Showing posts with label রুদ্র মিজান. Show all posts
Showing posts with label রুদ্র মিজান. Show all posts

Thursday, July 15, 2021

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে গ্যাং রেপ ও হত্যা by রুদ্র মিজান

কিশোরীকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে দুই যুবক। ১২ বছর বয়সী কিশোরী বলেছিল ঘটনাটি সবাইকে জানিয়ে দেবে। তারপরই তাকে হত্যা করে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে বাসার সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা
হয়। পরিকল্পায় সফল হতে চলেছিলো দুই খুনি। কিশোরী সুমাইয়া খাতুন আত্মহত্যা করেছে বলেই জানতো সবাই। এ বিষয়ে গত বছরের ৩১শে অক্টোবর গাজীপুরের কাশিমপুর থানায় অপমৃত্যু মামলাও হয়। কিন্তু আসল ঘটনা বের হয়ে আসে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। এতে উল্লেখ করা হয় শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে তাকে।
পাওয়া গেছে ধর্ষণের আলামতও। চলতি বছরের ৩রা জুলাই একই ঘটনায় এবার হত্যা মামলা হয় কাশিমপুর থানায়। দীর্ঘ তদন্তের পর কাশিমপুরের বারেন্ডা এলাকার বহুল আলোচিত কিশোরী সুমাইয়া খাতুন হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার করা হয়েছে এ ঘটনায় জড়িত দুই যুবককে। গ্রেপ্তারের পর গত ১২ ও ১৩ই জুলাই আদালতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে দুই আসামি।
কাশিমপুরের বারেন্ডা এলাকায় সুমাইয়াদের বাসার পাশেই ভাড়া থাকতো রনি মিয়া। রনির বাসায় টাকার বিনিময়ে খাওয়া-দাওয়া করতো মিলন, হাসান ও সাঈদ। তারা প্রত্যেকই শ্রমিক এবং ওই এলাকায় পাশাপাশি থাকতো। রনির বন্ধু মিলনের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল সুমাইয়ার। সুমাইয়ার প্রতি আকৃষ্ট ছিল রনি ও সাঈদ। নানাভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় রনি। একইভাবে ব্যর্থ হয় সাঈদও। এরমধ্যে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। বাধ্য হয়েই ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নেয়ার চিন্তা করেন সুমাইয়ার মা। গত বছরের নভেম্বরে বাসার মালিককে জানিয়ে দেয়া হয় এই মাস পরেই অন্যত্র চলে যাবেন তারা। সুমাইয়া চলে যাবে, তা জানার পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে রনি ও সাঈদ। দুইজন এক হয়ে শলাপরামর্শ করে। পরিকল্পনা করে তাকে রেপ করবে। পরিকল্পনা অনুসারেই ৩১শে অক্টোবর সকালে যখন সুমাইয়ার মাসহ অন্যরা কর্মস্থলে তখনই ঘটে ঘটনা। সুমাইয়ার সঙ্গে বসে কথা বলছিলো রনি ও সাঈদ। এরমধ্যেই হঠাৎ করে সুমাইয়াকে জাপটে ধরে। তার জামা খোলার চেষ্টা করে। সুমাইয়া বাধা দেয়। চিৎকার করতে চেষ্টা করে। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে বিছানায় শুইয়ে মুখে বালিশ চেপে ধরে রনি। বাধা হয় তার দুই হাত, পা ধরে রাখে সাঈদ। রনি ধর্ষণ করে সুমাইয়াকে। মোবাইল ফোনে সেই ভিডিওচিত্র ধারণ করে সাঈদ। রনির পর সুমাইয়াকে ধর্ষণ করে সাঈদ। সুমাইয়া তখন বলেছিলো, ধর্ষণের ঘটনা সবাইকে জানিয়ে দেবে। মাকে নিয়ে থানায় যাবে। তারপরই আরও হিংস্র হয়ে ওঠে রনি ও সাঈদ। পরিকিল্পতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে সুমাইয়াকে। তারপর নাটক সাজায় আত্মহত্যার। ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় তার লাশ।
সুমাইয়ার বাবা-মা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না তার মেয়ে কেন আত্মহত্যা করবে। বারবার এ বিষয়ে অভিযোগ করলেও আমলে নেয়নি কেউ। পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ জানা ও ধর্ষণের আলামত পাওয়া যাওয়ার পরই হত্যা মামলা রেকর্ড করে পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১২ই জুলাই ভোরে টঙ্গী পশ্চিম থানার গাজীপুরা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সাঈদ ইসলামকে। সাঈদ ইসলাম (১৯) নিলফামারী জেলার ডোমার থানার চিলাহাটী মাস্টারপাড়ার মৃত নবীর উদ্দিনের পুত্র। সাঈদকে গ্রেপ্তারের পরদিন ১৩ই জুলাই রাত দেড়টায় গাইবান্ধা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় রনিকে। রনি মিয়া (২১) লালমনিরহাটের তিস্তা চৌরাটারী গ্রামের শফিকুল ইসলামের পুত্র। নিহত সুমাইয়া যশোরের বাঘাপাড়া থানা এলাকার বাউলিয়া গ্রামের সোহেল রানা ও রুনা বেগমের সন্তান।
পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান বলেন, শুরু থেকেই এই ঘটনায় পিবিআই গাজীপুর জেলায় ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরবর্তীতে থানায় হত্যা মামলা রুজু হওয়ার পর স্ব-উদ্যোগে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আসামিরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানান তিনি।

Wednesday, October 30, 2019

শিল্পী পরিচয়ের আড়ালে ইয়াবার ডিলার সুবর্ণা by রুদ্র মিজান

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই গর্জিয়াস মেকআপে সাজেন তিনি। কখনও শাড়ি, কখনও ওয়েস্টার্ন পোশাকে হাজির হন আড্ডায়। ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক লাইভে নিয়মিত থাকেন। বিভিন্ন মঞ্চেও দেখা যায় তাকে। সূর্য ডুবার পর নিজের বাসায় বসে গানের আসর। সেজেগুজে সেই আসরে অংশ নেন। গান করেন। পরিচিতজনরা শিল্পী হিসেবেই জানেন তাকে।
তিনি সুবর্ণা রূপা। রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকেন। স্বামী, সন্তান কেউ সঙ্গে না থাকলেও বিভিন্ন পরিচয়ে থাকেন কয়েক তরুণী ও এক তরুণ। শিল্পী পরিচয়ের আড়ালে তার ছিলো ভিন্ন ব্যবসা। নারী ও মাদকের আখড়া ছিলো তার ফ্ল্যাট। এমনটিই জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা।
খিলগাঁও তিলপাপাড়া এলাকার ১৯ নম্বর সড়কের ছয় তলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন সুবর্ণা রুপা। ওই বাসা থেকেই রুপা ও তার সহযোগী রুবেলকে ইয়াবাসহ আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন তারা। গ্রেপ্তারের পর বারবার নিজেকে বড় মাপের শিল্পী এবং কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক এক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতার পুত্রবধূ হিসেবে পরিচয় দেন সুবর্ণা। তাকে ছাড়িয়ে নিতে তদবির করেন পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী অনেকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যার পরপরই সুবর্ণার বাসাতেই আয়োজন করা হতো পার্টির। এতে অংশ নিতেন সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, প্রবাসীসহ প্রভাবশালী অনেকে। বিলাসবহুল গাড়িগুলো পার্কিং করা থাকতো নিচে। গভীর রাত পর্যন্ত চলতো পার্টি। সেখানে গান করতেন সুবর্ণা রুপাসহ অনেকে। এই পার্টিতেই নিরাপদে ইয়াবা সেবন করতেন আগতরা। সেইসঙ্গে মনোরঞ্জনের জন্য থাকতো একঝাঁক সুন্দরী। গানে, মাদকে বুঁদ হয়ে স্বল্পবসনা তরুণীদের সঙ্গে নাচ করতেন পার্টিতে অংশগ্রহণকারীরা।
ওই বাড়ির মালিক বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা আলী আহমদ। অভিযানিক টিমকে তিনি জানিয়েছেন, সন্ধ্যার পর সুবর্ণার ফ্ল্যাটে অনেকেই যেতেন। এসব কারণে চলতি মাসে তাকে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেয়া হয়েছে। শুরুতে ওই বাড়ির ছয় তলার ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি। কয়েক মাস আগে ভাড়া নিয়েছেন তিন তলার ফ্ল্যাট।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, নিয়মিত চার-পাঁচ জন তরুণী থাকতো সুবর্ণা রুপার বাসায়। অভিযানকালে বাসায় চার তরুণীকে পাওয়া গেছে। ওই তরুণীরাও মাদকাসক্ত। আটকের পর উত্তরার একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে তাদের।
তরুণীদের সম্পর্কে সুর্বণা রুপা তদন্ত সংশ্লিষ্টদের শুরুতে জানিয়েছেন, একজন গৃহপরিচারিকা, দ্বিতীয়জন আত্মীয়, বাকি দু’জন তার ভক্ত। তাদের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। থাকেন জর্ডানে। ফেসবুকে পরিচয়। এই সূত্রধরে সোমবার বেড়াতে এসেছিলেন তার বাসায়। এ বিষয়ে তিনি একেক সময় একেক তথ্য দিচ্ছেন।
সুবর্ণার বাসায় থাকেন রুবেল। রুবেলকে প্রথমে ভাই পরিচয় দিলেও এক পর্যায়ে জানিয়েছেন, পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালীর সেনবাগের ছাতাপাইয়া এলাকার সম্পর্কে রুবেল তার ভাই হয়। ইয়াবা ও নারীদের খদ্দের সংগ্রহের কাজ করতেন এই রুবেল। প্রায় তিন লাখ টাকা মূল্যের ফিজার বাইক চালান তিনি। ইয়াবা বিক্রেতা ও অনৈতিক ব্যবসার দালাল পরিচয়ের আড়ালে নিজেকে পাঠাও চালক হিসেবে পরিচয় দিতেন রুবেল। মূলত পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের কাছেই নিয়মিত ইয়াবা বিক্রি করা হতো। সুবর্ণা রুপা জানিয়েছেন তার স্বামী রেজাউল করিম রেজা থাকেন সৌদি আরবে। তাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ছেলে ও স্কুল পড়ুয়া এক মেয়ে রয়েছে। দুই সন্তানই থাকেন কক্সবাজারে। কক্সবাজারের বাহারছড়ায় সুবর্ণা রুপার শ্বশুরবাড়ি। প্রতিবেশীরা জানান, ছেলে-মেয়ে খিলগাঁওয়ের ওই বাসায় তেমন আসতো না। মাঝে-মধ্যে এলে তখন ওই বাসায় কোনো পার্টি হতো না। বাইরের লোকজনও আসতো না। ছেলে-মেয়ে থাকাকালীন বোরকা পড়ে চলাফেরা করেন সুবর্ণা।
ইয়াবা বিক্রি করার খবর পেয়ে খিলগাঁওয়ের বাসায় তল্লাশি চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এসময় তার শরীরের বিশেষস্থানে রাখা ১০৭ পিস ইয়াবা জব্দ করে অধিদপ্তরের নারী সদস্যরা। এ ঘটনায় মঙ্গলবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় মামলা করেছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক কামরুল ইসলাম জানান, হোম পার্টিসহ রুবেলের মাধ্যমে ঢাকার বিভিন্নস্থানে ইয়াবা সাপ্লাই দিতেন সুবর্ণা। ইয়াবা সংগ্রহ করা হতো কক্সবাজার থেকে। ধারণা করা হচ্ছে তার সঙ্গে বড় কোনো মাদক সিন্ডিকেটের সম্পর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড চাইবেন বলে জানান তিনি।

Tuesday, October 29, 2019

আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সেই ডন by রুদ্র মিজান

আজিজ মোহাম্মদ ভাই। অপরাধ জগতের পুরনো রাজা। একটা সময় ছিল বাংলাদেশে মাফিয়া ডন বলতে তাকেই বুঝানো হতো। হত্যা, মাদক পাচার, শেয়ার কেলেঙ্কারি-পাপের খতিয়ান দীর্ঘ। ছিলেন পর্দার আড়ালে। অনেকদিন ধরেই দেশছাড়া। থাইল্যান্ডে গড়ে তুলেছেন বসত। সেই আজিজ মোহাম্মদ ভাই নতুন করে আলোচনায় এসেছেন।
তার গুলশানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রীতিমতো তাজ্জব বনে গেছেন মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। সেখানে খোঁজ মিলেছে বিপুল পরিমাণ মাদকের। ছিল আধুনিক সব ক্যাসিনো সামগ্রী। এ বাড়িতে অবশ্য অনেকদিন পা পড়ে না আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। থাকেন তার স্বজনরা। মাঝে মাঝে আসতেন আজিজের স্ত্রী।
অপরাধ জগতে আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে নিয়ে নানা কাহিনী। ডিসকো, মদ, নারী তার খুব পছন্দের। নাচ আর গানেও পারদর্শী তিনি। ঢাকায় থাকার সময় নাচ-গান জানা বান্ধবীদের নিয়ে প্রায়ই পার্টিতে যেতেন। তার গান শুনে মুগ্ধ হতেন অনেকে। ২৭শে জুলাই ১৯৯৮- প্রকাশিত এক রিপোর্টে দেখা যায়, এমনি এক পার্টিতে তার বান্ধবী বিয়ার চেয়ে না পাওয়ায় ঘটে যায় তুলকালাম কাণ্ড। চলচ্চিত্র প্রযোজনায় এসে ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ জড়িয়ে পড়েন নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে। জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে তৈরি হয় নানা স্ক্যান্ডাল। এমনকি ভারতীয় কোনো কোনো অভিনেত্রীও তার ডাকে ছুটে আসতেন ঢাকায়। এরশাদের শাসনামলে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। প্রিন্স আগা খানের সুপারিশে সেসময় তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন এমন আলোচনা আছে। ১৯৯৬ সালে কিংবদন্তির নায়ক সালমান শাহ’র রহস্যময় মৃত্যুর পর তুমুল আলোচনায় আসেন আজিজ মোহাম্মদ ভাই। সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ ওঠে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বিরুদ্ধে। সালমান শাহর মৃত্যুর দুই বছর পর ১৯৯৯ সালে ঢাকা ক্লাবে খুন হন আরেক চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী। এ হত্যাকাণ্ডেও আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও তার পরিবারের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। ১৯৯৬ সালে প্রতারণার মাধ্যমে শেয়ারবাজার  থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এই মামলায় গত বছরের ২৯শে আগস্ট তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। তার ভাতিজা আমিন হুদাকে ২০০৭ সালে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
আজিজ মোহাম্মদ ভাই অপরাধ জগতের এক রহস্যময় চরিত্র। ভাই তার পারিবারিক উপাধি। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় ভারতের কানপুর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন আজিজের বাবা মোহাম্মদ ভাই। পরের বছর থেকে ব্যবসায় নামেন। ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন স্টিল মিল। আজিজের জন্ম আরমানিটোলায়। অল্প বয়সেই পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি নিজেও আলাদা ব্যবসা শুরু করেন। তাদের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ওয়ান ইলেভেনের একদিন আগেই আজিজ মোহাম্মদ ভাই দেশ ত্যাগ করেন। দুই পুত্র ও তিন কন্যার জনক আজিজ দীর্ঘদিন ধরেই স্ত্রী নওরিনকে নিয়ে থাইল্যান্ডে বসবাস করছেন।
আজিজের গুলশানের বাড়িতে যা হতো
ঢাকায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের হয়ে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য তদারকি করেন তাদের মধ্যে একজন ওমর মোহাম্মদ ভাই। তিনি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ভাতিজা। নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈধ-অবৈধ বাণিজ্য পরিচালনা করছিলেন দীর্ঘদিন থেকে। শুদ্ধি অভিযানে ক্যাসিনো হোতাদের অনেকে গ্রেপ্তার, অনেকে আত্মগোপনে গেলেও ওমর মোহাম্মদ ভাই ছিলেন বহাল তবিয়তে। গুলশান-২ এলাকায় নিজেদের বাড়িতেই মিনি বার ও ক্যাসিনো পরিচালনা করছিলেন দীর্ঘদিন থেকে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে এই বাড়িটি যেন পরিণত হতো ভিন্ন এক জগতে।
রোববার বিকালে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের দুটি বাড়িতে অভিযানের পর গতকাল গুলশান থানায় এ বিষয়ে দুটি মামলা দায়ের করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের টিমের উপস্থিতি টের পেয়ে বাসা থেকে দ্রুত পালিয়ে যান ওমর মোহাম্মদ ভাই। তবে আটক করা হয় তার সহযোগী নবীন মণ্ডল ও মোহাম্মদ পারভেজকে। তারা দুজনেই গুলশানের ওই দুটি বাড়িতে পরিচালিত মাদক, বার ও ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের দেশি-বিদেশি অতিথি, বন্ধু, ঘনিষ্ঠদের জন্যই এই বারটি গড়ে তোলা হয়েছিল। এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। পরবর্তীতে বারটি বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন ওমর মোহাম্মদ। বিদেশ থেকে মদ আমদানি করে মজুত রাখা হতো দুটি বাড়ির দুই ফ্ল্যাটে। পার্টি হতো ৫৭ নম্বর সড়কের ১১/এ নম্বর বাড়ির ছাদে। ওই ছাদেই গড়ে তোলা হয়েছে সুসজ্জিত বার।
সূত্র মতে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেই বাড়ির পার্কিংয়ে একের পর এক জড়ো হতো কালো গ্লাসঘেরা বিলাসবহুল গাড়ি। গাড়ির দরজা টেনে বের হতেন সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। সঙ্গে থাকতেন সুদর্শনা নারী। বাড়ির ষষ্ঠ তলার ছাদের সুসজ্জিত বিশাল কক্ষে তখন ইংরেজি, হিন্দি গানের মিউজিক। পার্টিতে অংশ নিতেন বিভিন্ন বয়সের নারী, পুরুষ। ডেকে আনা হতো শিল্পীদেরও। লাইভ কনসার্ট হতো মাঝে-মধ্যে। এমনকি চলচ্চিত্রের নায়িকা, নৃত্যশিল্পী ও মডেলরা অংশ নিতেন পার্টিতে। মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বুঁদ হয়ে উপভোগ করতেন স্বল্প বসনা তরুণীদের নাচ, গান। পার্টিতে অংশ গ্রহণকারীদের পছন্দ অনুসারে আমদানি করা হতো বিলাতি মদ। প্রয়োজন অনুসারে মজুত থেকেই বারে মদ আনা হতো।
মদের সঙ্গে টাকা উড়তো ৬তলা এই ভবনের ছাদে। রাত ভর চলতো ক্যাসিনো। এই ক্যাসিনোতে ঢাকার প্রথম শ্রেণির কিছু ব্যবসায়ী এবং বিদেশিরাও অংশ নিতেন। প্রতিরাতেই বিপুল টাকার খেলা হতো এখানে। খেলা হতো ডলারে। বনানী এলাকার প্রভাবশালী এক বাসিন্দা সঙ্গী-সাথী নিয়ে এই আয়োজনে অংশ নিতেন। তবে তিনি ক্যাসিনো খেলতেন না। মূলত মদ ও নারীর আড্ডায় অংশ নিতেন তিনি। শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর ক্যাসিনো বন্ধ রাখা হয়েছিল বলে গ্রেপ্তাররা জানিয়েছে।
ওমর মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হতো আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। রাশিয়া, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে প্রায়ই আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের রেফারেন্সে বিদেশিরা ওই পার্টিতে যেতেন। আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাসায় অবৈধভাবে মদ মজুত রেখে বিক্রির বিষয়ে তথ্য পেয়ে রেকি করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি টিম। পরে রোববার বিকালে গুলশানের ৫৭ নম্বর সড়কে একই দেয়াল ঘেরা দুটি বাসায় একসঙ্গে পৃথক দুটি টিমের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়। ১১/এ বাসায় থাকেন আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ে ভাই মরহুম রাজা মোহাম্মদ ভাইয়ের পরিবার। তার পুত্র ওমর মোহাম্মদ ভাই ওই বাসার তৃতীয় তলায় মদ মজুত রাখতেন এবং ছাদে পরিচালনা করতেন বার। পাশাপাশি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ১১/বি নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় বিপুল মদ পাওয়া যায়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম জানান, এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গুলশান থানায় দুটি মামলা করেছে। মামলা দুটিতে ওমর মোহাম্মদ ভাইসহ তিন জনকে আসামি করা হয়েছে। বাদী হয়েছেন অধিদপ্তরের পরিদর্শক এসএম শামসুল কবির ও উপ-পরিদর্শক আতাউর রহমান। এ ছাড়াও অভিযানে ক্যাসিনো সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় একটি জিডি করা হয়েছে। এই অবৈধ কার্যক্রমে আর কারা জড়িত ছিলেন এ বিষয়ে তথ্য উদ্ধারের জন্য গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ জন্য তাদের রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।

Wednesday, October 23, 2019

যেভাবে মাদকে জড়ায় শিক্ষার্থীরা by রুদ্র মিজান

এমবিবিএস সম্পন্ন করেছেন। কিন্তু প্রত্যাশা অনুসারে চাকরি পাচ্ছেন না। উচ্চতর ডিগ্রিও নিতে পারছেন না। অনেক টাকার দরকার। এরকম হতাশায় আচ্ছন্ন ডাক্তার রাকিবুল হাসান রাকিব। ইতিমধ্যে মা-বাবার বিপুল টাকা ব্যয় হয়েছে তাকে লেখাপড়া করাতে। হতাশাগ্রস্ত রাকিব দু’চোখে অন্ধকার দেখছিলেন। ঠিক তখনই ইয়াবা সেবন শুরু করেন রাকিব। একসময় তা নেশা হয়ে দাঁড়ায়। ইয়াবা ছাড়া চলেই না। কিন্তু চাকরি নেই। ইয়াবা কেনার টাকা পাবেন কোথায়।
একসময়ে ইয়াবা কেনার টাকার জন্য নিজেই ইয়াবা আমদানি ও বিক্রি শুরু করেন। ইয়াবাসহ ডা. রাকিবকে গ্রেপ্তারের পর জানা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের প্রায় প্রতিটি মেডিকেলে কলেজেই প্রবেশ করছে মাদক। আসক্ত হচ্ছেন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। হতাশা, কৌতূহল, সঙ্গদোষ, ভুল ধারণা থেকেই তারা মাদকাসক্ত হচ্ছেন। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মেডিকেলে কিছু ডাক্তার রয়েছেন যারা নিজ কক্ষে বসেই ইয়াবা সেবন করেন। বিশেষ করে রাতে ডিউটিকালীন এমনটি ঘটে। তাদের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেন হাসপাতালের কর্মচারী, আনসার ও মাদক বিক্রেতারা।
রাকিবুল হাসান একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। এরমধ্যেই সহপাঠীকে বিয়ে করেন তিনি। স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন মধ্য বাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায়। মাদকাসক্ত হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি জানান, মেডিকেলে লেখাপড়া করে ডাক্তার হয়ে আয় করা খুব সহজ না বলেই মনে করেন তিনি। এমবিবিএস পাস করলেই একজন ছাত্র চিকিৎসা প্রদানের লাইসেন্স পায় না। তাকে এক বছর ইন্টার্ণশিপ করতে হয়। ইন্টার্ণশিপ শেষ মানে ডাক্তার জীবনের শুরু। তখন স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জনের প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। এজন্য আরও বিপুল টাকার প্রয়োজন হয়। এমবিবিএস পাস করার পর নামমাত্র বেতনে কিছুদিন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন রাকিব। কিন্তু এই টাকা দিয়ে সংসার চালানো দুষ্কর। ভালো চাকরিও পাচ্ছিলেন না। রাকিব মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করতেন একটি নিরাময় কেন্দ্রে। কিন্তু তিনি নিজেই একসময় আসক্ত হয়ে যান। শুরুতে নিজের হতাশা-কষ্ট ভুলে থাকার জন্য ইয়াবা সেবন শুরু করেন। ভালোই লাগছিলো। প্রায়ই ওই নিরাময় কেন্দ্রের নিজের কক্ষের দরজা বন্ধ এক বন্ধুকে নিয়ে ইয়াবা সেবন করতেন। এভাবেই একসময় নেশা হয়ে যায়। ইয়াবা ছাড়া চলে না। বুঁদ হয়ে থাকেন নেশায়।
নেশাগ্রস্ত ডাক্তারকে প্রতিষ্ঠানে রাখতে চান না কর্তৃপক্ষ। চাকরি চলে যায়। চাকরি নেই, টাকাও নেই। কিন্তু ইয়াবা ছাড়া তার চলে না। ইয়াবা সেবনের জন্য অন্তত তার টাকা চাই। গত বছরের ঘটনা। শুরু করেন ইয়াবা বিক্রি। চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তার কাছে ইয়াবা দিয়ে যায়। তিনি বিক্রি করেন। গড়ে তোলেন একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট গুলশান, বাড্ডা, বনানী ও বারিধারা এলাকায় ইয়াবা বিক্রি করতো। সেইসঙ্গে রাকিবের মাধ্যমে ইয়াবা বিক্রি করা হতো বিভিন্ন মেডিকেলের ডাক্তারদের কাছে। মধ্য বাড্ডার নিজ বাসায় ইয়াবা রাখা হতো। গত বছরের শেষের দিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ খোরশিদ আলমের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয় ডাক্তার রাকিবসহ এই সিন্ডিকেটের চার জনকে। মোহাম্মদ খোরশিদ আলম জানান, চাকরি না পেয়ে হতাশা থেকেই ইয়াবা সেবন ও বিক্রি শুরু করেছিলেন এই ডাক্তার। হতাশা থেকেই মেডিকেলের শিক্ষার্থী বা ডাক্তাররা এই মরণ নেশায় আসক্ত হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
প্রায়ই মাদকসহ ডাক্তাররা গ্রেপ্তার হচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে। গত বছরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসক মোস্তাফা কামালকে দুই সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এসময় তাদের কাছ থেকে ১২শ’ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। টেকনাফ থেকে ইয়াবা নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনার বাগুর বাস স্টেশন এলাকায় চান্দিনা থানা পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। কয়েকদিন আগেও চট্টগ্রামে একজন ডাক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের একটি নিরাময় কেন্দ্রে কথা হয় মাদকাসক্ত মেডিকেলের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তেজগাঁও এলাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রী তিনি। তার মাদকাসক্তের কারণ সম্পর্কে জানান, প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে শিসাবারে যেতেন। বন্ধুদের মধ্যে কয়েক জন ইয়াবা সেবন করতো। তিনি শিসা টানলেও ইয়াবার প্রতি কোনো আসক্তি ছিলো না। লেখাপড়ার প্রচন্ড চাপ ছিলো। বন্ধুরা ইয়াবা সেবন করে রাত জেগে লেখাপড়া করতো। রাত জেগে পড়ার জন্যই একপর্যায়ে তিনিও আগ্রহী হন। ইয়াবা সেবন শুরু করেন। সারা রাত জেগে লেখাপড়া করতে পারেন। লেখাপড়া হচ্ছিলো বেশ। কিন্তু মাঝে-মধ্যে ইয়াবা সেবন না করলেই সমস্যা। অস্বস্তি লাগে। কিছু একটার তীব্র অভাব বোধ করেন। তিনি জানান, অবস্থাটা এমন হয়ে দাঁড়ায় যে ইয়াবা ছাড়া তার চলছিলো না। নিজ রুমে বসেই ইয়াবা সেবন করতেন তিনি। বিষয়টি জানাজানির পর মা-বাবার উদ্যোগে তাকে ভর্তি করা হয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে।
মেডিকেলে মাদকের বিস্তার নিয়ে তদন্ত করেছে কয়েক গোয়েন্দা সংস্থা। সূত্রমতে, কর্মচারী, শিক্ষার্থী, ইণ্টার্ণি ডাক্তারদের মাধ্যমে মেডিকেলে মাদক বিস্তার লাভ করছে। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে এই অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি  গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল-২’র ছাদ, নার্সিং হোস্টেল এলাকায় কর্মচারীরা ও ডিউটি কক্ষে ইণ্টার্ণি ডাক্তাররা রাতে ইয়াবা সেবন করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই মাদক বিক্রেতা বা মাদক সরবরাহকারীরা গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু মেডিকেলের ডাক্তার, কর্মকর্তারা রয়ে যান আড়ালে। ইতিমধ্যে একাধিকবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, স্বপন, আলম, বিল্লাল, শামীম, সোহেল, আয়েশা, রনি, লিটন, সুবির বিশ্বাস ও শামীমসহ আরও অনেককে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, হতাশা, সঙ্গদোষ, কৌতূহল ও ভুল ধারণা থেকেই ডাক্তার বা মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা মাদকাসক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন চরম হতাশা বিরাজ করছে। লেখাপড়া ও চাকরির ক্ষেত্রে তাদের তীব্র প্রতিযোগীতা করতে হচ্ছে। প্রতিবছর হাজার-হাজার ডাক্তার পাস করে বের হলেও বেশিরভাগই চাকরি পাচ্ছেন না। এছাড়াও ইয়াবা সেবনে ঘুম চলে যায়, লেখাপড়া বেশি করা যায়- এরকম ভ্রান্ত ধারণা থেকেই অনেকেই আসক্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে, বেকারদের মধ্যে চিকিৎসক-প্রকৌশলীদের হার ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। এরমধ্যে নারী চিকিৎসক-প্রকৌশলীদের বেকারত্বের হার প্রায় ৩১ শতাংশ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালেই দেশে চাহিদার তুলনায় ১১ হাজার ৫২৯ জন ডাক্তার অতিরিক্ত ছিল। ওই বছর দেশে ১৬ কোটি মানুষের বিপরীতে ডাক্তারের চাহিদা ছিল ৬৩ হাজার ৩৯৫ জন। জোগান ছিল ৭৪ হাজার ৯২৪। ২০২১ সালে ৬৭ হাজার ২৬৫ জন ডাক্তারের চাহিদার বিপরীতে জোগান দাঁড়াবে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৬৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর ১০ হাজারের বেশি ডাক্তার স্বাস্থ্যখাতে যুক্ত হচ্ছেন।  সেই তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। অবসরে যাচ্ছেন মাত্র দুই থেকে আড়াইশ’ ডাক্তার। যা গড়ে ৩ শতাংশ। বিএমডিসি সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত চিকিৎসকের সংখ্যা ৯৩ হাজার ৭৬৩ জন। তাদের মধ্যে এমবিবিএস ৮৫ হাজার ৬৩৩ জন এবং বিডিএস (ডেন্টাল) ৮ হাজার ১৩০ জন। সরকারি চাকরিত আছেন প্রায় ৫০ হাজার ডাক্তার।

Saturday, October 19, 2019

আন্ডার ওয়ার্ল্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য সম্রাটের মুখে by রুদ্র মিজান

আন্ডার ওয়ার্ল্ড। এক বিস্ময়কর নাম। আধিপত্য নিয়ে যেখানে প্রায়ই ঘটে অস্ত্র ও রক্তের খেলা। সবসময়ই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ড। এমনকি বিদেশে বসেও আন্ডার ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করে সন্ত্রাসীরা। আধিপত্য বিস্তার, অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে প্রায়ই খুন-খারাবির ঘটনা ঘটে। ২০০৯ সালের পর থেকেই আন্ডার ওয়ার্ল্ডে নজর পড়ে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের। যুবলীগের ওয়ার্ড পর্যায়ের কর্মী থেকে মহানগরের নেতা হওয়া সম্রাটের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের।
নিজেও গড়ে তোলেন সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হওয়ার পর পুরো ঢাকার অপরাধ জগতে আধিপত্য বিস্তার করেন সম্রাট। তার আধিপত্য মেনে নিতে যারাই অস্বীকার করেছেন তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে, সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী দিয়ে সহজেই আন্ডার ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রনে নেন তিনি। রিমান্ডে থাকা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে এসব নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদে আন্ডারওয়ার্ল্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন সম্রাট।
ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব। র‌্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের একটি টিম তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। সূত্রে জানা গেছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এড়িয়ে যাচ্ছেন সম্রাট। মাঝে মাঝে ভুলে যাওয়ার ভান করছেন। তার উপার্জিত অর্থ, অস্ত্র ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে গতকাল জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তার দেয়া তথ্য নোট করা হচ্ছে। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম মানবজমিনকে বলেন, আন্ডারওয়ার্ল্ড, অস্ত্র, মাদক, অবৈধ অর্থ, জবর-দখলসহ সকল অপকর্ম নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সম্রাট ও আরমানের দেয়া তথ্য যাচাই বাছাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
সূত্রমতে, একসময় ঢাকার আন্ডার ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রন করতেন শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। ২০০৩ সালে মালিবাগের একটি হোটেলে ডিবি পুলিশের দুই সদস্যকে হত্যা করে জিসান বাহিনী। তারপর দেশের বাইরে আত্মগোপনে যান জিসান। ক্লিন হার্ট অপারেশনসহ বিভিন্ন কারণে ওই সময় থেকেই একে-একে দেশ ছাড়েন ঢাকার অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী। ২০১২ সাল থেকেই আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। ২০১৩ সালে ২৯শে জুলাই রাতে যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কিকে হত্যা করা হয়। গুলশানের ১২৩ নম্বর সড়কের বিপনী বিতান শপার্স ওয়ার্ল্ডের সামনে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে তাকে  হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। যুবলীগের একটি পক্ষ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলো। এই হত্যাকাণ্ডের পর থমথমে ছিলো আন্ডাওয়ার্ল্ড। মিল্কি হত্যার পর আসামিরা ছিলো আত্মগোপনে। এরমধ্যেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরো নিয়ন্ত্রন চলে যায় যুবলীগের দক্ষিণের সভাপতি সম্রাটের নিয়ন্ত্রনে। শুরু থেকেই সম্রাটের পাশে ছিলেন অস্ত্রের রাজনীতিতে প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূইঁয়া। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত খালেদ মাহমুদ ভূইঁয়ার নাম শুনলেই কেঁপে উঠে খিলগাঁও, শাহজাহানপুর, মতিঝিল এলাকার মানুষ।
দীর্ঘদিন থেকেই সম্রাট ও খালেদ মিলে পুরো ঢাকায় গড়ে তোলেন শক্তিশালী এক ক্যাডার বাহিনী। প্রতিটি ওয়ার্ডে ছিলো তাদের অনুসারীরা। তাদের চাঁদাবাজি, জবর-দখলে কেউ বাধা দিলেই জানানো হতো সম্রাটের দরবারে। কাকরাইলের ভূইঁয়া টাওয়ারে সম্রাটের অফিসেই সকল অপকর্মের পরিকল্পনা করা হতো। যারা বাধা হতো তাদের ডেকে আনা হতো সেখানেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জোর করে তোলে আনা হতো। তারপর ক্যাডার বাহিনীর সদস্যরা নির্যাতন করতো নির্বিঘ্নে। নির্যাতনের ক্ষেত্রে ইলেকট্রিকের শকও দেয়া হতো। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ থেকে শুরু করে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে রিমান্ডে থাকা সম্রাটকে।
সরকারি বিভিন্ন কাজের টেন্ডার, ক্যাসিনো, অবৈধ মার্কেট ও চাঁদাবাজি থেকেই বেশি টাকা উপার্জন হতো সম্রাটের। এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। আন্ডার ওয়ার্ল্ডে সম্রাটের হয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন খালেদ। ক্যাসিনো ব্যবসাও দেখাশোনা করতেন তিনি। খালেদের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় জিসানের সঙ্গে। জিসানকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা দিতেন সম্রাট। একাধিকবার সিঙ্গাপুরে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে সম্রাট, খালেদের বৈঠক হয়।
সম্রাটের দেয়া তথ্যানুসারে, অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের ভাগ পেয়েছেন অনেকে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ১১ জন সংসদ সদস্য সম্রাটের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা নিয়েছেন। ভোলার একজন এমপি নিয়মিত টাকার ভাগ নেন। নির্বাচনের প্রচারণা চালাতে সম্রাটের ক্যাডার বাহিনী নিয়ে এলাকায় গিয়েছিলেন তিনি। ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের নাম, ঠিকানা রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের বেশ আগে থেকেই খালেদের সঙ্গে দুরত্ব সৃষ্টি হয় তার। টাকার ভাগাভাগি নিয়ে এই দুরত্বের সূত্রপাত। একইভাবে দুরত্ব সৃষ্টি হয় জিসানের সঙ্গে। এজন্য আতঙ্কে ছিলেন। ধারণা ছিলো জিসানের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হতে পারে। এজন্য দুবাই থেকে সন্ত্রাসী  ও একে-২২ রাইফেলসহ বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র পাঠান জিসান। গত ২৬শে জুলাই খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগের বায়তুল হুদা মসজিদ সংলগ্ন ফাইভ স্টার নিবাসের সামনে থেকে অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ বিষয়ে ওই সময়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহিদুর রহমান রিপন বলেছিলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা পেশাদার সন্ত্রাসী। তারা বিদেশে অবস্থান করা একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর হয়ে কাজ করে। এই ঘটনার পর থেকে সম্রাট নিজে সন্ত্রাসীদের বহর নিয়ে চলাফেরা করতেন। খালেদের সঙ্গে দুরত্ব সৃষ্টির পর থেকে বিশ্বস্ত হিসেবে যুবলীগ নেতা এনামুল হক আরমান ছিলেন তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। একইভাবে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের হিসাব রাখতেন যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণের দপ্তর সম্পাদক এমদাদুল হক। একই বিষয়ে সম্রাট ও আরমানকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করছে র‌্যাব। সম্রাটের এই ক্যাডার বাহিনী, অস্ত্র, অবৈধ অর্থ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে র‌্যাব। সম্রাট প্রায়ই অসুস্থতার অজুহাতে প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করছেন। সূত্রমতে, আলাদভাবে জিজ্ঞাসাবাদের পর দু’জনকে মুখোমুখি করা হবে।
উল্লেখ্য, যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১৫ই অক্টোবর ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। একইভাবে সম্রাটের সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকেও পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের প্রথম দিনই গ্রেপ্তার করা হয় সম্রাটের সহযোগী যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। গত ৬ই অক্টোবর কুমিল্লা থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই দিন দুপুরে তাকে নিয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে কাকরাইল অফিসে তল্লাশি অভিযান করে র‌্যাব। এসময় পাঁচ রাউন্ড গুলি ভর্তি একটি ম্যাগাজিনসহ বিদেশি পিস্তল, ক্রেংক্রারুর চামড়া, এক হাজার ১৬০ পিস ইয়াবাসহ বিপুল মাদক জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় রমনা থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। সেইসঙ্গে বন্যপ্রাণীর চামড়া রাখার দায়ে সম্রাটকে ছয় মাস ও গ্রেপ্তারের সময় মদ্যপ অবস্থায় থাকায় আরমানকে ছয় মাসের কারাদন্ড দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত।

Friday, October 18, 2019

সম্রাটের মুখে কুশীলবদের নাম by রুদ্র মিজান

ক্যাসিনোকাণ্ডসহ অপরাধ জগতে সহযোগী কুশীলবদের নাম ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের মুখে। আড়ালে থাকা গডফাদারদের প্রশ্রয়ে অল্পদিনেই টাকার পাহাড় গড়েছেন সম্রাট। ওই টাকার ভাগ পেতেন আড়ালে থাকা কুশীলবরা। সেই কুশীলব, টাকা ও অস্ত্রের সন্ধান করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। রিমান্ডে এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে সম্রাটকে। প্রথম দিনই গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন যুবলীগ নেতা সম্রাট। সম্রাট ও তার সহযোগী এনামুল হক আরমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে রমনা থানায় দায়েরকৃত মামলা দুটি থানা পুলিশ থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে র‌্যাবে।
গতকাল ডিবির হেফাজতে থাকা সম্রাট ও আরমানকে র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে র‌্যাবের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ক্যাসিনো কারবারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করে র‌্যাব। র?্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক (এএসপি) মিজানুর রহমান মানবজমিনকে জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় থেকে ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও এনামুল হক আরমানকে র‌্যাবে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা দুটি তদন্ত করবে র‌্যাব। বুধবার রাতে র‌্যাবকে মামলা দুটি তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। সূত্রমতে, শুরু থেকেই সম্রাট ও আরমানের রিমান্ডের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। রিমান্ডের প্রথম দিনই ডিবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি টিম সম্রাট ও আরমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। শিগগিরই তাদের জয়েন্ট ইন্টারগেশন সেলে মুুখোমুখি (জেআইসি) নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রস্তুতি ছিলো ডিবি পুলিশের। এরমধ্যেই  মামলা হস্তান্তর করা হয়েছে র‌্যাবে। তবে ডিবি পুলিশ ও র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য দিয়েছেন সম্রাট। সূত্রে জানা গেছে, সম্রাট আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের শীর্ষ স্থানীয় একডজনেরও বেশি নেতার নাম প্রকাশ করেছেন। যারা নিয়মিত তার কাছ থেকে টাকার ভাগ নিয়েছেন। সম্রাটের কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন এরকম কয়েক পুলিশ কর্মকর্তাও রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট বলেছেন, ক্যাসিনোর টাকার ভাগতো অনেকেই পেয়েছেন।
এ জন্য শুধু আমাকে দায়ী করা হচ্ছে কেন? কাকরাইল, ফকিরাপুল, কমলাপুর, মতিঝিল এলাকায় ভবন নির্মাণ করতে গেলেই চাঁদা দিতো হতো সম্রাটকে। চাঁদার জন্য হুমকি-ধমকি দিতো তার লোকজন। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিটি মার্কেট থেকে আসতো কোটি কোটি টাকা। সিটি করপোরেশনের মার্কেটগুলোতে অবৈধভাবে দোকান তৈরি করে বিপুল অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর করতো সম্রাটের অনুসারীরা। গোয়েন্দা তথ্যানুসারে গুলিস্তানের বঙ্গবাজারের সিটি প্লাজা, জাকের মার্কেট, নগর প্লাজা, মহানগর কমপ্লেক্স, আদর্শ মার্কেট, সুন্দরবন স্কয়ারসহ বিভিন্ন মার্কেট থেকে এসব টাকা আসতো সম্রাটের কাছে। সিটি প্লাজা, জাকের মার্কেট ও নগরপ্লাজায় সহস্রাধিক অবৈধ দোকান তৈরি করে প্রতি দোকান থেকে ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছে এই চক্র। টাকা না পেলে দোকানে তালা দিয়ে দিতো চক্রের সদস্যরা। এমনকি সিটি করপোরেশন থেকে বৈধ কাগজ করে দেয়ার নামে দ্বিতীয় দফা গত ফেব্রুয়ারতিে আরও ১০ থেকে ১৫ লাখ করে টাকা নেয়। সবই হতো সম্রাটের প্রশ্রয়ে। সম্রাটকে গ্রেপ্তারের পরপর এসব মার্কেট চক্রের হোতা দেলোয়ার হোসেন দিলুসহ অনেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। এসব মার্কেট থেকে কত টাকা আসতো, এই চক্রে কারা জড়িত? কোন কোন ভবন নির্মাণে চাঁদাবাজি করেছেন? এসব বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে সম্রাটকে। জানা গেছে, বিভিন্ন অবৈধ খাত থেকে উপার্জিত টাকার ভাগ যারা নিতেন তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের শীর্ষ কয়েক নেতার নাম প্রকাশ করেছেন সম্রাট।
ইতিমধ্যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যুবলীগের সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এডভোকেট মোল্লা আবু কাওছার,  যুবলীগ নেতা নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন এমপিসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েক নেতার বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে। সম্রাটের কাছ থেকে টাকার ভাগ নিয়েছেন এমন তালিকায় রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা ও সমাজিক বিভিন্ন সংগঠনের নেতাও রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট জানিয়েছেন, উপাজির্ত অর্থ দিয়ে দলের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করতেন তিনি। এমনকি দলের কর্মীদের সহযোগিতা করতেন। নিজের ব্যক্তিগত কাজে তেমন টাকা ব্যয় করেননি বলে জানান তিনি। ঘনঘন বিদেশে গিয়ে মূলত জুয়া খেলতেন।
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে তার বাড়ি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরে কোথায় কোন ব্যাংকে তার টাকা রয়েছে এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে বারবার জানতে চাইলেও কৌশলে তা এড়িয়ে যান সম্রাট। কখনও কখনও রহস্যময় নিরবতা পালন করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি অসুস্থবোধ করছেন বলে জানান। এসময় সচেতনতার সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
উল্লেখ্য, মাদক ও অস্ত্র আইনের পৃথক দুই মামলায় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে ১৫ই অক্টোবর ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। একইভাবে সম্রাটের সহযোগী ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এনামুল হক আরমানকেও পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের প্রথম দিনই গ্রেপ্তার করা হয় সম্রাটের সহযোগী যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। তারপর থেকেই আতঙ্কে ছিলেন সম্রাট। গ্রেপ্তার এড়াতে কর্মি বেষ্টিত অবস্থায় কয়েক দিন নিজের কাকরাইলের অফিসে থাকলেও পরে আত্মগোপনে চলে যান। গত ৬ই অক্টোবর কুমিল্লা থেকে সম্রাট ও তার সহযোগী আরমানকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

Thursday, October 17, 2019

কাউন্সিলর পদ ব্যবহার করে গডফাদার by রুদ্র মিজান

কাউন্সিলর। এই পরিচয়ে জনবান্ধব হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তাদের অনেকেই ভয়ঙ্কর। রয়েছে নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। রাস্তায় বের হলেই তাদের সামনে পেছনে থাকে বিশাল বহর। কাউকে তোয়াক্কা করেন না। এক একটি ওয়ার্ডে তারা এক-একজন যেনো রাজা-মহারাজা। জবর-দখল, ফুটপাত, অবৈধ হাট, এমনকি ক্যাসিনো ব্যবসায় সম্পৃক্ততা রয়েছে তাদের।
অল্পদিনেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। রাজধানীর বুকে একাধিক বাড়ি-গাড়ির মালিক। দেশে-বিদেশে জমিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই সন্ত্রাস, মাদক ও জবর-দখলের রাজ্য গড়ে তোললেও তারা রয়েছেন বহাল তবিয়তে। সম্প্রতি ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির বেশ কয়েকজন কাউন্সিলরের নাম এখন আলোচনায়। জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। অন্তত এক ডজন কাউন্সিলর গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকা ছাড়া। আবার কেউ এলাকায় থাকলেও প্রকাশ্যে আসছেন না। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযানের শুরুতেই  আলোচনায় আসেন দক্ষিণ সিটির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক এই কাউন্সিলরকে দেখে বুঝার উপায় নেই তিনি কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারেন। মুখ ভরা দাড়ি। বিলাসবহুল গাড়িতে চড়তেন তিনি। এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে থানা পুলিশ থেকে সরকারি কর্মকর্তারা সবাই তাকে সমীহ করতেন। এই পরিচয়কে ব্যবহার করতেন ভিন্নভাবে। তার রয়েছে শতাধিক ক্যাডার। মতিঝিল, আরমবাগ, কমলাপুর এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করতে গেলেই তাকে দিতে হতো মোটা অঙ্কের চাঁদা।
কাউন্সিলর সাঈদকে চাঁদা না দিয়ে ভবন নির্মাণ করা দুষ্কর ওই এলাকায়। আরামবাগে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের গেস্ট হাউজ নির্মাণ করতে গেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি করেন সাঈদ। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, দাবিকৃত চাঁদা না দেয়ায় কাজ বন্ধ করে দেয় সাঈদের সন্ত্রাসীরা। প্রায় এক বছর কাজ বন্ধ ছিলো। সম্প্রতি ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরু হলে আত্মগোপনে যায় সাঈদ। আরামবাগের ওই ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, নির্মাণ শ্রমিকরা কাজে ব্যস্ত। কথা হয় নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসার সদস্য ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করে তারা জানান, ঠিকাদারের কাছে চাঁদা চেয়েছিলো সন্ত্রাসীরা। এটা নিয়ে সমস্যা ছিলো। এখন কোনো সমস্যা নেই। ওই এলাকায় ভবন নির্মাণ করতে গেলেই সাঈদকে দিতে হতো চাঁদা অথবা ফ্ল্যাট। মতিঝিল এলাকার ফুটপাত থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করে তার লোকজন। টাকা না দিলে তোলে দেয়া হয় দোকান। আবার ফুটপাত উচ্ছেদ করতে গেলেও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের রুখে দিতেন তিনি। ঢাকার অপরাধ জগতের বাদশা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের ঘনিষ্ঠজন সাঈদ। সম্রাটের ক্যাসিনো ব্যবসা দেখভাল করতেন সাঈদ।  গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, সাঈদের টাকা রয়েছে বিদেশের ব্যাংকেও। অস্ট্রেলিয়ার একটি ব্যাংকে টাকা রাখেন তিনি। সিঙ্গাপুরেও তার সম্পত্তি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দুটি দেশে বেশি যাতায়াত তার। বর্তমানেও সিঙ্গাপুরে রয়েছে সাঈদ। অল্প দিনে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া সাঈদ তার নিজ বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থেকে ২০০২ সালে ঢাকায় আসেন। মতিঝিলের দিলকুশার ফুটপাতে দোকান দেন। ২০০৯ সাল থেকে থেকে সক্রিয় হন যুবলীগের রাজনীতিতে।
তারপর রাতারাতি অপরাধ সাম্রাজ্যে পা দিয়ে উত্থান ঘটেছে তার। ওই এলাকার আরেক ভয়ঙ্কর কাউন্সিলর মোস্তফা জামান পপি। তিনি ঢাকা দক্ষিণের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে তালিকাভূক্ত। পল্টন এলাকায় তার নাম শুনলেই ভয় পায় সাধারণ মানুষ। ফুটপাত, মাদক, জবর-দখল, ক্যাসিনো সবকিছুতেই রয়েছে তার প্রভাব। কাউন্সিলর সাঈদের সঙ্গেও ছিল তার সখ্যতা। ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে পপি এখন এলাকাছাড়া। মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর এলাকায় মাদক ব্যবসার মূল হোতা ইসতিয়াক। নির্বিঘ্নে এই ব্যবসা পরিচালনার রহস্যের নাম হাবিবুর রহমান মিজান। তিনি ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। নিয়মিত মাসোহারা নিতেন ইসতিয়াকের কাছ থেকে। বিনিময়ে ওই এলাকায় মাদক ব্যবসা করার অবাধ সুযোগ তৈরি করে দিতেন মিজান। আছে জবর-দখল, ক্যাসিনো বাণিজ্যের অভিযোগ। ১৯৮৯ সালে ঝালকাঠি থেকে ঢাকায় এসে ছিনতাইয়ে জড়িয়ে যান হাবিবুর রহমান মিজান। তারপর যুবলীগের রাজনীতিতে মিশে একসময় জনপ্রতিনিধি হয়ে যান তিনি। কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক এখন এই মিজান। বিদেশে রয়েছে বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স। তাকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। মোহাম্মদপুর এলাকায় পাগলা মিজান হিসেবে পরিচিত এ কাউন্সিলর এতোদিন কাউকে পরোয়া করতেন না। এলাকায় তার ভয়ে দলীয় নেতাকর্মীরাও তটস্থ থাকতেন। কাউন্সিলর শব্দে ঢাকা পড়েছে অনেকের ভয়ঙ্কর সব অপকর্ম। তেমনি একজন কাউন্সিলর রয়েছে ঢাকা দক্ষিণে সিটি করপোরেশনের মোহাম্মদপুর এলাকার।
স্বাধীনতার পর জনতা ব্যাংক ডাকাতি করার অভিযোগ ছিলো তার বিরুদ্ধে। ধানমন্ডি এলাকায় যারা প্রথম ক্যাসিনো বাণিজ্যের শুরু করেন এই কাউন্সিলর তাদের একজন। এলাকায় নানা অপকর্মের হোতা এই কাউন্সিলরের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এই কাউন্সিলর চলাফেরা করেন আওয়ামী লীগের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সঙ্গে। পাশ্ববর্তী এলাকার আরেক কাউন্সিলর রয়েছেন যিনি ক্যাসিনো থেকে শুরু করে জবর দখলের হোতা। অবৈধভাবে কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়েছেন গত ১০ বছরে। তিনি আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী পরিবারের নেতার ঘনিষ্ঠজন। ঘনিষ্ঠত রয়েছে সিটি করপোরেশনের মেয়রের সঙ্গে। পাপের খতিয়ান দীর্ঘ হলেও তা প্রকাশ করতে ভয় পান এলাকার লোকজন।
উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রভাবশালী কয়েক কাউন্সিলরের মধ্যে একজন হাজি রজ্জব। ছয় নম্বর ওয়ার্ডের এই কাউন্সিলর পল্লবী, রূপনগর ও মিরপুর থানা এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত। এলাকায় সরকারি জমি দখল করে বস্তি পরিচালনা করে তিনি কয়েক বছরে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে রয়েছে আরও নানা অপকর্মের অভিযোগ। সম্প্রতি চলন্তিকা বস্তিতে আগুন লাগার পর তার নামটি সামনে আসে। রূপনগর ও আশপাশ এলাকার পরিবহন থেকে চাঁদা তোলা ও মাদক কারবারিদের সহায়তারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।  পরিবহন শ্রমিক থেকে মাত্র ১৫ বছরে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন রজ্জব। সম্প্রতি দুর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে এলাকায় খুব একটা দেখা যাচ্ছে না তাকে। ঢাকা মহানগর উত্তরের আরেক সুলতান তারেকুজ্জুমান রাজীব। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের এই কাউন্সিলরের যাত্রা শুরু হয়েছিলো ভূমি দখলের মাধ্যমে।  মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকায় ওয়াসার পানির পাম্পের জায়গা দখল করেন তিনি। ২০১৩ সালে জায়গা দখল নিতে যায় যুবলীগ নামধারী আরেক সন্ত্রাসী, দখলবাজ মনিরুজ্জামান। গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে সেদিন। ওই জায়গায় এখন কাউন্সিলর রাজীবের ডুপ্লেক্স বাড়ি।
আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতার স্নেহভাজন রাজীব নিয়ন্ত্রণ করেন এলাকার মাদক বাণিজ্যও। কাউন্সিলর শব্দের আড়ালে ঢাকা পড়েছে তার সব অপকর্ম। যদিও রাজীবের দাবি তিনি ব্যবসা করে সম্পদ গড়েছেন। ঢাকার দুই সিটির এমন ভয়ঙ্কর কাউন্সিলরদের একটি তালিকা ধরে অনুসন্ধান করছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। এ তালিকায় ১২ জনের নাম রয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দ সংস্থার তথ্যে এসব কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় নাম আছে দক্ষিণ সিটির অন্তত ৯ জনের। প্রাথমিক তালিকায় উত্তর সিটির তিন জন কাউন্সিলরের সম্পদ ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে আইন শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের কয়েক জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ জমা পড়েছে।

Tuesday, October 8, 2019

অস্ত্র ও মাদক আইনে দুই মামলা: সম্রাটের উজির নাজির কারা? by রুদ্র মিজান ও মোহাম্মদ ওমর ফারুক

ঢাকার অপরাধ সাম্রাজ্যের ডন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের অবৈধ টাকার উৎস এবং এই টাকার ভাগ কারা নিয়েছেন তা তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তার অবৈধ আয়ে যারা ভাগ বসিয়েছেন, মাসোহারা নিয়েছেন তারা আছেন এখন আতঙ্কে। ইতোমধ্যে তার আস্তানা থেকে একটি নথির সন্ধান পেয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ওই নথিতে অনেক রাঘব-বোয়ালের নাম রয়েছে। প্রতিমাসে কাকে কত টাকা দিতেন সেই হিসাবও আছে নথিতে। সম্রাটের অন্যতম সহযোগী খালেদ মাহমুদ ভুইয়াও ওইসব রাঘববোয়ালদের নিয়মিত অর্থ দিয়ে আসছিলেন। প্রতি রাতেই কোটি কোটি টাকা জমা হতো সম্রাটের দরবারে। সন্ধ্যা হলেই কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনের চতুর্থ তলায় হাজির হতেন তার অপরাধ সম্রাজ্যের হোতারা।
বস্তায় ভরে নিয়ে যেতেন টাকা। প্রতিদিনই এসব টাকা ভাগ বাটোয়ারা হতো। ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, মাদক বাণিজ্য, কোরবানির পশুর হাট, সিটি করপোরেশন মাকের্টে অবৈধ দোকান এরকম বিভিন্ন উৎস থেকেই কমিশন পেতেন অপরাধ সাম্রাজ্যের মুকুটহীন এই সম্রাট। টাকা পেতেন আবার একটি পক্ষকে টাকা দিতেনও তিনি।
টাকা নিতে অনেকেই ধর্না দিতেন সম্রাটের দরবারে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি রয়েছেন। তবে কোনো কোনো ব্যক্তিকে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠানো হতো প্রতি মাসের শেষের দিকে। টাকা পাঠাতে দেরি হলে তারা নিজেরাই যোগাযোগ করতেন। প্রথম সারির কয়েক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে টাকা পাঠানো হতো বিভিন্ন সেক্টরে। এমনকি দেশের বাইরে অবস্থান করা নেতা ও সন্ত্রাসীদেরও টাকা পাঠাতেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। ক্যাসিনো ও চাঁদাবাজির টাকা সঙ্গী, অনুসারীদের মধ্যেই বিলিয়ে দিতেন তিনি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য। গ্রেপ্তারের পর গতকাল রমনা থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দুটি মামলা করেছে র‌্যাব।
তার আগে রোববার ভোরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের কাছে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন যুবলীগের এই নেতা। গ্রেপ্তারের পর থেকেই একপর্যায়ে অনুশোচনায় ভোগেন তিনি। কান্নাও করেছেন একাধিকবার। নিজের অপরাধের জন্য তার সঙ্গীদের দায়ী করেছেন। এমনকি দলের অনেক সিনিয়র নেতাদেরও দায়ী করেছেন সম্রাট। সম্রাট দাবি করেছেন, তার হাত থেকে টাকার ভাগ নিয়েছেন অনেকেই। এমনকি দলীয় সভা-সমাবেশে বিপুল টাকা ব্যয় করতেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, ‘পোলাপান’ সংগ্রহ করতে টাকা লাগে। তাদের হাত খরচ দিতে হয়। তাদের পরিবারের প্রয়োজনেও টাকা দিতে হয়। এসব ক্ষেত্রে টাকা দিতেন তিনি। আবার কর্মীদের মধ্য থেকেই অনেকে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা নিয়ে হাজির হতো তার কাছে। অবৈধ নানা ব্যবসা, দোকান, ফুটপাত দখল থেকে টাকা আসতো। বড় অঙ্কের টাকা আসতো ক্যাসিনো ও মাদক থেকে। সম্রাটের অনুসারীদের অনেকেই সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, এমনকি তার এই সিন্ডিকেটে সংসদ সদস্যও রয়েছেন।
তার এই অবৈধ টাকার লেনদেনের হিসাব রাখতেন যুবলীগের দক্ষিণের এক নেতা। তবে টাকা লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। কয়েক মাস আগে থেকে টাকার লেনদেন নিয়েই সম্রাটের সঙ্গে দুরত্ব সৃষ্টি হয় খালেদের। সম্রাটের অবৈধ আয়ের একটা বিরাট উৎস নিয়ন্ত্রণ করতেন ঢাকা দক্ষিণের নয় নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজী এ কে এম মমিনুল হক সাঈদসহ আরো কয়েকজন কমিশনার। সূত্রমতে, সম্রাট স্বীকার করেছেন তার রয়েছে বিশাল ক্যাডার বাহিনী। মূলত তার ‘পোলাপানরা’ই বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা সংগ্রহ করে। অনেকক্ষেত্রেই দলের সভা-সমাবেশের অজুহাতে সংগ্রহ করা হতো। এছাড়া মতিঝিল, পল্টন, কমলাপুর, ফকিরাপুল, কাকরাইল এলাকায় কেউ ভবন নির্মাণ করতে গেলেই সম্রাটকে দিতো হতো মোটা অঙ্কের টাকা। ঢাকার বিভিন্নস্থানে ভবন, ফ্ল্যাট দখল করছে তার বাহিনী।
সম্রাটের অনুসারীদের নামে অভিযোগ করার সাহস পেতো না কেউ। র‌্যাবের কাছে সম্রাট জানিয়েছেন, তাকে অনেকেই ভয় পেতো। তিনি কখনও ভাবতে পারেননি তাকে এভাবে গ্রেপ্তার করা হবে। ঝামেলা এড়াতে নিজের দলের প্রভাবশালী নেতা থেকে শুরু করে উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত চাঁদা দিতেন তিনি। সরকার পরিবর্তন হলে দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা ছিলো তার। বিদেশে কয়েক নেতাকে বড় অঙ্কের টাকা পাঠাতেন সম্রাট। সূত্রেমতে, মমিনুল হক সাঈদ ও এনামুল হক আরমানকে নিয়ে প্রায়ই সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া যেতেন তিনি। সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনোতে খেলতেন সম্রাট। তবে তিনি কোথায় টাকা রাখতেন এ বিষয়ে বিস্তারীত তথ্য পায়নি র‌্যাব। ধারণা করা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়াতে টাকা পাঠাতেন সম্রাট।
অন্তত ১০টি ক্যাসিনোর পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিলো সম্রাটের হাতেই। ক্যাশিয়ার হিসেবে একেক ক্লাব থেকে একেকজন টাকা তুলতো। মতিঝিল ক্লাব পাড়া থেকে প্রতিদিন উঠতো ৩০-৩৫ লাখ টাকা। ক্যাশিয়ার ছিল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও নয় নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। অন্যান্য ক্যাসিনোর ক্যাশিয়ার ছিলো, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়া, বহিস্কৃত সহ-সভাপতি আরমানসহ আরো কয়েকজন।
পল্টনের জামান প্রীতম টাওয়ার থেকে প্রতিদিন আয় হতো ১০ লাখ টাকা। মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ ভবন নিয়ন্ত্রণ করত খালেদ ভূঁইয়া। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলমের সঙ্গে রয়েছে সম্রাটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ওই কমিটিতে বেশ প্রভাব ছিলো সম্রাটের। মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের বর্তমান এক শীর্ষ নেতা এবং আগের কমিটির এক শীর্ষ নেতা মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত।
অপরাধ সাম্রাজ্যের এই মুকুটহীন সম্রাট ও তার সহযোগী যুবলীগ নেতা আরমানকে রোববার ভোরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গ্রেপ্তারের পর সম্রাটকে নিয়ে কাকরাইলে তার অফিসে অভিযান চালানো হয়। এসময় ক্যাঙ্গারুর চামড়া সংরক্ষণের দায়ের তাকে ছয় মাসের কারাদন্ড দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমান আদালত। একইভাবে গ্রেপ্তারের সময় মাদকসেবনরত অবস্থায় থাকা আরমানকেও ছয় মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়। ওই দিনই তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল রমনা থানায় অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পৃথক দুটি মামলা করা হয়েছে।
এসব বিষয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম বলেন, দায়েরকৃত মামলায় সম্রাটের রিমান্ড চাওয়া হবে। সম্রাটের অবৈধ অর্থের উৎস, ক্যাসিনোর টাকা কোথায় যেতো, দেশের বাইরের অর্থপাচার হতো কি-না তা খোঁজা হবে। বিদেশে অর্থপাচারের ব্যাপারে কিছু তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

Saturday, October 5, 2019

জাপানে মাফিয়া দলের সদস্য ছিল সেলিম: ছোটবেলা থেকেই বেপরোয়া by রুদ্র মিজান

শৈশব থেকেই বেপরোয়া ছিলেন সেলিম প্রধান। মাদক ও নারীর নেশা তার বেশ পুরনো। স্কুলের গণ্ডি না পেরুলেও দেশে-বিদেশে গড়েছেন সম্পদের পাহাড় । অল্পতেই ঘনিষ্ঠ হয়ে যেতেন প্রভাবশালীদের। যে দলই সরকারে থাকতো তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতেন তিনি। চতুর সেলিম প্রধান আর্ন্তজাতিক সন্ত্রাসী, মাফিয়াদের সঙ্গে মিশে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী করেছেন নিজের অবস্থান। জাপানের সন্ত্রাসী, মাফিয়া গ্রুপ ইয়াকুজা’র সক্রিয় সদস্য তিনি। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও ব্যবসার জন্য জাপানে তিনি তালিকাভূক্ত অপরাধী।
অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের জন্য সেখানে কারভোগও করেছেন মাফিয়া ডন সেলিম প্রধান। এছাড়াও ঢাকাসহ কোরিয়া, থাইল্যান্ডে রয়েছে তার অপরাধ সাম্রাজ্য।
রাত হলেই মদ ও নারীতে মেতে উঠতেন সেলিম প্রধান। প্রায় রাতেই গুলশানের বাসায় আয়োজন করা হতো পার্টির। এসব পার্টিতে অংশ নিতেন প্রভাবশালী বেশ কয়েক রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কয়েক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। বিশেষ এই ব্যক্তিদের মনোরঞ্জনের জন্য প্রস্তুত থাকতো থাই ও কোরিয়ান সুন্দরী। তবে প্রভাবশালী এক নেতার অনুরোধে একাধিকবার রাশিয়ান তরুণীদেরও এনেছিলেন গুলশানের পার্টিতে। সেলিমের পার্টিতে শোবিজ জগতের অনেকেই অংশ নিতেন। নাচ ও গানে মাতিয়ে রাখতেন রাতভর। মাসে একাধিকবার পার্টি গার্ল পরিবর্তন করতেন সেলিম। সূত্রমতে, সেলিমের নেশা মূলত তিনটি। টাকা, মদ ও নারী। শৈশব থেকেই এই নেশায় পেয়ে বসে থাকে। দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদের পাশাপাশি জাপানি, আমেরিকান, রাশিয়ান ও বাংলাদেশি মিলে পাঁচটি বিয়ে করেছেন তিনি। স্ত্রী ছাড়াও একাধিক নারী সঙ্গ ছিলো তার প্রতি রাতের রুটিন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের টি-৩৪ নম্বর বাসাটি ছিলো সেলিম প্রধানের পিতা হান্নান প্রধানের। ওই বাসার দ্বিতীয় তলায় পরিবারের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর কেটেছে সেলিমের। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মেজো সেলিম। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন নাদিম প্রধান। বর্তমানে তারা দুই ভাই। তারা লেখাপড়া করতেন মোহাম্মদপুর বেঙ্গল মিডিয়াম স্কুলে। সেলিম প্রধানের ঘনিষ্ঠরা জানান, সেলিম ও তার বড় ভাই আলম প্রধান এবং ছোট ভাই নাদিম প্রধান কেউই স্কুলের গন্ডি পেরুতে পারেননি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন সেলিম প্রধান। ওই সময়ে দুটি বেবিটেক্সি ছিলো তাদের। কিছুদিনের মধ্যে একটি মিনিবাস কিনেন। লেখাপড়া না হলেও ছোটবেলা থেকেই সহপাঠী-বন্ধুদের চেয়ে অনেক বেশি টাকা ব্যয় করতেন সেলিম। কিশোর বয়সেই মাদক ও জুয়ায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেন তিনি। বখাটেদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন মহল্লার মোড়ে। সময়টা আশির দশকের শেষের দিক। মোহাম্মদপুরের সুন্দরী কিশোরীরা রেহাই পেতো না তার যৌন হয়রানি থেকে। এরকম অভিযোগ ছিলো প্রায় নিত্য দিনের।
৮৯ সালের দিকে সেলিমের বড় ভাই আলম পাড়ি দেন জাপানে। শ্রমিক হিসেবে জাপানে পৌঁছে কিছুদিনের মধ্যেই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন জাপানী তরুণীর সঙ্গে। তাকে বিয়েও করেন আলম। জাপানের ধনাঢ্য মা-বাবার একমাত্র সন্তান ওই তরুণী। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির মৃত্যুর পর বিশাল সম্পদ চলে আসে আলম প্রধানের অধীনে। মোহাম্মদপুরের বাড়ি ছেড়ে গুলশানে বসবাস করতে থাকে এই প্রধান পরিবার। ৯০ দশকের শুরুতেই জাপানে পাড়ি দেন সেলিম। জাপানে পা দিয়েই আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেন তিনি। অল্প দিনের মধ্যেই সম্পর্ক গড়েন সন্ত্রাসীদের সঙ্গে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জাপানের বিভিন্ন ক্লাবে, বারে ছিলো সেলিমের নিয়মিত আড্ডা। মাফিয়া সন্ত্রাসী সংগঠন ইয়াকুজা’র সদস্য হয়ে বৈধ-অবৈধ নানা ব্যবসায় জড়িত হন সেলিম প্রধান। অস্ত্র, জুয়া ও পতিতা বাণিজ্যে অন্যতম মাফিয়া হয়ে উঠেন। এরইমধ্যে জাপানে বিয়ে করেন তিনি। তবে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসায় জড়িত থাকার অপরাধে জাপানের গোয়েন্দাদের নজরে পড়েন সেলিম। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান আমেরিকায়। সেখান থেকে লন্ডনে, থাইল্যান্ডে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। মাঝে-মধ্যে পা রাখতেন ঢাকায়। জাপানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ওয়ান্টেড হওয়ার পর বিপাকে ছিলেন তিনি। জাপানে নিজের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ ছিলো। আমেরিকায় বিয়ে করে চেষ্টা করেন জাপানে পাড়ি দিতে। অতঃপর জাপানে গিয়ে আটকে যান গোয়েন্দা জালে। সেখানে দীর্ঘদিন কারাবাসের পর ফিরেন ঢাকায়।
বিএনপি তখন ক্ষমতায়। গিয়াস উদ্দিন আল মামুন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। তার সঙ্গে সখ্যতা গড়েন সেলিম। ‘উই আর ডিফরেন্ট’ স্লোগান নিয়ে গড়েন ‘প্রধান গ্রুপ’ নামে গ্রুপ অব কোম্পানী। এই গ্রুপের অধীনে বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি খাতে গড়ে তোলেন ‘জাপান বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপার্স লিমিটেড’ নামে প্রিন্টিং প্রেস। ওই সময়ে প্রভাব খাটিয়ে সরকারি বিভিন্ন কাজ করতেন সেলিম। এক-এগারোর সময়েও বহাল তবিয়তে ছিলেন অদৃশ্য ছায়ার বদৌলতে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েক নেতা, প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়েন সেলিম প্রধান। সেলিমের বাসার দেয়ালে প্রভাবশালী অনেকের সঙ্গে তোলা ছবি টানানো থাকতো।
সূত্রমতে, বেপরোয়াভাবে সেলিম প্রধানের উত্থান শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। ওই সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক থেকে ৪৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। গত বছরে সেলিমের প্রতিষ্ঠান ‘জাপান বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপার্স লিমিটেড’র কাছে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২৪ কোটি টাকা। প্রভাবশালীদের তদবিরের জোরে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা পেয়েছেন সেলিম প্রধান। গত বছরের শেষের দিকে প্রধান গ্রুপের অধীনে পি২৪ গেইমিং নামক অনলাইন ক্যাসিনো স্পা ও বিউটি সেন্টার চালু করেন সেলিম প্রধান। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অনলাইন ক্যাসিনোর মাধ্যমে উপার্জিত শত শত কোটি টাকা থাইল্যান্ড ও কোরিয়ায় পাচার করেছেন সেলিম প্রধান। তার স্পা সেন্টার ও বাসায় প্রতি রাতে বসানো হতো রিক্রিয়েশন পার্টি। মূলত প্রভাবশালী নেতা, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রমোদালয় ছিলো তার বাসা ও স্পা সেন্টার।
গত ১৮ই সেপ্টেম্বর থেকে দেশে ক্যাসিনো বিরোধী অভিযান শুরু হলে আতঙ্কে ছিলেন সেলিম প্রধান। ক্যাসিনো ব্যবসায়ী লোকমান গ্রেপ্তারের পর আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। ৩০শে সেপ্টেম্বর দুপুরে থাইল্যান্ডে যেতে পা দেন হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে। সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। সেলিম প্রধানের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের গাউসিয়া এলাকায়।
গুলশান থানার ওসি কামরুজ্জামান জানান, সেলিম প্রধানসহ তার দুই সহযোগীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত দুটি মামলা তদন্ত করবে ডিবি ও সিআইডি। আদালতের নির্দেশে শুক্রবার রিমান্ডে নিয়ে তাদের এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

Wednesday, September 25, 2019

টাকার সঙ্গে পাঠাতেন সুন্দরী মডেলও by রুদ্র মিজান

টেন্ডার মুঘল জি কে শামীমের দরবারে ডাক পড়তো সুন্দরীদের। তারা নাটক, সিনেমার পরিচিত মুখ। নায়িকা, মডেল হিসেবে পরিচিত। নিজের মনোরঞ্জন থেকে শুরু করে টেন্ডার বাগিয়ে নিতে তাদের ব্যবহার করতেন শামীম। উচ্চ পদস্থ বিভিন্ন কর্মকর্তার নিয়মিত আবদার ছিল, শুধু টাকা দিলেই হবে না, চাই উঠতি বয়সের নায়িকার সঙ্গ। কর্মকর্তাদের কাছে  দীর্ঘ তালিকা পাঠাতেন শামীম। ছবিসহ সেই তালিকা দেখেই বাছাই করে নিতেন মডেল, নায়িকাদের। একইভাবে প্রভাবশালী নেতাদের খুশি করতেও মডেল, নায়িকাদের পাঠানো হতো ফ্ল্যাটে-তারকা হোটেলে। এমনকি দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া হতো তাদের। বিনিময়ে অল্প দিনেই নায়িকা থেকে অনেকে প্রযোজক হয়েছেন। মালিক হয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকার। হাকিয়ে বেড়াচ্ছেন দামি দামি গাড়ি। জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি পুলিশের কাছে এ বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে জি কে শামীম ও যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। শামীম জানায়, অনেকেই টাকার সঙ্গে নারীসঙ্গ চাইতো। পাঁচ তারকা হোটেলে কক্ষের ব্যবস্থাও করতে হতো। শামীমের সঙ্গে সখ্যতা অর্ধশতাধিক সুন্দরী তরুণীর। এরমধ্যে এক ডজনেরও বেশি পরিচিত নায়িকা ও মডেল। টেন্ডার বাগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, নেতাদের কাছে পাঠানো হতো তাদের।

গুলশান ও বনানীর একটি তারকা হোটেল ও কাকরাইলের একটি হোটেল ব্যবহার করা হতো একান্তে সময় কাটানোর জন্য। টেন্ডার পাওয়ার পর পার্টি দেয়া হতো। পার্টি হতো দেশে ও বিদেশে। এসব পার্টিতে নিজ দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও সহযোগীরা উপস্থিত থাকতেন। পার্টিতে পশ্চিমা পোশাকে হাজির হতেন সুন্দরীরা। মাদকে বুঁদ হয়ে সুন্দরীদের মধ্য থেকে যাকে খুশি কাছে টেনে নিতেন। বেশ কয়েক পার্টি হয়েছে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায়। দেশের বাইরের পার্টিতে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন যুবলীগ দক্ষিণের শীর্ষ এক নেতা। কখনও কখনও হাজির হতেন ঢাকা মহানগর যুবলীগের সাবেক প্রভাবশালী এক নেতা ও  সংসদ সদস্য।

কখনও কখনও ব্যক্তিগতভবেই নায়িকা-মডেলদের সঙ্গী করে দেশের বাইরে যেতেন এই দরবারের কর্তারা। এরমধ্যে এক নায়িকা রয়েছেন। যিনি অভিষেকেই শ্রেষ্ঠ নবীন শিল্পী হিসেবে পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন লাভ করেন। শামীমের সঙ্গে পরিচয়ের পর দ্রুত ভাগ্য পরিবর্তন হতে থাকে খুলনার এই মেয়ের। শামীমের দরবারের আর্শীবাদের বদৌলতে রাতারাতি বদলে যায় তার আর্থিক অবস্থা। এই নায়িকা গুলশানে একটি ফ্যাশন হাউজ ও ধানমন্ডিতে একটি রেস্টুরেন্টের মালিক হয়েছেন। পাশাপাশি হয়েছেন প্রযোজক। ডেন্টাল কলেজের প্রাক্তন এই ছাত্রী অভিনয় ছাড়াও ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় আত্মপ্রকাশ করেন প্রযোজক হিসেবে। অভিনয় করেছেন ভোজপুরি চলচ্চিত্রেও। পাঁচটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এই নায়িকা।

জি কে শামীম তাকে নিয়েই বেশি সময় কাটাতেন। সূত্রমতে, যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতাও এই নায়িকাকে ডাকতেন। ওই নেতার কাছেও পাঠিয়ে দেয়া হতো তাকে। পার্টিতে তাল মিলিয়ে এ্যালকোহল পান করেন এই নায়িকা। প্রকাশ্যেই শামীমকে তুমি বলে সম্বোধন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৫ কোটি টাকার টেন্ডার বাগিয়ে নিতে সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি কয়েক নায়িকাকে ব্যবহার করেন জি কে শামীম। মোটা অঙ্কের টাকার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টরা এসব নায়িকা-মডেলদের চাইতেন। অবশ্য এই কর্মে রাতারাতি ভাগ্য বদলেছে নায়িকাদেরও। ওই নায়িকার সঙ্গে গুলশানের একটি তারকা হোটেলে প্রায়ই দেখা যেতো তাদের।

শামীমের প্রতিটি টেন্ডারে মোটা অঙ্কের ভাগ পেতেন যুবলীগের দক্ষিণের শীর্ষ ওই নেতা। ওই নেতার নিজেরও ছিলো সুন্দরী কানেকশন। যদিও তার ঘনিষ্ঠরা জানান, কাউকে ডাকতে হয় না। স্বেচ্ছায় হাজির হন সুন্দরীরা। ওই শীর্ষ নেতার হয়ে এই অপরাধ সাম্রাজ্য দেখাশোনা করতেন মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। তাদের দরবারে প্রায়ই হাজির হতেন পরিচিত এক মডেল, উপস্থাপিকা। অবশ্য চারটি চলচ্চিত্রেও দেখা মিলেছে এই মডেলের। এখন তার যাত্রাপথ চলচ্চিত্র কেন্দ্রিক। নৃত্যে তার রয়েছে ভালো দখল। ওয়ার্ল্ড ডান্স পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে পারফর্ম করেছেন তিনি। আলোচিত এই মডেলের একটি সেলফি বেশ আলোচিত হয়েছিলো। সেলফিতে তার সঙ্গে ছিলো বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের ঘটনায় অন্যতম আসামি নাঈম আশরাফ।

সূত্রমতে, ক্যাসিনোতে না গেলেও তারকা হোটেলে ক্যাসিনো হোতাদের আড্ডায় নিয়মিত থাকতেন এই মডেল, উপস্থাপিকা। ঢালিউড কিং হিসেবে পরিচিত নায়ক শাকিব খানের সঙ্গে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করার ইচ্ছে এই মডেল উপস্থাপিকার। সেই ইচ্ছে পূরণ করতে হাজির হয়েছিলেন ওই নেতার দরবারে। ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত শেষে দাবি জানিয়েছিলেন শাকিবের সঙ্গে মুভিতে অভিনয় নিশ্চিত করার। তারপর যথারীতি আশীর্বাদও পান। মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশিত হয় শাকিবের সঙ্গে অভিনয় করছেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চলচ্চিত্রটি আর নির্মাণ হয়নি।

এই দরবারের প্রমোদ সঙ্গী হিসেবে পরিচিত আরেক নায়িকা। যিনি রূপালি পর্দায় আসার আগে টিভি নাটকে কাজ করেছেন। মডেল হয়েছেন একটি বিস্কুট কোম্পানী ও একটি জুসের বিজ্ঞাপনে। মডেল হয়েছেন জনপ্রিয় শিল্পী আসিফের একটি গানেও। তিনি ২০১৪ সালে পা রাখেন চলচ্চিত্রে। সেরা নবীন শিল্পী হিসেবে মনোনীত হন বিশেষ একটি পুরস্কারের জন্যও। ওই বছরের শেষেই মুক্তি পায় তার আরও একটি চলচ্চিত্র। এ পর্যন্ত ওই নায়িকা অভিনীত চারটি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে। শীর্ষ নেতার দরবারে তাকে ডাকা হতো প্রায়ই। দরবারের ডাক এলে যে কাজই থাকুক তা ফেলে ছুটে যেতেন। দরবারের ডাককে আর্শীবাদ মনে করতেন এসব নায়িকা, মডেলরা।

সূত্রমতে, এই দরবারের নেতাদের উৎসাহে দশম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন এক নায়িকা। ২০০২ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় চলচ্চিত্রে আগমন ঘটে তার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। অশ্লীল জগতের নায়িকা হিসেবে অনেকের মধ্যে একজন হিসেবে পরিচিতি রয়েছে তার। আজ থেকে কয়েক বছর আগে শীর্ষ ওই নেতার দরবারে বেশ কদর ছিলো এই নায়িকার। দরবার থেকে ডাক না এলেও নিজ থেকেই যোগাযোগ রক্ষা করার চেষ্টা করেন এই নায়িকা। তবে দরবারের নতুনদের আগমনে ঈর্ষা কাজ করতো পুরাতনদের মধ্যে।

Sunday, September 22, 2019

ভয়ঙ্কর মাদক আইস ছড়িয়ে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক চক্র by রুদ্র মিজান

দেশব্যাপী মরণনেশা আইস ছড়াতে তৎপরতা চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক চক্র। ইয়াবার চেয়ে শক্তিশালী এই মাদক ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। দেশের বাইরে থাকা কিছু বাংলাদেশির মাধ্যমে এই মাদক ছড়িয়ে দিতে তৎপরতা চালানো হয়। বিশেষ করে আফ্রিকান কিছু নাগরিক ভ্রমণের নামে বিভিন্ন ভিসা নিয়ে ঢাকায় এসে আইস ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে। এমনকি ঢাকায় গড়ে তোলা হয় আইস তৈরির কারখানাও। গোয়েন্দাদের ধারণা প্রায়ই বিভিন্ন ভিসা নিয়ে এই চক্রের সদস্যরা দেশে এসে মাদকের কারবার করার চেষ্টা করছে।

দক্ষিণ পূর্ব-ইউরোপের ভয়ঙ্কর মাদক আইস। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মাদকটি ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে আফ্রিকান কিছু নাগরিক। বিত্তশালী পরিবারের ছেলে-মেয়ে, বিশেষ করে ব্যবসায়ী, শোবিজ জগতের লোক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে এই চক্র।
এক গ্রাম আইসের মূল্য ৭ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করছিলো তারা। 

এই চক্রের মধ্যে রয়েছে এক নাইজেরিয়ান। তার সম্পর্কে তথ্য পান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। তারপরই মাঠে নামে তারা। আযা আনাইচুকা অনিনুসি নামক ওই নাইজেরিয়ানের সঙ্গে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হয় সোর্সের মাধ্যমে। সম্প্রতি আইস বিক্রি করতে হোটেল লা মেরিডিয়ান সংলগ্ন বিমানবন্দর রোডে ক্রেতাবেশী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা টিমের সঙ্গে সাক্ষাত করতে যায় আযা আনাইচুকা। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আটক করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে ৫২২ গ্রাম আইস জব্দ করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে ওই নাইজেরিয়ান জানান, তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে এখানেই গার্মেন্টের ব্যবসা করছিলেন। তবে অল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হতে বিভিন্ন দেশে ভয়ঙ্কর এই মাদক ছড়িয়ে দিতে কাজ করছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ভ্রমণ করে এসব দেশে আইস ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন। উগান্ডা থেকে বিশেষ  কৌশলে তার কাছে এই মাদক পাঠানো হতো।

তবে ভয়ঙ্কর এই মাদকটির সন্ধান পাওয়া গেছে আরও আগেই। একজন ইয়াবা বিক্রেতাকে অনুসরণ করছিলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা টিম। মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, মিরপুর এলাকায় রয়েছে ওই মাদক ব্যবসায়ীর বিশেষ নেটওয়ার্ক। গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা বিক্রেতা রাকিব উদ্দিনকে ইয়াবাসহ আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের টিম। ওই সময়ে রাকিবের বাসায় ১৬০ পিস ইয়াবার সঙ্গে পাওয়া যায় পাঁচ গ্রাম নতুন এক মাদক। যা দেখতে অনেকটা লবণের মতো। বিদেশে প্রশিক্ষিত মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম তা দেখেই বুঝতে পারেন এটি দক্ষিণ পূর্ব-ইউরোপের ভয়ঙ্কর মাদক আইস। কোথাও কোথাও এটিকে ক্রিস্টিল ম্যাথ নামে চিনে অনেকে। শক্তি ও যৌন উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য তাপ দিয়ে এর বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে মাদকসেবীরা। এটি মাদকসেবীদের রক্তে মিশে যায়। পর্যায়ক্রমে এটি নেশায় পরিণত হয়। নেশা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে নিজের শরীর, যৌনশক্তি সবই হারাতে হয় সেবনকারীদের। নটরডেম কলেজের এক সময়ের মেধাবী এক শিক্ষার্থী  হতাশা থেকে মাদকে আসক্ত হন। তারপর নিজেই শুরু করেন মাদক বাণিজ্য।

আইস সম্পর্কে তার কাছ থেকে  জানা যায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই আইস বাণিজ্যের মূল হোতা ঝিগাতলার ইঞ্জিনিয়ার রাশিদুজ্জামানের ছেলে হাসিব মোহাম্মদ রশিদ (৩২)। ওই শিক্ষার্থীর দেয়া তথ্যানুসারেই ঝিগাতলার ৭/এ সড়কের ৬২ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। হাসিবদের নিজেদের ওই বাড়ির বেইজমেন্টে ছিলো আইস তৈরির কারখানা। সেখানে ছিলো আইস ও এমডিএমএ সহ সিউডোএফ্রিড্রিন এক্সটাকশন সুবিধা সম্বলিত ডিস্টিলেশন চেম্বার। ওই অভিযানেই আইস নামক মাদক বাংলাদেশে প্রথম সনাক্ত হয় বলে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে হাসিব পলাতক থাকায় তখনও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে গত ১৮ই মার্চ মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। জিজ্ঞাসাবাদে হাসিব জানান, মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন তিনি। দেশে আসার পর অনলাইন ও বিদেশী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেই সময় কাটতো তার। ডার্ক নেটের মাধ্যমেই আইস তৈরি সম্পর্কে শিক্ষা নিয়ে নিজেই কারখানা তৈরি করে ইয়াবার চেয়ে ভয়ঙ্কর এই মাদক তৈরি করছিলেন হাসিব।

এসব বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, আর্ন্তজাতিক মাদক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে টার্গেট করে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি। যে কারণে আইসের মতো ভয়ঙ্কর মাদক ছড়িয়ে দেয়ার আগেই জড়িতদের আটক করা সম্ভব হয়েছে।

Saturday, September 21, 2019

মাফিয়া ডন শামীম গ্রেপ্তার by রুদ্র মিজান ও আল আমিন

মাফিয়া ডন। বন্দুক শামীম। সম্রাট। গণপূর্তের যুবরাজ। নানা পরিচয় তার। রাজনীতির আড়ালে ঢাকা পড়েছিল তার পাপের লম্বা খতিয়ান। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ‘যুবলীগ নেতা’, প্রভাবশালী ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম ধরা পড়েছেন অ্যালিট বাহিনী র‌্যাবের হাতে। গুলশানের নিকেতনের কার্যালয় থেকে গতকাল কয়েকঘন্টার অভিযান শেষে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। এসময় গ্রেপ্তার করা হয় তার সাত দেহরক্ষীকেও। এই অস্ত্রধারী দেহরক্ষীরাই সবসময় ঘিরে থাকতো তাকে। তার বাণিজ্যিক কার্যালয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর, নগদ পৌনে দুই কোটি টাকা, অস্ত্র এবং মদ। তার বিপুল সম্পদ আর বিলাসী জীবনের কাহিনী দেখে চমকে ওঠেছেন সবাই। যুবলীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, শামীম যুবলীগের কেউ নন। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুবলীগের সমবায় সম্পাদক পরিচয়ই ছিল তার ক্ষমতার উৎস। যদিও একসময় তিনি যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে তার সহ-সভাপতি পদ থাকার তথ্যও সামনে এসেছে।

শামীমের কার্যালয় থেকে যা কিছু উদ্ধার: গতকাল সকাল ৭ টার দিকে র‌্যাবের একটি দল গুলশানের নিকেতনের ৫ নম্বর রোডের ১১৩ নম্বর বাসা ঘিরে ফেলে। ওই বাসার তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় জিকে শামীম তার পরিবার নিয়ে থাকেন। দুইটি ফ্ল্যাটকে তিনি ডুপ্লেক্স বাসা বানিয়েছিলেন। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি সব কিছু গোপন করার চেষ্টা করেন। ওই বাসায় র‌্যাবের সদস্যরা তল্লাশি শেষ করে শামীমের অফিস ১১৪ নম্বর বাড়িতে যান। ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলা ও তৃতীয় তলায় শামীমের বিলাসবহুল অফিস। সেখানে অভিযান চালিয়ে নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের এফডিআর, ১টি রিভলবার, ৪ টি বিদেশি মদের বোতল ও বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই উদ্ধার করা হয়। এসময় শামীমসহ তার ৭ দেহরক্ষীকে আটক করা হয়। র‌্যাব দেহরক্ষীর অস্ত্রগুলো জব্দ করে। আটককৃত দেহরক্ষীরা হলেন, শহিদুল ইসলাম, মুরাদ, দেলোয়ার, জাহেদ, সায়েম, আমিনুল ও কামাল। ভিআইপি এলাকায় র‌্যাবের অভিযানের কারণে ওই এলাকার লোকজন সেখানে ভিড় করে। তাদের ভিড় সামলাতে র‌্যাবের সদস্যদের বেগ পেতে হয়। অভিযান শেষে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সকাল থেকে আমরা শামীমের বাসা ও অফিসে অভিযান শুরু করি। এ সময় শামীম ও তার সাত জন দেহরক্ষীকে আটক করা হয়।

তিনি জানান, অভিযানে শামীমের অফিস থেকে তার একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও দেহরক্ষীদের সাতটি শটগান এবং নগদ এক কোটি আশি লাখ টাকা, মোট ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের (১৪০ কোটি টাকার এফডিআর মায়ের নামে, বাকি ২৫ কোটি টাকার এফডিআর শামীমের নামে) কাগজ ও বিদেশি মদের কয়েকটি বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেসব তদন্ত করছি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে। যেসব টাকাগুলো উদ্ধার হয়েছে সেগুলো বৈধ না অবৈধ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, অবৈধভাবে টাকাগুলো আয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। তদন্ত শেষে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হবে।

এসময় র‌্যাবের ভ্রামমাণ আদালতের মাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম সাংবাদিকদের জানান, শামীমের মায়ের নামে রয়েছে ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর। তবে তার মায়ের নামে কোনও প্রতিষ্ঠান নেই। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখবো। শামীমের রাজনৈতিক পরিচয় বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার কোনও রাজনৈতিক পরিচয় আছে কিনা তা নির্ধারণ করবে তার দল ও নেতারা। এ দায়িত্ব আমাদের নয়। উদ্ধার হওয়া তার অস্ত্রের লাইসেন্স আছে কী-না প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তার অস্ত্রের লাইসেন্স থাকলেও ওইসব অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করা হতো বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নিজেকে নির্দোষ প্রমানিত করলে তিনি ছাড়া পাবেন। আটক যুবলীগের নেতা খালেদের তথ্যের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয়েছে কী-না প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন উত্তর দেননি। শামীমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো দিদারুল ইসলাম জানান, স্যার বাসায় ঘুমাচ্ছিলেন। র‌্যাবের কর্মকর্তারা তাকে ঘুম থেকে তুলে অফিসে নিয়ে আসে।

শামীমের উত্থান ও বিলাসী জীবন: মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান শামীম ঢাকায় শাহজাহানপুর, বাসাবো এলাকায় বড় হয়েছেন। শিক্ষক পরিবারের এই সন্তান থাকতেন টিনশেডের ঘরে। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন আলাদীনের প্রদীপ পেয়ে যান হাতে। বদলে যায় তার জীবন-যাপন। এখন শত-শত কোটি টাকার মালিক জি কে শামীম। থাকেন বিলাসবহুল বাড়িতে, হাকান দামি গাড়ি। তার সেবায় রয়েছে অর্ধশত কর্মচারী। এরমধ্যে সাত জন রয়েছে তার সিকিউরিটি গার্ড। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার প্রথম পাঁচ বছরেই নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন শামীম। বাসাবো, কমলাপুর, ফকিরাপুল এলাকায় চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নানা অপকর্মে জড়িত তার লোকজন। তবে বাসাবো এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে পা দেন না শামীম। যদিও এখান থেকেই তার উত্থান। এখন ওই এলাকা নিয়ন্ত্রন করে তারই লোকজন। বাসাবো এলাকায় সদ্য নির্মিত শামীমের ৫তলা ভবনে একটি ইউনিট গড়ে তোলা হচ্ছিলো তার সাঙ্গ-পাঙ্গদের বিনোদনের জন্য।

ওই ইউনিটের ডেকোরেশনের কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ায় আতঙ্কে তার সঙ্গীরা। গতকাল বাসাবোর ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে নিচ তলায় রয়েছে গ্যারেজ ও পার্লার। রয়েছে সিঁড়ি ও লিফট। বাড়িটি দেখাশোনা করেন জি কে শামীমের এলাকার লোক নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মোহাম্মদ সায়েম। সায়েম জানান, তিন মাস যাবত এখানে আছেন। মাঝে-মধ্যে যুবলীগের স্থানীয় নেতারা ওই বাসায় গিয়ে আড্ডা দেন। বাসাটি নতুন হওয়ায় সিনিয়ররা আসেন না। তারা অন্য বাসায় আড্ডা দেন বলে জানান তিনি। এ বাড়ির তৃতীয় তলায় একটি ইউনিট তাদের জন্য করা হয়েছে বলে জানান সায়েম। বাসাবো এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, বাসাবো এলাকায় দুটি বাসা রয়েছে যেখানে রাত হলেই শামীমের লোকজন নারী ও মদে মত্ত হয়ে থাকতো। শামীমের কথার অবাধ্য হলে প্রকাশ্যে লোকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। বাসায় আটকে রাতভর নির্যাতন করে ছেড়ে দিতো। এমনকি রাজনৈতিক মামলায় আসামি করা হতো তাদের। এজন্য প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলেন না। ফকিরাপুলের একজন ব্যবসায়ী জানান, তার দোকানের সামনে ফুটপাতে দোকান বসিয়েছিলো শামীমের লোকজন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় তার ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় কমলাপুরে টর্চার সেলে।সেখানে বেদম মারধর করা হয়। এ ঘটনায় মামলার করারও সাহস পাননি এই ব্যবসায়ী।

এলাকাবাসী জানান, শামীমকে সন্ত্রাসী হিসেবেই জানেন এলাকার লোকজন। এই সরকারের আমলে আঙুল ফুলে কালাগাছ হয়েছেন তিনি। বাসাবো, শাহজাহানপুর এলাকাতে সাতটি বাড়ি রয়েছে তার। ওই এলাকায় শামীমের হয়ে নিয়ন্ত্রন করেন দুই জন। শামীমের সময় কাটে কমলাপুর, কাকরাইল ও গুলশানে। গুলশানের নিকেতনের বিলাসবহুল বাড়িতেই বেশি সময় কাটাতেন শামীম। তার অফিস হিসেবে ব্যবহৃত বাড়ির তৃতীয় তলায় রয়েছে শামীমের বসার কক্ষ। বাড়িটি সাজানোর জন্য চায়না থেকে বিভিন্ন ধরণের ল্যাম্প আনেন। প্রায় ৩০ ফুট লম্বা ও ২০ ফুট চওড়া কক্ষটিতে প্রায় রাতেই ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতেন। কখনও কখনও নামিদামি মডেল, নায়িকারা ভিড় করতেন তার এখানে। এছাড়া দেশের বাইরেই বেশি থাকতেন তিনি। নেপাল, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে বেশি আসা-যাওয়া করতেন তিনি। তার ঘনিষ্ঠরা জানান, মালয়েশিয়া ও নেপালে ব্যবসা রয়েছে তার।

তবে সাত আট বছর আগেও শামীমের আড্ডা ছিলো বাসাবো এলাকায়। ওই সময় থেকেই বিভিন্ন ক্লাবে জুয়ার আসরে রাত কাটাতেন তিনি। ঘুমাতেন দিনভর। এমনকি ঢাকার আশপাশে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকায় জুয়ার আয়োজন করতো তার লোকজন। প্রশাসন ম্যানেজ থেকে শুরু করে আর্থিক কাজগুলো করতেন তিনি। জি কে শামীমের আরেকটি সিন্ডিকেট রয়েছে যারা ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় করে নিয়মিত। স্থানীয় যুবলীগের নেতাকর্মীদের দিয়ে এসব অপকর্ম করতেন শামীম। এমনকি মাদক ব্যবসায়ীরাও মাসোহারা দিতো তাদের। ঠিকাদার হিসেবে তিনি গণপূর্ত ভবনের কাজ বাগিয়ে নেন সহজেই। এই চক্রে রয়েছে প্রভাবশালী বেশ কয়েক যুবলীগ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তা। অন্য ঠিকাদারদের মুখ বন্ধ করতে রয়েছে শামীম বাহিনীর অস্ত্র। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার জানান, অনিয়ম করে কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় কাজ বাগিয়ে নেয় এই চক্রটি। এ নিয়ে কথা বলার সাহস কারও নেই। সন্ত্রাসী ও অস্ত্র সবই তাদের। অস্ত্র ও সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া চলাফেরা করেন না শামীম। গত ১০ বছর যাবত দামি দামি গাড়ি ব্যবহার করেন তিনি। বাসা থেকে বের হলেই নিরাপত্তা বলয়ে থাকেন তিনি। জি কে শামীমের এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি জানান, সন্ধ্যার পর চাঁদাবাজি ও জুয়ার আসরের টাকা বস্তায় ভরে নিয়ে যাওয়া হতো কাকরাইলে। সেখানে তাদের এক নেতার অফিসে ভাগ বাটোয়ারা হতো এসব টাকার। ওই অফিসে ঢাকা দক্ষিণ এলাকার আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা হাজির হতেন।

জি কে শামীমের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সন্মানদী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া গ্রামে। তার পিতা মৃত মো. আফসার উদ্দিন। তিনি ছিলেন শিক্ষক। তবে কৈশোর থেকেই শামীম থাকতেন ঢাকায়। সুবিধাবাদী হিসেবে পরিচিত শামীম গত বিএনপি সরকারের আমলে যুবদলের রাজনীতি করতেন। ক্ষমতার পালা বদলে মিশে যান যুবলীগের সঙ্গে।

Friday, September 20, 2019

ক্যাসিনো গডফাদারদের তালিকা ধরে অভিযান by রুদ্র মিজান

রাজধানীতে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনাকারী গডফাদারদের বিরুদ্ধে তালিকা ধরে অভিযান শুরু করছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। বুধবার থেকে র‌্যাব এ অভিযান শুরু করে। এদিন অন্তত চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালানো হয়। র‌্যাব সূত্র জানায়, ক্যাসিনো পরিচালনা করেন এমন ব্যক্তিদের তালিকা করা হয়েছে। এখন পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে। এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, ডিএমপিও ক্যাসিনো ও জুয়ার আসর বিরোধী অভিযান জোরদার করবে। সূত্র জানায় রাজধানীতে বড় ধরণের অন্তত একশো ক্যাসিনো বা জুয়ার আসর রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬০টি রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। র‌্যাবের অনুসন্ধান সূত্র জানায়, রাজধানীর বহুতল ভবনের ছাদগুলোতে গড়ে তোলা হয়েছে ক্যাসিনো। রাত হলেই জমে উঠে ক্যাসিনোগুলো। দেশের বিভিন্ন এলাকার ধনাঢ্য জুয়ারিরা ভিড় করেন সেখানে। জুয়ারিদের পাশে বসে সঙ্গ দেন সুন্দরী তরুণীরা। তাদের অনেকে মডেল, অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত। এ্যালকোহল পান করে বুঁদ হয়ে থাকেন নেশায়।

স্বল্পবসনা এসব তরুণীরদের সেবা, খাবার, মদ সবকিছু মিলিয়ে ঢাকার বুকে এক ভিন্ন জগত রচনা করেছেন ক্যাসিনো মালিকরা। ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। বৈধ-অবৈধ অস্ত্র, গার্ড নিয়ে চলাফেরা করেন তারা। ঢাকার অর্ধশতাধিক ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত রয়েছেন দুই শতাধিক ব্যবসায়ী। এই তালিকা এখন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। ওই তালিকা ধরে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার আগে দীর্ঘদিন দাপটের সঙ্গে চলছিলো জুয়া। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরেই শুরু হয়েছে সাঁড়াশি অভিযান। ইতিমধ্যে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। আতঙ্কে রয়েছেন তার সহযোগীরাও। এরমধ্যেই ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিএমপি) শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ক্যাসিনোতে র‌্যাব অভিযান শুরু করেছে, পুলিশও করবে। জুয়ার বোর্ড ও ক্যাসিনোর তালিকা করা শুরু হয়েছে। ঢাকায় ক্যাসিনো মালিক ও এর সঙ্গে জড়িতরা যত প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, রাজধানীতে জুয়ার আসর বসতে দেয়া হবে না। কোথাও অবৈধ জুয়ার আড্ডা, ক্যাসিনো চলতে  দেয়া হবে না। এসব জুয়ার বোর্ড, ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কঠোর হবে। পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ যদি ক্যাসিনো ব্যবসায় জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

র‌্যাবের অভিযানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে ক্যাসিনো মালিকদের মধ্যে। ক্যাসিনো বন্ধ করে আত্মগোপনে রয়েছে জড়িতরা।
বুধবার রাত থেকে ঢাকার মোট চারটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র?্যাব। অভিযান চলে মধ্যরাত পর্যন্ত। এর মধ্যে মতিঝিলের ইয়াংমেন্স ক্লাব থেকে ২৪ লাখ ২৯ হাজার নগদ টাকাসহ ১৪২ জনকে আটক করা হয়। বনানীর আহম্মেদ টাওয়ারে অবস্থিত গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ নামক ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে কাউকে না পেয়ে সেটি সিলগালা করা হয়। মতিঝিলের ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবে অভিযান চালিয়ে ১০ লাখ ২৭ হাজার টাকা, ২০ হাজার ৫০০ জাল টাকাসহ ক্যাসিনোটি গুড়িয়ে দেয়া হয়। গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৬০০ টাকা জব্দ করা হয়। এসব অভিযানে আটক ১৮২ জনের মধ্যে ৩১ জনকে এক বছর করে এবং বাকিদের ৬ মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছেন র?্যাবের দু’জন ম্যাজিস্ট্রেট।

খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকায় কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে এক লাখ টাকা নেন তিনি। এসব ক্লাবে সকাল ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত ক্যাসিনো বসে। চলে মদ ও নারীর আড্ডা।

Wednesday, September 18, 2019

লিবিয়ায় বন্দিদশা থেকে বাংলাদেশির আর্তনাদ: আমাকে এই জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন by রুদ্র মিজান

‘আমাকে বাঁচান। আমি এই জীবনে কখনও বিদেশের নাম নেব না। আমাকে এই জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন। আমাকে ওরা মেরে ফেলবে।’ এভাবেই দেশে স্বজনদের কাছে বাঁচার আকুতি জানান বিদেশে দালাল চক্রের হাতে জিম্মিরা। প্রায় চার মাস যাবত জিম্মি তারা। রাখা হয়েছে টর্চার সেলে। এটি অন্ধকার ছোট একটি কক্ষ। সেখানে রাখা হয়েছে ১০ থেকে ১২ জনকে। রাত এলেই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে দালালরা। একেক জন করে ডেকে নেয় আলাদা কক্ষে। তারপর কান্নায় ভারি হয়ে উঠে বাতাস। বিদেশে-বিভূঁইয়ের এই কান্না চার দেয়ালেই আটকে থাকে। তবে দালালরা মাঝে-মধ্যে কান্নার শব্দ শোনায় দেশে থাকা স্বজনদের। কান্নার শব্দ শুনিয়ে দাবি করে টাকা। দাবিকৃত টাকা না দিলে হত্যা করার হুমকি দেয়। এখানেই শেষ নয় অত্যাচারের। মারধর ছাড়াও খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়। খাবার নেই, পানি নেই। দিনে একবার, কখনও কখনও এক দিন পরপর নাম মাত্র খাবার ও পানি দেয়া হয়। খেয়ে না খেয়ে শরীর শুকিয়ে হাড্ডিসার।

বিভিন্ন উন্নত দেশের কথা বলে তাদের লিবিয়ায় এনে বন্দি করে রাখা হয়েছে। দিনের পর দিন অত্যাচার করে বাড়িতে থাকা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হচ্ছে। এভাবেই লিবিয়ার টর্চার সেলে অন্যান্যদের সঙ্গে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার তারাশুলের মো. সামাজুল ইসলাম। এ বিষয়ে মানবপাচার ট্রাইবুন্যালে মামলা করেছেন তার চাচা আব্দুল কদ্দুছ। মামলা সূত্রে জানা গেছে, এলাকায় সিএনজি চালিত অটোরিকশা চালাতেন তিনি। গরীব কৃষক পরিবারের এই সন্তানকেই টার্গেট করে দালাল চক্র।  একই এলাকার গণেশপুরের নুর আলী তাকে প্রলোভন দেখায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় লক্ষাধিক টাকা বেতনে চাকরির সুযোগ রয়েছে। সেই প্রলোভনে পা দেন সামাজুল। কথানুসারেই এক মাসের মধ্যে নগদ তিন লাখ টাকাসহ ভিসার জন্য পাসপোর্ট, ছবি নুর আলীর নিকট দেন তিনি। অতঃপর গত ১৮ই মে নুর আলী তাকে জানান, সাউথ আফ্রিকার ভিসা হয়েছে। পরদিন ফ্লাইট। দ্রুত আরও দেড় লাখ টাকা দিতে হবে। এবার তাড়াহুড়া করে নিজের শেষ সম্বল সিএনজি অটোরিকশা বিক্রি করে দেড় লাখ টাকা তুলে দেন নুর আলীর হাতে।

১৯শে মে বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে শাহজালাল আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি বিমানে তুলে দেয়া হয় সামাজুলকে। জানানো হয়, দুবাইয়ের শারজাহ বিমানবন্দরে দালাল চক্রের লোকজন তাকে গ্রহণ করবে। সেখান থেকে স্থল পথে সাউথ আফ্রিকা পাঠানো হবে তাকে। স্বজনরাও তাকে বিদায় জানালেন। বিমানটি আকাশে উড়লো। সেই যে দেশ ছেড়ে গেলেন এরপর থেকে সামাজুলের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না স্বজনরা। দীর্ঘদিন তার কোনো হদিস নেই। দালাল নুর আলী, এই চক্রের সদস্য রাসেল মিয়া, রাকিব হাসান, নাসির, সুজন, জামান কেউ কোনো সন্ধান দিতে পারে না। দুশ্চিন্তায় পড়ে যান স্বজনরা। এভাবে একে একে প্রায় তিন মাস কাটে। সামাজুল বেঁচে আছে কি-না, তাও জানেন না তারা। গত ১৫ই আগস্ট হঠাৎ করেই ফোনে সামাজুলের কল। কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সামাজুল। তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার কথা বলে তাকে লিবিয়ায় আটকে রাখা হয়েছে। একটি ছোট অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে সামাজুলসহ আরও ১০-১২ জনকে। লিবিয়ায় চক্রটির হয়ে কাজ করে অ্যারাবিয়ানরা। প্রতি রাতেই বেদম প্রহার করা হয় তাদের। চক্রের সদস্যদের দাবি একটাই, টাকা চাই। দেশ থেকে টাকা নিতে চাপ দিচ্ছে তারা।

সামাজুলের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে চক্রটি। সামাজুল হাতে-পায়ে ধরে অনুনয় করেন। সামাজুল জানান, তিনি গরীব। তার মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন। সেটিও বিক্রি করে দিয়েছেন বিদেশে যাওয়ার জন্য। এখন তার কিছুই নেই। চক্রের সদস্যদের তাতে মায়া হয় না মোটেও। বরং টাকা না পেয়ে অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায়। আগুন দিয়ে রড গরম করে ছ্যাকা দেয়া হয়। লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করা হয় তাকে। নামমাত্র খাবার দেয়া হয়। কোনোভাবে বেঁচে আছেন তিনি।

সামাজুল ইসলামের বড় ভাই তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা গরীব মানুষ। সামাজুল তার শেষ সম্বল বিক্রি করে সাউথ আফ্রিকা যেতে চেয়েছিলো। দালালরা প্রতারণা করে তাকে লিবিয়া নিয়ে বন্দি করে নির্যাতন করছে। তাকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। এই অবস্থায় আমার চাচা আদালতে মামলা করেছেন। মামলা দায়েরের পর দালালরা আমার ভাইকে ছেড়ে দেবে বলে জানিয়েছে। কিন্তু এখনও সামাজুলকে ছাড়েনি। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা চেয়েছে ভুক্তভোগীর পরিবার।

Monday, September 16, 2019

হাসি হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা প্রাক্তন স্বামীর by রুদ্র মিজান

প্রাক্তন স্ত্রী হাসি আক্তার হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে সোহেল রানা। প্রেম করে সোহেলকে বিয়ে করেছিলেন হাসি। কিন্তু সোহেলের অত্যাচার-নির্যাতনে কয়েক মাসেই দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আলাদাভাবে বাঁচার চেষ্টা করেন। সোহেলকে ডিভোর্স দিয়ে একটু সুখ খুঁজছিলেন তিনি। চাকরিও নিয়েছিলেন। সময়গুলো ভালোই কাটছিলো। কিন্তু হাসিকে হাসিখুশিভাবে বাঁচতে দেয়নি সোহেল। দানব রূপে হাজির হয়েছিলো তার কাছে। তারপর কেড়ে নেয় হাসির প্রাণ। বেদম মারধরে অজ্ঞান হয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলেও মায়া হয়নি সোহেলের। ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয় হাসিকে। চাঞ্চল্যকর হাসি আক্তার হত্যা মামলার আসামি সোহেলকে রোববার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৪। কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের কাছে হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছে সোহেল।

র‌্যাব জানিয়েছে, গত ১লা মে হাসিকে হত্যা করে সোহেল। ওই দিন সকাল সাড়ে ৮টায় হাসির ভাড়া বাসায় জোর পূর্বক প্রবেশ করে সে। হাসির কাছে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করলে বেদম মারধর করে হাসিকে। চোখে এবং মাথার মারাত্বক আঘাত প্রাপ্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে ফ্লোরে পড়ে যান হাসি। সোহেলের পা ধরে জীবন ভিক্ষা চান। বাঁচার আকুতি জানান। কিন্তু মন গলে না সোহেলের। হাসির চুল ধরে

ফ্লোরের টাইলসের সঙ্গে উপর্যুপরি মাথায় আঘাত করতে থাকে। একপর্যায়ে খাটের নীচে থাকা ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়। এক পর্যায়ে আশপাশের লোকজন গুরুতর রক্তাক্ত অবস্থায় শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতলে ভর্তি করে তাকে। অবশেষে নিউরোলজী সায়েন্সের আইসিওতে লাইফ সাপোর্টে ছয় দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত ৭ ই মে মারা যান হাসি।

হত্যাকাণ্ডের চার মাস আগে সোহেল রানার সঙ্গে বিয়ে হয় হাসি আক্তারের।বিয়ের পর পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সোহেলসহ তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মনোমালিন্য দেখা দেয় হাসির। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তিনি। বাধ্য হয়েই হত্যাকাণ্ডের দুই মাস আগে সোহেলকে ডিভোর্স দেন।

বিবাহ বিচ্ছেদের পরে হাসি আক্তার মানসিক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তারপরও বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি একটি এনজিওতে চাকরি নেন। সাভার থানার আমীন বাজারের শিবপুরে নাজিম উদ্দিনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস শুরু করেন। ডির্ভোস হলেও হাসির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করে সোহেল। অফিসে যাওয়া আসার পথে উত্যক্ত করে তাকে। এমনকি টাকাও দাবি করে। এসব বিষয়ে কঠোর হলে হাসিকে হত্যার পরিকল্পনা করে সোহেল। অবশেষে বাসায় গিয়ে হাসিকে হত্যা করে সে।

এ ঘটনায় হাসির মা বাদি হয়ে সাভার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পলাতক সোহেল রানাকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।গ্রেপ্তার সোহেল রানা ব্রাহ্মনবাড়ীয়া জেলার নবীনগর থানার বিদ্যাকুট গ্রামের আবুল কাশেমের পুত্র।

Saturday, September 7, 2019

ভিন্ন কৌশলে বিদেশে থেকে মাদক ব্যবসা: বিক্রি হচ্ছে অনলাইনেও by রুদ্র মিজান

মাদকবিরোধী অভিযান হচ্ছে প্রায়ই। গ্রেপ্তার হচ্ছে মাদক বিক্রেতারা। কখনও কখনও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছে মাদক ব্যবসায়ীরা। তবুও কমছে না মাদক কারবারির সংখ্যা। ঢাকায় অন্তত অর্ধ শতাধিক শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে বহাল তবিয়তে। ভিন্ন কৌশলে মাদকের জাল বিস্তার করছে এই চক্র। অনেকে দেশের বাইরে থেকে, অনেকে কারাগারে থেকে মাদক ব্যবসা করছেন ঢাকায়। এছাড়াও মাদক কারবারিদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নারীরা।
ঢাকায় শীর্ষ মাদক কারবারিদের মধ্যে অন্তত ২০ জন নারী রয়েছেন। রাতারাতি নিজের আর্থিক অবস্থা পাল্টে দিতে অনেকেই এই ব্যবসায় সম্পৃক্ত হচ্ছেন। মাদক বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। ইতিমধ্যে মাদক কারবারিদের সম্পর্কে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে ভয়াবহ তথ্য।
সূত্রমতে, শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা অনেকেই মূল ব্যবসাস্থল থেকে দুরে থাকেন। অনেকেই বেশিরভাগ সময় থাকেন দেশের বাইরে। বাইরে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করেন ব্যবসা। একাধিক বাসা ভাড়া নিয়ে সহযোগীদের মাধ্যমে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ছড়িয়ে দিচ্ছে তারা। শীর্ষ ব্যবসায়ীদের অনেকেই প্রভাবশালী। প্রভাব খাটিয়ে এই ব্যবসা চালান তারা। ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকার কারণে প্রভাবশালীদের নামও প্রকাশ হয় না। সম্প্রতি মেধাবী অনেক তরুণ এই মরণনেশার বাণিজ্যে সম্পৃক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ধানমন্ডির বাসিন্দা হাসিব বিন মোয়াম্মার। মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন তিনি। দেশে ফিরে অল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হতে বেছে নেন অন্ধকার পথ। শুরু করেন মরণ নেশা মাদকের কারবার। মোহাম্মদপুরের রাকিবসহ অন্তত ২০ জন তরুণ-তরুণীকে দিয়ে মাদক বিক্রি করাচ্ছিলেন তিনি। বর্তমানে হাসিব কারাগারে থাকলেও ওই সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে জানা গেছে। একইভাবে কারাগারে রয়েছেন শ্যামলী-আদাবর, মোহাম্মদপুর এলাকার মাদক সম্রাজ্ঞি পাপিয়া ও তার স্বামী বাচ্চু। তাদের অবর্তমানে পলু ও সবুজ নামে দু’জন ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করছে। বছর খানেক আগে পাপিয়ার মোহাম্মদপুরের আজিজ মহল্লার বাসা থেকেই ইয়াবা বিক্রি করা হতো। এছাড়াও বেশ কয়েকটি ভাড়া বাসা ছিলো তাদের। সূত্রমতে, এখন মাদক বিক্রির জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে এসব চক্রের সদস্যরা। বিশেষ করে ইমো, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে অর্ডার নেয় এই চক্র। এমনকি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপও রয়েছে তাদের। এসব গ্রুপে ইয়াবাকে আপেল, বড়ই, আঙ্গুর, বিচি, চকলেট ইত্যাদি নামে সম্বোধন করা হয়। গ্রুপের সদস্যরা নিয়মিত মাদক সেবনকারী।
এরকম একটি গ্রুপের এক সদস্য জানান, গ্রুপগুলো পরিচালনা করে মাঠ পর্যায়ের বিক্রেতারা। শীর্ষ ব্যবসায়ীরা থাকেন আড়ালে। এরকম একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী হচ্ছেন ইসতিয়াক ওরফে কামরুল। ঢাকাসহ সারাদেশে রয়েছে তার নেটওয়ার্ক। আশুলিয়া, সাভার, উত্তরা ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় তার বাসা রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর একাধিকবার অভিযান চালিয়েও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। গত বছরের মে মাসের শেষের দিকে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হলে পালিয়ে যান অনেকেই। একটি সূত্রে জানা গেছে, এরমধ্যে ইসতিয়াকও পালিয়ে গেছে। সূত্রমতে, ইসতিয়াক বর্তমানে মালয়েশিয়াতে অবস্থান করছে। সেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তার ইয়াবা সিন্ডিকেট রয়েছে।
সূত্রমতে, রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার আর্শীবাদে মরণনেশা ইয়াবার বাণিজ্য করে ইসতিয়াক। মিরপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, শ্যামলি, সাভার এলাকায় এখনও তার লোকজন মরণনেশার বাণিজ্য করে যাচ্ছে। মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলি এলাকায় ইসতিয়াকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করে শাকিল। শাকিলের এই চক্রে রাজিয়া, মুটি সিমাসহ রয়েছে শতাধিক নারী ও কিশোর। নির্দিষ্ট ক্রেতাদের হোম ডেলিভারি দেয় এই চক্র। এই চক্রের হোতাদের মধ্যে রয়েছে জেনেভা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান গোলাম জিলানী ও শেখ মোহাম্মদ সাঈদ ওরফে মাছুয়া সাঈদ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ২০০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো জিলানীকে। আর  গত বছরের ১৮ই নভেম্বর ২০০ পিছ ইয়াবাসহ সাঈদকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
ঢাকার বংশালের ১৬৭ নবাবপুর এমএস মার্কেটে দোকান রয়েছে সাতকানিয়ার নাছির উদ্দিনের। ডেভলাপার ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত তিনি। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তার পরিচয় ইয়াবার ডিলার হিসেবে। ইতিমধ্যে তাকে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। একইভাবে এলিফ্যান্ট রোডের সেল সিদ্দিক প্লাজার বাসিন্দা আসমা আহমেদ ডালিয়া। স্যানিটারী ব্যবসার আড়ালে এই নারীও একজন ইয়াবা ডিলার। সূত্রমতে, কৌশল হিসেবে মাদক বাণিজ্যে জড়ানো হচ্ছে নারীদের। এমনকি ঢাকার শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকায় রয়েছেন অন্তত ২০ নারী। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ এলাকার চড়পাড়া কফিক্ষেত গ্রামের মাহমুদা খাতুন ও মিনা বেগম ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে ইয়াবা হোম ডেলিভারি দেয়। এছাড়াও চানখারপুরের নার্গিস আক্তার, ধামরাইয়ের বাউখন্ডের সোনিয়া বেগম, কেরানীগঞ্জের পূর্বআড়াকুলের জয়নব, বাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের মরিয়ম, কামরাঙ্গীচরের খুরশিদা ওরফে খুশি, মাদারীপুর সুইচগেটের পারভিন আক্তার, ভাটারা জোয়ার সাহারার ইতি বেগম, অঞ্জনা, মণিসহ অনেকেই এই মরণনেশার বাণিজ্যে সম্পৃক্ত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেন, প্রায়ই বিভিন্নস্থানে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। এরমধ্যে অনেক বড় ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার হচ্ছে। এর আগে যাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা ছিল না। অভিযান, সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানসহ নানাভাবে মাদক প্রতিরোধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সক্রিয় বলে জানান তিনি।

মান-ইজ্জত সব হারিয়েছেন, পরিবারেও ঠাঁই হচ্ছে না তাদের by রুদ্র মিজান

স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে গেছেন অনেক দূর। এবার জীবনের সব দুঃখ-কষ্ট ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে যাবেন সামনের দিকে। পরিবারে আনবেন সচ্ছলতা। হাসি ফুটবে সবার মুখে। সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে বিমানে উঠে আরো কত স্বপ্ন বুনছিলেন তারা। কিন্তু সব স্বপ্নই উবে গেছে আরবের মাটিতে পা রেখে। দিন যতই যাচ্ছে ততই তাদের সামনে পরিস্কার হচ্ছিল সব। বুঝতে পারছে ফাঁদে আটকে গেছে তারা।
আর আস্তে আস্তে স্বপ্নগুলো তাদের কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। মনে হয়েছে, এ যেন জাহান্নামের চেয়ে ভয়াবহ। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কেউ আলিঙ্গন করেছেন মৃত্যুকে। কেউবা মরতে গিয়েও বেঁচে গেছেন। কেউ দেশে ফিরেছেন শরীরে নির্যাতনের চিহৃ নিয়ে। শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তারা। অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে ফিরেছেন কেউ কেউ। কেউ ফিরেছেন বাচ্চা কোলে নিয়ে। বিদেশের নির্যাতনের সেল থেকে ফিরলেও মুক্তি পাননি তারা। দেশের মাটিতে এসেও শান্তি, স্বস্তি মিলছে না কিছুতেই। ‘নষ্টা, দুশ্চরিত্রা, খারাপ মেয়ে’ অপবাদ জুটছে তাদের। অপবাদ দিয়ে দুরে সরে গেছে স্বজনরা। ঠাঁই হচ্ছে না স্বামীর ঘরে। এমনকি তাড়িয়ে দিচ্ছেন মা-বাবা, ভাইয়েরাও।
সরকারি- বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার হিসেব অনুসারে নির্যাতনের শিকার হয়ে গত বছর সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরেছেন ১৩৫৩ নারী। এরমধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন ১৮ জন। অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেক নারী। গত বছর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা নারীদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই সহস্রাধিকে।
তাদের একজন তাহমিনা খাতুন। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্যই সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। সৌদি আরব থেকে ফিরে ঠাঁই পাচ্ছেন না কোথাও। নষ্টা অপবাদ দিয়ে দুরে চলে গেছেন স্বামী। একই অপবাদ দিচ্ছেন মা-বাবাও। তাহমিনা জানান, বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে মা-বাবা, স্বামী কেউ রাজি ছিলেন না। কিন্তু সংসারে স্বচ্ছলতার জন্য পরিচিত একজনের উৎসাহে বিদেশে যান তিনি। সেখানে দিনের পর দিন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিষয়টি দেশের সবাই জেনেছে। তাই এখন সবাই তাকে বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে। স্বামী তাকে ঘরে আশ্রয় দেননি। মা-বাবাও খবর নেন না। এক বান্ধবীর সঙ্গে থাকছেন করাইল বস্তিতে।
কাজ করেন একটি গার্মেন্টে। তাহমিনা জানান, গত বছর সৌদি আরব যান তিনি। রিয়াদে এক আরব ব্যবসায়ীর বাসায় ছিলেন। গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। বাসায় ওই ব্যবসায়ীর বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও তিন ছেলে সন্তান ছিলো। তাহমিনা যে কক্ষে ঘুমাতেন ওই কক্ষে কোনো দরজা ছিল না। কয়েক দিন যেতে না যেতেই শুরু হয় সমস্যা। রাতের বেলা তার কক্ষে ঢুকেন গৃহকর্তা। ঝাপটে ধরেন তাকে। শরীরের সব শক্তি দিয়ে বাধা দিয়েও ব্যর্থ হন। ধর্ষণের শিকার হন তাহমিনা। বিষয়টি পরদিন ওই ব্যক্তির স্ত্রীকে জানান। স্ত্রী উল্টো ধমক দেন। বিষয়টি কাউকে বলতে বারণ করে তা মেনে নিতে বলেন। তাহমিনা জানান, তারপর থেকে গৃহকর্তার কাছে প্রায় রাতেই ধর্ষণের শিকার হচ্ছিলেন তিনি। এরমধ্যেই এক রাতে গৃহকর্তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেজো ছেলেও পিতার মতোই তাহমিনার কক্ষে ঢুকে ধর্ষণের চেষ্টা করে। তাহমিনা চিৎকার করলে গৃহকর্তার স্ত্রী এগিয়ে যান।
এসময় ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় উল্টো তাকে মারধর করা হয়। পরের রাতে আবার তাহমিনার কক্ষে যায় ওই ছেলে। বাধা দিলে তাকে মারধর করা হয়। সে রাতে ধর্ষণের শিকার হন তিনি। তাহমিনা পালাতে চেয়েও পারেন না। দেশে স্বামীর কাছে ফোনে তাকে রক্ষা করতে অনুরোধ করেন। যেভাবেই হোক দেশে যেতে চান তিনি। স্বামী অনেক চেষ্টা করেও তাকে দেশে ফেরাতে পারছিলেন না। এভাবে কাটছিলো কয়েক মাস। যৌন নির্যাতন ছাড়াও বেতন চাইতে গেলেই তাকে মারধর করা হতো। একরাতে বাসা থেকে পালিয়ে যান। রাস্তায় এক বাঙালি শ্রমিকের সহযোগিতায় পৌঁছে যান সেইফ হোমে। কথা ছিলো তিনি বিচার পাবেন। কিন্তু বছরের পর বছর সেইফ হোমে থাকা নারীরা জানিয়েছেন বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রিতার কথা। খেয়ে না খেয়ে সেইফ হোমে থাকার চেয়ে দেশে ফিরে আসাই ভালো মনে করেছিলেন তিনি। তাই পাওনা টাকা ছাড়াই দেশে ফিরেন তাহমিনা।
নির্যাতিতাদের মধ্যে একজন ইয়াসমিন। ১৯ বছরের এই অবিবাহিতা তরুণী বিদেশে শিকার হয়েছেন যৌন নির্যাতনের। শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরেছেন একটি সন্তান নিয়ে। তারপর থেকে নিজের মা, বাবা, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন কেউ তাকে গ্রহন করেননি। অথচ এই তরুণীর কোনো অপরাধ ছিলো না। দরিদ্র পরিবারের ইয়াসমিন মা-বাবার কষ্টের ভাগ নিতে চেয়েছিলেন। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে যখন আর্থিক টানাপোড়েনে দিন কাটাচ্ছিলেন তার বাবা ঠিক তখন ইয়াসমিন সংসারের হাল ধরতে এগিয়ে যান। স্থানীয় দালাল কাশেম মিয়ার সহযোগিতায় ২০১৬ সালে জর্ডানে যান তিনি। সেখানে একটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। এরই মধ্যে জর্ডানে পরিচয় হয় মানিকগঞ্জের মেয়ে সোনিয়ার সঙ্গে। মাত্র ১৫ হাজার টাকা বেতনে গৃহকর্মীর কাজ করে জেনে সোনিয়া তাকে আরও ভালো বেতনে চাকরির প্রস্তাব দেয়। ভালো কাজ, বেশি বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে সোনিয়া তাকে নিয়ে যায় একটি বাসায়। পাঁচতলা ওই বাসায় অন্তত ২০ জন মেয়ে থাকে। বিভিন্ন দেশের পুরুষদের আনাগোনা।
এটি একটি পতিতালয়। পতিতাবৃত্তিতে ইয়াসমিন রাজি না হওয়ায় মারধর করা হয়। একপর্যায়ে জোর করে তাকে সেখানে ধর্ষণ করে কয়েক পুরুষ। এভাবেই বিদেশের মাটিতে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়। নির্যাতনে এক সময় অসুস্থ হয়ে যান ইয়াসমিন। অসুস্থ অবস্থায় তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়া হয়। দুই মাস কারাভোগের পর গত বছরের ১৭ই এপ্রিল দেশে ফিরেন তিনি। ততদিনে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ইয়াসমিন জানান, প্রথমে নিজেও বুঝতে পারেননি তিনি অন্তঃসত্ত্বা। তবে ছয় মাস পরে জানার পর তা আর নষ্ট করতে চাননি তিনি। এই অবস্থায় কেউ তাকে আশ্রয় দিতে চায়নি। নষ্টা মেয়ে বলে তাড়িয়ে দিচ্ছিলো সবাই। চেনা-অচেনা অনেকের আশ্রয়ে থাকতে হয়েছে। তবে এখন মা-বাবার সঙ্গেই আছেন তিনি। তার মা জানান, বাবার পরিচয় নেই বাচ্চার। তাই সমাজের মানুষ নানা কথা বলে। বাচ্চার বয়স হয়ে গেছে প্রায় ১০ মাস। বাচ্চাকে নিয়ে কোথাও যেতে পারে না। দেখলেই এই বাচ্চার বাবা কে, বাবা ছাড়া বাচ্চা- এরকম নানা কটুকথা শুনতে হয় তাকে। কোনো কাজ করতে পারে না। মেয়ের বাবা মাটিকাটা শ্রমিকের কাজ করেন। তার উপরই নির্ভর পুরো পরিবার।
নির্যাতিতা আরেক তরুণী লায়লা খাতুন। বাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলায় বাড়ি। নেশাগ্রস্থ স্বামী দুই সন্তান রেখে তাকে ছেড়ে চলে যায়। সন্তানদের নিয়ে কর্মহিন লায়লার অভাব যেন পিছু ছাড়ছিলোনা কোনোভাবেই। দালালের মাধ্যমে তিনি যান বিদেশে। লায়লার বয়স জাতীয় পরিচয়পত্রে ২২ বছর। কিন্তু দালাল পাসপোর্টে দেয় ২৫ বছর। এরপর দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সি নামিরা ওবারাসীজ (আর.এল-১০১৩)-এর জোগসাজেশে কোনরকম গামকার মেডিকেল চেকাপ ছাড়াই গত বছরের ২৬শে মার্চ সৌদি আরব যান। সৌদি বিমান বন্দর থেকে তাকে একজন সৌদিয়ান সারা দিন ঘুরিয়ে রাত ১০টার দিকে নিয়ে যায় একটি বাসায়। সেখানে রাতভর লায়লাকে নির্যাতন করে ৮-১০ পুরুষ। এই অবস্থায় দেশে ফিরতে চাইলে বাংলাদেশ রিক্রুটিং এজেন্সি অফিস কোনো সহযোগিতা করেনি। একপর্যায়ে পালিয়ে রাস্তায় বের হলে পুলিশ ধরে ফের মালিকের কাছে নিয়ে যায়। পুলিশকে ঘটনা খুলে বললে পুলিশ মালিকের কাছ থেকে বিমানটিকিট নিয়ে দেয়। গত ৩রা এপ্রিল দেশে ফিরেন তিনি।
দেশে আসার পর পরিবারও তাকে ভালোভাবে নিচ্ছে না। অবহেলার শিকার হচ্ছেন। একইভাবে দিনাজপুরের আয়শা ফিরতে পারছেন না মা-বাবার কাছে। বাবা কথা বলেন না তার সঙ্গে। কয়েকবার বাড়িতে গেলেও বের করে দিয়েছেন তাকে। এরকম অনেক নারীর ঠাঁই হচ্ছে না ঘরে। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের পক্ষ থেকে নির্যাতিতাতের সহযোগিতা করা হচ্ছে। কাউন্সিলিং করা হচ্ছে তাদের অভিভাবকদের। অনেকের ঠাঁই হচ্ছে, অনেকের হচ্ছে না। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম প্রধান শরিফুল হাসান জানান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা, নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন নারীরা। মানবিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এসব নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়াচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে নির্যাতিাদের স্বজনরাই তাদের আশ্রয় দিচ্ছেন না। এসব বিষয়ে তাদের কাউন্সিলিং করা হচ্ছে। পুর্নবাসনের বিষয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাদের চিকিৎসা ও বিমানবন্দর থেকে বাড়ি পৌঁছার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে ব্র্যাক।
প্রবাসে নির্যাতনের বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা)’র মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী বলেন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন সৌদিতে। সেখানকার মালিক কর্তৃক। অথচ মামলা হচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সীর বিরুদ্ধে। নির্যাতনকারীর বিরুদ্ধে সে দেশে অবস্থান করেই অভিযোগ করতে হবে। এজন্য সেইফ হোম, দূতাবাস রয়েছে। তাদের মাধ্যমে অভিযোগ করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে।
নারী শ্রমিকদের নির্যাতন ও সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসসংস্থান মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে যারা কাজ করেন তারা এখন দেশের বাইরে আছেন। তারা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসসংস্থান মন্ত্রনালয় এসব বিষয়ে অত্যন্ত সচেষ্ট বলে জানান তিনি।

Monday, August 26, 2019

চুল কাটায় নজরদারি by রুদ্র মিজান

হেয়ার ফ্যাশন নিয়ে বিপাকে তরুণরা। প্রশাসনের কড়া নজর এখন তরুণদের চুলের দিকে। নির্দেশ দিয়ে বাধ্য করে চুল কাটা হচ্ছে তরুণদের। কিভাবে চুল কাটতে হবে সেই সাজেশনও দেয়া হচ্ছে। দেশের অন্তত আটটি জেলায় ঘটেছে এ ধরণের ঘটনা। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এমনকি বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে গণমাধ্যমেও। পুলিশ সদরদপ্তরের এ ধরণের কোনো নির্দেশনা না থাকলেও বিভিন্ন থানার পুলিশ কর্মকর্তারা তরুণদের চুল নিয়ে বেশ তৎপর।
হলিউড, বলিউডের হিরো, রেসলিং খেলোয়ারসহ বিখ্যাতদের অনুকরণে চুল কাটছেন এ দেশের তরুণরা।
এই ফ্যাশনকে সহজভাবে নিচ্ছে না প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা। তাই চুল কাটা অভিযানে নেমেছেন তারা। সেলুন মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিভাবে চুল কাটতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সরগরম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সামরিক সরকারের সময়ে তরুণদের লম্বা চুল জোর করে কেটে দেয়ার গল্প নতুন করে প্রকাশ পাচ্ছে লোকমুখে। উদাহরণ দেয়া হচ্ছে এই সময়ে জোর করে চুল কাটার সঙ্গে।
গত বুধবার কুমিল্লায় তিন স্কুল ছাত্রের চুল কেটে দিয়েছে মুরাদনগর থানা পুলিশ। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ডি আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র মারুফ হোসেন, জাহিদুল ইসলাম ও ভূবনঘর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র মিজানকে আটক করা হয়। এ সময় পুলিশ তাদের চুল কেটে দেয়। পরে তাদের অভিভাবকরা এসে মুচলেকা দিয়ে তাদেরকে নিয়ে যায়।
এ বিষয়ে মুরাদনগর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) নাহিদ আহাম্মদ গণমাধ্যমকে জানান, মার্জিতভাবে চুলকেটে ও ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যেতে হবে। ইভটিজিং এবং বখাটেপনা রোধ করতে ও তাদেরকে বিদ্যালয়গামী করতে এ ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে এবং এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সম্প্রতি ফ্যাশন করে চুল না কাটতে সেলুন মালিক ও নরসুন্দরদের লিখিত নির্দেশনা দিয়েছে মাগুরা সদর থানা পুলিশ। এ বিষয়ে ব্যাপক মাইকিং, সেলুনকর্মীদের নিয়ে বৈঠকসহ নানা রকম প্রচারণা চালায় পুলিশ। সেলুন মালিকদের নির্দেশনা দেয়া হয়, কোনো সেলুনকর্মী কারও চুল কিংবা দাড়ি যেন মডেলিং ও বখাটে স্টাইলে না কাটেন। একইভাবে  রাজশাহীর বাঘায় উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ বখাটে স্টাইলে চুল কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে নরসুন্দরদের সঙ্গে বৈঠক করে।
তার আগে গত মার্চে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফ্যাশন করে চুল কাটলে সংশ্লিষ্ট সেলনুকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা ঘোষণা দিয়ে আলোচনার জন্ম দেন। পরবর্তীতে ঝালকাঠিতে তরুণদের ধরে ধরে চুল কেটে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। যদিও চুল কাটা নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর কোনো নির্দেশনা দেয়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে পুলিশকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী তাসলিমা ইয়াসমিন বলেন, এটি এক ধরণের ফৌজদারি অপরাধ। প্যানাল কোডের ৩৪১ ধারা অনুসারে বেআইনিভাবে কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। এটি শস্তিযোগ্য।  তিনি বলেন, সংবিধানে মানুষের চলার অধিকারের কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। চুল কে কিভাবে কাটবে এটা তার অধিকার। এটা নিয়ে যদি নির্দেশনা জারি করা হয় বা জোর করা হয় তা হবে সংবিধানের ৩১ ও ৩২ ধারার লঙ্ঘন। এ বিষয়ে ভুক্তভোগীরা আইনানুগ সহযোগিতা নিতে পারেন বলে জানান তিনি।

Friday, August 9, 2019

সীমান্ত পেরিয়ে আসছে অস্ত্র by রুদ্র মিজান

সীমান্ত পেরিয়ে নানা কৌশলে ঢুকছে অস্ত্র। আর এ অস্ত্র বহন করতে এক শ্রেণির গরিব লোকজনকে ভাড়া করে অস্ত্র কারবারিরা। অল্প টাকার বিনিময়ে তারা সীমান্ত পার করে নির্দিষ্টস্থানে অস্ত্র পৌঁছে দেয়। ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্ত্র পৌঁছাতে সহযোগিতা করে ভারতের লোকজন। এসব অস্ত্র প্রস্তুতের জন্য ভারতে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কারখানা। অল্প টাকাতেই এসব কারখানায় অস্ত্র তৈরি করা হয়। এই অস্ত্রের অন্যতম বাজার হচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে ঢোকার পরপরই অস্ত্রগুলো চলে যায় অপরাধীদের হাতে।
কখনও কখনও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যরা জব্দ করেন এসব অস্ত্র। অবৈধ এসব অস্ত্র সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও ডাকাতদের হাতে চলে যায়। তাছাড়াও বৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি প্রভাবশালীদের অনেকে সংগ্রহে রাখেন অবৈধ অস্ত্র।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে অবৈধ অস্ত্র সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। যশোরের দর্শনা, বেনাপোল, সাতক্ষীরার শাঁকারা, মেহেরপুর, চাপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লাসহ অন্তত ৩০টি রুট দিয়ে আমদানি করা হয় অবৈধ অস্ত্র। বিভিন্ন পণ্যের গাড়িতে করে এসব অস্ত্র আমদানি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্ত্রের বিভিন্ন অংশ আলাদা আলাদাভাবে আমদানি করা হয়। কারও কাছে স্প্রিং বা ট্রিগার, কারও কাছে শুধুই নল। এভাবেই নানা কৌশলে আমদানি করা হয় অবৈধ অস্ত্র। গত মাসে সীমান্ত এলাকায় ছয়টি বন্দুক, একটি পিস্তল, ৫৩টি ককটেল ও ৬২ রাউন্ড গুলি জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। মে মাসে দুটি পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরণের ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। একইভাবে এপ্রিল মাসে আটটি পিস্তল জব্দ করে বিজিবি।
বিজিবি’র কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে কিছু অস্ত্র আটক হলেও গোয়েন্দাদের ধারণা বেশিরভাগ চালানই বিজিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে নিয়ে আসা হচ্ছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে অস্ত্র এনে ৩০ হাজার থেকে লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।
বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ সেন্টার বিডিপিসি’র গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, দেশে অবৈধ অস্ত্র আমদানির শতাধিক সিন্ডিকেট রয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের মালিকরা অস্ত্র ভাড়া দিচ্ছেন এক শ্রেণির সন্ত্রাসীদের কাছে। যশোর, খুলনা ছাড়াও চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙ্গামাটির পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে প্রায়ই। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো আধিপত্য বিস্তারের জন্য এসব অস্ত্র ব্যবহার করছে। একইভাবে দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে অবৈধ অস্ত্র সংগ্রহ করে সন্ত্রাসীরা।
অত্যাধুনিক অস্ত্র প্রবেশের বিষয় আলোচনায় আসে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পরপরই। হলি আর্টিজানে হামলার জন্য চাঁপাই নবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে আমের ঝুড়িতে করে আনা হয় অস্ত্র। এরমধ্যে পিস্তল ও পাঁচটি একে-২২ ছিল। একইভাবে যশোরের চৌগাছা সীমান্ত দিয়ে করা আনা হয় বোমা।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে আসা বেশির ভাগ অস্ত্র তৈরি হয় ভারতে। ভারতের বিহারের রাজধানী পাটনা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বের শহর মুঙ্গেরে তৈরি হয় এসব অস্ত্র। মুঙ্গের তৈরি অস্ত্র অবৈধ পথে আসে বাংলাদেশে। গত বছরের শেষের দিকে পাচারের সময় প্রায় অর্ধশত একে-৪৭ বন্দুক জব্দ করে ভারতের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। মুঙ্গেরের চুরওয়া, মস্তকপুর, বরহদ, নয়াগাঁও, তৌফির দিয়ারা, শাদিপুরসহ বিভিন্ন গ্রামে কুটির শিল্পের মতো অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় অল্প খরচে অস্ত্র তৈরি করে বাংলাদেশের অবৈধ অস্ত্রের সিন্ডিকেটের কাছে বিক্রি করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেখানে অর্ডার দিয়ে অস্ত্র তৈরি করে অপরাধী চক্র।
এসব বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের পিআরও মুহম্মদ মোহসিন রেজা বলেন, বিভিন্ন কৌশলে অস্ত্র, চোরাচালান আমদানি করে চোরাকারবারিরা। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিজিবি অত্যন্ত তৎপর। যে কারণেই অবৈধ অস্ত্র আটক হচ্ছে বলে জানান তিনি।