Friday, March 8, 2019
ভারতীয় মিগ-২১: কেন এতো দুর্ঘটনায় পড়ছে?

রাজস্থানে ছক বাধা উড্ডয়ন কর্মসূচির সময়ে আজ বিমানটি বিধ্বস্ত হলেও বৈমানিক প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। এ নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে দুই মিগ-২১সহ তিনটি বিমান হারালো ভারত।
এর মধ্যে একটি মিগ-২১সহ দুইটি বিমান ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মিরের আকাশে যুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়েছ। এ ছাড়া, ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমে গত এক মাসে ৭ থেকে ৮ বিমান ধ্বংস হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে মিগের সংখ্যাই বেশি।
২০১২ সালে ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী দেশটির সংসদে এক বিবৃতি দেয়ার পর সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রাশিয়া থেকে কেনা ৮৭২টি মিগ বিমানের মধ্যে অর্ধেকের বেশি দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এতে দুই শতাধিক প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
মিগ-২১ মোটেও খারাপ বিমান নয়। এটি একটি যন্ত্র এবং সব যন্ত্রের মতো এর একটি সুনির্দিষ্ট আয়ু আছে। গত অর্ধ শতক ধরে ভারতীয় বিমান বাহিনীর ‘মেরুদণ্ড হিসেবে’ কাজ করছে মিগ-২১। অর্থাৎ আয়ুসীমা অনেক আগে অতিক্রম করলেও এখনো মিগ-২১ বিমানের বহর ব্যবহার করছে ভারত। ভারতীয় বিমান বাহিনীর অনেক বৈমানিক মিগ-২১কে ‘উড়ন্ত কফিন’ এবং ‘বিধবা তৈরির’ বিমান হিসেবে ডেকে থাকেন।
এ বিমান ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ মাইল গতিতে রানওয়ে স্পর্শ করে। বিমানের এতো প্রচণ্ড গতি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে অনেকে বলে থাকেন। এ ছাড়া, বিমানের জানালা এমন ভাবে তৈরি যে অবতরণের সময়ে রানওয়ে ভালভাবে দেখা সম্ভব হয় না।
এদিকে, ভারতের আবহাওয়া উষ্ণ হওয়ায় মিগের ইঞ্জিন থেকে আকাশে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি বা থ্রাস্ট ১২ শতাংশ কম পাওয়া যায়। পাশাপাশি মিগের ডানারও ১২ ওড়ার শক্তি বা লিফট ১২ শতাংশ কমে যায়। জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিলে উঁচুতে ওঠার জন্য হান্টার বা কিরন বিমানের থ্রটল নিচের দিকে ঠেলে দিলেই হলো। প্রায় বিনা ভাবনায় এ কাজ করতে পারেন যে কোনো বৈমানিক। কিন্তু মিগের ক্ষেত্রে প্রথম থ্রটলকে সামনে নিতে হবে তার একটু পর পিছনে ঠেলে দিতে হবে। জরুরি পরিস্থিতিতে এতোটা সময় পাওয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বিমান যখন ভূমির কাছাকাছি উচ্চতা দিয়ে ওড়ে তখন। মিগের ইজেকশন সিট বা জরুরি অবস্থায় বিমান থেকে বৈমানিককে বের করে আনার আসন ব্যবস্থাও আধুনিক নয়। বিশেষ করে নিচু দিয়ে ওড়ার সময় এ ব্যবস্থা সফল হয় না ফলে প্রাণ হারাতে পারেন হতভাগ্য মিগ-২১ চালক।
গত এক দশকে ভারতীয় বিমান বাহিনী ৮৫ জনের বেশি বৈমানিককে হারিয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই ছিলেন একেবারে তরুণ। বেশির ভাগ মিগ-২১ বিমানই কারিগরি ত্রুটির জন্য দুর্ঘটনা পড়েছে, মানবিক ভুলের জন্য নয়। ভারতীয় অনেক মিগকে চালু রাখা হয়েছে ‘ক্যানিবলিজম’ বা ‘স্বজাতিভক্ষণের’ মাধ্যমে। অর্থাৎ বাতিল মিগ-২১’এ যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে এসব বিমানকে চালু রাখা হচ্ছে।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
অযোধ্যা মামলা মধ্যস্ততায় নিষ্পত্তির আদেশ ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের

উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে বাবরি মসজিদের অবস্থান। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একাংশের দাবি, যেখানে মসজিদ গড়ে তোলা হয়েছে সেই জায়গাটি ছিল রামের জন্মভূমি, তা ভেঙে মসজিদ বানানো হয়। এ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম বিরোধ বহুদিনের। ১৯৯২ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন থাকার সময়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বাবরি মসজিদ। একে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ হারায় অন্তত ২ হাজার মানুষ। ভারতের প্রাচীন শহর অযোধ্যার ওই বিতর্কিত স্থানটি কোন সম্প্রদায়ের দখলে থাকবে, তা নিয়ে মামলা চলছে ৬০ বছর ধরে। শুক্রবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ এই মামলার রায় দেয়।
প্রধান বিচারপতি তার আদেশে বলেন, এই মামলাটি শুধু কোনও জমির বিরোধ নয়, এটি মানুষের হৃদয়, আবেগ আর কষ্ট নিরসনের বিরোধ।
সুপ্রিম কোর্টের গঠিত প্যানেলের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দেশটির অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এফএম ইব্রাহিম কলিফুল্লাহ। প্যানেলের বাকি দুই সদস্য হলেন, সিনিয়র আইনজীবী শ্রীরাম পঞ্চু এবং ভারতের হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শ্রী শ্রী রবি শঙ্কর। তবে এই প্যানেল চাইলে আরও সদস্য নিযুক্ত করতে পারবে বলে জানিয়েছে আদালত।
প্রধান বিচারপতি আদেশে আরও বলেন, অযোধ্যা বিরোধ নিরসনে মধ্যস্ততা হতে পারে। এতে কোনও আইনি বাধা দেখছি না আমরা। তিনি জানান, মধ্যস্ততা প্রক্রিয়া গোপন রাখা হবে। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কোনও খবর প্রকাশ করা যাবে না।
এক সপ্তাহের মধ্যে প্যানেলকে কাজ শুরুর কথা বলে পরবর্তী চার সপ্তাহের মধ্যে আদালতকে অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে। কাজ শেষ করতে ওই প্যানেলকে আট সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, বুধবার এই মামলায় শেষ শুনানির দিনে উত্তর প্রদেশ সরকারসহ বেশিরভাগ হিন্দু আবেদনকারী মধ্যস্ততার বিরোধিতা করেছেন। তবে মুসলিম পক্ষ সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড মধ্যস্ততাকে আরেকটি সুযোগ দিতে চায়। তবে আলোচনার গোপনীয়তা রক্ষা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানায় তারা। মামলার আরেক পক্ষ নির্মোহী আখরাও মধ্যস্ততার পক্ষে সম্মতি দিয়েছে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
চুক্তিতেই ভারতের বিরুদ্ধে এফ-১৬ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে আমেরিকা

পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যানে প্যাটারসন ২০০৮ সালের ২৪ এপ্রিল মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষভাবে এ দুটি বিষয় উল্লেখ করে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। প্যাটারসনের এ বার্তার কথা তুলে ধরেছে অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট উইকিলিকস।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত তার বার্তায় পাকিস্তানকে আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য মধ্যম পাল্লার ৫০০টি এআইএম-১২০-সি৫ অ্যাডভ্যান্সড ক্ষেপণাস্ত্র দেয়ার কথা বলেছিলেন। ভারত দাবি করছে, গত সপ্তাহে পাকিস্তান ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
এফ-১৬ বিমান সরবরাহের ব্যাপারে ভারত সেসময় আমেরিকার কাছে আপত্তি জানালে জবাবে রাষ্ট্রদূত প্যাটারসন মার্কিন প্রশাসনকে বলেছিলেন, “যদি আমাদের লক্ষ্য হয় পাক সেনাদের কৌশল পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করা এবং ভারত সীমান্ত থেকে সেনা পুনঃমোতায়েন করানো তাহলে এফ-১৬ বিমান নিয়ে চুক্তি বাতিল করলে তা আমাদের লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করবে না।”
একই বার্তায় তিনি বলেছিলেন, এফ-১৬ বিমান পেলে পাক সামরিক বাহিনী ভবিষ্যত যুদ্ধের সময় পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের পরিবর্তে প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারে উৎসাহিত হবে। এছাড়া, ভারত যেহেতু বিমান শক্তিতে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে সেক্ষেত্রে এফ-১৬ বিমান ভারতের প্রাধান্য কমাবে না। অন্যদিকে, এই বিমান সরবরাহে দেরি করলে পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করবে। সেসময় তিনি ভারতের ১২৬টি এফ-১৮ কিংবা সমমানের বিমান কেনার কথাও উল্লেখ করেন।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গাছের ওপর বোমাবর্ষণ: ভারতীয় পাইলটদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের

এতে বলা হয়েছে, ভারতীয় বিমান থেকে বোমাবর্ষণের ফলে বালাকোট এলাকার ১৯টি গাছ ধ্বংস হয়েছে। পাকিস্তানি বিমানের তাড়া খেয়ে ভারতীয় বিমান পালাতে গিয়ে তড়িঘড়ি করে ওই স্থানে বোমা ফেলে। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউন এ খবর দিয়েছে।
এ ঘটনায় পাক সরকার ভারতের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে অভিযোগ উত্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে ভারতের বিরুদ্ধে ‘পরিবেশ-সন্ত্রাসবাদের’ অভিযোগ আনা হবে।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় জঙ্গিবিমান অধিকৃত কাশ্মির থেকে ৪০ কিলোমিটার ভেতরে বালাকোটের জাব্বা টপ পাহাড়ি বনাঞ্চলে বোমাবর্ষণ করে। পাকিস্তানের পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রী মালিক আমিন আসলাম বলেছেন, ভারতীয় বিমানগুলো একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বোমা হামলা চালিয়েছে এবং ইসলামাবাদ সরকার পরিবেশ বিষয়ক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। এটাই হবে জাতিসংঘ ও অন্য সংস্থাগুলোতে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি।
মালিক আমিন আরো বলেন, বালাকোটে যা হয়েছে তা নিতান্তই পরিবেশ-সন্ত্রাসবাদ; এক ডজনের বেশি পাইন গাছ ধ্বংস হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দুই সাংবাদিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, বোমা বিস্ফোরণে ১৫টির বেশি পাইন গাছ ধ্বস হয়েছে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
স্বাধীনতাপন্থী কাশ্মীরী নেতা কারাগারে

কাশ্মীরের পালওয়ামাতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় কমপক্ষে ৪০ ভারতীয় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতেই ব্যাপক এই ধরপাকর শুরু করেছে দেশটির নিরাপত্তাকর্মীরা।
ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে জামায়াতে ইসলামি। গ্রেপ্তার করা হয়েছে এর কমপক্ষে ৩০০ সদস্যকে। আল-জাজিরাকে উচ্চপদস্থ জেকেএলএফ নেতা বলেন, এ সরকার দমনপীড়নের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কেউ কথা বললেই তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ভূমির ভোগান্তি কমবে কি by পার্থ শঙ্কর সাহা

অনিয়ম-দুর্নীতির খবর সরাসরি জানার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৭ সালের মাঝামাঝি হটলাইন ‘১০৬’ চালু করেছিল। এ পর্যন্ত এই হটলাইনে ১৯ লাখ অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেই অভিযোগের সংখ্যা বেশি। এগুলোর মধ্যে ভূমি রয়েছে প্রথম দিকে। ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সেবাদান নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ এন্তার। ভোগান্তির অভিযোগ আরও বেশি। জমিজমা সংঘাত-সংঘর্ষের বড় উৎস। ভূমিবিরোধ তাই অনেক মামলার জনক।
বিষফোড়ার মতো ঝুলে আছে লক্ষাধিক একরের অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণের বিষয়টি। এতে মূলত ভুগছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন। দেশের এক-দশমাংশ এলাকা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেখানে রক্তক্ষয়ী অতীতের জের টেনে চলেছে ভূমিবিরোধ। বিরোধ নিষ্পত্তির হাজার হাজার আবেদন পড়ে আছে।
আবার দেশজুড়ে ভূমির ব্যবহার, আগ্রাসন ও অধিগ্রহণ নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংকট আছে। দ্বন্দ্ব মূলত কৃষি বনাম শিল্প ও আবাসনের জন্য জমির ব্যবহার আর পরিবেশের সুরক্ষার প্রশ্নে।
ভোগান্তি-দুর্নীতি ও ডিজিটালকরণ
ভূমি নিয়ে ভোগান্তি আর দুর্নীতি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। ভূমি কার্যালয় থেকে কাগজপত্র ওঠাতে গিয়ে, নামজারি করতে বা কর দিতে গিয়ে, হয়রানির শিকার হয় মানুষ। সনাতনী পদ্ধতি ভোগান্তি বাড়ায়।
ভূমি অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের ভূমির কার্যালয়গুলো মানুষকে সেবার পরিবর্তে ভোগান্তি দেয়। ভূমিসংশ্লিষ্ট প্রতিটি কার্যালয়ই দুর্নীতির আখড়া। ভূমি বিষয়টি জটিল করে ফেলার ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা আছে।’
সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাতের এক গবেষণায়। ভূমি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০১৫ সালে করা এই গবেষণায় দেখা যায়, ভূমি কার্যালয়ে আসা প্রায় ৭০ শতাংশ সেবাগ্রহীতা অসন্তুষ্ট। দুই-তৃতীয়াংশ সেবাগ্রহীতা বলেছেন, ঘুষ দিতে বাধ্য হওয়াই তাঁদের অসন্তোষের কারণ।
দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গত বছরের একটি জরিপ বলছে, দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ তালিকায় ভূমির অবস্থান পঞ্চমে। জমিজমাসংক্রান্ত কাজ করাতে গিয়ে প্রায় অর্ধেক মানুষকে ঘুষ দিতে হয়।
ভূমি কার্যালয়গুলোতে দলিলপত্র নিতে গিয়ে মানুষ হয়রানির শিকার হয়। ভূমি অধিকার কর্মীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকানা বদল হলে সে তথ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয় না। তখন ভূমি কার্যালয়ের অসাধু চক্রের সাহায্যে দুর্বৃত্তরা নথি জাল করেন।
এসব দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করতে ২০০৯ সাল থেকে অনলাইনে মালিকানা নিবন্ধন ও নামজারি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু এখনো তা পুরোপুরি সম্পন্ন করা হয়ে ওঠেনি। ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘এটা সময়সাপেক্ষ। তবে আমরা পথে আছি।’
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, এযাবৎ ৬১ জেলার রেকর্ডকক্ষে থাকা সাড়ে তিন কোটি খতিয়ানের এক-তৃতীয়াংশ অনলাইনে প্রকাশ করা হয়েছে। আর ৬১ হাজার মৌজার মধ্যে ১৮ হাজারের বেশি মৌজা ম্যাপ স্ক্যান করা হয়েছে। এ ছাড়া আটটি জেলায় ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে জরিপ শুরু হয়েছে।
বিরোধ ও মামলা প্যাঁচ
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে বলেছেন, দেশে বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ। এএলআরডির গবেষণা বলছে, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে মোট মামলার অন্তত ৬৫ শতাংশ ভূমিকেন্দ্রিক।
জমিজমা নিয়ে মামলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গড়ায়। জড়িত পক্ষগুলোর অনেক টাকা গচ্চা যায়। জমিজমাসংক্রান্ত বিরোধের আর্থসামাজিক ক্ষতি নিয়ে ২০১৪ সালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) মিলে এক গবেষণা করেছিল। গবেষণায় ১ হাজার ৫০টি পরিবারের তথ্য নিয়ে দেখা যায়, প্রতি পাঁচটিতে একটির ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ আছে। যেসব মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে, সেগুলোতে গড়ে সাড়ে তিন বছর লেগেছে আর খরচ হয়েছে ৮০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ খরচ হয়েছে ১২ লাখ টাকা। বেশির ভাগ টাকাই গেছে উকিলের পেছনে।
গবেষণাটির পরিচালক পিআরআইয়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ৪৫ শতাংশ মালিকের জমির খারিজ বা নামজারি করা ছিল না। ফলে বিরোধ তৈরি হওয়া ছিল সহজ।
একই জমির নামজারি করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এই কার্যালয়গুলো আর নিবন্ধন করে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ রেজিস্ট্রি কার্যালয়। দুই কার্যালয়ের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই সমন্বয় নেই। বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন এইডে কর্মরত ভূমি গবেষক শমশের আলী বলছেন, এতে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। অনেক সময় নামজারির কাগজ যাচাই না করেই নিবন্ধন করে দেওয়া হয়। নিবন্ধন ও নামজারি একই ছাতার নিচে হওয়া দরকার।
শমশের আলী মনে করেন, জেলা পর্যায়ে ভূমিসংক্রান্ত মামলা কালেক্টর (এডিসি-রাজস্ব বা ডিসি) থেকে ভূমি আপিল বোর্ডের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে জট কমবে। ভূমি ক্যাডারও আলাদা করা দরকার।
উপজেলার এসি ল্যান্ড মূলত জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা। সরাসরি একটি ভূমি ক্যাডার হলে দায়িত্বশীলতা বাড়বে বলে মনে করেন ভূমিমন্ত্রী নিজেও। তবে তিনি বলেন, এ নিয়ে শুধু কথাই চালাচালি হচ্ছে।
অর্পিত সম্পত্তি ও পার্বত্য ভূমি
অর্পিত সম্পত্তি আসল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া এই সরকারের বড় নির্বাচনী অঙ্গীকার। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের সম্পত্তি অর্পিত হিসেবে তালিকাভুক্ত থাকায় তাঁরা মালিকানা হারিয়েছেন।
২০০৮ সালেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার জমিগুলো প্রত্যর্পণের উদ্যোগ নেয়। এখন প্রত্যর্পণ বা ফেরতযোগ্য অর্পিত সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় সোয়া দুই লাখ একর। ফেরত পেতে ৬১টি জেলায় সোয়া লাখের কাছাকাছি আবেদন জমা পড়েছে। সাত বছরে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৫ হাজার।
তবে প্রত্যর্পণের গতি নিয়ে খুশি নন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মাত্র ১২ শতাংশ আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে। এই ধারা চলতে থাকলে আরও ৩০ বছর অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে ২২ বছর হতে চলল, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকার ও স্বায়ত্তশাসনকামী সশস্ত্র দলটির মধ্যে শান্তি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু সেখানকার সবচেয়ে বড় সমস্যা পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে ভূমিবিরোধের বিষয়টি এখনো অমীমাংসিত। চুক্তি অনুযায়ী ভূমি কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় ও বিতর্কে অনেকটা সময় গেছে। আর ভূমিবিরোধ আইনটি সংশোধন হতে সময় লেগেছে প্রায় ১৬ বছর। বিধিমালা এখনো হয়নি।
গত বছর কমিশন নতুন করে গঠিত হয়েছে। ইতিমধ্যে কমিশনের কাছে ২২ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। চাকমা রাজা (সার্কেলপ্রধান) দেবাশীষ রায় কমিশনের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এর সদস্য। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘পাহাড়ের জটিল এবং ভিন্ন ধরনের ভূমি কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কেন জানি সুরাহার পথে বিঘ্ন দেখা দিচ্ছে।’
পাহাড়ি নেতারা ভূমিবিরোধ নিরসনে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গড়িমসির কথা বলেন। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং বলেন, ‘ঘণ্টায় যে পরিমাণ দৌড়ানো উচিত, তার চেয়ে বেশি এগোচ্ছি।’
এমনিতে বাংলাদেশে মাথাপিছু ভূমির পরিমাণ বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, এটা শূন্য দশমিক ৬ হেক্টর। তার ওপর সরকারি হিসাবে বছরে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে এক শতাংশ হারে। কৃষিজমিতে আগ্রাসী ও অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও আবাসন অথবা খাসজমি দখলের মতো সমস্যা আছে। ভূমি ও পরিবেশের দূষণ এরই অনুষঙ্গী।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যখন শিল্পের দরকার হচ্ছে, তখন চোখ পড়ছে ক্ষমতাহীন মানুষের জমির দিকে। ক্ষমতাবানদের হাতে থাকা দখলের জমি সরকারের দৃষ্টির বাইরে থাকছে।’
শেষ কথা
সব মিলিয়ে জমিজমার কাগজপত্র, জরিপসহ নাগরিককে সেবাদানের কাজটি ডিজিটাল করা গেলে অনেক সমস্যারই সুরাহার পথ তৈরি হতে পারে। সার্বিকভাবে দুর্নীতি কমানোরও সুবিধা হতে পারে। ধীর লয়ের ডিজিটালকরণকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তাই সরকারের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটালকরণ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার। পাশাপাশি চাই ভূমি প্রশাসনের সংস্কার এবং মামলার পাহাড় কমানোতে ভূমিকা রাখা।
আরেকটি সার্বিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আইন-নীতি মেনে ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করা। দুটি তাৎপর্যপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, অর্পিত সম্পত্তি আর পার্বত্য চট্টগ্রামে জমির মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা নিরসন।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ডাকসু নির্বাচন: ৬ ঘণ্টা ভোট কার স্বার্থে by মুনির হোসেন

গতকাল দুপুরেও একই দাবিতে ভিসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।
কিন্তু অধিকাংশের দাবিকে অগ্রাহ্য করে ২৮ বছরের পুরনো নিয়মে ছয় ঘণ্টা ভোটগ্রহণের পক্ষে শক্ত অবস্থান কর্তৃপক্ষের। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে- ছয় ঘণ্টা ভোট কার স্বার্থে? ক্ষমতাসীনদের বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দাবি- নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক নীল নকশার অন্যতম দৃষ্টান্ত ছয় ঘণ্টা ভোটগ্রহণ। তারা বলছেন, ছয় ঘণ্টা ভোটগ্রহণের মধ্যদিয়ে ছাত্রলীগকে জিতিয়ে আনতে চায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এমন অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে কিছুটা বিব্রত প্রশাসন। এ বিষয়ে জানতে ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান ও চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এসএম মাহফুজুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। আর রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মাহবুবা নাসরীন জানান, নির্বাচনের বিষয়ে তাদের কথা বলতে ‘না’ আছে। যা বলার চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক এসএম মাহফুজুর রহমান নিজে বলবেন। আরেক রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. মো. দিদার-উল-আলম বলেন, ‘ভোটগ্রহণের সময় যা ঠিক করা হয়েছে, সেটি এখন আর কিছু করার নেই। এ সময়ের মধ্যেই হলগুলোকে সকলের ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
এজন্য প্রয়োজনে বুথের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নির্দেশনা দেয়া আছে। হলগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী বুথ তৈরি করে নেবে।’ নির্বাচননের জন্য যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তা কোনোভাবেই সঠিক নয় মন্তব্য করে বাম জোটের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দী বলেন, ‘ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানোর জন্য আমরা বারবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলেছি- এত স্বল্প সময়ের মধ্যে ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্ভব না। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইচ্ছে করেই এ সময়টা বাড়াচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো পর্যন্ত যতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট প্রদানে অনুৎসাহিত করছে। এসব সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের পক্ষে অন্তরায়।’ নন্দী বলেন, ‘প্রশাসন আমাদের দাবি বারবার অগ্রাহ্য করছে। আমরা মনে করি এর মধ্যদিয়ে প্রশাসনের নিশ্চয় বড় ধরনের কোনো দুরভিসন্ধি আছে। কারণ, তারা জানে যত ভোট কম পড়বে তত ছাত্রলীগের জন্য ভালো হবে। কারণ, ছাত্রলীগের সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয়তা নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আহ্বান জানাচ্ছি প্রশাসন এখনো সময় আছে ভোটের সময় বাড়াবে এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ভোটাধিকার প্রদানে পরিবেশ নিশ্চিত করবে।’ জিএস পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী এ আর এম আসিফুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসন যেভাবে আগাচ্ছে আমার কাছে মনে হচ্ছে সবকিছুই সাজানো।
একটি পক্ষকে জিতিয়ে দিতে প্রশাসনিক নীল নকশা চলছে। ৪৩ হাজার ভোট, সেখানে ভোটগ্রহণের সময় রাখা হয়েছে ছয় ঘণ্টা। ছয় ঘণ্টা সময়ের মধ্যে সব ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত হবে বলে আমরা মনে করি না। আমরা ভোটগ্রহণের সময় বাড়িয়ে দশ ঘণ্টা করার পক্ষে প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসন আমাদের দাবি মানছে না। এর থেকে প্রমাণিত হয়- প্রশাসন চায় না যেসব শিক্ষার্থী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুক।’ কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের মনোনীত এজিএস প্রার্থী ফারুক হাসান বলেন, ‘ছয় ঘণ্টার মধ্যে ৪৩ হাজার শিক্ষার্থীর ভোটগ্রহণ কোনোভাবেই সম্ভব না। আমরাসহ অধিকাংশ ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন বারবার ভোটের সময় বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছিল। কিন্তু প্রশাসন সেটি মানছেন না। তারা ৯০ সালের নির্বাচনের একটি নিয়মে অনঢ় রয়েছেন। যদিও এখনকার শিক্ষার্থী তখন থেকে দ্বিগুণ।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের কমন দাবি না মানার পেছনে হয়তো বা প্রশাসনের কোনো দুরভিসন্ধি থাকতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চাই প্রশাসন বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করবে। আমরা যেভাবে প্রস্তাব দিয়েছি ৮টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ ও প্রতি ১০০ জনের বিপরীতে একটি করে বুথ করবে। কারণ তারা চাইলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পারে। যদি তা না করে তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অতীতের মতো সব অপতৎপরতাকে রুখে দেবে।’ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল মনোনীত জিএস পদপ্রার্থী আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক বলেন, ‘আমরা আজও ডাকসুর সভাপতি ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান স্যারের সঙ্গে দেখা করেছি এবং আমরা বলেছি যে ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানোর জন্য। যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা শিক্ষার্থী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকে একটি কথা বলে আসছি যে, তড়িগড়ি করে এ নির্বাচনটা একটা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার জন্য কি না? এখনো সকল প্রক্রিয়ায় আমরা তা দেখতে পাচ্ছি। সময় কম রাখার পেছনে আমরা মনে করি- হলগুলোতে ছাত্রলীগের একক আধিপত্য রয়েছে। তাই শুধু হলে অবস্থানরতদের ভোটগ্রহণে প্রশাসনের অপকৌশল হচ্ছে কি না সেটা নিয়ে আমরা শঙ্কায় রয়েছি।’
কোটা আন্দোলনকারীদের প্যানেলের ইশতেহার: এদিকে আসন্ন ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ মনোনীতি প্যানেল। গতকাল মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করেন এ প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী নুরুল হক নুর। এসময় অন্যান্য প্রার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন।
কোটা আন্দোলনকারীদের ইশতেহারের মধ্যে রয়েছে- মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে লিবারেশন ওয়ার স্টাডিজ সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা; হলগুলো থেকে বহিরাগত ও অছাত্রদের বিতাড়িত করে প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের বৈধ সিট প্রাপ্তির উদ্যোগ নেয়া; গেস্টরুম, গণরুম ও জোরপূর্বক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ সম্পূর্ণরূপে বিলোপ সাধন করা; বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়া ও ক্যান্টিনে খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং ন্যায্যমূল্যে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করা; বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন, ক্যাফেটেরিয়া, ডাইনিং এবং দোকানে খাবারের মান যাচাইয়ের জন্য খাদ্যমান নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা; বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন ও রুটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা; পরিবহন সংক্রান্ত খাতে বার্ষিক বাজেটের ন্যূনতম ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা; লাইব্রেরির সময়সূচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ বাসের সময় নির্ধারণ করা; বাসে ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রত্যেকটি বাসে ওয়াইফাই সেবা নিশ্চিত করা; বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পরিবহন সেবার উন্নয়ন করা; বহিরাগত যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা; ক্যাম্পাসে রিকশা ভাড়া নির্ধারণ করা; বিশেষ পরিবহন সার্ভিস চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং পরিবেশের উন্নয়নের স্বার্থে গ্রিন ক্যাম্পাস কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করা; বার্ষিক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্যাগ গ্রহণ করা; গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বার্ষিক বৃত্তির ব্যবস্থা করা; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যেকোনো সমস্যা তাৎক্ষণিক সমাধানের জন্য ডাকসুর ‘সেবা ডেস্ক’ চালু করা; বৈশ্বিক জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ বিনির্মাণের স্বার্থে আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনার ও বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা; রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের বাইরে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর স্বাধীন কার্যক্রম আরও গতিশীল করা; শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আইটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা; প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল বাংলাদেশের আওতায় নিয়ে আসা; চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান গ্রন্থাগারের পরিধি বৃদ্ধি করা; গবেষণা খাতে বাজেটের ন্যূনতম ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা; জালিয়াতির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা করা; কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের বাণিজ্যিক ব্যবহার সীমিত করা; মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবন বন্ধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া; মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন করা; নামে-বেনামে নেয়া বিবিধ ফি বন্ধ করা; সাত কলেজের অধিভুক্তি সমস্যার যৌক্তিক সমাধান; ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ফার্মেসি স্থাপন করা; বিদেশে উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত কনসালটেন্সি স্থাপন করা; বাণিজ্যিক সান্ধ্যকালীন কোর্স বন্ধ করা; অনাবাসিক ছাত্রীদের হলে যাওয়ার সমস্যার সহজ সমাধান করা; প্রক্টোরিয়াল টিমকে আরও শক্তিশালী করা।
ছাত্র ফেডারেশনের ৪১ দফা, ভিসি নয়, ডাকসু সভাপতি হবে শিক্ষার্থীরা
ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে ৪১ দফা ইশতেহার দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন। গতকাল মধুর ক্যান্টিনে এ ইশতেহারে ঘোষণা করেন জিএস প্রার্থী উম্মে হাবিবা বেনজীর। এসময় তিনি নির্বাচিত হলে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন। ঘোষণা দেন-নির্বাচিত হলে ডাকসুর সভাপতি হবে শিক্ষার্থীদের থেকে ভিসি নয়, সেলক্ষ্যে কাজ করবেন তিনি। ছাত্র ফেডারেশনের ইশতেহারের মধ্যে রয়েছে- রেজিস্ট্রার বিল্ডিং ও প্রশাসনিক কাজ ডিজিটালাইজড করা; ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের নিপীড়ন, নির্যাতন, মারধর, হয়রানি কিংবা ভয়ভীতির ঘটনায় শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক সহায়তায় বিশেষ নিরাপত্তা টিম ও ইমার্জেন্সি হেল্পলাইন চালু করা; ক্যাম্পাসের যান চলাচল যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ, বাইপাস রাস্তা নির্মাণ, রিকশা ভাড়ার চার্ট তৈরি নিশ্চিতকরণ; চাঁদাবাজি ও ছিনতাই কঠোরভাবে নির্মূল করা; বহিরাগতদের অবাধ আগমন যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ; অন্তর্ভুক্তি কলেজ সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান; খেলার মাঠ ও টিএসসির বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধ; বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত আয়-ব্যয়ের হিসাবে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ; প্রক্টোরিয়াল টিমের পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ; গেস্টরুম প্রথা চিরতরে নিষিদ্ধ করা; গণরুম ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে ১ম বর্ষেই ‘নো ফ্লোরিং, নো সিঙ্গেল’ নীতিতে ও দুই-তলা বিছানা পদ্ধতিতে বৈধ সিট; মাসিক ক্যান্টিন মনিটরিং; শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি হলে কাউন্সেলিং সেন্টার স্থাপন; ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীয়ভাবে মডেল ফার্মেসি স্থাপন ও ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা; মশা ও ছারপোকা নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ; শিক্ষক মূল্যায়নে রেটিং পদ্ধতি চালু; বিশেষজ্ঞ বোর্ডের মাধ্যমে গবেষণার বাজেট নির্ধারণ; যৌন নিপীড়ন ও প্লেজারিজমের (লেখাচুরি) অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ; লাইব্রেরি ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখা; সক্ষমতা ছাড়া নতুন ডিপার্টমেন্ট চালুর প্রক্রিয়া বন্ধ করা; আদিবাসীসহ সব জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও বর্ণের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত; টিএসসিভিত্তিক সংগঠনগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন করা; অনলাইনে ও অফলাইনে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও বিচারে টাস্কফোর্স গঠন; ভূমিকম্পসহ যেকোনো দুর্যোগে দ্রুত সাড়া দানের স্বার্থে মেয়েদের হলের কলাপসিবল গেটে তালা লাগানো স্থায়ীভাবে বন্ধ করা; রাত ৯টা পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থীর জন্য বাস চালু ও জরুরি রুটে ট্রিপ বাড়ানো; মেয়েদের প্রতিটি হলে ওষুধ ও স্যানিটারি উপকরণ সমৃদ্ধ ফার্মেসি স্থাপন এবং রাতে ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল ট্রিটমেন্ট’ এর জন্য দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত; হলে প্রবেশের সময়সীমা নির্ধারণে মেয়েদের হলে গণভোট গ্রহণ; হলে প্রবেশের সময়সীমা পর্যন্ত প্রতি ঘণ্টায় লাইব্রেরি থেকে মেয়েদের হলে স্পেশাল বাস ট্রিপ চালু করা; মেয়েদের হলে ২৪ ঘণ্টা রিডিং রুম খোলা রাখা; মেয়েদের সব হলে মেয়ে শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত; মেয়েদের হলে মার্শাল আর্ট সেন্টার স্থাপন ইত্যাদি।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলা: মধ্যস্থতার পথেই রায় দিলেন সুপ্রিম কোর্ট

প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন ধর্মগুরু শ্রীশ্রী রবিশঙ্কর এবং আইনজীবী শ্রীরাম পঞ্চু। চার সপ্তাহের মধ্যে মধ্যস্থতার অগ্রগতি সংক্রান্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবারই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা বলেছিলেন, বাবর কী করেছিলেন, তা এখন আর পাল্টানো যাবে না। সে সময় মন্দির ছিল না মসজিদ, তা-ও এখন বদলানো সম্ভব নয়।
কারণ অতীতের উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে মস্তিষ্ক ও মনের ক্ষতে মলম দেওয়া সম্ভব।
প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ বলেছেন, এটি শুধু সম্পত্তির বিবাদ নয়। সম্ভব হলে, মস্তিষ্ক, হৃদয় ও ক্ষত নিরাময়ের বিষয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট মধ্যস্থতার মাধ্যমে রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিবাদ মেটানোর পক্ষে সওয়াল করলেও উত্তরপ্রদেশ সরকার অবশ্য আগেই মধ্যস্থতার বিরোধিতা করেছে। সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের মতো মুসলিম পক্ষ, হিন্দুদের মধ্যে নির্মোহী আখড়া রাজি থাকলেও, হিন্দু মহাসভা এর বিরোধিতা করে যুক্তি দিয়েছে, এটা শুধু মামলাকারী দু’পক্ষের বিষয় নয়। দুই সম্প্রদায়ের সমস্যা। আমজনতা এই মধ্যস্থতা মানবে না। অযোধ্যায় সমঝোতার উদ্যোগ অবশ্য এর আগেও হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর ও নরসিংহ রাওয়ের সময়ে আলোচনায় অযোধ্যা বিতর্ক মেটানোর চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টায় কোনও ফল পাওয়া যায় নি।
২০১০-এর অগস্টে মধ্যস্থতায় গুরুত্ব দিয়েছিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। তবে আপত্তি জানিয়েছিলেন হিন্দু মামলাকারীরা। এরপর ২০১৭-এর মার্চে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জে এস খেহর নিজেই মধ্যস্থতা করতে চেয়েছিলেন। তবে তা শেষ পর্যন্ত এগোয়নি। এরই মধ্যে ধর্মগুরু শ্রী শ্রী রবিশঙ্করও মধ্যস্ততার চেষ্টা করেছিলেন। মধ্যস্থতার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অযোধ্যায় বিরাজমান রামলালা-র আইনজীবী। আদালতে রামলালার আইনজীবী বলেছেন, রামের জন্মস্থানেই মন্দির তৈরি করতে হবে। রাম যে অযোধ্যাতেই জন্ম নিয়েছিলেন, তা নিয়ে কোনও বিবাদ নেই। বিবাদ হল, সেই জন্মস্থান ঠিক কোথায়? রামের জন্মস্থান নিয়ে কোনও মধ্যস্থতা হতে পারে না। অযোধ্যা বিবাদে এর আগেও মধ্যস্থতার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বলে আপত্তি ওঠায় বিচারপতি বোবদে বলেছেন, আমাদের ইতিহাস বোঝাবেন না। আমরাও ইতিহাস জানি। অতীতের উপরে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।
কে হানা দিয়েছিল, বাবর কী করেছিলেন, কে সে সময় রাজা ছিলেন, সেখানে মসজিদ ছিল না মন্দির, তার উপরে আমাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে আদালতে দু’পক্ষের মধ্যস্থতা দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মানবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়। তিনি বলেছেন, আমরা কী ভাবে মধ্যস্থতা লক্ষ লক্ষ মানুষের উপরে চাপিয়ে দেব? এটা ততখানি সরল হবে না। কিন্তু বিচারপতি বোবদে বলেছেন, যখন এক পক্ষ একটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছে, তা আদালতের লড়াই হোক বা মধ্যস্থতা, তা মানতেই হবে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বিবাহিত কুমারী প্রসব করলেন কন্যা সন্তান

রেবতীর একটি রোগ আছে।
একে ইংরেজিতে বলা হয় ভ্যাজাইনিসমাস। এর ফলে তার প্রজননতন্ত্রের ভিতরে কোনো কিছু প্রবেশ করাতে পারেন না। যখনই এর ভিতরে কোনো কিছু প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেন, অমনি তা বন্ধ হয়ে যায়। চারদিক থেকে শক্ত হয়ে আটকে থাকে। রেবতী বিষয়টি বুঝতে পারেন ২২ বছর বয়সে। তবে এ নিয়ে অন্য কারো সঙ্গে কথা বলতে তিনি ছিলেন খুবই বিব্রত।
রেবেকা বলেন, এমন অবস্থায় ভবিষ্যতে আমি শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবো কিনা তা নিয়ে একরকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিল। তবু বিষয়টি আমি ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দিলাম।
২০১৩ সালে চিন্ময় নামে এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তাদের প্রেম গড়ে ওঠে। প্রেম এগুতে থাকে। চিন্ময় যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে চলে আসেন তাকে বিয়ে করার জন্য। তখনও রেবতী বিশ্বাস করতেন বিয়ের পর হয়তো তার সমস্যা কেটে যাবে। ২৫ বছর বয়সে বিয়ে হয় রেবতীর। বিয়ের রাতেই তিনি চিন্ময়ের কাছে তার সমস্যার কথা খুলে বলেন। শুনে চিন্ময় তা মেনে নিলেন এবং বললেন, রাতটি তাদের কাটানো উচিত একজন আরেকজনকে চেনাজানার মাধ্যমে।
কিন্তু এক বছর কেটে যায়। তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক নেই। এ অবস্থায় রেবতী বন্ধুদের পরামর্শ নেন। তাদের অনেকে তাকে ওয়াইন পান করতে এবং প্রসারণকাজ করে এমন ক্রিম ব্যবহারের পরামর্শ দেন। কোনো কিছুতেই কাজ না হওয়ায় রেবতী ডাক্তারের কাছে যান। তারা তাকে চিকিৎসা দেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয় না। এতে তারা আরো অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েন। অবশেষে ২০১৮ সালে কৃত্রিম উপায়ে সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্বিতীয়বারের প্রচেষ্টায় তিনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এবং সিজারিয়ান অপারেশনের পরিকল্পনা করেন। রেবতী বলেন, যখন প্রথম অন্তঃসত্ত্বা পরীক্ষায় পজেটিভ আসে তখন আমি আনন্দে চিৎকার করেছি। কারণ, অনেক দিনের স্বপ্ন আমার সত্যি হয়েছে।
৪৮ ঘন্টার লেবার অবস্থায় থাকার পর তিনি প্রসব করেন ইভা নামের মেয়ে। এতে সহায়তা করেন দু’জন ধাত্রী। রেবতী ও চিন্ময় আশা করেন এর ফলে তারা প্রথমবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে সক্ষম হবেন।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
শপথের পরেই দল থেকে বহিষ্কার: এমপি পদ টিকবে কী?

এ ধরনের পরিস্থিতিতে অতীতে এমপি পদ থাকার রেকর্ড আছে। তাই সুলতান মনসুরও সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন।
গতকাল বেলা ১১টার পর সংসদ সচিবালয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে শপথ নেন সুলতান মনসুর। শপথ নেয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের জানান, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাকে জানিয়েই তিনি শপথ নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত বাকি সাত সদস্যকেও শপথ নেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমি ছাড়া ঐক্যফ্রন্টের আরো যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সংসদে এসে জনগণের পক্ষে কথা বলুন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত ঐক্যফ্রন্ট নেবে। আমি এ কথা বলতে পারি যে, আমি যা করেছি তা আমাদের দলের শীর্ষ নেতার নলেজে করেছি। আমি এর আগেও সংসদ সদস্য ছিলাম। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ জেনে-বুঝেই শপথ নিয়েছি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গণশুনানির বিষয়ে এ নেতা বলেন, আমরা ৮ জন জয়ী হয়েছি। বাকি ২৯২ আসনে তারা একটি মিছিলও বের করতে পারেনি। তারা জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারলে হয়তো আরো অনেকেই জয়ী হতে পারতো।
গণফোরাম থেকে বহিষ্কার: দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে একাদশ সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ায় সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে গণফোরামের স্টিয়ারিং কমিটিসহ প্রাথমিক সদস্য পদ থকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গতকাল বিকালে গণফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের বৈঠক শেষে দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আদর্শবিরোধী কাজ করায় সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হলো।
সেই সঙ্গে তার দলীয় প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করা হলো। তিনি জানান, সুলতান মনসুরের বহিষ্কারের চিঠি স্পিকার বরাবর পাঠানো হবে। সেই সঙ্গে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। মন্টু বলেন, দল বহিষ্কার করায় সংবিধান অনুয়ায়ী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন না। অন্যদিকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে বহিষ্কারের বিষয়ে গণফোরামের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৩০শে ডিসেম্বর ১১তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের রাতে দেশব্যাপী প্রশাসনের সিলমারা ভোটে যে তামাশার জাতীয় সংসদ নির্বাচন নামীয় জাতীয় কলঙ্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার মধ্যেও আপনি বিজয়ী হওয়ায় দল এবং ঐক্যফ্রন্ট আপনাকে আগেই অভিনন্দন জানিয়েছে। প্রহসন, নির্বাচনী তামাশা এবং প্রতারণার কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক এই নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে, যা আপনি অবহিত। প্রহসন ও ভোট ডাকাতির এই নির্বাচনে সৌভাগ্যবান বিজয়ী ঐক্যফ্রন্টের ৮ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে ঐক্যফ্রন্টভুক্ত সকল দল আলাদা ভাবে এবং ঐক্যফ্রন্ট-এর স্টিয়ারিং কমিটি সর্বসম্মতভাবে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না নেয়া পর্যন্ত নির্বাচিত ৮ জন সংসদ সদস্য শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা আপনি অবহিত রয়েছেন।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের নামে অসংখ্য গায়েবি মামলা, গ্রেপ্তার, কারাবরণ, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, আহত নিহত, নেতাকর্মীদের মুক্তি বা মামলার ফয়সালা হয়নি এবং ৩০শে ডিসেম্বরের প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচন ইত্যাদি জাতীয় সংকট প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীনদের কোনো উদ্যোগ না থাকা সত্ত্বেও আপনি শপথ গ্রহণ করেছেন যাতে দেশের মানুষ চরম হতাশ এবং বিক্ষুব্ধ। আমাদের দল গণফোরাম এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনে করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ভোটের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে পদদলিত করে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে আপনি নৈতিকতাবিরোধী, জনবিরোধী এবং সংসদীয় রীতি বিরোধী কাজ করেছেন। অতএব, আপনার বিরুদ্ধে দলের নীতিবিরোধী, আদর্শবিরোধী, জনবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে আপনার গণফোরামের প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিল করা হলো এবং গণফোরাম থেকে বহিষ্কার করা হলো। একইসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো।
এমপি হিসেবে টিকতে পারবেন?
গতকাল শপথ নিলেও দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় সুলতান মনসুরের এমপি পদ থাকার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, গণফোরামের দুই নেতার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু দল থেকে বহিষ্কার হলে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও আরপিওর ১২(১) বিধি অনুযায়ী তাদের এমপি পদ থাকবে না। বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিষয়টি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, তা এখন দেখার বিষয়। তিনি বলেন, যে দল তাদের (সুলতান-মোকাব্বির) মনোনয়ন দিয়েছে, সেখান থেকে বহিষ্কৃত হলে সংসদে এ দু’জনের অবস্থান কোথায় হবে? এখন অন্য দলে যোগ দেয়ার বা স্বতন্ত্র এমপি হয়ে থাকার সুযোগও নেই। কারণ, স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার শর্ত তারা পূরণ করেননি।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক এ বিষয়ে মানবজমিনকে বলেন, দল কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করলে তার সদস্য পদ কি হবে এটার উত্তর সরাসরি আমাদের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে নেই। ৭০ অনুচ্ছেদে দল থেকে পদত্যাগ অথবা দলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার কথা বলা আছে। বহিষ্কারের বিষয়টি নিয়ে মামলা হলে তখন উচ্চ আদালত এ বিষয়ে নির্দেশনা দিতে পারেন। তবে আমার ধারণা শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা দাঁড়াবে পদত্যাগ ও বহিষ্কার শব্দটা সমর্থক কিনা। হাইকোর্ট হয়তো এটাই বলবেন যে, দল থেকে পদত্যাগ করা আর বহিষ্কার করা সমর্থক। তাহলে এই বিবেচনায় তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে না। তবে হাইকোর্ট কি বলবেন সেই সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
কারণ বহিষ্কারের ব্যাপারটা ৭০ অনুচ্ছেদে বলা নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, সংবিধান ও আরপিও’র আইনে বহিষ্কার হওয়ার পর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে কিনা সেটা অস্পষ্ট আছে। এক্ষেত্রে অতীতের উদাহরণের উপর সংসদ সদস্য পদ থাকা না থাকা নির্ভর করতে পারে। আর অতীতের উদাহরণ হলো দুই একজন এমপি বহিষ্কার হওয়ার পর তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, গণফোরাম থেকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে বহিষ্কার করায় তার সংসদ সদস্য পদে কোনো প্রভাব পড়বে না। সংবিধান অনুযায়ী তার সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে। এর ব্যাখ্যায় শফিক আহমেদ বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যদি কোনো সংসদ সদস্য পদত্যাগ করেন বা ইস্তফা দেন অথবা দলের বিপক্ষে ভোট দেন তাহলে তার পদ শূন্য হবে।
সংসদে যা বললেন সুলতান মনসুর
এদিকে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অংশ নিয়ে ৭ই মার্চের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সুলতান মনসুর বলেন, অপ্রিয় হলেও সত্য আজকে সংসদে যারা আছেন তারা এক জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। আমিই বোধহয় একজন নীলমনি যে বর্তমানে আপাতত জোটের বাইরে অন্য জোট থেকে নির্বাচিত হয়েছি। এবং শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মৌলভাবাজর-২ আসনের কুলাউড়া মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে এখানে এসেছি।
সরকার প্রধান হিসেবে আজকে সংসদ নেত্রীকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি বলেন, নির্বাচনে অন্তত আমার নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অন্য এলাকায় কি ঘটেছে জানি না। অন্যরা তাদের বিবেকের আদালতে তারাই বলতে পারবেন। সুলতান মনসুর বলেন, আজকে আমারও কিন্তু ওইখানে থাকার কথা ছিলো। অর্থাৎ যদি ওই জোটের পক্ষ হয়ে রাজনীতি করতাম। আজ থেকে ১৮ বছর আগে এই সংসদে আমার আসার সুযোগ হয়েছিলো। আপনি (স্পিকার) যে আসনে বসে আছেন ওই আসনে বসেছিলেন মরহুম আলহাজ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। আর ছিলেন আজকের প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ সাহেব। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, রাজনীতির ছন্দপতনের কারণে হয়তো আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় আমি একটি রাজনৈতিক কারাগারের মধ্যে ছিলাম।
গত ১৮ বছরে যদিও আমি এমপি ছিলাম না বা এইখানে ছিলাম না তবে আমি রাজনৈতিকভাবে চিন্তার দিক দিয়ে নিষ্ক্রিয় ছিলাম না। আর যে বিশ্বাস নিয়ে আজ ৭ই মার্চ যাকে নিয়ে আলোচনা ১৯৬৭-৬৮ সালে স্কুল ছাত্র থাকা অবস্থায় যাকে ঘিরে, যার স্লোগান দিয়ে রাজনীতি জীবন শুরু করেছিলাম- পদ্মা, মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা, জেলের তালা ভাঙবো শেখ মুজিবকে আনবো, মিথ্যা অসত্য ষড়যন্ত্রমূলক মামলা মানি না মানবো না। সেই জায়গা থেকে সেই বিশ্বাস থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচ্যুত হয়নি। যদিও জোটগতভাবে বা রাজনৈতিকভাবে বর্তমানে হয়তো আমার নেতাদের সঙ্গে ওই জোটে নাই। কিন্তু আজ থেকে ৫২ বছর আগে যে বিশ্বাস নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছিলাম, সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই আমি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে নির্বাচন করে আপনাদের সকলের দোয়াতে এই জাতীয় সংসদে এসেছি।
তিনি বলেন, আমি নিজেকে আজকে এইভাবে সম্মানিত বোধ করি-জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙ্গালীদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন সেই ৭ই মার্চে শপথ নিতে পেরেছি। অনেকের মনঃপূত বক্তব্য হয়তো আমি আজকে না রাখতে পারি তবে আশা করবো আপনার (স্পিকার) কাছে মহাজোটের বিরোধী একজন অন্য জোটের ব্যক্তি হয়ে যাতে স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারি, জনগণের কথা বলতে পারি, বাংলার মানুষের কথা বলতে পারি, সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলতে পারি। এবং বঙ্গবন্ধু যে কথা বলেছেন যে জনগণই ক্ষমতার উৎস সেই জনগণের স্বার্থে কথা বলে যাতে সারাজীবন রাজনীতি করতে পারি সেই শেল্টার পাবো বলে আশা করি। সেই সহযোগিতা পাবো বলে আশা করি। এমনকি সংসদ নেত্রীও সেই বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন মনে করি। এখানে ৯৯ পার্সেন্ট হচ্ছে এক জোটে আর আমি অন্য জোট থেকে এসে রাজনীতি করছি। তবে জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু এই প্রশ্নে কোনো আপস নেই। সুলতান মনসুর বলেন, সংসদ নেত্রী বলেছেন জাতীয় ঐক্যের কথা। আজ সেই ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সুলতান মনসুর প্রায় সাড়ে ১১ মিনিটের বক্তব্য শেষ করেন জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু বলে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
৭ই মার্চের ভাষণকে যারা নিষিদ্ধ করেছিল তারা আঁস্তাকুড়ের দিকেই যাবে -আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী

বেঁচে থাকবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের মানুষকে যারা ভালবাসবে। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ভাষণের ওপর আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ উপলক্ষে গতকাল সকালে ধানমন্ডি-৩২ নম্বরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানায় আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণা। ৭ই মার্চের ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ’বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না’। বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না। যুগের পর যুগ বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ পুরো জাতিকে নতুন করে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাচ্ছে, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে দেশপ্রেম, ত্যাগ ও আদর্শের মহিমায় উজ্জীবিত করে যাচ্ছে।
পৃথিবীর অনেক শ্রেষ্ঠ ভাষণ আছে, কিন্তু ৪৮ বছর ধরে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের মতো আর কোনো ভাষণ এতো বার বাজেনি।
তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ, এটি এখন প্রমাণিত সত্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক কর্নেল (অব.) সাজ্জাদ জহির, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক কৃষিবিদ আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় নেতা ডা. শামসুন্নাহার চাঁপা, আনোয়ার হোসেন ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী আবুল হাসনাত ও উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান।
কবিতা আবৃত্তি করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দীর্ঘ ২১টি বছর এই ভাষণ বাজানো নিষিদ্ধ ছিল। যেহেতু পাকিস্তানি হানাদারদের এই ভাষণটি পছন্দ নয়, সেজন্য ক্ষমতা দখল করে এই ভাষণটি বাজানো নিষিদ্ধ করেছিল ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমানরা। পরবর্তী সামরিক স্বৈরাচাররাও একই পথ অনুসরণ করে, রণাঙ্গনের স্লোগান জয় বাংলাকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সত্যকে কখনো অস্বীকার করে মুছে ফেলা যায় না। তিনি বলেন, জাতির পিতার ৭ই মার্চের ভাষণের প্রতিটি লাইন, প্রতিটি শব্দ একেকটি কোটেশন হয়।
ভাষণের প্রতিটি লাইন, শব্দ বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সারা পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের অনুপ্রেরণা যোগাতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি আজীবন টিকে থাকে। ৪৮ বছর হয়ে গেল বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের আবেদন এখনও এতটুকুও কমে যায়নি। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং ৪৮ থেকে ৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা রিপোর্ট নিয়ে করা পাণ্ডুুলিপিগুলো আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীদের পড়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বইগুলো পড়লেই বুঝতে পারবেন একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কত ত্যাগ করেছেন, কত কষ্ট করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর এই একটি মাত্র ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলতে পারছি, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই আমরা পেয়েছি একটি ভাষা ভিত্তিক স্বাধীন দেশ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর অনেক বড় বড় নেতা অনেক শ্রেষ্ঠ ভাষণ দিয়েছেন। গত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলো নিয়ে গবেষণা হয়েছে। গবেষণার পর যে শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলো স্থান পেয়েছে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি। সে কারণে জাতিসংঘের ইউনেস্কো ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তিনি বলেন, গত ৪৮ বছর ধরে কতবার, কত সময়, কত ঘণ্টা বা কত মিনিট এই ভাষণটি বাজানো হয়েছে, কত মানুষ শুনেছেন তার কোনো হিসাব নেই। পৃথিবীর অন্য কোনো নেতার ভাষণ এতবার বাজানোর কোনো ইতিহাস নেই। সারা বিশ্বে ৭ই মার্চের ভাষণটি এখনও সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে, ভাষণটির আবেদন এখনও এতটুকু কমেনি। বিশ্বের বড় বড় নেতার ভাষণগুলো একবার বেজেই থেমে গেছে, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণটি যুগ যুগ ধরে বেজেই যাচ্ছে, দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে। বিশ্বের অনেক শ্রেষ্ঠ ভাষণ আছে সেগুলো ছিল লিখিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ছিল সম্পূর্ণ অলিখিত, কোনো নোট পর্যন্ত ছিল না। বঙ্গবন্ধু যা বিশ্বাস করতেন, সেই মনের কথাটিই বলে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তর ও পঁচাত্তরের খুনি ও স্বাধীনতাবিরোধীরা দীর্ঘ ২১টি বছর এই ভাষণটি বাজানো নিষিদ্ধ করেছিল। বঙ্গবন্ধুর ছবি নিষিদ্ধ করেছিল।
যে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার জন্য হানাদার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে অকাতরে জীবন দিয়ে গেছেন, সেই স্লোগানটিও নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ভাষণটি বাজাতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে জীবন পর্যন্ত দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ প্রদানের আগ মুহূর্তে পিতার পাশে থাকার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষণটি দেয়ার আগে অনেক বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, রাজনৈতিক নেতা এমনকি ছাত্রলীগের নেতারাও বঙ্গবন্ধুর কাছে অনেক নোট দিয়ে বলেছিলেন, এসব বলতে হবে। কাগজের যেন বস্তা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিতে যাবেন, ঠিক তখন আমার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বাবাকে উপরে নিয়ে গিয়ে পাশে বসেন।
তখন আমিও বাবার মাথার কাছে বসে মাথা বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। তখন মা বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ’অনেকে অনেক কথা বলবে। ময়দানে লাখ লাখ মানুষ তোমার মুখের দিকে চেয়ে বসে আছে। তুমি দেশের মানুষের জন্য আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছ। তাই তাদের জন্য কী করতে হবে তোমার চেয়ে কেউ তা বেশি বুঝবে না। তাই তোমার মনে যা আসবে সেটিই বলবে।’ বঙ্গবন্ধু তাই করেছিলেন। কোনো নোট বা লিখিত কাগজ ছাড়াই বঙ্গবন্ধুর মনে যা ছিল সেটিই ভাষণে বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কী করেছেন, তা ওই সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দা বাহিনীর রিপোর্টেই স্পষ্ট উল্লেখ আছে। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়ে গোয়েন্দা সংস্থার ওই রিপোর্টগুলো সংগ্রহ করে আমরা বই আকারে বের করছি। ইতিমধ্যে দুইখণ্ডের বই বেরিয়েছে, তৃতীয় খণ্ডের কাজ চলছে। সমস্ত রিপোর্টগুলো নিয়ে ১৪ খণ্ডের বই বের করা হবে।
এই রিপোর্টগুলো পড়লেই সবাই জানতে পারবেন একটি স্বাধীন জাতি ও স্বাধীন দেশের জন্মের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনও বিশ্বের ইতিহাসে বিরল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে অসহযোগ আন্দোলন হয়েছে, পরে বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ডাকা অসহযোগ আন্দোলন থেকেই একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধুর মতো অসহযোগ আন্দোলন বিশ্বের আর কোন নেতাই করতে পারেননি। অসহযোগ আন্দোলনের সময় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আলোচনার জন্য বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু অসহযোগ আন্দোলন থাকায় গণভবনের বাঙালি বাবুর্চিরা রান্না করতে পর্যন্ত অস্বীকার করে। ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুকে ফোন করে তখন বলা হয়েছিল, একটু অনুমতি দেন, নইলে রাষ্ট্রপতি একটু গরম ভাতও খেতে পারবেন না। এমন অসহযোগী ঘটনা বিশ্বে শুধু বিরলই নয়, একটি অনন্য ইতিহাসও রচনা করে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু।
সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অমূল্য সম্পদই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেই আমাদের সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। যতদিন শেখ হাসিনার হাতে থাকবে দেশ, ততদিন পথ হারাবে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশ একদিন অনেক বড় হবে, আরও অনন্য উচ্চতায় যাবে। কারণ ক্ষমতায় আছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা।
আমির হোসেন আমু বলেন, ৭ই মার্চের স্বাধীনতার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা ২৬শে মার্চ পরিপূর্ণতা পেয়েছিল। স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর সারাজীবনের সংগ্রাম সাধনার কথা একটি মাত্র ভাষণে তুলে ধরেছিলেন। ৭ই মার্চ শুধু স্বাধীনতার ঘোষণাই ছিল না, গেরিলা যুদ্ধের সকল কৌশলও তুলে ধরেছিলেন অতি কৌশলে, যাতে পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে না পারেন। তাই ৭ই মার্চই ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু একটি মাত্র ভাষণে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি সৃষ্টি করেছেন, নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিলেন, একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছিলেন। ৭ই মার্চের ভাষণে স্বাধীনতা থেকে শুরু করে দেশ পুনর্গঠন পর্যন্ত এমন কোনো কথা নেই তা বলেননি। পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুকে ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু চতুরতার সঙ্গে ভাষণ দিয়ে উল্টো পাকিস্তানকেই ফাঁদে ফেলেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করেছেন যে দুই পাইলট

ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর আশংকা প্রবল হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারির ওই ঘটনায় ভারতের মিগ-২১’র পাইলট অভিনন্দন বর্তমানকে আটক করে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী। গত শুক্রবার অভিনন্দনকে ওয়াগা সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি গতকাল জাতীয় সংসদে বলেন, “পাকিস্তানি বিমান বাহিনী ভারতের দুটি বিমান ভূপাতিত করেছে।” তিনি জানান, স্কোয়াড্রন লিডার হাসান সিদ্দিকি এবং উইং কমান্ডার নুমান আলী খান বিমান দুটি ভূপাতিত করেন। মেহমুদ কোরেশি আরো বলেন, তিনি এ দুই পাইলটকে সম্মান জানাতে চান। এর আগে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে বেসরকারিভাবে সিদ্দিকির নাম আসছিল।

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
অর্জন অনেক এগুতে হবে আরো by মরিয়ম চম্পা

সমতা প্রতিষ্ঠা ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফলতার জন্য নারীদের আরও এগিয়ে যেতে হবে বলে মনে করছেন তারা। রিকশামিস্ত্রি নাজমা আক্তার। বয়স ৫০ বছর।
গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার মেহেন্দীগঞ্জ থানায়। ধানমন্ডি স্টার কাবাবের ঠিক বিপরীতে আবাহনী মাঠের পশ্চিম পাশের ফুটপাথ ঘেঁষে পরপর দু’টি রিকশা-সাইকেল সারাইয়ের দোকান। প্রথমটি মেয়ের পরেরটি মা নাজমার। রঙিন প্রিন্টের থ্রি-পিস পরে অলস দুপুরে পিঁড়ি পেতে বসে আছেন নাজমা। নাজমা অসুস্থ হওয়ায় রিকশাচালকরা নিজ তাগিদে তাদের প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিচ্ছেন। সামনেই রিকশা মেরামতের যন্ত্রপাতি থরে থরে সাজানো। রিকশা সারাইয়ের কাজে একজন নারী! এ রকম দৃশ্য দ্বিতীয়টি সচরাচর চোখে পড়বে বলে মনে হয় না। অনেকটা কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে।
নাজমা বলেন, অভাবের তাড়নায় বাবা-মা দু’জন ঢাকা চলে আসেন। আমার জন্ম ঢাকায়। বাবা ছিলেন রিকশামিস্ত্রি। ছোটবেলায় যখন বাবাকে রিকশার গ্যারেজে কাজ করতে দেখতাম তখন মনোযোগ সহকারে বাবার কাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। এককথায় বলতে গেলে আমি বড় হয়েছি রিকশা সারাইয়ের যন্ত্রপাতির সঙ্গে। ফলে এই কাজটি আমাকে খুব টানতো। সেই ছোটবেলাতেই বাবার কাছ থেকে আগ্রহভরে শেখেন রিকশা মেরামতের বিভিন্ন কাজ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে কাজের দক্ষতা। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় নাজমার। স্বামী-সংসার বোঝার বয়স ছিল না তার। স্বামীর সংসারেই ধীরে ধীরে পরিণত হন তিনি। অন্য আর দশটা বাঙালি বধূর মতো গৃহিণীর জীবন শুরু করেছিলেন নাজমা। ‘কিছুদিন যেতেই স্বামীর আচরণ বদলাতে থাকে। মানসিক অত্যাচার-অপমান, গায়ে হাত তোলা সবই করতেন তার স্বামী। নাজমা একসময় বুঝে যান আর্থিক স্বাবলম্বিতাই তাকে এই অপমান-অত্যাচারের গ্লানি থেকে মুক্তি দিতে পারে। ফলে বাবার শেখানো কাজটাকেই গ্রহণ করেন পেশা হিসেবে। প্রথম স্বামী মারা যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন তিনি।
বর্তমান স্বামীকে নিয়ে খুব সুখী নাজমা। স্বামী তার থেকে বয়সে সামান্য ছোট হলেও তাকে খুব সম্মান-শ্রদ্ধা করেন। স্বামী-সন্তান ও সংসার সামলে পেশার দিক থেকে সময়ের তালে তালে নাজমা হয়ে উঠেছেন আত্মনির্ভরশীল একজন। একজন দক্ষ রিকশামিস্ত্রি নয়, রিকশা মেরামতের প্রশিক্ষক হিসেবেও নাজমা আক্তার প্রতিষ্ঠিত। ঢাকা শহরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তার অসংখ্য ভক্ত ও শিষ্য। নাজমা বলেন, নারী দিবস বুঝি না। তবে আমি আমার স্বামীকে নিয়ে অনেক সুখে শান্তিতে সংসার করছি। গত তিন মাস হলো স্বামীর হাতে নিজের ব্যবসায়ের সকল দায়-দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছি। খুব শ্রদ্ধা করেন তিনি আমাকে। আগের স্বামীর সংসারে ৫ সন্তান আছে। দুই ছেলে- তিন মেয়ে। সবাইকেই এ কাজে হাতেখড়ি দিয়েছেন। তার মতে, ‘নারীর কাজ-পুরুষের কাজ’ বলে কাজের কোনো বিভাজন হয় না। অভিজ্ঞতা থাকলে যে কোনো কাজই পুরুষ বা নারী জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন ওই যে, খানিকটা দূরে আমার ছোট মেয়ে আমার মতো রিকশার গ্যারেজ চালাচ্ছে।
মোবাইল স্মার্টফোনের অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সিসেবার নেটওয়ার্ক উবারের মাধ্যমে মোটরবাইক চালান শাহনাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের কল্যাণে তিনি অনেকটাই পরিচিতি লাভ করেছেন। তবে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে তার মোটরসাইকেলটি চুরি এবং উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় তিনি ব্যাপক ভাবে আলোচিত হন।
পুরো নাম শাহনাজ আক্তার। বয়স ৩০ বছর। স্বামী থাকতেও নেই। পরিবারের অমতে নিজের পছন্দের পাত্রকে ভালোবেসে বিয়ে করেন শাহনাজ। তবে বিয়ের পর থেকে স্বামীর ভালোবাসা জিনিস কি সেটা বুঝতেই পারেননি এই সংগ্রামী নারী। উল্টো তার ওপর চালানো হতো শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। এরই মধ্যে জন্ম নেয় তাদের দুই কন্যাসন্তান। শাহনাজ বলেন, স্বামীর ভালোবাসাতো পাইনি। উল্টো তার নিগ্রহ সহ্য করতে করতে এক সময় প্রচণ্ড মাত্রায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়ি। জন্মের পর বাবা মারা যায়। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয়। দ্বিতীয় বাবা কিংবা তার ছেলে মেয়েদের লাথি-ঝাঁটা ছিল আমার নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।
তিনি বলেন, আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে মিরপুর বাঙলা কলেজে নবম শ্রেণিতে পড়ে। আর ছোট মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। ওদেরকে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হচ্ছে আমার একমাত্র চ্যালেঞ্জ। মোটরসাইকেল চালিয়ে আয়-রোজগার করা ও সংসার চালানো এটা আমার দৈনন্দিন রিজিকেরই একটি অংশ। আমাদের সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, ‘পুরুষ শাসিত সমাজ’। আমি এটা পরিবর্তন করতে চাই। নারী দিবস উপলক্ষে আমার মেসেজ থাকবে, প্রত্যেকটি নারীর প্রত্যয় হোক ‘এই প্রচলিত কথাটি আমরা পরিবর্তন করবো।
এই পুরুষ শাসিত সমাজে আমরা পুরুষ-মহিলা উভয় মিলে এই সমস্যার সমাধান করবো। প্রত্যেক নারীর কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, আসুন আমরা সবাই মিলে নারী-পুরুষ ‘উভয় শাসিত সমাজ তৈরি করি’। আমার মাধ্যমে আমি এই কাজটা শুরু করতে চাচ্ছি। আমার মতো সাহস করে যদি নারীরা পথে নামেন তাহলেই এটা সম্ভব। একার পক্ষে এটা সম্ভব হবে না। এমনকি নারীদের মনে ভয় থাকলেও এটা হবে না। আমাদের মুসলিম দেশগুলোর অধিকাংশ নারীই লজ্জিত এবং ভীতু স্বভাবের হয়ে থাকে। শতকরা ৯৫ জনই ভয় অথবা লজ্জা পায়। কিংবা পরিবারের বাবা-মা, স্বামী অথবা ভাই বাধা দিচ্ছে। তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নারীরা যদি টেম্পু চালাতে পারে তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে থাকবো। স্বামী পরিত্যক্তা নারী হিসেবে আমি যদি সন্তান ও মা বোনের দায়িত্ব নিতে পারি। রাস্তায় মোটরসাইকেল দাবড়িয়ে বেড়াতে পারি। তাহলে অন্যরা পারবে না কেন।
এবার নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে নারীর সমতা। ১৮৫৭ সালের ৮ই মার্চ। মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং কর্মক্ষেত্রে বৈরী পরিবেশের প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের সুতা কারখানার একদল শ্রমজীবী নারী। তাঁদের ওপরে দমন-পীড়ন চালায় মালিকপক্ষ। নানা ঘটনার পরে ১৯০৮ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ও রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো নারী সম্মেলন করা হয়। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ দিনটি নারী দিবস হিসেবে পালন করছে। তখন থেকেই বিভিন্ন দেশে নারীর সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ করে দিবসটি পালন শুরু হয়। ‘সবাই মিলে ভাব, নতুন কিছু করো, নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্ব গড়ো’ স্লোগানকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হবে সারা বিশ্বে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ভারতে হামলায় জইশকে ব্যবহার করেছে আইএসআই -পারভেজ মোশাররফ

এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ গতকাল বুধবার বলেছেন, জইশ-ই-মুহাম্মদ একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তাঁর দেশের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এই সংগঠনকে ব্যবহার করে ভারতে হামলা চালিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে এ ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৯৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন পারভেজ মোশাররফ। পাকিস্তানের হাম নিউজের সাংবাদিক নাদিম মালিককে টেলিফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জইশ-ই-মুহাম্মদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। পারভেজ মোশাররফ বলেন, ২০০৩-এর ডিসেম্বরে তাঁকে দুবার হত্যার চেষ্টা করেছিল জইশ-ই-মুহাম্মদ। তিনি বলেন, এত কিছু সত্ত্বেও জইশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি নিজেও কোনো উদ্যোগ নেননি।
নাদিম মালিক পারভেজ মোশাররফের সাক্ষাৎকারের ভিডিও শেয়ার করেছেন তাঁর ফেসবুক ও টুইটারে।
নাদিম পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্টের কাছে জানতে চান, আপনি নিজের শাসনামলে জঙ্গি সংগঠন জইস-ই-মুহাম্মদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেননি। উত্তরে পারভেজ মোশাররফ বলেন, তখন সময় ভিন্ন ছিল।
ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে আবার উত্তেজনা তৈরি হয়। সংকটের শুরু ১৪ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় দেশটির আধা সামরিক সিআরপিএফের গাড়িবহরে আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জনের বেশি জওয়ান নিহত হন। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদ হামলার দায় স্বীকার করে। এ ঘটনার ১২ দিন পর ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোরে পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত বালাকোটে বিমান হামলা চালায় ভারত। নয়াদিল্লির দাবি, ওই হামলায় পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী জইশ-ই-মুহাম্মদের বড় ঘাঁটি গুঁড়িয়ে গেছে। নিহত হয়েছে ৩০০ জঙ্গি। জঙ্গি ঘাঁটিতে আকাশপথে মিরাজ-২০০০ যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। কিন্তু ওই হামলায় এখন পর্যন্ত মাত্র একজনের আহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে বলে দাবি হামলাস্থল পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের বালাকোটের বাসিন্দাদের। এরপরই প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে চরম উত্তেজনা চলছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জঙ্গিদের লাশ কই। তবে ইতালির এক সাংবাদিক দাবি করেছেন, ভারতের আঘাত হানা জায়গা থেকে কয়েকটি দেহ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ওই হামলার পর জইশ-ই-মুহাম্মদের জঙ্গিদের ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করেছে ইমরান খান নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান সরকার। সংগঠনের প্রধান মাসুদ আজহারের ছেলে ও ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে হাফিজ সাঈদের সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়াকেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ভূমির সমার্থক হয়ে উঠেছে ভোগান্তি by শামসুল হুদা

কৃষি খাসজমি বণ্টনের সময় এর প্রধান দাবিদার আইনত ভূমিহীন মানুষ। কিন্তু আমাদের একাধিক গবেষণায় দেখেছি, এই বণ্টন সুষম হয় না। ভূমিহীন মানুষের প্রাপ্য সম্পদ চলে যায় ক্ষমতাশালী বা তাদের অনুগ্রহভাজনদের কাছে। খাসজমি হলো নিরীহ বিষয়। আসলে সরকারের কাছে কত খাসজমি আছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবার কৃষিজমিকে বাঁচিয়ে শিল্প স্থাপনের পক্ষে কথা বলেছেন। আমরাও এ কথা বলি। তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার সঙ্গে সরকারেরই বিভিন্ন দপ্তরের কার্যকলাপের মিল নেই। শিল্পসহ নানা ধরনের স্থাপনা তৈরিতে বারবার কর্তাব্যক্তিদের চোখ পড়ে উর্বর কৃষিজমিতে। এ ক্ষেত্রে আবার সুনির্দিষ্টভাবে প্রান্তিক মানুষ বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের দিকে দৃষ্টি বেশি থাকে। কারণ, এসব ক্ষমতাহীন মানুষের কাছ থেকে জোর করে জমি নেওয়াটা সহজ। আবার তাদের প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। শিল্প আমাদের লাগবে। তবে তা উর্বর জমি নষ্ট করে নয়। এর জন্য ভূমির বিন্যাস বা জোনিং দরকার। এখন যেভাবে জোনিং করা হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা নেই। এটা আমলানির্ভর। ভূমির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে এখানে সম্পৃক্ত করতে হবে।
বননির্ভর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তাদের আবাসস্থল হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এসব জাতিগোষ্ঠীর প্রথাগত আইনকে আমাদের সমাদর করতে হবে।
দিনের পর দিন ভূমিসংক্রান্ত মামলার পাহাড় জমছে। আবার দেশে দিন দিন বাড়ছে ভূমি-দারিদ্র্য ও ভূমিবঞ্চনা। ভূমি মামলার জট কাটাতে জেলা পর্যায়ে বিশেষ ভূমি ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি ভূমি অধিকারকর্মীরা করে আসছেন। তবে এ নিয়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখি না। কম সময়ে, কম খরচে মানুষ এখানে সেবা পাবে, এটাই আমরা দেখতে চাই। ১৯৯৮ সালে ভূমি ব্যবহার নীতিমালা হয়েছিল। এর কার্যকর কোনো প্রয়োগ দেখিনি। কৃষিজমির সুরক্ষার আইনটিও এখনো হয়নি। জমিকে রক্ষায়, দুর্বৃত্তায়ন রোধে এসব দরকার।
শামসুল হুদাঃ নির্বাহী পরিচালক, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ডাকসুতে গায়ের জোরে ভোট নেবে, খাতির করে ৪/৫টা দেবে: মান্না

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আজ শুক্রবার নাগরিক ঐক্যের ঘোষণাপত্র প্রকাশ ও আলোচনা সভায় ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না এসব কথা বলেন। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মুক্তির লড়াই-এ ঐক্যবদ্ধ হউন’ শিরোনামে ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে নাগরিক ঐক্য।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ডাকসু নির্বাচন ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের মতো হবে। ১০ বছরের ছাত্র রাজনীতির যে বন্ধ্যত্ব, স্থবিরতা, গতিহীনতা—সে কারণে এই পরিণতি হবে। ১০ বছর ধরে একটি দল ক্ষমতায় থেকে হল দখল করেছে, ক্যাম্পাস দখল করেছে। ভার্সিটির সব ছাত্র সংগঠনের বিকাশ নষ্ট করেছে। তিনি বলেন, এটাকে গড়ে তুলবেন কীভাবে? এই নির্বাচনকে সুযোগ মনে করে গড়ে তোলা যাবে? হয়তো যাবে, যদি পারে। আমরা ৩০ তারিখের ভোটকে বলেছি ডাকাতি, কিন্তু এখানে দিনের বেলায় ভয়ভীতি দেখিয়ে, গায়ের জোরে ভোট নেবে। খাতির করে চার-পাঁচটা ভোট দিয়ে দেবে। ১৯টি হলের মধ্যে দুই-তিনটি হল না হলে দিয়ে দেবে। তারপরে বলবে যে, গণতান্ত্রিকভাবে ভোট হয়েছে, না হলে ওরা জিতল কীভাবে?
ডাকসুর সাবেক সহসভাপতি (ভিপি) মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এমন নির্বাচনের মাধ্যমে কেউ ভিপি, কেউ জিএস হবে। একটা বড়াইয়ের ভাব হবে। গোটা ছাত্রসমাজ যে পদদলিত, পরাস্ত হয়ে গেল—সেটা মনে রাখার আর কারণ চলবে না।
মাহমুদুর রহমান মান্না আরও বলেন, ৩০ তারিখ বা ‘২৯ তারিখ রাতের’ ভোট ‘ডাকাতি’ জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্রের যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নেমেছিল আওয়ামী লীগ। যারা মনে করেছে এই রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে আজীবন রাষ্ট্রযন্ত্র চালাবে, তারা ভুল করেছে। এই রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজই হলো নড়েচড়ে তারপরে স্থান পরিবর্তন করে। তিনি বলেন, ‘এই পুলিশ, যে পুলিশ লীগ ছাড়া আওয়ামী লীগ থাকবে না। আওয়ামী লীগ পুলিশ লীগ ছাড়া চলবে না। তখন আওয়ামী লীগ নতুন করে গঠন করে চলতে পারবে? অপেক্ষা করুন। অনেক দেখেছি। এই পুলিশ, র্যাব, যা বলেন, ওরা ক্ষমতাসীনদের পূজা করে আর কারা ক্ষমতায় আসছে তার সঙ্গে তলে তলে লাইন মারে।’
নিজেদের পরাজয়ের বিষয়ে মান্না বলেন, আমাদের অনেকে প্রশ্ন করে, এই ভোটে গিয়ে লাভ হলো? আমি বলি এই ভোটে গিয়ে লাভ হলো কেমন? ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে না গিয়ে ভালো, মন্দ করেছি সে বিতর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু মানুষকে সরকার বলতে পেরেছে ওরা তো ভোটেই আসেনি। আওয়ামী লীগ ভোট চুরি, ডাকাতি করল, অন্য দলের কোনো অধিকার রাখেনি। এবার আমরা বলতে পেরেছি, ডাকাত। সরাসরি ডাকাত। এই সরকার বৈধ না, পার্লামেন্টও বৈধ না। কোনো একজন মানুষ নেই দেশে যিনি দ্বিমত পোষণ করবেন। তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগের লোকেরাই বলেন তাদের নিজেদেরই মন খারাপ হয়ে গেছে। পরিচিত অনেকে বলেছে, নির্বাচন দেখে তাদের মন খারাপ।
আলোচনা সভায় আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, জনগণের ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই। সবচেয়ে ভীত সরকার। কারণ তার মধ্যে ভেজাল আছে। যার যত ভেজাল, তার তত ভয়। আমাদের এত ভীত হওয়ার কারণ নেই। তিনি বলেন, এরশাদ সরকারের সময় আমাকে বন্দুকের সামনে পড়তে হয়েছিল। বিএনপির আমলের আটটি সেলাই পড়েছে। এবার সরকার আমাকে নতুনভাবে আপ্যায়ন করেছে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, সেই সরকারই আমাকে শত্রু ভাবে। যখন কেউ ক্ষমতায় থাকে না, তখন বন্ধু ভাবে।
নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক সি আর আবরার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক রাশেদ আল মাহমুদ প্রমুখ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
উপন্যাস- নিশিন্দা নারী by আল মাহমুদ

নিশিন্দা জানে, গাইগরু অবলা জানোয়ার মাত্র। জবাব দেয়ার ক্ষমতা নেই। সে ভাবছিল ঘরের ভেতর থেকে আবদুল্লাহর তেল মাখানো বরাক বাঁশের লাঠিটা এনে গরুর পালকে এক্ষুনি মেরে মেরে তাড়াবে কি-না! কিন্তু নিশিন্দা জানে, স্বপ্নটা হল একটা দৈব ব্যাপার। স্বপ্নের মধ্যে কে কি করবে, আগে থেকে কেউ তা আন্দাজ করতে পারে না। যদিও ষাঁড়গুলোর মধ্য থেকে এর মাঝেই দুয়েকটা গোবর ছেড়ে তার নিকানো উঠোন নোংরা করছে। আর কারো মুতে ভিজে কাদা হয়ে যাচ্ছে উঠোনের মাটি। তবুও নিশিন্দা তার প্রশ্নের একটা জবাবই যেন আশা করে। সে ক্ষুধার্ত গাইগুলোর শিংয়ের কাছাকাছি চলে এল—‘এই জাবরকাটা মাগীর দল, আমার উঠোন নোংরা করবি না বলে দিচ্ছি। আর আমার ঐ তুলসীগাছের দিকে মুখ বাড়ালে পাটকাটার ছেনি দিয়ে জিব কেটে ফেলব।’
নিশিন্দা দত্তখোলার চামারের মেয়ে। আবদুল্লাহ মাঝির সাথে মুসলমানের মত ঘর বাঁধলেও বাপের বাড়ি অর্থাৎ ঋষিপাড়া থেকে একটি তুলসীগাছ এনে সযত্নে দাওয়ার সামনে মাটি উঁচু করে পুঁতে দিয়েছে। সকাল-সন্ধ্যেয় গাছের সামনে আগে বাতি জ্বেলে মাথা নোয়াতো। কিন্তু একদিন মাঝির ধমক খেল, ‘এই চামারণী, তুই না মুসলমান হয়েছিস? তুই না আমার বৌ? খবদ্দার গাছেরে পীর মানলে আমি তোরে দুই টুকরো করে কেটে তিতাসের মাখনা খেতে পুঁতে রাখব। মনে রাখিস, তোকে আমি আমার পীরের সামনে নিয়ে গিয়ে হুজুর কেবলাকে সাক্ষী রেখে শাদি করেছি। আর তুই মাগী এখনো গাছ-পাথরের তলে মাথা ঠেকাস? তওবা পড় হারামজাদি, নিজের ভালাই চাইলে আওয়াল কলেমা পড়ে ছতরে ফু দে।’
স্বপ্নের মধ্যে তুলসীগাছটা সবকিছু ছাড়িয়ে নিশিন্দার নজরে পড়ল। পনেরো দিন আগে হঠাৎ সন্ধ্যারাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানার পুলিশ নদী পেরিয়ে এসে বাড়ি তছনছ করে গেছে। তারা বাড়ি ঘেরাও করে ঘন ঘন হুইসেল বাজিয়ে দুয়ারে এসে লাথি মারতে লেগেছিল। নিশিন্দা নিঃশব্দে দুয়ার খুলে বাইরে এসে দাঁড়াতেই হাওয়ালদার তার ঠিক বুকের মাঝখানে টর্চের আলো রেখে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল—‘এই মাগী, আবদুল্লাহ কই?’
‘আগে ছতর থেকে বাতি নামান দারোগা সাব। আবদুল্লাহ কি আমার বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে না-কি? বাত্তি নামান।’
আপনা থেকেই যেন টর্চটা হঠাৎ নিভে গেল। হাওয়ালদার জানে আবদুল্লাহকে ডাকাতির মামলায় ফেলবার মত কোনো প্রমাণই এখন পর্যন্ত পুলিশের লোকের হাতে নেই। আর দত্তখোলা হল সাংঘাতিক ধরনের মানুষের গ্রাম। এরা করতে পারে না এমন কোন কাজ নেই। খলায় এখন যারা ইটের ভাটা বসিয়েছে তারা আবদুল্লাহকে তোয়াজ না করে পারে না। এ গাঁয়ের শ্রমিক ছাড়া আবদুল্লাহ শহর থেকে মাটি ও ইটকাটার কারিগর আনতে দেয় না। এসব কাজে দত্তখোলার মানুষেরাই বহুকাল ধরে ওস্তাদ। আবদুল্লাহর বক্তব্য হল, আমাদের বাপ-দাদারা চরের জমিজমাকে লাখেরাজ সম্পত্তির মত ব্যবহার করে ধান লাগিয়েছে। তাদের গরুবাছুরের ঘাসের জোগান দিয়েছে। এখন সরকার এসব খাসজমি ইটখোলার জন্য শহরের লোকদের কাছে ইটকাটার মওসুমে ইজারা দিতে চান, দিন। কিন্তু স্থানীয় গরিব চাষাভুষোদের পেটের জোগাড় ইটখোলার মালিকদেরই করে দিতে হবে। তারা শহর থেকে মজুর এনে ইট ও মাটি কাটাতে পারবে না। স্থানীয় রাখাল, চাষী, চামার, কামাররা যারা আগে ঐসব খাসের জমিতে বোরো ধান করতো ক্ষেতে তাদেরকেই কাজে লাগাতে হবে। নইলে কি দত্তখোলার মানুষেরা খলার ঘাস খেয়ে বাঁচবে? ঘাসের জমিও তো শহরের জোতদারদেরই দখলে। তারা সেখানেও তাদের গাইগরুর জন্য চারণভূমি ডেকে নিয়ে তাদের বিরাট বিরাট বাথান বানিয়েছে। তাহলে নদীর এপারের মানুষ কি তিতাসের শেওলা খাবে? আবদুল্লাহর প্রতিবাদে যেন গাঁয়ের চাষী ও নিরীহ চামারের দল নিজেদের ভাষা খুঁজে পেয়ে দেয়ালের মত শক্ত হয়ে দাঁড়াল। সবার মুখে এক কথা, আবদুল্লাহ মাঝি আমাগো মাতবর। আপনাদের কিছু বলার থাকলে তার সাথে বলুন।
ইটখোলার ইজারাদাররা জানে আবদুল্লাহর কথার বাইরে গিয়ে কোন কাজ হবে না। টাকা পয়সা দিয়ে তাকে ভজানোও সম্ভব নয়। কারণ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বামপন্থী দলগুলোর সাথে তার গোপন যোগাযোগ আছে। যদিও লোকটা মাত্র ক্লাস সেভেন পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া এম-ই স্কুলে পড়াশোনা করেছে। তবুও গুপ্ত রাজনৈতিক কর্মীদের সাথে মেলামেশার ফলে তার কথাবার্তার মধ্যে এক ধরনের বুদ্ধির দীপ্তি ইজারাদার ও থানার লোকেরা বুঝতে পারে।
আবদুল্লাহ কোনদিন তার পারিবারিক বৃত্তি অর্থাৎ মাঝিগিরি করেছে—এমন দেখা যায়নি। এক সময় তার বাপ সফরুল্লাহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছবাজার ঘাট থেকে দত্তখোলা পর্যন্ত পারানীর কাজ করত। সবাই পারাপারের মাঝিকে চিনতো। লোকটার ব্যবহার অমায়িকই ছিল। ঘাট পারাপারের মাঝিরা যেমন সচরাচর বদমেজাজী থাকে—সফর মাঝি তেমন মানুষ ছিল না। অনেকে ঘাটে নেমে পয়সা দিতে না পারলে সফর মাঝির কাছে একটু এগিয়ে চাচা বলে সম্বোধন করলেই হত। সফর মাঝি আর তার দিকে পয়সার জন্য হাত বাড়াত না।
স্বপ্নের মধ্যেই নিশিন্দা ক্ষুদার্ত পালটাকে আরেকটা ধমক লাগালো, ‘এ্যাই গরুর দল, তোদের শিংয়ে রক্ত লেগে আছে কেন? কাদের গুঁতিয়েছিস?’
এই প্রশ্নে গাইগরুগুলো পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এক অদ্ভুত কাণ্ড করে বসল। সামনের গাইটা, যেটা নিশিন্দার প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়ানো। সে প্রথম জিব বের করে নাকটা মুছল, তারপর হঠাৎ তার গলার ভেতর থেকে একটা হাম্বা রব মেশানো মানুষের কথার মত কথা বেরিয়ে আসতে লাগল, ‘আমরা খলার সবগুলো রাখালকেই শিংয়ের গুঁতোয় শেষ করে এসেছি। আমরা আবদুল্লার দলে নাম লেখাব।’
গাইটা মানুষের মতো কথা বলছে দেখে নিশিন্দা ভয় পেয়ে গেল। এসব কি বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড, জানোয়ারগুলো মানুষের মতো কথা বলবে কেন? অথচ একটু আগে নিশিন্দা জানোয়ারগুলো অবলা জেনেও নিজেই এগুলোকে ধমক দিয়ে নানা প্রশ্ন করছিল। তখন ভাবেনি। সামনের গাইটা হাম্বা ডাক দিয়েই মানুষের মত বলতে শুরু করবে যে এরাই খলার রাখালদের সিংয়ের গুঁতোয় সাবাড় করে এসেছে।
ভয়ের চোটেই যেন নিশিন্দার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ‘আবদুল্লাহ এখানে কোথায়? এই উপোসী জানোয়ারের দল, জানিস না পুলিশের ভয়ে আবদুল্লাহ গায়েব হয়ে গেছে? পনেরো দিন মানুষটার কোন খোঁজ নেই। পুলিশও আর আসে না। কে জানে ধরা পড়ল কি-না? বল, এই পনেরো দিন আমি কি খেয়ে বাঁচি? গত দু’দিন ধরে আমি মরা নদীটার শাপলা পাতা সেদ্ধ করে খাচ্ছি। এখন এপারে আর শাপলা পাতাও নেই। তোরা নিজেরাই সব জিব বাড়িয়ে তোদের জাবরে ঢুকিয়েছিস। এখন আবদুল্লাহ হারামজাদাকে আমি কোথায় পাই?’ নিশিন্দা একটু থেমে পালটার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করল, ‘ইস ইনারা ডাকাতি করতে বেরিয়েছেন! আবদুল্লার দলে নাম লেখাবেন। যা ভাগ সব। আমার উঠোন নোংরা করবি না। খুনির দল কোথাকার।’
নিশিন্দা গরুগুলোর ওপর বিরক্ত হয়ে দাওয়ায় উঠে দাঁড়াতে গেলে সামনের গাইটা তার আঁচল কামড়ে থামিয়ে দিল, ‘আমরা আর বাথানে ফিরবো না।’
আঁচলে টান পড়ায় নিশিন্দা ফিরে দাঁড়াল। তার বুক উদোম হয়ে উদ্যত স্তন দু’টি বেরিয়ে পড়েছে। গরুগুলো অবাক হয়ে যেন নিশিন্দার চাঁদের মতো গোল দু’টি স্তন দেখছে। দু’সপ্তাহ আগে থানার বড় পুলিশটা টর্চ জ্বেলে যে রকম অবাক হয়ে তাকিয়েছিল, গাইগরুগুলোর অবস্থাও তেমনি। যেন এই মুহূর্তে জিব বের করে চাটতে শুরু করবে।
‘বাথানে না গেলে জাহান্নামে যা। আমি কি করব? আমি তোদের ঘাস-পানি এনে দেব কোত্থেকে? রাখালদের গুঁতিয়ে মেরেছিস, এখন নদী সাঁতরে সোজা চলে যা শহরে। গিয়ে লুট করে খেয়ে ফ্যাল চালের বাজার, মাছের আড়ত আর মুগ-মসুর যা পাস। আমার কাছে কী আছে? আমি কি খলায় সবুজ ঘাস গজিয়ে দিতে পারব?’
নিশিন্দার কথায় সামনের গাইটা আবার জিব বের করে নাকের গর্ত দু’টি চাটল। এখন গাভীটার গলার স্বর আরও স্পষ্ট, ‘আমরা যাব। তুমি আমাদের শহরে নিয়ে যাবে। তুমি আবদুল্লাহর বৌ, আমাদের নেত্রী। আমরা তার দলে থাকব। আর নদী পেরিয়ে সব কিছু চেটেপুটে খেয়ে নেব। তুমি আবদুল্লাহর রামদাটা নিয়ে আমাদের আগে আগে চল এক্ষুনি!’
‘এ্যাই হারামজাদী, আমাকে ধমক দিচ্ছিস?’
‘আমরা ক্ষুধার্ত।’
‘আমি না গেলে কি করবি?’
‘আমরা সবাই মিলে শিংয়ের গুঁতোয় তোমাকে থেঁতলে মারবো। তুমি আবদুল্লাহর বৌ কেন? আবদুল্লাহ আমাদের সর্দার। শহরে নিয়ে চলো আমাদের। আমরা সবাইকে শিংয়ে বিঁধে ফালা ফালা করে রক্ত চাটব।’
গাইগুলোর উদ্যত শিংয়ে মানুষের রক্ত শুকিয়ে আছে। একটু আগেও তাজা রক্ত দেখেছে নিশিন্দা। এখন শুকিয়ে জমাট কালো আস্তরণের মত চিকচিক করছে ভয় পেলো নিশিন্দা। এখন শুকিয়ে জমাট কালো আস্তরণের মত চিকচিক করছে। ভয় পেলো নিশিন্দা। বাঁচতে হলে এই মুহূর্তে দুয়ার বন্ধ করে শক্ত হাতে খিল এঁটে দিতে হবে। ক্ষুধার্ত পালটা আবদুল্লাহর রামদাঁর খবর পর্যন্ত রাখে। নিশ্চয়ই আবদুল্লাহর গোপন অস্ত্রের ভাণ্ডার যা নদীর পাড়ে একটা পরিত্যক্ত উল্টে রাখা নায়ের ভিতর ইট বিছিয়ে লুকিয়ে রাখা হয়েছে—যা নিশিন্দা ছাড়া খলার আর কেউ জানে না, গরুর পালটা সে খবরও নিশ্চয়ই রাখে। খুব ভয় পেয়ে গেল নিশিন্দা। শত চেষ্টা করেও যেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থানার লোকেরা খুঁজে বের করতে পারেনি, এই জানোয়ারগুলো সে খবরও জানে নাকি? না জানলে আবদুল্লাহর রামদাটার কথা তুললো কোত্থেকে? নিশিন্দার উদোম নাভির গর্তে একটা অজানা ভয়ের শিরশিরানি লাগল। সে এক দৌড়ে দাওয়া থেকে ঘরের ভেতর ঢুকেই খিল এঁটে দিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল—‘ও আল্লাহ্ ও ভগবান—এই বেশামাল পশুদের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও।’
কে শোনে কার কথা। একপাল ক্ষুধার্ত গাইগরু মুহূর্তের মধ্যে হাম্বা রব তুলে যেন দশটা হাতির জোর নিয়ে নিশিন্দার দুয়ারে ঝাঁপিয়ে পড়ে খিল ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল। কোথায় পালাবে নিশিন্দা এখন? নিশিন্দা দেখল, অসংখ্য বাঁকা শিংয়ের চুড়োয় মানুষের রক্ত শুকিয়ে আছে আর শিংগুলো ছুরির ফলার মতো এলোমেলোভাবে নেমে আসছে তার দু’দিনের উপোসে শুকিয়ে থাকা নাভির ওপর।
‘আব্দুল্লাহ বাঁচাও।’
বলে একটা আর্তচিৎকার করে নিশিন্দা বিছানায় ছিটকে উঠে বসেই বুঝতে পারল সে এতক্ষণ একটা উদ্ভট স্বপ্ন দেখছিল। ছতরে কাপড় নেই। সারা গা ঘামে ভেজা। উরতের ফাঁক দিয়ে বইছে জোয়ারের সময়কার তিতাসের স্রোতের মতো ঝিরঝিরে ঘামের নদী। নিশিন্দা শরীর থেকে শাড়িটা আলগা করে এনে মুখ, বুক ও পিঠ মুছলো। হাত বাড়িয়ে জানালা খুলতেই চোখে পড়ল আকাশে পূর্ণিমার গোল চাঁদ। জ্যোছনা ঠাণ্ডা রোদের মত বিছিয়ে আছে খলার সীমাহীন চারণভূমিতে। যদিও এই চারণভূমি গত দু’মাস যাবৎ খরায় জ্বলে হলুদ প্রান্তরের মত ধু-ধু করছে তবুও এই রাতের জ্যোছনার মায়ায় মাঠটাকে যেন ভেজা মনে হচ্ছে। নিশিন্দা শাড়িটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিছানায় দাঁড়িয়েই আড়মোড়া ভাঙলো। আড়মোড়া ভেঙে হাই তোলার এক ফাঁকে তার হাত এসে পড়ল তার নিজেরই তলপেটে। হঠাৎ যেন খিদেটা আবার মোচড় দিয়ে তাকে জানিয়ে দিল অদ্ভুত স্বপ্নের তাড়নার মধ্যেও খিদের জ্বালা তাকে ছেড়ে যায়নি।
নিশিন্দা আন্দাজ করতে পারল এখন রাত তিনটের কম হবে না। সে শরীরে শাড়িটা না জড়িয়েই দুয়ার মেলে বাইরে এসে দাঁড়াল। জ্যোছনায় ভাসছে উঠোন। বাড়ির সীমানার চালতে গাছ থেকে ডাকছে একটা জ্যোছনাভোলা কাক। কাকের আর দোষ কি? এমন দিনের মত দিলখোলা চাঁদনীতে কাকের তো ভুল হওয়ার কথাই। নিশিন্দার মনে হচ্ছে পৃথিবীটা হয়ে উঠেছে সকালবেলার আকাশের মত।
জ্যোছনা ধোয়া উঠোনের মাঝখানে নিশিন্দা কতক্ষণ। চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ক্ষুধার্ত তলপেটের ওপর হাত বোলালো। নাভির গর্তে তর্জনি ঢুকিয়ে নখ দিয়ে ভেতরকার ময়লা তুলে শুঁকলো। ঘামের টক গন্ধে খিদেটা বুঝি তার দ্বিগুণ চাড়া দিয়ে উঠেছে। হঠাৎ আবার স্বপ্নের হিংস্র গাইগরুগুলোর কথা তার মনে পড়তেই মনে হল, আসলে ঐ নিরীহ গাইগরুগুলো তো খলার বাথানগুলোতেই এখন হয়ত জাবরকেটে চলেছে। একটু পরেই গাইগুলোকে খলার রাখালরা দুইতে শুরু করবে। সকালে নদী পারাপার শুরু হলে দুধ নিয়ে চলে যাবে বাজারে। এর আগেই একটা গাইকে দুইয়ে দুধ নিয়ে এলে কেমন হয়? কথাটা মনে হতেই নিশিন্দার খিদেটা কেমন যেন চনমন করে উঠল। গরুগুলোই তো নিশিন্দাকে ডাকাতির পরামর্শ দিয়েছিল। হায় আল্লাহ! কেন নিশিন্দা গত কয়েক দিন দুধের কথা ভাবেনি? তবে কি ভগবান তার জন্য একটু আগে গাইগরুগুলোকে ডাকাত সাজিয়ে ঘুমের মধ্যে তার সাহস যুগিয়ে গেলেন?
নিশিন্দা দৌড়ে গিয়ে ঘরের ভেতর থেকে শাড়িটা তুলে এনে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক লহমায় পেঁচিয়ে কোমর ও বুক ঢেকে আঁচল মাথার ওপর তুলে দিয়ে দাওয়ায় উঠে শিকল বাঁধল। এখন তার চোখের সামনে খলার বাথানের গাভীগুলোর ওলান যেন মোটা বাট সমেত ফলের মত ঝুলছে। নিশিন্দার পেট মোচর দিতে দিতে যেন তার ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। সে দ্রুত পায়ে চারণভূমির জ্যোছনা ধোয়া শুকনো ঘাসের ওপর দাঁড়াতেই তার মনে পড়ল, আসলে সে যা করতে যাচ্ছে তা মোটেই সোজা কাজ নয়। যদি বাথানের রাখালের কারো হাতে ধরা পড়ে যায় তাহলে সহজে ছাড়া পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। দল বেঁধে ঐ পশুর দল তার শরীরের ওপর মজা লুটবে। আর গাইয়ের মতো মুখ বেঁধে ফেলে রাখবে বাথানের শুকনো খড়ের ভেতর। তারপর হয়ত চুরির অপরাধে তুলে দেবে থানার মানুষদের হাতে। একথা মনে হতেই নিশিন্দার ভেতরটা কেমন ঠাণ্ডা মেরে গেল। ঐ বাথানগুলোর রাখালেরা নদীর এপারের লোক নয়। তারা শহরের জোতদারদের নিজস্ব লোক। হারামজাদারা আবদুল্লার মাতব্বরি মানে না। চারণভূমি হলুদ হয়ে গেলেও ওরা পশুগুলোকে এখনো বাথানেই রেখেছে। ঘাস না থাকলেও শহর থেকে পানি আর খইল-ভুসি এনে গরুগুলোকে তাজা রাখার চেষ্টা করছে। সবাই জানে, একটু বৃষ্টি হলেই খলায় দিগন্তবিস্তৃত চারণভূমি এক রাতেই সবুজ হয়ে উঠবে। বাথানের রাখালরা আবদুল্লাহকে ভয় পায়। কারণ লোকটার মর্জি মেজাজের কোনো ঠিক নেই। ইটখোলার মালিকদের জিদ শেষ পর্যন্ত আবদুল্লাহর মাঝির কথার ওপর টক্কর খেয়ে এখন ভেঙে পড়েছে। তারা আবদুল্লাহর কথামতই দত্তখোলার মানুষদের ইট ও মাটি কাটার কাজে লাগতে বাধ্য হয়েছে। মঞ্জুরির ব্যাপারেও আবদুল্লাহর ফয়সালাই মেনে নিয়েছে ইটখোলার মালিক পক্ষ। বাকি আছে বাথানের মালিকরা। যদিও আবদুল্লাহ বাথানের দুধের ব্যাপারে এখনও কোনো কথা বলেনি বা রাখালদের বাথান ছেড়ে যেতেও ধমক লাগায়নি তবুও মালিকরা ভয়ে দিশেহারা। নিশিন্দা শুনেছে, অচিরেই আবদুল্লাহর সাথে জোতদারদের বাঁধবে। কারণ আবদুল্লাহ বাথানের দুধ পাইকারী দামে দত্তখোলার মানুষের কাছে বিক্রির প্রস্তাব না-কি এর মধ্যেই মালিকদের দিয়েছে। এর ফলেই এখন শহরের আশেপাশের জোতজমির মালিকদের মাথা গরম হয়ে আছে। তারাই পনেরো দিন আগে কোথায় কোন দোকানে ডাকাতির মামলায় আবদুল্লাহকেও জড়িয়ে দিয়েছে। আর আবদুল্লাহ পনেরো দিন ধরে ফেরার।
চারণভূমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিশিন্দা বাথানগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে একবার তিতাসের উঁচু পাড়ের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজল। হ্যাঁ, অই তো উল্টানো নাওটাও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নিশিন্দা নাওটার দিকে হাটা শুরু করল।
নাওয়ের কাছে গিয়ে নিশিন্দা একবার চারদিকটা দেখার জন্য মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল। না, কেউ তাকে লক্ষ্য করছে না। শুধু দক্ষিণ দিকে ইটের ভাটার বিশাল বিশাল চিমনি থেকে ধুঁয়োর কুণ্ডলী আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। নিশিন্দা উবু হয়ে নৌকার ভেতর ঢুকে গেল। ভেতরটায় আবদুল্লাহ যত্ন করে ইট বিছিয়ে মাটি ঢেকে রেখেছে। নিশিন্দা জানে, এর ভেতরেই আছে আবদুল্লাহর পার্টির জোগাড় করা অস্ত্রের আড়ত। নিশিন্দা এক পাশের কয়েকটা ইট সরাতেই বেরিয়ে পড়ল রামদাটা। পাশেই পড়ে আছে কাটা রাইফেল, পিস্তল আর বুলেটের বাক্স। নিশিন্দা শুধু চকচকে রামদা’টাই তুলে এনে পাশে রাখল। তারপর আগের মতই সমান করে ইট বিছিয়ে দিয়ে রামদা’টা তুলে নিয়ে জ্যোছনার ঠাণ্ডা রোদে চারণভূমিতে বেরিয়ে এল।
এ সময় হঠাৎ চাঁদটাও যেন সুযোগ বুজে একখণ্ড শাদা মেঘের ভিতরে গিয়ে মুখ ঢেকে ফেলায় চারণভূমিটাও সহসা ঘোলাটে মেঘের মত আবছা অন্ধকারে ছেয়ে গেল। নিশিন্দা রামদা হাতে দ্রুত ছুটতে ছুটতে আধো অন্ধকারের মধ্যেই বাথানের প্রথম খোয়াড়ের গেটে এসে থমকে দাঁড়াল। গেটটা গরুর দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। নিশিন্দা দড়িতে হাত দিয়েই বুঝল, বাঁধনটা ভেতরের দিকে হওয়ায় হাত ঢুকিয়ে খোলা মুশকিল। তাছাড়া ভেতরে মোটা তারের বন্ধনীতে তালা থাকাও বিচিত্র নয়। ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়তে লাগল নিশিন্দার। সে জানে গাইগরুর খোয়াড়ে ঢোকার আগে তাকে অন্তত একটা রাখালের মাচানের নিচ দিয়ে যেতে হবে। রাখালদের কেউ পাকড়াও করতে এলে রামদা’র কোপ না বসিয়ে পালাবার উপায় নেই।
নিশিন্দা একবার ভাবল, এ কাজ অর্থাৎ বাথানের গাই দুইয়ে দুধ চুরি করে পালানো তার কাজ নয়। কিন্তু তখনই খিদেটা চনমন করে উঠল। আর চাঁদটাও বেরিয়ে এল মেঘের ভেতর থেকে, দৈব দূরত্বে ভেসে নিশিন্দাকে সাহস যোগানোর জন্য। রামদাটা মোটা দড়ির বাঁধনের এ পাশটায় যেন আপনা থেকেই নেমে এল। খুব সাবধানে ঘষে ঘষে দড়িটা আলগা করে গেটটা যথাসম্ভব ফাঁক করে ভেতরে শরীর ঢুকিয়ে দিন নিশিন্দা। চাঁদের আলোয় দেখল, দুধের খালি মাটির ভাণ্ডগুলো সার করে বাঁশের দরজার পাশে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। নিশিন্দা নিঃশব্দে একটা ভাণ্ড তুলে নিয়ে বাঁশের দুয়ার ঠেলে রাখালদের মাচানের তলায় ঢুকে কতক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। বেচারাদের নাকের শব্দে খোয়াড়টা গম গম করছে। নিশিন্দা যথাসম্ভব নিঃশ্বাস চেপে আছে।
নিশিন্দা খোয়াড়ের ভেতরকার গোয়ালের বাঁধা গাইগরুগুলোর জাবরকাটার শব্দ শুনতে পাচ্ছে। শব্দটা এমন যেন, গরুগুলো পানি চিবুচ্ছে। একটু একটু করে মাচানের তলা থেকে মাথা বের করে উঁচু হয়ে সে গোয়ালটা খুঁজল। সামনেই গাইগরুগুলো বাঁধা। এর মধ্যে দুয়েকটা শুয়ে থেকে আরামে জাবর কেটে চলেছে।
নিশিন্দার আর দেরি সইল না। সে গুড়ি মেরে এক হাতে দার আর অন্য হাতে মাটির খালি ভাণ্ডসহ গাইগরুদের ভেতরে ঢুকে পড়তেই একটা গাই অনধিকার প্রবেশের বিষয়টি যেন টের পেয়েই একটা হাম্বা ডাক দিয়ে ভয়ে থেমে গেল। এটুকু শব্দেই মাচানের ওপর নাকের শব্দটাও হঠাৎ থেমে গেল। কিন্তু কেউ উঠল না বা নেমে আসছে না বুঝে নিশিন্দা রামদায়ের গোড়ায় হাতের মুঠো একটু শিথিল করে শেষে দা’টাকে আধো অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে একটা শূন্য গামলার পাশে যেখানে একটা দুধাল গাই শুয়ে শুয়ে জাবর কাটছে, তার গুটানো পায়ের কাছে ইট বাঁধানো মেঝের ওপর রাখল। নিশিন্দার নড়াচড়া ও হাতড়ে হাতড়ে গাইটার ওলান স্পর্শ করা মাত্রই প্রাণীটা ভয় পেয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। এ সুযোগটাই খুঁজছিল নিশিন্দা। ছোটো বয়েস থেকেই নিশিন্দা তার বাপের গাইগরু চড়িয়ে, দুইয়ে অভ্যস্ত। গাইটার ওলানে হাত দিয়েই বুঝেছে, দুধে টইটুম্বুর। আর ঘণ্টাখানেক পরেই রাখালেরা গাই দুইবার জন্য জেগে উঠবে। এর আগেই নিশিন্দাকে দুধ যতটা দুইয়ে নেয়া যায়—নিয়ে পালাতে হবে। ধরা পড়ার কথা মনে হতেই নিশিন্দার বুক দু’টি টিপ টিপ করে কাঁপল। সে সোজা উঠে দাঁড়িয়ে গাইটাকে তার আগমনে অভ্যস্ত করার জন্য পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। আগন্তুকের আদর পেয়ে গাইটা বেশ শান্ত হয়েই জাবরকেটে চলেছে। মনে হল প্রাণীটার বিস্মিত ভাব একটু স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই নিশিন্দা একবার গাইটার নিচে হাত দিয়ে ওলান স্পর্শ করল। বেশ উষ্ণ আর নরম। মনে হচ্ছে টানলেই ফিনকি দিয়ে দুধের সূক্ষ্ম স্রোত নেমে আসবে।
নিশিন্দা গাই দুইবার কায়দার অন্ধকারের মধ্যেই গাইটার নিচে উরত ফাঁক করে দুধের শূন্য ভাণ্ডাটা দুই হাঁটুতে চেপে আস্তে করে বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে গাভীর পেছনের বাট দুটো ধরে আস্তে টানতেই দুধ নেমে এল ফিনকি দিয়ে। মাটির পাত্র হলেও দুধের শব্দ উঠছে দেখে নিশিন্দা ধীরে বাটগুলো টেনে চলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশিন্দা বুঝল পাত্রটা অর্ধেক ভরে উঠছে। সে এখন ওলানের ওপর হাতের কয়েকটা ঠোনা মেরে দুধের স্রোত বাড়াতে চাইল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অদৃশ্য একটা হাত এসে সোজা তার উন্মুক্ত স্তন দু’টিকে স্পর্শ করে যেন স্তম্ভিত হয়ে বুকের মাঝখানে এসে থেমে গেল।
‘কে তুই হারামজাদী, অত্যবড় সাহস, আমার গাই দুইয়ে দুধ লুটে নিতে আমার বাথানে ঢুকেছিস?’
নিশিন্দার হাত দ্রুত গাইয়ের ওলান থেকে নিচে নেমে এসে মেঝেয় রাখা রামদায়ের বাটের উপর পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে দাটা এসে অদৃশ্য ব্যক্তির তলপেটে স্পর্শ করল।
‘আমার বুকের ওপর থেকে হাত সরা রাখালের বাচ্চা। আর আগে বাড়লে এক পোচে দু’টুকরো করে ফেলব।’
হাতটা বুকের উপর থেকে সরে গেল।
নিশিন্দা দুধের পাত্রটা উরতের ফাঁক থেকে সরিয়ে মেঝের ওপর নামিয়ে রাখল, ‘আমাকে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে দে।’
এখন সে প্রায় অদৃশ্য ছায়ার মত আবছা রাখালটার মুখোমুখি, ‘দু’দিন ধরে উপোস। নিরুপায় হয়ে তোর গাই দুইয়ে নিলাম। একটু দুধের জন্য আর তোর মালিকের ক্ষতি হবে না। আমাকে যেতে দে, পথ ছাড়।’
অদৃশ্য ছায়াটা কিন্তু পথ ছাড়ল না।
‘এমনিতেই আমি তোকে দুইতে দিতাম। তোর বুক দু’টি খুব নরম।’
‘পথ ছাড় হারামজাদা। নইলে রামদা’র এক কোপে তোর লালা ঝরানো থামিয়ে দেব।’
‘কে তুই?’
‘তোর ঠাকুমা।’
‘দত্তখোলা থেকে এসেছিস? কার বেটি ঠিকানা দে, প্রতি রাতে দুধ পাবি।’
‘আরে আমার পিরিতের বন্ধুরে, উনি আমারে দুধে ভাসাবেন। পথ ছাড়বি কি-না? না রামদা’র কোপ খাবি?’
বেশ জোরে চেঁচিয়ে উঠল নিশিন্দা। সামনের ছায়া মূর্তিটাকে মনে হয় যেন নিঃশব্দে হাসল।
‘জোরে চেঁচাবি না। এখন রাখালরা জাগবে। গাই দুইবার প্রহর হয়েছে। তখন রাম দা’ দেখিয়েও পার পাবি না। আমি আজ তোকে আটকাবো না। তোর মাই দুটো আমার সব রাগ কেড়ে নিয়েছে। ও-দুটো ছুঁতে বড় ভালো লেগেছে। আর একদিন ও দুটো ছোঁয়ার আশায় তোকে আজ ছেড়ে দিচ্ছি। যা দুধ নিয়ে পালিয়ে যা।’
ছায়ামূর্তিটা নিশিন্দার সামনে থেকে সরে যেতেই সে দুধের ভাণ্ড ও রাম দা’ তুলে বাথান থেকে বেরিয়ে এল। চাঁদ মেঘের আড়ালে আবার বোধহয় লুকিয়ে পড়েছে। চারণভূমিটা এখন অসংখ্য জোনাক পোকায় ভরে গেছে। নিশিন্দা আন্দাজে দত্তখোলা গাঁ থেকে একটু নদী ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তার ঢেউটিনের ঘরটা লক্ষ্য করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল।
------২------
সকালে ঘুম থেকে জেগেই নিশিন্দা নদীর ঘাটের দিকে একটা কলরব শুনে বিছানায় লাফিয়ে উঠে বসল। দা’টা এখনও তার বিছানার পাশেই চক চক করছে। রাতটাও কেটেছে নিঃস্বপ্ন। দুইয়ে আনা দুধ রাতেই জ্বাল দিয়ে সে সেরখানেক খেয়ে নিয়েছিল। দু’দিনের না খাওয়া পেটে উপচানো গরম দুধ ঢুকে যেতেই নিশিন্দার শরীর ভেঙে ঘুম নেমে আসায় সে রামদা’টা বিছানায় রেখেই শুয়ে পড়েছিল। এখন ঘাটপাড়ের কোলাহলে জেগে উঠেই তার মনে হল অস্ত্রটা এক্ষুনি লুকানো দরকার।
এর মধ্যে নদীর দিকের কোলাহল বাড়ছে। নিশিন্দার মনে হল নিশ্চয়ই পুলিশের লোক আবার এসেছে। আবদুল্লাহকে পাকড়াও করতে শহরের জোতদাররা আর ইটখোলার মালিকেরা নতুন কি চাল চেলেছে কে জানে? আর আবদুল্লাও কেমন, আজ পনেরো দিন পার হয়ে ষোল দিন হল একবারও নিশিন্দা কি খেয়ে বেঁচে আছে খোঁজ নিচ্ছে না। এমন তো কোনদিন হয়নি? এর আগেও আবদুল্লাহ পুলিশের ভয়ে কতবার উধাও হয়েছে। কিন্তু কোন না কোনভাবে নিশিন্দার খোঁজ নিয়েছে। এবার কি হল?
নিশিন্দা বিছানায় দাঁড়িয়ে শাড়ি ঠিক করতে করতে শুনলো দত্তখোলার দিক থেকে দলে দলে মানুষ ঘাটপাড়ের দিকে ছুটে যাওয়ার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আসলে সেখানে হয়েছেটা কি? গরু মরেছে নাকি যে চামার পাড়ার মরদ মাগীরা ঊর্ধ্বশ্বাসে মরা গরুর চামড়া ধরার জন্য ছুট লাগাচ্ছে?
নিশিন্দা শাড়ি আঁট করে পরেই দা’টা নিয়ে ভাবল। দা’টা এখন সে কোথায় লুকাবে? উল্টানো নৌকার দিকে অস্ত্র নিয়ে রওয়ানা হলে সবাই তাকে দেখবে। আর ঘাটে পুলিশ এসে থাকলে তারা এক্ষুনি এসে পড়বে এখানে। আর এসেই দা’টা তার হাতে দেখলে আবদুল্লাহকে ডাকাতির মামলায় আটকাবার সুবিধা পাবে। হয়ত হাতেনাতে ধরা পড়লে নিশিন্দাকেও থানায় টেনে নিয়ে বেইজ্জত করার একটা মওকা পাবে। ওরা যে কোনভাবে আবদুল্লাহকে হাতের মুঠোয় চেপে ধরার ফুরসত খুঁজছে।
দা’টা নিয়ে এক দৌড়ে নিশিন্দা বাড়ির বেড়ার কাছের ছাইয়ের গাদার দিকে চলে গেল। এই একটা জায়গা যেখানে দা’টা গুজে রাখলে পুলিশের সাধ্য নেই খুঁজে পায়। নিশিন্দা সোজাসুজি বিশাল ধারালো অস্ত্রটির সেগুন কাঠের বাটসহ ছাইয়ের গাদার ভেতর ঢুকিয়ে দিল। আর তখনই কে যেন বাড়ির উঠোনে এসে ঢুকেছে বলে মনে হওয়ায় নিশিন্দা তাড়াতাড়ি কুয়োর পাড়ে বালতি নামাচ্ছিল এমন একটা ভাব করে বালতির দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে উঠোনের দিকে মুখ করে ফিরতেই পুলিশের একটা লোক এসে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘এই আয়, দারোগা সাহেব উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে।’
নিশিন্দা এ সময় চোখে কোন ভাবান্তর দেখালো না। সে বালতিটা কুয়োর ভেতর ফেরে আবার স্বাভাবিকভাবেই টেনে তুলে পায়ের কাছে নামিয়ে আজলাভরা পানি নিয়ে কুলি করল। তারপর পানি ছিটালো মুখে। উবুড় হওয়াতে নিশিন্দার বুক দুটি ফলের মতো নিচের দিকে ঝুলে আছে। তার পিঠও উদোম। পুলিশটা হাভাতের মতো নিশিন্দার যৌবন দেখছে। নিশিন্দার গায়ের রং একটু ময়লা হলেও সে বিশ-বাইশ বছরের যুবতী। সবল নগ্ন বাহুমুল লালচে কেশে ভরা। গলায় ভাদুগড়ের বান্নি থেকে কেনা নতুন কাইতনে বাঁধা একটা মাদুলি। বাচ্চা হওয়ার জন্য আবদুল্লাহ তার পীর হুজুরের কাছ থেকে এনে গলায় বেঁধে দিয়েছে। নিশিন্দা উবুড় হয়ে থাকায় তার লম্বা গর্দান ও ভরাট নিতম্বের দিকে হাঁ করে দেখছে পুলিশটা।
‘এই মাগী, আমার কথা তোর কানে যায়নি? বললাম যে দারোগা সাব উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে? ভাতারকে খুন করে নদীতে ফেলে রেখে এখানে ঢং করছিস? পাছায় লাগাব লাথি একটা?’
চমকে গেল নিশিন্দা। লোকটা কি বলতে চাইছে? ভাতারকে খুন মানে কি?
এ সময় নদীপাড়ের কোলাহলটা হঠাৎ যেন তার নিজের উঠোনে এসে হট্টগোল বাঁধিয়েছে বলে মনে হল।
‘কি বললেন আপনি?’
‘ঢং করবি না মাগী। ভান করে খুনের মামলা থেকে পার পাবি না। তোর ভাতারের লাশ ষাটপাড়ের সামনে কলমি দামের পাশে ভেসে আছে। আমরা লাশ তুলে এখনই থানায় নিয়ে যাব। তারপর সুরতহাল। এখন গায়ে হাত দেবার আগে উঠোনে আয়। দারোগা সাহেব তোকে দেখবেন। এমন জোয়ান স্বামীটারে গুলীতে মারলি? আর কারা ছিল তোর সাথে আমরা সব বের করব।’
নিশিন্দা বুঝল যে তার সর্বনাশ হয়ে গেছে। সে আর পুলিশটার দিকে চোখ তুলে না তাকিয়ে কুয়োর পার থেকে বাড়ির পেছনটা পেরিয়ে উঠোনে দারোগার সামনে এসে দাঁড়াল, ‘কি হয়েছে আবদুল্লাহর? আপনার লোকটা গিয়ে কি কথা বলছে দারোগা সাব?’
আরও তিনজন পুলিশ নিয়ে দারোগা রমিজউদ্দিন উঠোনে দাঁড়িয়ে। তার পেছনে সারা দত্তখোলার লোক জমা হয়েছে। সবার চোখে মুখে আতঙ্ক। কয়েকদিন আগে আবদুল্লাকে ধরতে পুলিশ এ বাড়িতে হানা দিয়েছিল। রাতে একজন হাওয়ালদার এসে নিশিন্দাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে গেছে। দারোগা রমিজউদ্দিনের এসব অজানা থাকার কথা না। রমিজ মধ্য বয়ষ্ক অফিসার। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করার অভিজ্ঞতায় তার দাড়িতে পাক ধরেছে। সে সহসা নিহত ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে কোন অশালীন আচরণ করতে পারল না। সে স্থির দৃষ্টিতে নিশিন্দাকে দেখল। ততক্ষণে একটি সেপাই ঘরের দাওয়া থেকে একটা টুল তুলে এনে দারোগাকে উঠোনের মাঝখানে বসতে দিয়েছে। রমিজউদ্দিন কতক্ষণ নিশিন্দার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে চোখ মাটির দিকে ফিরিয়ে এনে অনুত্তেজিত গলায় নিশিন্দাকে প্রশ্ন করল, ‘তুই আবদুল্লার বৌ?’
নিশিন্দা বলল, ‘আমার স্বামীর কি হয়েছে সেটা আগে বলুন। আবদুল্লাহ কোথায়?’
‘নিজের ভালো চাস তো মাগী আগে আমার কথার জবাব দিয়ে যা। আগে বল আবদুল্লার সাথে তোর কতদিন হল বিয়ে হয়েছে?’
এবার রমিজ দারোগার গলা থেকে পুলিশের স্বভাবসুলভ কর্কষতা ছিটকে পড়ল। নিশিন্দা অনেকটা দিশেহারার মতো এদিক ওদিক তাকিয়ে এক ধরনের নিরুপায় গলায় জবাব দিল ‘এক বছর আগে। আমার শ্বশুর বেঁচে থাকতে।’
‘তুইতো চামারের মেয়ে।’
‘আমরা জাতে ঋষি।’
‘আবদুল্লার সাথে তোর পিরিতি হলো কি করে? মুসলমান মাঝির ছেলে তোকে কাবিন করে বিয়ে করেছিল?’
‘পীরের সামনে আমার বিয়ে হয়েছিল। সুহিলপুরের জেলেরা আর দত্তখোলার ঋষিরা সাক্ষী।’
‘অর্থাৎ বিয়েটিয়ে একটা বাজে কথা। তুই ডাকাত আবদুল্লার সাথে থাকতি। থানায় রেকর্ডে আছে তোর বাপ কার্তিক ঋষিও ডাকাতি করতে গিয়ে মেঘনায় পুলিশের গুলী খেয়ে মরেছিল। ঠিক কি-না?’
নিশিন্দা এ কথার জবাব দিল না।
‘আমার কথার ঠিক ঠিক জবাব দে। এটা খুনের মামলা।’
‘কে কাকে খুন করেছে, কে খুন হয়েছে তা না জেনে আমি আর একটি কথারও জবাব দেব না।’
এবার নিশিন্দারও ঋষিপাড়ার মেয়েদের মত নির্ভীক শঙ্খচিলের মত তীক্ষ্ন গলা বেরিয়ে এল।
রমিজ দারোগার মুঠি একবার তার বেটনের ওপর শক্ত হয়ে এলও দারোগা জানে যে কাজের জন্য সে মেয়েটাকে বাধ্য করতে চায় তা এপথে সম্ভব হবে না। মুহূর্তের মধ্যে সে ভঙ্গি বদলে ফেলতে চাইল।
‘আবদুল্লাহ গত রাতে খুন হয়েছে। তার লাশ নদীর কলমি ঝোপে পড়ে আছে।’
কথাটা শুনেই নিশিন্দা উঠোনের মাটিতে বসে পড়ল। তারপর গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করতে শুরু করল। দারোগা এই ফাঁকে একটা সিগ্রেট ধরিয়ে নিয়ে একটা সুখ টান দিয়ে ভিড়টার দিকে ফিরে বলল, ‘এই হারামজাদারা পালা জলদি। নইলে তোদেরও থানায় ধরে নিয়ে যাব।’
ভিড়টা এই ধমকে এক ইঞ্চিও নড়ল না। বরং একটা বেশ জোয়ান ছেলে এগিয়ে এসে বলল, ‘আবদুল্লাহ ভাইকে কে মেরে ফেলার চেষ্টা এতদিন করে এসেছে তা খলার আর দত্তখোলার মানুষেরা সকলেই জানে, পুলিশও জানে।’
দারোগা ছেলেটার দিকে এক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সিগ্রেটে একটা সুখটান মেরে বুঝল গাঁয়ের লোকের চোখে আগুন জ্বলছে।
রমিজ দারোগা বুদ্ধিমান। সে নিজেকে সম্বরণ করে নিল।
‘আমি তোর সাথে সোয়াল করছি না। খুনি কে তা আমরা ঠিকই বের করব।’
‘যারা নিজেরাই খুন করে তারা খুনি বের করে না।’
আবার ছেলেটা ঘাড় কাত করে কথা বলছে। আর ভিড়টাও নিবিড় হয়ে উঠোনটিকে ঘিরে ধরেছে। কে যেন ভেতর থেকে-চিৎকার ক’রে বলে উঠল, ‘ইটখোলার মালিক আর খরার গাইগরুর জোতদারদের জেরা না করে নিশিকে থানায় নিয়ে গেলে আমরা খলায় কাউকে আস্ত রাখবো না। নদী পার হয়ে চরে কাউকে ঢুকতে দেব না। ইটের ভাটায় তিতাসের পানি ঢুকিয়ে সব নিভিয়ে ঠাণ্ডা করে দেব। আমাদের কতজনকে পুলিশ ধরবে?’
এবার রমিজ দারোগার টনক নড়ল। সে একবার ভিড়টার দিকে তাকিয়ে দেখল প্রায় হাজার খানেক নরনারী। প্রত্যেকের চোখ ভাটার মতো জ্বলে উঠেছে। সে সিগ্রেটটা ক্রন্দনরত নিশিন্দার লুটিয়ে পড়া দেহের খানিক দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে দিতে বলল, আমি এই খুনের জন্য তোকে আসামী করব না। আমি জানি এই খুন কোনো মেয়েছেলের কাজ নয়। আবদুল্লাহর শরীরে বুলেটের চিহ্ন রয়েছে। এটা নিশ্চয়ই কোনো দলের কাজ। আবদুল্লাহ যাদের সাথে অর্থাৎ রাজনৈতিক সন্ত্রাসীদের সাথে জড়িত ছিল এটা তাদের কাজও হতে পারে। আবার শহরের জোতদার আর ইটভাটার মালিকদের লোকও এ খুন করতে পারে। আমরা তদন্তের জন্য এক্ষুনি লাশ তুলে শহরে নিয়ে যাব। যাওয়ার আগে নিয়মমাফিক আমি আবদুল্লাহর ঘরের মানুষকে গতরাতে সে বাড়িতে ছিল কি-না জিজ্ঞেস করতে চাই। গাঁয়ের লোকেরা যদি পুলিশের কাজে বাধা দেয় তবে আমি বাধ্য হব শহর থেকে আরও পুলিশ ফোর্স ডেকে আনতে।’
দারোগার কথায় ভিড়ের ভেতর গুঞ্জন উঠল।
ততক্ষণে নিশিন্দা মাটি থেকে মাথা তুলে উঠোনে বসেছে। তার বসন অসম্বৃত। শাড়িটা কোমরে খানিকটা জড়ানো থাকলেও ছতর থেকে মাটিতে লুটিয়ে থাকায় নাভি থেকে ওপর দিকটা উদোম। এ অবস্থায় নিশিন্দাকে মনে হচ্ছে ছবিতে দেখা মৎস্যকন্যার মত কিংবা কুমোরপাড়ার পূজোর আগে সাজিয়ে রাখা রংহীন মাটির দেবীমূর্তির মতো।
‘গতরাতে আবদুল্লাহ বাড়ি এসেছিল?’
দারোগার সোজাসুজি প্রশ্নে নিশিন্দা এবার একটু হকচকিয়ে গেল। তবে কি সে যখন খলায় গাই দুইয়ে আনতে গিয়েছিল তখন লোকটা তার খোঁজ নিতে বাড়িতে এসেছিল? ফেরার সময় কিংবা নদী পার হওয়ার সময় কেউ গুলী করে মেরেছে?
‘জবাব দে। আমি তোর জবানবন্দী নোট করছি।’
নিশিন্দা দেখল দারোগা বুক পকেট থেকে একটা নোট বই বের করে লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
‘না, সে গতরাতে বাড়ি ফেরেনি।’
‘কতদিন যাবৎ তোর সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ নেই?’
‘পনেরো দিন।’
‘পনেরো দিন আগে সে যখন নিয়মিত বাড়ি আসত তখন সে কি কেউ তার ওপর হামলা করতে পারে বলে তোকে জানিয়েছিল?’
‘না।’
‘তবে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল কেন?’
‘শহরের একটা ডাকাতি মামলায় পুলিশ তাকে জড়াতে চাচ্ছে বলে সে আমাকে জানিয়েছিল। পরশু রাতে থানার লোক তার জন্য এ বাড়ি তল্লাশি করে গেছে।’
‘তোর কাউকে সন্দেহ হয়?’
এ প্রশ্নে যেন নিশিন্দা সম্বিৎ ফিরে পেল। সে শাড়িটা টেনে বুক ঢাকলো। উদাসীনভাবে দেখলো এলাকার ভিড়টা তাকে দেখছে। চামার মেয়েটার সম্ভ্রমবোধ দেখে দারোগা হঠাৎ তার সিগ্রেটের প্যাকেট খুলে সামনের এগিয়ে দিয়ে বলল, তোর কথার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। সকলের সামনে নাম বলতে না চাইলে ঘরের ভেতরে চল। সে একটা সিগ্রেট খা।’
নিশিন্দা কি ভেবে যেন দারোগার প্যাকেট থেকে একটা সিগ্রেট ও তার হাতের দেশলাই নিয়ে ধরালো।
‘কারা কারা আবদুল্লাহকে খুন করতে পারে বলে তুই সন্দেহ করিস?’
নিশিন্দা ধোঁয়া ছেড়ে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল।
‘জবাব দে।’
‘আমার সবাইকে সন্দেহ হয়। পুলিশ, শহরের গাইগরুর মালিক আর আবদুল্লাহর সঙ্গী সবাইকে।’
দারোগা মাথা নুইয়ে কথাগুলো টুকে নিলো।
‘এবার তোর নাম, বাপের নাম বল।’
‘নিশিন্দা ঋষি। বাপ কার্তিক ঋষি। সাকিন দত্তখোলা, থানা ও জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।’
‘তোর আর আবদুল্লাহর পেশা কি ছিল? অর্থাৎ তোরা স্বামী-স্ত্রীর রুজিরোজগারের কথা বল। কি ধান্ধা করতি?’
‘আমার স্বামীর পৈতৃক পেশা ছিল মাঝিগিরি। সে নিজে ইজারঘাটগুলোর টোল আদায় করতো। আর আমি কিছু করি না।’
নিশিন্দা বুঝতে পেরেছে দারোগা একটু একটু করে এত মানুষের সামনে তার নাড়িভুঁড়ি বের করে নিতে চাইছে। সে খুব সাবধানে জবাব দিল।
‘গতরাতে নদীর মধ্যে কোনো গুলির শব্দ শুনেছিলি? তুইতো গতরাতে ঘরেই ছিলি। শুনেছিস?’
‘না।’
জবাব দিল নিশিন্দা। যদিও রাতে ঘরে থাকার প্রশ্ন শুনে বুকটা ধুক করে উঠল। জেরা শেষ হলে দারোগা বলল, ‘সন্ধ্যার দিকে থানায় গিয়ে মামলার কাগজপত্র তুই সই করে আসবি। আর সুরতহাল শেষ হতে একটু সময় নেবে। আগামীকাল সকালে গিয়ে গাঁয়ের লোক লাশ নিয়ে আসতে পারে।’
দারোগা লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় নিশিন্দা ও গাঁয়ের লোকজন ঘাটে গিয়ে চটে ঢাকা আবদুল্লাহর লাশ দেখল। পুলিশ লাশ নৌকোয় তুলে নদী পার হয়ে গেলে নিশিন্দা ঘরে ফিরে এসে গুম হয়ে দাওয়ায় বসে থাকল।
-------৩------
চাঁদ উঁঠেছে আকাশে। পূর্ণিমার পরের দিনের ঈষৎ ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদ। থানায় নিজের জবানবন্দি ও অভিযোগ স্বাক্ষর করে মামলা দায়ের করেছে নিশিন্দা। আবদুল্লার লাশ গাঁয়ের লোকেরা যথারীতি ব্যবস্থা করে কবর দিয়েছে তিতাসের এপারের বড় বটগাছটার নিচে। গাঁয়ের লোকেরা যথারীতি সহানুভূতি জানিয়ে কিছু চিড়ামুড়ি আর গুড় ঘরের দাওয়ায় রেখে গেলেও নিশিন্দার ভুখ পিয়াস মেটেনি। এও দু’দিন আগের কথা। এখন আবার ক্ষিদের পেটটা মোচড় দিচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে নিশিন্দা দাওয়ায় এসে মাদুর পেতে শুয়ে পড়ল। খিদেয়, গরমে আর জ্যোছনায় নিশিন্দা বুক থেকে কাপড় সরিয়ে চাঁদের দিকে তাকাতেই তার মনে হল কারা যেন তার সারা গায়ে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। কে যেন কানের কাছে মুখ এনে বলছে, ‘সব দুধ দুইয়ে নিয়ে যা। আজ আটকাবো না তোকে। তোর বুক দুটি খুব নরম। আহ তোর মুখখানি যদি দেখতে পেতাম। কার মেয়ে তুই ঠিকানা দিলে প্রতিদিন দুধ দুইয়ে দিয়ে আসব...।’
লাফ দিয়ে দাওয়ায় উঠে বসল নিশিন্দা। মনে পড়ল দা’টা এখনও ছাইয়ের গাদায় গোঁজা। কিন্তু হাতটা যেন হঠাৎ জ্যোছনায় মিলিয়ে গেল। নিশিন্দা চারদিকে তাকিয়ে বুঝল এখানে কেউ এসে তার গায়ে হাত দেয়নি। মনের ভুল। দুধ চুরির ঘটনাটা খিদের জ্বালায় আবার তাকে বাথানের দিকে ঠেলতে চাইছে। কেবলই কি দুধ? না আর কিছু? লোকটার গলা কি আশ্চর্যজনক ভাবেই না তার স্তন ছুঁয়ে নরম হয়ে উঠেছিল। কে রাখালটা? তার মুখ, গতর, হাত কিছু দেখেনি নিশিন্দা। কত বয়েস হবে রাখালটার? সে কি যুবা পুরুষ আবদুল্লাহর মতো? নাকি বুড়ো হাবড়া? বুড়ো হলে গলার আওয়াজ অতটা কোমল হয়ে উঠতে পারত না। না এটা তার মনেরই ভুল। খিদের জ্বালা নিশিন্দাকে রাম দা নিয়ে বাথানের দিকে ছুটে যেতে ডাকছে।
নিশিন্দা আবার শুয়ে পড়ল।
পেটের ভেতরে খিদের নখ আঁচড়ানো ঠেকাবার জন্য আবদুল্লাহর মরা মুখ মনে আনার চেষ্টা করল। কিন্তু কল্পনায় ভাসতে লাগল আবদুল্লার সাথে তার সুখস্মৃতি।
চিত্রালয়ে সিনেমা দেখে সে রাত সাড়ে এগারোটায় খেয়াঘাটে এসে দেখে কে একজন লোক নাও নিয়ে প্রায় নদীর মাঝামাঝি চলে গেছে। অথচ এটা শেষ খেয়া। ছাড়ার কথা রাত বারোটায়। সম্ভবত আজ পারানির মাঝি না থাকাতে ওপারের ঐ লোকটার তর সয়নি। ঠিক সময়ের আগেই নাও ভাসিয়ে নিজে পার হয়ে যাচ্ছে। কি স্বার্থপর লোকটা, একবারও ভাবল না শহরে সিনেমা দেখে যারা ফিরবে তাদের নাও না পেলে সাঁতরে তিতাস পার হওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না। তিতাস অবশ্য ছোট নদী। নাও না পেলে অনেকে সাঁতরেই পার হয়ে যায়। কিন্তু নিশিন্দার মত মেয়েছেলে কি করে এতরাতে নদী পেরুবার সাহস পাবে? শহরে নিশিন্দা সাধারণত যে ধরনের কাজ করে, যেমন মহাজনদের দোকান ঝাড় দেয়া থেকে শুরু করে কলসী ভরে পানি তুলে দেওয়া। দশ বারোটা দোকানের কাজ শেষ করতে তার সন্ধ্যাবাতির আগেই সব শেষ হয়ে যায়। কাজ শেষ হলেই সে আর অন্যান্য ঋষি মেয়েদের মতো ঘোরাফেরা করতে চায় না। সেদিন আটকে গিয়েছিল অন্য কারণে। ভাদুগড়ের ঋষিপাড়ার মেয়ে তার সই সুনীতি তাকে এক রকম জোর করে ধরেই সিনেমায় নিয়ে গিয়েছিল। তাও সেকেন্ড শো। সুনীতির কি, তার তো নদী পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় না। কে জানে সেদিন নিশিন্দাকে কিসে পেয়েছিল? সেও সুনীতির কথামত সেদিন রাতের শো দেখতেই হলে ঢুকে পড়েছিল। শো শেষ হলে ছুটতে ছুটতে সে নদীর ঘাটে এসে দেখে খেয়া নাও এখন মাঝ নদীতে।
নিশিন্দা দুহাত মুখে চোঙের মতো গোল করে প্রাণপণে নাওয়ের লোকটাকে ডাকল, ‘ও মাঝি আমাকে নিয়ে যাও।’
নদীতে বাতাস না থাকাতে এক ডাকেই কাজ হল। মনে হল নাওয়ের বাতাটা মাথাসহ ঘুরে যাচ্ছে। সে রাতটাও ছিল এমনি চাঁদনী রাত।
নাও এসে ভিড়তে নিশিন্দা কিনারের পানি ভেঙে এক লাফে নৌকায় উঠে গেল।
‘মেয়েমানুষ এত রাত করে কোত্থেকে এলি? চেনা মনে হচ্ছে?’
‘আমি দত্তখোলার কার্তিক ঋষির মেয়ে।’
‘ও কার্তিক কাকার মেয়ে। বাজারের কাজ শেষ করতে অত রাত হয় নাকি আজকাল? না অন্য ধান্ধায় ঘুরিস?’
‘কি ধান্ধা আবার? সইয়ের সাথে একটু সিনেমা দেখে ফিরলাম। ভাদুগড়ের সই। কোন ধান্ধায় ঋষি মেয়েরা থাকে না। আমরা খেটে খাই।’
মুখের ওপর জবাব দিল নিশিন্দা। ঘাড় ঘুরিয়ে নদীর দিকে তাকিয়েই বলল, ‘তুমি আবার কে? নাও নিয়ে বারোটার আগেই শেষ পাড়ি দিচ্ছ? আরও তো মানুষ থাকতে পারে?’
‘আরে আজ তুই আর আমিই শেষযাত্রী। আমার পরিচয় জেনে কি হবে? চেয়ে দ্যাখ আকাশে কাসার থালার মত চাঁদ উঠেছে। এমন রাতে মানুষ কি কূলে ভিড়তে চায়? শেষযাত্রী বলে তোর জন্য নাও ভিড়ালাম।’
লোকটা কেমন রহস্যময় হাসি হাসল। নাও ততক্ষণে আবার নদীর মাঝামাঝি এসে যেন হাল ছেড়ে দিয়েছে। লোকটা বৈঠা নাওয়ের ভেতর তুলে এনে চুপচাপ বসে আছে। বাইছে না।
‘এই মানুষ, বৈঠা তুলে রেখেছো কেন? নাও যে বেঘাটে যাচ্ছে দেখতে পাও না?’
লোকটার খাসলত সুবিধের নয় বলে মনে হল নিশিন্দার।
‘তোরে নিয়ে আজ আঘাটায়ই পাড়ি দিয়েছি,’ বলেই লোকটা অদ্ভুত শব্দ করে হাসল। কিন্তু অসভ্য মানুষটার কাছ থেকে সে রাতে যে আচরণ পাবে বলে নিশিন্দা ভয়ে কাঁপছিল, লোকটা তেমন কিছুই করল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে নিজেই বৈঠাটা তুলে নিয়ে বাইতে লাগল। নাও ঘাটে ভিড়ালে নিশিন্দা নেমে পড়ল। লোকটা নাওয়ের মাথা ডাঙার ওপর একটু টেনে উঠিয়ে লগি ঢুকিয়ে বাঁধল। নিশিন্দা ইচ্ছে করলে লোকটাকে ঘাটে রেখে চলে যেতে পারত। কিন্তু কি ভেবে যেন নিশিন্দা গেল না। পাড়ের উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে থাকল।
লোকটা ওপরে উঠে রহস্য করে হাসল, ‘কি, এখন চাঁদনীরাতে একা ঘরে ফিরতে তোর বুঝি মন চায় না?’
‘আমি যে একা একথা কে বলল?’
এবার নিশিন্দাও হাসল।
‘কার্তিক কাকার তুই ছাড়া আরও কেউ আছে নাকি? কই আমি তো জানি না? কার্তিক কাকার মৃত্যুর পর ওদিকে আর যাইনি। আমাকে তোর বাপ খুব ভালবাসতো। তোকে মাঝেমধ্যে নদী পার হয়ে শহরে যেতে দেখি বটে, কিন্তু আলাপ করা হয়নি। তুই তো খুব খুবসুরত হয়েছিস। পাত্তা দিলে একদিন তোর দাওয়ায় গিয়ে উঠব। দিবি নাকি পাত্তা?’
‘না চিনেই পাত্তা দেয় নাকি মানুষ? আগে তো তোমার সাতকাহন শুনব। তারপর মন চাইলে পাত্তাও খানিকটা দিতে পারি।’
এবার নিশিন্দাও রহস্যময়ী হাসি হেসে উঠল। লোকটাকেতো মজার মানুষ বলেই মনে হচ্ছে।
‘আমি চরের দক্ষিণ পারের সফর মাঝির ছেলে আবদুল্লাহ। আমার বাপের সাথে তোর বাপের দোস্তি ছিল। এখন চিনেছিস?’
‘আর চেনার দরকার হবে না। পাত্তা দিলাম। একদিন এসো। চামারের মেয়ে বলে আবার গায়ে ফুসকুড়ি উঠবে নাতো?’
এভাবেই আবদুল্লাহকে নিশিন্দা আহ্বান করে নিজের দাওয়ায় উঠিয়ে এনেছিল। আর আবদুল্লাহও তার পীরের কাছে নিয়ে গিয়ে অনেক মানুষকে সাক্ষী সাবুদ রেখে নিশিন্দাকে বিয়ে করেছিল।
নিশিন্দা শাড়ি শরীরে বিছিয়ে মুখ ঢেকে ঘুমুতে চাইল। কিন্তু ছাইয়ের গাদায় লুকিয়ে রাখা রামদাটা যেন এখন তার চোখের সামনে নাচছে। দায়ের মাথায় একটা চোখ আঁকা। চোখটা খুলছে আর বন্ধ হচ্ছে। নিশিন্দাকে ইশারা করছে রামদা’টা। যেন বলছে, কেন শুয়ে আছিস? আয়, বাথানের সবগুলো গাই দুইয়ে আনি। আমি থাকতে তুই মাগী কেন উপোসে হাঁসফাঁস করবি? ওখানে তোকে আটকাবার কে আছে? যে আছে সেতো তোর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতেই চায়। উঠে আয় মাগী।
নিশিন্দা এপাশ-ওপাশ করে ঘুমোবার চেষ্টা করল। কিন্তু হারামজাদা দা’টা বারবার ছাইয়ের গাদা থেকে উঠে এসে এমনভাবে নাচ জুড়ে দিল যে, নিশিন্দা আর শুয়ে থাকতে পারল না। ভাবল, দা’টা ছাইয়ের গাদা থেকে তুলে এনে মাদুরের নিচে রেখে দিলে সে হয়তো তাকে আর উস্কাবে না।
নিশিন্দা দাওয়া থেকে উঠে সোজা ছাইয়ের গাদার কাছে গিয়ে ভেতরে হাত ঢুকালো। দা’টা গরম হয়ে আছে। নিশিন্দা দা টেনে বের করে দাওয়ায় মাদুরের নিচে রেখে বালিশ টেনে শুয়ে পড়তেই উঠোনে কার যেন পায়ের আওয়াজ পেয়ে আবার উঠে বসল। উঠোনের এ প্রান্তেই নিশিন্দার গা ঘেঁষে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে।
‘কে?’
‘চেঁচাবি না, আমি খলিল।’
লোকটা নিশিন্দার গা ঘেঁষে বসল। একেবারে গায়ে গা লাগিয়ে। খলিল আবদুল্লার পার্টির লোক। দু-একবার গভীর রাতে আবদুল্লার সাথে দেখা করতে মাঝেমধ্যেই এ বাড়িতে এসেছে। কিন্তু আবদুল্লার মৃত্যুর পর এই প্রথম পার্টির কেউ নিশিন্দার খোঁজ নিতে এসেছে।
‘পুলিশের জন্য এদিকে আসতে পারি না। তোর সাথে পুলিশ নিশ্চয়ই খুব খারাপ ব্যবহার করছে? আমাদের কারো নাম জিজ্ঞেস করেছিল?’
লোকটা ঝুঁকে ফিসফিস করে নিশিন্দাকে প্রশ্ন করল। নিশিন্দা শাড়িটা শরীরে ঠিকমত জড়িয়ে মাদুরের নিচ থেকে রামদা’টা বের করে আনল।
‘তার আগে বল আবদুল্লাহকে কারা মেরেছে।’
‘আমি, বিশ্বাস কর নিশি কিছুই জানি না। আমি শহরে ছিলাম না।’
‘তাহলে এত রাতে আমার কাছে কেন এসেছিস?’
‘আমি তোর কোনো ক্ষতি করতে আসিনি নিশি। আমি শুধু হাতিয়ারগুলো নিয়ে যেতে এসেছি। ওগুলো তোর কাছে থাকলে খুব বিপদ হবে। পুলিশ আর পার্টির লোক বারবার ওগুলোর জন্য হানা দেবে। তোকে শেষ করেও দিতে পারে, যেমন আবদুল্লাহকে দিয়েছে।’
‘আবুদল্লাহকে তোরা মেরেছিস। তোদের পার্টির কাজ।’
‘বিশ্বাস কর আমি কিছুই জানি না। আমি এসবের মধ্যে ছিলাম না। ইটভাটার মালিক, পুলিশ আর পার্টি আবদুল্লার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছিল বুঝতে পেরে আমি পালিয়ে যাই। যাওয়ার আগে আমি আবদুল্লাকে আমার সন্দেহের কথা বলেছিলাম। আবদুল্লাহ পাত্তা দ্যায়নি। ইটখোলার মালিকরা আর বাথানের মালিকরা তোকে আর আবদুল্লাকে এখান থেকে উচ্ছেদের জন্য লাখ লাখ টাকা ঢেলেছে। আমি জানতাম। আবদুল্লাহকে বলেছিলাম। সে শুনলো না।’ লোকটা গলা আরও নামিয়ে কথা বলছে।
‘আমি দু’দিন ধরে না খেয়ে আছি। তোর ধানাইপানাই ভালো লাগছে না। কি বলতে এসেছিস তুই?’
‘আবদুল্লাহর হাতিয়ারগুলো আমাকে দিয়ে দে। তোকে আমি পাঁচ হাজার টাকা দেব নিশি। টাকা নিয়ে এখান থেকে তুই পালিয়ে যা, নইলে পার্টির লোকই তোকে একদিন ওগুলোর জন্য মেরে ফেলবে। আমি টাকা নিয়ে এসেছি।’
‘ওগুলো দিয়ে তুই কি করবি? তুই তো আর ওদের সাথে থাকছিস না মনে হচ্ছে। তোকে ওরা মালগুলোর জন্য ধাওয়া করে বেড়াবে না?’
লোকটার আসল মতলব যাচাই করতে চাইছে নিশিন্দা।
‘আমি তেলিয়াপাড়া সীমান্তের কাছে নতুন দল গড়েছি। আবদুল্লাহ নেই আমি এখানে থাকব না, তুই মালগুলো দিয়ে দে নিশি, আর তুই আমার সাথে যেতে চাইলে, চল আমরা এক সাথে থাকব।’
‘আমাকেও নিবি?’ খিল খিল করে হাসল নিশিন্দা, ‘আমাকেও নিবি মানে কি? তোর ওস্তাদের বিবিকে বিয়ে করবি? তোর হুকুম শুনবো, তোর সাথে শোবো এই তো?’
আবার শব্দ করে হাসল নিশিন্দা।
‘আমাদের কাজের ভাগও পাবি। তোকে রানীর হালে রাখব।’
‘আর আমি যদি বলি মালগুলো কোথায় আছে আমি জানি না। আবদুল্লাহ আমাকে ওসব সম্বন্ধে কিছু বলে যায়নি?’
‘মিথ্যে কথা। আমি জানি তুই সব জানিস।’ এবার খলিল লোকটার কণ্ঠ কর্কশ হয়ে উঠল।
‘আমি জানি না।’
‘তুই সব জানিস। এই রামদা’টা যখন তোর হাতে দেখছি, তুই বাকি মালগুলোর কথাও জানিস। মনে রাখিস আবদুল্লাহ ওগুলোর জন্যই মারা পড়ল। তুইও খতম হবি। ভালোয় ভালোয় আমাকে ওগুলো দিয়ে দে নিশি। আমি মারতে চাই না, পাঁচে না পোষায় তোকে দশ হাজার দিচ্ছি।’
খলিল মনে হল টাকার জন্য কোমরে হাত দিল।
‘আবদুল্লাহকে কে মেরেছে না জানা পর্যন্ত মালের সন্ধান কেউ পাবে না। ভাগ আমার উঠোন থেকে।’
নিশিন্দা উঠে দাঁড়াতে গেলে লোকটা হঠাৎ তার কোমর থেকে পিস্তল টেনে বের করে চিৎকার করে উঠল, হারামজাদি, আমিই তোকে শেষ করব।’ লোকটা গুলি করার আগেই নিশিন্দা ঝাটকা মেরে ঘুরে দাঁড়িয়েই রামদা’টা তার কবজি লক্ষ্য করে বসিয়ে দিল।
‘মাগো’ বলে লোকটা ঝুঁকে পড়ার আগেই নিশিন্দার মাদুরের ওপর অস্ত্রটা পড়ে গেল। নিশিন্দা দ্রুত হাতে পিস্তলটা তুলে ছুঁড়ে ঘরের ভেতরে ফেলে দিয়ে বলল, ‘পালা হারামজাদা। প্রাণের মায়া থাকলে খলা ছেড়ে পালা।’
তার হাতে উদ্যত রামদার ওপর চাঁদের আলো পড়ে চকচক করে উঠেছে। লোকটা দৌড়ে উঠোনটা পার হয়ে নদীর দিকে ছুটতে ছুটতে বলতে লাগল, ‘তুই আমার একটা আঙুল কেটেছিস। আমি তোকে একদিন দশ টুকরো করে কাটবো, মনে রাখিস।’
নিশিন্দা লোকটার পেছন পেছন উঠোন পেরিয়ে এসে জবাব দিল, ‘ইটভাটার দালাল, আবদুল্লাহর খুনির দল আমিও তোদের ফাঁসিতে না ঝুলিয়ে ছাড়ব না।’
------৪-------
সকালের সূর্য দিগন্তরেখার বেশ একটু ওপরে উঠে এসেছে। আবদুল্লাহর ঘরের দাওয়াটা খালি। গত রাতের ঘটনার পর নিশিন্দা ভেতরে গিয়ে খিল এঁটে শুয়ে পড়েছিল। তার একপাশে রামদা আর বালিশের নিচে খলিলের ফেলে যাওয়া পিস্তল। জানালার ফাঁক গলিয়ে রোদ এসে নিশিন্দার মুখে পড়তেই সে লাফ দিয়ে উঠে বসল। উঠেই মনে হল উঠোনে কে যেন হাঁটছে। নিশিন্দা দ্রুত হাতে রামদা’টা চাটাইয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে বালিশের ওপর কাঁথা চেপে দুয়ার মেলে দিয়ে বাইরে এল। খাকি শার্ট আর লুঙ্গি পরা একটা লোক নিশিন্দাকে সামনে দেখেই জিজ্ঞেস করল, ‘তুই আবদুল্লাহর বৌ?’
নিশিন্দা কোন জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে লোকটার দিকে চেয়ে থাকল।
‘আমি ইটখোলা থেকে এসেছি। তোকে খোলার ম্যানেজার ডেকেছে।’
‘ওখানে আমার কোন কাজ নেই। আমি ইটখোলায় যাই না।’
জবাব শুনে মধ্যবয়স্ক বেয়ারাটা থতমত খেয়ে নিশিন্দার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। সম্ভবত লোকটা এতদঞ্চলে নতুন কাজ নিয়েছে। ইটখোলার সাহেবের ডাক শুনেও এ গাঁয়ের কোন মানুষ, তাও আবার মেয়েমানুষ এ ধরনের একটা জবাব দিতে পারে তা তার ধারণায় ছিল না।’
‘আমাকে পাঠিয়েছে আমি বলে গেলাম। যাওয়া না যাওয়া তোর ইচ্ছে।’
‘আমার ইচ্ছেটাতো আমি তোকে বলেই দিলাম। যা গিয়ে তোর বাপকে বল, তার দরকার থাকলে সে-ই যেন আসে। বলিস আবদুল্লাহর বৌ বলেছে।’
এ-কথায় মনে হল লোকটা পড়িমরি করে উঠোন পেরিয়ে ছুটে পালাল।
এখন সারা পেটজুড়ে একটা ভুখের ব্যথা যেন ছড়িয়ে পড়েছে। নিশিন্দার মনে হল সে একটা ক্ষুধার্ত বাঘিনী। যে করেই হোক তার বেঁচে থেকে দুনিয়ার ওপর প্রতিশোধ নিতে হবে। প্রতিশোধ হত্যা এবং নিজের ক্ষুধার্ত পেটের। বেড়ায় ঝোলানো কনুই জালটার দিকে দৃষ্টি ফেরাল। এইতো এখনও বেঁচে থাকার কিছু উপকরণ তার ঘরে আছে। জালটা আধমরা তিতাসের স্রোতে কয়েকবার ছুড়ে মারলে মাছ না উঠুক, কয়েকটা গুগলি শামুকও কি রিজিক দেনেঅলা জুটিয়ে দিতে পারে না? না পারলে কাল থেকে সে পিস্তল নিয়ে শহরের পথে রাহাজানি করে বেড়াবে। তবুও হার মানবে না। সে হার মানবে না আবদুল্লাহর খুনি শহরের জোতদার, ইটভাটার মালিক আর গুপ্তপার্টির ছদ্মবেশধারী রাজনৈতিক ডাকাতদের কাছে।
সারাদিন জাল মেরে কিছু কুঁচো মাছ আর শাপলা তুলে এনে চুলোয় চাপিয়ে দিল নিশিন্দা। রান্না সেরে খেতে বসতে যাবে এমন সময় রমিজ দারোগা এসে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল, ‘তোকে দু’টো ভাল পরামর্শ দিতে এলাম। ইচ্ছে হলে আমার কথা কানে তুলবি কিংবা তোর যা খুশি তাই করবি।’
লোকটার কথায় একটা হামদর্দি ভাব টের পেয়ে নিশিন্দা টুলটা এগিয়ে দিল।
‘কিছু খেয়েছিস?’
‘পুলিশের লোক আজকাল মানুষের পেটের খোঁজও নেয় দেখছি!’ হাসল নিশিন্দা।
‘শোন্ ঋষির মেয়ে, আমি তো তোর বাপের বয়েসী। সবাই জানে তুই না খেয়ে আছিস। উপোস দিয়ে মানুষের দিন কাটে না। আমার কথা কানে নিলে আখেরে তোর মঙ্গলই হবে।’
বাপের বয়েসী কথাটা নিশিন্দার কানে বাজল। সে তার বিছানায় বালিশ দিয়ে ঢাকা পিস্তলের ওপরই বসে পড়ল। টেরবেটের হলে যাতে অস্ত্রটা চকিতে তুলে আনতে পারে।
‘বলুন কি বলতে চান?’
‘আমি তোকে এ বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে বলছি।’ সোজাসুজি প্রস্তাব দিলেন দারোগা।
নিশিন্দা কোন জবাব না দিয়ে দারোগার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।
‘তুই অত শত্রুর সাথে একা কি করে লড়বি? পারবি না। আবদুল্লাহর মতো তোকেও ওরা মেরে ফেলবে। তার চেয়ে পালিয়ে যা।’
‘কোথায় পালাব?’
‘যে দিকে দু’চোখ যায়।’
‘আবদুল্লাহর খুনের বিচার?’
‘পাবি না। আবদুল্লাহ খুন হয়েছে তার নিজেরই দলবলের হাতে। ইটভাটার ম্যানেজার, শহরের জোতদার আর আবদুল্লাহর পার্টির লোকেরা এ কাজ করেছে। মালিকরা পার্টিকে মোটা টাকা দিয়ে তোর স্বামীকে খুন করিয়েছে। কিন্তু কোন সাক্ষী নেই। তুই বিচার পাবি না। কে সাক্ষী দেবে? উল্টো বরং তোকেই ওরা জড়িয়ে দেবে। এবার আমার জন্য পারেনি।’
বেশ আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলছে দারোগা। প্যাকেট থেকেই একটা সিগ্রেট ধরিয়ে প্যাকেটটা নিশিন্দার দিকে এগিয়ে দিল।
নিশিও একটা সিগ্রেট ধরিয়ে ধুঁয়া ছাড়ল, আমার ওপর এত দয়া?’
‘কোন দয়ামায়া নয়। আমি তোর ওপর দয়া দেখতেও আসিনি। এসেছি বেঘোরে মারা পড়ার আগে প্রকৃত অবস্থাটা তোকে সমঝে দিতে। আজ যখন ভাটার ম্যানেজারের কাছে যাসনি তখুনি বুঝেছি তোর দিন ফুরিয়ে এসেছে। তাই সাবধান করতে এলাম।’
‘যাইনি কেন জানেন না? আপনি তো আমার বাপের বয়েসী বলে দোহাই দিয়ে মন নরম করে দিলেন। ম্যানেজারটা গেলেই তার বিছানায় শোয়ার প্রস্তাব দিত। আর আমিও ছাড়তাম না, গুলি করে মেরে ফেলতাম।’
‘জানি তোর কাছে হাতিয়ার আছে। তোর সাহসও আছে।’
‘হ্যাঁ মেরে ফেলতাম হারামজাদাকে। সে কারণে যাইনি, বলবেন ওকে।’
‘ঠিক আছে বলব। এর আগে আমার একটা কথা শোন।’
‘বলুন।’
‘এ বাড়িটা ছেড়ে দে। ভাটার ম্যানেজার এখানে ভাটা বসাবে।’
‘এটা আমার শ্বশুরের ভিটে। আবদুল্লাহর ভিটে।’
‘তোকে ভাটার মালিক উপযক্ত দাম দিচ্ছে। এক লাখ পাবি। টাকাটা চাস তো কাল রাতেই তোর কাছে পৌঁছে যাবে। ওরা চায় আবদুল্লাহর কোনো চিহ্ন খলায় না থাকুক।’
দারোগার কথায় নিশিন্দা জ্বলন্ত সিগ্রেটে একটা সুখটান দিল। ‘টাকাটা তাহলে এখানে বসেই পেয়ে যাব, কি বলেন বাপের বয়েসী মুরুব্বি?’
‘হ্যাঁ, ঘরে বসেই পাবি। ম্যানেজার নিজে এসে দলিলে তোর সই নিয়ে টাকা গুনে দিয়ে যাবে। কেউ জানবে না। ঐ টাকায় তুই শহরে গিয়ে থাকতে পারবি।’
খুব আগ্রহভরে কথা বলছেন রমিজ দারোগা। মুখটা আরো এগিয়ে নিশিন্দার কানের কাছে এনে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘এর চেয়ে ভালো তুই আর কি চাস? আবদুল্লাহর কথা ভুলে যা।’
‘ভুলে যাব?’
‘ভুলে যা।’
‘আবদুল্লাহর নামগন্ধও খলায় থাকবে না?’
‘না, থাকবে না।’
‘বেশ আমি রাজি।’
‘নিশিন্দা সিগ্রেটটা দরজা ডিঙিয়ে বারান্দায় ছুঁড়ে ফেলল।
দারোগার মনে হল একটা আনন্দময় বাজ পড়ল তার বুকের ভেতর।
‘আমি জানতাম তুই রাজি হবি। তুই খুব ভালো মেয়ে, আমি জানতাম নিশি।’
‘আপনি জানতেন আমি ভালো মেয়ে? তাহলে বলুন টাকাটা কখন পাবো? ম্যানেজার কখন পৌঁছে দেবে?’
নিশিন্দা যেন ব্যাকুলতা প্রকাশ করল।
‘কাল রাতে। রাত বারোটার পর। দত্তখোলা আর বাথানের মানুষ ঘুমিয়ে গেলে তুই টাকা পাবি। ম্যানেজার একা এসে দিয়ে যাবে, কেউ জানবে না। তুই ঘরে বসে থাকবি। আর সকালে কেউ জাগবার আগে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবি। তোর যেখানে ইচ্ছে।’
‘আমার যেখানে ইচ্ছে চলে যাব যেখানে আবদুল্লাহর নামগন্ধও না থাকে? বেশ আমি রাজি।’
নিশিন্দার কথায় দারোগা উঠে দাঁড়ালো।
-------৫-------
দারোগা রমিজকে বিদেয় করে নিশিন্দা জাল দিয়ে ধরা কুঁচো মাছ আর শাপলা ডাটার ঘ্যাঁট পেট ভরে খেয়ে দাওয়ায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। রাত ন’টায় তার ঘুম ভাঙলো। চোখ কচলে সে আকাশের দিকে তাকিয়েই বুঝল আজ চাঁদটা ঘর মেঘের আড়ালে ঢাকা। বেশ ক’দিন খরা আর দারুণ গরমের পর এখন আকাশে সহসা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাতাস ছুটেছে হা হা করে। চারণভূমির দিশেহারা বায়ুর বেগ সোজাসুজি এসে ধাক্কা মারছে ঘরের দরজায়। ঝড়ের দাপট কেঁপে কেঁপে শব্দ তুলছে তার টিনের চালাঘরটা। দাওয়া থেকে মাদুর গুটিয়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে খিল এঁটে দিল নিশিন্দা। ঘরে বাতিটা জ্বেলেই সে হাতড়ে হাতড়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। আর সাথে সাথেই শুরু হল প্রবল বাতাসের সাথে প্রচণ্ড বৃষ্টির শব্দ।
নিশিন্দা হাত বাড়িয়ে রামদা’টা পরখ করল। দা’টা যেন মানুষের রক্তের জন্য হা হা করে কাঁদছে।
নিশির মনে হল অদৃশ্য হাতটা আবার তার বুকের ওপর নেমে এসে কি যেন হাতড়ে বেড়াচ্ছে। আর একটা অদ্ভুত নরম কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে নেমে এসে বলছে, ‘তোর বুক দু’টি এমন নরম? তোকে আজ আটকাবো না। সব দুধ দুইয়ে নিয়ে যা আরেকদিন তোর ও দুটোতে ছোঁয়ার আশায় আজ ছেড়ে দিচ্ছি...।’
বৃষ্টির আওয়াজ এখন যেন আরও দ্বিগুণ শব্দে চালার ওপর ঝরে পড়ছে। নিশিন্দা বিছানায় উঠে বসল। একবার দা’টা হাতে তুলে নিয়ে আবার আগের জায়গায় রেখে দিয়ে বিছানা থেকে নামল। বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও দ্বিগুণ শক্তিতে উঠোনে ঝাঁপিয়ে নেমেছে। নিশিন্দা দুয়ার খুলে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির বাইরে মাঠে এসে দাঁড়িয়েই বুঝল তার শরীরের ওপর ভিজে শাড়িটা লেপ্টে বসে গেছে। আর পানির স্রোত বইছে তার দু’টি উদ্যত বুকের ফাঁক দিয়ে। তবে নাভীর ওপর বৃষ্টির নাচানাচি নিশির ভালোই লাগলো। আধপেটা খাওয়া ক্ষুধার জ্বালার ওপর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন সান্ত্বনার প্রলেপ বুলিয়ে চলেছে।
নিশিন্দা চারণভূমির দিকে তাকিয়েই বুঝল মিশমিশে অন্ধকারে ছেয়ে আছে সামনের দিগন্তবিস্তৃত চিরচেনা মাঠটা। এমনকি খলার বাথান বা গোয়ালগুলোর কোন চিহ্ন পর্যন্ত তার চির অভ্যস্ত নজরে আসছে না। তবুও নিশি পা বাড়াল সামনের দিকে। নিরস্ত্র, নিরূপায় এবং ক্ষুধার্ত এক নারী দেহ যেন সিক্ত শরীরকে অদৃষ্টের একটি নিক্ষিপ্ত অব্যর্থ তীর ভেবে নিয়ে অন্ধকারকে ভেদ করে সামনের দিকে ছুটতে লাগল।
আন্দাজে এগিয়ে গেলেও নিশিন্দা বুঝতে পারছে সে খোঁয়াড়গুলোর কাছে এসে পড়েছে এবং সম্ভবত তার সেই বাথানটা কয়েক হাত দূরত্বের মধ্যেই আছে। হাতড়ে এগোতে গিয়ে হঠাৎ সে পা পিছলে মাটিতে পড়ে যেতেই তার পা গিয়ে খোঁয়াড়ের বেড়ায় ধাক্কা খেল। নিশিন্দা বুঝল সে ভুল করেনি। এখন গেট খুঁজে বের করে দড়িটা খুলতে পারলেই হল। কে জানে গেটটা সেদিনের মত খুলতে পারবে কিনা? সেদিন তো হাতে রামদা আর আকাশে চাঁদ থাকায় তার কোন অসুবিধেই হয়নি। আজ কি ঘটে কে জানে?
নিশিন্দা হাতড়ে হাতড়ে শেষ পর্যন্ত গেটের মোটা খুঁটি পেয়েই বুঝল গেটটা দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা নয়। সম্ভবত এই কয়দিনে রাখালটা গেটের জন্য জাহাজের কাছির মত মোটা কাছি জোগাড় এখনও করে উঠতে পারেনি। কিংবা ইচ্ছে করেই গেটটা খোলা রাখা হয়েছে নরম বুকওয়ালা কোন দুধ চোরনীর আশায়।
নিশিন্দা গেটটা আলগা করে কতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে অনুভব করতে চেষ্টা করল সে ঠিক জায়গায় এসেছে কিনা। এদিকে বৃষ্টির বেগ প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে তার দেহটাকে ধুয়েমুছে আজকের অভিসারের জন্য উপযুক্ত করে দিচ্ছে। সারা এলাকায় বিশেষ করে খলার খোঁয়াড়গুলোতে কোন বাতির চিহ্নও নেই। কেউ কিছু জ্বালতে চাইলেও যে বাতাসে থাকার কথা নয় তা নিশিন্দা জানে।
নিশিন্দা ভেতরে ঢুকে সোজা মাচানের নিচে চলে এল। সামনেই সেদিনের সেই গাইটা বোধ হয় জাবর কাটছে। নিশিন্দা পানি চিবানোর মত শব্দ শুনতে পেয়ে গাইটার গায়ে হাত দিয়ে আদর করতে হাত বাড়াতেই গাইটা ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। তারপরই অযাচিতভাবে শিং ঘুরিয়ে অন্ধকারে গুঁতো মারল নিশিন্দার বাম বাহুতে। আর তক্ষুনি মাচানের ওপর থেকে কে যেন লাফিয়ে নেমে প্রশ্ন করল, ‘কে ওখানে?’
নিশিন্দা বুঝল যে রাখালটা আগন্তুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য হাতের কাছে কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে।
‘আমি এসেছি।’
নিশিন্দার শরীর বৃষ্টি ও বাতাসের ঝাপটা পেরিয়ে আসায় এখন রীতিমত কাঁপছে। কথা বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে গেল। রাখালটা, বোঝা যাচ্ছে এ কথায় মাচানের নিচে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কেটে গেল।
‘এমন দুর্যোগের রাতে কেউ চুরি করে দুইতে আসে? তুই আসলে কে? মানুষ না জিন?’
মনে হল রাখালটা ভয় পেয়ে উপর্যুপরি প্রশ্ন করে নিশ্চিত হতে চাইল।
‘তুমি সেদিন ছেড়ে দিয়েছিলে বলে এলাম। আমি মানুষ বলেই এলাম। আজ দুধ নিতে আসিনি।’
সাথে সাথেই একটা উষ্ণ হাত যেন সাপের মত এগিয়ে এসে নিশিন্দার কাঁধ স্পর্শ করল। তারপর বুক।
নিশিন্দা নড়ল না। বাধাও দিল না।
‘ভিজে একদম নেয়ে এসেছিস। তোর দা’টা কোথায়?’
‘আনিনি।’
‘বাতি জ্বালাবো?’
‘না।’
জবাব শুনেই বাহু দুটো দিয়ে কে যেন নিশিন্দাকে এক বিশাল বুকের ওপর চেপে ধরল। নিশিন্দা বাধা দিল না। হাত দু’টি তার সারাদেহের ওপর সাপের মত হাতড়ে বেড়িয়ে নাভীর কাছে শাড়ির গিটের ওপর এসে থেমে গেল; ‘কি ব্যাপার তোর নাভী বসে গেছে? ক’দিন ধরে উপোস দিচ্ছিস?’
লোকটা ডানহাতের বাঁধন আলগা করে নিশিন্দাকে ঠেলে দিল।
‘ওসব সোয়াল করে কি লাভ? একরাতে তোমার গোয়াল থেকে দুধ দুইয়ে নিয়েছিলাম। আজ দাম দিতে এসেছি। তোমার যেভাবে খুশি উসুল করে নাও।’
নিশিন্দার কথা কেঁপে যাচ্ছে। কারণ তার দেহ দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টির দাপট সহ্য করে এখন মাঘের শীতের ভিখিরির মত কাঁপছে।
‘কার মেয়ে তুই? কোথাকার মেয়ে?’
‘এ গাঁয়েরই মেয়ে। এর বেশি জানতে চেয়ো না।’
‘ভাতার নেই?’
‘বললাম তো জবাব পাবে না।’
‘তাহলে তোর মুখখানি একটু দেখা, আমি বাতি জ্বালি।’
‘মুখ দেখে কি হবে? তোমার পছন্দের যে জিনিস এতক্ষণ ছুঁয়ে দেখলে সবি নাও। আমিতো দিতেই এসেছি। তবে মুখ দেখতে বা পরিচয় জানতে চেয়ো না। সেটা আমি দেব না।’
নিশিন্দার কথায় অন্ধকারে চায়ামূর্তিটা কি করবে যেন ঠিক বুঝতে না পেরে নিশিন্দার মুখের ওপর হাত বাড়িয়ে অন্ধের মতো হাতড়াতে লাগল। কে জানে হাতে ছুঁয়ে যদি বোঝা যায় মাগীটা তার পরিচিত কেউ কিনা?
‘বললাম তো আমি তোমার চেনাজানা কেউ নই। আর কোনদিন আসবোও না এখানে। কে জানে এটাই এ দুনিয়ায় আমার শেষ রাত কিনা! তোমার দুধের দাম শোধ করে নাও। আমার বুক দু’টিতে হাত দিয়ে দেখো সে রাতের মতোই আছে।’
নিশিন্দার কথা ঠাণ্ডায় কেঁপে যাচ্ছে।
রাখালটা নিশির মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক জমাট বাঁধা অন্ধকারের মধ্যে দু’টি নারী-পুরুষ এ এক অবলা গাভী। জাবরের শব্দ আবার শোনা যাচ্ছে। সম্ভবত এতক্ষণে গাইটার জানা হয়ে গেছে আসলে তার পাশে যারা দাঁড়িয়ে আছে এরা প্রকৃতপক্ষে মানুষই বটে। ভয় পাবার মত অন্যকিছু নয়।
‘না, আমার কিছু চাই না। তুই চলে যা বাথান থেকে। আমি উপোসী একটা দেহের ওপর বলৎকার করে আমার পাপ আর বাড়াতে চাই না। যা বেরিয়ে যা।’
লোকটার কথায় নিশিন্দা তেমন অবাক হল না। সে জানে জানোয়ারের পাল চড়ালেও সে মুখহীন একটা হৃদয়বান পুরুষের কাছেই এসেছে।
‘চলে যাব?’
‘হ্যাঁ ভাগ!’
‘আমি কিন্তু এসেছিলাম!’
‘এলে কি হবে? এখন আমার কিছু চাইবার নেই। তুই ভাবিস খলার রাখালরা সব জানোয়ার?’
‘তাহলে আসি। সেদিনের খারাপ ব্যবহারের জন্য মাফ চেয়ে যাচ্ছি।’
‘দাঁড়া।’
নিশিন্দা অন্ধকারেই ফিরে দাঁড়াল।
‘আমার পাতিলে সেরখানেক জ্বাল দেয়া সর পড়া দুধ আছে, নিয়ে যা।’
নিশিন্দা অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে থাকল। না করল না।
লোকটা কোথায় যেন কিছুক্ষণের জন্য ডুব দিল।
একটু পরেই মাটির পাতিলের পেট এসে লাগল নিশিন্দার বুকে। ‘আয় তোকে গেট পার করে মাঠে পৌঁছে দিয়ে আসি।’
নিশিন্দা পাতিলটা ধরল। মনে হল গভীর ভালোবাসার দান যেন তার হাতে। যেন কোন অমৃতের ভাণ্ড তুলে দিয়েছে কোন অদৃশ্য ফেরেস্তা যার অস্তিত্ব হতে বাড়ালেই ছোঁয়া যায়।
‘না এগিয়ে দিতে হবে না। আমি যেতে পারব।’
‘খিদে পেলে আবার আসিস।’
‘আর কোনদিন অমন করে ক্ষিদে পাবে না বোধহয়।’
নিশিন্দা আর পেছনে তাকালো না। বাইরে পা দিয়েই দেখল প্রবল বৃষ্টির পর এখন আকাশে চাঁদ উঠেছে। আর পৃথিবী ভিজে কাদা হয়ে আছে তার ভেজা শাড়ির মতোই।
------৬------
পরের দিন নিশিন্দা সারাদিন পড়ে ঘুমালো। আজ তার মধ্যে কোনো খিদে তৃষ্ণার জ্বালা ছিল না। বেলা তিনটের দিকে জেগে সে কুয়োর পাড়ে গিয়ে গোছল করল। ভিজে শাড়ি পাল্টে ঘরে তুলে রাখা একটা লাল টাঙ্গাইলের শাড়ি পরল। সাথে টকটকে লাল রঙের ব্লাউজ। এগুলো নিশিন্দার তুলে রাখা বিয়ের দিনের পোশাক। ট্রাঙ্ক খুলে নিশিন্দা একটা মাদুলি ছড়া বের করে গলায় পরল চোখে কাজল পরে আয়নার সামনে গিয়ে চিরুনি দিয়ে টান করে আঁচড়িয়ে সিঁথি ঠিক করে খোঁপা বাঁধল। বাকি দিনটা অর্থাৎ সন্ধ্যার আঁধার নামার পূর্ব পর্যন্ত নিশিন্দা সাজগোজ করে দুয়ার খোলা রেখে বিছানায় এসে কাত হল।
ঘরে এখন একটা কোরোসিনের বাতি জ্বলছে। চৌকির ওপর এখন যে কেউ নিশিন্দাকে দেখলেই ভাববে সে কোন পুরুষের অপেক্ষায় বসে আছে। যেন আবদুল্লাহ আসবে বলে আগের মত নিশিন্দা অপেক্ষায় আছে। আজ তার দেহমনে কোন খিদের নখ আঁচড়ানো নেই। চেহারায় একটা নিরুত্তেজ দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছায়া ঝলকে উঠতে চাইছে। সে একবার রাম দা’টা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল। দায়ের ধারালো কিনার ছুঁয়ে তার মুখে একটা রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে গেল। তারপর হাত বালিশের নিচে ঢুকিয়ে গুলিভরা পিস্তলটা পরখ করে সে নিশ্চিন্তে বালিশে মাথা রেখে শুয়ে থাকল।
রাত বারোটা নাগাদ নিশিন্দা ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখতে লাগল। আবদুল্লাহ এসে যেন নিশিকে ঘুমের মধ্যে পেয়ে দুষ্টুমি করে তার ঠোঁটে আলতো করে একটা চুমু খেয়েই তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরেছে। আচমকা ঘুমের মধ্যে মানুষের ছোঁয়া পেয়ে নিশি লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসতে গেল। কিন্তু পারল না। কে যেন তাকে সজোরে বিছানার সাথে চেপে ধরার জন্য দু’বাহু দিয়ে শক্ত করে এঁটে কাবু করার চেষ্টা করছে। নিশি প্রাণপণে লোকটাকে ঠেলে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি? ছাড়ুন আমাকে। ছেড়ে দিন। নইলে চেঁচিয়ে গাঁয়ের লোক জড়ো করব।’
একটা ফ্যাসফেসে হাসির সাথে লোকটা নিশিন্দাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল, ‘আমি এসেছি নিশি। টাকা আর কাগজ নিয়ে এসেছি।’
‘ও ম্যানেজার সাব? তাই বলুন! আমি ভাবলাম কে না কে ঘরে ঢুকে আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। আসুন চৌকির ওপর বসে লেনদেনটা আগে হয়ে যাক। ঠিক আছে আমি বাড়ি ছেড়ে দেব। আগে টাকার বান্ডিলটা খুলুন। তারপর যা চান তাও দেব।’
‘আরে আমিতো সেকথাই বলতে এসে দেখি তুই পরীর মত ডানা মেলে শুয়ে আছিস। আমি তোর দু’টি উঁচু অই জিনিস দেখে নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি।’
‘তাই বুঝি এভাবে ঘুমের ভেতর কাউকে চেপে ধরতে হয়? আগে লেনদেন শেষ হোক। এ দুটো নিজের হাতে খুলে দেব।’
নিশিন্দা বুকের ওপর হাত রেখে ইঙ্গিতে লোকটার লোকে উসকে দিল।
‘শোন চামারসুন্দরী, আমার কথা শুনে চললে তোকে বাড়ি বিক্রি করেও থাকা খাওয়ার কষ্ট পেতে হবে না। আমি ইটখোলার কাছে তোকে ঘর বানিয়ে দেব। ইলেকট্রিক পাখা আর আলোর ব্যবস্থা করে দেব। আমিই তোর খাইখরচের ব্যবস্থা করব। আবদুল্লাহ বদমাশটার হাতে পড়ে তোর খুব ভোগান্তি হয়েছে। এখন থেকে রানীর হালে থাকবি।’
‘আগে বাড়ির দাম দিন।’
নিশিন্দার এসব কথায় কোন ভাবান্তর হলো না।
লোকটার চেহারার দিকে তার চোখ। তার বয়েস পঞ্চাশ বা ষাটের মতো হবে। তবে দশাসই শরীর। উত্তেজনায় মানুষটা যেন কাঁপছে। নিশির পরিষ্কার কথায় সে প্যান্টের পেছনের পকেটে হাত দিল।
এই নে তিরিশ হাজার। রেজিস্ট্রির সময় বাকিটা বুঝিয়ে দেব। এখন বায়নাপত্র সই করে দে।’
একটা কাগজ বুক পকেট থেকে বের করে নিশিন্দার সামনে তুলে ধরতেই নিশি চিলের মত ছোঁ মেরে কাগজটা ও টাকার প্যাকেটটা নিজের হাতে নিয়ে নিল।
‘সব বুঝে পেয়ে পরে এটা সই করে দেব। এখন টাকা আর কাগজ আমার কাছে থাক। আর বাঁচতে চাইলে এক্ষুনি এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।’
লোকটা নিশির আচরণে হঠাৎ যেন চমকে গেল, ‘জানিস এর পরিণাম কি?’
‘জানি। এ টাকায় আবদুল্লার খুনীদের আমি খুঁজে বের করব। আর কাগজ পাঠাবো জজ সাহেবের কাছে। আমি নিজে গিয়ে বলব বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য ইটখোলার মালিকেরা আমার স্বামীকে খুন করেছে।’
অদ্ভুত দৃঢ়তা নিয়ে বিছানার এক পাশে ছিটকে সরে যেতে চাইল নিশি।
লোকটা আর মুহূর্ত বিলম্ব না করে নিশির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে বিছানায় কাত করে ফেলতেই নিশিন্দার হাত চলে গেল রাম দা’টার ওপর। সে দা’টা টেনে এনেই মুখ ও মাথা বরাবর একটা কোপ বসিয়ে দিল। লোকটা হাত দিয়ে তা ঠেকাতে গেলে হাতের পাতার একটা দিক আঙুলসহ আলাদা হয়ে গেল। লোকটা ‘মাগো’ বলে এক লাফে বিছানা থেকে নেমে চারণভূমির দিকে দৌড়াতে লাগল।
নিশিন্দা ধীরে সুস্থে খাট থেকে নেমে দেখল ঘরটা মানুষের রক্তে ভেসে গেছে। সে একটা ন্যাকড়া নিয়ে মানুষের তিনটি কাটা আঙুল আলতো করে তুলে ছাইয়ের গাদার কাছে এসে এর মধ্যে সেঁধিয়ে দিল। তারপর বালতির পানিতে দা’টা ধুয়ে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে খিল এঁটে দিল। আর নিজের মনেই গুন গুন করে বলল, দেখি আবদুল্লার ভিটে থেকে কে আমাকে তাড়ায়? আমি যতদিন বেঁচে আছি এ ঘরেই থাকব।
এমন ঘুম নিশিন্দা আর কোনদিন ঘুমোয়নি। বিছানায়, বালিশে, মেঝেয় চাপ চাপ রক্তের আঁঠা আর একটা উঠকো গন্ধের মধ্যে নিশিন্দা খোঁপা খুলে চুল ছড়িয়ে শুয়ে পড়েছিল। তার মনে হয়েছিল সে সামনের চারণভূমির মতো বিশাল একটা মাঠ এক্ষুনি পার হয়ে এসেছে। শোয়ার আগে কেবল একবার রামদা’টা একটু পরখ করে নিয়েছিল। দায়ের ধারটা তার মনে হয়েছিল এক ধরনের সান্ত্বনার মত। দা’টা স্পর্শ করলেই তার আব্দুল্লার গরম ঠোঁট দুটোর কথা মনে হয়। তারপর লুটিয়ে পড়েছিল। ঘুমের আগে মুহূর্তমাত্র সে খতিয়ে দেখলো আগামীকাল সকালের সূর্য উঠলেই কি কি ঘটবে। থানার দারোগা এসে বাড়িটা ঘেরাও করে তাকে চুল ধরে টেনে থানায় নিয়ে যাবে। কিন্তু নিশিন্দা মনে মনে ভাবল কেন ওরা ওকে থানায় নিয়ে যাবে? তার বিরুদ্ধে নালিশটা কি? সে মৃত আবদুল্লার বৌ। তার স্বামী এই দত্তখোলাবাসীর মঙ্গলের জন্য আজ পর্যন্ত যা করেছে তা এলাকাবাসীর মর্মে গেঁথে আছে। আবদুল্লার কারণেই দত্তখোলার লোকেরা জমিজমা খুইয়েও দুটো পেটের ভাত যোগাড় করতে পারছে। আবদুল্লাহ না থাকলে দত্তখোলার চামার, মাঝি ও কামারের দল বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হতো। আবদুল্লাহ মালিকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বলেই এরা এখনও নদী পেরিয়ে যায়নি। নইলে শহরের পথে পথে এরা ভিক্ষে করতো। ওদের বৌঝিরা গতর বিকিয়ে খেত। আবদুল্লাহই ওদের বাঁচিয়ে ছিল। মালিকরা কেবল আবদুল্লাহর জন্যই গাঁটা উচ্ছেদ করতে পারেনি। আর গাঁয়ের মানুষগুলোও এখন রুখে দাঁড়াতে শিখেছে। সেদিন দারোগার মুখের কথা কেটে কথা বলতে ভয় পায়নি চামারের ছেলেরা। আজ একটু আগে ইটভাটার ম্যানেজারের লোভী আঙুল ক’টি রামদা দিয়ে আলগা করে ফেলেও সে নিশি বাড়ি ছেড়ে পালায়নি, এতে সে নিজেই অবাক। ভেতরে গুমরে উঠছে একটা মাত্র যুক্তি, আমি আবদুল্লাহর বৌ, আমার ইজ্জত বাঁচাতে আমি যা করেছি সেটাই এক অসহায় নারীর বাঁচার পথ। কি করবে আইন? আইন যদি ম্যানেজার, দারোগা আর জোতদারদের পক্ষে থেকে তার গায়ে হাত দিতে চায় তাহলে মানুষের চোখ আঁকা ঐ রামদা’টা দেশের কামারেরা কেন বানিয়েছে? আইন তার ইজ্জতের ওপর হামলা করতে চাইলে নিশিন্দা সবকিছুর ওপর দায়ের কোপ মারবে। এখন দা’টাই আবদুল্লাহ। কাল সকালের ভয়ে সে আজকের ঘুমটা মাটি করবে?
না তা করবে না নিশিন্দা। আসুক সকালে দারোগা। সেও ডেকে আনবে দত্তখোলার অসংখ্য চামার আর মাঝিদের। সবাই জানে ঋষিরা সবই সহ্য করতে জানে কিন্তু নিজেদের জাতের মেয়েদের গায়ে শহরের ভদ্রলোকদের হাত বাড়ানো সহ্য করে না।
আর নিশিন্দা আব্দুল্লাহর বৌ হলে কি হবে সেও চামারদের মেয়ে। নিশির বাপ ছিল দত্তখোলার সর্দার। কি করবে ম্যানেজার আর রমিজ দারোগা? গায়ে হাত দিলে দায়ের কোপ। এর চেয়ে বেশি কোন আইন বোঝে না নিশিন্দা চামারণী। আসুক দারোগা।
একবার ভাবলো সে এখনই রামদা হাতে দত্তখোলার ঘরে ঘরে গিয়ে পুরুষদের জাগিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমি নিশিন্দা নারী, খলার ম্যানেজার আমার ইজ্জতের ওপর হামলা করেছিল বলে আমি তার পাপী আঙুলগুলো কেটে ছাইয়ের গাদায় পুঁতে রেখেছি। তোমরা সাক্ষী থেকো। রমিজ দারোগা ফোর্স নিয়ে এলে তোমরাও হাজার হাজার চামার নর-নারী তোমাদের যার ঘরে যা আছে দা, কুড়াল, ঝাঁটা, লাঠি নিয়ে আমার পক্ষে থেকো। ওরা আবদুল্লার নাম নদীর এপার থেকে মুছে দিতে চায়, আমি এ নাম মুছতে দেব না।’
ভাবতে ভাবতেই নিশির দু’চোখে আবার সেই হারিয়ে যাওয়া উদ্ভট স্বপ্নটা ফিরে এল যেন। সেই রক্তমাখা শিংঅলা গরুর পাল। কিন্তু এখন আর স্বপ্নের মধ্যে গাভীগুলোকে প্রথম সারিতে দেখা গেল না। বরং মনে হল এক পাল ষাঁড় যেন তার দিকে মুখিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওলানের বদলে প্রতিটি গরুর নাভীর পেছনে ঝুলছে বিশাল বিশাল আতাফলের মতো হলুদ অণ্ডকোষ। কোনটার পেটের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে লাল টকটকে পুরুষাঙ্গ। কোনটার অগ্রভাগ চুঁইয়ে নামছে ফোঁটা ফোঁটা মুত।
নিশিন্দা সামনে এগিয়ে গেল।
‘এই ষাঁড়ের দল তোদের কে এখানে আসতে বলেছে?’
সামনের বিরাট গজওয়ালা ষাঁড়টা সহসা যেন মুখ নামিয়ে দিয়ে জিব দিয়ে নিজের তলদেশ ও নাভী চাটল আর মুখটা ফিরিয়ে আনতেই মুখটা হয়ে গেল মানুষের মুখ। কেমন যেন আবদুল্লাহর মতো লাগছে। গরুটা বিকট শব্দে হাম্বা রব তুলে সেদিনের গাভীটার মতো কথা বলে উঠল, ‘আমাদের আবদুল্লাহ পাঠিয়ে দিয়েছে।’
‘এ্যাই হারামজাদা, মিছে কথা বললে ছেনি দিয়ে আমি তোর জিব কেটে ফেলব। জানিস না যে আবদুল্লাহ খুন হয়েছে?’
নিশিন্দা পালটাকে ধমকে উঠল।
কিন্তু গরুগুলো একটুও নড়ল না। বরং ঘাড় নাড়িয়ে, লেজ দুলিয়ে মাছি তাড়াবার মতো ভঙ্গি করল মাত্র।
‘আমাকে ফাঁকি দিয়ে কি লাভ? আমি তোদের কি ক্ষতি করেছি? আর আমি কি আমার বাড়িতে বাথান খুলেছি যে তোরা যখন তখন এসে উঠোনে গোবর আর মুত ঝরাবি? নিজের জ্বালায়ই নিজে বাঁচি না। আবদুল্লাহকে মেরে ওরা এখন আমার ইজ্জতের ওপর হামলা করতে চায়।’
‘আবদুল্লাহ মরেনি।’
ষাঁড়টা বিপুল শব্দে হাম্বা রব তুলে কথা বলছে।
‘আবদুল্লাহ মরেনি তো খুন হল কে?’
নিশিন্দার গলা কেঁপে গেল। আশা এবং হতাশায় তার বুক দুটোকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়ে হৃৎপিণ্ড দুলে দুলে ধড়ফড় করতে লাগল। নিশিন্দা যেন এক্ষুনি ষাঁড়টার বাঁকা শিং দুটোকে দু’হাতে চেপে ধরবে।
‘আবদুল্লাহ খুন হয়েছে। তবে মরেনি। আবদুল্লাহ চিরকাল আমাদের মধ্যে থাকবে। শহীদরা যে মরে না তা আমাদের মতো গরুও জানে। আর তুই আবদুল্লাহর বৌ কিছুই জানিস না?’
ষাঁড়টার কথার মধ্যে এক ধরনের টিটকারীর চটচটে ভাব আছে।
‘জানব না কেন? জানি বলেই তো এবাড়ি ছেড়ে যাইনি। যাবো না কোনদিন। আজ রাতে নোংরা বুড়োটা গায়ে হাত দিতে এসেছিল। বাড়ি কিনতে এসেছিল। আমি আঙুল কেটে রেখে দিয়েছি। আমি আবদুল্লাহর বৌ...।’
ঘুমটা ছুটে গেলে নিশিন্দা শুনতে পেল বাড়ির বাইরে হট্টগোল চলছে। সে লাফ দিয়ে উঠে রাম দা’টা হাতে নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল।
উঠোনে তখন দত্তখোলার চামার পাড়ার ঋষি নরনারী, ছেলেবুড়ো, বৌ-বাচ্চার একটি বিরাট জমায়েত। সকলেই হাতে দা-খোন্তা আর পাট কাটার ছেনি, হাতে দাঁড়িয়ে আছে। নিশিন্দাকে দেখেই একটি চামার ছেলে এগিয়ে এসে বলল, ‘পুলিশ তোকে ধরতে এলে আমরা সবাই থানায় যাব। মিছিল করে যাব। তুই ম্যানেজারটার হাত কেটে দিয়েছিস বেশ করেছিস। তুই আব্দুল্লাহর মতো আমাদের জন্য দাঁড়িয়েছিস। আমরা তোর পক্ষে।’
‘আমাকে খেতে দেবে কে? আমি যে ক্ষুধার্ত।’
‘আমরা দেব। দত্তখোলা দেবে।’
‘আমরা দেব। আমাদের গাঁ দেবে।’
‘আমাকে আব্রু দেবে কে? আমার ছতর যে উদোম! আমার ইজ্জত?’
‘আমরা বাঁচাব। তুই রাম দা নিয়ে জেগে থাক। আবদুল্লাহর মতো।’
সমস্বরে জবাব দিয়ে উঠল দত্তখোলার নারী-পুরুষরা।
নিশিন্দা দলটির দিকে তাকাল। যেন স্বপ্নে দেখা পালটা সূর্যের আলোয় সত্য হয়ে উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে একটু একটু করে উঠোনের মধ্যে এসে দাঁড়াল। গ্রামবাসীর ভিড়ের মধ্যে দা’টা উঁচু করে জোরে জোরে বলতে লাগল, ‘আমি জানি আজ আমাকে রমিজ দারোগা ধরতে আসবে না। যারা ইজ্জতের ওপর হামলা চালায় তারা এখন নিজের আঙুল কাটার বেইজ্জতী লুকোতে চাইবে। কোন মামলা হবে না। এ বাড়িতে পুলিশও আসবে না। যদি আজকের মতো তোরা আমার পাশে থাকিস। আমি আবদুল্লার ভিটের ওপর এই খড়গটা হাতে নিয়ে জেগে থাকব।’
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1330)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
-
▼
2019
(6282)
-
▼
March
(458)
-
▼
Mar 08
(17)
- ভারতীয় মিগ-২১: কেন এতো দুর্ঘটনায় পড়ছে?
- অযোধ্যা মামলা মধ্যস্ততায় নিষ্পত্তির আদেশ ভারতের সর...
- চুক্তিতেই ভারতের বিরুদ্ধে এফ-১৬ ব্যবহারের অনুমতি দ...
- গাছের ওপর বোমাবর্ষণ: ভারতীয় পাইলটদের বিরুদ্ধে এফআই...
- স্বাধীনতাপন্থী কাশ্মীরী নেতা কারাগারে
- ভূমির ভোগান্তি কমবে কি by পার্থ শঙ্কর সাহা
- ডাকসু নির্বাচন: ৬ ঘণ্টা ভোট কার স্বার্থে by মুনির ...
- রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলা: মধ্যস্থতার পথেই রা...
- বিবাহিত কুমারী প্রসব করলেন কন্যা সন্তান
- শপথের পরেই দল থেকে বহিষ্কার: এমপি পদ টিকবে কী?
- ৭ই মার্চের ভাষণকে যারা নিষিদ্ধ করেছিল তারা আঁস্তাক...
- ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করেছেন যে দুই পাইলট
- অর্জন অনেক এগুতে হবে আরো by মরিয়ম চম্পা
- ভারতে হামলায় জইশকে ব্যবহার করেছে আইএসআই -পারভেজ মো...
- ভূমির সমার্থক হয়ে উঠেছে ভোগান্তি by শামসুল হুদা
- ডাকসুতে গায়ের জোরে ভোট নেবে, খাতির করে ৪/৫টা দেবে:...
- উপন্যাস- নিশিন্দা নারী by আল মাহমুদ
-
▼
Mar 08
(17)
-
▼
March
(458)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...