Wednesday, February 5, 2020

কেরমানশাহ: শাফেয়ি জামে মসজিদ

এ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব আর সংস্কৃতির বিচিত্র সমৃদ্ধ উপাদান। দেখার দেশ ইরান। ঘুরে বেড়ানোর দেশ ইরান। আর্যভূমির এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ঘুরে বেড়াবো আমরা। গত আসরে আমরা গিয়েছিলাম ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দর প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ শহর কেরমানশাহে। কেরমানশাহ প্রদেশের দুটি ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গেও আমরা খানিকটা পরিচিত হয়েছিলাম।
আপনারা নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন যে এই কেরমানশাহ প্রদেশে ২০১৭ সালের নভেম্বরে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। ওই ভূ-কম্পনে প্রদেশের শহরগুলো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছিল। জেনে রাখা ভালো যে কেরমানশাহের শহরগুলো ইরানের ঐতিহাসিক এবং সুন্দরতম শহরগুলোর অন্তর্ভুক্ত। স্বয়ং কেরমানশাহ শহর ইরানের ঐতিহাসিক এবং সুন্দর শহরগুলোর অন্যতম। কেরমানশাহের কথা উঠলে প্রথমেই অনেকের মনে পড়ে যায় বিস্তুনের শিলালিপির কথা। এই শিলালিপিটি ফরহাদের প্রস্তরলিপি নামেই বেশি পরিচিত। এখানকার হেরাক্লিয়াসের ভাষ্কর্যও দেখেছি আমরা। আরও দেখেছি পর্যটক আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক আরেকটি পাথুরে শিল্প স্থাপনা 'ত্বক বোস্তন'।
বলেছি যে কেরমানশাহ'তে ত্বক বোস্তন আর বিস্তুন পাহাড় ছাড়াও আরও বহু দর্শনীয় স্থাপনা রয়েছে। বিশেষ করে কাজার এবং পাহলাভি রাজবংশের শাসনামলের বহু নিদর্শন রয়েছে এখানে। ইরানে আকর্ষণীয় যতগুলো মসজিদ রয়েছে তাদের মধ্যে একটি মসজিদ এই কেরমানশাহ প্রদেশে অবস্থিত। এই ঐতিহাসিক মসজিদটি শাফেয়িদের মসজিদ। শাফেয়ি জামে মসজিদ নামেও পরিচিতি রয়েছে এই মসজিদের। তুর্কিদের মসজিদের ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছে এই মসজিদটি। এই মসজিদের বিশাল বিশাল মিনার পুরো শহরের সৌন্দর্য ব্যাপক বৃদ্ধি করেছে। এটি একটি সুন্নি মসজিদ। মসজিদের এক প্রান্ত গিয়ে মিশেছে কেরমানশাহ বাজারের সঙ্গে। কেরমানশাহ বাজারের বয়স দেড় শ বছরের বেশি। এখানে রয়েছে বিচিত্র সরাইখানা। রয়েছে বহু প্যাসেজ এবং শপিং মল, ছোটো ছোটো অনেক মসজিদ, জিমনেশিয়াম এবং  হাম্মামখানা।
এইসব প্রাচীন স্থাপনা প্রমাণ করছে যে কেরমানশাহ বেশ প্রাচীন একটি শহর। কেরমানশাহ শহরের লোকজনের সংস্কৃতি, স্মৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য তথা সমৃদ্ধ অতীতের কথা প্রামাণ্য করে তোলে এইসব স্থাপনা। কেরমানশাহ বাজারটি তার সমকালে ছিল সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় বাজার। এর ভেতরে আবার শাখা বাজারও রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সোনার বাজার, ইসলামি বাজার এবং তোপখানা বাজারের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাজারটির কাঠামো বেশ দৃষ্টিনন্দন। প্রাচীন কাঠামোর সঙ্গে আধুনিকতার সংমিশ্রণে গড়ে তোলা হয়েছে এর স্থাপত্যশৈলী। যার ফলে যে কোনো পর্যটকই প্রথম দেখাতেই বাজারের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারেন না।এই বাজারে কেরমানশাহের ঐতিহ্যবাহী কিছু জিনিসপত্র বিশেষ করে হস্তশিল্প দেখতে পাওয়া যায়। যেমন: নামাদমলি মানে দুম্বার পশম দিয়ে তৈরি এক ধরনের গালিচা। একইভাবে মৌজবফি মানে ঢেউয়ের মতো বুননের কাজ দিয়ে হাতে তৈরি এক ধরনের গালিচা। এই গালিচা সুতোর তৈরি।
বাজারে সহজলভ্য ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্রের কথা বলছিলাম। এই বাজারে আরও যেসব জিনিসপত্র পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রকমের থান কাপড়, রঙ-বেরঙের কাপড়, তৈরি করা জামা-কাপড়, বিচিত্র হস্তশিল্প ইত্যাদি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিচিত্র উপহার সামগ্রীও এই বাজারে পাওয়া যায়। যেমন চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি রুটি, কাকা রুটি এটা দেখতে অনেকটা পাকপান পিঠার মতো, খোরমা রুটিসহ স্থানীয়ভাবে তৈরি বহু রকমের মিষ্টি। এগুলোর বাইরেও বিভিন্ন রকমের গেলিম, গালিচা, জাজিম মানে সুতোর তৈরি মাদুর জাতীয় এক ধরনের মোটা গালিচা, জুতা, কুর্দি লেবাস ইত্যাদিও পাওয়া যায় এই বাজারে। এখানে আরও যে স্থাপনাটি না দেখলেই নয় তা হলো মোয়াবেনুল মুলক তাকিয়া। এই স্থাপনা বাংলাদেশের পুরান ঢাকার ইমামবাড়ির মতো। অনেকে হোসাইনিয়াও বলেন। সচিত্র টাইলসের কারুকাজে সাজানো এই স্থাপনাটির স্থাপত্যশৈলী দেখার মতো। কাজার শাসনামলের সুন্দরতম স্থাপনাগুলোর অন্যতম এই মোয়াবেনুল মুলক হোসাইনিয়া।
নাম থেকেই বোঝা যায় যে এটি একটি ধর্মী স্থাপনা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ উপজাতীয় ও গোত্রীয় দ্বন্দ্ব-মতপার্থক্য নিরসনে এই স্থাপনার ব্যাপক ভূমিকা ছিল। পরবর্তীকালে অবশ্য এটি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কাজার শাসনামলের আরও একটি তাকিয়া স্থাপনা হলো 'বিগলারবেইগি'। আয়নার কারুকাজের জন্য এই তাকিয়াটি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। মুজাফফার উদ্দিন শাহের আমলের এই স্থাপনায় রয়েছে লিপিকর্ম ও ক্যালিগ্রাফির সমৃদ্ধ সংগ্রহ। কেরমানশাহ বেড়াতে গেলে নিলুফার হ্রদ না দেখে আসা বোকামি হবে। নীলপদ্মময় এই হ্রদের সৌন্দর্যই অন্যরকম। গ্রীষ্মের মৌসুমে সবুজ থালার মতো পত্রময় সাদা, নীল, লাল পদ্মে ভরে যায় পুরো হ্রদ। পাশের কয়েকটি ঝরনা থেকে আসা পানিতে হ্রদ পরিপূর্ণ থাকে প্রায় সবসময়। বাতাসে পদ্মফুলের নৃত্য খেলা করে স্ফটিকস্বচ্ছ হ্রদের জলে। এর সৌন্দর্য সত্যিই অপূর্ব এবং রসিক মনের জন্য উপভোগ্য।
কেরমানশাহ দেখতে কিংবা বেড়াতে যাবেন কেন? কেবল তার পদ্মহ্রদ দেখার জন্য? ত্বক-বোস্তন, বিস্তুন পাহাড়, ইমামবাড়ি, ঐতিহ্যবাহী বাজার কিংবা রঙ-বেরঙের পোশাক-আশাক আর বিখ্যাত সব মিষ্টির জন্য? না। বরং কেরমানশাহ প্রদেশ এবং শহরে বেড়াতে যেতে হবে এই এলাকার মানুষের অতিথি পরায়ণতা, তাদের ঔদার্য আর সদয় ধৈর্যশীল আচরণের অভিজ্ঞতা লাভ করার জন্য। সেইসঙ্গে তাদের প্রতিরোধের দৃঢ়তা ও বীরত্বপূর্ণ মনমানসিকতার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্য। ইরাকের বাথ সরকারের চাপিয়ে দেওয়া আট বছরব্যাপী যুদ্ধের সময় ইরানের সার্বভৌমত্ব, সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষার স্বার্থে শত্রুদের মোকাবেলায় যেরকম বীরত্ব দেখিয়েছে এই কেরমানশাহের জনগণ তা ইতিহাসে বিরল। তার নিদর্শন এখনও তাদের মনে-প্রাণে-দেহে লক্ষ্য করা যাবে।
দেশের স্বার্থে প্রাণ বিসর্জনের সেই উন্নত মানসিকতা এখনও তাদের মাঝে বিরাজ করছে। এখনও কেরমানশাহ এলাকার জনগণ দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য নিজেদের সাধ্যমতো চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

হিজাব নিয়ে ব্রিটেনে বাংলাদেশী তরুণী সাবিনার লড়াই by নাজমুল হুদা সোহেল

হিজাব ইসলামের একটি ফরজ বিধান ও বিশ্বব্যাপী একটি বহুল আলোচিত বিষয়। এটি হলো সেই বিধিব্যবস্থা ও চেতনা যার মাধ্যমে ঘর থেকে শুরু করে পথ-প্রতিষ্ঠান-সমাবেশসহ সমাজের সব ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণহীন কথাবর্তা, দর্শন, দৃষ্টি বিনিময়, সৌন্দর্য প্রদর্শন ও সংস্পর্শ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ করা হয়। পারিভাষিক অর্থে হিজাব নারী পোশাকের ওপর কেন্দ্রীভূত হলেও পোশাক ও নারীর মধ্যেই ইসলামের হিজাবব্যবস্থা সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর অর্থ আরো ব্যাপক যাতে নারী-পুরুষ উভয়ের কম-বেশি অংশীদারিত্ব রয়েছে।
গত ১ ফেব্রুয়ারি ছিল বিশ্ব হিজাব দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘স্ট্যান্ড ফর হার রাইট টু কভার’। বিশ্বব্যাপী হিজাব বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিজাব বিভ্রান্তি ও বিরোধিতা চরম আকার ধারণ করেছে। কেউ একে নারীর রাকবজ এবং তাদের মর্যাদা ও শালীনতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করছেন। আবার কেউ একে অযৌক্তিক, নারীর বন্দিত্ব, পশ্চাৎপদতার কারণ ও প্রগতির অন্তরায় হিসেবে চিত্রিত করছেন। কোনো কোনো অমুসলিম দেশে এর বিরোধিতা করতে গিয়ে পার্লামেন্টে হিজাব নিষিদ্ধকারী আইনও পাস হয়েছে। হিজাববিরোধীরা হিজাবের প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য নানা কৌশল এবং প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে। কাসরুমে হেনস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার, ড্রেসকোডের অজুহাতে হিজাব পরা ছাত্রীদের জামার হাতা কেটে দেয়া, অশালীন ব্যবহার, ব্যাকডেটেড বলে গালি দেয়া, চাকরি পেতে বাধা তৈরি করা, চাকরিচ্যুতিসহ প্রতিদিন অসংখ্য বাধার মুখোমুখি হচ্ছেন হিজাবের অনুসারী নারীরা। তা সত্ত্বেও তরুণীরা অধিক হারে হিজাবের বিধিবিধান অনুসরণ করতে শুরু করেছে বিগত দশকে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে হিজাব তাদের অগ্রগতির প্রতিবন্ধক নয়; বরং নিবিষ্ট সহায়ক ও রাকবজের ভূমিকা পালন করছে। তাই মুসলিম নারীরা তাদের এই অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনি ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলছে। কারণ হিজাব নিছক একটি পোশাকের নাম নয়, বরং ইসলামি সংস্কৃতি ও সভ্যতার একটি প্রতীক।
আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে হিজাবের ব্যবহার ক্রমাগত ও আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অল্প কয়েক বছর আগেও এ দেশে হিজাব পরা নারীদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। আর যারা হিজাব পরত তাদের বেশির ভাগই ছিল গ্রামের সাধারণ মহিলা। শহরে কিংবা শিক্ষিত মহলে বোরকার ব্যবহার ছিল হাতেগোনা; কিন্তু এখন শিক্ষিত মহলেও হিজাবের ব্যবহার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন অফিস-আদালতে বর্তমানে হিজাবধারী নারীদের সংখ্যা অগণিত। নানা বৈরী প্রচারণার শিকার হওয়া সত্ত্বেও তরুণ-তরুণীরা অধিক হারে হিজাবের বিধিবিধান অনুসরণ করতে শুরু করেছে বিগত দশক গুলোতে। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গার্মেন্টকর্মী কোনো ধর্মীয় প্রণোদনা নয় বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হিজাবের পোশাক অংশটি বেছে নিয়েছে। নিশ্চিতভাবেই এটা হিজাববিরোধীদের ভাবিয়ে তুলছে। তাই যে করেই হোক হিজাবের এই অগ্রযাত্রা অঙ্কুরেই রোধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে তারা এ দেশে হিজাব নিষিদ্ধ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
তারা তাদের মিশন সফল করার জন্য যা যা করার প্রয়োজন তার কোনোটিই করতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। এরই অংশ হিসেবে ইসলামবিরোধী বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিজাবের ব্যাপক প্রসারে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে, দেশের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক হয়রানির পাশাপাশি হিজাব পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাকে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যই বলতে হবে। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও হিজাবের বিরুদ্ধে চলছে নানান ষড়যন্ত্র।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ইউরোপজুড়ে মুসলিমদের একটা গৎবাঁধা নেতিবাচক ছবি তুলে ধরার কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ এবং বৈষম্য আরো বাড়ছে। সম্প্রতি সংগঠনটি ইউরোপীয় মুসলমানদের নিয়ে Muslims discriminated against for demonstrating their faith নামে একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরি করে। রিপোর্টে মুসলিমদের বিরুদ্ধ বৈষম্যের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ইউরোপে এখন মুসলিম মহিলারা কেবল হিজাব পরার কারণে চাকরি পাচ্ছে না, মেয়েদের স্কুলে যেতে বাধা দেয়া হচ্ছে। মুসলিম পুরুষরা কেবল দাড়ি রাখার কারণে চাকরিচ্যুত হচ্ছেন।
১২৩ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টে অ্যামনেস্টি বলছে, ইউরোপজুড়ে মুসলিমরা তাদের ধর্ম পালন থেকে শুরু করে শিা, কর্মত্রে সব জায়গাতেই বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। ২০০২ সালে উত্তর লন্ডনের ডেনবিগ হাইস্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল স্কুলছাত্রী সাবিনা; জার্মানিতে স্কুলশিকিা ফিরিশতা লুদিন চাকরি হারান হিজাবের সপে কথা বলার কারণে। এমনি অনেক দেশেই ‘আইনি লড়াই’ এবং বহুপ্রকার প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে ‘হিজাব’ বারবার। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হিজাব নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেছে ফ্রান্স। সুইডেনে হিজাবসম্মত পোশাক পরার অপরাধে চাকরি হারিয়েছে অনেক মেয়ে।
বাধা পেরোতেই আন্দোলন দানা বাঁধে। এটিই প্রাকৃতিক নিয়ম। দেশে-বিদেশে হিজাবের বিরুদ্ধে এত বাধা ও ষড়যন্ত্রের পরও হিজাবের চেতনা বুকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে মুসলিম নারীরা, গড়ে তুলছে নানা সামাজিক আন্দোলন। হিজাবের বিরুদ্ধে প্রচলিত নানা বাধাকে চ্যালেঞ্জ করে গড়ে ওঠা হিজাব আন্দোলনের মধ্যে রয়েছে বিশ্ব হিজাব দিবস পালন, মানববন্ধন, র‌্যালি, সেমিনার, হিজাব মেলার আয়োজন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হিজাব সচেতনতামূলক প্রচারণা, আইনি লড়াই ইত্যাদি।
‘ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে’ হিজাবকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমনই একটি সামাজিক আন্দোলন। ধর্মের প্রতি মানুষের পারস্পরিক সহনশীলতা, শ্রদ্ধা ও হিজাবের ব্যবহার বৃদ্ধির ল্েয এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। হিজাবের ব্যাপারে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করে শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠাই এর উদ্দেশ্য। ইসলামে হিজাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামি সংস্কৃতির একটি গর্বিত প্রতীক। এটি ধর্মীয় সহনশীলতা এবং মা করে দেয়ারও অনন্য এক উদাহরণ। এতদসত্ত্বেও ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে হিজাবের অনুসরণ একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। হিজাব পরে কর্মস্থলে যাওয়া যায় না, হিজাব পরলে চাকরি হারানো আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি অনেক শিাপ্রতিষ্ঠানেও হিজাব পরে যাওয়ার বিধান নেই।
এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তরণে জনসচেতনতা সৃষ্টির অভিপ্রায়ে সারা বিশ্বের সব ধর্মের সব ধরনের মানুষের কাছে ‘হিজাব’ সম্পর্কে স্পষ্ট এবং সঠিক ধারণা সৃষ্টির উদ্দেশে ২০১৩ সাল থেকে ১ ফেব্রুয়ারিকে ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেন এর উদ্যোক্তারা। ২০১৬ সালে বিশ্বের প্রায় ১৪০টি দেশে ১ ফেব্রুয়ারি হিজাব দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়। ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে-এর প্রচার সাহিত্য ইতোমধ্যে পৃথিবীর প্রায় ৫৬টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, ৩৩টি দেশে ৯১ জন সেলিব্রেটি ব্যক্তিত্বগণ ‘ওয়ার্ল্ড হিজাব ডে’-এর অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই সামাজিক আন্দোলনটি বিবিসি, আলজাজিরার মতো মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায়ও ব্যাপক কভার পাচ্ছে। ইভেন্টটি সম্পর্কে আরো জানা যাবে তাদের নিজস্ব এই ওয়েবসাইট থেকে : http://worldhijabday.com/
মুসলিম নারীরা হিজাব পরিপালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রীরা সাহস করে র‌্যালি, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিবাধ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের ছাত্রীরা হিজাব পরতে দেয়ার দাবিতে যে আন্দোলনে নেমেছেন তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শুধু বাংলাদেশে নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিজাব পরতে দেয়ার দাবিতে ছাত্রীদের আন্দোলন করতে দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষ করে ফেসবুক ও ব্লগে হিজাব একটি অতি প্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। হিজাবকেন্দ্রিক ইভেন্ট ও প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে উঠে আসছে এসব সামাজিক মিডিয়ায়। সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিজাব আন্দোলনের অন্যতম প্লাটফরমের রূপ নিয়েছে। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে খোলা হয়েছে শত শত হিজাববিষয়ক ফেসবুক পেজ ও ব্লগ।
দ্য মুসলিম ওইমেন সোসাইটি MWS এবং মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটেন MAB দু’টি সংগঠন অ্যাসেম্বলি ফর প্রটেকশন অব হিজাব নামে একটি ইভেন্টের আয়োজন করে ১৭ জানুয়ারি ২০০৪ সালে। এই সম্মেলনটি পরিচালনা করেন আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভি। বাংলাদেশের এই ইভেন্টের সমর্থনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়। অ্যাসেম্বলি ফর প্রটেকশন অব হিজাব বর্তমানে সমাজ সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে থাকে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিজাব সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য হিজাব মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো হিজাব মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৪ সালে। মেলার আয়োজক ছিলেন মার্সি মিশন বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট। মেলার আয়োজকেরা জানান, মেলার মূল উদ্দেশ্য ছিল নারী-পুরুষ সবাইকে শালীন পোশাক সম্পর্কে সচেতন করা ও ইসলামি সংস্কৃতির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো।
হিজাবের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্রিটেনে বাংলাদেশী তরুণী সাবিনার আইনি লড়াই অনেকেরই মনে থাকার কথা। অস্ত্র ছাড়াও প্রচলিত আইনে শ্রদ্ধা রেখে লড়াই করা যায়। ব্রিটেনে নিজ সংস্কৃতির পোশাক নিয়ে এমনই এক অহিংস লড়াইয়ে নেমেছিলেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কিশোরী সাবিনা বেগম। ২০০২ সালে বিষয়টি ঝড় তোলে পৃথিবীর গণমাধ্যমে। তা ছাড়া দুই বছর আগে ব্রিটেনে বোরকা নিষিদ্ধের বিল রুখে দিয়েছে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এমপি রুশনারা আলী। বিরোধী দলের বিরোধিতায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উত্থাপিত হলে লেবার দলীয় বাঙালি এমপি রুশনারা আলীসহ লেবার এমপিরা তীব্র বিরোধিতা করেন।
বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রুশনারা আলী বলেন, নেকাব পরিধান ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং অনুশাসনের অং। আমি সবসময়ই নারীদের স্বাধীনতা এবং অধিকার রক্ষায় আন্তরিক। এভাবে আইনি লড়াই করে হিজাবের অধিকার আদায়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ। বাধার মোকাবেলায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুসলিম নারীরা তাদের বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার মাধ্যমে নিজেদের হিজাব অনুসরণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হচ্ছেন, হিজাবের অধিকার রক্ষায় গড়ে তুলছেন বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন। এসব আন্দোলনে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারীদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা আগামী দিনের সমাজে হিজাবের ধারণা যে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে তারই সুস্পষ্ট ঈঙ্গিত বহন করছে। হিজাবের চেতনাভিত্তিক সমাজ গড়তে এ আন্দোলন আরো ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর হবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : শিক্ষক, প্রবন্ধকার
হিজাব নিয়ে  ব্রিটেনে বাংলাদেশী তরুণী সাবিনার লড়াই

ঘরের নেয়ে

বাবা মারা গেলে কি হয়? একটু আগেই রতনের বাবা মারা গেলেন। মরা বাড়ির দৃশ্য সব প্রায় একই রকম। কান্নাকাটি হচ্ছে। আশপাশের বাড়ি থেকে মানুষজন সান্ত¡না দিচ্ছে। রতন পাশেই পুকুর পাড়ে ছিল। সে একই জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথায় কেবল চাপটি নামের একটা খাবারের কথা ঘুরছে। হাটে পাওয়া যায়। দুই ধরনের চাপটি হয়। একটা গাঢ় চিনির শিরায় বাদাম মিশিয়ে বানানো হয়। আর একটা মিঠাই এর শিরায় বাদাম মিশিয়ে। এর বাইরে আর কিছুই ঢুকছে না মাথায়। কান্নাকাটির শব্দও তেমন কিছুই মনে হচ্ছে না।

অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর। হয়তো অধিকের উপরের শোকে আবার নরম্যাল। রতন ভাবছে তার শোকটা অল্পও না, অধিকও না। তাই তার কিছুই মনে হচ্ছে না। সে বাড়ির মেজ ছেলে। বড় দুই ভাই, ছোট এক ভাই, এক বোন। এক ভাই ঢাকায় বুয়েটে পড়ছেন। অন্য ভাই চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে। দুই ভাইকে খবর দিতে হবে। ছোট বোনটা স্কুলে, ওকে খবর দেয়ার দরকার নেই। একটু পরে এমনিতেই চলে আসবে। আত্মীয়-স্বজনদের খবর দিতে হবে। এলাকায় মাইকিং করতে হবে। মৃত্যুর পর শোক বুকে নিয়েই অনেক ফর্মালিটিজ পালন করতে হয়। এরপরেও কোনো একটায় ভুল হলে তা ক্ষমার অযোগ্য বলেই সবাই ধরে নেয়। ওমুককে কেন খবর দেয়া হলো না, তুমুককে কেন সবার শেষে বলা হলো।

সকালের দিকেই রতনের বাবার খুব শ্বাস-কষ্ট হচ্ছিল। তিনি রতনকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, রতন তুই ছাড়া এই সংসারের হাল ধরার কেউ নাই। মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও মানুষের মাথায় সংসার নামের ব্যাপারটা থাকে! বাবার মুখটা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পানি আসল। চোখের পানি এত গরম হয়? রতন ঝরঝর করে অনেকক্ষণ কাঁদল, বাবা বাবা...

পকেটে টাকা বলতে শ’খানেক আছে। রতন সবেমাত্র ইন্টার পাস করেছে। তার পকেটে এরচেয়ে বেশি টাকা থাকে না। সে কোনোদিন কারো কাছে টাকা ধারও করেনি। কাফনের কাপড় কিনতে হবে। ভালোটাই কিনতে হবে। বাবা খুব পরিষ্কার ও রুচিওয়ালা মানুষ ছিলেন। মৃত্যুতে অবহেলা নিয়ে যেন বিদায় না হয়। ছোট বোনটা চলে এসেছে। কান্নাকটি আরেক ধাপে শুরু হলো। এর মধ্যে বসে থাকলে চলবে না। রতন ঘরে ঢুকে বাবার দোকানের চাবি হাতে নিল। যদি ক্যাশে কোনো নগদ টাকা থেকে থাকে এই আশায়। এই প্রথম বাবার দোকানের চাবিতে হাত দিল রতন।

বাবার মৃত্যুর পর দু’দিন পার হয়ে গেল। তার মানে মৃত্যুর তিন দিন হলো। ‘আজ মরলে কাল দুই দিন’ হিসাব মতে। আগামী দিন মিলাদ পড়াতে হবে। ক্যাশে যা টাকা ছিল তা প্রায় শেষ। বড় ভাইরা এসেছিলেন। যাওয়ার সময় গাড়ি ভাড়া দিতে হলো। কেউ চায়নি, রতনের মনে হলো টাকা ছাড়া যাবেন কিভাবে? দু’দিন আগেও রতন বোঝেনি টাকার কতটা প্রয়োজন সংসারে। মৃত্যুর পরেও যদি ফর্মালিটিজে এত টাকা খরচ হয় তবে জীবন্ত মানুষের কেন টাকা লাগবে না? এলাকার চৌকিদারকে দিয়ে বাড়ি বাড়ি খবর দেয়ার কাজটা করা হয়েছিল। ছেলেটাকে কিছু টাকা দিতে হবে। এক কাজ করা যায়, ওকে দিয়ে চারদিনের মিলাদের টুকটাক কাজ করিয়ে সঙ্গে বকশিশ হিসেবে একটু বেশি টাকা দিয়ে দিলেই হবে।

কাউকে কিছু বলতে হলো না। সংসার নামের যে নৌকার মাঝি তিনদিন আগে রিটায়ার করলেন, সেই নৌকার হাল এখন রতনের হাতে। কোথার এই নদীর চড়া কোথায় গভীরতা তা সব এখন রতনেরই বুঝতে হবে। সে যে নায়ের নেয়ে এই নায়ের লক্ষ্য কোনো তীর নয়। এই নায়ের নেয়ের কাজই হলো একে ঠিকমতো বেয়ে নিয়ে যাওয়া। সংসার নামক নৌকার কোনো গন্তব্য থাকে না। অনাদি কাল থেকেই তা চলছে। যে নৌকায় হাল ধরার মতো কেউ থাকে না তা উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক-সেদিক চলে। চলতে চলতে ধাক্কা খায়, ঠোক্কর খায়। ধাক্কা, ঠোক্কর খেয়ে খেয়ে কোনো একদিকে চলে যায়। ডুবেও যায় কেউ কেউ। রতন তা হতে দেবে না।

বড় ভাইদের পরীক্ষা ছিল, উনারা চলে গিয়েছিলেন। আগামী দিন আবার আসবেন। রতন দোকানে বসা শুরু করেছে। মাঝেমাঝেই মনে হচ্ছে সে ছাড়া আর কি কেউ আছে যে নাকি সংসারের হাল ধরবে? সে চিন্তা করে। কোনো ক‚ল-কিনারা পায় না। সে ছাড়া আর কে ধরবে হাল? বড় দুই ভাইয়ের পড়াশোনার আর কয়েক বছর বাকি। এর পরেই বড় চাকরি পাবেন। নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছেড়ে তারা গ্রামে ফেরত আসবেন? আবার শহরে থাকতে গেলে তাদের খরচ পাঠাবে কে? অতএব রতনই একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি সংসারের হাল ধারার। ছোটদের দায়িত্ব তো এমনিতেই তার ওপর। যাই হোক, আপাতত মিলাদের কাজটা শেষ হোক।
মিলাদ শেষ হলো। বড় ভাই আসেননি, উনার পরীক্ষা। এর পরের জন এসে সেদিনই চলে গেলেন। সংসার নিয়ে কেউ কিছুই বলছে না। ছোট ভাই-বোন কেউই স্কুলে যায়নি এই কয়দিন। পাঁচ দিনের দিন আত্মীয়-স্বজন সবাই চলে গেল। বাড়ি প্রায় ফাঁকা। ছোট ভাইটা কাছে এসে বল্লো, ভাইয়া তোমার সাথে আমিও যাব দোকানে। খুব সহজ একটা কথা। ভেতরটা হু হু করে ওঠল রতনের। ভাইটাকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠল। মা আসলেন, ছোট বোনটা আসল। মরা বাড়ির শোকটা এখনো মরেনি, আবার যেন তা কয়লার আগুনে বাতাস লাগার মতো জ্বলে ওঠল। সবাই একসাথে কাঁদছে।

রতন চট করেই নিজেকে সামলে হালকা করে হাসি দিয়ে বলল, দোকানে যাইতে চাইলে যাবি, আগে স্কুলে যা। প্রায় মাস খানেক হয়ে গেল রতন সংসার চালাচ্ছে। ব্যাবসাটা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছে। একটা ব্যাপার ভেবে সে প্রায়ই মজা পায়। ঘটনাটা হলো, অনেকেই বাকি টাকা চাইতে আসছেন। কিন্তু কেউ কেউ তো বাকিতে নিশ্চয়ই নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাকি যারা চাইতে আসছেন তাদের আস্তে আস্তে সে শোধ করছে। সব কিছুর পর হাতে তেমন টাকা থাকছে না। সংসার একটা তলাহীন ঝুড়ি, যতই দেয়া হয় ততই যেন নিমিষেই নাই হয়ে যায়। বাজার সদাই, মায়ের ওষুধ, ছোট ভাই বোন দুইটার খরচ। তার উপর আছে বড় দুই ভাই। বেশ কয়েকদিন ধরেই টুকটাক করে জমানোর চেষ্টা করছে রতন। তার ইচ্ছা হলো, বড় দুই ভাই লজ্জায় হয়তো তার কাছে চাইতে পারবে না। চাওয়ার আগেই যেন সে টাকা পাঠিয়ে দিতে পারে। বড় ভাই তার কাছে টাকা চাইবে এ হয় না। রতন কিছুতেই বড় ভাইদের এমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে দেবে না। এতে উনাদের চাইতে তারই লজ্জাটা বেশি হবে।

কখন যে কে সংসারের হাল ধরবে তা আগে থেকে কখনোই বুঝা যায় না। যে রতন কয়দিন আগেও বাবার কাছে টাকা চেয়ে না পেলে মন খারাপ করতো সেই রতন এখন টাকা দিতে না পারলে মনে কষ্ট পাচ্ছে। রতন দুই দুই চার হাজার টাকা বড় দুই ভাইয়ের নামে মানি অর্ডার করে দিল। মানি অর্ডারটা করার পর বেশ ফুরফুরে মন নিয়েই বাড়ি ফিরল রতন।

বাবা মারা যাওয়ার পর রতনের মা অনেকটা শক্ত হয়েছেন। আগে সংসারের অত ঝামেলা তিনি বুঝতেন না। এখন আস্তে আস্তে সবকিছুরই খবর রাখছেন। রতন তার বাবার ব্যবসাটা ভালো করে ধরতে পারছে না। যতটুকুই টুকটাক শুনতেন রতনের বাবার কাছে তা রতনের সঙ্গে শেয়ার করছেন। শীত আসার আগেই ভেজলিন কিনতে হবে মনে করিয়ে দিলেন। কৌটায় করে ভেজলিন ভরে রাখতে হবে। বিভিন্ন ছোট ছোট আড়তদাররা এই ভেজলিন নিয়ে যাবে। অনেকে আবার এর ওপর নিজেদের ট্যাগও লাগিয়ে নেন। জমিজামাগুলোও কিছু দেখতে হবে। মুশকিল হলো জমিজামা রতনের বাবাই সব দেখাশোনা করতেন। এছাড়া আর কেউ সব কয়টা জমি চিনেনও না। জমি না চিনলেও সমস্যা নাই। কোন মাঠে কত শতক জায়গা তা মুখে মুখে জানেন। বের করা বেশি কঠিন হবে না।

দেখতে দেখতে সময় দ্রুতই চলে গেল। ব্যবসায় উন্নতির কিছু হয়নি। অবনতি হতে হতে যখন বন্ধ প্রায় তখন রতনেরও দায়িত্ব প্রায় শেষ। বড় ভাই দুইজন পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকরি করছেন। ছোট ভাইটা স্কলারশিপ পেয়ে দেশের বাইরে চলে গেল। ছোট বোনটা পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হলে থাকে। এখন খরচ বলতে ছোট বোনের পড়াশোনা আর রতন আর তার মায়ের যা লাগে।

টাকায় টাকা আনে আবার টাকায় টাকার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই বড় ভাইরা ঈদে বাড়ি আসেন। কথায় কথায় বলেন, ঢাকা শহরে থাকা আর টাকা কচকচিয়ে খাওয়া। যে টাকা কচকচিয়ে তারা খান সে টাকায় কামড় দেয়ার ইচ্ছা রতনের নেই। তাদের মায়েরও না। প্রতিবারই তারা বলেন, একটু গুছিয়ে নেই তারপর আম্মা আপনারে নিয়ে যাব। রতনের মাও হাসি দিয়ে বলেন, গুছিয়ে নাও কিন্তু আমাকে নিতে হবে না।

আমি তার চোখে একই কামনা দেখেছি -‘প্রিয়তির আয়না’ বই থেকে

মাকসুদা আক্তার প্রিয়তী। বাংলাদেশী মেয়ে। বড় হয়েছেন ঢাকায়। পড়াশোনার জন্য পাড়ি জমান আয়ারল্যান্ডে। পড়াশোনার সঙ্গে জড়ান মডেলিং-এ। নিজের চেষ্টা আর সাধনায় অর্জন করেন মিস আয়ারল্যান্ড হওয়ার গৌরব। নিজের চেষ্টায়ই বিমান চালনা শিখেছেন। ঘর সংসার পেতেছেন আয়ারল্যান্ডেই।
নানা উত্থান পতন আর ঝড় বয়ে গেছে। নিজের বেড়ে উঠা, প্রেম, বিবাহ বিচ্ছেদ, মডেলিং, ক্যারিয়ার, প্রতারণা সব মিলিয়ে টালমাটাল এক পথ। প্রিয়তি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে বন্ধুর পথ পাড়ি দেয়ার নানা বিষয় নিয়ে প্রকাশ করেছেন আত্মজীবনী-‘প্রিয়তীর আয়না’। বইটিতে খোলামেলাভাবে নিজের বেড়ে ওঠা আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের নানা দিক তুলে ধরেছেন। এ বইয়ের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো মানবজমিন এর সৌজন্যে। আজ থাকছে পঞ্চম পর্ব-
আমরা সবাই বলি, অতীতকে ভোলা যায় না। আসলে অতীতকে হয়তো কোনো এক স্মৃতির ভাঁজে তুলে রেখে ভোলা যায় তা ঠিক, শুধুমাত্র অতীত থেকে যেই অভিজ্ঞতা নেয়া হয়েছে তা ভোলা যায় না। এখন দেখবার বিষয়, ওই অভিজ্ঞতাকে আসলে কোনো ভাবে কাজে লাগাচ্ছে তার গতানুগতিক জীবনে। ওই অভিজ্ঞতা অনেক শক্তিশালীও হতে পারে, অনেক শক্তিশালী।
আমি ধীরে ধীরে জীবন থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছি।
আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করতে যাচ্ছি আমার আরেক জীবন অভিজ্ঞতা।
মানুষ নাকি একা থাকতে পারে না। হ্যাঁ, তাতো পারেই না। আমি পুরো একটা বছর সম্পূর্ণ একা কাটিয়েছি, কিছুটা জনমন শূন্য। ফ্লাইং স্কুল এবং বাসা, এর মধ্যবর্তী আর কিছুই নেই, কোনো কথাও নেই। কথা বা মিশব কার সাথে নিজ দেশের কমিউনিটির কাছে তো আমি পরিত্যক্ত খারাপ নারী। আয়ারল্যান্ডে আশার পর থেকেই ছিলাম বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে, উঠা-বসা ছিল ওইখানেই। কখনোই আইরিশ কালচার বা আইরিশদের সাথে মিশিনি বা মিশার আগ্রহ জন্মায়নি, যার কারণে কোনো আইরিশ আমার পরিচিত বা বন্ধু ছিল না। আর পড়াশোনা বা কাজের খাতিরে যাদের সাথে কথা হতো, খুবই ফরমাল ছিল, ওই পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রেখেছি। তাদের সাথে কখনো সখ্যতা বা বন্ধুত্ব তৈরি করার চেষ্টা করিনি।
আমার জীবন খুব বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সমাজ ছাড়া, পরিবার ছাড়া, বন্ধু ছাড়া। বাংলাদেশেও তেমন আর ফোনে যোগাযোগ হতো না। বাংলাদেশে তখন ইন্টারনেট সবার ঘরে ঘরে ছিল না, এমনকি আয়ারল্যান্ড আমার বাসায়ও না, কারণ তার ব্যয় সুলভমূল্যে না থাকায় এফোর্ড করা সম্ভব ছিল না। আর সরাসরি ফোন করা তো আকাশের চাঁদ হাতে নেয়ার মতো। আর তাছাড়া পরিবার আমার এই পরিস্থিতির কথা জানলেও বা কী? ওদের কিছু করার নেই। ওরা আমাকে সাহায্য করতে পারবে না।
এই ভাবেই কেটে যাচ্ছে দুই বাচ্চা নিয়ে নিঃসঙ্গ জীবন। অভিযোগ নেই কারোর ওপর, এটি তো আমারই পছন্দ করা অপশন ছিল, যেই অপশনের আর কোনো অপশন আমার জন্য এভেইলেবেল ছিল না। ঘর থেকে বাইরে গিয়ে যে তিন ইউরো দিয়ে একটা কফি কিনে খাব, সেটি ভাবতো হতো একশ’বার। এই তিন ইউরো খরচ করা তো আমার জন্য বিলাসিতা, এই তিন ইউরো দিয়ে আমি একটা পাউরুটি এবং একটা গরুর দুধ কিনতে পারব।
এমনি সময়, আবরাজ হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল, হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এর মধ্যে মৌনীরা ও অসুস্থ হয়ে পড়ল, তারও অবস্থা খারাপ, দু’জনই হাসপাতালে। দু’জনকে দুই রুমে রাখা হয়েছে। আর আমি একা। বাচ্চাদের বাবার সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে যেহেতু সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না, যত রকম সুযোগ বিবেক পেত আমাকে আঘাত করার, আপ্রাণ চেষ্টা করত আমাকে ভাঙার। আমার প্রতি তার এতটাই ঘৃণা বা হিংসা। বাইরের মানুষ তার বাইরের প্রচ- ভদ্ররূপটা দেখেছে, কিন্তু সে ততটাই হিংস্র তার মনে, অপর সাইডে যার দেখা সবাই পায় না। হিউম্যান সাইকোলজি যারা পড়ে, তারা বিষয়টি জানে। আমাদের মানুষের মনে এক হিংস্র পশু বাস করে, যা আমরা জ্ঞান, বুদ্ধি, বিচার, বিবেক দিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখি। কিন্তু অনেক সময়ই ওই হিংসা পশু তালা ভেঙে বের হয়ে আসে, অনেকে পারে তা নিয়ন্ত্রণ করতে, অনেকেই পারে না। নির্ভর করছে যার যার ব্যক্তিত্বের ওপর। সুতরাং আমিই জানি বিবেকের অপর পাশের চেহারা, যেই চেহারা তার পরিবারও দেখেনি, আর আশপাশের মানুষ তো দূরের কথা। বাইরের মানুষের কাছে সে অনেক ঠা-া, ভদ্র-নম্র একজন মানুষ, যা আসলেই সে এমন। কিন্তু এটি বাহ্যিক রূপ বা চরিত্র ব্যক্তিত্ব। বাহ্যিক বা চরিত্র বলতে যা বোঝায় তা হলো, আমি বা আপনি মানুষের সামনে আমাদের বিশিষ্ট, ব্যবহার, উপস্থাপন করি। যেটা দিয়ে আমাদের বাইরের মানুষ বিচার করে আমরা মানুষটা কেমন। কিন্তু ভিতরে মানুষটিকে খুব কম মানুষই চিনতে পারে। আমার বয়স তখন কম, জীবন দেখেছি কম, বুঝিও কম। এত কিছু বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমার তখন হয়নি।
যা বলছিলাম, আবরাজ ও মৌনীরা অসুস্থ, হাসপাতালে। দুই বাচ্চার পাশে দু’জন এডাল্ট বা অভিভাবক থাকতে হবে। আমি একা, তো একবার এই রুমে আরেকবার ওই রুমে। পাবলিক হাসপাতাল তাই আমার বিশ্রাম নেয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, আছে শুধু একটা চেয়ার। সারারাত চেয়ারে বসে বসে কাটিয়েছি। বাচ্চাকে ফেলে রেখে হাসপাতালে থেকে বের হয়ে গিয়ে খাওয়ার পর্যন্ত অনুমতি নেই। হাসপাতাল তো আর আমাকে খাওয়াবে না। সুতরাং, বাচ্চাদের বাবা এই মোক্ষম সময়টি বেছে নিয়েছেন আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। তিনি আসেননি বাচ্চাদের দেখতে এবং আমাকে সহযোগিতা করতে। সারাদিন না খেয়ে আছি। গোসল নেই, ঘুম নেই। দু’টি কোলের বাচ্চা অসুস্থ, দু’জনই মায়ের সান্নিধ্য চায়। আমি হিমশিম খাচ্ছি। দুই বাচ্চার শরীরে স্যালাইন লাগানো, যার মাধ্যমে কয়েক ঘণ্টা এন্টিবায়োটিক ও অন্যান্য ওষুধ দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ সুই একটা এই মাসুম বাচ্চার ছোট হাতে লাগানো। একটু নাড়াচাড়া করলে হয়তো গুতা লাগে, তাতে ব্যথা লাগে, কান্না করে ওঠে। আমরা বড়রাই একটু অসুস্থ হলে কেমন লাগে, আপনারাই বলেন? তো, আমি সারারাত সজাগ থেকে যখন চেয়ারে বসে থাকি তখন হাসপাতালের ইন্টারনেট ব্যবহার করি। খুবই ধীরগতির ইন্টারনেট, যেহেতু শেয়ারিং এবং ফ্রি। রাত তখন ১২টা বাজবে, হঠাৎ করেই ফেসবুকে একটা মেসেজ আসলো। খুব অবাক হলাম, সাথে মৃদু হাসি। এতদিন, এত বছর পর বার্তা আসলো তার কাছ থেকে? আমি খুব আগ্রহের সাথে প্রতিউত্তর দিতে লাগলাম। বার্তাটি ছিল আয়ারল্যান্ডে আসার পর আমার প্রথম যার প্রতি ক্রাশ হয়েছিল। সিওর আমার প্রতিও তার ক্রাশ হয়েছিল, আমি সেই সিগন্যাল পেয়েছিলাম। যেহেতু বাংলাদেশ হাই, হ্যালো শুভেচ্ছা বিনিময় হতো প্রায়ই। কিন্তু ব্যাপারটি তেমন গভীরভাবে কাছাকাছি গড়ায়নি। কারণ তার বাংলাদেশে এক প্রেমিকা ছিল। পরবর্তীতে আমিও অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে যাই এবং তার প্রেমিকাকে সে বিয়ে করে ফেলে। সবকিছু ছিমছাম। ভালো লাগার ব্যাপারটি চাপা পড়ে যায়। সুদর্শন, ভদ্র ছেলে। পড়াশোনার প্রতি খুবই আগ্রহী, আয়ারল্যান্ডে খুব ভালো একটা ইউনিভার্সিটিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পড়াশোনা করে যাচ্ছে। কোন ধরনের বাজে অভ্যাস নেই, কোথাও দেখা হলে দেখতাম চুপচাপ ভদ্র ছেলের মতো বসে থাকত। কারো আগে-পিছে নাই, সে তার পৃথিবী নিয়ে ব্যস্ত। যে কেউ দেখলে বলবে অসাধারণ ছেলে।
সেই ছেলে হঠাৎ ফেসবুকে বার্তা পাঠানোর পর, বুক ধক করে উঠল। জানালাম আমি শিশু হাসপাতালে। আমাকে সে বলল, সে কাজ করে কাছেই, সে কাজ শেষে যাওয়ার সময় দেখা করে যাবে। আমিও হ্যাঁ সূচক সম্মতি জানালাম। সে আসলো, কিছু খাবার নিয়ে। কথা প্রসঙ্গে জানলাম, তার বিয়ের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। আমার ব্রেকআপের কথা শুনে খুব দুঃখ প্রকাশ করল। আমি যে খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, সেটা তার বুঝতে বেশি সময় লাগেনি। আমিও অনেকদিন পরে কথা বলার মানুষ পেয়ে বড় বড় করে অনেক কথা বললাম। ধরে নিলাম তার নাম নিশো। হাসপাতালে আমি পাঁচ দিন ধরে এক কাপড়ে কোনো গোসল নাই, কাপড় পরিবর্তন হয়নি। অনুধাবন করতে পারছেন আমার অবস্থা কেমন ছিল। হাসপাতাল থেকে আমার বাসা অনেক দূরে, যার কারণে বাচ্চাদের রেখে বাসায় যাওয়া হয়নি। নিশো এর মধ্যে আমার সাথে ফোনে যোগাযোগ রাখছে, খবর নিচ্ছে। ব্যাপারটি আমার কাছে খুব ভালো লাগছে। মনের কোনো এক কোণায় যেন শক্তি উৎপাদন হচ্ছে, নুয়ে থাকা মাথা উঠাচ্ছি আস্তে আস্তে।
নিশো পরের রাতে কাজ শেষে রাত একটার দিকে আবারও আসে। এসে বলল চলো তোমাকে বাসায় নিয়ে যাই, তোমার ফ্রেশ হওয়ার দরকার, কাপড় পরিবর্তন করার দরকার।
আমি মনে মনে বললাম, ‘হায় খোদা আমার শরীর থেকে আবার দুর্গন্ধ বের হচ্ছে না তো?’
আমি নার্সকে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলাম আমাকে দুই তিন ঘণ্টার জন্য যাওয়ার অনুমতি দিতে। বললাম, আমি ভোর পাঁচটার মধ্যে চলে আসব। নার্স আমার অবস্থা বিবেচনা করে বুঝতে পারলেন এবং দয়া করে যেতে দিলেন। আমি বাসায় গেলাম দ্রুত গোসল আর কিছু জিনিস আনতে।
বাসা থেকে হাসপাতালে ফেরার পথে ঘটল যত সব পাগলামি ঘটনা।
আমি তো তার পাশে বসে আছি গাড়িতে, নিশো কথা বলছে। কিন্তু আমার মনের মধ্যে কেমন যেন ধুুকুর ধুকুর করছে, আমি জানি না তার মধ্যেও তেমন করছিল কিনা। নিশোও আমার দিকে যেভাবে তাকাচ্ছিল, তার চাহনি আমার ভেতরটা ওলটপালট করে দিচ্ছিল। আমি বারবার তার হাতের দিকে তাকাচ্ছি। সে যখন আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলে, আমার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে কথা বলে মনে হচ্ছে সেই যে, আট/দশ বছর আগে তার প্রতি ক্রাশ খেয়েছিলাম, সেই তখনকার মুহূর্ত। তখনকার আকাক্সক্ষাগুলো এক সাথে জড়ো হচ্ছে। শরীরের রক্তনালীগুলোতে নিঃসৃত হরমোনগুলো ছুটোছুটি করছে। শরীরের অঙ্গের কোনো কিছুই যেন স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না। আজ অনেক বছর পর কোথায় যেন হারিয়ে যেতে মন চাইছে। হঠাৎ করেই উপলব্দি করলাম আমরা হাসপাতালের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি। এতখানি পথ এত দ্রুত কীভাবে চলে আসলাম? আশ্চর্য! আমার মনে তার (নিশো) হাত ধরার কামনা জাগছে। মন বলছে, ‘এই তুমি কি আমার হাত ধরবে? তোমার আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে আমার ঠোঁট স্পর্শ করবে? প্রথমে উপরের ঠোঁটে, তারপর নিচের ঠোঁটে, তারপর দুই ঠোঁটে?’ কিন্তু সে তো এই কথাগুলো শুনতে পারছে না। আমার ধুক ধুক করে যে হৃদয়ের স্পন্দন হচ্ছে, তা তো শোনার কথা, সে কি শুনতে পারছে? আমি স্পষ্ট তার চোখে দেখতে পারছি তার জড়তা তাকে বধির করে রাখার চেষ্টা করছে। আমার বায়োলজিক্যাল শরীর আমাকে জানান দিল, এই দেহে বিপরীত লিঙ্গের কোনো স্পর্শ পায়নি প্রায় তিন বছর হয়ে গেল। হাসপাতাল থেকে আমরা মাত্র তিন/চার মিনিটের দূরত্বে। আমি শেষমেশ দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রেখে, লাজ লজ্জা ভুলে, গাড়ির গিয়ার স্টিকের ওপরে রাখা তার হাতের ওপর আমার হাত রেখে নিশোকে আজকের উপকারের জন্য ধন্যবাদ জানালাম। ভাবলাম, সবকিছু বাদ, অন্তত তাকে তো একটা ধন্যবাদ জানাতে হবে।  হ্যাঁ অস্বীকার করব না, তাকে আমার ছুঁয়ে দেখতে মন চাচ্ছিল অবচেতন মন থেকে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। এখন, সে এটাকে যেভাবে নেয় নেবে। তার ব্যাপার। আমি তার চোখে ওই একই কামনা দেখেছি, অনুভব করেছি না ছুঁয়েই। আমি তার হাতের ওপরে আমার হাত আলতেভাবে রাখলাম, রাখার সাথে সাথে সারা শরীরে বিদ্যুতের মতো কিছু প্রবাহ হলো। আমি নিশ্চিত, আপনি জীবনের কোনো না কোনো সময় ওই রকম স্পর্শে শরীরে তড়িৎ প্রবাহের অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই হয়েছে। নিজের শরীর এতদিন নিজের কাছেই অপরিচিত, প্রাণহীন ছিল। অদ্ভুত! নিশো আমার হাতে স্পর্শ পেয়ে এমনভাবে তাকাল, যেন সে কয়েক হার্টবিট স্কিপ করেছে, যেন সে কল্পনাই করেনি আমি কখনো এমনভাবে নিজ থেকে তার হাত ধরব। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, নিশো আমার হাতটি চেপে ধরল। এ এমন ছোঁয়া যে শিরায় শিরায় তার প্রবাহ হচ্ছে, যেন এমন স্পর্শের জন্য মরতে পারি বারবার। মুহূর্তেই আমি আমার বিষাদ, কষ্ট, স্ট্রাগল সবকিছু যেন ভুলে গেলাম। গাড়ি থামল হাসপাতালের পিছনের গেটে। মুহূর্তগুলো যেন ওই জায়গায় ফ্রিজ হয়ে আছে। নিশো আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আমার দিকে মানে আমার ঠোঁকের দিকে। আমি তাকিয়ে আছি তার চোখের দিকে। দু’জনই খুব তৃষ্ণার্ত, ঢুক গিলছি বারবার। এ তো নিশ্চয় পানির জন্য তৃষ্ণার্ত নয়। ঠোঁট শুকিয়ে আসছে, গলা শুকিয়ে আসছে। দু’জন দু’জনের হৃদয়ের ধুক ধুক স্পন্দন শুনতে পাচ্ছি। হঠাৎ নিশোর একটা হাত আমার ঘাড়ের চুলের পিছনে রাখতেই আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে গেল। ছেলেরা মনে হয় জানেই যে তাদের হাতে সৃষ্টিকর্তা মেয়েদের শরীর কাবু করার জন্য জাদু দিয়ে দিয়েছেন। অটোম্যাটিকভাবে আমার চোখ বন্ধ হতেই নিশো তার ঠোঁট আমার ঠোঁটের ওপর চেপে ধরল। উফফ কী অদ্ভুত সুখ বয়ে যাচ্ছে আমার শরীরের ভিতর দিয়ে। সে তার ঠোঁট আর জিভ দিয়ে আমার দুই ঠোঁট চুষল, একবার উপরের ঠোঁট, একবার নিচের ঠোঁট। ঠিক যেমনটি আমি মনে মনে আকাক্সক্ষা করছিলাম প্রথম দিকে। আমার শরীর তখনও নিস্তেজ। তার দুই হাত দিয়ে আমার মুখখানা আলতো করে ছুঁয়ে সারা মুখে চুমু খেতে লাগল। আমার বাধা দেয়ার কোনো স্নায়ু কাজ করেনি তখন, ব্রেইনের নিয়ন্ত্রণ ছিল সম্পূর্ণ তার হাতে। আর আমি সাধারণ এক বায়োলজিক্যাল প্রাণীর মতো উপভোগ করছি, যার কামনা মনের কোনো এক কোণায় হয়তো পোষণ করছিলাম। চুম্বনের শেষটুকু সে শেষ করেছে, তার এক হাত দিয়ে আমার কোমরে হাত দিয়ে তার শরীরের আরও কাছে সে আনতে চাইল, যেন সে আরও বেশি কাছে আমাকে পেতে চায়। কয়েকবার আমার কোমরে হাত দিয়ে তার শরীরের সন্নিকটে আনার প্রচেষ্টা আমাকে আরও উত্তেজিত করে ফেলছিল। এই পুরো ব্যাপারটির সময়ের ব্যাপ্তি ছিল মাত্র ৪/৫ মিনিট। হঠাৎ করেই অনুধাবন করলাম, ওহ হ্যাঁ আমরা তো হাসপাতালের বাইরে, রাস্তার ওপর পার্কিং করে আছি। আমার যেতে হবে। চলে আসলাম, সুখের স্বর্গ থেকে বাস্তবতায়। বিদায়ের সময় লজ্জা পাচ্ছিলাম নিশোর চোখের দিকে তাকাতে, কি থেকে কি হয়ে গেল। আফসোস হচ্ছিল না, যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। এক ঝলক তার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বিদায় নিয়ে চলে আসলাম হাসপাতালের ভিতরে।
এরপর থেকে আমার প্রতি নিশোর যতœ, খোঁজ-খবর, কেয়ার করা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। আর আমি এইদিকে ভাবতে লাগলাম, আমার একঘরা নিঃসঙ্গ জীবনের সঙ্গী হিসেবে কাউকে পেলাম, কোথায় যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। মনে হলো স্বপ্নের রাজকুমার বুঝি এতে বছর পর এলো আমার জীবনে। ঘোড়ায় চড়ে এসে আমার জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট, বেদনা সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে, আর আমাকে জীবনের সব সুখগুলো দিয়ে ভরিয়ে রাখবে। আমি শুধু তার হয়ে থাকব সারাজীবন।
আমার শুরু হলো নিশোকে নিয়ে কল্পনার জগৎ। সারাক্ষণ তাকে নিয়ে ভাবনাগুলো আচ্ছন্ন করে রাখত। আর এই আচ্ছন্নতা ছিল সুখের। প্রেমে পড়লে আপনার মন যেমন স্বতঃফূর্ত থাকে, আমি সেই প্রেমের নৌকায় ভাসছি। কিছুক্ষণ পর পর নিশো আমার খবর নিচ্ছে, আমার প্রচ- ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আমার বোবার জীবনের অবসান হতে যাচ্ছে। আগেও আপনাদের বলেছি, ফ্লাইং স্কুলের বাইরে আমার কোথাও যাওয়া হতো না, আর সেখানে পড়াশোনার বিষয় ছাড়া কথা হতো না। আমি তখনও আইরিশদের সাথে ইন্ট্রিগ্রেইট করতে পারতাম না, সত্যি কথা বলতে কখনো সাদা চামড়ার পুরুষদের প্রতি আকর্ষণও বোধ করতাম না তখন। কোন ক্রাশ জাতীয় অনুভূতি হয়নি তাদের প্রতি। কেন, কে জানে? এটি আমার ব্যক্তিত্বের একটি বাধা বলব। নিজ কালচারের বাইরে কারোর সাথে মিশতে না পারার কারণে আমি যেভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম ‘নিশো তার মাঝে এক জাদুর কাঠি।’ আমার সাথে সে কাজ শেষে ২/১ দিন পর পর দেখা করতে আসত। তার সাথে কিছু অন্তরঙ্গ সময় কাটানো আমি খুব উপভোগ করতাম। যদিও সে আমাকে আরও গভীরভাবে পেতে চাইত, বিছানা পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাইত। ওই পর্যন্ত না যেতে পারলে যে, সে কিছুটা নিরাশ হতো বুঝতে পারতাম। কিন্তু তখন ব্যাপারটি আমার কাছে মিষ্টি লাগত। আমাদের মধ্যে সুখ-দুঃখগুলো বিনিময় হতো। মনে মনে বিশ্বাস বেড়েছিল দু’জন দু’জনকে মনে হয় খুব ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি। খুব তাড়াতাড়ি দু’জনের কাছাকাছি চলে এসেছি। সোশ্যাল মিডিয়াতে আমাদের খোলা-খুলি কিছু কথাবার্তা আদান-প্রদান করার কারণে খুব তাড়াতাড়ি মানুষজন জেনে গেলে আমাদের সম্পর্কের কথা। আসলে নিশো চাচ্ছিল সবাই জানুক আর আমারও বাধা দিতে মন চায়নি। কারণ লুকোচুরি করার তো কিছু নেই, তাই না? নিশোর ছায়াতে আমি সিকিউর অনুভব করতাম। এরই মধ্যে নিশো আমাকে বিয়ে করার জন্য প্রপোজ করে। সে খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চায়। সেই মুহূর্তে পৃথিবীতে আমার চেয়ে সুখী মেয়ে মনে হয় আর কেউ নেই।
বাচ্চাদের সাথে তার সখ্যতা হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। আর কি লাগে সুখের সাগরে ভাসার জন্য। আমি যখন লিখছি তখন হা হা করে হাসছি, কতটা বোকা ছিলাম আমি, তাই না? কঠিন পৃথিবী তখনও আমার কাছে অনেকটা অপরিচিত। আমাকে নিশো জানাল সে তার পরিবারের সাথে ইতিমধ্যে আমার বিষয়ে কথা বলেছে, তার বাবার সাথেও আমাকে ফোনে কথা বলিয়ে দিল। ভদ্রলোক বেশ ভদ্র মানুষ, মা মা বলে সম্বোধন করলেন। যেন আমি তার কত আপন। আমার বিশ্বাস করতে হচ্ছিল যে, আসলেই এই ঘটনাগুলো ঘটছে আমার জীবনে। বাংলাদেশে গিয়ে আমাদের বিয়ে হবে, আমি তার প্রেমে আরও পাগল হতে লাগলাম। আমি নিশোর প্রতি খুব ডিভোটেড এবং আমি অনুভব করছি সে নিজেও। আমাকে সত্যি সত্যি কেউ এত ভালোবাসতে পারে? এত!
বেশিদিন টেকেনি আমার সেই অবিশ্বাস্য কল্পনার জগৎ। আমি কিছু দিন পর থেকেই লক্ষ্য করছি একটু ভিন্ন কিছু। প্রথম প্রথম ভাবতাম এ বুঝি আমার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা। কিন্তু কিছুদিন পর থেকে আমার শ্বাসরুদ্ধ মনে হতে থাকে। মনে হতে থাকে কেউ মনে হয় আমাকে আস্তে আস্তে বোতলের ভিতর ভরার চেষ্টা করছে, আর আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না। নির্বাক হয়ে যেতাম যখন দেখতাম, সোশ্যাল মিডিয়ার আমার কোনো পোস্টে কারও কোনো কমেন্টে তেলে বেগুনে রেগে যেত। তার সাথে সম্পর্কতে জড়ানোর আগের টেক্সটগুলো পড়ত আমাকে না জানিয়ে। এইগুলো নিয়ে নিশো আমার সাথে তুমুল ঝগড়া করা শুরু করল, যা আমার কাছে সম্পূর্ণভিত্তিহীন মনে হতো। কিন্তু তখনও আমি ভেবে যাচ্ছি ও এইরকম প্রতিক্রিয়া করছে সব অভিমান, অনুযোগ থেকে। ভালোবাসা তো নিষ্পাপ, অন্ধ।
নিশোর ব্যাপারে প্রথমবারের মতো বাকরুদ্ধ হয়ে যাই এক সন্ধ্যার ঘটনাতে। সেই সন্ধ্যা যা অনেক কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছিল আমাকে কিন্তু আংশিক ধরেছি। খুব অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটছে আমাদের, আদর করছে সে আমাকে। অন্তরঙ্গ মুহূর্ত বলতে আমি চুমু খাওয়া, জড়িয়ে ধরা এগুলোই বুঝি। স্পর্শের উষ্ণতায় দু’জনেই হারিয়ে যাচ্ছি। কারও রূপে যে কেউ পাগল হতে পারে, তা এই প্রথম দেখছি নিশোর চোখে। তবে পুরুষ ও নারীর যে মনের ভিন্নতা, কামনার ভিন্নতা, চাওয়ার ভিন্নতা রয়েছে তার বিশ্লেষণ করার বয়স এবং অভিজ্ঞতা আমার তখনও হয়নি, আমি বুঝিনি। সে আমাকে আদর করতে করতে বিছানায় নিয়ে যেতে চাইল। আমাকে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল, আমার সাথে এই মুহূর্ত শারীরিক মিলনের কামনায় সে পাগল হয়ে আছে। আমার উত্তর তখন বাধা সূচক ‘না’ আসে। তখন নিশো ভেবে পাচ্ছে না যে, দু’দিন পর আমাদের বিয়ে হতে যাচ্ছে, এতটা কাছাকাছি আসার পর শারীরিক সম্পর্কে বাধা কোথায়? আমি বললাম, ‘আমি শারীরিক সম্পর্কের জন্য এখনো তৈরি নই। ‘আমার এই কথা শোনার পর মনে হয় নিশোর মাথায় বাপ পড়ল। প্রচ- রেগে গেল। তার চেহারা আর মুখের ভাষা মুহূর্তেই পালটে গেল। আমাকে নিশো বলে উঠল, ‘তুই কেমন প্রেমিকা যে, তুই তোর প্রেমিকের শারীরিক চাহিদা মিটাতে পারিস না?’ তার এই কথা শুনে আমি স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়! আমার মাথার মধ্যে কি কি যেন ইলেকট্রিক শক-এর মতো স্পার্ক হচ্ছে। আমি নির্বোধের মতো তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর দু’দিন পরই তো বাংলাদেশে যাচ্ছি বিয়ে করতে। কি এমন ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তার জন্য? কি এমন তাড়াহুড়া তার? এই উত্তরগুলো তখন আমার জানা না থাকলেও এখন আমি জানি। সাইকোলজিক্যাল নারী ও পুরুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো ভিন্নভাবে ফর্ম করা। কামনার বিষয়গুলো মাথায় কাজ করে ভিন্নভাবে।
ছোট একটা উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, একটা মেয়ে যখন সুন্দর করে সেজেগুঁজে, আবেদনময়ী হয়ে তার প্রেমিকের সামনে উপস্থিত হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য থাকে তার রূপে যেন তার প্রেমিক প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকে। প্রেমিকের চোখে যেন সে রানি, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী নারী। আর ওই একই মুহূর্তে পুরুষদের চিন্তা-ভাবনায়, কামনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একজন পুরুষ ভেবে নেয় যে, তার প্রেমিকা তার সাথে বিছানায় যাওয়ার জন্যই হয়তো এতসব আয়োজন করেছে, এত আবেদনময়ীভাবে সেজেছে। নারীরা টিজ করতে পছন্দ করে তা বেশিরভাগ পুরুষরা বোঝে না, বিশেষ করে রক্ষণশীল পুরুষরা।
ওড়াল সেক্স হওয়ার পর বা করার মুহূর্তে অনেক পুরুষ ভেবে নেয়, পুরোপুরিভাবে শারীরিক মিলনে সমস্যা কোথায়? যেখানে এক নারী যেকোনো মুহূর্তে মনে করতে পারে, আমি একটা পর্যায়ের বেশি এগুবে না। সম্মতির ব্যাপারটা তাই এখানে খুব জরুরি।
আমি নিশোর সাথে ওই মুহূর্তে শারীরিক সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জড়ানোর জন্য মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। হয়তো সেই সময় তখনও আসেনি তাই আমার মন সায় দেয়নি। আমি আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে খুব প্রাধান্য দেই। আমি শুনি তার কথা। নিশো রেগে চলে গেলেও, পরের দিন সরি বলে ক্ষমা চেয়ে নিল। নিশোর সাথে এই প্রথম ঘটেছে এমন ঘটনা, তাই আমিমাফ করে বিষয়টি স্বাভাবিক করে নেয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ভিতরে কোথায় যেন একটা তার ছিঁড়ে গিয়েছে তা বুঝতে পারছি, সুরটা মিলছে না। যাই হোক, দুদিন পরই বাংলাদেশে যাব, হয়তো তখন আমার এই উদ্বিগ্ন হওয়াটা চলে যাবে। দুই পক্ষ কথা বলবে, মুরব্বিরা যদি ভালো মনে করে তাহলেই বিয়ে ব্যাপারটা এগুবে। এখন আপাতত এই বিষয়গুলো কম্প্রোমাইজ করে ফেলাটাই ভালো।
এক্সাইটেট তৈরি হচ্ছে ধীরে ধীরে, ভুলে যেতে চাইলাম কষ্টের সব অভিজ্ঞতার কথা। এই অল্প কিছুদিনের মধ্যে নিশোর যে পরিবর্তন লক্ষ করেছিলাম, তাও এড়ানোর চেষ্টা করলাম। এক সাথে চলতে গেলে এমন টুকটাক বিষয় ঘটতেই পারে, বিষয়গুলো মাথায় এভাবে ঢুকানোর চেষ্টা করলেও আসলে বিষয়গুলো টুকটাক ছিল না। এইগুলো ছিল সিগন্যাল, একটা মানুষকে বোঝার সিগন্যাল, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত বোঝার সিগন্যাল। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, অনভিজ্ঞতার কারণে। ওইটুকু বয়সে কত কিছুই বুঝতে পারার কথা? নাকি মানুষের ওপর ঘৃণা আর অবিশ্বাসের দেয়াল উঠাব? মানুষ যে বলে দুনিয়া অনেক কঠিন, সেটি বুঝতে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, বাধার মুখোমুখি হতে হয়, তা ড্রিল করতে হয়।
তেমনি, আরেক আঘাত আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। বাংলাদেশে গিয়ে দেখি নিশোর বাবা আমাদের সম্পর্কের কথা জানলেও নিশোর পুরো পরিবার জানে না, অর্থাৎ তার মা এবং অন্যান্যরা। নিশোর বাবা-মা’র বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে তাও আমি জানি না। যদিও সেটি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বাবা জানলে মা জানবে না কেন এই প্রশ্ন আপনার মনে আসবে বলে কথাটি জানানো। নিশোর বাবা পরিবারে কারোর সাথে কোনো আলাপ করেনি এবং নিশো পুরো ব্যাপারটি গোপন রেখেছে। নিশোর মা একদিন লুকিয়ে আমাদের বাসায় আসে। এসে আমাকে হাতজোড় করে অনুরোধ করে, আমি যেন উনার ছেলের জীবন থেকে সরে যাই। আমি দুুই বাচ্চার মা আর দুই বাচ্চার মা’কে ছেলের বৌ হিসেবে মেনে নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজে তারা মুখ দেখাতে পারবে না। আমার আবরাজের দোহাই দিয়ে বলল, ‘তোমারও ছেলে আছে, তুমি আমার ছেলেকে এসব কথা বলো না। বললে সে পাগলামি করবে, আমাদের ছেড়ে চলে যাবে।’ উনার কান্না থামছিল না।
আমি উত্তরে বললাম, ‘আমি এসেছিলাম আপনাদের পরিবারের সদস্য হতে, আমার বাবা-মা নেই, আপনাদের মাধ্যমে বাবা-মা খুঁজে পেতে। আপনারা যদি আমাকে না-ই চান, তাহলে সেই পরিবারের সদস্য আমার হয়ে কি লাভ? আপনার ছেলে কোনোদিনই জানবে না, আমি এই সম্পর্ক ভেঙে দিচ্ছি, আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।’
আমি নিশোর সাথে কঠোরভাবে ব্রেকাপ করলাম। নিশো কখনোই জানতে পারল না আমাদের সম্পর্ক ভাঙার মূল কারণ। সে শুধু জানল আমি খুব নির্দয়ী, অহঙ্কারী, স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ মানুষ, যে শুধু ভালোবাসা নিয়ে খেলেছে।
কঠিন এক প্রিয়তী হয়ে গেলাম আমি।
এরপর থেকে দু’জন দু’জনের চেহারা আজ অব্দি দেখা হয়নি। দেখা যাতে কোনদিন না হয় সেই প্রার্থনা করি।
‘প্রিয়তির আয়না’ বই থেকে নেয়া