Sunday, September 20, 2026
অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্তকে নিয়ে ভুক্তভোগীর ক্ষোভ: ‘চোর তুহিন থেকে খুনি তুহিন’ by এম হাসান
তার অভিযোগ, রাজনৈতিক দলের এক প্রভাবশালী নেতার হাত থাকায় অতীতে একাধিক অভিযোগ সত্ত্বেও পুলিশ তুহিনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
শনিবার ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আসাদ উল্লাহ সোহাগ জানান, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি তুহিনের প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। তাকে একই কৌশলে ডেকে নিয়ে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি হাতিয়ে নেয় তুহিন।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে আসাদ উল্লাহ সোহাগ তার পোস্টে লেখেন, সেদিন আমাকে কৌশলে ডেকে এনে আমার বাইকটি নিয়ে যায় তুহিন। এ ঘটনায় মামলা করতে যখন আমি কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় যাই, তখন পুলিশ মামলা না নিয়ে কেবল একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) গ্রহণ করেছিল।
তিনি পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে লেখেন, তুহিনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে থানা পুলিশ আমাদের জানিয়েছিল, তার মাথার ওপর একটি রাজনৈতিক দলের বড় নেতার হাত রয়েছে। তাই তাকে যেন কিছু না করা হয়—এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছিল। সেদিন আমি চুপ ছিলাম, কিন্তু আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি—দেশের পুলিশের শুধু পোশাকই পরিবর্তন হয়েছে, চরিত্র বদলায়নি! অর্থ ছাড়া এই দেশে সহজ বিচারে সুবিচার পাওয়া যায় না।
মোটরসাইকেল খোয়ানোর চেয়ে সামাজিক অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়াকে দায়ী করে তিনি আরও লেখেন, আমার বাইকটি চুরির বিষয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু ছোট ছোট অপরাধের সঠিক বিচার না হলে অপরাধীরা পরবর্তী সময়ে কত বড় ও ভয়ানক অপরাধ ঘটানোর সাহস পায়, তা আজকের এই ঘটনা প্রমাণ করে। সেদিন যেসব নেতা ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে তাকে আইন ও বিচার থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, আজকে তারা তাকে কীভাবে বাঁচাবেন?
উল্লেখ্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত তিনজনকে আটক করেছে। আটককৃতদের মধ্যে এই তুহিন অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

Friday, September 18, 2026
মদ খাওয়ার টাকা দাবি, না দেওয়ায় উত্তরপ্রদেশে মুসলিম ব্যবসায়ীকে মারধর
ভিডিওতে আফশার আলী নামের ওই ব্যবসায়ীকে মোটরসাইকেল থেকে ফেলে দিয়ে এক ব্যক্তি বারবার মারধর করছেন। একপর্যায়ে হামলাকারী তাকে ক্ষমা চাইতে বলেন । আলী ক্ষমা চাওয়ার পরও তাকে চড় ও ঘুষি মারতে থাকেন ওই ব্যক্তি। এ সময় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী হামলা থামানোর চেষ্টা করেন।
আফশার আলীর জানান, শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার পথে কারারি থানার জামদুয়া এলাকার কাছে তার ওপর হামলা হয়। হামলার আগে মূল অভিযুক্ত তার কাছে মদ খাওয়ার জন্য টাকা দাবি করেন। তাকে বলা হয়, ‘তুমি এত আয় করো, আমাদের একটু মদও খাওয়াতে পারো না?’ এরপরই তাকে মারধর শুরু করা হয়।
আলী জানান, পরে আরো কয়েকজন ওই হামলায় যোগ দেন। তারা তাকে বেধড়ক মারধর করার পাশাপাশি তার কাছে থাকা ৪ হাজার ৫০০ রুপি নিয়ে পালিয়ে যান।
ঘটনার পর কারারি থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আলী। পরে তিনি কৌশাম্বির পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করে ঘটনার বিচার ও হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর কৌশাম্বি পুলিশ জানিয়েছে, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে এবং এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সূত্র: মুসলিম মিরর
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Saturday, August 29, 2026
রাজধানীতে সকালে ব্যাগ ধরে টান ছিনতাইকারীর, রিকশা থেকে পড়ে শিক্ষিকার মৃত্যু
নিহত ওই শিক্ষিকার নাম মোসা. রনজিনা পারভীন। তিনি বগুড়ার বাগবাড়ি বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। জানা যায়, রাতে বগুড়া থেকে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় ইসলামিয়া চক্ষু হাসাপাতালে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলেন রনজিনা পারভীন। ভোরে গাবতলী বাস টার্মিনাল নামেন তিনি। এরপর রিকশায় করে হাসপাতালে আসছিলেন। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় পৌঁছামাত্রই পেছন থেকে মোটরসাইকেলে করে এসে ছিনতাইকারী তার ব্যাগ ধরে টান দেয়। এ সময় পড়ে গিয়ে তার মাথা ফেটে যায়। পরে সেখান থেকে উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, ‘আমরা মোটরসাইকেল ও জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ করছি।’
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
Wednesday, July 22, 2026
‘যুদ্ধাপরাধীদের ঠাঁই নেই,’ ম্যানিলায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিওকে ঘিরে তোপ
মানবাধিকার কর্মী ক্রিস্টিনা পালাবে বিক্ষোভের বিষয়ে বলেন, বিশেষ করে ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান যুদ্ধাপরাধীতে পরিণত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, মার্কিন সরকার ফিলিস্তিন, ইরান, ফিলিপাইনসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষকে বোমা মেরে হত্যা করার জন্য পরিচিত, যেখানে তাদের স্থায়ী উপস্থিতি রয়েছে এবং সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে যাচ্ছে। আরেক বিক্ষোভকারী মং পালাতিনো ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের সরকারকে রুবির সাথে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার এই সফরের ফলে ফিলিপাইনে আরও বেশি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপিত হবে এবং দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ আরও বেশি লুটপাটের শিকার হবে। তাই মার্কিন সরকারের সাথে হাত মেলানোর জন্য তারা মার্কোস সরকারের তীব্র নিন্দা জানাতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের বার্ষিক এই সম্মেলনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ছাড়াও চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য অংশীদার দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা নিয়েই সম্মেলনজুড়ে প্রধান আলোচনা চলছে। এ প্রেক্ষাপটেই ফিলিপাইনের সাধারণ নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে ম্যানিলার রাজপথে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

Thursday, May 28, 2026
কিশোরদের যৌন সম্পর্ক কি অপরাধ, কী চাচ্ছেন ভারতের শিশু অধিকারকর্মীরা
জয়সিং যুক্তি দেন, পারস্পরিক সম্মতিতে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক শোষণমূলক নয় কিংবা নিপীড়নমূলকও নয়। এ ধরনের সম্পর্ককে ফৌজদারি অপরাধের আওতার বাইরে রাখতে আদালতের প্রতি অনুরোধ করেন তিনি।
আদালতে জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক নথিতে জয়সিং বলেন, আইনের মাধ্যমে যৌন সম্পর্কের বয়সসীমা নির্ধারণের উদ্দেশ্য হলো নিপীড়ন রোধ করা, ওই সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা নয়।
তবে কেন্দ্রীয় সরকার জয়সিংয়ের এই দাবির বিরোধিতা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের কম বয়সীদের যৌন সম্পর্কের বৈধতা দিলে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। এতে তারা নিপীড়ন ও শোষণের শিকার হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টে জয়সিংয়ের এই চ্যালেঞ্জের কারণে ভারতে আবারও যৌন সম্পর্কে সম্মতি এবং শিশুদের যৌন সুরক্ষা আইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। শিশুদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভারতের প্রধান আইন পসকো অ্যাক্ট-২০১২।
এ আইন অনুযায়ী, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেও ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীরা যৌন সম্পর্কে জড়ালে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিষয়টি পসকো আইন থেকে বাদ দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে ভারতে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, কিশোর-কিশোরীদের এই আইনের আওতামুক্ত রাখলে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে। অন্যদিকে এই মতের বিরোধীরা বলছেন, এতে মানব পাচার ও বাল্যবিবাহের মতো অপরাধ আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নিপীড়নের শিকার হলে কিশোর-কিশোরীরা কি আদৌ প্রমাণের দায়ভার বহন করতে সক্ষম? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স নির্ধারণ করে দেয় কে। আর এই আইন আদতে কার স্বার্থ রক্ষা করে?
অনেক দেশের মতো ভারতেও যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স নির্ধারণ নিয়ে তর্কবিতর্ক চলছে। যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে এই বয়স ভিন্ন হতে পারে। তবে ভারতজুড়ে একটি নির্দিষ্ট বয়সসীমা বেঁধে দেওয়া আছে।
ইউরোপের অধিকাংশ দেশ কিংবা যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশে যৌন সম্পর্কের বৈধ বয়স ১৬। কিন্তু ভারতে যৌন সম্পর্কের বয়সসীমা এর চেয়ে বেশি।
১৮৬০ সালে যখন ভারতে ফৌজদারি বিধি চালু হয়, তখন যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির ন্যূনতম বয়স ছিল ১০ বছর। ১৯৪০ সালে এই বিধি সংশোধনের মাধ্যমে তা বাড়িয়ে ১৬ বছর করা হয়।
পরে ২০১২ সালে পসকো আইনের মধ্য দিয়ে বড় পরিবর্তন আসে। এতে যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স ১৮ বছরে উন্নীত করা হয়। এক বছর পর ভারতের ফৌজদারি আইন এই পরিবর্তন অনুযায়ী সংশোধিত হয়। ২০২৪ সালে প্রণীত নতুন দণ্ডবিধিতেও এই বয়সসীমা বহাল রাখা হয়েছে।
ভারতে কিশোর-কিশোরীদের সম্মতিমূলক যৌন সম্পর্ক কেন অপরাধ
কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে অনেক শিশু অধিকারকর্মী এবং এমনকি আদালতও যৌন সম্পর্কের বৈধ বয়সসীমার সমালোচনা করেছেন এবং এই বয়সসীমা ১৬ বছরে নামিয়ে আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পসকো আইন কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং প্রায়ই প্রাপ্তবয়স্করা এ ধরনের সম্পর্কে বাধা দিতে এই আইনের অপব্যবহার করেন। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে এটি বেশি ঘটে।
ভারতে এখনো যৌনতা একটি নিষিদ্ধ ও অস্বস্তিকর বিষয়। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোটি কোটি ভারতীয় কিশোর-কিশোরী যৌন সম্পর্কে সক্রিয়।
শিশুদের যৌন নিপীড়ন রোধে কাজ করা সংস্থা ফাউন্ডেশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন-মুসকানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শর্মিলা রাজ বলেন, ‘আমাদের সমাজ জাত, শ্রেণি ও ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত। ফলে সহজেই এ আইনের অপব্যবহার করা যায়।’
২০২২ সালে কর্ণাটক হাইকোর্ট ভারতের আইন সংস্কার সংস্থা ল’ কমিশনকে নির্দেশ দেন, যেন তারা পসকো আইনের আওতায় যৌন সম্পর্কের জন্য সম্মতির বয়স পুনর্বিবেচনা করে। এ ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে বলা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, বহু ক্ষেত্রে ১৬ বছর পেরোনো কিশোরীরা প্রেমে পড়ে পালিয়ে যায় এবং যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু পরে শুধু ছেলেটির বিরুদ্ধে পসকো আইন ও দণ্ডবিধির আওতায় অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়।
পরের বছর ২০২৩ সালে ল’ কমিশনের প্রতিবেদনে বয়সসীমা কমানোর প্রস্তাব নাকচ করা হয়। তবে কমিশন সুপারিশ করেছে, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সে ক্ষেত্রে সাজা দেওয়ার সময় বিচারকদের জন্য ‘নির্দেশিত বিচারিক বিবেচনার’ সুযোগ রাখা উচিত। এর অর্থ হলো বিচারক যাতে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকে সাজা কমাতে বা মওকুফ করতে পারেন।
এটি এখনো কার্যকর না হলেও মামলার তথ্য ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে ইতিমধ্যে ভারতের বিভিন্ন আদালত এই নীতির ভিত্তিতে জামিন, খালাস বা মামলা বাতিলের সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন।
শর্মিলা রাজসহ অনেক শিশু অধিকারকর্মী চান, এই বিধানটি যাতে আইনে পরিণত হয়। শুধু প্রস্তাব আকারে থাকলে আদালত তা উপেক্ষা করতে পারেন।
ইন্দিরা জয়সিং মনে করেন, শুধু বিচারকের বিবেচনা যথেষ্ট নয়। কারণ, অভিযুক্তকে পুলিশের জেরা, আদালতের দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া ও সামাজিক লজ্জার মুখোমুখি হতে হয়। ভারতের বিচারব্যবস্থা এতটাই ধীর যে বহু মানুষ এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই শাস্তি পেয়ে যান।
ইন্দিরা জয়সিং আরও বলেন, প্রতিটি মামলা বিচারকের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া সেরা সমাধান নয়। কারণ, এতে ফলাফল অসম হতে পারে এবং পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কাও থেকে যায়।
ভারতে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পসকো আইনের আওতায় বিশেষ আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই লাখ।
জয়সিংয়ের দাবি, বয়সের ব্যবধান যদি খুব সামান্য হয় এবং উভয়েই সম্পর্কের জন্য সম্মত থাকে, তবে সে যৌন সম্পর্ককে যাতে ধর্ষণ বা শোষণের মতো অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করা হয়।
![]() |
| প্রতীকী ছবি: রয়টার্স |
Friday, May 15, 2026
চিঠিপত্রঃ সাইবার বুলিং থেকে কি নারীদের মুক্তি নেই by সামিয়া জামান
ঘটনা-২: শোভার (কাল্পনিক নাম) নাম ও ছবি ব্যবহার করে কেউ একজন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছে এবং সেই অ্যাকাউন্ট থেকে শোভার আত্মীয়দের বিভিন্ন রকম অশ্লীল ছবি পাঠানো হচ্ছে, শোভার ছবি দিয়ে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অশ্লীল ছবি বানানো হচ্ছে এবং তা ফেসবুকে প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে শোভা ও তার পরিবারকে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
আমরা উপরিউক্ত ঘটনা দুটি সাইবার বুলিংয়ের আওতায় ফেলতে পারি। সাইবার বুলিং হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীর ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খুলে তার ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রচার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি হ্যাক করা, পাসওয়ার্ড চুরি করা, পর্নোগ্রাফির ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে কাউকে বিব্রত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা।
প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে দেখতে পাই, ‘এ বছরের জানুয়ারিতে একটি ছাত্রীর ছবি ও পরিচয় ব্যবহার একটি আইডি খোলা হয় এবং সেই ছাত্রীর ছবি অন্য কারও আপত্তিকর ছবির সঙ্গে সম্পাদনা করে একের পর এক আপলোড করতে থাকে এবং ছাত্রীর আত্মীয়দের আইডিতে ছবিগুলো দেওয়া হয় ও হুমকি দেওয়া হয়।’
এ রকম ঘটনা সমাজে অহরহ ঘটেই চলেছে। আমরা গত দুই বছরে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে (পিসিএসডব্লিউ) আসা অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছবি ও পরিচয় গোপন করে ভুয়া আইডি খুলে ভুক্তভোগীর ছবি, ভিডিও ও তথ্য প্রকাশ করে, এ রকম অভিযোগ এসেছে ৪৩ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি হ্যাক, পাসওয়ার্ড চুরি করে অ্যাকাউন্টের দখল নেওয়া, এ রকম অভিযোগ ১৩ শতাংশ, পূর্বপরিচয় বা সম্পর্কের জের ধরে অন্য কোনোভাবে প্রাপ্ত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশের হুমকি দিয়ে টাকা বা সুবিধা আদায় করার অভিযোগ ১৭ শতাংশ।
মুঠোফোনে কল করে বা খুদে বার্তা পাঠিয়ে হয়রানি ১০ শতাংশ; বিভিন্ন মাধ্যমে অশ্লীল শব্দ, লেখা, ছবি বা ভিডিও হয়রানির অভিযোগ ৯ শতাংশ। এর বাইরে অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে আরও ৮ শতাংশ।
সাইবার বুলিংয়ে সবচেয়ে বেশি হেনস্তার স্বীকার হন নারীরা। ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর পিসিএসডব্লিউ যাত্রা শুরু করে। তখন থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২ বছরে ২১ হাজার ৯৪১ নারী এ সংস্থার কাছে হয়রানির অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৭ হাজার ৮৮৯টি অভিযোগ এসেছে। অর্থাৎ গড়ে মাসে ৭৮৯টি অভিযোগ।
এ ছাড়া ৯৯৯–এর উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানির অভিযোগের গত চার বছরের কল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিন দিন এমন ঘটনা বেড়ে চলেছে। এই জরুরি নম্বরে ২০১৮ সালে ৬৯২টি, ২০১৯ সালে ৭৩৭টি, ২০২০ সালে ৮৯৫টি এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৭১টি কল এসেছিল। ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৯ মাসে এসেছে ১ হাজার ৪৪৪টি কল। অর্থাৎ মাসে গড়ে ১৪১টি অভিযোগ। অর্থাৎ সাইবার বুলিং দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও বেড়ে গেছে।
সাইবার অপরাধ দূর করতে সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে। সাইবার নিরাপত্তা এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত ও বিচারের উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালে প্রণয়ন করা হয় তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, যা ২০১৩ সালে আবার সংশোধন করা হয়েছে। ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি বহন, বিনিময়, মুঠোফোনের মাধ্যমে ব্যবহার করা, বিক্রি প্রভৃতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ২০১৩ সালে সাইবার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণীত হয়।
সাইবার বুলিংয়ের অপরাধীদের যথাযথ শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে ডিজিটাল আইন-২০১৮–তে। ধারা-২৮ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিকস বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করে বা করায়, যাহা ধর্মীয় অনভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৫ বছর কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’
ধারা-২৯ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিকস বিন্যাসে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করে, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৩ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’
ধারা-৩১ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যা আইনশৃঙ্খলতার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৭ (সাত) হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত।’
সাইবার বুলিং সমাজকে একপ্রকার অসুস্থ করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়তই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার। তাই সাইবার বুলিং প্রতিকারে সমাজের প্রত্যেক মানুষের সাইবার আইন মেনে চলা উচিত। সমাজে সাইবার বুলিং সম্পর্কে সচেতন করা উচিত, সমাজে সাইবার বুলিংয়ের ক্ষতিকর দিক ও শাস্তি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত এবং আমাদের সাইবার বুলিং থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। দেশ ও সমাজকে এই মানসিক অসুস্থতা থেকে রক্ষা করা উচিত।
* সামিয়া জামান
- শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
- ই–মেইল: samiyazaman21@gmail.com
Sunday, May 10, 2026
‘বুলিংয়ের শিকার’ হয়ে মাস্টার্স না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন তরুণী, কী ঘটেছিল by নাজনীন আখতার
কথাগুলো বলেছিলেন এক তরুণী (২৬)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ার সময় তিনি কিছু সহপাঠীর মাধ্যমে বুলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।
তরুণী বলেন, তাঁর অভিজ্ঞতা এতটাই ভীতিকর ছিল যে অনার্সের পর তিনি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেননি। এর পরিবর্তে চাকরিতে যোগ দেন। প্রায় এক বছর চাকরি করেন। মাস্টার্স করার জন্য গত মাসে তিনি বিদেশে চলে যান।
দেশে থাকাকালে ভুক্তভোগী তরুণী এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি ‘বুলিংয়ের শিকার’ হওয়ার বিবরণ দিয়েছিলেন। বিদেশে যাওয়ার পর সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর সঙ্গে আবার কথা হয়।
ওই তরুণী বলেন, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, এ নিয়ে লোকজনকে যতটা প্রতিবাদী হতে দেখা যায়, বুলিং-গসিপের মতো মানসিক হয়রানি-পীড়নের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীদের বুলিং-গসিপের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানান ওই তরুণী। তিনি বলেন, মনোবিদের কাছে গিয়ে ছয় থেকে সাতটি কাউন্সেলিং সেশন নিতে হয়েছে তাঁর। তবে তাঁর এই মানসিক হয়রানির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্ব পায়নি।
তরুণী বলেন, ‘এটা (বুলিং) সেখানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। অথচ বুলিদের (হেনস্তাকারী) কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে পারলাম না।’
‘ওদের সঙ্গে আর পড়ব না’
ভুক্তভোগী তরুণী রাজধানীর একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি-এইচএসসি পাস করেন। তাঁর মা–বাবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ২০১৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হন।
তরুণী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি সবার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করতেন। তবে কারও সঙ্গেই খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়নি। এর মধ্যে একটি গ্রুপ হয়ে ওঠে ‘এলিট’ (প্রভাবশালী)। এই গ্রুপে মূলত ছেলেরাই ছিলেন। তাঁরা পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। পারিবারিকভাবে সচ্ছল। তাঁরা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তান। তাঁদের সঙ্গে তাঁর মেশা কম হতো।
২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোট কয়েকটি গ্রুপ তৈরি হয় বলে জানান তরুণী। তিনি বলেন, তখন কারও কোনো কাজ ছিল না। ফেসবুকে কাউকে না কাউকে নিশানা করে বুলিং করা হতো। কোভিডের পর সরাসরি ক্লাস শুরু হয়। তখনো এসব বুলিং থামেনি। কারও মধ্যে ‘বসিং’ (হুকুমবাজি) প্রবণতা বেশি ছিল। কাকে পশ্চিমা পোশাকে মানায় না, কার পোশাক পরার ধরন ভালো না, কে কোন সহপাঠীদের সঙ্গে প্রেম শুরু করেছে—এসব নিয়ে ক্লাসে গসিপ (পরচর্চা) চলত। সেই সঙ্গে চলত ব্যাকবাইটিং (কারও অনুপস্থিতিতে নিন্দা করা)।
তরুণীর ভাষ্য, তিনি খেয়াল করলেন, যা তিনি বলেননি, তা নিয়ে তাঁকে দোষারোপ করা হচ্ছে। বুলিং করা হচ্ছে। যে গ্রুপটা এলিট ছিল, সেই গ্রুপের ছেলেরা ছিল বুলি টাইপের। তিনজন ছেলে বেশি বুলি ছিলেন। তাঁরা গসিপও করতেন বেশি। তাঁরা নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করতেন খুব। বডি শেমিং, স্লাট শেমিং করতেন। একজন ছেলে কথা বলার সময় বাজে দৃষ্টিতে তাকাতেন। একবার একজন শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করে ‘বেখেয়ালের’ অজুহাত দিতে ‘সরি’ বলেছিলেন।
বছর দুয়েক পর এই ‘এলিট’ গ্রুপের তুলনামূলক ‘নিরীহ’ একটি ছেলের সঙ্গে ভালো লাগার সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে জানান তরুণী। সম্পর্কটিকে তিনি বর্ণনা করেন ‘সিচুয়েশনশিপ’ হিসেবে। তিনি বলেন, সম্পর্কটিকে দীর্ঘ বা স্থায়ী করার ক্ষেত্রে তাঁরা কেউ কারও প্রতি প্রতিশ্রুতবদ্ধ ছিলেন না। শুরুতে তাঁরা বলেছিলেন, সম্পর্ক ভেঙে গেলে তাঁরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। সম্পর্কের এক বছরের মধ্যে ছেলেটি সাবেক প্রেমিকার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তখন তিনি (তরুণী) সম্পর্কটি ভেঙে দেন।
তরুণীর ভাষ্য, এরপর দেখলেন, তিনি ক্লাসে গেলে অনেকে ফিসফিস করেন। তিনি বুঝতে পারতেন, তাঁকে নিয়েই কিছু বলা হচ্ছে। যাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেছে, সেই ছেলে, তাঁর বন্ধুসহ কিছু সহপাঠী মিলে তাঁকে নানান ধরনের মন্তব্য করে কোণঠাসা করে ফেলেন। সে সময় তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন। ক্লাসে যেতে ইচ্ছা করত না। পড়াশোনা করতে পারতেন না। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ভুগতে শুরু করেন।
তরুণী বলেন, ‘আমি কতটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম, বোঝাতে পারব না। মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে দুটি ক্লাস করে আর যাইনি। মা–বাবা অবাক হয়েছিলেন। তাঁদের বলেছি, আমি “বুলিড” হয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের সঙ্গে আর পড়ব না।’
শিক্ষক যা বললেন
তরুণীর অভিযোগ নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগটির শিক্ষক ও তৎকালীন স্টুডেন্ট কাউন্সেলরের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের ডেকে তিনি কথা বলেছিলেন। অন্য সহপাঠীদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। তাঁদের কথা ছিল, ‘ব্রেকআপ’ হওয়ার কারণে মেয়েটি বিষণ্ন ছিল।
ওই শিক্ষক বলেন, ‘মেয়েটি যে ধরনের অভিযোগ করেছিল, তা প্রমাণ করা কঠিন। ফলে মেয়েটিকে আমি মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার জন্য বুঝিয়েছিলাম। মেয়েটি অন্তর্মুখী। সে তার কষ্টের কথা সেভাবে শেয়ার করতে পারত না।’
বুলিংয়ের মতো হেনস্তার বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সুযোগ নেই—এমন প্রশ্নে ওই শিক্ষক বলেন, ব্যবস্থা আছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হতে হবে। শুরুতে তিনি মেয়েটিকে লিখিতভাবে অভিযোগ দিতে বলেছিলেন। পরে মেয়েটি বিভাগের প্রধানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষা হয়ে গেছে।
তরুণী বলেন, অনার্স ও ইন্টার্নশিপ শেষে তিনি প্রথম মৌখিক অভিযোগ করেন। পরে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষার পর লিখিত অভিযোগ দেন। তিনি পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এর মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং দুজনের বিরুদ্ধে মানসিক ও মৌখিক হয়রানির অভিযোগ দেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, একটা কমিটি হয়েছে। মাস্টার্সের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে এখনো ব্যবস্থা নিতে পারে।
মৌখিক অভিযোগ যখন করেছিলেন, তখন সেটাকে আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি তরুণীর। তিনি বলেন, ফলে হেনস্তাকারীরা নিজেদের আরও ক্ষমতায়িত বোধ করেছেন। তাঁদের কোনো অনুতাপ হয়নি। তাঁরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে ‘ব্রেকআপ’ বিষয়টিকে সামনে আনেন। এখানে ‘ব্রেকআপ’ কোনো বিষয় ছিল না।
সহপাঠীদের আচরণে হীনম্মন্যতায় ভোগে ৫ শতাংশ
বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন ২০২২ সালের অক্টোবরে ‘করোনা-পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একাডেমিক চাপের প্রভাব এবং তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা’ শীর্ষক জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, সহপাঠীদের দ্বারা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণে হীনম্মন্যতায় ভোগেন প্রায় ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।
জরিপে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার মোট ১ হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৫৬ শতাংশ।
একই সংগঠন ২০২২ সালের মার্চে ‘তরুণীদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব’ শিরোনামে আরেকটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, তরুণীরা তাঁদের দেহের আকৃতি, গঠন ও অবয়ব নিয়ে কথাবার্তায় হেয়প্রতিপন্ন বোধ করেন। বন্ধুবান্ধবের কাছে ‘বডি শেমিং’-এর শিকার হয়েছেন ২২ শতাংশ তরুণী। এই জরিপে এক হাজারের বেশি তরুণী অংশ নিয়েছিলেন।
২০২১ সালে পোল্যান্ডের ম্যানেজমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘কনসিকোয়েন্সেস অব বুলিং অন ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর বুলিংয়ের পরিণতি) শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে আসে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বুলিং হয়। বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানা, অভিযোগ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়া, অন্যদের সচেতন করা, পরিবারকে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভুক্তভোগীকে সহায়তা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গবেষণা প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়।
‘বুলিংয়ের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটের পরিচালক কামাল চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সেল রয়েছে। যৌন পীড়নের ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সেভাবে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। বুলিংয়ের মতো ঘটনায় ভুক্তভোগীর মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ক্লাসে যেতে ভয় পাওয়া, মানসিকভাবে দুর্বল বোধ করা, হীনম্মন্যতা, এমনকি অপরাধবোধে ভোগার মতো প্রবণতা দেখা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে নিজের ক্ষতি করা বা আত্মহত্যায় ঝুঁকতে দেখা যায়। এ কারণে কেউ বুলিংয়ের অভিযোগ করলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে ভুক্তভোগীকে কাউন্সেলিংয়ের মতো মানসিক সহায়তা দেওয়া উচিত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হলে ও ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) তিনতলায় বিনা মূল্যে মানসিক সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানান অধ্যাপক কামাল চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রচার কম থাকায় অনেক শিক্ষার্থী এসব সেবা সম্পর্কে জানেন না। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে অবস্থিত নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটে ফি দিয়ে সেবা নেওয়া যায়।
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
Monday, March 30, 2026
নিজের শুক্রাণু ব্যবহার করে ‘শিশু প্রজনন খামার’ গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন এপস্টিন
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনের অনুযায়ী, বছরের পর বছর ধরে এপস্টিন বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছে নিজের একটি ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। এপস্টিন চাইতেন, নিউ মেক্সিকোতে অবস্থিত তাঁর বিশাল খামারে তাঁর শুক্রাণু ব্যবহার করে নারীরা গর্ভধারণ করুক এবং অনেক সন্তান হোক।
যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে এ পরিকল্পনার কথা শুনেছিলেন, তাঁরা এটিকে ‘বেবি র্যাঞ্চ’ বা ‘শিশু প্রজনন খামার’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর এ পরিকল্পনা বাস্তবে কখনো কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হয়ে থাকলেও তা আইনত অপরাধ বলে বিবেচিত হবে কি না, তা–ও স্পষ্ট নয়।
বছরের পর বছর ধরে তদন্তকারী ও সাংবাদিকেরা দেখিয়েছেন, এপস্টিন তাঁর আর্থিক সাফল্য নিয়ে বাড়িয়ে বলতেন। তিনি তাঁর গ্রাহকদের পরিচয় ভুলভাবে উপস্থাপন করতেন। ব্যবসা ও বিজ্ঞানে নিজের ভূমিকার কথাও বাড়িয়ে বলতেন এপস্টিন। তবু অর্থ ও একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় তিনি রাজনীতি, অর্থনীতি ও শিক্ষাঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এপস্টিন একই কৌশল ব্যবহার করে অভিজাত বিজ্ঞানী মহলেও ঢুকে পড়েছিলেন। বিশিষ্ট কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এমন কয়েকজন বিজ্ঞানী হলেন নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী মারে গেল-মান, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী ও লেখক স্টিফেন হকিং, বিবর্তনবিজ্ঞানী স্টিফেন জে. গুল্ড এবং স্নায়ুতত্ত্ববিদ জর্জ এম চার্চ।
এপস্টিন বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন সম্মেলন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার খরচ বহন করতেন। তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে কিছু বৈজ্ঞানিক সভারও আয়োজন করতেন। সেখানে ব্যয়বহুল খাবার খেতে খেতে বিজ্ঞানীরা তাঁদের মতামত ভাগাভাগি করতেন। পরে অনেক বিজ্ঞানী বলেছিলেন, বিভিন্ন কাজে তহবিল পাওয়ার আশায় তাঁরা এপস্টিনের অপরাধমূলক ইতিহাসের দিকে নজর দেননি।
এপস্টিন হার্ভার্ড বিশ্বিব্যালয়ের ইভোল্যুশনারি ডাইনামিকস প্রোগ্রাম-এ ৬৫ লাখ ডলারের অনুদান দিয়েছিলেন। এপস্টিনের অনুদানে যেসব কনফারেন্স হতো, সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিন আইল্যান্ডসে আয়োজন করা হতো। সেখানে উড়োজাহাজে করে অতিথিদের নিয়ে আসা হতো এবং তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে তাঁদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করা হতো। একবার স্টিফেন হকিংসহ কয়েকজন বিজ্ঞানী এপস্টিনের চার্টার্ড সাবমেরিনে উঠেছিলেন।
হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার বলেছেন, এপস্টিন একবার তাঁকে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ওই বৈঠকে তাঁর সহকর্মী গণিতজ্ঞ ও জীববিজ্ঞানী মার্টিন নোয়াক এবং পদার্থবিজ্ঞানী লরেন্স ক্রাউসকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ওই আলোচনা এপস্টিনের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল।
‘বেবি র্যাঞ্চ’ বা ‘শিশু প্রজনন খামার’
হার্ভার্ডের এক আলোচনা সভায় এপস্টিন দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্যসংকট কমানো ও স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানোর উদ্যোগের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এ ধরনের উদ্যোগ জনসংখ্যা বাড়িয়ে দেবে।
হার্ভার্ডের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন পিঙ্কার ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এপস্টিনের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে পিঙ্কার যুক্তি দেখিয়েছিলেন, শিশু মৃত্যুহার বেশি হলে বরং পরিবারগুলো বেশি সন্তান নেয়।
পিঙ্কারের ওই কথায় এপস্টিন নাকি বিরক্ত হয়েছিলেন। পরে পিঙ্কার এক সহকর্মীর কাছ থেকে জানতে পারেন, তাঁকে আর এপস্টিনের আয়োজিত সভায় আমন্ত্রণ জানানো হবে না।
২০০০–এর দশকের শুরুর দিকে এপস্টিন বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ীদের বলতেন, তিনি নিউ মেক্সিকোতে থাকা তাঁর সম্পদকে কাজে লাগাতে চান। সেখানকার সান্তা ফে শহরের কাছে তাঁর মালিকানাধীন ৩৩ হাজার বর্গফুটের একটি জোরো র্যাঞ্চ ছিল। তিনি সেটিকে এমন একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তাঁর শুক্রাণু ব্যবহার করে নারীদের গর্ভধারণ করানো হবে।
দুজন পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী এবং ধনকুবেরদের উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তির বরাতে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন নৈশভোজ ও সম্মেলনে এপস্টিন তাঁদের কাছে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
এই ধারণা শুধু ব্যক্তিগত আলাপেই সীমাবদ্ধ ছিল না। একজন উপদেষ্টা বলেছেন, তিনি শুধু এপস্টিনের কাছ থেকেই নয়, ম্যানহাটানের এক অনুষ্ঠানে এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও এই পরিকল্পনার কথা শুনেছিলেন। যাঁরা এ বিষয়ে শুনেছিলেন, সবাই এটিকে অস্বস্তিকর ও অবাস্তব বলে উল্লেখ করেছেন।
নিজেকে নাসার বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক নারী বলেন, এপস্টিন চাইতেন, র্যাঞ্চে যেকোনো সময় অন্তত ২০ জন নারী অন্তঃসত্ত্বা থাকুক। এপস্টিন ‘রিপোজিটরি ফর জার্মিনাল চয়েস’ নামের একটি স্পার্ম ব্যাংক (শুক্রাণু সংরক্ষণ কেন্দ্র) থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এ স্পার্ম ব্যাংক এখন আর চালু নেই।
রিপোজিটরি ফর জার্মিনাল চয়েস নামে প্রতিষ্ঠানটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল, নোবেলজয়ীদের কাছ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করা। কারণ, তারা বিশ্বাস করত, নোবেলজয়ীদের জিন মানবজাতিকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে ১৯৯৯ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগপর্যন্ত মাত্র একজন নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠানটিতে শুক্রাণু দান করেছিলেন।
এপস্টেইন নিজের দেহ সংরক্ষণ করে রাখার ইচ্ছা নিয়েও খোলাখুলি কথা বলতেন। তাঁর এক সহযোগী বলেন, এপস্টিন ‘ক্রায়োনিকস’ নিয়ে আলোচনা করতেন। এটি এমন একটি অপ্রমাণিত পদ্ধতি, যেখানে মৃত্যুর পর ভবিষ্যতে পুনরুজ্জীবনের আশায় দেহ হিমায়িত করে রাখা হয়। ওই ব্যক্তির মতে, এপস্টিন চেয়েছিলেন, তাঁর মাথা ও যৌনাঙ্গ সংরক্ষণ করা হোক।
সন্তান ও গোপনীয়তার অভিযোগ
এপস্টিন কখনো সন্তানের বাবা হয়েছিলেন কি না, এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এপস্টিন–সংক্রান্ত অনেক নথি প্রকাশ করেছে। সেখানে এমন কিছু বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি সম্ভবত সন্তানের বাবা হয়েছিলেন।
এর মধ্যে একটি ডায়েরির অংশ রয়েছে। সেখানে এক নারী লিখেছেন, তিনি ২০০২ সালের দিকে একটি কন্যাশিশুর জন্ম দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৬ বা ১৭ বছর। ওই নারীর দাবি, জন্মের কয়েক মিনিটের মধ্যেই শিশুটিকে তাঁর কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়। এপস্টিনের সাবেক সঙ্গী গিলেন ম্যাক্সওয়েল পুরো প্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করেছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আলাদা করে যাচাই করা হয়নি। কথিত শিশুটির কী হয়েছিল, তা–ও অজানা।
ওই নারীর আইনজীবীরা ডায়েরিটি ফেডারেল কৌঁসুলিদের কাছে দিয়েছিলেন। পরে তিনি ছদ্মনামে বিনিয়োগকারী লিওন ব্ল্যাকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেখানে এপস্টিনের বাড়িতে ব্ল্যাক তাঁকে ধর্ষণ করেছেন বলে অভিযোগ করেন ওই নারী। ব্ল্যাক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
এপস্টিনের কোনো সন্তান ছিল কিনা, তার কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। তাঁর উইলেও সন্তানের কথা উল্লেখ নেই। কারিনা শুলিয়াক নামের এক নারী তাঁর সর্বশেষ বান্ধবী বলে পরিচিত। ওই নারীর জন্য তিনি তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপ, ম্যানহাটানের বাড়ি এবং ৫ কোটি ডলার রেখে যেতে চেয়েছিলেন।
এপস্টিনের নিউইয়র্কের বাড়ি থেকে পাওয়া একটি ভিডিওতে একটি টেবিলের ওপর ডিএনএ পিতৃত্ব পরীক্ষার নথি দেখা গেছে। ওই ভিডিও কবে ধারণ করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের লেখিকা সারা ফার্গুসন এক ই–মেইলে এপস্টিনকে একটি ছেলেসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান। সারাহ ওই ই–মেইলে উল্লেখ করেছিলেন, তিনি ডিউক অব ইয়র্কের কাছ থেকে এ তথ্য পেয়েছিলেন। পরে ফার্গুসন ইঙ্গিত দেন, তাঁকে এই বার্তা পাঠাতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। এরপর আর কিছু শোনেননি।
![]() |
| জেফরি এপস্টিন ও তাঁর সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি |
Friday, March 20, 2026
গলার চেইন ‘ছিনিয়ে নিতে’ শিশু হত্যা, লাশ লুকানো হয় চুলার ভেতরে
নিহত শিশুর নাম মরিয়ম আক্তার (৪)। সে উপজেলার সরিষা ইউনিয়নের মারুয়াখালি গ্রামের মিজানুর রহমান ও রিমা আক্তার দম্পতির মেয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বেলা ১টা থেকে মরিয়মকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাকে না পেয়ে পরিবারের লোকজন দিনভর হন্যে হয়ে আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেন। ইফতারের আগমুহূর্তে এক প্রতিবেশীর বাড়ির রান্নাঘরের চুলার ভেতরে তার লাশ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। এই ঘটনায় ওই প্রতিবেশী ও তাঁর ১৬ বছর বয়সী কিশোর ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন মিয়া বলেন, ‘কিশোরটি নেশাগ্রস্ত। শিশুটির গলায় থাকা একটি রুপার চেইন ছিনিয়ে নিয়ে তাকে হত্যা করেছে বলে আমরা ধারণা করছি।’
পুলিশ সূত্র জানায়, মরিয়ম আক্তারের গলায় ১২ আনা ওজনের রুপার একটি চেইন ছিল। নেশার টাকার জন্য সেই চেইন ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করে ওই কিশোর। শিশুটি কান্না শুরু করলে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে নিজেদের রান্নার চুলার ভেতর ঢুকিয়ে রাখে। পরে সেই রুপার চেইন আঠারবাড়ি বাজারের একটি দোকানে নিয়ে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করে।
ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল আজম বলেন, ‘শিশুটির গলায় থাকা রুপার চেইনের জন্য হত্যার ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত কিশোরকে আমরা হেফাজতে নিয়েছি। তার বাবাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের পর বিস্তারিত বলা যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তের জন্য শিশুটির মরদেহ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
![]() |
| মরিয়ম আক্তার। ছবি: সংগৃহীত |
Monday, March 16, 2026
বিউটি পার্লারের আড়ালে অনৈতিক কর্মকাণ্ড
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী এক নারী কর্মচারী মানিকগঞ্জ সদর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। পার্লারটি হলো মানিকগঞ্জ শহরের এলজিইডি অফিসের পশ্চিম পাশে রাইসা বিউটি ঘর পার্লার।
মামলার বাদী জানান, তিনি ওই বিউটি পার্লারে চাকরি করতেন। বেশ কিছু দিন চাকরি করার একপর্যায়ে পার্লারের মালিক রত্না ইয়াছমিন ও তার সহযোগীরা তাকে দেহব্যবসায় বাধ্য করার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে গত ১১ মার্চ ১৩ বছর বয়সী তার ছোট ছোট বোন পার্লারে তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। এমন সময় আমার বোনকে পার্লারের মালিকসহ তার চক্রের সদস্যরা দেখেন। পরে তারা আমার বোনকে দিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ড করানোর জন্য প্রস্তাব দেয়। এতে রাজি না হওয়ায় গত ১৪ মার্চ রাত আনুমানিক ১টার দিকে আসামিরা আমার বাসায় গিয়ে চাপ সৃষ্টি করে।
ভুক্তভোগী আরও জানান, বোনসহ আমি অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় আমাকে পার্লারে নিয়ে লোহার রড দিয়ে মারধর করে। শিকল দিয়ে হাত বেঁধে রাখে এবং আমার মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। আমি বাড়ি না ফেরায় আমার স্বজনরা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ গিয়ে আমাকে উদ্ধার করে।
অভিযুক্তরা হলেন, সদর উপজেলার পশ্চিম বান্দুটিয়া গ্রামের পার্লারের মালিক রত্মা ইয়াছমিন, তার ছেলে মো. তুষার রহমান (২৬), দেড় গ্রাম এলাকার তাজনীন আক্তার চাঁদনী (২৬), পশ্চিম সেওতা এলাকার রিফাত (২৫), ও রজ্জব (২৫), বাইচাইল গ্রামের জহিরুল ইসলাম টিপুসহ (৪৫) অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনের নামে মামলা করা হয়।
এ বিষয়ে সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইকরাম হোসেন জানান, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আমরা এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছি।
![]() |
| ভুক্তভোগী নারী। ছবি : সংগৃহীত |
Saturday, February 28, 2026
নরসিংদীতে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত নূরা গ্রেপ্তার
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় ও দড়িকান্দীর মধ্যবর্তী একটি শর্ষেখেত থেকে ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ধর্ষণের বিচার চাওয়ায় কিশোরীকে বাবার কাছ থেকে অপহরণের পর হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে ৯ জনের নামোল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা করেন ওই কিশোরীর মা।
মামলার এজাহারে নামোল্লেখ করা ৯ জন আসামি হলেন, নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (২৮), এবাদুল্লাহ (৪০), হযরত আলী (৪০), মো. গাফফার (৩৭), আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), ইমরান দেওয়ান (৩২), ইছহাক ওরফে ইছা (৪০), আবু তাহের (৫০) ও মো. আইয়ুব (৩০)। আহাম্মদ আলী দেওয়ান মহিষাশুড়া ইউপির সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি। তাকেসহ পাঁচ আসামিকে এই বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাকি চারজন হলেন ইমরান দেওয়ান, এবাদুল্লাহ, আইয়ুব ও গাফফার।
এদিকে অভিযোগ ওঠার পর আহাম্মদ আলী দেওয়ানকে দলীয় প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব ধরনের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে সদর উপজেলা বিএনপির এক নোটিশে এই তথ্য জানানো হয়। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত নোটিশে উল্লেখ করা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় আহাম্মদ আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত নূরা নামের এক তরুণের সঙ্গে কিশোরীর কথাবার্তা ছিল। ১৫ দিন আগে নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন তরুণ কিশোরীকে তুলে নেয়। তখন তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। এ ঘটনার বিচারের জন্য কিশোরীর পরিবার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আহাম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে যায়। তবে পরিবারটি বিচার পায়নি। সাবেক ইউপি সদস্যের কাছে অভিযোগ করায় নূরাসহ সংশ্লিষ্ট তরুণেরা ক্ষুব্ধ হন।
এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার রাতে মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন বাবা। পথে বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয় তরুণ বাবার কাছ থেকে কিশোরীকে অপহরণ করে নিয়ে যান। রাতভর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও মেয়েটির সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার মাঝামাঝি একটি শর্ষেখেতে কিশোরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে মাধবদী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ধর্ষণের বিচারের দায়িত্ব নিয়ে আহম্মদ আলী দেওয়ান অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং কোনো বিচার না করেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেন। পাশাপাশি কিশোরীর পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে চাপ দেন। বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এর জেরেই গত বুধবার রাতে বাবার সামনে থেকে কিশোরীকে অপহরণের পর শর্ষেখেতে নিয়ে হত্যা করা হয়।
![]() |
| গ্রেপ্তার প্রধান আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা। ছবি: পুলিশের সৌজন্যে |
Tuesday, February 24, 2026
ভারতের ঝাড়খন্ডে কালোজাদুর অভিযোগে নারী ও তাঁর শিশুসন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা
১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার জ্যোতি সিংকু নামের ওই নারীকে পুড়িয়ে হত্যার সময় তাঁর স্বামীর ওপরও হামলা চালানো হয়। তিনি গুরুতর দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
এ ঘটনায় অন্য সন্দেহভাজনদের ধরতে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। ইতিমধ্যে, আটক হওয়া ব্যক্তিরা পুলিশ হেফাজতে আছেন। তাঁরা এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশটিতে কালোজাদু করা সন্দেহে ২ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগই নারী।
মঙ্গলবার জ্যোতি সিংকু ও তাঁর শিশুপুত্রকে হত্যার ঘটনার কয়েক মাস আগে প্রতিবেশী বিহার রাজ্যে জাদুটোনার অভিযোগে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ আছে, তাঁদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়।
এ ধরনের ঘটনা সাধারণত ভারতের দরিদ্র ও প্রান্তিক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় বেশি দেখা যায়। এসব অঞ্চলের অনেকে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তা ছাড়া, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা না থাকায় সেখানকার বাসিন্দারা চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শের জন্য হাতুড়ে চিকিৎসকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
ঝাড়খন্ড রাজ্যে কুদসাই নামের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জ্যোতি সিংকুকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাজ্যের রাজধানী রাঁচি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে গ্রামটির অবস্থান। এখানে প্রায় ৫০টি মাটির ঘর রয়েছে।
গ্রামে ঘটা সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ওই সহিংসতাকে উসকে দিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ঘটনার মধ্যে আছে—হঠাৎ গবাদিপশুর মৃত্যু এবং পুস্তুন বিরুয়া নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির অসুস্থতা ও মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া গুজব।
পুস্তুন বিরুয়ার স্ত্রী জানো বিরুয়া বলেন, তাঁর স্বামী উদ্বেগজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন এবং বারবার অচেতন হচ্ছিলেন। এ অবস্থায় স্বামীর চিকিৎসার জন্য একজন হাতুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর শরণাপন্ন হন। যেসব গ্রামে সচরাচর চিকিৎসকদের পাওয়া যায় না, সেসব গ্রামে চিকিৎসার জন্য এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদেরই শরণাপন্ন হয়ে থাকে মানুষ। ওই স্বাস্থ্যসেবা কর্মী জানোকে বলেন, তাঁর স্বামী কোনো শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন না।
স্বামীকে হাসপাতালে না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে জানো বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, তাই এত দূরে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি।’
এদিকে গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে স্থানীয় বাসিন্দা জ্যোতি সিংকু জাদুটোনা করেন এবং ওই ব্যক্তির অসুস্থতার জন্য তিনিই দায়ী।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুস্তুন বিরুয়ার মৃত্যু হয়। আর সেই রাতেই হামলা হয় জ্যোতির বাড়িতে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জ্যোতির স্বামী কোলহান সিংকুর ভাষ্যমতে, প্রায় এক ডজন লোকের একটি দল তাঁদের বাড়িতে হামলা চালান এবং তাঁর স্ত্রী ও শিশুকে আগুনে পুড়িয়ে মারেন।
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে কোলহান বলেন, ‘বিষয়টি গ্রাম পরিষদে মীমাংসা করার জন্য আমি হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু হামলাকারীরা আমার কথা শোনেননি।’
কোলহান সিংকু ও তাঁর পরিবারের আরেক সদস্যের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে জেলা পুলিশ এ ঘটনায় হত্যা ও ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা করেছে।
পুলিশ বলেছে, চার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং হামলাকারী দলের অন্য সদস্যদের ধরতে একটি বিশেষ পুলিশ দল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে গ্রামীণ এলাকাগুলোয় বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হবে বলে জানায় পুলিশ।
![]() |
| জাদুটোনা করার সন্দেহে এই জায়গায় জ্যোতি সিংকু নামের ওই নারী ও তাঁর শিশুপুত্রকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া |
Wednesday, February 4, 2026
৯ বছর প্রেমের পর বিয়ে, দুই মাসের মধ্যেই মা-বাবার সহযোগিতায় স্বামীকে হত্যা করল স্ত্রী
হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালাতে, একটি মাফলার দিয়ে দেহ জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিতেন্দ্রর শ্যালকের খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে। পুলিশ জানায়, জ্যোতি ও জিতেন্দ্র কুমার যাদব গত বছরের ২৫ নভেম্বর বিয়ে করেন। তাদের প্রেমের সম্পর্কের বয়স ছিল প্রায় নয় বছর, যা শুরু হয়েছিল ছাত্রজীবনে। হিন্দু রীতি অনুযায়ী এবং দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটি হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে মূলত টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, জ্যোতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ হাজার টাকা তুলে অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন জিতেন্দ্র। এই ক্ষতি থেকেই দাম্পত্য কলহ শুরু হয় এবং তা ক্রমেই তীব্র আকার নেয়।
২৬ জানুয়ারি জ্যোতি স্বামীর কাছে ওই টাকার হিসাব চাইলে দু’জনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। যা একপর্যায়ে শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। তখন জ্যোতি তার মা-বাবা ও ভাইকে ফোন করে ভাড়া বাড়িতে ডেকে আনেন। এই দম্পতি বিয়ের পর থেকে ইজ্জতনগরের গির্জা শঙ্কর কলোনির ওই ভাড়া বাড়িতেই থাকতেন। জিতেন্দ্রের বাড়ি ছিল ইটাওয়া জেলার ভাবুপুরা গ্রামে।
পুলিশ জানায়, জ্যোতির বাবা কালিচরণ, মা চামেলি এবং ভাই দীপক ফোন পেয়ে ওই বাড়িতে আসেন। এরপর যে সংঘর্ষ হয়, তাতে পুলিশ দাবি করছে- বাবা, মা ও ভাই মিলে জিতেন্দ্রের হাত-পা চেপে ধরে রাখেন। সেই সুযোগে জ্যোতি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। জিতেন্দ্র নিস্তেজ হয়ে পড়ার পর, হত্যার আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পুলিশ বলছে, একটি মাফলার দিয়ে দেহ বেঁধে জানালা বা ভেন্টিলেটরের গ্রিলে ঝুলিয়ে দেয়া হয়, যেন ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হয়। এরপর প্রতিবেশীদের ডেকে বলা হয়, জামাই আত্মহত্যা করেছে।
২৬ জানুয়ারি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিষয়টি প্রথমে সন্দেহজনক আত্মহত্যা হিসেবেই দেখা হয়। ভাড়া বাড়ির ভেতরেই জিতেন্দ্রর ঝুলন্ত দেহ পাওয়া যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে আত্মহত্যার দাবি খণ্ডন করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে জিতেন্দ্রর ভাই অজয় কুমার পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ জ্যোতি ও আরও তিনজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করে এবং ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট হয় জিতেন্দ্রর মৃত্যু ঝুলে পড়ার কারণে নয়, শ্বাসরোধের কারণে হয়েছে। এর ফলে আত্মহত্যার সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায়।
এরপর পুলিশ মামলার ধারা পরিবর্তন করে হত্যা মামলা রুজু করে এবং তদন্ত জোরদার করে। জ্যোতির ভাই দীপককেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা জ্যোতি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি তদন্তকারীদের জানান, ছাত্রজীবন থেকেই তার ও জিতেন্দ্রর পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। পুলিশ জানায়, জিতেন্দ্র বেরেলিতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। জ্যোতি কাজ করতেন উত্তরপ্রদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক বাস কন্ডাক্টর হিসেবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই আর্থিক বিষয় নিয়ে ঘনঘন ঝগড়া হচ্ছিল, যা সম্পর্ককে তিক্ত করে তোলে। ঘটনার দিন সেই ঝগড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তিনি পরিবারকে ফোন করেন।
পুলিশের অভিযোগ এরপর যে সংঘর্ষ হয়, তাতে তার মা-বাবা ও ভাই জিতেন্দ্রকে ধরে রাখেন এবং রাগের বশে জ্যোতি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। মৃত্যুর পর সবাই মিলে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করে।

Wednesday, January 28, 2026
ডিএনএ পরীক্ষায় সামনে এল শৈশবে মা হওয়া কিশোরীর জীবনের নির্মম বাস্তবতা
অভিযুক্ত সৎবাবার নাম মেহেদী হাসান ওরফে হৃদয় (২৫)। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার একটি গ্রামে হলেও রাজশাহী শহরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। আর মেয়েটির মামার বাড়িও বাঘা উপজেলার একটি গ্রামে।
ভুক্তভোগী ওই কিশোরীর জন্ম দেওয়া শিশুটির বয়স এখন ১ বছর ৯ মাস। ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন আসার পর অভিযুক্ত মেহেদী হাসান ২১ জানুয়ারি নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পিবিআই বলছে, সৎবাবার কাছে ধর্ষণের শিকার হয়ে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হলেও সে তার মামার হাতেও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাই দুজনের বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রোববার রাজশাহী পিবিআইয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২১-২২ সালে ওই কিশোরী রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় তার নানার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। সেখানে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। পরে সে জানায়, ২০২১-২২ সাল পর্যন্ত নানার বাড়িতে থাকার সময় প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে তার মামা দিনের পর দিন ধর্ষণ করেন।
ঘটনা জানাজানি হলে ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর এলাকার লোকজন ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্র্যাম্পে সাত লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে মামার সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দেন। এ বিয়ে মানতে না পেরে তার মামা আত্মগোপন করেন। পরবর্তী সময় মেয়েটির মা তাকে রাজশাহী শহরের ভাড়া বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর ২০২৩ সালের ৩ মার্চ মেয়েটি একটি পুত্রসন্তান প্রসব করে।
এরপর ভুক্তভোগী মেয়েটির মা বাদী হয়ে তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল আদালতে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। তারা আসামিকে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আদালতের আদেশে ওই কিশোরী, তার সন্তান ও আসামির ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু দেখা যায়, আসামির সঙ্গে নবজাতকের ডিএনএ মিলছে না।
পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আরও অধিকতর তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এরপর তারা জানতে পারে, মেয়েটির মা ২০২০ সালে তার দ্বিতীয় স্বামী মেহেদী হাসানের সঙ্গে রাজশাহী শহরে ভাড়া থাকতেন। ২০২২ সালে মায়ের সঙ্গে ঈদ করতে এসে প্রায় দুই মাস সেই বাসায় থাকে ওই কিশোরী। ওই সময় মেহেদী তাকে ধর্ষণ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানান, মামার সঙ্গে ডিএনএ না মেলায় মেয়েটির সঙ্গে তিনি আবার কথা বলেন। সে কোথায় কোথায় ছিল, তা জানার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী জানায়, সে মায়ের বাড়ি এসে দুই মাস থেকেছে। তখন তিনি সৎবাবাকে সন্দেহ করেন। কিন্তু মেয়েটি জানায়, ঘুমের মধ্যে কিছু হয়েছে কি না, তা তার মনে নেই। পরবর্তী সময়ে ডিএনএ পরীক্ষা করে তাঁরা নিশ্চিত হন।
মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, ২১ জানুয়ারি অভিযুক্ত মেহেদীকে রাজশাহী নগরের মুক্তমঞ্চ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেন। পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি সব স্বীকার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এরপর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মেয়েটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে যে তার মামা তাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছেন। আবার মেহেদীও অপরাধ স্বীকার করেছেন। মেহেদীর ধর্ষণের কারণে মেয়েটি গর্ভবতী হলেও তার মামাও তার সঙ্গে একই কাজ করেছেন। বর্তমানে তার মামা জামিনে আছেন। আর মেহেদী কারাগারে। এখন বিষয়টির তদন্ত চলছে। মেয়েটিকে দুজন ধর্ষণ করে থাকলে দুজনকেই অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত করা হবে।
![]() |
| ধর্ষণ। প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো |
Friday, January 23, 2026
মোটেলে যৌন ব্যবসা: ভারতীয় বংশোদ্ভূত দম্পতিসহ গ্রেপ্তার ৫
আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে কোশা শর্মা, যিনি ‘মা’ বা ‘মামা কে’ নামে পরিচিত এবং তার স্বামী তরুণ শর্মা, যিনি ‘পপ’ বা ‘পা’ নামে পরিচিত তারা কোশা এলএলসি নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোটেলটি ইজারা নিয়ে পরিচালনা করছিলেন।
ফৌজদারি অভিযোগে বলা হয়েছে, এই দম্পতি মোটেলের ভেতর একটি যৌন ও মাদক চক্রকে অবাধে কার্যক্রম চালাতে দিয়েছিলেন এবং অবৈধ আয় থেকে নির্দিষ্ট অংশ নিজেরা নিতেন। পুলিশ জানায়, কোশা শর্মা মাদক ও যৌনকর্মী খোঁজা ব্যক্তিদের তৃতীয় তলায় পাঠাতেন এবং পুলিশ এলে তাদের সতর্ক করে দিতেন, যাতে কর্মকর্তারা কক্ষে ঢুকতে না পারেন।
এই অভিযানে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন ৫১ বছর বয়সী মার্গো পিয়ার্স, ৪০ বছর বয়সী জোশুয়া রেডিক এবং ৩৩ বছর বয়সী রাশার্ড স্মিথ। তারা সবাই এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আদালতের নথিতে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের মে থেকে আগস্টের মধ্যে প্রিন্স উইলিয়াম কাউন্টি পুলিশ ও এফবিআইয়ের গোপন এজেন্টরা যৌনকর্মী, দালাল ও ক্রেতা সেজে অন্তত নয়বার ওই মোটেলে গিয়েছিলেন। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অন্তত আটজন নারীকে ওই মোটেলে যৌনকর্মে বাধ্য করা হতো।
স্মিথসহ কয়েকজন ব্যক্তি তাদের দিয়ে যৌনকর্ম করিয়ে প্রতি ঘটনার জন্য ৮০ থেকে ১৫০ ডলার আদায় করতেন। নারীদের মোটেল ছাড়তে দেয়া হতো না এবং তাদের শারীরিক নির্যাতনও করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
একই সময়ে গোপন এজেন্টরা মোটেলে ১৫ বার মাদক কেনার অভিযান চালান। এর মধ্যে ১১ বার ফেন্টানিল এবং চারবার কোকেন সরবরাহ করা হয়। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মার্গো ওয়ালডন পিয়ার্স, যিনি মার্কো নামে পরিচিত, এই ১৫টি লেনদেনেই অবৈধ মাদক সরবরাহ করেছেন। পুলিশ জানায়, পাঁচ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ফেন্টানিলসহ নিয়ন্ত্রিত মাদক বিতরণের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের ন্যূনতম ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাজা নির্দেশিকা ও অন্যান্য আইনগত বিষয় বিবেচনা করে ফেডারেল জেলা আদালতের বিচারক চূড়ান্ত সাজা নির্ধারণ করবেন।

Monday, January 19, 2026
সুন্দরবনে ১০০ কেজি হরিণের মাংস ও ৪ হাজার মিটার ফাঁদ জব্দ
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুনতাসীর ইবনে মহসিন আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল বিকেল চারটার দিকে কোস্টগার্ডের একটি দল কয়রায় সুন্দরবনের কাগাদোবেকি টহল ফাঁড়ির ঘোলের খাল–সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় ওই এলাকা থেকে ১০০ কেজি হরিণের মাংস এবং প্রায় ৪ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে শিকারিরা বনের ভেতরে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
উদ্ধার করা হরিণের মাংস ও শিকারের ফাঁদ পরবর্তী আইনি ব্যবস্থার জন্য বন বিভাগের কাগাদোবেকি টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুনতাসীর ইবনে মহসিন বলেন, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গত এক বছরে সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে ৮২৪ কেজি হরিণের মাংসসহ ২৯ জন শিকারিকে আটক করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৭ ডিসেম্বর সুন্দরবনের মুচির দোয়ানি এলাকা থেকে ২১ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই শিকারিকে আটক করা হয়। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার রোধে কোস্টগার্ডের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
![]() |
| নদী তীরে হরিণের পাল। সুন্দরবনের নীলকমল এলাকায়। ফাইল ছবি |
Thursday, January 15, 2026
পূর্ণাঙ্গ রায়: হাসিনা–মাকসুদ কথোপকথনের ব্যাখ্যা নিয়ে কিছু প্রশ্ন by ডেভিড বার্গম্যান
সেই নিবন্ধে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের মধ্যে হওয়া একটি আড়ি পাতা কথোপকথন নিয়ে আলোচনা করা হয়।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আদালতে যে রায়ের অংশবিশেষ পড়ে শোনানো হয়, তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে-ট্রাইব্যুনাল ওই কথোপকথনকে এমন একটি প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেছেন, যার মাধ্যমে তাঁরা মনে করেছেন, ওই দিনই শেখ হাসিনা ‘হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা প্রথম অভিযোগের ক্ষেত্রে এই অডিও রেকর্ডিংটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই অভিযোগেই তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগটি ১৪ থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যকার ঘটনাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার মধ্যে আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।
এই সময়পর্বে আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করার নির্দেশ’ শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ যে প্রমাণ উপস্থাপন করেছে, তার মধ্যে এই কথোপকথনই একমাত্র সরাসরি প্রমাণ।
আগের লেখায় আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, ১৪ জুলাইয়ের ওই কথোপকথন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। তবে লেখার শেষে আমি এটাও বলেছিলাম—‘পরিপূর্ণ রায় পাওয়ার পর বোঝা সম্ভব হবে সেখানে ১৪ জুলাইয়ের ফোনালাপ নিয়ে ট্রাইব্যুনালের যে ভাষ্য এখন পাওয়া গেছে, তার বিস্তারিত আইনি যুক্তি ও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে কি না।’
এখন চূড়ান্ত রায় প্রকাশিত হয়েছে, ফলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। তা হলো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে যে মোট দণ্ড দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এই একটি অডিও কথোপকথনের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই।
এমনকি যদি প্রথম অভিযোগটি বাতিলও হয়ে যায়, তাহলেও দুটি অভিযোগে থাকে যাতে তিনি যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
এই দুই অভিযোগের প্রমানের জন্য হাসিনা ও মাকসুদ কামালের মধ্যকার ফোনালাপের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করার প্রয়োজন নেই।
তবু এই অডিও রেকর্ডিংটি ট্রাইব্যুনাল যেভাবে ব্যাবহার করেছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিচারকেরা তাঁদের সামনে পেশ করা প্রমাণগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করার সক্ষমতা ও মানসিকতা কতটা রাখেন, তা এর মাধ্যমে বোঝা যায়।
একই সঙ্গে প্রমাণ যদি শেখ হাসিনার (বা অন্য কোনো আওয়ামী লীগ নেতার) পক্ষে যায়, সে ক্ষেত্রে বিচারকেরা কি আদৌ তাঁদের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দিতে প্রস্তুত আছেন কি না, সেটিও এর মাধ্যমে বোঝা যায়।
অন্যভাবে বললে, বিষয়টি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, এই ট্রাইব্যুনাল সত্যিই কি একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছেন, নাকি এটি মূলত রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও জনমতের চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা একটি “সিলমোহর মারা” প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে; ঠিক যেমনটি ভিন্ন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার আগের ট্রাইব্যুনালগুলোর বিরুদ্ধে প্রায়ই অভিযোগ শোনা যেত।
মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথন: অভিযোগসমূহ
মাকসুদ ও শেখ হাসিনার মধ্যকার কথোপকথনের বিষয়টি তিনটি অভিযোগেই উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রতিটি অভিযোগে বিষয়টি ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
কথোপকথনের একটি অংশ উদ্ধৃত করার পর প্রথম অভিযোগে (রায়ের ৩৫ নম্বর পৃষ্ঠায়) বলা হয়—‘এভাবে শেখ হাসিনা ওই কথোপকথনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন যে তিনি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
এরপর ওই অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি আলাদা কাউন্ট বা অপরাধ উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে দুটি অপরাধ পুরোপুরি এই কথোপকথনের এমন ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে।
একটি অপরাধ হলো—‘আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া’; অন্যটি হলো-‘তাঁর নির্দেশ অনুসারেই আবু সাঈদকে হত্যা করা হয়েছে’।
দ্বিতীয় অভিযোগেও আড়ি পাতা ওই কথোপকথনের একই অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে লক্ষণীয় হলো, কথোপকথনটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে-‘এটি স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল) এবং একই সঙ্গে ইংল্যান্ডে এ ধরনের আন্দোলনের সময় যেভাবে মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তেমনভাবেই তাঁদের হত্যা করার নির্দেশও দিয়েছেন।’
আর তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে-এই কথোপকথনে শেখ হাসিনা ‘উল্লেখ করেছেন, তিনি আগেভাগেই আন্দোলনকারীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল)।’
এখানে লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, তৃতীয় অভিযোগে ‘হত্যার নির্দেশ’ দেওয়ার কোনো কথা উল্লেখ করা হয়নি।
ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত
তাহলে এই কথোপকথন নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত কী ছিল?
৪৫০ পৃষ্ঠার রায়ের পুরো নথিতে ট্রাইব্যুনাল এই রেকর্ডিংটির অর্থ বা ব্যাখ্যা নিয়ে আলাদা কোনো বিশ্লেষণ দেননি। বরং দুটি জায়গায় ট্রাইব্যুনাল সরাসরি সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন।
রায়ের ৩৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে-‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের সঙ্গে কথোপকথনে অভিযুক্ত শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, তিনি ইতিমধ্যেই শিক্ষার্থীদের রাজাকারদের মতো ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যে যেভাবে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হচ্ছে, সেভাবেই তাদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন।’
বাস্তবে এটি দ্বিতীয় অভিযোগে ব্যবহৃত ভাষারই প্রায় হুবহু পুনরাবৃত্তি। আর রায়ের ৪৫২ নম্বর পৃষ্ঠায় ওই কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে—‘এটি একেবারেই স্পষ্ট যে শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথনের ‘আসল’ অর্থ
কিন্তু এই রেকর্ডিংগুলো কি সত্যিই এমন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে?
ট্রাইব্যুনাল মাকসুদ-হাসিনা কথোপকথনের দুটি আলাদা অংশ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
কিন্তু রায়ে এই কথোপকথন নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ না থাকায়, কোন অংশটিকে প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছে যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন, সেটি স্পষ্ট নয়।
দুটি অংশ মিলিয়েই ট্রাইব্যুনাল এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন কি না, তা-ও এখানে পরিষ্কার নয়।
এ কারণে এখন আমরা কথোপকথনের প্রতিটি অংশ আলাদা করে পর্যালোচনা করব।
কথোপকথনের প্রথম অংশে শেখ হাসিনার জবানিতে বলা হয়েছে, ‘রাজাকার তো ফাঁসি দিছি, এবার তোদেরও তাই করব। একটাও ছাড়ব না, আমি বলে দিছি।’
তবে শেষের অংশের বাক্যটি-‘আমি বলে দিছি’-বিভিন্ন অর্থ বহন করে এবং একাধিকভাবে এর অনুবাদ করা সম্ভব। এটি হতে পারে-‘আমি তাদেরকে বলেছি’; ‘আমি আগেই বলেছি’ বা ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি।’
এই বাক্যটি ব্যবহার করে হাসিনা ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, তা নিয়ে অস্পষ্টতা আছে; এটি চূড়ান্ত রায়ে স্পষ্টও হয়ে ওঠে। অভিযোগগুলো নিয়ে আলোচনা করার সময় এবং ট্রাইব্যুনালের নিজেদের সিদ্ধান্তে (যেমন ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে) এই বাক্যটি ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে।
আবার রায়ে কথোপকথনের পূর্ণ অনূদিত ট্রান্সক্রিপ্ট বা প্রতিলিপিতে সেই একই বাক্যটিকে ‘আমি তোমাকে বলেছি’ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। রায় কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি কেন এক প্রসঙ্গে এক অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে এবং অন্য প্রসঙ্গে ভিন্ন অর্থে নেওয়া হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, যদি ট্রাইব্যুনাল কথোপকথনের সরাসরি প্রসঙ্গ, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি ভালোভাবে দেখতেন বা বিবেচনা করতেন, তাহলে তাঁর পক্ষে এটি যৌক্তিকভাবে বা যুক্তিসংগতভাবে বলা কঠিন হতো যে ‘আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি’ বাক্যটি দিয়ে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘হত্যা করার নির্দেশ’ দিয়েছেন।
প্রথমত, কথোপকথনের মধ্যে আসা ‘নির্দেশ’ শব্দটি মূলত রাজাকারদের ফাঁসির উদাহরণ প্রসঙ্গে এসেছে।
এখানে হাসিনা যা বলছিলেন, সেটি ছিল অতীতের ঘটনা-যেখানে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর যেসব নেতার কথা তিনি উল্লেখ করছিলেন, তাঁদের আটক, গ্রেপ্তার ও বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
অর্থাৎ, এটি কোনো স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেনি যাতে মনে হয়, হাসিনা আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করার, বিচার করার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কোনো পরিকল্পনা বা নির্দেশ দিয়েছিলেন কিংবা সরকারের মধ্যে এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, যদি ধরেও নেওয়া হয়, ট্রাইব্যুনাল বিশ্বাস করেছিলেন যে, হাসিনা রূপকভাবে কথাটি বলছিলেন এবং তাঁর ‘রাজাকারদের ফাঁসি’ উল্লেখ করা মানে ছিল ছাত্র আন্দোলনকারীদের হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া (যেমনটা বিচারকেরা মনে করছেন)।
তারপরও এমন ব্যাখ্যার কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অর্থাৎ, কথোপকথনের বাস্তব অর্থ বা তার প্রভাব দেখার মতো এমন কোনো তথ্য বা নথি নেই, যা বলে হাসিনা আসলেই আন্দোলনকারীদের হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন।
যদি সত্যিই এমন কোনো আদেশ দেওয়া হয়ে থাকে, তা কার কাছে পৌঁছেছিল? রাষ্ট্রপক্ষ কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি যে ১৪ জুলাইয়ের কথোপকথনের আগে বা ঠিক এই কথোপকথনের পরই কাউকে এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এ ধরনের নির্দেশ দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবে অন্তত পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) তা জানানো হতো; কিন্তু আইজিপির স্বীকারোক্তি বা ট্রাইব্যুনালের সামনে তাঁর দেওয়া সাক্ষ্য এমন কোনো বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না।
তৃতীয়ত, ১৪ জুলাই হাসিনা ‘হত্যার নির্দেশ’ দিয়েছেন-এই ধারণা রাষ্ট্রপক্ষের পেশ করা প্রমাণের সঙ্গে মিলছে না এবং তা হয়তো কিছুটা বিরোধপূর্ণও। কারণ, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের প্রমান গ্রহন করেছেন যে, ১৮ জুলাই হাসিনা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
১৮ জুলাইয়ের এই আদেশের প্রমাণ একটি স্পষ্ট আড়ি পাতা কথোপকথন এবং আইজিপির সাক্ষ্য দ্বারা সমর্থিত। তাহলে কি রাষ্ট্রপক্ষ এবং ট্রাইব্যুনালের দাবি অনুযায়ী হাসিনা একই আদেশ দুবার দিয়েছেন?
চতুর্থত, পরের দিনগুলোয় যা ঘটেছে, তা দেখায়, ১৪ জুলাই ‘হত্যার আদেশ’ দেওয়া হয়েছিল-এমন দাবি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।
কারণ যদি ১৪ জুলাই আসলেই এমন আদেশ দেওয়া হতো, তাহলে তার পরের দিন ১৫ জুলাই স্বাভাবিকভাবেই কোনো না কোনো হত্যার ঘটনা প্রত্যাশিত হতো। কিন্তু ১৫ জুলাই কোনো হত্যার ঘটনা ঘটেনি। তবে ১৬ জুলাই পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
এর মধ্যে একটি ঘটেছে রংপুরে, দুটি ঘটেছে ঢাকায় এবং তিনটি ঘটেছে চট্টগ্রামে। এসব ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অথবা আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বলা হলেও এগুলোকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমন্বিত হত্যার নীতি নয়, বরং বিক্ষিপ্ত গুলির ঘটনা হিসেবে বোঝানো অনেক বেশি যৌক্তিক।
দ্বিতীয় অংশ
তবে সম্ভবত ট্রাইব্যুনাল কথোপকথনের দ্বিতীয় অংশটিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেছে।
দ্বিতীয় অংশটি হলো: ‘সব এইগুলাকে বাইর করে দিতে হবে...আমি বলে দিচ্ছি আজকে সহ্য করার পর অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেয়ার নেবে...কারণ ইংল্যান্ডে এ রকম ছাত্ররাজনীতির জন্য মাঠে নামল, কতগুলি মেরে ফেলায় দিল না?’
কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এই কথাগুলোকে অনুবাদ করেছেন এভাবে: (“They all have to be ousted. I already ordered to arrest them after waiting this day to take appropriate action as same as that that of England where protesting students were killed. ”) ‘তাদের সবাইকে অপসারণ করতে হবে। আজ পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমি ইতিমধ্যেই তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছি এবং ইংল্যান্ডে যেভাবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
এই অনুবাদের মাধ্যমে এমন একটি ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে তিনি শুধু শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তারের নির্দেশই দেননি, বরং ইংল্যান্ডে যা ঘটেছিল, (যেখানে শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছিল বলে বলা হয়ে থাকে), সেই রকম ব্যবস্থা নিতেও নির্দেশ দিয়েছেন।
এ কথাগুলোর অর্থ ট্রাইব্যুনাল যেভাবে অনুবাদ করেছে তাতে ভাষার পরিপূর্ণ চিত্র আসেনি। আর এই বক্তব্য থেকে প্রমান মেলে যে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘হত্যা ও নির্মূল করার নির্দেশ’ দিয়েছিলেন-এমন ব্যাখ্যা করা কঠিন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এভাবেই দেখেছেন কথোপকথনের এই অংশকে।
এই বাক্যের একটি অংশ অবশ্যই স্পষ্ট। হাসিনা যখন বলেন, ‘আমি নির্দেশ দিচ্ছি’, তখন তিনি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশের কথাই বলছেন। এবং বাস্তবে সেটিই কয়েকদিনের মধ্যে ঘটেছিল। তিনি এ কথা বলছিলেন সরাসরি সেই ব্যক্তির সঙ্গে, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখেন।
তবে এই বাক্যে হাসিনা যা কিছুই বলেছেন, তার মধ্যে “...আজকে সহ্য করার পরে অ্যারেস্ট করবে, ধরে নেবে এবং যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে” কথগুলো আছে।
যেখানে ‘যা অ্যাকশন নেওয়ার নেবে’ বলতে হত্যার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; কিন্তু তারপরও এটি মোটেও পরিষ্কার করে না, তিনি ১৪ জুলাই বা ঠিক তার পরপরই এ ধরনের নির্দিষ্ট ‘হত্যার আদেশ’ দিয়েছিলেন।
এর পাশাপাশি কথোপকথনের প্রথম অংশের প্রসঙ্গে ওপরে যেভাবে বলা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, এ ধরনের কোনো আদেশ আদৌ দেওয়া হয়েছিল, এমন দাবি না কথোপকথনের পটভূমি সমর্থন করে, না এটি রাষ্ট্রপক্ষের নিজস্ব প্রমাণ।
কথোপকথনের এই অংশে হাসিনা যা বলছেন, সেটিকে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে হত্যা করার আদেশ হিসেবে না দেখে বরং তাঁর চিন্তার ধারাবাহিকতা হিসেবে বোঝাই বেশি যুক্তিসংগত হবে। অর্থাৎ, তিনি তখন কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন-সে বিষয়ে ভাবছিলেন এবং সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছিলেন।
এই চিন্তাভাবনার ধারাই শেষ পর্যন্ত ১৮ জুলাইয়ের একটি স্পষ্ট সিদ্ধান্তে গিয়ে শেষ হয়-যেদিন তিনি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করার অনুমোদন দেন।
এই ১৮ জুলাইয়ের আদেশটি নিয়ে পর্যাপ্ত ও শক্ত প্রমাণ রয়েছে (আড়ি পাতা কথোপকথন, সাক্ষ্য ইত্যাদি)।
উপসংহার
রায়ে হাসিনা-মাকসুদ কথোপকথন নিয়ে কোনো বিশদ আলোচনা নেই। ফলে ট্রাইব্যুনাল কীভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল কিংবা উল্লিখিত বিষয়গুলো তাঁরা আদৌ বিবেচনা করেছেন কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই।
সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, ট্রাইব্যুনাল রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্যকে পুরোপুরি ও প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করেছেন।
যেহেতু কথোপকথনটি প্রথম অভিযোগের জন্য মূল ও কেন্দ্রীয় প্রমাণ এবং যেহেতু এর ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনাল যে অর্থে নিয়েছে তার থেকে ভিন্ন ও যুক্তিসংগত ব্যাখ্যাও সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বিচারকদের সিদ্ধান্তের যুক্তি ব্যাখ্যা না করাটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
* ডেভিড বার্গম্যান, সাংবাদিক।
- ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david. bergman.77377
- ইংরেজি থেকে অনূদিত।
- মতামত লেখকের নিজস্ব।

Thursday, January 1, 2026
অপ্রকাশযোগ্য শোকের মৃত্যুগুলোর জন্য মেকি শোক by রাফসান গালিব
কোনো কোনো সমাজতাত্ত্বিকের মতে, সমাজ নির্দিষ্ট কিছু জীবনকে ‘শোকযোগ্য’ হিসেবে ফ্রেমিং করে থাকে এবং অন্যদের ‘অ-শোকযোগ্য’ হিসেবে। কার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া সমাজ কীভাবে প্রকাশ করছে, তাতেই শ্রেণি রাজনীতি বোঝাটা খুবই সহজ বলা যায়। সিয়াম মজুমদারের নামটা এখনো এ দেশের অধিকাংশ মানুষই জানে না। যে কয়জন জানে, তাদেরও এ কয় দিনে ভুলে যাওয়ার কথা বা অল্প কয়েক দিনেই ভুলে যাবে। সিয়াম মগবাজার এলাকায় একটি দোকানের কর্মচারী ছিলেন।
২৪ ডিসেম্বর চা আনতে গিয়ে উড়ালসড়কের ওপর থেকে ছোড়া ককটেলে প্রাণটা হারালেন। তাঁর শরীরের রক্ত-মাংস চায়ের দোকানের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েছিল। মানুষের মৃত্যু তো নিশ্চিত একটা ঘটনা। তাই বলে এতটা বীভৎস মৃত্যু, কল্পনা করা যায়! কারা ককটেল ছুড়ল, কারা একটা তরতাজা তরুণের প্রাণ কেড়ে নিল, তা হয়তো আমাদের কখনো জানা হবে না। ঘাতকেরা ঠিকই আরও মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকবে।
খুলনার গ্রাম থেকে সিয়ামের পরিবারটি ঋণগ্রস্ত হয়ে ঢাকায় এসেছিল। তাঁর বাবা রিকশা চালানো শুরু করেন। মা হয়ে যান আমাদের ভাষায় বাসাবাড়ির ‘কাজের বুয়া’। সিয়াম হয়েছিলেন দোকানের কর্মচারী। পরিবারের সবাই মিলে চেষ্টা করছিলেন ঋণমুক্ত হওয়ার। ছেলেকে হারিয়ে মা সিজু বেগমের বিলাপ, ‘আমি আর ঢাকায় থাকমু না। ঢাকায় আইস্যা সব শেষ হইয়্যা গেল।’ এই ‘জাদুর শহর’ ঢাকায় কেনই–বা তাঁরা আর থাকবেন!
এবার রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় আরেক হতভাগা ভ্যানচালক ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা করা যাক। চুরির অভিযোগে তাঁকে নির্যাতন করে মারা হয়েছে। শুনে নিশ্চয় ‘স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া’ কোনো গণপিটুনির মৃত্যুর কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এ হত্যার ঘটনা চরম নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়।
ভবানীগঞ্জের সিএনজি মালিক সমিতির সদস্যরা ওমর ফারুককে প্রথমে লোহার রড দিয়ে পেটাতে থাকেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে একটি প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে উভয় হাত ও পায়ে হাতুড়ি দিয়ে কয়েকটি লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তখনো মারধর চলতে থাকে। পানি পান করতে চাইলে নদীতে নিয়ে ওমর ফারুককে বিবস্ত্র করে চুবানো হয়। এরপর তাঁর পায়ুপথে শুকনা মরিচের গুঁড়া ঢেলে দেওয়া হয়।
নির্যাতনের একপর্যায়ে ওমর ফারুকের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে ওমর ফারুকের কাছ থেকে গাঁজা উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ওমর ফারুককে ১০০ টাকা অর্থদণ্ড ও ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
এরপর ওমর ফারুককে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাজশাহী কারাগারে পাঠায় পুলিশ। সেখান থেকে তাঁকে পরদিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২০ ডিসেম্বর ওমর ফারুকের মৃত্যু হয়।
ডার্ক কমেডি হিসেবে একটি কৌতুক আমরা প্রায় সবাই শুনেছি। কৌতুকটি হলো: পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী কী? উত্তর: মানুষ। ওমর ফারুককে যেভাবে ধাপে ধাপে বিবিধ নির্যাতন করে মারা হলো, তাতে ডার্ক কমেডিটা নিশ্চয়ই নিছক কোনো কৌতুক থাকে না, চরম বাস্তব হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়।
ওমর ফারুকের মতো কত কত মানুষের গণপিটুনি, মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতায় বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে বীভৎস মৃত্যু ঘটেছে বা ঘটছে—তা ভদ্র শ্রেণির বিবেকের দরজায় সামান্য টোকাও দেয় না।
সিয়াম মজুমদার, ওমর ফারুকের মতো আরও অনেকের মৃত্যু—আমাদের শোকের ব্যাকরণে তাঁদের জন্য কোনো অধ্যায় তো দূরের কথা, একটা ছোট অনুচ্ছেদই নেই। যেহেতু তাঁরা সমাজের সুবিধাভোগী অংশের অন্তর্ভুক্ত নন, ফলে তাঁদের মৃত্যু ‘অশোকযোগ্যই’ থেকে যায় আমাদের কাছে। আর মৃত্যুর সঙ্গে যদি কোনো ‘রাজনীতি’ যুক্ত না থাকে, তাহলে আরও বেশিই ‘অশোকযোগ্য’।
এসব মানুষের জন্য রাষ্ট্র নেই, সরকার নেই, নাগরিক সমাজ নেই, বুদ্ধিজীবী নেই, মানবাধিকারকর্মী নেই, রাজনৈতিক মহল নেই—কেউ নেই। মার্ক্সীয় তত্ত্বের আলাপ থেকে বলতে হয়, একটি কারখানার যন্ত্র নষ্ট হলে যেমন সমাজ শোক প্রকাশ করে না, কেবল সেটি মেরামতের কথা ভাবে, শ্রমিক বা কর্মজীবী এসব মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সমাজ একই আচরণ করে। সিয়াম বা ওমর ফারুকদের মৃত্যুতে এমনটিই তো দেখতে পাই। ‘সব শেষ হইয়্যা গেল’ মানুষগুলোর জন্য ‘প্রকাশযোগ্য শোক’ করতে না পারার ব্যর্থতা আমরা কোথায় লুকাব?
* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- rafsangalib1990@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ককটেল বিস্ফোরণে নিহত যুবকের বাবা আলী আকবর মজুমদার ঘটনাস্থলে আহাজারি করছেন। গত বুধবার রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে। ছবি: প্রথম আলো |
ভারতে বাড়ছে গণপিটুনি, পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই
ভিন্ন একটি দিন, ভিন্ন একটি রাজ্য, ভিন্ন একটি রোমহর্ষক গণপিটুনির ঘটনা। চলতি মাসে এটি নিয়ে এ রকম তিনটি ঘটনা ঘটল। তাই বলতে হয়, লজ্জা ও আতঙ্কজনক একটি পাদটীকা নিয়ে বছরটি বিদায় নিচ্ছে। এমন একটি বছর শেষ হতে চলেছে, যেখানে আমরা ‘অপর করে দেওয়া’ (আদারিং) ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে দেখছি। প্রশ্ন উঠেছে—তরুণ ও কর্মজীবী মানুষ কি নিজ দেশে নির্ভয়ে-নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন না?
উত্তরাখন্ডের একদল মানুষ সম্প্রতি দেরাদুনে এক তরুণকে ছুরিকাঘাত করে। ২৪ বছর বয়সী ভুক্তভোগী তরুণ এমবিএ শিক্ষার্থী ছিলেন। এক বছর ধরে তিনি ওই শহরে থাকছিলেন। তাঁকে নিয়ে বর্ণবিদ্বেষী কটূক্তি করা হলেও তিনি শান্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও হামলাকারীরা তাঁকে ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে। পরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান।
চলতি মাসে আরও দুজন পরিযায়ী শ্রমিক গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। একজন ওডিশায়। তাঁর বয়স ১৯-২০ বছর। আরেকজন কেরালা রাজ্যের ছত্তিশগড়ে। তাঁর বয়স ৩১ বছর। তাঁরা উভয়ে বাঙালি। তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা বাংলাদেশি ছিলেন না। এ দুই ঘটনা সারা দেশে প্রান্তিক পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আফ্রিকা ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার্থী ও শ্রমিকেরা কয়েক দশক ধরে দিল্লিসহ উত্তর ভারতের নানা রাজ্যে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকার বর্ণবাদ বা বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। উল্টো বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গি এবং চরম সহিংসতাকে পুলিশ প্রায় সময় ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে দায় সারে, যা আদতে বিচ্ছিন্ন নয়। এই বর্ণবাদ ও ‘আদারিং’–এর সুস্পষ্ট ধরন আছে। তারপরও এসবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না থাকায়, এসব ঘটনা এখন ঘন ঘন ঘটছে এবং নগ্ন-সহিংস রূপ নিচ্ছে।
ভারতীয় শিক্ষার্থীরাও বিদেশে, বিশেষ করে ট্রাম্পের আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। ভারতের সুবিধাভোগী ও উচ্চবিত্তরা পশ্চিমা দেশে নিজেদের ‘অ-শ্বেতাঙ্গ’ হিসেবে চিহ্নিত হতে দেখে এবং সেসব দেশে যেসব জনগোষ্ঠীর মানুষের দিকে অনেক সময় তাচ্ছিল্যভরে তাকানো হয়, সেই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের এক কাতারে দেখে হতভম্ব হয়ে যেতেন। কিন্তু তাঁরা এখন ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ—যা মাগা নামে পরিচিত) প্রচারের ধাঁচে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আদারিংয়ের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু অন্য দেশে ভুক্তভোগী হলেও নিজ সমাজে বিদ্যমান বর্ণবাদী মনোভাব নিয়ে আমরা চুপ।
সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফোর ট্রান্সফর্মিং ইন্ডিয়া বা নীতি আয়োগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্য পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এক লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু বর্ণ ও গায়ের রঙের প্রশ্নে বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা না গেলে, তা সম্ভব হবে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ অনেক দিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, তাঁরা নিজ দেশে আদারিংয়ের শিকার হচ্ছেন। মনে রাখতে হবে, এটা বৃদ্ধি হতে দিলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অনিবার্য।
আদারিং দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করলেও বছরের পর বছর ধরে সরকার বিষয়টির প্রতি উদাসীনতা দেখিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার ও ভুয়া খবর বা বাস্তব জীবনে বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। দেখা গেছে, অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে যায়। পুলিশ ও সরকার ঘটনা ঘটার পরই কেবল প্রতিক্রিয়া দেখায়।
বেশ কয়েক বছর আগে গুজব রটেছিল—‘শহরে অপহরণকারীরা’ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। তখন পুলিশের কঠোর মনোভাবের কারণে মিথ্যা প্রচার নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। রাজনৈতিকভাবে অস্থির পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কেরালার বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’–বিষয়ক জুজু অসহিষ্ণুতাকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আদারিং একধরনের পদ্ধতিগত বিষ। এর বিস্তার রোধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে সরকারকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক নাগরিককে একে অপরের কাছ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
![]() |
| গণপিটুনি। প্রতীকী ছবি |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
-c70033-720x405.webp)











