Saturday, May 15, 2010

শওকত ওসমানের স্বপ্ন ও জননী by সোহরাব হাসান



পাকিস্তান আমলে ঢাকা কলেজের নামকরা অধ্যক্ষ ছিলেন জালালউদ্দিন আহমদ। তিনি ছিলেন কঠোর নিয়মের মানুষ। শিক্ষক বা শিক্ষার্থী—কেউ তাঁকে ফাঁকি দিতে পারতেন না। ছাত্ররা একদিন দল বেঁধে তাঁর কাছে গিয়ে নালিশ করল, বাংলার শিক্ষক ক্লাসে পড়ান না, কেবল গল্প করেন।
অধ্যক্ষ শিক্ষকের নাম জানতে চাইলেন।
ছাত্ররা বলল, শওকত ওসমান।
তখন তিনি কণ্ঠে খানিকটা গাম্ভীর্য এনে বললেন, ‘শওকত ওসমানকে পড়ানোর জন্য রাখা হয়নি। তিনি ঢাকা কলেজে আছেন—এটাই আমাদের জন্য গর্বের। পড়ানোর জন্য তো আরও শিক্ষক আছেন।’
এই ছিলেন শওকত ওসমান। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী। জননী ও ক্রীতদাসের হাসিসহ বহু কালজয়ী গ্রন্থের লেখক।
শওকত ওসমানের জন্ম ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি, পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার সবল সিংহপুর গ্রামে। তিনি পড়াশোনা করেছেন নিজ গ্রামের মক্তব, কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর কলকাতাতেই কর্মজীবনের শুরু। শিক্ষকতা তাঁর পেশা হলেও নেশা ছিল লেখালেখি। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, আত্মজীবনী, স্মৃতিখণ্ড, শিশুতোষ মিলে তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। কলকাতায় থাকতেই তাঁর বনি আদম, ওটেন সাহেবের বাংলো, তস্কর লস্কর পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পর শওকত ওসমান চলে আসেন পূর্ববঙ্গে। প্রথমে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজে, পরে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতা করেন। দ্রোহী লেখক হুমায়ুন আজাদের চোখে তিনি ছিলেন আমাদের সমাজের ‘অগ্রবর্তী আধুনিক মানুষ’। ছাত্রদের তিনি ‘স্যার’ ও ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। সাতসকালে প্রিয় ছাত্রদের কাছে টেলিফোন করে জানতে চাইতেন, ‘স্যার, কেমন আছেন?’ ছাত্র নয় এমন ঘনিষ্ঠজনদের বলতেন, ‘ভ্রাত, প্রাতঃস্মরণীয় হও’।
বৃদ্ধ বয়সেও শওকত ওসমান সবার খোঁজখবর নিতেন। কারও বিপদের কথা শুনলে ছুটে যেতেন। নিজের বয়স নিয়ে কিছুটা গর্বও ছিল তাঁর। শেষ দিকে দেখা হলে তিনি বলতেন, ‘আমি সত্তরের কোঠা পেরিয়ে এসেছি। রবীন্দ্রনাথ আশি বছর বেঁচে ছিলেন।’ বয়সে তিনি রবীন্দ্রনাথকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১৪ মে ৮১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধী ছিলেন শওকত ওসমান। পাকিস্তান যে টিকবে না, তিনি অনেক আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানে কেন এলেন? এ প্রশ্নের জবাবে শওকত ওসমান বলেছিলেন, ‘বন্ধুরা সবাই এপারে চলে এলেন। আমি থাকি কী করে?’
শওকত ওসমান শিল্পের জন্য শিল্পের চর্চা করেননি। গল্প-উপন্যাস-নাটকে তিনি জীবন ও সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন। জীবনের দাবি মেটাতে গিয়ে কখনো কখনো শিল্পের দাবি উপেক্ষিত হয়েছে। ছোটদের জন্য ‘প্রাইজ’ নামে তাঁর একটি গল্প আছে। গল্পের নায়ক অত্যন্ত গরিবঘরের সন্তান। সে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করে। কোনো দিন স্কুলে যায়নি, কিন্তু স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় যেমন খুশি সাজোতে সে ভিক্ষুকের অভিনয় করে প্রথম প্রাইজটি জিতে নেয়।
এ গল্পে সামাজিক বৈষম্যের যে চিত্র রয়েছে, তা পাঠকের মনকে স্পর্শ করে। আইয়ুবের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যখন কেউ টুঁ শব্দটি করেননি, তখনই তিনি লিখলেন ক্রীতদাসের হাসি। এবং আদমজী পুরস্কারও পান। শওকত ওসমান ছিলেন বরাবর স্পষ্টভাষী। বনগাঁয়ে এক সাহিত্যসভায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আধ্যাত্মিক কথাবার্তা বলতে শুরু করলে ২৩ বছরের তরুণ শওকত ওসমান দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করলেন। বললেন, ‘সাহিত্যের কথা বলুন। আমরা ধর্মের কথা শুনতে আসিনি।’
শওকত ওসমান মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদ চিন্তাচেতনার কঠোর সমালোচক ছিলেন। কিন্তু সমাজটিকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন, কখনো ত্যাগ করেননি। তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতেন, যারা একটি আলপিন তৈরি করতে পারে না, তারা কীভাবে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে?
মুসলিম বিশ্বের দুজন নেতাকে শওকত ওসমান অতি উচ্চ মূল্য দিতেন। একজন তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক পাশা, অন্যজন বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান। দুজনই ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর তিনি দেশান্তরি হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, এ দেশে আর থাকা যাবে না। ফিরে আসেন ১৯৮১ সালে। তাঁর সেই নির্বাসিত জীবন-কাহিনি লিপিবদ্ধ আছে মুজিবনগর: উত্তর পর্বে। তার আগে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লিখেছিলেন জাহান্নাম হইতে বিদায়, দুই সৈনিক, নেকড়ে অরণ্য, রাজসাক্ষী।
শওকত ওসমান ধর্মান্ধতাকে অপছন্দ করতেন। হুজি, জেএমবি গঠনের বহু আগেই তিনি মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
শওকত ওসমানের জননী ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। অনুবাদেও তিনি ‘জননী’ নামটি অক্ষুণ্ন রাখার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা তো বাংলায় কত ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করি। বাংলা ভাষার অন্তত একটি শব্দকে ইংরেজিতে রপ্তানি করা গেছে।’
জননী নিয়ে তাঁর আরও একটি স্বপ্ন ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর কাহিনি নিয়ে ছবি হোক। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছবিটি করতে অনুদানও দেওয়া হয়েছিল। পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম থাকলেও কাজটি করছিলেন তাঁর ছোট ছেলে জাঁনেসার ওসমান। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কাজটিও বন্ধ হয়ে যায়। আমরা জানি না, ছবিটি কোন অবস্থায় আছে? এখন ফের আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে জননী চলচ্চিত্রায়ণের কাজটি শেষ হোক—তাঁর দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই প্রার্থনা।

কে এই ফয়সল by হাসান ফেরদৌস

প্রশ্নটি আমার নয়, ড. আদিল নাজামের। ভদ্রলোক নামজাদা পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী, হার্ভার্ডের অধ্যাপক; ‘অল থিংস পাকিস্তান’ নামের একটি জনপ্রিয় ব্লগের পরিচালক। এই ব্লগেই তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, ‘হু ইজ ফয়সল শাহজাদ?’ নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে গাড়িবোমা রাখার অভিযোগে ফয়সল শাহজাদ নামের এক লেখাপড়া জানা পাকিস্তানি-আমেরিকান ধরা পড়েছেন। আমেরিকায় যেসব পাকিস্তানি বাস করেন, ড. আদিল তাঁদেরই একজন। তাঁরা আবারও পাকিস্তান নামের পাশে ‘টেররিস্ট’ কথাটা যুক্ত হলো দেখে ভীত। এই বুঝি শুরু হলো আমেরিকা থেকে ‘পাকিস্তানি খেদাও’ আন্দোলন! সে কথা টের পেয়ে ড. আদিল আগেভাগেই বলে দিয়েছেন, ফয়সল একজন ক্রিমিনাল, শুধু এক ক্রিমিনালের কারণে পুরো একটা দেশকে বা একটা কমিউনিটিকে অভিযুক্ত করা কোনো কাজের কথা নয়।
ড. আদিলের কথার সঙ্গে অধিকাংশ মুক্তবুদ্ধির মানুষই একমত হবেন। এমনকি নিউইয়র্ক শহরের মেয়র মাইক ব্লুমবার্গও সে কথাই বলেছেন। এক ফয়সলের জন্য যেন কোনো পাকিস্তানি বা মুসলমানের ওপর আক্রমণ না করা হয়, তারা যেন বৈষম্যের শিকার না হয়, সে কথার হুঁশিয়ারি তিনি ফয়সল ধরা পড়ার পরই স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন। তার পরও পাকিস্তানি শুনলে লোকজন ট্যারা চোখে তাকাবে না বা বাড়িভাড়া চাইতে এলে দ্বিধাগ্রস্ত হবে না, এ কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। ড. আদিল অবশ্য এই ভেবে আশ্বস্ত হয়েছেন, ফয়সল ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই খোদ পাকিস্তান সরকার কবুল করেছে, এ ব্যাপারে আমেরিকার সঙ্গে সব রকম সহযোগিতা তারা করবে। হাফ ডজন পাকিস্তানিকে এরই মধ্যে তারা পাকড়াও করেছে।
পাকিস্তানের সরকার, সে দেশের তথ্যমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষ বরাবর সন্ত্রাসবাদের কথা উঠলেই বিদেশি ষড়যন্ত্রের গন্ধ আবিষ্কার করেছেন। হয় ভারত, নয়তো আমেরিকা সব অপকর্মের হোতা! মুম্বাইয়ে সরাসরি টিভির পর্দায় বোমা ও বন্দুক নিয়ে নিজেদের ভাই-ব্রাদারদের ছোটাছুটি করতে দেখার পরও তাদের বিশ্বাস, এ সবই ‘র’ এবং ‘সিআইএ’র কারসাজি। কিন্তু এবার দেখছি পাকিস্তানিদের গলার আওয়াজ কিঞ্চিত বদলেছে। যেমন, দৈনিক নিউজ ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকা ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছে, ‘ইদানীং অন্য আর কিছুর বদলে পাকিস্তান সবচেয়ে বেশি যা রপ্তানি করা শুরু করেছে, তা হলো সন্ত্রাসী।’ আরেক পাকিস্তানি বুদ্ধিজীবী পারভেজ হুদোবয় মন্তব্য করেছেন, ‘কে এই ফয়সল, সে প্রশ্ন করার চেয়ে অনেক জরুরি, ওই এক পাকিস্তান থেকে বারবার কেন আন্তর্জাতিক টেররিস্ট তৈরি হচ্ছে?’
যত দিন পর্যন্ত নিজেদের ঘরে পোষা সন্ত্রাসীদের হামলায় মুখ্যত পাকিস্তানিরাই ঘায়েল হচ্ছিল, তত দিন আমেরিকার বা বিদেশি অন্য কোনো দেশের এই নিয়ে ঘুম হারাম হয়নি। ভারতে হামলা হয়েছে, তারা পাকিস্তানি তালেবানের পুরোনো টার্গেট। লন্ডনের পাতালরেলে হামলা হয়েছে, বড় ধরনের ক্ষতি না হওয়ায় তা নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য আমরা শুনিনি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার দিকে হাত বাড়িয়েছে এসব সন্ত্রাসী। আমেরিকায় বাস করে, কেউ কেউ আমেরিকার নাগরিক, এমন লোকজনকে দলে ভিড়িয়ে সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্র হয়েছে, এমন গোটা তিনেক ঘটনা গত এক বছরে ধরা পড়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই হয় আল-কায়েদা, নয়তো পাকিস্তানি তালেবান এসব হামলাচেষ্টার পেছনে কলকাঠি নেড়েছে। ফয়সলের বেলায় যেমন তারা তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, কী করে বোমা বানাতে হয় তার বুদ্ধি বাতলে দিয়েছে, নগদ অর্থে বিমানের টিকিট কেনার পয়সাও সম্ভবত তাদের কাছ থেকেই এসেছে। (সম্ভবত বলছি, কারণ এ ব্যাপারটি এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি)। এ পর্যন্ত তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতে যে কোথাও আগুন জ্বলবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
পারভেজ হুদোবয় পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় লিখেছেন, একজন পাকিস্তানি যে টাইমস স্কয়ারে গাড়িতে বোমা ফাটিয়ে মানুষ মারার পাঁয়তারা করছিল, তা মোটেই বিস্ময়ের কিছু নয়। ‘আপনি যখন জ্বালানি তেলের ট্যাংকের মুখের ওপর জ্বলন্ত দেশলাই ধরে রাখেন, রসায়নশাস্ত্রের নিয়ম অনুসারে একসময় না একসময় সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠবেই।’ অন্য কথায়, এসব জিহাদি তো খোদ পাকিস্তানের নিজের সৃষ্টি। এখন বোতল ফুঁড়ে জিন বাইরে আসা শুরু করেছে। বস্তুত ব্যাপারটা আকস্মিক বা কাকতালীয় নয় মোটেই। ধর্মের নামে জিহাদ—তা কখনো ভারতের বিরুদ্ধে, কখনো আমেরিকার বিরুদ্ধে—পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর-শরীরে ঢুকে বসে আছে গত ৩০ বছর। ৩০ বছর কেন, পাকিস্তানের সৃষ্টির গোড়া থেকেই, তবে ১৯৭৪-এ জিয়াউল হক ক্ষমতা গ্রহণের পর জিহাদ ও রাজনীতি সমার্থক হয়ে ওঠে। এর একটি যদি হয় বন্দুক, তো অন্যটি সে বন্দুকের সুদৃশ্য চামড়ার মোড়ক। আসলে পাকিস্তান এমন একটা দেশ, যেখানে সে দেশের মানুষকে এক ছাতার নিচে আনতে পারে ওই এক ধর্ম ছাড়া অন্য কিছুই নেই। ফলে সেখানে যারাই ক্ষমতা নিয়েছে—তা উর্দি পরা জেনারেল হোক বা শেরোয়ানি পরা চতুর রাজনীতিক—সবাই ধর্মকে ব্যবহার করেছে নিজেদের ক্ষমতা দখলকে জায়েজ করতে। নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণে কে কত ইসলাম-পছন্দ, তার পাল্লা দিয়েছে। শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক নাগরিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলে কী হবে, পাকিস্তানি সরকারের নজরদারিতেই দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে মাদ্রাসাভিত্তিক জিহাদি শিক্ষাব্যবস্থা। এদের নেতৃত্বেই পাকিস্তানের ১১ হাজার মাদ্রাসা থেকে প্রতিবছর পাঁচ লাখ ছাত্র বেরোচ্ছে, যাদের ভেতর কম করে হলেও ১০ হাজার ছাত্র হাতে-কলমে সন্ত্রাসী কাজে সামরিক প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। অনেক সময় সে শিক্ষা যে খোদ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানেই হয়েছে, তা আর গোপন কোনো ব্যাপার নয়। সবচেয়ে পরিহাসের কথা হলো, এসব জিহাদির রোষের আগুনে সবচেয়ে বেশি পুড়েছে পাকিস্তানিরা নিজেরাই। কখনো শিয়া মসজিদে, কখনো বাজারে, কখনো বা মেয়েদের স্কুলঘরে বা পাঁচতারা হোটেলে জিহাদি হামলার ফলে গত কয়েক বছরে পাঁচ হাজারেরও বেশি পাকিস্তানির মৃত্যু হয়েছে। পাকিস্তান আশা করেছিল, এসব জিহাদি নজর দেবে ভারতের দিকে। কিন্তু তারা যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে উঠবে, তা তাদের মাথায় ঢোকেনি।
এবার তারা নজর দিয়েছে আমেরিকার ওপর। তার সৃষ্টির গোড়া থেকেই পাকিস্তান আমেরিকার তাঁবেদার রাষ্ট্র, আমেরিকাই তাকে ডলার, গম ও বোমারু বিমান সরবরাহ করে টিকিয়ে রেখেছে। আমেরিকা যেন পাকিস্তানের কামধেনু, বোঁটা ধরে টিপলেই ডলার ছলাৎ ছলাৎ করে পড়তে থাকে। তো, সেই দুধেল গাইয়ের ওপরেই যে জিহাদিরা পেছন থেকে ঢিল ছুড়বে, তা সম্ভবত পাকিস্তানের সরকারি জিহাদ প্ল্যানাররা ভাবেননি। এ কথা ঠিক যে আমেরিকার ব্যাপারে পাকিস্তানের সরকার ও তার দেশের মানুষের মনোভাবে বড় রকমের ব্যবধান রয়েছে। পাকিস্তানের উত্তর পাড়া-দক্ষিণ পাড়া যে যত মার্কিনপন্থীই হোক না কেন, দেশের মানুষ আমেরিকাকে ভারতের চেয়েও বড় শত্রু মনে করে। দেশের তথ্যমাধ্যমেও এ নিয়ে জ্বালাময়ী সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়র কমতি নেই। সবচেয়ে তেতে রয়েছে টিভির টক শো হোস্টগুলো। ব্যাপারটার ভেতর যে এক ধরনের পরিহাস রয়েছে, সে কথা অলক্ষ্যে জানিয়ে পারভেজ হুদোবয় লিখেছেন, এদের কথা শুনে মনে হয়, আমেরিকা বছর বছর যে কোটি কোটি ডলার পাকিস্তানের টাঁকশালে ঢালছে, তা যেন পাকিস্তানের নিজের টাকা, আমেরিকাই সে টাকায় ভাগ বসাতে চায়!
পাকিস্তানিদের মার্কিনবিরোধী মনোভাবকে সে দেশের খাকিওয়ালারা এত দিন পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থেই ব্যবহার করেছে। পাকিস্তানের ভেতর সন্ত্রাসী হুমকি যত বেড়েছে, আমেরিকাও তড়িঘড়ি করে সেখানে তাদের অনুদানের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যে নতুন লুগার-কেরি আইন আমেরিকার কংগ্রেসে পাস হয়েছে, তাতে আগামী পাঁচ বছরে পাকিস্তানের জন্য সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে। এই টাকার একটা বড় অংশ সামরিক খাতে ব্যবহার করা হবে, বাকিটা হবে সামাজিক খাতে। কিন্তু শর্ত দেওয়া হয়েছে একটা—সন্ত্রাসীদের ঠেকাতে হবে। তো, ঠেকানো দূরের কথা, সে জিহাদিরা এখন যদি আমেরিকাকেই টার্গেট বানিয়ে বসে, তাহলে উল্টো বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। শুধু যে এই দুধেল গরু দুধ দেওয়া বন্ধ করবে তা-ই নয়, সরাসরি গুঁতো দিতেও তেড়ে আসবে। আমেরিকান নীতিনির্ধারকেরা কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, তাঁদের নিজেদের ভূখণ্ডে কারও গায়ে যদি আঁচড়টুকুও লাগে, পাল্টা ব্যবস্থা নিতে তাঁরা বাধ্য হবেন। শুধু আত্মরক্ষার প্রয়োজনেই নয়, নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও তাঁদের খোদ পাকিস্তানের ভেতর হামলা করতে হবে। ওবামা প্রশাসনের এমনিতেই বদনাম রয়েছে যে নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা নরম, ‘টেররিস্ট’দের সঙ্গে হাত মেলাতেও তাদের আপত্তি নেই। এ অবস্থায় নিজের গদি সামাল দিতেই ওবামাকে সাঁড়াশি হামলা চালাতে হবে। যেমন হামলা চালিয়েছিলেন জর্জ বুশ ওসামা বিন লাদেনের আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে, ৯/১১-এর আক্রমণের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে।
অবস্থা যাতে তত দূর না গড়ায়, তার জন্য পাকিস্তানের সামনে খোলা পথ একটাই—নিজের গৃহপালিত জিহাদিদের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া। শুধু সামরিক ব্যবস্থা নিলেই হবে না, দেশের মানুষের জিহাদি সংস্কৃতি পরিবর্তনেও হাত লাগাতে হবে। এই কাজটা যদি দেশের ভেতর থেকে, নাগরিক প্রতিরোধের ভিত্তিতে অর্জিত না হয়, তাহলে সফল হওয়া অসম্ভব হবে। আশার কথা, পাকিস্তানিদের ভেতরেই কেউ কেউ এখন সে দাবি তোলা শুরু করেছেন।
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

পরিকল্পিত পরিবার সুখের বন্ধন by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

মানব সমাজের আদি ও ক্ষুদ্রতম মৌলিক প্রতিষ্ঠান হলো পরিবার। আর বিবাহ হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে পরিবার গঠনের অন্যতম মাধ্যম। বিবাহ এমন একটি সামাজিক বন্ধন, যার মাধ্যমে নর-নারী একটি স্থায়ী ও মধুর সম্পর্কে আবদ্ধ হয় এবং সন্তান জন্মদানের পরও তাদের এ পারিবারিক সুখের বন্ধন স্থায়ী হয়ে থাকে। মুসলিম সমাজে পরিকল্পিত পরিবার গঠনে বিবাহ হচ্ছে একটি মৌলিক উপাদান। ইসলামের দৃষ্টিতে মানব জীবনে পরিকল্পিত পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী-স্ত্রী, পুত্র-কন্যা, পিতা-মাতা ও ভাই-বোনের সমন্বয়ে একটি যৌথ পরিবার এবং সামাজিক সুসম্পর্কের ভিত্তি গড়ে ওঠে। পরিকল্পিত পরিবার ছাড়া একজন মানব শিশু সুসন্তান হিসেবে বেড়ে উঠতে পারে না। সন্তানদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষাদান, চরিত্র গঠনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবারের দায়িত্ব ও কর্তব্য পিতামাতার ওপর বর্তায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের যুগল থেকে সন্তানসন্ততি ও পুত্র-পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জীবন উপকরণ প্রদান করেছেন।’ (সূরা আন-নাহ্ল, আয়াত-৭২)
পরিবার গঠন ও বৈবাহিক জীবনযাত্রা শুরুর কালে পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ে উভয়ের বুদ্ধি, সামর্থ্য, কামনা, অভিপ্রায়, কর্মসূচি, লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য সচেষ্ট হওয়া উচিত। সুদৃঢ়ভাবে পরিকল্পিত পারিবারিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা ও শলা-পরামর্শের দ্বারা জন্ম নিয়ন্ত্রণ বা গর্ভ বিরতিকরণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে বহু পরিবারের অস্বচ্ছন্দ দাম্পত্য জীবন স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যেতে দেখা যায়। স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের মধ্যে জ্ঞানের অভাব, শিক্ষাগত অনগ্রসরতা, অপরিকল্পনা, অযৌক্তিক দাবি ও প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক সমস্যা ও সাংস্কৃতিক বিরোধ প্রভৃতি অসংখ্য কারণে প্রায়ই বৈবাহিক জীবনে দাম্পত্য সম্পর্ক বিকশিত হয়ে ওঠার সুযোগ পায় না। তাই হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে কাজ কর, যাতে কাজটা সুষ্ঠু ও সুন্দর হয়।’
নর-নারীর মধ্যে সুস্থ-স্বাভাবিক ও পরিকল্পিত পদ্ধতিতে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের পথ বৈবাহিক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালনের মাধ্যমে প্রশস্ত হয়। পারিবারিক জীবনে দাম্পত্য সম্পর্কের দ্বারাই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরতাও গড়ে ওঠে। একে অন্যের সন্তুষ্টি ও স্বস্তির জন্যই নয়, বৈরী পরিস্থিতির মোকাবিলায় যুগল সম্পর্কজাত শক্তি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। পরিবারে নতুন অতিথি তথা নবজাত সন্তানের আবির্ভাবের ফলে দাম্পত্য সম্পর্ক সাংগঠনিক পরিপূর্ণতা লাভ করে। বৈবাহিক চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা পরিবারে শিশুর আগমন ঘটে। স্বামী-স্ত্রীর ক্ষুদ্র পরিবারের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধনের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠে নবজাত সন্তান। ইসলামের আলোকে পরিবার হলো একটি শিশুর জীবন গড়ার প্রাথমিক পাঠশালা ও প্রধান পাঠাগার। এখানে শিশুর জীবনের ভিত রচিত হয়। পরিবারে শিশুরা ধীরে ধীরে গুণে ও মাধুর্যে বড় হয়ে যা কিছু শিখবে বা সুন্দর স্বভাব আয়ত্ত করবে এর বহিঃপ্রকাশ বাইরে ঘটাবে। পরিবার থেকে শিশু অন্যের সঙ্গে মেলামেশার সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রথম সুযোগ পায়। মুসলিম পারিবারিক কাঠামোর মধ্যেই সামাজিক সম্পর্ক রচনায় শিশুর প্রাথমিক অনুশীলন শুরু হয়।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসবাসের মধ্য দিয়েই শিশুরা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রচনার গুণাগুণের পরিচয় লাভ করতে শুরু করে। এ জন্য ক্ষুদ্র পরিবারের প্রধান দুজন সদস্য পিতা ও মাতার গুরুত্ব অপরিসীম। সন্তান পিতা-মাতার অতি প্রিয়জন। তারা পিতা-মাতার প্রতি অনুগত ও বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে—এটাই ইসলামের শিক্ষা। শিশুরা খুবই অনুকরণপ্রিয়; তারা যা শোনে, যা দেখে, তা-ই বলে ও করে। তাদের স্নেহ, আদর ও সুন্দর আচরণ শেখানো জরুরি। এতে তারা আদব-কায়দা, শিষ্টাচার ও ভালো কথা বলতে শিখবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘যে ছোটদের স্নেহ-মমতা করে না এবং বড়দের শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (বুখারি, তিরমিজি)
শিশুরা পরিবারের আদর-যত্ন, দয়া-মায়া, ভালোবাসা পেলে তারা সুন্দরভাবে বড় হবে এবং আস্তে আস্তে তাদের মধ্যে মানবীয় গুণাবলির ভিত্তি মজবুত হবে। এভাবে পারিবারিক জীবন শুরুর প্রাথমিক বছরগুলোতেই শিশুর মানসিক বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব কাঠামো গড়ে ওঠার সুযোগ হয়। পরবর্তী জীবনে শিশুর আচার-ব্যবহার ও কাজকর্মের ওপর প্রারম্ভিক জীবনাচরণের এই পরিবারিক অভিজ্ঞতা গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে। পরিবারে পিতা-মাতা যে ধরনের আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও কাজকর্ম করেন, ছেলে-মেয়েরা সেসব অনুসরণ করতে শিখে। ছেলে-মেয়েরা তাদের জীবনের আদর্শ হিসেবে পিতা-মাতাকে গ্রহণ করে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানদের সুশিক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা সন্তানদের স্নেহ করবে এবং তাদের শিষ্টাচার শিক্ষাদান করবে। সন্তানকে সদাচার শিক্ষা দেওয়া দান-খয়রাতের চেয়েও উত্তম।’
পরিকল্পিত পরিবারে ইসলামের নৈতিকতাবোধ, সামাজিক ব্যবহার, রীতিনীতি, চালচলন ও মানুষের সম্পর্কের গুণাগুণ সম্বন্ধে শিশুর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। এ পারিবারিক অনুশীলন ও শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা চালিকাশক্তির কাজ করে থাকে। পারিবারিক জীবনযাত্রার এসব ভালো দিকের পাশাপাশি শিশুর মন্দ দিকগুলো পরিবারে অসৎ সংস্পর্শ ও অবহেলা থেকেই প্রবল হয়ে ওঠার সুযোগ পায়। শিশুর পরবর্তী জীবনের জন্য শুধু নয়, বরং সমাজের জন্যও পারিবারিক জীবনে গড়ে ওঠা শিশুর বদস্বভাব বা অসদাচরণগুলো ভীষণ ক্ষতিকর হয়ে প্রতিভাত হয়। সুতরাং উন্নত ভাবধারা, ধর্মীয় জীবনাদর্শের বোধ ও অনুশীলন যদি শিশুরা বাল্যকালে সঞ্চারিত ও চর্চার সুযোগ পায়, তাহলে পরিণত বয়সে তারা দেশ-জাতি-সমাজ ও পরিবারের কল্যাণের সহায়ক হয়ে মানসিক বিকাশ লাভ করতে পারে। পরিবার থেকে শিশুদের উত্তম ও যুগোপযোগী শিক্ষাদানের জন্য নবী করিম (সা.) উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের উত্তমরূপে জ্ঞানদান করো। কেননা তারা তোমাদের পরবর্তী যুগের জন্য সৃষ্ট।’ (মুসলিম)
পরিকল্পিত পরিবারে সন্তান আগমনে নতুন নতুন দায়দায়িত্ব, চিন্তা-চেতনা ও কর্তব্যবোধ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মানসিকতার পরিবর্তন সাধন করে দেয়। একমাত্র সুস্থ, সুন্দর ও পরিকল্পিত দাম্পত্য সম্পর্ক নির্মিত হওয়ার মাধ্যমেই ছোট পরিবারে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও শান্তিময় পরিবেশ বিরাজ করতে পারে। শিশুর শারীরিক ও মানসিক উত্থানের জন্য কেবল পরিবারই অনুকূল পরিবেশ বিবেচিত হয়ে থাকে। আর দুটি পৃথক সত্তা নর-নারীর সমন্বিত জীবনযাত্রার মাধ্যমে শিশুর নব জীবনের উপযোগী পরিবেশ রচনা করে দিয়ে থাকেন। মুসলিম পারিবারিক জীবনে নারী-পুরুষের আদান-প্রদান নির্ভর এই যৌথশক্তি শুধু বৈবাহিক সম্পর্ক নির্মাণের মধ্য দিয়েই শান্তিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠা সম্ভব। আমরা যদি ইসলাম প্রদত্ত দিকনির্দেশনাবলি যথাযথভাবে পালন করে পরিকল্পিত পরিবার গঠন করতে পারি তাহলে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে সুখের বন্ধন এবং দেশে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
dr.munimkhan@yahoo.com

তাহলে কেমন দুদক প্রয়োজন by মশিউল আলম



৩ মে জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি হিসাবসক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভা শেষে ওই কমিটির সভাপতি মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলেছেন, যা সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যেমন, তিনি বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক আমলের মতো ক্ষমতার অপব্যবহারকারী দুদকের প্রয়োজন নেই। তাঁর মতে, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুদক সংবিধান লঙ্ঘন করে গোষ্ঠীস্বার্থে বিশেষ মহলের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় যেসব রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ক্ষমতাধর ব্যক্তি ‘দুর্নীতি ও গুরুতর অপরাধ দমনবিষয়ক টাস্কফোর্স’ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের দ্বারা নানা রকম হয়রানি, নিগ্রহ, নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের সাধারণ অভিযোগ কমবেশি এই রকম। এ অভিযোগ সংক্ষুব্ধ মানুষের অভিযোগ। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির অভিযোগ পক্ষপাতযুক্ত হতে পারে। যাঁরা সে সময় দুর্নীতি/ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁরা কারামুক্ত/মামলামুক্ত হলেও এ কথা বলা কঠিন যে, তাঁদের সবাই নিষ্কলুশ, কোনো দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার তাঁরা করেননি। বিচারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা বা যে কারণেই হোক, দুর্নীতির মামলাগুলো অভিযুক্তদের শাস্তি দিতে সক্ষম হয়নি বলেই জনমনে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়নি যে অনিয়ম-দুর্নীতি কিছুমাত্র ঘটেনি। অভিযোগ আদালত পর্যন্ত পৌঁছুতে পারুক বা না পারুক, অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হোক বা না হোক—জনসাধারণের মনে এত দিনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত যে: কিছু বিরল ব্যতিক্রম বাদে ক্ষমতাবানেরা সাধারণভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি করেন, ক্ষমতার অপব্যবহারের মধ্য দিয়ে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়ার প্রবণতা বেশ আছে।
কিন্তু তার মানে এটাও নয় যে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুদক বা সেই সাড়া-জাগানো টাস্কফোর্স যা কিছু করেছিল, তার সবই ছিল নৈতিক ভিত্তিসম্পন্ন। টাস্কফোর্স বা দুদক যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, প্রথম দিকে সেগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষ উৎসাহিত বোধ করলেও অচিরেই সংশয় দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে দুদকের সিলেক্টিভ পদ্ধতিতে দুর্নীতির বিচারের উদ্যোগ এমন প্রশ্ন জাগিয়েছিল: কাউকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, কাউকে নয়—এটা কেন? দুর্নীতি কি বাছাই করে বিচার করার মতো অপরাধ? তা ছাড়া, যাঁরা ক্ষমতা নিয়েছিলেন, তাঁদের নিজেদের ক্রিয়াকর্মের জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থা ছিল না বলে দুর্নীতি দমনের নামে তাঁরা নিজেরাও দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছেন কি না—এমন জিজ্ঞাসাও জনমনে জেগেছিল। তাঁরা ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর অনেক অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে শোনা গেছে। এখনো সেসব অভিযোগের প্রতিধ্বনি চলছে। মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সেদিনের বক্তব্যে সেই প্রতিধ্বনিই শোনা গেছে।
স্বস্তির বিষয়, সেসব দিন গত হয়েছে। দেশ এখন একটি গণতান্ত্রিক সরকারের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের কাছে এখন কিছু জবাবদিহি মানুষ দাবি করতে পারে। নির্বাচনে জনগণের রায় নিয়ে যাঁরা পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্র পরিচলানার দায়িত্ব ও ক্ষমতা পেয়েছেন, তাঁরা যদি মনে করেন, আগামী পাঁচ বছর তাঁরা যা করবেন তার সবকিছুর পেছনেই জনগণ আগাম সমর্থন দিয়ে রেখেছে, তবে সেটা হবে এক বিরাট ভুল। সেই সঙ্গে তাঁদের প্রতি মুহূর্তে বিচার করে দেখা উচিত, তাঁরা যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন সেগুলো তাঁদের নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না। কোনো বিষয়ের পক্ষে জনসমর্থন রয়েছে কি না, তা বোঝার জন্য সংবাদমাধ্যমে প্রতিফলিত বিভিন্ন মতামত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন এমনভাবে সংশোধনের প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, যার ফলে এই স্বাধীন সংস্থাটি আপন কর্তব্য পালনের ক্ষেত্রে অনেকাংশে নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এটা কি সরকারের নির্বাচনপূর্ব প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? এ রকম সংশোধনীর প্রস্তাব তৈরির প্রক্রিয়ায়, বা তা মন্ত্রিসভায় পাঠানোর আগে কি এ বিষয়ে জনমত যাচাইয়ের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? এমনকি খোদ দুদকেরও মতামত নেওয়া হয়েছে কি? দুদক নিজেই যদি মনে করে এই সংশোধনী তার ক্ষমতা খর্ব করবে, তাহলে এ রকম সংশোধনীর উদ্যোগ নেওয়া কি যুক্তিসঙ্গত, যখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে যে দুদককে আরও শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও ফলপ্রসূ করা হবে? এগুলোর উত্তর: না, না এবং না। আপামর জনসাধারণ বা সচেতন নাগরিক সমাজ—কারোর মতামত যাচাই বা বিবেচনা না করে সম্পূর্ণ এককভাবে সরকার দুদক আইন সংশোধনের এই উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, সরকারের নেতারাও বুঝতে পারছেন যে কাজটি সদুদ্দেশ্যপূর্ণ নয়। দুদককে শক্তিশালী করা নয়, বরং দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মতো একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করাই এ সংশোধনীর উদ্দেশ্য—এটা সবার কাছেই পরিষ্কার।
সেদিন মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, দুদককে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেওয়া যাবে না, তাহলে সেনাপ্রধানও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চাইবেন। প্রথমত স্মরণ রাখা দরকার: নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কাউকেই দেওয়া যাবে না, গণতন্ত্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বলে কিছু নেই। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব যাতে নিরঙ্কুশ না হয়ে ওঠে সে জন্যই কতকগুলো স্বাধীন সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান থাকে। দ্বিতীয়ত, দুদকের কতটা ক্ষমতা থাকবে, তা নির্ধারিত হবে সংবিধান-নির্দেশিত সুশাসনের চেতনার আলোকে ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী। দুদক দুর্নীতি দমন করবে, দুর্নীতির বিচার করবে—এ জন্য তার যতটা ক্ষমতা দরকার তা সে পাবে, সে জন্য যেরকম আইনের দরকার হয়, নির্বাচিত আইনপ্রণেতাদের সেরকম আইনই প্রণয়ন ও গ্রহণ করতে হবে। দুদক আইনে যেসব সংশোধনী আনার প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় গৃহীত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলোকে উপেক্ষা করা বা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়া মোটেও গণতান্ত্রিক আচরণ নয়।
দুদককে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দিলে সেনাপ্রধানও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা চাইবেন—এটা এক ধরনের তিক্ত খেদময় প্রতিক্রিয়া। সেনাপ্রধানেরা কি কখনো ক্ষমতা চেয়ে নেন? এবং ক্ষমতা না দিলে তাঁরা কি তাঁদের মাহেন্দ্রক্ষণে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন? না। যখন মুহূর্ত আসে, পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়, তখন তাঁরা কোনো কিছুরই অপেক্ষা করেন না। অবলীলায় নিজেদের হাতে তুলে নেন রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা (কখনো সরাসরি, কখনো বা কোনো বাতাবরণে)। এবং জনগণ কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত, মোহগ্রস্ত হয়ে ভাবে—রক্ষাকর্তারা এসে গেছেন, এইবার সব বদলে যাবে, দুর্নীতি-দুঃশাসন থেকে রক্ষা পাবে দেশ-জাতি।
কিন্তু তাই কি কখনো হয়? হয়েছে কখনো? এরশাদের ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদের’ কথা কি মনে পড়ে না? তাঁর বাইসাইকেলে চড়ে অফিসে যাওয়ার দৃশ্য কি আমরা ভুলে গেছি?
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের মতো দুদকের কোনো প্রয়োজন নেই। মহীউদ্দীন খান আলমগীরের এই বক্তব্য শতভাগ সমর্থনযোগ্য। কারণ সে সময় দুদক স্বাধীন ছিল না, ছিল নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ, যে নির্বাহী বিভাগ চলছিল সেনাবাহিনীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। কিন্তু সেই অধীনস্থতা সাধারণের চোখে লাগছিল না, কারণ তখন কাজ চলছিল রাষ্ট্রের প্রত্যেকটি অঙ্গপ্রতঙ্গের মধ্যে একধরনের বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। বোঝাপড়াটা গণতান্ত্রিক ছিল না, এক অঙ্গ অন্য অঙ্গের আচরণের জবাবদিহি দাবি করেনি। দৃষ্টান্তস্বরূপ, সেনাবাহিনীর সদস্যরা অনিয়ম-দুর্নীতি করছিলেন কি না, উপদেষ্টাদের সব আচরণ সততাপূর্ণ ছিল কি না—এসব প্রশ্ন দুদক বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা তোলেনি। যাঁদের হাতে ক্ষমতা ছিল তাঁরা কেউ কোনো নয়-ছয় করছেন কি না—দুদক এই প্রশ্ন তুললেই টের পাওয়া যেত সে কতটা স্বাধীন।
তো সেই রকম দুদক আমরা কেন চাইব? তাহলে কেমন দুদক প্রয়োজন? যে দুদক ক্ষমতাসীন প্রত্যেক ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে, মামলা করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করতে পারবে মহাক্ষমতাধর ব্যক্তিকেও। এটা সামান্য কথা, সবাই বোঝেন—একদম নিরক্ষর সাধারণ নাগরিকও। কিন্তু তার পরিবর্তে যদি দুদক আইন এমনভাবে সংশোধন করা হয়, যার ফলে সংস্থাটি সেই দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মতো নখদন্তহীন, নির্বাহী বিভাগের অনুগ্রহনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়, তবে তার প্রয়োজন নেই। সরকার যদি নিজের ইচ্ছামতো দুদককে ব্যবহার করার ক্ষমতা নিজের হাতে রেখে দেয়, তাহলে দুদকের বিলুপ্তিই শ্রেয়। জনগণের অর্থ খরচ করে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর হাতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিরাগভাজন ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানকে শায়েস্তা করার হাতিয়ার তুলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন আছে কি?
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

রেকর্ডসংখ্যক প্রথম শ্রেণী -সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ফল স্বাভাবিক নয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৭ সালের স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় (২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত) ৪৬ জনের প্রথম শ্রেণী পাওয়া নিয়ে শিক্ষকদের পারস্পরিক দোষারোপ প্রমাণ করে, এর পেছনে ঘাপলা রয়েছে। একই ব্যাচের স্নাতক সম্মান পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী পেয়েছিলেন মাত্র আটজন। স্নাতকোত্তর পরীক্ষার ফলাফলে খোদ বিভাগীয় চেয়ারম্যানও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং এ জন্য দুজন শিক্ষকের বেশি নম্বর দেওয়াকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে অভিযুক্ত একজন শিক্ষক বলেছেন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান এক শিক্ষার্থিনীকে বেশি নম্বর দিয়ে প্রথম শ্রেণী পাইয়ে দিয়েছেন। অপর একজন শিক্ষয়িত্রী পরীক্ষার্থীদের সময় দিতে না পারার কারণে প্রশ্নপত্র সহজ করার কথা স্বীকার করেছেন। বিভাগীয় শিক্ষকদের মধ্যকার বিরোধ ও আঞ্চলিকতার কারণে এমনটি হয়েছে বলে সন্দেহ করছেন অন্য একজন শিক্ষয়িত্রী।
সব মিলিয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের পরিবেশ যে সুস্থ ও শিক্ষানুকূল নয়, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। এ অবস্থায় স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় কীভাবে রেকর্ডসংখ্যক ৪৬ জন প্রথম শ্রেণী পেলেন, সে প্রশ্ন না উঠে পারে না। এর আগে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ৫২ জনের প্রথম শ্রেণী পাওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তোলপাড় হয়েছিল। গঠিত হয়েছিল তদন্ত কমিটিও। দেশের সর্বাধিক নামী বিদ্যাপীঠের পরীক্ষার ফলের ক্ষেত্রে এ রকম অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়। যেকোনো বিভাগের পরীক্ষার ফলাফলে ধারাবাহিকতা থাকা প্রয়োজন। কোনো বছর অহেতুক ‘ঔদার্য’ দেখানো, আবার কোনো বছর মাত্রাতিরিক্ত ‘রক্ষণশীল’ হওয়া কাম্য নয়। অথচ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকেরা সেই কাজটিই করেছেন। শিক্ষকদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, এর পেছনে রহস্য রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ‘কোনো বিষয়ে অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখা’র কথা বলেছেন।
যে ব্যাচের শিক্ষার্থীরা স্নাতক সম্মানে মাত্র আটজন প্রথম শ্রেণী পেয়েছেন, সে ব্যাচের স্নাতকোত্তরে ৪৬ জনের প্রথম শ্রেণী পাওয়া অস্বাভাবিক বটে। কীভাবে রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণী পেলেন, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। ভালো পরীক্ষা দিয়ে কেউ ভালো ফল করলে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু অযৌক্তিক উদারতা দেখিয়ে জোর করে কাউকে প্রথম শ্রেণী পাইয়ে দিলে প্রকৃতই যাঁরা ভালো পরীক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি অবিচার করা হয়। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অস্বাভাবিক ফলের পেছনে কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়ে থাকলে কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে তা খুুঁজে বের করা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

যারা এসএসসি দিয়েছে... by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যাপারটি হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। আমি আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ভুলে বসে আছি, কিন্তু এসএসসি পরীক্ষার দিনগুলোর কথা এখনো ভুলিনি! পরীক্ষা না যেটুকু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সব খবরের কাগজে হাস্যোজ্জ্বল ছেলেমেয়েদের ছবি ছাপা হবে, তারা একজন আরেকজনকে জড়াজড়ি করে ধরে, দুই আঙুল দিয়ে ‘ভি’ তৈরি করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—দেখেই আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। ছেলেমেয়েদের হাসিগুলো আমাদের মুখে ফুটে ওঠে, মনে হয়, তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদর করে দিয়ে আসি।
যেদিন এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়, তার পরদিন খবরের কাগজটির পৃষ্ঠা ওল্টানোর সময় আমার বুক দুরু দুরু করতে থাকে। প্রথম পৃষ্ঠায় ছেলেমেয়েদের হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবির পাশাপাশি আরও একটি ব্যাপার ঘটে, সেটি হচ্ছে আশাভঙ্গের বেদনা। সেই খবরগুলো খবরের কাগজে আসে না, আমরা তাই জানতে পারি না। আশাভঙ্গের কারণে কোনো ছেলে বা মেয়ে যখন ভয়ানক কিছু করে ফেলে, তখন সেটি খবরের কাগজে চলে আসে, সেগুলো দেখে আমার বুক ভেঙে যেতে চায়, নিজেদের অপরাধী মনে হয়। বেশ কয়েক বছর আগে খবরের কাগজে ফুটফুটে একটি মেয়ের ছবি দিয়ে তার বাবা-মায়েরা একটা বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে ছিলেন। এসএসসির রেজাল্ট হওয়ার পর মেয়েটি মন খারাপ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, বাবা-মা কাতর-কণ্ঠে সেই মেয়েটিকে বাড়ি ফিরে আসার জন্য অনুনয় করছেন। বিজ্ঞাপনটি কেটে সেটি আমি অনেক দিন পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি, মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে, ফোন করে বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করি মেয়েটি ফিরে এসেছে কি না। শেষ পর্যন্ত সাহস করে ফোন করতে পারিনি, যদি শুনি তাঁরা বলেন মেয়েটি আর ফিরে আসেনি, চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে, তখন আমি কী করব।
কখনো কখনো আরও ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে, পরীক্ষার রেজাল্ট হওয়ার পর একটি ছেলে বা মেয়ে আশাহত হয়ে আত্মহত্যা করে ফেলে। কী সর্বনাশ! আমি তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে সেই খবরটির দিকে তাকিয়ে থাকি, নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারি না। এবার এসএসসি পরীক্ষা চলার সময় হঠাৎ আমার কাছে একটি এসএমএস এসেছে, সেখানে লেখা পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্ন কঠিন হয়েছে, পরীক্ষা খারাপ হওয়ার জন্য একজন আত্মহত্যা করেছে।
সবার নিশ্চয়ই মনে আছে, মাঝখানে একটা সময় গেছে যখন প্রতিদিনই কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে—সবাই কম বয়সী মেয়ে। বাবা-মা বৈশাখী মেলায় নিয়ে যাননি বলে আত্মহত্যা, মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে আত্মহত্যা, বখাটে ছেলে রাস্তায় টিটকারি দিয়েছে বলে আত্মহত্যা, ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে মন কষাকষি হয়েছে বলে আত্মহত্যা। আমরা প্রতিদিন খবরের কাগজ খুলে দেখি আর চমকে চমকে উঠি।
আমার কাছে বিষয়টা অনেক বেশি বেদনাদায়ক ছিল, কারণ ঠিক সেই সময় আমার একজন ছাত্রী গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শাওয়ারের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। একেবারে ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট সেমিস্টারের বাচ্চা একটি মেয়ে। হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল। নিজের হাতে নিজের জীবনটা নেওয়ার ৩০ মিনিট আগেও সে জানত না, এ রকম ভয়ংকর একটা কাণ্ড সে করে ফেলবে। গভীর রাতে টেলিফোনে খবর পেয়ে মেয়েদের হোস্টেলে গিয়ে আমার প্রিয় মেয়েটির প্রাণহীন নিথর দেহটিকে বাথরুমের শাওয়ারের সঙ্গে ঝুলতে থাকার দৃশ্যটি যে কী ভয়ংকর রকম হূদয়বিদারক, সেটি অন্য কেউ বুঝতে পারবে না। শুধু মনে হয়, আহা, মেয়েটি গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ঝুলে যাওয়ার আগে যদি শুধু একবার আমাকে ফোন করে বলত, স্যার আমার বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে, রাগে-দুঃখে-অপমানে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে—তাহলে হয়তো আমি এই বাচ্চা মেয়েটিকে বলতে পারতাম, তোমার জীবন তোমার একার নয়। তোমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তোমার আপনজনের জীবন—স্বার্থপরের মতো নিজের জীবনটুকু নিয়ে তোমার আপনজনকে তুমি কষ্ট দিতে পারো না! তাকে আমি আরও অনেক কিছু বলতে পারতাম, আগে আমার কাছে যখন লেখাপড়ার কথা বলতে এসেছে, তখন আমি তাকে যেভাবে উৎসাহ দিয়েছি, তার থেকে একশ গুণ বেশি উৎসাহ দিতে পারতাম। কিন্তু বাচ্চা মেয়েটি আমার সঙ্গে কথা বলেনি, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলেনি, বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেনি, মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শাওয়ার থেকে ঝুলে পড়েছে।
আমি এখনো ক্লাস নেওয়ার সময় ভুল করে তার রোল নম্বর ডেকে ফেলি, তখন মনে পড়ে এই রোল নম্বর থেকে আমার ছাত্রীটি আর কখনো উত্তর দেবে না। একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে দুঃখের ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।

২.
টিন-এজ বয়সটা খুব জটিল একটা সময়। আমরা সবাই সেই সময়টা পার হয়ে এসেছি এবং আমাদের সবারই নিশ্চয়ই সেই সময়টার কথা মনে আছে। পরিচিত পৃথিবীটা তখন অন্য রকম মনে হতো—তখন বুকের ভেতর থাকত তীব্র আবেগ। সহজ বিষয়টাকে মনে হয় জটিল, জটিল বিষয়টাকে মনে হয় দুর্বোধ্য। শরীরে নতুন নতুন হরমোন খেলা করতে শুরু করেছে, সেই হরমোন আমাদের চিন্তার জগৎকে পাল্টে দিচ্ছে। আমরা সবাই সেই জটিল সময়টা পার হয়ে আসতে পেরেছি, কারণ আমাদের চারপাশে থাকত পরিবারের আপনজন। মনের কথা বলার জন্য থাকত বন্ধুবান্ধব, কাজকর্মে ব্যস্ত থাকার জন্য থাকত লেখাপড়ার দায়িত্ব, শরীরের প্রাণশক্তি বের করার জন্য থাকত খেলার মাঠ। টিন-এজ সময়ের সেই জটিল মাইনফিল্ডে সাবধানে পা ফেলে ফেলে আমরা বের হয়ে এসেছি।
সবাই বের হতে পারে না, জটিল ধাঁধায় আটকা পড়ে যায়। সারা পৃথিবীর পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করে টিন-এজ ছেলেমেয়েরা। আমাদের বাংলাদেশের কোনো পরিসংখ্যান আমি খুঁজে পাইনি, কিন্তু পৃথিবীর পরিসংখ্যান অনুযায়ী এটি হচ্ছে এই বয়সী ছেলেমেয়েদের অপমৃত্যুর বড় কারণগুলোর একটি। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে—এই বয়সী ছেলেমেয়েদের জীবনটাকে সহজ করার জন্য তাদের অনেক রকম পরিকল্পনা থাকে—আমাদের সে রকম কিছু নেই, আমরা শুধু কমন সেন্স দিয়ে এগুলো সমাধান করার চেষ্টা করি। আমি যখন বাংলাদেশে প্রথম এসে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছি, তখন একজন ছাত্রের খোঁজ পেলাম যে একাধিকবার ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। আমি তাকে ডেকে পাঠিয়েছি, তার সঙ্গে কথা বলেছি। সে তখন মাথা নিচু করে কাতর-কণ্ঠে বলেছে, ‘আমি জানি না স্যার, আমি কী করব, আমার মাঝেমধ্যেই আত্মহত্যা করার ইচ্ছে করে।’ আমি তাকে বলেছি, এর পরের বার যখনই ইচ্ছে করবে, আমার সঙ্গে দেখা করবে। ছাত্রটি মাঝেমধ্যেই আসত, অপরাধীর মতো বলত তার আত্মহত্যা করার ইচ্ছে করছে। আমি তখন তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলতাম, উৎসাহ দিতাম—জটিল একটা পৃথিবী যে আসলে সহজ, আনন্দময় একটা জীবন তাকে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। শেষ পর্যন্ত ছাত্রটি লেখাপড়া শেষ করে বিদেশে স্থায়ী হয়েছে। ফুটফুটে একটা মেয়েকে বিয়ে করে সুখে ঘর-সংসার করছে।
আমি মনোবিশেষজ্ঞ নই, আমি শুধু কমন সেন্স দিয়ে বুঝতে পারি টিন-এজ বয়সের জটিল একটা সময় যদি একটু স্নেহ-মমতা দিয়ে পার করিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে পরের জীবনটা হয় অনেক সহজ।
সে জন্য এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার দিন আমার বুক ধুকপুক করতে থাকে। আমি জানি, এদিন যখন লাখ লাখ ছেলেমেয়ে সাফল্যের আনন্দে উদ্ভাসিত হবে, ঠিক তখন অসংখ্য ছেলেমেয়ে আশাভঙ্গের কষ্টে কাতর হবে। এদের সবাই যে নিজের কারণে এই আশাভঙ্গের বেদনাটুকু পাবে তা নয়—অনেক সময়ই সেটি হবে নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমার সহকর্মীর একটি মেয়ে যখন পরীক্ষায় খুব ভালো একটা ফল আশা করছে, তখন আবিষ্কার করল সম্পূর্ণ বিচিত্র একটা কারণে খুব ভালো পরীক্ষা দেওয়া একটা বিষয়ে তাকে ফেল দেখাচ্ছে। আঘাতে মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়—আমরা এ রকম কথাবার্তা শুনেছি, সেবার আমি নিজের চোখে দেখলাম। মেয়েটি শুধু যে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল তা নয়, তার শরীরের সব অনুভূতিও থেমে গেল। ঘুমের ওষুধ দিয়েও তাকে ঘুম পাড়ানো যায় না, ভয়াবহ একটি অবস্থা। পরিবারের সবার স্নেহ-মমতা-ভালোবাসায় তাকে শেষ পর্যন্ত সুস্থ করে তোলা হয়েছিল। পরের বার পরীক্ষা দিয়ে চমৎকার রেজাল্ট করে এখন সে জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।
সবাই আমার সহকর্মীর মেয়েটির মতো সৌভাগ্যবান নয় যে একটা দুর্ঘটনার পর সে গভীর ভালোবাসা এবং মমতায় সেখান থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। অনেক সময়ই দেখা যায়, অভিভাবক বা আত্মীয়স্বজন আশ্চর্য রকম নিষ্ঠুর। একটি ছেলে বা মেয়ে পরীক্ষায় তার পছন্দের ফল না পেয়ে যখন গভীর আশাভঙ্গের বেদনায় কাতর হয়ে আছে, তখন তাকে তার চারপাশের মানুষ থেকে গালাগাল শুনতে হয়, অভিশাপ শুনতে হয়। টিন-এজ বয়সের সেই জটিল মনোজগতে এটি যে কী ভয়ংকর একটা ব্যাপার হতে পারে, সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। এই দেশের সব অভিভাবকের কাছে তাই আমার কাতর-অনুরোধ, এসএসসি পরীক্ষায় আপনার ছেলে বা মেয়ের ফল যদি আশানুরূপ না হয়, তাহলে তাদের ওপর রেগে উঠবেন না। তাদের সান্ত্বনা দিন, সাহস দিন, তাদের পাশে এসে দাঁড়ান।

৩.
আমাকে মাঝেমধ্যেই নানা রকম অনুষ্ঠানে যেতে হয়, সেই অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ অনুষ্ঠান হচ্ছে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান। সেখানে কয়েক হাজার ছেলেমেয়ে থাকে এবং সবাই পুরস্কার পায়। সেখান থেকে কেউ মন খারাপ করে যায় না।
সব অনুষ্ঠান এত সুন্দর নয়—অনেক অনুষ্ঠানেই প্রতিযোগিতা হয় এবং প্রতিযোগিতা হলেই সেখানে হাতে গোনা কয়েকজন বিজয়ী থাকে। যারা বিজয়ী হতে পারে না, আমি তাদের মনের কষ্টটা বুঝতে পারি। কারণ আমি ছেলেবেলায় অসংখ্যবার এই গ্লানি সহ্য করেছি। তাই এ ধরনের অনুষ্ঠানে গেলে আমি আমার সময়টুকু ব্যয় করি তাদের বোঝাতে যে বিজয়ী হতে না পারা অগৌরবের কিছু নয়। প্রতিযোগিতা একটা ছেলেমানুষি প্রক্রিয়া—পৃথিবীর বড় কাজ প্রতিযোগিতা দিয়ে হয় না, পৃথিবীর সব মহৎ কাজ হয় সহযোগিতা দিয়ে। তাই ছোটখাটো ব্যর্থতায় কোনো গ্লানি নেই, এটা হচ্ছে জীবনের পথচলার অভিজ্ঞতা। সবাইকে এর ভেতর দিয়ে যেতে হবে!
আমি খবর পেয়েছি, অনেক বাচ্চা-কাচ্চাও খবরের কাগজে ছাপা হওয়া আমার কলামগুলো পড়ে ফেলে! (কটমটে নীরস কলাম পড়ে সম্ভবত খানিকক্ষণ আমার মুণ্ডুপাতও করে।) অনুমান করছি, অনেক কম বয়সী ছেলে এই কলামটিও পড়ে ফেলবে। আমি শিরোনামটি এমনভাবে লিখেছি যেন যারা এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে, তারা এটি পড়ে ফেলে।
যাদের পরীক্ষার ফল ভালো হয়েছে তাদের অভিনন্দন। আমি নিশ্চিত তাদের পরিবার হইচই করে মিষ্টি কিনে আনবে—পাড়াপড়শি সবাইকে সেই মিষ্টি দেওয়া হবে। সেই মিষ্টি মুখে না দিয়েই আমি এখনই তার মিষ্টি স্বাদ অনুভব করতে পারছি। তাদের ভবিষ্যৎ জীবনটা হোক আনন্দময়, হোক সৃজনশীল। দোয়া করি তাদের যেন প্রাইভেট পড়তে না হয়, তাদের কোচিং করতে না হয়, জীবনে কখনো যেন তাদের গাইড বই স্পর্শ করে হাতকে অপবিত্র করতে না হয়। দোয়া করি, তারা বড় হয়ে এই দেশের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিক।
যাদের পরীক্ষার ফল মনমতো হয়নি কিংবা আপাতদৃষ্টিতে বলা যায় খুব খারাপই হয়েছে, আমার এই লেখাটি তাদের জন্য। আমি তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, তাদের এই আশাভঙ্গের সবচেয়ে বড় কারণ আমাদের এই পচা শিক্ষাব্যবস্থা। ১০ বছর লেখাপড়া করার পর যদি কেউ শূন্য হাতে বাড়ি ফিরে আসে, তাহলে তার দায়ভার তার একা নেওয়ার কথা নয়। সবাই মিলে এই দেশের লেখাপড়া ঠিক করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কাজ হচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসে যেটা হয়নি, এই প্রথমবার সেগুলো হচ্ছে। (এই দেশের অসম্ভব বড় সৌভাগ্য যে তারা একজন সত্যিকারের শিক্ষামন্ত্রী পেয়েছে, যিনি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কথা জানেন। সেটাকে ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করছেন। তাকে অনেক জ্বালা-যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে, সেটাও আমরা জানি। কিন্তু তাঁর ভয় পাওয়ার কিছু নেই, দেশের মানুষ তাঁর সঙ্গে আছে।) ভবিষ্যতের ছেলেমেয়েদের যেন এক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে না হয়, সেটাই আমাদের স্বপ্ন।
যাদের পরীক্ষার ফল ভালো হয়নি, তাদের নিশ্চয়ই মন খারাপ হবে—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মন খারাপ করে তারা যেন হতাশ হয়ে না যায়। পৃথিবীটা বিশাল, তার চেয়েও বিশাল হচ্ছে মানুষের জীবন। সেই বিশাল জীবনের সঙ্গে তুলনা করলে এসএসসি পরীক্ষাটা খুব ছোট একটা ঘটনা!
কাজেই বিশাল জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য এই ছোট ঘটনার কথা ভুলে নতুন উৎসাহে তাদের জীবন শুরু করতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে—এই বয়সটাই অন্য রকম, এই বয়সটাতে সবকিছুকেই একশ গুণ বড় মনে হয়। আনন্দকে একশ গুণ বড় করে দেখায় দোষ নেই।
কিন্তু দুঃখ-কষ্ট-হতাশাকে একশ গুণ বড় করে দেখা যাবে না। সামনের জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হলে আবার নতুন করে শুরু করতে হবে।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

‘ভারতে দুই কোটির বেশি অবৈধ অভিবাসী রয়েছে’

ভারতে দুই কোটির বেশি অবৈধ অভিবাসী রয়েছে। এদের অধিকাংশ এই উপমহাদেশেরই। গতকাল বৃহস্পতিবার ভারতের বিদেশবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা এ দাবি করেন।
অবৈধ অভিবাসী বিষয়ে আয়োজিত কর্মশালায় মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব জি গুরুচরণ বলেন, এ মুহূর্তে ভারতে দুই কোটির বেশি অবৈধ অভিবাসী আছে।
গুরুচরণ বলেন, আসলে কে কোন দেশের নাগরিক তা শুধু নৃতাত্ত্বিকভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ, চেন্নাইয়ের কেউ তামিলভাষী শ্রীলঙ্কান নাগরিক, পাঞ্জাবিভাষী কেউ পাকিস্তানি কিংবা বাংলাভাষী কেউ বাংলাদেশি নাগরিক হতে পারেন।
নেপাল থেকে ভারতে নারীপাচার সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে গুরুচরণ বলেন, ‘নেপালের সঙ্গে আমাদের সীমান্ত সুরক্ষিত রয়েছে। তার পরও এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সুশীল সমাজের সহায়তা প্রয়োজন।

‘ক্রসফায়ার’-এর আসল ও নকল -খুনের গায়ে আইনের রক্ষাকবচ পরানো আর নয়

‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধ’ যতই প্রতিদিনকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে, ততই দেখা যাচ্ছে নিহত ব্যক্তিদের অনেকেই র‌্যাব-পুলিশের হত্যাকাণ্ডের শিকার। সম্প্রতি নাটোরে এক বিচার বিভাগীয় তদন্তে ক্রসফায়ারের নামে পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যার প্রমাণ মিলেছে। গত বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোর এ সংবাদের পাশেই প্রকাশিত হয়েছে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আরও চারজন নিহত হওয়ার সংবাদ। এ ছাড়া হাইকোর্ট চট্টগ্রামে পুলিশের হেফাজতে একটি মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলে একই দিনে সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে। র‌্যাব-পুলিশের ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধ’ যে বেআইনি হত্যাকাণ্ড, উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলো সেই অভিযোগকেই আরও জোরালো করে তুলল।
র‌্যাব ও পুলিশের দাবি, তাদের গুলিতে নিহত প্রতিটি ব্যক্তিই ‘ভয়ংকর অপরাধী’ এবং নিহত ব্যক্তিদের মৃত্যুও আইনের আওতায়ই ঘটেছে। এ রকমভাবে ২০০৪ সালের জুন থেকে ২০০৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিনা বিচারে নিহত হয়েছেন এক হাজার ৪৬২ জন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র জানাচ্ছে, ২০০৯ সালেই নিহত হয়েছেন ২২৯ জন। এর মধ্যে নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের।
২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাপ্পী নামের এক তরুণ ঢাকায় ক্রসফায়ারে নিহত হন। র‌্যাবের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, তিনি ‘দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী’। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা সাধারণ অভিযোগ (জিডি) পর্যন্ত নেই! তাই কোনটি ‘আসল’ ক্রসফায়ার আর কোনটি ‘মিথ্যা’ ক্রসফায়ার, তা প্রমাণ হবে কী করে? যারা সন্ত্রাস দমনের নামে ‘ক্রসফায়ার’-এর পথ বেছে নিয়েছে, তাদের মাধ্যমে সেটা প্রমাণ করা কঠিন। তাই উচ্চতর আদালতের দায়িত্ব হয়ে পড়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করা। নাটোরের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম একটি খুনের ঘটনায় সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন উচ্চ আদালতের তরফে সব ‘ক্রসফায়ার’-এর ঘটনায়ও একই রকম তদন্ত হওয়া দরকার।
কাউকেই বিনা বিচারে হত্যা করা আইনের বরখেলাপ। কিন্তু সেই কাজটাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের অভিযোগ যে ভিত্তিহীন নয়, নাটোরের ঘটনায় সেটাই দেখা গেছে। এ পদ্ধতিতে যে অপরাধ দমন হয়, অব্যাহত সন্ত্রাস ও খুনোখুনির রেকর্ড তা প্রমাণ করে না।
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে সুস্পষ্টভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘এনকাউন্টার’-এর সমালোচনা করেন। সেদিন তিনি তদন্ত করে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রত্যয়ও ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও ‘ক্রসফায়ার’ বন্ধের প্রতিশ্রুতি ছিল। অথচ পরিহাস হলো, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী লাগাতার ‘ক্রসফায়ার’-এর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এ কাজে নিয়োজিত করেছে। তাঁদেরই এ অন্যায়ের দায় নিতে হবে। নাটোরের সার ব্যবসায়ী আনছার আলী কিংবা ঢাকার বাপ্পীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড সেই প্রশ্নই জাগিয়ে গেল। এখন সরকারকে ঠিক করতে হবে, এমন জ্বলন্ত অন্যায় তারা আর কত দিন চলতে দেবে?

জ্বালানি খাত ঢেলে সাজাবে যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন সিনেটররা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বহু প্রতীক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছেন। বুধবার অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে তাঁরা জ্বালানির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়া বিষয়গুলো পুনর্গঠনের অঙ্গীকারও করেন। মেক্সিকো উপসাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় উপকূলীয় প্রতিবেশ রক্ষায় সিনেটররা যখন সোচ্চার, ঠিক সে সময় এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হলো। খবর এএফপির।
এ উদ্যোগের পেছনে মূলশক্তি হিসেবে কাজ করছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ঘনিষ্ঠ মিত্র সিনেটর জন কেরি। বুধবার জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিলটি কার্বনের ওপর মূল্য আরোপ করবে। বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য কার্বন নির্গমনকেই দায়ী করা হয়। বিলটি অনুমোদিত হলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ব্যবহারের ধরনও বদলে যাবে। এতে সৃষ্টি হবে লাখ লাখ পরিবেশবান্ধব চাকরি।
জন কেরি বলেন, ‘এ বিল বিশ্বের প্রতি এমন এক বার্তা, যেখানে বলা হচ্ছে, বিশ্বের দূষণমুক্ত জ্বালানির সম্প্রসারণে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।

প্রাণনাশের আশঙ্কা নলিনীর, তদন্ত কমিটি গঠন

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি নলিনী শ্রীহরণ তাঁর প্রাণনাশের আশঙ্কা করেছেন। তাঁর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার শীর্ষ কারা কর্মকর্তাকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার তামিলনাড়ুর আইনমন্ত্রী দুরাই মুরুগান এ কথা জানান।
গত সোমবার বিধানসভার অধিবেশনে মুরুগান বলেন, তদন্ত কমিটির প্রধান রাজ্যের কোইমবাতর শহরের কারা উপ-মহাপরিদর্শক গোবিন্দরাজন কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ভেলোর নারী কারাগারে যাবেন এবং সেখানে নলিনীর অন্যান্য অভিযোগের অনুসন্ধান করবেন। নলিনী কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন, কারাগারের কর্মকর্তারা তাঁর ওপর নির্যাতনও করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, নলিনী বেশ কিছু দুর্দশা ও অভিযোগের কথা জানিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন। তাঁর অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। কমিটি দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্যাংককে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি নিহত ১, শীর্ষ নেতাসহ আহত ৮

থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সেনাবাহিনী গতকাল বৃহস্পতিবার গুলি চালিয়েছে। গুলিতে এক বিক্ষোভকারী নিহত ও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আটজন। গুলিবিদ্ধদের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের অন্যতম নেতা কাত্তিয়া সাওয়াসদিপলও রয়েছেন। সাওয়াসদিপল সেনাবাহিনীর একজন বরখাস্ত হওয়া জেনারেল। সেনাবাহিনীর এ দমনাভিযানে গোটা ব্যাংককে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করে ব্যাংককে তাদের দূতাবাস বন্ধের ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে ব্রিটেন আজ থেকে তাদের দূতাবাস বন্ধ রাখবে বলে গতকালই ঘোষণা দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যমগুলো বলেছে, সরকার বিক্ষোভকারীদের বিক্ষোভস্থল ত্যাগের জন্য যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, তা অতিক্রম করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেনাবাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে। সন্ধ্যার পর হঠাত্ করেই বাঁশ ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা বিক্ষোভস্থলে পর পর কয়েক দফা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। নিরাপত্তা বাহিনী একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালানো শুরু করে। গুলিতে একজন এক বিক্ষোভকারী ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
অন্যদিকে উত্তেজনা চলাকালে এক সাংবাদিককে সাক্ষাত্কার দেওয়ার সময় বিক্ষোভকারীদের অন্যতম নেতা কাত্তিয়া সাওয়াসদিপলের মাথায় গুলি লাগে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছাড়া এ পর্যন্ত আটজনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে বিরোধীরা রাজপথ না ছাড়লে ১৪ নভেম্বরের নির্বাচন স্থগিত রাখার পরিকল্পনা করছে সরকার। ফলে চলমান সংঘাত নিরসনের সম্ভাবনা আরও কমে গেল।
বিক্ষোভকারীরা বলছে, গত মাসে সামরিক অভিযানে নিহতদের ঘটনায় উপপ্রধানমন্ত্রীকে দোষী সাব্যস্ত না করা পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা রাজপথ না ছাড়লে নভেম্বরে নির্বাচন হবে না। বিক্ষোভকারীরা ঘরে ফিরলে তবেই নির্বাচন হবে। খবর এএফপি ও বিবিসি অনলাইনের।
প্রধানমন্ত্রী আপিসিত ভেজ্জাজিওয়া বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা সরে যেতে অস্বীকৃতি জানানোয় নির্বাচনের তারিখ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংককের স্বাভাবিক অবস্থা যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনার জন্য নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আপিসিত ভেজ্জাজিওয়ার সচিব কোরবাস্ক সাভবাসু বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, বিক্ষোভকারীরা কেবল মৌখিকভাবে জাতীয় রোডম্যাপ মেনে নিয়েছে। কিন্তু তারা রাজপথ ছেড়ে ঘরে ফিরে যেতে রাজি নয়। এ অবস্থায় পূর্বঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী ১৪ নভেম্বর নির্বাচন করা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, থাইল্যান্ডের সবাই যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং কোনো বাধা ছাড়াই পথ চলতে পারে, তবেই কেবল নির্বাচন হতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। আর নির্বাচন না হলে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ারও প্রশ্ন আসে না।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র সুনসার্ন কায়েকুমনার্ড বলেন, নিরাপত্তা কর্মকর্তারা স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টা (বৃহস্পতিবার) থেকে ব্যাংককের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীদের স্থান ঘেরাও শুরু করবে। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নতুন করে কেউ যাতে যোগ দিতে না পারে সে জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী বুধবার মধ্যরাত নাগাদ বিক্ষোভকারীদের খাওয়ার, পানি ও বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে সমর্থ না হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী আপিসিত বলেন, বিক্ষোভকারীদের এসব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
লাল শার্টধারী বিক্ষোভকারীদের আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী আপিসিত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে ১৪ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। থাইল্যান্ডের সব রাজনৈতিক দল তাঁর এ সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানান। লাল শার্টধারী বিক্ষোভকারীরাও এ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ১০ এপ্রিল আন্দোলনকারীদের ওপর সামরিক দমন-পীড়নের প্রতিবাদে তারা তাদের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
আন্দোলনকারীরা বলছে, ১০ এপ্রিল বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের ঘটনায় উপপ্রধানমন্ত্রী সুদিপ থাগসুবাকে অভিযুক্ত না করা পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না। ওই সেনা অভিযানে ২৫ ব্যক্তি নিহত হয়। তাদের মধ্যে ২০ জনই বিক্ষোভকারী।
লাল শার্ট নেতা ওয়েং তোজিরাকার্ন বলেন, সরকার নির্বাচন বানচাল করে এবং পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করতে চায়। নির্বাচন না করলে সরকার আত্মঘাতী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবে। আরেক লাল শার্ট পরা নেতা নাত্তাউত সাইকুয়ার বলেন, সরকারের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া ও আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্তে বিক্ষোভকারীরা এখনো অটল। তবে তাদের প্রধান দাবি হলো, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
আগাম নির্বাচনের দাবিতে মার্চের মাঝামাঝি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার অনুসারীরা আন্দোলনে নামে। দুই মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে ২৯ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে এক হাজার। দুই দশকের মধ্যে থাইল্যান্ডে এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সহিংসতা।

সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের অঙ্গীকার



মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও আফগান সরকারের মধ্যে বিরাজমান হালকা উত্তেজনাকে অনেক বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। গত বুধবার হোয়াইট হাউসে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে বৈঠককালে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় কারজাই যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন প্রকাশ করেন। এএফপি।
বৈঠক শেষে দুই নেতা ওভাল অফিসের সামনে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন। বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথাবার্তা বলেন। তাঁরা একসঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। ওবামা বলেন, আফগানিস্তানে অত্যন্ত জটিল ও কঠিন পরিবেশে মার্কিন সেনারা কাজ করছেন। যুদ্ধের ময়দানে দুই দেশের সেনারাই আত্মত্যাগ করছেন। এ অবস্থায় দুই দেশের মধ্যে একটু ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনা বিরাজ করা স্বাভাবিক।
আফগানিস্তানের দুর্নীতি নিয়ে মার্কিন প্রশাসন এত দিন উচ্চবাচ্চ করলেও বিষয়টি নিয়ে নরম সুরে কথা বলেন ওবামা। মার্ির্কন প্রেসিডেন্ট বলেন, আফগানিস্তানে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট কারজাই ও আমাকে আরও অনেক কাজ করতে হবে। ওবামা আফগানিস্তানকে আরও শত শত কোটি ডলার সাহায্য দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। আফগানিস্তানে বেসামরিক লোকের হতাহত হওয়া প্রসঙ্গে ওবামা বলেন, এটি তার জন্য কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয় বরং অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। সমস্ত দায়দায়িত্ব এসে বর্তায় তার ওপর।
ওবামা বলেন, আফগানিস্তানে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০১১ সালের জুলাইয়ের মধ্যে তিনি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা ফিরিয়ে আনতে পারবেন।

ফতোয়ার কথা অস্বীকার করল দেওবন্দ

মুসলিম মেয়েদের বাইরে চাকরি করাকে ‘হারাম’ বলে ফতোয়া দেওয়ার কথা অস্বীকার করল দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
দেওবন্দের মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা আইএএনএস জানায়, এ ধরনের কোনো ফতোয়া দেওয়া হয়নি। তারা শুধু কর্মরত নারীর কর্মক্ষেত্রের পোশাক সম্পর্কে মতামত দিয়েছে।
মাওলানা আদনান মুন্সি নামের ওই মুখপাত্র গত বুধবার জানান, সরকারি ও বেসরকারি অফিসে কর্মরত মুসলিম নারীর যথাযথ পোশাক সম্পর্কে শরিয়া অনুযায়ী কেবল তাঁরা তাঁদের মতামত জানিয়েছেন। পুরুষদের সঙ্গে একত্রে নারীদের কাজ করার বিরোধিতা করে ফতোয়া দেওয়ার কথা তিনি অস্বীকার করেন। মাওলানা মুন্সি কর্মরত নারীদের পোশাক নিয়ে তাঁদের মতামত দেড় মাসের পুরোনো বলে জানান।
এদিকে গত বুধবার দেওবন্দের এই ফতোয়ার কথা জানাজানি হওয়ার পর ভারতে মুসলিম নেতা ও বিদ্বজ্জনদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হয়। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সম্পাদক মাওলানা এন এ ফারুকি এ প্রসঙ্গে বলেন, দেওবন্দের এ নির্দেশ যথাযথ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
ফারুকী বলেন, বাইরে কাজ করতে যেতে বা ঘরের বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে ইসলামে নারীদের নিষেধ করা হয়নি। কিন্তু ‘ঠিকমতো ঢেকেঢুকে’ যাওয়ার ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আছে।
কংগ্রেসের সাংসদ রশিদ আলভি বলেন, প্রত্যেক ধর্মের নির্দিষ্ট নিয়মকানুন আছে। তবে সবকিছুর পরে দেশের প্রচলিত আইনই বহাল থাকবে।
সাবেক সাংসদ সৈয়দ সাহাবুদ্দীন বলেন, এখন মুসলিম নারীরা লেখাপড়া শিখছেন, তাঁরা চাকরি করবেন, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামীর ব্যবসায়িক কাজেও সাহায্য করবেন। তাই ‘এ ধরনের ফতোয়া মেনে চলা সম্ভব নয়’ বলে তিনি মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রী গড়ার কারখানা

যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ডেভিড ক্যামেরন। ইংল্যান্ডের উইন্ডসরের বিখ্যাত ইটন কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি। এ পর্যন্ত দেশকে ১৯ জন প্রধানমন্ত্রী উপহার দিয়েছে কলেজটি। বলতে গেলে প্রধানমন্ত্রী গড়ার কারখানা ইটন।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীদের তালিকায় ইটন থেকে পাস করা এমন বেশ কয়েকজন রয়েছেন, যাঁদের ব্যক্তিত্ব বিপরীতধর্মী। রবার্ট ওয়ালপোলের সঙ্গে অ্যান্টনি এডেনের কি মিল রয়েছে, অথবা উইলিয়াম গোল্ডস্টোনের সঙ্গে ম্যাকমিলানের মিল কোথায়? এর উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছেই।
টেমস নদীর তীরে ৫০০ বছরেরও বেশি আগে প্রতিষ্ঠিত হয় ইটন কলেজ। ব্রিটেনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় এটি। পরীক্ষার ফলেও দেশের মধ্যে সবচেয়ে সেরা নয় তারা। কিন্তু শুধু ছেলেদের জন্য এই কলেজ ব্রিটেনের ১৯ জন ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের একজন ‘প্রধানমন্ত্রীকে’ শিক্ষা দিয়েছে। থাইল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আপিসিত ভেজ্জাজিওয়াও এই কলেজের ছাত্র ছিলেন। আশির দশকে ইটন কলেজের ছাত্র ছিলেন পলাশ ডেভ। তিনি বিবিসিকে বললেন, ‘মনে পড়ে, ছেলেরা এখানে পড়তে আসত এক ধরনের আত্মবিশ্বাস নিয়ে; আর সেটি হলো তারাই ভবিষ্যতে দেশ চালাতে যাচ্ছে।’
পলাশের মতে, এ ধরনের ধারণা নিয়ে বেড়ে ওঠার একটি কারণ হচ্ছে নিয়মিতভাবে বিশিষ্টদের সফর ও বক্তৃতা। তাঁরা শিক্ষার্থীদের বলতেন, তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ নেতা।
পলাশ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য গড়ে তোলার দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। এখানে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়।’ ইটনের বৈশিষ্ট্য এর ভিক্টোরিয়ান যুগের পোশাক, আর কয়েক শতকের ঐতিহ্যবাহী নিয়মকানুন। একে প্রায়ই একটি রক্ষণশীল ধারার কলেজ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
দেশের জন্য ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরিতে ইটনের এই সাফল্যের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ‘দ্য ইমপরটেন্স অব বিইং ইটন’ বইয়ের লেখক নিক ফ্রেজার। তাঁর মতে, কলেজের এই সাফল্যের মূল কারণ, এখানে ছাত্ররা অনেক বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করে। রাজনীতিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার জন্যই তাদের প্রস্তুত করা হয়। শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি কলেজে বিজ্ঞান, খেলাধুলা ও অন্যান্য বিষয়ে ক্লাব রয়েছে এবং সেগুলো শিক্ষার্থীরাই পরিচালনা করে।
‘ট্যাটলার’ সাময়িকীর টিকি হেডলি-ডেন্ট বলেন, ‘আপনি সহজেই একজন ইটনিয়ানকে (ইটনের ছাত্র) চিনতে পারবেন। কারণ তারা কোথাও গেলে মনের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে যায় এবং সেটি অর্জনের চেষ্টা করে। অন্য লোকেরা কী ভাবল, তা নিয়ে অতটা মাথা ঘামায় না তারা।’ হেডলি-ডেন্ট বলেন, ‘একজন ভালো ইটনিয়ান নম্র ও বুদ্ধিমান। এর বেশি আর কী আশা করা যায়?’
ইটন থেকে পাস করা ব্রিটিশ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন, স্যার রবার্ট ওয়ালপোল, উইলিয়াম পিট, জন বিউট, জর্জ গ্রেনভিল, ফ্রেডেরিক নর্থ, উইলিয়াম গ্রেনভিল, জর্জ ক্যানিং, আর্থার ওয়েলেসলি, চার্লস গ্রে, উইলিয়াম মেলবোর্ন, এডওয়ার্ড ডার্বি, উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোন, রবার্ট স্যালিসবারি, আর্চিবল্ড রোজবেরি, আর্থার ব্যালফুর, স্যার অ্যান্টনি ইডেন, হ্যারল্ড ম্যাকমিলান, স্যার অ্যালেক ডগলাস-হোম এবং সর্বশেষ ডেভিড ক্যামেরন।
তবে পর্যবেক্ষকেরা বলেন, গত শতকের আশির দশকে ও নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে একটু কোণঠাসাই ছিলেন ইটনের সমর্থকেরা। অনেকে বলেন, ইটনের ভাবমূর্তি অনেকটাই অতিরঞ্জিত। এমনকি ইটনের তকমা নিয়ে অনেকে ভয়েও থাকতেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ইটনের শিক্ষক জো স্পেন্স মনে করেন, ইটন সম্পর্কে অনেক সময় এমন সব কথা বলা হয়, যা অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। স্পেন্স বলেন, ডগলাস হার্ড মনে করেছিলেন, তার ইটনের ‘সিলই’ কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইটনকে আর গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে না বলেই ভয় করছিলেন অনেকে। জো স্পেন্স বলেছেন, কনজারভেটিভ দলে ক্যামেরনের উত্থান এবং কালক্রমে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সে আশঙ্কাকে অমূলক প্রমাণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন তাঁর সরকারের সম্ভাব্য সদস্যদের যে প্রথম তালিকা করেন, তার মধ্যে ইটনের সাবেক ছাত্র ১৩ জন!

লালু ও মুলায়মকে ‘কুকুর’ বলে বিপাকে নীতিন



রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) প্রধান লালুপ্রসাদ যাদব ও সমাজবাদী পার্টির প্রধান মুলায়ম সিং যাদবকে ‘কুকুর’ বলে গাল দিয়ে বিপাকে পড়েছেন প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি নীতিন গড়কারি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিহারের আরজেডির নেতারা তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার ঘোষণা দিয়েছেন। গড়কারির বিরুদ্ধে মামলা ঠোকার কথাও ভাবছেন তাঁরা। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার।
গত বুধবার এক সমাবেশে নীতিন বলেন, লালুপ্রসাদ ও মুলায়ম সিং কংগ্রেসের পা-চাটা কুকুর। পরে অবশ্য তিনি তাঁর মন্তব্য ফিরিয়ে নিয়ে বলেন, কাউকে হেনস্তা করতে তিনি এ মন্তব্য করেননি। এতে চিঁড়া ভিজেনি। বরং আরজেডির কিছু নেতার ক্ষোভ বেড়েই চলে। দলীয় সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য আজ শুক্রবার নেতা-কর্মীদের সভা ডাকা হয়েছে।
আরজেডির জ্যেষ্ঠ নেতা রাম কিরপাল যাদব বলেন, সভায় গড়কারির বিরুদ্ধে মামলা করার বিষয়ে আলোচনা হবে। এ ঘটনায় আজ পাটনায় নীতিন গড়কারির কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হবে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা চুপ করে বসে থাকব না। গড়কারির সংকীর্ণ মানসিকতার সমুচিত জবাব দিতে আমরা প্রস্তুত।’
নীতিন গড়কারির ওই আপত্তিকর মন্তব্যের পরদিন কংগ্রেসের মুখপাত্র শাকিল আহমেদ বলেন, ‘এটি চরম অবমাননাকর ভাষা। তবে আমরা অবাক হইনি। কারণ তাঁর এ ধরনের মনোভাবের পরিচয় এর আগে আমরা পেয়েছি। দলের অপর মুখপাত্র জয়ন্তী নাটরাজন গড়কারির মন্তব্যকে ‘দুঃখজনক ও অবমাননাকর’ উল্লেখ করে বলেন, রাজনীতিকে এত নিচে নামিয়ে আনার জন্য জাতির কাছে তাঁর ক্ষমা চাইতে হবে।
এদিকে মন্তব্য করার পরপরই বিজেপির সভাপতি বলেন, ‘আমার কথাগুলো যদি কারও মনে ব্যথা দিয়ে থাকে, তাহলে তা ফিরিয়ে নিচ্ছি। আমি তাঁদের আসলে কুকুর বলিনি। এটি আসলে কথার কথা। এ নিয়ে ভুল বোঝা উচিত নয়। আমি কেবল তাঁদের ভূমিকা সম্পর্কে বলেছি।’
গড়কারি বলেন, ‘এই দুই দলই আমাদের সঙ্গে ছিল, পরে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।’ তিনি বলেন, ‘কাট মোশনের (লোকসভা সদস্যদের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা) সময় কী হয়েছিল? টিভির সামনে দেখা গেল, সুষমা স্বরাজের (বিরোধীদলীয় নেতা) সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন লালুপ্রসাদ ও মুলায়ম। দুই দলই তখন আমাদের সঙ্গে ছিল। পরে তারা সটকে পড়ে।’
গড়কারি বলেন, ‘পরে একজন আমাকে প্রশ্ন করেন, কংগ্রেসের সঙ্গে কোন দল রয়েছে? আমি তখন বলেছিলাম, একটি দলই আছে কংগ্রেসের সঙ্গে। দলটি হচ্ছে কংগ্রেস ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন।’ সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (সিবিআই) ইঙ্গিত করে তিনি এ কথা বলেন। রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআইকে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর।

সিগারেটের অবশিষ্টাংশ আর ফেলনা নয়



  1. ধূমপায়ীরা সিগারেট টানার পর যে অংশটি ফেলে দেন তা এখন আর ফেলনা নয়। চীনের বিজ্ঞানীরা এর ব্যবহার খুঁজে বের করেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, সিগারেটের অবশিষ্ঠাংশে যে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে, তা দিয়ে অনায়াসে মাছ মারা যাবে। লোহা বা স্টিলের পাইপের মরিচা প্রতিরোধে কাজে লাগানো যাবে।
    আমেরিকান কেমিকেল সোসাইটির সাপ্তাহিকী ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কেমিস্ট্রি রিসার্চে সম্প্রতি চীনা বিজ্ঞানীদের এ-সংক্রান্ত একটি গবেষণামূলক নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। খবর রয়টার্সের।
    নিবন্ধে বলা হয়, সিগারেটের গোড়া পানিতে ডোবালে কমপক্ষে নয়টি রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া যায়। এর মধ্যে এন৮০ নামের একটি পদার্থ তেলের পাইপের মরিচা রোধে সক্ষম।
    এ ছাড়া এখান থেকে পাওয়া নিকোটিনসহ আরও কিছু পদার্থ ব্যবহার করে লোহাজাতীয় অন্যান্য পাইপের ক্ষয় রোধ করা সম্ভব। বিভিন্ন তেল কোম্পানি পাইপের ক্ষয়রোধে প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার খরচ করে থাকে। এ গবেষণা সফল হলে তাদের খরচ অনেক কমে যাবে। চীনে ৩০ কোটি লোক ধূমপান করে।
    প্রতি বছর চীনে প্রায় সাড়ে চার লাখ কোটি সিগারেটের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা আরও জানান, সিগারেটের গোড়ায় যে বিষাক্ত পদার্থ থাকে সেটা ব্যবহার করে মাছও মারা যাবে।
    গবেষণায় নেতৃত্ব দেন সিয়ান জাওতুং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষক ঝুন ঝাও।

সহিংসতায় পাকিস্তানে বাড়ছে মানসিক রোগী

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছেন রিফাত রমজান। চোখে শূন্য দৃষ্টি। তাঁকে দেখলে বোঝা যায়, মনের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছেন তিনি। এই লড়াই তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুকে হারানোর ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার। আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর ফাঁদে পড়ে নিহত হন রমজানের বন্ধু নোমান। এ ঘটনায় রমজান যে মানসিক আঘাত পান, কয়েক সপ্তাহ পরও তা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। নোমানের রক্ত এত দিনে মিশে গেছে মাটিতে, কিন্তু তাঁর শোকে আহত রমজানের রক্ত বুকের গভীরে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরছে।
রমজানের জীবন-যাপনেও এসেছে পরিবর্তন। এখন তিনি বালিশের নিচে একটি আগ্নেয়াস্ত্র রেখে ঘুমান। হরদম তাঁকে এই ভয় তাড়া করে ফেরে—পাকিস্তানে চলমান সহিংসতা বুঝি তাঁর প্রাণও কেড়ে নেবে।
বন্ধু নিহত হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে রমজান জানান, একজন লোক এসে নোমানকে তাঁর মোটরসাইকেলে করে থানায় পৌঁছে দিতে অনুরোধ করে। নোমান এতে সাড়া দেন। লোকটিকে নিয়ে তিনি যেই থানায় পৌঁছান, সঙ্গে সঙ্গে লোকটি তাঁর দেহে লুকিয়ে রাখা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে নোমানসহ ১০ জন নিহত হন।
পাকিস্তানে তালেবান জঙ্গি ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সহিংস ঘটনায় এভাবে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার লোক নিহত হচ্ছে। আহতের সংখ্যাও কম নয়। তবে সহিংস ঘটনাগুলো যাঁদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে, মনোরোগ চিকিৎসক ছাড়া কেউ তাদের খোঁজ জানে না। রমজানের মতো যাঁরা রক্তপাতের ঘটনা সহজে মেনে নিতে পারছেন না, পাকিস্তানের বিভিন্ন হাসপাতালে তাঁদের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নাজাম ইউনুস বলেন, কিছু লোকের মানসিক আঘাত এতই গুরুতর যে তাঁরা কোনো কাজ করতে পারছেন না। অন্যরা উদ্বেগ, মানসিক অবসাদের মতো সমস্যায় ভুগছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, সংবাদ মাধ্যমে ছোটখাটো সংঘর্ষের শিরোনাম শুনেই অনেকে ঘুমানোর বড়ি আনতে চিকিৎসকের কাছে ছোটেন। চিকিৎসকেরা বলছেন, মানসিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে পারিবারিক সমর্থন ও সহযোগিতা একটি বড় বিষয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের বাড়ি ফিরে যাওয়া নিরাপদ হয় না।
পেশোয়ারের সরহাদ মনোরোগ হাসপাতালটি এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখানে একই সীমানার ভেতর একটি কারাগারও রয়েছে। হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক মুহাম্মদ তারিক বলেন, প্রতিদিন ১০-১৫ জন করে নতুন মানসিক রোগী আসে তাঁর কাছে। এর মধ্যে অনেকেই তাঁদের ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়েছেন।
হাসপাতালে ছেলের চিকিৎসা করাতে আসা বৃদ্ধ মুহাম্মদ ইখতিয়ার বলেন, সহিংসতা দেখে তাঁর ছেলে সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। একটি ইসলামি দাতব্য প্রতিষ্ঠান তাঁর ছেলে চিকিৎসার খরচ দিচ্ছে। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে কখনো তালেবান ও সেনাদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আবার কখনো সে নিজেকে তালেবান নেতা বা সেনা অধিনায়ক মনে করে।

ওভারে পাঁচ

আজ আবার যখন মুখোমুখি হচ্ছে পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়া, মোহাম্মদ আমিরের সেই ওভারের স্মৃতিটা ফিরে না এসে পারেই না। ২ মে এই বোশেজো স্টেডিয়ামেই অস্ট্রেলিয়ার সহজ জয়কে ছাপিয়ে গিয়েছিল আমিরের ‘ফাইভ উইকেটস মেডেন।’ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তো বটেই, প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে এমন কিছুর নজির নেই আর একটিও। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট ইতিহাসে এক ওভারে পাঁচ উইকেট পতনের ঘটনা একটি আছে, তবে সে ওভারে রানও হয়েছিল একটি। ১৯৭২ সালে সাসেক্সের বিপক্ষে সেই ওভারে সারের বোলার প্যাট পোককের কৃতিত্ব আমিরের চেয়ে একটু বেশিই ছিল, পাঁচ উইকেটের চারটি নিয়েছিলেন নিজেই, বাকিটি রানআউট। এই অফ স্পিনারের শেষ দুই ওভার ছিল এ রকম—উ ০ উ ২ ০ উ; উ উ উ ১ উ ০ (রানআউট)!

প্রথম বিভাগ বাস্কেটবল

প্রিমিয়ার ব্যাংক প্রথম বিভাগ বাস্কেটবলে কাল ক্যান্টেনিয়ানস ক্লাব ৬৭-৪৪ পয়েন্টে দ্য শাওনসকে হারিয়েছে। জয়ী দলের রিপন করেছেন সর্বোচ্চ ১৪ পয়েন্ট। ধানমন্ডি উডেনফ্লোর বাস্কেটবল জিমনেসিয়ামে দিনের অন্য ম্যাচে ধূমকেতু ক্লাব ১০১-৪৪ পয়েন্টে হারিয়েছে রেঞ্জার্স ক্লাবকে। সর্বোচ্চ ৭৩ পয়েন্ট করেছেন জয়ী দলের মিথুন।

ত্রিপক্ষীয় সিরিজের ফাইনাল আজ

সব ম্যাচে হেরে ত্রিপক্ষীয় সিরিজে আগেই দর্শক হয়ে গেছে বাংলাদেশ ‘এ’ দল। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের আজকের ফাইনালে তাই মুখোমুখি হবে দুই অতিথি দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ ও দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’।
ফাইনালে এগিয়ে থাকার কথা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলেরই। ডাবল লিগ পদ্ধতির সিরিজের সব ম্যাচ জিতে ফাইনালে এসেছে তারা। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দল জিতেছে শুধু বাংলাদেশ ‘এ’ দলের বিপক্ষে ম্যাচ দুটিতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের কাছে দুটো ম্যাচেই তারা হেরেছে।
ত্রিপক্ষীয় সিরিজ শেষ হওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকা দল দেশে ফিরে যাবে। তবে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের বিপক্ষে দুটি চার দিনের ম্যাচ খেলতে থেকে যাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’। মিরপুরে প্রথম ম্যাচটি শুরু হবে ১৭ মে।

সত্যিই রিয়ালে মরিনহো

গুঞ্জনটা শোনা যাচ্ছিল বেশ কিছুদিন থেকেই। ইতালি-স্পেন দুই দেশের পত্রপত্রিকাতেই লেখালেখি হচ্ছিল ইন্টার মিলান ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমাচ্ছেন হোসে মরিনহো। এবার আর কোনো গুজব নয়, রিয়ালে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন স্বয়ং মরিনহো। পানোরোমা নিউজ ম্যাগাজিনের আজকের সংখ্যাতেই ছাপা হওয়ার কথা মরিনহোর ইন্টারভিউ, যেটিতে তিনি রিয়ালে যাওয়ার কথা বলেছেন। যদিও ঠিক কখন বা কবে যাচ্ছেন, এটা পরিষ্কার করেননি। ‘আমি এক পা ইতালি আর এক পা স্পেনে দিয়ে রেখেছি বলে যেসব লেখালেখি হচ্ছে, তা পুরোপুরি মিথ্যে। সত্যিটা হচ্ছে আমি রিয়ালে যাচ্ছি। ইংল্যান্ডে একটি বড় ক্লাবকে আমি কোচিং করিয়েছি, ইতালিতে করাচ্ছি, আর স্পেনে করাব’—ইন্টারভিউয়ে নাকি এমনটাই বলেছেন মরিনহো।

ওয়াহর চেয়ে পন্টিং ভালো

এ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার সফলতম অধিনায়ক তিনি। সর্বকালেরই সেরা অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক হিসেবে অনেকেই মেনে নিয়েছেন স্টিভ ওয়াহকে। কিন্তু এই অনেকের মধ্যে আরেক সাবেক অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক ইয়ান চ্যাপেল নেই। সর্বকালের সেরা তো নয়ই, ইয়ান চ্যাপেলের কলমে অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ চার অধিনায়কের মধ্যেই ওয়াহ চতুর্থ! রিকি পন্টিং, মার্ক টেলর ও অ্যালান বোর্ডারকে তিনি এগিয়ে রাখছেন।
২০০৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হোম সিরিজ এবং ২০০৯ অ্যাশেজ খোয়ানোর পর যাঁর অধিনায়কত্ব নিয়েই প্রশ্ন ওঠে অস্ট্রেলীয় মিডিয়ায়, সেই রিকি পন্টিংকেও ওয়াহর চেয়ে ভালো অধিনায়ক মনে করেন চ্যাপেল। ক্রিকইনফোকে তিনি বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার সর্বশেষ চার অধিনায়কের কথা ভাবতে গিয়ে স্টিভকে আমি আমার বইয়ে চার নম্বরে রেখেছি।’ সর্বকালের সেরার বিতর্কে যাননি ৩০ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে ১৫টি জয় উপহার দেওয়া চ্যাপেল ভাইদের বড়জন। তবে যে চারজনের মধ্যে ওয়াহকে চতুর্থ স্থানে রেখেছেন, সেই তালিকাটা প্রকাশ করেছেন তিনি, ‘আমার হিসাবে সর্বশেষ চার অস্ট্রেলীয় অধিনায়কের মধ্যে চতুর্থ নামটি স্টিভ ওয়াহর। আমি বলব মার্ক টেলর, রিকি পন্টিং ও অ্যালান বোর্ডারের নাম...।’ বোর্ডারের নামের পরে রাখা খালি জায়গাটিই যে স্টিভ ওয়াহর জন্য বরাদ্দ রেখেছেন চ্যাপেল, সে তো না বললেও চলে।
যদিও পরিসংখ্যান বলবে, স্টিভ ওয়াহ অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। ৫৭ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে স্টিভ দলকে জয় উপহার দিয়েছেন ৪১টি। বিপরীতে হার মাত্র ৯টিতে। সাফল্যের হার ৭১.৯২ শতাংশ। যে পন্টিংকে ওয়াহর ওপরে রাখছেন চ্যাপেল, সেই পন্টিং ৬৯ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে জয়ের হাসি হেসেছেন ৪৬ বার। হার ১১ ম্যাচে। সাফল্যের হার ৬৬.৬৬ শতাংশ। মার্ক টেলর ৫০ টেস্টে অধিনায়কত্ব করে জয় উপহার দিয়েছেন ২৬টিতে, হার ১৩টিতে। পরিসংখ্যান বোর্ডারকে রাখছে আরও পেছনে। ৯৩ টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে জয় মাত্র ৩২ ম্যাচে। ৩৮ ড্রয়ের সঙ্গে হার ২২টিতে! পেছনে কথা উঠতে পারে, তাই আগে থেকেই চ্যাপেলের আত্মপক্ষ সমর্থন, পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করেননি তিনি।
পন্টিংয়ের পছন্দের দিক উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আমি মনে করি, মাঠে ফিল্ডিং সাজাতে রিকি খুবই রক্ষণশীল, যা আমার পছন্দের।’ চ্যাপেলের বিশ্বাস, ওয়াহ মাঠের সিদ্ধান্তগুলো খুব দ্রুত নিতেন। এবং প্রায়ই যার ফল হতো খারাপ।
চ্যাপেল যখন স্টিভের গর্বের জায়গাটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন, ঠিক তখনই একটি সুসংবাদও আছে স্টিভ ভক্তদের জন্য। আইপিএলের নতুন দুই ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্যতম কোচি স্টিভ ওয়াহকে প্রধান উপদেষ্টা এবং পরামর্শদাতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবছে।

আজ কত গোলে জিতবে আবাহনী

গত বছরের স্মৃতি মনে পড়লে একটু খারাপই লাগে ঢাকা আবাহনীর। গতবারের টুর্নামেন্টে একটা গোল বেশি না করতে পারার আক্ষেপে পুড়তে হয়েছিল তাদের। এএফসি প্রেসিডেন্টস কাপে শ্রীলঙ্কা আর্মি দলের বিপক্ষে জয় দিয়ে শুরু করেও গত বছর গ্রুপ পর্বে হয়েছিল রানার্সআপ। কিন্তু গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় চূড়ান্ত পর্বে তারা যেতে পারেনি। পরশু নেপাল নিউ রোড দলকে ২-০ গোলে হারালেও তাই জয়ের উদ্যাপনে ছিল না কোনো উচ্ছ্বাস। আজ চীনা তাইপের হাসুস এনটিসিপিই দলের বিপক্ষে বড় ব্যবধানে জয়টা যাতে হাতছাড়া না হয়, সেই প্রার্থনাই করছে আবাহনী।
প্রথম ম্যাচে জয় এনে দেওয়া স্ট্রাইকার এনামুল অবশ্য এই দলকে মোটেও অবহেলা করছেন না, ‘আমরা কোনো দলকেই খাটো করে দেখছি না। অবশ্যই জয়ের প্রত্যাশায় মাঠে নামব। তবে গতবার যেহেতু গোল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে চূড়ান্ত পর্বে যেতে পারিনি, তাই এবার মানসিক প্রস্তুতি থাকবে জয়ের সঙ্গে গোলসংখ্যা বাড়ানোরও। টুর্নামেন্টে গোল-গড়টা আমাদের অবশ্যই কাজে দেবে।’ আবাহনীর জন্য হাসুসকে বড় ব্যবধানে হারানোর অনুপ্রেরণা হতে পারে গত পরশুর ম্যাচটাই। প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত চীনা তাইপের দলটি পরশু ০-৫ গোলে হেরেছে কিরগিজস্তানের দরদই বিশকেকের কাছে।

কপাল ভালো রিয়ালের

কপাল! এই কপালগুণেই নাকি রিয়াল মাদ্রিদ এখনো শিরোপার দৌড়ে ভালোমতোই টিকে আছে। সৌভাগ্যের পরশ না পেলে তারা ছিটকে যেত সেই কবেই। বার্সেলোনার প্লে-মেকার জাভি হার্নান্দেজের এমনই মত।
‘অনেকগুলো ম্যাচে রিয়ালকে বাঁচিয়ে দিয়েছে ভাগ্য। যখনই দরকার পড়েছে, ভাগ্যের ছোঁয়া পেয়েছে তারা। লিগে ৯৬ পয়েন্ট পেয়েও এখনো আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারিনি, এটা দুঃখজনক। আবার মাদ্রিদের জন্যও এটা আক্ষেপের, ৯৫ পয়েন্ট তুলেও আমাদের পেছনেই থাকতে হচ্ছে ওদের’—বলেছেন জাভি।
ওসাসুনার বিপক্ষে রিয়াল জিতেছে রোনালদোর শেষ মুহূর্তের গোলে। অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের বিপক্ষে ৫-১ গোলে জিতলেও ৭২ মিনিট পর্যন্ত স্কোরলাইন ছিল ১-১! প্রায় পুরো মৌসুমে দুই দলই যেভাবে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে এগিয়ে লড়াইটাকে একদম শেষ ম্যাচে এনে ফেলেছে, বার্সার ডিফেন্ডার রাফায়েল মার্কেজ তো চিরকালীন শত্রুতা ভুলে বলেই ফেললেন, শেষ ম্যাচে কোনো এক দলের হাতে শিরোপা ওঠাটা হবে অন্যায়! আসল চ্যাম্পিয়ন তো দুই দলই! ওয়েবসাইট।
রোববারই নির্ধারণ হয়ে যাচ্ছে, শিরোপা উঠছে কার হাতে। রিয়াল সফল হলেও কোচ ম্যানুয়েল পেলেগ্রিনির চাকরি টেকাতে পারবেন কি না, কে জানে। শোনা যাচ্ছে হোসে মরিনহো আসছেন তাঁর জায়গায়। আর ইন্টার মিলানের পর্তুগিজ কোচকে আগাম স্বাগত জানিয়েছেন কাকা।

নেহরা-জহিরের মারামারি!

কোচ গ্যারি কারস্টেনকে খুবই ভালোবাসেন ভারতীয় দলের ক্রিকেটাররা। তবে পরশুর ঘটনার পর ভালোবাসা কতটুকু থাকবে, সন্দেহ আছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইট থেকে ভারতের বিদায়ে ভীষণই ক্ষুব্ধ কারস্টেন। সংবাদমাধ্যমের খবর, সেই ক্ষোভ তিনি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন ক্রিকেটারদেরও।
পরশু সকালে দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলাদা আলাদা কথা বলেছেন কারস্টেন। পরে বসেছেন পুরো দলের সঙ্গেই। এমনিতে মৃদুভাষী হলেও খেলোয়াড়দের সঙ্গে কারস্টেন নাকি কঠোর ভাষাতেই কথা বলেছেন। দলের অনেকের ফিটনেসই নিয়েই তিনি অসন্তুষ্ট, কারও কারও ওজনও বেশি দেখেছেন। সব খেলোয়াড়কে তাই ধরিয়ে দিয়েছেন একটা করে ফিটনেস চার্ট। এবং বলেছেন সেই চার্ট অনুযায়ী কাজ করে তাঁকে নিয়মিত অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে। এ ছাড়া তারকা ক্রিকেটারদের প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন—এখন থেকে আগের সেই ভালো মানুষ কোচটি হয়ে থাকবেন না তিনি।
কোচ জানিয়ে দিয়েছেন, শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় আসন্ন এশিয়া কাপ ক্রিকেটে দলের সবাইকে ফিট দেখতে চান তিনি। তার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে দেশে ফিরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে বিসিসিআইয়ের কাছে রিপোর্ট জমা দেবেন ২০০৮ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা কারস্টেন।
সে রিপোর্টে শুধু দলের পারফরম্যান্সের প্রসঙ্গই থাকবে নাকি থাকবে খেলোয়াড়দের মারামারির ঘটনাও, সেটা অবশ্য বলা যাচ্ছে না। মিডিয়ার খবর, শ্রীলঙ্কার কাছে হারের পর স্থানীয় পাব টাকিলা জো’তে গিয়ে ভক্তদের সঙ্গে হাতাহাতি করে এসেছেন আশিস নেহরা আর জহির খান। পরে যুবরাজ সিং গিয়ে তাঁদের থামিয়েছেন। যদিও টুইটারে এই খবর অস্বীকারই করেছেন যুবরাজ। তিনি লিখেছেন, ‘কোনো মারামারি হয়নি, তর্কাতর্কিও না।’ সংবাদমাধ্যমকে বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন না করারও অনুরোধ করেছেন ভারতের এই ক্রিকেটার।
ওদিকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে ভারতের বিদায়ে যথারীতি সমালোচনা মুখর সে দেশের সাবেক ক্রিকেটাররা। মহেন্দ্র সিং ধোনি যতই আইপিএলের পক্ষে বলুন সাবেক অধিনায়ক অনিল কুম্বলে কিন্তু অভিযোগের আঙুল তুলেছেন সেদিকেই। হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায় নিজের লেখা কলামে কুম্বলে বলেছেন, আইপিএলে খেলোয়াড়দের প্রতি অনেক বেশি চাপ ছিল। আইপিএল শেষে ভারতীয় দলে এসে তাই সবাই অনেক বেশি আয়েশি হয়ে পড়েছে এবং ব্যর্থতার কারণ সেটাই।
ব্যর্থতার পর ভারতে সমালোচনাটা নতুন কিছু নয়। তবে এবার একটা সান্ত্বনাও আছে তাদের জন্য। বিশ্বকাপ-ব্যর্থতার পরও ধানির এই দলটার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন শচীন টেন্ডুলকার।