Showing posts with label শুভ্র দেব. Show all posts
Showing posts with label শুভ্র দেব. Show all posts

Wednesday, July 29, 2026

পার্টি ড্রাগে উন্মাতাল ডিজে by শুভ্র দেব

ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। মুখে দামি প্রসাধনীর মেকআপ। পরনে স্লিভলেস ওয়েস্টার্ন পোশাক। পায়ে হাইহিল জুতা। হাতের আঙ্গুলে জ্বলছে সিগারেট। আরেক হাতে মদের গ্লাস। স্টেজে বাজছে ইংরেজি-হিন্দি গান। বিটের তালে তালে কাঁপছে পার্টি রুমের চার দেয়াল। তার সঙ্গে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, মধ্যবয়সী নারী-পুরুষদের উন্মাতাল ডিজে। কখনো তারা একে ওপরকে জড়িয়ে ধরছেন। কখনো হাতে হাত রেখে নাচছেন। পেশাদার ডিজেদের একের পর এক গান পরিবেশন আর তাদের সঙ্গে নেচে-গেয়ে বিরামহীন উন্মাতাল রাত কাটিয়ে দিচ্ছেন অতিথিরা। যদিও স্বাভাবিকভাবে কারও পক্ষে এভাবে রাতভর ডিজে করে কাটিয়ে দেয়া অসম্ভব। তাই বিরামহীনভাবে রাতভর ডিজে পার্টির জন্য তারা ব্যবহার করেন হ্যাপি ড্রাগ বা পার্টি ড্রাগ বা এমডিএমএ বা এক্সট্যাসি। দেশে বহুদিন ধরে এই ড্রাগটি ব্যবহার হলেও এ নিয়ে ইয়াবার মতো এতো আলোচনা নাই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটি ধরা পড়ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে। ধরা পড়ছেন এটির কারবারে যারা জড়িত। বেরিয়ে আসছে নানা তথ্য।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এক্সট্যাসি বা এমডিএমএ মূলত পার্টি ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি একটি কৃত্রিম সাইকোঅ্যাকটিভ ড্রাগ ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলে পাওয়া যায়। এটি একইসঙ্গে উত্তেজক ও ভ্রমসৃজনকারী প্রভাব সৃষ্টি করে দ্রুত সেরোটোনিন, ডোপামিন ও নর-অ্যাড্রেনালিন মুক্ত করে ব্যবহারকারীকে ইউফোরিয়া, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি দেয়। এ ছাড়া আলোসংগীত সংযোগকে তীব্রভাবে অনুভব করায় পার্টি-ডান্স ক্লাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত এই পার্টি ড্রাগের কারণে রাতভর পার্টিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষেরা ডিজে করতে পারেন। ড্রাগ নেয়ার কারণে তারা পার্টিতে খুব আনন্দে সময় কাটায়। তবে অল্প সময় আনন্দ করতে গিয়ে তারা ধীরে ধীরে পার্টি ড্রাগের কুফলে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পার্টি ড্রাগ সাময়িক আনন্দ দিলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতি পিস পার্টি বা হ্যাপি ড্রাগ বিক্রি হয় ৭ থেকে ১০ হাজার টাকায়। ব্যয়বহুল এই ড্রাগটি মূলত তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী ও মধ্যবয়সীরা ব্যবহার করেন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, চিকিৎসক, উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, বিদেশফেরত শিক্ষার্থী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, শিল্পী, মডেল, পেশাদার ডিজে, ব্যবসায়ীরা। তবে ড্রাগটি ব্যয়বহুল হওয়াতে কেবলমাত্র এলিট শ্রেণি ও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও ডিজে পার্টির প্রতি যাদের আগ্রহ আছে এবং নিয়মিত যারা পার্টিতে যাওয়া-আসা করে তারাই এটি ব্যবহার করেন। ঢাকার গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারা এলাকায় যেসব ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয় সেখানেই মূলত পার্টি ড্রাগ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি রিসোর্ট হোটেল মোটেলে ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরও দুয়েকটি দেশ থেকে পার্টি ড্রাগ আনা হয়। পার্টি ড্রাগ মূলত ‘খ’ শ্রেণির মাদক। সম্প্রতি যে চালানটি আনা হয়েছে সেটি যুক্তরাজ্য থেকে পাঠিয়েছে অরণ্য নামের এক ব্যক্তি। তার মাধ্যমেই এটি আনা হতো। ডিএনসি ঢাকা মেট্রো উত্তর সম্প্রতি যে চালান জব্দ করেছে সেটিতে ৩১৭ পিস পার্টি ড্রাগ ছিল। যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারাই মূলত এটি ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতো। বিদেশ থেকে এনে তারা উচ্চমূল্য দেশে বিক্রি করতো। এটির চাহিদাও ব্যাপক। দেশে আনার ক্ষেত্রে তারা কুরিয়ার সার্ভিস ও বিমানপথকে বেছে নিতো।

ডিএনসি’র কর্মকর্তারা বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল গ্রেপ্তার মো. জুবায়ের (২৮) স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া শিক্ষার্থী, প্রযুক্তি দক্ষ, শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির আরোও বেশ কয়েকজনের একটি চক্র পার্টি ড্রাগ, কুশ, গাঁজা, কিটামিনসহ অন্যান্য আধুনিক মাদক পার্সেলযোগে উন্নত দেশ থেকে আমদানি করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহানগরে বিভিন্ন ডিজে পার্টিতে এবং অভিজাত সোসাইটিতে সরবরাহ করছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুরাতন ডাক ভবনের বৈদেশিক ডাক শাখা থেকে যুক্তরাজ্য থেকে আগত এয়ার পার্সেল তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিতে একটি কাগজের কার্টনের ভেতর বিভিন্ন বিদেশি ব্রান্ডের চকলেটের নিচে লুকানো অবস্থায় একটি পেপারে মোড়ানো স্বচ্ছ পলি প্যাকেটে রক্ষিত লালচে বর্ণের পার্টি ড্রাগ ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা কাগজপত্র পর্যালোচনা ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পার্সেলটির রিসিভার মাদক চক্রের অন্যতম হোতা মো. জুবায়েরের অবস্থান শনাক্ত করে ঢাকা উদ্যান এলাকা থেকে আটক করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জানায়, পার্সেলটি যুক্তরাজ্য থেকে তার পূর্বপরিচিত অরণ্য ডাকযোগে অরণ্যের বন্ধু অপূর্ব রায়ের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে পাঠিয়েছে। রিসিভ করে তার আরেক বন্ধু জি এম প্রথিত সামস্‌-এর নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। এর বিনিময়ে তাকে ৫০ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়। কাজটি করার জন্য অরণ্যর কথায় প্রথিত সামস তাকে বিকাশের মাধ্যমে তিনবারে ১৫-১৬ হাজার টাকা অগ্রিম দেয়। পরে জুবায়েরের তথ্যমতে প্রথিত সামস (২৫) এর অবস্থান শনাক্ত করে তাকে সেগুনবাগিচা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার কাছ থেকে যুক্তরাজ্য থেকে আমদানিকৃত পার্টি ড্রাগ, গাঁজা ও কিটামিন নামক মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। জুবায়ের এবং জি এম প্রথিত সামসকে গ্রেপ্তারের পর আসিফ মাহবুব  চৌধুরীর বাসা ঘেরাও করে তাকে হাতেনাতে এমডিএমএ, গাঁজা, কুশ ও নগদ টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অপূর্ব রায়কে (২৫) গাঁজাসহ গ্রেপ্তার অপূর্বের দেয়া তথ্য মতে সৈয়দ শাইয়ান আহমেদকে (২৪)  গাঁজা ও পার্টি ড্রাগ ও চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণাদি জব্দ করে গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিএনসি কর্মকর্তারা বলেছেন, যে চক্রটিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে প্রথিত সামস একজন পেশাদার ডিজে। অভিজাত ঘরের সন্তান সামস দীর্ঘদিন ধরে ডিজে পার্টির সঙ্গে জড়িত।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পার্টি ড্রাগ সেবন করলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত উত্তাপে ডিহাইড্রেশন বা ইলেক্ট্রোলাইট ভ্রান্তি হতে পারে যা প্রাণঘাতী লিভার ও কিডনির সমস্যা, পেশির টান, খিঁচুনি ও দৃষ্টি ঝাপসা দেখা যেতে পারে। অতিরিক্ত ডোজে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে অঙ্গপ্রতঙ্গ বিকল বা হৃদরোগ স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ব্যবহারে জীবনহানির শঙ্কা থেকে যায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকামেট্রো উত্তরের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান মানবজমিনকে বলেন, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে তারা এই ব্যবসা করতো। ঢাকায় এলিটদের জন্য যেসব পার্টি আয়োজন করা হতো সেখানে তারা সরবরাহ করতো। আমরা এ সংক্রান্ত অনেক তথ্যপ্রমাণ পেয়েছি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের মোবাইলে থাকা অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছি। আরও অনেকের সংশ্লিষ্টতা আমরা পেয়েছি। তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে। 

https://mzamin.com/uploads/news/main/180908_par.webp

Monday, July 14, 2025

সোহাগ কিলিং মিশন: রজনী বোস লেনে হত্যা, হাসপাতালের সামনে নিয়ে চলে বর্বরতা ভিডিও by শুভ্র দেব ও আফজাল হোসেন

মিটফোর্ড এলাকার রজনী বোস লেনে লাল চাঁদ ওরফে সোহাগ (৩৯)কে হত্যা করা হয়। সোহাগ নিহত হওয়ার পরও মারতে মারতে তাকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের ভেতরে প্রবেশ করে খুনিরা। সেখানে নিহত সোহাগের গায়ে কিল-ঘুষি মারা হয়, কোপানো হয়। পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয় ঘাতকরা। পরে তার মরদেহের উপর লাফিয়ে পা দিয়ে লাথি মেরে অবর্ণীয় নির্মম নৃশংস উল্লাস করা হয়। সোহাগকে বাঁচানোর জন্য তার দু’জন কর্মচারী পা ধরে আকুতি করেও তাকে বাঁচাতে পারেনি। ঘটনার সময় আশপাশে অনেক লোকজন ছিল। কিন্তু ঘাতকরা এমনভাবে আতঙ্ক ছড়ায় যা দেখে কেউ এগিয়ে আসার সাহস পায়নি। কিন্তু কেন সোহাগকে তার দোকানের গলিতে মারার পর মৃত জেনেও হাসপাতালের ভেতরে এনে আরও মারা হলো সেটি বলতে পারছি না। এভাবেই ওইদিনের ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী।

ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্তব্ধ পুরো দেশ। নিন্দা প্রতিবাদ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন সর্বত্র। রাজনৈতিক দলও এ নিয়ে সরব হয়েছে। সব দলের তরফে বিবৃতি, মন্তব্য করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেশ কিছু বিষয় সামনে এসেছে। রজনী বোস লেনে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই নিশ্চিত করেছেন সোহাগকে ‘ধর ধর’ বলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। মব সৃষ্টি করে তাকে এমনভাবে মারধর করা হয়েছে সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে কেন নির্মমতা চালানো হয়েছে তার সঠিক কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশের ভাষ্যমতে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে সোহাগকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পরিবার বলছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদা না দিয়ে প্রতিবাদ করায় সোহাগের ওপর এত নৃশংসতা।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বলছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যেভাবে তার ওপর নৃশংসতা চালানো হয়েছে সেটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে করা হয়েছে। না হলে মরদেহের উপর কেউ এভাবে পাশবিকতা চালাতে পারে না। শুধুমাত্র চাঁদাবাজি, দোকান দখল বা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জন্য এভাবে কারও ওপর নৃশংসতা চালানো যায় না। এদিকে সোহাগকে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের যে স্থানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তার কয়েকহাত দূরে হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার ক্যাম্প। ঘটনার সময় অনেক আনসার সদস্য ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। পাশাপাশি ওইদিন ঘটনাস্থলের আশেপাশে বিভিন্ন ব্যবসায়ীসহ শতাধিক লোক দাঁড়িয়ে নির্মমতা দেখেছে। কিন্তু তারাও কেউ আসেনি। এই সুযোগে সোহাগের মৃতদেহের ওপর বিভিন্নভাবে নৃশংসতা করেছে। নৃশংসতার ভিডিও দেখে আঁতকে উঠেছে মানুষ। তবে ঘটনার দুইদিন পর্যন্ত এই নির্মমতা জানতে পারেনি কেউ। দু’দিন পর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আসল চিত্র সামনে আসে।

সরজমিন দেখা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনের মিটফোর্ড সড়কটি ডান দিকে ইসলামপুর, সদরঘাটের দিকে চলে গেছে। সামনের দিকের সড়কটি আরমানিটোলা ও বামপাশের সড়কটি লালবাগ মিটফোর্ড সড়ক নামে পরিচিত। এদিকেই রজনী বোস লেন। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের ঠিক সামনেই রয়েছে শাহিদা মেডিকেল ফার্মেসি, নেওয়াজ ফার্মেসি ও মনোয়ারা ম্যানশন। চোখের সামনে নির্মমতার পর কেন কোনো আনসার সদস্য এগিয়ে আসেনি এনিয়ে কথা হয় একাধিক আনসার সদস্যদের সঙ্গে। কিন্তু আনসার সদস্যরা জানিয়েছেন, ওই সময় এদিকে কারও ডিউটি ছিল না। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কিছু প্রত্যক্ষদর্শীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যারা সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারা এই এলাকার পরিচিত মুখ। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নাই। কারণ ওই সময় কেউ এগিয়ে গিয়ে বাধা দিতে গেলে তার ওপরও নির্যাতন চালাতো খুনিরা।

নিহত সোহাগকে নিয়েও নানা সমালোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন সোহাগ আওয়ামী লীগের আমলে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাবেক এমপি হাজী সেলিমের চাঁদা তুলতেন তিনি। বেশ কিছু ছবিতে হাজী সেলিমের সঙ্গেও তাকে দেখা গেছে। এ ছাড়া মিটফোর্ড এলাকার ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা বলেছেন, পট পরিবর্তনের পরেও সোহাগ যুবদলের হয়ে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। সোহাগ মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙাড়ি ব্যবসার সঙ্গে পুরনো বৈদ্যুতিক সাদা তার কেনাবেচার ব্যবসা করতেন। সোহানা মেটাল নামে মিটফোর্ড এলাকার চায়নাপট্টি ও রজনী বোস লেনে তার দুটি দোকান রয়েছে। সোহাগ এবং মহিন পূর্বপরিচিত ছিলেন। ওই এলাকায় বিদ্যুতের তামার তার ও সাদা তারের ব্যবসার একটা সিন্ডিকেট রয়েছে। তামার তার ও সাদা তারের অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ছিল মহিন, অপু, টিটু, যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক রজ্জব আলী পিন্টুসহ মিটফোর্ড হাসপাতালের একটি চক্র। তারা অবৈধ বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিল। তা না হলে নিয়মিত মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দেয়ার দাবি জানিয়েছিল তারা। এই দ্বন্দ্বের জেরে সোহাগের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলিও করে দুর্বৃত্তরা। এরপরে তিনদিন সোহাগ দোকান খুলেনি। পাশাপাশি সোহাগ হত্যায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার নেতৃত্বদানকারী যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা মাহমুদুল হাসান মহিন এবং একই থানা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত নেতা অপু দাসের ছত্রছায়ায় মিটফোর্ড এলাকায় চাঁদাবাজির ভয়ঙ্কর এক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী, ফুটপাথ, সব জায়গায় চাঁদাবাজি চলতো। তারা দু’জনের নেতৃত্বে ৫ই আগস্টের পর থেকে মিটফোর্ড ও পাশের এলাকায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজি করতো।

এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল আসামিদের অদ্যাবধি গ্রেপ্তার না করা এবং মামলার এজাহার থেকে মূল তিন আসামিকে বাদ দেয়া রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না। বলেছেন, এই ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত যাদের সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে আশ্বর্যজনক তাদের মামলার প্রধান আসামি করা হয়নি। যারা প্রাণঘাতী আঘাতগুলো করেছে তারা অদ্যাবধি গ্রেপ্তারও হয়নি। এর কারণ আমাদের বোধগম্য নয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার এজাহারে খুনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিন খুনিকে পুলিশ কৌশলে বাদ দিয়ে নিরপরাধ তিনজনকে আসামি করেছে।

নিহত সোহাগের মেয়ে মিম বলেন, এজাহার লেখার সময় পুলিশ তিনজন প্রকৃত আসামির (১৭, ১৮ ও ১৯ নম্বর) নাম বাদ দেয়। মামলার খসড়া দেখার সুযোগ পেলে তিনি ছবিও তুলে রাখেন এবং অসঙ্গতি তুলে ধরেন। তিনি পুলিশকে প্রশ্ন করেন, সোহাগকে যেহেতু অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটি কেন এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশ তখন তাকে আশ্বস্ত করে, সংশোধন করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত বাদীর অজান্তেই পূর্বে ঠিক থাকা খসড়া বাদ দিয়ে একটি নতুন নথিতে স্বাক্ষর নেয়া হয়, যেখানে প্রকৃত অপরাধীদের নাম বাদ দেয়া হয়। মিমের দাবি, পরে তার মাকে (মামলার বাদী) একা রেখে ওসি মনিরুজ্জামান মনির ও অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কক্ষে কথা বলেন এবং মূল অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে অন্য একটি নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। বাদী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ভাই মারা যাওয়ার কারণে আমি ভীষণ আবেগপ্রবণ ছিলাম। আমার মেয়েকে দেখিয়ে কপি চেক করিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, যেটায় দেখেছি, সেটাতেই সই করছি। কিন্তু পরে বুঝি, অন্য কাগজে সই করানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এতে রাজনীতি হয়েছে। যারা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। পুলিশ বলেছে, বিষয়টি তারা ঠিক করে দেবে। আমি ঢাকা গিয়েও সরাসরি কথা বলে এসেছি। স্বজনদের অভিযোগ, মামলাটিকে ‘হালকা’ করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং শুরুতে পুলিশ মামলাও নিতে চাইছিল না। এজাহারে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিবর্তন এনে প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা ও নির্দোষদের জড়ানো হয়েছে বলে তাদের দাবি। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘এজাহার তো তারা দিয়েছে, এজাহার কি আমরা করছি? এজাহার চেঞ্জ করার কোনো সুযোগই নেই। তারা যেটা এজাহার দিয়েছে, আমরা সেটাই মামলায় রেকর্ড করেছি। তারা কি অশিক্ষিত? তারা কি মুর্খ? কিছুই নয়। আন্দাজে একটা কথা বলে। তারা শিক্ষিত, তারা ১০ জন, ২০ জন আসে একসঙ্গে দেখতে। এখন এটা বললে হবে? এমনতো নয় যে, তারা অশিক্ষিত মানুষ, পড়েনি, দেখেনি। তারা পড়ছে, দেখছে, সব জেনেশুনে তাদের বক্তব্য মতো সেটা এজাহার করছে। এখানে আমাদের কিছু বলার নাই।

এদিকে, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কমেনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। সে বীভৎস ঘটনার ট্রমা থেকে তারা এখনো বের হতে পারেনি। হামলার ভয় আতঙ্কে কেউ মুখ খুলছেন না। অনেকে বলতে চাইলেও পরিবারের কথা বিবেচনা করে তথ্য দেয়ার সাহস পাচ্ছে না। গতকাল পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কথা জানানো হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তা মানতে নারাজ। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের ঠিক সামনেই রয়েছে শাহিদা মেডিকেল ফার্মেসি, নেওয়াজ ফার্মেসি ও মনোয়ারা ম্যানশন। তাদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও কেউ এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলছেন না। ওইদিন ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতাল ভবন থেকে অনেকে ভিডিও করলেও ভয়ে এ নিয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন এ ঘটনা ঠিক আনসার ক্যম্পের সঙ্গে হলেও আনসার সদস্যরা এগিয়ে আসেননি।  গতকাল সকাল ১১টার দিকে পুলিশ এসে মিটফোর্ড এলাকায় রাস্তা দখল করে থাকা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে দেয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিটফোর্ড এলাকার রজনী বোস লেনে ভাঙাড়ি ব্যবসার কেন্দ্র। সারা দেশ থেকে প্লাস্টিক, তামা, দস্তার পণ্য আসে এখানে। এ ছাড়া রয়েছে অবৈধ চোরাই তারের ব্যবসা। এ চোরাই তারের ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই সোহাগকে হত্যা করা হয়। একজন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী বলেন, এ হত্যাকাণ্ড সবার সামনেই ঘটেছে। যারা ঘটিয়েছে সবাই সবাইকে চিনে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে কেউ মুখ খুলবে না। আমরা ব্যবসা করি, এখানে পুরো ঢাকা শহর থেকে ভাঙাড়ি মাল আসে আবার অন্য জায়গায় আমরা বিক্রি করে দেই। লাশ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছি। দেশের পরিস্থিতি এখনো ভালো হয়নি আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। আরেক ব্যবসায়ী জানান, অস্ত্রসহ ২০-২৫ জনের একটি দল তাকে রজনী বোস লেন থেকে মারতে মারতে নিয়ে যায়। এখানে অনেক বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে সেগুলোর ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করুন। এখানে যারা জড়িত সবাইকেই এলাকাবাসী চিনে কিন্তু কেউ বলবে না, কারণ সবারই জীবনের মায়া আছে।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, বুধবার বিকাল বেলায় চিৎকার শুনে আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি সোহাগকে কয়েকজন বেধড়ক মারধর করছে। সবার চোখের সামনেই নৃশংসভাবে তারা নরপিশাচের মতো হত্যা করে। এখন শুনেছি তারা একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত এবং সবাই সোহাগের পূর্বপরিচিত। শুনেছি এখানে রাস্তার উপর থাকা প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। প্রশাসন এর সবই জানে এতদিন ধরে এগুলো চলে আসছে তারা চুপ ছিল কেন এতদিন? হঠাৎ আজকে কেন উচ্ছেদ অভিযান চালালো। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কি এসব দোকান বসে? কেউ প্রকাশ্যে কোনো তথ্য দিবে না কারণ প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সাংবাদিক, প্রশাসনকে দু’দিন পর এ এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে না কিন্তু আমাদের এ এলাকায় থাকতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন জানান, এরা সবাই প্রভাবশালী তাই কারও সাহস হয়নি এগিয়ে আসার। আমরা এ এলাকার বাসিন্দা আমাদের এ এলাকায় থাকতে হবে। প্রশাসন সবকিছুই জানে কে বা কারা এ সকল ঘটনায় জড়িত। প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে। অবুঝ শিশুও এ কথা বিশ্বাস করবে না। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে যদি এটি হতো তাহলে এত মানুষ কীভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হয়।

এদিকে, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে বেলা ২টার দিকে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে প্রতিবাদ জানান। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি শুরু থেকেই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতো তাহলে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটতো না। অপরাধী যেই হোক তার পরিচয় সে অপরাধীই, দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার হওয়ার জরুরি। আমরা দেখতে পেয়েছি অপরাধী যদি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয় তাহলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধের ব্যবস্থা নিতে চায় না ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তৃণমূল পর্যায়ে যারা রাজনীতি করেন তারা বহিষ্কারকে ভয় পায় না। সাংগঠনিক অ্যাকশন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এ আশায় থাকেন যে যখন তারা ক্ষমতায় আসবেন তারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিবে। এ ধরনের মনমানসিকতা ঢালাওভাবে চর্চা হয়েছে বিধায় আজকে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটছে।

mzamin

Thursday, June 19, 2025

প্রতারক থেকে সাবধান by শুভ্র দেব

সন্ধ্যা পৌনে ৬টা। ০১৩৩৭৫৪১৪০৩ মোবাইল নম্বর থেকে কল আসে দেশের একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকের কাছে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি ফোন দিয়েই বলেন ‘কেমন আছেন’। অপরিচিত মোবাইল নম্বর আবার কণ্ঠও অপরিচিত। তাই সম্পাদক তাকে বললেন, ‘আপনি কে? আপনার পরিচয় কী? কেন ফোন দিয়েছেন?’ ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে বলা হয় ‘আমি পুলিশ অফিসার ফারুক হোসেন বলছি, আপনার ছেলের সঙ্গে একটা ঝামেলা হয়েছে তাই কথা বলা’ তখন সম্পাদক কিছুটা বিব্রতবোধ করে বলেন, ‘আমার ছেলে কোথায় থাকে জানেন? তার সঙ্গে আপনার ঝামেলা হবে কেন? প্রতারণা করার জন্য ফোন দিয়েছেন? ব্ল্যাকমেইল করার আর জায়গা পাচ্ছেন না? এসব কথা শুনে ফোনের অপরপ্রান্তের ব্যক্তি কল কেটে দেন।

শুধু ওই সম্পাদক নন। অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে এভাবে প্রতারণা করার জন্য রাজধানীসহ সারা দেশে বেশ কিছু চক্র গড়ে উঠেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ রাহি। থাকেন রাজশাহীতে। তার বাবা থাকেন কুড়িগ্রামে। গত রমজানের ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্ত। হঠাৎ একটা ফোনকল আসে রাহির বাবার কাছে। রাহির বড় ভাই আহসান হাবিব রাভি বলেন, আব্বু চিৎকার করে উঠলো- তোমার কাছে মাদক মানে! আব্বুর কাছে গেলাম। আব্বু ফোনে কথা বলছে। ফোন লাউড স্পিকারে দিলাম। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হচ্ছে, রাহিকে ছাড়াতে হলে ২২ হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে এখনই। রাভি বলেন, আমি ফোনটা নিলাম। অপরপ্রান্তে পুলিশের গাড়ির সাইরেন, ওয়াকিটকির শব্দ আর ব্যস্ত পুলিশ স্টেশনের আবহ। রাহি কাঁদছে। একদম রাহির কণ্ঠ। মনে হলো- অনেক মার খেয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে- পুলিশ ধরেছে। মাদক পেয়েছে। আমাকে ছাড়াও। শব্দ শুনে মনে হলো, ফোনটা কেড়ে নিলো। এখন কয়েকজনের কথা শোনা যাচ্ছে। ওয়াকিটকির শব্দ আসছে। একজন বলছে, কোন ধারায় মামলা দেবো? আলোচনা চলছে। মাদকের কঠিন মামলা হবে। হঠাৎ একজন ফোনটা নিলেন। ভরাট গলা। বললো- আমি এসআই শফিক। রাহিকে ধরেছি। ওর সঙ্গের দু’জনের শরীর থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। ওর কাছে পাওয়া যায়নি। মামলা হবে। রাহি হবে ৩ নম্বর আসামি। আমি বললাম, কোন থানায় আছে এখন? এবারও ওপাশ থেকে সাড়া নেই। তারা আলোচনা করছেন। ৭২ ধারায় মামলা দেন। এসপি স্যারের রুমে যান। স্যারকে জানান। আবার ওয়াকিটকির শব্দ। খানিক বাদে আর একজন ফোন নিলেন। সে জানালো রাহি এখন রাজশাহী ডিবিতে আছে। মামলা হচ্ছে। কোর্টে তোলা হবে।

রাহির বড় ভাই বলেন, আমার গলা শুকিয়ে গেছে। ফোনটা কেটে গেল। আমরা নির্বাক। আব্বু চিন্তাগ্রস্ত। আমার স্ত্রী জানতে চাইলে বলি, রাহির কাছে মাদক পাওয়া যায়নি তবে ছাড়াতে হলে টাকা দিতে হবে। বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠাতে হবে। আমার স্ত্রী বলে, পুলিশকে চার্জ দিতে হবে মানে? চার্জ নাকি ঘুষ চায়। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা চেনা পরিচিতদের ফোন করা শুরু করি। এরপর কোনো উপায়ান্তর পাই না। আমার স্ত্রী বললো, রাহিকে ফোন দাও। আমি আর আব্বু বললাম, রাহির সঙ্গের দুজনেরই কথা হয়েছে এসআই এর ফোন থেকে। তবুও আরেকবার ফোন দিলাম। রাহির একটা নম্বর ব্যস্ত পাওয়া গেল। এবার আব্বুর ফোনে রাহির ফোন এসেছে। আমরা সবাই আরও তটস্থ হলাম। কিছু হলো নাকি। আব্বু কথা বলছে। বুঝলাম রাহি নিরাপদেই আছে। আব্বুর বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি ফোন নিলাম। ও নিশ্চিত করলো ও রুমে আছে। ‘এসআই শফিকে’র নম্বরে ফোন দিলাম। নম্বর বন্ধ। আবার ফোন দিলাম। এসআই পরিচয় দেয়া শফিকের নম্বর বন্ধ। রাহির কাছে ফোন এসেছিল ০১৪০২৫০৩৪০৮ নম্বর থেকে।

একই রকম আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল সুলতানা মাহির সঙ্গে। তিনি থাকেন রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায়। তারা দু’জনই চাকরিজীবী। ছুটির দিন শুক্রবার তার স্বামী সজীব বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারের জন্য ধানমণ্ডি যায়। মাহিও যায় ইফতারে ভার্সিটির অ্যালামনাইদের একটি ফোরাম ইফতারে, লালমাটিয়ায়। একসঙ্গেই মোটরসাইকেলে আসে তারা। লালমাটিয়ায় মাহিকে নামিয়ে দিয়ে সজীব যায় ধানমণ্ডিতে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। মাহিকে বলা হয়, সজীব একটি বাচ্চাকে মোটরসাইকেল দিয়ে হিট করেছে। বাচ্চার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন বাঁচাতে চাইলে জরুরি ২০ হাজার টাকা পাঠালে ছেড়ে দেবে। এরপর সজীবের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। সজীব জানায়- বিকাশে যা আছে আপাতত দিয়ে দাও। আরও টাকার ব্যবস্থা করো। ওয়াকিটকির একটি শব্দ ধীর থেকে প্রবল হলো। কেটে গেল ফোন। মাহি বলেন, আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কোনো কিছু না ভেবেই বিকাশে টাকা রিচার্জ করতে যাচ্ছিলাম। তখন বিষয়টি বুঝতে পেরে এক বন্ধু সজীবকে ফোন দিতে বলে। ইফতারের আগে ব্যস্ততার কারণে হয়তো ফোন ধরছিল না। আমি তার এক বন্ধুকে ফোন দেই- জানতে পারি যা ফোনে বলা হয়েছিল সব ভুয়া। তিনি বলেন, আমার কাছে যা টাকা ছিল আমি সব দেয়ার জন্যই দোকানে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছে যে, বিশ্বাস করতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, সজীবের সঙ্গে প্রায় ৩০ সেকেন্ড কথা হলো আমার। তাকেও ০১৪০২৫০৩৪০৮ এই নম্বর থেকেই ফোন দেয়া হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এখন রোবোকল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ০১৮৯৮৯১৬২০৩ নম্বরসহ আরও কয়েকটি নম্বর থেকে কল দিয়ে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে কোনো কথাই বলা হচ্ছে না। যারা কল দিয়ে কথা বলেন না তারা চান যাকে কল দেয়া হয়েছে তিনি কথা বলেন। কথা বললেই সেটি রেকর্ড করে রাখবেন। পরে প্রযুক্তির কেরামতিতে কণ্ঠটি টোপ হিসেবে ব্যবহার করে তার পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করবেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া বিভিন্ন ধরনের পোস্ট থেকে জানা যায় অনেককেই ফোন দেয়া হয়েছে বিভিন্ন নম্বর থেকে। আবার কয়েকজনকে একই নম্বর থেকে ফোন দেয়া হয়েছে। রোবোকল ছাড়াও সরাসরি কল করেও প্রতারণা করা হচ্ছে। একেক পরিবারের একেক ধরনের সমস্যার কথা বলা হয়। যারা এই কাজ করছেন তারা বিষয়টি এমনভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করেন বিশ্বাস না করার উপায় থাকে না। কাউকে বলা হয়েছে চাকরির কথা, রং নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স আপডেট, অগ্রিম ঈদের শুভেচ্ছা, বিপণিবিতানের অফার এসব উল্লেখযোগ্য।

সাইবার সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলছে, এটি প্রতারণার নতুন এক কৌশল। আগে বিভিন্ন মানুষকে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তার কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা হয়। প্রতারকরা ফোন দিয়ে অনেক সময় কথা বলে না। আবার অনেক সময় বিভিন্ন অজুহাতে কথা বলে। মূল উদ্দেশ্য হলো কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা। পরে সেই কণ্ঠ ব্যবহার করে তাদের পরিবারে ফোন দিয়ে বিভিন্ন বিপদে বা সমস্যায় পড়ার কথা বলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নিজের স্বজনের বিপদের কথা তার নিজের মুখে শুনে অনেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন। আবার অনেকেই টাকা পাঠানোর আগে একটু কৌশলী হয়ে সত্যতা জানতে পারেন। টাকা নেয়ার পর প্রতারকরা মোবাইল  ফোন বন্ধ করে রাখে। পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, মূলত এআই ব্যবহার করে এসব কাজ করছে কিছু চক্র। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ছড়িয়ে দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করে প্রতারণা করাই তাদের কাজ। এটি প্রতারকদের নতুন কৌশল। তবে যাদের কাছেই ফোন যাবে তারা সতর্ক থাকবে। যার কথা বলে ফোন দেয়া হবে তার নিজের নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ কাউকে এভাবে কখনো কল করে না। এ ধরনের ফোনকল আসলেই ধরে নিতে হবে এরা প্রতারক। প্রতারণার উদ্দেশ্যে ফোন দিয়েছে। তাই ভুলেও প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। যখনই এ ধরনের ঘটনা ঘটবে তখন নিকটস্থ থানায় অভিযোগ দিতে হবে। অভিযোগ দিলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা  নেবো।

mzamin

Sunday, May 4, 2025

বিকৃত যৌনাচার: ভয়ঙ্কর ফেমডম সেশন, মিস্ট্রেস অ্যান্ড স্লেভের অন্দরমহল by শুভ্র দেব

হাত, মুখ ও পা বাঁধা এক যুবক। শরীরের গোপনাঙ্গ ছাড়া আর কোথাও কোনো কাপড় নাই। মুখে মাস্ক, পার্টি ড্রেস ও পার্টি জুতা পায়ে দিয়ে চাবুক দিয়ে পেটাচ্ছে এক নারী। চাবুকের আঘাতে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। তবুও ওই পুরুষ নারীকে বলছেন আরও জোরে মারেন। ওই নারীও তখন আরও জোরে চাবুক মারছেন। কখনো পার্টি জুতা দিয়ে পেটে-পিঠে লাথি মারছেন। কিন্তু ওই পুরুষ না কেঁদে কেঁদে আনন্দ নিচ্ছেন। আবার কখনো ওই পুরুষ নারীর পায়ে মুখ লাগিয়ে চেটে দিচ্ছেন। আবার এসব দৃশ্যর ভিডিও ধারণ করা হচ্ছে মোবাইলে। যিনি মার খাচ্ছেন আর পা চেটে দিচ্ছেন তাকে বলা হচ্ছে স্লেভ। আর যিনি মারছেন তাকে বলা হয় মিস্ট্রেস। অর্থাৎ মিস্ট্রেস পানিশড দ্য স্লেভ। প্রথম দেখায় মনে হবে ওই নারী পুরুষের ওপর ভয়ঙ্কর অত্যাচার করছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যাকে বলা হচ্ছে ভয়ঙ্কর বিকৃত যৌনাচার। অনেকে এটাকে মনিব ও দাসের আচরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। টাকা দিয়ে পুরুষেরা (স্লেভ) নারীদের (মিস্ট্রেস) কাছে গিয়ে বিকৃত যৌনাচারের নামে নির্যাতিত হচ্ছেন। এখানে অভিযোগকারীও নেই। এটাকে পশ্চিমা দুনিয়ায় বলে ফেমডম সেশন বা বিডিএসএম। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন বিকৃত যৌনাচার বহু আগে থেকে চালু থাকলেও বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে অনেকটা আড়ালে আবডালে কয়েকটি গ্রুপ এমন কার্যক্রম চালিয়ে টাকা কামাচ্ছিল। এ ধরনের ঘটনার খবর পেয়ে এবং এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে দু’জন নারীকে গ্রেপ্তার করেছে ভাটারা থানা পুলিশ। আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তির অভিযোগের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- শিখা আক্তার ওরফে ফারহানা মিলি (২৫) ও সুইটি আক্তার জারা (২৫)। দীর্ঘদিন ধরে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করে আসছিলেন। মিস্ট্রেস ফারহানা মিলি ফ্রিডম লাইফস্টাইল ও মিস্ট্রেস মিলি এন্ড জারা ফ্রিডম লাইফ স্টাইল নামে দুটি পেজের মাধ্যমে তারা এসব করতো।

তথ্যমতে, ফেমডম সেশন বা বিডিএসএম দ্বারা একজাতীয় যৌন উদ্দীপক আচরণ বোঝানো হয় যেখানে কেউ যৌন আনন্দ লাভের জন্য সঙ্গীকে বেঁধে রাখে অথবা বিভিন্ন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা (চোখ বাঁধা, মুখে কাপড় দিয়ে কথা বলা রোধ করা ইত্যাদি) আরোপ করে। সাধারণত এসব কাজে দড়ি, হ্যান্ডকাফ, শিকল, টেপ, চাবুক, চামড়ার বেল্ট ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। বন্ডেজ বিডিএসএম এর অন্তর্ভুক্ত একটি ক্রিয়া। বিডিএসএম বিভিন্ন রকমের অনেকগুলো কর্মকাণ্ড নিয়ে গঠিত। এর সঙ্গে আন্তঃব্যক্তিগত সম্পর্ক, এবং বিভিন্ন উপসংস্কৃতিও জড়িত। এটি মূলত একপ্রকার যৌনচর্চা, যদিও তা স্বাভাবিক বিচারে সুস্থ ধারা হয় না।

বিডিএসএম-এর ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের দুইটি প্রকার আছে। প্রথমত, ডোমিন্যান্ট বা যিনি প্রভাব বিস্তার করেন, বা খাটান, বা শাসন করেন এবং দ্বিতীয়ত, যিনি প্রভাবান্বিত হন বা শাসিত হন। এই দুই প্রকারের অংশগ্রহণকারী থাকলেও অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দুই বা ততধিক হতে পারে। বিডিএসএম যৌনবিকৃতি হিসেবে স্বীকৃত।

বসুন্ধরার ওই ঘটনায় যে মামলা হয়েছে তার তদন্ত কর্মকর্তা হচ্ছেন ভাটারা থানার এসআই ইকবাল হোসেন। তিনি মানবজমিনের কাছে ফেমডম সেশন বা বিডিএসএম এবং ওই দুই নারীর বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। বলেছেন, যিনি মামলার বাদী তিনি আমাদেরকে ভুল তথ্য দিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, বসুন্ধরার একটি ফ্ল্যাটে পুরুষদের আটক রেখে ভয়ঙ্করভাবে নির্যাতন করে টাকা আদায় করা হয়। নির্যাতন করতে করতে মেরেও ফেলা হয়। নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ভিডিও আমাকে দেখায়। সেগুলো দেখে আমি ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালাই। তখন আমি ওই নারীদের জিজ্ঞাস করলাম মানুষকে এভাবে নির্যাতন করেন কেন? তখন তারা আমাকে জানায় পুরুষরা নিজেরাই টাকা দিয়ে আমাদের কাছে মার খেতে আসে। আমরা তো বিকৃত মস্তিষ্কের না। যারা আসে তারাই বিকৃত মস্তিষ্কের। তখন আমি এটা নিয়ে তদন্ত শুরু করি। ওই নারীদের সঙ্গে কথা বলি। তারা মূলত একটি থিওরি নিয়ে কাজ করে। সেটি হলো- মিস্ট্রেস আর সেলভ (মনিব আর চাকর বা দাস)। মূলত বিকৃত যৌনাচারের পুরুষরা ওই নারীদের কাছে টাকার বিনিময়ে নানা ধরনের বিকৃত যৌনাচার করে থাকে। কিন্তু তারা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করে না। নারীদের পা-চাটা থেকে শুরু করে থুথু খাওয়া, চাবুকের মার খাওয়াসহ নানা ধরনের বিকৃত যৌনাচার করে আনন্দ পায়। তারা আবার এসব ভিডিও করে রাখে। তখন সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আমরা তাদের মোবাইল ফোন ঘাঁটাঘাঁটি করি। সেখানে দেখতে পাই গ্রেপ্তার মিস্ট্রেস ফারহানা মিলির টেলিগ্রাম একটা গ্রুপ আছে। সেখানে শত শত ছেলেরা তাকে একটা সেশন দেয়ার জন্য অনুরোধ করছে। সেশনের মধ্যে একটি হলো পা-চাটা সেশন। আরেকটি হলো হার্ড সেশন চাবুকের মার খাওয়া। হার্ড সেশনে স্লেভরা যতক্ষণ মার সহ্য করতে পারে ততক্ষণ মার খাবে। তারপর কিছুক্ষণ পর বলবে আরও মারেন। এভাবে মার খেতে খেতে রক্তাক্ত হয়ে যায়। মিস্ট্রেসরা যদি মার দিয়ে সন্তুষ্ট করতে না পারে তবে সে আর না আসার হুমকি দিয়ে বলে অন্য মিস্ট্রেসের কাছে যাবে। তখন মিস্ট্রেসরা আরও বেশি করে মারে।

গ্রেপ্তারকৃত মিস্ট্রেস জেরি জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, মিস্ট্রেস মিলি তাকে এই আইডিয়া দিয়েছে। মিলির দেয়া আইডিয়ার পর সে চিন্তা করে দেখে এখানে সেক্সুয়াল কিছু করতে হয় না। শুধু স্লেভদের চাবুক দিয়ে মারতে হবে। এ ছাড়া স্লেভরা তার পা চেটে দিবে, থুথু খাবে এমনভাবে ইনকাম করলে ভালোই হয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল বড় ধরনের টাকা জমিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য। তারা আবার ভিডিও ধারণ করে সেগুলো এ ধরনের বিকৃত মন মানসিকতার ব্যক্তিদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এজন্য তারা তাদের গ্রুপে বিজ্ঞাপন দেয়- টু মিস্ট্রেস পানিসড ওয়ান স্লেভ টুয়েন্টি মিনিটস- এসব বিজ্ঞাপন দেখে তাদেরকে আবার অনেকে নক করে বলে এই ভিডিও তাদের লাগবে। তখন তারা অগ্রিম টাকা নিয়ে ভিডিও বিক্রি করে। যারা কিনে তারা এসব ভিডিও দেখে মজা পেয়ে তারাও টাকা দিয়ে সেশন নিতে চায়। এই কালচারটা পশ্চিমা দুনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আছে। তবে বেশিদিন হয়নি বাংলাদেশে চালু হয়েছে। বাংলাদেশে এরকম আরও কয়েকটি চক্র এমনটি করে। তবে সেটা খুব কম।

ইকবাল বলেন, ওই নারীরা জানিয়েছে, মামলার বাদীও তাদের কাছ থেকে তিন চার মাস আগে পা চাটার একটি সেশন নিয়েছে। যেদিন সে মামলা করে ওইদিনও অগ্রিম টাকা দিয়ে সেশন নিয়ে থানায় এসে অভিযোগ করে।
ওই ফ্ল্যাটে যারা স্লেভ হয়ে যেতো তাদের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সব শ্রেণি-পেশার লোকজন সেখানে যেতো। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যান। তবে বেশির ভাগই উচ্চবিত্তরা সেখানে যাওয়া-আসা করতো।

ইকবাল বলেন, মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে মিলি ও জারা দু’জনই ডিভোর্সি। বয়স ২৫ বছরের মধ্যে। মিলির বাড়ি ময়মনসিংহ আর জারার বাড়ি ঝিনাইদহ। জারা কয়েক মাস ধরে এই কাজ শুরু করেছে। আর মিলি দুই বছর আগে আরেকজনের সঙ্গে করতো। এখন নিজেই জারাকে নিয়ে শুরু করেছে। ৩২ হাজার টাকার ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে তারা বসুন্ধরা এলাকায় থাকতো। যে ফ্ল্যাটে তারা থাকতো সেখানেই স্লেভরা যাওয়া-আসা করতো। কিন্তু আশপাশের কেউ টের পেতো না। আর স্লেভরাও চাবুকের আঘাত খেয়ে সাউন্ড করতো না। কারণ তারা নিজেরাই টাকা দিয়ে মার খাচ্ছে। তাই তারা কোনো সাউন্ড করতো না। তাদেরকে পর্নোগ্রাফি আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

mzamin

Tuesday, April 29, 2025

বাইক-গাড়িতে ভয়ঙ্কর ছিনতাইকারী by শুভ্র দেব ও ফাহিমা আক্তার সুমি

ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া তৎপরতায় ঢাকার সড়কে চলাচল দিন দিন আরও বেশি আতঙ্কের হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ে নগরবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্যে এখন সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হতে ভয় পান অনেকে। আর মধ্যরাত ও ভোরবেলা খুব বেশি জরুরি কাজ না থাকলে কেউ বের হন না। ঢাকায় ছিনতাই এতটাই বেড়েছে যা বিগত দিনের তুলনায় বেশি। যদিও ছিনতাইয়ের শিকার অনেকেই মামলা করতে চান না। ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ছুরিকাঘাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর আহত হওয়ার সংখ্যাও অহরহ। বেপরোয়া ছিনতাইকারীরা এখন অনেকটা ভিআইপি স্টাইলে ছিনতাই করছে। তারা প্রাইভেট ও মোটরসাইকেলে করে ঘুরে ঘুরে ছিনতাই করে। চাপাতি, ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি প্রাইভেটকারের জানালা থেকে টান দিয়েও ছিনতাই করে। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।

শনিবার ভোর পৌনে পাঁচটার দিকে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী এলাকার গ্রিনল্যান্ড টাওয়ারের সামনে প্রাইভেটকারের জানালা খুলে এক নারীর ভ্যানিটি ব্যাগসহ ওই নারীকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রাস্তার পাশে শাড়ি পরা ওই নারী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার হাতে ছিল একটি ভ্যানিটি ব্যাগ, পাশে একটি ট্রলি ব্যাগ। গাজীপুরে একটি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। হঠাৎ সাদা রঙের একটি প্রাইভেটকার এসে থামে তার সামনে। ঠিক তখনি সাদা প্রাইভেটকারের জানালা খুলে এক ব্যক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে। কিন্তু ব্যাগ না ছাড়ায় মুহূর্তেই রাস্তায় পড়ে যান ওই নারী। ব্যাগের সঙ্গে সঙ্গে তাকেও টেনে নিয়ে যেতে থাকে ছিনতাইকারীরা। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীদের গাড়ি চলে যায়।

রাস্তায় পড়ে আর্ত চিৎকার করছিলেন ওই নারী। তার চিৎকারে আশপাশে থাকা লোকজন ওই নারীকে উদ্ধারে ছুটে আসেন। ব্যস্ত সড়কে এই ছিনতাইয়ের ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ওই নারী গুরুতর শারীরিক আঘাত  পেয়েছেন। তার অবস্থা সংকটমুক্ত হলেও মানসিকভাবে চরম আঘাত পেয়েছেন। রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় ইস্ট-ওয়েস্ট স্কুলের পাশের গলিতে ১৮ই এপ্রিল ভোররাতে চাপাতি ঠেকিয়ে এক তরুণীর কাছ থেকে রুপার চেইন ও ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা।  মোটরসাইকেলে করে ওই ছিনতাইকারী ছিনতাই করে চলে যায়। এ ঘটনার ভিডিওচিত্র ছড়ানোর পর পুলিশ তৎপর হয়ে আসামিদের গ্রেপ্তার করে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যানের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৫১টি, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২ শতাংশ বেশি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ১লা জানুয়ারি থেকে ৮ই মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে ছিনতাইয়ের (দস্যুতা) ৩২০টি মামলায় ৮৫২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মার্চ পর্যন্ত আড়াই মাসে রাজধানীতে ছিনতাই, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলায় গ্রেপ্তার অন্তত ১৫০ জন জামিন পেয়েছেন।

গত ২১শে এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ‘ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে’ মো. আরমান হোসেন (২২) নামের এক তরুণ নিহত হন। পরিবারের দাবি, ছিনতাইয়ে বাধা দেয়ায় তাকে হত্যা করা হয়। আদালত সূত্র জানায়, এর আগে গত আগস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে ছিনতাইকারীর হাতে সাতজন খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার মাতুয়াইল বাজার এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে কাউসার (২৫) নামে এক যুবক নিহত হন। তিনি একটি মশার কয়েল স্ট্যান্ডের কারখানায় কাজ করতেন।

ছিনতাইয়ের ৪৩২ হটস্পট: একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় ছিনতাইয়ের হটস্পটের সংখ্যা ৩৪২টি। এগুলোর মধ্যে তেজগাঁও বিভাগের মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় আছে ১০৮টি স্পট। শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, শিল্পাঞ্চল এবং হাতিরঝিল থানা এলাকায় ২৫ স্পট। বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় রয়েছে ৯৫টি হটস্পট। গুলশান ও উত্তরা বিভাগে আছে ৯৪টি এবং মতিঝিল বিভাগে-৩০, ওয়ারীতে-৩৫, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ৪৫টি হটস্পট। এসব স্পটে ছিনতাইয়ে সক্রিয় রয়েছে প্রায় ১২শ’ অপরাধী। এর মধ্যে মতিঝিল বিভাগ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ২১২ জন, মিরপুর ও তেজগাঁও বিভাগে সক্রিয় ৩৮৬, রমনা ও লালবাগ বিভাগে ২১৭, উত্তরা এবং গুলশান বিভাগে ১৫৪, মোহাম্মদপুর থানার আওতাধীন এলাকায় ২০৫ জন ছিনতাইকারী সক্রিয়ভাবে জড়িত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এসএন মো. নজরুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনা খুবই কম। একটা-দু’টা ঘটছে সেগুলো আসামি ধরা পড়ছে। শেওড়াপাড়ার ঘটনায় আসামি গ্রেপ্তার ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। সিদ্ধেশ্বরীর ঘটনায় গাড়ি পাওয়া গেছে। মালিকানা কার নামে সেটি বের করার কাজ চলছে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে এসব ঘটনা বাড়লেও র‌্যাব আগে থেকেই সতর্ক। র‌্যাব’র ঢাকার ৫টি ব্যাটালিয়নের টহল টিম সার্বক্ষণিক রাস্তায় থাকে। প্রত্যেকটা ব্যাটালিয়নের অধীনে ৪টা করে টহল টিম শিডিউল করে দায়িত্ব পালন করে। মোহাম্মদপুর, বছিলা, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে ছিনতাইকারীদের হাতেনাতে ধরেছি। তিনি বলেন, আমরা সবসময় ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রতিহত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তবুও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। সিদ্ধেশ্বরীর ঘটনায়ও আমরা ছায়া তদন্ত করছি।

সিদ্ধেশ্বরীর ঘটনার সময় ওই ভবনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা বলেন, আমি ঘটনার সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ দেখি এমন ঘটনা। তখন রাস্তাঘাটে তেমন মানুষ ছিল না। তার শুধুমাত্র একটা চিৎকার শুনতে পাই- এসময় আমিও  পেছন পেছন ছুটতে থাকি। বেশ কিছুদূরে এভাবে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। পরে আমরা সবাই এগিয়ে যাই। এমন ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এদের ঠেকাবে কে? কিছুদিন আগে আমার নিজেরই ক্যামেরা নিয়ে গেছে ছিনতাইকারীরা।

ঘটনাস্থলে থাকা সিদ্ধেশ্বরী কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, ঘটনাটি যেভাবে ঘটতে দেখেছি ওই নারী তো মারাও যেতে পারতেন। আমরা কেউ রাস্তায় নিরাপদ না। ভিডিওটি দেখে এখনো ভয় কাটছে না, যেকোনো সময় আমাদের সঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর হতে হবে। 

mzamin

Sunday, April 27, 2025

৫৭৯ জনকে দেয়া হবে অস্ত্র: গুলির ক্ষমতা পাচ্ছে নারকটিস by শুভ্র দেব

অভিযানে গিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়েন। মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় কর্মকর্তারা আহত হওয়ার ঘটনা অহরহ। মাদক ব্যবসায়ীদের আগ্নেয়াস্ত্রের দাপটে অনেক সময় অভিযান শেষ না করেই ফিরতে হয় কর্মকর্তাদের। এতে করে পার পেয়ে যেতেন মাদক  ব্যবসায়ীরা। কর্মকর্তাদের হাতছাড়া হতো মাদকের চালান।  তাই দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি ছিল অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় সেটি আর হয়নি। যদিও তারা দাবি অব্যাহত রেখেছিলেন। অবশেষে পেশাগত কাজে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি পেলেন ডিএনসি কর্মকর্তারা। অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা এখন থেকে ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল ব্যবহার করবেন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় অস্ত্র সংগ্রহ ও ব্যবহারের নীতিমালা অনুমোদন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। গত ২১শে এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অস্ত্র সংগ্রহ ও ব্যবহারের সংশোধিত নীতিমালা অনুমোদন করে গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের মাদক-১ শাখার নীতিমালায় বলা হয়েছে, অধিদপ্তরের মোট জনবল ৩ হাজার ৫৯ জন। এর মধ্যে ৫৭৯ জন অস্ত্র ব্যবহার করবেন। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক থেকে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যন্ত ৫৭৯ জন কর্মকর্তাকে অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপ-পরিচালক ৯০ জন, সহকারী পরিচালক ৯৩ জন, পরিদর্শক ১৮৬ জন ও ২১০ জন উপ-পরিদর্শক অস্ত্র পাবেন। তারা ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল বহন করবেন। এই অস্ত্র তুলনামূলক কম দামের হলেও কিছুটা আধুনিক। পুলিশ, আনসার, বিজিবি বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য, ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্দেশ্য সাধনের দিকে দৃষ্টি রেখে প্রস্তাব করা হয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে- একমাত্র সর্বশেষ পন্থা হিসেবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যাবে। তবে আদেশ প্রদানকারীকে অধিদপ্তর বা নির্বাহী তদন্তে গুলি করার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে। গুলি করার আদেশ দেয়ার আগে লাঠিপেটা ও অস্ত্রের বাট দিয়ে আঘাত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা যাবে না। যতো দূর সম্ভব ন্যূনতম বলপ্রয়োগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। তাতে কাজ না হলে দু-একটি গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। কোনোভাবেই প্রথমে দু’টি ফাঁকা ও সরাসরি একটির বেশি গুলি চালানো যাবে না। সুরক্ষিত অস্ত্রাগার না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র সংরক্ষণ করতে হবে জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি রুম অথবা জেলা পুলিশ লাইন্স বা সংশ্লিষ্ট থানার অস্ত্রাগারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ করতে হবে। অস্ত্র সংরক্ষণের জন্য প্রধান কার্যালয়সহ অধিদপ্তরের নিজস্ব সকল অফিস ভবনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করে নিজস্ব আরমারি বা অস্ত্রাগার নির্মাণ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ডিএনসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা বিজিবি বা আনসার বা পুলিশ বিভাগের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ একাডেমিতে অধিদপ্তরের অগ্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পরে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্য থেকে দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। গুলি করার প্রয়োজন হলে প্রথমে কারও দিকে তাক না করে আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে হবে। পাশাপাশি হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিতে হবে। প্রথমে ন্যূনতম বল প্রয়োগ করে লাঠিচার্জ ও অস্ত্রের বাট দিয়ে আঘাতের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক থেকে দু’টি গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এর বেশি গুলি করা যাবে না। ফাঁকা গুলির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একজন মাদক কারবারির কোমরের নিচে, হাঁটু অথবা পায়ে একটি গুলি করা যাবে। যেকোনো একজনের দিকে তাক করার সময় খেয়াল রাখতে হবে বর্ষিত গুলি যেন কোনোক্রমেই পেছনে অন্য কাউকে আঘাত না করে।

ঘনবসতি অথবা আবাসিক এলাকায় অথবা সমবেত উচ্ছৃৃঙ্খল জনতার ওপর গুলিবর্ষণের সময় খেয়াল রাখতে হবে নিরপরাধ জনগণ যেন আঘাত না পায়। গুলি করার পর গুলির খোসা অবশ্যই সংগ্রহের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় বা ভয় পেয়ে এলোপাতাড়ি গুলি না করে। প্রতিটি ক্ষেত্রে গুলির আদেশ প্রদানকারী ব্যক্তি গুলিবর্ষণের আদেশ দেয়ার যৌক্তিকতা পরবর্তীতে যুক্তিযুক্তভাবে উপস্থাপনের জন্য দায়ী থাকবেন। গুলির ঘটনা ঘটলে তা তাৎক্ষণিকভাবে অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বা মেট্রো বা জেলা বা বিভাগীয় গোয়েন্দা বা বিশেষ জোন কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা মহাপরিচালককে অবহিত করবেন। অভিযানকারী দলের দলনেতা যতো শিগগির সম্ভব মৃত দেহগুলোকে পুলিশ না আসা পর্যন্ত পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করবেন এবং আহতদের হাসপাতালে প্রেরণ করবেন। তিনি গুলির খোসা সংগ্রহ করে ইস্যুকৃত রাউন্ড সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন। প্রতি ক্ষেত্রেই গুলিবর্ষণের পর যথা শিগগির সংশ্লিষ্ট থানায় এজাহার বা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করতে হবে। তবে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা, আসামি গ্রেপ্তার ও আলামত উদ্ধার, আত্মরক্ষা এবং সরকারি সম্পত্তি- অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, স্থাপনা, যানবাহন উদ্ধার, উদ্ধারকৃত আলামত, আসামি, জব্দকৃত আলামত, সম্পদ রক্ষা করার আইনানুগ অধিকার রক্ষার্থে শক্তি প্রয়োগ তথা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করা যাবে। তবে যেকোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা যাবে না এবং ঘটনার পর যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্যভাবে বল প্রয়োগ বা গুলিবর্ষণের প্রমাণ দেখাতে হবে।  

ডিএনসি কর্মকর্তারা বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মাদক ব্যবসায়ীরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। অভিযানে গেলে তারা কর্মকর্তার উপরে হামলা ও গুলি করে। তাই অভিযান পরিচালনা করতে হলে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হয়। অনেক সময় জরুরি অবস্থায় সময়ের কারণে অন্যান্য বাহিনীর সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এ সময় ঝুঁকি নিয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় ডিএনসি কর্মকর্তাদের অভিযান চালাতে হয়। তাই এসব দিক বিবেচনা করে কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল- অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি। ২০০৮ সাল থেকে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চাইলেও নানা জটিলতা ও বিভিন্ন পক্ষের আপত্তিতে বিষয়টি ঝুলে যায়। এই সময়ে নিরস্ত্র অধিদপ্তরের সদস্যরা মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি ৭৮টি পিস্তল, ৭টি শর্টগান, ২৭টি ম্যাগাজিন, ১৭টি রিভলবার, একটি এয়ারগান, ১ হাজার ১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার ও জব্দ করে। মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে বিগত ১০ বছরে অভিযান পরিচালনাকালে অধিদপ্তরের ১২৫ জন সদস্য গুরুতর আহত হন। দু’জন প্রাণও হারান।

নাটোর জেলার উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান মানবজমিনকে বলেন, মাদকের অভিযান পরিচালনা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়। এখন সঙ্গে অস্ত্র থাকায় আমাদের মনোবল অনেক বেড়ে যাবে। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পিছপা হতে হবে না। এতে করে অধিদপ্তরের কাজে আরও বেশি গতি আসবে। উদ্ধারও বাড়বে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো উত্তরের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, সার্বিকভাবে সকল কাজকর্মে আমাদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি কিন্তু নিরস্ত্র থাকার কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হতো। মাদক ব্যবসায়ীরা মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকতো। কারণ তারা ভাবতো আমাদের কাছে অস্ত্র নাই। আমরা আর কী করতে পারবো। এখন তারাও মনে করবে কর্মকর্তাদের হাতে অস্ত্র থাকবে। আমরা আক্রমণ করলে তারাও নিজেদের আত্মরক্ষার্থে আক্রমণ করতে পারবে।

mzamin

Sunday, March 16, 2025

প্রতারণার নয়া ফাঁদ by শুভ্র দেব ও পিয়াস সরকার

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ রাহি। থাকেন রাজশাহীতে। তার বাবা থাকেন কুড়িগ্রামে। ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্ত। হঠাৎ একটা ফোনকল আসে রাহির বাবার কাছে। রাহির বড় ভাই আহসান হাবিব রাভি বলেন, আব্বু চিৎকার করে উঠলো- তোমার কাছে মাদক মানে! আব্বুর কাছে গেলাম। আব্বু ফোনে কথা বলছে। ফোন লাউড স্পিকারে দিলাম। অপরপ্রান্ত থেকে জানানো হচ্ছে, রাহিকে ছাড়াতে হলে ২২ হাজার টাকা চার্জ দিতে হবে এখনই। রাভি বলেন, আমি ফোনটা নিলাম। অপরপ্রান্তে পুলিশের গাড়ির সাইরেন, ওয়াকিটকির শব্দ আর ব্যস্ত পুলিশ স্টেশনের আবহ। রাহি কাঁদছে। একদম রাহির কণ্ঠ। মনে হলো- অনেক মার খেয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছে- পুলিশ ধরেছে। মাদক পেয়েছে। আমাকে ছাড়াও। শব্দ শুনে মনে হলো, ফোনটা কেড়ে নিলো। এখন কয়েকজনের কথা শোনা যাচ্ছে। ওয়াকিটকির শব্দ আসছে। একজন বলছে, কোন ধারায় মামলা দেবো? আলোচনা চলছে। মাদকের কঠিন মামলা হবে। হঠাৎ একজন ফোনটা নিলেন। ভরাট গলা। বললো- আমি এসআই শফিক। ডিবি থেকে রাহিকে ধরেছি। ওর সঙ্গের দু’জনের শরীর থেকে ৩০০ পিস ইয়াবা পাওয়া গেছে। ওর কাছে পাওয়া যায়নি। মামলা হবে। রাহি হবে ৩ নম্বর আসামি। আমি বললাম, কোন থানায় আছে এখন? এবার ও পাশ থেকে সাড়া নেই। তারা আলোচনা করছেন। ৭২ ধারায় মামলা দেন। এসপি স্যারের রুমে যান। স্যারকে জানান। আবার ওয়াকিটকির শব্দ। খানিক বাদে আর একজন ফোন নিলেন। সে জানালো রাহি এখন রাজশাহী ডিবিতে আছে। মামলা হচ্ছে। কোর্টে তোলা হবে।

রাহির বড় ভাই বলেন, আমার গলা শুকিয়ে গেছে। ফোনটা কেটে গেল। আমরা নির্বাক। আব্বু চিন্তাগ্রস্ত। আমার স্ত্রী জানতে চাইলে বলি, রাহির কাছে মাদক পাওয়া যায়নি তবে ছাড়াতে হলে টাকা দিতে হবে। বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা পাঠাতে হবে। আমার স্ত্রী বলে, পুলিশকে চার্জ দিতে হবে মানে? চার্জ নাকি ঘুষ চায়। ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আমরা চেনা পরিচিতদের ফোন করা শুরু করি। এরপর কোনো উপায়ান্তর পাই না। আমার স্ত্রী বললো, রাহিকে ফোন দাও। আমি আর আব্বু বললাম, রাহির সঙ্গের দুজনেরই কথা হয়েছে এসআই এর ফোন থেকে। তবুও আরেকবার ফোন দিলাম। রাহির একটা নম্বর ব্যস্ত পাওয়া গেল। এবার আব্বুর ফোনে রাহির ফোন এসেছে। আমরা সবাই আরও তটস্ত হলাম। কিছু হলো নাকি। আব্বু কথা বলছে। বুঝলাম রাহি। নিরাপদেই আছে। আব্বুর বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি ফোন নিলাম। ও নিশ্চিত করলো ও রুমে আছে। ‘এসআই শফিকে’র নম্বরে ফোন দিলাম। নম্বর বন্ধ। আবার ফোন দিলাম। এসআই পরিচয় দেয়া শফিকের নম্বর বন্ধ। রাহির কাছে ফোন এসেছিল ০১৪০২৫০৩৪০৮ নম্বর থেকে।

একই রকম ঘটনা ঘটেছিল সুলতানা মাহির সঙ্গে। তিনি থাকেন রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায়। তারা দু’জনই চাকরিজীবী। ছুটির দিন শুক্রবার তার স্বামী সজীব বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারের জন্য ধানমণ্ডি যায়। মাহিও যায় ইফতারে ভার্সিটির এলামনাইদের একটি ফোরাম ইফতারে, লালমাটিয়ায়। একসঙ্গেই মোটারসাইকেলে আসে তারা। লালমাটিয়ায় মাহিকে নামিয়ে দিয়ে সজীব যায় ধানমণ্ডিতে। ইফতারের ঠিক আগ মূহূর্তে অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। মাহিকে বলা হয়, সজীব একটি বাচ্চাকে মোটরসাইকেল দিয়ে হিট করেছে। বাচ্চার অবস্থা অশঙ্কাজনক। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। এখন বাঁচাতে চাইলে জরুরি ২০ হাজার টাকা পাঠালে ছেড়ে দেবে। এরপর সজীবের সঙ্গে কথা বলায় দেয়। সজীব জানায় বিকাশে যা আছে আপাতত দিয়ে দাও। আর টাকার ব্যবস্থা করো। ওয়াকিটকির একটি শব্দ ধীর থেকে প্রবল হলো। কেটো গেল ফোন। মাহি বলেন, আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কোনো কিছু না ভেবেই বিকাশে টাকা রিচার্জ করতে যাচ্ছিলাম। তখন বিষয়টি বুঝতে পেরে এক বন্ধু সজীবকে ফোন দিতে বলে। ইফতারের আগে ব্যস্ততার কারণে হয়তো ফোন ধরছিল না। আমি তার এক বন্ধুকে ফোন দেই জানতে পারি যা ফোনে বলা হয়েছিল সব ভুয়া। তিনি বলেন, আমার কাছে যা টাকা ছিল আমি সব দেবার জন্যই দোকানে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছে যে, বিশ্বাস করতে বাধ্য। শুধু তাই নয়, সজীবের সঙ্গে প্রায় ৩০ সেকেন্ড কথা হলো আমার। তাকেও ০১৪০২৫০৩৪০৮ এই নম্বর থেকেই ফোন দেয়া হয়েছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এখন রোবোকল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ০১৮৯৮৯১৬২০৩ নম্বরসহ আরও কয়েকটি নম্বর থেকে কল দিয়ে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে কোনো কথাই বলা হচ্ছে না। যারা কল দিয়ে কথা বলেন না তারা চান যাকে কল দেয়া হয়েছে তিনি কথা বলেন। কথা বললেই সেটি রেকর্ড করে রাখবেন। পরে প্রযুক্তির কেরামতিতে কণ্ঠটি টোপ হিসেবে ব্যবহার করে তার পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করবেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া বিভিন্ন ধরনের পোস্ট থেকে জানা যায় অনেককেই ফোন দেয়া হয়েছে বিভিন্ন নম্বর থেকে। আবার কয়েকজনকে একই নম্বর থেকে ফোন দেয়া হয়েছে। একেক পরিবারের একেক ধরনের সমস্যার কথা বলা হয়। যারা এই কাজ করছেন তারা বিষয়টি এমনভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করেন বিশ্বাস না করার উপায় থাকে না। কাউকে বলা হয়েছে চাকরির কথা, রং নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স আপডেট, অগ্রীম ঈদের শুভেচ্ছ, বিপণিবিতানের অফার এসব উল্লেখযোগ্য।

সাইবার সংশ্লিষ্টসূত্রগুলো বলছে, এটি প্রতারণার নতুন এক কৌশল। আগে বিভিন্ন মানুষকে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তার কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা হয়। প্রতারকরা ফোন দিয়ে অনেক সময় কথা বলে না। আবার অনেক সময় বিভিন্ন অজুহাতে কথা বলে। মূল উদ্দেশ্য হলো কণ্ঠ রেকর্ড করে রাখা। পরে সেই কণ্ঠ ব্যবহার করে তাদের পরিবারে ফোন দিয়ে বিভিন্ন বিপদে বা সমস্যায় পড়ার কথা বলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে নিজের স্বজনের বিপদের কথা তার নিজের মুখে শুনে অনেকেই টাকা পাঠিয়ে দেন। আবার অনেকেই টাকা পাঠানোর আগে একটু কৌশলী হয়ে সত্যতা জানতে পারেন। টাকা নেয়ার পর প্রতারকরা মোবাইল বন্ধ করে রাখে।

পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, মূলত এআই ব্যবহার করে এসব কাজ করছে কিছু চক্র। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক ছড়িয়ে দুর্বলতার জায়গায় আঘাত করে প্রতারণা করাই তাদের কাজ। এটি প্রতারকদের নতুন কৌশল। তবে যাদের কাছেই ফোন যাবে তারা সতর্ক থাকবে। যার কথা বলে ফোন দেয়া হবে তার নিজের নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. জাহিদুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু কোনো ভুক্তভোগী  থানায় মামলা বা জিডি করছেন না। যদি থানায় অভিযোগ আসে তবে আমরা অবশ্যই তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। তবে আমরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করছি। মানুষকে সচেতন হতে হবে। না বুঝে কারও সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করা যাবে না। প্রয়োজনে অবশ্যই পুলিশের সাহায্য নিতে হবে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের (দক্ষিণ) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে আসছে। একেক সময় একেক ধরনের ফাঁদ পাতে তারা। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। মানুষকে সচেতনতার জন্য বলছি।

mzamin

Tuesday, March 11, 2025

আলোচনায় পুলিশের অক্সিলারি ফোর্স by শুভ্র দেব

পুলিশের কাজে সহায়তার জন্য ‘অক্সিলারি ফোর্স’ নিয়োগ দিবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশের এই ইউনিটের ৪৮টি থানা এলাকায় এই ফোর্স সহায়ক হিসেবে কাজ করবে। একজন পুলিশ সদস্য যে দায়িত্ব পালন করেন ঠিক একই দায়িত্ব পালন করবে   অক্সিলারি ফোর্সের সদস্যরা। তাদের কাছে গ্রেপ্তারের ক্ষমতাসহ পুলিশ আইনগতভাবে যেসব প্রটেকশন পায় একই রকম প্রটেকশন তারাও পাবে। ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীর এমন ঘোষণার পর থেকে অক্সিলারি ফোর্স নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে। তারা কীভাবে কাজ করবে, দায়িত্ব কী হবে, কী ধরনের ক্ষমতা থাকবে। বেসরকারিভাবে নিয়োগ পাওয়া এই সদস্যদের হাতে পুলিশের ক্ষমতা দিলে এর অপব্যবহার নিয়ে শঙ্কার কথাও কেউ কেউ বলছেন। বিশ্বের বিভিন্ন শহর বা নগর পুলিশে এই ধরনের সহায়ক পুলিশ নিয়োগের রীতি থাকলেও দেশে এর আগে সরাসরি পুলিশি ক্ষমতা দিয়ে বেসরকারি কাউকে পুলিশে নিয়োগের নজির নেই। ফলে এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

ডিএমপি’র সূত্রগুলো জানিয়েছে, ডিএমপি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ অনুযায়ী কমিশনার অক্সিলারি ফোর্স নিয়োগ দিচ্ছে। শপিংমল ও আবাসিক এলাকার বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যক্তিদেরও এই ফোর্সে যুক্ত করা হচ্ছে। আপাতত ঈদ পর্যন্ত নিরাপত্তা কার্যক্রম চালাতে অন্তত ৫০০ সদস্যের অক্সিলারি ফোর্স নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পরেও এই ফোর্সের কার্যক্রম চালু রাখার চিন্তাভাবনা রয়েছে ডিএমপি’র। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ঢাকায়ও যদি এমনটা করা হয় তবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তাদেরকে গ্রেপ্তারি ক্ষমতা দিলে কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তবে নিয়োগের আগে অবশ্যই সেই বিষয়গুলো ভাবতে হবে। কাদেরকে নিয়োগ দেয়া হবে, তারা ঠিক কী কী কাজ করতে পারবে। অক্সিলারি সদস্যরা যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকেন সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাদের পুলিশ বাহিনীর মতো প্রশিক্ষণ, দক্ষতা কিংবা দায়বদ্ধতার জায়গাগুলো থাকবে না। এমনকি তাদের কোনো ধরনের অস্ত্র দেয়া হবে কি না সেটি নিয়েও আইনে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। এছাড়া সারা দেশে এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। যাদেরকে নিয়োগ দেয়া হবে তারা যেন কোনোভাবেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত না হন। যদি হন তবে মূল উদ্দেশ্যই সফল হবে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স-১৯৭৬ এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে এই অক্সিলারি ফোর্স নিয়োগের কথা বলা আছে। ১০ ধারায় ১-উপধারায় বলা হয়, যখন মনে হবে যে বাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন, তখন পুলিশ কমিশনার যে কোনো ব্যক্তিকে বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য সহায়ক পুলিশ অফিসার হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন। উপধারা-২-এ বলা হয়, প্রত্যেক সহকারী পুলিশ অফিসার নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন এবং নির্ধারিত ফর্মে একটি সনদ পাবেন। ২-উপধারার (খ)তে বলা হয়েছে, অন্য যে কোনো পুলিশ কর্মকর্তার মতো সহায়ক পুলিশ কর্মকর্তার একই ক্ষমতা এবং দায়মুক্তি থাকবেন। পাশাপাশি একই দায়িত্ব পালনের জন্য দায়ী থাকবেন এবং একই শাস্তির জন্য দায়ী থাকবেন। তারা অন্য যে কোনো পুলিশ অফিসারের মতো একই কর্তৃপক্ষের অধীন হবেন। যদিও এই ধারায় অক্সিলারি ফোর্সের সদস্যরা গ্রেপ্তারি ক্ষমতা বা তদন্ত ক্ষমতা পাবেন কি না, তা স্পষ্ট করে বলা নেই।
পুলিশের সূত্রগুলো বলছে, ডিএমপি’র অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশনার প্রয়োজন মনে করলে পুলিশকে সহায়তার জন্য যে কোনো ব্যক্তিকে যে কোনো সময় ‘অক্সিলারি পুলিশ অফিসার’ হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন। পুলিশের মতোই তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা থাকবে। তারা যদি আইনের ব্যত্যয় ঘটায় বা অপরাধ করেন, তবে পুলিশের ক্ষেত্রে যে ধরনের শান্তির কথা বলা আছে, তাদের ক্ষেত্রেও একই শাস্তির বিধান থাকবে। ডিএমপি অধ্যাদেশের ১০ ধারা প্রয়োগ কীভাবে হবে, এ-সংক্রান্ত কোনো বিধিমালাও নেই। ফলে এই মুহূর্তে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হবে, সেটি ঠিক করা হচ্ছে।

ডিএমপি জানিয়েছে, ঢাকার ৫০টি থানার মধ্যে ৪৮টি থানায় এই  অক্সিলারি ফোর্স নিয়োগ করা হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট থানা হওয়াতে আদাবর ও ক্যান্টনমেন্ট থানায় এই কার্যক্রম চালু হবে না। বাকি ৪৮ থানায় প্রাথমিকভাবে গড়ে ১০ জন করে সদস্য কাজ করবেন। প্রাথমিকভাবে এই নিয়োগের কোনো মেয়াদ থাকবে না। নিয়োগকারী তা নির্ধারণ করবেন। তবে তাদের কোনো বেতন বা ভাতা দেওয়া হবে না। শুধু সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। নিয়োগ পাওয়া সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহায়তা করবেন। আদাবর থানায় অক্সিলারি ফোর্স না থাকার কারণ হিসাবে ডিএমপি জানিয়েছে, রমজানে শপিংমল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়া বড় থানা এলাকাগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এই হিসাবে আদাবর থানাটি ছোট ও এই এলাকায় উল্লেখযোগ্য কোনো শপিংমল নাই। আদাবর থানায় যে পরিমাণ পুলিশ সদস্য রয়েছে তাদের পক্ষেই দায়িত্ব পালন সম্ভব।

ডিএমপি’র মিডিয়া শাখার ডিসি তালেবুর রহমান বলেছেন, পুলিশ যেমন দায়িত্ব পালন করে, সহযোগী ফোর্স ঠিক একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, আটক বা নিয়মিত টহলের মতো দায়িত্বগুলো পালন করতে পারবে। তবে তারা কোনো ধরনের তদন্ত করতে পারবে না। নিয়োগ পেতে যাওয়া পুলিশের সহায়ক এই ফোর্সের সদস্যদের হাতে একটি ব্যান্ড থাকবে, যা তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। আইন অনুযায়ী একজন পুলিশ সদস্য যে দায়িত্ব পালন করেন, সেই একই দায়িত্ব পালন করবেন অক্সিলারি ফোর্সের সদস্যরা। তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা থাকবে এবং পুলিশ আইনগতভাবে যে প্রোটেকশন পায়, ঠিক একই রকম প্রোটেকশন পাবে ফোর্সের সদস্যরা।

mzamin

Wednesday, March 5, 2025

পুলিশের খাতায় ১,২৪,৬৯৫ নারী-শিশু নির্যাতনকারীর নাম by শুভ্র দেব

দেশ জুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতন বাড়ছে। সাত বছরে পুলিশের এজাহারনামায় উঠেছে সোয়া লাখ নারী ও শিশুর নাম। যারা এই সময়ে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পুলিশের দেয়া পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৯৫ জন নারী-শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে মামলা করেছেন। তথ্যমতে, ২০১৯ সালে সারা দেশে ২১ হাজার ৭৬৪ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় মামলা করেছেন। ২০২০ সালে সেটি আরও বেড়ে ২২ হাজার ৫১৭ জন ভুক্তভোগী মামলা করেন। এভাবেই ২০২১ সালে ২২ হাজার ১৩৬ জন। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭৬৬ জন। ২০২৩ সালে ১৮ হাজার ৯৪১ জন। ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১ জন মামলা করেন। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১ হাজার ৪৪০ জন মামলা করেছেন।

মামলার পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ওই সময়টা সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ঢাকা রেঞ্জে। পুলিশের এই রেঞ্জে প্রায় ২০ হাজার ৮৭টি মামলা হয়েছে। এরপরে বেশি মামলা হয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১৫ হাজার ৩৪টি। পর্যায়ক্রমে রাজশাহী রেঞ্জে ১৪ হাজার ৮১টি। রংপুর রেঞ্জে ১৪ হাজার ৭২৭টি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে ১১ হাজার ৮৯০টি। ময়মনসিংহ রেঞ্জে ১০ হাজার ৯৯৩টি। খুলনা রেঞ্জে ১০ হাজার ৮২৮টি ও বরিশাল রেঞ্জে ৮ হাজার ৬০৪টি।  পুলিশের এসব ইউনিট ছাড়াও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি), খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি), রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি), রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি), গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি), সিলেট রেঞ্জ ও রেলওয়ে পুলিশের বিভিন্ন থানায়ও অনেক মামলা দায়ের হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডিএমপিতে ২০২৪ সালে ১ হাজার ৪৬০, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৬০২, ২০২২ সালে ২ হাজার ১২, ২০২১ সালে ২ হাজার ২১৮, ২০২০ সালে ২ হাজার ১৯৮ ও ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪০০টি মামলা হয়েছে। ঢাকা রেঞ্জে ২০২৪ সালে ২ হাজার ৯২৮, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ২৯১, ২০২২ সালে ৩ হাজার ৪৭৯, ২০২১ সালে ৩ হাজার ৫৫৯, ২০২০ সালে ৩ হাজার ৩৯৮, ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪৩২টি। ময়মনসিংহ রেঞ্জে ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৩২, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭৯৮, ২০২২ সালে ২ হাজার ১৭২, ২০২১ সালে ২ হাজার ১৫৫, ২০২০ সালে ১ হাজার ৮৬১ ও ২০১৯ সালে ১ হাজার ৬৭৫টি। চট্টগ্রাম রেঞ্জে ২০২৪ সালে ১ হাজার ৯৭৫, ২০২৩ সালে ২ হাজার ২০, ২০২২ সালে ২ হাজার ৪৮৬, ২০২১ সালে ২ হাজার ৮২৩, ২০২০ সালে ২ হাজার ৮৮৮, ২০১৯ সালে ২ হাজার ৮৬০। খুলনা রেঞ্জে ২০২৪ সালে ১ হাজার ৫৫৫, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৬৯৮, ২০২২ সালে ১ হাজার ৯৩২, ২০২১ সালে ২ হাজার ১৫, ২০২০ সালে ২ হাজার ১৩৫ ও ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪৯৩। বরিশাল রেঞ্জে ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭১১, ২০২৩ সালে ১ হাজার ৩০১, ২০২২ সালে ১ হাজার ২৮৩, ২০২১ সালে ১ হাজার ৩০০, ২০২০ সালে ১ হাজার ৪৩২ ও ২০১৯ সালে ১ হাজার ৬৭৭। রাজশাহী রেঞ্জে ২০২৪ সালে ২ হাজার ২৫৪, ২০২৩ সালে ২ হাজার ২৮৯, ২০২২ সালে ২ হাজার ৬২৪, ২০২১ সালে ২ হাজার ৩১০, ২০২০ সালে ২ হাজার ৮৬১ ও ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪৭৪। রংপুর রেঞ্জে ২০২৪ সালে ২ হাজার ২০০, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৩৭৭, ২০২২ সালে ২ হাজার ৬৪৬, ২০২১ সালে ২ হাজার ৫২৯, ২০২০ সালে ২ হাজার ৫৪৩ ও ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪৩২ জন ভুক্তভোগী নির্যাতনের শিকার হয়ে মামলা করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী ও শিশুরা প্রতিনিয়তই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ঘর থেকে শুরু করে পাড়াপ্রতিবেশী, কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সর্বত্রই নারীরা নির্যাতিত হচ্ছেন। কিন্তু অনেক ভুক্তভোগী এসব নির্যাতনের পরেও হয়রানি, মামলায় ঝক্কিঝামেলা, বিচার না পাবার শঙ্কা, প্রভাবশালীদের চাপ, হুমকি, মামলা পরিচালনা করতে অর্থের প্রয়োজন, লোক জানাজানি, সমাজ সেটিকে উল্টোভাবে নিবে এমন নানা কারণে আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে চান না। তাই হিসাবমতে, দেশে যে পরিমাণ নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হন তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন। তবুও দেশের গতানুগতিক অপরাধ যেমন চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, হত্যা, অপহরণসহ অন্যান্য অপরাধের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মামলা হচ্ছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায়। অপরাধ ও সমাজ নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন ঠেকানোর জন্য সরকার অনেক আইন ও নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করে রেখেছে। কিন্তু সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় এমন অপরাধ বন্ধ করা যাচ্ছে না। এখানে মামলার তদন্ত, বিচারহীনতা, অপরাধীরা প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যাওয়া, মামলার আলামত না পাওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা রয়েছে। কারণ অপরাধীরা এক সময় মনে করেন মামলা তাদের শাস্তি পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে না। এর ফাঁকফোকর দিয়ে তারা বের হয়ে যাবেন। এজন্য কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকে।  

সমাজ ও অপরাধবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের আইন আছে। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও মামলার সংখ্যা বেড়ে যাওয়া বা এই নির্যাতন বন্ধ করতে না পারাই একটি মৌলিক প্রশ্ন। আইন তৈরি করে সেটি বন্ধ করতে পারছে না কেন। আইনের জটিলতা বা চ্যালেঞ্জটা কোথায়। আরেকটা প্রশ্ন হলো যে আইন তৈরি হয়েছে সেটি যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা। এই দুটা প্রশ্নের সদত্তোর আমাদের দেশে নাই। আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, আইনে যে সাজার কথা বলা আছে সেটি সমাজে খুব বেশি প্রভাব ও সতর্কতা সৃষ্টি করে না। যেহেতু দ্রুত সময়ের ভেতরে বিচার সম্পন্ন হয় না, সময়ক্ষেপণ, বিচারহীনতার কারণে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন হয় সেটা থেকে অপরাধীরা মনে তারা পার পেয়ে যাবেন। পার পেয়ে যাওয়ার উদাহরণও আছে আমাদের দেশে।

তিনি বলেন, অধিকাংশ মামলাই হলো প্রান্তিক পর্যায়ের নারী ও শিশুদের। নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে প্রান্তিক পর্যায়ের নারী ও শিশুরা বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন। এই নারী ও শিশুদের  ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বলছে তাদের সুরক্ষার জন্য আইন করা হয়েছে, বিভিন্ন সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুরক্ষার জন্য কি কি আছে সেদিক দিয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। নারীদের সুরক্ষার জন্য সবই আছে। কিন্তু সেটি ঠিকমতো কাজ করছে না। শাস্তিভিত্তিক বিচার ব্যবস্থায় যদি বিচার না হয় দ্রুত সময়ের মধ্যে তাহলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা বাড়বেই। 

mzamin

Monday, February 24, 2025

হাতে আগ্নেয়াস্ত্র বেপরোয়া অপরাধী by শুভ্র দেব

হঠাৎ করে সারা দেশেই বেড়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে প্রায়ই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। জমি নিয়ে বিরোধে পিস্তলের ভয়, চলন্ত বাসে অস্ত্র ঠেকিয়ে ছিনতাই, নারীকে ধর্ষণ, তরুণীকে শ্লীলতাহানি, বিয়ের হুমকি, ডাকাতির সময় গুলি, চাঁদা না পেয়ে গুলি, খুন খারাবি, জমি দখল, আধিপত্য বিস্তারে অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে হরহামেশা। আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়ার খবর তো মাঝেমধ্যে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসছে। কিন্তু দেশে এত অস্ত্রের ছড়াছড়ি থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যত কোনো পদক্ষেপই চোখে পড়ার মতো না। অভিযান চালিয়ে মাঝেমধ্যে কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। যদিও যে পরিমাণ অস্ত্রের ছড়াছড়ি সে তুলনায় উদ্ধার খুবই কম। এমনকি থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও এখন পর্যন্ত পুরোপুরি উদ্ধার সম্ভব হয়নি। উদ্ধার না হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র যে শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটি নীতি নির্ধারকদের বক্তব্য স্পষ্ট। শুধু লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে অবৈধ অস্ত্রেরও আনাগোনা বেড়েছে।

থানা থেকে লুটের অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে কিছুদিন আগে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম মানবজমিনকে বলেছিলেন, এসব অস্ত্র তো অপরাধীদের কাছে চলেই গেছে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারে এখনো নতুন কোনো পদ্ধতি উদ্‌?ঘাটন করতে পারিনি যেটা দিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করে ফেলতে পারবো। আমি মনে করি আমরা যদি মানুষের আস্থাটা আরেকটু অর্জন করতে পারি এবং তাদের কাছে যেতে পারি তবে তারাই আমাদের বলবে কোথায় কোথায় অস্ত্র আছে। এ ছাড়া মানুষের সহযোগিতা ছাড়া অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব নয়। সর্বশেষ গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ সংক্রান্ত অধিবেশন শেষে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ সাংবাদিকদের জানান, জেলা প্রশাসক হিসেবে আগামী দিনে কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে সে বিষয়ে বলেছি। যেমন- আমি বলেছি প্রায় ১ হাজার ৪০০ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি, যেগুলো ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে লুট হয়েছিল। আড়াই লাখ গুলি এখনো উদ্ধার হয়নি। সেগুলো তাদের জেলায় কোনো না কোনো জায়গায় আছে। সেগুলো সন্ত্রাসীদের হাতে পড়তে পারে এবং তারা ব্যবহার করতে পারে। আইজিপি ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর বক্তব্যে স্পষ্ট লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের ভবিষ্যৎ ও এ নিয়ে কতটুকু চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে ৫ই আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে মোট ৫ হাজার ৭৫০টি বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র লুট হয়েছিল। আর গোলাবারুদ ৬ লাখ ৫১ হাজার ৯৬৯ রাউন্ড। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৩৬৬টি। এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩৮৪টি। আর লুট হওয়া গোলাবারুদ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৩ লাখ ৯১ হাজার ৪৩৮ রাউন্ড। এখনো উদ্ধার হয়নি ২ লাখ ৬০ হাজার ৫৩১ রাউন্ড। লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ ফেরত দিতে ওই সময় দেশবাসীর কাছে অনুরোধ জানায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত বছরের ৩রা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। এরপর ৪ঠা সেপ্টেম্বর থেকে দেশ জুড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান শুরু হয়।

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, এসএমজি, এলএমজি, বিভিন্ন ধরনের রাইফেল, পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান। এ ছাড়াও রয়েছে কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার, কাঁদানে গ্যাসের শেল, কাঁদানে গ্যাসের স্প্রে, সাউন্ড গ্রেনেড, বিভিন্ন বোরের গুলি। গণভবনের দায়িত্বে থাকা এসএসএফ সদস্যদের বিশেষায়িত অস্ত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি এখনো উদ্ধার হয়নি। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরপরই বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে ঢুকে লুট করে। এসবের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ট্যাক্টিক্যাল গিয়ার, অস্ত্র, গোলাবারুদ, সাজসরঞ্জাম, বেতার যোগাযোগ ও অপারেশনাল সরঞ্জামাদির মজুত ছিল। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনেও এসএসএফের অস্ত্র গোলাবারুদ মজুত ছিল। ৫ই আগস্ট জনতা গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করার পর ওইসব অস্ত্র লুট হয়ে যায়। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে অত্যাধুনিক অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, ফ্ল্যাশব্যাং গ্রেনেড, অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম, বেতার যোগাযোগের ডিভাইস ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ ৩২টি ভারী অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি।

পুলিশ সূত্র মতে, দেশে লাইসেন্স থাকা বৈধ অস্ত্রের সংখ্যা ৫০ হাজার ৩১০টি। এরমধ্যে ব্যক্তির হাতে ৪৫ হাজার ২২৬টি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঁচ হাজার ৮৪টি অস্ত্র আছে। ব্যক্তিগত অস্ত্রের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কাছে আছে সাত হাজার ৫৪৯টি। অনেক বিতর্কিত রাজনীতিকের হাতে বৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রও রয়েছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, লুট হওয়া অস্ত্র ও অবৈধ অস্ত্র নিরাপত্তা হুমকি তৈরি করেছে। এসব অস্ত্র এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ কথায় কথায় এখন অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। ইতিমধ্যে গত কয়েক মাসে অস্ত্র ব্যবহার করে যতগুলো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে অন্যান্য সময় পুরো বছরে এত অপরাধ হয় না। তাই উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে যাবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) মুনীরুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, ওই সময় যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে তার মধ্যে পুলিশের অস্ত্র ছাড়াও এসএসএফ’র কিছু বিশেষায়িত অস্ত্র ছিল সেগুলোও তারা এখনো খুঁজে পায়নি। কাজেই এগুলো আমাদের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি থাকবে। অস্ত্র উদ্ধারে যে অভিযান চালানো হয়েছিল সেটিতে পুরোপুরি অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি। তাই আরও জোরদার অভিযান চালাতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য আরও নিতে হবে যাতে অস্ত্র উদ্ধারে যেসব তথ্য দরকার সেগুলো দিয়ে যেন তারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করার চেষ্টা করে। এ ছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্য নতুন কোনো পদ্ধতি বের করতে হবে। ক্রিয়েটিভ এবং ইনোভেটিভ আইডিয়া ব্যবহার করতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করতে হবে। তাহলে উদ্ধারের প্রচেষ্টা আরও জোরদার হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, লুট হওয়া অস্ত্র যদি উদ্ধার করা না হয় তবে নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকেই যায়। 

mzamin

Sunday, February 23, 2025

পাড়ায় পাড়ায় কিশোর গ্যাং by শুভ্র দেব

প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে হুমকি-ধমকি। অস্ত্রের মহড়া। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে ফেসবুকে ভিডিও আপলোড। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা। সংঘাত-সংঘর্ষ। খুনখারাবি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ইভটিজিংসহ সবধরনের অপরাধের সঙ্গে তারা জড়িত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। তাদের দাপটে পুরো ঢাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিভিন্ন এলাকায় গ্যাং আতঙ্কে সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে চলাফেরাও করছেন না  নগরবাসী। দিন-দুপুরে প্রকাশ্যেও নানা অপকর্ম করছে তারা। বেপরোয়া এসব গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িত কিশোরদের আইনিভাবে মোকাবিলা করতে নানা ঝক্কিঝামেলা আছে। বয়স বিবেচনায় তাদের শাস্তির আওতায় আনা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়ের পালাবদলে কিশোররাই এখন অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ করছে।

সূত্রমতে, এক যুগ আগে ঢাকার অলিগলিতে শুরু হয় কিশোর গ্রুপিং। এলাকাভিত্তিক ছোটখাটো বিভিন্ন অপরাধ দিয়ে কিশোরদের যাত্রা শুরু হয়। একপর্যায়ে এই গ্রুপগুলোতে সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রতিটি গ্রুপের আলাদা আলাদা নাম দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে তাদের বিস্তারও বাড়তে থাকে। এলাকার চোর, ছিনতাইকারী, শ্রমিক, দিনমজুর, বখাটে, মাদকাসক্ত, পথশিশু থেকে শুরু করে এক সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এসব গ্রুপে সদস্য হয়ে গ্যাং তৈরি করে। প্রতিটি এলাকার কাউন্সিলর, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এসব গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। তাদের শেল্টারেই এসব গ্যাং সদস্য বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে বেড়াতো। থানা পুলিশের ঝক্কিঝামেলা এলে শেল্টারদাতা বা পৃষ্টপোষকরা ম্যানেজ করতেন।  মূলত পৃষ্ঠপোষকরা তাদের হাত শক্তিশালী করার জন্য গ্যাং সদস্যদের হাতে রাখতেন। তারা নিজের প্রয়োজনে বিভিন্ন অপরাধে কিশোর অপরাধীদের ব্যবহার করতেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই কিশোর গ্যাং সদস্যরাই এখন ঢাকার অপরাধ জগতে প্রতাপ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা গা-ঢাকা দেওয়াতে কিশোরদের হাতে চলে গেছে এখন অপরাধের চাবি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে ২৩৭টির মতো কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকায় ১২৭টি। ঢাকায় যেসংখ্যক গ্রুপ থাকার কথা বলা হয়েছে বাস্তবে তার অস্তিত্ব খুব একটা মিলে না। তবে ঢাকায় অপরাধ জগতের সঙ্গে পুরোপুরি সম্পৃক্ত এমন ৫০টির মতো কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা মিলেছে। এরমধ্যে উত্তরা এলাকায় ২৩টি গ্যাং সক্রিয়। এদের মধ্যে, পাওয়ার বয়েজ, ডিসকো বয়েজ, বিগ বস, নাইন স্টার, নাইন এমএম বয়েজ, এনএনএস, এফএইচবি, জিইউ, ক্যাকরা, ডিএইচবি, ব্যাক রোজ, রণো, কেনাইন, ফিফটিন গ্যাং, পোঁটলা বাবু, সুজন ফাইটার, আলতাফ জিরো, ক্যাসল বয়েজ, ভাইপার, তুফান, থ্রি গোল গ্যাং, শাহীন-রিপন গ্যাং ও নাজিম উদ্দিন গ্যাং বেশি সক্রিয়। তেজগাঁও এলাকায় সক্রিয় মাঈনুদ্দিন গ্রুপ। মিরপুর-১১ এবং ১২ নম্বর এলাকায় বিহারি রাসেল গ্যাং, বিচ্ছু বাহিনী, পিচ্চি বাবু ও সাইফুলের গ্যাং, সি-ব্লকে সাব্বির গ্যাং, ডি-ব্লকে বাবু রাজন গ্যাং, চ-ব্লকে রিপন গ্যাং, ধ-ব্লকে মোবারক গ্যাং। কাফরুলের ইব্রাহিমপুরে নয়ন গ্যাং।  ধানমণ্ডিতে ৪টি গ্রুপ সক্রিয়। এদেরমধ্যে নাইন এমএম, একে- ৪৭ ও ফাইভ স্টার গ্রুপ, রায়ের বাজারে স্টার বন্ড গ্রুপ। তুরাগে তালাচাবি গ্যাং। মোহাম্মদপুরে গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ, লাড়া দে, লেভেল হাই, দেখে ল- চিনে ল, কোপাইয়া দে, ঝিরঝির গ্রুপ এবং ভাইব্বা ল গ্রুপ, ‘পাটোয়ারী গ্রুপ’ ‘আতঙ্ক গ্রুপ’ ‘চাপায়-দে আটিপাড়ায়, শান্ত গ্যাং, মেহেদী গ্যাং, খ্রিস্টানপাড়ায় সোলেমান গ্যাং, ট্রান্সমিটার মোড়ের রাসেল ও উজ্জ্বল গ্যাং। হাজারীবাগে বাংলা ও গেণ্ডারিয়ায় লাভলেট। বংশালে জুম্মন গ্যাং। মুগদায়, চান-জাদু, ডেভিল কিং ফুল পার্টি, ভলিয়ম টু ও ভাণ্ডারী গ্যাং। চকবাজারে, টিকটক গ্যাং ও পোঁটলা সিফাত গ্যাং সক্রিয়। শ্যামপুরে ফইন্নী গ্রুপ।

গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। গ্যাং লিডারদের বয়স সাধারণ ২০ এর উপরে থাকে। প্রতিটি গ্রুপে ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য রয়েছে। বড় গ্রুপগুলোতে সদস্য আরও বেশি হয়। গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে পাড়া-মহল্লার ছিঁচকে চোর, মাস্তান, ছিনতাইকারী, মাদকসেবী, মাদক বিক্রেতা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এমনকি অভিজাত ঘরের সন্তানও রয়েছে। তাদের কেউ কেউ পশ্চিমা কালচারে অনুপ্রাণিত হয়ে আবার কেউ কেউ এলাকাভিত্তিক গ্যাংয়ের প্রভাবে বাধ্য হয়ে গ্যাং এ জড়িয়ে পড়ছে। শুরুটা স্বাভাবিক হলেও একসময় তাদের পোশাক, আচরণ, কর্মকাণ্ডে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। যা দেশীয় সংস্কৃতি ও সভ্য সমাজের সঙ্গে একেবারে মানানসই নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিত্য-নতুন ধারার অপরাধের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে। বিশেষ করে ঢাকার কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের কর্মকাণ্ড বেশি বেপরোয়া। তারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে স্কুল-কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, গভীর রাতে মাদকাসক্ত হয়ে কার ও মোটরসাইকেল রেসিং, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর এজেন্ট, শহরের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই এমনকি ভাড়ায় কিলিং মিশনে অংশ নিচ্ছে। একই এলাকায় একাধিক গ্রুপ হওয়াতে আধিপত্য বিস্তারে তারা মরিয়া হয়ে থাকে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে তারা প্রায়ই সংঘাত-সংঘর্ষে জড়ায়। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য তারা শক্তিশালী অবস্থান নেয়। দেশি- বিদেশি অস্ত্র ব্যবহার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে হুমকি দেয়। বিভিন্ন সময় প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য মারামারির ভিডিও আপলোড করে। কিশোর গ্যাংয়ের নানা সংঘাতে খুন পর্যন্ত গিয়ে গড়িয়েছে- এমন ঘটনাও অহরহ ঘটছে।

সূত্রমতে, ইন্টারনেটের ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতার কারণে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন, ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াট্‌সঅ্যাপ, ভাইভার ইমোতে গ্রুপ করে তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। কর্মপরিকল্পনা থেকে শুরু করে হুমকি, নির্দেশ সবকিছুই তারা ইন্টারনেটের সুবাধে সেরে নিচ্ছে। ইন্টারনেটই তাদের মূল হাতিয়ার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে এখন আগ্নেয়াস্ত্র প্রায়ই দেখা যায়। এসব অস্ত্র দিয়েই তারা নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে বেড়াচ্ছে। সরকার পতনের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে রয়েছে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দারা। এছাড়া আধুনিক ধারালো অস্ত্র যেমন চাপাতি, বেঁকি, বার্মিজ চাকু, কিরিচও রয়েছে। ডিএমপি’র প্রতিটি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করছে। ঢাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোর। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় অন্তত ২০ হাজারের মতো কিশোর গ্যাং কালচারের সঙ্গে জড়িত।
মাস দুয়েক আগে বিকালে রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ সংলগ্ন টিনশেড বাড়ির ওপর এক কিশোরকে চার-পাঁচ জনের কিশোর গ্রুপ চাপাতি দিয়ে প্রকাশ্যে কোপাতে দেখা যায়। মোহাম্মদপুরের আসাদ এভিনিউয়ের ফুটপাতে গভীর রাতে এক পথচারীর কাছ থেকে ছিনতাই করার সময় চাপাতি বাহিনীর চকচকে চাপাতি প্রদর্শনের দৃশ্যও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। গত মাসে যাত্রাবাড়ীতে রিকশায় এক দম্পতির কাছ থেকে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয় চাপাতি বাহিনী। এ সময় চাপাতির আঘাতে স্বামী গুরুতর আহত হন। গত ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আদাবরের মেহেদীবাগ, আদাবর বাজার এলাকায় দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। এতে বাধা দেওয়ায় এলাকাবাসীর ওপর হামলা করে গ্যাং গ্রুপের কয়েকশ সদস্য। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় অর্ধশতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা আহত হন। পহেলা ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের গুলিবিনিময়ের মধ্যে এক কলা ব্যবসায়ী ও কিশোর গুলিবিদ্ধ হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চলাকালে কিশোর গ্যাংয়ের এক সদস্য চাপাতি দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে আহত হন পুলিশের চার জন সদস্য। হামলার ঘটনার নেপথ্যে রায়েরবাজার বোর্ড ঘাট এলাকার কিশোর গ্যাং ‘পাটালি গ্রুপ’ জড়িত বলে জানায় পুলিশ। নেতৃত্ব দেয় ল্যাংড়া হাসান, ফরহাদ ও চিকু শাকিল। সব মিলিয়ে হামলা চালায় ৩০-৪০ জন। গত সপ্তাহে সোমবার রাতে উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর রোডে রিকশা যাত্রী মেহেবুল হাসান ও নাসরিন আক্তার ইপ্তির ওপর চাপাতি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। এ সময় মেহেবুলের সামনে নাসরিন দাঁড়িয়ে চাপাতি বাহিনীর হামলা থেকে রক্ষা করে। এই হামলার ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে বুধবার রাত ১১টার দিকে মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচে সড়কে এক রিকশাযাত্রী দম্পতিকে চাপাতি বাহিনী তাদের চাপাতি দেখিয়ে মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোন ছিনতাই করে মোটরসাইকেলে চলে যায়। মোহাম্মদপুর, উত্তরারা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ সবাই। কিছুদিন পরপরই তারা গণছিনতাই করে। অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। অস্ত্র ঠেকিয়ে মানুষের সবকিছু লুটে নেয়। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হতে ভয় পান অনেকে। যেকোনো কিছুতে তারা চাঁদাদাবি করেন। না দিলে হুমকি দেন। মহড়া দেওয়ার সময় বাসাবাড়ির জানালার গ্লাস ভাঙচুর, লাইট ভাঙচুর করে গ্যাংয়ের সদস্যরা।

পুলিশের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ঢাকার মধ্যে উত্তরা, আদাবর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। এ দুটি স্থানে একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের কয়েক হাজার সদস্য রয়েছে। আদাবর এলাকার আলিফ হাউজিং, শ্যামলী হাউজিং, শেখেরটেক ও ঢাকা উদ্যান এলাকার সব ধরনের অপরাধের সঙ্গে এদের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রোধ করতে রাজনৈতিক চাপ না থাকলেও প্রভাবশালীদের চাপ রয়েছে। যাদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে কিশোর গ্যাংয়ের গড ফাদাররা আইনের মারপ্যাঁচে সব সময় বেঁচে যান। তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। সাম্প্রতিক সময়ে যখন কিশোর গ্যাং সদস্যদের অপতৎপরতা বেড়েছে তখনও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনতো হয়তো অদৃশ্য প্রভাবশালীদের চাপে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কিশোরগ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

mzamin

Saturday, December 14, 2024

চাঁদাবাজি দখলের হাত বদল, ক্ষোভ by শুভ্র দেব

আগে তো মুখ খুলে কথা বলতে পারতাম না। কিছু বললেই আওয়ামী লীগের নেতারা সরকারবিরোধী বলে পুলিশে ধরিয়ে দিতেন।  একজন নিরীহ ব্যবসায়ী সরকারের বিরুদ্ধে বলায় তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কতো মারধর, অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। জমিজমা দখল  করে নেয়া হয়েছে। নিজের ভোটটা দিতে পারি নাই গত ১৬ বছর। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতে হতো। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এখন আমরা অনেক স্বস্তিতে আছি। মন খুলে কথা বলতে পারি। নিজের ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরতে পারি। কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার মুসাপুর ইউনিয়নের লাঙ্গলবন্দের চিড়াইপাড়া এলাকায় চা দোকানি নবীর হোসেন। একই এলাকার গাড়িচালক আব্দুস সালাম বলেন, সরকার পতন হওয়ার পর খুব শান্তিতে আছি। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারি। কথা বলার আগে কোনো চিন্তা করতে হয় না। ইনকাম হয়তো বাড়ছে না, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে তবুও ভালো আছি। আর দ্রব্যমূল্য বাড়ার পেছনে কারণও আছে। যেমন দুই বারের বন্যায় সবজি উৎপাদন করতে পারেননি কৃষক। তাই আলুর ওপর চাপ পড়েছে। তবে আরও কিছুদিন গেলে দাম কমবে। অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম কমলে সাধারণ মানুষ কিছুটা স্বস্তিতে থাকতে পারবে। মাংস বিক্রেতা আলিম উদ্দিন বলেন, ইউনূসের আমলে ভালো আছি। যদিও জিনিসপত্রের দাম বেশি। বাজারে গেলে হিমশিম খেতে হয়। তবে আগে মানসিকভাবে যে অশান্তিতে ছিলাম সেটা আর হচ্ছে না। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা জোর করে মানুষের জমি দখল করে নিতেন। চাঁদাবাজি করতেন। মানুষকে নির্যাতন করতেন। তাদের প্রভাবে কেউ কথা বলার সাহস পেতেন না। কোনো চায়ের দোকানে বসে আওয়ামী লীগ বা সরকার নিয়ে কিছু বলা যেতো না। এখন আর এসব নাই।

৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার মানুষ কেমন আছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনব্যবস্থা কেমন লাগছে, সাধারণ মানুষের জীবনমানে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা এসব জানতে বুধবার জেলার কয়েকটি উপজেলা ঘুরে বিভিন্ন তথ্য মিলেছে। বেশির ভাগ মানুষের সঙ্গে কথা বলে মোটাদাগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মিশ্র প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে।

বন্দর উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের চাঁনপুরের বাসিন্দা আব্দুল কাদের। ৬০ বছর বয়সী কাদের গত ১৪ বছর ধরে ব্যবসা করছেন। তিনি বলেন, ‘সরকার যেই হউক আমি কখনো কোনো সুবিধা নেইনি। আমরা সাধারণ মানুষ। ছোটখাটো ব্যবসা বাণিজ্য করে খাই। আওয়ামী লীগের আমলে ব্যবসা নিয়ে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এখন আর সেই সমস্যা নাই। সব জিনিসের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। কিনতে হয় বেশি দিয়ে অথচ বিক্রি করতে হয় আগের দামে। এতে করে লাভ কমে গেছে। যে হারে দাম বাড়ছে সেভাবে মানুষের আয় বাড়ছে না। তাই সরকারের জিনিসপত্রের দাম কমানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া দরকার। হাসিনা সরকারের আমলে ভোট দিতে পারি নাই ১৬ বছর। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজনই পড়েনি। মদনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এম এ সালাম ভোট জালিয়াতি করে ১৬ বছর ধরে চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনিই এই এলাকার সব নিয়ন্ত্রণ করতেন। শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সঙ্গে সখ্যতা রেখে দাপট দেখাতেন। তার বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ ছিল না। কতো মানুষের যে জমিজমা দখল করেছে তার হিসাব নাই।  কেওঢালা বাজারের জুতার ব্যবসায়ী ইয়াকুব দেওয়ান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে সব সমাধান করা সম্ভব না। কারণ এতগুলো মন্ত্রণালয় অথচ সব মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টা নাই। অনেকগুলো মন্ত্রণালয় একজন উপদেষ্টা সামলাচ্ছেন। তাই এখন মানুষ যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন এসব সমাধানের জন্য সরকারপ্রধান ও উপদেষ্টাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত। আর জনগণের নির্বাচিত সরকার যত দ্রুত আসবে ততই সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে অনেক পরিবর্তন এসেছে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরে। এই এলাকায় আওয়ামী নেতাদের প্রভাব কমেছে। সবাই পালিয়েছেন। এখন মানুষ চাচ্ছে দ্র্রব্যমূল্যর দাম নিয়ন্ত্রণে আসুক।

সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুর ইউনিয়নের ললাটি গ্রামের বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী শাহেদ শাহ বলেন, দ্রব্যমূল্য এত বেশি হয়েছে আমাদের মতো মানুষের একেবারে নাগালের বাইরে। মানুষ আশাবাদী ছিল এই সরকার সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু এখনও সবকিছু বেড়েই চলছে। একই ইউনিয়নের সুখেরটেক গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন বলেন, কত বছর পরে রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারছি গত কয়েকমাস ধরে। ভয় ছাড়া হাটাচলা করতে পারছি। পুলিশ এসে গ্রেপ্তার করার ভয় নেই। অকারণে বিনা অপরাধে অনেক মামলার আসামি হতে হয়েছে। এখন শান্তিতে নিশ্বাস নিতে পারি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারি। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান যেভাবে দেশে চালাচ্ছেন তাতে আমরা অনেক খুশি। এ ছাড়া জিনিসপত্রের দাম তিনি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবেন না। কারণ এখানে বড় একটা সিন্ডিকেট কাজ করছে। সিন্ডিকেট ভাঙা কষ্ট হবে। একই এলাকার অলি উল্লাহ বলেন, আমাদের এলাকায় শান্তি ফিরেছে। আমরা মিলেমিশে আছি। ধর্মীয় কোনো সংঘাত নাই। আলাউদ্দিন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, সবমিলিয়ে দেশের যা অবস্থা তাতে আমার কাছে ভালো মনে হচ্ছে না। অস্থির এক পরিবেশ বিরাজ করছে। বাজারে গেলে জিনিসপত্রের দাম শুনলে মন খারাপ হয়ে যায়। সোনারগাঁও উপজেলার পানামনগর সিটির পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচিত সরকার না আসলে দেশ এরকমই অস্থির থাকবে। কারণ নির্বাচিত সরকারের জবাবদিহিতা করতে হয়। তারা খারাপ করলে মানুষ আর ভোট দিবে না। এই ভয় তাদের মনে কাজ করে। তাই এই সরকার কোনো কিছু না করলেও বলার মতো কিছু থাকবে না। তবে সরকারের উচিত মানুষ কী চায় সেটা  বোঝার। রিকশাচালক আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, আমার রিকশায় করে প্রতিদিন কতো যাত্রীকে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যাই। যাত্রীদের গল্প শুনে বোঝা যায়। সবাই এক অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন।  

রূপগঞ্জের চনপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফিরোজ আহমেদ বলেন, ভেবেছিলাম হাসিনা সরকারের পতনের পর স্বস্তিতে থাকবো। কিন্তু কিছু পরিবর্তন আসলেও বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান হয়নি। আগে চাঁদাবাজি, দখল, মাদক ব্যবসা আওয়ামী লীগের নেতারা করতো। তারা পালিয়ে যাওয়ার পর এখন হাতবদল হয়েছে। চিত্র আগের মতোই আছে। এ ছাড়া আমরা সাধারণ মানুষের দাবি-দাওয়াও নাই। আমরা চাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকুক। প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে দাম বাড়লেও আমাদের আয় একই জায়গায় বন্দি। তাই এসবের পরিবর্তন হওয়া দরকার। কায়েতপাড়ার বাসিন্দা সোলায়মান ভূঁইয়া বলেন, স্বৈরাচারের পতনে আমরা খুশি। দেশে এক দুঃশাসন ছিল। এখন আমরা স্বস্তিতে আছি।  

সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনানী নতুন মহল্লার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, লুটপাটের জমানা এখন আর নাই। সব মানুষ এখন ভালো আছে। আয় কম হলেও মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারছে। কোনো ভয় নাই মনে। আগে তো একটা ভয় নিয়ে চলতে হতো। কখন কার ওপর কোন বিপদ আসে। একই এলাকার বাহরাইন প্রবাসী মকবুল বলেন, আমি দীর্ঘদিন ব্যবসা করেছি দেশে। কিন্তু আওয়ামী লীগের আমলে ব্যবসা করতে গিয়ে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে। আমরা দেশে কৃষিপণ্য উৎপাদন করেছি। অথচ ভারত থেকে পণ্য আনার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। অনেক টাকা লোকসানের পরে আমি মধ্যেপ্রাচ্য চলে যাই। এখন ভালো আছি। তবে আওয়ামী লীগের সময় আমার পরিবারের সদস্যরা অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়েও হয়রানি করা হয়েছে আমার পরিবারকে। হাসিনা সরকারের পতনের খবর পেয়ে দেশে এসেছি। এখন আর কোনো সমস্যা নাই।

mzamin

Wednesday, November 20, 2024

এক মামলায় ৫৩ সাবেক সচিব আসামি: বাদী বললেন ক্ষোভ থেকে মামলা করেছি by শুভ্র দেব

সাবেক ৫৩ সচিবের বিরুদ্ধে মামলা করে আলোচনায় জামাল হোসেন খান রিপন (৫১)। এক সময় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সরকারি তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদের জিএসও ছিলেন। ’৯০-এর আন্দোলনে ছাত্র ঐক্যের নেতা ছিলেন। বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তিনি। জিয়া ইয়ুথ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পারিবারিক ফার্নিচার ব্যবসার ও ঠিকাদারি করেন। এ ছাড়াও তিনি সামাজিক ও সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত আছেন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল বলেও দাবি করেছেন। তার তিন মেয়েও আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে আহত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের শাসনামল নিয়ে তার অনেক ক্ষোভ রয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাবেক সচিবদের প্রতি তিনি বেশি ক্ষিপ্ত। চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও তারা মেয়াদ বাড়িয়ে চাকরিতে অবস্থান, দুর্নীতি, বিভিন্ন দেশের এজেন্ট হিসাবে কাজ করাসহ নানা কারণেই এই ক্ষোভ। ক্ষোভ থেকেই মেয়েকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় মামলা করেছেন। বলেছেন, কে শাস্তি পাবে জানি না, ক্ষোভ থেকেই মামলা করেছি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন থানায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী,  পুলিশ সদস্য, আমলাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা  হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে সাবেক কয়েকজন সচিবকে আসামি করা হয়েছে। তবে এর আগে এক মামলায় ৫৩ জন সাবেক সচিবকে আসামি করা হয়নি। মামলায় কেন তিনি এত সাবেক সচিবকে আসামি করেছেন তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গতকাল মানবজমিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় জামাল হোসেন খান বলেন, এবারের আন্দোলনটি ছিল দীর্ঘ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিগত তিনটি নির্বাচন চোখের পলকে হয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদের একটা শক্তি দেশে দাঁড়িয়েছিল। আমার তিন মেয়ে। সবাই আন্দোলনে ছিল। আমিও ছিলাম।  ছোট মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। ৫টি গুলি লেগেছে তার শরীরে। দুইটা গুলি বের করা হয়েছে। তিনটা এখনো আছে। ফ্যাসিবাদ শব্দের সঙ্গে আমরা সেভাবে পরিচিত ছিলাম না। ফ্যাসিবাদের কারণে প্রশাসন, পুলিশ, আইন আদালত, মিডিয়া, স্কুল-কলেজ কিংবা ব্যবসার জায়গাগুলোতে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি বিগত দিনে। আমলাদের চাকরি শেষ তবুও ২/৪ বছর এক্সটেনশন করে চাকরি করেছে। অনেক ক্ষমতাবান তারা। আমলাতান্ত্রিকতার দিকে সরকার ঝুঁকেছে ২০১৪ সাল থেকে। আমরা দেখেছি আমলারা কীভাবে ক্ষমতাবান হয়ে যাচ্ছে। এমপি নির্বাচন করে মন্ত্রী হয়ে যায়। এরকম একটা ট্রেডিশন তৈরি হয়েছিল। এসব থেকে আমার মাঝে ক্ষোভ জন্মায়। তাদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নাই। আদালত যদি এগুলো আমলে আনে তবে পরবর্তী প্রজন্ম উপকৃত হবে। আর কোনো আমলা যেন দলীয়ভাবে এগ্রেসিভ না হয়। তারা যেন তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজটাই করে।

জামাল বলেন, আমার মেয়ে সামিয়া খান হৃদি। আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মেজো মেয়ে একই স্কুলের এইচএসসি’র শিক্ষার্থী। আর বড় মেয়ে নাফিসা খান মুন কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ তৃতীয় বর্ষে পড়ে। ১৮ তারিখে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের বের করে দেয় তখন সন্তানদের আর ঘরে রাখতে পারিনি। তাদের বড় ভাই, আপুরা বা সমবয়সীরা যখন আন্দোলনে যোগ দিয়েছে তখন তারা আর ঘরে থাকেনি। একসময় তো আন্দোলন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রিক হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা যখন ছাত্রলীগের হামলার কারণে আহত হয় তখনই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জোড়ালো ভূমিকা নেয়। আমরা অভিভাবক অথচ তারা আমাদের যেসব কথাবার্তা বলেছে সেসব শুনে আমরাও আন্দোলনে না গিয়ে থাকতে পারিনি। বনশ্রী এলাকায় অনেক টর্চার হয়েছে। না দেখলে বুঝানো যাবে না। এলোপাতাড়ি গুলি করেছে। এসব গুলিতে আমার মেয়ে আহত হয়েছে।  

যেখানে গণহত্যা মামলায় আসামিরা যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য প্রমাণ ও আলামতের অভাবে শাস্তির আওতায় আসবে কিনা এ নিয়ে সংশয় রয়েছে, এক্ষেত্রে হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক সচিবদের আসামি করা হয়েছে। এই মামলার ভবিষ্যত ও আসামিদের শাস্তির বিষয়ে তিনি বলেন, মামলা টিকবে কিনা এটা আদালতের বিষয় এবং দীর্ঘসূত্রিতা আছে। বিচারের প্রত্যাশা আদালতের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। কারণ আমরা জানি এদেশে বিচারের সংস্কৃতিটা এখনো গড়ে উঠে নাই। তবে যদি হয়! আমরা যেরকমটা স্বপ্ন দেখছি। আমাদের দেশটা ঘুরে দাঁড়াবে। সত্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে। স্বাধীনতার এত বছরে আমরা কিছুই পাইনি। প্রশাসনের লোকজন যদি ভালো হয়। রায় কি হবে আর কে শাস্তি পাবে তার চিন্তা করিনি। ডকুমেন্টারি থাকলো যাতে শাস্তির আওতায় আসতে পারে।

মামলায় সাবেক আমলাদের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট কেন বলা হলো এ নিয়ে তিনি বলেন, এটা বলার কারণ হলো সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেগুলো দ্রুত পাসিং হয়ে যায়। রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে আমলারা শক্তিশালী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সরকারের আচরণেও এসব বোঝা যেত। আমাদের সচিবরা পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ট্রেনিং নিচ্ছে। একদিনে হয়নি জুলাই বিপ্লবটা। এটা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিভিন্ন অনিয়ম থেকে জন্ম নেয়।

মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে কিনা এ নিয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি এরকম না। যারা ফ্যাসিবাদের দোসর হয়ে কাজ করেছে তাদেরকেই আসামি করা হয়েছে। আরও কয়েকজন ছিল তারা বাদ পড়ে গেছে। মিডিয়া সেক্টরের কিছু ব্যক্তির নাম বাদ পড়ে গেছে। তারাও ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে কাজ করেছে।  মেয়ের শারীরিক অবস্থা নিয়ে বলেন, আমার মেয়ের পায়ের হাড়ের সঙ্গে গুলি লেগে আছে।  মেয়েটা পা ভাঁজ করতে পারে না। দেশের বাইরে কোথাও নিয়ে চিকিৎসা করানোর ইচ্ছা আছে। সিএমএইচ বলেছে, তিন মাস পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে অপারেশনের অবস্থায় আছে কিনা। মামলার তদন্ত নিয়ে জামান বলেন, ঘটনার প্রায় তিন মাস পর তিনি প্রথমে বাড্ডা থানায় মামলা করতে যান। থানা থেকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেয়া হয়। এরপর তিনি সিএমএম আদালতে মামলা করেছেন। আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) এ মামলা তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে। এখনো তদন্ত শুরু হয়নি। এসপিকে ফোন দিয়েছিলাম। বললেন, তদন্ত কর্মকর্তা কিছুদিন পর যোগাযোগ করবে।

এর আগে ২৯শে অক্টোবর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে মামলা করেন জামান হোসেন খান। মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৯৬ জনকে। এ ছাড়া পুলিশ সদস্যসহ আরও ২০০/৩০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় তিনি সাবেক সচিবদের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট, দুর্নীতিবাজ, ফ্যাসিস্টের সহযোগী, রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার, সাবেক মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, আব্দুস সোবহান সিকদার, তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। সাবেক অন্য সচিবদের মধ্যে রয়েছেন মোজাম্মেল হক খান, জুয়েনা আজিজ, ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, হেলালুদ্দীন আহমেদ, ফয়েজ আহমেদ, সাজ্জাদুল হাসান, সালাহ উদ্দিন, লোকমান হোসেন মিয়া, আব্দুল মান্নান, আব্দুল মান্নান হাওলাদার, আবু হেনা মোরশেদ জামান, ওয়াহিদা আক্তার, হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, মাকছুদুর রহমান পাটোয়ারী, মহিবুল হক, উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত, জাহাংগীর আলম, এম এ এন সিদ্দিক, শাহজাহান আলী মোল্লা, শ্যামল কান্তি ঘোষ, ইকবাল খান চৌধুরী, মরতুজা আহমেদ, খন্দকার শওকত হোসেন, নিয়াজ উদ্দিন মিয়া, জাফর আহম্মদ খান, বরুণ দেব মিত্র, এম আসলাম আলম, রফিকুল ইসলাম, চৌধুরী মো. বাবুল হাসান, সুরাইয়া বেগম, নজরুল ইসলাম খান, শহীদউল্লা খন্দকার, আব্দুল মালেক, জিল্লার রহমান, ইবরাহীম হোসেইন খান, সম্পদ বড়ুয়া, পবন চৌধুরী, অপরূপ চৌধুরী, সামছুদ্দিন আজাদ চৌধুরী, আক্তারী মমতাজ, শাহ কামাল ও প্রশান্ত কুমার রায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ, সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন আহম্মেদ। মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম, সাবেক সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, পিএসসি’র সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক। ইসি সচিবালয়ের বর্তমান অতিরিক্ত সচিব ফরহাদ আহম্মদ খান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলি, সাবেক যুগ্ম সচিব আবুল কাশেম ও মোহাম্মদ আবদুল বাতেন এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের এনআইডি শাখার সাবেক পরিচালক ফরহাদ হোসেন। মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়, সায়মা ওয়াজেদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক একজন প্রধান বিচারপতি, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক একজন চেয়ারম্যান, পুলিশের সাবেক আইজিপি, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক তথ্য ও সমপ্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহ্‌মেদ, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক দুই মেয়র আতিকুল ইসলাম ও শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব বিপ্লব বড়ুয়া, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক, পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনসহ কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে তিনজন সাংবাদিক নেতাও রয়েছেন। তারা হলেন- ইকবাল সোবহান চৌধুরী, মোজাম্মেল বাবু ও নঈম নিজাম।

মামলার এজাহারে বাদী জামাল হোসেন খান উল্লেখ করেছেন, তার মেয়ে সামিয়া খান আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ বনশ্রী শাখার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ৫ই আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে যোগ দিতে সামিয়া আফতাবনগরে ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যায়। সেখানে ছাত্র-জনতা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিল। ছাত্র-জনতার মিছিল চলার সময় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করতে থাকে। এ সময় সামিয়া গুলিবিদ্ধ হয়। তার পায়ে এখনো তিনটি গুলি রয়েছে।

mzamin

Saturday, November 16, 2024

ফিরে এলো গায়েবি মামলা by শুভ্র দেব, সুদীপ অধিকারী, ফাহিমা আক্তার সুমি ও নাজমুল হুদা

ফের দেশে ফিরে এলো গায়েবি মামলা। দীর্ঘ প্রায় ষোল বছর দেশে গায়েবি মামলায় জেল খেটেছেন হাজার হাজার বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মী। এতে একদলীয় শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। এরই জের ধরে জুলাইয়ে কোটার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জন্ম হয়। ধীরে ধীরে তা তীব্র হয়। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে সরকার। এর দায়ে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। হাসিনা দেশ থেকে পালালেও তার আমলে সৃষ্টি গায়েবি মামলা পালায়নি। বরং বর্তমান সময়ে এসে গায়েবি মামলা ফিরে আসার পাশাপাশি মামলা বাণিজ্যও বেড়েছে বহুগুণ। জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডে দেশের বিভিন্ন থানায় মামলা করেন নিহতদের স্বজনরা। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু এসব মামলায় নিরীহ অনেক মানুষকে ব্যক্তিগত শত্রুতা, এলাকাভিত্তিক দ্বন্দ্বে আসামি করার অভিযোগ রয়েছে। কোনোদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং ছাত্র-জনতার আন্দোলন ভিন্নদিকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা ছিল না এমন ব্যক্তিও আসামি হয়েছেন। নিহতদের যে স্বজন বাদী হয়ে মামলা করেছেন তারা নিজেরাই অনেক আসামিকে চিনেন না। কখনো তাদের নামও শুনেননি। এসব হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে হাজার হাজার ব্যক্তিকে। এ ছাড়া কোনো কোনো মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে আরও কয়েক শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। বেশির ভাগ মামলার এজাহারের বর্ণনা একই। উপরের সারির আসামিরা একই। নিচের সারিতে যারা আসামি তাদের নামের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকলেও অভিযোগ আছে এসব আসামিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, হয়রানি ও শত্রুতাবশত আসামি করা হয়েছে। ঢালাওভাবে এসব মামলার কারণে ভুক্তভোগীদের সুবিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া অন্তত ৩০টি মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। আন্দোলন দমাতে ছাত্র-জনতাকে নির্মমভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলাকারী, হত্যার ইন্ধনদাতা ও নির্দেশ প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এসব মামলায় তৎকালীন সরকারি দলের নেতৃস্থানীয় হাই-প্রোফাইল ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হত্যা মামলা প্রমাণের জন্য কিছু আলামত লাগে। কিন্তু গণহত্যা মামলা আদালতে গেলে অপরাধীরা ছাড়া পেয়ে যাবে। কারণ এসব হত্যা মামলা প্রমাণের যথেষ্ট আলামত তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে নেই। অনেক ভুক্তভোগীর ময়নাতদন্তও করা হয়নি। ঢালাওভাবে শত শত আসামিকে মামলা করার জন্য এসব মামলা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও হচ্ছে ব্যাপক। কেউ কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলের মতো আবারো গায়েবি মামলা ফিরে এসেছে। ওই সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের দমিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন থানায় ডজন ডজন মামলা দেয়া হতো। মূলত নেতাকর্মীদের হয়রানি করার জন্য তৎকালীন পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা মামলার বাদী হতেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা এসব মামলার আসামি, স্থান, সময় নিয়ে তখন নানা বিভ্রান্তি ছিল। অনেক মৃত ও প্রবাসে থাকা ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কখনোই উপস্থিত ছিলেন না এমন ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে অবস্থান করা এবং নিরীহ ব্যক্তিরাও মামলার আসামি হয়েছেন। ব্যক্তিগত শত্রুতাবশত টাকার বিনিময়ে অনেকের নাম এজাহারে ঢুকানোর অভিযোগও ছিল। কাল্পনিক ঘটনায় করা বেশির ভাগ মামলার এজাহারের বর্ণনাও একই ছিল। থানা পুলিশ ও ডিবি এসব মামলার রেফারেন্সে নেতাকর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করতো। গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেকে বছরের পর বছর পরিবার পরিজন নিয়ে বাড়ি ছাড়া ছিলেন। বিএনপি সভা সমাবেশ বা আন্দোলনের ডাক দিলে আগের কয়েকদিন গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে নেতাকর্মীদের আদালতে পাঠানো হতো। আওয়ামী লীগ সরকারের এসব গায়েবি মামলা নিয়ে তখন মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন মহল তীব্র নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছিল। ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আড়ালে আবডালে থাকা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো সামনে চলে আসে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আন্দোলনে নিহতদের স্বজনদের বলপ্রয়োগ করে বাদী করে বিভিন্ন থানা ও আদালতে মামলা হয়। ঢালাওভাবে আসামি করায় প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে এসব মামলা। এসব মামলাকে আওয়ামী লীগ শাসনামলের কাল্পনিক মামলার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

বাদী চিনেন না আসামিদের: যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা কয়েকটি হত্যা মামলার এজাহার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সবগুলোতে প্রায় একই ধরনের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। আলাদা আলাদা হত্যা মামলা হলেও সেগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ একই মন্ত্রীদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদীরা জানিয়েছেন, এসব মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের অধিকাংশকেই তারা চেনেন না। রাজনৈতিক দলের প্রভাবে ঢালাওভাবে মামলাগুলো দেয়া হয়েছে। এমনকি মামলার বাদী হওয়ার জন্য হুমকির শিকার হতেও হয়েছে অনেককে। যাত্রাবাড়ী থানার ৬/৭৯২ নং মামলার এজাহারে দেখা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইমরান হোসেন (১৯) নিহত হন। ওই ঘটনায় নিহতের মা কোহিনূর আক্তার বাদী হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ একাধিক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ২৯৮ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও অনেকের নামে মামলা দেয়া হয়। তবে মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের অনেকেই বাদী কোহিনূর আক্তার চেনেন না বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন। তিনি জানান, রাজনৈতিকভাবে চাপাচাপির কারণে এভাবে এতজনের নামে মামলা করতে হয়েছে তাদের। কোহিনূর বলেন, মামলা করেছি, এখন যা হওয়ার হবে। রাজনৈতিকভাবে অনেক চাপাচাপি ও ঝামেলা ছিল। যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণ না করে তখন যার যার রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল তারা। সে কারণে অনেক চাপাচাপিতে মামলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, যাদের নামে মামলা হয়েছে তাদের কিছু মানুষকে চিনি। সবাইকে চিনি না। আমার ছেলেকে যে মেরেছে তা নয়, সারা বাংলাদেশে যাদের মারা হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে একই হুকুমদাতা, একই উস্কানিদাতা হিসেবে মামলা করা হয়েছে। আমার একজন মামা ও একজন আইনজীবী মামলা করতে সহায়তা করেছেন। মামা জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করেন। যাত্রাবাড়ী থানার ৪৫/৮৩১ নং মামলাতেও অজ্ঞাতনামাসহ শতাধিক আসামি করে মামলা দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৪৬ জনের নাম উল্লেখ করা হলেও তাদের সবাইকে ঠিকমতো চেনেন না বলে জানান মামলার বাদী মামুনুর রশিদ। তাকে হুমকি দিয়ে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যাত্রাবাড়ী এসে আসামিদের নাম উল্লেখ করে মামলা দিয়েছে। বাদী মামুনুর রশিদ বলেন, আমরা তখন মানসিকভাবে ভালো ছিলাম না। লাকসাম থেকে লোকজন ঢাকায় এসে তারাই এই নামগুলো দিয়েছে। তারা বলেছে, আমি বাদী হয়ে তাদের মতো করে মামলা না করলে, আমাদের বিরুদ্ধেই পুলিশকে বাদী করে মামলা দিয়ে দিতো। যাত্রাবাড়ী থানার ১০/৭৯৬ নং মামলাতে ৪৪২ জন আসামির নাম দিয়ে হত্যা মামলা করা হয়েছে। এই মামলাতেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ একাধিক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদী মো. আবু বক্কর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৩ নং ওয়ার্ডের আহ্বায়ক। এক মামলায় এতজনকে আসামি করার কারণ জানতে চইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় তো আপনি ছিলেন না। মাঠে আমরা আন্দোলন করেছি। গুলির শব্দ শুনেছি। অনেক কিছু চোখে দেখছি। মোবাইলে আমি কোনো স্টেটমেন্ট দিবো না।

এজাহার-আসামি একই: জুলাই- আগস্টের হত্যাকাণ্ডে নিউমার্কেট থানায় চলতি বছরের আগস্ট মাস থেকে নভেম্বর মাসে দুইটি হত্যা মামলা হয়েছে। দুইটি মামলায়ই আসামি করা হয়েছে ১৩৮ জনকে এবং অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৩৪০ জনকে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহত-নিহত হওয়ার ঘটনায় গত ২১শে আগস্ট আব্দুর রহমান নামে এক ব্যক্তি বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলা নম্বর-৪/৯০। সেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩১ জনকে আসামি করা হয়। ঘটনার দিন নিউমার্কেট থানার নীলক্ষেত এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট ৪০ থেকে ৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ব্যক্তিবর্গসহ আরও ২৫০ থেকে ৩০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। মামলার বাদী আব্দুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, গত ১৯শে জুলাই আমার ভগ্নিপতি নিউমার্কেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন। মাথার পেছনে গুলি লাগলে সেদিনই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এ ঘটনায় গত ২১শে আগস্ট নিউমার্কেট থানায় মামলা করি। আমাদের সন্দেহ থেকে আসামিদের নামগুলো দিয়েছি। পুলিশ তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নিবে। গত ২১শে আগস্ট নিউমার্কেট থানায় সামসি আরা জামান নামে এক নারী আরেকটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর-৩/৮৯। আন্দোলনে অংশ নিয়ে তার সন্তান তাহির জামান প্রিয় (২৭) গুলিতে নিহত হন। এই মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৭ জনকে আসামি করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা ৩০ থেকে ৪০ জন পুলিশ এবং বিজিবি’র কর্মকর্তা এবং সদস্যও রয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানায় মোট ৩৩টি মামলা দায়ের হয়েছে। বেশির ভাগ মামলাতেই প্রধান আসামি শেখ হাসিনা। এ ছাড়া মামলার আসামি হয়েছে সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক এমপি জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক ডিবি প্রধান হারুন-অর-রশীদসহ আওয়ামী লীগ ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে। মোট ৩৩টি মামলায় ৫ হাজারের বেশি মানুষকে আসামি করা হয়েছে। সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহত হওয়ার ঘটনায় গত ১২ই নভেম্বর মিস্টার হোসেন নামে একজন বাদী হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ২৭৭ জনকে আসামি করে মামলা করেছে মোহাম্মদপুর থানায়। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইফতেখার হাসান বলেন, আমাদের কাজ মানুষকে সেবা দেয়া, আমরা সেটাই করছি। কার নামে কে মামলা দিচ্ছে বা তার পেছনে কী উদ্দেশ্য বা বাণিজ্য হচ্ছে কিনা আমরা তা বলতে পারবো না। আমাদের এখান থেকে কোনো মামলার কাগজও দেয়া যাবে না। মামলা সম্পর্কে আমাদের তথ্য দেয়া নিষেধ। গণমাধ্যম কর্মীরা যদি মামলার বিষয়ে বাদীর সঙ্গে কথা বলে তাহলে আমাদের তদন্ত কাজে সমস্যা হতে পারে। তাই মামলার বিষয়ে জানতে হলে আদালতে যেতে হবে। গণহত্যার ঘটনায় রামপুরা থানায় যে ১৫টি মামলা হয়েছে তার অন্তত ১৩টিতেই শেখ হাসিনাকে আসামি করা হয়েছে। সব মামলায় প্রায় ৮০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ঘুরেফিরে সব মামলায় আসামিরা একই। মামলায় ঘটনাস্থলও প্রায় কাছাকাছি দেখানো হয়েছে।     

বিদেশে থেকেও আসামি: গত ২৪শে জুলাই মেয়েকে দেখতে কানাডা যান এভিআর বাংলাদেশের  চেয়ারম্যান হাসিব আলম তালুকদার। কিন্তু বিদেশে থাকলেও তিনি গণহত্যা মামলার আসামি হয়েছেন। তার ছোট ভাই আশিককেও আসামি করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ী থানার সামনে গত ৫ই আগস্ট নিহত হন পিকআপ চালক মো. শাহীন। এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন তার স্ত্রী স্বপ্না বেগম। গত ৭ই সেপ্টেম্বর ঢাকার যাত্রাবাড়ী থানায় এ মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় ৮৭ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। ঐ মামলায় ১৮ নম্বর আসামি করা হয়েছে হাসিব আলমকে ও  ৪৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে তার ভাই আশিকুর রহমানকে। হাসিব আলম তালুকদার জানিয়েছেন, তিনি ২৫শে জুলাই কানাডা চলে যান। এখনো তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।  তার ধারণা বরিশালের বাউফলকেন্দ্রিক কেউ হয়রানি করার উদ্দেশ্যে এই মামলার সঙ্গে তার নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। একইভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গত ৫ই আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১৪ কাফরুলে নিহত হন ভোলার চরফ্যাশনের মো. ফজলু। এ ঘটনায় বিদেশে থেকেও হত্যার অভিযোগে মামলার আসামি হয়েছেন ওমান প্রবাসী লোকমান। মামলায় ৪৯ নং আসামি করা হয়েছে তাকে। অথচ ঘটনার সময় তিনি ওমানে ছিলেন, বর্তমানেও তিনি ওমানেই অবস্থান করছেন। জানা যায়, এই মামলায় এমন অনেকেই আছেন যারা ঘটনার সময় ঢাকায় ছিলেন না। কেউ কেউ নিজ কর্মস্থলে ছিলেন। মামলা সূত্রে জানা যায়, এ হত্যার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন জেলার ৭১ জনসহ অজ্ঞাত আরও ২/৩শ’ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এসব আসামির মধ্যে ৫ জন ভোলার লালমোহন উপজেলার বাসিন্দা। আদাবর থানায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের নামেও মামলা হয়েছে। অথচ তিনিও আন্দোলনের সময় বিদেশে ছিলেন। শুধু বিদেশে অবস্থানরতরাই নয় রাজনীতি বা ছাত্র-জনতার আন্দোলনবিরোধী ছিলেন না, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরিসহ অন্যান্য পেশার সঙ্গে সাধারণ জীবনযাপন করেও অনেকে আসামি হয়ে এখন থানায় থানায় ঘুরছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণহত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের অনেক বেগ পেতে হবে। ঢালাওভাবে মনগড়া যেভাবে আসামি করা হয়েছে এসব মামলার তদন্ত করে চার্জশিট দেয়াই চ্যালেঞ্জ হবে। আর চার্জশিট দিলেও মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হলে যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ ও আলামতের অভাবে আসামিদের শাস্তি পর্যন্ত নাও হতে পারে। এ কারণে অনেক আসামি অপরাধ করা সত্ত্বেও আইনের ফাঁকফোকরের কারণে মুক্তি পেয়ে যেতে পারে। কারণ আন্দোলনে যারা নিহত হয়েছেন তাদের অনেকেরই ময়নাতদন্ত হয়নি। হত্যা মামলায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করার জন্য ময়নাতদন্ত রিপোর্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কথা বলা হলেও সরাসরি কে গুলি করে হত্যা করেছে তারও প্রমাণ নেই। তাকে শনাক্ত করাও কঠিন হবে। মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদেরকে হুকুমদাতা ও নির্দেশদাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে করে মামলার গোড়ায়ই গলদ থেকে যাচ্ছে।  
সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক মানবজমিনকে বলেন, একটা মামলায় যদি ২০০ আসামি থাকে। কে সম্পৃক্ত ছিল আর কে ছিল না। তার কি ভূমিকা ছিল এগুলো তদন্ত করে রিপোর্ট দেয়া প্রায় অসম্ভব হবে। ফলে এসব এজাহারের মামলার বিচার হওয়ার সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ মনে হচ্ছে। মামলা বাণিজ্য নিয়ে তিনি বলেন, এদিকে সরকার পর্যাপ্ত দৃষ্টি দিচ্ছে না। পুলিশের মধ্যেও অনেক ওলটপালট হয়েছে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বরিশাল পুলিশ লাইন্সে এক অনুষ্ঠানে বৃহস্পতিবার বলেছেন, কারও নামে হয়রানিমূলক মামলা করা হলে বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমরা এ ধরনের একটি সার্কুলার দিয়েছি, যেন এ ধরনের মামলা না নেয়া হয়। তিনি বলেন, এখন অনেক মামলা হচ্ছে, তাতে অনেক নিরপরাধ লোকদের ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি বাহিনীর প্রধানদের বলছি, যারা এ ধরনের মামলা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও অ্যাকশন নেয়ার জন্য। যদি এ ধরনের মামলা নেয়া হয়, তাহলে বাদীর বিরুদ্ধে যেন অ্যাকশন নেয়। এর আগে ঢালাও মামলা নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা ওঠার পর সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশ বাহিনীকে যাচাই বাছাই করে মামলা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়। মঙ্গলবার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও বলেছেন, দেশে ঢালাও মামলার প্রবণতা দেখা দিয়েছে যা বিব্রতকর। এসময় তিনি বলেন, দু’টি বিষয়ে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের কাছে সহায়তা চেয়েছেন। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে গায়েবি মামলা হতো। সরকারের পক্ষ থেকেও গায়েবি মামলা দিতো। আর এখন আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা দিচ্ছি না। সাধারণ লোকজন, ভুক্তভোগী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তারা অন্যদের ব্যাপারে ঢালাও মামলা দিচ্ছে। ঢালাও মামলার একটা মারাত্মক প্রকোপ দেশে দেখা দিয়েছে। এটি আমাদের অত্যন্ত বিব্রত করে।

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, বিগত সময়ে আমরা মামলা বাণিজ্য নামক একটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। ব্যক্তি ওই অপরাধের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত না, অথবা ব্যক্তি জীবিত নেই বা দেশে থাকেন না- এদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। এসকল মামলায় উদ্দেশ্য ছিল দু’টি, সেটি হলো- সরকার রাজনৈতিকভাবে বিরোধী মত অথবা তার বিপরীত যে পক্ষ ছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, অথবা এলাকা বা রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে দূরে রাখা। আর পুলিশের একটি অংশ এখান থেকে আর্থিকভাবে সুবিধাভোগী হয়েছে। এসকল মামলা যাদেরকে দিয়েছে তাদের কাছ থেকে নামটাকে বাদ দিবে বা আসামির সংখ্যাটা নিচের দিকে দিবে এরকম নানা ফন্দি ফিকির অথবা উপায়গুলো উপস্থাপন ওই অভিযুক্ত ব্যক্তি বা তার পরিবারের কাছ থেকে নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। এখন গত ৫ই আগস্টের পরে কিন্তু আমাদের এরকম হয়রানি, গায়েবি মামলা, মামলা বাণিজ্য বা অন্যান্য প্রসঙ্গ এগুলো থাকবে না এই প্রত্যাশা কিন্তু আমাদের সকলেরই ছিল। প্রথম দুই মাস আমরা এর খুব একটা বেশি উপস্থিতি দেখিনি। কিন্তু পুলিশের মধ্যে একটি অংশ হয়তো এরকম মনে করছে যে, আসলে পরিস্থিতি একটি সময় গিয়ে পরিবর্তন হবে এবং তারা আগে যা করতেন সেটি হয়তো তারা করার সুযোগ পাবেন। এই প্রসঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে যে, গায়েবি মামলার সংখ্যাটা বেড়ে যাচ্ছে, মানুষের নামে মিথ্যা মামলার সংখ্যাটা বেড়ে যাচ্ছে বা মানুষকে নানাভাবে কোথাও না কোথাও হয়রানি করা হচ্ছে এবং এই মামলা দেয়া না দেয়া এই প্রসঙ্গগুলোকে নিয়ে আর্থিক ভাগ-বাটোয়ারার প্রসঙ্গগুলো তৈরি হচ্ছে। এখন এই সবকিছু মিলে আমাদের যে পরিবর্তন বা সংস্কারের মধ্যদিয়ে আমরা যদি সুবিধাটা করতে চাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইনপ্রয়োগের প্রসঙ্গ ধরে যত ধরনের অন্যায়-অনিয়ম কিংবা মানুষের অধিকারবহির্ভূত বা বিরোধী যে সমস্ত  ব্যবস্থাগুলোর অভিযোগ আছে সেই ব্যবস্থাগুলোকে কিন্তু বাদ দিতে হবে।

তিনি বলেন, এই গায়েবি মামলা পরিমাণে বা সংখ্যায় অল্প হলেও আবার ফিরে এসেছে বা ফিরে আসার চেষ্টা করছে। যাদের মাধ্যমে ফিরে আসছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে জোরালো ভূমিকা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় আমরা যদি আবার সেই পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাই তখন যে বাস্তবতা দাঁড়াবে সেই প্রসঙ্গগুলো কিন্তু আমাদের এই সংস্কারের কার্যক্রমকে সাধারণ মানুষের মাঝে নানাভাবে প্রশ্ন তৈরি করবে এবং মানুষ কিন্তু আবার হয়রানি হওয়া এবং তার নাগরিক অধিকার থেকে নিরাপত্তার প্রশ্নে, মতামত প্রকাশের প্রশ্নে অর্থাৎ সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করতে গিয়ে সে কিন্তু আবার পুলিশকে দোষারোপ করবে এবং পুলিশের সঙ্গে আবার জনগণের আস্থার যে সম্পর্ক তৈরি হওয়ার কথা সেটির পরিবর্তে সংশয় ও ভয় তৈরি হবে। কোনোভাবে যাতে নাগরিকের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি না হয় এই প্রসঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে। তৌহিদুল হক বলেন, এই মামলাগুলো আমি দেখি যে একটা আজব মামলা। যিনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যিনি বাদী তিনি আসামিদের চিনেন না। যখন একটি অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে এই অনিয়মটাকে লাগাম টেনে ধরতে একটা সময় লাগে। যারা সুবিধা নিবে বা নিয়েছে তাদের অনেকেই এখন মাঠে আছে। এই অনিয়মটাকে চর্চা করার চেষ্টা করবেন বা চেষ্টা করছেন। জুলাই বিপ্লবে কোনো পরিবারের একজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এখন তাকে পুঁজি করে রাজনৈতিকভাবে অথবা অন্য কোনো স্বার্থকে পূরণ করার জন্য এইভাবে যদি আইনি কাঠামো বা ঘটনার পরিপন্থি মামলার সংখ্যাগুলো যখন তৈরি হয় এটি যখন গণমাধ্যমে আসে তখন কিন্তু মানুষের সেই আস্থার জায়গাটি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। এই ধরনের মামলার কিন্তু আইনিভাবে মেরিট বা ভিত্তি দুর্বল থাকে। যদি একজনও সত্যিকার অর্থে অভিযুক্ত থাকেন তিনিও কিন্তু একটা সময় গিয়ে ওইভাবে মামলার আসামি হওয়ার কারণে তিনিও পার পেয়ে যান। মামলা যদি করার মূল উদ্দেশ্য থাকে প্রকৃত অভিযুক্তকে বিচারের মুখোমুখি করার তাহলে মামলাগুলো এমন হওয়ার কথা না। সেক্ষেত্রে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি একটি নির্দেশনা ছিল যে, মামলা করার আগে যাচাই-বাছাই করবেন- এটি আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন সেটি কিন্তু আমরা দেখছি না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও যাতে কারও দ্বারা ব্যবহৃত না হন অথবা কেউ যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সামনে রেখে তার ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য এই মামলাকে সামনে রেখে যেন হয়রানি করতে না পারেন সেদিকে সতর্ক থাকলে এই অবস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

mzamin