Wednesday, October 28, 2020

ছারপোকা ও মশা দূর করে কর্পূর

ঘর থেকে পোকামাকড় দূর করতে ব্যবহার করতে পারেন কর্পূর। জেনে নিন কীভাবে কর্পূরের সাহায্যে পোকামুক্ত করবেন ঘর।
বিছানার তোষক, ম্যাট্রেস, চাদর ঘণ্টাখানেক রোদে দেওয়ার পর একটি বড় কর্পূরের টুকরো কাপড়ে মুড়ে বিছানা ও ম্যাট্রেসের মাঝামাঝি রেখে দিন। বন্ধ হবে ছারপোকার উপদ্রব।
পিঁপড়া দূর করতে ক্ষতিকর কীটনাশকের বদলে ব্যবহার করুন কর্পূর। পানির সঙ্গে কর্পূর মিশিয়ে ঘরের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দিন। কর্পূরের গন্ধে বারই ছাড়বে পিঁপড়া।
ঘর থেকে মশা তাড়াতে কর্পূরের ট্যাবলেট ঘরের কোণে কোণে ছড়িয়ে দিন। মশা দূর হওয়ার পাশাপাশি ঘর থাকবে সুরভিত।

Wednesday, October 21, 2020

পাইলসের আধুনিক চিকিৎসা by অধ্যাপক ডা: এ কে এম ফজলুল হক

পাইলস রোগে মলদ্বার থেকে মাঝে মধ্যে রক্ত যায়। মলত্যাগের সময় অনেকের মলদ্বার ফুলে ওঠে আবার কারো কারো মাংসপিণ্ড ঝুলে পড়ে, যা আবার আপনা-আপনি ভেতরে ঢুকে যায় অথবা চাপ দিয়ে ঢুকিয়ে দিতে হয়।
যুগ যুগ ধরে এ জাতীয় রোগী প্রতারণার শিকার হয়ে আসছেন। অনেক হাতুড়ে চিকিৎসক আছেন, যারা বিনা অপারেশনে চিকিৎসার নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন। তারা অনেকে মলদ্বারে বিষাক্ত কেমিক্যাল ইনজেকশন দিচ্ছেন, যাতে মলদ্বারে মারাত্মক ব্যথা হয় এবং মলদ্বারের আশপাশে পচন ধরে এবং এ জন্য রোগী অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করেন।
পরিণামে কারো কারো মলদ্বার সরু হয় এবং বন্ধ হয়ে যায়। তখন পেটে মলত্যাগের বিকল্প পথ করে দিয়ে ব্যাগ লাগিয়ে দিতে হয়। আবার কোনো কোনো হাতুড়ে চিকিৎসক বিষাক্ত কেমিক্যাল পাউডার দেন যা মলদ্বারে লাগালেও মলদ্বার পচে ঘা হয়ে যায় এবং রোগীর একই পরিণতি হয়।
লেজার সার্জারির মাধ্যমে ধন্বন্তরি পাইলস চিকিৎসা হচ্ছে। বিষয়টি মোটেই সত্য নয়। কারণ, এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে লেজারের মাধ্যমে পাইলস চিকিৎসায় কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নেই। রিং লাইগেশন এবং লংগো অপারেশনের মাধ্যমে প্রায় ১০০ ভাগ রোগীর মলদ্বারে কোনো রকম কাটাছেঁড়া ছাড়া চিকিৎসা করা সম্ভব। প্রচলিত অপারেশনে মলদ্বারের তিনটি মাংসপিণ্ড কাটতে হয়, যা আজকাল আমরা শুধু তাদের জন্যই করি, যারা রিং লাইগেশনের জন্য উপযুক্ত নয় এবং লংগো অপারেশনের যন্ত্র কিনতে অক্ষম।
লেজার দিয়ে পাইলস অপারেশন প্রচলিত অপারেশনের মতোই। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, এ ক্ষেত্রে লেজার বিম দিয়ে কাটা হয় এবং প্রচলিত অপারেশনে সার্জিক্যাল নাইফ দিয়ে কাটা হয়। প্রচলিত অপারেশনের মতো লেজার অপারেশনেও তিনটি ক্ষত স্থান হবে। লেজার অপারেশনের পর সাধারণত অপারেশনের মতোই ব্যথা হয়, ঘা শুকাতে দু-এক মাস লাগে এবং প্রচলিত অপারেশনের মতো একই ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
পাইলস চিকিৎসার জন্য বহু ধরনের পদ্ধতি রয়েছে। যেমন- ইনজেকশন, রিংলাইগেশন, ইলেকট্রোকোয়াগুলেশন, আল্ট্রয়েড, ক্রায়োথেরাপি ইনক্রারেড ফটোকোয়াগুলেশন, এনাল ডাইলেটেশন, লেজার থেরাপি, প্রচলিত অপারেশন এবং লংগো অপারেশন। সব ধরনের পদ্ধতির মেরিট ও ডিমেরিট বিবেচনা করলে এবং বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সার্জনদের প্র্যাকটিস বিবেচনা করলে তিনটি পদ্ধতি বেশি প্রচলিত আর তা হচ্ছে রিংলাইগেশন, লংগো অপারেশন ও প্রচলিত অপারেশন।
>>>লেখক : বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব:) কলোরেকটাল সার্জারি বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩ সাতমসজিদ রোড, (স্টার কাবাব সংলগ্ন) ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩-৬

Tuesday, October 20, 2020

গরমে এনার্জি ড্রিঙ্কের চেয়ে উপকারী পানি

এনার্জি ড্রিঙ্কের চেয়ে উপকারী পানি
অনেকেই দিনে আট গ্লাস পানি পানের কথা বলেন। অনেকেই বলেন, ২৪ ঘণ্টায় কম করে দু-লিটার পানি পান করা উচিত। চিকিতসকেরা বলেন, যতটা পানি আপনি নিতে পারবেন ততটাই খাবেন। এবং পারলে বারেবারে পানি পান করুন। এতে যেমন, পানি পানের অভ্যেস তৈরি হবে তেমনি এই গরমে শরীরে পানির ঘাটতি মিটবে। একই সঙ্গে ঘাম, প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে সমস্ত দূষিত পদার্থ। যা এনার্জি ড্রিঙ্কও করতে পারে না। তাই সুস্থ থাকতে, তাজা থাকতে নিয়মিত পানিপান করুন । তাতে আখেরে লাভ আপনারই----
সারাদিন পানি খেলে কী কী উপকার মেলে :
১. ফোলাভাব কমায় : অনেকেরই ভুল ধারণা, বেশি পানি খেলে নাকি শরীর ফুলে যায়। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে আপনি একেবারেই পানি খাওয়া কমাবেন না। কারণ, প্রচুর পানি পান মানেই শরীরের দূষিত পদার্থ ঘাম, প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে এসে শরীরকে দূষণমুক্ত রাখে। এাড়া, শরীরে সঠিক পরিমাণে পনি থাকলে লালা নিঃসরণ বেশি হয়। এতে খাবার দ্রুত নরম হয়। চিবোতে সুবিধে হয়। আর হজমও হয় তাড়াতাড়ি। এছাড়া, গরমে শরীরে পানির ঘাটতি মেটাতে পারে নিয়মিত পানি পান। তাহলে আর দেরি কেন? শুরু হোক পানিপান।
২. অক্সিজেন জোগায় : শরীরে পানি বেশি থাকলে রক্তের মাধ্যমে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তত বেশি ভিটামিন, মিনারেলস আর অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়বে। ফলে, গরমেও আপনি সূর্যমুখী ফুলের মতোই তাজা। একই সঙ্গে মাসল ক্র্যাম্প থেকেও রেহাই পাবেন। এবার বুঝলেন, পানি কতটা উপকার করে শরীরের?
৩. শরীর ঠাণ্ডা রাখে : খুব গরমে এসি ছাড়াই ঠাণ্ডা থাকুন। কীভাবে? প্রচুর পানি পান করলে। যত পানি খাবেন ততই ঘাম হবে। আর তাতে শরীরের তাপমাত্রা কমবে। আরামে থাকবেন আপনিই।
৪. শরীরচর্চায় পানিচর্চা: দুটোই যদি একসঙ্গে চলে তাহলে রোজ যে সময় পর্যন্ত আপনি এক্সারসাইজ করেন তার থেকেও বাড়তি আধঘণ্টা এনার্জি পাবেন শরীরচর্চার। বিশ্বাস না হলে অবশ্যই পরীক্ষা প্রার্থনীয়।
৫. এনার্জি ড্রিঙ্ক বনাম পানি : কার্যকারিতা একই। বরং, অতিরিক্ত চিনি মেশানো এনার্জি ড্রিঙ্ক আখেরে ক্ষতি করে আপনার। এর বদলে পানি খেলে শরীর তাজা থাকে বেশি।
৬. ত্বক থাকে তুলতুলে : তুলোর মতো নরম ত্বকের স্বপ্ন সব মেয়েই দেখেন। এ ধরনের ত্বক পান শুধু তারাই, যারা নিয়মিত পানিপান করেন

ঝিঙে চাষের জন্য কোন মাটি বেশি ভালো?

ঝিঙে বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় গ্রীষ্মকালীন সবজি। তরকারি বা ভাজি হিসেবে এটি খুবই সুস্বাদু। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই ঝিঙে চাষ হয়। বাড়ির আঙিনায় বা আশেপাশে ঝিঙে চাষ করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবারের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে চাষের জন্য দরকার উপযুক্ত মাটি।
কৃষিবিদরা জানান, দীর্ঘ সময় উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া, প্রচুর সূর্যের আলো থাকে এমন জায়গা ঝিঙে চাষের জন্য উত্তম। এছাড়া সুনিষ্কাশিত উচ্চ জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ দোঁআশ মাটি ঝিঙে চাষের জন্য উপযুক্ত। এতে হেক্টর প্রতি ১০-১৫ টন ফলন হতে পারে।
তাই ঝিঙে চাষে সেচ ও নিকাশের উত্তম সুবিধাযুক্ত এবং পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এমন জমি নির্বাচন করতে হবে। একই গাছের শেকড় বাড়ার জন্য জমি এবং গর্ত ভালোভাবে তৈরি করতে হয়। এ জন্য জমিকে প্রথমে ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যেন কোন বড় ঢিলা ও আগাছা না থাকে।
জমিতে বেডের উচ্চতা হবে ১৫-২০ সেন্টিমিটার। বেডের প্রস্থ হবে ১.২ মিটার এবং লম্বা জমির দৈর্ঘ অনুসারে সুবিধামত নিতে হবে। এভাবে পরপর বেড তৈরি করতে হবে। এভাবে পাশাপাশি দু’টি বেডের মাঝখানে ৬০ সেন্টিমিটার ব্যাসের সেচ ও নিকাশ নালা থাকবে। ফসল পরিচর্যার সুবিধার্থে প্রতি দু’ বেড পরপর ৩০ সেন্টিমিটার প্রশস্ত নালা থাকতে হবে।
মাটিতে মাদার আকারে ৫০ সেন্টিমিটার করে ব্যাস, গভীরতা ও তলদেশ রাখতে হবে। ৬০ সেন্টিমিটার প্রশস্ত সেচ ও নিকাশ নালা সংলগ্ন উভয় বেডের কিনারা থেকে ৬০ সেন্টিমিটার বাদ দিয়ে মাদার কেন্দ্র ধরে ২ মিটার পরপর এক সারিতে মাদা তৈরি করতে হবে। প্রতি বেডে এক সারিতে ১৬-১৭ দিন বয়সের চারা লাগাতে হবে।
এ প্রক্রিয়ায় ঝিঙের ভালো জাত উর্বর মাটিতে ভালোভাবে চাষ করতে পারলে হেক্টর প্রতি ১০-১৫ টন (শতাংশ প্রতি ৪০-৬০ কেজি) ফলন পাওয়া সম্ভব।

Friday, October 16, 2020

এ যুগের সিনড্রেলা- সত্য ঘটনা অবলম্বনে by জিনিয়া জাহিদ

রেহানা আমার ছোটবেলার বান্ধবী। ওরা চার ভাই, চার বোন। রেহানা ছিল ভাইবোনের মধ্যে ছয় নম্বর। বাবা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। রেহানা যখন ক্লাস সেভেনে পড়ে, তখন ওর বাবার চাকরি চলে যায়। হাঁপানির টানের কারণে তিনি ক্লাসে পড়াতে পারতেন না। বাধ্য হয়েই রেহানার বড় দুই ভাই পড়াশোনা ছেড়ে সংসারের হাল ধরেন।
রেহানা রংপুরের রোকেয়া কলেজে ইসলামের ইতিহাসে অনার্সে ভর্তি হয়। আমি ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে রংপুর ছেড়ে চলে আসি। ভার্সিটির ছুটির ফাঁকে ওর সঙ্গে দেখা হতো।
ধীরে ধীরে রেহানার দুই বোনের বিয়ে হয়ে যায়। বড় দুই ভাইও বিয়ে করেন। বউ দুটি প্রায় সারা দিনই উচ্চ স্বরে ঝগড়া করতেন। মেজ ভাইটির আর্থিক অবস্থা একটু ভালো। তিনি আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে চলে যান। রেহানার ইমিডিয়েট বড় বোনটা কালো আর খুব শুকনা হওয়ার কারণে তার বিয়ে দিতেও ঝামেলা হচ্ছিল। রেহানার বাবা-মা তাই রেহানার বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজা শুরু করেন।
রেহানা দেখতে খুবই সুন্দরী। সত্যি বলতে কি, তাদের আট ভাই-বোনের মধ্যে সে সম্পূর্ণ অন্য রকম। এত অভাবের মধ্যেও পড়াশোনা ছেড়ে দেয়নি। খুব মিশুক আর শান্ত স্বভাবের। মাথায় কাপড় দিয়ে চলাফেরা করে।
রেহানা এত সুন্দর হলেও ওর বিয়ের প্রস্তাবগুলো শুনে আমার সত্যি খুব রাগ লাগত। ওর ফ্যামিলির অবস্থা খারাপ হওয়ার জন্যই কি ওর থেকে বয়সে দ্বিগুণ-তিন গুণ, এক বাচ্চার বাপ, ডিভোর্সি কিংবা বিপত্নীক লোকের প্রস্তাব আসবে? কেন কারখানার একটা মেকার, যে এইট পাস, সে একটা অনার্স পড়ুয়া শিক্ষিত মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেবে? ভদ্র ফ্যামিলির শিক্ষিত একটি ছেলে, যার একটি ভালো চাকরি আছে এমন প্রস্তাব কেন আসবে না?
আমি নিজেই আমার অনেক আত্মীয়, ভার্সিটির পরিচিতদের অনেকে যাঁরা পাত্রী খোঁজার কথা বলতেন, তাঁদের ওর ছবি দেখিয়েছিলাম। সবাই একবাক্যে ওকে দেখে মুগ্ধ। কিন্তু ফ্যামিলিগতভাবে গেলেই সব বিয়ের কথা থমকে যেত। বাবা কিছু করে না, ভাইয়েরা পরিচয় দেওয়ার মতো নয়, বোনের জামাইগুলো সব কেমন যেন। এহেন ফ্যামিলিতে আত্মীয়তা করতে কেউ-ই আগ্রহী নয়।
সেবার যখন ছুটিতে বাড়ি গেলাম, ও আমাকে পেপারের একটি কাটিং দেখিয়ে বলল, এই চাকরিটার জন্য ও কয়েক মাস আগে অ্যাপ্লাই করেছিল। এখন ইন্টারভিউর চিঠি এসেছে। বাংলাদেশের খুব নামকরা একটি কোম্পানির ছোট একটা পোস্ট। শিক্ষাগত যোগ্যতা এইট পাস!
রেহানা তারপরও এই চাকরিটার জন্য চেষ্টা করতে চায়। ছোট দুই ভাইয়ের পড়ালেখা প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়। বাবা-মা দুজনেই অসুস্থ। খাবার জোটে না তো ওষুধ কিনবে কীভাবে।
কিন্তু ইন্টারভিউর জন্য ঢাকা যেতে হবে। বাসভাড়া নেই। ভালো একটা জামা নেই। সস্তা ফুটপাতের স্যান্ডেলটাও ছেঁড়া।
ওকে বললাম, তুই চিন্তা করিস না। আমার সঙ্গেই চল। বাসভাড়া আমি দেব। আমার ভার্সিটির হলে থাকবি। আর কাপড়চোপড় আমার একটা পরে নিস। হলে গেলে তোর পায়ের মাপের স্যান্ডেলের অভাব হবে না। সে রকম দেখলে গাউছিয়া থেকে কিনে নেব।
নভেম্বর মাসের সুন্দর এক সকালে আমরা দুজন ঢাকার পথে রওনা হলাম। ওর ইন্টারভিউ ছিল দুদিন পরে। ইন্টারভিউ বোর্ডে যাওয়ার জন্য ঈদের সাদা থ্রিপিসটা ওকে পরতে দিলাম। গাউছিয়া যাওয়ার টাইম নাই। হলের রত্না আপুর পায়ের সাদা কারুকাজ করা স্যান্ডেল, নিশার সাদা পাথরের কানের দুল আর হালকা মেকআপ রেহানাকে লাগছিল সাদা একটা অপ্সরী।
সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে যথাসময়ে ইন্টারভিউ দিতে নিয়ে গিয়েছিলাম। অনেকক্ষণ পর যখন ও ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বেরিয়ে এল, ম্লান একটা হাসি দিয়ে বলল, নাহ্, হবে না। মামা-চাচা না থাকলে ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি হয় না রে। খামাখা তোর পয়সা নষ্ট করলাম। আমি বললাম, ব্যাপার না। তুই পাস করলে কোথাও না কোথাও এমনিতেই হয়ে যাবে।
দুই দিন পর রেহানা রংপুরে ফিরে যায়।
এর প্রায় দুই মাস পর রেহানার ফোন। হ্যালো বলতেই ওপ্রান্তে চিৎকার করে রেহানা বলে, শোন, আমার চাকরিটা হয়েছে। ফুলটাইম, পারমানেন্ট। সুযোগ-সুবিধা শুনলে মাথা ঘুরে পড়ে যাবি। আনন্দে চিৎকার দিয়ে বললাম, বলিস কী! কবে জয়েনিং?
এই মাসের ২৫ তারিখ। বিশাল দুই মাইক্রোবাসে করে বাসায় এসে জয়েনিং লেটার দিয়ে গেছে। আমার জয়েনিংয়ের দিন তোকে কিন্তু আসতেই হবে।
আমি বোকার মতো বললাম, মানে কী? হো হো করে হেসে রেহানা বলল, ওই দিনের ইন্টারভিউ বোর্ডে, ভাঙা ঘরের এই ঘুঁটেকুড়ানি ধার করা জামাজুতা পরে রাজা-রানিমা আর রাজপুত্তরের নাকি মন জয় করে নিয়েছে।
রাজা-রানি আমাকে তাদের ছেলের বউ করার প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। রাজপুত্রও এসেছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম, হয় পাত্র পাগল, না হয় নির্ঘাত কোনো ঘাপলা আছে। কিন্তু পরে সবাই খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে, কোনো সমস্যাই নেই। তারা নাকি আমার মতো মেয়েই অনেক দিন ধরে খুঁজছিল। বিয়েতে সমস্ত খরচ তারাই দেবে। এখন তুই বল, আমি কি এ যুগের সিনড্রেলা নই?
ফোন রেখে মনে মনে বললাম, দোয়া করি বড়লোকের রাজপুত্র তোকে যেন তার মনের রানি করে রাখে। এ যুগের নয়, সে যুগের সিনড্রেলার মতোই রেহানা যেন সুখে থাকে আজীবন।
>>>বি. দ্র. প্রিয় পাঠক, এ যুগের সিনড্রেলা কি সত্যি সে যুগের সিনড্রেলার মতো আছে? সে গল্প তোলা থাক আরেক দিনের জন্য।

Thursday, October 15, 2020

গল্প- মীমাংসিত পথ by আনোয়ারা আল্পনা

আজ রাতে ঢাকার তাপমাত্রা ছত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গরমের হিসাবের বেলায় এখনও জুনের চেয়ে জ্যৈষ্ঠ ভালো শোনায়। কিন্তু একশো ডিগ্রিতে জ্বর কেবল শুরু হয়। তাহলে ছত্রিশ খুব বেশি তো নয়। আর জ্যৈষ্ঠের গরম তো লাগবেই, কত রকমের ফল পাকবে বলে অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু জ্বর আর ফল পাকাপাকির দোহাইয়ে কাজ হল না, নিজের নামও ঠাণ্ডা করতে পারল না তুষারকে। লুঙ্গি পরে খালি গায়েও দরদর করে ঘামতে লাগল সে। ফ্যানের বাতাসে বুকের ঘন লোম হালকা দোলে, কিন্তু চিত হয়ে শুয়ে থেকেও ঘাম গড়িয়ে পরে বিছানায়। তুষার বুঝতে পারে না, এত গরম লাগা কোনো অসুখের লক্ষণ কি না—পয়ত্রিশ বছর বয়সে হার্ট বিগড়াবে? মনে করতে চেষ্টা করে, এমন গরম আগেও লেগেছে কি না। কিন্তু তার মনে হয়, এমন গরম আগে কখনও লাগে নাই। দিনে একবারই গোসল করে সে, কিন্তু আজ ঘরের লাইট অফ করে, লুঙ্গি খুলে খাটের উপরে রেখে বাথরুমে ঢুকল। গরম হয়ে আছে বাথরুমের দেয়াল, গোসল না করেই বেরিয়ে এল। লুঙ্গি, গামছা নিয়ে ডাইনিং লাগোয়া বাথরুমে ঢুকল। এটার দেয়ালে সরাসরি রোদ লাগে না। মনে হল যেন এটা একটু ঠাণ্ডা। শাওয়ার ছেড়ে মাথা পেতে দাঁড়ালো। প্রথমে গরম পানি ঝাপিয়ে পড়ল গায়ে, সে সরে দাঁড়াল। মিনিট পাঁচেক পরে খানিক ঠাণ্ডা পানি এল। আজ সারাদিন ‘ভেজা কাপড় দলাপাকা অবস্থায় শুকানো’ রোদ গেছে। ছোটবেলায় তুষারের দাদি একদিন গল্প করেছিল, নতুন বউকালে একদিন জ্যৈষ্ঠ মাসের সকালে বাড়ির পেছনের পুকুরে গোসল করে খড়ির ঘরের পেছনে কাপড় বদলে, ভেজা কাপড় দলা করে রেখেছিল। শ্বশুর, ভাসুর বেরিয়ে গেলে তবে উঠানের দড়িতে শুকাতে দেন শাড়ি। সেদিন আর মনে নাই। বিকালে মনে পড়লে গিয়ে দেখেন, দলা পাকানো অবস্থায়ই শুকিয়ে গেছে শাড়ি।

গোসল শেষ করে গা না মুছেই বেরিয়ে এল তুষার। পুরা বাসার লাইট অফ করে ভেজা গায়ে লুঙ্গি না পরে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে হাঁটাহাঁটি করল কিছুক্ষণ। কেবল আটটা বাজে। আজ অন্যদিনের চেয়ে আগে অফিস থেকে ফিরেছে সে। সোহানা চলে যাওয়ার পর এত তাড়াতাড়ি ফেরে না। অফিসের পরে আড্ডা দিতে যায়, কোনো কোনও দিন একটু আধটু মদও খায়। দশটার পর বাসায় ফেরে। কিন্তু দুইদিন হলো অফিসে কাজ কমে গেছে তার। সপ্তাহ খানেক আগে নতুন একটা ছেলে জয়েন করেছে, হঠাৎ করে। তুষার অবাক হয়ে লক্ষ করেছে, ছেলেটা আইটির! তাদের অফিসে আইটির এত কাজ নেই যে আরো একজন লোক লাগবে। বিকালে ক্যান্টিনে চা খেতে খেতে তার মনে হয়েছে, তাহলে পুরানাদের কেউ ছাঁটাই হচ্ছে? কে?

সাড়ে আটটার দিকে সে সোহানাকে ফোন করল, প্রায় তিন মাস পর। বলল, ‘একটু আসো না, কিছুই ভালো লাগতেছে না আমার।’

সোহানা বলল, ‘মানে কী? তুমি আমাকে আর এভাবে ডাকতে পার?’

তুষার আবার বলল, ‘আসো প্লিজ!’

সোহানা ‘না’ বলে ফোন কেটে দিল।

এবার লুঙ্গিটা পড়ল সে। কিন্তু তবু লাইট জ্বালল না। ওয়্যারড্রবের উপরের ড্রয়ার খুলে একটা কনডমের প্যাকেট নিল। প্যাকেট ছিঁড়ে ডাইনিংয়ের বেসিনে গিয়ে কনডমটা লম্বা করে কল খুলে, কলের মুখে কনডমের মুখ ধরল। খানিক ভরে এলে কনডমের মুখ চেপে ধরে কল বন্ধ করল। তারপর অন্য হাত কনডমসহ উঁচু করা হাতের নিচে ধরল। না পানি পড়ছে ন। মানে এটাও ফুটা নয়। গত তিনমাসে প্রত্যেক রাতে সে একটা করে কনডমের ফুটা চেক করেছে।

তিন মাস আগে বাসা ছাড়ার আগে সোহানার সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল, ‘তোমার তাইলে যিশু খ্রিস্ট আসতেছে?’ এটা শুনে একটাও কথা বলে নাই সোহানা। সকালে নাস্তার টেবিলে এই তাদের শেষ কথা। তারপর দুজনেই অফিসে বেরিয়ে গেছে। রাতে ফিরে তুষার দেখেছে, নিজের জামা কাপড় নিয়ে গেছে সোহানা। তিন বছরের সংসার তাদের। এ বাসার অনেক কিছুই তাদের দুইজনের যৌথ টাকায় কেনা। সাতদিন পরে তুষার টেক্সট পাঠাল—‘আসবা না?’ জবাবে সোহানা লিখেছিল—‘ইটস সেপারেশন, যিশু এসে গেলে ডিভোর্স।’ তুষার লিখল, ‘জিনিসপত্র ভাগাভাগি হবে না?’ পরের দিন সোহানা টেক্সট করেছিল, ‘না, বাসা ভাড়া তুমি বেশি দিছ, কাজেই শোধবোধ।’

গোসলের পর কিছুক্ষণ আরাম লেগেছিল, আবার গরম লাগছে। এখন মনে হচ্ছে চল্লিশ-টল্লিশ হয়ে গেছে তাপমাত্রা। তুষার জিভ বের করে কুকুরের মতো হাঁপাতে শুরু করল। মনে মনে ঠিক করল, কাল ব্যাংক একাউন্ট চেক করে দেখবে, হাজার পঞ্চাশেক থাকলে, কালকেই একটা এসি কিনে ফেলবে।

বিয়ের আগেই বলেছিল তুষার, ‘আমরা কিন্তু বাচ্চাকাচ্চা নেব না, ওকে? না হাইসো না, আমি সিরিয়াস। বাচ্চাকাচ্চা সারা জীবনের জন্য চব্বিশ ঘণ্টার ডিউটি। আর বাবা-মা হওয়াকে অত মহান আর আনন্দদায়ক ভাবার কিছু নাই, এটা আরোপিত।’ সোহানা তখন ভেবেছিল, এখন এটা বলছে, বিয়ের পর দেখা যাবে তুষারই বাবা হওয়ার জন্য অস্থির হয়েছে বেশি। কিন্তু বিয়ের পর দেখেছে সত্যিই কনডম ছাড়া একদম নড়ে না সে। পিরিয়ডের পর কয়েক দিনের নিরাপদ সময়েও সে কনডম ছাড়া কাছে আসে না। চার মাস আগে যেদিন সোহানা হাসতে হাসতে বলেছে, ‘আমি প্রেগন্যান্ট’ তখন তুষার বলেছে, ‘হাউ?’ সোহানা চোখ টিপে বলেছে, ‘ফুটা ছিল মনে হয়!’ তারপরের একমাস সোহানা খুব খুশি ছিল, তুষারকে প্রায়ই নাম খুঁজতে বলত। সোহানা যেদিন বাসা ছেড়ে চলে গেল, সেদিন সকালে তুষার বলেছিল, ‘তোমার তাহলে বাবা ছাড়া বেবি আসতেছে? যিশু রিটারন্স?’ তখনই আসলে সোহানা বুঝেছিল তুষার কনডমেই আটকে আছে।

রাত প্রায় এগারোটা বাজে। আবার গোসল করতে ঢুকল তুষার। কিছুতেই গরম কমছে না। ভাবল, প্রেসারটা একটু চেক করা দরকার ছিল মনেহয়। নিচে গলির মাথার রনদা ফার্মেসিটা এখনও খোলা আছে কি না কে জানে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে শার্ট গায়ে দিয়ে লুঙ্গি পরেই নিচে নামল। দারোয়ানকে বলল, ‘গেট লাগাইও না, ওষুধের দোকান থেকে আসতেছি।’ দারোয়ান বলল, ‘ভাইজানের শরীরটা খারাপ? যেই গরম পড়ছে, বাপের জম্মে এমুন দেহি নাই।’ মাথা নেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে তুষার ভাবল, গরম তাইলে আমার একারই লাগতেছে না! ফার্মেসি খোলাই ছিল, ছেলেটা চেনা, যেতে আসতে দেখা হয়। বলল, ‘প্রেসারটা একটু দেইখা দে তো।’

প্রেসার মাপার সময় তুষার খেয়াল করল, থরথর করে হাত কাঁপছে ছেলেটার। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, মুখটা ভয়ে সাদা। সে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হইছে রে?’ ছেলেটা তুষারের কানের কাছে মুখ নামিয়ে বলল, আপনার ক্রশফায়ার ঠিক আছে ভাইজান, তাড়াতাড়ি বাসায় যান।’ তুষার অবাক হয়ে বলল, ‘কী বললি?’ ছেলেটা আবারও ফিসফিস করে বলল, ‘কিছু না ভাইজান, বাসায় যান।’ তুষার বলল, ‘কয়েকটা ঘুমের ওসুধ দে, ঘুম আসতেছে না।’ তারপরেই বলল, ‘কনডমে কি ফুটা থাকতে পারে রে?’ ছেলেটা বিড়বিড় করে বলল, ‘মানুষেই ফুটা ফুটা হয়া যায়, আর পেলাস্টিক!’ তারপর চারটা ঘুমের অসুধ দিয়ে বলল, ‘প্রেসক্রিপশন ছাড়া আর দেওন যাইব না।’ ঘুমের অসুধ পকেটে ভরে বাসার দিকে হাঁটতে হাঁটতে তুষারের মনে হল, ছেলেটা আবোল-তাবোল বকতেছিল কেন? বাসার গেটে ঢোকার সময় দারোয়ান বলল, ‘কিচু দেকলেন নাকি ভাইজান?’ তুষার বলল, ‘না, কী দেকব?’ এবার দারোয়ানও বিড়বিড়ালো, ‘মনে হয় পটকার আওয়াজ হুঞ্চিলাম ইট্টু আগে!’ তুষার বলল, ‘খেলা-টেলা আছে মনে হয়।’

বাসায় ঢুকে আবার খালি গা হয়ে গেল সে। মনে হচ্ছে গরম একটু কমেছে। খালি পেটেই দুইটা ঘুমের অসুধ খেয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুম বারে বারে এল, ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে গেল। যখন এসে চোখের পাতায় বসে তখন মনে হয় তলিয়ে যাবে, আবার ভুশ করে ভেসে ওঠে। এই চলল কয়েক ঘণ্টা। ভোরের দিকে খানিক গড়াগড়ি করে উঠে পড়ল, ভাবল, অনেকদিন হাঁটতে যাওয়া হয় না, আজ যাই। সোয়া পাঁচটার সময় বেরিয়ে পড়ল সে। রনদা ফার্মেসি পেরিয়ে স্কয়ার হাসপাতালের দিকে যাবে ভাবতে ভাবতে ফার্মেসির থেকে একটু সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। মাটিতে লাল, পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়েছে, তবু কালচে লাল হয়ে আছে। হাঁটতে হাঁটতে দেখল, একটা বন্ধ চায়ের দোকানে টিনের বেড়ায় ‘পাসওয়ার্ড’ নামের এক সিনেমার পোস্টার সাঁটা। স্কয়ার হাসপাতাল পেরিয়ে বত্রিশ নম্বরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, অফিসে যাব না আজ, এসি কিনতে যাব। এসি লাগাতে সারাদিনই লাগবে মনে হয়। সাত নম্বর ব্রিজ পেরিয়ে ধানমন্ডি লেকের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কলাবাগান মাঠের উল্টা দিকে দাঁড়িয়ে ভাবল, এখানে কী যেন বেশি আছে। এই সকালবেলা ধানমন্ডি লেক স্বাস্থ্যওয়ালাদের খ্যাক-খ্যাক করে হাসা আর পাই-পাই করে হাঁটার জায়গা, ঘামের লোভে লোভী মানুষের ভীড়ে কলাবাগান মাঠের উল্টা দিকের বেঞ্চিতে বসে আছে এক তপ্ত জুটি। দুইজনে মিলে চল্লিশের বেশি হবে না, কিন্তু ঝগড়া লেগেছে আশি কেজি ওজনের। সারারাত মনে হয় ঘুমায় নাই দুইজন, ওদের পেছেন দিয়ে হাঁটার গতি কমিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তুষার শুনল, ‘পাসওয়ার্ড দাও!’ ঝট করে তার মনে হল, তাহলে এ ধরনের প্রেমের সিনেমাই ওটা?

তারপরেই ভাবল, সোহানা কয়েকমাস আগে অফিসের কাজে সিঙ্গাপুর গেছিল, ও কি ওখান থেকেই স্পারম কিনছে?

হাঁটতে হাঁটতে আট নম্বর ব্রিজের ডানপাশের কোনার কামরাঙ্গা গেট দিয়ে বেরিয়ে, ব্রিজ পেরিয়ে ডানদিকে হাঁটতে হাঁটতে বায়তুল আমান মসজিদের কোনা দিয়ে আবারও ঢুকে পড়ল লেকের সীমানায়। অনেকদিন পর্যন্ত তুষার জানত না এখানে লেক অন্যদিকের তুলনায় বেশি সুন্দর। লেকের ওই পারের সুধা সদন পাহারা দেওয়ার জন্য এখানে একটা তাবু আছে। দুইজন পুলিশ বা আনসার থাকে। পোশাকের রঙ দেখে এখনও নিরাপত্তা বাহিনীর নাম আলাদা করতে পারে না সে। এইখানে লেকের পাড়ের সামান্য অংশ, ডিশের তারের মতো কালো মোটা তার দিয়ে আলাদা করা। বাকি লেক এবং লেকার পাড় আম জনতার জন্য উন্মুক্ত। তুষার ভাবল, আচ্ছা, সুধা সদনে এখন কে থাকে?

রোদ উঠতে শুরু করলে আবার গরম লাগতে থাকল তার। ফিরে যাবার রাস্তা ধরল। আবার সাত নম্বর ব্রিজের দিকে যেতে যেতে ভাবল, দুইটা মসজিদই সুন্দর। সাত নম্বর ব্রিজ পেরিয়ে তাকওয়া আর আট নম্বর ব্রিজ পেরিয়ে বায়তুল আমান। দুইটাই বিশাল আয়তনের। দুই মসজিদে রেষারেষি আছে না কি? না কি, এই বড়লোকদের এলাকায় সত্যিই এত লোকে নামাজ পড়ে? বত্রিশ নম্বরের বকুল গাছগুলার নিচ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, সোহানার সঙ্গে একবার দেখা করতে যেতে হবে। একবার কি বলবে, কেনা স্পার্মের বাবা হতে আপত্তি নেই আমার?

বাসায় ফিরে খিচুরি বসিয়ে দিয়ে গোসল করতে ঢুকল তুষার। এবার শোবার ঘরের লাগোয়াটাতেই। গায়ে পানি পড়তেই বুঝতে পারল, পুরা শরীর জুড়ে খিদা লেগেছে। কাল দুপুরের পর থেকে কিছু খাওয়া হয় নাই। নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে একটু যেন পিঠ ব্যথাও করছে, মানে এসিডিটি। নিজেকেই প্রশ্ন করল, সোহানার জন্য বেশি ফাঁকা লাগছে আমার? গোসল করে বেরিয়ে বুঝতে পারল, ক্লান্ত লাগছে খুব। পেট ভরে খিচুরি খেয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল সে।

ঘুম ভাঙল মেরিনা আপার ফোনে—কই তুমি? বসের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে ঘড়ি দেখল, সাড়ে দশটা বাজে। বলল, ‘মেরিনা আপা, আজ অফিসে আসব না, একটু সামলাইয়েন, খুব গরম, এসি কিনতে যাব আজ।’ মেরিনা আপা একটু যেন কী চিন্তা করল, নিঃশ্বাসের শব্দ শুনল সে। বলল, ‘শোনো তুষার, এসি কিনো না, এইতো আষাঢ় মাস এসেই গেল, বৃষ্টি শুরু হবে। সেভিংস শেষ কোরো না, তোমাদের না বেবি আসতেছে?’ দম নিয়ে বলল, ‘নতুন ছেলেটাকে দেখছ? কাজে খুব ভালো।’ তুষার এবার ধুম করে প্রশ্ন করেই ফেলল, ‘আমার চাকরি যাইতেছে?’ ফোনের ওপাশে বসের মুখ কেমন হল ভাবতে চেষ্টা করল সে। মেরিনা আপা বলল, ‘তুমি অফিসে আস, কথা আছে। রাখলাম, বাই।’

অফিসের জন্য রেডি হতে হতে ফোন বাজল আবার। অচেনা নম্বর এবার, ধরল না। তালা লাগিয়ে নিচে নেমে রিক্সায় উঠে একটু আগে আসা নাম্বাটায় ফোন করল। কথা বলল সোহানা, অবাক হল তুষার। সোহানা নম্বর বদলেছে এবং নিজে থেকে ফোন করেছে দুইটাই অবাক করল তাকে। তুষার বলল, ‘নম্বর বদলাইছ নাকি?’ সোহানা বলল, ‘তোমার বাসার নিচে ফার্মেসিটার সামনে কাল রাতে এগারোটার দিকে এক ডাক্তার খুন হয়েছে, জান?’ তুষার প্রায় চিৎকার করে বলল, ‘আমি তো এগারোটার দিকেই ওই ফার্মেসিতে গেছিলাম, কই কিছু তো দেখি নাই?’ সোহানা বলল, ‘ওই ডাক্তার আমার এক কলিগের হাজবেন্ড।’ তারপর জানতে চাইল, ‘কালরাতে ভালো লাগতেছিল না বললা, এখন কী অবস্থা?’ তুষার বলল, ‘এখন ঠিক আছি, আচ্ছা সোহানা, স্পার্ম কি সিঙ্গাপুর থেকে কিনছ?’ সোহানা ফোন কেটে দিল না, শান্ত গলায় বলল, ‘এই বাচ্চাটা যেভাবেই আসুক, সে তোমার পরিচয় নেবে না, কেন এটা নিয়া ভাবতেছ?’ তুষার বলল, ‘কিন্তু ওর কারণে তুমি চলে গেছ, তোমাকে তো চাই আমি!’ এবার সোহানার গলায় হতাশা, ‘তুমি কী চাও? আমি ওকে নষ্ট করে ফেলি?’ তুষার বলল, ‘না তা চাই না, শুধু বলো ও কীভাবে এসেছে!’ সোহানা বলল, ‘এখন ফোন রাখব, তুষার। বাই।’

অফিসে ঢুকতেই নতুন ছেলেটার সঙ্গে দেখা, হেসে সালাম দিল, বলল, ‘সাবলেটে একটা রুম খুজতেছি ভাইয়া, খোঁজ থাকলে জানায়েন।’ ‘আচ্ছা’ বলে নিজের টেবিলের দিকে যেতে যেতে অবাক হয়ে ভাবল, আমার রিপ্লেসমেন্ট আমার হেল্প চায়! টেবিলে বসতেই চা দিয়ে গেল। চায়ের মগে হাত দিতে না দিতেই মেরিনা আপা এসে বললেন, ‘একটু আমার সঙ্গে আস, নিচে যাই।’ তুষার বলল, ‘চা টা খেয়ে যাই?’ মাথা দুইদিকে নাড়লেন আপা, ‘না, আসো কফি খাওয়াবো।’ অফিসের নিচে নেমে পাশেই একটা কফিশপে বসল তারা। আপা নিজেই কফি নিয়ে এসে বসলেন, চিনি মিশিয়েও দিলেন। বললেন, ‘তুষার, আমি একটা অফিসে কথা বলে রাখছি, কাল সকালে যাবা, হয়ে যাবে।’ তুষার বলল, ‘কিন্তু আমার চাকরি ক্যান গেল, বলবেন না?’ আপা বললেন, ‘অফিস আমাকে বাজেট কমাতে বলছে, নতুন ছেলেটাকে খুব কম বেতনে পেয়ে গেছি।’ তুষার ধুম করে বলল, ‘কনডমে কি ফুটা থাকতে পারে?’ আপা কফির মগ ঠোঁটে তুলেছিলেন, হাত কেঁপে গেল, চুমুক না দিয়েই নামিয়ে রাখলেন, প্রাণপণ চেষ্টা করলেন স্বাভাবিক থাকতে, কফি ছাড়াই ঢোক গিলে বললেন, ‘সোহানা কোথায়?’ তুষার মনে মনে মেরিনা আপার বুদ্ধির প্রশংসা করল, বলল, ‘সোহানা বনশ্রী, মায়ের বাসায়।’ এর পরের প্রশ্ন তো রেডিই, ‘কবে গেছে?’ তুষার কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘তিনমাস।’ ‘বিয়ে ভাঙতেছে তোমাদের?’ সরাসরি এই প্রশ্ন করলেন আপা। তুষার ভাবল, মানে এটা তাহলে বিয়ে ভাঙার মতোই গুরুতর ব্যপার? বলল, ‘আমিতো চাই না, সোহানা মনে হয় চায়।’ আপা বললেন, ‘ভাঙাই ভালো, তোমার মাথায় যদি এটা এসে থাকে, তাহলে একসঙ্গে থাকলে জটিলতা শুধু বাড়বেই।’ তারপরেই ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন, ‘চলো অফিসে যাই।’ কাল কোন অফিসে যেতে হবে সেটা নিয়ে আর কথা হল না।

অফিস থেকে বেরিয়ে আড্ডা দিয়ে রাত দশটার দিকে সে যখন বাসার গলিতে ঢুকল, তখন গলিটা অন্যদিনের চেয়ে ফাঁকা লাগল। ফার্মেসিতে বসে আছে ছেলেটা। তুষারকে দেখে বলল, ‘ঘুম হইছে ভাইজান?’ তুষার দোকানে উঠে গেল, বলল, ‘কাল কী হইছে রে?’ তুষার কালকের মতোই ফিসফিস করে বলল, ‘লোকটা আপনার বাসার ঠিকানা বইলা কোন বাসা জানবার চাইছিল, আমি কইছিলাম, হের পরে দোকান থাইকা রাস্তায় নামার লগে লগে শ্যাষ!’ লোকটা তার বাসা খুঁজেছিল এটা শুনে এত অবাক হল সে, তার গলা দিয়েও ফিসফিস বেরোল তখন—‘কী বলিস!’ ছেলেটা বলল, আইজ পুলিশ আর সাম্বাদিক আইছিল, আমি কাউরে আপনের নাম কই নাই।’

বাসায় এসে চাবি ঘোরাতে গিয়ে দেখল, খোলা, ভেতর থেকে বন্ধ। আবার অবাক হয়ে বেল বাজাল সে। দরজা খুলল সোহানা। খুশি হয়ে হড়বড় করে বলল, ‘তুমি কখন আইলা? আমার চাকরি তো চইলা গেছে! তুমি ছাড়া আর কে খাওয়াবে আমারে!’ সোহানাও হেসে বলল, ‘চাকরি গেল কেন?’ কিন্তু সে কথায় না গিয়ে তুষার বলল, ‘আচ্ছা ওই ডাক্তার আমার বাসার খোঁজ করছিল, জানো?’ সোহানার মুখটা কালো হয়ে গেল এবার, বলল, ‘আমার কলিগ বৃষ্টি আপা আছে না? ওনার হাজবেন্ড আতা ভাই। আমার মুড কেন সব সময় অফ সেটা নিয়ে কয়েকদিন আগে খুব চেপে ধরলেন বৃষ্টি আপা, আমি বলে ফেলেছিলাম, তুমি বলছ যিশু আসতেছে কিনা। তারপর আর জানি না যে উনি সেটা আতা ভাইকে বলেছেন, কাল আপা আতা ভাইকে পাঠাইছিলেন তোমার কাছে, বুঝিয়ে বলতে যে এমন হতে পারে। আজ বৃষ্টি আপা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ওকে কেউ মেরে ফেলতে পারে, বিশ্বাস হয়না আমার—মনে হয় অন্য কেউ ভেবে ভুল করে মেরেছে!’

তুষার চুপ হয়ে গেল, অনেকক্ষণ পরে বলল, ‘এটা কেমন হল, বলতো!’

সোহানা বলল, ‘আলট্রাসনোগ্রাফি করতে দিছিলাম, রিপোর্ট দিছে আজ, ওটা বেবি না টিউমার!’ সোহানাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল তুষার, ‘আয়াম সো স্যরি সোনা!’ তুষারকে জড়িয়ে ধরেই সোহানা বলল, ‘কিন্তু ডিভোর্স হবে, তোমার সঙ্গে থাকব না আমি’।

Wednesday, October 14, 2020

জিহ্বা সাদা হওয়ার কারণ by ডা: মো: ফারুক হোসেন

সাদা জিহ্বা সাধারণত ক্ষণস্থায়ী হয়ে থাকে। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী এবং বারবার হতে পারে। জিহ্বার প্যাপিলার প্রদাহের কারণে সাদা জিহ্বার সৃষ্টি হয়। সূক্ষ্ম খাদ্যকণা, ব্যাকটেরিয়া এবং মৃত কোষ প্রদাহজনিত প্যাপিলাতে আবদ্ধ হয়ে সাদা আবরণ সৃষ্টি করে থাকে।
অনেক কারণে জিহ্বায় প্যাপিলার প্রদাহ হতে পারে। যেমন ধূমপান, মদ্যপান, মৃদু ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতার কারণে প্যাপিলার প্রদাহ হয়ে সাদা জিহ্বা সৃষ্টি হতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকেই মাঝে মধ্যে সাদা জিহ্বা দেখতে পান। ঠাণ্ডাজনিত কোনো অসুখ বা অ্যালার্জির কারণে এমন হতে পারে। আবার ক্রমাগত রাতের বেলায় মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়ার কারণেও এমনটি হতে পারে। সাধারণভাবে সাদা জিহ্বার এ অবস্থার অবসানে যা করণীয়, তা হলো ক. জিহ্বা ব্রাশ করতে হবে। খ. ধূমপান বন্ধ করতে হবে। গ. প্রচুর পানি পান করতে হবে। ঘ. আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে।
সাধারণ কারণ ছাড়াও বিভিন্ন অসুস্থতার কারণে জিহ্বা সাদা হতে পারে। সেগুলো হলো ১. ক্যান্ডিডোসিস; ২. ক্রনিক অসুস্থতা বা সব সময় অসুস্থ থাকা; ৩. এপস্টেন বা ভাইরাস; ৪. হেয়ারি টাং বা জিহ্বা; ৫. রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সমস্যা বা এইডস হলে; ৬. লিউকোপ্লাকিয়া; ৭. ডায়রিয়ায় পানিশূন্যতা বেশি হলে; ৮. অ্যাজমা রোগীদের ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ইনহেলার ব্যবহারের কারণে।
ধূমপান বা এলকোহল সেবন না করলেও জিহ্বার রঙ সাদা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগীর ক্রনিক ওরাল থ্রাশ থাকতে পারে। ক্রনিক ওরাল থ্রাশ হলে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ না করলে সমস্যা থেকেই যাবে। এ ছাড়া যেসব ওষুধ সেবনের কারণে শুষ্ক মুখ হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে জিহ্বা সাদা হতে পারে। ওষুধ সেবন শেষ হয়ে গেলে জিহ্বা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে। সাধারণ কারণ ছাড়া জিহ্বা সাদা হলে অবশ্যই আপনাকে বুঝতে হবে আপনি কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত। হয়তো অসুখটি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আপনি জানেন না বা আপনার সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না। তাই কোনো কিছুকে অবেহেলা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে মুখের অভ্যন্তরে সাদা সংক্রমণে আপনাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। মুখের অভ্যন্তরে সাদা সংক্রমণ দীর্ঘস্থায়ী হলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। নিজে সচেতন হোন এবং অন্যকেও সচেতন করে তুলুন। আর হ্যাঁ কোনো অবস্থাতেই মুখস্থ কোনো ওষুধ সেবন করবেন না।

>>>লেখক : ওরাল অ্যান্ড ডেন্টাল সার্জন। মোবাইল : ০১৮১৭৫২১৮৯৭

রবীন্দ্রসান্নিধ্যে গগন হরকরা by মো. মুখলেছুর রহমান ভূঁঞা

আমার মনের মানুষ যে রে, আমি কোথায় পাব তারে।
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশবিদেশে বেড়াই ঘুরে।
কোথায় পাব তারে।

এই বিখ্যাত মরমি গানের রচয়িতা গগন। যার পূর্ণ নাম গগনচন্দ্র দাম। দাম পদবী বাঙ্গালী হিন্দুদের মধ্যে দেখা যায়। দাঁ এবং দাম পদবী একই উৎস থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। গগন ছিলেন সামান্য শিক্ষিত আর তা দিয়েই তিনি শিলাইদহ ডাকঘরে ডাক হরকরার চাকরি পেয়েছিলেন। এ জন্য তার নামের পাশে হরকরা শব্দটি যোগ করে গগন হরকরা নামে ডাকা হত এবং এ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার প্রকৃত নাম গগনচন্দ্র দাস।

নাম তার গগন কিন্তু পদবি ডাক হরকরা তাই পোস্ট অফিসের চিঠি বিলির কাজে ঝাঁ ঝাঁ রোদে মাঠে ময়দানে কিংবা গাঁয়ে গাঁয়ে এঁকে ঘুরতে হত। সে সময় মাঠের মধ্যে, নদীর তীরে গগন প্রাণের আনন্দে মরমি সঙ্গীত গেয়ে শান্ত প্রকৃতিকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে দিতেন। তার গানের সুরে পল্লীর কুঠিরে কুঠিরে রসতরঙ্গ জেগে উঠত।

জমিদার রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৯-১৯০১ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ ও শাহজাদপুরের জমিদারি দেখার জন্য নিয়মিত আসতেন। এই সময় গগনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে বলে অনুমেয় হয়। আর চিঠি বিলি করার জন্য জমিদার রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রত্যহই গগনকে যেতে হত, সেই সুবাদে হয়ত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হত এবং কিছু খোসগল্প ও রসালাপও হত এটাই স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর নির্জনে বোটের ছাদে-কখনো তারা ভরা আকাশের নিচে কখনো নির্জন দুপুরে পদ্মা ঘাটে, কখনো কাচারি বাড়িতে গগন অপূর্ব সুষমা ও সুরব্যঞ্জনা দিয়ে আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে সঙ্গীত প্রিয় মানুষদের মাতিয়ে তুলতেন। সে সময় স্বয়ং জমিদার রবীন্দ্রনাথও তার গীতসুধা পান করতেন এবং মুগ্ধ হতেন। জমিদারি পরিচালনার কাজে শিলাইদহ এসে রবীন্দ্রনাথ যেমন ফকির লালন সাঁইয়ের গানে প্রভাবিত হয়েছিলেন, তেমনি লালনের পরে গগন হরকরার গানে যে কম প্রভাবিত হয়েছিলেন এমন নহে। আর তাই গগন হরকরার অনুকৃত সুরে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশীযুগের অনেক বাউল গান রচনা করেছেন, যা তার ‘বাউল’ গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। বাউলতত্ত¡ ও দর্শন সম্পর্কে তার ধারণা গঠনে গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটির ভ‚মিকা অত্যন্ত স্পষ্ট। কারণ বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মহান সুরটি রবীনদ্রনাথ ঠাকুর গগন হরকরার গাওয়া ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ গানটির সুরের উপর নতুন কথা বসিয়ে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেন।

গগন ছেঁউড়িয়ার বাউল লালন ফকিরের ভক্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে শিলাইদহে এসে গগনের বাউল গানের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা লাভ করেন এবং রবীন্দ্রনাথ তার সান্নিধ্য থেকেই কাঙ্গাল হরিনাথ, গোসাই রামলালসহ বিভিন্ন সাধকের বাউল গান শোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার কোন কোন নাটকে বাউল চরিত্র সংযোজন গগনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।

‘ডাকঘর’ নাটকেও আছে গগন চরিত্রের ছাপ। বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহও লক্ষ্য করেছেন, রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’, ‘অচলায়তন’ ইত্যাদি নাটকে ঠাকুর্দা, দাদা ঠাকুর, অন্ধবাউল শ্রেণীর যে একটি চরিত্রের সংযোজন দেখা যায়- এই চরিত্র সৃষ্টিতে শিলাইদহের কোন এক বাউল ফকিরের ছায়া পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ যে বাউলের সাথে দেখা পেয়েছিলেন, কথাও বলেছিলেন সেই বাউল গগন হরকরা। গগনের গানের ভনিতায় গুরুর নাম উল্লেখ নেই তবে পন্ডিত ক্ষিতিমোহন শাস্ত্রী গগনকে ‘লালনের শিষ্য ধারার একজন’ বলে অনুমান করেছেন। ত

বে গগন লালনের গান গাইতেন, গগনের কাছ থেকে অনেকে লালনসহ আরো কয়েকজন সাধকের গান সংগ্রহ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ গগনকে পরিচিত ও বিখ্যাত করলেও তার অনেক আগেই শ্রীমতি সরলা দেবী (ভারতী-ভাদ্র-১৩০২) গগনের গান সংগ্রহ ও প্রকাশ করেন এবং ‘লালনফকির ও গগন’ নামীয় প্রবন্ধ লেখেন উপসংহারে গগনের ভক্ত জীবনের বিবরণী সংগ্রহ করে ‘ভারতী’তে প্রকাশার্থে পাঠানোর জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ তার বিভিন্ন প্রবন্ধ আলোচনায় ও বক্তৃতায় গগনের ওই একটি গানের কথাই বারবার উল্লেখ করেছেন আর ওই গানটিকে যেন বাউল দর্শনের ভিত্তি হিসেবেই ধরে নিয়েছিলেন। ‘গগনের গানই শুধু তাকে মুগ্ধ করেনি, তার সরলতা, স্বতঃস্ফ‚র্ততা, ভাবুকতা ও চাল চলনও ঠাকুর কবির মন জয় করেছিল।’ রবীন্দ্রনাথ তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন বাউলের মূল উদ্দেশ্য যে মনের মানুষকে খোঁজ করা সেই পরম সত্যটি গগনের গানে উপলদ্ধি করা যায়।

ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে খুব সম্ভবত ১৮৪০ সালের দিকে শিলাইদহ ইউনিয়নের গবরাখালি গ্রামে এক কৃষিজীবী কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহাপুরুষ গগন হরকরা। গগনের পিতা ও মাতা সম্পর্কে তেমন কোন খোঁজ জানা না গেলেও কিরণচন্দ্র নামে তার একপুত্র ছিল বলে জানা যায়। তবে জনশ্রুতি রয়েছে, গগন পুত্র কিরণ চন্দ্রের অল্প বয়সে মৃত্যু হয়েছিল। মংলাচন্দ্র, সুন্দরীদাসী, কানাইচন্দ্র তার পৌত্র পৌত্রী। গগনের মৃত্যুর পর তার ভবিষ্যত বংশধর কেউ শিলাইদহে ছিল না। অভাব অভিযোগই মূল কারণ।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পূর্বেই পাংশার সরিষা পেসটিয়াতে গিয়ে বসবাস করে বলে জানা যায়। কৃষক পরিবারে জš§ গগন হরকরা প্রথমে কৃষিকাজ করতেন এটাই স্বাভাবিক। তবে বিভিন্ন জনশ্রুতি রয়েছে, গগনের বাস্তভিটায় আসামদ্দি নামক একজন কৃষক বাড়ি করে থাকতেন এবং সে বাড়িটি আজও দাসের ভিটা নামে পরিচিত। গগন হরকরার বিশাল এক আমবাগান ছিল। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে এসব আমগাছ আমদানি করেছিলেন। দুই যুগ আগেও গগনের ভিটা ও ফলের বাগানের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু আজ সেই বাগানে কিছু মেহগনী গাছ ছাড়া আর কিছু চোখে পরে না। গগন অনেকটাই অবহেলিত। কারণ পূর্বে শিলাইদহের কাছারি বাড়ির পূর্ব পাশে গগন হরকরা স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ পোস্ট অফিস ছিল। পরবর্তীতে সরকার সেটি নিলাম করে দিয়েছিল।

বর্তমানে সেখানে পুকুর খনন করা হয়েছে। গগন হরকরার আর কোন স্মৃতি চিহ্ন নেই বললেই চলে। তাকে কেউ গুরুত্ব সহকারে স্বরণ করে না। তবে কুষ্টিয়া জেলা সদরের নিশান মোড়ে পৌরসভার উদ্যোগে গগনের একটি প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে যা গগন ভক্তদের মনে দোলা দেয় ও নতুন প্রজšে§র কাছে গগননামী বাউল সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে। তিনি এক মহান সুরকার তাইত গগনের গান রবীন্দ্র মানসে অভ‚তপূর্ব দোলা লেগেছিল এবং তার গানে বাউলতত্ত সম্পর্কীয় আধ্যাত্মিক মনের ছবি সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে। এই গানটির সুরে রবীন্দ্রনাথ ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি রচনা করেছিলেন।

গগনের গানে মনের মানুষকে সন্ধান করার ব্যাকুলতা এবং মনের মানুষের জন্য ভালবাসা ফুটে উঠেছিল। আর রবীন্দ্রনাথ গানটির সুরে সোনার বাংলা তথা বাংলা ভাষা, বাংলার সঙ্গীত, বাংলার শিল্প, বাংলার যা কিছু আছে তাই-ই ভালবাসা দিয়ে অনুভব করেছিলেন। বিদেশী শাসনের নাগপাশ থেকে মুক্ত হবার পর বাউল সুরে রচিত গানটিই আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পেয়েছে।

আমেরিকার মিলিশিয়া আন্দোলন: সরকারের হাত থেকে বাঁচতে নিজেরাই সশস্ত্র হচ্ছে! by মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

তথাকথিত নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার
Roar.Media: ১৯৯০’র দশকে ‘মিলিশিয়া মুভমেন্ট’ নামে যে নতুন আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল আমেরিকায়, তাকে অনেকে অভিহিত করে থাকেন মিলিশিয়া আন্দোলনের আধুনিক অধ্যায় হিসেবে। এই আন্দোলনের সদস্যরা প্রবল স্বকীয়তাবোধ এবং যাবতীয় ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করে। ৯০’র দশকে এই আন্দোলন আনুষ্ঠানিক নাম ও কাঠামো পেলেও এর শুরু আদতে বহু আগেই হয়। মহামন্দার সময়ে চলা ‘শার্ট মুভমেন্ট’ ছিল মিলিশিয়া গঠনের প্রাথমিক ধাপ। ৬০’এর দশকে উগ্র ডানপন্থীদের সশস্ত্র ‘মিনিটম্যান’ আন্দোলন মিলিশিয়ার গঠনকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে।
এরপর, ৭০’এর দশকে আমেরিকার ৪০টি অঙ্গরাজ্যই মিলিশিয়া বা বেসরকারি আধা সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু বিধিবাম। এই নিষেধাজ্ঞার পরই আমেরিকাজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে উঠতে শুরু করে। শ্বেত আধিপত্যবাদী, জায়নবাদ বিরোধী, নব্য-ফ্যাসিবাদ সমর্থক, নব্য-নাৎসিবাদ সমর্থক, অ্যান্টি-সেমেটিক সহ আরো নানান ভাবাদর্শ নিয়ে একের পর এক সৃষ্টি হতে থাকে ছোটবড় মিলিশিয়া গ্রুপ।
এই গ্রুপগুলোর ধ্যানধারণা কমবেশি একই রকম ছিল, আর তা হলো সরকার ও রাষ্ট্র কর্তৃক শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই, মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার বিরুদ্ধে লড়াই, আমেরিকা কর্তৃক সৃষ্ট সর্বগ্রাসী ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ এর বিরুদ্ধে লড়াই। সরকার কর্তৃক আরোপিত কর, বিভিন্ন আইন এবং ব্যক্তিগত অস্ত্র মালিকানার নিষেধাজ্ঞাকে ধরা হয় সরকারি শোষণ হিসেবে। উল্লেখ্য, মিলিশিয়া গ্রুপগুলো ব্যক্তিগতভাবে অস্ত্র রাখার নিষেধাজ্ঞাকে অনেক বড় সমস্যা বলে মনে করে। কারণ, তাদের বিশ্বাস রাষ্ট্রীয় বাহিনী তাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ এবং তারা নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা বিধান করে নেবেন।
সারভাইবালিজম
এতকিছুর পরও এই মিলিশিয়া গড়ে ওঠার ব্যাপারটি কোনো আন্দোলন হিসেবে অভিহিত হচ্ছিল না, কারণ তারা সবাই এক ছাতার নীচে আসতে সক্ষম হয়নি। এরই মাঝে ৮০’র দশকে উত্থান ঘটে ‘সারভাইবালিজম’ নামক অদ্ভুত এক রীতির। মানুষজন বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, শীঘ্রই আমেরিকান শহুরে সমাজ ধ্বংস হবে পারমাণবিক আক্রমণে। তাই মানুষের উচিৎ শহর ছেড়ে মফস্বলে কিংবা গ্রামে গিয়ে বসবাস করা, অস্ত্রচালনা রপ্ত করে নিজের নিরাপত্তা নিজে বিধান করতে শেখা, সর্বোপরি চরমতম পরিস্থিতির জন্য নিজেকে তৈরি করা। এই সার্ভাইবালিজমে বিশ্বাসী মানুষগণও একধরনের মিলিশিয়া গড়ে তোলে। তবে ভাবাদর্শের দিক দিয়ে সেগুলো মূলধারার মিলিশিয়ার মতো নয়।
এ সময় আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছিল মিলিশিয়াগুলোর মাঝে। মিলিশিয়ায় বিশ্বাসী কিছু উদার গোছের নেতারা চাইতেন একেবারে সরকার পরিত্যাগ না করে বরং স্থানীয় মিলিশিয়াগুলোও সরকারি বাহিনীর মতোই দেশ ও সমাজের নিরাপত্তা বিধানের কাজে যোগ দিক। অবশ্য, এরকম চাওয়ার মতো লোকজনের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। তাছাড়া, মিলিশিয়াগুলোর তীব্র সরকারবিরোধী নীতি গ্রহণ চলতে থাকায় সরকারের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কের ধারণা খড়কুটোর মতো ভেসে যায়।
একটু আগেই বলছিলাম, দেশজুড়ে গড়ে ওঠা মিলিশিয়া বাহিনী কিংবা সারভাইবালিস্টদের গ্রুপগুলো এক পতাকাতলে আসতে ব্যর্থ হচ্ছিল বিধায় তারা বড় আকারে নিজেদের প্রকাশও করত পারছিল না। এই অভাবটুকু পূরণ হয়ে যায় ৯০’র দশকের শুরুতেই। মিলিশিয়া গ্রুপ, শ্বেত আধিপত্যবাদী গ্রুপ, উগ্র ডানপন্থী গ্রুপ, সারভাইবালিস্ট গ্রুপ, ট্যাক্সবিরোধী গ্রুপ, সকলে মিলেই ঐক্যবদ্ধভাবে ‘প্যাট্রিয়ট মুভমেন্ট’ নামক এক নতুন আন্দোলনের সূচনা করলো। আর তাতেই কিস্তিমাত হয়ে গেল। ‘দেশপ্রেম আন্দোলন’, এই নামটাই তো যথেষ্ট! দেশব্যাপী মানুষের সমর্থন আসতে লাগলো এ আন্দোলনের জন্য। কাকতালীয়ভাবে এ সময়ই আমেরিকায় ইন্টারনেটের বিকাশ শুরু হয়। ফলে প্যাট্রিয়ট আন্দোলন আকাঙ্ক্ষার চেয়েও দ্রুত বিকাশ লাভ করতে লাগলো।
রুবি রিজে উইভারের ছোট্ট ঘরটি
আধুনিক মিলিশিয়া আন্দোলন ১৯৯২ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা থেকে শুরু হয়। ইউএস মার্শালসের ৬ জন সদস্য সেদিন গিয়েছিলেন ফ্লোরিডার নেপলস শহরের রুবি রিজ নামক এক এলাকা পরিদর্শনে। উদ্দেশ্য ছিল, বহুদিন যাবত অস্ত্র মামলায় পলাতক আসামি রেন্ডি উইভারকে অ্যামবুশ করা। মার্শালসের নিকট তথ্য ছিল যে, উইভার রুবি রিজে একটি ছোট্ট কুটির সদৃশ ঘরে অবস্থান করছেন। তারা উইভারের ছোট্ট সে ঘরটি শনাক্তও করে ফেলেন। কিন্তু বিপত্তি বাঁধায় উইভারের কুকুর স্ট্রাইকার। অপরিচিত মানুষজন দেখে কুকুরটি তীব্র আক্রোশে গর্জন শুরু করে।
কুকুরের গর্জন শুনে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসেন উইভার। কুকুরের বিরক্তির উৎস খুঁজে পেতে বাইরে বেরিয়ে আসে উইভারের ১৪ বছরের ছেলে স্যামি ও তার বন্ধু কেভিনও। তাদের অনুসন্ধানের নেতৃত্ব দিচ্ছিল কুকুরটি। এদিকে, মার্শালস সদস্যরা ততক্ষণে আশেপাশে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে পড়েছেন। কুকুরকে অনুসরণ করে উইভারও ততক্ষণে ঝোপের কাছে পৌঁছে যান। এরপর কী ঘটেছিল তা নিয়ে রয়েছে বহুল বিতর্ক। কোনো উৎস থেকেই সঠিক বিবরণ পাওয়া যায়না। কেবল এতটুকু আমরা জানতে পারি যে, মিনিট দশেক পর সেখানে তিনটি প্রাণের অন্তর্ধান ঘটে। উইভারের ছেলে স্যামি, তার কুকুর স্ট্রাইকার আর একজন মার্শালস সদস্য বিল ডেগান!
ছেলের মৃতদেহ কোনোক্রমে নিজের ছোট কুঁড়েসদৃশ বাড়ির সামনে এনে বাড়িতে প্রবেশ করেন উইভার। আর মার্শালসদেরও কোনো অজানা কারণে শখ হলো রুবি রিজে একটি অদ্ভুত নাটুকে পরিবেশ তৈরি করার। তারা উইভারকে গ্রেফতারের জন্য এফবিআইয়ের সহায়তা চাইলেন। মাত্র তিনজন মানুষকে গ্রেফতারের জন্য তারা শতাধিক এফবিআই এবং স্থানীয় পুলিশ সদস্য আনালেন পরদিন। বাড়িতে আক্রমণ না করে বাড়ি ঘেরাও করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো এই ভয়ে যে, বাড়িতে বোমা থাকতে পারে! ২২ তারিখ তাদের স্নাইপারের গুলিতে নিহত হলেন উইভারের স্ত্রী ভিকি। আহত হলেন উইভার এবং কেভিন। স্নাইপারের আঘাতে গুরুতর আহত দুজন মানুষকেও তৎক্ষণাৎ গ্রেফতারের ইচ্ছে হলো না মার্শালসদের। তারা অবরোধ নাটক দীর্ঘায়িত করলেন আগস্টের শেষ পর্যন্ত!
মারশালসদের সাথে গোলাগুলির কিছুক্ষণ আগে অস্ত্রহাতে উইভার
এদিকে, ফেডারেল সরকারের পুলিশ ও এফবিআই বাহিনীর এই অবরোধ সুফল বয়ে আনে রেন্ডি উইভারের জন্য। দেশব্যাপী খবর ছড়িয়ে পড়ে যে ফেডারেল সরকার নির্মমভাবে একটি নির্দোষ পরিবারকে হত্যা করেছে। স্থানীয় মানুষজন এসে ভিড় করতে থাকে রুবি রিজের অবরোধ এলাকায়। জড়ো হয় ‘আরিয়ান ন্যাশনস’ নামক একটি শ্বেত আধিপত্যবাদী সংগঠন এবং আরো কিছু ডানপন্থী সংগঠনের সদস্যরা। উইভারের ব্যাপক জনসমর্থনের পালে বাড়তি হাওয়া যোগ করে পপুলিস্ট পার্টির সাবেক রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন প্রার্থী বো গির্টজের উপস্থিতি। শেষ পর্যন্ত এই অবরোধ নাটক এফবিআই ও মার্শলসদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বো গির্টজের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের সাথে সমঝোতা করে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয় ফেডারেল আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
এই ঘটনার জল এরপর বহুদূর গড়িয়েছে। উইভারের পক্ষ থেকে আগে গুলি ছোঁড়া হয়েছিল নাকি মার্শালসদের পক্ষ থেকে, তা নিয়ে চলে তুমুল বিতর্ক। অবশ্য সাধারণ মানুষ নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে নেয় যে, মার্শালসরাই আগে আক্রমণ করেছে। তাছাড়া, এ ঘটনায় এফবিআইয়ের সংযুক্তির পর তাদের হাতে খুন হয় উইভারের স্ত্রী ভিকি। এই হত্যার দায়ে রুবি রিজের অভিযান পরিচালনা করা এফবিআই দলের প্রধান মাইকেল কাহোকে দেড় বছরের কারাদণ্ডও দেয়া হয়। কিন্তু তাতেও লাভ হয়নি। দুর্নাম যা হবার হয়ে গেছে। দেশব্যাপী এফবিআইয়ের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নড়বড়ে হয়ে যায়। আর উগ্র ডানপন্থীরা তো দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন রাষ্ট্রকাঠামো বিরোধী অবস্থানে ছিল। তাদের এ অবস্থানকে আরেক ধাপ এগিয়ে দেয় রুবি রিজের ঘটনা। এ ঘটনা আমেরিকায় মিলিশিয়া আন্দোলনের আধুনিক অধ্যায়ের সূচনা করে।
স্নাইপারের গুলিতে মৃত্যুর কিছুক্ষণ পূর্বে ভিকি
রুবি রিজের ঘটনার পর উগ্র ডানপন্থী সংগঠন কিংবা আরিয়ান ন্যাশনের মতো শ্বেত আধিপত্যবাদী সংগঠনগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতি ভরসার সমাপ্তি ঘটে। তথাকথিত ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’এ টিকে থাকবার জন্য নিজেদের সুরক্ষা নিজেদেরই করতে হবে, এরূপ বিশ্বাস তাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়। রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজেদের রক্ষক ভাবার পরিবর্তে ভক্ষক ভাবতে শুরু করে এই শ্রেণী। আর নিরাপত্তার স্বার্থে নিজেদের সাথে রাখতে শুরু করে অস্ত্র, গড়ে উঠতে থাকে অসংখ্য অর্ধসামরিক ছোট ছোট বাহিনী, যারা একত্রে সংগঠিত হয়ে পরবর্তীতে মিলিশিয়া আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। এর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির টোটকা ছিল সেই রুবি রিজই। ফেডারেল সরকারের বা আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ‘দায়িত্বহীনতা’ এবং রুবি রিজে নির্বিচারে গুলি করার ঘটনা উল্লেখ করার মাধ্যমে আন্দোলনে নতুন মুখ যোগ করা হয়।
৯০’র দশকের দ্বিতীয়ার্ধে পুরো সময়টাই আমেরিকায় বিভিন্ন মিলিশিয়ার কিছুমাত্রায় সহিংস রূপ দেখা যায়। শ্বেত আধিপত্যবাদীরা ‘স্থানীয় আধিপত্যবাদ’ (লোকাল সুপ্রিমেসি) নামক নতুন ভাবধারার উন্মেষ ঘটায়। স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যা তাদের আধাসামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য তারা স্থানে স্থানে বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থা যেমন ‘ফরেস্ট সার্ভিস’, ‘ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ এর সদস্যদের কাজে বাঁধা দেয়, হামলা চালায়।
রুবি রিজের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ
যেভাবেই হোক, যেমন করেই হোক, মিলিশিয়া আন্দোলনের জনপ্রিয়তা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছিল। কিন্তু সেই বিকাশে বাঁধ সাধে অতি উৎসাহী এক কর্মীর ন্যাক্কারজনক এক কাণ্ড। টিমোথি ম্যাকভেই নামক সে কর্মী ভেবেছিলেন, বোমা মেরে একটি ফেডারেল ভবন ধ্বসিয়ে দিতে পারলে তাদের আন্দোলন আরো বেগবান হবে। তিনি ‘ভি ফর ভেন্ডেটা’ সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন কি না কে জানে! কিন্তু, ১৯৯৫ সালে ওকলাহোমায় তার সেই অতি উৎসাহী কর্ম ১৫৮ জনের জীবন কেড়ে নেয়! তাতে কি হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটলো মিলিশিয়া আন্দোলনের?
না, মিলিশিয়া আন্দোলন ততদিনে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, উগ্র আর অন্ধ সমর্থকদের দলে ভিড়িয়ে নিয়েছে, ছন্দপতনের তখন প্রশ্নই আসে না। ততদিনে আমেরিকাজুড়ে গঠিত হয়েছে ৯০০’র অধিক আধাসামরিক গ্রুপ, যাদের মোট সক্রিয় সদস্য সংখ্যা ৪০ হাজারের অধিক! অবশ্য তাদের স্থানীয় পৃষ্ঠপোষক এবং স্বক্রিয় সমর্থক হিসাব করলে সে সংখ্যাটা আড়াই লাখ ছাড়িয়েছিল! তবে ২০০০ সালের পর মিলিশিয়া আন্দোলনের ছোট ছোট গ্রুপগুলো একত্রিত হয়ে আকারে বড় গ্রুপ গড়ে তোলে। ফলে, বুশ সরকারের সময় মিলিশিয়া গ্রুপের সংখ্যা কমে গেলেও আদতে এ আন্দোলন দুর্বল হয়নি।
টিমোথি ম্যাকভেইয়ের বোমায় ধ্বসে গেছে ওকলাহোমার একটি ফেডারেল ভবন
বর্তমানে আমেরিকায় সক্রিয় মিলিশিয়া গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছে ‘থ্রি পার্সেন্টারস’, ‘মিশিগান মিলিশিয়া’, ‘মিলিশিয়া মন্টানা’, ‘ওথ কিপারস’, ‘নিউ ইয়র্ক লাইট ফুট’। সময়ের সাথে সাথে এদের কৌশলগত দিকে অনেক পরিবর্তন এলেও চিন্তাচেতনায় কোনো পরিবর্তনই আসেনি। এখনো এই মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর প্রধান বিশ্বাসই হলো ফেডারেল সরকারে ষড়যন্ত্র এবং ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’। অবশ্য সাম্প্রতিককালে মিলিশিয়া গ্রুপগুলো কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। এই দ্বিধার কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হওয়া।
বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়টা ছিল আমেরিকান মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর স্বর্ণযুগের মতো! ২০০৮ থেকে ২০১১ সালেই মিলিশিয়া গ্রুপের সংখ্যা ৪২ থেকে বেড়ে ৩০০-তে উন্নীত হয়। এর বড় কারণ টি পার্টি আন্দোলন। টি পার্টি আন্দোলন হয়েছিল ফেডারেল সরকারের ঋণ মওকুফ ও ওবামাকেয়ার বিলের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে মিলিশিয়া আন্দোলনের ডিএনএতেই রয়েছে সরকারবিরোধীতা। ফলে ব্যাপক হারে মিলিশিয়া সদস্যরা টি পার্টি আন্দোলনে যোগ দেয় এবং তাদের নিজেদের সদস্য সংখ্যাও বৃদ্ধি পায়।
টি পার্টি আন্দোলন
কিন্তু ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে যেন মিলিশিয়া আন্দোলনের ভবিষ্যতই শংকার মধ্যে ফেলে দেন। দীর্ঘকাল ধরে যে ফেডারেল সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রতত্ত্ব নিয়ে বেঁচে ছিল এই মিলিশিয়া আন্দোলন, সেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বই এবার ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। কেননা, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিজেই ছিলেন একজন কট্টর ডানপন্থী, শ্বেত আধিপত্যবাদী! তাহলে মিলিশিয়া আন্দোলনের শ্বেত আধিপত্যবাদী ও ডানপন্থীরা (মূলত এই আন্দোলনের প্রায় সবাই শ্বেতাঙ্গ এবং ডানপন্থী) কি এবার সরকারের সমর্থন দেয়া শুরু করবে? নাকি ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নিজেদের ভাবাদর্শের বিপরীতে গিয়ে হলেও একজন শ্বেত আধিপত্যবাদী ও ডানপন্থী প্রেসিডেন্টের বিরোধীতা করবে?
ট্রাম্প ইস্যুতে মিলিশিয়া আন্দোলন স্তিমিত হবার পরিবর্তে পুরনো খোলস পাল্টে নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। মিলিশিয়া আন্দোলনের একটা বড় অংশ ট্রাম্পের আগমনের পর থেকে কিছুটা উদারকণ্ঠে কথা বলতে শুরু করে এবং ট্রাম্পের শ্বেত আধিপত্যবাদী আচরণের নিন্দা জানায়! এ পর্যায়ে এসে থ্রি পার্সেন্টারস আর ওথ কিপারসের মতো মিলিশিয়া গ্রুপগুলো উগ্র ডানপন্থী আর শ্বেত জাতীয়তাবাদীদের থেকে কিছুটা আলাদা হয়ে যায়। আর পূর্বেকার সেই ‘সরকারের সাথে কাজ করা’র ধারণাটি নতুন করে প্রাণ পায়। কিছু কিছু অঙ্গরাজ্যে তো ইতোমধ্যে রিপাবলিকনদের সাথে মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর সমঝোতাও দেখা গেছে। পোর্টল্যান্ডে তো রীতিমতো রিপাবলিকান কিছু সভা সমাবেশের নিরাপত্তার দায়িত্বও দেয়া হয়েছে মিলিশিয়াদের। ফলে ভবিষ্যতে কী হবে তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, বর্তমানকালের প্রেক্ষাপটে অন্তত এটা বলা চলে যে আধুনিককালের মিলিশিয়া আন্দোলনকে কিছুটা হলেও বশে আনতে সক্ষম হয়েছে রিপাবলিকানরা অথবা আরো নির্দিষ্ট করে বললে, টি পার্টির সদস্যরা। উগ্র স্বকীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সাথে তাদের এই লোক দেখানো লিয়াজো কতদিন টিকে থাকে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
থ্রি পার্সেন্টারের পতাকা

Tuesday, October 13, 2020

ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করবে এ মসলা!

বলা বাহুল্য ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ ধূমপান জনিত ক্যান্সার সহ অনান্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে।
ধূমপায়ীদের প্রায় প্রতিজ্ঞা করতে দেখা যায়, এবার ধূমপান করা ছেড়ে দেব! ছেড়ে দিয়েছি, আর সিগারেট খাব না! বারবার শপথ করেও তা রক্ষা করতে পারেনা অনেক ধূমপায়ী।
তবে এবার হয়তো অন্য একটি উপায়ের সাহায্যে এ শপথ রক্ষা করা সম্ভব।
গোলমরিচ আপনাকে এ কাজে সহায়তা করবে। শুধু যে ধূমপান ছাড়াতে সাহায্য করবে এমনও নয়। এর অন্যরকম কিছু ব্যবহার রয়েছে যা আমাদের অনেকেরই অজানা। তবে গোলমরিচের কিছু ব্যতিক্রমী ব্যবহার সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক:
১. ধূমপান ছাড়তে: একটি তুলায় গোলমরিচের তেল মাখিয়ে নিতে হবে। যখন ধূমপান করতে প্রচন্ড ইচ্ছা করবে তখন গোলমরিচের তেল ভেজানো তুলার ঘ্রাণ নিনতে হবে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে ধূমপানের ইচ্ছা একদম চলে গেছে।
২. কাশি প্রশমিত করে: ঠাণ্ডা, কাশি দূর করতে গোলমরিচও অনেক ভাল উপশমকারী। চীনে চায়ের সঙ্গে গোল মরিচের গুঁড়া মিশিয়ে পান করা হয় ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য। ১ টেবিল চামচ গোলমরিচের গুঁড়া, ২ টেবিল চামচ মধু এক কাপ পানির মধ্যে দিয়ে জ্বাল দিতে হবে। ১৫ মিনিট জ্বাল দেয়ার পর নামিয়ে রাখতে হবে এবং ঠান্ডা হলে তা পান করতে হবে। এতে নিমিষেই কাশি গায়েব হয়ে যাবে।
৩. হজমশক্তি বাড়াতে: গোলমরিচ খেলে পাকস্থলী থেকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড নিঃসৃত হয় যা খাবার দ্রুত হজম করতে সহায়তা করে। অরুচি দূর করে ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়।
৪. পেশির ব্যথা কমাতে: পেশির ব্যথা কমাতে গোল মরিচ তেলের ব্যবহার করলে তা পেশির ব্যথা কমাতে সাহায্য করবে। এছাড়াও মাংসপেশি শক্ত করতে সাহায্য করে থাকে। ২ টেবিল চামচ গোল মরিচের তেলের সাথে ৪ চা চামচ রোজমেরী তেল বা আদার রস মিশিয়ে নেয়া যেতে পারে। মাংসপেশির যেখানে ব্যথা করবে সেখানে এই তেল ব্যবহার করুন। ব্যথা কমে যাবে।