Wednesday, July 1, 2026

যুদ্ধ থেকে পালাতে সাগরে ভেসে, গুলির মুখে পড়ে ইয়েমেনি তরুণের রোমহর্ষক এক যাত্রা

দ্য গার্ডিয়ানঃ আমাল সাহেলের (ছদ্মনাম) বয়স তখন ১৫ বছর। একদিন সে ও তার বন্ধুরা রাস্তায় পড়ে থাকা লম্বা একটা ধাতব টুকরা কুড়িয়ে পায়। সঙ্গে সঙ্গে তারা ভেবে নিল এর সেরা ব্যবহার কী হতে পারে: একটি তলোয়ার। একটা বছর ধরে নিজেদের মহল্লায় অদ্ভুত সব ধ্বংসাবশেষ দেখতে দেখতে ওদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল—সাহেল যেগুলোকে ‘দারুণ সব ধাতব টুকরা’ বলত।

ইয়েমেনে সাহেলের নিজের শহরে বারবার বিমান হামলার কারণে এমন ভাঙাচোরা জিনিসের স্তূপ পড়ে থাকত, গৃহযুদ্ধে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাওয়ার আগে এই শহর ছিল বেশ শান্ত।

‘আমরা জানতাম না যে এগুলো বিপজ্জনক এবং আমাদের কাছে এগুলো স্রেফ অদ্ভুত জিনিস বলেই মনে হতো,’ সাহেল বলেন। ‘(আমার) এক বন্ধু তলোয়ারের মতোই সেটি নিয়ে খেলছিল, সেটা বাতাসে শাঁই শাঁই করে ঘোরাচ্ছিল। আমাকে একটু পরেই তাদের ছেড়ে চলে আসতে হয়, কারণ আমাকে বক্সিং প্রশিক্ষণের জন্য জিমে (ব্যায়ামাগার) যেতে হতো।’

সাহেল যখন নিজের ঘরে, সে তখনই একটা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পায়।

‘কী হয়েছে দেখার জন্য আমি উল্টো ঘুরে দৌড়াতে শুরু করলাম। গিয়ে দেখি আমার বন্ধুরা রক্তে মাখামাখি এবং এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছে…ওদের একজন দৌড়ে এসে ঠিক আমার সামনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং আরেকজনের ঘাড় ফুঁড়ে গোলার একটি টুকরা গেঁথে ছিল। আমার মনে হয়, ততক্ষণে সে মারা গিয়েছিল।’

ওরা যে ধাতব টুকরাগুলো নিয়ে খেলছিল, সেগুলোর একটি ছিল আসলে এক অবিস্ফোরিত বোমা, যেটি হঠাৎ ফেটে যাওয়ায় বিস্ফোরণের কবলে পড়ে ছয়টি ছেলে।

‘আমরা গাড়ি আছে—এমন কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকলাম এবং ওদের হাসপাতালে নিয়ে গেলাম…দুই ঘণ্টা পর তারা এসে আমাদের জানাল, আমার তিন বন্ধু মারা গেছে। আমি বোধশূন্য হয়ে পড়ি, কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না।’

সাহেলের মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার চারটি অভিজ্ঞতার মধ্যে এটি ছিল প্রথম। এখন তাঁর বয়স ২৩ বছর। পরের বছরগুলোতে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহী যোদ্ধা হিসেবে জবরদস্তিমূলকভাবে সামরিক দলে যোগ দেওয়া থেকে কোনোমতে রক্ষা পান সাহেল, তাঁর ওপর গুলি চালানো হয়েছিল, এরপর ইউরোপে পালিয়ে যাওয়ার পথে তিনি প্রায় ডুবে মরতে বসেছিলেন।

অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে ইয়েমেনে বেড়ে ওঠার দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতো, বলছিলেন সাহেল। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক। সাহেল বলেন, অনিন্দ্য সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য ও চমৎকার আবহাওয়ার এই নিরাপদ ও বন্ধুভাবাপন্ন দেশটি ছিল ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের সেরা জায়গা’।

কিন্তু ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সবকিছু পাল্টে যায়। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের প্রথম দিনের কথা মনে করে সাহেল বলেন, ‘বোমার শব্দে আমি জেগে উঠতাম।’ গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধবিরতি হওয়ার আগে এই যুদ্ধে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ মারা যায়।

হুতিরা নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশের পশ্চিমে অবস্থিত তাঁর নিজের শহরটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং অস্ত্রে সয়লাব হয়ে যায়। সাহেল বলেন, ‘আমার মনে আছে, কোনো কোনো দিন বাইরে গিয়ে দেখতাম, বোমার কারণে বালু একদম কালো হয়ে আছে।’

পরের কয়েক বছর ধরে যখন যুদ্ধ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন সশস্ত্র দলগুলো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। কিন্তু সাহেল নিজের পড়াশোনায় মন দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এসব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতাম।’

নিজের একটা ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন ছিল সাহেলের। কিন্তু পার্ট-টাইম ফটোগ্রাফার ও মডেল হিসেবে কাজ করতে গিয়েই তিনি হুতিদের নজরে পড়ে যান। আর এটাই তাঁকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।

সাহেল বলেন, ‘আমরা একটা পার্কে ফটোশুটের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এমন সময় তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হয়।’ সেনারা তাঁর বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও সামরিক ঘাঁটির ছবি তোলার অভিযোগ আনে। সাহেল বলেন, ‘তারা ক্যামেরাটি কেড়ে নেয়। এমনকি (ক্যামেরার) ছবিগুলো দেখার পরও তারা আমাকে তাদের ব্যারাকে ধরে নিয়ে যায় এবং মারধর শুরু করে।’

‘তারা বারবার বলছিল যে আমি যেহেতু ইংরেজি বলতে পারি, তাই আমি নিশ্চয়ই যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে কাজ করি। আর আমি তাদের জন্যই ছবি তুলছি।’ তারা আমাকে তাদের সঙ্গে সেনা হিসেবে যোগ দিতে বলে। আমি যখন বললাম, ‘ভাই, আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমি আপনাদের কোনো কিছুর মধ্যে জড়াতে চাই না,’ তখন তারা বলত, ‘না, তার মানে তুমি শত্রুদের সঙ্গে আছ। তুমি আমাদের হয়ে লড়ছ না কেন?’

শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া হলেও সাহেলের মনে হতে লাগল তিনি যেন একজন ‘পালিয়ে বেড়ানো মানুষ’, যাকে সবাই খুঁজছে। লোকেরা বারবার তাঁর বাড়িতে আসত এবং তাঁকে সেনাদলে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দিত।

‘তারা আমাকে বলত, “তুমি খুব ভালো ও শিক্ষিত ছেলে। তুমি সুন্দর করে কথা বলতে পারো। চিন্তা কোরো না, আমরা তোমাকে যুদ্ধে পাঠাব না। আমরা তোমাকে নিরাপদে রাখব। আমরা তোমাকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পাওয়া ব্যক্তি বানাবো।” কিন্তু আমি জানতাম, তারা ১৪ বছরের ছোট শিশুদেরও ধরে নিয়ে যেত। এরপর পরিবারের কাছে তাদের লাশ ফেরত দিয়ে বলত, “সে এখন বেহেশতে আছে।” আমি আসলে মরতে চাইনি।’

২০২৩ সালে ২১ বছর বয়সে সাহেল দেশ ছাড়েন, গন্তব্য মিসর। ইয়েমেনের নাগরিকেরা ভিসা ছাড়াই যে গুটিকয়েক দেশে যেতে পারত, মিসর তার মধ্যে একটি। তিনি জানান, সেখানে যাওয়ার পর তাঁকে বারবার ইয়েমেনে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেওয়া হতো।

‘তুমি যে দেশে গেলে মারা পড়বে, এই নিয়ে তাদের কোনো দয়া নেই। তারা শুধু ফেরত পাঠিয়ে দেয়। আমার অনেক বন্ধুকেই এমন ভাগ্য মেনে নিতে হয়েছিল।’ তুরস্ক থেকে গ্রিসে যেতে মাত্র ১৫ মিনিট লাগে, এটা জানতে পেরে তিনি বন্ধুদের পরামর্শে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।

তা করতে গিয়ে সাহেলকে তৃতীয়বারের মতো মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়েছিল।

তুরস্ক থেকে নৌকায় পার হতে টাকা দেওয়ার পরও সাহেলসহ একদলকে সাঁতরে তীরে উঠতে বাধ্য করা হয়েছিল, কারণ ওই মানব পাচারকারী পাহারারত গ্রিক কোস্টগার্ডের নজর এড়ানোর চেষ্টা করছিল। ‘আমি সাঁতরে তীরে পৌঁছে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখতে পেলাম একজন লোক আর একটি শিশু পানিতে ডুবে যাচ্ছে।’

তখন সাহেল আবার পানিতে নেমে পড়েন।

‘এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। ছেলেটার বয়স ১৬ বা ১৭ হবে, কিন্তু সে বড় ও মোটা ছিল এবং সাঁতারও জানত না। সে পানিতে ভেসে থাকার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, আর বারবার আমার মাথা পানির নিচে চেপে ধরছিল…আমি ডুবে যাচ্ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না ওকে কীভাবে বাঁচাব। সেদিন আমি চোখের সামনে মৃত্যু দেখেছি। অবশেষে আমি ঘুরে ওর পেছনের দিকে চলে যাই। এরপর ওকে ঠেলতে ঠেলতে সাঁতরাতে থাকি, যাতে সে আমাকে আর ধরতে না পারে।’

শেষমেশ তীরে ফিরে আসার পর সাহেল বেঁচে ফেরা ওই দুজনসহ একদল মানুষকে টানা পাঁচ ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে পার হতে সাহায্য করেন।

সাহেলের দলটি একটি পুলিশ স্টেশনে পৌঁছায়। তিনি বলেন, তাঁদের রাস্তায় ঘুমাতে বলা হয়েছিল। সাহেল শেষ পর্যন্ত গ্রিসে তিন মাস ছিলেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে একদম অপরাধীর মতো আচরণ করা হয়েছিল। বন্ধুরা তাঁকে বলেছিলেন, ইউরোপে তিনি কখনোই আশ্রয় পাবেন না। ‘তাঁরা বলেছিলেন, যুক্তরাজ্যই একমাত্র যে দেশ, যেটি এখনো আশ্রয় দিচ্ছে।’

২০২৪ সালের শেষের দিকে সাহেল ফ্রান্সের ক্যালে শহরে যান ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার এক বিপজ্জনক যাত্রায় অংশ নিতে। ডিসেম্বরের শুরুতে যেদিন তিনি সমুদ্র পার হচ্ছিলেন, সেদিন ছিল বেশ ঠান্ডা, বৃষ্টি পড়ছিল।

সাহেল বলেন, ‘যারা এভাবে চ্যানেল পার হতে গিয়ে মারা যাচ্ছে, তাদের কথা আমি পাচারকারীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। পাচারকারী আমাকে বলল, যারা মারা গেছে তারা নাকি হিরো হতে চেয়েছিল!’ আমি ভাবলাম, মরে গেলে যাব। তবু স্বাধীন হওয়ার বড় সুযোগ যখন আছে, চেষ্টাটা অন্তত করে দেখব।’

শেষমেশ দেখা গেল, সবচেয়ে বড় বিপদটা নৌকা ডুবে যাওয়ার কারণে আসেনি, বরং এসেছিল আরেকজন পাচারকারীর সঙ্গে সাহেলের যাত্রার দায়িত্ব নেওয়া লোকটির এক ভয়ংকর মারামারির কারণে।

‘তারা বন্দুক বের করে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে লাগল। কে জানে কী কারণে তারা আমাদের মেরে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরা শুধু দৌড়াতে লাগলাম আর লুকিয়ে পড়লাম। এত গোলাগুলির পরও সেখানে কোনো পুলিশ আসেনি।’

ওই দিন সন্ধ্যায় সাহেল আরও প্রায় ৬০ জনের সঙ্গে অন্য একটি নৌকায় উঠতে সক্ষম হন। আর এবার তাঁরা ঠিকঠাকমতো যুক্তরাজ্যে পৌঁছে যান।

পৌঁছানোর পর এক অন্য রকম অনুভূতি সাহেলকে ছুঁয়ে যায়। তিনি বলেন, সেখানকার আবহাওয়া আর অভ্যর্থনায় তিনি বেশ স্বস্তি পান।

‘যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর আগে আমি বহুদিন মানুষের মুখে কোনো হাসি দেখিনি। আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছে, এমনটা অনুভব করেছিলাম। এখানে তুমি মানবতা আর দয়া খুঁজে পাবে। আমাকে আর মেরে ফেলা হবে না। আমি নিরাপদ।’

এ বছরের শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যে আইনি বৈধতা নিয়ে থাকা ও কাজ খোঁজার সুযোগ পাওয়ার পর সাহেল নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবেন। একই সঙ্গে ফেলে আসা ইয়েমেন নিয়ে বেদনাও তাঁকে পোড়ায়। সাহেলের ভাষায়, তাঁর দেশ ‘শয়তানের হাতে বন্দী এক টুকরা বেহেশত’।

‘আমি সত্যিই দেশটাকে খুব গভীরভাবে অনুভব করি। কিন্তু আমার সঙ্গে যা যা ঘটেছে, তা আমি ভীষণ ঘৃণা করি। আমি মাঝরাস্তায় গুলি খেয়ে অকারণে মরতে চাই না। আমি জগতে বড় কিছু করতে চাই এবং একজন ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চাই। আমি এই জিনিসটারই খোঁজ করছি।’

ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা তরুণ আমাল সাহেল। নিরাপত্তার স্বার্থে ছবিতে তাঁর মুখাবয়ব অস্পষ্ট করে দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা তরুণ আমাল সাহেল। নিরাপত্তার স্বার্থে ছবিতে তাঁর মুখাবয়ব অস্পষ্ট করে দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। ছবিটি দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

চাঁদে ঘাঁটি গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করছে নাসা

মাত্র কয়েক মাস আগে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা চাঁদে ঘাঁটি (মুন বেজ) গড়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তাদের প্রকল্পটি এখন বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণযান, রোভার, ছোট চন্দ্রযান এবং অন্যান্য সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে একটি বিস্তারিত কৌশল নির্ধারণ করছে নাসা।

গত মঙ্গলবার নাসা ঘোষণা দিয়েছে, তারা অ্যাস্ট্রোবোটিক, ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেস, ইনটুইটিভ মেশিনস নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৫৯ কোটি ডলার দেবে। এই অর্থের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো চারটি মিশনের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মালামাল চাঁদে পৌঁছে দেবে। এর মধ্যে অ্যাস্ট্রোবোটিকই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা দুটি মিশনের দায়িত্ব পেয়েছে।

নাসা আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, মঙ্গলে অভিযান চালানো ‘প্রমিজ’ নামের রোভারকে ভবিষ্যতে চাঁদে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার কথাও ভাবা হচ্ছে।

এসব উদ্যোগ একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এর লক্ষ্য হলো, রোবটচালিত যানবাহনের মাধ্যমে চাঁদে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা, যেন ভবিষ্যতে মানব মহাকাশচারীরা চাঁদে গেলে এই অবকাঠামোকে তাঁদের কাজ ও বসবাসের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

গতকাল মঙ্গলবার নাসাঘোষিত চুক্তিগুলো মূলত চাঁদে একটি স্থায়ী মানববসতি গড়ে তোলার বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ। সেখানে ভবিষ্যতে মহাকাশচারীরা বসবাস ও কাজ করবেন। নাসার চন্দ্রঘাঁটি কর্মসূচির নির্বাহী কর্মকর্তা কার্লোস গার্সিয়া গালান এই পরিকল্পনার প্রথম ধাপকে ‘ফেজ–১’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই ধাপ ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার।

গত মাসে নাসা এই কর্মসূচির প্রথম ধাপের আওতায় আরও কয়েকটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। পরিকল্পনার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে চাঁদে প্রথম চাপ-নিয়ন্ত্রিত আবাস নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। এর মাধ্যমে ২০৩০-এর দশকে ধাপে ধাপে চন্দ্রঘাঁটি সম্প্রসারণে নাসার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নাসার আশা, মহাকাশচারীরা চাঁদে ‘আধা স্থায়ী’ বসতিতে বসবাস ও কাজ করতে পারবেন।

মহাকাশ অভিযানের প্রতিযোগিতায় চীনকে টেক্কা দিতে নাসার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত এক দশকে চীনের মহাকাশ কর্মসূচি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা বারবার সতর্ক করে আসছেন, মহাকাশ প্রযুক্তিতে চীনের দ্রুত অগ্রযাত্রা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে ছাপিয়ে যেতে পারে।

বাধা মোকাবিলা

এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে নাসাকে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

জেফ বেজোসের মালিকানাধীন মহাকাশযান প্রস্তুতকারী সংস্থা ব্লু অরিজিন চলতি বছরের শেষ দিকে তাদের বিশাল রোবোটিক অবতরণযান ব্লু মুনের একটি প্রোটোটাইপ চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছিল। চাঁদের দক্ষিণ প্রান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। কারণ, সেখানে প্রাকৃতিকভাবে জমাট হওয়া বরফের মজুত থাকার সম্ভাবনা আছে। এই বরফ থেকে ভবিষ্যতে রকেটের জ্বালানি বা পানযোগ্য পানি উৎপাদন করা যেতে পারে।

তবে মে মাসে ব্লু অরিজিন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। তখন তাদের নিউ গ্লেন রকেটটি উৎক্ষেপণ স্থলেই হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। এতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়, যা পুনর্নির্মাণ করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। ফলে ব্লু মুন মিশনের উৎক্ষেপণ কতটা পিছিয়ে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

মঙ্গলবার নাসার চন্দ্রঘাঁটি কর্মসূচির নির্বাহী কর্মকর্তা কার্লোস গার্সিয়া গালান ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ব্লু মুন অবতরণযানকে অন্য কোনো উৎক্ষেপণযানে করে পাঠানো হতে পারে। তিনি বলেন, ব্লু অরিজিনের রকেট ও উৎক্ষেপণকেন্দ্রের কাজ যদি নাসার নির্ধারিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সংস্থাটি ‘বিকল্প ব্যবস্থা’ বিবেচনা করছে।

এদিকে নিউ গ্লেন দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজাকম্যান স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো বাধা বা সমস্যা দেখা দিলে নাসা তাদের বেসরকারি সহযোগীদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করবে।

৩০০০ কোটি ডলারের প্রশ্ন

ব্লু অরিজিন নাসার একমাত্র অংশীদার নয়। তবে তাদের ব্লু মুন অবতরণযান বেশির ভাগ রোবোটিক মহাকাশযানের তুলনায় অনেক বড়। এটি দুটি সংস্করণে তৈরি হওয়ার কথা, যার একটি মহাকাশচারী বহনের উপযোগী হবে। অপর দিকে মহাকাশযান প্রস্তুতকারী আরেক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স চাঁদে মহাকাশচারী পরিবহনের জন্য তাদের স্টারশিপ রকেট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অবশ্য, বিশাল এই যান এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি।

চাঁদের পৃষ্ঠে মালামাল পৌঁছে দিতে নাসার হাতে আরও কয়েকটি বিকল্প আছে। টেক্সাসভিত্তিক ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেস এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা পুরোপুরি সফলভাবে একটি চন্দ্রাভিযান সম্পন্ন করেছে। তাদের ব্লু গোস্ট যানটি গত বছর চাঁদের বিষুবীয় অঞ্চলের কাছে সফলভাবে অবতরণ করেছিল।

আর টেক্সাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইনটুইটিভ মেশিনস দুবার চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অবতরণযান পাঠাতে সক্ষম হলেও উভয় ক্ষেত্রেই যানগুলো অবতরণের পর কাত হয়ে পড়েছিল।

নাসার হিসাব অনুযায়ী, চন্দ্রঘাঁটি নির্মাণে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে।

এই চন্দ্রঘাঁটি নাসার আর্টেমিস কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখন পর্যন্ত এ কর্মসূচির পেছনে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার খরচ হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে একটি মনুষ্যবিহীন অভিযান এবং এপ্রিল মাসে চাঁদের চারপাশে ঐতিহাসিক মনুষ্যবাহী অভিযান সম্পন্ন হয়েছে।

পাঁচ দশকের বেশি সময় পর নাসা এখন আবার মানুষকে চাঁদের মাটিতে অবতরণ করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদে সেখানে একটি স্থায়ী বসতি গড়ে তোলাও তাদের লক্ষ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে নাসার সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘মুন বেজ’ উদ্যোগের হালনাগাদ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এ সময় ব্লু অরিজিন, লুনার আউটপোস্ট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি নতুন চন্দ্রঘাঁটি প্রকল্পের মডেল প্রদর্শন করে নাসা। ২৬ মে, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে নাসার সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘মুন বেজ’ উদ্যোগের হালনাগাদ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এ সময় ব্লু অরিজিন, লুনার আউটপোস্ট ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি নতুন চন্দ্রঘাঁটি প্রকল্পের মডেল প্রদর্শন করে নাসা। ২৬ মে, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

বিতর্ক, বিচ্ছেদ—সব ছাপিয়ে এখনো জনপ্রিয় আবেদনময়ী সেই নায়িকা by পৃথা পারমিতা নাগ

প্রকাশ ১৯ নভেম্বর ২০২৫ঃ নস্টালজিক অতীতের মুহূর্ত শেয়ার করা থেকে নিজের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলা—সব সময়ই সোচ্চার সত্তর দশকের ‘হার্টথ্রব’ জিনাত আমান। একসময়ের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া এই অভিনেত্রীর রয়েছে এক দুঃস্বপ্নের অতীত। তবে এসব পেছনে ফেলে ৭৪ বছর বয়সেও তিনি ইনস্টাগ্রামের জয় করে চলেছেন মিলেনিয়াল আর জেন-জিদের মন। নিজের বুদ্ধিদীপ্ত ও সাবলীল লেখনী দিয়ে তিনি যেভাবে সব বয়সী মানুষের কাছে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখছেন, আজকের যুগের অনেক নামী তারকাও এখনো তা আয়ত্ত করতে পারেননি। তাঁর স্মৃতিচারণামূলক এ পোস্টগুলো হয়ে উঠেছে কালের সাক্ষী। আজ এই অভিনেত্রীর জন্মদিন। এ উপলক্ষে আলো ফেলা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারে।

শুরুর গল্প
১৯৫১ সালের ১৯ নভেম্বর মুম্বাইতে জন্ম; তাঁর আগের নাম ছিল জিনাত খান। তাঁর বাবা আমানুল্লাহ খান ছিলেন একজন পাঠান মুসলিম, মা বর্ধিনী সিন্ধিয়া ছিলেন মহারাষ্ট্রের হিন্দু। আমানউল্লাহ খান ‘মুঘল-ই-আজম’ (১৯৬০) ও ‘পাকিজা’ (১৯৭২)-এর চিত্রনাট্যকার ছিলেন। আমানুল্লাহ খান তাঁর নাম সংক্ষিপ্তভাবে ‘আমান’ লিখতেন। তাই পরবর্তীকালে জিনাত তাঁর নামের শেষে আমান যুক্ত করেন মাত্র ১৩ বছর বয়সে জিনাতের মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়, যা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। স্কুল শেষ করার পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় লস অ্যাঞ্জেলেসে পড়াশোনা চালানোর জন্য যান। তবে তিনি স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারেননি। ভারতে ফিরে আসেন।

পাদপ্রদীপের আলোয় আসা
ভারতে ফিরে এসে জিনাত ‘ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ‘প্রথম প্রিন্সেস’ নির্বাচিত হন। সেই বছরের শেষ দিকে তিনি ‘মিস এশিয়া প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল’ টাইটেলও জিতে নেন। প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে তিনি এই খেতাব অর্জন করেন। টাইমস অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু মিস ইন্ডিয়া ও মিস এশিয়া প্যাসিফিক ১৯৭০ জিতিনি, আমি মিস ফোটোজেনিকও হয়েছিলাম। আমি নিজেই মেকআপ করতাম, চুল বাঁধতাম এবং পোশাক বাছতাম। সেই সময়ে কেউ সহায়তা করার ব্যবস্থা ছিল না। আমি শুধু নিজের সেরাটা দিয়েছি। এখনকার মেয়েদের বড় টিম থাকে, এটা আমি খুব পছন্দ করি।’ এই জয়ের মাধ্যমে তাঁর স্বীকৃতি মেলে এবং বলিউডে প্রবেশের পথ খুলে যায়।

অভিনয়ের যাত্রা

১৯৭০ সালে ‘দ্য ইভিল উইদিন’-এ দেব আনন্দের বিপরীতে অভিনয় শুরু করেন, যদিও সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। পরে ১৯৭১ সালে ‘হুলচুল’ ও ‘হাঙ্গামা’তেও অভিনয় করেন, কিন্তু সেগুলোও বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়।
জিনাতের পরিচিতি আসে ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ (১৯৭১)-এর মাধ্যমে। তিনি ছবিতে হিপি ও মাদকাসক্ত চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি এই ছবিতে অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর জন্য ফিল্মফেয়ার পুরস্কার ও সেরা অভিনেত্রীর জন্য বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার পান।

এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘সে সময় আমরা পরিবারসহ দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছিলাম। দেব আনন্দ যখন আমাকে দেখেন আমি তখন স্কার্ট পরে ছিলাম, পাইপ খাচ্ছিলাম। হয়তো তিনি আমার দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তিত্ব দেখে আমাকে এই চরিত্রের জন্য উপযুক্ত ভেবেছিলেন।’ এই সিনেমা তাঁকে এক রাতের মধ্যে তারকা বানিয়ে দেয় এবং সাধারণ হিন্দি নায়িকাদের থেকে আলাদা করে তোলে। এরপর তিনি ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’, ‘রোটি কাপড়া অর মাকান’, ‘আজানাবি’, ‘দেওয়াঙ্গি’—আলোচিত সব সিনেমায় কাজ করেন। ‘ইয়াদোঁ কি বরাত’ ছবিটিকে চলচ্চিত্র বিশ্লেষক কৌশিক বাউমিক ‘প্রথম আদর্শ বলিউড ছবি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। বক্স অফিসেও সাফল্য পায় এটি। এ ছাড়া তাঁর জনপ্রিয় ছবির মধ্যে রয়েছে হরে ‘রাম হরে কৃষ্ণ’, ‘কুরবানি’, ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’, ‘ডন’, ‘রোটি কাপড়া অউর মাকান’, ‘লাওয়ারিস’, ‘ধরমবীর’, দোস্তানা’, ‘হীরা পান্না’।

জিনাত নতুন নতুন চরিত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, অনেকটাই সময়ের চেয়ে এগিয়ে। তিনি ছিলেন প্রথাগত বলিউড নায়িকাদের চেয়ে আলাদা। তিনি নিজেও এটা জানতেন। ২০১৩ সালে বিবিসিকে বলেন, ‘হিন্দি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে মেয়েদের ভূমিকা খুব নির্দিষ্ট—গান গাওয়া, সুন্দর দেখা। আমিও ধীরে ধীরে মেইন স্ট্রিমে ঢুকে গিয়েছিলাম, কিন্তু ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ভাগে আমি ভিন্নধর্মী চরিত্র করেছি।’
সত্যিই তিনি সেটা করে দেখিয়েছেন।  ‘রোটি কাপড়া অউর মকান’-এ শীতল, যে প্রেমিক বেকার বলে ধনী, সুদর্শন পুরুষকে বেছে নেয়। অথবা ‘ইনসাফ কা তারাজু’তে ভরতি, ধর্ষণের শিকার নারী ন্যায়ের খোঁজে লড়াই করে। তিনি নিয়ম ভাঙতেন, পর্দায়—পর্দার বাইরে আর অনুপ্রাণিত করতেন অসংখ্য নারীকে।

সঞ্জয় খানের সঙ্গে বিয়ে ও দুঃস্বপ্নের অতীত
জীনাতের ক্যারিয়ারের শীর্ষে পৌঁছানোর সময়, ১৯৭৮ সালে তিনি অভিনেতা সঞ্জয় খানকে ভালোবেসে বিয়ে করেন। সঞ্জয় তখন ইতিমধ্যেই বিবাহিত ও চার সন্তানের পিতা ছিলেন। এই সম্পর্ক তাঁর জীবনে একটি স্থায়ী ক্ষত রেখে যায়। সে সময় খবর রটে, সঞ্জয় মুম্বাই হোটেলে তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন, যার ফলে তাঁর ডান চোখে আঘাত লাগে। এ ঘটনার পর তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। সেই ঘটনা নিয়ে জিনাত এক ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছেন, ‘এই আঘাতের কারণে আমার পাতা কেটে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছিল। চল্লিশ বছর পরে চিকিৎসাশাস্ত্রে উন্নতির পর আমি দৃষ্টি ফিরে পেয়েছি।’ যদিও জিনাত পোস্টে সঞ্জয়ের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবে ভক্তরা ঠিকই ধরেছেন এটি প্রায় ৪০ বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার দিকে ইঙ্গিত। যদিও সঞ্জয় খান একাধিকবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মাজহার খানের সঙ্গে বিয়ে
১৯৮৫ সালে জিনাত অভিনেতা মাজহার খানকে বিয়ে করেন। কিন্তু সম্পর্ক শুরুর পরেই তা টানাপোড়েনের মুখে পড়ে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি সিমি গরেওয়ালকে বলেন, ‘বিয়ের প্রথম বছরেই আমি বুঝতে পারলাম আমি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু যেহেতু আমি সবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, তাই আমি ঠিক করেছিলাম বিয়েটা টিকিয়ে রাখার।’ তাই তিনি সংসার ও দুই সন্তানের বেড়ে ওঠায় তখন মনোযোগ দেন।

জিনাত আমান বলেন, ‘বিয়ের প্রথম বছর থেকেই সম্পর্কটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ, আমি যখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম মাজহার তখন পাশে ছিলেন না। সেই সময় স্টারডাস্ট ম্যাগাজিনে একটা বড় লেখা ছাপা হলো, মাজহার অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন।’ সন্তান জন্ম নেওয়ার পর তিনি বিচ্ছেদের কথা চিন্তা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। জিনাতের ভাষ্যে, ‘আমি ভাবলাম আমার সন্তানের দিকে তাকিয়ে একটি সুযোগ দেওয়া উচিত—সবকিছু করেছি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্য।’

মাজহার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর জিনাত তাঁকে পাঁচ বছর ধরে যত্ন করে সুস্থ করে তোলেন। ‘আমি সবকিছু চেষ্টা করেছি। আমরা মুম্বাইয়ের সব হাসপাতালে ঘুরেছি। ইনজেকশন দিতে শিখেছি, ড্রেসিং করতে শিখেছি। ১৮ মাস ধরে সে তাঁর শরীরের বাইরে ব্যাগ নিয়ে বেঁচে ছিল; আমি সেই ব্যাগটি কীভাবে পরিবর্তন করতে হয় তা শিখেছি। মাজহার সুস্থ হওয়ার পর এটার প্রভাব আমার ওপর পড়ে। আমি নার্ভাস ব্রেকডাউনের খুব কাছাকাছি ছিলাম,’ বলেন তিনি।

কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর মাজহার প্রেসক্রিপশন ড্রাগের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত আর থাকতে না পেরে জিনাত বিচ্ছেদ করতে বাধ্য হন। মাজহারের মৃত্যুর পরে জিনাত জানান, তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পত্তি থেকে তাঁকে বঞ্চিত করেছেন। শুধু তাই-ই নয়, সন্তানদেরও বিরুদ্ধে যেতে প্ররোচিত করেছেন।

আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক
নিজের সেরা সময়ে জিনাত আমান ছিলেন হিন্দি সিনেমার অন্যতম প্রধান অভিনেত্রী। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের একজন তিনি। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮১ সাল মধ্যে আটবার বক্স অফিস ইন্ডিয়ার ‘শীর্ষ অভিনেত্রী’ তালিকায় ছিলেন। ২০২২ সালে তিনি আউটলুক ইন্ডিয়ার করা ‘৭৫ জন সেরা বলিউড অভিনেত্রী’র তালিকায় স্থান পান।

জিনাত অভিনয়জীবনের শুরুতে বেশ কয়েকটি ছবিতে খোলামেলা দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত ছবি ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’—তাঁর পর্দার পোশাক আর শশী কাপুরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল। ছবির ‘সাইয়াঁ নিকাস গায়ে’ গানটির দৃশ্যেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। ছবিটি মুক্তির পর সমাজের তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে। রাজ কাপুরের বিরুদ্ধে হিমাচল প্রদেশের এক ব্যক্তি মামলা করেন। অভিযোগ, ছবিটি অশালীন ও নামের মধ্যেই অশালীন আভাস আছে। অনেকেই রাজ কাপুরের বিরুদ্ধে নারীর শরীরকে ‘আধ্যাত্মিকতা’ ও ‘নির্মলতার’ আড়ালে ব্যবহার করার অভিযোগ তোলেন। সব সমালোচনা সত্ত্বেও ‘সত্যম শিবম সুন্দরম’ বক্স অফিসে দারুণ সাফল্য পায়। সময়ের সঙ্গে এটি বলিউডের অন্যতম প্রতীকী ও সাহসী সিনেমা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।

সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে সেই ছবির ক্যামেরা-টেস্টের ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘অশ্লীলতার অভিযোগ আমাকে সব সময় হাসিয়েছে। মানবশরীরে কোনো অশ্লীলতা দেখি না…রুপার সংবেদনশীলতা কাহিনির মূল ছিল না—শুধু অংশমাত্র।’

কিছু সমালোচক ও ভক্তরা মনে করেন, এসব সাহসী দৃশ্যে অভিনয় তাঁর অভিনয়-দক্ষতাকে আড়ালে ফেলে দেয়। এ বিষয়ে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘যা ঘটেছে বা যা ঘটেনি, তার জন্য আমি অনুশোচনা করি না। আমি যা হারিয়েছি, তার চেয়ে অনেক বেশি পেয়েছি। আমি আমার ক্যারিয়ারের দিকে গর্ব ও আনন্দ নিয়ে ফিরে তাকাতে পারি।’
জিনাত আমানকে অনেকে বলেন বলিউডের সবচেয়ে ‘আবেদনময়ী অভিনেত্রী’।। জিনাত অবশ্য এসব তকমা নিয়ে মাথা ঘামান না; বরং এটিকে ‘বোঝা’ মনে করেন। ২০১৯ সালের এপ্রিলে বলিউড হাঙ্গামা আমানকে ‘সর্বকালের ১০ আবেদনময়ী বলিউড অভিনেত্রী’র স্বীকৃতি দেয়।

সম্মাননা ও পুরস্কার
২০০৮ সালে জি সিনে অ্যাওয়ার্ডসে জিনাত আমানকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। ২০১০ সালে ১১তম আইফা পুরস্কারে ভারতীয় চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য পুরস্কৃত করা হয়। ২০১৬ সালে ‘টাইমলেস গ্ল্যামার ও স্টাইল আইকন’ স্বীকৃতি পান ফিল্মফেয়ার গ্ল্যামার ও স্টাইল অ্যাওয়ার্ডসে।

বলিউডে ফেরা ও ইনস্টাগ্রামে ঝড়
১৯৮৯ সালের পর থেকে তিনি সিনেমার অনুপস্থিত ছিলেন। ১০ বছর পর্দার বাইরে থাকার পর ১৯৯৯ সালে তিনি ‘ভোপাল এক্সপ্রেস’-এ অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর তাঁকে দেখা যায় ‘স্ট্রিং অব প্যাশন’, ‘লাভ লাইফ অ্যান্ড স্ক্রু আপস’-এও।
কিন্তু ২০২৩ সালে ইনস্টাগ্রামে তাঁর উপস্থিতি তাঁকে নতুনভাবে তারকাখ্যাতি ফিরিয়ে দেয়। তাঁর মজার লেখা, স্টাইলিশ লুক এ প্রজন্মের দর্শকের কাছেও তাঁকে পরিচিত করে তোলে।

৭১ বছর বয়সে ইনস্টাগ্রামে পা রাখার পর তিনি কয়েকটি ছবি পোস্ট করেন। এক নারী আলোকচিত্রীর তোলা এসব ছবিতে আরামদায়ক লিনেন জাম্পসুট পরে বসে থাকতে দেখা গেছে। ক্যাপশনে লিখেছিলেন, ‘৭০-এর দশকে ফ্যাশন আর সিনেমার জগতে পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল প্রধান। ক্যারিয়ারের এত বছরে বহু প্রতিভাবান পুরুষ আমাকে ফটো তুলেছেন, ভিডিও করেছেন। কিন্তু নারীর দৃষ্টি একেবারেই আলাদা এখানে কোনো লাইট নয়, মেকআপ আর্টিস্ট নয়, হেয়ারড্রেসার বা স্টাইলিস্ট নয়—শুধু এক রোদেলা বিকেল।’ পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। হাজার হাজার মানুষ শেয়ার করেছেন তাঁর কথাগুলো, প্রশংসা করেছেন—কীভাবে সহজভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ শুরু করেছেন তিনি। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, যাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময় চার দশক আগে পেরিয়ে গেছে, তিনি জেন–জিসহ নতুন প্রজন্মের মন জয় করে ফেলেছেন মুহূর্তেই। এমনকি মিলেনিয়ালরাও, যারা সাধারণত ছোট ভিডিও আর মিম-ভাষায় কথা বলে, মুগ্ধ তাঁর লেখার গভীরতায়।

ইনস্টাগ্রাম উপস্থিতি তাঁকে নতুন প্রজেক্টে যুক্ত করে। তিনি নেটফ্লিক্সের ‘দ্য রয়্যালস’ সিরিজে তাঁকে রাজমাতার লুকে দেখা গেছে। সবশেষ তিনি করেছেন ‘বান টিকি’ সিনেমা; যেখানে আরও ছিলেন শাবানা আজমি ও অভয় দেওল।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, লাইফস্টাইল এশিয়া, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও বিবিসি অবলম্বনে

বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্যে জিনাত আমান। কোলাজ
বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্যে জিনাত আমান। কোলাজ

ফুসফুসের রোগ সিওপিডি সম্পর্কে যা জানা দরকার by ডা. মো. জাকির হোসেন সরকার

প্রতিবছর নভেম্বরের তৃতীয় বুধবার পালিত হয় বিশ্ব সিওপিডি দিবস। ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি দীর্ঘস্থায়ী বায়ুপ্রবাহে বাধা প্রদানকারী ফুসফুসের রোগ।  গতবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘শ্বাসকষ্ট দেখলে সিওপিডির কথা ভাবুন’।

সিওপিডি প্রতিরোধ ও চিকিৎসাযোগ্য, বিশেষত যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হয়। সঠিক চিকিৎসা, ফুসফুসের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, পুষ্টিসহায়তা, প্রতিষেধক টিকা ও ধূমপান ত্যাগ করে এ রোগে আক্রান্ত অনেক মানুষ সক্রিয় ও পরিপূর্ণ জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারেন।

কীভাবে বুঝবেন, কেন হয়

সিওপিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, এমনকি দীর্ঘ সময় কথা বলার মতো দৈনন্দিন কাজেও রুদ্ধশ্বাস অনুভব করেন। রোগটি ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে খেয়াল না–ও হতে পারে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে রোগ নির্ণয় করা হয়।

ধূমপান সিওপিডির সবচেয়ে সাধারণ কারণ, তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। কর্মক্ষেত্রে বায়ুদূষণ, পরোক্ষ ধোঁয়া, ধুলা, ধোঁয়া ও রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শে থাকাও ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, বংশগত কারণের ভূমিকাও থাকে।

সচেতনতা জরুরি কেন

বিশ্বব্যাপী লাখো মানুষ সিওপিডিতে আক্রান্ত। অনেকেই যে রোগটিতে আক্রান্ত, সেটা তাঁরা নিজেরা জানেন না। প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেলে জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটির অগ্রগতি ধীর করে দেওয়া যায়।

শ্বাস-প্রশ্বাসের সামান্য অস্বস্তিও দৈনন্দিন কাজকর্ম, ঘুমের মান, মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলে। তামাকজাত পণ্য পরিহার, দূষণের সংস্পর্শ কমানো ও ফুসফুসের জন্য স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখা ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

এ রোগ উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি করে। সামাজিক কার্যকলাপকে সীমিত করতে পারে। তাই আগেই সচেতন হতে হবে।

করণীয়

সিওপিডি হলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলুন। চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যায়াম করুন। মানসিক চাপ মোকাবিলা করতে সাহায্য নিন। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকুন। বাড়িতে বায়ুদূষণ যেন না হয়, তা নিশ্চিত করুন।

অতিরিক্ত ওজন হলে তা কমান। দৌড়, হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার এমনকি জিমে যাওয়ার মাধ্যমে সক্রিয় থাকুন। সিওপিডি দ্রুত ও সহজে নির্ণয় করা হয় না। কারণ, এর প্রাথমিক লক্ষণকে ‘স্বাভাবিক বার্ধক্য’, ‘ফিটনেসের অভাব’ বা ‘ধূমপানের কারণে কাশি’ বলে ভুল করা হয়।

অনেকে শ্বাসকষ্টে অভ্যস্ত হয়ে যান, বুঝতেও পারেন না যে রোগটি হয়েছে। এই বিলম্বের কারণে রোগটি নির্ণয় করতে করতে ফুসফুসের ক্ষতিও অনেক বেড়ে যায়।

* ডা. মো. জাকির হোসেন সরকার, সভাপতি, বাংলাদেশ ইন্টারভেনশনাল পালমোনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার অ্যান্ড স্লিপ সোসাইটি (বিপস)

ফুসফুসের রোগ সিওপিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, এমনকি দীর্ঘ সময় কথা বলার মতো দৈনন্দিন কাজেও রুদ্ধশ্বাস অনুভব করেন
ফুসফুসের রোগ সিওপিডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, এমনকি দীর্ঘ সময় কথা বলার মতো দৈনন্দিন কাজেও রুদ্ধশ্বাস অনুভব করেন। ছবি: ফ্রিপিক