Wednesday, June 10, 2026
প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাস্তা বানাতে ‘ইটভাড়া’ নিয়েছিল এলজিইডি
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাবতলী উপজেলার নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে প্রধানমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি পর্যন্ত ৫০০ মিটার এ কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য গত অর্থবছর এলজিইডি থেকে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কার্যাদেশ পাওয়ার পরও ঠিকাদার সঠিক সময়ে কাজ শুরু করেননি। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী সফরের সময় এ কাঁচা সড়কে অস্থায়ীভাবে ইট বিছানো হয়। আনুষঙ্গিক কিছু কাজসহ এতে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। প্রধানমন্ত্রী ফিরে যাওয়ার সপ্তাহখানেকের মধ্যে সড়কের ৫০০ মিটার অংশে বিছানো ইট পুরোটায় তুলে নেওয়া হয়েছে।
নিয়মনীতি মেনেই অস্থায়ীভাবে সড়কে ইট বিছানো হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এলজিইডির বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান। তিনি বলেন, ওই সড়ক পাকা করতে ৮৪ লাখ টাকা আগেই বরাদ্দ হয়েছে। এ কারণে সেখানে অস্থায়ীভাবে বিছানো ইট ঠিকাদারকে তুলে নিতে বলা হয়েছে। কারণ, অস্থায়ীভাবে সোলিং করার জন্য ইট ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ইট কিনতে গেলে ব্যয় অনেক বেড়ে যেতে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, বাগবাড়ি-সোনাহাটা সড়ক থেকে জিয়াবাড়ি পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি কার্পেটিং করার জন্য গত অর্থবছরে এলজিইডি থেকে ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্র আহ্বানের পর গত বছরের আগস্ট মাসে মেসার্স হক ট্রেডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী, এ বছরের আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত সড়ক পাকাকরণের কাজ শুরুই করেনি।
এর মধ্যে গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া সফরে আসেন। এদিন তিনি বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন, চৌকিরদহ খাল খননকাজের উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ি পরিদর্শন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে ৫০০ মিটার এই কাঁচা রাস্তায় রাতারাতি ইট বিছানোর তোড়জোড় শুরু করে এলজিইডি। শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমানকে এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে ইট বিছানোর কাজ শেষ হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে আতিকুর রহমান তাঁর শ্রমিক দিয়ে রাস্তা থেকে ইট তুলে নেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
মিনহাজুল ইসলাম নামে স্থানীয় একজন বাসিন্দা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনে কাঁচা সড়কে ইট বসায় এলাকাবাসী খুশি হয়েছিলেন। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছিল। এখন সড়কের ইট তুলে নেওয়ায় এ রাস্তা দিয়ে চলাচল দায় হয়ে পড়েছে। চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে মাদলা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে এলজিইডি থেকে ওই কাঁচা সড়কে অস্থায়ীভাবে ইট সোলিং করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী, ভাটা থেকে ইট নিয়ে গিয়ে শ্রমিক দিয়ে সড়কে ইট বিছিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সড়কের ইট তুলে ভাটায় নিয়ে এসেছেন। এলজিইডি থেকে শুধু পরিবহন ও শ্রমিক খরচ দেওয়া হয়েছে। তবে সেই কাজের জন্য ঠিক কত টাকা দেওয়া হয়েছিল, সেটা এই মুহূর্তে মনে নেই।
গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান বলেন, ৫০০ মিটার কাঁচা রাস্তা ৮৪ লাখ টাকায় পাকাকরণের জন্য ইতিমধ্যে ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। বর্তমানে সড়কের পাশে প্যালাসাইডিংয়ের কাজ চলছে। সড়কের সীমানা নিয়ে জটিলতার কারণে সাইট বুঝে দিতে বিলম্ব হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে ওই কাঁচা সড়কটি ইট বিছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আরও ১৫০ মিটার রাস্তা ও আনুষঙ্গিক কাজসহ খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৫০ মিটার রাস্তা নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য গাবতলী উপজেলা পরিষদ থেকে ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি টাকা এখনো ঠিকাদারকে দেওয়া হয়নি।
সুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক বলেন, একটি কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য দরপত্রপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে নতুন করে আর কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করার সুযোগ নেই। শুধু রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথির সফরকে কেন্দ্র করে এ ধরনের ব্যয় রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে কাঁচা সড়কে ইট বিছিয়ে প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর সড়ক থেকে ইট তুলে নেওয়ায় চরম ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ কাজে সরকারি যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় দেখানো হোক, সেটার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে।
| প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে নির্মাণ করা সড়ক থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ইট। সম্প্রতি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে। ছবি: সংগৃহীত |
Thursday, February 19, 2026
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু আসল বিজয়ী কি ড. ইউনূস? by যুধাজিৎ শংকর দাস
আমি যে ঘূর্ণিঝড়ের কথা বলছি, তা হলো আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ও নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিনের সংঘাত। এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সংকট ও রাজনৈতিক বিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল। ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলন দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়া, সহিংসতা, নাটকীয়ভাবে শেখ হাসিনার পতন এবং হঠাৎ করে মুহাম্মদ ইউনূসের আবির্ভাব- সবকিছুই যেন ঘড়ির কাঁটার মতো সময়মতো ঘটেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূস জানান, হাসিনাকে সরানোর আন্দোলন ছিল সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পিত। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলেছে, রাজনৈতিক দল ও ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো ছাত্রনেতাদের পেছনে মাঠের শক্তি জুগিয়েছিল। আজকের প্রশ্ন হলো- ফেব্রুয়ারি ১২’র নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলেও এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলেও, প্রকৃত বিজয়ী কি ইউনূস? রাজনৈতিক শক্তি না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনি নিজের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়ন করলেন? আর ইতিহাস কি তার প্রতি সদয় হবে?
৮৫ বছর বয়সী ইউনূস নির্বাচিত সরকার শপথ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ১৮ মাসের শাসনামলে তিনি যেসব লক্ষ্য নিয়েছিলেন, তার বেশিরভাগই বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন- অর্ডিন্যান্স জারি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, সেনাপ্রধান ডিসেম্বর ২০২৫-এ নির্বাচন চাইলেও তিনি ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ নির্বাচন নির্ধারণ করেন এবং সেই নির্বাচনকে বৈধতা দেয়া- সব মিলিয়ে ইউনূস বড় বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শফকত রাব্বী বলেন, ৮৫ বছর বয়সে ইউনূস অল্প সময়ে প্রায় সব লক্ষ্য পূরণ করেছেন। তাকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রোডাকটিভ সরকারপ্রধান বলা যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, ইউনূস অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে ও নির্বাচন আয়োজন করতে পেরেছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, জনতার উচ্ছৃঙ্খলতা রোধ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। ইউনূসের বড় ব্যক্তিগত বিজয় হলো- তিনি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ভোট সম্পন্ন করেছেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতিও আদায় করেছেন। সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, বাংলাদেশের অন্তত ৪০ শতাংশ ভোটার-সমর্থিত দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করেও তিনি তা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। এটা একপ্রকার অলৌকিক ঘটনা।
ইউনূস-হাসিনা দ্বন্দ্বের শিকড়
এই সংঘাতের সূত্রপাত বহু আগে। ২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র আওতায় শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে ইউনূসকে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ইউনূসের বিরুদ্ধে চাপ বাড়তে থাকে। গ্রামীণ টেলিকমের শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সমালোচকরা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে উল্লেখ করেন। অবশেষে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের মূল্যায়ন
ড. ইউনূস অর্থনীতি স্থিতিশীল করতে সক্ষম হলেও মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে পারেননি। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও জনতার হাতে হত্যার ঘটনা অব্যাহত ছিল। নারীর অধিকার ইস্যুতে ইসলামপন্থীদের দাবির কাছেও তিনি নতি স্বীকার করেন। তবে তিনি তথ্য সুরক্ষা, ডাটা প্রাইভেসি ও ক্লাউড কম্পিউটিং সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স পাস করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তার প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোটে ৬২ শতাংশ মানুষ সমর্থন দিলেও, বিএনপি তার কিছু ধারায় আপত্তি জানিয়েছে। ফলে এর বাস্তবায়ন অনিশ্চিত।
রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া কীভাবে সফল?
ড. ইউনূসের নিজস্ব রাজনৈতিক দল নেই। ছাত্রদের আহ্বানে তিনি দায়িত্ব নেন। কিন্তু তিনি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের মতো শক্তিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একত্র করতে সক্ষম হন। তিনি ছাত্রনেতাদের সংগঠন এনসিপি ও যুবসমাজের সমর্থন পান। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতাও বড় ভূমিকা রেখেছে।
এখন ইউনূসের ভবিষ্যৎ কী?
কেউ কেউ ধারণা করছিলেন তিনি হয়তো প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, তবে বিএনপি ক্ষমতায় থাকায় সেই সম্ভাবনা কম। অধ্যাপক শাহান মনে করেন, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করাই তার বড় অর্জন। তবে বিশ্লেষকরা বলবেন- তার সাফল্য ও ব্যর্থতা মিলিয়ে এক মিশ্র উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন।
সাংবাদিক স্বদেশ রায় বলেন, ইউনূস প্রমাণ করেছেন তিনি আঞ্চলিক নয়, আন্তর্জাতিক অ্যাক্টর।
কিন্তু ইতিহাস কি মুহাম্মদ ইউনূসকে উষ্ণ আলিঙ্গন দেবে? স্বদেশ রায়ের ভাষায়, ইতিহাস বেছে নেয়। সবাইকে জায়গা দেয়, কিন্তু সব বিজয়ীকে নয়।
(অনলাইন ইন্ডিয়া টুডে থেকে অনুবাদ)

Monday, February 16, 2026
তারেক-শফিকুর বৈঠক: এ ধরনের ‘নতুন সংস্কৃতি’ নিজেদের ভেতরে একটা গুণগত পরিবর্তন -তাহের
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় যান। দুই নেতার ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
দুই নেতার সাক্ষাতের বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, ‘এটাকে আমরা ওয়েলকাম করি (স্বাগত জানাই)। আমি মনে করি, এ ধরনের নিউ কালচার (নতুন সংস্কৃতি) নিজেদের ভেতরে থাকাটা একটা গুণগত পরিবর্তন।’
আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। এ সময় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে থাকার প্রসঙ্গ তুলে ভবিষ্যতেও রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্মিলিতভাবে কাজের আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, নিজেদের ভেতর আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ে ইতিবাচক সমাধানের বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াত মৌলিকভাবে একমত হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করতে যাওয়া বিএনপিকে অগ্রাধিকার নির্ধারণেও পরামর্শ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে ল অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশন (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি), মানুষের সিকিউরিটি (নিরাপত্তা)...এ বিষয়ে যেন সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে।’
এ ছাড়া মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবর্তনে বিএনপির গঠিত সরকার যেন কাজ করে, সে বিষয়েও জামায়াতের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বলে জানান জামায়াতের এই নায়েবে আমির।
![]() |
| বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে বিএনপির চেয়ারম্যান রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় প্রবেশ করেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বিএনপি। এ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসনে জয় পায় বিএনপির একসময়ের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী। মূলত সৌজন্য সাক্ষাৎ করতেই জামায়াতের আমিরের বাসায় গেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান। সেখানে কুশলাদি বিনিময় ছাড়াও সমসাময়িক বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে বলে দলগুলোর নেতারা জানিয়েছেন। সাক্ষাৎ শেষে রাত ৭টা ৫৮ মিনিটের দিকে তারেক রহমানকে বহনকারী গাড়িটিকে জামায়াতের আমিরের বাসভবন ছেড়ে যেতে দেখা যায়। |
বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধে আশ্বস্ত করেছেন: জামায়াত আমির
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আজ রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় জামায়াতের আমিরের বাসায় যান। এর ঠিক আধা ঘণ্টা পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ পোস্ট দেন শফিকুর রহমান।
সেখানে জামায়াতের আমির লেখেন, ‘আমাদের আলোচনায় তিনি (তারেক রহমান) আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং বিরোধী দলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যেকোনো হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন। আমি এ আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের প্রত্যাশা, কোনো নাগরিকই যেন ভয়ভীতি বা নিরাপত্তাহীনতার শিকার না হয়।’
জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে নির্বাচিত সরকারকে জামায়াত পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবে উল্লেখ করে পোস্টে শফিকুর রহমান লেখেন, ‘তবে একটি আদর্শিক বিরোধী দল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে আমরা আপসহীন থাকব। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের সমর্থন থাকবে, কিন্তু যেখানেই জবাবদিহির প্রয়োজন হবে, সেখানে আমরা সোচ্চার থাকব।’
জামায়াতের আমির লেখেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয়; বরং সংশোধন, বাধা দেওয়া নয়; বরং পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।’
শফিকুর রহমান আরও লেখেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অগ্রিম অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তাঁর এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তাঁর এই আগমনকে স্বাগত জানাই এবং প্রত্যাশা রাখি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।’
ফেসবুক পোস্টে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আমি এমন এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, যা হবে ফ্যাসিবাদমুক্ত, সার্বভৌম এবং ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১-দলীয় জোটের সঙ্গে মিলে একটি সমৃদ্ধ, স্থিতিশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক শাসনের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে।’
![]() |
| বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ছবি: জামায়াতের ফেসবুক পেজ থেকে |
নাহিদ ইসলামের বাসায় তারেক রহমান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার দুই দিন পর আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদের বাসায় যান তারেক রহমান। তাঁর সঙ্গে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানও ছিলেন।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য নাহিদের বাসার ড্রয়িং রুমে তারেক রহমান ও নাহিদ ইসলামের সাক্ষাৎ হয়। এ সময় এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত আখতার হোসেন এবং দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম নাহিদের সঙ্গে ছিলেন। প্রথমেই তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান নাহিদ। এরপর শহীদ আনাসের ফ্রেমে বাঁধা সেই মর্মস্পর্শী চিঠি তারেক রহমানকে উপহার দেন তিনি। এনসিপির দলীয় প্রতীক শাপলা কলির একটি স্টিলের তৈরি প্রতিকৃতিও বিএনপির চেয়ারম্যানকে উপহার দেন নাহিদ ইসলাম। পরে দুজন বসে আলোচনা শুরু করেন।
আলোচনা শেষে রাত সোয়া নয়টার দিকে নাহিদের বাসা থেকে বের হয়ে যান তারেক রহমান। বাইরে সাংবাদিকেরা থাকলেও তিনি কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তারেক রহমান চলে যাওয়ার পর নাহিদের বাসার নিচে সংবাদ সম্মেলন করেন এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘জনাব তারেক রহমান ও জনাব নাহিদ ইসলাম আজকে সৌজন্য সাক্ষাতে একত্রে বসেছেন। নির্বাচনে কয়েকটি আসনের ফলাফল নিয়ে এনসিপির প্রশ্ন থাকলেও তারেক রহমান যে রাজনৈতিক সৌজন্যবোধের জায়গা থেকে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন, এই রাজনৈতিক সৌজন্যতা এবং তাঁর জয়ী হয়ে আসাকে আমরা অভিনন্দন জানাই। নিজেদের মধ্যে মতভিন্নতা সত্ত্বেও আমরা কীভাবে একত্রে দেশের জন্য কাজ করতে পারি, সে বিষয়ে আমরা কথা বলেছি। সংস্কারের প্রশ্নকে কীভাবে সুরাহা করা যায় এবং বিচারের প্রশ্ন নিয়েও আমরা কথা বলেছি।’
তারেক রহমান ও নাহিদ ইসলাম এবং বিএনপি ও এনসিপির এই নির্বাচন–পরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটা পরিবর্তনের আভাস দেয় উল্লেখ করে আখতার বলেন, ‘আমরা মনেপ্রাণে চাই, আমাদের রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকবে, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্য আলাদা হবে, কিন্তু দেশের প্রশ্নে সব দল একসঙ্গে থাকব। সে ধরনের পরিবেশ অটুট থাকবে, এই প্রত্যাশা আমরা রাখছি।’
কৃষি, শিক্ষা, শিল্প, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে কীভাবে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ‘পলিসি ডায়ালগের’ (নীতি–সংলাপ) মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেসব বিষয়েও তারেক রহমানের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান এনসিপির সদস্যসচিব। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন–পরবর্তী যেসব সহিংসতা বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে, সেসব নিয়েও আমরা তারেক রহমানকে জানিয়েছি। তাঁদের দলের পক্ষ থেকে সে বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, অভ্যুত্থানে জীবন দেওয়া ও অঙ্গহানি হওয়া বীর শহীদ ও গাজীদের পরিবারের যথোপযুক্ত পুনর্বাসন নিয়েও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন আখতার। তিনি বলেন, নির্বাচন–পরবর্তী এই সৌজন্য সাক্ষাৎ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হবে।
পরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আখতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের পক্ষে, ফ্যাসিবাদের বিপক্ষে থাকা যেকোনো রাজনৈতিক দল, যারা বাংলাদেশকে নতুন করে গড়তে চায়—এমন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, পলিসির (নীতির) ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু আমরা যাতে একত্রে বসতে পারি, সংলাপের মধ্য দিয়ে যাতে আমরা সমাধানে পৌঁছাতে পারি, সে ব্যাপারে নাহিদ ইসলাম আহ্বান জানিয়েছেন। সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে বিএনপির নেতারাও জোরারোপ করেছেন। আমরা আশাবাদী, আজকের এই সাক্ষাৎ বা সংলাপের মধ্য দিয়েই আমরা দেশের সংকটকে সমাধানের দিকে নিতে পারব।’
বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় যোগদানের কোনো আহ্বান এনসিপি পেয়েছে কি না, জানতে চাইলে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘এটা নির্বাচন–পরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ। রাজনৈতিক যেসব বিষয়বস্তু থাকে, সে রকম কোনো বিষয়ে আমাদের আলোচনা হয়নি। নির্বাচনে জয়ী দল ও বিরোধী দল হিসেবে যাঁরা ফাংশন করবেন, তাঁদের মধ্যকার একটা সম্পর্কের সূচনা হিসেবে আজকের এই সাক্ষাৎ। অন্যান্য রাজনৈতিক প্রশ্ন নিয়ে এখানে আলোচনা হয়নি। সে বিষয়গুলো সামনের দিনে আমাদের মধ্যে আরও আলোচনা হবে। তখন এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানানো যাবে।’
![]() |
| বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে বাসায় স্বাগত জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। আজ রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর বেইলি রোডে। ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেলের সৌজন্যে |
নিরঙ্কুশ জয়ের পর বাংলাদেশের নতুন নেতা কি পরিবর্তন আনতে পারবেন
তবে বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের চক্রে এটি হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার আরও একটি হাতবদলমাত্র। কয়েক দশক ধরে এ দুই দলই পর্যায়ক্রমে দেশ শাসন করে আসছে।
ব্যতিক্রম শুধু এটিই যে এবারই প্রথম বিএনপির নতুন নেতা তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও প্রথমবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
গত বছরের শেষ দিকে অসুস্থতায় তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া মারা যান। বিএনপির প্রয়াত এই চেয়ারপারসন চার দশক ধরে দলের প্রধান ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা দলের হাল ধরেছিলেন।
মায়ের শাসনামলে স্বজনপ্রীতির সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ যেমন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রয়েছে, তেমন তিনি দুর্নীতির অভিযোগেরও মুখোমুখি হয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে লন্ডনে ১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন তিনি।
৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান তাঁর মায়ের কারাবাস ও অসুস্থকালীন মাঝেমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া বিএনপির ‘ডি-ফ্যাক্টো’ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি মূলত একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে বিবেচিত নন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাভীন মুর্শিদ বলেন, ‘তাঁর (তারেক রহমান) পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকাটা তাঁর জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, মানুষ পরিবর্তনের সুযোগ দিতে চায়। ভাবতে চায়, নতুন ও ভালো কিছু করা প্রকৃতপক্ষেই সম্ভব। তাই অনেক আশা রয়েছে।’
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, ‘গত এক দশকে যেসব গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে, সেগুলো আমাদের আগে ঠিক করতে হবে।’
বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং পরে তা ভাঙার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যেখানে ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।
তবে এবার ২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’ অংশ নেওয়া তরুণ প্রজন্ম, যারা হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে, তারা আর এমন ধারার (পুরোনো) রাজনীতি মেনে নিতে রাজি নয় বলে মনে হচ্ছে।
অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী তাজিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা আর লড়াই করতে চাই না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগই আমাদের চূড়ান্ত বিজয় ছিল না। আমাদের দেশ যখন কোনো দুর্নীতি ছাড়া চলবে ও অর্থনীতি ভালো হবে, সেটাই হবে আমাদের মূল বিজয়।’
তাজিনের ২১ বছর বয়সী স্বজন তাহমিনা তাসনিম বলেন, ‘আমরা প্রথমেই মানুষের মধ্যে ঐক্য চাই। আমাদের একটি স্থিতিশীল দেশ ও অর্থনীতি পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছি এবং জানি কীভাবে লড়াই করতে হয়। তাই, যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়, আমরা আবার রাস্তায় নামার অধিকার রাখি।’
হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামল সংঘাতের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে।
নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। এ ছাড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, খাদ্যদ্রব্যের দাম কমানো এবং বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও হবে বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা মনে করেন, সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতার অভাব সব দলের ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে দুবার নিষিদ্ধ হওয়া ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর জন্য এবারই প্রথম উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন জয়ের অভিজ্ঞতা হলো।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ও জামায়াতে ইসলামীর জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের প্রথম নির্বাচনেই ছয়টি আসনে জয়ী হয়েছে।
লুৎফা বলেন, ‘আমরা সংসদে এমন সব নেতাদের দেখতে যাচ্ছি, যাঁরা আগে কখনো সংসদে যাননি। এনসিপির তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছে। অন্যরা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হলেও তাঁদের দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাই এটি একটি কঠিন কাজ হতে যাচ্ছে।’
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী। সেখানে ইসলামি আইনের কোনো উল্লেখ ছিল না। কিন্তু দলটির ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, ‘জামায়াত রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজ করে, কারণ রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’ আর এটিই সব সময় প্রশ্ন তুলেছে যে দলটি ক্ষমতায় এলে প্রকৃতপক্ষে কী করবে।
নাভীন মুর্শিদ বলেন, এই নির্বাচনে জামায়াতের ফলাফল আশ্চর্যজনক কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘জামায়াত একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। কয়েক দশক ধরে তারা তৃণমূল পর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করেছে। আমি মনে করি, সেটি স্বীকার করতে হবে। তবে দলটির সমস্যাযুক্ত দিক হলো তারা মূলত “গণতন্ত্রবিরোধী, নারীবিদ্বেষী ও পিতৃতান্ত্রিক”।’
লুৎফা বলেন, সব রাজনৈতিক দলই বাংলাদেশের নারীদের হতাশ করেছে। মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি ছিল নারী। তিনি বলেন, ‘আমরা যেসব নারী জুলাই অভ্যুত্থানের অংশ ছিলাম, সব রাজনৈতিক দল আমাদের সেই সম্মিলিত ভূমিকাকে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বা নির্বাচনী রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন সংসদ সদস্যদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে তাঁরা সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থীদের নিয়ে আসতে পারেন।’
বাংলাদেশের ৩৫০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৩০০টি সরাসরি নির্বাচিত। বাকি ৫০টি সংরক্ষিত আসন দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে মনোনীত নারীদের জন্য বরাদ্দ।
যদিও হাসিনার অধীন গত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় এ নির্বাচন ছিল একদম ভিন্ন, যেখানে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হয়েছে এবং ভোটের আগে ফলাফল জানা ছিল না। কিন্তু তাঁর দলকে নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি এর গ্রহণযোগ্যতার ওপর একটি ছায়া ফেলেছে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যখন জিজ্ঞেস করা হয় যে তাঁরা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি সমর্থন করবেন কি না, তখন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা চৌধুরী বলেন, ‘এটি আমাদের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়।’
এই নেতা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফিরতে সময় লাগবে। কারণ, তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যখন আপনি আপনার নিজের দেশের মানুষকে হত্যা, নৃশংসতা ও নিপীড়ন করার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, তখন ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান কোথায় হবে, তা জনগণই ঠিক করবে।’
ভারত থেকে শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবারের এ নির্বাচনকে ‘প্রতারণা ও প্রহসনের’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং আবার নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন, যেখানে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারবে।
বর্তমানে হাসিনার দলের বিরুদ্ধে জনরোষ তুঙ্গে। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনায় আওয়ামী লীগকে চিরতরে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়াটা হবে অপরিপক্বতা।
![]() |
| বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স |
Thursday, February 12, 2026
এএফপিকে তারেক রহমান: দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরাতে হবে, যাতে মানুষ নিরাপদ থাকে
তারেক রহমানের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে মঙ্গলবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এএফপি। তাতে বলা হয়, ২০২৪ সালে তরুণদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসন উৎখাত হওয়ার পর যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশকে ঘিরে ধরেছে, তার অবসানের জন্য আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার।
তারেক রহমান সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নির্বাচিত হলে তাদের কাজের তালিকার সবার উপরে থাকবে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক দুর্দশা মোকাবিলা করা। আওয়ামী লীগের প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘মেগা প্রকল্পের নামে আমরা কী দেখেছি, মেগা দুর্নীতি হয়েছে। অল্প কিছু ব্যক্তি ধনী হয়েছে। কিন্তু দেশের বাকি মানুষেরা, পুরো জনগোষ্ঠী কিছুই পায়নি।’
এই সংকট মোকাবিলায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব দেবেন বলে জানান তারেক রহমান। এ প্রসঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, দেশে বিপুল সংখ্যায় বেকার রয়েছে। এই তরুণেরা যাতে চাকরি পায় সেজন্য ব্যবসা–বাণিজ্য বাড়াতে হবে।
দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেলে বাবা-মা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চেয়ে ভালো কাজ করতে চান বলে উল্লেখ করেছেন তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমি তাদের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করব।’
এএফপিকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান সতর্ক করে দেন যে, ১৭ কোটি মানুষের এই দেশের ভবিষ্যৎ খুবই কঠিন হতে যাচ্ছে।
পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে অবহেলার অভিযোগ এনে তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে, জ্বালানি খাত ধ্বংস করা হয়েছে।’
বিভিন্ন জরিপে তারেক রহমানের বিএনপি নির্বাচনী লড়াইয়ে এগিয়ে আছে। তবে দলটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের কাছ থেকে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
তারেক রহমান নিজ কার্যালয়ে এএফপিকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এ সময় তিনি বলেন, নির্বাচনে বিএনপির বিপুল ব্যাবধানে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা আশা করি, জনগণের কাছ থেকে একটি স্পষ্ট ম্যান্ডেট পাব— একটি বড় ম্যান্ডেট।’
বর্তমান দলীয় জোটের বাইরে নতুন কোনো জোট করার প্রয়োজন দেখছেন না উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘নিজেদের সরকার গঠনের জন্য আমরা পর্যাপ্ত আসন পাব।’
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে তারেক রাহমান বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে সাবধানী মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘জনগণের স্বার্থ এবং আমার দেশের স্বার্থই সবার আগে।’
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। গত বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এক সময় বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রশংসিত হলেও শেখ হাসিনার সরকার ভিন্নমত দমন এবং বিশেষ করে বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্প থেকে ব্যাপক চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত।
এ বিষয়ে তারেক রাহমান বলেন, ‘আমরা মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি হতে দেখেছি। অল্প কিছু মানুষকে অনেক ধনী করা হয়েছে। কিন্তু দেশের বাকি অংশ, পুরো জনগোষ্ঠী নিঃস্ব হয়ে গেছে।’
তবে তারেক রাহমান আইন করে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধী বলে জানান।
তিনি বলেন, ‘অবশ্যই কেউ যদি কোনো ধরনের অপরাধে জড়িত থাকে, তাহলে তাদের আইন অনুযায়ী শাস্তি হতে হবে।’
![]() |
| নিজ কার্যালয়ে এএফপিকে সাক্ষাৎকার দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ছবি: এএফপি |
সবাই সরকারে চলে এলে দেশ চলবে কীভাবে : -ডয়চে ভেলেকে তারেক রহমান
প্রশ্ন: ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট৷ তো এই নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে বলে আপনি আশাবাদী?
তারেক রহমান: আমরা আশা করছি যে নির্বাচনটা সুষ্ঠু হবে। মানুষেরও তা–ই প্রত্যাশা। আমরা আশাবাদী।
প্রশ্ন: ১৭ বছর পর আপনি এই বাংলাদেশে এসেছেন। আপনি নির্বাসনে ছিলেন নানা কারণে। এই ১৭ বছর পর আসার পরে আপনার দল গোছানো নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে আপনার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনটা ছিল?
তারেক রহমান: চ্যালেঞ্জটা হয়তো কিছুটা খুব সম্ভবত আমারই ছিল। এত বছর পরে এসেছি, আসার পরে মানুষের চোখেমুখে একটা প্রত্যাশা দেখেছি। এটা হলো রাজনৈতিক দিক, অন্যদিকে আসার পাঁচ দিন পরেই আম্মা মারা গেলেন। উনি অসুস্থ ছিলেন অনেক দিন ধরে। স্বাভাবিকভাবে এটাও একটা খুব কষ্টকর বিষয় আমাদের সবার জন্য। আমরা পরিবার যে একসাথে বসে নিজেদের কষ্টটা ভাগ করে নেব, সেই সুযোগটা বা সময়টা হয়নি। কারণ, আমরা একদম নির্বাচনের ডামাডোলের ভেতরে। একদিকে নির্বাচনী ডামাডোল অন্যদিকে ব্যক্তিগত বিষয়টা—দুটোর সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, এটাই আসলে আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে হয়তো এই চ্যালেঞ্জটা মোটামুটিভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি আমি।
প্রশ্ন: এবার তো অনেক ভোটার যাঁরা হচ্ছেন তরুণ এবং প্রথমবারের মতো ভোট দিতে যাচ্ছেন। গত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত নির্বাচন আপনি জানেন। ফলে মানুষের মধ্যে একটা বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। তরুণদের আগ্রহী করতে বা তরুণদের কাছে পৌঁছাতে, আপনার দলের পক্ষ থেকে কি আলাদা করে বা বিশেষ করে কোনো কিছু করা হয়েছে, যেটাতে তরুণেরা একটু আকৃষ্ট হতে পারেন?
তারেক রহমান: দেখুন, আপনি যদি আমাদের মেনিফেস্টোটা দেখে থাকেন, যেটা আমরা কয়েক দিন আগে জাতির সামনে উপস্থাপন করেছি, সেখানে কিন্তু আমরা সমাজের তরুণদের জন্য, একইভাবে এখানে বয়স্ক যাঁরা আছেন, তাঁদের জন্য, একই সাথে দেশে যে ৪০ লাখ প্রতিবন্ধী আছেন, তাঁদের জন্য, একই সাথে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক যে নারী, তাঁদের ক্ষমতায়নের জন্য আমরা পরিকল্পনা রেখেছি, কর্মসূচি রেখেছি, বিশেষ করে শুধু তরুণদের জন্য না, সবার জন্য। কারণ, দেশটা গঠন করতে হবে সবাইকে নিয়ে।
প্রশ্ন: জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং তার পর থেকে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমশ অবনতি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। এই যে সম্পর্ক এবং অতীতে দেখা গেছে যে গত এক দশকে অনেকে মনে করেন যে ভারতের সঙ্গে বিএনপির একটা দূরত্ব রয়ে গেছে এবং সেই দূরত্বটা ঘোচানো যায়নি। ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কী হবে?
তারেক রহমান: দেখুন, আপনি যেটা বললেন যে দেখা গেছে যে বিএনপির সাথে তাদের একটা দূরত্ব আছে। অবশ্যই আমরা যদি দেখি যে এমন কোনো চুক্তি হচ্ছে, যেটা বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী, বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী, সেটা যেকোনো দেশের সাথেই হোক না কেন তাদের সাথে স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব হবে। কারণ, আমি তো প্রতিনিধিত্ব করি আমার দেশের মানুষকে। কাজেই যেকোনো দুই দেশের মধ্যে যদি কোনো চুক্তি হয়, যেটা আমার দেশের স্বার্থের সাথে যাবে না, সে ক্ষেত্রে যে কারও সাথেই আমাদের এ রকম দূরত্ব হতে পারে।
প্রশ্ন: ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে যে চীনের একটা বাড়তি আগ্রহ আছে বাংলাদেশ নিয়ে। আপনাদের কি চীনের জন্য আলাদা কোনো নীতি বা কোনো পদক্ষেপ আছে?
তারেক রহমান: বর্তমান বিশ্বে যদি আমরা চিন্তা করি আমাদের সাথে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক থাকবে, আমরা একা বসবাস করতে পারব না। গ্লোবাল ভিলেজ বলা হয় এখন পৃথিবীকে। কাজেই আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসা–বাণিজ্য করবে। আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্ন দেশে যাবে চাকরি–বাকরি বিভিন্ন কারণে। কাজেই আমার দেশের স্বার্থ যেখানে বজায় থাকবে, দেশের মানুষের স্বার্থ যেখানে বজায় থাকবে, আমাদের সাথে তাদের সম্পর্ক ভালো হবে।
প্রশ্ন: একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে আপনি কয়েক দিন আগেই বলেছেন যে বিএনপি কোনো রকম ঐক্যের সরকার বা জাতীয় সরকার গঠনের পরিকল্পনা নেই জামায়াতের সঙ্গে৷ কিন্তু জামায়াত বলছে যে তারা যদি সুযোগ পায় তারা বিএনপির সঙ্গে এখনো ঐক্যের সরকার করতে রাজি এবং তারা আমন্ত্রণ জানাবে। সে ক্ষেত্রে কি আপনি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করবেন?
তারেক রহমান: আমরা কনফিডেন্ট যে ইনশা আল্লাহ বাংলাদেশের মানুষের রায় আমরা পাব৷ আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হব—এককভাবে। সে ক্ষেত্রে তো কাউকে অপজিশনে থাকতে হবে। কারণ, একটা ব্যালেন্সড রাষ্ট্র যদি হতে হয়, ব্যালেন্সড সরকার যদি হতে হয়, তাদের সে ক্ষেত্রে অপজিশনে থাকতে হবে কাউকে। সবাই সরকারে চলে এলে কেমন করে দেশ চলবে?
প্রশ্ন: বাংলাদেশে প্রায় ১৩ কোটি ভোটার এবং তার অর্ধেকের মতোই নারী। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি যে রাজনৈতিক দলগুলো যে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছেন, তার মধ্যে নারীর সংখ্যা খুবই কম এবং এটা নিয়ে একটা আলোচনা হচ্ছে দেশে–বিদেশে যে নারীকে কেন এতটা কম সুযোগ দেওয়া হচ্ছে ভোটের রাজনীতিতে? কারণ, যে জুলাই বিপ্লবের কথা বলা হয়, গণ–অভ্যুত্থানের কথা বলা হয়, সেখানেও তাঁরা বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন। বিষয়টা কীভাবে দেখছেন?
তারেক রহমান: বিষয়টাকে আমি অন্যভাবে দেখি। বেগম খালেদা জিয়া যখন এর আগে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন উনি একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিলেন এবং সেটা হচ্ছে মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা। ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত উনি ফ্রি করে দিয়েছিলেন। এটি হচ্ছে নারী সমাজকে এমপাওয়ার করার প্রথম একটি পদক্ষেপ৷ অর্থাৎ আপনি একজনের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করলেন। আমরা সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে নারীদের এই শিক্ষার সুযোগটা আরও হায়ার ক্লাস পর্যন্ত আমরা নিয়ে যাব। এটা হলো এক নম্বর। দ্বিতীয়ত, আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন বা জানেন আমরা দেশের প্রত্যেক হাউসওয়াইফ–এর জন্য, বিশেষ করে শুরু করব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর থেকে, আমরা একটি ফ্যামিলি কার্ড দিতে চাই, যার মাধ্যমে আমরা তাকে একটি রাষ্ট্র বা সরকার থেকে একটা সহযোগিতা দেব। এই ফ্যামিলি কার্ডটা যখন পাবে, মানসিকভাবে সে এমপাওয়ার্ড ফিল করবে এবং সহযোগিতা যখন বজায় থাকবে, আস্তে আস্তে অর্থনৈতিকভাবে সে স্বাবলম্বী হবে। একদিকে আমরা চেষ্টা করছি নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে। একই সাথে আমরা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছি৷ আমরা শুধু কথার কথা বলে কিছু নমিনেশন বা কিছু গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কিছু নারীকে দিয়ে দিলাম না৷ কিন্তু আপনি যদি সত্যিই নারীদের ক্ষমতায়নের কথা বলেন তা এভাবে আনতে হবে। তাদের শিক্ষা এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে হবে। আমরা চাইছি শিক্ষার পাশাপাশি নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে৷ তাহলে সে তার নিজ যোগ্যতাতেই যেকোনো পর্যায়ের নির্বাচন হোক—স্থানীয় হোক বা জাতীয় নির্বাচন, সে তার নিজ যোগ্যতাবলে নমিনেশন আদায় করেই নিতে সক্ষম হবে। বিষয়টিকে আমরা লংটার্মে নিয়ে যেতে চাইছি। ধীরে ধীরে স্থায়ীভাবে জিনিসটাকে গড়ে তুলতে চাইছি আমরা।
প্রশ্ন: আমরা যখন কথা বলি নারী ভোটারদের সঙ্গে, তাদের কারও কারও মধ্যে একধরনের ভয় বা উৎকণ্ঠাও কাজ করছে যে ১২ তারিখের পরে কী হবে, তারা কতটা নিরাপদ থাকতে পারবেন বা তাদের ওপরে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ হবে কি না, তাদের জীবন সংকুচিত করার কোনোরকম পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না৷ এ রকম একধরনের ভয়, একধরনের উৎকণ্ঠা কাজ করছে৷ তাদের উদ্দেশে আপনার কি কোনো বার্তা আছে?
তারেক রহমান: আপনি যে বিষয়গুলো বললেন এটি অবশ্যই আমাদের পক্ষ থেকে নয়। এটি বাংলাদেশে কিছু কিছু অন্য রাজনৈতিক দল আছে যাদের বিভিন্ন কথাবার্তা বা সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের বিভিন্ন স্টেটমেন্টের মাধ্যমে এই ধারণাগুলো জন্ম নিয়েছে মানুষের মাঝে বা নারীদের মাঝে। আমরা সব সময়ই নারীদের এম্পাওয়ারমেন্ট এর কথা বলেছি৷ কারণ, আমরা যত যাই পরিকল্পনা করি না কেন, যখন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হয়ে থাকেন, তাদের আলাদা রেখে আমরা দেশকে সামনে নিতে পারব না। আমাদের সকলকে নিয়েই সেটি করতে হবে। সে জন্যই আমরা তাদের শিক্ষার আরও এমন ব্যবস্থা করতে চেয়েছি, যাতে তারা আরও উচ্চশিক্ষা লাভ করতে পারে সহজে। আমরা এমন ব্যবস্থা করতে চাইছি, যাতে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে৷ অর্থাৎ তাদের কনফিডেন্স আমরা আরও স্ট্রং করতে চাইছি৷ তাদের আত্মবিশ্বাসটা আমরা দৃঢ় করতে চাইছি৷ শুধু তা–ই নয়, আমরা এরই মধ্যে বলেছি যে আমরা দেশে সরকার গঠন করতে সক্ষম হলে আমরা দেশে এমন শিল্পও নিয়ে আসতে চাই, যেখানে নারীরা তাদের কর্মসংস্থান বেশি হবে। কর্মসংস্থানে নারীরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে, সেই জন্য কেয়ার সেন্টারসহ অন্যান্য বিষয়গুলো আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব আমাদের পরিকল্পনার মধ্যে। আমরা এটাও বলেছি যে নারীরা যাতে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে, ঢাকা শহরসহ বড় শহরগুলোতে আমরা নারীদের জন্য ইলেকট্রিক বাস ইন্ট্রোডিউস করব, যেটা শুধু নারীরাই ব্যবহার করবে এবং সেই বাস পরিচালনাও করবে নারীরা। কাজেই আমাদের দলীয় অবস্থান থেকে আমরা পরিকল্পনা রেখেছি যেগুলো আমরা ইনশা আল্লাহ বাস্তবায়ন করব সুযোগ পেলে যাতে করে নারীরা তাদের জন্য যত বেশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
প্রশ্ন: গণ–অভ্যুত্থানের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না এবং কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এ রকম মত দিচ্ছেন যে আওয়ামী লীগ অংশ না নেওয়ায় এই নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না। এই বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?
তারেক রহমান: দেখুন এটা তো পুরো রাজনীতি৷ আমরা রাজনীতি করি মানুষের জন্য, মানুষের সমর্থন নিয়ে৷ কাজেই আমি মনে করি, রাজনীতিতে মানুষ যাকে গ্রহণ করবে তাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না৷ আর যাকে মানুষ গ্রহণ করবে না, যত শক্তিই থাকুক না কেন, শক্তি প্রয়োগ করে সে ধরে রাখতে পারে না, ৫ অগাস্ট যার উদাহরণ৷
প্রশ্ন: দুর্নীতি দমনের যে উদ্যোগের কথা আপনি বলছেন এবং আপনার ম্যানিফেস্টোতে সেটা রয়েছে, ইশতেহারে রয়েছে৷ কিন্তু টিআইবি এবং একাধিক সংগঠন নানা রকম পরিসংখ্যান দিচ্ছে এবং তাতে দেখা যাচ্ছে যে বিএনপির বেশ কয়েকজন প্রার্থী ঋণখেলাপি৷ তারা আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে তারপরে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এবং অনেকে আছেন যাঁরা ঋণগ্রস্ত৷ এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?
তারেক রহমান: দেখুন দুর্নীতি এবং ঋণগ্রস্ত বা ব্যাংক ডিফল্ট দুটো ভিন্ন জিনিস৷ আমাদের দলের লক্ষ নেতা–কর্মীর নামে বিগত স্বৈরাচার সরকার কেস দিয়েছিল৷ আমাদের দলের মধ্যে যাঁরা আছেন, যাঁরা আমাদের দলীয় রাজনীতির সাথে আছে, যারা ব্যবসা–বাণিজ্য করে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে৷ তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে৷ তাদের ব্যবসা–বাণিজ্য চলতে দেওয়া হয়নি৷ তাদের বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে৷ তাঁদের ন্যায্য ব্যাংক লোন যেটা আছে সেটা তাঁদের দেওয়া হয়নি৷ কাজেই এ রকম একটি অবস্থার মধ্যে আমাদের লোকজন, আমাদের ব্যবসায়ীরা, আমাদের নেতা–কর্মীরা যাঁরা ব্যবসা–বাণিজ্য করতেন, তাঁদের জন্য তো এ রকম ডিফল্ট হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার৷ দুর্নীতি এবং ডিফল্ট হয়ে যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক তো নেই৷ দুটো একদম ভিন্ন জিনিস৷
প্রশ্ন: সম্পূর্ণভাবে গণ–অভ্যুত্থানের কথা আপনি যেটা বলছেন যে বিএনপির অনেক নেতা–কর্মী হতাহত হয়েছেন বলে আপনার দল থেকে জানানো হয়েছে৷ গত ১৫-১৬ বছরে গুম খুনের শিকার হয়েছেন অনেকে৷ যারা ভুক্তভোগী, তাদের পরিবারকে বা তাদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য আপনার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
তারেক রহমান: অবশ্যই আমাদের পরিকল্পনা আছে, কারণ আমাদের নেতা–কর্মীরা যে রকম গুম–খুনের শিকার হয়েছেন, অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল যাঁরা আমাদের সাথে আন্দোলন–সংগ্রামে ছিলেন, তাঁরা গুম–খুনের শিকার হয়েছেন। হয়তো সংখ্যা কমবেশি হবে৷ এমনকি অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা রাজনীতির সাথে জড়িত না৷ কিন্তু তাঁরা অত্যাচার–নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, গুম–খুনের শিকার হয়েছেন৷ এটি একটি অন্যায় ব্যাপার৷ একটি সভ্য দেশে মানুষ গুম হয়ে যাবে, দেশের মানুষ খুন হয়ে যাবে কিন্তু তার কোনো বিচার হবে না, এটা তো হতে পারে না৷ কাজেই দেশের আইন অনুযায়ী অবশ্যই প্রত্যেকটা মানুষ কারও সাথে যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাঁর বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।

Tuesday, February 10, 2026
বিএনপির ইশতেহার: গণভোটে ‘হ্যাঁ’, ইশতেহারে ‘না’ by ইসলামুল হক
জুলাই সনদে তাদের এই ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি এই পত্রিকায় একটি কলামে লিখেছিলাম, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত; ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতির নির্বাচনের মৌলিক দুর্বলতার সুযোগে মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ ভোটেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শাসক দলগুলো বারবার সংবিধানকে নিজেদের মতো করে কাটাছেঁড়া করেছে, যা আদতে স্বৈরতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করেছে।
এই আত্মঘাতী প্রবণতা রোধ করতে হলে উচ্চকক্ষকে হতে হবে সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক, যেখানে ভোটের সংখ্যানুপাতে সব দলের উপস্থিতি থাকবে। আর সংবিধান সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এই উচ্চকক্ষের অন্তত সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো একটি দল চাইলেই সহজে রাষ্ট্র পরিচালনার ‘খেলার নিয়ম’ বা মৌলিক নীতিগুলো একপক্ষীয়ভাবে বদলে ফেলতে না পারে। (সূত্র: মৌলিক সংস্কারে নোট অব ডিসেন্ট রাখলে জুলাই সনদ হবে মূল্যহীন, ৩ নভেম্বর, ২০২৫)
যেহেতু অধিকাংশ রাজনৈতিক দল পিআর পদ্ধতির উচ্চকক্ষ এবং সংবিধান সংশোধনে এর ভূমিকার পক্ষে অনড় ছিল, তাই অন্তর্বর্তী সরকার বাধ্য হয়েই বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য গণভোটের মাধ্যমে জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
গণভোটের প্রশ্নের ‘খ’ প্রস্তাবে আনুপাতিক উচ্চকক্ষের বিষয়টি সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য—যখন দলগুলো একমত হতে পারে না, তখন জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। আশার কথা ছিল, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, গণভোটের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং কয়েকটি সমাবেশে এর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এতে মনে হয়েছিল, হয়তো বিএনপি এই ইস্যুতে নমনীয় হচ্ছে এবং গণরায় মেনে নিতে প্রস্তুত।
কিন্তু সম্প্রতি বিএনপি যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, সেখানে উচ্চকক্ষ গঠনের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তা শুধু হতাশাজনকই নয়; বরং স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। ইশতেহারে বলা হয়েছে, উচ্চকক্ষ গঠিত হবে নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার অনুপাতে, প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে নয়। এই প্রস্তাব গণভোটের ‘খ’ প্রস্তাবনার বিরুদ্ধে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের পূর্ববর্তী সমর্থনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার হুবহু অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করার প্রস্তাবটি কার্যত অর্থহীন। যদি উচ্চকক্ষের গঠন নিম্নকক্ষের মতোই হয়, তবে আলাদা একটি কক্ষ রাখার যৌক্তিকতা কোথায়? বিএনপি হয়তো বলবে, তারা বিভিন্ন পেশার বিশিষ্টজনদের এখানে আনতে চায়; কিন্তু যদি উদ্দেশ্য শুধুই বিশেষজ্ঞ বা বিশিষ্টজনদের মতামত নেওয়া হয়, তবে ক্ষমতাসীন দল চাইলেই একটি ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ গঠন করতে পারে। এর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে, আইনসভার আদলে একটি ক্ষমতাহীন ও নিম্নকক্ষের প্রতিচ্ছবিসম উচ্চকক্ষ তৈরি করার কোনো প্রয়োজন নেই।
আমাদের বুঝতে হবে, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের মূল উদ্দেশ্য কেবল ‘পণ্ডিতদের আড্ডাখানা’ তৈরি করা নয়। এর আসল উদ্দেশ্য হলো একপক্ষীয় ও স্বেচ্ছাচারী সংবিধান সংশোধন রোধ করা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে কোনো দল মাত্র ৪০ শতাংশের ঘরে ভোট পেয়েও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন বাগিয়ে নেয়।
এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়েই বিএনপি চতুর্দশ এবং আওয়ামী লীগ পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছিল, যা দেশের রাজনীতির জন্য ছিল চরম ধ্বংসাত্মক। বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি একনায়কতন্ত্রের পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
‘খেলার নিয়ম’ বা সংবিধান যেন কোনো একক দল নিজেদের সুবিধামতো পাল্টে ফেলতে না পারে, সেটিই নিশ্চিত করা জরুরি। আর এ কারণেই গণভোটে প্রস্তাবিত পিআর বা সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির উচ্চকক্ষ—যাদের সংবিধান সংশোধনে অন্তত সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন লাগবে—একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আদর্শগতভাবে এটি উচ্চকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ হওয়া উচিত ছিল, তবে অন্তত সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার শর্ত থাকাও সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের পথে বাধা হতে পারে।
জুলাই সনদে প্রস্তাবিত এই ‘হাইব্রিড সিস্টেম’, যেখানে নিম্নকক্ষ হবে প্রচলিত ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’ পদ্ধতিতে এবং উচ্চকক্ষ হবে সংখ্যানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতিতে—একটি অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ নকশা। উচ্চকক্ষের ক্ষমতা কেবল সংবিধান পরিবর্তন ও যুদ্ধ ঘোষণার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
ফলে সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম বা সাধারণ আইন প্রণয়নে কোনো অচলাবস্থা তৈরির সুযোগ নেই। এই পদ্ধতি একদিকে যেমন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে, অন্যদিকে পিআর পদ্ধতির সুফলও নিশ্চিত করবে। কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই বিএনপির এমন একটি যৌক্তিক ব্যবস্থার বিরোধিতা করা সত্যিই দুঃখজনক।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকা নির্বাচনের আগে প্রকাশ করা হবে না। এটি কি গণতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এর পরিষ্কার ইঙ্গিত হলো নিম্নকক্ষে যেসব হেভিওয়েট নেতা পরাজিত হবেন, তাঁদের ‘পেছনের দরজা’ দিয়ে সংসদে আনার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ভোটাররা কাদের প্রতিনিধি হিসেবে পাচ্ছেন, তা জানার অধিকার তাঁদের আছে। নির্বাচনের পরে নিজেদের পছন্দমতো লোক বসানোর এই পরিকল্পনা ভোটারদের সঙ্গে একধরনের প্রতারণা।
সব শেষে যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে, তা হলো বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব একদিকে গণভোটে ‘হ্যাঁ’–এর পক্ষে কথা বলছে, অন্যদিকে ইশতেহারে এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা গণভোটের একটি মৌলিক প্রস্তাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। যদি জনগণ গণভোটে পিআর পদ্ধতির উচ্চকক্ষ এবং সংবিধান সংশোধনে তার ক্ষমতার পক্ষে রায় দেয়; পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে জিতে বিএনপি তাদের ইশতেহার অনুযায়ী উল্টো পথে হাঁটে, তবে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? তখন সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এক নতুন সংঘাত সৃষ্টি হবে।
দেশ যখন স্বৈরাচার-পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের দিকে এগোতে চাইছে, তখন এমন স্ববিরোধিতা নতুন করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে। বিএনপিকে বিষয়টি গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত হবে না।
* ইসলামুল হক, পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চার, ইয়েল ইউনিভার্সিটি।
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ফাইল ছবি |
Monday, January 12, 2026
পলিটিক্যাল কদমবুসি কালচার যে কারণে ভয়ের by সারফুদ্দিন আহমেদ
জুতা আবিষ্কারের আগের আমলে খালি পায়ে বালি লাগায় হবু রাজা বিরক্ত হয়েছিলেন। পায়ে যাতে ধুলা না লাগে, সেই ব্যবস্থা করতে গবু মন্ত্রীকে কড়া হুকুম দিয়েছিলেন। গবু মন্ত্রী ‘হবুর পাদপদ্মে’ কদমবুসি করে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলেছিলেন—‘যদি না ধুলা লাগিবে তব পায়ে/ পায়ের ধুলা পাইব কী উপায়ে!’
তখন ‘শুনিয়া রাজা ভাবিল দুলি দুলি/ কহিল শেষে, “কথাটা বটে সত্য—।”’
মানে, পায়ের ধুলা মন্ত্রী-সান্ত্রি-চ্যালাব্যালারা নিয়মিত না নিলে তা যে এক পর্যায়ে রাজবশ্যতা-বিচ্যুতির মতো বড় বিড়ম্বনার ব্যাপার ঘটিয়ে দিতে পারে, সেটি রাজা ঠাওর করতে পেরেছিলেন।
হবু রাজা-গবু মন্ত্রীর যুগ অস্ত গেছে। এখন নেতার যুগ। বড় নেতা, মেজ নেতা, সেজ নেতা, রোগা নেতা, মোটা নেতা, আধা নেতা, গোটা নেতা, পাতি নেতা, সিকি নেতার যুগ। হবু রাজার পায়ে আগে ধুলা লাগত। জুতার বদৌলতে নেতাদের পায়ে এখন তা লাগে না। কিন্তু জাতে উঠতে গেলে বড় নেতার পাদপদ্মের পদরেণু আধলা থেকে সিকি নেতার লাগবেই। এ কারণে রাজনীতিতে কদমবুসি কালচার আলসারের মতো বাসা বেঁধে আছে।
সারা জীবনে একবারও মা-বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেননি—এমন লোকও রাজনীতিতে এসে নেতা থেকে শুরু করে নেতার নাতজামাইকে পর্যন্ত নতজানু হয়ে কদমবুসি করেন। কদমবুসি তাঁর কাছে সামাজিক মূলধন। চাটুকারিতা তাঁর কাছে চরিত্রের বিচ্যুতি নয়, পদোন্নতির পথ। পা ধরা যে দারুণ দরকারি, তা বহুলচর্চিত কদমবুসি কালচার তাঁকে শিখিয়ে দিয়েছে।
দিন কয়েক আগে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তাঁর দলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতা যে কায়দায় কদমবুসি করার কসরত করেছেন, তা বিস্তর বিনোদন দিয়েছে।
আরেক অনুষ্ঠানে পরপর দুজন নেতা একইভাবে তারেক রহমানকে কদমবুসি করার চেষ্টা করেন। কদমবুসির সঙ্গে বয়সের ব্যবধানের বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য হলেও এই নেতাদের সবাইকেই তারেক রহমানের সমবয়সী বলে মনে হয়েছে।
ভাইরাল ভিডিও চিত্রে উভয় জায়গায় তারেক রহমানকে বিব্রত দেখা গেছে। পদরেণুপ্রার্থীদের হাত তাঁর পায়ে পৌঁছানোর আগেই তিনি পা সরিয়ে নিয়েছেন।
ঘটনা দুটোকে ‘বাদ দেন, তেমন কিছু না’ বলে কেউ উড়িয়ে দিতেই পারেন। কিন্তু ঘটনা হলো, ভরা মজলিশে এই কিসিমের কদমবুসি কালচার যে জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্রের জন্য কী ভয়ানক ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে, তা আমরা অতীতে দেখেছি।
রাজনৈতিক কদমবুসি সংক্রামক রোগবিশেষ। এ রোগ শরীর থেকে শরীরে ছড়ায় না, ছড়ায় মন থেকে মনে। ব্যক্তিগত চর্চা দিয়ে এর শুরু। তবে খুব দ্রুত এটি সমষ্টিগত আচরণে পরিণত হয়। কারণ, মানুষ কেবল যুক্তিবাদী প্রাণী নয়, সে গভীরভাবে অনুকরণপ্রবণ।
রাজনীতিতে অনুকরণ শিক্ষার বদলে বশ্যতা শেখায়। একজন জুনিয়র নেতা যখন সিনিয়র নেতার পা ধরেন, তিনি তখন শুধু নিজে নত হন না, তিনি অন্যদের সামনে একটি নতুন মানদণ্ড তুলে ধরেন।
কোনো নেতাকে যখন ভরা মঞ্চে তাঁর নিচের সারির কোনো একজন নেতা পা ছুঁয়ে সালাম করেন, তখন সেই নিচের সারির আরও কোনো নেতা তাঁকে একই কায়দায় কদমবুসি করতে পারেন। তাঁর দেখাদেখি আরেকজন করতে পারেন।
তখন ওই সারির যে নেতার কদমবুসি কালচারে বিশ্বাস নেই, তাঁকে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। চক্ষুলজ্জায় পড়ে বা বাধ্য হয়ে তাঁকেও কদমবুসি করতে হয়।
তবে একাধিকবার সিনিয়র নেতাদের পা ছুঁয়ে সালাম করার পর তাঁর ভেতরে থাকা অস্বস্তি কেটে যায়।
এরপর নিজ এলাকার জুনিয়র নেতাদের কাছ থেকে একই কায়দার কদমবুসি তিনি আশা করতে থাকেন। তাঁদের মধ্যে কেউ তা না করলে তখন তাঁকে যথার্থ অনুগত অনুসারী মনে করাটা তাঁর জন্য কঠিন হয়।
রাজনীতিতে তখন কদমবুসি আনুগত্যের মানদণ্ড হয়ে ওঠে। অথচ এই ধরনের কদমবুসিতে সম্মান নেই, আছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
আসলে পা এবং ধামা—এই দুটোই ধরা প্রথম প্রথম অস্বস্তিকর থাকে। তারপর সহনীয় হয়। তারপর স্বাভাবিক হয়। তারপর প্রত্যাশিত হয়।
ধাপে ধাপে আত্মসম্মান ও নৈতিকতার এই ক্ষয়ই রাজনৈতিক কদমবুসিকে সংক্রামক করে তোলে।
পা ধরাটা একবার স্বাভাবিক হয়ে গেলে অস্বীকার করাটাই হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক। এভাবে পা ধরা আর আচরণ থাকে না, তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতি।
রাজনীতিতে কুদমবুসির নামে পা ধরার সংস্কৃতি বিনয় দিয়ে শুরু হয়। বিনয় এখানে বীজ, বশ্যতা তার বৃক্ষ, আর ভীরুতা তার ফল।
এখানে ধীরে ধীরে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়—যে প্রশ্ন করে, সে বেয়াদব; যে প্রতিবাদ করে, সে প্রগলভ; আর যে মাথা নুইয়ে পা ধরে, সে সংস্কৃতিমান ও ‘দলবান্ধব’। যে ধরতে চায় না, সে অচিরেই নিজেকে আবিষ্কার করে একা, অবাঞ্ছিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তার সামনে তখন দুই পথ—‘হয় পা ধরো, নয় পথ ধরো।’
যাঁর পা ধরা হয়, তাঁর অবস্থাও ধীরে ধীরে বদলায়। প্রথমে লজ্জা, পরে নির্লজ্জতা। প্রথমে সংকোচ, পরে সংগতির খোঁজ।
একসময় তিনি নিজেই ভাবতে শুরু করেন, ‘ওরা যদি আমার পা ধরে, ও ধরছে না কেন?’ এ প্রশ্নের মধ্যেই জন্ম নেয় ক্ষমতার কর্কশতা আর নেতৃত্বের লজ্জাহীনতা।
এটি হলো সেই মুহূর্ত, যেখানে রাজনীতি হয়ে ওঠে পা–কেন্দ্রিক। নীতি তখন নুয়ে পড়ে। নৈতিকতা নীরব হয়। নজরদারি নষ্ট হয়। নেতা যত উঁচুতে বসেন, প্রশ্ন তত নিচে নামে।
যে রাজনীতিতে পা ধরাটা সবচেয়ে বড় গুণ হয়ে ওঠে, সেই রাজনীতিতে পায়ে হাঁটার শক্তি সবচেয়ে কম হয়। শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায়, তা হলো পা ধরা আর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় থাকে না। তা হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। ধামা ধরাটা আর সৌজন্য থাকে না, হয়ে ওঠে শর্ত।
রাজনীতিতে তখন নীতির বদলে নতি কাজ করে। আর যে রাজনীতিতে সবাই পা ধরে, সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না। দাঁড়ানোর মানুষ না থাকলে গণতন্ত্র দাঁড়ায় না।
* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
- sarfuddin2003@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| দিন কয়েক আগে তারেক রহমানকে তাঁর দলের একাধিক নেতা যে কায়দায় কদমবুসি করার কসরত করেছেন, তা বিস্তর বিনোদন দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত |
Saturday, January 3, 2026
‘জেবু’র বেড়ে ওঠার গল্প বললেন জাইমা রহমান
‘জেবু’ পোষা সাইবেরিয়ান প্রজাতির, তাকে নিয়ে পরিবারের একটু বিশেষ নজরের কথাও তুলে ধরেন জাইমা। তিনি লিখেছেন, সন্ধ্যায় আব্বুর অনলাইন মিটিংগুলো শেষ হওয়া পর্যন্ত তার কোলে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতো, মাথায় হাত বুলানোর আদর উপভোগ করতো। আর আমার ক্ষেত্রে, জেবু যেন সব সময় আমার মনের অবস্থা বুঝে ফেলতো, তার ছোট্ট পা আর কোমল ছোঁয়া দিয়ে যেভাবে পারে সেভাবেই সঙ্গ দিতো। যারা প্রাণী পোষেন, তারা জানেন, পোষা প্রাণী নিয়ে বাসা বদলানো কতোটা কঠিন। জেবু এখন মহাদেশ পেরিয়ে একেবারে নতুন একটা দুনিয়ায় এসেছে। ওর ছোট্ট প্রাণটার জন্য এই পরিবর্তনটা অনেক বড় আর কষ্টের, যেটা আমরা পুরোপুরি বুঝতেও পারি না। পরিবারের কাছে ‘বিশেষ আদর’ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রাণিপ্রেমী জাইমা বলেন, জেবু’র মাধ্যমে আমাদের অনেকেই ধৈর্য শিখেছে, বড়-ছোট সব প্রাণীর প্রতি মমতা শিখেছে, আর ভাষা এক না হলেও একে অন্যকে ভালোবাসা আর যত্ন নেয়ার সৌন্দর্য বুঝেছে। কারণ ভালোবাসা তো প্রজাতির সীমা মানে না। আমরা ছোটবেলা থেকেই পশু-পাখির সঙ্গে বড় হয়েছি। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, যে মানুষ অন্য কোনো জীবের দায়িত্ব নেয়ার সৌভাগ্য পায়, সে নিজের সম্পর্কে অনেক বেশি কিছু শিখে ফেলে, যা সে হয়তো কল্পনাও করেনি। জেবু’র সম্পর্কে জাইমা বলেন, একটা মজার তথ্য: ও কখনো ‘মিউ মিউ’ করে না! একদমই না। আলমারিতে আটকে গেলেও না। বরং খুশি বা অবাক হলে পাখির মতো নরম করে ডাক দেয়। অনুমতি ছাড়া কোলে নিলে হালকা বিরক্তিতে গোঁ গোঁ করে। আর যেসব বিড়াল ওর পছন্দ না, তাদের দিকে কিন্তু বেশ জোরেই চিৎকার করে! দীর্ঘ ১৭ বছর পর তারেক রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান দেশে ফেরেন ২৫শে ডিসেম্বর। বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার ফ্লাইটে তারেক রহমানের পরিবারের সঙ্গে এসেছেন সেলিব্রেটি ‘জেবু’। লোমশ বিড়াল, যার ছবি এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। জেবু রাশিয়ায় উৎপত্তি হওয়া সাইবেরিয়ান প্রজাতির একটি বিড়াল। বয়স প্রায় ৭ বছর। এই জাতের বিড়াল আকারে তুলনামূলক বড়, শরীর জুড়ে ঘন ও নরম তিন স্তরের লোম থাকে। স্বভাব শান্ত হলেও এরা আত্মবিশ্বাসী এবং মানুষের আবেগ বুঝতে পারদর্শী। এ কারণেই অনেকেই সাইবেরিয়ান বিড়ালকে ‘ইমোশনাল কম্প্যানিয়ন’ হিসেবে দেখেন।

Wednesday, December 31, 2025
তারেক রহমানের ফেরা মোড় বদলের সূচনা হতে পারে
তার প্রত্যাবর্তন এমন এক মুহূর্তে ঘটেছে, যখন বছরের পর বছর দমনপীড়ন, সহিংস আন্দোলন ও বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিকীকরণের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ভিত ক্ষয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিচিত মুখ আশ্বাস জাগাতে পারে- যদিও তার সঙ্গে থাকে অমীমাংসিত অনেক বিষয়। আগের সরকার পতনের পর তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো খারিজ হয়ে গেছে। সমর্থকদের কাছে এই অব্যাহতি পাওয়া সাবেক সরকারের নিপীড়নের প্রমাণ হলেও, সমালোচকদের দৃষ্টিতে জবাবদিহির বিষয়টি সামনে এসেছে। বিপদটি এখানেই- আইনি সমাপ্তিকে যদি নৈতিক নিষ্পত্তি বলে ভুল ধরা হয়। স্বচ্ছ বিচার বিশ্লেষণ ছাড়া স্থিতির বিনিময়ে রাজনৈতিকভাবে বিস্মৃতি যদি মূল্য হিসেবে গৃহীত হয়- তবে সেই হিসাবনিকাশ অসম্পূর্ণই থেকে যায়। তবে জনতার উচ্ছ্বাসকে গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। জনতার উচ্ছ্বাস ও সমর্থন ইঙ্গিত দিতে পারে, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে নির্বাহী আধিপত্যের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প নয়।
বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কাঠামো, স্বাধীন আদালত ও রাজনৈতিক সংযমের সংস্কৃতি না থাকলে তাতে ঝুঁকি থেকেই যায়। সেই অর্থে আসন্ন নির্বাচনের গুরুত্ব কেবল আসনসংখ্যার অঙ্কে নয়- বরং এই প্রশ্নে যে, এখান থেকে কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে। পূর্বতন শাসকদল কার্যত প্রান্তিক হয়ে পড়ায় এই প্রতিযোগিতা প্রতিনিধিত্বের চেয়ে উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে রূপ নেয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তারেক রহমানের জনসমর্থননির্ভর জনপ্রিয়তা দলগত সাংগঠনিক শক্তি ও জমে থাকা বিরোধী শক্তির উন্মোচন ঘটালেও একই সঙ্গে তাতে রাজনৈতিক বিকল্পের পরিসর প্রসারিত করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পাল্টা ভারসাম্য নিয়েও আলোকপাত করে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই রূপান্তরকে তাই আবেগহীন ও সতর্ক বিবেচনায় দেখা প্রয়োজন। বাংলাদেশ কেবল প্রতিবেশীই নয়- আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত-পরিচালনা ও অর্থনৈতিক সংযোগের এক কৌশলগত অংশীদার। তাদের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে। পুনর্মিলনের বদলে বর্জনের মাধ্যমে জন্ম নেয়া কোনো সরকার দেশে প্রাথমিক বৈধতা পেলেও দীর্ঘমেয়াদে সংহতি ও বহির্বিশ্বের আস্থার পরীক্ষায় পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেবল নেতৃত্বের নয়- শেখারও পরীক্ষা। যদি বাংলাদেশের পরবর্তী অধ্যায় কেবল পুরনো রাজনৈতিক ভারসাম্যকেই নতুন প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে আনে, তবে অভিযোগ-প্রতিকারের এই চক্র ঘুরতে থাকবে। কিন্তু যদি এই মুহূর্তটি ক্ষমতার ব্যক্তিকেন্দ্রিকীকরণ নয়, প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে তারেক রহমানের এই ঘরে ফেরা পুনরাবৃত্তির পূর্বাভাস নয়, বরং এক সম্ভাব্য মোড় বদলের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

Monday, December 29, 2025
আল জাজিরার বিশ্লেষণ: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে প্রত্যাবর্তন
তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা বেড়েছে। তরুণ নেতা ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে দুটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটে। এছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপিকে আসন্ন নির্বাচনে এগিয়ে থাকা দল হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর তারেক রহমানকে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার কারণে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও জল্পনা ছিল। তবে বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও বক্তব্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান বলেন, তার আগমন একটি নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। এতে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে এবং দেশ যে স্থিতিশীলতা খুঁজছে, তার দিকে অগ্রসর হবে।
নেতৃত্বের পরীক্ষায় তারেক রহমান
খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ থাকায়, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তারেক রহমানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। যদিও নির্বাসন শেষে তার দেশে ফেরা নিয়ে বেশ কিছুদিন কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল। অধ্যাপক শাহান বলেন, এখন মূল প্রশ্ন হলোÑ তিনি কি কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারবেন? তিনি যদি চরমপন্থার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন, জনগণের উদ্বেগ বোঝেন এবং দলীয় কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হবে। অন্যথায় পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে।
জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তি
ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও উন্নয়ন গবেষণা উদ্যোগের (এইচএডিআরআই) গবেষক মুবাশশার হাসানের মতে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে যে জনউদ্দীপনা দেখা গেছে, তা কেবল বিএনপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তার প্রত্যাবর্তনে আগ্রহ দেখিয়েছে। গত ১৬ মাসের অস্থিরতার পর অনেকেই বিএনপিকে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখতে চাইছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগের পর নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগে সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে।
মামলা প্রত্যাহার ও ‘দ্বিতীয় সুযোগ’
২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে হত্যা ও দুর্নীতিসহ একাধিক মামলা হয়। সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে মামলা ও পরবর্তীতে অনুপস্থিতিতে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গত দেড় বছরে এসব মামলা প্রত্যাহার ও দণ্ডাদেশ স্থগিত করা হয়, যা তার দেশে ফেরার পথ খুলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক শাফকাত রাব্বি বলেন, তারেক রহমান নীতিনির্ধারণে আগ্রহী রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। আজকের ভাষণেও তিনি বারবার বলেছেন- তার একটি পরিকল্পনা আছে।
ভারত নীতি ও আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি
তারেক রহমানের পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক। ঐতিহাসিকভাবে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শীতল ছিল এবং দিল্লি আওয়ামী লীগকেই বেশি পছন্দ করত। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটও এই সম্পর্ক জটিল করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে এবং নিজেকে একটি মধ্যপন্থী দল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। যদিও তারেক রহমান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশ ফার্স্ট) স্লোগান ব্যবহার করছেন। বিশ্লেষকদের মতে তিনি কট্টর ভারতবিরোধী রাজনীতিক হবেন না। রাব্বির ভাষায়, তারেক রহমান ফিরে আসায় ভারতের কাছে একজন আভিজ্ঞ ও বিবেচক ব্যক্তি পাওয়া যাবে, যিনি বাস্তবসম্মতভাবে সম্পর্ক সামলাতে পারবেন।
নির্বাচনের পথে প্রভাব
সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচনে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের উপস্থিতি বিএনপির জন্য বাড়তি সুবিধা আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অধ্যাপক শাহান বলেন, তার উপস্থিতি দলীয় কর্মীদের উজ্জীবিত করবে এবং সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের বিএনপির দিকে টানবে। তিনি ভালোভাবে পারফর্ম করলে বিএনপির জন্য বড় জয় আসবে। এমনকি ‘ওয়েভ ইলেকশন’ও হতে পারে। তবে এর জন্য তারেক রহমানকে জনগণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, আশ্বাস দেওয়া এবং সংস্কার ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি স্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরতে হবে বলেই মত বিশ্লেষকদের।

Tuesday, December 2, 2025
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও তারেকের ফেরা নিয়ে বিতর্ক by জাহেদ উর রহমান
শেখ হাসিনার পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করা রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিতর্কে নেমেছে। বর্তমান পটভূমিতে সবাই চায় তার রাজনৈতিক বয়ান যতটা সম্ভব প্রতিষ্ঠিত করতে। দীর্ঘদিন একটা স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের অধীন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা–কর্মীদের মধ্যেও একধরনের স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা দেখা গেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক বিতর্ক গণতান্ত্রিক পরিবেশের সীমা ছাড়িয়ে রীতিমতো কলহে রূপ নিয়েছে। একে অপরের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো আচরণ না করে ক্ষেত্রবিশেষে শত্রুর মতো আচরণ করছে।
কিন্তু এমন রাজনৈতিক পটভূমিতেও প্রতিটি রাজনৈতিক দল বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তাদের সম্মান দ্ব্যর্থহীনভাবে দেখিয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হওয়ার পরও এমন জাতীয় অভিভাবকত্বের জায়গা অর্জন করতে পারা বাংলাদেশের মতো দেশে এক অভাবনীয় ঘটনা। সেটি হওয়ারই কথা।
শেখ হাসিনার প্রতিষ্ঠিত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর লড়াই করেছে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন দলটি। এর মাশুল দলের অসংখ্য নেতা–কর্মীর মতো দিয়েছেন খালেদা জিয়া স্বয়ং। অত্যন্ত খারাপ শারীরিক অবস্থায়ও দীর্ঘদিন তিনি অন্যায়ভাবে জেলে আটক ছিলেন। যে অসুস্থতার কারণে তিনি আজ মৃত্যুর মুখোমুখি, সেটি বেড়ে যাওয়ার পেছনে হাসিনা সরকারের ষড়যন্ত্র ক্রিয়াশীল ছিল—এ অভিযোগও আছে।
অথচ সরকারের সঙ্গে কিছু সমঝোতা মেনে নিলে অনেক আগেই বিদেশে গিয়ে সুচিকিৎসা নিয়ে জীবিত একমাত্র সন্তানের সঙ্গে বাকি জীবন সুন্দরভাবে কাটাতে পারতেন। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে ভয়ংকর মাশুল দিয়েছেন তিনি, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর এ আপসহীনতা এখন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছে।
বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার পটভূমিতে আলোচনায় এসেছে তাঁর বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান তারেক রহমান কেন দেশে ফিরছেন না। একটি রাষ্ট্রে, সমাজে ঘটে চলা প্রতিটি বিষয়ই রাজনৈতিক। আর সেটি যদি হয় দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যে দলটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে আগামী নির্বাচনে বিজয় লাভ করবে বলেই ধারণা করা হয়, সেই দলটির প্রধান নেতৃত্বের অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে তাঁর সন্তানের ফিরে আসা নিয়ে প্রশ্ন ঘিরে, রাজনীতি হওয়াটা স্বাভাবিক।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে অনেকের বক্তব্য ‘হেইট স্পিচের’ (ঘৃণা সৃষ্টিকারী বক্তব্য) পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য অনিবার্যভাবেই ক্ষতিকর হবে।
কেন তারেক রহমান দেশে আসছেন না? কবে তিনি দেশে আসবেন?— চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে প্রশ্নগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ক্রমাগত আলোচিত হয়েছে। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে মানুষ এটা ধারণা করেছিল, দীর্ঘকাল দেশের বাইরে থাকা মানুষটির জন্য এবার অনুকূল সময়ে এসেছে, তাই তিনি দেশে এসে দলের হাল ধরবেন। তাই তারেক রহমান দেশে ফেরা নিয়ে মানুষের কৌতূহল খুব স্বাভাবিক।
কিন্তু মায়ের সাংঘাতিক অসুস্থতার সময়েও দেশে ফিরে না আসাকে কেন্দ্র করে রীতিমতো তারেক রহমানের মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও কর্তব্যপরায়ণতাকেই প্রশ্ন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি নিয়ে এতটাই হইচই তৈরি হয়েছে যে এ মুহুর্তে নিজের দেশে না ফেরার কারণ নিয়ে তারেক রহমানকে কিছু কথা বলতে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন,“...কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়ামাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।”
এর আগে তারেক রহমান নানা সময়ে ‘দ্রুতই দেশে ফিরবেন’ ধরনের বক্তব্য দিলেও এই প্রথম কিছুটা স্পষ্ট করলেন, তিনি কেন দেশে ফিরে আসছেন না। বলা বাহুল্য তাঁর এ বক্তব্যেও বেশ অস্পষ্টতা আছে এবং এটি আরও নতুন কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে। মানুষ খোঁজার চেষ্টা করছে, ‘অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’ এমন একটা সিদ্ধান্তের পেছনে আসলে কে আছে।
প্রশ্ন এসেছে, তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ‘অপর নিয়ন্ত্রক’ কারা? তারা কি দেশি, নাকি বিদেশি? যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এর মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের ফেরার পথে কোনো বাধা নেই। তাহলে এ ক্ষেত্রে কি বিদেশি কোনো শক্তি ক্রিয়াশীল, যারা তাকে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে কোনো দর–কষাকষি করছে?
নির্বাচন সামনে রেখে দেশে ফেরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিশ্চয়ই আছে তারেক রহমানের। তাঁর দেশে না ফেরা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন তাঁকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, এটিও তাঁর না বোঝার কারণ নেই। এসব বিতর্ক–সমালোচনার পরও তাঁর ফিরে না আসা প্রমাণ করে, সমস্যা সমাধান করা ছাড়া তাঁর ফেরাটা বিপজ্জনক হতে পারে।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রশ্নে তাঁর নিরাপত্তার ইস্যু দীর্ঘদিন থেকে আলোচিত হচ্ছে। এটা সত্যি, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো নয়। তিনি দেশে ফিরলে একটি দলের প্রধান হিসেবে যে নিরাপত্তা পাবেন, সরকারের পক্ষ থেকে সেটি কি যথেষ্ট হবে? দেশে ও দেশের বাইরে অনেকেই আছে, যারা তাঁর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে নিরাপত্তাঝুঁকি থাকবেই। এ দেশে রাজনীতি করতে হলে এ ঝুঁকি মাথায় নিয়েই করতে হবে। এই সরলীকরণের বাইরে গিয়ে আমরা এটা বলতে পারি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠার বিপরীতে একটা মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সেই দলের প্রধান যদি এমন কোনো পরিস্থিতিতে বড় নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েন, সেটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনার ওপরে বড় আঘাত তৈরি করবে। এমনকি বাংলাদেশ খুবই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রবেশ করবে—এ শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তাই এমন শঙ্কা যদি সত্যিই থেকে থাকে, সেটি বিবেচনায় নেওয়া ভুল হবে না।
দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রশ্নে বিএনপি যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেখানে খালেদা জিয়ার বড় গুরুত্ব আছে শুধু দলের প্রধান হিসেবেই নয়, দলের ঊর্ধ্বে উঠেও। আমাদের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে (নির্বাচনের আগে কিংবা পরে) যদি কোথাও কোনো শঙ্কা তৈরি হয়, কোথাও যদি সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা শক্তির অন্যান্য ভরকেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রে জাতির অভিভাবকে পরিণত হওয়া খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন; সমঝোতার জন্য মধ্যস্থতা করতে পারবেন।
রাজনৈতিক জীবনে কিংবা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার ছোট-বড় ভুল আছে। কিন্তু শেষ বিচারে তিনি আমাদের গণতন্ত্রের লড়াইয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর আরও বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকা এই জাতি এবং রাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি। আমি নিশ্চিত, এই জাতির প্রার্থনা তাঁর সঙ্গে আছে।
* জাহেদ উর রহমান, শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদায় জানান বড় ছেলে তারেক রহমান। লন্ডন, ৫ মে। ছবি: বিএনপির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া |
Saturday, June 14, 2025
লন্ডনে ইউনূস-তারেকের আলোচনায় বিএনপিরই কি জিত by সোহরাব হাসান
বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল চলতি বছরের ডিসেম্বের মধ্যে নির্বাচন করার দাবি জানিয়ে আসছিল। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বশেষ বৈঠকেও দু–একটি ছাড়া সবাই ডিসেম্বর–জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছিল।
কিন্তু ঈদুল আজহার আগে প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বললেন, এপ্রিলের প্রথমার্ধের যেকোনো দিন নির্বাচন হবে।
নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে উপদেষ্টাদের মধ্যেও বিভক্তি ছিল বলে জানা যায়। এক পক্ষ চাইছিল ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন করাই শ্রেয় হবে। অন্য পক্ষের অভিমত ছিল, রাজনৈতিক দলের দাবি যা–ই হোক না কেন, এপ্রিলের আগে নির্বাচন করা ঠিক হবে না। সে সময়ে প্রধান উপদেষ্টা দ্বিতীয় পক্ষের কথা মেনে নিলেন।
কিন্তু সেই ঘোষণা সমস্যার সমাধান না করে আরও জটিল করে তুলল। বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। রাজনৈতিক অঙ্গনে ডিসেম্বর–এপ্রিলের দ্বৈরথ চলতে থাকে। এ অবস্থায় সরকার একটি সম্মানজনক আপসরফা চেয়েছিল, যার প্রতিফলন ঘটল লন্ডন বৈঠকে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এপ্রিলের ঘোষণায় যারা সম্মতি জানিয়েছিল, তারা কি ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে একমত হবেন কী না?
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে আগামী বছরের রমজানের আগে নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তাব করেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও মনে করেন, ওই সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভালো হয়।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন যে তিনি আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালের রমজান শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে।’
বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার আগ্রহেই এই বৈঠক হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। খালেদা জিয়া বলেছেন, তারেক রহমানই এখন দল চালাচ্ছেন, রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বললেই ভালো হয়।
বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকার—উভয়ের শুভানুধ্যায়ীরাও চেয়েছিলেন বৈঠকটি হোক। বৈঠকের আগের দিন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিক, তিনি যেকোনো সময় বাংলাদেশে আসতে পারেন। গত ১০ মাসে তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে কোনো উপদেস্টা প্রকাশ্যে কিছু বলেননি।
সবচেয়ে ভালো হতো যদি লন্ডন বৈঠক ছাড়াই জট খোলা যেত। কিন্তু সেটা যায়নি। বাংলাদেশে স্বাভাবিক ও সহজ পথে কিছু হয় না। অনেকেই প্রশ্ন করবেন, যে সিদ্ধান্তের জন্য সরকারপ্রধানকে লন্ডন যেতে হলো, সেই সিদ্ধান্ত ঢাকায় নেওয়া গেল না কেন? যৌক্তিক প্রশ্ন।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের ডরচেস্টার হোটেলে শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৯টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা দুইটা) বৈঠকটি শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে তিনটা) বৈঠক শেষ হয়। বৈঠক শেষে তারেক রহমান ডরচেস্টার হোটেল ত্যাগ করেন।
বৈঠকের শুরুতে প্রধান উপদেষ্টাই কথা শুরু করলেন আবহাওয়ার সুসংবাদ দিয়ে। তিনি বললেন, ‘আজ আবহাওয়াটা খুব ভালো।’ তারেক রহমান তাঁকে সমর্থন করলেন।
তাঁদের কথোপকথন ছিল অনেকটা এ রকম:
ইউনূস: খুব ভালো লাগছে।
তারেক: আমারও ভীষণ ভালো লাগছে। আই ফিল অনার্ড।
ইউনূস: আসেন। চলুন বসি।
তারেক: আপনার শরীর কেমন? ভালো আছেন?
ইউনূস: এই যাচ্ছে। টেনে টেনে যাচ্ছে।
তারেক: আম্মা সালাম জানিয়েছেন আপনাকে।
ইউনূস: অসংখ্য ধন্যবাদ। ওয়ালাইকুমুস সালাম। ওনাকেও আমার সালাম দেবেন।
নির্বাচনের বিষয়ে বিএনপির সঙ্গে মতৈক্যের বিষয়টিই সরকার তথা প্রধান উপদেষ্টার বড় সাফল্য বলে মনে করি।
তবে এ ধরনের বৈঠক হয় সাধারণত দুটি পক্ষের মধ্যে। এখানে তো অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো পক্ষ হওয়ার কথা ছিল না। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব দল ও সংগঠনের সম্মতি ও সমর্থন নিয়েই মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছিল। কিন্তু তারা সব সময় নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছে বলে মনে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে চাপের মুখে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাহলে এবারও কি বিএনপির চাপের কাছে সরকার নতিস্বীকার করল কি না সেই প্রশ্নও উঠবে।
সরকারের তিনটি অঙ্গীকার ছিল। সংস্কার, জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ের হত্যার বিচার ও নির্বাচন। সরকারের গঠন করা সংস্কার কমিশনগুলো ইতিমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আর সব কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব বা সুপারিশ বাস্তবায়নের সঙ্গে সংবিধান বা নির্বাচনেরও সম্পর্ক নেই। সরকার নির্বাহী আদেশে অনেক সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে পারে। কিন্তু দু–একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সরকার কোনোটিতে হাত দেয়নি।
বিচারপ্রক্রিয়াও এগিয়ে চলেছে বলে সরকারের উপদেষ্টারা জানিয়েছেন। এই বিচার নিয়েও কেউ আপত্তি করেননি। তবে বিচারটি কবে শেষ হবে, সেটা নির্ভর করে আদালতের ওপর। এখানে সরকার বলে দিতে পারে না, অমুক তারিখে অমুক মামলার কাজ শেষ করতে হবে।
তৃতীয়টি হলো নির্বাচন। নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রে উত্তরণের কোনো বিকল্প উপায় আছে বলে আমাদের জানা নেই। নির্বাচন দুই মাস পর হলে সব সংস্কার বা বিচারকাজ শেষ হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এপ্রিলে নির্বাচন করার সমস্যাগুলো প্রায় সব দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সরকারপ্রধান ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের যৌথ বিবৃতির পর নির্বাচনের দিণক্ষণসংক্রান্ত সমস্যা হয়তো কেটে যাবে। কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশটি তৈরি করা সহজ হবে না। সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে, কোথাও সংঘাত সংঘর্ষ হলে সেনা সদস্যদেরই হস্তক্ষেপ করতে হয়।
বৃহস্পতিবার যে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায় পাতাবুনিয়া বটতলা বাজারে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হককে অবরুদ্ধ হন, তাঁকে উদ্ধার করতে আসেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। বকুলবাড়ীয়া ইউনিয়নের পাতাবুনিয়া এলাকায় আয়োজিত এক স্মরণসভায় অংশ নিয়ে ফেরার পথে অবরুদ্ধ হন নুরুল হক। এ সময় পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনের অনুসারীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাঁর পথ রোধ করেন, দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করেন।
এ বিষয়ে বিএনপি নেতা হাসান মামুন প্রথম আলোকে বলেন, নুরুল হক নূর এলাকায় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ উসকানিমূলক বক্তব্য দিলেই তাঁকে মারধর কিংবা অবরুদ্ধ করতে হবে, এটা কোন আইনে লেখা আছে। তাঁরা কেন আইন নিজের হাতে তুলে নিলেন?
বিএনপি বেশ কয়েকটি আসনে মিত্র দলের নেতাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য স্থানীয় নেতাদের কাছে চিঠি দিয়েছিল। অন্যান্য আসনেও কমবেশি একই রকম সমস্যা আছে।
নির্বাচনের দিনতারিখ ঠিক হওয়ার পর বল পুরোপুরি রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে চলে যাবে। তখনো যদি তারা জবরদস্তি পরিহার করতে না পারে, তাহলে ইতিহাসের সেরা নির্বাচন দূরের কথা, মোটামুটি সুষ্ঠু নির্বাচন করাও দুরূহ হবে।
* সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠক। শুক্রবার লন্ডনে। ছবি: প্রেস উইংয়ের কাছ থেকে পাওয়া |
রমজানের আগে নির্বাচনের প্রস্তাব তারেক রহমানের, প্রধান উপদেষ্টা বললেন, প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে করা যেতে পারে, বৈঠকে দু’পক্ষই সন্তুষ্ট
গতকাল লন্ডন সময় সকাল নয়টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা দুইটা) স্থানীয় ডোরচেস্টার হোটেলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের প্রায় পুরোটাই ছিল দুই নেতার একান্ত আলোচনা। শুরুতে কুশল বিনিময়ের সময় দুইপক্ষের কয়েকজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৈঠক স্থলে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দরজায় এসে তাকে অভ্যর্থনা জানান। এরপর হাসিমুখে তারা দুইজন কুশলবিনিময় করেন। তারেক রহমান দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টাকে সালাম পৌঁছে দেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টাও বেগম খালেদা জিয়ার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টাকে উপহার হিসেবে কলম এবং দু’টি বই তুলে দেন। শুভেচ্ছাবিনিময়ের পর দুই নেতা একান্তে বৈঠকে বসেন। বৈঠক শেষে দুইপক্ষের যৌথ বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়। এই বিবৃতিতে রমজানের আগে নির্বাচন আয়োজনে তারেক রহমানের প্রস্তাব এবং প্রধান উপদেষ্টার সম্মতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
একান্ত বৈঠকের আগে তারেক রহমানের সঙ্গে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ও প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আলোচনায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। দেশের প্রয়োজনে তাকে আরও কাজ করতে হবে।
গতকাল হওয়া ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের মধ্যকার বৈঠকটিতে দৃষ্টি ছিল পুরো দেশের। বৈঠকটি ইতিবাচকভাবে সম্পন্ন হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে উভয়পক্ষ। সাধারণ মানুষও বৈঠকটি নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন।
বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আগামী বছরের রমজানের আগে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রস্তাব করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জবাবে প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে এই সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন লন্ডনে সফররত প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অত্যন্ত সৌহার্দ্যমূলক পরিবেশে তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার কাছে আগামী বছরের রমজানের আগে নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তাব করেন। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও মনে করেন, ওই সময় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ভালো হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন যে, তিনি আগামী বছরের এপ্রিলের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছেন। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালের রমজান শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহেও নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সেই সময়ের মধ্যে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টার এই অবস্থানকে স্বাগত জানান এবং দলের পক্ষ থেকে তাকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। প্রধান উপদেষ্টাও তারেক রহমানকে ফলপ্রসূ আলোচনার জন্য ধন্যবাদ জানান।
যৌথ বিবৃতি পড়ে শোনার পর সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জুলাই সনদ নিয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে অলরেডি আলোচনা চলছে দেশে। এ ব্যাপারে আমাদের মধ্যে অলরেডি সিদ্ধান্ত আছে যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা হোক। সংস্কার নিয়েও একই জবাব আমাকে দিতে হবে।
তিনি বলেন, ঐকমত্য যেখানে হবে, স্বাভাবিকভাবে ঐকমত্যের পরিপ্রেক্ষিতে যে সিদ্ধান্ত হবে, স্বাক্ষরিত তো হবেই, না হওয়ার কোনো কারণ তো নেই।
সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, নির্বাচনের একটি সঠিক তারিখ নির্ধারণে আসলে সমস্যাটা কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর দেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এর কোনো সমস্যাই নেই। আমরা কোনো সমস্যা দেখছি না, কেউ দেখলে পরে এটা ভুল দেখছেন। নির্বাচন সম্পর্কে আজকে যৌথ বিবৃতিতে আমরা বলে দিয়েছি দুই পক্ষই এবং আমরা আশা করবো, নির্বাচন কমিশন শিগগিরই একটা তারিখ ঘোষণা করবে।
বৈঠকে কি শুধু নির্বাচন নিয়েই কথা হয়েছে, নাকি দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয় নিয়েও কথা হয়েছে একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে বিএনপি নেতা আমীর খসরু বলেন, ‘সব বিষয়ে আলোচনা তো হবে, স্বাভাবিক। আমরা তো নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে সামনের দিকে এগোচ্ছি। সবাই আমরা চাই, দেশ গড়ার যে প্রত্যয় আমরা নিয়েছি, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে সেই কাজটা করবো। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় নিয়ে আমরা সবাই ঐকমত্যে এসেছি, শুধু নির্বাচনের আগে নয়, নির্বাচনের পরও সেটা আমরা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবো।
তারেক রহমানের দেশে ফেরা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ ব্যাপারে আলোচনার কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমরা মনে করি না। তারেক রহমান সাহেব যখনই ইচ্ছা দেশে ফিরে যেতে পারবেন। সুতরাং এটার সিদ্ধান্ত তিনি নেবেন, সময়মতো।
নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপি নির্বাচন কমিশনের সংস্কার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা? এমন এক প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ বলেন, এ ব্যাপারে এখানে আলোচনার কোনো সুযোগ আছে বলে আমি মনে করি না। এ প্রশ্নে নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, এটা তাদেরকে (এনসিপি) জিজ্ঞেস করুন। প্রত্যেকটি দলের নিজস্ব মতামত আছে। তবে আমরা সবাইকে নিয়ে নির্বাচনটা করতে চাচ্ছি।
আরেকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, তাহলে কি আমরা বলতে পারি যে এপ্রিলে ঘোষিত যে নির্বাচনের রূপরেখা, সেখান থেকে সরকার কিছুটা সরে আসতে চাচ্ছে বা আসবে? এর উত্তরে নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, যৌথ ঘোষণায় এই বিষয়টি সুস্পষ্টই বলা আছে। আপনারা শুনেছেন। যদি সব কাজ সময়মতো আমরা করতে পারি এবং বিচার ও সংস্কারের ব্যাপারে পর্যাপ্ত অগ্রগতি হয়, তাহলে নিশ্চয়ই সেটা করা যেতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে শেষ প্রশ্ন ছিল, ‘আপনারা কি সন্তুষ্ট?’ এ প্রশ্নের উত্তরে একইসঙ্গে খলিলুর রহমান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট।’ আমীর খসরু বলেন, আমরা তো বলছি নির্বাচনের আগে নয়, নির্বাচনের পরও নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ওদিকে বৈঠক ঘিরে প্রধান উপদেষ্টার আবাসস্থল হোটেল ডোরচেস্টারের সামনে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। তাদের হাতে বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন দেখা গেছে। তারেক রহমান হোটেলে পৌঁছালে নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগত জানিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেন। বের হয়ে যাওয়ার সময় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় তারেক রহমান হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানান।

Saturday, May 3, 2025
১৭ বছর পর শাশুড়ির সঙ্গে দেশে ফিরছেন জুবাইদা রহমান by সাইদুল ইসলাম
৪ মে রোববার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশের উদ্দেশে যাত্রা করবেন খালেদা জিয়া ও তাঁর সফরসঙ্গীরা। খালেদা জিয়াকে বহনকারী উড়োজাহাজটি পরদিন ৫ মে সোমবার সকালে ঢাকায় পৌঁছাবে। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৮ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে আসেন খালেদা জিয়া। টানা ১৭ দিন দ্য লন্ডন ক্লিনিকে চিকিৎসা শেষে ২৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে বড় ছেলে তারেক রহমানের বাসায় থেকে চিকিৎসা নেন। চার মাসের চিকিৎসা শেষে ৫ মে সোমবার দেশে পৌঁছাবেন তিনি।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান, তাঁর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান ও জুবাইদা রহমানের মা ইকবাল মান্দ বানুর বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় একটি মামলা করে দুদক। এই মামলায় জুবাইদা রহমানকে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ৩৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন ঢাকার একটি আদালত। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতের ওই সাজা স্থগিত হয়।
জুবাইদা রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে মেডিসিনে এমএসসি করেন। তিনি চিকিৎসকদের সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ১৯৯৫ সালে চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ২০০৮ সালে শিক্ষা ছুটি নিয়ে লন্ডনে যাওয়ার পর দ্বিতীয় মেয়াদে ছুটি বাড়ানোর পরেও ফেরত এসে চাকরিতে যোগ না দেওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
জুবাইদা রহমানের জন্ম বাংলাদেশের সিলেট জেলায়। তিনি প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলীর মেয়ে। মাহবুব আলী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের সময়েও তিনি যোগাযোগ ও কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী জুবাইদা রহমানের চাচা।
১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের সঙ্গে জুবাইদা রহমানের বিয়ে হয়। ১৯৯৫ সালে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন তিনি। ২০০৮ সালে শিক্ষা ছুটি নিয়ে তিনি স্বামী তারেক রহমানের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে আসেন।
![]() |
| চার মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরবেন খালেদা জিয়া। লন্ডনে পৌঁছানোর পরের ছবি। ফাইল ছবি: বাসস |
Saturday, April 26, 2025
‘দ্য উইক’-এ কাভার স্টোরি ‘ডেসটিনি’স চাইল্ড’ তারেকের ফেরার অপেক্ষায়
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫৭ বছর বয়সী তারেক রহমান এখন তার মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। কারণ বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছে। সাপ্তাহিক নিউজ ম্যাগাজিন ‘দ্য উইক’-এর চলতি সংখ্যার কাভার স্টোরি ‘ডেসটিনি’স চাইল্ড’-এর বাংলা অনুবাদ পাঠকের উদ্দেশ্যে নিচে তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশে পরিবর্তন তারেক রহমানকে একটি সুযোগ এনে দিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হতে পারে তারেক রহমানের জন্য। যিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন। সমর্থকদের কাছে ‘তারেক জিয়া’ নামে পরিচিত। তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র। মুক্তিযোদ্ধা ও সেনা জেনারেল জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮১ সালে বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের হাতে নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পতনের দিকে নিয়ে যায়।
৫৭ বছর বয়সী তারেক রহমান এখন তার মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন। কারণ বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছে। আওয়ামী লীগ সরকারকে সরিয়ে দেয়ার পর বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ঢাকায় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। তিনি বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন।
তারেক রহমানের জন্য, যিনি ভার্চ্যুয়ালি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন, ঢাকায় নামার পর তার জীবনে পূর্ণ চক্র সম্পূর্ণ হবে। খালেদা জিয়া আশা করছেন, তারেকই আসন্ন নির্বাচনে দলের মুখ হিসেবে আবির্ভূত হবেন।
“তারেক রহমান ইতিমধ্যে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করেছেন,” বলেন তার উপদেষ্টা মাহদী আমিন। “চাকরি, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষক, শ্রমিক বা শ্রমজীবী যেই হোক না কেন, আমরা তাদের সমান সুযোগ, ন্যায্য মজুরি এবং দুর্নীতিমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দিতে চাই,” বলেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা এবং তারেকের উপদেষ্টা ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি জানান, “আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক ও উন্নয়নকেন্দ্রিক রাজনীতি গড়ে তুলতে তারেকের দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন করতে চাই।”
সব নজর এখন থাকবে এদিকে যে, কতোটা দক্ষতার সঙ্গে তারেক বাংলাদেশের নেতৃত্ব নিতে সক্ষম হবেন যখন তিনি ঢাকায় নামবেন। “তিনি নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, এবং সামরিক-প্রশাসনিক কর্তৃত্ব তার কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকার নিয়েছিল যে, তিনি ভবিষ্যতে আর রাজনীতিতে জড়াবেন না। এটি ছিল তার রাজনৈতিক অধিকারের লঙ্ঘন,” বলেন জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী।
১৬ বছরের নির্বাসনকালে তারেক রহমান ব্যক্তিগত ক্ষতির সম্মুখীন হন (তিনি তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে হারান) এবং বহু আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। তবুও, তিনি বিএনপিতে প্রভাবশালী থেকে যান এবং দলকে একত্রিত রাখেন। “আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক দল ভাঙার চেষ্টার বিপরীতে তারেক এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন” বলেন আসিফ আলী।
২০০৯ সালে দলের পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ২০১৬ সালে পুনঃনির্বাচিত হন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার মায়ের কারাবরণের পর থেকে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। “তারেক বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে রয়েছেন, কারণ তার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে,” বলেন আলী।
তারেক ১৯৮৮ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণ করেন, কিন্তু পরে খুব একটা সক্রিয় ছিলেন না, যদিও বিএনপি সরকার গঠন করে। তিনি ২০০১ সালের নির্বাচনী প্রচারে পুনরায় সক্রিয় হন এবং বিএনপি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। এই সময়ে তিনি দলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব অর্জন করেন। তবে, মায়ের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ এবং সরকারে কোনো আনুষ্ঠানিক পদে না থেকেও ক্ষমতা প্রয়োগের অভিযোগ আনা হয়।
২০০৭ সালে, ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় এবং তারেক তার মায়ের সঙ্গে বন্দি হন। দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনকালে, অনেক শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়। তারেক ২০০৮ সালের নির্বাচন পূর্বে মুক্তি পান এবং চিকিৎসার জন্য প্যারোলে লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি পান।
বাংলাদেশে পরিবর্তন তারেকের জন্য একটি সুযোগ, যাতে তিনি তার পূর্বসূরিদের ধারা ভেঙে নিজস্ব একটি উত্তরাধিকার তৈরি করতে পারেন। প্রশ্ন হলো, তিনি কেমন নেতা হবেন?
(ভাষান্তর: কাউসার মুমিন, যুক্তরাষ্ট্র)

Wednesday, March 26, 2025
গণতন্ত্রবিনাশী শক্তির চক্রান্ত এখনো থেমে নেই
তিনি আরও বলেন, মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে চক্রান্তমূলকভাবে হত্যার পরে গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফল ও সার্থক নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ধারা সূচিত হলেও গণতন্ত্রের শত্রুদের কারণে স্থায়ী ও মজবুত গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার হীন লক্ষ্যে পলাতক অবৈধ সরকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলেছে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে আজও তাই এদেশের মানুষ স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারেনি।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর এখন সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তি এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথচলা নিশ্চিত করা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে সংহত করা। এটিই হচ্ছে স্বাধীনতার মূল চেতনা। আজকের এই মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমি আহ্বান জানাচ্ছি, জাতির সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ’৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বহুমত ও পথের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমুন্নত রাখার জন্য। আমি দেশবাসী সকলের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা জানাই।
তিনি আরও বলেন, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে নবীন সূর্যোদয়ের মধ্যদিয়ে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। হাজার বছরের সংগ্রামমুখর এ জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আজকের এই দিনে আমি দেশবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এই স্বাধীনতা দিবসে আনন্দোজ্জ্বল মুহূর্তের মধ্যে প্রথমেই যে কথা মনে পড়ে, তাহলো এ দেশের অগণিত দেশপ্রেমিক শহীদের আত্মদান, আমি এ মহান দিনে তাদের গভীর শ্রদ্ধা জানাই। যাদের অবিস্মরণীয় আত্মদানে অর্জিত হয়েছে দেশমাতৃকার মুক্তি।
তারেক রহমান বলেন, মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমসহ সকল জাতীয় নেতার স্মৃতির প্রতি আমি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। যাদের জীবন-মরণ লড়াইয়ে ৯ মাসে আমরা বিজয় লাভ করেছি, সেইসব অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা জাতি কখনোই বিস্মৃত হবে না। আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি, সেসব মা-বোনদের কথা, যারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। স্বাধিকার আর স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রক্তস্নাত পথে বিশ্ব মানচিত্রে উদ্ভাসিত হয় আমাদের মানচিত্র। এ দিনে দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তার ঐতিহাসিক ঘোষণায় সেই মুহূর্তে দিশাহারা জাতি পেয়েছিল মুক্তিযদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভয়মন্ত্র।
অপর এক বাণীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আমি দেশবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। তাদের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের মানুষ ঔপনিবেশিক স্বৈরশাসনের গ্লানি থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল। লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে রাঙ্গানো আমাদের স্বাধীনতা। আজকের এই মহান দিবসে আমি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে-যার ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে গোটা জাতি মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, এদেশের জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা দিবস সবচাইতে গৌরবময় ও পবিত্রতম দিন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে রক্তস্নাত স্বাধীনতা বিশ্বের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন। কোনো জাতিকেই জন্মভূমির জন্য এমনভাবে আত্মত্যাগ করতে হয়নি। তবে ১৯৭১ সালে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল-তা আজও পূরণ হয়নি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য আজও দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

Sunday, March 9, 2025
আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ তিন মানুষ-মা স্ত্রী ও কন্যা -তারেক রহমান
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লিখেছেন, বাংলাদেশের তরুণী এবং নারীরা চারপাশের মানুষের মাধ্যমে ক্ষমতায়িত এবং সমর্থন পাওয়ার অধিকার রাখেন। প্রতিটি নারীরই যেকোনো পুরুষের মতো একই মর্যাদা, সুরক্ষা এবং সুযোগ উপভোগ করা উচিত। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আমি আবারো নিশ্চিত করছি যে, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের মতো আমরা একটি ন্যায়সঙ্গত, সহনশীল এবং সম্মানজনক সমাজ তৈরির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করবো। যেখানে লিঙ্গ, বর্ণ বা ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য থাকবে না।
নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান লিখেছেন, আমাদের মেয়েদেরও আমাদের ছেলেদের মতো সমান সুযোগ থাকা উচিত। তাদেরকে ঘর ছেড়ে বাইরে আসতে হবে, তারা যেন কোনো হয়রানি ছাড়াই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে এবং কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারে।
তারেক রহমান তার পোস্টে লিখেছেন, একটি নিরাপদ এবং সুরক্ষিত সমাজে নারীর সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেয়ার মধ্যেই বিএনপি’র নীতি প্রণয়ন গভীরভাবে প্রোথিত। আমাদের ‘পরিবার কার্ড’ কর্মসূচি, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এসএমই ঋণ, তরুণীদের শিক্ষিত করার জন্য শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক প্রকল্পের মতো উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আসুন, আমরা একসঙ্গে চ্যাম্পিয়ন নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাই।
এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর তৎকালীন সরকারের নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে সুচিকিৎসার জন্য লন্ডন যান তারেক রহমান, সঙ্গে স্ত্রী জুবাইদা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমান।
দীর্ঘ দেড় যুগের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের নির্যাতনের শিকার হন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও। সরকারের নির্যাতন চিকিৎসা না পেয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন বিএনপি চেয়ারপারসন। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনিও লন্ডনে যান এবং বর্তমানে ছেলের বাসায় আছেন।

BNM Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1536)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...









