Thursday, August 27, 2026
ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি তাদেরই দেশ
এর মাধ্যমে মূলত তিনি একটি সতর্কবাণী দিয়েছিলেন। কিন্তু এই সতর্কবার্তা ব্রিটেন শহর সম্পর্কে জানার চেয়ে বরং এই উক্তিটির পেছনের রাজনীতিকেই বের করে আনে।
মুসলিমদের দৃশ্যমানতা ও ‘ইসলামীকরণ’ বিতর্ক
ব্রিটেন একটি বৈচিত্র্যময় গণতন্ত্র, যেখানে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ছয় শতাংশ। রাজনীতি, সংস্কৃতি, পেশাগত ক্ষেত্র এবং জনজীবনে তাদের ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমানতা হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসতি স্থাপন, নাগরিকত্ব এবং অংশগ্রহণের এক স্বাভাবিক পরিণতি।
কিন্তু মুসলিম-বিরোধী আতঙ্কের রাজনীতিতে, দৃশ্যমানতাকে আধিপত্য, বৈচিত্র্যকে ‘ইসলামীকরণ’ এবং অংশগ্রহণকে অনুপ্রবেশ হিসেবে নতুন রূপ দেওয়া হয়। এর অন্তর্নিহিত প্রস্তাবনাটি বেশ অদ্ভুত: যখন একটি গণতন্ত্রে মুসলমানরা যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন গণতন্ত্র নিজেই কোনোভাবে মুসলিম হয়ে যায়।
ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাছাই করা আতঙ্ক
এই বাছাই প্রক্রিয়াটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ব্রিটেনে সম্প্রতি ঋষি সুনাকের মতো একজন প্র্যাক্টিসিং হিন্দু প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, নেতানিয়াহু এবং তার আদর্শগত মিত্ররা তখন ব্রিটেনের মধ্যে কেনো ‘হিন্দুকরণ’ আঁচ করতে পারেননি। এমনকি ওয়েস্টমিনস্টার যে একটি হিন্দু প্রজাতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সতর্কবার্তা ছিল না।
সুনাকের স্থলাভিষিক্ত হন কিয়ার স্টারমার, যার স্ত্রী ইহুদি এবং সন্তানরা ইহুদি ঐতিহ্য অনুসারে বেড়ে উঠেছে। এবারও ‘ব্রিটেনের ইহুদিকরণ’ নিয়ে কোনো কথা হয়নি, কিংবা টেমস নদীর তীরে একটি ইহুদি প্রজাতন্ত্র গড়ে ওঠার কোনো জল্পনাও শোনা যায়নি।
ব্রিটেনের বর্তমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, যিনি একজন ক্যাথলিক। এখন পর্যন্ত, ‘ব্রিটেনের ক্যাথলিকীকরণ’ দৃশ্যত নেতানিয়াহুরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।
জাতিগত বৈচিত্র্য
কিন্তু মুসলিমরা রাজনীতি বা পেশাগত ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হলেই তাকে ‘ইসলামীকরণ’ বা ‘অনুপ্রবেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়। মুসলিম মেয়র, এমপি, ডাক্তার, আইনজীবী এবং ভোটাররা কেবল অংশগ্রহণের প্রমাণ নয়, বরং ‘ইসলামীকরণের’ প্রমাণ হয়ে ওঠে। তাদের দৃশ্যমানতা হয়ে দাঁড়ায় জনসংখ্যাতাত্ত্বিক হুমকি; তাদের রাজনৈতিক প্রভাব হয়ে ওঠে অনুপ্রবেশ।
মনে হচ্ছে, ধর্মীয় বহুত্ববাদ বহুত্ববাদই থেকে যায়—যতক্ষণ না সেই ধর্মটি ইসলাম হয়।
ব্রিটেনে মুসলিমদের বাস্তব অবস্থান
বাস্তবতা ততটা চাঞ্চল্যকর নয়। ব্রিটেনে প্রায় চল্লিশ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু মাত্র। সেখানে কোনো উল্লেখযোগ্য আন্দোলন নেই যা একটি ইসলামিক রাষ্ট্র বা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ব্রিটিশ রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং আইন সম্পূর্ণ ব্রিটিশই রয়েছে; সংসদ কোনো শুরা কাউন্সিল দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়নি এবং ব্রিটিশ আইনও ইসলামিক আইন দ্বারা উচ্ছেদ করা হয়নি।
পরিবর্তনটি মূলত দৃশ্যমানতার ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী ইংল্যান্ডে প্রায় ১৩,০০০ মুসলিম ডাক্তার কর্মরত ছিলেন, যা মোট চিকিৎসকদের প্রায় ১০% (জনসংখ্যার অনুপাতের প্রায় দ্বিগুণ)। তারা নির্বাচনে ভোট দেন এবং তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা ইংরেজিকে প্রথম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে ব্রিটেনকেই তাদের নিজের বাড়ি মনে করে।
এটিকে ইসলামী দখলের প্রমাণ হিসেবে চিত্রিত করা মানে নাগরিকত্বকে বিজয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা—এবং এই বিভ্রান্তির একটি ইতিহাস রয়েছে।
ইউরোপের ইতিহাসে ইসলামের দীর্ঘ উপস্থিতি
ইউরোপের ইতিহাসে ইসলাম কোনো নতুন বিষয় নয়। সহস্রাধিক বছর ধরে যুদ্ধ, বাণিজ্য, পাণ্ডিত্য, অভিবাসন, কূটনীতি এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে।
আল-আন্দালুসে বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। খ্রিস্টান ইউরোপের রাজনৈতিক কল্পনায় আরব ও অটোমানরা বারবার আবির্ভূত হয়েছিল। পোয়াতিয়ে থেকে ভিয়েনা পর্যন্ত, এই মুসলিম ‘অন্য’ সত্তাটি ইউরোপকে তার আত্মপরিচয় নির্ধারণে সহায়তা করেছিল।
সুতরাং ইসলাম কখনোই ইউরোপীয় ইতিহাসের বাইরে ছিল না। এটি ছিল সেই শক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম, যার বিরুদ্ধে এবং যার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরোপ নিজেকে গড়ে তুলেছিল।
যুদ্ধোত্তর অভিবাসন ও ইউরোপ পুনর্গঠন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেই সম্পর্কটি মৌলিকভাবে বদলে যায়। বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনকারী ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের উপনিবেশ ও সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে শ্রমিক নিয়ে আসে। ব্রিটেন দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য স্থান থেকে অভিবাসী গ্রহণ করে; ফ্রান্স উত্তর আফ্রিকা থেকে; এবং অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজস্ব ঔপনিবেশিক প্রভাবাধীন অঞ্চল বা শ্রম সংগ্রহের এলাকা থেকে শ্রমিক নেয়।
এইসব পুরুষ ও মহিলা কারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা, হাসপাতাল এবং সরকারি পরিষেবাগুলিতে কাজ করতেন। তাঁরা প্রায়শই সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও ইউরোপ পুনর্গঠনে সহায়তা করেছিলেন।
কিন্তু সেটাও গল্পের শুরু ছিল না।
যুদ্ধ, আত্মত্যাগ ও ব্রিটিশ ইতিহাসে মুসলিমদের ভূমিকা
যুদ্ধোত্তর অভিবাসন ব্রিটেনকে বদলে দেওয়ার অনেক আগেই, মুসলমানরা ব্রিটিশ ও মিত্রশক্তির পাশাপাশি বিপুল সংখ্যায় যুদ্ধ করেছিল এবং প্রাণ দিয়েছিল। সংসদে উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাদের অবদান ছিল কমপক্ষে ২৫ লক্ষ সৈন্য ও শ্রমিক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৫৫ লক্ষ, এবং ধারণা করা হয় যে এই দুই সংঘাত জুড়ে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ যুদ্ধে নিহত হয়েছিল।
মুসলিম সৈন্যরা ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের পরিখায়, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এবং সুদূর প্রাচ্যের যুদ্ধাভিযানে লড়াই করেছিল। শুধুমাত্র প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই ব্রিটিশ ভারত থেকে চার লক্ষেরও বেশি মুসলিম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।
তাদের এই আত্মত্যাগ এমন এক সমসাময়িক রাজনীতির পাশে বেমানান মনে হয়, যা খুব সহজেই মুসলমানদের নবাগত, বহিরাগত অথবা এমন এক জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে যাদের অন্তর্ভুক্তির প্রমাণ ক্রমাগত দিতে হয়। মুসলমানরা ব্রিটিশ ইতিহাসে নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত কোনো ভিনগ্রহী সত্তা নয়। তারা এর যুদ্ধগুলোতে লড়তে, এর স্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং এর ইতিহাস গঠনে সাহায্য করেছে।
অভিবাসী থেকে নাগরিক
তারা থিতু হলেন। তাদের সন্তান জন্মালো, তারপর নাতি-নাতনি। সেই ‘অভিবাসী’ নাগরিক হয়ে উঠলেন।
এই রূপান্তরটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আজকের অধিকাংশ কথাবার্তাই আগমনের পরিভাষায় আটকে আছে, যেন মুসলিম পটভূমির লক্ষ লক্ষ ইউরোপীয় এইমাত্র একটি নৌকা থেকে নেমেছেন এবং যেকোনো মুহূর্তে তাদের অন্য কোথাও ফিরে যেতে প্ররোচিত করা যেতে পারে।
কিন্তু চতুর্থ প্রজন্মের একজন লন্ডনবাসী ঠিক কোথায় “ফিরে” যাবে? ব্রিটেনই তো তার বাড়ি। এটাই সেই বাস্তবতা, যার সঙ্গে চিরস্থায়ী পরদেশীত্বের রাজনীতি লড়াই করতে হিমশিম খায়।
আধুনিক ব্রিটেন ও বহুত্ববাদ
আধুনিক ব্রিটেন কোনো অপরিবর্তনীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নয়, যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে অবিকৃতভাবে চলে আসে। এটি এমন একটি সমাজ যা এর অধিবাসীরাই ক্রমাগত রূপদান করে। খ্রিস্টান, ইহুদি, মুসলিম, হিন্দু, শিখ, ধর্মনিরপেক্ষ এবং অধার্মিকদের জীবনযাত্রা এখন একই জাতীয় পরিসরে একে অপরের সাথে মিশে গেছে।
আর একীকরণ মানে কখনোই এই নয় যে সংখ্যালঘুরা অপরিবর্তিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সংস্কৃতির সাথে কেবল বিলীন হয়ে যাবে। এটি উভয় দিকেই কাজ করে।
নাগরিকত্ব, পরিচয় ও অন্তর্ভুক্তি
এই কারণেই “ইসলামিক রিপাবলিক অফ ব্রিটেন” কথাটি শুধু উপহাসের চেয়েও বেশি কিছু দাবি করে। এর অযৌক্তিকতার আড়ালে নাগরিকত্বের এক গভীর বর্জনমূলক ধারণা নিহিত রয়েছে: যে কিছু নাগরিক স্বাভাবিকভাবেই জাতির অন্তর্ভুক্ত, আর অন্যরা স্থায়ী অতিথি হয়ে থাকে, যাদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতার জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয়।
একজন মুসলমান আপাতদৃষ্টিতে ব্রিটিশ হতে পারেন—যদি তার ব্রিটিশ পরিচয় যথেষ্ট পরিমাণে অস্পষ্ট থাকে।
কিন্তু নাগরিকত্ব এভাবে কাজ করে না। সংসদে একজন ব্রিটিশ মুসলিম নির্বাচিত হওয়াটা এই প্রমাণ দেয় না যে মুসলিমরা ব্রিটেন দখল করে নিয়েছে। বরং এটি প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ মুসলিমরা ভোট দেয় এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
জাতীয় স্বাস্থ্য সেবায় একজন মুসলিম ডাক্তার থাকা ইসলামীকরণের প্রমাণ নয়। গির্জা, সিনাগগ বা মন্দিরের পাশে একটি মসজিদ থাকাও বিজয়ের প্রমাণ নয়।
কোনো মুসলিম পরিবার, যাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানি পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, সোমালিয়া বা মরক্কো থেকে এসেছিলেন, তারা তাদের জাতীয় উত্তরাধিকারের পাশাপাশি একটি ধর্মীয় উত্তরাধিকার ধরে রাখার কারণে কম ব্রিটিশ হয়ে যান না।
আধুনিক ব্রিটেন
বহুত্ববাদ মানে ব্রিটেনের বিলুপ্তি নয়। এটিই সমসাময়িক ব্রিটেন – এবং মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক উপস্থিতিকেও সেইভাবেই বোঝা উচিত। বিভিন্ন সম্প্রদায় যখন প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। গণতান্ত্রিক সমাজজুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ক্ষেত্রে এই একই প্রক্রিয়া বারবার ঘটেছে।
সূত্র:মিডল ইস্ট আই
![]() |
| ছবি: সংগৃহীত। |
Monday, August 24, 2026
সামরিক দিক থেকে তুরস্ক এত শক্তিশালী হলো কীভাবে
২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী, তুরস্কের সক্রিয় সেনাসদস্য প্রায় ৪ লাখ ৮১ হাজার। এর সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার রিজার্ভ সেনা এবং দেড় লাখের মতো আধাসামরিক সদস্য রয়েছে। সব মিলিয়ে এই সংখ্যা ১০ লাখের বেশি।
স্থলবাহিনী তুরস্কের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দেশটির কাছে প্রায় ২ হাজার ২৮৪টি ট্যাংক এবং প্রায় ৯৮ হাজার বিভিন্ন ধরনের সামরিক যান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে এক হাজারের বেশি স্বচালিত কামান, ৬৩৫টি টানা কামান এবং ২৩৭টি রকেট লঞ্চার।
আকাশপথেও তুরস্কের শক্তি বড়। দেশটির সামরিক বহরে প্রায় ১ হাজার ১০১টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ২০১টি যুদ্ধবিমান, ৮৪টি পরিবহন বিমান, ৩০১টি প্রশিক্ষণ বিমান এবং ৫০৯টি হেলিকপ্টার রয়েছে। তুরস্কের যুদ্ধবিমান বহরের মূল শক্তি এখনো এফ-১৬। পাশাপাশি নিজেদের তৈরি কেএএএন যুদ্ধবিমানও উন্নয়ন করছে দেশটি।
তবে তুরস্কের সামরিক শক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ড্রোন। দেশটির বায়কার কোম্পানির তৈরি বায়রাকতার টিবি-২ বিশ্বের পরিচিত সামরিক ড্রোনগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। তুরস্ক এখন বিভিন্ন দেশে এসব ড্রোন রপ্তানিও করছে। ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যা ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
নৌবাহিনীতেও তুরস্কের বড় উপস্থিতি রয়েছে। দেশটির নৌবহরে প্রায় ১৯২টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ফ্রিগেট, ৯টি করভেট এবং ১৪টি সাবমেরিন। কৃষ্ণসাগর, এজিয়ান সাগর ও ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের নৌবাহিনী সক্রিয়। বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালির নিয়ন্ত্রণও দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
তুরস্ক এখন নিজের অস্ত্র নিজেই তৈরির দিকে এগোচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে বর্তমানে ৪ হাজার ৫০০টির বেশি কোম্পানি কাজ করছে এবং প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। দুই দশক আগে যেখানে স্থানীয়ভাবে তৈরি সামরিক সরঞ্জামের অংশ ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, এখন তা ৮৫ শতাংশের বেশি বলে তুরস্কের সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
তুরস্কের সামরিক শক্তির পেছনে ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থান করার পাশাপাশি দেশটির সীমান্ত রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, জর্জিয়া ও বুলগেরিয়ার সঙ্গে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, বলকান ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তুরস্কের সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা। তুরস্ক বহু বছর ধরে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে এবং সিরিয়া ও ইরাকের উত্তরাঞ্চলেও সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। ন্যাটোর সদস্য হিসেবে যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও সামরিক প্রযুক্তির সুবিধাও পাচ্ছে দেশটি।
তবে শুধু ট্যাংক, বিমান বা যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা দিয়ে কোনো দেশের সামরিক শক্তি পুরোপুরি বোঝা যায় না। এসব অস্ত্রের কতগুলো কার্যকর, আধুনিক যুদ্ধে কতটা সক্ষম এবং বিভিন্ন বাহিনী কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ওয়াইনেট নিউজ
![]() |
| ছবি: এপি |
ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দিলে প্রতিবেশীদের শত্রু গণ্য করবে ইরান, ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলার ভাবনা
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই গতকাল শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি দেন।
আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, ‘আমরা সব প্রতিবেশী দেশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার জন্য বলছি। অন্যথায়, আমরা তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করব।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানবিরোধী অর্থনৈতিক হুমকি ক্রমাগত বাড়তে থাকার মুখে রেজাই এ মন্তব্য করলেন।
দুই দেশের মধ্যে চলমান শত্রুতার অংশ হিসেবে গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তাঁর সরকার ইরানের বিরুদ্ধে এযাবৎকালের ‘সবচেয়ে বিধ্বংসী অর্থনৈতিক অভিযান’ শুরু করতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। ওই দিন এ দুই মিত্রদেশ যৌথভাবে তেহরানের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় হামলা চালায়।
চলতি সপ্তাহে ইরানের অর্থনীতিকে বিপদে ফেলার হুমকির পাশাপাশি ট্রাম্প এক নতুন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইরানকে যেকোনো ধরনের ‘লাইফলাইন’ বা সহায়তা দেওয়া দেশগুলোকে ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’র শিকার হওয়ার হুমকি দেন তিনি।
এর পরের দিনই ট্রাম্পের সঙ্গে সুর মেলান মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। অন্য দেশগুলোর উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল, ‘আপনারা হয় আমাদের সঙ্গে আছেন, না হয় আমাদের বিরুদ্ধে।’
গতকাল দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজাই ইরানের আঞ্চলিক কৌশলকে তিন পর্যায়ের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন। এ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানো।
রেজাই বলেন, ‘প্রথমত আমরা আলোচনা করব। তারপর সুন্দর ভাষায় তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করব। কারণ, আমরা আসলে যুদ্ধ ছড়াতে চাই না। এরপরও যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়া বজায় রাখবে, তাদের পুনর্বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দেব। তবে তৃতীয় পর্যায়ে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ না করলেও রেজাই মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রকৃতপক্ষে ইরানের সমাজব্যবস্থাকে অর্থনৈতিক চাপের মুখে ভেঙে ফেলার বাজি ধরেছে। এর উদ্দেশ্য, (ইরানিদের) বিক্ষোভের মুখে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটানো।
একটি বিশেষ যুদ্ধবিমানের প্রসঙ্গ টেনে রেজাই বলেন, ‘তারা আশা করছে যে অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে আমাদের ঐক্য ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলে একদল বিক্ষোভকারী রাস্তায় নামবে। এতে তারা প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের কাজটাই সহজ করে দেবে।’
গত ১৭ জুনের একটি সমঝোতা স্মারক ব্যর্থ হওয়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোয় যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে। ওই সমঝোতায় ‘অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের’ আহ্বান জানানো হয়েছিল।
বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান দ্রুত এ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে তেল, সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ আগে রপ্তানির জন্য এ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে শুরু করে।
কিন্তু রেজাই সতর্ক করে দিয়েছেন, আঞ্চলিক দেশগুলো যদি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধের পরিকল্পনায় অংশ নেয়, তবে পারস্য উপসাগরের বাইরের বিকল্প তেল পরিবহন পথগুলোও লক্ষ্যবস্তু করবে ইরান।
এদিকে মার্কিন এ নতুন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘভুক্ত সদস্যদেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এ নীতিকে ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলে গতকাল মন্তব্য করেছে তারা।
তেহরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বাড়ানোর কথা ভাবছে বলে জানা গেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের অভিযানকে সমর্থন দেওয়া ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের ওপরও আঘাত হানতে পারে ইরান।
![]() |
| ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাই সম্প্রতি দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া |
Sunday, August 23, 2026
ইউরোপের ‘ফাঁপা নিন্দায়’ শক্তিশালী হচ্ছে ইসরাইল
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিনকাস বলেন, ইসরাইল সরকারের কাছে এসব নিন্দা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং এর প্রভাব উল্টো। ইউরোপীয় দেশগুলোর এমন সমালোচনা ইসরাইল সরকারকে তাদের পুরোনো একটি যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়।
পিনকাস বলেন, এসব নিন্দার পর ইসরাইল সরকার বলতে পারে, ‘পুরো বিশ্ব আমাদের বিরুদ্ধে। সবাই ইহুদিবিদ্বেষী। ইসরাইলবিরোধী একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সবাই আমাদের ঘৃণা করে।’
ইসরাইলের এই সাবেক কূটনীতিকের মন্তব্যের আগে বৃহস্পতিবার ইউরোপের কয়েকটি দেশ ও কানাডা একটি যৌথ বিবৃতি দেয়। এতে ইসরাইলের ‘ই ওয়ান’ বসতি প্রকল্পের সমালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে এর সম্ভাব্য ‘আইনি ও সুনামগত পরিণতি’ সম্পর্কে সতর্ক করা হয়।
‘ই ওয়ান’ প্রকল্পটি পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ প্রকল্প নিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরোধ দীর্ঘদিনের।
পিনকাস ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্কে ইসরাইলের কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর সংসদ বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে শুধু বক্তব্য ও নিন্দা জানানো হলে তাতে ইসরায়েল সরকারের ওপর কোনো বাস্তব চাপ তৈরি হয় না।
তিনি বলেন, যতক্ষণ এসব পদক্ষেপ শুধু বক্তব্য এবং ‘ফাঁপা নিন্দার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, ততক্ষণ ইসরাইল সরকার তা নিয়ে চিন্তিত নয়।
পিনকাসের বক্তব্যে মূলত ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাম্প্রতিক সমালোচনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তার মতে, শুধু নিন্দা বা সতর্কবার্তা না দিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এসব সমালোচনা ইসরাইলের নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না। বরং এসব নিন্দাকে ইসরাইল সরকার নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক বক্তব্য তৈরিতে ব্যবহার করতে পারে।
![]() |
| ছবি: আল-জাজিরা |
কসোভোয় গণকবরের সন্ধান, মিলল ২৩ জনের দেহাবশেষ
স্থানীয় সময় বুধবার এক যৌথ বিবৃতিতে দেশটির প্রসিকিউটর, পুলিশ ও ফরেনসিক কর্মকর্তারা জানান, ফরেনসিক মেডিসিন ইনস্টিটিউটের দলগুলো অন্তত ২৩ ব্যক্তির কঙ্কালসদৃশ দেহাবশেষ উদ্ধার করেছে। তবে ফরেনসিক পরীক্ষা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরই তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কসোভো যুদ্ধে স্বাধীনতাকামী জাতিগত আলবেনীয় বিদ্রোহীদের সঙ্গে সার্বীয় বাহিনীর সংঘর্ষে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ নিহত এবং ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন। পরবর্তী কয়েক দশকে বিভিন্ন গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেলেও এখনও প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষের কোনো সন্ধান মেলেনি।
দেশটির উত্তরাঞ্চলের জুবিন পোটোক এলাকায় দুই সপ্তাহ আগে খননকাজ শুরু হয়। নিখোঁজ জাতিগত আলবেনীয়দের সন্ধানে চালানো এ অভিযানে পাওয়া দেহাবশেষগুলো ১৯৯৯ সালের বসন্তে মিত্রোভিৎসা শহর থেকে অপহরণ করে হত্যা করা ২৩ আলবেনীয়ের বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কসোভোর ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী আলবিন কুর্তি খননকাজ চলাকালে এ দাবি করেন। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চূড়ান্ত পরিচয় নিশ্চিত করতে সব দেহাবশেষ ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
এ ঘটনায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে স্থানীয় তিন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে বেসামরিক জনগণের ওপর যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের সন্দেহে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউটররা।
সূত্র: আল জাজিরা
![]() |
| গণকবরের স্থানে পুলিশের সতর্ক অবস্থান। ছবি: এএফপি |
Thursday, August 20, 2026
ইউরোপের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাতের ছক ইরানের
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। একই সময়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনীকে স্থান বা সামরিক সুবিধা দিলে সেসব দেশকে ওয়াশিংটনের যুদ্ধসঙ্গী বিবেচনা করে পাল্টা আঘাত হানা হবে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার নীতিগত সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখছে তেহরান। বিশেষ করে বুলগেরিয়ার বেজমের বিমান ঘাঁটি (যা মার্কিন ড্রোন ও রিফুয়েলিংয়ে ব্যবহৃত হয়) এবং সাইপ্রাসের সামরিক স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তেহরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ইউরোপের বোঝা উচিত তাদের ভূখণ্ডেও ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে পারে। আমাদের জাতীয় অবকাঠামো ধ্বংস করা হলে এই যুদ্ধ আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এছাড়া সংঘাত চরম আকার ধারণ করলে হরমুজ প্রণালির তলদেশের মূল সাবসি ফাইবার-অপটিক কেবল কেটে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) দাবি করেছে, তাদের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। যদিও এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ইরানের সঙ্গে যাবতীয় বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে দেশটি। যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই অভিযোগকে মিথ্যা ও উসকানিমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অন্যদিকে জেনারেল আলী আবদুল্লাহি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, স্বাগতিক দেশের অনুমতি ছাড়া মার্কিন বিমান বা রিফুয়েলিং ট্যাংকার ঘাঁটিতে অবস্থান নেওয়া অসম্ভব। সুতরাং আক্রামণকারী মার্কিন বাহিনীকে যে কোনো সহায়তা প্রদান করা সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।
দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধ নিয়ে তেহরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি অন্ধ আবেগে চালিত হয়ে বিশ্ব পরাশক্তির সঙ্গে যুদ্ধ চালানোর পরিণাম নিয়ে সতর্ক করেছেন। বিপরীতে স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া এক নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন।
এরই মাঝে নেটদুনিয়ায় ট্রাম্প ও তেহরানের মধ্যে এক অদ্ভুত মানচিত্র যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অঞ্চল দাবি করলে জবাবে ইরান মার্কিন অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়াকে (যেখানে তেহরানজেলেস খ্যাত বিপুলসংখ্যক ইরানি থাকেন) নীল রঙে চিহ্নিত করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নতুন ভূখণ্ড ঘোষণা করে ব্যঙ্গাত্মক বার্তা দিয়েছে। ৬০ দিনের শান্তি চুক্তি ব্যর্থ হওয়ায় এই পরিস্থিতি এখন এক সর্বাত্মক বৈশ্বিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।
![]() |
| ইউরোপের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাতের ছক ইরানের |
ইউরোপে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছে ইরান
এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা কার্যত ভেঙে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, বর্তমানে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কোনো আলোচনা চলছে না এবং নতুন করে আলোচনা শুরুরও কোনো পরিকল্পনা নেই। এদিকে বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের ‘বাণিজ্য, বাণিজ্যিক বিনিময় ও আর্থিক লেনদেন’ স্থগিত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এখন হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি খোলা রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে। কিন্তু বাস্তবে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো খুবই কম।
চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলরত একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। ইরানের এক সামরিক মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে ফক্স নিউজ জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজগুলোর হালে ‘কয়েকটি সুন্দর গর্ত’ দেখা যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানে সহযোগিতা না করার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের বিরুদ্ধেও কঠোর ভাষা ব্যবহার করছেন ট্রাম্প। ওমানকে তার মধ্যপ্রাচ্য নীতির পথে বাধা সৃষ্টি না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও সিএনবিসি

Wednesday, August 19, 2026
ইউরোপের প্রতি ১০ জনের ৯ জনই বিদেশে থাকতে চায়, কেন?
ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের ২ হাজার মানুষের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। প্রতিটি দেশ থেকে ৫০০ জন করে এতে অংশ নেন।
জরিপে দেখা গেছে, প্রতিটি দেশের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা কোনোভাবেই বিদেশে গিয়ে বসবাস করতে চান না।
বিদেশে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন ব্রিটেনের ৫৩ শতাংশ, ফ্রান্সের ৪৮ শতাংশ, জার্মানির ৪৩ শতাংশ এবং ইতালির ৩২ শতাংশ মানুষ।
সব দেশের উত্তরদাতাদের পছন্দ এক না হলেও স্পেন সামগ্রিকভাবে সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে।
যুক্তরাজ্যের ২৪ শতাংশ এবং ইতালির ২০ শতাংশ মানুষ স্পেনকে ভবিষ্যতের পছন্দের দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফ্রান্সের ক্ষেত্রেও স্পেন দ্বিতীয় পছন্দের দেশ।
ফরাসিদের কাছে অবশ্য সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য কানাডা। ১৭ শতাংশ ফরাসি উত্তরদাতা কানাডায় বসবাসের আগ্রহ জানিয়েছেন। এরপর ১৪ শতাংশের পছন্দ ইতালি।
জার্মানদের পছন্দ তুলনামূলকভাবে কাছের দেশ। ১৭ শতাংশ জার্মান অস্ট্রিয়াকে পছন্দের গন্তব্য বলেছেন। স্পেন ও সুইজারল্যান্ডকে বেছে নিয়েছেন ১২ শতাংশ করে।
অন্যদিকে ব্রিটিশদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে দূরের দেশও। ১৯ শতাংশ অস্ট্রেলিয়া, ১৫ শতাংশ কানাডা এবং ১০ শতাংশ নিউজিল্যান্ডে বসবাসের আগ্রহ জানিয়েছেন।
বিদেশে বসবাসের ক্ষেত্রে নতুন একটি প্রবণতার কথাও উঠে এসেছে জরিপে। এক দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের বদলে কয়েকটি দেশে ভাগ করে সময় কাটানোর প্রবণতা বাড়ছে।
ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ হলি রুবেনস্টাইনের মতে, নতুন ধরনের প্রবাসী জীবন হবে আরও নমনীয়। কেউ হয়তো ছয় মাস এক দেশে থেকে দূরবর্তীভাবে কাজ করবেন, এরপর অন্য দেশে গিয়ে নতুন জীবনযাপন পরীক্ষা করে দেখবেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কাজ, বন্ধুত্ব ও ব্যক্তিগত পরিচয় আর একটি নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে আবদ্ধ থাকবে না।
সূত্র: ইউরোনিউজ
![]() |
| ফ্রান্সের প্যারিস। ছবি: ইউরোনিউজ থেকে নেওয়া |
Tuesday, August 18, 2026
ইরান ও ইউক্রেন যেভাবে সমুদ্রপথে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করছে by ওমর আশুর
সাম্প্রতিক সময়ের হামলা ও পাল্টা হামলা এই বাস্তবতা তৈরি করেনি, বরং এটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ওয়াশিংটন হয়তো এখন স্থলভাগে সেনা অভিযান, ইরানের বিদ্যুৎ-জ্বালানির মতো জরুরি অবকাঠামোতে হামলা, কিংবা ইসফাহান প্রদেশের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর গভীরে লুকিয়ে থাকা পরমাণু কেন্দ্রে আঘাত হেনে সংঘাত বাড়াতে পারে।
এসব পদক্ষেপে ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হবে এবং যুদ্ধও ছড়াবে, সন্দেহ নেই। তবে এতে সমুদ্রজুড়ে ছড়িয়ে রাখা ইরানের নৌ প্রতিরক্ষাব্যূহ ধসে পড়বে না, কিংবা প্রণালি হিসেবে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্বও কমবে না।
গত মাসেই তেহরানে দেখা গেছে এই যুদ্ধের এক রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবন। সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কেবল শোক পালনের অনুষ্ঠান ছিল না; ভয়াবহ হামলা, শীর্ষ নেতৃত্ব হারানো আর বোমাবর্ষণের পর ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ধারাবাহিকতা কতখানি বজায় রাখতে পেরেছে, এটি ছিল তারই এক শক্তি প্রদর্শন।
এই টিকে থাকার শক্তি কেবল সমুদ্র তৈরি করেনি, তবে সমুদ্র সেই শক্তিকে ধরে রাখতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
নিজের আকাশসীমা সুরক্ষিত না থাকা সত্ত্বেও ইরান পশ্চিমাদের ভারী আক্রমণ হজম করতে পেরেছে একটি বড় কারণে—সমুদ্রে তাদের একটি জবরদস্তিমূলক দর-কষাকষির ক্ষমতা ছিল। আকাশে চালানো প্রতিটি হামলার একটি বিশাল মূল্য দিতে হবে ওয়াশিংটন, উপসাগরীয় রাজধানী, বিমা কোম্পানি ও বিশ্ব জ্বালানির বাজারকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশাসন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে বিষের পেয়ালায় চুমুক দিতে বাধ্য করতে পারেনি—যেমনটা একসময় রুহুল্লাহ খোমেনি করেছিলেন।
দেখা গেল, ট্রাম্প নিজেই নিজের তৈরি করা ফাঁদে পড়েছেন। ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা শতভাগ ধ্বংস করা হয়েছে’—নিজের এই অসত্য দাবির পর একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি পিছু হটেছেন। ইরানের সঙ্গে ১৪ দফার যে মধ্যবর্তী চুক্তি হলো, তা কিন্তু ওয়াশিংটনের কাছে তেহরানের আত্মসমর্পণ নয়; বরং এটি ছিল সমুদ্রের এক কঠিন বাস্তবতার কূটনৈতিক রূপান্তর।
একে হয়তো চিরাচরিত অর্থে কোনো ‘জয়’ বলা যাবে না। তবে এটি ছিল ওয়াশিংটনের যুদ্ধচেষ্টাকে কৌশলগতভাবে নস্যাৎ করে দিয়ে নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর এক নিখুঁত উদাহরণ।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানশক্তি ইরানের বিমানবাহিনীকে ধ্বংস করতে পেরেছে, অবকাঠামোর ক্ষতি করেছে, শীর্ষ সামরিক কর্তাদের হত্যা করেছে। কিন্তু সরকার পতন, ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করা কিংবা পুরোপুরি সামরিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো উদ্দেশ্যগুলো অর্জিত হয়নি।
ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘অরতেশ’-এর পদাতিক শক্তিতে বিন্দুমাত্র ফাটল ধরেনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ইরান তাদের সামরিক কাঠামোর যে অংশকে সুরক্ষিত আকাশের ওপর নির্ভর না করে তৈরি করেছিল—অর্থাৎ তাদের উপকূলীয় নৌ, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনব্যবস্থা—তা তার সামরিক কার্যকারিতা ও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার ক্ষমতা, দুটোই অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
ইতিহাসের শিক্ষা
অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যে কতটা বিপজ্জনক, ইতিহাস তা বহুবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে হ্যানয়ে এক মার্কিন কর্নেল হ্যারি জি সামারস জুনিয়র তাঁর উত্তর ভিয়েতনামি প্রতিপক্ষকে বলেছিলেন, ‘তোমরা কিন্তু আমাদের যুদ্ধের ময়দানে কখনোই হারাতে পারোনি।’
উত্তর ভিয়েতনামের কর্নেল টু এর উত্তর দিয়েছিলেন খুব সংক্ষেপে, ‘কথাটা সত্যি হতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিকতাহীন।’
২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধের যেকোনো মূল্যায়নে কথোপকথনটি বড় এক শিক্ষা হয়ে ওঠার কথা। এ কথার পেছনের যুক্তি খুব সহজ, আকাশপথে আপনি কতটা একচ্ছত্র আধিপত্য দেখাচ্ছেন, তা দিয়ে যুদ্ধ জয় নিশ্চিত হয় না, যদি না আপনি শত্রুর কৌশলগত অবস্থান ও তার মানসিক শক্তিতে ফাটল ধরাতে পারেন।
একই কথা সমুদ্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ১৯৮০-এর দশকের ট্যাংকার যুদ্ধের কথা ধরা যাক। সাত বছরের রক্তক্ষয়ী ইরাক-ইরান যুদ্ধে ইরান যখন এমনিতেই ক্লান্ত, ঠিক তখন আমেরিকা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে একাধিক অভিযানের মাধ্যমে—আর্নেস্ট উইল, প্রাইম চ্যান্স, নিম্বল আর্চার এবং সর্বশেষ প্রেয়িং ম্যান্টিস।
১৯৮৮ সালের এপ্রিলে এক দিনের অভিযানে মার্কিন বাহিনী মূল ইরানি নৌসম্পদ ও তেল প্ল্যাটফর্মের কমান্ড পোস্টগুলো ধ্বংস করে এক বিরাট জয় পেয়েছিল। কিন্তু সেই জয় এসেছিল এক অভিজ্ঞতাশূন্য, ক্লান্ত ইরানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ এসকর্ট, মাইন অপসারণ ও আক্রমণের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল।
সেগুলো ছিল শাসনক্ষমতা বদলানোর মতো বড় উদ্দেশ্যের তুলনায় অনেকটাই সীমিত এবং এক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরিচালিত মিশন।
কিন্তু আজকের পরিস্থিতি মার্কিন বাহিনীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরান তাদের নৌশক্তিকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। একদিকে নিয়মিত নৌবাহিনী ‘নেদাজা’, যারা গভীর সমুদ্রে নিজেদের অবস্থান জাহির করতে চায়; অন্যদিকে আইআরজিসির নৌবাহিনী ‘নেদসা’, যারা পারস্য উপসাগরকে এক কঠিন ও অনিশ্চিত রণক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
নেদাজা মূলত একটি প্রথাগত ও মর্যাদার নৌবাহিনী। কিন্তু নেদসা হলো এমন এক ব্যবস্থা, যা শত্রু প্রতিরোধ, হয়রানি, ধোঁয়াশা ও কৌশলগত কার্যকারিতার জন্য তৈরি।
প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ের মতো ভৌগোলিক অবস্থানও এক নিরপেক্ষ ব্যাপার। এটা বন্ধু বা শত্রু, যে কারোর কাজেই লাগতে পারে। কিন্তু কৌশল, কাজের পদ্ধতি, যুদ্ধ উপকরণের অভিযোজন এবং কমান্ড কালচার দিয়ে সেই ভূগোলকে কতটা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটাই মূল বিষয়। ইরান এ শিক্ষা আকাশের চেয়ে সমুদ্রেই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে।
এগুলো কোনো বিমানবাহী রণতরি নয়। এগুলো হলো সমুদ্রে বসানো একেকটি অদম্য দুর্গ এবং অনিশ্চয়তা তৈরির কারখানা।
সমুদ্রের দাবার চাল
ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে কীভাবে সমুদ্রের লড়াই স্থলযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া হাতছাড়া হওয়ার পর ইউক্রেন তাদের নৌসম্পদের বড় অংশ হারায়, আর ২০২২ সালের মধ্যে তাদের প্রথাগত কোনো নৌবাহিনীই অবশিষ্ট ছিল না।
তা সত্ত্বেও ইউক্রেন উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ মিসাইল, বিশেষ অভিযান, ড্রোন বোট এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভর করে কৃষ্ণসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশকে রাশিয়ার জন্য এক নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত করে।
এর ফলাফল শুধু কৌশলগত নয়, ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউক্রেন রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে তাদের সেভাসতোপোল ঘাঁটি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এতে রাশিয়ার অবাধ নৌ চলাচল বন্ধ হয়েছে এবং ইউক্রেন ওদেসা বন্দর দিয়ে নিজেদের পণ্য রপ্তানি পথ আবার চালু করতে পেরেছে।
মূলত সাগরে সম্পূর্ণ আধিপত্য না থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন রাশিয়ার বড় বড় উদ্দেশ্য—যেমন ইউক্রেনকে অবরুদ্ধ করা, ওদেসায় চাপ সৃষ্টি করা এবং ক্রিমিয়াকে সুরক্ষিত রাখা—ব্যর্থ করে দিতে পেরেছে।
ইরানের উপসাগরীয় রণকৌশলও ঠিক আমেরিকার বিরুদ্ধে এই একই ব্যবস্থার এক রূপ। তেহরানের উদ্দেশ্য মার্কিন নৌবাহিনীকে সম্মুখযুদ্ধে হারানো নয়। তারা এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বিশাল শক্তিশালী নৌবাহিনী নিয়ে এসেও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগতভাবে হেরে যেতে পারে।
এ থেকে শিক্ষা স্পষ্ট, দুর্বল শক্তির জন্য সমুদ্রকে অবরুদ্ধ করা কেবল এক বিকল্প পথ নয়, এটিই এখন যুদ্ধ জয়ের বড় অস্ত্র। কৃষ্ণসাগরে এই কৌশল ব্যবহার করে ইউক্রেন যেমন এক পরাশক্তিকে রুখে দিয়েছে, ঠিক তেমনি উপসাগরে ইরানও কোনো বড় নৌযুদ্ধ না জিতেই ওয়াশিংটনের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
অবশ্য ইউক্রেন ও ইরানের ঘটনা হুবহু এক নয়। ইউক্রেন সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে এবং বাণিজ্যপথ সচল রাখতে এসব ব্যবহার করেছে। আর ইরান তা ব্যবহার করেছে চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে—বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে, বিমা মাশুল বাড়াতে এবং ওয়াশিংটনকে মনে করিয়ে দিতে যে বিমান হামলার একটা বড় আর্থিক মূল্য সমুদ্রেই চোকাতে হবে।
ইরানের এই পথ কোনো প্রথাগত নৌসংগ্রাম নয়; এটি হলো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে নৌ অবরোধের এক চতুর মিশ্রণ।
পরিস্থিতি তাই এক বড় বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ইরান হয়তো আকাশে অনেক লড়াইয়ে হেরেছে, কিন্তু সমুদ্রের কারণে তাদের কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা কমেনি। যুক্তরাষ্ট্র আকাশে একচ্ছত্র আধিপত্য দেখালেও সমুদ্রকে অপ্রাসঙ্গিক করতে পারেনি।
ইউক্রেন বিশ্বকে দেখিয়েছে, নৌবহর না নিয়েও একটি বিশাল নৌবাহিনীকে ঠেকিয়ে দেওয়া যায়। আর ইরান দেখিয়ে দিল, একটি বড় নৌযুদ্ধ না জিতেও কীভাবে এক পরাশক্তির মূল উদ্দেশ্যগুলোকে সমুদ্রের জলে ডুবিয়ে দেওয়া যায়।
* ড. ওমর আশুর, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।
![]() |
| হরমুজ প্রণালিতে ইরানি নৌযানের টহল। ফাইল ছবি: এএফপি |
Monday, August 3, 2026
সমুদ্রে ভেসে থেকে কীভাবে ৪০ ঘণ্টা বেঁচে ফিরলেন রাফি?
স্পেনের বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে যাচ্ছিল একটি পরিবারের নৌকা। তারা তাকে দেখে প্রথমে তাকে টেনে তোলে। পরে স্পেনের সামুদ্রিক উদ্ধারকারী জাহাজ এসে তাকে মালাগার বন্দরে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে পুলিশ ও রেডক্রসের কাছে হস্তান্তর করে। এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দেয়, ইউরোপ সীমান্ত বন্ধ করতে থাকায় অভিবাসীরা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, শুধু গত বছরই কমপক্ষে ৫৭২ জন মানুষ উত্তর আফ্রিকা থেকে স্পেনে পৌঁছাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে। রাফি নাদি জানান, ১৭ জুলাই ২০২৫ রাতে মরক্কোর ফনিদেক উপকূল থেকে তিনি ও তার ১৭ বছর বয়সী এক বন্ধু সমুদ্রপথে সেউতা পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। পরিকল্পনা ছিল ৫-৬ ঘণ্টায় সেউতায় পৌঁছে যাবেন। কিন্তু ভোরে সূর্য ওঠার পরও তারা গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর আগে রাফি নাদি চারবার সেউতার সীমান্ত প্রাচীর টপকাতে ব্যর্থ হন। তাই তারা বিকল্প পরিকল্পনা করেন- অল্প টাকায় ভাসমান রিং, ফ্লিপার আর ডাইভিং স্যুট কিনে নেন। দু’জনেই ভালো সাঁতার জানতেন। তাই পাচারকারীদের ৩-৪ হাজার ইউরো দেয়ার সামর্থ্য না থাকায় এই পথই তাদের কাছে ভরসা মনে হয়।
রাত ১২টার দিকে সেনাদের চোখ এড়িয়ে তারা পানিতে নামে। বলেন, আমরা সাঁতার কাটলাম, কাটলাম আর কাটলাম। কিন্তু পূর্বাভাসে শান্ত সমুদ্রের কথা বলা হলেও সেদিন ঢেউ খুব উঁচু ছিল। সকালে টানা আট ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর ঢেউয়ের তোড়ে তার বন্ধুর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। রাফি নাদি বলেন, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। তখন চারপাশে শুধু পানি আর পানি। মৃত্যুভয়ে কাঁপছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো কোনো বোট আমাকে টেনে তুলবে। আমি আল্লাহকে ডাকছিলাম, যেন মায়ের কষ্ট না বাড়ে। অন্তত পাঁচটি জাহাজের কাছে সাহায্য চাইতে চেষ্টা করেন তিনি। বলেন, আমি হাত নেড়ে, চিৎকার করে বলেছি- ‘হেল্প, হেল্প’। একটি জাহাজ এতটাই কাছে এসেছিল যে লোকজন স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিল। কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি। জীবনের লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি শুধু ভেসে থাকার শক্তি জোগাড় করতে। দুই রাত আরও একটি দিন কেটে যাওয়ার পর দূরে একটি বোট দেখতে পান। তিনি মরিয়া হয়ে হাত নাড়তে থাকেন। অবশেষে নৌকার মানুষরা দূরবীন দিয়ে তাকে দেখে দড়ি ছুড়ে দেয়। রাফি আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, আমি দড়িটা আঁকড়ে ধরি। তারা আমাকে ওপরে তোলে, খাবার, পানি ও পোশাক দেয়।
উদ্ধার মুহূর্তটি ভিডিওতে ধরা পড়ে। স্পেনের বেনালমাদেনা উপকূল থেকে প্রায় ১৩ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে, অর্থাৎ শুরুর স্থান থেকে প্রায় ১০০ কিমি দূরে তাকে পাওয়া যায়। রাফি নাদি বলেন, যদি ওই বোট আমাকে না তুলত, আমি হয়তো আর বাঁচতে পারতাম না। আরও খুশির খবর পান পরে- তার বন্ধু মালাগার কাছাকাছি সমুদ্রতটে নিরাপদে উদ্ধার হয়েছে। রাফি বলেন, আমি তার কণ্ঠ শুনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি।
দুই সপ্তাহ রেডক্রস শিবিরে থাকার পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। কারণ স্পেন ও মিশরের মধ্যে ফেরত পাঠানোর কোনো চুক্তি নেই। আন্তর্জাতিক আইনে তিনি আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন, যদিও মিশরীয় নাগরিক হিসেবে তার সুযোগ খুবই কম। এখন তার চিন্তা নতুন জীবনের। বলেন, ভাবছিলাম স্পেনে এসে সাথে সাথেই কাজ শুরু করব। কিন্তু আসলে কাগজপত্র ছাড়া এখানে খুব কঠিন। কোনো কাজ পেলেই করতে চাই।
সমুদ্রে ভেসে থাকার সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতা এখনো তাকে তাড়া করে। বলেন, প্রতিবার ভিডিওটা দেখি, আমি বাঁচতে পেরেছি ভেবে আনন্দ পাই। কিন্তু আমি চাই না আর কেউ আমার মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাক।

Sunday, August 2, 2026
অভিবাসীদের ঢল যেভাবে স্পেন-ইসরায়েল সম্পর্ককে আরও তিক্ত করল
গত বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এই অভূতপূর্ব ঢলে হাজার হাজার মানুষ সমুদ্রপথে সাঁতরে বা ছোট নৌকায় করে সিউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। অনেকে সীমান্ত ফটকে এত বেশি সংখ্যায় জড়ো হন যে, নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সামাল দিতে হিমশিম খায়। কেউ কেউ সীমান্তের বাঁধ ও কাঁটাতারের বেড়া টপকে ঢোকারও চেষ্টা করেন। এ সময় সিউতায় পৌঁছাতে গিয়ে অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষ কেন একই সময়ে সিউতায় ঢোকার চেষ্টা করলেন, এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। ঘটনাটি যে নিছক কাকতালীয় নয়, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রায় ঐকমত্য রয়েছে। তাহলে কি এটি আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল? যদি হয়ে থাকে, তবে কারা এর পেছনে এবং উদ্দেশ্যই বা কী? এ নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
সিউতা কোথায়, কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সিউতা উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর, যার এক পাশে মরক্কো। মেলিলার সঙ্গে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আফ্রিকার মধ্যে থাকা মাত্র দুটি স্থলসীমান্তের একটি।
১৪১৫ সালে প্রথম পর্তুগালের দখলে যায় সিউতা। পরে ১৫৮০ সালে এটি স্পেনের অংশে পরিণত হয়। ১৬৪০ সালে পর্তুগাল স্বাধীন হলেও সিউতা স্পেনের অধীনেই থেকে যায়। আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পরও সিউতা ও মেলিলা ইউরোপীয় শক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ দুটি ভূখণ্ড।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বহু বছর ধরেই এটি ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। শহরটি উঁচু সীমান্তবেষ্টনী, নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্পেনের সিভিল গার্ড ও জাতীয় পুলিশের স্থায়ী উপস্থিতির মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখা হয়।
হঠাৎ অভিবাসীদের এত বড় ঢলের কারণ কী?
স্পেনের কর্মকর্তারা বলছেন, গত জুলাইয়ে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের পরই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ওই রায়ে বলা হয়, সমুদ্রপথে স্পেনে পৌঁছানো অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। তবে স্থলপথে সীমান্ত অতিক্রমকারীদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়।
কিন্তু অনেক বিশ্লেষক এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাদের মতে, আদালতের ওই রায়ের খবর এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর জানার কথা নয়।
উত্তর আফ্রিকায় অভিবাসন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ স্প্যানিশ সাংবাদিক ইগনাসিও সেমব্রেরো এএফপিকে বলেন, সন্দেহ নেই, ৮ জুলাইয়ের রায়টি কিছুটা ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এত বড় মাত্রার মানুষের সমাবেশ ব্যাখ্যা করার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের অভিযোগ, মানব পাচারকারী চক্রগুলো আদালতের রায়কে অতিরঞ্জিত করে হাজার হাজার মানুষকে সিউতায় ঢোকার জন্য উৎসাহিত করেছে।
তবে আরেকটি আলোচিত ব্যাখ্যা হলো মরক্কো নিজেই হয়তো এই সীমান্ত ভাঙার ঘটনাকে নীরবে উৎসাহ দিয়েছে। মরক্কো কখনো সিউতা ও মেলিলার ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেনি। তাদের দাবি, এগুলো মরক্কোর ভূখণ্ড এবং এখনো স্পেনের দখলে রয়েছে।
এ ছাড়া পশ্চিম সাহারা নিয়েও স্পেন ও মরক্কোর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। ১৯৭৫ সালে মরক্কো পশ্চিম সাহারা দখল করে নেয়। কিন্তু পলিসারিও ফ্রন্ট ওই অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
২০২১ সালের এপ্রিলে স্পেন মানবিক কারণে পলিসারিও ফ্রন্টের নেতা ব্রাহিম ঘালিকে কভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অনুমতি দেয়। এতে মরক্কো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। কারণ, ঘালিকে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের নেতা ও অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করে।
এর জেরে মরক্কো মাদ্রিদ থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ২০২১ সালের মে মাসে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। সে সময় প্রায় ১০ হাজার অভিবাসী সিউতায় ঢুকে পড়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল স্পেনের ওপর মরক্কোর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির একটি কৌশল।
পরে ২০২২ সালে দুই দেশের সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়। পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে প্রায় চার দশকের অবস্থান পরিবর্তন করে স্পেন মরক্কোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থন জানায়। অনেকের ধারণা, সিউতা ও মেলিলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকিকেই কূটনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করেছিল মরক্কো।
তবে সম্প্রতি সম্পর্ক আবারও টানাপোড়েনে পড়ে। কারণ, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আলজেরিয়া সফর করেন। আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে পলিসারিও ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান সমর্থক এবং মরক্কোর দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী।
এ কারণে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, সিউতায় সাম্প্রতিক ঘটনাও হয়তো স্পেনকে নতুন করে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা।
এর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক কোথায়?
কিছু বিশ্লেষকের মতে, যদি মরক্কো সত্যিই এই পরিস্থিতি তৈরিতে ভূমিকা রেখে থাকে, তাহলে তারা হয়তো একা নয়। কারণ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে এমন আরও কয়েকজন নেতার নামও আলোচনায় এসেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ইউরোপের মধ্যে পেদ্রো সানচেজকে সবচেয়ে প্রকাশ্য ফিলিস্তিনপন্থী নেতাদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি একাধিকবার বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান গণহত্যার শামিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান নিয়েও তিনি কড়া সমালোচনা করেছেন।
শুধু তাই নয়, স্পেনের যৌথভাবে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন সামরিক স্থাপনাগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে ব্যবহার করারও অনুমতি দেননি তিনি।
অন্যদিকে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ে স্পেনের অবস্থানের সমালোচনা করে আসছেন।
মরক্কো-ইসরায়েল সম্পর্ক
স্পেনের তুলনায় মরক্কোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক অনেক উষ্ণ। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী একটি জাহাজ, যাতে ইসরায়েলের জন্য অস্ত্র বহন করা হচ্ছিল, সেটিকে স্পেনের আলহেসিরাস বন্দরে ভিড়তে দেয়নি মাদ্রিদ। পরে জাহাজটি মরক্কোর বন্দরে যায়।
একই বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রার পথে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ স্পেনে প্রবেশের অনুমতি না পেয়ে মরক্কোর তানজিয়ার বন্দরে জ্বালানি ও রসদ সংগ্রহ করে।
ইসরায়েলের অনেক রাজনীতিকই মনে করেন, স্পেন একদিকে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেয়, অন্যদিকে নিজেই আরব ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে।
২০১৯ সালে নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহু সামাজিকমাধ্যমে সিউতা ও মেলিলার মানচিত্র প্রকাশ করে লিখেছিলেন, প্রিয় আরব ও মুসলিমরা, দখলকৃত আরব-ইসলামী ভূমি মুক্ত করতে চাইলে এখান থেকেই শুরু করুন।
চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক মিডল ইস্ট ফোরামে প্রকাশিত এক নিবন্ধে গবেষক মাইকেল রুবিন লিখেছিলেন, মরক্কোর উচিত সীমান্তে বুলডোজার নিয়ে গিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সিউতা ও মেলিলা পুনর্দখলের উদ্যোগ নেওয়া।
এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট নিউজে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মরক্কোর বিশ্লেষক আমিন আইয়ুবও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র-স্পেন সম্পর্কে টানাপোড়েন মরক্কোর জন্য সিউতা ও মেলিলা প্রশ্নে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং এ ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের মাধ্যমে ইসরায়েল কূটনৈতিকভাবে রাবাতকে সমর্থন দিতে পারে।
শুক্রবার, যখন হাজার হাজার অভিবাসীর ঢলে সিউতা কার্যত অচল, তখন জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি মন্তব্য করেন, যা নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
তিনি লেখেন, স্পেন কখনো ইসরায়েলকে উপদেশ দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করে না। অথচ এখন সিউতায় নিজেদের অভিবাসন নীতির কারণে তাদের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়েছে। অন্যদের শিক্ষা দেওয়ার আগে স্পেনের উচিত বিশ্বের কাছে ব্যাখ্যা করা তারা এখনো কেন আফ্রিকায় উপনিবেশ ধরে রেখেছে।
ড্যাননের এই মন্তব্যের জবাবে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে বলেন, আচ্ছা, এখন অনেক কিছুই যেন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে।
তার এই মন্তব্যকে অনেকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি হয়তো মনে করছেন, সিউতার সাম্প্রতিক ঘটনার পেছনে ইসরায়েলেরও কোনো না কোনো ভূমিকা থাকতে পারে।
মরক্কোয় ইসরায়েলপন্থি অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মরক্কোয় ইসরায়েলপন্থি মনোভাব দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দেশটির কূটনৈতিক সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
সম্প্রতি মরক্কো পশ্চিম সাহারার একটি ১ হাজার ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়কের নাম যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে রাখার ঘোষণা দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি অস্বাভাবিক নয়। কারণ, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর একটি ছিল মরক্কো। ওই চুক্তির মাধ্যমে দেশটি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।
এর বিনিময়ে পশ্চিম সাহারা প্রশ্নে জাতিসংঘ এবং দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে মরক্কোকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ফলে অঞ্চলটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে রাবাত।
প্রমাণ নেই, তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে
সিউতায় অভিবাসীদের ঢল সংগঠিত করতে মরক্কো ইসরায়েলের হয়ে কাজ করেছে এমন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। তবে একের পর এক কাকতালীয় ঘটনা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আলজাজিরার বিশ্লেষণ বলছে, ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ না থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট সিউতার সাম্প্রতিক সংকট স্পেনের বামপন্থি প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং ইসরায়েলের ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের মধ্যকার আগেই তিক্ত হয়ে ওঠা সম্পর্ককে আরও শীতল করে তুলেছে।
সূত্র : আল জাজিরা
![]() |
| স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।। ছবি : সংগৃহীত |
Wednesday, July 29, 2026
পিএইচডি শেষে স্ত্রীকে নিয়ে নুডলসের দোকান, দৈনিক আয় ১২০০ ডলার
এতে বলা হয়, গত মে মাস থেকে এই দম্পতি বেলজিয়ামের স্থানীয় বাজারগুলোতে মশলাদার মটরশুঁটির নুডলস বিক্রি করা শুরু করেন। এটি ওয়াংয়ের নিজ শহর চংকিংয়ের একটি সুস্বাদু খাবার। স্থানীয়দের রুচি অনুযায়ী ওয়াং নুডলসের ঝাল কিছুটা কমিয়ে দিয়েছেন। ওয়াং জিমু নিউজকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই খাবারটি খেয়ে বড় হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে তার নিজের একটি দোকান খোলার স্বপ্ন ছিল।
তাদের দোকানে খাবারের জন্য কয়েকটি চেয়ার রাখা আছে। রান্নার প্রয়োজনীয় উপকরণ আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখায়, প্রতিটি বাটি তৈরি করতে মাত্র কয়েক মিনিট লাগে। ডিং জানান, তারা সপ্তাহে দু’দিন দোকান চালান এবং নুডলসের ধরন অনুযায়ী প্রতি বাটি ৮ থেকে ১১ ডলার বিক্রি করেন। সবচেয়ে ব্যস্ত দিনে তাদের আয় অন্যান্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি হয়। এর পাশাপাশি অন্য কাজও করেন স্বামী ডিং। ওয়াং বলেন, দোকান চালানো গবেষণার মতোই, এটি কেবল আমাদের পরিবারকে সাহায্য করার একটি উপায়।
এই দম্পতির দোকানের ভিডিওগুলো চীনের সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং তাদের অনুসারীর সংখ্যা ৭৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বয়স্কা ক্রেতা চপস্টিক ব্যবহারে কষ্ট করছেন। তবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যত চীনা নুডলস খেয়েছি, এটি তার মধ্যে সেরা। একজন নিয়মিত ক্রেতা বলেন, আমি জানতাম না যে, মটরশুঁটি এত সুস্বাদু হতে পারে। এই দম্পতির গল্প অনলাইনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। একজন অনলাইন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, তারা দারুণ উদ্যোক্তা- যারা চীনা স্ট্রিট ফুড বিদেশে নিয়ে গেছেন এবং তা থেকে অর্থ উপার্জন করছেন। আরেকজন লিখেছেন, চীনের অসংখ্য অসাধারণ খাবার রয়েছে, যা বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নেয়া উচিত।

Friday, July 24, 2026
ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করল রাশিয়া
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে লাভরভ রুবিওকে জানান, কিয়েভ সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রায় আধাঘণ্টার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে ভালো ও খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ করেননি তিনি।
ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদের মাধ্যমে অস্ত্র বিক্রি করে এবং এ নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
গত বছর চালু হওয়া একটি কর্মসূচির আওতায় ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা সামরিক সরঞ্জাম ইউক্রেনকে সরবরাহ করতে পারে।
রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন এখনো যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তার ভাষায়, আমরা শান্তিচুক্তি চাই। আমরা চাই যুদ্ধের অবসান হোক। তবে এমন একটি সমাধান প্রয়োজন, যাতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই সম্মত হতে পারে। এজন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে।
অন্যদিকে, রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে লাভরভ বলেন, ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানে মস্কো এখনো প্রস্তুত রয়েছে।
বৈঠকের কিছুক্ষণ আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, স্থবির হয়ে পড়া শান্তি প্রচেষ্টা পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে এসব হামলা যুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হতে পারে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার অগ্রযাত্রা কিছুটা ধীর করতে সক্ষম হয়েছে এবং একই সঙ্গে রুশ ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কমে যাওয়ার সুযোগে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও জোরদার করেছে রাশিয়া।
বৃহস্পতিবার রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে তিনজন নিহত হন। একই দিনে রাশিয়া ও রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়ায় ইউক্রেনের হামলায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় আসে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইরানবিরোধী হামলার নিন্দা জানিয়েছে মস্কো।
![]() |
| বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার আলোচকবৃন্দ। ছবি : সংগৃহীত |
Thursday, July 16, 2026
ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা যেভাবে পাল্টে দিল তুরস্ককে
ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান
তুর্কি সরকারের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসলামপন্থি ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনের নেটওয়ার্ক এই অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিল। তবে ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত গুলেন এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ওই ঘটনার পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল।
এই সময়ে তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শুদ্ধি অভিযান চালানো হয়। গুলেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে হাজার হাজার সেনাসদস্য, বিচারক, পুলিশ, শিক্ষাবিদ ও সরকারি কর্মচারীকে গ্রেফতার বা বরখাস্ত করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় শত শত স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়।
তবে সমালোচকদের দাবি, গুলেনপন্থিদের দমনের নামে এই অভিযান মূলত ভিন্নমত স্তব্ধ করতে ব্যবহার করা হয়েছে।
এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। ২০১৭ সালের গণভোটে সামান্য ব্যবধানে সংবিধানে বড় পরিবর্তন আনা হয়। এর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে শক্তিশালী নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।
সমর্থকদের মতে, এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করেছে।
তবে ফ্রিডম হাউজের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, এতে আইনপ্রণেতাদের ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে এবং রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন।
ইস্তানবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক দোগান চেতিনকায়া বলেন, নতুন এই প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা মূলত খামখেয়ালিপনা ও অস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দ্বারা চিহ্নিত।
শুদ্ধি অভিযানের পর তুরস্কের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। হাজার হাজার বিচারক-প্রসিকিউটরকে অপসারণ করায় বিচার বিভাগ স্বায়ত্তশাসন হারিয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৬ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ১৬৩তম। সম্প্রতি প্রেসিডেন্টকে অপমানের অভিযোগে একজন জনপ্রিয় কমেডিয়ানও গ্রেফতার হয়েছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ২০২৫ সালের মার্চে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ২০২৬ সালের মে মাসে আদালতের আদেশে প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-এর নেতৃত্বেও হস্তক্ষেপ করা হয়, যাকে বিরোধীরা ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
তবে সরকারের দাবি, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতেই এই পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে।
রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের অবসান
তুর্কি রাজনীতিতে এই ঘটনার অন্যতম বড় ইতিবাচক পরিবর্তন হলো সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে দৃঢ়ভাবে সরকারের অধীনে আনা হয়েছে। মিলিটারি একাডেমি ও হাসপাতালগুলো পুনর্গঠন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক তুর্কি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জনগণ সক্রিয়ভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করেছে, যা রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অভিভাবকত্বের যুগের অবসান ঘটিয়েছে।
নিরাপত্তাকেন্দ্রিক বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতি
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে উত্তর সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট ও কুর্দি গোষ্ঠী ওয়াইপিজি-র বিরুদ্ধে তিনটি বড় সামরিক অভিযান চালায় আঙ্কারা।
একই সঙ্গে নেটের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আঙ্কারার বিরোধ তৈরি হয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়। তবে সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, ২০১৮ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তুরস্কের আলোচনা কার্যত স্থগিত রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
![]() |
| অভ্যুত্থানচেষ্টাটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল, কিন্তু এর পরিণতি গত এক দশকে তুর্কি রাজনীতিকে পুনর্গঠন করেছে। ছবি: বিবিসি |
Tuesday, July 14, 2026
বিশ্বকাপ ২০২৬: ইউরোপে মুসলিম ফুটবলারদের পরিচয়ই নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ফলে ১৩টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইসলামি বিশ্বাসের প্রকাশ অস্বাভাবিক নয়। তবে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এমন অনেক ফুটবলার, যারা খ্রিস্টান-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
স্পেন ও বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোলের পর সিজদাহ দিয়ে উদযাপন করেন। এর আগেও মার্চে স্পেন-মিশর প্রীতি ম্যাচে তার ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে দর্শকদের একটি অংশ বিদ্বেষমূলক স্লোগান দেয়। জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়ামাল লিখেছিলেন, আমি মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ। ফুটবল মানুষের বিনোদন ও আনন্দের জন্য, কারও বিশ্বাসকে অসম্মান করার জন্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বেড়েছে। অথচ ইয়ামালের মতো ফুটবলারদের উপস্থিতি সেই ধারণার বিপরীত বাস্তবতাই তুলে ধরছে।
জার্মানির ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগারও ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশের কারণে বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালে রমজান উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাওহিদের প্রতীক হিসেবে তর্জনী উঁচিয়ে ছবি পোস্ট করার পর সেটিকে উগ্রবাদী সংগঠনের প্রতীক বলে দাবি করা হয়। পরে তিনি মানহানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেন।
একইভাবে, তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করে সিজদাহ দিয়ে উদযাপন করেন সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারি। তিউনিসিয়ান বংশোদ্ভূত হলেও সুইডেনের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশটিতে নতুন করে পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তবে আয়ারির বাবা আজুজ আয়ারি স্পষ্টভাবে জানান, তার সন্তানরা সুইডেনেই জন্মেছে ও বেড়ে উঠেছে, তাই সুইডেনের প্রতিনিধিত্ব করাই তাদের স্বাভাবিক অধিকার।
ইউরোপে শুধু অভিবাসী পরিবার থেকেই নয়, ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারের সংখ্যাও বাড়ছে। নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ক্লারেন্স সিডর্ফ, ফরাসি বংশোদ্ভূত ফ্রেডেরিক কানুতে এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী পল পগবার পর এবার ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জেড স্পেন্সও ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলার হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অভিষেকের মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের প্রথম মুসলিম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন। স্পেন্স বলেন, ইতিহাসের অংশ হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি এটি বিশ্বের তরুণদের অনুপ্রাণিত করবে।
অন্যদিকে, কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ দলে ইউরোপে বেড়ে ওঠা তিন ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারও বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন। জ্যামিরো মন্টেইরো, লোগান কস্তা ও স্টিভেন মোরেইরা পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের ভাষ্য, মুসলিম সতীর্থদের জীবনযাপন ও ধর্মীয় অনুশীলন কাছ থেকে দেখেই তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন।
কেপ ভার্দে দলে ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হয়। মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য নিয়মিত হালাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয় এবং দলটির মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও ঐক্য বজায় রাখা হয়। লোগান কস্তার ভাষায়, আমরা মুসলিম হই বা খ্রিস্টান, আমাদের শক্তি হলো আমরা সবাই কেপ ভার্দিয়ান।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপে মুসলিম ফুটবলারদের এই উপস্থিতি ও আত্মবিশ্বাসী পরিচয় প্রকাশ শুধু ক্রীড়াঙ্গনের নয়, ইউরোপের বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে চলমান বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সূত্র: মিডলইস্ট আই

Sunday, July 12, 2026
হরমুজে ফি দিতে সম্মত হচ্ছে ইউরোপ
ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করা হলে তা বিপর্যয়কর হবে। তবে ব্রিটিশ সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী মনে করেন, মালাক্কা প্রণালি ও ইংলিশ চ্যানেলের মতো আন্তর্জাতিক জলপথে যেভাবে নির্দিষ্ট নৌ-সেবা বাবদ অর্থ নেওয়া হয়, একই ধরনের ব্যবস্থা হরমুজেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এই পথ ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে—এমন একটি প্রকাশ্য ঘোষণা দিতে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে এ বিষয়ে সমঝোতা ও তা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। যদিও ইরান বলছে, হরমুজ প্রণালি-সংক্রান্ত নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে দেশটির নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তী চুক্তি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে স্থায়ীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ তুলে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন।
অন্যদিকে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর তার ছেলে ও নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে বলেন, তার বাবার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এটিই জাতির ইচ্ছা।
হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমান ইতোমধ্যে মালাক্কা প্রণালির সহযোগিতামূলক মডেলের আদলে একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে। ব্রিটিশ আইন বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রস্তুত ওই পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করতে ওমান তাদের আইন বিশেষজ্ঞদের তেহরানে পাঠাতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হরমুজ প্রণালি ও নৌ-নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য ওমান সফর করবেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও আশা প্রকাশ করেছেন, এ বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে দ্রুত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
তবে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল মার্কিন ডলারে বিক্রির ক্ষেত্রে যে ছাড় দিয়েছিল, তা প্রত্যাহার করেছে।
হরমুজ প্রণালির অধিকাংশ নৌপথ ওমানের নিয়ন্ত্রণে। দেশটি বাধ্যতামূলক টোলের বিরোধিতা করছে। কাতারও বলেছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন উপেক্ষা করে ইরানকে প্রণালির ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি অংশ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন মেনে চলার বিষয়ে অনাগ্রহী, অন্য অংশ সহযোগিতার পক্ষে। ফলে এ বিষয়ে তেহরানের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য রয়েছে।
লন্ডনে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) কাউন্সিল বৈঠকে ওমানের প্রতিনিধি খামিস বিন মোহাম্মদ আল শামাখি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধ নৌ-চলাচলের অধিকার নিশ্চিত এবং সেখানে বাধ্যতামূলক ট্রানজিট ফি আরোপের সুযোগ নেই। তবে নৌ-নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় স্বেচ্ছাভিত্তিক নৌ-সহায়তা সেবা চালুর বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
এদিকে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ও ইউরোপীয় রাষ্ট্র আইএমওতে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করলেও রাশিয়া ও চীন তা সমর্থন করেনি। রাশিয়ার মতে, প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণ উপেক্ষা করেছে। চীনের ভাষ্য, এটি একপেশে এবং আইএমওর এখতিয়ারের বাইরে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে মূল বিতর্ক দুটি বিষয়কে ঘিরে। একটি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি চালু হওয়ার পর এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অন্যটি দীর্ঘমেয়াদে প্রণালির প্রশাসনিক কাঠামো কী হবে এবং মালাক্কা প্রণালির মডেল ইরানের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়া বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এর অর্থ এই নয় যে, ইরানের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মে মাসের শুরু থেকে তাদের বাহিনী ৮০০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এবং প্রায় ৩৮ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করেছে, সমঝোতা অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব তারা পালন করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বিদেশি বাহিনীর কোনো ভূমিকা থাকার সুযোগ নেই।

Saturday, July 11, 2026
হরমুজ প্রণালিতে নৌ-ফি চালুর প্রস্তাব বিবেচনা করছে ইউরোপ
এমন এক সময়ে এই প্রস্তাবের কথা সামনে এলো যখন মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ইরান যেন জনসমক্ষে একটি বিবৃতি দিয়ে জানায় যে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর আর কোনো হামলা চালানো হবে না। মার্কিন কর্মকর্তারা তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং তা মেনে চলার ক্ষেত্রে মূল বাধা হিসেবে দায়ী করেছেন। ডনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে শেষ বলে মনে করছেন, তবে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে। এর কয়েক ঘণ্টা পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে তাকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ এনে নতুন করে হুমকি দিয়ে বলেন, ১০০০ মিসাইল লক ও লোড করা আছে এবং সেগুলো ইরানের দিকে তাক করা রয়েছে। মালাক্কা প্রণালির নীতিমালার আদলে হরমুজ প্রণালির জন্য একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে বৃটিশ আইনজীবীদের সহায়তায় ওমান তৈরি করেছে। মাস্কট এখন এই পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য তেহরানে তাদের আইনি বিশেষজ্ঞদের পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম শুক্রবার জানিয়েছে, এই প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য শনিবার ওমান পৌঁছেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেইকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এই সফর হরমুজ প্রণালি এবং নৌ-চলাচলের নিরাপত্তার ওপর কেন্দ্র করে হবে এবং এটি গত এক বা দুই মাস ধরে ওমানের সাথে শুরু হওয়া পরার্মশেরই ধারাবাহিকতা। হরমুজ প্রণালির বেশিরভাগ নৌ-চলাচলযোগ্য জলপথ ওমানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা বাধ্যতামূলক টোলের বিরোধিতা করছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের পরিপন্থী উপায়ে ইরানকে এই প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব দেয়া হবে মূলত যে কোনো উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হওয়া মেনে নেয়া, যারা যখন-তখন এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।
তবে ওমানের এই বিকল্প পরিকল্পনা ইরানিদের, বিশেষ করে ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) উচ্চাকাক্সক্ষার সাথে নাও মিলতে পারে। একজন কূটনীতিক বলেছেন, আইআরজিসির কিছু অংশ বলছে যে যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারিতে তাদের ওপর একটি অবৈধ হামলা চালিয়েছিল, তাই তারা কেন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলবে? আবার অন্যরা সহযোগিতা করতে চায়। তেহরানের ভেতরে এই বিষয়ে বিভাজন রয়েছে। ইরান এই ফি আদায়ের বিষয়টি বাস্তবে বাধ্যতামূলক করবে কিনা, তা স্পষ্ট করার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর পক্ষ থেকেও চাপের মধ্যে রয়েছে। লন্ডনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস জানিয়েছে, এনার্জি পলিসি রিসার্চ গ্রুপের স্বাধীনভাবে প্রস্তুত করা প্রস্তাবগুলোর প্রতি তাদের আগ্রহ রয়েছে। ওই গবেষণাপত্রে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক ব্যবস্থার মধ্যে স্বচ্ছ সেবা ফি যুক্ত থাকলে তা সব পক্ষকে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করবে। এটি কেবল প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজের ওপর আরোপিত কোনো টোল নয়। গত বৃহস্পতিবার লন্ডনে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) লন্ডনের বৈঠকে কিছু উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় দেশের জোট একটি প্রস্তাব পাসের জন্য চাপ দেয়, যেখানে জাহাজে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার জন্য ইরানের নিন্দা জানানো হয়। তবে এই প্রস্তাবটি রাশিয়া বা চীন সমর্থন করেনি।
রাশিয়া বলেছে, এই সংঘাতমূলক প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণগুলোকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে। অন্যদিকে চীন এটিকে একতরফা এবং আইএমও-এর ম্যান্ডেটের বাইরে বলে অভিহিত করেছে। চলতি সপ্তাহে ড্রোন, মিসাইল ও ছোট নৌকার সাহায্যে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়ার ইরানি সক্ষমতা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে ১৫০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পর এই প্রস্তাবটি আসে। ইরান এর জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হেনেছে। একজন কূটনীতিক বলেন, নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার দুটি কারণ রয়েছে। একটি হলো প্রণালিটি পুনরায় খোলার সময় এর বিতর্কিত নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যটি হলো এই জলপথের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা, যার মধ্যে মালাক্কা প্রণালির মডেলটি ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা তা অন্তর্ভুক্ত।
গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি আলোচনার রোডম্যাপ বা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ইরান কেবল ৬০ দিনের জন্য কোনো ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল। কারিগরি ও সামরিক বাধাগুলো দূর হওয়ার পর, ৩০ দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক করার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে যে এই সমঝোতা স্মারকের অর্থ এই নয় যে জাহাজগুলো কেবল ইরানের অনুমতি নিয়ে এবং তেহরানের নির্দিষ্ট করে দেয়া রুটেই প্রণালি পার হতে পারবে। আলাদাভাবে, এই স্মারকে ইরান ওমানের সাথে প্রণালির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি নৌবাহিনী দাবি করেছে যে তারা মূলত সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিগুলো তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী পূরণ করেছে।
আইআরজিসি নৌবাহিনী জানিয়েছে, আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি যে এই ভূখণ্ডে বা হরমুজ প্রণালিতে বিদেশিদের কোনো ভূমিকা নেই। কূটনীতিকরা এখন খতিয়ে দেখছেন যে তেহরান আটকে থাকা জাহাজের জট কমাতে সব জাহাজকে ইরানের কাছের উত্তরাঞ্চলীয় রুট ব্যবহারের জন্য জোর দিচ্ছে, নাকি দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট ব্যবহারের জন্য দেশের পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটির অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক করছে।

Tuesday, July 7, 2026
ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের আগে ন্যাটোর বড় অস্ত্র চুক্তি
সম্মেলনের চমক হিসেবে চুক্তির বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায় ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন কোম্পানি নর্থরপ গ্রুম্যানের কাছ থেকে নজরদারি ড্রোন এবং ন্যাটো জোট সুইডেনের কোম্পানি ‘সাব’–এর কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনবে। এ ছাড়া ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপে যৌথভাবে উৎপাদনের বিষয়ে জার্মানি ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন–বিধ্বংসী সক্ষমতা বাড়াতে মিত্ররা ৪ হাজার কোটি (৪০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি বিনিয়োগ করবে বলেও ন্যাটো মহাসচিব নিশ্চিত করেছেন।
স্নায়ুযুদ্ধের শুরু থেকে ন্যাটো জোট ইউরোপকে রক্ষা করে এলেও ট্রাম্প প্রায়ই প্রতিরক্ষায় ইউরোপের অপর্যাপ্ত অবদানের সমালোচনা করেন। মার্ক রুতে জানান, রুশ হুমকির ভয় ও ট্রাম্পের জোরালো চাপের কারণে ইউরোপীয়রা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ‘বিস্ময়করভাবে’ বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ন্যাটোর ইউরোপীয় দেশগুলো ও কানাডা প্রতিরক্ষায় আরও ৯ হাজার কোটি ডলার বেশি ব্যয় করেছে। সব মিলিয়ে এ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার কোটি ডলারে, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা
শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠক করবেন ট্রাম্প। সূত্র বলছে, ট্রাম্প হয়তো তুরস্ককে আবার এফ-৩৫ স্টিলথ ফাইটার কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার অনুমতি দিতে পারেন। ২০১৯ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ ব্যবস্থা কেনার পর তুরস্ককে এ কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালানোর পর ন্যাটোর অভ্যন্তরে উত্তেজনা বেড়েছে। ওই সংঘাতে সমর্থন না দেওয়ায় ট্রাম্প ন্যাটো সদস্যদের কড়া সমালোচনা করেন। তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না হলেও তাঁরা আকাশসীমা ও ঘাঁটি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন। ওই যুদ্ধ ইউরোপের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপ থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিয়েছে। এর মধ্যে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বন্দ্ব ইউরোপের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
শীর্ষ সম্মেলনে ন্যাটো সদস্যরা এ বছর ইউক্রেনের জন্য সাত হাজার কোটি ইউরো (আট হাজার কোটি ডলার) সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন। এর মধ্যেই সোমবার কিয়েভে রাশিয়ার হামলায় অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন, যা ইউক্রেনে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রকট সংকটের বিষয়টিই নতুন করে সামনে এনেছে।
![]() |
| ন্যাটো নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে আয়োজিত ‘ন্যাটো সামিট ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রি ফোরাম’-এ বক্তব্য দিচ্ছেন ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুতে। আঙ্কারা, তুরস্ক। ৭ জুলাই ২০২৬ ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, June 23, 2026
ব্রেক্সিট ধাক্কায় লন্ডভন্ড ব্রিটিশ রাজনীতি
তার পরের উত্তরসূরিরা সবাই ব্রেক্সিটের এই বিচ্ছেদের পরিণতি সামাল দিতে গিয়ে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছেন। সর্বশেষ লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গতকাল সোমবার পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। মাত্র দুই বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন। অলস বা ধীরগতির অর্থনীতি, সরকারের অকার্যকারিতা এবং বিভক্ত ও ক্লান্ত ভোটারদের কারণে তিনি পদত্যাগ করেন, যার সবই অন্তত আংশিকভাবে ব্রেক্সিটের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।
যুক্তরাজ্যের ইইউ ত্যাগ নিয়ে গবেষণা করা শিক্ষাবিদ ক্রিস গ্রে বলেন, যদিও এই সিদ্ধান্তটি এখন আর সংবাদপত্রের শিরোনামে নেই, তবুও ব্রেক্সিটের অভ্যন্তরীণ ক্ষত ব্রিটেনের ক্রমবর্ধমান অশান্ত রাজনীতির মধ্য দিয়ে এখনও প্রবাহিত হচ্ছে।
অসন্তোষকে পুঁজি করে ব্রেক্সিট প্রচার
ব্রেক্সিটের পক্ষের প্রচারকারীরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ২৮ সদস্যের এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্লক বা জোট থেকে বেরিয়ে গেলে যুক্তরাজ্য তাদের আইন, অর্থনীতি এবং সীমান্তের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে’।
‘রিমেইন’ বা ইইউ-তে থেকে যাওয়ার পক্ষের দল যখন অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির ওপর জোর দিয়েছিল, তখন ‘লিভ’ বা বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষের দল মানুষের আবেগকে পুঁজি করেছিল। ব্রেক্সিটের প্রধান প্রচারক এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হওয়া বরিস জনসন গণভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে বলেছিলেন, আমরা সামনের আলোকিত পথ দেখতে পাচ্ছি। এই জীবনে একবারই পাওয়া সুযোগের দরজা দিয়ে হেঁটে না যাওয়াটা হবে আমাদের বোকামি।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ইমেরিটাস অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান বলেন, ব্রেক্সিট মূলত একটি কল্পিত অতীতের প্রতি মানুষের নস্টালজিয়া বা আকুলতাসহ বিভিন্ন কারণে ত্বরান্বিত হয়েছিল। মানুষ এটিকে অবাধ অভিবাসন এবং ইইউ-র নিয়মের বিরুদ্ধে একটি অবস্থান হিসেবে দেখেছিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল নস্টালজিয়া, যেমন আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একাই লড়েছিলাম, যা আসলে সত্যি ছিল না। ব্রেক্সিটের ফলে আসলে কী ঘটতে পারে, তা কখনোই স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
ব্রেক্সিট কার্যকরের চেষ্টা সবাইকে অসন্তুষ্ট করেছে
ব্রেক্সিটপন্থিদের দেওয়া অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য চুক্তি, জনসেবায় আরো অর্থ বরাদ্দ এবং ব্রাসেলস থেকে আসা জটিল নিয়মের অবসান ঘটানোর সাহসী প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুতই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিক্ত বিচ্ছেদ আলোচনা চলার পর ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে। এরপর চূড়ান্ত বিচ্ছেদের জন্য আরো ১১ মাসের একটি অন্তর্বর্তী সময় পার করতে হয়।
ডেভিড ক্যামেরনের উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে একটি বিভক্ত পার্লামেন্টের কাছে গ্রহণযোগ্য বিদায়ী শর্ত খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়ে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন। বরিস জনসন মে-র স্থলাভিষিক্ত হন এবং ‘ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার’ প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি আলোচনার মাধ্যমে একটি নামমাত্র বাণিজ্য চুক্তি করতে সক্ষম হলেও যুক্তরাজ্য ও ইইউ-র সম্পর্ককে সম্পূর্ণ শীতল বা স্থবির করে রেখে যান।
ক্রমবর্ধমান আর্থিক ও নৈতিক কেলেঙ্কারির কারণে ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে কনজারভেটিভ পার্টি জনসনকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। তার স্থলাভিষিক্ত হওয়া লিজ ট্রাস মাত্র ৪৯ দিন ক্ষমতায় টিকে ছিলেন। পরের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বড় কোনো পরিবর্তন না করেই ইইউ-র সঙ্গে শীতল সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলিয়েছিলেন। কিয়ার স্টারমার সম্পর্ক ‘পুনর্নির্ধারণের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তবে তিনি ইইউ-র শুল্কমুক্ত একক বাজারে পুনরায় যোগদানের বিষয়টি বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানান। স্টারমার ক্ষমতা হস্তান্তর করার সময়ও ব্রেক্সিট একটি অসমাপ্ত কাজ হিসেবেই রয়ে গেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি
ইতিহাসবিদ অ্যান্থনি সেলডন বলেন, ক্যামেরন এই আশায় গণভোটের ডাক দিয়েছিলেন যে এটি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের বিতর্ক দূর করবে, যা কনজারভেটিভ পার্টিকে বিভক্ত করে রেখেছিল। কিন্তু তা হয়নি।
সেলডন টাইমস রেডিওকে বলেন, যারা এটি নিয়ে পড়েছিলেন, তারা এখনও এটি নিয়েই পড়ে আছেন এবং ব্রিটেনের সমস্যাগুলো অব্যাহত রয়েছে।
বিচ্ছেদ আলোচনার সময় যে কনজারভেটিভরা ইইউ-র সঙ্গে নরম ব্রেক্সিট বা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চেয়েছিলেন, তাদের দল থেকে বের করে দেয় জয়ী ব্রেক্সিটপন্থি গোষ্ঠী। অন্যদিকে লেবার পার্টি অনেক বেশি ইইউ-পন্থি হওয়া সত্ত্বেও দলের ভেতরে বিভক্তি রয়েছে। দলের একাংশ ইইউ-র আরো কাছাকাছি যেতে বা পুনরায় যোগ দিতে চায়, তবে স্টারমারের মতো শীর্ষ নেতারা পুরোনো ক্ষত নতুন করে খুঁড়তে চান না।
এক দশক পর লাখ লাখ ভোটার বড় দুটি দল ছেড়ে বামপন্থি গ্রিন পার্টি এবং নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টরপন্থি রিফর্ম ইউকে-র মতো বিকল্প দলগুলোর দিকে ঝুঁকছেন। নাইজেল ফারাজ সম্ভবত ব্রেক্সিটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয়ী। তিনি প্রথমে বিচ্ছেদের জন্য প্রচার চালান এবং পরে অভিযোগ করেন যে ব্রেক্সিটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তার অভিবাসনবিরোধী বার্তা এখন পোলিশ প্লাম্বারদের থেকে সরে গিয়ে ছোট নৌকায় আসা আশ্রয়প্রার্থীদের দিকে মোড় নিয়েছে। তার দল বর্তমানে জনমত জরিপগুলোতে ক্রমাগত এগিয়ে রয়েছে।
সংশয়বাদ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বৃদ্ধি
গত এক দশকে ব্রিটেনের অর্থনীতি বেশ লড়াই করছে। ব্রেক্সিটই একমাত্র কারণ না হলেও এর ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন। তবে এই ধীরগতির প্রবৃদ্ধির পেছনে কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরান যুদ্ধও ভূমিকা রেখেছে।
থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর গভর্নমেন্ট’-এর পরিচালক হ্যানা হোয়াইট বলেন, আমরা এমন কোনো রাজনীতিবিদ পাইনি যারা জনগণের সামনে অকপটে সত্য বলতে পেরেছেন। ক্ষমতায় আসার পর তারা কর না বাড়িয়ে, ঋণ না বাড়িয়ে একই সঙ্গে উন্নত জনসেবা দিতে পারবেন না এই সত্যটি তারা বলেননি। ফলে মানুষ আশাহত হয়েছে।
ব্রেক্সিট অভিবাসন সংক্রান্ত বিতর্ক কমাতে ব্যর্থ হয়েছে, বরং সংখ্যার হেরফের নির্বিশেষে এটি আরো তীব্র হয়েছে। ব্রেক্সিটের পর ২০২৩ সালে নিট অভিবাসন বেড়ে ৯ লাখের বেশি হয়েছিল, যা গত বছর কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে নেমে এসেছে।
রাজনীতিবিদদের ওপর মানুষের আস্থা কমেছে এবং সংশয়বাদ বা সিনিকিজম বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসীদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জের ধরে বা মিথ্যা রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে উসকানিদাতারা রাস্তায় অভিবাসনবিরোধী সহিংসতা ছড়িয়েছে।
ক্রিস গ্রে বলেন, অতীতে ব্রিটেনের প্রচলিত রাজনৈতিক আলোচনা ও তর্ক এবং রাস্তার সহিংসতার মধ্যে একটি দৃঢ় প্রাচীর বা সীমানা ছিল। আমি মনে করি সেই সীমানা এখন ভেঙে যাচ্ছে এবং বড় আকারে এর শুরুটা ব্রেক্সিট দিয়েই হয়েছিল।
অনুশোচনা
যুক্তরাজ্যের মানুষের মধ্যে এখন কিছুটা ‘ব্রেক্সিট নিয়ে অনুশোচনা’ বা অনুতাপ দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক ইপসস জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৫২ শতাংশ মানুষ পুনরায় ইইউ-তে যোগ দিতে চান এবং ৩৩ শতাংশ এর বিরোধিতা করছেন।
গত শনিবার শত শত মানুষ নীল এবং হলুদ রঙের ইইউ পতাকা উড়িয়ে লন্ডনের রাস্তায় ‘পুনরায় যোগদানের’ দাবিতে একটি মিছিল করেছেন। তবে ব্রেক্সিট নাটকের চূড়ান্ত সময়ের তুলনায় এই জমায়েত ছিল অনেক ছোট। কারণ অনেক মানুষ এখন এটি ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে চান।
কিন্তু ব্রেক্সিট এমন একটি ল্যান্ডমাইন বা বিপজ্জনক ক্ষেত্র, যা স্পর্শ করতে রাজনীতিবিদরা ভয় পান। ব্রিটেন যদি পুনরায় যোগ দিতেও চায়, তবে সতর্ক বা সংশয়ী ইইউ-র কাছে ফিরে যাওয়ার পথটি হবে অনেক দীর্ঘ।
ক্রিস গ্রে বলেন, যতক্ষণ না রাজনীতিবিদরা ব্রেক্সিটের এই উত্তরাধিকারের মুখোমুখি হতে রাজি হচ্ছেন, ততক্ষণ ব্রিটেন একটি মৃদু সংকটের আবর্তে থাকবে।
তিনি যুক্তরাজ্যের অবস্থাকে একজন মানুষের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সঙ্গে তুলনা করেছেন যা তার শক্তি কমিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ, যা হয়তো নিরাময় অযোগ্য নয়। তবে তারা ডাক্তারের কাছে যেতে পছন্দ করছে না কারণ তারা জানে যে বিষয়টি খুব একটা সুখকর হবে না।
সূত্র: এপি
![]() |
| ছবি: এপি |
ইসরাইলকে অন্ধ সমর্থন করে ডুবেছেন স্টারমার
যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচন ও বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, গাজা ইস্যুতে ভোটারদের একাংশ লেবার পার্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। সাবেক লেবার ভোটারদের একটি বড় অংশই পরের নির্বাচনে মধ্যপন্থি বা বামপন্থি দলগুলোকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এর পেছনে তারা গাজায় ইসরাইলের অভিযান ও যুক্তরাজ্যের সহযোগিতাকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লেবার পার্টির সাবেক নেতা জেরেমি করবিন এই বিষয়ে বর্তমান নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেছেন। করবিন বলেন, স্ট্যারমার করপোরেট দাতাদের স্বার্থে রাজনৈতিক আদর্শ বিসর্জন দিয়েছেন এবং তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার হলো গণহত্যায় অংশীদারত্ব ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব।
গ্রিন পার্টির নেতা জ্যাক পোলানস্কিও সরকারের এই নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন।
বিরোধী দলে থাকাকালীন অবস্থান
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন। এর পর থেকে ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় গাজায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি। হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ এবং তারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় স্টারমার তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকারের সুরেই ইসরাইলের এই গাজা অভিযানের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। ওই বছরের ১১ অক্টোবর এক সাক্ষাৎকারে গাজায় বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো অবরোধকে ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার বলে মন্তব্য করেন তিনি। যদিও পরে ২০ অক্টোবর তিনি এই মন্তব্য থেকে কিছুটা সরে আসেন।
২০২৩ সালের নভেম্বরে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির (এসএনপি) পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনিদের ওপর ‘যৌথ শাস্তি’ বন্ধের দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব আনা হলে স্টারমার লেবার এমপিদের সেই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট না দেওয়ার নির্দেশ দেন। ২০২৪ সালের শুরুতে তিনি কমন্স সভার স্পিকারকে প্রভাবিত করে এসএনপির একটি শক্তিশালী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহযোগিতা
ক্ষমতায় আসার পর স্টারমার সরকার ইসরাইলের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বজায় রাখে। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে গাজার ওপর দিয়ে অন্তত ৫১৮টি ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিমান উড়েছে।
সরকার দাবি করেছে, এগুলো শুধু জিম্মিদের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য ছিল। তবে এই অভিযানগুলো ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। এমন দিনগুলোতেও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করা হয়েছে, যেদিন ইসরাইলি হামলায় ব্রিটিশ নাগরিক নিহত হয়েছেন।
২০২৪ সালের ১ এপ্রিল গাজায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের কনভয়ে ইসরাইলি হামলায় সাবেক রয়্যাল মেরিন জেমস হেন্ডারসনসহ সাতজন সাহায্যকর্মী নিহত হন। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে ওই দিনের ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও তারা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এ ছাড়া প্রায় ২ হাজার ব্রিটিশ-ইসরাইলি দ্বৈত নাগরিক ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে গাজায় যুদ্ধ করেছেন, যাকে স্টারমার সরকার তাদের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন
অবশ্য কনজারভেটিভদের নীতি থেকে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তনও এনেছিল লেবার সরকার। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) এক্তিয়ার নিয়ে যুক্তরাজ্যের আপত্তি প্রত্যাহার করা এবং ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থি মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করে।
২০২৬ সালের জুনে প্রথমবারের মতো অবৈধ বসতি স্থাপনের সঙ্গে কোনো অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা না রাখার ঘোষণা দেয় যুক্তরাজ্য। ফ্রান্স, নরওয়ে ও কানাডার মতো দেশের সঙ্গে মিলে তারা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের অর্থায়ন করা নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে বসতি এলাকার পণ্য আমদানির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়নি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্য ইসরাইলের কাছে অস্ত্র বিক্রির ৩০টি লাইসেন্স স্থগিত করে। তবে বৈশ্বিক এফ-৩৫ ফাইটার জেটের যন্ত্রাংশ সরবরাহের খাতটিকে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে বাদ রাখা হয়। এ ছাড়া স্টারমার সরকারের আমলে ১৬ কোটি ৯০ লাখ ডলারের সামরিক পণ্য সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে বিপুল পরিমাণ বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো যুদ্ধাস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ উপেক্ষা করার অভিযোগ
স্টারমারের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ উপেক্ষা করার অভিযোগ তুলেছেন তারই সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী ওয়েস স্ট্রিটিং।
এক সাক্ষাৎকারে স্ট্রিটিং জানান, গাজা থেকে ফিরে আসা ব্রিটিশ চিকিৎসকদের দেওয়া যুদ্ধাপরাধের একটি প্রমাণসংক্রান্ত নথি তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠান, তখন স্টারমার উল্টো তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটি ফাঁসের চেষ্টার অভিযোগ তোলেন। স্টারমার বরাবরই ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তুলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছেন।
পররাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ নীতি নিয়ে বিতর্ক
পররাষ্ট্র নীতিতে স্টারমার বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির ঘোষণা দিলেও বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। পরে সেপ্টেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলে ইসরাইল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়।
চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় মার্কিন নীতি অনুসরণ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে স্টারমার ঘোষণা দেন যুক্তরাজ্য ইরানের ওপর হামলায় অংশ নেবে না এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তবে পরে তিনি এই অবস্থান থেকে সরে আসেন এবং মার্কিন বাহিনীকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেন, যা আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে একটি অবৈধ যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে।
অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে গাজা যুদ্ধের সমালোচকদের দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্টারমার সরকারের বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নামক একটি অধিকার রক্ষা গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়। উচ্চ আদালত প্রথমে এই সিদ্ধান্তকে বেআইনি ও বৈষম্যমূলক বললেও, পরবর্তীতে আপিল বিভাগ সরকারের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। এই গোষ্ঠীর সমর্থনে নীরব সমাবেশ করার অপরাধেও অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পাশাপাশি, ইসরাইলের সমালোচনা করার কারণে মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জেঙ্ক উইগার এবং হাসান পিকারকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। অথচ একই সময়ে ইসরাইলি সামরিক প্রধান হার্জি হালেভি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদোন সার এবং প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ যুক্তরাজ্য সফর করেছেন এবং হালেভিকে বিশেষ কূটনৈতিক সুরক্ষাও দেওয়া হয়েছিল।
মেডিকেল এইড ফর প্যালেস্টাইনিয়ান্সের পরিচালক রোহান টালবট মন্তব্য করেছেন, ইসরাইলের নৃশংসতার মুখে স্ট্যারমারের আন্তর্জাতিক ভূমিকা চিরকাল অর্ধেক ব্যবস্থা এবং নিষ্ক্রিয়তার জন্য কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। গাজা ইস্যুতে সব পক্ষকেই অসন্তুষ্ট করে বিদায় নিতে হলো স্ট্যারমারকে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
![]() |
| কিয়ার স্টারমার ওআইজ্যাক হারজগ। ছবি: সংগৃহীত |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...













