Saturday, September 17, 2016

ফারাক্কা-রামপাল: বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্কের বাধা

যা মানুষকে কঠিন বিপদের মধ্যে নিক্ষেপ করছে, যে ক্ষতি পূরণ করা কখনোই সম্ভব নয়, যে ক্ষতি বহন করা মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য, সেই ক্ষতি নিয়েও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের হাসিঠাট্টামিশ্রিত ‘কোনো ক্ষতি হয়নি’ ‘কিংবা হবে না’ শুনে শুনে আমরা অভ্যস্ত। তাঁরা তাঁদের দিক থেকে যে খুব অসত্য বলছেন তা-ও নয়, কেননা ক্ষতি তো তাঁদের হয়ইনি, হবেও না কোনো দিন। তাঁরা মানুষ ও জনপদের অপরিসীম ক্ষতি করেন, লাভবান হন এবং তারপর চলে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রথমে একটি বাঁধের কথা বলি। গত শতকের ষাটের দশকে গঙ্গা-পদ্মা নদীর ওপর যখন ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ চলছিল, তখনই এ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। ভারতের কয়েকজন বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞও দীর্ঘ মেয়াদে এই বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েই উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। কিন্তু এর প্রতি কোনো গুরুত্ব না দিয়ে এই বাঁধ নির্মাণ শেষ করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে তা চালু হয়। এই বাঁধের কারণে এত বছরে, বিশেষত শুষ্ক মৌসুমে, বাংলাদেশের প্রধান একটি নদীর পানিপ্রবাহ ভয়াবহ মাত্রায় বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। তার ফলে এর সঙ্গে সংযুক্ত আরও ছোট-বড় নদীর পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলাফল বহুমাত্রিক বিপর্যয়, শুধু যে এসব নদীর অববাহিকায় জীবন, জীবিকা, ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা-ই নয়, প্রতিবেশগত ভারসাম্য বিপর্যস্ত হয়ে জীবনমান স্বাস্থ্য প্রাণবৈচিত্র্যও বিপদাপন্ন হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য বের করা কঠিন।
এই ফারাক্কা বাঁধের পর বাংলাদেশে নেমে আসা আরও নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, আরও পরিকল্পনাধীন আছে। এর ওপর ‘নদী-সংযোগ পরিকল্পনা’ নামে যে ভয়াবহ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ভারত তা পুরো অঞ্চলে নদী ও নদীনির্ভর জীবন ও অর্থনীতির ওপর মরণ আঘাত হানবে। আন্তর্জাতিক পানি কনভেনশন অনুযায়ী ভারত একতরফাভাবে কিছু করতে পারে না এবং ক্ষয়ক্ষতির দায় ভারতের ওপরই বর্তাবে। কিন্তু বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এর সুরাহা করবে কি, তার নিজের উন্নয়ন মডেলেই যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণ, নদী দখল ও দূষণ দিয়ে নদীর বাকি অস্তিত্বের ক্ষতিসাধন করে চলেছে। নদীর ওপর যথেচ্ছাচার বাঁধ নির্মাণের সুবিধাভোগী বিশ্বজোড়া নির্মাণ কোম্পানি, কনসালট্যান্ট, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ীদের জোট গত শতকের শেষ কয়েক দশকে বিশ্বের বহু দেশে বন্যানিয়ন্ত্রণ, সেচ ও সবুজ বিপ্লবের নামে নদীপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের এসব কর্মসূচি নিয়েছে। এর বিরূপ ফলাফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। ভাটার দেশগুলো যে বড় বিপর্যয়ের সামনে পতিত হচ্ছে, তার দৃষ্টান্ত বিশ্বজোড়া। উজানের দেশগুলোতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। সে কারণে নিজের মতো করে ভারত যে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করেছে, বাংলাদেশের মতামত ও অধিকারের তোয়াক্কা না করে যে বাঁধ চালু করেছে, শুকনো মৌসুমে পানি আটকে বর্ষা মৌসুমে পানি ছেড়ে ভেবেছে এতে ভাটির দেশের ক্ষতি হলে কী—ভারতের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, ঘটনা তা ঘটেনি।
বরং ভারতের দিকে নতুন নতুন সমস্যা ক্রমে জমে এখন ভয়াল আকার ধারণ করেছে। এর শিকার হচ্ছে অনেক এলাকা, বিহার তার অন্যতম, এই বাঁধের কারণে নদীর গভীরতা কমে যাচ্ছে, বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। বিহারে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে এই বছরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানিয়েছেন ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলতে (বাংলাদেশের মানুষের মনের কথাও তাই। কিন্তু কখনো সরকার বা প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল তা বলেনি)। কিন্তু ভারতপন্থী ও ভারত বিরোধিতার নামে পরিচালিত রাজনীতির দুষ্টচক্রের কারণে বাংলাদেশে এ নিয়ে সুস্থ আলোচনা হয় না কখনো। কিন্তু সর্বসাধারণের মনের মধ্যেই এ বিষয়ে ক্ষোভ আছে। বরাবর ভারত এটি উপেক্ষা করতে চেয়েছে ‘এগুলো নিছক ভারতবিদ্বেষী রাজনীতি’—এই আওয়াজ দিয়ে। ফারাক্কার জন্য ক্ষতি কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তার প্রমাণ সুন্দরবন। সুন্দরবন যেসব নদী ও শাখা নদীর পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল, সেই নদীগুলো আবার গঙ্গা-পদ্মার পানিপ্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত। ফারাক্কা কাজ শুরুর পর থেকে নদীগুলোর রুগ্ণতাপ্রাপ্তিতে তাই সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়, ফলে সুন্দরবনে বিপরীত থেকে সমুদ্রের নোনাপানির প্রবাহ ভারসাম্যহীনভাবে বেড়ে যায়। এক গবেষণার ফলাফলে তাই দেখা যায়,
‘গঙ্গা নদীর মিঠাপানি গড়াই হয়ে পশুর নদ ও শিবসা নদীর মাধ্যমে সুন্দরবনে প্রবাহিত হয়। ফারাক্কা বাঁধের পর পানিপ্রবাহ কমে গেছে।...মিঠাপানির প্রবাহ কম থাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে বনের মধ্যে। এ কারণে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বেঁচে থাকতে পারছে না।...বাঁধ চালুর পর শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবন প্রতি সেকেন্ডে শূন্য থেকে ১৭০ ঘনমিটার পলিযুক্ত মিঠাপানি গ্রহণ করেছে। সেখানে লবণাক্ততার পরিমাণ ঠিক রাখার জন্য কমপক্ষে ১৯৪ দশমিক ৪ ঘনমিটার পানিপ্রবাহ প্রয়োজন। কম পানিপ্রবাহ থাকায় সাগরের লবণাক্ত পানি বনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। যদিও ১ শতাংশের বেশি লবণাক্ততা থাকলে সুন্দরীগাছের বেঁচে থাকা কঠিন।’ (প্রথম আলো, ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬) বছরের পর বছর এই পরিস্থিতি সুন্দরবনকে অনেক দিক থেকে দুর্বল করেছে। বাংলাদেশের জন্য শুধু নয়, ভারত বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীপ্রবাহ এবং বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবনের গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা বা দায়বদ্ধতা যদি দুই দেশের সরকারের থাকত, তাহলেও ফারাক্কা নিয়ে গভীর পর্যালোচনা ও নতুন চিন্তা দেখা যেত। কিন্তু তা না থাকার ফলে দশকের পর দশক ফারাক্কা প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশের ক্ষতি করে গেছে। সুন্দরবনকে এই বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা না করে একই দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটিয়ে সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্প হাজির করা হয়েছে, সেটি হলো রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প।
এর প্রধান উদ্যোক্তা এবং পরিচালক ভারতের এনটিপিসি, এই কেন্দ্র নির্মাণ করবে ভারতের একটি কোম্পানি, এর জন্য ঋণ জোগান দেবে ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক (এর জন্য সার্বভৌম গ্যারান্টি দেবে বাংলাদেশ সরকার) এবং সব লক্ষণ বলছে কয়লা জোগান দেবে ভারতের কয়লা কোম্পানি। তার মানে কাগজপত্রে ৫০: ৫০ মালিকানা ও মুনাফা দেখানো হলেও বিনিয়োগ, নানা কিছু বিক্রি, কর্মসংস্থান ও মুনাফা সবকিছুতেই ভারতের বিভিন্ন কোম্পানিরই সুবিধা। বিপরীতে বাংলাদেশের শুধুই ক্ষতি, সুন্দরবন হারানোর মতো অপূরণীয় অচিন্তনীয় ক্ষতি, বহু মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষতি, কয়েক কোটি মানুষের জীবন নিরাপত্তার ঝুঁকি, তারপরও ঘাড়ে ঋণ আর আর্থিক বোঝা। কিন্তু ক্ষতি কি শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? না। প্রকৃতি অবিচ্ছিন্ন, সীমান্তে কাঁটাতার দিয়ে তার সর্বনাশ আসা ঠেকানো যায় না। সে জন্য সুন্দরবন বাংলাদেশ অংশে বিপর্যস্ত হলে ভারতের অংশের সুন্দরবনও তার থেকে বাঁচবে না। তাই কলকাতায় সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্পের বিরুদ্ধে এক সমাবেশে সংহতি জানাতে এসেছিলেন সেই এলাকার কয়েকজন অধিবাসী। তাঁদের একজন আমাকে বললেন, ‘আমরা ওই এলাকায় ৫০ লাখ মানুষ বসবাস করি। সুন্দরবনের ক্ষতি হলে আমাদের সর্বনাশ। তাই আমরাও এই লড়াইয়ে আছি।’ মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকায় বাংলাদেশের মানুষ একটি বড় আশ্রয় পেয়েছিল, তার কারণে বাংলাদেশের মানুষের মনে সব সময়ই একটা কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। কিন্তু আবার ভারতের শাসকদের গৃহীত কোনো কোনো নীতি নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের ক্ষোভও আছে। এগুলো মানুষ ভুলে যেতে চাইলেও পারে না।
ফারাক্কা এর একটি, তারপর আরও বাঁধ, তারপর নদী-সংযোগ পরিকল্পনা, সীমান্তে মানুষ হত্যা, বাণিজ্যে প্রতিবন্ধকতা, ট্রানজিটের নামে পুরো যোগাযোগব্যবস্থার ওপর সুবিধা আদায় ইত্যাদি। সর্বশেষ সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প। আগেরগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আছে, তারপরও মানুষ আশা নিয়ে থাকে হয়তো এসবের সমাধান একদিন পাওয়া যাবে। পুরোনো উন্নয়ন মডেলে নদীসহ প্রকৃতির ওপর কর্তৃত্বকেই মানুষের ক্ষমতা আর উন্নয়নের প্রদর্শনী ভাবা হতো, এখন তার পরিণাম যত স্পষ্ট হচ্ছে ততই ভুল সংশোধনের পথ খুঁজছে মানুষ। এমনকি বাঁধ ভেঙে হলেও নদীকে স্বাভাবিক প্রবাহের মধ্যে নিয়ে যাওয়া, প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়ন চিন্তা ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশকেও সেই পথই ধরতে হবে। কিন্তু রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে যখন সুন্দরবনের বিনাশ ঘটবে, সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকবে না, সুন্দরবনের এই ক্ষতি আর কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা যাবে না। ফলে তখন মানুষের তীব্র ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আমরা চাই না এ রকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হোক। ‘কোনো ক্ষতি হয়নি, কোনো ক্ষতি হবে না’ আপ্তবাক্য উচ্চারণ আওড়িয়ে সত্য আড়াল করা যাবে না। সে জন্য আমরা চাই দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বের স্বার্থেই বাংলাদেশ ও ভারতের সরকার দ্রুত এই প্রকল্প থেকে সরে আসবে। আমরা এখনো আশা করি, সমমর্যাদার ভিত্তিতে দুই দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হবে, বন্ধুত্ব হবে প্রকৃতই বিকাশমুখী এবং উভয়ের জন্য কল্যাণকর। দুই দেশের সজাগ মানুষ জনপন্থী উন্নয়নের ধারার জন্য যৌথ চিন্তা ও লড়াই শক্তিশালী করলে নিশ্চয়ই দুই দেশের মানুষের প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত মজবুত হবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu/anujuniv@gmail.com

কিশোরীদের জন্য বিনিয়োগ বৃথা যাবে না

‘কিশোরীদের জন্য বিনিয়োগ, আগামী প্রজন্মের সুরক্ষা’। এটা ছিল চলতি বছরের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য। গত ১১ জুলাই বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়েছে। বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে সরকারি–বেসরকারি নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল। এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল সভা ও সেমিনার। এসব সভা ও সেমিনারে কিশোরীদের উন্নয়নের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়। তাদের জন্য বিনিয়োগ করার কথা বলা হয়। বলা হয়, কিশোর-কিশোরীদের পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে এবং এই বিনিয়োগের সুফল যেন তারা পায়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। সভা-সেমিনারে বলা এসব কথার কোনোটিই বাগাড়ম্বর নয়। প্রতিটি কথা একেবারে সত্য। কিন্তু আমাদের দেশের কিশোরীদের প্রকৃত অবস্থা কী?
দেশের অনেক মেয়েরই কৈশোর বয়সে না পৌঁছাতেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, তারা খুব অল্প বয়সে মা হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে এক-তৃতীয়াংশ কন্যাশিশুর ১৫ বছরের আগে এবং দুই-তৃতীয়াংশ কন্যাশিশুর ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়। গ্রামে এ হার ৭১ শতাংশ এবং শহরে ৫৪ শতাংশ। ২০১৪ সালে এ গবেষণা করা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ বলছে, কিশোরীদের ৪৯ শতাংশের বিয়ে হয় ১৮ বছরের আগে। অল্প বয়সে বিয়ের ফলে একটি কিশোরী অল্প বয়সে মা হচ্ছে। অথচ তার শরীর কোনোভাবেই গর্ভধারণ বা মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। আগামী প্রজন্মের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে বাল্যবিবাহ একটি বড় বাধা। একটি কিশোরী যখন সন্তানের মা হয়, তখন সে মারাত্মক অসুবিধায় পড়ে। সে যেখানে নিজেকে সামলাতে পারে না, সেখানে কী করে একটি শিশুকে সে লালন পালন করবে। এর কিছুই তো সে জানে না। ফলে শিশুটিও নানা অসুবিধায় ভোগে। সে ঠিকভাবে বেড়ে ওঠে না। নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, অপুষ্টিতে ভোগে।
বাল্যবিবাহের কারণে কিশোরীরা পড়ালেখা থেকে ঝরে পড়ে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৪ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের অন্তর্ভুক্তি প্রায় শতভাগ এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণও আশাব্যঞ্জক, প্রায় ৬৯ শতাংশ। তবে ঝরে পড়ার হার এখনো অনেক বেশি, ৪৭ শতাংশ। এতে স্পষ্ট হয় যে অধিকাংশ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছে না। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় ঝরে পড়ার উচ্চ হারের নেপথ্যে একটি বড় কারণ হচ্ছে বাল্যবিবাহ। এ তো গেল কিশোরীদের অল্প বয়সের বিয়ের কথা। এ ছাড়া তারা নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তাদের উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে, যৌন নিপীড়ন করা হচ্ছে, ধর্ষণ করা হচ্ছে; এমনকি খুনও করা হচ্ছে। এই তো সেদিনের কথা, বখাটের ছুরিকাঘাতে খুন হলো রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিসা। তারও আগে থেকে ওই বখাটে রিসাকে মোবাইল ফোনে উত্ত৵ক্ত করে আসছিল। রিসার মতো আরেক কিশোরী কণিকা ঘোষ একইভাবে বখাটের ধারালো অস্ত্রের কোপে প্রাণ হারায়। গত মে মাসে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে এ ঘটনা ঘটে। এ রকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে।
কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় পরিবারে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় কিশোরী নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। এখানে প্রায় প্রতি দুজনের একজন (৪৭ শতাংশ) বিবাহিত কিশোরী (১৫ থেকে ১৯ বছর) স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়; বিশেষ করে মামা, চাচা কিংবা ভাইয়ের হাতে নির্যাতন, এমনকি যৌন নিপীড়নেরও শিকার হচ্ছে কিশোরীরা। এ ঘটনাগুলোয় আইনের আশ্রয় নেওয়া হয় না বলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব নিপীড়নের ঘটনা প্রকাশ পায় না। পাঠক বলুন, কিশোরীদের এই পরিস্থিতিকে আপনি কী বলে অভিহিত করবেন? এরপরও বলবেন, তারা ভালো আছে? তাহলে করণীয় কী? আজকের কিশোরীরাই আগামী দিনের মা। তারাই মা হিসেবে জন্ম দেবে ভবিষ্যতের কান্ডারিদের। তাই পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিশোরীদের উন্নয়ন না হলে দেশের উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে না। তাই জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে আজকের কিশোরীদের জন্য আমাদের বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। কিশোরীদের উন্নয়নে সরকারের অনেক কর্মসূচি চালু আছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোও প্রজননস্বাস্থ্যের উন্নতিসহ কিশোরীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। কিন্তু দেশের সব কিশোরী এসব কর্মসূচির আওতায় নেই।
সে জন্য সরকারকে আরও ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। আরও অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। তবে কিশোরীদের জন্য বিনিয়োগের প্রথম দায়িত্বটি পরিবারকে নিতে হবে। দেশের প্রতিটি পরিবারকে তার কিশোরী সদস্যের প্রতি বেশি খেয়াল রাখতে হবে। তার শিক্ষার ব্যবস্থা প্রথমে পরিবারই করবে। তার যাতে বাল্যবিবাহ না হয়, সেটা নিশ্চিত করবে পরিবার। তার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। তার নিরাপত্তার দিকটিও পরিবারকে দেখতে হবে। নিজ ঘরেই তারা যাতে কোনো ধরনের নির্যাতনের বা যৌন হয়রানির শিকার না হয়, সে জন্য পরিবারকে সচেতন হতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চায়। মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও সুস্থ শ্রমশক্তি, যেখানে নারী ও পুরুষ উভয়েই থাকবে। তাই এ দেশের মেয়েদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে। কিশোরীদের উন্নয়ন ছাড়া দেশ কখনো প্রকৃত মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে? কাজেই আসুন, কিশোরীদের উন্নয়নে আমরা তাদের জন্য আরও অনেক বেশি বিনিয়োগ করি। এই বিনিয়োগ বৃথা যাবে না, এটা নিশ্চিত।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক।

মগজের বৃহত্তম ‘জাদুঘর’

আআআ
মানসিকভাবে অসুস্থ, মৃগী ও আলঝেইমার রোগী এমনকি মুষ্টিযোদ্ধাও রয়েছেন তালিকায়। বেলজিয়ামের দুফেলের মনোরোগ হাসপাতাল সম্প্রতি পেয়েছে এ রকম বিভিন্ন ধরনের মানুষের প্রায় তিন হাজার মস্তিষ্কের এক ‘চালান’। যুক্তরাজ্যের কর্তৃপক্ষ জায়গার অভাবে তাদের সংগ্রহের একটি বড় অংশ পাঠিয়ে দিয়েছে বেলজিয়ামে। আর এই ফরমালডিহাইড বা প্যারাফিনে চোবানো মগজসম্ভার গবেষণার অমূল্য উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেখানে। দুফেলের মনোরোগ হাসপাতালের পাওয়া মস্তিষ্কের সম্ভারটি বিশ্বে এককভাবে এ ধরনের বৃহত্তম সংগ্রহ। এ বিচিত্র সংগ্রহের মূল কৃতিত্ব ব্রিটিশ স্নায়ুরোগবিশারদ জন কর্সেলিসের। তিনি ১৯৫১ থেকে ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অন্তত ৪০ বছর ধরে এসব মস্তিষ্ক সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছেন। দুফেলের ওই হাসপাতালের গবেষণা পরিচালক ম্যানুয়েল মোরেনস বলেন, ‘আমরা যত দূর জানি, এটাই এক জায়গায় সবচেয়ে বেশি মস্তিষ্কের সংগ্রহশালা। কোনো রোগীর মৃত্যুর পর তাঁর সত্যিকারের টিস্যু আপনি ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন—আজকের বেলজিয়ামে এটা একেবারে অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন।
কারণ, মস্তিষ্কের টিস্যু সংগ্রহের ব্যাপারে যেসব নৈতিক নির্দেশনা রয়েছে, সেগুলো খুবই কঠোর।’ মোরেনস আরও বলেন, ‘সাধারণত আমরা মস্তিষ্কের কাজের ধরন জানতে রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে থাকি। কিন্তু এখন আসল জিনিসই সরাসরি দেখার সুযোগ মিলেছে।’ পুরোনো দিনের ওই সব মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার বড় সুবিধা হলো, সেগুলো আধুনিক কিছু ওষুধের প্রভাব থেকে একেবারেই মুক্ত। কারণ, ওই সময়ে এসব ওষুধের প্রচলন ছিল না। গবেষণা পরিচালক মোরেনস বলেন, এখনকার মস্তিষ্কগুলো যেসব রোগীর শরীর থেকে নেওয়া হয়েছে তাঁরা বিভিন্ন চিকিৎসা নিয়েছিলেন। কিন্তু গবেষকেরা এমন মস্তিষ্ক নিয়ে কাজ করতে চান, যার মধ্যে অসুখটা সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রূপে বিরাজ করছিল। ওষুধের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়নি। জন কর্সেলিসের সংগৃহীত মস্তিষ্কগুলো ইংল্যান্ডের একটি মনোরোগ হাসপাতালে সংরক্ষিত ছিল। নানা রকমের মনোরোগে আক্রান্ত লোকজনের মৃতদেহ থেকে এগুলো নেওয়া হয়েছিল।

লিবিয়ায় হস্তক্ষেপের জন্য ক্যামেরনের সমালোচনা

ডেভিড ক্যামেরন
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের এক প্রতিবেদনে ২০১১ সালে লিবিয়ায় হস্তক্ষেপের জন্য ব্রিটিশ সরকার এবং ফ্রান্সের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটি বলছে, বেনগাজির বেসামরিক জনগণকে রক্ষার জন্য বিমান হামলা চালানোর পর ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি রাজনৈতিক স্বার্থে লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য উদ্বুদ্ধ হন। অন্যদিকে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন লিবিয়ার প্রশ্নে একটি ‘সংগতিপূর্ণ’ নীতিমালা তৈরি করতে ব্যর্থ হন। ২০১১ সালের মার্চে গাদ্দাফির অনুগত সেনাবাহিনী বেনগাজি শহরের বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হওয়ার পরপরই যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স লিবিয়ায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে।
তৎকালীন দুই নেতা ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের যুক্তি ছিল, বেনগাজিতে মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকার গণহত্যা চালাতে পারে। তবে ওই ঘটনার পাঁচ বছর পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এই কমিটি এখন তদন্ত করে বলছে, বেনগাজির মানুষের ওপর হুমকির যে যুক্তি তখন দেওয়া হয়েছিল তা ছিল অতিরঞ্জিত। পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ক্রিসপিন ব্লান্ট বলেন, বেনগাজির সাধারণ মানুষকে রক্ষার অভিযান পরে বদলে গিয়ে সরকার বদলের অভিযানে পরিণত হয়।