Wednesday, May 6, 2015

নবরূপে রাহুল, হাতিয়ার মোদির জমিনীতি by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

খুব অল্প দিনের ব্যবধানে ভারতীয় রাজনীতিতে বেশ কয়েকটা ঘটনা ঘটল। পুরোনো জনতা পরিবারের ছয়টি দল আলাদা আলাদা করে ঘর না করে যৌথ পরিবারের শরিক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা সবাই একজোট হয়ে একটি দল গঠন করছে। মুলায়ম সিং যাদব সেই দলের প্রধান নেতা। পুরোনো দল গুটিয়ে এই নতুন দলে এসেছেন লালু প্রসাদ, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার ও শরদ যাদব, হরিয়ানার ওম প্রকাশ চৌটালা, কর্ণাটকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া ও কমল মোরারকা। দ্বিতীয় ঘটনাটা সিপিএমে। কট্টরপন্থী প্রকাশ কারােতর জায়গায় দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন নরমপন্থী সীতারাম ইয়েচুরি। ঠিক ওই সময়েই দিল্লির শাসক দল আম আদমি পার্টি (এএপি) তাদের গৃহবিবাদের অবসানে দল থেকে বের করে দিল যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্ত ভূষণসহ চার শীর্ষ নেতাকে। চতুর্থ ঘটনাটিও পিঠোপিঠিই। প্রায় দুই মাসের অজ্ঞাতবাস শেষে কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী দেশে ফিরলেন এবং দিন কয়েকের মধ্যেই যেন কংগ্রেসের মরা গাঙে বান এল। চারটি ঘটনাই ভারতীয় রাজনীতিতে গভীর অর্থবহই শুধু নয়, এই ঘটনাগুলোর কুশীলবেরা সবাই রাজনৈতিকভাবে ভারতের শাসক দল বিজেপির ঘোরতর বিরোধী।
যে ঘটনাগুলোর কথা বলা হলো, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক রাহুলের ফিরে আসা, যা মৃতসঞ্জীবনী সুধার মতো কংগ্রেসকে আচমকাই চনমনে করে তুলেছে। বাকি ঘটনাগুলোও ক্রমেই দেশের রাজনৈতিক মেরুকরণের ছবি নতুনভাবে আঁকতে সাহায্য করবে। আপাতত এটুকু বলা যেতে পারে, নরেন্দ্র মোদির সরকারের মধুচন্দ্রিমার দিন এই ঘটনাগুলোর সঙ্গেই শেষ হলো।
যে ছয় দল একজোট হলো, সেগুলোর মধ্যে মুলায়মের সমাজবাদী পার্টির রমরমা উত্তর প্রদেশে, লালু প্রসাদের রাষ্ট্রীয় জনতা দল ও নীতিশ-শরদ যাদবের জনতা দলের (সংযুক্ত) শক্তি প্রধানত বিহার ও ঝাড়খন্ডে, চৌটালার লোকদলের বিক্রম হরিয়ানায় এবং দেবগৌড়ার জনতা দলের (ধর্মনিরপেক্ষ) প্রতিপত্তি কর্ণাটকে। কমল মোরারকার সমাজবাদী জনতা পার্টির দাপট অবশ্য সেই অর্থে কোথাও নেই। বিহারে এই বছরের অক্টোবর মাসে বিধানসভার ভোট। লালু-নীতিশ-শরদের সঙ্গে সেখানে ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসও জোটবদ্ধ। বিজেপিকে এই জোট গত লোকসভা ভোটে ভালোমতোই বেগ দিয়েছে। এককাট্টা হয়ে লড়লে এবং মুলায়ম-চৌটালার সক্রিয় সমর্থন পেলে রাজ্য বিধানসভা নীতিশ দখলে রাখতে পারেন। এটা নতুন এই দলের (যে দলের নাম ও প্রতীক অবশ্য এই লেখার সময়েও ঠিক হয়নি) কাছে যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনই চ্যালেঞ্জ নরেন্দ্র মোদির কাছেও।
সিপিএমে সীতারামের আমল যে শুরু হতে যাচ্ছে তা মোটামুটি নিশ্চিতই ছিল। তবু পার্টিটা যেহেতু সিপিএম, তাই না আঁচানো পর্যন্ত কোনো কিছুই সেখানে বিশ্বাস নেই। প্রকাশ কারােতর সঙ্গে সীতারামের রাজনৈতিক অমিল বহু চর্চিত। কংগ্রেস ও বিজেপি দুই দলের সঙ্গেই সমদূরত্ব রেখে কারাত বাম শক্তিদের ঐক্যবদ্ধ করায় বরাবর বেশি আগ্রহী ছিলেন। সীতারামও সেই নীতি অনুসরণ করতেন। তবে তিনি মনে করেন, বিজেপি ও কংগ্রেস দুটি দলই খারাপ হলেও বিজেপি বেশি খারাপ, কংগ্রেস কম। বিজেপি বেশি খারাপ কারণ, তারা সাম্প্রদায়িক। কংগ্রেস অন্তত সাম্প্রদায়িক দল নয়। ‘সাম্প্রদায়িক’ বিজেপিকে রুখতে তাই কংগ্রেসকে পাশে রাখা দরকার। আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তির কারণে বামেরা যখন ইউপিএ থেকে বেরিয়ে আসে, সীতারাম তখন সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু প্রকাশদের মতো কট্টরদের গোঁয়ের সামনে তাঁর মতো নরমপন্থীদের পিছু হটতে হয়েছিল। আজ সেই সিপিএমের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে সীতারাম আসীন।
এই লেখাটি লেখার সময় আমার খুব মনে পড়ছে বন্ধু সৈফুদ্দিন চৌধুরীর কথা। দিল্লিতে দিনে দিনে আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়। লোকসভায় সিপিএমের সদস্য হিসেবে সৈফুদ্দিন ক্রমেই দাগ কাটতে লাগলেন এবং শাসক কংগ্রেসের সমীহ আদায়ে সফল হলেন। বাবরি মসজিদ আন্দোলনের সময় থেকে সৈফুদ্দিন যখন সাম্প্রদায়িকতার ঝাপটানির বিপদ অনুধাবন করতে থাকেন, তখন থেকেই তাঁর চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন শুরু। দলে তিনিই প্রথম অনুধাবন করেন, প্রয়োজনে বিজেপিকে রুখতে কংগ্রেসকে সঙ্গ দেওয়া দরকার। তাঁর কথায়, ‘বিজেপি গ্রেটার ইিভল, কংগ্রেস লেসার ইিভল। বড় বিপদকে রুখতে কম বিপদকে সঙ্গে নিতে হবে।’ সেই সময় সৈফুদ্দিনের ওই রাজনৈতিক লাইন সিপিএম গ্রহণ করেনি। তাঁর সঙ্গে ক্রমেই দলের দূরত্ব বাড়ল এবং একসময় তিনি দলত্যাগে বাধ্য হলেন। তাঁর বিতাড়নে প্রকাশ-সীতারাম হাত মিলিয়েছিলেন। সৈফুদ্দিনকে ক্যানসার হারিয়ে দিলেও সিপিএম শেষ পর্যন্ত তাঁর নীতিই যে আঁকড়ে ধরেছে, মৃত্যুর আগেই তা তিনি দেখে যেতে পেরেছিলেন।
সীতারামের উত্থান এবং রাহুল গান্ধীর ফিরে আসা প্রায় একই সময়ে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সংসদের বাজেট অধিবেশন শুরুর ঠিক আগেই রাহুল গা-ঢাকা দিলেন। তাঁর দপ্তর থেকে বলা হলো, দুই সপ্তাহের জন্য তিনি জনজীবন থেকে ছুটি নিয়েছেন রাজনৈতিক আত্মানুসন্ধানের জন্য। তখন থেকেই শুরু জল্পনার, কী হলো, রাহুল গেলেন কোথায়? কংগ্রেসের কেউই এর কোনো স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি বা চাননি। আজও কেউ জানেন না উনি কোথায় ছিলেন। আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে কিছু কিছু বিষয়ে বেশ ঢাক ঢাক গুড় গুড় রয়েছে। যেমন, অসুস্থতা। নেতাদের নাকি অসুস্থ হতে নেই। অসুখ হলেও কী অসুখ তা নিয়ে কেউ কিছু বলতে চান না। তাতে নাকি দর কমে যায়। সোনিয়া গান্ধীর অসুখটা যে ঠিক কী, যার জন্য তাঁকে আমেরিকার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল এবং এখনো মাঝে মাঝে ‘চেকআপ’ করাতে যেতে হয়, তা কেউ জানে না। শরদ পাওয়ারের যে মুখে ক্যানসার হয়েছিল তা জানা যায় অস্ত্রোপচারের পরে। মুলায়ম সিং যাদবকে নাকি পারকিনসন্স রোগে ধরেছে। কিন্তু তিনি নিজে কিছু বলেন না। অটল বিহারি বাজপেয়িও যত দিন পারা যায় অসুস্থতা চেপে ছিলেন। রাজনৈতিক নেতাদের শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে সবকিছু জানার কোনো অধিকারই কেন জানি এ দেশের আম আদমির নেই। আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল পর্যন্ত তাঁর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। জননেতা হলেও রাহুল কোথায় ছিলেন এই দুই মাস, তা জানার অধিকার যেন জনতার থাকতে নেই।
অবশ্য সেই আগ্রহ ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে নেতা রাহুলের প্রত্যাবর্তন। দেশে ফেরার তিন দিনের মাথায় দিল্লির রামলীলা ময়দানে সরকারের কৃষিজমি অধিগ্রহণ নীতির বিরোধিতা করে কংগ্রেস যে কৃষক সমাবেশের আয়োজন করে, তা ছিল রাহুলের দ্বিতীয় ইনিংসের গোড়াপত্তন। সেদিন রাহুলের ভাষণ, মঞ্চে তাঁর আচরণ (মনমোহন সিংকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিয়েছিলেন, সব বয়স্ক শীর্ষ নেতা নামার পর নিজে মঞ্চ ছেড়েছিলেন) এটুকু বুঝিয়ে দেয়, এ এক নতুন রাহুল। ঠিক পরের দিন সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বের শুরুতে জমি অধিগ্রহণ বিল নিয়ে সরকারকে তুলাধোনা করলেন। প্রতিদিন নিয়ম করে সংসদে হাজিরাই শুধু দিচ্ছেন না, বিভিন্ন বিষয়ে সরকারকে বিদ্ধ করছেন। এত বছর এই রাহুলকে কেউ দেখেনি। সাংসদ হিসেবে গত ১০ বছরে যাঁর কোনো ভূমিকাই প্রায় ছিল না, অজ্ঞাতবাস শেষে কোনো এক জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় তিনি এখন অন্য নেতা। ইন্টারনেটের স্বাধীনতা রক্ষায় তাঁর ভাষণ, সেই ভাষণ শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসার নামে ব্যজস্তুতি (মোদিকে কৃষকবিরোধী ও শিল্পপ্রিয় বুঝিয়ে দেওয়া), সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের কাছে নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া, সেখান থেকে কৃষকের আত্মহত্যার খবর পেয়ে হাসপাতালে যাওয়া—সবকিছুই কংগ্রেসিদের বিরাটভাবে আশ্বস্ত করছে। তাঁরা এটুকু অন্তত বুঝতে পারছেন, রাহুল আগের খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। এখন তিনি আগের তুলনায় অনেক ‘প্রো-অ্যাক্টিভ’। এই বোধোদয় কদিনেই কংগ্রেসকে অদ্ভুতভাবে চনমনে করে তুলেছে। এ যেন বন্য বাইসনের গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর মতো।
ঐতিহাসিকভাবেই কংগ্রেসের রাজনৈতিক অবস্থান ‘লেফট টু দ্য সেন্টার’। জওহরলাল নেহরু সমাজবাদের রাস্তায় হেঁটেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীও কমিউনিস্ট পার্টিকে কোল পেতে দিয়েছিলেন। সমাজতান্ত্রিক ভাবনা থেকেই ইন্দিরার ব্যাংক জাতীয়করণ, কয়লাখনি রাষ্ট্রীয়করণ। বিজেপিকে রুখতেও কংগ্রেস বামপন্থীদের ও বামপন্থীরা কংগ্রেসকে কোল পেতে দিয়ে আসছে। সীতারাম ইয়েচুরির উত্থান কংগ্রেস-বামপন্থীদের কাছাকাছি আসার এই প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে দেবে। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতৃত্ব বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসকে রুখতে (তাঁরা মনে করেন, মোদি-মমতা একটা অলিখিত চুক্তি হয়েছে, যা সারদা কেলেঙ্কারি থেকে মমতা ও রাজ্যসভায় গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের ক্ষেত্রে মোদিকে সাহায্য করবে) মাস কয়েক ধরেই বামপন্থীদের সঙ্গে জোট বাঁধার জন্য তদবির করে আসছেন। সীতারামের ক্ষমতায়ন সেই দাবিকে আরও জোরালো করবে। সংসদের ভেতর ও বাইরে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সমন্বয় ক্রমেই বাড়ছে। সীতারাম রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার পর সব দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর দলের বোঝাপড়া অনেকটাই বেড়ে গেছে। বিজেপিকে রুখতে রাহুল-সীতারাম জুটির যুগলবন্দী আগামী দিনে অন্য রাজনৈতিক অনুঘটকের কাজ করতে পারে।
কংগ্রেসের দুর্বলতাই দিল্লিতে আম আদমি পার্টির জন্ম দিয়েছে। সেই দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চার শীর্ষ নেতার বহিষ্কার এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালের একগুঁয়ে আচরণ এই দলটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। তাদের ডাকা বিক্ষোভ সমাবেশে এক কৃষকের আত্মহত্যা সাধারণ মানুষের মনেও অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসক হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল এখনো আহামরি এমন কিছু করতে পারেননি, যাতে আর পাঁচজনের চেয়ে তিনি নিজেকে আলাদা দাবি করতে পারেন। রাহুলের গা ঝাড়া দিয়ে ওঠা তাঁর কাছে অশনিসংকেত। রাহুলের জমি-আন্দোলনকে কেজরিওয়ালও তাই হাতিয়ার করতে উঠেপড়ে নেমেছেন।
জমি বড় বিষয়বস্তু। জমি বড়ই স্পর্শকাতর। মমতার জমি আন্দোলনেই ৩৪ বছরের বাম মৌরসি পাট্টা পশ্চিমবঙ্গ থেকে উৎপাটিত। রাহুল গান্ধী সেই জমিকেই হাতিয়ার করে বিজেপির বিরুদ্ধে কোমর কষে নেমেছেন। নিরাপত্তার ঘেরাটোপ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আয়েশের দিনকে পেছনে ফেলে তিনি যদি রাজ্যে রাজ্যে এভাবে রাস্তায় নামেন, মোদি সরকারের জমিনীতি কংগ্রেসের হারানো জমি ফেরত দিতে তাহলে দেরি করবে না।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

মজুরের দেশে মজুরই কেউ না! by আনু মুহাম্মদ

আট ঘণ্টা কাজের অধিকার এখন বিশ্বে এমনভাবে স্বীকৃত যে তাকে স্বতঃসিদ্ধ বলেই মনে হয়। কিন্তু এই অধিকার মানুষ এমনি এমনি পায়নি। এর জন্য অসংখ্য মানুষের শ্রম, ঘাম, মেধা কাজ করেছে; অনেক মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। এত বছর পরও আট ঘণ্টা কাজ করে বাঁচার মতো মজুরির অধিকার প্রতিষ্ঠা থেকে বাংলাদেশ অনেক দূরে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নেহাত টিকে থাকতেও শুধু আট ঘণ্টার বেশি কাজ করলেই হয় না, শিশুসহ পরিবারের একাধিক সদস্যকে কাজে যোগ দিতে হয়। এ ছাড়া মজুরিবিহীন শ্রমের অস্তিত্ব আছে, আছে নারীর অস্বীকৃত শ্রম। আইএলও কনভেনশনে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করলেও তার থেকে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার এখনো অনেক দূরে।
ইউরোপে শিল্পবিপ্লবকালে একদিকে যেমন পুঁজিপতি একটি শ্রেণি হিসেবে তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে শ্রমিক শ্রেণি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় একই চিত্র ছিল। কাজের সময় কিংবা মজুরির তখন ঠিক ছিল না। ক্রমেই নারী-শিশুসহ শ্রমিকদের অবর্ণনীয় জীবন পরিবর্তনের জন্য অসংখ্য প্রতিবাদ-বিক্ষোভ তৈরি হয়। সংগঠন গড়ে ওঠে। এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়ই ১৮৮৬ সালের মে মাসের ১ তারিখে তিন লক্ষাধিক শ্রমিকের ধর্মঘটের মধ্যে শিকাগো শহরের বড় সমাবেশে হামলা হয়। গুলিতে মৃত্যু ছাড়াও পরে সংগঠকদের ফাঁসিও দেওয়া হয়। জীবনদান বৃথা যায়নি। সারা বিশ্ব তাঁদের দাবি গ্রহণ করেছে। বিশ্বের কয়েকটি বাদে প্রায় সব দেশে এই দিবস এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা জন্ম থেকেই এই দিবস পালন করছে। অবশ্য যে দেশে ‘মে দিবসের’ জন্ম, সেই যুক্তরাষ্ট্রে এই দিবস ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় দিবসটি পালিত হয় না। সেখানে সেপ্টেম্বর মাসে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয় শ্রম দিবস।
সংখ্যার বিপুল গরিষ্ঠতা বিবেচনা করলে অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশও শ্রমিক বা মজুরের দেশ। শ্রমিক বলতে প্রথমে শিল্পশ্রমিকের ধারণা মাথায় এলেও শ্রমজীবী মানুষের বিস্তৃতি আরও অনেক বেশি। শ্রমিক বা মজুর বলতে সেই মানুষকেই বোঝায়, যিনি তাঁর শারীরিক মেহনত বা শ্রমশক্তি বিক্রি করে জীবন ধারণ করেন। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে তো বটেই, বিশ্বের সব অঞ্চলেই পুঁজির ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার কাছে শ্রমশক্তি বিক্রির মানুষ, অর্থাৎ মজুরেরও বিস্তার ঘটে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বহুদূর। সে জন্য শুধু শিল্প খাতের মধ্যেই শ্রমিক পরিচয় সীমাবদ্ধ রাখলে পুঁজির আধিপত্য ও ক্রিয়ার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। প্রযুক্তি বিকাশের মধ্য দিয়ে শ্রমশক্তি বিক্রেতাদের মধ্যে বহু ধরন তৈরি হয়েছে। এই বিবেচনায় শ্রমশক্তি ও মেধাশক্তি পুঁজির কাছে বিক্রি করে উদ্বৃত্ত মূল্য সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছেন—এ রকম নারী-পুরুষের সংখ্যাই সমাজে ৯৯ শতাংশ। ‘আমরা ৯৯%’ স্লোগান দিয়ে বিশ্বজুড়ে এই পরিচয়ই নতুনভাবে নির্মিত হচ্ছে।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনো কৃষিশ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। জাতীয় আয়ে কৃষির অনুপাত অনেক কমে এলেও দুই কোটিরও বেশি নারী-পুরুষ কৃষির সঙ্গেই যুক্ত। পোশাকশিল্পসহ ছোট-বড় সব কারখানার হিসাব ধরলে শিল্পশ্রমিকদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭২ লাখ। অর্থনীতির গতির ধরনের কারণে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের সম্প্রসারণ বাড়ছে, আর বাড়ছে তাতে যুক্ত মানুষের সংখ্যা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানে কর্মরত শ্রমিকদের সংখ্যা এখন প্রায় ৮৫ লাখ। রিকশা-ভ্যানসহ পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪৫ লাখ শ্রমিক। নির্মাণশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। নতুন প্রযুক্তির খাত যেমন: মোবাইল, আইটিসহ বাণিজ্যিক, শিক্ষা, চিকিৎসা—সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন স্তরের মজুরদের সংখ্যা বেশি, তবে তাঁদের পরিচয় অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকা দেওয়া। প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুঁজির বিপরীতে লোকজন অসংগঠিত, অস্থায়ী, অস্বচ্ছ কর্মশর্তে নিয়োজিত।
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের কারখানায় যত শ্রমিক নিয়োজিত, প্রায় একই সংখ্যক বাংলাদেশি এখন শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মরত আছেন। তাঁদের কাজের ক্ষেত্রও অনিশ্চিত, নির্যাতন ও প্রতারণায় ভরা। বাংলাদেশে বেশ বড় বৈদেশিক মুদ্রার মজুত তৈরি হয়েছে এখন, এর পেছনে মূল অবদান যে পোশাকশ্রমিক ও বিদেশে কর্মরত সোয়া কোটি শ্রমিক নারী-পুরুষের, তাঁদের জীবনই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। রানা প্লাজা থেকে শুরু করে বিদেশ থেকে আসা লাশের সারি আর অসংখ্য পরিবারের আহাজারি এই সত্যই স্পষ্ট করে।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে শিল্প খাতের অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ধারাবাহিকতা যেমন আছে, তেমনি গুণগত কিছু পরিবর্তনও দেখা যায়। যেসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে আছে: (১) বাঁচার মতো মজুরির তুলনায় প্রকৃত মজুরি অনেক কম; (২) ট্রেড ইউনিয়নের অধিকারবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক, ৫ শতাংশের কম; (৩) মোট উৎপাদন মূল্যে অনুপাত অনেক কম হলেও ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিকদের অবস্থান; (৪) তালিকাবিহীন বহুসংখ্যক কারখানায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিকের অবস্থান।
পাশাপাশি শিল্পশ্রমিকদের মধ্যে যেসব ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন দেখা যায়, সেগুলো হলো: (১) শিল্পশ্রমিকদের লিঙ্গীয় গঠনে পরিবর্তন। আশির দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত শ্রমিকদের মধ্যে নারী শ্রমিকদের অনুপাত ছিল অনুল্লেখ্য। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প ছাড়া নারী শ্রমিকদের দেখা যেত না। কিন্তু এখন মোট শিল্পশ্রমিকদের প্রায় ৫০ শতাংশ নারী। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প ছাড়াও গার্মেন্টসসহ রপ্তানিমুখী কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের অনুপাত ৮০ শতাংশ। (২) শ্রমিকদের প্রধান ক্ষেত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থানান্তরিত হয়েছে। (৩) আগে শিল্প খাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকার কারণে শ্রমিক আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এসব প্রতিষ্ঠান। আদমজী পাটকলসহ সেসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা ব্যক্তিমালিকানাধীনে হস্তান্তরিত হওয়ার পর শ্রমিক সংগঠন ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বড় রকমের ছেদ পড়েছে। (৪) ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থায়ী কাজের অনুপাত খুব কম। বহু প্রতিষ্ঠানে স্থায়ীভাবে কোনো নিয়োগই দেওয়া হয় না। বহু প্রতিষ্ঠানেই নিয়োগ দেওয়া হয় চুক্তিভিত্তিক বা দৈনিক ভিত্তিতে। জাতীয়ভাবে ন্যূনতম মজুরি নির্দিষ্ট না থাকায় এসব কারখানায় মজুরি স্তর অনেক নিচে, স্থায়ী নিয়োগ না হওয়ার কারণে মজুরি নিয়ে দর-কষাকষি বা আইনি লড়াইয়ের সুযোগ নেই। (৫) রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন প্রধানত সরকার ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠীই ব্যবহার করেছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই অধিকার আরও সংকুচিত হয়েছে।
দেশব্যাপী পুরোনো রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের আন্দোলনের ব্যাপক শক্তি সমাবেশের সর্বশেষ ঘটনা ঘটে ১৯৮৪ সালের মে মাসে। এরপর শ্রমিক আন্দোলন মালিক শ্রেণির রাজনীতির অধীনস্থ হয়ে যাওয়ার কারণে আন্দোলন, সংগঠন ও যৌথ মঞ্চ—সবই ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। তা ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গীর অনেকগুলো বড় কারখানা এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের আন্দোলনের পুরোনো কেন্দ্রগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়ে। এসব কারণে পরবর্তী সময়ে পুরোনো সংগঠন ও শিল্পশ্রমিকদের নিয়ে বড় কোনো আন্দোলন দেখা যায়নি। শ্রমিক আন্দোলনের দৃষ্টিগ্রাহ্য বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় এর প্রায় ২০ বছর পর, সম্পূর্ণ নতুন এক ক্ষেত্রে, পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে। তাঁদের এই আন্দোলনের সঙ্গে আশির দশক পর্যন্ত পরিচালিত শ্রমিক আন্দোলনের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
শিল্পশ্রমিকদের মধ্যে বর্তমানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র এই পোশাকশিল্প। গত ১০ বছরে শিল্পশ্রমিক আন্দোলনের প্রধান বা প্রায় একমাত্র তৎপরতা এই খাতেই দেখা যায়। এই আন্দোলন বেশির ভাগ সময় কোনো নির্দিষ্ট কারখানা বা অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হলেও ২০০৬ ও ২০১০ সালে ঢাকা মহানগরসহ কয়েকটি অঞ্চল অচল করে ফেলার মাত্রায় উঠেছিল। এখনো বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে প্রায়ই শ্রমিকদের বিক্ষুব্ধ অবস্থান দেখা যায়। দাবিগুলো অবশ্য এখনো খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের, যার মধ্যে আছে নিয়োগপত্র, সাপ্তাহিক ছুটি, নিয়মিত মজুরি ও বকেয়া পরিশোধ, অতিরিক্ত সময়ের মজুরি প্রদান, কাজের নিশ্চয়তা ইত্যাদি। পোশাকশ্রমিকদের অধিকাংশ নারী হওয়ায় যৌন নিপীড়নসহ নারীসম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ও ক্রমেই সামনে আসছে।
সাংগঠনিকভাবে খুবই দুর্বল হলেও মজুরিসহ বঞ্চনা ও নিপীড়নের মাত্রার কারণে ক্ষোভ, প্রতিবাদও প্রায়ই ফেটে পড়ে। সে জন্য গত ১ দশকে শ্রমিক আন্দোলনের একটি নতুন চেহারা আমরা দেখতে পেয়েছি। এই আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত, অনেক বিস্তৃত। তবে সাংগঠনিক শক্তি ও যথাযথ দিকনির্দেশনার অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পর্যুদস্ত। অর্থনীতির গতিমুখের কারণে বর্তমানে সব খাতের শ্রমিকদের মধ্যে অস্থায়ী, দিনভিত্তিক, খণ্ডকালীন, ইনফর্মাল অনুপাতই এখন বেশি। সুতরাং তাঁদের আন্দোলনের ধারণাও নতুনভাবে বিন্যস্ত করার তাগিদ প্রবল।
আন্দোলনের কারণেই পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি এখন ৫ হাজার ৩০০ টাকা। অথচ দারিদ্র্যসীমার আয় যথাযথভাবে হিসাব করলে দাঁড়ায় পরিবারপ্রতি মাসিক ১৮ হাজার টাকা। তার মানে একজন তো নয়ই, দুজন কাজ করলেও মজুরি দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করতে পারে না। বহু কারখানায় এই মজুরিও দেওয়া হয় না। শুধু মজুরিবঞ্চনা বা নিপীড়নের প্রতিনিয়ত অভিজ্ঞতা দিয়েই শ্রমিকের জীবন শেষ নয়; স্পেকট্রাম, তাজরীন ফ্যাশনস, স্মার্ট বা রানা প্লাজার মতো বর্বর হত্যাকাণ্ডের শিকারও তাঁদের হতে হয়।
তাজরীন ফ্যাশনস বা রানা প্লাজার মতো একেকটি এমন ঘটনা প্রকাশ করছে রাষ্ট্রের স্বরূপ, ক্ষমতার সম্পর্ক, পুঁজির পুঞ্জীভবনের নির্মম প্রক্রিয়া। মালিকদের সংগঠন আছে, সেখানে তৈরি হয়েছে দলনির্বিশেষে শক্তিশালী শ্রেণি ঐক্য। বিজিএমইএ ভবনটিই তাদের সম্মিলিত অনিয়ম, ক্ষমতা ও দুর্নীতির দিকে বারবার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মালিকদের আছে সংগঠন, সরকার, থানা-পুলিশ ও র্যা ব। পাশাপাশি শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ কোনো সাংগঠনিক শক্তি নেই, রাজনৈতিক দিশা অস্পষ্ট। মাঝেমধ্যে অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ কেবল শ্রমিক শ্রেণির অন্তর্নিহিত শক্তির জানান দেয়। তা সন্ত্রস্ত করে ‘ভদ্রলোক’দের, সাহস জোগায় পাবলিক বা সর্বজনকে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

যুক্তরাজ্য কাকে বেছে নেবে—ক্যামেরন না মিলিব্যান্ড? by মহিউদ্দিন আহমদ

বৃহস্পতিবার, ৭ মে-তে যুক্তরাজ্যে যে সাধারণ নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে, তাতে দেশটির ভোটাররা ২০১০-এর নির্বাচনে ৬৫ শতাংশ টার্ন আউটের বিপরীতে অধিক সংখ্যায় ভোট দেবেন ধারণা করি। কারণ, সম্ভবত গত ২ মে শনিবার ব্রিটিশ রাজপরিবারে এক নতুন প্রিন্সেস, রাজকুমারীর জন্মগ্রহণ। রানি এলিজাবেথের সিংহাসনের চতুর্থ অধিকারী হতে যাচ্ছেন এই ছোট শিশুটি। ব্রিটিশ জনগণ তো বটেই, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের লোকজন যাদের বেশির ভাগই পৈতৃক সূত্রে ব্রিটিশ, তারা ব্রিটিশ রাজপরিবারের যেকোনো ঘটনায় দারুণভাবে আলোড়িত হয়। তারা উল্লসিত হয়েছিল প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে ডায়ানার এবং পরে তাঁদের প্রথম ছেলে প্রিন্স উইলিয়ামের সঙ্গে প্রিন্সেস কেটের বিয়েতে। তারা আবার সাংঘাতিকভাবে বিচলিত হয়েছিল, প্রিন্স চার্লস ও ডায়ানার ছাড়াছাড়িতে এবং পরে প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুতে।
সদ্য ভূমিষ্ঠ, এখনো ‘অনামিকা’ এই রাজকন্যার জন্ম ব্রিটিশদের উল্লসিত হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা। এই শিশুটি ব্রিটিশদের এত গুরুত্বপূর্ণ যে সাধারণ নির্বাচনটিকেও কিছুটা আড়াল করে দিয়েছে। তার নাম কী হবে, তা নিয়ে হাজার হাজার ব্রিটিশ বাজিও ধরেছে। ব্রিটিশদের মন-মেজাজ এখন ফুরফুরে, সুতরাং তারা ভোট দিতে যাবে বেশি সংখ্যায়।
ব্রিটিশরা অতিসাধারণ কারণেও ভোটবিমুখ হয়ে পড়তে পারে। এমনটি দেখেছি ১৯৭০-এর ১৮ জুনের সাধারণ নির্বাচনে। লেবার পার্টি ১৯৬৪-তে কনজারভেটিভ পার্টির সিটিং প্রাইম মিনিস্টার স্যার আলেক-ডগলাস হিউমকে পরাজিত করে নির্বাচনে জিতে গেল। লেবার পার্টি থেকে ’৬৪ ও ৬৬-তে দুবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন ১৯৭০-এ এত বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে পার্লামেন্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নির্বাচন ঘোষণা করলেন। কিন্তু সব হিসাব–নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে তিনি পরাজিত হন কনজারভেটিভ পার্টির নতুন নেতা এডওয়ার্ড হিথের কাছে। অন্যতম কারণ হিসেবে তখন বলা হয়েছিল, ১৯৬৬-তে যে ইংল্যান্ড লন্ডনের বিশ্ব ফুটবলের ফাইনালে জিতল, সেই ইংল্যান্ড ১৯৭০-এ মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের দ্বিতীয় কি তৃতীয় রাউন্ডেই ছিটকে পড়ল; আর তাতে মন ভেঙে গেল ব্রিটিশ ভোটারদের। ভোটবিমুখদের মধ্যে বেশি ছিল লেবার পার্টির সমর্থক। সুতরাং হ্যারল্ড উইলসন হেরে গেলেন নির্বাচনে।
‘পুওর’ উইলসন লন্ডনে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ১০ ডাউনিং স্ট্রিট ছেড়ে দেওয়ার পর লন্ডনে তাঁর থাকার বাসা ছিল না। এই সংকট থেকে উদ্ধার করলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। তিনি উইলসনকে লন্ডনের উপকণ্ঠে চেকার্সে তাঁর কান্ট্রিহোমে মেহমান হিসেবে কয়েক দিন থাকতে দিলেন।
উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক যে ১৯৭১-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় এডওয়ার্ড হিথ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী; আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার আলেক-ডগলাস হিউম ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। হ্যারল্ড উইলসন ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা। তাঁরা তিনজনই সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল প্রায় এককভাবে ব্রিটিশ দ্বীপ থেকে ইউরোপ দখলকারী হিটলারকে পরাজিত করলেন, কনজারভেটিভ পার্টির নেতা সেই চার্চিল ১৯৪৫-এর সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির ক্লিমেন্ট অ্যাটলির কাছে পরাজিত হলেন! চার্চিল সম্পর্কে একটি বিখ্যাত উক্তি, ‘হি ওয়ান দি ওয়ার বাট লস্ট দি ইলেকশন।’ তাই বলে চার্চিল কিন্তু ভোটারদের গালাগাল দেননি।
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান যখন স্বাধীনতা অর্জন করে, তখন অ্যাটলি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। চার্চিল ঘোরতরভাবে ভারতের স্বাধীনতাবিরোধী ও গান্ধীবিদ্বেষী ছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ জয় করলেও যুদ্ধকালীন বছরগুলোতে ব্রিটিশ জনগণকে যেসব কষ্ট সহ্য করতে হয়, তার প্রতিশোধ নেয় তারা চার্চিলের ওপর। ব্রিটিশ নির্বাচনের শত শত বছরের ইতিহাসে মাত্র দুবার নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি—দুই বিশ্বযুদ্ধের সময়, ১৯১৫ ও ১৯৪০-এ।
এখন প্রতিটি পার্লামেন্ট পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হচ্ছে। আগে ‘সিটিং’ প্রধানমন্ত্রী তাঁর মর্জিমতো ব্রিটিশ রানিকে পার্লামেন্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে যেকোনো সময় বাতিল করার পরামর্শ দিতে পারতেন এবং ব্রিটিশ রাজা-রানি সেই পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য থাকতেন। কিন্তু ২০১১ সালে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সে গৃহীত এক আইনে প্রধানমন্ত্রীর সেই ক্ষমতা রহিত করা হয়।
দুই...
৭ মের নির্বাচনটি অনেক কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম কারণটি হচ্ছে নির্বাচনটি বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হতে যাচ্ছে। ‘হাউস অব কমন্সের’ ৬৫০টি আসনের মধ্যে পরের সরকারটি গঠনের জন্য ন্যূনতম ৩২৬টি আসন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ডেভিড ক্যামেরন পাবেন, নাকি তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টির নেতা এড মিলিব্যান্ডের হবে, তা নিশ্চিতভাবে কোনো জনমত
জরিপই বলতে পারছে না। ২৭০ থেকে ২৮০-এর মধ্যে তাঁদের আসনসংখ্যা থাকবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কিন্তু তাহলে তো অন্য ছোট দল দুটির একটির সঙ্গে কোয়ালিশন করতে হবে। এই ছোট দল দুটি হচ্ছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা লিব্-ডেম এবং স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি এসএনপি।
পাঁচ বছর আগে ২০১০-এর সাধারণ নির্বাচনেও লেবার বা কনজারভেটিভ—কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তখন ডেভিড ক্যামেরন লিব্-ডেমের নেতা নিক ক্লেগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন। ডেভিড ক্যামেরন আবার প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে নিয়ে আসতে চেষ্টা চালাবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর তিনি বিরক্ত। আবার লেবার পার্টি যদি স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন করে, তাহলে এই পার্টিও স্কটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্য থেকে বের করে এনে আলাদা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বানাতে আবার চাইবে। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার ওপর গণভোটে স্কটিশরা অল্প ভোটের ব্যবধানে যুক্তরাজ্যে থেকে যাওয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়। একবার পরাজিত হলেও এসএনপি সেই দাবি থেকে সরে আসেনি।
ডেভিড ক্যামেরন নির্বাচনী প্রচারে বলেছেন, তাঁর পাঁচ বছরে যুক্তরাজ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আবার বাড়তে শুরু করেছে, দেশের মানুষ সুখেই আছে। সুতরাং তাঁর দল ও তাঁকেই ভোট দেওয়া উচিত। এর বিপরীতে লেবার পার্টির মিলিব্যান্ড বলছেন, গত পাঁচ বছরে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি ঘটেনি, বরং ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়েছে। কনজারভেটিভরা আবার ক্ষমতায় এলে মানুষজনের, বিশেষ করে গরিব জনগোষ্ঠীর অনেকগুলো সুযোগ-সুবিধা কাটছাঁট করবে, ধনীদের ওপর ট্যাক্স কমিয়ে দেবে।
ডেভিড ক্যামেরনের বিরুদ্ধে একটি বড় ব্যর্থতার অভিযোগ: বিদেশি অভিবাসীদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশ প্রত্যাশিতভাবে ঠেকাতে পারেননি। অনেক ব্রিটিশের অভিযোগ, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত হওয়ার কারণে কোনো রকমের ভিসা বা বাধাবিঘ্ন ছাড়া পূর্ব ইউরোপের ইইউ সদস্যভুক্ত গরিব দেশগুলো থেকে হাজার হাজার মানুষ যুক্তরাজ্যে ঢুকছে এবং সরকারি ভাতা নিয়ে মাসের পর মাস কাজকর্ম না পেয়ে বেকার থাকছে। তাদের ট্যাক্সের টাকায় এই লোকগুলোকে পুষতে হচ্ছে। লেবার পার্টিও এমন সব লোকের প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চায়। তবে তারা কনজারভেটিভদের মতো এত কঠোর নয়।
অভিবাসী ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে আছে ‘ইউকিপ’, মানে ‘ইউনাইটেড কিংডম ইনডিপেনডেন্স পার্টি’। তারা বলতে গেলে কোনো বিদেশিকেই যুক্তরাজ্যে সহ্য করতে চায় না। সৌভাগ্যবশত ২০১০-এর নির্বাচনে তারা কোনো আসনই পায়নি, তবে পরে দুটো উপনির্বাচনে তারা জিতে যায় এবং ‘হাউস অব কমন্সে’ ঢুকতেও পারে। এতে অনেকেই আতঙ্কিত বোধ করতে থাকে এই নির্বাচনেও তারা কয়টি আসন পায় এবং মোট ‘কাস্ট’ ভোটের বিপরীতে কত শতাংশ ভোট পায়, ২০১০-এর তুলনায় ভোটের শতাংশে বাড়ল না কমল, তা ‘মনিটর’ করবে যুক্তরাজ্য ও তার বাইরের কোটি কোটি মানুষ। তাদের ভোটসংখ্যা বাড়লে অনেক বছর ধরে বসবাসকারী বাংলাদেশিদেরও নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে।
এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা অযৌক্তিক হবে না যে, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং অন্য সব নেতা-মন্ত্রী বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও, হরতাল-অবরোধের বিরুদ্ধে এত বক্তৃতা-বিবৃতি, হুমকি-ধমকি দিলেন, কিন্তু তার পরও গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট, প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৩৫ শতাংশ পেলেন কী করে? তাহলে কি নেতা-মন্ত্রীদের এত বক্তৃতা-বিবৃতি এই ভোটাররা গ্রাহ্যই করেননি?
যুক্তরাজ্যের এই সাধারণ নির্বাচনে আমাদের বাংলাদেশিদের আরও বেশি আগ্রহী হওয়ার বড় কারণ: বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত ১২ জন বড় তিনটি দল থেকে প্রার্থী হয়েছেন। রুশনারা আলী ২০১০-এর সাধারণ নির্বাচনে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ‘হাউস অব কমন্সে’ নির্বাচিত হয়েছিলেন, লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে। এবার অন্তত আরও দুজন নির্বাচিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এঁদের একজন ‘সেলিব্রিটি’ টিউলিপ সিদ্দিক, বঙ্গবন্ধুর নাতনি ও শেখ রেহানার মেয়ে। অনেক বছর ধরে তাঁর নির্বাচনী এলাকায় তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
লেবার পার্টির আর এক সেলিব্রিটি অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্রিটিশ অভিনেত্রী ৮০ বছর বয়সী গ্লেন্ডা জ্যাকসন। ২০১১ সালে অবসরের ঘোষণা দিলে উত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবান আসনে লেবার পার্টি টিউলিপ সিদ্দিককে মনোনয়ন দেয়। ২০১০-এর নির্বাচনে গ্লেন্ডা জ্যাকসন ৪২ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন।
ব্রিটিশ নির্বাচনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় যেসব মনোনয়ন পেয়ে থাকে, তা দেওয়া হয় পার্টির স্থানীয় শাখা থেকে, কেন্দ্র থেকে নয়। আমাদের দেশে পার্টিগুলোর শীর্ষ নেতা-নেত্রীরাই প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। তাই, ব্রিটেনে কয়লাখনি অধ্যুষিত একটি নির্বাচনী এলাকায় পার্টির স্থানীয় শাখা মনোনয়ন দেবে হয়তো একজন কয়লাশ্রমিককেই। কারণ, এই কয়লাশ্রমিকই অনেক বেশি বুঝবেন ওই এলাকা এবং কয়লাশ্রমিকদের সমস্যা।
আর মনোনয়ন কখনো কখনো নির্বাচনের অনেক আগেই দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন দেওয়া হয়েছে টিউলিপ সিদ্দিককে। নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো বড় জনসভা বা শোডাউন ছিল না, কখনোই থাকে না। প্রচারণা চলে টিভি-রেডিওতে।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ব্রিটিশ পত্রপত্রিকাগুলো নির্বাচনের ঠিক আগে আগে নির্দিষ্ট কোনো দলকে সাধারণত সমর্থন জানায়।
দুনিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী ইংরেজি সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট চলতি সংখ্যায় প্রথম সম্পাদকীয়কে কনজারভেটিভ পার্টি ও তার নেতা ডেভিড ক্যামেরনকে সমর্থন দিয়েছে। এ জন্য প্রতিপক্ষ দল পত্রিকাটিকে শত্রু মনে করে না। আমাদের দেশে এই রীতি এখনো গড়ে ওঠেনি।
মহিউদ্দিন আহমদ: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সচিব, কলাম লেখক।
mohiuddinahmed1944@yahoo.com

দিল্লির বিরুদ্ধে এখন কড়া প্রতিবাদের সময় by মিজানুর রহমান খান

তিস্তা চুক্তি না হওয়ার বেদনার ভার বাংলাদেশের পক্ষে আরও বেশি সময় ধরে বহন করা যখন অসম্ভব হয়ে পড়ছে, তখন কিনা ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির বহুল প্রত্যাশিত বাস্তবায়নেও নতুন করে অনিশ্চয়তার খবর মিলছে। এটা সত্যি হলে তা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর একটি গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি করবে। এটা একটা অভাবনীয় খারাপ খবর। বিষয়টিকে আমরা হয়তো গুরুত্ব দিতাম না, কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরণ রিজু ১৬ এপ্রিল ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক ইকোনমিক টাইমসকে নির্দিষ্টভাবে বলেন, আসামকে বাইরে রেখে সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন হবে। ১৫ এপ্রিল পিটিআই ‘সরকারি সূত্রগুলোর’ বরাতে বলেছে, আসামকে বাদ দিয়ে চুক্তি করতে মন্ত্রিসভার নথি তৈরি হচ্ছে। এসব খবর ছাপা হওয়ার পর দুসপ্তাহ পুরো হতে চলেছে, অথচ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর এ রকম একটি বোমা ফাটানো বিষয়ে উভয় তরফে একপ্রকার নীরবতা পালনই চলছে। বরং আমরা ঢাকায় দায়িত্বশীল সূত্রে বাংলাদেশ আসামকে বাদ দিয়ে চুক্তিতে রাজি বলে ইঙ্গিত পাই, যদিও প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ১৭ এপ্রিল সাংবাদিকদের বলেন, এ রকম কথা তাঁদের জানা নেই।
অনেকে হয়তো বিশ্বাস করতে চান যে আসামের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি এবার সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখছে। সুতরাং সেখানে বিজেপির তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ও প্রস্তাবিত সীমান্ত চুক্তি বিরোধিতার প্রকাশ্য কারণ মূলত সে কারণেই। তবে তিস্তা চুক্তির হতাশা নিয়ে এখন তো আমরা বছরের পর বছর, সরকারের পর সরকার কাটিয়ে দেওয়ার পথে রয়েছি। এখন মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, ভারতের রাজনীতিকদের সেই আমলাকাতর মহলটি এখনো সক্রিয়, বাংলাদেশকে আস্থায় রাখা দূরে থাকুক, যারা গিভ অ্যান্ড টেক রাজনীতিতে নয়, ‘বড় ভাই’সুলভ আচরণ প্রদর্শনকেই সফল কূটনীতি মনে করে। আর বাংলাদেশও সেটা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিচ্ছে। উভয় পক্ষের এই আচরণ আমাদের ক্ষুব্ধ করছে।
ভারতকে এখন বাংলাদেশের তরফে সাফ জানিয়ে দিতে হবে যে বাংলাদেশের অঞ্জলি অনবরত গ্রহণ করার বিনিময়ে তার স্বার্থকে উপেক্ষার কূটনীতি যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়। ভারতের রাষ্ট্রপতির আসনে আমাদের অনেকেরই বিরাট শ্রদ্ধাভাজন প্রণব মুখার্জি রয়েছেন। কংগ্রেস নানা বিষয়ে বিজেপির তাৎক্ষণিক সমালোচনা করতে দ্বিধাহীন। অথচ মোদি সরকারের নেহরু-ইন্দিরার চুক্তি বিরোধিতা কংগ্রেস নেতারা একদম গায়ে মাখছেন না। অরুণাচল থেকে নির্বাচিত ও উত্তর–পূর্ব ভারতে বিজেপি রাজনীতির রাজপুত্তুর খ্যাত কিরণ রিজুর মন্তব্যের বিষয়ে কংগ্রেস নীরবতা পালন করছে।
ভারত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশকে অর্থনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছে। বাংলাদেশ তার সুফলও পাচ্ছে। কিন্তু সে ধরনের সুফলের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি বা স্থলসীমান্ত চুক্তি না করার যে ঘাটতি, তা অপূরণীয়। দিল্লিতে মোদি ও নওয়াজ শরিফের করমর্দনের পরের বছরে ভারত পাকিস্তানে প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলার ও পাকিস্তান ভারতে মাত্র ৪৩০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে। সুতরাং বাণিজ্য-সূচকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তন যাচাই করা চলে না। প্রতিটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুণগত পরিবর্তনের নির্দেশক হিসেবে কতগুলো মৌলিক বিষয় থাকে, যা প্রায় বিনিময়যোগ্য নয় বলেই চলে। তিস্তার মতো নদীর পানি বণ্টন বা সীমান্ত চুক্তিগুলো হলো সেই মাপের মৌলিক বিষয়। এর বিনিময়ে অন্য কিছু বেশি পেলেও যেখানে সান্ত্বনার কিছু থাকার নয়।
ভারত সব সময় বলেছে, তাদের আর কিছুই চাই না, তাদের যত উদ্বেগ বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে তাদের প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে। বিএনপি-জামায়াত সরকার ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। আর এটা ভারতের সর্বমহলে স্বীকৃত যে, শেখ হাসিনা ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে দিয়েছেন। তাহলে ভারত কেন এখন বাংলাদেশকে তার ন্যায্য প্রাপ্য বুঝিয়ে দিয়ে বাংলাদেশি জনগণের শুভেচ্ছা কুড়াতে এত বেশি দ্বিধান্বিত?
গত বছর প্রথম আলোয় একজন ভারতীয় বিশেষজ্ঞ এসেছিলেন। তাঁকে বলেছিলাম, ভারত তার নিরাপত্তা ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে শেখ হাসিনা সরকারের যে সহযোগিতা পেয়েছে আর সেখানে ভারতের যে সন্তুষ্টি, তার সঙ্গে তুলনীয় সন্তুষ্টি শেখ হাসিনার প্রাপ্য। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরকালে তিস্তা চুক্তি না করতে পারাটা শেখ হাসিনার জন্য ছিল ‘বিশ্বাসভঙ্গের’ শামিল। তিনি আমার সঙ্গে একমত হননি। এখন মোদি যদি স্থলসীমান্ত চুক্তিকে খণ্ডিতভাবে পাস করিয়ে ঢাকায় আসেন, তাহলে সেটা হবে শূন্য হাতে আসার শামিল, আর তখন বাংলাদেশ তো উজ্জ্বল হাসিতে মুখ ভরাতে পারবে না। আসাম কার্ডটি শেষ পর্যন্ত খেলা হোক বা না হোক, মোদির ঢাকা সফরকে এটা বিতর্কিত করতে পারে। অনেকের মতে শেখ হাসিনার সরকারের দীর্ঘায়ু কামনা করে দিল্লি, কিন্তু স্থলসীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন থেকেও তাঁকে এখন বঞ্চিত করা হলে সেই দাবি টিকবে না। এমনকি তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া কেবল আওয়ামী লীগের ওপর পড়বে না, ভারতের বন্ধুমহল প্রকাশ্যে কিছু না বললেও এটা তাদের রক্তক্ষরণ বাড়াবে বলেও অনুমান করি। এটা ভারতবিদ্বেষী মহলকে ইন্ধন জোগাবে। বাংলাদেশের নির্দলীয়–নিরপেক্ষ নতুন প্রজন্মকে তা বিক্ষুব্ধ করবে। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবকে চাঙা হতে দেওয়ার বহুবিধ ও নানামাত্রিক নেতিবাচক মাত্রা রয়েছে, যা কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়, তার সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিরও একটা যোগসূত্র রয়েছে। ভারত যদি তা মানে, তবে তাকে তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি ঠিকঠাকভাবে করতে হবে।
ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরণ রিজু দাবি করেছেন, আসামকে বাদ দিয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন করা হলে তা ‘উভয় দেশের’ জন্য মঙ্গল ডেকে আনবে। তাঁর যুক্তি আসামে এ নিয়ে ‘বিরাট প্রতিবাদ আছে এবং অনেক সমস্যা আছে’। কিরণ রিজু বোকার স্বর্গে বাস করছেন, কারণ কোনো অর্থেই এ ধরনের পদক্ষেপ ভারত বা বাংলাদেশ কারও জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে না।
বাংলাদেশের চিহ্নিত ভারতবিরোধী গোষ্ঠীর ভ্রু কুঁচকানো অগ্রাহ্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। সত্যি বলতে কী, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় মোর্চাও গতানুগতিকভাবে তা নাকচ করতে পারেনি। সুতরাং একটু সরলীকরণের ঝুঁকি সত্ত্বেও এটা বলা চলে যে সাতচল্লিশের পর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে শেখ হাসিনা এমন একটি উচ্চতায় নিয়েছেন, যাকে আগলে রাখা দরকার।
আর তাই ভারত তার নিকটতম প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে মৌলিক সমস্যা মেটাতে যে অন্যায্য আচরণ করে চলছে, তার যতি টানা উচিত। অভ্যুদয়ের জন্য কৃতজ্ঞ বাংলাদেশ এই দুটি বিষয়ে দিল্লির বিরামহীন উপেক্ষার ভার আর বহন করতে পারছে না। ভারত একান্ত না পারলে সেটা খোলাখুলি বলুক। সমুদ্রসীমার সমস্যা মেটাতে তারা পারেনি। সালিসকার মেনেছে। এবারও দরকার হলে সালিসি হবে। কিন্তু অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের বিরোধিতায় তিস্তা চুক্তি না করা, এখন আবার আরেকটি অঙ্গরাজ্যের দোহাই দিয়ে সীমান্ত চুক্তি না করার কৈফিয়ত দাঁড় করানো ভ্রাতৃপ্রতিম বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি অবমাননাকর। এটা আমাদের সার্বভৌমত্বের অনুভূতিতে আঘাত লাগার শামিল।
নরেন্দ্র মোদি এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজসহ প্রতিটি নির্ভরযোগ্য মহল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে আশ্বস্ত করেছে যে অনতিবিলম্বে তিস্তা না হলেও সীমান্ত চুক্তি হবে। এখন কিরণ রিজুর কথা তো বাড়া ভাতে ছাই দেওয়ার শামিল। আমরা ভাবতেই পারি না, মোদি কী করে খণ্ডিত চুক্তি হাতে বাংলাদেশে তাঁর প্রথম ঐতিহাসিক সফরটি সম্পন্ন করবেন? এ ধরনের পরিস্থিতি এই সফরটি না হওয়ার আশঙ্কাকেই জোরদার করছে।
নুন-নেহরু চুক্তিটা যেন ভারতীয় রাজনীতিকদের ভ্রান্তিবিলাস কিছুতেই যেন ঘুচবার নয়। পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে ১৯৫৮ সালে যখন নুন-নেহরু এই চুক্তিটা করেছিলেন, তখনকার রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ আপত্তি তুলেছিলেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টে বিশেষ রেফারেন্স পাঠান। সে অনুযায়ী ভারত সংবিধানের নবম সংশোধনী এনেছিল। চুয়াত্তরে মুজিব-ইন্দিরার চুক্তির পরে বেরুবাড়ি ও তিনবিঘা নিয়ে ফের ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা হলো। সেই রায়েও চুক্তি সমর্থিত হয়। এতে বলা আছে, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ভারতকে অবিলম্বে ওই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে। ওই রায়ে আরও স্পষ্ট করা হয় যে ভারত যে জমি বাংলাদেশকে দিচ্ছে, সেটা স্যার রেডক্লিফের কাটাকুটির পরে তা কখনো ভারতের ভূখণ্ড বলে স্বীকৃত হয়নি। তাই পরের জমি পরকেই দিচ্ছে ও বুঝে নিচ্ছে ভারত। তাই কিরণ রিজুর মন্তব্য ওই রায়ের পরিপন্থী। অবশ্য বিরোধী দলে থাকতে বিজেপির জ্যেষ্ঠ নেতা বর্তমান অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকেও একই ভুল করতে দেখেছি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে রাজ্যসভার সচিবকে লেখা এক চিঠিতে জেটলি সাংবিধানের মৌলিক কাঠামোর প্রশ্ন তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ভারতের ভূখণ্ড সংবিধানের অংশ। তাই তার হেরফের সংশোধনের অযোগ্য।’ সুষমার যুক্তি ছিল, ভারত কেন খামোখা এত জমি বাংলাদেশকে দিয়ে দেবে। আসাম এখন একই সুরে বলছে, আমাদের দুই শ একর জমি কমে যাবে! আর বাংলাদেশ কিন্তু ৪১ বছর আগেই সংবিধানে সংশোধনী এনে চুক্তি অনুসমর্থন করে বেরুবাড়ী হস্তান্তর করেছিল।
রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া। তিস্তা চুক্তির অভিজ্ঞতা মনে রেখে শেখ হাসিনার সরকারের এ বিষয়ে ভারতের কাছে বিস্তারিত জানতে চাওয়া এবং তা বাংলাদেশের জনগণকে অবহিত করা উচিত। মোদি সরকারের সফরকালে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তির একটি বিধান বদলাতে ভারতীয় আপত্তি এই মুহূর্তেও বিবেচনায় নিতে আমাদের প্রশাসন ব্যস্ত। অতি তৎপর কর্মকর্তারা ভারতের বিরক্তির কারণ হতে চান না। আসলে দৌড়াতে থাকা বাংলাদেশের জিরিয়ে নেওয়া উচিত। ভারতকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া উচিত, ৪১ বছর অপেক্ষার পরে তার পক্ষে আরও অপেক্ষায় থাকা কঠিন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

উৎকণ্ঠায় বিএনপির কারারুদ্ধ নেতাদের পরিবার

মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে পঙ্গুত্ব বরণ করেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী। দীর্ঘ চার মাস ধরে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে অমানবিক কষ্ট ভোগ করছেন বীরবিক্রম খেতাবধারী এই মুক্তিযোদ্ধা। ঘুম ও হাঁটা-চলার অসুবিধার কারণে তার গুলিবিদ্ধ পা অবশ হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মের কারণে ওজন কমে গেছে ৮ কেজি। একই অবস্থা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, মোসাদ্দেক আলী ফালু, যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদসহ বিরোধী জোটের ১৫ সহস্রাধিক নেতাকর্মীর। কেউ বা ডায়াবেটিস, হার্ট আবার কেউ বা উচ্চরক্ত চাপসহ নানা জটিল ব্যাধিতে ভোগছেন। সম্প্রতি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর মৃত্যু হওয়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে কারারুদ্ধ নেতাদের পরিবারের মধ্যে। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন- গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে যে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বয়সের ভারে ন্যূব্জ এসব নেতার। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে কারারুদ্ধ নেতাদের চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মুখপাত্র ও দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন।
গত ৬ই জানুয়ারি গ্রেপ্তার হন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জটিল নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত এই বিএনপির শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে ৭৯টি রাজনৈতিক মামলা। মস্তিষ্কের ধমনি ও হার্টে ব্লক, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ বিভিন্ন রোগে ভোগছেন তিনি। মির্জা আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম জানান, আমার স্বামীর মস্তিষ্কের ধমনিতে দুটি ব্লক ধরা পড়েছে। যার ৮০ ভাগই অকেজো বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। যে কোন সময় ব্রেন স্ট্রোকের আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মের কারণে তার ১৫ কেজি ওজন কমে গেছে। দীর্ঘ প্রায় এক বছরের বেশি ধরে কারাগারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনিও ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনির সমস্যাসহ নানা জটিল রোগে ভোগছেন। ২০১৪ সালের ১২ই মার্চ গ্রেপ্তারের পর অসুস্থতার জন্য বেশ কয়েকবার কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখন তিনি কাশিমপুর কারাগারের পার্ট-১এ রয়েছেন। খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে ড. মারুফ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, গত শনিবার কারাগারে বাবাকে দেখতে গিয়েছিলাম। তিনি আগে থেকেই  ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিনডির সমস্যাসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তাকে গ্রেপ্তারের পর কয়েকদফায় বেশ কয়েকদিন  রিমান্ডে পাঠানো হয়। এরপর তার হার্টের সমস্যাটা বেড়ে যায়। ফলে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেলে স্থানান্তর করা হয়। ওই হাসপাতালে তিনি প্রায় দুই মাসের মতো চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেন, কারাগারে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা পেলেও সব ওষুধপত্র আমরা নিয়মিত দিয়ে আসি। সেখানে খাওয়া-দাওয়ার সমস্যায় ভুগছেন তিনি। এছাড়া প্রচণ্ড গরমের কারণেই প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ব্লাড প্রেশার, আলচার ও হার্টের সমস্যায় ভুগছেন দীর্ঘ ৫ মাসের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। গত ২৬শে ডিসেম্বর গ্রেপ্তারের পর তাকে বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখন তিনি কাশিমপুর কারাগারে রয়েছেন। বেশ কয়েকটি জটিল রোগের জন্য নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। গয়েশ্বর রায়ের কন্যা অপর্ণা রায় বলেন, বাবার শরীরটা ভাল নেই। গত সপ্তাহে কারাগারে বাবাকে দেখে এসেছি। তাকে ওষুধ দিয়ে এসেছি। তিনি বলেন, বাবা গ্যাস্ট্রিক, আলচার, ব্লাড প্রেশার, হার্টের সমস্যাসহ বেশ কয়েকটি রোগে আক্রান্ত। তিনি রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালের প্রফেসর মুজিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়নে নিয়মিত চিকিৎসা করান। সবগুলো রোগের জন্য নিয়মিত তাকে ওষুধ খেতে হয়। ওষুধগুলো শেষ হয়ে গিয়েছিল। গত সপ্তাহে দিয়ে এসেছি। তবে কারাগারে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে সমস্যায় ভুগছেন বলে জানান তিনি। কারাগারে চরম অমানবিক কষ্ট ভোগ করছেন শমসের মবিন চৌধুরী। ৮ই জানুয়ারি গ্রেপ্তারের পর কয়েকদফা রিমান্ডও ভোগ করেন সাবেক এই পররাষ্ট্র সচিব। শমসের মবিনের স্ত্রী শাহেদা ইয়াসমিন মানবজমিনকে বলেন, গত সোমবার কারাগারে উনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। যুদ্ধের সময় যে পায়ে গুলি লেগেছিল সেটা অবশ হয়ে গেছে। কারণ তিনি গত চার মাস ধরে যে বিছানায় শুচ্ছেন সেটা তো তার জন্য সঠিক বিছানা নয়। এছাড়া তার পায়ের জুতা যেহেতু ঠিক নয়, লাঠির ওপর ভর করে প্রতিদিন দেড় ঘণ্টা হাঁটতে হচ্ছে। ফলে পায়ের ওপর একটা চাপ পড়ে। খাওয়া-দাওয়ার অনিয়মের কারণে তার ৮ কেজি ওপরে ওজন কমে গেছে। এখন তিনি পায়ের জন্যই বেশি কষ্ট করছেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি কারাগারে ১৭ দিন বিদ্যুৎ ছিল না। ওই সময় গরমে তিনি খুবই কষ্ট পেয়েছেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর রহমতে তার হার্ট বা অন্য কোন রোগ নেই। তবে এখন যে পরিমাণ গরম পড়েছে তাতে এই বয়সে তার কখন যে কি হয় সেটা নিয়েই বেশি চিন্তা করছি। তিনি বলেন, ব্যাংককের সামিটি ব্যাজ হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা করাতেন শমসের মবিন। এখন পায়ের যে অবস্থা তাকে অতিদ্রুত বিদেশে নিতে হবে। আশা করি সরকার সেই সুযোগ দেবে।  
ডায়াবেটিস, হার্ট ও ব্লাড প্রেশারের সমস্যায় ভুগছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু। গত ১১ই জানুয়ারির গ্রেপ্তারের পাঁচদফায় বেশ কয়েকদিন রিমান্ড ভোগ করেন। এরপর থেকে তিনিও শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছেন। শামসুজ্জামান দুদুর ছোটভাই ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, কয়েকদিন আগে ভাইকে কারাগারে দেখে এসেছি। তার শারীরিক অবস্থা তেমন ভাল নয়। তিনি ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার ও হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। এসব রোগের ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত চেকআপ করাতে হয়। কিন্তু কারাগারে সেই সুবিধা পাচ্ছেন না তিনি। আশা করি কারাকর্তৃপক্ষ তার চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। ৩রা জানুয়ারি রাতে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদকে অসুস্থ অবস্থায় নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। চিকিৎসা শেষে বাসায় ফেরার পর ৩০শে জানুয়ারি রাতে ফের গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। এরপর রেকর্ড টানা ২৭ দিন রিমান্ড ভোগ করেন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ সাবেক এই ছাত্রনেতা। তিনিও ডায়াবেটিস, হার্ট ও পেটের সমস্যায় ভুগছেন। রিজভী আহমেদের সহধর্মিণী আঞ্জুমান আরা বেগম মানবজমিনকে বলেন, গত সপ্তাহে তার সঙ্গে দেখা করেছি। ওর শরীরটা বেশি ভাল নেই। খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধার জন্য প্রায়ই তিনি পেটের সমস্যায় ভুগেন। তিনি বলেন, রিজভী একটু চাপা স্বভাবের। শত সমস্যায় ভুগলেও মুখ ফুটে কিছু বলে না। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তার হাতে ও পায়ে রড লাগানো আছে। এছাড়া গ্রেপ্তারের পর ১২ দফায় এক মাসেরও বেশি সময় রিমান্ড ভোগ করেন তিনি। রিমান্ড চলাকালীনও তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। ওই সময় তার ডায়াবেটিসটা বেড়ে গিয়েছিল।  এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর,  চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক আবদুল মান্নান, মোসাদ্দেক আলী ফালু, সিলেটের মেয়র আরিফুল হক, বিশেষ সম্পাদক নাদিম মোস্তফা, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক লায়ন আসলাম চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদ, মাহবুবুল হক নান্নু, সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল মতিন, হবিগঞ্জ পৌর মেয়র আলহাজ জিকে গউছসহ বিরোধী জোটের প্রায় ১৫ সহস্রাধিক নেতাকর্মী।
চিকিৎসা না দিয়ে নেতাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে: বিএনপি
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতাদের সুচিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে রেখে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির মুখপাত্র ও দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। সুচিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি অবিলম্বে নেতাদের মুক্তি দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল বিকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন। ড. রিপন বলেন, আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি- কারারুদ্ধ বিএনপি নেতৃবৃন্দকে বারবার রিমান্ডে নেয়ায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। নেতাদের সুস্থ অবস্থায় গ্রেপ্তার করা হলেও এদের কেউ  কেউ লাশ হয়ে ফিরছেন আবার কেউ হুইল চেয়ারে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছেন। অন্যরা রোগ যন্ত্রণায় কারাভ্যন্তরে কাতর হয়ে পড়ছেন। মির্জা আলমগীরকে চিকিৎসা না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর সমালোচনা করে রিপন বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব গুরুতর অসুস্থ হয়ে হুইল চেয়ারে বসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। কিন্তু তাকে হাসপাতালে ভর্তি না করে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা তার জীবন নিয়ে শঙ্কিত। কারণ মির্জা আলমগীর হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ক্যারোটিড আর্টারিতে ব্লকসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে আটক রয়েছেন তিনি। রিপন বলেন, মির্জা আলমগীর ছাড়াও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, আবদুস সালাম পিন্টু, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও গাজীপুর সিটির মেয়র আবদুল মান্নান, শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সুচিকিৎসার অভাবে তাদের জীবন সঙ্কটাপন্ন হয়ে উঠছে। এই অবস্থায় নেতাদের পরিবার যেমন উৎকণ্ঠিত তেমনি আমরাও উদ্বিগ্ন। রিপন বলেন, সুচিকিৎসা না দেয়ায় বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর মৃত্যু হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, পিন্টুকে হত্যা ?করা হয়েছে। আমিও একই কথা বলছি। তাকে সুচিকিৎসা না দেয়ার তার মৃত্যু হয়েছে। অবিলম্বে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সুচিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরসহ আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি জানিয়ে রিপন বলেন, আমরা সরকারের কাছে মানবিক আচরণের প্রত্যাশা করছি। কারণ বিরোধী নেতারা বেঁচে থাকলেই সরকার তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধিতায় অবতীর্ণ হতে পারবেন। কিন্তু মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া চরম অমানবিক। তিনি বলেন, রাজনীতিতে মানুষের ভিন্নমত থাকবে। রাজনীতি মানে এই নয় কাউকে সমালোচনা করলে জেলে ঢুকিয়ে রাখা। সরকার ভিন্নমতের লোকজনদের জেলখানায় ঢুকিয়ে রেখেছে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন, যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আবদুস সালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
কারাগারে ফেরত নেয়া হলো ফখরুলকে
কাশিমপুর কারাগার থেকে অসুস্থ অবস্থায় বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তার চিকিৎসায় একটি মেডিকেল বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত চিকিৎসা না দিয়ে চেকআপ শেষে বিকালে তাকে ফের কাশিমপুর কারাগারে ফেরত নেয়া হয়েছে। তার পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে এমন অভিযোগ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে পরিবারের সদস্যরা জানান, মির্জা ফখরুলের অবস্থা এতটাই জটিল, যে কোন সময় ব্রেন স্ট্রোকের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ তার মস্তিষ্কের ধমনিতে (ক্যারটিড আর্টারি) দুটি ব্লক ধরা পড়েছে। অন্যদিকে তার হার্টের তিনটি ব্লকে রিং পরানো রয়েছে। তবে একটি ব্লক ৯০ ভাগ, যাতে রিং পরানো হয়নি। যে কোন সময় তার হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, আইবিএস, মেরুদণ্ড, দাঁতের সমস্যাসহ কয়েকটি রোগে আক্রান্ত। সমপ্রতি কাশিমপুর  থেকে তাকে দুইবার বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিব মেডিকেল হাসপাতালেও আনা হয়। কিন্তু সেখানেও তার সুচিকিৎসা  মেলেনি। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসার জন্য মির্জা আলমগীরকে পুলিশের একটি প্রিজনভ্যানে করে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মেডিকেলে পাঠানো হয়। সকাল সোয়া ১০টায় প্রিজন ভ্যানটি বিএসএমএমইউ হাসপাতালে পৌঁছে। কারা চিকিৎসক মো. আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, মির্জা আলমগীরের ইন্টারনাল করোটিড আর্টারি (মাথায়) ব্লক রয়েছে। এছাড়া পেটের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদ?রোগে ভুগছেন তিনি। তাকে ভাস্কুলার সার্জন, নিউরোলজিস্ট, গ্যাস্ট্রো এন্টেরোলজিস্ট ও কার্ডিওলজিস্ট দেখানো দরকার। এদিকে মির্জা ফখরুলকে কারাগারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বিএসএমএমইউ-এর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মজিদ ভূঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, মির্জা ফখরুলের গুরুতর কোন সমস্যা নেই। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তাকে এ হাসপাতালে আনা হয়েছে। তার শরীরের কয়েকটি টেস্ট (পরীক্ষা) করা হচ্ছে। এদিকে মির্জা আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম জানান, দুদিন আগে তিনি দেখা করেছেন। তখন তার প্রেসার ছিল হাই। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নেয়ার সময় তার চিকিৎসকরা যে লেভেলের মধ্যে প্রেশার নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন তার চেয়ে অনেক বেড়েছে। তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম হাসপাতালে অন্তত কয়েকদিন ভর্তি রেখে তার চিকিৎসার অধিকারটুকু সরকার এবং কারাকর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবে। আমরা তো পরিবারের সদস্য হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে এটুকু মানবিকতা আশা করতে পারি। কিন্তু কি কারণে সে অধিকার তিনি পেলেন না। রাহাত আরা বেগম বলেন, কাশিমপুর কারাগার থেকে মেডিকেলে আনা হয় সাধারণ গাড়িতে। এসিতো দূরের কথা, গাড়ির ছোট ফ্যানটিও ঠিকমতো কাজ করছিল না। অথচ কাশিমপুর কারাগার থেকে যানজট পার হয়ে মেডিকেলে আনা-নেয়ায় তিন ঘণ্টা করে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। কোন অসুস্থ মানুষ এমন ভ্যাঁপসা গরম ও বদ্ধপরিবেশে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, টেলিভিশনে দেখলাম- মেডিকেল বোর্ড নাকি তেমন কোন গুরুতর সমস্যা পায়নি। আল্লাহ জানে উনার ভাগ্যে কি আছে। তিনি আরও বলেন, আমার স্বামীর এমন কিছু রোগ আছে যার চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই। উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নেয়া উচিত। আশা করি, তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে জামিন কিংবা অনুমতি দেয়া হবে। এদিকে মির্জা আলমগীরের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, অসুস্থ অবস্থায় যাতায়াতের কষ্টে তিনি আরও বেশি অসুস্থবোধ করছেন। কারাগারে ফেরত নেয়ার সময় তিনি চিকিৎসকদের জানিয়েছেন, কাশিমপুর থেকে হাসপাতালে এসে চিকিৎসার কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারছেন না। এভাবে কারাগার থেকে হাসপাতালে আনা নেয়ার মাধ্যমে চিকিৎসা করালে তিনি আর হাসপাতালে আসতে আগ্রহী নন। উল্লেখ্য, সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি পোড়ানোসহ ৭৯টি মামলার আসামি হয়ে প্রায় মাস ধরে কাশিমপুর কারাগার-২-এ অন্তরীণ রয়েছে তিনি। ইতিমধ্যে ৩০ মামলায় তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি মির্জা ফখরুলকে এক মামলায় জামিন দেয়া হয়। তিন মামলায় কেন তাকে জামিন দেয়া হবে না সে বিষয়ে হাইকোর্ট রুল জারিও করে। অবশ্য ওই তিন মামলায় শ্যোন এরেস্ট দেখায়নি পুলিশ। এ নিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে ছয় দফা কারাভোগ করছেন মির্জা আলমগীর।

নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা রহিমা খাতুনের, থাইল্যান্ডের বন্দিশিবিরে আরও বাংলাদেশী

থাইল্যান্ডের পাচারকারীদের বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে এসেছেন রহিমা খাতুন (২৫) নামে এক নারী। তিনি ওই বন্দিশিবিরকে নির্যাতনের সেল হিসেবে অভিহিত করেছেন। বলেছেন, গহিন জঙ্গলে এখনও পাচারকারীদের হাতে বন্দি বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের  রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের অবস্থা শোচনীয়। তারা ঠিকমতো খাবার পান না। স্বাস্থ্যের ভয়াবহ অবনতি হয়েছে তাদের। তার ওপর চলে প্রহার। আত্মীয়স্বজনদের কাছে পাচারকারীরা দাবি করে মুক্তিপণ। তা দিতে ব্যর্থ হলে চলে আরও নির্যাতন। রহিমার দাবি, তাকে যে শিবির বা ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল সে দলে রয়েছেন ৪০০ বন্দি। তার বেশির ভাগই বাংলাদেশের নাগরিক ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা। এমন অবস্থায় গতকাল থাইল্যান্ডের অনুসন্ধানকারীরা দ্বিতীয় আরও একটি গণকবরের সন্ধান পেয়েছেন। সেখানে কি পরিমাণ মৃতদেহ আছে এবং নিহতরা কোন দেশের নাগরিক সে বিষয়ে পরিষ্কার জানা যায়নি। গতকাল এ খবর দিয়েছে অনলাইন ব্যাংকক পোস্ট। এতে বলা হয়, রহিমা খাতুনের (২৫) চোখেমুখে এখন হতাশা। মানুষ দেখলেই চমকে উঠছেন তিনি। আবার তাকে অপহরণ করা হতে পারে এ ভয়ে তটস্থ রহিমা। আশ্বস্ত হওয়ার মতো কাউকে পেলে আকুতি জানাচ্ছেন তাকে বাঁচাতে। বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে এখন জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন তিনি। ফেলে এসেছেন তার ১০ বছর বয়সী মেয়েকে। তার ভাগ্যে কি ঘটেছে বলতে পারেন না রহিমা। মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই চোখের কোণে জমছে পানি। ভাবলেশহীন তাকিয়ে থাকেন। রহিমা ও তার মেয়েকে মিয়ানমার থেকে অপহরণ করে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে। সেখান থেকে পালিয়ে তিনি বলেছেন, তাকে যে ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল সেখানে রয়েছে প্রায় ৪০০ মানুষ। এর বেশির ভাগই রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী। সেখানে বন্দিদের সঙ্গে নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেছেন রহিমা। পেডাং বেসার এলাকায় রূপ চাং পাহাড়ের কাছে যেসব গ্রাম আছে পালিয়ে তিনি তার কাছাকাছি যান।  সেখান থেকেই সোমবার বিকালে উদ্ধার করা হয়েছে তাকে। পরিচয় জানার পর তাকে ভর্তি করা হয়েছে সংখলা প্রদেশের একটি হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে তাকে। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। রহিমা মানসিকভাবে এতটাই ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন, তিনি অতীত সম্পর্কে পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছেন না। তবে এতটুকু বলেছেন- আমাকে ওই শিবিরে আটকে রেখে প্রহার করা হয়েছে। এমন নির্যাতন করা হয়েছে অনেকবার। তিনি বলেছেন, তাকে ও তার মেয়েকে মিয়ানমারের কোন এক জায়গা থেকে অপহরণ করা হয় ৪ মাস আগে। এর পর নিয়ে যাওয়া হয় থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে। সেখানে প্রায় ৪০০ মানুষের সঙ্গে তাদের রাখা হয়। এখানে অন্য যারা আছেন তারা হয় বাংলাদেশী না হয় রোহিঙ্গা। তাদের সারাক্ষণ নজরদারিতে রাখা হয়। ঠিকমতো খাবার দেয়া হয় না। দাবি করা হয় মুক্তিপণ। মুক্তিপণ দিতে না পারলে অব্যাহতভাবে নির্যাতন চালানো হয়। রহিমা বলেন, এক সময় অকস্মাৎ পাচারকারীরা বলে, পুলিশ আসছে, পালাও। ওরা ধরতে পারলে আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে। এ কথা বলেই তারা দৌড়ানো শুরু করে। উপায় না দেখে অন্যরা সবাই দৌড়াতে থাকে তাদের পিছু পিছু। রহিমা বলেন, আমি তাদের সঙ্গে দৌড়াতে পারিনি। দৌড়ানোর মতো শক্তি ছিল না আমার। সবাই আমাকে পিছনে ফেলে দৌড়াতে থাকেন।
পেছনে পড়ে যান রহিমা খাতুন। এ সময় তিনি পাহাড়ের নিচের দিকে যে গ্রাম আছে, সে দিকে হাঁটা শুরু করেন। কতক্ষণ, কতদিন এভাবে ক্লান্ত পায়ে তিনি হেঁটেছেন বলতে পারেন না। এক পর্যায়ে পাহাড়ি ওই গ্রামের মানুষগুলো তাকে দেখে উদ্ধার করেন। এমনি এক নির্মম সময়ে তিনি হারিয়ে ফেলেন নিজের ১০ বছর বয়সী মেয়েকে। সে এখন কোথায় আছে, কি তার পরিণতি তার কিছুই জানেন না রহিমা।  ওই একই হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে উদ্ধার হওয়া তুতানসাসা (২৮) নামে আরেক ব্যক্তিকে। কয়েক দিন আগে গণকবর থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া একমাত্র ব্যক্তি এই তুতানসাসা। তিনি একটি চিনিকলের সাবেক একাউন্ট ম্যানেজার। তিনি সোমবার জাতীয় পুলিশ প্রধান সময়োত পুমপানমুয়াংকে বলেছেন, ওই জঙ্গলে আরও ৬০ থেকে ৭০টি এরকম ক্যাম্প আছে। সেখানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে পাচার করে মানুষকে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এসব বিপন্ন মানুষের আত্মীয়স্বজনদের কাছে মুক্তিপণ দাবি করছে পাচারকারীরা। তুতানসাসা বলেছেন, তাকে ৯ মাস আগে বাংলাদেশ থেকে অপহরণ করা হয়। এরপর থাইল্যান্ডের জঙ্গলে কমপক্ষে তিনটি আলাদা আলাদা ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। তিনি সবশেষে যে ক্যাম্পে ছিলেন সেখানে কমপক্ষে ৪০ জন মানুষ নিহত হয়েছেন। ওদিকে গতকাল অনুসন্ধানকারীরা গহীন ও দুর্গম জঙ্গলে আরও একটি গণকবরের সন্ধান পেয়েছেন। এসব ঘটনায় এর কাছাকাছি অবস্থিত একটি গ্রামপ্রধান ইয়ালি ক্রেমকে আটক করেছে পুলিশ। সে বলেছে, প্রথম গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে গত শুক্রবার। সেখানে যে পরিমাণ মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তার বাইরে অন্য বন্দিদের মৃতদেহ রয়েছে দ্বিতীয় ওই গণকবরে। ইয়ালি ক্রেমসহ এ ঘটনায় স্থানীয় মোট ৫ জন রাজনীতিক ও বিদেশী নাগরিককে আটক করা হলো। দ্বিতীয় যে গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে তা প্রথম গণকবর থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে। পুলিশ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্রাউত বলেছেন, তারা সেখানে ৫টি কবরের সন্ধান পেয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের চোখে জামায়াত হবে ‘বোকো হারাম’? by মিজানুর রহমান খান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের কি অবসান ঘটতে যাচ্ছে? মনে হচ্ছে বিএনপিকে তার ‘কৌশল-মিত্র’ জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। ১৯৯৬ সালের আগ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যে বিতর্কিত কৌশলগত সম্পর্ক ছিল, তার দোহাই দিয়ে বিএনপি এতকাল যতটা সহজে দলটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করে চলছিল, এখন তাদের তা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। জামায়াতকে বাদ দিয়ে জোট পুনর্গঠন করা উচিত, কিন্তু তা করতে গেলে তারেক রহমানকেও মাইনাস করার ঝুঁকি নিতে হবে।
একাত্তরে নিক্সন-কিসিঞ্জারের অনুসরণ করা বিতর্কিত বাংলাদেশ নীতির একমাত্র বাংলাদেশি সমর্থক জামায়াতই এখনো রাজনীতিতে ফ্যাক্টর হিসেবে টিকে আছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র বিচার–প্রক্রিয়ার মান নিয়ে উচ্চকিত থাকলেও ধীরে ধীরে অবস্থান বদল করে।
ইইউ পার্লামেন্টের সুপারিশের পরে মার্কিন কংগ্রেসের গত ৩০ এপ্রিলের শুনানিতে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার প্রসঙ্গ প্রথম উঠল। গত বছরের আগস্টে যুদ্ধাপরাধসংক্রান্ত মার্কিন অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট লার্জ স্টিফেন র্যা প তাঁর পঞ্চম সফরে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য ট্রাইব্যুনালের অগ্রগতিতে সন্তুষ্টি ও বিচারকদের সাহসের প্রশংসা করেন। বিএনপি-জামায়াত হয়তো ভেবেছে, র্যা প বুঝি উভয় দলের কাঠগড়ায় তোলা নেতাদের উদ্ধার করতে এসেছেন। র্যা প স্মরণ করেছিলেন আর্চার কেন্ট ব্লাডকে, এর চার বছর পরে প্রথম আলোয় এসে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট তাঁকেই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, যাঁকে আমি বলি আমাদের রণাঙ্গনের একমাত্র মার্কিন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা (কারণ, একাত্তরে ঢাকায় মার্কিন কনসাল ব্লাড তাঁর বাড়ির বাগানে মাটির নিচে বিদ্রোহী বাঙালি পুলিশের রাইফেল লুকিয়ে রেখেছিলেন)। ঢাকা থেকে ড্যান মজীনার ধূসর বিদায়ের পরে বার্নিকাট রীতিমতো ঢাকায় হাতে করে বয়ে আনেন নিক্সন-কিসিঞ্জারের নীতির প্রতি অনাস্থা প্রকাশের স্মৃতিধন্য ব্লাডের সেই বিখ্যাত টেলিগ্রাম, যা তিনি জাতীয় জাদুঘরে দান করেছেন।
বিএনপি আমেরিকার ২০০১ সালের ৯/১১-এর মাহাত্ম্য বুঝতে পারলে হয়তো নিজের জন্য ২০০৭ সালের ১/১১ এড়াতে পারত। কিন্তু সময় গড়িয়ে গেলেও বিএনপি জামায়াতে আটকে আছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে এককালের শিথিল জামায়াতি দোস্তিটাই তার পক্ষে আজও আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহারের লোভটা সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে।
তাই বিএনপি নেত্রী কিছুদিন আগেও তার প্রথম সরকারকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গাঁটছড়া বাধার পুরোনো ও আত্মঘাতী কাসুন্দিটাই বিরক্তিকরভাবে ঘেঁটেছেন। কিন্তু তিনি হয়তো এখনো ভাবছেন না, শহীদজননী জাহানারা ইমামের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া সেই শেখ হাসিনা আর আজকের হাসিনা এক নন। সেই সময় আর টুইন টাওয়ার পরবর্তী আজকের সময়ের মধ্যে বিরাট তফাত। এখন প্রতি পদে পদে ভারতকেও সমঝে চলতে হয় চীনা পীড়াতাড়িত যুক্তরাষ্ট্রকে।
টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পরে বিশ্বের নিরাপত্তা ধারণা রাতারাতি বদলে গিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি নাচতে নাচতে জামায়াতকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিল। এরপর জামায়াতি জোশে জেএমবি সারা দেশে বোমা ফাটালেও তাদের হুঁশ হলো না, ঘুম ভাঙতে খুব দেরি হলো কিংবা ভাঙলই না।
ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর বার্টিল লিন্টনার ছিলেন হুইসেল ব্লোয়ার। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির পরিবর্তে তারা লিন্টনারকেই কুচক্রী চিহ্নিত করে। রাজশাহীতে বাংলা ভাইকে দেওয়া হয় গণসংবর্ধনা, আর ঢাকায় চলে তালেবানি জয়গান, আর রাতের আঁধারে ঘটে ১০ ট্রাক অস্ত্রের পারাপার। এরপর আফগানিস্তান ও ইরাক উপাখ্যান ঘটেছে, হালে আইএসের উত্থান ঘটেছে। কিন্তু বিএনপি ও তার নেত্রী ধনুক ভাঙা পণ করেই আছেন। জগৎ উল্টে যায় যাবে, কিন্তু তাদের জামায়াতপ্রীতি অবিনশ্বর, উল্টো তারা হেফাজতপ্রীতি দেখিয়ে আরও সর্বনাশ করেছে। এই সেদিন বিএনপি নেত্রী একটু নরম সুরে বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে মতাদর্শগত নয়, কৌশলগত ঐক্য চলছে। বিএনপি-সমর্থকদের চোখেমুখে সে কী তৃপ্তির ছাপ, যেন খালেদা জিয়া মহা একটা চাল দিয়ে ফেলেছেন।
ইতিমধ্যে কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের ফাঁসি হয়েছে। ইইউ পার্লামেন্টে জামায়াতের অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করতে প্রস্তাব পাস হওয়ার পরে এবারে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে কথাটা উঠল। যদিও এটা কোনো সংসদীয় প্রস্তাব নয়, তদুপরি মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন রিলেশনস কমিটিতে যাঁদের ডাকা হলো, তাঁরা জামায়াত সম্পর্কে কম-বেশি নেতিবাচক ধারণাই স্পষ্ট করেছেন।
হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের পরিচালক জে কানসারাকে সাক্ষী হিসেবে ডাকাটাই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বহুত্ববাদ ও হিন্দুত্ববাদ প্রচারক এই সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধের অনুকূলে প্রচার চালাচ্ছে। তারা নির্দিষ্টভাবে জামায়াত-শিবিরকে এফটিও এবং ইও ১৩২৪৪-এর আওতায় ফেলার প্রস্তাব করেছে। এফটিও মানে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের ২১৯ ধারার অধীনে ‘ফরেন টেররিস্ট অর্গানাইজেশনস’, যা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেন। জামায়াত-শিবিরকে এফটিও হলে তার নেতা–কর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধাগ্রস্ত হবেন, জামায়াতের মার্কিন সদস্যরা সে দেশ থেকে অপসারিত হবেন।
আর ইও ১৩২৪৪-এর আওতায় এক্সিকিউটিভ অর্ডারে উল্লেখ করা বিধিনিষেধের মধ্যে জামায়াতের ব্যক্তি বা সংগঠন পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ মার্কিন এখতিয়ারে আসা তাদের সব অর্থ ও সম্পদ আটকে দিতে পারবে। এটা করতে হলে দেখাতে হবে যে জামায়াত-শিবির মার্কিন বিদেশনীতির জন্য ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত। নাইজেরিয়ার বোকো হারামকে এই দুটো ধারাতেই নিষিদ্ধ করা হয়। কানসারা ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশবিষয়ক শুনানিতে বলেছেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করতে হবে।
আমেরিকান হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মিস লিসা কার্টিস দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে সিএনএন বিবিসির পরিচিত ভাষ্যকার। হেরিটেজে যোগদানের আগে তিনি মার্কিন আইনসভায় দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ে ব্যাপকভাবে যুক্ত থেকেছেন। নয়াদিল্লি ও ইসলামাবাদে মার্কিন পলিটিক্যাল অফিসার ছিলেন আর সিআইএ-তে থাকতেও এই অঞ্চলের ওপর কাজ করেছেন। কংগ্রেস শুনানিতে লিসা কার্টিজ বলেন, ‘জামায়াতের সহিংস রেকর্ড বিবেচনায় নিলে তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্বেগের যথার্থতা আছে। যদিও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর তারা ক্রাক ডাউন চালালে যে অসন্তোষ তৈরি হবে, সেই সুযোগে জামায়াত আবারও সহিংস প্রবণতাকে সংগঠিত করার সুযোগ পাবে, আর তখন সমস্যা আরও খারাপ দিকে মোড় নেবে।’ লিসার মতে, ‘জামায়াতের গ্রামে ছোট ভিত্তি আছে। তাদের যুব সংগঠনের জঙ্গিত্ব সুবিদিত। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তারা সহিংস উসকানি দিয়ে থাকে। জামায়াত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর একাধিক হামলা চালিয়েছে।’
অধ্যাপক আলী রীয়াজ তাঁর বক্তব্যে পেট্রলবোমা হামলার কিছু ক্ষেত্রে সরকারদলীয়দের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের প্রতি ইঙ্গিত করলেও সাফ বলেছেন, অধিকাংশ হামলার সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত জড়িত। লক্ষণীয় যে ২০১৩ সালের নভেম্বরের মার্কিন কংগ্রেসের একই ধরনের শুনানিতে জামায়াত প্রসঙ্গ একেবারেই আলোচনায় আসেনি।
জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি স্পর্শকাতর বলেই সরকার হয়তো সাতপাঁচ ভেবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। স্টিফেন র‌্যাপ অবশ্য গত আগস্টে তাঁর সবশেষ সফরে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারের বিরোধিতা করেছিলেন। জামায়াতের বিচার ও সমাজে সংগঠন হিসেবে তার পুনর্বাসন খুবই যে জটিলতাপূর্ণ, তাতে সন্দেহ নেই।
গত মার্চে ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে যখন যুদ্ধাপরাধী সংগঠনের বিচারের প্রশ্নটি তুলি, তখন আর্জেন্টাইন বিশেষজ্ঞ দানিয়েল ফেইরেস্তেইন অবাক হন। তিনি স্পষ্ট ইঙ্গিত করেন যে সংগঠন নিষিদ্ধ করা হলে তারা তো নাম বদলে নেবে, তাহলে তাতে লাভ কী হবে। বাহাত্তরের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদও আর আগের মতো নেই।
উইকিলিকস নথিতে প্রমাণ মেলে, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্ক পরিষ্কার। তবে এখন তাতে চিড় ধরলে অবাক হব না। আবার কংগ্রেসের শুনানিটাই চূড়ান্ত বার্তা নাও হতে পারে। এর আগে যখন মার্কিন তদন্তের ভিত্তিতে বুদ্ধিজীবী হত্যায় জামায়াতের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলাম, তখন জামায়াত প্রতিবাদ করল। তাদের ভারপ্রাপ্ত নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান গত ১৪ ডিসেম্বরে প্রথম আলোর নিবন্ধের নিন্দা করলেন। কিন্তু তারা মার্কিন দূতাবাসের তদন্তকে মিথ্যা বলে মার্কিন সরকারের নিন্দা করেনি।
২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি মার্কিন দূতাবাসের একটি গোপন তারবার্তা সাক্ষ্য দিচ্ছে যে জামায়াত বলেছিল, তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য তাদের মতো করে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। এটা এখন চার মূলনীতির সঙ্গে যায় না। আসলে জামায়াতের দরকার আত্মজিজ্ঞাসা। বিএনপি তাকে ‘মুক্তি’ দিলে বা নিজ থেকে নিলে এ কাজটা হয়তো তার জন্য সহজ হতে পারে। কামারুজ্জামানের চিঠিতে যে সংস্কারের নির্দেশনা আছে, বিএনপির অন্তত উচিত সেটা মেনে নেওয়া বা ফয়সালা করে নেওয়া।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাইদুল ইসলামের লেখা ও কেমব্রিজ প্রকাশিত নতুন বইয়ে (লিমিটস অব ইসলামিজম, জামায়াত-ই-ইসলামী ইন কনটেম্পরারি ইন্ডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ, ২০১৫) বাংলাদেশ ও ভারতের জামায়াতের একটি তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। এই বইয়ে বিএনপি ও তার নেত্রী খালেদা জিয়া সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, সেটা বড়ই কৌতূহলোদ্দীপক। এতে অনুমান করা হয়েছে, রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার দিন ফুরালে বিএনপিরও দিন ফুরাবে। তখন জামায়াত আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হবে। এর কারণ তার নামের শেষে ইসলাম থাকার কারণে অতীত ভুলে আমজনতা তাদের পেছনেই থাকবে। বর্তমানে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান মনে করেন, ‘মিসরের ইখওয়ানের (মুসলিম ব্রাদারহুড) মতো জামায়াত হয়তো একাত্তরে কৌশলগত ভুল করেছে।’ তাঁর মতে, ‘খালেদা জিয়ার পরে বিএনপি ভেঙে যাওয়ার প্রকৃত সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। বিএনপি সাফল্যের সঙ্গে দুর্বল হলে ভারত ও আওয়ামী লীগবিরোধী একমাত্র মঞ্চ হবে জামায়াত, সে ক্ষেত্রে বর্তমানে জামায়াতের যত দুর্বলতা আছে, তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।’ (পৃ. ৩০৩)
মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে লিসা কার্টিজ বাংলাদেশ সংকট মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ থাকার সুপারিশ করেছেন। এর অর্থ ভারতকে তারা চটাবে না। এখন জামায়াত ‘বোকো হারামের’ ভাগ্য বরণ করে কি না, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে। গতকালের এএফপির খবর, অভিজিৎ হত্যার দায় আল–কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ চ্যাপ্টার স্বীকার করেছে। এ ঘটনা ওবামা প্রশাসনের জামায়াতবিরোধী অবস্থান গ্রহণকে তীব্রতা দিতে পারে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

৫০০ অভিবাসীকে হত্যা!

থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া সীমান্তের বন্দিশিবিরে পাচার বা অপহরণের শিকার হওয়া পাঁচ শতাধিক অভিবাসীকে মেরে ফেলা হয়ে থাকতে পারে। মানব পাচারকারীদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া একজন অভিবাসী এ কথা বলেছেন। মানব পাচার রোধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে থাইল্যান্ডকে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। খবর বিবিসি, রয়টার্স, ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ফুকেট গেজেটের।
বন্দিশিবিরের পাঁচ শতাধিক লোককে মেরে ফেলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন যিনি, সেই অভিবাসী তাঁর নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ওই ঘাঁটিগুলোতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে চাকরির আশ্বাস দিয়ে বা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আটক রাখা হতো। মালয়েশিয়ায় চাকরির লোভ দেখিয়ে ছয় মাস আগে তাঁকেও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে থাইল্যান্ডে নেয় পাচারকারীরা। তিনি যে শিবিরে ছিলেন সেখানে ৭০০ থেকে ৮০০ অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘মা জমি বিক্রি করে মুক্তিপণ শোধ করায় আমি বেঁচে গেছি।’
থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশের সাদাও এলাকার গভীর জঙ্গলে গণকবর থেকে সম্প্রতি যে ২৬ জন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীর দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁদের একজনের নাম কাজিম। বেঁচে যাওয়া এক অভিবাসী পুলিশকে জানিয়েছেন, অরনুয়া নামের এক পাচারকারী ও তার সহযোগীরা মিলে কাজিমকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে মেরে ফেেলছে। তিনি নিজে সে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে কাজিম কোন দেশের নাগরিক তা উল্লেখ করা হয়নি।
থাইল্যান্ড সীমান্তের বন্দিশিবির থেকে ভাগনে কাজিমকে ছাড়াতে ৯৫ হাজার বাথ (থাই মুদ্রা) মুক্তিপণ দিয়েছিলেন কুরামিয়া। তার পরও কাজিমকে জীবিত ফিরে পাননি। মিলেছে তাঁর দেহাবশেষ। কুরামিয়া নিজেও ভাগ্যান্বেষণে একইভাবে দেশ ছেড়েছিলেন।
কুরামিয়া বলেন, ‘অরনুয়া নামের এক পাচারকারী যখন আমার সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ করে, তখন তাকে কাজিমের মুক্তিপণ বাবদ ৯৫ হাজার বাথ দিই। ১৫ দিন পর সে আরও ১ লাখ ২০ হাজার বাথ চায়। আর টাকা না থাকায় আমি থাই পুলিশের কাছে অভিযোগ করি। এরপর কাজিমকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়।’
থাইল্যান্ডের পুলিশ কর্মকর্তা জারুমপর্ন সুরামানি গত রোববার জানান, প্রথম গণকবর থেকে তাঁরা ২০ জনের কঙ্কাল ও ছয়জনের গলিত দেহাবশেষ পেয়েছেন। একই দিন শংখলার গভীর জঙ্গলে আরেকটি গণকবরের সন্ধান পাওয়ার খবর শোনা যায়। গত শুক্র ও শনিবার প্রথম গণকবরটি থেকে যাঁদের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়, তাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি ছিলেন বলে জানিয়েছেন সেখানকার শিবির থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া এক বাংলাদেশি। দ্বিতীয় গণকবরটিতে ৫০ জনের বেশি লোকের দেহাবশেষ থাকতে পারে বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়। সেখানে অনুসন্ধান চলছে।
পুলিশ জানায়, প্রত্যন্ত শংখলা এলাকায় মানব পাচারকারীদের বড় ঘাঁটি ছিল বলে তাদের ধারণা। সম্ভবত কিছুদিন আগে তারা এলাকাটি ছেড়ে গেছে। নৌকায় করে আসা বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওই বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হতো। পরে স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করা হতো মুক্তিপণ। টাকা দিতে না পারায় অনেকে দীর্ঘ সময় বন্দী থেকে অনাহারে ও রোগে মারা যান।
জীবিত একজন বাংলাদেশি: গণকবরের কাছ থেকে গত শুক্রবার মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি বাংলাদেশি বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে ব্যাংককের বাংলাদেশ দূতাবাস। পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক গতকাল বিবিসিকে বলেন, রাষ্ট্রদূত ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বাংলাদেশি বলে দাবি করেছেন। আরও নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে।
চাপের মুখে থাইল্যান্ড: মানব পাচার রোধে থাইল্যান্ডের বর্তমান সামরিক সরকারের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল দেশটির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। সম্প্রতি গণকবর থেকে অভিবাসীদের দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনায় এ চাপ অনেক বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় থাই সরকার পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর অঙ্গীকার করেছে।
কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে থাইল্যান্ডকে নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি করার হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। থাইল্যান্ড থেকে বছরে প্রায় ৭০ কোটি ডলারের সামুদ্রিক খাবারের আমদানি বাতিল করার হুমকি দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ)।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, ‘এ ঘটনায় বিস্ময়ের তেমন কিছু নেই। মানব পাচারে থাই কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন থেকেই জড়িত। দোষী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততায় নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।’
তিন সরকারি কর্মকর্তা গ্রেপ্তার: আন্তর্জাতিক চাপ ও সমালোচনার মুখে মানব পাচারে জড়িত সন্দেহে তিন সরকারি কর্মকর্তাকে গতকাল গ্রেপ্তার করেছে থাইল্যান্ড। থাই পুলিশের জেনারেল সোময়ুত পুনপানমুয়াং গতকাল ঘটনার আলোচিত কেন্দ্রস্থল শংখলায় যান। এর আগে আগে সাদাও এলাকার একজন কাউন্সিলর ও দুজন উপগ্রামপ্রধানকে গ্রেপ্তারের কথা ঘোষণা করেন তিনি।
বুধবার পুলিশ সো নাইং ওরফে আনওয়ার নামের আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে। কর্তৃপক্ষের ধারণা, সে পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা। পুলিশ বলেছে, তাদের অভিযানে সম্প্রতি একটি আটক শিবির বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে প্রায় ৪০০ অভিবাসীকে মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা হয়েছিল বলে তাদের ধারণা। তাঁদের প্রায় সবাই ছিলেন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি।
সীমান্তে অন্তত ৬০ আটক শিবির: থাইল্যান্ডের রোহিঙ্গা অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল কামাল বলেন, থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তে পাচারকারীদের অন্তত ৬০টি আটক শিবির রয়েছে। এর অধিকাংশই মালয়েশীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত। প্রতিটি শিবিরে ১৫০ থেকে ৮০০ জন রয়েছেন।
এদিকে আরাকান প্রোজেক্ট নামের একটি সংগঠনের পরিচালক ক্রিস লিওয়া বলেন, থাইল্যান্ডের সমুদ্রোপকূলের শিবিরগুলোতে এখনো অনেক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বন্দী হয়ে আছেন।
দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার তাগিদ: বাংলাদেশে মানব পাচার চক্রগুলো আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইএমওর কর্মকর্তা আসিফ মুনির বিবিসিকে বলেন, সংঘবদ্ধ চক্রগুলো সব সময় তৎপর রয়েছে। তবে মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে। তারা বুঝতে পারছে, বেআইনি পথে বিদেশে যাওয়াটা কত বিপজ্জনক। তার পরও অনেকের মধ্যে মরিয়া ভাবটা থেকে যায় যে তার হয়তো কিছু হবে না।
আসিফ মুনির আরও বলেন, বেআইনিভাবে যারা বিদেশে যান, তাঁদের ব্যাপারে সরকার বা অন্য সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য থাকে না। যখন তাঁরা বিদেশে কোনো বিপদে পড়ে সাহায্য চান, কেবল তখনই তথ্যগুলো প্রকাশ পায়। এ ধরনের বেআইনি অভিবাসনের চেষ্টা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য তৎপরতা বাড়াতে হবে।

যার ছোঁয়ায় বদলে গেলেন মোদি

আগামী ৯ মে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের প্রাদেশিক রাজধানী কলকাতা সফরে যাচ্ছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেখানে ৯৫ বছর বয়স্ক এক হিন্দু সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা করবেন তিনি, আর এর মাধ্যমে রক্ষা করবেন বহু বছর আগে নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতিটি।
এ সন্ন্যাসীকেই নিজের গুরু মেনেছিলেন মোদি এবং এই গুরুর নির্দেশেই রাজনীতিতে পা রাখেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বিশ্বের মানচিত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশটির প্রধানমন্ত্রিত্বও অর্জন করেন তিনি।
কলকাতার কাছেই অবস্থিত বেলুর মঠে রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান পুরোহিত স্বামী আত্মাস্থানন্দ সঙ্গে দু’দিনের কলকাতা সফরের মধ্যে যে কোনো সময় দেখা করতে যেতে পারেন মোদি। শেষবার বেলুরে পা রেখছিলেন মোদি ২০১৩ সালে। এখন তিনি ছিলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। সেবারই ফের এই বেলুরে ফেরার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন তিনি। এক সময় স্বামীজির সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন মোদি।
১৯৬৬ সালের কথা। কলকাতার বেলুরের রামকৃষ্ণ আশ্রমের (আরকেএম) সন্ন্যাসী স্বামী আত্মাস্থানন্দ গুজরাটের রাজকোটে প্রধান সন্ন্যাসী হয়ে যান। স্বামী বিবেকানন্দের ভক্ত তরুণ মোদি ছুটে যান তার কাছে। তিনি আশ্রমে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি চেয়েছিলেন। এর আগেই কয়েক বছর বিভিন্ন আশ্রমে ঘুরেছেন মোদি। তিনি সন্ন্যাসী হতে চেয়েছিলেন। স্বামী আত্মাস্থানন্দের সাহচর্চে বেশ কিছুদিন পার করেন মোদি। এ সময়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলে মোদির গুরু আত্মাস্থানন্দ তাকে বলেন, ‘সন্ন্যাস জীবন তোমার জন্য নয়।’ রাজকোট আশ্রম মোদিকে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করতে না দিলে মোদি রামকৃষ্ণ আশ্রমের প্রধান কার্যালয় বেলুরে চলে যান এবং তার ইচ্ছার কথা জানান।
আত্মাস্থানন্দ মোদির হাতে একটি চিঠি দিয়ে তাকে বেলুরে রামকৃষ্ণ আশ্রমের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট স্বামী মধ্যবানন্দের কাছে পাঠান। স্বামী মধ্যবানন্দও মোদির অনুরোধ রাখেননি। মোদিকে তিনি বলেন, তোমার কাজ জনগণকে নিয়ে। গৃহত্যাগী হওয়া তোমার কাজ নয়।’ বেলুর থেকে রাজকোটে ফিরে কয়েকদিন স্বামী আত্মাস্থানন্দের সান্নিধ্যে কাটান মোদি। এরপর যোগ দেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘে (আরএসএস)। এ সংগঠনের হাত ধরে রাজনীতিতে যুক্ত হন মোদি।
গত বছরের মে মাসে গুরু আত্মাস্থানন্দের সঙ্গে দেখা করতে যান মোদি। গুরুর পায়ের কাছে বসে থাকেন তিনি। গুরুর আশীর্বাদ নিয়ে ফিরে আসেন। মোদির ৯৫ বছর বয়সী গুরু স্বামী আত্মাস্থানন্দ অসুস্থ। তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রিয় ভক্ত মোদি এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বেলুর মঠ থেকে রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদার মূর্তি চুরি হওয়ায় মোদিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য বলেছেন তার গুরু। মোদি ও তার গুরুর মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে সেই ১৯৬৬ সাল থেকে, প্রায় ৫০ বছর। অনেকেই জানেন না- ২০১৪ সালের ২৬ মে ভারতের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করছিলেন তিনি, তখন তার জ্যাকেটের পকেটে একটি ‘প্রসাদী’ ফুল ছিল।

পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কে?

আগামী ৭ মে ব্রিটেনের ১৮তম সাধারণ নির্বাচন। বৃহস্পতিবারের ওই নির্বাচনে কে হতে যাচ্ছেন পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী? প্রতিদ্বন্দ্বিতার তালিকায় রয়েছেন অনেকে। কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির দ্বিদলীয় প্রভাব থেকে বেরিয়ে এখন উদ্ভব হয়েছে বহু দল ও গোষ্ঠীর। ধারণা করা হচ্ছে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। তখন জোট করতে হবে ছোট দলগুলোর সঙ্গে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান প্রধান দল ও নেতার পরিচয় এখানে তুলে ধরা হল-
ডেভিড ক্যামেরন- কনজারভেটিভ পার্টি : ডেভিড ক্যামেরন (৪৮) ব্রিটেনের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। ২০১০ সালে লেবার পার্টির গর্ডন ব্রাউনের পর সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিটেনের হাল ধরেন তিনি। সেই নির্বাচনে তার দল কনজারভেটিভ পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বাধ্য হয়ে তৃতীয় বৃহত্তম দল লিবারেল ডেমোক্রেটের সঙ্গে জোট করে। এটোন ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ক্যামেরনের বাবা ছিলেন স্টকব্রোকার ও মা ছিলেন একজন বিচারক। ক্ষমতায় আসার আগে ক্যামেরন প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন ব্রিটেনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ‘কমিউনিটি ক্ষমতায়ন’ করবেন। কিন্তু অর্থনীতির হাল ধরতে ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় ওই প্রতিশ্র“তি পূরণের ব্যর্থ হয়েছেন তিনি।
নাইজেল ফারাগ- ইউকিপ : ইউনাইটেড কিংডম ইন্ডিপেনডেন্স পার্টির (ইউকিপ) নেতা নাইজেল ফারাগ প্রচণ্ড অভিবাসনবিরোধী। ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের করে এনে ইউরোপের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য গড়তে চান তিনি। স্কুল শেষ করে আর কলেজে পড়তে পারেননি ফারাগ। বাবার মতো স্টকব্রোকার ব্যবসা করেন। পরে রাজনীতিতে আসেন।
নাতালি বেনেত- গ্রিন পার্টি : ২০১২ সাল থেকে গ্রিন পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাংবাদিক নাতালি বেনেত। ‘দ্য ব্যাংকক পোস্ট’, ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’ ও ‘টাইমস অব লন্ডন’ পত্রিকা প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন তিনি। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ‘গার্ডিয়ান উইকলি’ সম্পাদনা করতেন। অস্ট্রেলিয়া বংশোদ্ভূত নাতালি (৪৯) একজন নারীবাদী কর্মী। ক্ষমতায় এলে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
এড মিলিব্যান্ড- লেবার পার্টি : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাজি হত্যাকাণ্ড থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী ইহুদিপুত্র এড মিলিব্যান্ড (৪৫)। ২০১০ সালে তার ভাই আন্তর্জাতিক উদ্ধার কমিটি ও সাহায্য সংস্থার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডেভিডকে সামান্য ব্যবধানে হারিয়ে বামপন্থী লেবার পার্টির নেতৃত্বে আসেন মিলিব্যান্ড। তার স্ত্রী থরটন একজন পরিবেশবাদী আইনজীবী। মিলিব্যান্ড ব্রিটেনের ‘ক্রমবর্ধমান’ ধনী-গরিব ব্যবধান কমিয়ে আনা ও আবাসন খরচ সহনীয় করতে চান। স্বাস্থ্য খাতে বছরে অতিরিক্ত ৪০০ কোটি ডলার ব্যয়ের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
নিক ক্লেগ- লিবারেল ডেমোক্রেটস : ২০০৭ সাল থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটসের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিক ক্লেগ (৪৮)। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের সময় তার মা ইংল্যান্ডে এসেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনের প্রথম জোট সরকারের (২০১০) ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী হন ক্লেগ। কর্মজীবী পিতামাতার সন্তানদের বিনামূল্যে শিশুসেবা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শ্রমিকদের কর কমিয়ে আনতে চায় তার দল। গত পাঁচ বছরে নিু আয়ের মানুষের কর কমিয়ে দেয়া হয়েছে।
লিনে উড- প্লেইড সিমরু : ওয়েলসের রাজনৈতিক দল প্লেইড সিমরুর প্রথম নারী নেতা লিনে উড (৪৩)। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে স্কটল্যান্ডের মতো ওয়েলসের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে ২০১২ সাল থেকে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রভাষক উড।
নিকোলা স্টারজিয়ন- স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি : স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার নিকোলা স্টারজিয়ন (৪৪) নেতৃত্বাধীন স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি লিবারেল ডেমোক্রেটসকে পেছনে ফেলে ব্রিটেনের তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে বলে সর্বশেষ জরিপে আভাস পাওয়া গেছে। শ্রমজীবী পরিবার থেকে উঠে এসেছেন স্টারজিয়ন। তার বাবা ছিলেন ইলেকট্রিশিয়ান ও মা ছিলেন নার্স। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করেছেন স্টারজিয়ন।

বৃটেনের নির্বাচনের দিকে সিলেটের ‘কোটি চোখ’ by ওয়েছ খছরু

বৃটেনের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে সিলেটের কোটি মানুষ। ইতিমধ্যে নির্বাচন নিয়ে প্রবাসী পরিবারে দেখা দিয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। আর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে সিলেট থেকে বৃটেন ছুটে গেছেন অনেকেই। তারা পছন্দের সিলেটি প্রার্থীর পক্ষে বিশেষ করে বাঙালি কমিউনিটির কাছে প্রচারণা চালিয়েছেন। জয় ঘরে তুলতে তারা অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও। বৃটেন-সিলেটের সেতুবন্ধন ক্রমেই সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। এর কারণ কয়েক লাখ সিলেটি বসবাস করেন স্বপ্নের শহর লন্ডনে। এ কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বৃটেনের সঙ্গে সিলেটের সম্পর্ক (আত্মার সম্পর্কে) পরিণত হয়েছে। আর এ কারণে সিলেট ও বৃটেন যেন একই সুতোয় গাঁথা। সুখ, দুঃখ, আনন্দ বেদনা গাথাও একসঙ্গে। সিলেটের মানুষ সম্পর্কের কারণেই এতোদিন বাংলাদেশে নির্বাচন হলেই ছুটে আসতেন হাজার হাজার লন্ডন প্রবাসী। কেউ কেউ বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমপি হয়েছেন। কিন্তু এবার বৃটেনের নির্বাচন নিয়ে সিলেটের স্থানীয় মানুষের কাছে আগ্রহ বেশি। নির্বাচন শুরু হওয়ার প্রায় ৬ মাস আগে বৃটেন নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে গেছেন প্রবাসীরা। রুশনারা আলী, মিনা রহমানসহ কয়েক জন এমপি প্রার্থী সিলেটের স্বজনদের কাছে মতবিনিময় করে গেছেন। বৃটেনের এমপি প্রার্থীদের প্রচারণায় মুখর ছিল সিলেট। আর নির্বাচনী ডামাডোল শুরু হওয়ার পর এবার সিলেট থেকে অনেকেই ছুটে গেছেন লন্ডনে। তারা সিলেটি প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। এবার বৃটেনের নির্বাচনে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ১২ জন প্রার্থী প্রচারণায় নেমেছেন। এর মধ্যে লেবার দল থেকে আটজন, কনজারভেটিভ দল থেকে একজন ও লিবারেল  েেমাক্রেট দল থেকে তিনজন মনোনয়ন  পেয়েছেন। এরা হচ্ছেন, লেবার পার্টির রুশনারা আলী এমপি, টিউলিপ সিদ্দিক, ড. রূপা হক, ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া, সুমন হক, আখলাকুল ইসলাম, কনজারভেটিভ পার্টি থেকে মিনা রহমান, লিবারেল ডেমোক্রেট থেকে আশুক আহমদ এমবিই, প্রিন্স সাদিক চৌধুরী ও মোহাম্মদ সুলতান। এই প্রার্থীদের মধ্যে অনেকেই সিলেটের মানুষের কাছে অনেক প্রিয় ব্যক্তি। এক নামেই চেনেন সবাই তাদের। নির্বাচন এখন দরোজায় কড়া নাড়ছে। কিন্তু তার আগেই সিলেট থেকে ইতিমধ্যে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা লন্ডনে গেছেন। তারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতেই লন্ডন গেছেন বলে জানিয়েছেন তাদের স্বজনরা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন সিলেটের সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে তিনি এ দুটি সিটি নির্বাচনের প্রচারণায় শেষ করে লন্ডন গেছেন। যাওয়ার আগে সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান জানিয়েছেন, লন্ডনে অবস্থানরত সিলেটের মানুষের কাছে পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাতে তিনি সেখানে যাচ্ছেন। সেখানে তিনি নির্বাচন পর্যন্ত অবস্থান করবেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ও সিটি নির্বাচনে লন্ডনের নেতারা এসে এখানে প্রচারণা চালান। এবার তাদের প্রচারণায় অংশ নিতে তিনি লন্ডনে গেছেন। কামরান বৃটেনে  পৌঁছে রুশনারা আলীসহ বেশ কয়েকজন এমপি প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী বৃটেনের নির্বাচনী ও প্রচারণায় অংশ নিতে লন্ডনে গেছেন। তিনি সেখানে পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেন। এর আগে কয়েক দিন লন্ডনে অবস্থান করে বাঙালি কমিউনিটিদের কাছে প্রচারণা চালিয়ে এসেছেন সিলেট-২ আসনের বর্তমান এমপি ইয়াহইয়া চৌধুরী এহিয়া। এছাড়া সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও সিটি কাউন্সিলর আজাদুর রহমান সহ ২০ থেকে ২৫ জন নেতাকর্মী প্রচারনণা চালাতে বৃটেনে ছুটে গেছেন। এছাড়া এমপি প্রার্থীদের সহযোগিতা করতে তাদের স্বজনরাও ছুটে গেছে বৃটেনে। সিলেটের প্রবাসীদের স্বজনরা জানিয়েছেন, বৃটেন ও সিলেটের যে সম্পর্ক সেটি আরও সুদৃঢ় করতে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন সিলেটিরা। দিন দিন সিলেটি বংশোদ্ভূত এমপি প্রার্থীদের সংখ্যা বেড়েছে লন্ডনে। আর প্রার্থী বাড়ার সংখ্যার পেছনে রয়েছে বৃটেন সরকারে বাঙালিদের ন্যায় সঙ্গত দাবি উপস্থাপন করা। সিলেটি প্রার্থীদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে বৃটেন ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। সহজ হবে ভিসা প্রাপ্তি প্রক্রিয়াও।
ভোটের আগে সিলেটবাসীর কাছে মিনা রহমানের আহ্বান: বৃটেনে আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টির একমাত্র বাঙালি প্রার্থী মিনা রহমান গতকাল এক বিবৃতিতে নির্বাচনে সিলেটবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে বার্কিং-এ অবস্থানরত সিলেটীদের তাকে ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিবৃতিতে মিনা রহমান বলেন, ‘আমি আপনাদের সন্তান। আমি আপনাদের দোয়া এবং ভালবাসা নিয়ে বৃটেনে পার্লামেন্ট নির্বাচনে বার্কিং আসনে এমপি প্রার্থী হিসেবে লড়াই করছি। বৃহস্পতিবার বৃটেনে পার্লামেন্টে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই প্রিয় দেশবাসীর কাছে আমি দোয়া কামনা করছি। আমি যেন নির্বাচনে জয়লাভ করে আপনাদের কাছে আসতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার নির্বাচনের প্রচারণা আমি সিলেট থেকে শুরু করেছিলাম। নির্বাচনে জয়লাভ করে আপনাদের মাঝে আসতে চাই। সিলেটবাসীর ভালবাসায় আমার এত দূর আসা। বার্কিং-এ অবস্থানরত শুধু সিলেটীদের ভোটে আমি নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারবো। তাই সিলেটবাসীর কাছে আমার আহ্বান বার্কিং-এ অবস্থানরত আপনাদের আত্মীয়স্বজনদের আমাকে ভোট দিতে আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি।’ বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমার দল কনজারভেটিভ পার্টি বাঙালি কমিউনিটির সেবায় সর্বদা নিয়োজিত ছিল। আমি নির্বাচিত হলে বার্কিং-এর সকল বাঙালির সেবায় সর্বদা নিয়োজিত থাকবো। বার্কিং-এর বাঙালি কমিউনিটির সুখে-দুঃখে পাশে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।’

ব্যাংক ডাকাতিতে অংশ নেয় ১০ জন

রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতিতে অংশ নিয়েছিল ১০ ডাকাত। এরা সবাই জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। মূলত ব্যাংক ডাকাতি করে তহবিল সংগ্রহ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এই ১০ ডাকাতকে শনাক্ত করার দাবি করেছে পুলিশ। ইতিমধ্যে এ ঘটনায় ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ সোমবার দিবাগত রাতে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর এলাকা থেকে জসিম উদ্দিন ওরফে আসাদ (৩০) কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত আসাদই নিজ হাতে ব্যাংক ম্যানেজারকে ছুরিকাঘাত করেছিল। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক। তিনি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া জসিম উদ্দিন ব্যাংক ম্যানেজারকে ছুরিকাঘাত করে খুন করে। পালিয়ে যাওয়ার সময় জনতা তাকে ধাওয়া করলে সেখানে এক বৃদ্ধকে ছুরিকাঘাত করে। এ সময় সহযোগীদের ছোড়া বোমার স্প্লিন্টার ও গুলি তার পায়ে লাগে। রক্তমাখা অবস্থায় একটি সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে সে আশুলিয়ার শ্বশুর বাড়িতে আশ্রয় নেয়। সেখানে দুইদিন অবস্থানের পর সে পালিয়ে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ফুফুর বাড়িতে আত্মগোপন করে। সোমবার দিবাগত রাতে সেই ফুফুর বাড়ি থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের বরাত দিয়ে অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, আমরা নিশ্চিত হয়েছি তারা জঙ্গি সংগঠনের তহবিল সংগ্রহের জন্য ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়েছে। তহবিল সংগ্রহের জন্য এর আগেও তারা ছোটখাটো ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায়। তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারের পর সবার বাসায় তল্লাশি করে তাদের ধর্মীয় নেতা ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান জসীম উদ্দিন রহমানির বিভিন্ন বই পাওয়া গেছে। আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে জসিম উদ্দিন রাহমানি তাদের ধর্মীয় নেতা বলে জানিয়েছে। পুলিশ তদন্ত করেও প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে তারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য।
ডাকাতিতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা কর্মচারীর সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ব্যাংকের দারোয়ান সোহেলকে আটক করা হয়েছে। কারণ সে সুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় তাকে নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। এখন তাকে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে  ব্যাংকের সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে সেদিনের কোন ফুটেজ সংগ্রহ করা যায়নি। সিসিটিভিতে ১৮ই এপ্রিল পর্যন্ত ভিডিও ফুটেজ ছিল। এর পরের ভিডিও ফুটেজে কেন নেই তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ডাকাতির ঘটনায় নেতৃত্ব দেন আব্দুল্লাহ আল বাকী ওরফে মাহফুজ ওরফে হাফিজ নামে একজন। তার বাড়ি শেরপুর। তিনি জামায়াত-শিবিরের সদস্য ছিলেন। বর্তমানে আনসারুল্লাহার উচ্চপর্যায়ের নেতা। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিল সুমন। এই দুজনকে গ্রেপ্তার করতে পারলে ডাকাতির ঘটনার পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। সূত্র জানায়, সর্বশেষ আসাদসহ এ ঘটনায় মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে বোরহান মৃধা ও আরিফ নামে দুজনকে ঘটনাস্থলে স্থানীয় লোকজন পুলিশে ধরিয়ে দেয়। সে সময় অজ্ঞাত এক যুবককে গণপিটুনী দিয়ে মেরে ফেলে। পরবর্তীতে বাবুল সরদার ও মিন্টু প্রধান নামে দুজনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া ডাকাতির  সহযোগিতার ঘটনায় ব্যাংকের দারোয়ান সোহেলকেও গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গত ২১শে এপ্রিল আশুলিয়ার কাঠগড়া বাজারে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের শাখায় ডাকাতরা হানা দিয়ে ক্যাশ লুটের চেষ্টা চালায়। স্থানীয় লোকজন বিষয়টি টের পেয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এ সময় ডাকাত দলের সদস্যরা ব্যাংকের ভেতরে ব্যাংকের ওই শাখার ব্যবস্থাপক অলিউল্লাহ (৪৫), ব্যাংকের নিরাপত্তা রক্ষী বদরুল আলম (৩৮), ব্যাংকের গ্রাহক ব্যবসায়ী পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করে। ব্যাংক থেকে বেরিয়ে পালানোর সময় ডাকাতদের গুলি ও বোমার আঘাতে মারা যায় ঝালমুড়ি বিক্রেতা মনির, জিল্লুর, জমির, নূর মোহাম্মদ ও আইয়ুব আলী নামে পাঁচ জন। এ ঘটনায় আহত হয় আরও অন্তত ১৬ জন।

লড়ছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ৫ নারী by গোলাম মোস্তফা ফারুক

বাঁ থেকে : রূপা হক, মিনা রহমান, মেরিনা আহমদ
(উপরে), টিউলিপ সিদ্দিক ও রুশনারা আলী
ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে এবার ৫ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নারী দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। এদের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টি থেকে এমপি মনোনয়ন পেয়েছেন ৪ জন। ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টি মনোনয়ন দিয়েছে ১ জনকে। পুরুষদের পাশাপাশি সমান তালে তারা নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে লেবার পার্টির রুশনারা আলী, টিউলিপ সিদ্দিক এবং রূপা হক এখন পর্যন্ত তাদের প্রতিপক্ষের সঙ্গে কোনো কোনো আসনে সমানভাবে, কোথাও বিপুল ভোটের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এসব নারী প্রার্থীর নির্বাচনী কর্মতৎপরতা তুলে ধরা হল :
রুশনারা আলী : বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত রুশনারা আলী ২০১০ সালের ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো নির্বাচনী এলাকা থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তিনিই প্রথম বাঙালি এমপি। এবারও তিনি এ আসন থেকে শ্বেতাঙ্গ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়ছেন। প্রায় ১২ হাজার ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি লেবার পার্টির এ আসনটি পুনরুদ্ধার করেন। গত ৫ বছরে রুশনারা তার নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করেন। তিনি শ্যাডো ডিএফআইডি মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন করেন লেবার পার্টির এমপি হিসেবে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় ব্রিটেনের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় তার দেশের বাড়ি। ৭ বছর বয়সে তিনি পিতা-মাতার সঙ্গে লন্ডনে আসেন। পূর্ব লন্ডনের মালবারী গার্লস স্কুলের এই ছাত্রী পরে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতি, দর্শন এবং অর্থনীতিতে ডিগ্রি লাভ করেন।
টিউলিপ সিদ্দিক : লন্ডনের ক্যামডেন কাউন্সিলের সাবেক কাউন্সিলর ও সংস্কৃতিবিষয়ক কেবিনেট মেম্বার টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক লেবার পার্টির মনোনয়ন পেয়ে হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন আসন থেকে পার্লামেন্ট নির্বাচনে লড়ছেন। টিউলিপ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি। শেখ রেহানার বড় মেয়ে। তার শৈশব কেটেছে ব্র“নেই, ভারত, সিঙ্গাপুর এবং বাংলাদেশে। লন্ডনে কিংস কলেজ থেকে রাজনীতি, পিলিসি ও গভর্নমেন্ট বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রি করেন। তিনি ১৬ বছর বয়স থেকে ব্রিটেনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, গ্রেটার লন্ডন অথোরিটি ও সেইভ দ্য চিলড্রেন ফান্ড চ্যারিটির জন্য তিনি কাজ করেন। ২০০৮ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে অংশ নেন টিউলিপ। ২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলে প্রথম বাঙালি মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের তিনি একজন সদস্য।
রূপা আশা হক : ২০০৪ সালে রূপা হক ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৫ সালে লেবার পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে চেশাম অ্যান্ড এমারশাম আসন থেকে লড়েছিলেন। তিনি লন্ডন বারা অব ইলিংয়ের ডেপুটি মেয়র ছিলেন। ১৯৯৩ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে রাজনীতি, সমাজবিজ্ঞান এবং আইনে গ্রাজুয়েশন করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি কালচরাল স্টাডিজের ওপর পিএইচডি করেন। ব্রিটেনের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান, সানডে অবজারভার, ট্রিবিউন প্রভৃতি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম লিখেন। রূপা হক ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে লেকচারারের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি কিংস্টন ইউনিভার্সিটিতে সোশ্যালজি ও ক্রিমিনালজিতে লেকচারারের দায়িত্ব পালন করছেন। এ বছর ব্রিটিশ পার্লামেন্টে লেবার পার্টি হয়ে ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড একটন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ষাটের দশকে তার মা-বাবা ব্রিটেনে আসেন। তাদের দেশের বাড়ি পাবনা জেলায়। রূপার জন্ম ১৯৭২ সালে লন্ডনে।
মেরিনা আহমদ : ব্যারিস্টার মেরিনা আহমদ ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে লেবার পার্টি মনোনয়ন পেয়েছেন লন্ডনের বেকেনহাম আসনে। মেরিনা গত ত্রিশ বছর লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পার্টির বিভিন্ন ন্যাশনাল ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছেন।
মেরিনা ইউনিভার্সিটি অব সারে থেকে ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাসে বিএ অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব বাথ থেকে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এবং পরে ইন্স অব কোর্ট স্কুল অব ল’ থেকে বার এট ল’ সমাপ্ত করেন।
মেরিনা ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসে হেলথ প্রমোশন অফিসার এবং ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন। লন্ডনে একটি স্থানীয় সংস্থার পলিসি অফিসার তিনি। সরকারের অনেক মন্ত্রীর সঙ্গে কেবিনেট অফিসে তিনি কাজ করেছেন। ব্যারিস্টার হিসেবে ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের প্রসিকিশন টিমে দায়িত্ব পালন করছেন।
মিনা রহমান : এবারের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি থেকে লন্ডনের বাকিং আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি একমাত্র বাঙালি যিনি এ বছর কনজারভেটিভ পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন। লেবার পার্টির সাবেক মন্ত্রী মার্গারেট হজ এই আসনের এমপি ছিলেন। মিনা কাউন্সিলের ঘরবাড়ি উন্নয়ন, বয়স্কদের উন্নয়ন ভাতা বৃদ্ধি, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, স্বল্প ও মধ্যবিত্ত মানুষের কল্যাণসহ বেশ কয়েকটি দাবি বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্র“তি দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। যদিও তিনি ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন কিন্তু তার আসনটি প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত।
সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় মিনার জন্ম। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে বসবাস করছেন।

মার্কেট দখল করে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি by নূর মোহাম্মদ

বিস্ময়কর হলেও ঘটনা সত্য। খোদ রাজধানীতে শপিং মলের বিভিন্ন অংশ দখল করে শিক্ষাকাজ পরিচালনা করছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ধানমন্ডির সোবহানবাগে প্রিন্স প্লাজার একটি তলার আংশিক ভাড়া নিয়ে সেখানে কার্যক্রম শুরু করেছিল ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এরপর আশ্রয় নেয়া হয় নানা কৌশলের। কখনও ভবনের অংশবিশেষ কেনা হয়, কখনওবা করা হয় দখল। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করেই ৫ বছর ধরে কার্যক্রম চালাচ্ছে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি। এ নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে চারটি মামলা  করেছেন ভুক্তভোগীরা। তিনটি মামলায় চার্জ গঠন করা হয়েছে। একটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে।
তিন বছরের ভাড়ার চুক্তিনামা করে প্রায় ৫ বছর ধরে ভবনের ষষ্ঠ তলা জবরদখল করে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ ছাড়া চতুর্থ তলার ২১টি দোকানসহ ৫ হাজার বর্গফুটের বেশি জায়গা দখল করে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ দুই ফ্লোরের ভাড়া বাবদ প্রিন্স প্লাজা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ৪ কোটি ৪১ লাখেরও বেশি টাকা পাওনা। নানা অজুহাতে ভাড়ার টাকা পরিশোধ করছে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ভবনের নিজস্ব গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা, বেইজমেন্ট, সেমি-বেইজমেন্ট দখল করে সেখানে ইনফরমেশন সেন্টার করা হয়েছে। বেসরকারি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলদারিত্বের কারণে পথে বসার উপক্রম হয়েছে ৩ শতাধিক দোকান মালিকের।
সরজমিন দেখা যায়, গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে শুরু করে প্রতিটি তলায় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শ্রেণীকক্ষ, প্রশাসনিক কক্ষ, ইনফরমেশন সেন্টার, শিক্ষার্থীদের বিশ্রামকক্ষ বানানো হয়েছে। দোতলায় দুটি জুয়েলারি দোকান ছাড়া মার্কেটে আর কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। বাকি থাকা এ জুয়েলারি দোকানিরা এখন পজিশন বিক্রি করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। ষষ্ঠ তলার ‘মনে রেখ’ শাড়ির শোরুমের মালিক জুলফিকার আলী মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে একটি মামলা করেছেন ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। মামলা নং-১৩৫/২০১৪। মার্কেটের একজন জুয়েলারি দোকানি অভিযোগ করে বলেন, একসময়ের জাঁকজমকপূর্ণ এ শপিং মলটি এখন মৃতপ্রায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের আনাগোনায় এখানে ক্রেতা আসে না। বাধ্য হয়ে অনেক দোকানদার পজিশন বিক্রি করে চলে গেছেন। এখন মার্কেটের বাইরে থেকে বোঝার কোন উপায় নেই, ভেতরে কোন দোকান আছে কিনা। একটি বাণিজ্যিক ভবনকে আমাদের চোখের সামনে ধ্বংস হতে দেখেছি। তিনি বলেন, ভবনের সামনে ড্যাফোডিল টাওয়ারসহ নানা ব্যানার টানিয়ে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পুরো ভবনের মালিক না হয়ে এটি কিভাবে ড্যাফোডিল টাওয়ার হলো এ প্রশ্ন করেন তিনি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০-এ স্পষ্ট বলা আছে, কোন বাণিজ্যিক বা শপিং মল, জনবহুল জায়গা, প্রধান রাস্তার পাশে কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপন করা যাবে না। অথচ ড্যাফোডিল প্রতিষ্ঠিত একটি বাণিজ্যিক শপিং মল দখল করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস স্থাপন করেছে। মার্কেট দখল করে বিশ্ববিদ্যালয় বানানো হয়েছে- এমন অভিযোগ করে ব্যবস্থা চেয়ে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা ২০১২ সালের ৫ই মে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং ২০শে মে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিব বরাবর আবেদন করেন। এ বিষয়ে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পরিচালক শামসুল আলম বলেন, শপিং মল দখল করে ক্যাম্পাস স্থাপন করলে এটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পরিপন্থি।
প্রিন্স রিয়েল এস্টেটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুর রহমান বলেন, একসময়ের ঐতিহ্যবাহী এ শপিং মলটি একজন লোকের কারণে আজ মৃতপ্রায়। তিনি বলেন, ২০১০ সালের ১লা অক্টোবর ভবনের ষষ্ঠ তলা ভাড়ার চুক্তি হয়। ড্যাফোডিলের তৎকালীন রেজিস্ট্রার ড. ফখরে হোসেন সই করা চুক্তিতে বলা হয়, এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০১৩ সালের ৩০শে নভেম্বর। চুক্তির পরই বুঝতে পারি তাকে ভাড়া দিয়ে ‘খাল কেটে কুমির আনার’ মতো অবস্থা শুরু হয়েছে। নিয়মিত ভাড়া প্রদান না করা এবং প্রিন্স রিয়েল এস্টেট কোম্পানিকে অহেতুক হয়রানি করা তাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়।
আতিক বলেন, এ অবস্থায় ২০১২ সালের ১লা ডিসেম্বর প্রিন্স কোম্পানির পক্ষ থেকে ড্যাফোডিলের চেয়ারম্যানকে নোটিশ প্রদান করি। সেখানে ষষ্ঠ তলার বকেয়া ভাড়া পরিশোধ ও চুক্তিপত্র নবায়ন ও ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করে নতুন চুক্তিপত্র সম্পাদন করার জন্য নোটিশ দেয়া হয়। কিন্তু সবুর খান ওই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি এবং চুক্তিপত্র নবায়ন করেননি। সে অনুযায়ী ২০১৩ সালে ৩০শে নভেম্বরের পর ওই চুক্তি বাতিল ও অকার্যকর হয়ে যায়। প্রিন্স প্লাজার ষষ্ঠ তলার ১১ হাজার ২০০ বর্গফুট ও চতুর্থ তলার ৫২৫৪.০৮ বর্গফুট স্পেসের মালিক প্রিন্স রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ড্যাফোডিলের কাছে বকেয়া ভাড়া বাবদ ৪ কোটি ৪১ লাখ ১৬ হাজার টাকা পাওনা হয়। এ পাওনা টাকা নিয়ে নানা টালবাহানা করেন তিনি। ইউসিবি ব্যাংকের চেক দেন। ব্যাংকে চেক নগদায়নের জন্য দিলে ডিজঅনার হয়। এরপর ২০১৪ সালে আগস্ট মাসে চূড়ান্তভাবে তাকে নোটিশ করা হলেও কোন উত্তর দেয়নি ড্যাফোডিল। বাধ্য হয়ে প্রিন্স রিয়েল এস্টেট (প্রা.) লিমিটেড কোম্পানির পক্ষে আমি ড্যাফোডিলের চেয়ারম্যান সবুর খানের বিরুদ্ধে মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে মামলা করি। মামলা নং-৬৮/১৪, ধারা: ৪০৩/৪০৬/৫০৬ চার্জ গঠন হয়। দ্বিতীয় মামলা নং-৮২৭৪/১৪, ধারা: এনআই অ্যাক্ট ১৩৮ চার্জ গঠন হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩শে এপ্রিল একটি মামলা করেছি। মামলা নং-৫৯/১৫, ধারা: ৪১৭ দণ্ডবিধি। এ মামলার পর সবুর খানের বিরুদ্ধে ২৩শে এপ্রিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এর আগে ১৫ই এপ্রিল সবুর খান ষষ্ঠ তলার ফ্লোর ভেঙে ফেলে। সেখানে নতুন করে ডেকোরেশনের কাজ শুরু করেন। চুক্তির সময় আগের থাকা ডেকোরেশন যার বর্তমান মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা, সেই ডেকোরেশন সবুর খানের লোকজন সরিয়ে ফেলে। সেখানে তার মতো করে ডেকোরেশনের কাজ শুরু করেছে, যা সরজমিন গিয়েও দেখা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রিন্স রিয়েল এস্টেট (প্রা.) লিমিটেড কোম্পানি প্রিন্স প্লাজা বাণিজ্যিক ভবনের বেইজমেন্ট, সেমি-বেইজমেন্ট ও প্রথম তলা থেকে ষষ্ঠ তলা পর্যন্ত দলিল মূলে ৬০%, ষষ্ঠ তলা থেকে তদূর্ধ্বে ৬৪%, ষষ্ঠ তলার ল্যান্ডওনারের ৪০% অংশ ও নবম তলার ৩৬% অংশ দলিল মূলে ল্যান্ডওনারের কাছ ২০০৩ কিনে নেন। তখন থেকে এ ভবনের মালিক ছিল প্রিন্স রিয়েল এস্টেট। বর্তমানে প্রিন্স প্লাজা বাণিজ্যিক ভবনের ষষ্ঠ তলার সম্পূর্ণ ফ্লোর প্রায় ১১ হাজার ২০০ বর্গফুট, নবম তলার সম্পূর্ণ ফ্লোর প্রায় ১১ হাজার ৪৮০ বর্গফুট, নবম তলার ওপরে ৬৪% প্রায় ৭৩৪৭.২০ বর্গফুট, চতুর্থ তলার ৫২৫৪.০৮ বর্গফুট, বেইজমেন্ট ফ্লোরের ৬০%, সেমি-বেইজমেন্ট ফ্লোরের ৬০%-সহ প্রায় ৫টি ফ্লোরের দলিল মূলে বৈধ মালিকানায় আছে প্রিন্স রিয়েল এস্টেট (প্রা.) লিমিটেড কোম্পানি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সবুর খান বলেন, অভিযোগ সত্য না। এ ভবনের ১৩৭ জন মালিক ছিলেন। কেউ আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি। ষষ্ঠ তলার বিষয়ে তিনি বলেন, ওই ফ্লোর দেখিয়ে মালিকপক্ষ আতিকুর রহমান একটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। ওই ব্যাংক আমাকে তার সঙ্গে কোন লেনদেন করতে মানা করেছে। এখন আমি কাকে ভাড়া দেবো প্রশ্ন করেন তিনি। তিনি বলেন, এ ভবনটি প্রায় পুরোটাই আমি কিনেছি। ষষ্ঠ তলার ‘মনে রেখ’ শাড়ি এবং দোতলার দুটি জুয়েলারি দোকানদার আমার কাছে বিক্রি করতে এসেছেন। আমি তাদের কাছ থেকে একটু সময় নিয়েছি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এগুলো কিনে নেবো। একটি বাণিজ্যিক ভবন কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিল্ডিংয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অনুমোদন দিয়েছেন। আতিকুর রহমান আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। এখন আদালতেই বিষয়টি সুরাহা হবে।