Saturday, September 26, 2026

রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই, কী ভবিষ্যৎ মমতার by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

কথায় বলে, রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই। আজ যা অসম্ভব মনে হচ্ছে, নিবু নিবু; একদিন তা আবার দাবানল হতে পারে। যে দল বা নেতার হাল দেখে মনে হচ্ছে জনজীবনে দেওয়ার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই; একদিন দেখা যেতে পারে ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে মাথা তুলে তিনি আবার ডানা ঝাপটাচ্ছেন।

চলতি বছরের ১৮ মার্চ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, মহারাষ্ট্রের এনসিপি নেতা শারদ পাওয়ার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়াসহ ৫৯ জন রাজ্যসভা সদস্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এই আপ্তবাক্য মনে করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই।’

তৃণমূল কংগ্রেসকে দুরমুশ করে এই বছরের মে মাসে যারা প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এসেছে, সেই বিজেপির রাজ্য–নেতৃত্ব অবশ্য সদর্পে ঘোষণা করেছেন, মমতাকে তাঁরা শেষ করে ছাড়বেন। সেই লক্ষ্যে তাঁরা এগোচ্ছেনও। নিজ হাতে যে দল মমতা তৈরি করেছেন, জোড়া ফুল প্রতীককে পরিচিতি দিয়েছেন; সেই নাম ও নিশানা আপাতত হাতছাড়া। এখন তাঁর সর্বস্বান্ত হাল।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্তে মমতা ও তাঁর দলত্যাগী বিক্ষুব্ধ নেতারা কেউ আপাতত ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীকের অধিকারী নন। আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যে যে দুই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হতে চলেছে, অধিকারী পরিবারের খাসতালুক নন্দীগ্রাম ও মুসলমান–অধ্যুষিত রেজিনগর; সেখানে কোনো পক্ষই ওই নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না।

মমতা বনাম মমতাত্যাগী তৃণমূলিদের সম্ভাব্য নির্বাচনী টক্কর ঘিরে উত্তেজনার যে ফানুস উড়ছিল, গুরুমারা বিদ্যা প্রয়োগে তাতে সুচ ফুটিয়েছেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামে মমতার প্রার্থী বসে গেছেন। রেজিনগরের প্রার্থী টলমল করতে করতে টিকে আছেন ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রীয় চাপ সহ্য করতে না পেরে প্রচার থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানকার মূল শক্তি আমজনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবির, যিনি এই আসন ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচন। ফলে ৭০ শতাংশ মুসলমান এলাকায় বিজেপি জেতে কি না, সেটাই আপাতত মূল আকর্ষণ।

এই পরিস্থিতিতে বিরোধীদের চোখে মমতা এখন ‘সর্বহারা’। কিছুকাল আগেও যিনি রাহুল গান্ধীকে বিরোধী জোটের নেতা মানতে চাননি, পদে পদে অসম্মান করেছেন, জোটের মধ্যে জোট তৈরি করে পরোক্ষভাবে বিজেপিকে সাহায্য করেছেন; নখদন্তহীন বৃদ্ধ সিংহের মতো সেই মমতা আজ কংগ্রেসের শরণাপন্ন! সর্বভারতীয় স্তরে তো বটেই, রাজ্য-রাজনীতিতেও তিনি বিজেপিবিরোধী শক্তিদের জোটবদ্ধ হওয়ার হাঁক দিচ্ছেন! মানভঞ্জনের চেষ্টা করছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। এই অবস্থান পাঁচ মাস আগে নিলে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে এভাবে ছড়ি ঘোরাতে পারত না। এই দায় বাকি জীবন তাঁকেই বহন করতে হবে।

পরিসংখ্যান সব ক্ষেত্রে সত্য চিত্র হয়তো ফুটিয়ে তোলে না। কিন্তু তা উপেক্ষাও করা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় এক কোটি ভোটারের নাম কেটে তৈরি তালিকা, ২৭ লাখ ভোটারকে ট্রাইব্যুনালে ঠেলে ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা, সাড়ে ৭০০ সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাকে ক্ষমতাহীন করা, গোটা রাজ্যের ভার কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যুগলবন্দীও পশ্চিমবঙ্গের গত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট ৪১ শতাংশের নিচে নামাতে পারেনি! বেছে বেছে মুসলমানদের ভোট কাটার অভিযোগ আজ নির্বাচন কমিশনের গায়ে খামের ওপর ডাকটিকিটের মতো সেঁটে রয়েছে।

দেশের সাবেক মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি ইসির এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘১০০ শতাংশ স্ক্যাম’ বা প্রতারণা বলে জাহির করেছেন। এত কিছু করেও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট আদায় করতে পারেনি! পাটিগণিতের হিসাব দেখাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে বিজেপি মাত্র ৩২ লাখ ১১ হাজার ৪২৭ ভোট বেশি পেয়েছে! তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, সেটাও তারা করতে পেরেছে গণনার দিন প্রতিপক্ষ এজেন্টদের বের করে দিয়ে। নাহলে তাদের নাকি ঠাঁইনাড়া করা যেত না।

পরাজিতরা চিরকালই অজুহাত খোঁজে। মমতা ও তাঁর দলের নেতাদের এই অভিযোগও অজুহাত হিসেবে খারিজ করা যায়। কিন্তু পরিসংখ্যান? নির্বাচন কমিশনের হিসাব দেখাচ্ছে, বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছে ৪৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট। দুই বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে তারা পেয়েছিল ৩৯ শতাংশ। এর মানে, মমতা-বিদ্বেষ ও ইসির কল্যাণে তারা ৭ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে। তুলনায় তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৪১ দশমিক ১৬ শতাংশ, কংগ্রেস ২ দশমিক ৯৯, সিপিএম ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট। রাজ্যের এই তিন বিজেপিবিরোধী শক্তির অর্জন ৪৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এর সঙ্গে এআইএসএফের ১ দশমিক ৫৪ এবং অন্য তিনটি বাম দলের প্রাপ্ত ভোট জুড়লে হিসাবটা ৫০ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়ায়।

মমতা আন্তরিক হলে এই ভোট ভাগাভাগি রুখতে পারতেন। বিজেপির উল্কা-উত্থান ঠেকাতে পারতেন। রাজনীতিতে কখন কুশলী হতে হয়, এক পা পিছিয়ে দুই পা এগোতে হয়, বিজেপিকে দেখে তা শিখতে পারতেন। সেই শিক্ষা তিনি নেননি। অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতা পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

অমোঘ প্রশ্ন, এখন তিনি কী করবেন। তিনি কি এভাবেই নিঃসীম নীলিমায় ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবেন? অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে পড়বেন উত্তর প্রদেশের দলিত নেত্রী মায়াবতীর মতো? নাকি ছাইয়ের গাদা থেকে গাত্রোত্থান করবেন ইন্দিরা গান্ধীর মতো?

পুত্র সঞ্জয়ের কারণে বিড়ম্বিত ও নিন্দিত হয়েছিলেন ইন্দিরা, ভাতিজা অভিষেকের জন্য মমতা। দলের কান্ডারিরা ইন্দিরাকে কোণঠাসা করেছিলেন; মমতাকে ত্যাগ করেছেন তাঁরা, যাঁদের তিনি গড়েপিটে বড় করেছেন। এই মিলের পাশে অমিলও আছে। ‘গুঙ্গি গুড়িয়া’ (বোবা পুতুল) ইন্দিরা যখন কংগ্রেসি বাস্তুঘুঘুদের মোকাবিলা করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫০। সেটা ছিল তাঁর গড়ে ওঠার সময়। পাঁচ বছরের মধ্যেই একাত্তরে তিনি ‘এশিয়ার সূর্য’। মমতা নিঃশেষ হলেন তাঁর রাজনৈতিক গোধূলিবেলায়। ৭১ বছর বয়সে। ইন্দিরাকে গদিছাড়া করেছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণ, ৭৫ বছর বয়সে। মমতার মধ্যে এখনো কি তেমনই শক্তি অবশিষ্ট? নাকি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসই তাঁর বার্ধক্যের বারানসি, যেখানে জন্মে, যে আদর্শ ধারণ করে পৃথক পরিচিতি তিনি গড়ে তুলেছেন?

মমতা নিজেও সম্ভবত এই ধন্দের মীমাংসা করে উঠতে পারছেন না। হয়তো এখনো বিশ্বাস করেন, স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে ঠিক তীরে ফিরবেন। তাই এখনো পরাজয় মানেননি। অভিষেককেও আড়াল করে চলেছেন। তাঁকে নিয়ে কংগ্রেসেও রয়েছে বিস্তর দোলাচল।

প্রয়াত রাজীব ও তাঁর স্ত্রী সোনিয়া গান্ধী ছাড়া কংগ্রেসের আর কাউকে কখনো মমতা মন থেকে নেতা মানেননি। জোটসঙ্গী হিসেবে বিজেপি বা কংগ্রেস কাউকে কখনো স্বস্তি দেননি। জোটের মধ্যে জোট ও ঘোঁট করে নিজেকে জাহিরের চেষ্টা করেছেন। তাই বিশ্বস্ত হতে পারেননি।

কংগ্রেসে অনেকের ধারণা, মমতাকে দলে নেওয়ার অর্থ তাঁর যাবতীয় অপকর্মের ভাগীদার হওয়া। এর চেয়ে রাজ্যে প্রকৃত বিজেপিবিরোধী শক্তি হিসেবে মাথা তোলার চেষ্টা চালানো দরকার।

রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই ঠিকই, বিজেপিবিরোধী জোটের সঙ্গী হওয়া ছাড়া মমতার বিকল্পও কিন্তু সীমিত।

* সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি
- মতামত লেখকের নিজস্ব

নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত সমাবেশে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১ জুলাই ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গ
নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে আয়োজিত সমাবেশে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১ জুলাই ২০২৬, পশ্চিমবঙ্গ। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তাণ্ডব: দখলবাজি ও ক্ষমতা দেখানোর এ কেমন নমুনা! by রাফসান গালিব

ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক নিকোলো মেকিয়াভেলির প্রখ্যাত দ্য প্রিন্স বইটি যারা পড়েছেন, তাঁরা ক্ষমতার প্রকাশ্য ও ভয়াবহ চর্চার নির্মম সত্যের বিষয়টি জানেন । ৫০০ বছর আগে লেখা এই বইতে মেকিয়াভেলি দেখিয়েছিলেন, কোনো শাসনব্যবস্থায় যখন আইন ও নৈতিকতাকে ছাপিয়ে স্রেফ ভয় ও বলপ্রয়োগের নীতি কার্যকর হয়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত এক চরম অরাজকতার দিকে যাত্রা করে।

আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ধূলিসাৎ হওয়া ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকালে মেকিয়াভেলির সেই আশঙ্কাই যেন চোখে ধরা পড়ে।

যে দেশে হামে প্রতিদিন একাধিক বাচ্চা মারা যাচ্ছে, এ বছর সাত মাসের হিসাবে ইতিমধ্যে সহস্রাধিক বাচ্চা মারাও গেছে, সেই দেশের খোদ রাজধানীতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ৫০ বছরের পুরোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, যেখানে মূলত প্রসূতি নারী ও শিশুদের সেবা দেওয়া হয়, টিকা দেওয়া হয়, তা এক রাতে ভারী এক্সকাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো!

শুধু তাই নয় জীবনের সঞ্চার করা শিশুটিকা আর কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতিও লুট করে নিয়ে যাওয়া হলো। মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটলেও কয়েক শ মানুষের এ তাণ্ডব কোনোভাবেই নীরব কর্মকাণ্ড ছিল না। এলাকাবাসী জানলেও কোনো বাধা দেওয়ার বা প্রতিবাদ করার উপায় ছিল না।

মিরপুর ১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি কেন্দ্রটি কেবল একটি চার দেয়ালের পাকা ভবন ছিল না; এটি ছিল ১৯৭৪ সাল থেকে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের হাজার হাজার নারী ও শিশুর আশার আশ্রয়স্থল।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে সুইডিশ সেভ দ্য চিলড্রেনের উদ্যোগে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যেটির সঙ্গে যুক্ত আছেন এশিয়ার নোবেল হিসেবে খ্যাত র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি নারী ও সমাজকর্মী তাহরুন্নেসা আবদুল্লাহ। জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিও এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এক সময়।

নাগরিক সমাজের বিশিষ্ট প্রতিনিধি, বীর মুক্তিযোদ্ধা, নামকরা চিকিৎসক ও সমাজসেবীদের স্মৃতি ও ঘাম জড়িয়ে ছিল এ প্রতিষ্ঠান, তা রাতারাতি পরিণত হলো পলেস্তারা, বাঁশ আর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এক ধ্বংসস্তূপে।

আর এই ধ্বংসযজ্ঞের ঠিক পরের দিন সকালে কী দেখা গেল? খোলা আকাশে, ধুলোবালির মধ্যে, বাঁশের খুঁটিতে ত্রিপল টাঙিয়ে প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিলে বসে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের হামের টিকা দিচ্ছেন। শিশুরা প্রচণ্ড গরমে ও অস্বস্তিতে ছটফট করে কাঁদছে। চরম এই অমানবিক দৃশ্য আমাদের কোনোভাবেই স্বস্তিতে থাকতে দেয় না।

বলতেই হচ্ছে যে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই চেনা, পুরোনো ও দুর্বৃত্তায়িত ক্ষমতাচর্চার বহিঃপ্রকাশ ঘটল। সরকার পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার পরিবর্তন হয় কিন্তু জবরদখল ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনৈতিক চরিত্র বিন্দুমাত্র বদলায় না। আরও হতাশার বিষয় যে, একটা রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থানের পরেও আমাদের এসব দেখতে হচ্ছে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই ১০ কাঠা জমির ওপর নজর ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’ নামক এক ভুঁইফোড় সংগঠনের ব্যানারে সাবেক এক কাউন্সিলরের স্ত্রী ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের (মিষ্টি) মদদে এই দখলদারির অভিযোগ উঠেছে।

এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের দায় এড়িয়ে যেমন মেকি বক্তব্য দিয়ে থাকেন, সেই নারী সংসদ সদস্যের মুখেও তা শোনা গেল, ‘আমি ভাঙচুরের কথা শুনেছি, তবে আমি জড়িত নই’।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ২০০-২৫০ জন সশস্ত্র লোক রাতারাতি এসে এক্সকাভেটর বা বুলডোজার দিয়ে একটি বিশাল স্থাপনা ভেঙে ফেলবে, অথচ স্থানীয় রাজনৈতিক অভিভাবক বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিছুই জানবে না—এমন গল্প বিশ্বাস করার মতো অবোধ কি এ দেশের মানুষ? ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই নারী সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযোগ ওঠেছে। মানুষ তার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করছে।

আরও বেশি অবাক হতে হয়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খানের বক্তব্যে। তাঁর জানামতে, জায়গাটি কাঁচাবাজার ও সেমিপাকা ধরনের ছিল। সেখানে কোনো ভবন বা স্থাপনা ছিল না। তার মানে এখানে যে কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের স্থাপনা ছিল তা তিনি জানতেন না! নাকি জেনেও অস্বীকার করলেন?  

রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় হামলা চালিয়ে একটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র যখন এভাবে গুড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হয় এবং হামলাকারীদের কেউ বাধা দিতে পারে না, পুলিশ অসহায় হয়ে থাকে, প্রশাসকও পরোক্ষভাবে এ নিয়ে সাফাই গায়—তখন এটা মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ‘আইনের শাসন’ বা ‘জননিরাপত্তা’ শব্দগুলো এ ক্ষেত্রে স্রেফ অর্থহীন।

এই ঘটনার সবচেয়ে আতঙ্কজনক দিক হলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা। কেন্দ্রটির কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, তাণ্ডব চলার সময়েই তাঁরা পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন। পুলিশ নাকি ঘটনাস্থলেও গিয়েছিল, অথচ চোখের সামনে এত বড় একটি হাসপাতাল স্থাপনা ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া তারা ঠেকাতে পারল না! ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর শাহ আলী থানার পুলিশ কর্মকর্তার মুখে সেই গতানুগতিক বক্তব্যই শোনা গেল, ‘মামলা হয়েছে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব’।

রাজধানীর বুকে থানার এক কিলোমিটারের মধ্যে, মাত্র ৫–১০ মিনিট দূরত্বে এত বড় একটি তাণ্ডব ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলল, আর পুলিশ তা ‘ঠেকানোর সাধ্য রাখল না’—এটি কি স্রেফ অক্ষমতা, নাকি অপরাধীদের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সম্মতি?

এ ঘটনা কেবল ১০ কাঠা জমি দখলের একটি সাধারণ অপরাধ নয়; এটি যেন একটি পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক অধপতনের বড় দৃষ্টান্ত। একটি চিকিৎসাকেন্দ্রকেও এভাবে সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক মব বা অরগানাইজড্ পলিটিক্যাল মবের শিকার হতে হবে, তা অভাবনীয়।

যে শিশুটি আজ রাস্তার ওপর ধুলোবালিতে বসে ত্রিপলের নিচে দাঁড়িয়ে টিকা নিচ্ছে, বড় হয়ে সে এই রাষ্ট্রকে কীভাবে মনে রাখবে? সে কি জানবে না যে, এই দেশে মানুষের জীবনের চেয়ে জমির দাম বেশি? এই দেশে আইনের চেয়ে রাজনৈতিক মাস্তানদের হাতুড়ি আর এক্সকাভেটর বা বুলডোজারের শক্তি বেশি?

আজ সরকার যদি এই দখলদারির বিচার করতে ব্যর্থ হয় তবে এ ধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতার জন্য যে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তখন নাগরিক হিসেবে আমরা কি কেবল নীরব দর্শক হয়ে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে বেঁচে থাকার অভিনয় করে যাব?

* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই-মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। মিরপুর, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। মিরপুর, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: জাহিদুল করিম

চুরির অভিযোগ, তবুও বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার দৃশ্য মানুষকে কাঁদিয়েছে

বাবাকে নিয়ে গল্প-সিনেমায় অনেক কিছু দেখা গেলেও সবকিছুকে যেন হার মানিয়েছে বাবার প্রতি এক ছোট্ট শিশুর ভালোবাসার দৃশ্য। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। বামরাইল বাজারে চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করে মারধর করছিলেন স্থানীয় লোকজন। চারপাশে মানুষের ভিড়, উত্তেজনা আর চিৎকার। বাবাকে বাঁচাতে হঠাৎ ভিড় ঠেলে ছুটে আসে ৯ বছরের এক ছোট্ট মেয়ে। হাত জোড় বলল, বাবাকে মেরো না।

আটক ওই ব্যক্তির নাম অনিক হাওলাদার। স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও একাধিকবার চুরির অভিযোগে তিনি ধরা পড়েছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে বিষয়গুলো মীমাংসাও করা হয়েছিল।

ভোরে বামরাইল বাজারে চুরির অভিযোগে অনিককে আটক করে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন স্থানীয়রা। এ দৃশ্য দেখে তার ৯ বছরের মেয়ে বাবাকে বাঁচানোর জন্য কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসে এবং উপস্থিত লোকজনকে মারধর বন্ধ করার অনুরোধ করতে থাকে।

এরপর ঘটে যায় আরো এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য। বাবার জন্য বাড়ি থেকে চা ও রুটি নিয়ে আসে মেয়েটি। চায়ের মধ্যে রুটি ভিজিয়ে বাবার মুখে তুলে দিতে থাকে এবং কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘দেখো বাবা, তোমার কিচ্ছু হবে না।’

বাবার শরীরের ব্যথার জায়গায় ছোট্ট হাত বুলিয়ে দিতে দিতে সে জানতে চায়, ‘বেশি ব্যথা পাইছো বাবা?’ চারপাশের উত্তেজনার মধ্যেও বাবা-মেয়ের এই দৃশ্য অনেককে কাঁদিয়েছে।

পরে মানবিকভাবে বিবেচনায় স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে অনিককে ছেড়ে দেওয়া হয়।

উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. রকিবুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও ভিডিও দেখে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পরে স্থানীয়রা বিষয়টি নিজেদের মধ্যে সমাধান করে নিয়েছেন। এ ঘটনায় কেউ থানায় কোনো অভিযোগ করেননি।

চুরির অভিযোগ, তবুও বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার দৃশ্য মানুষকে কাঁদিয়েছে

আস্থায় চিড়: কেন নজিরবিহীন প্রশ্নের মুখে ভারতের নির্বাচন

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশের পর দেশটির নির্বাচনি ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশন একটি স্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। বিগত দশকগুলোতে বিশাল পরিসর ও জটিলতার মধ্যেও সুষ্ঠুভাবে ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
বিজ্ঞাপন

তবে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় চলমান পরিবর্তনের স্বচ্ছতা নিয়ে অন্য দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর আপত্তি উপেক্ষা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার তারা বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানান।

দেশের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে মূলত ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ বলেই গণ্য করা হতো।

কিন্তু সাম্প্রতিক মাস ও বছরগুলোতে শীর্ষস্থানীয় বিরোধী নেতারা প্রথমবারের মতো নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভোট গণনার নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাশাপাশি, ভোটার হওয়ার বিষয়টি কি নিয়মের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, নাকি ক্ষমতাসীনেরা খেয়ালখুশিমতো সিদ্ধান্ত নেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক

গত বছরের জুন থেকে দেশজুড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া (এসআইআর) চলছে। এতে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি নাম বাদ পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, অভিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে।

এসআইআরের আওতায় অনেক ভোটারকে পুরোনো জন্ম নথি, জমি বা শিক্ষার নথি দিয়ে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার প্রমাণ করতে হচ্ছে। ফলে নথিতে সামান্য বানান ভুল বা তথ্যের অমিল থাকলেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সমালোচকদের মতে, এর ফলে ভোটারদের ওপর নিজেদের ভোটাধিকার প্রমাণের দায়িত্ব বর্তেছে, যা ভারতের ঐতিহ্যগত নির্বাচনি ব্যবস্থার সঙ্গে বড় ধরনের পরিবর্তন।

অন্যদিকে বিজেপি ও এসআইআরের সমর্থকদের দাবি, এর মূল উদ্দেশ্য মৃত, ভুয়া ও অবৈধ অভিবাসী ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া।

নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা পরিচালনার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ইসিআইনেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। গোয়ায় ভুল করে বাদ পড়া প্রায় ১০০ ভোটারের নাম পুনর্বহালের বিষয়ে স্থানীয় কর্মকর্তারা দিল্লিতে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সময়মতো সাড়া পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা বিকেন্দ্রীভূত ও স্বচ্ছ, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বিরোধীদের অভিযোগ

বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করছে, ভোটার তালিকা থেকে ব্যাপক হারে নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে। এতে ক্ষমতাসীন বিজেপি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে প্রতিষ্ঠানটির সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। কমিশন অবশ্য বলেছে, তিন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ।

ভারতের গণতন্ত্রে এর প্রভাব কী

বিশ্লেষকদের মতে, এত দিন ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে প্রধান উদ্বেগ ছিল নির্বাচনগুলোর মধ্যবর্তী সময়ে নাগরিক স্বাধীনতা, আইনের সমতা এবং নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠলে নির্বাচনের সময়কার গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতাও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশির মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বিশ্লেষক মিলান বৈষ্ণব মনে করেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের বর্তমান পদ্ধতি ভারতের দীর্ঘদিনের সেই নীতিকে বদলে দিতে পারে, যেখানে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল যোগ্য নাগরিককে ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।

সব মিলিয়ে, ভোটার তালিকা সংশোধন, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং প্রতিষ্ঠানটির স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক ভারতের নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর নতুন করে জনআস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন সামনে এনেছে।

আস্থায় চিড়: কেন নজিরবিহীন প্রশ্নের মুখে ভারতের নির্বাচন
ছবি: আল জাজিরা

ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের, নভেম্বরে ফের হামলার পরিকল্পনা

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালঃ ইরানের দেওয়া শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ইরানে আবারও বোমা হামলা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের জানিয়েছেন ট্রাম্প।

শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার জাতিসংঘে সাংবাদিকদের জানান, কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরান। প্রস্তাব অনুযায়ী, চুক্তি হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধ হবে।

আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি চুক্তিতে পৌঁছাতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে সত্যিই আগ্রহী হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পাশাপাশি লেবাননসহ বিভিন্ন ফ্রন্টে চলমান সংঘাত বন্ধ করবে ইরান। এরপর দুই পক্ষ নিজেদের সম্মত বিষয়গুলো নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনায় বসতে পারবে।

এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপ করা অবরোধ তুলে নিতে, দেশটির আটকে থাকা অর্থ ছাড় করতে এবং ইরানের ওপর থেকে তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে বলে জানিয়েছে তেহরান।

এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ আলোচনা চলছে। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ট্রাম্পের দাবিগুলো মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সন্দিহান।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, ইরানে আবারও বোমা হামলা শুরু করার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন। তবে রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে ঘিরে নিউইয়র্কে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরানের এই প্রস্তাব সামনে এলো। সাত মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। এতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

এর আগে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর কয়েক দফা হামলা-পাল্টা হামলা ও সাময়িক বিরতি হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরান ও তার মিত্ররাও বিভিন্নভাবে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিরা সৌদি স্বার্থে হামলা চালিয়েছে। ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সৌদি আরবের একটি তেল পাইপলাইনে হামলার অভিযোগ উঠেছে। লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে।

এদিকে সৌদি আরবের ওপর হুতি হামলা এবং ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে হুতিদের লড়াইয়ের মধ্যে দেশটির মিত্ররাও সমর্থন জোরদার করছে।

শুক্রবার তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা রিয়াদে বৈঠক করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সামরিক সমন্বয় এবং বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স

ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এপি

মুর্শিদাবাদে বাবা ও তিন ছেলেকে আটকের পর বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে, দাবি মানবাধিকার সংস্থার

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যের মুর্শিদাবাদের সুতি এলাকার একটি ঘটনা রাজ্য পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) কর্মপদ্ধতি নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠেছে। সীমান্ত এলাকা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর তরফে গত বৃহস্পতিবার বিষয়টিকে প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।

‘মাসুম’–এর তরফ থেকে বলা হচ্ছে, গত ১৩ আগস্ট সুতি থানার উমরাপুর পঞ্চায়েতের বালিয়াঘাটি গ্রাম থেকে ষাটোর্ধ্ব ডাবলু শেখ এবং তাঁর তিন ছেলে কায়েম শেখ, রাজাউল শেখ ও ১৬ বছর বয়সী কিশোর আসমাউল শেখকে পুলিশ কোনো প্রকার আগাম তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক করে। শেখ পরিবারের দাবি ও নথিপত্রকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দ্রুততার সঙ্গে তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়। ওই পরিবারের প্রধান ডাবলু শেখ ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নাগরিক এবং চলতি বছরও তিনি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এমনকি তাঁর বাবা শেখ সামজানির নাম ১৯৬৬ সালের ভারতের নির্বাচনী রেকর্ডে রয়েছে। পরিবারটির কাছে আধার ও রেশন কার্ডের মতো যাবতীয় বৈধ ভারতীয় পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এই পুরো ঘটনার পেছনে কোনো বৈধ আইনি অনুসন্ধান ছিল না বলেই মানবাধিকার সংগঠনের দাবি। সন্দেহজনক নাগরিকত্বের নামে কেবল বাংলাভাষী, দরিদ্র বা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের হওয়ার কারণে কাউকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দেওয়া আইনত ও সংবিধানগতভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি।

রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের যেভাবে গণহারে হেনস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা তীব্র উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংস্থাগুলো। সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও বিভিন্ন স্থানে বাঙালি মুসলিমদের লক্ষ্য করে প্রশাসনিক ও পুলিশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তাঁদের গায়ে ‘বিদেশি’র তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কোনো নাগরিককে তাঁর আইনি অধিকার রক্ষা ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ না দিয়েই সীমান্ত পার করে দেওয়ার প্রক্রিয়া মূলত সাংবিধানিক সুরক্ষাকবচকে অস্বীকার করার শামিল। যে পরিবারগুলোর স্বজনদের এভাবে জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন—প্রিয়জন আদৌ বেঁচে আছেন, নাকি ভিনদেশের কোনো কারাগারে বন্দী, সে খবরও পরিবারগুলো পাচ্ছে না।

এই অমানবিক পরিস্থিতি ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ ‘মাসুম’ ও ‘প্যাকটি’ রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানিয়ে সরাসরি পদক্ষেপের দাবি তুলেছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যদি কোনো রকম নিরপেক্ষ ও যাচাইযোগ্য সিদ্ধান্ত ছাড়াই ওই চারজনকে আন্তর্জাতিক সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তবে অবিলম্বে ডাবলু শেখ ও তাঁর তিন সন্তানকে নিরাপদে ভারতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এই পুরো আটক ও সীমান্ত পার করে দেওয়ার বেআইনি ঘটনার পেছনে কাদের ভূমিকা ছিল, তা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও সময়সীমাভিত্তিক তদন্তের দাবি রাখা হয়েছে। পুলিশের অনুসন্ধান প্রতিবেদন, এফআরআরওর নির্দেশপত্র, বিএসএফকে হস্তান্তরের দলিল এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগসংক্রান্ত সব রেকর্ড সর্বসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি সুতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, জঙ্গিপুর জেলার পুলিশ সুপার এবং জড়িত অন্যান্য ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্ত করে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভুয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কোনো ভারতীয় নাগরিককে বেআইনিভাবে আটক বা বিতাড়িত করার পেছনে যেসব সরকারি কর্মকর্তা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। সবশেষে ডাবলু শেখ ও তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের ভোটার তালিকা এবং অন্যান্য দেওয়ানি নথিপত্র নতুন করে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত
বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত। ফাইল ছবি

জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণের কড়া জবাব দিলেন মামদানি

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভাষণের কড়া সমালোচনা করেছেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি বলেছেন, ভাষণে ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ ছড়িয়েছেন নেতানিয়াহু। গত বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরপরই এ কথা বলেন মামদানি।

নেতানিয়াহুকে নিয়ে মামদানি আগে থেকেই সমালোচনা করে আসছেন। ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। এর জেরে নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে গেলে গ্রেপ্তার করা হবে বলে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন মামদানি। যদিও নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের এখতিয়ার নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষের নেই। তাই নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করতে মামদানি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এসব নিয়ে জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে মামদানিকে সরাসরি আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। ৩৪ বছর বয়সী এই মুসলিম মেয়রকে ইহুদিবিদ্বেষী আখ্যা দেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, মামদানি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসরায়েলের সমালোচনা করে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে নিউইয়র্কে অনেক ইহুদি নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না।

পরে এক বিবৃতিতে মামদানি বলেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর নিজের চালানো গণহত্যাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য জাতিসংঘের ভাষণকে ব্যবহার করে আবার ভিত্তিহীন মিথ্যা ছড়িয়েছেন নেতানিয়াহু। মামদানির ভাষায়, তবে কোনো মিথ্যাই এই সত্যকে বদলে দিতে পারবে না যে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।

ভাষণে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন নেতানিয়াহু। তাঁর কথায়, ‘ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা।’ নেতানিয়াহুর ভাষণে মামদানির স্ত্রী রামা দুয়াজির কথাও আসে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার পর সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের সমর্থন জানানো কিছু পোস্টে লাইক দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন দুয়াজি।

জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় মামদানি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে এর কিছু আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি। সেখানে নিজের সরকারি বাসভবনে একটি জলপাইগাছের চারা রোপণ করতে দেখা যায় মামদানিকে। গাজার কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারের সঙ্গে নৈশভোজ করতেও দেখা যায়। ভিডিও শিরোনাম, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ যেন শান্তির হয়।’

মামদানিকে নিয়ে নেতানিয়াহুর সমালোচনা জাতিসংঘের মঞ্চ ছাড়িয়ে ইসরায়েলেও চলছে। আগামী মাসে দেশটিতে নির্বাচন। এই নির্বাচন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টির জন্য বড় পরীক্ষা। নির্বাচন ঘিরে প্রচারে দলটি বিভিন্ন বিলবোর্ড ও পোস্টারে মামদানির ছবি ব্যবহার করছে। সেখানে মামদানির পাশাপাশি ইরান, তুরস্ক ও লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর নেতাদের ছবিও ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ ছাড়া চলতি মাসের শুরুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন নেতানিয়াহু। সেখানে নির্বাচনে তাঁর পরাজয়ের সম্ভাবনা ঘিরে মামদানিকে উচ্ছ্বাস করতে দেখা যায়। চলতি সপ্তাহের শুরুতেও মামদানিকে আক্রমণ করে আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেন নেতানিয়াহু। সেখানে মামদানির বিরুদ্ধে ইহুদিবিরোধী দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার মিথ্যা অভিযোগ তোলেন তিনি।

মামদানির বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর এসব আক্রমণের সমালোচনাও হচ্ছে। যেমন মামদানির মিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্রুকলিন ও ম্যানহাটানে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডার। জাতিসংঘে মামদানিকে নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, নিজের অপরাধের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়ার বদলে নেতানিয়াহু যদি ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে ইসরায়েলি ও মার্কিন ইহুদিদের নিরাপত্তা আরও কমে যায়।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

লোকদেখানো হলেও নিজের সিদ্ধান্তেই ঠিকমতো দেখানো হলো না ট্রাম্পের by হাসান ফেরদৌস

বিশ্লেষণঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাঁকজমক পছন্দ করেন। এ বছরের মে মাসে বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাঁকে চোখধাঁধানো অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এবার পালা ছিল ট্রাম্পের। বুধবার বিমানবন্দরে নিজে গিয়ে অতিথিকে স্বাগত জানালেন তিনি। পরদিন হোয়াইট হাউসে সির সম্মানে হাজির করা হলো প্রায় পাঁচ শ সামরিক সদস্যকে। ছিল কুচকাওয়াজ, সামরিক বিমানের মহড়া আর সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় ভোজ।

পুরো আয়োজন যেন ক্যামেরার জন্যই সাজানো। অথচ প্রধান মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর যৌথ ভিডিও ক্যামেরা ছিল না সেখানে। কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ‘ভুয়া সংবাদ’ পরিবেশনের অভিযোগে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। প্রতিবাদে প্রধান নেটওয়ার্কগুলো প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানের জন্য যৌথ ভিডিও সরবরাহ বন্ধ রাখে। আদালতের নির্দেশে তিন প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ফিরলেও সিকে দেওয়া অভ্যর্থনার সময় সেই অচলাবস্থা কাটেনি। অন্য সংবাদমাধ্যম অনুষ্ঠানটি ধারণ করেছে; তবু ট্রাম্প যে টেলিভিশন-দৃশ্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন, তার প্রচারই বাধাগ্রস্ত হলো।

লোকদেখানো অনুষ্ঠান, অথচ নিজের সিদ্ধান্তের কারণেই লোককে ঠিকমতো দেখানো গেল না।

অতিথি আপ্যায়নের পাশাপাশি ট্রাম্প সির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাও তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁদের বন্ধুত্বের কথা বলেছেন বারবার; রাষ্ট্রীয় ভোজে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বয়ে আনে, এমন সম্পর্ক গড়ার আশা প্রকাশ করেছেন। সির সুর ছিল অপেক্ষাকৃত সংযত। প্রতিযোগিতা থাকবেই, কিন্তু তাকে এমন মল্লযুদ্ধে পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে একজনের জয় মানেই অন্যজনের পরাজয়।

সৌজন্যের আড়ালে বিরোধগুলো অবশ্য অটুট। বাণিজ্যযুদ্ধ আপাতত সাময়িক বিরতিতে রয়েছে, স্থায়ী মীমাংসা হয়নি। বিরল খনিজের সরবরাহ এবং উন্নত প্রযুক্তির ওপর বিধিনিষেধ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তাইওয়ান প্রশ্নে সি চান ওয়াশিংটন স্বাধীনতার বিরোধিতা করুক; যুক্তরাষ্ট্র এত দিন বলেছে তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। এই দুই অবস্থানের ফারাক ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু কূটনীতিতে তার গুরুত্ব অনেক।

ইরান নিয়েও অস্বস্তি আছে। চীন ইরানের তেলের বড় ক্রেতা; নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চালু রাখার ব্যবস্থার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম–সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ট্রাম্প চান ইরান যুদ্ধ অবসানে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে বেইজিং সহায়তা করুক। ইরান যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় ফেরার পক্ষে সি কথা বলেছেন, কিন্তু ইরানকে মার্কিন শর্ত মানাতে চাপ দেওয়ার কোনো প্রকাশ্য অঙ্গীকার করেননি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চায় দুই দেশই। একই সঙ্গে বিপজ্জনক কোনো এআই-সংকট দেখা দিলে দ্রুত যোগাযোগের প্রয়োজনও তারা স্বীকার করছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সে ধরনের ঘটনার বিষয়ে পরস্পরকে সতর্ক করার একটি ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছেন। প্রেসিডেন্ট সি এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সতর্কবার্তা আদান-প্রদানের কোনো চুক্তি হয়েছে, এমন ঘোষণা এখনো আসেনি। চীন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে হলেও নিজের এআই উন্নয়নের ওপর মার্কিন বাধা কিংবা দেশের ভেতরে প্রযুক্তির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে রাজি—এমন লক্ষণ নেই।

ওয়াশিংটনে তাই আপাতত সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্জনটি রাজনৈতিক নয়, আনুষ্ঠানিক। কুচকাওয়াজ, খানাপিনা, পারস্পরিক পিঠ চুলকানো। কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি। যত দিন সেই উত্তর নেই, তত দিন এই শীর্ষ বৈঠকের ছবি অনেক; ফলাফল অল্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র সব প্রস্তাব মানলেও পারমাণবিক কর্মসূচিতে ছাড় দেবে না ইরান

যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেওয়াসহ অন্যান্য প্রস্তাবে রাজি হলে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেবে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র সব প্রস্তাব মেনে নিলেও পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দেবে না তেহরান। গতকাল শুক্রবার রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে প্রস্তুত তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, সাত দিনের মধ্যে লেবাননসহ সব রণাঙ্গনে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। একই সময়ের মধ্যে ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে, ইরানের জব্দ করা অর্থ ছাড় দিতে হবে এবং দেশটির জ্বালানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টায় হরমুজ প্রণালি এখন দর-কষাকষির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তেহরান মার্কিন নৌ অবরোধ থেকে স্বস্তি চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটন বৈশ্বিক তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা চায়। বর্তমানে প্রণালিটি তেহরান কার্যত বন্ধ করে রেখেছে।

গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের এক ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর আশা করছেন তিনি। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই এ চুক্তি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের শর্ত মেনে নেওয়ার পরই পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তারা বিস্তারিত আলোচনায় যেতে প্রস্তুত।

তবে ওই ইরানি কর্মকর্তা বলেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার কিংবা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানোসহ নিজেদের অধিকারের বিষয়ে কোনো ছাড় দেবে না ইরান। উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি।

ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। এর মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করার বিষয়টিও তারা উল্লেখ করেছে। তবে ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

ইরানের তেহরানের আজাদি স্কয়ারে একটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার পাশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবিযুক্ত ব্যানার। ৩০ জুলাই ২০২৬
ইরানের তেহরানের আজাদি স্কয়ারে একটি ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার পাশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবিযুক্ত ব্যানার। ৩০ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থীদের জয়, কী তাদের এজেন্ডা by জন ক্যাম্পফনার

‘সবকিছুই সম্ভব’—স্পষ্ট কণ্ঠে ঘোষণা করেছে অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। পূর্বাঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষের রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টে ৪৩.৮ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হওয়ার পর উগ্র ডানপন্থী এই দলটি কেবল জার্মানি নয়, পুরো অঞ্চলে জোর কম্পন সৃষ্টি করেছে।

বিগত দশকজুড়ে দাপট দেখানো অন্যান্য জনতুষ্টিবাদী আন্দোলনের মতোই এএফডিও তাদের আসল রূপ লুকিয়ে রাখার কোনো চেষ্টা করেনি।  

স্যাক্সনি-আনহাল্টে নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতেই এএফডি ২৫৮ পৃষ্ঠার একটি ইশতেহার প্রকাশ করে, যার মূল স্লোগান ছিল: ‘সবার আগে দেশ’। এই ইশতেহারে প্রাকৃতিক উপায়ে নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিসহ বিপুলসংখ্যক অভিবাসীকে বিতাড়িত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, বিশেষত যাদের দেখতে বা শুনতে ঠিক ‘জার্মানদের মতো’ মনে হয় না।

ইশতেহারটিতে স্কুলের ইতিহাস পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে ‘হিটলারের পাঠ কমিয়ে বিসমার্কের ইতিহাস বেশি পড়ানো হয়’। এর মূল উদ্দেশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর জার্মানির নাৎসিবাদ ও হলোকস্ট স্মরণের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তাকে ছোট করে সাম্রাজ্যবাদী অর্জন ও জাতীয় শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

এএফডির এই ইশতেহারে ‘স্বাভাবিক’ বা প্রথাগত বিষমকামী পরিবারকে সব ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এলজিবিটিকিউ পরিবারসহ তাদের চোখে ‘পথভ্রষ্ট’ গোষ্ঠীগুলোর আইনি স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

দলটি ইউক্রেনে জার্মানির সামরিক সহায়তার কঠোর বিরোধিতা করে এবং দাবি করে যে রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা গেলেই কেবল জার্মানদের জন্য সস্তা জ্বালানি ও পণ্যের কম দাম নিশ্চিত করা সম্ভব।

উগ্র ডানপন্থী এই দলটির ইশতেহার পুরোটা পড়ার মতো। কোনো সন্দেহ নেই যে স্যাক্সনি-আনহাল্ট এবং পাশের একটি রাজ্যে এএফডির শাখাগুলোকে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা কেন ‘ডানপন্থী চরমপন্থী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে এটি স্বীকার করতেই হবে যে জার্মানির এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে এই চরমপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিই বেশ প্রলুব্ধকর মনে হচ্ছে।

এএফডির প্রলোভনময় প্রতিশ্রুতি

বার্লিনের একের পর এক জোট সরকারের নীতি ছিল আমলাতান্ত্রিক ও ধীরগতির—যেখানে কঠিন বাস্তবতার মুখে অগ্রগতি হতো অত্যন্ত ধীরগতিতে, যদি আদৌ কোনো অগ্রগতি হতো। এর বিপরীতে এএফডির এই চোখধাঁধানো ও সরলীকৃত প্রতিশ্রুতিগুলো ভোটারদের সহজে আকৃষ্ট করছে।

বাজেটঘাটতি মেটাতে কাটছাঁট, চীনের তীব্র প্রতিযোগিতায় চাকরি হারানো, আর নতুন করে অস্ত্রসজ্জায় শতকোটি ইউরো খরচ করা দলগুলোকে কেন ভোট দেবে মানুষ— যখন তারা নিশ্চিন্তে অতীত জীবনের সেই নিরাপদ সময়েই ফিরে যেতে পারছে?

মূলধারার সব রাজনৈতিক প্রতিপক্ষেরই ভোটব্যাংকে থাবা বসিয়েছে এএফডি। এমনকি বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (সিডিইউ) প্রায় ৮২ হাজার ভোটারকে নিজেদের দিকে টেনে নিয়েছে তারা।

তবে ৬ সেপ্টেম্বরের স্যাক্সনি-আনহাল্ট নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ফল হলো এএফডি এমন সব মানুষকে ভোটের মাঠে ফিরিয়ে এনেছে, যারা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। এলাকার মোট ভোটারের প্রায় ১০ ভাগের ১ ভাগ—প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার নিষ্ক্রিয় মানুষকে তারা আবার ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

এরা মূলত সেই শ্রেণির মানুষ, যারা রাজনীতির ওপর থেকে আশা ছেড়ে দিয়ে এত দিন এক সমান্তরাল জগতে বাস করছিল। এই ভোটারদের অনেকেই জার্মানির নাৎসি অতীতকে ‘বড় করে দেখানো হয়েছে’ বলে মনে করে এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের তুলনা টানতে নারাজ।

উপরন্তু, তারা মধ্যপন্থী রাজনীতিকে সাধারণ মানুষের মূল্যবোধ ধ্বংস করার কাজে নিয়োজিত একটি ‘ডিপ স্টেট’ বা অদৃশ্য ব্যবস্থার অস্ত্র হিসেবে দেখে।

স্যাক্সনি-আনহাল্ট থেকে রিপোর্টিং করার সময় অতিমারির আগের একটি ছোট ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সাবেক কমিউনিস্টশাসিত পূর্ব জার্মানির প্রধান শহরগুলোর একটি লাইপজিগের রাস্তা দিয়ে আমি হাঁটছিলাম এক স্থানীয় পরিচিত সাহায্যকারীর সঙ্গে। স্মার্ট ও বুদ্ধিমতী সেই নারী অ্যাকটিভিস্ট একসময় গ্রিন পার্টির হয়ে কাজ করতেন।

আঞ্চলিক পাবলিক ব্রডকাস্টার ‘এমডিআর’-এর কার্যালয় অতিক্রম করার সময়, কোনো উসকানি ছাড়াই তিনি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন—‘মিথ্যাবাদী সংবাদমাধ্যম’ বা ‘ফেক নিউজ’। চমকে উঠে আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই চ্যানেলটি তাঁর এমন ক্ষোভের কারণ কী করল?

‘ওরা আমার মতো সাধারণ মানুষের কথা শোনে না,’ ব্যস, এটুকুই ছিল তাঁর উত্তর। যখনই তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের কথা বলতে বললাম, তিনি আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে উঠলেন।

জার্মান রাজনীতিতে এখন যা ঘটছে তার কিছুটা কেবল এই দেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপট থেকে উদ্ভূত—বিশেষ করে ১৯৯০ সালে দুই জার্মানির একত্রকরণের পর থেকে পূর্ব জার্মানির মানুষের মনে নিজেদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক ভাবার যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ জমে আছে, তা অনস্বীকার্য। তবে এর একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার বাইরে ছড়িয়ে পড়া উগ্র ডানপন্থীদের সামগ্রিক উত্থান।

মাগার প্রতিধ্বনি

স্যাক্সনি-আনহাল্টে জয়ী এএফডি প্রার্থী ৩৫ বছর বয়সী উলরিখ সিগমুন্ড ছিলেন সুগন্ধি বিক্রির একজন সাবেক সেলসম্যান, যিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নিখুঁতভাবে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই তাঁর ‘আদর্শ’।

নীতি এবং যোগাযোগ কৌশল—উভয় ক্ষেত্রেই এএফডি হলো ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক মিত্র।

বিষয়টি ট্রাম্পের নজর এড়ায়নি। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে ইউরোপজুড়ে ‘দেশপ্রেমিক’ আন্দোলনগুলোকে সমর্থন করার কথা বলা হয়েছিল, যাতে তাদের ভাষায় ‘সভ্যতার বিলুপ্তি’ রোধ করা যায়।

নির্বাচনের ফলাফল আসার পর নিজের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি এএফডির নাম না নিলেও লেখেন, ‘ওয়াও, জার্মানির জনতুষ্টিবাদী দলটির জন্য খুব বড় ঘটনা।’ তিনি তাঁর পোস্টের শেষে যোগ করেন—মাগার আদলেই লেখেন এমজিজিএ!—যা ‘মেক জার্মানি গ্রেট এগেইন’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

উচ্চপর্যায়ে ট্রাম্পই এএফডির একমাত্র বন্ধু নন। ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি নিজেদের অনুরাগের কথা কখনোই গোপন করেনি দলটি। ইউক্রেনসহ অন্যান্য নানা ইস্যুতে তারা মূল রুশ প্রেসিডেন্টের সুরেই কথা বলে। ক্রেমলিনের শর্ত মেনেই অবিলম্বে ইউক্রেন যুদ্ধের ‘শান্তি’ আলোচনার দাবি জানায় তারা।

এই দলের বিশ্বাস, রাশিয়াকে পুনরায় ইউরোপের প্রাণকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনলে তাদের সামাজিক রক্ষণশীল এজেন্ডাকে ত্বরান্বিত করা যাবে, সস্তা তেল ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরবে।

তবে এই সবকিছুর পেছনে এখনো একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত জার্মান সংবিধানে কেন্দ্র ও রাজ্য—উভয় পর্যায় সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

উদ্দেশ্য একটাই—ক্ষমতা যেন একক কোনো দলের হাতে পুঞ্জীভূত না হতে পারে। ৮৩ আসনের রাজ্য সংসদে সরকার গঠনে মাত্র ৩টি আসন দূরে থেকে এএফডির এভাবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি চলে আসাটাই এক অভাবনীয় ঘটনা।

এখন মোটরসাইকেল র‍্যালি আর বর্ণিল নির্বাচনী প্রচারণায় নজরকাড়া এএফডি নেতা সিগমুন্ডকে সরকার গঠনের কঠিন লড়াইয়ে নামতে হবে। এর জন্য তাঁকে হয় অন্য কোনো দলকে রাজি করাতে হবে, না হয় দু-একজন বিদ্রোহী আইন প্রণেতাকে নিজেদের দিকে টানতে হবে।

কিন্তু কোনোটিই সহজ হবে না; বিশেষ করে তথাকথিত ‘ফায়ারওয়াল’–এর কারণে। এটা মূলত মূলধারার দলগুলোর এএফডির সঙ্গে কাজ না করার এক যৌথ অঙ্গীকার। সেই দেয়াল হয়তো কিছুটা দুর্বল হয়ে আসছে, তবে এবারও হয়তো তা কোনোমতে টিকে যেতে পারে।

অক্টোবরের শুরুতে সংসদ অধিবেশন বসার আগে এই রাজনৈতিক দর–কষাকষি একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গড়াবে। সিগমুন্ড যদি মুখ্যমন্ত্রী হনও, তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে বিল পাস করানোর জন্য এএফডির মূলনীতিতে কোনো আপস তিনি করবেন না।

যুদ্ধ–উত্তর জার্মান রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি ছিল সমঝোতা ও ঐকমত্য—যা কয়েক দশক ধরে গুণ হিসেবে বিবেচিত হতো। অথচ আজকের অনেক ভোটার সেটিকেই দুর্বলতা হিসেবে দেখছে। আর সোশ্যাল মিডিয়া দেশ ও বিশ্বের সব জটিল সমস্যার তাৎক্ষণিক এবং ব্যথাহীন সমাধানের দাবিকে কেবল আরও উসকে দিচ্ছে।

বার্লিনের গোধূলিলগ্ন

৯ সেপ্টেম্বর বার্লিনে বার্ষিক বাজেট ভাষণ দেওয়ার সময় চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জকে অত্যন্ত বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। তাঁর নেতৃত্ব এখন গুরুতর সংকটের মুখে। পূর্বের আরেকটি রাজ্য মেকলেনবার্গ-ভোরপোমার্ন এবং রাজধানী বার্লিনে আসন্ন রাজ্য নির্বাচনকে সামনে রেখে তাঁর দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটস এক বড় ধরনের পরাজয়ের আশঙ্কা করছে।

এমনিতেই কিছুটা কড়া মেজাজের মানুষ মার্জ মাসের পর মাস ধরে জনমত জরিপে ইতিহাসের সর্বনিম্ন রেটিং নিয়ে চলছেন। জার্মান সংবাদমাধ্যমের এক বড় অংশ তাঁকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছে এবং তাঁর ব্যাকফায়ার করা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

তিনি বড়াই করে বলেছিলেন এএফডির সমর্থন অর্ধেক কমিয়ে আনবেন, অথচ দেখলেন তা দ্বিগুণ হয়ে গেছে।  

মার্জ চ্যান্সেলর পদের জন্য বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তিনি তাঁর পূর্বসূরি অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সমালোচনা করে বলেছিলেন যে ম্যার্কেল দলকে অতিরিক্ত মধ্যপন্থার দিকে নিয়ে গেছেন, কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনে অতিরিক্ত অর্থ অপচয় করেছেন এবং অভিবাসীদের খুব বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে জার্মানদের সামনে খাঁটি রক্ষণশীলতার বিকল্প থাকা উচিত। সাধারণ মানুষ তাঁর সেই কথা শুনেছে ঠিকই, তবে তাঁর দেখানো পথে হাঁটেনি; হেঁটেছে আরও চরমপন্থার দিকে।  

কেবল মার্জের দলই যে সংকটে আছে তা নয়। ক্ষমতাসীন জোটের জুনিয়র শরিক মধ্য-বামপন্থী সোস্যাল ডেমোক্র্যাটদের (এসপিডি) অবস্থাও করুণ, তাদের ভোটব্যাংক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

এসপিডির তৃণমূল কর্মীরা মনে করেন, এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হলো বামপন্থীদের ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের নীতিতে ফিরে যাওয়া। অন্যদিকে সিডিইউ কর্মীরা চান সরকার যেন ব্যয় আরও কমায় এবং অভিবাসীদের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে।

অর্থাৎ একসঙ্গে সরকার পরিচালনা করতে হলেও দুটি দল প্রতিদিন সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে টান দিচ্ছে।

মস্কো এবং ওয়াশিংটন—দুই পক্ষই যখন এএফডিকে উৎসাহ দিচ্ছে, তখন জার্মানির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে তার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে। মার্জ হয়তো তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এজেন্ডা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তবে জার্মানির সামরিক অবস্থান পুনর্গঠনে তিনি যথেষ্ট সাহস ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন।

তবে এই নীতি ঝুঁকিমুক্ত নয়, যা স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনের পর চ্যান্সেলর নিজেও স্বীকার করেছেন। তিনি মেনে নিয়েছেন যে ওই রাজ্যের ৫৭.৭ শতাংশ ভোটার এমন দলগুলোকে সমর্থন করেছে ‘যারা ইউক্রেনের প্রতি জার্মানির নিরঙ্কুশ সমর্থনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।’

তবুও তিনি যোগ করেছেন যে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে ‘এক মিলিমিটারও সরবেন না।’ সংসদে মার্জ এএফডিকে মস্কোর সঙ্গে ‘অদ্ভুত আঁতাত’ এবং ‘গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবজ্ঞা’ প্রদর্শনের জন্য অভিযুক্ত করেন।

মার্জ যখন নিজের বক্তব্য শোনাতে এবং আশাবাদী শোনাতে লড়াই করছিলেন, তখন এএফডির সহনেত্রী অ্যালিস ওয়াইডেল পুরো সংসদ মাতিয়ে রেখেছিলেন। জার্মান অর্থনীতির একমাত্র বর্ধনশীল খাত হিসেবে ‘সরকারি খাত এবং আশ্রয়শিল্পকে’ খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, তাঁর দল তাদের পথে দাঁড়ানো সবাইকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।

এটি ছিল ক্ষোভের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। আর সামনের অন্ধকার দিন ও মাসগুলোতে এমন দৃশ্য যে আরও দেখতে হবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

* জন ক্যাম্পফনার, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। হোয়াই দ্য জার্মানস ডু ইট বেটার–এর লেখক।

- টাইম থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

বক্তব্য দিচ্ছেন এএফডির নেতা উলরিখ সিগমুন্ড
বক্তব্য দিচ্ছেন এএফডির নেতা উলরিখ সিগমুন্ড। রয়টার্স

‘প্যাক্স আমেরিকানা’র দিন শেষ, এরপর কী হবে? by পেদ্রো আব্রামোভাই ও জুলিয়া সাকর-টার্নি

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতিতে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। শান্তির মধ্যেই যুদ্ধের আশঙ্কা, আবার যুদ্ধের মধ্যেই শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিরতি যেন যুদ্ধের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্থির শান্তি।

গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল ৬০ দিনের আলোচনা শুরু করা এবং শেষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি; বরং লড়াই চলেছে। হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের হামলা হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এতে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও হুমকির মুখে পড়েছে।

ইরানের ওপর হাজার হাজার বিমান হামলা চালিয়েও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি আবার খুলতে তেহরানকে বাধ্য করতে পারেনি। ইরান বলছে, চার দশকের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে তারা এই অবরোধ প্রত্যাহার করবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র উল্টো আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। অর্থাৎ সর্বোচ্চ মাত্রার নিষেধাজ্ঞাকেও আরও বাড়ানো হচ্ছে। তবু ইরান আত্মসমর্পণের কাছাকাছি যায়নি। এতে নিজেদের সামরিক আগ্রাসনের পরিণতি সামলানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে।

পুরো অঞ্চলেই এখন শক্তিকে আর শক্তির প্রতীক বলে মনে হচ্ছে না; বরং তা অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে উঠছে। গাজায় যুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের উপায় নয়; যুদ্ধই যেন সেখানে মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল যে অতিরিক্ত ও ব্যাপক শক্তি প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করছে (লেখকদের ভাষায় যা ‘গাজা ডকট্রিন’), তার লক্ষ্য শুধু হামাস নয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবস্থাকেও আঘাত করা হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননেও একই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে। সেখানে দুটি যুদ্ধবিরতি ও একটি শান্তিচুক্তি থাকা সত্ত্বেও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে লেবাননের সার্বভৌমত্ব কার্যত উপহাসে পরিণত হয়েছে।

অনেকে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘শক্তিই ন্যায়’—এই নগ্ন নীতি প্রাধান্য পেয়েছে। এর উদাহরণ হিসেবে ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর অসাধারণ হস্তান্তর এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি ভণ্ডামিপূর্ণ হলেও আগে যে আনুষ্ঠানিক সম্মান দেখাত, সেটিও এখন অনেকটাই পরিত্যাগ করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন ইরাকে হামলার আগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নিজেদের অবস্থানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন সেখানে কোনো ধরনের পরামর্শ বা অনুমোদনের ভানও করছে না। ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া আন্তর্জাতিক পরামর্শের বিষয়টি যেন গুরুত্বই হারিয়েছে।

তবে এটি পুরোপুরি নতুন কোনো পরিবর্তন নয়; বরং আগের নীতিরই আরও চরম রূপ। ড্রোন হামলায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে গুয়ানতানামো বে-তে অনির্দিষ্টকাল আটক—এক প্রজন্ম ধরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সেই যুদ্ধপরবর্তী ‘নিয়মভিত্তিক’ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, যেটি একসময় তারা প্রতিষ্ঠা করেছিল। শুধু নিয়মের সর্বজনীন প্রয়োগ সীমিত করা হয়নি; প্রয়োজন হলে নিয়মকে ব্যবহার না করার সুযোগও তৈরি করা হয়েছে। লেখকদের মতে, বিশ্বজুড়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ট্রাম্প নীতির পথ আগেই তৈরি হয়েছিল গাজায় গণহত্যার ঘটনায় আগের মার্কিন প্রশাসনের সহযোগিতার মধ্য দিয়ে।

তবে প্রকাশ্য সামরিক শক্তিনির্ভর নীতির একটি পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সেটি ট্রাম্পের প্রত্যাশিত পরিবর্তন নয়। এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য শক্তিশালী করার বদলে তা দুর্বল করেছে। যুদ্ধ ও শান্তির সীমারেখা যখন এমন এক যুদ্ধবিরতিতে মিলিয়ে যায়, যেটি পুরোপুরি যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়, আর মাসের পর মাস বোমাবর্ষণের পরও যখন বিজয় আসে না, তখন সামরিক শক্তিকে আর শক্তি বলে মনে হয় না। মনে হয় অর্থহীন ধ্বংসযজ্ঞ।

চলমান যুদ্ধ কোনো কার্যকর বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করতে পারে না। কাঁচা শক্তি প্রয়োগ করলে প্রতিরোধ তৈরি হবেই। যুদ্ধাপরাধ আন্তর্জাতিক নিন্দা ডেকে আনবে। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে শর্তসাপেক্ষ করা গেলেও দীর্ঘদিন আধিপত্য ধরে রাখা যায় না। তাই এখন বড় প্রশ্ন হলো, এরপর কী?

সামরিক শক্তিনির্ভর নীতি গভীর অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। কিন্তু এর ব্যর্থতা রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আরও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরির সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। এর ভিত্তি হতে পারে নতুন ধরনের বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, যেখানে সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান থাকবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বজনীন অধিকার, পারস্পরিক সংযম এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে শক্তিশালী করবে। যৌথ সম্পদ, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মূল্যবোধের বিষয়ে সিদ্ধান্তও সম্মিলিতভাবে নেওয়া হবে। এমন ব্যবস্থা এখনো আকাঙ্ক্ষার বিষয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রতিটি দেশেরই এতে স্বার্থ রয়েছে।

এই নতুন ব্যবস্থায় জাতিসংঘ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে না। তবে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত মাত্র একটি প্রস্তাব দিয়েছে। সেখানে ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করা হয়েছে, কিন্তু যে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে, তার সমালোচনা করা হয়নি। ফলে কূটনীতির পক্ষে নতুন রক্ষকদের প্রয়োজন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আর এর সম্ভাবনাও ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক এর একটি উদাহরণ। এই আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে পাকিস্তান ও কাতারের নেতৃত্বাধীন একটি জোট। এতে মিসর, সৌদি আরব ও তুরস্কও সহায়তা করেছে। এটি ২০১৫ সালের ইরানের পারমাণবিক চুক্তি বা জেসিপিওএ নিয়ে আলোচনার চেয়ে বড় পরিবর্তন। ওই চুক্তিতে ইরানের সঙ্গে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্ত ছিল।

বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০১০ সালে ব্রাজিল ও তুরস্ক ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক জ্বালানি বিনিময়ের একটি সমঝোতা করেছিল। পরে জেসিপিওএতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো দ্রুত সেই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে। তখন ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেলসো আমোরিম আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘প্রচলিত ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো তাদের বিশেষ মর্যাদা সহজে ভাগ করে নিতে চায় না।’

আরেকটি উদাহরণ হলো মিসর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ কাঠামো। এর লক্ষ্য হলো অভিন্ন নীতির ভিত্তিতে আরও স্থিতিশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা। এর মধ্যে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকারও রয়েছে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেছে। এতে কোনো নির্দিষ্ট শত্রুর নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং অন্য দেশগুলোর যোগ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলার মধ্যে এই চুক্তির কার্যকারিতা এখন পরীক্ষা হচ্ছে। তবে বৃহত্তর প্রবণতাটি স্পষ্ট। আরও বহুত্ববাদী একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেখানে দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই বেশি করে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সেখানে কমছে।

হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মানদেব প্রণালিও এখন কার্যত বন্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির জবাবে যে অসম শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, তার ফলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমরা শুধু চরম সহিংসতাই দেখছি না, দেখছি চরম মাত্রার ক্ষমতার অপব্যবহারও।

তবে যে যুদ্ধ প্যাক্স আমেরিকানা তথা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে, সে যুদ্ধই আরও টেকসই একটি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার জন্য জায়গা তৈরি করতে পারে। এই নতুন ব্যবস্থার ভিত্তি হতে পারে অধিকার, সংযম, মর্যাদা, কূটনীতি এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান।

* পেদ্রো আব্রামোভাই, ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনসের কর্মসূচিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জুলিয়া সাকর, একই প্রতিষ্ঠানের বিশেষ উপদেষ্টা।
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন একটি মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ড। সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি এবং লেখা রয়েছে—‘মহান বিজয়, হরমুজ প্রণালি’। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইরানের রাজধানী তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন একটি মার্কিনবিরোধী বিলবোর্ড। সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি এবং লেখা রয়েছে—‘মহান বিজয়, হরমুজ প্রণালি’। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

রাকুল প্রীত সিং এর সময় কাটছে আনন্দে

প্রকাশ ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ মালদ্বীপে ছুটি কাটাচ্ছেন বলিউড তারকা রাকুল প্রীত সিং। স্বামী জ্যাকি ভগনানি ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে দ্বীপদেশে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। আর সেখানকার রোদ-সমুদ্র-আকাশের রঙে ভরা মুহূর্তগুলো একের পর এক শেয়ার করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। এরই মধ্যে তার ভোকেশন ডায়েরি ভক্তদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে।

সপ্তাহের শুরুতে ওভারওয়াটার ভিলার দৃশ্যের ঝলক দেখানোর পর রাকুল এবার প্রকাশ করেছেন আরও একগুচ্ছ ছবি। যেখানে ভ্রমণ ও ফ্যাশনের চমৎকার সমন্বয় দেখা গেছে। উজ্জ্বল রঙ, আরামদায়ক পোশাক ও বিচ-ফ্রেন্ডলি অ্যাকসেসরিজে সাজিয়ে তুলেছেন নিজের ছুটির স্টাইল।

নজর কাড়ার মতো একটি লুকে তাকে দেখা যায় নীল-অলিভ টোনের ট্রপিক্যাল-প্রিন্ট মনোকিনিতে, যার সঙ্গে ছিল একটি ছোট স্কার্ট। ডার্ক সানগ্লাস ও মিলিয়ে পরা চুড়ি পুরো লুকটিকে দিয়েছে বাড়তি গ্ল্যামার। আরেকটি ছবিতে তিনি হাজির হন ফুলেল ব্যান্ডিউ টপ ও সারং-স্টাইলের স্কার্টে, সঙ্গে প্রশস্ত স্ট্র হ্যাট, যা ছুটির মুডকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

এ ছাড়া হালকা নীল-সাদা পিনস্ট্রাইপড কো-অর্ড সেটে ক্রিস্টাল-স্বচ্ছ পানির ভেতর হাঁটার মুহূর্তও শেয়ার করেছেন অভিনেত্রী। ছুটি উপভোগের পাশাপাশি ক্যারিয়ারেও ব্যস্ত সময় পার করছেন রাকুল প্রীত সিং।

সম্প্রতি ‘দে দে প্যার দে-২’ ছবিতে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। সামনে রয়েছে ‘পতি পত্নী অউর ওহ-২’, যেখানে আয়ুষ্মান খুরানা, সারা আলী খান ও ওয়ামিকা গাব্বির সঙ্গে দেখা যাবে তাকে। 

অভিনেত্রী রাকুল প্রীত সিং। ছবি: সংগৃহীত
অভিনেত্রী রাকুল প্রীত সিং। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ভাবমূর্তি ‘নজিরবিহীন তলানিতে’ নামিয়েছেন নেতানিয়াহু

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের অবস্থানকে ‘নজিরবিহীন নিম্নস্তরে’ নিয়ে গেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—এমন মন্তব্য করেছে ইসরাইলি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম হারেৎজ।

শুক্রবার প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে পত্রিকাটি বলেছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু ও তার সরকারের কর্মকাণ্ডের কারণে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক বড় ধরনের সংকটে পড়ার বিষয়ে বহু বছর ধরেই সতর্ক করা হচ্ছিল।

হারেৎজ লিখেছে, নেতানিয়াহু ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষতি নিয়ে দেওয়া অসংখ্য সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন।

বিশেষ করে মার্কিন রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির পক্ষে তার প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরাইলের অবস্থানকে দুর্বল করেছে বলে পত্রিকাটি মন্তব্য করেছে।

তবে হারেৎজের মতে, ইসরাইলের অবস্থানের অবনতি এখন আর শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পত্রিকাটি লিখেছে, গত দুই বছরে নেতানিয়াহু, ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচের নেতৃত্বাধীন সরকারের নীতির কারণে রিপাবলিকানদের মধ্যেও ইসরাইলের অবস্থান আরও খারাপ হয়েছে।

পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে ইরান যুদ্ধ ও এর পর জ্বালানির দামের তীব্র বৃদ্ধি, ফিলিস্তিনিদের ওপর উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত—এসব ঘটনার কারণে এমনকি ইসরাইলের সবচেয়ে কট্টর সমর্থকেরাও নজিরবিহীন সমালোচনা করছেন বলে হারেৎজ দাবি করেছে।

সংবাদপত্রটি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোর মার্কিন জনমত জরিপে ইসরাইলের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের ক্ষেত্রে—বিশেষ করে তরুণ উত্তরদাতাদের মধ্যে—এক তীব্র ও অভূতপূর্ব পতন দেখা গেছে। এতে আরও বলা হয়েছে যে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর কোনো আড়ম্বরপূর্ণ ভাষণই এই নিদারুণ বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারবে না।

উভয় দেশের সম্পর্কের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করে পত্রিকাটি লিখেছে: আমেরিকান জনগণের চোখে ইসরাইলের ভাবমূর্তি কতটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং দুই দেশের সম্পর্কে ভবিষ্যতে এর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা প্রতিটি ইসরাইলি নাগরিকের বোঝা প্রয়োজন।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ভাবমূর্তি ‘নজিরবিহীন তলানিতে’ নামিয়েছেন নেতানিয়াহু
ছবি: সংগৃহীত।

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না: গুতেরেস

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে না বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা ও আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খবর আলজাজিরার।

ইরনা ও ফার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে আলাপকালে গুতেরেস বলেন, তার মূল্যায়ন অনুযায়ী ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে না।

পেজেশকিয়ানও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এমন দাবি ‘ভুল ধারণা ও বানোয়াট’।

ইরনা জানিয়েছে, পেজেশকিয়ান বলেন, ইরানের লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্ঞান ও প্রযুক্তি অর্জন এবং এর সুফল ভোগ করা; পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা নয়।

তিনি আরও বলেন, ইরান কূটনৈতিক আলোচনা থেকে সরে আসেনি। তবে কূটনীতির বারবার ব্যর্থতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেহরানের আর কোনো আস্থা নেই।

এদিকে গুতেরেস জানান, মধ্যপ্রাচ্য সফরের সময় তিনি ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করার আহ্বান জানাবেন।

ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না: গুতেরেস
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের (বামে) সঙ্গে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত।

বোমা হামলা থেকে জাতিসংঘে, কূটনীতির নতুন অধ্যায়ে ইরান

সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা যুক্তরাষ্ট্র-সমন্বিত ইসরাইলি বিমান হামলা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে ফেরার সাত মাস পর, ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসের সুরক্ষাবলয়ে ম্যানহাটনের রাস্তায় হেঁটেছেন।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে বিশ্বনেতারা যখন নিউ ইয়র্কে সমবেত হয়েছেন, তখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের অবস্থান তুলে ধরেছেন।

নিউইয়র্কে অবস্থানকালে আরাগচি দুই ডজনের বেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাদের মধ্যে ইউরোপের ১০টির বেশি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা প্রতিনিধিও ছিলেন। বৈঠক হয়েছে জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদির সঙ্গেও—যে দেশটির ভূখণ্ডে সাম্প্রতিক সময়ে ইরান হামলা চালিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে আরাগচির সরাসরি বৈঠক। তিন মাস ধরে অচল থাকা কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় চালুর লক্ষ্যেই এ বৈঠক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

আরাগচি পরে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। ওই প্রস্তাবের আওতায় ওয়াশিংটন ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল করলে তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে এগিয়ে আসবে এবং একটি চূড়ান্ত সমঝোতার পথে আলোচনা শুরু হতে পারে।

জাতিসংঘের সমাবেশে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই মাথা নত করবে না। তার এই বক্তব্য দেশের ভেতরের কট্টরপন্থীদের কাছে বেশ সমাদৃত হয়েছে—যদিও তাদেরই কেউ কেউ এই সফরের বিরোধিতা করেছিলেন, কারণ যুদ্ধকালীন নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ইরানের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলছে।

বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে পেজেশকিয়ান পশ্চিমা সাংবাদিক ও থিংক-ট্যাংক বিশ্লেষকদের সঙ্গে বসে তার সরকারের চিন্তাধারা তুলে ধরেন। ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই সকালের পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের এই দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত; সেদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকায় তাঁর মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছিল।

অতীতের দশকগুলোতেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইরানের অংশগ্রহণ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। তবে যুদ্ধের ঘনঘটার মধ্যে এবারের সফরটিই হয়ে উঠেছে প্রধান আলোচনার বিষয়। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় মহলের মনোযোগের কথা মাথায় রেখেই তেহরানের কর্মকর্তারা অত্যন্ত কৌশলী পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সফরটি আয়োজন করেছিলেন।

ইরানের কট্টরপন্থীরা শুরুতে ওয়াশিংটনের প্রতি পেজেশকিয়ান ও আরাগচির কূটনৈতিক উদ্যোগের সমালোচনা করেছিল। যারা তাদের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ চালাচ্ছে, সেই দেশে সফর করার সিদ্ধান্তকে তারা ‘আত্মসমর্পণ’ হিসেবেই দেখেছিল। বিশেষ করে, উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করার কারণে আরাগচি ইরানের রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কোনোভাবেই হঠকারিতার বিষয় নয়, গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ এমনটাই লিখেছেন কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা ইব্রাহিম রেজাই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে শত্রুপক্ষের প্রতিনিধির সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো, তার ব্যাখ্যা তাঁকে অবশ্যই দিতে হবে।

তবে রাজনৈতিকভাবে ভুল পদক্ষেপের বড় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, ইরানি কর্মকর্তারা এমন এক সফরের আয়োজন করেছিলেন যা দেশের ভেতরে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছিল; এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুনরায় উন্মুক্ত হয়, বিশ্ববাসীর কাছে টিকে থাকার বার্তা পৌঁছায় এবং আমেরিকান জনগণের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা সম্ভব হয়।

পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের মঞ্চ থেকে ইরানের দাবিগুলো তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন দেশের সমকক্ষ নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রে; তিনি যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন নিউ ইয়র্কের রাস্তায় তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয় এবং জাতিসংঘের অধিবেশনে উপস্থিত প্রতিনিধিরা প্রতিবাদস্বরূপ সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান।

সূত্র: সিএনএন

বোমা হামলা থেকে জাতিসংঘে, কূটনীতির নতুন অধ্যায়ে ইরান
ছবি: সংগৃহীত।

নামাজে দুই সিজদার মধ্যবর্তী দোয়া

নামাজ একটি পরিপূর্ণ ইবাদত। এতে প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ও প্রতিটি বাক্যাবলি গভীর অর্থবহ। রুকু, সিজদা, কিয়াম—সবকিছুর মাঝে আল্লাহর প্রতি বিনয় ও আত্মসমর্পণের ভাষা রয়েছে। এর মধ্যে দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকে পড়া দোয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (স.) তা নিয়মিত পড়তেন এবং সাহাবিদেরও শিক্ষা দিতেন।

দোয়া (উচ্চারণ ও অর্থ)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগ্‌ফিরলী, ওয়ারহামনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়ারযুকনী, ওয়ারফা‘নী

অর্থ: হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমাকে দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার দুর্বলতা পূরণ করুন, আমাকে রিজিক দিন এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন।

হাদিসের উৎস: সহিহ ইবন খুজাইমাহ, হাদিস: ৬৯৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৮৫০; সহিহ ইবনে হিব্বান। ইমাম নাসাঈ ও আলবানি (রহ.) হাদিসটি সহিহ বলেছেন।

দোয়াটি কেন পড়তে হয়?

১. ক্ষমা প্রার্থনা: দোয়ার প্রথম শব্দই “আল্লাহুম্মাগফিরলি”—অর্থাৎ, হে আল্লাহ, ক্ষমা করুন। কারণ সিজদা হলো বিনয়ের চরম স্তর, আর ক্ষমা প্রার্থনা সেই বিনয়ের পূর্ণতা।

২. রহমত প্রার্থনা: মুমিনের জীবনে আল্লাহর দয়া ছাড়া কোনো অগ্রগতি নেই। তাই ক্ষমার পরপরই রহমত চাওয়া হয়েছে।

৩. হেদায়েত: নামাজের প্রতিটি রুকনে আল্লাহর দিকেই ফিরে যাওয়া—এ কারণেই দোয়ার অংশ: “ওয়াহদিনী”—আমাকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।

৪. ভেঙে যাওয়া মন: “ওয়াজবুরনী”—এটি একটি হৃদয়ছোঁয়া শব্দ। অর্থ: আমার ভাঙা দিকগুলো পূরণ করুন।

কারো মানসিক কষ্ট, ভাঙা মন, দারিদ্র্য, আঘাত—এসবই আল্লাহ পূরণ করেন।

৫. রিজিক: নামাজ শুধু আধ্যাত্মিক বিষয় নয়; তা দুনিয়াবি কল্যাণও বয়ে আনে। তাই দোয়া: “ওয়ারযুকনী”—হালাল রিজিক দিন।

৬. মর্যাদা: “ওয়ারফা‘নী”—আমাকে উঁচু করুন। দুনিয়া ও আখেরাত—উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যমে সম্মান বৃদ্ধির জন্য এ আবেদন।

দোয়াটির গুরুত্ব

রাসুল (স.) শুধু নিজে দোয়া পড়তেন না; তিনি বলেন, “নামাজে দুই সিজদার মধ্যে তোমরা এই শব্দগুলো পড়ো।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৮৯৮)

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুল (স.) এই দোয়াটি নিয়মিত পড়তেন এবং আমাদেরও শিক্ষা দিতেন।

দুই সিজদার মধ্যবর্তী বৈঠকের বিধান


ফিকহের চার মাজহাবের বিধান:

১. বৈঠকটি ওয়াজিব (হানাফি মতে)।

২. শরীর স্থির করে কায়দার মতো বসা সুন্নাহ।

৩. দোয়া করা সুন্নাহ মুয়াক্কাদাহ (জোরালো সুন্নাহ)।

৪. যদি কেউ দোয়াটি না পড়ে, নামাজ হয়—কিন্তু সুন্নাহ বঞ্চিত হয়।

দোয়ার মাধ্যমে মুমিনের জীবনে যে পরিবর্তন আসে

১. মন শান্ত হয় এবং একাগ্রতা বৃদ্ধি পায়।

২. আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয়।

৩. রিজিক, হেদায়েত ও রহমতের দরজা খুলে যায়।

৪. নামাজের গুণগত মান উন্নত হয়।

৫. আত্মিক ভরসা শক্তিশালী হয়।

৬. দোয়ার প্রতিটি শব্দ নিজের জীবনে প্রয়োগ করার সুযোগ তৈরি হয়।

নামাজ শুধু কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়; এটি আল্লাহ ও বান্দার হৃদয়সংলগ্ন সম্পর্ক। দুই সিজদার মধ্যবর্তী দোয়া সেই সম্পর্কের গভীরতম প্রকাশ। এতে বান্দা নিজের দুর্বলতা, চাহিদা, আশা, অনুরোধ—সবকিছু আল্লাহর কাছে পেশ করে। যে ব্যক্তি এই দোয়াটি বুঝে, অনুভব করে এবং নিয়মিত পড়ে, তার নামাজ আরও পরিপূর্ণ হয় এবং তার দুনিয়া-আখেরাত উভয় জীবনে বরকত নেমে আসে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-29%2Fksdr0rm0%2Fpexels-michael-burrows-7129239.jpg?rect=0%2C0%2C6000%2C4000&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ছবি: পেক্সেলস