Sunday, June 27, 2010

আলোকদীপ্ত শহীদজননী জাহানারা ইমাম by সুস্মিতা সিকদার

ত্রিশ এবং চল্লিশের দশকের একটি রক্ষণশীল বাঙালি মুসলিম পরিবারে শহীদজননী জাহানারা ইমামের জন্ম হয়। সামাজিক নানা অনুশাসনের মধ্যে কেটেছে তাঁর ছেলেবেলা। বাবা ছিলেন অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বাবার উদার মনোভাবের কারণে তিনি একজন আধুনিক, রুচিশীল মানুষ হতে পেরেছিলেন। তা না হলে সে যুগে এমন একটি রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নিয়ে সংস্কৃতিমনা, শিক্ষিত, পরিশীলিত মনের মানুষ করে নিজেকে গড়ে তোলা মোটেই সহজ হতো না।
ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় সাহিত্যপাগল শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় তিনি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হন। ওই বয়সে তিনি বাংলা অনুবাদে পরিচিত হন তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, ভিক্টর হুগো, সেলমা লেগারলফ, শেক্সপিয়র, বার্নার্ড শ, ন্যুট হামসুনের মতো লেখকদের সাহিত্যের সঙ্গে। পৃথিবীর জন্ম ও সভ্যতার বিবর্তন নিয়ে কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে লেখা নেহেরুর ‘এ ফাদার্স লেটার টু হিজ ডটার’ ইত্যাদি জাহানারা ইমামকে যুক্তিশীল ধ্যান-ধারণায় মনোযোগী করে তোলে। সুদূর মফস্বলে থেকে তিনি জেনেছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস। তিনি আরও জেনেছিলেন মুসলমান সমাজে নারীশিক্ষা বিস্তারে বেগম রোকেয়ার আমৃত্যু সংগ্রামের ইতিহাস। এ প্রসঙ্গে জাহানারা ইমাম বলেছেন, ‘আধো অস্পষ্টতার মধ্যে আমি বোধহয় সত্যিকারের মানুষ হতে চেয়েছিলাম। বাবা আমাদের Plain living, high thinking-এর কথা বলতেন। অল্প বয়সেই বড় বড় লেখকের বই পড়তাম, বড় বড় লোকের জীবনী পড়তাম। রবীন্দ্রনাথকে তো হূদয়েই গেঁথে নিয়েছিলাম। ধর্মীয় গ্রন্থ, বিশেষ করে সুফিদের ওপর পড়াশোনা করতাম। বাউল-বৈরাগীদের জীবন আমাকে আকর্ষিত করত...সবখানেই মূল সুর তো আত্মার মুক্তি এবং একই সঙ্গে মানবকল্যাণ। নিজের ঊর্ধ্বে উঠে সবার জন্য ভাবনা। আমার এই ভাবনা পরিপক্বতা পায় অঞ্জলীর সঙ্গে মিশে।’
রংপুর কারমাইকেল কলেজে পড়ার সময় জাহানারা ইমাম শোষিত, লাঞ্ছিত, নির্বাক মানুষের কথা জানতে পেরেছিলেন প্রগতিশীল পত্রিকা জনযুদ্ধ এবং বাম ছাত্রসংগঠনের কর্মী অঞ্জলীর মাধ্যমে। অঞ্জলীর কথা তিনি লিখেছেন তাঁর অন্যজীবন গ্রন্থে। অঞ্জলীর মাধ্যমেই বাম রাজনীতি সম্পর্কে অল্পকিছু পড়াশোনা, ছোটখাটো কাজের সূচনা। কিন্তু অঞ্জলীর সঙ্গে মেলামেশা তাঁর বাবা পছন্দ করেননি। তাই রাজনীতি করা তাঁর আর হলো না।
কিন্তু রাজনীতিতে যুক্ত হতে না পারলেও এই সময় জাহানারা ইমাম বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি কিশোরী মেয়েদের নিয়ে মুকুল ফৌজ গঠন করেন। তাঁর নির্দেশে মেয়েরা প্যারেড করত, দেয়ালপত্রিকা বের করত, বাঁশের ছোট ছোট তাঁতে তোয়ালে বা গামছা আকারে কাপড় বুনত, গরিব ছেলেমেয়েদের মধ্যে দুধ বিতরণ করত। নাচ, গান ও নাটকের মহড়া দিত। জাহানারা ইমাম মেয়েদের হামদ ও নাত গাওয়ার প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতেন। বাড়ির ছেলেমেয়েদের নিয়ে উঠানে মঞ্চ তৈরি করে সোহরাব রুস্তম নাটকটি প্রদর্শন করেন। এ ছাড়া তিনি বাড়িতে নারীদের দাওয়াত করে মিলাদ পড়াতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। তখন তিনি সাদা সালোয়ার-কামিজ পরতেন, গয়না পরতেন না। অন্যদেরও গয়না না পরার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। ইসলাম ধর্মসংক্রান্ত যত বই বাড়িতে ছিল, সব তিনি পড়ে ফেলেছিলেন। এ জন্য জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তাঁর মধ্যে কোনো মিথ্যাচার, ভণ্ডামি, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। অত্যন্ত আকর্ষণীয় চেহারা ও অদ্ভুত সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের অধিকারী এই তরুণী অতি অল্প সময়ের মধ্যে বহুজনের আদর্শ হয়ে উঠেছিলেন। তখন যুদ্ধের সময় বাজারে ভালো কাপড় পাওয়া যেত না। রেশনের দোকানে দেওয়া কন্ট্রোলের মোটা শাড়ি নারীরা পরতে চাইতেন না। জাহানারা ইমাম এবং তাঁর মা কন্ট্রোলের মোটা শাড়ির পাড়ে ব্লকপ্রিন্ট করিয়ে সেই শাড়ি পরে লাইব্রেরিতে, মিটিংয়ে গিয়ে নারীদের কন্ট্রোলের মোটা শাড়ি পরতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। চরিত্রের তেজস্বিতা, বিবেকের সচেতনতা, দূরদর্শিতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের সাহসিকতার অঙ্কুর এই সময়েই তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।
রংপুর কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর তিনি কলকাতায় লেডিব্রেবোন কলেজে ভর্তি হন। তাঁর জীবন যত এগিয়েছে, তিনি তত বাহুল্য বর্জন করতে শিখেছেন। তিনি সাদা শাড়ি পরতে শুরু করেন। এমনকি জাহানারা ইমামের বিয়ে হয়েছিল চিরাচরিত বেনারসি শাড়ির পরিবর্তে সাদা সালোয়ার-কামিজ আর রজনীগন্ধা ফুলের অলংকার পরে।
জাহানারা ইমামের স্বামী শরীফুল আলম ইমাম আহমেদ ছিলেন একজন প্রকৌশলী। তিনি ছিলেন মুক্ত ও পরিশীলিত মনের মানুষ। তাই জাহানারা ইমামের জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল স্বামীর ঘর থেকেই। বিয়ের পর তিনি স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় পড়তে যান। টিচার্স ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। ষাটের দশকে ঢাকার রাস্তায় গাড়ি চালাতেন তিনি। কিন্তু কোথাও তাঁর কোনো উগ্রতা ছিল না। হালকা রঙের শাড়ি পরতেন। গয়না পরতেন না।
সংসারজীবনে জাহানারা ইমাম স্বামী এবং দুই ছেলে রুমী ও জামীকে নিয়ে ছিলেন পরিপূর্ণ সুখী। কিন্তু ১৯৭১ সালে তিনি হারালেন প্রাণপ্রিয় ছেলে রুমী আর প্রিয়তম স্বামী শরীফ ইমামকে। নিদারুণ শোকের হাহাকার জাহানারা ইমামকে বিপর্যস্ত করলেও নিষ্ঠুর নিয়তির কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করেননি। তাই হূদয়কে পাথর করে দুঃখের নিবিড় অতলে ডুব দিয়ে তুলে আনেন বিন্দু বিন্দু মুক্তোর দানার মতো অভিজ্ঞতার সব নির্যাস। রচিত হয় অমর গ্রন্থ একাত্তরের দিনগুলি। ব্যক্তিগত শোক-স্মৃতি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সবার টুকরো টুকরো অগণিত দুঃখবোধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে। তাঁর আপনজনের গৌরবগাথা যুক্ত হয়ে যায় জাতির হাজারো বীরগাথার সঙ্গে। রুমী অলক্ষে হয়ে যায় সবার আদরের ভাই, সজ্জন ব্যক্তি শরীফ ইমাম প্রতীক হয়ে পড়েন রাশভারী স্নেহপ্রবণ পিতার।
একাত্তরের দিনগুলি ছাড়াও তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। ষাটের দশকে অনুবাদগ্রন্থ দিয়ে তাঁর লেখালেখি শুরু হয় নদীর তীরে ফুলের মেলা, তেপান্তরের ছোট্ট শহর ও নগরী দিয়ে। মাঝখানে তিনি আর লেখালেখি না করলেও শেষ জীবনে এসে অনেক বই লিখেছেন। গজকচ্ছপ, সাতটি তারার ঝিকিমিকি, অন্যজীবন, নিঃসঙ্গ পাইন, বীরশ্রেষ্ঠ, এ নয় মধুর খেলা, নাটকের অবসান, ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস, বিদায় দে মা ঘুরে আসি ইত্যাদি।
আজ ২৬ জুন শহীদজননী জাহানারা ইমামের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। শহীদজননীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শহীদজননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি জাদুঘর দিনব্যাপী এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। প্রদর্শনীটি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

ইভ টিজিং নাকি অ্যাডাম টেররাইজিং by আইরিন খান

সম্প্রতি বিবিসির ওয়েবসাইটে দুটি খবর পাশাপাশি গেছে—আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে বাংলাদেশ নারী পুলিশ কর্মকর্তা নিযুক্ত করবে এবং সরকার ১৩ জুনকে ছাত্রীদের উত্যক্তকরণ প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে মনোনীত করেছে। একদিকে অগ্রগতি আর অন্যদিকে পেছন দিকে চলা। এ দুই খবর আজকের বাংলাদেশে নারীর জন্য যে ভগ্নমনস্ক অবস্থা বিরাজ করছে তার নজির।
যে দেশে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা নারী, সে দেশে নারী ও কিশোরীরা পুরুষের লোলুপ চাহনি, বিদ্রূপ বা কটু মন্তব্য, লাঞ্ছনা, হয়রানি, যৌন নিগ্রহ, গায়ে পুরুষের হাত বা আকস্মিক হামলার শিকার না হয়ে রাস্তায় হাঁটতে পারেন না, কিংবা বিদ্যালয়, দোকান, উদ্যান বা অন্য কোনো সামাজিক পরিসরে যেতে পারেন না, জনপরিবহন ব্যবহার করতে পারেন না—আর কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসিড আক্রমণ, অপহরণ বা হত্যার শিকার হন।
এমন অভিজ্ঞতার ফলে অল্প বয়সী কিছু মেয়ে এতটাই যন্ত্রণার্ত ও লাঞ্ছিত বোধ করেছে যে তারা আত্মহত্যা করেছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের মতে, ১০ থেকে ১৮ বছর বয়সী মেয়েদের প্রায় ৯০ শতাংশই সামাজিক পরিসরে যৌন হয়রানির শিকার। আর কলেজছাত্র, বেকার যুবক থেকে শুরু করে ফেরিওয়ালা, রিকশাচালক, বাসচালক, সহযাত্রী, সহকর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক পর্যন্ত সবাই এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত। অর্থ্যাৎ তরুণ-বৃদ্ধ, ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সব পুরুষ এমন অপরাধ করে থাকেন।
ভিকটিমরাও তেমনি বিচিত্র—কারখানাশ্রমিক ও গৃহপরিচারিকা থেকে ছাত্রী এবং অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন পেশাজীবী নারী সবাই। দারিদ্র্য এর ঝুঁকি বাড়ায়, কিন্তু আর্থিক সংগতি নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে স্বীকৃতি মিলেছে যে ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের পিছু নেওয়ার মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করার মাত্রা এত তীব্র হয়েছে যে কিছু বিদ্যালয় বন্ধ এবং পরীক্ষা স্থগিত করে দিতে হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের একটি পথ হলো শিক্ষা। অথচ শিক্ষাক্ষেত্রও লিঙ্গীয় সহিংসতার কাছে জিম্মি। মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন মা-বাবা বহু মেয়েকে বিদ্যালয় থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন, বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ফলে বাল্যবিবাহ ও কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা সমস্যা বাড়ছে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ছে।
সিগমুন্ড ফ্রয়েড লিখেছিলেন, ‘জীবদেহের গঠন নিয়তিনির্ভর।’ তাঁর এ কথা বাংলাদেশের বাস্তবতায় নতুন অর্থ তৈরি করে। ব্যাপক মাত্রায় চর্চিত লিঙ্গীয় সহিংসতার আতঙ্কে নারী ও কিশোরীর জীবন, জীবিকা, সচলতা ও স্বাধীনতা এখন বিপর্যস্ত।
অন্ধকার নেমে এলে আপনি বাইরে বেরোতে পারেন না। তরুণদের লোলুপ দৃষ্টি সবখানে ছড়ানো যে সামাজিক পরিসরে সেটি আপনি পরিহার করেন। আপনার নিরাপত্তার জন্য আপনি পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল। অন্যের দৃষ্টি এড়াতে আপনি ঢিলেঢালা পোশাক অথবা হিজাব পরেন। আপনি অবমাননা হজম করেন, আর ভান করেন যেন লোলুপ দৃষ্টি, লাম্পট্যপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি, বারবার অগ্রসর হওয়া এবং গায়ে হাত দেওয়া আপনি খেয়াল করছেন না। আরও আক্রমণের শিকার হওয়ার ভয়ে অথবা এই আক্রমণের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আপনার ওপরই আসার আশঙ্কায়, এমনকি আপনার চলাফেরার ওপর পরিবারের আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আশঙ্কায় আপনি অভিযোগ করার সাহস করেন না।
যে দেশে নারী সম-অধিকার ভোগ করেন না এবং যে রক্ষণশীল সমাজে নারীর ওপর কলঙ্কচিহ্ন পড়ে, নারীকে লজ্জিত হতে হয়, সেখানকার সামাজিক পরিসরে লিঙ্গীয় নিগ্রহ হলো পুরুষের ক্ষমতার নির্লজ্জ প্রদর্শনী। কোনো পুরুষ সেখানে নারীকে অপমান করে, আক্রমণ করে, তাঁর জীবন ধ্বংস করে দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারেন। আইন অপর্যাপ্ত, সমাজ নিস্পৃহ অথবা এতে সহযোগীর ভূমিকায়।
‘ইভ টিজিং’ বা ‘ওমেন টিজিং’ শব্দগুচ্ছই এই অপরাধ যে কতটা গুরুতর, সেটিকে হালকা করে ফেলে। টিজিং তো কৌতুকপূর্ণ, নিরিহ আচরণ। ছোট ছেলেরা ছোট মেয়েদের চুলের বেণী ধরে টান দেওয়াকে বর্ণনা করতে এটা ব্যবহার করা যেতে পারে; কিন্তু নারীর স্তনে বা নিতম্বে পুরুষের হাত দেওয়া, নারীর উদ্দেশ্যে কটু বাক্য ছুড়ে দেওয়া, নারীর পিছু নেওয়া বা জনসম্মুখে তাঁদের পোশাক টেনে ধরার বর্ণনা দিতে গিয়ে নয়।
ইলোরা, পিংকি, তন্বী, সীমা, রুমি, রুনা, রিনা ও অন্যরা টিজিংয়ের শিকার নয়। নির্যাতন ও ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে যা ঘটছে তা যৌন-সন্ত্রাস। এটা সন্ত্রাস, কারণ এর শিকার হওয়া নারী শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হন। এটা সন্ত্রাস, কারণ অপরাধ সংঘটনকারী তার শিকারকে বশে আনতে, আতঙ্কিত ও ধ্বংস করতে তার অপ্রতিসম ক্ষমতা কাজে লাগায়।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় নানা দেশে সরকার জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে মানবাধিকারকে কাটছাঁট করে। আর বাংলাদেশে যৌন-সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় সমাজ ও পরিবার নারীর স্বাধীনতায় লাগাম পরাচ্ছে অধিকতর শারীরিক নিরাপত্তার আশায়। কিন্তু ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ আমাদের দেখাচ্ছে যে নিরাপত্তা অর্জনের জন্য স্বাধীনতা বিসর্জন শেষ পর্যন্ত উভয়েরই ক্ষতি করে। যৌন-সন্ত্রাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নারীর স্বাধীনতার ওপর বাধানিষেধ বেড়েই চলেছে, কিন্তু তাদের জীবন একটুও নিরাপদ হয়নি।
মেয়েদের পিছু নেওয়া ঠেকাতে শিক্ষামন্ত্রী সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণের আহ্বান জানিয়েছেন। এটা ভালো, কিন্তু যথেষ্ট নয়। যাঁরা এই সন্ত্রাসের শিকার তাঁদের সুরক্ষা ও সহায়তা দেওয়া, নারীর মানবাধিকারকে তুলে ধরা, অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া এবং এমন সহিংসতার মূল কারণগুলোকে আঘাত করার জন্য আরও অনেক কিছু করার প্রয়োজন আছে।
সব ধরনের যৌন হয়রানি নিষিদ্ধ করে সংসদে আইন করা উচিত। লিঙ্গীয় সমতাভিত্তিক আইন প্রণয়নের বিষয়কে জরুরি ভিত্তিতে সংসদের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
পুলিশি ব্যবস্থা যাতে নারীর নিরাপত্তায় দ্রুত সাড়া দেয় সেভাবে গড়ে তোলা দরকার। উদাহরণস্বরূপ, এমন সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য পুলিশের একটি নিবেদিত অভিযোগ কক্ষ এবং হেল্প লাইনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
যৌন হয়রানির বিষয়ে গত বছর হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রশ্নটিকে রাষ্ট্র ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। কোন প্রতিষ্ঠান তা না করলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকা উচিত।
আক্রান্তদের সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া এবং জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর জন্য সুশীল সমাজের সংগঠন ও নারী সংগঠনগুলোকে অধিকতর সম্পদ দেওয়াা উচিত।
অনেক অপরাধী বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্য বা সহযোগী অথবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া কোনো দুর্বৃত্ত। আমাদের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে আছেন নারী। তাঁরা কেমন করে এই অবমাননা সহ্য করেন? নিজ নিজ দলের ভেতর তাঁদেরকে এই সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করা উচিত এবং নারীর ক্ষমতায়ন ঘটানো উচিত যেন তাঁরা নিপীড়কের অবস্থান যে রাজনৈতিক স্তরেই হোক না কেন তাঁর বিরুদ্ধে নির্ভয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে পারেন।
দমনমূলক সামাজিক পরিবেশ কিশোর ও তরুণদের মনে নারীর নেতিবাচক ইমেজ তৈরি করে। কোন নারী নিজের মতো চলতে চাইলে ধর্মীয় নেতারা তাঁকে দুশ্চরিত্র বলে নিন্দা করেন। বলিউডের সিনেমায় নারীকে উপস্থাপন করা হয় যৌন আকাঙ্ক্ষার বস্তু হিসেবে।
নারী-পুরুষ বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে ওঠার ফলে ছেলেরা মেয়েদের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রেখে বেড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ হয়। যৌনশিক্ষা নিষিদ্ধ থাকার ফলে না ঘরে না বাইরের বিদ্যালয়ে অল্প বয়সীরা তাদের শরীরে যৌনতাকেন্দ্রীক পরিবর্তনকে অনুভব করতে পারার সময়টাতে যৌনতাকে বুঝতে পারা এবং এ অবস্থায় তারা কী ধরণের আচরণ করবে তার বিহিত করার কোনো সুযোগ থাকে না। কেন মেয়েদের সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখতে হবে সে বিষয়ে ছেলেরা কিছু মাত্রায় শিখতে পারবে যদি বিদ্যালয়ে যৌনতা বিষয়ে এবং সমাজে লিঙ্গীয় ভূমিকা ও লিঙ্গীয় সহিংসতা বিষয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করা যায়।
সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের সন্তানদের আমরা কেমনভাবে লালনপালন করব, সেটাও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেক মা-বাবা তাঁদের সব ছেলে ও মেয়েকে সমান চোখে দেখেন না। ছেলে ও মেয়ের প্রতি ভিন্ন ভিন্ন নৈতিক বিধি প্রয়োগ করে তাঁরা যে শুধু আইনি বৈষম্যকে উৎসাহিত করেন তাই নয়, বরং মেয়েদের মধ্যে হীনম্মন্যতা আর ছেলেদের মধ্যে উচ্চম্মন্যতার অনুভূতি সঞ্চারিত করেন।
পিতৃতান্ত্রিক আচরণ, কুসংস্কার, সাংস্কৃতিক প্রথা, অসম নীতি এবং বৈষম্যমূলক আইন, যা নারীকে অবমূল্যায়ন করে ও অধিকারবঞ্চিত রাখে, এই সবকিছুর কারণে যৌন-সন্ত্রাস বাড়ে। এই সন্ত্রাস দূর করতে দরকার রূপান্তরমূলক সামাজিক পরিবর্তন। এ কাজটি হবে চ্যালেঞ্জিং, বিতর্কিত, জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির অনেক কিছু করার আছে। এ পথেই নারী ও কিশোরীর জন্য নিরাপদ হবে রাস্তাঘাট, বিদ্যালয় ও সামাজিক পরিসর।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
আইরিন খান: সাবেক মহাসচিব, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সমাচার by আতাউর রহমান

পত্রিকার পাতায় প্রতিদিন কত প্রতিবেদনই না বেরোয়! তন্মধ্যে কিছু প্রতিবেদন বেরোয় যেগুলো পাঠান্তে যুগপৎ বিস্মিত ও বিচলিত হতে হয়। তেমনই একটি প্রতিবেদন অতি সম্প্রতি বেরিয়েছে: রাজশাহী উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৮৩ জন প্রধান শিক্ষকের মধ্যে ৫৬ জনই ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। অংশ নেওয়া কয়েকজন প্রশিক্ষণার্থীর চলাফেরা, অসংলগ্ন আচরণ ও অনভিজ্ঞতাই নাকি অন্যদের মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি করে। সত্যিই সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!
প্রসঙ্গত মনে পড়ে গেল, এই রাজশাহীতেই ডাক বিভাগের একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ একাডেমি বিদ্যমান। সেখানে একবার একটি প্রশিক্ষণ-কোর্সে আফগানিস্তানের ডাক বিভাগ থেকে একজনকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, যে তাঁর মাতৃভাষা ফার্সি ব্যতিরেকে আর কোনো ভাষাই জানেন না; এমনকি ইংরেজি একটি শব্দও নয়। তিনি হোস্টেলে ও ক্লাসে সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে চুপচাপ বসে থাকতেন, মুখে হাসির চিহ্নমাত্রও দৃষ্টিগোচর হতো না। ঘটনাচক্রে আমি গেলাম ঢাকা থেকে ওখানে একটা ক্লাস নিতে। ক্লাসে তাঁর পরিচয় পেয়ে বাল্যকালে হাইস্কুলে ক্লাসিক ভাষা হিসেবে দুই বছর যে ফার্সি ভাষা পড়েছিলাম, স্মৃতি হাতড়িয়ে তার প্রয়োগে আমি সচেষ্ট হলাম। ফার্সিতে ‘নামে শোমা চিশ্ত’ অর্থাৎ আপনার নাম কী বলতেই তাঁর মুখে যে হাসির আভাটি ফুটে উঠল, সেটা দেখে বাংলাদেশি ও অন্যান্য দেশ থেকে আগত তাঁর সহপ্রশিক্ষণার্থীরা বলতে লাগল, ‘এই প্রথম আমরা তাঁর মুখে হাসি দেখতে পেলাম।’ অতঃপর আমি যখন তাঁকে শোনালাম তাজমহলের দেয়ালে উৎকীর্ণ কথিত বাণী, ‘আগর ফেরদৌসে বরুইয়ে জমি আস্ত/হামি আস্ত, ও হামি আস্ত, ও হামি আস্ত (অর্থাৎ, পৃথিবীতে স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে, তাহলে তা এখানেই এবং এখানেই এবং এখানেই)’, তখন তাঁর আকর্ণবিস্তৃত হাসি দেখে আমি মনে মনে ভাবছিলাম, তাহলে তাঁর দেশ তাঁকে বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠাল কেন!
সে যা হোক, ফিরে আসি শিক্ষকদের ব্যাপারটায়। নিন্দুকেরা নাকি বলেন, শিক্ষকতা হচ্ছে নিজে তেমন কিছু না জেনেই জ্ঞান বিতরণের আর্ট বা কলাকৌশল। তাঁরা আরও বলেন, শিক্ষকেরা হচ্ছেন দুনিয়াতে সর্বাধিক দায়িত্বপূর্ণ, সবচেয়ে কম বিজ্ঞাপিত, সর্বনিম্ন বেতনভোগী অথচ সবচেয়ে বেশি পুরস্কৃত পেশাজীবী। তা দুনিয়ার অন্যান্য দেশের বেলায় না হোক, আমাদের দেশের বেলায় কথাগুলো যে বহুলাংশে সত্যি, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। বিশেষ করে আমাদের রাজধানী শহরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বহু সম্মানিত শিক্ষক প্রতি মাসে প্রাইভেট পড়িয়ে যে পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন, তাতে তাঁরা যে আক্ষরিক অর্থেই সবচেয়ে বেশি পুরস্কৃত, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ধানমন্ডিতে আমার বাসার পাশে একটি কোচিং ক্লাস, সেখানে আগত ছাত্রছাত্রীদের গাড়ির ঠেলায় বিকেলে আমরা হাঁটতেও পারি না। আর আগেকার দিনে একজন তেজি তরুণ যখন হাইস্কুলের হেডমাস্টারের কামরায় যেত, তখন ভাবা হতো তার খবর আছে; এখনকার দিনে কোনো তেজি তরুণ যখন হেডমাস্টারের কামরায় যায়, তখন আশঙ্কা করা হয় হেডমাস্টার সাহেবের খবর আছে।
তো গরুকে নদীর তীরে নিয়ে যাওয়ার অনুরূপভাবে হয়ে যাক হাইস্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করে কিছু খোশগল্প: তরুণ শিক্ষার্থী পরীক্ষার খাতায় শূন্য পেয়ে শিক্ষকের কাছে গিয়ে বলছে, ‘স্যার, আমার বিশ্বাস হয় না যে আমি শূন্য পেতে পারি।’ তদুত্তরে গম্ভীর কণ্ঠে শিক্ষক বললেন, ‘তা আমি কী করব, এত্থেকে কম দেবার নিয়ম নেই যে!’ বারান্তরে শিক্ষক এক শিক্ষার্থীকে শোধালেন, ‘তুমি কি আমাকে শক্তির অপচয়ের একটি উদাহরণ দিতে পার?’ ‘পারি স্যার’, ছেলেটি চটপট উত্তর দিল, ‘একজন টাক-মাথা লোকের কাছে শুনলে ভয়ে মাথার চুল দাঁড়িয়ে যায় এমন একটি ভূতের গল্প বলা।’
আরও আছে। বার্ষিক পরীক্ষার ঠিক আগে প্রধান শিক্ষক দশম শ্রেণীর ক্লাস নিচ্ছিলেন। তিনি অত্যন্ত যত্নসহকারে বোঝালেন, পরীক্ষার আগে যে কয়দিন বাকি আছে, সে কয়দিন শিক্ষার্থীদের অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে পরীক্ষার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে হবে।
পরিশেষে তিনি বললেন, ‘পরীক্ষার প্রশ্নপত্র এখন ছাপাখানায়। কারও কোনো কিছু জানবার আছে কি?’
এক মিনিট নীরবতা। অতঃপর পেছনের দিক থেকে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আছে স্যার। ছাপাখানার নামটা জানা যাবে কি?’
আর আমাদের দেশের দশম শ্রেণীর এক ছাত্র যে স্কুল-পরিদর্শকের ‘সোমনাথের মন্দির কে ভেঙেছে?’ প্রশ্নের উত্তরে কাঁচুমাচু হয়ে জবাব দিয়েছিল, ‘আমি ভাঙিনি স্যার’ এবং ক্লাসটিচার থেকে শুরু করে হেডমাস্টার পর্যন্ত সবাই তার সাফাই গাইলেন, সেই গল্পটি বহুজন-কথিত ও বহুশ্রুত বিধায় এখানে আর বিস্তারিত বর্ণনায় গেলাম না।
তবে হ্যাঁ, দুই তরুণ শিক্ষার্থীর সেই গল্পটা বলতেই হয়: একজন অপরজনকে উদ্দেশ করে বলল, ‘গত রাতে আমি একটুর জন্য বেঁচে গেছি।’ ‘কেন, কী হয়েছিল?’ শ্রোতা ব্যগ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করল। ‘আর বলো না ভাই’, প্রথমজন এবার বলল, ‘আমি মাঝরাতে ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে আমার কামরায় সাদামতো কিছু একটা দেখতে পেয়ে অন্ধকারেই চাকু ছুড়ে মেরে ওটাকে বিদ্ধ করলাম। অতঃপর বাতি জ্বালিয়ে দেখি, সেটা আমার শার্ট, যা সে দিন সন্ধ্যায় ধুয়ে আমি দেয়ালে হ্যাঙ্গারে টাঙিয়ে রেখেছিলাম।’
-তো তাতে একটুর জন্য বেঁচে যাওয়ার কী হলো, বুঝতে পারলাম না!
—আরে, বুঝলে না? ভেবে দেখো, যদি আমি গত রাতে শার্টটা গা থেকে খুলে রাখতে ভুলে যেতাম, তাহলে তো আমিও বিদ্ধ হতাম।
লেখাটা এখানেই শেষ করা যেত। কিন্তু ইতিমধ্যে এক বিরাট ব্যাপার ঘটে গেছে, আমাদের মুসা ইব্রাহীম এভারেস্ট জয় করে এসেছেন, সে জন্য রবীন্দ্র সরণিতে তাঁকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। তো সংবর্ধনা-অনুষ্ঠানে গিয়ে আমার মনে পড়ে গিয়েছিল সেই গল্পটি: দুই পর্বতারোহী বন্ধু রশি বেয়ে চূড়ায় উঠছিল। সে সময় নিচের বন্ধু ওপরের বন্ধুকে উদ্দেশ করে বলল, ‘আমার ভয় হচ্ছে, হঠাৎ যদি রশি ছিঁড়ে যায়!’ ‘ভয়ের কিছু নেই’, উপরিস্থ বন্ধু জবাব দিল, ‘আমার ব্যাকপ্যাকে আরেকটা রশি আছে।’
আতাউর রহমান: রম্য লেখক, ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক।

চট্টগ্রামের নতুন মেয়রের জন্য কিছু পরামর্শ by মশিউল আলম

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনবারের নির্বাচিত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী কার্যালয়ে সাক্ষাতের সময় প্রশ্ন করেছিলাম, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আপনি বিভিন্ন সময়ে একাধিক কাজের উদ্যোগ নিয়েছেন, যেগুলোর বিরুদ্ধে নগরবাসীর একাংশ প্রবল প্রতিবাদ করেছিল। আপনি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নগরবাসীর মতামত শোনার চেয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেন বলে অনেকে বলছেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে কি আপনার উচিত নয় সব সময় জনমতকে গুরুত্ব দেওয়া? উত্তরে মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেছিলেন, জনগণ তাঁকে ভোট দিয়ে মেয়র নির্বাচিত করেছে, অর্থাৎ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই জনগণ তাঁকে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও কাজ করার ম্যান্ডেট দিয়ে দিয়েছে। এরপর আর সব সময় জনগণের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এম মন্জুর আলমকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি যদি মেয়র নির্বাচিত হন, তাহলে কি একক সিদ্ধান্তেই সিটি করপোরেশন চালাবেন, না সময়ে সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের মতামত নেবেন এবং সেগুলো বিবেচনা করে দেখবেন? অমায়িক বিনয়ী হিসেবে পরিচিত মন্জুর আলম স্মিত হেসে বলেছিলেন, তিনি যদি মেয়র নির্বাচিত হন, তাহলে নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে, তাঁদের মতামতকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবেন, কাজ করবেন।
১৭ জুনের নির্বাচনে এম মন্জুর আলম জয়ী হয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরীর বাসায় গিয়েছিলেন সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে, তাঁর সহযোগিতা চাইতে। মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁকে সাদরে বরণ করেছেন, চট্টগ্রামের উন্নয়নের লক্ষ্যে তাঁকে সার্বিক সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন। এটি অবশ্যই একটি প্রীতিকর ঘটনা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন ঘটনা বিরল। সে কারণেই সংবাদপত্রগুলো বেশ গুরুত্বের সঙ্গে খবরটি প্রকাশ করেছে। এবারের সিসিসি নির্বাচনের কিছু প্রশংসনীয় দিক সবারই দৃষ্টি কেড়েছে। যেমন বিএনপিনর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এম মন্জুর আলম নির্বাচিত হলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবিলম্বে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মন্জুর আলমের দিক থেকে আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল এই যে, নির্বাচনী প্রচারণাকালে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কুৎসামূলক প্রচারণায় তিনি নামেননি। যেদিন সন্ধ্যায় তাঁর নির্বাচনী কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম, সেখানে তাঁকে পরিবেষ্টন করে ছিলেন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। কথার ফাঁকে ফাঁকে তাঁরা যখনই মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে নিন্দামূলক কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তখনই মন্জুর আলম বিব্রত হচ্ছিলেন, বিনয়ের সঙ্গে তাঁদেরকে নিন্দা পরিহার করতে অনুরোধ জানাচ্ছিলেন।
সন্দেহ নেই, চট্টগ্রাম নগরবাসী একজন ভদ্রলোক মেয়র পেলেন, যাঁর স্বভাবে বহুলপ্রচলিত রাজনৈতিক কুটিলতা ও খেয়োখেয়ি দৃশ্যত অনুপস্থিত। তবে এসব গুণের সঙ্গে নেতৃত্বদানের দক্ষতা, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা এবং সর্বোপরি নগরবাসীর পছন্দ-অপছন্দগুলোকে আমলে নেওয়ার মানসিকতা বিশেষভাবে দরকার। নির্বাচনের আগে তিনি নগরবাসীকে জানিয়েছিলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে তিনি তাঁদের জন্য কী কী করবেন। কিন্তু নগরবাসী কী চায় তা জানার ও বোঝার চেষ্টা করেছিলেন কি না, করলে কী প্রক্রিয়ায় করেছিলেন তা জানি না। এ দেশের সব নির্বাচনেই এমনটি হয়ে থাকে। নির্বাচনে প্রার্থীরা ও তাঁদের দলগুলো কিছু প্রতিশ্রুতি বা অঙ্গীকার প্রকাশ করে জনগণের ভোট চান। সেসব প্রতিশ্রুতির তালিকায় থাকে সাধারণভাবে জনপ্রিয় বিষয়গুলো। ‘চট্টগ্রামের উন্নয়ন’ সে রকমই একটি সাধারণ জনপ্রিয় বিষয়। একজন সিটি মেয়র তাঁর নগরটিকে কী রূপে গড়ে তুলতে চান, অর্থাৎ এ বিষয়ে তাঁর ভিশন বা রূপকল্প কী, তা পরিষ্কার ছিল না। এখনো মেয়র মন্জুরের তেমন কোনো রূপকল্প আছে বলে মনে হয় না। অবশ্য সে রকম একটি রূপকল্প আগে থেকে নিজেই স্থির করার চেয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, তাদের মধ্যে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও মতবিনিময়ের ভিত্তিতে গড়ে তোলাই শ্রেয়তর হবে। এখন মেয়র মন্জুরের সেই সময়।
মহিউদ্দিন চৌধুরী মেয়র থাকাকালে সিটি করপোরেশনকে প্রায় একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে ফেলেছিলেন—এ রকম সমালোচনা গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করেছিলেন তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মন্জুর আলম। মহিউদ্দিন চৌধুরী নগরবাসীর ওপর করের বোঝা না বাড়িয়ে সিটি করপোরেশনের আয় বাড়িয়েছিলেন—এই ব্যাপারটির মধ্যে একটা প্যারাডক্স ছিল। করের বোঝা খুবই অজনপ্রিয়, সেটা না বাড়িয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী ধনী-গরিব নির্বিশেষে নগরবাসীর সবার ভালোবাসা পেয়েছেন। কিন্তু সিটি করপোরেশনের আয় বাড়ানোর জন্য যে ব্যাপক বাণিজ্যিক তৎপরতা চালিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরও চালাবেন বলেই প্রচার করছিলেন (কেননা তিনি চট্টগ্রামকে গড়ে তুলতে চান সিঙ্গাপুরের মতো করে), সেটা বেশির ভাগ লোকেই পছন্দ করেনি। আমি দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বিভিন্ন বয়স, লিঙ্গ ও শ্রেণী-পেশার ৫০ জন ভোটারের মতামত সংগ্রহের সময় এটা লক্ষ করেছিলাম: অধিকাংশ ভোটারই বলেছেন, সিটি করপোরেশনের আয় বাড়ানো ভালো, কিন্তু একশভাগ বাণিজ্যিকীকরণ ভালো নয়। মন্জুর আলম আমাকে বলেছিলেন, তিনি করও বাড়াবেন না, বাণিজ্যিকীকরণও করবেন না। দুটোর মাঝামাঝি থেকে চট্টগ্রামের উন্নয়ন করবেন। বিষয়টা ঠিক পরিষ্কার নয়। সিটি করপোরেশন কর না বাড়িয়ে কীভাবে আয় বাড়াতে পারে তা ব্যাখ্যা করার জন্য যে সময় প্রয়োজন, আমার সঙ্গে আলাপের ওই মুহূর্তে মন্জুর আলমের তা ছিল না। এ বিষয়ে নিশ্চয়ই তাঁর কিছু বাস্তবভিত্তিক চিন্তা-ভাবনা থেকে থাকবে।
যাই হোক, মেয়র মন্জুরের এখন সিটি করপোরেশন পরিচালনার নীতি-কৌশলগত পরিকল্পনা করার সময়। এ সময় তিনি যদি স্মরণে রাখেন যে মেয়র নির্বাচিত করার মধ্য দিয়েই চট্টগ্রাম নগরবাসী তাঁকে সব ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগাম ম্যান্ডেট দিয়ে দেননি, বরং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জনমত গ্রহণ ও বিবেচনা করা উচিত, তাহলে মহিউদ্দিন চৌধুরীর ভুল পদক্ষেপগুলো তিনি এড়াতে পারবেন এবং সেটাই গড়ে তুলবে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সবচেয়ে কার্যকর ও ফলপ্রসূ কর্মপদ্ধতি। প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলোর সবচেয়ে বড় যে সুবিধার কথা অ্যারিস্টটল বলতেন, সেটা হলো এই: ছোট ইউনিটের শাসনকাজ পরিচালনা অপেক্ষাকৃত সহজ ও অধিকতর গণতান্ত্রিক হতে পারে, কারণ সেখানে নাগরিকের সংখ্যা কম, প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। সেখানে সবার মতামত গ্রহণ ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সে রকম হতে পারত যদি শুধু নির্বাচনকালে নয়, সব সময় সংশ্লিষ্ট ইউনিটের জনগণের মতামত গ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হতো; যদি মনে করা না হতো যে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ একজন প্রার্থীকে সবকিছু করার আগাম ম্যান্ডেট দিয়ে দেয়।
মেয়র মন্জুর আলম যদি সত্যিই সব সময় তাঁর নগরবাসীর মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে চলতে চান, তাহলে জনমত সংগ্রহের কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হবে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডের ৪১ জন নির্বাচিত কাউন্সিলর তাঁদের নিজ নিজ ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই মেয়র সাহেব যা বলবেন তাই হবে—এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে কাউন্সিলরদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কাউন্সিলররা যেন মেয়রের বিরাগভাজন হওয়ার ভয় থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের ওয়ার্ডের জনগণের পক্ষে মতামত প্রকাশ করতে পারেন, সে দিকে নজর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি ওয়ার্ড কাউন্সিল কার্যালয়ে একটি করে মতামত প্রদানকেন্দ্র খোলা উচিত, যেখানে ওয়ার্ডবাসীর বক্তব্য নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা থাকবে। এ ক্ষেত্রে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলো কাজে লাগানো যেতে পারে। আর কেন্দ্রীয়ভাবে মেয়রের কার্যালয়ের থাকবে একটি ওয়েবসাইট, যেখানে শিক্ষিত নগরবাসীরা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রসঙ্গে নিজেদের মতামত, অভিযোগ, দাবি-দাওয়া ইত্যাদি জানিয়ে লিখতে পারবেন। এবং সেসব মতামত মেয়রকে নিয়মিতভাবে অবহিত করার স্থায়ী ব্যবস্থা থাকবে; মেয়র ও কাউন্সিলরদের সাধারণ সভায় সেসব নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হবে এবং সেসবের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এভাবে আমাদের সিটি করপোরেশনগুলো শুধু ভোটকেন্দ্রিক গণতন্ত্র চর্চার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে হতে পারে নাগরিক পর্যায়ের অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে গণতন্ত্র অনুশীলনের একেকটা মডেল। এই কাজে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার হতে পারে অত্যন্ত সহায়ক। এবারের সিসিসি নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে (২১ নং ওয়ার্ড—জামালখান) ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে ভোটদানের ব্যবস্থায় বেশ সাড়া মিলেছে। ভবিষ্যতে অবশ্যই এ ব্যবস্থার প্রসার ঘটবে। সামনে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও নিশ্চয় অনেক ওয়ার্ডে এই ব্যবস্থা করবে নির্বাচন কমিশন।
সবকিছু মিলিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী। চট্টগ্রামের নবনির্বাচিত মেয়র এম মন্জুর আলম যদি তাঁর নগরবাসীকে সঙ্গে নিয়ে, সব সময় তাদের মতামত ও পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিটি করপোরেশন পরিচালনার চেষ্টা করেন, তাহলে চট্টগ্রাম থেকেই সূচিত হতে পারে আমাদের কাঙ্ক্ষিত, কার্যকর ও ফলপ্রসূ স্থানীয় সরকারব্যবস্থার অগ্রযাত্রা। এবং তার কিছু ইতিবাচক প্রভাব অবশ্যই জাতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ধীরে ধীরে প্রতিফলিত হবে।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক
mashiul.alam@gmail.com

নিজ শহর থেকেই সরিয়ে দেওয়া হলো স্তালিনের মূর্তি

সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিনের নিজ শহর গোরি থেকেই তাঁর একটি মূর্তি সরিয়ে নিয়েছে জর্জিয়ার কর্তৃপক্ষ। গতকাল শুক্রবার দেশটির কর্মকর্তারা এ কথা জানান।
খবরে বলা হয়, জর্জিয়ার শহর গোরির কেন্দ্রীয় চত্বর থেকে মধ্যরাতের দিকে হঠাৎ করেই ২০ ফুট উঁচু ব্রোঞ্জের ওই মূর্তিটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
সিটি কাউন্সিলের প্রধান জভিয়াদ খামালাদজে বলেন, মূর্তিটি গোরির একটি জাদুঘরে স্থানান্তর করা হবে।
স্তালিনের মূর্তির জায়গায় ২০০৮ সালে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে নিহতদের স্মরণে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে।
১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে গোরির কেন্দ্রীয় চত্বরে স্তালিনের ওই মূর্তিটি স্থাপন করা হয়।
একজন সাংবাদিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করতে সাংবাদিকদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ।
খামালাদজে বলেন, রুশ আগ্রাসনে নিহতদের স্মরণে কেন্দ্রীয় চত্বরে একটি নতুন ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে।
২০০৮ সালের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের সময় গোরি শহরে বোমা হামলা চালিয়েছিলেন রুশ সেনাসদস্যরা।
স্তালিন এখনো গোরিতে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিনের যে স্বল্পসংখ্যক মূর্তি এখনো দাঁড়িয়ে আছে, গোরির মূর্তিটি ছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।

জ্যামাইকার কথিত মাদকসম্রাট দুদুস কোককে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর

জ্যামাইকার কথিত মাদকসম্রাট ক্রিস্টোফার ‘দুদুস’ কোককে গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে সে দেশের সরকার। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় পলাতক আসামিদের তালিকার অন্যতম কোক। অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের অভিযোগে তাঁকে খুঁজছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষ।
নিউইয়র্কে কোকের বিরুদ্ধে করা মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ হতে পারে। চলতি সপ্তাহেই কোককে কিংস্টোনের পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মার্কিন বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের গতকাল শুক্রবারই নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের আদালতে কোককে হাজির করার কথা। যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর আগে জ্যামাইকায় একটি আদালতে স্বল্প সময়ের জন্য হাজির করা হয় কোককে। তাঁকে মার্কিন কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করেননি কোক।
গত মাসে কোককে আটক করতে কিংস্টোনে তাঁর মূল ঘাঁটিতে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালায়। সে সময় তাঁর দলের লোকজন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৭৬ জন নিহত হয়। মার্কিন কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, ৪১ বছর বয়সী কোক কুখ্যাত ‘শাওয়ার পোসি’ চক্রের প্রধান। এই চক্রটি মাদক ও অস্ত্র পাচারের একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক চালায়।

জাতিসংঘের তদন্তদলকে শ্রীলঙ্কায় যেতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা

শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্তে জাতিসংঘ গঠিত প্যানেলকে শ্রীলঙ্কায় প্রবেশ করতে না দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন প্যানেলের প্রধান মারজুকি দারুসমান। গতকাল শুক্রবার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ সমালোচনা করেন।
ইন্দোনেশিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মারজুকি দারুসমান বলেন, তাঁরা যদি শ্রীলঙ্কায় যেতে না পারেন, তাহলে সবাই হতাশ হবেন। এতে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। প্যানেলের শ্রীলঙ্কা সফর নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তকে ‘অত্যন্ত দুঃখজনক’ বলেও বর্ণনা করেন তিনি।
গত মঙ্গলবার প্যানেলের প্রধান হিসেবে মারজুকি দারুসমানের নাম ঘোষণা করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জামিনি লক্ষ্মণ পেইরিস বলেন, প্যানেলের সদস্যদের ভিসা দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, এই প্যানেল ‘সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়।’ শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর মারজুকি দারুসমান ওই মন্তব্য করলেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেইরিস বলেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর শ্রীলঙ্কা নিজস্ব তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। তারাই অভিযোগ তদন্ত করবে।
শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী বেসামরিক তামিল ও আত্মসমর্পণ করা তামিল বিদ্রোহীদের ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছে—এ অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জাতিসংঘ এ প্যানেল গঠন করে।

ভারত সরকারের নতুন ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ

ভারতের ভোপালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিয়ন কার্বাইডের কারখানায় দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য ভারত সরকার ২৮ কোটি ডলারের নতুন ক্ষতিপূরণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
সরকার গত বৃহস্পতিবার এই প্যাকেজ ঘোষণা করে। তবে ক্ষতিপূরণ আদায়ে কাজ করছে, এমন সংস্থা ও সংগঠকেরা প্যাকেজে ঘোষিত অর্থের পরিমাণ পর্যাপ্ত নয় বলে মন্তব্য করেছেন। অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে তাঁরা গতকাল শুক্রবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে সমাবেশও করেন।
মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইডের কারখানায় ১৯৮৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ওই দুর্ঘটনা ঘটে। আশপাশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত গ্যাস। এতে বেসরকারি হিসাবে ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ছয় লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভারত সরকার বলছে, নতুন করে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ দুর্ঘটনার ফলে দূষিত হয়ে যাওয়া কারখানা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ব্যয় করা হবে। এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরাও সহায়তা পাবেন।
দুর্ঘটনার প্রায় ২৬ বছর পর ভারতের একটি আদালত গত ৭ জুন ভোপাল দুর্ঘটনার মামলার রায় ঘোষণা করেন। এতে ইউনিয়ন কার্বাইডের ভারতীয় আট কর্মকর্তাকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও এক লাখ রুপি করে জরিমানা করা হয়। এঁদের মধ্যে একজন অবশ্য আগেই মারা গেছেন। বাকি সাত কর্মকর্তা জামিনে মুক্ত আছেন। কিন্তু রায়ে কারখানাটির চেয়ারম্যান মার্কিন নাগরিক ওয়ারেন অ্যান্ডারসনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আফগান যুদ্ধে গিলার্ডের সমর্থন

অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড আফগান যুদ্ধের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করেছেন। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে তিনি এ সমর্থন জানান। সম্প্রতি আফগানিস্তানে পাঁচজন অস্ট্রেলীয় সেনার মৃত্যু নিয়ে যখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, ঠিক তখন গিলার্ড যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য মিত্রদেশের সঙ্গে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এ দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেভিন রুডের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার এক দিনের মাথায় গিলার্ড গতকাল আফগান পরিস্থিতি নিয়ে ওবামার সঙ্গে আলাপ করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু উল্লেখ করতে গিয়ে গিলার্ড সাংবাদিকদের বলেন, আফগানিস্তানে হতাহতের ঘটনা সম্প্রতি বেড়ে গেছে। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি ওবামার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন রাখার প্রতি তিনি সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি ওবামাকে বলেছেন, আফগানিস্তানের অস্ট্রেলীয় সেনাদের মিশন অব্যাহত থাকবে। গিলার্ড বলেন, ‘আমরা দুই দেশ খুবই ঘনিষ্ঠ। বিশ্বের নানা জায়গায় আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ করেছি। আফগানিস্তানেও আমরা একসঙ্গে যুদ্ধ করে যাব।

কিরগিজস্তানে কাল সেনারা ভোট দিয়েছেন

কিরগিজস্তানের সাংবিধানিক গণভোট কাল রোববার অনুষ্ঠিত হবে। তবে দেশটির সেনারা গতকাল শুক্রবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। এই গণভোটের মাধ্যমে দেশটিতে আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় পার্লামেন্ট নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত হবে।
১০ জুন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের ওশ শহর থেকে কিরগিজ ও উজবেকদের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়। বাস্তুচ্যুত হয় অন্তত চার লাখ মানুষ। বাড়িঘর ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ উজবেকিস্তানে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত। শরণার্থীরা বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। এ পরিস্থিতিতে আগামীকাল দেশটিতে সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চলের ওশ শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোটকেন্দ্রে প্রায় দুই হাজার সেনা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। স্থানীয় নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা আবদিকালিক বোলতাবায়েভ বলেন, ‘সেনারা আজ (গতকাল) ভোট দিচ্ছে। রোববার ভোটের দিন যাতে তারা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকতে পারে, এ জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
প্রস্তাবিত সংবিধানে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা অনেক কমানো এবং কিরগিজস্তানে সংসদীয় প্রজাতন্ত্র (পার্লামেন্টারি রিপাবলিক) প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। জনগণ এর পক্ষে রায় দিলে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কিরগিজস্তানই হবে প্রথম সংসদীয় প্রজাতন্ত্রের দেশ।

‘উসকানি’ বন্ধের আহ্বান দক্ষিণ কোরিয়ার

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি মিউং-বাক বেপরোয়া সামরিক ‘উসকানি’ বন্ধে উত্তর কোরিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের জাহাজডুবির ঘটনায় উত্তর কোরিয়া যে ভুল করেছে, তা সততার সঙ্গে স্বীকারের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। গতকাল শুক্রবার সিউলে কোরীয় যুদ্ধের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তিনি এ আহ্বান জানান।
উত্তর কোরিয়া তার পশ্চিম উপকূলীয় অংশে জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এতে সেখানে জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এই পদক্ষেপকে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার আভাস হিসেবে দেখছে দক্ষিণ কোরিয়া। এ ব্যাপারে তারা তীক্ষ নজর রাখছে। গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ কথা জানায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গতকাল বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টিকে তাঁরা নিয়মিত সামরিক মহড়ার অংশ হিসেবে দেখছে। তবে তাদের কর্মকাণ্ড আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।’
বার্তা সংস্থা ইয়োনহ্যাপ জানায়, দুই কোরিয়ার মধ্যে বিতর্কিত সমুদ্রসীমার উত্তরে পশ্চিমা বন্দরনগরী ন্যাম্পোর কাছে উপকূলীয় এলাকায় পিয়ংইয়ং নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২৭ জুন পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, সামরিক মহড়া বা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার জন্য এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
উত্তর কোরিয়া অতীতে এ ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে অনেকবার স্বল্পমাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে। এ নিয়ে দুই কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলে আসছে। গত মার্চে দক্ষিণ কোরীয় একটি যুদ্ধজাহাজডুবিতে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় এ উত্তেজনা বেড়ে যায়।
প্রেসিডেন্ট লি মিউং-বাক পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি সামরিক উসকানি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘যুদ্ধজাহাজডুবির ঘটনার সব দায়দায়িত্ব সততার সঙ্গে পরিষ্কারভাবে উত্তর কোরিয়ার স্বীকার করে নেওয়া উচিত।’
কোরীয় যুদ্ধের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গতকাল রাজধানী সিউলে এক অনুষ্ঠানে মিউং-বাক এসব কথা বলেন। এ সময় অনুষ্ঠানস্থলে যুদ্ধের সময়সহায়তা করা ২০টি দেশের পতাকা ওড়ানো হয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার অঙ্গীকার ওবামা-মেদভেদেভের

দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার অঙ্গীকার করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে দুই নেতার বৈঠকের পর বারাক ওবামা বলেন, তাঁরা দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে সফল হয়েছেন।
ওবামা জানান, অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রাশিয়া আবার মার্কিন পোলট্রি-সামগ্রী আমদানি করতে রাজি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তিতে সমর্থনের অঙ্গীকার করেছে।
রুশ-মার্কিন দুই নেতাই সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বারবার উল্লেখ করেন। এ সময় ওবামা বলেন, সাবেক মার্কিন সরকারের সময় এ সম্পর্ক কিছুটা শিথিল হয়ে গিয়েছিল।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম হোয়াইট হাউসে গেলেন মেদভেদেভ। এর আগে এপ্রিলে ৪৭ দেশের পরমাণু অস্ত্রবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিতে ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন তিনি।
হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পর সারা দিনের ব্যস্ত কর্মসূচির অংশ হিসেবে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ও যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া ব্যবসায়িক পরিষদের বৈঠকেও যোগ দেন দুই নেতা। হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পর দুই প্রেসিডেন্ট একই গাড়িতে চড়ে ভার্জিনিয়া শহরতলির জনপ্রিয় একটি ফাস্টফুডের দোকানে বার্গার খেতে যান। এভাবে প্রটোকল শিথিল করে এক গাড়িতে চড়ে সাধারণ রেস্তোরাঁয় বার্গার খেতে যাওয়াকে পর্যবেক্ষকেরা সম্পর্ক সহজ করার একটি উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন।
সফরকালে মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তিশিল্পের প্রাণকেন্দ্র ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালি পরিদর্শন করেন মেদভেদেভ।
ওবামা-মেদভেদেভ বৈঠকে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার বিতর্কিত পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা, সন্ত্রাসবাদের হুমকি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থান পায়। দুই নেতাই বলেন, একুশ শতকে বিশ্ব একটি শক্তিশালী রুশ-মার্কিন সম্পর্ক দেখতে চায়। ওবামা উল্লেখ করেন, আগের সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ওবামা বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে সমর্থন জানাবে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি তিনি ঘোষণা করেন, রাশিয়া পোলট্রি-পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে। ছয় মাস আগে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেশটি।
ওবামা সাংবাদিকদের আরও বলেন, ‘আমাদের দেশ এবং বিশ্ব আরও বেশি নিরাপদ হবে, যদি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে এগিয়ে চলে।’ তবে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে মতানৈক্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর মধ্যে একটি বিষয় হচ্ছে জর্জিয়ার সংকট।
অন্যদিকে স্থিতিশীল আফগানিস্তান গঠনের মার্কিন লক্ষ্যে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন মেদভেদেভ।
জাতিগত দাঙ্গাকবলিত কিরগিজস্তানে মানবিক সহায়তা পাঠানোর ব্যাপারে একমত হন ওবামা ও মেদভেদেভ। আশঙ্কা প্রকাশ করে মেদভেদেভ বলেন, কিরগিজস্তানের পরিস্থিতি এখনো নাজুক। সেখানকার কট্টরপন্থীরা আবারও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়তে পারে।
ওবামা রাশিয়ায় আরও বেশি মার্কিনপণ্য রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে মেদভেদেভ রাশিয়ায় আরও বেশি মার্কিন বিনিয়োগের আহ্বান জানান। বিশেষ করে, রাশিয়ার তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৮-এর সম্মেলনে যোগ দিতে বৃহস্পতিবারই কানাডার উদ্দেশে রওনা দেন মেদভেদেভ। ওবামাও জি-৮ সম্মেলনে অংশ নেবেন।

বিশ্ব নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে আলোচনা হবে

দুটি সম্মেলন উপলক্ষে বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর অনেক নেতাই এখন কানাডায়। উন্নত দেশগুলোর সংগঠন জি-৮-এর নেতাদের গতকাল শুক্রবার টরন্টোতে বৈঠকে মিলিত হওয়ার কথা। পরে আজ শনি ও রোববার তাঁরা উন্নয়নশীল ও উঠতি অর্থনীতির দেশগুলোর সংগঠন জি-২০-এর নেতা ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
সম্মেলনে বিশ্ব নিরাপত্তা ও উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। বরাবরের মতো এবারও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গৃহীত নিরাপত্তাব্যবস্থাকে কানাডার ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেখানে ২০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শুধু নিরাপত্তাব্যবস্থার পেছনে খরচ হচ্ছে ১০০ কোটি ডলার। পুলিশ টরন্টোর পথে পথে কাঁটাতারের বেড়া ও কয়েক মাইল জুড়ে কংক্রিটের ব্লক ফেলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। মাথার ওপর টহল দিচ্ছে হেলিকপ্টার। পরিবেশ ও আদিবাসীদের অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবাদ করতে সমবেত বিক্ষোভকারীদের কথা মাথায় রেখেই নিরাপত্তার এত আয়োজন।
সম্মেলনে জি-৮ সদস্যদেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও রাশিয়া এবং আমন্ত্রিত বেশ কটি দেশের নেতাদের অংশ নেওয়ার কথা।
জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি, চীনের প্রধানমন্ত্রী হু জিনতাও এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালের মধ্যেই টরন্টোয় পৌঁছান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দিনের প্রথম ভাগে কানাডার উদ্দেশে ওয়াশিংটন ত্যাগ করেন।
স্বাগতিক দেশ কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হার্পার সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের উদ্দেশে এক বার্তায় বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সমস্যা নিয়ে আমরা আলোচনা করব।’
টরন্টো থেকে ২২০ কিলোমিটার উত্তরে লেক-তীরবর্তী হান্টসভিলের এক রিসোর্টে জি-৮ নেতাদের বৈঠকে মিলিত হওয়ার কথা। আর আজ শনিবার টরন্টোর মেট্রো কনভেনশন সেন্টারে শুরু হবে জি-২০ সম্মেলন। এবারের জি-২০ সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে ভারত, ব্রাজিল, চীন ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্লেষকেরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
টরন্টোর বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার তীর-ধনুক ও জ্বালানি তেলের কৌটার মতো ঘরে তৈরি অস্ত্রসহ এক ব্যক্তিকে গাড়ি থামিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। জি-২০ সম্মেলনের জন্য নির্ধারিত কনভেনশন সেন্টার থেকে এক মাইলেরও কম দূরত্ব থেকে তাকে আটক করে পুলিশ। এর আগের দিনই কর্তৃপক্ষ এক ব্যক্তিকে বিস্ফোরক রাখার দায়ে তার স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার করে। তারা সম্মেলনে বোমা হামলার ষড়যন্ত্র করেছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এ ঘটনার পর থেকেই কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করে।

ভাইয়ের জন্য

আনন্দের উল্টো পিঠেই থাকে বেদনা। জারমেইন ডিফো এখন সেটাই উপলব্ধি করছেন গভীরভাবে। স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে গত বুধবার বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোলটি করেছেন। স্বভাবতই ডিফোর পরিবারের সবাই আনন্দিত। কিন্তু এর মধ্যেও লুকিয়ে আছে চাপা কষ্ট। ছোট ভাই জাডে ডিফোর অকালমৃত্যুর স্মৃতিই বারবার কাঁদায় জারমেইনকে। ২০০৯-এর এপ্রিলে লন্ডনে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে নিহত হয়েছিলেন জাডে। সেই শোক থেকেই তখন শক্তি খুঁজে পেয়েছিলেন জারমেইন। সংকল্প করেছিলেন, ফুটবল মাঠে অবশ্যই ভালো কিছু করবেন। ম্যাচ শুরুর আগে জারমেইন কথা বলেছিলেন মা সান্ড্রার সঙ্গে। মা তখন কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই তোমার খেলা দেখার জন্য বসে আছি।’ জারমেইনও তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ভালো খেলতে হবে।

দুই দলের দুই প্রতীক

ক্লাবের ফোরলান উরুগুয়ের নয়—ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ জুড়েই লেগে থাকা এই অপবাদ ঘুচিয়েছেন এবারের বাছাইপর্বেই, দলের সর্বোচ্চ ৭ গোল করে। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ডিয়েগো ফোরলান বুঝিয়ে দিয়েছেন, শুধু নামেই নয়, মাঠের পারফরম্যান্সেও উরুগুয়ের সবচেয়ে বড় তারকা তিনি। দুবার করে লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘পিচিচি ট্রফি’ এবং ইউরোপীয় সোনার বুট জেতা স্ট্রাইকার বিশ্বকাপে এসেছিলেন ফর্মের তুঙ্গে থেকে। সদ্য শেষ মৌসুমে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে করেছেন ২৮ গোল। এবার প্রথম ম্যাচে গোল পাননি, তবে পুষিয়ে দিয়েছেন পরের ম্যাচে দু গোল করে। এর মধ্যে প্রথমটি তো ছিল অসাধারণ, এখনো পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা। তিন ম্যাচে গোল ওই দুটিই, তবে সুযোগ সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য। বদলে যাওয়া ফোরলান আজও উরুগুয়ের ভরসা।
দেশের হয়ে ভালো খেলতে না পারার দুর্নাম আবার পার্ক জি-সুংয়ের কখনোই ছিল না। বরং দেশের হয়ে দুর্দান্ত খেলেই নজর কেড়েছেন ইউরোপের বড় বড় ক্লাবের। ২০০২ বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিপক্ষে অসাধারণ এক গোল করে নিজেকে চিনিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চে, গত বিশ্বকাপেও ফ্রান্সের বিপক্ষে করেছিলেন দারুণ এক গোল। অধিনায়কের আর্মব্যান্ড হাতে পার্ক এবার আরও অপ্রতিরোধ্য। গোল পেয়েছেন কেবল একটি, তবে যে দুটি ম্যাচ জিতে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে দক্ষিণ কোরিয়া, দুটোতেই সেরা হয়েছেন পার্ক। প্রাণভোমরা বলতে যা বোঝায়, পার্ক দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য আক্ষরিক অর্থেই তা। অবিশ্বাস্য দমের জন্য ‘থ্রি লাংস’ উপাধি পেয়ে যাওয়া পার্ক আজও দাপিয়ে বেড়াবেন পুরো মাঠ, নিচে নেমে যেমন ফোরলানদের ঠেকাবেন, তেমনি আতঙ্ক হয়ে উঠবেন উরুগুয়ের সীমানায়।

ইতালি আর লিপ্পির বিদায়ের রাতে

বিজয়ী ও বিজিত দলের কোচ এবং ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় এসে কথা বলবেন, সব সাংবাদিকের চোখ থাকবে টেবিলটার দিকে। ওটাকে তাই পরিপাটি করেই সাজিয়ে রাখা হয়। তিনটি মাইক্রোফোন, একটি জাবুলানি বল, আর কয়েক বোতল কোমল পানীয়। কথা বলতে বলতে গলা শুকিয়ে গেলে গলাটা ভিজিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু জাবুলানি বলটা কেন? ওটা বিশ্বকাপের প্রতীক। তবে জাবুলানি পরশু ইতালির কোচ মার্সেলো লিপ্পিকে হয়তো এটাও মনে করিয়ে দিল, পৃথিবীটা গোলাকার। এখানে সবকিছুই একটা চক্র সম্পন্ন করে।
ফুটবল খেলাটা বড় নির্মম। ফুটবল যা দেয়, একসময় তা ফিরিয়েও নেয়। চার বছর আগে এই বিশ্বকাপই মার্সেলো লিপ্পিকে দিয়েছিল দু হাত ভরে। চার বছর পর তা তাঁকে নিঃস্ব করে বিদায় দিল।
চার বছর আগে ঘানার বিপক্ষে ২-০ গোলের অনুজ্জ্বল জয়ে যখন বিশ্বকাপ শুরু করল ইতালি, কেউই তখন ভাবতে পারেনি লিপ্পির দল বিশ্বকাপ জিতবে। অথচ ইতালিকে ঠিকই চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিলেন লিপ্পি। এবার কেপটাউনে প্যারাগুয়ের সঙ্গে ১-১ ড্রয়ে বিশ্বকাপ শুরু করলেও ‘হায় হায়’ রব ওঠেনি। ইতালি তো টুর্নামেন্ট শুরুই করে ঘষা কাচের মতো। খেলা যতই এগোতে থাকে, ততই উজ্জ্বল হয় তাদের আলো। কিন্তু পরের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গেও ড্র করার পর সবাই ভাবতে বসে গেল। এই ইতালি তো অন্য রকম, কেমন যেন ভেতর থেকেই দলটির ক্ষয়াটে ভাব। পরশু বিশ্বকাপে নতুন দল স্লোভাকিয়ার কাছে হেরে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায়।
ম্যাচ শেষের ২০ মিনিট পর যে লিপ্পি সংবাদ সম্মেলনে এলেন, তাঁর চোখগুলো যেন ঘষা কাচ, একটুও আলো নেই। মুখে এক খণ্ড কালো মেঘ। ইতালির সাংবাদিকেরা একেবারে ছুরিতে শান দিয়ে বসেছিলেন। তাঁরা আর কী বলবেন, লিপ্পি নিজেই বেদনাভরা কণ্ঠে কথা বললেন, ‘আজ ইতালির বড় দুঃখের দিন।’
দিন তিনেক আগে একটা মাত্র ড্র, একটা মাত্র গোলের সঙ্গে দুটো পরাজয়ের বোঝা পিঠে বয়ে বিদায় হয়ে গেছে গতবারের রানার্সআপ ফ্রান্স। এবার গেল চ্যাম্পিয়নরাও। লজ্জার নতুন ইতিহাস লেখা হলো। পরপর দুটি বিশ্বকাপ জিতে ভিত্তোরিও পোজ্জোর পাশে বসা হলো না লিপ্পির। সারা পৃথিবীর মনে যদিও এই সম্ভাবনাটা একটু হলেও উঁকি দিয়েছিল, লিপ্পির মনে নাকি কখনোই নয়, ‘আমি কখনো ভাবিনি, আবারও বিশ্বকাপ জিতব আমরা। তবে এটা কল্পনা করতে পারিনি যে বেশি দূর পর্যন্ত যেতে পারব না।’
লিপ্পি কথা বলেন, আর তাঁর সামনে ইতালীয় সাংবাদিকদের জটলা শুধুই প্রতিধ্বনি তোলে। ইতালীয় ভাষা বুঝতে না পারলেও এটা বোঝা গেল, কথাগুলো প্রীতিকর নয়। মাথাভর্তি সাদা চুলের নিচে থাকা মুখটায় অদৃশ্য কান্না, ‘আমরা খেলতেই পারলাম না। আমাদের পা চলল না। প্রতিপক্ষকে অনেক জায়গা দিলাম। ওদের গোলমুখে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেললাম। কিছুই হলো না আমাদের।’
কুরিয়েরো দেল্লা সেরার সাংবাদিক লুকা জেলমিনি ঝাঁঝের সঙ্গে জানতে চাইলেন, ‘বিশ্বকাপ জিতিয়েই দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন, এখন কি মনে হচ্ছে না আবার ফিরে এসে ভুল করেছেন?’ মাথা নাড়লেন লিপ্পি, ‘না, ভুল করিনি। আমি ভেবেছিলাম, যে দলটিকে আমি গড়ে তুলেছি, তাদের ওপর আস্থা রাখার প্রতিদান আমি পাব। কিন্তু হলো না।’
সারা দুনিয়া বলছিল, গোটা ইতালি বলছিল, ওরা বুড়িয়ে গেছে, ওদের দিয়ে আর চলবে না। লিপ্পির যুক্তি ছিল, মাত্রই তো সাতটি ম্যাচ। এখানে বয়স কিংবা তারুণ্যের নয়, প্রশ্নটা অভিজ্ঞতার। অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত লজ্জাই দিল ইতালিকে। ফ্যাবিও ক্যানাভারো রক্ষণকে সামলাতে পারলেন না, জেনারো গাত্তুসো মাঝমাঠে বল দখলের জন্য ছুটতে পারলেন না, জিয়ানলুকা জামব্রোত্তা গতিশীল স্লোভাকদের আটকাতে পারলেন না। দ্বিতীয়ার্ধে প্লে-মেকার আন্দ্রে পিরলোই বা কোন ডিফেন্স-চেরা পাসটি দিতে পেরেছেন? লিপ্পির সঙ্গে হয়তো এঁদের বিদায়টাও পরশু এলিস পার্ক স্টেডিয়াম দেখে ফেলল।
ইতালির নাপোলিতে খেলা স্লোভাক মিডফিল্ডার মারেক হামসিক মিক্সড জোনে বলেছেন, ‘এখনো আমার বিশ্বাস হচ্ছে না যে ইতালিকে বিদায় করে আমরা দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে গেছি!’ বিশ্বাস কেইবা করেছে। খেলার শেষ সেকেন্ডগুলোতেও গ্যালারির ‘নীল অরণ্য’কে বিশ্বাস ধরে রাখতে দেখেছি। শেষ বাঁশি বাজলে পর স্লোভাকিয়ার ‘সব পেয়েছি’র আনন্দে সেই বিশ্বাস খান খান হয়ে ভেঙে পড়েছে।
তুরিন থেকে বন্ধুকে নিয়ে বিশ্বকাপ দেখতে আসা আন্তোনিনার মাথায় তখনো তেরঙা নকল চুল জ্বলজ্বল করছিল, কিন্তু চোখের কোণে অশ্রু। গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্তের রিপোর্টার রিকার্দো প্রাতেসি ধরা গলায় বললেন, ‘দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরে লিপ্পি পচা টমেটোর হাত থেকে বাঁচতে পারবেন না। নিজস্ব জেট নিয়ে ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের মতো না পালালেই হয়।’
এই কি প্রাপ্য ছিল মার্সেলো লিপ্পির?

একই সুতোয় ইসনার-মাহুত

জন ইসনারের র‌্যাঙ্কিং ১৯, নিকোলাস মাহুতের ১৪৯। গ্র্যান্ড স্লাম জেতেননি কেউই। তবে টেনিস ইতিহাসের একটা জায়গায় সারা জীবন তাঁদের দুজনের নাম একই ফ্রেমে বাঁধা থাকবে। পরশু উইম্বলডনের প্রথম রাউন্ডে ১১ ঘণ্টা ৫ মিনিটের অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ শেষে ইতিহাসে ঢুকে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জন ইসনার ও ফরাসি নিকোলাস মাহুত। ম্যাচ শেষে ইসনারকে অভিনন্দন জানাতে লকার রুমে ছুটে গিয়েছিলেন স্বদেশি অ্যান্ডি রডিক। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন পিৎজা, মুরগির মাংস আর আলু সিদ্ধ।
ইসনার ও মাহুত দুজন হয়তো আরও অনেক ম্যাচ খেলবেন, ভবিষ্যতে অনেকবার দেখাও হবে তাঁদের, কিন্তু এই স্মৃতি সারা জীবনই অমলিন হয়ে থাকবে। ইসনারও বলছেন সে রকমই, ‘এটা এমন এক ঘটনা যেটা আজীবনের জন্য আমাদের এক করে দিল। অথচ এ ম্যাচের আগে ওর (মাহুত) সঙ্গে আমার পাঁচটা শব্দও বিনিময় হয়েছে বলে মনে হয় না। মানুষ হিসেবে ও খারাপ হয়তো নয়, তার পরও বিষয়টা এ রকমই। তবে এখন থেকে কোনো টুর্নামেন্টের লকার রুমে দেখা হলে অবশ্যই আমাদের মধ্যে এসব নিয়ে কথা হবে।’ টেনিস ইতিহাসে ঢুকে যাওয়া এই ম্যাচে ইসনার ৬-৪, ৩-৬, ৬-৭ (৭/৯), ৭-৬ (৭/৩), ৭০-৬৮ গেমে হারিয়েছেন মাহুতকে। দুজন খেলেছেন ১৮৩টি গেম। ‘এস’ হয়েছে রেকর্ড সর্বোচ্চ ২১৫টি। এর মধ্যে ১১২টি ইসনারের, মাহুতের ১০৩টি। ফেদেরারের ম্যাচের বদলে ১৮ নম্বর কোর্টের দিকেই সেদিন ছিল সবার নজর। ‘উইম্বলডনে হয়েছে বলেই সম্ভবত এটা টেনিস-বিশ্বের বড় ঘটনা। যারা টেনিসের খোঁজখবর রাখে তাদের সবারই চোখ ছিল এই টুর্নামেন্টে’—বলেছেন ইসনার। তবে হেরেও মাহুত প্রশংসায় ভাসালেন প্রতিপক্ষকে, ‘এটা অবিশ্বাস্য। অবিশ্বাস্য সব সার্ভ করেছে ও। আসলেই সে চ্যাম্পিয়ন।

জার্মানি-ইংল্যান্ড ‘ফাইনাল’ কাল

১১ জুলাই বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন? তর সইছে না? ফাইনালের মহারণের জন্য প্রতিটি পল-অনুপল আপনার জন্য একেকটি প্রলম্বিত প্রহর হয়ে আসছে? অপেক্ষার কী দরকার! কালকেই দেখে ফেলুন না ফাইনাল!
না, বিশ্বকাপের সূচিতে রদবদল করে ফাইনালটা আগেই নিয়ে আসা হয়নি। তবে কিনা কাল দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে যখন মুখোমুখি হওয়া দল দুটোর নাম জার্মানি আর ইংল্যান্ড; সেটিকে ফাইনাল বলাই বরং ভালো!
দুই দলের লড়াইয়ের ইতিহাসটা অনেক পুরোনো। এই দীর্ঘ পথে এখানে-ওখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে স্নায়ুক্ষরা অসংখ্য লড়াইয়ের ইতিহাস। বিশ্বকাপেই যেমন এই দুই দল যে চারটি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে, তার দুটিরই ফল নির্ধারিত হয়েছে অতিরিক্ত সময়ে, আরেকটি ম্যাচ নিষ্পত্তি হয়েছে টাইব্রেকে।
আগামীকাল ব্লুমফন্টেইনে এমনই আরও একটা ধ্রুপদী লড়াই-ই কি দেখবে সবাই? জার্মান অধিনায়ক ফিলিপ লাম আশাবাদী, ‘ইংল্যান্ডের সঙ্গে লড়াই মানেই একটা ক্লাসিক ম্যাচ। এই ম্যাচ ঘিরে প্রত্যাশার পারদ সব সময়ই উঁচুতে থাকে। আমরা ম্যাচটা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। তবে আমরা এও জানি, ভালো করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই নিজেদের খেলার মান আরও বাড়াতে হবে।’
এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মুখোমুখি হওয়ার আগে চলে কথার লড়াই। লামের কথাবার্তায় অবশ্য কূটনৈতিক সুর। জার্মান অধিনায়ককে আসলে তোপটোপ দাগাতে হচ্ছে না। বাকিরাই যে তাঁর হয়ে কাজটি করে দিচ্ছেন!
ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার সেই কবেই ‘ইংলিশদের খেলা সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে গেছে’ মন্তব্য করে উসকে দিয়েছিলেন। এরপর পাল্টা জবাব এসেছে। মাঝখানে বেকেনবাওয়ার আবারও খোঁটা দিয়েছেন এই বলে, ইংলিশদের ভুলের কারণেই সেমিফাইনালে যে ম্যাচ হওয়ার কথা সেটি হচ্ছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ‘ক্লান্ত’ ইংলিশ ফুটবলাররা ম্যাচটা জমাতে পারবে কি না, এ নিয়েও সংশয় দেখিয়েছেন ‘কাইজার’।
ইটের জবাব অবশ্য পাটকেলে আসেনি। বেকেনবাওয়ারের মাপের একজনকে জার্মেইন ডিফোর মতো একজনের পাল্টা জবাব দেওয়া হয়তো শোভা পায় না। ভদ্রতার খোলসে এই ইংলিশ স্ট্রাইকার জবাব দিলেন, ‘সব সময়ই সবাই আপনার প্রশংসা করবে, এমনটা আশা করা বাড়াবাড়ি। তবে আমার কিন্তু নিজেকে মোটেও ক্লান্ত লাগছে না। শরীর দেখভাল করার উপায় জানলে সেটা লাগারও কথা নয়।’
আগের ম্যাচে গোল করা ডিফো এই ম্যাচে জার্মানদের জন্য হুমকি। ইংলিশদের জন্যও হুমকি গত ম্যাচে গোল করা মেসুত ওজিল। জুজুর ভয় দেখাতে জার্মানরা ‘মেসুত’ নামটা ঘষেমেজে বলছে ‘মেসি’! ইংলিশদের আবার অন্য কোনো খেলোয়াড়ের নাম ধার করতে হচ্ছে না। তাঁদের তো ওয়েইন রুনি আছে। ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত একটা মৌসুম কাটিয়ে বিশ্বকাপে আসা রুনি অবশ্য এখন পর্যন্ত নিজের ছায়া হয়েই আছেন। ইংলিশদের দাবি, এটাই বরং জার্মানদের জন্য আরও বড় ভয়ের কারণ। মেসি-রোনালদো-কাকারা এরই মধ্যে ঝলক দেখিয়েছেন বলে তাঁর ভেতরে আছে ভালো করার তাড়া। কে জানে, আগামীকাল দিনটা রুনিরই কিনা!
জার্মানরা রুনিকে আসলেই ভয় পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোনো লুকোছাপাও নেই। দলের হয়ে সেন্টারব্যাক আরনে ফ্রেডরিখ খোলাখুলিই সেটা স্বীকার করে নিয়েছেন? নাকি এও একটা জার্মান কৌশল। রুনির ওপর আরও মণ কয়েক প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। এরই মধ্যে ‘ইংল্যান্ড ফেবারিট’ কোরাস তুলে যেমন ক্যাপেলোর দলকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে তারা।
কথা এবং মনস্তাত্ত্বিক লড়াই যে জমে উঠেছে সেটি আর না বললেও চলে। এবার মাঠের খেলাটাও জমে উঠল বলে!

আবার হেরেছে অস্ট্রেলিয়া

পাঁচ ম্যাচ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেটিও জিতে নিল ইংল্যান্ড। কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেনে পরশু দ্বিতীয় ওয়ানডে জিতেছে ইংল্যান্ড ৪ উইকেটে। টস জিতে ব্যাটিংয়ে যাওয়া অস্ট্রেলিয়া ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে তুলেছে ২৩৯ রান। ১১৮ রানে ৪ উইকেট হারানোর পরও এই রান তারা করতে পেরেছে ক্যামেরন হোয়াইটের অপরাজিত ৮৬ রানের সৌজন্যে। স্টুয়ার্ট ব্রড নিয়েছেন ৪ উইকেট। ২৪০ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ৪৫.২ ওভারে ৬ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ইংল্যান্ড। গত ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান এউইন মরগান করেছেন সর্বোচ্চ ৫২ রান।

অপরাজেয় নিউজিল্যান্ড

গ্রুপ পর্বের বেড়া ডিঙোতে না পারাটা কি সব সময়ই বিষাদের? কখনোই না! বিশেষত বিশ্বকাপ-মঞ্চে নিউজিল্যান্ডের মতো ‘পুঁচকে’ দলের কাছে সেটাও হতে পারে গর্বের! হ্যাঁ, গর্বেরই। বিশ্বকাপ খেলতে আসাটাই যাদের কাছে স্বপ্নের মতো, রাগবির দেশ সেই নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে হারেনি এক ম্যাচেও। তিন ম্যাচের তিনটিতেই ড্র। প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায়ের পরও তাই গর্বে বুক ভরে যাচ্ছে কিউইদের।
শেষ ষোলোতে উঠতে না পারার বেদনা যে একেবারেই নেই তা নয়। কিন্তু সেই দুঃখবোধটা হালকা হয়ে গেছে দলের বীরোচিত নৈপুণ্যে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী, দলের কোচ, মিডিয়া, সমর্থক—সবার মুখেই তাই দলের জয়গান। পরশু প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ড্র ম্যাচ শেষে কোচ রিকি হার্বার্টই যেমন বলে দিয়েছেন, ‘ছেলেরা যা করেছে, তাতে আমি পুলকিত। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে আমার।’
প্রধানমন্ত্রী জন কির উচ্ছ্বাসটা যেন আরও বেশি। দেশে ফিরলে নিউজিল্যান্ড দলকে বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়েও সংবর্ধনা পাওয়া প্রথম দলও সম্ভবত হয়ে যাবে কিউইরাই! প্রধানমন্ত্রী কির কণ্ঠে উত্তেজনা, ‘দেশ কাঁপছে বিশ্বকাপ উত্তেজনায়। অল-হোয়াইটরা কাঁপছে টগবগে মনে দেশে ফেরার উত্তেজনায়। চ্যাম্পিয়নের মতোই দেশে ফিরবে তারা।’
এর আগে একবারই বিশ্বকাপে খেলেছিল নিউজিল্যান্ড। ১৯৮২ বিশ্বকাপের কোচ জন অ্যাডশিয়াড প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচের পর বলেছেন, ‘আমার কাছে পুরোটাই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। এক একটি মিনিট কেটে গেল, কেউ আমাদের বিপক্ষে গোল করতে পারল না। সত্যিই আমি বিস্ময়াভিভূত।’
নিউজিল্যান্ডের মিডিয়াও কম যায়নি। নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড শিরোনাম করেছে ‘অপরাজিত, অদম্য।’ দ্য প্রেস লিখেছে, ‘অপরাজিত। কিন্তু এখন সময় বীরদের দেশে ফেরার।’ রাজধানী ওয়েলিংটনের এক সমর্থকের প্রতিক্রিয়া, ‘এটা বিস্ময়কর। আমরা হারিনি।’
গতবারের দুই ফাইনালিস্ট ইতালি আর ফ্রান্সের চেয়েও ওপরে অবস্থান নিউজিল্যান্ডের। কিউই কোচ তাই বলছেন, র‌্যাঙ্কিংয়ে ৭৮ নম্বর জায়গাটি মানায় না নিউজিল্যান্ডের, ‘ইতালি, ফ্রান্সের অবস্থান আমাদের পেছনে। আমি মনে করি, বিশ্বের শীর্ষ ২৫-এ থেকে শেষ করাটা আমাদের জন্য দারুণ ব্যাপার।’

রেহাগেলকে দিয়ে শুরু

প্রথম রাউন্ডেই পাততাড়ি গুটিয়েছে গ্রিস ও ক্যামেরুন। আর দল হেরে যাওয়া মানে সমালোচকদের একে-ওকে দোষ দেওয়া শুরু। ইতিহাস অনুযায়ী এই দোষের বোঝা কোচদের কাঁধেই বেশি পড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার গ্রিস ফুটবল ফেডারেশন ৭২ বছর বয়সী কোচ অটো রেহাগেলকে জানিয়ে দিল, আপনি এবার আসুন। গ্রিসে ‘কিং অটো’ হিসেবে পরিচিত এই জার্মান নয় বছর ধরে গ্রিসের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। দলকে জিতিয়েছেন ২০০৪-এর ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। এ ছাড়া এবারের বিশ্বকাপে চরম ব্যর্থ ক্যামেরুনের কোচ পল লি গুয়েনও পড়েছেন বাতিলের খাতায়। এই ফরাসি জানিয়েছেন নিজের প্রতিক্রিয়া, ‘চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। এটা পরিষ্কার—সবকিছুর ইতি টানতে হবে এবার।

প্রত্যাশার ভার তাঁদের কাঁধে

দুটি ম্যাচ, দুটি পেনাল্টি, দুটি গোল, দুবার ম্যাচ-সেরা—বিশ্বকাপের শুরুটা হয়েছিল আসামোয়া জিয়ানের স্বপ্নের মতো। ল্যান্ডন ডনোভানের শুরুটা আবার ভালো হয়নি। প্রথম ম্যাচে গোল পাননি, খেলতেও পারেননি নিজের প্রত্যাশামতো। তবে পরের দুই ম্যাচেই গোল পেয়েছেন, হয়েছেন ম্যাচ-সেরা। শেষ আটে ওঠার লড়াইয়ে আজও যুক্তরাষ্ট্র ও ঘানার ভরসা এই দুজন।
জার্সি নম্বর দেখলে মনে হবে ডিফেন্ডার, কিন্তু জিয়ান ধীরে ধীরে হয়ে উঠছেন ডিফেন্ডারদের আতঙ্ক। দলের সেরা ফুটবলার মাইকেল এসিয়েনের ইনজুরির পরও যে ঘানা দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠল, তাতে সবচেয়ে বড় অবদান তো এই জিয়ানেরই। তাঁর গোলেই প্রথম ম্যাচে সার্বিয়াকে হারিয়েছে ঘানা, ড্র করেছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। দুটি গোলই এসেছে পেনাল্টি থেকে, জিয়ানের কৃতিত্ব তবু কমছে না একটুও। দুবারই ম্যাচ-সেরার পুরস্কার তো এরই প্রমাণ। জিয়ানের দিকে তাকিয়ে আজ শুধু ঘানা নয়, পুরো আফ্রিকাই।
এমন প্রত্যাশার ভার অবশ্য ডনোভান অনেক দিন ধরেই সাফল্যের সঙ্গে বয়ে আসছেন। গোল করা এবং করানো—দুটোতেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বকালের সেরা। আর সবার ক্ষেত্রে যেমন প্রথমেই বলতে হয় ‘অমুক ক্লাবের তমুক’, ডনোভানের ক্ষেত্রে সবার আগেই আসে দেশ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডনোভান। গত আট বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষসেরা হয়েছেন ছয়বার। আজ যে যুক্তরাষ্ট্র এই ম্যাচ খেলতে পারছে, এটাও তো ডনোভানের জন্যই। যুক্তরাষ্ট্রকে নাটকীয়ভাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে তুলে দেওয়া গোলটি করেছেন তিনিই। এমন অসংখ্যবার দলের ভাগ্য যিনি নিজের হাতে নির্ধারণ করেছেন, সেই ডনোভানের হাত ধরে ধরেই আসতে পারে আরেকটি বড় সাফল্য।

ওবামার শুভেচ্ছা

শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে নাটকীয় জয়। উৎসবে মেতেছে মার্কিনরা। ল্যানডন ডনোভানরা এখন শেষ ষোলোর লড়াইয়ে। মার্কিনভক্তরা শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে প্রিয় দলকে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও দলকে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলে যাননি। গত বৃহস্পতিবার টেলিফোনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল দলের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের এই জয়ে তিনিও গর্বিত।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে এই জয়কে ‘অসাধারণ জয়’ হিসেবে দেখছেন ওবামা। যদিও ম্যাচটি টিভিতে দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর। হোয়াইট হাউস থেকে জানানো হয়েছে, সেদিন আফগান যুদ্ধের নতুন কমান্ডার জেনারেল ডেভিড পেট্রাউসের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় ব্যস্ত ছিলেন প্রেসিডেন্ট। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ডনোভানের নাটকীয় গোলের সময় হোয়াইট হাউসের পশ্চিম প্রান্ত থেকে ভেসে আসা উল্লাসের শব্দ কানে আসে তাঁর। ওবামা তখনই জেনেছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় শেষ ষোলোর টিকিট কেটে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র।
বারাক ওবামার মুখপাত্র জানিয়েছেন, টেলিফোনে ডনোভানকে বিশেষ অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। কথা বলেছেন গোলরক্ষক টিম হাওয়ার্ডের সঙ্গে। খোঁজ নিয়েছেন তাঁর ইনজুরি-পরবর্তী অবস্থা নিয়ে। এ ছাড়া মিডফিল্ডার ক্লিন্ট ডেম্পসির সঙ্গেও কথা বলেছেন ওবামা

‘ভয়’ই ডুবিয়েছে ইতালিকে

অনেকে কোচ মার্সেল্লো লিপ্পিকেই দুষছে। ইতালি কোচ নিজেও দায়টা নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ দিচ্ছে বয়সের দোষ। আসলে কী হয়েছিল ইতালির? এভাবে প্রথম রাউন্ড থেকেই কেন বাদ পড়ল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা? ভয়! অধিনায়ক ফ্যাবিও ক্যানাভারো বলেছেন, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চাপই ডুবিয়েছে ইতালিকে।
‘চার তারকাসম্পন্ন (চারটি বিশ্বকাপ শিরোপা) একটি দলে খেললে ভয় তো আপনার থাকবেই। চাপ থাকে, খেলতে গিয়ে ভয় থাকবে। কারণ আপনার মাথায় তখন চিন্তা থাকবে যে জিততেই হবে’—বলেছেন গতবার ইতালির হয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা ক্যানাভারো।
চাপ আর ভয়ে ইতালির খেলোয়াড়েরা নার্ভাসই হয়ে পড়েছিল, ‘আপনি যখন নার্ভাস হয়ে যান, তখন কখনোই ভালো খেলতে পারবেন না।’ তবে মানসম্মত খেলোয়াড়ের যে এবার ইতালি দলে অভাব ছিল, সেটা বলেছেন ক্যানাভারো, ‘আমাদের দলে এবার কোনো মহাতারকা ছিল না। কোনো ফ্রান্সেসকো টট্টি বা কোনো আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো ছিল না।’
ক্যানাভারো মনে করেন, বিশ্ব ফুটবলে ইতালিকে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে, ‘আমাদের এখন আর আগের মতো তারকা খেলোয়াড় বেরোচ্ছে না। আগে আমাদের গ্রেট খেলোয়াড় ছিল, যারা ইতিহাস তৈরি করত। শুধু জাতীয় দলেই নয়, ক্লাব ফুটবলেও ইতিহাস তৈরি করত তারা। আমাদের আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। তারকা খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে আমাদের।’
নতুন করে শুরুটা শিগগিরই করতে যাচ্ছে ইতালি। এরই মধ্যে লিপ্পির উত্তরসূরি ঠিক করে ফেলেছে তারা। ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ইতালি দলের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হবে সিজার প্রান্দেল্লির হাতে।

ভিতেকের চমক, আবারও হোন্ডা

বিশ্বকাপের আগে তাঁর নাম কজনই বা জানত! দেশ তাঁর স্লোভাকিয়া, খেলেন আঙ্কারাগুচু নামের তুরস্কের এক অখ্যাত ক্লাবে। অথচ সেই রবার্ট ভিতেকই এখন কাঁপাচ্ছেন বিশ্বকাপ। ইতালিকে বিদায় করে দেওয়া ম্যাচে করেছেন দু গোল, মোট তিন গোল করে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের শেষ দিনটির আগে সোনার জুতোর লড়াইয়ে সঙ্গী তিনি গঞ্জালো হিগুয়েইনের। প্রথম ম্যাচে বিশ্বকাপ ইতিহাসে স্লোভাকিয়ার প্রথম গোলটি করে ম্যাচ-সেরা হয়েছিলেন, পরশু দু গোল করে ম্যাচ-সেরা হওয়ার পাশাপাশি ছুঁলেন একটি মাইলফলক।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে ভিতেক ছিলেন স্লোভাকিয়ার সর্বকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বকাপে তিন গোল করে এখন তিনি যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা জিলার্ড নেমেথের সঙ্গে। পেশাদারি ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন নিজ দেশের ক্লাব স্লোভান ব্রাতিস্লাভায়। পরে বছর পাঁচেক খেলেছেন জার্মানির ন্যুরেমবার্গে। এরপর ফ্রেঞ্চ ক্লাব লিলেতে, পারফরম্যান্স ভালো না হওয়ায় ধারে পাঠিয়ে দেওয়া হয় আঙ্কারাগুচুতে।
ক্যারিয়ারের পুনরুজ্জীবন ওখানেই, খেলায় মুগ্ধ হয়ে এ মৌসুমে তাঁকে কিনেই নিয়েছে আঙ্কারাগুচু। বিশ্বকাপে যেমন খেললেন, তাতে তাঁকে কিনে নিতে উৎসাহী হতে পারে অনেক বড় ক্লাবও।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে জাপান কোচ তাকেশি ওকাদার কণ্ঠে ছিল হাহাকার, ‘হোন্ডা খেলতে পারবে তো!’ বিশ্বকাপের তিন ম্যাচ শেষে কেইসুকে হোন্ডা বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর ইনজুরি নিয়ে কেন এত ভাবনায় ছিলেন জাপান কোচ। গ্রিসকে ২-০ গোলে হারানোর ম্যাচে সেরা হয়েছিলেন এক গোল করে, ভালো খেলেছিলেন হল্যান্ডের বিপক্ষে হারার ম্যাচেও। তবে সেরাটা দেখালেন দলের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মুহূর্তেই। ডেনমার্কের বিপক্ষে দলকে এগিয়ে দিয়েছেন দারুণ এক ফ্রি-কিকে, দলের জয় নিশ্চিত করা তৃতীয় গোলটি হয়েছে তাঁর অসাধারণ এক পাসে। ম্যাচ শেষে হোন্ডা জানিয়েছেন এখানেই শেষ নয়, আরও আসছে!
বিশ্বকাপের আগে প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিলেন রক সান্তা ক্রুজ। শুধু বাছাইপর্বে দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা বলেই নয়, দলের সবচেয়ে বড় তারকাও তো তিনি। তবে আগের দুটি ম্যাচের একটিতেও শুরু থেকে খেলতে পারেননি ইনজুরির জন্য। পরশু খেললেন শুরু থেকেই। হলেন ম্যাচ-সেরাও। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রাণহীন গোলশূন্য ম্যাচে আলাদা করে নজর কাড়তে পেরেছেন কেবল এই ফরোয়ার্ডই।
রবিন ফন পার্সিকে নিয়ে হল্যান্ডের প্রত্যাশা ছিল অনেক। ইনজুরিতে মৌসুমের অনেকটা সময় মাঠের বাইরে থাকায় তরতাজা ফন পার্সি দলকে বিশ্বকাপ জেতাবেন, এমনও বলে ফেললেন সাবেক ডাচ তারকা রুদ খুলিত। কোথায় কী! বিশ্বকাপের প্রথম দুটো ম্যাচে হতাশ করলেন আর্সেনাল ফরোয়ার্ড। তবে আশার কথা নকআউট রাউন্ডের আগেই দিয়েছেন ফর্মে ফেরার ইঙ্গিত। ক্যামেরুনের বিপক্ষে দলকে এগিয়ে দেওয়া গোলটি করে হয়েছেন ম্যাচ-সেরা। ডাচদের শিরোপা-স্বপ্নের এবার আরও জোর বাতাস বইবে।

মার্কিনদের ফুটবল-প্রেম

বিল ক্লিনটনের নাকি গলা ভেঙে গেছে। বক্তৃতা দিতে গিয়ে নয়, ক্লিনটনের গলা ভেঙেছে যুক্তরাষ্ট্রের জয়ে চিৎকার করতে গিয়ে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নাটকীয় জয়ের দিন মাঠে ছিলেন বিল ক্লিনটন। আজ ঘানার বিপক্ষে দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচেও মাঠে থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট। মাঠে থাকার জন্য কিছু কর্মসূচি বাতিল-টাতিলও করেছেন।
শুধু ক্লিনটনের কথা বলি কেন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তো ফোন করে যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানিয়েছেন, শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নিয়েছেন। ল্যান্ডন ডনোভানরা অভিনন্দন পেয়েছেন হলিউড তারকা ডেমি মুরের কাছ থেকেও। তিনি টুইটার-এ লিখেছেন—‘গো ইউএসএ! ইয়াহহহহহহ!!!!!’
ফুটবলটা কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে শেকড় গেড়েই ফেলল? কদিন আগেও ‘ফুটবল’ বলতে যে দেশটির লোকজন ‘আমেরিকান ফুটবল’ নামে হাতের এক খেলার কথা বুঝত, তারা ফুটবলপ্রেমী হয়ে গেল! এখনো যাদের কাছে ফুটবলের নাম ‘সকার’ তারা মজে গেল পায়ের বলের খেলায়!
হিসেবনিকেশ বলে, যুক্তরাষ্ট্রে অনেক আগেই ফুটবলের শেকড় তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। দেশটির ফুটবল ইতিহাস আজকের নয়। সেই ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেও খেলেছে যুক্তরাষ্ট্র, বাছাই দল হিসেবেই খেলেছে। এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে আটবার বিশ্বকাপ খেলেছে তারা। মনে রাখবেন, ফুটবলীয় শক্তি বলে কথায় কথায় যাদের নাম আসে, সেই হল্যান্ডও বিশ্বকাপ খেলেছে আটবার।
তবে ১৯৫০-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে একটা বিরাট ‘অন্ধকার যুগ’ গেছে। কিন্তু ফুটবলকে দেশটিতে জনপ্রিয় করার চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। সত্তরের দশকে ফুটবলকে জনপ্রিয় করার জন্য পেলে-ক্রুইফদের নিয়ে আসা হয়েছিল মার্কিন ঘরোয়া ফুটবল খেলার জন্য। তাতেও কাজ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের লোকজন বেসবল, আমেরিকান ফুটবল, আইস হকি, বাস্কেটবল ছেড়ে মোটেও সকারপ্রেমী হয়নি। ১৯৯৪ সালে ফিফা যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়িত্ব দিল বিশ্বকাপ আয়োজন করার। উদ্দেশ্য, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটিতে ফুটবলকে জনপ্রিয় করা।
তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয়েছিল, ফিফার উদ্দেশ্য দারুণ সফল। সব মিলিয়ে সে বিশ্বকাপে ৩৫ লাখ টিকিট বিক্রি হয়েছিল, যেটি এখনো যেকোনো বিশ্বকাপের জন্য রেকর্ড হয়ে আছে। প্রতিটি ম্যাচে সমর্থকদের উপস্থিতি দেখে মনে হলো, এবার মার্কিনরা ফুটবলপ্রেমী না হয়ে ছাড়ছে না।
কিন্তু কিসের কী! যেই না বিশ্বকাপ শেষ, ফুটবল নিয়ে তাবৎ আগ্রহও শেষ মার্কিনদের। দর্শকপ্রীতি তৈরি করতে না পারলেও ১৯৯৪ বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলের ‘নবজন্ম’ ঘটিয়ে দিয়ে গেল। এর দু বছর পর যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হলো পেশাদার লিগ।
আর ১৯৫৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপ বাছাইপর্বই পার হতে না পারা দলটি ২০০৬ সালে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের চার নম্বর দল হয়ে গেল! এখন তারা বিশ্বের ১৪ নম্বর র‌্যাঙ্কিংধারী। এর মধ্যে গত কনফেডারেশনস কাপের ফাইনালে উঠে গিয়েছিল স্পেনকে সেমিফাইনালে হারিয়ে। ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে ২ গোলে এগিয়েও গিয়েছিল, কিন্তু শেষরক্ষা করতে পারেনি তারা। তার পরও ইদানীংকালে দেশটিকে দারুণ সফল ফুটবলীয় দেশ বলা চলে।
কিন্তু লাভ কী! ফুটবল জনপ্রিয় তো হচ্ছে না। মার্কিনদের এখনো এমন অবস্থা যে খোদ ডেভিড বেকহাম সে দেশে পেশাদার ফুটবল খেলতে গিয়ে পরিচয়-সংকটে ভোগেন। যুক্তরাষ্ট্রে লোকজন তাঁকে চেনে ‘স্পাইস গার্ল ভিক্টোরিয়ার স্বামী’ হিসেবে!
যুক্তরাষ্ট্র তাহলে কি বিশ্বকাপের বাইরে ফুটবলকে আর আপন করে নেবেই না? না, এবার অন্তত একটু আশার আলো দেখছেন দেশটির ফুটবল-সংশ্লিষ্ট লোকজন। চলতি বিশ্বকাপের প্রথম পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি ম্যাচে গড়ে টেলিভিশন দর্শকসংখ্যা ছিল এক কোটি ১১ লাখ, যা গত বিশ্বকাপের চেয়ে শতকরা ৬৮ ভাগ বেশি!
দর্শকেরা স্রেফ টিভির সামনে বসে ‘দুর্বোধ্য’ খেলা দেখে গেছে, তা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জয়ে ওয়াশিংটনে আক্ষরিক অর্থেই মিছিল হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন বার-পাব ভরে গিয়েছিল ফুটবল-দর্শকে। দর্শকদের এই আগ্রহ দেখে একটা পরিবর্তন টের পাচ্ছেন মার্টিন ভাসকুয়েজ।
মেক্সিকান বংশোদ্ভূত মার্কিন ফুটবলার ভাসকুয়েজ ছিলেন ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পেশাদার লিগের খেলোয়াড়। ফলে পরিবর্তনটা তাঁর চোখে ভালোই ধরা পড়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলের জন্য সময়টা নিঃসন্দেহে অনেক ভালো যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দল এখন যে কভারেজ পাচ্ছে, সেটা অবিশ্বাস্য।’
অবশ্য মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল কোচ সাচো চিরোভস্কি বলছেন, বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই, ‘তৃণমূল পর্যায়ে যে কঠোর পরিশ্রম করা হয়েছে তারই ফল আসছে এখন।’ চিরোভস্কি এবারের বিশ্বকাপকে দেখছেন ‘এক শুরু’ হিসেবে।
শুরুটা তো করতেই হবে। ২০১৮ অথবা ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজনের জন্য চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আর সেই বিড কমিটির চেয়ারম্যান বিল ক্লিনটন। যুক্তরাষ্ট্রে এর পরও ফুটবল-শেকড় তৈরি করতে না পারলে লোকেরা ক্লিনটনদের ফুটবল-প্রেমে শুধু স্বার্থই খুঁজে পাবে!

মাঠে নেমেই ইতিহাস সং

হল্যান্ড-ক্যামেরুনের গুরুত্বহীন ম্যাচের বয়স তখন ৭৩ মিনিট। নিকোলাস একুলুকে তুলে কোচ পল লি গুয়েন মাঠে ঠেলে দিলেন ডিফেন্ডার রিগোবার্ট সংকে। সঙ্গে সঙ্গেই সং হয়ে গেলেন ইতিহাস। আফ্রিকান হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার (৪ বার) বিশ্বকাপ খেলা একমাত্র ফুটবলার এখন তিনিই।
এর আগে ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২ বিশ্বকাপে খেলেছেন সং। দেশের পক্ষে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন। খেলেছেন আটটি আফ্রিকান নেশনস কাপে, যার পাঁচ আসরেই ছিলেন দলের অধিনায়ক। দেশকে দুবার উপহার দিয়েছেন নেশনস কাপের ট্রফি। ক্যামেরুন ফুটবলের অনেক উজ্জ্বল ইতিহাসের সঙ্গেই জড়িয়ে গেছে রিগোবার্ট সংয়ের নাম। সেই সং গড়লেন আফ্রিকার সবচেয়ে বেশিবার বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড।
কোচ পল লি গুয়েন দলে তাঁকে যখন রেখেছিলেন, তখনই বোঝা যাচ্ছিল অনন্য এই রেকর্ডটিও হয়ে যাবে সংয়ের। কিন্তু প্রথম দুই ম্যাচে মাঠে না নামানোয় শঙ্কাটা বেজেই উঠেছিল। তবে কি অপেক্ষায় থেকে থেকেই শেষ হবে সংয়ের এবারের বিশ্বকাপ-যাত্রা? অবশেষে সদয় হয়েছেন কোচ।
বয়স খুব বেশি না। আসছে ১ জুলাই পা দেবেন ৩৪-এ। অথচ এই বয়সেই খেলে ফেলেছেন দেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ১৩৭টি ম্যাচ। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে খেলেছেন লিভারপুল, ওয়েস্ট হাম, এফসি কোলন, লেনস, গ্যালাতাসারে দলে। গ্যালাতাসারে থেকে নাম লিখিয়েছিলেন তুর্কি ক্লাব ত্রাবজোনস্পোরে। কিন্তু তারা আর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর তাগিদ না দেখানোয় বর্ষীয়ান এই ক্যামেরুন ডিফেন্ডার এখন উন্মুক্ত খেলোয়াড়। সুবর্ণ সময়টা বুঝি পেছনেই ফেলে এসেছেন সং!

আমার ফেবারিট উরুগুয়ে

ইতালির বিদায়ে যখন আকাশ ভারী হয়ে আছে, ঠিক তখনই আমাকে লিখতে হচ্ছে দ্বিতীয় রাউন্ড নিয়ে। যে দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলবে না চ্যাম্পিয়ন ইতালি, আমার ইতালি!
পেশাদারির কাছে আবেগের মূল্য ঠুনকো। তাই আবেগ চাপা দিয়েই এখন আমাদের তাকাতে হবে শেষ ষোলোতে। দুঃখ-ব্যথা নিশ্চয়ই ভুলে যাবে ফুটবলের উত্তেজনায়। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই যে শুরু হচ্ছে নকআউট পর্ব। একটা ম্যাচে খারাপ করা মানেই ইতালির পথ ধরে বাড়ি ফেরা। সেটি সত্যি হয়ে যেতে পারে যেকোনো বড় দলের জন্যই।
প্রথম দিনেই রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হবে উরুগুয়ে-দক্ষিণ কোরিয়া আর যুক্তরাষ্ট্র-ঘানার গ্লাডিয়েটররা। কোচ অস্কার তাবারেজ এই দলটাকে অটল, আক্রমণাত্মক করে গড়ে তুলেছেন। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই এই রাউন্ডে এসেছে ওরা। যদিও আমার মনে হয়, এখনো ওরা ওদের সামর্থ্যের সবটুকু দেখাতে পারেনি।
মাঝখানে ফোরলান, দুই পাশে লুইস সুয়ারেজ আর কাভানি—ওদের আক্রমণভাগটিকে আমার এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরাই মনে হয়। মাঝমাঠে আছে পেরেইরা, পেরেজ আর আরেভালোর মতো খেলোয়াড়, যারা শ্রমিকের মতো অক্লান্ত, শিল্পীর মতো সৃষ্টিশীল। ওদের রক্ষণভাগকেও কিন্তু প্রাপ্য কৃতিত্ব দিতে হবে। এখন পর্যন্ত একটা গোলও ওরা খায়নি। সেখানে আছে অভিজ্ঞ অধিনায়ক লুগানো। গোলরক্ষক মুসলেরাও আস্থার প্রতীক। দলটা ভারসাম্যপূর্ণ এবং যেকোনো মুহূর্তে গোলের মুখ খুলে দেওয়ার সামর্থ্য যে ওদের আছে, সেটি মেক্সিকো আর দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে দেখা গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া দ্বিতীয় পর্বের টিকিট পেয়েছে গ্রিসের বিপক্ষে জিতে আর নাইজেরিয়ার সঙ্গে ড্র করে। আক্রমণে দুই পার্ক—ম্যানইউ তারকা পার্ক জি-সুং আর মনাকোর পার্ক চু-ইয়ং। কোরীয়রা ৪-৩-২-১-এর দ্রুত মুভ করে এমন একটা ছক নিয়ে খেলে। শারীরিকভাবেও দলটা শক্তপোক্ত।
কোরীয়দের দুর্বলতা ওদের রক্ষণ। গ্রুপ পর্বে তিন ম্যাচে ছয়টি গোল খেয়ে এসেছে। তবে ছয় গোলের চারটিই তারা হজম করেছে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে এক ম্যাচেই। ফলে খুব বেশি দুশ্চিন্তার কিছু নেই। যদিও আরেক দক্ষিণ আমেরিকান দলই আজ তাদের প্রতিপক্ষ। নিজেদের রক্ষণ সামলে রাখার পাশাপাশি কোরীয়দের তাই মনোযোগ দিতে হবে উরুগুয়ের রক্ষণ নিয়েও। দুই দলের মধ্যে অভিন্ন যে মিলটি আছে, তারা আক্রমণ চালায় উইং ব্যবহার করে। এই ম্যাচে আমার ফেবারিট উরুগুয়ে। ওদের সেরা আটে দেখব বলেই আশা করছি।
যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় রাউন্ডে এসেছে ৯২ মিনিটে ল্যান্ডন ডনোভানের গোলে ভর করে। ঘানাও ভাগ্যের পরশ পেয়েছে বৈকি। শেষ ম্যাচে হেরেও দ্বিতীয় রাউন্ডে এসেছে তারা। ওদের গ্রুপটাতেই আসলে শেষ পর্যন্ত জমজমাট লড়াই হয়েছে। এই দুই দলই শেষ না হওয়া পর্যন্ত হার মানে না। ফলে একটা দুর্দান্ত ম্যাচের গ্যারান্টি আপনাকে দিতে পারি। ম্যাচটা হবে দ্রুতগতির, শক্তির ব্যবহার থাকবে, থাকবে শরীরের ব্যবহারও।
ঘানাই একমাত্র দল হিসেবে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করছে। ফলে বিশাল সমর্থন ওদের পেছনে থাকবে। ম্যাচে এই দিক দিয়ে তারা এগিয়েই আছে। জার্মানির বিপক্ষে ঘানার রক্ষণকে প্রায়ই ঝামেলায় পড়তে দেখা গেছে। আজ যুক্তরাষ্ট্রও তাদের একই রকম সমস্যায় ফেলতে চাইবে।
ডনোভানদের দলটা খুবই পরিশ্রমী। তবে এই ম্যাচে তারা কেমন খেলছে সেটাই নির্ধারণ করে দেবে ফলাফল। মার্কিনদের খেলার ধরনটাই এমন, ধীরে ধীরে ওরা ম্যাচের লাগাম মুঠোয় পোরে। ম্যাচটায় দুই পক্ষই আমার চোখে সমশক্তির, কিন্তু ঘানার যা আছে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের নেই—আফ্রিকার বিশাল জনগোষ্ঠীর নিঃস্বার্থ সমর্থন।

‘ফ্লপ ইতালিয়া’

আজকের বাদশা কীভাবে কাল ফকির হয়ে যান—তা এখন সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন মার্সেলো লিপ্পি, ফ্যাবিও ক্যানাভারোরা। চার বছর আগে দেশে ফেরার সময় যাদের নামে জয়ধ্বনি উঠেছিল, সেই ইতালিয়ান কোচ-ফুটবলারদের নামেই এখন ধিক্কারের শব্দ শোনা যায়। ওয়েবসাইট।
জনগণের হয়ে ইতালিয়ান দলকে নিন্দায় ভাসানোর কাজটা করছে সংবাদমাধ্যম। লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ত বড় বড় করে হেডিং করেছে, ‘ফ্লপ ইতালিয়া’। লা রিপাবলিকা লিখেছে ‘ইতালির অবসান’। কুরিয়েরে দেল্লা সেরা শিরোনাম করেছে, ‘কুৎসিত ইতালি: আমরা তিনটি (গোল) নিয়ে বাড়ি ফিরছি’।
এ নিয়ে দ্বিতীয়বার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপে গিয়ে প্রথম পর্ব থেকে বাদ পড়ল ইতালি। এই অপমান মেনে নিতে পারছে না সে দেশের সংবাদমাধ্যম। কুরিয়েরে দেল্লা সেরা পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘বার্লিনের আরেক ফাইনালিস্ট, বিদ্রোহ জর্জরিত ও হাস্যকর ফ্রান্সের মতো আমরাও লাথি খেয়ে প্রথম রাউন্ড থেকে ছিটকে গেলাম। ভবিষ্যৎহীন, নিষ্প্রভ দলটা হতাশা ও বিষণ্নতা নিয়ে বাড়ি ফিরছে।’
‘বুড়ো’ খেলোয়াড়দের নিয়ে দল করায় মার্সেলো লিপ্পি আগে থেকেই ‘ভিলেন’ হয়ে ছিলেন সংবাদমাধ্যমের কাছে। এবার লিপ্পির দলের করুণ পরিণতিতে আসলেই হাত খুলে গেছে তাদের। লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্ত তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে, ‘স্লোভাকিয়ার কাছে চরম অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরছি আমরা।’ পত্রিকাটি দাবি করছে, ‘জোহানেসবার্গে এদিন কোনো কিছুই ঠিকমতো কাজ করল না।’
‘এক ভয়াবহ বিপর্যয়’ শিরোনামে লা রিপাবলিকা পত্রিকায় ফুটবল লেখক মার্কো মেনসুরাতি লিখেছেন, ‘গতকাল পর্যন্তও আমরা ইতালিয়ানরা হিসাব কষেছি, ইতালি কত বড় ব্যবধানে জিততে পারে। উত্তর আসছিল, ব্যবধানটা বড়ই হবে।’
রিপোর্টার রিকার্ডো প্রেতেসি লিখেছেন, ‘ইতালি তাদের সব অস্ত্র নিয়েই আক্রমণ করেছিল। কিন্তু কঠিন সময় মেনে নিতে হয়েছে। ইতালির এই ফুটবল আর চলে না।’
এবারের বিশ্বকাপ কি সেই শিক্ষাই দিয়ে গেল?

বিচার চলছে সেই ইংলিশ সমর্থকের

ইংল্যান্ড থেকে অনেক আশা নিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকায় এসেছিলেন পাভলোস জোসেফ। কিন্তু প্রিয় দলের পারফরমেন্স তো হতাশ করেছেই, উল্টো এখন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে ৩২ বছর বয়সী পাভলোসকে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ড হতাশাজনকভাবে ড্র করার পর ড্রেসিং রুমে ঢুকে পড়েছিলেন ইংল্যান্ডের এই সমর্থক। সেখানে তিনি সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক ডেভিড বেকহামকে অপমান করেছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাভলোস। তাঁর দাবি, বাথরুমের যাওয়ার পথ খুঁজতে খুঁজতে আচমকাই তিনি ঢুকে পড়েছিলেন ইংল্যান্ডের ড্রেসিং রুমে। তাই চোখের সামনে ডেভিড বেকহামকে পেয়ে দলের পারফরমেন্স নিয়ে দু-কথা বলার সুযোগটা ছাড়েননি পাভলোস। তবে অপমানজনক কোনো কথাও বেকহামকে বলেননি তিনি। এত টাকা খরচ করে খেলা দেখতে এসে প্রিয় দলের এমন লজ্জাজনক পারফরমেন্সে সমর্থকেরা যে হতাশ, সেটা তো তিনি বলতেই পারেন। কিন্তু এসব কথায় কর্ণপাত করেননি দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশ কর্তৃপক্ষ। অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের দায়ে গ্রেপ্তার করা হয় পাভলোসকে। ৫০ ইউরোর বিনিময়ে জামিন পেলেও বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ইংল্যান্ডের আগামী খেলাগুলো দেখতে পারবেন না পাভলোস।