Sunday, August 24, 2025

পশ্চিম তীরে তিন হাজার জলপাইগাছ উপড়ে ফেলল ইসরায়েলি সেনারা

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লার কাছে একটি গ্রামে ইসরায়েলি সেনারা প্রায় তিন হাজার জলপাইগাছ উপড়ে ফেলেছে। গ্রাম পরিষদের উপপ্রধান এ তথ্য দিয়েছেন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আল-মুগাইর নামের গ্রামটির শূন্য দশমিক ২৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে। রামাল্লার উত্তর–পূর্বে এ গ্রামটির অবস্থান। এখানে প্রায় চার হাজার মানুষের বসবাস।

গ্রাম পরিষদের উপপ্রধান মারজুক আবু নাইম ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফাকে বলেন, শনিবার ভোর থেকে ইসরায়েলি সেনারা ৩০টির বেশি বাড়িতে ঢুকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পদ এবং গাড়ি ধ্বংস করেছে।

জলপাইগাছকে ফিলিস্তিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি সেনারা দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটিতে জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। ফিলিস্তিনি জমি দখল ও বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার চেষ্টায় এমনটা করা হয়ে থাকে।

ইসরায়েলি সেনাদের দাবি, জলপাইগাছগুলো গ্রামের ভেতর দিয়ে তাদের বসতি এলাকার দিকে চলে যাওয়া প্রধান সড়কটির জন্য ‘নিরাপত্তা হুমকি’ তৈরি করছিল।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তরের (ওসিএইচএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ২ হাজার ৩৭০ বারের বেশি হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে রামাল্লা এলাকায়। সেখানে ৫৮৫টি হামলা হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে উত্তরাঞ্চলীয় নাবলুস এলাকা। সেখানে ৪৭৯টি হামলা হয়েছে।

একই সময়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে কমপক্ষে ৬৭১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১২৯ জন শিশু।

গত শনিবার আল-মুগাইর গ্রামে জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার বিষয়ে আল–জাজিরার পক্ষ থেকে ইসরায়েলি সেনাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তবে তারা তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

ফিলিস্তিনের গবেষক হামজা জুবেইদাত মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের নিজেদের ভূখণ্ড থেকে উৎখাত করতে চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইসরায়েল এ ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

আল–জাজিরাকে জুবেইদাত বলেন, ‘১৯৬৭ সাল থেকে ইসরায়েল একই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ করে যাচ্ছে। সেটি হলো—পশ্চিম তীরের শহর ও গ্রাম থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা। এখন যা ঘটছে, তা এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ারই ধারাবাহিকতা। ইসরায়েলের নতুন কোনো প্রক্রিয়া নয়।’

জুবাইদাতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আল-মুগাইরের কৃষির ইতিহাস অনেক পুরোনো। পশ্চিম তীরের অন্য গ্রামের মতোই এখানকার মানুষও মূলত কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল।

জুবেইদাত বলেন, ‘যে এলাকা থেকে তিন হাজারের বেশি জলপাইগাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে, সেটি রামাল্লা অঞ্চলের সবচেয়ে উর্বর ভূমিগুলোর একটি। গাছ কেটে ফেলা, পানির উৎস দখল, ফিলিস্তিনিদের খামার ও পানির উৎসের কাছে যেতে বাধা দেওয়ার মানে হলো তাদের খাদ্য ও পানির অনিশ্চয়তা আরও বেড়ে যাওয়া।’

এদিকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলা চলছেই। হামলায় নতুন করে ৬৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৬২ হাজার ৬০০–এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

পশ্চিম তীরের আল-মুগাইর গ্রামে জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে
পশ্চিম তীরের আল-মুগাইর গ্রামে জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। রয়টার্স ফাইল ছবি

মাহবুব তালুকদারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ: বেঁচে থাকলে তোমার স্বপ্নের বাংলাদেশ দেখতে পেতে

একে একে তিনটি বছর পার হয়ে গেল, তুমি চলে গেছ। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়!  মনে হয়, এই তো তুমি লিভিং রুমে বসে পত্রিকা পড়ছো, আমি কাছে গিয়ে তোমাকে ছুঁতে পারবো। আমাকে দেখে তুমি জিজ্ঞেস করলে, ‘আজ কি রান্না করছো?’ খাওয়া-দাওয়া তুমি খুব পছন্দ করতে।

তুমি নতুন বাংলাদেশ দেখতে পেতে। নিবিড় তিমির অমানিশা ভেদ করে নতুন সূর্য ছিনিয়ে এনেছে বাংলার ছাত্র-জনতা। আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলাম! এখন আর রাতের ভোট নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নাই।

যে নির্বাচন নিয়ে হুদা এবং তার দলের সঙ্গে পাঁচটা বছর তুমি একা লড়াই করেছ, সেই নির্বাচন কলুষমুক্ত হবে আশা করি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সমস্ত হিসাব বদলে দিয়েছে। তোমার ভাষায় ‘মূক’ জনতার মুখে ভাষা ফুটেছে। জনগণ সবই দেখে, সবই বোঝে, শুধু একটা দিয়াশলাইয়ের কাঠির জ্বলে ওঠার অপেক্ষা। তারা অধিকার আদায় করতে রাস্তায় নেমেছে। প্রবল শক্তিধর সিইসি নুরুল হুদাকে প্রকাশ্যে অপমান করেছে। নুরুল হুদা পাঁচটা বছর তোমাকে কী পরিমাণ অপমান করেছে! তুমি ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলে, সেটা নিয়েও কতো কটূক্তি করেছে। কিন্তু তোমার শক্তি ছিল দেশের মানুষের ভালোবাসা। তারা তোমাকে গ্রহণ করেছিল।

তুমি তোমার কাজে অটল ছিলে। তুমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলে, তাই একাই লড়াই চালিয়ে গিয়েছ। পাঁচটা বছর নির্বাচন ব্যবস্থাকে ভেতর থেকে যেভাবে দেখেছ, তাকেই কাগজে কলমে রূপ দিয়েছ। লিখেছ ‘নির্বাচননামা’। এটি একটি দলিল। এতে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিক নানা অসঙ্গতি নিয়ে লিখেছ। তুমি আশা করেছ, একদিন এই অমানিশা কেটে যাবে, নতুন সূর্য উঠবে। কবিরা স্বপ্নদ্রষ্টা, তারা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়!

বিয়ের পর তুমি একদিন বলেছিলে, ছোটবেলায় তুমি একটা স্বপ্ন দেখেছিলে, তোমার মরদেহের উপর ফুল দিয়ে ঢাকা। কী আশ্চর্য! তোমার কফিন বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা দিয়ে ঢাকা হলো আর সেই পতাকার উপর ছিল পুষ্পস্তবক! তোমাকে গার্ড অব অনার দেয়া হলো। আরও আশ্চর্যের ব্যাপার, তোমার নির্বাচন কমিশনে কার্যকালের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। ‘নির্বাচননামা’ বইটি লিখতেও তোমার লাগলো পাঁচ বছর, আর ক্যান্সারে আক্রান্ত তোমার জীবন প্রদীপও নিভে গেল পাঁচ বছরেই!

তোমার কবি মন কেমন করে বুঝতে পেরেছিল যে, সময় দ্রুত শেষ হয়ে আসছে! তাই তো তুমি লিখেছ, ‘মৃত্যুর পরেও আমার দু’চোখ উন্মীলিত থাকবে দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য। মানুষ নির্বাচনের সাঁকো বেয়ে গণতন্ত্রের আবাসভূমিতে যথাযথভাবে পৌঁছাতে পারছে কিনা, সেটা দেখার জন্য। কেউ তখন আমার চোখের পাতা বন্ধ করে দেবেন না, এই প্রত্যাশা পরিবার-পরিজনের কাছে।’

* নীলুফার বেগম
- সহধর্মিণী এবং মুক্তিযোদ্ধা

mzamin

গাজায় বিশ্ব খাদ্য নজরদারি সংস্থাগুলোর দুর্ভিক্ষ সতর্কতা

গাজায় আবারও দুর্ভিক্ষের বিষয়ে সতর্ক করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সহায়তা সংস্থা ও জাতিসংঘের উদ্যোগে গঠিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)। সংস্থাগুলো বলছে, গাজার একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে এবং আগামী এক মাসের মধ্যে তা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

আইপিসি’র মতে গাজায় বর্তমানে দুর্ভিক্ষের শিকার প্রায় ৫ লাখ ১৪ হাজার মানুষ। যা মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ। সংখ্যাটি সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ৬ লাখ ৪১ হাজারে পৌঁছাতে পারে। এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তর গাজার প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। এদের সকলেই গাজা শহরের আশেপাশের। আইপিসি এই অঞ্চলকে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়া প্রথম এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইপিসি আরও জানিয়েছে, আগামী মাসের মধ্যে মধ্য ও দক্ষিণ গাজার দেইর আল-বালাহ এবং খান ইউনিসও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে পারে।

আইপিসি’র এই প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা ও পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরাইল। গাজায় ত্রাণ সমন্বয়কারী ইসরাইলি সামরিক সংস্থা জানিয়েছে, আইপিসি তাদের জরিপটি হামাসের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছে। তাদের দাবি, প্রতিবেদনে ইসরাইলের ত্রাণ সরবরাহের তথ্যকে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং সম্প্রতি ত্রাণ সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও দেখানো হয়নি। তারা দঢ়ভাবে গাজা শহরে দুর্ভিক্ষের দাবি অস্বীকার করেছে এবং প্রতিবেদনটিকে ‘অপেশাদার’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

আইপিসি’র সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট কিছু বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- মোট জনসংখ্যার কমপক্ষে ২০ শতাংশ চরম খাদ্য সংকটে ভুগবে। প্রতি তিনটি শিশুর মধ্যে একটি তীব্র অপুষ্টির শিকার হবে। প্রতিদিন প্রতি ১০ হাজার মানুষের মধ্যে অন্তত দুজন অনাহারে বা অপুষ্টিতে মারা যাবে। যদি কোনো অঞ্চলে এই শর্তগুলো পূরণ নাও হয়, তবুও আইপিসি সেখানে ‘দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি’ ঘোষণা করতে পারে, যা চরম অনাহার, দুর্দশা এবং মৃত্যু নির্দেশ করে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক জানিয়েছেন, গাজায় দুর্ভিক্ষ ইসরাইলি সরকারের পদক্ষেপের সরাসরি ফলাফল। অনাহারে মৃত্যু যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার এই সংস্থাটি। আইপিসি বিশ্লেষণ এমন এক সময়ে এসেছে যখন ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের অনেক দেশ গাজার মানবিক সংকটকে অকল্পনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও গাজায় একটি ‘মহাকাব্যিক মানবিক বিপর্যয়’ সম্পর্কে বারবার সতর্ক করেছেন। জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে গাজায় ত্রাণ পৌঁছানো এবং বিতরণের ক্ষেত্রে বাধা নিয়ে অভিযোগ করে আসছে।

গত ১৪ বছরে এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো আইপিসি দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে। এর আগে ২০১১ সালে সোমালিয়া, ২০১৭ ও ২০২০ সালে দক্ষিণ সুদান এবং ২০২৪ সালে সুদানের কিছু অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সম্প্রতি রয়টার্স ও ইপসোস এর একটি জরিপে দেখা গেছে যে, ৬৫ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন যে দেশটির গাজার অনাহারী মানুষদের সাহায্য করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রের জনসমর্থনে এমন পরিবর্তন ইসরাইলের জন্য একটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক সহযোগী।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরাইলে হামলা চালায়, যেখানে ১,২০০ জন নিহত হয় এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়। এরপর থেকে ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গাজায় ৬২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এই সংঘাতের অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, কাতার এবং মিশর মধ্যস্থতা করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

mzamin

ইসরাইলে লাখো মানুষের বিক্ষোভ: সরকারের স্বার্থ রক্ষায় কেন জিম্মিদের বলি দেব?

ইসরাইলের বিভিন্ন শহরে লাখো মানুষ রাস্তায়। সরকারের গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনা ও হামাস সমর্থিত সীমিত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের মাঝেই তারা পথে নেমেছেন। তাদের দাবি জিম্মিদের মুক্তির জন্য অবিলম্বে চুক্তি করতে হবে। তেল আবিবের হোস্টেজ স্কয়ারে সাপ্তাহিক সমাবেশে অপহৃত যমজ গালি ও জিভ বারমানের ভাই লিরান বারমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রী জিম্মিদের বলি দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ৪২ জন জিম্মিকে গাজায় জীবিত নেয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের মৃতদেহ ফিরেছে। তাদের বাঁচানো যেত। আমি চাই না আমার পরিবার ৪৩তম শোকার্ত পরিবার হোক।

তিনি আরও বলেন, ইসরাইল রাষ্ট্র এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আমরা কি জিম্মিদের আশা ছেড়ে দেব এবং তাদেরকে কি ক্ষমতাসীন জোটের স্বার্থ রক্ষার জন্য বলি দেব? আমি এখান থেকে প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বান জানাচ্ছি- অপেক্ষা করবেন না, এগিয়ে যান। তাদের ফিরিয়ে আনুন- সবাইকে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন হারেৎজ।

অপহৃত সেনা মাতান আংগ্রেস্টের পিতা হাগাই আংগ্রেস্ট বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে বাধ্য করতে হবে যেন তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি উপস্থাপন করেন। ৭ অক্টোবরে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। আলন শিমরিজের ভাই ইয়োনাতান শিমরিজ গাজায় আইডিএফ-এর গুলিতে নিহত হন। শিমরিজ বলেন, যখন আলন নিহত হল, তারা আমাদের বলেছিল যুদ্ধ ও সামরিক চাপ জিম্মিদের ফিরিয়ে আনবে। আমরা বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সামরিক চাপ জিম্মিদের মেরে ফেলে। এটা কোনো স্লোগান নয়, এটাই বাস্তবতা। তামির আদারের মৃতদেহ এখনো গাজায় আটকে আছে। তার বোন রনি আদার বলেন, দিন, জিম্মি, হতাশার প্রহর গুনতে গুনতে আমি ক্লান্ত। যদি নাগরিকদেরই না বাঁচাতে পারে তাহলে রাষ্ট্রের কাজ কী? তেল আবিবে বেগিন গেটেও বিক্ষোভে লোকজন রাস্তায় আগুন জ্বালায়।

নিহত জিম্মি আব্রাহাম মুন্ডারের আত্মীয় মানো মোর বলেন, সামরিক চাপ জিম্মিদের কফিনে ফিরিয়ে আনে এই কথাটাই আজকের বাস্তবতার সঙ্গে বেশি মানানসই। তিনি আরও বলেন, তাদের মৃত্যু বৃথা গেছে, কোনো সামরিক উদ্দেশ্যও পূরণ করেনি। নেতানিয়াহু তাদের নিজের ক্ষমতার জন্য বলি দিয়েছেন। আলোচনার টেবিলে চুক্তি ছিল, কিন্তু তিনিই তা আটকে রেখেছেন। জেরুজালেম ও হাইফাতেও ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। হাইফায় টম ৭ অক্টোবর কিবুতজ কিসুফিমে আইডিএফের গুলিতে নিহত হন। তার পিতা ইয়াকভ গডো বলেন, যে যুদ্ধাপরাধ আমার ছেলেকে হত্যা করেছে, সেই একই অপরাধ গাজায় চলেছে। অসংখ্য জিম্মি বোমা হামলায় নিহত হয়েছে, নিরীহ বেসামরিকদের গণহত্যা হয়েছে, গাজা সিটি দখল হয়েছে, জীবিত জিম্মিদেরও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।

প্রতিবাদের আগে জিম্মিদের পরিবারগুলো সতর্ক করে বলেছে, গাজা দখলের পরিকল্পনা হলে আলোচনা ভেঙে পড়বে। মাতান নামের এক জিম্মির মা আইনাভ জাঙ্গাউকার বলেন, যদি গাজা দখল শুরু হয়, কোনো চুক্তি হবে না। দখল মানে আলোচনা শেষ, আর জিম্মি ও সেনাদের মৃত্যু।

অন্য এক জিম্মি নিমরোদের পিতা ইয়েহুদা কোহেন বলেন, নেতানিয়াহু জনগণকে ভুল বুঝাচ্ছেন। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেন, শুধু আপনিই বিবিকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে পারেন। সময় এখনই। ইতজিক হর্নের ছেলে এতান এখনো বন্দি। তিনি বলেন, যুদ্ধ ইতিমধ্যেই সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে। সরকার এখন উগ্রপন্থিদের হাতে। তারা আমাদের সন্তানদের মেসিয়ানিক কল্পনার জন্য বলি দিতে চায়। আমি ইসরাইলের জনগণের কাছে আবেদন করছি, আপনারাই আমাদের আশা। শনিবার উত্তরের বিভিন্ন মোড়ে, যেমন হাগোমা, নাহালাল ও কারকুর সংযোগস্থলে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেছে। মঙ্গলবারের জন্য হোস্টেজেস অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিজ ফোরাম একটি জাতীয় সংগ্রামের দিন ঘোষণা করেছে। 

mzamin

চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক মেরামতের আসল কারণ by হার্স ভি পান্থ

বহু বছরের উত্তেজনার পর ভারত ও চীন আবার ঘনিষ্ঠ হচ্ছে।

সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দিল্লিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাঁচ বছর পর প্রথমবারের মতো প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচল ফের চালু করার প্রস্তুতি চলছে।

২০২০ সালে সীমান্ত সংঘাতে অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা ও ৪ জন চীনা সেনা নিহত হওয়ার পর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (এস জয়শঙ্কর) সর্বশেষ বৈঠকটি ছিল মাত্র দ্বিতীয় বৈঠক।

ওয়াং ইর এই ‘ইতিবাচক’ বৈঠকগুলো সাত বছর পর মোদির চীন সফরের আগে একটা ভালো পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। এ মাসের শেষে চীন সফরে মোদি দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

ভারত–চীন সম্পর্কের পুনর্মিলনকে ট্রাম্পীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এর কারণ হলো ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে অস্থিরতা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের আমদানির ওপর বিস্ময়করভাবে ৫০ শতাংশ শুল্কের বোঝা চাপিয়েছেন, যেটি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো অভিযোগ করেছেন, ভারত আসলে ‘বিশ্বব্যাপী রাশিয়ার তেলের সংগ্রহ ও বিতরণের কেন্দ্র’ হিসেবে কাজ করছে। নিষেধাজ্ঞায় থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারত শোধন করে বিশ্বের নানা দেশে উচ্চ মূল্যে রপ্তানি করছে। এর মাধ্যমে মস্কো তার অতি প্রয়োজনীয় ডলারের জোগান পাচ্ছে।

শীতল যুদ্ধের সময়কার হুমকির ভাষা পুনরাবৃত্ত করে নাভারো সতর্ক করে বলেন, ‘ভারত যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হতে চায়, তবে দেশটিকে ঠিকমতো আচরণ শুরু করতে হবে।’

এটা সত্যি যে ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অনেক বাড়িয়েছে। কিন্তু এর আগে বাইডেন প্রশাসনই দিল্লিকে বলেছিল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখতে রাশিয়া থেকে তেল কিনতে।

কিন্তু ট্রাম্পের কাছে এই ধরনের যুক্তির কোনো মূল্য নেই। ট্রাম্প আশা করেছিলেন ভারত তার সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি একটি বাণিজ্যচুক্তি করবে, কিন্তু আলোচনার শর্তের ওপর দিল্লির কঠোর অবস্থানের কারণে সেই আশা পূরণ হয়নি। যে ব্যক্তি ইউক্রেনের চেয়ে প্রায়ই রাশিয়াকে বেশি প্রশংসা করেন তাঁর কাছে ভারতের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক বসানোর পেছনে এটাই সত্যিকারের যুক্তি।

যাহোক, ট্রাম্প যখন প্রকাশ্যেই একটি দেশ ও তার নেতৃত্বকে অপমান করেছেন, তখন যা–ই ঘটুক না কেন, ভারতের জনগণের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি মনোভাব তিক্ত হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাণিজ্যের মতো কঠিন বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের চুক্তি করতে পারার সক্ষমতা আরও কমে আসছে।

শুধু তা–ই নয়, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত খুব সাবধানে যে ইন্দো-প্যাসিফিক নীতিমালা তৈরি করেছিল, সেটাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। কারণ, কোয়াড জোটের ভবিষ্যৎ (ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র এই জোট গড়ে তুলেছে) নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বিভক্তি তাই বেইজিংয়ের জন্য এমন একটি সুযোগ হিসেবে এসেছে, যার জন্য দেশটি দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করে ছিল। ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করার জন্য চীনের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সম্পর্ক পুনর্গঠন করার পাশাপাশি একসময় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া ভারত–মার্কিন অংশীদারত্বের তীক্ষ্ণ প্রভাব কমানোর সুযোগও চীনের সামনে তৈরি হয়েছে।

এরপরও ট্রাম্পের আচরণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটাকে দেখা প্রাথমিকভাবে ভুল হবে। যদিও ট্রাম্পের পদক্ষেপ চীন–ভারতের সম্পৃক্ততাকে ত্বরান্বিত করতে পারে, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে খুব সতর্কভাবে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া চলছিল গত অক্টোবর মাস থেকে। সে সময় ভারত ও চীন বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর উদ্দেশ্যে টহলব্যবস্থা নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল।

২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকে দিল্লি বারবার দাবি করেছে যে সীমান্তের বর্তমান অবস্থান, বেইজিং নিজেদের পাশে তাঁবু ও পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করে একতরফাভাবে পরিবর্তন করেছে।

গত বছর চীন যখন সীমান্ত–সংক্রান্ত অবস্থান থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হলো, তখন সেটিকে একধরনের অপ্রকাশিত স্বীকারোক্তি হিসেবে ধরা হলো যে প্রকৃতপক্ষে সংকটের কারণ ছিল বেইজিংয়ের কর্মকাণ্ড। ফলে দিল্লি চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের পদক্ষেপ নেয়।

এর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চীন এ বছর তিব্বত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় তীর্থস্থানে যেতে ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের অনুমতি দিয়েছে। ভারত চীনা পর্যটকদের জন্য ভিসা সেবা আবার চালু করেছে। নির্দিষ্ট পাসের মাধ্যমে সীমান্ত বাণিজ্য ফের চালুর আলোচনা শুরু করার ব্যাপারে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।

ওয়াং ইর সাম্প্রতিক সফরে দুই পক্ষ সীমান্ত নির্ধারণের জন্য নতুন বিশেষজ্ঞ ও কার্যনির্বাহী দল গঠনের সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এর পাশাপাশি ভারতকে সার, বিরল খনিজ ও টানেল বোরিং মেশিন দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে চীন। দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে এই আমদানিতে প্রভাব পড়েছিল।

কিন্তু ভারতে খুব কম লোকই আছেন যাঁরা চীন–ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন। অতীতে বহুবার সম্পর্ক ফের চালু করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক, ভারত চীনের উদ্দেশ্য নিয়ে সতর্ক থাকবে। কারণ, দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের মৌলিক প্রকৃতি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং দিল্লি চায় এমন একটি প্রতিরোধ–কাঠামো গড়ে তুলতে, যাতে ২০২০ সালের মতো পরিস্থিতি আর সৃষ্টি না হয়।

এবারে ভারত–চীন সম্পর্ক আবার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের যদি কোনো ভূমিকা থেকে থাকে, সেটা একেবারেই প্রান্তিক।

* হার্স ভি পান্থ, ভারতের দিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি এবং কিংস কলেজ লন্ডনের ভিজিটিং অধ্যাপক
- টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-23%2F0v7pywfa%2Fjjj-ll.JPG?rect=0%2C9%2C624%2C416&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই দিল্লিতে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ছবি : রয়টার্স

গাজায় ক্ষুধার কষ্ট বাড়ছে, তীব্র অপুষ্টিতে সোয়া ৩ লাখ শিশু

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। অপুষ্টির শিকার এসব শিশুর চিকিৎসা করতে অন্তত ১০টি হাসপাতাল দরকার। গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া ও নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের শিশু হাসপাতালের পরিচালক আহমদ আল-ফারা এ কথাগুলো বলেছেন।

আবু সালমিয়া বলেন, শিশুদের পাশাপাশি গাজার বিভিন্ন হাসপাতালে আহত হয়ে আরও যাঁরা ভর্তি হয়েছেন, তাঁরাও বিভিন্ন মাত্রায় অপুষ্টিতে ভুগছেন। অপুষ্টি গাজার অন্যতম প্রধান সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

আল-ফারা বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে ভর্তি ১২০টি শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার। যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে, সারা জীবন তাদের মাশুল গুনতে হবে।’

গাজার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, গতকাল শনিবার বেলা তিনটা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় গাজায় অপুষ্টিতে আরও আট শিশু মারা গেছে। ইসরায়েল হামলা শুরুর পর গত প্রায় দুই বছরে গাজায় এ নিয়ে অন্তত ২৮১ জন অপুষ্টিতে মারা গেছেন, যাঁদের মধ্যে শিশু ১১৪টি।

গত শুক্রবার দ্য ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) এক প্রতিবেদনে জানায়, গাজা উপত্যকার গাজা নগর প্রশাসনিক অঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় দুর্ভিক্ষ চলছে। এতে অন্তত ৫ লাখ ১৪ হাজার গাজাবাসী দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী মাসের শেষের দিকে উপত্যকার মধ্যাঞ্চলের প্রশাসনিক অঞ্চল দেইর আল-বালাহ ও দক্ষিণের খান ইউনিসেও দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

জাতিসংঘসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের অনুদান ও সহায়তায় পরিচালিত আইপিসির প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েল গাজায় দুর্ভিক্ষের দাবি অস্বীকার করেছে।

কিন্তু জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আইপিসির প্রতিবেদন আমলে নিয়ে এক বিবৃতিতে গাজার দুর্ভিক্ষকে ‘মানবসৃষ্ট বিপর্যয়’ ও ‘মানবতার ব্যর্থতা’ বলে মন্তব্য করেছেন। সংস্থাটির মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক ‘গাজার দুর্ভিক্ষকে ইসরায়েল সরকারের কর্মকাণ্ডের সরাসরি ফলাফল’ বলে উল্লেখ করেছেন।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর প্রধান ফিলিপ লাজারিনি বলেছেন, গাজায় নিজেরা যে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করেছে, তা অস্বীকার করা ইসরায়েলকে বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, যাদের (যেসব দেশের) প্রভাব আছে, তাদের এটাকে (আইপিসির প্রতিবেদনকে) গুরুত্ব ও নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। জাতিসংঘের মানবিক কার্যক্রম বিভাগের অতিরিক্ত মহাসচিব টম ফ্লেচারের বিবৃতি ধরে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান।

আইপিসির প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় টম ফ্লেচার বলেন, ‘এ দুর্ভিক্ষ পুরোপুরি ঠেকানো যেত। কিন্তু ইসরায়েলের পরিকল্পিত বাধায় গাজায় খাদ্য ঢুকতে পারছে না। তাই দুর্ভিক্ষ তৈরি হয়েছে।’

মিসর সীমান্তে ত্রাণভর্তি হাজারো ট্রাক কয়েক মাস ধরে গাজায় ঢোকার অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু গত মার্চ থেকে ইসরায়েলের অবরোধের কারণে সেগুলো গাজায় প্রবেশ করতে পারছে না। মে মাসের শেষ থেকে তারা গাজায় কিছু ত্রাণবাহী ট্রাক ঢুকতে দিচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

এদিকে ইসরায়েলের ওপর অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তাবে মন্ত্রিসভার সমর্থন না পেয়ে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাসপার ভেল্ডক্যাম্প পদত্যাগ করেছেন। ভেল্ডক্যাম্প মধ্য ডানপন্থী নিউ সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট দলের সদস্য।

মিডল ইস্ট আই–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে ইসরায়েলপন্থী ভাষা ব্যবহার না করার অভিযোগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক গণমাধ্যমবিষয়ক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছ। তাঁর নাম শাহেদ ঘোরেইশি। তিনি বার্তা সংস্থা এপির এক প্রশ্নের জবাবে লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র গাজাবাসীদের জোরপূর্বক স্থানান্তরকে সমর্থন করে না।

গতকাল ভোর থেকে ইসরায়েলের হামলায় গাজায় আরও ৭১ জন নিহত ও আরও অনেকে আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ১৬ জন। এ নিয়ে মে মাস থেকে গাজায় এ পর্যন্ত ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২ হাজার ৭৬। এর মধ্যে অন্তত ১ হাজার জন নিহত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সমর্থিত বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) ত্রাণকেন্দ্রের আশপাশে।

গাজায় এ নিয়ে নিহতের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬২ হাজার ৬২২। একই সময়ে ২১০টি শিশুসহ অধিকৃত পশ্চিম তীরে নিহত হয়েছেন অন্তত ১ হাজার ৩১ ফিলিস্তিনি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-07-27%2Fz805c3rj%2Fgaaza.png?rect=3%2C0%2C630%2C420&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজায় অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশু। ফাইল ছবি: এএফপি

রিজার্ভ সেনা ইস্যুতে আগুন নিয়ে খেলছে ইসরাইল: গাজায় দুর্ভিক্ষ- জাতিসংঘ, ইসরাইলের অস্বীকার

গাজা সিটি পুনর্দখলের পরিকল্পিত অভিযানের আগে আকস্মিকভাবে ডাকা বা বর্তমান দায়িত্ব বাড়ানোর নির্দেশে ইসরাইলি রিজার্ভ সেনারা ক্ষুব্ধ। তারা বলছেন, সরকার তাদেরকে শোষণ করছে। যদিও তারা গাজায় হামাসের হাতে আটক জিম্মিদের প্রতি এবং নিজেদের ইউনিটের সহযোদ্ধাদের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন  হারেৎজ। রিজার্ভ সেনাদের একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল বলেন, এখনো ব্যাপক হারে কর্তব্যে অস্বীকার দেখা যায়নি, তবে এটি ক্রমেই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। অভিজাত এই ব্রিগেড কর্মকর্তা বলেন, মানুষ বুঝতে পারছে গাজা সিটিতে কঠিন যুদ্ধ হবে। আর তাদের পক্ষে অনুপস্থিত থাকা কঠিন। আমরা রিজার্ভদের সেখানে ঠেলে দিচ্ছি। তিনি জানান, যুদ্ধের ২২ মাসে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং বুঝতে পারেন কেন কিছু সেনা আর্থিক কারণে সেবা চালিয়ে যেতে পারছেন না। তিনি প্রশ্ন তোলেন। বলেন,  দুই বছর ধরে যুদ্ধে থাকা এক রিজার্ভ সেনা যখন বলে তার পরিবার ভেঙে যাচ্ছে বা সন্তানরা ভয়ে বিছানা ভিজিয়ে দিচ্ছে, তখন আমি কী বলব? তিনি আরও বলেন,  কতবারই বা তাদের বলব জায়নবাদের কথা, বা বলব এই যুদ্ধ আমাদের দেশের জন্য? আমাদের ইউনিটের ছাত্ররা এক বছর একাডেমিক পড়াশোনা মিস করেছে। আর আগামী বছরও স্পষ্ট নয় তারা পড়াশোনা করতে পারবে কি না। আমি ২৬ বছর বয়সী সেনাকে কী বলব- আরও এক-দুই বছর পর পড়াশোনা শুরু করো? সেনাবাহিনী ইউনিটের সংকটের গভীরতা বোঝে না। রিজার্ভদের নিয়ে আমরা আগুন নিয়ে খেলছি।

বুধবার আইডিএফ প্রধান অব স্টাফ ইয়াল জামির ৬০ হাজার রিজার্ভকে আগামী মাসে ডেকে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে ২০ হাজার সেনার দায়িত্ব ৪০ দিন বাড়ানো হবে। কেউ গাজায় যাবে, আবার কেউ অন্যত্র মোতায়েন হবে। গাজায় মোতায়েন এক রিজার্ভ সেনা বলেন, ব্রিগেড কমান্ডাররা তাদের দুর্দশা বোঝেন না, শুধু সফলতার পেছনে ছুটেন। তিনি বলেন, ব্রিগেড কমান্ডারের কাছে সেনাদের জীবনের চেয়ে তার পদোন্নতি বড় ব্যাপার। তাই প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

তার কাছে একটাই ব্যাখ্যা- এটা জায়নবাদ। কিন্তু তিনি বোঝেন না, তার ইউনিটের লোকেরা ফ্রিজে খাবারও রাখতে পারছে না, সন্তানরা দুই বছর ধরে আতঙ্কে আছে কারণ তাদের বাবা যুদ্ধে। উত্তর সীমান্তে দায়িত্বে থাকা এক সেনা বলেন, অনিশ্চয়তায় রিজার্ভরা কষ্ট পাচ্ছে। যুদ্ধের দুই বছর পর আমরা বুঝে গেছি এটা শিগগির শেষ হবে না। কেউ আমাদের সময়সূচি জানাতে পারে না। অন্তত কেউ যদি বলত- তুমি এই দুই মাস রিজার্ভে থাকবে, তাহলে আমরা জীবন পরিকল্পনা করতে পারতাম। কিন্তু হঠাৎ ফোনে ডাকা হয়, একদিন পরেই আদেশ এসে যায়। তিনি জানান, প্রতিবার ডাক পাওয়ার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। আমরা ২৫০ দিনেরও বেশি সেবা করেছি, হাজির হয়েছি। কিন্তু কেন এই অবহেলা, কেন আমাদের পরিবারকে এভাবে কষ্ট সহ্য করতে হবে? তিনি সতর্ক করে বলেন, একসময় যদি সেনারা উপস্থিত না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি তুষারগোলার মতো গড়াতে থাকবে, থামানো যাবে না।

এক জরিপে দেখা গেছে, ৪০ ভাগ সেনার যুদ্ধের প্রেরণা কমেছে। ১৩ ভাগ বেড়েছে, আর বাকিদের মধ্যে কোনো পরিবর্তন নেই। এক অভিজাত ইউনিটের রিজার্ভ সেনা চতুর্থবার গাজায় যাচ্ছেন। বলেন, তিনি ও তার সহযোদ্ধারা দায়িত্ব অস্বীকারের কথাও ভেবেছেন। তার ভাষায়, আমরা স্থির করেছি যদি অস্বীকৃতি জানাই, তা সবাই মিলে জানাবো। এখনো দেখছি কোথায়, কতদিন পাঠানো হয়।  তিনি আরও বলেন, অক্টোবর ৭-এর পর আমরা আর আগের সেই সেনা নই। আমরা ক্লান্ত, চাকরি বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছি।

যুদ্ধের কোনো লক্ষ্য নেই। আমরা শুধু পাহারায় থাকি আর ধ্বংস হওয়া ভবনে হামলা চালাই যেগুলোকে সন্ত্রাসী অবকাঠামো বলা হয়। তবুও তিনি উপস্থিত হবেন বলেই জানালেন- আমার প্রথম দায়বদ্ধতা আমার টিমের প্রতি। আমরা একসাথে বড় হয়েছি। তাদের ছাড়া থাকা কল্পনা করতে পারি না।
কমান্ডাররা জানেন, অনেক সেনা হয়তো আসবে না বা যতদিন ছুটি সম্ভব চাইবে। তাই ইউনিটগুলো যতজন সম্ভব সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। এক সেনা বলেন, তার শেষ দায়িত্বকালীন সময়ে জনবলের অভাব ছিল। তিনি বলেন, কিছু মিশন আমরা পূরণই করতে পারিনি, যেমন আহতদের সরিয়ে নেয়া বা ভেতরে থাকা বাহিনীকে সহায়তা। তাই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে বিশেষ দক্ষতা সম্পন্ন সেনা খোঁজা হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবার আছে এমন সেনা বা দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারীদের কিছুটা সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ফল সীমিত।

গাজায় দুর্ভিক্ষ- জাতিসংঘ, ইসরাইলের অস্বীকার
গাজায় দুর্ভিক্ষ। সেখানে খাবারের অভাবে মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। একটু খাবার খুঁজতে গিয়ে তারা বন্দুকের গুলির নিশানায় পরিণত হচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্ববাসী তা শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। কারো মুখে রা নেই। বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠী নীরবে ঘুমের দেশে আছে। সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হয় গাজাবাসী মানুষ নয়। পশুপাখি যে অধিকার ভোগ করে, তাদের সেই  অধিকারও নেই। পশুপাখি মুক্তভাবে উড়তে পারে। আকাশ তার অবারিত ভুবন। তাকে বাধা দেয়ার কেউ নেই। কিন্তু গাজার মানুষ অবরুদ্ধ। তাদের নড়াচড়া করার কোনো অনুমতি নেই।

অনলাইন বিবিসি বলছে, জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস গাজা সিটি ও এর আশপাশের এলাকায় নিশ্চিত দুর্ভিক্ষ চলছে বলে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, এটা  মানবতার ব্যর্থতা। অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এটি একটি মানুষের তৈরি বিপর্যয়। জাতিসংঘ সমর্থিত একটি সংস্থা গাজার কিছু অংশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ স্তর ফেজ ৫-এ উন্নীত করেছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) জানিয়েছে, গাজা জুড়ে অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ মারাত্মক অবস্থার মুখোমুখি।

ইসরাইল এ প্রতিবেদনকে সরাসরি মিথ্যা বলে আখ্যা দিয়েছে এবং দুর্ভিক্ষের দাবি অস্বীকার করেছে। জাতিসংঘ বলছে, ইসরাইল এখনো গাজায় সাহায্য প্রবেশে সীমাবদ্ধতা আরোপ করছে। তবে ইসরাইল তা অস্বীকার করেছে। কিন্তু এই অস্বীকৃতি মাঠ পর্যায়ের সাক্ষী, শতাধিক মানবিক সংস্থা, একাধিক জাতিসংঘ সংস্থা এবং ইসরাইলের কয়েকটি মিত্র প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ অবস্থানে।  

আইপিসি সতর্ক করেছে, তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক পদক্ষেপ না নিলে দুর্ভিক্ষজনিত মৃত্যু অগ্রহণযোগ্যভাবে বৃদ্ধি ঘটবে। সংস্থাটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, আগস্টের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ দুর্ভিক্ষ গাজার দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনুস পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। এই সময়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বা প্রায় ৬,৪১,০০০ মানুষ আইপিসি ফেজ ৫-এর মারাত্মক পরিস্থিতিতে পড়বে। আর ফেজ ৪ (জরুরি পরিস্থিতি)-এর আওতায় পড়বে ১.১৪ মিলিয়ন মানুষ (জনসংখ্যার ৫৮ ভাগ)।

আইপিসির রিপোর্ট বলছে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অপুষ্টি পাঁচ বছরের কম বয়সী ১,৩২,০০০ শিশুর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলবে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অপুষ্টিতে ইতিমধ্যে ২৭১ জন মারা গেছে, তাদের মধ্যে ১১২টি শিশু। ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর  আইপিসি এখন পর্যন্ত মাত্র চারটি দুর্ভিক্ষকে চিহ্নিত করেছে। সর্বশেষটি ২০২৪ সালে সুদানে। তবে আইপিসি আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে পারে না; সাধারণত তা করে সরকার বা জাতিসংঘ।

mzamin

শান্তি অধরাই, রাশিয়ার ওপর আবারও ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার হুমকি

গার্ডিয়ানের রিপোর্টঃ আলাস্কা সম্মেলনের পর পরই মনে হয়েছিল রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হয়ে যাচ্ছে। শান্তি চলে এসেছে। কিন্তু এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও  সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি অধরাই রয়ে গেছে। এরই মধ্যে রাশিয়ার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। হুমকিতে তিনি বলেছেন, ইউক্রেনে শান্তিপূর্ণ সমাধানের অগ্রগতি না হলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক আরোপ করবেন। আলাস্কায় ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের এক সপ্তাহ পর মস্কোর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমি সিদ্ধান্ত নেব কী করব- বড় নিষেধাজ্ঞা, বড় শুল্ক, দুটোই, নাকি কিছুই না করে বলব এটা তোমাদের যুদ্ধ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান।

এতে বলা হয়, ট্রাম্প অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন ইউক্রেনে একটি মার্কিন কারখানায় রুশ হামলার পর। ওই হামলায় সেখানে আগুন ধরে কয়েকজন কর্মচারী আহত হন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি শুক্রবার বলেন, রাশিয়া তার ও পুতিনের বৈঠক ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, আলাস্কার বৈঠকের পর সোমবার পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপেই তিনি পুতিন-জেলেনস্কি বৈঠকের প্রস্তুতি শুরু করেন। জেলেনস্কি বারবার পুতিনকে বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন, বলেছেন যুদ্ধ শেষ করতে এটিই একমাত্র উপায়। কিন্তু রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এনবিসিকে বলেন, কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। পুতিন প্রস্তুত আছেন যখন আলোচনার এজেন্ডা তৈরি হবে- কিন্তু এ মুহূর্তে তা মোটেই প্রস্তুত নয়।

এটি ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা। তিনি পুরো সপ্তাহজুড়ে শান্তি প্রক্রিয়ায় কূটনৈতিক অগ্রগতির দাবি করেন। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের দেখানো ছবিতে ট্রাম্প আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে লাল কার্পেটে সাক্ষাৎ দেখান এবং জানান, পুতিন ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় ফুটবল বিশ্বকাপে আসতে চান। ট্রাম্প বলেন, আমি এটা তার জন্য সই করব। তিনি হয়তো আসবেন, আবার নাও আসতে পারেন- সবকিছু পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। তবে ট্রাম্প উল্লেখ করেননি যে, ইউক্রেন আক্রমণের পর ২০২২ সালে রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং তারা ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বেও অংশ নেয়নি।

শুক্রবার একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে সফরে গিয়ে পুতিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে সামনের সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, আলাস্কায় আমাদের খুবই ভালো, অর্থবহ ও খোলামেলা বৈঠক হয়েছে। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ আমেরিকার নেতৃত্বের হাতে। তবে আমি বর্তমান প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বগুণ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। পুতিনের বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের স্পষ্ট কোনো অগ্রগতি না হলেও রাশিয়া এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত ও ব্যবসায়িক চুক্তির ব্যাপারে আশাবাদী। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু করার পর থেকে হাজার হাজার ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, দুই পক্ষে মিলিয়ে ১০ লাখেরও বেশি সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন। যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে এবং উভয় পক্ষই জ্বালানি স্থাপনা আক্রমণ করছে।
রাশিয়া দাবি করছে, শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে ইউক্রেনকে পূর্বাঞ্চলের দুটি অঞ্চল ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি দক্ষিণের আরও দুটি অঞ্চলে ফ্রন্টলাইন স্থির করার প্রস্তাব দিয়েছে, যা মস্কো নিজেদের অংশ বলে দাবি করছে। কিছু দখলকৃত এলাকা ফেরত দেওয়ার কথাও ইঙ্গিত দিয়েছে। জেলেনস্কি ইতিমধ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির শর্ত তুলে নিয়েছেন, যদিও আগে বলেছিলেন বন্দুকের নল উঁচিয়ে ধরে আলোচনায় বসা সম্ভব নয়।

বৃহস্পতিবার তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া বৈঠক এড়াতে চাইছে এবং আক্রমণ অব্যাহত রাখতে চায়। ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এখন মার্কিন নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের জন্য কিছু পশ্চিমা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা মেনে নিয়েছে। তবে পরে ল্যাভরভ বলেছেন, রাশিয়াকে বাদ দিয়ে এসব আলোচনা করা অর্থহীন।

জেলেনস্কি পাল্টা বলেন, রাশিয়ার নিরাপত্তার হুমকি কোথা থেকে আসছে আমি জানি না। আমাদের নিরাপত্তার জন্য আমরা বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি চাই, যাতে ভবিষ্যতে রুশ আক্রমণ ঠেকানো যায়।

mzamin

গাজা সিটিতে দুর্ভিক্ষ: ইসরায়েলকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় দ্রুত বদলে যাচ্ছে জনমত

রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদনঃ গাজা যুদ্ধ নিয়ে জনমতের বড় পরিবর্তন আঁচ করতে পেরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এখন বোঝা যাচ্ছে, ঐতিহাসিকভাবে বিশ্বস্ত মিত্র ইসরায়েল এ সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলেও তাতে শঙ্কিত নয় দেশটি।

১১ আগস্ট অস্ট্রেলিয়া সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এর কয়েক দিন আগে সিডনির বিখ্যাত হারবার ব্রিজে হাজার হাজার মানুষ গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ত্রাণ সরবরাহের দাবিতে মিছিল করেন।

প্রায় দুই বছর আগে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ইসরায়েলে ঢুকে নজিরবিহীন হামলা চালায়। হামলার প্রতিশোধ নিতে সেদিন থেকেই গাজায় যুদ্ধ শুরু করে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত উপত্যকাটিতে ৬২ হাজার ১৯২ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। এদিকে জাতিসংঘ–সমর্থিত একটি সংস্থা বলেছে, গাজা নগরীতে দুর্ভিক্ষ চলছে।

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত বিশেষজ্ঞ মার্টিন কেয়ার বলেন, ইসরায়েলকে অব্যাহত সমর্থন প্রদান এবং সব দোষ হামাসের ঘাড়ে চাপানোর বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির সিদ্ধান্তে ইসরায়েল-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্ক এমন টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে, যা কয়েক দশকেও দেখা যায়নি। এ ইস্যুতে দুই দেশের শীর্ষ রাজনীতিকেরা একে অপরকে কটাক্ষ করেছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছেন। পশ্চিম তীরে নিযুক্ত অস্ট্রেলীয় কূটনীতিকদের ভিসা বাতিল করেছে ইসরায়েল। বিপরীতে, একজন ইসরায়েলি আইনপ্রণেতাকে অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি।

অস্ট্রেলিয়ার একটি শীর্ষ ইহুদি সংগঠন বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সংগঠনটি নজিরবিহীনভাবে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করেছে। অস্ট্রেলিয়ার অনেক ইহুদি বলেছেন, এ টানাপোড়েন তাঁদের মনে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা জাগাচ্ছে। কারণ, গত এক বছরে দেশটিতে একাধিক ইহুদিবিদ্বেষী হামলা হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ায় দ্বিতীয় বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু ইহুদিদের কাছে গাজা সংঘাত একটি বিতর্কিত বিষয়। দেশটিতে জনমত জরিপে দেখা গেছে, এ সংঘাতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সেখানকার মানুষের সহানুভূতি বাড়ছে।

গত আগস্টে ডেমোসএইউ-এর এক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েল–হামাস শান্তিচুক্তি হওয়ার আগেই অস্ট্রেলিয়ার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে সমর্থন জানিয়েছেন ৪৫ শতাংশ মানুষ। এটি গত বছর ছিল ৩৫ শতাংশ। স্বীকৃতির বিরোধিতা করেছেন ২৩ শতাংশ মানুষ।

অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, গাজায় দুর্ভিক্ষের ভয়ংকর চিত্র সামনে আসার পর ইসরায়েলের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার জনগণের সহানুভূতি দ্রুত কমতে শুরু করেছে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক চার্লস মিলার বলেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে গাজার ছবিগুলো অস্ট্রেলিয়ার আইনপ্রণেতাদের শক্তি জুগিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এগুলো নীতিনির্ধারকদের অনেকের মানসিকতা বদলে দিয়েছে; যেমনটা অন্যান্য দেশেও হয়েছে।’

ইহুদিদের উদ্বেগ

অস্ট্রেলিয়ায় দুই শতাধিক ইহুদি গোষ্ঠীর আমব্রেলা সংগঠন হিসেবে কাজ করে এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়ান জিউরি। অস্ট্রেলিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনে সংগঠনটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি গত বুধবার আলবানিজ ও নেতানিয়াহুকে চিঠি লিখে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘যদি জনসমক্ষে কোনো কিছু বলা লাগে, তবে তা যেন একজন জাতীয় নেতার জন্য মানানসই, সংযত ও মর্যাদাপূর্ণ ভাষায় বলা হয়।’

গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অস্ট্রেলিয়ায় উপাসনালয়, ভবন ও গাড়িতে একাধিক ইহুদিবিদ্বেষী হামলা হয়েছে। অনেক ইহুদি আশঙ্কা করছেন, অস্ট্রেলিয়া-ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে এমন হামলার ঘটনাও বাড়তে পারে।

সিডনির নিউটাউন সিনাগগের গুরু এলি ফেল্ডম্যান বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনায় ইসরায়েলের সমালোচনার দিকে এত বেশি মনোযোগ দিলে এর প্রভাব স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর পড়বে। আমাদের এটা ভেবে দেখা দরকার।’

ঐতিহাসিক মিত্র

অস্ট্রেলিয়া শুরু থেকেই একটি ইহুদি রাষ্ট্রের সমর্থক ছিল। দেশটি আন্তর্জাতিক নানা বিবাদে লম্বা সময় ধরে ইসরায়েলের পাশে ছিল। তবে অস্ট্রেলিয়ার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নীতিগতভাবে ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংকটের দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের নীতি সমর্থন করে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ দীর্ঘদিন ব্যক্তিগতভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে এত দিন সতর্ক ছিলেন। জনমতের পরিবর্তনে তাঁর এ অবস্থানও বদল হয়েছে। এ ছাড়া গত মে মাসে নির্বাচনে ব্যাপকভাবে জয়ের কারণে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তে জনগণের তোপে পড়ার ঝুঁকিও কমে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে অবস্থিত ফ্লিন্ডার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সংঘাত বিশেষজ্ঞ জেসিকা জেনাওয়ার বলেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় অস্ট্রেলিয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে।

১১ আগস্টের পর থেকে নেতানিয়াহু একাধিক সাক্ষাৎকার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলবানিজকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করছেন। তিনি আলবানিজকে একজন দুর্বল নেতা বলেছেন ও ইসরায়েলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিযোগ তুলেছেন।

সিডনির হারবার ব্রিজে ৩ আগস্ট ফিলিস্তিনপন্থী মিছিলে অংশ নেন হাজারো মানুষ
সিডনির হারবার ব্রিজে ৩ আগস্ট ফিলিস্তিনপন্থী মিছিলে অংশ নেন হাজারো মানুষ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে পুরোনো প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে ইরান: প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজি নাসিরজাদে বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান পুরোনো প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। তবু এগুলো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে যে কার্যকর, সেটা প্রমাণিত হয়েছে।

নাসিরজাদে সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘১২ দিনের এই যুদ্ধে আমরা এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছিলাম, যাঁদের পূর্ণ সমর্থন ছিল। ইরান কেবল ইসরায়েলি শাসনের সঙ্গেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা, লজিস্টিক ও সামরিক সহায়তার বিরুদ্ধেও লড়েছে।’

প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মতে, পুরো যুদ্ধে ইরান কেবল নিজেদের তৈরি অস্ত্রই ব্যবহার করেছে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সব অস্ত্র আমাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে এসেছে। বিশ্ব দেখেছে আমাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কীভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে এবং শত্রুর কতটা ক্ষতি করেছে।’

নাসিরজাদে অভিযোগ করেন, ইসরায়েল গণমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি গোপন করেছে। তবে ধীরে ধীরে ফাঁস হওয়া তথ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত আঘাত ও ধ্বংসক্ষমতা প্রমাণ করেছে।

ইরানের মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এখন আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র আগের তুলনায় অনেক উন্নত। আমাদের হাতে আরও শক্তিশালী অস্ত্র আছে, যেগুলো এখনো ব্যবহার করা হয়নি। ইসরায়েল আবার কোনো দুঃসাহস দেখালে আমরা অবশ্যই সেগুলো ব্যবহার করব।’

প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, যুদ্ধে ইসরায়েল তাদের সবচেয়ে উন্নত মার্কিন-সমর্থিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করেছে—যেমন থাড, প্যাট্রিয়ট, আয়রন ডোম, অ্যারো ইত্যাদি। কিন্তু এসব ব্যবস্থা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রস্তুতির প্রশংসা

অন্যদিকে খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল সদর দপ্তরের কমান্ডার বলেছেন, ইরানের সেনারা পূর্ণ প্রস্তুতিতে আছে এবং শত্রুপক্ষের গতিবিধি নিবিড়ভাবে নজরদারি করছে।

আল-আনবিয়া ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বিচার বিভাগীয় প্রধান হোজ্জাতোল ইসলাম পুরখাঘানের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘যদি তারা আবার ভুল করে আমাদের পবিত্র ভূখণ্ডে আক্রমণ চালায়, তবে তাদের আরও ভয়াবহ জবাব দেওয়া হবে।’

গত ১৩ জুন ইসরায়েল উসকানিমূলকভাবে ইরানের হামলা চালালে বহু বেসামরিক মানুষ ও কিছু জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও পরমাণুবিজ্ঞানী নিহত হন। এরপর ইরান পাল্টা আঘাত হানে। তখনই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি নতুন করে প্রকাশ্যে আসে।

ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজি নাসিরজাদে
ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজি নাসিরজাদে। ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তানি হামলায় ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর সেই আদলে ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

চীনের তৈরি অতি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তান গত মে মাসে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল। সেই ঘটনার কয়েক মাস পর মার্কিন বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী এআইএম–২৬০ নামের তাদের নিজস্ব উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে বাজেট চাইছে।

লকহিড মার্টিন কোম্পানি আট বছর এই ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে। তারা শিগগিরই এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে বলে আশা করছে।

২০২৬ অর্থবছরে বিমান ও নৌবাহিনী প্রায় ১০০ কোটি ডলার চেয়েছে, যা গোপন এই ব্যবস্থা তৈরি শুরু করতে ব্যবহার করা হবে। আগামী ১ অক্টোবর থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হচ্ছে।

এআইএম–২৬০ ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়া বিমানবাহিনী এআইএম-২৬০ বা জয়েন্ট অ্যাডভান্সড ট্যাকটিক্যাল মিসাইল তৈরির জন্য প্রথমবারের মতো ৩৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার চেয়েছে। এ ছাড়া কংগ্রেসের প্রতিরক্ষা কমিটিতে জমা দেওয়া বার্ষিক অতিরিক্ত চাহিদার তালিকায় আরও ৩০ কোটি ডলার চেয়েছে। অন্যদিকে নৌবাহিনী ৩০ কোটি ১০ লাখ ডলার চেয়েছে।

মেলিয়াস রিসার্চের বিশ্লেষকেরা বলছেন, উৎপাদনের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে এই ক্ষেপণাস্ত্র কমসূচিতে ব্যয় ৩ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। লকহিড মার্টিনের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাদের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক আয় প্রতিবেদনে ১৬০ কোটি ডলারের চার্জ এবং সম্ভাব্য ৪৬০ কোটি ডলারের করসংক্রান্ত আর্থিক দায়–এর কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

মেলিয়াসের বিশ্লেষক স্কট মিকাস বলেন, ‘লাভজনক প্রবৃদ্ধি লকহিড মার্টিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল চ্যালেঞ্জ হবে তারা কীভাবে ভবিষ্যতে এই গোপন ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির খরচ কমাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।’

যখন এআইএম–২৬০ ব্যবহারযোগ্য হবে, তখন এটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে উন্নত আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। অবশ্য বিমানবাহিনী জানায়নি কখন এটি ব্যবহারযোগ্য হবে। দীর্ঘদিন ধরে এআইএম–১২০ এএমআরএএএম এই ভূমিকা পালন করছে, যা ১৯৯৩ সালে তৈরি করা হয়েছে। কোন কারণে তারা এখন এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন শুরু করার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস পাচ্ছে, সে বিষয়ে বিমানবাহিনী কোনো কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান গত মে মাসে চীনের তৈরি পিএল–১৫ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ১০০ মাইলের বেশি দূর থেকে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল। প্রতিপক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়ার মতো কোনো ঝুঁকিও ছিল না। এ কারণে অতি দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্ব সামনে এসেছে।

গত বছরের চীনের সামরিক সক্ষমতা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে পেন্টাগন জানিয়েছে, চীনা বিমানবাহিনী সম্ভবত ২০২৩ সালে পিএল–১৭ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে। পিএল–১৫ পরবর্তী সংস্করণ হচ্ছে পিএল–১৭ যা ৪০০ কিলোমিটার (২৪৮ মাইল) দূর থেকে নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম।

মার্কিন বিমানবাহিনী বলেছে, নতুন এআইএম–২৬০ ক্ষেপণাস্ত্র বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে পারবে। বিভিন্ন হুমকির পরিস্থিতিতে এই ক্ষেপণাস্ত্র বেশ কার্যকর হবে।

ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর একজন মুখপাত্র ২০২৩ সালে বলেছিলেন, তাঁদের দেশে যে এআইএম–১২০ ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়া হয়েছে, সেটি প্রায় প্রায় ১০০ মাইল দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম।

এআইএম–২৬০ ক্ষেপণাস্ত্রকে এফ–২২ ও এফ–৩৫ যুদ্ধবিমানেই ব্যবহারযোগ্য করা হয়েছে। তবে বিমানবাহিনী বলেছে, এটি এফ–১৬ ও এফ–১৫ যুদ্ধবিমানেও সংযুক্ত করা যাবে।

চীনের তৈরি পিএল–১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ
চীনের তৈরি পিএল–১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের অংশ। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া