Showing posts with label ব্রেকিং নিউজ. Show all posts
Showing posts with label ব্রেকিং নিউজ. Show all posts

Wednesday, June 10, 2026

৬০টি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে, লন্ডনে কেমন আছেন অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন

একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক, দর্শকহৃদয়ের নায়ক এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন এখন জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছেন। আলোঝলমলে চলচ্চিত্রজীবন আর সামাজিক আন্দোলনের ব্যস্ত সময় পেরিয়ে তাঁর দিন কাটছে এখন হাসপাতাল, চিকিৎসা আর পরিবারের সান্নিধ্যে।

ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়ে গত বছর থেকে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সেখানে এখন মেয়ে ইমা ইসলামের বাসায় থেকে চলছে তাঁর চিকিৎসা। গত বছরের আগস্টে লন্ডনের একটি হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। চিকিৎসকেরা টিউমারের একটি বড় অংশ অপসারণ করতে সক্ষম হলেও ঝুঁকির কারণে পুরো টিউমার সরানো সম্ভব হয়নি। পরে চিকিৎসক জানান, তাঁর ব্রেন ক্যানসারের কথা।

অস্ত্রোপচারের শেষে শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসাযাত্রা। প্রথম ধাপে টানা তিন মাস কেমোথেরাপি নেওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে চলছে দ্বিতীয় ধাপের ওরাল থেরাপি। পরিবার-ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, সপ্তাহে পাঁচ দিন করে ১২ সপ্তাহের চিকিৎসায় এরই মধ্যে প্রায় ৬০টি কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে এই অভিনেতাকে। এরপর তিন মাসের প্রথম ধাপের ওরাল থেরাপি শেষ করে তিনি এখন দ্বিতীয় ধাপের আরও তিন মাসের ওরাল থেরাপি নিচ্ছেন।

তবে এত দীর্ঘ চিকিৎসার পরও ইলিয়াস কাঞ্চনের শারীরিক অবস্থার আশানুরূপ উন্নতি হয়নি বলে জানিয়েছেন নিসচার ভাইস চেয়ারম্যান লিটন এরশাদ। আজ বুধবার সকালে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইলিয়াস কাঞ্চন ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা মোটামুটি আগের মতোই রয়েছে। উন্নতিও নেই। বর্তমানে যে থেরাপি চলছে, তা আগামী ৩০ জুলাই পর্যন্ত চলবে। এরপর চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থা কী, তা নতুন করে জানাবেন এবং পরবর্তী করণীয় কী, তা জানাবেন।

চিকিৎসকের বরাতে লিটন এরশাদ জানালেন, অস্ত্রোপচারের পর ক্যানসার যে স্থানে ছিল, এখনো সেখানেই রয়েছে। যদিও তা শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়ে পড়েনি। এটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের আশা, দ্বিতীয় ধাপের ওরাল থেরাপি শেষ হলে শারীরিক অবস্থার কিছু উন্নতি দেখা যেতে পারে।

তবে প্রতিদিনের বাস্তবতা সহজ নয়। লিটন এরশাদ জানান, কাঞ্চন ভাই এখন ধীরে ধীরে কথা বলতে পারেন, কিন্তু কথাবার্তায় জড়তা রয়েছে। অনেক সময় কয়েক মিনিট কথা বলার পর তিনি পুরো বাক্য শেষ করতে পারেন না। একটি পূর্ণ বাক্য শেষ করতেও কষ্ট হয় তাঁর। খাবারদাবার মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও নিয়মিত সময়মতো খাওয়ার অভ্যাসটিও আগের মতো নেই।

একসময় চলচ্চিত্রের শুটিং, সামাজিক কর্মসূচি আর নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে যার দিন-রাত কেটে যেত, সেই মানুষটির সময় এখন কাটছে হাসপাতালের ফলোআপ আর মেয়ের লন্ডনের বাড়ির চারদেয়ালের মধ্যে। স্বভাবতই এই পরিবর্তন তাঁকে অস্থির করে তোলে। তবু পরিবারের ভালোবাসাই হয়ে উঠেছে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।

মেয়ে, জামাতা এবং নাতি–নাতনিদের সঙ্গেই কাটছে তাঁর বেশির ভাগ সময়। কখনো তাঁদের সঙ্গে বাইরে ঘুরতে যাওয়া, কখনো পারিবারিক আড্ডা—এই ছোট ছোট মুহূর্তই কিছুটা স্বস্তি এনে দিচ্ছে তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসাজীবনে। সম্প্রতি পরিবারের সঙ্গে কাটানো কিছু হাসিমুখের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সুস্থতার পথ এখনো দীর্ঘ।

কোমোথেরাপির আগে ও পরের ইলিয়াস কাঞ্চন
কোমোথেরাপির আগে ও পরের ইলিয়াস কাঞ্চন। কোলাজ

Sunday, March 8, 2026

‘বড় শয়তান’ যাকে অগ্রহণযোগ্য বলেছে, তিনিই হতে যাচ্ছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির উত্তরসূরি তথা ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা বিশেষজ্ঞ পর্ষদ প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ঐক্যমত্যে পৌঁছেছে।

আজ রোববার পর্ষদের (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) সদস্য আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি এ তথ্য জানিয়েছেন।

ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, মিরবাঘেরি জানিয়েছেন, নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এখনো ‘কিছু প্রতিবন্ধকতা’ রয়ে গেছে; যার সমাধান করা প্রয়োজন।

এর আগে গতকাল শনিবার বিশেষজ্ঞ পর্ষদের একজন জ্যেষ্ঠ আলেম জানান, সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের জন্য পর্ষদ সদস্যরা ‘এক দিনের মধ্যে’ বৈঠকে বসবেন।

ইরানের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে একটি বিষয়ে সামান্য মতভেদ দেখা দিয়েছে। সেটি হলো, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সশরীর বৈঠকের মাধ্যমে নেওয়া বাধ্যতামূলক কি না, নাকি এমন আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ঘোষণা করা সম্ভব।

নূর নিউজ প্রকাশিত এক ভিডিওতে পর্ষদের আরেকজন সদস্য আয়াতুল্লাহ মহসিন হায়দারি আলেকাসির আজ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সশরীর উপস্থিত হয়ে চূড়ান্ত ভোট দেওয়া সম্ভব নয়।

এ সদস্য আরও জানান, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী একজন প্রার্থীকে বাছাই করা হয়েছে। পরামর্শটি ছিল—ইরানের শীর্ষ নেতাকে এমন হতে হবে, যাঁকে ‘শত্রুরা ঘৃণা করবে’, প্রশংসা নয়।

বাছাই করা উত্তরসূরি সম্পর্কে হায়দারি আলেকাসির বলেন, ‘এমনকি ‘‘বড় শয়তান’’ (যুক্তরাষ্ট্র) তাঁর নাম উল্লেখ করেছে।’

উল্লেখ্য, কয়েক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, খামেনির ছেলে মোজতাবা খামেনি তাঁর কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য’ পছন্দ।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-08%2Fv5wib6ku%2Firan-supreme-leader.avif?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী সমাবেশে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি হাতে প্রতিক্রিয়া জানান এক নারী। ছবিটি তোলা হয়েছে ৬ মার্চ ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

অন্তত ৬ মাস ‘তীব্র যুদ্ধ’ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আছে ইরানের: আইআরজিসি

ইরান বর্তমান আকার ও মাত্রার যুদ্ধ আরও ‘অন্তত’ ছয় মাস চালিয়ে যেতে সক্ষম বলে দাবি করেছেন দেশটির ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একজন কর্মকর্তা।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সির বরাতে আইআরজিসির মুখপাত্র আলি মোহাম্মদ নাইনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বর্তমান গতির এই তীব্র যুদ্ধ অন্তত ৬ মাস চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে।’

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাইনির এ বক্তব্য সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মূল্যায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত। ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো অভিযান অত্যন্ত সফল হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা এ যুদ্ধে বড় ব্যবধানে জিতছি। আমরা তাদের পুরো ‘‘শয়তানি সাম্রাজ্য’’ গুঁড়িয়ে দিয়েছি।’

আইআরজিসি ইরানের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী একটি সংস্থা। সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনীতি, শিক্ষা ও অর্থনীতিতেও এ বাহিনীর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

ইরানের রাজধানী তেহরানে বিস্ফোরণের পর আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। ছবিটি তোলা হয়েছে ৭ মার্চ ২০২৬
ইরানের রাজধানী তেহরানে বিস্ফোরণের পর আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। ছবিটি তোলা হয়েছে ৭ মার্চ ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Monday, August 12, 2024

ভারতীয় গণমাধ্যমের ‘প্রোপাগান্ডা’ কাউন্টার করতেই হবে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

মানবজমিনঃ ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার বিষয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে যে নেতিবাচক প্রচারণা চালছে তা মোকাবিলার তাগিদ দিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বলেছেন, যে প্রোপাগান্ডাগুলো হচ্ছে তার কাউন্টার করতে হবে। এ বিষয়ে দেশীয় গণমাধ্যম কর্মীদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে গ্রাউন্ড রিয়েলিটি তুলে ধরার অনুরোধ জানান তিনি। মি. হোসেন বলেন, তারা গ্রাউন্ডে না থেকে একটা পজিশন নিয়েছে। এখান থেকে অনেক ক্ষেত্রে কিছু ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে। এটা কাউন্টার করতেই হবে। সোমবার বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা’য় প্রায় অর্ধশতাধিক বিদেশি কূটনীতিকের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

মিডিয়া ব্রিফিংয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া প্রধানমন্ত্রী (সদ্য সাবেক) শেখ হাসিনাকে ভারত দীর্ঘদিন আশ্রয় দিলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উঠানামার আশঙ্কা নাকচ করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাকে হাইপোথিক্যাল (অনুমানমূলক) কোয়েশ্চন উল্লেখ করে উপদেষ্টা সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে পাল্টা প্রশ্ন রাখেন। বলেন, একজন যদি কোনো এক দেশে গিয়ে থাকেন, তাহলে ওই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে কেন? এর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্যানভাসটি ‘অনেক বড়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে স্বার্থই মুখ্য। বন্ধুত্বটাও স্বার্থ বিবেচনায় হয়ে থাকে। এখানে ভারতের স্বার্থ আছে; ভারতেও আমাদের (বাংলাদেশের) স্বার্থ আছে। কাজেই সেই স্বার্থকে আমরা অনুসরণ করবো। বিদ্যমান সুসম্পর্ক বজায় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
কূটনৈতিক ব্রিফিং এবং সংবাদ সম্মেলন উভয় অনুষ্ঠানে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের সহিংসতা, মানুষের ক্ষতি, অগ্নিসংযোগ কিংবা অত্যাচার অন্তবর্তীকালীণ সরকার বরদাশত করতে বলে বলে সাফ জানান তিনি। উপদেষ্টা বলেন, সম্প্রতিক সময়ের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করা হবে। সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হবে, কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। অত্যাচারের কারণ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় যাই হোকÑ অপরাধকে অপরাধ হিসাবেই দেখা হবে। মিস্টার হোসেন বলেন, যার মতাদর্শ যাই হোক, কারও প্রতি অত্যাচার করলে শাস্তি পেতেই হবে। কোন অবস্থাতেই কারও প্রতি বিরূপ বা বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না, করলে আইন সেটা দেখবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, উপস্থিত বিদেশি কোন কূটনীতিক আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ নিয়েও তাদের কোন জিজ্ঞাসা ছিলো না। উপদেষ্টা বলেন, আমরা নিজে থেকে বলেছি, যারা পরিবর্তনটি এনেছে, জীবন দিয়েছে তাদের দাবিগুলো যৌক্তিক। তারা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার জন্য এতোগুলো জীবন বিসর্জন দেয়নি। আমরাও অনুধাবন করি রাষ্ট্র, সমাজে জরুরি কিছু রিফর্মের প্রয়োজন। এ রিফর্মের জন্য ঠিক যেটুকু সময় থাকা দরকার সেটুকু সময়ই আমরা (অন্তর্বতী সরকার) থাকবো। এর বেশি থাকবো না, কমও না। দেশে সর্বজনীন মানবাধিকার নিশ্চিতে বিদেশি বন্ধু-উন্নয়ন সহযোগীদের সুপারিশ সরকার আমলে নিয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। বিদায়ী সরকারের পরিকল্পনায় থাকা বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন এনগেজমেন্ট আটকে যাওয়া প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ঠিক এই মুহূর্তে আমরা কোনো কিছু থেকে সরে যাবো এমন না। যার সঙ্গে যে চুক্তি আছে বা কমিটমেন্ট আছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা দ্বিপক্ষীয় ব্যাপারে সেগুলো কিন্তু যে কমিটমেন্ট বাংলাদেশ করেছে অবশ্যই আমাদের রক্ষা করতে হবে। যেখানে আমাদের মনে হবে স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে সেখানে আমাদের স্বার্থটা সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিবো। অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোনো শক্তির হাতে কিনা? এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা সাফ জবাব দেন। বলেন, বাইরের কারও নিয়ন্ত্রণে সরকার নেই। বরং উপদেষ্টা কাউন্সিলই দেশ পরিচালনা করছে। তিনি এটাকে ‘ক্ষমতা’ না বলে দায়িত্ব বলা সমীচীন বলে উল্লেখ করেন। দেশে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার দিনরাত কাজ করছেন বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। কূটনীতিক ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ভারত, চীন রাশিয়া, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারসহ প্রায় ৬৪ জন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন সেগুনবাগিচা।

Thursday, August 8, 2024

বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে: মাইলাম

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছেন ওয়াশিংটনভিত্তিক সংগঠন রাইট টু ফ্রিডমের প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম। বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, বিশ্ব জুড়ে আমার অনেক বন্ধু রয়েছে। আমরা স্বাধীনতার অধিকারকে প্রশংসার সাথে দেখছি। কেননা বাংলাদেশের জনগণ এ সপ্তাহে তাদের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে। আমরা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রাণহানির জন্য শোক প্রকাশ করছি। এছাড়া চলমান সহিংসতার বিষয় নিয়েও আমাদের উদ্বেগ রয়েছে। সামনের দিনগুলোতে সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের যেন আইনের আওতায় আনা হয় সেবিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের সহিংসতায় যে প্রাণহানি হয়েছে তার আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন মাইলাম। তিনি বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশের এ মর্মান্তিক ঘটনায় আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নির্বাচিত করায় মাইলাম অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তনি বলেছেন, আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান হিসেবে ড. ইউনূস ছাড়া আমরা অন্য কাউকে বিকল্প হিসেবে ভাবতে পারি না।

আমরা আশা করি বাংলাদেশি সমাজের সকল উপাদান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রফেসর ইউনূস এবং তার সরকারকে এই মহান দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে।

এর আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারগুলোর ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন মাইলাম। তিনি বলেছেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারগুলোর বিষয়ে জনগণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আমরা মনে করি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে অবাধ, সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন কার্যকর করা। তবে এক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সেটা সম্ভব হবে না। সরকারকে বাংলাদেশের সমালোচনামূলক স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এছাড়া দেশের প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং নিরাপত্তা বিভাগ সংস্কারে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে তাই যত দ্রুত সম্ভব এ বিষয়ে কাজ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন মাইলাম।

আগের অন্তবর্তীকালীন সরকার শাসনের সুযোগ বেছে নিয়ে মানবাধিকারের প্রতি অসম্মান দেখিয়েছে বলে অভিযোগ করে মাইলাম বলেছেন, হাসিনার স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা যে আত্মত্যাগ করেছে তার আলোকে আগের ভুলগুলো শুধরে নিতে হবে। যারা তাদের জীবন দিয়েছেন তাদের সম্মান জানাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন ওই রাষ্ট্রদূত। এছাড়া তিনি আরও বলেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বাক ও সমাবেশের স্বাধীনতাকে সম্মান করার ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। যারা অপরাধী তাদের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সর্বশেষে মাইলাম বাংলাদেশের সাধারণ জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

ড. ইউনূস ঢাকায় ফিরলেন, কান্নাজড়িত কণ্ঠে তরুণদের প্রতি জানালেন কৃতজ্ঞতা

শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে আজ বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন। বেলা ২টা ১০ মিনিটের কিছু পরে তিনি ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান।

আজ রাত আটটার দিকে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিতে পারে।  ড. ইউনূসকে স্বাগত জানিয়েছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, তিন বাহিনীর প্রধান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা, নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী ও ব্রতীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মুরশিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

বিমানবন্দরে বেলা পৌনে তিনটার দিকে বক্তব্য দেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশে আজকে নতুন বিজয় সৃষ্টি হলো। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘তরুণ সমাজ এটা সম্ভব করেছে। তাঁদের প্রতি আমরা সমস্ত কৃতজ্ঞতা জানাই।’

বক্তব্য দেওয়ার সময় ড. ইউনূসের পাশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দেখা যায়। বক্তব্য শুরুর আগে তাঁরা ড. ইউনূসকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ড. ইউনূস বলেন, ‘আমার ওপর আপনারা আস্থা রাখেন। কারও ওপর হামলা হবে না।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদস্য ১৫ জনের মতো হতে পারে বলে গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে জানান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। কে কে এই সরকারে থাকছেন, তা জানা যায়নি। বিভিন্ন নামের তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা আছে। সদস্যসংখ্যার পর যেটি আলোচনা, তা হলো, এ সরকারের মেয়াদ কত দিন হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ১৫ জনের নামের একটি তালিকা তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। ড. ইউনূস আজ দেশে ফেরার পর তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে তালিকাটি চূড়ান্ত হবে।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ছাত্র আন্দোলনের নেতারা গতকাল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে দেখা করে তালিকার বিষয়ে কথা বলেছেন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয় গত সোমবার। এরপর তিন দিন ধরে দেশে কার্যত কোনো সরকার নেই।

রিকশায় ছবি দেখে হাসপাতালে নাফিজের লাশ পান বাবা by ফাহিমা আক্তার সুমি

সদ্য এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন গোলাম নাফিজ। বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন। নাফিজের বাবা একজন ব্যবসায়ী। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসেন ঢাকায়। মহাখালীতে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। পড়াশোনায় নাফিজ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। তার ইচ্ছে ছিল ভবিষ্যতে পাইলট হওয়ার। তবে সে স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি তার। ৪ঠা জুলাই কোটা বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে সংষর্ষে নিহত হন তিনি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মা। নাফিজের মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। রোববার নাফিজ আহত হওয়ার পর একজন রিকশাচালক তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। রিকশায় তুলার পরও কিছু সময় তিনি বেঁচে ছিলেন। রিকশায় করে তাকে নিয়ে যাওয়ার ছবি ভাইরাল হলেও তখনো তার পরিচয় নিশ্চিত হয়নি।

নাফিজের বাবা গোলাম রহমান মানবজমিনকে বলেন, রোববার দুপুর বরোটার দিকে বাসা থেকে নাফিজ বের হয়। তিনটার সময় তার এক বন্ধুর মোবাইল থেকে ওর মায়ের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় তার মায়ের শরীর খারাপ থাকায় দ্রুত বাসায় যাওয়ার জন্য বলেছিল। কিন্তু আমার নাফিজ আর বাসায় ফেরেনি। নাফিজ ফার্মগেটে ছিল আন্দোলন করার সময় খামারবাড়ী মৃত্তিকা ভবনের সামনে নাফিজ গুলিবিদ্ধ হয়। কিছুক্ষণ পরে মনের মধ্যে অস্বস্তি শুরু হলো। আমার সন্তানের কোনো খবর না পেয়ে আমি খুঁজতে বের হই। ঢাকা শহরে এমন কোনো থানা, হাসপাতাল, ডিবি অফিসে খুঁজতে বাকি ছিল না। ভেবেছিলাম ওকে মনে হয় পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। দুই সন্তানের মধ্যে নাফিজ ছিল ছোট। মিরপুর ১৪ নম্বরে নেভি কলেজে ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র ছিল। আমার সন্তান খুব মেধাবী ছিল। সে খেলাধুলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক কাজে সংযুক্ত ছিল। ভবিষ্যতে পাইলট হওয়ার ইচ্ছে ছিল, আমরাও ওর আগ্রহ দেখে তাকে উৎসাহ দেই। শুরু থেকেই নাফিজ আন্দোলনে নেমেছে আমিও ওকে বাধা দেইনি কখনো, সবসময় সাহস দিয়েছি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সন্তান হারানোর যন্ত্রণা নিয়ে আমি কী করে বেঁচে থাকবো। রোববার পাগলের মতো খুঁজতে থাকি। পরে ওইদিন রাত বারোটার সময় ‘জনবিস্ফোরণ নিহত শতাধিক’ শিরোনামে মানবজমিন পত্রিকায় দেখি রিকশার উপরে নিথর হয়ে পড়ে থাকা একটি ছবি ছাপা হয়েছে- এটিই আমার সন্তান। যখন ছবিটা দেখি আমার ছেলেকে নিথর অবস্থায় রিকশায় নিয়ে যাচ্ছে তখনই বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে। আমার আর সহ্য হয়নি, মনে হয়েছে পৃথিবীতে এমন মৃত্যু আর যেন না হয়। কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন খালি না হয়। এরপর আবার হাসপাতালে হাসপাতালে খুঁজতে থাকি। পরে রাত চারটার সময় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দেখি নাফিজ মারা গেছে। পরে তার মরদেহ নিয়ে দক্ষিণখানে দাফন করা হয়। ছাত্র আন্দোলনে আমার ছেলের সঙ্গে আরও অনেকে শহীদ হয়েছে। কতো বাবা-মায়ের বুক খালি হয়েছে। আমার বড় সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য এডমিশন দিচ্ছে। ব্যবসা করে দুই সন্তানের লেখাপড়ায় সবসময় সর্বোচ্চটা দেয়ার চেষ্টা করেছি সবসময়। এখন আমার বুক খালি করে দিয়ে গেছে। ওর মা কথা বলতে পারছে না। এমন দুঃখজনক মৃত্যু তো চাইনি। তবুও আমার সন্তান রাষ্ট্রের ভালোর জন্য মারা গিয়েছে এটাই এখন সান্ত্ব্তনা। কাঁদতে কাঁদতে নাফিজের মামা আবুল হাশেম বলেন, নাফিজের বুকের বাম পাশে গুলি লাগে। নাকে-মুখে অনেক আঘাতের চিহ্ন ছিল।

Wednesday, August 7, 2024

২৪ ঘণ্টার বেশি সরকারহীন বাংলাদেশ

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নতুন সরকার গঠিত না হওয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড। সরকারি কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় খুললে হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তা অফিসে গিয়েছেন। সরকারি অনেক অফিসে কর্মকর্তাদের বাড়িতে চলে যেতে বলা বা তালাবদ্ধ করে রাখার তথ্যও পাওয়া গেছে।

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যেসব মন্ত্রী ছিলেন, তাদের কারো কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের অনেকের সরকারি বাসভবনে হামলা হয়েছে, তারা কোথায় রয়েছেন, কেউ জানে না।

অন্যদিকে সোমবার বিকেল থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশে থানাগুলোতে হামলা ও কোথাও কোথাও অস্ত্র লুটের ঘটনায় কিছু পুলিশ সদস্যের মৃত্যুর পর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই কার্যত অচল হয়ে গেছে পুলিশ প্রশাসন। দেশের বেশিভাগ জেলা ও থানায় পুলিশ সদস্যদের কোনো তৎপরতা নেই।

বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে জানা যাচ্ছে, সেখানকার স্থানীয় প্রশাসনও কাজ করছে না। অনেক স্থানে ডিসি, ইউএনও, ভূমি কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড দেখা যায়নি।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে জুলাই মাস থেকে যে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল দেশে, তাতে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মানুষের মৃ্ত্যু হয়েছে।

আন্দোলনের একপর্যায়ে সোমবার পদত্যাগের পর দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর আওয়ামী লীগের সব নেতা ও মন্ত্রী আত্মগোপনে চলে যান। অবশ্য তাদের অনেকে আগেভাগে দেশের বাইরে চলে গেছেন বলে জানা যাচ্ছে।

সরকারহীন ২৪ ঘণ্টা

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি।

শেখ হাসিনা সোমবার দুপুরে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর বেলা ৪টার দিকে প্রেস ব্রিফিং-এ সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে দ্রুতই রাষ্ট্রপতির সাথে পরামর্শ করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কথা বলেছিলেন।

পরে রাতে বঙ্গভবনে গিয়ে সেনাপ্রধান, জামায়াত ও বিএনপিসহ কয়েকটি দলের নেতারা রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনের সাথে বৈঠক করেন।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে দ্রুত একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্তের কথা জানান।

এর মধ্যে সোমবার রাত ৮টার দিকে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আটজন সমন্বয়ক জানান যে সেনা-সমর্থিত কোনো সরকার তারা মানবেন না এবং তারা নিজেরাই সরকার গঠনের একটি রূপরেখা দিয়ে সেই সরকারে কারা থাকবেন তাদের নাম প্রকাশ করবেন।

মঙ্গলবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম।

যদিও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, দ্রুত অন্তর্বর্তী সরকার গঠন না করলে রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা দিতে পারে।

ড. ইউনূসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ছাত্রদের প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা আছে। তবে সর্বদলীয় ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দিতে হবে।’

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ড. ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দেখতে চেয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের প্রস্তাবকে তার দল শ্রদ্ধার চোখে দেখে।

এর মধ্যে মঙ্গলবার দুপুরেই সংসদ ভেঙে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন। ফলে এ মুহূর্তে সংসদ, মন্ত্রীসভা ও সরকার- এই তিনটির কোনোটিরই অস্তিত্ব নেই।

ফলে প্রশাসন, সরকারের বিভাগের মধ্যে এই মুহূর্তে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে না। সারাদেশে অনেক সহিংসতা ও হামলার ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

পুলিশ ও প্রশাসন অচল
সোমবার দুপুরের পর থেকে ঢাকাসহ সারাদেশে বহু থানায় হামলা হয়। ঢাকায় পুলিশ সদর দফতর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসেও হামলা হয়।

বাংলাদেশের কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের সংগঠন পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ঘোষণা করেছে, পুলিশ সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মবিরতি পালন করবে। ফলে কার্যত সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে পুলিশের কোনো তৎপরতা চলমান নেই।

এমনকি মঙ্গলবার ঢাকার কোথাও ট্রাফিক পুলিশ দেখা যায়নি এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দফতর বন্ধ ছিল। ওই কার্যালয়ের সামনে দুপুর ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি দলকে অবস্থান করতে দেখা গেছে।

ট্রাফিক পুলিশ না থাকায় অনেক স্থানে শিক্ষার্থীদের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে।

রাজধানীর বেশিভাগই থানাতেই হামলার পর অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে সোমবার বিকেলে। কিছু থানা থেকে অস্ত্র লুট করা হয়েছে। বেশ কিছু পুলিশ সদস্য নিহত ও আহত হয়েছেন। ফলে এসব থানার কোনো কার্যক্রমই এখন আর চলছে না।

ঢাকায় যাত্রাবাড়ী ও উত্তরায় থানায় হামলার পর পুলিশ সদস্যরা গুলি ছুড়লে তা নিয়েও অনেক সহিংসতা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশ সুপার ও থানাগুলোতে নিরাপত্তাহীন পরিবেশ বিরাজ করায় কেউই অফিস করছে না।

সোমবারই পুলিশ সদর দফতরের হামলা এবং রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে হামলার পর পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন কর্মবিরতি ঘোষণা দিয়েছে।

তবে পুলিশের আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এক ভিডিও বার্তায় পুলিশ ও পুলিশের স্থাপনার নিরাপত্তায় রাজনৈতিক নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের আহ্বান জানানোর জন্য অনুরোধ জানান। তিনি শিগগিরই পুলিশের কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

পুলিশের অনুপস্থিতিতে থানা, ট্রাফিক ও বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে।

অন্যদিকে সরকারি কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় খুললে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তা অফিসে গিয়েছেন।

তবে সচিবালয়ের কাছেই একাধিক ভবনে হামলার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ১২টার দিকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচিবালয় থেকে বেরিয়ে আসেন।

এসব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার বা নির্দেশনা দেয়ার মতো বর্তমানে কেউ নেই। যেসব মন্ত্রীরা দায়িত্বে ছিলেন, সরকার পতন হওয়ায় কার্যত তারা আর দায়িত্বে নেই। তাদের অনেকে আগেই দেশের বাইরে পালিয়ে চলে গেছেন, অনেকের আপাতত কোনো সন্ধান মিলছে না।

ড. হাছান মাহমুদ ও জুনাইদ আহমদ পলকের মতো কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন।

ঢাকার বাইরে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা নিজ নিজ স্টেশনে উপস্থিত আছেন বলে জানা গেছে। তবে অনেকেই নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে অফিস করেননি।

একজন জেলা প্রশাসক বলেন, নৌবাহিনী জেলায় আসার পর থেকে তিনি অফিস করা শুরু করেছেন।

অর্থাৎ জেলা উপজেলা পর্যায়ে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন শুরু হয়েছে। সেটি হলে জেলা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা পুরো দমে অফিস শুরু করতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে।

তবে কয়েকটি জেলা থেকে খবর পাওয়া গেছে, সেখানে ডিসি, ইউএনও, এসি ল্যান্ডদের তাদের কার্যালয় ও বাসায় পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কর্মকাণ্ডেও তাদের কোনো তৎপরতা বা নির্দেশনা দেখা যাচ্ছে না।

একজন কর্মকর্তা জানান, তার উপজেলায় সরকারি স্থাপনাতেও অনেকগুলো হামলা হওয়ায় তিনি নিরাপদ অবস্থানে রয়েছেন। সরকারি দায়িত্ব পালন করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথেও যোগাযোগ করতে পারছেন না, এমনকি সহকর্মী অন্যরাও কার্যালয়ে আসতে সাহস পাচ্ছেন না।

‘নিরাপত্তার অভাব’ দেখিয়ে সরকারি অনেক অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসায় চলে যেতে বলা হয়েছে। সরকারি অনেক অফিসের প্রধান ফটক ও বিভিন্ন কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

এমনকি অনেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক হাসপাতালেও চিকিৎসকরা আসেনি, তাদের চেম্বার তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক জানান, বন্দরের কার্যক্রম তারা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘জাহাজ থেকে পণ্য ওঠা-নামা চলছে। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু কম ডেলিভারি হচ্ছে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকার কারণে। আশা করি দ্রুতই সব স্বাভাবিক হবে।’

তবে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনীর একটি দল কাস্টমস হাউজ পরিদর্শন করেছেন বলে একজন কর্মকর্তা জানান।

মঙ্গলবার সব কিছু খোলার তথ্য জানানো হলেও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খোলেনি।

বিকেএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলছেন বিজেএমইএ ও বিকেএমইএ-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার তারা কারখানাগুলো খুলে দেবেন।

তিনি বলেন, ‘তবে বাস্তবতা হলো পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় জনমনে ভীতি আছে। আমরা মনে করি সেনাবাহিনী যেহেতু মোতায়েন আছে তাদের টহল দৃশ্যমান হলেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করবে।’
সূত্র : বিবিসি

Tuesday, August 6, 2024

লাশ পড়ে আছে সামনে, আগুনে পোড়ার ক্ষত ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে

প্রথম আলোঃ অজ্ঞাতপরিচয় দুটি লাশ পড়ে ছিল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে। পুরোনো ছাপা ছিটকাপড় দিয়ে ঢাকা লাশ দুটি ঘিরে বেশ কিছু কৌতূহলী মানুষ। পাশেই ধানমন্ডি লেকের কিনার ঘেঁষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ও পুষ্পস্তবক রাখার বিধ্বস্ত বেদি। সড়কের অপর পাশে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ির ভাঙা ফটক দিয়ে প্রবেশ করছে শত শত মানুষ। আগুনে পুড়ে গেছে তিনতলা বাড়িটি। আজ মঙ্গলবার বেলা দেড়টার দিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে এই চিত্র দেখা গেছে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই ঐতিহাসিক বাড়ির রয়েছে নিবিড় সংযোগ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর এই বাসভবন থেকে মুক্তিযুদ্ধের আগের দিনগুলোতে দিকনির্দেশনা দিতেন। হাজার হাজার মুক্তিপাগল মানুষ আসত তাঁর মুখ থেকে আন্দোলনের পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানতে।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই এক মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞ ঘটেছিল এই বাড়িতে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু, তাঁর স্ত্রী–পুত্র, পুত্রবধূসহ আত্মীয়দের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল এখানে। ৪৯ বছর পর সেই একই আগস্ট মাসে আবার এক নির্মমতা–কবলিত হলো বাড়িটি। গতকাল সোমবার বিকেলে বিক্ষুব্ধ মানুষ এই বাড়িতে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে।

বঙ্গবন্ধুর এই বাড়িটিকে স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। মূল বাড়িটি তিনতলা। হত্যাকাণ্ডের সময় যে অবস্থা ছিল, যত দূর সম্ভব অবিকল সেই অবস্থায় বাড়ি, আসবাব, গুলি চিহ্নিত দেয়ালগুলো, বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত জিনিসপত্র সব সংরক্ষণ করে বাড়িটিকে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। পরে মূল বাড়ির পেছনে একটি নতুন ভবন করে সেখানে পাঠাগার, গবেষণা কেন্দ্র ও সেমিনার কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল।

সরেজমিনে দেখা গেল দলে দলে মানুষ বাড়িটি দেখতে আসছে। মূল বাড়ির তিনতলা পর্যন্ত প্রতিটি ঘরের দরজা–কপাট পুড়ে গেছে। নিচের ও দোতলার প্রতিটি ঘরের সব জিনিসপত্র পুড়ে মেঝেতে ছাই-কয়লার স্তূপ হয়ে আছে। সিলিং ফ্যানের পাখাগুলো দুমড়েমুচড়ে গেছে আগুনের তাপে। দেয়ালগুলো কালো হয়ে আছে ধোঁয়া ও কালিতে। তৃতীয় তলার ঘরে আগুনের ক্ষতি কম। তবে জিনিসপত্র যা ছিল সেগুলো লুট হয়ে গেছে।

মূল বাড়ির পাশে ছিল রান্নাঘর, দুটো আলাদা ছোট ঘর কবুতরের জন্য। এগুলোর শুধু পোড়া কাঠামো রয়েছে। পেছনের নতুন ভবনের নিচতলায় পড়ে ছিল সাদা সিমেন্টে তৈরি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য। এই ভবনের পাঠাগার থেকে লোকজন বই ও অন্যান্য দ্রব্যাদি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। সেখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষার্থী লুটপাট ঠেকানোর চেষ্টা করছিলেন। বিশেষ করে বইগুলো নিয়ে তাঁরা মেঝের পাশে জমা করছিলেন।

তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চূড়ান্ত পর্বের শিক্ষার্থী নাঈমুল ইসলাম ও স্ট্যান্ডার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তানভী আহমেদ বললেন, তাঁরা লুটপাট বন্ধের চেষ্টা করছেন। বইগুলো রক্ষা করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বইগুলো কাদের হেফাজতে দেবেন, তা নিয়ে বেশ সিদ্ধান্তহীনতায় পড়েছিলেন।

বাড়িটি দেখতে আসা নানা মানুষের নানা মত। অনেকে বাড়ির বিভিন্ন দেয়ালে কয়লা দিয়ে ‘৩২ নম্বর পোড়াবাড়ি’সহ বিভিন্ন কথা লিখে রেখেছে।

জুরাইন থেকে এসেছিলেন ব্যবসায়ী শাহ আলম। তিনি বলেন, যেভাবে লুটপাট হচ্ছে এটা খুবই দুঃখজনক। এমনটা হওয়া উচিত নয়।

কলাবাগান থেকে আসা মশিউর রহমানের বক্তব্য, মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে। লুটপাট, দুর্নীতি, সাধারণ মানুষের ওপর দমনপীড়ন তারাও কম চালায়নি। এমন পরিণতি তো হওয়ারই কথা ছিল। মানুষের ক্ষোভের আগুনে পুড়ে যাওয়া এই ভবনটি ইতিহাসের আরেক দফা পালাবদলের সাক্ষী হয়েই থাকবে।

শেষ সময়েও বলপ্রয়োগ করে থাকতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা

শেষ সময়েও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং আরও রক্তপাতের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। দেশ ছাড়ার আগে গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় এক ঘণ্টা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের চাপ দিয়েছিলেন তিনি। তবে পরিস্থিতি যে একেবারেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেটা তিনি কিছুতেই মানতে চাচ্ছিলেন না। পরে পরিবারের সদস্যরাসহ বোঝানোর পর পদত্যাগে রাজি হন। এরপর দ্রুততম সময়ে পদত্যাগ করে সামরিক হেলিকপ্টারে করে গোপনে বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের কাছ থেকে শেখ হাসিনার ক্ষমতা ছাড়ার শেষ চার ঘণ্টার একটা বিবরণ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা হয়ে দিল্লি পৌঁছেছেন তিনি। সেখান থেকে তাঁর যুক্তরাজ্য যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দলীয় অস্ত্রধারী কর্মীদের নামিয়ে গত রোববার দিনভর সারা দেশে ব্যাপক সংঘাত ও প্রাণহানি ঘটানোর পরও ছাত্র-জনতার আন্দোলন সামাল দিতে পারেননি শেখ হাসিনা। যদিও পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পেরে রোববার রাতেই শেখ হাসিনাকে তাঁর একজন উপদেষ্টাসহ কয়েকজন নেতা বোঝানোর চেষ্টা করেন। তাঁরা সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরামর্শ দেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি তা মানতে চাননি; বরং সোমবার (গতকাল) থেকে কারফিউ আরও কড়াকড়ি করতে বলেন। ভোর থেকে কারফিউ কড়াকড়ি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সকাল ৯টার পর থেকে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীরা কারফিউ ভেঙে নামতে শুরু করেন। ১০টা নাগাদ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জমায়েত বড় হতে থাকে।

বিভিন্ন বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে ডাকা হয়। নিরাপত্তা বাহিনী কেন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না, সেটার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আন্দোলনকারীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁজোয়া যানে উঠে লাল রং দিয়ে দিচ্ছেন, সামরিক যানে পর্যন্ত উঠে পড়ছেন—এর পরও কেন তারা কঠোর হচ্ছে না, সেটা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ ছাড়া বিশ্বাস করে এই কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে বসিয়েছেন—সেটাও তিনি উল্লেখ করেন।

একপর্যায়ে শেখ হাসিনা আইজিপিকে দেখিয়ে বলেন, তারা (পুলিশ) তো ভালো করছে। তখন আইজিপি জানান, পরিস্থিতি যে পর্যায়ে গেছে, তাতে পুলিশের পক্ষেও আর বেশি সময় এ রকম কঠোর অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব নয়।

ওই সময়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়, বলপ্রয়োগ করে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। কিন্তু শেখ হাসিনা সেটা মানতে চাচ্ছিলেন না। তখন কর্মকর্তারা শেখ রেহানার সঙ্গে আরেক কক্ষে আলোচনা করেন। তাঁকে পরিস্থিতি জানিয়ে শেখ হাসিনাকে বোঝাতে অনুরোধ করেন। শেখ রেহানা এরপর বড় বোন শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতা ধরে রাখতে অনড় থাকেন। একপর্যায়ে বিদেশে থাকা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। এরপর জয় তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তারপর শেখ হাসিনা পদত্যাগে রাজি হন। তিনি তখন একটা ভাষণ রেকর্ড করতে চান জাতির উদ্দেশে প্রচারের জন্য।

ততক্ষণে গোয়েন্দা তথ্য আসে যে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা শাহবাগ ও উত্তরা থেকে গণভবন অভিমুখে রওনা হয়েছে। দূরত্ব বিবেচনায় ৪৫ মিনিটের মধ্যে শাহবাগ থেকে গণভবনে আন্দোলনকারীরা চলে আসতে পারে বলে অনুমান করা হয়। ভাষণ রেকর্ড করতে দিলে গণভবন থেকে বের হওয়ার সময় না-ও পাওয়া যেতে পারে। এই বিবেচনায় শেখ হাসিনাকে ভাষণ রেকর্ডের সময় না দিয়ে ৪৫ মিনিট সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

এরপর ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানবন্দরে হেলিপ্যাডে আসেন শেখ হাসিনা। সেখানে তাঁদের কয়েকটি লাগেজ ওঠানো হয়। তারপর তাঁরা বঙ্গভবনে যান। সেখানে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বেলা আড়াইটার দিকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে ছোট বোনসহ ভারতের উদ্দেশে উড্ডয়ন করেন শেখ হাসিনা।

জানা গেছে, হেলিকপ্টারটি ভারতের আকাশে প্রবেশের পর কিছুক্ষণ উড্ডয়ন করে। পরে আগরতলায় বিএসএফের একটা হেলিপ্যাডে অবতরণ করে। তারপর সেখান থেকে দিল্লি যান বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর বের হয়েছে।

ইন্ডিয়া টুডের এক খবরে বলা হয়, শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির কাছের গাজিয়াবাদে (উত্তর প্রদেশ) ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিন্দন বিমানঘাঁটিতে দেশটির স্থানীয় সময় ৫টা ৩৬ মিনিটে অবতরণ করেন। ভারতের সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা তাঁকে স্বাগত জানান। সেখান থেকে তিনি লন্ডনে যেতে পারেন বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এ বছরের ১১ জানুয়ারি। এর আগে ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে ভোটে বিএনপি জয়ী হলে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে যায়। তখন সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হন শেখ হাসিনা।

এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। পাঁচ বছর পর ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচন করেন। তাতে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বীতায় ১৫৩ জন সংসদ সদস্য হন। ওই নির্বাচনে (দশম সংসদ) বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি; শেখ হাসিনা ও তাঁর জোটসঙ্গীরা মিলে সরকার গঠন করেন। ২০১৮ সালে বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। আগের রাতে ব্যালটে সিল মারার ব্যাপক অভিযোগের কারণে ওই নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিতি পায়। আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি। নিজ দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী করে ‘ডামি’ প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হন। এ নির্বাচনকে বিরোধীরা ‘ডামি নির্বাচন’ আখ্যা দেন। এর সাত মাসের মধ্যে ছাত্র আন্দোলন ও গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করে হেলিকপ্টারযোগে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা।

জয়োল্লাসে ভাসে দেশ


 উত্তর আকাশের কালো মেঘ কেটে গেছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের একদলীয় শাসনের অবসান হয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাত করেছে ছাত্র-জনতা। দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন  শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। তাতেই বিজয় উল্লাসে মেতেছেন আপামর জনতা। দুপুরের পর থেকেই আন্দোলন-সংগ্রামের তীর্থস্থান শাহবাগে আসতে থাকেন মুক্তিকামী মানুষ। এদিন রাজধানীর সব বিজয় মিছিলের স্রোত মিশেছে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে। সেখান থেকে বিজয়ী ছাত্র-জনতা দখলে নেন গণভবন। বিজয়ের এ মিছিলের শক্তি হয়ে ছিলেন আবু সাঈদ ও দীপ্ত দে’র মতো তিন শতাধিক শহীদ। তাদের রক্তেই এসেছে চূড়ান্ত বিজয়। জাতির পতাকা খামচে ধরা পুরনো শকুন থেকে মুক্তি পেয়েছে। বাংলার আকাশে পত্পত্ করে উড়ছে লাল-সবুজের রক্তাক্ত পতাকা। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর এ যেন পুনর্জন্ম বাংলাদেশের। যে জন্মের পিছনে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে রয়েছে সব বয়সী ছাত্র-জনতার রক্ত। কোটা সংস্কারের যৌক্তিক আন্দোলনে নামার পর ছাত্রদের ওপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল হাসিনা সরকার। মাসব্যাপী চলা সংঘাত-সংঘর্ষের ইতি ঘটেছে। তবে বিজয়ের দিনও সুখকর ছিল না ছাত্রদের জন্য। এদিনও সকাল থেকে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীসহ সারা দেশে হত্যা করা হয়েছে ১৩ জনকে। ‘মার্চ টু ঢাকা’- কর্মসূচির অংশ হিসেবে সোমবার সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হতে থাকেন ছাত্র-জনতা। কিন্তু এদিনও নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা, গুলি, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। আহত হন অসংখ্য শিক্ষার্থী। আটক করা হয় তিনজনকে। একই সময়ে উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় নামতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দুপুরে যখন অন্তর্বর্তী সরকারের বিষয় আলোচনায় আসে তখনও হামলা চালানো হয় ছাত্র-জনতার ওপর। কিন্তু শেখ হাসিনার পদত্যাগ করার খবরে রাস্তায় নেমে আসে লাখ লাখ মানুষ। পিছু হটে পুলিশ। যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, উত্তরা, মিরপুর, মহাখালী, গাবতলী, নিকেতন, বাড্ডা, আজিমপুর, পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ মানুষ নেমে আসে রাস্তায়। বিজয় উল্লাসে মাতেন আপামর ছাত্র-জনতা। এ সময় সমন্বয়করা সবাইকে শাহবাগে আসার আহ্বান জানান। রাজধানীর অলিতে গলিতে শুরু হওয়া মিছিলগুলো শাহবাগের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যে মিছিলের স্লোগান ছিল- ‘এইমাত্র খবর হলো, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেল’, ‘হৈ হৈ রই রই, শেখ হাসিনা গেলি কই’, ‘এইমাত্র খবর হলো, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো’, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’, ‘কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’, ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না’, ‘শহীদের রক্ত, বৃথা যেতে পারে না’- ইত্যাদি স্লোগান দেন। মিছিলে শামিল হয়ে একে-অপরকে মিষ্টি খাওয়ান জনতা। অল্প সময়ের মধ্যেই মিষ্টির দোকানের সবমিষ্টি পুরিয়ে যায়। শাহবাগের বিজয় উদ্যাপনে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। সেখান থেকে বিজয় মিছিল নিয়ে গণভবনে যান আন্দোলনকারীরা। এ সময় ছাত্রদের পাশাপাশি অভিভাবকরাও এসেছেন। শিশু থেকে আবাল বৃদ্ধ সবাই মেতেছেন আনন্দ উল্লাসে। বিজয়ের মিছিলে থাকা আয়েশা আক্তার নামে এক নারী বলেন, দেশটাকে ধ্বংস করেছেন হাসিনা। তার পতনে আমাদের এ বিজয় উল্লাস। উদ্বেলিত জনতা সংসদ ভবনে প্রবেশ করেও আনন্দ উল্লাস করেছেন। এ সময় সেখানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সংসদ ভবনের সামনে বিজয় মিছিলে আসা একজন বলেন, আমাদের তিনজনকে সকালে পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু হাসিনার পদত্যাগের পর আমাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এদিকে গণভবনে উল্লাসে থাকা জনতার মধ্যে অনেকে সেখানকার আসবাবপত্রসহ সব ধ্বংস ও নিয়ে যান। এদিকে রাজপথে লাখ লাখ মানুষের বিজয় মিছিল ছাড়াও আশপাশের সব দালান থেকে বিজয়ী জনতাকে অভিনন্দন জানান ঢাকাবাসী। কেউ কেউ পানিসহ বিভিন্ন খাবারও নিয়ে আসেন ছাত্র-জনতার জন্য। ঢাকা ছাড়াও দেশের সব জেলায় আনন্দ মিছিল করেছেন ছাত্র-জনতা। চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, রংপুর, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরা, খুলনা, বরিশাল, পিরোজপুর, নোয়াখালীসহ দেশের সব জায়গায় আনন্দে মেতেছে জনতা। জেলা ও উপজেলা শহর ছাড়াও গ্রামে-গঞ্জেও বিজয় মিছিল করেছেন আপামর জনতা। সেখান থেকে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নেন তারা। জানান, এখন থেকে বাংলাদেশ হবে সবার। যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।

Monday, August 5, 2024

জনবিষ্ফোরণ নিহত শতাধিক

রক্তাক্ত বাংলাদেশ। লাশের মিছিল। নজিরবিহীন গুলি, সংঘাত, সংঘর্ষ। নিহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। নিহতদের বড় অংশ আন্দোলনকারী। সহিংস হামলায় নিহত হয়েছে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ১৩ পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া কুমিল্লায় আরও এক পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শাসকদলের নেতাকর্মীও। আহত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। স্বাধীন বাংলাদেশ আগে কখনো এমন দিন দেখেনি। সারা দিনই ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেড়েছে নিহতের সংখ্যা। হামলা-সংঘর্ষ হয়েছে জেলায় জেলায়। পুরো দেশই যেন যুদ্ধক্ষেত্র। একই পরিস্থিতি ছিল রাজধানী ঢাকাতেও। পয়েন্টে পয়েন্টে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে ছাত্র-জনতার। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে স্থানে স্থানে। তাদের হাতে রামদা সহ অন্যান্য দেশীয় অস্ত্রও ছিল। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল লাঠি। শনিবার আওয়ামী লীগ যখন কর্মসূচি ঘোষণা করে তখন থেকেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাতভর সরকার সমর্থকরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন আন্দোলনকারীদের প্রতি। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে গতকাল। দিনের শুরুতেই অবশ্য ছাত্র-জনতা শাহবাগের নিয়ন্ত্রণ নেন। এসময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ধাওয়ার মুখে সরে যান। কিন্তু পরবর্তীতে তারা সংগঠিত হয়ে দিনভর বাংলামোটর থেকে গুলি করে। ক্রমশ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঢাকায়। দেশের বিভিন্নস্থানেও সরকার সমর্থকরা হামলা চালান আন্দোলনকারীদের ওপর। কোথাও কোথাও আন্দোলনকারীরাও আওয়ামী লীগের অফিস এবং দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালান। শ্বাসরুদ্ধকর এই পরিস্থিতিতে নতুন করে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সন্ধ্যা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বলবৎ করা হয়েছে কারফিউ।  দুপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে আজ ডাক দেয়া হয়েছে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির। এই কর্মসূচির আওতায় সারা দেশ থেকে আন্দোলনকারীদের রাজধানীতে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিরোধী দলগুলো ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।

দিনব্যাপী সংঘাত-সংঘর্ষে কমপক্ষে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগই গুলিবিদ্ধ। অতিরিক্ত চাপের কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। ঢাকা মেডিকেলে মিনিটে মিনিটে আসে আহত ও নিহতদের বহনকারী এম্বুলেন্স। রাজধানীতে অন্তত ৯ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাশ এসেছে ৭টি। তারা হলেন- কাওরান বাজার এলাকায় গুলিবিদ্ধ কবি নজরুল ইসলাম কলেজের শিক্ষার্থী তাহিদুল ইসলাম (২২), ফার্মগেটে গুলিবিদ্ধ ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রমিজ উদ্দিন (২৮), সায়েন্সল্যাবে গুলিবিদ্ধ হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী (২২), যাত্রাবাড়ীতে গুলিবিদ্ধ ভ্যানচালক রিয়াজুলদৌল্লা (৩২), টিকাটুলিতে গুলিবিদ্ধ অজ্ঞাত একজন, শাহবাগে গুলিবিদ্ধ অজ্ঞাত একজন। এ ছাড়াও আরেকজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া মিরপুরে একজন আওয়ামী লীগের  নেতাকর্মীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। মোহাম্মদপুরের বছিলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ১৯ জেলায় পুলিশসহ অন্তত ৯১ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মী ও পুলিশের গুলিতে নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই হলেন শিক্ষার্থী। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীও আন্দোলনকারীদের হামলায় নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সিরাজগঞ্জে ১৩ পুলিশসহ ২৩, লক্ষ্মীপুরে ১০, ফেনীতে ৮, নরসিংদীতে ৬, কিশোরগঞ্জে ৪, মুন্সীগঞ্জে ৪, রংপুরে ৫, সিলেটে ৬, মাগুরায় ৪, পাবনায় ৩, বগুড়ায় ৪, কুমিল্লায় ৪, বরিশালে ২, শেরপুরে ২, ভোলায় ১, জয়পুরহাটে ১, সাভারে ১, হবিগঞ্জে ১, কক্সবাজারে ১ জন ও কেরানীগঞ্জ ১ জন রয়েছেন।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এদিন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে হিসেবে সকালে রাজধানীর শাহবাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দিতে থাকেন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় শাহবাগে আসা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে ছাত্রলীগ। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুরান ঢাকার দিক থেকে আন্দোলনকারীদের বিশাল একটি মিছিল আসলে ধাওয়া দিতে যায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। কিন্তু উল্টো ধাওয়া খেয়ে পাশে থাকা বিএসএমএমইউতে আশ্রয় নেয় তারা। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এক পর্যায়ে হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন ও পার্কিংয়ে থাকা গাড়ি ও এম্বুলেন্সে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। মুহূর্তে শাহবাগে জড়ো হন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে শাহবাগ, টিএসসি, মৎস্য ভবন, ইন্টারকন্টিনেন্টাল, কাঁটাবনসহ আশপাশের এলাকা। পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অগ্নিসংযোগের সঙ্গে ছাত্র-জনতার কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী আসাদ বিন রনি। তিনি বলেন, ছাত্র সমাবেশে বাধা দিতে সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র, গ্রেনেড-বোমা নিয়ে শাহবাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে জড়ো হতে থাকে। তারা ছাত্রদের ওপর হামলা করার পাঁয়তারা করছিল। সাধারণ ছাত্রদের ওপর দায় দিতে তারা পরিকল্পিতভাবে হাসপাতালের ভেতরে আগুন দেয়। দুপুরের দিকে বাংলামোটর থেকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়ে আওয়ামী লীগ। দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর এক পর্যায়ে পিছু হটে ক্ষমতাসীনরা। ভাঙচুর করা হয় ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আসাদুজ্জামান আসাদের কার্যালয়। এরপর বাংলামোটর থেকে টিএসসি পর্যন্ত পূর্ণ দখলে নেন। একই সময়ে আজিমপুরে হাসিবুর রহমান মানিকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাল্টা ধাওয়ায় পিছু হটেন তারা। একই সময়ে রাজধানীর উত্তরায়ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। এতে কমপক্ষে ১৮ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গুলিবিদ্ধরা উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল ও ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সংঘর্ষের সময় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পুলিশ। এ সময় আজমপুর থেকে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপকে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিতে দেখা যায়। এরপর শিক্ষার্থীরাও পাল্টা ধাওয়া দেন তাদের। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে মোহাম্মদপুরেও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আন্দোলনকারীদের রাবার বুলেট ছুড়ে পুলিশ। এর আগে সকাল থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র হাতে জড়ো হতে শুরু করেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বেলা ১২টার পর থেকে বিচ্ছিন্নভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা তিন রাস্তার মোড় এলাকা থেকে রাস্তায় নামতে শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা।

বিকাল ৩টার দিকে আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুখোমুখি অবস্থান নিতে শুরু করেন। এর কিছুক্ষণ পরই আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে পুলিশের গুলিবর্ষণ চলে। রাজধানীর মালিবাগ আবুল হোটেল এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সরকারবিরোধী নানা স্ল্লোগান আর গ্রাফিতি এঁকে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এ সময় খিলগাঁওয়ের বিভিন্ন রাস্তার গলিতে অবস্থান নেন ছাত্রলীগ ও সরকার সমর্থিত কর্মীরা। রামপুরা ব্রিজ থেকে বাড্ডা পর্যন্তও বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। যমুনার গেটেও অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা।  রাজধানীর ফার্মগেট-কাওরান বাজারে দিনভর হামলায় নিহত ৩ আন্দোলনকারী লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বের করে তাদের নিয়ে রাজপথে নেমেছে আন্দোলনকারীরা। রোববার বিকাল সোয়া ৬টায় আন্দোলনকারীরা শহীদ মিনার থেকে শাহবাগের দিকে স্লোগান দিয়ে যেতে থাকেন। এ সময় তারা, ‘আমার ভাই মরলো কেন? খুনি হাসিনা জবাব দে’, ছি ছি হাসিনা, লজ্জায় বাঁচি না’, ‘একদফা এক দাবি, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। দিনভর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখলে রাখে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সকাল থেকে নেতাকর্মীরা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হন। এ সময় পাশে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দিকে আগাতে চাইলে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দিয়ে পুরো এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। তারা খণ্ড খণ্ড ভাগে ভাগ হয়ে গোলাপ শাহ মাজার, পাতাল মার্কেট, বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম গেট, ফুলবাড়িয়া বিআরটিসি কাউন্টসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন। হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে কাওরান বাজারেও। দুপুরের পর থেকে কাওরান বাজারে অবস্থান নেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। বেলা ২টার পর কিছু শিক্ষার্থী কাওরান বাজারে দিকে এলে তাদের ধাওয়া দেয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা। পরে খবর পেয়ে শাহবাগ এলাকার শিক্ষার্থীরা বাংলামোটরের দিকে এগিয়ে আসেন। এ সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে গুলি ছোড়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। বেলা ৩টার পর বাংলামোটর এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লাঠি হাতে বহিরাগতরা যুক্ত হন। এ সময় দু’পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ চলে। অন্যদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। দীর্ঘক্ষণ চলা সংঘর্ষের পর আওয়ামী লীগ ফার্মগেটের দিকে পিছু হটে। সকাল দশটার পর ধানমণ্ডি-২ নম্বর, সিটি কলেজ, সাইন্সল্যাব এলাকায় জড়ো হতে থাকে ইউল্যাব, স্ট্যামফোর্ড, ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, ধানমণ্ডি আইডিয়াল কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজসহ আশপাশের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকা। পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় হামলা, সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও গুলি ছোড়া হয়। চার ঘণ্টাব্যাপী চলা সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়। নিহত মিরাজ হোসেন (২২) একটি বাসের চালক। সংঘর্ষে অন্তত তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়ে আশপাশের হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সকাল ১০টার পর থেকেই মিরপুর ১০ গোলচত্বরে অবস্থান নেয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ঢাকা-১৪ আসনের এমপি ও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান খান নিখিলের নেতৃত্বে সেখানে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা সমাবেশ করেন। দুপুর ১২টার পর থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা মিরপুর-১০ নাম্বার এলাকায় আসতে চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। মুহুর্মুহু গুলির শব্দ পাওয়া যায়। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ, টিয়ারশেল, গুলি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের। সংঘর্ষ বেনারশি পল্লী, আইডিয়াল গার্লস স্কুল সড়ক, বিআরটিএ সড়ক, মিরপুর ৬ নম্বর, বেগম রোকেয়া স্মরণীতে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ঘটনার পর চিফ মেট্রোপলিটন ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারিক কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। দুপুরে লাঠিসোটা হাতে আদালতের প্রধান ফটক ভেঙে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে পুলিশের বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এরপরই সাময়িকভাবে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। শিক্ষার্থীদের সরকার পদত্যাগের একদফা দাবির সমর্থনে সুপ্রিম কোর্টে প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করছেন আইনজীবীরা। বিক্ষোভ থেকে সরকার পতনের দাবিতে নানান স্লোগান দিয়েছেন আইনজীবীরা। সকাল ১০টা থেকে সুপ্রিম কোর্ট বার ভবনের সামনে আইনজীবীরা বিক্ষোভ শুরু করেন।

ইন্ডিয়া টুডের নিবন্ধ : বাংলাদেশে চূড়ান্ত অরাজকতা, পতনের দ্বারপ্রান্তে হাসিনা সরকার

বাংলাদেশে একপ্রকার নৈরাজ্য চলছে।  নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সহিংসতায় রবিবার কমপক্ষে ৮৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন জেলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যালয় জ্বালিয়ে দিচ্ছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী সহিংস আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শেখ হাসিনার গদি টলমল। রবিবার অসহযোগ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দিনব্যাপী সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৮৮তে পৌঁছে গেছে।  প্রতি মিনিটে বাড়ছে নিহতের সংখ্যা । বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি  বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দাবি মেনে নেন, তাহলে আগামী দিনে  একটি সামরিক সরকার প্রত্যক্ষ করতে চলেছে বাংলাদেশের মানুষ। কারণ জনগণের রায় তার আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। স্পষ্টভাবে বিক্ষোভকারীদের সমর্থনের কথা না বললেও  বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে তারা জনগণের পাশে আছে। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান অফিসারদের বলেছেন যে, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের আস্থার প্রতীক’ এবং ‘তারা  সর্বদা জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে।

জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থে এই সমর্থন  অব্যাহত থাকবে’। একই সময়ে কয়েকজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন এবং সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া সমর্থন প্রদর্শনে তার ফেসবুক প্রোফাইলের  ছবি লাল করে দিয়েছেন।

গত ১৯ জুলাই কোটা বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষ যোগ দেয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর নেতারা সহিংস বিক্ষোভের শিকার হচ্ছেন। ঐক্যবদ্ধভাবে স্লোগান তোলা হচ্ছে - ‘হাসিনা সরকারকে যেতে হবে’। রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। ইন্টারনেট আংশিক বন্ধ  আছে। বাংলাদেশি মোবাইল ফোন অপারেটরদের কর্মকর্তারা বলেছেন যে, তারা দেশে ফোর জি পরিষেবা বন্ধ করার নির্দেশনা পেয়েছেন। ঢাকা-ভিত্তিক একটি সূত্র ইন্ডিয়াটুডে-কে জানিয়েছে- ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আগুন লাগানো হয়েছিল কিন্তু পুলিশ বা অন্য কোনো নিরাপত্তা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়নি।’ তিনি আরও জানিয়েছেন , ‘বেশিরভাগ জেলায় আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন দেওয়া হয়েছে। একজন এমপির বাসভবনে হাজার হাজার জনতা হামলা করেছে এবং তাকে পানির ট্যাঙ্কে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে।’

একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক তথা ডালাস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি সদস্য শাফকাত রাব্বি বলছেন - ‘শেখ হাসিনা সম্ভবত একই ভুল করেছিলেন যেটা ইয়াহিয়া খান ২৬শে মার্চ, ১৯৭১ সালে নির্বিচারে ঢাকার মানুষকে গুলি করে করেছিলেন। হাসিনা জুলাইয়ের মাঝামাঝি সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করেছেন  এবং ফলাফলটি একই দিকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে’। বাংলাদেশের একাধিক সূত্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। তিনি যোগ করেছেন - ‘৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায়  প্রায় এক মাস তরুণ শিক্ষার্থীদের পেছনে তাড়া করার পর সারাদেশে পুলিশ ক্লান্ত এবং শ্রান্ত । এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে যেখানে উল্লেখযোগ্যভাবে পুলিশ কোনো পদক্ষেপ করছে না।  বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কিছু সদস্য (আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন) যারা পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল তারা নিজেরাই হাতে আইন তুলে নিয়েছে  এবং  প্রায় ৪০ জন ছাত্রকে  হত্যা করেছে’।  শাফকাত রাব্বি বলছেন, বাংলাদেশের রাস্তায় প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিবাদে নেমেছে।

ঢাকা-ভিত্তিক সূত্রগুলি বলছে যে, এবার হয়তো হাসিনার যাবার সময় উপস্থিত এবং একটি সামরিক  সরকার তার জায়গা নেবে। তবে হাসিনা বাংলাদেশে  থাকবেন কিনা তা নির্ভর করবে  পরিবর্তিত পরিস্থিতির ওপর। তিনি সবাইকে অনুরোধ করে পরিস্থিতি সামলানোর  চেষ্টা করছেন বটে তবে  জনগণের ক্ষোভ তার এবং তার দলের প্রতি বেড়েই চলেছে । শেখ হাসিনা ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় রয়েছেন। প্রধান বিরোধী দল - বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)  সাম্প্রতিক নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তা বয়কট করে । শাফকাত রাব্বি মনে করেন  ‘এই অবস্থা থেকে হাসিনার বাঁচার  একমাত্র উপায় হবে ব্যাপক হারে  দমনপীড়ন। সামরিক বাহিনী ইতিমধ্যেই তাদের মেশিনগান নিয়ে সারা বাংলাদেশে প্রায় ১০ মিলিয়ন বিক্ষোভকারীর মুখোমুখি হয়ে রাস্তায় নেমেছে। ছাত্র বিক্ষোভ দমন করার জন্য আগামী দিনে  যে ভয়ঙ্কর  মাত্রার দমনপীড়ন শুরু হবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি আবার একটি আক্রমণাত্মক জয় ছিনিয়ে  নিতে পারেন, তবে এই মুহুর্তে সেটির সম্ভাবনা কম’।

ঢাকাভিত্তিক সূত্র মোতাবেক, হাসিনা সরকারকে সমর্থন দেওয়ায় বাংলাদেশিদের মনে  ভারতের বিরুদ্ধে তিক্ততা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা ১৯ জুলাই থেকে একটি নজিরবিহীন বিক্ষোভ প্রত্যক্ষ করছেন এবং  তারা বিশ্বাস করেন যে, হাসিনা সরকার এই মুহূর্তে পতনের  দ্বারপ্রান্তে। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা বাতিলের দাবিতে গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন চালিয়েছে শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ তীব্র হওয়ার সাথে সাথে, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট ২১শে জুলাই কোটা কমিয়ে ৫ শতাংশ করে। এরপরেও  বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল।  বিক্ষোভকারীরা অশান্তি দমন করতে সরকার কর্তৃক ব্যবহৃত অত্যধিক বল প্রয়োগের জন্য জবাবদিহিতার দাবি জানায়। আন্দোলন (যার কেন্দ্রস্থল ছিল ঢাকা), যা একাধিকবার সহিংস রূপ নিয়েছে, তাতে এখনো পর্যন্ত সারা দেশে কমপক্ষে ২৫০ জন (সরকারি হিসেব ) নিহত হয়েছে। সংখ্যাটা ক্রমবর্ধমান।

রংপুর রণক্ষেত্র, কাউন্সিলরসহ নিহত ৪, আহত শতাধিক

রংপুরে শিক্ষার্থী ও আওয়ামী লীগের ভয়াবহ সংঘর্ষে আওয়ামী-যুবলীগ ও ছাত্রলীগ, সিটি কাউন্সিলরসহ ৪ জনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে আন্দোলনকারীসহ বিক্ষুব্ধ জনতা। উত্তাল রংপুর, মাঠ এখন রণক্ষেত্র। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি চলাকালীন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালীন সময় আওয়ামী লীগের যুবলীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডাররা দেশীয় অস্ত্র, ছোরা, তলোয়ার, এসএস পাইপসহ পিস্তল নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গুলি চালায়। তাদের গুলিতে এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হলে নিয়ন্ত্রণহীন শিক্ষার্থীরা বেপরোয়া হয়ে পাল্টা ধাওয়া করে দু’জন যুবলীগ-ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করে পিটিয়ে হত্যা করে। এর পরপরই আওয়ামী লীগ নেতা, রংপুর সিটি করপোরেশনের ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারাধন রায় ও ভাগ্নেকে ঘেরাও করে বিক্ষুব্ধ জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। এ সংঘর্ষে আহত শতাধিক। নিহত দু’জনের লাশ রংপুর মেডিকেল হাসপাতালে পড়ে আছে। অপর দু’জনের লাশ নগরীর পায়রা চত্বরে পড়ে রয়েছে। ব্যাপক সংঘর্ষ হলেও নগরীর কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, সেনবাহিনীসহ প্রশাসনের কাউকে দেখা যায়নি।

সরজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে রংপুর টাউন হলের সামনে আন্দোলনকারীরা আসতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে রাজপথ মহাসমুদ্রে পরিণত হয়। শান্তিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালীন একঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেখানে জমায়েত হয়ে সরকারের পতনে একদফা দাবিতে নানা স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীরা তাদের ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডে লেখা “মোদির পোষা হাসিনা, আমরা তোমায় মানি না” সেই সঙ্গে “আর কোনো আপস নাই খুনী স্বৈরাচার হাসিনার পদত্যগ চাই” “একদফা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষজন। আন্দোলন চলাকালীন বেলা ১১টায় আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেম, তুষার কান্তি মণ্ডলের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্র ও পিস্তল নিয়ে ৭-৮শ’ নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে একটি পক্ষ সামনের দিকে এগুতে থাকে। এ সময় আন্দোলনকারীরা তাদের আসতে দেখে প্রতিহত করার উদ্যোগ নিলে সংঘর্ষে নগরীর সিটি করপোরেশন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিস্তল দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি ছুঁড়লে একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে আন্দোলনকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে আওয়ামী-যুবলীগ-ছাত্রলীগের ওপর। ধাওয়া করে একে একে ৪ জনকে পিটিয়ে হত্যা করে। বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলছিল। এ সময় দু’পক্ষেরই কমপক্ষে ১০০ জন আহত হয়। শিক্ষার্থী মৌমিতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের এখন আলোচনায় বসতে বলতেছেন। তার বাবা তো আলোচনায় বসেননি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমার ভাইয়ের লাশের উপর দিয়ে আলোচনায় বসতে পারবো না। তাই আর কোনো আলোচনা নয়, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ চাই। শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবির উপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। আমি প্রশাসনের ভাইদের বলবো অনেক হয়েছে। দালালি করেছেন এখন বাঁচতে চাইলে আপনারা নিরপেক্ষ থাকেন। কারণ যারা আন্দোলনে রয়েছে তারা আপনার ভাই-বোন। তাদের ওপর গুলি করবেন না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি এলাকা পীরগঞ্জে উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ ছাড়াও পীরগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে ১২টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।

Sunday, August 4, 2024

রণক্ষেত্র সিলেট: মুহুর্মুহু গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল by ওয়েছ খছরু

সন্ধ্যা যখন নামছিল তখন অন্ধকার চারদিকে। এই অবস্থায়ও সিলেট নগরের প্রাণকেন্দ্র চৌহাট্টার চতুর্দিকের এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সংঘর্ষ চলছিল। ক্ষণে ক্ষণে ভেসে আসছিল গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেলের শব্দ। এর আগে বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। প্রায় ৩ ঘণ্টা কয়েকশ’ রাউন্ড গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে প্রকম্পিত হয়ে উঠে সিলেট নগর। নগরের হাওয়াপাড়া, তাঁতিপাড়া, রিকাবীবাজার, দরগাহ মহল্লা, জিন্দাবাজার, মীরবক্সটুলা, আম্বরখানা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ। এ কারণে বাসাবাড়িতে আটকে থাকা বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাটের শাটার বন্ধ রেখে ভেতরে ভয়ে কাঁপছিল আশ্রয় নেয়া সাধারণ লোকজন। বাইরে শুধু শব্দ আর শব্দ। সেই সঙ্গে চিৎকারের শব্দ কানে ভেসে আসছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন; শত শত রাউন্ড গুলির শব্দ তারা বাসাবাড়িতে বসেই শুনেছেন। অনেকেরই দরোজা, জানালায় এসে ছররা গুলি লেগেছে। টিয়ারশেলের ঝাঁঝে বাসাবাড়িতে থাকা শিশু ও বৃদ্ধ লোকজন অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিনের শুরুতে সিলেটের পরিস্থিতি শান্তই ছিল। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী অভিভাবকদের গন্তব্যস্থল ছিল সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার।  বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় কর্মসূচি। নানা ব্যানারে লোকজন এসে শহীদ মিনারে জমায়েত হয়ে কর্মসূচি পালন করতে থাকেন। দুপুরে সেখানে অভিভাবক ও শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কর্মসূচি শুরু হয়। পুলিশের গুলি ও শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় তাদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়। অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবস্থান থাকতে থাকতেই সেখানে আসেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বেলা আড়াইটার মধ্যে হাজারো শিক্ষার্থী অবস্থান নেন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে।

এ সময় সেখানে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ- সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে বিএনপি’র এক দল  কর্মী-সমর্থক আসেন। তারাও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিলে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এভাবে বিকাল পৌনে ৫টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে চলে কর্মসূচি পালন। এ সময় সাঁজোয়া যান নিয়ে পুলিশের একটি টিম চৌহাট্টা এলাকায় অবস্থান করছিল। একই সঙ্গে আরেকটি টিম নগরের জিন্দাবাজার এলাকায় অবস্থান করে। এ ছাড়া চৌহাট্টাকে ঘিরে চতুর্দিকে পুলিশের নিরাপত্তা ব্যুহ তৈরি করা হয়। ৫টার দিকে শুরু হয় সংঘাত। চৌহাট্টা ও শহীদ মিনার এলাকায় সড়কে থাকা শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে লাঠিচার্জ চালায় পুলিশ। এ সময় শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড সহ ছররা গুলি শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুরুতেই পুলিশের ছররা গুলি ও লাঠিচার্জে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী আহত হন। এ সময় পুলিশের কয়েকজনকেও রক্তাক্ত অবস্থায় ওই এলাকায় দেখা যায়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে নগরের হাওয়াপাড়া, তাঁতীপাড়া, জিন্দাবাজার, দরগাহ গেইট, রিকাবীবাজার, মীরবক্সটুলা এলাকায়। এতে করে কয়েকটি এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত পুলিশও কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে এসব এলাকায় শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে টিয়ারশেল, ফাঁকা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে। নগরের হাওয়াপাড়া এলাকার গুলজার টাওয়ারের কয়েকজন বাসিন্দা মানবজমিনকে জানিয়েছেন- টাওয়ারের বাইরে যেনো যুদ্ধ চলছিল। টাওয়ারের সামনে ও আশপাশ এলাকায় অবিরত গুলি ছোড়া হয়। ছররা গুলি এসে তাদের ঘরেও ঢুকে। এ সময় টিয়ারশেলের গন্ধে গোটা এলাকা ছেয়ে যায়। এতে করে মানুষজনও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা জানান- বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁতীপাড়ার একটি মসজিদের মাইক থেকে সাহায্য চেয়ে একজন মাইকিং করেছেন। বাইরে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ হওয়ার কারণে তারা বের হতে পারেননি। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা চৌহাট্টা এলাকা থেকে এসে পাড়া- মহল্লায় আশ্রয় নেন। এ সময় পুলিশ এসে তাদের গলির ভেতরে ঢুকে গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে। গোলাগুলির প্রকম্পিত শব্দে ঘণ্টাখানেক তারা বাসাবাড়িতেই বন্দি ছিলেন।

নগরের জিন্দাবাজার এলাকায় শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিলে পুলিশও সেখানে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় জিন্দাবাজার এলাকার ব্যবসায়ীরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিকালে সিলেট নগরে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার কারণে নগরের সব দোকানপাট ও বিপণি বিতান বন্ধ করে দেয়া হয়। যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ী সহ স্থানীয়রা দোকানপাটের ভেতরেই বন্দি হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় সন্ধ্যার দিকে যখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হচ্ছিলো তখন নগরের দরগাহ’র মূল গেইট থেকে কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ সদস্যরা গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ শুরু করলে তারা চলে যায়। এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা নগরের আম্বরখানা এলাকা পর্যন্ত গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। এদিকে সংঘর্ষের সময় সিলেটে পুলিশ, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, পথচারী সহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সন্ধ্যায় সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (অতিরিক্ত ডিআইজি) আজবাহার আলী শেখ জানিয়েছেন, তাদের কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ কয়েকজনকে আটক করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ  চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি। গতকাল সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কর্মসূচিতে এসে যুক্ত হয়েছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক আসাদুল্লাহ আল গালিব। তিনি জানিয়েছেন- পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি কী ঘটেছে তারা পরবর্তীতে সেটি জানাবেন। এছাড়া; কেন্দ্রীয় ভাবে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে সেটি পালনে তারা সিলেটে সক্রিয় থাকবেন বলে জানান। সিলেট জেলা বিএনপি’র সভাপতি আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী ও নগর বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তারা জানিয়েছেন, ছাত্র- জনতার এই বিক্ষোভ গুলি করে দমানো যাবে না। জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। এদিকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সিলেটে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ আসছিল। নগরের লোকজন ভয়ে-আতঙ্কে ঘরবন্দি অবস্থায় ছিলেন।

সিলেট নগরের চৌহাট্টা এলাকায় ছাত্র-জনতা ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বিএনপি’র পদত্যাগকারী সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট শামসুজ্জামান জামান। মদিনা মার্কেটে আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ: জামায়াত-শিবিরের ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে গতকাল সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেটে শান্তি সমাবেশ করেছে আওয়ামী লীগ। স্থানীয় ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উদ্যোগে এ শান্তি সমাবেশ করা হয় বলে জানিয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বিজিত চৌধুরী। তিনি মানবজমিনকে জানিয়েছেন; শান্তি সমাবেশে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও স্থানীয় লোকজন উপস্থিত ছিলেন। এ সময় আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহ ফরিদ, নাজনিন হোসেন, নগরের সহ-সভাপতি আসাদ উদ্দিন, ফয়জুল আনোয়ার আলাউর, আব্দুল খালিক, স্থানীয় কাউন্সিলর জগদীশ চন্দ্র দাস, জেলা যুবলীগ সভাপতি শামীম আহমদ ভিপি, নগর যুবলীগ সভাপতি আলম খান মুক্তি সহ সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে জেলা ও নগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি: ব্যবস্থা চেয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের চিঠি

বাংলাদেশে সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনকে চিঠি লিখেছেন ২২ জন সিনেটর ও কংগ্রেসম্যান। এতে তারা বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন সম্প্রতি ছাত্রদের বিক্ষোভ দমন করতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ব্যবহার করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সহিংসতা ও সংঘর্ষে বিপুল প্রাণহানি ঘটেছে। তারা গত ৭ই জানুয়ারি নির্বাচনের ইস্যুকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জানুয়ারিতে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অবনতিশীল গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। ক্ষমতাসীন দলের এবং বিরোধী রিপাবলিকান উভয় দলের সদস্য রয়েছেন তাদের মধ্যে। ২রা আগস্ট লেখা ওই চিঠিতে তারা বলেছেন, কয়েক সপ্তাহে সারা বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। এতে বর্তমান সরকারের অধীনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এই চিঠির উদ্যোক্তা সিনেটর এডওয়ার্ড জে. মারকি (ডেমোক্রেট-ম্যাচাচুসেটস), প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জিম ম্যাকগভার্ন ও বিল কেটিং। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অন্যরা হলেন- সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন (ডেমোক্রেট), ডিক ডারবান  (ডেমোক্রেট), টিম কেইন (ডেমোক্রেট), টামি বল্ডউইন (ডেমোক্রেট), জেফ মারকি (ডেমোক্রেট) এবং ক্রিস মারফি। এ ছাড়া প্রতিনিধি পরিষদের যারা স্বাক্ষর করেছেন তারা হলেন- শেঠ মুলটন, লোরি ট্রাহান, জো উইলসন, দিনা তিতাস, গ্রেস মেং, গেরি কনোলি, গাবি আমো, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, ইলহান ওমর, নিদিয়া ভেলাজকুয়ে, ড্যান কিলডি, বারবারা লি এবং ডেলিগেট জেমস মোইলান। চিঠিতে তারা লিখেছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে খর্ব করে এমন পদক্ষেপ অব্যাহতভাবে নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এর মধ্যে আছে জানুয়ারিতে ভয়াবহ ত্রুটিপূর্ণ এক নির্বাচন। শ্রমিকদের বিষয়ে বিধান উন্নত করতে ব্যর্থতা। আর অতি সমপ্রতি গুলি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহভাবে দমনপীড়ন চালাচ্ছে। এই চিঠিতে জোর দিয়ে বলা হয়, এসব উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এবং অব্যাহতভাবে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে আমরা  আশা  করি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে জোরালো সম্পর্ক আছে তার প্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে সমুন্নত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে উদ্যোগ নেবেন আপনি। সব রকম সহিংসতার অবশ্যই নিন্দা জানাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। নিশ্চিত করতে হবে নাগরিক গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতাকে। এর মধ্যে আছে মত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুরক্ষিত রাখা। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে উপরে বর্ণিত নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিতে হবে। উপরন্তু গণতন্ত্রের আরও অবনতি রোধ করার জন্য বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক সরকারের বিষয়ে বাংলাদেশি জনগণের অধিকারকে সমর্থন করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। যে সরকার জনগণের মানবাধিকার ও স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখবে।  উল্লেখ্য, সিনেটর মারকি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এর মধ্যে আছে- শান্তিতে নোবেল  পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়রানি বন্ধে এ বছর জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি ও তার সহকর্মীরা চিঠি লিখেছেন। একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে সরকারের সমালোচকদের টার্গেট করতে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে নিয়ম লঙ্ঘন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সিনেটর মারকি ও তার সহকর্মীরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার। একই সঙ্গে তাদেরকে ভাসানচরে পুনর্বাসন স্থগিত করার আহ্বান জানান, যতক্ষণ ওই স্থানকে জাতিসংঘ নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী বলে নিশ্চয়তা না দেয়।

সংঘর্ষ হামলা গুলি: সিলেট, কুমিল্লা, জামালপুর রণক্ষেত্র, চট্টগ্রামে মন্ত্রীর বাসায় হামলা, গাজীপুরে নিহত ১

দেশের বিভিন্ন জেলায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে হামলা, সংঘর্ষ ও গুলি এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বিভিন্নস্থানে। সংঘর্ষের  মধ্যে পড়ে গাজীপুরের শ্রীপুরে নিহত হয়েছেন। নিহতের নাম জাহাঙ্গীর আলম। তিনি লেপ-তোষকের ব্যবসা করতেন। পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ওদিকে কুমিল্লায় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে ৯ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধসহ অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সিলেটে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশের ছোড়া সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও ছররা গুলিতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এ সময় শিক্ষার্থীদের পাল্টা ইটপাটকেলে পুলিশের কয়েকজন আহত হন।

জামালপুরে শিক্ষার্থীদের নিপীড়নবিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। এসময় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারশেল ছুড়ে পুলিশ। এতে  ১০  শিক্ষার্থী আহত হন।
এদিকে রাতে চট্টগ্রামে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবনে। একই সময়ে স্থানীয় এমপি মহিউদ্দিন বাচ্চুর কার্যালয়ে হামলা করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়।

কুমিল্লায় শিক্ষার্থীদের ওপর আওয়ামী লীগের গুলি গুলিবিদ্ধ ৯, আহত অর্ধশত, এসিল্যান্ডের গাড়িতে আগুন
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে জানান, কুমিল্লায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে ৯ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক। শনিবার দুপুরে কুমিল্লা নগরীর পুলিশ লাইন ও রেসকোর্স এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। চান্দিনা এসিল্যান্ডের একটি গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। তবে চান্দিনা ইউএনও বলেছেন এটি দুর্বৃত্তরা পুড়িয়েছে, শিক্ষার্থীরা নয়।
সরজমিন দেখা যায়, দুপুর ১টায় কুমিল্লা নগরীর পুলিশ লাইনে অবস্থান নিয়েছিলেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে শিক্ষার্থীরাও পাল্টা ইটপাটকেল ছোড়ে। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে গুলি ও ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ ও আহত হন। গুলিবিদ্ধরা হলেনÑ  কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কোটা আন্দোলনকারীর সমন্বয়ক জন্নাতুল মিলি (২০), রেসকোর্স এলাকার মনিরুল হকের ছেলে মাহাবুবুল হক (২০), রামমালা এলাকার জাকির হোসেনের ছেলে আরেফিন (২০), ঠাকুরপাড়া এলাকার শাহাদাতের ছেলে রাহাতুল হাসান মৃদুল (১৭), জুয়েলের ছেলে আরফান মজুমদার (১৬), দিলীপের ছেলে সৌরভ (২৫), আবদুল করীমের ছেলে মারুফ (১৬), ফরিদ উদ্দিনের ছেলে আসিফ (১৮), ইউসুফ মিয়ার ছেলে সুজন (১৮), তোফায়েলের ছেলে সানি (১৮)। আর আহতরা হলেনÑ কুমিল্লা নগরীর কাপ্তানবাজার এলাকার মিজানুর রহমানের ছেলে নাজমুল রহমান (২৭), টমসমব্রীজ এলাকার মহিন উদ্দিন মিয়ার ছেলে শাওন (৪২), বাগিচাগাঁও এলাকার জলিল মিয়ার ছেলে মিরাজ (১৭), ধর্মপুর এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে অপু (৩২), মুনাফের ছেলে সবুর (৩০), রানীর দীঘির পাড় এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে রাব্বি (১৬), মনোহরপুর এলাকার খোকনের মেয়ে আছিয়া (১৮), দৌলতপুর এলাকার জব্বারের ছেলে সফিক (৬০)সহ আরও অনেকে চিকিৎসাধীন আছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলের ব্যানারে অনুষ্ঠিত এ গণমিছিলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এতে কুমিল্লা জিলা স্কুল, কুমিল্লা ইবনেতাইমিয়া স্কুল, কুমিল্লা হাই স্কুল, কুমিল্লা মডার্ন স্কুল, ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়।

জানা যায়, কুমিল্লা সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র সৌরভ চক্রবর্তী নিহত হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। তবে সৌরভ এখন কুমেকে চিকিৎসা শেষে ঢাকা চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি হতে যাচ্ছে বলে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা শেখ ফজলে রাব্বি নিশ্চিত করেছেন। গুলিবিদ্ধ মৃদুলের বাবা শাহাদাত বলেন, আমার ছেলেকে কতো মানা করলাম তাও গেল এ দেশের স্বার্থে। এখন আমার ছেলের একটি চোখে গুলি লেগেছে। কাল অপারেশন হবে, জানি না সে এ চোখে আর দেখতে পাবে কিনা। গুলিবিদ্ধ আরেক শিক্ষার্থী আসিফের বাবা ফরিদ বলেন, আমরা দেশের এ পরিস্থিতি আর দেখতে চাই না। ছেলেদের দাবিগুলো সরকার মানলে তো তারা আর রাস্তায় আসবে না। সরকারকে বলবো আর আমাদের সন্তানদের এভাবে রক্ত দিতে রাস্তায় নামাবেন না। দাবিগুলো মেনে নিন।
এ বিষয়ে কুমিল্লা পুলিশ সুপার সাইদুর ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মৃত্যুর গুজব রটানো হচ্ছে। কুমিল্লায় কেউ মারা যায়নি। পুলিশ ছাত্রদের নিরাপত্তা দিয়েছে। ঘটনার সময় পুলিশ লাইনে আটকে পড়া প্রায় ২ শতাধিক শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের নিরাপত্তা দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

শ্রীপুরে সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়ি ও বক্সে আগুন
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে গাজীপুরের মাওনা চৌরাস্তায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে আশপাশের বেসরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়।  সংঘর্ষে পুলিশের কয়েকটি গাড়ি ও বক্সে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা।

শনিবার বেলা ১১টা থেকে দুইটা পর্যন্ত দফায় দফায় এ সংঘর্ষে বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহসড়কের যান চলাচল। দুপুর ৩টা পর্যন্ত আন্দোলনকারীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে নানা সেøাগান দিচ্ছেন। আটকেপড়া যাত্রীরা পড়েছেন ভোগান্তিতে।
সরজমিন ঘটনাস্থল থেকে দেখা যায়, বেলা ১১টার দিকে ঢাকা ময়মনসিংহ মহাসড়কের উড়াল সড়কের মুখ পল্লী বিদ্যুৎ মোড়ে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেয়। এ সময় পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাওনা চৌরাস্তা  উড়াল সড়কের নিচে অবস্থান নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন।  পুলিশ প্রথম থেকেই পিছু হটলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ধাওয়া দেয়ার চেষ্টা করে এগিয়ে যান। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে আন্দোলনকারীরা ধাওয়া দিলে পিছু হটে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ। একপর্যায়ে পুলিশকে ধাওয়া দিয়ে স্থানীয় একটি মার্কেটে অবরুদ্ধ করলে  পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশের ৩টি গাড়িতে ও ৩টি পুলিশ বক্সে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনকারীরা।  এর একপর্যায়ে পুলিশও পিছু হটে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। নিরাপত্তায় সকাল থেকেই পুলিশের সঙ্গে  ঘটনাস্থলে ছিলেন শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শোভন রাংসা।

মাওনা চৌরাস্তার বেশ কয়েকটি বেসরকারি  হাসপাতালে ও শ্রীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তাদের এখানে প্রায় ২৪ জন আহত রোগী এসেছিল, তাদের অধিকাংশই রাবার বুলেটে আহত। তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা ও ময়মনসিংহে প্রেরণ করা হয়েছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার কাজী শফিকুল আলম বলেন, পুলিশ প্রথম থেকেই তাদের দাযিত্ব পালন করে গেছে, তারা কারও উপর চড়াও হয়নি, এরপর আন্দোলনকারীরা তাদের ধাওয়া করে পুলিশের গাড়িতে ও পুলিশ বক্সে আগুন দেয়।

বিক্ষোভ সর্বত্র, একদফা দাবি: ঢাকাসহ সারা দেশে রাজপথে লাখো শিক্ষার্থী-জনতা

চারদিকে মানুষ আর মানুষ। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গতকাল ঢল নেমেছিল লাখো ছাত্র-জনতার। সেখানে ছাত্র-জনতার সমাবেশ থেকে সরকার পতনের একদফা ঘোষণা করা হয়। চূড়ান্ত এই ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ হাসান। তিনি  বলেন, আর নয় ৯ দফা, এখন দফা একটি- প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হবে। একই সঙ্গে আজ থেকে অসহযোগের ডাক দেয়া হয়। এদিন পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ মিছিল নিয়ে জড়ো হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখান থেকে ছাত্র-জনতার স্রোত ঠেকে চানখাঁরপুল, দোয়েল চত্বর, টিএসসি, স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য পর্যন্ত। হাজার হাজার মানুষের এ সমাবেশে অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ঢাকার স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের দেখা যায় সমাবেশে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফরম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে এদিন বিক্ষোভের নগরীতে পরিণত হয় ঢাকা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, বরিশাল, বরগুনা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, গাজীপুর, রংপুর, জয়পুরহাট, পাবনা, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও, ফরিদপুর, শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভ-সংঘর্ষ হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন অনেকে। গতকালও চিকিৎসাধীন একজনসহ দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এদিন বিভিন্ন স্থানে পুলিশকে খুবই সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুরের পর থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। এদিন আগে থেকেই ঘোষণা দেয়া হয় শহীদ মিনারের বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেবেন এ আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়করা। বিকাল ৩টার আগেই লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সহস্র মানুষের জমায়েত থেকে হত্যা- খুনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে ছিল- ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘দফা এক, দাবি এক-শেখ হাসিনার পদত্যাগ’, ‘৯ দফা বাদ দে, একদফার ডাক দে’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না’, ‘আবু সাঈদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’ ইত্যাদি।

দুপুরের পর থেকে মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ বিকালে ঘোষণা হয় নতুন কর্মসূচি। এ সময় বক্তব্য দেন ডিবি হেফাজত থেকে মুক্ত হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়করা। সেখান থেকে অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। একদফা ঘোষণা করে অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এখন একদফা দাবি। তা হলো- এই যে খুন-হত্যা হয়েছে এর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে। শুধু পদত্যাগ করলেই হবে না বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু শেখ হাসিনা নয় সকল মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আর তাদের কাছে কী বিচার চাইবো। তারাই তো খুনি। আমাদের ডিবি অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনাদের আন্দোলনের কারণে আমরা ছাড় পেয়েছি। আজকেও গুলি চলেছে। এই পরিস্থিতিতে একদফা ঘোষণা করছি। শেখ হাসিনা বলেছেন আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে। তিনি আগেই বুঝেছেন দরজা খোলা রাখার সময় হয়েছে। আমরা আসছি। তিনি আরও বলেন, আমাদের একদফা হলো শেখ হাসিনার পতন এবং এই সরকারের লুটপাট ও দুর্নীতির বিচার করতে হবে। আমরা জেলের তালা ভেঙে আমাদের  ভাইকে আনবো। যে অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে এতে সকল জনতা যোগ দিন। আমরা সকলের সঙ্গে আলোচনা করে সম্মিলিত মোর্চা গঠন করবো। আমরা আমাদের দেশের রূপরেখা ঘোষণা করবো। আগামীকাল থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন চলবে। নাহিদ বলেন, যদি ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি হয় আমরা মেনে নেবো না। এখন ছাত্র-জনতা সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ আন্দোলন পালন করবেন। সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এটা জনগণ মানবে না। আমরা সকল গণহত্যার বিচার করবো বাংলার মাটিতে। বাংলাদেশের জনগণ অসহযোগের নেতৃত্ব দেবে। আপনারা যদি অস্ত্র চালান তাহলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। ছাত্র-নাগরিক সবাই অসহযোগ আন্দোলন সফল করুন। অসহযোগের পাশাপাশি রাজপথের কর্মসূচি পালন করুন। আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ অসহযোগ আন্দোলনের রূপরেখা দেন। ছাত্র আন্দোলনের আরেক অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, আমরা শত শত ভাইয়ের লাশের ওপর দাঁড়িয়েছি। আমরা স্বৈরাচারী সরকারের পতনের দাবি ও ডাক দিয়েছি। পুলিশ সদস্যদের ওপর আমাদের কোনো ক্ষোভ নেই। ক্ষোভ পোশাকটার ওপর। এই পোশাক পরে অসংখ্য গুম, খুন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী আপনারা সম্মানের অনেক উপরে রয়েছেন। আপনারা ক্যান্টনমেন্টে থাকুন। আসতে হলে পোশাক রেখে আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দিন। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সরকার বিভাজন করে রাখতে চায়। আমরা ডান-বাম বুঝি না। আমরা খুনি সরকারের পতন চাই। আমাদের যাতে বিভক্ত করার সুযোগ না পায়। সজাগ থাকবেন।

অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, খুনি সরকার থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত, বিচার না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে। এখানে আবু সাঈদ রয়েছেন, মুগ্ধ রয়েছেন। আপনারাই আন্দোলন সফল করুন। সমাবেশ শেষে ছাত্র-জনতা বেশকিছু সময় অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর সকলে মিছিল নিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। একেকটি মিছিলে কয়েক হাজার করে শিক্ষার্থী বের হচ্ছিল। তারা স্লোগানে স্লোগানে মুখর করে রাখে চারপাশ। শিক্ষার্থীরা বের হয়ে অনেকে টিএসসি’র রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। এর আগে মিছিল নিয়ে আসার সময় আন্দোলনকারী কয়েকজন পুলিশকে লক্ষ্য করে পানির বোতল ছোড়েন। এরপর শিক্ষার্থীরা মানবঢাল হয়ে বোতল হামলা ঠেকান।

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনে ছাত্র-জনতা হত্যা, নির্যাতন এবং গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদ এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ চেয়ে র‍্যালি ও সংহতি সমাবেশ করেছে বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। দুপুরে র‍্যালিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বর থেকে শুরু করে শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর হয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়।
এর আগে রাজধানীর সাইন্সল্যাব, মিরপুর-১০, ডিওএইচ, রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, প্রগতি সরণি, উত্তরা, বসুন্ধরা, খিলগাঁও, আফতাবনগর, শনির আখড়া, কাজলাসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। এ সব কর্মসূচিতে অনেক জায়গায় জড়ো হন অভিভাবকরাও।  

এদিকে রাজধানীর বাইরেও বিক্ষোভ-সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা। সেখান থেকেও সরকারের বিদায়ের দাবি তোলা হয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও জনতার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। কুমিল্লাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় ছাত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন। আহত হয়েছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। চট্টগ্রামে ভাঙচুর চালানো হয়েছে শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরীর বাসভবনে। চট্টগ্রামের মেয়রের বাসায়ও হামলা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ অফিসসহ পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লায় বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে চান্দিনা উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড) সৌম্য চৌধুরীর গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা-বাগুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চট্টগ্রাম অভিমুখী লেনে এসি ল্যান্ডের ব্যবহৃত সরকারি ওই গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়াও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে হামলা চালিয়েছে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এতে অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দুপুর দেড়টার দিকে কুমিল্লা নগরীর পুলিশ লাইনস এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। সন্ধ্যায় শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের চট্টগ্রামের চশমা হিলের বাসায় হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করে। তার আগে বাড়ির অভ্যন্তরে ভাঙচুর ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়াও হামলা হয়েছে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবনেও। টাঙ্গাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা মূল গেট ভেঙে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। এ সময় হলগুলো খুলে দেয়ার জন্য বিক্ষোভ করেন তারা। পরে হল খুলে দেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে স্মারকলিপি দেয়া হয়। বিকাল ৪টার দিকে টাঙ্গাইল শহর ও ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে মাভাবিপ্রবি’র শিক্ষার্থীরা তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

গাজীপুরের শ্রীপুরের মাওনা হাইওয়ে থানায় হামলা চালিয়ে গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে থানার সীমানা প্রাচীরের ভেতরে থাকা রেকার ও থানার একটি গাড়িসহ পুলিশের তিনটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। বিকাল ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

সিলেটে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি অনুযায়ী ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর জেলখানা মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন তারা। বিকাল ৩টা থেকে মহাসড়ক দখলে নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিকাল সোয়া ৫টার দিকে নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় আন্দোলনকারী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষ আশপাশের এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।

নোয়াখালীতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা ও হত্যার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর আড়াইটা থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করে জেলা শহরের মাইজদী বাজার থেকে কর্মসূচি শুরু করা হয়। সেখান থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা জিলা স্কুলের সামনে মহাসড়কে অবস্থান নেয়। বিক্ষোভে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় সবক’টি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। একাত্মতা পোষণ করে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক, আইনজীবী ও শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। শিক্ষার্থীদের সমাবেশ শেষে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

বরগুনায় বৃষ্টিতে ভিজে সড়কে অবস্থান করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন অনেক অভিভাবক। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে থেকে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। পরে শহরের কয়েকটি সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বরগুনা সদর রোড এলাকার প্রেস ক্লাব চত্বর প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।

কুষ্টিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের পাশাপাশি বিক্ষোভে অনেক অভিভাবক, বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের যোগ দিতে দেখা গেছে। এ সময় মিছিল-স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে কুষ্টিয়া শহর।

বিক্ষোভ হয়েছে চাঁদপুরেও। সকাল ১১টার দিকে চাঁদপুর সরকারি কলেজের গেট থেকে সমবেত হতে থাকেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়ে প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে। নওগাঁয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা ও হত্যার প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর জেরে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। সাংবাদিক, পুলিশসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১৮জন। সকাল সাড়ে ১১টায় শহরের কাজীর মোড়ে সমবেত হয়ে এ কর্মসূচি শুরু করেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের একাংশ।

জামালপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। দুপুরে শহরের নতুন বাইপাস মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ হয়ে মির্জা আজম চত্বরে অবস্থান নেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। এতে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ ও জামালপুর-মাদারগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে প্রায় দেড় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এরপর শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ।

যশোরেও বিক্ষোভ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় তাদের সঙ্গে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছেন অভিভাবকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষেরা। এতে দেশের বৃহত্তর স্থলবন্দর বেনাপোলের সঙ্গে সড়কপথে সারা দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিক্ষোভ হয়েছে বরিশালে। এ সময় পুলিশ সদস্যদের বহনকারী একটি গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে সিফাত নামে পুলিশের এক কনস্টেবল আহত হয়েছেন। দুপুর সোয়া ২টার দিকে নগরীর চৌমাথা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ফেনীতেও বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। তবে এ নিয়ে পুলিশ পাল্টা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। দুপুর দেড়টার দিকে শহরের জহিরিয়া মসজিদের সামনে থেকে এ বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খুলতে কর্তৃপক্ষতে ২৪ ঘণ্টা আল্টিমেটাম দিয়েছেন তারা। দুপুর পৌনে ১টা থেকে পৌনে ২টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। বিক্ষোভ হয়েছে রংপুরেও। এতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন  শিক্ষক, আইনজীবী অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে রংপুর প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে বৃষ্টির মধ্যে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়।

ময়মনসিংহে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনকারীরা। দুপুর ২টায় নগরীর টাউন হল মোড় থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে নগরীর নতুন বাজার, গাঙ্গিনাপাড়, দুর্গাবাড়ী, কাচারি সড়ক হয়ে ফের টাউন হলে গিয়ে শেষ হয়। এর আগে বেলা ১১টা থেকে টাউন হল মোড়ে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ মিছিলের জন‍্য শিক্ষার্থীরা জড়ো হন।

রাজশাহীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সমবেত হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিলে শেষে পুলিশ বক্স, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা নগরীতে তিনটি পুলিশ বক্সে ভাঙচুর চালিয়েছে। এ ছাড়া ভদ্রা পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছে। এ সময় দুটি আওয়ামী লীগ ও একটি ছাত্রলীগের কার্যালয় ভাঙচুর চালায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।  
ঢাকার ধামরাইয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা  ঘোষণা করে অভিভাবকরাও অংশ নিয়েছেন এ আন্দোলনে।

ছাত্রদের গণমিছিল ও বিক্ষোভের আয়োজন করেছেন শরীয়তপুরের জেড এইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছাত্রলীগের ধাওয়ায় বিক্ষোভ মিছিলটি পণ্ড হয়ে গেছে। এ সময় কয়েকজনকে মারধর করা হয়।

টাঙ্গাইলে বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা। শহর থে‌কে মহাসড়‌কে গ‌ড়ি‌য়ে‌ছে আন্দোলন। এখনো পর্যন্ত টাঙ্গাইল শহরে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটলেও জেলার সখীপুর উপজেলায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। এ সময় পুলিশসহ অন্তত ১৫জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলমান।

বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন জয়পুরহাটের শিক্ষার্থীরা। ফরিদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিক্ষোভ মিছিলে রাবার বুলেট, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়েছে পুলিশ। এ সময় পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় অন্তত ৮ থেকে ১০ জন ছাত্রের গায়ে রাবার বুলেট বিদ্ধ হয়। এক ছাত্র ১৮টি বুলেট বিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

Saturday, August 3, 2024

বাংলাদেশে আন্দোলনের সমর্থনে রেমিট্যান্স বর্জন নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা :নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন

নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান ভয়াবহ প্রতিবাদ বিক্ষোভকে সমর্থন দিতে বিদেশি রেমিট্যান্সকে নতুন এক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন সমালোচকরা। তারা এই সহিংসতাকে রাষ্ট্র আরোপিত বলে অভিহিত করছেন। এ  উদ্যোগের আয়োজকরা বিদেশে অবস্থানরত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন দেশে রেমিট্যান্স না পাঠাতে। এসব প্রবাসী মাসে প্রায় ২০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে গত বছর আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতে বাধ্য হয়, এমন অবস্থার মধ্যে প্রবাসীরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হলো রেমিট্যান্স। এ উদ্যোগের আয়োজকদের একজন ইউরোপে একটি টেলিকম কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স কমিয়ে দিয়ে স্বৈরাচার সরকারের অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দিতে পারি আমরা। নতুন এই উদ্যোগে সমর্থন করছেন বেশ কিছু সুপরিচিত বাংলাদেশি প্রবাসী। তার মধ্যে আছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একজন সাংবাদিক। তিনি এর আগে একটি টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি ক্ষমতাসীন সরকারের কড়া সমালোচক। ইউটিউবে আছেন তার কমপক্ষে ২০ লাখ ফলোয়ার।

দেশে যুবকদের মধ্যে বেকরত্ব  আকাশচুম্বী। এমন অবস্থায় সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের আহ্বান জানান শিক্ষার্থীরা ও অন্য প্রতিবাদকারীরা। গত মাসে সেই দাবিকে সামনে রেখে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এরপর কমপক্ষে ২০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেখা দেয় ভয়ঙ্কর অস্থিরতা। তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করে সরকার। এর জন্য দেশে ও বিদেশে তীব্র নিন্দা জানানো হচ্ছে। ওদিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে হাজারো মানুষকে। বিরোধী দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে এ বছর বিতর্কিত নির্বাচনে টানা চতুর্থ মেয়াদে পুনঃনির্বাচিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার।  তারা সহিংসতার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে তাদেরকে এবং তাদের ছাত্র সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে। উল্লেখ্য, তীব্র প্রতিবাদের পর ২০১৮ সালে চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। কিন্তু জুনে তা পুনর্বহালের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। কোটা কমিয়ে আনতে যখন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সরকার রাজি হয়, তখন কারফিউ চলতে থাকে এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ উচ্চ পর্যায়ে রয়ে যায়।

বুধবার ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বলেছে, অস্থিরতায় ঢাকা যেভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে তার কড়া সমালোচনা করে তারা। এরপরই বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন সহযোগিতামুলক চুক্তির আলোচনা স্থগিত করে তারা। দুই বছর আগে বাংলাদেশের রিজার্ভ প্রায় ৪৯০০ কোটি থেকে কমে দাঁড়ায় ১৮০০ কোটি ডলারে। এমন অবস্থায় বৈদেশিক রিজার্ভ সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বাংলাদেশ। গত বছরে  প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪০০ কোটি ডলার। তারা যে অর্থ পাঠান তাতে সরকারি ট্যাক্স থেকে এই আয় আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডজাঙ্কট ইন্সট্রাক্সটর অব বিজনেস অ্যানালাইটিসের শাফকাত রাব্বি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য তেল বিক্রি করে যেমন আয় হয়, বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্সও তেমন। রেমিট্যান্স কমে গেলে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এই বর্জন আন্দোলনের আরেকজন নেতা টোকিও ভিত্তিক তৈরি পোশাকের মার্চেন্ডাইজার সাদ্দাম হোসেন।  জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের প্রতি তিনি আহ্বান জানাচ্ছেন অস্থায়ীভিত্তিতে অর্থনৈতিক সঙ্কট থাকা সত্ত্বেও দেশে বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানো বন্ধ রাখতে। তিনি বলেন, আমি এটা করছি আমার মাতৃভূমির জন্য। শিক্ষার্থীদের হত্যা করে এই স্বৈরাচার সরকার সকল বৈধতা হারিয়েছে।
তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বন্ধ রাখাকে দেশদ্রোহিতা এবং দীর্ঘ মেয়াদে অবাস্তব বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, দেশে অবস্থানরত আত্মীয়রা এই অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বৈধ চ্যানেল পরিহার করার আহ্বানের মাধ্যমে তারা অবৈধ উপায়কে উৎসাহিত করছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি রেমিট্যান্স এড়াতে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের উল্লেখ করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রচারণার ফলে সরকারের শীর্ষ স্থানীয় মন্ত্রীরা দেশে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের অনুরোধ করছেন। কোনো কোনো ব্যাংক রেমিট্যান্স আসা বৃদ্ধির জন্য ডলারের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা এরই মধ্যে সতর্কতা দিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক প্রতিবাদ বিক্ষোভ, কারফিউ এবং সরকারের নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ায় প্রায় ১০০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগের স্থান এমন মর্যাদা হুমকিতে পড়েছে।
বর্তমানে এটা পরিষ্কার নয় যে, কি পরিমাণ প্রবাসী বাংলাদেশি রেমিট্যান্স বর্জন আহ্বানে অংশ নিচ্ছেন এবং কি পরিমাণ রেমিট্যান্স কমতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট বলছে,  ১৯শে জুলাই থেকে ২৪শে জুলাই পর্যন্ত মাত্র ৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা একদিনের রেমিট্যান্সের সমান। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাহ উল হক বলেন, বিক্ষোভের সময় ৫ দিন ইন্টারনেট বন্ধ  থাকার কারণে দ্রুত রেমিট্যান্সের এই পতন হয়ে থাকতে পারে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান বলেন, রেমিট্যান্স বর্জনের ফলে এই অবস্থা কিনা তা এখনই বলা যাবে না। কিন্তু যারা রেমিট্যান্স পাঠান তাদের ভগ্নাংশও যদি দেশে অর্থ পাঠানো থেকে বিরত থাকেন, তার মানে হবে বৈদেশিক মুদ্রার  বিনিময় কম আসবে। এর ফলে দেশীয় মুদ্রা টাকার ওপর নিম্নমুখী চাপ বাড়বে। যদি রেমিট্যান্স অর্ধেক কমে যায় তাহলে বাংলাদেশ অস্বচ্ছল হয়ে পড়বে। স্থানীয় মুদ্রা ‘ক্র্যাশ’ করবে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিক্ষাবিদ রাব্বি।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট জাভেদ  আখতার সতর্কতা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সবে আসছে। বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে পুরো ক্ষতি আরও বড় হতে পারে। তবে সরকার আন্দোলন রুখে দিলে রেমিট্যান্স বর্জন হিতে বিপরীত হতে পারে। ঢাকা ভিত্তিক অর্থনীতিবিদ রুবাইয়াত সারওয়ার বলেন, বর্তমান অবস্থা জটিল। তীব্র চাপ রয়েছে। এটাকে সরকার নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘাত বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

ঢাকার পয়েন্টে পয়েন্টে বিক্ষোভ-অবস্থান

রাজধানীর আফতাবনগর, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মিরপুর-১০ ও সায়েন্সল্যাব, শহীদ মিনারে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। শনিবার সকাল থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা এ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন তারা।

আফতাবনগরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা কর্মসূচিতে অংশ নিতে জড়ো হয়েছেন কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে রামপুরার আফতাবনগরের জড়ো হন তারা। এ সময় ব্যাপক পুলিশ সদস্যের অবস্থানও লক্ষ্য করা যায়। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রাজধানীর বাড্ডা রামপুরা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। এ সময় বাড্ডা থানার অর্ধশতাধিক পুলিশ রাস্তা থেকে সরে গেছে।

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ইউআইটিএস ও সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অংশ নিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, এদিন সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শিক্ষার্থীরা অবস্থান শুরু করেন। পরে ১১টা ৫০ মিনিটে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী একযোগে ৯ দফা দাবি আদায়ে স্লোগান দেয়া শুরু করেন।

তারা বলেন, ‘নয় দফা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরবো না। দেশজুড়ে আমাদের ভাই-বোনদের হত্যা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’

বনশ্রী বি ব্ল‌কের সাম‌নে আইডিয়াল স্কু‌লের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগন দিতে থাকেন। এছাড়া সায়েন্সল্যাবে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’সহ নানা স্লোগান দিচ্ছেন তারা। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে সকাল থেকে অনেক পুলিশ সদস্যকে অবস্থান করতে দেখা গেছে।

এদিকে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে অবস্থান নিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন। পরে দুপুর ১টার দিকে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্রে করে সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করে 'আমার ভাই মরল কেন'সহ বিভিন্ন শ্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। রাজধানীর শনির আখড়ায় সড়কে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা নানা ধরনের স্লোগান দিচ্ছেন। রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়িতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

উল্লেখ্য, সারা দেশে আজ শনিবার বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গতকাল শুক্রবার রাত পৌনে ৮টার দিকে ফেসবুক লাইভে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান।

একইসঙ্গে আগামীকাল রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন তারা। ‘সারা দেশে ছাত্র-নাগরিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে খুনের প্রতিবাদ ও ৯ দফা’ দাবিতে এই কর্মসূচির ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।