Wednesday, March 26, 2025

ট্রাম্পের ভণ্ডামিতেই কি গাজার সংকট বাড়ল by পাপলু রহমান

গাজায় চলমান সংকট ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি ট্রাম্পের মন্তব্য এবং তার প্রশাসনের কার্যকলাপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দ্বিচারিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্পের চাপ এবং গাজার বিরুদ্ধে ইসরায়েলকে সবুজ সংকেত দেওয়া, এই দ্বৈত নীতি এখন স্পষ্ট। গাজার পরিস্থিতি, ইসরায়েলের চুক্তি লঙ্ঘন, ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপ্রেক্ষিতে ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এ প্রতিবেদন।

ইউক্রেনে শান্তির বার্তা, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ

এ বছরের মার্চে গাজার অবরুদ্ধ অঞ্চল আবারও ইসরায়েলের আগ্রাসনের শিকার হয়। গত ১৮ ও ১৯ মার্চের ভোরে নির্বিচার বোমা হামলায় হাজারের বেশি বেসামরিক ফিলিস্তিনি হতাহত হয়েছেন। এ হামলার পেছনে ইসরায়েলের যুক্তি ছিল, তারা যুদ্ধবিরতির শর্ত পুনর্নির্ধারণের চেষ্টা করছে। এর আগেও গাজার অবস্থা ছিল উত্তপ্ত, যেখানে ইসরায়েলি বাহিনী একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করেছে।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের পরিস্থিতি নিয়ে শান্তির বার্তা দিয়েছেন। তবে গাজার ক্ষেত্রে তার নীতির মধ্যে এক ধরনের দ্বিচারিতা লক্ষ্য করা যায়। ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির জন্য ট্রাম্প যে চাপ সৃষ্টি করছেন, বিপরীতে গাজায় তিনি ইসরায়েলকে আগ্রাসন চালানোর অনুমোদন দিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এই দ্বৈত নীতির কারণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প যখন ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কথা বলছেন, তখন গাজায় রক্তপ্লাবন অব্যাহত রেখেছেন।

ইসরায়েলের চুক্তি লঙ্ঘন: ১৯৯৩-২০২৫

ফিলিস্তিনবিষয়ক চুক্তি ও সমঝোতাগুলো ইসরায়েল ধারাবাহিক লঙ্ঘন করে আসছে। ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তিতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) একে অপরকে স্বীকৃতি দেয়। একইসঙ্গে দুই-রাষ্ট্র নীতির ভিত্তি স্থাপন করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চুক্তির পরপরই ইসরায়েল তার দখলদারি বাড়িয়ে ফিলিস্তিনিদের মাটিতে নতুন বসতি স্থাপন শুরু করে, যা মূল চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন। এমনকি, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে পূর্ববর্তী চুক্তি বাতিল করার চেষ্টা চালিয়েছে।

২০০৩ সালে ‘রোডম্যাপ টু পিস’ নামে একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছিল, তবে ইসরায়েল নতুন শর্ত চাপিয়ে দেয়। শর্তটি ছিল ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলকে ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তারা রাজি না হলে তাদেরকে ‘শান্তির অন্তরায়’ হিসেবে দোষারোপ করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েল শুধু এসব কার্যকলাপ ফিলিস্তিনেই নয়, লেবানন ও সিরিয়ার সঙ্গেও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে চলেছে।

গাজার বর্তমান সংকট: ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা

গাজায় সহিংসতা ও মানবাধিকার সংকট চরম অবস্থায় রয়েছে। গত ১৫ মার্চ গাজার এক ত্রাণ দলের ওপর হামলা চালিয়ে ৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩ জন সাংবাদিকও ছিলেন। এরপরই নতুন করে বিমান হামলা চালিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৫০০ বেসামরিক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র, মিশর ও কাতার গাজার যুদ্ধবিরতির প্রধান মধ্যস্থতাকারী হলেও তারা ইসরায়েলকে চুক্তি মানতে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হতো, তবে তারা ইসরায়েলকে বাধ্য করত চুক্তি মানতে। কিন্তু বাস্তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে চুক্তি পরিবর্তনের অনুমতি দিয়েছে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করব!’—এটিই ইসরায়েলের জন্য আগ্রাসন চালানোর সবুজ সংকেত ছিল। এ বক্তব্যের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলের পক্ষে থাকায় ইসরায়েল আরও দখল ও বসতি স্থাপনে উঠেপড়ে লেগেছে।

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ: ট্রাম্পের অমানবিক মন্তব্য


ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, গাজার জনগণকে মিশর, জর্ডান বা অন্য কোথাও পুনর্বাসিত করা উচিত। এটি শুধু একটি অমানবিক মন্তব্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অপরাধ। ট্রাম্পের এ মন্তব্যের পর ইসরায়েল গাজার অবকাঠামো ধ্বংসে নামে। একইসঙ্গে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন একেবারে পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, ফিলিস্তিন কেবল একটি ভূখণ্ড নয়। এর হাজার হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে। এই ভূমির সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের শুধু ভৌগোলিক সম্পর্কই নয়, এটি তাদের সাংস্কৃতিক, আধ্যাত্মিক এবং ঐতিহাসিক পরিচয়ের অংশ। ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা মানে তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদা ধ্বংস করা।

যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন

ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ বা তাদের ওপর আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৪৯ সালের চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন এবং রোম স্ট্যাটিউট অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) অনুসারে, কোনো জনগণকে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। ট্রাম্পের মন্তব্য আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার হরণের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে।

শান্তির সম্ভাবনা আরও দূরে

গাজার পরিস্থিতি ও ট্রাম্পের নীতি শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজার মানবিক সংকট, ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নীতি আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে একটি বড় প্রশ্নের বিষয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র সঠিকভাবে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হতে চাইতো, তাহলে তারা ইসরায়েলকে শান্তির শর্ত মেনে চলতে বাধ্য করতো। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ায়, শান্তির সম্ভাবনা আরও দূরে চলে গেছে।

ফিলিস্তিনিদের প্রাণপণ সংগ্রাম

ফিলিস্তিনিরা জীবন গেলেও মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ হতে রাজি নয়। তারা তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখতে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের উচিত ফিলিস্তিনিদের এই সংগ্রামে সমর্থন জানানো এবং তাদের অধিকার রক্ষায় একযোগভাবে কাজ করা। আইন অনুসারে, ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমিতে থাকার অধিকার রয়েছে এবং তাদের এ অধিকার রক্ষা করা একটি নৈতিক ও যৌক্তিক দায়িত্ব। তবে শান্তির নামে যুদ্ধ সমর্থন করা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘন করা শুধু কূটনৈতিক নয়, আইনগত ও নৈতিকভাবে অপরাধ। যতদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলকে তার চুক্তি মানতে বাধ্য করবে না, ততদিন পর্যন্ত এই সংকটের সমাধান অসম্ভব হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

শোডাউন আর গাড়িবহরের রাজনীতিই কি চলবে by রাফসান গালিব

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে জোরেশোরেই ওঠে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মানেই তো আমরা পুরোনো রাজনীতিতে আর ফিরে যাব না।

পুরোনো রাজনীতি মানে কী? রাজনৈতিক দলের ভেতরে নামকাওয়াস্তে গণতন্ত্রের চর্চা, দলের খরচে চাঁদাবাজি সংস্কৃতি, এলাকায় এলাকায় দলীয় প্রভাব জারি রাখতে বিবিধ ক্ষমতাচর্চা, নিজেদের ভেতরে দলাদলি ও প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা—এসবই তো নাকি?

নতুন রাজনীতির চর্চা বা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দাবি তুলেছিল অভ্যুত্থানের পক্ষের সব শক্তিই। এর মধ্যে অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্ররা নিজেরাই তৈরি করলেন রাজনৈতিক দল। ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে যেদিন নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক দলের (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ ঘটল, সেদিন তাদের ঘিরে বিপুল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেয়েছিল।

এনসিপির মঞ্চে একেকজন বক্তার বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিল, প্রথাগত রাজনীতির যাবতীয় কলুষতা ও অচলায়তন ভেঙে নতুন বাংলাদেশ গড়তে তারাই পারবে। কিন্তু শুরুতেই দলটির কিছু নেতা সমালোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, ফলে তাঁদের নিয়ে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার কতটা প্রতিফলন ঘটবে, তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা দেখা দিয়েছে।

কদিন আগে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ নামে পতিত শক্তির পুনর্বাসন নিয়ে সেনাবাহিনীর দিকে সরাসরি আঙুল তুলে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক পোস্ট রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক ঝড় তোলে। তার প্রতিক্রিয়ায় এনসিপির একেকজন নেতা যেভাবে বক্তব্য রাখছিলেন, তাতে মনেই হলো দলের ভেতরে আদতে তেমন কোনো সমন্বয় নেই।

হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক পোস্ট দেশীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সাহসিকতার পরিচয় দিলেও দলের অভ্যন্তরে সে ব্যাপারে পূর্বসিদ্ধান্ত বা দলীয় ফোরামে পূর্ব–আলোচনা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও জল্পনা–কল্পনা তৈরি হয়।

সংবাদমাধ্যমে এ–ও প্রকাশ পেয়েছে, এই ইস্যুতে একেকজনের একেক বক্তব্যে এনসিপিতে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। একটা ইস্যুকে ঘিরে দলের একেকজন একেক বক্তব্য দেওয়ায় এটিই স্পষ্ট যে এখনো দলীয় শৃঙ্খলা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রকাশ্যে মতামত প্রদানে পরিপক্বতার অভাব থেকে গেছে তাঁদের।

যা–ই হোক, এই ইস্যু ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নানা গুজব ও অনিশ্চয়তার একপ্রকার অবসান ঘটে সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেনাপ্রধানের এক বৈঠকে (অফিসার্স অ্যাড্রেস) এবং তাঁর দেওয়া বক্তব্য।

তবে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না এনসিপির। গতকাল ২৪ মার্চ দলটির নেতা সারজিস আলম নিজ এলাকায় বিশাল শোডাউন করে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তিনি ঢাকা থেকে সৈয়দপুর পর্যন্ত গিয়েছেন উড়োজাহাজে চড়ে। বাকি ১০০ কিলোমিটার পথের মধ্যে অর্ধেকটা পাড়ি দিয়েছেন শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, করতোয়া নদীর ওপর একটি সেতু পার হতে শতাধিক গাড়িবহরের জন্য পাঁচ হাজার টাকা টোল দেন সারজিস। তাঁর গাড়িবহরের একজন চালকের বক্তব্য, শোডাউনের গাড়ির সংখ্যা হতে পারে দেড় শর বেশি। পুরো দিনের জন্য একেকটি গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা দিয়ে।

যে দলের আত্মপ্রকাশের এখনো এক মাসও হয়নি, এখনো যে দলের নিবন্ধনই হয়নি, সেই দলের একজন নেতার বিশাল শোডাউন ও এর খরচ কোথা থেকে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আর টোল দেওয়া এবং প্রতিটি গাড়ি ভাড়া নির্ধারণ থেকে এটি স্পষ্ট যে এ বিশাল শোডাউন, এ বিপুল টাকা খরচের বিষয়টি সারজিস আলমের অজানা নয়। বরং বলা যায়, এই আয়োজনের পরিকল্পনা, সম্মতি বা অর্থ খরচের বিষয়টি তাঁরই সিদ্ধান্ত অনুসারেই হয়েছে।

অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত বছরের তাঁর একটি বক্তব্য আমরা দেখে থাকি, যেখানে তিনি বলেন, ‘আমার আসলে এই মুহূর্তে কোনো টাকা নেই। ধার করে চলতেছি। এইটাই হচ্ছে রিয়েলিটি। আমার পকেটে মানিব্যাগও নেই।’ তাঁর এ বক্তব্যের পর এমন শোডাউনের বিষয়টি মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তুলবে, সেটিই তো স্বাভাবিক।

দলের ভেতরেও সারজিস আলমের এ শোডাউন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এনসিপির আরেক নেতা তাসনিম জারার ফেসবুক পোস্ট থেকেই তা স্পষ্ট। সারজিসের প্রতি একটি খোলা চিঠিতে তাঁর আগের বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তাসনিম জারা বলেন, ‘সেই প্রেক্ষাপটে এত বড় একটি আয়োজন কীভাবে সম্ভব হলো—এর অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনা কীভাবে হয়েছে, তা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক। আমাদের দল স্বচ্ছতা, সততা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সে জায়গা থেকে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য উত্তর দেওয়া আমাদের সবারই দায়িত্ব। আমি আশা করি, বিষয়টি তুমি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং জনগণের সামনে একটি গ্রহণযোগ্য ও পরিষ্কার ব্যাখ্যা তুলে ধরবে। এতে জনগণের কাছে দলের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে বলেই আমার বিশ্বাস।’

তাসনিম জারার এই পোস্ট নিয়েও অনেকের বক্তব্য হচ্ছে, বিষয়গুলো কি দলীয় ফোরামে আগেই আলোচনা করে নেওয়ার দরকার ছিল না? তাঁদের কি নিজস্ব ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ নেই? তাসনিম জারা কি সারজিসকেও সরাসরি বিষয়গুলো বলতে পারতেন না?

তবে কেউ কেউ বলছেন, দলের মানুষ নিয়েও পাবলিকলি প্রশ্ন করার মধ্য দিয়ে এখানে একপ্রকার রাজনৈতিক স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছেন তাসনিম জারা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় রক্তক্ষয়ী একটি অভ্যুত্থানের পর মানুষ কোন ধরনের রাজনীতি চায়, অভ্যুত্থানের নেতাদের কাছ থেকেও মানুষ কেমন রাজনীতি আশা করে, সে ব্যাপারে কেন তাদের বোধোদয় হবে না? ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ বিগত এক যুগে দেশের রাজনীতি চর্চাকে যেভাবে কলুষিত করে গেছে, সেখান থেকে মুক্তিই বা মিলবে কীভাবে?

যদিও সার্জিস আলমও তাসনিম জারার প্রতিউত্তর দিয়েছেন ফেসবুক পোস্টে। সেখানে তিনি জানাচ্ছেন, ‘আমার এলাকায় ফেরার সময় এত গাড়ি, এত মানুষ; তাদের আকাঙ্ক্ষা এবং ভালোবাসা নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করবে এবং আমাকে সঙ্গ দিবে এটা আমিও কল্পনা করিনি। আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং জেলার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে অর্ধেকের বেশি গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। যেগুলোর ব্যয় আমাদের বহন করতে হয়নি। বাকি প্রায় ৫০ টার মতো গাড়ির ৬০০০ করে যে তিন লাখ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে সে টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার পরিবারের আরো ৫০ বছর আগেও ছিল। এবং আমি বিশ্বাস করি অন্য কেউ না; শুধু আমার দাদা আমার জন্য যতটুকু রেখে গিয়েছেন, সেটা দিয়ে আমি আমার ইলেকশনও করে ফেলতে পারব ইনশাআল্লাহ।’

সামর্থ থাকলেও এমন শোডাউন কি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্খা ধারণ করে কি? আর তাঁর পারিবারিক সামর্থ্যের সঙ্গে ‘ধার করে চলার লাইফস্টাইলের’ সামঞ্জস্যও খুঁজে পাওয়া যায় কি?

সারজিসের শোডাউনের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা এসেছে রাজনৈতিক মহল থেকেও। যেমন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাজধানীর রমনায় মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বিএনপির এক আলোচনা সভায় বলেছেন, ‘যারা ১০০ গাড়ি নিয়ে ইলেকশন ক্যাম্পেইন (নির্বাচনী প্রচারাভিযান) করতে যায়, তারা কী করবে, সেটা আমরা ভালো বুঝি।’

কিন্তু বিএনপি মহাসচিব এটিও নিশ্চয়ই মানবেন, শোডাউনের এই সংস্কৃতি তো তাঁর দলের ভেতরেও আছে। গত সাত মাসে বিএনপির অনেক নেতাই জেলা-উপজেলায় বিশাল বিশাল শোডাউন করেছেন। কেউ এক যুগ পর জেল থেকে বের হয়ে বা বিদেশ থেকে ফিরে এসে এলাকায় পুরোনো প্রভাব ফিরে পেতে বিশাল বিশাল শোডাউন দিয়েছেন। এমনকি নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে থাকতে দলের ভেতরে একাধিক পক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতাস্বরূপ শোডাউনও হয়েছে। তবে এটি ঠিক, দলীয় নির্দেশনা অমান্য করে এমন শোডাউন করায় কারও কারও বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। আবার এটিও তো আমরা দেখেছি, দলীয় শাস্তিমূলক এমন ব্যবস্থা গ্রহণ আসলে কতটা কার্যকরী।

গত ডিসেম্বরে দীর্ঘ ১৩ বছর পর দেশে ফিরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের শোডাউনও ব্যাপক সমালোচনা তৈরি করে। তাঁর নির্বাচনী এলাকা থেকে ট্রাক ভরে শত শত নেতা-কর্মী ও শুভানুধ্যায়ী হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে জড়ো হন। তাঁদের উপস্থিতিতে বিমানবন্দর এলাকায় যানজট দেখা দেয়। রাস্তার দুই পাশের যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে অতিরিক্ত বিমান সেনা, পুলিশ ও র‌্যাব সদস্য মোতায়েন করা হয়। পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠ ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের গাড়িতে এলাকায় গিয়ে সংবর্ধনা নিয়ে বিএনপি নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদকে নিয়েও তো বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

ফলে বিএনপির মহাসচিবকে লক্ষ করে যদি তাঁর মতন করেই কেউ যদি বলে, ‘তারাও কী করবে, সেটিও আমরা ভালো বুঝি’, তখন কী উত্তর দেবেন তিনি?

আমাদের দেশীয় রাজনীতির এই সব ‘ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’ যদি ভাঙা না যায়, তাহলে তো নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রশ্নই আসে না। জুলাই অভ্যুত্থানে এত ত্যাগ ও বিসর্জনের পর রাজনৈতিক দলগুলোই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা তুলল, সেই তারাই তাদের কথাবার্তা-আচরণ-কর্মসূচিতে আমাদের ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে তারা আসলে পুরোনো বন্দোবস্তেই থেকে যেতে চায়। সেখানেই তাদের যাবতীয় সুখ! আর কত গণ-অভ্যুত্থান হলে পরে এ দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে?

* রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: rafsangalib1990@gmail.com

সোমবার বিকেলে শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে পঞ্চগড় শহর পার হন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে
রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠনের পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা পঞ্চগড়ে গেলেন দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়ক সারজিস আলম। সোমবার বিকেলে শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে পঞ্চগড় শহর পার হন। জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে। ছবি: রাজিউর রহমান। প্রথম আলো

তামিম রক্ষা পেলেন, আমাদের করণীয় কী by আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী

বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার তামিম ইকবাল খেলার মাঠে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারকা এই ক্রিকেটারের জন্য হেলিকপ্টার আনা হলো। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। নিকটস্থ কেপিজে ফজিলাতুন্নেছা বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কার্ডিয়াক টিম তাঁকে দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে পরবর্তী সময়ে হার্টে দুটি রিং পরায়।

আমি নিজে চিকিৎসক। বর্ণনা থেকে বুঝলাম, তামিম ইকবাল ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক বা অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁকে যে চিকিৎসাটি প্রদান করা হয়েছে, চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষায় তাকে বলা হয় প্রাইমারি পিসিআই। এতে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুততম সময়ে বিশেষায়িত ক্যাথল্যাবে নিয়ে গিয়ে অ্যানজিওগ্রাম করে কালপ্রিট ভ্যাসেল, মানে আক্রান্ত রক্তনালিতে রিং বা স্টেন্ট পরিয়ে দেওয়া হয়।

উন্নত বিশ্বের এ চিকিৎসাটি এখন বাংলাদেশে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে। এই প্রাইমারি পিসিআইয়ের মাঝখানে তামিম ইকবালকে লম্বা সময় সিপিআর, মানে বুকে চাপ দিয়ে হার্টের কার্যকারিতা চালু করার চিকিৎসাসহ ডিসি শক দিয়ে তাঁর বন্ধ হয়ে যাওয়া হার্টকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি যে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন এই আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ক্রিকেট তারকা। তবে তিনি এখনো সংকটমুক্ত নন।

একজন তারকা ক্রিকেটার হওয়ার সুবাদে এবং কেপিজে হাসপাতালে কার্ডিয়াক সুবিধা থাকার কারণে হয়তো তামিম দ্রুততম সময়ে এই উন্নত চিকিৎসা পেয়ে প্রাণে বেঁচে গেলেন। গর্বের কথা বলি। যে প্রাইমারি পিসিআই চিকিৎসাটি বাংলাদেশে তামিমের ক্ষেত্রে সফলভাবে দেওয়া হয়েছে, ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশে কোনো খেলোয়াড় এ রকম অসুস্থ হলেও সেই একই চিকিৎসা তাঁদের দেওয়া হবে। অর্থাৎ হৃদ্‌রোগ চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন গর্ব করতে পারে। তামিমের সফল চিকিৎসার এ ঘটনা বাংলাদেশের চিকিৎসার আধুনিকায়নের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।

উপমহাদেশের প্রখ্যাত কার্ডিয়াক সার্জন দেবী শেঠি বাংলাদেশে এসে এ দেশের হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। প্রশ্ন হচ্ছে, তামিম ইকবাল একজন ভিআইপি। তাই দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসা পেয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। একজন সাধারণ মানুষের হার্ট অ্যাটাক হলে তিনি কোথায় যাবেন? কী চিকিৎসা নেবেন? তাঁদের জন্য তো আর হেলিকপ্টার চলে আসবে না।

এ ক্ষেত্রেও ভালো সংবাদ আছে। বাংলাদেশে অর্ধশতাধিক কার্ডিয়াক সেন্টার রয়েছে, যেখানে হৃদ্‌রোগের সব চিকিৎসা ও সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। একসময় একটা অ্যানজিওগ্রাম করার জন্য অন্তত পাশের দেশ ভারতে যেতে হতো। অথচ আজ বাংলাদেশে অ্যানজিওগ্রাম, অ্যানজিপ্লাস্টি (রিং পরানো), বাইপাস সার্জারি, ভাল্‌ভ সার্জারি, এমনকি বুক না কেটে মিনিমাল ইনভেসিভ কার্ডিয়াক সার্জারি সফলতার সঙ্গে প্রতিদিন সম্পন্ন হচ্ছে।

তবু আকস্মিক মৃত্যু থেমে নেই। এর একমাত্র কারণ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। হৃদ্‌রোগে আকস্মিক মৃত্যু বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ হৃদ্‌রোগে মারা যান, যার ৫৪ শতাংশের জন্য উচ্চ রক্তচাপ দায়ী। এ ছাড়া তামাক ব্যবহার ও বায়ুদূষণ হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৭৯ লাখ মানুষ হৃদ্‌রোগে মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩১ শতাংশ। এর মধ্যে তামাকের কারণে হৃদ্‌রোগে বছরে ১৯ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

বুকে ব্যথা, চোয়ালে ব্যথা, ঘাম হওয়া, মাথা ঝিমঝিম করা, অবসন্নতার মতো উপসর্গ বা কোনো উপসর্গ ছাড়াই আকস্মিক হার্ট বিকল হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। হার্টের অসুখ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। পথিমধ্যেই মারা যায়। তাহলে এ রকম পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

বুকে ব্যথা হলে গ্যাসের ব্যথা ভেবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুততম সময়ে হৃদ্‌রোগের সব সাপোর্ট আছে, এমন হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। ঢাকার বাইরে কিছু কিছু বিভাগীয় শহরে ক্যাথল্যাব ও কার্ডিয়াক সার্জারির সুবিধা আছে। বাংলাদেশে বেসরকারি হেলিকপ্টার যৌক্তিক মূল্যে অত্যন্ত সহজলভ্য। মনে রাখতে হবে, হার্টের চিকিৎসায় সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি বুকে ব্যথা নিয়ে সঠিক সময়ে কোনো কার্ডিয়াক হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন, তাহলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি।

তাহলে করণীয় কী? উত্তর একটাই, নিয়মিত হেলথ চেকআপ। আপনার দেহে উপসর্গ থাকুক আর না থাকুক, বছরে কমপক্ষে দুবার হেলথ চেকআপ করতে হবে। এ ছাড়া সুষম খাদ্যাভ্যাস, প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস, ওজন কমানো, ধূমপান ও তামাকজাতীয় পণ্য বর্জনের পাশাপাশি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। আর দরকার এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড।

* ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্ত্তী ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা

তামিম ইকবাল
তামিম ইকবাল। ছবি: প্রথম আলো

গাড়িবহর নিয়ে তাসনিম জারার চিঠির জবাব দিলেন সারজিস

সারজিস আলমের শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে পঞ্চগড়ে নিজের এলাকায় যাওয়া ঘিরে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা চেয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন তাঁর দলের নেতা তাসনিম জারা। জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা এই পোস্ট দেওয়ার প্রায় দুই ঘণ্টার মাথায় জবাব দিয়েছেন সারজিস আলম। তিনি বলেছেন, তাঁরা যে নতুন বন্দোবস্তের কল্পনা করেন, সেটা ছয় মাসের মধ্যে প্রয়োগ করলে নির্বাচনে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই জামানত হারানোর আশঙ্কা থাকবে।

তা ছাড়া তাঁর নিজের কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করার সামর্থ্য নেই মানে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সেই সামর্থ্য নেই—বিষয়টি তেমন নয় বলে দাবি করেছেন সারজিস আলম।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠকের (উত্তরাঞ্চল) দায়িত্ব পাওয়ার পর গতকাল সোমবার প্রথম নিজের এলাকায় যান সারজিস আলম। তিনি গতকাল ঢাকা থেকে উড়োজাহাজে সৈয়দপুরে যান। সেখান থেকে তিনি সড়কপথে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ যান। দেবীগঞ্জ থেকে শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে সারজিস আলম জেলার বোদা, পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলা সফর করেন। সারজিস আলমের বাড়ি আটোয়ারী উপজেলায়।

সারজিস আলমের এই ‘শোডাউন’ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বিষয়টি নিয়ে আজ প্রশ্ন তুলেছেন। এরপর সন্ধ্যায় এক ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি ঘিরে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর গ্রহণযোগ্য ও পরিষ্কার ব্যাখ্যা চান পেশায় চিকিৎসক তাসনিম জারা।

জবাবে সারজিস আলম যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি দাবি করেছেন, গতকাল তাঁর পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং জেলার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তাঁদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহরের অর্ধেকের বেশি গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। যেগুলোর ব্যয় তাঁদের বহন করতে হয়নি। বাকি ৫০টির মতো গাড়ির ৬০০০ টাকা করে যে তিন লাখ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে, সেই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য তাঁর পরিবারের আরও ৫০ বছর আগেও ছিল।

আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হলে তার খরচ নিয়েও আত্মবিশ্বাসী সারজিস লিখেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, অন্য কেউ না; শুধু আমার দাদা আমার জন্য যতটুকু রেখে গিয়েছেন, সেটা দিয়ে আমি আমার ইলেকশনও করে ফেলতে পারব ইনশা আল্লাহ।’

সারজিস আলমের ফেসবুক পোস্টটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:

‘প্রিয় তাসনিম জারা আপু,

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

আপনার খোলাচিঠির উত্তরের পূর্বে দুটি বিষয় বলতে চাই।

প্রথমত, আমাদের চিন্তাচেতনা, ধ্যানধারণা থেকে সবার আগে যে বিষয়টি বাদ দিতে হবে, সেটি হচ্ছে একজন নতুন করে জাতীয় রাজনীতিতে এসেছে মানেই তার পরিবার সহায়-সম্বলহীন, অসহায়, নিঃস্ব না। বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগের নেতারা চাঁদাবাজি, লুটপাট করে এসব কাজ করেছে বলে, একই কাজ করে অন্যরাও সেটা করবে, বিষয়টি তেমনও নয়। আমার এই মুহূর্তে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই মানে এই নয় যে আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজনের সেই সামর্থ্য নেই।

দ্বিতীয়ত: কতিপয় সোশ্যাল মিডিয়া বুদ্ধিজীবী তাদের জায়গা থেকে যেভাবে রাজনীতিকে কল্পনা করেন, সেটা কোন আদর্শ পৃথিবীর চিত্র হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো বৈচিত্র্যময় চিন্তাধারা ধারণকারী জনগণ–সংবলিত একটি দেশের চিত্র নয়। এমনকি বাংলাদেশের একটি জেলার রাজনৈতিক কালচারের সাথে অন্য একটি জেলার রাজনৈতিক কালচারেরও পুরোপুরি মিল নেই। তাই আমার চোখের সামনে আমার আসনে যা দেখছি, সেটা দিয়ে অন্য আসনও তুলনা করা যায় না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলগত অবস্থান বিবেচনায় সেই ইকুয়েশনগুলো ভিন্ন হয়।

আমরা নতুন বন্দোবস্ত চাই। কিন্তু নতুন বন্দোবস্ত বলতে আমরা যেটা কল্পনা করি, সেটা ছয় মাসের মধ্যে অ্যাপ্লাই করলে অলমোস্ট ৯৫+% ক্ষেত্রে জামানত হারানোর সম্ভাবনা থাকবে। তার মানে কি আমরা নতুন বন্দোবস্ত চাই না? অবশ্যই চাই।

কিন্তু সেটা কখনো ছয় মাসের ব্যবধানে ১৮০ ডিগ্রি উল্টে যাবে না, বরং সময়ের সাথে সাথে ১০% ২০% ৩০% এভাবে পরিবর্তিত হবে। একসময় হয়তো শতভাগ নতুন বন্দোবস্ত দেখতে পাব।

ফেসবুকের রাজনীতি আর মাঠের রাজনীতি এক নয়। আপনার প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করার জনবল এবং সামর্থ্য আপনার যদি না থাকে কিংবা আপনি দেখাতে না পারেন, তাহলে মাঠের রাজনীতিতে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। অন্য নেতা তো দূরের কথা সাধারণ জনগণও আপনাকে গোনায় ধরবে না। কারণ, মানুষ স্বভাবতই ক্ষমতামুখী। আমাদের যেমন নতুন বন্দোবস্তের দিকে যেতে হবে, তেমনি মাঠের রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য পূর্বের যেই বন্দোবস্তগুলো চাইলেই এখনই ছুড়ে ফেলা সম্ভব নয়, সেগুলো কেউ পাশে রেখে আপাতত চলতে হবে। যেদিন সেগুলোও ছুড়ে ফেলার সুযোগ আসবে, সেদিন সেগুলোর ছুড়ে ফেলতে হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক বুদ্ধিজীবী তাদের যে আইডিয়াগুলোকে বিভিন্ন ন্যারেটিভ দিয়ে স্টাবলিশ করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা দেখায়, তারা সেই প্রসেসে বাংলাদেশের এই মানসিকতার জনগণের কাছে—এই ইলেকশনে মাঠে নামলেও জামানত হারাবে, একই প্রসেসে ৫ বছর পরে ইলেকশন করলেও জামানত হারাবে।

তারা শুধু আপনার পিছেই লাগতে পারে কিন্তু কোন প্রসেসে আপনি মাঠে ইলেকশন করে জিতে আসতে পারবেন, সেগুলো আপনাকে দেখাতে পারে না কিংবা দেখালেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর মাঠের বাস্তবতা নেই।

আমরা তো অনেকেই চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, মামলা–বাণিজ্য, হয়রানি এসবের বিরুদ্ধে কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেললাম। কিন্তু এই অভ্যুত্থানেরই একটি অংশ আবার ওই একই কাজগুলো করছে। আটকাতে পেরেছেন কি? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আপনারা অনেকে কথাও বলতে পারছি না। আর বললেও তারা সে কথাকে কানে নেয় না। কথা বলতে পারছি সেই অল্প কিছু নতুন করে চিন্তা করা মানুষের বিরুদ্ধে যারা এখনো সেই কথা বলার স্পেসটা দেয় এবং সেই কথাগুলোকে রিসিভ করে।

এবার কিছু তিক্ত কথা বলতে চাই । বাংলাদেশের রাজনৈতিক কালচার পরিবর্তন করতে হবে । এটা আবশ্যক। কিন্তু যত দিন না আমজনতা তাদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন করছে ততদিন আপনি সরাসরি নতুন চিন্তাগুলোকে বাস্তবায়ন করতে গেলে সময়ের সাথে সাথে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বেন। আপনি আজকে একটি আসনে নির্বাচন করার ঘোষণা দিন। কাল থেকে সেই আসনের অসংখ্য মানুষ আপনার কাছে আসবে নানা তদবির নিয়ে আবদার নিয়ে। এর মধ্যে অনেক অনৈতিক চাওয়া থাকবে। আবার যাদের আবদার পূরণ করতে পারবেন না, তারা আপনার বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করবে। অথচ তারা একটিবারও ভাববে না আপনার সেই সামর্থ্য আছে কি না, বিষয়গুলো ন্যায়সংগত কি না। তারা শুধু নিজের স্বার্থটা ভাববে। আপনি দিলে আছে, না দিলে নাই।

তার ওপর এখন আপনার কোন অথরিটিও নাই। এ ক্ষেত্রে সরাসরি নতুন বন্দোবস্ত অ্যাপ্লাই করে দীর্ঘ মেয়াদে অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার চেয়ে সাময়িকভাবে নতুন পুরোনো মিশেলে এগিয়ে গিয়ে যদি আপনি একটি অথরিটি পান কিংবা নির্বাচিত হতে পারেন, তখন বরং দীর্ঘ মেয়াদে নতুন বন্দোবস্তের কালচার চালু করা এবং সেগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করার সুযোগ বেশি থাকবে। আমি এটাকে মন্দের ভালো মনে করি।

আর আমার এলাকায় ফেরার সময় এত গাড়ি, এত মানুষ; তাদের আকাঙ্ক্ষা এবং ভালোবাসা নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করবে এবং আমাকে সঙ্গ দেবে এটা আমিও কল্পনা করিনি।

আমার পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং জেলার অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে অর্ধেকের বেশি গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। যেগুলোর ব্যয় আমাদের বহন করতে হয়নি। বাকি প্রায় ৫০টার মতো গাড়ির ৬০০০ করে যে তিন লাখ টাকা ভাড়া দিতে হয়েছে, তার টাকা দেওয়ার সামর্থ্য আমার পরিবারের আরও ৫০ বছর আগেও ছিল এবং আমি বিশ্বাস করি, অন্য কেউ না; শুধু আমার দাদা আমার জন্য যতটুকু রেখে গিয়েছেন, সেটা দিয়ে আমি আমার ইলেকশনও করে ফেলতে পারব ইনশা আল্লাহ।

ধন্যবাদ।’

সারজিস আলম
সারজিস আলম। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

শহীদ হওয়ার আগে ফিলিস্তিনি সাংবাদিকের আবেগঘন পোস্ট: ‘অবশেষে বিশ্রামে যাচ্ছি, বিশ্রাম’

হোসাম শাবেত। আল জাজিরার ফিলিস্তিনি সাংবাদিক। ইসরাইলের হামলায় মাত্র ২৩ বছর বয়সে শহীদ হলেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের লড়াই-সংগ্রামে নিজেকে ওতোপ্রতভাবে জড়িত রেখেছিলেন। গাজায় ইসরাইলি বর্বরতা শুরুর পর থেকে ১৮ মাস ধরে এক আমানবিক জীবন কাটিয়েছেন নির্ভীক শাবেত। বার বার মৃত্যুর সম্মুখীন হয়েও এক মুহূর্তের জন্য দায়িত্ব থেকে পিছপা হননি তিনি। তার এক্সে দেয়া প্রতিটি পোস্টে ইসরাইলি হামলার মধ্যে নির্ভীক দায়িত্ব পালনের সাক্ষ্য স্পষ্ট।

আল জাজিরা বলছে, এর আগেও তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। তাতে আহত হলেও গাজা ছেড়ে যাননি হোসাম শাবেত। যেকোনো সময় ইসরাইলের বোমার আঘাতে জীবনের ওপারে চলে যেতে পারেন এমনটা ধরে নিয়ে এক্সে পোস্টও করেছিলেন তিনি। বিশ্বাস এবং সংগ্রামের প্রতি অবিচল থাকা সাহসী ওই সাংবাদিক লিখেছেন, ১৮ মাস ধরে আমার প্রতিটি মুহূর্ত আমার জনগণের জন্য ব্যয় করেছি। উত্তর গাজার বীভৎসতা আমি ডকুমেন্টেড করেছি যেন বিশ্ব জানতে পারে হায়েনারা কী লুকাতে চায়। আমি ফুটপাতে, স্কুলে, তাঁবুতে- যেখানে পেরেছি রাত কাটিয়েছি। প্রতিটি দিনই ছিল টিকে থাকার সংগ্রাম। মাসের পর মাস ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করেছি। তবু আমি জনগণের কাছ থেকে সরে যাইনি।

তিনি আরও লিখেছেন, আল্লাহর কসম! আমি সাংবাদিক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। সত্য প্রকাশ করার স্বার্থে আমি সবরকমের ঝুঁকি নিয়েছি। এখন অবশেষে আমি বিশ্রামে যাচ্ছি, বিশ্রাম; যার সঙ্গে গত ১৮ মাস আমার পরিচয় নেই। এসব কিছু ফিলিস্তিনের স্বার্থেই করা হচ্ছে উল্লেখ করে শাবেত লিখেছেন, আমি এসব করেছি। কারণ আমি ফিলিস্তিনে বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি এই ভূমি আমাদের। এই ভূমিকে রক্ষা করা এবং মানুষের সেবা করার জন্য জীবন দেয়া আমার কাছে সর্বোচ্চ সম্মানের। আমি এখন আপনাদের বলি- গাজা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করবেন না। বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে দিবেন না। যুদ্ধ অব্যাহত রাখুন। আমাদের কথা বলতে থাকুন- যতক্ষণ না ফিলিস্তিন স্বাধীন হয়।

এদিকে সোমবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হামলায় প্যালেস্টাইন টুডের সাংবাদিক মোহাম্মদ মনসুরও নিহত হয়েছেন। তার উপরও অতর্কিত হামলা চালানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যানুসারে দুই সাংবাদিকের হত্যার ফলে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহত সংবাদ কর্মীর সংখ্যা ২০৮ জনে দাঁড়িয়েছে।

mzamin

জাতির উদ্দেশ্যে ড. ইউনূসের ভাষণ: বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য

বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, এ লক্ষ্যে আমরা আসিয়ানের সদস্য হিসেবে যোগদান করার বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছি। আমরা মহাসৌভাগ্যবান এক জাতি, পৃথিবীর মানচিত্রে আমাদের অবস্থানের কারণে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটান- দক্ষিণ এশিয়ার এই চারটি দেশ মিলে একটি যৌথ অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারলে চার দেশই লাভবান হবে। নেপাল ও ভুটান আমাদের জলবিদ্যুৎ দিতে অত্যন্ত আগ্রহী, আমরাও নিতে আগ্রহী। বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে এর কোনো বিকল্প নেই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মহান স্বাধীনতা দিবস ও পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রফেসর ইউনূস। এ বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন হবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার চায়, আগামী নির্বাচনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক। এ জন্য নির্বাচন কমিশন সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস এবং ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেয়া এই ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয় উল্লেখ করেন। সরকারের চেষ্টায় দ্রব্যমূল্য কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে তিনি আশা করেন। ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা এবং ঈদুল ফিতরের আগাম শুভেচ্ছা জানান।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সবচাইতে বড় সমস্যা সীমাহীন দুর্নীতি। স্বৈরাচারী সরকার এই দুর্নীতিকে বিশ্বের শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছে। দুর্নীতির ফলে শুধু যে সবকিছুতে অবিশ্বাস্য রকম ব্যয়বৃদ্ধি পাচ্ছে তাই না, এর ফলে সরকার ও জনগণের সকল আয়োজন বিকৃত হয়ে যায়। পুরো বিশ্ব বুঝে গেছে, আমরা জাতি হিসেবে সততার পরিচয় বহন করি না। এটা শুধু জাতীয় কলঙ্কের বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এটা আত্মঘাতী বিষয়। দেশবাসীর মতো আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ও চায় আমরা দুর্নীতিমুক্ত হই, কারণ তারা আমাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সমপ্রসারণ করতে চায়। দুর্নীতিমুক্ত হতে না পারলে ব্যবসা-বাণিজ্য কিছুই চলবে না। দুর্নীতি থেকে মুক্ত হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের কোনো গতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকার সকল কাজ দুর্নীতিমুক্ত করতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে। এই সরকারের মেয়াদকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার চেষ্টার পাশাপাশি আগামী দিনেও দেশের নাগরিককে যেন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখতে পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আজ ২৫শে মার্চ, মানব সভ্যতার ইতিহাসে কলঙ্কিত এক হত্যাযজ্ঞের দিন। ১৯৭১ সালের আজকের রাতে পাক হানাদার বাহিনী নিরপরাধ, নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙালির ওপর নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হাজারো মানুষকে হত্যা করেছে। ২৫শে মার্চ থেকেই এ দেশের মানুষ সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। ৯ মাসের যুদ্ধের মধ্যদিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। এ সময় তিনি স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের। সেইসঙ্গে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত হাজারো শহীদ ও আহত, যারা বৈষম্য, শোষণ, নির্যাতন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের প্রতি সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে সশ্রদ্ধ সালাম জানান সরকারপ্রধান। বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদেরকে যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ এনে দিয়েছে, সে সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে চাই।
প্রফেসর ইউনূস বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে জোর ব্যবস্থা নিয়েছে। রমজান ও ঈদে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জিনিসপত্রের দামের লাগাম টেনে ধরা, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ রমজানে যাতে কোনো পণ্যের দাম বেড়ে না যায় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ যেন বিঘ্নিত না হয় সেজন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে শেখ হাসিনা যে ভয়াবহ লুটপাট কায়েম করেছিল; আপনারা সেটার ভুক্তভোগী ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে তারা পালিয়ে যাবার সময় এক লণ্ডভণ্ড অর্থনীতি রেখে গেছে। এই পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেবার পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরেছে, ক্রমান্বয়ে অর্থনীতির অপরাপর সূচকগুলো ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করছে। এ সরকারের সবচাইতে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি। ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৯.৩২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যা ২২ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগামী জুন মাসের মধ্যে এটি ৮ শতাংশের নিচে নেমে আসবে বলে আশা করছি। দেশের ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিতে স্বস্তি এনে দিয়েছে আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনেরা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে রেমিট্যান্স ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। রেমিট্যান্স যোদ্ধারা আমাদের দেশের অর্থনীতি গড়ার বীর সৈনিক। তাদের জন্য প্রক্রিয়াগত যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলো সহজ করে দেয়া আমাদের দায়িত্ব। তারা যেন ভোগান্তির শিকার না হন, দূতাবাস যেন ঠিকমতো কাজ করে, এটি নিশ্চিত করার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আগামী নির্বাচনে যেন তাদের ভোটাধিকার দিতে পারি সেজন্য কাজ করছি।

ড. ইউনূস বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেছে। এর ফলে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জনগুলোর মধ্যে এটা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থায় বিনিয়োগের বিষয়ে খুবই আগ্রহী। আশা করছি, দ্রুততম সময়ে দেশে নতুন নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আপনারা দেখতে পাবেন। সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে দেশে রপ্তানি ১৩ শতাংশ বেড়েছে। জানুয়ারিতে ৭ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডেলিং বেড়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে লাইসেন্সিং রিকোয়ারমেন্টস, প্রত্যাবাসন আইনসহ বিনিয়োগকারীদের যে সাধারণ সমস্যাগুলো রয়েছে সেগুলো সমাধানে কাজ শুরু করেছে।

বিগত সরকারের আমলে ভিন্নমতকে দমন করতে মিথ্যা মামলাকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে আমরা এসব হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছি। গত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় দায়ের করা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাগুলোর মধ্যে সারা দেশে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ২৯৫টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যান্য সকল হয়রানিমূলক মামলাও ক্রমান্বয়ে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া এ পর্যন্ত সাইবার সিকিউরিটি আইনের অধীনে বিচারাধীন স্পিচ অফেন্স সংক্রান্ত ৪১৩টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই আইনটি অবিলম্বে বাতিল করে নাগরিকবান্ধব সাইবার সুরক্ষা আইন করা হচ্ছে।

সরকারপ্রধান বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার পর বিমানের টিকিট কেনার পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে নিয়ে যাওয়ায় ফলে বিমানের টিকিটের দাম শতকরা ৫০ থেকে ৭৫ ভাগ কমে গেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী ভাই-বোনেরা এতে করে স্বস্তি পাচ্ছেন। এ ছাড়া অন্যান্য এয়ারলাইনে টিকিটের দামও কমে গেছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এখনকার যুগ হলো প্রযুক্তির যুগ। সৃজনশীলতার যুগ। আমাদের দেশে ১৭ কোটি নারী-পুরুষ, তার মধ্যে তরুণরা হলো বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাংলাদেশ মানব সম্পদের দিক থেকে অষ্টম বৃহত্তম দেশ। একযোগে এ তরুণরা সৃজনশীলতার প্রকাশের সুযোগ পেলে বন্যার স্রোতের মতো আমাদের দেশ দ্রুতবেগে পৃথিবীর বাজারের মধ্যস্থানে চলে যাবে। এই বিপুল তরুণ গোষ্ঠীর সামনে থেকে পথের বাধা সরিয়ে দেয়াই হলো আমাদের সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

প্রফেসর ড. ইউনূস বলেন, হজ মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে গভীর আধ্যাত্মিক সফরগুলোর মধ্যে প্রধান। সারা জীবন এর জন্য তারা অপেক্ষা করেন। পবিত্র হজ পালনে বাংলাদেশের হাজীরা প্রায়ই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন- ভাষাগত বাধা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, অতিরিক্ত ভিড়, প্রশাসনিক জটিলতা এবং লজিস্টিক সমস্যাসহ নানা অসুবিধা। হজের অভিজ্ঞতাকে মসৃণ ও নিরাপদ করতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছে, যা সম্মানিত হাজীদের যাত্রার আগে, যাত্রা চলাকালীন সময়ে এবং ফিরে আসার পরেও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।

স্টারলিংকের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ককে বাংলাদেশে স্টারলিংকের কার্যক্রম শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কোম্পানিটির প্রতিনিধিরা এখন বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরুর আয়োজন করছে। তাদের সঙ্গে তিন মাসের মধ্যে বাণিজ্যিক চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। স্টারলিংকের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট বাংলাদেশের ডিজিটাল জগতে একটি বিপ্লব আনবে। স্টারলিংক সেবা চালু হলে দেশের প্রতিটি গ্রাম, দ্বীপাঞ্চল, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল অতি উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবার আওতায় চলে আসবে। স্টারলিংক চালু হলে ভবিষ্যতে কোনো সরকার ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে মানুষকে আর তথ্যবন্দি করার কোনো সুযোগ পাবে না।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশ সফরের কথা উল্লেখ করে প্রফেসর ড. ইউনূস বলেন, তাকে সঙ্গে নিয়ে আমি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে গিয়েছি। ক্যাম্পে অবস্থানরত ১ লাখ রোহিঙ্গা শিশু-কিশোর, নারী, পুরুষ সবার সঙ্গে একসঙ্গে ইফতার করেছি। আমাদের প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে আগামী সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি পৃথক অধিবেশন আয়োজন করার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারের নিপীড়নের বর্ণনা উঠে এসেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের রিপোর্টে। এই রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, শেখ হাসিনা নিজেই নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে। বিগত সরকার, আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগের সহযোগী গোষ্ঠী ও সংগঠন একত্রিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল। মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ চলাকালে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু। বিক্ষোভের সম্মুখসারিতে থাকার কারণে, আমাদের জুলাই-কন্যারা নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্ট পড়ে সবার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে। কী ভয়াবহতা! কীভাবে একজন প্রধানমন্ত্রী নিজ দেশের নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার পর লাশ লুকিয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে পারে! ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য তিনি পৃথিবীর সকল নিষ্ঠুরতা ছাড়িয়ে গেছেন- এটাই জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার কার্যালয়ের এই রিপোর্টকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিবেদনে যে সুপারিশ করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার সে সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। যারা গণহত্যায় জড়িত ছিল, যারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে, যারা ইতিমধ্যে হত্যাকারী হিসেবে বিশ্বের কাছে স্বীকৃত তাদের বিচার এদেশের মাটিতে হবেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজবের যেন এক মহোৎসব চলছে। দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য একের পর এক মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে। যতই নির্বাচন কাছে আসবে এর রূপ আরও ভয়ঙ্কর হতে থাকবে। কারা এর পেছনে আছে, কেন আছে তা আপনাদের সবারই জানা আছে। আমরা এই গুজব ও মিথ্যা তথ্যের প্রচারণা রোধ করতে জাতিসংঘের সহযোগিতা চেয়েছি।

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তাদের কাজ শুরু করেছে। ৬টি সংস্কার কমিশনের ১৬৬টি সুপারিশ ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনসহ ৩৮টি রাজনৈতিক দলের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক শুরু হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলো খুবই ইতিবাচকভাবে সংস্কার কাজে সাড়া দিয়েছে, তাদের মতামত তুলে ধরছেন। কোন রাজনৈতিক দল কোন কোন সংস্কার প্রস্তাবে একমত হয়েছে, কোনটিতে দ্বিমত হয়েছে- সেসব তারা জানাচ্ছেন। এটা আমাদের জাতির জন্য অত্যন্ত সুখকর বিষয় যে, প্রতিটি রাজনৈতিক দল সংস্কারের পক্ষে মত দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের লক্ষ্য হচ্ছে যে সকল বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হবে সেগুলো চিহ্নিত করা এবং তার একটা তালিকা প্রস্তুত করা। যেসকল দল এতে একমত হয়েছে তাদের স্বাক্ষর নেয়া। এই তালিকাটিই হবে জুলাই চার্টার বা জুলাই সনদ।

mzamin

জুলাই অভ্যুত্থান: হাসপাতালেই ঈদ কাটবে তাদের by আরিফুল ইসলাম ও আফজাল হোসেন

প্রায় আট মাস আগে জুলাই অভ্যুত্থানে আহত হয়েছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছিল শরীর। গুলিতে কারও হাতকাটা পড়েছে। কারও পা। কারও চোখের আলো নিভেছে আজীবনের জন্য। আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ জীবন দিয়েছেন। আহত হন ২২ হাজারেরও বেশি মানুষ। আহতদের একটি অংশ এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঈদ কড়া নাড়লেও তারা বাড়ি ফিরতে পারছেন না। রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (পঙ্গু হাসপাতাল), চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ আরও কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন এসব আহতরা। নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন তারা।

তারা শুধু নিজেদের আহত শরীর নিয়ে নয়, বরং পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ না করতে পারার আফসোস নিয়েও দিন কাটাচ্ছেন। আগের বছরগুলোতে পরিবারের সঙ্গে ঈদের খুশি ভাগ করে নেয়া হলেও, এবার  শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা তাদের পিছু ছাড়ছে না। আগের  বছরগুলোতে পরিজনের সঙ্গে কাটানো ঈদের স্মৃতি মনে করে কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কেউ কেউ ছুটি নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করলেও শারীরিক অবস্থার অবনতির আশঙ্কা থাকায় ছুটি দিতে চাইছে না হাসপাতাল। আহতরা বলছেন, প্রতি বছর পরিবার পরিজন, বন্ধুদের সঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপন করতাম। এবার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছি।

সরজমিন রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল), জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তিকৃত জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে কথা বললে আহতরা জানিয়েছেন, তারা ছুটি নিয়ে বাড়ি যেতে চান, তবে শারীরিক অবস্থার কারণে শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। কেউ কেউ এতটাই গুরুতর আহত যে, আপাতত হাসপাতালের শয্যা ছাড়া আর কোনো আশ্রয় নেই। তাদের ঈদ হাসপাতালেই করতে হবে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বেশির ভাগেরই অপারেশনসহ চিকিৎসা কার্যক্রম চলমান। অনেকেরই ২/৩ বার করে অপারেশন হয়েছে। অনেকের বিশ্রাম দরকার। আবার কারও কারও থেরাপি দিতে হচ্ছে। এমন রোগীরা চাইলে নিজ দায়িত্বে ছুটি নিয়ে যেতে পারবে। নিয়মিত চেকআপের অংশ হিসেবে তাদের আসতে হবে মাঝেমধ্যে।

মো. আলম শেখ। পেশায় রিকশাচালক। বাগেরহাট সদর উপজেলার বৈথপুর গ্রামের বাসিন্দা। ৮ মাস হলো পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনি বলেন, বাগেরহাটের কোর্টের সামনে ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে আহত হই। ছাত্রদের বাঁচাতে গেলে আমাকেও পিটিয়ে আহত করে তারা। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও এসে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে আহত করে। আমার পায়ের লিগামেন্ট ছিড়ে যায়। ঈদে বাড়ি যেতে পারবো কিনা জানি না। তবে এখন আগের থেকে অনেকটা ভালো আছি। ডাক্তার যেতে দিলে যাবো। না দিলে থেকে যাবে। এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। তবে মনে হচ্ছে যেতে পারবো না এ অবস্থায়। ঈদের আনন্দ এবার আর আমার কপালে নেই মনে হচ্ছে।
একই হাসপাতালে আহত  কুষ্টিয়ার জয় ইসলাম  বলেন, আমার ডান হাতের ভেতরের জয়েন্ট পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ডাক্তার বলছেন দেশের বাইরে চিকিৎসা করাতে হবে। এবার ঈদে বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। এজন্য কিছু টাকা  রেখেছিলাম। গতকাল রাতে সব টাকা হারিয়ে গেছে। কে যেন চুরি করে নিয়ে গেছে আমার টাকাগুলো। এখন মনে হয় আর যেতে পারবো না।
পটুয়াখালির আরিফুল ইসলাম বলেন, আতর টুপির ব্যবসা করতাম। ঈদ এলে বেচাবিক্রি বাড়তো। এবার আমি নিজেই হাসপাতালের বেডে, ঈদ নিয়ে কোনো আশা নেই মনে। বউ ছেলে মেয়েরা এখানেই আছে। ঈদ হাসপাতালেই করতে হবে।

যাত্রাবাড়ীর মো. আব্দুল্লাহ বলেন, বাড়িতে আর যাওয়া হবে না। ঈদের আনন্দ পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে হতে পারবো না। এটাই সবচেয়ে কষ্টের।
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে আহত ইমরান। পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি এখনো। সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে পুলিশের গুলিতে পায়ের হাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হাসপাতালে কাতরাচ্ছিলেন। কথা বলতে গেলে কান্নার্ত কণ্ঠে  ইমরান বলেন,  শরীরের যা পরিস্থিতি, কবে ভালো হবো তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমি কাজ করে মাসে ১৫ হাজার টাকা আয় করতাম। ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মা রয়েছে। প্রতি বছর তাদেরকে নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতাম। আমার টাকা দিয়েই সংসার চলতো অথচ সে জায়গায় এখন হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে আছি। ঈদে কতো আনন্দ করতাম বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেতাম। আগের মতো আর কখনো স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতে পারবো না।

কুষ্টিয়ার মেজবাহুর রহমান বলেন, আমাদের আন্দোলন ন্যায়ের জন্য ছিল। কিন্তু এখন আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। ঈদে পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারবো না, এটাই সবচেয়ে কষ্টের।
গত ১৮ই জুলাই মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের সামনে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন রোমান। তখন থেকেই হাসপাতালে ভর্তি। তিনি বলেন, আট মাস ধরে হাসপাতালে কাতরাচ্ছি। হাড় জোড়া লাগছে না, সেইসঙ্গে নার্ভগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না। পা নিয়ে খুব শঙ্কিত আছি। যেই জায়গায় বাবা-মায়ের সেবাযত্ন আমি করতাম সে জায়গায় তারা আমার সেবাযত্ন করছে। ঈদে কতো রকমের মজা করতাম। জীবনের সুখের মুহূর্তগুলো শেষ হয়ে গেল।    

৫ই আগস্ট সাভারের আশুলিয়া থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন মামুন। সেদিন ই তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তিনি বলেন, পায়ের আঙুল গুলো কাজ করছে না। কয়েকবার অস্ত্রপাচার করা হয়েছে পায়ে, পা নাড়াতেই পারি না। সারাক্ষণ শুয়ে থাকা লাগে। বেডের পাশ দিয়ে যারা হেঁটে যায় তাদের দেখলেই মন খারাপ হয়ে যায়, আমি কবে হাঁটতে পারবো তা ভেবে। ঈদের কথা শোনা মাত্রই চোখের পানি ছেড়ে তিনি বলেন, যে হাঁটতেই পারে না তার আবার ঈদ। জীবনের সবচাইতে খারাপ ঈদ এবার কাটবে। প্রতি ঈদে বাবা মায়ের সঙ্গে ২৫ রমজানের পরেই গ্রামের বাড়িতে যেতাম চাচাতো ভাইদের সাথে কতো স্মৃতিময় সময় কাটিয়েছি। এখন সেগুলো স্বপ্নের মতো লাগে। আরো বেশি খারাপ লাগে বাবা-মা আমার জন্যে এবারের ঈদে বাড়ি যেতে পারবে না। হাসপাতালে থাকতে হবে তাদের। কী জীবন! মুহূর্তেই কী হয়ে গেল!    

গত ১৮ই জুলাই মোহাম্মদপুর আল্লাহ করীম মসজিদের সামনে পুলিশের গুলি এসে চোখে লাগে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী শামিম হোসেনের। তখন থেকেই তিনি জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি আছেন । শামিম বলেন, আমার বাম চোখ অকেজো হয়ে গিয়েছে এ চোখে কিছু দেখতে পাই না। আরেকটি অপারেশন করা লাগবে।
জুলাই অভ্যুত্থান দেশের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে যুগান্তকারী ঘটনা। এতে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারা জাতির গর্ব। এই আন্দোলনে তরুণ সমাজ শুধু অংশগ্রহণই করেনি বরং কীভাবে সত্য ও সঠিক পথে ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায় করা যায় সেই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জুলাই যোদ্ধাগণের স্বপ্ন পূরণে সবসময় পাশে থেকেছে। তিনি অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা সর্বত্র আমরা দেশের তরে’ এই মূলমন্ত্র বুকে ধারণ করে অতীতের ন্যায় ভবিষ্যতেও দেশ মাতৃকার কল্যাণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় পাশে থাকবে।

মঙ্গলবার ঢাকা সেনানিবাসস্থ ‘আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্স’-এ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত যোদ্ধা ও শহীদ যোদ্ধাগণের পরিবারবর্গের সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ৭২ জন আহত যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যবৃন্দসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সেনাপ্রধান আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, সততা, মানবিকতাবোধ ও নিয়মানুবর্তিতার সমন্বয়ে সকলে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করলে এই দেশ সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তিনি সেই স্বপ্ন পূরণে সকলকে একযোগে কাজ করার অনুরোধ জানান। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও নিহত যোদ্ধাগণের প্রতিটি পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হয়।
mzamin

পশ্চিমাদের শ্যেন দৃষ্টি ড. ইউনূসের চীন সফরে: মোদির সঙ্গে দেখা হতে পারে ব্যাংককে

রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে সরকার প্রধানের দায়িত্বগ্রহণের প্রায় ৮ মাসের মাথায় প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে চীন যাচ্ছেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ভূ-রাজনৈতিক কারণে সফরটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সফরটি এমন এক সময় হচ্ছে যখন প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চরম টানাপড়েন চলছে। সফরটির ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে পূর্ব-পশ্চিমের বাংলাদেশি সব বন্ধু রাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীরা। চীন থেকে ফিরেই ব্যাংকক যাবেন ড. ইউনূস। সেই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হবে তার। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য একান্ত বৈঠকও হতে পারে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিমসটেকের ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলন। এই সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আগামী ২রা থেকে ৪ঠা এপ্রিল এই সম্মেলনের ফাঁকে প্রতিবেশী দুই দেশের সরকারপ্রধানের একান্ত বৈঠক হবে কিনা? তা নিয়ে অন্তহীন কৌতূহল কূটনৈতিক   অঙ্গনে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম অবশ্য দুই সরকার প্রধানের বৈঠকের সম্ভাবনা একেবারে নাকচ করে দিয়েছে। তবে কূটনৈতিক সূত্র মানবজমিনকে বলেছে, শেষ মুহূর্তে বিমসটেক সম্মেলনের সাইড লাইনে সোফা সেট ফর্মে দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের একটি সম্ভাবনা এখনো সমুজ্জ্বল। নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের জন্য ঢাকা প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন। মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টার আসন্ন চীন ও থাইল্যান্ড সফর প্রস্তুতির আপডেট জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আমাদের দিক থেকে আমরা বলতে পারি যে, এই বৈঠকের জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। ভারতের দিক থেকে একটা ইতিবাচক উত্তরের অপেক্ষায় আছি।

তিনি বলেন, যেকোনো দেশের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের যে বৈঠক, সেই বৈঠক আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বর্তমান যে প্রেক্ষাপট সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই বৈঠকটি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি এবং আমরা আশা করছি- এই বৈঠকটি যদি অনুষ্ঠিত হয় তাহলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে সৃষ্ট স্থবিরতা, সেটি কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। স্মরণ করা যায়,  বঙ্গোপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক চেয়ে গত সপ্তাহে কূটনৈতিক পত্র পাঠায় বাংলাদেশ। তবে এখনো দিল্লির কাছ থেকে কোনো উত্তর পায়নি ঢাকা। তবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর নয়াদিল্লিতে সংসদীয় প্যানেলের একটি বৈঠকে চলতি সপ্তাহে বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির বৈঠক আয়োজনে বাংলাদেশের অনুরোধ বিবেচনা করা হচ্ছে।
চীন সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ:
সব কিছু ঠিক থাকলে ২৬শে মার্চ ঐতিহাসিক স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানাদি সেরে চীনের একটি স্পেশাল ফ্লাইটে দেশটির উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়ে যাবেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অনুষ্ঠেয় প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য চীনকে পছন্দ করা বা চীনের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার বাড়তি তাৎপর্য রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শেখ হাসিনার গত সাড়ে ১৫ বছর একতরফাভাবে নয়াদিল্লির দিকেই ঝুঁকে ছিল বাংলাদেশ। বিদ্যমান পরবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কতোটা চীনের দিকে হেলে পড়ে তা নিয়ে চিন্তিত ভারত এবং পশ্চিমা বন্ধুরা। ওই সফরকে সামনে রেখে বাংলাদেশের তরফে সামগ্রিক রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করা হয়েছে। চীন সফরটি সম্পর্কের জন্য মাইলফলক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় ’৭৪ সালে  বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় চীন।  সে হিসেবে এ বছর দুই দেশের সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি হবে। সুবর্ণজয়ন্তীর এই বছরে অনুষ্ঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিত্বের সফরে অর্থনৈতিক খাতে সহযোগিতা বাড়ানোই অগ্রাধিকার থাকছে বলে নিশ্চিত করেছে সেগুনবাগিচা।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠক করবেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দুই শীর্ষ নেতার আলোচনা শেষে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের পাশাপাশি সহযোগিতার কয়েকটি বিষয়ে ঘোষণা আসার কথা রয়েছে।

ওই বৈঠকে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, ভূরাজনীতিসহ সামগ্রিক নানা প্রসঙ্গ গুরুত্ব পেতে পারে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শিক্ষা খাতে সহযোগিতা, বিনিয়োগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্পকারখানা স্থানান্তর, আকাশপথে সংযুক্তি, অতীতে ঘোষিত প্রকল্পগুলোতে অর্থ ছাড় ত্বরান্বিত করার বিষয়গুলোতে অগ্রাধিকার থাকতে পারে। একই সঙ্গে সেখানে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের বিষয়টি উঠে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। বৈঠকের পর একই দিনে চীনের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী সংলাপে যোগ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা। এরপর আলাদা তিনটি ব্যবসা ও বিনিয়োগ বিষয়ক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি।

mzamin

গণতন্ত্রবিনাশী শক্তির চক্রান্ত এখনো থেমে নেই

গণতন্ত্রবিনাশী শক্তির চক্রান্ত এখনো থেমে নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার এক বাণীতে তিনি এ মন্তব্য করেন। তারেক রহমান বলেন, একটি শোষণ, বঞ্চনাহীন, মানবিক সাম্যের উদার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এদেশের মানুষ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। দুর্ভাগ্যক্রমে গণতন্ত্রবিনাশী শক্তির চক্রান্ত এখনো থেমে নেই।

তিনি আরও বলেন, মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে চক্রান্তমূলকভাবে হত্যার পরে গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সফল ও সার্থক নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ধারা সূচিত হলেও গণতন্ত্রের শত্রুদের কারণে স্থায়ী ও মজবুত গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার হীন লক্ষ্যে পলাতক অবৈধ সরকার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙে ফেলেছে। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরে আজও তাই এদেশের মানুষ স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারেনি।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর এখন সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সকল দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ব্যক্তি এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথচলা নিশ্চিত করা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে সংহত করা। এটিই হচ্ছে স্বাধীনতার মূল চেতনা। আজকের এই মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমি আহ্বান জানাচ্ছি, জাতির সম্মিলিত ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ’৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বহুমত ও পথের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমুন্নত রাখার জন্য। আমি দেশবাসী সকলের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে প্রার্থনা জানাই।

তিনি আরও বলেন, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে নবীন সূর্যোদয়ের মধ্যদিয়ে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। হাজার বছরের সংগ্রামমুখর এ জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আজকের এই দিনে আমি দেশবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। এই স্বাধীনতা দিবসে আনন্দোজ্জ্বল মুহূর্তের মধ্যে প্রথমেই যে কথা মনে পড়ে, তাহলো এ দেশের অগণিত দেশপ্রেমিক শহীদের আত্মদান, আমি এ মহান দিনে তাদের গভীর শ্রদ্ধা জানাই। যাদের অবিস্মরণীয় আত্মদানে অর্জিত হয়েছে দেশমাতৃকার মুক্তি।

তারেক রহমান বলেন, মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমসহ সকল জাতীয় নেতার স্মৃতির প্রতি আমি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। যাদের জীবন-মরণ লড়াইয়ে ৯ মাসে আমরা বিজয় লাভ করেছি, সেইসব অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা জাতি কখনোই বিস্মৃত হবে না। আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি, সেসব মা-বোনদের কথা, যারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। স্বাধিকার আর স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রক্তস্নাত পথে বিশ্ব মানচিত্রে উদ্ভাসিত হয় আমাদের মানচিত্র। এ দিনে দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তার ঐতিহাসিক ঘোষণায় সেই মুহূর্তে দিশাহারা জাতি পেয়েছিল মুক্তিযদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভয়মন্ত্র।

অপর এক বাণীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আমি দেশবাসী ও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই। তাদের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করি। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের মানুষ ঔপনিবেশিক স্বৈরশাসনের গ্লানি থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল। লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে রাঙ্গানো আমাদের স্বাধীনতা। আজকের এই মহান দিবসে আমি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের অধিনায়ক শহীদ  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে-যার ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের এই দিনে গোটা জাতি মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, এদেশের জাতীয় জীবনে স্বাধীনতা দিবস সবচাইতে গৌরবময় ও পবিত্রতম দিন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে রক্তস্নাত স্বাধীনতা বিশ্বের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল দিন। কোনো জাতিকেই জন্মভূমির জন্য এমনভাবে আত্মত্যাগ করতে হয়নি। তবে ১৯৭১ সালে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল-তা আজও পূরণ হয়নি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য আজও দেশি-বিদেশি চক্রান্তকারীরা নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। 

mzamin