Thursday, August 2, 2018

‘বাংলাদেশকে যেন শরণার্থীদের প্রতি তিক্ত হতে না হয়’ by ব্রজেশ উপাধ্যায়

বাংলাদেশ এককভাবে রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা বহন করছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, বাংলাদেশকে যেন শরণার্থীদের প্রতি তিক্ত হতে না হয়। এমনটাই মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কেলি ই কুরি।
জাতিসংঘের ইকনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কেলি ই কুরি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সমর্থন চেয়ে তিনি বলেন, আশ্রয়দাতা দেশকে বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যার একটি বোঝা বহন করতে হচ্ছে। তারা যেন সব সহায়তা পায় বিশ্বকে অবশ্যই এটা নিশ্চিত করতে হবে।
কেলি ই কুরি বলেন, আমরা এমনটা দেখতে চাই না যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে তারা তিক্ত ও রাগান্বিত হয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফর করেন কেলি ই কুরি।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক বৃহত্তম দাতা দেশ। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে এ ইস্যুতে দেশটি ২০৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছে। এরমধ্যে ৮০ ডলারেরও বেশি পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে বাংলাদেশকে দেওয়া মানবিক সহায়তার পেছনে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারে নতুন করে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরুর পর জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের 'পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা সংঘটনের প্রমাণ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বহু মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।
ওয়াশিংটনে প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ ফাউন্ডেশনে দেওয়া ভাষণে কেলি ই কুরি বলেন, আমরা কী বলছি সেটা নয়; বরং আমরা কি করছি সেটাই বড় বিষয়। রাখাইনের ঘটনায় দায়ীদের শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে। বার্মিজ কর্মকর্তাদের ওপর পুনরায় ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। দেশটির সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক অবদমন করা হয়েছে।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত জাতিগত নিধনযজ্ঞে খুন-ধর্ষণ-সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হতে থাকে ধারাবাহিকভাবে। পাহাড় বেয়ে ভেসে আসতে শুরু করে বিস্ফোরণ আর গুলির শব্দ। পুড়িয়ে দেওয়া গ্রামগুলো থেকে আগুনের ধোঁয়া এসে মিশতে থাকে বাতাসে। মানবাধিকার সংগঠনের স্যাটেলাইট ইমেজ, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন আর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, মায়ের কোল থেকে শিশুকে কেড়ে শূন্যে ছুঁড়ে ফেলে বর্মি সেনা। কখনও কেটে ফেলা হয় তাদের গলা। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় মানুষকে। এমন বাস্তবতায় নিধনযজ্ঞের বলি হয়ে রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় অন্তত সাত লাখ রোহিঙ্গা।
মিয়ানমার সরকারের দাবি, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার কারণেই রোহিঙ্গা সংকটের উদ্ভব। তবে মিয়ানমারের এমন দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘ।

সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী: দুর্বল বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে দরিদ্র জনগোষ্ঠী by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

দেশে সিগারেটের প্যাকেটে দেয়া ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সংক্রান্ত সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর দুর্বল বাস্তবায়ন। ফলে স্বাস্থ্য ঝুঁকির  মুখে রয়েছেন দরিদ্র জনগোষ্ঠী। ৭৫ শতাংশ তামাক পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী নেই। সম্প্রতি প্রভাবশালী মেডিকেল সাময়িকী বিএমজে (বৃটিশ মেডিকেল জার্নাল)-এর টোব্যাকো কন্ট্রোল জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সংক্রান্ত কঠোর আইন পাস হওয়ার পরও সারা দেশে এখনো এর লঙ্ঘন এবং অমান্যের ঘটনা অনেক। ‘গ্রাফিক হেলথ ওয়ার্নিংস অন টোব্যাকো প্যাকেটস অ্যান্ড কনটেইনারস: কমপ্লায়েন্স স্ট্যাটাস ইন বাংলাদেশ’- নামের এই গবেষণায় সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর ব্যবহার ও বাস্তবায়নকে কিভাবে আরো উন্নত এবং কার্যকরী করা যায় এবং কিভাবে এর মাধ্যমে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনা যায়, তার উল্লেখ আছে। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে এখনো শতভাগ সাক্ষরতা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা নিশ্চিত করা যায়নি, সেখানে দরিদ্র এবং লেখাপড়া না জানা জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাক ব্যবহারের কুফল সম্পর্কে তথ্য ছড়িয়ে দিতে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কতাবাণীর কোনো বিকল্প নেই। তাই এই আইন বাস্তবায়নে অবহেলা শেষ পর্যন্ত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকেই হুমকির মুখে ফেলবে। খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর আইন বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সচেতনতাও অত্যন্ত কম।
গবেষকরা জানান, তামাক আসক্তির ফলস্বরূপ ভবিষ্যতে নিজের কি পরিণতি হতে পারে, তা ব্যবহারকারীকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেয়ার কাজটি করে থাকে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী। কোন একজন ধূমপায়ী যদি দিনে এক প্যাকেট করে সিগারেট খেয়ে থাকেন, তাহলে এক বছরে অন্তত ৭০০০ বার সিগারেটের প্যাকেটে দেয়া ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সংক্রান্ত সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীগুলো তার চোখে পড়বে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে ‘তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০৫’ সংশোধন করে। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সিগারেট, বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের প্যাকেট বা কৌটায় তামাক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিক সংবলিত রঙিন ছবি সংযোজন বাধ্যতামূলক করে। আইন অনুযায়ী, যে কোনো ধরনের তামাকপণ্যের প্যাকেট, কার্টন এবং কৌটার উপরের ৫০ শতাংশ জায়গাজুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ছাপানো বাধ্যতামূলক। ২০১৬ সালের ১৯শে মার্চে বলবৎ হওয়ার পর থেকে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীবিহীন কোনো তামাকপণ্য বাংলাদেশে বিক্রি নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। আইনের অধীনে তামাক ব্যবহারের ক্ষতি সম্পর্কিত ৯টি ছবি এবং লিখিত বার্তাকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে, বিড়ি ও সিগারেটের প্যাকেটের জন্য ৭টি ছবি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের (জর্দা ও গুল) জন্য ২টি ছবি নির্ধারণ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস পর পর পর্যায়ক্রমে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পরিবর্তন করে মুদ্রণ করার বিধান রয়েছে। এছাড়া আমদানিকৃত কিংবা দেশে উৎপাদিত সকল তামাকপণ্যের প্যাকেটে ’শুধুমাত্র বাংলাদেশে বিক্রির জন্য’-এই লেবেল সংযুক্ত থাকতে হবে। সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সংক্রান্ত আইন এবং এর বিধি-বিধান ভঙ্গ করলে ছয়মাসের কারাদণ্ড অথবা ২ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা দুইয়েরই অনুমোদন রাখা হয়েছে। একবার শাস্তি পাওয়ার পর যদি ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এই অপরাধ করে, তাহলে শাস্তির পরিমাণও দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
২০১৬ সালের মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশ বাধ্যতামূলকভাবে চালু হওয়া সকল তামাকপণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কতাবাণীর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্যই এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে এবং পরবর্তীতে ২০১৬ সালের নভেম্বরে- এই দুই দফায় কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নাবলী ব্যবহার করে বাংলাদেশের ৮টি বিভাগীয় শহরে এই গবেষণা চালানো হয়। গবেষণায় তিন ধরনের খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়; (ক) প্রধানত সিগারেট বিক্রেতা (যার দোকানের বেশির ভাগ পণ্য সিগারেট); (খ) প্রধানত বিড়ি এবং স্বল্পমূল্যের সিগারেট বিক্রেতা (যার দোকানের বেশির ভাগ পণ্য বিড়ি এবং কম দামি সিগারেট); (গ) প্রধানত ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য বিক্রেতা (যার দোকানের বেশির ভাগ পণ্য ধোঁয়াবিহীন তামাক)। প্রতিটি ক্যাটাগরিতে ৫টি দোকান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এভাবে ৮টি বিভাগীয় শহরের ১২০টি দোকান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় বিভিন্ন তামাকপণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর আকার, ছবি ও লেখার অনুপাত, লেখায় কালো জমিনের উপর সাদা অক্ষর ব্যবহার এবং তিন মাস পর পর ছবি পরিবর্তনের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় মোট ৩৩১২টি তামাকপণ্যের প্যাকেট/কৌটা পর্যবেক্ষণ করা হয়। সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সংক্রান্ত আইন বলবৎ হওয়ার পরের মাস অর্থাৎ, ২০১৬ সালের এপ্রিলে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ৭৫ শতাংশ তামাক পণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী নেই। একই বছর নভেম্বর মাসে এই সংখ্যা ১৯ শতাংশে নেমে আসে। যদিও শতভাগ আইন মেনে তামাকপণ্যের মোড়কে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রদানের হার উভয় গবেষণাতেই খুব কম পাওয়া গেছে। সিগারেটের প্যাকেটে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মুদ্রণ সংক্রান্ত আইন প্রতিপালনের হার বেশি হলেও ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের ক্ষেত্রে আইন প্রতিপালনের হার সবচেয়ে কম। বিশেষ করে, জর্দার ক্ষেত্রে সচিত্র সাস্থ্য সতর্কবাণী উপস্থিতির হার সবচেয়ে উদ্বেগজনক।
৪০ শতাংশ জর্দার প্যাকেট এবং কৌটায় সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পাওয়া যায়নি। গুলের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ২৪ শতাংশ এবং বিড়ির ক্ষেত্রে ১৪ শতাংশ। ২০১৬ সালের নভেম্বরে দেখা যায়, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী আছে এমন ৯০ শতাংশ বিড়ির প্যাকেটেই সেটা আইনানুগভাবে ছাপানো হয়নি। আর জর্দার প্যাকেট বা কৌটার ৮৫ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষেত্রেই আইন লঙ্ঘন করে উপরে বা নিচের একপাশে অথবা কৌটার মধ্যভাগে সচিত্র সতর্কবাণী মুদ্রণ করা হয়েছে। গুলের ক্ষেত্রে এই আইন লঙ্ঘনের হার ৪২ শতাংশ। এছাড়া খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর আইন বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সচেতনতাও অত্যন্ত কম। ৩ মাস অন্তর সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী পরিবর্তনের আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে অবহিত নন ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ বিক্রেতাই। করণীয়  বিষয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, খুচরা বিক্রেতা এবং অন্যান্য অংশীদারদের মধ্যে প্রচারণা চালাতে হবে। সঠিক আইনের প্রয়োগ, সুষ্ঠু তদারকি নিশ্চিত করা, সচিত্র স্বাস্থ্য সতকর্তাবাণীর আইনানুগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

হেপাটাইটিস সংক্রমণ বাংলাদেশে কতটা ভয়াবহ রোগ?

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস সংক্রমণকে এক নীরব ঘাতক হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে প্রায় এক কোটি মানুষ আক্রান্ত। বেসরকারি হিসেবে হেপাটাইটিসে প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বাংলাদেশে।
হেপাটাইটিস নিয়ে উদ্বেগের সবচে বড় কারণ হচ্ছে সারা বিশ্বে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে সংক্রমিত দশজনের মধ্যে নয়জনই জানেন না যে শরীরে এই ভাইরাস তারা বহন করছে।
এছাড়া এ রোগে আক্রান্তরা অনেকক্ষেত্রেই সুচিকিৎসা পান না। আর বাংলাদেশে হেপাটাইটিসে আক্রান্তদের একটা বড় অংশ ঝাড়ফুঁক, পানি পড়া, ডাব পড়া নেয়ার মতো কবিরাজি চিকিৎসার দ্বারস্থ হন।
এ হেপাটাইটিস সংক্রমণ বাংলাদেশে জনসাধারণের মধ্যে জন্ডিস রোগ হিসেবে পরিচিত। প্রকৃত অর্থে হেপাটাইটিস হলো ভাইরাসজনিত লিভারের রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ৫ ধরনের হেপাটাইটিস রয়েছে। হেপাটাইটিস এ এবং ই স্বল্পমেয়াদী লিভার রোগ। এটি বিশ্রাম নিলে এক পর্যায়ে সেরে ওঠে। তবে প্রাণঘাতী হচ্ছে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের সংক্রমণ। ঢাকার রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, হেপাটাইটিসের যে ৫ রকম ভাইরাস আছে তার সবগুলোর সংক্রমণই বাংলাদেশে আছে। এ বছরও চট্টগ্রামে হেপাটাইটিস ই ভাইরাসের একটি প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং এখন পর্যন্ত তিনজন মারা গেছে।
"হেপাটাইটিসের পাঁচ রকমের ভাইরাসেরই রোগী আমাদের দেশে আছে। ই ভাইরাসেই সবচে বেশি মানুষ ভোগে। আমাদের দেশে যদি কোনো প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় সেটা মূলত ই ভাইরাসের আউট ব্রেক হয়। কারণ এটা ছড়ায় বেশি। ই ভাইরাস মূলত পানির মাধ্যমে ছড়ায়। এবং গত দুই-তিন বছরে আমরা প্রতিবছর একটা ই ভাইরাসের আউট ব্রেক দেখতে পাচ্ছি।" চিকিৎসকরা জানান, হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে আক্রান্তদের তিন শতাংশ মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়। আর হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস ছড়ায় মূলত রক্ত এবং মানবদেহের তরল পদার্থের মাধ্যমে।
ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বলেন, ''হেপাটাইটিস বাংলাদেশে এটা একটা নীরব ঘাতক। বিশ্বে যত মানুষের লিভার ক্যান্সার হয় তার ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী হচ্ছে এই হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস। পৃথিবীতে গড়ে প্রতিদিন ৪ হাজার মানুষ লিভার রোগে মারা যায়।''
"এটা নীরবে একজন থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াচ্ছে। বিভিন্ন ভাবে যেমন, সেলুনে শেভ করতে গিয়ে ক্ষুর থেকে, সিরিঞ্জের মাধ্যমে ড্রাগস গ্রহণ, ট্যাটু করার মাধ্যমে, নাক-কান ফুটানো, রক্ত পরিসঞ্চালন, তারপর যৌন মিলনের মাধ্যমে সহজে ট্রান্সমিট হচ্ছে। হেপাটাইটিস বি এবং সি অনেকটা এইডসের মতো।"
মি. আলী আরো বলছেন হেপাটাইটিস সংক্রমণের বিষয়ে মানুষকে সচেতনতা করার জরুরী হয়ে পড়েছে।
"নবজাতক শিশুকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস প্রতিরোধে বার্থ ডোজ দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে শিশু জন্মের ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে এ টিকা দিতে।" যেহেতু রক্তের মাধ্যমে এটি সবচে বেশি ছড়ায় তাই নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে রক্তদানের আগে যে পরীক্ষা করা হয় সেখানে সবসময় হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস ধরা পড়ে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম জানান বি ও সি ভাইরাস রক্তে সংক্রমণের পর একটা উইন্ডো পিরিয়ড থাকে ২ থেকে ৬ মাস। এ সময়ে সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় এ ভাইরাস ধরা পড়ে না। এ সময় কেউ যদি রক্ত আদান-প্রদান করেন তাহলে অগোচরেই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে পড়ে। এটি নিরূপণে ডিএনএ ভাইরাল মার্কার বা এইচভিসি টোটাল টেস্ট প্রয়োজন হয়। এটা একটা প্রাণঘাতী রোগ যা নির্মূল করতে চাইলে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের কোনো বিকল্প কোনো কিছু নেই।
"আমাদের দেশে জেলা উপজেলা হাসপাতালগুলোকে আমরা প্রাইমারি সেকেন্ডারি হসপিটাল বলে থাকি। কিন্তু এসব জায়গায় রক্তে হেপাটাইটিস পরীক্ষায় এইচভিসি ভাইরাল মার্কার বা এইচভিসি টোটাল-এই টেস্টগুলো করার ব্যবস্থা নেই। এগুলো ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যায় না যে রক্তে ভাইরাস আছে কি নেই। আমি জেনে বুঝেই বলছি বাংলাদেশের জেলা উপজেলার হাসপাতালগুলোতে এখনো ডিএনএ ভাইরাল মার্কার করার ব্যবস্থা নেই।"হেপাটাইটিস বি এর উপসর্গ হলো জ্বর, দুর্বলতা, অবসাদ, বমি ভাব বা বমি হওয়া। বাংলাদেশে অনেকেই দেখা যায় এসব উপসর্গ নিয়ে কবিরাজি চিকিৎসা নিচ্ছেন। কবিরাজি চিকিৎসা বিশ্বাসের একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি হলো হেপাটাইটিস এ এবং ই যথাযথ বিশ্রাম নিলে এমনিতেই সেরে যায়। এ ভাইরাসে সংক্রমিতরা ঝাড়-ফুঁক, ডাব পড়া পানি পড়া নিয়ে মনে করেন যে কবিরাজি চিকিৎসায় কাজ হয়েছে। কিন্তু হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস রক্তে সংক্রমিত হলে লিভার সিরোসিস এবং শেষ পর্যন্ত লিভার ক্যান্সার হয়ে মৃত্যু হতে পারে। তাই বাংলাদেশের বিরাট জনগোষ্ঠীকে হেপাটাইটিস থেকে রক্ষা করতে সচেতন করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টার্গেট অনুযায়ী লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ কাজ করছে।
''হেপাটাইটিস রোগ নিয়ে সরকার অত্যন্ত সচেতন। এ রোগের ক্ষেত্রে সরকারের কর্মপরিকল্পনা আছে। ৫ বছর মেয়াদী আমরা শিশুসহ সবাইকে বিনা পয়সায় হেপাটাইটিসের টিকা দেয়ার বিষয়টি আমরা এ কর্মসূচীতে রেখেছি। এটা দেয়া হবে।'' এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশকিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
হেপাটাইটিস নিয়ে কাজ করছেন এমন বিশেষজ্ঞরা বলছেন ২০৩০ এর লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশ অঙ্গীকার করলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধে এখনো কোনো জাতীয় নীতিমালা করা হয়নি।
সূত্রঃ বিবিসি

অজানাই রইলো চট্টগ্রামে সেই চার হত্যার রহস্য by ইব্রাহিম খলিল

তদন্তের পর তদন্ত চলছে। তবুও অজানা রয়ে গেল চট্টগ্রাম মহানগরীর চার যুবতী ও কিশোরী হত্যার রহস্য। এরমধ্যে কোনোটার মাস পার, কোনোটার বছর পার হলেও পুলিশের কাছে তেমন কোনো ক্লু নেই চার খুনের। চারজনের মধ্যে একজনকে কুপিয়ে, একজনকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। বাকি দু’জনকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে তাও বের করতে পারেনি পুলিশ। তবে তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন মামলাগুলো তদন্তাধীন রয়েছে।
মামলাগুলোর বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১০ই জানুয়ারি নগরীর পাঁচলাইশ তেলিপট্টি এলাকায়  নিজ বাসার গলির মুখে চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের শিক্ষক অঞ্জলী রানী দেবীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্র্বৃত্তরা। নার্সিং কলেজে যাবার সময় সেদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি।
এ ঘটনায় অজ্ঞাতপরিচয় যুবকদের আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এরপর পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত শুরু করে। কিন্তু ঘটনার কোনো রহস্য বা ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। প্রায় দু’মাস পর মামলাটি পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে তদন্ত শুরু করে নগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
সেই থেকে আড়াই বছর ধরে শুধু তদন্তই করছে  গোয়েন্দা পুলিশ। জানাতে পারেনি হত্যার কারণ বা রহস্য। ঘটনা তদন্তে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় একপর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়েন অঞ্জলীর স্বামী ও মামলার বাদী চিকিৎসক রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী।
রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী বলেন, হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন পর মামলা তুলে নিতে দুর্বৃত্তরা মুঠোফোনে তাকে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। ওই মুঠোফোন নাম্বারটি পুলিশকে দিলেও কারা তাকে হুমকি দিয়েছে তাও বের করতে পারেনি পুলিশ।
দুর্বৃত্তদের হুমকির মুখে ভয়ে-আতঙ্কে তিনি নগরীর বাসা ছেড়ে এখন হাটহাজারীর গ্রামের বাড়িতে বসবাস করছেন বলে জানান রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. কামরুজ্জামানের সাফ কথা অঞ্জলী রানী দেবী খুনের ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। বলার মতো নতুন কিছু নেই।
এদিকে গত ২৭শে জুন চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া এলাকায় বাড়ির ভেতরে জবাই করে হত্যা করা হয় ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী ইলহাম বিনতে নাসিরকে। সকাল সাতটা থেকে আটটার মধ্যে বাকলিয়ার ল্যান্ডমার্ক আবাসিক এলাকার লায়লা ভবনের ৫ তলার বাসায় পৈশাচিক এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
মা নাসরিন আক্তার খুশবু সকাল সাড়ে সাতটায় মেজ মেয়েকে স্কুলে দিতে বেরিয়েছিলেন। আটটার দিকে বাসায় এসে দেখেন বড় মেয়ের গলাকাটা রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে খাটের ওপর। সকাল ১১টার দিকে পুলিশ ইলহামের মরদেহ উদ্ধার করে।
খবর পেয়ে পরের দিন সৌদি আরব থেকে আসেন ইলহামের বাবা নাসির উদ্দিন। দুদিন পর এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন তিনি। এরপর রিজুয়ান কবির রাজু নামে তাদের এক নিকটাত্মীয় আইনজীবীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তাকে রিমান্ডে এনে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও ইলহাম হত্যার বিষয়ে তিনি নিজেকে বরাবরই নির্দোষ দাবি করেছেন। তার স্বজনরাও এ ঘটনার সঙ্গে তাকে জড়ানোর জন্য জোর স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন পুলিশের বিরুদ্ধে। 
এ ব্যাপারে মামলার বাদী নাসির উদ্দিন জানান, ঘরের ভেতরে আমার মেয়েটিকে জবাই করে হত্যা করা হলো। হত্যাকাণ্ডের এক মাস পার হলেও জানতেই পারলাম না কারা কি কারণে আমার শিশুকন্যাকে জবাই করে হত্যা করলো। বরং পুলিশ আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে টানাটানি করছে। তাতেও যদি কোনো রহস্য জানতে পারতাম তাহলে শান্তি পেতাম।
এ বিষয়ে বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (ওসি) প্রণব কুমার চৌধুরী জানান, ইলহাম হত্যা মামলার তদন্তে পুলিশের তেমন অগ্রগতি নেই। ফলে মামলার তদন্তভার চেয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) চিঠি পাঠিয়েছে। মামলাটি এখন সিআইডিতে যাচ্ছে।
চলতি বছরের ৩রা ফেব্রুয়ারি বাকলিয়া ইছাহাকের পুলের বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় শিশু নুদরাত। এক সপ্তাহ পর ৮ই ফেব্রুয়ারি নুদরাতের গলিত লাশ পাওয়া যায় সার্সন রোডের ঝোপের ভেতরে। এ ঘটনায় নুদরাতের বড় বোন রোজি আক্তার বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি দিয়ে একটি মামলা দায়ের করেন।
ঘটনার পাঁচমাস পার হলেও শিশু নুদরাত হত্যার বিষয়ে কোনো তথ্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব কুমার চৌধুরী বলেন, নুদরাত হত্যার বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ মামলাটিও সিআইডিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে গত ৩রা মে চট্টগ্রাম মহানগরীর জিইসি আবাসিক এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজের পর পতেঙ্গা থানার কর্ণফুলীর নেভাল এলাকায় স্কুলছাত্রী তাসফিয়ার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার আগের দিন বিকালে নগরীর গোলাপাহাড় মোড়ে একটি রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে সিএনজি অটোরিকশায় উঠেছিল তাসফিয়া। রেস্টুরেন্টের ক্লোজ-সার্কিট ক্যামেরায় দেখা গেছে বন্ধু আদনান মির্জা তাকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় উঠিয়ে দিয়েছে।
এ ঘটনায় তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন বাদী হয়ে পতেঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জাসহ ছয়জনকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তাসফিয়ার মৃত্যুরহস্য এখনো উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
এ ব্যাপারে মামলার তদারকি কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আবু বক্কর জানান, তাসফিয়া হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তদন্তের পর তদন্ত হয়েছে। কিন্তু সে কেন বা কীভাবে নেভালে গেল সে বিষয়টি এখনো জানা যায়নি।
এ ঘটনায় আটক তার বন্ধু আদনান মির্জাকে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত রোববার দুইঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। আদনান জানিয়েছে, ঘটনার দিন দুপুরে আদনান ও তাসফিয়া ঘুরতে বের হয়। তারা প্রথমে নগরীর সার্সন রোডে ওয়ার সিমেট্রিতে যায়। সেখানে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর নগরীর গোলপাহাড় মোড়ে চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে যায়।
এ সময় আদনানের বন্ধু আসিফ মিজান ফোন দিয়ে জানান, তাসফিয়াকে খুঁজছেন তার মা। এরপর আদনান তাসফিয়াকে রেস্টুরেন্টের নিচ থেকে বাসায় যাবার জন্য একটি অটোরিকশা ঠিক করে দেয়। নিজে আরেকটি অটোরিকশায় করে বাসায় চলে যায়। এরপর তাসফিয়া কেন এবং কীভাবে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকায় গেছে, সে বিষয়ে কিছুই জানে না। তবে সে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। আদনানকে গাজীপুরে কিশোর সংশোধনাগারে নেয়া হয়েছে বলে জানান আবু বক্কর।

সেই মডেল কন্যার বয়ফ্রেন্ডের রহস্যজনক মৃত্যু by বিল্লাল হোসেন রবিন

নারায়ণগঞ্জে নিহত মডেল কন্যা মাহমুদা আক্তারের বয়ফ্রেন্ডের সন্ধান পাওয়া গেছে। তার নাম সাগর ইসলাম বাপ্পি (৩৬)। সে মুন্সীগঞ্জের সদর থানার মীরকাদিম পৌরসভার রিকাবীবাজার পূর্বপাড়ার জহিরুল ইসলামের ছেলে। তার মায়ের নাম দেলোয়ারা ইসলাম। সোমবার রাতে নারায়ণগঞ্জ সদর থানার গোগনগর এলাকায় তালাবদ্ধ ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে মাহমুদার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার হওয়ার একদিন পর মঙ্গলবার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে বাপ্পির রহস্যজনক মৃত্যু হয়। পরিবার তড়িঘড়ি করে তার দাফন সম্পন্ন করে। নিহত বাপ্পির পারিবারের দাবি, স্ট্রোক করে বাপ্পি মারা গেছে। কিন্তু কেউ কেউ বলছেন বাপ্পি আত্মহত্যা করেছে।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিহত মাহমুদার বয়ফ্রেন্ডকে শনাক্ত করা গেছে। সে নারায়ণগঞ্জে থাকতো। তবে তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। কিন্তু পরে জানতে পারলাম মাহমুদার বয়ফ্রেন্ড মারা গেছে। আমরা বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য এবং সে কীভাবে মারা গেছে তা জানতে থানা থেকে লোক পাঠাবো মুন্সীগঞ্জে।
মুন্সীগঞ্জের রামপাল (হাতিমারা) তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ জিল্লুর রহমান জানান, আমরা শুনেছি রিকাবীবাজার পূর্বপাড়ায় বাপ্পি নামে একজন স্ট্রোক করে মারা গেছে। এর বেশি কিছু তিনি জানাতে পারেননি। এদিকে নিহত মাহমুদার বাবা আক্কাস আলী মঙ্গলবার রাতে বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। সূত্র মতে, মাহমুদা ও বাপ্পি দু’জনেই বিবাহিত। মাহমুদার এক কন্যাসন্তান ও বাপ্পির দুই ছেলে সন্তান রয়েছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি মেগাশপে কাজ করার সুবাদে তাদের মধ্যে পরকীয়া সম্পর্ক তৈরি হয়। এক সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র ধরে দু’জনেই ওই প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে দেয়। মাহমুদা মডেলিং ও অভিনয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মিশনে নামেন। স্ত্রীর অগোচরে বাপ্পি মাহমুদাকে মানসিক সাপোর্ট দেয়। তারা দু’জনে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেও বেড়ায়। এরই মধ্যে মাহমুদা কয়েকটি শর্ট ফ্লিমে কাজও করেছেন।
তার সঙ্গে আরো নতুন নতুন বন্ধুর সম্পর্ক হয়। এদিকে বাপ্পি সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ শহরের চষাড়া বালু মাঠে ‘ওয়ার্ল্ড ফ্যাশন’-এ গত রমজান মাসজুড়ে সেলসম্যানের চাকরি করেছে। ঈদের পর মাহমুদা ও বাপ্পি গোপনে নারায়ণগঞ্জ শহরের গোগনগরের আলামিন নগর এলাকার মোহাম্মদ আলী আকবরের বাড়ির একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাস শুরু করে। এক পর্যায়ে ৩০শে জুলাই রাতে ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ পেয়ে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে ভেতর থেকে মাহমুদার লাশ উদ্ধার করে।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, এই ফ্ল্যাট যারা ভাড়া নিয়েছিলেন তাদের সঙ্গে তেমন দেখা সাক্ষাৎ হতো না। কথাও হতো না। তাই তারা কে কি করেন, নাম কি, কিছুই তারা জানতে পারেননি।
মাহমুদার ছোট বোন শাহিদা জানান, ‘গত বুধবার বাবার সঙ্গে আপুর ফোনে কথা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার থেকে আপুর ফোন বন্ধ। সবার ধারণা বৃহস্পতিবারই আপুকে হত্যা করা হয়েছে।’
পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয়দের সূত্র মতে, মাহমুদার বাবা আক্কাছ আলী নাগবাড়ি এলাকার ডায়াবেটিস হাসপাতালের একজন নিরাপত্তা প্রহরী। মডেলিংয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চাওয়া মাহমুদা ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। তার জীবনযাপনও ছিল সেই ধরনের। স্বামী হাবিবের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর বিভিন্ন ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন তিনি। বেশ কয়েকটি শর্টফ্লিমেও কাজ করেছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন শুটিং করতে গিয়ে। আড্ডাও ছিল ছেলেদের সঙ্গে। পরিবার থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন তিনি। যার কারণে মা-বাবাসহ পরিবারের কেউই তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখেননি।
নিহত মাহমুদার মা সুফিয়া বেগম জানান, ২০১৩ সালে মাহমুদার একটি বিয়ে হয়। এক বছর পর যৌতুকের দাবিতে স্বামী হাফিজুর রহমান মাহমুদাকে নির্যাতন করলে বিয়ে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে। ওই সময় তাদের সংসারে জন্ম নেয় রিয়ানা রহমান জারা। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর থেকে মেয়ে রিয়ানা রহমান জারাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে বসবাস করছিল মাহমুদা। নিজের ও মেয়ের খরচ জোগাড় করতেই চাকরি শুরু করেন।
তিনি জানান, জারাকে এ বছর প্লে গ্রুপে শেরেবাংলা একাডেমিতে ভর্তি করে দেয় তার নানা। তাছাড়া পাশের বাসার এক শিক্ষিকা তাকে পড়ায়। জারাও পড়ালেখায় খুব ভালো। এখন এ মেয়েটার কি হবে। জন্মের পর বাবা ছেড়ে গেছে। এখন মাকে হারালো। তার ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার।
এদিকে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে মিডিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নে মাহমুদা বেপোরায়া হয়ে উঠেন। যার পরিণতিতে তিনি লাশ হয়েছেন। এবং তিন-চারদিন আগেই তাকে হত্যার পর লাশ তালাবদ্ধ রেখে ঘাতক পালিয়ে যায়। এছাড়া আরো জানা যায়, মিডিয়ার কল্যাণে মাহমুদার সঙ্গে আরো অনেক ছেলের সখ্য গড়ে উঠে। যাদের সঙ্গে তিনি শুটিংয়ের বদৌলতে দেশের বিভিন্নস্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বন্ধুদের সঙ্গে তার মোজ-মাস্তির অনেক ছবি নিজের ফেসবুক আইডিতে আপলোড দিয়েছেন বিভিন্ন সময়। তবে তার ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা যায়, ৩রা জুলাইয়ের পর ২০শে জুলাই তিনি তার তিনটি ছবি আপলোড দিয়েছেন। এবং ২৬শে জুলাই তাকে ফেসবুকে অ্যাকটিভ দেখা যায়। এরপর তাকে আর ফেসবুকে অ্যাকটিভ দেখা যায়নি। ৩০শে জুলাই রাতে নিজের ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ মাহমুদার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে ২৬শে জুলাইয়ের পর যেকোনো সময়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
সূত্র মতে, ২০১৬ সালে মাহমুদা আক্তার শহরের উকিলপাড়ায় মেগাশপ ‘টপটেন’ এ কাজ নেন। খুব অল্প সময় কাজ করেন বলে জানায় সেখানকার ইনচার্জ জানে আলম।
তিনি বলেন, মাহমুদা আক্তার নারায়ণগঞ্জ টপটেন শাখার প্রথম নারী বিক্রয়কর্মী ছিলেন। কিন্তু  ২০১৭ সালের প্রথম কয়েক মাস কাজ করে নিজেই রিজাইন করেন। মাহমুদা টপটেনের আন্ডার গার্মেন্ট বিভাগে কাজ করতেন। সেখান থেকে রিজাইন করার পর আর কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এমনকি সহকর্মীদের ফেসবুকও ব্লক করে দেন।
টপটেনে কর্মকালীন মাহমুদার সহকর্মী নিপা জানান, মাহমুদা চুপচাপ নিজের কাজ করতেন, কারো সঙ্গে বেশি আলাপ তার পছন্দ ছিল না। মাহমুদা খুব বেশি শিক্ষিত না। মর্গান স্কুলে পড়ালেখা করেছিলেন। ক্লাস সিক্সের পর আর পড়াশোনা করেননি।
এদিকে মাহমুদার ফেসবুক আইডিতে কিছু ছবির মধ্যে অনেক বন্ধুর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো ও আড্ডার অসংখ্য চিত্র পাওয়া গেছে। তার ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা যায় ৩রা জুলাইয়ের পর ২০শে জুলাই তিনটি ছবি আপলোড দিয়েছেন। এবং ২৬শে জুলাই তাকে ফেসবুকে অ্যাকটিভ দেখা যায়। এরপর তাকে আর ফেসবুকে অ্যাকটিভ দেখা যায়নি। এর আগে সর্বশেষ ১৮ই জানুয়ারি নিজের আইডিতে প্রোফাইলে মেয়ের সঙ্গে নিজের একটি ছবি আপডেট দেন।
এলাকাবাসী সূত্র জানায়, উচ্চাভিলাষী জীবনযাপনে অভ্যস্ত মাহমুদার মোবাইলের কললিস্ট চেক করলেই হত্যার রহস্য উদঘাটন  হবে।

সত্যকে কেউ কখনও চাপা দিয়ে রাখতে পারে না: প্রধানমন্ত্রী

১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জিয়াউর রহমানের জড়িত থাকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সত্যকে কেউ কখনও চাপা দিয়ে রাখতে পারে না।  কিন্তু আমার দুঃখ একটাই, আমি জিয়ার বিচারটা করতেই পারলাম না। তার আগেই সে মারা গেল। গতকাল বিকালে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর প্রাঙ্গণে শোকাবহ আগস্টের মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষক লীগ আয়োজিত এক রক্তদান কর্মসূচি ও আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ইতিহাসকে কেউ মুছে ফেলতে পারে না।
ইতিহাসও কিন্তু প্রতিশোধ নেয়। জাতির পিতাকে হত্যা করে এই জাতিকে বিকৃত ইতিহাস জানানো হয়েছিল। কিন্তু সত্যকে কেউ কখনও চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। তাই মানুষের কাছে এখন সব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে কৃষক লীগের মুখপত্র ‘কৃষক কণ্ঠ’র মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি কর্মসূচি ঘুরে ঘুরে দেখেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগস্ট শোকের মাস। এ মাসে আমি হারিয়েছি আমার বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের। কিন্তু জাতি হারিয়েছে দেশের অভিভাবককে। শেখ মুজিব আজ বেঁচে থাকলে অনেক আগেই বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হতো। জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো তার অপরাধ কী ছিল? তার অপরাধ ছিল তিনি দেশকে স্বাধীন করেছিলেন। দেশের মানুষকে শোষকদের হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন।
যারা স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি, যারা ঘটনাচক্রে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিশ্বাস করত না সেসব কুলাঙ্গার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। তারা ভেবেছিল, মুজিব না থাকলে এ দেশ আবার পাকিস্তানিদের করায়ত্ত হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা ১৫ই আগস্টের খুনি তারা প্রতিনিয়ত আমাদের বাসায় যাতায়াত করতো। বাবার কাছ থেকে নানা সুবিধা নিত। এরপরও তারা বেইমানিটা করেছে। তারা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যাই করেনি। এ হত্যার বিচার যাতে না হয় সেজন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে। শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমান এই হত্যার সঙ্গে সম্পূর্ণ জড়িত ছিল বলেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে। আমাকে আর রেহানাকে দেশে আসতে দেয়নি। রেহানার পাসপোর্ট আটকে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে জাতির পিতার নাম মুছে ফেলা হয়েছিল। বিকৃত ইতিহাস এদেশের মানুষকে শোনানো হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। সত্যকে চাপিয়ে রাখা যায় না। বিবিসি’কে দেয়া খুনি কর্নেল রশিদের সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইন্টারভিউতে বলেছিল, তারাই জাতির পিতাকে হত্যা করেছে। কেন হত্যা করেছিল প্রশ্নের জবাবে রশিদ বলেছিল বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা কমানোর বহু চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তার পাহাড় সমান জনপ্রিয়তা কোনোক্রমেই কমানো যায়নি। কাজেই ওদের হত্যা ছাড়া নাকি আর কোনো পথ তাদের ছিল না। তারা এটাও বলে তাদের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সম্পর্ক ছিল। তারা জিয়াউর রহমানকে জানিয়েছিল এবং জিয়াউর রহমান এগিয়ে যাও বলে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল।
সে বলেছিল আমরা সবাই তোমাদের সঙ্গে আছি। বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বিধ্বস্ত অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশকে গড়ে তুলেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরে স্বল্পোন্নত দেশে উন্নীত হয়েছিল। গৃহহারা মানুষকে ঘরবাড়ি করে দিয়েছিলেন। ইউনিয়নে ইউনিয়নে হাসপাতাল করে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন দেশটি কেবল উঠে দাঁড়াচ্ছিল, মানুষ শান্তির মুখ দেখছিল, তখনই আঘাতটি এলো। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কী দুর্ভাগ্য আমাদের! অতি পরিচিতজন খুনি রশিদ, ফারুক, ডালিম, নূর। এরা কারা? এদের তো প্রতিনিয়ত আমাদের বাসায় যাতায়াত ছিল। ডালিম, তার শাশুড়ি, বউ, শালিতো দিনরাত ২৪ ঘণ্টা আমাদের বাড়িতেই পড়ে থাকতো। মুক্তিযুদ্ধে যখন জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে সশস্ত্রবাহিনী গঠন করা হলো তখন কামালকে এডিসির দায়িত্ব দেয়া হলো। নূরকেও এডিসির দায়িত্ব দেয়া হলো। তারা দুজন কর্নেল ওসামানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিল।
সেই নূর নিজেই বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সময় উপস্থিত ছিল। খুনি মোশতাক আমাদের দলেরই একজন ছিল, কিন্তু সে বেইমানি করলো, মুনাফেকি করলো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানিরাও একাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। কিন্তু যে বাংলার মানুষের ওপর তার অগাধ বিশ্বাস ছিল, তিনি ভাবতে পারেননি, এই বাংলার মাটিতে কেউ তাকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু সেই বাংলার মাটিতে বিশ্বাসঘাতকের দল তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছিল বলেই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করেছি। হত্যার বিচার করে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করেছি। এখনও কিছু খুনি লুকিয়ে রয়েছে বিদেশে। আমরা চেষ্টা করছি তাদের ফিরিয়ে আনতে।
বঙ্গবন্ধুর বিচারে দেশি-বিদেশি নানান বাধাবিপত্তির প্রসঙ্গ টেনে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, বিচার করতে গিয়ে অনেক হুমকি, অনেক ধমকি, অনেক কিছুই আমাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু অন্যায়কে কখনও প্রশ্রয় দেয়া যায় না। বাংলাদেশের কথা বললে বঙ্গবন্ধু চলে আসে, এজন্য সেই নাম সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। ৭ই মার্চের ভাষণ বাজানো যাবে না, কোথাও বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়া যাবে না। তিনি বলেন, আমার ওপর বারবার আঘাত এসেছে। আবারও হয়তো আসবে, কিন্তু সেগুলো আমি পরোয়া করি না। মৃত্যুকে আমি কখনও পরোয়া করি না। এটুকু শুধু মনে করি আমি বেঁচে তো আছি, বাবার অধরা কাজগুলো সম্পন্ন করতে। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে।
দেশকে বিশ্বে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে। অন্তত বলতে পারি আজকে বাংলাদেশ বিশ্বে মর্যাদার আসন পেয়েছে। আজকে যখন দেশের জন্য একটি অর্জন করি, শুধু এটুকু মনে হয় আমার বাবা-মা বেহেস্ত থেকে নিশ্চয় দেখতে পান, তার দেশ আজকে এগিয়ে যাচ্ছে। মর্যাদা ফিরে পেয়েছে। এটা দেখে নিশ্চয়ই আমার বা্বা-মার আত্মা শান্তি পায়। আমার বিশ্বাস এই দেশকে আমরা এগিয়ে নিতে পারবো। শেখ হাসিনা বলেন, ‘নিজের রক্ত দিয়ে দেশের প্রতি তার ভালোবাসার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। আমাদের সেই রক্তের ঋণ শোধ দিতে হবে। বাংলাদেশকে তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলে ওই রক্তের ঋণ শোধ করবো। ইনশাআল্লাহ, আমরা তা পারবো। আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি। আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো।
সবার কাছে দোয়া চেয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, এই গতি যেন থেমে না যায়। আমরা যেন এগিয়ে যাওয়ার এই গতি ধরে রেখে বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে আলোচনাসভায় আরও বক্তব্য দেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, ড. আব্দুর রাজ্জাক, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুর নাহার লাইলী, ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে নূর তাপস, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক রেজা। সভা পরিচালনা করেন কৃষক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সমীর চন্দ্র দে।

বৃষ্টি মাথায় ঢাকার রাজপথে শিক্ষার্থীরা, বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে

নিরাপত্তার অভিযোগে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হলেও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থামছে না। বৃষ্টি উপেক্ষা করে আজও শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছে রাজধানীর রাজপথে।
স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও পঞ্চম দিনের মতো নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে স্কুল ড্রেস পরা শিক্ষার্থীদের নেমে আসতে দেখা গেছে। তারা গাড়িচালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করে দেখছে।
আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল ৯টা থেকে রাজধানীর মৌচাক, আসাদগেট, মতিঝিল, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, শাহবাগ মোড়, মিরপুর, শনির আখড়া, উত্তরার হাউস বিল্ডিং, বিমানবন্দর এলাকায় শিক্ষার্থীদের রাস্তায় জড়ো হতে দেখা যায়। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় অবস্থান নিয়েছে।
দোহারে ট্রাকচাপায় স্কুলশিক্ষার্থী নিহত
ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের মাঝেও আজ (বৃহস্পতিবার) ঢাকার দোহার উপজেলায় ট্রাকচাপায় মো. রেশাদ (১৩) নামে এক স্কুলশিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। সকাল ৮টার  দিকে উপজেলার চরকুশাই এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
রাজধানীতে রোববার বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের জেরে টানা চতুর্থ দিন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজ (বৃহস্পতিবার) বন্ধ রাখা হয়েছে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
বুধবার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন জানান, ‘শিক্ষার্থী ও অন্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে বৃহস্পতিবার দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।’
গণপরিবহন বন্ধ, ভোগান্তিতে যাত্রীরা
এদিকে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাজধানীর সড়কে এবং আশেপাশের জেলাগুলোতে পর্যাপ্ত গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রী সাধারণ।
বাস মালিক-শ্রমিকরা জানায়, নিরাপত্তার কারণে এবং বাস ভাঙচুরের ঘটনায় তারা পরিবহন বন্ধ রেখেছেন।
অপরদিকে ময়মনসিংহ ও ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়ও আন্তঃনগর ও দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ রেখেছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা।
চট্টগ্রামে বৃষ্টিতে ভিজে শিক্ষার্থীদের মিছিল
ওদিকে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে আজ সকাল ১০টা থেকে জিইসি মোড়, গরিবুল্লাহ শাহ মাজার, ওয়াসা এলাকায় কয়েকশ শিক্ষার্থী বৃষ্টিতে ভিজে মিছিল করে রাস্তায় নেমে আসেন। এ সময় তারা বেশ কিছু অটোরিকশা, বাসের চালকদের লাইসেন্স ও গাড়ীর কাগজপত্র দেখতে গেলে তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। তবে বিপুলসংখ্যক পুলিশ রাস্তায় ছাত্রদের বুঝিয়ে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।
ছাত্ররা বলছে, আমাদের দাবি নিরাপদ সড়ক। আর কোনো মায়ের বুক খালি হোক তা আমরা চাই না। যদি চালকের লাইসেন্স না থাকে, গাড়ির  ফিটনেস না থাকে, তবে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।
এছাড়া, ঢাকার সাভার, নারায়ণগঞ্জ, রাজশাহী, টাঙ্গাইল, নাটোর ও বগুড়াসহ কয়েকটি জেলায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা।
হাসির জন্য ক্ষমা চাইলেন নৌমন্ত্রী
শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের নিহত শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিমের বাসায় গিয়ে তাঁর হাসির জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। গতকাল বুধবার সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তিনি দিয়াদের বাসায় যান। প্রায় ১৫ মিনিট সেখানে অবস্থান করেন।
শাজাহান খান একই সাথে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি।
সড়ক দুর্ঘটনায় রাজধানীতে দু'জন ছাত্র নিহত হবার বিষয় জানতে চাইলে ঘটনার দিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের হাসিমুখে প্রতিক্রিয়া জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ওঠে।
নিহত দিয়ার বাসায় গিয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী  বলেন, তিনি অন্য একটি প্রসঙ্গে হেসেছিলেন। তখনো জানতেন না সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। সাংবাদিকেরা বিষয়টি অন্যভাবে উপস্থাপন করেন। তাঁর হাসিতে সবাই দুঃখ পেয়েছে জেনে তিনি আগেই শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এখন নিজে এসে তাঁদের পরিবারের কাছেও ক্ষমা চান।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশকে অপমান করছে: মমতা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশকে অপমান করছে। বাংলাদেশ কোনো সন্ত্রাসবাসী দেশ নয়। অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে (এনআরসি) ৪০ লাখ লোকের নাম বাদ যাওয়া প্রসঙ্গে গতকাল (বুধবার) তিনি ওই মন্তব্য করেন।
কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপিকে টার্গেট করে মমতা বলেন, ‘অসম নিয়ে আমি কথা বলবই। দেখি কে আটকায়! বাংলাদেশকেও অপমান করছে সরকার। বাংলাদেশ কোনো সন্ত্রাসবাসী দেশ নয়। এনআরসি থেকে যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে অশান্তি তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। তারা মানুষের ওপরে বুলডোজার চালাতে চাচ্ছে। ভয় ও অশান্তির পরিবেশ তৈরি করে সেখানে আধাসেনা পাঠানো হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের প্রতিবেশী দেশ। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক মধুর। দেশ ভাগের সময় কেউ বাংলাদেশ থেকে, কেউ পাকিস্তান থেকে এসেছেন। তার মানে এটা নয় যে, তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।’
এনআরসি নিয়ে যা চলছে, তাতে দু’দেশের মধ্যে জটিলতা সৃষ্টি হবে বলেও তিনি আশঙ্কা করেছেন।
এনআরসি ইস্যুতে মমতা এর আগে বলেছিলেন, অসমে বাঙালি খেদাওয়ের নাম করে গৃহযুদ্ধ বাঁধানোর ষড়যন্ত্র চলছে। এসব মোটেই বরদাস্ত করা হবে না।
তার ওই মন্তব্যের পরেই বিজেপি’র পক্ষ থেকে তীব্র আপত্তি ও সমালোচনা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অনন্ত কুমার বলেছেন, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গৃহযুদ্ধ’ বাধার কথা বলে প্ররোচনা  দিচ্ছেন। কিছু হলে উনিই দায়ী হবেন।’
মমতা অবশ্য না থেমে পাল্টা জবাবে বলেছেন, ‘আমরা সব ভাষাকে সম্মান করি। বাংলাভাষী মানুষদের অস্বীকার করা উচিত নয়। এক সময় ভারত ও পাকিস্তান এক ছিল, পরে বিভক্ত হয়েছে।’ বিজেপি আগুন নিয়ে খেলছে এবং এরফলে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে বলেও মমতা মন্তব্য করেছেন।
তিনি বিজেপি’র বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে পিছিয়ে না এসে গতকাল (বুধবার) বলেন, ‘আমরা গালির জবাব গালি দিয়ে দিই না। আমি বিজেপি’র চাকর নই যে ওরা যা বলবে তার সাফাই দিতে থাকব।  আপনারা ৪০ লাখ ভোটারকে দেশ থেকে বের করে দেবেন, আপনারা দেশে শান্তি চান, না গৃহযুদ্ধ চান?’
উত্তেজক বিবৃতি দেয়ার অভিযোগে অসমের কয়েকটি থানায় মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এরইমধ্যে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। মমতা অবশ্য ওই ঘটনাকে বিশেষ আমল দিতে চাচ্ছেন না। বরং এনআরসি ইস্যুতে তার আক্রমণাত্মক মনোভাব অব্যাহত রেখে এনআরসিতে যেসব মানুষের নাম বাদ পড়েছে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জোরালো প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

অচল ঢাকা, শিক্ষার্থীদের দখলে রাজপথ

বৃষ্টি উপেক্ষা করে আজও শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছে রাজধানীর রাজপথে। এ অবস্থায় অচল হয়ে পড়েছে রাজধানী ঢাকা। সকালে গাড়ি চলাচল করলেও বেলা ১১টার পর তা একেবারে কমে আসে। ওদিকে রাজপথের দখল নিয়ে শিক্ষার্থীরা গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিভিন্ন কাগজপত্র চেক করছে। শুরুটা হয় সকাল ১০ টায়। এ সময়  কবি নজরুল কলেজের সামনে থেকে তাতী বাজারের দিকে প্রথম বিক্ষোভ মিছিলটি যায়।  ১০টার আগে থেকেই লক্ষ্মীবাজারের কবি নজরুল সরকারি কলেজের সামনে হাজির হতে থাকে আশপাশের স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। তারা নিরাপদ সড়ক চাই দাবিতে কবি নজরুল কলেজের সামনে থেকে তাতি বাজারের দিকে যায মিছিল নিয়ে। মিছিল থেকে তাদের ৯ দফা দাবির সমর্থনে নানা শ্লোগান দিচ্ছে। বেলা ১১টার পর শাহবাগ, কাকরাইল, সাইন্সল্যাব, ফার্মগেট, মিরপুর, বাড্ডা, মহাখালী এলাকায় নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা। তারা বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাস্তায় চলাচল করা যানবাহনের ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করতে থাকে। যাদের লাইসেন্স নেই তাদের গাড়ি আটকে রাখে সড়কের পাশে। ওদিকে কাজী নজরুল ইসলাম এ্যভিনিউ সড়কে যান চলাচল একেবারেই কমে যায়। ফার্মগেটে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে বসে পড়েন। বৃষ্টির মধ্যেই তারা নিরাপদ সড়ক চাই দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে।  শাহবাগ চত্ত্বরও শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত। ছাত্র-পুলিশ ভাই ভাই, উই ওয়ান্ট জাস্টিস ইত্যাদি শ্লোগান দিচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা সেখানে ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছেন। তাদের একটাই কথা নয় দফা দাবি মানলে তারা ঘরে ফিরে যাবে। তারা আর তাদের ভাই বোনের করুণ মৃত্যু দেখতে চায়না। এর আগে  আশপাশের বিভিন্ন স্কুল কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শাহবাগে জড়ো হন।  মিরপুর থেকে আজিমপুর রাস্তায়ও শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়েছেন। তারা বিভিন্ন গাড়ির চালকের লাইসেন্স চেক করছেন। এছাড়া বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাড্ডা নতুন বাজার এলাকায় আলাতুন্নেসা সাউথ পয়েন্টে ইউআইটিএসের শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন। তারা বৃষ্টির মধ্যে রাস্তায় বসে পড়েন। সেখানেই তাদের দাবির পক্ষে শ্লোগান দিচ্ছেন। অপরদিকে মহাখালী থেকে ফার্মগেট ও সাতরাস্তা বন্ধ করে বিক্ষোভ করছে শিক্ষার্থীরা।  শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আজ সারাদেশে স্কুল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল । গতকাল এক আদেশে এ বন্ধ ঘোষণার পরও শিক্ষার্থীরা  রাজপথে নেমে আসে।
শাহবাগে শিক্ষার্থীদের মিছিল, বিক্ষোভ
বেলা ১১টার পর শাহবাগে আসতে থাকে একে একে মিছিল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্লেকার্ড বহন করে মিছিল নিয়ে শাহবাগে জড়ো হন। তারা নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে। একদিকে ছাত্ররা বিভিন্ন গাড়ির কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করতে থাকে। কাগজপত্র ঠিক থাকলে গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে তারা। অন্যথায় যাত্রী নামিয়ে দিয়ে গাড়ি রাস্তার পাশে আটকে রাখছে। এ অবস্থায় বৃষ্টি এলেও তারা ভিজে তাদের কর্মসূচি পালন করে যায়। শিক্ষার্থীরা বলছেন, তাদের ৯ দফা দাবি মেনে নেয়ার স্পষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তারা রাজপথে এ কর্মসূচি পালন করে যাবে।
সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে বাস রেখে ব্যারিকেড
সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় ও নিউমার্কেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাস্তায় বাস রেখে ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় তারা। বেলা পৌনে ১১টার দিকে একদল শিক্ষার্থী সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও নিউমার্কেট এলাকায় এসে যানবাহন থামিয়ে চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেসের কাগজ আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে থাকে। এ সময় যেসব চালকের কাছে বৈধ লাইসেন্স পাওয়া গেছে, তাদের ছেড়ে দেয় তারা। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ভিজে ভিজে কাজ করতে থাকে শিক্ষার্থীরা। বেলা ১১টার দিকে উইনার পরিবহনের একটি বাস আটকায় শিক্ষার্থীরা। বাসটি যাত্রী নিয়ে গুলশান থেকে আজিমপুরের দিকে যাচ্ছিল। ল্যাব এইডের সামনে আসার পর শিক্ষার্থীরা বাসটি থামিয়ে চালকের লাইসেন্স দেখতে চায়। চালক কোনো বৈধ লাইসেন্স দেখাতে না পারায় বাসটি যেতে দেয়া হয়নি। ঘুরিয়ে দেয়া হয়। পরে বিহঙ্গ পরিবহনের আরেকটি বাস থামিয়ে চালকের লাইসেন্স দেখতে চায় শিক্ষার্থীরা। চালক লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। তখন চালককে নামিয়ে দিয়ে নিজেরাই বাসটি ঠেলে সরিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। বাসে থাকা যাত্রীদেরও নামিয়ে দেয়া হয়। এরপর বাসটি ঠেলে নিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সামনে নিয়ে ব্যারিকেড দেয় তারা।
এর আগে ল্যাব এইডের ৩ নম্বর ক্রসিয়ে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশ তরিকুল ইসলাম জানান, সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। বেলা পৌনে ১১টার সময় একদল শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমেছে। তারা বিভিন্ন যানবাহনের ড্রাইভিং ও ফিটনেস লাইসেন্স আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখছে। এ সময় তাদের কোনো ধরনের বাধা দেয়নি ট্রাফিক পুলিশ।
মিরপুর সড়কজুড়ে অবস্থান: পঞ্চম দিনের মতো রাজধানীর মিরপুর সড়কজুড়ে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা।
সকাল ১০টা থেকে মিরপুর সড়কের সায়েন্স ল্যাবরেটরি, লালমাটিয়া, আসাদগেট ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন শিক্ষার্থীরা। অবরোধ চলছে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেও। বুধবারের ধারাবাহিকতায় আজও শিক্ষার্থীরা গাড়ির ফিটনেস ও লাইসেন্স পরীক্ষা করছেন। যেসব গাড়ির কাগজপত্র ঠিক রয়েছে, সেগুলো ছেড়ে দিচ্ছেন। বাকিগুলো আটকে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ থামাতে আজ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু আজও স্কুল পোশাক ও ব্যাজ পরা শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। সরেজমিন দেখা গেছে, ধানম-ির ২৭ নম্বর থেকে সংসদ ভবনের দিকে কিছু গাড়ি যেতে দেয়া হচ্ছে। তবে সেগুলোরও ফিটনেস ও লাইসেন্স পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ কারণে সড়কে খুবই কম গাড়ির দেখা মিলছে। এতে যাত্রীদের পড়তে হয়েছে ভোগান্তিতে। নিরুপায় হয়েও অনেকে হেঁটেই গন্তব্যে রওনা দিয়েছেন। গণভবন ক্রসিংয়ে আছেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ওসমান গনি। তিনি বলেন, আমি যেখানে আছি, সেখানে সমস্যা নেই। তবে আড়ংয়ের সামনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আছেন। তারা বিক্ষোভ করছেন। কোথাও কোথাও গাড়ি পরীক্ষা করছেন। গাড়িতে সমস্যা দেখা দিলে আমাদের ডেকে নিচ্ছেন। আমরা মামলা করে দিচ্ছি। তবে কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে না। ট্রাফিক ইন্সপেক্টর এখলাস বলেন, শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করায় মানিক মিয়া সড়ক বন্ধ রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। এতে মিরপুর রোডের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
ঢাকার বাইরেও শিক্ষার্থীরা মাঠে
রাজধানীল বাইরেও শিক্ষার্থীদের অহিংস আন্দোলন চলছে। সাভার, গাজীপুর, টঙ্গী, রংপুর, ফেনী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা রাজপথে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করছে। সেখানেও তারা গাড়ির কাগজপত্র চেক করছেন। বিভিন্ন শ্লোগান দিচ্ছেন।

থেমে নেই ৫৭ ধারায় মামলা by মহিউদ্দিন অদুল

মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি হিসেবে ব্যাপক বিতর্কিত বিধান তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন-২০০৬ এর ৫৭ ধারা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে চলতি বছরের ২৯শে জানুয়ারি আইনটির ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারা বিলুপ্তির বিধান রেখেই মন্ত্রিসভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার  অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে তখন তা অনুমোদন দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত জাতীয় সংসদে আইনটি উত্থাপন বা পাস হয়নি। এ ছাড়া নানাভাবে আইনটির অপপ্রয়োগ ঠেকানোর কথা বলা হলেও থামেনি ৫৭ ধারায় মামলা দায়ের। পুলিশ সদরদপ্তরের অনুমতি ছাড়া মামলা না নিতে বলা হলেও প্রায় প্রতি মাসে একাধিক মামলা হচ্ছে বিভিন্ন থানা ও আদালতে। এর মধ্যে বেশির ভাগ মামলাই হচ্ছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। এর বেশির ভাগই ‘প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীসহ বিভিন্নজনকে অবমাননার’ অভিযোগে। ফলে বিলুপ্ত হওয়ার আগে এই মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে যেখানে আলোচনা হচ্ছে সেখানে দ্বৈতনীতিতে বিতর্কিত বিধানটিতে মামলা দায়েরের মাধ্যমে সাংবাদিকদের হয়রানি অব্যাহত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভিকটিমরা।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সদ্য নির্বাচিত সভাপতি মোল্লা জালাল মানবজমিনকে বলেন, আমরা পুরো সাংবাদিক সমাজই মত প্রকাশের পরিপন্থি ৫৭ ধারার বিপক্ষে। ইতিপূর্বে বিএফইউজের বিগত কমিটির নেতৃবৃন্দ আইনটি বাতিলের জন্য সরকারকে নানাভাবে জানিয়েছে। আইনটি নিয়ে এখন স্ববিরোধী দ্বৈতনীতি কাজ করছে। একদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমতি ছাড়া মামলা না নিতে বলা হচ্ছে। অন্যদিকে আদালতে গেলে তদন্তের ভার পড়ছে পুলিশের উপর। তারপর মামলা হচ্ছে। একদিকে মন্ত্রিপরিষদ সভায় নতুন আইনের খসড়া অনুমোদনের মধ্য দিয়ে ওই আইনের ৫ ধারাটি বিলুপ্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। তাতে সাংবাদিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। আমরা তা আর চাই না। আইনটি বিলুপ্ত হলে ওই আইনে দায়ের করা সাংবাদিকদের সব মামলাও বিলুপ্ত বা তামাদি করতে হবে।
জানা যায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ইলেক্ট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও উহার দণ্ড :৫৭। (১) কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোনো ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সমপ্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ। (২) কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বৎসর এবং অন্যূন সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

এই আইনটিতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে উল্লেখ করে সাংবাদিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ তা বিলুপ্ত করার জন্য সোচ্চার হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ওই আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারা পুরোপুরি বিলুপ্তির বিধান রেখে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। চলতি বছরের ২৯শে জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভায় নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বহুল আলোচিত কয়েকটি ধারা বিলুপ্ত করা হলেও ৫৭ ধারায় বর্ণিত অপরাধ ও শাস্তির বিধান পুনর্বিন্যাস করে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮’ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন আইনের ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, মানহানিকর কোনো তথ্য দিলে তিন বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনো ধরনের তথ্য-উপাত্ত, যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে এবং এ অপরাধে ১৪ বছর কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অপর দিকে আইনটি অপপ্রয়োগ ঠেকানোর কথা বলা হলেও চলতি মাসেই ৫৭ ধারায় অন্তত ডজন খানেক মামলা হয়েছে। ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটূক্তি করার অভিযোগে গত ২৩শে জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেছেন এক ছাত্রলীগ নেতা। হাটহাজারি থানায় মামলাটি করেন চবি ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সদস্য ইফতেখার উদ্দিন। ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাংবাদিক ইউনিয়ন কুষ্টিয়ার সভাপতি ও বিএফইউজের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব বাদী হয়ে দৈনিক জনকণ্ঠের সহকারী সম্পাদক জাফর ওয়াজেদের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করেছেন।
ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) নির্বাচন নিয়ে জাফর ওয়াজেদ নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘মৃত ব্যক্তির ভোট দান’ শিরোনামে একটি লেখার জন্য মামলাটি করা হয়। বাদী এতে বিএফইউজের নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীসহ কয়েকজনের সম্মানহানি ও কটূক্তির অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ১লা জুলাই কোটা সংস্কারে আন্দোলনরত বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খানের বিরুদ্ধে একই ধারায় মামলার পর তাকে দীর্ঘ রিমান্ডে নেয়া হয়। ছাত্রলীগের সদ্য সাবেক কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক আল নাহিয়ান শাহবাগ থানায় মামলাটি করেন। অবশ্য অন্যদের বিরুদ্ধে এই ধারায় না হলেও অন্য ধারায় মামলা হয়েছে। মামলার এজাহারে বলা হয়, রাশেদ খান ফেসবুক লাইভে মিথ্যা, মানহানিকর ও নাশকতা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। কিছু বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে প্রধানমন্ত্রীর মানহানিকর ছিল।
এর আগে ৪ঠা জুলাই দিনাজপুরের হাকিমপুর থানায় পৌর ছাত্রলীগ সভাপতি মো. তরিকুল সরকার বাদী হয়ে ৫৭ ধারায় সাকিল ইসলাম (২০) নামে অপর এক যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মান ক্ষুণ্নের লক্ষ্যে ফেসবুকে বিকৃত ছবি পোস্ট করার অভিযোগে মামলাটি (মামলা নং-০৮) করা হয়। এ মামলায় সে দিনই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। তার আগে ৬ই মে জামালপুর সদর থানায় উপজেলা সহকারী পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা শবনম মোস্তারী ও দৈনিক ইত্তেফাকের জামালপুর প্রতিনিধি হালিম দুলালকে আসামি করে ৫৭ ধারায় মামলা করা হয়েছে। শবনম এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার পর ওই দু’জনকে আসামি করে সদর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
সম্মানহানির অভিযোগে গত ১৬ই মার্চ রাজধানীর আদাবর থানায় এক তরুণীর বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা (মামলা নং-১৮) করেন চলচ্চিত্র পরিচালক গাজী রাকায়েত। এ ছাড়া আইনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম ও তার ব্যক্তিগত সহকারী রাশেদুল কায়ছার ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে ফেসবুকে অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে গত ১৬ই মে গ্রেপ্তার হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার কটি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোখলেছুর রহমান লিটন। ৫৭ ধারায় মামলাটি করেন কুটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইদুর রহমান স্বপন। একই সময় পুলিশ সদরদপ্তর থেকে অনুমতি নিয়ে ৭টি মামলা করা হয়। চলতি বছরের ২২শে এপ্রিল বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসের (বেসিস) পরিচালক লুনা শামসুদ্দোহার মামলায় একই সংগঠনের সদস্য বেঙ্গল ক্রিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাজুল ইসলাম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এর আগে ১০ই এপ্রিল তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় গুলশান থানায় মামলাটি করেন লুনা। ২২শে এপ্রিল দেশের জনপ্রিয় চাকরির অনলাইন পোর্টাল বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী একেএম ফাহিম মাসরুর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ছবির ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন আপলোড ও অপমানমূলক স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগে রাজধানীর কাফরুল থানায় ৫৭ ধারায় মামলা করেন ঢাবি ছাত্রলীগের সাবেক গণশিক্ষা সম্পাদক মো. আল সাদিক। এই মামলায় গত ২৫শে এপ্রিল পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের সদস্যরা গ্রেপ্তারের পর আবার ছেড়ে দেয়।
সাইবার সিকিউরিটি ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের হয় ৭৪০টি মামলা। এর মধ্যে ৬০ শতাংশ মামলা হয়েছে ৫৭ ধারায়। ২০১৩ সালে প্রথম তিনটি মামলা হয়। এরপর প্রতি বছর মামলার সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৪ সালে সারা দেশে ৩৩টি মামলা হলেও ২০১৫ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫২টিতে। ২০১৬ সালে ৫৭ ধারায় মামলা হয় ২৩৩টি, আর ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই ধারায় মামলা হয়েছে ৩২৩টি।

সুন্দরবনে শিল্পায়ন বন্ধের আহ্বান জাতিসংঘের

বিশ্বের বৃহত্তম ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ সুন্দরবনে শিল্পায়ন বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। মঙ্গলবার সংস্থাটির মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয় হিউম্যান রাইটস অফিস অব দ্য হাইকমিশনার এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানায়। এতে  বলা হয়, সুন্দরবনের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, গঙ্গা নদীর ডলফিনসহ সেখানে বিচরণকারী অন্যান্য বিপন্ন প্রাণীর অনন্য বাস্তুসংস্থান প্রক্রিয়াকে শুধু হুমকির মুখেই ফেলেনি, বরং এতে ৬০ লাখেরও বেশি মানুষের অধিকার ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এসব মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, খাদ্য ও সংস্কৃতি সরাসরি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও টেকসই সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে। বিবৃতিতে সংস্থাটির মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত জন এইচ নক্স বলেন, বাংলাদেশকে অবশ্যই সুন্দরবনের বনাঞ্চলে শিল্পায়ন বন্ধ করতে হবে।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত সুন্দরবন বিশ্বের প্রাকৃতিক আশ্চর্যগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি প্রাকৃতিক জলাভূমি সুরক্ষা বিষয়ক রামসার কনভেনশন ও ইউনেস্কো কর্তৃক ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত। ইউনেস্কো ও প্রকৃতি সুরক্ষা বিষয়ক ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়নের আপত্তি সত্ত্বেও বাংলাদেশ সম্প্রতি সুন্দরবন এলাকায় ৩২০টিরও বেশি শিল্প প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র অন্যতম। গত বছরে বাংলাদেশের হাইকোর্ট সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কোনো শিল্প প্রকল্পের অনুমতি না দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু এর পরেও সরকার সেখানে শিল্প প্রকল্পের অনুমতি দেয়া অব্যাহত রেখেছে। জন এইচ নক্স বলেন, অবশ্যই বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি প্রয়োজন। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি অগ্রাহ্য করে স্বল্প মেয়াদে অর্থনৈতিক লাভকে গুরুত্ব দেয়ার অর্থ হলো মরীচিকার পেছনে ছুটে চলা। কেননা সুষ্ঠু পরিবেশ ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন টেকসই হবে না। সত্যিকার অর্থে টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

পরিস্থিতি সামাল দিতে দিনভর নানা চেষ্টা

শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে দিনভর সরকারের পক্ষ থেকে নানাভাবে চেষ্টা হয়েছে পরিস্থিতি শান্ত করার। বিভিন্ন পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সভা ছাড়াও সড়ক পরিবহন আইনটি আগামী মন্ত্রিসভা বৈঠকে উঠবে বলে জানানো হয়েছে। এদিন বেলা ১১টায় সড়ক পরিবহন আইন এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এরপর সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে কথা বলেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক।
বলেন, সড়ক পরিবহন আইনের ভেটিং শেষ হয়েছে। আগামী মন্ত্রিসভায় আইনটি উঠতে পারে। এরপর বিকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অন্যান্যের মধ্যে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গাসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। আর জাতীয় পার্টির নেতা রাঙ্গা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি।
বৈঠকের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থীদের রাজপথ ছেড়ে ঘরে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, আমরা ছাত্রছাত্রীদের আহ্বান জানাবো, তোমাদের যে সমবেদনা, যে দুর্ভোগ- সারা দেশে এই মেসেজ পৌঁছে গেছে। আমরা অনুরোধ করবো, তোমাদের দাবি সবই মানা হয়েছে। যারা অন্যায় করেছে, যারা ঘাতক, আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তি যাতে তারা পায়, সেই ব্যবস্থা আমরা করছি। অভিভাবক, শিক্ষক যারা আছেন, তাদের বলছি, আপনারা আপনাদের ছেলেমেয়েদের, ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধ করুন, তারা যেন ক্লাসরুমে ফিরে আসে। মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে জনদুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে, সারা শহর অচল হয়ে যাচ্ছে; এটা কারও কাম্য নয়। আমাদের প্রিয় ছাত্রছাত্রী ভাইয়েরা অবরোধ তুলে নেবেন, এই অনুরোধ আমরা জানাচ্ছি। যারা অবরোধ করছে, তাদের জন্য কাম্য নয়।
যারা আমরা রাস্তায় চলাচল করছি, তাদের জন্য কাম্য নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত তিন দিনে ৩০৯টি গাড়ি ভাঙা হয়েছে, পোড়ানো হয়েছে আটটি গাড়ি। তিনি বলেন, ২৯ তারিখ ১৫০টি গাড়ি ভেঙেছে, ৩০ তারিখে ২৫টি গাড়ি ভেঙেছে এবং ৩১ তারিখে ১৩৪টি গাড়ি ভেঙেছে। এর মধ্যে পুলিশের ২টি, ফায়ার সার্ভিসের ১টি, যা পুলিশের ক্ষতি, ফায়ার সার্ভিসেরও ক্ষতি। এই যে আমাদের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা অবরোধ করছে। একে কাজে লাগিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল নতুন করে জ্বালাও-পোড়াও ও গাড়ি ভাঙছে। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন তুলে নিয়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসাদুজ্জামান খান বলেন, অনুরোধ করবো, আমাদের প্রিয় কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনায় মনোযোগী হবে। দোষীরা যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি পায়, তার ব্যবস্থা নেবো। সরকার ব্যবস্থা নেবে। বিভিন্নভাবে দাবি-দাওয়া আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
আমরা সবগুলো মেনে নিয়েছি। সবগুলোই মনে হয় যৌক্তিক। আমরা কোনোক্রমে লাইসেন্সবিহীন, রুট পারমিটবিহীন গাড়ি চলতে দেবো না। এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিন দিন হয়ে যাচ্ছে, আমাদের সন্তানেরা রাস্তায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও চান, আমাদের প্রিয় সন্তানেরা রাস্তা থেকে ফিরে আসুক। স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসুক। সমস্যা দীর্ঘদিনের, অল্প সময়ের মধ্যে কি এই সমস্যার সমাধান হবে?- এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যথার্থ বলেছেন। আমাদের ইনটেনশন হলো যেন দুর্ঘটনা না ঘটে। সবাই যেন আইন মেনে চলে। মালিক, শ্রমিক ও পথচারীরা আইনটা মেনে চলে। পথচারীরাও ভুল করে। সবাই যাতে মেনে চলে, তার জন্য আমরা আইনটা করতে চাইছি।
এদিকে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া ছাত্র বিক্ষোভকে অযৌক্তিক মনে করেন না সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ছাত্রদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন আইন পাস হচ্ছে, এরপরই সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে। গতকাল সড়কমন্ত্রী সেতু ভবনে গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এখানে একটা প্রচণ্ড ইমোশন কাজ করেছে, এর বাস্তবতাও আছে। কারণ দুইজন সম্ভাবনাময়ী শিক্ষার্থী মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন। সেটার প্রতিবাদে এমন বিক্ষোভ আমি অযৌক্তিক বলে মনে করি না।
এ ধরনের বিক্ষোভ হতেই পারে। এই বিক্ষোভের মধ্যে বুধবার সড়কে বাসের সংখ্যাও আবার কম। এ বিষয়ে কাদের বলেন, কিছু কিছু অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হওয়াতে পরিবহনের লোকজন কিছুটা ভয় পেয়েছিল। তারা তো ভাঙচুরের মধ্যে গাড়ি নামাতে চাইবে না। আমার মনে হয় ভীতিটা কেটে যাবে। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এটা কি ভীতির কারণে নাকি কেউ কলকাঠি নাড়ছে- এমন প্রশ্নে সড়কমন্ত্রী বলেন, না না, এটা ভীতির কারণ। কারণ এমন অবস্থায় গাড়িতে আগুন দেবে বা ভাঙচুর করবে এই আশঙ্কা তো তাদের থাকতেই পারে। ছাত্রদের কিছু বলবেন কি না?- জানতে চাইলে কাদের বলেন, চলমান বিক্ষোভ কি এখনো আছে নাকি? তার প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকরা বিক্ষোভ চলছে জানালে মন্ত্রী বলেন, আজকে অনেক কম।
এ ব্যাপারে চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি তাদের বলবো, সড়কে দুর্ঘটনা ও সড়কে বিশৃঙ্খলা নিয়ে আইন কেবিনেটে আসছে এবং আগামী সংসদ অধিবেশনে এ ব্যাপারে আইনও পাস হবে। কাজেই আমি ছাত্রছাত্রীদের বলবো যে, আমরা সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নিজেই অবৈধ চালকদের ধরার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং তিনি মর্মাহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আমরা সবাই মর্মাহত। নৌমন্ত্রী নিজেও ক্ষমা চেয়েছেন। আমি ছাত্রছাত্রীদের বলবো শান্ত হওয়ার জন্য। স্ব স্ব ক্যাম্পাসে ফিরে গিয়ে তারা পড়াশোনায় মনোনিবেশ করবে। আমরা ভবিষ্যতে যাতে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তার জন্য কঠোর আইন করতে যাচ্ছি এবং ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি। গত নয় বছরে সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্য যতবারই আলোচনায় এসেছে ততবারই নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের নাম এসেছে।
সরকার কি তাকে নিয়ে এখন পর্যন্ত বিব্রত কিনা?’- এমন প্রশ্নে সড়কমন্ত্রী বলেন, আমাদের সরকারের সময়ের আগে টার্মিনালে খুনোখুনি নিত্যদিনের ঘটনা ছিল। কিন্তু এই সরকারের সময়ে কিন্তু এই নৈরাজ্য হয়নি এবং যেভাবে ধর্মঘট হওয়ার কথা ছিল সেভাবে হয়নি। একমাত্র চিটাগাংয়ে ঈদের সময় একটা ধর্মঘট হয়েছিল, যাতে ভোগান্তিও হয়েছিলো। এছাড়া কিন্তু কোনো ধর্মঘট স্থায়ী রূপ নেয়নি। বাকিগুলো যেদিন ডেকেছে সেদিনই প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এদিকে সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় দ্রুত বিচারের বিধান রাখা হচ্ছে। এতে মোট ১২টি ক্ষেত্রে বিচারের কথা বলা আছে। এই আইনে কী আছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় যে শাস্তি হওয়া উচিত, তার সর্বোচ্চটাই থাকছে সড়ক পরিবহন আইনে।
আইনটিতে ত্বরিত গতিতে বিচারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এই আইনে সংশ্লিষ্ট কোনো অপরাধী আইনের কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে বের হতে পারবে না। যদি কেউ বড় অপরাধ করে তাহলে তাকে এ আইন অনুযায়ী বড় শাস্তি পেতে হবে। আবার কেউ ছোট অপরাধ করে বড় শাস্তি পাবারও আশঙ্কা থাকবে না এই আইনে। মন্ত্রী জানান, আইনটিতে আরো ১২টি বিষয় রাখা হয়েছে। চালকদের নানা ভুলের শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে এই বিষয়গুলো। প্রধানমন্ত্রী চান আইনটি দ্রুত পাস হোক এবং অপরাধীরা শাস্তি পাক। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ও আন্তরিক ভূমিকা রাখছে।

ছাত্র বিক্ষোভে অচল রাজধানী: সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আজ

রাজধানীজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। অচল সবকিছু। বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদ এবং নয় দফা দাবিতে ঢাকার স্কুল-কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থী গতকাল নেমে আসে রাজপথে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আজ সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। রাতে মন্ত্রণালয়ে জরুরি  বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন। ওদিকে শিক্ষার্থীরা আজ সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
এদিকে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত চলা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভের কারণে বন্ধ ছিল গণপরিবহন চলাচল। এতে কর্মমুখী মানুষকে দিনভরই দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। দুর্ভোগ হলেও শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ। রোববার বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বেপরোয়া বাস চাপায় প্রাণ হারান শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী। ঘটনার পর থেকে ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন।
পরের দিন বিক্ষোভে যোগ দেয় আশপাশের আরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মঙ্গলবার বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজধানীতে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তাৎক্ষণিক নোটিশে বন্ধ রাখা হয় বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চতুর্থ দিনে গতকালের বিক্ষোভ ছিল রাজধানীজুড়ে। সকাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ব্যানার, প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। শহরজুড়ে শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল অভিন্ন স্লোগান, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিজ’। নগরজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় তা থামাতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো তৎপরতাই কাজে আসেনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল সচিবালয়ে বৈঠক করেছেন মন্ত্রীরা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বিষয়ে সদস্যদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। গতকাল বিক্ষোভ ছড়িয়েছে ঢাকার বাইরেও। চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, সাভারসহ বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ সড়কের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভে ৯ দফা দাবির পাশপাশি নৌপরিবহন মন্ত্রী ও শ্রমিক পরিবহন নেতা শাজাহান খানের পদত্যাগ চেয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শাহবাগে বিক্ষোভকারীরা নৌ-মন্ত্রীর কুশপুত্তলিকাও পুড়িয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীরা বৈধ কাগজপত্র, চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করে। বৈধ কাগজ না পেলেই যানবাহনে ভাঙচুর চালিয়েছে তারা। তবে এম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের যানবাহন নিরাপদে চলাচলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। বিক্ষোভের সময় উল্টো পথে আসা একজন সিনিয়র মন্ত্রীর গাড়িও ফিরিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। এছাড়া চালকের কাছে লাইসেন্স না থাকায় পুলিশের একটি গাড়ি আটকে রাখার ঘটনাও ঘটে। এদিকে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি চালকালে শনির আখড়া এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানের কাগজ দেখতে চাইলে চালক না দেখিয়ে এক শিক্ষার্থীর ওপর দিয়ে পিকাপ চালিয়ে পালিয়ে যায়।
অবরোধ ও বিক্ষোভের কারণে সকাল থেকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর থেকে কুড়িল বিশ্বরোড হয়ে রামপুরা, বিমানবন্দর থেকে বনানী হয়ে শাহবাগ, গাবতলী থেকে নিউ মার্কেট, বেগম রোকেয়া সরণি, শাহবাগ থেকে মতিঝিল হয়ে শনির আখড়া সড়কে সারা দিনই কোনো গণপরিবহন চলেনি। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও ছিল কম। স্থানে স্থানে বিক্ষোভ হওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা হেঁটে বা রিকশায় করে যার যার গন্তব্যে যান। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে চলা কর্মসূচিতে ভোগান্তি হলেও সাধারণ মানুষকে বিরক্ত দেখা যায়নি খুব একটা। বিকাল সোয়া চারটায় মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে বেগম রোকেয়া সরণির শেওড়াপাড়া এলাকায় সড়ক বন্ধ করে বিক্ষোভ করছিলেন গ্রিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা।
সড়ক নিরাপত্তা ও নৌ-মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে তারা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। এসময় সড়কের দুপাশ ব্যারিকেড দিয়ে আটকানো ছিল। বিকাল সোয়া পাঁচটার দিকে দিনের কর্মসূচি স্থগিত করে শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে পরের দিনও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। সকাল থেকেই এ সড়কে মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর এলাকায় কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জড়ো হয়ে দিনভর সড়ক অবরোধ করে রাখেন। এদিকে গতকাল বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ী জাবালে নূর পরিবহনের মালিক শাহাদাৎ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। ঘাতক বাসের চালক মাসুম বিল্লাহকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। দায়ী পরিবহনের দুটি বাসের রুট পারমিট বাতিল করেছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অর্থরিটি।
উত্তরা থেকে বিমানবন্দর সড়ক জুড়ে বিক্ষোভ: সকাল সাড়ে ৯টা থেকে উত্তরা হাউজ বিল্ডিং ও জসিম উদ্দিন রোডে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে স্লোগানে তারা পুরো এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে। চতুর্থ দিনের এই বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেন উত্তরা রাজউক মডেল কলেজ, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, স্কলাস্টিকা, বিজেএমইএ ইউনিভার্সিটি, উত্তরা কমার্স কলেজ, উত্তরা ইউনাইটেড কলেজসহ আরো অনেক কলেজ।
এসময় শিক্ষার্থীরা উত্তরা থেকে মহাখালী পর্যন্ত কোন যানবাহন চলাচল করতে দেয়নি। যে কয়েকটা যানবাহন চলাচল করেছে তার চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে হয়েছে। যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল না সেই যানবাহনের চালকদের কিছুক্ষণ আটকে রেখে পরে ছেড়ে দেয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হাউজ বিল্ডিং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিকাল ৫টার দিকে ওই এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা অবস্থান থেকে সরে গেলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। বিমানবন্দর, খিলক্ষেত এলাকায়ও একই পরিস্থিতি বিরাজ করে। প্রধান সড়কে অবস্থান নেয় বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা।
সড়কে গুটিকয়েক যানবাহন ছাড়া আর কোনো যানবাহন চলতে দেখা যায়নি। বিশেষ কারণ দেখিয়ে অনেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছাড় পায়নি। মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে যাদের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল তাদেরকে চলে যেতে বলা হয়। তবে অসুস্থ রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সকে চলাচল করতে দেয়া হয়। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, রেডিসন ব্লু ও এমইএস এলাকায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, বিএফ শাহিন কলেজ, ক্যামব্রিয়ান কলেজ বিক্ষোভ করেন। পরে তাদের সঙ্গে এসে যোগ দেন রাজউক, মাইলস্টোন, উত্তরা কমার্স কলেজসহ আরো অনেক কলেজের শিক্ষার্থীরা।
যানবাহন চলাচল বন্ধ করে এমইএসের জিয়া কলোনি এমপি চেকপোস্টের সামনে কিছু শিক্ষার্থী অবস্থান নেয়। বাকিরা দুপাশের সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এসময় ওই সড়ক দিয়ে  অ্যাম্বুলেন্স ও শিক্ষার্থীদের গাড়ি ছাড়া আর কোনো গাড়ি চলতে দেয়া হয়নি। যারা ভুল করে ওই সড়ক দিয়ে প্রবেশ করেছে তাদের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হাত থেকে বাধ যায়নি পুলিশের গাড়িও। পুলিশকে বহনকারী কিছু গাড়িকে ভাঙচুর করা হয়। আর মোটরসাইকেল চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখিয়ে হেঁটে হেঁটে যেতে হয়। কাকলী মোড়েও জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন নর্দান ইউনিভার্সিটি, প্রাইমেশিয়া ইউনিভার্সিটি, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, বনানী বিদ্যা নিকেতনসহ আরো বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। প্রধান সড়কে অবরোধ করায় ওই এলাকা দিয়ে কোনো যানবাহন চলতে দেয়া হয়নি। যানবাহন চলতে না দেয়ায় ওই এলাকায় সাধারণ যাত্রীদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।
হেঁটে অনেককে গন্তব্য পৌঁছাতে দেখা গেছে। তবে রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় ঢাকা কমার্স কলেজ, ইমপেরিয়াল কলেজ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ঢাকা কলেজ, রাজউক উত্তরা কলেজ, আইডিয়াল কলেজসহ আরো কিছু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। রামপুরা ব্রিজের ওপরে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা আশপাশের সবকটি রাস্তা বন্ধ করে দেন। এতে করে আশপাশের এলাকা থেকে আসা যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে অনেক যানবাহনকে। ব্রিজের ওপরে শিক্ষার্থীরা বসে দাঁড়িয়ে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিতে থাকেন। বিকাল চারটার পরে শিক্ষার্থীরা অবরোধ বন্ধ করেন। পরে ওই এলাকায় যানবাহন চলাচল অনেকটা স্বাভাবিক হয়। এছাড়া বসুন্ধরা এলাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিপেন্ডেট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ভিকারুন্নেসা কলেজের শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন। মহাখালী-গুলশান এলাকায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন।
যাত্রাবাড়ী এলাকা: রাজধানীর চট্টগ্রাম রোড, শনির আখড়া, কাজলা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সকাল থেকে জমায়েত হয় আশপাশের বিভিন্ন কলেজের সহস্রাধিক শিক্ষার্থীরা। সেখানে ওই এলাকার কিছু স্কুল ছাত্রকেও যোগ দিতে দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জ প্রবেশের রাস্তার মাথা থেকে শুরু করে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত কয়েক দল শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করতে থাকে। তারা নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের পদত্যাগ দাবি করে মিছিল করেন। সহস্রাধিক শিক্ষার্থী সড়কে অবস্থান নিলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
এদিকে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় অবস্থান নিলে সকাল ৯টার পর থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে দূরপাল্লার বাস দীর্ঘক্ষণ ধরে আর রাজধানীতে ঢুকতে পারেনি। ঠাঁই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামের দিকে দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার যানজট পড়তে দেখা গেছে। আবার এই যানজট এড়াতে বহু গাড়ি রাস্তা পরিবর্তন করে ডেমরা দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করে।
ফার্মগেট থেকে শাহবাগ: রাজধানীর ফার্মগেট থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। এ অবস্থায় পুরো এলাকায় যান চলাচল বন্ধ ছিল দিনভর। বেলা ১ টা ৪০ মিনিটের দিকে বাংলামটর এলাকায় বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের গাড়ি উল্টোপথ দিয়ে যাওয়ায় তা আটকে দেয় শিক্ষার্থীরা। পরে তিনি গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা তার গাড়িকে উল্টো পথে না গিয়ে শাহবাগ হয়ে ঘুরে যাবার পরামর্শ দেয়। পরে তিনি শাহবাগের দিকে চলে যান। শাহবাগ এলাকায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের কুশপত্তলিকা পোড়ায়। সকাল পৌনে ১০টার দিকে রাজধানীর সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, তেজগাঁও কলেজ, সিটি কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী কলেজ, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের শিক্ষার্থীরা শাহবাগে রাস্তা অবরোধ করে। এতে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
শাহবাগ ও বাংলামটর এলাকায় পুলিশ ঘটনাস্থলে থাকলেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ তাদের বার বার বলেছে সড়ক ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু, তারা পুলিশের কোনো কথা শুনেনি। একপর্যায়ে দুপুর পৌনে ১টার দিকে শাহবাগ ও বাংলামটর এলাকায় পুলিশের অনুরোধে শিক্ষার্থীরা মূল সড়কের একপাশে দাঁড়ায়। তখন গাড়িগুলো কিছুটা ধীরে ধীরে চলতে থাকে। কিন্তু, শিক্ষার্থীরা সড়কের প্রত্যেকটি গাড়ির লাইসেন্স দেখতে চান। এতে গাড়ির চালকের সঙ্গে তাদের তর্কাতর্কি হয়। যেসব গাড়ির চালক তাদের ব্যক্তিগত ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে পারেননি সেইসব গাড়ির চাবি তারা কেড়ে নেয়। ওইসব গাড়িগুলো সড়কের একপাশে রেখে দেয় চালকেরা। লাইন ধরে প্রত্যেক চালকের গাড়ির ব্যক্তিগত লাইসেন্স দেখার কারণে আবারো প্রচণ্ড যানজট দেখা দেয়। এদিকে, বাংলামটর এলাকায় প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করে। সেখানে তারা সকল গাড়ির চালকের লাইসেন্স দেখতে চান। যারা লাইসেন্স দেখাতে ব্যর্থ হয় তাদের গাড়ি আটকায়। তবে বাংলামটর থেকে মগবাজারগামী সড়কটি তারা অবরোধ না করার কারণে পুলিশ সকল গাড়িগুলো ওই সড়কের পাঠিয়ে দেয়।
আন্দোলনরত একদল ছাত্র ফার্মগেটে সড়ক অবরোধ করে বাস ও বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের লাইসেন্স পরীক্ষা শেষে মিছিল করে। এ সময় সড়কে সকল প্রকার যানচলাচল বন্ধ ছিল। মিছিল নিয়ে সার্ক ফোয়ারা মোড়ে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে আসে। তারা সেখানে স্বাধীন পরিবহনের একটি বাসের চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করছিল। শাহবাগের দিক থেকে আসা বাসটিতে আগে থেকেই সাদা ইউনিফর্ম পরা কিছু ছাত্র ছিল। তারাই গাড়িটি কারওয়ান বাজার সিগনালে থামায়। এ সময় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর বাসটি চালাচ্ছিলো। কিশোর চালকের কোনো লাইসেন্স না থাকায় ছাত্ররা যাত্রীদের বলে, ‘আপনারা নেমে যান, আমরা গাড়ির কোনো ক্ষতি করবো না। এই গাড়ি নিরাপদ না।
নীল রংয়ের স্কুল ড্রেস পরা প্রায় দুই-আড়াইশ’ ছাত্র এ সময় গাড়িটিকে ঘিরে থাকে। এ সময় হঠাৎ ইউনিফর্ম ছাড়া সাদা টি-শার্ট পরা এক যুবক একটি ইট নিয়ে গাড়ির সামনের কাচ ভেঙে ফেলে। এরপর সে পালাতে চাইলে তড়িঘড়ি করে ছাত্ররা তাকে আটকায়। ছাত্ররা ভাঙচুরকারী যুবককে পাকড়াও করে দূরে দাঁড়ানো পুলিশের কাছে নিয়ে যায়। ছাত্ররা বারবার বলছিল, ‘তুই গাড়ি ভাঙলি ক্যান? আমরা কি ভাঙচুরের আন্দোলন করতেছি?’। পরে তারা যুবকটিকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে।
মতিঝিল এলাকা: দুপুর থেকেই উত্তাল হয়ে উঠে মতিঝিলসহ আশপাশের এলাকা। নৌ পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন দাবিতে শিক্ষার্থীরা মতিঝিল গোলচত্বরসহ আশেপাশের বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করে। নটরডেম, আইডিয়ালসহ আশেপাশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের অবরোধে ওই এলাকার সব ধরনের যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মতিঝিলের কেন্দ্রবিন্দু শাপলা চত্বর ঘেরাও করে নটরডেমের শিক্ষার্থীরা।
এসময় তারা নানা স্লোগানে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ দাবি করে। এরপর দুপুর ১২টায় পর নটরডেম কলেজসহ আশেপাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি হওয়ার পর দল বেঁধে শিক্ষার্থীরা প্রথম ক্যাম্পাসের সামনে পরে শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয়। এতে আশেপাশের সব রাস্তার যানবাহন বন্ধ হয়ে যায়। বিকাল ৪টা পর্যন্ত তারা সড়কে অবস্থান করে।
সায়েন্স ল্যাব: সকাল থেকেই ধানমন্ডি সাইন্স ল্যাব- সিটি কলেজ মোড়ে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। প্রথমে ঢাকা সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীবৃন্দ আন্দোলন শুরু করলেও, তাদের সঙ্গে একে একে যুক্ত হয় সরকারি বিজ্ঞান কলেজ, ইম্পিরিয়াল কলেজ, ধানমন্ডি আইডিয়াল কলেজ, ধানমন্ডি ল্যাবরেটরি কলেজ, ড্যাফোডিল কলেজসহ আশপাশের আরো বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা।
আন্দোলনের শুরুতে রাস্তায় চলাচল করা সকল গাড়িই থামিয়ে দেয় তারা। এ সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশ সিটি কলেজের দিকে আগত সকল গাড়িরই বিআরটিএ কর্তৃক গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চায়। যাদের কাগজ ঠিক ছিল, তাদের কিছু না বলে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে বলেন তারা। কিন্তু লাইসেন্স দেখাতে না পারায় অনেক গাড়িরই চাবি খুলে নেয় ছাত্ররা। আনুমানিক বেলা ১২টার দিকে পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের একটি গাড়ি আন্দোলনরত সামনে আসলে সিটি কলেজের একজন ছাত্র গাড়িটির সামনে গিয়ে বাধা দেয়।
এ সময় পুলিশের গাড়ি ঘিরে ধরে চালকের কাছে লাইসেন্স দেখতে চান শিক্ষার্থীরা। চালক লাইসেন্স দেখাতে না পারায় শুরু হয় বাক-বিতণ্ডা। সিটি কলেজের ইউনিফর্ম পরিহিত এক শিক্ষার্থী জানায়, তারা লাইসেন্স দেখতে চেয়েছিল, কিন্তু পুলিশের গাড়ির চালক তা দেখাতে পারেননি। পুলিশের পোশাক পরিহিত ওই গাড়ির চালকের আসনে থাকা পুলিশ কনস্টেবল অরবিন্দ সমাদ্দার বলেন, ‘আমরা সরকারি চাকরি করি। লাইসেন্স না দেখে তো আর চাকরি দেয়নি।’ তাহলে লাইসেন্স দেখাতে পারছেন না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি গাড়ি, আমাদের গাড়িতে করে খাবার নেয়া হয়। কাজের সময় আমরা লাইসেন্স নিয়ে বের হই না। কাগজ অফিসে থাকে।’ প্রায় আধা ঘণ্টা একই জায়গায় আটকে থাকার পর আশেপাশের বাড়তি পুলিশ এসে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে ওই পিকআপটি ছাড়িয়ে নিয়ে যায়।
মিরপুর এলাকা: সকাল থেকেই সড়ক অবরোধ করেছে মিরপুরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। মিরপুর এক, দশ, তের ও শেওড়া পাড়া এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা দিনভর সড়কে অবস্থান করে বিক্ষোভ। মিরপুর ১০ নম্বরে বিক্ষোভ চলাকালে এক স্কুল শিক্ষার্থীকে মারপিট করে পরিবহন শ্রমিকরা। পরে ওই এলাকায় অবস্থান নিয়ে সব সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় শিক্ষার্থীরা। মিরপুর ১০ গোলচত্বর দিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের একটি গাড়িতেও ভাঙচুর করে শিক্ষার্থীরা। শেওড়া পাড়া এলাকায় গ্রিন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত অবরোধ করলে সড়কে দিনভর যান চলাচল বন্ধ ছিল।
শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন আজ: এদিকে বিমানবন্দর সড়কের দুর্ঘটনাস্থলে প্রেস ব্রিফিং করে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা। বৃহস্পতিবার সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলগুলোতে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে ‘সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ছাত্র আন্দোলন’। সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাত দফা দাবির কথা তুলে ধরে শিক্ষার্থীরা।
দাবিগুলো হলো-১. বেপরোয়া ড্রাইভারকে অবিলম্বে ফাঁসি দিতে হবে ও  ড্রাইভারদের সঙ্গে মালিক পক্ষকেও দুর্ঘটনার দায়ভার নিতে হবে; ২. এই শান্তি অবিলম্বে সংবিধানে সংযোজন করতে হবে, সব ফিটনেসবিহীন গাড়ির রুট পারমিট অবিলম্বে বাতিল করতে হবে; ৩. সড়কের প্রত্যেকটি মোড়ে মোড়ে সিসি ক্যামেরা লাগাতে হবে, সিসি ক্যামেরার সুষ্ঠু তদারকি করতে হবে; ৪. সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের সামনে স্পিডব্রেকার ও জেব্রা ক্রসিং রাখতে হবে; ৫. বিআরটিএর অধীনে সব চালক ও হেলপারকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান করতে হবে, বিআরটিএকে সেনাবাহিনীর আওতাভুক্ত করতে হবে; ৬. শুধু ঢাকা নয় সারা দেশেই শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং ৭. হাঁটার জন্য উপযুক্ত ফুটপাথ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে আজকের কর্মসূচি পালিত হবে।

কংগ্রেস বাংলাদেশি অভিবাসীদের বের করে দেয়ার সাহস দেখাতে পারেনি- অমিত শাহ

ক্ষমতায় থাকতে ইউপিএ সরকার বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের বের করে দেয়ার সাহস দেখাতে পারেনি। এখন বিরোধীরা এসব অবৈধ অভিবাসীদের তাদের  ভোট ব্যাংক হিসেবে দেখছে। সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি করেছেন ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ। ভারতের রাজনীতিকে কাঁপিয়ে দেয়া আসামের নাগরিকত্ব বিষয়ক এনআরসি নিয়ে  তিনি নয়া দিল্লিতে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা পিটিআই। সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলগুলোতে বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী ইস্যুতে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন বিজেপি প্রধান। এ সময় তিনি বলেন, তার দল জাতীয় নিরাপত্তা ও ভারতীয়দের অধিকারের পক্ষে। তাই আসামে এনআরসি বাস্তবায়ন করা হবে শেষ ‘ফুল স্টপ’ পর্যন্ত।
এ নিয়ে তিনি কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের মতো দলগুলোর সমালোচনাকে প্রত্যাখ্যান করেন। অমিত শাহ বলেন, এনআরসির ম্যান্ডেট হলো অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করা। এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। তখন ক্ষমতায় ছিল ইউপিএ সরকার। কিন্তু অবৈধ বাংলাদেশিদের দেশ থেকে বের করে দেয়ার সাহসে ঘাটতি ছিল ওই সরকারের। এখন এনআরসি বাস্তবায়ন হবে শেষ ‘ফুল স্টপ ও কমা’ পর্যন্ত বা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এরই মধ্যে বিভক্তির নীতি গ্রহণ করার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তার কথার জবাব দেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, নির্বাচনে জেতার জন্য মমতা অবৈধ অভিবাসীদের ভোটব্যাংক হিসেবে দেখেন।
অন্যদিকে তার দল কাজ করছে দেশের নিরাপত্তা ও নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে। মানবাধিকারের ভিত্তিতে এনআরসি নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে তাও প্রত্যাখ্যান করেন অমিত শাহ। তিনি বলেন, যেসব মানুষ মানবাধিকারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে কথা বলছেন তাদের উদ্বেগ দেখানো উচিত আসামের মানুষের অধিকারের বিষয়ে। তিনি পাল্টা প্রশ্ন রাখেন, আসামের মানুষের কি কোনো মানবাধিকার নেই? ভারতীয় নাগরিকদের মানবাধিকার রক্ষার জন্যই এনআরসি করা হয়েছে। এ নিয়ে ভারতীয় নাগকিরদের কারো উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অথবা অন্য রাজ্যের যেসব নাগরিক আসামে বসবাস করছেন তাদেরও অবিচারের মুখে পড়ার কোনো ভয় নেই। এনআরসি বাস্তবায়ন হবে দৃঢ়তার সঙ্গে ও সুষ্ঠুভাবে। বিজেপি এ ইস্যুর পক্ষে এবং ভারতীয় নাগরিকদের অধিকারের পক্ষে তার অবস্থান। বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে যারা উদ্বিগ্ন সেই পক্ষের বিরুদ্ধে এ দলের অবস্থান।
অমিত শাহ বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিজেপি। এটাই আমাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার। অন্য দলগুলোরও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত। এক্ষেত্রে এনআরসি তারা সমর্থন করেন কিনা সে প্রশ্নে তাদের শুধু ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলা উচিত। তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী যে আসাম চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন তারই মূল এনআরসি। এর সুস্পষ্ট উচ্চারণ হলো, প্রতিজন অবৈধ অভিবাসীকে শনাক্ত করতে হবে এবং তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। কিন্তু কেন্দ্রে এবং আসামে বেশ কয়েকটি কংগ্রেস শাসিত সরকার ছিল। তারা এটা বাস্তবায়ন করার সাহস দেখায়নি। পরে সুপ্রিম কোর্ট এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসে এবং মোদি সরকার প্রক্রিয়া গ্রহণ শুরু করে। পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করছে সুপ্রিম কোর্ট। অমিত শাহ আরো বলেন, আমি কংগ্রেসের কাছে জানতে চাই তারা কেন এনআরসি নিয়ে ভোটব্যাংক বানানোর জন্য প্রশ্ন তুলছে। কংগ্রেসই তো ২০০৫ সালে এনআরসি কার্যক্রম শুরু করেছিল। কিন্তু আপনারা অবৈধ বাংলাদেশিদের বের করে দেয়ার সাহস দেখাতে পারেননি। কারণ, তারা আপনাদের কাছে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ। আপনাদের কাছে জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিকদের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। জাতীয় স্বার্থের ওপরে গিয়ে ভোটব্যাংক রাজনীতি করা উচিত নয় কংগ্রেসের।
এটা দুঃখজনক যে বিজেপি ও বিজেডি ছাড়া আর কোনো দল অবৈধ অভিবাসীদের জন্য দেশে জায়গা নেই এই কথাটি বলতে পারলো না। এ নিয়ে বিজেপি রাজনীতি করছে না। কংগ্রেসের অবস্থান পরিবর্তনের স্বভাব আছে। এ সময় কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ্য করে অমিত শাহ বলেন, তাকে স্মরণ করতে বলবো তার দাদি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বক্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ভারতে অবৈধ অভিবাসীদের কোনো জায়গা নেই। এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এনআরসিকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হতে পারে গৃহযুদ্ধ ও রক্তপাত। এর নিন্দা জানান অমিত শাহ। তিনি বলেন, গৃহযুদ্ধের নামে একবার দেশ বিভক্তি ছিল। তাকে স্পষ্ট করে বলতে হবে তিনি কোন রকম গৃহযুদ্ধের বিষয়ে কথা বলছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতাদের এনআরসি বাস্তবায়নের দাবির বিষয়েও তিনি কথা বলেন। বলেন, বর্তমানে আসামে এটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এ ইস্যুতে উপযুক্ত সময়ে তার দল ব্যবস্থা নেবে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীকে পিষে চলে গেল পিকআপ

চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট দেখতে আটকানো হয়েছিল একটি পিকআপ ভ্যান। ভ্যানটি ঘিরে যখন শিক্ষার্থীরা চালকের কাছে কাগজ চাইছিল তখন বেপরোয়া চালক সটকে পড়ার চেষ্টা করে। তাকে আটকাতে সামনে দাঁড়ায় এক শিক্ষার্থী। বেপরোয়া চালক দিব্যি  ওই শিক্ষার্থীর ওপর দিয়েই ভ্যানটি চালিয়ে পালিয়ে যায়। এ সময় পিকআপ ভ্যানের নিচে পড়ে গুরুতর আহত হয়েছে ওই শিক্ষার্থী। তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ঘটনাটি ঘটে যাত্রাবাড়ী থানার শনিরআখড়া এলাকায়। পুরো ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় আন্দোলনকারীদের মধ্যে। পরে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা যানবাহনে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে। ওই এলাকায় ব্যাপক গাড়ি ভাঙচুর করে তারা।
গতকাল সকালে ঢাকা-সিলেট রোডের শনির আখড়ায়ও ব্যাপক ছাত্র জমায়েত হয়। তারা গাড়ির চালকের লাইসেন্স আছে কিনা তা পরীক্ষা করছিল। লাইসেন্স না থাকলে তা রাস্তার পাশে সরিয়ে দাঁড় করতে বলা হয়। এমন সময় শনির আখড়ায় রাস্তার একটা অংশ কিছুটা ফাঁকা দেখে একটি পিকআপ ভ্যান দ্রুতগতিতে সেই এলাকা ত্যাগ করার চেষ্টা করে। ততক্ষণে অন্য শিক্ষার্থীরা ওই গাড়িটি ঘিরে ফেলে। গাড়িটি আটকাতে সামনে দাঁড়ায় সরকারি তোলারাম কলেজের এইচএসসির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ফয়সাল মাহমুদ। তখন গাড়িটি না থামিয়ে তার উপর দিয়েই বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে পালিয়ে যায়। তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় প্রো-অ্যাক্টিভ মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়।
তার বন্ধু যাত্রাবাড়ীর কবি নজরুল কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও ধোলাইপাড়ের বাসিন্দা নাইমুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, সকাল থেকে আমি, ফয়সাল ও অন্যরা বাসচাপায় ছাত্র নিহতের প্রতিবাদে ও মন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ দাবিতে মিছিলে ছিলাম। তখন একটি পিকআপ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ফয়সাল মাহমুদের উপর দিয়ে চালিয়ে দেয়া হয়। গতকাল ফয়সাল হাসপাতালে মানবজমিনকে বলেন, সকালে আমার সহপাঠীরা রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করছিল। বেপরোয়াগতিতে একটি পিকআপ আমাকে চাপা দেয়। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।
একটি সিএনজি গ্যাস স্টেশনে কর্মরত তার পিতা শামসুল হক বলেন, সকাল ৮টায় সে কলেজের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়। ৯টার সময় দনিয়া কলেজের সামনে রাস্তা পারাপারের সময় একটি পিকআপ তার উপর উঠে গেলে সে গুরুতর আহত হয়।
চিকিৎসাধীন ফয়সালের বাম কোমরে আঘাত লেগেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। হাসপাতালটির চিকিৎসক একেএম বাহার বলেন, তার কোমরের বামপাশে ফ্র্যাকচার হয়েছে। যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন জ্ঞান ছিল না। প্রস্রাবও বন্ধ ছিল। প্রয়োজনীয় ইনজেকশন দেয়া হয়েছে। সে এখন শঙ্কামুক্ত। তাকে এক-দেড় মাস হাসপাতালে থাকতে হতে পারে।
আহত ফয়সাল তার বাবা-মা’র সঙ্গে কদমতলীর মোহাম্মদীপাড়ায় থাকেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে সবার বড়।

ট্রাম্প বিশ্বাসযোগ্য না, আলোচনার প্রস্তাব মূল্যহীন: ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটি বলেছে, ট্রাম্পকে বিশ্বাস করা যায় না (আনরিলায়েবল)। আর তার দেয়া বৈঠকের প্রস্তাব নিতান্তই মূল্যহীন। মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি এসব কথা বলেন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
খবরে বলা হয়, ইরান ও ছয় বিশ্ব শক্তির মধ্যে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়ার প্রায় তিন মাসের মাথায় সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বৈঠকে বসার প্রস্তাব দেন। অব্যাহত হুমকি ও সতর্ক বার্তার মধ্যেই তিনি জানান, কোনো পূর্ব শর্ত ছাড়াই তিনি ইরানের সঙ্গে যে কোনো সময় বৈঠকে বসতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের বৈঠকে বসার আহ্বান মঙ্গলবার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি বলেন, ট্রাম্পের প্রস্তাব তার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না। তিনি ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা ও বলপ্রয়োগ আলোচনার পুরোপুরি বিপরীত। ইরানি জাতির কাছে ট্রাম্প কিভাবে প্রমাণ করবেন যে, বাস্তবেই তার বক্তব্যের সত্যিকারের উদ্দেশ্য সমঝোতা এবং তিনি জনপ্রিয়তা লাভ করার জন্য ওই কথা বলেননি। এদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার আলি মোতাহারি বলেছেন, ইরান ও ছয় বিশ্ব শক্তির মধ্যে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কোনো সমঝোতা করলে তা হবে লজ্জাজনক বিষয়। যদি ট্রাম্প পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে না নিতেন এবং নতুন করে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করতেন, তাহলে তার সঙ্গে বৈঠকে বসতে আমাদের কোনো আপত্তি ছিল না। আর জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি বিষয়ক ইরানের সংসদীয় কমিটির প্রধান হেসমাতুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রকে পারমাণবিক চুক্তিতে ফিরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিতে ফিরে আসার পরই ইরান দেশটির সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি বিবেচনা করবে। দেশটির বৈদেশিক নীতি বিষয়ক স্ট্র্যাটেজিক কাউন্সিলের প্রধান কামাল খারাজি ট্রাম্পের প্রস্তাবকে মূল্যহীন আখ্যা দেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই বৈঠকে বসার প্রস্তাব দিলেও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার ক্ষেত্রে কয়েকটি দাবির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইরানিরা যদি নিজেদের জনগণের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন আনে, তাদের অপকর্ম কমিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ করতে কার্যকর কোনো চুক্তি করতে রাজি থাকে, তখনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন, তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। মাইক পম্পেওয়ের এমন শর্ত ইরান কখনোই মেনে নেবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্ল্ড স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি  বলেন, ইরানের কেউই পম্পেওর দেয়া শর্ত মেনে নেবে না। কেননা এটা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যা। পম্পেওর শর্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অভ্যন্তরীণ নীতিতে নাক গলাতে চাচ্ছে। আর দ্বিতীয় শর্তে বোঝা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বৈদেশিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে। আর তৃতীয় শর্তে মনে হচ্ছে, তারা ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচি বা ইরানের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র থাকুক এটা চায় না।