Friday, January 9, 2026

আসুন, কোলদের প্রতি মানবিক হই by সঞ্জীব দ্রং

প্রকাশ ০৪ নভেম্বর ২০২৫ঃ মানুষের নাকি রাষ্ট্রের নির্মম ঔদাসীন্য ও হিংস্র বিদ্বেষের শিকার হলো অতি সংখ্যালঘু কোল জাতির পাঁচ পরিবার। ঘটনা এ রকম: প্রায় আড়াই দশক ধরে রুমালী হাসদাসহ পাঁচ কোল পরিবার এই ভূমিতে বসবাস করছিল। তারা জানত, জমিটা খাস এবং তাদের জাতভাই তিলক মাঝি, দিনু মাঝি, ভাদু মাঝিসহ কয়েকজনের নামে জমির রেকর্ড আছে।

রাজশাহী থেকে স্টিফেন সরেন আমাকে কাগজ পাঠিয়েছেন। আমি দেখলাম, এসএ রেকর্ডে এই কোলদের নাম আছে। তাদের অভিযোগ, জাতিতে হিন্দু সাজিয়ে এবরিজিনালদের জমি রেজিস্ট্রি করে নিয়েছেন মকবুল হোসেন। তাঁর ওয়ারিশরা পরে আদালতে মামলা করেন। কোল পরিবারগুলো অভাব–অনটন ও নানা কারণে মামলার খোঁজ নিতে পারেনি। আদালত একতরফা রায় দেন।

২৭ অক্টোবর কোলদের মাটির বাড়িঘর ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তারা আশ্রয় নেয় বাঁশঝাড়ে। পত্রিকায় দেখলাম, গোদাগাড়ী উপজেলার ইউএনও কোলদের দেখতে গিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রশাসনের প্রতি আমার অনুরোধ হলো, এই কোলদের পুনর্বাসনসহ জমির মামলার বিষয়ে সহায়তা করুন। বাদীর কাগজপত্র সঠিক কি না, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জমি হস্তান্তরে প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা লঙ্ঘন হয়েছে কি না, এসব দেখা গুরুত্বপূর্ণ। কেন কোল সম্প্রদায় মামলার আপিল করেনি, সেটি দেখা। তারা কি আদৌ উকিল নিয়োগ করেছিল? আপিলের সুযোগ থাকলে আপিলের ব্যবস্থা করা জরুরি। আর মানবিক কারণে হলেও ওদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

অনেক সময় বলা হয়, রাষ্ট্র এই অবহেলিত প্রান্তিক মানুষদের থেকে অনেক দূরে থাকে। এই দূরত্ব বাস রুটের বা সড়কপথের দূরত্ব নয়। অন্য এক দূরত্ব। দৃষ্টিভঙ্গির, অবহেলার, উপেক্ষার, না দেখার। সর্বোপরি অমর্যাদার। কেউ কি আমাকে বলবেন, কোনো কোল জাতির মানুষ কোনো দিন ডিসি অফিসে গেছেন কি না? ইউএনও অফিসে কোনো তথ্য কি আছে, কোনো কোল জাতির মানুষ দেখা করতে গেছেন? যদি গিয়ে থাকেন, কেমন রিসেপশন তিনি পেয়েছিলেন? নাকি গভীর এক হতাশা ও দুঃখ নিয়ে তাঁকে ফিরতে হয়েছে চিরচেনা তাঁর গ্রামে, যেখানে তাঁর থাকার ঘরের নিশ্চয়তা নেই? আমাদের সংবিধানে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা লেখা আছে।

ভারতের সংবিধানে ট্রাইবালদের জন্য সমতা শুধু নয়, অগ্রাধিকারের কথা লেখা আছে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, ‘কার্যকালে দশকের পর দশক ধরে শব্দগুলো সংবিধানে শোভা হয়ে থাকে এবং আদিবাসীদের দুঃখ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার দপ্তর থেকে হতাশা নিয়ে ফিরে এসে আদিবাসীরা স্টেশনে উবু হয়ে বসে থাকে, ট্রেন ধরে, সাঁইত্রিশ মাইল হেঁটে গ্রামে ফেরে এবং
অপরিচিত, হিংস্র আলোকোজ্জ্বল নয়া ভারত থেকে স্বীয় পরিবেশের অপরিমেয় অন্ধকারে ফিরে স্বস্তি পায় (জগমোহনের মৃত্যু)।’

আমি দেখলাম ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোল জাতির সংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৮২২। আর ২০১১ সালে ছিল ২ হাজার ৮৪৩ জন। তার আগে যেমন ২০০১ বা ১৯৯১ শুমারিতে তাদের নামই ছিল না। সরকারি রেকর্ডে তারা ছিল পরিচয়হীন। আমি ঢাকা শহরে কোল জাতির কোনো মানুষ খুঁজে পাইনি। অনেক বছর আগে প্রথম এক কোচ ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছিল। ভর্তির আগে আমার কাছে এসেছিল একটু সাহায্যের জন্য। আমি তাকে বলেছিলাম, অর্থের অভাবে কোচ ছেলের পড়া হবে না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেটি হওয়া উচিত হবে না। ছেলেটি বিসিএস ক্যাডারে চাকরি করছে এখন। কোলদের এখানে আসতে অনেক সময় লাগবে। আসুন, সবাই ওদের পাশে দাঁড়াই।

পাঁচ কোল পরিবার উচ্ছেদ নিয়ে খুব বেশি রিপোর্ট হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তেমন হইচই হয়নি। প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সম্পাদকীয় লিখেছে। বাড়িঘর ভাঙার ছবি, ধ্বংসস্তূপের ছবি ছাপা হয়েছে। এসবের কোনোটিই আমাদের রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। আমরা ইনক্লুসিভ, মানবিক ও সংবেদনশীল রাষ্ট্রের কথা বলি। এর জন্য রাষ্ট্রকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

বাঙালি অনেক বড় জাতি। সংখ্যায় পৃথিবীতে অষ্টম আর বাংলাভাষীর বিচারে বিশ্বে পঞ্চম। এত বড় জাতি ৩ হাজার ৮২২ জনের কোলদের সহজেই এগিয়ে নিতে পাশে দাঁড়াতে পারে।

সঞ্জীব দ্রং, কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী

উচ্ছেদের পর কোল পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে বাঁশঝাড়ের নিচে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং এলাকায়
উচ্ছেদের পর কোল পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে বাঁশঝাড়ের নিচে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাবুডাইং এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

টার্গেট তাজমহল: বলিউডের নতুন হিন্দুত্ববাদী পণ্য ও বিভাজনের রাজনীতি by আলতাফ পারভেজ

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ঘৃণাবাদী রাজনৈতিক-সংস্কৃতির চাষবাসে আরএসএস বরাবরই এক পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় আছে। বলিউড কীভাবে বিতর্ক ও বিভেদের নতুন পণ্য তৈরি করেছে, তা নিয়ে লিখেছেন আলতাফ পারভেজ

সমকালীন ভারতে ৩১ অক্টোবর একটা বিশেষ দিন। ইন্দিরা গান্ধীকে দুজন শিখ এই দিন হত্যা করে এবং পাল্টা প্রতিশোধ হিসেবে শিখবিরোধী সহিংসতা শুরু হয়। তবে দিনটি আবার সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মবারও। এবার উদ্‌যাপিত হবে তাঁর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী।

বলা বাহুল্য, আরএসএস পরিবার এই দিনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উদ্‌যাপন করতে চায়। সেই উদ্‌যাপনে যুক্ত হচ্ছে নতুন এক শিল্পকলাও। দ্য তাজ স্টোরি নামে একটা মুভি মুক্তি দেওয়া হচ্ছে এই দিন, যা ইতিমধ্যে ভারতীয় ইসলামি শিল্পকলার অনন্য স্থাপনা তাজমহল নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত এক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, এতে ভারতীয় সমাজের নাজুক আন্তসাম্প্রদায়িক সম্পর্কে আরেকটু বিষ ঢালা হবে।

মুভির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতা উসকে দেওয়া

শিল্পকলাকে ধর্মীয় বিদ্বেষের কাজে লাগানোর অপচেষ্টা বলিউডে নতুন নয়। কিছুদিন আগেও ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ নিয়ে হইচইয়ের চেষ্টা ছিল। তেমন কাজ হয়নি, যেমনটি হয়েছিল ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ বা ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ নিয়ে। এ রকম পটভূমির মাঝেই আসছে দ্য তাজ স্টোরি।

বড় খবর হলো এতে অভিনয় করেছেন পরেশ রাওয়াল। পরেশ খ্যাতনামা অভিনয়শিল্পী। তবে একই সঙ্গে তিনি যে বিজেপির লোক, এটাও কোনো গোপন ব্যাপার নয়। এর আগেও ২০১৬–তে তিনি সরদার ছবিতে বল্লভভাই প্যাটেলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এবার তাজ স্টোরিতে তাঁকে মুখ্য চরিত্র বানিয়ে তুষার গোয়েল তাজমহলের বিরুদ্ধে সংঘ পরিবারের পুরোনো ‘গল্প’গুলোতে বাড়তি জ্বালানি জোগাতে চাইছেন।

মুভিটি মুক্তির আগে যে পোস্টার ছাড়া হয়, তাতে দেখানো হয়, রাওয়াল তাজমহলের সর্বোচ্চ গম্বুজ খুলছেন আর তার ভেতর থেকে বের হচ্ছে হিন্দুদেবতা শিবের মূর্তি। এ রকম একটা পোস্টারের লক্ষ্য ছিল সহজ: তাজমহল নিয়ে হিন্দুত্ববাদী সেসব গল্প ও মিথ উসকে দেওয়া যে মোগল সম্রাট স্থাপনাটি নির্মাণ করিয়েছেন একটা হিন্দু মন্দিরের ওপর।

মুভির ভেতরে কী আছে, সেটা নভেম্বরের শুরু থেকে জানা যাবে। তবে বিজেপিপন্থী মিডিয়াগুলোর ব্যাপক প্রচার এবং পরেশ রাওয়ালকে দেখে তাজমহলপ্রেমীরা চট করে ধরে নিচ্ছেন এটা ঐতিহাসিক এই শিল্পস্থাপনা নিয়ে হিন্দুত্ববাদী প্রচার ইতিহাসের নতুন প্রকল্প আকারেই আসছে।  

তাজমহল নিয়ে হিন্দুত্ববাদী গল্পগুলো

তাজমহল ‘তেজো মহালায়া’ নামে একটা শিবমন্দিরের ওপর নির্মিত এই গল্প বহুদিনের। বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরের বছরই এটা নিয়ে বড় আকারে রাজনীতি শুরু হয়। সে সময় আগ্রায় তারা এই বিষয়ে সাতটি মামলা দায়ের করে। সেখানে দাবি করা হয় তাজমহলকে যেন হিন্দুদের পূজার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। মামলায় এ–ও দাবি ছিল তাজের কক্ষগুলো যেন পরীক্ষা করে দেখা হয় সেখানে অন্য ধর্মের কোনো চিহ্ন আছে কি না।

মামলাকারীরা আগবাড়িয়ে এমনও দাবি করছিলেন, তাঁদের কাছে শতাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ আছে এই বিষয়ে। এসবই ছিল বিষয়টিকে সমাজে বিশ্বাসযোগ্যতা দেওয়ার রাজনৈতিক প্রচারধর্মী বয়ান মাত্র।

বাস্তবে ওই সব মামলা নিয়ে আগ্রার আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেননি। কিন্তু বিজেপিপন্থীরা থেমে যাননি। ২০২২ সালে তাঁরা এলাহাবাদে একই ধরনের মামলা করেন। সেখানেও তাজমহলের বিশেষ ২০টি কক্ষ খোলার জন্য বলা হয়। এসব কক্ষ কেন খোলা হয় না, নিশ্চয়ই তাতে হিন্দুধর্মীয় কোনো স্মারক আছে, এই ছিল মামলাকারীদের প্রশ্ন।

সেবারও আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। কোর্ট বুঝতে পেরেছিলেন মূলত মোগলদের তৈরি বলে তাজমহলে কলঙ্ক লেপনের জন্যই এ রকম বলা হচ্ছে।

এলাহাবাদের দুই বিচারপতি ডি কে উপাধ্যায় ও সুভাষ বিদ্যার্থী তখন মন্তব্য করেছিলেন, এভাবে ‘জনস্বার্থে মামলা’ চলতে থাকলে একদিন হয়তো আমাদের চেম্বারও খুলে দেখতে চাওয়ার আরজি হবে।

এ সময় আরএসএসের এ–সংক্রান্ত প্রচারে বাড়তি গতি দিতে জয়পুরের মহারাজা মান সিংয়ের নাতনি দীয়া কুমারী বলছিলেন তাজমহল তাঁদের পরিবারের জমিতে নির্মিত! অনেকেই জানেন দীয়াও বিজেপির লোক। এখন রাজস্থানের উপমুখ্যমন্ত্রী। আগের লোকসভায় রাজস্থান থেকে এমপি হয়েছিলেন তিনি।

একই বিষয়ে ২০১৯ সালে কর্ণাটকের বিজেপি নেতা অনন্ত কুমার হেগড়ের দাবি ছিল আরেক কাঠি সরেস। তাজমহলের মূল মালিক রাজস্থানের রাজা জয়সিং বলে উল্লেখ করে তিনি এ–ও দাবি করেন, শাহজাহান এই স্থাপনা খরিদ করেন মাত্র। তারও বহু আগে, ১৯৬৫ সালে পি এন ওক (পুরুষোত্তম নাগেশ ওক) এ বিষয়ে মোটাসোটা একটা বই লেখেন, তাজমহল ইজ আ রাজপুত প্যালেস নামে।

পি এন ওক কাজ করতেন ভারতের সেনাবাহিনীতে। সেখানে প্রচার বিভাগে ছিলেন তিনি। সম্ভবত পেশাগত অভ্যাস থেকে পরবর্তীকালে তাজমহল নিয়ে নানান ধরনের কল্পিত তথ্য প্রচার করতে শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ভারতীয় ইতিহাস পুনর্লিখন ইনস্টিটিউট নামে একটা প্রতিষ্ঠানও গড়েন।

দ্য তাজ স্টোরির শিল্পী তালিকায় পরেশ রাওয়ালের মতো সুপারস্টারের নাম দেখে স্পষ্টই মনে হচ্ছে পিএন ওকের রূপকল্প পুরো ব্যর্থ হয়নি। যদিও বিদেশি অনেক স্থপতি বহু আগেই ওকের যুক্তিগুলো খণ্ডন করেছেন। বিশেষ করে তাজমহল নির্মাণের কারিগরি ও নান্দনিক ধরন যে মোগল-পূর্ব দক্ষিণ এশিয়ায় অনুপস্থিত ছিল না, সেটা বিস্তারিতভাবে দেখান জাইলস টিলোটসনের মতো শিল্প-প্রত্নতত্ত্বের পণ্ডিতও।

টিলোটসনকে এ বিষয়ে একালের সেরা বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। তবে এরপরও ওক এ বিষয়ে আরেকটি বই লেখেন তাজমহল: ট্রু স্টোরি নামে এবং ২০০০ সালে এ নিয়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদলতে একটা মামলাও করেন। আদালত সেটা অগ্রাহ্য করেন। এতসব কিছুর পরও বিজেপি পরিবার যে তাজমহল প্রকল্প থেকে সরছে না, তারই নমুনা আগামী সপ্তাহে মুক্তির মিছিলে থাকা তাজ স্টোরি।

প্রয়োজক যা বলছেন

হিন্দুত্ববাদী শিবিরের বিভিন্ন পেশাজীবী এবং রাজনীতিবিদদের তাজমহলকেন্দ্রিক বিবিধ চেষ্টার লক্ষ্য হিসেবে এটাই অনুমান করা হয়, স্থাপনাটিকে বৈধভাবে ভাঙচুর চালাতে সরকারের হাতে তুলে দিতে ইচ্ছুক তারা। বাবরি মসজিদের মতো নিজ হাতে তারা কিছু করতে চাইছে না এবার। কিন্তু আর্কেওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া ২০১৭ সালে বিজেপি সমর্থকদের এই মর্মে আশাহত করে। তারা জানিয়ে দেয়, তাজমহলের ভেতরে বা নিচে কোনো হিন্দু মন্দির নেই বা ছিলও না। এ বিষয়ে ব্রিটিশদের তরফ থেকে ১৯০৪ থেকে তাদের হাতে আসা যাবতীয় কাগজপত্র দেখানো হয়।

কিন্তু বিরুদ্ধবাদীরা তারপরও ক্ষান্ত দেয়নি। আদালতকে প্রভাবিত করতে তারা সামাজিক জনমত তৈরির দিকে মনোযোগ দেয় এরপর। তারই অংশ হিসেবে এখন চলচ্চিত্র তৈরির পথ বেছে নেওয়া হলো।  

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাজ স্টোরির পোস্টার ও টিজার দেখে দর্শকেরা অনেকে হাস্যরসাত্মক মন্তব্য করতে শুরু করলে তাজ স্টোরির প্রযোজক বলছেন, তাঁরা তেজো মহালায়ার রহস্য উন্মোচনমূলক একটা মুভি তৈরি করতে চেয়েছেন মাত্র। অর্থাৎ বিশ্বের সপ্তম আশ্চার্যের একটি হয়েও তাজমহল তাঁদের কাছে এখনো তেজো মহালায়া।

তাজ স্টোরির প্রযোজক হলেন সরনিম গ্লোবাল সার্ভিসেস নামের প্রতিষ্ঠানের সুরেশ ঝা। এই সংস্থার কার্যালয় রয়েছে মহারাষ্ট্রে। সুরেশ ঝা এর আগে বানিয়েছেন মোদি কা গাঁও। ২০১৭ সালে গুজরাট নির্বাচনের আগে এটা মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়বস্তু ছিল ভারতের এখনকার প্রধানমন্ত্রীর বন্দনা। সেই সুরেশ ঝা এখন তাজ স্টোরিতে কী বলতে চাইবেন, সেটা অনুমান করা তাই দুরূহ নয়।

কৌতূহলোদ্দীপক হলো, সুরেশ ঝা এখনকার ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে মুভি বানালেও গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে মোদির আমলে যে গণহত্যা হয়, সে বিষয়  এড়িয়ে গেছেন। মুভিতে এমন কোনো তথ্যও নেই যে নরেন্দ্র মোদি কখনো গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

আরএসএস পরিবার কেন তাজমহল নিয়ে নাছোড়বান্দার মতো লেগে আছে

বাবরি মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়ার পর আরএসএস পরিবার ভারতজুড়ে মোগল আমলে স্থাপিত রাস্তাঘাট, শহর ও বিভিন্ন ধরনের স্থাপনার নাম বদলের হিড়িক ফেলে। কিন্তু তাতে তেমন কোনো বড় দাঙ্গা বাধানো যায়নি। এরপর তারা অনেকগুলো পুরোনো মসজিদের মালিকানা নিয়ে হাঙ্গামা করে। দেশটির সংখ্যালঘুরা সেসব নিয়েও মারমুখী কোনো প্রতিরোধ গড়তে যায়নি বা পারেনি। এমনকি সংখ্যাগুরুরাও তাতে মোটাদাগে তেমন প্রভাবিত হয়নি, অংশ নেয়নি।

স্বভাবত এখন সংঘ পরিবার চাইছে বড় কোনো ইস্যু, যা ভারতজুড়ে সংখ্যাগুরুকে নাড়া দেবে, আকর্ষণ করবে। তাজমহল যেহেতু মোগল শাসনামলের বড় এক প্রতীক এবং মোগলদের আগ্রাসী শক্তি হিসেবে দেখানো যেহেতু গেরুয়া শিবিরের রাজনীতির প্রধান এক প্রতিজ্ঞা, সে কারণে তাজকে তারা এখন ব্যাপক প্রচারে আনতে চাইছে। একই প্রকল্পের পাইপলাইনে আছে কুতুব মিনার, লালকেল্লা ইত্যাদিও।

লালকেল্লাও কোনো এক হিন্দু রাজা একাদশ শতাব্দীতে বানিয়েছিলেন বলে ব্যাপক প্রচার চলছে। অথচ বাস্তবতা হলো লালকেল্লা শাহজাহান তৈরি করেন ১৬৪০–এর দিকে এবং একাদশ শতাব্দীর দাবিকৃত দুর্গের জায়গা থেকে বহুদূরে। আপাতদৃষ্টে অবিশ্বাস্য ঠেকলেও মোগল আমলে নির্মিত সব বড় বড় স্থাপনা আরএসএসের চক্ষুশূল এবং প্রতিটির স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক মাহাত্ম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে।

এ কাজে ইতিহাস চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে নানান সামাজিক রূপকথা ও গল্পের মাধ্যমে। অর্থাৎ ঐতিহাসিক তথ্য ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কল্পনা দিয়ে। যখনই এ রকম অপচেষ্টা প্রত্নতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় চ্যালেঞ্জে পড়ছে, তখন আবার ধর্মীয় আবরণ দিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়কে সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষমূলক প্রচার আকারে হাজির করা হচ্ছে ভোটের রাজনীতিতে।

আরএসএস পরিবারের এ রকম রাজনীতির ছায়ায় অনেক উচ্চাভিলাষী লেখক-শিল্পী নিজেদের ভাগ্য বদলে নিতেও সচেষ্ট হচ্ছেন। ভারতে গেল কয়েক সপ্তাহ ধরে অনেক নিরপেক্ষ ভাষ্যকার লিখছেন, পরেশ রাওয়াল তাজ স্টোরির মাধ্যমে আসলে আবারও বিজেপির নির্বাচনী টিকিট পেতে চাইছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব আহমেদাবাদ আসনে অনায়াসে জিতলেও বিজেপি দ্বিতীয়বার তাঁকে সেই সুযোগ না দিয়ে দিল্লিতে এনএসডির (ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা) সভাপতি করে দেয়। ৭০ বছর বয়সে এখনো এই দায়িত্বে আছেন তিনি। তাজ স্টোরি তাঁর জন্য তাই বড় এক বাজি।

রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডাধর্মী মুভিতে কেন্দ্রীয় চরিত্র রূপায়ণের ভেতর দিয়ে তিনি দেশটির উদারনৈতিক শিল্পী সমাজে বড় মাত্রায় বিরাগভাজন হতে পারেন। ঝুঁকি নিচ্ছেন তিনি দক্ষিণ দিক থেকে নিশ্চিতভাবে বড় কিছুর আশায়। একজন জাতীয় শিল্পীর স্বাভাবিক নির্মোহতা ছুড়ে ফেলে সম্প্রতি তাজ স্টোরিতে অভিনয় করার সিদ্ধান্তকে এই বলেও ন্যায্যতা দিলেন তিনি যে তাজমহল হলো গণহত্যার প্রতীক। ঘৃণার এ রকম প্রকাশ মূলত তাজ স্টোরি মুক্তির পর সংখ্যাগুরুদের সিনেমা হলে টানতে।

বাংলাভাষীদের নিয়েও পরেশের ঘৃণাসূচক মন্তব্যের রেকর্ড আছে এবং এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গেও পুরোনো ক্ষোভ রয়েছে। ২০২২–এ গুজরাটে বিজেপির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি বলেন, ‘গুজরাটিরা অনেক কিছু সহ্য করে। তারা মূল্যবৃদ্ধি মেনে নেবে। কিন্তু ঘরের পাশে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের বসবাস মেনে নেবে না। যে ভাষায় ওরা কথা বলে, তাতে মুখে ডায়াপার পরানো উচিত।’ এখানে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বলতে পরেশ বাংলাভাষীদের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন এবং এ নিয়ে কলকাতায় তাঁর বিরুদ্ধে থানায় এফআইআর পর্যন্ত দায়ের হয় তখন।

পরেশের বাংলাভাষী ঘৃণাবিদ্বেষ ওই সময় এ–ও নতুন করে সামনে নিয়ে আসে যে ধর্মীয় ঘৃণাবাদের মধ্যে জাতিবাদী ঘৃণাও মিশে থাকে অনেক সময়। তবে এটা কেবল ভারতের একার সমস্যা নেই আর। যদিও দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এ রকম ঘৃণাবাদী রাজনৈতিক-সংস্কৃতির চাষবাসে আরএসএস বরাবরই এক পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় আছে আজও।

এমনকি ২০২৫ সালে দল হিসেবে তাদের শত বছর পূর্তিকালেও সূচনাকালীন বিদ্বেষের মতাদর্শ ছাড়ছে না তারা এবং তার বলি হচ্ছে শিল্পকলাও। বলিউডকে ব্যবহার করে প্রোপাগান্ডা ও শিল্পের ব্যবধান অনেকখানি কমিয়ে এনেছে তারা। তাতে ব্যবহৃত হচ্ছে আবার একদল ‘শিল্পীসমাজ’। তাজ স্টোরির বিজ্ঞাপন উন্মুক্ত করার দিন হিসেবে যে ১৪ আগস্টকে (পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস) বেছে নেওয়া হয়, সে–ও বেশ বিদ্বেষী মনোভাবেরই পরিচয় দেয়।

* আলতাফ পারভেজ, দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

[২৪ অক্টোবর ২০২৫ প্রথম আলোর ছাপা সংস্করণে এ লেখা ‘টার্গেট তাজমহল: বলিউড থেকে আসছে বিভেদের নতুন পণ্য’—শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে]

 ‘দ্য তাজ স্টোরি’ মুক্তির আগে যে পোস্টার ছাড়া হয়, তাতে দেখানো হয়, পরেশ রাওয়াল তাজমহলের সর্বোচ্চ গম্বুজ খুলছেন আর তার ভেতর থেকে বের হচ্ছে হিন্দুদেবতা শিবের মূর্তি।
‘দ্য তাজ স্টোরি’ মুক্তির আগে যে পোস্টার ছাড়া হয়, তাতে দেখানো হয়, পরেশ রাওয়াল তাজমহলের সর্বোচ্চ গম্বুজ খুলছেন আর তার ভেতর থেকে বের হচ্ছে হিন্দুদেবতা শিবের মূর্তি। ছবি: সিনেমার পোস্টার থেকে

অধিকাংশ আমেরিকান ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পদক্ষেপ সমর্থন করে না

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপঃ সফল অভিযানের মাধ্যমে সপ্তাহের শুরুতে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের মধ্যদিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনীতির নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এর মাধ্যমে রিপাবলিকানদের সমর্থন পেলেও বেশির ভাগ আমেরিকান তার এমন সাম্রাজ্যবাদী পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে।

সোমবার প্রকাশিত দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে এমন চিত্রই উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল বলছে ট্রাম্পের বিদেশনীতি নিয়ে আমেরিকার জনগণের বিভক্তি তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলায় হামলা ও মাদুরোকে আটকের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পদক্ষেপ যাচাই করতে ওয়াশিংটন পোস্ট এক হাজার আমেরিকানের ওপর জরিপ চালায়। এসব আমেরিকানদের জবাবের ভিত্তিতেই জরিপটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী এই সংবাদমাধ্যম।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট প্রকাশিত জরিপটিকে প্রথম মানসম্মত জরিপ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। জরিপে দেখা যায়, ৪০ শতাংশ ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান সমর্থন করলেও এর বিরোধিতা করেছেন ৪২ শতাংশ আমেরিকান। অর্থাৎ জনমত প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত। রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে সমর্থন তুলনামূলক বেশি হলেও সামগ্রিকভাবে এটিকে জনপ্রিয় বলা যাচ্ছে না।

এই ফলাফল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো, কারণ অভিযানের আগে নেয়া জরিপগুলোতে ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে ছিল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির জরিপে ৬৩ শতাংশ এবং সিবিএস নিউজ-বিডিএমএফ জরিপে ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে লক্ষ্য করে সীমিত অভিযানের কারণে কিছু মানুষের সমর্থন বেড়েছে। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ নয় বরং একজন অজনপ্রিয় শাসককে আটক করার বিষয়টি জনমনে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে।
পাশাপাশি, দলীয় আনুগত্যও ভূমিকা রেখেছে। অভিযানের পর রিপাবলিকানদের মধ্যে সমর্থন বেড়ে ৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে অভিযানের আগে তা ছিল ৫২-৫৮ শতাংশের মধ্যে। স্বাধীন ভোটারদের সমর্থন তুলনামূলক কম। মাত্র ৩৪ শতাংশ।
ইতিহাস বলছে- এ ধরনের সামরিক অভিযানের শুরুতে সাধারণত ব্যাপক জনসমর্থন দেখা যায়। ১৯৮৯ সালে পানামার নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে তখন ৮০ শতাংশ আমেরিকান সমর্থন জানিয়েছিলেন।

গ্রানাডা (১৯৮৩), আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাক (২০০৩) অভিযানের ক্ষেত্রেও শুরুতে সমর্থন ছিল প্রবল। সে তুলনায় ভেনেজুয়েলা অভিযান শুরুর দিকেই মাঝারি সমর্থন পাওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা শাসনে সরাসরি প্রভাব বিস্তার ও তেলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার ইঙ্গিত জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।
জরিপগুলো দেখাচ্ছে, বেশির ভাগ আমেরিকান এখন বিদেশনীতি নয় বরং দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সমস্যা, মূল্যস্ফীতি ও ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ শতাংশ আমেরিকান চান যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে কম জড়াক। এপি-এনওআরসি জরিপে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে বিদেশনীতি ছিল তালিকার একেবারে নিচে।
এমনকি রিপাবলিকানদের মধ্যেও অভিযানের প্রতি ‘দৃঢ় সমর্থন’ সীমিত। ওয়াশিংটন পোস্টের জরিপে মাত্র ৪৫ শতাংশ রিপাবলিকান জোরালোভাবে এই অভিযান সমর্থন করেছেন।

রাজনৈতিকভাবে জনসমর্থন সীমিত হলেও এই অভিযানের মাধ্যমে ট্রাম্প পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের বার্তা দিতে পেরেছেন। প্রশাসনের ভাষায়, এটি শক্তি প্রদর্শনের একটি বড় পদক্ষেপ। তবে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি জড়িত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।
একই সঙ্গে এই অভিযান ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট নীতি’ জোটের ভেতর বিভাজন বাড়াতে পারে। হস্তক্ষেপবিরোধী রিপাবলিকান নেতা ও প্রভাবশালীরা ইতিমধ্যে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। তাদের আশঙ্কা ভেনেজুয়েলায় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে আটকে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় অভিযান ট্রাম্প প্রশাসনকে রিপাবলিকানদের বাহবা পাইয়ে দিলেও জরিপ বলছে- আমেরিকান জনমত এমন সাম্রাজ্যবাদী বিদেশনীতির বিপক্ষে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে,  ভেনেজুয়েলা অভিযান কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। ‘ডনরো ডকট্রিন’ শব্দটি ব্যবহার করে ট্রাম্প কার্যত ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে আবারো একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সমপ্রতি প্রকাশিত জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলেও হুমকি, চাপ ও সামরিক শক্তির ব্যবহারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত প্রতীকী ছবিতে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাম্পের হাতে ‘ডনরো ডকট্রিন’ লেখা ব্যাট- এই কৌশলকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, একজন অবাধ্য বিদেশি নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করা ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের শক্তি প্রদর্শন। এর মাধ্যমে শুধু ভেনেজুয়েলাকেই নয় বরং অন্য দেশগুলোকেও একটি কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ উপেক্ষা করলে পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে।
সিএনএনের বিশ্লেষক নিক পেটন ওয়ালশের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ট্রাম্পের আলোচনার কৌশলেরই অংশ, যেখানে ভয় ও শক্তি ব্যবহার করে অন্যদের তার ইচ্ছার সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়।

এই অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে ট্রাম্পের নিজস্ব ঘাঁটিতে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পক্ষে থাকা হস্তক্ষেপবিরোধী রিপাবলিকানরা ক্রমেই অস্বস্তি প্রকাশ করছেন। কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসি ও মার্জরি টেলর গ্রিনের প্রকাশ্য সমালোচনা এবং সিনেটর র‌্যান্ড পল, লিসা মুরকোস্কি ও ড্যান সুলিভানের সতর্ক বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে-দলের ভেতরে ঐকমত্য আর আগের মতো শক্ত নেই।

ট্রাম্প-সমর্থক গণমাধ্যম ও অনলাইন প্রভাবকদের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট। ক্যান্ডেস ওয়েন্স এই অভিযানকে ‘বিশ্বায়নবাদীদের শত্রুতামূলক দখলদারিত্ব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে স্টিভ ব্যানন প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্প কি নব্য রক্ষণশীল বা ‘নিওকন’দের প্রভাবে এ পথে হাঁটছেন?
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ ও শাসনব্যবস্থা ঘিরে। ট্রাম্প যদি সত্যিই দেশটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে এগোন, তবে তা শুধু আন্তর্জাতিক সমালোচনাই নয়, ঘরোয়া রাজনীতিতেও বড় ধাক্কা দিতে পারে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/197616_odhi.webp

'এটা আমার নতুন অধ্যায়ের সূচনা'- বহিষ্কারের আদেশের পর বললেন রুমিন ফারহানা

বহিষ্কারের ঘটনা স্বাভাবিক হলেও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনই দল থেকে বহিষ্কারের আদেশ আসা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন রুমিন ফারহানা, তবে এটাও বলেছেন, "এটা আমার জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা"।

তবে যেহেতু স্বতন্ত্র নির্বাচন করছেন, তাই বহিষ্কারের ঘটনা ঘটবে জানতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার ভোরে খালেদা জিয়া মারা যান। পরে সকাল এগারোটায় বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির এক বৈঠকে মিজ ফারহানাসহ নয়জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরে গতকালই বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় মিজ ফারহানাসহ নয় জনকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মিজ ফারহানা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বহিষ্কার আদেশ এসছে এটা স্বাভাবিক। এটাতো হবেই। তবে উনি যেদিন চলে গেলেন সেদিনই বহিষ্কার আদেশ আসাটা, এটাকে আমি বলবো যে, এটা আল্লাহর একটা ইশারাও বটে।"

"যিনি আমাকে এনেছিলেন, যার ছায়ায় আমি ছিলাম, তিনি যেদিন চলে গেলেন, বিএনপির সাথে আমার যাত্রাও সেদিনই শেষ হলো," বলেন তিনি।

শোকের দিনে স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন

বাবা অলি আহাদ মারা যাওয়ার পর ২০১২ সালে রাজনীতিতে হাতেখড়ি পেশায় আইনজীবী মিজ ফারহানার। বাবা রাজনীতিবিদ হলেও বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না।

ওই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের দাবিতে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করছিলো। সে সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে পথচলা শুরু করেছেন মিজ ফারহানা।

পরবর্তী সময় মিজ ফারহানাকে বিএনপির পক্ষে গণমাধ্যমে বেশ সরব হয়ে উঠতে দেখা গেছে।

২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির মনোনীত সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য রুমিন ফারহানার সংসদে একটি বক্তব্য নিয়ে মূলত ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মিজ ফারহানা তার বক্তব্যের শুরুতেই যখন বলেন যে, এই সংসদ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়, তখন সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা ব্যাপক শোরগোল শুরু করেন।

ওই সময় নানা ইস্যুতে সংসদ অধিবেশনে মন্তব্যের কারণে রুমিন ফারহানা আলোচনায় ছিলেন। একপর্যায়ে সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউটও করেন তিনিসহ বিএনপির এমপিরা।

মিজ ফারহানা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার 'আহ্বানে, অভিভাবকত্বে এবং ছায়ায়' গত ১৭ বছর বিএনপির সাথে ছিলেন।

অনেক সময়ই বয়স এবং অভিজ্ঞতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও খালেদা জিয়া তাকে দলে অনেক বড় বড় কাজ দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনেই বিএনপির বৈঠক করে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে রুমিন ফারহানা বলেন, "সাধারণত বাঙালি সংস্কৃতি বলেন বা পশ্চিমা সংস্কৃতিই বলেন, মৃত্যুর একটা ভাবগাম্ভীর্য আছে। এরকম দিন আমরা সাধারণত কোনো রকম সিদ্ধান্তে যাই না"।

"খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিন, যেখানে রাষ্ট্রীয় শোক... সেদিন দলের স্ট্যান্ডিং কমিটির মিটিং হওয়া, বহিষ্কার আদেশ আসা... আমি জানি না, বাংলাদেশের মানুষ এটাকে কীভাবে নেবে," বলেন সদ্য বহিষ্কৃত এই বিএনপি নেত্রী।

এই বহিষ্কার আদেশই বিএনপির সাথে মিজ ফারহানার 'যাত্রা শেষের ক্লিয়ার ইনডিকেশন' বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির যে রাজনীতি তাতে তার অবস্থান কোথায়? এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিনি।

জীবনে ' নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা '

দলীয় সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই গত ১০ বছর ধরে ব্রাক্ষণবাড়িয়া - ২ আসনে নির্বাচনের জন্য রাজনীতি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিলেন বলে দাবি করেন মিজ ফারহানা।

এর আগে, ওই আসনে ২০১৮ সালে বিএনপি নেতা উকিল আব্দুস সাত্তার নির্বাচন করেছিলেন।

পরে ২০২৩ সালে মি. সাত্তার দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

সে সময় ওই আসনে নির্বাচন করতে দলের হাই কমান্ড নির্দেশ দিয়েছিল বলে দাবি করেন রুমিন ফারহানা।

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ওই আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের এক নেতাকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।

পরে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন মিজ ফারহানা।

"আমি গত ১০ বছর ধরেই কাজ করছিলাম। এখন হঠাৎ করে জুনায়েদ আল হাবিব জোটের প্রার্থী আসাটা আমার জন্য একটু বিস্ময়কর ছিলো," বলেন তিনি।

বিএনপি মঙ্গলবার যে নয় জনকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানায় তাদের প্রত্যেকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন।

তবে, বিএনপিতে দলীয় রাজনীতির সমাপ্তি হলেও মিজ ফারহানা এটিকে তার জীবনে 'নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও নতুন যাত্রা' বলে মনে করেন।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কতটুকু সাড়া পাবেন এমন প্রশ্নে জানান, এলাকার মানুষের চাওয়ার প্রেক্ষিতেই একা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

"রাজনীতিতে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া এগুলো একেকটা ঘটনা। কিন্তু রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা অনেক বড় একটা ব্যাপার। আমি একজন রাজনীতিবিদ হতে চাইছি," বলেন মিজ ফারহানা।

রুমিন ফারহানা

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের নির্বাচনী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইপ্যাকে ইডির অভিযান, ছুটে গেলেন মমতা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চাঞ্চল্যকর কয়লা দুর্নীতি মামলায় বৃহস্পতিবার সকালে তদন্তে নেমেছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। দিল্লির নির্দেশেই এই তদন্ত শুরু হয়। কলকাতার ৬টি এবং দিল্লির ৪টি স্থানে তল্লাশি অভিযান চালায় ইডি।

শুরুতেই সকালে কলকাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের নির্বাচনী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের কলকাতার ল্যান্সডাউন স্ট্রিটের বাসভবনে তল্লাশি চালায় ইডি। এই খবর মমতার কানে পৌঁছালে তিনি ছুটে যান আই প্যাকের কর্ণধারের বাসভবনে। সেখানে আরও ছুটে আসেন কলকাতা ও রাজ্যের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা।

এরপর ইডি যায় আইপ্যাকের সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের কার্যালয়ে। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারাও মমতার সঙ্গে সেখানে যান। ইডি সেখানে তল্লাশি অভিযান শুরু করে বেশ কিছু নথি জব্দ করে। তবে মমতা সেখান থেকে সব নথি নিয়ে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক ও অন্যান্য প্রামাণ্য নথি।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, মমতা আইপ্যাকের দপ্তরে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করেন। তিনি নিজেই প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকেও বেশ কিছু নথি নিজের হাতে গাড়িতে তুলে বিকেলের দিকে বেরিয়ে যান।

মমতার অভিযোগ, এভাবে তাঁর দলের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইপ্যাকের দপ্তরে তল্লাশি তাঁরা মেনে নেবেন না।

যদিও এই বাধার পর ইডি সঙ্গে সঙ্গে কলকাতা হাইকোর্টে সরকারি তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলে। হাইকোর্ট ইডির আবেদন গ্রাহ্য করে আগামীকাল শুক্রবার তাদের আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেন। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে এই শুনানি হবে।

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সারদা দুনীতি মামলার তদন্তে কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের ল্যান্সডাউনের সরকারি বাসভবনে সিবিআইর কর্মকর্তারা অভিযানে গেলে তাঁদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি। সেখানেও ছুটে গিয়েছিলেন মমতা। সেই পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার এখন পশ্চিমবঙ্গের পুলিশের মহানির্দেশক বা ডিজি। এবার ছয় বছর পর ইডির অভিযানের কথা শুনে আইপ্যাকের কার্যালয়ে গেলেন মমতা।

পশ্চিমবঙ্গের কয়লা পাচার কাণ্ডের মামলাটি পুরোনো হলেও আজ নতুন করে এই মামলার তদন্তের স্বার্থে তল্লাশি অভিযান শুরু করে ইডি। তল্লাশিতে মমতার বাধা দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিবৃতি জারি করে ইডি বলেছে, ‘সাংবিধানিক পদে থেকে এভাবে একটি দপ্তরে ঢুকে নথি ছিনিয়ে নেওয়া আইনবিরুদ্ধ কাজ। আমরা এর বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেব।’

ইডির তল্লাশির পর রাজ্যে সংস্থাটির অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আজ বিকেলে প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দিয়েছেন মমতা। তিনি বলেছেন, তাঁর দলের বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি ইডি নিয়ে গেছে।

মমতার দাবি, দলের নানা গুরুত্বপূর্ণ নথিসহ আসন্ন রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের বহু মূল্যবান নথিপত্র ইডি নিয়ে গেছে। তবে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছেন, আইপ্যাক দপ্তর থেকে বিভিন্ন নথি ছিনিয়ে নিয়ে মমতা বিকেলেই আইপ্যাক দপ্তর ছেড়ে চলে যান।

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আইপ্যাকের দপ্তর থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৮ জানুয়ারি ২০২৬, কলকাতা
পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আইপ্যাকের দপ্তর থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৮ জানুয়ারি ২০২৬, কলকাতা। ছবি: এএনআই

জানুয়ারিতে কলকাতায় স্মরণকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা, দার্জিলিংয়ে ১.৩ ডিগ্রি

প্রকাশ ০৬ জানুয়ারি ২০২৬ঃ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় আজ মঙ্গলবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে হয়েছে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জানুয়ারি মাসে এটিই কলকাতায় শীতের সর্বকালীন রেকর্ড বলে কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

কলকাতায় জানুয়ারি মাসে এমন শীত আগে কখনো পড়েনি। পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো স্থানে তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে।

আজ মঙ্গলবারও কলকাতাসহ শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় ঘন কুয়াশা ছিল। ছিল মেঘলা আকাশ। আরও ছিল উত্তুরে হাওয়া।

পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি জনপদ দার্জিলিংয়ের সর্বনিম্ন¤তাপমাত্রা গতকাল সোমবার ছিল ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কলকাতার আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর আজ এই রাজ্যের আট জেলায় শৈত্যপ্রবাহের আগাম সতর্কতা জারি করেছে। জেলাগুলো হলো দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ ও পশ্চিম বর্ধমান।

তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরবঙ্গে তুষারাপাতের আশঙ্কার কথা বলেছে আলিপুর আবহাওয়া দপ্তর। বলা হয়েছে মানেভঞ্জন, সান্দাকফু, ঘুমসহ পাহাড়ের উঁচু এলাকায় শৈত্যপ্রবাহ চলবে। আর উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘনকুয়াশা থাকবে। মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা থাকবে; পাশাপাশি সাগরদ্বীপ, দীঘা, ডায়মন্ডহারবারসহ উপকূল এলাকায় কুয়াশার দাপট বাড়বে। আবহাওয়া দপ্তর আরও জানিয়েছে, ২১ দিন ধরে এই রাজ্যে স্বাভাবিকের নিচে রয়েছে তাপমাত্রা।

এদিকে কলকাতাসহ এই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। যানবাহন কমেছে। ট্রেন চলাচলে কুয়াশা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তীব্র ঠান্ডাকে মাথায় নিয়ে চাকরিজীবীরা সকাল থেকে ছুটছেন কর্মস্থলে। তবে হাটবাজারে ক্রেতা কম। অনেক ব্যবসায়ী তীব্র শীতে দোকানপাট খোলেননি। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় কাঠ আর গাড়ির টায়ার পুড়িয়ে শীতকে সামাল দিচ্ছেন অনেকে। স্কুল–কলেজেও শীতের কারণে অনেকেই স্কুলমুখী হয়নি। বাস, ট্রেন, উড়োজাহাজসহ অন্যান্য যান চলাচলে এই প্রচণ্ড শীতের পাশাপাশি ঘন কুয়াশা বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দিল্লির আবহাওয়া দপ্তরও সতর্কতা জারি করে বলেছে, দিল্লি, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড় ও রাজস্থানে শৈত্যপ্রবাহ বইবে। জারি করা হয়েছে সতর্কতা। বিহার, ঝাড়খন্ড, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখন্ডে তীব্র ঠান্ডার আভাস দেওয়া হয়েছে; পাশাপাশি ওডিশা, দিল্লি ও মধ্যপ্রদেশে ঘনকুয়াশা থাকার আভাস দিয়েছে।

শীতে জড়সড় হয়ে একদল ব্যক্তি আগুনের তাপ নিচ্ছে। ৬ জানুয়ারি, কলকাতা
শীতে জড়সড় হয়ে একদল ব্যক্তি আগুনের তাপ নিচ্ছে। ৬ জানুয়ারি, কলকাতা ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

ট্রাম্পকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী: গ্রিনল্যান্ড নিয়ে হুমকি দেয়া বন্ধ করুন

অনেকদিন আগেই গ্রিনল্যান্ডের ওপর চোখ পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে তিনি বার বার গ্রিনল্যান্ডকে দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। তার এসব হুমকির কড়া জবাব দিয়েছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। সর্বশেষ ভেনেজুয়েলা অপারেশন ও সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দম্পতিকে তুলে নেয়ার পর বিষয়টি বিশ্ববাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আলোচনায় উঠেছে ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি একটি সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে এবং সেখানকার প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে যে অভিযান চালিয়েছেন তাতে কর্তৃত্ববাদীরা বিশেষত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। এমন প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে শেষবারে সতর্ক করেছেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন। ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে দেয়া ‘হুমকি’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার প্রয়োজন আছে-  (ট্রাম্পের) এমন কথা বলার কোনো অর্থই হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ড্যানিশ সাম্রাজ্যের তিনটি জাতির কোনো একটিকেই সংযুক্ত করার অধিকার নেই।

ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করার পর তিনি এ মন্তব্য করলেন। ওই ছবিতে গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার জাতীয় পতাকার রঙে দেখানো হয়েছিল, সাথে লেখা ছিল ‘সুন’ (শিগগিরই)।
ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বহুবার তুলেছেন। তার কৌশলগত অবস্থান ও খনিজ সম্পদের কথা তুলে ধরেছেন। ফ্রেডেরিকসেনের সমালোচনার পরও তিনি নিজের বক্তব্যে অনড় থাকেন। ড্যানিশ সরকারের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে ফ্রেডেরিকসেন বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ‘খুব সরাসরি’ এই বার্তা দিচ্ছেন। তার ভাষায়, ডেনমার্ক এবং সেইসঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ন্যাটোর সদস্য এবং জোটের নিরাপত্তা নিশ্চয়তার আওতায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ডেনমার্কের এমনিতেই একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি আছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশাধিকার পায়। পাশাপাশি ডেনমার্ক আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা বিনিয়োগও বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, আমি যুক্তরাষ্ট্রকে জোরালোভাবে অনুরোধ করব, একটি ঐতিহাসিক মিত্র দেশের বিরুদ্ধে এবং এমন এক দেশ ও জনগণের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়া বন্ধ করুন, যারা খুব পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে যে তারা বিক্রির জন্য নয়।

কয়েক ঘণ্টা পর এয়ার ফোর্স ওয়ানে ট্রাম্প আবার বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার, আর ডেনমার্ক এটা করতে পারবে না। এর আগে কেটি মিলারের পোস্টের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ড্যানিশ রাষ্ট্রদূত এক ‘বন্ধুসুলভ মনে করিয়ে দেয়া’ বার্তায় জানান- দুই দেশ মিত্র এবং ডেনমার্ক তার ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করে।

এই উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এমন এক সময়, যখন যুক্তরাষ্ট্র শনিবার ভেনিজুয়েলায় বড় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। পরে ট্রাম্প বলেন, ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করবে যুক্তরাষ্ট্র এবং মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দেশটির অবকাঠামো ঠিক করে দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।

ট্রাম্প আগে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে বল প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। তার দাবি, দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর কৌশলগত অবস্থান ও উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য জরুরি বহু খনিজসম্পদ সেখানে রয়েছে। সম্প্রতি গ্রিনল্যান্ডে একটি বিশেষ দূত নিয়োগ করায় ডেনমার্ক ক্ষোভ প্রকাশ করে। গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা ৫৭ হাজার। ১৯৭৯ সাল থেকে অঞ্চলটি ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে- যদিও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি এখনো ডেনমার্কের নিয়ন্ত্রণে। বেশিরভাগ গ্রিনল্যান্ডবাসী ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চায়। তবে জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে তারা প্রবলভাবে বিরোধিতা করে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/197360_Abul-3.webp

ভেনেজুয়েলার পর কলম্বিয়া, কিউবা, মেক্সিকোর দিকে দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের

ভেনেজুয়েলায় ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামে সামরিক অভিযানে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতারের পর দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্রের চোখ এখন কলম্বিয়া, কিউবা ও মেক্সিকোর দিকে। অনেকেই বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট হতে পারে এই দুটি দেশ। এরই মধ্যে এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকো প্রসঙ্গে বলেছেন, তাদের সঙ্গে অবশ্যই কিছু একটা করতে হবে। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে সতর্ক করেছেন। তিনি  পেত্রোকে উদ্দেশ্য করে বলেন- তাকে ‘নিজের খবর রাখতে হবে।’ সাংবাদিকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, তিনি কোকেন তৈরি করছেন এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছেন। সুতরাং তাকে নিজের খবর রাখতে হবে।

মাদুরোর নাম উল্লেখ না করেই পেত্রো ওয়াশিংটনের অভিযানকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের উপর হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন এবং বলেন যে, এর ফলে মানবিক সংকট তৈরি হবে। ট্রাম্প ক্যারিবিয়ানে কথিত মাদক চালানবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে সামরিক মোতায়েনের নির্দেশ দেয়ার পর থেকেই পেত্রো এসব পদক্ষেপের সমালোচক। মাদকবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দেন যে, কলম্বিয়ার মাদক উৎপাদন ল্যাবেও হামলা চালানো হতে পারে। একে পেত্রো ‘আক্রমণের হুমকি’ বলে নিন্দা করেন।

কারাকাস থেকে মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে সরিয়ে নেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে দেশটি পরিচালনা করবে। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও বিচক্ষণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা না যায়, ততক্ষণ আমরা দেশটি পরিচালনা করব। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় ধরনের দ্বিতীয় আক্রমণ চালানোর জন্য প্রস্তুত।

লাতিন আমেরিকা নিয়ে ওয়াশিংটনের বৃহত্তর পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, পশ্চিম গোলার্ধে আবার কখনও আমেরিকার আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না। তার ভাষায়, আমরা নিজেদের চারপাশে ভালো প্রতিবেশী চাই, স্থিতিশীলতা চাই, শক্তির উৎস চাই। ওই দেশে আমাদের বিরাট ‘এনার্জি’ রয়েছে এবং সেটাকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। আমাদের নিজেদের জন্যই তা প্রয়োজন।

ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রতি আস্থা প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেন যে, দেশটিকে আবার মহান করতে যা দরকার তিনি তা করতে আগ্রহী। তবে বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদোর দেশীয় সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, তার (মাচাদো) জন্য নেতা হওয়া খুব কঠিন হবে। দেশে তার ভেতরে সেই সমর্থন বা সম্মান নেই। তিনি খুব ভদ্র একজন নারী, কিন্তু তার সে সম্মান নেই।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের বড় তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলায় পাঠাবে। ভেঙেপড়া তেল অবকাঠামো মেরামতে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে এবং দেশের জন্য আয় সৃষ্টি করবে। তার ভাষায়, আমাদের বিশাল মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে যাবে, বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, ভেঙেচুরে যাওয়া তেল বিষয়ক অবকাঠামো ঠিক করবে এবং দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে। ভেনেজুয়েলার সব তেলের ওপর আরোপিত অবরোধ বহাল আছে। আমেরিকান নৌবহর প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক বিকল্প খোলা রয়েছে যতক্ষণ না আমাদের সব দাবি পুরোপুরি মেনে নেয়া হয়।

মেক্সিকো ও কিউবার উদ্দেশে বার্তা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইঙ্গিত দেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে কিউবা। তিনি বলেন, আমি যদি হাভানায় সরকারে থাকতাম, তাহলে অন্তত কিছুটা হলেও চিন্তিত হতাম।
লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘ সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে ১৯৬১ সালের কিউবান নির্বাসিতদের নেতৃত্বাধীন ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ অভিযান, যা ফিদেল কাস্ত্রোকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছিল। মেক্সিকো প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, দেশটির সঙ্গে কিছু একটা করতেই হবে। তিনি দাবি করেন, আমরা তার  (প্রেসিডেন্ট শেইনবাউমের) সঙ্গে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। তিনি একজন ভালো নারী। কিন্তু মেক্সিকো চালাচ্ছে মাদক কার্টেলগুলো।
ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউমকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছেন ‘আপনি কি চান আমরা ওই কার্টেলগুলোকে গুঁড়িয়ে দিই?’ কিন্তু তিনি নাকি সবসময়ই ‘না’ বলেছেন।

mzamin

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এখন ২৯৫টি, বিক্রি করতে হবে সরকার নির্ধারিত দামে

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বড় করেছে সরকার। এই তালিকায় এখন ওষুধের সংখ্যা ২৯৫। এসব ওষুধ সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে বিক্রি করতে হবে। তবে ওষুধশিল্পের মালিকেরা এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন।

আজ বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের সভায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের হালনাগাদ তালিকার অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতিরও অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এ বিষয়ে সংবাদ ব্রিফিং করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ও উপ–প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।

অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ১৩৫টি ওষুধ যুক্ত করা হয়েছে। এখন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা ২৯৫। এই ওষুধগুলোর মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে। তালিকায় থাকা এসব ওষুধ দেশের ৮০ শতাংশ মানুষের প্রাথমিক চাহিদা মেটাবে এবং এসব ওষুধ দেশের মানুষের ৮০ শতাংশ রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ব্রিফিংয়ে বলা হয়, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ নীতি তৈরির জন্য টাস্কফোর্স ও কমিটি করা হয়েছিল। এই টাস্কফোর্স ও কমিটি ওষুধবিশেষজ্ঞ, ওষুধশিল্প মালিক, জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ও পরামর্শক, গবেষকসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে পৃথক সভা করেছে ও তাঁদের সুপারিশ নিয়ে তালিকা ও নীতি চূড়ান্ত করেছে। তালিকাভুক্ত ওষুধের মধ্যে ক্যানসার বা ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের ওষুধ ও বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগের ওষুধও আছে।

সায়েদুর রহমান বলেন, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যব্যয়ের দুই–তৃতীয়াংশ চলে যায় ওষুধের পেছনে। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যেও উদ্বেগ ছিল। সরকার মনে করেছে, ওষুধের মূল্য যেন প্রাপ্যতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। মানুষের কাঁধ থেকে ব্যয়ের বোঝা কমানোর জন্যই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, সবকিছু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রীতিনীতি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা মেনেই করা হয়েছে।

সরকারি এ উদ্যোগ ওষুধশিল্পের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী বলেন, মূল্য সমন্বয় করার জন্য ওষুধ কোম্পানিগুলো চার বছর সময় পাবে। যাদের মূল্য কম, তারা বাড়াবে, যাদের বেশি, তারা ক্রমান্বয়ে কমাবে।

এখানেই শেষ নয়, তালিকার বাইরে বাজারে থাকা ওষুধের দামও সরকারের নীতি অনুসারে নির্ধারিত হবে। সে ক্ষেত্রে কোনো কোম্পানি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম বা বেশি মূল্যে ওষুধ বিক্রি করতে পারবে। কোনো কোম্পানি নিজে কোনো ওষুধের দাম ঠিক করে তা বাজারে বিক্রি করতে পারবে না। এ ছাড়া প্রতিটি ওষুধ কোম্পানিকে উৎপাদনের ২৫ শতাংশ রাখতে হবে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা থেকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের কমিটির সঙ্গে তাঁদের এক–দুবার কথা হয়েছে। কিন্তু গঠনমূলক আলোচনা হয়নি। মূল্য নির্ধারণ কমিটি সমিতিকে অন্ধকারে রেখে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সমিতি এ ব্যাপারে দ্রুত আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, মন্ত্রিপরিষদ সভায় ডেটা সংরক্ষণ, শিল্পকলা একাডেমিতে নতুন বিভাগ খোলাসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সভার মূল আলোচনার বিষয় ছিল ওষুধ।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান আজ ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে উপদেষ্টা পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান আজ ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে উপদেষ্টা পরিষদের সভার সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন। ছবি: পিআইডি