Tuesday, July 29, 2025

গাজায় কেউ না খেয়ে নেই—দাবি নেতানিয়াহুর, দ্বিমত ট্রাম্পের

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, গাজায় কেউ অনাহারে নেই। তাঁর দাবি, ‘গাজায় অনাহারে রাখার কোনো নীতি (আমাদের) নেই এবং গাজায় কেউ না খেয়েও নেই। যুদ্ধ চলার পুরো সময় আমরা সেখানে মানবিক সহায়তা প্রবেশ করতে দিয়েছি। না হলে গাজায় এখন কোনো মানুষই থাকত না।’

তবে গাজায় কেউ অনাহারে না থাকার নেতানিয়াহুর এ দাবির সঙ্গে একমত হতে পারেননি তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উপত্যকাটির অস্থিচর্মসার মানুষের যেসব ছবি প্রকাশ পাচ্ছে সেগুলোর কথা উল্লেখ করে গতকাল সোমবার তিনি বলেন, ‘ওই শিশুদের খুবই ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য ত্রাণসহায়তা প্রবেশের সুযোগ করে দিতে ইসরায়েল এ সপ্তাহান্তে সেখানে মানবিক বিরতি ঘোষণা করেছে। আকাশ থেকে ত্রাণ ফেলা ও অন্যান্য উদ্যোগের ঘোষণাও এসেছে।

কিন্তু বাস্তবে সেখানে পরিস্থিতির খুবই সামান্য বা একেবারেই পরিবর্তন হয়নি বলে জানাচ্ছেন গাজার বাসিন্দারা।

জাতিসংঘ বলেছে, ত্রাণসহায়তা বৃদ্ধির এ উদ্যোগ এক সপ্তাহ ধরে চলবে। তবে ইসরায়েল এখনো তাদের এ ব্যবস্থা কত দিন জারি থাকবে সে বিষয়ে কিছু জানায়নি।

ইসরায়েল আকাশ থেকে গাজায় ত্রাণ ফেলেছে—এমন একটি স্থানে উপস্থিত ছিলেন হাসান আল-জালান। তিনি বলেন, ‘এভাবে ত্রাণ দেওয়া ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য অবমাননাকর।’ যেখানে ত্রাণ ফেলা হচ্ছে সেখানে মানুষ ত্রাণের জন্য লড়াই করছে। ওপর থেকে ছোলাভর্তি ক্যানগুলো মাটিতে পড়ে ভেঙে ভেতরের সব ছড়িয়ে–ছিটিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

ইসরায়েলের দাবি, হামাসের কারণে গাজায় ফিলিস্তিনিদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, হামাস সদস্যরা ত্রাণ লুট করে নিজেদের কাছে নিয়ে নিচ্ছেন এবং গাজায় নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সেগুলো ব্যবহার করছেন।

অবশ্য বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ইসরায়েলের এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে। জাতিসংঘও গাজায় পরিকল্পিতভাবে ত্রাণ লুট হওয়ার ইসরায়েলি অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বরং জাতিসংঘ বলেছে, গাজায় যথেষ্ট পরিমাণে ত্রাণ প্রবেশ করতে দিলে লুটপাট কমে যাবে বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

অনাহারে মৃত্যু বাড়ছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) রোববার বলেছে, এ মাসে গাজায় অনাহারে ভুগে ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪ শিশু রয়েছে। এ বছরের প্রথম ৬ মাসে উপত্যকাটিতে অনাহারে ১১ জন মারা গেছেন। সে তুলনায় এক মাসে ৬৩ জনের মৃত্যু উদ্বেগজনক রকম বেশি।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনাহারে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি বলে উল্লেখ করেছে। তারা বলেছে, এ মাসে গাজায় অনাহার ও অপুষ্টিতে ভুগে ৮২ জন মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে ২৪টি শিশু ও ৫৮ জন প্রাপ্তবয়স্ক।

গতকাল গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আরও বলা হয়, বিগত ২৪ ঘণ্টায় অনাহারে ১৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সেখানে যুদ্ধের মধ্যে হতাহতের প্রকৃত তথ্য পাওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস বলে বিবেচনা করে জাতিসংঘ।

দ্য পেশেন্টস ফ্রেন্ডস হাসপাতাল গাজার উত্তরাঞ্চলে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য প্রধান জরুরি কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। হাসপাতালটি থেকে বলা হয়েছে, এ মাসে তারা প্রথমবারের মতো অনাহারে এমন শিশুদের মৃত্যু দেখছে, যারা আগে অসুস্থ ছিল না।

অনাহারে মারা যাওয়া কয়েকজন বয়স্ক ব্যক্তি ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা কিডনির রোগে ভুগছিলেন। দীর্ঘদিন অনাহারে থাকার কারণে তাঁদের অসুস্থতা আরও গুরুতর হয়ে উঠেছিল বলে জানান গাজার চিকিৎসা কর্মকর্তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলেছে, উত্তর গাজায় অনাহারে চরম অপুষ্টির মাত্রা তিন গুণ বেড়েছে। সেখানে পাঁচ বছরের নিচে প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে প্রায় একজন তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। মধ্য ও দক্ষিণ গাজায়ও অপুষ্টির মাত্রা দ্বিগুণ হয়েছে।

গাজায় মাত্র চারটি বিশেষায়িত কেন্দ্র রয়েছে; যেখানে অপুষ্টির চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘ বলেছে, সেগুলোতে ভিড় উপচে পড়ছে।

খাদ্যসংকট নিয়ে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’ কয়েক মাস ধরে গাজায় দুর্ভিক্ষের সতর্কতা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইসরায়েল প্রবেশাধিকার সীমিত রাখায় সেখান থেকে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। তাই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা যাচ্ছে না।

গাজায় অপুষ্টি উদ্বেগজনক পর্যায়ে, সতর্ক করল ডব্লিউএইচও

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অপুষ্টির মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা বিপজ্জনক গতিপথে রয়েছে।

দীর্ঘ বিরতির পর গাজায় উড়োজাহাজ থেকে ত্রাণসামগ্রী ফেলার কার্যক্রম আবার শুরুর পর ডব্লিউএইচওর কাছ থেকে এ সতর্কবার্তা এল।

গতকাল রোববার জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত গাজায় উড়োজাহাজ থেকে ত্রাণসামগ্রী ফেলে। এর আগে ইসরায়েল জানায়, তারা গাজার কিছু অংশে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে যুদ্ধ বন্ধ রাখবে। যাকে তারা বলছে, ‘কৌশলগত বিরতি’। এ বিরতির আওতায় জাতিসংঘের ত্রাণবহরের জন্য করিডর তৈরি করে দেওয়ার কথাও জানায় তারা।

ইসরায়েলের দাবি, গাজাবাসীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে রাখার যে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ উঠেছে, তা খণ্ডন করতেই এ বিশেষ ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের ভাষ্য, হামাস ইচ্ছাকৃতভাবে এমন অভিযোগ তুলে বিশ্বের সামনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে।

জর্ডানের সামরিক বাহিনী বলেছে, গাজাবাসীর জন্য ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কাজ করছে। ইতিমধ্যে তারা উড়োজাহাজ দিয়ে তিন দফায় গাজায় ২৫ টন ত্রাণসামগ্রী ফেলেছে। এ ছাড়া মিসর হয়ে ত্রাণবাহী লরির একটি বহর গাজায় প্রবেশ করেছে। আরেকটি বহর ঢোকার কথা রয়েছে জর্ডান থেকে।

তবে গাজার মধ্যাঞ্চলে একটি ত্রাণবহর যে পথে অগ্রসর হচ্ছিল, তার পাশেই ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৯ জন নিহত ও ৫৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। এমনকি গত শনিবার যুদ্ধ সাময়িক বন্ধের বিষয়টি কার্যকরের এক ঘণ্টার মাথায় গাজার একটি আবাসিক এলাকায় বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।

স্থানীয় সূত্রগুলো বিবিসিকে জানিয়েছে, গাজার মধ্যাঞ্চলের নেতজারিন করিডরের সালাহ আল-দিন সড়কে জাতিসংঘের ত্রাণবহরের অপেক্ষায় বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। সেখানেই গুলির ঘটনা ঘটে। হতাহত ব্যক্তিদের নুসাইরাতের আল-আওদা হাসপাতালে নেওয়া হয় বলে জানান হাসপাতালটির একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তাদের সেনাদের দিকে কিছু সন্দেহভাজন ব্যক্তি এগিয়ে আসছিলেন। তাই সেনারা সতর্কবার্তা হিসেবে গুলি ছোড়েন। তবে এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তারা কিছু জানে না।

অবরুদ্ধ গাজায় ত্রাণসহায়তা প্রবেশ করতে না দেওয়া নিয়ে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে ইসরায়েল। এর মধ্যে গাজায় চরম খাদ্যসংকট ও অনাহারের ঘটনা নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। এ চাপে পড়ে ইসরায়েল এখন কিছুটা নমনীয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বলেছে, গাজার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কয়েক দিন ধরে না খেয়ে দিন পার করছে। আর প্রতি চারজনের একজন দুর্ভিক্ষসদৃশ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, উড়োজাহাজ থেকে ত্রাণ ফেলা চরম দুর্ভোগ লাঘবে সহায়ক হবে। তবে গাজায় ত্রাণসহায়তা পাঠানোর একমাত্র কার্যকর ও টেকসই উপায় হলো স্থলপথ।

গাজায় যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। তিনি বলেছেন, প্রতিদিন গাজায় আরও ধ্বংস, আরও হত্যাকাণ্ড ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আরও অমানবিকতা চলছে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁর প্রশাসন গাজায় আরও ত্রাণ পাঠাবে। তবে তিনি এ কথাও বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা, যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা নয়।

 গাজায় তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশু। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
গাজায় তীব্র অপুষ্টিতে ভোগা একটি শিশু। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফাইল। ছবি: এএফপি ও রয়টার্স

ফ্রান্স কেন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে, আসল কারণ কী by মুহাম্মদ জুলফিকার রাহমাত

ফ্রান্সের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইন্দোনেশিয়া ‘শান্তির পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। ভাসা ভাসাভাবে দেখতে গেলে, এই কূটনৈতিক সমর্থন ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ফ্রান্সের এই ইঙ্গিতের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর ও বিপজ্জনক হিসাব–নিকাশ, যা কেবল বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে না, বরং সেটিকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ফ্রান্স যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটা মোটেই ন্যায়বিচার নয়। এটি স্বাধীনতাও নয়। এটি সেই পুরোনো বিভ্রমেরই আধুনিক সংস্করণ, যা দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের বন্দী ও ভূমিহীন করে রেখেছে। সেই তথাকথিত দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান।

জাকার্তার সরকারি বিবৃতিতে ফ্রান্সের পদক্ষেপকে স্বাগত জানানো হয়েছে তার কারণ হলো একটি ‘সার্বভৌম ও স্বাধীন’ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করা হয়েছে। এর ভিত্তি হবে ১৯৬৭ সালের সীমানা এবং যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি কেমন ধরনের রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করছেন। একটি সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকৃত ফিলিস্তিন, ইসরায়েলের স্বীকৃতি যেখানে থাকবে। মাখোঁর কল্পিত রাষ্ট্রে বসতি উচ্ছেদের কথা নেই, দখলকৃত ভূমিতে পুনর্বাসনের কথা নেই। এমনকি গাজায় যুদ্ধাপরাধের জন্য জবাবদিহির কোনো বালাই নেই। শুধু একটি কূটনৈতিক তকমার বিনিময়ে একপেশে আত্মসমর্পণ।

এটি শান্তির পথে কোনো পদক্ষেপ নয়—এটি স্থায়ী দাসত্বের ছক।

ফ্রান্সের অবস্থান শুধু পক্ষপাতদুষ্টই নয়, এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ম্যাখোঁ ‘হামাসের নিরস্ত্রীকরণের’ আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে গাজা পুনর্গঠন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে ইসরায়েলের নিরস্ত্রীকরণ কোনো দাবি নেই, বেসামরিক মানুষ হত্যার জন্য কোনো জবাবদিহি নেই, আর ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত সার্বভৌমত্বের কোনো নিশ্চয়তাও নেই। বরং ফিলিস্তিনিদের বলা হচ্ছে প্রতিরোধ ত্যাগ করতে, অথচ দখলদার রাষ্ট্রটির ওপর দখল শেষ করার কোনো চাপই নেই।

ইন্দোনেশিয়া যদি কোনো শর্ত ছাড়াই এই চুক্তিকে প্রশংসা করে, তবে সেটি এমন একটি কাঠামোকে সমর্থন করা হয়, যা কূটনীতির ভাষায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার বিসর্জন দেওয়ার পথ খুলে দেয়। এভাবে, ইন্দোনেশিয়াও এমন এক প্রক্রিয়ার অংশ হচ্ছে, যা ইসরায়েলকে তার দীর্ঘস্থায়ী দখল ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

কারণ, আমরা গাজায় যা দেখছি, তা শুধু যুদ্ধ নয়—এটি একটি জাতিকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার একটি প্রক্রিয়া।

ইসরায়েলের নেতারা সংযমের কোনো ভান করছেন না। দেশটির অর্থমন্ত্রী বেজালেল বেজালেল স্মোট্রিচ ঘোষণা দিয়েছেন যে গাজাকে ‘পুরোপুরি ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া’ উচিত। ইসরায়েলের আইনসভা নেসেটের সদস্যরা এবং শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা এই ভূখণ্ডকে ‘সমূলে উৎপাটন’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। অনাহার, অবরোধ ও বোমাবর্ষণ কোনোটিই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এর পেছনে সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে। লক্ষ্য শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, বরং গাজাকে জনশূন্য করে ফেলা।

আর এই গণহত্যার আকাঙ্ক্ষাটা নতুন কিছু নয়। এটি ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থীদের দীর্ঘদিনের একটি নীলনকশার অংশ, যেটি ‘মহান ইসরায়েল’ প্রকল্প নামে পরিচিত। এই নীলনকশায় কেবল জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করাটাই উদ্দেশ্য নয়, এর বিস্তৃতি আরও বেশি। একটি বিশাল ভূখণ্ডে কেবল একটি জাতির নিয়ন্ত্রণে থাকার স্বপ্ন এখানে রয়েছে। এই মডেলে ফিলিস্তিনিরা নাগরিক বা প্রতিবেশী নয়, তারা এমন এক পথের কাঁটা, যাদেরকে তুলে ফেলতে হবে।

এই প্রেক্ষাপট থেকেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি ফ্রান্সের স্বীকৃতিকে বুঝতে হবে। এটি কোনো নীতিগত সাহসী সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিশ্বজুড়ে সমালোচনার মুখে একটি বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার কূটনৈতিক কৌশল। সচেতনভাবে হোক আর অসচেতনভাবে হোক, এটি গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে ইন্দোনেশিয়া, ইসরায়েলি শাসকদের নৈতিক মনোবল সেটিকে গ্রহণ করে, সেই শাসনব্যবস্থার জন্য একটি নৈতিক বৈধতা তৈরি করে দিচ্ছে।

এত দুর্ভোগের মুখে, অগ্রগতির যেকোনো ইঙ্গিতকে স্বাগত জানানো প্রলুব্ধকর হতে পারে। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া প্রতীকী স্বীকৃতি কেবল বিদ্যমান বৈষম্যকেই আরও শক্তিশালী করে। একটিকে যদি বলা হয় ‘রাষ্ট্র’, অথচ সেটি থাকবে ইসরায়েলি চেকপোস্টে ঘেরা, কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকবে না, থাকবে না ফেরার অধিকার—তাহলে তা প্রকৃতপক্ষে কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং একটি খোলা আকাশের নিচের কারাগার, যার হাতে শুধু একটি পতাকা তুলে দেওয়া হয়েছে।

গাজাবাসী যে সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে আছে, তাতে কোনো অগ্রগতির আভাসকে স্বাগত জানানো যায় না। কিন্তু কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া কোনো প্রতীকী স্বীকৃতি বিদ্যমান বাস্তবতাকেই আরও শক্তিশালী করবে। সামরিক বাহিনীহীন ফিলিস্তিন! এর মানে হচ্ছে, ইসরায়েলি চেকপোস্টে ঘেরা একটি জায়গা, যাদের কোনো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকবে না, থাকবে না সেখানে ফেরার অধিকার। এটি কোনো রাষ্ট্র নয়, এটি এমন এক খোলা কারাগার, যেখানে শুধু একটা পতাকা থাকবে।

এখন কূটনৈতিক নাটকের জন্য করতালি দেওয়ার দরকার নেই। এখন প্রয়োজন মিথ্যা সমাধানকে প্রত্যাখ্যান করা। এখন যে দ্বিরাষ্ট্র কাঠামোর কথা বলা হচ্ছে, সেটা ন্যায়বিচারের পথ নয়। এটি এমন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা কিনা উপনিবেশবাদকে সক্ষম করে তোলে।

* মুহাম্মদ জুলফিকার রাহমাত, সেন্টার ফর ইকোনমিকের ইন্দোনেশিয়া-মেনা ডেস্কের পরিচালক
- মিডলইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ বাড়ছেই
গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ বাড়ছেই। ছবি : রয়টার্স

গাজায় দুর্ভিক্ষ, অনাহার, লাশের স্তূপ by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

অব্যাহত বোমা হামলা। সরাসরি গুলি। ক্ষুধা। হাহাকার। আর লাশের স্তূপ গাজায়। অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে নিরীহ মানুষ। এর অর্থ গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে। গত বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর থেকে সতর্ক করা হয়েছে, গাজা দুর্ভিক্ষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এখনও সেটাই বলা হচ্ছে। কিন্তু আসলে পরিস্থিতি যা বলে, তাতে গাজায় চরম আকারে দুর্ভিক্ষ চলছে। অসংখ্য মানুষ আছেন দুই তিনদিন ধরে কিছু খান না। কারণ, খাবার পাচ্ছেন না। শিশুরা অনাহারে থাকতে থাকতে, তাদের গায়ের চামড়া হাড়ের সঙ্গে লেগে গেছে। তাদের জন্য নেই কোনো খাদ্য, শিশুখাদ্য। মায়েদের বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। তারাই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। কোথাও কিছু নেই। চারদিকে শুধু হাহাকার। একে দুর্ভিক্ষ ছাড়া কি বলা যায়! তারপরও সেখানে অব্যাহতভাবে বোমা হামলা করছে ইসরাইল। তারা আসলে গাজাবাসীকে চাপে ফেলে গাজা থেকে উৎখাত করতে চায়। এরপরই গাজায় তাদের কথিত ‘ভূমধ্যসাগরের রিভেরা’ বা রিসোর্ট গড়ে তুলতে পারবে। এরই মধ্যে এমন আয়োজন শুরু হয়েছে।

গাজাবাসীকে পশ্চিমতীরে ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মিত মানবিক শহরে আটকে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে ইসরাইল। সেখানে একবার তাদেরকে ঢোকাতে পারলে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। কারণ, ইসরাইলি সেনারা তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তারা সেই মানবিক সিটির বাইরে যেতে পারবেন না। তাদের নড়াচড়ার কোনো অধিকার থাকবে না। ঠিক পশ্চিমা দেশে অবৈধ অভিবাসীদের যেভাবে আটকে রাখা হয়, সেই একই পরিণতি হবে তাদের। এ অবস্থায় গাজাকে আসলে কী বলা যায়, তা মাথায় ঠাহর হচ্ছে না।

বৃটেনসহ ইউরোপের অনেক দেশ এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গাজায় অবরোধ তুলে নেয়ার জন্য জোর দাবি জানানো হচ্ছে। জাতিসংঘ কথা বলছে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি বৃটিশ পার্লামেন্টারিয়ানদের মধ্যে তীব্র হয়েছে। তারা প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারকে এ জন্য খোলা চিঠি দিয়েছেন।

গাজাকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান ও মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির সঙ্গে আলোচনা করেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন। সব মানুষ গাজায় হত্যাযজ্ঞ, অনাহারে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়ার বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু হায়, মুসলিম বিশ্ব! তাদের মধ্যে এ নিয়ে তেমন কোনো সাড়া নেই। মুসলিম বিশ্বের একীভূত কোনো উদ্যোগ নেই। হয়তো এ কারণে গাজাবাসীকে ক্রমশ নিষ্পেষণ করে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার সাহস দেখাচ্ছে ইসরাইল।

ওদিকে ফ্লোটিলা হানাদা ত্রাণ নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল গাজার দিকে। তাতে ২১ জন ক্রু ছিলেন। তাদের সবাইকে আটক করেছে ইসরাইল। তাদের পরিণতিও হয়তো ফ্লোটিলা মেডেলিনের গ্রেটা থানবার্গদের মতো হতে পারে। হানদালা নৌযানে ১০টি দেশের ১৯ জন কর্মী ও আল জাজিরার দু’জন সাংবাদিক আছেন। কর্মীদের মধ্যে আছেন ফরাসি-সুইডিশ ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য এমা ফুরো, ফরাসি সংসদ সদস্য গ্যাব্রিয়েল ক্যাথালা, ফিলিস্তিনি-মার্কিন মানবাধিকার আইনজীবী হুয়াইদা আরাফ, ইহুদি-আমেরিকান কর্মী জ্যাকব বার্গে, তিউনিসীয় ট্রেড ইউনিয়নিস্ট হাতেম আওইনি, ৭০ বছর বয়সী নরওয়েজীয় কর্মী ভিগডিস বিওরভ্যান্ড এবং অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক তানিয়া সাফি প্রমুখ।

ওদিকে, গাজায় খাদ্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, মে মাসে বিতর্কিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) চালু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী ও মার্কিন ভাড়াটে সেনাদের হাতে এক হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তারা খাদ্য সংগ্রহে গিয়েছিলেন। কেবল শনিবারই খাদ্যের জন্য লাইন ধরার সময় ৪২ জন নিহত হন। গাজাবাসীর দিকে ইসরাইলি সেনারা এমনভাবে গুলি ছুড়ছে, দেখে মনে হতে পারে তারা পাখি শিকার করছে। কিন্তু তারা এ কাজ করে উল্টো সুরে কথা বলছে। তারা বলছে, যারা নিহত হয়েছেন তারা খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের বাইরে মারা গেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক সিনেটর কোরি বুকার গাজায় মানবিক পরিস্থিতিকে ‘বিধ্বংসী ও হৃদয়বিদারক’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে ব্যাপক ত্রাণ সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি মুহূর্ত দেরি মানে শিশুরা, গর্ভবতী নারীসহ অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ও তা এক স্থায়ী ক্ষতি।

অন্যদিকে, ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল ব্যারো জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো হামাসকে নিন্দা জানাবে আরব দেশগুলো এবং এর নিরস্ত্রীকরণের দাবি তুলবে। এর মাধ্যমে ইউরোপের আরও দেশকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথে আনা হবে।

এদিকে বৃটেনে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) হুঁশিয়ারি দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির বিরোধিতা অব্যাহত রাখলে তারা সেপ্টেম্বর মাসে সংসদে ‘প্যালেস্টাইন রিকগনিশন বিল’ উত্থাপন করে ভোটে বাধ্য করবে। ইতিমধ্যে ২২০ জনের বেশি বৃটিশ এমপি, যার মধ্যে স্টারমারের লেবার পার্টির বহু সদস্য আছেন, বৃটেনকে ফ্রান্সের মতো ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কমপক্ষে ৫৯,৭৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১,৪৪,৪৭৭ জন আহত হয়েছেন। গাজায় দুর্ভিক্ষ নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ইসরাইল আকাশপথে কিছু ত্রাণ ফেলার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু এই ত্রাণ চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। আকাশ থেকে ফেলা ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে হুড়োহুড়িতে, সংঘর্ষে মানুষ আহত হচ্ছেন।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিন বিষয়ক কমিশনার জেনারেল ফিলিপ্পে লাজারিনি এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা বলার কারণে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের সেবা থেকে তিনি সরে যাবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন।

দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘে সম্মেলন শুরু আজ: গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল -দুই মানবাধিকার সংস্থা

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের আলোচনা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে জাতিসংঘে সম্মেলন শুরু হচ্ছে। আজ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরে তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন শুরু হবে। সম্মেলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে ফ্রান্স ও সৌদি আরব। সম্প্রতি ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে প্যারিস।

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন বিভক্ত করার প্রস্তাব তোলা হয়। পরে ইহুদিদের জন্য ইসরায়েল এবং আরবদের জন্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। দশকের পর দশক ধরে জাতিসংঘের অধিকাংশ সদস্য ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের সমর্থন জানিয়ে আসছে। তবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনো আলোর মুখ দেখেনি।

এএফপির তথ্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যদেশের মধ্যে ফ্রান্সসহ ১৪২টিই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এ তালিকায় যুক্তরাজ্যও যোগ দেবে বলে আশা ফ্রান্সের। কারণ, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে চিঠি দিয়েছেন ২২১ ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা। জবাবে স্টারমার বলেছেন, এই স্বীকৃতি অবশ্যই বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।

জাতিসংঘের সম্মেলনে ইউরোপের আরও দেশ যে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে পারে, তার ইঙ্গিত দিয়েছেন ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ নোয়েল ব্যারটও। এ বিষয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষক রিচার্ড গোয়ান বলেন, দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের বিষয় গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার পথে ছিল। তবে ফিলিস্তিনকে ফ্রান্সের স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণার পর জাতিসংঘের এ সম্মেলনে প্রাণসঞ্চার হবে।

তবে ফিলিস্তিনের গাজায় ২১ মাস ধরে চলা ইসরায়েলের হামলা, দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন নতুন বসতি স্থাপন এবং দখল করা এলাকাগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার যে পরিকল্পনা কথা দেশটির কর্মকর্তারা তুলে ধরছেন, তাতে দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান শেষ পর্যন্ত ভৌগলিকভাবে সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

‘গাজায় অপুষ্টি উদ্বেগজনক পর্যায়ে’

জাতিসংঘের সম্মেলন যখন শুরু হয়েছে, তখনো গাজায় নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ৫৯ হাজার ৭৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ। হতাহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

ইসরায়েলের অবরোধের কারণে গাজায় চরম আকার ধারণ করেছে খাদ্যসংকট। তবে রোববার থেকে অবরোধ কিছুটা শিথিল করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। গাজার কিছু অংশে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা করে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে তারা। জাতিসংঘের ত্রাণবহরের জন্য করিডর তৈরি করে দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। উড়োজাহাজে করে গাজায় ত্রাণসামগ্রী ফেলেছে জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় অপুষ্টির মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। না খেতে পেয়ে আজও ১৪ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের একজন শিশু।

গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে ইসরায়েল: বলছে ইসরায়েলভিত্তিক দুই মানবাধিকার সংস্থা

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে ইসরায়েলভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় দুটি মানবাধিকার সংস্থা—বতসেলেম ও ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস। সংস্থা দুটি বলেছে, ইসরায়েলকে থামানো দেশটির পশ্চিমা মিত্রদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।

আজ সোমবার মানবাধিকার সংস্থা দুটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় বেসামরিক লোকজনের পরিচয় ফিলিস্তিনি হওয়ার কারণেই কেবল প্রায় দুই বছর ধরে তাঁদের নিশানা করছে ইসরায়েল। এর ফলে ফিলিস্তিনি সমাজে মারাত্মক—কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় নৃশংসতা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও ফিলিস্তিনি সংস্থা একে গণহত্যা বলে বর্ণনা করেছে। এবার ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রভাবশালী দুটি মানবাধিকার সংস্থা এ প্রতিবেদন দেওয়ার পর দেশটির ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে গাজায় ইসরায়েলের অপরাধের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার নারী, শিশু ও বৃদ্ধ ফিলিস্তিনিকে হত্যা; গণহারে বাস্তুচ্যুত করা এবং মানুষকে অনাহারে রাখা। এ ছাড়া ইসরায়েলের হামলায় ঘরবাড়িসহ বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংসের ফলে ফিলিস্তিনিরা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বতসেলেমের পরিচালক ইউলি নোভাক বলেন, ‘আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা স্পষ্ট—একটি গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক লোকজনের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে।’ জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, সবাইকে নিজেদের জিজ্ঞাসা করতে হবে—গণহত্যার মুখে আপনি কী করবেন?’

ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস তাদের প্রতিবেদনে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ইসরায়েলের হামলা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক হামলার তথ্য বিস্তারিত আকারে সংগ্রহ করে নথিবদ্ধ করেছে সংস্থাটির নিজস্ব দল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সংঘাত শুরুর আগে গাজায় নিয়মিত কার্যক্রম চালাত সংস্থাটি।

ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটসের পরিচালক গায় শালেভ বলেন, গণহত্যাবিষয়ক কনভেনশনের ২(সি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শুধু স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞই এই ‘যুদ্ধকে’ গণহত্যায় পরিণত করেছে। কোনো কিছুকে গণহত্যা বলার জন্য সনদের পাঁচটি অনুচ্ছেদের—সবকটি পূরণ করার প্রয়োজন নেই।

নিজেদের প্রতিবেদনে দুটি মানবাধিকার সংস্থাই বলেছে, ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্ররা দেশটির গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে। গাজায় মানুষের দুর্ভোগের জন্য তারাও যৌথভাবে দায়ী। ইউলি নোভাক বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্বের সহায়তা ছাড়া এটি (গণহত্যা) সম্ভব হতো না। কোনো নেতাই এটি থামানোর জন্য নিজেদের সাধ্য অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলো এত দিন পর্যন্ত যা করেছে, তার চেয়ে এখন তাদের জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন গায় শালেভ। তিনি বলেন, ‘নিজেদের হাতে থাকা সব কৌশল কাজে লাগাতে হবে। নিজেদের চিন্তাভাবনা থেকে আমরা এই কথা বলছি না। এই আহ্বান গণহত্যা কনভেনশনেই জানানো হয়েছে।’

দাতব্য রান্নাঘরের সরবরাহ করা খাবার সংগ্রহ করতে ফিলিস্তিনিদের ভিড়। আজ সোমবার গাজা নগরীতে
দাতব্য রান্নাঘরের সরবরাহ করা খাবার সংগ্রহ করতে ফিলিস্তিনিদের ভিড়। আজ সোমবার গাজা নগরীতে। ছবি: রয়টার্স