Friday, December 6, 2019

নিজের সুযোগ নিজেই তৈরি করো —নেলসন ম্যান্ডেলা

নেলসন ম্যান্ডেলা
>>>>নেলসন ম্যান্ডেলা। জন্ম: ১৮ জুলাই ১৯১৮, মৃত্যু: ৫ ডিসেম্বর ২০১৩ (বয়স ৯৫)। বিশ্বের বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা। বর্ণবাদ-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি। আফ্রিকানরা তাঁকে ‘মাদিবা’ বলে ডাকে, যার অর্থ হল "জাতির জনক"। বিভিন্ন সময় মোট ২৭ বছর কেটেছে কারাগারে। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ১৯৯৩ সালে। ম্যান্ডেলা ব্রিটিশ দক্ষিণ আফ্রিকার এমভেজোর এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশুনা করেন এবং জোহানেসবার্গে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি উপনিবেশ-বিরোধী কার্যক্রম ও আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৪৩ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন ও ১৯৪৪ সালে ইয়ুথ লিগ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি সশস্ত্র সংগঠন উমখন্তো উই সিযওয়ের নেতা হিসাবে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার গ্রেপ্তার করে ও অন্তর্ঘাতসহ নানা অপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। ম্যান্ডেলা ২৭ বছর কারাবাস করেন। এর অধিকাংশ সময়ই তিনি ছিলেন রবেন দ্বীপে। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি কারামুক্ত হন। এর পর তিনি তাঁর দলের হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় অংশ নেন। এর ফলশ্রুতিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের অবসান ঘটে এবং সব বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের প্রতীক হিসবে গণ্য ম্যান্ডেলা ২৫০টিরও অধিক পুরস্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ভারত সরকার প্রদত্ত ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ভারতরত্ন পুরস্কার ও ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে নোবেল শান্তি পুরস্কার। তাছাড়াও তিনি ১৯৮৮ সালে শাখারভ পুরস্কারের অভিষেক পুরস্কারটি যৌথভাবে অর্জন করেন। ১৯৯৬ সালের ১৬ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার যুব দিবসে তরুণদের উদ্দেশে উৎসাহব্যঞ্জক এক বক্তব্য দেন নেলসন ম্যান্ডেলা।<<<<
  • আজও স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে চোখে। কোমলমতি তরুণদের নিথর দেহ পড়ে আছে পথে পথে। পুলিশের বন্দুকের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে অসংখ্য তরুণের তাজা তাজা প্রাণ। পুরো দক্ষিণ আফ্রিকা সেদিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। এই স্মৃতিগুলো আমাদের তাড়া করে আর মনে করিয়ে দেয়, কেমন এক বিভীষিকাময় অন্ধকার ভয়ংকর অতীতকে আমরা জয় করেছি। এই স্মৃতিগুলো বারবার করে বলে তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে। কারণ, তরুণদের আত্মত্যাগেই মিলেছে আমাদের মুক্তি, আমাদের স্বাধীনতা। আমরা এখন কত না আনন্দিত। কারণ, আর কোনো বুলেট কোনো তরুণের গায়ে লাগবে না। আমাদের তরুণেরা এখন শিক্ষার ভালো পরিবেশ চায়। তারা চায় ভালোভাবে জীবনটাকে উপভোগ করতে।
  • আমরা এই দিনে সমবেত হয়েছি শুধু তরুণদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে। কেননা বর্ণবৈষম্যের বিষদাঁত ভেঙে তরুণেরাই তো আমাদের মুক্তি এনে দিয়েছে। বর্ণবৈষম্যবিরোধী বিপ্লবের সামনে থেকে তারা নেতৃত্ব দিয়েছে। মুক্তি বা স্বাধীনতা যখনই হাতছানি দিয়ে ডেকেছে, তখনই তোমরা তরুণেরা সাড়া দিয়েছ। মৃত্যুকে পরোয়া না করে, বরং তুচ্ছ বলে বুলেটের আঘাতকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেছ। বিপ্লবের মাঠ থেকে তোমরা কখনোই পিছপা হওনি। একটি গণতান্ত্রিক ও বিকল্প জাতি গঠনের আহ্বানে তোমরা সাড়া দিয়েছ।
  • তোমরা এসব করেছ নিজেদের জন্য, জাতির জন্য। অথচ বিনিময়ে তোমরা বিশেষ কোনো সুবিধা চাওনি। এমনকি আজও চাইছ না। কিন্তু আজ আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলতে চাই, এই জাতি তরুণদের কাছে ঋণী। তাই জাতি তোমাদের গণতন্ত্রের সব ধরনের সুবিধা দিতে নতুন করে একটি জাতীয় যুব কমিশন গঠন করছে। শুধু তরুণদের জন্য এই কমিশন কাজ করবে। তরুণদের চাহিদার জোগান আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে এ কমিশনের কাজ। তরুণেরা যেমন জাতির জন্য নিবেদিতপ্রাণ, তেমনি জাতিরও কিছু দায়িত্ব থাকে। তরুণেরা যেন জাতি গঠনে ও জাতির উন্নয়নে সক্রিয় অংশ নিতে পারে, সেটা নিশ্চিত করবে জাতি। আশা করি, এই কমিশন সব বাধা পেরিয়ে সফলভাবেই কাজ করতে পারবে। তবে কমিশনের সফলতা নির্ভর করবে তরুণদের ওপরই। তোমাদের সহযোগিতা ছাড়া এই কমিশন সফল হতে পারবে না। তোমাদের সহযোগিতা ছাড়া জাতিও সফল হতে পারবে না। কারণ, তোমরা তরুণেরাই জাতির কর্ণধার।
  • আমরা ঋণী তরুণদের কাছে, যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে জাতির জন্য। যারা আত্মবিসর্জন দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের জন্য, যেন সবাই উন্নত ও সুখী জীবনযাপন করতে পারে। ২০ বছর আগের সেই দিন, ১৬ জুন ১৯৭৬। ঘুমন্ত জাতিকে তোমরা তরুণেরা সেদিন জাগিয়ে তুলেছিলে। তখন বর্ণবৈষম্যের শাসনব্যবস্থায় কালোরা ছিল ক্রীতদাস। তোমরা সেই তরুণ, যারা সেদিন নিজেদের প্রাণ দিয়ে দাসত্ব থেকে জাতিকে এনে দিয়েছিলে মুক্তি। বর্ণবৈষম্যের পতন ঘটিয়ে তোমরা বদলে দিয়েছ ইতিহাসের গতিধারা।
  • আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দারিদ্র্যকে জয় করা। গৃহহীনদের আবাসনের ব্যবস্থা করা। আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ এখন অশিক্ষা আর অজ্ঞানতাকে জয় করা। পৃথিবীটা দিন দিন ছোট হয়ে আসছে। আমাদের দক্ষতা আরও বাড়াতে হবে। উদ্ভাবনের দিকে আমাদের উন্নতি করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক পণ্য উৎপাদন করতে হবে এবং এসব চ্যালেঞ্জ আসলে তরুণদেরই মোকাবিলা করতে হবে। যখন শহর আর গ্রাম থেকে তোমরা প্রকৌশলী, পদার্থবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও অন্যান্য বিজ্ঞানী হিসেবে গড়ে উঠবে এবং এই সংখ্যাটা ধীরে ধীরে বাড়বে, তখনই আমরা বলতে পারব, আমরা উন্নতি করছি। এ জন্য যত ধরনের সুযোগ-সুবিধা তোমরা পাবে, তা ঠিকঠাকভাবে কাজে লাগাবে।
  • জাতির জন্য চাই কর্মঠ ও পরিশ্রমী তরুণ। দেশের অর্থনীতি নির্ভর করে তরুণদের ওপর, তোমাদের ওপর। তোমরাই পারো, তোমাদের কঠোর পরিশ্রম আর প্রচেষ্টায় নিজ জাতিকে সবচেয়ে সফল, সুখী ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে। জাতি গঠনের এ লক্ষ্যটা পূরণ করতে তোমাদের কাজ করতে হবে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহভাগিতার মানসিকতা নিয়ে।
  • যেসব তরুণ কাজ জোটাতে পারোনি, তাদের বলি, তোমরা হতাশ হোয়ো না। সুযোগকে কাজে লাগাতে শেখো। বড় হোক ছোট হোক, কাজে যোগ দাও। শুধু শুধু অন্যের ওপর নির্ভর কোরো না। নিজেই নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে হবে। নিজের জন্য নিজেই সুযোগ তৈরি করো। সরকারের দেওয়া ছোট কোনো কাজ, হতে পারে সেটা কৃষিকাজ, তুমিও যোগ দাও।
  • আমার বিশ্বাস, দেশের সব মানুষই বর্ণ ও লিঙ্গবৈষম্যহীন জাতি গঠনে একযোগে কাজ করবে। আমি জোরালো প্রত্যাশা করি তরুণদের কাছ থেকে। বৈষম্যহীন জাতি গঠনের স্বপ্নটাকে সত্যি করতে তোমরা প্রাণ উজাড় করে কাজ করবে। সব যুবক যদি এক হয়, সব মানুষ যদি এক হয়, তবে দেশে এমন একটা পরিবেশ গড়ে উঠবে, যেখানে সবাই মিলে সুখে-শান্তিতে বাস করা যায়।
  • তরুণেরা আমাদের অহংকার, তরুণেরা একটা জাতির অলংকার। তরুণেরা দুঃসাহসের প্রতীক। তাদের বীরত্বকে ভোলা যায় না। সংগ্রামী তরুণদের জন্য আমরা গর্বিত। আজকের দিনে প্রতিটি জাতির জন্য এমন দুঃসাহসিক বীর যুবকের আরও বেশি প্রয়োজন। তোমরা সাহসী হও। শেখায় মনোনিবেশ করো। নিজেদের দক্ষতা বাড়াও। মতৈক্য গড়ে তোলো। জাতির ভবিষ্যৎ তোমাদের হাতেই। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তোমরা তোমাদের জাতির ভবিষ্যৎটাকে উজ্জ্বল করো, আলোকিত করো। তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
>>>(নেলসন ম্যান্ডেলা ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর: জাহাঙ্গীর আলম ।)

এরশাদের পতন: পর্দার আড়ালে যা ঘটেছিল by কাদির কল্লোল

নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন এরশাদ
লাস্ট আপডেট- ৬ ডিসেম্বর ২০১৮: ১৯৯০ সালের এই দিনে, ৬ই ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন সাবেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। দিনটিকে আওয়ামী লীগ 'গণতন্ত্র মুক্তি দিবস', বিএনপি 'গণতন্ত্র দিবস' এবং এরশাদের জাতীয় পার্টি 'সংবিধান সংরক্ষণ দিবস' হিসেবে পালন করে থাকে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এই দিনকে 'স্বৈরাচার পতন দিবস' হিসেবেও পালন করে থাকে।
গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হলেও প্রায় তিনদশক ধরে রাজনীতিতে কিভাবে টিকে রয়েছেন জেনারেল এরশাদ? বিবিসি নিউজ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন:
১৯৯০ সালের ডিসেম্বর মাসের এক তারিখে ঢাকা সেনানিবাসে এক জরুরী বৈঠকে বসেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা।
সে বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, সে প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে আলোচনা করা।
জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। এর কয়েকদিন আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় চিকিৎসক নেতা ডা: শামসুল আলম মিলনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
সেনানিবাসের ভেতরে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে দেশের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক বিষয় এবং এ সঙ্কট সমাধানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।
ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা আরো সিদ্ধান্ত নিলেন যে চলমান রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর করনীয় কিছু নেই।
এমন অবস্থায় প্রেসিডেন্ট এরশাদ সেনা সদরকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে দেশে সামরিক আইন জারী করা হবে।
এরপর ডিসেম্বরের তিন তারিখে তখনকার সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাথে দেখা করতে যান।
সেনা কর্মকর্তারা চেয়েছিলেন যে সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল নূর উদ্দিন যেন প্রেসিডেন্ট এরশাদকে পদত্যাগের জন্য সরাসরি বলেন।
কিন্তু সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি পদত্যাগের কথা না বললেও তিনি জানিয়ে দেন যে দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অফিসাররা কোন দায়িত্ব নিতে রাজী হচ্ছে না।
তখন ঢাকা সেনানিবাসে ব্রিগেডিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। মি: চৌধুরী ২০১৩ সালে পরলোকগমন করেন।
২০১০ সালে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাতকারে জেনারেল চৌধুরী বলেন, " উনি (সেনাপ্রধান) প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন আপনার উচিত হবে বিষয়টির দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান করা। অথবা বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেয়া।"
জেনারেল এরশাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী সামরিক শাসন জারীর বিষয়ে সেনাবাহিনী একমত নয় বলে প্রেসিডেন্টকে পরিষ্কার জানিয়েছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান।
প্রেসিডেন্টের সাথে সেনাপ্রধানের বৈঠক নিয়ে তখন দেশজুড়ে নানা গুঞ্জন। সেসব বৈঠক নিয়ে নানা অনুমান তৈরি হয়েছিল সে সময়।
একদিকে ক্যান্টনম্যান্টের ভেতরে নানা তৎপরতা অন্যদিকে রাস্তায় এরশাদ বিরোধী বিক্ষোভ। সব মিলিয়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল।
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি বলেন যে তার পদত্যাগ করা উচিত।
"পদত্যাগের কথাটা জেনারেল সালামই প্রথম সরাসরি বলেন। অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। আর্মি অধৈর্য হয়ে যাচ্ছে," বলছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী।
জরুরী অবস্থা এবং কারফিউর মতো কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেওে যখন গণআন্দোলন দমানো যাচ্ছিল না তখন সেনাবাহিনীর দিক থেকে নেতিবাচক মনোভাব দেখলেন মি: প্রেসিডেন্ট এরশাদ।
এমন অবস্থায় ডিসেম্বরের চার তারিখ রাতেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন জেনারেল এরশাদ।
তখন এরশাদ সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন মওদুদ আহমেদ. যিনি বর্তমানে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা। মি: আহমেদ জানালেন সেনাবাহিনীর মনোভাব বোঝার পরেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি মি: এরশাদ।
সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন মোকাবেলার জন্য তিনি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো এরশাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে তখনকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমেদকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার জন্য বাংলাদেশে টেলিভিশনে পাঠিয়েছিলেন মি: এরশাদ।
উদ্দেশ্য ছিল, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পিত নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা।
বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচনের প্রস্তাব আগেই বর্জন করার পরেও মি: এরশাদ চেয়েছিলেন ভাইস-প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরার মাধ্যমে জনগণকে আশ্বস্ত করা।
মি: এরশাদের নির্দেশ মতো ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমদ সন্ধ্যার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে গিয়েছিলেন ভাষণ রেকর্ড করার জন্য। সে ভাষণ তিনি রেকর্ডও করেছিলেন।
সে ভাষণ রেকর্ড করার পর মওদুদ আহমদ যখন বাসায় ফিরে আসেন তখন তিনি জানতে পারেন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এরপর কয়েক ঘন্টা পর মধ্যরাতে মওদুদ আহমেদকে আবারো বাংলাদেশ টেলিভিশনে যেতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার জন্য।
১৯৯০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মওদুদ আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, " প্রথম ভাষণ রেকর্ড করে আমি যখন বাসায় ফিরে আসলাম, তখন আমার স্ত্রী বললেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোন করেছিলেন। তখন আমি ওনাকে ফোন করলাম। উনি তখন বললেন, আমি এখনই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তখন আমি ওনার বাসায় গেলাম। তখন রাতে নিউজের পরে ওনার পদত্যাগের ঘোষণা দেয়া হলো।"
এরশাদ সরকারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন মওদুদ আহমেদ
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময় ছন্দপতন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে একটি মিছিলে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হবার ঘটনা আন্দোলনে গতি এনেছিল।
আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি'র নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট একই সাথে আন্দোলন কর্মসূচী নিয়ে এগিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও মাঠে ছিল।
১৯৯০ সালের অক্টোবর মাস থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের' ব্যানারে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল।
সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিএনপি সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতা খায়রুল কবির খোকন।
তিনি বলছিলেন, ২৭শে নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যার পর আন্দোলনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল।
"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে দখল করার জন্য বহিরাগত মাস্তানরা পরিকল্পিতভাবে ডা: মিলনকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা ছিল আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট, " বলছিলেন মি: খোকন।
ডা: মিলন যখন রিক্সায় করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ডা: মিলনের সাথে একই রিক্সায় ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশনের তখনকার মহাসচিব ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।
অভিযোগ রয়েছে জেনারেল এরশাদ সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দখল চেষ্টার অংশ হিসেবে ডা: মিলনকে হত্যা করা হয়েছে।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেন, " আমার রিক্সাটা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় উপস্থিত হয়েছে তখন মিলন আরেকটি রিক্সায় করে আমাকে ক্রস করে সামনে চলে যাচ্ছিল। তখন আমি মিলনকে বললাম তুমি ঐ রিক্সা ছেড়ে আমার রিক্সায় আসো। এরপর মিলন আমার রিক্সায় এসে ডানদিকে বসলো। রিকশাওয়ালা ঠিকমতো একটা প্যাডেলও দিতে পারে নাই। মনে হলো সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের দিকে থেকে গুলি আসলো। গুলিটা মিলনের বুকের পাশে লেগেছে। তখন মিলন বললো, জালাল ভাই কী হইছে দেখেন। একথা বলার সাথে সাথে সে আমার কোলে ঢলে পড়লো। "
ডা: মিলনকে হত্যার পর জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন আরো তুঙ্গে উঠে। তখন জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে শুরু করেছিল সেনাবাহিনী।
একইসাথে জেনারেল এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল সেনাবাহিনী।
ডা: মিলন হত্যাকাণ্ডের পর আন্দোলন সামাল দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ।
সেনা মোতায়েনের জন্য জেনারেল এরশাদ যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করেছিল।
প্রয়াত মেজর জেনারেল আমিন আহমেদ চৌধুরীর বর্ণনা মতে, সেনাবাহিনী সৈনিকদের পাঠিয়ে রাস্তায় মোতায়েন করার পরিবর্তে রমনা পার্কে সীমাবদ্ধ করে রাখে। কমান্ডিং অফিসাররা সরকারের 'অপকর্মের' দায়িত্ব নিতে রাজী ছিলেন না।
জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লে কী হবে সে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনকারী দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ফর্মুলা ঠিক করে রেখেছিল।
সে ফর্মুলা মতে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিনমাস মেয়াদী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা ছিল।
কিন্তু সে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন সেটি তখন নির্ধারিত ছিলনা ।
ড: কামাল হোসেন তখন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন।
তিনি জানালেন, জেনারেল এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার পর আন্দোলনকারী দলগুলো তখনকার প্রধান বিচারপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন আহমদের বিষয়ে একমত হয়েছিল।
অস্থায়ী সরকার প্রধানের নাম আসার পর ৬ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হয়েছিল।
ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পর্কে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, " পাঁচ তারিখে বিরোধী দল থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আসলো যে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন সাহেব উপ-রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে তারপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির কাজ করবেন তিনি এবং তার অধীনেই একটি নির্দলীয় সরকার হবে। ছয় তারিখ বিকেল তিনটায় আমি রিজাইন করলাম। আমি রিজাইন করার পরে সাহাবুদ্দিন সাহেবকে ভাইস-প্রেসিডেন্ট এপয়েন্ট করলেন প্রেসিডেন্ট সাহেব। তারপর প্রেসিডেন্ট এরশাদ নিজে রিজাইন করলেন এবং তারপর সাহাবুদ্দিন সাহেব ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু করলেন।"
ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে জেনারেল এরশাদ যখন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন রাস্তায় মানুষের যে ঢল নেমেছিল সেটি ৬ই ডিসেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত বজায় ছিল।
ড: কামাল হোসেন তখন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দিন দিল্লিতে কি হয়েছিল, জানালেন সলমন খুরশিদ

সলমন খুরশিদ
একটি নতুন বইয়ে এই দাবি করা হয়েছে, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল, তখন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন রাজেশ পাইলট, সেই দিনই তিনি অযোধ্যার জনগণকে ছত্রভঙ্গ করার বিষয়ে কথা বলার জন্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই সময় “এই বিষয়টির উপর আমল দেওয়া হয়নি” কারণ সেই সময় রাও ঘুমিয়ে ছিলেন। সেই সময় রাও ক্যাবিনেটের মন্ত্রী সলমন খুরশিদ তাঁর বই “ভিসিবল মুসলিম, ইনভিনসিবল সিটিজেন: আন্ডারস্ট্যান্ডিং ইসলাম ইন ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেসি”-তে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। মসজিদ ধ্বংসের ঠিক পরেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় হিংসা মাথা চাড়া দেয়। খুরশিদ তাঁর বইয়ে আরও বলেন যে মসজিদ ধ্বংসের পর দেশের আইনব্যবস্থা নিয়ে নানান প্রশ্ন ওঠে।
খুরশিদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, “৬ ডিসেম্বর রাতে, আমি কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য রাজেশ পাইলটের কাছে গিয়েছিলাম কারণ মসজিদ এলাকার আশেপাশের ভিড় ক্রমশই বাড়ছিল। তিনি এই বিষয় সহমত হয়ে বলেন যে যদি কয়েকজন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে এই বিষয়ে রাজি করান তবে তিনি ফৈজাবাদে যাবেন।”
খুরশিদ তাঁর বইয়ে লিখেছেন, “আমি জাফর শরীফের (সি কে) কাছে যাই, যাতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করতে পারেন। তিনি ফোন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তাঁদেরকে বলেন প্রধান সচিব এ এন ভার্মা বা স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে, যাতে জলদি উত্তরপ্রদেশ পৌঁছনোর সম্ভাবনা ছিল” ভার্মা তখন কিছু প্রশ্ন করেন, যদিও এটা স্পষ্ট হয়নি যে ঘটনাস্থলে তখনই যাওয়া সম্ভব কিনা।
সলমন খুরশিদ আরও বলেন, “তারপর আমরা পাইলটের কাছে ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলাম যে আমাদের কি করা উচিত?  এদিকে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলছে, শেষপর্যন্ত এ ব্যপারের শরীফের বাড়িতে আমরা উত্তর পেলাম, কিন্তু যখন তিনি আবার প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করলেন  তখন তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন”। তিনি বলেন, পরের দিন,  আধা সামরিক বাহিনী সেখানে গিয়ে ওই ভিড়কে ছত্রভঙ্গ করে দেয় কারণ এটা বোঝা যাচ্ছিল যে ওই ভিড়ের মন্দিরের ছাদ ভাঙ্গারও পরিকল্পনা রয়েছে।