Tuesday, November 26, 2013

‘দলে দলে কলাগাছে ভোট দিন’ by শাহদীন মালিক

‘আপনারা দলে দলে কলাগাছে ভোট দিন’ এটাই মনে হচ্ছে ইদানীংকালের আওয়ামী লীগের উদাত্ত আহ্বান— ভোটারদের প্রতি।
বলা বাহুল্য, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সরাসরি কলাগাছকে ভোট দিতে বলা হচ্ছে না। তবে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল এবং আওয়ামী লীগের অন্য নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সভায় যা বেশ কয়েকবার বলেছেন, এর মর্মার্থ হলো আওয়ামী লীগ যে আসনে যাঁকেই মনোনয়ন দেবে, নেতা-কর্মীদের উচিত হবে প্রার্থী ভালো কী মন্দ—সে বিতর্কে না গিয়ে ভোটারদের নৌকা মার্কায় ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করা এবং নিজেরাও নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়া। এ ধরনের অতি মূল্যবান ‘দিকনির্দেশনা’র কারণ খোঁজা বা বোঝা জটিল কাজ নয়।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ২,৬১১টি মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে। যাঁরা একাধিক মনোনয়নপত্র নিয়েছেন, তাঁরা শুধু একটির মূল্য পরিশোধ করেছেন, নাকি যতগুলো ক্রয় করেছেন প্রতিটির জন্য আলাদাভাবে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছেন, সে খবর চোখে পড়েনি। তবে ২৫ হাজার টাকা হারে ২,৬১১টি মনোনয়নপত্রের জন্য জমা হওয়ার কথা সাড়ে ছয় কোটি টাকার অনেক বেশি।
অবশ্য টাকাপয়সা বড় কথা নয়। অঙ্কের হিসাবে ৩০০ আসনের জন্য এতগুলো মনোনয়নপত্র বিক্রি হওয়া মানে আসনপ্রতি আটজন মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থী। মনোনয়ন পাবেন একজন। তাই গোসসা করবেন বাকি সাতজন। শেষ পর্যন্ত যাঁরা মনোনয়ন পাবেন না, তাঁরা বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন কি না, সেটা সময়ের ব্যাপার। তবে মনোনয়ন পাওয়া ৩০০ প্রার্থীর বাইরে মনোবাসনা অপূর্ণ থেকে যাওয়া নেতা-কর্মীর সংখ্যা হবে দুই হাজারের বেশি।
তাই শেখ হাসিনার আহ্বান— কে প্রার্থী হলো বা হলো না, সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা হলো নৌকা। মার্কা একটাই—নৌকা।
গত চার দশকের নির্বাচনগুলোতে মার্কায় ভোট হয়েছিল দুবার। অর্থাৎ ভালো-মন্দনির্বিশেষে শুধু দলীয় বিবেচনায় বেশির ভাগ ভোটার নৌকায় ভোট দিয়েছেন ১৯৭০ আর ২০০৮ সালে। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের কতটা আসল আর কতটা নকল, সেটা বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তবু ধারণা করা যায় যে ওই নির্বাচনেও সম্ভবত বেশির ভাগ ভোট পড়েছিল মার্কা বিবেচনায়, প্রার্থী বিবেচনায় নয়। ভোট পড়েছিল ধানের শীষে।।
২...
এটা এখন স্পষ্ট যে কে মনোনয়ন পাবেন আর কে পাবেন না, সেটা নির্ভর করবে দলীয় সভানেত্রীর ইচ্ছার ওপর। মনোনয়নপত্র বিক্রি হয়েছে ঢাকা থেকে। স্থানীয় পর্যায় থেকে মনোনয়নপত্র কেনাবেচা বা জমা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা পর্যন্ত অনুভূত হয়নি।
গত নির্বাচনে স্থানীয় পর্যায় থেকে পাঁচজন প্রার্থীর নাম পাঠানো লোক দেখানো হলেও একটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। এবার মনে হচ্ছে সেটাও নেই। স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কিছু বৈঠক নিঃসন্দেহে হচ্ছে। কিন্তু এসব বৈঠকের মর্মবাণী হচ্ছে, আমি যাঁকে মনোনয়ন দেব, আপনারা তাঁকেই ভোট দেবেন এবং এলাকার ভোটাররা যাতে তাঁকেই ভোট দেন, সেটার জন্য কাজ করাই স্থানীয় নেতা-কর্মীদের একমাত্র কাজ।
এটা তো গণতন্ত্র হতে পারে না। প্রতিষ্ঠার ৬৫ বছর পরও যদি একটি রাজনৈতিক দল প্রায় সম্পূর্ণভাবে এক ব্যক্তির খেয়ালখুশির ওপর নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সেই দলকে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বলবেন, না এক ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বলবেন, সেটাই বিবেচ্য। অবশ্য এ অবস্থা যে শুধু শেখ হাসিনার দলের, তা নয়। জাতীয় পার্টির অবস্থা তো আরও করুণ। দলের নেতা সকালে কী বলবেন আর বিকেলে কী বলবেন, সেটা তিনি না বলা পর্যন্ত কিন্তু কেউ জানতে পারে না।
তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, দলের কে প্রার্থী হবেন বা না হবেন, সেটা যখন এক ব্যক্তির ইচ্ছা বা বিচার-বিবেচনার ওপর নির্ভর করে, তাহলে যাঁরা প্রার্থী হতে চান, তাঁরাই বা এমন দলের সদস্য-নেতা কেন? তাঁরা কি কোনো নিয়মতান্ত্রিকতা বা গণতন্ত্রের রেওয়াজ চর্চা চান না? অনুমান হয়, তাঁরা এসব ব্যাপারে বিন্দুমাত্র বিচলিত নন।
এ সপ্তাহে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন—মহীউদ্দীন খান আলমগীর, দীপু মনি, সাহারা খাতুন, ড. আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ। তাঁরা অন্য যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিক দলের রাজনৈতিক নেতা হলে এভাবে মন্ত্রিত্ব হারানোর পর নির্বাচনের জন্য আর মনোনয়নপত্র চাইতেন না। প্রায় পাঁচ বছর পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার পর আর কী বড় পদ বা মর্যাদা চাওয়ার থাকতে পারে; বা দুই দফা মন্ত্রী থাকার পর (১৯৯৬তে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আর এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং চাকরিজীবনে সচিবের মতো প্রজাতন্ত্রের কর্মে সর্বোচ্চ পদ) আর কী চাওয়া বা পাওয়ার থাকতে পারে।
আমাদের রাজনীতিতে চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই কেন? সম্ভাব্য উত্তর হলো, যাঁরা ‘রাজনীতি করেন’, তাঁরা আর অন্য কিছু করতে পারেন না। অবশ্যই ব্যতিক্রম আছে। সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা ও ড. কামাল হোসেনের মতো নেতারা বিশাল আইনজীবী। আইনজীবী পেশার পাশাপাশি রাজনীতিতে ছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলামের মতো ব্যক্তি, যাঁরা রাজনীতি করতেন সম্পূর্ণ আদর্শগত তাড়নায়। তাঁদের মতো স্থানীয় পর্যায়ে যুগ যুগ ধরে বহু নেতা-কর্মী আছেন, যাঁদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার মূল কারণ হলো আদর্শগত বিশ্বাস এবং পরোপকার করার বাসনা।
কিন্তু এই ঘরানার লোকজন এখন ‘বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি’র শ্রেণীভুক্ত। ছোটবেলায়, ষাটের দশকে সুন্দরবনের ভেতরে নদী-খালে স্টিমারে বসে পানির ধারে সন্ধ্যায় বিরাট বিরাট বেঙ্গল টাইগার দেখেছি অনেকবার। মোহিত হয়েছি, ভীত হয়েছি, শ্রদ্ধা করতে শিখেছি। তখন ‘বাঘ’ শব্দটিও উচ্চারণে মানা ছিল। বলতে হতো—ওই যে গাছের আড়ালে ‘মামা’। এখন সেই বনও নেই, সেই জাঁদরেল বাঘও বিলুপ্তপ্রায়। মাত্র নাকি শ-চারেক। তা-ও শীর্ণ-দীর্ণ। পারলে বনের আশপাশের মানুষের রান্নাঘরে রান্না করা মুরগির জন্য বা ছাগলের ছানার জন্য হানা দেয়।
৩...
বন রক্ষার তাগিদ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে জনসাধারণের গণতান্ত্রিক চেতনা, মূল্যবোধ এবং ‘ফেয়ার প্লে’র বাসনা ও আকাঙ্ক্ষা। কলাগাছকে কেউ আর গাছ এখন মানবে না। তাই শেখ হাসিনাকে পিছে ফেলে আমরা সম্ভবত এগিয়ে গিয়েছি। এককভাবে কলাগাছকে মনোনয়ন দেবেন আর দলের লোকজন কোনো বাছবিচার না করে ‘মার্কা’য় ভোট দেবেন, সেটা হওয়ার সম্ভাবনা কম। অন্য প্রধান দলের অবস্থা সম্ভবত আরও করুণ। গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের বার বিল্ডিংয়ের বারান্দায় এক বিরাট ‘বার্থডে কেক’ রাখা ছিল ঢাউস এক টেবিলের ওপর। ষাট, সত্তর, এমনকি দু-চারজন আশি-ঊর্ধ্ব আইনজীবী সেই কেক খাচ্ছিলেন। বিলেতের রানি এলিজাবেথেরও সম্ভবত এ রকম সৌভাগ্য হয় না। অর্থাৎ রানির জন্মদিনে ওই দেশের বড় আইনজীবীরা ঘটা করে প্রকাশ্যে কেক কেটে খান না। তারপর পত্রিকায় খবর পড়লাম—ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেছেন। বইয়ের নাম তারেক রহমানের রাজনৈতিক চিন্তা বা সে গোছের কিছু।
নব্বইয়ের দশকের শুরুর কথা। তখনো ওয়েব বা ইন্টারনেটে তথ্য পাওয়া যেত না। তথ্যসংক্রান্ত অনেকগুলো বই থেকে খুঁজে পেয়েছিলাম—তখন পর্যন্ত বিশ্বের বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাত্মা গান্ধী সম্পর্কে শ-চারেক পিএইচডি থিসিস লেখা হয়েছিল—তাঁর রাজনীতি, দর্শন, কর্ম, ধর্মবিশ্বাস, অহিংস আন্দোলন ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৯১-৯২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত কোনো পিএইচডি থিসিসের হদিস পাইনি।
তারপর গত ২০ বছরের খবর কি কেউ রেখেছেন? নাকি এখন তারেক রহমানের ওপর পিএইচডি গবেষণায় নামতে হবে!
৪...
নষ্ট রাজনীতি এখন ভোট চাওয়া-চাওয়িতেই সীমাবদ্ধ। তা-ও আবার সুষ্ঠুভাবে, অর্থাৎ সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশীদারিমূলক নির্বাচনও আয়োজিত হচ্ছে না। মধ্যযুগীয় গোষ্ঠীগুলোর মতো এখন হয় কলাগাছে ভোট, না হয় লাঠালাঠি। যারা নিজের দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে আইনসংগত পথে আয়-উপার্জন করতে পারে না, তাদের হালুয়া-রুটির যে পন্থা, সেটাই এখন রাজনীতি, সেটাই এখন নির্বাচন।
এসবের শেষ চাই। আজই, এখনই।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট এবং অধ্যাপক, স্কুল অব ল, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি।

ইদানীং রাজনীতি- ‘দলে দলে কলাগাছে ভোট দিন’ by শাহদীন মালিক

‘আপনারা দলে দলে কলাগাছে ভোট দিন’ এটাই মনে হচ্ছে ইদানীংকালের আওয়ামী লীগের উদাত্ত আহ্বান— ভোটারদের প্রতি।

সহজিয়া কড়চা- আজাওজা সরকার ও মহা জুয়া খেলা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

জগতে কখনোই একই জাতীয় দুটি বা তারও বেশি ঘটনা এক রকম হয় না। স্থানবিশেষে, সময়ের কারণে এবং কাদের দ্বারা তা নিয়ন্ত্রিত, তার ওপর ঘটনার চরিত্র ভিন্ন হয়।

নির্বাচনী খেলা এবং উলুখাগড়াদের জীবন by একেএম শাহ নাওয়াজ

আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের পরিচয় দীর্ঘদিনের। ‘আন্দোলন’ শব্দটি সবসময় একটি ইতিবাচক ধারণা বহন করে। অধিকার বঞ্চিত সমাজ, গোষ্ঠী বা গণমানুষের স্বার্থরক্ষায় বা মুক্তির জন্য সংগঠিত দাবি আদায়ের প্রেরণা থেকেই আন্দোলনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষার রাজনীতির চক্রে পড়ে আন্দোলন শব্দটির বিকৃত প্রয়োগ চলছে এখন সর্বত্র। স্বার্থবাদী নেতারা আন্দোলন শব্দের অসৎ ব্যবহার করে অনুসারীদের পথে নামাচ্ছেন। নানা অন্যায়ে যুক্ত করাচ্ছেন তাদের। নিজেরা নিরাপদে থেকে অনুসারীদের ঠেলে দিচ্ছেন বিপদে। আর ঘরে তুলে নিচ্ছেন লাভের ফসল। এ ধরনের অমানবিক ও যুক্তিহীন আন্দোলন করছেন জাতীয় রাজনীতির নেতা-নেত্রীরা। আন্দোলনের নামে শিক্ষাজীবন বিপন্ন করছে কোনো কোনো শিক্ষক গোষ্ঠী। শিল্প শ্রমিকদের নামানো হচ্ছে পথে। যুক্ত করানো হচ্ছে ধ্বংসাত্মক কাজে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।’ আর এর বিকৃত রূপান্তর করে যেন নানা ঘরানার আন্দোলনকারীরা বলতে চাচ্ছেন ‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই আন্দোলনের রাজত্বে।’ রাজতন্ত্রের যুগের রাজাদের মতোই এ আন্দোলনকারী রাজাদের ক্ষমতা অগাধ। কারও কাছে জবাব দেয়ার দরকার পড়ে না। এভাবে একসময় নির্মম স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনের নামে অনাচার করতে আরও বেশি উৎসাহিত হন, যখন সরকারি কোনো অনুশাসন-শাসন কার্যকর থাকে না। আর এসব অনাচারে দুর্ভোগ ও ক্ষতি পোহাতে হয় দেশবাসীকে।
বিএনপির ঝগড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে। এ দুই দল বিভিন্ন সময় সরকার গঠন করেছে। দুই-চারটা ভালো কাজও করেছে। মানুষ বিশ্বাস করে, এ করাটা অনেকটা একান্ত দায়ে পড়ে। দেশ জাতির কল্যাণে লাগে এমন কিছু কাজ অর্থাৎ সরকারি রাজনীতির ভাষায় ‘উন্নয়ন’ না করলে অস্তিত্ব বিপন্ন হবে বলেই কখনও কখনও তেমন সাফল্যের নমুনা পাই। এর বাইরে ক্ষমতাসীনরা গভীর মনোযোগে বাকি কাজগুলো করেন দলীয় ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষায়। সাধারণ দেশবাসীকে একপাশে ফেলে দলীয়করণের আবর্তে বন্দি করা হয়। দুর্নীতি প্রতিহত করতে ভূমিকা রাখেনি কোনো ক্ষমতাসীন দল। বরঞ্চ নানা প্রশ্রয়ে দুর্নীতির প্রসার ঘটেছে। দলগুলোর স্বার্থবাদী আচরণে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে। আমাদের বড় দুই দলই সরকারি দলে থেকে অভিন্ন আচরণ করেছে। বিরোধী দলে থেকেও স্বার্থ রক্ষার সরকারবিরোধী আন্দোলনে একইভাবে দেশ ও মানুষকে বিপদগ্রস্ত করেছে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের লক্ষ্য পূরণে সচেষ্ট থেকেছে। তাই নির্বাচনের এ প্রস্তুতিলগ্নে নানা বিভ্রান্তি ও ভীতি দেশবাসীকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-নেত্রীরা নিজেদের লক্ষ্য পূরণে অবলীলায় হরতাল-অবরোধে বিপন্ন করছে দেশবাসীকে। মানুষের কষ্ট, মানুষের আর্তি তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে না। কোনো দ্বিধা না রেখেই একের পর এক সম্পদহানি ও প্রাণঘাতী কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। এমন যদি হতো, নতুন চেহারার নতুন প্রত্যয়ের দল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মুক্তির জন্য গণধিকৃত সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শানিয়েছে, বিশাল আস্থা নিয়ে মানুষ এ দলটিকে সমর্থন দিয়েছে, তাহলে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে দেশবাসী কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করত চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য। এর মধ্যে থাকত স্বতঃস্ফূর্ততা। কিন্তু চিরচেনা আওয়ামী লীগ আর জামায়াত আশ্রিত বিএনপিকে ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়ার সিঁড়ি পাইয়ে দিতে সাধারণ মানুষ জীবনবাজি রাখবে কেন?
তারপরও আমাদের রাজনীতির সুপারস্টার দলগুলো সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে খেয়ালখুশির আন্দোলন চাপিয়ে দিচ্ছেন ভীষণ নির্মমতায়। এ কারণেই বলছিলাম, ঝগড়াটা আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মধ্যে। একদল আরেক দলকে ঘায়েল করতে যত ইচ্ছা কর্মসূচি দিক আপত্তি নেই, কিন্তু তাই বলে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করা কেন? এদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমরা বিএনপি নেতাদের উদ্দেশে বলতে পারি, নির্দলীয় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নিয়ে আপনারা যত ইচ্ছা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করুন; কিন্তু ককটেল ফাটানো, গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, মন্ত্রীদের আক্রমণ করা- এসব কি গণতন্ত্রসম্মত? রাজনীতিতে জনগণকে জিম্মি করার কোনো রীতি কি পৃথিবীর কোথাও আছে? আপনারা কীভাবে নিশ্চিত হলেন, সাধারণ মানুষ আপনাদের সহিংস আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে?
সরকারের নির্বাচনী সিদ্ধান্ত আপনাদের পছন্দ হয়নি বা দাবি পূরণ করেনি সরকার পক্ষ। এ কারণে আপনাদের আদালতে দোষী সরকার আর সরকারি দলের নেতা-নেত্রীরা। আপনাদের তোপানলের আগুনে পুড়বেন তারা। আপনাদের ককটেল আর গান পাউডারের মুখোমুখি হবেন তারা। তার বদলে অস্ত্র ঘুরিয়ে দিচ্ছেন কেন জনগণের দিকে? অবলীলায় দেশবাসীর ওপর লাগাতার হরতাল চাপিয়ে দিচ্ছেন কোন অধিকারে? তাহলে কি কবুল করছেন, এদেশের সব মানুষ আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে? আপনাদের দাবি না মানায় আওয়ামী লীগ অনুসারী বলে শাস্তি পেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। রাজনীতির প্রতারণাপূর্ণ ভাষায় এসবকে মানুষের ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ হরতাল পালন বলা হচ্ছে। অর্থাৎ কোটি কোটি কোমলমতি শিশু পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে না স্বতঃস্ফূর্তভাবে! লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের পরিবার কর্মহীন হয়ে পেটে পাথর বেঁধে পড়ে আছে। শত শত অটোরিকশা চালক, ট্রাক-বাসচালক স্বতঃস্ফূর্তভাবেই নিজেদের পিকেটারদের আগুনের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন, অগ্নিদগ্ধ হচ্ছেন! পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জীবনপ্রদীপ নিভে যাচ্ছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে! স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বন্ধ রেখে বাড়িতে বসে আছেন! দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে আর হরতালের এ সাফল্য দেখে সাধারণ মানুষ দারুণ তৃপ্তিতে হাততালি দিচ্ছেন!
একটি প্রশ্নের উত্তর সহিংসতা ছড়ানো হরতাল আহ্বানকারী নেতা-নেত্রী এবং তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবী তথা নাগরিক সমাজের মানুষ কখনও দেন না যে, হরতাল তো ডাকা হচ্ছে সরকারকে চাপ দেয়ার জন্য, যাতে সরকার তাদের দলীয় দাবি মেনে নেয়। যতই ‘জনগণের দাবি’র কথা বলা হোক, বিষয়টি বায়বীয়। এ নিয়ে কোনো জনমত জরিপ বা জনমতের ওপর ভোটাভুটি হয়নি। তাহলে দলীয় দাবি আদায়ের কৌশল হিসেবে সরকারকে বিপর্যস্ত করার জন্য জননেতারা সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন করে তুলছেন কোন অধিকারে? মানুষের কষ্টের টাকায় কেনা গাড়ি এদেশের সড়ক-মহাসড়কে চালানোর নাগরিক অধিকার রয়েছে। সেগুলো কেন হার্মাদের মতো নির্বিচারে ভেঙে ফেলা হচ্ছে? কেন আগুন দেয়া হচ্ছে? কেন নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে? কেন দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত করা হচ্ছে? কেন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন বিপন্ন করে তোলা হচ্ছে? নেতা-নেত্রীরা এতটাই ক্ষমতাবান আর স্বৈরাচারী যে, তারা পরিপাটি পোশাকে ও নধরকান্তি চেহারায় টিভি ক্যামেরা আর সাংবাদিকদের সামনে হাজির হয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্নকারী সহিংস হরতালের ঘোষণা দিয়ে দিচ্ছেন। এসব তাদের কাছে এতটাই সহজ যে, ২২ অক্টোবর বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল জানিয়ে দিলেন, যেদিন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে সেদিন থেকে দেশ অচল করে দেয়া হবে। যেন দেশটি বিএনপি আর আওয়ামী লীগের খেলার পুতুল। তারা নিজেদের ঝগড়া মেটাবেন, ঝগড়ায় জিতবেন কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদকে বাজি রেখে। দেশের ও দেশের মানুষের প্রতি যাদের ন্যূনতম ভালোবাসা নেই, দায়িত্ব নেই, তারা জনগণের রাজনীতি করেন কেমন করে সে এক বিস্ময়। সেদিন এক টিভি মন্তব্যে বিএনপির দিকে কিঞ্চিৎ ঝোঁকা এক আইনজ্ঞ শিক্ষক বলছিলেন, এখন রাজপথে আরও কঠোর আন্দোলন করা ছাড়া বিএনপির অন্য কোনো উপায় নেই। আমি অবাক হলাম, তিনি আন্দোলনের ধরন নিয়ে কোনো কথা বললেন না। এটি মুক্তিযুদ্ধের ডাক নয় যে জীবনপণ করে, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সরকারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত আরেক পক্ষের জেতা-হারার লড়াইয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা কেন অধিকারের পর্যায়ে পৌঁছে গেল?
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীদেরও কোনোভাবে কলুষমুক্ত ভাবার কারণ নেই। জনগণের ঘাড়ে বন্দুক রাখতে তারাও কসুর করছেন না। নিজেরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে কোনো ধরনের কসরৎ বাকি রাখেননি। নৈতিকতা ও যুক্তি বলেও কথা থাকে। সংসদের জনপ্রতিনিধিত্বের শক্তিতে যা কিছু করে ফেলার মধ্যে হয়তো আইনগত সমর্থন থাকতে পারে, কিন্তু সবকিছু ন্যায়সম্মতভাবে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এখানেও নিজেদের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের জন্য জনগণকেই জিম্মি করা হচ্ছে। নিজ নিজ সিদ্ধান্তে অনড় থেকে অসুস্থ রাজনীতির অগ্নিকুণ্ডে ছুড়ে ফেলে দেয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিপন্ন করা হচ্ছে দেশের অর্থনীতির। নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি জনগণকে রক্ষা করার দায় বোধ থেকে সমঝোতার পথে হাঁটা যে আওয়ামী লীগ নেতা-নেত্রীদের পবিত্র দায়িত্ব তা তাদের বিবেচনায় আছে বলে মনে হয় না।
এভাবে রাজনীতির সুবিধাবাদী খেলুড়েরা যার যার লক্ষ্য পূরণে খেলতেই থাকবেন আর উলুখাগড়া দেশবাসীর জীবন বিপন্ন হতে থাকবে। কিন্তু এ কথা ভেবে বিস্মিত হতে হয়, আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিকরা কেমন করে ভুলে যান দেশ ও রাজনীতির ভিত্তি ও শক্তি এ বিপন্ন উলুখাগড়ারাই? ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়ে তার ওপর যতই সুরম্য প্রাসাদ নির্মাণ করুন না কেন, তা ধসে পড়বেই। রাজনীতি করতে হলে শেষ পর্যন্ত উলুখাগড়াদের কাছেই ফিরতে হবে।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

রাজনীতিকরা নিজেদের রক্ষা করতে না পারলে অন্যরা পারবেন না by মইনুল হোসেন

দেশে বিদ্যমান ভয়াবহ অবস্থার কথা ভেবে সরকারের মধ্যে কিছু জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সঙ্গত কারণে উদ্বেগ বোধ করছেন; কিন্তু কিছু লোক আবার এই ভেবে আনন্দ বোধ করছেন যে, নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব না হলে তাতে কিছু যায় আসে না। নির্বাচন না হলে সরকার বদলাবে না এবং তাদের কিছু হারানোরও নেই, কারণ তারাই ক্ষমতায় থেকে যাবেন। ক্ষমতা হারানোর ভয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার প্রক্রিয়ায় সরকার জটিলতা সৃষ্টি করে বসেছে এ কথা সত্যি। তবে বিষয়টি এমন যে নির্বাচন অনুষ্ঠান মোটেও সহজ হবে না। আমি তো নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা দেখছি না। কারণ সরকার কোনো নির্বাচনী ঝুঁকি নিতে নারাজ। নির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের জয় নিশ্চিত করতেই সব কিছু করা হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের জন্য সরকার শাসনতন্ত্রে পঞ্চদশ সংশোধনী আনেনি। আদতে বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান অসম্ভব করে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকারের অবসান ঘটিয়েই শাসনতন্ত্রে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে এ আশায় যে, এই পরিবর্তন সরকারের জন্য নির্বাচনে বিজয় অর্জন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। ক্ষমতায় স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা বহুদিন ধরেই চলেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জনগণকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং নানাভাবে পঞ্চদশ সংশোধনী থেকেও বিচ্যুৎ হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ সরকারকে শিথিল ও নড়বড়ে করে ফেলেছে। সংলাপের কথা যতই বলা হোক না কেন, মূল কথা হচ্ছে সরকার নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার ব্যাপারে কোনো সমঝোতা করবে না।
সর্বদলীয় সরকারের ধারণাটি সামনে আনা হয়েছে অন্যদের সরকারে যোগদানে প্রলুব্ধ করতে, যাতে তারা লাভবান হতে পারে। আর রাজনীতি যে এখন বিকিকিনির বিষয় সেটা তো কারও অজানা নয়। রাজনীতিতে নীতি-চরিত্রের সঙ্গতি বজায় রাখার বিষয়টি বর্তমানে গুরুত্ব পাচ্ছে না, যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের জীবন থেকে ওসব গুণাবলী বিদায় নিয়েছে। দেশব্যাপী দুর্নীতি আর অপরাধ করে রক্ষা পাওয়ার বড় ব্যবসার নাম এখন রাজনীতি। তাই রাজনীতির বাইরে এখন কোনো সংগঠিত অপরাধীদের সন্ধান পাওয়া কঠিন।
অন্য দল ভাঙার আশায় এ সংক্রান্ত আইন বদলানো হয়েছে এবং অন্য দলের লোকেরা যাতে সরকারে যোগদান করতে আকৃষ্ট হয় সে রকম একটি দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন কেউ দলে যোগদান করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার পথে যে বাধা ছিল, সে বাধা আর এখন নেই। উপরন্তু নিজেদের লোকদের নিয়ে গঠিত স্বীকৃত সরকারকে তারা নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন এবং ভুলে যাওয়া হচ্ছে যে, শাসনতন্ত্র সংশোধন করে এ ধরনের অন্তর্বর্তী সরকারের ধারণাকে তারা নিরুৎসাহিত করেছেন। এখন সরকার চেষ্টা করছে নির্বাচনের জন্য শাসনতন্ত্রে যে ব্যবস্থা রয়েছে তার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সৃষ্ট বিরোধ থেকে মুক্তি পেতে।
নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠন করার জন্য প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগ করতে বলেছিলেন। কিন্তু যখন তারা পদত্যাগ করলেন, তখন আবার তাদের পদত্যাগকে পদত্যাগ হিসেবে গ্রহণ না করে শাসনতন্ত্রকে অবজ্ঞা করা হল।
এমনটি হওয়া খুবই সম্ভব যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার কিছু রাজনৈতিক গুরু বলে থাকবেন, বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবে না এবং দলটি ভেঙে একটি অংশ মন্ত্রী হওয়ার প্রকাশ্য আমন্ত্রণ এবং টেবিলের নিচের অনেক আকর্ষণীয় সুবিধা গ্রহণের লোভ সংবরণ করতে পারবে না। যদি তেমনটি ঘটে তবে সেটা হবে আওয়ামী লীগের জন্য পূর্ণ বিজয় এবং সেক্ষেত্রে বিএনপির উল্লেখযোগ্য অস্তিত্বই থাকবে না। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের কিছু সদস্য সরকারে যোগ দিতে পারে এমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বিশ্বাসের অভাব এত প্রকট যে, দল দুটির মধ্যে আস্থার ভিত্তিতে কোনো সম্পর্ক আশা করা কঠিন। তাই বিএনপি ক্যাম্পে দল ভাঙার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।
রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা ভোগে বিভোর ক্ষমতার জুয়াড়িরা বুঝতে অস্বীকার করছেন যে, ঢাকার বাইরে সরকারের নিয়ন্ত্রণ খুবই শিথিল। হত্যা, ধ্বংস, অপহরণের ঘটনাবলী বেড়েই চলেছে। জনগণের দুঃখ-দুর্ভোগের ব্যাপারে কারও আবেদন-নিবেদনের প্রতি কেউ ভ্রুক্ষেপ করছে না। পুলিশের সঙ্গে সংঘাত সমানে চলছে, প্রতিবাদকারীদের পুলিশ ব্যাপক হারে ধরপাকড় করছে এবং এতে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। জনআক্রোশের ভীতি এমন একটি উপাদান যাকে সহজভাবে নেয়া ঠিক নয়।
সুতরাং এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন যদি অনুষ্ঠান করা সম্ভব না হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সরকার অস্বস্তিতে ভুগতে যাবে কেন? পরিবর্তিত শাসনতন্ত্রে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নির্বাচনকালে ক্ষমতায় থাকবে এবং নতুন সরকার নির্বাচিত হয়ে না আসা পর্যন্ত তারাই সরকারে থাকবেন। নির্বাচনের সময় সংসদ সদস্যরা এবং মন্ত্রিসভা বহাল তবিয়তে থাকবেন। আওয়ামী লীগের দিক থেকে স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার এটা একটা নিñিদ্র ব্যবস্থা। কিন্তু যেটা মনে রাখতে হবে তা হল, যে সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান করার মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়, সেই সরকার ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারেও একইভাবে অক্ষম। বাস্তব সত্য হচ্ছে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে না পারলে ক্ষমতায় থাকারও গ্রহণযোগ্যতা না থাকবে জাতীয় পর্যায়ে, না থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার স্বপ্নের কোনো সারবত্তা নেই।
আশার লক্ষণ হচ্ছে, এখনও সরকারের মধ্যে দুই-চারজন লোক আছেন যারা ক্ষমতায় থাকার এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন টেকসই হবে না।
রূঢ় সত্য হচ্ছে, রাজনীতিকরা যদি নিজেদের সাহায্য করার ব্যাপারে অসহায় থাকেন, তবে অন্য কেউ তাদের সাহায্য করতে পারে না। অন্যরা অবশ্যই এ রকম নাজুক পরিস্থিতিতে জাতিকে সাহায্য করবে।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

দয়া করে আমজনতার কথা ভাবুন by বেগম জাহান আরা

মার্কিন কংগ্রেস বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্টও। বৃহস্পতিবার রাতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে আলোচনার পর একটি প্রস্তাবনাও পাস হয়েছে। পার্লামেন্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশনকে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনাসহ নির্বাচনের আগে ও পরে সহনশীলতা প্রদর্শন এবং শান্ত থাকার জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পার্লামেন্ট সদস্যরা। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দেশস্থ কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ তো আমরা দেখছিই। মাঝে মাঝে বাইরে থেকে উড়ে আসেন শুভাকাক্সক্ষী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। এই তো ক’দিন আগে ঘুরে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। টগবগে তারুণ্য নিয়ে মোড়লি করে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেন। গণতান্ত্রিক যাত্রা অব্যাহত রাখার কথা বললেন তিনি। বললেন, বাংলাদেশের অমিত ধনসম্পদ প্রাপ্তির সম্ভাবনার কথা। ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক করিডোর থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হওয়ার আশার কথা। দেশে ফিরে বলেছেন, বাংলাদেশ সফরকালে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের দলীয় মতবিরোধের ঊর্ধ্বে ওঠা এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন।
লাখ লাখ কথা খরচ হয়েছে এ পর্যন্ত। কিন্তু সমাধানের পথ বের হচ্ছে না। স্কুলের বার্ষিক স্পোর্টসে একটা আইটেম থাকত দড়ি টানাটানি। খুবই মজার খেলা। দেখতে ভালো লাগত। প্রধানত এ খেলায় দু’পক্ষের কেউ-ই দৌড়-লাফ-ঝাঁপ করতে পারত না। তাদের জন্যই বিনোদন ছিল ওটা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সে রকম একটা দড়ি টানাটানি চলছে মনে হয়। বিরোধী দল চায় তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হোক। আর সরকার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী চান দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হোক।
গণতন্ত্রে জেদাজেদির কোনো ধারা আছে কি-না জানি না। তবে দলতন্ত্রে তো আছেই। এ দেশে অনেক দল, অনেক পথ। মোক্ষ লাভ একটাই- ক্ষমতা চাই। ক্ষমতার লোভে দল গঠিত হয়। দল ভাঙে। জোট গড়ে ওঠে। জোট ভাঙে। বন্ধু শত্র“ হয়। শত্র“ বন্ধু হয়। দুঃখ যাতনায় ক্লেশে পড়ে থাকে আমজনতা।
রাজনৈতিক নেতাদের যদি জিজ্ঞাসা করা যায়, কী চেয়েছে আপনাদের কাছে আমজনতা? তারা তো দিয়েই গেছে, দিয়েই যাচ্ছে। কথায় কথায় জনগণের রেশ টেনে কথা বলেন আপনারা। ক’জন মাটিঘেঁষা, পরিশ্রমী, সংগ্রামী, দেশ অনুগত মানুষ দেখেন আপনারা প্রতিদিন? প্রতি মাস? প্রতি বছর? শুধু নির্বাচনের সময় সেই নিরন্ন, দুঃখী, সৎ মানুষগুলোর সামনে কেঁদেকেটে নতজানু হয়ে ভোট চান। প্রতিশ্র“তি দেন নতুন করে। ভঙ্গ প্রতিশ্র“তির জন্য ক্ষমা চান। এই তো দেখা যায়। তবু ওরা তাকিয়ে থাকে আপনাদের সদিচ্ছার দিকে।
দলীয় মতবিরোধজনিত রাজনৈতিক প্রায় অচলাবস্থায় দেশের জনগণ যে কষ্ট পাচ্ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারা স্বস্তি চায়। শান্তি চায়। সেটুকুও দিতে পারেন না নেতারা। দল তো দেশ নয়। দলের চেয়ে দেশ বড়। মেধায় মননে এদেশের মানুষ যথেষ্ট যোগ্য। তবু দলীয়করণের দাপটে পেছনে পড়ে থাকে প্রকৃত যোগ্য মানুষরা। সামনে আসে অযোগ্য, অদক্ষ, ধামাধরা তেলাপোকারা। ব্যতিক্রম তো আছেই। এই প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ। এ ক্ষতি একদিনের নয়। দীর্ঘদিনের জমাকৃত ক্ষতি।
কেউ কেউ বলছেন, দেশে একদলীয় শাসনের আলামত দেখা যাচ্ছে। যেন একদলীয় সরকার তথা শাসনব্যবস্থা আগে দেখেনি কেউ। যেন ভুলে গেছে সবাই বাকশালের কথা! যুগান্তের আদর্শ এবং রাজনৈতিক পরিচিতি ছুড়ে ফেলে বড় বড় নেতারা বাকশালের স্ট্যাম্প লাগালেন গায়ে। গোল্লায় গিয়েছিল ‘গণতন্ত্র’ চর্চা। কারণ ওই একটাই, ক্ষমতার ভাগ নেয়া। জনগণ তো কচু-ঘেঁচু। তাতেও শান্তি পাননি ক্ষমতালোভীরা। যে মহামানবের মতো মানুষটার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছিল নেতারা, তাদের হাউশ হল এক নম্বর নেতা হওয়ার। তাই-ই হল ১৯৭৫ সালের আগস্টে। পথ নিষ্কণ্টক করার জন্য প্রায় তিন মাস পর আরও চার দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা নেতাকে নৃশংসভাবে খুন করা হল বদ্ধ জেলের ভেতর। কেন? ক্ষমতাকে নিরংকুশ করার জন্য। এর মধ্যে সাধারণ মানুষ কোথায়? কে ভাবে তাদের কথা?
সামরিক শাসনের লোকজন হাঁসফাঁস করে গণতন্ত্রের জন্য। কারণ, গণতন্ত্রে সর্বদলীয় কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকে, যা সামরিক শাসন তথা স্বৈরশাসনের কাঠামোতে থাকে না। কিন্তু গণতন্ত্র শব্দটা বলতে যত ভালো লাগে, গণের উদ্দেশে বা জন্য তান্ত্রিক তথা তন্ত্রবিধি মোতাবেক সেটার চর্চা তত ভালো লাগে না নেতাদের। গণতন্ত্রের বুলি আউড়ে আবার ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকার ভোগের লোভ জাগে মনে। শাসনতন্ত্রের দলীয়করণেও মন ভরে না, দলীয়করণ চাই নির্বাচনেও। জনগণ কিছুই বোঝে না এসবের। যেসব চামচা পরিস্থিতি বোঝে, তারা এতই কথা বলে যে কী বলা হল তার হিসাব থাকে না। প্রবীণ এক নেতা মন্ত্রী বললেন, দেশে বিরোধী দলই নেই। তাহলে আর সমস্যা কোথায়? নির্বাচনেরই বা দরকার কী? হয়ে যাক না আবার বাকশাল। সেটা নেহায়েত পারছেন না বলেই তো এত উষ্মা! তবু সামনে পেলে নেতাকে প্রস্তাবটা দিতাম। কিন্তু তারা তো থাকেন বহু দূরে। ধরা যায় না। ছোঁয়া যায় না। সামনে থেকে দেখা যায় না। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা বলা যায় না। আমরা শুধু তাদের বাণী শুনি।
২২ নভেম্বর দুই মহিলা সংসদ সদস্যের এক আলোচনা অনুষ্ঠান দেখলাম টিভিতে। প্রসঙ্গ ছিল নির্বাচন এবং সঙ্গত কারণেই ‘সংলাপ না সংঘর্ষ?’ দুই দলের দু’জন সদস্য। তাদের নিজেদের এত কথা বলার আছে, নিজ দল সমর্থন এবং অন্য দল কর্তন নিয়ে এত যুক্তি আছে যে, কেউ ধৈর্য ধারণ করতে পারছিলেন না। দু’জনই একসঙ্গে বেশ উচ্চকণ্ঠে কথা বলছিলেন। বেচারা সঞ্চালকের উড়ে যাওয়ার দশা। টিভিতে সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকে। তাই তাদের অবিরত কথার মধ্যেই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। এটা কোনো ব্যাপার নয় আমার জন্য। আমি দেখছিলাম, তারা কেউ সমস্যা উত্তরণের প্রসঙ্গে গঠনমূলক কথা বলেন কি-না। হতাশ হয়েছি। তবে ‘সংলাপ’ শব্দটা শুনেছি কয়েকবার। এই এক বিপদ। ‘সংলাপ’ শব্দটা ক্ষয়ে গেল শুনতে শুনতে। কী নিয়ে সংলাপ, কেন সংলাপ, সেটা তো জানাই আছে।
আশ্চর্য হয়ে যাই অন্য টকশোগুলোর বচন-বাচন দেখেও। কথা বলতে বলতে কেউ লাইনে উঠেও পড়ে যান ইচ্ছে করে। কেন আজ এমন দেয়ালে পিঠ ঠেকার অবস্থা, সেটার সমাধানই বা কী- এ দুটো প্রশ্ন এলেই গলা মিইয়ে যায় অনেকের। কেউ বা বলেনও। কিন্তু কিছুই আসে যায় না তাতে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রধানমন্ত্রী এমন কিছু কাজ করেছেন, যাকে অসাংবিধানিকও বলছেন কেউ কেউ। কিন্তু কে শোনে কার কথা? ঝড় তোলা প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়ে গেল। বলা হচ্ছে, সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা। আসলে এটা সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা নয় কিছুতেই।
প্রশ্ন হল, বিশ্ব রাজনীতিকরা এই অনার্য অধ্যুষিত বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে উৎকণ্ঠিত কেন? এটা ঠিক যে, বিশ্ব নেতারা আন্তরিকভাবেই চাইছেন বাংলাদেশের শান্তি। চাইছেন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা বজায় থাকুক। সাধ্যমতো তারা বোঝাচ্ছেন নেতাদের। শুনছেন না কেউ। এরপর নইলে কী? কেউ জানে না। শুধুই অনুমান যে, সংঘর্ষের ফল ভালো হবে না। হয় না কখনও। সে তো সবাই জানে। বেচারা আমজনতা! কোনো দোষ না করে, কোনো লোভে পা না দিয়ে এবং কোনো দুর্নীতি না করেও মরবে তারাই। এরপরও নেতাদের কি অধিকার থাকে জনগণের দোহাই দিয়ে কোনো কথা বলার? তাদের স্বার্থেই ছাড় দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তো বলেছিলেনই, তিনি শান্তি চান, প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না।
এখনও আশাবাদ মানুষের মনে। হয়তো শেষ মুহূর্তে একটা সমঝোতা হবে, যাতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কেন উল্টো সুরে কথা বলছে? কমিশন জানাচ্ছে, ‘নির্বাচনে আইন-শৃংখলা নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সঙ্গে থাকবে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও।’ এই যুদ্ধ যুদ্ধ প্রস্তুতির কারণ কী? মরবে তো সেই আমজনতাই। নেতারা যাদের ক্ষমতার উৎসরূপে পরিচয় দেন, তাদের ভয় করার তো কিছু নেই।
বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া অবশেষে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে বর্তমান অচলাবস্থার একটা সমাধানের আবেদন জানিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি তো নিজের ক্ষমতাবলে আইনের ঊর্ধ্বে উঠতেই পারেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে। আমি সংবিধান লংঘনের কথা বলছি না। আমার বিশ্বাস, সমাজের সুহৃদ বা শীর্ষ নাগরিক হিসেবেও চাইলে একটা পথ হয়তো বের করতে পারতেন তিনি। ড. কামাল হোসেন এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ দেশের অনেক রাজীনিতিকও তাই মনে করেন। কারণ, সবারই শেষ ভরসা রাষ্ট্রের অভিভাবকের ওপর। তিনি মুখ ফিরিয়ে থাকবেন কী করে? এখনও তাই আশা করে আছি।
অশনি সংকেত তো বেজেই যাচ্ছে। একপেশে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তারপরও দুন্দুভি দামামা বাজিয়ে রণক্ষেত্র তৈরির প্রস্তুতি চলছে। বিরোধী দলেও সাজ সাজ রবের হুংকার। আগেও বলেছি, আবারও বলছি- প্রধানমন্ত্রী, দয়া করে একবার শুধু আমজনতার মুখের দিকে তাকান। বাঁচান তাদের সংঘর্ষের ক্ষতি থেকে। কারও কথা শুনতে হবে না আপনাকে। নিজের কথাটাই রাখুন। পারিষদের তোষামোদিতে কান দেবেন না। আপন অন্তর্জাত উপলব্ধির কথাটাই আবার বলুন। ইতিহাস সৃষ্টি করুন বাংলাদেশে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়- ‘কথায় ও কর্মে আত্মীয়তা’ অর্জন করুন। দেশের গভীর সংকটে তুলনাহীন মহানুভবতা দেখানোর এটাই শ্রেষ্ঠ সুযোগ।
ড. বেগম জাহান আরা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, গবেষক

শিক্ষাব্যবস্থা সবার জন্য এক হোক by নুরুল ইসলাম বিএসসি

একটি বই পড়েছিলাম ‘The Governing Principles of Ancient China’। এ বইটিতে ৩৬০ জন বিভিন্ন পণ্ডিত ও মনীষীর কথা আছে। এখানে ভালো ভালো প্রশাসক তাদের জীবনের অভিজ্ঞতার কথাও বর্ণনা করেছেন। এ বইটিতে লেখা নিয়ম-কানুনগুলো ফলো করে দেশটির প্রশাসন। এ বইয়ের ২১০নং রুলসে বর্ণনা করা হয়েছে ‘The best way to govern people is to pay undivided attention to education’.
একজন শাসকের সর্বোত্তম কাজ হল, মানুষকে অবিভক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। এ কাজটির প্রতি আমি যেমন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি, এই সরকারও যত্ন সহকারে গুরুত্ব দিয়েছে। উন্নয়ন শুধু দালান-ইমারত নয়। উন্নয়নের ১নং শর্ত শিক্ষা। দুর্ভাগ্য যে, আমাদের দেশে অবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার বদলে বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। এখানে হাত দিলেই মাদ্রাসাগুলো তলোয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
এই শিক্ষার ওপর আমি বিগত ৩০ বছর ধরে কাজ করছি। নিজের অর্থায়নে অসংখ্য স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি। এর বাইরেও যেগুলোর দায়িত্ব নিয়েছি, সেখানেও আমুল পরিবর্তন এনে দিয়েছি। কাজেম আলী হাই স্কুল এন্ড কলেজ দেখার আমন্ত্রণ জানাই। এমন একজনকে সভাপতি করা হয়েছে, যার দূরদর্শিতার তুলনা হয় না। আমাকে শতভাগ কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে যুগোপযোগী করেছেন।
শিক্ষার বিকল্প নেই। আজ যদি এই বিজ্ঞানের যুগে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রাম-গঞ্জে গড়ে তোলা যেত, তাহলে সাঈদীকে চাঁদে দেখা যায় বলে কেউ প্রচারও করত না বা কেউ বিশ্বাসই করত না। শিক্ষিতের মধ্যেও কিছু দুষ্ট শিক্ষিত লোক থেকে যায়। এদের হৃদয়ের দ্বার উন্মোচিত হয়নি, হৃদয়ে শিক্ষার আলো প্রবেশ করেনি। অন্ধকারে বসে এরা জীবন চর্চা করে এবং সমাজের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায়। এরাই নারীদের গৃহবন্দি করে পঞ্চম শ্রেণীর ওপর না পড়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে।
শিক্ষা দু’প্রকার। প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাকৃতিক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণে আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হই। কিন্তু যারা প্রতিষ্ঠানে যায়নি, তাদের মধ্যেও শিক্ষিত লোক আছে। আরজ আলী মাতব্বর কোনোদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাননি। তিনি প্রাকৃতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে এমন সব বই রচনা করেছেন, যা পড়লে অবাক হতে হয়। আমাদের নবীও (দঃ) কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাননি। কিন্তু তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষিত ব্যক্তি। প্রকৃতি ও আল্লাহ হজরতকে এমনভাবে শিক্ষিত করে তুলেছিলেন, যাঁর সমকক্ষ পৃথিবীতে আর নেই।
আজ থেকে ৩৪ বছর আগে আমার মনে হয়েছে, সাধারণ দান-খয়রাত না করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারলে এবং ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো জ্বালাতে পারলে প্রকৃত উন্নয়ন হবে। একজন শিক্ষিত নারী সংসারের চেহারা পাল্টাতে পারে, এজন্যই সর্বপ্রথম বালিকা হাইস্কুল গড়ে তুলি। আস্তে আস্তে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খাতির করে শিক্ষক নিয়োগ দিলে, উপযুক্ততার বিচার না করলে ওই প্রতিষ্ঠান প্রসার লাভে সক্ষম হয় না। এদিকে লক্ষ্য রেখে উপযুক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব প্রতিষ্ঠান নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু গড়লে হয় না, নিয়মিত তদারকও করতে হয়। দৈনন্দিন শিক্ষা কার্যক্রমে, পরীক্ষার খাতায় কোনো রকম হস্তক্ষেপ ছাড়াই চলতে দিতে হবে। প্রশাসনিক কাজেও প্রতিষ্ঠান প্রধানকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। মূল জায়গা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি থাকলে তা প্রশমনের সঙ্গে সঙ্গে পরিচালকরা নিরপেক্ষ থাকবেন। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির প্রত্যেক সদস্য নিরপেক্ষ হবেন এবং শুধু প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রসারে, মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন। বর্তমান অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে অনেক কাজ করার বাকি। আমাদের ছেলেমেয়েরা এখনও পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে পিছিয়ে। এদিকে খেয়াল রেখে শিক্ষা কার্যক্রম নতুন করে সাজাতে হবে। বিজ্ঞানের যুগে, ইন্টারনেটের যুগের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এই আশা রইল।
নুরুল ইসলাম বিএসসি : সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক

সংলাপের সূচনা (?) ভালোই হয়েছে by ড. মাহবুব উল্লাহ্

অবশেষে দুই প্রধান দলের সাধারণ সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের আলোচনা বৈঠকটি হল। অবশ্য দল দুটির পক্ষ থেকে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পক্ষে খোলাখুলি কোনো স্বীকারোক্তি আসেনি। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য দুই প্রধান দলের মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়ে আসছিলেন সুধী সমাজ এবং বিদেশী কূটনীতিকরা। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি নিশা দেশাই বিসওয়াল ঢাকা সফর শেষে মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপের তাগিদ দিয়ে গেছেন। এর আগে এফবিসিসিআই’র পক্ষ থেকেও অনুরূপভাবে সংলাপের তাগিদ দেয়া হয়েছিল। টেলিভিশন টকশোতে যারা নিয়মিত আলোচনা করেন, তাদের অনেকেই সংলাপ অনুষ্ঠানের জন্য বারবার তাগিদ দিয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে সংলাপের আগ্রহ ব্যক্ত করে দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে চিঠি দেন। সেই চিঠি পাওয়ার স্বীকারোক্তির কথা আমরা জেনেছি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের চিঠি সম্পর্কে তাদের বক্তব্য জানাবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পর আর কোনো সাড়া মেলেনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এর পর শাসক দল নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করে। এই মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগ ছাড়াও জাতীয় পার্টি (এরশাদ), ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ (ইনু) প্রভৃতি দলের ঠাঁই হয়েছে। জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়–য়া নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এই মন্ত্রিসভাকে শুরুর দিকে সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা বলে দাবি করা হলেও পরবর্তী সময়ে এই দাবি থেকে শাসক দল সরে এসেছে। এখন বলা হচ্ছে, এটা হল বহুদলীয় মন্ত্রিসভা। এই মন্ত্রিসভা গঠনের সংবাদ জানতে পেরে বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তার টিম নিয়ে সাক্ষাৎপ্রার্থী হন। রাষ্ট্রপতি তাকে সাক্ষাতের জন্য দ্রুততার সঙ্গেই সময় জানিয়ে দেন। সেই বৈঠকে রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কথা বলে তার পক্ষে কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়ে দেন। তিনি আরও বলেন, সংলাপের জন্য দুই প্রধান দলকেই উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রপতি বিএনপি চেয়ারপারসনের পেশ করা লিখিত বক্তব্যটি যথাযথ মহলের কাছে পৌঁছে দেয়ারও আশ্বাস দেন। এর পর বেশ কটি দিন কেটে গেছে। সংলাপের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ আমরা দেখিনি।
২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কুশল বিনিময় ঘটে। মিডিয়া সূত্রে জানা যায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহাসচিব পর্যায়ে আলোচনা শুরু করার কথা বলেন। এ ব্যাপারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি। এ সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশকিছু ঘটনা ঘটে যায়। বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন কংগ্রেসের সাব-কমিটিতে একটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এই শুনানিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’ এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে বাংলাদেশের সংকটের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করে এবং সংকট সমাধানকল্পে কোনো সমঝোতা না হলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও ইঙ্গিত দেয়। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক প্রস্তাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক ‘দ্য হিন্দু’ ভারত সরকারকে বাংলাদেশের প্রধান দুই দলের ব্যাপারে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে পরামর্শ প্রদান করে। এসব ঘটনার আলোকে বাংলাদেশের একটি ইংরেজি দৈনিক সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে বলে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঢাকায় এক আলোচনা সভায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে দেশ অচল করে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এভাবেই পরিস্থিতির চাপে দুই প্রধান দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে গত শনিবার একটি একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকটি যে গোপন বৈঠক ছিল তা বলাই বাহুল্য। এই সম্পর্কে ঢাকার একটি দৈনিক নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আলোচনা শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীর একটি বাড়িতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গোপনে বৈঠক করেন। সন্ধ্যা ৭টা ৫ মিনিটে সৈয়দ আশরাফ ওই বাড়িতে যান। এর আগে ৬টা ৪০ মিনিটে মির্জা ফখরুল সেখানে পৌঁছেন। বৈঠকে দুই দলের দুই নেতার সঙ্গে দলীয় অন্য কেউ ছিলেন না।
দুই দলের ঘনিষ্ঠ সূত্র বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে রাজি হননি। বৈঠকের পর সৈয়দ আশরাফ ও মির্জা ফখরুলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে রাতে মির্জা ফখরুল বৈঠকের কথা অস্বীকার করেন।
সরেজমিন দেখা যায়, মির্জা ফখরুল ইসলাম গতকাল বিকালে মতিঝিলে একটি অনুষ্ঠান শেষ করে বনানীর উদ্দেশে রওনা দেন। বনানী কবরস্থানের পাশে গাড়ি বদল করে তিনি সন্ধ্যায় ওই নির্দিষ্ট বাড়িতে পৌঁছান। বাড়িটি রাস্তার পাশে হলেও মির্জা ফখরুল আশপাশের কয়েকটি গলি ঘুরে ওই বাড়িতে ঢোকেন।
এক ঘণ্টার বৈঠক শেষে সৈয়দ আশরাফ রাত ৮টা ৭ মিনিটে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। মির্জা ফখরুল বেরিয়ে যান ৮টা ২০ মিনিটে। তারা দু’জন দুই দিক দিয়ে বের হয়ে যান।
নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, এই আলোচনার জন্য সৈয়দ আশরাফ ও মির্জা ফখরুল দুই দলের দুই শীর্ষ নেত্রীর কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওমরাহ হজ পালনের জন্য সৌদি আরব যাওয়ার আগে সৈয়দ আশরাফকে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করার দায়িত্ব দিয়ে গেছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া এর আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দুই দলের সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে আলোচনা শুরুর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ব্যবসায়ীদের ওই প্রতিনিধি দল এর পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করেন।
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, গতকালের বৈঠকে দুই নেতা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের দাবিগুলো লিখিতভাবে সৈয়দ আশরাফকে দেয়া হয়েছে। তিনি দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। পরে সৈয়দ আশরাফ এসব দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে আবার বৈঠক হবে বলে মির্জা ফখরুলকে জানান।
প্রশ্ন উঠতে পারে বৈঠক নিয়ে এত লুকোচুরি খেলা কেন? অনেকেই বলবেন, স্বচ্ছতার এই যুগে এমন লুকোচুরি সঠিক হয়নি। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে, একান্ত আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার বিষয়টিকে একটি পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে না পারলে মিডিয়ার ঔৎসুক্য এবং নানা মুনির নানা মন্তব্যের ফলে মূল উদ্যোগটি ভেস্তে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও দুই দেশের মধ্যে বিবদমান বিষয় নিয়ে সংগোপনে আলোচনা এগিয়ে নেয়ার রেওয়াজ রয়েছে। আলোচনা যখন একটি পর্যায়ে উপনীত হয় তখনই কেবল অন্য মহলকে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়।
প্রশ্ন হল, দুই নেতার বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীনদের কাছে কী দাবিনামা পেশ করা হয়েছে? যশোরের একটি সাপ্তাহিক ‘দেশকাল’ সূত্রে জানা যায়, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনা এবং সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনাকে সরে যেতে হবে। সংসদ ভেঙে দিয়ে এর পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। প্রশাসন এখন যেভাবে ‘সাজানো’ আছে, বিশেষ করে ডিসি, এসপিদের রদবদল করতে হবে। এসব বিষয়ে দুই দল একমত হলে বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেবে। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, এসব শর্ত পূরণ হবে বলে তারা মনে করেন না। কারণ তাদের ধারণা, সরকার চাইছে বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন করতে। মফস্বলের নতুন এই সাপ্তাহিক পত্রিকাটির রিপোর্ট নির্ভরযোগ্য মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিএনপি নেতারা বহুবার বলেছেন, তারা শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের অধীনে নির্বাচন করবেন না। জাতীয় সমঝোতার স্বার্থে বিএনপির এই দাবিগুলো (যদি বিএনপি করে থাকে) যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক এক কেবিনেট মিটিংয়ে বলেছিলেন, তিনি সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত আছেন। পরবর্তীকালে তিনি আরও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রিত্ব তার জন্য বড় কোনো ব্যাপার নয়। এ যাত্রা তিনি যদি জাতির স্বার্থে এই উদারতাটুকু প্রদর্শন করতে পারেন, তাহলে জনগণও তাকে অধিকতর শ্রদ্ধা জানাবে। রাজনৈতিক সংঘাত দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। দেশের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল ও শ্রীবৃদ্ধি হোক। এটাই দেশবাসীর কামনা।
ড. মাহবুব উল্লাহ :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর

বাংলাদেশ কেন ‘গ্রেট গেম’-এর শিকার হবে?

বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক
করেন মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই
মধ্য এশিয়ার বহু দেশের একটি খেলার নাম ‘বুজকাসি’। খেলাটি হলো মস্তকবিহীন মৃত মেষকে দুই দল ঘোড়সওয়ারের মধ্যে গোলপোস্টে নিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। এটি মুণ্ডবিহীন মেষ নিয়ে টানাটানি। খেলাটি আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী ও জাতীয় খেলা। অনেকের মতে, খেলাটি চেঙ্গিস খানের মধ্য এশিয়া অভিযানের পর শুরু হয়েছিল। ইতিহাসের কী নির্মম পরিহাস, এ খেলার মতো আফগানিস্তানকে নিয়ে বুজকাসির মতো টানাটানি শুরু হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীতে, যা কার্যত শেষ হয় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে।
ভূকৌশলের ইতিহাসে এটি ‘গ্রেট গেম’ নামে পরিচিত। এই খেলার এক প্রান্তে ছিল পরাশক্তি রাশিয়া, অন্য প্রান্তে ভারতের ব্রিটিশরাজ। উভয়ই আফগানিস্তানের ওপর কর্তৃত্ব ও প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে ওঠে। এ কারণেই সংঘটিত হয় প্রথম আফগান যুদ্ধ এবং ব্রিটিশরাজ দখলে নেয় দেশটি। এ যুদ্ধ প্রাথমিক পর্যায়ে শেষ হয় ১৯১৯ সালে, তৃতীয় আফগান যুদ্ধের সমাপ্তি রাওয়ালপিন্ডি চুক্তির মাধ্যমে। ব্রিটিশরাজ আফগানিস্তানকে রাশিয়া ও ব্রিটিশ-ভারতের মধ্যে ‘বাফার স্টেট’ হিসেবে থাকার অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে দেশটির সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয়। এ খেলা আফগানিস্তানে নতুনভাবে শুরু হয় শীতল যুদ্ধের সময়ে, যাতে দুই পরাশক্তি জড়িয়ে পড়ে। আজ আফগানিস্তানে হানাহানি আর বিদেশিদের দখলদারি চলছে। ক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার কারজাই সরকার। বর্তমানে ভারত ও চীনের মধ্যে নতুন করে ভূকৌশলগত ‘খেলা’ শুরু হয়েছে। প্রসঙ্গত, চীনের পেছনে পাকিস্তান আর ভারতের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুজকাসি আমাদের দেশের খেলা নয়। কিন্তু বুজকাসির মতো আমরাও পড়েছি দুই শক্তির টানাটানির মাঝে। বিশেষ করে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক ডামাডোলে খেলাটি অনেকটা প্রকাশ্য হয়ে পড়েছে। কোনো রাখঢাক নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধুনা বাংলাদেশকে নিয়ে এ অঞ্চলে গ্রেট গেম শুরু হয়েছে। বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারত রয়েছে এই গ্রেট গেমের দুই পাশে।
এ ক্ষেত্রে চীন কার পেছনে রয়েছে, তা অনুমানযোগ্য। মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রকাশ্যে বলেছেন যে তাঁর দেশ ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অনেকটা ঐকমত্যে পৌঁছেছে। আপাতদৃষ্টে মতভেদ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও টানাটানি চলছে নেপথ্যে। কিছুদিন আগে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতীয় আমেরিকান নিশা দেশাই বিসওয়াল ঢাকায় তিন দিনের সফরে এসে আমাদের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের সংকট নিরসনের অছিয়ত করে গেলেন। আর রাজনীতিবিদেরাও খুবই উৎসাহের সঙ্গে তাঁর কথা শুনলেন। তাঁর ডাকে একই ছাদের নিচে জড়ো হলেন, যাদের যুদ্ধাপরাধীর দল বলে অপাঙেক্তয় করা হয়েছে, সেই জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দলের নেতারাও। অথচ দেশের রাজনীতিতে জামায়াতের অবস্থান নিয়ে তীব্র বিরোধ চলছে দুই জোটের মধ্যে। কয়েক মাস আগেও সরকারি দলের শীর্ষ ব্যক্তিরা এই দলকে নিষিদ্ধ করার কথা বললেও এখন আর বলছেন না। যদিও নিশা বিসওয়াল আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কী আলাপ করেছেন,
তা সাধারণ মানুষ জানতে পারবে না। তবে তাঁর ছোট ছোট বক্তব্য ও অভিব্যক্তি ইঙ্গিত দেয় যে সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবে না হলে বাংলাদেশের আকাশে কালো মেঘ ছেয়ে যেতে পারে। রয়টার্স খবর এজেন্সির এক লেখায় তিনি বলেছেন যে চলমান সংকট রাজনৈতিকভাবে সমাধান না হলে বাংলাদেশের জনগণ দুই প্রধান দলের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে রাস্তায় নামতে পারে। বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির এ উক্তি তাঁর নিজস্ব মতামত হতে পারে না, যেমনটি আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মুখ থেকে হরহামেশাই বের হতে থাকে। নিশা বিসওয়ালের ইঙ্গিত কি তাহলে বাংলা বসন্তের আভাস? সে ধরনের কিছু হলে সত্যিই উদ্বেগজনক। নিশা দেশাই বিসওয়াল একতরফা নির্বাচনের ওপর তাঁর মতামত সরাসরি না দিলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন।
দুই. যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই আমরা রাজনীতিকদের অবস্থানের বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করি। ‘সর্বদলীয়’ বা ‘নির্বাচনকালীন’ নামে মন্ত্রিসভায় আটজন মন্ত্রী যুক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে চারজন পূর্ণ এবং একজন প্রতিমন্ত্রী সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির যোগদান নিয়ে এখন নানা ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া চলছে গণমাধ্যমে। এরশাদের রাজনৈতিক অবস্থান এর আগে এত বেশি বিতর্কের মধ্যে পড়েনি, যদিও কখনোই তিনি বিতর্কের বাইরে ছিলেন না। তিনি মহাজোটের শরিক ছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি যে ধরনের বক্তব্য, সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার উদিগরণ করেছেন, তার ঠিক বিপরীত কাজটি করায় হকচকিয়ে গেছেন রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা। বর্তমানে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন অথবা বিরোধী দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন—উভয় ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের জাতীয় পার্টি, যার অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। তবে জোটবিহীন জাতীয় পার্টি কতখানি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। অনেকের বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ সরকারের কাছ থেকে চাপ প্রয়োগ করে এরশাদ বেশ কিছু সুবিধা আদায় করেছেন। অন্তত পাঁচজন মন্ত্রী ও একজন উপদেষ্টার পদ পেয়েছেন। অপ্রকাশ্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত। এরশাদ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য না দিলেই ভালো করতেন। তথ্যে প্রকাশ যে বিরোধী জোট যদি নির্বাচনে না আসে, তবে জাতীয় পার্টি আলাদা নির্বাচন করবে এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তবে বিরোধী দল নির্বাচনে যোগ দিলে জাতীয় পার্টি আবার মহাজোটে ফিরে যাবে। তেমনটাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রেও জাতীয় পার্টি আগের অবস্থায় থাকবে কি না, সন্দেহ। পার্টি-প্রধানের পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে পার্টির ভেতরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। ভাঙনের মুখে পড়তে পারে দলটি। ইতিমধ্যে দলের জ্যেষ্ঠ নেতা কাজী জাফর আহমদ এক বিবৃতিতে তাঁর কঠোর সমালোচনা করেছেন।
তিন. নিশা বিসওয়ালের বাংলাদেশ সফরের এক দিন পরেই রাজনৈতিক মঞ্চপটে আরেকটি অঙ্ক রচিত হলো। বিরোধীদলীয় নেতা ১৯ জন সদস্যসহ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করেন। প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক হয়। বৈঠকে বিরোধী দল তাদের নির্দলীয় সরকারসহ অন্যান্য দাবিও তুলে ধরে। এর মধ্যে নতুনভাবে সংযোজিত হয় নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন। কারণ, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা নেই বিরোধী দলের, যদিও অতীতে বেশ কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন বিরোধী দলের সমর্থক প্রার্থীরা। ফলাফল অপ্রত্যাশিতভাবে বিরোধী দলের পক্ষে হলেও, পরে বিএনএফ নামের দলটিকে যেভাবে নিবন্ধন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন, সেটাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে করে তারা। লক্ষণীয় যে এই দলটিকে যেভাবে কমিশন নিবন্ধন দিয়েছে, তাতে সন্দেহের মাত্রা বেড়েছে। বিএনপিকে বেকায়দায় ফেলতেই এই দলকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে বলে মনে করে দলটি। বিরোধী দলের অনুরোধ ছিল, সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে তাদের দাবিদাওয়া রাষ্ট্রপতি যেন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। এতে বিরোধী দলের জন্য নির্বাচনের পথ সুগম হয়। বিরোধী দলের প্রধান দাবি নির্দলীয় সরকার, যা সরকারি দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অতিসীমিত, তা জেনেও বিরোধী জোট এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দাবিদাওয়ার মধ্যে মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকের বিষয়টিও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি সরকারি দলকে রাজি করাতে পারেন। তবে তা হবে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত উদ্যোগ। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে বিরোধী দল দেশবাসীকে দেখাতে সক্ষম হয়েছে যে তারা সংলাপের মাধ্যমে সংকটের নিষ্পত্তি চায়। তবে এই সাক্ষাৎ ও বৈঠক কতখানি ফলপ্রসূ হয়েছে বা হবে, তা নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কারণ, ইতিমধ্যেই সংসদের অধিবেশন শেষ হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর মতে ‘শেষ বৈঠক’। তিনি আরও বলেছেন যে আপৎকালীন বলে বিবেচিত সময় হলে সংসদ আবারও ডাকা যেতে পারে। প্রসঙ্গত, সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। কাজেই সংসদের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি আবার সংসদ অধিবেশন ডাকতে পারেন। এখন সবার চোখ বঙ্গভবনের দিকে। রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত, সন্দেহ নেই। তবে সংবিধানের ৪৮(৫) ধারায় কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রপতি কোনো বিষয় পাঠালে মন্ত্রিপরিষদ আলোচনা করতে পারে। এর পরও রাষ্ট্রপতি ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে দুই জোটের মধ্যে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, এমনকি তিনি আলোচনায় মধ্যস্থতাও করতে পারেন। এমনটা করলে রাষ্ট্রপতি একটি ঐতিহাসিক নৈতিক দায়িত্ব পালন করবেন। রাষ্ট্রের অভিভাবক রাষ্ট্রপতি নিশ্চয়ই চাইবেন না যে তাঁর দায়িত্ব পালনকালে দেশ সংঘাত-সংঘর্ষে জর্জরিত হোক।
চার. লেখাটি শুরু করেছিলাম বুজকাসি আর ‘গ্রেট গেম’ দিয়ে। ইতিমধ্যেই নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার খবর, অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে পড়তে পারে দেশ। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে শুনানি হয়েছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন উদ্বিগ্ন। ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য হিন্দুর সম্পাদকীয়তে ভারত সরকারকে কোনো পক্ষ না নিতে অনুরোধ করেছে। এককথায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি বেশ উত্তাপ ছড়াচ্ছে। উপসংহার টানতে চাই এ মন্তব্য করে যে আমরা বুজকাসি খেলার মস্তকবিহীন মেষ হতে চাই না। চাই না দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন গ্রেট গেমের ক্ষেত্র হোক। দেশের জনসাধারণ প্রত্যাশা করে যে দুই পক্ষই যৌক্তিক ছাড় দিয়ে দেশের স্বার্থে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে । এ ক্ষেত্রে দেরিতে হলেও নির্বাচন কমিশনের উপলব্ধির সঙ্গে আমরাও একমত যে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে না। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙে, আলোচনার ভিত্তিতে, একটি ছোট আকারের সরকারের সহযোগিতায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। আমরা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত দেখতে চাই। চাই না নিশা দেশাই বিসওয়ালের আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হোক।
এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক।
hhintlbd@yahoo.com

পোল্যান্ড বাংলাদেশের ভালো বন্ধু

ইয়ানুশ জারেস্কির হাতে প্রথম আলোর
উপহার সামগ্রী তুলে দিচ্ছেন লেখক
বাংলাদেশের নদীদূষণ বন্ধ, আর্সেনিকমুক্ত সুপেয় পানি সহজলভ্য করা, সবুজ প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যাপ্ত বিদ্যুতের ব্যবস্থা—এসবই সম্ভব বলে মনে করেন পোল্যান্ডের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ইয়ানুশ জারেস্কি। এ জন্য দরকার একটি মাস্টারপ্ল্যান। এ ব্যাপারে পোল্যান্ড বাংলাদেশকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে পোল্যান্ডের মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ওয়ারশতে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ-১৯-এর চূড়ান্ত দর-কষাকষির ফাঁকে আমি পূর্বনির্ধারিত এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য সম্মেলন-ভেন্যুতে স্থাপিত পোল্যান্ড সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অস্থায়ী কার্যালয়ে যাই। এই সাক্ষাৎকারের সুযোগ করে দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের কাউন্সেলর এভা সিদ্দিকী ওলেশেউক। তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মাহবুব সিদ্দিকীর স্ত্রী। বাংলাদেশের জন্য তাঁর অসীম ভালোবাসা। আমার অনুরোধে তিনিই মন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। আমি পোল্যান্ডের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলি, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতালাভের পরপরই যে কটি দেশ স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, পোল্যান্ড তাদের অন্যতম। পোল্যান্ড বাংলাদেশের ভালো বন্ধু। নিখুঁত ব্যবস্থাপনায় জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রশংসা করলে মন্ত্রী বলেন, পোল্যান্ড ফুটবলে বেশি সফল হতে পারেনি, কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি জলবায়ু বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে এই সম্মেলন সম্পন্ন করা ছিল আমাদের সামনে বিরাট চ্যালেঞ্জ।
একটি তিনতলা ফুটবল স্টেডিয়ামকে যে এমন সুন্দরভাবে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন-ভেন্যুতে সাময়িকভাবে রূপান্তরিত করা যেতে পারে, তা ভাবলেও অবাক লাগে। মাঠ মাঠের মতোই আছে, তার ওপর কাঠের পাটাতন বানিয়ে সম্মেলনের মূল আলোচনাকক্ষ বানানো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিসজ্জিত, সারা স্টেডিয়াম এলাকা স্বয়ংক্রিয় ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্কের আওতায় রাখা, বেতার হেডসেটে প্রতিটি বক্তৃতার বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ সম্প্রচার, লিফট, খাওয়া-দাওয়ার সুব্যবস্থা, যেখানে-সেখানে চা-কফি, কী না আছে সেখানে। সম্মেলনের প্রতিনিধিদের যে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে, তা গলায় ঝুলিয়ে বাস-ট্রাম-রেল-সাবওয়েতে সারা শহর বিনা ভাড়ায় চষে বেড়ানো যায়। এই বিশাল আয়োজনের ব্যয়ভার প্রায় পুরোটাই বহন করেছে পোল্যান্ড। হয়তো কিছু সহযোগিতা দিয়েছে জাতিসংঘ। মন্ত্রী ইয়ানুশ জারেস্কি বলেন, পরিবেশ ও জ্বালানি বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে পোল্যান্ডের সহযোগিতার ভালো ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে। তাদের প্রযুক্তি পরিবেশবান্ধব, আধুনিক, উন্নত মানের, কিন্তু সস্তা। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ, পানি পরিশোধন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রভৃতি ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার বিরাট সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। আলোচনার সময় মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ওয়াটার ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান এবং প্রেসিডেন্টের অ্যাডভাইজার মারেক গ্রোমিয়েস। তিনি এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার জন্য মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ শেষে মন্ত্রীর হাতে প্রথম আলোর উপহারসামগ্রী তুলে দিলে তিনি ধন্যবাদ জানান।
জলবায়ু সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনটি ছিল বেশ দ্বন্দ্বমুখর। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শফিকুর রহমান পাটোয়ারী বেশ কটি বিষয়ে মতবিরোধ কাটিয়ে ওঠার বিষয়ে ছিলেন আশাবাদী। এডিপি ২-৩-এর ওপর ২২ নভেম্বর ভোররাত পৌনে ছয়টায় যে খসড়া দলিলটি সবার কাছে দেওয়া হয়, তাতে অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্যের আভাস পাওয়া গেলেও আলোচনা থেমে থেমে চলেছে রাত পর্যন্ত। অনেকেরই ধারণা সম্মেলনে কিছু বিষয় হয়তো অমীমাংসিত থেকে যাবে। তার পরও অগ্রগতি লক্ষণীয়। বিকেলে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত দুই নারী প্রতিনিধির সঙ্গে আমরা কয়েকজন আলোচনা করছিলাম। ওরা জিজ্ঞেস করল সম্মেলনে সব বিষয়ে ঐকমত্যে আসার পথে বাধা কোথায়? আমি বললাম, বিশ্বের বেশ কটি উন্নত দেশ জলবায়ু তহবিলে অর্থায়নে রাজি না হওয়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্ল্যানারি সেশনে বিভিন্ন দেশের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, ২০১১ ও ২০১২ সালে ওডিএর পরিমাণ ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু-সুবিচার প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিনিধি হাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, আমরা সত্যিই দুঃখিত। আসলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিরাও চান না যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য ২০১৫ সালের প্যারিস সম্মেলন পর্যন্ত একটি রোডম্যাপ তৈরির পথ বাধাগ্রস্ত হোক।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

গণমাধ্যমের ওপর অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা

‘সাংবাদিক হওয়ার চেষ্টা কোরো না, পাকিস্তানে সাংবাদিকতা খুবই বিপজ্জনক।’ কলেজছাত্র অবস্থায় আমার একটি লেখা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে দেখে বাবা আমাকে এটা বলেছিলেন তিন দশক আগে। বাবা ছিলেন পাঞ্জাবের লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক এবং বিখ্যাত কলাম লেখক। অথচ আমার জন্য বিষয়টি ছিল দারুণ আনন্দের। আমার লেখা ছাপা হয়েছে দেখে কলেজের শিক্ষক ও সহপাঠীরাও খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু বাবা আমাকে পাকিস্তানের সাংবাদিকদের বিপদ নিয়ে ছোটখাটো একটা বক্তৃতা দিলেন। সে সময়ের সামরিক স্বৈরাচার জিয়াউল হকের সমালোচনা করায় বাবা বেশ বিপদে ছিলেন। পরিষ্কার ভাষায় তিনি আমাকে বললেন, ‘সরকার আমাকে দেখতে পারে না, কিছু ধর্মীয় চরমপন্থী দিন-রাত আমাকে অনুসরণ করে; ওরা হয়তো আমাকে মেরে ফেলবে। তুমি বরং লেখালেখি ছেড়ে ক্রিকেট নিয়ে থাকো।’ আমি হতাশ হলাম এবং কয়েক মাসের মধ্যেই বাবার আশঙ্কা সত্যি হলো। রহস্যময় পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হলো। মানবাধিকারকর্মীরা ময়নাতদন্ত দাবি করলেও সরকারি নিষেধাজ্ঞায় সেটা হলো না। মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কর্তৃপক্ষ তাঁকে কবরস্থ করল। সৌভাগ্যজনক অথবা দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমি বাবার আদেশ মানলাম না।
মায়ের ইচ্ছায় আমি সাংবাদিকই হলাম। মা ছিলেন সাহসী একজন নারী। তিনি এমনকি আমার ছোট ভাইকেও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে বললেন। মা বেঁচে থাকলে দেখতেন, এখনো পাকিস্তানে সাংবাদিকতা কী রকম বিপজ্জনক এক পেশা। তিন দশক পরেও আমরা বিপদে আছি। এত বছরে সাংবাদিকতা ভালোই বিকশিত হয়েছে এ দেশে। তরুণেরা আরও বেশি হারে এই পেশায় আসছেন। তাঁদের বিশ্বাস, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ব্যবহার করে তাঁরা পাকিস্তানে সামাজিক পরিবর্তন ঘটাবেন। কিন্তু স্বাধীনতা থাকার জন্য আমাদের দিতে হচ্ছে চরম মূল্য। ৯/১১-এর পাকিস্তানে ৯৫ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই অপহরণের শিকার হয়ে নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। অনেক সময় আমরা তাঁদের হত্যাকারীদের চিনে ফেলি। কিন্তু তারা আইনের থেকেও শক্তিশালী। আমি কয়েক ডজন সাংবাদিকের কথা জানি, যাঁরা বাধ্য হয়ে পেশা বদল করেছেন। আমি এমন মানুষদেরও জানি, যাঁরা তাঁদের আপন শহর ছাড়তে না চাওয়ার পরিণতিতে খুন হয়েছেন। শারীরিক আক্রমণ এবং সহিংস হুমকিই আজ পাকিস্তানে চরম অঘোষিত সেন্সরশিপের কাজ করছে। সম্প্রতি তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) কয়েকটি গণমাধ্যম সংস্থার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেছে। বিশেষভাবে তাদের কাছে ঘৃণিত দুই সাংবাদিকের ছবি দিয়ে সেই রায় তারা প্রকাশও করেছে।
একজন হলেন বিখ্যাত কলাম লেখক হাসান নিসার এবং অন্যজন হলাম আমি। এ ধরনের হুমকি এটাই প্রথম নয়। ২০১২ সালে মালালা ইউসুফজাইয়ের ওপর আক্রমণের প্রতিবাদ করলে তারা আমার বিরুদ্ধে প্রথম হুমকি দেয়। এর কয়েক দিন পরেই আমার গাড়িতে বোমা পাতা হয় এবং টিটিপি তার দায় স্বীকারও করে। আমি ছাড়াও অন্য সাংবাদিকেরাও টিটিপির হুমকির শিকার। আমরা আরও বেশি চিন্তিত নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর দ্বিমুখী চাল ও হুমকির জন্য। বেশ কয়েকবারই তারা সাংবাদিকদের অপহরণের পর হত্যা করে টিটিপির ওপর দায় চাপিয়েছে। পাকিস্তানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রধান দুই শত্রু হলো টিটিপি ও গোয়েন্দা সংস্থা। টিটিপি আমাদের ইসলামের শত্রু বলে চাপে ফেলে। আর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো গণমাধ্যমকে বশ করতে তাদের দালালদের পত্রিকার মাধ্যমে আমাদের ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে অভিহিত করে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পিটিভিতে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র প্রথম আমাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা দেয়। আমার অপরাধ ছিল কাশ্মীরের ভূমিকম্পদুর্গত এলাকা নীলাম উপত্যকায় গিয়েছিলাম এবং দেখে এসে জানিয়েছিলাম যে সেখানে কোনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পারভেজ মোশাররফকে জানায়, আমি শত্রুদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ধ্বংস করছি। সেনা কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি অনুসন্ধান করে এবং দেখতে পায় আমি ঠিকই বলেছি। তখন মোশাররফ আমাকে প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরীর বিপক্ষে ব্যবহারের চেষ্টা করেন।
আমাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়, আমি যদি তাঁর বিরুদ্ধে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান করি, তাহলে আমাকে ১৫০ মিলিয়ন রুপি দেওয়া হবে। আমি নারাজ হলে আরও পাঁচজন টিভি উপস্থাপকসহ আমাকে টেলিভিশনে নিষিদ্ধ করা হয়। মোশাররফের বিদায়ের পর আমার অনুষ্ঠানে আমি নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়টা সামনে আনা শুরু করি। কিন্তু অচিরেই বুঝতে পারি, মোশাররফ বিদায় নিলেও তাঁর নীতি অটুট রয়ে গেছে। পাকিস্তানের শক্তিমান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা আমাকে বোঝাতে আসে যে জাতীয় স্বার্থে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়টা আমার এড়িয়ে যাওয়া উচিত। আমি তাদের বোঝাতে চাইছিলাম যে আমি কেবল আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করছি। আমার জবাবকে তারা ঔদ্ধত্য হিসেবে নিল। এর পরিণতিতে আমার ছেলেমেয়েদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। এটা ছিল আমার সবচেয়ে নাজুক জায়গায় আঘাত; এ ঘটনায় আমার স্নায়ু বিকল হয়ে যায়। কিন্তু সেটাই শেষ নয়। আইএসআই আমাকে একটা খুনের মামলায় জড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আদালতে তারা প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়। অথচ আমার অনেক সহকর্মী গণমাধ্যমে আমার বিচার শুরু করে একজন নৌ কর্মকর্তার চাপে। নৌবাহিনীর এই অফিসারকে আইএসআইয়ের মিডিয়া শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে, আমার মোবাইলে কিছু হুমকিবার্তা আসে।
আমি সবকিছু প্রকাশ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। পার্লামেন্টে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পিকার ফাহমিদা মির্জা বিষয়টি তদন্তে বিশেষ একটি কমিটি করে দেন। আমি তাঁদের সব ফোন নম্বর সরবরাহ করি। এর কয়েক দিন পর আইএসআইয়ের এক কর্মকর্তা আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘সবই হয়েছে ভুল-বোঝাবুঝি থেকে। আমাদের প্রতিষ্ঠান নয়, কয়েকজন ব্যক্তি এর জন্য দায়ী।’ আমি বিষয়টি গণমাধ্যমে দিইনি, কারণ আমি কোনো ব্যক্তিগত রোষ থেকে এসব করিনি। বিশেষ কমিটি ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ একটি বিশদ প্রতিবেদন পার্লামেন্টে পেশ করে। কিন্তু সেখানে আমাকে দেওয়া হুমকি বিষয়ে তদন্তের কোনো কথাই ছিল না। পাকিস্তানের সাংবাদিকেরা শুধু টিটিপি বা আইএসআইয়ের কাছ থেকেই হুমকি পান না। মাঝেমধ্যে শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রদূতেরা আমাদের ওপর খেপে যান। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যান ডব্লিউ পিটারসন আমি ও আমার সহকর্মী কামরান খানের বিরুদ্ধে একটা ক্রুদ্ধ চিঠি পাঠান। সে সময় আমরা ইসলামাবাদের কুখ্যাত মার্কিন ভাড়াটে যুদ্ধ কোম্পানি ব্ল্যাকওয়াটার নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার করছিলাম। সম্প্রতি আমার টেলিভিশন চ্যানেলের ম্যানেজমেন্ট আমাকে জানিয়েছে যে একটি গণতন্ত্রবিরোধী থিংক ট্যাংক আমাকে হত্যার জন্য খুনি ভাড়া করার চেষ্টা করছে।
এই ধর্মোন্মাদ গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। কখনো কখনো তিনি আমাকে ‘সিআইএ’র এজেন্ট, কখনো ভারতীয় ‘র’-এর এজেন্ট বলে গালি দেন। কখনো কখনো তালেবান এজেন্টও বলেন। আমাদের ম্যানেজমেন্ট তথ্য-প্রমাণসমেত আদালতে অভিযোগ করে যে কতিপয় গণতন্ত্রবিরোধী ব্যক্তি গোয়েন্দা সংস্থার তহবিল নিয়ে স্বাধীন গণমাধ্যমকে জিম্মি করার জন্য ইসলাম ও দেশপ্রেমের নামে চক্রান্ত করছে। করাচির একটি আদালত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। কিন্তু এখনো লোকটি ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেকে মনে করেন, পাকিস্তানের গণমাধ্যম শক্তিশালী। তারা ভাবে, আমি খুবই প্রভাবশালী। কিন্তু ঘটনা হলো, এক বছর ধরে আমি এক জায়গায় নিয়মিত ঘুমাই না। সাংবাদিক হওয়ার দোষে আমি স্বাভাবিক পারিবারিক জীবনও পাই না। যদি রাজধানী নিবাসী নামকরা সাংবাদিক হয়েও আমি এ রকম বিপন্ন জীবন কাটাই, তাহলে যারা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কাজ করেন, তাঁদের কথা ভাবুন। তাঁরা আমার চেয়েও বিপন্ন। সরকার তাঁদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। আমরা তাহলে কী করব? পেশা ছেড়ে দেব? না! কারণ, আমাদের দর্শক-শ্রোতারাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। জনগণই আমাদের সেরা বিচারক।
তারা জানে যে আমরা তাদের জানার অধিকারের জন্য লড়াই করছি। আমরা তাদের আশা। গণমাধ্যমের শত্রুরা আমাদের নিশ্চুপ করিয়ে দিতে পারবে না, কারণ আমরা বেঁচে আছি জনগণের হূদয়ে। একটি জিনিস পরিষ্কার: আমরা সাংবাদিকেরা লড়াই চালিয়ে যাব। আমরা আত্মসমর্পণ করব না। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আমাদের কিছু ঘটলে তার দায় অবশ্যই সরকারের। পাকিস্তানের নতুন প্রজন্ম মাতৃভূমিতে এই অঘোষিত সেন্সরশিপ কোনোভাবেই মেনে নেবে না। এ বছর পাকিস্তান সরকার তাঁর পিটিশনের প্রতিক্রিয়ায় ২০টি সরকারি সংস্থার মাধ্যমে সাংবাদিকদের কিনে নেওয়ার জন্য ব্যবহূত গোপন তহবিল বাতিল করে এবং ভাতাপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের নাম প্রকাশ করে।
হামিদ মির: পাকিস্তানের জিয়ো টিভি ও জং গ্রুপে কর্মরত সাংবাদিক।

শর্তসাপেক্ষে শর্ত মানবেন কারজাই

আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই রোববার বলেছেন আমেরিকা আগে শান্তি ফিরিয়ে আনুক, পরে আমরা আফগান মার্কিন নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করব। যদি শান্তিই না থাকে তবে চুক্তি দিয়ে আফগানদের কি হবে? শান্তি চুক্তির পূর্বশর্ত। তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তান মার্কিনিদের প্রতি বন্ধুত্ব প্রমাণ করেছে এবার মার্কিনিদের পালা আফগানদের ওপর তাদের বিশ্বস্তার প্রমাণ দেয়া। চলতি বছর আফগান-মার্কিন নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন না বলে সাফ জানিয়েছেন আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে লয়া জিরগা বা গ্র্যান্ড অ্যাসেম্বলির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট কারজাই এ সিদ্ধান্ত জানান।
নিরাপত্তা চুক্তিটির অনুমোদনের জন্য গত চারদিন ধরে কাবুলে দুই হাজার ৫০০ জনেরও বেশি আফগান নেতা এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। কিন্তু চুক্তিটির কয়েকটি দিক নিয়ে তীব্র বির্তকের সৃষ্টি হয়। বির্তকের একপর্যায়ে প্রেসিডেন্ট কারজাই ঘোষণা দেন, আগামী বছরের এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর চুক্তির স্বাক্ষর করা হবে। তবে, আমেরিকা কারজাইয়ের এ সিদ্ধান্তকে অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করে। এ ব্যাপারে গত কয়েকদিন ধরে প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে টেলিফোনে বেশ কয়েক দফা আলোচনা করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। চুক্তির কয়েকটি বিতর্কিত বিষয় হচ্ছে- ২০১৪ সালের পর ঠিক কতজন মার্কিন সেনা আফগানিস্তানে মোতায়েন থাকবে। মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা কোথায় হবে? মার্কিন আদালতে, নাকি আফগান আদালতে? মার্কিন সেনারা নিরাপত্তার স্বার্থে আফগান নাগরিকদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালাতে পারবে কিনা। আফগান প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়া কোনো অভিযান চালাতে পারবে না মার্কিন সেনারা। তবে, চুক্তির যে কোনো ধারা বা উপধারা সংশোধন করার ক্ষমতা থাকবে আফগানিস্তানের। বিবিসি ও রয়টার্স।
শান্তি চুক্তির পূর্বশর্ত মার্কিনিদের বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিতে হবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে চুক্তি স্বাক্ষর হবে