Friday, January 29, 2021

জাফনার মরমি অতীত ও বিখ্যাত হিন্দু সন্ন্যাসী যোগস্বামীর আশ্রম: ফিরে দেখা by ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা

ব্যস্ত ক্রিসমাস সপ্তাহে এক রাতে আমি জাফনাগামী বাসে ওঠে বসলাম, কলম্বোর চোখ ধাঁধানো আর জৌলুসময় উৎসবমুখর মওসুম পেছনে ফেলে যাওয়াটা আসলেই ছিলো কঠিন ব্যাপার। শ্রীলঙ্কার উত্তরের ঐতিহাসিক প্রাচীন তামিল রাজ্যটি অসংখ্য হিন্দু মন্দিরে পরিপূর্ণ। এখনকার লোকজনও বেশ উদ্দীপ্ত হিসেবে পরিচিত। ৩০ বছর ধরে অবশ্য এলাকাটি তামিল টাইগারদের সাথে গৃহযুদ্ধ নিয়েই বেশি আলোচনায় এসেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় একটি আলাদা রাজ্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ওই লড়াইয়ে শত শত জীবন-প্রদীপ নিভে গেছে।
১৯৮০-এর দশক থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা ওই গৃহযুদ্ধের ফলে যে জিনিসটি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে তা হলো জাফনা ছিল অনেক সাধু পুরুষ আর মরমি সাধকের আধ্যাত্মিক সাধনার আবাস, বাড়ি। বিশেষ করে তামিল রাজ্যের রাজধানী জাফনা শহরের উপকণ্ঠে থাকা ন্যালুরের কথা বলা যেতে পারে। এখানেই রয়েছে এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরটি। কার্থিকেয়া বা মরুগান নামে পরিচিত সাধুর উদ্দেশ্যে ছিল এই মন্দিরটি। এছাড়া কলোম্বোবুথিুরাই ও ভেলভেতিথুরাইয়ের মতো এলাকাগুলোও হিন্দু ও সুফি সাধকদের কাছে বিখ্যাত ছিল। এসব সাধক অবশ্য কোনো একটি ধর্মের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেননি। ১৯৫০, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে যারাই আধ্যাত্মিক সাধনায় মগ্ন হতে চাইতেন, তাদের জন্যই স্থানটি ছিল সান্ত্বনা পাওয়ার স্থান।
বিস্মৃতির আড়ালে চলে যাওয়া এই জাফনাতেই আমি ছুটলাম পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে, ক্রিসমাসের উৎসবমুখর উন্মাদনাকে পেছনে ফেলে। জাফগান পৌঁছলাম ভোর ৫টায়। তাড়াহুড়া করে নাস্তা সেরে নিলাম। আর কয়েকজন খ্রিস্টান পাদ্রির কাছে জানতে পারলাম, অনেক হিন্দু মরমি সাধক ও সুফি ফকিরের আস্তানা এখন তাদের হয়ে গেছে। সাধকেরা বাস করেন, এমন কয়েকটি আশ্রমের কথাও জানলেন।
আমি জাফনার রহস্যময় অতীত সম্পর্কে অগ্রহী ছিলাম। আমাকে বলা হলো, বিখ্যাত যোগ সাধক যোগস্বামীর আশ্রমটি এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তিনি পরলোকগমন করেছেন ১৯৬৪ সালে। কিন্তু জাফনার বেশির ভাগ লোক এখনো তাকে মনে রেখেছে। সব ধর্মের লোকের কাছেই তিনি শ্রদ্ধাভাজন। তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন জাফনার সুপরিচিত একটি খ্রিস্টান স্কুলে। তিনি বাইবেল ও পবিত্র কোরআন সম্পর্কেও জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তিনি মুসলিত উৎসব ও সুফিদের সমাবেশে আল্লাহর ‍গুণগাণ গাইতেন। তিনি ও তার মতো অন্যান্য সুফি সাধকের কোনো বাড়িঘর ছিল না। কথিত আছে, বর্ষাকালেও তারা হাতে হাত ধরে ঘুরে বেড়াতেন। হাসতেন, গাইতেন। তাদের নিজস্ব বাড়িঘর না থাকায় তারা পুরো জাফনাকেই তাদের বাড়িঘরে পরিণত করেছিলেন। এরকম আরো অনেক ঋষি ছিলো যেমন: কাদাইত সামিয়ার, ভারিদাপাপ্পারা দেসিয়ার ও তুত্থুকুদি সামিয়ার।
এসব লোক শান্তির কথা প্রচার করতেন। এরকম কল্পনা করা এখনো কঠিন কিছু নয়। কারণ উন্নয়নের নামে কলম্বোর বিশাল বিশাল ভবনের জঞ্জাল যেখানে গজিয়ে ওঠছে, সেখানে জাফনা এখনো সহজ-সরল আর মন্ত্রমুগ্ধকর হয়ে আছে। যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িঘরগুলো নতুন করে তৈরি করেছে জাফনার পরিশ্রমী মানুষ। রাস্তায় বাইসাইকেল ও মটরসাইকেল বেশি। চলছে গবাধিপশু, মানুষের জন্য পথ করে দিতে যাদের কোন তাড়া নেই।
জাফনার উপকণ্ঠগুলোতে সরু সরু রাস্তাগুলো স্নিগ্ধতা আর সবুজের স্বর্গরাজ্য। বাইরের লোকজন এই দৃশ্য দেখে আশ্চর্য না হয়ে যাবে না। তবে আমার লক্ষ্য ছিল যোগস্বামীর আশ্রম। এটি ছিল জাফনা টাউন থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে কে কে এস রোডে।
যোগস্বামীর আশ্রমটি সিবাথনদাম নামে পরিচিত। এটি সাদামাটা, তবে সু-ব্যবস্থায় থাকা ভবন। ভেতর থেকে যে তরুণটি বের হয়ে এলেন, তার মুখ ছাইমাখা, হিন্দু মন্দিরের সাথে জড়িত লোকজন যেমন পোশাক পরে, তিনিও তেমন কিছু পরে আছেন। তার নাম মুরালিধারান। তার জ্ঞানী বাবা বাত্তিকালোয় যোগস্বামীকে নিবেদন করা একটি আশ্রম পরিচালনা করেন। মুরালিধারান যোগ সাধনার ওপর কয়েকটি বই দেখালেন। এতে যোগস্বামীর গান আর বাণী রয়েছে।
মুরালিধারন ব্যাখ্যা করলেন যে যোগস্বামীর কয়েকজন শিষ্য রয়েছেন। সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ শিষ্য হলেন সেলাথুরাই স্বামী। তিনি জাফনা আর বাত্তিকালোয় গুরুর বাণী প্রচার করেছেন।এছাড়া সান্থস্বামীও বিখ্যাত। তার জন্মনাম ছিল জেমস র‌্যামবোথাম। তিনি ছিলেন শ্রীলঙ্কার শেষ ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড সলবুরির ছেলে। জন্মসূত্রে খ্রিস্টান সান্থস্বামী গভীর ধ্যানে ‘রিক্যাপচুলেশন অব দি লর্ডস প্রেয়ার’ রচনা করেছিলেন।
আমরা যখন কথা বলছিলাম, তখন জাফনা হাসপাতালের এক চিকিৎসক দৈনন্দিন যোগ করছিলেন। মুরালিধারান আমাকে ডাকলো আশ্রমটি ঘুরিয়ে দেখাবে বলে। সেখানে যোগস্বামীর প্রবীণ বয়সের ছবি রয়েছে। রূপালি চুলগুলো গিটবাধা এবং ধ্যানের ভঙ্গিতে নুয়ে থাকা ছবি।
মুরালিধারানের দেয়া বইগুলো থেকে একটির কয়েকটি পাতা উল্টিয়ে আমি একটি রুমে প্রবেশ করলাম। এই রুমেই যোগস্বামীর ব্যবহার করা সামগ্রী রাখা হতো। আরো কয়েকটি হাসিমাখা মুখ আমাকে স্বাগত জানাল। পরে আমি মুরালিধারানকে নিয়ে আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখলাম। তিনি আমাকে সয়া কফি পরিবেশন করলেন। খ্রিস্টান ও সিংহলি হিসেবে আমি খুশি হলাম এই জেনে যে এই আশ্রমের কারোরই ধর্ম, বর্ণ কিংবা মতবাদের ব্যাপারে আগ্রহ নেই। অবশ্য আশ্রমটি পরিচালিত হয় শৈবমতে।
কফি পান করতে করতে আমি সুসানাগা বিরাপেরুনার লেখা ছোট্ট একটি চটি বইয়ের ওপর চোখ বুলাচ্ছিলাম। জন্মসূত্রে সিংহলি ও বৌদ্ধ হিসেবে এই লোকটি আধ্যাত্মিক জগত নিয়ে লেখালেখি করে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছেন। জাফনা যাওয়ার ট্রেন ভাড়া পর্যন্ত ছিলো না এমন এক তরুণ কিভাবে কলম্বো থেকে সেখানে পৌছেছিলো, বিস্ময়করভাবে তার মনে যোগস্বামীর সঙ্গে দেখা করার গোপন ইচ্ছাটি জেগেছিলো।
গল্পের শুরুটা এভাবে, কলম্বোর উপকণ্ঠে সৈকতের পাশে পাথরের উপর বসে কোন এক সন্ধ্যায় জাফনা থেকে আসা এক তামিল ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়। অনেক চিরন্তন সত্য উচ্চারিত হচ্ছিল সেখানে। বুড়ো লোকটি তাকে জাফনা সফরের আমন্ত্রণ জানায়। তামিল সংখ্যাগুরু জাফনায় ওই সিনহলা বৌদ্ধ লোকটির কোন বন্ধু বা স্বজন ছিলো না। এরপরও সেখানে মাসাধিকাল পার করে দেয় সে। যখন আশ্রয়দাতার মনে হলো যোগস্বামীর সঙ্গে তার দেখা করার সময় হয়েছে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো। ঋষি সুসুনাগাকে তাকে হাতাওয়ালা এক লম্বা ঝাঁটা নিয়ে স্বাগত জানান। বলেন, আমি কুলির কাজ করছি। তুমি কেন এক কুলিকে দেখতে এসেছো? অতিথিকে সকালের নাস্তা পরিবেশনের পর এক ঘন্টা বা তার কিছু বেশি সময় পার হয়েছে। তিনি বলে উঠেন, ‘গাছের দিকে তাকাও। গাছ কিন্তু ধ্যান করে। ধ্যান হলো নীরবতা। যখন বুঝতে পারবে যে সত্যিই তুমি কিছু জানো না, তখন তুমি সত্যিকারের ধ্যান করতে পারবে। এই সত্যবাদিতাই নীরবতার সত্যিকারের ক্ষেত্র। নীরবতাই ধ্যান।’ এ কথা বলে ঋষি ধ্যানমগ্ন হয়ে যান।
এছাড়া ‘যোগস্বামী: লাইফ অ্যান্ড স্পিরিচুয়াল গাইডেন্স’ নামের বড় আকারের একটি বইয়ে অনেক ধর্মের লোকজন যোগস্বামী সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। যোগস্বামীর ভক্তদের একজন ছিলেন সু্প্রিম কোর্টের খ্যাতনামা বিচারপতি ও সিলনের সলিসিটর জেনারেল, মুসলিম ব্যক্তিত্ব এম টি আকবর। তিনি আত্মশুদ্ধির জন্য ইসলামের মানবিক শিক্ষাগুলো প্রচার করতেন। কোন মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর তিনি চেম্বার থেকে বেরিয়ে গিয়ে আল্লার কাছে ক্ষমা প্রার্থণার জন্য বসে পড়তেন।
যোগস্বামী জীবনের একটি বড় সময় গাছের নিচে, গাছের পরার্থপরতার আশ্রয়ে কাটিয়েছেন। বলা হয় যে, একদা তিনি এক সদাশয় বৃদ্ধার পীড়াপীড়িতে একটি ছোট খালি কুঁড়ে ঘরে থাকতে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই প্রথম তার ভক্তদের সমাবেশ ঘটে। যোগস্বামীর ওপর লেখা বইগুলোতে তার অনেক অলৌকিক কীর্তি তুলে ধরা হয়েছ।, যার কিছু কিছু সত্যিই বিষ্ময়কর। জীবনের অন্তিম সময়ে তিনি ১৯৮০’র দশক থেকে ২০০৯ পর্যন্ত জাফনার মর্মান্তিক ঘটনাবলী সম্পর্কে কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছিলেন: ‘মন্দিরগুলো ধূলায় মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে।’

Thursday, January 21, 2021

অসংক্রামক রোগ কিভাবে ছড়ায়?

একুশে টেলিভিশন: অসংক্রামক ব্যাধি কী?
যেসব রোগ জীবাণু দিয়ে হয় না, যে রোগগুলো একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায় না; অর্থাৎ ছোঁয়াচে না তাদের অসংক্রামক ব্যাধি (Noncommunicable diseases, or NCDs) বলা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত শারীরিক অবস্থা বা রোগ যেটা এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে ছড়ায় না।
দুনিয়াজুড়ে অসংক্রামক ব্যাধি এখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, মাইগ্রেন ইত্যাদি অসংক্রামক ব্যাধি এখন মারণ ঘাতক। ‘বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিসমূহের জরিপ-২০১৮’ তে তথ্য উঠে এসেছে, অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ। আর অসংক্রামক রোগের ঝুঁকিমুক্ত মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ।
কিভাবে হতে পারে অসংক্রামক ব্যাধি? অসংক্রামক ব্যাধি আক্রান্ত মানুষের মধ্যে তাদের পূর্ব পুরুষের রোগের জোরালো পারিবারিক ইতিহাসই থাকে। এই রোগগুলোর ক্ষেত্রে পারিবারিক বা জিনগত (জেনেটিক) ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার সঙ্গে যোগ হয় পরিবেশগত উপাদান (Environmental factors) যেমন পরিবেশ দূষণ, অস্বাস্থ্যকর ও বাজে খাদ্যাভ্যাস, কায়িক শ্রমের অভাব, ধূমপান, মানসিক চাপ ইত্যাদি। এই দুয়ে মিলে বর্তমান সময়ে অনেক কম বয়সেই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এ ধরনের রোগে। ফলে সারা পৃথিবীজুড়ে অনেক মানুষ কম বয়সে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন, এতে পারিবারিক ব্যয় বাড়ছে। সময়মতো সচেতন হলে বংশ পরম্পরায় থাকা এসব রোগ প্রতিরোধ করা সহজ।
প্রকারভেদ: সাধারণত চার্ ধরনের অসংক্রামক ব্যাধি আছে এবং সেগুলো হল হৃদরোগ (cardiovascular diseases) যেমন হৃদযন্ত্রের বৈকল্য (heart attacks)এবং উচ্চ্ রক্তচাপ জনিত মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (stroke); ক্যান্সার, দীর্ঘকালস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ (chronic respiratory diseases) যেমন দীর্ঘকালস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের বিশেষত ফুসফুসের বাধাগ্রস্থতার রোগ এবং হাঁপানি এবং বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস।
সাবধানতা ও প্রতিকার: যাদের পরিবারে অসংক্রামক ব্যাধি জনিত রোগ আছে, তাদের উচিত হবে তাঁদের বিশেষভাবে সচেতন হওয়া উচিত। শৈশব থেকেই এ ধরনের পরিবারের সন্তানদের দিকে মনোযোগী হতে হবে। ওজন বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড বা কোমল পানীয় গ্রহণ, ধূমপান—ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। ছেলেবেলা থেকে কায়িক শ্রম, ব্যায়াম ও খেলাধুলায় উৎসাহী করতে হবে এদের। কাঁচা শাকসবজি, ফলমূল ও আঁশযুক্ত খাবার খেতে হবে বেশি। ইদানীং বলা হচ্ছে স্তন ক্যানসার, অন্ত্রের ক্যানসারসহ কিছু ক্যানসারেরও পারিবারিক ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। আর স্থূলতা, ওজনাধিক্য প্রতিরোধ করা গেলে, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে পারলে এ ধরনের ক্যানসারকেও প্রতিরোধ করা যায়। পরিবারে মা-বাবার ডায়াবেটিস থাকলে তাঁদের তরুণী কন্যাসন্তানের গর্ভকালীন ডায়াবেটিসেরও ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই এ ধরনের পরিবারের মেয়েদেরও হতে হবে সচেতন। মুটিয়ে যাওয়া এবং কায়িক শ্রমের অভাব এই ঝুঁকি বাড়াবে। তাই তাঁদের উচিত সন্তান নেওয়ার আগেই ওজন নিয়ন্ত্রণ করা, নিয়মিত ব্যায়াম করা ও খাদ্যাভ্যাস পাল্টানো। পাশাপাশি নিয়মিত নিজেদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো। ৩৫ বছর বয়সের পর থেকেই বছরে অন্তত একবার রক্তে শর্করা, চর্বির পরিমাণ পরীক্ষা করা, রক্তচাপ মাপা উচিত। মাত্রা বর্ডার লাইনে হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। উচ্চতা অনুযায়ী ওজন ঠিক আছে কি না দেখুন। এ ধরনের পরিবারের সন্তানদের সামান্য উপসর্গকেও উপেক্ষা করা যাবে না। মেয়েরা গর্ভকালীন সময়ে অবশ্যই রক্তের শর্করা দেখে নেবেন। থাইরয়েডের সমস্যা পরিবারে থেকে থাকলে তা-ও দেখে নেওয়া ভালো। মা-খালাদের স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে নিজের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। নিয়মিত নিজের স্তন পরীক্ষা করে দেখুন। প্রয়োজনে আলট্রাসনোগ্রাম বা ম্যামোগ্রাফি করান চিকিৎসকের পরামর্শে। কোলন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে পারিবারিক খাদ্যাভ্যাস পাল্টে ফেলুন। লাল মাংস (গরু-খাসি) কম খাবেন, বেশি খাবেন আঁশযুক্ত খাবার ও ফলমূল। এ ছাড়া কিছু জিনগত রোগ আছে, যেমন থ্যালাসেমিয়ার জিন বংশগতভাবে সন্তানেরা পেয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে শিশুকাল থেকেই তার যথাযথ স্ক্রিনিং, রোগ নির্ণয় প্রয়োজন। বড় হলে প্রয়োজনে যেন ব্যবস্থা নেওয়া যায় এ জন্য সচেতন হতে হবে। এ ধরনের পরিবারে নিজেদের মধ্যে বিয়ে না হওয়াই ভালো। ‘কাজিন ম্যারেজ’ পরবর্তী প্রজন্মের সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলতে পারে। এমনকি বিয়েশাদির সময় জীবনসঙ্গীও এ ধরনের জিনের বাহক কি না তা জেনে নেওয়া ভালো।

Friday, January 15, 2021

গল্প- বৃক্ষদের করুণ গান by নাসরীন জাহান

সেতুর আসমান টুটে গেল,

নীলিমার ঝাঁক পাখিরা গতি হারিয়ে বিহবল হলো

দুর্ঘটনার পৈশাচিক নখর অনন্তকে জীবনের জন্য কেড়ে নিয়ে গেল এই ধরিত্রী থেকে।

দিনরাতগুলো কাটে অগ্নিঝরা নিঃশ্বাসে চারপাশ পোড়াতে পোড়াতে। সেতুর চক্ষুকোটরে একবিন্দু আলো নেই, আত্মাপিঞ্জরে একফোঁটা জল নেই।

সে দিন-রাত্রির ওপর দিয়ে চলে না, যেন এক বিবশ প্রস্তরখ- সেতু, দিনরাত্রিগুলো কীভাবে তার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঠাহর হয় না তার।

এদিকে ঘাগরা ঢেউ তোলে শিশু বাতাস

সূর্য সাগরের প্রকা-তাকে ঢেকে রাখে তুমুল ধূসর ছায়া। চূর্ণ-বিচূর্ণ অবস্থার মধ্যে অনন্তর মুখটি স্থিত ছিলো।

কাফনে ঢাকা সেই মানুষটার মুখটা দু-আঁজলায় ধরে সেতু…।

একরাতে তেমনই নিঃসাড় পড়ে থেকে জাগ্রত রাত্রিকে বলছিল সেতু, আমাকে তুলে নাও,

দরজায় অনন্ত,

তুমি আমাকে এইভাবে মৃত ভেবে মাতম করবে, অনন্ত আহত, এ যে আমার কল্পনার বাইরে ছিল। একমাত্র তোমাকেই আমি বলে দেশের বাইরে গেছি, তুমি সেতু…।

সেতু ছিলাটান দিয়ে সোজা হয়। এরই ধারাস্রোতে সে দাঁড়ায়ও, এক আজব বিহবলতায় তার নিঃশ্বাস আটকে আসতে থাকে, তবে যে আমি নিজে তোমার লাশ দেখলাম, নিজ হাতে আমি।

সে তো তোমার স্বপ্ন। এ-জীবনে স্বপ্ন আর বাস্তবকে কম গুলিয়েছো তুমি!

তুমি এই এতো রাতে? চারপাশে তাকায় সেতু, আলো-আঁধারের অদ্ভুত প্রচ্ছায়া।

বিছানায় বসে অনন্ত সেতুকে আঁকড়ে ধরে, আমার ফ্লাইট ডিলে ছিলো, ভালো করে বাতিগুলো জ্বালাও সেতু, কতদিন তোমার মুখটা দেখি না।

উত্তেজনা, কম্পমানে দিশেহারা সেতু কাঁপতে কাঁপতে বাতিগুলো জ্বালায়, আমি চক্ষু ভরে দেখব তোমাকে, চিমটি কাটছি বারবার এই দেখো, এমনও বাস্তব হতে পারে? যেন ঘরে জ্বলজ্বল করছে বাতি নয়, সূর্যের স্ফটিক আলো। যেন পূর্ণ চন্দ্রাকাশে দুজন নিবিড় জ্যোৎস্নায় আসন পেতেছে, বিছানায় বসে অনন্তর মুখটার ওপর যেন হাতড়ে নয় হামলে পড়ে সেতু, এমন দুঃসহ স্বপ্ন কারো জীবনে যেন না আসে…

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে রাত তিনটে স্পর্শ করেছে। আচমকা সেতুর বুক খালি করে ফের অনন্ত হারিয়ে যায়।

এই যে বাতিগুলো আমি নিজ হাতে জ্বেলেছি। বিছানার যে-জায়গাটায় বসেছিল, স্পষ্ট কুঁচকে আছে। এ কী করে স্বপ্ন হয়?

গলা উজাড় করে চিৎকার করে সেতু।

এইভাবে দিনগুলো রাত্রিগুলো যায়।

সবাই পিকনিকে এসেছে। অনন্তর মৃত্যুর মাস পরেও সেতুর কোনো বিবর্তন নেই। সবাই চেয়েছে, তাই এসেছে পিকনিকে।

সেতুকে আচ্ছন্ন করেছিলো প্রগাঢ় বিষাদের ছায়া। রৌদ্র-উজ্জ্বল দিনেও তার আত্মার করোটিতে কেবলই গাঢ় অন্ধকার। সবার হুল্লোড় ছেড়ে সে অরণ্যের এক অদ্ভুত নির্জনে এসে দাঁড়ায়।

হুজ্জতে মাতা কেউ খেয়াল করে না।

হৃদয় আচ্ছন্ন করা ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে। তক্ষুনি যেন এতোক্ষণ পাশেই ছিলো এমনভাবে সেতুর ঘাড়ে হাত রেখে বলে অনন্ত, নির্জন অরণ্যের নিজেরও যে আলাদা একটা গান আছে, সত্যিকারভাবে কান পাতলে বোঝা যায়।

ফের ভূকম্পন, ফের আত্মার আরক্ষেতে ধুকপুক, এ যে সত্যিই জ্যান্ত অনন্ত – অরণ্যের ছায়াছায়া আলোয় স্পষ্ট দেখে ফের তার শরীর হাতড়ায় সেতু, তুমি ফের চলে যাবে, ফের ফাঁকি দেবে আমাকে, সাবধান স্বপ্ন বলো না, আমি তা শুনতে চাই না,

তুমি আমাকে দেখে এভাবে চমকে উঠলে আমার অসম্মান হয় না, যেন গানের ঘোরে অনন্ত বলে, অথচ আমরা বিয়ের রাতেই পরস্পরকে কথা দিয়েছিলাম, আমরা একজন আরেকজনের পরিপূরক থাকবো। যেন আমি অচেনা, এভাবে যদি চমকে ওঠো…।

তুমি জানো না অনন্ত, তুমি জানো না, সেতু কাঙালের মতো আঁকড়ে ধরে অনন্তকে, এইভাবে খেলো না তুমি আমার সঙ্গে, এমন মজা করো না, আমি এরকম বারবার মরতে পারবো না অনন্ত।

তুমি মরছো? ওপরের গাছেদের মাথার ফালির ভাঁজে ভাঁজে ছলকে ছলকে রোদ্দুর গড়িয়ে পড়ছে। আর সত্যিই অরণ্যে মিহি বাতাস ওঠায় এক অদ্ভুত মিহি দেহমন আচ্ছন্ন করা সুর উঠেছে।

এমন মাতাল করা সুর, অভিভূত বোধে মাঝখানের সময়টা পুরো ভুলে সেতু আমূল জড়িয়ে ধরে অনন্তকে। অনন্তের গায়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর মাতাল করা ঘ্রাণ, সব বেদনা রশ্মির ওপর গিয়ে অনন্তকে পুরোটাই উপভোগ করার স্পৃহায় সেতু আচমকা চুম্বন করে তাকে।

এখানে না, এখানে না, অনন্ত সচকিত হয়ে ওঠে। ভুলে যেয়ো না, আমরা দম্পতি। বনের মধ্যে এসব কা- করে প্রেমিক-প্রেমিকারা।

যেন ঝিল্লিমুখর পূর্ণিমারাত্রির গায়ে কেউ ঢিল ছুড়ল। যেন ছলকে এক কালো মেঘ ঢেকে দিলো সেতুর মুখ, তার মানে, বিয়ের পর প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো আমাদের স্পৃহা থাকতে নেই, আমাদের লিগ্যাল ঘর আছে বলে আমাদের মধ্যে আর প্রেম থাকতে নেই।

কেন তা থাকবে না? এইবার অনন্ত জড়িয়ে ধরে সেতুকে, আমি জানতাম এই পয়েন্টে এমনই রিঅ্যাক্ট করবে তুমি, বলে দুজন যখন একজন আরেকজনের খোলসগুলো খুলছে… তখন কাছেই কোথাও হলো রোল আর আর্তনাদ-ধ্বনি, শুনে সচকিত হতেই সেতু দেখে, তার প্রাণকে শূন্য করে অনন্ত চলে গেছে।

বিমূঢ় বিস্ময়ে আত্মার কান্নার হলাহল নিয়েও সে স্থবিরের মতো সেই কোরাসের দিকে এগিয়ে যায়, এতো রকম চিৎকার-ধ্বনির মধ্যে একটাই উচ্চকিত বেশি, এ কী করে হয়?

চিত্রার্পিতের মতো আলুথালু সেতু ভিড়ের কাছটায় যেতেই ওকে দেখে অনেকে সরে যায়।

ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দেখে সেতু, একটা রক্তেভেজা ডালের কাছে হুবহু কিছু আগের অনন্ত মরে পড়ে আছে।

দেশ দেশের হয়ে ভাববে ২ যৌনতা by আফসার আমেদ

অমৃত ছোট এই মফস্সল শহরে বসবাসের জীবনে, স্বেচ্ছাবসরের পঞ্চান্ন বছর বয়সে পৌঁছে ঘরটুকু তার পৃথিবী হয়ে উঠেছে। বিগত তিন বছর হলো স্ত্রী রণিতা ব্লাড ক্যানসারে মারা গেছে। অবসর জীবনের শুরু থেকে তার একা থাকার নিয়তি তাকে নিরুপায়তার মুহূর্তগুলিকে শূন্যতার যাপনে জীবন বাঁচিয়ে রাখার অহরহ নির্জীবতার লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তিনটি ঘর আর ডাইনিংয়ের পরিসরে থাকা। ছিয়াশি বছরের ঠাকুমা থাকে শুধু। তার বিশেষ অসুখজনিত অসুবিধে কিছু নেই। সেই ছোট ঘরের পৃথিবীতে সে-ই একমাত্র অসম বয়সের নারীসঙ্গী। সে অনেকটা সময় বয়সজনিত অসুবিধের কারণে বিছানায় বিশ্রামে থাকে। আর তাদের কাজের মেয়ে আরতি দুবেলা এসে বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘরদোর ঝাড়পোঁছ, রান্না ও দোকানবাজার পর্যন্ত করে দিয়ে যায়। সে-সব সে দ্রম্নততার সঙ্গে করে যায়। তার সঙ্গে মুখোমুখি দু-চারটে কথা বলারও সময় রাখতে দেয় না। অমৃত মোবাইলে তার একমাত্র সমবয়সী বন্ধু নবীনের সঙ্গে কথা বলে, কথা বলার সময় তখনই তাকে বলতে দেয় যখন সে মুহূর্তের ছোট কোনো উজ্জীবনের টুকরো আলোর মধ্যে পৌঁছে যায়।

নবীনের সঙ্গে এমনসব কথা হয় সেসব কথা বিগত স্ত্রী রণিতাকে বলতে পারত না। সে মনে করে দেখেছে সব মানুষের দাম্পত্যের জীবনেই স্ত্রীকে না বলতে পারার কিছু কথা থেকে যায়। তার সঙ্গে যৌনমুহূর্ত যাপন করার মধ্যেও আনন্দবোধের অনেক কিছু গোপন রেখে যেতে হয়। সেখানে কখনো কখনো মুহূর্তে মনে হয় সে স্বেচ্ছাচারী। নিজের আনন্দটুকুর ভেতরে স্বার্থপরও। সেখানে সে তার অপরাধ ও অক্ষমতা গোপন করে যায়। সেই রকম অনেক কিছু কথা বন্ধুকে বলা যায়, সে-রকম বন্ধু হলেই। নবীন সে-রকম এক বন্ধু। জীবনে বন্ধু এক-দুজনই থেকে যায়। এই পৃথিবীতে বন্ধুর অভাব প্রত্যেক মানুষই বোধ করে হয়তো। এখন সে বসবাসের পাড়াতে নির্বান্ধব।

তার এখন সঙ্গী হয় কিছু স্মৃতি ও টিভির নিউজ চ্যানেল। রাষ্ট্র ও রাজনীতি, সামাজিক অপরাধ, সন্ত্রাস এসবের আপডেট রাখে। তার মধ্যে অনেকটা সে অসুখী ও ক্ষুভিত হয়ে ওঠে। নিজের মধ্যেই সে প্রতিবাদ নিরুচ্চার ও লুকিয়ে রাখে। সে-সব কথা নবীনের সঙ্গে শেয়ার করে। এইটুকুই। তার এই রাষ্ট্রিক জীবনের অসূয়া বোধগুলিতে আহত হয়ে নিজেকে রাখে। সে এসবের কিছু নয়, কেউ নয় বলে মনে মনেই সাজায় তার প্রতিক্রিয়া। সে-সব কথা সমাজে রাষ্ট্রে পৌঁছয় না, সে একা থাকার ঘরে তখন নিজেকে সমাজ ও রাষ্ট্রের নিকটবর্তী মনে করেও অপ্রকাশিত থেকে যায়। সে মনে করে এই অপ্রকাশিত প্রতিবাদের ইতিহাস আছে, ঘরে ঘরে অনেক নিঃসঙ্গ নিরুচ্চার মানুষের প্রতিবাদ সংগঠন গোপন সক্রিয় আছে। দেশ দেশের হয়ে ভাববে!

সন্ধ্যায় শুরু করে রাত দশটা-এগারোটা পর্যন্ত ঠাকুমা আশা দেবীর কাছে, মুখোমুখি নয়, পাশাপাশি বসে অনেকটা সময় কাটে। তারা তখন টিভির সামনে অভিমুখী থাকে। ঠাকুমা একটার পর একটা সিরিয়াল দেখে যায়। এতেই আশা দেবী সময় কাটায়। নিজেকে রাখে। আশা দেবীর সঙ্গ দেবার কারণেই অমৃত সে-সব সিরিয়াল দেখেও। যেন দেখেও দেখে না। দেখা শেষ হয়ে যাওয়ার পর মনেও থাকে না। মাঝে মাঝে উঠে গিয়ে নবীনের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলে ফিরে এসে আবার যখন সিরিয়াল দেখাতে যোগ দেয়, মোবাইলে এতক্ষণ কথা বলার বিয়োগ সময়টুকুর জন্য সিরিয়াল না দেখাটুকুর জন্য কোনো খেদ জন্মায় না।

এখন বিকেল। মার্চের প্রথম সপ্তাহ। এখন অমৃত এ ঘর থেকে এ ঘরে, তিনটে ঘর ও ডাইনিং বারান্দা, রান্নাঘর বাথরুম একটা থেকে আরেকটা ঘরে যায়। যাওয়া-আসা তার চলতে থাকে, এমনভাবে তার যাওয়া হয় যে সে কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে যাওয়া-আসা করছে। যেন তার স্ত্রী রণিতার কাছে যাচ্ছে। যে-ঘরে সে রণিতাকে খুঁজে পাচ্ছে না, সে তখন অন্য ঘরে যাচ্ছে। যেন এক সম্মোহিতের মধ্যে যাওয়া-আসা করছে। এই যাওয়াকে যাওয়া করছে, ব্যর্থযাত্রা কখনো মনে করছে না। কেন না। সে যাওয়াটাকে বাস্তবতার ধ্যানে প্রেমে-ভালোবাসায় বিগত যাওয়া ও খুঁজে পাওয়ার জাদুকরি মুহূর্তের টানে করছে। এটাকে সে বেঁচে থাকার ভেতর মিশিয়ে দিচ্ছে। সে জানে রণিতার মৃত্যু হয়েছে কয়েক বছর আগে। তবুও তার এভাবে যাওয়া ও খোঁজার মুহূর্তগুলিকে প্রাণ মনে করছে। এই বুঝি তাকে দেখে হেসে ফেলবে। বলবে, ‘আর একবার চা খাবে তো? দিচ্ছি।’ অমৃতর মনে হলো রণিতাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। কিংবা তাকে নিজের দিকে টেনে এনে ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে চুমু খেল। অমৃতর হৃদয় তখন বলে উঠল, ‘আজ রাতে কিন্তু’ – রণিতা তাকে ছদ্মরাগ করে ঠেলে সরিয়ে দিলো। মুখ তার লাল হয়ে উঠল। বলল, ‘এখান থেকে এখন যাও, রান্না পুড়ে যাবে।’

অমৃত বলল, ‘এইভাবে তোমাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ চুমু খেতে থাকি না কেন, রান্না পুড়ে যাক, আমরাও পুড়ে ধ্বংস হয়ে যাই এসো।’

‘এত পাগলামি’ –

‘ভালোবাসায় পাগলামি তো লাগেই।’

‘তুমি মজা মারতে এসেছ এখন আমার সঙ্গে।’

‘জীবনে মজারও মানে আছে। এখন এই মুহূর্তে আমাকে সরিয়ে দিতে চাইলে, অস্বীকার করতে চাইলে পৃথিবীর কত মানুষের বিষণ্ণতার ভেতর থাকা কত মানুষের হাসি হারিয়ে যাবে, দেখতে পাচ্ছ কি?’

‘কত মানুষের?’

‘আট কোটি, দশ কোটি আরো বেশি হতে পারে।’

কথার জাদুতে আকৃষ্ট হয়ে রণিতা বলে, ‘তাই?’

‘আমি যখন কল্পনা করতে পারছি, আমার এই মুহূর্তের প্রেমে তারাও থাকতে পারে, আট কোটি দশ কোটি বলাটা হয়তো ভুল হলো। তারও অনেক বেশি।’

‘তোমার এই হাবিজাবি কথা বলা’ – মুখ আরো লাল হয়ে উঠল রণিতার।

‘শুনতে খারাপ লাগছে।’

‘খুব খুব ভালো লাগছে!’

‘কোটি কোটি মানুষের তেমনটাই লাগে।’

‘আঠারো বছর বিয়ে হয়েছে আমাদের। আমরা সমত্মান পাইনি বলেই কি’ –

‘সমত্মান পাওয়ার জন্যই যে নারী-পুরুষ মিলিত হয়, এটা একটা ধ্বংসাত্মক কথা। হাজার বছর আগে মৃত মানুষকে মাটি খুঁড়ে বের করে আনলে, সেই কঙ্কালও প্রমাণ করবে না এই কথা।’

‘কি যে বলো তুমি, তোমার কথার মানে বুঝতে পারি না।’

‘আমার এই কথার কোনো মানে নেই, কথার ভেতর আর এক কথা খুঁজি। এই সব কথায় তোমার কি খুব রাগ হয়?’

‘মনে হয় কথা দিয়ে তুমি আমাকে ভালোবাসছ।’

‘আর কী?’

‘আর কিছু নয়, বলার ভাষা পাচ্ছি না।’ ডুকরে কেঁদে ওঠে রণিতা।

‘ভালোবাসায় তোমার কান্না পায়?’

‘পায়।’

‘আনন্দিত হও তো?’

‘হই।’

সেই কাল্পনিক দৃশ্যের সামনে অমৃত চুপ করে থাকে। সে যেন রণিতাকে দেখতে পায়। কতবার তো তারা কাছাকাছি থেকে কিছু না বলে বলা-অতিরিক্ত বলা তৈরি করেছে। সেই প্রেমময়তার আস্বাদ শীতে রোদ পোহানোর মতো করে গ্রহণ করে চলেছে। যেন তারা চাইছে এই মুহূর্ত নিরবচ্ছিন্ন থেকে যাক পাথর কেটে ভাস্কর্যের রূপ নিয়ে, অনন্তকাল সৌন্দর্যের মহাঘ্রাণ দিয়ে যাক পৃথিবীর সবকালের সব দেশের সব মানুষের কাছে।

রণিতা তেমনই দাঁড়িয়ে আছে।

অমৃত তার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝতে চাইছে তার না-বলা কথাগুলিকে। স্থির নিষ্কম্প দাঁড়িয়ে আছে তারা। সময় গড়িয়ে যেতে থাকে। একসময় অমৃত বলে ওঠে, ‘তাহলে তুমি মরে গেলে কেন?’

রণিতা বলল, ‘তা তো জানি না, মরে গেছি কিনা?’

‘তাই তো মনে হচ্ছে, মরে যাওনি। কোনোদিন কোনো মানুষই মরে যায় না।’

‘আমি আছি, তোমার কাছেই আছি। তুমি খুঁজতে থাকো বলে আমাকে পাও।’ ডুকরে কেঁদে ওঠে রণিতা।

অমৃত তার এই কান্নায় থাকা রণিতাকে দেখতে চায় না বলে সেই সম্মোহিত বাস্তবতা সরিয়ে দিয়ে ফিরতে থাকে রান্নাঘরের দিক থেকে।

আর সেই মুহূর্তেই কাজের মেয়ে আরতি এসে রান্নাঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, অমৃতের বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়।

তখন সন্ধ্যা নেমেছে। চোখের মনে অমৃতের অশ্রম্নর মতো যত তার ভাবমোক্ষনের বেদনা ছিল, অশ্রম্ন উপমার আধারিত যত সব প্রেম ছিল, সে সমস্ত দ্রম্নততার সঙ্গে সরিয়ে ফেলে। রণিতাকে লুকিয়ে রাখে চোখের মনে, যৌনতার অনুষঙ্গকে শরীরের মনে লুকিয়ে রাখে।

আরতি চা দেবে এখনই। সেই অপেক্ষার সময়টা মুছবার জন্য চলে যায় অমৃত বাথরুমে আয়নার মুখোমুখি। তার মুখ থেকে বিষণ্ণতা এখনো সরে যায়নি? সরে যেতে দেয়। সেটাকে চেষ্টাকৃতভাবে সরিয়ে রাখে। এবং আরশিতে একটি হাসি রাখে, সেটাকে দর্পণে রেখেই ডাইনিংয়ে বেরিয়ে এসে বসে ডাইনিংয়ের সোফায়। ধূমায়িত চা দিয়ে গেছে আরতি। দুখানা বিস্কুটও। বাহ্!

আশা দেবী সিরিয়াল দেখেই চলেছে। ঠাকুমার পাশে সে বসেনি। তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য সে যখন গিয়ে তার পাশের চেয়ারে বসে তখনই টিভির মুখোমুখি হয় অমৃত। এখন টিভির কথা সে শুনছে। কাল্পনিক, বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই, মিল থাকলেও তা কাকতালীয়। এটা একটা অসত্য নিয়ে মিথ্যা বাস্তবতার বাণিজ্যযাত্রার বমন। শিল্পবোধ সাহিত্যবোধ কিছুই থাকে না। থাকে গৃহসিংসা। ধনী পাত্রপাত্রীর সঙ্গে কখনো গরিব পাত্রপাত্রীর বিয়ে। সে-সব বিয়ে কনট্রাকচুয়াল, কখনো বারবার বিয়ের রীতি ও লোকাচার থাকে। একবার বিয়ে হওয়ার পর একই পাত্রপাত্রীর একাধিক বিয়ে হয়। সমস্ত পাত্রপাত্রী যারা দাম্পত্যে থাকছে তাদের মধ্যে যৌনজীবন নেই। যৌনতার প্রেম ও আনন্দসৌন্দর্য এতই জীবনসংলগ্ন যে তাকে এড়িয়ে যায়। অমৃত মধ্যপঞ্চাশে পৌঁছে যৌনতার বোধ, স্ত্রী বিয়োগের দশায় থেকেও সে-বোধ সে হারিয়ে ফেলে না। দাম্পত্যসংসর্গের এই শারীরিক প্রেমময়তার ক্ষুণ্ণতায় থাকে। সিরিয়ালে সেই বোধ নিরুদ্দেশ। তবুও সবাই দেখে। কোটি কোটি মানুষকে সে-সব দিয়ে বাণিজ্য করে। এটাই আমাদের দেশ। ‘আকাশ কুসুম’ সিরিয়ালে দাম্পত্যের মধ্যে যৌনতা নেই। আছে যৌনহিংসা। ‘জয় রবীন্দ্র’ সিরিয়ালেও, ‘আহ্লাদি’তেও। কত আর বলবে। সেসব সিরিয়াল শেষ হয়ে গেলে দ্রম্নত সিরিয়ালের নাম ও পাত্রপাত্রীর নাম ভুলে যায়। তখন চরিত্র-নামে নায়ক-নায়িকার নাম আত্মপরিচয় পেয়ে থাকে না। আমাদের পাশের ঘরের, পাড়ার ও বৃহত্তর সমাজের মানুষ থাকে না। তারা কারা? কোন দেশের মানুষ? দেশ নেই, কাল নেই, চেনা মানুষের ভেতর পাত্র-পাত্রীরাও নেই। এ-বিষয়ে দেশ কি দেশের কথা ভাববে।

অমৃতর ঠাকুমা আশা দেবী এসব দেখে। তাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য অমৃতও দেখে। সারাক্ষণই সে নিজেকে তুলে নিয়ে চলে যায় বাথরুমে যাওয়ার ছলনায়। কখনো নবীনের ফোন এলে মোবাইল নিয়ে বারান্দায় গিয়ে বাঁচে। কখনো নিজে থেকেই বারান্দায় চলে গিয়ে বাঁচে।

এখনই অমৃতর অসহ্য বোধ হলো। মোবাইল হাতে সে পৌঁছে গেল বারান্দায়।

‘হ্যালো নবীন, তুই কী করছিস?’

‘এই পড়ছিলাম।’

‘কী বই?’

‘ধুলোমাটি। ননী ভৌমিকের।’

‘কেমন লাগছে?’

‘বেশ উত্তেজিত হবার মতো।’

‘দেশভাগ নিয়ে আরও উপন্যাস আছে।’

‘হাসান আজিজুল হকের আগুন পাখি পড়েছি। বেশ ভালো। তুই কী করছিলি?’

‘টিভির সামনে বসে কিছু কথা ভাবছিলাম।’

‘কী ধরনের কথা ভাবছিলি?’

‘সে-এক অদ্ভুত বিষয়।’

‘কী অদ্ভুত?’

‘যৌনতা নিয়ে?’

‘ভালো বিষয় তো। সমাজে জীবনে সাহিত্যে এর কদরই নেই। তোর বউ নেই, তুই-ই বুঝতে পারবি যৌনতার গুরুত্ব। সমাজ তাকে যেমন গোপন রাখতে চেয়েছে, তার সৌন্দর্যের বোধকে আড়াল করে গেছে বেশি। এই নীরবতা নিরুচ্চার রাষ্ট্রও গোপন রাখছে। মানুষের জীবনের এই অত্যাবশ্যিক বিষয়টা সমাজে নান্দনিকতার পরিসরে না গিয়ে ধর্ষণ, গণধর্ষণে চলে গেছে। সমাজে যত ধর্ষণ হয় বিবাহিত পুরুষের কাছে স্ত্রীরা বেশি ধর্ষিত হয়ে চলেছে। এত বেশি গোপন অপরাধের কথা দেশ দেশের হয়ে ভাববে!’

‘কি জানি।’

‘তুই রণিতাকে হারিয়ে আছিস – বেঁচে থাকার মন্ত্র তুই হয়তো জানিস।’

‘জানি। আমি কল্পনার ভেতর নিজ দেহরূপকে কাজে লাগাই। ভালো লাগে। শান্ত হই। বেঁচে থাকার মুহূর্তগুলির ভেতর পবিত্র শমিত হই।’

‘বেশ বেশ। ঠাকুমা কী করছে?’

‘সারাক্ষণ বসে বসে টিভি সিরিয়াল দেখছে।’

‘হ্যাঁ, সেটাতেও তার বিকল্প বেঁচে থাকার কোনো কিছু।’

‘কী রান্না হচ্ছে?’

‘আরতি বাজার থেকে যা এনেছে তার একটা কিছু দিয়ে খাব।’

‘তুই তো নিজে বাজারে গিয়ে পছন্দমতো মাছ কিনে আনতিস।’

‘এখন আর যাই না।’

‘কেন?’

‘চেনা মানুষগুলো অচেনা মানুষ হয়ে উঠেছে বলে। অপরিচয়ের সমাজ এখন আমার মনে হয় ভেংচি দেয়।’

‘তুই তাদের পাত্তা দিবি না। না দেখার ভান করবি।’

‘কবে আসবি আমার কাছে?’

‘দুদিন পর শনিবারেই দুটো বিয়ার নিয়ে যাব। স্ট্রং?’

‘না, লাইট।’

‘এখনই বউ দোকানে যেতে বলেছে, জিরে গুঁড়ো কিনতে। রাতে শোবার আগে তোর সঙ্গে আমি নিজেই ফোন করে কথা বলব।’

‘ঠিক আছে রাখছি। ফোন করবি কিন্তু।’

নবীন ফোন কেটে দেয়।

বাধ্যত অমৃত আশা দেবীর পাশে বসে এসে। টিভি সিরিয়ালের মুখোমুখি তাকে বসতেই হয়।

আর সেই সময় লোডশেডিং হয়ে যায়। ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। টিভি দেখা থেকে নিষ্কৃতি পায়।

আশা দেবী বলল, ‘বুড়ো, তুই মোমবাতি খুঁজে জ্বালাতে পারবি না?’

‘কোথায় রেখেছে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজতে খুঁজতে জেরবার হয়ে যাব। মোমবাতি আর দেশলাইকে একসঙ্গে করতে সে খুব হাঙ্গামা। একটু পরেই কারেন্ট এসে যাবে। তার চেয়ে অন্ধকারে থাকা কি ভালো নয়? তোমার ভয় করবে?’

‘একটাই ভয়, বয়েস হলো সবসময়ই মনে হয় এই এক্ষুনিই মৃত্যুর সময় এসে পড়বে।’

‘ভয় পাও কেন, আমি তো তোমার পাশে বসে আছি।’

‘আমার বাঁ হাতটা ধরে রাখ।’

অমৃত আশা দেবীর বাঁ হাতটা চেপে ধরে মুঠোর মধ্যে রাখে।

জরার হাত মৃতপ্রায় মানুষের মতো। অমৃত চুপ করে থাকে।

আশা দেবী বলে, ‘বুড়ো ভাই চুপ করে আছিস কেন? কথা বল।’

অমৃত কিছু ভেবে নিয়ে বলল, ‘আমি যা জিগেস করব, তার ঠিকঠিক উত্তর মনের ভেতরের সঞ্চিত কথা সত্যির অক্ষরে বীণার সুরের মতো বলবে?’

‘কী কথা বুড়ো? এমন কী কথা বুড়ো তুই আমার কাছ থেকে জানতে চাস? তোর প্রশ্নের ধরনের ভেতরে আমার ভয় করছে। আমি নারী তো! আমি নিঃশব্দতার ভেতর অনেক কিছু শুনতে পাই। পুরুষের চাহনির ভেতর আমি সেই পুরুষের অভিসন্ধি পড়ে ফেলতে শিখে এসেছি।’

‘তুমি তো এখনো নারীই। সেজন্যে চাইছি।’

‘তুই তো আমার হাত ধরে আছিস বুড়ো, এই বয়সেও পুরুষের স্পর্শের প্রেমময় অনুভূতি পাচ্ছি।’

‘তুমি কি নিজের পুরুষের কাছে খেলনার মতো ছিলে?’

‘কখনো ছিলাম, কখনো নয়।’

‘যৌন সংসর্গের অনুভূতি কেমন ছিল?’

‘আমাকে কাঁদতে দিস না বুড়ো।’

‘কেন?’

‘সেই সব অনুভূতি অনন্তকালীন হলো না বলে।’

‘তুমি কি যৌন অনুভূতিকে খুঁজে পাও নিজের মধ্যে?’

‘তোর হাতের স্পর্শের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছি। এখন স্মৃতিতে পাই, কল্পনায় পাই, প্রকৃতির নানা রূপ আলোছায়া এসব মাথার ভেতর আমি এখনো চিরযৌবনা হতে চাই। কিন্তু আমি জানি আমার জীবনের আলো ফুরিয়ে এসেছে।’

‘এ-কথা মৃত্যুর শেষ শ্বাস পর্যন্ত বলতে নেই। তোমার বাঁচাটা তোমার কাছে চিরকালীন হয়।’

‘বুড়ো, বুড়ো, ও বুড়ো, তুই এত কথা কী করে জানলি?’

‘এক কথায় তা বলা যায় না, বাঁশি জানে, সেতার জানে, সরোদ জানে। রাগে, খেয়াল ঠুমরির ভিতর দিয়ে ওস্তাদ ও প–ত গায়করা জানিয়ে যেতেই থাকে। থাকে শিল্পে সাহিত্যে ভাস্কর্যে।’

আশা দেবী চুপ করে যায়। কিছু বলে না। নিঃশব্দতার ভেতর কত কথা বলে যেন।

অমৃত হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইছে, এই অনুভূতি পেয়ে আশা দেবী আর্তনাদের মতো বলে উঠল, ‘হাত ছাড়িস না বুড়ো, আমার হাত ধরে রাখ।’ কেঁদে উঠল আশা দেবী, অমৃতর মনে এলো পৃথিবীর সব নারীই এমনভাবে কাঁদে।

Wednesday, January 13, 2021

হাজারদুয়ারি প্রাসাদের ১০০ দরজা নকল! by আসাদুজ্জামান সরদার

হাজারদুয়ারি প্রাসাদ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শহর মুর্শিদাবাদে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হাজারদুয়ারি প্রাসাদ। স্থানীয়দের মতে, একহাজার দরজা রয়েছে বলে এমন নামকরণ। প্রাসাদে ৯০০টি প্রকৃত দরজা আর বাকি ১০০টি দরজা নকল। এর কারণ চমকপ্রদ।
হাজারদুয়ারি প্রাসাদ নবাব আর ব্রিটিশদের বিচারালয় হিসেবেও ব্যবহার হতো। বিচারকার্য পরিচালনার সময় কেউ যেন পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য বিচারপ্রার্থীদের বোকা বানাতে ও শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে একহাজার দরজার মধ্যে ১০০টি নকল রাখা হয়। বাকিগুলো একটি চাবি দিয়েই খোলা ও বন্ধ করা যায়।
ভাগীরথী নদীর তীরে ১২ বিঘা জমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৮০ ফুট উচ্চতার হাজারদুয়ারি প্যালেস। বর্তমানে ভারত সরকারের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে রয়েছে এটি। এর বর্তমান নাম হাজারদুয়ারী প্যালেস মিউজিয়াম।
হাজারদুয়ারির মূল স্থপতি ডানকান ম্যাকলয়েড। নবাব নাজিম হুমায়ুনজার আদেশ অনুযায়ী তার তত্ত্বাবধানে প্রাসাদটি নির্মিত হয়। বাঙালি সন্তান সগুর মিস্ত্রী ছিলেন তার সহকারী।
প্রাসাদটি তিনতলা। একতলায় অস্ত্রাগার, অফিস-কাছারি ও রেকর্ড রুম। অস্ত্রাগারে মোট ২ হাজার ৬০০টি অস্ত্র আছে। বর্তমানে এই জাদুঘরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করা মুহাম্মদী বেগের অস্ত্র, পলাশীর যুদ্ধে ব্যবহৃত মীর মর্দনের কামানসহ অনেক অস্ত্র, প্রজাবৎসল নবাব আলীবর্দীর ব্যবহৃত তলোয়ার ও বহুনল বিশিষ্ট বন্দুক, মীরকাসিমের ছোরা, নাদির শাহের মাথার বর্ম, বিভিন্ন ধরন ও আকারের কামান, বিভিন্ন ধরনের ছোরাসহ দুর্লভ সংগ্রহ রয়েছে এখানে।
হাজারদুয়ারি প্রাসাদ
একতলা প্যালেসের সামনের বিশাল সিঁড়িটি দরবার পর্যন্ত উঠে গেছে। সামনে লম্বা গোলাকার স্তম্ভে সুন্দর নকশার কাজ রয়েছে। সিঁড়ির দু’পাশে দুটি সিংহ মূর্তি ও দুটি ছোট সেলামি কামান। তিনতলায় বেগম ও নবাবদের থাকার ঘর, দোতলায় দরবার হল, পাঠাগার, অতিথিশালা। দোতলা ও তৃতীয় তলায় আর্ট গ্যালারি ও লাইব্রেরি। গ্যালারিতে বহু বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর চিত্রকলা আছে এখানে। লাইব্রেরিতে রয়েছে বহু ধর্মপুস্তক, চুক্তিপত্র, নাটক, উপন্যাস, তাম্রলিপি, ইতিহাস, প্রয়োজনীয় দলিল-দস্তাবেজ, বিদেশি ভাষার গ্রন্থ ইত্যাদি। সম্রাট আকবরের সময়কার আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরির পাণ্ডুলিপি ও বাগদাদের বিখ্যাত লেখক হারুন অর রশিদের হস্তলিখিত কোরআন শরীফ রয়েছে এখানে। এছাড়া আছে নবাব আর ইংরেজদের ব্যবহৃত বহু অস্ত্র, বাসন, আসবাব, বহু বিখ্যাত শিল্পীদের হাতে আঁকা ছবি।
স্থানীয় গাইড মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘হাজারদুয়ারি প্রাসাদ বাংলার এক ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর স্থাপত্যে নবাবি আমলের উজ্জ্বল প্রতিফলন রয়েছে। মুর্শিদাবাদে পর্যটকদের কাছে প্রধান আকর্ষণ ব্রিটিশ আমলের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এই জাদুঘর। এখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।’
এই গাইডের ভাষ্য, ‘অনেক পর্যটকের ধারণা, হাজারদুয়ারি প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাউদ্দৌলা। কিন্তু তার মৃত্যুর প্রায় ৮০ বছর পর মীর জাফরের পঞ্চম বংশধর নবাব হুমায়ুনজা এটি স্থাপন করেন। সিরাজের প্রাসাদের নাম ছিল হীরাঝিল। পরে তা ভাগীরথী নদীতে বিলীন হয়ে যায়।
১৮২৯ সালে হাজারদুয়ারি প্রাসাদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। আট বছর ধরে চলে এটি। এতে ব্যয় হয় ১৮ লাখ টাকা। কথিত আছে, গাঁথুনির কাজে ইট-চুন-সুরকির সঙ্গে খয়ের জল, আখের গুড়, ডিমের কুসুম ইত্যাদি ব্যবহার করে এই দরজা তৈরি হয়েছিল। রানি ভিক্টোরিয়ার উপহার দেওয়া ১০১ বাতির একটি সুদৃশ্য ঝাড়বাতি হাজারদুয়ারির ভেতরে পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
হাজারদুয়ারি প্রাসাদের ঘড়িঘর
প্যালেসের সামনে রয়েছে মনোরম বাগান। এর পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ভাগীরথী নদী। হাজারদুয়ারির ভেতরে মোবাইল ফোন বা ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া বারণ। কারও কাছে এগুলো থাকলে সরকারিভাবে টোকেন দিয়ে জমা নেওয়া হয়। হাজারদুয়ারি শুক্রবার বন্ধ থাকে। প্রবেশ মূল্য ১০ রুপি।
ইতিহাস সাক্ষী হাজারদুয়ারির ঠিক মুখোমুখি রয়েছে বড়া ইমামবরা। হাজারদুয়ারি ও ইমামবরার মাঝখানে মদিনা মসজিদ। সিরাজউদ্দৌলার তৈরি করা স্থাপনার মধ্যে শুধু এই মসজিদ টিকে আছে। মদিনা মসজিদের সামনে বাঁধানো বেদীর ওপর রাখা আছে বাচ্চাওয়ালী কামান। হাজারদুয়ারির সামনের পূর্ব পাশে আকাশছোঁয়া ঘড়ি ঘর পশ্চিমমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুর্শিদাবাদবাসী ও ভাগীরথী নদীতে চলাচলকারী যাত্রীবাহী নৌকা ও জলযানের মাঝি-মল্লার ও যাত্রীদের সুবিধার্থে ঘড়িটি নির্মাণ করা হয়।
মুর্শিদাবাদের ইতিহাস
মুর্শিদাবাদের নাম ছিল মাকসুদাবাদ। মোগল সুবেদার মুর্শিদ কুলি খান ১৭১৭ সালে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মাকসুদাবাদে স্থানান্তর করেন। তিনিই বাংলার প্রথম নবাব। তার নামানুসারে মুর্শিদাবাদের নামকরণ হয়। নবাবি আমলে বাংলা, বিহার ও ওড়িষ্যার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ। এটি নবাবি আমলের ঐতিহাসিক এলাকা। শুধু নবাব নয়, মীর জাফরসহ ইতিহাসের খলনায়কদের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে এখানে। তাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এই শহরে বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের সমাগম হয়ে থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অনেকে ইতিহাস ও নবাবি আমলের বিভিন্ন স্থাপনা দেখতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস ঐতিহ্যবাহী জেলা মুর্শিদাবাদে ভিড় করেন।
মুর্শিদাবাদের আকর্ষণ
হাজারদুয়ারি প্রাসাদ (মিউজিয়াম), বড়া ইমামবরা, বাচ্চাওয়ালী তোপ, ঘড়িঘর, চক মসজিদ, ত্রিপোলি গেট, খোশবাগ, কাটরা মসজিদ, মতিঝিল, নসিপুর প্রাসাদ, কাঠগোলা বাগানবাড়ি, কাশিমবাজার রাজবাড়ি, ওসেফ মঞ্জিল, জগৎ শেঠের বাড়ি, নশীপুর রাজবাড়ি, নশিপুর আখড়া, মীর জাফরের বাড়ির গেট, জাফরাগঞ্জ সমাধি, আজিমুন্নেসা বেগমের সমাধি, হলুদ মসজিদ, ফুটি মসজিদ, জাহান কোষা কামান, উনিচাঁদের মন্দির, রাধামাধব মন্দির, ইংরেজ সমাধি, সুজাউদ্দিনের সমাধি, মীরমদনের সমাধি পলাশী, আস্তাবল ইত্যাদি।
যেভাবে যাবেন
বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১৯৮ কিলোমিটার দক্ষিণে ও কলকাতা থেকে ২০৯ কিলোমিটার উত্তরে মুর্শিদাবাদ। কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশন থেকে লোকাল ট্রেন বা এক্সপ্রেসে লালগোলা, হাজারদুয়ারি ও ভাগীরথীতে যাওয়া যায়। লোকাল ট্রেনে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে মুর্শিদাবাদের ভাড়া ৪৫ টাকা। সড়ক পথে ৩৪ নং জাতীয় সড়ক ধরে বা শিলিগুড়ি মালদা বাসে চড়ে প্রথমে বহরমপুর ও পরে বাস, রিকশা, অটোরিকশা, জিপ ভাড়া করে মুর্শিদাবাদ যেতে হবে।

Tuesday, January 12, 2021

গিরিশ কারনাড এবং তার ঘোড়ামুখো হয়বদন by ইরা সামন্ত

১৯৭১ সালে প্রকাশিত হয় গিরিশ কারনাডের নাটক হয়বদন  বা হায়াবাদানা । নাটকটি টমাস মানের উপন্যাসিকা দ্য ট্রান্সপোজড হেডসর মূলভাবের পুনঃনির্মাণ, যেটাকে তিনি এগারো শতকের কথাসরিৎসাগরের অনুসরণে ভারতীয় করে তোলেন।
হয়বদন নাটকের সর্বত্রই একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয় : ‘আত্মা’ ‘আমিত্ব’ ‘স্বয়ং’ ব্যাপারটি কোথায় থাকে? শরীরে নাকি মনে?
নাটকের প্রথম অঙ্কে মানুষের দেহকে বিবেচনা করা হয়। হয়বদন এমন ব্যক্তি যিনি ঘোড়ার মাথাওয়ালা একজন মানুষ। যিনি খুঁজে চলেছেন কীভাবে নিজেকে পরিপূর্ণ মানুষরূপে সম্পূর্ণ করা যায়, কারণ তিনি পুরোপুরি ঘোড়াও না, আবার পুরোপুরি মানুষও না। তিনি স্বর্গীয় রাজকুমারীর সন্তান, যে তাকে জন্মের পর থেকেই ঘৃণা করে। কারণ হয়বদনের পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিচয় নেই, আজকের দুনিয়ায় যা প্রাসঙ্গিক। যেন কারনাড একটি কাজের খণ্ডিত অংশের ভেতর দিয়ে একটি অপূর্ণ মোটিফের মাধ্যমে অস্তিত্ববাদ অনুসন্ধান করেছেন। শূন্য থেকে তাকালে হয়বদনকে মনে হবে অসম্পূর্ণতার প্রতিমূর্তি। তার এই সমস্যা সমাধানে নাটকের কথক তাকে চিত্রকূট পাহাড়ে গিয়ে দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে বলেন।
নাটকে কাহিনির স্থান ধর্মপুর। গোটা নাটকটি এগিয়ে চলেছে কথক অধিকারী মশাইয়ের বয়ানে।
দ্বিতীয় অঙ্কে দেখা যায় দেবদত্ত ও কপিলা যাথাক্রমে তাদের বিদ্যা ও শারীরিক সৌষ্ঠবের জন্য ধর্মপুরে বিখ্যাত—তারা একে অপরকে ভালোবাসে। কিন্তু হঠাৎ পদ্মিনী নামে এক সুন্দরী নারীকে কেন্দ্র করে শুরু হয় দু’জনের টানাপোড়েন।
দেবদত্ত শিক্ষিত ব্রাহ্মণ—কবিতা লেখে, শারীরিকভাবে চলাফেরায় অক্ষম, কপিলা ক্ষত্রিয়—পালোয়ানের মতো শক্তিশালী এবং সুন্দরী। প্রথম পরিচয়ে পদ্মিনীও কপিলার শক্তিমত্তায় আকৃষ্ট হয়। শেষমেশ দেবদত্ত ও কপিলার প্রণয় ভেঙে দেওয়া হয়, দেবদত্তের সাথে বিয়ে হয় পদ্মিনীর, কারণ জাতে সে ব্রাহ্মণ। সমাজের নিয়মে কপিলাকে সে বিয়ে করতে পারবে না। এদিকে, বিয়ের পর দেবদত্তের শারীরিক অক্ষমতা পদ্মিনীকে হতাশ করে, আর দেবদত্ত ও কপিলা একে অপরকে না পেয়ে কালক্রমে দু’জনেই আত্মহত্যা করে। পরে যদিও মা কালীর আশীর্বাদে প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু পদ্মিনীর ‘স্বেচ্ছাকৃত ভুলে’ দেবদত্ত ও কপিলের শরীর ও মাথার অদলবদল হয়ে যায়। পদ্মিনী বেছে নেয় কপিলার শরীর ও দেবদত্তের মাথা। কারণ প্রথম পরিচয়ে দেবদত্তের স্ত্রী পদ্মিনী প্রবলভাবেই কামনা করেছিল কপিলার শরীর।
নতুনভাবে জীবন ফিরে পাওয়ার পর দুটি জীবন দু’রকম আচরণ করে।
শরীর যে চিন্তার জন্য অপেক্ষা করে না এবং শুধু কাজ করে সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে নাটকের এই অঙ্কে। আমরা দেখি পদ্মিনী শারীরিক সক্ষমতার ব্যাপারে বেশি তৎপর, যা আজকের যুগের মতোই।
অবশেষে তাকে দেখি কপিলার শরীর এবং দেবদত্ত’র মাথার সমন্বয়ে গড়া মানুষটি তাকে শারীরিকভাবে সুখি করেছে—এজন্য সে অতিমাত্রায় উচ্ছ্বসিত।
এই নাটকে অনেক মজাদার শিক্ষা আছে, হাস্যরসের মধ্য দিয়ে আপনাকে গাঢ় একটি ঘুম থেকে জাগিয়ে হালকা করে দেবে। একই সাথে সহজ এবং চিন্তাশীল একটি সময় উপহার দেবে।
কারনাড নাটকে ভারতীয় মিথ, লোককথা এবং মহাভারত-রামায়ণ সহ যাবতীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে আধুনিক রীতিতে উপস্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি স্থানিক প্রেম, পরিণয় ও যৌনতাকে মিশ্রিত করেছেন। সব মিলিয়ে নাটকটি একটি উপভোগ্য পঠন।
ভারতীয় থিয়েটারের আত্মীয় এবং আধুনিক নাট্যকলার অন্যতম চিন্তক, নাট্যব্যক্তিত্ব গিরিশ কারনাড হয়বদন ছাড়াও বিশের অধিক নাটক লিখেছেন ইংরেজি ও কন্নড় দুই ভাষাতেই। ভারতীয় নাট্যাঙ্গনে বাদল সরকার, মোহন রাকেশ এবং বিজয় টেন্ডুলকারের মতো রথী-মহারথী নাট্যকারদের পাশে তার নাম উচ্চারিত হয়। তিনি ভারতীয় নাটককে দিয়েছেন এক অনন্য মাত্রা।
যখন তিনি নাটকে ইতিহাস উপস্থাপন করেন, তখন তিনি সমসাময়িকতাকেও স্পর্শ করেন। ১৫৬৫ সালে বিজয়নগর সাম্রাজ্য এবং চার সুলতানের মিলিত বাহিনীর যুদ্ধের কাহিনী অবলম্বনে রচিত রক্ষা টানগাডি নাটকটি এর জ্বলন্ত উদাহরণ।
১৯৩৮ সালের ১৯ মে বর্তমান মুম্বাইয়ে গিরিশ কারনাড জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন কর্নাটকে। পরে অঙ্ক এবং সংখ্যাতত্ত্বে স্নাতক হয়ে রাজনীতি এবং অর্থনীতি নিয়ে অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন। কাজ করেছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে। পরে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি অভিনয় ও লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন।
চার দশকের বেশি সময় ধরে নাট্য চর্চার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন কারনাড। ১৯৬১ সালে তার বিখ্যাত নাটক যাত্রী রাতারাতি তাকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়। এরপর একে একে মঞ্চস্থ হয় তুঘলক, হয়বদন-এর মতো বিখ্যাত নাটক। হিন্দি ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি ভাষার নাটক ও সিনেমায় অভিনয় করেছেন কারনাড। ছিলেন একাধিক সিনেমার পরিচালকও, যার মধ্যে রয়েছে কন্নড় ও মরাঠি ছবি।
১৯৬০ থেকে কন্নড় ভাষার লেখক হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন গিরিশ। ১৯৯৮ সালে জ্ঞানপীঠে ভূষিত হন। পরিচালক হিসেব ১৯৭৪ সালে পেয়েছেন পদ্মশ্রী, ১৯৯২ সালে ভূষিত হয়েছেন পদ্মবিভুষণ সম্মানে। পেয়েছেন চারটি ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডও।
১৯৭০-এ মুক্তিপ্রাপ্ত সংস্কার ছিল গিরিশের অভিনীত প্রথম সিনেমা।
তিনি জীবনে আলোচিত সমালোচিত দুটোই হয়েছেন। ২০১২ সালে রবীন্দ্রনাথকে "তিনি একজন মহান কবি, কিন্তু একজন মাঝারি মানের এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নাট্যকার" বলে আলোচনায় এসেছিলেন, কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র তিনি নন। আত্মপক্ষ সমর্থনে গিরিশ কারনাড দু’একটি যুক্তি দিয়েছিলেন। যেমন, রবীন্দ্রনাথ গরিব মানুষকে চিনতেন না, তাই তার নাটকে গরিব মানুষদের বানানো, অর্থাৎ কৃত্রিম, অস্বাভাবিক এবং অবাস্তব চরিত্র বলে মনে হয়। কেবল নাটক নয়, রবীন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাস, আখ্যান-কবিতা ইত্যাদি পড়তে গিয়েও অনেক সময়েই খটকা লাগে, সবাই কেমন যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষাতেই কথা বলছে, না? আমরা এই খটকাটুকুর কথাই বলতে পারি।
গিরিশ কারনাডের দ্বিতীয় যুক্তি, দু’একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথের নাটক দেশদুনিয়ায় বিশেষ অভিনীত হয়নি, তার সমকালের বাংলা মঞ্চেও খুব একটা নয়। এটা কোনও বিচারের প্রশ্ন নয়, তথ্যের প্রশ্ন, যাকে বলে ‘কোয়েশ্চেন অব ফ্যাক্ট’।

Sunday, January 10, 2021

পুদিনার যত গুণ

পুদিনা যেমন খাবারের স্বাদ বাড়ায়, তেমনি এর অনেক ঔষধি গুণও রয়েছে। হজমের শক্তি বাড়ানো থেকে শুরু করে নিঃশ্বাসে সজীবতা নিয়ে আসতে এর জুড়ি নেই। জেনে নিন পুদিনার উপকারিতা।

*শ্বাসনালী পরিষ্কার রাখে পুদিনা। শ্বাসকষ্টের রোগীরা নিয়মিত খেতে পারেন এটি। তবে অতিরিক্ত খেতে যাবেন না।
*সর্দি-কাশিতে পুদিনা চা পান করুন। আরাম মিলবে।
*নিয়মিত পুদিনা পাতা খেলে হজমে সহায়ক পাচক রসের ক্ষরণ বাড়ে। এতে অ্যাসিডিটি কমে। পাশাপাশি দূর হয় বদহজমের সমস্যাও।
*পুদিনা পাতায় থাকা ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
*একটি গ্লাসে পানি নিয়ে পুদিনা পাতা, লেবুর টুকরা, শসার টুকরা ও আদা কুচি দিন। বরফের টুকরা দিয়ে ভালো করে নাড়ুন। ঠাণ্ডা হলে পান করুন পুদিনা-পানি। গরমে পুদিনা-পানি শরীর রাখবে ঠাণ্ডা ও ঝরঝরে।
*নিয়মিত পুদিনা পাতা খেলে ত্বক ও চুল সুস্থ থাকে।
*নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ দূর করতে চিবিয়ে খান পুদিনা পাতা।

>>>তথ্য: এনডিটিভি