Saturday, February 20, 2010

ইসলামে ভাষাশহীদদের মর্যাদা -ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি মানুষের সহজাত যে আকর্ষণ ও শ্রদ্ধাবোধ; ইসলাম একে বিশেষভাবে উত্সাহিত করেছে। এ জন্যই মাতৃভূমি, মায়ের ভাষা কিংবা স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ইসলামি প্রেরণার অন্যতম বিষয়। মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার শুধু জন্মগত নয় বরং মাতৃভাষা মহান সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত একটি বিশেষ নিয়ামত ও নিজস্ব মৌলিক অধিকার। এতে হস্তক্ষেপ করার অধিকার আল্লাহতাআলা কাউকে দেননি। ধর্মপ্রাণ মানুষের জীবনে ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মেধা বিকাশের সব পরিচয় তার নিজস্ব ভাষা বা মাতৃভাষার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়। নিত্যদিনের মনের আবেগ-উচ্ছ্বাস, কামনা-বাসনা, আকুতি-মিনতি—সবই তার নিজের ভাষায়ই প্রস্ফুটিত হয়, অন্য কোনো ভাষায় নয়। ফলে সে তার নিজস্ব ভাষা বা মাতৃভাষা কোনো প্ররোচনায় বা কোনো কারণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ত্যাগ করতে কখনো বাধ্য নয়। যদি কোনো কারণে তার মুখের ভাষা প্রকাশ করতে প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়, তবে সে জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও তা প্রতিহত করতে বাধ্য হয়। এ জন্য মাতৃভাষার উত্কর্ষ সাধনে ইসলাম যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন।’ (সূরা আর-রাহমান, আয়াত: ৩-৪)
দেশমাতৃকার জন্য আত্মত্যাগ ও প্রাণোত্সর্গের ঘটনা জানা থাকলেও, কোনো জাতি তার মাতৃভাষার জন্য জীবন বিসর্জন দিয়ে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছে—এমন নজির জগতের ইতিহাসে আর নেই। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করতে গিয়ে বাংলা মায়ের বীর সন্তানেরা বুকের তাজা রক্ত বাংলাবিরোধীদের উপহার দিয়ে ভাষার স্ব্বাধীনতা এনেছিল। জাগতিক উত্কর্ষ ও নানাবিধ লোভ-মোহের প্রতি কোনো রকম ভ্রুক্ষেপ না করে বাঙালি জাতি মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্বকে অনুধাবন করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য প্রাণোত্সর্গ করেছিল। সেদিন ঢাকার পিচঢালা রাজপথ বুকের তাজা রক্ত দিয়ে রঞ্জিত করেছিলেন শহীদি চেতনায় উজ্জীবিত রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিউরের মতো নাম না জানা আরও অনেক মহান ভাষাসৈনিক। ভাষার জন্য আন্দোলন করে নিজের প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে তাঁরা মাতৃভাষা বাংলার নাম সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে রক্তিম অক্ষরে লিখে গেলেন। রক্তের বন্যায় সেদিন ভাষার বিজয়কে ছিনিয়ে এনেছিলেন বাংলাদেশের অমর ভাষাসৈনিকেরা। এই মহান বিজয় আত্মত্যাগের, শৌর্য-বীর্য ও গৌরবের। ভাষার লড়াইয়ে তাঁদের আত্মোত্সর্গ আজ জগত্বাসীর কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন। সেই সব ভাষা শহীদের অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগে বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হিসেবে পৃথিবীতে বেঁচে আছে। যে বাংলাভাষার মাধ্যমে দেশের মানুষের সার্বিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি, সেই ভাষার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণার্থে যাঁরা অকাতরে প্রাণ দিলেন, তাঁদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের ভাষায় বলা যায়, ‘আর আল্লাহর পথে যারা নিহত হয়, তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা বুঝতে পার না।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৫৪)
মাতৃভাষা বাংলাভাষা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সেরা দান। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ একমাত্র স্বাধীন দেশ, যে দেশের দামাল ছেলেরা মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করার জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। মাতৃভাষার এই মহান আন্দোলন ও আত্মত্যাগকে ইসলাম যথাযথ মর্যাদার দৃষ্টিতে বিবেচনা করে। তাঁদের আত্মদান দেশবাসীর জন্য চিরস্থায়ী এবং বাঙালি জাতি তাঁদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। এহেন সত্কর্ম তাঁদের নিয়ে যাবে জান্নাতুল ফেরদাউসে। শহীদদের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহতাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘যারা বিশ্বাস করে ও সত্কর্ম করে, তাদের অভ্যর্থনার জন্য আছে ফিরদাউসের উদ্যান। সেখানে ওরা স্থায়ী হবে, এর পরিবর্তে অন্য স্থান চাইবে না।’ (সুরা আল-কাহ্ফ, আয়াত-১০৭) হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শহীদদের রুহগুলো সবুজ পাখির গড়নের মধ্যে জান্নাতে ভ্রমণ করে থাকে এবং সেখানকার ফল ও নিয়ামতসমূহ আহার করে থাকে।’
ইসলাম স্বদেশ ও জাতির প্রতি আত্মিক প্রেরণা ও ভালোবাসাকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। দেশপ্রেম একটি বহুমাত্রিক অনুভূতির দর্পণ। মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি যার অন্তরে ভালোবাসা বিদ্যমান, দেশের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ কামনা ও মঙ্গল সাধন তার করণীয় হতে বাধ্য। আজ বাংলাভাষাকে রক্ষা করার জন্য সালাম, বরকত, জব্বার, রফিকের মতো বুকের তাজা রক্ত বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই; শুধু প্রয়োজন মমতা দিয়ে গ্রহণ করার এবং শুদ্ধভাবে তা প্রয়োগ করার। এই মহত্ কর্মের সুফল আমরা যাঁদের জীবনের বিনিময়ে পেয়েছি, তাঁরা হলেন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আত্মত্যাগী, জীবনদানকারী, মাতৃভাষার অধিকার রক্ষাকারী মহান ব্যক্তিবর্গ ও অমর ভাষাসৈনিকগণ। তাঁদের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে সারা পৃথিবীতে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত এবং বিশ্বসভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসে বাংলাভাষা উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত। বিশাল গৌরবময় আসনে সমাসীন মাতৃভাষা বাংলা এবং বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত বাঙালি জাতি। জগতে বহু ভাষা প্রচলিত আছে; তন্মধ্যে বাংলা ভাষার স্থান সপ্তম। পৃথিবীর বহু দেশে বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার চলছে।
মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আত্মাহূতি দেওয়া আমাদের সূর্যসন্তানদের জন্য এই অমর একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত, পরিচিত ও সম্মানিত। তাই মাতৃভাষার জন্য ত্যাগী শহীদ সন্তানদের মতো আরও নিবেদিতপ্রাণ সংগ্রামীর জন্ম হোক বিশ্বের দিকে দিকে। সত্য ও ন্যায়ের জন্য আমরণ সংগ্রামের আদর্শে এগিয়ে যাওয়ার দৃপ্ত শপথ হোক আমাদের পাথেয়। মহান ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষা চর্চায় বাঙালি জাতিকে একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে হলে ধর্ম-বর্ণ ও দল-মতনির্বিশেষে সব শ্রেণীর লোকের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ সাধনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষা ও দেশপ্রেমের চেতনায় ভাষাশহীদসহ সবার অশেষ অবদানকে সম্মান জানানো একজন মুমিন মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। এটা তাঁর ঈমানের অপরিহার্য দাবি। মাতৃভাষা রক্ষায় দেশপ্রেমের আহ্বানে সাড়া দিতে তাই আমাদের প্রত্যেকেরই সদা প্রস্তুত থাকা বাঞ্ছনীয়।
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক এমীকাডে, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার by সৌরভ সিকদার

বাংলাদেশ একটি বহু জাতি, বহু ধর্ম এবং বহু ভাষার দেশ। এ দেশে প্রধান ভাষা বাংলা হলেও শতকরা দুই ভাগেরও অধিক ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ বাস করে। এদের মধ্যে উর্দুভাষী বিহারি, তেলেগুসহ ৩০ লাখ বা তারও বেশি আদিবাসী বা নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী বাস করে। যদিও সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা এর অর্ধেক। বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও প্রায় ৪৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে। বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসীদের ভাষা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে পৃথিবীর চারটি প্রধান ভাষা-পরিবারের প্রায় ৩০টি ভাষা তারা ব্যবহার করে। এর মধ্যে কিছু ভাষা পৃথক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হলেও অনেক ভাষাই পরস্পর এতটা ঘনিষ্ঠ যে এগুলোকে উপভাষাই বলা যায়। যেমন তনচঙ্গা মূলত চাকমা ভাষার উপভাষা। অনুরূপভাবে রাখাইন মারমা ভাষার, লালং বা পাত্র গারো ভাষার এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ও হাজং বাংলার উপভাষা। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষার সংখ্যা ২৬-৩০টি। যদিও একটি ওয়েবসাইটে (Ethnologue, Languages of Bangladesh) বাংলাদেশে বাংলাসহ মোট ৩৭টি ভাষার উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে ওই ওয়েবসাইটে আসামিজ, বার্মিজ, চিটাগোনিয়ান, হাকা-চীন, রিয়াং, সিলেটি প্রভৃতিকে পৃথক ভাষা হিসেবে দেখানো হয়েছে।
জর্জ গ্রিয়ারসনের ‘ভারতীয় ভাষাসমূহের জরিপ’ প্রকাশিত হওয়ার পর দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও এ অঞ্চলের আদিবাসী ভাষা নিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি। ফলে ভাষাগুলোর শ্রেণীকরণসহ ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় এবং তুলনামূলক কোনো আলোচনা হয়নি। অথচ গত প্রায় এক শ বছরে ভাষাগুলোতে নানা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে।
বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলাসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গ, সিলেট বিভাগের চা-বাগানসহ নানা উপজেলা, ময়মনসিংহের শেরপুর, মধুপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনাসহ গারো পাহাড়সংলগ্ন এলাকা এবং কক্সবাজার, পটুয়াখালী, বরগুনা জেলায় বসবাস করে এরা। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তুলনায় এরা রয়েছে নানা দিক থেকে পিছিয়ে। বিশেষ করে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। অথচ যেকোনো শিশুরই মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের মৌলিক অধিকার রয়েছে। স্কুলে যেতে পারে কিংবা স্কুলে যাচ্ছে এরূপ চার থেকে দশ বছর বয়সের আদিবাসী শিশুর সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। ইউনেসকো ২০০৩-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাদের মাতৃভাষা জাতীয় বা স্থানীয় ভাষা থেকে ভিন্ন তারা শিক্ষাব্যবস্থায় অনেকটা সুবিধাবঞ্চিত থাকে। বাংলাদেশের আদিবাসী শিশুর ক্ষেত্রে এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।
এ বিষয়ে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানান, ‘আমরা মনে করি বাংলাদেশে আদিবাসী ও তাদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে জাতীয় পর্যায়েই এমন সব কৌশল, পরিকল্পনা, কাঠামো ও চুক্তি বিদ্যমান যা দেশের আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি দীর্ঘস্থায়ী মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষী শিক্ষা কর্মসূচি প্রণয়নের জন্য অনুকূল’ (প্রথমে মাতৃভাষা, ২০০৭; সেভ দ্য চিলড্রেন)। তবে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার আজ পর্যন্ত এসব কৌশল, পরিকল্পনা এবং চুক্তির বাস্তবায়ন করেনি। বাংলাদেশের সব শিশুর শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হলে এসবের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ধারায় ধর্ম, বর্ণ, জন্মস্থানভেদে কোনো ধরনের বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৫ ও ১৭ ধারায় অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, গণভিত্তিক সার্বজনীন শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। এদিক দিয়ে আদিবাসী শিক্ষার্থীরাও সমান সুযোগ পাওয়ার দাবিদার। ১৯৯৭ সালের পাবর্ত্য শান্তি চুক্তির ৩৩/খ-২ ধারায়ও মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে শিশুকে এই শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় বিগত দুই দশকে শিক্ষার হার বাড়তে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং এর ফলে শিক্ষার হারও বেড়েছে। কিন্তু আদিবাসী শিশুর শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে তেমন কোনো পরিকল্পনা অদ্যাবধি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নেওয়া হয়নি, যা হয়েছে তা বেসরকারি উদ্যোগে। সরকারি উদ্যোগে পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসীদের শিক্ষার্থীর জন্য কোনো পৃথক ব্যবস্থা বা অর্থ বরাদ্দ নেই। কাজেই আদিবাসী শিশুর শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করছে মূলত উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত বিদ্যালয়সমূহ। দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (সরকারি) আমাদের প্রচলিত জাতীয় শিক্ষাক্রমের একই পাঠ্যবই অনুসরণ করা হয় এবং এগুলোর ভাষা সংগত কারণেই বাংলা। এসব পাঠ্যপুস্তক মূলত বাংলাভাষী বাঙালি শিশুর পাঠ, বোধগম্যতা এবং মানস-বৃদ্ধির সহায়ক হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে। এগুলো মোটেও আদিবাসী শিশুর শিক্ষাগ্রহণের জন্য বিজ্ঞানসম্মত নয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষক এবং পাঠ্যপুস্তকজনিত সমস্যার কারণে অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে।
শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ভাষা। আর এই ভাষা যদি শিশুর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটে না। যেহেতু আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা বাংলা নয় এবং বিদ্যালয়ে যে বই পড়তে হয় তার ভাষা এবং বিষয় তার পরিচিত পরিমণ্ডলের নয়, এমনকি যে শিক্ষক পড়ান তাঁর সঙ্গেও তার রয়েছে ভাষিক দূরত্ব (কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া) কাজেই এতগুলো প্রতিকূলতা পেরিয়ে আদিবাসী শিশুর শিক্ষার বিস্তার ঘটবে তা প্রত্যাশা করা যায় না। আর সম্ভবত এখানেই প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে আদিবাসী শিশুর ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনক। কাজেই অনেক ক্ষেত্রে আদিবাসী শিশুরা শিক্ষক বা অন্যান্য সহপাঠীর সঙ্গে যথার্থ ভাষিক যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়, যা তাদের মনোবল ও উত্সাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পৃথিবীর যেকোনো জাতির রয়েছে মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার। কেননা শিশুর দৈহিক, মানসিক ও মানবিক বিকাশের স্বার্থে মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। জাতিসংঘ সনদে প্রতিটি শিশুর মাতৃভাষায় প্রথমিক শিক্ষার সুযোগ দানের কথা বলা হয়েছে (১২০.১৯৫৭, ১০৭/৩১-১)
শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিজ্ঞানীদের ধারণা, মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ না থাকায় আদিবাসীদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটছে না। তা ছাডা বাংলাদেশের আদিবাসী এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে শিশুরা যা পড়ছে তা কোনোক্রমেই তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ফলে শিশুরা পাঠের উত্সাহ হারিয়ে ফেলে। কাজেই তাদের জন্য পৃথক পাঠক্রম তৈরি করা জরুরি।
আদিবাসী গবেষক মিথু শিলাক মুরমু লিখেছেন,
‘রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা যেন আদিবাসীদের ভাষা উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা না হয়ে ভাষার নির্দেশিকা দুটোর প্রতিটি বর্ণ যেন একটি উজ্জ্বল তারকা হয়ে জ্বলতে পারে। সরকারকে ভাষা রক্ষার জন্য রেডিও-টেলিভিশনে সংশ্লিষ্ট ভাষাগোষ্ঠীর জন্য অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানে উত্সাহী করে। আদিবাসী একাডেমিগুলো থেকে যেন মাসিক, ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশনা, পাশাপাশি রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আদিবাসী অধ্যুষিত বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যসূচি হিসেবে মাতৃভাষা অন্তর্ভুক্তিকরণ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক ভাষাগুলোকে উন্নয়ন প্রচলন ও সংরক্ষণের জন্য গবেষণার উদ্যোগ নিতে হবে’।
এ দেশের মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারির মাধ্যমে অর্জন করেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব। কিন্তু এ দেশেরই সংখ্যালঘু মানুষ তথা আদিবাসীদের ভাষা বিষয়ে আমরা উদাসীন। আমাদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে তাদের ভাষাগুলো বিপন্নপ্রায়। বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে আমাদের এখন নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে সংখ্যালঘুদের ভাষার অধিকার ও উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভাষা-পরিকল্পনা এবং ভাষিক সমমর্মিতা। বৈচিত্র্যের মধ্যে একতা। পৃথিবী নামক গ্রহের বাংলাদেশ নামক দেশে যতগুলো ভাষা রয়েছে তাদের মর্যাদা ও ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শ্রীলঙ্কার নির্বাচন-উত্তর রাজনীতি by ফারুক চৌধুরী

যেকোনো যুদ্ধের পর যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না কখনো। তার প্রমাণ আমরা পাই পৃথিবীর যেকোনো স্থানে ঘটা যুদ্ধোত্তর অবস্থা থেকে। একটি সশস্ত্র সংঘাত নতুন একটি অবস্থার সৃষ্টি করে, যা নতুন আঙ্গিকে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। শ্রীলঙ্কায় এলটিটিইর বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটল গত বছরের মে মাসে, তা এই নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। যেমন ছিল না আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।
শ্রীলঙ্কায় তামিলবিরোধী অভিযানের সাফল্যজনক সমাপ্তি ঘটেছে বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সমাজে সিনহালা-তামিল দ্বন্দ্বের অবসান হয়েছে বলে দাবি করা যাবে না। এই দ্বন্দ্ব এখন কীভাবে শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করবে, তা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। তবে আশা তো এই রইবে যে তা যেন সহিংস আকার ধারণ না করে।
শ্রীলঙ্কা অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি দেশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ, মাথাপিছু আয়সমেত অন্যান্য অনেক খাতেই দেশটি আমাদের অঞ্চলের অন্য অনেক দেশ থেকেই এগিয়ে আছে। দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ আর ভয়াবহ সুনামি শ্রীলঙ্কাকে আঘাত হেনেছে সত্যি, কিন্তু পর্যুদস্ত করতে পারেনি। এমনকি গণতন্ত্রচর্চার ক্ষেত্রে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রেও শ্রীলঙ্কার অবস্থান প্রশংসনীয়ই রয়েছে বছর বছর ধরে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে শ্রীলঙ্কার প্রাদেশিক এবং সাধারণ নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল—এবং এক কথায় এই বলা যায় যে সেই সময়ে চলমান গৃহযুদ্ধ সত্ত্বেও, যুদ্ধবহির্ভূত অঞ্চলে একটি মুক্ত, অবাধ ও উচ্চমানের নির্বাচন দেশটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল; যেখানে সেই দেশের নির্বাচন কমিশন একটি নিরপেক্ষ এবং শক্তিশালী ভূমিকা নির্ভয়ে পালন করেছিল।
কিন্তু গৃহযুদ্ধের অবসানে গত ২৬ জানুয়ারি যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনটি হলো তা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশেষ নজরের দাবি রাখে বলে আমার বিশ্বাস।
প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই বছর আগেই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত করলেন। তা অসাংবিধানিক না হলেও, ছিল রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত। যুদ্ধ শেষ হয়েছে, বিজয়ের দাবিদার তো তিনিই—অতএব ঝটপট নির্বাচন—‘শুভস্য শীঘ্রং’। কিন্তু তখন শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিবর্তনটি ঘটল, তা অনেকের চোখেই ছিল অনভিপ্রেত। তা হলো শ্রীলঙ্কার বিরোধী দলগুলো একজোট হয়ে, যুদ্ধে শ্রীলঙ্কার সশস্ত্র বাহিনীর অধ্যক্ষ জেনারেল শরত ফনসেকাকে দাঁড় করাল এবং জেনারেল ফনসেকাও প্রথামত উর্দি ত্যাগ করে স্বেচ্ছায় এবং সাগ্রহে নির্বাচন যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। বাংলাদেশসমেত দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এই ধরনের ঘটনা বিরল নয়—কিন্তু অনেকেই মনে করেন যে তার রাজনৈতিক নেতা, প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে, সেনাধ্যক্ষ জেনারেল শরত ফনসেকাকে না দাঁড় করালেই তা গণতন্ত্র এবং যুদ্ধোত্তর শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের জন্য মঙ্গলতর হতো। নির্বাচনে অনিয়ম ঘটল বেশ, কিন্তু শতকরা ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে (ফনসেকা পেলেন ৪০ শতাংশ) নির্বাচনে মাহিন্দা রাজাপক্ষে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আরও ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হলেন।
প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষকে উদ্দেশ করে বলা যায়, ‘জয় করে তবু ভয় কেন তোর যায় না!’
ফনসেকা নির্বাচনে অনিয়মের কথা তুলে ধরলেন, আর তিনি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে পারেন, এ কারণে অথবা অজুহাতে জেনারেল ফনসেকাকে বন্দী করা হলো। তিনজন মেজর জেনারেল আর চারজন ব্রিগেডিয়ার-সমেত প্রায় এক ডজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হলো। সামরিক বাহিনীর অবকাঠামোয় অনেক পরিবর্তন আনা হলো। প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে হয়তো বা প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত পদক্ষেপই গ্রহণ করলেন।
আগের কথায় ফিরে আসি। যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি কখনো যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে পারে না। যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সামরিক বাহিনীকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হলো। সামরিক বাহিনীতে রাজনৈতিকীকরণ ঘটল। প্রতিরক্ষা খাতে যে দেশে; স্বাধীনতার পর পর বাজেটের শতকরা দুই ভাগ ব্যয় হতো সেখানে সেই খাতে খরচ দাঁড়াল বাজেটের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি—শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষি খাতকে ছাড়িয়ে সেনাবাহিনীর আকার উন্নীত হলো তিন লাখে। সমাজে উর্দিভীতি প্রবেশ করল—উর্দি-বন্দনা শুরু হলো। ‘তোমারে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে’ এই আপ্তবাক্যের সত্যাসত্যটি সিনহালা-তামিল দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক সমাধান আনয়নে বিফল রাজনীতিবিদেরা বেমালুম ভুলে গেলেন। সেই ভুলেরই মাশুল শ্রীলঙ্কাকে এখন দিতে হচ্ছে।
এখন এই সামরিক দৈত্যকে আবার বোতলবন্দী করা প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে আর সেই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত সমস্যাটিকে যেভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে তা রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় নয় বলেই অনেকে ভাবছেন। যুদ্ধ শেষ হলেও একটি নতুন অশান্তি শ্রীলঙ্কার সমাজকে আক্রান্ত করেছে, যা দেশটির আশু অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত করতে পারে। শ্রীলঙ্কায় গণতন্ত্রের সুদৃঢ়করণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান। শ্রীলঙ্কার সমস্যার ‘বল’টি এখন সেই দেশের রাজনীতিবিদদেরই ‘কোর্টে’।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব। কলাম লেখক।

বাগাড়ম্বর, ভাবাবেগ ও শখ মেটানোর হুজুগ -যুক্তি তর্ক গল্প by আবুল মোমেন

আর দুদিন পরই একুশে ফেব্রুয়ারি। তবে আজকাল বইয়ের প্রকাশনা ও বইমেলা ঘিরে একুশের উত্সব ও আমেজ শুরু হয়ে যায় ফেব্রুয়ারির গোড়া থেকেই। ঢাকার মতো সারা দেশেই একুশের মৌসুম শুরু হয়ে গেছে।
মূলে শহীদ দিবস হলেও একুশের চেতনায় বাঙালির অধিকার ও আত্মবিকাশের দৃপ্ত অঙ্গীকারই মুখ্য হয়ে উঠেছিল। পাকিস্তান আমল জুড়ে একুশের ছিল প্রতিবাদী-সংগ্রামী রূপ। শহীদদের স্মরণ করা হয়, তবে তাঁদের ত্যাগের ফলে যে অর্জন, তা ঘিরে উত্সব ও আনন্দের আবহই প্রধান হয়ে উঠেছে এখন। এটা একুশের বিবর্তন, এমনকি উত্তরণও বলা যায়।
একুশকে ঘিরেই বাঙালির অধিকারের সংগ্রাম শুরু এবং তা ক্রমে স্বাধীনতার যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে ধীরে ধীরে একুশ যেন প্রেরণায় ও উদ্যাপনের আঙ্গিকে ছাপিয়ে গেছে স্বাধীনতা বা বিজয় দিবসকেও। একুশে উদ্যাপিত হয় মাসব্যাপী। বিজয় দিবসকে ঘিরে এ রকম প্রয়াস থাকলেও তা এখনো কি স্বতঃস্ফূর্ততায়, কি অংশগ্রহণে একুশের কাছাকাছি আসতে পারেনি।
একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত হওয়ায় তার যেমন অর্জনের ব্যাপ্তি ঘটল, তেমনি তাত্পর্য ও উদ্যাপনের ক্ষেত্রেও কিছু নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
এত সব অর্জন, ব্যাপ্তি-উত্তরণের মধ্যে আমার ভাবনা ঘুরছে—এসবের পেছনে যে আবেগের ঢল দেখতে পাই তাকে ছাপিয়ে কাজের কাজ কতটা হচ্ছে—তা নিয়ে। ভয় এ জন্য বাড়ে যে ভাবনা-চিন্তা, বিচার-বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে আবেগে মাতামাতি করে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কেও আমরা প্রায়ই খেলো করে ফেলি। একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা নিয়ে ভাবাবেগপূর্ণ অনেক কথা বললেও নানাভাবে এসবকে খেলোও করেছি আমরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কীভাবে খেলো করা হলো, রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানটিকে বিএনপি কীভাবে খেলো করল, সেসব একবার ভাবুন!
বহু বছর পর এবার বাংলা একাডেমীর বইমেলায় গিয়ে মনে হলো, বই লেখা, বই প্রকাশ করা—এ সবই নেহাত ছেলেখেলার বিষয় হয়ে যাচ্ছে। কেউ পাঁচটা, কেউ ছয়টা, কেউ এরও বেশি বই লিখে প্রকাশ করছেন এক বছরে! বঙ্গবন্ধুর নামকে যথেচ্ছ খেলো করার কাজে নেমেছে এক দল। তদ্রূপ জিয়া ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে চলছে ছেলেখেলা। অনেক কাল আগে লিখেছিলাম, বাংলাদেশ বহু মানুষের স্বপ্নের দেশ। কথাটা অসত্য নয়। তবে আজ মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ বহু মানুষের শখের দেশ—অর্থাত্ শখ পূরণের দেশ। এই শখের মধ্যে একটি সহজ খেলো শখ হচ্ছে বই লেখা ও লেখক হওয়া। অনেকের শখ মন্ত্রী হওয়া, ইদানীং অনেকে ভাবেন মন্ত্রীর চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার শখ পূরণ হলে মর্যাদা বেশি হবে। খালেদা জিয়া শখ করে ইয়াজউদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি বানালেন, ইয়াজউদ্দিন শখ করে মফিজকে বানালেন প্রেস-সচিব।
একুশের প্রধান উত্সব বাংলা একাডেমীর বইমেলা। এটাই এখন শখ পূরণের প্রধান অঙ্গন। এ পর্যন্ত (১৬ ফেব্রুয়ারি) প্রায় ১৮০০ নতুন বই এসেছে মেলায় আর দুই শতাধিক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হয়েছে। তাতে বাঘা বাঘা বুদ্ধিজীবী, মন্ত্রী, সাংসদ, লেখক, সাহিত্যিকেরা অংশ নিয়েছেন। সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে বাংলাদেশের সারস্বত সাধনা ও মনন-মনীষার চর্চা এবং সৃজন-সাহিত্যের বসন্তকাল যে চলছে, তা মানতেই হবে। দর্শনে একটা তত্ত্বে বলে appearance and reality, অর্থাত্ দৃশ্যত যে রকম কার্যত ব্যাপারটা তা নয় সব সময়। এই পৃথিবীটা দেখতে লাগে সমতল, কিন্তু কার্যত এটি গোল, আকাশটা দেখায় নীল কিন্তু বাস্তবে তার কোনো রং নেই। তো এই বিশাল মেলা, বিপুল প্রকাশনা, অসংখ্য নতুন বই, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে এত আবেগ-ভালোবাসার কতটা বাস্তবে সত্য, এ প্রশ্ন কি তোলা যায় না?
কারণ বাংলা ভাষা চর্চার অবস্থাটা ভালো নয়। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের আধিপত্য ঢাকা-চট্টগ্রাম ছাপিয়ে মফস্বলে পৌঁছেছে। এখন ক্রমে এর একটা করাপ্ট রূপ চালু হতে শুরু করেছে। এরও চেয়ে মারাত্মক হলো শিক্ষাভিমানী বাঙালির মনের অবস্থা। এখন ইংরেজিই তার সুয়োরানি, বাংলা দুয়ো। এত সাধের শখের মাতৃভাষা বাংলার বিনিময়ে হলেও সে সন্তানের ইংরেজি শেখার বিষয়ে তত্পর। ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য। কিন্তু বর্তমান সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অধিকাংশ সফল খ্যাতিমান প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গের সন্তান-সন্ততি যাচ্ছে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে, বেরোচ্ছে বাংলায় ভয়ংকর দুর্বলতা নিয়ে। তাতে ক্রিয়াত্মক শিল্প চলতে পারে, কিন্তু সাহিত্য ও মননসাধনার মতো ভাষানির্ভর কাজের কী হবে। এভাবে কি জাতি এগোবে?
এভাবে বাংলা ভাষা নিয়ে মৌলিক গবেষণা, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা (এ নিয়ে বাংলা একাডেমীর বর্তমান মহাপরিচালক অবশ্য একটা উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছেন), সংস্কৃত ভাষা শিক্ষার সংকট ও সংস্কৃত জানা শিক্ষকের অভাব, স্কুল পর্যায়ে বাংলা শিক্ষকের মানের ক্রমাবনতি ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ তোলা যায়। এসব ক্ষেত্রে যে বাস্তব চিত্র পাওয়া যাবে, এর সঙ্গে মেলানো যাবে না বাগাড়ম্বর ও ভাবাবেগপূর্ণ সেমিনার, প্রকাশনা ও মেলার কার্যক্রমের চিত্রকে।
এরই সূত্র ধরে একটা কথা একটু ভাবার জন্য বলব। একুশে যদি আমার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির চেতনা এবং এগুলোকে অবলম্বন করে আত্মবিকাশের প্রেরণা হয়ে থাকে, তবে একুশের সূত্রে কেবল কি ভাষাশহীদেরাই আমাদের নায়ক থাকবেন? এঁরা বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রের পুলিশি হামলার শিকার হয়েছেন। তাঁরা শহীদ, সে কারণে তাঁরা স্মরণীয় ও বরণীয়। তাঁদের কথা আমাদের ইতিহাসে অবশ্যই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে এবং তাঁদের প্রসঙ্গে আমরা ইতিহাসে পাঠ করব।
একটু সংকোচের সঙ্গে বলি, তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি, শহীদ মাত্রেরই জীবন ছাত্র-শিশুদের জন্য কিছু স্মরণীয়-শিক্ষণীয় পাঠে সমৃদ্ধ নাও হতে পারে। আবারও বলছি, তাঁদের শ্রদ্ধা জানানো ও স্মরণ করা জাতির কর্তব্য। এ জন্য তাঁদের নামে স্কুল, কলেজ, পাঠাগারও হতে পারে। কিন্তু জীবনী পাঠের জন্য স্কুলছাত্রদের ওপর জবরদস্তি খাটানো উচিত কি না, ভেবে দেখা দরকার।
এ কথাটা আরও বিশেষভাবে বলছি, যদি একুশের চেতনা হয়ে থাকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির বিকাশ ইত্যাদি, তাহলে এই চেতনা আমাদের কেন অনুপ্রাণিত করে না আধুনিক বাংলা গদ্যের নির্মাতা হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করতে, তিনি কেবল ভাষার ক্ষেত্রে নয়—সমাজ সংস্কার বাদ দিলাম—শিক্ষাবিস্তারে যে কাজ করেছেন, সে কারণে তাঁর নামে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, নিদেনপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নাম, কোনো মিলনায়তনের নাম হতে পারত না? এ গদ্যের ওপর যাঁরা সাহিত্যের সৌধ নির্মাণ করে যুগপত্ বাংলা ভাষা ও বাঙালি-মনীষার উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, সেই বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথের নামেও কি আমরা কোনো প্রতিষ্ঠান গড়েছি? এভাবে বলা যাবে মাইকেল, লালন, নজরুল, জসীম, জয়নুল, আব্বাসউদ্দীনদের নামেই বা আমরা যথাযোগ্য কী করেছি?
একটা জাতি সালাম-জব্বার-রফিক-বরকতকে স্মরণীয় করে রাখতে চায়, তাঁদের শ্রদ্ধা জানায় কিন্তু বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ হয়ে নজরুল-জসীম-জয়নুল-আব্বাসউদ্দীনদের বিস্মৃত হতে থাকলে তার সম্পর্কে কী ভাবব?
একই রকমের খটকা লাগে বীরশ্রেষ্ঠদের ব্যাপারেও। তাঁরা অবশ্যই আমাদের শ্রেষ্ঠবীর। তাঁরা অমর, তাঁদের কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তাঁদের নামে নানা প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠবে নিশ্চয়। তাঁদের ত্যাগোদ্দীপ্ত বীরত্বব্যঞ্জক যুদ্ধগুলো নিয়ে সাহিত্যও রচিত হতে পারে, কিন্তু ঠিক স্বতন্ত্রভাবে জীবনীপাঠ্য করার কথা বললে মনে প্রশ্ন জাগে, যে জাতি মুক্তিযুদ্ধের মূল রূপকার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভ্রান্ত ও বিতর্কে লিপ্ত থাকে, মূল স্থপতি তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে উদাসীন ও নির্লিপ্ত, তার জন্য এ কাজ কতটা যথার্থ হচ্ছে? এমনকি সে কেন মাস্টারদা সূর্য সেন, বীরকন্যা প্রীতিলতা এবং ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামীদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকবে?
তখন সংশয় হয়, আমরা ভাবনা-চিন্তা, বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া হুজুগে মেতে উঠিনি তো?
বাংলাদেশ স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই পথ হারাতে শুরু করেছিল। ১৯৭৫-এর পর থেকে সম্পূর্ণ বিপথগামী হয়ে গেল দেশ। আমরা মনে করছি বহুদিন বিপথে-বিপদে ঘুরপাক খেয়ে ভ্রান্তি-ব্যর্থতার গোলকধাঁধা পেরিয়ে এবার বোধহয় জাতি ঠিক পথে আসতে চাইছে। সে রকম কিছু লক্ষণ তত্ত্বাবধায়ক আমল থেকে দেখা যাচ্ছিল, এবং বিগত নির্বাচনে নতুন প্রজন্মসহ অধিকাংশ দেশবাসী সে রকম মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বলা বাহুল্য, এই প্রত্যাশার দায় চেপেছে বর্তমান সরকারের ওপর, বিশেষভাবে আওয়ামী লীগের ওপর। একটু বলে নিতে চাই, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্র অবশ্যই ছিল, স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারকে তারা সফল হতে দিতে চায়নি, এসব কথা সত্য বটে, তবে সেই সঙ্গে এও সত্য যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে সেদিন সঠিক পথে চালাতে পারেনি।
এবার কিন্তু ব্যর্থ হলে চলবে না। নানা মানুষের শখ পূরণের কাজে যেন সরকার বা কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যবহূত না হয়। উচ্চাভিলাষী, শৌখিন, বিলাসী মানুষের শখ পূরণের কাজে আমাদের কোনো উপলক্ষ, অনুষ্ঠান যেন ছিনতাই হয়ে না যায়। লাখো মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণই বড় কথা।
ভাবাবেগ ও বাগাড়ম্বরে যেন আমরা গা না ভাসাই। এভাবে ভাঙা যায়, গড়া যায় না। গড়ে তোলা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিচারবোধ কাজ না করলে দেবতা গড়তে বাঁদর গড়া হয়ে যেতে পারে। আমার ভয়, আমাদের মজ্জাগত গা-ভাসানো স্বভাব, শখ মেটানোর দুর্বলতার ফলে আতিশয্য ও অতিশয়োক্তির চোরাবালিতে না আবার ডুবে মরি।
দ্রুত, দ্রুত আমাদের শক্ত জমিনের ওপর দাঁড়াতে হবে। যেটি যেমন হওয়া উচিত, যাকে যেভাবে স্বীকৃতি দিতে ও জানতে হবে, মোট কথা যে কাজ যেভাবে করণীয় তা সেভাবেই করতে হবে। যুক্তিহীন ভাবের ঘোরে পড়লে দশায় পাবে। ব্যক্তির এমন অবস্থা হলে ক্ষতি সামান্য—সেই ক্ষতি ব্যক্তি ও তার পরিবারের, কিন্তু জাতি ঘোরে কাটালে, দশায় পড়লে সমূহ বিপদ।
একুশ আমাদের অমূল্য সম্পদ, এর যেন ভাবের ঘোরে দশাপ্রাপ্তি না ঘটে, সেদিকে সবার খেয়াল রাখতে হবে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

এনজিওর আচরণবিধি -উদ্দেশ্য, ঘোষণা ও কাজের মধ্যে সংগতি থাকা প্রয়োজন

যার পরিচয় কাজে, তাকে নাম দিয়ে চেনা কঠিন। শিশুর অধিকারের পক্ষে কাজ করার জন্য ২৬৩টি এনজিও নিয়ে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম। অথচ সদস্য সংস্থাগুলোর ৭৫টিরই কোনো শিশু-কার্যক্রম নেই! বুধবারের প্রথম আলোয় এ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ফোরামের সদস্য হওয়ার সুবিধা ওই এনজিওগুলো যতই পাক, তাদের দ্বারা অন্তত শিশুরা কোনোভাবে উপকৃত হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। কথা ও কাজের অমিলের মিছিলে বেশ কিছু এনজিওর এই যোগদান দুঃখজনক।
এনজিও তথা সেবার উদ্দেশ্যে গঠিত বেসরকারি সংস্থা মাত্রই জনসেবায় নিয়োজিত অলাভজনক প্রতিষ্ঠান; প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতায় এ কথা বলার আর জো নেই। জনস্বার্থে কাজ করার পাশাপাশি এনজিও প্রতিষ্ঠান অনেক অসাধু উদ্দেশ্যেও ব্যবহূত হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে, বিদেশি অনুদান এনে তা অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা, ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠায় লাগানো, এমনকি রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালানোর চর্চাও আর গোপন নয়। এনজিওর স্বত্বাধিকারী হওয়া অনেকের জন্যই ক্ষমতাবান হওয়ার সিঁড়ি। অন্যদিকে দেশে অজস্র এনজিও রয়েছে, যাদের নিবন্ধন নেই। সম্প্রতি প্রথম আলোর এক সংবাদ থেকে জানা গেছে, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট আড়াই হাজার এনজিওর মধ্যে এক হাজার ৩০৯টিই অবৈধভাবে চলছে। এগুলো হয় কখনো নিবন্ধিতই হয়নি, অথবা তাদের নিবন্ধনের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও নবায়ন করা হয়নি। গত বৃহস্পতিবারের প্রথম আলো থেকে দেখা যাচ্ছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সমাজসেবামূলক কাজের জন্য নিবন্ধিত এনজিওদের কোনো কোনোটি এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবসাতেও জড়িয়ে পড়ছে।
এসব কারণেই বেসরকারি সংস্থা তথা এনজিও প্রতিষ্ঠা, পরিচালনাসহ এদের সার্বিক কার্যক্রমের ওপর দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নজর থাকা দরকার। বিশেষ করে, বিদেশি অর্থসাহায্যের ব্যবহার আইনানুগভাবে ও ঘোষিত উদ্দেশ্যে হচ্ছে কি না, দুর্নীতি হচ্ছে কি না এবং সর্বোপরি দেশবিরোধী কাজে এই অর্থ ব্যবহূত হচ্ছে কি না, তা তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।
তবে নিয়মবদ্ধ বা নিবন্ধিত করার নামে এ ক্ষেত্রে যেন সরকারি খবরদারি না চলে আসে, সেটাও দেখা জরুরি। হিতের নামে যা বিপরীতটা ঘটায়, তা কাঙ্ক্ষিত নয়।

বাধ্যতামূলক অবসর -আইনের অপব্যবহার রোধ করতে হবে

সরকারি কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার আদেশে সহকারী সচিব থেকে সচিব পর্যন্ত যেকোনো কর্মকর্তা সই করতে পারবেন বলে যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, তা সরকারকে আশ্বস্ত করলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এত দিন যুগ্ম সচিব বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তারা এ ধরনের আদেশে সই করতে পারতেন। প্রজ্ঞাপনটি জারির কারণ হলো, অতীতে যুগ্ম সচিবের নিচের কর্মকর্তাদের সইয়ে অনেককে অবসরের আদেশ দেওয়া হলেও আদালতে তা নাকচ হয়ে যায়। ফলে সরকার বকেয়া বেতন-ভাতাসহ তাঁদের চাকরি ফেরত দিতে বাধ্য হয়েছে।
১৯৭৪ সালের গণকর্মচারী অবসর আইনের ৯(২) ধারামতে, সরকারি চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার যে-কাউকে বাধ্যতামূলক অবসর দিতে পারে। অথবা সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিজেও অবসর নিতে পারেন। স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। বিপত্তি ঘটে থাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার ক্ষেত্রে। চাকরিবিধিতে জনস্বার্থে অবসর দেওয়ার বিধান থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা দলীয় স্বার্থেই করা হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে এ আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার অতীতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। সাবেক দুই সচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান ও এম হাফিজউদ্দিন খান যথার্থই বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার বিধান রহিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। আকবর আলি খান রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান থাকাকালে আইনটি রহিতের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশও করা হয়েছিল।
যেখানে আইনটির যথার্থতা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, সেখানে সেটিকে ‘নিখুঁত’ করার কী যুক্তি থাকতে পারে? বর্তমানে ক্ষমতাসীনেরা বিরোধী দলে থাকতে রাজনৈতিক কারণে জনপ্রশাসনে বাধ্যতামূলক অবসর ও ওএসডির প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তাঁরাও একই কাজ করছেন। গত এক বছরে বেশ কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা শৃঙ্খলাবিরোধী কিছু করলে সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
দুর্ভাগ্যজনক যে, সব সরকারই জনপ্রশাসনকে নিজেদের কবজায় রাখতে চায়। এটি কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না। বরং কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয়ভীতির সৃষ্টি হয়। এই সুযোগে একশ্রেণীর কর্মকর্তা ক্ষমতাসীনদের সুনজরে থাকতে অনৈতিক কাজ করতে দ্বিধা করেন না। সার্বিকভাবে জনপ্রশাসনের দক্ষতা-যোগ্যতা হ্রাস পায়। জনগণ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। অতএব কোনো কারণে সরকারি চাকরিবিধির উল্লিখিত ধারা পুরোপুরি বাতিল করা না গেলেও এর অপব্যবহার রোধে কার্যকর রক্ষাকবচ থাকা জরুরি বলেই আমরা মনে করি।

জুলাইয়ে পদত্যাগ করছেন জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান

জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান ইভো ডি বোয়ার আগামী জুলাইয়ে পদত্যাগ করছেন। তিনি কেপিএমজি কনসালটেন্সি গ্রুপের উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেবেন। জাতিসংঘের জলবায়ু সচিবালয় গতকাল এ কথা জানায়।
হতাশ করা কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের দুই মাস পর বোয়ারের পদত্যাগের এ খবর এল। তাঁর পদত্যাগ কার্যকর হবে ১ জুলাই থেকে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংস্থা ‘ইউএনএফসিসিসি’ এক বিবৃতিতে এ কথা জানায়। ২০০৬ সাল থেকে তিনি এ সংস্থার নির্বাহী কর্মকর্তার পদে আছেন।
এক বিবৃতিতে বোয়ার বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। কিন্তু আমি মনে করি বেসরকারি খাতে জলবায়ু এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নিয়ে কাজ করার নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার এটাই সময়।’

ছায়াপথের বাইরে সবচেয়ে পুরোনো নক্ষত্ররাজির সন্ধান

আমাদের এই ছায়াপথের বাইরের সবচেয়ে পুরোনো নক্ষত্ররাজির সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিদেরা। গত বুধবার ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির (ইএসও) জ্যোতির্বিদেরা এ কথা জানান। চিলিতে স্থাপিত মানমন্দির থেকে ওই নক্ষত্রগুলোর সন্ধান পান তাঁরা।
এক বিবৃতিতে ইএসওর জ্যোতির্বিদেরা বলেন, ‘ছায়াপথের বাইরে এই নক্ষত্রগুলোর খোঁজ পাওয়ার মাধ্যমে কীভাবে মহাবিশ্বে প্রথম নক্ষত্রটির উদ্ভব হয়েছিল, সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা পেতে সুবিধা হবে।’ জ্যোতির্বিদদের ধারণা, বিগ ব্যাংয়ের পরপরই প্রায় এক হাজার ৩৭০ কোটি বছর আগে প্রাচীন নক্ষত্রগুলো সৃষ্টি হয়েছিল।
চিলির সান্তিয়াগো শহরের উত্তরে আতাকামা মরুভূমিতে স্থাপিত ইএসওর অনেক বড় দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে এই পুরোনো নক্ষত্ররাজির সন্ধান পাওয়া গেছে। এই অনুসন্ধানী জ্যোতির্বিদ দলের সদস্য ভানেসা হিল দূরবীক্ষণযন্ত্রের ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন।
এ ব্যাপারে গবেষণাপত্রের মূল লেখক এলসে স্টারকেনবার্গ বলেন, এ ধরনের পুরোনো নক্ষত্রের দেখা পাওয়া দুর্লভ ঘটনা। সাধারণ নক্ষত্রগুলোর ভিড়ে এগুলো লুকিয়ে থাকে। তবে একটি নতুন কৌশল ব্যবহার করার মাধ্যমে ইউরোপীয় জ্যেতির্বিদেরা এ নক্ষত্রটি খুঁজে পেয়েছেন।

দালাই লামার সঙ্গে বৈঠক করলেন ওবামা

চীনের প্রতিবাদ সত্ত্বেও তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। খবর বিবিসি, এএফপি ও রয়টার্স অনলাইন।
ওবামা ও দালাই লামার মধ্যে ৪৫ মিনিট স্থায়ী এ বৈঠকে তাঁরা তিব্বতি এবং চীনের জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলেন। পরে দালাই লামা সাংবাদিকদের বলেন, ওবামা একজন সহায়ক ব্যক্তি। তিনি (দালাই লামা) লড়ছেন ন্যায় ও শান্তির জন্য। এ বৈঠকের ব্যাপারে তিনি খুবই খুশি।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেন, বৈঠকে ওবামা তিব্বতে মানবাধিকার এবং তিব্বতি ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের প্রতি তাঁর দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেন।
চীন সরকার দালাই লামাকে একজন বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে মনে করে। দেশটির মতে, এ বৈঠকের কারণে বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। তবে ওবামা প্রশাসনের বক্তব্য, দালাই লামা একজন গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতা। তিব্বতের মানবাধিকার নিয়ে তিনি সোচ্চার। এ বৈঠক নিয়ে চীনের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
দালাই লামা গত বছরও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার ব্যস্ততার কারণে সে সময় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারেননি তিনি।
দালাই লামার বিশেষ দূত লোদি গায়ারি বলেন, এ বৈঠক খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিব্বতি এবং চীনের জনগণের জন্য একটি হিতকর সমাধান বের করতে দালাই লামা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার সঙ্গে এ বৈঠক করেন। দালাই লামার মুখপাত্র সিমে সোয়া লিয়াকো বলেন, রাজনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র তিব্বতিদের সাহায্য করেছে। উভয় পক্ষের ভালো হয়, এমন একটি সমাধান খুঁজে বের করতে দালাই লামার সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন—মার্কিন সরকার এ কথা চীনকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত চীন সরকারের সঙ্গে নয়বার আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এটা এক ধরনের অগ্রগতি। তিনি আরও বলেন, চীন সরকার যে মনে করে এটা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন এবং একটি সমাধান খুঁজে বের করা দরকার, সেটাই অগ্রগতি।
ওবামা-দালাই লামা বৈঠক নিয়ে চীনের আপত্তি প্রসঙ্গে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেন, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেক পরিণত। বিভ্নি বিষয়ে মতানৈক্য থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তারা একমত পোষণ করতে পারবে।
এদিকে এ বৈঠককে স্বাগত জানাতে আতশবাজি পুড়িয়ে উত্সব করেছে তিব্বতিরা।
২০০৭ সালে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশও দালাই লামার সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁকে বিশেষ পদকও দেন। ওই সময়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল চীন। তবে গত এক বছরে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও বাণিজ্য চুক্তি বেইজিং-ওয়াশিংটনের মতানৈক্য অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে দুই প্রধান দলের নজিরবিহীন ঐক্য

যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিদলীয় রাজনীতির প্রভাব এখন খুবই প্রবল। তাই কোনো বিষয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মতৈক্যে আনা রীতিমতো কঠিন একটি কাজ। পরিস্থিতি এমন, এক দল যদি তাদের প্রচারসূচিতে ঘোষণা দেয় ‘বাচ্চাকুকুর আদরণীয়’, অন্য দলটি সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাকুকুরবিরোধী বিজ্ঞাপনের বন্যা বইয়ে দেবে। তবে হঠাত্ই একটি বিষয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের একমত হতে দেখা গেছে। সেটি হলো, সম্প্রতি নির্বাচনী ব্যয় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি রায়ের বিরোধিতা করা।
জানুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত এক রায়ে জানান, এখন থেকে করপোরেশন, শ্রমিক সংঘ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচনী প্রচারের সময় সরাসরি তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করতে পারবে। এ রায় নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে হইচই পড়ে যায় এবং বিরোধিতা শুরু হয়। ২০০২ সালের এক আইনে এ ধরনের ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত ও সীমারেখা আরোপ করা ছিল। কিন্তু মার্কিন আদালত ওই আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে নতুন এই নির্দেশনা জারি করে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ ও প্রভাবশালী পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিনদের একটি বড় অংশ সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এ আদেশের বিরোধী। জরিপের ফলে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক রায়টির বিরোধিতা করেছেন। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, ৮৫ শতাংশ ডেমোক্র্যাট, ৮১ শতাংশ স্বতন্ত্র ও ৭৬ শতাংশ রিপাবলিকান সুপ্রিম কোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান জানিয়েছেন। জরিপের এমন ফলকে অনেকে নজিরবিহীন বলেছেন।
এ রায়ের কার্যকারিতা ঠেকাতে মার্কিন কংগ্রেসে একটি আইন অনুমোদন করার ব্যাপারে ভালো সমর্থন পাওয়া যাবে, জরিপের ফল থেকে এখন এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭২ শতাংশ জানিয়েছেন, আদালতের আদেশের বিপরীতে কংগ্রেসের নেওয়া পদক্ষেপের পক্ষে তাঁরা সমর্থন দেবেন।
মার্কিন সিনেটে নির্বাচনী ব্যয়বিষয়ক সংস্কার কার্যক্রমের নেতৃত্বে থাকা সিনেটর চার্লস শুমার বলেন, নির্বাচনে বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাব কমানোর ব্যাপারে আনা প্রস্তাবের পক্ষে দুই দলের সমর্থন পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
এই জরিপের ফল কিছুটা অবাক করার মতো, কারণ সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পর ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান-দলীয় সদস্যরা একে স্বাগত জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ডেমোক্র্যাটিক-দলীয় অন্য সদস্যরা এর সমালোচনা করে রায় ঘোষণার দিনটিকে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য একটি কালো দিবস হিসেবে অভিহিত করেন।

গনির ধরা পড়া ‘বড় সাফল্য’: যুক্তরাষ্ট্র

তালেবানের শীর্ষস্থানীয় নেতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদারের ধরা পড়ার ঘটনাকে একটি ‘বড় সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বুধবার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী গনির ধরা পড়ার খবর নিশ্চিত করে। একই দিন মার্কিন কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে প্রশংসা করে বিবৃতি দেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বুধবার বলেন, ‘ওই এলাকায় (তালেবানের বিরুদ্ধে) আমাদের যৌথ উদ্যোগের একটি বড় সাফল্য এটি।’ পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ও মার্কিন গোয়েন্দারা চলতি মাসে করাচিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে গনিকে ধরে। পাকিস্তানে ধরা পড়া তালেবান জঙ্গিদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বড় নেতা। বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, গনির কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে।
মার্কিন বিশেষ দূত রিচার্ড হলব্রুকও গনির আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনিও এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলেননি। আফগানিস্তানের কাবুলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তালেবানবিরোধী লড়াইয়ে এটা সুস্পষ্ট একটা অগ্রগতি।’
এদিকে মোল্লা গনি ধরা পড়লেও তালেবানের অন্যান্য কমান্ডারকে ধরার ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে কতখানি সহায়তা করবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা। তাঁরা বলেছেন, গনিকে ধরার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি নিরাপত্তা-সদস্যরা সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু তালেবান বা আল-কায়েদার অন্য নেতাদের ধরার ক্ষেত্রে পাকিস্তানি নিরাপত্তা-সদস্যরা সহযোগিতা করবেন কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। পাকিস্তান এ ব্যাপারে গড়িমসি করলে আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সাবেক বিশ্লেষক ব্রুক রিডেল বলেন, ‘পাকিস্তানিরা রাতারাতি বদলে যাবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।’ পাকিস্তানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আশকারি বলেন, ‘এই গ্রেপ্তার খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। তালেবানের জন্য এটি বড় ধাক্কা। তাদের মনোবল ভেঙে যাওয়ার একটি ভালো প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে এটি।’
একজন মার্কিন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেছেন, মোল্লা আবদুল গনি আফগানিস্তানে তালেবান তত্পরতার অন্যতম হোতা ছিলেন। তাঁকে আটক রাখা হলে অন্তত কিছুদিনের জন্য তালেবানের তত্পরতায় ঘাটতি তৈরি হবে এবং তালেবানের শীর্ষ নেতা মোল্লা ওমরের জন্য ব্যক্তিগত সমস্যা তৈরি হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আবদুল গনি দীর্ঘদিন ধরেই মোল্লা ওমরের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন।
মোল্লা গনির ধরা পড়ার বিষয়টি এমন এক সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে, যখন আফগানিস্তানে তালেবানের শক্ত ঘাঁটি হেলমান্দে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী তালেবানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে।

বিহারে ১২ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করেছে মাওবাদীরা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরে মাত্র দুই দিন আগে ২৪ পুলিশ সদস্যের হত্যাকাণ্ডের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই বিহারের একটি গ্রামে গত বুধবার শেষরাতে ১২ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করেছে মাওবাদীরা। পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য বিহারের জামুই জেলার কাসারি গ্রামে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শতাধিক মাওবাদী ওই হামলা চালায়।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যৌথ বাহিনী পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বেলপাহাড়ির তুলাখেড়া জঙ্গলে মাওবাদীদের ধরতে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে।
বুধবার রাতের হামলার খবরে বলা হয়, ওই রাতে দেড় শতাধিক মাওবাদী বিদ্রোহী কাসারি গ্রামে হামলা চালিয়ে ২৫টির বেশি কাঁচা বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় বহু মানুষ আহত হয়। পুলিশের মহাপরিচালক ইউ এস দত্ত সাংবাদিকদের বলেন, শতাধিক মাওবাদী পুরো গ্রামটি ঘিরে ফেলে বাড়িঘরে নির্বিচারে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে। এ ঘটনায় ১২ জন নিহত হয়েছে। ওই সময় মাওবাদীরা ছয়জনকে অপহরণ করে।
স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, মাওবাদীদের সন্দেহ, চলতি মাসের গোড়ার দিকে তাদের ১১ সদস্যকে গ্রেপ্তারে সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করেছিল এই গ্রামের লোকজন।
পুলিশ জানায়, তারা ধারণা করছে, অপহরণকারীদের পার্শ্ববর্তী ঝাড়খন্ড রাজ্যের গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ওই রাজ্যেই মাওবাদীদের শক্ত ঘাঁটি।
গত সোমবার পশ্চিমবঙ্গের বেলপাহাড়ির শিলদার যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে মাওবাদীদের অতর্কিত হামলায় ২৪ জন আধাসামরিক জওয়ানের মৃত্যুর পর গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে যৌথ বাহিনী পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বেলপাহাড়ির তুলাখেড়া জঙ্গলে চিরুনি অভিযান শুরু করে। তারা ইতিমধ্যে ওই জঙ্গল ঘিরে ফেলেছে। জঙ্গলে পুঁতে রাখা চারটি মাইনের বিস্ফোরণ ঘটেছে। সেখানে মর্টারের শব্দও শোনা গেছে।
সোমবারের মাওবাদী হামলায় নিহত ২৪ জওয়ানের পরিবারসহ স্থানীয় লোকজন মঙ্গলবার থেকে পশ্চিমবঙ্গের সালুয়ায় সড়ক অবরোধ করে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়ে আসছে। তারা ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রী এসে দুঃখ প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছে। আজ শুক্রবার তারা সালুয়ায় আমরণ অনশন শুরু করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ মন্ত্রিসভার বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য গতকাল মাওবাদী হামলার নিন্দা এবং নিহত জওয়ানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়েছে।
রাজ্য সরকার মাওবাদী হামলা তদন্তের ভার ইতিমধ্যে সিআইডির হাতে তুলে দিয়েছে। সিআইডির শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন।
মাওবাদী নেতা কিষানজি গতকালও বলেছেন, সরকার অপারেশন গ্রিনহান্ট বন্ধ না করলে তাঁরাও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে অপারেশন পিসহান্ট চালিয়ে যাবেন।

আটক আট মিশনারি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে হাইতি ছেড়েছেন

হাইতিতে শিশু পাচারের অভিযোগে আটক হওয়া ১০ আমেরিকান মিশনারির মধ্যে আটজন গত বুধবার একটি ফ্লাইটে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে পোর্ট অ প্রিন্স ত্যাগ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা এ কথা জানায়।
এর আগে একটি আদালত কোনো ধরনের জামিন আবেদন ছাড়াই তাঁদের মুক্তির আদেশ দেন। পরে কূটনীতিকদের বহনকারী একটি গাড়িতে করে তাঁদের বিমানবন্দরে আনা হয়। এরপর তাঁরা মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামির উদ্দেশে যাত্রা করেন।

‘ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে না’

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থায় নিয়োজিত ইরানি দূত আলী আসগর সোলতানি বলেছেন, ইরান কোনো অবস্থাতেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে না।
আলী আসগর সোলতানির উদ্ধৃতি দিয়ে ব্রিটিশ সাময়িকী নিউ স্টেটসম্যান গত বুধবার এ কথা জানিয়েছে।
নিউ স্টেটসম্যানকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে সোলতানি বলেন, ইরান সব সময়ের জন্য আলোচনায় প্রস্তুত।
সোলতানি আরও বলেন, ‘পশ্চিমা বিশ্বকে শক্তিশালী ইরানের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে। দেশটির হাজার হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস রয়েছে। এখন ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণেও দক্ষ। আমি জানি, ইরানের এ সক্ষমতার বিষয়টি তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু এটাই এখন বাস্তবতা।’
ইরানি দূত আরও বলেন, ‘ইরান কখনোই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করবে না। এমনকি সামরিক হামলার হুমকিও আমাদের এ পথ থেকে সরাতে পারবে না।’
নিউ স্টেটসম্যান জানিয়েছে, সম্প্রতি কোনো এক রোববার ভিয়েনায় এ সাক্ষাত্কার নেওয়া হয়েছে। তবে তারা সাক্ষাত্কারের নির্দিষ্ট তারিখ জানায়নি।
ইরান সব সময়ই দাবি করে আসছে, বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়ানোর জন্য তারা পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, ইরান তলে তলে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে।
বিদেশ থেকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে আনার জন্য ইরানকে প্রস্তাব দেয় পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো। কিন্তু ইরান এ প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর নিজেদের ধারণাকে বদ্ধমূল করে ইরানের ওপর চতুর্থ দফায় অবরোধ আরোপের চেষ্টা চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এ অবরোধের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
অবরোধের এ চেষ্টা বিষয়ে সোলতানি বলেন, হুমকির ভাষায় ঔপনিবেশিক মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের অবরোধ, সামরিক হামলা এসব হুমকি তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে দিচ্ছে। এসব কোনো কাজে আসবে না। তিনি আরও জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পরিবর্তনের স্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় এলেও তা বাস্তবে পরিণত করতে পারেননি। ওবামাও সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের মতো একই ভাষায় ইরানকে হুমকি দিচ্ছেন।

হামাস কমান্ডার হত্যায় মোসাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ নেই: ইসরায়েল

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান বলেছেন, দুবাইয়ে হামাস নেতার সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের তালিকায় বিদেশি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের পরিচয় ব্যবহার করার অর্থ এই নয় যে, তা এ হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের জড়িত থাকার বিষয়টি প্রমাণ করে। তিনি বলেন, এ হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের জড়িত থাকার বিষয়ে কোনো প্রমাণ নেই।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেছেন, ওই খুনের ধরন বিশ্লেষণ করে এবং দুবাই পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মনে হয়, এতে মোসাদ জড়িত ছিল।
কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা ওই খুনের ঘটনার সঙ্গে হামাসের নেতা খালেদ মিসাল হত্যায় মোসাদের ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনা মিলিয়ে দেখছেন। মাসালকে ১৯৯৭ সালে মোসাদের সদস্যরা বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করেন। মোসাদের সদস্যরা তখন কানাডীয় নাগরিকদের ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করেন।
গত জানুয়ারি মাসে দুবাইয়ের একটি বিলাসবহুল হোটেলে হামাস নেতা মাহমুদ আল-মাবহোর মৃতদেহ পাওয়া যায়। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে ১১ জন ইউরোপীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে দুবাই পুলিশ।
দুবাই পুলিশের সন্দেহভাজনের তালিকায় থাকা ১১ ইউরোপীয়র মধ্যে সাতজনই ইসরায়েলে বাস করেন।
তাঁদের ছয়জন ব্রিটিশ এবং তাঁরা ইসরায়েলের অভিবাসী। অপরজন ইসরায়েলি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। দুবাইয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি জার্মান পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন।
ব্রিটিশ নাগরিকেরা কীভাবে ইসরায়েলে বাস করছে, এর কারণ ব্যাখ্যার জন্য গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি দূতকে ডেকে পাঠিয়েছে ব্রিটেন। সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের পাসপোর্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানার পরই ইসরায়েলি দূতকে ডেকে পাঠানো হয়েছে।

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার অব্যাহত থাকবে: রাষ্ট্রদূত

ইরাকে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, সে দেশ থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।
ইরাকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টোফার হিল গত বুধবার ওয়াশিংটন সফরকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে ৫০ হাজার সেনা প্রত্যাহার করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।’
ক্রিস্টোফার হিল বলেন, ‘আমাদের সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে ইরাকে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাচনে আমাদের একমাত্র স্বার্থ হচ্ছে, দেশটির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তোলা।’
পেন্টাগন জানায়, ইরাকে বর্তমানে ৯৭ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। ২০০৩ সালে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র অভিযান চালানোর পর এই প্রথমবারের মতো ওই সেনাসংখ্যা এক লাখের নিচে নেমে এল।
আগামী আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ সব যোদ্ধা এবং বাকি ৫০ হাজার যোদ্ধা ২০১১ সালের শেষ নাগাদ প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
আগামী ৭ মার্চ ইরাকে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ক্রিস্টোফার হিল সব পক্ষের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দৃঢ় আস্থা ব্যক্ত করে বলেন, সংখ্যালঘু সুন্নিরা ২০০৫ সালের নির্বাচন বর্জন করলেও এ নির্বাচনের ব্যাপারে তেমন কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, সরকার গঠনে ইরাকের কত সময় লাগবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী নূরি আল-মালিকির প্রশাসন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

পাকিস্তানে আরও একজন তালেবান নেতা গ্রেপ্তার

তালেবানের উপপ্রধান মোল্লা আবদুল গনি বারাদারের গ্রেপ্তারের পর পাকিস্তানে ওই জঙ্গি গোষ্ঠীর আরও একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মার্কিন ও পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের যৌথ অভিযানে তালেবান নেতা মোল্লা সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফক্স নিউজ এ খবর জানায়।
মোল্লা সালামের গ্রেপ্তারের খবরটি প্রথমে নিউজউইক ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। চলতি মাসে পাকিস্তানের করাচি থেকে মোল্লা গনিকে গ্রেপ্তারের পর গ্রেপ্তারের ওই ঘটনা ঘটল।
একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে একটি বিদেশি বার্তা সংস্থা জানায়, গ্রেপ্তারের পর তথ্য দিতে শুরু করেছেন গনি। তবে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। মোল্লা সালাম আফগানিস্তানে তাঁর নিজের এলাকায় ‘ছায়া গভর্নর’ হিসেবে পরিচিত।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা ফক্স নিউজকে বলেন, আফগান তালেবানের ‘ছায়া গভর্নর’-এর গ্রেপ্তার ইতিবাচক ও ভালো খবর।
মোল্লা সালামের গ্রেপ্তারের বিষয়টি বারাদারের গ্রেপ্তারের মতো এতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও এ ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা।
বোমা হামলায় নিহত ১২: পাকিস্তানের খাইবার অঞ্চলের প্রত্যন্ত একটি গ্রামের বাজারে গতকাল বৃহস্পতিবার বোমা হামলায় এক জঙ্গি কমান্ডারসহ কমপক্ষে ১২ জন নিহত হয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এ কথা জানান।
হামলার লক্ষ্য ছিলেন ওই অঞ্চলের লস্কর-ই-ইসলাম জঙ্গি গোষ্ঠীর কমান্ডার। ওই গোষ্ঠীটি পাকিস্তানের প্রধান তালেবান জোটের অংশ নয়। তবে ওই গোষ্ঠীটিও তালেবানের মতো একই ধরনের কট্টর পন্থায় বিশ্বাসী।
পাকিস্তানের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের ভেতরে আটকা পড়ে আছেন। এ কারণে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কর্মকর্তারা আরও বলেন, বৃহস্পতিবারের ওই বোমা হামলা প্রতিদ্বন্দ্বী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার সংঘাতের কারণে হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কৃষ্ণার মন্তব্য সম্পর্কে ভারতের ব্যাখ্যা দাবি করেছে পাকিস্তান

আগামী সপ্তাহে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক সম্পর্কে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণার মন্তব্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। এ ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। গতকাল প্রকাশিত খবরে এ কথা জানা গেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে আগেই কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয় কিংবা বৈঠকের ব্যাপ্তির সীমা চিহ্নিত করে দেওয়াও উচিত হবে না।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল বাসিত গত বুধবার দিনের শেষ ভাগে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় আসন্ন পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক সম্পর্কে বলেছেন, ওই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার সমন্বিত সংলাপ পুণরায় শুরু হবে না। তাঁর ওই বক্তব্য পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিপরীত।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে ভারতের ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে। এর আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা এ বিষয়টি পরিষ্কার করেন যে, সন্ত্রাসবিরোধী ক্ষেত্রে ইসলামাদের প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে সমন্বিত বা সামগ্রিক সংলাপ প্রক্রিয়া আবারও শুরু করার পক্ষে নয় ভারত। তাঁর ওই মন্তব্যের এক দিন পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ওই বিবৃতি দেওয়া হলো।
একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে এস এম কৃষ্ণা বলেন, যথার্থ কারণে পূর্ণাঙ্গ সংলাপ স্থগিত করা হয়েছে। মুম্বাই হামলার পর ইস্যুটি উঠে আসে, যা এখনো বহাল আছে। খুবই গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি দেখা করা প্রয়োজন।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে সব উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করতে ইচ্ছুক। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে সন্ত্রাসবাদ।’
উল্লেখ্য, আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পুনের ঘটনা সত্ত্বেও সংলাপ চলবে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এ বিষয়টি পরিষ্কার করার পর এস এস কৃষ্ণা ওই মন্তব্য করলেন। তবে মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত সংলাপ প্রক্রিয়া হবে শর্তাধীন।
অন্যদিকে, পাকিস্তান বলেছে, থমকে পড়া ভারত-পাকিস্তান সংলাপ পুণরায় আরম্ভসহ ভারতের সঙ্গে অর্থপূর্ণ ও ফলপ্রসূ সংলাপ চায় ইসলামাবাদ।

ব্রিটিশ অনুদানে বিশ্বব্যাংকের খবরদারির প্রতিবাদ by সরাফ আহমেদ

বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া মোকাবিলায় বাংলাদেশকে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিশ্রুত ৬০ মিলিয়ন পাউন্ড অনুদান বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবহারের উদ্যোগের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ইউরোপিয়ান অ্যাকশন গ্রুপ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ, দ্য ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্ট ও জুবিলি ডেব্ট ক্যাম্পেইন।
গত সোমবার সকাল আটটায় লন্ডনে ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি) কার্যালয়ের সামনে ওই সব সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ হয়। এতে ব্রিটিশ অনুদান বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবহারের জন্য সম্মত হতে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার জন্য ডিএফআইডির প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
দ্য ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্ট ও জুবিলি ডেব্ট ক্যাম্পেইনের সদস্যদের সঙ্গে ‘ইউরোপিয়ান অ্যাকশন গ্রুপ অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশ’-এর মুরাদ কোরায়শী, আনসার আহমেদ, আবু মুসা হাসান, সৈয়দ এনাম ও নিলুফা ইয়াসমীন হাসানসহ আরও অনেকে ওই প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেন।
প্রতিবাদ সমাবেশ চলাকালে লন্ডন অ্যাসেম্বলির সদস্য মুরাদ কোরায়শিসহ আনসার আহমেদ, আবু মুসা হাসান, সৈয়দ এনাম, টিম জোন্স ও নিক ডিয়ার ডেন ডিএফআইডির সাউথ এশিয়া অপারেশনসের রিচার্ড ডিউডনি ও ডিএফআইডির কর্মকর্তা লুইসা রবার্টসের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের এই উদ্যোগ ও উত্কণ্ঠার কথা তুলে ধরেন।

ভাষাশহীদ সালামের কথা by দীপংকর চন্দ

‘আমার জন্ম ১৯৪৭ সালের সংশয়াকীর্ণ সময়ে। আসন্ন দেশভাগ নিয়ে তখন উৎকণ্ঠিত অবিভক্ত বাংলার মানুষ। আমার কৃষিজীবী বাবা মো. ফাজিল মিয়াও অন্য সবার মতোই আসন্ন দেশভাগের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে হিসাব কষছিলেন। ঠিক ওই সময়ই আমার মা দৌলতুন্নেসা জন্ম দিলেন আমাকে।’ বলতে বলতে একটু থামলেন ষাটোর্ধ্ব আবদুল করিম, তারপর কথা শুরু করলেন আবার।
‘ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম লক্ষ্মণপুরে থাকি আমরা। চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তান আমি। স্বাভাবিকভাবেই আমার পক্ষে এই সব রাজনৈতিক ঘোরপ্যাঁচের বিন্দুবিসর্গ বোঝা সম্ভব ছিল না তখন। আমাদের সংসারে বাবা ছাড়া দেশ ও দশের খবরে উত্সাহী ছিলেন আমার বড় ভাই আবদুস সালাম। হ্যাঁ, বায়ান্নর ভাষাশহীদ আবদুস সালামের কথাই বলছি আমি। নানা সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে আমার অকৃতদার বড় ভাইয়ের জন্ম ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর দাগনভূঞা উপজেলার বেকের বাজার সংলগ্ন লক্ষ্মণপুর গ্রামেই।
‘আমার বাবা কৃষিজীবী হলেও প্রকৃতই বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তিনি আমার বড় ভাই আবদুস সালামকে লক্ষ্মণপুর থেকে মাইল দেড়েক দূরে অবস্থিত কৃষ্ণরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পর আবদুস সালাম ভর্তি হন মাতুভূঞা করিমউল্লাহ উচ্চবিদ্যালয়ে। বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরের এই বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী অবধি শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। তারপর আবদুস সালাম বিদ্যালয় পরিবর্তন করেন। প্রায় তিন মাইল দূরের উপজেলা সদরে অবস্থিত দাগনভূঞা কামাল আতাতুর্ক উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন তিনি। এই বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা নিলেও কেবল সাংসারিক অসচ্ছলতার কারণেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে ব্যর্থ হন আবদুস সালাম। এরপর বেশ কিছুদিন গ্রামের কর্মহীন পরিবেশে জীবন অতিবাহিত হয় তাঁর। কিন্তু এই কর্মহীন জীবন যাপন নিরর্থক মনে হয় সালামের কাছে। জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতেই একদিন তিনি পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানে ভাগ্যান্বেষণের একপর্যায়ে শিল্প দপ্তরে রেকর্ড-কিপার হিসেবে চাকরিও জুটে যায় তাঁর। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বিনষ্ট করে কলকাতায় সালামের চাকরির ভবিষ্যৎ। ভাগ্যবিড়ম্বিত সালাম শূন্য হাতে ফিরে আসেন গ্রামে। তারপর অন্তরে অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে গ্রাম ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন একদিন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল আবদুস সালামের। অল্প দিনের চেষ্টায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত ডাইরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজে রেকর্ড-কিপার হিসেবেই চাকরি পেলেন আবার। দিলকুশায় অফিস ভবনে আবার শুরু হলো তাঁর কর্মব্যস্ত জীবন। চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকায় নির্দিষ্ট বাসস্থান ছিল না আবদুস সালামের। এবার তিনি বাসস্থান অনুসন্ধানে সচেষ্ট হলেন। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে আবদুস সালাম নীলক্ষেতে অবস্থিত সরকারি ব্যারাকে একটি ব্যাচেলর সিট পেলেন। ১৯৪৮ সালের প্রথম পাদে নীলক্ষেত সরকারি ব্যারাকে উঠে এলেন আবদুস সালাম এবং এ বছরের সূচনালগ্নেই ঢাকায় শুরু হলো রাষ্ট্রভাষা বাংলার সপক্ষে তীব্র আন্দোলন।
‘আমার বড় ভাই আবদুস সালাম ছোটবেলা থেকেই রাজনীতি-সচেতন। কিন্তু কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে জড়ানোর প্রত্যক্ষ সুযোগ তাঁর ঘটেনি কোনোকালেই। চাকরিসূত্রে ঢাকায় বসবাস এবার সে সুযোগ সৃষ্টি করল সালামের জীবনে। তিনি দেখলেন, ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের যে জোয়ার তৈরি হলো বাঙালির রাজনৈতিক চেতনার প্রেক্ষাপটে, পরবর্তী বছরগুলোতেও কী দারুণভাবে তা সক্রিয় রইল!
‘এভাবেই ১৯৫২ সাল এল। ২১ ফেব্রুয়ারি। ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল সেদিন। কিন্তু পূর্বঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ছাত্ররাও জড়ো হলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। আমতলায় ছাত্রসভা শুরু হলো বেলা ১১টায়। সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে দলে দলে ছাত্ররা এগিয়ে গেল ১৪৪ ধারা ভাঙতে। পুলিশ বাধা দিল, গ্রেপ্তার করল অনেককে। কিন্তু এতেও যখন নিবৃত্ত করা গেল না ছাত্রদের, তখন তারা লাঠিচার্জ করল, নিক্ষেপ করল কাঁদানে গ্যাস। ছাত্রদের প্রতি পুলিশের এই অন্যায় আচরণ ব্যথিত করল উপস্থিত জনতাকে। আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করল তারা। পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া শুরু হলো। অপরাহ্নে ছাত্র-জনতা অবস্থান নিল মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাকের সামনে।
‘আবদুস সালাম সেদিন কর্মস্থল থেকে নীলক্ষেতের সরকারি ব্যারাকে ফিরেছিলেন তাড়াতাড়িই। ফিরেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য দ্রুত ছুটে গিয়েছিলেন মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাক প্রাঙ্গণে। সেখানে পৌঁছে তিনি শাসকগোষ্ঠীর বিরূপ আচরণে ব্যথিত হলেন। সালামের সেই ব্যথা একসময় পরিণত হলো বিক্ষুব্ধতায়। বিক্ষুব্ধ সালাম রাজপথ বিদীর্ণ করা চিত্কার করতে করতে আন্দেলনরত ছাত্র-জনতার সঙ্গে অজান্তেই মিশে গেলেন। পুলিশ সচেতনভাবেই গুলি ছুড়ল ছাত্র-জনতার মিছিলে। সেই মিছিলের অবিভাজ্য অংশ আবদুস সালাম গুলিবিদ্ধ হলেন নৃশংসভাবে। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেওয়া হলো তাঁকে। চিকিৎসাও দেওয়া হলো যথোপযুক্ত। কিন্তু প্রায় দেড় মাস যমে-মানুষে টানাটানির পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন আমার বড় ভাই। যত দূর মনে পড়ে, সেই দিনটি ছিল বায়ান্নর ৭ এপ্রিল।’ বলতে বলতে অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে আবদুল করিমের কণ্ঠস্বর।

সাংগু কি ব্যর্থ গ্যাসক্ষেত্র: বিদেশি কোম্পানি কী বলে -জ্বালানি নিরাপত্তা by বদরূল ইমাম

যেকোনো দেশের সাগরবক্ষ তার প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে তেল ও গ্যাসভান্ডারের মোক্ষম স্থান হতে পারে। বিশ্বে অনেক দেশই তাদের অর্থনৈতিক দুরবস্থার চাপ থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে সাগরবক্ষের তেল ও গ্যাসভান্ডার উন্মোচনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ ১৯৭৪ সাল থেকে বিভিন্ন সময় সাগরবক্ষে বিদেশি কোম্পানিকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত করলেও, ১৯৯৬ সালে ব্রিটিশ তেল কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জির সাংগু গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং ১৯৯৮ সালে গ্যাসক্ষেত্রটির উৎপাদন চালুর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশের মাটিতে সাগরের গ্যাস পৌঁছায়। এ দেশের মানুষের মনে আশা জাগে যে বাংলাদেশের সাগরও বুঝি ঘরে লক্ষ্মী বয়ে এনেছে সমৃদ্ধি ঘটাবে বলে।
সাংগু গ্যাসক্ষেত্র প্রথম দিকে আশানুরূপ গ্যাস উৎপাদন করে এলেও হঠাৎ করেই একসময় অনেকটা অপরিপক্ব অবস্থায় তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একসময় যেখানে দৈনিক ১৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হতো তা হঠাৎ করে কমে যায় এবং কমতে কমতে বর্তমানে দৈনিক মাত্র ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন করার ক্ষমতা নিয়ে চালু রয়েছে। মাত্র প্রায় ১২ বছরে গ্যাসক্ষেত্রটি এ রকম নিম্নমুখী যাত্রা অদূর ভবিষতে তার অকাল মৃত্যুর ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। সাংগু গ্যাসক্ষেত্রের এহেন উৎপাদন পতন যে সবাইকে আশাহত করেছে, কেবল তাই নয়, বরং সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের গ্যাস সরবরাহকে ইতিপূর্বে সাংগুর ওপর নির্ভরশীল করে দেওয়ার ফলে বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চল চরম গ্যাসসংকটে পড়েছে।
সাংগু গ্যাসক্ষেত্রটিতে এ রকম অবস্থা ঘটার কারণ কী? পেট্রোবাংলার বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বিদেশি কোম্পানি গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে অতিরিক্ত হারে গ্যাস উৎপাদন করার ফলে গ্যাসস্তরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তা পরে উৎপাদন পতনের কারণ ঘটায়। এ ছাড়া বিদেশি কোম্পানি আগে সাংগুক্ষেত্রে যে গ্যাস মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছিল, পরে মজুদ তার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কম বলে জানায়। সাংগু গ্যাসক্ষেত্র বর্তমানে যৌথভাবে পরিচালনা করছে ব্রিটিশ কোম্পানি কেয়ার্ন এনার্জি ও অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি সান্তোস অয়েল। সাংগু গ্যাসক্ষেত্রটির কর্মকাণ্ড ইতিমধ্যেই পর্যবেক্ষক মহলে সমালোচিত হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে বিদেশি কোম্পানি কী মত পোষণ করে?
সাংগু গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনায় নিয়োজিত যৌথ কোম্পানির একজন উচ্চতর প্রতিনিধিকে অতিরিক্ত হারে উৎপাদন করার ফলে গ্যাসস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও পরিণতিতে উৎপাদন পতনসংক্রান্ত পেট্রোবাংলার অভিমত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি এ সম্পর্কে ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ‘এটি একটি ভুল ধারণা। অতিরিক্ত উৎপাদন হার নয়, বরং ক্ষেত্রটির ভূগর্ভস্থ গ্যাসস্তরবিন্যাসের জটিলতা উৎপাদন হার পতনের কারণ। সাংগুর গ্যাসস্তরের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা প্রায়ই “চ্যানেল কাট” দ্বারা ক্ষয়ের প্রভাবে প্রভাবিত, যা কি না গ্যাসস্তরের সরল বিস্তৃতি ভঙ্গ করে। আর ৩-ডি সাইসমিক জরিপ ছাড়া এ রকম জটিল স্তরে উৎপাদন করে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ৩-ডি সাইসমিক জরিপ অধিকতর ব্যয়সাধ্য এবং তা কোম্পানির কস্ট রিকভারি বা বিনিয়োগ উশুলের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেবে বলে পেট্রোবাংলা আগে তার অনুমোদন দিতে রাজি ছিল না, যদিও বর্তমানে এ অনুমোদন দেওয়া হয়ে থাকে।’
উৎপাদন পতন ছাড়া অপর একটি ক্ষেত্রেও সাংগু বিতর্কিত হয়েছে। তা হলো এর মজুদ নির্ধারণে কোম্পানির অসংগতি। অনেকে মনে করেন, প্রাথমিক মজুদ ঘোষণায় কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে গ্যাসক্ষেত্রকে বড় দেখিয়েছে, যাতে অধিকতর উৎপাদনের অনুমোদন পাওয়া যায়। অধিকতর উৎপাদনের লক্ষ্য কম সময়ে অধিকতর মুনাফা অর্জন, আর কোম্পানি এ কাজটি করে গ্যাসক্ষেত্রটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ বিষয়টি নিয়েও কোম্পানির প্রতিনিধি ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ‘গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ নির্ণয় একটি চলমান প্রক্রিয়া। গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের সঙ্গে নতুন প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কখনো আগের মজুদ বৃদ্ধি পায়, আবার কখনো বা মজুদ হ্রাস পেতে দেখা যায়। এটি তেল-গ্যাস ব্যবসায় সর্বত্রই ঘটে থাকে। সাংগুতে প্রাথমিক জরিপে এক টিসিএস গ্যাস আছে বলে হিসাব করা হয়েছিল, কিন্তু পরে তার পরিমাণ প্রায় অর্ধেক বলে প্রতীয়মান হয়। বিশেষ করে সাংগুর মতো জটিল স্তরবিন্যাসসম্পন্ন গ্যাসক্ষেত্রের বেলায় তা অস্বাভাবিক নয়। অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, একসঙ্গে বহুসংখ্যক গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, অনেকটায় মজুদ বৃদ্ধি পেল, আবার অনেকটায় মজুদ হ্রাস। তবে সার্বিকভাবে তা লাভজনক হয় বটে। সাংগুর সমস্যা হলো, এখানে সমুদ্রবক্ষে এটিই একমাত্র উৎপাদক গ্যাসক্ষেত্র এবং এই একটিতে মজুদ হ্রাস হওয়া মানে সার্বিকভাবে নেতিবাচক চিত্র প্রতীয়মান হওয়া।’
সাংগু বড় গ্যাসক্ষেত্র না হলেও এটির গ্যাস প্রসেসিং করার জন্য সাগরের সন্নিকটে চট্টগ্রামের সিলিমপুরে যে গ্যাস প্রসেসিং প্লান্টটি নির্মাণ করা হয়েছে তার আয়তন ও ক্ষমতা অসামঞ্জস্যভাবে বৃহৎ। যেখানে সাংগুর সর্বোচ্চ উৎপাদন মাত্রা দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করা হতো (বর্তমানে উৎপাদন কমে দৈনিক মাত্র ৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে) সেখানে বিশাল খরচ সাপেক্ষে দৈনিক ৫২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রসেস করার ক্ষমতাসম্পন্ন প্লান্ট তৈরি করা নেহাতই অপচয় এবং বর্তমানে এটি যেন একটি সাদা হাতি। আর এ নির্মাণব্যয়ের পুরোটাই পিএসসির ধারামতে বাংলাদেশের প্রাপ্য গ্যাস-অংশ থেকে কস্ট রিকভারি বা বিনিয়োগ উশুল হিসেবে কোম্পানি তুলে নিয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে সাংগুর যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত তা হলো কস্ট রিকভারি বা কোম্পানির বিনিয়োগের খরচ উশুল করার উচ্চমাত্রা। বাংলাদেশ বিদেশি কোম্পানিকে দিয়ে গ্যাস উত্তোলন করে এই কারণে যে উৎপাদিত গ্যাস কোম্পানি ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগাভাগি হবে এবং বাংলাদেশ তার প্রাপ্য ভাগ ব্যবহার করে লাভবান হবে। কিন্তু সাংগুর বেলায় কোম্পানির বিনিয়োগের খরচ উশুলের সূত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্য গ্যাসের বিরাট অংশই চলে যায়। তাহলে এ গ্যাস উত্তোলন করে বাংলাদেশের লাভ কোথায়? বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করে কোম্পানির প্রতিনিধি তাঁর মত প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, ‘সাংগু বাংলাদেশের জন্য যেমন ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, কোম্পানির ক্ষেত্রেও সে রকম অলাভজনক পরিস্থতি বহন করে এনেছে। সাংগুতে কোম্পানির বিনিয়োগ প্রায় এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, কিন্তু গ্যাসক্ষেত্রটির অভ্যন্তরীণ ভূতাত্ত্বিক জটিলতার কারণে ঈপ্সিত গ্যাস মজুদ আবিষ্কৃত হয়নি; এমনকি এখানে ভূগর্ভে অতিগভীরে উচ্চচাপ অঞ্চলে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ড্রিলিং করেও গ্যাস না পাওয়াটা কোম্পানির জন্য হতাশাব্যঞ্জক বটে। কোম্পানি এখানে তার বিনিয়োগের ক্ষতি পোষানোর জন্য ইতিপূর্বে অধিক হারে উৎপাদন করার পন্থা নেয়।’
তাহলে সাংগুর ভবিষ্যৎ কী? সাংগু পরিচালনায় নিয়োজিত কোম্পানি গ্যাসক্ষেত্রটিকে জীবিত রাখার লক্ষ্যে নতুন করে ৩-ডি সাইসমিক জরিপ পরিচালনা করছে। এর ওপর ভিত্তি করে নতুন কূপ খনন করার বিষয়টি নির্ভর করবে কোম্পানি তার বিনিয়োগের অঙ্ক কীভাবে কষবে তার ওপর। কোম্পানি চায় গ্যাস তুলে লাভজনক ব্যবসা করতে। কোম্পানির মতে, গ্যাসের নিম্ন মূল্যের কারণে এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভজনক ব্যবসা করা কঠিন। আর সে জন্য কোম্পানি চায় গ্যাসের মল্য বৃদ্ধি। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা তার অর্থনীতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সহজ কাজ নয়। তাই বাংলাদেশ ও বিদেশি কোম্পানিকে এমন একটি ফর্মুলা বের করতে হবে, যা দুই পক্ষকেই গ্যাস ব্যবসায় লাভ এনে দিতে পারে।
সাংগু বাংলাদেশের সাগরবক্ষে প্রথম উৎপাদক গ্যাসক্ষেত্র। এটি অদূর ভকিষ্যতে নিঃশেষিত হবে সে আশঙ্কাই বেশি। কিন্তু সাংগু সাগরবক্ষের শেষ কথা নয়। বাংলাদেশের সাগরবক্ষের গ্যাস-সম্ভাবনা এখনো প্রকৃতভাবে উন্মোচিত হয়নি। এ সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলে সাগরের সরবরাহকৃত গ্যাস বাংলাদেশকে গ্যাসসংকট থেকে মুক্ত করতে পারবে। সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধানে বর্তমানে বাংলাদেশের নিজস্ব কারিগরি ক্ষমতা না থাকায় বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভর করতে হয়। বিদেশি কোম্পানি সাংগু ছাড়াও সাগরবক্ষে ম্যাগনামা, হাতিয়া, টেকনাফ সমুদ্র ইত্যাদি অঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তিবদ্ধ। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, অনুসন্ধানে বিনিয়োগ করতে তাদের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিদেশি কেম্পানি গ্যাস ব্যবসায়ে তাদের স্বার্থ যথেষ্টভাবে বোঝে। বাংলাদেশকেও নিজ স্বার্থ রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ক্ষমতা নিতে অগ্রসর হতে হবে। সাংগুর কার্যক্রম তদারক ও ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের অনভিজ্ঞতা ও ব্যর্থতা থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশকে সাংগু থেকে শিক্ষা নিতে হবে। নিজ স্বার্থ রক্ষা করে পারস্পরিক সহযোগিতা অনুসন্ধান কার্যক্রমকে গতিশীল করতে পারে। আর সেটাই হবে উত্তম পন্থা।
বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, রেজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়।

কত মায়ের কোল খালি হলে আমরা চেতন হব -ছাত্রের মৃত্যু by মেহতাব খানম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী পরিশ্রমী ছাত্র আবু বকর আর মায়ের কোলে ফিরে আসবে না কখনো। নিজে না খেয়ে, মাথায় তেল না দিয়ে যে সন্তানটিকে তিলে তিলে বড় করেছিলেন স্নেহময়ী মা, তাঁর বুকের ব্যথার তীব্রতা এতটুকুও কমবে না এই জীবনে। অন্য সবাই ভুলতে শুরু করবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু বকর নামে একজন শিক্ষার্থী ছিল, যাকে মূল্যবান জীবনটি দিতে হয়েছিল লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির কোন্দলের কারণে। কিন্তু মায়ের কাছে এই লক্ষ্মী আর কর্তব্যপরায়ণ ছেলেটির স্মৃতি সব সময় অমলিন থাকবে। যারা শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অসুস্থ রাজনীতিচর্চার কারণে মারা গেছে, তাদের মায়েদের দীর্ঘশ্বাস ও আর্তচিত্কার আমাদের বিবেককে কি একটু নাড়া দিচ্ছে? এ প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করা উচিত। লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি আর শিক্ষকরাজনীতি আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোকে কলঙ্কিত আর ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে বহুদিন ধরে। বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে এর বিস্তার ঘটেছে মাহামারির মতো। বিভন্ন সময় শাসক বদলেছে। কখনো গণতন্ত্র, কখনো স্বৈরশাসন দেখেছি আমরা। কিন্তু কখনো কি মনে হয়েছে, আমরা সাধারণ নাগরিক সব দিক থেকে শান্তিতে আছি? অনেক বিষয় আমাদের পীড়া দিয়েছে অহরহ। এর মধ্যে একটি বড় ধরনের পীড়াদায়ক বিষয় হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে প্রতিনিয়ত মারামারি আর সহিংসতা। দিনের পর দিন ছাত্রদের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে। সেগুলো দেখার পর আমরা কিছুদিন ‘আহা’, ‘উহু’ করেছি, দুফোঁটা চোখের জলও হয়তো ফেলেছি এবং তারপর সেটা ভুলে গিয়ে নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমরা এখন অনেক নির্বিকার হয়ে গেছি এবং এ ধরনের মৃত্যু আমাদের আর স্পর্শ করে না। হয়তো বা এসব ঘটনা এত বেশি ঘটে যে আমরা সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, ‘এটা কোনো ব্যাপার না, কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা।’ কথাটি মনে হয়েছে আমারও, কিন্তু মুখে না বললেও অনেকটা এ ধরনের মনোভাব নিয়েই চলছি। কারণ আমরা কেউ তো রাস্তায় নেমে এসব মৃত্যুর নিন্দা বা প্রতিবাদ করছি না। আমাদের স্কুলপড়ুয়া সন্তানেরা ভবিষ্যতে কোথায় শিক্ষা নেবে, কোন ধরনের মূল্যবোধসম্পন্ন শিক্ষকের কাছে পড়বে তা নিয়ে ভাববার অবসর আমাদের কারোরই নেই।
রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা ছাত্রদের শিক্ষা গ্রহণের ওপর কতটা গুরুত্ব আরোপ করেন, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। যদি তাঁরা এ ব্যাপারে আন্তরিক হতেন, তাহলে এত দিন ধরে অস্ত্রবাজি বা দলবাজির সংস্কৃতি রাজনীতির অস্থিমজ্জার এত গভীরে প্রবেশ করত না। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোই নয়, যাঁরা উচ্চপদে আসীন থেকে দলগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং সেই সঙ্গে কিছু স্বার্থান্বেষী শিক্ষক রয়েছেন, তাঁরাও এই সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার জন্য অনেকাংশে দায়ী। এ সমস্ত বুদ্ধিজীবী বিভিন্ন সভায়, সেমিনারে, মিডিয়ায় তাঁরা যে দল সমর্থন করেন, সেই দলের নেতাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় ইতিহাসের কথা জাতির সামনে তুলে ধরেন। তাঁরা স্বীকার করেন না যে ছাত্রদের সেই সময়কার ভূমিকার সঙ্গে এখনকার ভূমিকার বিন্দুমাত্র সাদৃশ্য নেই। পুরোনো রেকর্ড বারবার শোনানোর মতো করে তাঁরা বলতে থাকেন, ছাত্রদের জন্যই ভাষা আন্দোলন হয়েছে, গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে, স্বৈরশাসন উত্খাত হয়েছে; অতএব, ছাত্ররাজনীতি অব্যাহত থাকবে। এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় না যে আমরা এই অহেতুক মৃত্যুকে আর শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্যকে প্রশ্রয় দিচ্ছি?
কতিপয় শিক্ষক প্রত্যক্ষভাবে কেউ বিরোধী দলের এবং কেউ সরকারি দলের রাজনীতিতে যেভাবে সমর্থন দান করছেন, তার মধ্যে তো লেজুড়বৃত্তি ও তাঁবেদারি ছাড়া এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। একটি রাজনৈতিক দল জাতীয় নির্বাচনে জিতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনে রাতারাতি দলীয়করণের যে প্রক্রিয়া চলতে থাকে, তা সমস্ত জাতির জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর। সাধারণ ছাত্ররা কিন্তু ভালো করেই জানে যে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ, যাঁদের মধ্যে শিক্ষকেরাও রয়েছেন, তাঁরা যদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে সরকার ও বিরোধী দলের লোকজনের অপকীর্তির নিন্দা করে তাদের সর্বদা সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়ে আসতেন, তাহলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে অন্য সব জায়গায় এত বড় ধস নামত না। ছাত্ররাজনীতির নামে যেভাবে সব জায়গায় ক্ষমতার প্রভাব খাটানো হয়, সেসব ঘটনা সমাজের সব সচেতন মানুষই জানে, নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সত্যিই দেশের মানুষের শান্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাজনীতির চর্চা হলে সাধারণ মানুষের কাছে তা অনেক গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আর তেমন স্বপ্ন দেখি না।
এখন একমাত্র উপায় হচ্ছে, যারা এই দেশটির সচেতন ও সাধারণ মানুষ, যারা কখনো অন্ধভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন জানায়নি কিন্তু দেশটিকে এবং মানুষকে ভালোবাসে, তারা যদি সন্তানহারা বাবা-মায়ের সঙ্গে দুঃখ ভাগ করে নিতে চায়, তাহলে চলুন সবাই মিলে শপথ করি—যেভাবেই হোক, অন্তত আগামী ১০ বছর এই লেজুড়বৃত্তির তথাকথিত রাজনীতি যাতে বন্ধ থাকে, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করব। অনেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রদের গৌরবময় অবদানের কথা স্মরণ করে এটি অব্যাহত রাখার কথা বলছেন, কিন্তু লেজুড়বৃত্তি চাইছেন না। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, বিষয়টিকে এখন শুধু সাদা-কালোতেই দেখতে হবে। ধূসর এলাকায় এটিকে টিকিয়ে রাখতে চাইলে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হওয়ারই সম্ভাবনা রয়েছে। ছাত্ররাজনীতির নামে টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস, অস্ত্রবাজি, অর্থের ছড়াছড়ি—এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে কীভাবে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, সেই লক্ষ্যে আমরা সমমনা কিছু মানুষ একটি ফোরাম তৈরি করে সুপারিশমালা দিতে পারি।
প্রাথমিকভাবে যা করা যেতে পারে তা হচ্ছে, অবিলম্বে আগামী ১০ বছর সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলবাজি বন্ধ করা। শুধু প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের লক্ষ্যে যার যার প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম বন্ধ করার জন্য, প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ রক্ষার জন্য দুর্নীতি রোধ, অপসংস্কৃতি রোধ, শিশু অধিকার রক্ষা—এ ধরনের কিছু বিষয়ের ওপরই শুধু দলবদ্ধ হয়ে শান্তি বজায় রেখে কাজ করা যাবে এমন নির্দেশ উচ্চ আদালত থেকে আসতে পারে।
সমমনা নাগরিকদের পক্ষ থেকে চলুন আমরা হাত জোড় করে রাজনৈতিক নেতাদের বলি, ‘তোমাদের আর কত রক্ত দরকার? এবার নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই গড়ে নাও। ছাত্রদের ওপর ভর করে গোটা জাতিকে এভাবে ধ্বংস করে দিও না। তোমরা কি সন্তানহারা মায়েদের কান্না একেবারেই শুনতে পাও না? যে ছেলেগুলোকে ঘর থেকে বের করে অর্থ, ক্ষমতা আর অস্ত্রের লোভ দেখিয়েছো; আগামী ১০ বছরের মধ্যে তোমরা আবার তাদের ঘরে পৌঁছে দাও। তোমাদের বুঝতে হবে, শিক্ষা গ্রহণ আর দেশোদ্ধার একই সঙ্গে করা সম্ভব নয়। ছাত্রদের যদি সত্যি আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাও, তাহলে ওদের মধ্যে অর্থ আর ক্ষমতা নয়, জ্ঞানের পিপাসা তৈরি করার লক্ষ্যে কাজ করো। আর সেটাই হবে তোমাদের প্রকৃত দেশসেবা। যেন ভবিষ্যতে কোনো মায়ের সন্তান অস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাস না করে, টেন্ডারের অর্থ নিয়ে মাতাল না হয়, অস্ত্রবাজি আর সন্ত্রাসের কারণে নিরীহ ছাত্রের মায়ের কান্না আর দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ভেসে না বেড়ায়, তেমন একটি সমাজ তোমরা নিশ্চিত করো। দুহাত জোড় করে সেই অঙ্গীকারটুকু চাইছি তোমাদের কাছে।’
মেহতাব খানম: অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বার একাত্তরের চেয়ে আমার আশঙ্কা বেশি -ধর্মভিত্তিক রাজনীতি by শাহদীন মালিক

গত সপ্তাহে এক ভাগ্নির বিয়েতে গিয়েছিলাম। সময় কীভাবে চলে যায় তা আমরা প্রায় সবাই সম্ভবত খেয়াল করি না। মনে হয় ওই তো সেদিনের কথা। মামাতো বোনটা ফ্রক পরত, বয়স তখন দশ বছরও হয়নি। আর গত সপ্তাহে গেলাম তার মেয়ের বিয়েতে। ভাগ্নিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার পাঠ চুকিয়ে চাকরিও শুরু করে দিয়েছে। আর সেদিনের ফ্রক পরা মামাতো বোনটি সরকারের যুগ্ম সচিব।
একাত্তরের এপ্রিল। বাবা চট্টগ্রামে থাকতেন বেশ কিছু বছর ধরে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে মামা-মামি আর তাদের চার ছেলেমেয়ে নিয়ে আমাদের বাসায়। নিজের বাসায় তার নিরাপদ বোধ হচ্ছিল না। সবচেয়ে ছোট মেয়েটির বয়স এক বছরও হয়নি, বড়জন, আগেই বললাম, দশও হয়নি। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহেই পাকিস্তান আর্মি চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। পাকিস্তান আর্মির ট্যাংক, বড় কামান ইত্যাদির তোপে বাঙালি সেনা ইপিআর আস্তে আস্তে পিছু হটে কালুরঘাট ব্রিজ পেরিয়ে কোন দিকে দিয়ে যেন গ্রাম-গঞ্জে চলে গেছে। সে সময়ের আমাদের মুক্তিযোদ্ধা আর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনা- কর্মকর্তাদের লেখা বইগুলোতে বিশদ বিবরণ আছে। পাঁচলাইশে যে বাড়িতে থাকতাম তার আশপাশে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল। ঠিক পাশের তিনতলা বাড়ির তৃতীয় তলা ট্যাংকের গোলার আঘাতে বিধ্বস্ত। আমাদের বাড়িটাও কেঁপে উঠেছিল। ডাইনিং টেবিলের নিচে জড়োসড়ো হয়ে সবাই বসে থাকার সময় মনে হয়েছিল আমাদের দোতলা বাড়িটির উপরের তলায়ই বোধ হয় কামানের গোলা পড়েছে।
মধ্য এপ্রিলে চট্টগ্রাম পাকিস্তানি আর্মির নিয়ন্ত্রণে। তখন পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় থাকত প্রধানত চট্টগ্রামের স্থানীয় আর বিহারি বা উর্দুভাষী ব্যবসায়ীরা। যে বাসায় থাকতাম তার মালিক ছিলেন তখনকার বড় বিহারি ব্যবসায়ী। তিনি থাকতেন দোতলায়, আমরা নিচের তলায়। মধ্য এপ্রিল নাগাদ পাঁচলাইশ এলাকা সুনসান, জনমানবশূন্য। মামার কথা—মধ্য এপ্রিলের দুপুর। সাঁজোয়া গাড়ি আর বিভিন্ন ধরনের বীভত্স সব বন্দুকধারী জনা পঞ্চাশেক পাকিস্তানি সেনা বাড়ি ঘিরে ফেলল কিছু বোঝার আগেই। আর্মির জিপ থেকে অফিসার গোছের একজন নামলেন। মামার নাম বলে জিজ্ঞাসা করলেন, ওই ব্যক্তি কি এ বাসায় আছেন।
মনে পড়ে মামা গোসল সেরে বেরিয়েছেন। পরনে লুঙ্গি গেঞ্জি শার্ট না পাঞ্জাবি তা মনে পড়ে না। তাকে ধরে জিপে উঠানো হলো। জিপ আর আমাদের দিকে বন্দুক তাক করা সব সেনারও চলে গেল। তারপর অনেক দিন বাসায় মিলাদ মাহফিল, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, দরুদ—মামা যাতে সুস্থ শরীরে ফিরে আসেন। মামা আর আসেননি। পরে বুঝেছি, মামার একটু ‘আওয়ামী দোষ’ ছিল। কিছু টাকা-পয়সা দিতেন। আঁচ করেছিলেন ধর্মরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ কিছু পাড়া-প্রতিবেশী হয়তো তার দোষটা ‘জায়গামতো’ জানিয়ে দিতে পারে। তাই চলে এসেছিলেন আমাদের বাসায়।
বিজয়ের পর পরই সম্ভবত ২০ কি ২১ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম থেকে সিলেট গিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের মাসগুলোতে সিলেটের গ্রামে থাকা দাদা-দাদির খোঁজ পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম থেকে সিলেট যেতে দুই দিনের বেশি লেগেছিল। রাস্তাঘাট ভাঙা, সেতু-ব্রিজ-কালভার্ট কিছুই অক্ষত ছিল না। কিছু কিছু জায়গায় মিত্রবাহিনী পন্টুন না অন্য কী যেন নাম অর্থাত্ অস্থায়ী আপাতত কাজ চালানোর জন্য ব্রিজ বানিয়েছিল। অনেক জায়গায় রাস্তা ছেড়ে ধানখেত দিয়ে ঘুরে রাস্তায় ফিরে আসা। ডিসেম্বর মাস, তাই খাল-বিল-মাঠে পানি ছিল না। তাই গাড়ি চলেছিল। ফেনী থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অংশে রাস্তা থেকে যতদূর চোখ গেছে কোথাও ঘর-বাড়ি অক্ষত ছিল না। হয় আগুন দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে অথবা গোলাগুলিতে বিধ্বস্ত অথবা লুটপাট হয়ে গেছে।
সবই ধর্ম রক্ষা করার জন্য। ধর্ম রক্ষার জন্য খুন, ধর্ম রক্ষার জন্য ধর্ষণ, ধর্ম রক্ষার জন্য গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নিরীহ মানুষ মারা। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ইসলাম ধংস হয়ে যাবে, আমরা সবাই অমুসলিম-হিন্দু হয়ে যাব।

২.
প্রায় চল্লিশ বছর পর আজও সেই একই কথা বলা হচ্ছে। ১৯৭১-এ বলা হতো যে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে, পাকিস্তান ভেঙে গেলে ইসলাম বিপন্ন হবে। আমরা সবাই অমুসলিম হয়ে যাব। যখন বলা হচ্ছে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ না থাকলে ইসলাম বিপন্ন হবে, আমি-আপনি বিধর্মী হয়ে যাব। আমি-আপনি যাতে মুসলমান থাকি তা নিশ্চিত করার সর্বোত্তম গ্যারান্টি বা রক্ষাকবচ নাকি সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ থাকা এবং রাষ্ট্রের ধর্ম ইসলাম রাখা। আমরা নাকি ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি।
মামার মতো যে ৩০ লাখ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা-খুন করা হয়েছিল, তাঁরা কি আমাদের এই বাংলাদেশকে ধর্মীয় রাষ্ট্র করার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। আমাদের বীরশ্রেষ্ঠ সাতজনের খেতাব মরণোত্তর। তাদের তো আর জিজ্ঞাসা করা যাবে না। বীর বিক্রম, বীর উত্তম আর বীর প্রতীকদের অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন। তাঁরা কি সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ আর রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের জন্য জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। তাঁদের সংখ্যা কমে আসছে। তাঁদের সবাইকে এখনো জিজ্ঞাসা করা যাবে। জেনে নিন।
এক কোটি লোক ভারতে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিল। তারা কি ‘ধর্মের জন্য হিজরত’ করেছিল।

৩.
একই বিশ্ববেহায়া, চরম দুর্নীতিবাজ যে ১৯৭২ সালে পাকিস্তানে বসে পাকিস্তানে আটকেপড়া বাঙালি সেনা কর্মকর্তা-সৈনিকদের বিরুদ্ধে আনীত দেশদ্রোহিতাসহ অন্যান্য অপরাধের বিচারক ছিল, বন্দুক উঁচিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল, যে ফরমান জারি করেছিল যে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’; এখন সে লোকের ফরমানটা শিরোধার্য করে পঁচাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সব চেতনা, মূল্যবোধ, আশা-আকাঙ্ক্ষা জলাঞ্জলি দেওয়ার অকাট্য যুক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।
চেম্বারে বসে লিখছি। টেবিলের উল্টো দিকের সেলফে বেশ কিছু আইনি বই আছে। মুসলিম আইন, ইসলামিক আইন, ইসলামিক আইনের ইতিহাস এবং আনুষঙ্গিক নামের গোটা ত্রিশেক বই আছে। অনেকগুলোর প্রথম দুই-চার পৃষ্ঠা উল্টালাম। অন্যান্য আইনের বইও আছে। ইসলামি আইন বা অন্য আইনের কোনো বইয়ের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ শব্দগুলো নেই। বুঝতে পারছি না এ মুহূর্তে করণীয় কী। ‘বিসমিল্লাহ’ নেই বলে ওই বইগুলো পড়তে গেলে কি আমি বিধর্মী হয়ে যাব?
যাদের জন্য ইসলাম বা ধর্ম ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার মাত্র, তারাই ‘বিসমিল্লাহ’ নিয়ে মাতম করে। একাত্তরের মতো এখনো বলব—সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ না থাকলে আমরা বিধর্মী হয়ে যাব, একাত্তরে যেভাবে বলা হয়েছিল যারা বাংলাদেশ চায় তারা বিধর্মী—তাদের কতল করো, তাদের সহায়-সম্পত্তি লুটপাট করো।
ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করার চেয়ে অযৌক্তিক ধ্বংসযজ্ঞে লেলিয়ে দেওয়া অনেক সহজ কাজ। হিংস্র অমানুষ মানুষ ধ্বংসযজ্ঞে পারদর্শিতা সব সময় বেশি দেখাতে ও করতে পেরেছে।
একাত্তরের যারা ঘাতক, এখন মনে হচ্ছে জামায়াত-শিবির না করেও অনেকেই সে দলের কথা বলছেন—পত্রিকায়, কলমে আর টক শোতে।

৪.
মনে মনে অনেক দিন ধরেই একটা প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারছিল। ধর্ম বা বিশ্বাস ব্যক্তির, প্রতিষ্ঠান কীভাবে একটা ধর্মে বিশ্বাসী হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম কী? অথবা মোহামেডান বা আবাহনী ক্লাব? জনতা বা অগ্রণী ব্যাংকের ধর্ম কী? ওই সব বা অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠানের যদি ধর্ম না থাকে, তবে রাষ্ট্রের ধর্ম কীভাবে হবে। রাষ্ট্র তো ব্যক্তি না। রাষ্ট্র একটা প্রতিষ্ঠান।
প্রশ্নের উত্তরটা পেলাম আপিল বিভাগের সাম্প্রতিক একটা রায়ে। [ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড বনাম দি কমিশনার অফ ট্যাক্সেস, ১৪ এমএলআর, আপিল বিভাগ পৃষ্ঠা ৩৩৭-৩৫৪]। ইসলামী ব্যাংক তার আমানতকারী বা অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের জমাকৃত অর্থ থেকে নির্ধারিত হারে টাকা কেটে নিয়ে জাকাত দিয়েছে। জাকাত হিসেবে দেওয়া এই অর্থ ব্যাংক বলছে তাদের ‘ব্যবসায়িক খরচ’। ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক খরচ হিসেবে যে টাকা ব্যয় হয় সেটা প্রতিষ্ঠানের আয় হিসাবে গণ্য হয় না এবং ওই পরিমাণ অর্থের ওপর আয়কর দিতে হয় না। ইসলামী ব্যাংক বলছে, তাদের আমানতকারীর যে পরিমাণ অর্থ তারা ‘জাকাত’ দিয়েছে, সেটা তাদের ব্যবসায়িক খরচ হিসেবে বাদ দিতে হবে অর্থাত্ জাকাত হিসেবে প্রদত্ত অর্থ তাদের ‘আয়ের হিসাবের’ বাইরে থাকবে এবং ওই পরিমাণ অর্থের ওপর আয়কর দিতে হবে।
আপিল বিভাগ এই যুক্তি অগ্রাহ্য করলেন। অগ্রাহ্য করার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে আদালত বলেছেন—জাকাত বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য ফরজ। যে ব্যক্তি সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে তার জন্য নামাজ এবং জাকাতসহ (বলাবাহুল্য বছর শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা হিসাবে থাকলে) পাঁচটা ‘ফরজ’। আইনের চোখে ব্যক্তি দুই প্রকার—ন্যাচারাল পারসন এবং লিগ্যাল পারসন, অর্থাত্ স্বাভাবিক ব্যক্তি (একজন মানুষ) এবং আইনানুগ ব্যক্তি বা আইনের দৃষ্টিতে একজন ব্যক্তি। আইনানুগ ব্যক্তি যেমন ব্যাংক বা রাষ্ট্র সাধারণ ব্যক্তির মতো অনেক আইনি পদক্ষেপ বা কাজ করতে পারে। যেমন বাড়ি-গাড়ি কিনতে পারে, ব্যাংক বা রাষ্ট্র জমি-বাড়ি-গাড়ির মালিক হতে পারে। আইনের দৃষ্টিতে ব্যক্তি হলেও মানুষের মতো অনেক আইনি কাজ করতে পারে না—যেমন ভালোবাসা, বিয়ে, তালাক, পিতামাতা হওয়া।
আদালত বলেছেন প্রতিষ্ঠানের কোনো ধর্ম বিশ্বাস থাকতে পারে না, অতএব জাকাত দেওয়া বা না দেওয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক নয় এবং আমানতকারীর পক্ষে থাকতে দেওয়ার জন্য কোনো আইনগত সুবিধা সে পেতে পারে না। তত্কালীন প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন, বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল মতিন ও বিচারপতি এম এম রুহুল আমিন—তিনজন স্ব স্ব ভাবে রায় লিখেছেন। মূলকথাতে সবাই একমত।
অর্থাত্ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে আমার প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। প্রতিষ্ঠান হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ হতে পারে না। ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তিগত ব্যাপার। ব্যক্তি তার ইহকালে কৃত কাজকর্মের জন্য বেহেশত বা দোজখে যাবে—যা সৃষ্টিকর্তা নির্ধারণ করবেন। ইসলামী ব্যাংক বা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ পরকালে কোথায় যাবে?

৫.
একাত্তরের মতো একদল পিশাচ আবার এ দেশের সহজ-সরল-ধর্মপ্রাণ মানুষকে নৃশংসতা আর বর্বরতার দিকে ঠেলে দিতে উদ্যত হয়েছে। ধর্মের অপব্যাখ্যা করে দেশে আবার রক্তগঙ্গার পাঁয়তারা চলছে। এবার একাত্তরের চেয়ে আমার আশঙ্কা বেশি। প্রথমত এখন ধর্মীয় উন্মাদনা বিশ্বব্যাপী। দ্বিতীয়ত অস্ত্রশস্ত্র, বোমা-বন্দুকের সহজপ্রাপ্যতায় যুক্তি, মানসিকতা, সহনশীলতা ও গণতন্ত্র প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে। তৃতীয়ত সম্ভবত অগ্র-পশ্চাত্ বিবেচনা না করেই ছয় দফা বা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না এমন কথার মোহে অনেকেই আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন।
আমরা সবাই ধার্মিক। যারা ধর্ম বোঝে না বা বুঝেও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে ধর্মকে স্থান দিতে পারে না; রাষ্ট্র ও ব্যক্তির পার্থক্য গুলিয়ে ফেলে; বর্বরতা ও নৃশংসতা যাদের মুখ্য হাতিয়ার তারাই আজ পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় নিয়ে ‘ধর্ম গেল, ধর্ম গেল’ বলে মাতম করছে, উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, যেমনটি করেছিল একাত্তরে।
মামার লাশ পাওয়া যায়নি। কেউই তার ‘কবর জিয়ারত’ করতে পারিনি। মামা বেঁচে থাকলে প্রথম নাতনির বিয়েতে নিশ্চয় দোয়া-দরুদ পড়তেন। হাত তুলে নবদম্পতির শুভকামনায় মোনাজাত করতেন। আমি নিশ্চিত তাঁর ও আমাদের এই দেশকে ‘ধার্মিক’ বানানোর মধ্যযুগীয় কথাবার্তা শুনলে আঁতকে উঠতেন।
দেশটা ওই ধর্মান্ধ ও তাদের স্বার্থান্বেষী বর্বর লোভীদের নয়। এটা পনেরো কোটি বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ দেশ।
শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

সবার জন্য স্বাস্থ্য -সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ও আওতা বাড়াতে হবে

বাঙালি অমর্ত্য সেন ও মুহাম্মদ ইউনূস—নোবেল বিজয়ী দুই বাঙালি গত শনিবার রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়ন বিষয়ে কিছু নতুন দিক উত্থাপন করেছেন, যা সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতে নতুন উদ্যোগের সূচনা ঘটাতে পারে।
ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), প্রতীচী ট্রাস্ট ও ইউনিসেফ আয়োজিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা’ শীর্ষক ওই আলোচনা সভায় অমর্ত্য সেন স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। গণতন্ত্রচর্চার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পায় না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন, ‘সরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবার মান ও আওতা বাড়ানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নয়নে এটিই সবচেয়ে মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি বলে আমাদের মনে হয়।’
বাংলাদেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি দরিদ্র মানুষের পক্ষে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা দুর্লভ। কারণ তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবাই তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিত্সকসহ সংশ্লিষ্ট লোকবল, চিকিত্সা-সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও চিকিত্সাসামগ্রীর অপর্যাপ্ততা; ব্যবস্থাপনাও ভয়ানক দুর্বল; অনিয়ম-দুর্নীতি, দায়িত্ব পালনে অবহেলা গুরুতর। এ কারণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান মোটেও ভালো নয়। এর আওতাও সীমিত। গ্রামাঞ্চলের মানুষকে চিকিত্সার জন্য ছুটতে হয় ছোট-বড় শহরগুলোতে। এসব ছাড়া সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরও যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতি জোর দিয়েছেন অমর্ত্য সেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনপ্রশাসনের অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপক রাজনৈতিক দলীয়করণ ঘটেছে; যা দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা ইত্যাদির কারণ হয়েছে। চিকিত্সা-শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর পরিবর্তে নানা পন্থায় পদ-পদবি অর্জনের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছে। সরকারি চিকিত্সকদের মূল দায়িত্ব পালনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রাইভেট প্র্যাকটিস। বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন অনেক সরকারি চিকিত্সক। এ কারণে রাজধানী ও বড় শহরগুলোর বাইরে তাঁরা পারতপক্ষে যেতে চান না। বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত এমনিতেই বেশ ব্যয়বহুল, দিন দিন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ বস্তুত নেই।
পুরো ব্যবস্থাটির বড় রকমের সংস্কার প্রয়োজন।

উন্নয়ন ফোরাম বৈঠকে ভিন্নমাত্রা -সহায়তার জন্য সমঝোতা হতে হবে গণমুখী

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি সাহায্যের অংশ গাণিতিক হিসাবে ব্যাপক কমে গেলেও এর প্রাসঙ্গিকতা ফুরিয়ে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সহায়তার প্রয়োজনীয়তার মাত্রাগত পরিবর্তন ঘটেছে। এই বাস্তবতায় প্রায় পাঁচ বছর পর বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো ঢাকায়। কথিত দাতাগোষ্ঠী বা উন্নয়ন-সহযোগীদের সঙ্গে সরকারের এই বৈঠক মূলত মধ্যমেয়াদে বিভিন্ন খাতে সহায়তা পাওয়ার জন্য সমঝোতা করার আনুষ্ঠানিকতা। এখানে তাত্ক্ষণিকভাবে আর্থিক সহায়তার কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় না। এর বদলে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে সরকার ও উন্নয়ন-সহযোগীদের চিন্তাভাবনা এবং সেগুলো বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে পরস্পর মতবিনিময় করা হয়। এবারের বৈঠকেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে আনুষ্ঠানিকতার সীমা ছাড়িয়ে এবারের বৈঠকটির গুরুত্ব রয়েছে একাধিক কারণে।
প্রথমত, বিশ্বমন্দার পর এই প্রথম এ ধরনের একটি বৈঠক হয়েছে। গরিব ও ছোট দেশ হিসেবে মন্দায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি, তা বৈশ্বিক বিবেচনায় হয়তো খুব কম, কিন্তু বাংলাদেশের নিজের জন্য তা খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। ফলে মন্দা-পরবর্তী সময়কালে উন্নয়ন-সহযোগীরা সহায়তার হাত কতটা ও কীভাবে প্রসারিত করবে, তা বোঝার জন্য এই বৈঠকের প্রয়োজন ছিল। দ্বিতীয়ত, জলবায়ুর অভিঘাতজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোপেনহেগেনে যেটুকু আশার বাণী শুনিয়েছে, তা আরেকটু নিবিড়ভাবে যাচাই করার সুযোগ হয়েছে। তৃতীয়ত, নানা সীমাবদ্ধতার পরও শিক্ষা, মানবসম্পদ, ব্যক্তি-উদ্যোগ ও শ্রম খাতে বাংলাদেশের ইতিবাচক অর্জনগুলো উন্নয়ন-সহযোগীদের মনোজগতে কতটুকু দোলা দিতে পেরেছে, তা জানার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চতুর্থত, এবার বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের উল্লেখযোগ্য হারে সম্পৃক্ত করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে সরকার ও উন্নয়ন-সহযোগী উভয়ের পক্ষ থেকেই ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হয়েছে। এই প্রবণতা বজায় থাকলে তা বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গতির সঞ্চার করবে।
পাশাপাশি এটাও ঠিক যে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির পথে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপচয়ের মতো বড় প্রতিবন্ধকতাগুলো বাধা হয়ে রয়েছে। জ্বালানি সংকট ও অবকাঠামোর অপ্রতুলতা বিনিয়োগ ও উত্পাদনকে পেছনে ঠেলে দিতে চাইছে। বিডিএফ বৈঠকে এসব প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে। এসব কারণে বাংলাদেশের মানুষ যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি উদ্বিগ্ন উন্নয়ন-সহযোগীরাও। তবে তাদের উদ্বেগ অনেক সময়ই বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার বাইরে চলে যায়, যা উন্নয়ন-সহায়তার ক্ষেত্রে নানা ধরনের অযাচিত শর্তারোপে পরিণত হয়। আর তখনই প্রশ্ন ওঠে সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য নিয়ে। সুতরাং উন্নয়ন-সহযোগীদেরও অধিকতর দায়বদ্ধ হতে হবে। অন্যদিকে সরকারকেও মনে রাখতে হবে যে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই বিদেশি সহায়তার সমঝোতা করতে হবে, যেন তা অর্থবহ হয়, দেনা না বাড়ায়। এসব বিষয়ে ভবিষ্যতে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে বিডিএফ বৈঠকের যৌক্তিকতা গ্রহণযোগ্য হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হলেন দালাই লামা

তিব্বতের নির্বাসিত আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা গতকাল বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে নয়াদিল্লি ত্যাগ করেছেন। সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি। ওই বৈঠকের খবরে চীন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।
৭৪ বছর বয়সী দালাই লামাকে ‘সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে নেকড়ে’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বেইজিং। ওবামা প্রশাসন জানিয়েছে, দালাই লামাকে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবেই বরণ করে নেবেন ওবামা। তাঁদের ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে হোয়াইট হাউসের ম্যাপ কক্ষে; ওভাল অফিসে নয়।
কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক কৌশল তিব্বতিদের হতোদ্যম করবে না এবং এতে চীনের অসন্তোষও প্রশমিত হবে না।
দালাই লামার সঙ্গে ভারত ত্যাগের আগে তাঁর মুখপাত্র তেনজিন তাকলহা বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চীন কী বলছে, তাতে কিছু যায়-আসে না।

আবার খুলে দেওয়া হবে মাচু পিচ্চু

আগামী এপ্রিলে পেরুর মাচু পিচ্চু দর্শনার্থীদের জন্য আবার খুলে দেওয়া হবে। এ কথা জানিয়েছে সে দেশের সরকার।
অতিরিক্ত বৃষ্টিতে প্রবেশপথ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় গত মাসে বন্ধ করে দেওয়া হয় পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত প্রাচীন ইনকা সভ্যতার বিশ্বখ্যাত এই নিদর্শনটি।
পেরুর বাণিজ্য ও পর্যটনমন্ত্রী মারতিন পেরেস বলেন, ‘নিদর্শনটি অক্ষত আছে এবং আগামী ১ এপ্রিল তা আবার সবার জন্য খুলে দেওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।’

‘সৌদি রাজপরিবারের’ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ব্রিটিশ পুলিশ

নিজেকে সৌদি রাজপরিবারের সদস্য দাবিকারী এক ব্যক্তিকে গতকাল জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ব্রিটেনের পুলিশ। লন্ডনের একটি পাঁচ তারকা হোটেলে স্বদেশি এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ জানায়, সোমবার হোটেল থেকে ৩২ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃতদেহ উদ্ধার করার পর ‘সৌদি রাজপরিবারের’ ওই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। এএফপি।
পুলিশ জানিয়েছে, লন্ডনের ওই হোটেলে সৌদি নাগরিকের মৃতদেহের খোঁজ পাওয়ার পর হোটেল কর্তৃপক্ষ তাদের খবর দেয়। ওই দিনই সন্দেহভাজন ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়।

ম্যালেরিয়াই কাল হয়েছিল তুতেনখামেনের!

মিসরীয় বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, তাঁরা মিসরের কিশোর ফারাও তুতেনখামেনের মৃত্যুরহস্যের সমাধান করেছেন। সম্ভবত ম্যালেরিয়া জীবাণুর সংক্রমণের কারণে মৃত্যু হয় মিসরের ওই কিশোর ফারাওয়ের। ম্যালেরিয়া জীবাণুর সংক্রমণে তাঁর দেহে অস্থি-বিকৃতি ঘটেছিল। গতকাল এ বিষয়ে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।
মিসরের বিজ্ঞানীরা দুই বছর ধরে ১৯ বছর বয়সী এই রাজার মৃতদেহের মমির ডিএনএ ও রক্তকোষ পরীক্ষা করেন। তাঁরা সেখানে ম্যালেরিয়ার জীবাণু খুঁজে পান। জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন-এ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। ১৯২২ সালে মিসরে তুতেনখামেনের মমি আবিষ্কৃত হয়। তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে মিসরের সিংহাসনে মাত্র নয় বছর বয়সে অধিষ্ঠিত হন এই রাজা। তিনি ছিলেন ফারাও অষ্টাদশ রাজবংশের বংশধর। তুতেনখামেনের মমি আবিষ্কারের পর থেকেই বিষয়টি রহস্যাবৃত ছিল—কেন অল্পবয়সে এই রাজার মৃত্যু হয়েছিল। প্রচলিত আছে, সম্ভবত রথ থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। আরেকটি ধারণা হলো, পারিবারিক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।
মিসরের প্রধান প্রত্নতত্ত্ববিদ জাহি হাওয়াস বলেছেন, ‘মৃত্যুর বেশ কয়েক দিন আগে সম্ভবত পড়ে গিয়ে পায়ের হাড়ে চিড় ধরেছিল তুতেনখামেনের। আর ওই ক্ষতেই হয়তো ম্যালেরিয়ার জীবাণু সংক্রমিত হয়, যা রাজার জীবনাবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

দুবাইতে দুই ফিলিস্তিনিকে জিজ্ঞাসাবাদ

দুবাই পুলিশ শীর্ষ এক হামাস জঙ্গিকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা দুই ফিলিস্তিনিকে গত মঙ্গলবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। পুলিশ ১১ সদস্যের একটি ঘাতক দলের নাম ঘোষণার পর তাদের আটক করা হয়। এরা বিভিন্ন সময় ইউরোপীয় জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করেছে।
পুলিশ-প্রধান দাহি খালফান বলেন, গত মাসে দুবাইয়ের একটি হোটেল কক্ষে মাহমুদ আল-মাবুর লাশ পাওয়ার পর গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা জর্ডানে পালিয়ে যায়। এরা দুজন সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিক।
খালফান বলেন, তিন দিন আগে জর্ডান থেকে তাদের ফিরিয়ে আনা হয়। তাদের ব্যাপকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে। কারণ, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন হত্যাকাণ্ডের আগে সন্দেহভাজন ঘাতক দলের এক সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে।
খালফান সোমবার ঘোষণা করেন, পুলিশ ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী ছয় ব্যক্তি ও আয়ারল্যান্ডের তিন পাসপোর্টধারীকে খুঁজছে। এ ছাড়া এক জার্মান পাসপোর্টধারী এবং ফ্রান্সের পাসপোর্টধারী অপর এক ব্যক্তিকেও খোঁজা হচ্ছে। তারা সবাই সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করেছিল।
ব্রিটিশ, আয়ারল্যান্ড ও ফ্রান্সের কর্মকর্তারা মঙ্গলবার বলেন, পাসপোর্টগুলো সবই জাল। এদিকে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, এ তালিকায় ছয়জনেরও বেশি ইসরায়েলির নাম রয়েছে। এদের আবার দ্বৈত ব্রিটিশ নাগরিকত্বও রয়েছে।

পুনেতে হামলার দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানি সংগঠন

পাকিস্তানের অপরিচিত একটি ইসলামি সংগঠন ভারতে গত সপ্তাহের হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে। পাকিস্তানভিত্তিক বৃহত্ এক ইসলামি সংগঠন ভেঙে নতুন ওই দল গঠন করা হয়। খবর এএফপির।
বুধবার ভারতের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়, নতুন এ দলটির নাম লস্কর-ই-তাইয়েবা আল-আলমি। নিজেকে সংগঠনের মুখপাত্র দাবি করে এক ব্যক্তি ওই পত্রিকাকে বলেন, লস্কর-ই-তাইয়েবা আল-আলমি এ হামলা চালিয়েছে।
আবু জিনদাল নামের ওই ব্যক্তি দ্য হিন্দুর ইসলামাবাদ প্রতিনিধিকে বলেন, বিতর্কিত কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা করতে ভারতের ‘অস্বীকৃতি’র জবাবে এ হামলা চালানো হয়। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত এ ভূখণ্ড নিজের বলে দাবি করে আসছে। চলতি মাসের ২৫ তারিখ দুটি দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হবে।
খবরে বলা হয়, লস্কর-ই-তাইয়েবার দলত্যাগী সদস্যরা লস্কর-ই-তাইয়েবা আল-আলমি গঠন করে। কারণ, লস্কর-ই-তাইয়েবা পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে।
ভারত ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাই হামলার জন্য নিষিদ্ধঘোষিত লস্কর-ই-তাইয়েবাকে দায়ী করেছে। মুম্বাই হামলায় ১৬৬ জন নিহত হয়।
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় পুনে নগরের একটি জার্মান রেস্টুরেন্টে শনিবার বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হয়। এদের মধ্যে এক ইতালীয় নারী ও ইরানের এক নাগরিক রয়েছে। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ের পর এটিই ভারতে সবচেয়ে বড় হামলার ঘটনা।

বেসামরিক লোকজনকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে তালেবান

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মারজাহতে তালেবান জঙ্গিরা বেসামরিক লোকজনকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বলে গতকাল বুধবার অভিযোগ করেছেন একজন আফগান সেনা কর্মকর্তা। এদিকে শহরটিতে তালেবানের খোঁজে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি শুরু করেছেন ন্যাটো ও আফগান সেনারা।
মারজাহ ও এর আশপাশের এলাকায় পরিচালিত ওই অভিযানে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার ন্যাটো ও আফগান সেনা। মারজায় আফগান সেনাবাহিনীর ব্রিগেড কমান্ডার জেনারেল মহিউদিন ঘোরি বলেন, মনে হচ্ছে, তালেবান জঙ্গিরা নারী ও শিশুদের কিছু কিছু বাড়ির ছাদে অথবা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করছে। এবং ওই বাড়িগুলো থেকে কিংবা বাড়িগুলোর আশপাশ থেকে তারা আফগান সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে মারজাহর দক্ষিণে এ ঘটনা ঘটছে। সেনারা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন যে কিছু বাড়ির ছাদের নারী ও শিশুরা অবস্থান করছে। তৃতীয় ও চতুর্থ তলার জানালায়ও নারী ও শিশুদের দেখা যাচ্ছে। শত্রুরা ওই সব বাড়ি থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। জেনারেল ঘোরি আরও বলেন, তারা চাইছে, সেনারা যেন তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালান এবং এতে বেসামরিক লোকজন মারা যায়।
২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর অভিযানের পর এটাই সবচেয়ে বড় যৌথ অভিযান। এ অভিযানকে বেসামরিক লোকজনকে রক্ষায় ন্যাটোর কৌশলের বড় ধরনের পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
জেনারেল ঘোরি বলেন, জঙ্গি ও বেসামরিক লোকজনের পার্থক্য বোঝার জন্য সেনাদের আরও অনেক ধীরগতিতে এগোতে হবে। কিন্তু এসব সতর্কতা সত্ত্বেও অভিযানে বেসামরিক লোকজন মারা পড়ছে। ন্যাটো বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে এ অভিযানে এ পর্যন্ত ১৫ জন বেসামরিক লোক মারা গেছেন। কিন্তু আফগান মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, অভিযানে কমপক্ষে ১৯ জন বেসামরিক লোক প্রাণ হারিয়েছেন।
তালেবানের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার মোল্লা আবদুল রাজ্জাক আখন্দ এ অভিযানকে ন্যাটোর প্রোপাগান্ডা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তালেবানের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মারজাহ সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আফগান কর্মকর্তারা জানান, মারজাহ অভিযানে এ পর্যন্ত ন্যাটোর চার সেনা নিহত হয়েছেন। গত শনিবার মারা যান এক মার্কিন ও এক ব্রিটিশ সেনা। গত মঙ্গলবার নিহত দুই সেনার জাতীয়তা প্রকাশ করা হয়নি। মঙ্গলবার এক আফগান সেনাও প্রাণ হারান।
গতকাল বুধবার ন্যাটোর এক বিবৃতিতে বলা হয়, অপারেশন মুশতারাকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সেনা নিহত হয়েছেন। ন্যাটো জানায়, গত মঙ্গলবার ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে ওই সেনা প্রাণ হারান। তবে নিহত সেনার জাতীয়তা প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন মেরিন কর্মকর্তারা বলেছেন, তালেবান এখন আগের চেয়ে অনেক বিশৃঙ্খল। জেনারেল ঘোরি বলেন, অভিযানের শুরুতে তালেবানরা যে হারে মর্টার ও রকেটচালিত গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল, এখন ওই হার অনেক কমে এসেছে। এতে ইঙ্গিত মিলছে যে তালেবানের মজুদ ফুরিয়ে গেছে কিংবা তাদের ভারী অস্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফ্লোরিডায় এক সরকারি কর্মকর্তার হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

ফ্লোরিডায় ১৯৮৪ সালে এক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে দণ্ডিত এক ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড গত মঙ্গলবার কার্যকর করা হয়েছে।
কারাগারের মুখপাত্র গ্রেট প্লিসিনজার বলেন, মার্গারেট পেগি পার্ককে হত্যার দায়ে দণ্ডিত মার্টিন গ্রসম্যানের (৪৫) মৃত্যুদণ্ড স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টা ১৭ মিনিটে কার্যকর করা হয়। গ্রসম্যান ১৯ বছর বয়সে পার্ককে হত্যা করেন।
মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতাকারীরা ক্ষমা প্রদর্শনের জন্য ফ্লোরিডার গভর্নর চার্লি ক্রিস্টকে আহ্বান জানাতে বিভিন্ন ইহুদিবাদী সংগঠনের সঙ্গে যোগ দেন। তবে তাঁরা গ্রসম্যানের মৃত্যুদণ্ড রোধ করতে ব্যর্থ হন।
ফ্লোরিডায় ১৯৭৬ সালে সর্বোচ্চ এ শাস্তি চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৬৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
গ্রসম্যানের মৃত্যুদণ্ডের মধ্য দিয়ে ২০১০ সালের এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো।

মুম্বাইয়ে আইনজীবী হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩

ভারতের পুলিশ মুম্বাই হামলা মামলার এক আইনজীবী শহীদ আজমীকে হত্যার দায়ে ভাড়াটে তিন খুনিকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০০৮ সালে মুম্বাই হামলা মামলায় অভিযুক্ত তিন ব্যক্তির একজনের পক্ষে ওই আইনজীবী লড়ছিলেন।
পুলিশ জানায়, মুম্বাইয়ের একটি উপশহর থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের এখন শহীদ আজমীর মৃত্যুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শহীদ আজমীকে গত শুক্রবার তাঁর কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
আইনজীবী শহীদ আজমী (৩২) ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাই নগরে হামলাকারী ইসলামি ১০ চরমপন্থীকে সহায়তার দায়ে অভিযুক্ত ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে একজনের পক্ষে মামলা পরিচালনা করছিলেন। মুম্বাই পুলিশের অপরাধ শাখার প্রধান রাকেশ মারিয়া গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে ওই আইনজীবীকে হত্যার কারণ এখনো জানা যায়নি।
ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গত সপ্তাহের ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মুম্বাই মামলার কোনো সম্পর্ক নেই।

দেশভাগের জন্য মহাত্মা গান্ধীকে দুষলেন বিজেপির সম্পাদক

দেশভাগ নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সম্ভবত শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। মাত্র কয়েক মাস আগে যশবন্ত সিং তাঁর বইয়ে দেশভাগের জন্য জহরলাল নেহরু ও সরদার প্যাটেলকে দায়ী করেছিলেন। তিনি পাকিস্তানের স্থপতি এম এ জিন্নাহর প্রশংসা করায় পার্টি থেকেও বহিষ্কৃত হন। এর রেশ কাটতে না-কাটতেই বিজেপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক ও রাজ্যসভার সদস্য বালবীর পুঞ্জ এবার আঙুল তুললেন মহাত্মা গান্ধীর দিকে।
তিনি দেশভাগকে ‘আদি অধর্ম’ হিসেবে বর্ণনা করে অভিশপ্ত এ কাজের দায় চাপালেন বাপুজির ঘাড়ে।
পুঞ্জ বিকল্প নামের ছোট্ট এক বইয়ে উল্লেখ করেন, দূর তুরস্কে ১৯২০ সালে খেলাফত পুনরুদ্ধারে গান্ধীজির অকৃপণ সমর্থনই দেশভাগ ডেকে আনে। খলিফার রাজত্ব কায়েমের লক্ষ্যে ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত খেলাফত আন্দোলন চলে। ব্রিটিশরা খলিফার রাজত্ব বিলুপ্ত করে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ‘মুসলিম ফার্স্ট’ নীতিও একই বলে বর্ণনা করেন পুঞ্জ।
বিজেপির সভাপতি নিতিন গড়কারি ও বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা এল কে আদভানির উপস্থিতিতে ১১ ফেব্রুয়ারি জনসংঘের প্রবর্তক ও বিজেপির পূর্বসূরি দয়াল উপাধ্যায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর দিন বইটি প্রকাশ করা হয়। বহুল প্রচারিত হিন্দুস্থান টাইমস-এর খবরে এ কথা বলা হয়েছে।
পুঞ্জ আরও বলেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ মানেই হিন্দু জাতীয়তাবাদ। অথচ গান্ধীর সময় থেকেই হিন্দুদের অবমূল্যায়ন শুরু হয়।
বিশ্লেষকেরা পুঞ্জের এ বক্তব্যকে গান্ধী সম্পর্কে সংঘ পরিবারের বিশ্বাসের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বলে মনে করেন। কারণ, প্রথম থেকেই বিজেপি গান্ধীর নীতিকে অনুসরণের দাবি করে আসছে।

পাঁচ বছর পর সিরিয়ায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিল যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত হিসেবে রবার্ট ফোর্ডকে মনোনয়ন দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ বছর আগে সিরিয়া থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের পর এই প্রথম রবার্ট ফোর্ডকে মনোনয়ন দেওয়া হলো।
লেবাননের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরি ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক বোমা হামলায় নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া থেকে তার কূটনৈতিক দল প্রত্যাহার করে। কারণ, এ ঘটনার জন্য সিরিয়াকে দায়ী করা হয়। সিনেটের নিশ্চয়তা পেলে ওই ঘটনার পর ফোর্ডই হবেন সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রদূত।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা উইলিয়াম বার্নসের সিরিয়া সফরের প্রাক্কালে হোয়াইট হাউস এ কথা জানায়।
হোয়াইট হাউস থেকে আরও জানানো হয়, সার্বিকভাবে সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে দামেস্কের সঙ্গে আরও আলোচনা চালানো হবে।
এ মাসের প্রথম দিকে ওবামা প্রশাসন দামেস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে দেশটিতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য ফোর্ডের নাম ঘোষণা করে।
ফোর্ড বর্তমানে বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি আলজেরিয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এ ছাড়া পররাষ্ট্র দপ্তরে ২৫ বছরের কর্মজীবনে তিনি কায়রোতেও দায়িত্ব পালন করেন।

পশ্চিমবঙ্গে চিরুনি অভিযান শুরু

পশ্চিমবঙ্গে গত সোমবারের মাওবাদী হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫। এর মধ্যে আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ান রয়েছেন ২৪ জন এবং একজন স্থানীয় কলেজের ছাত্র রয়েছেন। গত মঙ্গলবার ভোরথেকে মাওবাদীনির্মূলে ঘটনাস্থল শিলদার পার্শ্ববর্তী জঙ্গলএলাকায় চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মহানির্দেশক ভূপেন্দ্র সিং ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেছেন, জওয়ান ছাড়াও তিনজন মাওবাদীর মৃত্যুর খবর তাঁরা পেয়েছেন। মাওবাদীরা ক্যাম্পের অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় পিকআপ ভ্যানে করে ওই মৃতদেহ নিয়ে গেছে। ফলে পুলিশের হিসাবে ওই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ২৮।
পুলিশের মহানির্দেশক আরও বলেছেন, মাওবাদীরা ক্যাম্প থেকে ৪০টি আধুনিক অস্ত্র এবং প্রচুর গোলাবারুদ নিয়ে পালিয়ে গেছে। মাওবাদীরা পার্শ্ববর্তী ঝাড়খন্ড রাজ্য থেকে এসে রাতের আঁধারেই আবার ঝাড়খন্ডে পালিয়ে গেছে।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, এবারের মাওবাদী হামলায় নেতৃত্ব দেন মাওবাদী নেতা শশধর মাহাত ও নেত্রী জাগরি বাস্কে।
মাওবাদীদের আস্তানা খুঁজে বের করতে মঙ্গলবার ভোর থেকে ঘটনাস্থল শিলদারের পার্শ্ববর্তী লোধাশুলি জঙ্গলজুড়ে চিরুনি তল্লাশি শুরু করেছে যৌথ বাহিনী।
মঙ্গলবার সকালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিব অশোক মোহন চক্রবর্তী জানিয়ে দিয়েছেন, যৌথ বাহিনীর অভিযান চলবেই। অভিযানের মাত্রা আরও বাড়ানো হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদী হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এখন মাওবাদী সমর্থকদের ওই ঘটনার নিন্দা করা উচিত। মাওবাদীদের সঙ্গে কোনো সহানুভূতি নয়।
মাওবাদী নেতা কিষেনজিও হুমকি দিয়ে বলেছেন, সরকারের গ্রিনহান্ট অপারেশনের বদলা হিসেবে তাঁরাও শুরু করেছেন অপারেশন পিসহান্ট। গ্রিনহান্ট বন্ধ না হলে পিসহান্টও বন্ধ হবে না।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বেলপাহাড়ির শিলদার পুলিশ ফাঁড়িতে গড়া যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে গত সোমবার বিকেলে হামলা চালায় মাওবাদীরা।

গনির গ্রেপ্তার জঙ্গিদের জন্য বড় ধাক্কা

আফগানিস্তানের তালেবানের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা মোল্লা আবদুল গনির গ্রেপ্তারের ঘটনাকে সে দেশের তালেবান জঙ্গিদের জন্য একটা বড় ধাক্কা হিসেবে গণ্য করছেন বিশ্লেষকেরা। সম্প্রতি পাকিস্তানের করাচিতে গোপন যৌথ অভিযান চালিয়ে তালেবানের জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার মোল্লা গনিকে গ্রেপ্তার করেন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের গোয়েন্দারা। গনির গ্রেপ্তারের বিষয়টি আফগান সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার ব্যাপারে জঙ্গি গোষ্ঠীটির অন্য নেতাদের ওপর চাপ তৈরি করবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
গত সোমবার প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস মোল্লা গনির আটকের খবর প্রকাশ করার পর গতকাল বুধবার এ খবর নিশ্চিত করেছেন পাকিস্তানের কর্মকর্তারা। সামরিক বাহিনীর একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে গনির আটকের খবর জানানো হলেও বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি।
ধারণা করা হয়, মোল্লা গনি তালেবানের প্রাত্যহিক কার্যক্রম দেখভাল করতেন। তালেবান গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম তিনি। তালেবানের শীর্ষ নেতা মোল্লা ওমরের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের নেতাদের যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতেন গনি।
গত মঙ্গলবার পাকিস্তানের দুজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মোল্লা গনি ১০ দিনের বেশি আটক রয়েছেন এবং তদন্ত কর্মকর্তারা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। গনিকে ধরতে পরিচালিত অভিযানে আরও কয়েকজন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে আটক করা হয়েছে বলে জানান এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, মোল্লা গনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন এবং তাঁরা সেগুলো মার্কিন সহযোগীদের জানিয়েছেন। তবে তালেবানের এ শীর্ষস্থানীয় নেতার আটকের খবর নিশ্চিত করেনি হোয়াইট হাউস। এ ব্যাপারে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেন, চরমপন্থীদের সঙ্গে লড়াইয়ে গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তাঁর মতে, কোনো একটি বিষয় সম্পর্কে আলোচনা না করেই সেটি সম্পর্কে তথ্য জানতে পারাটা উত্তম পন্থা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রশাসন পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের তালেবান নেতাদের গ্রেপ্তার বা হত্যার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
তালেবান গোষ্ঠীর সাবেক সদস্য ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গনির গ্রেপ্তার তালেবানের জন্য একটি বড় ধাক্কা হলেও তা সামলে নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাদের। গনির শূন্যস্থানটি দ্রুত পূরণ হয়ে যাবে।
লন্ডনভিত্তিক জানেস টেরোরিজম অ্যান্ড ইনসারজেন্সি সেন্টারের বিশ্লেষক উইল হার্টলে বলেন, আফগানিস্তানের ন্যাটো বাহিনীর জন্য এটি একটি বড় কৌশলগত সাফল্য, তবে কোনোভাবেই একে (তালেবানের) পতনের শুরু বলা যাবে না। অবশ্য স্বল্প মেয়াদে তালেবানের কার্যক্রমে এর প্রভাব দেখা যাবে। মার্কিন সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগনের মুখপাত্র কর্নেল ডাভে লাপান বলেন, ‘মোল্লা গনির গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমি নিশ্চিত বা অস্বীকারও করতে পারছি না। তবে তালেবানের কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনা সংগঠনের কার্যক্রমে তাত্ক্ষণিক প্রভাব ফেলবে। তবে আমরা এও দেখেছি, তারা দ্রুত শূন্যস্থান পূরণ করে ফেলে।’
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: পাকিস্তানের উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে গতকাল মার্কিন মনুষ্যবিহীন বিমান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে চার জঙ্গি নিহত হয়েছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, একটি তালেবান ঘাঁটি লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। প্রাথমিক খবরে চারজন জঙ্গি নিহত ও দুজন আহত হয়েছে। তালেবান, আল-কায়েদা ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তর ওয়াজিরিস্তানে গত রোববার থেকে এ পর্যন্ত এটি তৃতীয় মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।

পঞ্চগড়ে ওয়ালটনের শোরুম উদ্বোধন

পঞ্চগড় শহরের ডেকরোপাড়া এলাকায় গতকাল বুধবার ওয়ালটনের একটি শোরুম খোলা হয়েছে।
শোরুমটির উদ্বোধন করেন ওয়ালটনের পরিচালক চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক, সংগীতশিল্পী রাখী ভৌমিক, ওয়ালটনের পরিচালক (মিডিয়া) হুমায়ুন কবীর, বিপণন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম ও শোরুমের ব্যবস্থাপক সাইদুল ইসলাম বক্তব্য দেন।

চাঁদপুরে মাইডাস ফাইন্যান্সিংয়ের বুথ উদ্বোধন

স্বল্প সময়ে সহজ শর্তে বিনা জামানতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ-সহায়তা দিতে চাঁদপুরে মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেডের একটি বুথ উদ্বোধন করা হয়েছে।
শহরের হাজি মহসীন রোডে গত সোমবার বুথটির উদ্বোধন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবং এ কোম্পানির চেয়ারম্যান রোকেয়া আফজাল রহমান।
এর আগে শহরের একটি পার্টি সেন্টারে রোকেয়া আফজাল রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চাঁদপুর পৌরসভার মেয়র নাসির উদ্দিন আহমেদ। এতে আরও বক্তব্য দেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিক উল আজম ও উদ্যোক্তা রওশনারা মাহমুদ প্রমুখ।

বাংলালিংকের পরিবেশক সম্মেলন অনুষ্ঠিত

মোবাইল ফোন অপারেটর বাংলালিংকের পরিবেশক সম্মেলন-২০১০ সম্প্রতি রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী এই সম্মেলনে সারা দেশ থেকে বাংলালিংকের পরিবেশকেরা, বিক্রয় দল ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ আবু দোমা, প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আসার ইয়াকুব খান, বিপণন পরিচালক শিহাব আহমেদ, বিক্রয় পরিচালক আরিফ মেহমুদ মালিকসহ অন্যান্য পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনে কোম্পানির ২০০৯ সালের সফল পরিবেশকদের পুরস্কৃত করা হয়। সবশেষে অনুষ্ঠিত হয় র্যাফল ড্র।
আহমেদ আবু দোমা বাংলালিংকের সঙ্গে পরিবেশকদের সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বাংলালিংকের আজকের অবস্থান পরিবেশকদের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।