Wednesday, January 22, 2025

স্পর্শকাতর কিছু পলিসি নিয়ে হাজির হচ্ছেন ডনাল্ড ট্রাম্প by গাজী মিজানুর রহমান

এবারে ডনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা করেছেন, গালফ অব মেক্সিকোর নাম হবে ‘গালফ অব আমেরিকা’। উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড় ডেনালির নাম রাখবেন ‘ম্যাককিনলি’। ২০১৫ সালে বারাক ওবামা পাহাড়টির নাম পরিবর্তন করেছিলেন। ট্রাম্প আগের নামে ফিরে যাবেন। আমাদের দেশে ক্ষমতার পালাবদল হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় মামলা থেকে রেহাই পায় অনেকে। এর একটা কারণ হচ্ছে পূর্ববর্তী সরকারের দ্বারা রাজনৈতিক মামলা দায়েরকৃত হওয়া । গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই জানুয়ারি ৬ এর ক্যাপিটল হিলের হাঙ্গামাকারী ১৫০০ অভিযুক্তকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এটা যুক্তরাষ্ট্রকে যারা অনুসরণ করতে চায়, তাদের জন্য একটা বড় ধাক্কা খাওয়ার বিষয়।

পানামার কাছে হস্তান্তর করা পানামা খাল ফেরত নেবেন ট্রাম্প, কারণ পানামা চীনকে এটা অপারেট করতে দিয়েছে । তার সময়ে মাত্র দুইটি লিঙ্গ থাকবে পুরুষ এবং নারী। তৃতীয় লিঙ্গের কোনো স্বীকৃতি থাকবে না যুক্তরাষ্ট্রে । ২০২২ থেকে বলবৎ ব্যবস্থায় নারী বা পুরুষ ছাড়াও পাসপোর্ট, ভিসা এবং অন্যান্য সরকারি দলিলে জেন্ডার পরিচিতি হিসেবে ‘এক্স’ লেখা যেত। এখন তা রহিত হবে। ট্রাম্প প্রশাসন কোভিড-১৯ এর সময় ডব্লিউএইচও যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি এই অভিযোগে সংস্থাটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছে। এছাড়া জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম প্যারিস এগ্রিমেন্ট থেকে সরে যাবে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্র। ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে যে, কানাডা এবং মেক্সিকোর রফতানি করা পণ্যের উপর ২৫ % অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। এতে এই দুটি দেশের রফতানি বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়বে। সেইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কিছু দ্রব্যসামগ্রির দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকগণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, যদি আগের সমান মূল্যে অন্য কোন দেশ থেকে সেসব পণ্য আমদানি করা না যায় ।

ডনাল্ড ট্রাম্প পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বেছে নিয়েছেন মার্কো রুবিওকে। তিনি পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে কট্টরপন্থী। রুবিওকে কট্টরপন্থী বিদেশনীতির বাজপাখি বলা হয়। ইরান এবং চীনের প্রতি তার হুমকি থাকবে বহুমাত্রিক। আগ্রাসনবাদী  ইসরায়েলকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার পক্ষে তিনি। তাইওয়ানকে আগের মতই সহায়তা দেবেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘটাতে সহায়তা করার জন্য মেক্সিকোকে কঠোর চাপে রাখা হবে। রুবিও  ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ সমাপ্তি চান। কিন্তু তা কেবল ইউরোপের শান্তির জন্য। কারণ এখানে জড়িত হয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যান্য স্থানে তার স্বার্থের প্রতি যথাযথ দৃষ্টি দিতে পারছে না । চীন তাদেরকে ইউরোপে বেঁধে ফেলে অন্যান্য স্থানের গুড় খেয়ে নিচ্ছে । তাঁর মতে জন্মলগ্ন থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যত প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছে , এদের মধ্যে চীন সবচেয়ে ভয়ানক। এমন সব ভয়ানক নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে কি পারবেন ডনাল্ড ট্রাম্প ? আমেরিকার প্রতি চীন-রাশিয়া-ইরান তো নাখোশ ছিলই। সেইসাথে যোগ হচ্ছে মেক্সিকো, কানাডা, পানামা, প্যারিস এগ্রিমেন্টভুক্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের দেশ জার্মানি। থার্ড জেন্ডারের পক্ষের নাগরিকেরাও খুশি থাকবে না নিশ্চয়ই । চাপে পড়ে লেজে-গোবুরে অবস্থা হবে না তো? বলদ গরু যখন কেবল কাঁচা ঘাসের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন ঘাসের মৌসুমে প্রচুর ঘাস খায় আর পেট খারাপ হয়। কষ্টের কাজ করতে গেলে লেজ উঁচু করতে পারে না। ফলে গোবরে আর লেজে সয়লাব হয়ে যায়। গাড়ি টানতে, লাঙ্গল টানতে, ঘানি ঘুরাতো গিয়ে কষ্ট একটু বেশি হলেই  তার অবস্থা খারাপ হয়। কিন্তু  ট্রাম্প শত বিপত্তির মুখে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে প্রমাণ করেছেন, তিনি দুর্বল নন— নাদুস নুদুস ‘ষাঁড়ের’ মতো–  গুঁতো দিতে এবং গুঁতো খেতে ওস্তাদ। এসব ষাঁড় শক্তিধর এবং খায় দায় শুকনো খাবার। তাই  লেজের সাথে গোবরের কনফ্লিক্ট হয় না। সম্ভবত ট্রাম্পের ক্ষেত্রে লেজে-গোবরে অবস্থা হবে না বলে তার সমর্থকদের বিশ্বাস ষোল আনা। তবে কুরবানির হাটের খদ্দেরের মতো বিশ্ববাসীকে চোখ রাখতে হবে তাঁর সিং এর দিকে ।

(গাজী মিজানুর রহমান, অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব এবং প্রবন্ধকার) 

mzamin

ক্ষমতায় বসেই অনেক কিছু বদলে দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েই একের পর এক নির্বাহী আদেশে সই করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পুরোনো অনেক আইন বাতিল করেছেন। অনেক কিছুই এখন ওলট–পালট। তাঁর এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বাইডেন প্রশাসনের ধারা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে আনার ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁর তড়িঘড়ি জারি করা নির্বাহী আদেশের প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে।

রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল ভবনে গত সোমবার জাঁকজমকপূর্ণ এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ৭৮ বছর বয়সী ট্রাম্প। এরপর দুই দফায় প্রায় অর্ধশত নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন তিনি। প্রথম দফায় রাজধানীর ক্যাপিটল ওয়ান অ্যারেনায় অভিষেক প্যারেডের পরপরই, আর দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে। এ সময় সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপও চালিয়ে গেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

অভিবাসন থেকে পরিবেশ, সরকারি নিয়োগ থেকে নাগরিকত্ব—নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কোন বিষয়ে বদল আনেননি ট্রাম্প? ক্ষমতায় বসে কলমের এক খোঁচায় ক্ষমা করেছেন ২০২১ সালে ক্যাপিটলে হামলায় দোষী সাব্যস্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে। এমন কিছু ঘোষণা দিয়েছেন, যার প্রভাব এরই মধ্যে পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। দেশের বাইরে থেকেও ট্রাম্পের নানা মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া আসছে।

এসব পরিবর্তনের বিষয়ে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকেই বলে আসছিলেন ট্রাম্প। গণতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ তা মেনেই বিপুল ভোটে তাঁকে জয়ী করে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছেন। সোমবার অভিষেক ভাষণেও ট্রাম্প বলেছেন, এই নির্বাহী আদেশগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার যাত্রা শুরু হবে।

সীমান্তে জরুরি অবস্থা, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিল

ক্ষমতায় বসার দিনই অবৈধ অভিবাসীদের ওপর খড়্গহস্ত হওয়ার কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। সে কথার কোনো নড়চড় হয়নি। সোমবার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র–মেক্সিকো সীমান্তে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন তিনি। এখন চাইলে সেখানে মার্কিন সেনাদের মোতায়েন করতে পারবেন। এই আদেশের আওতায় অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার একটি প্রকল্পও বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত কর্তৃপক্ষ।

সংবিধানের তোয়াক্কা না করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের একটি বিধানও বাতিল করেছেন ট্রাম্প। এতে এখন থেকে ৩০ দিন পর যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া অবৈধ অভিবাসীদের সন্তানেরা দেশটির নাগরিকত্ব পাবে না। ট্রাম্পের এই আদেশ মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনের বিরুদ্ধে যায়। ১৮৯৮ সালের ওই সংশোধনীতে বলা হয়, মার্কিন ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করা সবাই দেশটির নাগরিকত্ব পাবে।

২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দিন ট্রাম্পের উসকানিতে ক্যাপিটল ভবনে দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় ১৪০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছিলেন। মৃত্যু হয়েছিল চারজনের। দাঙ্গার পর ট্রাম্পের বিপুলসংখ্যক সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে দোষী সাব্যস্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ জনকে সোমবার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। যদিও এদিনই সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বাইডেনের পরিবারের সদস্যসহ তাঁর প্রশাসনের একদল কর্মকর্তাকে আগাম সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার কড়া সমালোচনা করেছিলেন তিনি।

এ ছাড়া আরও কিছু নির্বাহী আদেশে সই করেছেন ট্রাম্প। সেগুলোর মাধ্যমে তিনি বাতিল করেছেন বাইডেনের বিভিন্ন নীতি; মাদক চক্রগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে; সহজ হয়েছে সরকারি কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত করার প্রক্রিয়া; স্থগিত হয়েছে সামরিক বাহিনীসহ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগ; বন্ধ হয়েছে সরকারি চাকরিজীবীদের বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ; চালু করা হয়েছে সরকারের কার্যকারিতা মূল্যায়ন–সংক্রান্ত বিভাগ—‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট ইফিসিয়েন্সি’; নির্বাচনে হস্তক্ষেপের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের; বাইডেন প্রশাসনের অনুসন্ধানমূলক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিগত প্রশাসন যেসব ‘অপকর্ম’ করেছে সেগুলো সংশোধন করা যায়।

আন্তর্জাতিক সংস্থা, চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের উদ্যোগ

নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জলবায়ু–সংকট নিরসনে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন ট্রাম্প। এর আগে প্রথম মেয়াদেও একই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পরে তা আবার বহাল করেন। সেদিকেই ইঙ্গিত করে এই নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের সময় ট্রাম্প বলেন, ‘কী মনে হয়, বাইডেন এটা করতে পারতেন? আমার মনে হয় না।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন ট্রাম্প। সংস্থাটিতে সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়ে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালের হিসাবে তা মোট অনুদানের ১৮ শতাংশ। সেখান থেকে সরে আসতে চান নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র আবারও বিবেচনা করে দেখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন ডব্লিউএইচওর প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস।

সোমবার ট্রাম্পের নেওয়া সিদ্ধান্তের বিষয়বস্তু ছিল পররাষ্ট্র দপ্তরও। এদিন সীমান্ত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দপ্তরের এক ডজনের বেশি জ্যেষ্ঠ কূটনীতিককে পদত্যাগ করতে বলা হয়। সিনেটের ভোটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মার্কো রুবিও। এ ছাড়া ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, বাইডেন প্রশাসনের নিয়োগ দেওয়া সহস্রাধিক ব্যক্তিকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেবেন তিনি।

এরই মধ্যে সরকারের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁরা হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের খেলাধুলা, স্বাস্থ্য-সবলতা ও পুষ্টিবিষয়ক পরিষদের হোসে আন্দ্রেজ, জাতীয় অবকাঠামো উপদেষ্টা পরিষদের মার্ক মিলে, উইলসন সেন্টার ফর স্কলার্সের ব্রায়ান হুক ও রপ্তানিবিষয়ক পরিষদের কেইশা ল্যান্স বটমস।

প্রথম দিনেই বিশ্ব অর্থনীতি, গাজা, রাশিয়া ইস্যু

ক্ষমতায় বসার পর যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন ট্রাম্প। তবে সোমবার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেননি। শুধু বলেছেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মেক্সিকো ও কানাডার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এ খবরেই দরপতন হয়েছে দুই দেশের মুদ্রার। বেড়েছে মার্কিন ডলারের দাম। প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও।

অভিষেকের দিন বৈশ্বিক অঙ্গনে সাড়া ফেলার মতো কিছু বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প। উঠে এসেছে পানামা খাল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও। নির্বাচনে জয়ের পর কয়েক সপ্তাহ ধরে বেশ কয়েকবার পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। আর সোমবার বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ ওই পানিপথের চারপাশে চীনের প্রভাব বাড়ছে এবং চীনই কার্যত পানামা খাল পরিচালনা করছে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা দেশের তালিকা থেকে কিউবার নাম সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ আটকে দিয়েছেন ট্রাম্প। ঘোষণা করেছেন মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ রাখার। নতুন মেয়াদের শুরুর দিনে গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গও তুলেছেন। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ডের জনগণ ডেনমার্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুখী থাকবে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করতে আগে থেকেই তৎপর ছিলেন ট্রাম্প। একটি শান্তিচুক্তি নিয়েও আলোচনা শুরু করেছিলেন। এই যুদ্ধ নিয়ে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনে ট্রাম্পের ক্ষমতা হস্তান্তর দলের প্রধান রবার্ট উইলকি বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ফোন করে যুদ্ধ থামাতে বলবেন ট্রাম্প। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকেও ফোন করবেন তিনি।

তবে সোমবার ট্রাম্পের একটি বক্তব্য হতাশা জাগানোর মতো। হোয়াইট হাউসে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের সময় তিনি বলেন, গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে তিনি আশাবাদী নন। দীর্ঘ ১৫ মাস পর গত রোববার থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম দিনেই ৯০ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি উন্নয়ন সহায়তা স্থগিত করেছেন ট্রাম্প। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিক এই আদেশের ব্যাপ্তি সম্পর্কে পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি। এই আদেশ কী ধরনের কর্মসূচি, দেশ, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা–ও স্পষ্ট হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েই জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব সুবিধা বন্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েই জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব সুবিধা বন্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

ভেঙে পড়ছে বিশ্ব ব্যবস্থা! by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনে বিশ্ব ব্যবস্থা কি ভেঙে পড়ছে? যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের মোড়ল হিসেবে গণ্য করা হয়। সেই মোড়লকে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় অবস্থান থেকে কার্যত সরিয়ে নিচ্ছেন দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ঘোষণার মধ্যদিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে মোড়ল মেনে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে পড়ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ অবস্থায় সারাবিশ্বে এক হিম আতঙ্ক বিরাজ করছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের গৃহীত পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি সহ সব বিষয়কে প্রভাবিত করে। ক্ষমতায় এসেই ট্রাম্প যে বিপুল পরিমাণ নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক সমালোচনা উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে তিনি কি নিজেদেরকে গুটিয়ে নিলেন! বিষয়টি সেরকমই। এই যেমন শপথ নেয়ার পরই তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা দেন। এর মধ্যদিয়ে সারাবিশ্বের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এর ফলে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. আধানম ঘেব্রেয়েসাস। তিনি সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে ট্রাম্প জারি করেন জাতীয় জরুরি অবস্থা। অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেন। তাদেরকে ঠাঁই দেয়ার জন্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনকে দায়ী করেন। ২০২১ সালের ৬ই জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে তার উস্কানিতে সংঘটিত দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত প্রায় ১৬০০ ব্যক্তিকে সাধারণ ক্ষমা করে দেন। এর মধ্যে অনেক বন্দি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বেরিয়ে আসার কথা। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক স্বর্ণালী যুগের সূচনার ঘোষণা দেন। নিজেকে জানান একজন পিসমেকার এবং একত্রীকরণ বিষয়ক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রথম নির্বাহী আদেশগুলোর মধ্যে কয়েকটি বেশির ভাগ ফেডারেল নিয়োগকে স্থগিত করেছে, নতুন ফেডারেল নিয়ম প্রণয়ন এবং সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জারি করেছেন এমন প্রায় ৮০টি নির্বাহী আদেশ প্রত্যাহার করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথম মেয়াদের মতোই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করেছেন। বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটকের বিরুদ্ধে ফেডারেল যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা স্থগিত করতে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। এই আদেশে তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলকে ৭৫ দিনের জন্য টিকটকের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নিতে বলেছেন। এ সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ পাবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার শপথ অনুষ্ঠানের ভাষণে তার প্রথম প্রশাসনিক মেয়াদের কিছু পদক্ষেপ ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। এরই মধ্যে ফেডারেল কর্মকর্তারা সরকারের একটি অ্যাপ বন্ধ করে দিয়েছে। এই অ্যাপটি ব্যবহার করে অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে প্রবেশের জন্য শিডিউল নিতেন। এই অ্যাপ সক্রিয় থাকা অবস্থায় প্রায় ১০ লাখ অভিবাসী তা ব্যবহার করেছেন। ডনাল্ড ট্রাম্প ফেডারেল ওয়ার্কারদেরকে ব্যক্তিগতভাবে পূর্ণ সময় কাজে ফেরার নির্দেশ দিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব (ইন্টারনাল রেভিন্যু সার্ভিস) বাড়ানোর জন্য তিনি লোক ‘হায়ার’ করা স্থগিত করেছেন। জন্মগতভাবে নাগরিকত্ব সংজ্ঞায়িত করে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন ট্রাম্প। তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারেন না। তবে এটা পরিষ্কার করেছেন যে, তিনি জন্মগতভাবে নাগরিকত্বের অধিকারকে প্রত্যাখ্যান করতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন এমন ব্যক্তিদের সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলে সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে ওই সন্তানকে নাগরিকত্ব দেয়া হয়। ট্রাম্প এই অধিকারের বিরুদ্ধে নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। তবে বিষয়টি আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ক্ষমতার শেষ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জেনারেল মার্ক এ মিলি সহ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ এমন বেশ কিছু ব্যক্তিকে সুরক্ষিত রাখতে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। ক্ষমা করে দেয়ার জন্য মিসিসিপির ডেমোক্রেট প্রতিনিধি বেনি থম্পসন, ওয়েমিং থেকে রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রতিনিধি লিজ চেনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন জো বাইডেনকে। তারা বলেছেন, আইন ভঙ্গ করে নয়, আইনকে সমুন্নত রেখে তাদেরকে ক্ষমা করেছেন বাইডেন। ট্রাম্প তার ভাষণে বলেছেন, ফেডারেল আইন প্রয়োগকে হাতিয়ার বানানো হয়েছিল। তিনি তার ইতি ঘটাবেন। জো বাইডেন প্রশাসনের ‘রাজনৈতিক বিরোধী’দের বিরুদ্ধে যেসব ফেডারেল মামলা আছে তা তুলে নেয়ার আদেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইস্যুতে ট্রাম্প বলেছেন, কোভিড-১৯ মহামারি এবং আন্তর্জাতিক অন্য স্বাস্থ্যগত সংকটকে ভুলভাবে মোকাবিলা করেছে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিষয়ক এই সংস্থা। তিনি অভিযোগ করেছেন সংস্থার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক প্রভাব নিরপেক্ষভাবে কাটিয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই সংস্থায় অন্যায়ভাবে বেশি অর্থ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের মতো বৃহৎ দেশগুলোর তুলনায় বৈষম্যমূলকভাবে বেশি সেই অর্থ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সবাই যুক্তরাষ্ট্রকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। এটা আর ঘটতে দেয়া যাবে না। তার সিদ্ধান্তের বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিচালনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে শুধুই শক্তিশালী করা উচিত, দুর্বল নয়। নিজের দায়িত্ব পালনে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সহযোগিতা আরও গভীর করতে এই সংস্থাকে অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়ে যাবে চীন। ট্রাম্পের ঘোষণার অর্থ হলো আগামী এক বছর বা ১২ মাসের মধ্যে জাতিসংঘের স্বাস্থ্য বিষয়ক এই সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে যাবে এবং এতে তাদের যে আর্থিক অবদান তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। উল্লেখ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র। এই সংস্থায় মোট যে তহবিল তার মধ্যে শতকরা প্রায় ১৮ ভাগ দেয়  দেশটি। এ সংস্থার সর্বশেষ ২০২৪-২০২৫ব্যাপী দুই বছরের বাজেট ধরা হয়েছে ৬৮০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র পরিশোধ করেছে প্রায় ১২২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভেতরের এবং বাইরের বেশ কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, এই সংগঠনের সব কর্মসূচি এর ফলে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগ টিবি, এইচআইভি/এইডস এবং স্বাস্থ্যগত অন্যান্য জরুরি সেবা রয়েছে এর মধ্যে। ট্রাম্পের আদেশে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যখন নিজেদেরকে প্রত্যাহার প্রক্রিয়া চলবে তখন ডব্লিউএইচও’র সঙ্গে মহামারি বিষয়ক চুক্তি নিয়ে আলোচনা বন্ধ রাখবে প্রশাসন। ডব্লিউএইচও’তে সরকারের যেসব কর্মকর্তা কাজ করছেন তাদেরকে দেশে ফেরত নেয়া হবে এবং নতুন দায়িত্ব দেয়া হবে। তবে এক্সে দেয়া এক পোস্টে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেডরোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে তাতে অনুশোচনা প্রকাশ করছে এই সংস্থা। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গড়ে তোলার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র। আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মধ্যে অংশীদারিত্ব বজায় রাখার গঠনমূলক আলোচনায় জড়িত থাকার অভিপ্রায় প্রকাশ করেন তিনি।  

আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সমালোচনা উঠেছে যে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পলিসি নিতে গিয়ে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রকে অধিক পরিমাণে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে যাচ্ছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা বিষয়ক খরচের খাত ব্যাপকভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশের অধীনে যেখানে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বিদেশি সহায়তা হিসেবে বেশি অর্থ খরচ করছে, সেখানে সেখানে কর্তন করতে পারেন ট্রাম্প। এর মধ্যদিয়ে অর্থ সাশ্রয় করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দিতে চান। পাশাপাশি আগ্রাসী কিছু নীতি নিয়েছেন। তিনি পানামা ক্যানাল, গ্রিনল্যান্ড এবং গালফ অব মেক্সিকোকে যুক্তরাষ্ট্রের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছেন। গালফ অব মেক্সিকোকে তিনি গালফ অব আমেরিকা ঘোষণার নির্দেশে স্বাক্ষর করার পরিকল্পনা নিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাউন্ট ম্যাককিনলে’কে ডেনালি নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ এই পাহাড়কে আবার আগের নামে ফিরিয়ে নেয়া হবে। ভবিষ্যতে প্রতিজন প্রেসিডেন্টের শপথগ্রহণের দিন জাতীয় পতাকা পূর্ণ উচ্চতায় উত্তোলনকে বাধ্যতামূলক করে আদেশে স্বাক্ষর করেছেন ট্রাম্প।  প্রয়াত সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মৃত্যুতে পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছিল। এ কারণে তিনি এমন নির্দেশ দিয়েছেন।

সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ের বেশ কিছু অভিবাসন বিষয়ক নির্দেশ উল্টে দিয়েছেন নতুন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এর মধ্যে ভয়াবহ অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয় আছে। তাদেরকে দেখা হয় জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ ছাড়া সীমান্তে যাদেরকে জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি মনে হবে, তাদেরকে ফেরত পাঠানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে যেসব মানুষ বসবাস করছেন তাদেরকে ফেরত পাঠানোকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে এই নীতি ছিল। যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন ট্রাম্প। সেখানে অভিবাসন বিষয়ক এজেন্টদের সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে শরণার্থী ও আশ্রয় গ্রহণকে বিধিনিষেধের আওতায় আনার নীতি নেয়া হয়েছে। ট্রাম্প আকস্মিকভাবে ইউএস রিভিউজি এডমিশন প্রোগ্রাম অস্থায়ী ভিত্তিতে সাময়িক স্থগিত করেছেন। এর মধ্যদিয়ে এই কর্মসূচিতে জনগণের নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এমন একটি নীতি চালু করার, যার অধীনে জোরপূর্বক আশ্রয়প্রার্থীদেরকে মেক্সিকো সীমান্তে অপেক্ষমাণ রাখা হবে। কিন্তু কর্মকর্তারা এখনো বলেননি যে, মেক্সিকো তার অভিবাসীদের আবার ফেরত নেবে কিনা।

উপরন্তু কানাডা, মেক্সিকো, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত যে শুল্ক আরোপের ঘোষণা আগেভাগেই তিনি দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিরাট প্রভাব পড়বে। ভোক্তাদের গুণতে হবে অতিরিক্ত অর্থ। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো আর্থিক সঙ্কটে পড়তে পারে। এর ফলে ক্রমশঃ অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি।

mzamin

জুলাই গণহত্যায় জড়িতরা পুনরায় দেশ চালাবে জনগণ তা চায় না

যারা মানুষকে হত্যা করেছে এবং বিভিন্নভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে নির্বাচন কমিশনকে সেই সুপারিশ দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার। গতকাল নির্বাচন ভবনে ইসি বিটের সাংবাদিকদের সংগঠন রিপোর্টার্স ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি আয়োজিত ‘আরএফইডি টক’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যারা দেড় হাজার মানুষকে হত্যা, গুম ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, তারা পুনরায় দেশ শাসন করুক তা অধিকাংশ মানুষ চায় না। গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা করেছে, যারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করেছে, তারা যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে সেই সুপারিশ নির্বাচন কমিশনকে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যত জায়গায় গিয়েছি মানুষের কাছে এই আকুতি শুনেছি, আবার যেন এর পুনরাবৃত্তি না ঘটে। সেজন্য আমরা কতোগুলো প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা আশা করি সরকার গ্রহণ করবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা কাউকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চাই না। এটা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। যারা আমাদের প্রায় দেড়-দুই হাজার ব্যক্তি খুন করেছে, যারা গুম করেছে, যারা বিভিন্নভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে, আমরা কি চাই তারা আবার এসে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনা করুক? আমি তো মনে করি অধিকাংশ জনগণই চায় না। আমরা তাই প্রস্তাব করেছি। সেগুলো গৃহীত হবে কি না হবে সেটা নির্ভর করবে আমাদের রাজনৈতিক দল ও সরকারের ওপর।

বদিউল আলম বলেন, একই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনও যে দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে গিয়েছে এজন্য আমরা যারা অপরাধী তারা যেন রাজনৈতিক দলের সদস্য না হতে পারে তার সুপারিশ করেছি। আমরা রাজনৈতিক দলের মেম্বারশিপ রোস্টার করার প্রস্তাব করেছি। এই মেম্বারশিপ রোস্টার ব্যবহার করেই তারা স্থানীয় পর্যায়ে তাদের দলীয় নেতাকর্মীরাই মনোনয়নের ব্যাপারে একটা প্যানেল দেবে এবং প্যানেল থেকে জাতীয় মনোনয়ন বোর্ড সেখান থেকে মনোনয়ন দেবে। যাতে রাজনৈতিক দলগুলো দায়বদ্ধ হয় তাদের সদস্যদের কাছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা বলেছি রাজনৈতিক দলগুলো যাতে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। আপনারা জানেন যে, আমি একটা মামলা করেছিলাম নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে, তথ্য কমিশনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলের হিসাবনিকাশ পাওয়ার ব্যাপারে। বহু হয়রানির পর শেষ পর্যন্ত আমি আদালতে গিয়েছি এবং একটা যুগান্তকারী রায় দিয়েছে আদালত। যেসব তথ্য তাদের কাছে এগুলো পাবলিক ইনফরমেশন এবং এগুলো তারা প্রকাশ করতে বাধ্য। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়বদ্ধ হতে হবে, স্বচ্ছ হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সদস্যদের কাছ থেকে যে সদস্য ফি নেবে, তাদের যে অনুদান আসবে তার একটি সীমা আমরা নির্ধারণ করে দিয়েছি। তার ভিত্তিতে তারা ব্যয় করবে। এর অডিট হিসাব তারা নির্বাচন কমিশনে দেবে এবং নির্বাচন কমিশন এগুলো প্রকাশ করতে বাধ্য হবে।

রাজনৈতিক দলের আর্থিক স্বচ্ছতা, গণতন্ত্রের চর্চা এবং দায়বদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক অঙ্গন পরিচ্ছন্ন করার ব্যাপারে আমাদের সুপারিশ দিয়েছি এবং ইসিকে আমরা ক্ষমতায়িত করার চেষ্টা করেছি। যেমন প্রার্থী চূড়ান্ত করার ব্যাপারে ইসি’র নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, হলফনামা ছকের পরিবর্তনের কথা বলেছি। নির্বাচনের পরে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সঠিক হয়েছে এটা সার্টিফাই করবে। নির্বাচন সুষ্ঠু করার ব্যাপারেও কতোগুলো সুপারিশ করেছি আমরা।

তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য আমরা না ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করেছি, হলফনামার ছকের পরিবর্তন আনা এবং হলফনামা যাচাই-বাছাই করা এবং যাচাইয়ের সময় যদি অসত্য তথ্য বা তথ্য গোপনের অভিযোগ ওঠে তাদের মনোনয়ন বাতিল, নির্বাচন বাতিল এবং নির্বাচন একবার বাতিল হলে আদালতের মাধ্যমে তারা যেন আর নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে এর সুপারিশ করেছি। তিনি বলেন, আমরা ৪০ শতাংশের নিচে ভোট পড়লে পুনঃনির্বাচনের কথা বলেছি।

mzamin

ট্রাম্পের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে চাঁদের হাট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে ডনাল্ড ট্রাম্পের  শপথগ্রহণ  অনুষ্ঠানে দেখা যায় বিশ্বের অন্যতম ধনকুবেরদের মেলা। পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করা জায়ান্ট কোম্পানিগুলোর অধিকাংশ মালিকদের এদিন দেখা যায় এক ফ্রেমে। ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস এবং মার্ক জাকারবার্গ-কে এক ফ্রেমে বন্দি করেন চিত্রগ্রাহকরা।  ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে মঞ্চের ডান পাশে দেখা যায় জনপ্রিয় মোবাইল কোম্পানি অ্যাপেলের সিইও টিম কুককে, তার পাশে দেখা যায় এলফাবেট প্রধান সুন্দর পিচাইকে। বিশ্বের এক নম্বর ধনী টেসলা ব্র্যান্ডের মালিক ইলন মাস্ক, মেটা’র সিইও মার্ক জাকারবার্গ, অ্যামাজনের সাবেক প্রধান জেফ বেজোস এবং তার বাগদত্তা লরেন স্যানচেজ  শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে  বিশেষভাবে নজর কাড়েন। শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে যেন প্রযুক্তি খাতের ধনকুবের, বিদেশি কূটনীতিক ও শীর্ষস্থানীয় সিইওদের মিলনমেলা বসেছিল। শপথ অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সদস্যদের পেছনেই আসন গ্রহণ করেন প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী কর্তাব্যক্তিরা। বিশ্ব ধনকুবেরদের একই ছাদের নিচে নিয়ে আসাকে মার্কিনিদের নতুন একটি মাইলফলক হিসেবেই বিবেচনা করছেন অনেকেই। ক্যাপিটলের রোটুন্ডায় যখন বিলিয়নিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠাতা, কোটিপতি ব্যবসায়ী এবং ধনী রাজনীতিবিদরা উপস্থিত ছিলেন তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ অনেকের হয়তো কল্পনাতেও আসবে নাÑ ১ ট্রিলিয়ন  ডলারেরও  বেশি। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী, ফোর্বসের রিয়েল-টাইম বিলিয়নিয়ারদের তালিকায় শীর্ষে ছিলেন ইলন মাস্ক। দক্ষিণ আফ্রিকার এই উদ্যোক্তা বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলা এবং মহাকাশ অনুসন্ধান কোম্পানি স্পেস এক্স-এর মালিকানার মাধ্যমে তার সম্পদ বাড়িয়েছেন। ফোর্বস অনুসারে তার সম্পদ ৪৩৩.৯ বিলিয়ন ডলার। ধনীদের  তালিকাতে এরপরেই আছেন অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, তার সম্পদ ২৩৯.৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও বেজোসের আংশিক মালিকানাধীন দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে ট্রাম্প সম্পর্কে লেখা হয়েছিল ৩৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তাদের প্রতিষ্ঠান মার্কিন নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে সমর্থন করবে না। ফোর্বসের তালিকায় তৃতীয় ধনী হলেন মেটা প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ, যার সম্পদ মূল্য ২১১.৮ বিলিয়ন ডলার। তার কোম্পানি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপের মালিক। বিশ্বের চতুর্থ ধনী ব্যক্তিÑ ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন সেখানে ছিলেন না। তবে  পঞ্চম স্থান দখলকারী ব্যক্তি  বার্নার্ড আর্নল্ডকে ট্রাম্পের  পরিবারের সঙ্গে দেখা গেছে। যিনি ফরাসি বিলাস দ্রব্যের জায়ান্ট কোম্পানি এলভিএমএইচ ডিওর-এর মালিক। তার মোট সম্পদ মূল্য ১৮১.৩ বিলিয়ন ডলার। মরিয়ম অ্যাডেলসন, যিনি  ৩১.৯ বিলিয়ন সম্পদের সঙ্গে ফোর্বসে বিশ্বের ৫৫তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্থান পেয়েছেন। তার উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ফোর্বসের ধনী তালিকায় নিচের দিকে ৮৯তম স্থানে থাকলেও মিডিয়া ম্যাগনেট রুপার্ট মারডক, যার সম্পদ মূল্য ২২.২ বিলিয়ন ডলার, তিনিও উপস্থিত ছিলেন এদিনের অনুষ্ঠানে। তার ফক্স নেটওয়ার্ক আবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে বেশ প্রিয়। ফক্স ছাড়াও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং নিউ ইয়র্ক পোস্টের মালিক।

সূত্র: স্কাই নিউজ

mzamin

টিউলিপের কানেকশনে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে

সিটি মিনিস্টারের পদ ত্যাগ করেছেন টিউলিপ সিদ্দিক। তবে তিনি বৃটেনে এমপি আছেন এখনো। তার খালা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের সময় মানুষকে ‘গুম’ করা হয়েছে। এসব বিষয় জানার পরও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার সিটি মিনিস্টার বানিয়েছেন টিউলিপকে। তাহলে কেন তাকে একজন মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেছেন স্টারমার? এ প্রশ্ন উঠছে এখন। এ খবর দিয়ে বিবিসিতে দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন লিখেছেন তাদের রাজনৈতিক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদক জো পাইক। ‘হার আন্টস রেজিম ডিজঅ্যাপেয়ার্ড পিপল- সো হোয়াই ডিড স্টারমার মেক হার এ মিনিস্টার?’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তিনি আরও লিখেছেন, টিউলিপের ‘স্ক্যান্ডালে জড়িত খালা’র সঙ্গে টিউলিপের যোগসূত্রের বিষয় দীর্ঘদিন ধরে জানে লেবার পার্টি। ২০১৬ সালে মীর আহমেদ বিন কাসেমকে গুমের বিষয়টি প্রথম টিউলিপের কাছে তুলে ধরা হয়েছিল। টিউলিপ সিদ্দিক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানবাধিকারের পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। কিন্তু মীর আহমেদ এবং বাংলাদেশের অন্য যারা ‘গুম’ হয়েছেন, তারা টিউলিপের সেই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে জঘন্য এক উত্তেজনার প্রতিনিধিত্ব করেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে- এসব বিষয় সামনে আসার পরও কেন লেবার পার্টি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলো?

জো পাইক তার প্রতিবেদনে লিখেছেন- বাংলাদেশে নিজের বাড়ি থেকে রাতের বেলা সশস্ত্র ব্যক্তিরা অপহরণ করে মীর আহমেদ বিন কাসেম (৪০)কে। এ সময় তার চার বছর বয়সী মেয়ে এত ছোট ছিল যে, সে বুঝতেই পারেনি আসলে কি ঘটেছিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মীর আহমেদ বিন কাসেম বলেন, আমার পা ছিল খালি। তারা আমাকে সেভাবেই টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। এ সময় আমার জুতা হাতে নিয়ে পেছন  পেছন দৌড়ে আসে আমার ছোট্ট মেয়ে। সে বলতে থাকে- বাবা জুতা নাও। সে হয়তো ভেবেছিল- আমি বাইরে যাচ্ছি।

মীর আহমেদ বিন কাসেমকে আট বছর ধরে হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো অবস্থায়, চোখ বাঁধা অবস্থায় নিঃসঙ্গ কারাগারে রাখা হয়। তিনি এখনো জানেন না সেটা কোথায় এবং কেন তাকে ওভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি বৃটেনে প্রশিক্ষিত একজন ব্যারিস্টার। বাংলাদেশে গুমের শিকার ব্যক্তিদের অন্যতম তিনি। তারাই হলেন- বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচক। শেখ হাসিনা দুই মেয়াদে কমপক্ষে ২০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। অবশেষে গত আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হন। শেখ হাসিনার আমলে যে পরিমাণ ভয়াবহ সহিংসতা হয়েছে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর থেকে তার চেয়ে ভয়াবহতা আর কখনো দেখা যায়নি। ওই সহিংসতায় কয়েকশত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। ক্ষমতায় হাসিনা কোনোমতে ঝুলে থাকার জন্য তার শেষ ক্ষমতার দিনেও কমপক্ষে ৯০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। তার (টিউলিপ) অবস্থানের দিক দিয়ে বিতর্কিত, শেখ হাসিনা বৃটেনে ক্ষমতাসীন লেবার দলের এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের খালা। একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের দুর্নীতি বিরোধী মন্ত্রীর পদ ত্যাগ করেছেন টিউলিপ। তিনি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যানও করেছেন। অভিযোগের মধ্যে আছে- বাংলাদেশে অবকাঠামো বিষয়ক খরচের খাত থেকে টিউলিপের পরিবার কমপক্ষে ৩৯০ কোটি পাউন্ড আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া তার খালার (শেখ হাসিনা) লন্ডনে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কাছ থেকে উপহার পাওয়া প্রোপার্টি ব্যবহার করেছেন টিউলিপ। পরে সরকারের এথিক বিষয়ক পর্যবেক্ষক খতিয়ে দেখেছে যে, টিউলিপ মন্ত্রিত্বের আচরণবিধি ভঙ্গ করেননি। তবে তিনি যেকোনোভাবে পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ হয়ে যায়নি।

এ ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের ‘জাজমেন্ট’ নিয়ে হতাশাজনক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশি ঐতিহ্যের জনগণের ভোট পাওয়ার জন্য লেবার দলের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। টিউলিপ সিদ্দিক দীর্ঘদিন ধরে তার নির্বাচনী আসনের নাজানিন জাঘারি-র‌্যাটক্লিফকে ইরান থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশে তার খালার (শেখ হাসিনা) শাসনামলে দুর্ভোগ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি তুলনামূলক উদাসীনতা দেখান। ১৯৮১ সাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। কয়েক বছর আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে নিজের খালা শেখ হাসিনার সঙ্গে এর আগে দেখা গেছে টিউলিপকে। বিবিসি টেলিভিশনে তাকে দেখা গেছে আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র হিসেবে। ২০১৫ সালে লেবার দলের এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন টিউলিপ। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে তার ওয়েবসাইটের দুটি পেজ মুছে ফেলা হয়েছে। এ দুটি পেজে দলটির সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু একবার যখন পার্লামেন্টে প্রবেশ করলেন টিউলিপ, তখন তিনি সাংবাদিকদের বলেন- বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা বা ইচ্ছা তার নেই। সুতরাং এসব সম্পর্কের কথা কোনো গোপন বিষয় ছিল না। কিন্তু এ বিষয়গুলোকে হয়তো লেবার দলের  ভেতরে খারাপ হিসেবে দেখা হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ থেকে নিজেকে দূরে রাখার সামান্য লক্ষণ হিসেবেও দেখা হয়নি। তখনকার লেবার দলের এমপি জিম ফিটজপ্যাট্রিক ২০১২ সালে হাউস অব কমন্সে বলেন যে- তারা হলেন ‘অঙ্গ সংগঠন’। এই উষ্ণতা শেয়ার করেন তার অনেক সহকর্মী। ২০১৫ সালে পাশাপাশি আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের সময়েই পার্লামেন্টে প্রবেশ করেন স্টারমার। তিনিও বহুবার শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তারপর ২০২২ সালে বাংলাদেশের তখনকার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা লন্ডনে গিয়েছিলেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে। সেখানেও তাদের সাক্ষাৎ হয়। এই মিটিংয়ে ‘হৃদয়ভঙ্গকারী ও হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন মীর আহমেদ বিন কাসেম।

কিয়ের স্টারমারের একজন মিত্র যুক্তি দেন যে, তখন শেখ হাসিনার সঙ্গে স্টারমারের সাক্ষাৎ যথার্থই আইনগতভাবে হয়েছে। এর মধ্যদিয়ে তার (হাসিনা) রাজনীতিকে উৎসাহিত করা হয়নি। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশকে পাশে রাখার চেষ্টা করেছে লেবার পার্টি। এতে বৃটেনের রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতিফলিত হতে পারে, বিশেষ করে রাজধানী শহরের কিছু অংশে। লেবার দলের একজন ক্যাম্পেইনার বলেন, বাংলাদেশি ভোটের বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারলে পূর্ব লন্ডনে আপনি সফল হতে পারবেন না। যাই হোক, যারা দেশের বিভক্তি ও অস্থির রাজনীতিকে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, শেষ পর্যন্ত তারা ওইসব মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলে- যারা মনোমুগ্ধকর কিছু করছে। ওই ক্যাম্পেইনার বলেন, আপনি কি বলবেন এবং কি করবেন- সে বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সতর্কতা গ্রহণ করা উচিত। আপনি যদি (বাংলাদেশের) একটি দলের পক্ষে খুব বেশি প্রকাশ্যে অবস্থান নেন, তাহলে আপনি সমালোচিত হবেন। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বৃটেনের কমপক্ষে ১৭টি আসনে বাংলাদেশি ভোটের যোগ্য মানুষের সংখ্যা লেবার সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়েও বেশি। কিয়ের স্টারমার নির্বাচিত হয়েছেন হলবর্ন অ্যান্ড সেইন্ট প্যানক্রাস আসনে। ওই আসনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কমপক্ষে ৬ হাজার প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের বসবাস আছে।  

এই উত্তাপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কিয়ের স্টারমারের জাজমেন্টের ওপর কি একটি মেঘ সৃষ্টি করেছে সবেমাত্র জুলাইয়ে নির্বাচনে জয়ের পরে, বিশেষ করে দুর্নীতির ক্ষেত্রে। বৃটেনে দুর্নীতিবিরোধী দায়িত্বে ট্রেজারি মন্ত্রী হিসেবে টিউলিপ সিদ্দিককে তার নিয়োগ দেয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। লেবার দলের এক সূত্র বলেছেন, নিজের বন্ধু এবং রাজনৈতিক মিত্রদের বিষয়ে কিয়ের স্টারমার চোখ বন্ধ করে রাখেন। এটা কোনো নতুন বিষয় নয়। এক দশক ধরে বাংলাদেশি রাজনীতির সঙ্গে টিউলিপ সিদ্দিকের সংযোগের বিষয়ে আলো ফেলেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান। তিনি সবকিছুর বিষয়ে কথা বলেছেন।  ডেভিড বার্গম্যান বলেন, লেবার পার্টি যদি ক্ষমতায় না যেতো, টিউলিপ সিদ্দিক যদি মন্ত্রী না হতেন এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের যদি পতন না ঘটতো, তাহলে এ বিষয়টি বড় কোনো কাহিনী হতো না। তিনি যুক্তি দেন, দলের ভেতরের কাউকে না কাউকে এ বিষয়টি অনেক বছর আগে উদ্বেগের সঙ্গে তুলে ধরা উচিত ছিল। বার্গম্যান আরও বলেন, বাংলাদেশে জোরপূর্বক গুমের বিষয়ে সাড়া দিতে টিউলিপ সিদ্দিক যখন ব্যর্থ হলেন, তখন  সেটাই ছিল প্রথম ‘ব্লাইন্ডস্পট’। তারপর আওয়ামী লীগের বৃটেন শাখার সঙ্গে তার কি সম্পর্ক সে বিষয়টি হলো আরেকটি ‘ব্লাইন্ডস্পট’।

সাংবাদিক জো পাইক লিখেছেন- যখন আমি এ বিষয়টি লেবার দলের একজন এমপি’র কাছে তুলে ধরলাম, তখন তারা বলছিল- বৃটিশ মিডিয়া এমনকি লেবার পার্টির বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি ব্লাইন্ডস্পট আছে। তারা বললেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রায় ৬ লাখ মানুষ আছেন। এটা এমন একটি দেশ, যা হলো বিশ্বের অষ্টম সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠীর বসবাস। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর আমরা বৃটিশ মিডিয়ার পক্ষ থেকে কোনো উঁকিঝুঁকির খবরও শুনতে পাইনি। হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত কিছু সময়ের জন্য গর্জে উঠতে পারে, যা স্টারমারের দলকে সামনের মাসগুলোতে সমাধান করার জন্য আরও সমস্যা নিয়ে আসবে, যখন টিউলিপ সিদ্দিক লেবার দলের একজন এমপি থাকবেন। হাসিনার শাসনের পতনের পর মীর আহমেদ বিন কাসেমকে আকস্মিকভাবে তার সেলে জাগিয়ে তোলা হয়। একটি গাড়িতে ঢুকিয়ে একটি খাদের কিনারে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়। এরপরই দুই মেয়ের সহযোগিতায় তাকে বাড়িতে ফিরতে দেয়া হয়। সন্তানদেরকে তিনি ২০১৬ সালে সর্বশেষ দেখেছিলেন। এখন তারা যুবতী। মীর আহমেদ বিন কাসেম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমি বাস্তবেই তাদেরকে চিনতে পারিনি। তারাও আমাকে চিনতে পারেনি। এটা কঠিন বিষয় যে, আমি আমার কন্যাদেরকে বড় হওয়া কখনো দেখতে পারিনি। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়কে হারিয়ে ফেলেছি। আমি তাদের শৈশবকে মিস করি। 

mzamin