Showing posts with label সৈয়দ আবুল মকসুদ. Show all posts
Showing posts with label সৈয়দ আবুল মকসুদ. Show all posts
Saturday, March 5, 2016
মার্চেই ঘটে পাকিস্তানের পরাজয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ
স্বাধীনতার
আকাঙ্ক্ষা সব জনগোষ্ঠীরই সহজাত। একটি স্বাধীন সার্বভৌম বহুজাতিক
রাষ্ট্রের সব প্রদেশ বা প্রতিটি অংশই স্বাধীন। তাহলে একটি স্বাধীন
রাষ্ট্রের ভেতরের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডকে নতুন করে স্বাধীন করার জন্য
সেখানকার জনগণ চঞ্চল হয়ে ওঠে কেন? একটি অঞ্চলের জনগোষ্ঠী যখন দেখে তাদের
ন্যায়সংগত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রভৃতি অধিকার রাষ্ট্র হরণ
করছে এবং তারা হচ্ছে নির্মম অবিচার ও নিপীড়নের শিকার, তখন তাদের স্বশাসিত
বা স্বাধীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। উনিশ শ একাত্তর
খ্রিষ্টীয় অব্দের মার্চ মাসের প্রথম দিনই বাংলাদেশে তেমনটির প্রকাশ ঘটেছিল।
বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন ছিল বহু কালের, তার বহিঃপ্রকাশ বা
বিস্ফোরণ ঘটে একাত্তরের মার্চে।
কোনো রাষ্ট্রের কোনো একটি অংশের মানুষ স্বাধীনতা চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের স্বাধীনতা দিয়ে দেয়—এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্রের কোনো একটি অংশের মানুষ স্বাধীনতার দাবি তুললেই কেন্দ্রীয় সরকারের সশস্ত্র বাহিনী স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর হিংস্র শ্বাপদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র একটি খুঁজে পাওয়া যাবে। সেটি একাত্তরের বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক কালের পৃথিবীর অন্যান্য দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র একেবারেই আলাদা।ষাটের দশকে আমরা দেখেছি পৃথিবীর বহু জাতি সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম করছে; তাদের কেউ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, অনেকেরই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। অগণিত প্রাণ গেছে, কিন্তু স্বাধীনতা আসেনি। কেন আসেনি, তার কারণগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে ওই সব আন্দোলনে ত্রুটি ও দুর্বলতা ছিল। এবং সেগুলোতে স্বাধীনতা আন্দোলনের যৌক্তিকতার অভাব ছিল। আমাদের অনেক বিদ্বান ব্যক্তিরও বদ্ধমূল ধারণা যে সরকার নির্যাতন-নিপীড়ন খুব বেশি চালালেই এবং ব্যাপক রক্তপাত হলেই স্বাধীনতাপ্রাপ্তি খুব সহজ হয়। এই ধারণা ভিত্তিহীন।
ষাটের দশকে নাইজেরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তেলসমৃদ্ধ বায়াফ্রা প্রদেশ ‘বায়াফ্রা রিপাবলিক’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিল। একাত্তরের বাংলাদেশের মতো সেখানে অবর্ণনীয় গণহত্যা হয়। দুর্ভিক্ষে মানুষ মরে। স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক কিছু সমর্থনও পায়। কিন্তু স্বাধীনতা আসে না। আজও বায়াফ্রা নাইজেরিয়ার অংশ। মনে পড়ে একাত্তরে আমি রেডিও পাকিস্তানের সংবাদ ভাষ্যে শুনেছি, পাকিস্তানি রাজাকার আলবদর বিশ্লেষকেরা বলছেন: পূর্ব পাকিস্তানের নিয়তি হবে বায়াফ্রার মতো। তাঁদের অনুমান ও প্রত্যাশা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
পর্তুগিজ তিমুরের জনগণ ইন্দোনেশিয়া থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উত্তাল আন্দোলন করে। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অগণিত প্রাণ ঝরে পড়ে। স্বাধীনতা থাকে বহুদিনের জন্য সুদূরপরাহত। তুরস্ক, ইরান, ইরাক, গ্রিস প্রভৃতি দেশের কুর্দিরা কতকাল থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র চাইছে। তারা একটি প্রাচীন জাতি। আজও তাদের সংগ্রাম চলছে, তারা স্বাধীনতা পায়নি। বর্তমান জায়ার বা কঙ্গো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক থেকে কাতাঙ্গা বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল। প্যাট্রিস লুমুম্বা কাতাঙ্গার বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ দিলেন। স্বাধীনতা এল না।
কানাডার ফরাসি ভাষাভাষী অঞ্চল কুইবেকের স্বাধীনতার দাবি উঠেছে। তবে সে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ। কাতালান ও বাস্ক ভাষাভাষীরা স্পেনে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র চায়। ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হতে স্কটল্যান্ড গণভোট করছে। হয়তো শান্তিপূর্ণ উপায়েই একদিন স্বাধীনতা পাবে। এ রকম দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বহু আছে।
কসোভো স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। স্বাধীনতা অত সোজা জিনিস নয়। ছেলের হাতের মোয়া তো একেবারেই নয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে, গণতান্ত্রিক উপায়ে, গায়ের জোরে নয়। বাংলাদেশও স্বাধীনতা অর্জন করে জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী, তবে সীমাহীন রক্ত ও নির্যাতনের বিনিময়ে। যদি ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচন হয়ে থাকে পাকিস্তানের জন্য গণভোট, তাহলে ২৪ বছর পর আর একটি সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে; এই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা বা স্বাধীনতার জন্য গণভোট।
১৯৭০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানের প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক শাসকগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সামান্যতম আস্থা থাকলে ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই অধিবেশন বসিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করত। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে
আমি বহুবার ভেবে দেখেছি, পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সংকট ১৯৭০ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই সমাধান হতে পারত কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তা ঝুলিয়ে রাখে ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিকেল পর্যন্ত।
সব সংগ্রাম ও যুদ্ধেরই দুটি দিক। একটি সামরিক ও আরেকটি নৈতিক। কোনো পক্ষ সামরিকভাবে বিজয়ী হলেও নৈতিকভাবে পরাজিত হয়। কেউ শক্তি পরীক্ষায় হেরে গেলেও নৈতিকভাবে জয়লাভ করে। পাকিস্তান একাত্তরে সামরিক ও নৈতিক দুভাবেই পরাজিত হয়। পাকিস্তান নৈতিকভাবে শেষ হয়ে যায়; তার নৈতিক পরাজয় ঘটে ’৭১-এর ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১ মিনিটে। তার সামরিক পরাজয় ঘটে ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাসের চত্বরে। ওই পরাজয়ের গ্লানি থেকে সে বাঁচতে পারত যদি ২৫ মার্চের মধ্যে কোনো একদিন বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা দিয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে গিয়ে উড়োজাহাজে উঠে ইয়াহিয়া খান ইসলামাবাদ চলে যেতেন। সে পরামর্শই টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষের বুড়ো সারা মার্চ মাস ইয়াহিয়াকে দিয়েছেন: মাউন্টব্যাটেন যেমন জিন্নাহ-নেহরুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, সেভাবে আপনিও মুজিবের হাতে ক্ষমতা দিয়ে হ্যান্ডশেক করে চলে যান। তা না করলে বাংলাদেশের মানুষ যা করার তা-ই করবে।
সত্তরের নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গ্রেপ্তার হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু একজন অবিচল গণতান্ত্রিক নেতার মতো অতি সংযত আচরণ করেছেন। তাঁর ওই তিন মাসের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক। অন্যদিকে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার প্রতিটি কাজ ছিল অগণতান্ত্রিক ও ষড়যন্ত্রমূলক। একাত্তরে বাংলাদেশে মানুষ ছিল সাড়ে সাত কোটির মতো। তাদের মধ্যে যাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক ও ভোটার ছিলেন এবং যাঁদের সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদের দেড় কোটির মতো মানুষ এখনো বেঁচে আছেন। আমি তাঁদের একজন। কী রকম ছিল সেই একাত্তরের মার্চ, তা এখন যাদের বয়স ষাটের নিচে, তাদের বোঝাতে পারব না।
একাত্তরের পয়লা মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন হোটেল পূর্বাণীতে তাঁর দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক করছিলেন, তখনই ইয়াহিয়া খান রেডিওতে পাকিস্তানের মৃত্যুপরোয়ানা পাঠ করেন। আমি কী এক কাজে বা বিনা প্রয়োজনেই সিকান্দার আবু জাফরের সমকাল পত্রিকার অফিসে বসে ছিলাম। রাস্তায় শোরগোল শুনতে পেয়ে বেরিয়ে শিল্প ভবনের গোলচত্বরের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তখন এত সংবাদপত্রও ছিল না, টিভি চ্যানেল শব্দটাই কেউ শোনেনি, এত সাংবাদিকও ছিলেন না। হাঁটতে হাঁটতে বিমান অফিসের সামনে যাই। বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের অল্প কিছু বক্তব্য দিয়ে ‘অপেক্ষা’ করতে বলেন। পরে তাঁর হরতাল ও অসহযোগের ঘোষণা আসে।
ইয়াহিয়ার সংসদ অধিবেশন মুলতবির ঘোষণার পর মানুষ বুঝে যায় পঞ্চনদীর দেশ পাকিস্তান তাদের নয়, তাদের ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। পনেরো-কুড়ি মিনিটের মধ্যে ঢাকার চেহারা বদলে যায়। স্তব্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাস, মোটরগাড়ি, রিকশা রাস্তা থেকে সরে যায়। মানুষ নেমে পড়ে রাস্তায়। তখন অল্প কয়েকটি বাড়িতে গ্যাস–সংযোগ ছিল। রান্নাবান্না হতো কেরোসিন ও লাকড়িতে। বিভিন্ন জায়গায় লাকড়ির দোকান ছিল। মণ দরে বিক্রি হতো। অনেক মানুষ দোকান থেকে লাকড়ি হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পাকিস্তানবিরোধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান দেয়। ওই লাকড়ি বা লাঠি ছিল সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতীকী অস্ত্র—মেশিনগান, কামানের সঙ্গে লড়াইয়ের হাতিয়ার।
পাকিস্তানি জান্তা শিশু, বৃদ্ধ, নারীসহ লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে। ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে কোটি খানেক মানুষকে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আধুনিক অস্ত্র ও রণকৌশল শত্রুকে পরাজিত করতে অবশ্যই ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনে সবচেয়ে কঠিন ভূমিকা রেখেছে সাধারণ মানুষের ত্যাগ ও মনোবল এবং স্বাধীনতার জন্য তাদের অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
কোনো রাষ্ট্রের কোনো একটি অংশের মানুষ স্বাধীনতা চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের স্বাধীনতা দিয়ে দেয়—এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। অন্যদিকে রাষ্ট্রের কোনো একটি অংশের মানুষ স্বাধীনতার দাবি তুললেই কেন্দ্রীয় সরকারের সশস্ত্র বাহিনী স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর হিংস্র শ্বাপদের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে মাত্র একটি খুঁজে পাওয়া যাবে। সেটি একাত্তরের বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক কালের পৃথিবীর অন্যান্য দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র একেবারেই আলাদা।ষাটের দশকে আমরা দেখেছি পৃথিবীর বহু জাতি সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রাম করছে; তাদের কেউ স্বাধীনতা অর্জন করেছে, অনেকেরই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। অগণিত প্রাণ গেছে, কিন্তু স্বাধীনতা আসেনি। কেন আসেনি, তার কারণগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে ওই সব আন্দোলনে ত্রুটি ও দুর্বলতা ছিল। এবং সেগুলোতে স্বাধীনতা আন্দোলনের যৌক্তিকতার অভাব ছিল। আমাদের অনেক বিদ্বান ব্যক্তিরও বদ্ধমূল ধারণা যে সরকার নির্যাতন-নিপীড়ন খুব বেশি চালালেই এবং ব্যাপক রক্তপাত হলেই স্বাধীনতাপ্রাপ্তি খুব সহজ হয়। এই ধারণা ভিত্তিহীন।
ষাটের দশকে নাইজেরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তেলসমৃদ্ধ বায়াফ্রা প্রদেশ ‘বায়াফ্রা রিপাবলিক’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিল। একাত্তরের বাংলাদেশের মতো সেখানে অবর্ণনীয় গণহত্যা হয়। দুর্ভিক্ষে মানুষ মরে। স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক কিছু সমর্থনও পায়। কিন্তু স্বাধীনতা আসে না। আজও বায়াফ্রা নাইজেরিয়ার অংশ। মনে পড়ে একাত্তরে আমি রেডিও পাকিস্তানের সংবাদ ভাষ্যে শুনেছি, পাকিস্তানি রাজাকার আলবদর বিশ্লেষকেরা বলছেন: পূর্ব পাকিস্তানের নিয়তি হবে বায়াফ্রার মতো। তাঁদের অনুমান ও প্রত্যাশা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
পর্তুগিজ তিমুরের জনগণ ইন্দোনেশিয়া থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উত্তাল আন্দোলন করে। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অগণিত প্রাণ ঝরে পড়ে। স্বাধীনতা থাকে বহুদিনের জন্য সুদূরপরাহত। তুরস্ক, ইরান, ইরাক, গ্রিস প্রভৃতি দেশের কুর্দিরা কতকাল থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র চাইছে। তারা একটি প্রাচীন জাতি। আজও তাদের সংগ্রাম চলছে, তারা স্বাধীনতা পায়নি। বর্তমান জায়ার বা কঙ্গো ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক থেকে কাতাঙ্গা বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল। প্যাট্রিস লুমুম্বা কাতাঙ্গার বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ দিলেন। স্বাধীনতা এল না।
কানাডার ফরাসি ভাষাভাষী অঞ্চল কুইবেকের স্বাধীনতার দাবি উঠেছে। তবে সে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ। কাতালান ও বাস্ক ভাষাভাষীরা স্পেনে আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র চায়। ব্রিটেন থেকে বেরিয়ে স্বাধীন হতে স্কটল্যান্ড গণভোট করছে। হয়তো শান্তিপূর্ণ উপায়েই একদিন স্বাধীনতা পাবে। এ রকম দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বহু আছে।
কসোভো স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। স্বাধীনতা অত সোজা জিনিস নয়। ছেলের হাতের মোয়া তো একেবারেই নয়।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে, গণতান্ত্রিক উপায়ে, গায়ের জোরে নয়। বাংলাদেশও স্বাধীনতা অর্জন করে জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী, তবে সীমাহীন রক্ত ও নির্যাতনের বিনিময়ে। যদি ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচন হয়ে থাকে পাকিস্তানের জন্য গণভোট, তাহলে ২৪ বছর পর আর একটি সাধারণ নির্বাচন হয় ১৯৭০ সালে; এই নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা বা স্বাধীনতার জন্য গণভোট।
১৯৭০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তানের প্রায় ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক শাসকগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে সামান্যতম আস্থা থাকলে ডিসেম্বরের শেষে অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই অধিবেশন বসিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করত। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে
আমি বহুবার ভেবে দেখেছি, পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সংকট ১৯৭০ সালের ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যেই সমাধান হতে পারত কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তা ঝুলিয়ে রাখে ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বিকেল পর্যন্ত।
সব সংগ্রাম ও যুদ্ধেরই দুটি দিক। একটি সামরিক ও আরেকটি নৈতিক। কোনো পক্ষ সামরিকভাবে বিজয়ী হলেও নৈতিকভাবে পরাজিত হয়। কেউ শক্তি পরীক্ষায় হেরে গেলেও নৈতিকভাবে জয়লাভ করে। পাকিস্তান একাত্তরে সামরিক ও নৈতিক দুভাবেই পরাজিত হয়। পাকিস্তান নৈতিকভাবে শেষ হয়ে যায়; তার নৈতিক পরাজয় ঘটে ’৭১-এর ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১ মিনিটে। তার সামরিক পরাজয় ঘটে ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাসের চত্বরে। ওই পরাজয়ের গ্লানি থেকে সে বাঁচতে পারত যদি ২৫ মার্চের মধ্যে কোনো একদিন বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা দিয়ে তেজগাঁও বিমানবন্দরে গিয়ে উড়োজাহাজে উঠে ইয়াহিয়া খান ইসলামাবাদ চলে যেতেন। সে পরামর্শই টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষের বুড়ো সারা মার্চ মাস ইয়াহিয়াকে দিয়েছেন: মাউন্টব্যাটেন যেমন জিন্নাহ-নেহরুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, সেভাবে আপনিও মুজিবের হাতে ক্ষমতা দিয়ে হ্যান্ডশেক করে চলে যান। তা না করলে বাংলাদেশের মানুষ যা করার তা-ই করবে।
সত্তরের নির্বাচনে জয়লাভ করার পর থেকে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গ্রেপ্তার হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু একজন অবিচল গণতান্ত্রিক নেতার মতো অতি সংযত আচরণ করেছেন। তাঁর ওই তিন মাসের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক। অন্যদিকে ইয়াহিয়ার সামরিক জান্তার প্রতিটি কাজ ছিল অগণতান্ত্রিক ও ষড়যন্ত্রমূলক। একাত্তরে বাংলাদেশে মানুষ ছিল সাড়ে সাত কোটির মতো। তাদের মধ্যে যাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক ও ভোটার ছিলেন এবং যাঁদের সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদের দেড় কোটির মতো মানুষ এখনো বেঁচে আছেন। আমি তাঁদের একজন। কী রকম ছিল সেই একাত্তরের মার্চ, তা এখন যাদের বয়স ষাটের নিচে, তাদের বোঝাতে পারব না।
একাত্তরের পয়লা মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন হোটেল পূর্বাণীতে তাঁর দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক করছিলেন, তখনই ইয়াহিয়া খান রেডিওতে পাকিস্তানের মৃত্যুপরোয়ানা পাঠ করেন। আমি কী এক কাজে বা বিনা প্রয়োজনেই সিকান্দার আবু জাফরের সমকাল পত্রিকার অফিসে বসে ছিলাম। রাস্তায় শোরগোল শুনতে পেয়ে বেরিয়ে শিল্প ভবনের গোলচত্বরের কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তখন এত সংবাদপত্রও ছিল না, টিভি চ্যানেল শব্দটাই কেউ শোনেনি, এত সাংবাদিকও ছিলেন না। হাঁটতে হাঁটতে বিমান অফিসের সামনে যাই। বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের অল্প কিছু বক্তব্য দিয়ে ‘অপেক্ষা’ করতে বলেন। পরে তাঁর হরতাল ও অসহযোগের ঘোষণা আসে।
ইয়াহিয়ার সংসদ অধিবেশন মুলতবির ঘোষণার পর মানুষ বুঝে যায় পঞ্চনদীর দেশ পাকিস্তান তাদের নয়, তাদের ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। পনেরো-কুড়ি মিনিটের মধ্যে ঢাকার চেহারা বদলে যায়। স্তব্ধ হয়ে যায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাস, মোটরগাড়ি, রিকশা রাস্তা থেকে সরে যায়। মানুষ নেমে পড়ে রাস্তায়। তখন অল্প কয়েকটি বাড়িতে গ্যাস–সংযোগ ছিল। রান্নাবান্না হতো কেরোসিন ও লাকড়িতে। বিভিন্ন জায়গায় লাকড়ির দোকান ছিল। মণ দরে বিক্রি হতো। অনেক মানুষ দোকান থেকে লাকড়ি হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে পাকিস্তানবিরোধী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান দেয়। ওই লাকড়ি বা লাঠি ছিল সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতীকী অস্ত্র—মেশিনগান, কামানের সঙ্গে লড়াইয়ের হাতিয়ার।
পাকিস্তানি জান্তা শিশু, বৃদ্ধ, নারীসহ লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করে। ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে কোটি খানেক মানুষকে। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর আধুনিক অস্ত্র ও রণকৌশল শত্রুকে পরাজিত করতে অবশ্যই ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনে সবচেয়ে কঠিন ভূমিকা রেখেছে সাধারণ মানুষের ত্যাগ ও মনোবল এবং স্বাধীনতার জন্য তাদের অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
Thursday, February 11, 2016
গান্ধীবাদী আবদুল্লাহ ও অগ্নিদগ্ধ চা-দোকানি by সৈয়দ আবুল মকসুদ
১৯৪৬-এর
অক্টোবরে নোয়াখালীর নারকীয়তার পর মহাত্মা গান্ধী তাঁর শান্তি মিশন নিয়ে
নোয়াখালী আসেন। তিনি এ কালের প্রাজ্ঞ ও জনবান্ধব রাজনীতিকদের মতো
অপরাহ্ণে মিডিয়ার সামনে প্রবল উত্তেজনাকর বক্তব্য দেওয়া পছন্দ করতেন না।
আইন ও নিয়মকানুন মেনে চলতেন। অবিচারের প্রতিবাদে যেখানে আইন অমান্য
প্রয়োজন, সেখানে যথাযথ ঘোষণা দিয়েই আইন অমান্য করে সত্যাগ্রহ করতেন।
নোয়াখালীতে এসে গান্ধীজি সেখানকার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং বিভিন্ন
থানার ওসিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ
নেন। তখন নোয়াখালীর পুলিশ সুপার ছিলেন এম এ আবদুল্লাহ। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান
পুলিশ সার্ভিস বা আইপিএসের সদস্য। অতি সৎ, দক্ষ ও ন্যায়পরায়ণ অফিসার।
মাঝেমধ্যেই তিনি গান্ধীজির সঙ্গে তাঁর ক্যাম্পে গিয়ে দেখা করতেন। তাঁর
অভিযোগ শুনতেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন। আবদুল্লাহর কাজে গান্ধীজি খুবই
প্রীত হন। তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মে। তিনি গান্ধীর ভক্তে পরিণত হন।
মাছ-মাংস খাওয়া ছেড়ে দেন। নিরামিষ ধরেন এবং আমৃত্যু তিনি নিরামিষাশী
ছিলেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি তাঁর মৃত্যু হয়।
আবদুল্লাহ পঞ্চাশের শুরুতে ঢাকার সিটি এসপি ছিলেন, এখন যা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের পদ। আমরা তখন স্কুলছাত্র। গান্ধীবাদী আবদুল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার কথা শুনে আমরা শিহরিত হতাম। সেকালে সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার হতো না। কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা খুব বেশি হলে তাঁদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিতেন গাড়িতে। ঢাকা শহরই ছিল তখন একটুখানি। সব কটি স্কুলই ছিল দু-আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে। কোনো সরকারি জিপে কোনো স্কুলছাত্রছাত্রীকে যাতায়াত করতে দেখলে আবদুল্লাহ তাকে থামাতেন। গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে তাকে বলতেন, হেঁটে বাড়ি যাও, এ গাড়ি তোমার বাবার অফিসের কাজে ব্যবহারের জন্য, তোমার ব্যবহারের জন্য নয়। মেয়েদের পর্যন্ত তিনি গাড়ি থেকে নামিয়ে চার আনা পয়সা দিয়ে একটি রিকশা ভাড়া করে দিয়েছেন তাকে বাড়িতে বা স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এসপি আবদুল্লাহ তাঁর চেয়ে উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তা, এমনকি সচিব পর্যায়ের অফিসারের ছেলেমেয়েদেরও সরকারি গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি হয়ে ওঠেন সরকারি গাড়ি অপব্যবহারকারীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু সেকালের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ন্যূনতম মূল্যবোধ থাকায় তাঁকে বিপদে পড়তে হয়নি। ওএসডি বা পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন।
আবদুল্লাহরা ছিলেন দুই ভাই—আবদুল্লাহ ও সাদুল্লাহ। কলকাতার মানুষ। আধা উর্দুভাষী। আবদুল্লাহ ছিলেন ব্যাচেলর। থাকতেন কাকরাইল সার্কিট হাউসে। তাঁর প্রিয়জনের মধ্যে ছিল গোটা আট-দশ বিড়াল। ওই বিড়াল নিয়ে আপত্তি তোলেন সার্কিট হাউসের অন্যান্য অফিসার। তিনি ডিআইজি হয়েছিলেন। একপর্যায়ে বিড়াল নিয়ে গোলমাল বাধে গভর্নর মোনায়েম খানের সঙ্গে। চিঠি চালাচালি হয়। আবদুল্লাহ আগাম অবসর নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যারিস্টার হয়েছিলেনও। তিনি থাকতেন ইস্কাটনে ভাড়াটে বাড়িতে। তাঁর ভাই চলে গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। গান্ধীভক্ত আবদুল্লাহ আজীবন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল ছিলেন। গান্ধীজির নোয়াখালীর কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে একটি স্মৃতিকথামূলক বই লেখার ইচ্ছা তাঁর ছিল, কিন্তু সম্ভবত তা আর হয়ে ওঠেনি।
পুলিশ বিভাগের সব কর্মকর্তাই আবদুল্লাহর মতো সত্য ও ন্যায় নিয়ে থাকবেন, তা ভাবা ঠিক নয়। কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের বিপরীতে অবস্থান নেবেন, সেটাও মানা যায় না। আর কেউ যদি দুর্বৃত্ত হয়ে ওঠেন, তা ঘোরতর অন্যায়। পুলিশ কর্মকর্তার কাজ অপরাধী ও দুর্বৃত্তকে ধরে আইন-আদালতের কাছে সোপর্দ করা। রাষ্ট্র তাদের বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি দেবে। পুলিশের কাজ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা পর্যন্ত। অবশিষ্ট কাজ করবে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
পুলিশ একটি অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী এবং আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় খুবই ক্ষমতাবান। অন্যদিকে একজন দরিদ্র চা-দোকানি অতি দুর্বল। পুলিশের সোর্স বলে একটি প্রজাতি বহুকাল থেকেই পুলিশ বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করে। অপরাধীকে শনাক্ত করতে পুলিশের সোর্সের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। পুলিশ ও তার সোর্স যোগসাজশ করে যদি কোনো অপরাধ ঘটায়, সে অপরাধ কোনো সাধারণ নাগরিকের অপরাধের চেয়ে গুরুতর। এবং ক্ষমার অযোগ্য। ক্ষমা করা যায় না এ জন্য যে তাঁদের রাষ্ট্র বেতন-ভাতা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে অপরাধীদের দমন করতে, তা না করে তাঁরা নিজেরাই অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন। এবং সে অপরাধও মুহূর্তের উত্তেজনাবশত নয়, সুপরিকল্পিতভাবে স্বার্থসিদ্ধির জন্য।
কোনো পুলিশ অফিসার বা সোর্স স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করে যদি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বসেন, সেটা অপরাধ। সে অপরাধের দায় পুলিশ বাহিনীর ওপর বর্তায় না। কিন্তু কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা তাঁর সোর্স জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করতে গিয়ে যদি কোনো চা-দোকানিকে তাঁর জ্বলন্ত চুলার মধ্যে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মারেন, সে খুনের দায় ওই বাহিনীর ওপর অবশ্যই বর্তায়। তাতে প্রমাণিত হয় ওই বাহিনীর কেউ কেউ ঠিকমতো দায়িত্ব পালন তো করছেনই না বরং অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। বাহিনী হিসেবে নির্দোষ থাকতে চাইলে কর্তৃপক্ষের কর্তব্য তৎক্ষণাৎ দোষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং তারপর যথাযথ শাস্তির জন্য তাঁকে আইনের হাতে সোপর্দ করা। তা না করে অপরাধ আড়ালের চেষ্টা গর্হিত ও জঘন্য কাজ।
পুলিশ বাহিনী নিয়ে এত কথা হওয়া সত্ত্বেও আমি বিশ্বাস করি না সবাই দুর্নীতিতে লিপ্ত। সম্প্রতি কোনো এক মাসের শেষ দিকে আমি একজন সহকারী পুলিশ সুপার পর্যায়ের কর্মকর্তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁদের সংসার। তাঁরা রাতে খেতে বসেছিলেন। ডিম আর ডাল দিয়ে তাঁরা ভাত খাচ্ছিলেন। আভাসে-ইঙ্গিতে আলাপ করে যা বুঝলাম তা হলো, মাসের শেষের দিকে ঠিকমতো বাজার করা সম্ভব হয় না। কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়ের খরচ চালানোর পর সংসার চালানোই কঠিন। বছরে রোজার ঈদে ছাড়া নতুন কাপড় কেনা সম্ভব হয় না। বাস্তবতা হলো, সততা-অসততা কোনো পেশাজীবীর গায়ে লেখা থাকে না। আজও পুলিশ বাহিনীতে সৎ ও নীতিমান মানুষ আছেন। তাঁদের বাহিনীর কেউ যখন অপরাধী সাব্যস্ত হন, তখন নিশ্চয়ই তাঁদের মাথা লজ্জায় হেঁট হয়। আমার পরিচিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সৎ এবং দক্ষ। মানুষের প্রতি রয়েছে তাঁদের শ্রদ্ধাবোধ। সম্ভবত তাঁরা পুলিশ পদক পান না।
পুলিশ মানুষ, তাঁর পক্ষে অপরাধ করা অসম্ভব নয়। কিন্তু কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তাঁর এক মজাদার শাস্তি আছে। সে শাস্তির নাম ক্লোজ, যার বাংলা করেছি আমরা ‘প্রত্যাহার’। দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে দূরে রাখা। যে অপরাধ করলে কলিমুদ্দিন ও হারাধন সাহার কোমরে দড়ি পড়ে, সেই অপরাধ করে পুলিশ দিব্যি দাঁত কেলিয়ে হাসেন। বসে বসে বেতন-ভাতা পান। এমনকি কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে যখন সাসপেন্ড করা হয়, তিনি শুধু মূল বেতনটা পান—অন্য কোনো ভাতা নয়। পুলিশ বেতন-ভাতাসহ দায়িত্ব থেকে ‘প্রত্যাহার’ হন। ক্ষতি শুধু থানায় থাকলে উপরি আয় হয়, ‘ক্লোজ’ থাকলে সেটা বন্ধ। ধর্ষণের মতো চরমতম অপরাধের অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, তাঁকে শুধু ‘ক্লোজ’ করলেই হলো।
বিরোধী দলের তথাকথিত আন্দোলন এবং ৫ জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পরে অবস্থার অস্বাভাবিক অবনতি ঘটেছে। গ্রেপ্তার-বাণিজ্যে অতিষ্ঠ বিরোধী দলের তৃণমূলের কর্মী ও সমর্থকেরা। থানা-হাজতে নির্যাতন, পুলিশি হেফাজতে নারীর ওপর যৌন হয়রানি, ইয়াবা থেরাপি, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ অতি মাত্রায় বেড়ে গেছে। অভিযুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তাও নয়। ‘পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ছোট-বড় বিভিন্ন বিচ্যুতি-অপরাধে ৯ হাজার ৯৫৮ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৭৬ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে থানা ও আদালতে মামলা হয়েছে।...২০১৫ সালের ১২ মাসে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে।’ [সমকাল, ৭ মার্চ ’১৫]
পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার মামলা করবে কোথায়? থানা মামলা নিতে চায় না। নিলেও ফরিয়াদি গুম হওয়ার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়ায়। আদালতে হাজিরা দেয় না। যা দরকার তা হলো উচ্চপর্যায়ের আশকারা বন্ধ হওয়া এবং দ্রুত বিচারের আদালতে বিচার করে রায় বাস্তবায়ন।
চুলার আগুনে পুড়িয়ে মিরপুরের চা-দোকানি বাবুল মাতবরকে হত্যা করার অভিযোগে মিডিয়ার প্রবল চাপে শাহ আলী থানার ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে। মানুষ ‘ব্যবস্থা’ দেখতে চায় না, শাস্তি দেখতে চায়। বাংলার মানুষের কপাল পোড়া, তাই স্টোভের আগুনে ফেলে তাদের পুড়িয়ে মারা হয়। বাংলার মানুষ কার আগুনে পুড়ে মরল সেটা মুখ্য নয়, পুড়ে মরছে সেটাই বাস্তবতা।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেও সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দরকার। চাঁদাবাজিতে শিল্প-কারখানার মালিক ও ঠিকাদার-ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ। পুলিশের সহায়তা তাঁদের প্রয়োজন। তা না পেয়ে যদি তাঁরা পুলিশের হাতেই নিগৃহীত হন, তাতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমাজেও থাকবে না শান্তিশৃঙ্খলা। আমরা গান্ধীবাদী আবদুল্লাহকে পাব না। কিন্তু ১৬-১৭ কোটি মানুষের দেশে দু-এক লাখ ন্যায়পরায়ণ পুলিশ সদস্য পাব না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
আবদুল্লাহ পঞ্চাশের শুরুতে ঢাকার সিটি এসপি ছিলেন, এখন যা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের পদ। আমরা তখন স্কুলছাত্র। গান্ধীবাদী আবদুল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার কথা শুনে আমরা শিহরিত হতাম। সেকালে সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার হতো না। কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা খুব বেশি হলে তাঁদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিতেন গাড়িতে। ঢাকা শহরই ছিল তখন একটুখানি। সব কটি স্কুলই ছিল দু-আড়াই কিলোমিটারের মধ্যে। কোনো সরকারি জিপে কোনো স্কুলছাত্রছাত্রীকে যাতায়াত করতে দেখলে আবদুল্লাহ তাকে থামাতেন। গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে তাকে বলতেন, হেঁটে বাড়ি যাও, এ গাড়ি তোমার বাবার অফিসের কাজে ব্যবহারের জন্য, তোমার ব্যবহারের জন্য নয়। মেয়েদের পর্যন্ত তিনি গাড়ি থেকে নামিয়ে চার আনা পয়সা দিয়ে একটি রিকশা ভাড়া করে দিয়েছেন তাকে বাড়িতে বা স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এসপি আবদুল্লাহ তাঁর চেয়ে উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন কর্মকর্তা, এমনকি সচিব পর্যায়ের অফিসারের ছেলেমেয়েদেরও সরকারি গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছেন। একপর্যায়ে তিনি হয়ে ওঠেন সরকারি গাড়ি অপব্যবহারকারীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু সেকালের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ন্যূনতম মূল্যবোধ থাকায় তাঁকে বিপদে পড়তে হয়নি। ওএসডি বা পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি হওয়া থেকে বেঁচে গেছেন।
আবদুল্লাহরা ছিলেন দুই ভাই—আবদুল্লাহ ও সাদুল্লাহ। কলকাতার মানুষ। আধা উর্দুভাষী। আবদুল্লাহ ছিলেন ব্যাচেলর। থাকতেন কাকরাইল সার্কিট হাউসে। তাঁর প্রিয়জনের মধ্যে ছিল গোটা আট-দশ বিড়াল। ওই বিড়াল নিয়ে আপত্তি তোলেন সার্কিট হাউসের অন্যান্য অফিসার। তিনি ডিআইজি হয়েছিলেন। একপর্যায়ে বিড়াল নিয়ে গোলমাল বাধে গভর্নর মোনায়েম খানের সঙ্গে। চিঠি চালাচালি হয়। আবদুল্লাহ আগাম অবসর নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্যারিস্টার হয়েছিলেনও। তিনি থাকতেন ইস্কাটনে ভাড়াটে বাড়িতে। তাঁর ভাই চলে গিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। গান্ধীভক্ত আবদুল্লাহ আজীবন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল ছিলেন। গান্ধীজির নোয়াখালীর কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে একটি স্মৃতিকথামূলক বই লেখার ইচ্ছা তাঁর ছিল, কিন্তু সম্ভবত তা আর হয়ে ওঠেনি।
পুলিশ বিভাগের সব কর্মকর্তাই আবদুল্লাহর মতো সত্য ও ন্যায় নিয়ে থাকবেন, তা ভাবা ঠিক নয়। কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের বিপরীতে অবস্থান নেবেন, সেটাও মানা যায় না। আর কেউ যদি দুর্বৃত্ত হয়ে ওঠেন, তা ঘোরতর অন্যায়। পুলিশ কর্মকর্তার কাজ অপরাধী ও দুর্বৃত্তকে ধরে আইন-আদালতের কাছে সোপর্দ করা। রাষ্ট্র তাদের বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি দেবে। পুলিশের কাজ অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা পর্যন্ত। অবশিষ্ট কাজ করবে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ।
পুলিশ একটি অস্ত্রসজ্জিত বাহিনী এবং আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় খুবই ক্ষমতাবান। অন্যদিকে একজন দরিদ্র চা-দোকানি অতি দুর্বল। পুলিশের সোর্স বলে একটি প্রজাতি বহুকাল থেকেই পুলিশ বাহিনীর দোসর হিসেবে কাজ করে। অপরাধীকে শনাক্ত করতে পুলিশের সোর্সের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। পুলিশ ও তার সোর্স যোগসাজশ করে যদি কোনো অপরাধ ঘটায়, সে অপরাধ কোনো সাধারণ নাগরিকের অপরাধের চেয়ে গুরুতর। এবং ক্ষমার অযোগ্য। ক্ষমা করা যায় না এ জন্য যে তাঁদের রাষ্ট্র বেতন-ভাতা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছে অপরাধীদের দমন করতে, তা না করে তাঁরা নিজেরাই অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন। এবং সে অপরাধও মুহূর্তের উত্তেজনাবশত নয়, সুপরিকল্পিতভাবে স্বার্থসিদ্ধির জন্য।
কোনো পুলিশ অফিসার বা সোর্স স্ত্রীর সঙ্গে রাগারাগি করে যদি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বসেন, সেটা অপরাধ। সে অপরাধের দায় পুলিশ বাহিনীর ওপর বর্তায় না। কিন্তু কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা তাঁর সোর্স জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করতে গিয়ে যদি কোনো চা-দোকানিকে তাঁর জ্বলন্ত চুলার মধ্যে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মারেন, সে খুনের দায় ওই বাহিনীর ওপর অবশ্যই বর্তায়। তাতে প্রমাণিত হয় ওই বাহিনীর কেউ কেউ ঠিকমতো দায়িত্ব পালন তো করছেনই না বরং অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। বাহিনী হিসেবে নির্দোষ থাকতে চাইলে কর্তৃপক্ষের কর্তব্য তৎক্ষণাৎ দোষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং তারপর যথাযথ শাস্তির জন্য তাঁকে আইনের হাতে সোপর্দ করা। তা না করে অপরাধ আড়ালের চেষ্টা গর্হিত ও জঘন্য কাজ।
পুলিশ বাহিনী নিয়ে এত কথা হওয়া সত্ত্বেও আমি বিশ্বাস করি না সবাই দুর্নীতিতে লিপ্ত। সম্প্রতি কোনো এক মাসের শেষ দিকে আমি একজন সহকারী পুলিশ সুপার পর্যায়ের কর্মকর্তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তাঁদের সংসার। তাঁরা রাতে খেতে বসেছিলেন। ডিম আর ডাল দিয়ে তাঁরা ভাত খাচ্ছিলেন। আভাসে-ইঙ্গিতে আলাপ করে যা বুঝলাম তা হলো, মাসের শেষের দিকে ঠিকমতো বাজার করা সম্ভব হয় না। কলেজে পড়ুয়া ছেলেমেয়ের খরচ চালানোর পর সংসার চালানোই কঠিন। বছরে রোজার ঈদে ছাড়া নতুন কাপড় কেনা সম্ভব হয় না। বাস্তবতা হলো, সততা-অসততা কোনো পেশাজীবীর গায়ে লেখা থাকে না। আজও পুলিশ বাহিনীতে সৎ ও নীতিমান মানুষ আছেন। তাঁদের বাহিনীর কেউ যখন অপরাধী সাব্যস্ত হন, তখন নিশ্চয়ই তাঁদের মাথা লজ্জায় হেঁট হয়। আমার পরিচিত অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সৎ এবং দক্ষ। মানুষের প্রতি রয়েছে তাঁদের শ্রদ্ধাবোধ। সম্ভবত তাঁরা পুলিশ পদক পান না।
পুলিশ মানুষ, তাঁর পক্ষে অপরাধ করা অসম্ভব নয়। কিন্তু কোনো পুলিশ সদস্য অপরাধ করলে তাঁর এক মজাদার শাস্তি আছে। সে শাস্তির নাম ক্লোজ, যার বাংলা করেছি আমরা ‘প্রত্যাহার’। দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে দূরে রাখা। যে অপরাধ করলে কলিমুদ্দিন ও হারাধন সাহার কোমরে দড়ি পড়ে, সেই অপরাধ করে পুলিশ দিব্যি দাঁত কেলিয়ে হাসেন। বসে বসে বেতন-ভাতা পান। এমনকি কোনো সরকারি কর্মকর্তাকে যখন সাসপেন্ড করা হয়, তিনি শুধু মূল বেতনটা পান—অন্য কোনো ভাতা নয়। পুলিশ বেতন-ভাতাসহ দায়িত্ব থেকে ‘প্রত্যাহার’ হন। ক্ষতি শুধু থানায় থাকলে উপরি আয় হয়, ‘ক্লোজ’ থাকলে সেটা বন্ধ। ধর্ষণের মতো চরমতম অপরাধের অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, তাঁকে শুধু ‘ক্লোজ’ করলেই হলো।
বিরোধী দলের তথাকথিত আন্দোলন এবং ৫ জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার নির্বাচনের পরে অবস্থার অস্বাভাবিক অবনতি ঘটেছে। গ্রেপ্তার-বাণিজ্যে অতিষ্ঠ বিরোধী দলের তৃণমূলের কর্মী ও সমর্থকেরা। থানা-হাজতে নির্যাতন, পুলিশি হেফাজতে নারীর ওপর যৌন হয়রানি, ইয়াবা থেরাপি, চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য অপরাধ অতি মাত্রায় বেড়ে গেছে। অভিযুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, তাও নয়। ‘পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ছোট-বড় বিভিন্ন বিচ্যুতি-অপরাধে ৯ হাজার ৯৫৮ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যকে বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ৭৬ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধে থানা ও আদালতে মামলা হয়েছে।...২০১৫ সালের ১২ মাসে বিভিন্ন স্থানে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ হাজার অভিযোগ জমা পড়ে।’ [সমকাল, ৭ মার্চ ’১৫]
পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার মামলা করবে কোথায়? থানা মামলা নিতে চায় না। নিলেও ফরিয়াদি গুম হওয়ার আতঙ্কে পালিয়ে বেড়ায়। আদালতে হাজিরা দেয় না। যা দরকার তা হলো উচ্চপর্যায়ের আশকারা বন্ধ হওয়া এবং দ্রুত বিচারের আদালতে বিচার করে রায় বাস্তবায়ন।
চুলার আগুনে পুড়িয়ে মিরপুরের চা-দোকানি বাবুল মাতবরকে হত্যা করার অভিযোগে মিডিয়ার প্রবল চাপে শাহ আলী থানার ওসিসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করা হয়েছে বিভাগীয় ব্যবস্থা হিসেবে। মানুষ ‘ব্যবস্থা’ দেখতে চায় না, শাস্তি দেখতে চায়। বাংলার মানুষের কপাল পোড়া, তাই স্টোভের আগুনে ফেলে তাদের পুড়িয়ে মারা হয়। বাংলার মানুষ কার আগুনে পুড়ে মরল সেটা মুখ্য নয়, পুড়ে মরছে সেটাই বাস্তবতা।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থেও সৎ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দরকার। চাঁদাবাজিতে শিল্প-কারখানার মালিক ও ঠিকাদার-ব্যবসায়ীরা অতিষ্ঠ। পুলিশের সহায়তা তাঁদের প্রয়োজন। তা না পেয়ে যদি তাঁরা পুলিশের হাতেই নিগৃহীত হন, তাতে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমাজেও থাকবে না শান্তিশৃঙ্খলা। আমরা গান্ধীবাদী আবদুল্লাহকে পাব না। কিন্তু ১৬-১৭ কোটি মানুষের দেশে দু-এক লাখ ন্যায়পরায়ণ পুলিশ সদস্য পাব না, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
Tuesday, February 2, 2016
বেতনবৃত্তান্ত by সৈয়দ আবুল মকসুদ
কিছুদিন যাবৎ বাংলার মাটিতে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ: বেতন। ড্রয়িংরুমে, সরকারি অফিসে, আদালতের সেরেস্তাখানায়, রেস্তোরাঁর টেবিলে, রাস্তার পাশের চা-দোকানে, তেমাথার বটতলায়, খেলার মাঠে, কসাইখানা থেকে শুঁড়িখানায়—কোথায় নেই বেতন নিয়ে আলোচনা। বাসে ও ট্রেনের কামরায় বসে যাত্রীরা ঝিমুনি বাদ দিয়ে বেতন নিয়ে আলোচনা করেন। গ্রামের হাটুরেরা হাটবারে বেচাকেনা করে বাড়ি ফেরার সময় আলোচনা করেন বেতন নিয়ে; তাঁদের নিজেদের বেতন-ভাতা বলে কিছু নেই, রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে কারা কত বেতন পান বা কার বেতন কত বাড়ল, তাই নিয়ে আলোচনা। মুদি দোকানদারের নিজের বেতনের প্রশ্ন আসে না, কিন্তু অন্যদের বেতন বাড়ার কথায় তাঁর খুশি সীমাহীন।
মুক্তবাজার অর্থনীতির মৌসুমে বাংলার মাটিতে সবকিছুর মাপকাঠি আজ বেতন। রাষ্ট্রের কল্যাণে কার কী অবদান তা নয়, কার বেতন কত, সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এমনকি যে কবির বেতন বেশি, তাঁর কবিতায় শিল্পগুণ যেমন বেশি, তাঁর কাব্যের কদরও বেশি। কার বেতন কত, তাই নিয়ে মুক্ত আলোচনার ফলে আজ বাংলার বহু পরিবারে বিপর্যয় পর্যন্ত দেখা দিয়েছে। যেমন ধরুন, আমাদের পরিচিত হেকতম আলী চৌধুরীর পরিবারের স্নায়ুযুদ্ধ।
চৌধুরী সাহেবের ফাটা কপাল। ছেলে নেই, চার-চারটে মেয়েকেই সুপাত্রে সমর্পণ করতে পেরেছেন। নিজে জেলা শহরে তিনতলা বাড়িতে থাকেন। তাঁর শরীর ৭৮ বছরেরও মাশাল্লাহ ভালো, কিন্তু স্ত্রীকে নিয়েই পেরেশানে থাকেন। ফরকুন্দা বেগম ছিলেন যুবতী বয়স থেকেই ভোজনরসিক। মিষ্টি-মাংসের প্রতি প্রবল ঝোঁক। আস্ত একটা মোরগের সিনা-রান গিলা-কলিজাসহ খেয়ে ফেলতেন। মেজো মেয়ে হওয়ার পরেই মুটিয়ে যান। অনেক দিন থেকে ডায়াবেটিসে ও হার্টের সমস্যায় মর-মর। হঠাৎ অবস্থা খারাপ। মেয়েদের কাছে মুহূর্তে মোবাইলে খবর যায়। চার মেয়েই স্বামীদের নিয়ে ছুটে আসেন। বড় মেয়ের জামাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। মেজো জামাই অতিরিক্ত সচিব। তৃতীয় মেয়ের স্বামী একটি প্রাইভেট ব্যাংকের (যে ব্যাংকের ঋণখেলাপির পরিমাণ বিপুল) ডিএমডি এবং ছোট জামাই সাবেক এমপি। তিনি প্রথম জীবনে জ্ঞানসাগর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। বিশেষ উপায়ে ডিগ্রিটা নেওয়ার পর সড়ক ও জনপথ বিভাগে সাব-কন্ট্রাকটারি করতেন। রাজনীতিতে ভালো করায় সংসদেও গিয়েছিলেন। শুল্কমুক্ত দামি গাড়ি হাঁকান। এখন রাজউকের প্লটে বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। শাশুড়ির খবর শুনে বাড়ির বাথরুমের ফিটিংসের মালপত্র কেনা বাদ দিয়ে ছুটে এসেছেন।
চৌধুরী ভিলার সামনে মেজো, সেজো ও ছোট জামাইয়ের তিনটি দামি গাড়ি দাঁড়ানো। এমন সময় ভটভট শব্দ করে ইজিবাইক নিয়ে বড় জামাই ড. খালিদ বাহাউল্লাহ এলেন সস্ত্রীক। চৌধুরী সাহেব বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েকে বললেন, তোমরা বাসস্ট্যান্ড থিকা ফোন করতা। একটা গাড়ি পাঠাইয়া দিতাম। ড. বাহাউল্লাহর শ্বশুরের কথা শুনে গা জ্বালা করে ওঠে। ভায়রার গাড়িতে উঠবেন!
রাষ্ট্রের সেবায় কে কত গুরুত্বপূর্ণ তার ওপর নির্ভর করে মর্যাদা, কে কত টাকা বেতন পান সেটা নয় বিপত্তি ঘটে রাতে খাবারের সময়। টেবিলে গিয়ে বসেন মেজো জামাই সচিব সমির শেখ, সেজো ডিএমডি জামশেদ তোফাদার এবং ছোট জামাই সাবেদ আলী সাবু। বড় জামাই আসেন না। কাজের মেয়েটি গিয়ে বলে, দুলাভাই-আপা আসেন। দুলাভাইরা বইয়া রইছে আপনেগো লাইগা। ড. বাহাউল্লাহ নিম্মিকে বলেন, বলে দাও এখন আমি খাব না। মাথা ধরেছে। রাতে এক গেলাস দুধ দিয়ো।
কাজের মেয়েটি চলে গেলে নিম্মি বলেন, খেয়ে নিলেই পারতা। তোমার মাথা ধরল কখন?
ড. বাহাউল্লাহ খুব নিচু স্তরে ধমকে ওঠেন, তোমার যদি সেই আক্কেল থাকত, তাহলে তোমার আব্বা আমার ঘাড়ে তোমাকে চাপাত না। তুমি জানো, ওই টেবিলে গিয়ে বসলেই বেতনের কথা উঠবে? সমির, জামশেদ, সাবু সবাই বেতনের প্রসঙ্গে ঘাঁটাঘাঁটি করবে।
প্রফেসর বিশেষভাবে শঙ্কিত ছিলেন তাঁর এক মামাশ্বশুরকে নিয়ে। ভদ্রলোক সারা জীবন কিছুই করেননি। ভগ্নিপতির ওপরই চলেছেন। বেশি কথা বলেন। কার বেতন কত—এই সব নিয়ে তাঁরই যত মাথাব্যথা। যা হোক, সবাই এক রকম না। পাশের বাড়ির দূরসম্পর্কের এক চাচিশাশুড়ি এলেন জামাইদের সঙ্গে দেখা করতে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন। টেলিভিশন দেখেন। খবরের কাগজও পড়েন। কোথায় কারা কী দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করেন, সে খবর রাখেন। বড় জামাইয়ের সঙ্গেই তাঁর অনেকক্ষণ কথা হয়। কথা প্রসঙ্গে একটি পুরোনো গল্প বড় দুলামিয়াকে স্মরণ করিয়ে দেন:
মোগল সম্রাট তাঁর ছেলেকে বিদ্যাশিক্ষা দিতে শিক্ষক রেখে দেন। একদিন সম্রাট দেখেন যুবরাজ তার ওস্তাদের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর ওস্তাদজি নিজের হাতে পা ধুচ্ছেন। তা দেখে সম্রাট ক্ষুব্ধ হন এবং পুত্রকে বকুনি দিয়ে বলেন, এটা স্রেফ বেয়াদবি। তুমি নিজের হাতে ওস্তাদজির পা ধুইয়ে দাও। এই কাহিনিতে শিক্ষকের মর্যাদার কথাই বলা হয়েছে।
বেতন হলো কর্মমূল্য। বেশি বেতনে ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য বাড়ে, মর্যাদা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সত্যেন বসু, রমেশ মজুমদার যে বেতন পেতেন, তার চার গুণ বেশি পেতেন ঢাকা ডিএম—জেলা প্রশাসক। বাংলাদেশ বিমানের বিদেশি এমডি আমাদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের বেতন-ভাতা যোগ দিলে যা হয়, তার দ্বিগুণের বেশি বেতন পান। প্রাইভেট ব্যাংকের অনেক এমডিও তাই। রাষ্ট্রের সেবায় কে কত গুরুত্বপূর্ণ, তার ওপর নির্ভর করে মর্যাদা, কে কত টাকা বেতন পান সেটা নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
মুক্তবাজার অর্থনীতির মৌসুমে বাংলার মাটিতে সবকিছুর মাপকাঠি আজ বেতন। রাষ্ট্রের কল্যাণে কার কী অবদান তা নয়, কার বেতন কত, সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয়। এমনকি যে কবির বেতন বেশি, তাঁর কবিতায় শিল্পগুণ যেমন বেশি, তাঁর কাব্যের কদরও বেশি। কার বেতন কত, তাই নিয়ে মুক্ত আলোচনার ফলে আজ বাংলার বহু পরিবারে বিপর্যয় পর্যন্ত দেখা দিয়েছে। যেমন ধরুন, আমাদের পরিচিত হেকতম আলী চৌধুরীর পরিবারের স্নায়ুযুদ্ধ।
চৌধুরী সাহেবের ফাটা কপাল। ছেলে নেই, চার-চারটে মেয়েকেই সুপাত্রে সমর্পণ করতে পেরেছেন। নিজে জেলা শহরে তিনতলা বাড়িতে থাকেন। তাঁর শরীর ৭৮ বছরেরও মাশাল্লাহ ভালো, কিন্তু স্ত্রীকে নিয়েই পেরেশানে থাকেন। ফরকুন্দা বেগম ছিলেন যুবতী বয়স থেকেই ভোজনরসিক। মিষ্টি-মাংসের প্রতি প্রবল ঝোঁক। আস্ত একটা মোরগের সিনা-রান গিলা-কলিজাসহ খেয়ে ফেলতেন। মেজো মেয়ে হওয়ার পরেই মুটিয়ে যান। অনেক দিন থেকে ডায়াবেটিসে ও হার্টের সমস্যায় মর-মর। হঠাৎ অবস্থা খারাপ। মেয়েদের কাছে মুহূর্তে মোবাইলে খবর যায়। চার মেয়েই স্বামীদের নিয়ে ছুটে আসেন। বড় মেয়ের জামাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। মেজো জামাই অতিরিক্ত সচিব। তৃতীয় মেয়ের স্বামী একটি প্রাইভেট ব্যাংকের (যে ব্যাংকের ঋণখেলাপির পরিমাণ বিপুল) ডিএমডি এবং ছোট জামাই সাবেক এমপি। তিনি প্রথম জীবনে জ্ঞানসাগর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। বিশেষ উপায়ে ডিগ্রিটা নেওয়ার পর সড়ক ও জনপথ বিভাগে সাব-কন্ট্রাকটারি করতেন। রাজনীতিতে ভালো করায় সংসদেও গিয়েছিলেন। শুল্কমুক্ত দামি গাড়ি হাঁকান। এখন রাজউকের প্লটে বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। শাশুড়ির খবর শুনে বাড়ির বাথরুমের ফিটিংসের মালপত্র কেনা বাদ দিয়ে ছুটে এসেছেন।
চৌধুরী ভিলার সামনে মেজো, সেজো ও ছোট জামাইয়ের তিনটি দামি গাড়ি দাঁড়ানো। এমন সময় ভটভট শব্দ করে ইজিবাইক নিয়ে বড় জামাই ড. খালিদ বাহাউল্লাহ এলেন সস্ত্রীক। চৌধুরী সাহেব বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েকে বললেন, তোমরা বাসস্ট্যান্ড থিকা ফোন করতা। একটা গাড়ি পাঠাইয়া দিতাম। ড. বাহাউল্লাহর শ্বশুরের কথা শুনে গা জ্বালা করে ওঠে। ভায়রার গাড়িতে উঠবেন!
রাষ্ট্রের সেবায় কে কত গুরুত্বপূর্ণ তার ওপর নির্ভর করে মর্যাদা, কে কত টাকা বেতন পান সেটা নয় বিপত্তি ঘটে রাতে খাবারের সময়। টেবিলে গিয়ে বসেন মেজো জামাই সচিব সমির শেখ, সেজো ডিএমডি জামশেদ তোফাদার এবং ছোট জামাই সাবেদ আলী সাবু। বড় জামাই আসেন না। কাজের মেয়েটি গিয়ে বলে, দুলাভাই-আপা আসেন। দুলাভাইরা বইয়া রইছে আপনেগো লাইগা। ড. বাহাউল্লাহ নিম্মিকে বলেন, বলে দাও এখন আমি খাব না। মাথা ধরেছে। রাতে এক গেলাস দুধ দিয়ো।
কাজের মেয়েটি চলে গেলে নিম্মি বলেন, খেয়ে নিলেই পারতা। তোমার মাথা ধরল কখন?
ড. বাহাউল্লাহ খুব নিচু স্তরে ধমকে ওঠেন, তোমার যদি সেই আক্কেল থাকত, তাহলে তোমার আব্বা আমার ঘাড়ে তোমাকে চাপাত না। তুমি জানো, ওই টেবিলে গিয়ে বসলেই বেতনের কথা উঠবে? সমির, জামশেদ, সাবু সবাই বেতনের প্রসঙ্গে ঘাঁটাঘাঁটি করবে।
প্রফেসর বিশেষভাবে শঙ্কিত ছিলেন তাঁর এক মামাশ্বশুরকে নিয়ে। ভদ্রলোক সারা জীবন কিছুই করেননি। ভগ্নিপতির ওপরই চলেছেন। বেশি কথা বলেন। কার বেতন কত—এই সব নিয়ে তাঁরই যত মাথাব্যথা। যা হোক, সবাই এক রকম না। পাশের বাড়ির দূরসম্পর্কের এক চাচিশাশুড়ি এলেন জামাইদের সঙ্গে দেখা করতে। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন। টেলিভিশন দেখেন। খবরের কাগজও পড়েন। কোথায় কারা কী দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করেন, সে খবর রাখেন। বড় জামাইয়ের সঙ্গেই তাঁর অনেকক্ষণ কথা হয়। কথা প্রসঙ্গে একটি পুরোনো গল্প বড় দুলামিয়াকে স্মরণ করিয়ে দেন:
মোগল সম্রাট তাঁর ছেলেকে বিদ্যাশিক্ষা দিতে শিক্ষক রেখে দেন। একদিন সম্রাট দেখেন যুবরাজ তার ওস্তাদের পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে আর ওস্তাদজি নিজের হাতে পা ধুচ্ছেন। তা দেখে সম্রাট ক্ষুব্ধ হন এবং পুত্রকে বকুনি দিয়ে বলেন, এটা স্রেফ বেয়াদবি। তুমি নিজের হাতে ওস্তাদজির পা ধুইয়ে দাও। এই কাহিনিতে শিক্ষকের মর্যাদার কথাই বলা হয়েছে।
বেতন হলো কর্মমূল্য। বেশি বেতনে ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্য বাড়ে, মর্যাদা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সত্যেন বসু, রমেশ মজুমদার যে বেতন পেতেন, তার চার গুণ বেশি পেতেন ঢাকা ডিএম—জেলা প্রশাসক। বাংলাদেশ বিমানের বিদেশি এমডি আমাদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের বেতন-ভাতা যোগ দিলে যা হয়, তার দ্বিগুণের বেশি বেতন পান। প্রাইভেট ব্যাংকের অনেক এমডিও তাই। রাষ্ট্রের সেবায় কে কত গুরুত্বপূর্ণ, তার ওপর নির্ভর করে মর্যাদা, কে কত টাকা বেতন পান সেটা নয়।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
Wednesday, January 27, 2016
রাজনৈতিক দলের সেকাল ও একাল by সৈয়দ আবুল মকসুদ
Wednesday, January 27, 2016
Anonymous
আলোচনা,
উপ-সম্পাদকীয়,
প্রথম আলো,
মতামত,
রাজনীতি,
সৈয়দ আবুল মকসুদ
রাজনৈতিক
দল কী এবং রাজনৈতিক নেতাদের কী কাজ, তা দেখে আসছে এ দেশের মানুষ বহু বছর
থেকে। জীবনে আমি কোনো দলের কার্যালয়ে খুব কমই গিয়েছি। গেলেও গিয়েছি
স্বাধীনতার আগে, কোনো নেতার সঙ্গে দেখা করতে। তবে কয়েকটি দলের কর্মকাণ্ড
দেখে আসছি ছোটবেলা থেকে। বড় নেতাদের কর্মকাণ্ড দেখেছি কাছে থেকে। যে দলকে
আমি সমর্থন করেছি তার কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে বিশেষ ছিল না। গণতান্ত্রিক
দলগুলোর জনসভায়ও উপস্থিত থেকেছি।
চিরকাল কোনো কিছু একই রকম থাকবে, তা আশা করা ঠিক নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আসে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে। পোশাক-আশাকে পরিবর্তন আসে। চালচলনে পরিবর্তন আসে। ৬০-৭০ বছর আগে এ দেশের বড় নেতারা পাম্প শু, ঢোলা পায়জামা, লম্বা কালো শেরওয়ানি এবং কালো টুপি পরতেন। পঞ্চাশের দশকে দেখেছি অধিকাংশ নেতাকে রাবারের জুতা, পায়জামা ও লম্বা শার্ট পরতে। সে শার্টও এখনকার শার্টের মতো নয়। তাতে পকেট থাকত তিনটি। দুই পাশে দুটি মস্ত বড় পকেট। তাতে অল্পস্বল্প বাজার করে রাখা যেত। সাধারণত ওই পকেটে তাঁরা রাখতেন টাকা-আধুলি ও খুচরা পয়সা। ওপরের বুকপকেটে থাকত কিছু কাগজপত্র, পাঁচ-দশটি টাকা এবং অবধারিতভাবে একটি ফাউন্টেন পেন। কেউ কেউ চশমাটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রাখতেন। কারও কারও জামার বুকপকেট থাকত কলঙ্কিত—ফাউন্টেন পেনের বেরিয়ে পড়া কালির ছ্যাবড়ানো দাগ। কোনো কোনো নেতা পশ্চিম পাকিস্তানে যেতেন কারও থেকে একটা শেরওয়ানি ও জুতা ধার করে। ষাটের দশকে শার্ট-পায়জামা, প্যান্ট-শার্ট এবং পাঞ্জাবি-পায়জামা একই সঙ্গে চলত। মোটের ওপর এই ছিল বাহাত্তরের জানুয়ারির আগের পোশাকপরিচ্ছদের অবস্থা।
সুখ ও সমৃদ্ধি আসে সত্তরের দশক থেকে। একেবারে নিম্নমধ্য থেকে এক লাফে উচ্চ। পারমিট, টেন্ডার ইত্যাদি যাঁরা অতি দ্রুত হস্তগত করতে পেরেছেন এবং যাঁরা যথেষ্ট স্মার্ট, তাঁরা স্যুট-কোটে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। বঙ্গীয় রাজনীতির সঙ্গে পায়জামা-পাঞ্জাবির একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সত্তরের দশক থেকে ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি ও দামি টেট্রনের পায়জামা এবং তার ওপরে একটা হাতকাটা কটির মতো। যে ধরনের পোশাকে সুগঠিত দীর্ঘদেহী বঙ্গবন্ধুকে নায়কোচিত লাগত, সেই পোশাকেই অনেক ভুঁড়িঅলা বা পাতলা লিকলিকে অনেককে কার্টুনের মতো মনে হতো। আশির দশক নাগাদ এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের পোশাক-আশাক, বাড়ি-গাড়ি ও জীবনযাপনে যে পরিবর্তন আসে, তেমনটি আমেরিকায় আসতে ১০০ বছরের ওপরে লেগেছে। যানবাহনের প্রশ্নে পঞ্চাশের দশকে তো বটেই, ষাটের দশকেও ঢাকার অনেক নেতার অবলম্বন ছিল বাইসাইকেল। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁরা যাতায়াত করতেন লঞ্চে বা ট্রেনে, প্রত্যন্ত এলাকায় নৌকায়। সত্তরের দশক পর্যন্ত দেশের রাস্তাঘাটও ছিল শোচনীয়। যোগাযোগের অসুবিধা সত্ত্বেও দেশের সব অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে নেতাদের সম্পর্ক সৃষ্টি হতো ব্যক্তিগত পর্যায়ে।
এখন কেউ ভাবতেও পারবে না সদরঘাট মোড় থেকে টাউন সার্ভিস বাস ইসলামপুর, মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, আজিমপুর হয়ে নিউমার্কেট-নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত চলত। পঞ্চাশের দশকে ওই রুটে আমরা বাসে, রিকশায়, সাইকেলে বা হেঁটে বাংলাবাজার থেকে আজিমপুর-লালবাগ আসতাম। মিটফোর্ড পার হয়ে মোগলটুলী-চকবাজার এলে আব্বা আমাকে দেখাতেন একটি বাড়ি। ১৫০ নম্বর মোগলটুলী। ইতিহাসের সাক্ষী। ওই বাড়িতে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের প্রক্রিয়ার শুরু। তারপর টিকাটুলী কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেন’ নামক বাড়িতে দলের আত্মপ্রকাশ। পঞ্চাশের দশকে এবং ষাটের প্রথম কিছুকাল আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছিল নবাবপুরে। কোনো জৌলুশ ছিল না, কিন্তু তা মুখরিত থাকত বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের আনাগোনায়। তারপর অফিস আসে পুরানা পল্টন। সবশেষে গুলিস্তান-জিন্নাহ অ্যাভিনিউতে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। ওই সব কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নেতা ও দলীয় সাধারণ কর্মীদের মধ্যে অবাধে মেলামেশা হতো। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকেরা সবার নাম টুকে রাখতেন তাঁদের খাতায়। ঝুঁকি নিয়ে নিচের দিকের নেতারা দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত করতেন।
এক দল থেকে আরেক বা একাধিক দলের জন্ম হতে পারে। সেটা স্বাভাবিক। তাকে দলের ভাঙন বলে না। কোন্দলও বলে না। ১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই আওয়ামী লীগ থেকে বামপন্থীরা বেরিয়ে অন্য আরও কয়েকটি দলকে নিয়ে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সন্তোষের লুঙ্গি-পরা এক বৃদ্ধের নেতৃত্বে। প্রথমে অফিস ছিল না। লিয়াকত অ্যাভিনিউর রয়েল স্টেশনারির ওপরে ব্যারিস্টার শওকত আলী খানের বাড়িতেই দলের কাজ চলত। সন্তোষের বৃদ্ধও ওই বাড়িতে এসে উঠতেন। ঢাকায় তাঁর অস্থায়ী বা স্থায়ী বাসা বা বাড়ি ছিল না। টিপু সুলতান রোডে ‘স্টেপ-ইন’ নামক এক বাড়িতেও উঠতেন। কখনো মগবাজারে সাইদুল হাসানের (একাত্তরে শহীদ) বাড়িতে।
পরে ন্যাপের অফিস হয় নবাবপুর-ঠাটারিবাজারের কাছে ‘নাইল ভ্যালি’ হোটেলের দোতলায়। সেখানেই থাকতেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাস করা কৃষকনেতা হাজী দানেশ, হাতেম আলী খান প্রমুখ। হাজী দানেশ নিজের হাতে ডাল, ভাত, তরকারি রান্না করে খেতেন এবং ন্যাপ কর্মীরা গেলে তাঁদেরও খেতে দিতেন। ন্যাপকে বাইরে থেকে নানাভাবে আর্থিক সাহায্য করতেন ডাক্তার আবদুল ওয়াদুদ, জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের সঙ্গেও সাইদুর রহমান স্যারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
সেকালের আর একটি প্রধান দল কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সম্পর্কে কিছু না বলাই ভালো। এখনকার তরুণেরা মনে করবে গুল মারছি। পুরানা পল্টনে ছিল ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয়। সেখানে থাকতেন জ্ঞান চক্রবর্তী, খোকা রায়, সুনীল রায়, অনিল মুখার্জি। কোনো দিন লক্ষ্মীবাজার থেকে হেঁটে আসতেন রণেশ দাশগুপ্ত। খোকা রায় সকালে উঠে পার্টির অফিস নিজের হাতে ঝাড়ু দিতেন। মাছ-তরকারি কুটে রান্নাবান্নাও করতেন। আমাদের মতো নির্বোধ ছোকরারা ওই সব বিষয়বুদ্ধি-বিবর্জিত নেতার কথা শুনতাম আর ভাবতাম, এই বুঝি দেশটায় বিপ্লব এল আর বদলে গেল পুরোনো সমাজটা।
এখন সকালবেলা খবরের কাগজ পড়ে এবং সন্ধ্যাবেলা টিভি চ্যানেলে খবর শুনে পুরোনো দিনের সব আজেবাজে স্মৃতি মাথার মধ্যে জড়ো হয়। সেখানে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি প্রভৃতি ছিল রাজনৈতিক দল। নেতারা ছিলেন জনগণের নেতা। রাজনৈতিক দল ডিপার্টমেন্ট স্টোর বা হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগলের খামারের মতো প্রতিষ্ঠান নয়। দলের নেতা ইচ্ছামতো একে বরখাস্ত ওকে নিযুক্তি দিতে পারেন না ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিক বা চেয়ারম্যানের মতো। রাজনৈতিক দলের অফিস আর কোনো কোম্পানির চিফ এক্সিকিউটিভের কার্যালয় এক রকম নয়।
৫০-৬০ বছর আগে ধড়িবাজ-বাটপার ধরনের লোকের রাজনীতিতে স্থান ছিল না। সেখানে রাজনীতিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, দলের আলিশান কার্যালয় নয়। তখন ‘আসল’ দলের লোকেরা নকল দলের অফিস দখল করতে ট্রাক নিয়ে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের মতো অভিযানে বের হতেন না। তারপর ধাওয়া–পাল্টাধাওয়া, মারপিট ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ। দাউ দাউ করে জ্বলছে ট্রাক আর তার সওয়ারিরা ভোঁ-দৌড় দিতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে ভাঙছেন হাঁটু।
রাজনীতি আর মন্ত্রিত্ব, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্ব—সবই একসঙ্গে ককটেল বানানো শুধু কলিযুগেই সম্ভব। ধারণা করা যায় কি কোনো দেশে বিরোধী দলের কোন্দল মেটাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে? ভাবা যায়, আওয়ামী লীগ বা ন্যাপের নেতারা নিজেদের বিরোধ মেটাতে গভর্নর মোনায়েম খানের শরণাপন্ন হচ্ছেন? মন্ত্রিত্ব বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা না নিয়ে বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দিলে তা হতো সততা। ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করার নাম রাজনীতি নয় এবং জনগণকে ছাগল মনে করা ঘোরতর অন্যায়। কামরুল হাসানের জীবনের শেষ ছবিটির কথা মনে পড়ে, যার ক্যাপশন: দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার কবলে। কী অমোঘ সত্য কথা বলেছেন নেতা: ‘আওয়ামী লীগ তার প্রয়োজনেই জাপাকে শক্তিশালী করবে।’
একজনের ১০টি বছর মন্ত্রিত্ব করেও সাধ মেটেনি। এখন আবার সরকারি দলে যাওয়ার জন্য এক পায়ে খাঁড়া। শুধু হাতছানির হাতটা নড়তে দেখলেই হয়। আগে নেতাদের দেখেছি দল শক্তিশালী করাকে মন্ত্রিত্বের চেয়ে সম্মানজনক মনে করতেন। ১৯৫৭-তে শেখ মুজিব মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়াই বড় দায়িত্ব মনে করেছেন। মনে আছে, ১৯৭৪-এ এ এইচ এম কামারুজ্জামান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর জায়গায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন ও পানিসম্পদমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাককে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেখানে এখন বিরোধী দলের পরিচয় দিয়ে মন্ত্রিত্ব কামড়ে পড়ে থাকা নির্লজ্জতা নয় কি?
বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দুটোরই জন্ম ক্ষমতাসীন অবস্থায়। তাই সরকারের বাইরে থেকে যে রাজনীতি হয়, তা মানতে তারা বাধ্য নয়। কোনো দলের জাতীয় কাউন্সিল অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাতে পূর্ববর্তী বছরগুলোর নেতাদের কাজের মূল্যায়ন হয় এবং আগামী বছরগুলোতে নতুন নেতৃত্ব কী করবেন, তা ঠিক করা হয়। দল যদি প্রাইভেট কোম্পানিতে পরিণত হয় তাহলে এক কাউন্সিল থেকে আরেক কাউন্সিল থোড় বড়ি খাড়া—খাড়া বড়ি থোড় মাত্র।
বিএনপি যদি ডান্ডি ডাইংয়ের আর একটি ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, তাহলে মার্চে কাউন্সিল করেও লাভ নেই, বরং ২০১৯-এর মার্চে গিয়ে করলেই ভালো। স্মৃতি থেকে যেটুকু মনে পড়ে, বিএনপির কোনো মহাসচিবই স্বাধীনমতো কাজ করা শুধু নয়, পুরো মেয়াদ পার করতে পারেননি। হয় পরপারে গেছেন, নয়তো পদ থেকে হয়েছেন বরখাস্ত। মান্নান ভূঁইয়ার প্রতি খালেদা জিয়া ভদ্রজনোচিত আচরণ করেননি। কে এম ওবায়দুর রহমান ভালো নেতা ছিলেন। এক রাত আগেও জানতেন না যে তিনি পদ হারাচ্ছেন। দলের সেক্রেটারি বানাতে হয় তরুণ ও দক্ষ নেতাকে। বুড়োরা ইমামতি করতে পারেন, দলের নেতৃত্ব নয়। মির্জা আলমগীরের মতো একজন অসাম্প্রদায়িক ভদ্র ও প্রগতিশীল নেতাকে শুধু ভারই বহন করতে হলো।
তবু আশা করি, নেতারা শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবেন। বাংলাদেশের পথভ্রষ্ট রাজনীতি তার অতীত ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নেবে এবং এ বছর স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসে মানুষকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি দেবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
চিরকাল কোনো কিছু একই রকম থাকবে, তা আশা করা ঠিক নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুতেই পরিবর্তন আসে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসে। পোশাক-আশাকে পরিবর্তন আসে। চালচলনে পরিবর্তন আসে। ৬০-৭০ বছর আগে এ দেশের বড় নেতারা পাম্প শু, ঢোলা পায়জামা, লম্বা কালো শেরওয়ানি এবং কালো টুপি পরতেন। পঞ্চাশের দশকে দেখেছি অধিকাংশ নেতাকে রাবারের জুতা, পায়জামা ও লম্বা শার্ট পরতে। সে শার্টও এখনকার শার্টের মতো নয়। তাতে পকেট থাকত তিনটি। দুই পাশে দুটি মস্ত বড় পকেট। তাতে অল্পস্বল্প বাজার করে রাখা যেত। সাধারণত ওই পকেটে তাঁরা রাখতেন টাকা-আধুলি ও খুচরা পয়সা। ওপরের বুকপকেটে থাকত কিছু কাগজপত্র, পাঁচ-দশটি টাকা এবং অবধারিতভাবে একটি ফাউন্টেন পেন। কেউ কেউ চশমাটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রাখতেন। কারও কারও জামার বুকপকেট থাকত কলঙ্কিত—ফাউন্টেন পেনের বেরিয়ে পড়া কালির ছ্যাবড়ানো দাগ। কোনো কোনো নেতা পশ্চিম পাকিস্তানে যেতেন কারও থেকে একটা শেরওয়ানি ও জুতা ধার করে। ষাটের দশকে শার্ট-পায়জামা, প্যান্ট-শার্ট এবং পাঞ্জাবি-পায়জামা একই সঙ্গে চলত। মোটের ওপর এই ছিল বাহাত্তরের জানুয়ারির আগের পোশাকপরিচ্ছদের অবস্থা।
সুখ ও সমৃদ্ধি আসে সত্তরের দশক থেকে। একেবারে নিম্নমধ্য থেকে এক লাফে উচ্চ। পারমিট, টেন্ডার ইত্যাদি যাঁরা অতি দ্রুত হস্তগত করতে পেরেছেন এবং যাঁরা যথেষ্ট স্মার্ট, তাঁরা স্যুট-কোটে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। বঙ্গীয় রাজনীতির সঙ্গে পায়জামা-পাঞ্জাবির একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সত্তরের দশক থেকে ফিনফিনে আদ্দির পাঞ্জাবি ও দামি টেট্রনের পায়জামা এবং তার ওপরে একটা হাতকাটা কটির মতো। যে ধরনের পোশাকে সুগঠিত দীর্ঘদেহী বঙ্গবন্ধুকে নায়কোচিত লাগত, সেই পোশাকেই অনেক ভুঁড়িঅলা বা পাতলা লিকলিকে অনেককে কার্টুনের মতো মনে হতো। আশির দশক নাগাদ এ দেশের রাজনৈতিক নেতাদের পোশাক-আশাক, বাড়ি-গাড়ি ও জীবনযাপনে যে পরিবর্তন আসে, তেমনটি আমেরিকায় আসতে ১০০ বছরের ওপরে লেগেছে। যানবাহনের প্রশ্নে পঞ্চাশের দশকে তো বটেই, ষাটের দশকেও ঢাকার অনেক নেতার অবলম্বন ছিল বাইসাইকেল। দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁরা যাতায়াত করতেন লঞ্চে বা ট্রেনে, প্রত্যন্ত এলাকায় নৌকায়। সত্তরের দশক পর্যন্ত দেশের রাস্তাঘাটও ছিল শোচনীয়। যোগাযোগের অসুবিধা সত্ত্বেও দেশের সব অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে নেতাদের সম্পর্ক সৃষ্টি হতো ব্যক্তিগত পর্যায়ে।
এখন কেউ ভাবতেও পারবে না সদরঘাট মোড় থেকে টাউন সার্ভিস বাস ইসলামপুর, মিটফোর্ড, চকবাজার, লালবাগ, আজিমপুর হয়ে নিউমার্কেট-নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত চলত। পঞ্চাশের দশকে ওই রুটে আমরা বাসে, রিকশায়, সাইকেলে বা হেঁটে বাংলাবাজার থেকে আজিমপুর-লালবাগ আসতাম। মিটফোর্ড পার হয়ে মোগলটুলী-চকবাজার এলে আব্বা আমাকে দেখাতেন একটি বাড়ি। ১৫০ নম্বর মোগলটুলী। ইতিহাসের সাক্ষী। ওই বাড়িতে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের প্রক্রিয়ার শুরু। তারপর টিকাটুলী কে এম দাস লেনের ‘রোজ গার্ডেন’ নামক বাড়িতে দলের আত্মপ্রকাশ। পঞ্চাশের দশকে এবং ষাটের প্রথম কিছুকাল আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছিল নবাবপুরে। কোনো জৌলুশ ছিল না, কিন্তু তা মুখরিত থাকত বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের আনাগোনায়। তারপর অফিস আসে পুরানা পল্টন। সবশেষে গুলিস্তান-জিন্নাহ অ্যাভিনিউতে। বর্তমানে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। ওই সব কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নেতা ও দলীয় সাধারণ কর্মীদের মধ্যে অবাধে মেলামেশা হতো। পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোকেরা সবার নাম টুকে রাখতেন তাঁদের খাতায়। ঝুঁকি নিয়ে নিচের দিকের নেতারা দলীয় কার্যালয়ে যাতায়াত করতেন।
এক দল থেকে আরেক বা একাধিক দলের জন্ম হতে পারে। সেটা স্বাভাবিক। তাকে দলের ভাঙন বলে না। কোন্দলও বলে না। ১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই আওয়ামী লীগ থেকে বামপন্থীরা বেরিয়ে অন্য আরও কয়েকটি দলকে নিয়ে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সন্তোষের লুঙ্গি-পরা এক বৃদ্ধের নেতৃত্বে। প্রথমে অফিস ছিল না। লিয়াকত অ্যাভিনিউর রয়েল স্টেশনারির ওপরে ব্যারিস্টার শওকত আলী খানের বাড়িতেই দলের কাজ চলত। সন্তোষের বৃদ্ধও ওই বাড়িতে এসে উঠতেন। ঢাকায় তাঁর অস্থায়ী বা স্থায়ী বাসা বা বাড়ি ছিল না। টিপু সুলতান রোডে ‘স্টেপ-ইন’ নামক এক বাড়িতেও উঠতেন। কখনো মগবাজারে সাইদুল হাসানের (একাত্তরে শহীদ) বাড়িতে।
পরে ন্যাপের অফিস হয় নবাবপুর-ঠাটারিবাজারের কাছে ‘নাইল ভ্যালি’ হোটেলের দোতলায়। সেখানেই থাকতেন আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাস করা কৃষকনেতা হাজী দানেশ, হাতেম আলী খান প্রমুখ। হাজী দানেশ নিজের হাতে ডাল, ভাত, তরকারি রান্না করে খেতেন এবং ন্যাপ কর্মীরা গেলে তাঁদেরও খেতে দিতেন। ন্যাপকে বাইরে থেকে নানাভাবে আর্থিক সাহায্য করতেন ডাক্তার আবদুল ওয়াদুদ, জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগের সঙ্গেও সাইদুর রহমান স্যারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
সেকালের আর একটি প্রধান দল কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সম্পর্কে কিছু না বলাই ভালো। এখনকার তরুণেরা মনে করবে গুল মারছি। পুরানা পল্টনে ছিল ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির কার্যালয়। সেখানে থাকতেন জ্ঞান চক্রবর্তী, খোকা রায়, সুনীল রায়, অনিল মুখার্জি। কোনো দিন লক্ষ্মীবাজার থেকে হেঁটে আসতেন রণেশ দাশগুপ্ত। খোকা রায় সকালে উঠে পার্টির অফিস নিজের হাতে ঝাড়ু দিতেন। মাছ-তরকারি কুটে রান্নাবান্নাও করতেন। আমাদের মতো নির্বোধ ছোকরারা ওই সব বিষয়বুদ্ধি-বিবর্জিত নেতার কথা শুনতাম আর ভাবতাম, এই বুঝি দেশটায় বিপ্লব এল আর বদলে গেল পুরোনো সমাজটা।
এখন সকালবেলা খবরের কাগজ পড়ে এবং সন্ধ্যাবেলা টিভি চ্যানেলে খবর শুনে পুরোনো দিনের সব আজেবাজে স্মৃতি মাথার মধ্যে জড়ো হয়। সেখানে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি প্রভৃতি ছিল রাজনৈতিক দল। নেতারা ছিলেন জনগণের নেতা। রাজনৈতিক দল ডিপার্টমেন্ট স্টোর বা হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগলের খামারের মতো প্রতিষ্ঠান নয়। দলের নেতা ইচ্ছামতো একে বরখাস্ত ওকে নিযুক্তি দিতে পারেন না ডিপার্টমেন্ট স্টোরের মালিক বা চেয়ারম্যানের মতো। রাজনৈতিক দলের অফিস আর কোনো কোম্পানির চিফ এক্সিকিউটিভের কার্যালয় এক রকম নয়।
৫০-৬০ বছর আগে ধড়িবাজ-বাটপার ধরনের লোকের রাজনীতিতে স্থান ছিল না। সেখানে রাজনীতিই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, দলের আলিশান কার্যালয় নয়। তখন ‘আসল’ দলের লোকেরা নকল দলের অফিস দখল করতে ট্রাক নিয়ে দিগ্বিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের মতো অভিযানে বের হতেন না। তারপর ধাওয়া–পাল্টাধাওয়া, মারপিট ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ। দাউ দাউ করে জ্বলছে ট্রাক আর তার সওয়ারিরা ভোঁ-দৌড় দিতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে ভাঙছেন হাঁটু।
রাজনীতি আর মন্ত্রিত্ব, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্ব—সবই একসঙ্গে ককটেল বানানো শুধু কলিযুগেই সম্ভব। ধারণা করা যায় কি কোনো দেশে বিরোধী দলের কোন্দল মেটাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হচ্ছে? ভাবা যায়, আওয়ামী লীগ বা ন্যাপের নেতারা নিজেদের বিরোধ মেটাতে গভর্নর মোনায়েম খানের শরণাপন্ন হচ্ছেন? মন্ত্রিত্ব বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা না নিয়ে বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন দিলে তা হতো সততা। ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করার নাম রাজনীতি নয় এবং জনগণকে ছাগল মনে করা ঘোরতর অন্যায়। কামরুল হাসানের জীবনের শেষ ছবিটির কথা মনে পড়ে, যার ক্যাপশন: দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার কবলে। কী অমোঘ সত্য কথা বলেছেন নেতা: ‘আওয়ামী লীগ তার প্রয়োজনেই জাপাকে শক্তিশালী করবে।’
একজনের ১০টি বছর মন্ত্রিত্ব করেও সাধ মেটেনি। এখন আবার সরকারি দলে যাওয়ার জন্য এক পায়ে খাঁড়া। শুধু হাতছানির হাতটা নড়তে দেখলেই হয়। আগে নেতাদের দেখেছি দল শক্তিশালী করাকে মন্ত্রিত্বের চেয়ে সম্মানজনক মনে করতেন। ১৯৫৭-তে শেখ মুজিব মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়াই বড় দায়িত্ব মনে করেছেন। মনে আছে, ১৯৭৪-এ এ এইচ এম কামারুজ্জামান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর জায়গায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন ও পানিসম্পদমন্ত্রী খোন্দকার মোশতাককে বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেখানে এখন বিরোধী দলের পরিচয় দিয়ে মন্ত্রিত্ব কামড়ে পড়ে থাকা নির্লজ্জতা নয় কি?
বিএনপি ও জাতীয় পার্টি দুটোরই জন্ম ক্ষমতাসীন অবস্থায়। তাই সরকারের বাইরে থেকে যে রাজনীতি হয়, তা মানতে তারা বাধ্য নয়। কোনো দলের জাতীয় কাউন্সিল অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তাতে পূর্ববর্তী বছরগুলোর নেতাদের কাজের মূল্যায়ন হয় এবং আগামী বছরগুলোতে নতুন নেতৃত্ব কী করবেন, তা ঠিক করা হয়। দল যদি প্রাইভেট কোম্পানিতে পরিণত হয় তাহলে এক কাউন্সিল থেকে আরেক কাউন্সিল থোড় বড়ি খাড়া—খাড়া বড়ি থোড় মাত্র।
বিএনপি যদি ডান্ডি ডাইংয়ের আর একটি ভ্রাতৃপ্রতিম প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে, তাহলে মার্চে কাউন্সিল করেও লাভ নেই, বরং ২০১৯-এর মার্চে গিয়ে করলেই ভালো। স্মৃতি থেকে যেটুকু মনে পড়ে, বিএনপির কোনো মহাসচিবই স্বাধীনমতো কাজ করা শুধু নয়, পুরো মেয়াদ পার করতে পারেননি। হয় পরপারে গেছেন, নয়তো পদ থেকে হয়েছেন বরখাস্ত। মান্নান ভূঁইয়ার প্রতি খালেদা জিয়া ভদ্রজনোচিত আচরণ করেননি। কে এম ওবায়দুর রহমান ভালো নেতা ছিলেন। এক রাত আগেও জানতেন না যে তিনি পদ হারাচ্ছেন। দলের সেক্রেটারি বানাতে হয় তরুণ ও দক্ষ নেতাকে। বুড়োরা ইমামতি করতে পারেন, দলের নেতৃত্ব নয়। মির্জা আলমগীরের মতো একজন অসাম্প্রদায়িক ভদ্র ও প্রগতিশীল নেতাকে শুধু ভারই বহন করতে হলো।
তবু আশা করি, নেতারা শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবেন। বাংলাদেশের পথভ্রষ্ট রাজনীতি তার অতীত ঐতিহ্য থেকে শিক্ষা নেবে এবং এ বছর স্বাভাবিক ধারায় ফিরে এসে মানুষকে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে মুক্তি দেবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
Tuesday, January 19, 2016
এক মত ও বহু মত by সৈয়দ আবুল মকসুদ
Tuesday, January 19, 2016
Anonymous
আলোচনা,
উপ-সম্পাদকীয়,
প্রথম আলো,
মতামত,
রাজনীতি,
সৈয়দ আবুল মকসুদ
দ্বিতীয়
মহাযুদ্ধে হিটলারের পরাজয়ের পর জার্মানি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি
ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ। ভৌগোলিকভাবে দুটুকরো হয়ে যায় জার্মানি। সোভিয়েত
সমাজতান্ত্রিক শিবিরে থাকে পূর্ব জার্মানি: জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক
বা জিডিআর। পশ্চিম জার্মানি—ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি থাকে পুঁজিবাদী
গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে। কিন্তু দেশটির আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক,
সাংস্কৃতিক অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। সেই বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে
সেখানে আবির্ভাব ঘটতে পারত একজন শক্তিশালী ডিকটেটরের। কিন্তু জার্মানির
নতুন নেতৃত্ব সে পথ গ্রহণ না করে উদার গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনা করেন।
রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, জার্মানিতে ‘এক মত’ চলবে না।
ভালো হোক মন্দ হোক, রাষ্ট্রে ও সমাজে নানা মতের সহ-অবস্থান থাকতে হবে।
বাস্তবিক পক্ষে শুধু রাষ্ট্রে নয়, জার্মান সমাজে, এমনকি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ও পরিবারে পর্যন্ত ‘এক মত’ পরিত্যাজ্য। আমি জার্মান পরিবারে দেখেছি, শিশুকাল থেকেই স্বাধীন চিন্তায় উৎসাহ দেওয়া হয়। যেকোনো প্রশ্নে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সমান। জার্মান সংবিধান, যার নাম ‘বেসিক ল’ বা মৌলিক আইন, তাতে বাক্ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার শতভাগ গ্যারান্টি দেওয়া আছে। শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্বাধীনতা সীমাহীন। আমি সেকালের পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বন নগরীর প্রেসক্লাবে এক কার্টুন প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম। তাতে প্রদর্শিত হয়েছিল একজন খ্যাতিমান কার্টুনশিল্পীর আঁকা ব্যঙ্গচিত্র। বিষয়বস্তু জার্মান রাজনীতিবিদ। জনা চল্লিশ বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতার কার্টুন। তাতে প্রেসিডেন্ট, চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে মন্ত্রী ও পার্লামেন্ট মেম্বারদের ব্যঙ্গচিত্র ছিল। প্রত্যেক নেতার মুখটা মানুষের, তার শরীরটি পশুর। কোনো নেতা বিড়াল, কোনো নেতা কুকুর, কোনো নেতা বেজি, কোনো নেতা শুয়োর, কোনো নেতা সাপ, কোনো নেতা ষাঁড় প্রভৃতি। বাংলাদেশে ওই রকম কার্টুনের যদি কোনো শিল্পী প্রদর্শনী করতেন, তাহলে তা নিয়ে হতো নানা রকম মামলা—দেওয়ানি, ফৌজদারি ও রিট। সে মামলাও একটি নয়, বিভিন্ন জেলা শহরে। অনুভূতিতে আঘাতের কারণে মানহানির মামলা তো হতোই। ফৌজদারি মামলা হতো, কারণ ওই প্রদর্শনী ভাঙচুর করতে গিয়ে জনা বিশেক জখম হয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে থাকত চিকিৎসাধীন। হতো বহু প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন। সেখানেও মারামারিতে মাথা ফাটত কয়েকজনের। বিভিন্ন নিকৃষ্ট জানোয়ারের সঙ্গে রাজনীতিকদের তুলনা করায় কোনো আপত্তি উঠেছে কি না—জানতে চাইলে একজন জার্মান কর্মকর্তা বলেছিলেন, আর্ট ইজ ফ্রি। শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মে স্বাধীন।
উনিশ শতক থেকে পৃথিবীর প্রায় সব প্রগতিশীল দার্শনিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের উদ্ভব জার্মানিতে। উনিশ শতকেই পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠে জার্মানিতে। সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সূচনাও জার্মানিতে। শিল্প-সাহিত্য, তত্ত্বজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার প্রভৃতি ক্ষেত্রেও জার্মানরাই ছিলেন অগ্রগামী। তারপরও কী কারণে জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে বর্বর ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে এবং তাঁর এক যুগের শাসনকালে অতীতের সব গৌরব ম্লান হয়ে যায়, তা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। তার একমাত্র কারণ ‘এক মত’-এর প্রাধান্য এবং বহু মতের প্রকাশ ও সমন্বয় না থাকা। কোনো রাষ্ট্রেরই ভালোমন্দের সব দায়দায়িত্ব কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দিতে পারে না জনগণ। সেই গোষ্ঠী যদি অপার দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন হয়, তা হলেও নয়। সেই জন্য হিটলারের পতনের পরপরই নতুন গণতান্ত্রিক জার্মানির যাত্রা শুরুর সময়ই ‘এক মত’-এর প্রাধান্য বর্জিত হয় এবং বহু মতের গুরুত্ব ঘোষিত হয়।
একটি রাষ্ট্র কোনো এক-দরজাবিশিষ্ট প্রায় অন্ধকার আলো-বাতাসহীন ঘর নয়। রাষ্ট্রকে হতে হয় বহু দরজা-জানালাবিশিষ্ট একটি আলোকিত ও উন্মুক্ত ভবন। এক-দরজাবিশিষ্ট রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত কিমের উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, সিরিয়া প্রভৃতি। একটি মাত্র দরজা থাকাতে আলো-বাতাসহীন জায়গাতেই আইএস প্রভৃতির মতো জিনিসের জন্ম হতে পারে। তাতে শাসকদের যতটুকু ক্ষতি, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষতি দেশের জনগণের। মূল্যটা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়। কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমারের শাসকেরা নন, খেসারত দিয়ে আসছে সে দেশের সাধারণ মানুষ। পাকিস্তানি শাসকদের দুর্বুদ্ধির মূল্য দিয়েছে এবং দিচ্ছে পাকিস্তানের জনগণ এবং আরও বহুকাল দেবে।
রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার হলো সরকার, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। রাষ্ট্রের নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সরকার। সরকারের নিজস্ব নীতিনির্ধারক রয়েছেন। তাঁদের দুর্বলতা ও ভুলভ্রান্তি থাকা সম্ভব। সরকারের বাইরে নাগরিকদের যেসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের মতামতের মূল্য সামান্য নয়। কিছু কিছু প্রশ্নে বরং বেশি। কারণ সরকারের মেয়াদকাল নির্দিষ্ট, জনগণ চিরস্থায়ী; প্রজন্মের পর প্রজন্ম বংশানুক্রমে মানুষ বেঁচে থাকে। কোনো সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনাহীনতার কারণে যদি দেশের একটি অমূল্য বনভূমি ধ্বংস হয়ে যায়, সেই সরকারের তাতে কিছুই আসে-যায় না; কিন্তু সর্বনাশ দেশের জনগণের। এক প্রজন্মের ক্ষতি নয়, অনাগত সব প্রজন্মের। কোনো সরকারের গৃহীত কোনো প্রকল্পে যদি চেরনোবিলের মতো বিস্ফোরণ ঘটায় লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, তাতে সেই সরকারের লোকদের কী যায়-আসে। জনগণের ভবিষ্যৎ জনগণই ভালো বোঝে।
পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক, বেসরকারি সংস্থা, পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংস্থা, সিভিল সোসাইটির সংগঠনগুলোকে সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। আর যদি নাও দেয়, অন্তত তাদের কাজের মূল্যায়ন করে। নাগরিক সমাজের মতামতের মূল্য দেয়। আর কিছুই যদি না করে, অন্তত অসম্মান করে না। ভিন্নমতাবলম্বীকে অপমানটা করে না। আমাদের সরকার তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো মতামতকেই দাম দেয় না; বরং যেকোনো ভিন্নমত বিচার-বিবেচনা না করে তাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে।
সরকারি লোকেরা যেহেতু টাকাপয়সা বোঝেন ভালো, তাই কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে যখন সমালোচনামূলক মতামত আসে—তাঁরা প্রথমেই প্রশ্ন তোলেন, তারা গবেষণা যে করে, টাকা পায় কোথায়? শুধু টাকা কোথায় পায়, তা-ই নয়, বলেই দেন টাকাটা তারা পায় নির্ঘাত সরকারের শত্রুপক্ষ থেকে। এই ধরনের প্রশ্ন তোলা খুব নিম্নমানের গ্রাম্যতা। রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনার কাজটা যেহেতু সরকারের, সুতরাং তার কাজের প্রশংসা-সমালোচনা-নিন্দা হবেই। অন্যায্য ও বিদ্বেষমূলক সমালোচনায় মানুষ কানই দেয় না—নিন্দা নিন্দুকের মুখেই থাকে।
সব গণতান্ত্রিক সমাজেই গণমাধ্যম স্বাধীন এবং সমালোচনামূলক কর্তৃত্বের কাজ করে। মাঠপর্যায়ের মানুষের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। স্বাধীন নাগরিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করে। তাদের গবেষণালব্ধ সমীক্ষার ফলাফল গণমাধ্যম সরকার ও দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়। সেই সব বেসরকারি সমীক্ষা সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে পারে। নাগরিকদের সমীক্ষা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সহায়ক—উন্নয়নের শত্রু নয়। বিতর্ক হতেই পারে এবং হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অমর্ত্য সেনের ভাষায় যাকে বলে তক্কাতক্কি। যে সমাজে বিতর্ক বা তক্কাতক্কির সুযোগ নেই, তা এক-দরজাবিশিষ্ট ঘর।
গত ৪০ বছরে বাংলাদেশের সমাজে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। মানুষ পুরোনো বাংলাদেশে ফিরে যেতে চায় না; বরং চায় নতুন আরও ভালো এক বাংলাদেশ। যেখানে মানুষ তার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে পারবে, যেখানে থাকবে সামাজিক ন্যায়বিচার। যেখানে মানুষ আছে, সেখানে সমস্যা থাকবে। সব সমস্যার সমাধান একা সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। প্রাকৃতিক ও সামরিক সব সমস্যাই সম্মিলিত চেষ্টা ছাড়া সমাধান অসম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা লাগবেই। জঙ্গিবাদ মহামারির আকারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা তুলনামূলকভাবে ভালো আছি। কিন্তু জঙ্গিবাদ কার প্ররোচনায়, কোথায়, কী আকার ধারণ করে, তা বলা সম্ভব নয়। কোন জঙ্গিবাদ দমনের ধরন কী রকম হবে, তা একা সরকারের পক্ষে নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়। নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী, উন্নয়ন গবেষকদের বুদ্ধি-পরামর্শ দরকার। সবাইকে ঠেলা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন গত শুক্রবার সাধারণ পরিষদে বলেছেন, অপরিকল্পিত নীতি, ব্যর্থ নেতৃত্ব, কঠোর পন্থা, কেবল সামরিক বল প্রয়োগ করে জঙ্গিবাদ নির্মূলের চেষ্টা হয়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে মানবাধিকার। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এসব পন্থা নেওয়ার ফলে জঙ্গিবাদ বেড়েই চলেছে। প্রতিটি রাষ্ট্রকে তিনি জঙ্গিবাদ নির্মূলে জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দাবি করে, প্রতিটি দেশের নেতৃত্বের সুবিবেচনাপ্রসূত সংযমী সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিমিতিবোধ। সে জন্য এক মতের একরোখা নীতি নয়, চাই বহু মতের সমন্বয়ী সিদ্ধান্ত, পক্ষপাতহীনতা ও সহনশীলতা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হীন পন্থায় দুর্বল করতে চাইলে হিতে বিপরীত হয়। ভিন্নমতাবলম্বীকে তার অপ্রীতিকর কথার জন্য চপেটাঘাত না করে তা ধীরস্থিরভাবে বিচার করে প্রত্যাখ্যান করাই ভালো। নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে, যেন প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এই বোধ জন্মে: এই রাষ্ট্র আমার।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
বাস্তবিক পক্ষে শুধু রাষ্ট্রে নয়, জার্মান সমাজে, এমনকি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ও পরিবারে পর্যন্ত ‘এক মত’ পরিত্যাজ্য। আমি জার্মান পরিবারে দেখেছি, শিশুকাল থেকেই স্বাধীন চিন্তায় উৎসাহ দেওয়া হয়। যেকোনো প্রশ্নে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের সমান। জার্মান সংবিধান, যার নাম ‘বেসিক ল’ বা মৌলিক আইন, তাতে বাক্ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার শতভাগ গ্যারান্টি দেওয়া আছে। শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্বাধীনতা সীমাহীন। আমি সেকালের পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বন নগরীর প্রেসক্লাবে এক কার্টুন প্রদর্শনী দেখতে গিয়েছিলাম। তাতে প্রদর্শিত হয়েছিল একজন খ্যাতিমান কার্টুনশিল্পীর আঁকা ব্যঙ্গচিত্র। বিষয়বস্তু জার্মান রাজনীতিবিদ। জনা চল্লিশ বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতার কার্টুন। তাতে প্রেসিডেন্ট, চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে মন্ত্রী ও পার্লামেন্ট মেম্বারদের ব্যঙ্গচিত্র ছিল। প্রত্যেক নেতার মুখটা মানুষের, তার শরীরটি পশুর। কোনো নেতা বিড়াল, কোনো নেতা কুকুর, কোনো নেতা বেজি, কোনো নেতা শুয়োর, কোনো নেতা সাপ, কোনো নেতা ষাঁড় প্রভৃতি। বাংলাদেশে ওই রকম কার্টুনের যদি কোনো শিল্পী প্রদর্শনী করতেন, তাহলে তা নিয়ে হতো নানা রকম মামলা—দেওয়ানি, ফৌজদারি ও রিট। সে মামলাও একটি নয়, বিভিন্ন জেলা শহরে। অনুভূতিতে আঘাতের কারণে মানহানির মামলা তো হতোই। ফৌজদারি মামলা হতো, কারণ ওই প্রদর্শনী ভাঙচুর করতে গিয়ে জনা বিশেক জখম হয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে থাকত চিকিৎসাধীন। হতো বহু প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন। সেখানেও মারামারিতে মাথা ফাটত কয়েকজনের। বিভিন্ন নিকৃষ্ট জানোয়ারের সঙ্গে রাজনীতিকদের তুলনা করায় কোনো আপত্তি উঠেছে কি না—জানতে চাইলে একজন জার্মান কর্মকর্তা বলেছিলেন, আর্ট ইজ ফ্রি। শিল্পী তাঁর শিল্পকর্মে স্বাধীন।
উনিশ শতক থেকে পৃথিবীর প্রায় সব প্রগতিশীল দার্শনিক ও রাজনৈতিক তত্ত্বের উদ্ভব জার্মানিতে। উনিশ শতকেই পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠে জার্মানিতে। সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সূচনাও জার্মানিতে। শিল্প-সাহিত্য, তত্ত্বজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার প্রভৃতি ক্ষেত্রেও জার্মানরাই ছিলেন অগ্রগামী। তারপরও কী কারণে জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে বর্বর ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে এবং তাঁর এক যুগের শাসনকালে অতীতের সব গৌরব ম্লান হয়ে যায়, তা বোঝার জন্য খুব বেশি বুদ্ধির প্রয়োজন হয় না। তার একমাত্র কারণ ‘এক মত’-এর প্রাধান্য এবং বহু মতের প্রকাশ ও সমন্বয় না থাকা। কোনো রাষ্ট্রেরই ভালোমন্দের সব দায়দায়িত্ব কোনো একটি গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দিতে পারে না জনগণ। সেই গোষ্ঠী যদি অপার দেশপ্রেমিক ও অত্যন্ত যোগ্যতাসম্পন্ন হয়, তা হলেও নয়। সেই জন্য হিটলারের পতনের পরপরই নতুন গণতান্ত্রিক জার্মানির যাত্রা শুরুর সময়ই ‘এক মত’-এর প্রাধান্য বর্জিত হয় এবং বহু মতের গুরুত্ব ঘোষিত হয়।
একটি রাষ্ট্র কোনো এক-দরজাবিশিষ্ট প্রায় অন্ধকার আলো-বাতাসহীন ঘর নয়। রাষ্ট্রকে হতে হয় বহু দরজা-জানালাবিশিষ্ট একটি আলোকিত ও উন্মুক্ত ভবন। এক-দরজাবিশিষ্ট রাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত কিমের উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, সিরিয়া প্রভৃতি। একটি মাত্র দরজা থাকাতে আলো-বাতাসহীন জায়গাতেই আইএস প্রভৃতির মতো জিনিসের জন্ম হতে পারে। তাতে শাসকদের যতটুকু ক্ষতি, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষতি দেশের জনগণের। মূল্যটা শেষ পর্যন্ত জনগণকেই দিতে হয়। কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমারের শাসকেরা নন, খেসারত দিয়ে আসছে সে দেশের সাধারণ মানুষ। পাকিস্তানি শাসকদের দুর্বুদ্ধির মূল্য দিয়েছে এবং দিচ্ছে পাকিস্তানের জনগণ এবং আরও বহুকাল দেবে।
রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার হলো সরকার, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। রাষ্ট্রের নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে সরকার। সরকারের নিজস্ব নীতিনির্ধারক রয়েছেন। তাঁদের দুর্বলতা ও ভুলভ্রান্তি থাকা সম্ভব। সরকারের বাইরে নাগরিকদের যেসব সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের মতামতের মূল্য সামান্য নয়। কিছু কিছু প্রশ্নে বরং বেশি। কারণ সরকারের মেয়াদকাল নির্দিষ্ট, জনগণ চিরস্থায়ী; প্রজন্মের পর প্রজন্ম বংশানুক্রমে মানুষ বেঁচে থাকে। কোনো সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনাহীনতার কারণে যদি দেশের একটি অমূল্য বনভূমি ধ্বংস হয়ে যায়, সেই সরকারের তাতে কিছুই আসে-যায় না; কিন্তু সর্বনাশ দেশের জনগণের। এক প্রজন্মের ক্ষতি নয়, অনাগত সব প্রজন্মের। কোনো সরকারের গৃহীত কোনো প্রকল্পে যদি চেরনোবিলের মতো বিস্ফোরণ ঘটায় লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়, তাতে সেই সরকারের লোকদের কী যায়-আসে। জনগণের ভবিষ্যৎ জনগণই ভালো বোঝে।
পশ্চিমের গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক, বেসরকারি সংস্থা, পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংস্থা, সিভিল সোসাইটির সংগঠনগুলোকে সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকে। আর যদি নাও দেয়, অন্তত তাদের কাজের মূল্যায়ন করে। নাগরিক সমাজের মতামতের মূল্য দেয়। আর কিছুই যদি না করে, অন্তত অসম্মান করে না। ভিন্নমতাবলম্বীকে অপমানটা করে না। আমাদের সরকার তাদের নিজেদের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো মতামতকেই দাম দেয় না; বরং যেকোনো ভিন্নমত বিচার-বিবেচনা না করে তাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে।
সরকারি লোকেরা যেহেতু টাকাপয়সা বোঝেন ভালো, তাই কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে যখন সমালোচনামূলক মতামত আসে—তাঁরা প্রথমেই প্রশ্ন তোলেন, তারা গবেষণা যে করে, টাকা পায় কোথায়? শুধু টাকা কোথায় পায়, তা-ই নয়, বলেই দেন টাকাটা তারা পায় নির্ঘাত সরকারের শত্রুপক্ষ থেকে। এই ধরনের প্রশ্ন তোলা খুব নিম্নমানের গ্রাম্যতা। রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনার কাজটা যেহেতু সরকারের, সুতরাং তার কাজের প্রশংসা-সমালোচনা-নিন্দা হবেই। অন্যায্য ও বিদ্বেষমূলক সমালোচনায় মানুষ কানই দেয় না—নিন্দা নিন্দুকের মুখেই থাকে।
সব গণতান্ত্রিক সমাজেই গণমাধ্যম স্বাধীন এবং সমালোচনামূলক কর্তৃত্বের কাজ করে। মাঠপর্যায়ের মানুষের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। স্বাধীন নাগরিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন জাতীয় সমস্যা নিয়ে কাজ করে। তাদের গবেষণালব্ধ সমীক্ষার ফলাফল গণমাধ্যম সরকার ও দেশবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়। সেই সব বেসরকারি সমীক্ষা সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে পারে। নাগরিকদের সমীক্ষা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সহায়ক—উন্নয়নের শত্রু নয়। বিতর্ক হতেই পারে এবং হওয়াই বাঞ্ছনীয়। অমর্ত্য সেনের ভাষায় যাকে বলে তক্কাতক্কি। যে সমাজে বিতর্ক বা তক্কাতক্কির সুযোগ নেই, তা এক-দরজাবিশিষ্ট ঘর।
গত ৪০ বছরে বাংলাদেশের সমাজে ব্যাপক রূপান্তর ঘটেছে। মানুষ পুরোনো বাংলাদেশে ফিরে যেতে চায় না; বরং চায় নতুন আরও ভালো এক বাংলাদেশ। যেখানে মানুষ তার পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করতে পারবে, যেখানে থাকবে সামাজিক ন্যায়বিচার। যেখানে মানুষ আছে, সেখানে সমস্যা থাকবে। সব সমস্যার সমাধান একা সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের যুগে কোনো দেশই এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। প্রাকৃতিক ও সামরিক সব সমস্যাই সম্মিলিত চেষ্টা ছাড়া সমাধান অসম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা লাগবেই। জঙ্গিবাদ মহামারির আকারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা তুলনামূলকভাবে ভালো আছি। কিন্তু জঙ্গিবাদ কার প্ররোচনায়, কোথায়, কী আকার ধারণ করে, তা বলা সম্ভব নয়। কোন জঙ্গিবাদ দমনের ধরন কী রকম হবে, তা একা সরকারের পক্ষে নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়। নাগরিক সমাজ, মানবাধিকারকর্মী, উন্নয়ন গবেষকদের বুদ্ধি-পরামর্শ দরকার। সবাইকে ঠেলা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলে বড় ক্ষতির আশঙ্কা।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন গত শুক্রবার সাধারণ পরিষদে বলেছেন, অপরিকল্পিত নীতি, ব্যর্থ নেতৃত্ব, কঠোর পন্থা, কেবল সামরিক বল প্রয়োগ করে জঙ্গিবাদ নির্মূলের চেষ্টা হয়েছে। উপেক্ষিত হয়েছে মানবাধিকার। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এসব পন্থা নেওয়ার ফলে জঙ্গিবাদ বেড়েই চলেছে। প্রতিটি রাষ্ট্রকে তিনি জঙ্গিবাদ নির্মূলে জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানান।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি দাবি করে, প্রতিটি দেশের নেতৃত্বের সুবিবেচনাপ্রসূত সংযমী সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক পরিমিতিবোধ। সে জন্য এক মতের একরোখা নীতি নয়, চাই বহু মতের সমন্বয়ী সিদ্ধান্ত, পক্ষপাতহীনতা ও সহনশীলতা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হীন পন্থায় দুর্বল করতে চাইলে হিতে বিপরীত হয়। ভিন্নমতাবলম্বীকে তার অপ্রীতিকর কথার জন্য চপেটাঘাত না করে তা ধীরস্থিরভাবে বিচার করে প্রত্যাখ্যান করাই ভালো। নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে, যেন প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এই বোধ জন্মে: এই রাষ্ট্র আমার।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।
Thursday, January 14, 2016
রাজনৈতিক দল ভাঙাভাঙির ইতিবৃত্ত by সৈয়দ আবুল মকসুদ
Thursday, January 14, 2016
Anonymous
আলোচনা,
উপ-সম্পাদকীয়,
প্রথম আলো,
মতামত,
রাজনীতি,
সৈয়দ আবুল মকসুদ
এই
জগৎ-সংসারে ভাঙার মতো জিনিস এত রয়েছে যে তা বলে শেষ করা যায় না। চিরকাল
কোনো কিছুই অটুট থাকে না। বৃক্ষেরও ডাল ভাঙে। নদীর তীর ভাঙে।
স্বামী-স্ত্রীর সংসার ভাঙে। মানুষের এবং কোনো কোনো জাতির কপাল ভাঙে।
রাজনৈতিক দলই-বা ভাঙবে না কেন? তেলের শিশি ভাঙলে আমরা খুকির ওপর রাগ করি,
অথচ ধেড়েরা যখন দল ভাঙাভাঙি করে, তখন আমরা উপভোগ করি।
রাজনৈতিক দল তেলের শিশি নয়, স্বামী-স্ত্রীর সংসারও নয়, তবু কেন ভাঙে? কারা ভাঙেন? ভাঙায় কার লাভ, কার ক্ষতি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের যেতে হবে অতীতে।
গত ১০০ বছরে ভাঙেনি কোন দল? ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভেঙেছে। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ভেঙেছে। কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙেছে। আওয়ামী লীগ ভেঙেছে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ভেঙেছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ভেঙেছে। ইসলামী ঐক্যজোট ভেঙেছে। সাম্যবাদী দলও ভেঙেছে। সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আগেই সর্বহারা পার্টিও ভেঙেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে কতবার ভেঙেছে, তা তাদের নেতাদের পক্ষেও বলা সম্ভব নয়। ‘আসল বিএনপি’ বলে কোথাও কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে নকল বিএনপির নেতাদের সম্ভবত কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু কয়েক দিন আগে ‘আসল’ ও নকলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুচারু ব্যবস্থাপনায় নয়াপল্টনে যে যুদ্ধ হয়ে গেল, অতীতে গ্রিক ও রোমানদের মধ্যেও ওই রকম সংঘর্ষ হয়েছে কি না সন্দেহ। আসলের পদাঘাতে নকলের ঊরুর হাড় পর্যন্ত স্থানচ্যুত হয়েছে। এসব যে দল ভাঙাভাঙি নাটকের পূর্ব রাগ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সরকারি দলের মুখপাত্ররা বলছেন, বিএনপি ভেঙে চিনামাটি ও মেলামিনের বাসন-পেয়ালার মতো ‘খান খান’ হয়ে যাবে। জোটের আরেক দলের নেতা বলছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো মিটমাট হবে না, বিএনপিকে ধ্বংস করতে হবে। একটি জিনিস তাঁরা খেয়াল করছেন না যে নেতাদের ধ্বংস করা যায়, সমর্থকদের ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ওদিকে উত্তাল সমুদ্রে দিগ্ভ্রান্ত সাম্পানের মতো টালমাটাল বিএনপির মুখপাত্ররা হাহাকার করছেন এই বলে যে তাঁদের দল ভাঙার জন্য সরকার হাতুড়ি-শাবল ঠুকছে। গোপনে গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই যে দল ভাঙাভাঙির একটা মহড়া চলছে, তাতে কারোরই সন্দেহের সামান্যতম অবকাশ নেই। এ বছরের শেষ বা আগামী বছরের প্রথম দিকে একটা নির্বাচন করতে চাইলে দল ভাঙাভাঙির বিলকুল প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনৈতিক দল ভাঙার সঙ্গে নদীভাঙনের মিল রয়েছে। কবির ভাষায়—নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা। এক দল ভেঙে যদি দুর্বল হয়, আরেক দলের শক্তি বাড়ে। সাধারণত নৈতিকভাবে দুর্বল কোনো কেন্দ্রীয় সরকারই প্রতিপক্ষ বিরোধী দলে ভাঙন ধরিয়ে আনন্দ পায়। এই দল ভাঙাভাঙির খেলা বাংলার মানুষ দেখেছে পঞ্চাশের ও ষাটের দশকে। ক্ষমতার লোভে যাঁরা দল ভাঙেন বা দল ছাড়েন, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে তাঁদের ঠাঁই হয় এবং দল ভাঙার প্ররোচনাকারীদের স্থান হয় ইতিহাসের নিন্দনীয়দের সঙ্গে।
গত ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে মধ্য ৫০-এ দল ভাঙাভাঙির লীলাখেলা শুরু হয়। প্রথমবার বিরোধী দলে গিয়ে মুসলিম লীগেও ভাঙন দেখা দেয়। ১৯৫৫ সালে প্রাদেশিক লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের আগে সভাপতি নূরুল আমিন, সহসভাপতি নবাব হাবিবুল্লাহ, যুগ্ম সম্পাদক শাহ আজিজুর রহমান, প্রচার সম্পাদক খান এ সবুরসহ কয়েকজন পদত্যাগ করলে ভাঙন প্রকাশ্য রূপ নেয়।
যুক্তফ্রন্টের দলাদলিতে এবং ক্ষমতার কামড়াকামড়িতে পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় দল আওয়ামী লীগেও ভাঙন দেখা দেয়। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা সরকারের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করেন। তাতে নেতৃত্ব দেন আবদুস সালাম খান, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, খালেক নেওয়াজ খান, হাশিম উদ্দিন প্রমুখ। দলের মূলধারায় ছিলেন মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, এমনকি যুবনেতা তাজউদ্দীন আহমদ। ভাঙনপন্থী সালাম খানদের স্থান আদৌ ইতিহাসের কোথাও হয়েছে কি না, তা জানারও প্রয়োজন মনে করে না মানুষ।
আদর্শের কারণে দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে যদি কেউ আলাদা সংগঠন গঠন করেন, সেটা ভিন্ন বিষয়। সে রকম ঘটনা এ দেশের ইতিহাসে একবারই ঘটেছিল, ১৯৫৭-তে। যখন নিজেদের দল প্রদেশে এবং কেন্দ্রে ক্ষমতায়, চিফ মিনিস্টার ও প্রাইম মিনিস্টার নিজের দলের, তখনই আদর্শগত কারণে একটি পক্ষ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্য কয়েকটি বাম দলকে নিয়ে গঠন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)।
আওয়ামী লীগে আর একবার সরকার ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করে মধ্য ৬০-এর দিকে। তখন আইয়ুবের একনায়কী শাসনকাল। তাঁর লোক মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। আওয়ামী লীগ ছিল তাঁর দুই চক্ষের শূল। ১৯৬৪-তে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। দলের অবস্থা তখন এখনকার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরদের দলের চেয়েও শোচনীয়। আওয়ামী লীগকে আরও দুর্বল করার জন্য এবং শেখ মুজিবকে নেতৃত্ব থেকে দূর করতে গভর্নর মোনায়েম নানা রকম কৌশলের আশ্রয় নেন। দলকে ভাঙতে কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে তিনি আলাদা আলাদাভাবে গভর্নর হাউসে চা খেতে আমন্ত্রণও জানান। অন্য দলের নেতাদের সঙ্গেও রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করেন। মোদ্দা কথা, সংসদীয় গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের প্রবক্তা মুজিবকে মাইনাস করার জন্য নামীদামি নেতাদের হাত করে ফেলে সরকার। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে মুজিব-সমর্থকেরা ঘরোয়া সভা করার জন্য হলঘর ভাড়া পর্যন্ত পেতেন না ঢাকার কোথাও। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনেই অনেক সভা করতে হতো। এখনকার মতো এত বড় বড় বস্তাভর্তি টাকা তখন ছিল না। তবে মোনায়েমের থলেভর্তি টাকা অনেকেই পেয়েছেন মুজিবকে বিরোধিতা করার জন্য এবং সে টাকায় তাঁরা ধানমন্ডি-গুলশানে আম-কাঁঠালের বাগানসহ বড় বড় বাড়ি বানাতে পেরেছেন।
ছয় দফা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের ভাঙন আর রোধ করা গেল না। যে কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফা অনুমোদন করা হবে, তার দুই-তিন দিন আগেই দলের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশসহ কয়েকজন নাটকীয়ভাবে দল থেকে সটকে পড়েন। সেই সব নাটকীয় মুহূর্তের কথা দলের বাইরের লোক আমাদের যখন মনে আছে, বর্তমান আওয়ামী লীগের অনেক নেতারও মনে থাকার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশে হোটেল ইডেনের প্রাঙ্গণে হয়েছিল কাউন্সিল অধিবেশন। সভাপতির পদটি খালি হচ্ছে এই সুখবরে সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন ছয় দফাবিরোধী আবদুস সালাম খান। এখনকার পাঠকদের শুনতেই চোখ কপালে উঠবে, তা হলো ওই সম্মেলনে শাহ আজিজুর রহমানও যোগ দেন। আগ বাড়িয়ে কেউ এলে তাকে তাড়িয়েও দেওয়া যায় না।
ওই অধিবেশনটি ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে যাঁরা দলের নেতা নির্বাচিত হন তাঁরা হলেন: সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান, সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুস সালাম খান, খোন্দকার মোশতাক, শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ; সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী, মহিলা-বিষয়ক সম্পাদক আমেনা বেগম প্রমুখ। দল ভাঙে। তর্কবাগীশ, আতাউর রহমান খানরা আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। কিছুদিন পর সালাম খান, শাহ আজিজও স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রীয় জীবনে যত রকম নিকৃষ্ট কাজ আছে, তার মধ্যে দল ভাঙাভাঙি ও ক্ষমতার লোভে দলত্যাগ সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ও নোংরা কাজ। যখন রাজনীতিকদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল থাকে, তখনই এসব হয়ে থাকে। সামরিক শাসন ও স্বৈরশাসনের মধ্যেই এ-জাতীয় ব্যাপার বেশি ঘটে। ব্যক্তিস্বার্থে এ রকম দলত্যাগীদের একবার আমার এই কলামে নাম দিয়েছিলাম মোতাজিলাপন্থী রাজনীতিক।
আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী ও নেলসন ম্যান্ডেলা যা করতে পারেননি, বিএনপির এক মোতাজিলাপন্থী ব্যারিস্টার তা করে দেখিয়েছেন। গত তিন বছরে তিনি তিন-তিনটি দল ও জোট গঠন করেছেন। আমাদের কোনো কোনো মিডিয়া চুটিয়ে এই জনপ্রিয় বঙ্গনেতাকে প্রচার দেয়। জনগণ বুঝতে পারে না তাঁর কাছে রাজনীতি বড়, না স্ত্রীকে রেলের ইজারা দেওয়া জমি রক্ষা বড়। কয়েক দিন আগে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর দল গঠিত হবে একেবারে তৃণমূল থেকে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রাধান্য না পেয়েই পারে না। ১০ বছর বিএনপির মন্ত্রী থাকাকালে তিনি যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে শাহরিয়ার কবিরকে বিচিত্রা থেকে বিতাড়িত করেন এবং জাহানারা ইমামসহ বহু দেশপ্রেমিকের ললাটে এঁটে দেন দেশদ্রোহীর তকমা।
বহু দুঃখের ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত যে দেশ, তাকে সবাই মিলেমিশে গড়ে তোলাই রাজনীতিকদের ব্রত হওয়া কাম্য। কোনো রকম ষড়যন্ত্র, তামাশা, নোংরামো পরিত্যাজ্য। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, মাটি কামড়ে যাঁরা দলে পড়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরাই লাভবান হন।
প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উচিত তার নিজের চরকায় তেল দেওয়া। অন্য দলের ক্ষতি করার চেয়ে নিজ দলের কী করে জনপ্রিয়তা বাড়বে, সে চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কয়েক দিন যাবৎ পত্রপত্রিকায় দেখছি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিলম্বিত জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে মাস দু-তিনের মধ্যে। যেকোনো দলের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অপেক্ষাকৃত সৎ ও নিবেদিত নেতাদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠিত হবে, এই প্রত্যাশা করি। কারণ, একটি আদর্শভিত্তিক ভালো দলই ভালো রাজনীতি দিতে পারে। ভালো রাজনীতিই সমৃদ্ধ জাতি গঠনের যোগ্যতা রাখে। দল ভাঙাভাঙিতে অর্থ ও শক্তি ক্ষয় করে দেশের কোনো লাভ হবে না। আমরা চাই, সুশৃঙ্খল জনকল্যাণকামী রাজনৈতিক দল।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক৷
রাজনৈতিক দল তেলের শিশি নয়, স্বামী-স্ত্রীর সংসারও নয়, তবু কেন ভাঙে? কারা ভাঙেন? ভাঙায় কার লাভ, কার ক্ষতি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের যেতে হবে অতীতে।
গত ১০০ বছরে ভাঙেনি কোন দল? ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভেঙেছে। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ভেঙেছে। কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙেছে। আওয়ামী লীগ ভেঙেছে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ভেঙেছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ভেঙেছে। ইসলামী ঐক্যজোট ভেঙেছে। সাম্যবাদী দলও ভেঙেছে। সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আগেই সর্বহারা পার্টিও ভেঙেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে কতবার ভেঙেছে, তা তাদের নেতাদের পক্ষেও বলা সম্ভব নয়। ‘আসল বিএনপি’ বলে কোথাও কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে নকল বিএনপির নেতাদের সম্ভবত কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু কয়েক দিন আগে ‘আসল’ ও নকলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুচারু ব্যবস্থাপনায় নয়াপল্টনে যে যুদ্ধ হয়ে গেল, অতীতে গ্রিক ও রোমানদের মধ্যেও ওই রকম সংঘর্ষ হয়েছে কি না সন্দেহ। আসলের পদাঘাতে নকলের ঊরুর হাড় পর্যন্ত স্থানচ্যুত হয়েছে। এসব যে দল ভাঙাভাঙি নাটকের পূর্ব রাগ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সরকারি দলের মুখপাত্ররা বলছেন, বিএনপি ভেঙে চিনামাটি ও মেলামিনের বাসন-পেয়ালার মতো ‘খান খান’ হয়ে যাবে। জোটের আরেক দলের নেতা বলছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো মিটমাট হবে না, বিএনপিকে ধ্বংস করতে হবে। একটি জিনিস তাঁরা খেয়াল করছেন না যে নেতাদের ধ্বংস করা যায়, সমর্থকদের ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ওদিকে উত্তাল সমুদ্রে দিগ্ভ্রান্ত সাম্পানের মতো টালমাটাল বিএনপির মুখপাত্ররা হাহাকার করছেন এই বলে যে তাঁদের দল ভাঙার জন্য সরকার হাতুড়ি-শাবল ঠুকছে। গোপনে গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই যে দল ভাঙাভাঙির একটা মহড়া চলছে, তাতে কারোরই সন্দেহের সামান্যতম অবকাশ নেই। এ বছরের শেষ বা আগামী বছরের প্রথম দিকে একটা নির্বাচন করতে চাইলে দল ভাঙাভাঙির বিলকুল প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনৈতিক দল ভাঙার সঙ্গে নদীভাঙনের মিল রয়েছে। কবির ভাষায়—নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা। এক দল ভেঙে যদি দুর্বল হয়, আরেক দলের শক্তি বাড়ে। সাধারণত নৈতিকভাবে দুর্বল কোনো কেন্দ্রীয় সরকারই প্রতিপক্ষ বিরোধী দলে ভাঙন ধরিয়ে আনন্দ পায়। এই দল ভাঙাভাঙির খেলা বাংলার মানুষ দেখেছে পঞ্চাশের ও ষাটের দশকে। ক্ষমতার লোভে যাঁরা দল ভাঙেন বা দল ছাড়েন, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে তাঁদের ঠাঁই হয় এবং দল ভাঙার প্ররোচনাকারীদের স্থান হয় ইতিহাসের নিন্দনীয়দের সঙ্গে।
গত ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে মধ্য ৫০-এ দল ভাঙাভাঙির লীলাখেলা শুরু হয়। প্রথমবার বিরোধী দলে গিয়ে মুসলিম লীগেও ভাঙন দেখা দেয়। ১৯৫৫ সালে প্রাদেশিক লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের আগে সভাপতি নূরুল আমিন, সহসভাপতি নবাব হাবিবুল্লাহ, যুগ্ম সম্পাদক শাহ আজিজুর রহমান, প্রচার সম্পাদক খান এ সবুরসহ কয়েকজন পদত্যাগ করলে ভাঙন প্রকাশ্য রূপ নেয়।
যুক্তফ্রন্টের দলাদলিতে এবং ক্ষমতার কামড়াকামড়িতে পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় দল আওয়ামী লীগেও ভাঙন দেখা দেয়। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা সরকারের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করেন। তাতে নেতৃত্ব দেন আবদুস সালাম খান, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, খালেক নেওয়াজ খান, হাশিম উদ্দিন প্রমুখ। দলের মূলধারায় ছিলেন মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, এমনকি যুবনেতা তাজউদ্দীন আহমদ। ভাঙনপন্থী সালাম খানদের স্থান আদৌ ইতিহাসের কোথাও হয়েছে কি না, তা জানারও প্রয়োজন মনে করে না মানুষ।
আদর্শের কারণে দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে যদি কেউ আলাদা সংগঠন গঠন করেন, সেটা ভিন্ন বিষয়। সে রকম ঘটনা এ দেশের ইতিহাসে একবারই ঘটেছিল, ১৯৫৭-তে। যখন নিজেদের দল প্রদেশে এবং কেন্দ্রে ক্ষমতায়, চিফ মিনিস্টার ও প্রাইম মিনিস্টার নিজের দলের, তখনই আদর্শগত কারণে একটি পক্ষ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্য কয়েকটি বাম দলকে নিয়ে গঠন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)।
আওয়ামী লীগে আর একবার সরকার ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করে মধ্য ৬০-এর দিকে। তখন আইয়ুবের একনায়কী শাসনকাল। তাঁর লোক মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। আওয়ামী লীগ ছিল তাঁর দুই চক্ষের শূল। ১৯৬৪-তে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। দলের অবস্থা তখন এখনকার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরদের দলের চেয়েও শোচনীয়। আওয়ামী লীগকে আরও দুর্বল করার জন্য এবং শেখ মুজিবকে নেতৃত্ব থেকে দূর করতে গভর্নর মোনায়েম নানা রকম কৌশলের আশ্রয় নেন। দলকে ভাঙতে কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে তিনি আলাদা আলাদাভাবে গভর্নর হাউসে চা খেতে আমন্ত্রণও জানান। অন্য দলের নেতাদের সঙ্গেও রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করেন। মোদ্দা কথা, সংসদীয় গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের প্রবক্তা মুজিবকে মাইনাস করার জন্য নামীদামি নেতাদের হাত করে ফেলে সরকার। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে মুজিব-সমর্থকেরা ঘরোয়া সভা করার জন্য হলঘর ভাড়া পর্যন্ত পেতেন না ঢাকার কোথাও। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনেই অনেক সভা করতে হতো। এখনকার মতো এত বড় বড় বস্তাভর্তি টাকা তখন ছিল না। তবে মোনায়েমের থলেভর্তি টাকা অনেকেই পেয়েছেন মুজিবকে বিরোধিতা করার জন্য এবং সে টাকায় তাঁরা ধানমন্ডি-গুলশানে আম-কাঁঠালের বাগানসহ বড় বড় বাড়ি বানাতে পেরেছেন।
ছয় দফা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের ভাঙন আর রোধ করা গেল না। যে কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফা অনুমোদন করা হবে, তার দুই-তিন দিন আগেই দলের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশসহ কয়েকজন নাটকীয়ভাবে দল থেকে সটকে পড়েন। সেই সব নাটকীয় মুহূর্তের কথা দলের বাইরের লোক আমাদের যখন মনে আছে, বর্তমান আওয়ামী লীগের অনেক নেতারও মনে থাকার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশে হোটেল ইডেনের প্রাঙ্গণে হয়েছিল কাউন্সিল অধিবেশন। সভাপতির পদটি খালি হচ্ছে এই সুখবরে সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন ছয় দফাবিরোধী আবদুস সালাম খান। এখনকার পাঠকদের শুনতেই চোখ কপালে উঠবে, তা হলো ওই সম্মেলনে শাহ আজিজুর রহমানও যোগ দেন। আগ বাড়িয়ে কেউ এলে তাকে তাড়িয়েও দেওয়া যায় না।
ওই অধিবেশনটি ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে যাঁরা দলের নেতা নির্বাচিত হন তাঁরা হলেন: সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান, সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুস সালাম খান, খোন্দকার মোশতাক, শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ; সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী, মহিলা-বিষয়ক সম্পাদক আমেনা বেগম প্রমুখ। দল ভাঙে। তর্কবাগীশ, আতাউর রহমান খানরা আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। কিছুদিন পর সালাম খান, শাহ আজিজও স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রীয় জীবনে যত রকম নিকৃষ্ট কাজ আছে, তার মধ্যে দল ভাঙাভাঙি ও ক্ষমতার লোভে দলত্যাগ সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ও নোংরা কাজ। যখন রাজনীতিকদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল থাকে, তখনই এসব হয়ে থাকে। সামরিক শাসন ও স্বৈরশাসনের মধ্যেই এ-জাতীয় ব্যাপার বেশি ঘটে। ব্যক্তিস্বার্থে এ রকম দলত্যাগীদের একবার আমার এই কলামে নাম দিয়েছিলাম মোতাজিলাপন্থী রাজনীতিক।
আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী ও নেলসন ম্যান্ডেলা যা করতে পারেননি, বিএনপির এক মোতাজিলাপন্থী ব্যারিস্টার তা করে দেখিয়েছেন। গত তিন বছরে তিনি তিন-তিনটি দল ও জোট গঠন করেছেন। আমাদের কোনো কোনো মিডিয়া চুটিয়ে এই জনপ্রিয় বঙ্গনেতাকে প্রচার দেয়। জনগণ বুঝতে পারে না তাঁর কাছে রাজনীতি বড়, না স্ত্রীকে রেলের ইজারা দেওয়া জমি রক্ষা বড়। কয়েক দিন আগে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর দল গঠিত হবে একেবারে তৃণমূল থেকে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রাধান্য না পেয়েই পারে না। ১০ বছর বিএনপির মন্ত্রী থাকাকালে তিনি যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে শাহরিয়ার কবিরকে বিচিত্রা থেকে বিতাড়িত করেন এবং জাহানারা ইমামসহ বহু দেশপ্রেমিকের ললাটে এঁটে দেন দেশদ্রোহীর তকমা।
বহু দুঃখের ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত যে দেশ, তাকে সবাই মিলেমিশে গড়ে তোলাই রাজনীতিকদের ব্রত হওয়া কাম্য। কোনো রকম ষড়যন্ত্র, তামাশা, নোংরামো পরিত্যাজ্য। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, মাটি কামড়ে যাঁরা দলে পড়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরাই লাভবান হন।
প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উচিত তার নিজের চরকায় তেল দেওয়া। অন্য দলের ক্ষতি করার চেয়ে নিজ দলের কী করে জনপ্রিয়তা বাড়বে, সে চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কয়েক দিন যাবৎ পত্রপত্রিকায় দেখছি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিলম্বিত জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে মাস দু-তিনের মধ্যে। যেকোনো দলের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অপেক্ষাকৃত সৎ ও নিবেদিত নেতাদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠিত হবে, এই প্রত্যাশা করি। কারণ, একটি আদর্শভিত্তিক ভালো দলই ভালো রাজনীতি দিতে পারে। ভালো রাজনীতিই সমৃদ্ধ জাতি গঠনের যোগ্যতা রাখে। দল ভাঙাভাঙিতে অর্থ ও শক্তি ক্ষয় করে দেশের কোনো লাভ হবে না। আমরা চাই, সুশৃঙ্খল জনকল্যাণকামী রাজনৈতিক দল।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক৷
Wednesday, January 6, 2016
মধ্যম আয়ের দেশ বনাম উন্নত জাতি by সৈয়দ আবুল মকসুদ
Wednesday, January 06, 2016
Anonymous
অর্থনীতি,
আলোচনা,
উপ-সম্পাদকীয়,
প্রথম আলো,
মতামত,
সৈয়দ আবুল মকসুদ
কোন
রেস্তোরাঁর রান্না সুস্বাদু, তা তার ভোজনকারীরাই ভালো জানেন, তার মালিক বা
ম্যানেজার নন। কোন ভাষার সাহিত্যের অবস্থা কী, তা সেই ভাষার লেখকদের চেয়ে
পাঠকেরা ভালো বলতে পারেন। কোন হাসপাতালের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা কেমন, তা
তার ডাক্তার-নার্সদের চেয়ে রোগী ও তাদের দেখাশোনায় নিয়োজিত সঙ্গীরাই ভালো
জানেন। কোন ট্রেনে যাতায়াতে কী সুবিধা-অসুবিধা, তা ওই ট্রেনের চালক ও
গার্ডের চেয়ে যাত্রীরাই সঠিক বলতে পারেন। কোন দেশের কী অবস্থা, তা সে
দেশের সরকারের চেয়ে সাধারণ মানুষ হাজার গুণ বেশি জানে। এবং তাদের মতামতই
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—অন্য কারও সার্টিফিকেট নয়।
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ৪৫ বছরে পা দিয়ে বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে—এমন প্রশ্ন যদি কেউ করেন, এক কথায় জবাব দেওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ বলতে পারেন, একটি নিম্ন মাঝারি পর্বতের ওপর দাঁড়িয়ে। কেউ বলবেন তিনি দাঁড়িয়ে নেই, নিম্ন মধ্যম গতিতে ছুটে চলেছেন। কেউ বলবেন, তিনি একটি মাঝারি পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন বটে, কিন্তু তার পাশেই গভীর এক খাদ, নড়াচড়ায় অসাবধান হলেই সর্বনাশ!
মোটামুটি আশাবাদী, তবে খুব সাবধানি কোনো সাধারণ নাগরিক বলবেন, বাংলাদেশের একদিকে সম্ভাবনা, আরেক দিকে অনিশ্চয়তা। একদিকে অশেষ আশার আলো, আরেক দিকে অপার হতাশার অন্ধকার। একদিকে সূর্যালোক, অন্যদিকে ঘন কুয়াশা। খুব ভালো নেতৃত্বই পারে অনিশ্চয়তা, অন্ধকার ও কুয়াশার অমঙ্গল থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে।
সব বাঙালিই, তা তিনি বাংলাদেশিই হোন বা অন্য কোনো দেশের হোন, মেটাফোর বা রূপক-অলংকার দিয়ে ভাব প্রকাশ করা পছন্দ করেন। একশ্রেণির বাঙালি সমস্বরে বলছেন, বাংলাদেশ নাকি এশিয়ার বাঘ হতে যাচ্ছে। বাঘ—তা মানুষের চেয়ে যত বেশি শক্তিমানই হোক, সে পশু। পশুর ভেতরে পাশবিকতাই প্রাধান্য পাবে, মানবিক গুণাবলি নয়। ৪৫ বছর আগে যখন আমাদের মধ্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার স্পৃহা জাগ্রত হয়, সেদিন আমরা একটি মধ্যমানের মহৎ জাতি হতে চেয়েছিলাম। বাঘ-ভাল্লুক নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিন্দুকে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা মজুত আছে, তা দিয়ে কোনো জাতির যোগ্যতা ও মহত্তের পরিমাপ হয় না।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঢাকার রাস্তায় মোটরগাড়ির দীর্ঘ সারি বা যানজট দেখে সন্তুষ্ট ও তাজ্জব হয়েছেন। কারণ, এত চকচকে দামি গাড়ি দুই দশক আগে তিনি দেখেননি। রাস্তায় দামি মোটরগাড়ির বহর টেকসই অর্থনীতির পরিচয় কি না, তা আমার মতো অজ্ঞ লোকের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু এটুকুই বলতে পারি, এই গাড়িবহর দেখে আমরাও খুশি হতে পারতাম, যদি গাড়িগুলো মালয়েশিয়ার মতো আমরাই তৈরি করতাম। প্রমোশন পেলাম প্রায় মধ্যম আয়ের দেশে, বানাতে পারি না একখানা মোটরগাড়ি। অথচ স্বাধীনতার আগেই প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ চট্টগ্রামে মোটরগাড়ি বানাতে শুরু করেছিল।
স্বাধীনতার পরে দেশে বহু নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। পাটকল, চিনিকল প্রভৃতি বহু পুরোনো শিল্প ধ্বংস হয়েছে দুর্নীতির কারণে। গড়ে উঠেছে তৈরি পোশাক, সিমেন্ট প্রভৃতি শিল্প। কর্মসংস্থানও হয়েছে বহু মানুষের। জিডিপিতে শিল্প খাত থেকে অর্জন ৩০ শতাংশের বেশি। অথচ এই খাতের ৯০ শতাংশ শ্রমিকের সামাজিক ও আইনগত সুরক্ষা নেই। অনানুষ্ঠানিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের নিরাপত্তা নেই। এমপ্লয়মেন্ট বেনিফিট থেকে তাঁরা বঞ্চিত।
আমরা অবশ্যই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই। তবে যেটা বেশি চাই তা হলো উন্নত জাতির দেশ। যেখানে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পাবে, কিন্তু প্রাধান্য পাবে জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড লুণ্ঠনের অর্থনীতি আর উন্নয়নের অর্থনীতি দুই জিনিস। রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি ছোট্ট শ্রেণি যখন ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন তা অনুৎপাদনশীল অর্থনীতি। দুর্নীতির অর্থনীতি ও দুর্নীতির সংস্কৃতি যখন একাকার হয়ে যায়, তা দেশকে টেকসই অর্থনীতি উপহার দেয় না। দায়িত্ববান গণমুখী রাজনীতি ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতির প্রাধান্য সৃষ্টি হবে না।
সাবেক বাঙালি মধ্যশ্রেণি একটি অনতিক্রান্ত বৃত্তের মধ্যে আটকে আছে। সমাজে উচ্চবিত্ত শ্রেণির আকার বাড়ছে। উন্নয়নের সুফল তারাই ভোগ করছে। বারো আনা মানুষ উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত। সামগ্রিক উন্নয়ন আর শ্রেণিবিশেষের আংশিক উন্নয়ন দুই জিনিস।
বাঙালির সভ্যতা হচ্ছে গ্রামীণ কৃষি সভ্যতা। সেই কৃষি ও গ্রামই উপেক্ষিত। উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের, পেশাজীবীদের সম্পর্ক শূন্য। গ্রামে এখন যে ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তাতে উপকৃত হচ্ছে সরকারি দলগুলোর ক্যাডার ও টাউট-ধড়িবাজ ধরনের মানুষ—সব শ্রেণির পেশাজীবী সাধারণ মানুষ নয়।
জাতি গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। বিশাল যুবসমাজের মেধা ও শক্তি অব্যবহৃত থাকছে। তার ফলে রাষ্ট্র থাকছে বঞ্চিত তাদের সেবা থেকে। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে হতাশা দেখা দিচ্ছে। তাদের কেউ কেউ উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়লে সমাজের ও জাতির সর্বনাশ ঘটবে। বিশেষ করে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা যদি হতাশায় ভোগে, তারা ধরবে মাদক, ঝুঁকবে যৌনাচারের দিকে। গরিবের সন্তানদের ক্ষোভ থেকে যে হতাশা, তার ফলে তারা হিংসার পথ ধরবে। হিংসার পথ হলো উগ্র রাজনীতির পথ। বিশ্বব্যাপী এই পথটি বর্তমানে খুবই বাণিজ্যসফল। সমাজে অনুৎপাদনশীল অর্থনীতি যত বিস্তৃত হবে, উগ্র রাজনীতির কর্মীদের অর্থায়নের সুযোগও তত বাড়বে।
জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কাজের চেয়ে আমরা অর্থহীন হট্টগোলে বেশি অভ্যস্ত। সরল মানুষের মন ভোলানোর কায়দা রপ্ত করেছি ভালো। মানসম্মত বই পড়ে মেধার বিকাশ ঘটানো এক কথা আর নতুন বই নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা-মন্ত্রীসহ লাফালাফি করা আরেক জিনিস। মানবজাতির ইতিহাসে কোনোকালে কোনো দেশে বই উৎসব নামে কিছু হয়েছে, ইন্টারনেট ঘেঁটে তা পাওয়া যাবে না। যে দেশে বই উৎসব উদ্ভাবিত হয়, সেখানে বিদেশি অনুদানে অর্থনৈতিক অবস্থা আর একটু ভালো হলে ব্যাগ উৎসব, খাতা উৎসব, পেনসিল উৎসব হবে না তার নিশ্চয়তা কী? তা ছাড়া বই দিয়েছে রাষ্ট্র বিনা মূল্যে, অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তা প্রকাশ্যে করছেন বিক্রি। এই আমাদের নৈতিকতা!
দুই দিন আগে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা জগন্নাথ হলে বলেছেন, শিক্ষার মান আগে কী ছিল আর এখন কী হয়েছে। নিম্নমানের শিক্ষা যারা পাচ্ছে, তাদের কেউই উঁচু মাপের কিছু হতে পারবে না। বড় লেখক হতে পারবে না, গবেষক হতে পারবে না, বিজ্ঞানী হতে পারবে না। দেশে জীবন রক্ষাকারী নতুন ওষুধ বা নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হবে না। এ-জাতীয় বিদ্যায় তেজারতি করে বা নানা অবৈধ উপায়ে টাকা রোজগার করতে পারবে। তার ফলে দেশ মধ্যম আয়ে প্রমোশন পাবে। আমাদের ওই মধ্যম আয়ের দেশে উপকৃত হবেন বিদেশি এয়ারলাইনস, ব্যাংকক ও বালি দ্বীপের পর্যটনকেন্দ্রগুলো, বামরুনগ্রাদ ও মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মালিকেরা।
আমাদের পরম হিতার্থী বিশ্বব্যাংক চায় আমরা দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশ হই। সরকারি দলেই থাকুন আর বিরোধী দলেই থাকুন, আমাদের শাসকশ্রেণির পরিকল্পনাবিদেরা চান বাংলাদেশের গায়ে মধ্যম আয়ের তকমা আঁটতে। বাংলাদেশের মতো একটি জাতিরাষ্ট্রের, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অপরিমেয় রক্তের বিনিময়ে, প্রধানতম ও একমাত্র অন্বেষা হওয়া উচিত উন্নত জাতি গঠন।
আমাদের মাথা ছোট, বিদ্যা-বুদ্ধি কম, তবে এটুকু বুঝি যে নিম্নমানের শিক্ষা দিয়ে নানা কায়দায় টাকা কামাই করা যায়, যোগ্য ও উন্নত মানুষ হওয়া যায় না। বহু পাইকারি বাজারে ভুঁড়িঅলা আড়তদারের অনেক টাকা; একজন বিজ্ঞানী, শিল্পী বা দার্শনিকের তাঁর তুলনায় অর্থবিত্ত অতি কম, জগতে কার দাম বেশি বা মানবজাতির জন্য কার প্রয়োজন বেশি?
দারিদ্র্য দূর করে, বৈষম্য কমিয়ে আমরা অবশ্যই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই। তবে তা হই বা না হই, যেটা বেশি চাই তা হলো উন্নত জাতির দেশ। যেখানে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পাবে, কিন্তু প্রাধান্য পাবে জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ৪৫ বছরে পা দিয়ে বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে—এমন প্রশ্ন যদি কেউ করেন, এক কথায় জবাব দেওয়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কেউ বলতে পারেন, একটি নিম্ন মাঝারি পর্বতের ওপর দাঁড়িয়ে। কেউ বলবেন তিনি দাঁড়িয়ে নেই, নিম্ন মধ্যম গতিতে ছুটে চলেছেন। কেউ বলবেন, তিনি একটি মাঝারি পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন বটে, কিন্তু তার পাশেই গভীর এক খাদ, নড়াচড়ায় অসাবধান হলেই সর্বনাশ!
মোটামুটি আশাবাদী, তবে খুব সাবধানি কোনো সাধারণ নাগরিক বলবেন, বাংলাদেশের একদিকে সম্ভাবনা, আরেক দিকে অনিশ্চয়তা। একদিকে অশেষ আশার আলো, আরেক দিকে অপার হতাশার অন্ধকার। একদিকে সূর্যালোক, অন্যদিকে ঘন কুয়াশা। খুব ভালো নেতৃত্বই পারে অনিশ্চয়তা, অন্ধকার ও কুয়াশার অমঙ্গল থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে।
সব বাঙালিই, তা তিনি বাংলাদেশিই হোন বা অন্য কোনো দেশের হোন, মেটাফোর বা রূপক-অলংকার দিয়ে ভাব প্রকাশ করা পছন্দ করেন। একশ্রেণির বাঙালি সমস্বরে বলছেন, বাংলাদেশ নাকি এশিয়ার বাঘ হতে যাচ্ছে। বাঘ—তা মানুষের চেয়ে যত বেশি শক্তিমানই হোক, সে পশু। পশুর ভেতরে পাশবিকতাই প্রাধান্য পাবে, মানবিক গুণাবলি নয়। ৪৫ বছর আগে যখন আমাদের মধ্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার স্পৃহা জাগ্রত হয়, সেদিন আমরা একটি মধ্যমানের মহৎ জাতি হতে চেয়েছিলাম। বাঘ-ভাল্লুক নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিন্দুকে কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা মজুত আছে, তা দিয়ে কোনো জাতির যোগ্যতা ও মহত্তের পরিমাপ হয় না।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঢাকার রাস্তায় মোটরগাড়ির দীর্ঘ সারি বা যানজট দেখে সন্তুষ্ট ও তাজ্জব হয়েছেন। কারণ, এত চকচকে দামি গাড়ি দুই দশক আগে তিনি দেখেননি। রাস্তায় দামি মোটরগাড়ির বহর টেকসই অর্থনীতির পরিচয় কি না, তা আমার মতো অজ্ঞ লোকের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আমরা সাধারণ মানুষ শুধু এটুকুই বলতে পারি, এই গাড়িবহর দেখে আমরাও খুশি হতে পারতাম, যদি গাড়িগুলো মালয়েশিয়ার মতো আমরাই তৈরি করতাম। প্রমোশন পেলাম প্রায় মধ্যম আয়ের দেশে, বানাতে পারি না একখানা মোটরগাড়ি। অথচ স্বাধীনতার আগেই প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ চট্টগ্রামে মোটরগাড়ি বানাতে শুরু করেছিল।
স্বাধীনতার পরে দেশে বহু নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। পাটকল, চিনিকল প্রভৃতি বহু পুরোনো শিল্প ধ্বংস হয়েছে দুর্নীতির কারণে। গড়ে উঠেছে তৈরি পোশাক, সিমেন্ট প্রভৃতি শিল্প। কর্মসংস্থানও হয়েছে বহু মানুষের। জিডিপিতে শিল্প খাত থেকে অর্জন ৩০ শতাংশের বেশি। অথচ এই খাতের ৯০ শতাংশ শ্রমিকের সামাজিক ও আইনগত সুরক্ষা নেই। অনানুষ্ঠানিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের নিরাপত্তা নেই। এমপ্লয়মেন্ট বেনিফিট থেকে তাঁরা বঞ্চিত।
আমরা অবশ্যই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই। তবে যেটা বেশি চাই তা হলো উন্নত জাতির দেশ। যেখানে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পাবে, কিন্তু প্রাধান্য পাবে জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড লুণ্ঠনের অর্থনীতি আর উন্নয়নের অর্থনীতি দুই জিনিস। রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি ছোট্ট শ্রেণি যখন ফুলেফেঁপে ওঠে, তখন তা অনুৎপাদনশীল অর্থনীতি। দুর্নীতির অর্থনীতি ও দুর্নীতির সংস্কৃতি যখন একাকার হয়ে যায়, তা দেশকে টেকসই অর্থনীতি উপহার দেয় না। দায়িত্ববান গণমুখী রাজনীতি ছাড়া উৎপাদনশীল অর্থনীতির প্রাধান্য সৃষ্টি হবে না।
সাবেক বাঙালি মধ্যশ্রেণি একটি অনতিক্রান্ত বৃত্তের মধ্যে আটকে আছে। সমাজে উচ্চবিত্ত শ্রেণির আকার বাড়ছে। উন্নয়নের সুফল তারাই ভোগ করছে। বারো আনা মানুষ উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত। সামগ্রিক উন্নয়ন আর শ্রেণিবিশেষের আংশিক উন্নয়ন দুই জিনিস।
বাঙালির সভ্যতা হচ্ছে গ্রামীণ কৃষি সভ্যতা। সেই কৃষি ও গ্রামই উপেক্ষিত। উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে গ্রামীণ মানুষের, পেশাজীবীদের সম্পর্ক শূন্য। গ্রামে এখন যে ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তাতে উপকৃত হচ্ছে সরকারি দলগুলোর ক্যাডার ও টাউট-ধড়িবাজ ধরনের মানুষ—সব শ্রেণির পেশাজীবী সাধারণ মানুষ নয়।
জাতি গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। বিশাল যুবসমাজের মেধা ও শক্তি অব্যবহৃত থাকছে। তার ফলে রাষ্ট্র থাকছে বঞ্চিত তাদের সেবা থেকে। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে হতাশা দেখা দিচ্ছে। তাদের কেউ কেউ উগ্রপন্থায় ঝুঁকে পড়লে সমাজের ও জাতির সর্বনাশ ঘটবে। বিশেষ করে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা যদি হতাশায় ভোগে, তারা ধরবে মাদক, ঝুঁকবে যৌনাচারের দিকে। গরিবের সন্তানদের ক্ষোভ থেকে যে হতাশা, তার ফলে তারা হিংসার পথ ধরবে। হিংসার পথ হলো উগ্র রাজনীতির পথ। বিশ্বব্যাপী এই পথটি বর্তমানে খুবই বাণিজ্যসফল। সমাজে অনুৎপাদনশীল অর্থনীতি যত বিস্তৃত হবে, উগ্র রাজনীতির কর্মীদের অর্থায়নের সুযোগও তত বাড়বে।
জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কাজের চেয়ে আমরা অর্থহীন হট্টগোলে বেশি অভ্যস্ত। সরল মানুষের মন ভোলানোর কায়দা রপ্ত করেছি ভালো। মানসম্মত বই পড়ে মেধার বিকাশ ঘটানো এক কথা আর নতুন বই নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক-শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা-মন্ত্রীসহ লাফালাফি করা আরেক জিনিস। মানবজাতির ইতিহাসে কোনোকালে কোনো দেশে বই উৎসব নামে কিছু হয়েছে, ইন্টারনেট ঘেঁটে তা পাওয়া যাবে না। যে দেশে বই উৎসব উদ্ভাবিত হয়, সেখানে বিদেশি অনুদানে অর্থনৈতিক অবস্থা আর একটু ভালো হলে ব্যাগ উৎসব, খাতা উৎসব, পেনসিল উৎসব হবে না তার নিশ্চয়তা কী? তা ছাড়া বই দিয়েছে রাষ্ট্র বিনা মূল্যে, অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তা প্রকাশ্যে করছেন বিক্রি। এই আমাদের নৈতিকতা!
দুই দিন আগে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা জগন্নাথ হলে বলেছেন, শিক্ষার মান আগে কী ছিল আর এখন কী হয়েছে। নিম্নমানের শিক্ষা যারা পাচ্ছে, তাদের কেউই উঁচু মাপের কিছু হতে পারবে না। বড় লেখক হতে পারবে না, গবেষক হতে পারবে না, বিজ্ঞানী হতে পারবে না। দেশে জীবন রক্ষাকারী নতুন ওষুধ বা নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার হবে না। এ-জাতীয় বিদ্যায় তেজারতি করে বা নানা অবৈধ উপায়ে টাকা রোজগার করতে পারবে। তার ফলে দেশ মধ্যম আয়ে প্রমোশন পাবে। আমাদের ওই মধ্যম আয়ের দেশে উপকৃত হবেন বিদেশি এয়ারলাইনস, ব্যাংকক ও বালি দ্বীপের পর্যটনকেন্দ্রগুলো, বামরুনগ্রাদ ও মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের মালিকেরা।
আমাদের পরম হিতার্থী বিশ্বব্যাংক চায় আমরা দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশ হই। সরকারি দলেই থাকুন আর বিরোধী দলেই থাকুন, আমাদের শাসকশ্রেণির পরিকল্পনাবিদেরা চান বাংলাদেশের গায়ে মধ্যম আয়ের তকমা আঁটতে। বাংলাদেশের মতো একটি জাতিরাষ্ট্রের, যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অপরিমেয় রক্তের বিনিময়ে, প্রধানতম ও একমাত্র অন্বেষা হওয়া উচিত উন্নত জাতি গঠন।
আমাদের মাথা ছোট, বিদ্যা-বুদ্ধি কম, তবে এটুকু বুঝি যে নিম্নমানের শিক্ষা দিয়ে নানা কায়দায় টাকা কামাই করা যায়, যোগ্য ও উন্নত মানুষ হওয়া যায় না। বহু পাইকারি বাজারে ভুঁড়িঅলা আড়তদারের অনেক টাকা; একজন বিজ্ঞানী, শিল্পী বা দার্শনিকের তাঁর তুলনায় অর্থবিত্ত অতি কম, জগতে কার দাম বেশি বা মানবজাতির জন্য কার প্রয়োজন বেশি?
দারিদ্র্য দূর করে, বৈষম্য কমিয়ে আমরা অবশ্যই মধ্যম আয়ের দেশ হতে চাই। তবে তা হই বা না হই, যেটা বেশি চাই তা হলো উন্নত জাতির দেশ। যেখানে অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব পাবে, কিন্তু প্রাধান্য পাবে জ্ঞানচর্চা ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
Wednesday, December 30, 2015
রাষ্ট্র ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা by সৈয়দ আবুল মকসুদ
কোনো
একটি রাষ্ট্র, তার ভৌগোলিক আকার ও জনসংখ্যা যা-ই হোক, একটি মস্ত বড়
জিনিস। মানবদেহের মতো তারও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে। শুধু হাত আর পা থাকলেই
একজন মানুষকে সুস্থ মানুষ বলা যায় না। তার চোখ, কান, হৃদ্যন্ত্র, কিডনি,
লিভার প্রভৃতি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তার ওপর নির্ভর করছে মানুষটি
সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক কি না। দেহযন্ত্রের ক্ষেত্রে যেমন,
রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষেত্রেও তা-ই। শুধু নির্বাহী বিভাগ নয়, আইন বিভাগ, বিচার
বিভাগসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান
যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করলে সমস্ত রাষ্ট্রযন্ত্র নড়বড়ে ও দুর্বল হয়ে
যায়।
সাত বছর যাবৎ বাংলাদেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে, এটা একটা ইতিবাচক দিক। যেভাবেই নির্বাচিত হোক, একটি সংবিধানসম্মত সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাস্তবায়িত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিভিন্ন ফোরামে অংশ নিচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে এত কথা উঠছে কেন? গত দুই বছরে পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলগুলোতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই অপরিণত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংশোধনে বাস্তবসম্মত ও বলিষ্ঠ কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে শুধু সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে তা নয়, সরকারের বাইরের রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি দরকার।
রাষ্ট্র পরিচালনা করে প্রধানত নির্বাহী বিভাগ, যার অধীনে থাকে প্রশাসন। প্রশাসন পরিচালিত হয় স্থায়ী আমলাতন্ত্র দ্বারা। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের নাম শুনলেই আজকাল অনেকে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তাঁদের মতামতকে ফেলে দেওয়ার জন্য শক্তিশালী যুক্তি এখনো পর্যন্ত দুর্লভ। এঙ্গেলস তাঁর ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ শীর্ষক রচনায় বলেছেন, ‘যেহেতু রাষ্ট্রের আবির্ভাব শ্রেণি বিরোধকে সংহত করার প্রয়োজন থেকে, সেই সঙ্গে তার উদ্ভব হয় শ্রেণি বিরোধের মধ্যেই, সেই জন্য রাষ্ট্র হলো সাধারণত সবচেয়ে শক্তিশালী ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রভুত্বকারী শ্রেণির রাষ্ট্র; এই শ্রেণি রাষ্ট্রের মাধ্যমে রাজনীতির ক্ষেত্রেও আধিপত্যকারী শ্রেণি হয়ে ওঠে; এবং তার ফলে দুর্বল ও নিপীড়িত শ্রেণির দমন এবং তার শোষণে নতুন হাতিয়ার লাভ করে। এভাবে প্রাচীন যুগে রাষ্ট্র ছিল প্রধানত ক্রীতদাস দমনের জন্য দাস-মালিকদের রাষ্ট্র, যেমন সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল ভূমিদাস কৃষকদের বশে রাখার জন্য অভিজাতদের সংস্থা। বর্তমানে আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র হচ্ছে পুঁজি কর্তৃক মজুরি শ্রম শোষণের হাতিয়ার।...অধিকাংশ রাষ্ট্রেই দেখা যায়, নাগরিকদের অধিকার নির্ধারিত হয় ধনসম্পত্তির অনুপাতে,...রাষ্ট্র হচ্ছে বিত্তহীন শ্রেণির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিত্তশীল শ্রেণির একটি সংগঠন।’
রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী। যদিও সব গণতান্ত্রিক দেশেই পার্লামেন্টকে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা। যদিও তার সেই ক্ষমতাও নির্বাহী বিভাগের আমলাদের মাধ্যমেই প্রয়োগ হয়ে থাকে। ক্ষমতা হাতে পেয়ে নির্বাহী বিভাগ যদি অন্যায় করে, ভুল করে অথবা থাকে তার দুর্বলতা, তার প্রতিবিধান করবে কে? আধুনিক রাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারির জন্য বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিচার বিভাগ রয়েছে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য। সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটির সঙ্গে যদি রাষ্ট্র অবিচার করে, বিচার বিভাগ দুর্বলের পক্ষে রায় দিয়ে রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে থাকে। তা ছাড়া রাষ্ট্রে রয়েছে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেমন নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। যেমন মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন। এসবই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অতি আবশ্যকীয় অংশ। এগুলোর প্রতিটির আলাদা আলাদা কাজ এবং প্রতিটিই অন্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত, যেমন মোটরগাড়ির ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাধারণ নাগরিকেরা ন্যায়বিচার ও সুশাসন আশা করতে পারে না।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ও সুষ্ঠু নির্বাচন করে সম্ভাব্য ক্ষতি ডেকে আনার কাজটি সরকার কেন করতে যাবে? তা করার কথা নির্বাচন কমিশনের। সে ক্ষমতা সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে। জেলা প্রশাসক হোন, পুলিশ সুপার হোন বা কোনো জনপ্রতিনিধিই হোন, তাঁরা যখন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কে ব্যবস্থা নেবেন? নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা হোন বা যেকোনো ক্ষমতাবান হোন, নির্বাচনকেন্দ্রে বসে ব্যালট পেপারে কারও পক্ষে যদি সিল মারতে থাকেন, তাঁকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তা যখন তারা করে না, তখন তারা জনগণ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। বিশ্বাসঘাতক মানুষকে দিয়ে ভালো রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
রাষ্ট্র চলে যে অর্থে, রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, তাঁদের আরামদায়ক বাড়ি-গাড়ির ব্যয়, তার প্রতিটি পয়সাই জনগণের; সরকারি দলের তহবিল থেকে আসে না। ওই অর্থের অপব্যবহার করার অধিকার রাষ্ট্রের কারও নেই। এবং সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা তদারকের জন্য রয়েছেন মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক। অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ। অতি গুরুদায়িত্ব তাঁর। তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে সংবিধান বলে দিয়েছে:
‘মহা হিসাব নিরীক্ষক প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব এবং সকল আদালত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীর সরকারি হিসাব নিরীক্ষা করিবেন এবং অনুরূপ হিসাব সম্পর্কে রিপোর্ট দান করিবেন এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি কিংবা সেই প্রয়োজনে তাঁহার দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির দখলভুক্ত সকল নথি, বহি, রসিদ, দলিল, নগদ অর্থ, স্ট্যাম্প, জামিন, ভান্ডার বা অন্য প্রকার সরকারি সম্পত্তি পরীক্ষার অধিকারী হইবেন।’
সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা তাঁরা করছেনও। মহা হিসাব নিরীক্ষক তাঁর বার্ষিক রিপোর্ট রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেন। রাষ্ট্রপতি সেটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে পাঠিয়ে দেন। সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, যা সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি, ওই রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়। ব্রিটেন, ভারতসহ পৃথিবীর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সব দেশেই মহা হিসাব নিরীক্ষকের রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। সাধারণত পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হন বিরোধী দলের নেতা। কমিটিতে কোনো মন্ত্রী থাকেন না। মহা হিসাব নিরীক্ষকের অফিস ঠিকমতো কাজ করলে সরকারি অফিসে চুরি, অপচয়, দুর্নীতি প্রভৃতি যথেষ্ট পরিমাণে কমে যেতে পারে। কিন্তু বহু শিক্ষিত মানুষকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, মহা হিসাব নিরীক্ষকের দায়িত্ব সম্পর্কে শুধু নয়, তাঁর পদটি সম্পর্কেই তাঁদের ধারণা নেই। মহা হিসাব নিরীক্ষক এবং সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি অন্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো যদি বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করত, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজ বারো আনা কমে যেত।
আমাদের সংবিধান বলেছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে’ এবং ‘কারও প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না’। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের জন্য রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকমিশন। এই কমিশনের প্রধানতম দায়িত্ব হলো ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগদানের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদিগকে মনোনয়নের উদ্দেশ্যে যাচাই ও পরীক্ষা পরিচালনা’ করা। সংবিধান এ কথা বলেনি যে পরীক্ষার্থীদের ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস করিবার অধিকারও তাহাদের থাকিবে’। রাষ্ট্রে একটি দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ভূমিকাই প্রধান। সরকারি দলের নিম্ন মেধার ও অযোগ্য ক্যাডারদের নিয়োগ দিলে একসময় প্রশাসন ভেঙে পড়বে। আমরা এখনো পর্যন্ত যা দেখে এসেছি, তাতে বলা যায়, দলীয়করণের কারণে যোগ্যতর ও মেধাবীদের অনেকেই আপ্রাণ চেষ্টা করেও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। গরিব-মেধাবী তরুণেরা হতাশ। রাষ্ট্রীয় নিয়োগে বিপুল অর্থ অবৈধভাবে লেনদেন হয়। এই প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে একসময় রাষ্ট্র দুর্বল এমনকি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন আগে ছিল না। বর্তমানে এ দুটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। দুদক সম্পর্কে সাবেক এক চেয়ারম্যান নিজেই বলেছিলেন, এটি ‘নখদন্তহীন বাঘ’। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সদিচ্ছা ছাড়া দুদকের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করা অসম্ভব। যদিও গত তিন-চার বছরে বেশ কয়েকজন ক্ষমতাশালীকে তাদের অফিসে তলব করেছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু যেভাবে দুদক এখন কাজ করছে, এই গতিতে চললে দেশে দুর্নীতি বাড়বে ছাড়া কমার সম্ভাবনা কম।
মানবাধিকার কমিশনের মিডিয়া প্রচার ছাড়া সাবলীল ভূমিকা এখনো দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। অথচ অসহায় ও দুর্বলের প্রধান সহায়ক হওয়ার কথা মানবাধিকার কমিশন। বরং বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দুর্বলের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট কাজ করছে। আমাদের রাষ্ট্রে দুর্বলের পাশে মিডিয়া ছাড়া দাঁড়ানোর কেউ নেই। ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সংখ্যালঘু নৃজাতি, নারী এবং শিশুর ওপর প্রবলের আঘাতকে প্রত্যাঘাত করার জন্য যেসব সংস্থা দায়বদ্ধ, তাদের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। বিরোধী নেতা-কর্মীর অপহরণ, গুম, হত্যা প্রভৃতির সঙ্গে রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জড়িত থাকলে তাঁদের বিচারের আওতায় আনার জন্য যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের কথা, সেগুলোর ওপর মানুষের আস্থার সৃষ্টি হয়নি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক যা তা হলো নাগরিক সমাজের যেসব সংগঠন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ও মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার, সেগুলোর কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে খুবই কঠোরভাবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও মানবাধিকার নিয়ে দেশে ও বিদেশে সমালোচনা ও উদ্বেগের ঘাটতি নেই। গত দুই-আড়াই বছরে তার মাত্রা বেড়েছে। সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে বাধাহীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে দিলেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব। আশা করি নতুন বছরে জাতীয় এজেন্ডায় এ বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
সাত বছর যাবৎ বাংলাদেশে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে, এটা একটা ইতিবাচক দিক। যেভাবেই নির্বাচিত হোক, একটি সংবিধানসম্মত সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। সরকারের গৃহীত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও বাস্তবায়িত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিভিন্ন ফোরামে অংশ নিচ্ছে। তারপরও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে এত কথা উঠছে কেন? গত দুই বছরে পত্রপত্রিকায় ও টিভি চ্যানেলগুলোতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি ও আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই অপরিণত রাজনৈতিক ব্যবস্থার সংশোধনে বাস্তবসম্মত ও বলিষ্ঠ কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে শুধু সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে তা নয়, সরকারের বাইরের রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি দরকার।
রাষ্ট্র পরিচালনা করে প্রধানত নির্বাহী বিভাগ, যার অধীনে থাকে প্রশাসন। প্রশাসন পরিচালিত হয় স্থায়ী আমলাতন্ত্র দ্বারা। কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের নাম শুনলেই আজকাল অনেকে বিরক্তি প্রকাশ করেন। তাঁদের মতামতকে ফেলে দেওয়ার জন্য শক্তিশালী যুক্তি এখনো পর্যন্ত দুর্লভ। এঙ্গেলস তাঁর ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ শীর্ষক রচনায় বলেছেন, ‘যেহেতু রাষ্ট্রের আবির্ভাব শ্রেণি বিরোধকে সংহত করার প্রয়োজন থেকে, সেই সঙ্গে তার উদ্ভব হয় শ্রেণি বিরোধের মধ্যেই, সেই জন্য রাষ্ট্র হলো সাধারণত সবচেয়ে শক্তিশালী ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রভুত্বকারী শ্রেণির রাষ্ট্র; এই শ্রেণি রাষ্ট্রের মাধ্যমে রাজনীতির ক্ষেত্রেও আধিপত্যকারী শ্রেণি হয়ে ওঠে; এবং তার ফলে দুর্বল ও নিপীড়িত শ্রেণির দমন এবং তার শোষণে নতুন হাতিয়ার লাভ করে। এভাবে প্রাচীন যুগে রাষ্ট্র ছিল প্রধানত ক্রীতদাস দমনের জন্য দাস-মালিকদের রাষ্ট্র, যেমন সামন্ততান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল ভূমিদাস কৃষকদের বশে রাখার জন্য অভিজাতদের সংস্থা। বর্তমানে আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্র হচ্ছে পুঁজি কর্তৃক মজুরি শ্রম শোষণের হাতিয়ার।...অধিকাংশ রাষ্ট্রেই দেখা যায়, নাগরিকদের অধিকার নির্ধারিত হয় ধনসম্পত্তির অনুপাতে,...রাষ্ট্র হচ্ছে বিত্তহীন শ্রেণির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিত্তশীল শ্রেণির একটি সংগঠন।’
রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগই সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী। যদিও সব গণতান্ত্রিক দেশেই পার্লামেন্টকে দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা। যদিও তার সেই ক্ষমতাও নির্বাহী বিভাগের আমলাদের মাধ্যমেই প্রয়োগ হয়ে থাকে। ক্ষমতা হাতে পেয়ে নির্বাহী বিভাগ যদি অন্যায় করে, ভুল করে অথবা থাকে তার দুর্বলতা, তার প্রতিবিধান করবে কে? আধুনিক রাষ্ট্রে নির্বাহী বিভাগের ওপর নজরদারির জন্য বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বিচার বিভাগ রয়েছে রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য। সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকটির সঙ্গে যদি রাষ্ট্র অবিচার করে, বিচার বিভাগ দুর্বলের পক্ষে রায় দিয়ে রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে থাকে। তা ছাড়া রাষ্ট্রে রয়েছে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, যেমন নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক এবং সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। যেমন মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন। এসবই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অতি আবশ্যকীয় অংশ। এগুলোর প্রতিটির আলাদা আলাদা কাজ এবং প্রতিটিই অন্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত, যেমন মোটরগাড়ির ইঞ্জিনের বিভিন্ন অংশ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী না করে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাধারণ নাগরিকেরা ন্যায়বিচার ও সুশাসন আশা করতে পারে না।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ও সুষ্ঠু নির্বাচন করে সম্ভাব্য ক্ষতি ডেকে আনার কাজটি সরকার কেন করতে যাবে? তা করার কথা নির্বাচন কমিশনের। সে ক্ষমতা সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে। জেলা প্রশাসক হোন, পুলিশ সুপার হোন বা কোনো জনপ্রতিনিধিই হোন, তাঁরা যখন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কে ব্যবস্থা নেবেন? নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা হোন বা যেকোনো ক্ষমতাবান হোন, নির্বাচনকেন্দ্রে বসে ব্যালট পেপারে কারও পক্ষে যদি সিল মারতে থাকেন, তাঁকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তা যখন তারা করে না, তখন তারা জনগণ ও রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে। বিশ্বাসঘাতক মানুষকে দিয়ে ভালো রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
রাষ্ট্র চলে যে অর্থে, রাষ্ট্রের যাবতীয় কাজকর্ম এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, তাঁদের আরামদায়ক বাড়ি-গাড়ির ব্যয়, তার প্রতিটি পয়সাই জনগণের; সরকারি দলের তহবিল থেকে আসে না। ওই অর্থের অপব্যবহার করার অধিকার রাষ্ট্রের কারও নেই। এবং সরকারি অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা তদারকের জন্য রয়েছেন মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক। অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ। অতি গুরুদায়িত্ব তাঁর। তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে সংবিধান বলে দিয়েছে:
‘মহা হিসাব নিরীক্ষক প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব এবং সকল আদালত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীর সরকারি হিসাব নিরীক্ষা করিবেন এবং অনুরূপ হিসাব সম্পর্কে রিপোর্ট দান করিবেন এবং সেই উদ্দেশ্যে তিনি কিংবা সেই প্রয়োজনে তাঁহার দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির দখলভুক্ত সকল নথি, বহি, রসিদ, দলিল, নগদ অর্থ, স্ট্যাম্প, জামিন, ভান্ডার বা অন্য প্রকার সরকারি সম্পত্তি পরীক্ষার অধিকারী হইবেন।’
সরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষা তাঁরা করছেনও। মহা হিসাব নিরীক্ষক তাঁর বার্ষিক রিপোর্ট রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেন। রাষ্ট্রপতি সেটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংসদে পাঠিয়ে দেন। সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, যা সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি, ওই রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়। ব্রিটেন, ভারতসহ পৃথিবীর সংসদীয় গণতান্ত্রিক সব দেশেই মহা হিসাব নিরীক্ষকের রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। সাধারণত পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হন বিরোধী দলের নেতা। কমিটিতে কোনো মন্ত্রী থাকেন না। মহা হিসাব নিরীক্ষকের অফিস ঠিকমতো কাজ করলে সরকারি অফিসে চুরি, অপচয়, দুর্নীতি প্রভৃতি যথেষ্ট পরিমাণে কমে যেতে পারে। কিন্তু বহু শিক্ষিত মানুষকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি, মহা হিসাব নিরীক্ষকের দায়িত্ব সম্পর্কে শুধু নয়, তাঁর পদটি সম্পর্কেই তাঁদের ধারণা নেই। মহা হিসাব নিরীক্ষক এবং সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি অন্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো যদি বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করত, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজ বারো আনা কমে যেত।
আমাদের সংবিধান বলেছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে’ এবং ‘কারও প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না’। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের জন্য রয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকমিশন। এই কমিশনের প্রধানতম দায়িত্ব হলো ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগদানের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদিগকে মনোনয়নের উদ্দেশ্যে যাচাই ও পরীক্ষা পরিচালনা’ করা। সংবিধান এ কথা বলেনি যে পরীক্ষার্থীদের ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস করিবার অধিকারও তাহাদের থাকিবে’। রাষ্ট্রে একটি দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ভূমিকাই প্রধান। সরকারি দলের নিম্ন মেধার ও অযোগ্য ক্যাডারদের নিয়োগ দিলে একসময় প্রশাসন ভেঙে পড়বে। আমরা এখনো পর্যন্ত যা দেখে এসেছি, তাতে বলা যায়, দলীয়করণের কারণে যোগ্যতর ও মেধাবীদের অনেকেই আপ্রাণ চেষ্টা করেও সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছেন না। গরিব-মেধাবী তরুণেরা হতাশ। রাষ্ট্রীয় নিয়োগে বিপুল অর্থ অবৈধভাবে লেনদেন হয়। এই প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে একসময় রাষ্ট্র দুর্বল এমনকি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশন আগে ছিল না। বর্তমানে এ দুটি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অপরিমেয়। দুদক সম্পর্কে সাবেক এক চেয়ারম্যান নিজেই বলেছিলেন, এটি ‘নখদন্তহীন বাঘ’। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের সদিচ্ছা ছাড়া দুদকের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করা অসম্ভব। যদিও গত তিন-চার বছরে বেশ কয়েকজন ক্ষমতাশালীকে তাদের অফিসে তলব করেছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু যেভাবে দুদক এখন কাজ করছে, এই গতিতে চললে দেশে দুর্নীতি বাড়বে ছাড়া কমার সম্ভাবনা কম।
মানবাধিকার কমিশনের মিডিয়া প্রচার ছাড়া সাবলীল ভূমিকা এখনো দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। অথচ অসহায় ও দুর্বলের প্রধান সহায়ক হওয়ার কথা মানবাধিকার কমিশন। বরং বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থাগুলো দুর্বলের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট কাজ করছে। আমাদের রাষ্ট্রে দুর্বলের পাশে মিডিয়া ছাড়া দাঁড়ানোর কেউ নেই। ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সংখ্যালঘু নৃজাতি, নারী এবং শিশুর ওপর প্রবলের আঘাতকে প্রত্যাঘাত করার জন্য যেসব সংস্থা দায়বদ্ধ, তাদের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। বিরোধী নেতা-কর্মীর অপহরণ, গুম, হত্যা প্রভৃতির সঙ্গে রাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জড়িত থাকলে তাঁদের বিচারের আওতায় আনার জন্য যে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনের কথা, সেগুলোর ওপর মানুষের আস্থার সৃষ্টি হয়নি। সবচেয়ে বেদনাদায়ক যা তা হলো নাগরিক সমাজের যেসব সংগঠন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ও মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার, সেগুলোর কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে খুবই কঠোরভাবে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও মানবাধিকার নিয়ে দেশে ও বিদেশে সমালোচনা ও উদ্বেগের ঘাটতি নেই। গত দুই-আড়াই বছরে তার মাত্রা বেড়েছে। সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে বাধাহীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে দিলেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো সম্ভব। আশা করি নতুন বছরে জাতীয় এজেন্ডায় এ বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
Saturday, December 26, 2015
মোড়ল ও মেয়র এক নয় by সৈয়দ আবুল মকসুদ
Saturday, December 26, 2015
Anonymous
আলোচনা,
উপ-সম্পাদকীয়,
নির্বাচন,
প্রথম আলো,
মতামত,
সৈয়দ আবুল মকসুদ
মাদকনগর,
ইয়াবাগঞ্জ প্রভৃতি পৌরসভার মেয়র ও কমিশনার নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে।
কোনো কোনো ভূখণ্ডে যেকোনো ধরনের নির্বাচনের কথা উঠলেই সৎ-যোগ্য
প্রার্থীরা বসা থেকে তড়াক করে দাঁড়িয়ে যান। ইয়াবাগঞ্জ, মাদকনগরের
ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। এ মাটিতে সাম্প্রতিক সময়ে যেকোনো নির্বাচনেই বিরল
ব্যতিক্রম ছাড়া সৎ ও যোগ্য প্রার্থীরাই অতি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের
মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তবে প্রতিটি নির্বাচনেই সবচেয়ে
বেশি যা হয়, তা হলো বঙ্গসন্তানদের সততার পরীক্ষা এবং বিশেষভাবে প্রকাশ পায়
বাঙালির বিমল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
২০০৮ সালের আগে কোনো সমস্যা ছিল না। জামানত দিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেলেই হতো, আমলনামা প্রকাশের প্রয়োজন ছিল না। ২০০৮-এ নাগরিক সমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা নির্বাচনী সংস্কার হয়। প্রার্থীদের সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য জানার অধিকার ভোটারদের দেওয়া হয়েছে। হলফনামা বাধ্যতামূলক। না দিলে প্রার্থিতা বাতিল হবে। প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা। তাঁর আয়ের উৎস। তিনি ঋণখেলাপি কি না। ফৌজদারি মামলা তাঁর মাথার ওপরে ঝুলছে কি না। কোন মামলায় অভিযুক্ত হয়ে শ্রীঘরে কত দিন ছিলেন। দুই বছরের বেশি জেলের ভাত খেলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশায় গুড়ে বালি। প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা বেঁধে দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ (জানিপক)। কিন্তু এ মাটিতে কার পিতা-পিতামহের ঘাড়ে কয়টি মাথা যে কাউকে কিছু বেঁধে দেয় এবং তা মানতে বাধ্য করে।
মন্তাজুদ্দিন মিয়া মাদকনগরের কয়েকজন মেয়র প্রার্থীর একজন। তাঁর বিরুদ্ধে খুনখারাবির মামলার সংখ্যা ১৩। সিকিম আলি সক্কু ইয়াবানগর পৌরসভার অন্যতম মেয়র প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় কী পরিমাণ মামলা হয়েছে, তা বড় দারোগার পক্ষেও বলা সম্ভব নয়, পুরোনো কাগজপত্র না ঘেঁটে। কিন্তু সততার প্রশ্নে তাঁরা উভয়ই শতভাগ খাঁটি। তাঁদের দলীয় পিতৃ প্রতিষ্ঠানে তাঁদের উভয়েরই দাম সংগঠনগুলোর যেকোনো নেতার চেয়ে বেশি। বাংলার মাটিতে যাঁর বিরুদ্ধে যত বেশি ফৌজদারি মামলা, তিনি তত বড় নেতা।
সক্কু মিয়া ও মন্তাজুদ্দিনের সততার প্রশ্নে মিডিয়ার ছোকরামতো রিপোর্টাররা সন্দেহ প্রকাশ করলেও তাঁদের ক্যাডারদের কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। সক্কু মিয়া সদলবলে প্রচারাভিযানে বেরিয়ে যাঁকে সামনে পাচ্ছেন, তাঁকেই বুকে জড়িয়ে ধরছেন। ইয়াবাগঞ্জে একতলা কাঁচাপাকা ঘরই বেশি। তিনি তাঁর ভোটারদের বলছেন, তিনি নির্বাচিত হলে পৌরসভাকে ক্যালিফোর্নিয়ার কোনো একটি পৌরসভার মতো আধুনিক ও তকতকে-ঝকঝকে করে ফেলবেন।
প্রার্থীদের খুনখারাবির অভিযোগ, সন্ত্রাসী তৎপরতা, অবৈধ উপার্জন, আয়কর না দেওয়া প্রভৃতির সঙ্গে জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, সূক্ষ্ম ও মোটা কারচুপি প্রভৃতি আমাদের নির্বাচনী বৈশিষ্ট্য। এভাবে যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁদের থেকে মানুষ কী আশা করতে পারে?
সক্কু মিয়া যে হলফনামা জমা দিয়েছেন তাতে দেখা যায়, তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ একজন ঠেলাগাড়িচালকের চেয়ে সামান্য বেশি। নগদ অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ১৫০ টাকা। হলফনামা পূরণের সময় তাঁর এক ক্যাডার, যার দুই হাতে দুটি মোবাইল ফোন। বলল, এত কম দিলেন, মানুষ তো বিশ্বাস করবে না। প্রার্থী তাঁর মাফলারটি গলায় ঝাপটা মেরে প্যাঁচ দিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন। বললেন, তুই একটা রামছাগল। ছাগল না হইলে তোরে আমি পাঠাইলাম টেকনাফ। নিজে ধরা খাইয়া দুই মাস তো জেল খাটলিই, দেড় লাখ পিস আমার জিনিস নিয়া ধরা পড়লি। আরে ছাগল, নগদ টাকা তো আমার কাছে এই মুহূর্তে ১ হাজার ১৫০ টাকাই আছে।
আরেক প্রার্থীর শ্যালক ঝড়ু মিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বিদ্যার্থী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। ছেলেটি খুব খারাপ না। চাঁদাবাজি নিজে করে না। অন্যেরা করে যা দেয়, তাতেই সে সন্তুষ্ট। সে দুলাভাইকে বলল, আপনি যে এতগুলা খুনের মামলার আসামি, আমাগো বিরুদ্ধ পার্টি এই নিয়া যদি ভোটারগো হাত করে?
প্রার্থী বলেন, তুই তোর বইনের লাগান হস নাই। তোর বুদ্ধি বড়ই কাঁচা। অপরাধ কী জিনিস তা আমি বুঝি। কারণ, আমি জীবনে ফৌজদারি অপরাধ কইরাই এই জায়গায় আইছি। তা না হইলে পার্টি আমারে নমিনেশন দেয়? পৌরসভাকে অপরাধমুক্ত করা আমার পক্ষেই সম্ভব। কারণ, আমি অপরাধ কী জিনিস তা জানি আর অপরাধীরে দেখলেই চিনতে পারি।
মাদকনগর ও ইয়াবাগঞ্জ আগে ছিল গ্রামের বাজার। সন্ধ্যার পর এখানে-ওখানে বসত তাসের আড্ডা। একটু আড়ালমতো জায়গায় বসত হেরোইন ও ইয়াবাসেবীদের আসর। আওয়াজ উঠল বাজার কমিটি কথাটা ভালো শোনায় না, পৌরসভা বানাইতে হইব। যেমন ঢাকা ছিল একদিন পৌরসভা, এখন সিটি করপোরেশন এবং তাও একটি নয়, দুটি। যেমন জেলাগুলোকে করা হচ্ছে বিভাগ। ডিভিশনাল কমিশনারের কী কাজ তা একমাত্র তিনিই জানেন, জনগণ নয়। যে রকম দাবি উঠছে প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা থেকে, তাতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগেই সব জেলাকে বিভাগে পরিণত না করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকতে পারবে না। বাংলার মাটিতে নামটিই আসল—কাম নয়। যেমন আক্কেল আলি কলেজ কেমন-কেমন শোনায়, সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হলো: আক্কেল আলি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। তেমনি গ্রামগঞ্জের বাজারগুলোকে ‘শহর’ বানাতে করা হয়েছে পৌরসভা। সেটির যিনি শাসক হবেন, তাঁর পদবি মেয়র।
প্রতিটি শব্দের একটি অর্থ আছে, আর আছে তাৎপর্য ও মর্যাদা। পৌরসভা শব্দটির অন্য রকম দ্যোতনা। মেয়র শব্দটির মর্যাদা আলাদা, বাজার কমিটির সভাপতির মতো নয়। বড় দলের মেয়র প্রার্থীদের কেউ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়ই যদি অতিরিক্ত মদ্যপানে মারা যান, তিনি জীবিত থাকলে নির্ঘাত নির্বাচিত হতেন, তা পৌরসভার নেশাকারীদের জন্য হতো আশীর্বাদ। প্রার্থীদের খুনখারাবির অভিযোগ, সন্ত্রাসী তৎপরতা, অবৈধ উপার্জন, আয়কর না দেওয়া প্রভৃতির সঙ্গে জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, সূক্ষ্ম ও মোটা কারচুপি প্রভৃতি আমাদের নির্বাচনী বৈশিষ্ট্য। এভাবে যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁদের থেকে মানুষ কী আশা করতে পারে?
পল্লি আর শহর এক জিনিস নয়। গ্রামের মোড়ল আর শহরের পৌরসভার মেয়র এক রকম নয়। ছোট-বড় শহরগুলোতে স্বশাসিত পৌরসভা বা মিউনিসিপ্যালটির ব্যবস্থা গড়ে ওঠে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক শতাব্দী আগে। আমাদের যেসব মফস্বলের হাটবাজার পৌরসভায় প্রমোশন পেয়েছে, এখন দরকার সেগুলোতে নাগরিক সুবিধা বাড়ানো। বিশেষ করে যে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে আজ দেশের প্রতিটি এলাকায়, সেই সন্ত্রাস ও মাদক থেকে পৌরসভাগুলোকে মুক্ত রাখা পৌর কর্তৃপক্ষের প্রধানতম দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে যাঁরা সক্ষম, তাঁদেরই মানুষ নির্বাচিত করবেন, এই প্রত্যাশা করি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
২০০৮ সালের আগে কোনো সমস্যা ছিল না। জামানত দিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে গেলেই হতো, আমলনামা প্রকাশের প্রয়োজন ছিল না। ২০০৮-এ নাগরিক সমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কিছুটা নির্বাচনী সংস্কার হয়। প্রার্থীদের সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য জানার অধিকার ভোটারদের দেওয়া হয়েছে। হলফনামা বাধ্যতামূলক। না দিলে প্রার্থিতা বাতিল হবে। প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা। তাঁর আয়ের উৎস। তিনি ঋণখেলাপি কি না। ফৌজদারি মামলা তাঁর মাথার ওপরে ঝুলছে কি না। কোন মামলায় অভিযুক্ত হয়ে শ্রীঘরে কত দিন ছিলেন। দুই বছরের বেশি জেলের ভাত খেলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশায় গুড়ে বালি। প্রার্থীদের সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমা বেঁধে দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ (জানিপক)। কিন্তু এ মাটিতে কার পিতা-পিতামহের ঘাড়ে কয়টি মাথা যে কাউকে কিছু বেঁধে দেয় এবং তা মানতে বাধ্য করে।
মন্তাজুদ্দিন মিয়া মাদকনগরের কয়েকজন মেয়র প্রার্থীর একজন। তাঁর বিরুদ্ধে খুনখারাবির মামলার সংখ্যা ১৩। সিকিম আলি সক্কু ইয়াবানগর পৌরসভার অন্যতম মেয়র প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে থানায় কী পরিমাণ মামলা হয়েছে, তা বড় দারোগার পক্ষেও বলা সম্ভব নয়, পুরোনো কাগজপত্র না ঘেঁটে। কিন্তু সততার প্রশ্নে তাঁরা উভয়ই শতভাগ খাঁটি। তাঁদের দলীয় পিতৃ প্রতিষ্ঠানে তাঁদের উভয়েরই দাম সংগঠনগুলোর যেকোনো নেতার চেয়ে বেশি। বাংলার মাটিতে যাঁর বিরুদ্ধে যত বেশি ফৌজদারি মামলা, তিনি তত বড় নেতা।
সক্কু মিয়া ও মন্তাজুদ্দিনের সততার প্রশ্নে মিডিয়ার ছোকরামতো রিপোর্টাররা সন্দেহ প্রকাশ করলেও তাঁদের ক্যাডারদের কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। সক্কু মিয়া সদলবলে প্রচারাভিযানে বেরিয়ে যাঁকে সামনে পাচ্ছেন, তাঁকেই বুকে জড়িয়ে ধরছেন। ইয়াবাগঞ্জে একতলা কাঁচাপাকা ঘরই বেশি। তিনি তাঁর ভোটারদের বলছেন, তিনি নির্বাচিত হলে পৌরসভাকে ক্যালিফোর্নিয়ার কোনো একটি পৌরসভার মতো আধুনিক ও তকতকে-ঝকঝকে করে ফেলবেন।
প্রার্থীদের খুনখারাবির অভিযোগ, সন্ত্রাসী তৎপরতা, অবৈধ উপার্জন, আয়কর না দেওয়া প্রভৃতির সঙ্গে জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, সূক্ষ্ম ও মোটা কারচুপি প্রভৃতি আমাদের নির্বাচনী বৈশিষ্ট্য। এভাবে যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁদের থেকে মানুষ কী আশা করতে পারে?
সক্কু মিয়া যে হলফনামা জমা দিয়েছেন তাতে দেখা যায়, তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ একজন ঠেলাগাড়িচালকের চেয়ে সামান্য বেশি। নগদ অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ১৫০ টাকা। হলফনামা পূরণের সময় তাঁর এক ক্যাডার, যার দুই হাতে দুটি মোবাইল ফোন। বলল, এত কম দিলেন, মানুষ তো বিশ্বাস করবে না। প্রার্থী তাঁর মাফলারটি গলায় ঝাপটা মেরে প্যাঁচ দিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন। বললেন, তুই একটা রামছাগল। ছাগল না হইলে তোরে আমি পাঠাইলাম টেকনাফ। নিজে ধরা খাইয়া দুই মাস তো জেল খাটলিই, দেড় লাখ পিস আমার জিনিস নিয়া ধরা পড়লি। আরে ছাগল, নগদ টাকা তো আমার কাছে এই মুহূর্তে ১ হাজার ১৫০ টাকাই আছে।
আরেক প্রার্থীর শ্যালক ঝড়ু মিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বিদ্যার্থী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। ছেলেটি খুব খারাপ না। চাঁদাবাজি নিজে করে না। অন্যেরা করে যা দেয়, তাতেই সে সন্তুষ্ট। সে দুলাভাইকে বলল, আপনি যে এতগুলা খুনের মামলার আসামি, আমাগো বিরুদ্ধ পার্টি এই নিয়া যদি ভোটারগো হাত করে?
প্রার্থী বলেন, তুই তোর বইনের লাগান হস নাই। তোর বুদ্ধি বড়ই কাঁচা। অপরাধ কী জিনিস তা আমি বুঝি। কারণ, আমি জীবনে ফৌজদারি অপরাধ কইরাই এই জায়গায় আইছি। তা না হইলে পার্টি আমারে নমিনেশন দেয়? পৌরসভাকে অপরাধমুক্ত করা আমার পক্ষেই সম্ভব। কারণ, আমি অপরাধ কী জিনিস তা জানি আর অপরাধীরে দেখলেই চিনতে পারি।
মাদকনগর ও ইয়াবাগঞ্জ আগে ছিল গ্রামের বাজার। সন্ধ্যার পর এখানে-ওখানে বসত তাসের আড্ডা। একটু আড়ালমতো জায়গায় বসত হেরোইন ও ইয়াবাসেবীদের আসর। আওয়াজ উঠল বাজার কমিটি কথাটা ভালো শোনায় না, পৌরসভা বানাইতে হইব। যেমন ঢাকা ছিল একদিন পৌরসভা, এখন সিটি করপোরেশন এবং তাও একটি নয়, দুটি। যেমন জেলাগুলোকে করা হচ্ছে বিভাগ। ডিভিশনাল কমিশনারের কী কাজ তা একমাত্র তিনিই জানেন, জনগণ নয়। যে রকম দাবি উঠছে প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তা থেকে, তাতে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আগেই সব জেলাকে বিভাগে পরিণত না করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকতে পারবে না। বাংলার মাটিতে নামটিই আসল—কাম নয়। যেমন আক্কেল আলি কলেজ কেমন-কেমন শোনায়, সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হলো: আক্কেল আলি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। তেমনি গ্রামগঞ্জের বাজারগুলোকে ‘শহর’ বানাতে করা হয়েছে পৌরসভা। সেটির যিনি শাসক হবেন, তাঁর পদবি মেয়র।
প্রতিটি শব্দের একটি অর্থ আছে, আর আছে তাৎপর্য ও মর্যাদা। পৌরসভা শব্দটির অন্য রকম দ্যোতনা। মেয়র শব্দটির মর্যাদা আলাদা, বাজার কমিটির সভাপতির মতো নয়। বড় দলের মেয়র প্রার্থীদের কেউ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়ই যদি অতিরিক্ত মদ্যপানে মারা যান, তিনি জীবিত থাকলে নির্ঘাত নির্বাচিত হতেন, তা পৌরসভার নেশাকারীদের জন্য হতো আশীর্বাদ। প্রার্থীদের খুনখারাবির অভিযোগ, সন্ত্রাসী তৎপরতা, অবৈধ উপার্জন, আয়কর না দেওয়া প্রভৃতির সঙ্গে জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, সূক্ষ্ম ও মোটা কারচুপি প্রভৃতি আমাদের নির্বাচনী বৈশিষ্ট্য। এভাবে যাঁরা নির্বাচিত হন, তাঁদের থেকে মানুষ কী আশা করতে পারে?
পল্লি আর শহর এক জিনিস নয়। গ্রামের মোড়ল আর শহরের পৌরসভার মেয়র এক রকম নয়। ছোট-বড় শহরগুলোতে স্বশাসিত পৌরসভা বা মিউনিসিপ্যালটির ব্যবস্থা গড়ে ওঠে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কয়েক শতাব্দী আগে। আমাদের যেসব মফস্বলের হাটবাজার পৌরসভায় প্রমোশন পেয়েছে, এখন দরকার সেগুলোতে নাগরিক সুবিধা বাড়ানো। বিশেষ করে যে বিষ ছড়িয়ে পড়েছে আজ দেশের প্রতিটি এলাকায়, সেই সন্ত্রাস ও মাদক থেকে পৌরসভাগুলোকে মুক্ত রাখা পৌর কর্তৃপক্ষের প্রধানতম দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে যাঁরা সক্ষম, তাঁদেরই মানুষ নির্বাচিত করবেন, এই প্রত্যাশা করি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
Tuesday, December 8, 2015
রাষ্ট্রে ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগ by সৈয়দ আবুল মকসুদ
Tuesday, December 08, 2015
Anonymous
আলোচনা,
উপ-সম্পাদকীয়,
জাতীয়,
প্রথম আলো,
মতামত,
সৈয়দ আবুল মকসুদ
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
ও অন্যান্য উপলক্ষে প্রথম আলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। একেক
ক্রোড়পত্রের লেখার জন্য নির্বাচন করা হয় একেকটি থিম বা বিষয়বস্তু।
কোনোটিতে থাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যাঁরা সমাজে অবদান রেখেছেন, তাঁদের কাজ
সম্পর্কে, যাতে আরও অনেকে তাঁদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। এক
ক্রোড়পত্রে বিভিন্ন সময় যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক
পদক-পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁদের সম্পর্কে লেখা ছিল। ফিলিপাইনের ম্যাগসাইসাই
পুরস্কার এশিয়ার নোবেল পুরস্কার বলে খ্যাত। প্রথম বাংলাদেশি, যিনি
ম্যাগসাইসাই পুরস্কারে ভূষিত হন, তিনি তাহেরুন্নেসা আবদুল্লাহ।
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তাঁর ওপর একটি লেখা ছিল। তিনি বলেছিলেন:
‘আমার মতো অজানা-অচেনা একটি মেয়ে ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেল, তা অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেনি। ফলে একসময় কাজ করার পরিবেশটি হারিয়ে যায়। তাই অনেক কিছু করার পরিকল্পনা ছিল, তা করতে পারিনি। কুমিল্লা একাডেমির কাজ থেকেই ইস্তফা নিতে হয়।’
আজ উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নারী রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। ৫০ বছর আগে তা সম্ভব ছিল না। কর্মক্ষেত্রে উঁচু পদে নারীর দেখা পাওয়া ছিল বিরল দৃশ্য। তাহেরুন্নেসা ১৯৬৩ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত ‘পাকিস্তান একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট’-এ ভারপ্রাপ্ত ইনস্ট্রাক্টর পদে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর এর নাম হয় বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট, সংক্ষেপে বার্ড। কুমিল্লা একাডেমি নামেই বেশি পরিচিত। এটি যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত এবং যিনি এর প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর নাম আখতার হামিদ খান। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অফিসার, অসামান্য কর্মী। স্বাধীনতার পর কুমিল্লা একাডেমির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ছিলেন তাহেরুন্নেসা। সেই ষাটের দশকে নারীশিক্ষা, বাসস্থান উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, গ্রামীণ নারীদের ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া, কুটিরশিল্প গড়ে তুলে গ্রামীণ দারিদ্র্যমোচন প্রভৃতি কাজ তিনি দক্ষতার সঙ্গে করেন। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ ‘কমিউনিটি লিডারশিপ’ বিভাগে ১৯৭৮ সালে তাঁকে ম্যাগসাইসাই পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি আরও এগিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সমাজের সহযোগিতা তো দূরের কথা, কোনো রকম আনুকূল্যই পাননি; বরং শিকার হয়েছেন ঈর্ষার। তারপরও তিনি বলেছেন:
‘চারপাশে অনেক হতাশা। তবে অনেক আশাও আছে। দল বেঁধে মেয়েরা কারখানায় যাচ্ছে, বড় বড় জায়গায় চাকরি করছে, মায়েদের আর সাত-আটটি সন্তানের জন্ম দিতে হচ্ছে না—এ ধরনের দৃশ্য আমি জীবিত অবস্থাতেই দেখে যেতে পারছি, তা অনেক বড় পাওয়া।’
সেই বড় প্রাপ্তির পেছনে যে দীর্ঘ যাত্রা, সেই পথ যাঁরা তৈরি করেন, তাহেরুন্নেসাও তাঁদের একজন। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তবে তাঁর পরিবারের অনেকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের পরিবার অবিভক্ত বাংলার আলোকিত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারগুলোর একটি। তাঁরা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক ও উদার। তাঁর নানা খান বাহাদুর তাসাদ্দুক আহমদ ছিলেন বিশের দশকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সবচেয়ে খ্যাতিমান প্রধান শিক্ষক। অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত, কবি-কথাশিল্পী বুদ্ধদেব বসুর মতো তাঁর বিখ্যাত ছাত্ররা তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা সব সময় করতেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁকে সম্মান করতেন। তাসাদ্দুক আহমদের অন্যান্য ভাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুখ্যাত ছিলেন। তাহেরুন্নেসার স্বামী ভূতত্ত্ববিদ এস কে এম আবদুল্লাহ ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ। স্ত্রীকে অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা দিয়েছেন।
শুরুতে উদ্ধৃত মিসেস আবদুল্লাহর সোজা কথাটি আমার মনে একটি ধারণার জন্ম দেয়। তাঁর বক্তব্যটি নিয়ে চিন্তা করি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল নতুন স্বাধীন দেশ। শুধু সরকারি উদ্যোগ ও তৎপরতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়। কোনো দেশের এক-তৃতীয়াংশ কাজের বেশি সরকারের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের সরকারের আর্থিক সংগতি কম। ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগ দরকার। বাংলাদেশ আজ যে আর্থসামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার পেছনে বহু ব্যক্তি ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবদানই বারো আনা।
আমাদের বাঙালি সমাজ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজ কোনো শক্ত দার্শনিক ও নৈতিক আদর্শিক পাটাতনের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। না ধর্মীয়, না ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ সমাজের চালিকাশক্তি। এ সমাজে অতীতে উঁচু আদর্শবান ও নীতিমান মানুষ যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিজেরাই নিজেদের নির্মাণ করেছিলেন—সমাজ নয়। যে সমাজের দার্শনিক ভিত্তি দুর্বল, সেখানে প্রতিষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রে উন্নত রাজনৈতিক আদর্শ থাকতে পারে না। তবে কিছু কিছু আদর্শ সব সমাজেই স্বীকৃত। তার মধ্যে সত্য, প্রেম, ন্যায়বিচার প্রভৃতি রয়েছে। সত্য হলো নিরপেক্ষ সত্য ইমপারশিয়াল ট্রুথ; এবং প্রেমও নর-নারীর দেহঘনিষ্ঠ প্রেম নয়—মানুষে মানুষের প্রেম। সে প্রেম অনেক বড় প্রেম। মানবপ্রেম। আমাদের সমাজে যে হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, তা দার্শনিক ভিত্তি না থাকারই ফল। সে জন্য বহু রক্তে অর্জিত রাষ্ট্রকেও মানবিক করা সম্ভব হয়নি।
সমাজে উঁচু দার্শনিক চিন্তা ও নৈতিকতার অতি বড় ব্যাপার। রাষ্ট্রে গঠনমূলক কাজে যত বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন, তত সমাজ দ্রুত এগিয়ে যায়। উপমহাদেশের দুই বড় মনীষী রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী রাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি সন্দেহের চোখে দেখেছেন। তাঁরা ব্যক্তির সৃষ্টিশীল ও গঠনমূলক কাজের ওপর জোর দিয়েছেন। তরুণদের অনেকেই মনে করেন একটা বিপ্লবই সব সমস্যার সমাধান। বস্তুত তা ঠিক নয়। তবে প্রগতিশীল নেতৃত্বে বড় ধাক্কায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
একবার শান্তিনিকেতনে সাবেক বিপ্লববাদী এবং পরে গান্ধীবাদী ও রবীন্দ্রপ্রেমিক পান্নালাল দাশগুপ্তের সঙ্গে কথা হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমদ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বেলাল মোহাম্মদ ও আমি গিয়েছিলাম দেখা করতে। দাশগুপ্ত অতি খাঁটি মানুষ। আশির ওপরে বয়স তখন। তিনি বোলপুর অঞ্চলের গ্রামের মানুষের সমস্যা সমাধানে অনশন করছিলেন তাঁর বন্ধুর গুরুপল্লির বাড়িতে। একবার স্বাধীনতার পরেও তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়। তাঁর একটি কথা আমার সব সময় মনে পড়ে। গান্ধীবাদী দাশগুপ্ত বলতেন, রাষ্ট্রের ওপর সব ব্যাপারে নির্ভর করা যায় না। তা কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—যা-ই হোক না কেন! বিকল্প কৃষিব্যবস্থা, বিকল্প শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তা করতে হবে। আমার মনে হয়েছে, তা করতে হলে সমাজেরও পূর্ণ আনুকূল্য ও সহযোগিতা দরকার। ঈর্ষাবশত যেকোনো বেসরকারি ও বিকল্প উদ্যোগ থামিয়ে দিলে সামাজিক অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
গত সপ্তাহে ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্য ড. বালচন্দ্র মুঙ্গেকার ঢাকায় এসেছিলেন এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে। তিনি ভারতের সংবিধানপ্রণেতা বি আর আম্বেদকরের অনুসারী এবং গান্ধীবাদীও। গান্ধীজিকে নিয়ে কাজও করছেন। তাঁর বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনে আলোচনা করতে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেন। প্রফেসর মুঙ্গেকার আগে ছিলেন মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং পরে সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স স্টাডিজের চেয়ারম্যান। তিনি রাষ্ট্রপতি মনোনীত পার্লামেন্টের মেম্বার। আম্বেদকর নিয়েও তাঁর সঙ্গে কথা হলো। আম্বেদকর বলেছেন, শুধু আইনের দ্বারা মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সমাজের ভেতরের চেতনা জাগ্রত থাকতে হবে।
সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি হয় অতি অল্পসংখ্যক সচেতন ও সংক্ষুব্ধ মানুষের মধ্যে। একটি ভালো রাষ্ট্র তা-ই, যা ওই সংক্ষুব্ধ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের উদারভাবে সহ্য করে এবং তাঁদের উন্নত আদর্শ ও চিন্তা মেনে নেয়। মানুষের কল্যাণে অল্প কিছু বিক্ষুব্ধ মানুষের আন্দোলনকে বিকশিত হতে দেওয়া উচিত। সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা ক্ষতিকর। যেকোনো উন্নত চিন্তাকে শ্রদ্ধা জানানো উচিত। সে চিন্তা বা মত যদি আপাতত সরকার বা রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী হয় তবু।
সরকার তার প্রশাসনযন্ত্র দিয়ে যে কাজ করে, তা নাগরিকদের প্রত্যাশার তুলনায় অতি অল্প। আধুনিক শিল্পকারখানা থেকেও মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি। কিন্তু শিল্পকারখানারও চাকরি দেওয়া বা কর্মসংস্থান করার ক্ষমতা সীমাহীন নয়। নতুন ডিগ্রিপ্রাপ্তরা চাকরির সন্ধানে সরকার ও শিল্পমালিকদের কাছে ছুটছেন, কিন্তু তাঁদের একটি বড় অংশের আশা পূরণ হচ্ছে না। ফলে, যুবসমাজের একটি অংশের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। সেই হতাশাকে নানাভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে উগ্রবাদীরা। জঙ্গিগোষ্ঠী পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব। যাদের সৎ পথে উপার্জনের পথ বন্ধ, তারা সমাজবিরোধী কাজে যেতে পারে। সে জন্য বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা জরুরি।
বেকারত্ব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে যুবসমাজে সন্ত্রাসী প্রবণতা দেখা দেয়। তারা সংগতভাবেই একটি পরিবর্তন চায়। আজ গ্রামীণ জীবনে শান্তি নেই, শহরেও অশান্তি। ফলে, গোটা সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের অনাচারেই মানুষ অতিষ্ঠ। বর্তমান ব্যবস্থায় সে রকম শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, যাতে গ্রামের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা নিয়ে গ্রামেও জীবিকা উপার্জন করতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি, যে কথা রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী বলেছেন। ছেলেমেয়েদের হাতে একটা সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিলেই আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এখন ডিগ্রির সার্টিফিকেটের একটি কাগজের চোতা পনেরো আনা শিক্ষার্থীরই কাজে লাগছে না। যুগের ও সমাজের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া উগ্রবাদী প্রবণতার মোকাবিলা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের অতিরিক্ত কর্তৃত্ব একটি অস্বাস্থ্যকর রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেয়। গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ উভয়ই তার বিরোধিতা করেছেন। সমাজের ওপর রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী আচরণ ও নিপীড়ন নাগরিকদের সৃষ্টিশীলতাকে দুর্বল করে। একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীলতাও মানুষকে স্বাবলম্বী হতে দেয় না। দাতাদের অর্থনির্ভর এনজিও সমাজের সমবায়ী ও স্বেচ্ছাশ্রমের তৎপরতাকেও খর্ব করে। দলীয় রাজনীতির অন্ধ আনুগত্য মানুষের ন্যায়বিচারের প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করে। এবং মানবিক সহানুভূতি, সহযোগিতা ও গঠনমূলক কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ নষ্ট করে দেয়। সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ব্যক্তির উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং গঠনমূলক কাজকে বাধাগ্রস্ত না করে বিকশিত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তব্য।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
‘আমার মতো অজানা-অচেনা একটি মেয়ে ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেল, তা অনেকেই সহজভাবে নিতে পারেনি। ফলে একসময় কাজ করার পরিবেশটি হারিয়ে যায়। তাই অনেক কিছু করার পরিকল্পনা ছিল, তা করতে পারিনি। কুমিল্লা একাডেমির কাজ থেকেই ইস্তফা নিতে হয়।’
আজ উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে নারী রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। ৫০ বছর আগে তা সম্ভব ছিল না। কর্মক্ষেত্রে উঁচু পদে নারীর দেখা পাওয়া ছিল বিরল দৃশ্য। তাহেরুন্নেসা ১৯৬৩ সালে কুমিল্লায় প্রতিষ্ঠিত ‘পাকিস্তান একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট’-এ ভারপ্রাপ্ত ইনস্ট্রাক্টর পদে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর এর নাম হয় বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট, সংক্ষেপে বার্ড। কুমিল্লা একাডেমি নামেই বেশি পরিচিত। এটি যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত এবং যিনি এর প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর নাম আখতার হামিদ খান। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অফিসার, অসামান্য কর্মী। স্বাধীনতার পর কুমিল্লা একাডেমির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ছিলেন তাহেরুন্নেসা। সেই ষাটের দশকে নারীশিক্ষা, বাসস্থান উন্নয়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, গ্রামীণ নারীদের ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া, কুটিরশিল্প গড়ে তুলে গ্রামীণ দারিদ্র্যমোচন প্রভৃতি কাজ তিনি দক্ষতার সঙ্গে করেন। তারই স্বীকৃতিস্বরূপ ‘কমিউনিটি লিডারশিপ’ বিভাগে ১৯৭৮ সালে তাঁকে ম্যাগসাইসাই পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি আরও এগিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সমাজের সহযোগিতা তো দূরের কথা, কোনো রকম আনুকূল্যই পাননি; বরং শিকার হয়েছেন ঈর্ষার। তারপরও তিনি বলেছেন:
‘চারপাশে অনেক হতাশা। তবে অনেক আশাও আছে। দল বেঁধে মেয়েরা কারখানায় যাচ্ছে, বড় বড় জায়গায় চাকরি করছে, মায়েদের আর সাত-আটটি সন্তানের জন্ম দিতে হচ্ছে না—এ ধরনের দৃশ্য আমি জীবিত অবস্থাতেই দেখে যেতে পারছি, তা অনেক বড় পাওয়া।’
সেই বড় প্রাপ্তির পেছনে যে দীর্ঘ যাত্রা, সেই পথ যাঁরা তৈরি করেন, তাহেরুন্নেসাও তাঁদের একজন। তাঁর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই। তবে তাঁর পরিবারের অনেকের সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের পরিবার অবিভক্ত বাংলার আলোকিত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারগুলোর একটি। তাঁরা ছিলেন অসাম্প্রদায়িক, আধুনিক ও উদার। তাঁর নানা খান বাহাদুর তাসাদ্দুক আহমদ ছিলেন বিশের দশকে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের সবচেয়ে খ্যাতিমান প্রধান শিক্ষক। অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত, কবি-কথাশিল্পী বুদ্ধদেব বসুর মতো তাঁর বিখ্যাত ছাত্ররা তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রশংসা সব সময় করতেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁকে সম্মান করতেন। তাসাদ্দুক আহমদের অন্যান্য ভাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুখ্যাত ছিলেন। তাহেরুন্নেসার স্বামী ভূতত্ত্ববিদ এস কে এম আবদুল্লাহ ছিলেন উদার প্রকৃতির মানুষ। স্ত্রীকে অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা দিয়েছেন।
শুরুতে উদ্ধৃত মিসেস আবদুল্লাহর সোজা কথাটি আমার মনে একটি ধারণার জন্ম দেয়। তাঁর বক্তব্যটি নিয়ে চিন্তা করি। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল নতুন স্বাধীন দেশ। শুধু সরকারি উদ্যোগ ও তৎপরতায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সম্ভব নয়। কোনো দেশের এক-তৃতীয়াংশ কাজের বেশি সরকারের পক্ষে করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের সরকারের আর্থিক সংগতি কম। ব্যক্তি ও বেসরকারি উদ্যোগ দরকার। বাংলাদেশ আজ যে আর্থসামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার পেছনে বহু ব্যক্তি ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অবদানই বারো আনা।
আমাদের বাঙালি সমাজ, বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজ কোনো শক্ত দার্শনিক ও নৈতিক আদর্শিক পাটাতনের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। না ধর্মীয়, না ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ সমাজের চালিকাশক্তি। এ সমাজে অতীতে উঁচু আদর্শবান ও নীতিমান মানুষ যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিজেরাই নিজেদের নির্মাণ করেছিলেন—সমাজ নয়। যে সমাজের দার্শনিক ভিত্তি দুর্বল, সেখানে প্রতিষ্ঠিত কোনো রাষ্ট্রে উন্নত রাজনৈতিক আদর্শ থাকতে পারে না। তবে কিছু কিছু আদর্শ সব সমাজেই স্বীকৃত। তার মধ্যে সত্য, প্রেম, ন্যায়বিচার প্রভৃতি রয়েছে। সত্য হলো নিরপেক্ষ সত্য ইমপারশিয়াল ট্রুথ; এবং প্রেমও নর-নারীর দেহঘনিষ্ঠ প্রেম নয়—মানুষে মানুষের প্রেম। সে প্রেম অনেক বড় প্রেম। মানবপ্রেম। আমাদের সমাজে যে হিংসা-বিদ্বেষ, ঈর্ষা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, তা দার্শনিক ভিত্তি না থাকারই ফল। সে জন্য বহু রক্তে অর্জিত রাষ্ট্রকেও মানবিক করা সম্ভব হয়নি।
সমাজে উঁচু দার্শনিক চিন্তা ও নৈতিকতার অতি বড় ব্যাপার। রাষ্ট্রে গঠনমূলক কাজে যত বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেন, তত সমাজ দ্রুত এগিয়ে যায়। উপমহাদেশের দুই বড় মনীষী রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধী রাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি সন্দেহের চোখে দেখেছেন। তাঁরা ব্যক্তির সৃষ্টিশীল ও গঠনমূলক কাজের ওপর জোর দিয়েছেন। তরুণদের অনেকেই মনে করেন একটা বিপ্লবই সব সমস্যার সমাধান। বস্তুত তা ঠিক নয়। তবে প্রগতিশীল নেতৃত্বে বড় ধাক্কায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
একবার শান্তিনিকেতনে সাবেক বিপ্লববাদী এবং পরে গান্ধীবাদী ও রবীন্দ্রপ্রেমিক পান্নালাল দাশগুপ্তের সঙ্গে কথা হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মহিউদ্দিন আহমদ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বেলাল মোহাম্মদ ও আমি গিয়েছিলাম দেখা করতে। দাশগুপ্ত অতি খাঁটি মানুষ। আশির ওপরে বয়স তখন। তিনি বোলপুর অঞ্চলের গ্রামের মানুষের সমস্যা সমাধানে অনশন করছিলেন তাঁর বন্ধুর গুরুপল্লির বাড়িতে। একবার স্বাধীনতার পরেও তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়। তাঁর একটি কথা আমার সব সময় মনে পড়ে। গান্ধীবাদী দাশগুপ্ত বলতেন, রাষ্ট্রের ওপর সব ব্যাপারে নির্ভর করা যায় না। তা কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—যা-ই হোক না কেন! বিকল্প কৃষিব্যবস্থা, বিকল্প শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তা করতে হবে। আমার মনে হয়েছে, তা করতে হলে সমাজেরও পূর্ণ আনুকূল্য ও সহযোগিতা দরকার। ঈর্ষাবশত যেকোনো বেসরকারি ও বিকল্প উদ্যোগ থামিয়ে দিলে সামাজিক অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
গত সপ্তাহে ভারতের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের সদস্য ড. বালচন্দ্র মুঙ্গেকার ঢাকায় এসেছিলেন এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে। তিনি ভারতের সংবিধানপ্রণেতা বি আর আম্বেদকরের অনুসারী এবং গান্ধীবাদীও। গান্ধীজিকে নিয়ে কাজও করছেন। তাঁর বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনে আলোচনা করতে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করেন। প্রফেসর মুঙ্গেকার আগে ছিলেন মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং পরে সিমলার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স স্টাডিজের চেয়ারম্যান। তিনি রাষ্ট্রপতি মনোনীত পার্লামেন্টের মেম্বার। আম্বেদকর নিয়েও তাঁর সঙ্গে কথা হলো। আম্বেদকর বলেছেন, শুধু আইনের দ্বারা মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সমাজের ভেতরের চেতনা জাগ্রত থাকতে হবে।
সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি হয় অতি অল্পসংখ্যক সচেতন ও সংক্ষুব্ধ মানুষের মধ্যে। একটি ভালো রাষ্ট্র তা-ই, যা ওই সংক্ষুব্ধ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের উদারভাবে সহ্য করে এবং তাঁদের উন্নত আদর্শ ও চিন্তা মেনে নেয়। মানুষের কল্যাণে অল্প কিছু বিক্ষুব্ধ মানুষের আন্দোলনকে বিকশিত হতে দেওয়া উচিত। সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ও কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা ক্ষতিকর। যেকোনো উন্নত চিন্তাকে শ্রদ্ধা জানানো উচিত। সে চিন্তা বা মত যদি আপাতত সরকার বা রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী হয় তবু।
সরকার তার প্রশাসনযন্ত্র দিয়ে যে কাজ করে, তা নাগরিকদের প্রত্যাশার তুলনায় অতি অল্প। আধুনিক শিল্পকারখানা থেকেও মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি। কিন্তু শিল্পকারখানারও চাকরি দেওয়া বা কর্মসংস্থান করার ক্ষমতা সীমাহীন নয়। নতুন ডিগ্রিপ্রাপ্তরা চাকরির সন্ধানে সরকার ও শিল্পমালিকদের কাছে ছুটছেন, কিন্তু তাঁদের একটি বড় অংশের আশা পূরণ হচ্ছে না। ফলে, যুবসমাজের একটি অংশের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে। সেই হতাশাকে নানাভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে উগ্রবাদীরা। জঙ্গিগোষ্ঠী পর্যন্ত তৈরি করা সম্ভব। যাদের সৎ পথে উপার্জনের পথ বন্ধ, তারা সমাজবিরোধী কাজে যেতে পারে। সে জন্য বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ে স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা জরুরি।
বেকারত্ব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে যুবসমাজে সন্ত্রাসী প্রবণতা দেখা দেয়। তারা সংগতভাবেই একটি পরিবর্তন চায়। আজ গ্রামীণ জীবনে শান্তি নেই, শহরেও অশান্তি। ফলে, গোটা সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের অনাচারেই মানুষ অতিষ্ঠ। বর্তমান ব্যবস্থায় সে রকম শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না, যাতে গ্রামের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা নিয়ে গ্রামেও জীবিকা উপার্জন করতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি, যে কথা রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধী বলেছেন। ছেলেমেয়েদের হাতে একটা সার্টিফিকেট ধরিয়ে দিলেই আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে না। এখন ডিগ্রির সার্টিফিকেটের একটি কাগজের চোতা পনেরো আনা শিক্ষার্থীরই কাজে লাগছে না। যুগের ও সমাজের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া উগ্রবাদী প্রবণতার মোকাবিলা সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের অতিরিক্ত কর্তৃত্ব একটি অস্বাস্থ্যকর রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দেয়। গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথ উভয়ই তার বিরোধিতা করেছেন। সমাজের ওপর রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী আচরণ ও নিপীড়ন নাগরিকদের সৃষ্টিশীলতাকে দুর্বল করে। একটি কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীলতাও মানুষকে স্বাবলম্বী হতে দেয় না। দাতাদের অর্থনির্ভর এনজিও সমাজের সমবায়ী ও স্বেচ্ছাশ্রমের তৎপরতাকেও খর্ব করে। দলীয় রাজনীতির অন্ধ আনুগত্য মানুষের ন্যায়বিচারের প্রবৃত্তিকে ধ্বংস করে। এবং মানবিক সহানুভূতি, সহযোগিতা ও গঠনমূলক কাজের প্রতি মানুষের আগ্রহ নষ্ট করে দেয়। সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ব্যক্তির উদ্যোগকে উৎসাহিত করা এবং গঠনমূলক কাজকে বাধাগ্রস্ত না করে বিকশিত হওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তব্য।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
Friday, November 13, 2015
ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান ও সমাজ by সৈয়দ আবুল মকসুদ
অনেকে
মনে করেন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের পরে পাশ্চাত্য দর্শনে
সবচেয়ে প্রভাবশালী ও মৌলিক দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট। তিনি জার্মান
আইডিয়ালিজমের প্রতিষ্ঠাতা। যুক্তির বাইরে তিনি একচুলও নড়তে চাইতেন না।
মুক্তচিন্তা বলতে এ কালে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তার চেয়েও বেশি যুক্তিবাদী,
মুক্তচিন্তার প্রবক্তা। তাঁর জীবন ছিল কঠোর নিয়মে বন্দী। সারা দিনের
পাঁচটি মিনিটও তিনি অপচয় করতেন না। কখন ঘুম থেকে উঠবেন, চা খাবেন, লেখার
টেবিলে বসবেন, লাঞ্চ করবেন, কয় মিনিট চোখ বুজে বিশ্রাম করবেন এবং কখন
অপরাহ্ণে হাঁটতে বেরোবেন—সবই ছিল তাঁর কঠোর নিয়মে বাঁধা। তাঁকে রাস্তায়
বেরোতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের ঘড়ির কাঁটা ঠিক করে নিতেন।
চিরকুমার কান্টের কাজের লোকটির নাম ছিল ল্যাম্বে। দিনরাত সারাক্ষণ তিনি দার্শনিকের বাড়িতে থাকতেন। কান্টকে জ্ঞানচর্চার অবকাশ দিয়ে ঘরদোরের সব কাজ—রান্নাবান্না, কাপড় ধোপাবাড়িতে দেওয়া প্রভৃতি—ল্যাম্বে করতেন। কয়েক দশক তিনি কান্টের বাড়িতে ছিলেন। তিনি ছিলেন দার্শনিকের অতি বিশ্বাসভাজন। কান্ট সারা দিনে পাঁচ-দশটি বাক্যের বেশি বলতেন না। তিনি যখন লিখতেন তখন ল্যাম্বে চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন কখনো কখনো। কান্ট আপন মনে লেখালেখি করতেন। একদিন তিনি অনুভব করেন পেছনে দাঁড়িয়ে ল্যাম্বে কেমন অস্বাভাবিক জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পেছনে তাকিয়ে দেখেন ল্যাম্বের চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়ছে।
কান্টের মধ্যে আবেগের লেশমাত্র ছিল না। কাঁদার প্রয়োজন হলে কেউ কাঁদবে তাতে বিস্ময়ের কী? কান্ট জিজ্ঞেস করেন, তুমি এখানে কাঁদছ? কান্ট অপ্রয়োজনীয় বাক্য ব্যয়ের পাত্র ছিলেন না। আমরা হলে বলতাম, এখানে কান্নাকাটি কী? কাঁদো তো নিজের ঘরে গিয়ে কাঁদো। কান্টের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ল্যাম্বে বললেন, আমি আপনার লেখা পড়ে কাঁদছি। কান্ট অবাক হন। ল্যাম্বে বলেন, গড আছেন কি নেই, সে সম্পর্কে আপনি লিখছেন এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ-ট্রমাণ নিয়ে কী সব লিখছেন, আমি তা মানতে পারি না। গডের বিরুদ্ধে কোনো কথা আমার সইবে না।
মহাজ্ঞানী কান্ট ভেবে দেখলেন, ওর সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে ওর অনুভূতিরও মূল্য রয়েছে। থাকুক ল্যাম্বে ওর বিশ্বাস নিয়ে। দুই দিন পর এক সকালে কান্ট দেখেন ল্যাম্বে সুটকেস গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঈশ্বর সম্পর্কে বাইবেলপরিপন্থী লেখায় তাঁদের ৩০-৪০ বছরের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে। সুটকেস হাতে নিয়ে ল্যাম্বে চিরদিনের জন্য কান্টের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।
বহু বছর আগে বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটির অধীন গেলফার্টস্ট্রাসেতে ইনস্টিটিউট ফর ফিলোসফির এক আলোচনায় কান্টের জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে শোনার সুযোগ হয়েছিল। আঠারো শতকের শেষ দশকে, যখন গির্জার প্রভাব রাষ্ট্রের ওপর প্রবল, প্রকাশিত হয় কান্টের ‘রিলিজিয়ন উইদিন দ্য লিমিটস অব রিজন অ্যালোন’ শীর্ষক সন্দর্ভ। শুধু যুক্তির সীমার মধ্যে ধর্ম। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক উইলিয়ামের কাছে নালিশ জানান। তখন কান্ট ইউরোপের দর্শনের ভুবনে সম্রাট। সম্রাট ফ্রেডরিকের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়ে কান্টকে এক কড়া চিঠি দেয় এই মর্মে যে ধর্ম নিয়ে কোনো কথা বলা বা লেখালেখি চলবে না। তাঁর ওই রচনা একটি অফেন্স বা অপরাধ এবং তা হাইয়েস্ট ডিসপ্লেজার বা সর্বোচ্চ অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। ঝামেলায় জড়িয়ে জ্ঞানচর্চায় ব্যাঘাত ঘটুক, তা যেমন চাইতেন না, তেমনি শেষ বয়সে গর্দানটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হোক, তাও তাঁর একেবারেই কাম্য ছিল না। সম্রাটের নির্দেশের লিখিত জবাবে কান্ট জানান: আপনার একজন অনুগত নাগরিক হিসেবে ভবিষ্যতে আমি আমার কোনো বক্তৃতায় বা রচনায়—অন রিলিজিয়াস ম্যাটার্স—ধর্মীয় বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। এরপর ১০ বছর বেঁচে ছিলেন, ধর্মের ধারেকাছেও যাননি কান্ট। তবে বলেছেন, এই যে নক্ষত্রখচিত রাতের মহাকাশ, এর সৃষ্টির পেছনে নিশ্চয়ই রয়েছে মহারহস্য—কোনো এক মহাশক্তি। সেই মহাশক্তিকে যে নামেই ডাকা হোক।
কুড়ি শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী যৌক্তিক বিশ্লেষণী দার্শনিক ভিটগেনস্টাইন বই লিখেছেন মাত্র একখানা: ট্র্যাকটেটাস, কিন্তু তাতেই তিনি কিস্তিমাত করেছেন। ওতে দাঁত বসানোর সাধ্য খুব কম দার্শনিক বিজ্ঞানীরই আছে। ভিটগেনস্টাইনকে বিজ্ঞানের দার্শনিকও বলা হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনিও বলেছেন: বিজ্ঞানের প্রধান রহস্যগুলোর সমাধান হয়ে যাওয়ার পরেও মানবজীবনের কিছু প্রশ্ন অজানাই থেকে যাবে।
কপারনিকাস হোন, গ্যালিলিও হোন, কেপলার হোন, নিউটন বা আইনস্টাইন হোন—পশ্চিমের পদার্থবিজ্ঞানীরা কেউ ধর্মবিরূপ ছিলেন না। তাঁরা মহাজগতের বস্তুর রহস্য ও সত্য উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁদের আবিষ্কারের সঙ্গে ধর্মগ্রন্থের বেমিল হয়েছে, কিন্তু তাঁরা নিজেদের আবিষ্কৃত তথ্যের কথাই বলেছেন, ধর্মগ্রন্থের বাণীর সঙ্গে কোথায় তার বিরোধ, তা নিয়ে বাহাস করেননি। ধর্ম প্রবর্তকদের তাঁরা খাটো করেননি। আইনস্টাইন এতটাই ধর্মভাবাপন্ন ছিলেন যে তিনি বড় হাতের ইংরেজি অক্ষর ‘G’ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে লিখতেন। কারণ, গড লিখতে হয় ক্যাপিটাল জি অক্ষর দিয়ে।
ধর্ম আর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এক জিনিস নয়। প্রাচ্যের অনগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোর বদনাম বেশি। অথচ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা পশ্চিমের ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে কিছু ঘটলে তা নিয়ে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তোলে। তাদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কথা, খ্রিষ্টান মৌলবাদীদের কথা ধামাচাপা দেয়। বাংলাদেশের বা ভারতের কোনো মুসলমান পাঁচজন হিন্দুকে অথবা কোনো হিন্দু বা বৌদ্ধ পাঁচজন মুসলমানকে গুলি করে হত্যা করলে তা তিন মাস ধরে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম প্রচার করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ। ২০১১ সালের ২২ জুলাই পৃথিবীর ইতিহাসের এক জঘন্য সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী হত্যাকাণ্ড ঘটে নরওয়েতে। আন্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নামক এক খ্রিষ্টান মৌলবাদী একটি সামার ক্যাম্পের ৪১ জন যুবক-যুবতীকে বোমা মেরে ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে গুলি করে হত্যা করে। সে অতি সুস্থ এবং স্বীকার করে যে এশিয়ার কালোদের বিশেষ করে মুসলমান অভিবাসী নীতির বিরুদ্ধেই তার হত্যা অভিযান। ইউরোপ খ্রিষ্টানদের জন্য—হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধদের জন্য নয়। তার দেশের অতি প্রগতিশীল সরকার তাকে ‘পাগলাটে’ বা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ বলে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বিচারের এজলাসে তাঁকে দাঁড় করিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ওই খ্রিষ্টান মৌলবাদী ও বর্ণবাদীকে ‘সাইকোটিক প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিক’ বলে হত্যাকাণ্ডটিকে হালকাভাবে দেখা হয়।
ইউরোপে একটি ভালো গণতান্ত্রিক সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে সন্দেহ নেই, আমরা তা করতে পারিনি বা করতে চাইনি ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে। কিন্তু সেখানে যে বর্ণবাদী চেতনা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ, তা দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের চেয়ে অনেক গভীরে। উদার মানবতাবাদের কথা তাঁরা বলেন এবং তা প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যমও তাঁদের আছে; কিন্তু তাঁরা জানেন না প্রাচ্যের হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান মানবতাবাদীদের কথা। আমাদের মহামানবেরা সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাঁদের নিজেদের জীবনাচরণে, তা পশ্চিমে বিরল। আমাদের দুর্বলতা আমরা অন্যের মুখে ঝাল খাই এবং পোঁ ধরতে পছন্দ করি।
ধর্ম যদি মানব প্রগতির বাধা হতো, তাহলে আজ বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি হতো না। পাঁচ-ছয় শ মানুষ ও হাজার হাজার কিলোগ্রাম মালপত্র নিয়ে বিমান আকাশে উড়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেত না। মানুষ চলাফেরা করত নৌকা বা ঠেলাগাড়িতে। চাঁদে বা মহাকাশে মানুষকে যেতে বাধা দেওয়া হতো। ধর্ম মহত্তম সভ্যতা সৃষ্টিতে কোনো অঞ্চলে কোনো কালেই কিছুমাত্র বাধা হয়নি। তা-ই যদি হতো, তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশে মহান বৈদিক হিন্দু সভ্যতা বা বৌদ্ধ সভ্যতা আমরা পেতাম না। শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে স্পেন পর্যন্ত মহান ইসলামি সভ্যতা গড়ে উঠত না প্রাক-মধ্যযুগে। বৌদ্ধধর্ম অধ্যুষিত চীন, মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান, কোরিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কায় সভ্যতার সৃষ্টি হতো না। সব ধর্মাবলম্বীর ভেতরেই কিছু মানুষের মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নোংরামি আগেও ছিল, এখনো আছে। স্রোতস্বিনী নদীতে মানুষ ও পশুর মৃতদেহ ভেসে যায়, তাতে নদীর পানি নষ্ট হয়ে যায় না। মানুষ নদীর পানিই পান করে। নদীর নির্মল পানিই আসল। অল্প-স্বল্প নোংরা সেই পানিকে অপবিত্র করতে পারে না। পবিত্র ধর্মকে কিছু নোংরামি অপবিত্র করতে পারে না।
ধর্ম এক জিনিস। ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও অন্ধত্ব আরেক জিনিস এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বা ধর্মীয় রাজনীতি আরেক বস্তু। ধর্ম মানুষকে হিংসা ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে, অন্তরে নির্মল হয়ে সুন্দর জীবনযাপনে সহায়তা করে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা মানুষকে ছোট করে। ধর্মীয় রাজনীতি মানুষকে অসহিষ্ণু ও হিংস্র করে তোলে।
এই পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর ধরে ধর্ম ছিল। ভবিষ্যতেও ধর্ম স্বমহিমায় থাকবে। আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনীতি থাকতেই হবে। সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিও থাকবে। কেউ কারও সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেউ কারও জন্য বাধা নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ সহাবস্থান অতীতে যেমন করেছে, এই পৃথিবীতে ভবিষ্যতেও তেমনিভাবে করবে। তবে যখন এই তিনের মধ্যে কোনো কারণে বিরোধ দেখা দেয়, তখন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য সংবেদনশীলতার সঙ্গে তার মীমাংসা করা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
চিরকুমার কান্টের কাজের লোকটির নাম ছিল ল্যাম্বে। দিনরাত সারাক্ষণ তিনি দার্শনিকের বাড়িতে থাকতেন। কান্টকে জ্ঞানচর্চার অবকাশ দিয়ে ঘরদোরের সব কাজ—রান্নাবান্না, কাপড় ধোপাবাড়িতে দেওয়া প্রভৃতি—ল্যাম্বে করতেন। কয়েক দশক তিনি কান্টের বাড়িতে ছিলেন। তিনি ছিলেন দার্শনিকের অতি বিশ্বাসভাজন। কান্ট সারা দিনে পাঁচ-দশটি বাক্যের বেশি বলতেন না। তিনি যখন লিখতেন তখন ল্যাম্বে চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতেন কখনো কখনো। কান্ট আপন মনে লেখালেখি করতেন। একদিন তিনি অনুভব করেন পেছনে দাঁড়িয়ে ল্যাম্বে কেমন অস্বাভাবিক জোরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পেছনে তাকিয়ে দেখেন ল্যাম্বের চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়ছে।
কান্টের মধ্যে আবেগের লেশমাত্র ছিল না। কাঁদার প্রয়োজন হলে কেউ কাঁদবে তাতে বিস্ময়ের কী? কান্ট জিজ্ঞেস করেন, তুমি এখানে কাঁদছ? কান্ট অপ্রয়োজনীয় বাক্য ব্যয়ের পাত্র ছিলেন না। আমরা হলে বলতাম, এখানে কান্নাকাটি কী? কাঁদো তো নিজের ঘরে গিয়ে কাঁদো। কান্টের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ল্যাম্বে বললেন, আমি আপনার লেখা পড়ে কাঁদছি। কান্ট অবাক হন। ল্যাম্বে বলেন, গড আছেন কি নেই, সে সম্পর্কে আপনি লিখছেন এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ-ট্রমাণ নিয়ে কী সব লিখছেন, আমি তা মানতে পারি না। গডের বিরুদ্ধে কোনো কথা আমার সইবে না।
মহাজ্ঞানী কান্ট ভেবে দেখলেন, ওর সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে ওর অনুভূতিরও মূল্য রয়েছে। থাকুক ল্যাম্বে ওর বিশ্বাস নিয়ে। দুই দিন পর এক সকালে কান্ট দেখেন ল্যাম্বে সুটকেস গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ঈশ্বর সম্পর্কে বাইবেলপরিপন্থী লেখায় তাঁদের ৩০-৪০ বছরের সম্পর্কের সমাপ্তি ঘটে। সুটকেস হাতে নিয়ে ল্যাম্বে চিরদিনের জন্য কান্টের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান।
বহু বছর আগে বার্লিনের ফ্রি ইউনিভার্সিটির অধীন গেলফার্টস্ট্রাসেতে ইনস্টিটিউট ফর ফিলোসফির এক আলোচনায় কান্টের জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন সম্পর্কে শোনার সুযোগ হয়েছিল। আঠারো শতকের শেষ দশকে, যখন গির্জার প্রভাব রাষ্ট্রের ওপর প্রবল, প্রকাশিত হয় কান্টের ‘রিলিজিয়ন উইদিন দ্য লিমিটস অব রিজন অ্যালোন’ শীর্ষক সন্দর্ভ। শুধু যুক্তির সীমার মধ্যে ধর্ম। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক উইলিয়ামের কাছে নালিশ জানান। তখন কান্ট ইউরোপের দর্শনের ভুবনে সম্রাট। সম্রাট ফ্রেডরিকের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়ে কান্টকে এক কড়া চিঠি দেয় এই মর্মে যে ধর্ম নিয়ে কোনো কথা বলা বা লেখালেখি চলবে না। তাঁর ওই রচনা একটি অফেন্স বা অপরাধ এবং তা হাইয়েস্ট ডিসপ্লেজার বা সর্বোচ্চ অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। ঝামেলায় জড়িয়ে জ্ঞানচর্চায় ব্যাঘাত ঘটুক, তা যেমন চাইতেন না, তেমনি শেষ বয়সে গর্দানটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হোক, তাও তাঁর একেবারেই কাম্য ছিল না। সম্রাটের নির্দেশের লিখিত জবাবে কান্ট জানান: আপনার একজন অনুগত নাগরিক হিসেবে ভবিষ্যতে আমি আমার কোনো বক্তৃতায় বা রচনায়—অন রিলিজিয়াস ম্যাটার্স—ধর্মীয় বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না। এরপর ১০ বছর বেঁচে ছিলেন, ধর্মের ধারেকাছেও যাননি কান্ট। তবে বলেছেন, এই যে নক্ষত্রখচিত রাতের মহাকাশ, এর সৃষ্টির পেছনে নিশ্চয়ই রয়েছে মহারহস্য—কোনো এক মহাশক্তি। সেই মহাশক্তিকে যে নামেই ডাকা হোক।
কুড়ি শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী যৌক্তিক বিশ্লেষণী দার্শনিক ভিটগেনস্টাইন বই লিখেছেন মাত্র একখানা: ট্র্যাকটেটাস, কিন্তু তাতেই তিনি কিস্তিমাত করেছেন। ওতে দাঁত বসানোর সাধ্য খুব কম দার্শনিক বিজ্ঞানীরই আছে। ভিটগেনস্টাইনকে বিজ্ঞানের দার্শনিকও বলা হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনিও বলেছেন: বিজ্ঞানের প্রধান রহস্যগুলোর সমাধান হয়ে যাওয়ার পরেও মানবজীবনের কিছু প্রশ্ন অজানাই থেকে যাবে।
কপারনিকাস হোন, গ্যালিলিও হোন, কেপলার হোন, নিউটন বা আইনস্টাইন হোন—পশ্চিমের পদার্থবিজ্ঞানীরা কেউ ধর্মবিরূপ ছিলেন না। তাঁরা মহাজগতের বস্তুর রহস্য ও সত্য উদ্ঘাটন করেছেন। তাঁদের আবিষ্কারের সঙ্গে ধর্মগ্রন্থের বেমিল হয়েছে, কিন্তু তাঁরা নিজেদের আবিষ্কৃত তথ্যের কথাই বলেছেন, ধর্মগ্রন্থের বাণীর সঙ্গে কোথায় তার বিরোধ, তা নিয়ে বাহাস করেননি। ধর্ম প্রবর্তকদের তাঁরা খাটো করেননি। আইনস্টাইন এতটাই ধর্মভাবাপন্ন ছিলেন যে তিনি বড় হাতের ইংরেজি অক্ষর ‘G’ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে লিখতেন। কারণ, গড লিখতে হয় ক্যাপিটাল জি অক্ষর দিয়ে।
ধর্ম আর ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এক জিনিস নয়। প্রাচ্যের অনগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলোর বদনাম বেশি। অথচ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা পশ্চিমের ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে কিছু ঘটলে তা নিয়ে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তোলে। তাদের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার কথা, খ্রিষ্টান মৌলবাদীদের কথা ধামাচাপা দেয়। বাংলাদেশের বা ভারতের কোনো মুসলমান পাঁচজন হিন্দুকে অথবা কোনো হিন্দু বা বৌদ্ধ পাঁচজন মুসলমানকে গুলি করে হত্যা করলে তা তিন মাস ধরে পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম প্রচার করে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ। ২০১১ সালের ২২ জুলাই পৃথিবীর ইতিহাসের এক জঘন্য সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী হত্যাকাণ্ড ঘটে নরওয়েতে। আন্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক নামক এক খ্রিষ্টান মৌলবাদী একটি সামার ক্যাম্পের ৪১ জন যুবক-যুবতীকে বোমা মেরে ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রে গুলি করে হত্যা করে। সে অতি সুস্থ এবং স্বীকার করে যে এশিয়ার কালোদের বিশেষ করে মুসলমান অভিবাসী নীতির বিরুদ্ধেই তার হত্যা অভিযান। ইউরোপ খ্রিষ্টানদের জন্য—হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধদের জন্য নয়। তার দেশের অতি প্রগতিশীল সরকার তাকে ‘পাগলাটে’ বা ‘অপ্রকৃতিস্থ’ বলে প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত বিচারের এজলাসে তাঁকে দাঁড় করিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ওই খ্রিষ্টান মৌলবাদী ও বর্ণবাদীকে ‘সাইকোটিক প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিক’ বলে হত্যাকাণ্ডটিকে হালকাভাবে দেখা হয়।
ইউরোপে একটি ভালো গণতান্ত্রিক সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে সন্দেহ নেই, আমরা তা করতে পারিনি বা করতে চাইনি ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে। কিন্তু সেখানে যে বর্ণবাদী চেতনা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক হিংসা-বিদ্বেষ, তা দক্ষিণ এশীয় উপমহাদেশের চেয়ে অনেক গভীরে। উদার মানবতাবাদের কথা তাঁরা বলেন এবং তা প্রচারের শক্তিশালী মাধ্যমও তাঁদের আছে; কিন্তু তাঁরা জানেন না প্রাচ্যের হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান মানবতাবাদীদের কথা। আমাদের মহামানবেরা সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তাঁদের নিজেদের জীবনাচরণে, তা পশ্চিমে বিরল। আমাদের দুর্বলতা আমরা অন্যের মুখে ঝাল খাই এবং পোঁ ধরতে পছন্দ করি।
ধর্ম যদি মানব প্রগতির বাধা হতো, তাহলে আজ বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি হতো না। পাঁচ-ছয় শ মানুষ ও হাজার হাজার কিলোগ্রাম মালপত্র নিয়ে বিমান আকাশে উড়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেত না। মানুষ চলাফেরা করত নৌকা বা ঠেলাগাড়িতে। চাঁদে বা মহাকাশে মানুষকে যেতে বাধা দেওয়া হতো। ধর্ম মহত্তম সভ্যতা সৃষ্টিতে কোনো অঞ্চলে কোনো কালেই কিছুমাত্র বাধা হয়নি। তা-ই যদি হতো, তাহলে ভারতীয় উপমহাদেশে মহান বৈদিক হিন্দু সভ্যতা বা বৌদ্ধ সভ্যতা আমরা পেতাম না। শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে স্পেন পর্যন্ত মহান ইসলামি সভ্যতা গড়ে উঠত না প্রাক-মধ্যযুগে। বৌদ্ধধর্ম অধ্যুষিত চীন, মঙ্গোলিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান, কোরিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কায় সভ্যতার সৃষ্টি হতো না। সব ধর্মাবলম্বীর ভেতরেই কিছু মানুষের মধ্যে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও নোংরামি আগেও ছিল, এখনো আছে। স্রোতস্বিনী নদীতে মানুষ ও পশুর মৃতদেহ ভেসে যায়, তাতে নদীর পানি নষ্ট হয়ে যায় না। মানুষ নদীর পানিই পান করে। নদীর নির্মল পানিই আসল। অল্প-স্বল্প নোংরা সেই পানিকে অপবিত্র করতে পারে না। পবিত্র ধর্মকে কিছু নোংরামি অপবিত্র করতে পারে না।
ধর্ম এক জিনিস। ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও অন্ধত্ব আরেক জিনিস এবং ধর্ম নিয়ে রাজনীতি বা ধর্মীয় রাজনীতি আরেক বস্তু। ধর্ম মানুষকে হিংসা ও কলুষতা থেকে মুক্ত হয়ে, অন্তরে নির্মল হয়ে সুন্দর জীবনযাপনে সহায়তা করে। ধর্মীয় সংকীর্ণতা মানুষকে ছোট করে। ধর্মীয় রাজনীতি মানুষকে অসহিষ্ণু ও হিংস্র করে তোলে।
এই পৃথিবীতে হাজার হাজার বছর ধরে ধর্ম ছিল। ভবিষ্যতেও ধর্ম স্বমহিমায় থাকবে। আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনীতি থাকতেই হবে। সমাজে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিও থাকবে। কেউ কারও সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। কেউ কারও জন্য বাধা নয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ সহাবস্থান অতীতে যেমন করেছে, এই পৃথিবীতে ভবিষ্যতেও তেমনিভাবে করবে। তবে যখন এই তিনের মধ্যে কোনো কারণে বিরোধ দেখা দেয়, তখন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য সংবেদনশীলতার সঙ্গে তার মীমাংসা করা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
Wednesday, November 4, 2015
‘পারলে গলায় পাড়া দিয়া ট্যাকা নেয়’ by সৈয়দ আবুল মকসুদ
Wednesday, November 04, 2015
Anonymous
আলোচনা,
উপ-সম্পাদকীয়,
জাতীয়,
প্রথম আলো,
মতামত,
সৈয়দ আবুল মকসুদ
জীবিকার
প্রয়োজনে অথবা অন্য দরকারে মানুষকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়
যাতায়াত করতে হয়। নিজস্ব যানবাহন আছে খুব কম মানুষের। গণপরিবহন
বাস-মিনিবাস প্রভৃতিতে যাতায়াত করে ৯০ শতাংশ মানুষ। তাদের ৭০ শতাংশ অতি
নিম্ন আয়ের মানুষ। অধিকাংশই সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের
অল্প ও মাঝারি আয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী। গণপরিবহনে যাতায়াতকারীদের একটি
বিরাট অংশ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। আধা বেকার যুবক-যুবতী,
যাঁরা জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াত করেন—বাস-মিনিবাস
প্রভৃতির যাত্রীদের একটি অংশ তাঁরাও।
বাংলাদেশের অধিপতি শ্রেণির মানুষ, যাঁদের নিজস্ব গাড়ি রয়েছে এবং কোনো কোনো পরিবারে কয়েকটি গাড়ি, তাঁদের পক্ষে গণপরিবহনে যাতায়াতকারী মানুষের দুর্ভোগের মাত্রাটি উপলব্ধি করা একেবারেই সম্ভব নয়। বর্তমান বাজারে যাঁর গড় আয় ১০-১২ হাজার টাকা, তাঁকে যদি হঠাৎ মাসে এক-দেড় হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়, তা তাঁর ওপরে জুলুম। বর্তমানে গণপরিবহনে যাতায়াত ও বাড়তি ভাড়া নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে, তাতে সেই রকম জুলুমের শিকার কোটি কোটি মানুষ। অসহায় মানুষের সেই দুর্দশা দেখে নাগরিক সমাজের আমরা নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারি না। সে জন্য যাত্রীদের মুখে তাঁদের দুর্দশার কথা শুনতে আমরা গণশুনানির আয়োজন করেছি।
পোশাকশিল্পে কাজ করে এমন একটি মেয়ে বলল, ‘বাসভাড়ায় এখন কুড়ি টাকা আগের চেয়ে বেশি লাগতেছে। বাজার করুম কী দিয়া?’ অর্থাৎ যাঁর মাসিক আয় সাত হাজার টাকার মতো, তাঁর যদি হাজার দেড়েক টাকা বাসভাড়াতেই চলে যায়, তিনি খাবেন কী? ফার্মগেটে এক নারী বিবিসির সংবাদদাতাকে বললেন, ‘পারলে গলায় পাড়া দিয়া ট্যাকা নেয়।’
বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাস-মিনিবাসে যাতায়াত করতে বাধ্য হয়। তাতে জোর-জুলুম করে বর্ধিত ভাড়া আদায় বাস মালিক-কর্মচারীদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ভাড়া সরকার নির্ধারণ করেছে বড় বাসের জন্য সাত টাকা, সেখানে যাত্রীদের থেকে আদায় করা হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ১০ পয়সা। সে হিসাবে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে বাড়তি দিতে হতে পারে এক থেকে তিন টাকা, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে পাঁচ থেকে আট টাকা বেশি।
আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের কোনো ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব নেই। আমরা গণপরিবহনের মালিকদের ন্যায্য ভাড়া নিতে বাধ্য করতে পারি না। কর্মচারীরা কেন অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে—সে কথাও আমরা কোনো বাস-মিনিবাস চালক বা হেলপারকে জিজ্ঞেস করি না। সে অধিকার আমাদের নেই। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা শুধু জিজ্ঞেস করে কোন জায়গা থেকে কোন দূরত্বে নির্ধারিত ভাড়া কত আর যাত্রীদের থেকে আদায় করা হচ্ছে কত?
পরিবহন ক্ষেত্রের এই নৈরাজ্যের মূলেও দুর্নীতি। খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যেসব বাস-মিনিবাস-লেগুনা-টেম্পো রাস্তায় দেখা যায়, বিদেশি পর্যটকদের চোখে বাংলাদেশকে হেয় করার জন্য সেগুলোই যথেষ্ট অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুধু বাস-মিনিবাসে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা ও তার আশপাশের সড়কে লেগুনা, টেম্পো, হিউম্যান হলার, পিকআপ ভ্যান প্রভৃতির ভাড়াও অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। কেন অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, তা যাত্রীরা জিজ্ঞেস করলে মারামারি-হাতাহাতি পর্যন্ত হচ্ছে যাত্রীদের সঙ্গে যানবাহনের কর্মচারীদের।
বাসভাড়া বাড়ানোর আগে ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি বিচার-বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে যাত্রীসাধারণের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। এবার তিন বছর পর ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। বাসে ১.৬০ থেকে ১.৭০ পয়সা এবং মিনিবাসে ১.৫০ থেকে ১.৬০ পয়সা। সেটা কাগজে, বাস্তব অবস্থা একেবারেই অন্য রকম। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কৌশল মালিক-শ্রমিকদের ভালো জানা। গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে দুটি চাতুর্যের আশ্রয় নিচ্ছে তারা। গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে কোনো জিনিসের অনুমোদন নেই সরকারের। সবই সাধারণ। লোকাল বাস, শুধু এসি বাস ছাড়া। ইচ্ছামতো গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে মানুষকে প্রতারিত করে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে। এই অবৈধ কাণ্ড সরকার বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। চলছে লোকালের মতো, বলছে সিটিং সার্ভিস। ভাড়া দ্বিগুণ বা তারও বেশি। এই অবৈধ তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু রেখেছে। তা নিয়েও তুলকালাম কাণ্ড। বাংলাদেশে আইন প্রয়োগ চলবে না। দু-চারজন বাস কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করায় এবং কয়েক দিনের জেল দেওয়ায় এক দিন ঢাকা নগর অচল করে দেওয়া হয়। সরকার নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট চারজন। কয়েক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে অনেকগুলো। কিছু গাড়িকে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়েছে। অবস্থার উন্নতি হয়নি। মালিক-শ্রমিকেরা জরিমানাও দিচ্ছে, অতিরিক্ত ভাড়াও নিচ্ছে।
মালিকপক্ষ ও সরকার মনে করছে, কয়েক দিন এভাবে চললে মানুষ বাধ্য হয়ে বর্ধিত ভাড়াই মেনে নেবে। হয়তো নেবে কিন্তু মানুষের ভেতরের অসন্তোষ বন্ধ হবে না। একটি অবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। ক্ষমতাসীন দলগুলোর তাতে কিছুই আসে যায় না। দলকে চাঁদা দেয় পরিবহন মালিকেরা, জনগণ নয়। সুতরাং সরকারকে মালিকদের স্বার্থই রক্ষা করতে হয়—জনগণের স্বার্থ নয়।
শুধু সরকারকেই বা দোষ দেব কেন? রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা হতাশাজনক। জনস্বার্থ রক্ষায় তাদের ভূমিকা দেখি না। ২০-৩০ বছর আগে এভাবে ভাড়া বাড়ালে এবং অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত ভাড়া নিলে দলগুলো রাস্তায় নামত বা ধর্মঘট ডাকত। ক্ষমতাসীন দলগুলোর নীরবতা অর্থবহ, কিন্তু বিরোধী দল বলে যারা দাবি করে, বিশেষ করে বাম দলগুলো তারাও একটি বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব পালন করেছে।
গণপরিবহনে অরাজকতা নতুন নয়, দীর্ঘদিনের। আশির দশক থেকে অবস্থার অবনতি ঘটেছে। কোনো সরকার এদিকে দৃষ্টি দেয়নি, অতি নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি দলসহ বিভিন্ন বড় দল চাঁদা তুলেছে। গত ৩০ বছরে ঢাকায় মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণ, গণপরিবহনের সংখ্যা কমেছে অর্ধেক। অদ্ভুত বৈপরীত্য। পরিবহন মালিকদের সূত্রে জানলাম, ১৫ বছর আগে ঢাকায় বাস ছিল সাত হাজার, বর্তমানে কমে হয়েছে চার হাজার। চট্টগ্রামে বাস চলছে দেড় হাজার মাত্র। অতি কষ্টে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে বা দরজার হাতলে বা বাম্পারে ঝুলে যাতায়াত করে। ভাড়া নেওয়া হয় খেয়ালখুশিমতো।
বর্তমানে ঢাকায় গণপরিবহনে যাতায়াত করে প্রায় এক কোটি মানুষ। তাদের চার ভাগের এক ভাগ নারী এবং আর এক ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। কর্মজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। গণপরিবহনে তাদের যাতায়াতে যে লাঞ্ছনা ও দুঃখ সইতে হয়, তা সীমাহীন। তাদের বসার নির্দিষ্ট আসন নেই। বঙ্গীয় পুরুষের সৌজন্যবোধ নেই। নারী দেখলে উঠে দাঁড়ায় না। জানালা দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে আকাশে তাকিয়ে থাকে না দেখার ভান করে। কেউ একটু বসার জায়গা চাইলে খেঁকিয়ে জবাব দেওয়া হয়। বাসের কর্মচারীদের থেকেও তারা সহানুভূতি পায় না। ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন তুললে অশ্লীল ভাষায় কথা শোনানো হয়। কিশোরী-যুবতীদের গায়ে হাত পর্যন্ত দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে ও লজ্জায় তারা তা হজম করে।
বাস-মিনিবাসের ড্রাইভার-হেলপারদের জীবনও খুবই দুঃখের। হেলপারদের অনেকেরই বয়স খুব কম। বলতে গেলে কিশোর। তারা অবহেলিত-বঞ্চিত। বেতন সামান্য। সারা দিন পরিশ্রম করতে হয়। বিশ্রামের অভাব। থাকার জায়গা নেই। যাত্রীদের অনেকেই তিরিক্ষি মেজাজের। ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষির সময় মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন। ফলে যাত্রীদের সঙ্গে ‘হেলপার’দের শুধু কথা-কাটাকাটি নয়, মারামারি পর্যন্ত ঘটে।
পরিবহন মালিকদেরও সমস্যা থাকতে পারে। সেসব দেখাও সরকারের দায়িত্ব। যেকোনো সমস্যাই আলোচনার মাধ্যমে যুক্তিগ্রাহ্যভাবে সমাধান সম্ভব। তবে কোনো অজুহাতেই সরকারি নীতিমালা অমান্য করার অধিকার কোনো পক্ষেরই নেই। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত রেখে কাঙ্ক্ষিত আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
ঢাকা বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর শুধু নয়, বৃহত্তম নগর এবং প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। রাজধানী নগরের পরিবহনব্যবস্থা কী রকম হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো সরকারেরই কিছুমাত্র ধারণা ছিল বলে মনে হয় না। থাকলে অবস্থাটা এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করত না। স্বাধীনতার আগে বিআরটিসির বাস ছিল সবচেয়ে সুন্দর ও আরামদায়ক গণপরিবহন। নষ্ট রাজনীতি ও দুর্নীতির ধাক্কায় সেটা ধ্বংস করা হয়েছে। পরিবহন ক্ষেত্রের এই নৈরাজ্যের মূলেও দুর্নীতি। খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যেসব বাস-মিনিবাস-লেগুনা-টেম্পো রাস্তায় দেখা যায়, বিদেশি পর্যটকদের চোখে বাংলাদেশকে হেয় করার জন্য সেগুলোই যথেষ্ট।
এই নৈরাজ্য ও সমস্যার সমাধান কোথায়? গণপরিবহন যে একটি জটিল সমস্যা, স্বীকার করে নিয়ে তা সমাধানে গোত্র ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। থাকতে হবে যথাযথ অঙ্গীকার। সরকার একা পারবে না। মালিক-শ্রমিকসহ সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নাগরিক সমাজকেও সম্পৃক্ত করা বাঞ্ছনীয়। বর্তমানে নৈরাজ্য-অনাচার বন্ধ করতে সরকার যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণ তা সমর্থন দেবে। অকারণে কঠোর হওয়ার দরকার নেই, আইনের যথাযথ প্রয়োগই সমস্যার সমাধান করতে পারে। সেই সঙ্গে দরকার সরকারি নীতিনির্ধারক এবং কর্তৃপক্ষের জনগণের বেদনা উপলব্ধি করা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
বাংলাদেশের অধিপতি শ্রেণির মানুষ, যাঁদের নিজস্ব গাড়ি রয়েছে এবং কোনো কোনো পরিবারে কয়েকটি গাড়ি, তাঁদের পক্ষে গণপরিবহনে যাতায়াতকারী মানুষের দুর্ভোগের মাত্রাটি উপলব্ধি করা একেবারেই সম্ভব নয়। বর্তমান বাজারে যাঁর গড় আয় ১০-১২ হাজার টাকা, তাঁকে যদি হঠাৎ মাসে এক-দেড় হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়, তা তাঁর ওপরে জুলুম। বর্তমানে গণপরিবহনে যাতায়াত ও বাড়তি ভাড়া নিয়ে যে নৈরাজ্য চলছে, তাতে সেই রকম জুলুমের শিকার কোটি কোটি মানুষ। অসহায় মানুষের সেই দুর্দশা দেখে নাগরিক সমাজের আমরা নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারি না। সে জন্য যাত্রীদের মুখে তাঁদের দুর্দশার কথা শুনতে আমরা গণশুনানির আয়োজন করেছি।
পোশাকশিল্পে কাজ করে এমন একটি মেয়ে বলল, ‘বাসভাড়ায় এখন কুড়ি টাকা আগের চেয়ে বেশি লাগতেছে। বাজার করুম কী দিয়া?’ অর্থাৎ যাঁর মাসিক আয় সাত হাজার টাকার মতো, তাঁর যদি হাজার দেড়েক টাকা বাসভাড়াতেই চলে যায়, তিনি খাবেন কী? ফার্মগেটে এক নারী বিবিসির সংবাদদাতাকে বললেন, ‘পারলে গলায় পাড়া দিয়া ট্যাকা নেয়।’
বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ বাস-মিনিবাসে যাতায়াত করতে বাধ্য হয়। তাতে জোর-জুলুম করে বর্ধিত ভাড়া আদায় বাস মালিক-কর্মচারীদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ভাড়া সরকার নির্ধারণ করেছে বড় বাসের জন্য সাত টাকা, সেখানে যাত্রীদের থেকে আদায় করা হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা। প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে ১০ পয়সা। সে হিসাবে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে বাড়তি দিতে হতে পারে এক থেকে তিন টাকা, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে পাঁচ থেকে আট টাকা বেশি।
আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের কোনো ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব নেই। আমরা গণপরিবহনের মালিকদের ন্যায্য ভাড়া নিতে বাধ্য করতে পারি না। কর্মচারীরা কেন অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে—সে কথাও আমরা কোনো বাস-মিনিবাস চালক বা হেলপারকে জিজ্ঞেস করি না। সে অধিকার আমাদের নেই। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকেরা শুধু জিজ্ঞেস করে কোন জায়গা থেকে কোন দূরত্বে নির্ধারিত ভাড়া কত আর যাত্রীদের থেকে আদায় করা হচ্ছে কত?
পরিবহন ক্ষেত্রের এই নৈরাজ্যের মূলেও দুর্নীতি। খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যেসব বাস-মিনিবাস-লেগুনা-টেম্পো রাস্তায় দেখা যায়, বিদেশি পর্যটকদের চোখে বাংলাদেশকে হেয় করার জন্য সেগুলোই যথেষ্ট অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুধু বাস-মিনিবাসে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা ও তার আশপাশের সড়কে লেগুনা, টেম্পো, হিউম্যান হলার, পিকআপ ভ্যান প্রভৃতির ভাড়াও অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। কেন অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, তা যাত্রীরা জিজ্ঞেস করলে মারামারি-হাতাহাতি পর্যন্ত হচ্ছে যাত্রীদের সঙ্গে যানবাহনের কর্মচারীদের।
বাসভাড়া বাড়ানোর আগে ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটি বিচার-বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে যাত্রীসাধারণের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। এবার তিন বছর পর ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। বাসে ১.৬০ থেকে ১.৭০ পয়সা এবং মিনিবাসে ১.৫০ থেকে ১.৬০ পয়সা। সেটা কাগজে, বাস্তব অবস্থা একেবারেই অন্য রকম। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কৌশল মালিক-শ্রমিকদের ভালো জানা। গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে দুটি চাতুর্যের আশ্রয় নিচ্ছে তারা। গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে কোনো জিনিসের অনুমোদন নেই সরকারের। সবই সাধারণ। লোকাল বাস, শুধু এসি বাস ছাড়া। ইচ্ছামতো গেটলক ও সিটিং সার্ভিস বলে মানুষকে প্রতারিত করে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করছে। এই অবৈধ কাণ্ড সরকার বন্ধ করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। চলছে লোকালের মতো, বলছে সিটিং সার্ভিস। ভাড়া দ্বিগুণ বা তারও বেশি। এই অবৈধ তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে বিআরটিএ ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু রেখেছে। তা নিয়েও তুলকালাম কাণ্ড। বাংলাদেশে আইন প্রয়োগ চলবে না। দু-চারজন বাস কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করায় এবং কয়েক দিনের জেল দেওয়ায় এক দিন ঢাকা নগর অচল করে দেওয়া হয়। সরকার নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতে ম্যাজিস্ট্রেট চারজন। কয়েক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে অনেকগুলো। কিছু গাড়িকে ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয়েছে। অবস্থার উন্নতি হয়নি। মালিক-শ্রমিকেরা জরিমানাও দিচ্ছে, অতিরিক্ত ভাড়াও নিচ্ছে।
মালিকপক্ষ ও সরকার মনে করছে, কয়েক দিন এভাবে চললে মানুষ বাধ্য হয়ে বর্ধিত ভাড়াই মেনে নেবে। হয়তো নেবে কিন্তু মানুষের ভেতরের অসন্তোষ বন্ধ হবে না। একটি অবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। ক্ষমতাসীন দলগুলোর তাতে কিছুই আসে যায় না। দলকে চাঁদা দেয় পরিবহন মালিকেরা, জনগণ নয়। সুতরাং সরকারকে মালিকদের স্বার্থই রক্ষা করতে হয়—জনগণের স্বার্থ নয়।
শুধু সরকারকেই বা দোষ দেব কেন? রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা হতাশাজনক। জনস্বার্থ রক্ষায় তাদের ভূমিকা দেখি না। ২০-৩০ বছর আগে এভাবে ভাড়া বাড়ালে এবং অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত ভাড়া নিলে দলগুলো রাস্তায় নামত বা ধর্মঘট ডাকত। ক্ষমতাসীন দলগুলোর নীরবতা অর্থবহ, কিন্তু বিরোধী দল বলে যারা দাবি করে, বিশেষ করে বাম দলগুলো তারাও একটি বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব পালন করেছে।
গণপরিবহনে অরাজকতা নতুন নয়, দীর্ঘদিনের। আশির দশক থেকে অবস্থার অবনতি ঘটেছে। কোনো সরকার এদিকে দৃষ্টি দেয়নি, অতি নিষ্ঠার সঙ্গে সরকারি দলসহ বিভিন্ন বড় দল চাঁদা তুলেছে। গত ৩০ বছরে ঢাকায় মানুষ বেড়েছে দ্বিগুণ, গণপরিবহনের সংখ্যা কমেছে অর্ধেক। অদ্ভুত বৈপরীত্য। পরিবহন মালিকদের সূত্রে জানলাম, ১৫ বছর আগে ঢাকায় বাস ছিল সাত হাজার, বর্তমানে কমে হয়েছে চার হাজার। চট্টগ্রামে বাস চলছে দেড় হাজার মাত্র। অতি কষ্টে যাত্রীরা দাঁড়িয়ে বা দরজার হাতলে বা বাম্পারে ঝুলে যাতায়াত করে। ভাড়া নেওয়া হয় খেয়ালখুশিমতো।
বর্তমানে ঢাকায় গণপরিবহনে যাতায়াত করে প্রায় এক কোটি মানুষ। তাদের চার ভাগের এক ভাগ নারী এবং আর এক ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। কর্মজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। গণপরিবহনে তাদের যাতায়াতে যে লাঞ্ছনা ও দুঃখ সইতে হয়, তা সীমাহীন। তাদের বসার নির্দিষ্ট আসন নেই। বঙ্গীয় পুরুষের সৌজন্যবোধ নেই। নারী দেখলে উঠে দাঁড়ায় না। জানালা দিয়ে উদাস দৃষ্টিতে আকাশে তাকিয়ে থাকে না দেখার ভান করে। কেউ একটু বসার জায়গা চাইলে খেঁকিয়ে জবাব দেওয়া হয়। বাসের কর্মচারীদের থেকেও তারা সহানুভূতি পায় না। ভাড়া নিয়ে প্রশ্ন তুললে অশ্লীল ভাষায় কথা শোনানো হয়। কিশোরী-যুবতীদের গায়ে হাত পর্যন্ত দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে ও লজ্জায় তারা তা হজম করে।
বাস-মিনিবাসের ড্রাইভার-হেলপারদের জীবনও খুবই দুঃখের। হেলপারদের অনেকেরই বয়স খুব কম। বলতে গেলে কিশোর। তারা অবহেলিত-বঞ্চিত। বেতন সামান্য। সারা দিন পরিশ্রম করতে হয়। বিশ্রামের অভাব। থাকার জায়গা নেই। যাত্রীদের অনেকেই তিরিক্ষি মেজাজের। ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষির সময় মেজাজ ঠিক রাখা কঠিন। ফলে যাত্রীদের সঙ্গে ‘হেলপার’দের শুধু কথা-কাটাকাটি নয়, মারামারি পর্যন্ত ঘটে।
পরিবহন মালিকদেরও সমস্যা থাকতে পারে। সেসব দেখাও সরকারের দায়িত্ব। যেকোনো সমস্যাই আলোচনার মাধ্যমে যুক্তিগ্রাহ্যভাবে সমাধান সম্ভব। তবে কোনো অজুহাতেই সরকারি নীতিমালা অমান্য করার অধিকার কোনো পক্ষেরই নেই। গণপরিবহন ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত রেখে কাঙ্ক্ষিত আর্থসামাজিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
ঢাকা বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর শুধু নয়, বৃহত্তম নগর এবং প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। রাজধানী নগরের পরিবহনব্যবস্থা কী রকম হওয়া উচিত, সে সম্পর্কে আমাদের কোনো সরকারেরই কিছুমাত্র ধারণা ছিল বলে মনে হয় না। থাকলে অবস্থাটা এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করত না। স্বাধীনতার আগে বিআরটিসির বাস ছিল সবচেয়ে সুন্দর ও আরামদায়ক গণপরিবহন। নষ্ট রাজনীতি ও দুর্নীতির ধাক্কায় সেটা ধ্বংস করা হয়েছে। পরিবহন ক্ষেত্রের এই নৈরাজ্যের মূলেও দুর্নীতি। খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় যেসব বাস-মিনিবাস-লেগুনা-টেম্পো রাস্তায় দেখা যায়, বিদেশি পর্যটকদের চোখে বাংলাদেশকে হেয় করার জন্য সেগুলোই যথেষ্ট।
এই নৈরাজ্য ও সমস্যার সমাধান কোথায়? গণপরিবহন যে একটি জটিল সমস্যা, স্বীকার করে নিয়ে তা সমাধানে গোত্র ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। থাকতে হবে যথাযথ অঙ্গীকার। সরকার একা পারবে না। মালিক-শ্রমিকসহ সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে নাগরিক সমাজকেও সম্পৃক্ত করা বাঞ্ছনীয়। বর্তমানে নৈরাজ্য-অনাচার বন্ধ করতে সরকার যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণ তা সমর্থন দেবে। অকারণে কঠোর হওয়ার দরকার নেই, আইনের যথাযথ প্রয়োগই সমস্যার সমাধান করতে পারে। সেই সঙ্গে দরকার সরকারি নীতিনির্ধারক এবং কর্তৃপক্ষের জনগণের বেদনা উপলব্ধি করা।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷
Subscribe to:
Posts (Atom)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
বিনোদন
শেষের পাতা
ক্রিকেট খেলা
মধ্যপ্রাচ্য
যুক্তরাষ্ট্র
দেশে দেশে
নির্বাচন
স্পেশাল প্রতিবেদন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আমার দেশ
আইন আদালত ও বিচার
ইসরায়েল
ফুটবল খেলা
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
ফিলিস্তিন
Lead
রাজধানী
আন্দোলন
অপরাধ
এক্সক্লুসিভ
ইরান
আইন ও মানবাধিকার
নারী
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
সাহিত্য
কালবেলা
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
চট্টগ্রাম
বিশাল বাংলা
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
হত্যা
নতুন বার্তা
ধর্ম
মুসলিম
যুক্তরাজ্য
স্মরণ
গল্প
রাশিয়া
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
জাতিসংঘ
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সাক্ষাৎকার
মুক্তিযুদ্ধ
ইউরোপ
সৌদি আরব
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
খেলা ধুলা
ইতিহাস
ছাত্রলীগ
প্রতিবেদন
জামায়াতে ইসলামী
সোহরাব হাসান
অমানবিক
পশ্চিমবঙ্গ
আলোকিত চট্টগ্রাম
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
জাতীয় সংসদ
নারী ধর্ষণ
আনন্দ
বিজ্ঞান ও গবেষণা
আফ্রিকা
খেলাধুলা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
মাদক
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
সংখ্যালঘু
যৌন আবেদনময়ী
তুরস্ক
প্রবাস
ছুটির দিনে
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
সৈয়দ আবুল মকসুদ
নকশা
আফগানিস্তান
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
গোল্লাছুট
বইপত্র
অন্য আলো
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ছবি
প্রতারণা
ইউক্রেন
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
তরুণ প্রজন্ম
ব্যবসা বাণিজ্য
দুর্ঘটনা
অপহরণ
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
স্বাস্থ্য
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
Exclusive
ফূটবল খেলা
রোহিঙ্গা
হিন্দু
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
ইয়েমেন
রুদ্র মিজান
খুলনা
মানবকণ্ঠ
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
নেপাল
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
জ্যোতির্বিজ্ঞান
সড়ক দুর্ঘটনা
আলী রীয়াজ
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
রংপুর
শিল্প ও সাহিত্য
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
কক্সবাজার
এ এম এম শওকত আলী
ঢাকা
বন্ধুসভা
মিয়ানমার
সংবিধান ও রাষ্ট্র
বগুড়া
ফ্রান্স
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
গবেষণা
মিসর
জীবনযাপন
বাংলাদেশ
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
শোক
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
সংস্কৃতি
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শুভ্র দেব
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
কিশোরগঞ্জ
লেবানন
আবদুল মান্নান
কুমিল্লা
জাপান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
শিল্প
মুক্তমত
মাহমুদুর রহমান
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
পার্বত্য চট্টগ্রাম
ময়মনসিংহ
সংবাদ২৪.নেট
সীমান্ত সন্ত্রাস
ইরাক
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
যশোর
HotTopic
চিকিৎসা
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
তথ্য প্রযুক্তি
কলকাতা
মেহেদী হাসান
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
বরগুনা
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
আনু মুহাম্মদ
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
কুলদীপ নায়ার
ব্রাজিল
সারাবেলা
অস্ট্রেলিয়া
মারুফ কিবরিয়া
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মসজিদ
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
বরিশাল
আতাউর রহমান
আসাম
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
রোকনুজ্জামান পিয়াস
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
ফেনী
রণজিৎ বিশ্বাস
অরুণ কর্মকার
উত্তর কোরিয়া
মোস্তফা হোসেইন
একরামুল হক
জলবায়ু ও পরিবেশ
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
কালি ও কলম
তুহিন ওয়াদুদ
ইন্দোনেশিয়া
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
অপরাজিতা
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
রাজীব আহমেদ
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
জনস্বাস্থ্য
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
নিবন্ধ
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
কুষ্টিয়া
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
জাতীয় নাগরিক পার্টি
ঝিলিমিলি
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
উচ্চশিক্ষা
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
চারু শিল্প
দিল্লি
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
কাতার
বিজ্ঞান
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
প্রযুক্তি
পার্থ সারথি দাস
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
আদিবাসী
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
কালের খেয়া
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
কানাডা
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
ঝড় ও দুর্যোগ
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
শিশির মোড়ল
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আরব আমিরাত বা দুবাই
আলম শাইন
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
হুমায়ূন আহমেদ
আবুল হাসনাত
আল আমিন
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
লাতিন আমেরিকা
হারুন হাবীব
অমিত বসু
ওমর ফারুক
জার্মানি
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
সুদান
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
কাজী হাফিজ
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
ব্যবসা
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
আবু সালেহ আকন
ইসলাম
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
দক্ষিণ কোরিয়া
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
লিবিয়া
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
আসজাদুল কিবরিয়া
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
উইঘুর মুসলিম
এম শাহজাহান
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
জোহরান মামদানি
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মহাকাশচারী
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
Hot Topic
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
Fantastic
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
ইতালি
নিয়ন আলোয়
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
গ্রিনল্যান্ড
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
ইহুদি
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
কিশোর আলো
ডিডাব্লিউ
নরসিংদী
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জলবায়ু পরিবর্তন
ঝালকাঠি
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
যৌন অপরাধ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
WikiInterview
আকবর হোসেন
ইসলামী ছাত্রশিবির
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
চুয়াডাঙ্গা
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
গণমাধ্যম
ধর্মঘট
স্পেন
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
খ্রিষ্টধর্ম
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
গদ্যকার্টুন
পিরোজপুর
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
জন্মদিন
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
তিউনিসিয়া
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
প্রবাসী শ্রমিক
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
শিশুমৃত্যু
সুশাসনের জন্য নাগরিক
সোমালিয়া
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কলম্বিয়া
কুতুবদিয়া নিউজ
কুয়েত
চট্টগ্রাম বন্দর
চিঠিপত্র
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
দুর্যোগ
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
বেলজিয়াম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মরক্কো
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
হংকং
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
ওমান
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চুক্তি
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বন্য প্রাণী
বিশ্বকাপ ফুটবল
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সমাজ
সামাজ
সুজন সুপান্থ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
জঙ্গি
জর্দান
জাদুঘর
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
নরওয়ে
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শেরপুর
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সিঙ্গাপুর
সুইডেন
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
অ্যান্টার্কটিকা
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পানিসম্পদ
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
রাজবাড়ী
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অমানবিকতা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পুলিশ
পেরু
পোল্যান্ড
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আব্বাস আরাগচি
আলজেরিয়া
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইলহান ওমর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রিস
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাত্রদল
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নীহারুল ইসলাম
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বাহরাইন
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলগেরিয়া
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রকিব হাসান
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট










