Wednesday, October 22, 2014

রাষ্ট্র ও রাজনীতি- ভাষা–মতিন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেলেন না, রাষ্ট্রটি কার? by মইনুল ইসলাম

১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের প্রধান ছাত্রনেতা হিসেবে স্বীকৃত প্রবাদপুরুষ আবদুল মতিন ৮ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৪৮ সালের প্রথম ভাষা আন্দোলনের সময়েই ২৪ মার্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের কনভোকেশনের ভাষণে পাকিস্তানের বড় লাট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হবে, কথাটা উচ্চারণের পর পর মতিনের কণ্ঠ থেকেই প্রথম উচ্চকণ্ঠের প্রতিবাদ ‘নো নো’ ধ্বনিত হয়েছিল। আবার ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সরকার ঘোষিত ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে ১১-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত অমান্য করার পক্ষে অবস্থান গ্রহণকারী ছাত্রদেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই আবদুল মতিন। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার সভায় ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্তটিই পাস হয়েছিল তাঁর জ্বালাময়ী ভাষণের প্রভাবে, এটুকুও ইতিহাস। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়টায় ভাষা আন্দোলনকে উদ্দীপ্ত রাখার জন্য তাঁর সাধনার স্বীকৃতি হিসেবেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই তিনি ‘ভাষা–মতিন’ নামে অভিহিত হয়েছিলেন, যে নামে তিনি আজীবন বাংলাদেশের আপামর জনগণের পরম শ্রদ্ধাভাজন নেতার আসনে অভিষিক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই যেহেতু বাঙালি জাতির স্বাধীনতাসংগ্রামের সূতিকাগার, তাই ভাষা–মতিন স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম রূপকার। তাঁকে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে অপারগতা এই রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের ব্যর্থতা ও সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক বলে মনে করি।

ভাষা–মতিন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সত্ত্বেও মতিন এ দেশের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একজন অগ্রনায়ক ছিলেন, সে জন্য তাঁর রাজনৈতিক সাথিদের কাছে তিনি ছিলেন কমরেড আবদুল মতিন। ভাষা আন্দোলনের পরের বছর মতিন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করার সাধনায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ষাটের দশকের শেষের দিকের ‘লালটুপি’ কৃষক আন্দোলনেরও প্রাণপুরুষ ছিলেন মতিন। কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙন-পুনর্গঠন, আবারও ভাঙনের ওই ধারায় তাঁর অবস্থান যে একপর্যায়ে ভুল ছিল, সেটা তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন। ভারতের নকশালবাড়ী আন্দোলনের চরমপন্থী কৌশল দ্বারা প্রভাবিত মতিন-আলাউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী গ্রুপের তৎপরতা স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে ১৯৭২ সালেই মতিন গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন প্রায় চার বছর, ১৯৭৬ সালে তিনি মুক্তি পান। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ভাঙা-গড়ার আত্মঘাতী ধারাবাহিকতায় গুরুত্ব হারালেও সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার থেকে কখনোই বিচ্যুত হননি তিনি।
আশির দশক থেকে বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক মডেলগুলোর পতনপর্ব শুরু হওয়ার পর অনেক নিবেদিতপ্রাণ কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীকে বিভ্রান্ত হয়ে সমাজতন্ত্রের দর্শনকেই পরিত্যাগ করতে দেখেছি, কিন্তু মতিন আজীবন তাঁর মতাদর্শে অবিচল ছিলেন। বলতে গেলে, তাঁর সঙ্গে আমার শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্কটাও গড়ে উঠেছিল সেই আশির দশকেই, যখন আমার পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ও সভা-সেমিনারের বক্তব্যগুলো তাঁর নজরে পড়েছিল। তথাকথিত ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’র ডামাডোলে শরিক হয়ে অনেক বামপন্থী রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী এখন পুঁজিবাদের সক্রিয় স্তাবকে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু সোভিয়েত স্টাইলের সমাজতন্ত্রের প্রায়োগিক মডেল ভুল প্রমাণিত হওয়ার মানে তো শ্রমজীবী জনগণের অভীষ্ট শোষণহীন সমাজের যাত্রাপথের স্তর হিসেবে সমাজতন্ত্রের মূল দর্শনের ভ্রান্তি প্রমাণিত হওয়া নয়, এই সত্যটুকু ক্রমেই বিশ্বের দেশে দেশে প্রতিভাত হতে শুরু করেছে। প্রায়োগিক মডেলগুলো তো সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে ‘রাষ্ট্রতন্ত্র’ এবং একদলীয় পুলিশি রাষ্ট্র কায়েম করেছিল। এই ধাঁচের মডেলগুলো বেশির ভাগ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, এগুলোকে আর ফেরত আনা যাবে না। যেগুলো এখনো টিকে রয়েছে, সেগুলোকে টেকসই করতে হলে ক্রমাগত সংস্কারের মাধ্যমে ত্রুটি শোধরানোর প্রয়াসে সফল হতেই হবে। পতিত মডেলগুলোর পোস্ট মর্টেমের মাধ্যমে আড়াই দশক ধরে সমাজতন্ত্রের সৃজনশীল সংস্কারের বিভিন্ন প্রয়াস এগিয়ে চলেছে।
‘একুশ শতকের সমাজতন্ত্র’ নাম নিয়ে বাজার ও রাষ্ট্রের যৌক্তিক ভূমিকা নির্ধারণের নতুন নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা গণচীন, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, চিলি, আর্জেন্টিনা, নিকারাগুয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা, এল সালভাদর ও কিউবায় প্রযুক্ত হয়ে চলেছে। এই দেশগুলো ক্রমেই এখন উন্নয়নের সফল মডেল হিসেবে বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসেছে। অন্যদিকে, বিংশ শতাব্দীর আশির দশক থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে জেঁকে বসা ‘বাজার মৌলবাদের’ জারিজুরিও ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার পরিপ্রেক্ষিতে ফাঁস হতে শুরু করেছে। যেসব উন্নয়নশীল দেশ মহাজোশে ওই গড্ডলিকাপ্রবাহে গা ভাসিয়েছিল, সেগুলোয় বাজার মৌলবাদের নেতিবাচক অভিঘাতগুলো এমনভাবে সাধারণ শ্রমজীবী জনগণের জীবনকে পর্যুদস্ত করে দিচ্ছে যে ওখানে জাতীয় আয় ও সম্পদ সমাজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অংশের কাছে পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া বিপজ্জনক পর্যায়ে উপনীত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত পুঁজিবাদী দেশে মাঝেমধ্যে ‘উই আর দ্য নাইনটি নাইন পার্সেন্ট’ ধরনের যেসব প্রতিরোধ আন্দোলন ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্যের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো বাজার মৌলবাদের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিচ্ছে বলা চলে। জোসেফ স্টিগলিৎজ ও পল ক্রুগম্যানের মতো নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদেরা মুক্তবাজার অর্থনীতিকে ‘ধন্বন্তরি সমাধান’ হিসেবে জাহিরকারীদের যুদ্ধংদেহী লাফালাফিকে ‘অযৌক্তিক উচ্ছ্বাস’ হিসেবে সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছেন। শক্তহাতে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রকে কীভাবে সক্রিয় ও কার্যকর করা যায়, তারই পথ খুঁজে চলেছে পুঁজিবাদী দেশগুলো। উন্নয়নচিন্তার এহেন একটা পালাবদলের ক্রান্তিলগ্নে ২০১০ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়ে সমাজতন্ত্র আবার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারটি রাষ্ট্রীয় মূলনীতির অন্যতম নীতি হিসেবে পুনর্বহাল হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করার মাধ্যমে বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট এই পালাবদলের অংশীদার হয়ে গেছে। অতএব, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এই জাতিকে যেসব বরেণ্য নেতা ইতিহাসের বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের যথাযথ সম্মান জানানো এই রাষ্ট্রের দায়িত্ব বৈকি।
এই রাষ্ট্রটির স্বাধীনতাসংগ্রামের সঠিক ইতিহাস ১৯৫২-এর ভাষাসংগ্রাম, ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয়, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফার সংগ্রাম, ১৯৬৯ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনকে ধারণ করতেই হবে। এই সংগ্রামগুলোর ধারাবাহিকতায় জাতিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে জাতিকে বিজয়ের বন্দরে পৌঁছে দিয়েছিলেন তাজউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকারের জাতীয় নেতারা এবং মুক্তিবাহিনীর কমান্ডাররা ও লাখো মুক্তিযোদ্ধা। ভাষাসংগ্রাম, স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ও স্বাধীনতাসংগ্রামকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধ-সম্পর্কিত বিএনপির বিকৃত ও মিথ্যা ইতিহাসের বেসাতিকে ‘ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে’ নিক্ষিপ্ত করার প্রয়োজনে স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে এই সঠিক পদ্ধতিতে বিবেচনা করতে হবে। আর তা করতে হলে স্বাধীনতাসংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে মূল নেতৃত্বদানকারী কারও অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো যৌক্তিকতা কিংবা প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।
১৯৫২ সালের ভাষাসংগ্রামের অবিসংবাদিত মূল নায়ক ভাষা–মতিন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের মূল নেতা এ কে ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনের স্বীকৃত নেতারা ছিলেন ছাত্রলীগের শেখ ফজলুল হক মণি ও সিরাজুল আলম খান এবং ছাত্র ইউনিয়নের কাজী জাফর, রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরী। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মূল নায়ক মওলানা ভাসানী ও তদানীন্তন ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা আসামি ছিলেন আরও ৩৪ জন জাতীয় বীর, তাঁদের জনাকয়েক এখনো জীবিত আছেন। জাতির মুক্তিযুদ্ধের মূল কান্ডারি ছিলেন তাজউদ্দীন, সঙ্গে ছিলেন সৈয়দ নজরুল, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ছিলেন বঙ্গবীর ওসমানী, তাঁর অধীনে চিফ অব স্টাফ ছিলেন রব, সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন এ কে খন্দকার। মুক্তিযুদ্ধের বীর সেক্টর কমান্ডার, অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাও ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।
ওপরে যাঁদের কথা উল্লেখ করলাম, তাঁদের সবাই তাঁদের জীবনের কোনো এক পর্যায়ে কিংবা বর্তমান পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সমর্থক না-ও থাকতে পারেন। কিন্তু জাতি ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করলে শুধু রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে যেন কাউকে সম্মান জানাতে আমরা কার্পণ্য না করি। তাঁদের পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে যদি খোন্দকার মোশতাকের মতো জাতিদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায় কেউ অবতীর্ণ হয়, তাহলে কেউ তাকে সম্মান জানাতে বলবে না। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা হয়েও জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করেছিলেন। কয়েক শ মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার কলঙ্কও তাঁকেই বহন করতে হবে। পাকিস্তানের স্বঘোষিত দালালদের পুনর্বাসিতও করেছেন তিনি। অতএব, তাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থানকে হয়তো অযৌক্তিক বলা যাবে না। কিন্তু আবদুল মতিন তো জাতির সঙ্গে কিংবা মেহনতি জনগণের সঙ্গে কখনোই বেইমানি করেননি। এই জাতিকে সারা জীবন শুধু দিয়েই গেছেন, কিছুই নেননি। লোভের কাছে কখনোই পরাস্ত হননি। এমনকি মৃত্যুর পর নিজের দেহ ও চোখ দুটোকে পর্যন্ত দান করে দিয়ে গেলেন মানবকল্যাণে। স্বাধীনতার এই অন্যতম রূপকারকে ‘রোল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের সুযোগ এখনো আছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে মতিনের জন্য একটি স্মরণসভা আয়োজনের মাধ্যমে ভুল সংশোধনের জন্য আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। একই সঙ্গে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করার জন্য দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে তাঁর নামে উৎসর্গ করার প্রস্তাব করছি।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

মহামারি- যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা by আবদুল এল-সায়েদ

টমাস এরিক ডানকানই প্রথম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা নিয়ে আসেন। তার আগে এটা পশ্চিম আফ্রিকার একটি রোগ হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে, যদি না কেউ সেখানে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে যায়। ডানকানের শুশ্রূষাকারী দুই নার্সও এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, ফলে যুক্তরাষ্ট্র এ রোগের প্রকোপ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে বেশ শোরগোল তৈরি হয়েছে। দুজন নার্স সম্ভবত মেডিকেল প্রটোকল ভঙ্গ করায় এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কিছুদিন আগে এই ভাইরাস চিহ্নিত, রোগীদের পৃথক্করণ ও এর নিয়ন্ত্রণ করতে ‘ইবোলা জার’ নিয়োগ দিয়েছেন। মেডিকেল ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জনগণকে আশ্বাস দিয়েছেন, ভয়ের তেমন কোনো কারণ নেই। সেন্টারস ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো পর্দার আড়ালে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে, তারা চেষ্টা করছে ডানকানের সংস্পর্শে এসেছে এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত ও যাদের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে, তাদের আলাদা রাখতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে সেখানে রোগের সংক্রমণ প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, এমনই ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের আলোকে এসব স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোকে বিশ্বাস করার কিছু নেই। বস্তুত গত কয়েক দশকে সরকার শীর্ষ কয়েকটি স্বাস্থ্য সংস্থার বাজেট কমিয়ে দিয়েছে, এর মধ্যে আছে এনডিসি, দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ) ও স্থানীয় এবং প্রাদেশিক স্বাস্থ্য বিভাগ। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সিডিসির তহবিল ১৭ শতাংশ কমেছে। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ইবোলার মতো জরুরি রোগের চিকিৎসায় ২০০৩ সালে যে পরিমাণ বরাদ্দ ছিল, এখন তার পরিমাণ সেটার চেয়েও এক বিলিয়ন ডলার কম। প্রাদেশিক ও স্থানীয় পর্যায়ে আরও বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের ২৩ শতাংশ বলেছে, জনাস্বাস্থ্য প্রস্তুতি কর্মসূচি ২০১১ সালে এসে অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে, এমনকি তা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, আর ২০১২ সালে আরও প্রায় ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যে হাসপাতাল প্রস্তুতি কর্মসূচির মাধ্যমে আঞ্চলিক হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে সম্ভাব্য জরুরি জনস্বাস্থ্য হুমকি মোকাবিলা করা হতো, শুধু ২০১৪ সালেই সে কর্মসূচির বাজেট হ্রাস করা হয়েছে ১০০ মিলিয়ন ডলার।
এসব হ্রাসের প্রভাব ইতিমধ্যে অনুভূত হতে শুরু করেছে। উল্লিখিত হাসপাতাল প্রস্তুতি কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীদের ইবোলার মতো জরুরি অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রস্তুত করা হতো। এতে যদি যথাযথ পরিমাণ তহবিল দেওয়া হতো, তাহলে যে দুই নার্স ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁরা হয়তো এখনো সুস্থই থাকতেন। এনআইএইচ অনেক কাজ করলেও সংস্থাটির তহবিল হ্রাস করা হয়েছে। গত দশকের বেশির ভাগ সময়জুড়েই সংস্থাটির বাজেট এক জায়গায় স্থির ছিল। হ্যাঁ, এর একটি ব্যতিক্রমও আছে, তবে সেটা কমের দিকে, বেশির দিকে নয়। যেমন, ২০১৩ সালে এর বাজেট নাটকীয়ভাবে হ্রাস করা হয়েছিল। ফলে অনেক কার্যকর গবেষণা ল্যাবরেটরি বন্ধ হয়ে গেছে, আর ইবোলা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মতো জীবন রক্ষাকারী গবেষণাও বন্ধ হয়ে গেছে। এর একটি কারণ হতে পারে এ রকম যে এসব জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে কাজ করে, এরা সাধারণত পাদপ্রদীপের আলোয় থাকে না। তারা হয়তো কোনো রোগের প্রকোপ কমাতে পারে, কিন্তু সেটার কোনো লক্ষণ থাকে না। তারা যে পরিশ্রম করে লোকে তা চোখে দেখতে পায় না। ফলে অর্থনীতির সুসময়েও সে খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির কোনো তাগিদ থাকে না, আর হ্রাসের ক্ষেত্রে প্রথম পছন্দ হয় তারা। কিন্তু ইবোলার মতো এই সাম্প্রতিক মহামারিতে উল্লিখিত আর্থিক অগ্রাধিকারের অসাড়তা প্রকাশ পায়। আমরা স্বাস্থ্য অবকাঠামোতে তেমন একটা আলোকপাত না করলেও ইবোলার মতো রোগ ও মৃত্যু আমাদের দরজায় কড়া নাড়লে আমরা সবাই নড়েচড়ে বসি।
হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্রে ইবোলা হয়তো মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়বে না, কিন্তু তার পরও আমাদের আত্মতৃপ্তির কোনো সুযোগ নেই। পশ্চিম আফ্রিকায় এ রোগের প্রকোপ যত বাড়ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়ার অন্যান্য স্থানেও এ রোগের বিস্তারের আশঙ্কা বাড়ছে। আর অন্যান্য দেশ এ মহামারি রোধ করতে না পারলে সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী দেশ হিসেবে তখন যুক্তরাষ্ট্রেরই উচিত হবে এ রোগ দমনে এগিয়ে আসা। কিন্তু উল্লিখিত বাজেট হ্রাসের কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারছে না, আর এর ফল ভয়াবহ হতে পারে। এই সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগে বারাক ওবামা লাইবেরিয়ায় ইবোলা মোকাবিলায় ৮৮ মিলিয়ন ডলার ও তিন হাজার সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত দিতে তিনি অনেক দেরি করে ফেললেন, এর মধ্যে ছয় হাজার মানুষ ইবোলায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং আরও অনেকেই হয়তো আক্রান্ত হবেন। এখন উল্টো সিডিসি ও এর নেতৃত্ব ডানকানের সেবায় গাফিলতি ও এর ফলে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে নানা রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। এখন যে আইনপ্রণেতারা সিডিসি নিয়ে মশকরা করছেন, তাঁরা যদি আগেই বাজেট হ্রাসের পরিণাম যে খারাপ হবে সে বিষয়ে দৃষ্টি দিতেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের এ অবস্থায় পড়তে হতো না।
জনস্বাস্থ্যের মূল বিষয় হচ্ছে, রোগ হওয়ার আগে তা প্রতিরোধ করা। তার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারে সেখানে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগ করতে হয়। আমাদের গণস্বাস্থ্য ও ভালো থাকাটাই হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার প্রমাণ। সৌভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই ইবোলায় হয়তো যুক্তরাষ্ট্র তেমনভাবে আক্রান্ত হবে না, আর সে কারণে গত কয়েক বছরে দেশটির ভুল বাজেটের পরিণাম তেমন একটা ভয়াবহ হবে না। কিন্তু আমরা সতর্ক না হলে কী হতে পারে, সেটা অন্তত বোঝা যাচ্ছে। পরবর্তী মহামারি হয়তো আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। আমাদের এটা নিশ্চিত করতে হবে, যে আমরা এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

আবদুল এল-সায়েদ: কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এপিডেমিওলজির অধ্যাপক।

নারীবাদী নয়, সমতাবাদী by উম্মে মুসলিমা

প্রথম আলোর ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পাতা থেকে হ্যারি পটারখ্যাত অভিনেত্রী এমা ওয়াটসন ‘হি ফর শি’ নামের কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছেন বলে জানা গেল। তিনি বলেছেন, ‘আমি যত বেশি ফেমিনিজম বা নারীবাদ নিয়ে কথা বলি, তত বেশি বুঝতে পারি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীর অধিকারের লড়াইকে পুরুষবিদ্বেষী ভাবা হয়। আমি একটা কথাই বিশ্বাস করি, সব ধরনের বিদ্বেষ রুখতে হবে। নারী ও পুরুষের সম–অধিকার ও সমান সুযোগই নারীবাদের ভাবাদর্শ।’ ৫০ থেকে ৬০ বছর আগে কাউকে ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে জানতে পারলে সাধারণ ধর্মভীরু মানুষজন আঁতকে উঠত। নুরজাহান বোসের আগুনমুখার মেয়ে বইটিতে এ রকম উল্লেখ আছে যে একটা বাড়িতে এক কমিউনিস্ট এসেছেন জানতে পেরে কেউ আর ওই বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে রাজি নয়। ইদানীং আবার উল্টোটাও দেখা যায়, কোনো কট্টর মৌলবাদী বেড়াতে আসবে জানতে পেরে সে বাড়ির আধুনিক ছেলেমেয়েরা আগেভাগেই কেটে পড়ে। ‘নারীবাদী’ শব্দটাও অনেকের কাছে ও রকমই ভীতিপ্রদ। যেন নারীবাদী মানেই তসলিমা নাসরিন। নারীবাদী মানেই পুরুষবিদ্বেষী। অনেক প্রগতিশীল পুরুষও নারীবাদীদের এড়িয়ে চলেন, আর যেসব পুরুষ নারীবাদী, তাঁদের পৌরুষ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। আবার এমনও অনেক নারীবাদী নারী-পুরুষ আছেন, যাঁরা কেবল তাত্ত্বিক নারীবাদিত্বের বড়াই করেন কিন্তু ব্যবহারিক জীবনাচরণে নারীকে দেখেন পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতে। অল্প কিছুসংখ্যক ঠিকই বোঝেন যে নারীবাদীরা যেসব যুক্তিতে সমতার কথা বলে, তার ষোলো আনাই সঠিক, কিন্তু পারিপার্শ্বিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর মতো সৎ সাহস তাদের নেই বলে তারা মুখ বুঝে থাকে। কিন্তু এ কথা তো ঠিক যে নারী যেমনভাবে নারীর কথা বলতে পারবেন, পুরুষ তা পারবেন না। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো যেখানে পুরুষপ্রাধান্য, সেখানে খামোখা শত্রু বাড়িয়ে লাভ কী?
একসময় উইড (উইমেন ইন ডেভেলপমেন্ট) বেশ সরব ভূমিকা পালন করলেও পরবর্তী সময়ে গ্যাড (জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) অধিক জনপ্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়। জেন্ডার উন্নয়নে নারী-পুরুষ উভয়ের কথাই বলা হয়। তার পরও জেন্ডার পরামর্শক বা বিশেষজ্ঞদের (নারীই এসব পদে বেশি বহাল আছেন) নারীবাদীরূপেই বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের একজন সচিবের কাছে এক নারী কর্মকর্তা বিধি অনুযায়ী তাঁর পদোন্নতির কথা বলতে গেলে সচিব ‘নারীর ক্ষমতায়ন?’ বলে এমন অবজ্ঞামিশ্রিত এক হাসি দিলেন যে সে নারী দ্বিতীয়বার আর অনুরোধের সাহস করলেন না। অথচ সে নারী কর্মকর্তার চেয়ে পদমর্যাদায় জ্যেষ্ঠ একজন পুরুষ কর্মকর্তা কেবল সরকারদলীয় বিবেচনায় বছরের পর বছর পদোন্নতির সুবিধা ভোগ করে আসছেন। নারীর ক্ষমতায়ন যেখানে এ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতির একটি, সেখানে নারীদের তাঁদের ন্যায্য পাওনাটার জন্যও লড়াই করতে হচ্ছে। তাহলে ক্ষমতায়নের আগে দরকার সমতায়ন? নারীরা যেমন নারীশক্তির মাহাত্ম্য সম্পর্কে সম্যক অবহিত, পৃথিবীতে পুরুষদের বিজয়গাথা নিয়েও পুরুষেরা গর্বিত। যেসব নারী জানেন পুরুষের গৌরবগাথা ভুলে থাকার বিষয় নয় এবং যেসব পুরুষ জানেন নারীর শক্তিও কালে কালে আলোকবর্তিকা হয়ে দেখা দিয়েছে, কেবল তাঁরাই একত্রে অভিন্ন মতাদর্শ নিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন। একে অন্যের সুকৃতি ও পথচলাকে শ্রদ্ধা করতে না পারলে বাহ্যিক ইতিবাচকতা অন্তর্গত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে তেমন উল্লেখযোগ্য ছাপ রেখে যেতে পারবে না। অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর শেষ প্রশ্ন উপন্যাসে শতাধিক বছর আগেও যা বলে গেছেন, আজকের দিনেও তা আমরা অনেককেই বলতে শুনি না। উপন্যাসের নায়িকা কমল বলছেন, ‘মানুষ তো কেবল নরও নয় নারীও নয়—এ দুয়ে মিলেই তবে সে এক।’
সহমর্মী পুরুষেরা নারীদের শক্তি। তাদের ভালো দিকগুলোকে উদ্ভাসিত না করে কেবল খারাপ দিকগুলো নিয়ে আক্রমণ করে গেলে সমব্যথিতা হারানোর ভয় থাকে। পুরুষতন্ত্র অবশ্যই বর্জনীয়, তা বলে পুরুষমাত্রই পুরুষতান্ত্রিক নন, অন্যদিকে নারীজীবনের বঞ্চনা ও নির্যাতনের মধ্যে কাল কাটিয়েও সব নারীই নারীবাদী নন। শাশুড়ি, ননদ, জা যখন নিপীড়ক ও হন্তারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন জেন্ডারকানারা বলেন, ‘এত যে পুরুষতন্ত্র পুরুষতন্ত্র বলে যুদ্ধ ঘোষণা করা, এরা তবে কারা?’ তাঁরা আসলে নারী হলেও পুরুষতন্ত্রেরই ধ্বজাধারী। পুরুষতন্ত্র হচ্ছে পুরুষ কর্তৃত্বের একটি নীতি, যে নীতি তার সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নারীকে নিপীড়ন করে। আজ নারীবাদী হিসেবে যাঁরা বিশ্বে খ্যাতি বা অপবাদ কুড়াচ্ছেন, তাঁরাও কম দুঃখে নারীবাদী হননি। নারীবাদের ধারণা, নারীর ওপর নিপীড়ন ও তা থেকে মুক্তির উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচিত মতের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। তবে প্রণোদনায় হোক বা নগরায়ণ-শিল্পায়ন অথবা ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের জয়জয়কারেই হোক, দুটির বেশি সন্তান নিতে চাইছেন না মা-বাবারা। উন্নত বিশ্বে তো শিক্ষা ও পেশাকে অগ্রাধিকারে রেখে সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অনীহা তৈরি হয়েছে। এতে ছোট পরিবারগুলোর মধ্যে মেয়েসন্তান ও ছেলেসন্তানের সঙ্গে আচরণে বৈষম্য কমে আসছে। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়েরাই বৃদ্ধ বয়সের মা-বাবার দেখাশোনা-সেবাযত্ন করেন বলে মেয়েদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্টের অভিযোগও আছে। অনেক নারী নিজের বা তাঁর মায়ের জীবনের অবহেলা-নিপীড়নের কথা চিন্তা করে বা সমাজে নারীর দুঃসহ অবস্থান দেখে নিজের সন্তানদের মধ্যে কন্যাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। সার্বিকভাবে এ চিত্র যদিও নগণ্য, তবু কারও প্রতি বৈষম্যই কাম্য হওয়া উচিত নয়। এমা ওয়াটসন বাস্তবিকই বলেছেন, ‘আমাদের এমন মানুষই দরকার বেশি করে, যারাই পৃথিবীতে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। লিঙ্গভিত্তিক সম–অধিকার প্রতিষ্ঠাই নারীবাদের মূল লক্ষ্য। নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে সাধারণ মানুষ পুরুষবিদ্বেষী হিসেবে দেখে থাকেন। শুধু নারীদের একার পক্ষে অধিকারের জন্য লড়াই করা সম্ভব নয়। পুরুষদেরও নারীর সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। পুরুষেরাও নানা কারণে অধিকারবঞ্চিত। নানা কারণে নারীর মতো পুরুষেরাও নির্যাতনের শিকার। আমরা একজন আরেকজনের জন্য দাঁড়িয়ে বৈষম্য বিলোপ করার চেষ্টা করতে পারি।’
হ্যারি পটার–এর সেই ছোট্ট মেয়েটি, যিনি এখন জাতিসংঘের নারী সংস্থার শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করছেন, সেই মেয়েটিকে আমাদের জ্ঞানচক্ষু খুলে দেওয়ার জন্য অজস্র ধন্যবাদ।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।

বেতন কমিশনের সুপারিশ ও বাস্তবতা by আলী ইমাম মজুমদার

সম্প্রতি প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হয়েছে, বেতন ও চাকরি কমিশন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করবে। তাদের সুপারিশে থাকবে বিভিন্ন স্তরে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার, সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণ। বিদ্যমান কাঠামোয় ২০টি গ্রেডের অষ্টম ও নবম আর একাদশ ও দ্বাদশ ধাপকে একীভূত করে ১৮টি করার প্রস্তাব তারা করবে বলে সে খবরেই জানা গেছে। আরও জানা যায়, তারা স্বাস্থ্যবিমা, জীবনবিমা ও দুর্ঘটনাজনিত অক্ষমতা বিমার সুপারিশও করতে যাচ্ছে। তারা সরকারি কর্মচারীদের ২০ জনের জন্য একটি প্লট এবং বিনা সুদে বাড়ি তৈরির ঋণ দেওয়ার সুপারিশও করতে পারে। অবসরসুবিধা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, আপ্যায়ন, প্রেষণ, মহার্ঘ, উৎসব ও শ্রান্তি বিনোদন, ধোলাই ভাতা, টেলিফোন, গাড়ি ও মুঠোফোনবিষয়ক আর্থিক সুবিধা এবং রেশনসুবিধা-সংক্রান্ত ভাতাদি যৌক্তিকীকরণের প্রস্তাবও তাদের সুপারিশে থাকবে বলে জানা গেছে। সেই সুপারিশে আরও থাকবে টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড ও ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে বর্তমান অসংগতি দূর করা। এসব প্রস্তাবিত সুপারিশের কয়েকটি সম্পর্কে কমিশনের চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের ধারণা দিয়েছেন। বেশির ভাগ তথ্যই অন্যান্য সূত্র থেকে সংগৃহীত। কেননা, এখনো বিষয়গুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। যুগবাহিত ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৪ নভেম্বর এ কমিশন গঠিত হয়। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পর পর এরূপ হয়ে থাকে। তারা সরকারের সামর্থ্য আর কর্মচারীদের চাহিদার সঙ্গে সংগতি বিধানের প্রচেষ্টা নেয়। বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ১৪ ডিসেম্বর। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে এ কমিশন। তিনি একজন প্রাজ্ঞ, কর্মনিষ্ঠ ও সজ্জন ব্যক্তি। কমিশন ইতিমধ্যে বিভিন্ন মহলে প্রশ্নমালা বিতরণ ও উত্তর সংকলন করেছে। কমিশনের সদস্যরা কয়েক দফা বৈঠকও করেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সুপারিশ নিতে। এই সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নিজদের প্রজ্ঞার আলোকে তঁাদের প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট সবাই আশা করছেন, আলোচ্য প্রতিবেদনটি তাঁদের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে। ইতিমধ্যে সংবাদপত্রে যেটুকু তথ্য এসেছে, তাতে স্বাস্থ্যবিমা, জীবনবিমা কিংবা অক্ষমতাজনিত বিমার প্রস্তাবগুলো প্রশংসনীয়। এ ধরনের উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়নি। বাড়ি করার জন্য ২০ জনকে একটি প্লট আর সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব সরকারি কর্মচারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

চারটি স্কেলকে একীভূত করে দুটিতে আনার বিষয়টি একটু ভেবে দেখার আছে। স্বাধীনতার আগে এ দেশে কয়েক হাজার বেতন স্কেল ছিল। ১৯৭৩ সালে হয় ১০টি। আর ১৯৭৭ সালে সেটা ২০টিতে উন্নীত হয়। এযাবৎ তা-ই আছে। বড় রকমের কোনো সমস্যার সৃষ্টি না হলে এ ধরনের সমন্বয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়। এখন নবম ধাপ প্রথম শ্রেণির পদের সূচনাস্তর। একীভূত হলে সেই স্তর হবে বর্তমানের অষ্টম ধাপ। ভাতার যৌক্তিকীকরণ কোনটিকে কীভাবে করবেন, তার সুপারিশ জানা না গেলে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে সরকারি বাড়ি থাকা সত্ত্বেও সেখানে না থেকে বেশ কিছু কর্মকর্তা বাড়িভাড়ার ভাতা নিচ্ছেন। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ সার্কিট হাউস, ডাকবাংলো, রেস্ট হাউসে নামমাত্র ভাড়ায় ইচ্ছা করেই থাকছেন মাসের পর মাস। তাঁদের বাড়িভাড়ার ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বন্ধ করা সংগত হবে। যাঁরা রেশন–সুবিধা ভোগ করছেন, তাঁরা তা করবেন। পাশাপাশি বেসামরিক নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের এ সুবিধার আওতায় আনা যৌক্তিক ও সময়ের দাবি। ঝুঁকিভাতা নিচ্ছেন অনেকেই। পার্বত্য অঞ্চলের জন্য রয়েছে পাহাড়ি ভাতা। কিন্তু সুদূর দ্বীপাঞ্চলে যাঁরা চাকরি করেন, তাঁদের সবাইকে ঝুঁকি ভাতার আওতায় আনাও ন্যায়সংগত হবে। তবে গাড়ির প্রাধিকারের মতো অনেক বিষয় নতুন করে উন্মোচন করা হলে নিষ্পত্তি কঠিন হবে।
উল্লেখ্য, কমিশনের সুপারিশ সরকার আর্থিক সীমাবদ্ধতার জন্য পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারে না। তা ছাড়া চাকরিঘটিত সুপারিশে নীতিগত দিকও থাকে। সাম্প্রতিক কালের রেওয়াজ হচ্ছে, প্রতিবেদন পাওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি সচিব কমিটি এর আর্থিক সংশ্লেষ পর্যালোচনা করে। বিবেচনায় রাখে সরকারের সম্পদের বিষয়টি। এর ভিত্তিতে তাদের সুপারিশ যায় মন্ত্রিসভায়। তখন মন্ত্রিসভা যেভাবে যৌক্তিক মনে করে, সেভাবেই এটাকে অনুমোদন দিতে পারে। যেকোনো ধরনের সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রের আবশ্যক হন সামরিক ও বেসামরিক বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী। স্বাভাবিকভাবে তাঁদের জীবনের মৌলিক চাহিদার বিষয়টি সব সরকারের বিবেচনাতেই থাকে। আর সেই চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে বেতন-ভাতাদিসহ অন্যান্য সুবিধা দিতে হয়। এগুলো সময়ে সময়ে নির্ধারণের জন্য সুপারিশ করতে আমাদের দেশে গঠন করা হয় বেতন কমিশন। অনেক দেশে স্থায়ী বেতন কমিশন আছে। কোথাও আছে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সংগতি রেখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন বাড়ার পদ্ধতি। আমাদের এখানে স্থায়ী বেতন কমিশন করার জন্য বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রয়েছে। কিন্তু এবার তারা তা করল না। বর্তমান কমিশন স্বীয় বিবেচনায় সুপারিশ করতে পারে, চূড়ান্তভাবে ধার্যকৃত বেতন মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। এটি ন্যায়বিচার ও যুক্তির কথা। বেতন কমিশন গঠিত হলেই কেউ কেউ বলতে থাকেন মূল্যস্ফীতি হবে। সরকারের মোট ব্যয়ের কমবেশি ১৪ শতাংশ যায় কর্মচারীদের বেতন-ভাতার খাতে। সুতরাং এ ব্যায়ের একটি অংশ বাড়লে তেমন মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা থাকবে বলে মনে হয় না।
প্রকাশিত খবরের আলোকে কয়েকটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। সংবাদপত্রে যেটুকু দেখা যায়, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্তরের মাঝে বেতনের অনুপাত ৭ ঃ১ করার জন্য কমিশন সুপারিশ করবে। বিষয়টি স্পর্শকাতর। সর্বনিম্ন স্তরের মৌলিক চাহিদা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ স্তরকে আকর্ষণীয় রাখার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আগে এ অনুপাত অনেক বেশি ছিল। ইদানীং ১০ ঃ১-এর কাছাকাছি। ভারতে ১২ ঃ ১। বর্তমান অনুপাত থেকে বিচ্যুতির জনপ্রিয় দাবি থাকতে পারে। কিন্তু যৌক্তিকতা দেওয়া খুবই কঠিন। একটি মাঝারি মানের ব্যাংকের এমডি লাখ পাঁচেক টাকা বেতন পান। সেখানে সর্বনিম্ন স্তরের সঙ্গে অনুপাতটা কত? অন্য অনেক বেসরকারি সংস্থার অবস্থাও তা-ই। এসব বিষয় আবেগবর্জিতভাবে দেখা প্রয়োজন। সরকারি চাকরিতে মেধাশূন্যতার অভিযোগ সবাই করেন। অথচ এটা দূর করতে যা করা আবশ্যক, তা কেউ করছেন না। এই মেধাশূন্যতার একটি কারণ অনাকর্ষণীয় বেতন। একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা নিয়োগ স্তরে এখন ১১ হাজার টাকা মূল বেতন পান। ভাতাদিসহ সাকল্যে ২০ হাজারের নিচে। এই বেতন কিছু বেসরকারি সংস্থার কম্পিউটার অপারেটর কিংবা রিসিপশনিস্টদের চেয়েও কম। এ স্তরটির বেতনকাঠামো সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অনুপাতে বৃদ্ধির দাবি রাখে। কেননা, তাঁদের কেউ কেউ ভবিষ্যতে বিভিন্ন শীর্ষ পদে যাবেন। আমাদের সুশীল সমাজ রাষ্ট্রীয় খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যৌক্তিক বেতন-ভাতা দিলে অনেকেই দুর্নীতি করবেন না, এটা বলা যায়। সুতরাং সরকারি কর্মচারীদের উপযুক্ত বেতনকাঠামোর দাবিতে সুশীল সমাজের জোর সমর্থন থাকা সংগত।
আসছি পেনশন প্রসঙ্গে। যাঁরা মাসে মাসে পেনশন নিচ্ছেন, তাঁদের পেনশনও আনুপাতিক হারে একই সময়ে বাড়ার কথা। আর যাঁরা একবারে সমগ্র অর্থ নিয়ে পেনশন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন, তাঁরা এক বৈষম্যমূলক করনীতির শিকার। পেনশন আয়করমুক্ত। অথচ একবারে সেই পেনশন তুলে নিয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে মুনাফায় পুরো আয়কর দিতে হয়। একসময় উৎসে কর কিছুটা কেটে একেবারে নিষ্পত্তি করা হতো। এসব হতভাগ্য পেনশনজীবীর আয়কর আগের নিয়মে কাটার ব্যবস্থা কমিশন সুপারিশ করতে পারে। পরিশেষে বলতে হয়, কমিশনের সুপারিশ সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না। অতীতেও কখনো পারেনি। তা সত্ত্বেও যে কঠোর নিষ্ঠা ও উদ্যম নিয়ে বর্তমান কমিশন কাজ করছে, তা প্রশংসনীয়। আশা রইল তাদের সুপারিশে সরকারি কর্মচারীদের যৌক্তিক দাবি অনেকাংশে পূরণ হবে। সমৃদ্ধ হবে সরকারের প্রশাসনযন্ত্র।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

মহাসড়কে আবার বিভীষিকা -ভারী মোটরযানের চালকদের সামলান

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় ঢাকা-নাটোর মহাসড়কে সোমবার বিকেলে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৩ জনের প্রাণহানি ও ২২ জনের আহত হওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ থেকে এই বিভীষিকার মাত্রা স্পষ্ট হয়েছে। তবে শুধু দুঃখ প্রকাশই যথেষ্ট নয়। এই বিরাট বিয়োগান্ত ঘটনাটি যদি প্রকৃত অর্থেই রাষ্ট্র ও সরকারের সর্বোচ্চ দুই পদাধিকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকে, তাহলে মহাসড়কে মৃত্যুর অন্তহীন মিছিলের রাশ টানার কার্যকর উদ্যোগও গ্রহণ করা জরুরি।
এই দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, অপরাধবৃত্তি, কর্মক্ষেত্র, নৌপথ ও রেলপথের দুর্ঘটনা ইত্যাদি সব ধরনের দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় তার চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক মানুষ। বছরে ১২ হাজারের বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হারিয়ে পঙ্গু হয়ে যায় তার কয়েক গুণ।
সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো সাধারণভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ সেন্টার সারা দেশের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার মহাসড়কের ২০৯টি স্থানকে অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘ব্ল্যাক স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই অবকাঠামোগত কারণ ছাড়া, মোটরযান চালকদের যোগ্যতা-দক্ষতার অভাব এবং বেপরোয়াভাবে যানচালনার প্রবণতাকেও দায়ী করা হয়। সোমবারের দুর্ঘটনাটি যেখানে ঘটেছে, সেটি মহাসড়কের কোনো ব্ল্যাক স্পট নয়। একটি যাত্রীবাহী বাস একটি ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি যাত্রীপূর্ণ বাসের মুখোমুখি হলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। উভয় বাসের চালকই প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ বেপরোয়া যানচালনার ফলেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক ধারণা।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে মোটরযান চালকদের লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়ায় কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যদিও তা যথেষ্ট নয়। তবে বাস, ট্রাক ইত্যাদি ভারী মোটরযানের চালকদের লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়ায় আরও কঠোরতা আরোপ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তাঁদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

অবমাননার উপত্যকা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, যেকোনো মানুষের মৃতদেহকেই সম্মান দেখাবে। যখন তোমার সামনে দিয়ে কেউ কোনো মৃতদেহ নিয়ে যাবে, তুমি দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান প্রদর্শন করবে। এই হাদিসের মর্মার্থ বইতে যেটুকু পড়েছি তা হলো এই: মৃতদেহটি ইহুদি না খ্রিষ্টানের, হিন্দুর না বৌদ্ধের, না অগ্নি-উপাসকের, আস্তিকের না নাস্তিকের, তা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। যিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন এবং শেষবারের মতো চলে যাচ্ছেন, শেষ সম্মানটুকু তাঁর প্রাপ্য। খ্যাতি ও ব্যক্তিত্বের সংঘাত সব সমাজে সব কালেই ছিল। বঙ্গীয় সমাজে ছিল ও আছে, ব্রিটিশ সমাজেও আছে ও ছিল। আঠারো শতকের ব্রিটিশ রাজনীতিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, কূটনীতিক ও লেখক আর্ল অব চেস্টারফিল্ডের সঙ্গে প্রখ্যাত লেখক স্যামুয়েল জনসনের সম্পর্ক ভালো ছিল না। উভয়েই ছিলেন খর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। চেস্টারফিল্ডের অমর গ্রন্থ লেটারস টু হিজ সান (তাঁর পুত্রের কাছে চিঠি)। ১৭৪৬ সালের ৯ অক্টোবর চেস্টারফিল্ড তাঁর পুত্রের কাছে লিখেছিলেন: An injury is much sooner forgotten than an insult. কোনো শারীরিক জখম শিগগিরই ভুলে যায় মানুষ, কিন্তু অপমান নয়। কোনো মৃতদেহকে ফুল দিয়ে সম্মান দেখানোই হোক বা গালাগাল দিয়ে অসম্মান বা অমর্যাদা করা হোক—তাতে তাঁর কিছুই আসে যায় না। কারণ, তিনি তখন জাগতিক সবকিছুর ঊর্ধ্বে। কিন্তু যে মৃতকে অসম্মান করা হলো,  তাঁর যাঁরা নিকটজন, যঁারা আরও কিছুকাল বেঁচে থাকবেন, তাঁরা স্মৃতিভ্রষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ওই মৃতের অবমাননা ভুলতে পারেন না। অবমাননা হলো হিংসাপ্রসূত আচরণ। হিংসা থেকে জন্ম প্রতিহিংসার। প্রতিহিংসা পলিথিনের মতো। তা যতই মাটিচাপা পড়ুক না কেন কোনো দিনই পচে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রতিহিংসা অটুট থাকে।
গত সপ্তাহে ভারতের সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম এক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে ঢাকা এসেছিলেন। ধারণা করি, মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা তিনি প্রভাবিত। ঢাকায় তরুণসমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় জনাব কালাম পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন, পারমাণবিক শক্তি যখন মানবসভ্যতা ধ্বংসের জন্য ব্যবহার করা হয়, তখন তা অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠায় ভারত, পাকিস্তানসহ সব দেশের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। (প্রথম আলো) কোনো হিংস্র প্রকৃতির মানবশত্রু ছাড়া ড. কালামের বক্তব্যের সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না। আমিও একজন নগণ্য গান্ধীপ্রেমিক। ‘মিসাইল মানব’ আবদুল কালামের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের প্রশ্নই আসে না; তবে আমি শুধু এটুকু যোগ করব: হিংসা পারমাণবিক বোমার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর এবং হিংসা-প্রতিহিংসা মানবজাতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ। পারমাণবিক বোমা একবারে অনেক মানুষকে হত্যা করে এবং পঙ্গু করে অসংখ্য মানুষকে, ধ্বংস করে একটি নির্দিষ্ট জনপদ। কিন্তু হিংসা দীর্ঘ সময় ধরে অগণিত মানুষকে শেষ করে। হিংসা চিরস্থায়ী প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। আণবিক বোমায় ধ্বংস করার পরেও হিরোশিমা ও নাগাসাকি পুনর্গঠিত হয়েছে। কোনো আগন্তুক এখন সেখানে গিয়ে বুঝতেই পারে না যে একদিন ওই নগর দুটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আণবিক বোমায় না জ্বলে যদি ওই দুই নগর হিংসা-প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলত, তাহলে গোটা জাপান দেশটাই জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যেত। এখন যেমন পৃথিবীর কোনো কোনো দেশ সেই পথেই যাচ্ছে। সেসব দেশের রাজনীতির মূলমন্ত্রই হিংসা ও প্রতিপক্ষকে অবমাননা।
গত পূজা ও ঈদের কয়েক দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অধ্যয়ন কেন্দ্রের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন ভারতের খ্যাতিমান রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানী ও সমাজতত্ত্ববিদ আশীষ নন্দী। কয়েক দিন ধরে শুয়ে শুয়ে আমি তাঁর দি ইনটিমেট এনিমি বইটি পড়ছি। উপনিবেশবাদও তাঁর একটি গবেষণার বিষয়। যাহোক, সেদিনের তাঁর বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল Humiliation বা অবমাননা। পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিষয়টি খুবই সময় উপযোগী। বাঙালির অন্যকে অপমান করার প্রতিভা অপার। প্রতিপক্ষকে অপমান করতে তার উপলক্ষের অভাব হয় না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা থেকে শুরু করে রাস্তার পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে পর্যন্ত কোনো কারণ ছাড়াই অপমান করে বাঙালি উপভোগ করে নির্মল আনন্দ। বাঙালি যে শুধু জীবিতকে অপমান করে আনন্দ পায় তা-ই নয়, মৃতদেহকেও অপমান করতেও তার কোনো দ্বিধা নেই। গত কয়েক সপ্তাহে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি গত হয়েছেন। তাঁদের একজন আবদুল মতিন। এই জাতিরাষ্ট্র গঠনে তাঁর অবদান কতটা তা যাঁরা জানেন না, তাঁরা যদি তাঁকে উপযুক্ত মর্যাদা না দেন তাঁদের দোষ দেওয়া যাবে না। কিন্তু যাঁরা তাঁর অবদান জানেন এবং জেনেও চেপে যান এবং দায়সারা গোছের শোক প্রকাশ করেন, তাঁদের অবহেলা ক্ষমার অযোগ্য। বাংলা ভাষা আন্দোলন, একুশে ফেব্রুয়ারি ও শহীদ মিনারের সঙ্গে আবদুল মতিনের সম্পর্ক কী—তা বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। তার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন; আমার কাছে রয়েছে কিছু জীর্ণ কাগজপত্র।
কোনো কোনো মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান কোনো আবশ্যক বিষয় নয়। একটা আনুষ্ঠানিকতামাত্র। পেলে এবং কেউ দিলে ভালো, না দিলেও ক্ষতি নেই। আমাদের স্বনামধন্যরা অবশ্য সবই চান। জীবিত অবস্থায় চান কোনো বড় পদ, বন বিভাগের শত শত বিঘা জমি, সরকারি ব্যাংক থেকে অফেরতযোগ্য কোটি কোটি টাকার ঋণ, হিন্দু সম্পত্তি ও খাসজমির ইজারা, বিহারিদের কোনো পরিত্যক্ত বাড়ি ভুয়া দলিলে ৯৯ বছরের মালিকানা, চুরি করা টাকায় অসংখ্য ফ্ল্যাটের স্বত্বাধিকারী হওয়া, খুব বড় বড় স্যুটকেস নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশভ্রমণ প্রভৃতি। কিন্তু তাতেও তাঁদের মন ভরে না। বিপুল সম্পদ তো রেখে গেলেনই, মৃত্যুর পর শহীদ মিনারে গিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার বন্দোবস্তও করে যান। আবদুল মতিনকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হয়নি প্রটোকলের প্রবল বাধার কারণে। সেদিন শহীদ মিনারে ও-কথা শুনে আমি বোধ হয় কোনো চ্যানেলকে বলেছিলাম নন-কমিশন্ড সৈনিক হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামকে তিন বাহিনীর প্রধান ও বড় বড় জেনারেলরা খটাস খটাস করে স্যালুট ঠুকলেন কোন প্রটোকলে! আবদুল মতিনকে সরকার মৃদু সম্মানও দিয়েছে, আবার প্রটোকলের দোহাইও দিয়েছে। তবে অনেক মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতা তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে গিয়েছিলেন। তিনি শেষ দিকে ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। সুবিধাবাদী ও প্রাপ্তিযোগী রাজনীতি করা সম্ভব না হওয়ায় দল থেকে সরে যান। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী হাজি রাশেদ খান মেনন সৌদি আরবে ছিলেন, তবে রাষ্ট্রীয় সম্মানপ্রাপ্তির ব্যাপারে তাঁর দলের কোনো ভূমিকা লক্ষ করিনি।
আবদুল মতিনের পরপরই অকালে চলে গেল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. পিয়াস করিম। জাতির জীবনে মতিন আর করিমের ভূমিকার তুলনার প্রশ্নই আসে না। গত কয়েক বছরে টক শোতে অংশ নিয়ে কিছু স্পষ্ট ও সাহসী কথা বলে পিয়াস জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পিয়াস মারা যাওয়ার পরদিন কাগজে আমি দেখতে পাই পিয়াস নেই, কিন্তু তাকে নিয়ে কথা বলার লোক জুটেছে অনেক। পিয়াসের অনেক মতামতের সঙ্গে আমি একমত ছিলাম না। কিন্তু তার মেধাকে আমি মূল্য দিতাম। প্রচুর বই পড়ত এবং তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা ছিল অসামান্য। পিয়াসকে আমি প্রথম দেখি ১৯৭২-এর মাঝামাঝি শেখ ফজলুল হক মণির বাংলার বাণী অফিসে তার বন্ধু ছাত্রলীগের ফেরদৌস আলম দুলালের সঙ্গে। উভয়কেই আমি তুমি ও তুই বলতাম। খবরে জানতে পারি, পিয়াস শেষ রাতের দিকে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে। কোনোরকমে রাতটা পার হয়, সকালবেলায় মহাজোটের কয়েকটি ছাত্রসংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দেয়, পিয়াস করিমের লাশ তারা শহীদ মিনারে নিতে দেবে না। কারণ হিসেবে তাকে বলা হয়, সে জামায়াত-বিএনপির দোসর, পাকিস্তানপন্থী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং শাহবাগের আন্দোলন সম্পর্কে সমালোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছে। কোনো কোনো পত্রিকা তার মৃত্যুসংবাদ রচনার সময় এ কথাটি যোগ করতে ভুল করেনি যে পিয়াসের বাবা ছিলেন একাত্তরে শান্তি কমিটির মেম্বার বা চেয়ারম্যান। এসব কারণে শহীদ মিনারের মতো পবিত্র অঙ্গনে তার অপবিত্র লাশ নেওয়া যাবে না। তার লাশ শহীদ মিনারে নেওয়া ঠেকাতে পর্যাপ্ত পাহারাদারের ব্যবস্থা করা হয়। এবং বিস্ময়কর যা তা হলো সবচেয়ে সুকুমার শিল্পের যাঁরা সাধক, তাঁরা পর্যন্ত রংতুলি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন।
পিয়াসের মৃতদেহ কবর দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ফরিদপুরে বলেছেন, ‘শহীদ মিনারে পিয়াস করিমের লাশ নেওয়ার অর্থ হলো দেউলিয়াপনা। পিয়াস করিমের নাম আগে আমরা শুনিনি। পরে জানলাম, তিনি নাকি বিএনপির নেতা এবং মধ্যরাতে টক শো করে বেড়ান। মধ্যরাতে পুলিশ ও চোর ছাড়া কেউ জেগে থাকে না। রাত ১২টার পর যাদের বুদ্ধি খোলে তারা হয় চোরের দোসর, না হয় পুলিশের দোসর।’ (যাযাদি) খুব কম গেলেও আমিও মধ্যরাতে টক শোতে যাই। আমার সঙ্গে অধিকাংশ সময় কোনো মাননীয় মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা থাকেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার করতে হয়। জীবিকার জন্য অনেক কিছু করতে হয়, প্রয়োজনে চুরি পর্যন্ত। পিয়াস যদি কয়েক মিনিটের জন্য মাটির তলা থেকে জীবন পেয়ে বেঁচে উঠত, তাকে বলতাম, তুই না হয় চোরের সহযোগী ছিলি, আমাকেও চোরের খাতায় নাম লিখিয়ে দিয়ে গেলি!
পিয়াসের হতভাগ্য বাবাকে চিনতাম না, তবে তার চাচা আবদুর রহিমকে চিনতাম। আওয়ামী লীগ সরকারই স্বাধীনতার পরে তাঁকে করেছিল পুলিশের আইজি। পরে তাঁকে দিয়ে একটি কমিশনও গঠন করা হয়েছিল, যার কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের তালিকা করা। আমরা তাঁকে সাহায্য করেছি। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বাবা সিরাজুল হক সাহেব ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত বিশ্বস্ত। এককালে জাঁদরেল আইনজীবী হিসেবে সবিতা রঞ্জনপাল ও সিরাজুল হক ছিলেন স্বনামধন্য। আনিসুল হক রোববার সাংবাদিকদের বলেছেন: ‘সদ্য প্রয়াত ড. পিয়াস করিমকে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারপত্র বিলি করার সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী আটক করেছিল। পিয়াস করিমের বাবা সে সময় আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁকে জোর করে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বানানো হয়েছিল। ২০-২১ বছর আগে মারা যাওয়া একজন ব্যক্তি সম্পর্কে যে ধরনের কথা বলা হচ্ছে, তা শুনলে খুব কষ্ট লাগে, দুঃখজনক।...একাত্তরের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচারপত্র বিলি করার সময় পিয়াস করিমকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে কুমিল্লা সার্কিট হাউসে আটকে রেখেছিল। পিয়াস সম্পর্কে যা বলছি তা জেনেশুনে ও দায়িত্ব নিয়েই বলছি। সে সময় তার বয়স ছিল ১৩ বছর। পরে পিয়াসের বাবা অ্যাডভোকেট এম এ করিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শর্ত মেনে বন্ডসই দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন। পাকিস্তানি বাহিনীর শর্ত ছিল, তারা পিয়াস করিমকে মুক্তি দেবে, তবে সে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোনো কাজ করতে পারবে না। পিয়াস করিমের বাবা এম এ করিম একাত্তরে কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে এসে পাকিস্তানি বাহিনীর শর্ত মেনে ও বাধ্য হয়েই তিনি স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হন। এর পরও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষার চেষ্টায় তাদের ডান্ডি কার্ড (পরিচয়পত্র) দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেছেন।’ (সমকাল) এ তো গেল পরপারে যাওয়া বাবা ও ছেলের কাহিনি। কিন্তু যাঁরা এখনো মরেননি এবং ২০৪১ সালের আগেই হয়তো মারা যাবেন, তাঁদের উপায় কী? এ এক মারাত্মক পরিহাস! মারা গেলে যাঁদের মরদেহ নেওয়া যাবে না শহীদ মিনারে, জীবিত থাকতে তাঁদের ছবি টাঙিয়ে দেওয়া হলো সেই শহীদ মিনারেই। তাঁরা মহাজোটের তারিফ করে টক শোতে টেবিল চাপড়াতে না পারেন, কেউ কেউ এই সরকারের পতনও চাইতে পারেন ২০১৯-এর আগেই এরশাদ সাহেবের মতো, কিন্তু তাঁরা স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তানপন্থী—সে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ এক আশ্চর্য অবমাননার উপত্যকা। বিখ্যাত ব্রিটিশ লেখক তাঁর পিলগ্রিমস প্রগ্রেস-এ যা বলেছেন: দ্য ভ্যালি অব হিউমিলিয়েশন।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

আর্থিক খাতের জাল by হাওয়ার্ড ডেভিস

বৈশ্বিক পরিসরে আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা খুবই জটিল, ফলে এ সম্পর্কে মানুষের বোঝাপড়াও খুব সীমিত। আমার ছাত্রদের বিষয়টি ভালোভাবে বোঝানোর জন্য আমি একটি রেখাচিত্র এঁকেছি, এতে আর্থিক খাতের বিভিন্ন দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার আন্তসম্পর্ক বোঝানোর চেষ্টা করেছি আমি। এটা দেখতে অনেকটা সার্কিট বোর্ডের মতো হলেও তা বেশ বোধগম্য। তবে ব্যাংকিং খাত তত্ত্বাবধানে যে ব্যাসেল কমিটি আছে, সেটা সম্পর্কে মানুষ অনেকটাই অবগত। এই সংস্থাটি ব্যাংকের পুঁজির সীমা নির্ধারণ করে দেয়। মানুষ হয়তো আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাংকিংবিষয়ক আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য যে ব্যাংক আছে সেটার কথাও শুনে থাকবে। এটা হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাসেল কমিটির কার্যালয় সেখানেই অবস্থিত। আর ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব সিকিউরিটিজ কমিশনস (আইওএসসিও) সম্পর্কেও কিছু কিছু মানুষ অবগত। এই প্রতিষ্ঠানটি বিনিময় ও জামানত নিয়ন্ত্রকদের মান নির্ধারণ করে। কিন্তু যখন আপনি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইনস্যুরেন্স সুপারভাইজার্সের কথা বলবেন, তখন বেশির ভাগ মানুষেরই ভ্রু কুঞ্চিত হবে। আরও অনেক গ্রুপ আছে। দি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডস বোর্ড যে কাজ করে, তা আপনি হয়তো সাধারণভাবে আশা করেন না। মার্কিনরা এর সদস্য হলেও তারা বস্তুত এর নির্ধারিত মান ব্যবহার করে না। এটাকে এখন উল্লেখ করা হয় ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস হিসেবে, ব্যাপারটা বিভ্রান্তিকর। কিন্তু আইএএসবি নিরীক্ষা কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করার জন্য আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিয়েছে। এমনকি নিরীক্ষকদের যারা নিরীক্ষা করে তাদের নিরীক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা রয়েছে।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের কথা শুনতে ভালোই লাগে, কোনো সমস্যায় জর্জরিত দেশে যাদের তাৎক্ষণিকভাবে পাঠানো সম্ভব। আসলে এটা ওইসিডির একটি অংশ, যার কাজ হচ্ছে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে প্রণীত মান বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু এর আওতা বৈশ্বিক হলেও কেন এটি ওইসিডির অংশ, তা সত্যিই এক রহস্য। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এটি গঠিত হয়েছে। আর এশিয়ার আর্থিক খাতে সংকট সৃষ্টি হওয়ার আগে এটি ছিল অনেকটা মাকড়সাবিহীন জালের মতো। বুন্দেসব্যাংকের সাবেক প্রধান হানস টিয়েটমেয়ারকে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা এর কার্যকারিতা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানালে তিনি ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ফোরাম (এফএসএফ) শীর্ষক এক নতুন সংস্থার প্রস্তাব করেন। এর কাজ হবে আর্থিক খাতের সার্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, আর ভবিষ্যতে সমস্যাজনক হতে পারে এমন দুর্বলতা খুঁজে বের করা। আমি এই উল্লিখিত এফএসএফের সদস্য ছিলাম পাঁচ বছরের জন্য। আমি স্বীকার করি, এরূপ জালবিষয়ক আমার একধরনের ভীতি আছে। কিন্তু আমার মতো নৈরাজ্য-ভীত একজন মানুষও এতে বিচলিত হওয়ার মতো তেমন কোনো কারণ খুঁজে পায়নি। এফএসএফ কোনো ভীতিকর প্রাণী নয়, আর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রকদের হাতে নিজেদের অস্ত্র ছাড়া আর কিছু ছিল না, সেই দুর্ভাগ্যজনক ফলাফল, যেগুলোর সঙ্গে আমরা কমবেশি পরিচিত।
২০০৭ সালের আগে বৈশ্বিক মানের সঙ্গে খুব সামান্যই রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত ছিল। আর জাতিরাষ্ট্রগুলোও চায়নি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের দেশের রুগ্ণ ব্যাংকিং খাতে নাক গলাক। ফলে এর পরের সংকট সৃষ্টি হওয়ার পরপরই দেখা গেল, এফএসএফের চাহিদা বেড়ে গেছে। ২০০৯ সালে জি-২০ ভুক্ত দেশগুলো সিদ্ধান্ত নিল, আরও শক্ত কোনো মডেল প্রণয়ন করতে হবে—দ্য ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি বোর্ড (এফএসবি)। এই এফএসবি কাজ করছে পাঁচ বছর ধরে, অনেক বড় বিধায় সংকটের মুখে পড়তে পারে না এমন ব্যাংকের জন্য কিছু নতুন প্রস্তাবের ওপর কাজ করছে তারা। ব্রিসবেনে অনুষ্ঠেয় জি-২০ এর পরবর্তী বৈঠকে এটি এজেন্ডা হিসেবে থাকবে। এফএসবির কার্যকারিতা নিরীক্ষণ করতে পারে এমন কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। কিন্তু সে রকম কিছু থাকলেই বা তারা এফএসবির কাজ সম্পর্কে কী বলত? এর নেতৃত্বে ছিলেন মারিও দ্রাঘি ও মার্ক কারনে, যাঁরা নিজেদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালানোর পাশাপাশি অবসর সময় এ কাজ করেছেন। ব্যালেন্সশিটের পরিসম্পদ অংশে নিরীক্ষকেরা এটা বলতে বাধ্য হবেন যে বোর্ড অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। জি-২০ এ তাঁরা যে নিয়মিত প্রতিবেদন পেশ করেন, তাতে তাঁরা নিয়ন্ত্রণের বিবিধ সুতা একত্রে গাঁথেন, আর তাঁরা সেটা যথেষ্ট বোধগম্য ও পরিষ্কারভাবেই করেন। এখানে তথ্যের এর চেয়ে ভালো কোনো উৎস নেই। তাদের এটাও দেখতে হবে, এফএসবি থেকে যে চাপ দেওয়া হচ্ছে, তা বিভিন্ন খাতের নিয়ন্ত্রকদের কাজ বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্বিতীয় ব্যাসেল মতৈক্যের বাস্তবায়নে এক দশকেরও বেশি সময় লেগে গেছে। ব্যাসেল ৩ বাস্তবায়ন করতে ২৪ মাসের একটু বেশি সময় লেগে গেছে। এফএসবির মাধ্যমে অগ্রগতি প্রতিবেদন পেশের যে প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আইওএসসিও এবং আইএআইএসের কার্যকারিতা আরও ধারালো হয়েছে।
বোর্ড তার তথাকথিত ‘দুর্বলতা’ মূল্যায়নে কিছু মূল্যবান সতর্ক বার্তা দিয়েছে। এতে এই ব্যবস্থায় কিছু বিকাশমান সমস্যার কথা বলা হয়েছে। একই খাতের অন্যরা যে এর পুনর্বিবেচনা করছেন, তার ফলে বিভিন্ন দেশ তাদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করছে। আসলে বৈশ্বিক আর্থিক খাতের পুরো কাঠামোই ‘সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এফএসবির সনদে বলা হয়েছে, এতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। এফএসবি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো নয়, কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি মান্য করতে বাধ্য নয় তারা। অর্থাৎ সদস্যদেশগুলো কোনো মান বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সত্যভাষণ হলো, এফএসবির রাজনৈতিক গুরুরা তার যে সীমারেখা নির্ধারণ করেছে, তার চেয়ে বেশি বা কম কোনো কিছুই করেনি এফএসবি। এমন কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করার কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এই রাজনৈতিক গুরুদের নেই, যে সংস্থাটি আন্তর্জাতিক মান বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে। যারা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নিয়ম ভঙ্গ করে তাদের ধরতে পারে, স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এরূপ একটি প্রত্যয় সৃষ্টি হতে আরও একটি সংকটের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর এর মধ্যে সব দুর্বলতা সত্ত্বেও এফএসবিই সর্বোত্তম প্রতিষ্ঠান।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
হাওয়ার্ড ডেভিস: প্যারিসের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সায়েন্সেস পো-এর অধ্যাপক।

শিক্ষার মান, কোচিং ও শিক্ষা-বাণিজ্য by আবদুল মান্নান

মাস দুয়েক ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। বাঙালি হুজ্জত পছন্দ করে। তবে শিক্ষা নিয়ে হুজ্জত ভালো। অন্তত যাঁরা সাধারণত রাজনীতির আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, তাঁরা নতুন একটি ইস্যু পেলেন। শুরুটা হয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পরপর। ৭৮ শতাংশ ছাত্রছাত্রী এই পরীক্ষায় পাস করল। বেশুমার ছাত্রছাত্রী ‘এ প্লাস’ বা ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ পেয়েছে। সবার চক্ষু চড়কগাছ। ওমা, সে কী কথা! এত পরীক্ষার্থী পাস করল আর এত বিশালসংখ্যক পরীক্ষার্থী এ প্লাস পেল, তা কেমন করে সম্ভব? যাঁরা এই আহাজারি করেন, তাঁরা সবাই আমার বা আমার আগে-পরের প্রজন্ম। তখন এসএসসি অথবা এইচএসসি পরীক্ষায় ৪০ শতাংশ পাস করলে সবাই বলত, এবার শিক্ষা বোর্ড ৪০ শতাংশ পাস করিয়েছে। কদাচিৎ শোনা যেত, ৪০ শতাংশ পাস করেছে। প্রথম বিভাগ পেলে তো কথাই নেই। আমি দুটি পরীক্ষায় বোর্ডের মেধাতালিকায় স্থান পেলে আমাদের পাড়ামহল্লায় সেকি কাণ্ড। রাতারাতি সেলিব্রেটি। যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসব (তখন কোনো ভর্তি পরীক্ষা চালু হয়নি) তখন মহল্লার লোকজন মিলে শুধু আমাকে নয়, আমার বাবাকে পর্যন্ত এক ছোটখাটো সংবর্ধনা দিল। মহল্লার প্রথম স্থানীয় ছেলের উচ্চশিক্ষায় ঢাকা যাত্রা! তখন কেউ পড়ালেখার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। তখন কোচিং শব্দটির সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত। ক্লাসের যেসব ছাত্র অঙ্কে কাঁচা, তাদের জন্য সপ্তাহে এক কি দুই দিন বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা। ইংরেজি নিয়ে সমস্যা নেই, কারণ স্কুলটা ১৮৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত খানদানি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। যুগের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু পাল্টে গেল। এখন এসব পাবলিক পরীক্ষায় পাস করলে কেউ তেমন একটা খোঁজখবর নেয় না, কারণ এখন শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা স্কুল-মাদ্রাসায় পড়ছে। পরীক্ষায় পাস করা তেমন কোনো বিষয় নয়, কারণ পাঠশালায় গেলে একজন শিক্ষার্থী পাস করবে, তাই স্বাভাবিক। পাঠশালায় কেউ ফেল করতে যায় না। সুতরাং, এত ছেলেমেয়ে পাস করলে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।
তবে পুরো বিষয়টা অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে সামনে চলে আসে, যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শতকরা ১০ থেকে ১৫ জন ভর্তির জন্য মনোনীত হলো। পুরো বিষয়ে আরও উত্তাপ ছড়াল যখন ইংরেজি বিভাগে ভর্তির জন্য মাত্র দুজন পরীক্ষার্থী নির্বাচিত হলো। সবাই সমস্বরে চিৎকার শুরু করে দিয়ে বলল, এত ছেলেমেয়ে পাস করল, গোেল্ডন এ প্লাস পেল—তাহলে এত বিরাটসংখ্যক পরীক্ষার্থী ফেল করে কীভাবে? বিষয়টা তো পাস-ফেলের বিষয় নয়। আসল বিষয় হচ্ছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যার তুলনায় পরীক্ষা দিয়েছে অনেক বেশি। সুতরাং, ভর্তি হতে না পারার সংখ্যা তো বাড়বেই। সামনের বছর যদি আরও বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করে আর ঢাকা বা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে অবস্থা এই বছরের তুলনায় তো আরও খারাপ হবে। এটি সাধারণ গাণিতিক হিসাব। আর ইংরেজি বিভাগে যা হয়েছে, তা হচ্ছে স্রেফ পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে। অ্যাডভান্সড ইংরেজিতে পরীক্ষা দিতে হবে, তা পরীক্ষার্থীরা জেনেছে অনেক পরে। এর দায়দায়িত্ব কিছুটা হলেও বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। ২০০০ সালে আমার কন্যা ইংরেজিতে প্রথম দফায় টিকেও পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তির নির্ধারিত যোগ্যতা পরিবর্তন করলে তার আর ওই বিভাগে পড়া হয়নি। সবাই শিক্ষার মান নিয়েও বেশ কথা বলছেন। এত বেশিসংখ্যক পাস অথবা এত গোল্ডেন এ প্লাসের অর্থ কি শিক্ষার মানও বেড়ে গেছে? সবাই মোটামুটি একমত—না, তা বাড়েনি। তাদের সঙ্গে দ্বিমত নেই। তবে এর জন্য শিক্ষার্থীদের দায়ী করতে আমি নারাজ। আমার চার দশকের বেশি সময়ের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এর দায়দায়িত্বের বেশির ভাগ শিক্ষকদের। ১৯৯৮ সালে আমার সুযোগ হয়েছিল ইউনেসকোর আমন্ত্রণে বিশ্বভারতীর এক আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা সম্মেলনে যোগ দেওয়ার। একটি সেশনে প্রবন্ধ পাঠ করবেন বিশ্বভারতীর একসময়ের উপাচার্য ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অম্লান দত্ত। নির্ধারিত সভাপতি না আসায় সভায় সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব পড়ল আমার ওপর। বিষয় ‘উচ্চশিক্ষার মান’। এই বিষয়ে বলতে গিয়ে একপর্যায়ে অধ্যাপক দত্ত বললেন, If the students have not learnt, teachers have not taught। শিক্ষার্থীরা যদি না শেখে, তাহলে বুঝতে হবে, শিক্ষক তাদের পাঠদান করেননি।
এর চেয়ে খাঁটি কথা আর কী হতে পারে? প্রথমে এটি স্বীকার করে নেওয়া ভালো, শিক্ষার মান বিষয়টা অনেকটা আপেক্ষিক এবং তা বহুলাংশে নির্ভর করে শিক্ষকদের ওপর। একসময় গ্রামের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে পাবলিক পরীক্ষায় শহুরে শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো করত। এখন তা হয় না, তার অন্যতম কারণ গ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে এখন আর ভালো শিক্ষক পাওয়া যায় না। অন্যদিকে শহুরে শিক্ষার্থীদের অনানুষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ অনেক বেশি। তবে গ্রাম হোক আর শহর, সবখানেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের লেঠা চুকেছে অনেক আগেই। ব্যতিক্রম কিছু অবশ্যই আছে। পড়ালেখা এখন প্রায় সম্পূর্ণটাই কোচিং সেন্টার আর পরীক্ষামুখী। শ্রেণিকক্ষে ঢুকে একজন শিক্ষক প্রথমে যে কাজটি করেন, তা হচ্ছে বোর্ডে তাঁর কোচিং সেন্টারের ঠিকানাটা লেখা। এ কাজে ড্রয়িং শিক্ষক থেকে বাংলার শিক্ষক—কেউ বাদ যান না। ব্যতিক্রম বাদ দিচ্ছি। চট্টগ্রামে একজন শিক্ষক বাড়িতে ইংরেজি বিষয়ে প্রাইভেট পড়াতেন। সকাল পাঁচটায় শুরু হতো। টেপরেকর্ডার ছেড়ে দিয়ে তিনি ঘুমাতে যেতেন। পদোন্নতি দিয়ে তাঁকে সন্দ্বীপে বদলি করা হলো। চাকরিতে ইস্তফা দিলেন, কারণ তাঁর প্রাইভেট পড়ানোতে বিঘ্ন ঘটবে। পরের দিকে তিনি ধর্মসভায় বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেন। এখন কেউ তেমন আর বাড়িতে প্রাইভেট পড়ান না। সবাই নিজে একটা আস্ত বাড়ি অথবা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন। পশ্চিম ধানমন্ডির ৯/এ সড়কে বিকেল চারটার পর থেকে হাঁটাচলা অসম্ভব, কারণ ওই সড়কে অবস্থিত একটি কোচিং সেন্টারে দলে দলে ছাত্রছাত্রীরা গাড়িতে করে আসে কোচিংয়ে পড়তে। সে এক এলাহি কারবার। প্রায় সব কোচিং সেন্টারের মালিকেরাই এই ঢাকা শহরে একাধিক বাড়ি-গাড়ির মালিক।
বড় প্রশ্ন, তাঁরা যে বিষয়টি এই কোচিং সেন্টারে পড়ান, তা ক্লাসে কেন পড়াতে পারেন না? এই প্রশ্নের কোনো জবাব কিন্তু তাঁদের কাছে কখনো পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের এসব কোচিং সেন্টারে না এসে কি কোনো উপায় আছে? না, নেই। কারণ, না এলে তার পক্ষে স্কুল বা কলেজ পরীক্ষায় কখনো পাস করা সম্ভব হবে না, সে যত ভালো পরীক্ষাই দিক না কেন। কোচিং সেন্টারে আসতে সে বাধ্য। একজন অভিভাবকের তঁার প্রত্যেক সন্তানের জন্য মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা কোচিং সেন্টার বাবদ ব্যয় অনেকটা বাধ্যতামূলক। কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিভিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করে, তাদের কলেজে পড়লে প্রাইভেট কোচিংয়ের প্রয়োজন হয় না। যে কথাটি তারা বলে না, এসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ক্যাম্পাসে কোচিং বাবদ বছরের শুরুতেই লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। বাংলাদেশে শিক্ষার যদি কেউ সর্বনাশ করে থাকেন, তাহলে তার দায়দায়িত্ব ওই কোচিং সেন্টারওয়ালা শিক্ষকদেরই নিতে হবে। তাঁরা সবাই মিলে বছরে ৩২ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্য করেন কিন্তু কর-খাজনা দেন বলে তেমন একট শোনা যায় না। সেদিন একটি টিভি টক শোতে এ বিষয়ে চমৎকার একটি আলোচনা হচ্ছিল। অন্যদের সঙ্গে ছয়জন সদ্য এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থীও অংশ নিয়েছিল সেই টক শোতে। তাদের একাধিকজন বলল, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও তাদের কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য করেন তাদের মায়েরা (বাবারা নন)। মায়েরা সন্তানদের পড়ালেখা নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকেন, তা সত্য কিন্তু তাঁদের প্রতি অনুরোধ কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য করে আপনার সন্তানের সৃজনশীলতা ধ্বংস করবেন না। বর্তমান ছাত্ররা মেধাবী নয়, তা মানতে রাজি নই। তবে এটি মানতে হবে, তাদের মেধার মান উন্নত করার যথেষ্ট সুযোগ আছে, সার্বিক পরিবেশের কারণে তা তারা করতে পারে না। এটি সম্ভব স্কুল কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক আর সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আইন করে বন্ধ করে দেওয়া হোক সব কোচিং সেন্টার । স্কুলে ভালো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক দেওয়া হোক, পড়ালেখার পরিবেশ উন্নত করা হোক। আমার বাড়ির সামনে একটি প্রাইমারি স্কুল আছে। তাতে ইসলামিয়াত পড়ানোর কোনো শিক্ষক নেই কয়েক বছর ধরে। বর্তমান মন্ত্রিসভায় যে কজন সফল মন্ত্রী আছেন, নিঃসন্দেহে শিক্ষামন্ত্রী তাঁদের অন্যতম। তাঁর আমলে এমনটি ঘটবে কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারাটা হচ্ছে স্রেফ চাহিদার চেয়ে জোগান কম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় হাজার আসনের বিপরীত তিন লাখ দুই হাজার ৬৩ জন ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল। প্রতি আসনের জন্য ৪৬ জন। এ জোগানটা বাড়াতে হবে। আবার এটাও ঠিক, সবাইকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে কেন? সারা বিশ্বে বর্তমানে কারিগরি বৃত্তিমূলক দক্ষতার মূল্য অপরিসীম। বাংলাদেশে এই শিক্ষায় তেমন একটি প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায় না। মাত্র ৮ শতাংশ শিক্ষার্থী এই শিক্ষায় আসে। এখানে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার বিকল্প নেই। পরীক্ষা পাসের নম্বর বাড়িয়ে নাকি শিক্ষার মান বাড়ানোর একটি অভিনব চিন্তা করা হচ্ছে, যা নিতান্তই বোকামি। পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর শিক্ষার মানের মাপকাঠি নয়। শিক্ষক নিয়োগে পৃথক কমিশনের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। এটি উত্তম প্রস্তাব। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতনকাঠামো প্রয়োজন। শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে পারলে সমস্যার অর্ধেক সমাধান হয়ে যাবে। যেসব শিক্ষক এ কাজ করতে অক্ষম তাঁদের আলু-পোটলের ব্যবসা করা ভালো।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ব অর্থনীতি- চীনের বিস্ময়কর উত্থান by মাহবুবুর রহমান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় দেড় শ বছরের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে শেষ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি আদায় করে নিল চীন। এটি সামরিক শক্তির নয়, অর্থনীতির। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ জরিপ প্রতিবেদন অনুসারে চীন এখন অর্থনৈতিক শক্তিতে বিশ্বের এক নম্বর দেশ। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের এ উত্তরণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে বিশ্বজুড়ে। পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সামনে চীন আজ সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের মডেল। আইএমএফের সাম্প্রতিক জরিপে চীনের অর্থনীতি বিশ্লে­ষণ করে আরও বলা হয়েছে, ১৮৭২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রই ছিল বিশ্বসেরা অর্থনীতি। এতকাল পরে এসে চীন অদ্যম শক্তিতে সেই শীর্ষস্থান দখল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ফেলে দিয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। সংস্থার জরিপে আরও দেখানো হয়েছে, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের পর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ভারত। চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে জাপান, পঞ্চমে জার্মানি, এর পরেই রয়েছে রাশিয়া, ব্রাজিল, ফ্রান্স ও ইন্দোনেশিয়া। আর সেরা দশে শেষ নামটি যুক্তরাজ্য। আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সদ্য অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের বর্তমান অর্থনীতির আকার আর্থিক মূল্যে ১৭ দশমিক ৬১ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে শীর্ষস্থানচ্যুত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আকার ১৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এদিকে ১৭ দশমিক ৬১ ট্রিলিয়ন ডলারেই চীনের অর্থনীতির উল্লম্ফন থেমে নেই। সংস্থার পূর্বাভাস হচ্ছে, ২০১৯ সাল নাগাদ চীনের অর্থনীতির আকার ২৬ দশমিক ৯৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে, যা হবে ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আকারের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হলেও ৮ শতাংশ বা তার কাছাকাছি থেকে একটা দীর্ঘ সময় ধরে প্রবৃদ্ধি বার্ষিক ১১ থেকে ১৩ বা তারও বেশি শতাংশ অব্যাহত রয়। চীন হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রপ্তানিকারক দেশ। বিগত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা চলাকালে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ চীন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের অনেক দেশকে বিশাল অর্থনীতির ধস থেকে উদ্ধার করেছে।
১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ চীনে রয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ শ্রমশক্তি। চীনের রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাস্টিন লিন ২০১১ সালে বলেন, ২০১০ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত চীন ২০৩০ সাল নাগাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অতিক্রম করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে, যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে। স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক তার ২০১১ সালের এক প্রতিবেদনে মত প্রকাশ করে যে চীন ২০২০ সালের মধ্যেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন প্রণীত ২০০৭ সালের একটি ওইসিডির প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, চীন যদি তার দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় কিছুটা সমতা আনতে পারে, তাহলে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেমস উলফেনসনের ২০১০ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের সর্বমোট মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই হবে চীনের অধিবাসী। ২০২১ সালে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি) তার শতবর্ষপূর্তি পালন করবে। চীন তার কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক অবস্থান বিশ্ব বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যদ্বাণীর উল্লি­খিত সময়ের বহু আগেই অর্জন করে সবাইকে একরকম তাক লাগিয়ে দিয়েছে। পার্টিপ্রধান শি নেতৃত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি পার্টির শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন এবং দলে শক্ত শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেন, বিভিন্ন অঞ্চল ও মানুষের মধ্যে আয়ের অসমতা দূর করার অঙ্গীকার করেন এবং শহর ও গ্রামাঞ্চল, উন্নত ও অনুন্নত এলাকা এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে তৎপর হন।
চীনের বর্তমান নেতৃত্ব অর্থনীতিকে আরও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চীন তার বিশাল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখছে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মধ্য দিয়ে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় চীন রপ্তানি বাজার সংকুচিত করে সুবিশাল এশিয়া মহাদেশের উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বাণিজ্য প্রসারে প্রয়াস নিয়েছে। দেশটি তার মুদ্রা ইউয়ানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগযোগ্য মুদ্রায় রূপান্তরিত করার ব্যবস্থা করেছে। ইউয়ান ইতিমধ্যে একটি আঞ্চলিক অর্থব্যবস্থার অংশ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের আদলে ব্রিকস চীন একটি এশীয় ব্যাংক করার উদ্যোগ নিয়েছে, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এর সদস্যপদ লাভে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। চীন, রাশিয়া ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রজাতন্ত্রগুলোর সমন্বয়ে গঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক জোট। চীন একে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই জোটে অচিরেই ভারত যোগ দেবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আসিয়ান হবে অন্যতম খুঁটিস্বরূপ। আসিয়ান ডলার ব্লক। চীন এটাকে ইউয়ান ব্লকে রূপান্তর করার উদ্যোগ নিচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আসিয়ানের অর্থনৈতিক জোট বাঁধার প্রবণতা রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতসহ সার্কভুক্ত সব কটি দেশের সঙ্গে চীনের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। চীন দক্ষিণ এশিয়ার সমৃদ্ধি ও প্রবৃদ্ধিতে অংশগ্রহণে আগ্রহী। চীনের প্রেসিডেন্ট ভারতসহ কয়েকটি দেশে সফর করেছেন। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ গোটা এশিয়া মহাদেশকে একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির মহাদেশ হিসেবে পরিণত করতে চায় চীন। আর এসবই সে করতে চায় শান্তিপূর্ণ উপায়ের মাধ্যমে। চীন সব দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অন্যের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়ে। বর্তমান বিশ্বে চারদিকে অস্থিরত ও যুদ্ধের দামামা। দেশে দেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ, জাতি-গোষ্ঠীর ঘৃণা, হানাহানি। আরও আছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও রোগব্যাধি। শান্তি এখনো সুদূরপরাহত। স্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে নানাভাবে বিঘ্নিত। সমতা ও ন্যায়বিচারের অভাব প্রকট। বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর এক-পঞ্চমাংশ রয়েছে চীনে। দেশটি নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছে এবং অবশ্যই ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন সাধনে অনেক দীর্ঘ পথ এগিয়ে গেছে। চীন জনগণের দারিদ্র্য বিমোচন করেছে। তাদের জীবনযাত্রার মানের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতা এবং মানবজাতির উন্নয়ন ও প্রগতির ক্ষেত্রে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আজ চীন বিশ্ব অর্থনীতির শীর্ষে দাঁড়িয়ে। বোধগম্য কারণেই চীনের প্রতি বিশ্বের মনোযোগ বাড়ছে। বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, চীনের বর্তমান নেতৃত্ব চীনকে শান্তি, অগ্রগতি ও মর্যাদার আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং এশীয় অঞ্চলে ও সাধারণভাবে গোটা বিশ্বকে আরও শান্তিময়, সম্প্রীতিময় ও বাসযোগ্য করে গড়ে তোলায় প্রভূত অবদান রাখবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তিনটি পৃথক অনুষ্ঠানে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। শান্ত, সৌম্য, স্থিতধী, অত্যন্ত সংবেদনশীল এক মহান ব্যক্তিত্ব শি জিনপিং। মুখে তাঁর সর্বদা লেগে থাকে প্রীতিময় মৃদু হাসি এবং উষ্ণ আন্তরিকতার ঔজ্জ্বল্য। আমি তাঁর মধ্যে দেখেছি সাবেক প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাইয়ের প্রতিচ্ছবি। চীনের জয়রথ অব্যাহত থাক, আরও বেগবান হোক। সাফল্যের নব নব দিগন্ত উন্মোচিত হোক।
লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান: সাবেক সেনাপ্রধান।

সংসদ থেকেও লতিফ সিদ্দিকীকে বহিষ্কার সম্ভব by মিজানুর রহমান খান

মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে তাঁর সংসদ সদস্যপদ চলে যাবে কি যাবে না, সে মর্মে দুটি বিপরীতমুখী মত এসেছে ক্ষমতাসীন দল থেকে। প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি মনে করেন, সিদ্দিকীকে বহিষ্কার করলেও সংসদে তাঁর আসন শূন্য হবে না। কিন্তু এই সুযোগে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সিদ্দিকীকে সংসদ থেকে বহিষ্কারের একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। জাতীয় সংসদ কখনো তার সদস্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়নি। সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে যত অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সংসদের জন্য অবমাননাকর। বাংলাদেশের সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে আছে, সংসদ চলাকালে স্পিকার কোনো সাংসদকে কোনো নির্দিষ্ট দিনের বৈঠকের বাদবাকি সময়ের জন্য বহিষ্কার করতে পারেন। কিন্তু সংসদ থেকে বহিষ্কার করে তাঁর আসন শূন্য ঘোষণার নির্দিষ্ট বিধান নেই। অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, যে বিধান নেই তা কী করে সুপারিশ করেন এবং সংসদ বাস্তবায়ন করবে। এর উত্তরে বলব, আমাদের সংবিধানের ৬৬ (২) অনুচ্ছেদের ‘ছ’ উপ-দফার অধীনে সাংসদ থাকার নতুন অযোগ্যতা নির্দেশ করা সম্ভব। ভারতের সংবিধানে অযোগ্যতা নির্ধারণী ১০২ অনুচ্ছেদটির সঙ্গে আমাদের ৬৬ অনুচ্ছেদের অবিকল মিল আছে। তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলবেন, নতুন আইন না করে সিদ্দিকীকে সংসদ থেকে কী করে বহিষ্কার সম্ভব? ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর ভাষায় বলি, ‘সংবিধানে না লেখা থাকলেও সার্বভৌম সংসদ হিসেবে তার সহজাত অধিকার আছে নিজের সমস্যা নিজেকে সমাধান করা। এ বিষয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ থাকতে পারে বলে আমি মনে করি না।’ ১৯৫১ সালে লোকসভা সদস্য এইচ জি মুডগালকে বহিষ্কারের ঘটনায় নেহরু ওই মন্তব্য করেছিলেন।

মুডগালের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতিসহ অন্যান্য অভিযোগ লোকসভা একটি কমিটি করে তদন্ত করে এবং তারা রিপোর্ট দেয় যে ওই সাংসদের আচরণ লোকসভার আচরণের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। মুডগাল এরপর স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলেও তা গ্রহণ না করে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী লোকসভা তাঁকে বহিষ্কার করে। তাঁর আসন শূন্য হয়। ভারতে সেটাই প্রথম দৃষ্টান্ত। ২০০৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ‘ঘুষের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন উত্থাপনের’ দায়ে লোকসভা তার ১০ সদস্যকে বহিষ্কার করেছিল। বহিষ্কারের এই রীতিরও জনক হাউস অব কমন্স। ১৬৬৭ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যবর্তী ২৮৭ বছরে কমন্স তার ৬০ সদস্যকে বহিষ্কার করেছে। আমরা সম্প্রতি জাতীয় সংসদকে বিচারকদের বিচারের ক্ষমতা নিতে দেখলাম। তাহলে আমরা কেন লতিফ সিদ্দিকীর মতো একজন অভিযুক্ত সদস্যের বিরুদ্ধে সংসদকে সার্বভৌম হতে দেখব না? একটাই বাধা, সংসদ নেতা প্যান্ডোরার বাক্স খোলার ঝুঁকি নেবেন কি না। লতিফ সিদ্দিকীকে হয়তো দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। এরপর ১৯৯৬–২০০১ সালের মেয়াদে বিএনপির সাংসদ আলাউদ্দিন ও হাসিবুর রহমানের মতো একটি বৈধতার প্রশ্ন তোলা হবে স্পিকারের কাছে। আর আমরা সেদিনের বিএনপির ভূমিকায় দেখব ক্ষমতাসীন দলকে। এবারে স্পিকার হয়তো সেটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছেও পাঠাবেন। ১৯৮১ সালের আইনমতে ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন রায় দেবেন। এভাবে সংসদ অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে শিকার করতে উৎসুক থাকবে। সিদ্দিকী-কীর্তি একটা বিরল সুযোগ, যার বিরুদ্ধে মোটামুটি জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁকে বহিষ্কার করলে প্রশ্নবিদ্ধ সংসদ কিছুটা হলেও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। উপরন্তু এ দেশ প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্রের অন্যান্য স্তম্ভ দিয়ে সাংসদ বা রাজনীতিকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো অত্যন্ত দুরূহ। তার চেয়ে বরং কিছু ব্যাধি নিরাময়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানকেই কাজে লাগানো উচিত।
ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে লোকসভা যে কাণ্ড করেছে, সেটা আদালতকে দিয়ে করাতে গেলে আদালতকে অহেতুক জখম হতে হতো। ১৯৭৭ সালে লোকসভা কমিটি ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। কিন্তু সে জন্য শাস্তি কী হবে, তা নির্ধারণের ভার সংসদের কাছে ন্যস্ত করে। লোকসভা তার অবমাননার জন্য ইন্দিরাকে লোকসভা অধিবেশনের সমাপ্তি পর্যন্ত মেয়াদে কারাবাসের শাস্তি ও লোকসভা থেকে বহিষ্কার করে। এরপর কংগ্রেস এর বৈধতার প্রশ্ন নির্বাচন কমিশনে নিয়ে যায়। আর নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত দেয় যে বহিষ্কৃত হওয়ার পরই লোকসভায় ইন্দিরার আসন শূন্য হয়ে গেছে। মাত্র তিন বছর পর একটি নতুন লোকসভা তার আগের সিদ্ধান্তকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে ইন্দিরাকে নির্দোষ ঘোষণা করে। সংসদীয় গণতন্ত্র সত্যি চাইলে বাংলাদেশকে এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। আমরা মনে রাখব সিদ্দিকীর প্রধান পরিচয় তিনি সাংসদ। তিনি যদি মন্ত্রী না থাকতেন তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে সংসদ কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে? আমরা এই বিষয়টিকে বৃহত্তর পরিসরে বোঝার চেষ্টা করি। ব্যক্তি সিদ্দিকী বলে নয়, দেশের জনগণের আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত প্রদানের ঘটনা, সেটা ধর্মীয় অনুভূতি ব্যতিরেকে কোনো বড় ধরনের দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারি বাধালেও ঘটতে পারে। আর তখন সংসদ নেতা তাঁকে বহিষ্কারের উদ্যোগ না নিলে সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে যেখানে বলা আছে, জনগণ ক্ষমতার মালিক, সেই মালিকপক্ষের নিতান্ত অসহায় দর্শক হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সে কারণে বিশ্বে একটি নতুন প্রবণতা লক্ষ করছি। চার বা পাঁচ বছরের একটি টানা মেয়াদে কেউ একজন যত অপকর্মই করুন, জনগণ একবার তাঁকে নির্বাচিত করেছেন বলে তিনি যাতে তাঁদের মাথায় চড়ে বসতে না পারেন, সে জন্য রিকল-ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। নতুন করে যারাই সংবিধান লিখছে, তারাই রিকল-ব্যবস্থা চালু করছে। এই বিধান আমাদেরও থাকা দরকার। এটা থাকলে পদত্যাগ বা বহিষ্কারের তর্কে সময় নষ্ট হতো না। টাঙ্গাইলের মানুষ অনেক আগেই উপনির্বাচনের মাধ্যমে তাঁদের নেতা পাল্টানোর উদ্যোগ নিতে পারতেন। সৈয়দ আশরাফ অবিলম্বে উপনির্বাচন চেয়েছেন। কিন্তু তা কীভাবে হতে পারে? পুরো জাতি এবং সংশ্লিষ্ট দলও যখন চাইছে, তখন আমরা এমন সংবিধান করেছি, যা দ্রুত একটি উপনির্বাচন হতে দিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এটা আইনের মীমাংসিত নীতি যে সংবিধান ব্যাখ্যায় সংবিধানপ্রণেতাদের ‘অভিপ্রায়’ কী ছিল, সেটা মানা আবশ্যক। সংবিধানপ্রণেতা ড. কামাল হোসেনের ভাষায়, ‘বহিষ্কার করা হলে সংসদের আসন শূন্য হওয়ার বিধানকে বাক্স্বাধীনতার জন্য “বেশি রূঢ়” বিবেচনা করা হয়েছিল। তাই সুচিন্তিতভাবে বহিষ্কারের শর্ত পরিহার করে ৭০ অনুচ্ছেদে মাত্র দুটি শর্ত (পদত্যাগ ও দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া) যুক্ত করা হয়েছিল।’ এটাই কি বেদবাক্য? পেছনের দরজা দিয়ে মন্ত্রী হওয়া ঠেকাতে বঙ্গবন্ধু ৭০ অনুচ্ছেদ এনেছিলেন। প্রশ্নের জবাবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আমাকে বলেন, শেখ মুজিব তাঁকে বলেছিলেন ৭০ অনুচ্ছেদ একটা স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা। ১৯৯৮ সালে বিএনপির মো. আলাউদ্দিন ও হাসিবুর রহমানকে শেখ হাসিনা যথাক্রমে প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী করেছিলেন। সেদিক থেকে এরশাদকে নিয়ে এবার যা ঘটল, সেটা দ্বিতীয় উপাখ্যান। বিএনপি তাদের ওই দুই ছদ্মবেশী দলত্যাগীর আসন শূন্য করাতে চাইলে স্পিকার (হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী) রুলিং দিলেন, ‘৭০ অনুচ্ছেদের ব্যত্যয় ঘটেনি।’ অথচ আইন বলেছে, কারও সদস্যপদ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে স্পিকার তা ৩০ দিনের মধ্যে ইসির কাছে পাঠাবেন, এবং তাদের মতই চূড়ান্ত। স্পিকার সেই প্রশ্ন তৎকালীন সিইসি আবু হেনার কাছে পাঠিয়েছিলেন বটে কিন্তু তা হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের দ্বারা তাঁর রুলিং নাকচ হওয়ার আগে নয়। ইসির রায় ছিল, ওই দুজন তাঁদের ‘আচরণের মাধ্যমে বিএনপি থেকে পদত্যাগ’ করেছেন। ১৯৯৯ সালের ১১ অক্টোবর তাঁদের মন্ত্রিত্ব গেল। সংসদের আসনও শূন্য হলো।
এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে আমরা তাই সুপারিশ রাখব, জনগণ যাতে প্রত্যক্ষভাবে তাঁদের ক্ষমতার অনুশীলন করতে পারেন, সে জন্য রিকল-ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে। তাহলে ‘২০১৯ সালের এক ঘণ্টা আগেও’ সাধারণ নির্বাচন নাই-বা হলো, জনগণ অন্তত কোথাও কোথাও ‘রিকল’ করে সংসদ গঠন-প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবে। আমাদের সংবিধানমতে যুদ্ধ হলে গোটা সংসদকে রিকল করা যায়। কিন্তু আমাদের জরুরি দরকার জনগণের কাছে ব্যক্তি সাংসদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। বর্তমান ব্যবস্থায় সিদ্দিকীর মতো সাংসদেরা ব্যক্তিগত অপকীর্তি দলের কাঁধে চাপিয়ে দিন পার করতে পারেন। রিকল-ব্যবস্থা দলের শাপমোচন ও জনগণের অংশগ্রহণ উভয় দিক নিশ্চিত করতে পারে। বর্তমানে ৫০টির বেশি দেশে (অধিকাংশ নতুন গণতন্ত্র) কোনো না কোনো মাত্রায় রিকল-প্রথার ব্যবহার আছে। প্রতিবেশী মিয়ানমার তার ২০০৮ সালের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে উন্নত গণতন্ত্রের আদলে লিখেছে, সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটাররা তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিকে রিকল করতে পারবেন। এর মানে হলো, সংসদ না ভেঙে আসনভিত্তিক মধ্যবর্তী বা আগাম নির্বাচন করা যাবে। মিয়ানমার পারলে আমরা পারব না কেন? তবে আপাতত যেটা চাইছি সেটা হলো, সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করে ইসিকে দিয়ে আসন শূন্য করানোর পথে না যাওয়া। সংবিধানের আদি চেতনা টিকে থাক। এখন তাই উপযুক্ত উপায় হলো তাঁকে সংসদ থেকে বহিষ্কার করা। ৭০ অনুচ্ছেদের মতো বিধান আছে আয়ারল্যান্ডে। সংসদ অবমাননার জন্য তারাও সাংসদ বহিষ্কার করে থাকে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

মধ্যপ্রাচ্য- ক্রুসেডার ও জায়নবাদী by ইউরি আভনেরি

সম্প্রতি ‘ক্রুসেডার’ ও ‘জায়নবাদী’ শব্দ দুটি জড়াজড়ি করে ব্যবহৃত হচ্ছে। দিন কয়েক আগে আইএসের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্র দেখেছি আমি। এতে দেখা যায়, সব ইসলামি যোদ্ধা ও কিশোরই এ শব্দ দুটি ব্যবহার করছে। প্রায় ৬০ বছর আগে আমি ‘ক্রুসেডার ও জায়নিস্ট’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। সম্ভবত এ বিষয়ে সেটিই ছিল প্রথম লেখা। এর ব্যাপক বিরোধিতা শুরু হয়েছিল। বলা হচ্ছিল, ইহুদিরা একটি জাতি, তারা ক্রুসেডারদের (খ্রিষ্টীয় ধর্মযোদ্ধা) মতো নয়। ক্রুসেডাররা বর্বর, তারা সে সময়ের সভ্য মুসলমানদের মতো ছিল না। সে তুলনায় জায়নবাদীরা কৌশলগতভাবে শ্রেয়। জায়নবাদীরা তাদের কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
১৯৪৮ সালের যুদ্ধে আমার কমান্ডো ইউনিট ইসরায়েলের দক্ষিণে যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধের শেষে ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেঁষে এক টুকরা জমি মিসরীয়দের হাতে থেকে গিয়েছিল। আমরা এটার নাম দিলাম ‘গাজা উপত্যকা’, আর এর চারপাশ ঘিরে নজরদারি চৌকি গড়ে তুললাম। তার কয়েক বছর পরে আমি স্টিভেন রানসিম্যানের আ হিস্টরি অব দ্য ক্রুসেডস শীর্ষক ঢাউস বইটি পড়ি। সেখানে উল্লিখিত দুটি ঘটনার কৌতূহলোদ্দীপক ও আকস্মিক যোগাযোগের প্রতি আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। বিষয়টা এ রকম: প্রথম ক্রুসেডের পর সমুদ্রের ধারঘেঁষে একখণ্ড জমি মিসরীয়দের হাতে চলে গিয়েছিল, এর বিস্তৃতি গাজা ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। ক্রুসেডাররা সেখানে একটি দুর্গ নির্মাণ করে সেটা রক্ষার চেষ্টা করে। আজ আমাদের পর্যবেক্ষণ ফাঁড়ি যেখানে অবস্থিত, ঠিক সেখানেই তারা অবস্থান নিয়েছিল।
বইটির তিনটি খণ্ড পড়ার পর আমি এমন কিছু করলাম, যা আমি আগে কখনো করিনি বা তার পরও আর করিনি। লেখকের কাছে আমি একটি চিঠি লিখলাম। চিঠিতে বইটির অনেক প্রশংসা করার পর আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, আপনি কি তাদের ও আমাদের মধ্যে কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছেন? তিন দিনের মধ্যেই আমি উত্তর পেলাম। তিনি শুধু এ বিষয়ে একবার ভাবেননি, এ চিন্তা সব সময় তাঁর মাথায় উঁকি দিচ্ছে। তিনি উল্লিখিত বইটির উপশিরোনাম দিতে চেয়েছিলেন এ রকম: ‘আ গাইড ফর জায়োননিস্ট অন হাউ নট টু ডু ইট’। পরবর্তীকালে তাঁর আহ্বানে লন্ডনে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করি। তাঁকে দেখে আমি বেশ অভিভূত হয়েছিলাম। ক্রুসেডার-জায়নবাদীবিষয়ক আলেচনায় ডুব দেওয়ার পর আমাদের সময় যে কীভাবে কেটে গিয়েছিল, তা টেরও পাইনি। চার ঘণ্টা ধরে আমরা ব্যক্তিমানুষ ও ঘটনাগুলোর মধ্যকার তুলনা টেনেছি।
ক্রুসেড ও জায়নবাদের উত্থানের ঐতিহাসিক দুটি ঘটনার মধ্যে ছয় শতাব্দীর ব্যবধান। এমনকি ঘটনা দুটির রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক পরিপ্রেক্ষিতও একদম আলাদা। কিন্তু কিছু সাদৃশ্যও খুব পরিষ্কার। এই ক্রুসেডার ও জায়নবাদী উভয় গোষ্ঠীই পশ্চিম থেকে এসে ফিলিস্তিন আক্রমণ করেছে। তাদের পেছনে ছিল সমুদ্র ও ইউরোপ, আর সামনে ছিল মুসলিম-আরব বিশ্ব। তারা সব সময় যুদ্ধে লিপ্ত থেকেছে। সে সময় ইহুদিরা নিজেদের আরবদের ভাই মনে করত। ক্রুসেডাররা পবিত্র ভূমিতে ফিরে যাওয়ার পথে রাইন নদীর ধারে বহু ইহুদি হত্যা করেছে, এই বিষয়টি ইহুদিদের চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। জেরুজালেম দখল করার পর ক্রুসেডাররা আরও একটি জঘন্য অপরাধ করেছে, তারা সেখানকার সব ইহুদি ও মুসলমান অধিবাসীকে হত্যা করে। নারী ও শিশু কেউই সে যাত্রায় রেহাই পায়নি। ক্রুসেডাররা রক্তে পা ডুবিয়ে হেঁটেছে, একজন খ্রিষ্টান ভাষ্যকার এভাবেই এর বিবরণ দিয়েছেন।
আমি ক্রুসেডারদের ঘৃণা করেই বড় হয়েছি। কিন্তু মুসলমানরাও যে ক্রুসেডারদের এত ঘৃণা করে, তা আমি জানতাম না। আরব-ইসরায়েলি লেখক এমিল হাবিবিকে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি অংশীদারত্বে স্বাক্ষর করার আহ্বান জানালে আমি বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারি। এতে আমি উল্লেখ করেছিলাম, কীভাবে অতীতে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে হাইফা শহর সমৃদ্ধ হয়েছে। হাবিবি যখন দেখলেন, আমি ক্রুসেডারদের নামও এতে যুক্ত করেছি, তিনি তখন স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি রাগে গড়গড় করতে করতে বলেন, ‘ক্রুসেডাররা নির্মম খুনি’। আরবরা আমাদের (ইসরায়েলিদের) ক্রুসেডারদের সঙ্গে একই কাতারে ফেলে। তারা এটা দ্ব্যর্থহীনভাবেই মনে করে, তাদের দেশে আমরাও বিদেশি এবং অনাহূত প্রবেশকারী—এ দেশ ও অঞ্চলে আমরা আগন্তুক। সে কারণেই এ তুলনা খুব বিপজ্জনক। আরবরা যদি ছয় দশক পরও আমাদের বিরুদ্ধে এরূপ ঘৃণা পোষণ করে, তাহলে আমাদের মিলন হবে কীভাবে? আমরা আসলেই একই রকম কি না, এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে সময় নষ্ট করার চেয়ে আমাদের উচিত হবে, ক্রুসেডারদের ইতিহাস থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়া।
প্রথম শিক্ষাটি আমাদের পরিচয়সংক্রান্ত। আমরা কে? আমরা কি ইউরোপীয়, যারা একটি প্রতিকূল অঞ্চলে এসে পড়েছি? আমরা কি ‘এশীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে একটি দেয়াল’, থিওডোর হার্জল যেটা বলেছেন। নাকি এহুদ বারাকের ভাষ্যমতে, আমরা ‘জঙ্গলের মধ্যে মনোরম বসতির মতো’? সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমরা কি নিজেদের ইউরোপীয় মনে করি? নাকি একটি ভুল মহাদেশে আমরা হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। আমার কাছে মনে হয়, এটাই হচ্ছে জায়নবাদের মৌলিক প্রশ্ন—একদম প্রথম দিন থেকে শুরু করে গতকাল পর্যন্ত। আমার পুস্তিকা ‘ওয়্যার অর পিস ইন দ্য সেমিটিক রিজিয়ন’-এর প্রথম বাক্যেই আমি এ প্রশ্ন তুলেছিলাম। ক্রুসেডারদের জন্য এটা কোনো প্রশ্নই নয়। তারা ছিল ইউরোপীয় নাইটদের মুকুটের ফুলের মতো, যারা সারাসেনদের (মুসলমানদের ইউরোপীয় নাম) সঙ্গে যুদ্ধ করতে এসেছিল। তারা আরব শাসকদের সঙ্গে সন্ধি করেছে, মূলত দামেস্কের আমিরের সঙ্গে। কিন্তু তাদের মূল শত্রু ছিল মুসলমানরাই।
ইসরায়েলও ঠিক একই অবস্থায় আছে। এটা সত্য, আমরা কখনো স্বীকার করি না যে আমরা যুদ্ধ চাই; বরং বলি যে আরবরা শান্তি চায় না। কিন্তু সেই প্রথম দিন থেকেই ইসরায়েল রাষ্ট্র তার সীমানা নির্ধারণে টালবাহানা করছে। উল্টো তারা প্রতিদিনই বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের সীমানা বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে—ক্রুসেডাররা ঠিক যা করেছিল। আজ আমাদের ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৬৬ বছর পরও ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যমে অর্ধেকের বেশি খবর থাকে আরবদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ নিয়ে। ইসরায়েল নিরাপত্তা আতঙ্কে ভুগছে, এর মূল অনেক গভীরে প্রোথিত, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে আবার নানাভাবেই। কিন্তু ইসরায়েলের সফলতা দৃষ্টি আকর্ষক, তার সামরিক শক্তিও বিশ্বমানের। ফলে নিরাপত্তা নিয়ে এই শঙ্কার বিষয়টি সত্যিই আজগুবি—বোধগম্য নয়। আসলে যে অঞ্চলে আমরা বাস করছি, সেখানে আমাদের নাড়ি পোঁতা নেই। অন্য কথায়, আমরা মনে করি, ইসরায়েল জঙ্গলের মধ্যে ঘর বানিয়ে থাকছে।
আরকেটি শিক্ষা হচ্ছে, অভিবাসন নিয়ে ঐকান্তিকভাবে চিন্তা করা। ক্রুসেডারদের সমাজে সব সময়ই যাওয়া-আসা ছিল। ইসরায়েলের উচ্চশিক্ষিত তরুণেরা পরিবারসহ বার্লিন ও অন্যান্য ইউরোপীয় এবং মার্কিন শহরের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করছে। সময় এসেছে হিসাব মেলানোর, কতজন মানুষ সেমিটীয় বিরোধিতার জ্বালায় ইসরায়েলে এসেছে, আর কতজন ডানপন্থী চরমপন্থা ও যুদ্ধের কারণে ইউরোপে ফেরত যাচ্ছে। এটাই হচ্ছে ট্র্যাজেডি। হ্যাঁ, ক্রুসেডারদের হাতে পরামাণবিক বোমা ও জার্মান সাবমেরিন ছিল না। যখন আইএস ও অন্য আরবরা ক্রুসেডার শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে, তখন তারা শুধু মধ্যযুগের হামলাকারীদের প্রতিই ইঙ্গিত করে না। তারা সব মার্কিন ও ইউরোপীয় খ্রিষ্টানকেও এর মধ্যে ফেলে। আর যখন জায়নবাদীদের সম্পর্কে বলে, তখন তারা সব ইসরায়েলি ইহুদি ও কখনো কখনো সব ইহুদিকেই বুঝিয়ে থাকে। আমি মনে করি, এই দুটি শব্দের মধ্যে মেলবন্ধন খোঁজার ব্যাপারটি খুবই বিপজ্জনক। আইএসের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আমি মোটেও ভীত নই, কিন্তু তাদের মতাদর্শের শক্তি নিয়ে শঙ্কিত। তাদের সামরিক শক্তি খুবই নগণ্য পর্যায়ের। কিন্তু কোনো মার্কিন বোমারু বিমানই বোমা মেরে এই মতাদর্শ ধ্বংস করতে পারবে না।
সময় বয়ে যাচ্ছে, আমাদের উচিত হবে ক্রুসেডারদের থেকে বিযুক্ত হওয়া, তা সে প্রাচীন বা আধুনিক যা-ই হোক না কেন। ফিলিস্তিনের মাটিতে প্রথম কোনো আধুনিক জায়নবাদী পা রেখেছেন আজ থেকে ১৩২ বছর আগে, নিজেদের ঠিকুজি ঠিক করার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; ইন্টারনেট থেকে নেওয়া
ইউরি আভনেরি: ইসরায়েলি লেখক।

শহীদ মিনারের অবমাননা -ভিন্নমতের কণ্ঠরোধের অপপ্রয়াস বন্ধ হোক

বাংলাদেশের দুটি রাজনৈতিক ঘরানা দেশকে বিভক্ত করে যেভাবে নিজেদের ক্ষমতার বিস্তার ঘটাতে চাইছে, তাতে অমঙ্গলের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। সর্বশেষ ভাষা আন্দোলনের মহান প্রতীক, বাংলাদেশের মুক্তিকামী চেতনার প্রাণভোমরা শহীদ মিনারও তাদের হিংসা-বিভক্তির রাজনীতির শিকার হলো। অধ্যাপক পিয়াস করিমের মরদেহ শহীদ মিনারে নিতে না দেওয়ার নামে রাজনৈতিক মহলে কুৎসিত তৎপরতা চালানো হয়েছে। তাঁকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ আখ্যায়িত করে একটি পক্ষ অনলাইনমাধ্যম থেকে শুরু করে বাস্তব জমিনে ঘৃণা প্রকাশ করে চলেছে। এই ঘৃণার সুনামি ক্রমেই দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকের ভাবমূর্তিতেও আঘাত হেনেছে। শাহবাগে একটি ভুঁইফোড় সংগঠন ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচকদের ছবিতে কাটাচিহ্ন দিয়ে তাঁদের মৃত্যুর পর শহীদ মিনারে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শহীদ মিনারে পিয়াস করিমের শেষ সম্মাননার ‘অনুমতি’ না দিয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। সবকিছু মিলিয়ে শহীদ মিনারকে সচেতনভাবে দলীয় সম্পত্তি বানানোর প্রয়াস অত্যন্ত নিন্দনীয়। ভালোবাসার অশ্রু আর সংগ্রামের রক্তবিধৌত শহীদ মিনারকে এভাবে অপমান করার অধিকার কারও নেই। শহীদ মিনার সর্বজনের গন্তব্য। সভ্য সমাজে সামাজিক সম্মতির ভিত্তিতে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ের মীমাংসা হয়। যে বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য নেই, সে বিষয়ের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদ মিনারকে জড়িত না করাই গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক। সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করলেই ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া, ভিন্নমতাবলম্বীকে হুমকি-অবমাননা ও কুৎসার শিকার করা স্বৈরাচারী মনোবৃত্তিরই পরিচায়ক। সরকারি মহল থেকে যেখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড নিবৃত্ত করার কথা, সেখানে উসকে দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রীদের কণ্ঠেও হুমকি-রণহুংকার শোনা যাচ্ছে। এভাবে শহীদ মিনারকে ক্ষমতার ঢাল বানানো খোদ মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ মিনার ও ভাষাশহীদদের প্রতিই চরম অবমাননা।

তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে ছবি

স্বদেশভূমি আর নিজ লেখার জগৎটা ছেড়ে দূরে থাকতে কেমন লাগে একজন লেখকের? সেই নির্বাসনের গল্প উঠে এসেছে খ্যাতনামা বাঙালি অভিনেত্রী চূর্ণি গাঙ্গুলীর ছবি নির্বাসিততে। নির্বাসিত বাঙালি লেখিকা তসলিমা নাসরিনের জীবনের অনুপ্রেরণায় বানানো ছবিটি দিয়ে পরিচালক হিসেবে অভিষেক হলো চূর্ণির। গত সোমবার মুম্বাই চলচ্চিত্র উত্সবে (এমএফএফ) ছবিটির প্রিমিয়ার হয়েছে।

ছবিতে নির্বাসিত লেখিকার চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন চূর্ণি। শুটিং হয়েছে কলকাতা ও সুইডেনে। চূর্ণি জানিয়েছেন, ছবিটি বানানোর আগে তিনি তসলিমাকে পাণ্ডুলিপি দেখিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, ছবিটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও তাঁকে দেখানো হয়েছে। চূর্ণি বলেছেন, ‘ছবিটি তাঁকে দেখানোর পর তিনি বলেছেন, আমি গল্পটার প্রতি ন্যায়বিচার করেছি।’ কলকাতা নিউজ।

ভাইয়ের সঙ্গে বোনকে পিঠমোড়া করে বেঁধে গণধর্ষণ

সঙ্গে থাকা মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে পিঠমোড়া করে বাঁধা হলো তিন সন্তানের জননীকে। দুজনেরই চোখ বেঁধে ফেলা হলো। ওই অবস্থায় একে একে সাতজন ধর্ষণ করল ওই নারীকে। গতকাল মঙ্গলবার রাতে লোমহর্ষক পাশবিকতার এ ঘটনা ঘটেছে যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারণ-সাতক্ষীরা সড়কের কুচেমোড়া এলাকায়। গুরুতর অবস্থায় ওই নারীকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৫ বছর বয়সী এ নারী দাবি করেন, তিনি তিন সন্তানকে নিয়ে যশোর শহরে ভাড়া বাসায় থাকেন। গতকাল রাত আটটার দিকে তিনি ছোট মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে মোটরসাইকলে করে যশোর থেকে শার্শা উপজেলার ভবানীপুরে এক খালাতো বোনের বাড়ি যাচ্ছিলেন। ঘটনার শিকার এই নারী বলেন, তাঁদের মোটরসাইকেলটি নাভারণ-সাতক্ষীরা সড়কের কুচেমোড়ায় পৌঁছালে আট-দশজন দুর্বৃত্ত দড়ি টানিয়ে রাস্তা আটকায়। পরে তাঁদের ভাই-বোনকে ধরে মাঠের মধ্যে নিয়ে একজনের সঙ্গে অন্যজনকে পিঠমোড়া করে বাঁধে। দুজনেরই মুখ ও চোখ বেঁধে দেয় দুর্বৃত্তরা। ওই অবস্থায় একে একে সাতজন তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। দুর্বৃত্তরা পরস্পরকে ডাকাডাকি করার সময় তিনি রাজু, আরিফ, লতিফ,বাবু নামগুলো শুনেছেন বলে দাবি করেন। দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল ও তাঁদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে।
ওই নারী জানান, রাত দুটো পর্যন্ত তাঁর ওপর নির্যাতন চালানোর পর দুর্বৃত্তরা তাঁদের মাঠের মধ্যে ফেলে রেখে চলে যায়। পরে তাঁর মামাতো অতিকষ্টে বাঁধন খুলে তাঁকে (নারীকে) নাভারণের একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। দুপুরে তাঁকে নাভারণ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাঁকে যশোর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বেলা একটায় মেয়েটিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। তাঁর শরীরে ধর্ষণের আলামত ছিল। তাঁর শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল। তাঁর শরীরে উচ্চমাত্রার জ্বর, বমি ও তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা ছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্যে মেয়েটিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। শার্শা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রহিম জানান, ওই নারী যেসব নাম বলেছেন, সেগুলো ধরে দোষীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আর ধর্ষণের ঘটনায় ওই নারীর মামাতো ভাই বাদী হয়ে মামলা করেছেন।

ব্যক্তিগত শত্রুতার জের- দুই পায়ে গুলি করে যুবককে সন্ত্রাসী সাজাল পুলিশ!

ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে এক গাড়িচালককে দুই পায়ে গুলি করে সন্ত্রাসী সাজানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে। দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ গাড়িচালক শাহ আলমকে (২৬) জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অভিযুক্ত এসআই আনোয়ার হোসেন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় কর্মরত। এ ঘটনা তদন্তের জন্য কমিটি করেছে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগ।
শাহ আলমের স্বজনেরা জানান, দুই বছর আগে তিনি মোহাম্মদপুর থানার গাড়ি চালাতেন। তখন এসআই আনোয়ার মোহাম্মদপুর থানায় কর্মরত ছিলেন। শাহ আলম স্ত্রী শান্তাসহ মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ি এলাকায় থাকতেন। সেখানে তাঁদের একটি মেয়েও হয়। মেয়ের বয়স এখন আড়াই বছর। পারিবারিক কলহের জেরে দেড় বছর আগে শান্তা বাঁশবাড়ি ছেড়ে কেরানীগঞ্জে বাবার বাড়ির এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যান। যাওয়ার আগে তিনি শাহ আলমের মালিকানাধীন একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিক্রি করে দেন। শাহ আলম নানাভাবে খোঁজাখুঁজি করে কেরানীগঞ্জের আরশিনগরের ওই বাড়ির সন্ধান পান। এরপর দেড় মাস আগে শাহ আলম জানতে পারেন যে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে এসআই আনোয়ারের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে এবং আনোয়ারের ভাড়া করা বাসাতেই তিনি থাকছেন। এরপর তিনি কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে গিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্যদের বিষয়টি জানান এবং সুবিচার চান। এ বিষয়ে একাধিক সালিস-বৈঠকও হয়েছে। সবশেষে গত রোববার রাতে এক লোকের মাধ্যমে ডেকে নিয়ে শাহ আলমের দুই পায়ে গুলি করে তাঁকে সন্ত্রাসী সাজিয়েছেন এসআই আনোয়ার।
পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শাহ আলম প্রথম আলোকে বলেন, গত রোববার রাতে পারিবারিক বিষয় নিয়ে মীমাংসার কথা বলে পরিচিত এক ব্যক্তি তাঁকে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট এলাকায় নিয়ে যান। সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া এসআই আনোয়ার তাঁকে চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে তোলেন।
এরপর তালতলা এলাকায় নিয়ে মাটিতে ফেলে হাতকড়া পরা অবস্থাতেই দুই পায়ে গুলি করেন। শাহ আলম বলেন, তাঁর ডান পায়ে শটগান দিয়ে আর বাঁ পায়ে পিস্তল দিয়ে গুলি করেছেন এসআই আনোয়ার। ডান পায়ের হাঁটুর নিচের পুরো মাংসপেশিই গুলিতে উড়ে গেছে।
কেরানীগঞ্জের আরশিনগরের স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আরশিনগরের ছয়তলা একটি বাড়ির চারতলার ফ্ল্যাট ভাড়া নেন এসআই আনোয়ার। সেই ফ্ল্যাটে এখনো শাহ আলমের স্ত্রী থাকছেন। স্থানীয় লোকজন জানান, মোহাম্মদপুরের লোহালক্কড়ের ব্যবসায়ী পরিচয়ে আনোয়ার ওই বাসাটি ভাড়া নেন। স্থানীয় নিরাপত্তাকর্মীরা জানিয়েছেন, আনোয়ার কখনো ওই বাসায় টানা ছয় ঘণ্টা থাকতেন না। সর্বোচ্চ তিন থেকে চার ঘণ্টা ওই বাড়িতে থাকতেন। তবে গত ঈদের আগে এ বিষয়ে সালিস-বৈঠক বসার পর থেকে আনোয়ার আর আসেন না।
ওই সালিসে উপস্থিত থাকা একজন বলেন, গত ঈদের আগে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শাহ আলম, তাঁর স্ত্রী শান্তা ও শান্তার বাবা-মাসহ স্থানীয় লোকজন উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় লোকজনের মত ছিল, বিয়ে ছাড়া আনোয়ারের সঙ্গে শান্তার এক বাড়িতে থাকা ঠিক নয়। একই সঙ্গে শাহ আলমের সিএনজিচালিত অটোরিকশার টাকা দিয়ে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলার পক্ষে ছিলেন তাঁরা। ১৭ অক্টোবর পরের বৈঠকের তারিখ ছিল। তবে শান্তার পরিবার আর বসতে রাজি হয়নি।
অভিযুক্ত এসআই আনোয়ার হোসেন অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করে গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, গুলিবিদ্ধ শাহ আলম একজন পেশাদার অপরাধী। ঢাকার বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ছিনতাই-ডাকাতিসহ অনেক মামলা রয়েছে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় একটি গাড়ি ছিনতাইয়ের সময় সিসি ক্যামেরায় ধারণ হওয়া তাঁর ভিডিও ফুটেজও পুলিশের হাতে রয়েছে। তিনি বলেন, রোববার রাতে পুলিশ খবর পায় যে তালতলা এলাকায় একটি অপরাধী দল সংগঠিত হচ্ছে। খবর পেয়ে পুলিশ অতিরিক্ত জনবল নিয়ে সেখানে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। পুলিশ দেখে সন্ত্রাসীরা দূর থেকেই পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে শাহ আলম গুলিবিদ্ধ হন। তাঁর হাত থেকে গুলিভর্তি একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, রোববার রাত দেড়টার দিকে তাঁকে ফোন করে জানানো হয় যে একজন সন্ত্রাসী অস্ত্রসহ ধরা পড়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে ওই সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়। তখন তিনি (উপকমিশনার) বিধি মোতাবেক মামলা করে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বলেন। সোমবার সন্ধ্যায় তাঁকে একজন ফোন করে বলেন, এটি নিছক সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের ঘটনা নয়। এর পেছনে ব্যক্তিগত শত্রুতাও থাকতে পারে। এরপর তেজগাঁও বিভাগের একজন অতিরিক্ত উপকমিশনার ও একজন সহকারী কমিশনারকে ঘটনা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

প্যারালাইজড থেকে সুস্থ হওয়ার পর যেন চাঁদের মাটিতে হাঁটছেন

বৈপ্লবিক অপারেশনের পর সুস্থ হয়ে উঠেছেন এক প্যারালাইজড রোগী। পোল্যান্ডের ড্যারেক ফিডেকো নামের এই রোগী এখন হাঁটতে পারছেন। এ সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসার সাথে জড়িত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেও রেইসম্যান। সংবাদ হিন্দুস্তান টাইমসের।
রেইসম্যান বলেন, ফিডেকো এখন হাঁটতে পারছে। বিষয়টা বৈপ্লবিক। তার হাঁটাচলা দেখে আমার কাছে চাঁদে হেঁটে বেড়ানোর মতো আনন্দ হচ্ছে। এখন সময় এসেছে প্যারালাইসিসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর।
২০১০ সাল থেকে পোল্যান্ডের বাসিন্দা ড্যারেক ফিডেকোর বুকের নিচ থেকে পুরো শরীর অবশ হয়ে যায়। সম্প্রতি অপারেশন করে তার নাকের অংশ থেকে নার্ভ স্থানান্তর করে মেরুদণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। মঙ্গলবার একটি জার্নালে এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

রোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জন কনসালটেন্ট ট্যাবাকোর নেতৃত্বে একটি দল জটিল এ অপারেশনটি করেন।  এতে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী নেইসম্যানের নেতৃত্বে গবেষক দলের অংশগ্রহণও ছিলো। অপারেশনের পর পোল্যান্ডের একটি নিউরো রিহ্যাবিলিটি সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ফিডেকো।
প্যারালাইসিসের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় বৈপ্লবিক সাফল্যে লন্ডনের বিজ্ঞানী রেইসম্যান উচ্ছাস প্রকাশ করলেও, তার সহযোগিরা পরবর্তী চিকিৎসার জন্য যথেস্ট সাবধানতা অবলম্বন করছেন। তারা সম্পূর্ণ চিকিৎসাটা ভালোয় ভালোয় শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছেন।

আমি ক্লিনটনের প্রেমে পড়েছিলাম

হোয়াইট হাউসের সাবেক শিক্ষানবিস কর্মী মনিকা লিউনস্কি বলেছেন, ‘আমি সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রেমে পড়েছিলাম। ২২ বছর বয়সে আমি আমার বসের প্রেমে পড়েছিলাম। কিন্তু আমার বস তো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।’ তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে আমাদের প্রেমের শুরু, যা প্রায় দুই বছর স্থায়ী হয়েছিল। সে সময় এটাই ছিল আমার সবকিছু। কিন্তু সেই নোংরা বিষয়টা ফাঁস হয়ে গিয়েছিল এবং জনগণ প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠেছিল। ঘটনার ১৩ বছর পর প্রথম প্রকাশ্যে মুখ খুলে মনিকা তার লজ্জা, হতাশা ও আত্মঘাতী হওয়ার চিন্তার কথা শ্রোতাদের কাছে অকপটে তুলে ধরেন। ফিলাডেলফিয়ায় এক ফোরামে আবেগঘন বক্তৃতাকালে তিনি আরও বলেন, আমিই প্রথম ব্যক্তি ইন্টারনেট টানাহেঁচড়ায় যার খ্যাতিকে ধ্বংস করা হয়েছে। ওই খবর ফাঁসের পর ইন্টারনেটের মাধ্যমে যেসব সংবাদ ও গালগল্প প্রচারিত হয় সেগুলোর কারণে ওই সময় আমি আত্মহত্যার কথা ভেবেছি। তিনি বলেন, কম্পিউটারের পর্দায় লেখাগুলো দেখে ‘ও ঈশ্বর’ বলে চিৎকার করতাম। তখন কেবল ভাবতাম ‘আমি মরতে চাই’।
সোমবার সন্ধ্যায় আয়োজিত ফোর্বস থার্টি আন্ডার থার্টি সম্মেলনে ৪১ বছর বয়সী মনিকা জানান, সে কারণে সাইবার নিপীড়নের শিকার যারা তাদের রক্ষায় তিনি এগিয়ে আসতে চান। তিনি বলেন, এখন থেকে যারা এ ধরনের সাইবার নিপীড়নের শিকার হবেন তাদের পাশে দাঁড়াবেন তিনি। মনিকা লিউনস্কি আরও বলেন, ইন্টারনেট যুগের একেবারে প্রথম দিক হলেও তিনি তীব্রভাবেই সাইবার পীড়নের শিকার হয়েছেন। ক্লিনটনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা নিয়ে ঘরে ঘরে তাকে নিয়ে হাসি তামাশা চলতো। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ইন্টারনেট আরও দুর্নিবার। তাই নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি অন্যদের এ ধরনের পরিস্থিতি অতিক্রমে সাহায্য করবেন। ক্লিনটনের সঙ্গে মনিকার সম্পর্কের খবর ১৯৯৮ সালে ড্রুর্জ রিপোর্টে প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে এটি বিশ্বের সব সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠে। ওই বছর ক্লিনটন প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেও সিনেটে রেহাই পেয়ে যান। কিন্তু মনিকা লিউনস্কি কেলেংকারির অন্ধকার ঘূর্ণিতে তলিয়ে যান। বর্তমানে ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিন অনিয়মিত কলাম লিখছেন মনিকা।

হংকংয়ে ছাত্রনেতা সরকার বৈঠক শুরু

তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা বিক্ষোভের পর অবশেষে বিক্ষুব্ধ ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন হংকংয়ের উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তারা বৈঠকে বসেন। বৈঠকটি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। হংকংয়ে ২০১৭ সালের প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে।
গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভকারী তথা হংকংয়ের বেশিরভাগ মানুষই চাচ্ছেন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রশাসক নির্বাচিত করতে। তবে, চীনের কেন্দ্রীয় সরকার চায়, ভোটাভুটি গণতান্ত্রিকভাবেই হবে, কিন্তু যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন তাদের বেইজিংয়ের অনুমোদনপ্রাপ্ত হতে হবে। অর্থাৎ যেসব ব্যক্তি বেইজিংয়ের আস্থাভাজন কেবল তারাই নির্বাচন করতে পারবেন। তার মানে যে-ই নির্বাচিত হোক না কেন বেইজিংয়ের কোনো মাথাব্যথা থাকছে না। আর এটা নিয়েই বিপত্তি। হংকংয়ের অধিবাসীরা বেইজিংয়ের এই আধিপত্যশীল নীতিকে মেনে নিতে পারছে না। এদিকে, চীন বলেছে হংকংকে অনেক ছাড় দেয়া হয়েছে।

সিরিয়ায় অস্ত্র ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র

সিরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহর কোবানিতে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত কুর্দি যোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও চিকিৎসাসামগ্রী ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমান। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, ইরাকের কুর্দি কর্তৃপক্ষের সরবরাহকৃত সহায়তা সামগ্রীগুলো মার্কিন বিমান থেকে কোবানিতে কুর্দি যোদ্ধাদের জন্য ফেলা হয়েছে। কোবানিতে কুর্দি যোদ্ধাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হারকিউলিস সি-১৩০ পরিবহন বিমান থেকে ফেলা সহায়তা সামগ্রীগুলো সরবরাহ করেছে ইরাকের কুর্দি কর্তৃপক্ষ। শহরটি দখল হয়ে যাওয়া ঠেকাতে আইএসের বিরুদ্ধে কুর্দি যোদ্ধাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে এই সহায়তা সামগ্রী ফেলা হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তুরস্কের সীমান্তবর্তী শহরটিতে কুর্দি যোদ্ধাদের জন্য বিমান থেকে একাধিকবার ওই সহায়তা সামগ্রী ফেলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে তুরস্ক ক্ষুব্ধ হতে পারে।
কারণ দেশটি কয়েক দশক ধরে উগ্রবাদী কুর্দি গোষ্ঠী পিকেকের সন্ত্রাসী তৎপরতা মোকাবেলা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ড বলেছে, মার্কিন বাহিনী কোবানিতে আইএসের বিরুদ্ধে ১৩৫ বারেরও বেশি হামলা করেছে। কোবানি শহরে কয়েক সপ্তাহ ধরে কুর্দি যোদ্ধাদের সঙ্গে আইএস জঙ্গিদের লড়াই চলছে। শহরটি দখল করতে পারলে সীমান্তের বিস্তৃত অঞ্চলে আইএসের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। কোবানি শহর দখল হওয়া ঠেকাতে কুর্দি বাহিনী প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং আইএস যোদ্ধারাও কুর্দি বাহিনীর ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে। ওয়াশিংটনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেছেন। তিনটি বিমান থেকে ২৭ বান্ডিল সহায়তা সামগ্রী ফেলা হয়েছে। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান বলেছেন, কুর্দি যোদ্ধাদের আমেরিকার যে কোন ধরনের অস্ত্র গ্রহণ মেনে নেবে না তুরস্ক। কোবানিতে কুর্দি যোদ্ধাদের সহায়তার আহ্বানে আপত্তি জানিয়ে তুরস্ক বলেছে, কুর্দি জঙ্গি সংগঠন পিকেকের মতো কুর্দি যোদ্ধারাও সন্ত্রাসী। এএফপি।
ইরাকি কুর্দিদের সাহায্য করবে তুরস্ক
সিরিয়ার কুর্দি অধ্যুষিত কোবানি শহরে ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়তে ইরাকি কুর্দিদের সাহায্য করার ঘোষণা দিয়েছে তুরস্ক। এজন্য তারা নিজেদের সীমান্ত ব্যবহার করতে দেবে। ফলে ইরাকি কুর্দিরা তুরস্কের সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সিরিয়ান কুর্দিশ বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে পারবে। আলজাজিরা ও বিবিসি অনলাইনের খবরে এ তথ্য জানা গেছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলাট কাভুসোগল সোমবার আঙ্কারায় সাংবাদিকদের জানান, আমরা ইরাক কুর্দিশ পেশর্মাগা বাহিনীকে কোবানিতে যাওয়ার জন্য সাহায্য করব। এ বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেও তিনি জানান। কোবানিতে আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কুর্দিশ যোদ্ধাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্লেন থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সহায়তা সামগ্রী ফেলার পর এমন সিদ্ধান্তের কথা জানাল তুরস্ক।

বিভক্ত থাকলে আমরা কখনোই মহান জাতি হতে পারব না

ইন্দেনেশিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন জোকো উইদোদো। তিনি জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন। রাজনৈতিক ও সামরিক এলিট শ্রেণীর বাইরের লোক হিসেবে এই প্রথম জাকার্তার সাবেক গভর্নর উইদোদো দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। রাজধানী জাকার্তার পার্লামেন্টে সোমবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৫৩ বছর বয়সী উইদোদো শপথ নেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট তার শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
শপথ গ্রহণের পর দেশবাসীর উদ্দেশে উইদোদো বলেন, আমাদের মহান জাতি হতে হলে হাতে হাত মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বিভক্ত হয়ে থাকলে আমরা কখনোই মহান জাতি হতে পারব না। তিনি বলেন, এক যোগে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এটি আমাদের কাছে এক ঐতিহাসিক মূহূর্ত। অনুষ্ঠান শেষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জুসুফ কালালাকে সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে করে উইদোদার প্রাসাদে যাওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য ইভেন্ট উপলক্ষে রাজধানীতে ২৪ হাজার পুলিশ ও সামরিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রাবোবো সুবিয়ান্তো গত সপ্তাহে নতুন নেতাকে শর্তসাপেক্ষে সমর্থনের আশ্বাস দেন। বিশ্লেষকরা একে ইতিবাচক আভাস হিসেবে বিবেচনা করছেন। তবে নতুন প্রেসিডেন্টের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ইন্দোনেশিয়ার ২০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি ভর্তুকি বিল।

ত্রিমাত্রিক ভারসাম্য প্রয়োজন by মে. জে. (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক

ঘটনা মানুষের জন্য অপো করে না; ঘটনা ঘটে যায় মানুষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। অর্থাৎ ঘটনা হলো ক্রিয়া, তারপরে মানুষ যা করে সেটা হলো প্রতিক্রিয়া। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সুযোগ্য কন্যা শারমিন আহমদ, অথবা মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের প্রধান সেনাপতি বা কমান্ডার ইন চিফ তৎকালীন কর্নেল এম এ জি ওসমানীর সরাসরি অধীনে ‘ডেপুটি চিফ অব স্টাফ’ হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী, তৎকালীন গ্র“প ক্যাপটেন এ কে খন্দকারÑ উভয়ে তাদের বিখ্যাত ঐতিহাসিক বই লেখার ও প্রকাশ করার আগে কারো অনুমতি নিয়েছেন বলে জানা নেই। তিন সপ্তাহ আগে নিউ ইয়র্ক মহানগরীতে, টাঙ্গাইল সমিতির অনুষ্ঠানে যেসব ধর্মবিরোধী-দেশবিরোধী-আওয়ামী লীগ বিরোধী কথাবার্তা বলেছেন তৎকালীন মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সেগুলো বলার আগে তিনি কারো অনুমতি নিয়েছেন বলে জানা নেই। ১৩ অক্টোবর ইন্তেকাল করেছেন অতি সুপরিচিত অধ্যাপক ও জনপ্রিয় টকশো ব্যক্তিত্ব, প্রফেসর পিয়াস করিম। তার লাশ শহীদ মিনারে নিতে দেয়া হয়নি। এই নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে এবং আরো কয়েক দিন হবে বলে মনে হয়। কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছি, পত্রিকার কলাম লেখকদের জন্য, টেলিভিশন টকশোতে আলোচনার জন্য, রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে প্রতিবাদী বক্তব্য দেয়ার জন্য বিষয়ের কোনো অভাব হয় না। বেশির ভাগ আলোচনা তখন অতীতের ঘটনাবলি নিয়ে হয়; কিন্তু শুধু অতীত নিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে না। মানুষকে বাঁচতে হয় অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ, এই তিনকালের সমন্বিত প্রভাবে বা কল্পনায়। যাদের বয়স ৬০ বা ৭০ বা ৭৫ বছর তারা এবং যাদের বয়স ১৮ বা ২০ বা ২৫ বছর, তাদের চিন্তার গতিপ্রকৃতি কোনো দিনই একরকম হতে পারে না। এর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এসব নিয়েই আজকের নাতিদীর্ঘ কলাম।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে, তৎকালীন মোগল সাম্রাজ্যের বর্ধিষ্ণু বাংলা নামক প্রদেশ (আধা স্বাধীন, আধা দিল্লির অধীন) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির করতলগত হয়েছিল। পরবর্তী এক শ’ বছর কলকাতাকে রাজধানী করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত শাসন করেছিল। একটি কথা আরেকবার উল্লেখ করছি। বাংলা প্রদেশের েেত্র নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করে এবং ভারতবর্ষের অন্য কিছু জায়গার েেত্র মোগল সম্রাটের প্রতিনিধিদের পরাজিত করেই তৎকালীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের শাসন মতা অর্জন করতে থাকে। অতি স্বাভাবিকভাবেই নবাব বা বাংলার নবাব বা মোগল সম্রাট যে গোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক ও কর্মকর্তা কর্মচারীরা ওই গোষ্ঠীর প্রতিপ হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ ইংরেজরা হলো মুসলমানদের প্রতিপ। অপর দিকে, মোগল শাসনামলে যারা মতায় ছিল না, প্রজা ছিল, ওই মানুষগুলো ইংরেজদের বন্ধু হয়ে গেল। অতি প্রাচীন একটি নীতি হলো, ‘তোমার শত্র“র শত্র“ তোমার বন্ধু হবে’। অর্থাৎ, ওই আমলে মুসলমানদের শত্র“ ছিল ইংরেজরা। মুসলমানদের শত্র“ না হলেও অবান্ধব সম্পর্কে ছিল শিখ-হিন্দু প্রভৃতি। অতএব শিখ-হিন্দুরা হয়ে উঠেছিলেন ইংরেজদের বন্ধু। যে সময়ের কথা বলছি সেটা হলো ১৮৫৭ সাল থেকে শুরু করে, অতীতের এক শ’ দেড় শ’ বছর।
১৮৫৭ সালে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। কেউ বলেন সিপাহি বিদ্রোহ। কেউ বলেন স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ; কিন্তু এই ঘটনার পর মোগল সাম্রাজ্যের সূর্য চূড়ান্তভাবেই ডুবে যায়। ১৮৫৭ সালের পরে ভারতের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা একটু একটু করে বিকশিত হতে থাকে। মুসলমানদের জন্য শিক্ষাপ্রসারে উদ্যোগ নেয়া হতে থাকে। ১৮৮০-এর দশকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস নামক রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। হিন্দু-মুসলমান-শিখ মোটামুটিভাবে সবাই এই রাজনৈতিক দলটিকে কম হোক বেশি হোক নিজের বা আপন মনে করে নেয়; কিন্তু পরিস্থিতি সবার জন্য অনুকূল থাকেনি। না থাকাতে তৎকালীন ভারতের মুসলমানেরা নিজেদের জন্য আলাদা রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ৩০ নভেম্বর ১৯০৬ সালে এই ঢাকা শহরে, অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ নামে একটি নতুন দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই রাজনৈতিক দলটি ভারতে, ক্রমান্বয়ে, ন্যাশনাল কংগ্রেসের পাশাপাশি সমান্তরাল শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ ঐতিহাসিক লাহোর নগরীতে, মুসলিম লীগের সম্মেলনে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছিল। এটি পাকিস্তান প্রস্তাব নামে পরিচিত। এর সংপ্তি সার হলো, তৎকালীন ভারতবর্ষের পশ্চিমাংশে বা পূর্বাংশে বা অন্যত্র যেসব ভূখণ্ডে জনগণের মধ্যে মুসলমানেরা মেজরিটি, ওইসব এলাকায় একটি করে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এই মুসলমান অধ্যুষিত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলো ছাড়া সমগ্র ভারতবর্ষের বাকি অংশ, তথা অমুসলমান অংশ, আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে। নবাব বা মহারাজা শাসিত রাজ্যগুলো হয় স্বাধীন থাকবে অথবা তাদের ইচ্ছা মোতাবেক কোনো একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে যোগ দেবে। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ সাল, এই সময়টা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য উত্তাল ছিল। ভারতও ব্যস্ত ছিল। তখনকার অনেক ঘটনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হলো, মুসলিম লীগের জ্যেষ্ঠতম নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং অন্য কয়েকজনের বিশেষ আগ্রহে বা পরিকল্পনায় লাহোর প্রস্তাবটি সংশোধিত হয়ে যায়। মুসলিম অধ্যুষিত একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিবর্তে সমগ্র ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মেজরিটি এলাকাগুলো নিয়ে একটি মাত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের পে প্রস্তাব সংশোধিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট তারিখে পাকিস্তান নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ১৫ আগস্ট তারিখ থেকে ভারত নামক স্বাধীন রাষ্ট্র জন্ম নেয়। ভারত নামক রাষ্ট্র, পাকিস্তানের সৃষ্টিতে খুশি হয়নি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক মানুষও ওই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হয়নি। তারা চিন্তা করেছিল ‘এখন কী করণীয়’? এর উত্তর ছিল, ‘ধৈর্য ধরো, ধীরে ধীরে আগাও’। এখন ২০১৪ সালে এত বছর পরে ১৯৪৭-এর আগে চল্লিশের দশকের কথা বা ত্রিশের দশকের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা এবং মূল্যায়ন করা অতি কঠিন কাজ এবং অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয়, আবার অনেকের কাছে প্রয়োজনীয়। যা হোক, ১৯৪৭-এর আগস্টে স্বাধীনতা পাওয়া পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের দু’টি প্রদেশ ছিল। একটি পশ্চিম পাকিস্তান, আরেকটি পূর্ব পাকিস্তান। এই দুই প্রদেশের জনগণের মধ্যে যেসব বন্ধন ছিল সেগুলো বেশির ভাগই ছিল দুর্বল বা ঠুনকো। সবচেয়ে বড় বন্ধন ছিল ধর্মীয় বিশ্বাস। অর্থাৎ ধর্মীয় পরিচয়ে পাকিস্তানের মেজরিটি জনগণ ছিলেন মুসলমান।
পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে, শাসক গোষ্ঠীর অন্যায় ও অত্যাচারের কারণে ক্রমান্বয়ে, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগণ তাদের ওপর সৃষ্ট বঞ্চনা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে থাকে। প্রতীকী অর্থেই বলতে পারি যে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকেই শুরু। বাঙালিদের মধ্যে অনেকেই চিন্তা করছিলেন যে, আমাদের স্বাধীন হওয়া উচিত। আবার অনেকেই চিন্তা করছিলেন, স্বাধীন না হয়ে একই পাকিস্তানের ভেতরে আরো মতাশীল হওয়া উচিত। একটি ক্ষুদ্র অংশের মনে এমন চিন্তা হচ্ছিল যে, আমরা পাকিস্তানেও থাকা উচিত না, স্বাধীনও হওয়া উচিত না, বরং আমরা ঐতিহাসিক বঙ্গ প্রদেশের অবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং বৃহত্তর ভারতের অঙ্গীভূত হওয়া উচিত।
সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পে ও বিপে গণভোটের ফলাফল সবাই জানে। এখন থেকে পঞ্চাশ বছর বা ষাট বছর আগে ফিরে যাই। দেশে দেশে মানুষ স্বাধীনতা যেমন চেয়েছে, তার বিকল্পও চিন্তা করেছে। স্কটল্যান্ডের কথা একটু আগেই বললাম। কানাডার বিখ্যাত প্রদেশ কিউবেক বা কুইবেক। এই প্রদেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য একাধিকবার রেফারেন্ডাম বা গণভোটের সুযোগ পেয়েছে। কুইবেকের জনগণ স্বাধীনতার পে যায়নি, তারা কানাডার সাথেই থাকতে চেয়েছে। নাইজেরিয়া হচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকার তেলসমৃদ্ধ একটি বিখ্যাত দেশ। মুসলমান ও খ্রিষ্টান এখানে প্রধান জনগোষ্ঠী। ১৯৭০ সালের দিকে নাইজেরিয়ার পূর্বাংশের একটি প্রদেশ, যার নাম বায়াফ্রা, স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। নাইজেরিয়া সরকার সেই ঘোষণাকে মেনে নেয়নি এবং ওই বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন করার জন্য সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় তিন বছর যুদ্ধ চলে। এতে বিদ্রোহী বা একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণাকারী, বায়াফ্রার বাহিনী পরাজিত হয়। ইন্দোনেশিয়া নামক মুসলমানপ্রধান দেশে বড় ছোট হাজারের অধিক দ্বীপ আছে। ইন্দোনেশিয়ার দূর পূর্বাংশে অবস্থিত একটি দ্বীপের নাম তিমুর যার একটি অংশ খ্রিষ্টান অধ্যুষিত। এই অংশ ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য প্রায় ৯ বছর যুদ্ধ করে। অতঃপর তারা স্বাধীন হয়। তাদের স্বাধীনতায় জাতিসঙ্ঘ এবং প্রতিবেশী দেশ অস্ট্রেলিয়া সহায়তা করেছে। এখন থেকে প্রায় ৩৪-৩৫ বছর আগে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের জনগণের একটি অংশ, ভারত থেকে স্বাধীন হয়ে নতুন একটি রাষ্ট্র (নাম : খালিস্তান) প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিল। তাদের এ সংগ্রাম ও আন্দোলনে আধ্যাত্মিক ও গোপন রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল অমৃতসর শহরের স্বর্ণমন্দির। একপর্যায়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে স্বর্ণমন্দিরের অভ্যন্তরের স্বাধীনতাকামী বা বিদ্রোহী বা রাষ্ট্রদ্রোহীদের দমন করে। বর্তমান ভারতের উত্তর পশ্চিম অংশে একটি প্রদেশের নাম জম্মু কাশ্মির। সেখানকার জনগণের একটি অংশ ৫০-৬০ বছর ধরে সংগ্রাম করছে ভারত থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য। কোনো সময় সংগ্রাম তীব্র হয় কোনো সময় সংগ্রাম ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত স্বাধীন হয় তখন বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরপূর্বে ভারতীয় ভূখণ্ডে, মাত্র একটি প্রদেশ ও দু’টি মহারাজা শাসিত রাজ্য ছিল। পুরো এলাকাটি ছিল একটি প্রদেশ যার নাম ছিল আসাম এবং মহারাজা শাসিত রাজ্যগুলোর নাম ছিল ত্রিপুরা ও মনিপুর। এখন বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব দিকে, ভারতের সাতটি রাজ্য বা প্রদেশ আছে। ১৯৫২ সালে প্রথম নাগাল্যান্ড (তখনো প্রদেশ হয়নি) স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের ঢেউ লেগে অনেক জায়গায় সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হয়। ভারত সরকার তাদেরকে স্বাধীনতা না দিয়ে দেশের মর্যাদা দেয়। এখনও উত্তর-পূর্ব ভারতে আসাম বা নাগাল্যান্ড ইত্যাদি অঞ্চলে ভারত থেকে স্বাধীনতা চায় এমন মানুষ একদম নেই বললে ভুল হবে। তবে আন্দোলন এখন ম্রিয়মাণ।
বাংলাদেশের সর্বদণি পূর্বে অবস্থিত রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানÑ এই তিনটি জেলাকে সম্মিলিতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বলা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের একটি অংশ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে চায়নি। তারা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে চেয়েছিল। এই পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের একটি অংশ তথা সর্ববৃহৎ উপজাতি ‘চাকমা’দের বৃহদাংশ ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি বরং পাকিস্তানের সাফল্যই কামনা করেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত প্রকাশ্যে ঘোষিতভাবে সেই পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রবিরোধী ও সরকারবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহ পরিচালিত হয়েছে। বিদ্রোহ পরিচালনাকারী দলের গোপন দলের নাম ছিল ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ এবং তাদের সশস্ত্র অংশের নাম ছিল ‘শান্তিবাহিনী’। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্রোহীরা প্রকাশ্যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেনি সত্য; কিন্তু অপ্রকাশ্যে তারা স্বাধীনতার জন্যও যুদ্ধ করছিল। দীর্ঘ দিন গুরুত্বপূর্ণ পদে পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকরি করার সুবাদে, এ মন্তব্য করছি। মওলা ব্রাদার্স কর্তৃক প্রকাশিত, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ-পরিস্থিতির মূল্যায়ন’ নামে আমার লেখা ৩৮৫ পৃষ্ঠার বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে এ বিষয়ে। এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র আন্দোলন, কৌশলগতভাবে ম্রিয়মাণ; কিন্তু ভিন্ন আঙ্গিকে পরিচালিত হচ্ছে।
সামরিক ইতিহাসের একজন ছাত্র এবং অধুনা সমকালীন রাজনীতির একজন ছাত্র হওয়ার সুবাদে আমার মূল্যায়ন হলো, যেখানেই স্বাধীনতা এসেছে বা স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়েছে, সেখানেই কিছু কাজ অপ্রকাশ্যে হয়েছে, কিছু কাজ প্রকাশ্যে হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক ও বাস্তব। যেখানেই কোনো না কোনো জনগোষ্ঠী তাদের জন্য স্বাধীনতা চেয়েছে, সেখানেই প্রতিবেশী জনগোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে বা অনানুষ্ঠানিকভাবে হয় সাহায্য-সহযোগিতা করেছে অথবা অসহযোগিতা করেছে। কোনো একটি জনগোষ্ঠী বা কোনো একটি দেশ তার প্রতিবেশী একটি জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতা কামনায় বা স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা করবে, নাকি অসহযোগিতা করবে, এর পেছনে অনেক কারণ থাকে। যেটা করলে তার লাভ, সেটাই করা হয়। যেমন স্কটল্যান্ড যেন স্বাধীন না হয়, তার জন্য ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বেশির ভাগ দেশই আধা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় প্রকাশ্যেই, পরোভাবে, স্কটল্যান্ডবাসীর স্বাধীনতার পরে অংশকে নিরুৎসাহিত করেছে। যখন ষাটের দশক পুরা এবং সত্তরের দশকের শুরুর দিকে, উত্তর ভিয়েতনামভিত্তিক ভিয়েতকং বাহিনী, আমেরিকা-বান্ধব দণি ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, একটি কমিউনিস্ট ভিয়েতনাম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করছিল, তখন ভিয়েতনামের উত্তরের বৃহৎ প্রতিবেশী চীন তাদেরকে প্রভূত সাহায্য করেছিল। একপর্যায়ে দণি ভিয়েতনাম মার্কিন প্রভাবমুক্ত এবং একক ভিয়েতনামে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পরের পনেরো-বিশ বছর যেকোনো কারণেই হোক না কেন, চীন ও ভিয়েতনামের সম্পর্কে অবনতি আসে। অপরপে ৯ বছর গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া মাত্রই পূর্ব তিমুর নামক রাষ্ট্রটি তাদের সাবেক শাসক ইন্দোনেশিয়ার সাথে বন্ধুত্ব গভীর থেকে গভীরতর করেছে। যা হোক ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাই।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ স্বাধীনতা চাচ্ছিলেন এবং এ জন্য গোপন প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন। তারা কৌশলী পদপে নিচ্ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত সেই প্রস্তুতিতে গোপনে বা আধা প্রকাশ্যে সাহায্য করছিল। অপর ভাষায়, আমাদের স্বাধীনতাকামীরা সহযোগিতা নিচ্ছিলেন ও পাচ্ছিলেন। এর বিস্তারিত বিবরণ কোনো দিনই প্রকাশিত হয়নি। না হওয়ারই কথা। এখন ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হচ্ছে ইচ্ছায় হোক বা ঘটনাক্রমে হোক। এই কলামের প্রথম অনুচ্ছেদে দু’টি বইয়ের উল্লেখ করেছি, যেই দু’টি বইয়ে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও তার পূর্ব-প্রস্তুতি নিয়ে আলোচিত হয়েছে। এই দু’টি বই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মুহূর্তে অনেক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আলোচনার বিষয়বস্তু, ১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য, তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতারা বা আওয়ামীপন্থী রাজনীতিবিদেরা কী কী পদপে নিয়েছিলেন; বিশেষ করে ভারতের সাথে সহযোগিতার ত্রে কিভাবে বিস্তৃত করা হচ্ছিল; কিন্তু ওই আমলের সরকারি গোয়েন্দা বা ওই আমলের স্বাধীনতাকামীদের প্রতিপ রাজনৈতিক শক্তি, ওই রূপ ভারতীয় সাহায্য-সহযোগিতা এবং ভারতীয় উৎসাহের কথা জানত। এখন ২০১৪ সালে, পেছনের দিকে তাকিয়ে আমরা কেউ কেউ প্রশ্ন করছি এবং কেউ কেউ উত্তর দিচ্ছি যে, ওই রূপ ভারতীয় সাহায্য-সহযোগিতার পরিমাণ বা ব্যাপ্তি কতটুকু ছিল? যেকোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি চূড়ান্ত ল্য ও রোডম্যাপ থাকে। যদি রাজনৈতিক আন্দোলনের ল্য হয় স্বাধীনতা, তাহলে তার চূড়ান্ত ধাপের প্রস্তুতি ও কর্ম কী হবে বা কী হতে পারে সেটা অনেক দিন পর্যন্ত অনিশ্চিত থাকে। অনিশ্চিত শব্দটি অপছন্দ হলে আমরা অপ্রকাশিত বলতে পারি। আমাদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ষাটের দশকের শেষে, সত্তরের দশকের শুরুতে রাজনৈতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হয়েছিল সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ। নিরস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন এবং সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধ, এই দু’টির মধ্যে সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য; কিন্তু দুয়ের পরিচয় আলাদা। বাংলাদেশের েেত্র সশস্ত্র যুদ্ধ হয়েছিল প্রকাশ্যে, পৃথিবীকে সাী রেখে। বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী ছিল প্রতিবেশী ভারত। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ভারত কি সব কিছু নিঃস্বার্থভাবে, নির্মোহভাবে, প্রতিদানের আশা না করেই সাহায্য করেছিল? নাকি প্রকাশিত বা অপ্রকাশিত শর্তে, স্বার্থ উদ্ধারের ল্েয এবং প্রতিদান পাওয়ার পরিকল্পনায় এই সাহায্য করেছিল? নাকি কিছুটা স্বার্থ কিছুটা নিঃস্বার্থভাবে করেছিল? এসব প্রশ্নের আলোচনা আমাদের করা প্রয়োজন।
তবে ‘আমাদের’ বলতে কাকে বোঝাই, এটি একটি কঠিন প্রশ্ন। আমার বয়স ৬৫ শেষ হয়ে ৬৬ মাত্র শুরু হলো। আমি ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা। যারা আজকে তরুণ, যাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রকৃতির ওপর, তারা ইতিহাসের জন্য কতটুকু সময় দেবে? এর থেকেও বড় প্রশ্ন, কতটুকু সময় আমরাই বা তাদের কাছে চাইতে পারি ইতিহাস শোনার জন্য? কথাগুলো এ জন্য বললাম যে, মাঝে মধ্যেই বাংলাদেশের বড় বড় পত্রিকার কলাম লেখার জায়গাগুলো এবং টেলিভিশন টকশোর বিষয়বস্তু এই প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে থাকে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎÑ এই তিনটির মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রয়োজন। ব্যবসায়িক উন্নয়ন, রাজনৈতিক উন্নয়ন ও সামরিক উন্নয়নÑ এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন। অতীতের বন্ধু, বর্তমানের বন্ধু ও ভবিষ্যতের বন্ধু, এই তিনটির মধ্যেও ভারসাম্য প্রয়োজন। অর্থাৎ ত্রিমাত্রিক ভারসাম্য প্রয়োজন।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com