Monday, November 17, 2025

ট্রাম্পের এশিয়া সফর: চুক্তি, নতজানু কূটনীতি ও আমেরিকার প্রাপ্তি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বিদেশ সফর সাধারণত হয় বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার শক্তি প্রদর্শনের এক বড় সুযোগ হিসেবে। কিন্তু ডনাল্ড ট্রাম্পের পাঁচ দিনের পূর্ব এশিয়া সফর ছিল একেবারেই অন্যরকম। এটি ছিল ট্রাম্প নামে এক ব্যক্তির ক্ষমতার প্রদর্শন। তবে সেই সঙ্গে তার সীমাবদ্ধতারও এক প্রকাশ। অনলাইন বিবিসির সাংবাদিক অ্যান্থনি জারচার ট্রাম্পের এশিয়া সফরকে এভাবে মূল্যায়ন করেছেন।

তিনি আরও লিখেছেন, প্রথম চার দিন মালয়েশিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্পের সফর ছিল এমন এক কূটনৈতিক অনুশীলন, যেখানে সবাই চেষ্টা করছিল এক অস্থির ও অনিশ্চিত মার্কিন প্রেসিডেন্টকে খুশি রাখতে। কারণ ট্রাম্প এক কলমের ছোঁয়ায় শুল্ক বা অন্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেন, যা রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

তবে বৃহস্পতিবার চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার বৈঠক ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটি ছিল দুই সমমর্যাদার পরাশক্তির নেতার মুখোমুখি হওয়া। সেখানে দুই দেশের অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক মর্যাদা এবং নাগরিকদের কল্যাণ, সবকিছুরই বড় ঝুঁকি জড়িত। চীনের ক্ষেত্রে ট্রাম্প কলম চালাতে পারেন, কিন্তু এর পরিণতিও ভয়াবহ। প্রথম চার দিন সফর ছিল বেশ মসৃণ। প্রতিটি স্টপে ছিল বাণিজ্য আলোচনা ও ট্রাম্পকে তুষ্ট করার এক প্রদর্শনী, যা অনেক সময় সীমা ছাড়িয়ে চাটুকারিতার পর্যায়ে পৌঁছায়।

মালয়েশিয়ায় ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার পান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির পথে অগ্রগতি করেন। পাশাপাশি তিনি থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে এক ‘শান্তি চুক্তি’ তত্ত্বাবধান করেন, যা ট্রাম্প পছন্দ করেন দেখাতে।

জাপানে ট্রাম্পের হেলিকপ্টার মেরিন ওয়ান টোকিও টাওয়ারের পাশ দিয়ে উড়ে যায়, যা সেদিন আমেরিকার পতাকার লাল-সাদা-নীলে আলোকিত ছিল, আর টাওয়ারের চূড়া ছিল সোনালি- ‘ট্রাম্পীয়’ রঙে।

নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেন এবং ট্রাম্পকে উপহার দেন ২৫০টি চেরি গাছ (আমেরিকার ২৫০তম জন্মবার্ষিকীর উপহার হিসেবে) ও প্রয়াত শিনজো আবের ব্যবহৃত গলফ ক্লাব ও ব্যাগ। তাকাইচি ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্যও মনোনয়ন দেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্পকে রাজকীয়ভাবে স্বাগত জানানো হয়। কামান থেকে ২১ রাউন্ড গান স্যালুট, সামরিক ব্যান্ডে বাজানো হয় ‘হেইল টু দ্য চিফ’ এবং ট্রাম্পের প্রিয় সংগীত ওয়াইএমসিএ। প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং ট্রাম্পকে দেশের সর্বোচ্চ পদক ও এক প্রাচীন রাজবংশীয় মুকুটের প্রতিলিপি উপহার দেন। দুপুরের খাবারে পরিবেশন করা হয় ‘শান্তিদূতের মিষ্টান্ন’- সোনার প্রলেপ দেয়া ব্রাউনি। পরে ছয়টি দেশের নেতাদের নিয়ে ট্রাম্পের সম্মানে নৈশভোজে পরিবেশন করা হয় বিশেষ ওয়াইন।

আমেরিকায় হয়তো ট্রাম্পকেম ‘নো কিংস’ প্রতিবাদে সমালোচিত হতে হয়। কিন্তু এশিয়ায় তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থেই রাজাদের মতো সম্মানিত। আর রাজাদের মতোই, ট্রাম্পও এসেছিলেন ‘খাজনা’ নিতে- দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থপ্রদান (প্রতি বছর ২০ বিলিয়ন ডলার), যা যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলে যাবে। এর বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানিতে মার্কিন শুল্ক ২৫ ভাগ থেকে কমে ১৫ ভাগ করা হয়।

কিন্তু সফরের মূল আকর্ষণ ছিল চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শেষ বৈঠক। এখানে আগের রাজকীয় আড়ম্বরের কিছুই ছিল না- না ব্যান্ড, না অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। বরং বুসান বিমানবন্দরের পাশে এক সাধারণ সামরিক ভবনে দীর্ঘ টেবিলের দুই পাশে বসেছিলেন দুই নেতা ও তাদের উপদেষ্টারা।
ট্রাম্পের মুখে তখন টানটান ভাব- একদিন আগেও তিনি বলেছিলেন, আমি বেশ আশাবাদী, ভালো বৈঠক হবে।

কিন্তু এই বৈঠকের পেছনে ছিল মাসের পর মাসের উত্তেজনা। ট্রাম্প চীনকে উচ্চ শুল্কের হুমকি দিচ্ছিলেন, চীনা বাজার খুলে দিতে ও ফেন্টানিল তৈরির রাসায়নিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে চাপ দিতে। চীন পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায়- আমেরিকার কৃষিপণ্য কেনা স্থগিত করে, এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রস্তাব দেয়।

অবশেষে বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দুপক্ষ সমঝোতায় আসে- আমেরিকা শুল্ক কমাবে, চীন আবার কৃষিপণ্য আমদানি শুরু করবে, তেল ও গ্যাস কেনা বাড়াবে এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজে প্রবেশাধিকার দেবে। যদিও এটি কোনো যুগান্তকারী চুক্তি নয়, তবে একে উভয় পক্ষের বাস্তবতা স্বীকার বলে দেখা হচ্ছে।

শি বৈঠকের শুরুতে বলেন, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে মতপার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। এটি হয়তো কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত, কিন্তু একই সঙ্গে জানিয়ে দেয় যে ‘ফ্রিকশন’ বা সংঘাত এখানেই শেষ নয়। চীন তার বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে চায়, আর ট্রাম্প আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করছেন- যেখানে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী উভয়কেই চাপ দিয়ে রাখা হয়।

ফলস্বরূপ, আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী মিত্ররা- জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া- নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ট্রাম্পকে খুশি রাখতে নানা রকম উপহার ও সম্মান দিচ্ছে। কিন্তু বড় আর্থিক দায়, বাড়তি প্রতিরক্ষা ব্যয় ও স্থায়ী শুল্কের বোঝা তাদের ভাবিয়ে তুলছে। শেষ পর্যন্ত এসবই আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার দিকে ঠেলে দিতে পারে- যা চীনের জন্য সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্প যখন দক্ষিণ কোরিয়া ত্যাগ করছিলেন, ঠিক তখনই সেখানে পৌঁছাচ্ছিলেন শি জিনপিং- এ যেন এক প্রতীকী দৃশ্য। শি অংশ নিচ্ছেন এপেক সম্মেলনের পূর্ণাঙ্গ বৈঠকে, যেটি ট্রাম্প এড়িয়ে গেছেন। যদি আমেরিকা আন্তর্জাতিক নেতৃত্বে ফাঁক তৈরি করে, চীন সেই শূন্যস্থান পূরণে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প হয়তো এই সফরে নিজের চাওয়া সবকিছুই পেয়েছেন- কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমেরিকা কি পেয়েছে তার প্রয়োজনীয়টুকু?

https://mzamin.com/uploads/news/main/187356_trmps.webp

কী হবে যদি গণভোটে ‘না’ জয়ী হয় by আনোয়ার হোসেন

প্রথম আলো এক্সপ্লেইনারঃ রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সংস্কার বাস্তবায়নের রূপরেখা অনুমোদন করেছে। রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে তা ইতিমধ্যে আইনি ভিত্তি পেয়েছে। প্রধান দলগুলোর সবাই খুশি না হলেও দৃশ্যত তারা এটি মেনেই নিয়েছে। ফলে সংস্কার নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার আপাত সুরাহা হয়েছে বলা চলে। তবে ভবিষ্যৎ সংস্কার পুরোপুরি নির্ভর করছে গণভোটের ফলাফলের ওপর। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এর পরিবর্তে ‘না’ জয়ী হলে কী হবে—সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। ঐকমত্য কমিশনের নয় মাসের আলোচনা, রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের চেষ্টা ভেস্তে যাবে? আপাতত এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর কারও কাছেই নেই।

‘না’ ভোট জয়ী হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল জুলাই সনদ মেনে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। পরবর্তী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছার ওপরই সংস্কার নির্ভর করবে। ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই ‘সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার’ এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ‘রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা’ ঘোষণা করে বিএনপি। সেই আলোকেই দলটি ভবিষ্যৎ সংস্কার এগিয়ে নিতে পারে। তা আবার জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়ার সঙ্গে মেলে না। অবশ্য জামায়াত জুলাই সনদের প্রায় সবগুলো সংস্কার প্রস্তাবকে সমর্থন করেছে। গণভোটে ‘না’ জয়ী হলেও কি জুলাই সনদ মেনে সংস্কার করবে, নাকি নিজেদের মতো করে নতুন ফর্মুলা সামনে আনবে, তা সময়ই বলে দেবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দীর্ঘ আলোচনায় ৬টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে তৈরি হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সংক্রান্ত। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাবে বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের ভিন্নমত আছে। ভিন্নমত সত্ত্বেও বিএনপি, জামায়াতসহ অধিকাংশ দল গত ১৭ অক্টোবর সনদে সই করে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় গণভোটের মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য হয়। কিন্তু সনদ ও গণভোটের আইনি ভিত্তি, সময় ও পথ-পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে ভিন্নমত থেকে যায়। গত ২৮ অক্টোবর সনদ বাস্তবায়নে দুটি বিকল্প সুপারিশ সরকারকে দিয়েছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেখানে গণভোটের সময় নিয়ে সিদ্ধান্তের ভার সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।

এরপর ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার বাস্তবায়নের রূপরেখা প্রকাশ করে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট হবে একই দিনে। চারটি বিষয়ের ওপর একটি প্রশ্নে হবে গণভোট। চারটি বিষয় হলেও আসলে এর মধ্যে সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবই আছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে (পিআর পদ্ধতি) ১০০ সদস্য নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অর্থাৎ এসব সংস্কার করতে হলে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হতে হবে।

জুলাই সনদ প্রণয়নে গঠিত ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ গত ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে একান্ত সাক্ষাৎকার দেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার বিষয়ে আশাবাদী মনোভাব দেখান, আবার প্রত্যাখ্যান হলে তা মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন।

আলী রীয়াজ বলেছিলেন, ১৭৯০ থেকে শুরু করে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পৃথিবীতে ৮০০ শতাধিক গণভোট হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে গণভোট ‘ফেল’ করেছে। তিনি আরও বলেন, শঙ্কাটা অন্য জায়গায়। এত দিনের চেষ্টা, এত বিষয়ে ঐকমত্য হলো। তারপর জনগণের কাছ থেকে সেটা প্রত্যাখ্যান হয়ে গেল। সেটা মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা দরকার।

চার প্রশ্নের উত্তর একটি, ঝুঁকি

৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাব নিয়ে গণভোট হবে। প্রস্তাবগুলোকে চারটি বিষয়ে ভাগ করে একটি প্রশ্নে হবে গণভোট। গণভোটের প্রশ্নটি হবে এ রকম: ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?’

ক. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

খ. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

ঘ. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

‘গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে হবে। এখানেই মূল জটিলতাটা রয়ে গেছে। চারটি প্রশ্নের কোনো কোনোটিতে বিএনপি ও সমমনাদের আপত্তি আছে। জামায়াত ও সমমনাদের আপত্তি আছে অল্প কিছু বিষয়ে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হয় জুলাই সনদ অনুসারে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার স্বীকৃতি দিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। নতুবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। এর ফলে ‘না’ ভোট জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও নাকচ করে দেওয়া যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মত হচ্ছে—কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সফল হওয়ার সুযোগ দেবে বলে মনে হয় না। ফলে তাদের সমর্থক ও ভোটারেরা ‘না’ ভোটের দিকে ঝুঁকতে পারে।

অন্যদিকে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মধ্যে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন, উচ্চকক্ষের ক্ষমতা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক পদে নিয়োগের বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত বেশি। ফলে দলটির সমর্থকদের অনেকে ‘না’ ভোট দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এর মধ্যে গত শুক্রবার নোয়াখালীর নিজ নির্বাচনী এলাকায় এক কর্মসূচিতে গণভোটে ‘না’ ভোট দিতে আহ্বান জানান বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের কী হবে

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটের প্রশ্নের প্রথম বিষয় হলো: ‘নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে’।

নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ সব দলই একমত। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের যে প্রক্রিয়া জুলাই সনদে রয়েছে, এর কয়েকটি ধাপ নিয়ে ভিন্নমত আছে বিএনপির।

এই পরিস্থিতিতে গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে এবং বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা গঠনের প্রক্রিয়া কীভাবে গ্রহণ করে, সেটা দেখার বিষয়। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে উচ্চ আদালতের রায় অপেক্ষমাণ আছে। রায়ের নির্দেশনা মানার একটা বাধ্যবাধকতা আছে। ফলে জুলাই সনদ জনগণের রায় না পেলেও উচ্চ আদালতের রায়ের বিষয়টি থাকবে।

জুলাই সনদে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি), ন্যায়পাল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নিয়োগের পদ্ধতি সংবিধানে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। সরকারি দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত বাছাই কমিটির মাধ্যমে এসব সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে।

নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে একমত হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে এভাবে নিয়োগের বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত আছে। দলটি এসব প্রতিষ্ঠানে আইনের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে ঐকমত্য কমিশনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে একমত জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

বিএনপি তাদের ঘোষিত ৩১ দফায় বলেছে, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে সব রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করা হবে। ফলে বিএনপি জয়ী হলে নিজেদের মতো আইন-বিধিবিধান করতে পারে।

ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ

বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ২৫টি রাজনৈতিক দল সংসদের উচ্চকক্ষ চায়। বিএনপি তাদের ৩১ দফাতেও ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে জুলাই সনদে যে পদ্ধতির কথা উল্লেখ রয়েছে, তা নিয়ে দ্বিমত আছে বিএনপিসহ সাতটি দলের।

জুলাই সনদ অনুসারে, সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের শরিক ১২-দলীয় জোটসহ সমমনা দলগুলোর চাওয়া হচ্ছে—নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে ভাগ হবে উচ্চকক্ষের আসন।

জুলাই সনদ অনুসারে, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট ‘হ্যাঁ’ সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এই প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত। সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন লাগবে।

গণভোটে ‘না’ সূচক ভোট জয়লাভ করলে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনেরই আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তখন যে দল ক্ষমতায় আসবে, চাইলে তাদের মতো করে উচ্চকক্ষ হতে পারে।

সবকিছু নির্ভর করছে ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর

যেকোনো নির্বাচনে ভোটারদের কেন্দ্রে আনার মূল দায়িত্ব রাজনৈতিক দল, তাদের মনোনীত প্রার্থী এবং নেতা-কর্মীদের। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে—এমনটাই ধারণা করা যায়।

তবে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে ৪৮টি বিষয়ের ওপর। যা কিছুটা জটিল, সংবিধান–সংক্রান্ত। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের যেভাবে বোঝাবে, সে অনুসারেই গণভোটের ফল আসার সম্ভাবনা বেশি। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর চাওয়ার ওপরই গণভোটের ফলাফল নির্ভর করছে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংস্কারের নতুন যুগ শুরু হবে—এটা নিশ্চিত। কিন্তু ‘না’ জিতলেও সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে না। কিছু সংস্কার নির্বাহী আদেশে বাস্তবায়ন হয়ে যাবে। তবে অনেক মৌলিক সংস্কারই অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে, যা নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পতনের আগে বিএনপি, আওয়ামী লীগসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে তিন জোটের রূপরেখা বা সংস্কার উদ্যোগ তৈরি করা হয়। তবে সেটি আইনি ভিত্তি পায়নি। ফলে এর বেশির ভাগই পরবর্তী সংসদে বাস্তবায়ন করা হয়নি।

২০০১ সাল থেকে পরবর্তী সবগুলো নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দল ও তাদের জোট দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। আগামী নির্বাচনে কোনো দল ও জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সংস্কারের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা বলা মুশকিল। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে হয়তো বিরোধীদের চাপের মুখে থেকে কিছু কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

কী হবে যদি গণভোটে ‘না’ জয়ী হয়

ট্রাম্প কেন মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান by ইয়ান ব্রেমার

সংকেতটা ক্রমে জোরালো হচ্ছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চান। তিনি তা এমনভাবে করতে চান, যাতে পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে কোনো যুদ্ধ শুরু না হয়।

এ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ সীমিত রয়েছে এক ডজনের বেশি নৌকায় হামলার মধ্যে। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, এসব নৌকায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দশে মাদক বহন করা হচ্ছিল। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘এ মাদক আমাদের গোটা দেশের পরিবারগুলোকে ধ্বংস করছে।’ তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘এর মানে কি যুদ্ধ?’ উত্তরে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার তা মনে হয় না। কিন্তু তারা আমাদের সঙ্গে খুব বাজে আচরণ করেছে।’ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন হামলায় অন্তত ৬৯ জন নিহত হয়েছেন।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবীয় অঞ্চলে উল্লেখ করার মতো সামরিক শক্তি মোতায়েন করেছে। একটি বিমানবাহী রণতরিসহ সেনাসদস্যরা ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে হামলা চালাতে পারে। গত মাসে নিউইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন গোপনে সিআইএকে ভেনেজুয়েলায় গোপন অভিযান পরিচালনার অনুমোদন দিয়েছে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ মাদক পাচার হয়ে আসে, তাতে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা নগণ্য। এরপরও কারাকাসের প্রতি ওয়াশিংটনের এমন কঠোর অবস্থানের কারণ হলো ট্রাম্পের ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) আন্দোলনের সমর্থক গোষ্ঠী ও লাতিন আমেরিকান পৃষ্ঠপোষকেরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র লাতিন আমেরিকার মাদুরোর মতো বামপন্থী নেতাদের প্রতি খুব নরম আচরণ করছে। ২০১৩ সালে হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর থেকে মাদুরো ক্ষমতায় আছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে।

এসব কারণেই ভেনেজুয়ালার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এ চাপের উদ্দেশ্য হচ্ছে, মাদুরোর ঘনিষ্ঠ মহলকে এটি মানতে বাধ্য করা যে এই শক্তিশালী নেতার প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার মূল্য অনেক বেশি। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সংঘাত এড়াতে তাঁকে ভেতর থেকেই সরিয়ে দেওয়া উচিত। এ কৌশল যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি মাদুরোকেই লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা বাহিনীর ভেতর থেকে মাদুরোর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে আলোচনার পথ খুলে যেতে পারে। সেনাবাহিনীর ভেতর থেকে আসা কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করতে পারেন।

সেনাবাহিনীর ভেতরে বিরোধী দলের প্রতি গভীর অবিশ্বাস রয়েছে, সে কারণে কম সম্ভাবনাময় আরেকটি দৃশ্যপটের কথাও চিন্তা করা যেতে। সেনাবাহিনীর কিছু অংশ বিরোধী নেতা মারিয়া মাচাদো ও এদমুন্দো গোনসালেসের পাশে দাঁড়াতে পারে অথবা নতুন নির্বাচনের দাবিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

কিন্তু মাদুরোর লোকদের সঙ্গে আপসরফা করাটাই যুদ্ধ এড়ানোর একমাত্র উপায়। শাসক দল ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলা দেশটির সব শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে। মাদুরোকে আলাদা করতে চাইলে নিরাপত্তা বাহিনী এমন নিশ্চয়তা দাবি করবে, যাতে তাদের নিরাপত্তা, দেশের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদে প্রবেশগম্যতার অধিকার সুরক্ষিত থাকে।

ভেনেজুয়েলার পদস্থ সামরিক নেতৃত্ব জানেন, মাদুরো কিউবার গোয়েন্দাব্যবস্থাকে তাঁর নিজ দেশের জেনারেলদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তিতে ব্যবহার করেন। ফলে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যেকোনো পদেক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টার মানেই মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি। ফলে তাঁদের রাজি করাতে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি মাদুরো সরকারের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যাতে অন্যদের ওপর চাপ তৈরি করা যায়।

ট্রাম্প জানেন, মাদুরোকে সরাতে ব্যর্থ হলে সেটি তাঁর জন্য লজ্জার কারণ হবে। আর যদি মাদুরোকে সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপে সরানো হয়, ভেনেজুয়েলার ভেতরের পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, যা তিনি সহজে নিতে চাইবেন না।

এটি ধরে নেওয়া হচ্ছে যে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকিতে ফেলে ভেনেজুয়েলায় শৃঙ্খলা ফেরানোর ব্যাপারে হোয়াইট হাউসের গভীর অনাস্থা আছে। ভেনেজুয়েলায় গৃহযুদ্ধ হলে তাতে যে রক্তগঙ্গা বইবে, তার জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করা হবে। সিনেটে যেহেতু ট্রাম্পের যুদ্ধের ক্ষমতা সীমিত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টকেই নিতে হবে। এখন পর্যন্ত তিনি এমন কৌশল বেছে নিতে পারেননি, যা তাঁকে তাঁর কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দেবে।

* ইয়ান ব্রেমার, টাইম–এর পররাষ্ট্রবিষয়ক কলাম লেখক
- টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। রয়টার্স

নভিচক দুঃস্বপ্ন: পুতিনের নির্দেশে সাবেক রুশ গুপ্তচর ও মেয়েকে টার্গেট

বৃটেনের রাস্তায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের টার্গেটে রাসায়নিক হামলার বিভীষিকা প্রথমবারের মতো প্রকাশ করলেন সাবেক এক রুশ গুপ্তচর ও তার মেয়ে। ২০১৮ সালের ৪ঠা মার্চ সালিসবুরিতে রুশ এজেন্টদের বিষপ্রয়োগে প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিলেন এমআই৬-কে তথ্য সরবরাহকারী দ্বৈত এজেন্ট সের্গেই স্ক্রিপাল এবং তার ৩৩ বছর বয়সী মেয়ে ইউলিয়া স্ক্রিপাল। এ খবর দিয়ে অনলাইন ডেইলি মেইল বলছে, স্ক্রিপালদের বাড়ির দরজার হাতলে মারাত্মক নভিচক নার্ভ এজেন্ট ছড়ানো হয়েছিল। বিষক্রিয়ার পর তারা তিন সপ্তাহ কোমায় ছিলেন। দীর্ঘ সময় কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের।

এরপর থেকে তারা গোপনে বসবাস করছেন। এখন ঘটনার ওপর হওয়া সরকারি তদন্তে দেয়া তাদের লিখিত বিবৃতিতে সেই ভয়াল দিনের সবকিছু উঠে এসেছে। ইউলিয়া জানান, রাশিয়া থেকে আগের দিন বৃটেনে পৌঁছে পরদিন বাবা-মেয়ে লাঞ্চ খাচ্ছিলেন। হঠাৎ দু’জনের চোখ কাঁপতে শুরু করে, যা তারা প্রথমে ‘মজার’ বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু এর পরপরই শ্বাসকষ্ট, প্রবল বিভ্রম, দৃষ্টিবিভ্রাট এবং বমি শুরু হয়। রেস্তোরাঁ ছাড়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। ইউলিয়া বলেন, রাস্তার সবকিছু দুলছিল খুবই খারাপভাবে। আমাকে বাবার হাত ধরে থাকতে হয়েছিল। কিছুদূর গিয়ে সাইন্সবারির কার পার্কের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তারা আর এগোতে না পেরে একটি বেঞ্চে বসে পড়েন।

ইউলিয়া বলেন, বসে সঙ্গে সঙ্গে এক অদ্ভুত, ভয়ানক অনুভূতি হলো। চারদিকে সব ঝাঁপসা, রঙ বদলে গোলাপি, লাল, নীল হয়ে যাচ্ছে, যেন এলএসডি বা অ্যামফেটামিন নিয়েছি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পথচারীরা তাদের সাহায্য না করলে নিজের বমিতেই শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল বলে তিনি মনে করেন। সিসিটিভিতে দেখা যায়, তিনি বাবার কাঁধে হেলে আছেন এবং শুধু বাম হাত দিয়ে গোল গোল ঘূর্ণি আঁকার মতো নড়াচড়া করছেন। সের্গেই স্ক্রিপাল তার নথিতে বলেন, আমি বিভ্রমে আরবি পুরুষ-নারী দেখছিলাম। তাদের একজনকে ঘুষিও মারি। জানতাম এগুলো বিভ্রম, কারণ সালিসবুরিতে তো আরবি মানুষ খুব বেশি থাকে না।
তিন সপ্তাহ কোমায় থাকার পর জেগে উঠে তিনি ভাবেন কেবল একদিন গেছে। কিন্তু আসলে কেটে গেছে ২১ দিন। ঘটনার পর কাউন্টার টেরর পুলিশ ও ১৮০ জন রাসায়নিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ যুক্ত হয়ে বিশাল তদন্ত চালায়। তদন্তটির নাম ডন স্টার্জেস ইনকোয়ারি। ডন স্টার্জেস ৪৪ বছর বয়সী এক নারী।  তিনি পরিত্যক্ত সুগন্ধির বোতলে থাকা নভিচক ভুল করে শরীরে স্প্রে করে মারা যান। পরীক্ষায় প্রমাণ মেলে, এটি সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৮০-এর দশকে তৈরি করা সামরিক পর্যায়ের নার্ভ এজেন্ট।

বৃটিশ পুলিশ বিশ্বাস করে, দুই রুশ গুপ্তচর ভুয়া নাম আলেকজান্ডার পেত্রভ ও রুসলান বশিরভ ঘটনার আগের দিন বৃটেনে যান এবং স্ক্রিপালের বাড়িতে বিষ প্রয়োগ করেন। পরে বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রকৃত পরিচয় বের করে। তাতে দেখা যায় তারা আসলে ইভান এরমাকভ ও আলেক্সেই লুগোভ। দাবি করেন, তারা নাকি সালিসবুরির ‘খ্যাতিমান ১২৩ মিটার উঁচু ক্যাথেড্রালের চূড়া দেখতে’ গিয়েছিলেন। তা নিয়ে ব্যাপক উপহাস হয়। বৃটিশ সরকার আরও অভিযোগ করে, ২০১৩ সাল থেকে তারা ইউলিয়ার ইমেইল হ্যাক করছিল এক্স-এজেন্ট ম্যালওয়্যার ব্যবহার করে। এছাড়া ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগে তারা এফবিআইয়ের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছে। আগামী মাসে এই তদন্তের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/189759_Abul-7.webp

ভারত কেবল মুসলিমদের ‘বিদেশি’ বলে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে by আরশাদ আহমেদ ও মহিবুল হক

ভারত থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো নাগরিকদের বেশির ভাগই সে দেশের নাগরিক। যাঁদের পাঠানো হচ্ছে তাঁরা মুসলিম এবং বাংলাভাষী। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভুক্তভোগীদের অবস্থা নিয়ে ২৪ জুন আল–জাজিরার অনলাইনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আরশাদ আহমেদমহিবুল হক প্রতিবেদনটি করেছেন।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের ৬৭ বছর বয়সী সাইকেল মেকানিক আলী গত ৩১ মে নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। এর আগে তিনি চারটি ভয়ংকর দিন কাটিয়েছিলেন বাংলাদেশে। জন্মের পর থেকে তিনি জীবনভর এই প্রতিবেশী দেশটির নাম কেবল ‘গালি হিসেবে’ শুনেছেন বলে দাবি করেন।

আলীর এই এক সপ্তাহের দুর্ভোগ শুরু হয় ২৩ মে। ওই দিন রাজ্যের মোরিগাঁও জেলার কুইয়াদল নামের ছোট একটি গ্রামে তাঁর ভাড়া বাসা থেকে আসাম পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। সেদিন রাজ্য সরকার ঘোষিত ‘বিদেশি নাগরিকদের’ ধরপাকড় শুরু করে। আসামে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে কেবল ‘বিদেশি নাগরিক’ বলা হয়ে থাকে।

আসাম হচ্ছে চা উৎপাদনকারী এলাকা। এ অঞ্চলে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে বাংলাভাষী মানুষের আগমন ঘটেছে এবং তাঁরা সেখানে বসবাস করছেন। এর পর থেকে স্থানীয় আদিবাসীদের (যাঁরা মূলত অসমিয়া ভাষায় কথা বলেন) সঙ্গে জাতিগত উত্তেজনা তৈরি করেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ২০১৬ সালে প্রথমবার আসামের ক্ষমতায় এলে এই উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। রাজ্যের ৩ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি মুসলিম, যা ভারতের যেকোনো রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ হার।

আলী হচ্ছেন সেই ৩০০-এর বেশি মুসলিমের একজন, যাঁদের মে মাস থেকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো (পুশ ইন) হয়েছে। এমন তথ্য দিয়েছেন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা। তিনি বলেছেন, ‘এ ধরনের ঠেলে পাঠানো আরও জোরদার করা হবে। আমাদের রাজ্যকে বাঁচাতে আরও সক্রিয় ও উদ্যোগী হতে হবে।’

নীল আকাশের নিচে নরক

২৩ মে পুলিশ আলীকে আটক করে ২০০ কিলোমিটারের বেশি দূরের গোয়ালপাড়া জেলার মাতিয়ায় নিয়ে যায়। ওই এলাকায় আসামের কথিত ‘অবৈধ’ অভিবাসীদের জন্য রাজ্যের সবচেয়ে বড় বন্দিশিবির নির্মাণ করা হয়েছে।

তিন দিন পর ২৭ মে ভোরবেলায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) আলী, পাঁচ নারীসহ ১৩ জনকে একটি ভ্যানে করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যায়।

আলী বলেন, ‘বিএসএফ আমাদের জোর করে ওপারে ঠেলে দিতে চাইছিল। কিন্তু বিজিবি (বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড) এবং স্থানীয় বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ জানায়, তারা আমাদের নেবে না। কারণ, আমরা ভারতীয়।’

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ নামে পরিচিত একটি খোলা মাঠে আলীসহ অন্যদের পরবর্তী ১২ ঘণ্টা হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। তাঁদের জন্য ছিল না কোনো খাবার, আশ্রয় কিংবা সুরক্ষা।

আলীকে জলাভূমিতে বসে থাকতে এবং তাঁর চোখেমুখে গভীর আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে—এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা নীল আকাশের নিচে নরক দেখেছি আর অনুভব করেছি, কেমন করে জীবন আমাদের ছেড়ে যাচ্ছিল।’

আলী বলেন, তাঁরা যখন ভারতের দিকেই ফিরে যেতে চান, তখন বিএসএফ তাঁদের ভয় দেখিয়ে বলে, ফিরে গেলে গুলি করা হবে।

আলী বলেন, ‘আমরা কান্নাকাটি করে অনুরোধ করেছিলাম যেন আমাদের না ঠেলে দেওয়া হয়। তখন ভারতের নিরাপত্তা সদস্যরা রাবার বুলেট ছোড়েন। ওই স্থান আমাদের জন্য কোনো “নো ম্যানস ল্যান্ড” ছিল না। বরং সেটি ছিল এমন এক জায়গা, যেখানে আমাদের কোনো দেশই ছিল না।’

৫০ বছর বয়সী রহিমা বেগমকে একইভাবে আসামের গোলাঘাট জেলা থেকে ধরে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলছেন, এ ঘটনার স্মৃতি তাঁকে এখনো তাড়া করে।

রহিমা বলেন, ‘আমি যখন দৌড়ে বাংলাদেশের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি, তখন বিজিবি আমাকে মারধর করে। আমার কোনো পালানোর পথ ছিল না। বিএসএফ হুমকি দেয়, যদি আমরা না যাই ওপারে, তাহলে তারা আমাদের গুলি করে মারবে।’

বাংলাদেশের সীমান্ত শহর রৌমারীর সাংবাদিক জিতেন চন্দ্র দাস। তিনি এ ঘটনা নিয়ে একটি বাংলা দৈনিকে প্রতিবেদন করেছিলেন। এই সাংবাদিক আল–জাজিরাকে বলেন, বিএসএফ ওই আটকে পড়া ভারতীয় নাগরিকদের ওপর রাবার বুলেট ছুড়েছে। বিএসএফ তাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাতে ‘আকাশে চার রাউন্ড গুলি’ ছুড়েছে।

তবে ২৭ মে বিএসএফ এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা কেবল বাংলাদেশি নাগরিকদের ‘অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে’ কাজ করেছে।

বাংলাদেশি গ্রামবাসী ও বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপের পর বিজিবি আলীকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে তিনি জঙ্গল পেরিয়ে ১০ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা শেষে বাড়ি ফেরেন।

৩১ মে আসামভিত্তিক দ্য সেন্টিনেল পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজিবির কাছ থেকে বিএসএফ ৬৫ জন সন্দেহভাজন ভারতীয় নাগরিককে ফেরত নেয়।

বাংলাদেশে ঠেলে পাঠনো হয়েছিল, ভারতের এমন মুসলিম নাগরিকেরা আল–জাজিরাকে বলেন, বিজিবি তাঁদের আন্তর্জাতিক সীমান্তে রেখে যায়। সেখান থেকে অন্তত ১০০ জন নিজেরাই বাড়ি ফিরে যান। এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেকেই জানান, সীমান্তে ‘সাদাপোশাকে থাকা লোকজন’ তাঁদের গ্রহণ করেন এবং পরে হাইওয়েতে ফেলে রেখে চলে যান।

মুসলিমদের বিতাড়নের ঢেউ

গত ২২ এপ্রিল ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে গুলি করে ২৬ জনকে হত্যা করে সশস্ত্র গোষ্ঠী। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ তোলে ভারত। ওই ঘটনার পরই ভারতে মুসলিমবিরোধী মনোভাব আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এর পর থেকেই তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বিতাড়নের প্রচার-প্রচারণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি অধ্যাপক অপূর্বানন্দ আল–জাজিরাকে বলেন, পেহেলগাম হামলার পর ভারতের কেন্দ্রীয় ও আসাম রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি দুর্বল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তাড়িয়ে দেওয়ার অজুহাত খুঁজে পায়। যেমন রোহিঙ্গা সম্প্রদায় কিংবা বাংলাভাষী ভারতের মুসলিম নাগরিক।

অপূর্বানন্দ বলেন, ‘বিজেপি সরকারের অধীন ভারতে মুসলিম পরিচয় মানেই সন্ত্রাসবাদের প্রতীক। এই সরকার বাংলাভাষী মুসলিমদের অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে বিবেচনা করে।’

আসামের বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছে, চলমান কথিত বিদেশি নাগরিক ধরার অভিযানে কেবল মুসলিমদের নিশানা করা হচ্ছে। কংগ্রেস পার্টির নেতা দেবব্রত শইকিয়া আল–জাজিরাকে বলেন, তারা কেবল মুসলিমদেরই মাতিয়া বন্দিশিবির থেকে ঠেলে পাঠিয়েছে।

অবশ্য বিজেপির মুখপাত্র মনোজ বৌরাহ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অভিযান ধর্মভিত্তিক নয়। তিনি দাবি করেন, অবৈধ হিন্দুদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়নি। কারণ, তাঁরা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হতে পারেন।

আসামের পরিস্থিতি

আসামে বহু দশক ধরে জাতিগত ও ধর্মীয় উত্তেজনা চলে আসছে। এই উত্তেজনার মূল শিকড় রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে।

১৯ শতকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা আসামের পার্বত্য এলাকাগুলোয় চা–বাগান তৈরি করে। এতে কাজ করতে বাংলাভাষী মুসলিম ও হিন্দু—উভয় সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক আসামে আসেন। তাঁদের অনেকে বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চল থেকে এসেছেন।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় ভারত ও পাকিস্তান—দুটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হয়। পাকিস্তানের একটি অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান, যেখানে বেশির ভাগ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলতেন। অন্যদিকে পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা ছিল উর্দু।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে ভাষা নিয়ে গণ–আন্দোলনের পর ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে মুক্তিযুদ্ধ হয় এবং স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজকের দিনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার (২ হাজার ৫৪৫ মাইল) দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ২৬০ কিলোমিটার (১৬০ মাইল) আসামের সঙ্গে।

অন্যদিকে আসামের কর্তৃপক্ষ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চকে (বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার আগের দিন) একটি সীমারেখা হিসেবে নির্ধারণ করে। বাংলাভাষী বসবাসকারীদের নাগরিকত্ব দাবি করতে হলে প্রমাণ হিসেবে দাখিল করতে হয়, তাঁরা ওই তারিখের আগে আসামে এসেছিলেন।

এ ধরনের নাগরিকত্ব সম্পর্কিত মামলাগুলো নিষ্পত্তি করে আসাম রাজ্যে স্থাপিত বিশেষ ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ বা বিদেশি ট্রাইব্যুনাল। এসব ট্রাইব্যুনাল একটি বিশেষ আদালতের মতো কাজ করে এবং সরকারি নথিপত্রে ছোটখাটো বানান ভুল বা অমিল দেখিয়ে মানুষকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করার ক্ষমতা রাখে।

২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছিল, এসব ট্রাইব্যুনাল ছিল ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং তারা ‘ইচ্ছামতো কাজ করে’।

ওই বছরেই আসামে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়। অবৈধ বাসিন্দাদের শনাক্ত করতে সরকার বহু বছর ধরে এই এনআরসি প্রস্তুত করছিল।

এই তালিকায় প্রায় ২০ লাখ বাসিন্দাকে বাদ দেওয়া হয়, যাঁদের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ মুসলিম। এনআরসি প্রকাশের পর জোরপূর্বক ভারত থেকে বহিষ্কার করতে শত শত মুসলিমকে বন্দিশিবিরে ধরে নেওয়া হয়।

আলীর নাম এনআরসিতে ছিল। তবে ২০১৩ সালে মোরিগাঁওয়ের একটি ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করেন। কারণ, কিছু কাগজপত্রে তাঁর বাবার নাম ছিল ‘সামত আলী’। আবার কিছু কাগজপত্রে ‘চামত আলী’ এবং ‘চাহমত আলী’ হিসেবে তাঁর বাবার নাম লেখা হয়েছে।

নাগরিকত্ব বাতিলের পর আলী দুই বছর বন্দিশিবিরে কাটান। ২০১৪ সালে আসাম হাইকোর্টও ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রাখেন।

আলী বলেন, তিনি এতটাই দরিদ্র যে সুপ্রিম কোর্টে এই রায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার সামর্থ্য তাঁর নেই।

‘তারা আমাকে বাংলাদেশি বানিয়ে দিল’

বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন অনেক মুসলিমের নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন।

হয়রানির শিকার এসব মুসলিমের দাবি, এ পরিস্থিতিতে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারের ধরপাকড় বেআইনি। তারা অবৈধ বিদেশি ধরার নামে ইচ্ছামতো হয়রানি করছে।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা স্বীকার করেছেন, ‘যাদের মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, এমন কিছু মানুষকে কূটনৈতিক চ্যানেলে বাংলাদেশ থেকে ফেরত আনা হয়েছে।’

তাঁদের একজন হলেন সোনা বানু। তিনি রাজ্যের বরপেটা জেলার বুড়িখামার গ্রামের বাসিন্দা। তাঁকে ২৭ মে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠানো হয়।

৫৯ বছর বয়সী সোনা বানু আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি, যে দেশে আমি জন্মেছি, যেখানে আমার মা–বাবা ও দাদু-দাদির জন্ম, সেই দেশ আমাকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে পাঠাবে। তারা আমাকে বাংলাদেশি বানিয়ে দিল। অথচ বাংলাদেশকে আমি জীবনে কেবল ১০ মিটার দূর থেকে দেখেছি, নো ম্যানস ল্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়ে।’

মোরিগাঁও জেলার মিকিরভেটা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়া যেন আমার জন্য মৃত্যুদণ্ডের মতো ছিল।’

আসামের মুসলিম খায়রুল

খায়রুল ইসলাম বলেন, প্রাসঙ্গিক দলিল-দস্তাবেজ থাকার পরও ২০১৬ সালে তাঁকে ‘বিদেশি’ নাগরিক ঘোষণা করা হয়। তাঁর পরিবার ব্রিটিশ আমলের জমির দলিল আদালতে জমা দিয়েছিল, যেখানে তাঁর দাদার নামে ভূমি রেকর্ড ছিল। তিনি এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছেন।

খায়রুল বলেন, ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে কাটানো সময় আমাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আমাদের শরণার্থীর চেয়েও খারাপ অবস্থায় রাখা হয়েছিল। আমাদের কষ্ট পুরো পৃথিবীর চোখে দৃশ্যমান ছিল। আমরা যেন ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের জন্যই বিদেশি ছিলাম।’

কিন্তু ৫০ বছর বয়সী নিজাম আহমেদ সরকারি নথি অনুযায়ী, কোনোভাবেই বিদেশি ছিলেন না। গোলাঘাট জেলার জামুগুড়ি চা–বাগান এলাকায় ট্রাকচালক হিসেবে কর্মরত নিজামের নাম এনআরসিতে রয়েছে। তবু তাঁকে নো ম্যানস ল্যান্ডে ফেলে দেওয়া হয়।

নিজামের ছেলে জাহিদ বলেন, একটি ভাইরাল ভিডিও থেকে তিনি তাঁর বাবার আটক হওয়ার খবর জানতে পারেন। ওই ভিডিওতে তাঁর বাবাকে বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে দেখা যায়।

জাহিদ বলেন, ‘[আমরা] ভারতীয়। আমার দাদা সেকেন্ড আসাম পুলিশ ব্যাটালিয়নে ছিলেন।’

আল–জাজিরা এ তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত করেছে, নিজামের বাবা সেলিম উদ্দিন আহমেদ ১৯৬০ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের সদস্য ছিলেন।

জাহিদ বলেন, ‘আমার দাদা যদি এখন বেঁচে থাকতেন, এটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিত। একজন পুলিশ কর্মকর্তার ছেলেকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হলো।’

‘ফিরে এলে গুলি করব’

সম্প্রতি ভারতের বিজেপিশাসিত অন্যান্য রাজ্যেও কথিত অবৈধ বাংলাদেশিদের বিতাড়নের অভিযান ছড়িয়ে পড়েছে।

গুজরাট রাজ্যের প্রধান শহর আহমেদাবাদের পুলিশ জানিয়েছে, তারা ২৫০ জনের বেশি ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে। এসব ব্যক্তি ‘অবৈধভাবে এখানে বসবাস’ করছেন। তাঁরা ‘বাংলাদেশি অভিবাসী’ বলে পুলিশ দাবি করছে।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে পুলিশ কর্মকর্তা অজিত রাজিয়ানের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া চলছে।

ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রেও গত মাসে সাতজন মুসলিমকে বিদেশি দাবি করে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর জন্য বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপে ১৫ জুন তাঁদের সীমান্ত থেকে ফিরিয়ে আনা হয় বলে জানান পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য সমীরুল ইসলাম। এ দলটি বিজেপিবিরোধী ইন্ডিয়া জোটের শরিক।

সমীরুল আল–জাজিরাকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও অন্যান্য রাজ্য কর্তৃপক্ষ মহারাষ্ট্র পুলিশকে জানিয়েছিল, এসব ব্যক্তি পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা, তাঁরা ভারতীয় নাগরিক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ বা সরকারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ না করেই তাঁদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

১৬ জুন কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহারাষ্ট্র পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শুধু বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই তাঁদের বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আল–জাজিরার সঙ্গে কথা বলা ওই সাত মুসলিমের মধ্যে তিনজন বলেন, তাঁরা যখন মহারাষ্ট্র পুলিশের হেফাজতে ছিলেন, তখন পরিবার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁদের ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণস্বরূপ কাগজপত্র জমা দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা মিরানুল শেখ ও নিজামউদ্দিন শেখকে আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে নো ম্যানস ল্যান্ডে দেখা গেছে।

৩২ বছর বয়সী মিরানুল আল–জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা বারবার বলছিলাম, আমরা মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছি। কিন্তু বিএসএফ আমাদের মারধর করেছে। তারা গালাগাল করে বলেছিল, “ফিরে এলে গুলি করব।”’

আল–জাজিরা ১৯ জুন বিএসএফের কাছে এসব অভিযোগ সম্পর্কে মন্তব্য জানাতে ই–মেইল করলেও এই প্রতিবেদন করা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

আসামের ‘মিয়া’ মুসলিমরা

এই ব্যাপক অভিযান চলাকালে আসামের পুলিশ ২৫ মে গোলাঘাট জেলার নোয়াজান গ্রাম থেকে বাংলাভাষী মুসলিম আবদুল হানিফকে তাঁর বাড়ি থেকে আটক করে। কিন্তু তাঁকে আটকের কোনো কারণ জানানো হয়নি।

আল–জাজিরাকে হানিফের বড় ভাই দীন ইসলাম বলেন, পুলিশ বলেছিল, দুই দিনের মধ্যে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

পূর্ব আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের জন্য পুলিশি অভিযান নতুন কিছু নয়। রাজ্যের চা-বাগান অঞ্চলে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব ব্যাপকভাবে দেখা যায়। তবে পুলিশ যে এটি একটি ‘রুটিন যাচাই-বাছাই অভিযান’ বলে উল্লেখ করেছে, সেটিই হানিফকে খুঁজে বের করতে পরিবারকে মরিয়া করে তোলে।

দীন ইসলাম বলেন, ‘আমরা তার খোঁজে এক থানা থেকে আরেক থানায় ঘুরছি; কিন্তু পুলিশ কিছু বলছে না।’

দীন ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, হানিফকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল গোলাঘাটের পুলিশ সুপার রাজেন সিংয়ের কার্যালয়ে। সেখানে হানিফসহ আরও কয়েকজনকে আটক রাখা হয়েছিল। পরে তাঁদের সবাইকে বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

হানিফের পরিবার দৃঢ়তার সঙ্গে বলছে, তিনি বিদেশি নন। দীন ইসলাম বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে কোনো ট্রাইব্যুনালে মামলা নেই। শুধু আমরা “মিয়া” বলে সন্দেহ থেকে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

আসামে মিয়া একটি অপমানসূচক শব্দ, যা আদিবাসী অসমিয়ারা বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘বাংলাদেশি’ বোঝাতে ব্যবহার করে।

আল–জাজিরা হানিফের অবস্থান জানতে চাইলে পুলিশ সুপার রাজেন সিং বলেন, এ ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায় না।

হানিফের সঙ্গে রাজেন সিংয়ের কার্যালয়ে ছিলেন একজন স্থানীয় ব্যক্তি। তিনি বলেন, তাঁদের দলটিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। হানিফকে সম্ভবত বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে।

নিজের পরিচয় গোপন রেখে স্থানীয় ওই ব্যক্তি বলেন, তাঁকেও বাংলাদেশ সীমান্তে নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, মানুষ রাতারাতি গায়েব হয়ে যাচ্ছে। হানিফ হয়তো অনেকের মতো বাংলাদেশে হারিয়ে গেছেন।

আল–জাজিরা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছে, গত মাসে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী যাঁদের জোর করে নো ম্যানস ল্যান্ডে ঠেলে পাঠিয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থান এখনো অজানা।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানের জন্য আসামে অন্তত চারটি পরিবার হাইকোর্টে আবেদন করেছে। তাদের মধ্যে অন্তত দুটি পরিবার ‘দেশি’ মুসলিম সম্প্রদায়ের, যাদের রাজ্য সরকার নিজস্ব আদিবাসী মুসলিম হিসেবে গণ্য করে।

সামসুল আলীর ছেলে বক্কার আলী বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম, আমরা আদিবাসী মুসলিম; তাই নিরাপদ। কিন্তু এখন দেখছি, এখানে কোনো মুসলিমই নিরাপদ নন।’

বক্কার বলেন, তাঁর বাবাকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে। এখন তিনি সে দেশের পুলিশের হেফাজতে আছেন।

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার জেল সুপার আমিরুল ইসলাম ১৬ জুন আল–জাজিরাকে জানান, আরেকজন ভারতীয় নাগরিক দইজান বিবি বাংলাদেশ পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মুখপাত্র ফয়সাল মাহমুদ আল–জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে একটি কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছে, যাতে বলা হয়েছে, বিএসএফ যে পদ্ধতিতে মানুষকে বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হচ্ছে না।

ভারতীয় বাহিনী মুসলিমদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে—এমন অভিযোগ নিয়ে আল–জাজিরা ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য জানতে চাইলেও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা (২৪ জুন) পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

‘মুসলিমদের বেছে বেছে ঠেলে পাঠানো হয়েছে’

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর এবং কিংস কলেজ লন্ডনের যৌথ ডক্টরাল ফেলো এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশ্লেষক অংশুমান চৌধুরী বলেছেন, আসাম সরকার যে কথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’দের ঠেলে পাঠানোর (পুশ ব্যাক) দাবি করছে, তা আসলে ‘জোরপূর্বক বহিষ্কার’।

আল–জাজিরাকে অংশুমান চৌধুরী বলেন, ‘পুশ ব্যাক’ অর্থ হচ্ছে—যে অভিবাসীরা আপনার সীমান্তে ঢোকার চেষ্টা করছেন, তাঁদের ঠেলে ফেরত পাঠানো। কিন্তু সরকার যা করছে, তা হলো মানুষকে ধরে তুলে নেওয়া এবং তাদের আরেকটি দেশে ছুড়ে ফেলা।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটিকে তিনি ন্যায্য বলেই মনে করছেন। কারণ, তিনি ১৯৫০ সালের একটি আইনের কথা উল্লেখ করছেন, যা জেলা কমিশনারদের নির্দিষ্ট কিছু কাগজপত্রহীন অভিবাসীকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা দেয়।

কিন্তু আসাম হাইকোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ওলিউল্লাহ লস্কর বলছেন, এই আইন কেবল তাঁদের জন্য, যাঁরা অবৈধভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন বা যাঁরা ভিসার মেয়াদ শেষে থেকে যাচ্ছেন।

ওলিউল্লাহ লস্কর আল–জাজিরাকে বলেন, যাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে আসামে বসবাস করছেন এবং যাঁদের হাতে রাজ্য সরকার-প্রদত্ত নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই আইন নয়।

সরকারি প্রতিশোধের আশঙ্কায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন আইনজীবী বলেন, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে ‘ঘোষিত বিদেশি’ বন্দিদের বিষয়ে শুনানির সময় আসাম সরকার নিজেই বলেছে, যাঁদের বাংলাদেশের ঠিকানা জানা নেই, তাঁদের বহিষ্কার করা সম্ভব নয়।

সরকার এক হলফনামায় বলেছে, বিনীতভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে যে সংশ্লিষ্ট বিদেশি দেশের নাগরিকত্ব যাচাই ও ভ্রমণ অনুমতির (ট্রাভেল পারমিট) ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত এই বন্দিদের বহিষ্কার করা যাবে না।

অমুসলিম, বিশেষ করে হিন্দুদের যাঁরা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে আসামে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে না পাঠাতে গত বছর আসাম সরকার পুলিশকে নির্দেশ দেয়। এ তারিখটি ছিল ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা।

২০১৯ সালের এ আইন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ওই নির্ধারিত তারিখের আগে প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে ‘ধর্মীয় নির্যাতনের’ শিকার অমুসলিমদের কেউ ভারতে প্রবেশ করলে তাঁদের জন্য সে দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া সহজতর করা হয়েছে। এই আইনের বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। কারণ, এটি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ ওঠে। জাতিসংঘ একে ‘মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক’ বলে অভিহিত করেছে।

ক্ষুব্ধ আলী বলেন, ‘আমাদের জাতীয়তা প্রমাণ করতে ২০-৩০টা কাগজ দেখাতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুরা শুধু বললেই হয়, তারা হিন্দু, তাহলেই তারা নাগরিকত্ব পেয়ে যায়।’

বিএসএফ সীমান্তে ধরে নিয়ে যাওয়া ৫০ বছর বয়সী রহিমা বেগম গোলাঘাটে নিজের বাড়ির বাইরে বসে আল–জাজিরাকে বলেন, যে দেশকে তিনি নিজের দেশ মনে করেন এবং যেখানে তাঁর জন্ম, এখন তিনি সেই দেশের কাছে নিজেকে প্রতারিত মনে করেন।

রহিমা বলেন, ‘এই দেশ আমার, কিন্তু আমি এ দেশের নই।’

৪ থেকে ৭ মে ভারত থেকে ১৬৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে
৪ থেকে ৭ মে ভারত থেকে ১৬৭ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ছবি: বন বিভাগের সৌজন্যে

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি, নাগরিকত্ব পাওয়া অভিবাসীরাও শঙ্কিত

যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশক আগে নাগিরকত্ব পাওয়া অভিবাসীরাও নতুন করে ফের অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। দ্বিধা ও ভয় তাদের নিত্য সঙ্গী। মার্কিন প্রশাসনের সুরক্ষার আশ্বাস পেয়ে যারা দেশটির নাগরিক হয়েছিলেন তারাও এখন গভীর শঙ্কায় পড়েছেন। ভয় ও উৎকণ্ঠায় নিজ রাজ্যে ভ্রমণ সীমিত করেছেন ভুক্তভোগীরা। এর কারণ হিসেবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতিÑবিশেষ করে গণহারে বহিষ্কার অভিযান, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের প্রচেষ্টাÑমার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া অভিবাসীদের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। অনেকেরই মনে করছেন নাগরিকত্ব আর সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।

বার্তা সংস্থা এপির এক খবরে বলা হয়েছে, সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে দাউদা সিসে যখন যুক্তরাষ্ট্রে আসেন তখন তাকে নাগরিকত্বের ভিত্তিতে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়। দীর্ঘদিন আশ্রয়কেন্দ্রে অতিবাহিত করা সিসের কিভাবে নাগরিক হতে হয় সে বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিলনা। তাকে বলা হয় তিনি নাগরিক হলে তিনি নিরাপদ থাকবেন এবং ভোটের অধিকার পাবেন। সেই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন। সিসে বলেন, তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই তিনি নাগরিক হন। তবে যেই নাগরিকত্বকে একসময় তিনি সুরক্ষার মূল প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন তা এখন অস্থিতিশীলতার পাহাড়ে পরিণত হয়েছে।
বহু বছর আগে নাগরিকত্ব পাওয়া অভিবাসীদের অনেকেই এখন দেশ ত্যাগ নিয়ে উদ্বিগ্ন। একবার দেশ ছাড়লে পুনরায় ফিরে আসতে পারবেন কিনা সেই ভয় তাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যেখানে সেখানে তাদের ফোনগুলো চেক করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বহু আমেরিকান নাগরিকদের অভিবাসী হিসেবে আটক করা হয়েছে। পরিবারের কাছে সন্তানদের জন্ম সনদ থাকা সত্ত্বেও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।      
গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের একটি স্মারকলিপি প্রকাশিত হয়। যেখানে বলা হয়েছে, যারা অপরাধ করেছেন অথবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারেন, তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য পদক্ষেপ বাড়ানো হবে। এক পর্যায়ে ট্রাম্প নিউইয়র্ক সিটির নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির নাগরিকত্ব বাতিল করার হুমকি দিয়েছিলেন। অথচ মামদানি শিশু অবস্থাতেই নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কারণ তারা মনে করছেন এতে তাদের ওপর নেতিবাচক সিদ্ধান্ত চাপাতে পারে।

mzamin

মানবতাবিরোধী অপরাধ: শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম রায় আজ by সাজ্জাদ হোসেন

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার রায় আজ ঘোষণা করা হবে। মামলার অন্য দুই আসামি হলো- তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা করবেন। রায়টি সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো সরকার প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রায় দেয়া হবে এই ট্রাইব্যুনালে। এদিকে ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণার পর আবারো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। গতকাল সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শেখ হাসিনাসহ আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে সেটা শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়ার জন্যও আবেদন করেছেন। ট্রাইব্যুনাল ন্যায়বিচারের স্বার্থে যে আদেশই দিক না কেন, প্রসিকিউশন সেটা মেনে নেবে। এ মামলায় হাসিনা-কামালের সর্বোচ্চ সাজা চাইলেও, মামুনের শাস্তি নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে প্রসিকিউশন।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় প্রথম মামলাটি (মিসকেস বা বিবিধ মামলা) হয় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মামলায় আসামি ‘অ্যাপ্রুভার’ (দোষ স্বীকার করে ঘটনার সত্য বিবরণ প্রকাশ) হয়েছেন। পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এই মামলায় ‘অ্যাপ্রুভার’ হওয়ার আবেদন করলে তা মঞ্জুর করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।

গত বছরের ১৭ই অক্টোবর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রথম বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনই এ মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। শুরুতে এই মামলায় শেখ হাসিনাই একমাত্র আসামি ছিলেন। প্রসিকিউশনের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৬ই মার্চ এ মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি হিসেবে তা মঞ্জুর করেন ট্রাইব্যুনাল। এ মামলায় গত ১২ই মে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। পরে গত ১লা জুন আসামিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। এতে শেখ হাসিনাকে জুলাই-আগস্টে নৃশংসতার ‘মাস্টারমাইন্ড, হুকুমদাতা ও সুপিরিয়র কমান্ডার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে এই তিন আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়। এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো হলো- গত বছরের ১৪ই জুলাই গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রদান। হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের নির্মূল করার নির্দেশ প্রদান। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা। রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় আন্দোলনকারীকে গুলি করে হত্যা এবং আশুলিয়ায় ছয়জনকে পোড়ানোর অভিযোগ। এই পাঁচ অভিযোগে তিন আসামির বিরুদ্ধে গত ১০ই জুলাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ২৩শে অক্টোবর মামলাটির যুক্তিতর্ক শেষ হয়। উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আরও ৩টি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে দুটি মামলায় আওয়ামী লীগ শাসনামলের সাড়ে ১৫ বছরে গুম-খুনের ঘটনায় তাকে আসামি করা হয়েছে। অপরটি রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার এস এম মইনুল করিম মানবজমিনকে বলেন, মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফর্মাল চার্জ) পত্রে আসামিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি, হত্যার নির্দেশদাতা ও পরিকল্পনাকারী হিসেবে সুনির্দিষ্ট ৫টি অভিযোগে বিচারকাজ সম্পন্ন করেছে প্রসিকিউশন। আজ মামলাটির রায় প্রদান করা হবে। প্রসিকিউশন মনে করে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আসামিরা মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিলেন। এজন্য আসামিদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করা হয়েছে। তবে, মামলার আসামি আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন যেহেতু রাজসাক্ষী হয়েছেন, তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি পুরোপুরি ট্রাইব্যুনালের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তাই মামুনের ব্যাপারে প্রসিকিউশন কোনো প্রেয়ার দেয়নি। প্রসিকিউশন মনে করে রাজসাক্ষী হয়ে মামুন সত্য প্রকাশ করেছে। বিচারে ট্রাইব্যুনাল অ্যাপ্রুভারকে (রাজসাক্ষী) সম্পূর্ণভাবে মুক্তি অথবা অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার।
এদিকে, আসামি চৌধুরী মামুনের খালাস চেয়েছেন নিজের অর্থে নিয়োগ করা আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমার আসামি রাজসাক্ষী হয়ে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া প্রসিকিউশন থেকেও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, চৌধুরী মামুন সত্য প্রকাশ করেছে। তাই আমি মামুনের অ্যাকুইটাল (খালাস) চেয়ে আবেদন করেছি। এখন ট্রাইব্যুনাল এটি বিবেচনা করবেন।

রায়ে নারী-পুরুষ সমান, অপরাধের ধরন বিবেচনায় শাস্তি দেয়া হয়: প্রসিকিউটর  
গতকাল ট্রাইব্যুনালের এই প্রসিকিউটর জানান, রায় দেয়ার ক্ষেত্রে নারীর আলাদা প্রিভিলেজ (বিশেষ সুবিধা) নেই। সিআরপিসি আইন অনুযায়ী জামিনের ক্ষেত্রে নারী, অসুস্থ ব্যক্তি ও কিশোরদের প্রিভিলেজ বা বিশেষ সুবিধা রয়েছে। তবে রায়ের ক্ষেত্রে নারীকে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা দেয়ার বিধান সাধারণ কিংবা ট্রাইব্যুনাল আইনেও নেই। অর্থাৎ আসামি নারী নাকি পুরুষ তা বিবেচ্য নয়। বরং তিনি কী অপরাধ করেছেন সেই গ্রাভিটি বা গুরুতরতার ভিত্তিতেই শাস্তি নির্ধারণ হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে আসামি খালাস পাবেন। তিনি আরও বলেন, আইনে পরিষ্কার করে বলা আছে যে, যদি আসামি পলাতক হয় তাহলে রায়ের পর থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন। যদি তিনি গ্রেপ্তার হন অথবা ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন। অন্যথায় স্টেট ডিফেন্সের কোনো এখতিয়ার নেই। যেসব আসামি এ মামলায় পলাতক রয়েছেন তারাও গ্রেপ্তার বা আত্মসমর্পণ ছাড়া আপিল করতে পারবেন না।

mzamin

কাবুল-ইসলামাবাদের সম্পর্ক কি আবার জোড়া লাগবে by মো. সাহাবুল হক

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। একই ধর্ম, মিলেমিশে থাকা সংস্কৃতি আর ভাগাভাগি করা সীমান্ত সত্ত্বেও যেন চিরকাল এক অদৃশ্য দেয়ালে বিভক্ত। কখনো ঘনিষ্ঠ মিত্র, আবার কখনো তীব্র শত্রু—তাদের সম্পর্কের ইতিহাস যেন এক দুর্বোধ্য নাটক। যেখানে বিশ্বাসের চেয়ে অনাস্থায় মুখ্য চরিত্র। সীমান্তের প্রতিটি ইঞ্চি যেন সাক্ষী, কীভাবে সন্দেহ, সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দুই জাতিকে বারবার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই টানাপোড়েন যেন নতুন উচ্চতায় পৌঁছে, পুরোনো ক্ষতগুলোকে আবারও রক্তাক্ত করে তুলেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত অক্টোবরের ৯ তারিখ থেকে শুরু হওয়া দুই দেশের সীমান্ত সংঘাতে কমপক্ষে ৫০ জন বেসামরিক মানুষ নিহত এবং চার শতাধিক আহত হয়েছে। এ নিয়ে ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে শুরু হওয়া শান্তি আলোচনাও আবার অচলাবস্থায় পড়েছে।

পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘আলোচনা স্থবির, কারণ আফগান সরকার সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় তাদের প্রতিশ্রুতি রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।’ এর আগেও কয়েক দফায় ইসলামাবাদ এবং কাবুল শান্তি আলোচনায় বসেছিল। তবে তা কোনো ধরনের সুরাহা ছাড়াই সমাপ্ত হয়।

এ পরিস্থিতি শুধু সাম্প্রতিক কোনো সীমান্ত উত্তেজনা নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ জট পাকানো রাজনৈতিক হিসাব। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আফগানিস্তান দেশটিকে স্বীকৃতি দিতে প্রথমে অনীহা প্রকাশ করেছিল। আফগান সরকার তৎকালীন ব্রিটিশ-নির্ধারিত ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকার করেনি, যা ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারত ও আফগান আমির আবদুর রহমানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই রেখা নিয়ে বিরোধ শুরু হয় এবং আজও সেটি দুই দেশের মধ্যে অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু।

ইসলামাবাদ ও কাবুল শান্তি আলোচনা

২০২১ সালের আগস্টে তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের পর ইসলামাবাদ ও কাবুলের মধ্যে তিন দফা শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যার প্রতিটিই মূলত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা টিটিপি (তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান) ইস্যুতে অচলাবস্থায় শেষ হয়। প্রথম দফা আলোচনা হয়েছিল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদে, যেখানে পাকিস্তান কাবুলকে টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার এবং তাদের সীমান্ত অতিক্রম করা বন্ধ করার জন্য চাপ দেয়।

দ্বিতীয় দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের মে মাসে দোহায়, যেখানে আফগানিস্তান একটি যৌথ সীমান্ত নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল; কিন্তু তারা টিটিপিকে সরাসরি দমনের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনার প্রস্তাব দেয়, যা ইসলামাবাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য ছিল।

সর্বশেষ তৃতীয় দফা আলোচনা গত বছর নভেম্বর মাসে শুরু হয়, কিন্তু নভেম্বরের শেষের দিকে আফগান সীমান্তে এক প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। পাকিস্তান দৃঢ়ভাবে অভিযোগ করে যে আফগান সরকার টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং সীমান্তজুড়ে তাদের কার্যকলাপ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আফগান পক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে এবং তাদের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলে, যার ফলে প্রতিটি চুক্তি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

ইতিহাসের অদৃশ্য যুদ্ধ

সত্তরের দশকে সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থনে আফগান মুজাহিদিনদের আশ্রয় ও অস্ত্র দেয়। সেই সময় থেকেই পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আফগান রাজনীতিতে গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ে। ১৯৯০-এর দশকে তালেবানদের উত্থানও হয়েছিল পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ সমর্থনে। ইসলামাবাদ ভেবেছিল, আফগানিস্তানে তালেবান শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানে ‘কৌশলগত গভীরতা’ অর্জিত হবে—যা ভারতের বিরুদ্ধে একপ্রকার নিরাপত্তাবেষ্টনী হিসেবে কাজ করবে; কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তালেবান কখনোই পাকিস্তানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ২০০১ সালে মার্কিন হামলার পর তালেবানের পতন ঘটে; কিন্তু পাকিস্তানের অভ্যন্তরে টিটিপি নামের জঙ্গিগোষ্ঠী উত্থিত হয়, যারা আফগান তালেবানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই অস্ত্র তুলে নেয়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত এক দশকে টিটিপি হামলায় পাকিস্তানে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি ও সীমান্ত উত্তেজনা

২০২১ সালে কাবুলে পুনরায় তালেবান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান ভেবেছিল, এবার হয়তো তাদের পুরোনো বন্ধুত্ব পুনর্জীবিত হবে; কিন্তু বাস্তব হলো উল্টো। ইসলামাবাদের দাবি, আফগাননিস্তানের মাটিতে আশ্রয় নিচ্ছে টিটিপি, যারা পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালাচ্ছে। আফগানপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ‘আমরা আমাদের মাটি অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দিই না।’ অথচ পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রায়ই আফগান সীমান্তে বিমান হামলা চালাচ্ছে, যার শিকার হচ্ছেন নিরীহ গ্রামবাসী।

আল–জাজিরার  প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবর ২০২৫-এর সংঘর্ষে পাকিস্তানের ২৩ জন সেনা নিহত এবং আফগানপক্ষের ৫০ জন বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। সীমান্তের কাবুল-স্পিন বোলদাক করিডরে দুই পক্ষের গোলাগুলি কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। তুরস্ক ও কাতার শান্তি মধ্যস্থতায় এগিয়ে এলেও ফল হয় শূন্য—উভয় দেশই একে অপরকে দোষারোপ করছে।

আফগান-ভারত ঘনিষ্ঠতা: পাকিস্তানের উদ্বেগ

সম্প্রতি আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফর করেছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে নতুন মোড় এনেছে। ভারত ২০২৫ সালের মাঝামাঝি কাবুলে তাদের দূতাবাস পুনরায় খুলে দেয় এবং মানবিক সহায়তার নামে সীমিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। পাকিস্তান এটি সন্দেহের চোখে দেখছে। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে ভারত আফগানিস্তানে ‘নরম প্রভাব’ (সফট পাওয়ার) গড়ে তুলতে আগ্রহী, যাতে পাকিস্তানের কৌশলগত প্রভাব কমে যায়। ইসলামাবাদ আশঙ্কা করছে, ভারত আফগান ভূমি ব্যবহার করে পাকিস্তানবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে উৎসাহ দিতে পারে।

মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট

অন্যদিকে আফগানিস্তান বর্তমানে ভয়াবহ মানবিক সংকটে আছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ খাদ্যঘাটতিতে ভুগছে এবং অর্থনীতির এক-তৃতীয়াংশ ইতিমধ্যে ধসে পড়েছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগান শরণার্থীদের বোঝা বহন করছে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৭ লাখ আফগান শরণার্থী পাকিস্তানে অবস্থান করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামাবাদ ঘোষণা দিয়েছে, অবৈধভাবে থাকা আফগান নাগরিকদের বহিষ্কার করা হবে। এই পদক্ষেপে দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়েছে।

আলোচনার পর্দার আড়ালে

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় সাম্প্রতিক আলোচনায় পাকিস্তানের প্রতিনিধি ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আসিম মালিক এবং আফগান পক্ষের নেতৃত্ব দেন গোয়েন্দা প্রধান আবদুল হক ওয়াসিক। তবু আলোচনায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। আফগান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, ‘পাকিস্তান আমাদের ওপর যে অভিযোগ করছে, তা ভিত্তিহীন। আমরা শান্তি চাই, তবে সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপস নয়।’

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ কথার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আফগানিস্তানের নতুন রাজনৈতিক মনোভাব—তারা পাকিস্তানের ছায়া থেকে বের হয়ে স্বাধীন নীতিতে চলতে চায়। তালেবান এখন আর ১৯৯৬ সালের মতো পাকিস্তানের ‘ক্লায়েন্ট রেজিম’ নয়। তারা চায় চীন, ইরান, রাশিয়া ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে।

চীন-রাশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি

চীন আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী, বিশেষত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে। পাকিস্তানের গওয়াদার বন্দরের সঙ্গে আফগানিস্তানের বাণিজ্য রুট সংযোগের পরিকল্পনা রয়েছে; কিন্তু সীমান্ত অস্থিরতা এবং টিটিপির উপস্থিতি এই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। রাশিয়াও মধ্য এশিয়ায় নিরাপত্তা ভারসাম্য রক্ষায় আফগান-পাকিস্তান সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ দেখতে চায়।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

সবশেষে প্রশ্ন ওঠে—কাবুল-ইসলামাবাদের সম্পর্ক কি আবার জোড়া লাগবে? ইতিহাস বলে, দুই দেশের সম্পর্ক সব সময় ‘বাস্তববাদ ও প্রয়োজন’ দ্বারা চালিত। বর্তমানে আফগানিস্তানের প্রধান সমস্যা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি; আর পাকিস্তানের চ্যালেঞ্জ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা। উভয় দেশই যদি সীমান্তে শান্তি বজায় রাখে, বাণিজ্য পুনরায় শুরু করে এবং সন্ত্রাস দমনে যৌথ উদ্যোগ নেয়, তাহলে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।

তবে এই আশাবাদ বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো অবিশ্বাস। ইসলামাবাদ মনে করে, কাবুল  টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না; আর কাবুল মনে করে, পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করছে।

এক আফগান সাংবাদিক একবার লিখেছিলেন, ‘আমরা প্রতিবেশী হয়েও পরস্পরের বন্দি।’ এই কথাই আজও সত্য। সীমান্তের ওপারে গুলি থামলেও মানসিক সীমান্তের প্রাচীর এখনো উঁচু। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—দুই মুসলিম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বাস কি কখনো ফিরবে?

ইতিহাসের শিক্ষা বলছে, প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজনই সম্পর্ক পুনর্গঠনের আসল প্রেরণা। আফগানিস্তান ও পাকিস্তান যদি বাস্তবতার মাটিতে পা রেখে পারস্পরিক স্বার্থে এগোতে পারে, তবেই হয়তো একদিন কাবুল-ইসলামাবাদ সত্যিকার অর্থে  সম্পর্ক জোড়া লাগবে।

* ড. মো. সাহাবুল হক, অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে পুরোনো ক্ষোভ, ভুল কূটনীতি আর আদর্শগত দ্বন্দ্ব।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে পুরোনো ক্ষোভ, ভুল কূটনীতি আর আদর্শগত দ্বন্দ্ব। ফাইল ছবি

পশ্চিম তীরে মসজিদে অগ্নিসংযোগ ও পবিত্র কোরআন পোড়ানোর ঘটনায় বিশ্বসম্প্রদায়ের নিন্দা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে মসজিদে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের আগুন দেওয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। ওই অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা অনবরত বৃদ্ধি পাওয়ার মধ্যেই আগুন দেওয়ার এ ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা আল–জাজিরাকে বলেন, গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত সালফিত এলাকার কাছে দেইর ইস্তিয়া গ্রামের হাজ্জা হামিদা মসজিদে আগুন দেন।

ঘটনাস্থল থেকে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, মসজিদের দেয়ালে স্প্রে ব্যবহার করে বর্ণবিদ্বেষী ও ফিলিস্তিনবিরোধী স্লোগান লেখা হয়েছে। আগুনে মসজিদের ভেতরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পবিত্র কোরআনের কিছু কপিও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

ফিলিস্তিনের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ঘটনাকে ‘জঘন্য অপরাধ’ উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। বলেছে, এর মধ্য দিয়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত জায়গাগুলোতেও ইসরায়েলি বর্বরতার কথা সামনে এসেছে।

ওয়াফা সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ওই ঘটনার বাইরে পশ্চিম তীরের দক্ষিণে হেবরনের কাছে বেইত উম্মার শহরে গতকাল এক অভিযানের সময় ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালালে দুই ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়।

এসব সহিংসতার ঘটনা এমন সময়ে ঘটেছে, যখন কিনা চলতি বছর পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের হামলার সংখ্যা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছেছে। এসব হামলার বড় অংশই ঘটছে ২০২৫ সালের জলপাই চাষের মৌসুমকে ঘিরে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থা (ওসিএইচএ) তাদের সবশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, গত ১ অক্টোবর থেকে জলপাই চাষকে কেন্দ্র করে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের চালানো কমপক্ষে ১৬৭টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব হামলায় ১৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি আহত ও ৫ হাজার ৭০০টির বেশি গাছ নষ্ট হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের যুদ্ধের আড়ালে পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি হামলা বেড়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৬৯ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ইতিমধ্যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উগ্র দক্ষিণপন্থী সরকারের সদস্যরা পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের দেশের অন্তর্ভুক্ত করতে চাপ দিচ্ছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ইসরায়েল এখনই পশ্চিম তীরকে কার্যত নিজেদের অংশ বলে বিবেচনা করছে এবং বর্ণবিদ্বেষী আচরণ চালিয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর গত জুলাই মাসে সতর্ক করে বলেছিল, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর ‘মৌন সম্মতি, সমর্থন ও কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের’ মাধ্যমে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীরা সহিংসতা চালাচ্ছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর আরও বলেছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরকে আরও ব্যাপকভাবে দখল করার জন্য ইসরায়েলের বৃহত্তর ও সমন্বিত কৌশলের অংশ হিসেবে বসতি স্থাপনকারীরা ও সামরিক বাহিনী এ হামলাগুলো চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর বৈষম্য, দমন–পীড়ন ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে আরও জোরাল করা হচ্ছে।

‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’

দেইর ইস্তিয়ার মসজিদে বৃহস্পতিবারের হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নিন্দার জন্ম দিয়েছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, জাতিসংঘ এ ঘটনাটি নিয়ে ‘অত্যন্ত উদ্বিগ্ন’। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ব্রিফিংয়ে স্টিফেন ডুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘উপাসনালয়ে এমন হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’

ডুজারিক আরও বলেন, ‘আমরা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ও তাঁদের সম্পদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের চালানো হামলার নিন্দা জানিয়েছি এবং জানিয়ে যাব। দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের উচিত বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং মসজিদে হামলা ও দেয়ালে স্প্রে করে নোংরা কথা লেখার মতো ঘটনাগুলোয় দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা।’

ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা বলছে, জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান হামলার ‘তীব্র নিন্দা’ জানিয়েছে।

জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এ সহিংসতাকে ইসরায়েল সরকারের উগ্র নীতি ও উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও উগ্রতা উসকে দিচ্ছে।

গাজায় যুদ্ধের পরও ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সমালোচনার মুখে থাকা জার্মানিও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঘটনাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করতে হবে এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

একইভাবে সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো ‘অগ্রহণযোগ্য’। এক বিবৃতিতে দেশটি আরও বলেছে, এ ধরনের সহিংসতা এবং অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে।

ফিলিস্তিনিরা বিশ্বনেতাদের শুধু নিন্দা নয়, বরং দখলকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় চলমান সহিংসতার মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করাসহ আরও কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি।

আগুনে পুড়ে যাওয়া মসজিদের ভেতর ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি দেখছে দুই শিশু–কিশোর। ১৩ নভেম্বর ২০২৫
আগুনে পুড়ে যাওয়া মসজিদের ভেতর ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি দেখছে দুই শিশু–কিশোর। ১৩ নভেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি