Showing posts with label ধর্মঘট. Show all posts
Showing posts with label ধর্মঘট. Show all posts

Monday, September 23, 2024

ধর্মঘটে অচল রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি

পার্বত্য দুই জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে নতুন করে সংঘাতের খবর পাওয়া না গেলেও কাটেনি আতঙ্ক। ১৪৪ ধারা তুলে নেয়া হলেও স্বাভাবিক হয়নি দুই জেলার জনজীবন। ৭২ ঘণ্টার অবরোধের দ্বিতীয় দিন গতকালও দুই জেলায় বন্ধ ছিল দূরপাল্লার যানবাহন। তিন উপদেষ্টার পরিদর্শনের পরও খোলেনি অধিকাংশ দোকানপাট। পরিবহন ধর্মঘট ও অবরোধের কারণে রাঙ্গামাটিতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে রাঙ্গামাটি শহরে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তেমন মানুষ বের হননি। যাদের জরুরি প্রয়োজন তারা হেঁটে কাজ সেরে বাড়িতে ফিরছেন। সকাল থেকে শহরে কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। রাঙ্গামাটি শহরে একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম অটোরিকশাও চলাচল করতে দেখা যায়নি। এ ছাড়া রাঙ্গামাটি-চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই-বান্দরবান রুটেও কোনো যানবাহন চলাচল করেনি। যান চলাচল বন্ধ থাকায় সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এদিকে রোববার বেলা ১১টার দিকে রাঙ্গামাটি জেলার ১৪৪ ধারা তুলে নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পরিদর্শন করা হচ্ছে। এ সময় রাঙ্গামাটির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শওকত ওসমান, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন খান, পুলিশ সুপার এস এম ফরহাদ হোসেন ও কোতোয়ালি থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আলী উপস্থিত ছিলেন।

রাঙ্গামাটিতে সংঘর্ষে মামলা: তদন্তে কোর কমিটি
রাঙ্গামাটিতে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষে হতাহত, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় কোর কমিটির মাধ্যমে তদন্ত চালানো হবে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক মোশারফ হোসেন খান। এই কোর কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো সরজমিন পরিদর্শনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি কথা বলে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে। এবং প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। অপরদিকে রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুটি মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটির নবাগত পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন। এই দুইটি মামলার আলোকেই রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত সংঘর্ষের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, যারাই আইন হাতে তুলে নিয়েছে তাদেরকে কোনো ভাবেই ছাড় দেয়া হবে না। এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে সকলকেই ভূমিকা রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন পুলিশ সুপার।

এদিকে খাগড়াছড়ি শহরের বেশকিছু স্থানে অটোরিকশা চলাচল করলেও রাঙ্গামাটি শহরের অভ্যন্তরেও কোনো যানবাহন চলছে না। এতে বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লা ও আঞ্চলিক সড়কের যান চলাচল। খাগড়াছড়ি থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামগামী সকল যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন প্রান্তে আটকে আছে কাঁচামাল বহনকারী গাড়ি। আসতে পারছে না ফুয়েল চালিত গাড়িও। খাগড়াছড়ি বাজারে দোকানপাট খোলা থাকলেও ক্রেতাশূন্য দিন কাটছে অনেকের।

খাগড়াছড়ি বাজারে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে সবজি, মাছসহ বিভিন্ন দোকানপাট খালি পড়ে আছে। অবরোধে গাড়ি চলছে না তাই তারা কোনো মালামাল আনতে পারছেন না। খাগড়াছড়ির মাছ ব্যবসায়ী রিয়াদ বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খাগড়াছড়িতে মাছ আনা হতো। অবরোধে কোনো গাড়ি চলছে না বিধায় কোনো মাছ আনা যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ী ভোক্তাসহ সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’ সবজি বিক্রেতা বাবুল বলেন, খাগড়াছড়িতে লাখ লাখ মানুষের বসবাস। তাদের চাহিদার প্রেক্ষিতে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে গাড়ি ভরে সবজি আনা হতো। এখন সবজি আনা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অনেক কাঁচামাল পচে যাচ্ছে।

মামুন হত্যার ঘটনায় মামলা
এদিকে খাগড়াছড়িতে আলোচিত মামুন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৩ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ১০/১২ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। ১৯শে সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিহতের স্ত্রী মুক্তা আক্তার বাদী হয়ে মামলাটি করেন। আসামি হলো- গাড়িচালক মো. শাকিল (২৭), মো. রফিকুল আলম (৫৬) ও মো. দিদারুল আলম (৪৮)।  খাগড়াছড়ি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন মৃধা মামলা হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, ১৯শে সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে নিহতের স্ত্রী মুক্তা আক্তার মামলাটি করেছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল বলেন, বর্তমানে খাগড়াছড়ি অনেক শান্ত রয়েছে। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ি-বাঙালি মিলে শান্তি কমিটি করে সম্প্রীতি বজায় রাখতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি পাহাড়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে আমরা আর সেটার পুনরাবৃত্তি চাই না। আমরা সবাই মিলেমিশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রেখে চলতে চাই। সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

পাহাড়ের ঘটনার প্রতিবাদে গত শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরের চেরাগী পাহাড় মোড় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে ‘বিক্ষুব্ধ জুম্ম ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে ৭২ ঘণ্টার এ অবরোধের ডাক দেয়া হয়। কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়েছে সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন নামের সংগঠন। এ ছাড়া পার্বত্য এলাকার আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টও (ইউপিডিএফ) অবরোধে সমর্থন দেয়। শনিবার সকাল ৬টা থেকে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ চলছে। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য মো. আবদুল মোমিন বলেন, পরিবহন শ্রমিক, সাধারণ যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। পার্বত্য যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি নির্নিমেষ দেওয়ান বলেন, তাদের কোনো গাড়ি চলাচল করছে না। এতে গাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত অনেক কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন। খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আরেফিন জুয়েল বলেন, অবরোধের কারণে জেলায় কোনো ধরনের সহিংসতা ঘটেনি। শহরে দোকানপাট এবং গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা টহলে রয়েছে।

mzamin

Monday, August 19, 2024

মেট্রোরেল: যাত্রীদের জিম্মি করে দাবি আদায়ের ধর্মঘট

চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত মেট্রোরেল। তবুও চালু করা যাচ্ছে না মেট্রোরেল। খোদ মেট্রোরেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণেই মেট্রোরেল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ঢাকাবাসী। সরকার পতনের পর ছয় দফা দাবিতে মেট্রোরেলের ১০ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি ঘোষণা করেছেন। এসব দাবির মধ্যে তাদের বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতির বিষয় রয়েছে। তাদের দাবি পূরণ না হলে অনিদিষ্টকালের জন্য সর্বাত্মক কর্মবিরতির ঘোষণাও দিয়েছেন। এতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন মেট্রোরেলের যাত্রীরা। সড়কে যানজট আর ভোগান্তির মধ্যেই চলাচল করতে হচ্ছে রাজধানীবাসীর।

মেট্রোরেল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা যায়, মেট্রোরেল চালু করার জন্য কারিগরি কোনো ত্রুটি নেই। শুধুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত মিরপুর-১০ ও কাজিপাড়া স্টেশন যাত্রীসেবা দেয়া ছাড়া মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্তই মেট্রো চালানো যাবে। দীর্ঘদিন মেট্রোরেল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কয়েকদিন ট্রায়াল রান করতে হয়।

তারপর যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে মেট্রোরেল। কিন্তু মেট্রোরেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে সেটি আটকে রয়েছে। মেট্রোরেলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, ট্রেন অপারেটর, স্টেশন কন্ট্রোলার, টেকিনিশিয়ানরা ধর্মঘট দিয়েছে। এই কারণে মেট্রোরেল চালানো যাচ্ছে না। মেট্রোরেলের ট্রায়াল রানের জন্য তাদের লাগবে। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য ৫-৬ দিন ট্রেন চালিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। কিন্তু তারা কাজে না ফেরায় আমরা সেটা করতে পারছি না।

গত ১৭ই আগস্ট মেট্রোরেল চলাচল করার কথা ছিল। কিন্তু ১৫ই আগস্ট ডিএমটিসিএল সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১৭ই আগস্ট থেকে মেট্রোরেল পুনরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মেট্রোরেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছয় দফা দাবি মেনে না নিলে তারা কাজে ফিরবেন না। এসব দাবিতে বেতন বৃদ্ধি, বকেয়াসহ সিপিএফ সুবিধা, পদ্দোন্নতি, চাকরি স্থায়ীকরণ, পরিবহন ব্যবস্থা ও বৈষম্যমূলক বহিঃপ্রকাশ বন্ধ করার কথা উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি সুরাহা না হওয়ায় এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। সরকার পতনের পর মেট্রোরেল বন্ধ রেখে এসব দাবি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা হয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে আগামী সাতদিনের মধ্যে মেট্রোরেল চালু করার কথা বলেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মেট্রোরেল চালু করতে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের কাজ চলছে। এটার (চালু করতে) দুটো সমস্যা ছিল। একটা সমস্যা ছিল যে বোর্ডের সদস্য ছিল না। সেটা আমরা আজই করে ফেলেছি। ওই বোর্ডের একটা সভা হবে কাল (সোমবার)। সভার পরে লাইনগুলো চেক করতে দুই-চারদিন লাগবে। আমাদের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সাহেব আছেন, তিনি আমাদের সময় দিয়েছেন এটা আগামী সাতদিনের মধ্যে চালু করার চেষ্টা করবেন।

মেট্রোরেল বন্ধ থাকার কারণে ঢাকার সড়কে বেড়েছে যানজট। বিশেষ করে মতিঝিল থেকে উত্তরা পর্যন্ত মেট্রোরেলের রুটে পরিবহনের চাপ বেড়েছে। শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, বিজয়সরণি, মিরপুর এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। যানজটের মধ্যে গরম আর লক্কর-ঝক্কর বাসে চলাচল করায় ভোগান্তি বেড়েছে এই রুটের যাত্রীদের। তারা বলছেন, সড়কে শূঙ্খলা ফেরাতে শিক্ষার্থীরা মাঠে পরিশ্রম করছে, অথচ মেট্রোরেল বন্ধ রেখে যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলে কর্মচারীরা বেতন বৃদ্ধির দাবি করছেন। তারা মেট্রোরেল চালু রেখে তাদের দাবির ব্যাপারে সোচ্চার হতে পারতেন। তামিম ইসলাম নামে এক মেট্রোযাত্রী বলেন, মেট্রোরেল দ্রুত চালু করে দেয়া উচিত। যাদের জন্য এখনো মেট্রোরেল চালু করা সম্ভব হচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলবো কর্তৃপক্ষকে। জাবেদ ইকবাল নামের আরেক যাত্রী বলেন, অনেক দিন ধরে শুনছি মেট্রোরেল চালু করা হবে। কিন্তু তাও করা হচ্ছে না।

এখন তো সবকিছু স্বাভাবিক চলছে তাহলে মেট্রোরেল বন্ধ রেখে জনভোগান্তি করার কোনো মানে নেই।
কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে গত ১৮ই জুলাই ঢাকায় মিরপুর-১০ এলাকায় ব্যাপক সংঘাত হয়। একপর্যায়ে মিরপুর-১০ পুলিশ বক্সে অগ্নি সংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। ওই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ওভারব্রিজের ওপর। সংঘর্ষ চলমান থাকায় তখন মেট্রোরেলের মিরপুর ১০, মিরপুর ১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে ওই সময়ে অন্য স্টেশনগুলোতে চলছিল মেট্রোরেল। একইদিন বিকাল ৫টার দিকে ডিএমটিসিএল এক বিজ্ঞপ্তিতে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অনিবার্য কারণবশত জননিরাপত্তার স্বার্থে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে সর্বশেষ মেট্রো ট্রেন বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে উত্তরা উত্তর মেট্রোরেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। আজ (ওইদিন) আর কোনো মেট্রো ট্রেন চলাচল করবে না।’ তবে ওই বিজ্ঞপ্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রয়েছে।

Sunday, January 13, 2019

টানা সপ্তম দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে: আশুলিয়ায় অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা, আহত ২০

সাভারের আশুলিয়ায় টানা সপ্তম দিনের মতো বিক্ষোভ করেছে তৈরি পোশাক শ্রমিকরা। আজ সকালে শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানার তৈরি পোশাক শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করলেও কাজ না করে কার্ড পাঞ্চ করে বের হয়ে যায়। পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বাইপাইল আবদুল্লাহপুর মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এসময় পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদেরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট টিয়ারশেল ও জলকামান ব্যবহার করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এরপর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মহাসড়কের বিভিন্ন শাখা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় কমপক্ষে ২০ শ্রমিক আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প কারখানাগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হলে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে চলে যায়।
আশুলিয়ার  বেরন এলাকার শারমিন গ্রুপের এম ডিজাইন কারখানার এইচ আর এডমিন ম্যানেজার মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, আমাদের কারখানার কোন শ্রমিক বিক্ষোভ করেনি। সকালে কারখানার শ্রমিকরা শান্তভাবে ভেতরে প্রবেশ করে কাজে যোগ দেয়। কিছুক্ষণ পর বহিরাগত একটি গ্রুপ এসে আমাদের কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। এ সময় আমরা বাধ্য হয়ে কারখানাটি ছুটি দিলে শ্রমিকরা বের হয়ে চলে যায়।
তৈরি পোশাক কারখানার এই কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, আমাদের কারখানার শ্রমিকরা শান্তি মতো কাজ করে আসছে। কিন্তু তারা দুপুরে খাবারের সময় বা কোন প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে গেলে একটি অপরিচিত গ্রুপের লোকজন তাদের কে বিভিন্নভাবে মারধর করে এবং কারখানায় কাজ করতে নিষেধ করে। তিনি বলেন কিছু কিছু ভুঁইফোড় শ্রমিক সংগঠনের নামে একটি গ্রুপ দেশের পোশাকশিল্প কে অস্থিতিশীল করার লক্ষে পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করছে। আমরা প্রতিদিনই শ্রমিকদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এই সব শ্রমিকরা কারখানার বাইরে গেলে ওই সব শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাদেরকে বিভিন্নভাবে ভুল বুঝিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ এর দিকে নিয়ে যায়। যার ফলে আমরা বোঝানো সত্ত্বেও তা কোন কাজে আসছে না। এ বিষয়ে তিনি সরকার ও প্রশাসনের কাছে বিষয়টি সঠিক ভাবে অনুসন্ধান করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। তা না হলে ভবিষ্যতে তৈরি পোশাকশিল্পকে এই দেশে টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়বে।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক কারখানা মালিকদের এমন অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে পোশাক শ্রমিকরা জানান, আমরা কারো প্ররোচনায় নয়, নিজেদের স্বার্থে যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছি।  সোলাইমান নামে একজন পোশাক শ্রমিক জানান, নতুন ঘোষিত মজুরি কাঠামোতে আমার বেতন বেড়েছে এক হাজার টাকার মতো এর বিপরীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৫০০ টাকা। অন্যদিকে একজন হেলপারের মজুরি বেড়েছে তিন হাজার টাকা। তাহলে যে শ্রমিক টি কালকে গ্রাম থেকে এসে কাজে যোগদান করেই আট হাজার টাকা মজুরি পাবে আর আমরা পাঁচ বছর ধরে কাজ করে বেতন পাচ্ছি দশ হাজার টাকা। তাই অবিলম্বে তিনি এই মজুরি বৈষম্য সংশোধনের দাবি জানান।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি শেখ রেজাউল হক দিপু বলেন,  শ্রমিকরা সকালে কারখানা থেকে একযোগে বের হয়ে বাইপাইল আবদুল্লাহপুর সড়ক জিরাবো বিশ মাইল সড়কসহ বিভিন্ন শাখা সড়কে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ভাঙচুরের চেষ্টা করলে আমরা তাদেরকে প্রতিহত করি। এসময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের কিছুটা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পক্ষ থেকে টিয়ার শেল জলকামান ব্যবহার করে তাদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর তারা বিভিন্ন শাখা সড়কে অবস্থান নিলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে তারা  চলে যায়। বর্তমানে শিল্প এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এছাড়া শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনায় অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বিজিবির টহল অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রামে পরিবহণ ধর্মঘট নিয়ে শ্রমিক-মালিক গ্রুপ মুখোমুখি by ইব্রাহিম খলিল

চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুন্ড আসনের এমপি দিদারুল আলম দিদারের চাঁদা দাবি ও মারধরের প্রতিবাদে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৫ জেলায় ডাকা পরিবহণ ধর্মঘট নিয়ে বিভক্ত শ্রমিক ও মালিক গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। ধর্মঘটের পক্ষে-বিপক্ষে একের পর এক সভা-সমাবেশ করছেন তারা।  
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন আগামীকাল ১৪ জানুয়ারি থেকে ৪৮ ঘন্টা ধর্মঘটের ডাক দিলেও তার বিরোধিতা করে শনিবার রাতে ডাকা পৃথক সভায় ধর্মঘট বর্জনের ঘোষণা দেন জাতীয় সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম পরিবহণ শ্রমিক ঐক্য পরিষদের একটি অংশ।
ঐক্য পরিষদের শ্রমিক নেতাদের দাবি, শ্রমিক ফেডারেশনের নামে বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাঁচ জেলায় চাঁদাবাজির বৈধতা নিতে এবং সংসদ সদস্য দিদারুল আলম দিদারের মান ক্ষুন্ন করার উদ্দেশ্যে বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে বেআইনি এই পরিবহণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। বেআইনি এই ধর্মঘট আহ্বান রাষ্ট্রদ্রোহিতা কর্মকান্ডের সামিল।
ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক এম জসিম রানা বলেন, ধর্মঘট আহ্বানকারীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী। জাতীয় ভিত্তিক একটি শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃত্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দীর্ঘকাল যাবৎ নিরীহ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক-মালিকদের জিম্মি করে সড়ক পরিবহণে নৈরাজ্য সৃষ্টি, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িত। তাদের অনৈতিক কর্মকান্ডে সড়ক পরিবহণ শ্রমিকদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
সদস্য সচিব উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন, ধর্মঘট ডাক দেওয়ার প্রেক্ষিতে বৃহত্তর চট্টগ্রাম পরিবহণ শ্রমিক ঐক্য পরিষদ এনায়েত বাজারস্থ কার্যালয়ে শনিবার রাতে জরুরি সভার আয়োজন করে।
এতে এই পরিবহণ ধর্মঘট বর্জনের পক্ষে মত দেন শ্রমিকরা। এ সময় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধের অভিযোগে ধর্মঘট আহ্বানকারী ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা প্রদানেরও হুঁশিয়ারি দেন।
একই সময়ে পৃথক সভায় ধর্মঘট বর্জনের ঘোষণা দেন জাতীয় সড়ক পরিবহণ শ্রমিক লীগও। নগরীর দারুল ফজল মার্কেট কার্যালয়ে সংগঠনের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব পরিবহণ ধর্মঘট প্রত্যাখান করে বলেন, শ্রমিক নেতার সাথে সংসদ সদস্যের ভিত্তিহীন ঘটনার অজুহাতে ধর্মঘটের নামে বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাধারন মানুষকে জিম্মি করার অধিকার ফেডারেশন নেতৃবৃন্দের নেই। তারা বলেছেন, এ ধর্মঘট সম্পূর্ণ শ্রম আইন পরিপন্থী।
অন্যদিকে পরিবহণ ধর্মঘট পালনে অনড় অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন। এই ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক গ্রুপ। তারাও ধর্মঘটের সমর্থনে শনিবার রাতে জরুরি সভায় মিলিত হন।
এতে জেলা সড়ক পরিবহণ মালিক গ্রুপের মহাসচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ ও মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ আলমের উপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। আমরা মালিক গ্রুপের পক্ষ থেকে ওই সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। পাশাপাশি আগামী ১৪ জানুয়ারি হতে শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকা ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘটে আমরা পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি। জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের জরুরি সভায় আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা শ্রমিক-মালিক নেতৃবৃন্দের উপর হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবিও জানাচ্ছি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ ও মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ আলমকে মারধর ও চাঁদা দাবির প্রতিবাদে আগামীকাল ১৪ জানুয়ারি সোমবার ভোর হতে ১৭ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রামের ৫টি জেলায় (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন ৪৮ ঘন্টার লাগাতার ধর্মঘটে ডাক দেয়।
শ্রমিক ফেডারেশনের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ মুছার ভাষ্য, সীতাকুন্ড আসনের এমপি দিদারুল আলম দিদার বৃহ¯পতিবার রাত সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ ও নগরীর অলংকার মোড় থেকে সীতাকুন্ড রুটে চলাচলকারী ৮নং রুটের মালিক সমিতির নেতাদের বাসায় ডাকেন।
এ সময় অলঙ্কার থেকে সীতাকুন্ড রুটে গাড়ি চলাচলের নিয়ন্ত্রণ তাকে ছেড়ে দিতে বলেন তিনি। মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ট্রেড ইউনিয়নের আইন ও শ্রমিকদের অর্পিত দায়িত্ব শ্রমিকের মতামত ছাড়া ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানালে তিনি তাকে প্রতিমাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হবে বলে চাপ সৃষ্টি করেন।
তাতে সম্মত না হওয়ায় এমপি দিদার এক পর্যায়ে ৮নং রুটে মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক খোরশেদ আলমকে নিজ হাতে মারধর শুরু করেন। এই ঘটনার কারণ জানতে চাইলে এমপি দিদারুল আলম উত্তেজিত হয়ে শ্রমিক নেতা অলি আহমদের দিকে তেড়ে গিয়ে তাকেও মারধর করেন। প্রয়োজনে রিভলবার দিয়ে গুলি করে হত্যার হুমকি দিয়ে বেরিয়ে যেতে বলেন।

Tuesday, October 30, 2018

অসভ্যতা, অমানবিকতা: ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনেও চরম ভোগান্তি, চালকদের কান ধরে উঠবস, অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়িকেও বাধা

অসভ্যতা আর অমানবিকতার আরো বীভৎস রূপ দেখা গেল পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিনে। আগের দিনের মবিল সন্ত্রাসের পর গতকাল স্থানে স্থানে গাড়ি চালকদের কান ধরে উঠবস করানো, পথে পথে অ্যাম্বুলেন্সের গতিরোধ করার ঘটনা ঘটেছে। দিনভর যানবাহন না চলায় অনেকটা জিম্মি দশায় ছিল পুরো দেশ। যানবাহন না থাকায় রাজধানীতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। হেঁটে, রিকশা, ভ্যানে করে অনেকে নিজ নিজ গন্তব্যে যান। অ্যাপভিত্তিক রাইড সেবায়ও বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়েছে যাত্রীদের। এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে ৪৮ ঘণ্টার অবরোধ শেষে ফের ৯৬ ঘণ্টার অবরোধের হুমকি দেয়া হয়েছে। আগামী   ২১ দিনের মধ্যে আট দফা দাবি না মানলে ফের অবরোধ কর্মসূচিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
গতকাল মহাখালী বাস টার্মিনালে মাথার নিচে ব্যাগ রেখে যাত্রী ছাউনিতে শুয়ে ছিলেন শাহরিয়ার ইসলাম।
পাশে যেতেই চোখ খুলে তাকান। তার চোখে-মুখে হতাশা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিটে দ্বিতীয় শিফটে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ট্রেনে ঢাকায় ফিরেছেন। ঢাকা থেকে যাবেন বাড়িতে বগুড়ার শেরপুরে। কমলাপুর থেকে সকাল ১০টায় মহাখালী এসে হতাশ হয়েছেন। কোনো গাড়িই ছাড়ছে না। শুধু শাহরিয়ার না, এরকম অনেক যাত্রীকে দেখা গেছে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে। যদি গাড়ি ছাড়ে এই আশায় প্রহর গুনছেন তারা। এই কর্মবিরতির শেষ কোথায় শ্রমিকরাও নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না। রাজধানীতে দূরপাল্লা ও লোকাল গণপরিবহনের দেখা মিলেনি গতকালও। যে কারণে অনেকের ভরসা ছিল অ্যাপসে চালিত বাইক, সিএনজি অটোরিকশা, রিকশা ও ভ্যান। তবে ফকিরাপুল, মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল, প্রেস ক্লাব, বাংলামোটর, মগবাজার, রামপুরা, ফার্মগেট, তেজগাঁও, মহাখালী এলাকায় অনেককেই দেখা গেছে পায়ে হেঁটে পথ চলতে। এই দুর্ভোগের কারণে জরুরি কাজ ছাড়া বাসার বাইরে বের হননি কেউ।
মিরপুর-১১ থেকে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়েও সিএনজি অটোরিকশা পাননি মোহাম্মদ রকি। হাইকোর্টে জরুরি কাজে যাওয়ার কথা। পরে অ্যাপসের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং কোম্পানির একটি বাইক চালককে কল দেন। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করে পরে জানিয়ে দেন অ্যাপসে যাবেন না। অ্যাপস চালু না করে বাংলামোটর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারবেন তিনি। ২৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে বাংলামোটরে পৌঁছেন রকি। পরে পায়ে হেঁটে শাহবাগ পর্যন্ত যান। সেখান থেকে রিকশায় দোয়েল চত্বর হয়ে হাইকোর্টে পৌঁছেন। ততক্ষণে সময় ব্যয় হয়েছে অনেক। একইভাবে রোগী নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন অনেকে।
রামপুরা থেকে হাত ভাঙ্গা এক শিশুকে নিয়ে রিকশায় ও পায়ে হেঁটে শেরেবাংলা নগর এলাকার অর্থোপেডিক হাসাপাতালে পৌঁছেন সামিয়া বেগম নামে এক গার্মেন্টকর্মী। সকালে প্রচণ্ড দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন অফিসগামীরা। গণপরিবহন না পেয়ে অ্যাপসে চালিত বাইকের ভরসায় ছিলেন। তাও মিলেনি সবার। রিকশাও পাননি অনেকে। খিলগাঁও থেকে পায়ে হেঁটে মতিঝিলের অফিসে যেতে হয়েছে মমিনুল ইসলামকে। এরকম দৃশ্য দেখা গেছে দিনব্যাপী।
মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেছে, শ্রমিকরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বাসস্ট্যান্ডজুড়ে। আড্ডা দিচ্ছেন। অনেকে ক্যানভাসারের মজমায় সময় কাটাচ্ছেন। কখনও কখনও দু-একজন করে যাত্রী আসছেন। হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। কেউ কেউ উপায় না পেয়ে বিভিন্ন বাসের কাউন্টারে বসে আছেন। তাদের চোখে-মুখে বিমর্ষতা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এরকম দৃশ্যই দেখা গেছে ওই এলাকায়।
দুপুরে বোরকাপরা এক নারীকে দেখা গেছে একটি বাস কাউন্টারের সামনের বেঞ্চে বসে থাকতে। সঙ্গে ১০-১১ বছর বয়সী এক কন্যাশিশু। কথা হয় ওই নারীর সঙ্গে। তার নাম ফাতেমা। গৃহপরিচারিকার কাজ করেন লালমাটিয়া এলাকায়। সেখান থেকেই এসেছেন। উদ্দেশ্য মাকে দেখতে যাবেন কিশোরগঞ্জের কটিয়াদির আসমিতা গ্রামে। ফাতেমা জানান, তার মা খুব অসুস্থ, যেতেই হবে। গাড়ি যে একদমই চলে না তা জানতেন না তিনি। ভেবেছিলেন দু-একটি গাড়িতো চলতেই পারে। সকাল ৯টা থেকে বাসস্ট্যান্ডে বসে আছেন। শ্রমিকরাও নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না।
আসকির নামে এক পরিবহন শ্রমিক জানান, কর্মবিরতি চলছে। যেকোনো সময় কর্মবিরতি শেষও হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত গাড়ি না পেলে ট্রেনে যাবেন বলে জানান ফাতেমা। প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে যেতে হবে।
বিকাল ৪টায় বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় ১৪ বছরের কিশোর জুবাইদের সঙ্গে। কাঁধে স্কুলব্যাগ জুবাইদ চাকরি করে হাজারীবাগের একটি রেস্টুরেন্টে। ফাতেমার মতো সেও বুঝতে পারেনি গাড়ি একদমই চলছে না। জুবাইদ বলে, এত কঠিন ধর্মঘট বুঝতে পারিনি। নেত্রকোনার কলমাকান্দা নিজেদের বাড়িতে যেতে চেয়েছিল  জুবাইদ। গাড়ি না পেয়ে হতাশ হয়ে কিশোর ছেলেটি  হাজারীবাগে ফিরছে। তাও কোনো বাস নেই। ফিরতে হবে সিএনজি অটোরিকশায়। সিএনজি অটোরিকশার জন্য অপেক্ষা করছিল জুবাইদ।
বাসস্ট্যান্ডের সামনে পার্কিং করা ১৫-২০টি মোটরসাইকেল। প্রায় সবগুলোই অ্যাপসে ভাড়ায় চালিত। মোটরসাইকেলের যাত্রীরা জানান, অনেকেই এখন অ্যাপসে যাত্রী নিতে চান না। এখন যাত্রী বেশি। অ্যাপসে নিলে লাভ কম। কথা বলে ভাড়া নির্ধারণ করলে বেশি ভাড়া আদায় করা যায়। একইভাবে সিএনজি অটোরিকশার চালকরাও যাত্রীদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি ভাড়া আদায় করছেন।
এদিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, খিলগাঁও, মালিবাগ, মগবাজার, ধানমন্ডি, গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন এলাকায় কোনো বাস চলতে দেখা যায়নি। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কোনো দূর পাল্লার গাড়িও ছেড়ে যায়নি। বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে পরিবহন শ্রমিকদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।
প্রথমদিনের মতো যানবাহনে হামলা ও চালকদের শরীরে মবিল লাগানোর তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সকালের দিকে কিছু কিছু এলাকায় প্রাইভেট যানবাহনের চালকদের কানে ধরিয়ে উঠবস করানোর কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। পুলিশি বাধায় শেষ পর্যন্ত শ্রমিকরা এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে। তবে গতকালও গণপরিবহন না পেয়ে যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। সকালে সরজমিন যাত্রাবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী থানা থেকে ১০০ হাত দূরে অবস্থান নেন শ্রমিকরা। দলবেঁধে তারা সেখানে দাঁড়িয়ে প্রাইভেট কার, মাইক্রো, ব্যাটারিচালিত রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চালকদের হেনস্তা করা শুরু করে। এ সময় তারা কিছু কিছু যানবাহনে লাথি-ঘুষি দেয়। কয়েকজন চালককে মবিল লাগিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত হয়ে শ্রমিকদের সেখান থেকে সরিয়ে দেন। মুগদা-মানিকনগর এলাকায় সকালে পরিবহন শ্রমিকরা প্রাইভেট যানবাহনের চালকদের ওপর চওড়া হন। কয়েকজন চালককে কানে ধরে উঠবস করাতেও দেখা গেছে। এর পর থেকে সারাদিন শ্রমিকদের আর কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
দুপুরের দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় গিয়ে জানা যায় গতকালও কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায়নি। তবে দূরপাল্লার যাত্রীরা সকাল থেকেই টার্মিনালে আসেন। অনেক যাত্রীই বাস না পেয়ে নিরাশ হয়ে ঘরে ফিরেন। আল আমিন নামের এক ব্যবসায়ী গত দুু’দিন ধরে আটকা পড়েছেন ঢাকায়। ব্যবসার কাজে গত শনিবার তিনি ঢাকা এসেছিলেন। তার বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার। মানবজমিনকে তিনি বলেন, শনিবার ঢাকা এসেছিলাম। কাজ শেষ করতে করতে অনেক রাত হয়ে যায়। পরে আর ওইদিন কুমিল্লা যাইনি। রাতের বেলা একটি হোটেলে কাটিয়ে  রোববার সকালের দিকে টার্মিনালে আসি। এসে দেখি কোনো বাস নাই। আমার মতো আরো অনেকে দাঁড়িয়ে আছে। কাউন্টারগুলো বন্ধ রয়েছে। কথা বলে তথ্য নেয়ার মতো কোনো মানুষ পাচ্ছিলাম না। পরে জানতে পারি পরিবহন শ্রমিকদের ধর্মঘট চলছে। আজও একি অবস্থা দেখছি।
হবিগঞ্জের মাধবপুরের যাত্রী নজরুল ইসলামও জানালেন তার সমস্যার কথা। পারিবারিক কাজে যেতে হবে মাধবপুর। সকাল ১০টায় এসেছেন কিন্তু গত দুই ঘণ্টা ধরে একটি বাসের দেখা মেলেনি। আর না গেলেও হবার নয়। তিনি কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের আশপাশের সড়কে দেখা যায়, একুশে পরিবহন, স্টার লাইন, নিউলাইন, এনা পরিবহন, শ্যামলী, মামুন, আল রিয়াদ, ঢাকা এক্সপ্রেস, বলাকা, জননীসহ আরো একাধিক কোম্পানির বাস সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। টার্মিনালের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ বাস শ্রমিকরা বাস পরিষ্কারের কাজ করছেন। পুরাতন চাকা খুলে নতুন চাকা লাগাচ্ছেন।
এদিকে গতকাল অফিস, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। গণপরিবহন না থাকায় অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি। আবার অনেকেই জরুরি কাজে বের হয়ে আবার ফিরে গেছেন বাসায়। সকাল ১০টার দিকে মালিবাগ মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন নুসরাত আরা। তিনি উত্তরার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তিনি বলেন, অনেকক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। একটি বাসও চলাচল করছে না। সিএনজিচালকদের সিগন্যাল দিচ্ছি তারা ৪০০/৫০০ টাকা ভাড়া দাবি করছে। এছাড়া পাঠাও, উবারে রিকুয়েস্ট পাঠাচ্ছি কোনো চালকই তা গ্রহণ করছেন না।
মতিঝিল শাপলা চত্বর এলাকায় দাঁড়িয়ে সকালে বাসের অপেক্ষা করছিলেন মোহাম্মদ আলী। তিনি যাবেন মিরপুরের বিআরটিএতে। বাস না থাকায় অনেকবার পাঠাওকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। পরে অ্যাপস ছাড়া এক চালককে ঠিক করে তিনি মিরপুর যান। ধানমন্ডির ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাবে) লেখাপড়া করেন আসিফ শাওন। খিলগাঁও থেকে কোনো বাস না পেয়ে তিনি পরে ১৫০ টাকা দিয়ে রিকশা ভাড়া করে ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্য রওনা দেন। শাওন বলেন, বাস নাই এই সুযোগে রিকশাচালকরা সুযোগ পেয়ে গেছে। ৭০/৮০ টাকার ভাড়া তারা ২০০ টাকা চেয়ে বসে আছেন। এছাড়া রাইড শেয়ারিং কোম্পানি পাঠাও-উবারেও আমন্ত্রণ জানিয়ে কোনো লাভ হয়নি।
পরিবহন ধর্মঘট নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি সংসদে: ধর্মঘটের নামে পরিবহন শ্রমিকরা সারা দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান। এ বিষয়ে সরকারের পুলিশ প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তিনি জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দাবি করেন। সোমবার দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনের শেষদিনের বৈঠকে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি করেন। পরিবহন ধর্মঘটের প্রসঙ্গ তুলে পীর ফজলুর রহমান বলেন, এই সংসদে পাস করা সড়ক পরিবহন আইনের কিছু ধারা পরিবর্তনের দাবিতে গত দুইদিন থেকে পরিবহন শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করছে। এই অবরোধের নামে শ্রমিকদের কেউ কেউ নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে।
বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ও চালকদের মুখে পোড়া মবিল মেখে দেয়া হয়েছে। একটি অসুস্থ শিশুকে হাসাপাতালে নেয়ার সময় এম্বুলেন্স আটকে দেওয়ায় শিশুটি মারা গেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই অবরোধে সারা দেশের মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। অবরোধের নামে মানুষের আত্মমর্যাদায় যারা আঘাত করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নীরব রয়েছে। এই ঘটনা আমাদের আহত করেছে। আমি এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দাবি করছি।
রূপগঞ্জে যাত্রীদের ওপর শ্রমিকদের হামলা: আহত ১০
স্টাফ রিপোর্টার, রূপগঞ্জ থেকে জানান, সোমবার সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তারাব বিশ্বরোড ও বরপা এলাকায় লেগুনা ও অটোরিকশা যাত্রীদের ওপর হামলা চালিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা। এসময় ১০ যাত্রী আহত হয়।
জানা যায়, শ্রমিক ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে রূপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তারাব বিশ্বরোড, বরপা, রুপসী, গাউছিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকেই অবস্থান নেয় পরিবহন শ্রমিকরা। তারা স্থানীয় রুটে চলাচলরত লেগুনা, থ্রি হুইলার, ব্যাটারিত চালিত অটোরিকশা, সিএনজিসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলে বাঁধা দিতে থাকে। সকাল ৯টার দিকে বরপা এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা একটি লেগুনা আটক করে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়। এ সময় যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রীদের উপর হামলা চালিয়ে আমান উল্লাহ, আনোয়ার, বিল্লাল, সিদ্দিকসহ ৫ যাত্রীকে পিটিয়ে আহত করে। অপরদিকে, মহাসড়কের তারাব বিশ্বরোড এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা অটোরিকশার যাত্রী রেহেনা আক্তার, সালাম, আকবর আলী ও শাকিলসহ আরো ৫ যাত্রীকে গণপরিবহনে উঠার দায়ে প্রহার করে।
লাশের গাড়ি আটকে চালককে মারধর করলো শ্রমিকরা
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, প্রিয়জনের লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন স্বজনরা। একদিকে কান্নার রোল অন্যদিকে রাস্তায় ভোগান্তি। লাশবাহী এম্বুলেন্স থামিয়ে  চালককে পিটিয়ে আহত করেছে কিছু শ্রমিক। ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার সকাল ১০টায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের আউশকান্দি এলাকায়। মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নারায়ণ কর্মকার জানান, আমার বড়ভাই বাদল কর্মকার রোববার সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সোমবার সকালে সিলেট থেকে লাশ নিয়ে এম্বুলেন্সযোগে মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর গ্রামে আসার সময় আউশকান্দি এলাকায় পৌঁছালে ৫/৬ জনের একদল শ্রমিক তাদের লাশবাহী এম্বুলেন্স আটক করে। পরে চালককে গাড়ি থেকে নামিয়ে ব্যাপক মারধর করে তারা। এ সময় এম্বুলেন্সে থাকা তাদের স্বজনরা অনুনয়-বিনয় করে চালককে না মারার অনুরোধ করলেও তাদের মন গলেনি। পরে স্থানীয় কিছু লোকের অনুরোধে শ্রমিকরা এম্বুলেন্সটি ছেড়ে দেয়। একটি স্বাধীন দেশে লাশ নিয়ে যেতে দেয়া হয় না- এটা কি ভাবা যায়। আমরা কোন দেশে বাস করি। এভাবে কথাগুলো বলে বিচার দাবি করেন জগদীশপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য নারায়ণ কর্মকার।

Monday, October 29, 2018

নারায়ণগঞ্জে কলেজছাত্রীদের গায়ে কালি মেখে দিলো শ্রমিকরা

পরিবহন ধর্মঘটের নামে ‘কালি সন্ত্রাস’ থেকে রক্ষা পায়নি নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রীরা। কলেজ বাসে হামলা চালিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা ছাত্রীদের গায়ে কালি (পোড়া মবিল) লেপন করেছে। ভাঙচুর করেছে বাসের গ্লাসও। এসময় ছাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটেছে রোববার দুপুরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি পাম্পের কাছে। পরে বাসটি সেখানে থামিয়ে দিয়ে আর যেতে দেয়নি।
ছাত্রীরা জানায়, রোববার দ্বাদশ শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষে ছাত্রীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে এক সঙ্গে ৩৮ জন ছাত্রীকে কলেজ বাসযোগে পাঠানো হয়। দুপুর ১২টার দিকে ছাত্রীদের বহনকারী বাসটি সাইনবোর্ড এলাকা পার হওয়ার সময় হঠাৎ শ্রমিকরা থামিয়ে দেয়। এবং বাসের চালক মজিবর ও হেলপার জহিরুলকে বাস থেকে নামিয়ে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে পোড়া মবিল মেখে দেয় উচ্ছৃঙ্খল পরিবহন শ্রমিকরা।
এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে কয়েকজন ছাত্রীকেও কালি লেপে দেন শ্রমিকরা। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেন। পরে বাসের কয়েকটি গ্লাস ভাঙচুর করে বাস থেকে সবাইকে নামিয়ে দেয়া হয়।
বাসটির চালক মজিবর রহমান বলেন, বাসটিতে ৩৮ জন ছাত্রী ছিল। তারা সবাই সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যয়নরত। ছাত্রী বহনকারী বাসটি সাইনবোর্ড এলাকায় এলেই হামলা করে বাসের গ্লাস ভাঙচুর করে শ্রমিকরা। পরে ছাত্রীদের গায়েও কালি মাখিয়ে দেয়। নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ বেদৌরা বিনতে হাবিবা বলেন, আমাদের বাসের চালক মজিবর আমাকে ঘটনাটি জানিয়েছে। পরিবহন শ্রমিকরা বাসের কয়েকটি গ্লাস ভাঙচুর করেছে। এবং ছাত্রীদের গায়েও কালি দিয়েছে বলে জানালো। বাসটি ওখানেই রাখা হয়েছে, কলেজে ফিরলে বিস্তারিত জানতে পারবো।
এদিকে মহিলা কলেজের গাড়িতে হামলা ও ছাত্রীদের গায়ে কালি লেপনের ঘটনায় সর্বত্র নিন্দার ঝড় বইছে। এক ছাত্রীর কলেজ ড্রেসে কালির ছবি সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তার ছবির নিচে নিন্দা আর ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করছে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা।
সিদ্ধিরগঞ্জে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শ্রমিকদের: এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ শিমরাইল মোড়ে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়কে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পরিবহন শ্রমিকরা। এসময় তারা ৮ দফা দাবি আদায়ে বিক্ষোভ করে। তবে কর্মসূচি চলাকালে উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিকদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা। গাড়ি থামিয়ে গালমন্দ করে চালকের মুখে পোড়া মবিল মেখে দিয়েছে তারা। অনেকে আবার পরিবহন শ্রমিকদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছে। সকাল ৮টা থেকে শিমরাইল মোড় পরিবহন শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় বিপাকে পড়ে হাজার হাজার যাত্রী। শ্রমিকরা রাস্তায় সব ধরনের পরিবহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।
এ থেকে রেহাই পায়নি এম্বুলেন্সও। ছোট যানের মধ্যে রিকশা, মোটরসাইকেল, ইজিবাইকও বাধার মুখে পড়েছে। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে গণপরিবহন, বিশেষ করে বাসের অপেক্ষায় সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় হাজারো যাত্রীকে অপেক্ষা করতে দেখা  গেছে। বিভিন্ন এলাকায় অফিসগামী যাত্রীদের গাড়ির অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। অনেকে নিরুপায় হয়ে পায়ে হেটে গন্তব্যে রওনা দিয়েছে। কেউ বেশি ভাড়ায় রিকশা অথবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাচ্ছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে কাঁচপুর মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০টি স্পটে অবস্থান নেয় পরিবহন শ্রমিকরা। তারা কোনরকম যানবাহন চলাচল করতে  দেয়নি। অ্যাম্বুলেন্সও চেক করে তারা।
তবে রোগী থাকলে তারা অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু রোগী না থাকলে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখে। এমনকি মোটরসাইকেল, রিকশা-ভ্যানগাড়ি দিয়ে চলাচল করতে  দেয়নি। শ্রমিকরা মোটরসাইকেল, রিকশা, ভ্যানসহ যেকোন ধরনের পরিবহন দেখলেই ময়লা কাদা বা আলকাতরা ও পোড়া মবিল লাগিয়ে দিচ্ছে। এমনকি সাংবাদিকদেরও কোনরকম ছবি তুলতে দেয়া হয়নি। এক পর্যায়ে ছবি তুলতে গেলে কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক এক সাংবাদিকের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে।
প্রধানমন্ত্রীর পিএসের গাড়িও আটকে দিয়েছে শ্রমিকরা: গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিমরাইল মোড়ে প্রধানমন্ত্রীর পিএস সাজ্জাদুল হাসানের গাড়ি আটকে দেয় পরিবহন শ্রমিকরা। প্রায় আধা ঘণ্টা পর নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের টিআই (প্রশাসন) মোল্লা তাসলিম হোসেন শ্রমিকদের  সঙ্গে আলোচনা করে গাড়িটি ছাড়াতে সক্ষম হন।  শুধু তাই নয়, পুলিশের গাড়িও আটকে দেয় পরিবহন শ্রমিকরা।

মন্ত্রীর সংগঠনের ধর্মঘটে জিম্মি দেশ

গণপরিবহন চলাচল বন্ধ। সিএনজি অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলেও শ্রমিকদের বাধা। জরুরি প্রয়োজনে গাড়ি নিয়ে যারাই রাস্তায় নেমেছে মারমুখী শ্রমিকদের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। হয় গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে না হয় চালকের মুখে লাগিয়ে দেয়া   হয়েছে পোড়া মবিল। পরিবহন শ্রমিকদের নগ্ন হেনস্তা থেকে বাদ যায়নি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও। রোগীবহনকারী অ্যাম্বুলেন্সে মবিল মাখিয়েছে তারা। গতকাল সকাল থেকে দিনভর সারা দেশে ছিল অরাজক অবস্থা। সড়ক পরিবহন আইন বাতিলের দাবিতে পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে সকাল থেকে শুরু হয় ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট।
শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে ধর্মঘট হলেও ব্যক্তিগত গাড়ি, রপ্তানিসহ বিভিন্ন জরুরি সেবার যানবাহন আটকে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে পথে পথে। ধর্মঘটে অচল ছিল পুরো দেশ। লাখ লাখ মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের নামে এই ধর্মঘট ডাকে নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। মন্ত্রী এ সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি। পুরো দেশকে জিম্মি করে ধর্মঘট ডাকার বিষয়ে কোনো কথা বলেননি শাজাহান খান। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। এদিকে ফেডারেশনের পক্ষ থেকে রাতে ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। যদিও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন এই মুহূর্তে আইন পরিবর্তন সম্ভব নয়।
৮ দফা দাবিতে ধর্মঘট চলাকালে সকাল  থেকে সরকারি মালিকানাধীন বিআরটিসি’র কিছু সংখ্যক বাস ছাড়া কোনো গণপরিবহন রাস্তায় দেখা যায়নি। তবে বিভিন্ন রুটে ব্যক্তিগত গাড়ি, ভাড়ায় চালিত সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করতে দেখা গেলেও চালকরা দাবি করেন পথে পথে পরিবহন শ্রমিকরা তাদের হেনস্তা করেন। সকালে মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেছে, নাবিস্কো থেকে মহাখালী মোড় পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে বাসের সারি। পার্ক করে রাখা হয়েছে এসব গণপরিবহন। রাস্তায়, চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন শ্রমিকরা। যাত্রীরা আসছেন, হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তাদেরই একজন বিলকিস বেগম। দ্বিগুণ টাকায় সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ থেকে মহাখালী পৌঁছেন। সঙ্গে দুই শিশু সন্তান।
উদ্দেশ্য গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের বীরগঞ্জে যাবেন। শাশুড়ি অসুস্থ। এতটা পথ গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। বিলকিস বলেন, ‘গরিব মানুষ। বিপদে পড়ে গেছি। এখন কেমনে কি করি। গাড়ি তো ছাড়বে না।’ কথা বলছিলেন আর অসহায় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলেন তিনি। তারপর সিএনজি অটোরিকশাতে করেই ফিরে যান তিনি। রিকশা থেকে নেমে দ্রুত এনা পরিবহনের কাউন্টারে ছুটে যান শরণ। বাসের কাউন্টার বন্ধ। ফোনে কল দিলেও রিসিভ করছে না কেউ। শরণ সোমবারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে চট্টগ্রামে যাবেন। টিকিট কেটে রেখেছিলেন বেশ আগেই।
শনিবার যখন জানতে পারলেন শ্রমিকরা ধর্মঘট ডেকেছে ঠিক তখনই ওই পরিবহন সার্ভিসের ফোন নম্বরে যোগাযোগ করেন। শরণ জানান, কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়েছেন, টিকিট বাতিল করা হয়নি। তাই গাড়ি ছাড়তে পারে। তাদের কথায় আশ্বস্ত হয়েই গতকাল ফার্মগেট থেকে দুপুরে মহাখালী ছুটে যান তিনি। এখন কি করবেন জানতে চাইলে শরণ বলেন, কি করবো বুঝতে পারছি না। ট্রেনে দাঁড়িয়ে যাওয়া যায় কিনা চেষ্টা করবো। এ ছাড়া উপায় নেই। পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবো কিনা বুঝতে পারছি না। কথা বলার সময় তার চোখ ছলছল করছিলো। ধর্মঘট জানার পরও বাসস্ট্যান্ডে গিয়েছিলেন নিকেতনের লুৎফর রহমান। তিনিসহ বেশ কয়েক জন যাবেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে। সোমবারে তার চাচাতো ভাইয়ের বিয়ে। চাচাতো ভাইয়ের অভিভাবক বলতে লুৎফর রহমান। না গিয়ে উপায় নেই। পরিবহন শ্রমিকদের কাছে বারবার জানতে চাচ্ছিলেন, গাড়ি কখন ছাড়বে, ধর্মঘট কী আজ শেষ হবে না? লুৎফরসহ বিভিন্ন যাত্রীদের এরকম নানা প্রশ্নে বিরক্ত হচ্ছিলেন শ্রমিকরা।
বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছেন শ্রমিকরা। কেউ কেউ অলস সময় কাটাচ্ছিলেন চায়ের দোকানে। বাসস্ট্যান্ডে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিলেন। সাংবাদিক পরিচয় জানতে পেরে ভিড় করেন তারা। শ্রমিকরা বলেন, আমরা শ্রমিক। জরিমানা দেব, জেল খাটবো। এটা হবে না। এসব আইন মানি না। শ্রমিকদের মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটের ইমাম পরিবহনের সুপারভাইজার শামীম শেখ বলেন, দেশের মানুষ কী সব শিক্ষিত হয়ে গেছে, যে অষ্টম শ্রেণি পাস ছাড়া গাড়ি চালানো যাবে না। আমরা গরিব মানুষ। লেখাপড়া করতে পারিনি। ভাতা জুটে না ঠিকমতো, লেখাপড়া করবো কীভাবে? এখন যদি গাড়ি চালাতে অষ্টম শ্রেণি পাস হতে হয় তাহলে না খেয়ে মরতে হবে আমাদের। পাঁচ বছরের জেল-জরিমানা থাকলে কেউ গাড়ি চালাবে না।
এই আইন পরিবর্তন করতে হবে বলে দাবি করেন এই শ্রমিক। মহাখালী, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, শাহবাগ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে কোথাও কোনো গণপরিবহন নেই। বৃদ্ধা মাকে ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন এক তরুণী। বাংলামোটর এলাকায় কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি জানান, তালতলায় দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কোনো গাড়ি পাননি। মা অসুস্থ। তাকে ঢাকা মেডিকেলে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর কথা। এতদূরে রিকশায় যাওয়া সম্ভব না। তাই বাধ্য হয়েই ভ্যানে উঠেন। তবে অনেককেই দেখা গেছে, পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে। রাজধানীর রাস্তাগুলো ছিল ফাঁকা। প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও রিকশা-অটোরিকশা ছাড়া কোনো গণপরিবহনের দেখা মিলেনি।
সকাল থেকেই যাত্রাবাড়ী মোড়ে অবস্থান নেন ওই এলাকার পরিবহন শ্রমিকরা।
সেখান থেকে কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে তারা ডেমরা, পোস্তগোলা, দয়াগঞ্জ, চিটাগাং রোডে অবস্থান নেন। এসময় তারা ওইসব সড়কে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, ব্যাটারিচালিত রিকশা, মোটরসাইকেলের ওপর হামলা করেন। পোড়া মবিল লাগিয়ে দেন গাড়ি ও চালকের শরীরে। এ ছাড়া নানাভাবে করেন হেনস্তাও। কেউ কেউ গাড়িতে লাথি-ঘুষি দিয়ে ভেঙে দেন প্রাইভেট গাড়ির হেডলাইটসহ নানা যন্ত্রাংশ। শ্রমিকদের হাতে-পায়ে ধরেও রেহাই পাননি অনেকে। সারা দিনই বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিকরা। দুপুরের দিকে যাত্রাবাড়ী থানা থেকে ১০০ গজ দূরে চিটাগাং রোডে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রমিকরা একের পর এক প্রাইভেট গাড়ির যাত্রী ও চালকদের হেনস্তা করছিলেন।
খিলগাঁও থেকে আসা ঢাকা মেট্রো থ-১৩-১৯৪০ নম্বরের একটি সিএনজিকে আটকে তারা ভাঙচুর করেন। লাথি দিয়ে দুমড়ে মুচড়ে দেন সিএনজিটিকে। এসময় শ্রমিকরা ওই চালকের পুরো শরীর মবিল দিয়ে লেপ্টে দেন। তার কিছুক্ষণ পর ঢাকা মেট্রো গ-১৭-৭৩৭৩ নম্বরের একটি প্রাইভেট কারকে একইভাবে হেনস্তা করতে দেখা গেছে। বিকালের দিকে ডেমরা সড়কে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বহন করা একটি বাসের চালকের ওপর পোড়া মবিল ঢেলে দেয় শ্রমিকরা। এসময় শিক্ষার্থীরা শ্রমিকদের ওপর ক্ষেপে উঠেন। বিক্ষুব্ধ হয়ে তারা সড়কে অবস্থানরত শ্রমিকদের ধাওয়া করেন। ধাওয়া খেয়ে শ্রমিকরা সেখান থেকে পালিয়ে যান। শ্রমিকরা পালিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীরা সড়কে আড়াআড়ি বাস দাঁড় করিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে সেখানে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ছাড়া পরিবহন ধর্মঘট থাকার কারণে সড়কে কোনো ধরনের বাস চলাচল না থাকায় সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি ছিল চরমে। যাত্রাবাড়ী মোড়ে হাজার হাজার যাত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। অনেকে জরুরি প্রয়োজনে বিভিন্ন স্থানে যেতে চাইলেও কোনো পরিবহনের দেখা পাননি। বিকল্প হিসেবে রিকশা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে। জরুরি কাজে মিরপুর যাওয়ার জন্য যাত্রাবাড়ী মোড়ে দাঁড়িয়েছিলেন আশরাফি সুলতানা। তিনি বলেন, এ কেমন ভোগান্তি শুরু হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছি তবুও একটাও বাসের দেখা পেলাম না। এখন এতদূর রিকশা নিয়ে যাওয়ার উপায় নাই। আবার না গেলেও হবে না। অনেক সিএনজিকে সিগন্যাল দিয়েছি। তারা মিরপুর যেতে অনেক ভাড়া চায়। অসুস্থ রোগী দেখতে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে কোনো বাস পাননি যাত্রাবাড়ীর সোহেল হায়দার। পরে ৪০০ টাকা খরচ করে তিনি বিশ্বরোড পর্যন্ত একটি সিএনজি ভাড়া করেন। নারায়ণগঞ্জ যাবার জন্য বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মানিকনগরের আয়েশা খাতুন ও তার ছোট দুই সন্তান। মানিকনগর থেকে রিকশা করে এসে পৌঁছান যাত্রাবাড়ী। সেখানে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। রিকশা করেও এতদূর যাওয়া সম্ভব নয়। পরে তিনি বাধ্য হয়েই ফিরে যান বাসায়।  
এদিকে গতকাল সকাল থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কোনো দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যেতে দেখা যায়নি। টার্মিনাল ও তার আশেপাশের সকল সড়কে সারিবদ্ধভাবে বাস পার্কিং করে রাখা হয়েছিলো। শ্রমিকরা তখন বিভিন্ন সড়কে দলবেঁধে ধর্মঘট পালন করছিলেন। আর বাস টার্মিনালের বাসের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় শত শত যাত্রীকে। শাহ আলম নামের এক যাত্রী বলেন, প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে সপরিবারে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। জরুরি কাজে পরিবার নিয়ে সিলেট যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এখানে একটি বাসের কাউন্টারও খোলা নাই। কি করে সিলেট যাবো জানি না। ভৈরবগামী আরেক যাত্রী সোহেল মিয়া জানান, কয়েক ঘণ্টা ধরেই এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কোনো বাস ছাড়ছে না। শুনেছি সকাল থেকে একটাও বাস ছেড়ে যায়নি।
একই চিত্র দেখা গেছে, রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে। দিনভর সেখান থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়ে পরিবহন শ্রমিকরা কোনো যানবাহন চলতে দেয়নি। ওই এলাকায় সিএনজি অটোরিকশা ও লেগুনা চলাচলেও বাধা দেয় শ্রমিকরা।

ধর্মঘটের নেপথ্যে কারা by শাহেদ শফিক

পরিবহন ধর্মঘটে মহাখালী বাস টার্মিনালের চিত্র
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ আট দফা দাবিতে দেশজুড়ে শ্রমিকদের ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট চলছে। এই ধর্মঘটে জনদুর্ভোগের পাশাপাশি নানা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। সরকারের শেষ মুহূর্তে এমন ধর্মঘট পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সরকারের কেউ কেউ বিশৃঙ্খলাসহ সহিংসতা ঘটালে কঠোর হাতে দমনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। তবে এর নেপথ্যে সরকার ও সরকারবিরোধীদের শ্রমিক নেতারা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও ধর্মঘট আহ্বানকারী সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশন বলছে, তাদের এই দাবি ন্যায়সংগত। তারা কোনও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চান না। সরকারবিরোধী কোনও শক্তিরও হাত নেই এতে।
তবে সরকারপন্থী বেশ কয়েকটি সংগঠনের অভিযোগ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেড়ারেশনের অধিকাংশ নেতাই বিএনপি আর জামায়াতের। এদের সঙ্গে সরকারের একজন মন্ত্রীসহ কিছু স্বার্থন্বেষী লোকও জড়িত। তারা দেশকে অচল করতে এবং সরকারের উন্নয়ন কাজকে বাধা দিতে সরকারের শেষ মুহূর্তে সংসদ নির্বাচনের আগে এমন কর্মবিরতি আহ্বান করে সরকার ও জনগণকে জিম্মি করে ফায়দা লুটতে চায়। যদিও এই সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সরকারের নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তিনি এর কার্যকরী সভাপতি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হানিফ খোকনের অভিযোগ, ‘অতীতে শ্রম আইন পরিপন্থী ধর্মঘট ডেকে যারা সরকারকে জিম্মি করতে চেয়েছিল, সেই একই চক্র আজকে পরিবহন খাতে কর্মবিরতি ডেকেছে। এই চক্রটিতে কারা আছে, কাদের নির্দেশে কর্মবিরতি চলছে তা সবাই জানে। পরিবহন শ্রমিকদের এই সংগঠনের বেশিরভাগ নেতাই বিএনপিপন্থী। তাই সংগঠনটি সরকারকে অচল করতে এমন কাজ করছে। এই সংগঠন শ্রম আইন, নীতি কিছুই মানে না। তাছাড়া আন্দোলনের নামে সাধারণ যাত্রী ও প্রাইভেটকার চালকদের মুখে পোড়া মবিল মেখে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এটা ফেডারেশনের নেতাদের ইন্ধনেই ঘটেছে। তারা একজন ক্ষমতাধর মন্ত্রীর ওপর ভর দিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চায়।
শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে বন্ধ রয়েছে বাস চলাচল 
শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে বন্ধ রয়েছে বাস চলাচল
জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি শাজাহান খান, তিনি সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রী। সহসভাপতি-১ আব্দুর রহিম বক্স দুদু, তিনি জাতীয়বাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সম্পাদক এবং খুলনা মহানগর শ্রমিক দলের সেক্রেটারি। সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা। যুগ্ম-সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সহকারী। ফেড়ারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করম আলী দোহার থাকা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। কার্যকরী কমিটির সদস্য- ইসমাইল হোসেন ফলিক জামায়াত সমর্থিত বলে জানা গেছে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক মুখলেসুর রহমান এক সময় ফ্রিডম পার্টির সদস্য ছিলেন। ফেড়ারেশনের সহ-সভাপতি আব্দুল ওদুদ নয়ন সিপিডির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সহ-সভাপতি আব্বাস উদ্দিন সাভার থাকার বিএনপির সভাপতি বলে জানা গেছে।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফেড়ারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমি ও শাজাহান খান দীর্ঘ ৪০-৪৪ বছর ধরে এই শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। অনেকেই অভিযোগ করতেই পারে। শাজাহান খানকেও বিএনপি বানিয়ে দিতে পারে। কেউ বলতো তো করার কিছু নেই। আমরা শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করছি। শ্রমিকের ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে আছি এবং থাকবো। আমাদের কর্মবিরতি শ্রমিকদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য।  যে বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে আমাদের ৮ দফার মধ্যে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এই আন্দোলনের সঙ্গে ফেড়ারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান সম্পৃক্ত আছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি কার্যকরী সভাপতি হিসেবে সংগঠনের সিদ্ধান্তগুলো জানেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তার একার বিরোধিতায় তো আর হবে না। এখানে সংগঠনের অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন এবং সরকারেরও প্রতিনিধিত্ব করছেন।
শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে বিপাকে যাত্রীরা 
শ্রমিক ধর্মঘটের কারণে বিপাকে যাত্রীরা
সরকারপন্থী বিভিন্ন সংগঠন ফেডারেশনের অধিকাংশ নেতাকে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী বলছে। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, যারা এই অভিযোগ করছেন তারা বিএনপি জামায়াতের তাণ্ডবের সময় কোথায় ছিলেন? আমরা তো রাস্তায় ছিলাম। এখন বিষয়টা হচ্ছে সংগঠন একটা খুলে একটা সংবাদ সম্মেলন করে অনেক অভিযোগ করা যায়। কিন্তু রাস্তায় তাদেরকে দেখা যায় না। এরাই রিকশা এবং ভ্যানগাড়ির লাইসেন্স বিক্রি করে চলে।
এদিকে রবিবার সকালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মো. ইনসুর আলী অভিযোগ করে বলেন, আগামী নির্বাচন উপলক্ষে যখন দেশে উৎসবমুখর নির্বাচনি প্রচারণা চলছে ঠিক তখনই বিএনপি জামাতের মদদপুষ্ট সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন কর্মবিরতির নামে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনি পরিবেশ অশান্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। গতকাল (২৭ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে পরিবহন শ্রমিক সমাবেশের নামে যারা বক্তব্য রেখেছেন তারা অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ওই মিটিংয়ে ফেডারেশনের সভাপতি জনাব ওয়াজ উদ্দিন খানের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হননি।
প্রাইভেট, কার ও রিকশার দখলে রাজপথ 
প্রাইভেট, কার ও রিকশার দখলে রাজপথ
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন যাবত এই তথাকথিত নেতারা পরিবহন শ্রমিকদের ব্যবহার করে নিজেদের আখের গুছিয়েছেন। পরিবহন শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কখনও কোনও কর্মসূচি গ্রহণ করে নাই। যার ফলে কিছুদিন আগে বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ ফেডারেশনের তথাকথিত নেতাদের পরিত্যাগ করে নিজেরাই আন্দোলন সূচনা করেছিল এবং সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী ধারা-উপধারা শিথিল করার আশ্বাস দেন। যেখানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের তথাকথিত নেতারা সংযুক্ত ছিল না। যার ফলে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য আজ থেকে ৪৮ ঘণ্টা কর্মবিরতির নামে ধর্মঘট ডেকে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার পাঁয়তারা করছে।
এর আগেই প্রায় একই দাবিতে গত ৮ অক্টোবর ঢাকা বিভাগের জেলাগুলোতে পণ্যপরিবহন ধর্মঘট আহ্বান করে বাংলাদেশ পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। কিন্তু তখন ওই ধর্মঘটে ফেডারেশনের নেতাদের সমর্থন ছিল না।

Monday, October 8, 2018

ধর্মঘটে বন্ধ পণ্যপরিবহন, ইলিয়াস কাঞ্চনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা

সড়ক পরিবহন আইনের সংশোধনসহ সাত দফা দাবি আদায়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য পণ্য পরিবহন ধর্মঘট চলছে। ‘পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’র ডাকে গতকাল সকাল থেকে এ পণ্য পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়। এসময় রাজধানীর ফুলবাড়িয়া টার্মিনালে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন (নিসচা)’র চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। পরিবহন  মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতারা এ ঘোষণা দেন।
রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাস চাপায় নিহতের ঘটনায় দেশব্যাপী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ওই দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারা দেশের বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভে একাত্মতা প্রকাশ করে তাদের পাশে ছিলেন চলচ্চিত্রের নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় জড়িত শ্রমিকদের সর্বোচ্চ সাজা দাবি করেন তিনি।  এর প্রেক্ষিতে ‘পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’র ওই সমাবেশ থেকে চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি সাদিকুর রহমান হিরুর সভাপতিত্বে সমাবেশে সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনসহ সাত দফা দাবি মেনে নিতে সরকারকে আগামী ১২ই অক্টোবর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়। অন্যথায় ১৩ই অক্টোবর  থেকে সারা দেশে লাগাতার পরিবহন ধর্মঘটের হুঁশিয়ারি দেন নেতৃবৃন্দ।
‘পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’র আহ্বায়ক মকবুল আহমদ বলেন, মৃত্যুপরোয়ানা মাথায় নিয়ে শ্রমিকরা রাস্তায় পণ্যবাহী গাড়ি চালাবে না। কোনো শ্রমিক ইচ্ছা করে রাস্তায় মানুষ মারে না। অনেক কারণে সড়ক দুর্ঘটনা হতে পারে। এ জন্য শুধু শ্রমিককে ফাঁসি বা জেল দেয়ার বিধান মানা হবে না।
সমাবেশে সাত দফা দাবি জানানো হয়। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংশোধন করাসহ তাদের অন্যান্য দাবিগুলো হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০২ ধারায় মামলা গ্রহণ না করা, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান বাতিল ও জামিনযোগ্য ধারায় মামলা করা, টাঙ্গাইল জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সদস্য হাসমত আলীসহ মালিক ও শ্রমিক মুক্তি, পুলিশের হয়রানি বন্ধ করা, গাড়ির কাগজপত্র চেকিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ট্রাক টার্মিনাল বা স্ট্যান্ড নির্মাণ করা, গাড়ির মডেল বাতিল করতে হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেয়া, সহজ শর্তে ভারী যানবাহন চালককে ভারী লাইসেন্স দেয়া ও এর আগ পর্যন্ত হালকা বা মধ্যম লাইসেন্স দিয়ে ভারী যানবাহন চালানোর সুযোগ দেয়া, সারা দেশে গাড়ির ওভারলোডিং বন্ধ করা এবং ফুটপাথ, ওভারব্রিজ, আন্ডারপাস ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করা। এসব দাবি মেনে নেয়া হলে আগামীতে যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করা হবে পরিবহন মালিকরা জানান।
তার আগে শনিবার রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালে এক সমাবেশে পণ্য পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয় সংগঠনটি। ওই সমাবেশে ‘পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ’র নেতৃবৃন্দ বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় পণ্যবাহী গাড়ি চলবে না। আর দাবি মেনে নেয়া হলে আগামীতে যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করা হবে বলে ঘোষণা দেন তারা।

Friday, June 11, 2010

ধর্মঘট ও জনদুর্ভোগ -আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত

শুক্রবার সকাল থেকে হঠাৎ আংশিক নৌ-ধর্মঘট শুরু হয়। রোববার থেকে শুরু হয় পেট্রলপাম্প মালিক-শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট। ইতিমধ্যে পেট্রলপাম্প ধর্মঘট স্থগিত করা হয়েছে এবং হয়তো অচিরেই নৌ-ধর্মঘটের অবসান হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি হবে, তা অবর্ণনীয়। এর আগে ১৬ থেকে ২০ মার্চ নৌ-ধর্মঘট হয়েছে। এরপর শ্রমিক-মালিক ও সরকারপক্ষের মধ্যে আলোচনায় একটা মীমাংসা হয়। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে বেতনকাঠামো নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। মূলত মালিক ও শ্রমিকপক্ষের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত ছিল। আলোচনা ফলপ্রসূ করার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু সেটা হবে নিতান্তই সহায়তাকারীর ভূমিকা।
কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সরকার নিজেই মূল সিদ্ধান্তকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, শ্রমিকদের বেতন ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ, বাড়িভাড়া ১৩৩ শতাংশ ও ধোলাই-ভাতা ১৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এ মজুরিকাঠামো ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এবং এটা পাঁচ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে বলে জানানো হয়েছে। শ্রমিকেরা এতে সন্তুষ্ট নন। বেতন-ভাতা এত বাড়ানোর পরও যদি সেটা যথেষ্ট না হয়ে থাকে, তাহলে আরও আলোচনা করা যেত। কিন্তু তা না করে সরকার পুলিশি ব্যবস্থা নিতে গেল কেন? সরকারি দলের সমর্থক শ্রমিকদের সাহায্যে ধর্মঘট ভাঙার চেষ্টা করে হয়তো আংশিক লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থা করা সম্ভব, কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়।
বেতন-ভাতা কত শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, সেটা বড় কথা নয়। এ বৃদ্ধির ফলে শ্রমিকদের মোট প্রাপ্তি কত এবং সেটা চলতি বাজারদরে একটি পরিবারের মোটামুটি খেয়ে-পরে চলার মতো কি না, তা দেখতে হবে। এখানে বল প্রয়োগ পরিস্থিতিকে খারাপের দিকেই ঠেলে দেবে। মন্ত্রী মহোদয়ের কথায় মনে হয়, সরকার একটি পক্ষ নিয়ে কথা বলছে। মন্ত্রী বলছেন, চাপ দিলে মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন, এর ফল ভোগ করতে হবে যাত্রীদের। এ ধরনের কথায় মালিকেরা ভাড়া বাড়ানোর অজুহাত পান। অযৌক্তিকভাবে ভাড়া যেন না বাড়ানো হয়, সেটা সরকারকেই দেখতে হবে। একই সঙ্গে ভাড়া কম বা আয় কম—এ ধরনের কথা বলে শ্রমিকদের যেন অযৌক্তিকভাবে কম মজুরিতে শ্রম দিতে বাধ্য করা না হয়, সেটাও সরকারকে দেখতে হবে।
বারবার ধর্মঘট শুধু যাত্রীদেরই ভোগায় না, শ্রমিকদেরও পথে বসায়। এ কথাটা শ্রমিকদের চেয়ে আর কেউ ভালো বোঝে না। তাই তাঁদের গ্রেপ্তার না করে বরং আলোচনার টেবিলে আনা দরকার। শ্রমিকদেরও বোঝা দরকার যে আলোচনার পথেই অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।
পেট্রলপাম্প মালিক-শ্রমিকদের ধর্মঘটের ব্যাপারটাও অনেকটা সে রকম। মূলত জ্বালানি তেল বিক্রির কমিশন বাড়ানোর কথা বলে তাঁরা ১২ এপ্রিল বলেছিলেন, দাবি না মানলে ধর্মঘট। তাঁদের অন্য কিছু দাবিও আছে। কিন্তু সরকার এত দিন কী করল? ধর্মঘট কেন অবধারিত করে তোলা হলো? পেট্রলপাম্প বন্ধ মানে বাস-ট্রাকসহ সব ধরনের যানবাহনের একটি বড় অংশই বন্ধ। এতে যে শুধু জনদুর্ভোগই বাড়ে তা নয়, পণ্য পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হয়। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে।
পরিবহন খাতে কোনো ধরনের ধর্মঘট কাম্য নয়। আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে।

Friday, March 19, 2010

নৌযান ধর্মঘট

২২ দফা দাবিতে গত সোমবার রাত থেকে দেশের নৌযান শ্রমিক-কর্মচারীরা যে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছেন, তা দেশজুড়ে বিভিন্ন নৌরুটে বিপুল মানুষের চরম দুর্ভোগের কারণ হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে নৌযানের মালিক বা শ্রমিক-কর্মচারী কোনো পক্ষ থেকেই এই জনভোগান্তি সম্পর্কে সংবেদনশীলতার আভাস পাওয়া যায়নি।
বেতন-ভাতা বাড়ানো, নতুন বেতনকাঠানো ঘোষণা, নৌ-নিরাপত্তা বাড়ানো, নৌযানে মাস্টার-চালকদের সনদের মেয়াদীকরণ, মেরিন আইনের সঠিক বাস্তবায়নসহ মোট যে ২২ দফা দাবিতে নৌযান শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি চালাচ্ছেন, সেসবের মধ্যে বেতন-ভাতা বাড়ানোর দাবিটি নিশ্চয়ই বিবেচনার যোগ্য। কারণ দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়েছে। ধর্মঘট শুরুর আগেই উভয় তরফে দুপক্ষের আলোচনায় বসার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। তা তো হয়ইনি, বুধবার পর্যন্তও তাদের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগাযোগের খবর পাওয়া যায়নি। নৌমন্ত্রী মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের কাছে মন্তব্য করেছেন, আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষ সমঝোতায় যেতে পারে, কিন্তু তারা তা করছে না, ফলে দুর্ভোগ হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
নৌযান মালিকদের পক্ষ থেকে ধর্মঘট পালনকারী শ্রমিক-কর্মচারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি বলে শ্রমিকদের তরফে বলা হয়েছে। এটা যদি সত্য হয়, তাহলে কি বুঝতে হবে, মালিকেরা শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘটে মোটেই বিচলিত নন? কিন্তু এভাবে কি অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে? এদিকে খবরে বলা হচ্ছে, শ্রমিক-কর্মচারীদের একাংশ ধর্মঘটে যোগ দেয়নি। ধর্মঘট ডাকার প্রতিবাদে সদরঘাট নৌ-টার্মিনাল এলাকায় মঙ্গলবার বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা হয়েছে সরকারপন্থী নৌযান শ্রমিক লীগের উদ্যোগে। এটা যেন কোনো সংঘাত-সংঘর্ষের দিকে না এগোয়, সেদিকেও লক্ষ রাখা দরকার।
নৌমন্ত্রী পৃথকভাবে নৌযান মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলে খবরে প্রকাশ। এই মধ্যস্থতা দ্রুত ফলপ্রসূ হোক, এটাই কাম্য। উভয় পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে আলোচনায় বসতে পারলে ভালো হয়। একটা স্থায়ী সমঝোতার মধ্য দিয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা দরকার। আর ভবিষ্যতে এ ধরনের ধর্মঘটে যাওয়ার আগে বিপুলসংখ্যক মানুষের দুর্ভোগের বিষয়গুলো যেন ভালোভাবে বিবেচনা করা হয়।

Friday, March 12, 2010

প্রতিরোধের ভিত গড়ে দেয় যে ধর্মঘট এম আর মাহবুব



বাংলাদেশ এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে এ দেশের উপকূলের কাছাকাছি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে জানা গিয়েছে যে, দেশের ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচ দেওয়ার ফলে সেই পানিস্তর নেমে যাচ্ছে এবং সেটা এখন এমন পর্যায়ে যে আর্সেনিক দূষণযুক্ত এলাকাতে সেচের পানি বাহিত হয়ে আর্সেনিক সেখানে উৎপাদিত ধানের মধ্যেও প্রবেশ করেছে। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার অশনি সংকেতটিকে বিবেচনা করে কৃষি উন্নয়নের নতুন পথ, নতুনতর কৌশল এখন থেকেই বেছে নিতে হবে।
প্রত্যাশিতভাবেই সরকার এখন ধান বা খাদ্যশস্য উৎপাদনের নতুন পন্থার ওপর জোর দিচ্ছে। শীতকালীন, ভূগর্ভস্থ পানি বা সেচনির্ভর ধানের চেয়ে আমন মৌসুমে উপরিস্তরের পানির ওপর নির্ভরশীল ধানের চাষ বাড়ানোর ধারণাটি এখন সামনে এসেছে। কৌশল পরিবর্তনের এই ধারাটি অবশ্যই সুফল আনতে পারে। তবে শুধু আমন মৌসুমের ধান বা উপরিস্তরের পানির দ্বারা সেচ দিয়ে শস্য উৎপাদন করে এই দেশের খাদ্যশস্যের চাহিদা ৮০-৯০ শতাংশ মেটানো সম্ভব হবে কি না সন্দেহজনক। কাজেই এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের (যা কিনা বেড়ে দ্রুত দাঁড়াবে ২০ বা ২৫ কোটিতে) জন্য খাদ্য সংস্থান কীভাবে করা হবে সেই দুশ্চিন্তাটি এখন থেকেই করা দরকার।
বর্তমান খাদ্যনিরাপত্তা কিন্তু বিশেষভাবে ‘খাদ্যশস্য নিরাপত্তা’ হিসেবে আলোচিত হয়। কিন্তু এ পর্যায়ে এই সত্যটিকে মেনে নিতেই হবে যে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে কৃষিজমির সংকোচন ঘটতে থাকবে এবং এ রকম ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশের নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্যশস্যের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো দুরূহ হবে। সে ক্ষেত্রে শুধু খাদ্যশস্যভিত্তিক কৃষি উন্নয়নের পরিবর্তে বহুমুখী উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কৃষি উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এই পন্থা গ্রহণ করার বা সেটা প্রকাশ্যে আলোচনা করার জন্য একটু সাহসিকতার প্রয়োজন। এ ধরনের পরিবর্তন অবশ্যই সময়সাপেক্ষ এবং প্রথম দিকে ধীরগতিতেই এগোতে হবে। তবে এখনই কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, দোদুল্যমানতায় থাকলে বা কালক্ষেপণ করলে সমস্যা ক্রমশ আরও জটিল হয়ে উঠবে।
কৌশল পরিবর্তনের বিষয়টিতে অবশ্যই সতর্কভাবে অগ্রসর হতে হবে। কারণ এখানে জড়িয়ে আছে দেশের বিপুল নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি। আর যেসব অঞ্চলে আর্সেনিক সমস্যাটি গুরুতর সেগুলো দেশের দরিদ্রতর অংশ। সেখানে উৎপাদন বাড়ানোর সব ধরনের প্রচেষ্টা নেওয়া একটি জরুরি প্রয়োজন। অথচ সেসব এলাকাতেই নতুন সমস্যার উদ্ভব হলে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো বিশেষভাবে সংকটের মুখোমুখি হতে পারে। সুতরাং যেকোনো পরিবর্তনের শুরুতে তাদের জন্য নিরাপত্তা বেষ্টনী দৃঢ়তর করতে হবে।
২০০৭-০৮ সময়ে চালের মূল্যের দ্রুত ঊর্ধ্বগতি এবং খাদ্যশস্য সরবরাহ পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা থেকে খাদ্যনিরাপত্তা বিষয়ে কিছু অন্তর্দৃষ্টি পাওয়া গিয়েছে। তখন অনুধাবন করা গিয়েছে যে আমদানির ভিত্তিতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জটিলতা ঘটতে পারে। আংশিক আমদানি-সম্পৃক্ত খাদ্যনিরাপত্তার জন্য যে ধরনের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, খাদ্য কূটনীতি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ দরকার, সেখানে আমাদের দক্ষতা ও পারদর্শিতা এখনো বোধ হয় যথেষ্ট নয়।
কৃষি উন্নয়নের নতুন পথ ও কৌশল গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হবে।
১. ধান চাষ এবং অন্য ফসল বা প্রাণী-সম্পদ উন্নয়নে আর্থিক বিনিয়োগে যথেষ্ট পার্থক্য থাকবে। ক্ষুদ্র মাত্রায় অন্য খাদ্য উৎপাদনের কাজ হাতে নিতে যে আর্থিক বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধান চাষের চেয়ে বেশি হবে। আর জমির অনুপাত ধানের ক্ষেত্রে বেশি হবে।
২. প্রাণীজাত খাদ্য উৎপাদনের জন্য কৃষকের নিজস্ব জ্ঞানই যথেষ্ট নয়। এই বিষয়ে ন্যূনতম কিছু প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হবে। তার জন্য কিছু স্কুলশিক্ষা বা অন্তত হিসাবজ্ঞানের ভিত্তিও লাগবে।
৩. এসব উৎপাদন প্রক্রিয়াতে নতুন উপকরণ সবরাহ ও তার ব্যবস্থাপনার নিরবচ্ছিন্ন জাল পাতা থাকতে হবে।
৪. ধান চাষের চেয়ে প্রাণীজ খাদ্য উৎপাদনে ঝুঁকি বেশি হবে। সুতরাং ঝুঁকি কমানোর পন্থা নিতে হবে।
আজকাল নানাবিধ সবজি-ফল ইত্যাদি চাষের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সাফল্যের খবর আসছে। এসব সাফল্যকে আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
সবজি ও ফল টিনজাতকরণ শিল্পকে উত্সাহিত করতে হবে। তাতে কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঘটতে পারে। শুরুতেই বলা হয়েছে যে ধান চাষের তুলনায় অন্য খাদ্য উৎপাদনে আর্থিক বিনিয়োগ বেশি হতে হবে। সুতরাং ঋণ দেওয়ার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। দেশের বহুসংখ্যক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান নিশ্চয় এদিকটিতে লক্ষ রাখবে।
শস্য বাদে অন্য খাদ্যপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। তা হচ্ছে, সেসব খাদ্যের মান ও নিরাপদ সংরক্ষণপদ্ধতি। অতিতে বিভিন্ন খাদ্যে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর উৎপাদনের ঘটনা ঘটেছে। দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করতে হলে দেখতে হবে যে এগুলো সংরক্ষণ যেভাবে হচ্ছে তাতে সঠিক পুষ্টিগুণ বজায় থাকে কি না, বিপজ্জনক কোনো উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না। পশুখাদ্যের মান ও ব্যবহূত বিভিন্ন প্রতিষেধক ও পশু চিকিত্সাপদ্ধতি সঠিক কি না সেটাই বা কে দেখবে। চিংড়ি চাষে যেসব ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার হয়েছে তাতে চিংড়ি রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে সেগুলোই সুখাদ্য হিসেবে চলছে। এগুলো থেকে ক্ষতি হয়তো অল্পদিনে হবে না। কিন্তু এসব বিষক্রিয়া যখন পরস্ফুিট হবে, তখন বিপরীত দিকে যাওয়া কঠিনতর হবে।
আসলে এ দেশের ধনীশ্রেণীর পরিবারগুলো এসব বিপদ নানাভাবে পাশ কাটিয়ে চলে। যেমন, বিভিন্ন প্যাকেটকৃত তরল দুধে যখন ভেজাল ও মেলামিনযুক্ত গুঁড়ো দুধ মেশানোর অভিযোগ পাওয়া গেল, তার পর থেকে অনেক ধনী ব্যক্তি বিদেশ থেকে আমদানিকৃত প্যাকেটের তরল দুধ বেছে নিলেন। এসব কারণে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার উত্সাহ কমে যেতে পরে (যেমনটি ঘটেছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে চেষ্টার অভাবের ক্ষেত্রে, কারণ যাদের সংগতি আছে তারা তো সেখানে না গিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে বা বিদেশে যাচ্ছে এবং নীতিনির্ধারকও সেই শ্রেণীরই অন্তর্ভুক্ত)।
ধান বাদে অন্য খাদ্য উৎপাদন, শস্য বা অ-শস্য, যা-ই হোক, বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে শুরুতেই এসবের ভ্যারাইটি উন্নয়ন, মান উন্নয়ন, চিকিত্সাব্যবস্থা ও উপকরণের মান নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে। এ দেশের কৃষি গবেষণার সিস্টেমে যেসব প্রতিষ্ঠান, তাদের ভূমিকা সুস্পষ্ট করতে হবে এবং দায়বদ্ধতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উৎপাদনকারীদের সচেতন করতে হবে, যেন তারা দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বা উৎপাদন ব্যয় কমানোর জন্য ক্ষতিকর উপকরণ বা ক্ষতিকর পদ্ধতি ব্যবহার না করে। ভোক্তাদেরও এসব বিষয়ে সচেতন করতে হবে। নিয়মিতভাবে বাজারে চালু পণ্যের মান পরীক্ষা করার প্রথা থাকতে হবে।
এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে। এ দেশে মানুষ ও জমির অনুপাত খুব বেশি এবং কৃষিজমি যে হারে কমছে তা আশঙ্কাজনক। অকৃষি বা শিল্প উন্নয়নে কিছু না কিছু জমি লাগছে। তা ছাড়া প্রতিবছর নতুন পরিবারের জন্য বাসস্থান নির্মাণ হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই চলবে। কিন্তু এ বিষয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। কোন ধরনের জমি কী কাজে লাগানো যাবে তার নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একটি জরুরি কাজ।
আরও একধরনের ব্যবহারের জন্য জমির মালিকানা বদল হচ্ছে। যেসব অঞ্চলে ভালো সড়কপথ হচ্ছে, তার আশপাশের অধিকাংশ জমি এখন অ-কৃষকের হাতে। এসব জমি এখন আক্ষরিক অর্থেই সোনার চেয়ে দামি। সেগুলো বিলাস ও বিনোদনের জন্য ব্যবহূত ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে শোভা পাচ্ছে। এর ফলে কত যে কর্ম নিয়োজনের সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে, কত শস্য আলোর মুখ দেখল না, সেসব কথা কি কেউ ভাবছেন? এসব জমি অন্তত যদি শিল্প স্থাপনার জন্য ব্যবহূত হতো তাহলেও কিছু সুফল আনত। এই বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুত সামগ্রিক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় হাত দেওয়া প্রয়োজন।
শুরুতে যে কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে, সে বক্তব্যে ফিরে আসি। এ দেশের খাদ্যচাহিদা মেটাতে চালের পরিমাণ কমিয়ে অন্যান্য খাদ্য প্রাত্যহিক তালিকাতে ঢোকানোর চিন্তা করতে হবে। এটা শুধু চালের সাশ্রয়ের জন্য ও চাহিদা বৃদ্ধির গতি কমানোর জন্য নয়। এতে পুষ্টি সমস্যারও সমাধান হবে, বিশেষত শিশু ও মাতৃত্বকালীন পুষ্টি বাড়বে। তবে এই পথে দুটি বাধা: প্রথমত, এটা যে অধিকতর পুষ্টিকর সেই বিষয়টিতে জনগণের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি করা কঠিন এবং দ্বিতীয়ত, সর্বসাধারণের আয় বাড়ানো দরকার হবে, যাতে তারা অন্যান্য খাদ্য, বিশেষত প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য কেনার কথা ভাবতে পারে। আসলে দ্বিতীয়টি ছাড়া প্রথম পদক্ষেপ কার্যকর হবে না (বরং সেই রানির গল্পটিই সবার মনে পড়বে, যিনি সবাইকে রুটির পরিবর্তে কেক খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন)।
চালপ্রধান খাদ্য বিন্যাস এ দেশে চালু এ জন্য যে এটাই উদরপূর্তির সবচেয়ে কম ব্যয়সাধ্য উপায়। ‘ভেতো বাঙালি’ হয়ে ওঠা শুধু স্বভাবজাত কারণে হয়তো হয়নি। কাজেই অন্য খাদ্যের দিকে ঝুঁকতে বললে প্রশ্ন উঠবে, কেন আমরা ওগুলো কিনব অর্থাত্ ‘ভাত পাই না, আর বলে কিনা মাছ-মাংস কেনো—এ কী প্রহসন!’ সুতরাং অ-শস্য খাদ্য উৎপাদনের কৌশল হবে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে এই কাজে সম্পৃক্ত করা। তাতে তারা নিজেদের আয় বৃদ্ধি করবে এবং এসব পণ্যের উৎপাদনকারী হিসেবে এগুলো দৈনন্দিন খাদ্য তালিকাতে গ্রহণ করতে উত্সাহী হবে।
সাম্প্রতিক একটি গবেষণাতে দেখেছি, আয় একই রকম হলেও যেসব পরিবার চাল বেশি উৎপাদন করে, তাদের খাদ্যে চালের পরিমাণ বা ক্যালোরির পরিমাণ বেশি। অন্য খাদ্যের বেলায়ও একই বিষয় প্রযোজ্য হতে পারে।
এই প্রসঙ্গে একই গবেষণাতে অন্য একটি বিষয় বোঝা গিয়েছে। স্কুল পাঠ্য বইতে, বা স্কুলের শিক্ষাতে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সম্পর্কে জ্ঞান দেওয়া হয় খুব কম। স্কুল প্রায় শেষ হয়েছে এমন শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করে দেখা গিয়েছে, কোন খাদ্যে কী ধরনের পুষ্টিগুণ আছে, সেগুলো কেন খেতে হবে এসব সম্পর্কে তেমন কোনো জ্ঞান তারা অর্জন করেনি। সুতরাং স্কুল শিক্ষায় যেন এসব জ্ঞান বাড়ানোর বাস্তব বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয় সেদিকেও দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।
দেশ ও জাতির ক্রম অগ্রগতির জন্য প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়েই যেতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেলে শীতকালীন সেচনির্ভর ধানের পরিবর্তে অন্যান্য শস্য ও প্রাণী-সম্পদ উন্নয়ন, উপরিস্তরের পানি দিয়ে সেচ ইত্যাদি পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। তবে এই কারণে যেন নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে দৃষ্টি রেখে দীর্ঘমেয়াদের উন্নয়নকৌশল নির্ধারণ করতে হবে। আসলে এই ঘনবসতিপূর্ণ দেশে, যেখানে কৃষিজমি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, সেখানে একযুগ পরে শিল্প ও প্রশস্ত সেবা খাতনির্ভর একটি অর্থনীতি এবং সেই সঙ্গে শস্য ও অন্য খাদ্য উৎপাদনের একটি সমন্বিত পন্থাই হওয়া দরকার আমাদের লক্ষ্য।
ড. রুশিদান ইসলাম রহমান: অর্থনীতিবিদ। গবেষণা পরিচালক, বিআইডিএস।

Thursday, November 12, 2009

সময়মতো উদ্যোগ ধর্মঘট এড়াতে পারত -ভোগান্তির নৌপরিবহন ধর্মঘটের অবসান

যেকোনো পরিবহন ধর্মঘট নাগরিক জীবনে চরম ভোগান্তি ডেকে আনে। সোমবার নৌপরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের আগে হাজারো যাত্রী দুই দিন ধরে অবর্ণনীয় সমস্যার মুখে পড়েছিল। বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের একাংশের ডাকে রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের প্রথম দিন সারা দেশের নৌযোগাযোগ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্য ওঠানামা ও কর্ণফুলীর ১৬টি বেসরকারি ঘাটে পণ্য খালাস বন্ধ থাকে। অনেকে লঞ্চঘাটে এসে গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো বিকল্প না পাওয়ায় দুর্ভোগে পড়ে।
নৌযান শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, নতুন বেতনকাঠামো ঘোষণা, নৌপথে ডাকাতি বন্ধসহ নৌ-নিরাপত্তা বাড়ানো, মাস্টার-চালকদের সনদের মেয়াদীকরণ, মেরিন আইনের সঠিক বাস্তবায়নসহ ২২ দফা দাবিতে এ ধর্মঘট ডাকা হয়েছিল। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব দাবি আদায়ে শ্রমিক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন। কিন্তু এত দিনেও তাঁদের দাবিগুলোর বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় তাঁরা ধর্মঘটের মতো কর্মসূচি দিয়েছিলেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের এসব দাবি যৌক্তিক কি না তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু দেশবাসীকে ধর্মঘটের দুর্ভোগই নিতে হলো।
শ্রমিক-কর্মচারীরা বলছেন, দাবি মেনে নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে বেশ কয়েক দিন আগে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। আমাদের প্রশ্ন, এই সময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলো না কেন। ধর্মঘট ডাকার পর দুই দিন ধরে যে আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ দেখা গেছে, সেটা যদি আগে নেওয়া হতো তাহলে হয়তো শ্রমিকদের এ ধর্মঘট ডাকার প্রয়োজন পড়ত না; কর্তৃপক্ষ, নৌযানের মালিক ও শ্রমিক-কর্মচারী মিলে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতো এবং যাত্রীদেরও এ দুর্ভোগে পড়তে হতো না। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমরা আরও তত্পর দেখতে চাই।
জনসাধারণের ভোগান্তি ও দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে এ ধরনের ধর্মঘট যেন ভবিষ্যতে এড়ানো যায়, সে দিকে নজর দেওয়া জরুরি।