Sunday, September 1, 2013

সিরিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদন

সিরিয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর সে দেশের শাসকগোষ্ঠী রাসায়নিক অস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুধু তা-ই নয়। দামেস্কের বেসামরিক লোকজনের ওপর ব্যবহার করা হয়েছে স্নায়ু অস্ত্রও।

একুশ বছর পর .... by সাজেদা সুইটি

প্রায় ২১ বছর পর আসছেন তিনি। তাকে স্বাগত জানাতে ২০ কিলোমিটার জুড়ে পাঁচ হাজার তোরণ হচ্ছে ‘ঢাকা টু নরসিংদী’ মহাসড়কে। চারপাশ ছেয়ে যাচ্ছে স্বাগতম বার্তাবাহী নানা আকারের ব্যানারে।

যুদ্ধের দামামা, আসাদের স্ত্রীর বিলাসী জীবন

চারদিকে যুদ্ধের দামামা। জলে, স্থলে হামলার প্রস্তুতি। গৃহযুদ্ধে ছারখার সিরিয়া। এমন অবস্থার মধ্যেও বিলাসী জীবন যাপন করছেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাসার আল আসাদের স্ত্রী আসমা আসাদ। এমন পরিস্থিেিতও তিনি বুলেট প্রুফ বাঙ্কারে ঘটনা করে ছেলের জন্মদিন পালন করেছেন। খবর সংবাদ সংস্থার।

পর্যবেক্ষকদের দামেস্ক ত্যাগ, সিরিয়াজুড়ে উৎকণ্ঠা

রাসায়নিক অস্ত্র হামলাস্থল পরিদর্শন শেষে শনিবার সিরিয়া ত্যাগ করেছে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল। অন্য দিকে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে শায়েস্তা করতে সামরিক অভিযানের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

সিরিয়া অভিযান নিয়ে নরম সুর ওবামার

সিরিয়া অভিযান নিয়ে এবার সুর নরম করলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এতোদিন ধরে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই হোয়াইট হাউসের একক ক্ষমতাবলে সিরিয়ায় হামলার সিদ্ধান্ত বিবেচনার ইঙ্গিত দিলেও শনিবার রোজ গার্ডেনে দেওয়া এক ভাষণে ওবামা বলেন,

নৌকায় ভোট দিলে জনগণ কিছু পায়

নৌকা মার্কায় দেশের জনগণ যখন ভোট দেয়, তখন তারা কিছু পায় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার বিকেলে আশুলিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠের জনসভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

বাশারের পাশে কেন রাশিয়া, চীন ও ইরান

সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। পশ্চিমা অনেক নেতা ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সমাজকর্মী এ নিয়ে আলোচনা করছেন। তা থেকে দৃশ্যত একটি সুপারিশই বেরিয়ে আসছে।

লক্ষ্য বিশ্বের ১০০০০০ পুরুষ

বিশ্বের ১০০০০০ পুরুষের শয্যাসঙ্গী হওয়ার বিশেষ অভিযানে নেমেছেন পোল্যান্ডের আনিয়া লিসেওস্কা। দেখতে সুন্দরী। বয়সও তেমন বেশি নয়, মাত্র ২১। জীবনটাকে একটু অন্যভাবে উপভোগ করতে গত মাসে তিনি নিজের শহর ওয়ারসো থেকে এ ব্যতিক্রমধর্মী বিশ্ব অভিযান শুরু করেছেন।

পরিবেশ অধিদফতরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন by হাসান কামরুল

বাংলায় বহুল প্রচলিত একটা প্রবাদ আছে- যে যায় লংকায় সেই-ই হয় রাবণ। সরকার সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার অদূরে ভারতের সহযোগিতায় যৌথভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সাইট সিলেকশন, অবস্থানগত ছাড়পত্র ও সবশেষে পরিবেশ অধিদফতর ইআইএ (পরিবেশগত সমীক্ষা নিরূপণ) সার্টিফিকেটও দিয়েছে। সরকার বলছে, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হবে না। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখবে। আর এজন্য জ্বালানি উপদেষ্টা পরিবেশবাদীদের উন্নত প্রযুক্তির ওপর পড়াশোনার উপদেশ দিয়েছেন। কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ সমর্থন করবে না। কারণ সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের একটি অংশ। এ বনে এমন কিছু প্রাণী আছে যারা বিপন্ন প্রজাতির। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সুন্দরবনের আশপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে সংকটাপন্ন হিসেবে ঘোষণা করে ১৯৯৯ সালে। রেড জোন বা সংকটাপন্ন এলাকায় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেন, ভারি যানবাহন চলাচলও নিষিদ্ধ করা হয়েছে পরিবেশ আইনে। এখন পরিবেশ অধিদফতর তাদের করা আইনকেই অমান্য করছে?
রামপালে কয়লা আনা-নেয়ার কাজে সুন্দরবনের আকরাম পয়েন্টকে ব্যবহার করবে ভারত। সরকার হয়তো সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব বুঝতেই পারছে না। সরকার ভারতের সঙ্গে যৌথ কারবারি ব্যবসা খুলেছে। তাই ভারত থেকে কয়লা আমদানি করে সুন্দরবনের সন্নিকটে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতরের কী কাজ? কেন তারা অবস্থানগত ছাড়পত্র ও ইআইএ সার্টিফিকেট ইস্যু করল? তাহলে কি পরিবেশ অধিদফতর তাদের কর্মপরিধি বা গাইডলাইন ভুলে গেল? একটি রাজনৈতিক সরকারের নানা রাজনৈতিক ইচ্ছা থাকতেই পারে। কিন্তু পরিবেশ অধিদফতর এ দেশের পরিবেশ সুরক্ষার অভিভাবক। সরকার ভুল সিদ্ধান্ত নিলে অধিদফতর তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। তারা কোনো ধরনের উদ্যোগ না নিয়েই ছাড়পত্র ইস্যু করল, যা কোনোভাবেই উচিত হয়নি। অধিদফতর যদি সত্যিই রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে পরিবেশগত সমীক্ষা নিরূপণ করে থাকে, তাহলে তো নিরূপণের রেজাল্ট পজিটিভ হওয়ার কথা নয়। নেতিবাচক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে অধিদফতর পরিবেশের ক্লিয়ারেন্স দিল! এ দায়ভার অধিদফতর এড়াতে পারবে কি? রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবন বিপর্যস্ত হবে, জীববৈচিত্র্য চরমভাবে ক্ষতির মুখে পড়বে- এ কথাগুলো তো মিথ্যা নয়। পরিবেশ অধিদফতর সুন্দরবন ধ্বংসে মেতে উঠেছে এমন অভিযোগে যদি কেউ মামলা করে, তাহলে অধিদফতরকে আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হবে।
পরিবেশ অধিদফতর এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার জন্ম সরকারের তাঁবেদারি করার জন্য হয়নি। অধিদফতর সব ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের পরিবেশের ওপর নজর রাখবে, এটা অধিদফতরের গঠনতন্ত্রে বলা আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অধিদফতর সরকারের চাপের মুখেই হোক বা সরকারের পছন্দমতো লোকজন এ অধিদফতরের দায়িত্বে থাকার কারণেই হোক, অধিদফতর পক্ষান্তরে দেশের পরিবেশকেই ভারাক্রান্ত করে তুলছে। এ সরকারের আমলেই পারকির চরে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে শেষ পর্যন্ত অব্যাহত সমালোচনার মুখে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। সেখানেও অধিদফতর থেকে সাইট ক্লিয়ারেন্স দেয়া হয়েছিল। ভারতীয় রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এনটিপিসি সুন্দরবনের পাশে ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে যাচ্ছে। অথচ ভারতের ওয়ার্ল্ড লাইফ প্রটেকশন আইন ১৯৭২-এ বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে বাঘ বা হাতির সংরক্ষণ অঞ্চল, জৈববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা চলবে না। অথচ বাংলাদেশে প্রকল্প এলাকাটি ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে হওয়ায় অধিদফতর থেকে বলা হচ্ছে, এতে সুন্দরবনের ওপর প্রভাব পড়বে না। সাধারণত কোথাও একটা ইটভাটা থাকলেই ইটভাটার আশপাশের ৫ কিলোমিটার এলাকার বাতাস ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে। আর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব তো ২০-২৫ কিলোমিটার এলাকায় এমনিতেই প্রভাবিত হবে। ইআইএ রিপোর্টে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রকল্প এলাকায় ধান, মাছ, গৃহপালিত পশুপাখি ইত্যাদি ধ্বংস হবে বলে স্বীকার করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজ, ড্রেজিং, রাসায়নিক ও তৈল নিঃসরণের ফলে পশুর ও মাইদারা নদী, সংযোগ খাল, জোয়ার-ভাটার প্লাবন ভূমি ইত্যাদি এলাকার মৎস্য আবাস, মৎস্য চলাচল ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতির মুখে পড়বে বলে ইআইএ রিপোর্টে বলা হয়েছে (ইআইএ, পৃষ্ঠা ২৬৬ ও ২৬৭)। বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পরিবহনের ফলে বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নিঃসরণ, বর্জ্য নিঃসরণ, আলো, শব্দ দূষণ ইত্যাদি পরিবেশ আইন অনুসারে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সুন্দরবনের ইকো-সিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে বলেও ইআইএ রিপোর্টে আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে (ইআইএ, পৃষ্ঠা ২৬৮)। ইআইএ রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন নির্গত হবে। স্বভাবতই এ বিপুল বিষাক্ত গ্যাস সুন্দরবনের বাতাসে মিশে গোটা সুন্দরবনকে ধ্বংস করবে।
কয়লাভিত্তিক সাধারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় উন্নত প্রযুক্তির বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মাত্র ১০ শতাংশ কম কার্বন নিঃসরণ হয় এবং ৮০ শতাংশ লোড ফ্যাক্টর ধরলে প্রতিবছর কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ হবে ৭৯ লাখ মেট্রিক টন, যা সুন্দরবনের সৌন্দর্যকে চিরতরে ধ্বংস করে দেবে। অথচ এ নিয়ে ইআইএ রিপোর্টে কিছুই বলা হয়নি। ইআইএ রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির জন্য প্রতি ঘণ্টায় পশুর নদী থেকে ৯১৫০ ঘনমিটার পানি প্রত্যাহার করতে হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি শীতলকরণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের পর ৫১৫০ ঘনমিটার পানি আবার নদীতে ফেরত আনা হবে। ঘণ্টায় প্রায় ৪ হাজার ঘনমিটার পানির প্রবাহ কমবে। তার মানে প্রতিদিন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি যদি ২০ ঘণ্টা উৎপাদনে থাকে, তাহলে প্রতিদিন ৮০ হাজার ঘনমিটার পানির প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই নষ্ট হবে। এ হিসাবটাও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৯৯৫ সালে নেয়া। পশুর নদীর বর্তমান পানির প্রভাব হিসাব করলে এ হিসাবের অংকটা অনেক উঁচু হবে। এ এনপিটিসি ভারতে যখন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে, তখন জিরো ডিসচার্জ নীতি অনুসরণ করে। যেমন ভারতের ছত্তিশগড়ে রায়গড়ের কাছে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র। অথচ এনপিটিসি রামপালে জিরো ডিসচার্জ নীতি অনুসরণ না করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে যাচ্ছে (রায়গড় ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এক্সিকিউটিভ সামারি, পৃষ্ঠা ২)। এ বিদ্যুৎ কেন্দে বছরে ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লাখ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এ ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, স্নারি তরল বা ঘনীভূত অবস্থায় ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করবে। এতে বিভিন্ন ধাতু সংমিশ্রিত অবস্থায় থাকে যেমন- আর্সেনিক, পারদ, সিসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম ও রেডিয়াম, যা পশুপাখিসহ মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ বলে বিবেচিত। পরিবেশ অধিদফতর তাদের ইআইএ’র এক জায়গায় বলছে, এ বিষাক্ত ছাই পরিবেশে নির্গত হলে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ হবে (ইআইএ পৃষ্ঠা ২৮৭)। অন্যদিকে বলছে, নির্গত বিষাক্ত ছাই ১৮৩৪ একর জমির মধ্যে ১৪১৪ একর জমি ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হবে (ইআইএ, পৃষ্ঠা ২৬৩), যা পরিবেশের সঙ্গে নিছক তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।
পরিবেশ অধিদফতর সত্যিই যদি দেশের পরিবেশের ওপর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভিভাবক হয়ে থাকে, তাহলে অন্তত বিবেকের তাড়নায় হলেও সুন্দরবনের কাছে এ ধরনের বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সরকারকে নিরুৎসাহিত করবে। প্রয়োজনে ইস্যু করা ইআইএ ছাড়পত্র প্রত্যাহার করে নিরপেক্ষ পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সঠিক ইআইএ রিপোর্ট প্রস্তুত করার জন্য অনুরোধ করছি। বিদ্যুৎ আমাদের দরকার কিন্তু সুন্দরবনকে ধ্বংস করে আমরা বিদ্যুৎ চাই না।
হাসান কামরুল : জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

জনগণের সাড়া মিলবে কি? by ইকতেদার আহমেদ

উন্নয়নের বহুবিধ দিক রয়েছে। যে কোনো উন্নয়ন সব সময় জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়ে থাকে। একটি দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অপরিহার্য। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও সব ধরনের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের পূর্বশর্ত। এর পাশাপাশি উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সঠিক জাতীয় নেতৃত্ব এবং দক্ষ, মেধাবী, সৎ ও আত্মনিবেদিত জনশক্তি। সঠিক জাতীয় নেতৃত্বের মধ্যে সততা, একাগ্রতা, ত্যাগ ও দেশপ্রেম- এ চারটি গুণের সমন্বয়ের আবশ্যকতা রয়েছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন বা ভোটপ্রাপ্ত দল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সরকার পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। একটি দল নির্বাচনে বিজয়ী হলে দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তা নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যক্ত করা হয়। তবে নির্বাচনী ইশতেহারের চেয়ে নির্বাচন-পরবর্তী ক্ষমতাসীন দলের সরকার পরিচালনায় সফলতা ও ব্যর্থতা ভোটের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।
আমাদের দেশের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ’৯০-পূর্ববর্তী ১ম, ২য়, ৩য় ও ৪র্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ চারটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিজয় অর্জনে সমর্থ হয়। অপরদিকে ’৯০-পরবর্তী অনুষ্ঠিত ৫টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া ৫ম, ৭ম, ৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্তর্বর্তী অথবা নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও সে সংসদ এক মাসেরও কম সময়ের ব্যাপ্তিকালে শুধু নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত বিল পাসের পর অবলুপ্ত হয়।
বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে সংসদ বহাল থাকাকালীন মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে সংবিধানে সংশোধনী আনার আবশ্যকতা আছে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে মেয়াদ অবসান ছাড়া অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে দেয়া হলে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই।
সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি স্বপদে বহাল থাকবেন এবং সংসদ ভেঙে যাওয়া এবং সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে মন্ত্রী নিয়োগ দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভেঙে যাওয়ার অব্যবহিত পূর্বে যারা সংসদ সদস্য ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে নিয়োগদানে সাংবিধানিকভাবে কোনো বাধা নেই।
সংবিধানের উপরোক্ত বিধানাবলি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, বর্তমান সরকার মেয়াদ অবসান পূর্ববর্তী সংসদ ভেঙে দিয়ে বা না দিয়ে নির্বাচন করতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী স্বপদে বহাল থেকে অব্যবহিত আগের সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে তিনি যাদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করতে ইচ্ছুক এমন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠনপূর্বক অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। ইতিমধ্যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সরকারি ও দলীয় উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন সভা-সমাবেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য তার দলের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিভিন্ন দেশে সরকারের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষায় একটি দলকে পরপর দু’মেয়াদের জন্য নির্বাচিত করার অসংখ্য নজির রয়েছে। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সংবিধান সংশোধন করে জাতীয় স্বার্থে তিন মেয়াদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে স্বপদে বহাল রাখা হয়েছিল।
একাদিক্রমে একাধিক মেয়াদে সরকার পরিচালনার সুযোগ পেয়ে দেশকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছে দেয়ার নজির আমাদের পার্শ্ববর্তী এশিয়া মহাদেশের দু’-তিনটি দেশের ক্ষেত্রে রয়েছে। এসব দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, সততা, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যনিষ্ঠা অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছিল। আমাদের দেশের জনগণের জিজ্ঞাসা- আমরা কি আমাদের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে উপরোক্ত সব গুণের প্রতিফলন দেখতে পাই?
দলীয় ঐক্য অটুট রাখার অভিপ্রায়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেত্রীর রাজনীতিতে আগমন। রাজনীতিক হয়ে দেশের কর্ণধার হবেন তা যে তার চিন্তা-চেতনায় ছিল না, এ বিষয়টি দলীয় প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বিবিসিতে প্রদত্ত সাক্ষাৎকার থেকে অনুধাবন করা যায়। পারিবারিক ধারাবাহিকতার সূত্র ধরে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেত্রীর রাজনীতিতে আগমন ঘটলেও তার নেতৃত্বের যোগ্যতার গুণে তিনি দু’বার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার দলের জন্য বিজয় অর্জনে সমর্থ হয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কোনো এক সময় ভারত ও শ্রীলংকার রাজনীতিতে পারিবারিক ধারাবাহিকতা প্রাধান্য পেত। কিন্তু সে ধারাবাহিকতা শ্রীলংকার ক্ষেত্রে বলতে গেলে অবলুপ্ত আর ভারতের ক্ষেত্রে ক্ষয়িষ্ণু পর্যায়ে রয়েছে। উন্নত দেশের রাজনীতিতে পারিবারিক ধারাবাহিকতা কদাচিৎ পরিলক্ষিত হয়। এসব দেশে যোগ্যতাই একজন ব্যক্তিকে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছে দেয়।
আমাদের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী পারিবারিক ধারাবাহিকতার ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে স্বীয় পুত্রকে তার উত্তরসূরি হিসেবে দেখতে চান এমনই আভাস পাওয়া যায়। ক্ষমতাসীন দলের নেত্রীর তনয় রাজনীতিতে কতটুকু সফল হবেন, তা দেখতে দেশবাসীকে হয়তো আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু যারা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী তাদের প্রশ্ন- ঐতিহ্যবাহী ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যদি পারিবারিক ধারাবাহিকতার ঐতিহ্যই লালন করা হয় তবে সৎ, দক্ষ, যোগ্য, মেধাবী ও দেশপ্রেমিকরা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হবেন কেন?
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফলে ব্যথিত হয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেত্রীকে বলতে শোনা গেছে, জনগণ তার দলের বিদায়ী মেয়রদের উন্নয়ন কার্যক্রম ও যোগ্যতা বিবেচনা না করে নির্বাচনে তাদের পরাভূত করায় চোর ও লুটেরা বিজয়ী হয়েছে। এ ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বর্তমান ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল কারও কাছে প্রশ্নবিদ্ধ নয়। তাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তিকে চোর ও লুটেরা বললে যে জনগণ তাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তাদের অবমাননা করা হয় কি-না, সে প্রশ্নটি এসে যায়।
পদ্মা সেতু বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার এবং এ সরকারের বর্তমান মেয়াদকালেই এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। এ সেতু নির্মাণ করা গেলে অবহেলিত দক্ষিণ অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজতর হতো, যা অর্থনীতি ও জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখত। ব্যক্তিবিশেষের দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতায় বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। পদ্মা সেতু বিষয়ে বিশ্বব্যাংক প্রাথমিক পর্যায়ে যখন অভিযোগ উত্থাপন করে, তখন সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলে প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ হতো না। যদিও পরে দুর্নীতি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কিন্তু সে উদ্যোগ একপেশে হওয়ায় তা প্রকল্পটির বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নে সুফল এনে দিতে পারেনি।
পদ্মা সেতু ছাড়াও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, শেয়ারবাজার, রেলের কর্মচারী নিয়োগ, হলমার্ক, ডেসটিনি, প্রশ্নপত্র ফাঁস, সরকারের উচ্চপদে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ প্রভৃতি দুর্নীতি জনমনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। এ বিরূপ প্রভাব ভোটের ময়দানে প্রতিফলিত হলে তা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের জন্য হবে উদ্বেগজনক।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার রাস্তার দু’পাশের বিভিন্ন সংস্থার বিলবোর্ড দখল করে সরকারের উন্নয়ন প্রচারণার যে প্রয়াস নেয়া হয়েছিল, তা জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। এটি যে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলবে সে বিষয়ে দলের অনেকের মধ্যে এবং দলবহির্ভূত কারও মধ্যে কোনো ধরনের সংশয় আছে বলে মনে হয় না। যদিও আশার কথা, সরকারদলীয় নেত্রী বিলবোর্ডের উন্নয়ন প্রচারণার ব্যানার অপসারণপূর্বক সংশ্লিষ্টদের ভাড়াবাবদ অর্থ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তা হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধারে যে সম্পূর্ণ সক্ষম হবে না, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
আমাদের দেশে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ ছোট-বড় অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অবকাঠামো বিনির্মাণে দুর্নীতি সম্পৃক্ততা বর্তমানে গোপন কিছু নয়। বর্তমান সরকারের সময় যতটুকু উন্নয়ন হয়েছে তা নিয়ে এবং উন্নয়নের কাজের মান নিয়ে দেশবাসী সন্তুষ্ট নয়। তাছাড়া উন্নয়ন ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক দলকে সুষ্ঠু ও সাবলীলভাবে সরকার পরিচালনায় দক্ষ প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করতে হয়। ’৯০-পরবর্তী দলীয়করণের কারণে প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে চলেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা নেমে আসবে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান ও সরকারপ্রধান একই ব্যক্তি হওয়ায় সার্বিক ক্ষমতা একই ব্যক্তিকে ঘিরে কেন্দ্রীভূত। এ ধরনের ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। এ ব্যবস্থা বহাল রাখা হলে যোগ্য ব্যক্তির পক্ষে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসা দুরূহ হবে। কাউন্সিল অধিবেশনের মাধ্যমে গোপন ব্যালটে নেতা নির্বাচন করার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা গেলে যে কোনো দলে সময়ের ব্যবধানে সঠিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল এমন এক সময় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন নির্বাচন আদৌ হবে কি-না তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতার অনুপস্থিতিতে একতরফা নির্বাচন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না। দেশবাসীর বিশ্বাস, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলনে সরকার গঠিত হবে। আর সেক্ষেত্রে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় পুনঃআগমনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বানে জনগণের সাড়া না মিললে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ ও কলামিস্ট

সাজাইলে হয় ফুলের বাগান- না সাজাইলে হয় জঙ্গল by মোকাম্মেল হোসেন

দু’বছর পার না হতেই গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। চারপাশে ফিসফাস-ভুসভাস ও দীর্ঘশ্বাসের পরিধি ক্রমশ স্ফীত হতে থাকায় লবণ বেগমকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম-
: ঘটনা কী!
লবণ বেগম কোনো কথা না বলে বড় বড় চোখ দুটোয় অসহায়ত্ব ফুটিয়ে তুলে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার চোখে জলের ধারা দেখে বিস্মিত হয়ে বললাম-
: কী হইছে! তুমি কাঁদতেছ কীজন্য?
লবণ বেগম মাথা নিচু করে চোখের জল গোপন করার চেষ্টা করতেই দু’হাতের করতলে তার মুখমণ্ডল রেখে মাথাটা উঁচু করে তুলে ধরলাম। তারপর মৃদুস্বরে বললাম-
: কষ্ট ভাগ করলে কইম্যা যায়। মনের মাইকোষ থেইক্যা তোমার কষ্টগুলান জলদি বাইর কর।
- সবাই আজেবাজে কথা বলে!
: কী রকম?
: বলে- আমাদের নাকি বাচ্চাকাচ্চা হবে না!
- ধুরউ! যত সব আউল-ফাউল কথাবার্তা। বাচ্চাকাচ্চা না হওয়ার কোনো কারণ নাই। ফারদার কেউ এই ধরনের কথা বললে তুমি বলবা- একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমরা গ্যাপ দিছি!
: তাই তো বলি। কিন্তু কোনো লাভ হইতেছে না...
এর কিছুদিন পর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে দেখলাম, লবণ বেগম ভেজা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে কলপাড়ে বসে আছে। তার হাতে একটা কলাপাতা। কলাপাতায় নানা ধরনের কবিরাজি ওষুধ। বিষয়টা আন্দাজ করতে পেরে শাশুড়িকে ডাক দিয়ে বললাম-
: আম্মা, এইসব কী?
কোনো উত্তর না পেয়ে হইচই শুরু করতেই লবণ বেগম চোখের দৃষ্টিতে আমাকে খামোশ হওয়ার নির্দেশ দিল। নারীজাতির চোখের চাহনির কাছে পরাস্ত হয় না এমন পুরুষ বিরল। আমি চুপ মেরে গেলাম। এতো ভারি যন্ত্রণা শুরু হয়েছে! ইনস্ট্যান্ট বাচ্চাকাচ্চা লাভের কোনো ব্যবস্থা নেই। মানবশিশু গাছের ফল বা পুকুরের মাছ নয়- মন চাইলেই একটা এনে লবণ বেগমের হাতে ধরিয়ে দেব। সন্তান কোলে নিয়ে তার মুখে আব্বা ডাক শোনার জন্য একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এজন্য সময় দরকার। কিন্তু চারপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, সময় দিতে কেউ আর রাজি নয়। বিষয়টা উপলব্ধি করে মনে মনে বললাম-
: ওকে! মাই ডিয়ার ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামেলি। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি- ইনশাল্লাহ...
পরের মাসেই লবণ বেগম সবাইকে সুসংবাদ দিল এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে আমাদের প্রথম সন্তান মাতৃগর্ভের অন্ধকার থেকে পৃথিবীর আলোয় এসে ওয়াও-ওয়াও বলে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করল। প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কয়েক মাস যেতে না যেতে লবণ যখন আবার মা হওয়ার ঘোষণা দিল- সবাই চমৎকৃত হল। ঠাট্টার সম্পর্ক- এমন এক আত্মীয়া তার চোখ দুটো প্রজাপতির পাখার মতো এদিক-ওদিক নাচিয়ে আমাকে বলল-
: দুলাভাই, ক্ষেইপ্যা গেলাইন নাকি?
আমি মুচকি হেসে বললাম-
: তোমরা যেভাবে সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করছিলা, না ক্ষেইপ্যা উপায় আছে?
এখানেই শেষ নয়। এক্কা-দুক্কার পর তৃতীয়বারের মতো মা হওয়ার কৃতিত্ব নিয়ে লবণ বেগম ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর রোগীর ইতিহাস জানার পর তিনি থ মেরে গেলেন। ভীত গলায় লবণ বেগমের উদ্দেশে বললেন-
: আপনার পরপর দুইটা বেবি সিজার অপারেশনের মাধ্যমে হইছে- তারপরও আপনি থার্ড টাইম মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কোন আক্কেলে! আপনার কি মৃত্যুভয় নাই?
ডাক্তারের কথা শুনে লবণ বেগম ইতস্তত না করে বলল-
: মরতে কোনো সমস্যা নাই। আপনে এখন আমার আলট্রাসনোগ্রাম করার ব্যবস্থা করেন। মরবার আগে আমি শুধু জাইন্যা যাবার চাই- আমার গর্ভের এই সন্তানটা মেয়ে!
লবণ বেগমের কথায় ডাক্তার খুবই অবাক হল। গলার স্বর নিচু করে বলল-
: আপনার আগের দুটি সন্তান ছেলে?
- জ্বি।
: কন্যাশিশুর আশায় আপনি এরকম একটা ঝুঁকি নিছেন?
- জ্বি।
: তার কি কোনো দরকার ছিল?
- জ্বি, দরকার ছিল।
এটুকু বলার পর লবণ বেগম থামল। তারপর আমার দিকে ইঙ্গিত করে ডাক্তারের উদ্দেশে বলল-
: উনি বলেন- কন্যাশিশু হইল সংসারের ছায়াবৃক্ষ। যে সংসারে কন্যাশিশু নাই, সেই সংসার মরুভূমি। আমার সংসার একটা মরুভূমি হোক- এইটা আমি চাই না।
শুধু লবণ বেগম কেন, কোনো বাবা-মা চায় না তাদের সংসার মরুভূমির রূপ ধারণ করুক। সবারই স্বপ্ন ও প্রত্যাশা থাকে তাদের সংসার হবে একটি ফুলের বাগান। নানা রঙের, নানা গন্ধের ফুল মিলে একটি বাগানকে যে রকম স্নিগ্ধতায় ভরে তোলে, সেই স্নিগ্ধতা তাদের সংসারেও বিরাজ করবে। রূপ, গুণ ও সুবাসে চারপাশ আমোদিত করা বাগানের ফুলের মতো তাদের সন্তানরাও সৌরভ ছড়াবে, সবার প্রশংসা কুড়াবে। সন্তানের সুকর্ম, সদাচরণ ও সাফল্যে মা-বাবার হৃদয় আনন্দে যেমন নেচে ওঠে, তেমনি সন্তানের কুকর্ম, অসদাচরণ ও ব্যর্থতায় তাদের মন ভেঙে খানখান হয়ে যায়। ১৯৭৪ সালের কথা। আমি তখন খুবই ছোট। তারপরও দৃশ্যটা স্পষ্ট মনে আছে। আমাদের অষ্টধার উচ্চ বিদ্যালয়ে সেসময় এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ছিল। বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি, দেখলাম- এক অভিভাবক তার পরীক্ষার্থী সন্তানের জন্য টিফিন-ক্যারিয়ারে করে খাবার নিয়ে যাচ্ছেন। বিপরীত দিক থেকে আসা এক লোক এসময় তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল-
: খাওন-দাওন লইয়া যাইয়া কী করবাইন! বাড়িত যাইনগা।
- ক্যান, কী হইছে!
: আপনের পোলা নকল করতে যাইয়া ধরা পড়ছে। তারে পরীক্ষার হল থেইক্যা বহিষ্কার করা হইছে।
এ কথা শোনার পর সেই অভিভাবক জ্ঞান হারিয়ে রাস্তার ওপর পড়ে গেলেন। তার হাতে থাকা টিফিন-ক্যারিয়ারের খাবারগুলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। যে মা তার সন্তানের জন্য খাবারগুলো সযতেœ সাজিয়ে দিয়েছিলেন, আর যে বাবা সেগুলো বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন- তাদের নিশ্চয়ই চাওয়া ছিল ছেলে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে। তাদের গর্বের ধনে পরিণত হবে।
চাওয়ার কাজটা খুবই সহজ। তবে পাওয়াটা মোটেই সহজ নয়। কেবল সন্তান জন্ম দিলেই একটা সংসার ফুলের বাগান হয়ে যায় না। বাগান তৈরি করতে হয়। এ ব্যাপারে বাবা-মা তথা পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাগান তৈরি করতে হলে ধৈর্য ও শ্রম দিয়ে এর আগাছাগুলো পরিষ্কার করতে হয়। পরিকল্পনা দিয়ে তাকে সাজাতে হয়। সাজানোর কাজটি ঠিকমতো হলে তবেই সেটা বাগান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শ্রম না দিয়ে আগাছা পরিষ্কারের ব্যাপারে উদাসীন থাকলে, সাজানোর কাজটি সঠিকভাবে না হলে সেটা বাগান না হয়ে জঙ্গলে পরিণত হয়। সেই জঙ্গল তখন হিংস্র জন্তু-জানোয়ার ও পোকামাকড়ের অবাধ বিচরণস্থলে পরিণত হয়ে সমূহ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মেয়ে ঐশীর হাতে তার বাবা-মা খুন হওয়ার ঘটনা আমাদের সবার প্রত্যাশিত একটি বাগান জঙ্গলে পরিণত হওয়ারই হৃদয়বিদারক কাহিনী। এ ঘটনা থেকে অনেক কিছু শিক্ষা নেয়ার আছে।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভয়াবহ গবেষণা কর্ম by বদরুদ্দীন উমর

Public Satisfaction with Current Policing Practice-এর ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ তাদের Criminology and Criminal Justice Programme-এর অধীনে একটি সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ২০ আগস্ট ২০১৩ তারিখে। ২০১২ সালের ২৪ মে থেকে ৪ নভেম্বর ঢাকা শহরে ৬১৭ জনের ওপর এই সমীক্ষা পরিচালিত হয় পুলিশ ডিপার্টমেন্টের অর্থায়নে। এর রিপোর্ট অনুযায়ী শতকরা ৮১ জন পুলিশের আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সমীক্ষাটি পরিচালিত হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অধীনস্থ ৪৬টি থানা এলাকায়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ তাদের এক সমীক্ষা রিপোর্টে বলেছে, পুলিশ ও রাজনৈতিক দলগুলোই হচ্ছে সমাজের সব থেকে দুর্নীতিবাজ প্রতিষ্ঠান। (Daily Star, 21.08.2013).
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সমীক্ষার প্রধান তদন্তকারী অধ্যাপক মাহবুবউদ্দীন আহমদ সমীক্ষা রিপোর্টটি প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল, ডিএমপি কমিশনার প্রমুখ বক্তব্য প্রদান করেন। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অর্থাৎ বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই পুলিশের অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত সমীক্ষাটির রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। দু’জন শিক্ষক ও ১৩ জন ছাত্র এই সমীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। তাদের রিপোর্টটিতে বলা হয়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আচরণ ও তাদের প্রতি জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে বিপুল অধিকাংশ নাগরিক ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। তাদের মতে, পুলিশ কোনো দুর্নীতি করে না এবং কোনো কাজের জন্য তাদের কোনো টাকাকড়িও ( Speed money) দিতে হয় না!
ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমদ, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের একজন অতিথি শিক্ষক, পুলিশের সততা ও দুর্নীতিমুক্ত আচরণের প্রশংসা করে বলেন, পুলিশ যদি দুর্নীতিবাজ হতো তা হলে তারা ঢাকার প্রত্যেকটি ভবনেরই মালিক হতো!! এহেন বক্তব্যের মাথামুণ্ডু বোঝার উপায় নেই। কোনো একটি বিভাগের লোক দুর্নীতিবাজ হলে তারা দেশের সব সম্পত্তির মালিক হবে- এই বক্তব্য যে সম্পূর্ণ অসার ও উন্মাদতুল্য তাতে সন্দেহ নেই। কারণ সমাজে অন্য অনেক ধরনের কর্মকাণ্ড আছে এবং এসব ক্ষেত্রেও দুর্নীতির অভাব নেই। কাজেই দুর্নীতিলব্ধ অর্থ তারা ঘরে রেখে দিয়ে শুধু পুলিশের জন্যই ঘরবাড়ি ও জমির বাজার ছেড়ে দিয়ে বসে থাকবে এমন চিন্তা উন্মাদ ছাড়া আর কে করতে পারে? তাদের এই বক্তব্যের মধ্যে যে ঔদ্ধত্য আছে সেটাও লক্ষ্য করার মতো। দুর্নীতির মাধ্যমে ঢাকা শহরের সব ভবনের মালিক পুলিশের লোকজন না হলেও পুলিশের লোকরা যে ঢাকা শহর এবং দেশের সর্বত্র বিশাল ধন-সম্পত্তি ও বাড়িঘরের মালিক তাতে সন্দেহ নেই। পুলিশের অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই তথাকথিত সমীক্ষায় যা বলা হয়েছে তার বিপরীতে সাধারণ মানুষ পুলিশকে চরম দুর্নীতিবাজ হিসেবেই জানেন। কারণ পুলিশের সঙ্গে যাদেরই যোগাযোগ হয় এবং পুলিশের খপ্পরে কোনো না কোনোভাবে যারাই পড়েন, তারা অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই জানেন, পুলিশের মধ্যে সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত লোক এতই দুষ্প্রাপ্য যে তার সাক্ষাৎ পাওয়া এক মহা ব্যতিক্রমী ব্যাপার।
পুলিশের চরিত্রের এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়। পুলিশের দুর্নীতি এমন এক ব্যাপক ও নিষ্ঠুর ব্যাপার যে পুলিশের অন্য কোনো ভাবমূর্তি কল্পনা করাও কঠিন। পুলিশের প্রচলিত ভাবমূর্তি এমনই প্রতিষ্ঠিত যে, এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ বিভাগ কর্তৃক নিজেদের অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি সম্মানজনক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নিজেদের চরিত্রের কালিমা চুনকাম করার চেষ্টা হঠাৎ কেন করা হল এবং তার থেকেও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, এ বিষয়টি প্রচারের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে উপাচার্যের সম্মতি ও উপস্থিতিতে এর প্রচারের ব্যবস্থাই বা কেন করা হল- এটা এক বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের যে অবস্থা তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। সবই এ দেশে সম্ভব। পুলিশের ওপর এই সমীক্ষা রিপোর্টটি এভাবে প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়া তারই এক উদাহরণ।
পুলিশের সততা ও দুর্নীতি নিরূপণের এই রিপোর্ট যখন প্রকাশিত হচ্ছে, সেই মুহূর্তেই পুলিশের এক বড় ধরনের দুর্নীতির রিপোর্ট সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষক ও ছাত্ররা এই সমীক্ষা চালিয়েছেন তারা গাবতলী-আমিনবাজার এলাকার জনগণের কাছে গিয়েছিলেন কি-না জানা নেই। কারণ পত্রিকায় পুলিশের দুর্নীতি ও নির্যাতনের ওপর যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, কাঁচাবাজারের দোকানদার এবং বাস ড্রাইভারদের থেকে পুলিশের নিয়মিতভাবে জিনিসপত্র ও টাকা-পয়সা জোর করে আদায় করার বিরুদ্ধে দোকানদাররা ও বাস কর্মচারীরা সেখানে রাস্তা অবরোধ করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর সময় আমিনবাজার পুলিশ ক্যাম্প থেকে পুলিশের সব লোককে সরিয়ে নিয়ে অন্য এক দলকে সেখানে এখন দেয়া হয়েছে (Daily Star, 27.08.2013)। পুলিশের বড় কর্তারা উপস্থিত হয়ে অবরোধকারীদের আশ্বাস দেন, কোনো পুলিশের দুর্নীতি প্রমাণিত হলে তাকে শাস্তি দেয়ার ব্যবস্থা তারা করবেন। এর পর তারা অবরোধ উঠিয়ে নেন। আমিনবাজারে পুলিশের দুর্নীতির ওপর বিস্তারিত রিপোর্ট পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হলেও তার দীর্ঘ বিবরণ এখানে উল্লেখের প্রয়োজন নেই। বিষয়টি এখানে উল্লেখ করা হল এ কারণে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে যখন পুলিশের সততা ও দুর্নীতিবিরোধিতা সম্পর্কে গালভরা রিপোর্টটি প্রকাশিত ও আলোচিত হচ্ছে ঠিক সেই একই সময়ে আমিনবাজারে পুলিশের ব্যাপক দুর্নীতি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সড়ক অবরোধ হচ্ছে। সিনেট হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সমীক্ষা রিপোর্টটিতে যা বলা হয়েছে তার সমালোচনা করে সেখানে কেউ কোনো বক্তব্য প্রদান করেছেন- এমন কিছুর উল্লেখ পত্রপত্রিকার কোথাও নেই! এর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষিত ভদ্রলোকদের অবস্থাও অনুমান করা কঠিন নয়!!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত উপরোক্ত সমীক্ষাটি যে একেবারে ভুয়া ব্যাপার, এতে কোনো সংশয় নেই। এটা যে কোনো সৎ ব্যক্তিই স্বীকার করতে বাধ্য। কিন্তু এটা বললেই শেষ হয় না। এর ভয়াবহ দিকটি হল, পুলিশের আচরণ ও দুর্নীতিমুক্ত চরিত্র বিষয়ে যারা সমীক্ষা চালিয়ে রিপোর্টটি তৈরি করেছেন, তাদের অবস্থা। পুলিশের সুপরিচিত দুর্নীতিকে চুনকাম করে সমাজে উপস্থিত করার এই চেষ্টা যারা করেছেন, তারা নিজেরা দুর্নীতিবাজ পুলিশের দুর্নীতির শিকার হয়েই যে এই কাজ করেছেন, এতে সন্দেহ নেই। এ কাজ যদি কোনো বেসরকারি সংস্থা থেকে করা হতো, তাহলে সেটা তত বিপজ্জনক হতো না। কিন্তু এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের উদ্যোগে হওয়ায় সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা ও গবেষণা আজ কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, তার একটা মূল চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি। শুধু তাই নয়। এ ধরনের গবেষণার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষক সমাজের একাংশেরও যে সমর্থন আছে, সেটা সিনেট হলে উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং অন্যদের আচরণ থেকেও বোঝা যায়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণা, সংস্কৃতি ইত্যাদির অবস্থা এখন কী ভয়াবহ চরিত্র পরিগ্রহ করেছে, তার পরিচয়ও এই কেলেংকারির মধ্যেই নিহিত আছে।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল