Monday, March 12, 2018

বিমানে ছিলেন সুজন-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী বিপাশা

নেপালে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় সপরিবারে নিখোঁজ রয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী সানজিদা হক বিপাশা। সুজন-এর সহযোগী সমন্বয়কারী নেসার আমিন জানান, বিপাশার সঙ্গে তার স্বামী রফিক জামান ও ছেলে অনিরুদ্ধ ছিলেন। দুর্ঘটনার পর তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছেনা।
ফেসবুকের কয়েকটি পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ওই বিমানে সোনা মনি ও মেহেদী হাসান অমিও নামে দুই তরুণ-তরুণী ছিলেন। তারা হানিমুনে যাচ্ছিলেন বলে ফেসবুকে পোস্ট করেন। একই সময়ে ইমরানা কবীর হাসি ও রকিবুল হাসান নামে অপর দুই তরুণ-তরুণী ইউএস বাংলায় তাদের ভ্রমণের ছবি পোস্ট করেন। এছাড়া নেপালের উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগের পূর্বে আন্নি প্রিয়ক ও এফএইচ প্রিয়ক নামে অপর এক দম্পতি ছবি পোস্ট করেছেন।

বিধ্বস্ত বিমানে ছিলেন খুলনার ছাত্রনেতা আলিফ

নেপালের কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় খুলনার আলিফুজ্জামান আলিফ (২৬) নামে এক ছাত্র রয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকে তার সঙ্গে পরিবারের পক্ষ থেকে কোন ধরনের যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার ভাগ্যে ঠিক কি ঘটেছে- সেটিও বলতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা।
আলিফুজ্জামান আলিফ খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতি বারোপোল গ্রামের মো. আসাদুজ্জামানের পুত্র। সে খুলনার সরকারি বি এল বিশ্ববিদ্যালয়  কলেজ থেকে এবার মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছে। সে খুলনা জেলা প্রজন্ম লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।
আলিফের নিকটাত্মীয় মো. সাব্বির খান দ্বীপ জানান, আলিফ নেপাল ভ্রমণের জন্য সোমবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়। সে যশোর থেকে প্রথম ফ্লাইটে বেসরকারি এয়ারওয়েজ নভো এয়ারে ঢাকায় যায়। দুপুর পৌনে ১টার দিকে ইউএস-বাংলার (ফ্লাইট বিএস ২১১) ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা হয়  নেপালের উদ্দেশ্যে। সে বিমানের সর্বশেষ আসনে ছিল। নেপালের স্থানীয় সময় বেলা ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডুতে নামার সময় পাইলট নিয়ন্ত্রণ হারালে বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়। বিমানে উড্ডয়নের আগে তার ফেসবুক আইডি থেকে বেশ কয়েকটি ছবি আপলোড করে যা তার বন্ধুরা দুর্ঘটনার পর পরই ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। 
দ্বীপ জানান, ঘটনার পর থেকে আলিফের সঙ্গে তারা কোন যোগাযোগ করতে পারেননি। দুর্ঘটনায় তার ভাগ্যে ঠিক কি ঘটেছে- সেটিও তার পরিবারের সদস্যরা ধারণা করতে পারছেন না।
এদিকে, ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আলিফদের আইচগাতির বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশিসহ উৎসুক জনতার ভিড় জমে গেছে। তার বাড়িতে এসে আলিফের খবর জানার চেষ্টা করছেন। তবে, পরিবারের সদস্যরা অনেকটাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও শোকাহত হয়ে পড়েছেন।
আলিফের বড় ভাই আশিকুজ্জামান হামিম ও ছোট ভাই ইয়াসিন আরাফাত বলেন, তারা তাদের ভাইয়ের সঠিক কোন তথ্যই এখনও পাননি। যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। এর বেশি কিছু বলতে পারেননি তারা।
আলিফের অপর আত্মীয় স্থানীয় আইচগাতি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী খান জুলু বলেন, তিনি খবর পেয়ে আলিফদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে শোক বিরাজ করছে। পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দেয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

বিধ্বস্ত বিমানের যাত্রী ছিলেন সাংবাদিক ফয়সাল

নেপালে ঢাকা-কাঠমাণ্ডু রুটে ইউএস-বাংলার বিধ্বস্ত উড়োজাহাজে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বৈশাখীর স্টাফ রিপোর্টার ফয়সাল আহমেদ ছিলেন। ফ্লাইটের যাত্রীদের তালিকা থেকেই এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বৈশাখী কর্তৃপক্ষ। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানেন না তার সহকর্মীরা। ঢাকাসহ কাঠমন্ডুতে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বলে জানান বৈশাখি টেলিভিশনের এ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মিঠুন মোস্তাফিজ। মানবজমিনকে তিনি বলেন, তার পাসপোর্ট ও টিকেটের মিল পাওয়া গেছে। অফিসিয়ালি তিন ছুটিতে আছেন। আমরা সব ধরনের চেষ্টা করছি তার সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য। তিনি জানান, দূর্ঘটনার পর পরই তার সামাজিক যোগযোগ মাধ্যম ফেসবুক বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ফয়সাল আহমেদ বৈশাখী’র হয়ে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ বিটের সংবাদ কভার করতেন। ফয়সালের গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুরের ডামুড্যা। বাবা-মা দুজনেই গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরপেক্ষ থাকবে বেইজিং : প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন রাষ্ট্রদূত

রোহিঙ্গা সংকটে বেইজিংয়ের অবস্থান সংক্রান্ত প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন ঢাকায় নব নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং ঝু। গতকাল বিকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে প্রথম সৌজন্য সাক্ষাতের পর উপস্থিত সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জানতে চান। রাষ্ট্রদূত প্রশ্নে জবাব না দিয়ে বলেন, সব জিজ্ঞাসার জবাব দিবেন আগামী ২১শে মার্চ। ওই দূতাবাসে তার প্রথম সংবাদ সম্মেলন হবে। এত সব মিডিয়াকে আগাম আমন্ত্রণও জানান দিনি। তবে রাতে এ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে প্রচারিত আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছেÑ রাষ্ট্রদূত প্রতিমন্ত্রীকে জানিয়েছেন মিয়ানমার ও বাংলাদেশ উভয়েই চীনের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী। রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে বেইজিং। আলোচনায় চীনের রাষ্ট্রদূতের কাছে এই সমস্যা সমাধানের জন্য রাজনৈতিক সমর্থন চান শাহরিয়ার আলম। চীনের রাষ্ট্রদূত গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট আব্দুল হামিদের কাছে তার পরিচয়পত্র পেশের মধ্য দিয়ে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যাহত করার জন্য মিয়ানমারের বিভিন্ন পদক্ষেপের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে রাষ্ট্রদূত ঝ্যাং ঝু প্রতিমন্ত্রীকে জানান, চীন মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কাজ করার চেষ্টা করছে। চীনের অর্থায়নে বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বিশেষ করে পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ এবং ঢাকা অঞ্চলে পাওয়ার সিস্টেম নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প দু’টি দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানান। বৈঠক শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের কৌশলগত অংশীদারিত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সিঙ্গাপুর-বাংলাদেশ ২ সমঝোতা সই

সরকারি-বেসরকারী অংশীদারিত্ব এবং বিমান চলাচলে সহযোগিতায় সিঙ্গাপুরের সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বাংলাদেশ। আজ সোমবার দুপুরে সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট ভবন ইস্তানায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের উপস্থিতিতে সমঝোতা দুটি স্বাক্ষর হয়।
বিমান চলাচল বিষয়ে দুই সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশে বেসরকারি বিমান চলাচল ও পর্যটন সচিব এসএম গোলাম ফারুক এবং সিঙ্গাপুরের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি লোহ নাই সেং। অন্যদিকে, সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারিত্বের প্রকল্পে সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আফসর এইচ উদ্দিন এবং সিঙ্গাপুরের ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজের সহকারী প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ট্যান সুন কিম।
সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে রোববার দেশটিতে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ সকালে প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট ভবন ইস্তানায় পৌঁছালে লি সিয়েন লুং তাকে স্বাগত জানান।
চার দিনের সফর শেষে ১৪ই মার্চ দেশে ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পশ্চিমাদের সমালোচনায় চীনা মিডিয়া

আজীবন প্রেসিডেন্ট হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের যারা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সমালোচনা করেছেন তাদেরকে এক হাত নিয়েছে চীনা মিডিয়া। চীনের প্রায় সব পত্রিকাই এমন সমালোচনাকে লজ্জাজনক ও বিদ্বেষপরায়ণতা বলে আখ্যায়িত করেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান। রোববার চীনের সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের জন্য নির্ধারিত সময়সীমার মেয়াদ বাতিল করা হয়। এর ফলে আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকার বৈধতা পান শি জিনপিং। সংবিধান সংশোধন করে এভাবে এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সমালোচনা উঠেছে পশ্চিমা দুনিয়ায়। তাদের বিষয়ে চীনের পত্রিকাগুলো বলছে, ওই সব পশ্চিমা সমালোচক নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। তাদের এমন দৃষ্টিভঙ্গি লজ্জাজনক। রোববারের একদিন পরে অর্থাৎ সোমবার এসব পশ্চিমা বা বিদেশী সমালোচকের কড়া সমালোচনা করেছে চীনের পত্রিকাগুলো। চীনের ইংরেজি ভাষার পত্রিকা চায়না ডেইলি তার সম্পাদকীয়তে লিখেছেন, চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলা পশ্চিমাদের এরই মধ্যে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যখনই চীন প্রসঙ্গ আসে তখনই তারা ঘোলা চশমায় তাকান সেদিকে। রাষ্ট্র পরিচালিত, বেইজিংয়ের আন্তর্জাতিক এক মুখপত্রে দাবি করা হয়েছে, বেশির ভাগ নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক মনে করেন প্রেসিডেন্টের সীমাবদ্ধ মেয়াদ বাতিল করার অর্থ এই নয় যে, কোন নেতা আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকবেন। এতে বলা হয়, এক্ষেত্রে পশ্চিমা কিছু মানুষ বিষয়টাকে দেখে অন্যভাবে। তারা চীনের বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করে। তারা নিচু মনোভাব পোষণ করে। তারা চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিদ্বেষমুলক মনোভাব পোষণ করে। এটা তাদের আদর্শগত অযৌক্তিক, আত্মবাদী ও অপেশাদারসুলভ আচরণ। মিথ্যা কথা বলার কারণে তাদের অনুশোচনা হয় না। তাই এসব নিয়ে এত নির্লজ্জভাবে কথা বলে। কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত পত্রিকা দ্য গ্লোবাল টাইমস পশ্চিমা সমালোচকদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। বলেছে, তারা চীনকে অযাচিত পরামর্শ দিয়ে পশ্চাৎধাবনে পছন্দ করেন। দ্য গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, আমরা বেশি বেশি আত্মবিশ্বাসী। দৃঢ় নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা থাকার ভিতরেই চীনের মূল পথ লুকিয়ে আছে। দলের কেন্দ্রীয় অংশে যারা থাকবেন তাদের সঙ্গে মূল স্থানে থাকবেন শি জিনপিং।
উল্লেখ্য, রোববার বিকালে ভোটের মাধ্যমে বেইজিং শি জিনপিংকে চীনের আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকার বৈধতা দেয়। ওই ভোটে দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের হয়ে সংবিধান সংশোধনের পক্ষে ভোট দেন ২৯৬৪ জন ডেলিগেট। এতে দেশের নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল না। ওই ভোটের মাধ্যমে শি জিনপিংয়ের প্রতি প্রায় সর্বসম্মত সমর্থন দেয়া হয়। ভোটের পর একজন আইন প্রণেতা শেণ চুনাও এর পক্ষে সমর্থন প্রকাশ করেন। এই ভোটের মাধ্যমে চীন এক ব্যক্তির শাসনে যাচ্ছে। এতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে পড়বেÑ এমন সমালোচনাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন শেন চুনিয়াও। তবে পশ্চিমা বিশ্লেষকরা মনে করছেন শি জিনপিংকে এত বিশাল ক্ষমতা দেয়া হলো চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মৃত্যু। এর মধ্য দিয়ে সমন্বিত নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে দেশ পরিচালিত হওয়ার সুযোগের ইতি ঘটেছে। আর চীন পরিচালিত হবে এক ব্যক্তির শাসনে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের উপ সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও চীনা এক বিশেষজ্ঞ সুসান শিরক বলেছেন, শি জিনপিংয়ের অধীনে চীন উল্টোপথে যাত্রা করেছে। সেখানে ফিরে এসেছে ব্যক্তির শাসন।

দাবি আদায়ে মুম্বইয়ে সমবেত ৩০ হাজার কৃষক

ঋণ মওকুফ ও উৎপাদিত ফসলের বেশি দাম পাওয়ার দাবিতে ১৬৭ কিলোমিটার (১০৩ মাইল) পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বইয়ে সমবেত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ হাজার কৃষক। তারা নাশিক থেকে যাত্রা করে পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেছেন সেখানে। এর মধ্যে রয়েছে শিশু, নারী ও বয়স্করাও। তাদের দাবি, গত বছর সরকার ঋণ মওকুফ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয় নি। তবে মহরাষ্ট্রের রাজ্য সরকার বলেছে, তারা কৃষকদের এই বিক্ষোভ শেষে আলোচনায় বসতে চায়। অন্যদিকে কৃষকদের দাবি, তারা অধিক হারে ফসল ফলান। কিন্তু তাদেরকে একপেশে করে রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, নাশিক থেকে টানা ছয়দিন পায়ে হেঁটে এসব কৃষক মুম্বইয়ের আজাদ ময়দানে সমবেত হন। তবে তাতে স্কুলগামী ছেলেমেয়ে বা অফিসগামী কোনো মানুষের কোনো অসুবিধা হয় নি। শিক্ষার্থীদের যাতে স্কুলে যাওয়া আসায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, অফিসগামী মানুষের যাতে কোনো বিপত্তি না ঘটে, এ জন্য সোমবার দিনের একেবারে প্রথম প্রহরে তারা ওই ময়দানে গিয়ে পৌঁছে। সেখানে কৃষকরা দাবি তুলেছে, তারা যে ফসল ফলায় তার উৎপাদন খরচের কমপক্ষে দেড়গুন দাম দিতে হবে। উপজাতি সম্প্রদায়ের কৃষকদের যাতে নিজস্ব জমি থাকে তা অনুমোদন দেয়ারও দাবি তোলা হয়েছে। কারণ, তাদের অনেকেই চাষবাস করেন বনের ভিতর। এসব দাবি যতক্ষণ পর্যন্ত মেনে নেয়া না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ওই ময়দানের ভিতরে তাঁবু টানিয়ে অবস্থান নেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজয় জাভানধিয়া নামের একজন কৃষক। তিনি বিবিসিকে বলেছেন, কৃষি খাতে আয় দ্রুততার সঙ্গে নি¤œমুখী হয়েছে ভারতে। দিনের পর দিন কটন, শস্য ও ডালের দান কমে যাচ্ছে। এ জন্যই গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে অর্থ। নাশিকের ৬৫ বছর বয়সী কৃষক নারী সুখুবাই। তিনি বলেন, আমাদের জমি চাই। এটাই হলো আমাদের প্রধান দাবি। এই দাবিকে সামনে রেখে এত দীর্ঘ পথ হাঁটতে হাঁটতে আমার পায়ে ক্ষত হয়ে গেছে। তবুও দাবি না মেটা পর্যন্ত আমি প্রতিবাদ জানিয়ে যাবো। এই কৃষি বিক্ষোভের অন্যতম সংগঠক ধর্মরাজ শিন্ডে। তিনি বলেন, আমরা লড়াই করছি আমাদের ভূমির জন্য। আমাদেরকে জমির মালিকানা দিতে হবে। কারণ, উপজাতি হিসেবে এটা আমাদের অধিকার। কয়েক দশক ধরে কৃষকদের বিভিন্ন আন্দোলন নিয়ে রিপোর্ট করছেন সাংবাদিক পি সাইনাথ। তিনি বলেছেন, কৃষকদের এই দাবি অবশ্যই সরকারকে মানতে হবে। একবার চিন্তা করুন এই গরম আবহাওয়ায় নাশিক থেকে মুম্বই পর্যন্ত পথ কিভাবে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়া নারীরাও তাদের বন ও জমির অধিকারের জন্য পথে নেমেছেন। একবার বিবেচনা করুন কত কঠিন অবস্থা পাড়ি দিয়ে উপজাতির এসব মানুষ এত পথ পাড়ি দিয়েছে। এসব মানুষ টানা পাঁচদিন তাদের কাজ থেকে বিরত রয়েছেন।

অল্পতেই অনেক খুশি তমা

অনেকদিন ধরেই চলচ্চিত্রে কাজ করছেন চিত্রনায়িকা তমা মির্জা। অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কারও জিতেছেন। কাজ না থাকলে বন্ধুদের নিয়ে ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। বর্তমানে তার হাতে বেশকিছু ছবির কাজ রয়েছে। তবে প্রশ্নটা হচ্ছে বড় বাজেটের ছবিতে তাকে তেমন দর্শক দেখতে পাচ্ছেন না কেন? এর উত্তরে তমা মানবজমিনকে বলেন, ছবির গল্প এবং মেকিংটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি আমি। বাজেট কম বা বেশি এসব নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। যেভাবে আছি এবং যা করছি তাতেই আমি খুশি। বলা যায়, অল্পতেই অনেক খুশি আমি। ভালো গল্পের ছবিতে আমি কাজ করার চেষ্টা করছি। এই যেমন আসছে এপ্রিলে ‘কাঠগড়ায় শরৎচন্দ্র’ নামে একটি ছবির কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাস নিয়ে ছবিটি নির্মাণ করবেন পরিচালক। এখানে আমার চরিত্রের নাম থাকছে অচলা। আমার বিশ্বাস, ছবিটি দর্শক পছন্দ করবেন। এ ছবিতে তমা মির্জার বিপরীতে অভিনয় করবেন নিরব। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকায় এ ছবিতে অভিনয় করবেন গাজী রাকায়েত। ছবিটি পরিচালনা করবেন তরুণ নির্মাতা আরিফুর জামান আরিফ। ইভেন্ট প্লাসের প্রযোজনায় এ ছবিতে আরো বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করবেন ফেরদৌস, পপি, আনিসুর রহমান মিলন, প্রকৃতি প্রমুখ। এ ছবির বাইরে গত মাসে আইফ্লিক্সের জন্য একটি ওয়েব সিরিজে অভিনয় করছেন তমা। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে করা এই ওয়েব সিরিজের নাম ছিল ‘বেটার হাফ’। আর বি প্রীতমের পরিচালনায় এখানে তার বিপরীতে অভিনয় করেন বায়েজীদ। এটা প্রচারের পর বেশ সাড়া পেয়েছেন বলে জানান তমা। সামনে আরো কয়েকটি ওয়েব সিরিজে তাকে দেখতে পাবেন দর্শক।

হাতিরঝিলে মধ্যরাতে প্রেম by মারুফ কিবরিয়া

মধ্যরাত। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১টা ৩৫ মিনিট। হাতিরঝিলেও সুনসান নীরবতা। দিনের ব্যস্ততা শেষে কাজপাগল মানুষগুলো নিজ ঠিকানায় আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু তখনও কেউ কেউ একটু সুখ খুঁজে পেতে বেরিয়ে পড়ে রাজপথে। মনের খোরাক জোগায়। কেউবা প্রেমিকের হাত ধরে রাতের আকাশ দেখে। এমনই একাধিক মধ্যরাতের প্রেমিকযুগল একান্তে সময় কাটাতে এসেছেন হাতিরঝিলে। তাদেরই একজন সাদা এপ্রোন পরিহিত এক তরুণী। সঙ্গে তার তরুণ প্রেমিক। দুজনই একই মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। সারাদিনের ব্যস্ততা ও লেখাপড়ার কারণে সময় হয় না একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর। তাই রাতকেই বেছে নেন একে অন্যের জন্য। এ সময়ে ভাববিনিময় করেন। মনের জমানো কথা মুখের ভাষায় প্রকাশ করেন। আধ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তারা ভাব বিনিময়ের পর ফের একসঙ্গে ফিরে যান গন্তব্যে। বলেন, ব্যস্ত রাজধানীতে কোথায় যাব বলুন? এ ছাড়া মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা কয়টা আছে ঢাকায়?
সত্যিইতো মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ানোর হাতেগোনা ক’টি জায়গার মধ্যে হাতিরঝিল অন্যতম। যেমন আসে পরিবারের সবাই একটু নিশ্বাস নিতে, তেমনি এখানে আসে প্রেমিক প্রেমিকারাও। তবে বিকালের হাতিরঝিল যেমন হয়ে উঠে প্রাণবন্ত, কপোত-কপোতীদের পদচারণায় মুখরিত। হয়ে উঠে প্রেম-বিরহ আর মিলন এমনকি হাসি আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু। আর তাই নগরবাসীর অনেকে এখন হাতিরঝিলকে ‘ডেটিং স্পট’ বলে আখ্যা দেন। দিনের শুরু থেকে সন্ধ্যা এমনকি রাত ১১টা পর্যন্ত যারা চলাচল করেন তাদের চোখেই পড়ে কপোত-কপোতীদের মিলনমেলা। কিন্তু গভীর রাতেও যে কোনো কোনো প্রেমিকযুগল হাতিরঝিলকে বেছে নেন প্রেমকুঞ্জ হিসাবে এটা অনেকেরই অজানা।
মধ্যরাতে আড্ডায় মেতে উঠা সেই তরুণ-তরুণীর নাম সানি ও অধরা। দুজই রাজধানীর একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থী। তারা জানান, সারাদিন কাজ আর পড়াশোনার ব্যস্ততায় একান্তে কেউ কাউকে সময় দিতে পারেন না। তাই প্রায়ই রাতে বের হয়ে পড়েন ভালোবাসার টানে। আড্ডা হাসিতে মেতে থাকেন পরস্পর। সানি-অধরার কথা, রাতের শহরটা  নীরব থাকে। বিশেষত হাতিরঝিলেই তারা বেশি স্বস্তিবোধ করেন। সানি বলেন, আমরা পরস্পরকে ভালোবাসি তিন বছর ধরে। পরিবার থেকেও আমাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছে। পড়া শেষ হলেই বিয়ে। বিয়ের পর সংসার জীবনে গিয়ে জানি অনেক ব্যস্ত হয়ে পড়বো। নিজেদের জন্য আলাদা সময় বের করলেও তা অনেকটা কঠিন হয়ে যাবে। তাই রোমান্সের সঠিক সময় এটাকেই ধরে নিয়েছি। মাঝে মাঝে যখন সময় পাই দুজন বেরিয়ে পড়ি। নিজেদের জমানো গল্পগুলো শেয়ার করি। অধরা বলেন, বাসা থেকে বের হতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। তবুও যখন প্রেমের বিষয়টা মেনে নিয়েছে তাই সামান্য বেগ পেলেও বেরিয়ে আসি। জমে থাকা কথাগুলো একে অপরের সঙ্গে শেয়ার হয়। বেশ ভালো সময়ই কাটে।
হাতিরঝিলের কুনিপাড়া সংলগ্ন ব্রিজে গিয়ে দেখা যায় মনির ও সূচনা নামের আরেক যুগল। তারা এসেছেন উত্তরা থেকে। পেশায় দুজনই চাকরিজীবী। সন্ধ্যায়ও কারো সঙ্গে কেউ দেখা করতে পারেন না। তাই রাতেই হাতিরঝিলে আসেন নিজের গাড়িতে করে। মনির বলেন, আমরা শিগগিরই বিয়ে করতে যাচ্ছি। বিশেষ করে সময় মেলে না ব্যস্ততার কারণে। রাতে ফ্রি থাকি। ওই সময়টায় ভালোবাসার মানুষটিকে সময় দিই। তাছাড়া হাতিরঝিলের এই পরিবেশটা রাতেই উপভোগ্য। সূচনা বলেন, এটা সত্যি যে প্রেম মানে না বাধা। আর এই তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে মনিরের সঙ্গে সম্পর্ক তিন বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছি। রাতে বের হওয়া খানিকটা সমস্যা হলেও ওর ডাকে আমি চলে আসি। দারুণ কিছু সময় ওর সঙ্গে কাটাতে পারি। তাছাড়া হাতিরঝিলের এই জায়গাটি রাতের জন্যই বেস্ট বলে আমার মনে হয়। তবে রাতের ঢাকা তাদের জন্য কতটা নিরাপদ? দুই প্রেমিক যুগলের কাছে করা প্রশ্নের উত্তরে তারা জানান, হাতিরঝিলে দিনে যেমন কোনো সমস্যা নেই রাতটাও নিরাপদ। হাতিরঝিলের নিরাপত্তাকর্মীদের অবস্থানের পাশাপাশি অত্র অঞ্চলের পুলিশ সদস্যরাও কিছু সময় পরপরই টহল দেয়। সফিক নামের হাতিরঝিলের এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, আমাদের একাধিক নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্বে থাকেন। এখানে রাত ১২টার পরও মানুষের আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের আড্ডা জমে। কোনো ঝামেলা হয় না। আমাদের সঙ্গে আশপাশের থানা থেকে পুলিশ সদস্যরাও টহল দেন। তাই নিরাপত্তার বিষয়টি জোরদারই বলা যায়।

নেপালে বাংলাদেশী বিমান বিধ্বস্ত: নিহত ৩৮, আহত ২৩

ঢাকা থেকে নেপালের কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে কমপক্ষে ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। বিমানে যাত্রী ও ক্রু সহ আরোহী ছিলেন মোট ৭১ জন। বার্তা সংস্থা এপির নিহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছে। মর্মান্তিক এই দূর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ২৩ জন। বাকিদের কি অবস্থা তা এখনও জানা যায় নি।
আহতদের উদ্ধার করে নেয়া হয়েছে কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ, টিচিং হাসপাতালে। সেখানে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাতজনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। কাঠমান্ডু টাইমসকে এ কথা জানিয়েছেন ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মুখপাত্র প্রেম নাথ ঠাকুর। উদ্ধার অভিযানে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনী। দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬৭ জন যাত্রী নিয়ে বিমানটি নেপালের উদ্দেশে ছেড়ে যায় বলে ইউএস বাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় হতাহতের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। রানওয়েতে অবতরনের সময় ছিটকে পরে একটি ফুটবল মাঠে বিধ্বস্ত হয় বিমানটি। স্থানীয় সময় বিকাল ২টা ২০ মিনিটে এ ঘটনা ঘটে। হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখনও উদ্ধার তৎপরতা চলছে।
বিবিসির নেপালি সার্ভিস জানাচ্ছে, বিমানটি কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ডিং করার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। নেপাল পুলিশের মুখপাত্র মনোজ নেউপানে বিবিসি নিউজ নেপালিকে জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়েছে।
ইউএস বাংলার মুখপাত্র কামরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তারা বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পেয়েছেন। তবে, কি কারণে দূঘর্টনা ঘটেছে, কতজন হতাহত হয়েছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোন তথ্য তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেন নি। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজ কুমার ছেত্রি জানিয়েছেন, আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে দমকল কর্মীরা। বিমান বন্দরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমান থেকে ধোয়া বেরুতে এবং তাড়াহুড়া করে যাত্রীদের বিমান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছেন তারা। যাত্রীদের কয়েকজন আহত হয়েছেন। সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে দেখা যাচ্ছে কাঠমুন্ডু বিমানবন্দর থেকে ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠছে। ইউএস বাংলার মোট আটটি বিমান আছে। এর মধ্যে চারটি ড্যাশ এইট, চারটি বোয়িং। এর মধ্যে একটি ড্যাশ এইট নষ্ট থাকার কারণে কিছুদিন যাবত হ্যাঙ্গারে পড়ে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন গন্তব্য ছাড়াও কলকাতা, কাঠমান্ডু, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, দোহা এবং মাসকট রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে ইউএস বাংলা। এছাড়া এপ্রিলে চীনের গুয়াংঝু শহরে ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।

জিনপিং আজীবন প্রেসিডেন্ট

যত দিন খুশি চীন শাসন করবেন শি জিনপিং। সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের নিয়ম উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে কার্যত জিনপিং এখন আজীবনের জন্য দেশটির প্রেসিডেন্ট। রোববার চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে    প্রেসিডেন্টের মেয়াদ সংক্রান্ত ধারা তুলে দেয়ার পক্ষে ভোট দেয়। মোট ২৯৬৪টি ভোটের মধ্যে দু’জন এর বিরুদ্ধে ভোট দেন। ভোট প্রদানে বিরত থাকেন তিন জন। বিলুপ্ত হয় ৯০ এর দশক থেকে চলে আসা প্রেসিডেন্ট পদে দুই মেয়াদের সীমাবদ্ধতা। ফলে আরো সংহত হয় জিনপিংয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য।
২০২৩ সালে শি জিনপিংয়ের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়া কথা ছিল। গেল অক্টোবরে কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসে নিয়মমাফিক দলের সম্ভাব্য উত্তরসূরি নির্বাচন থেকে বিরত থাকেন তিনি। বরং নিজের ক্ষমতাকে আরো সুসংহত করেন। কমিউনিস্ট পার্টি শি জিনপিংয়ের নাম ও তার রাজনৈতিক আদর্শ দলের সংবিধানে স্থায়ী করার পক্ষে ভোট দেয়। জিনপিং উন্নীত হন দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের সমমর্যাদায়।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাগজে কলমে চীনের সবথেকে ক্ষমতাধর আইনসভা হলো কংগ্রেস। অনেকটা অন্যদেশের পার্লামেন্টের মতো। তবে, ধারণা করা হয়, ক্ষমতার ধারক-বাহকরা যা বলবেন সেটাই এখানে অনুমোদন পায়। 
গতকাল চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেয়ার পর বিবিসির চীন প্রতিনিধি স্টিফেন ম্যাকডনেল তার বিশ্লেষণে লিখেছেন, ‘শি জিনপিংকে কোনোভাবে চ্যালেঞ্জ করার কোনো সুযোগ আর দেখা যাচ্ছে না। দলের চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের পর অন্য কাউকে আর এমনভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে দেখা যায় নি। পাঁচ বছর আগেও সমষ্টিগত নেতৃত্বে শাসিত হতো বেইজিং। সাবেক প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও এর অধীনে তৎকালীন নয় সদস্যের পলিটব্যুরো স্টান্ডিং কমিটিতে আপনি ভিন্নমত প্রকাশের কথাও ভাবতে পারতেন। এমন একটা ধারণা ছিল যে, মি. হুকে কমিউনিস্ট পার্টির নানা অংশকে তুষ্ট করে চলতে হতো। মনে করা হয়েছিল, প্রতি দশ বছর অন্তর নিজস্ব লোকজন নিয়ে একজন নতুন নেতা আসবেন। আর ক্ষমতার পালাবদলটা থাকবে মসৃণ। কিন্তু আজ থেকে সেসব কিছু বিলুপ্ত হলো। সংবিধান পাল্টে শি জিনপিংকে দুই মেয়াদের সীমা পেরিয়ে প্রেসিডেন্ট থাকার সুযোগ করে দেয়া হলো।’ 
স্টিফেন ম্যাকডনেল আরো বলেছেন, ‘একজন নেতাকে তার ইচ্ছামতো যতদিন খুশি ক্ষমতায় থাকতে দেয়া উচিত কিনা তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোনো  বিতর্কও হয় নি। নীরবে তবে নিশ্চিতভাবেই শি জিনপিং তার দেশ পরিচালিত হওয়ার ধারাকে পাল্টে দিয়েছেন। আর সে নতুন ধারার একেবারে কেন্দ্রে রয়েছেন তিনি।’ 
ক্ষমতা স্থায়ী করার এই ইস্যু নিয়ে একেবারে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয় নি তাও নয়। চীনের অনলাইন সেন্সরগুলো এ বিষয়ের আলোচনা ব্লক করছে। চীনা সরকারের এক সমালোচক গেল মাসে এক খোলা চিঠিতে ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোকে প্রহসন বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমন ভিন্নমত প্রকাশ বিরল আখ্যা পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সাবেক সম্পাদক লি ডাটং লিখেছেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ বিলুপ্ত করাটা হবে নৈরাজ্যের বীজ বপনের শামিল। বিবিসি চাইনিজতে তিনি বলেছেন, ‘আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আমার বন্ধু, সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করছিলাম। আমরা এতে ক্ষুব্ধ। আমাদের অবশ্যই আমাদের বিরোধী মত প্রকাশ করতে হবে।’
তবে, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই পরিবর্তনকে অতিপ্রয়োজনীয় এক সংস্কার হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে।
শি জিনপিং চীনের প্রেসিডেন্ট হন ২০১২ সালে। ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই নিজের ক্ষমতাকে আরো সুসংহত করতে থাকেন। অন্যদিকে মনোযোগ দেন আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের অবস্থানকে সুদৃঢ় করার। দেশের ভেতর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান তিনি। শাস্তি দেন দলের ১০ লক্ষাধিক সদস্যকে। এতে করে জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠতে থাকে তার। পাশপাশি, অবশ্য ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপরও হস্তক্ষেপ জোরদার করেন তিনি। রাষ্ট্রীয় নজরদারি, সেন্সরশিপ কার্যক্রম জোরালো করে তোলেন। সমালোচকরা এও বলে থাকেন, মি. শি দুর্নীতি বিরোধী অভিযান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও ব্যবহার করেছেন।

যৌন নিপীড়ন: দায়মুক্ত পাপ! by মরিয়ম চম্পা

লালমাটিয়া কলেজের এক শিক্ষার্থী। তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। কাজ শেষে হোস্টেলে ফিরতে প্রায়ই রাত ১০টা বেজে যায়। রাতে ফেরার পথে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের মুখোমুখি হতে  হয় তাকে। কখনো অশ্লীল বাক্য। কখনো বা বাজে স্পর্শ। এভাবে সারা দেশে প্রতিদিনই প্রকাশ্যে এ ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে। কিন্তু আইনি দুর্বলতার কারণে এ ধরনের ঘটনার বিচার হচ্ছে না। এ যেন পরিণত হয়েছে দায়মুক্ত পাপে।
ব্র্যাকের সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে গণপরিবহনে যাতায়াত করার সময় ৯৪ শতাংশ নারী বিভিন্ন সময় মৌখিক, শারীরিক বা অন্য কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষের মাধ্যমে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বেশি। ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে জুন- এই তিন মাস গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রায় ৪১৫ জন নারীর অংশগ্রহণে এই গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে নারীদের সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবহারের  দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি দাবি করেছে, গণপরিবহনে গত ১৩ মাসে ২১ নারী ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এরমধ্যে গণধর্ষণের ঘটনা ৯টি, ধর্ষণের ঘটনা ৮টি, শ্লীলতাহানির ৪টি ঘটনা ঘটেছে। এইসব ঘটনায় ৫৫ আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পর্যবেক্ষণ মতে, ২০১৭ সালের ২১শে জানুয়ারি রাজধানীর দারুসসালামে চলন্ত বাসে যৌন হয়রানির অভিযোগে গাবতলী-নবীনগর রুটের বাসচালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে দারুসসালাম থানায় মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। একই বছরের ১৩ই মার্চ ইজিবাইকে করে চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে আলমডাঙ্গায় ফিরছিলেন এক স্কুলছাত্রী। ইজিবাইকের ভাড়া মেটাতে না পারার কারণে চালক তাকে ফাঁদে ফেলে আরো তিনজন সহ গণধর্ষণ করে। একই বছরের ৮ই আগস্ট রাজধানীর বনানীতে এক তরুণীকে প্রাইভেট কারে তুলে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা চালিয়েছে ইমরান হোসেন নামের এক ব্যক্তি। এই ঘটনায় ইমরানকে গ্রেপ্তার ও গাড়িটি জব্দ করেছে পুলিশ।
মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী এসব প্রসঙ্গে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখে আসছি দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা বিভিন্নভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নানা সময়ে তারা আমাদের কাছে আসতেন। হয়রানি ও ভোগান্তির অনুভূতি ভাগাভাগি করতেন। শিক্ষার্থী ছাড়াও চিকিৎসক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ কর্মক্ষেত্রের নারীরাও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। কেউ কেউ সাহস করে অভিযোগ নিয়ে তারা আমাদের কাছে আসলেও আদালত পর্যন্ত যেতে না চাওয়ায় আমরা বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও কিছুই করতে পারি না। এছাড়া সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে ভুক্তভোগীরা পুলিশের শরণাপন্ন হতে ভয় পান। ঘটনা নিয়ে সামনে আসতে চান না। একই সঙ্গে নারীদের হয়রানি করা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির বিধান থাকলেও নেই আইনের সঠিক প্রয়োগ। এক্ষেত্রে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বন্ধ করতে হলে সরকারকে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, শুধুমাত্র আইন বা বিচারের মাধ্যমে এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে অপরাধের ধরন অনুযায়ী অভিযুক্তদের কাউকে ধমক দিয়ে, কাউকে মোবাইল কোর্টের আওতায় এনে অর্থাৎ যে যতটা অপরাধ করবে তাকে সেই পরিমাণ শাস্তি দেয়া হবে। এখানে আমি বলবো, আইন হবে, এর প্রয়োগও থাকবে। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকতে হবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, চারিত্রিক নৈতিকতা। কেউ যেন সুযোগ সন্ধানী না হয়, আবার আইনের অপব্যবহার না করে, সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি তা আশা করবে।
আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী এলিনা খান বলেন, সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো সঠিক আইন প্রণয়ন। পেনাল কোডের ৩৫৪ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ১ বছর থেকে শুরু করে দুই থেকে তিন বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কারণে আইনের সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা আত্মসম্মানের ভয়ে আদালতের মুখোমুখি হতে চান না। এছাড়া অভিযোগ করার পর বিভিন্ন কারণে বিচার কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় বিচারের ফলাফলের প্রতি আস্থা হারিয়ে নতুন করে আদালতমুখো হতে চায় না ভুক্তভোগী নারীরা।
একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বর্ষবরণে উপস্থিত কয়েকজন নারী যৌন হয়রানির শিকার হন। এ ঘটনার মামলায় আট আসামিকে শনাক্ত করেছিল পুলিশ। পরে শনাক্তকৃত আট আসামির মধ্যে একজন আটক হলে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে মামলাটি পুনঃতদন্তের আবেদন করা হয়। শুধুমাত্র পহেলা বৈশাখের এ ঘটনাটিই নয় গণপরিসরে নারীদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে বাংলাদেশে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন না থাকায় কোনো ঘটনার বিচার সুষ্ঠুভাবে হয় না। তবে বিদ্যমান আইনে কিছু বিধান থাকলেও নেই তার প্রয়োগ। দীর্ঘ সময় পার হলেও এসব যৌন হয়রানির মামলাগুলোর বিচার ঝুলে থাকে বছরের পর বছর। অভাব আছে সচেতনতারও। ফলে গণপরিসরে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হলে আইনিভাবে তার প্রতিকার খুবই কম পান তারা।
ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, অন্যদিকে দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় কথা বা আচরণের মাধ্যমে যৌন হয়রানির সাজার বিধান দেয়া হয়েছে। ১৮৬০ সালে প্রণিত এই আইনে গত ১৫৭ বছরে মাত্র একটি মামলা হওয়ার কথা জানা যায়। অথচ এমন যৌন হয়রানির ঘটনা হরহামেশা ঘটছে এবং এর মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। আবার দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ধারা-৫৯০ কে মোবাইল কোর্ট আইন ২০০৯ এর শিডিউলে যোগ করা হয়েছে। এই বিচারিক পদ্ধতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য কোনো আইনজীবী নিয়োগের এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো সুযোগ নেই। যা অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘন করে। ‘সংবিধানের ২৮, ২৯, ৩২, ৩৬ ধারায় নারীর চিন্তা, কাজ, চলাফেরায় স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের আইনগুলো সেই সুরক্ষা দেয়নি। এটি আমাদের পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার খারাপ পরিস্থিতি।
জাতীয় আইন কমিশনের কর্মকর্তা ফারজানা হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের নারীদের সহিষ্ণুতার মাত্রা অনেক। যুগোপযোগী আইন না থাকায় নারীরা খারাপ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জনপরিসরে সহিংসতা ঠেকাতে সুনির্দিষ্ট আইনের দরকার। দরকার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার। ‘আইন প্রয়োগের বিষয়টি আমাদের দেশে এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। এজন্য সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রুজ্ঞান কেন by এমাজউদ্দীন আহমদ

দেশে নানারকম অনিয়ম, দুর্নীতি যে হচ্ছে গণমাধ্যমে প্রকাশিত-প্রচারিত সংবাদে এর প্রতিফলন ঘটছে। ব্যাংক ঋণে কেলেঙ্কারি, সরকারি নানা প্রকল্পে অনিয়ম ইত্যাদি তো থেমে নেই। সম্প্রতি খালেদা জিয়ার কারাবন্দি নিয়ে নানা মহলে সঙ্গতই উচ্চকণ্ঠে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ কথা আমি মনে করি যে, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পর্যালোচনা করলে বিএনপি চেয়ারপারসনের জয় হয়েছে। কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রুজ্ঞান করে এমন নির্মমতা দেখানো হয় না। হিংসা-প্রতিহিংসার রাজনীতি রাষ্ট্র ও রাজনীতির চিত্র বিবর্ণ করে, নানামুখী সংকট সৃষ্টি করে। এই সংকট আমাদের জন্যও অমঙ্গল ডেকে আনে। এর ফলে প্রতিপক্ষের ক্ষতির পাশাপাশি গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষতি হয় অপরিসীম এমন চিন্তা কিংবা কর্মকাণ্ড রাষ্ট্র-সমাজ অথবা রাষ্ট্রের নাগরিক সমাজের জন্য বহুমুখী নেতিবাচকতার কারণ হয়েও দাঁড়ায়। সরকারের নীতিনির্ধারকরা গণতন্ত্রের উৎকর্ষ, বিকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে অনেক রকম ইতিবাচক কথা বলছেন বটে; কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান বাস্তবতা কি এর বিপরীত নয়? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রুজ্ঞান করা হবে কেন? যেখানে এমন পরিস্থিতি বিদ্যমান, সেখানে কোন ধরনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে, তা খুব সহজেই অনুমেয়। এমনটি সুস্থ রাজনীতির পরিবেশ ক্রমেই জটিল করে তুলছে। আইনের শাসন, ন্যায়বিচারের আকুতি সত্ত্বেও আমরা এসবের কাঙ্ক্ষিত মাত্রা স্পর্শ করতে পারছি না। প্রতিহিংসার রাজনীতি তো কখনও গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনাপ্রসূত সুস্থ রাজনীতির অংশ হতে পারে না। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যতই এগিয়ে আসছে রাজনৈতিক কূটকৌশল কিংবা প্রতিহিংসার রূপও ততই প্রকট হচ্ছে। প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেমন করা সম্ভব নয়, তেমনি সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের বিষয়টিও থেকে যাবে অনিশ্চিত। এসব ব্যাপারে আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। দলবিহীন, ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং গত জাতীয় নির্বাচনোত্তর যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা আমাদের জন্য মোটেও গৌরবের বিষয় নয়। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কারামুক্তির দাবিতে দলের তরফে যেসব কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে সবই ভণ্ডুল হয়ে যাচ্ছে পুলিশের মারমুখী অবস্থানের কারণে। দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দলটি গণতান্ত্রিক পন্থায় তাদের নেত্রীর কারামুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে কর্মসূচি পালন করতে পারবে না অথচ সরকারের তরফে অহরহ শোনানো হবে গণতন্ত্রের মাহাত্ম্য বাণী, এমনটি কি স্পষ্টতই স্ববিরোধিতা নয়? বিএনপির শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে অহরহ যে অবস্থার মুখোমুখি হচ্ছেন বিএনপির নেতৃবৃন্দ তা কি গণতান্ত্রিক সমাজে কাম্য? পুলিশ যে মারমুখী কায়দায় বাধা দিয়ে তাদের সব কর্মসূচি ভণ্ডুল করে দিচ্ছে তা তো কোনো গণতান্ত্রিক সমাজের চিত্র হতে পারে না। এমতাবস্থায় সঙ্গতই প্রশ্ন দাঁড়ায়, সরকারের কথা ও কাজের মধ্যে মিল কোথায়? এমন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সরকারের বেপরোয়া মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলরা হয়তো নিজ সিদ্ধান্তে কিংবা নিজেদের কষা ছকে এমন বৈরী আচরণ করছেন না। এ ক্ষেত্রে তারা সরকারের নির্দেশই পালন করছেন- এটি খুব সহজ-সরল বিশ্নেষণে প্রতীয়মান হয়। যদি সরকারের নির্দেশ এসব ক্ষেত্রে এমন না থাকে তাহলে সরকার এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি কেন? যদি সরকার এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত তাহলে প্রতীয়মান হতো, সরকারের কথা ও কাজে মিল রয়েছে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দণ্ডাদেশকে কেন্দ্র করে দলটির নেতারা কোনোরকম হিংসাশ্রয়ী কর্মসূচি দেননি বা দিচ্ছেন না। তারা শান্তিপূর্ণ পন্থায় তাদের নেত্রীর মুক্তির জন্য আন্দোলন করছেন; কিন্তু তাদের রাস্তায় দাঁড়াতেই দেওয়া হচ্ছে না। তারা হরতাল-অবরোধের পথে হাঁটেননি। পরিস্থিতি অরাজক হয়ে উঠুক এমনটি তারা যে কোনোভাবেই চান না এটি তো তাদের প্রদত্ত কর্মসূচির মধ্য দিয়েই স্পষ্ট। বিএনপি জনসমর্থিত বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে অত্যন্ত সাদামাটা ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিস্ময় ও উদ্বেগের বিষয় হলো, এমন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও দলটির নেতাকর্মীরা পালন করতে পারছেন না। এই কর্মসূচিগুলো পালন করতে গিয়ে তারা যে কেবল হামলা ও বাধার মুখেই পড়ছেন তাই নয়, নেতাকর্মীদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা, রীতিনীতির অনুশীলন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক সমাজের কথা অকল্পনীয় এই সত্য অস্বীকারের অবকাশ নেই। সরকারের অনেকেও এমন উচ্চারণ করে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের এ রকম উচ্চারণ আর বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য খতিয়ে দেখতে গভীর দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে কি? বহু ক্ষেত্রেই স্পষ্টভাবে দেখা যায় স্ববিরোধিতা। গণতন্ত্রের অপরিহার্য কিছু শর্ত আছে। পরমতসহিষুষ্ণতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, রুচি, সমঅধিকার ইত্যাদি এর মধ্যে অন্যতম। গণতান্ত্রিক সমাজ কিংবা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইত্যাদির অভাব দেখা দিলে বহুমুখী সংকট দেখা দেয়। আমাদের দেশের রাজনীতি এই সংকটমুক্ত হতে পারছে না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা-আন্তরিকতা-পরিচ্ছন্নতা যদি থাকে তাহলে বৈরিতা এড়িয়ে সৃজনশীল, জনকল্যাণমুখী রাজনীতির পথ প্রশস্ত করা দুরূহ কোনো বিষয় নয়। ক্ষমতাসীনদের তরফে জনকল্যাণ কিংবা সুস্থ রাজনীতি চর্চার অঙ্গীকার ব্যক্ত হলেও কার্যক্ষেত্রে এর প্রতিফলন কতটা লক্ষ্য করা যায়? বিগত কয়েক দশকে বিশ্বে গণতন্ত্রের পদ্ধতিগত অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। আমরাও এর বাইরে নই। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তনের যে কথা উচ্চারিত হয় এর কোনো কিছুই উল্লিখিত বিষয়গুলো ব্যতিরেকে নয়। মূল কথা হলো, সুন্দর মনোভাব নিয়ে ইতিবাচক রাজনীতির বিকাশে কাজ না করলে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। সহমর্মিতা কিংবা প্রতিহিংসাপরায়ণতা থেকেই দেশে রাজনীতিতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে কিংবা হচ্ছে। এ দেশের মানুষ বরাবরই চেয়েছে সভ্য গণতান্ত্রিক সমাজ। নামকাওয়াস্তে সংসদীয় গণতন্ত্র এ দেশের মানুষ চায়নি। সুস্থ রাজনীতির বিকাশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে, তেমনি বর্জন করতে হবে প্রতিহিংসার রাজনীতি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল ও ভিন্ন মতের জন্য অধিকারের সমতল ভূমি করাটা সর্বাংশে জরুরি। বিএনপির নেতাকর্মীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কালো পতাকা প্রদর্শনের কিংবা মানববন্ধনের মধ্যে অহিংস কর্মসূচিও পালন করতে যদি না পারেন তাহলে কী করে বলব যে, আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি? সরকারের কয়েকজন দায়িত্বশীল বিগত কয়েক সপ্তাহে নতুন প্রেক্ষাপটে ইতিমধ্যে বহুবার বলেছেন যে, 'সরকার কারও রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করছে না। সরকার কোনো রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকারে বাধা দিচ্ছে না।' তাদের অনেকেই এ কথাও বলেছেন যে, 'সুষ্ঠু রাজনৈতিক আন্দোলন করলে বরং বিএনপিকে সহযোগিতা করা হবে।' এমন আশ্বাস-প্রতিশ্রুতির পরও কি প্রতিহিংসার চিত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে না? অসংযত ও অসহনশীল বক্তৃতা-বিবৃতি না দিয়ে কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেদিকে সরকারকে সজাগ-সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও গণতন্ত্রের বৃহৎ প্রয়োজনের নিরিখে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে কোনোরকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কিংবা অজুহাত দাঁড় করানো নয় বরং কথা ও কাজে মিল রাখার ক্ষেত্রে পরিচয় দিতে হবে আন্তরিকতা-সদিচ্ছার। বিএনপি যেসব কর্মসূচি দিচ্ছে সেসব কর্মসূচি পালনে জনজীবনে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা মোটেও নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়িত্বশীলদের উচিত, নিরাপত্তা-শৃঙ্খলা বজায় রেখে অধিকার পালনের পথে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা যাতে সৃষ্টি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে সবসময় অনুমতি কিংবা প্রশাসনের অনুমোদনই-বা নিতে হবে কেন? সদাসর্বদা অনুমতির বিষয়টি তো গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়টিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। অবশ্যই প্রত্যাশিত যে, সরকারের দায়িত্বশীলরা বিরোধীপক্ষের নেতাকর্মীদের গণতান্ত্রিক অধিকারের মতো জরুরি বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেবেন। অনুমতি রাজনীতি গণতান্ত্রিক অধিকার নয়, রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক অধিকারের সমতল ভূমি নিশ্চিত করা। হিংসা-প্রতিহিংসা বর্জন করে পরমতসহিষ্ণু হয়ে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে রাজনীতির পথ মসৃণ করতে হবে। জনগণের জন্যই রাজনীতি। রাষ্ট্রের কল্যাণগত এর মধ্য দিয়েই নিশ্চিত করা হয়। নিশ্চয়ই দায়িত্বশীলরা এমন সত্য স্বীকার করবেন না। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে সবার অংশগ্রহণমূলক হয়, এমন পরামর্শ যখন বিভিন্ন মহল থেকে দেওয়া হচ্ছে, তখন সরকারের দিক থেকে কী প্রতিফলিত হচ্ছে? এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের নিরসন ভিন্ন সুস্থ রাজনীতির পথ মসৃণ করা দুরূহ। রাজনীতি ও নির্বাচনের জন্য সমতল ভূমি নিশ্চিত করা না গেলে এর ফল ইতিবাচক হবে কীভাবে?
সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

অলিম্পিক গেম ও দুই কোরিয়ার সম্পর্ক by মোহাম্মদ জমির

দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংচ্যাংয়ে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিক-২০১৮-এ উত্তর কোরিয়ার অংশগ্রহণে বিশ্বের প্রতিক্রিয়া খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। কেউ বিচিত্রময় খেলার আয়োজনে চোখ রেখেছেন আবার কেউ উত্তর কোরিয়ার প্রশাসনের জনসংযোগে ভারসাম্যপূর্ণ তৎপরতাকে সতর্কভাবে বিশ্নেষণ করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার গাংনেয়াং থেকে সিএনএনের সাংবাদিক এমি লুইস দেখিয়েছেন, ঐক্যবদ্ধ কোরিয়ার অংশগ্রহণে হকি দল এটা প্রমাণ করেছে যে, 'জেতাই সবকিছু নয়।' এটা বলা প্রয়োজন, এবার অলিম্পিকে দুই কোরিয়ার ঐক্যবদ্ধ হকি দলের সূচনা হয়েছে। কিন্তু তাদের হার বিশ্বের কাছে এ বার্তা দিয়েছে যে, জয় সর্বদা সবকিছু নয় কিংবা সব শেষও নয়। দুই কোরিয়ার ঐক্যবদ্ধ এ নারী দলের পুনর্মিলনের একটি উপলক্ষ হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সব প্রজন্মের মানুষ উচ্ছ্বসিত হয়ে ঐক্যবদ্ধ কোরীয় উপদ্বীপের পতাকা নাড়িয়েছে। এক বছর আগেও পিয়ংইয়ংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট শত্রুতার পর আবার এই অলিম্পিক কোরীয় উপদ্বীপের দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে এনেছে। কেউ কেউ অবশ্য ২০১৭ সালের শুরুতে এ রকম পরিবর্তনের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন উত্তর কোরিয়ার আলঙ্কারিক রাষ্ট্রপ্রধান কিম ইয়ং ন্যাম ও উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের ছোট বোন কিম ইয়ো জং। ১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর পিয়ংইয়ংয়ের শাসকগোষ্ঠীর কোনো সদস্যের এটাই ছিল প্রথম দক্ষিণ কোরিয়া সফর। যা হোক, কোরিয়ার হকি দল সুইজারল্যান্ডের কাছে হারার পর ম্যাচ শেষে কোরিয়ানরা ঐক্যবদ্ধ দল হিসেবে পরস্পরের সঙ্গে ভাববিনিময় করেছে এবং একত্রে ছবি তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অনেকেই সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেছে- তারা আশা করেছিল, ঐক্যবদ্ধ দল দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কে আরও উন্নয়ন ঘটবে। তারা একে আশা ও শান্তির বার্তা হিসেবে বিবেচনা করে। এই প্রচেষ্টা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে জনহপকিন্স ইউনিভার্সিটির মার্কিন-কোরীয় ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং স্কলার মিচেল ম্যাডেন বলেন, দুই কোরিয়ার ঐক্যবদ্ধ হকি দল কোনো পদক জিততে না পারলেও তারা একটি ভালো প্রচার পেয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, এ জন্য উত্তর কোরিয়া কোনো অর্থ পাচ্ছে না। এমনকি তারা যদি কোনো জয়ও না পায়, তাতে ব্যথিত হওয়ার কিছু নেই। আর উত্তর কোরিয়া কখনোই তাদের হকির ক্ষেত্রে খুব শক্তিশালী দল মনে করে না। সেখানে হয়তো হাড্ডাহাড্ডি খেলা হয়নি; তবে খেলায় অংশ নিয়েই তারা খুশি। তিনি আশান্বিত এ কারণে যে, এটি অনেক নেতিবাচক ধারণা ও চিন্তার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে। সিএনএনের সাংবাদিক জ্যামি তারাবে স্মরণ করছেন, ১৯৮৮ সালে যখন দক্ষিণ কোরিয়া অলিম্পিকের আয়োজন করে, তখন তারা চায় উত্তর কোরিয়া যাতে অংশ নেয়। পিয়ংইয়ং তখন সেখানে অংশগ্রহণে অস্বীকার করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তা বয়কটের ঘোষণা দেয়। তারা সফল হয়নি। কারণ তখন খেলাটির পৃষ্ঠপোষক ছিল কমিউনিস্ট চীনের বেইজিং ও রাশিয়ার মস্কো। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে উত্তর কোরিয়া কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করে সেখানে একটি বিশ্ব তরুণ সম্মেলনের আয়োজন করে তাদের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য। সেখানে ১৭০টিরও অধিক দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে সপ্তাহব্যাপী সেমিনার, প্রতিযোগিতা ও সঙ্গীত আসরের আয়োজন হয়। তারা ১০৫ তলাবিশিষ্ট হোটেল, মার্বেল পাথরের পাতাল রেল, ফ্রান্সের আর্ক দ্য ট্রিয়েমফের আদলে একটি স্মৃতিসৌধ এবং দেড় লাখ দর্শকের আসনবিশিষ্ট একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করে। বিদেশিদের জন্য তখন এক হাজার অত্যাধুনিক গাড়ি আমদানি করা হয়। এতে উত্তর কোরিয়ার কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিই হয়নি বরং তাতে সে রকম সাফল্য অর্জিত না হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। এটা বলা প্রয়োজন যে, পিয়ংইয়ংয়ের ১০৫ তলা রিউগইয়ং হোটেলের কাজ শুরু হয় ১৯৮৭ সালে; কিন্তু আজও হোটেলটির কাজ শেষ হয়নি। যা হোক, এ সময় উত্তর কোরিয়া এ শিক্ষা পেয়েছে যে, অর্থই সবকিছু নয়। এখন আমরা দেখছি, দক্ষিণ কোরিয়ার তরফ থেকে ইতিবাচক পরিবর্তন। তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-জাপানসহ অন্যরা নড়েচড়ে বসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রশাসন ও দেশটির প্রেসিডেন্টের উদ্যোগকে উত্তর কোরিয়া ইতিবাচকভাবেই নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চায়। স্মরণ করা যেতে পারে- দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জা-ইন তার নির্বাচনী প্রচারের সময় বলেছিলেন, তিনি নির্বাচিত হলে দুই কোরিয়ার শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করবেন। ফলে তার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বোন কিম ইয়ং জংয়ের সাক্ষাৎ খুব একটা চমকপ্রদ ঘটনা নয়। বোনের মাধ্যমে মুন জা-ইনকে উত্তর কোরিয়া সফরে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র দেন দেশটির নেতা কিম জং উন। ২০০৭ সালে কিম জং উনের পিতা কিম জং ইলের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট রো মু হিউনের সাক্ষাতের পর একে বলা হয় কোরীয় উপদ্বীপের প্রথম ও ঘটনাবহুল সম্মেলন। এ রকম একটি প্রতীক্ষিত সফরকে কোরিয়ার বিশ্নেষকরা মুনের জন্য কূটনৈতিক ক্যু হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যে সফর তার রক্ষণশীল পূর্বপুরুষদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। এমনকি এ সম্পর্ক দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও টান পড়বে। এ রকম প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়ার প্রতিনিধি দল যখন উষ্ণ আতিথেয়তা পায় এবং বিষয়টি যখন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের সামনে সাংবাদিকরা তুলে ধরেন, তখন সেটি পেন্সের কাছে যেন অস্বস্তির বিষয় ছিল। অবশ্য উত্তর কোরিয়ার নিমন্ত্রণে মুন জা ইনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিল কিছুটা সতর্ক। তার কার্যালয়ের তরফ থেকে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের বৈঠক একটি ভালো ফলই আনবে। তাতে আরও বলা হয়, উত্তর কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও বৈঠক হওয়া প্রয়োজন। এ কথা এটা ইঙ্গিত করে যে, কূটনৈতিক কৌশলের মাধ্যমেই মুন সামনে এগোতে চান। মুন অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে সংলাপের ব্যাপারে একটা জনমত তৈরি হয়েছে। যে সংলাপ আসলে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়তে সহায়ক হবে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের দপ্তরের প্রতিক্রিয়া জানা যায় মুখপাত্র অলিসা ফারার মাধ্যমে- 'আমাদের ভাইস প্রেসিডেন্ট দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জা-ইনের প্রতি কৃতজ্ঞ; কারণ মুন বৈশ্বিক অবস্থানের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন এবং পারমাণবিক অবরোধের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।' পেন্স আরও বলেছেন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি হলো, আমরা সর্বতোভাবে উত্তর কোরিয়ার প্রতি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে যাব, যতক্ষণ না দেশটি তার পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগ না করে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ১০ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের অবস্থান একই। দৃশ্যত এটা বলা যায় যে, উত্তর কোরিয়ার প্রশাসন পুরো পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গেই অবলোকন করছে। আর সেটা উত্তর কোরীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক জো ইয়ং স্যামের কথায় বোঝা যায়। তবে সর্বশেষ পরিস্থিতি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও উত্তর কোরিয়ার নেতার মধ্যে একটি বৈঠকের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিম জং উনের একটি আমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মে মাস নাগাদ দু'জনের মধ্যে বৈঠকটি হতে পারে। গোটা পরিস্থিতির আলোকে এ উপসংহার টানা যায় যে, পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষার আক্রমণাত্মক কর্মসূচি বনাম প্রচারণা- এ উভয়ের মধ্যে অলিম্পিকের খেলা সমান্তরালভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। শীতকালীন অলিম্পিক খেলা যেহেতু শেষ, সামনে কী হয়, সেটাই দেখার বিষয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত
muhammadzamir0@gmail.com

প্রশ্ন নিয়ে কিছু জরুরি প্রশ্ন by আমিরুল আলম খান

হালে দেশের মানুষ দুটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন বলে আমার বিশ্বাস। দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের শিক্ষা এবং আর্থিক খাত ভেঙে পড়েছে। আমি আদার বেপারী, তাই আর্থিক খাত নিয়ে কথা বলব না। আমার আলোচনার বিষয় ভেঙে পড়া শিক্ষা ব্যবস্থা। ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়া মাধ্যমিক পরীক্ষার সব প্রশ্নের বহু নৈর্বাচনিক অংশ এবার আগেভাগেই ফাঁস হয়েছে। ফলে গোটা পরীক্ষাই প্রশ্নবিদ্ধ। স্বীকার করতেই হবে, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সবাই পায়নি, পেয়েছে অল্প কিছুসংখ্যক পরীক্ষার্থী। ফলে সুযোগের সমতা বিনষ্ট হয়েছে। এখন পরীক্ষার ফলে এর যে প্রভাব পড়বে, তা হবে অত্যন্ত মারাত্মক। সবচেয়ে বেশি সংকট হবে আস্থার। এ বছর যারা পাস করবে, বিশেষ করে যাদের ফল ভালো হবে, তাদের সবাইকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তাদের গায়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের গন্ধ লেগে থাকবে। প্রশ্ন ফাঁসের কোনো সুযোগ না নিয়েও সারা জীবন অনেককেই এই অপবাদ সহ্য করতে হবে; কিন্তু কোন অধিকারে তাকে দায়ী করব আমরা? বেশ কিছুকাল ধরে বাংলাদেশে সর্বক্ষেত্রে হুটহাট সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। কেন এমন হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার কোনো সন্তোষজনক জবাব জাতি জানতে পারছে না। কোনো রকম বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়াই কিছু অতি উৎসাহী মানুষ একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত দিচ্ছে আর তার মূল্য দিয়ে চলেছে দেশের সাধারণ মানুষ। কিন্তু ভুল কাজের জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হচ্ছে না। শিক্ষা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা দুটি ভিন্ন বিষয়। শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। অন্তত আগামী ৫০ বছরে দেশি ও বৈদেশিক চাহিদা অনুমান ও বৈশ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে শিক্ষার ভিত তৈরি করতে হয়। শিক্ষার ভিত্তি হলো কারিকুলাম। সে কারিকুলামের লক্ষ্য অর্জনে তাকে ভাগ করা হয় শ্রেণিভিত্তিক সিলেবাসে। কাজটি খুবই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি। তাই পৃথিবীর কোনো দেশেই কারিকুলাম-সিলেবাসে যখন-তখন হস্তক্ষেপ করা হয় না। বিশেষজ্ঞরা এসব নিয়ে নিরন্তর গবেষণা করেন এবং তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, পরিবর্তন, বর্জন ইত্যাদি করে থাকে। শিক্ষার কোন স্তরে কী পড়ানো হবে, কতক্ষণ পড়ানো হবে, কীভাবে পড়ানো হবে, কীভাবে শিখনফল যাচাই করা হবে, কোন ধরনের প্রশ্ন করে তা যাচাই করা হবে, কোন কর্তৃপক্ষ কীভাবে তা যাচাই করবে, সে জন্য কত সময় ও নম্বর বরাদ্দ করা হবে ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করা থাকে সিলেবাস-কারিকুলামে। তাই কারিকুলাম ও সিলেবাসকে বলা হয় শিক্ষার মস্তিস্ক। আমাদের দেশে নব্বই দশকে বহু নির্বাচনী নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া চালু হয়। প্রথমে ৫০০ প্রশ্নের একটি প্রশ্নব্যাংক করে তা থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তখন বহু নৈর্বাচনিক প্রশ্নে নম্বর ছিল ৫০। তার ফল শুভ হয়নি। পরে প্রশ্নব্যাংক উঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে বহু নৈর্বাচনিক প্রশ্ন উঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে আবার চালু করা হয়। মোট নম্বরের ৪০ ভাগ ছিল বহু নির্বাচনী প্রশ্ন। এখন তা ৩০ ভাগে নামিয়ে আনা হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করা হয়। এবার মাধ্যমিক প্রশ্নের ৭০ ভাগ ছিল সৃজনশীল। কিন্তু শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না দিয়েই এ পদ্ধতি চালু করায় নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াতে পারছেন না। অভিভাবকরাও সন্তানদের পড়ায় সাহায্য করতে পারছেন না। ফলে দেশে নোট-গাইডের বান ডেকেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশ্ন ফাঁস। এবার নাকি শুধু বহু নির্বাচনী নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। সৃজনশীল অংশ নাকি ফাঁস হয়নি। এ বিষয়টি নিরপেক্ষ ও নিরাসক্তভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রত্যেক বিষয়ে বহু নৈর্বাচনিক প্রশ্ন করা হয় চার সেট। সেখানে একই প্রশ্নের ক্রমপরিবর্তন করে দেওয়া হয়, যাতে পরীক্ষা হলে পরস্পর বলাবলি করে কেউ উত্তর দেওয়ার সুযোগ না নিতে পারে। ধরা যাক, বাংলার কোনো পত্রের বহু নির্বাচনী প্রশ্ন ফাঁস হলো। তাহলে যদি চার সেট প্রশ্নই ফাঁস না হয়, তার যে সমাধান দুর্বৃত্তরা সরবরাহ করবে, সে উত্তর এক-চতুর্থাংশ পরীক্ষার্থীর কাজে লাগলেও বাকিদের উত্তর ভুল হবে এবং কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে মূল্যায়নের ফলে সেই ভুল সংশোধনের কোনো উপায়ও থাকবে না। মিডিয়ায় বহু নির্বাচনী প্রশ্ন ফাঁসের যেসব খবর বেরিয়েছে, তাতে আমরা নিশ্চিত নই চার সেট প্রশ্নই ফাঁস হয়েছে কিনা। এদিকে এটা বলা হচ্ছে যে, সৃজনশীল প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। তাই দাবি উঠেছে, বহু নৈর্বাচনিক প্রশ্ন বাদ দিতে হবে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছে যে, ২০১৯ সাল থেকে মাধ্যমিকে ৩০ নম্বরের বহু নির্বাচনী অংশ থাকবে না। তবে কি আগামী বছর থেকে শতভাগ সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষা হবে? আগামী বছর যদি সৃজনশীল প্রশ্ন ফাঁস হয়, তখন কি সৃজনশীল পদ্ধতি বাদ দেওয়া হবে? এমন সিদ্ধান্ত স্রেফ মূর্খতা। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কি পদ্ধতিগত সমস্যা? আমি মনে করি, এটি একটি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা। তার সঙ্গে যুক্ত মূল্যবোধ বা নৈতিকতার সংকট। আরও স্পষ্ট করে বললে, দুর্নীতির সীমাহীন বিস্তারের সমস্যা। কিন্তু কিছু লোক পরামর্শ দিচ্ছেন, বহু নৈর্বাচনিক পরীক্ষা ব্যবস্থাই এ জন্য দায়ী। এ দেশে তো সরকারি কর্মকমিশন থেকে সব চাকরিক্ষেত্রে বহু নৈর্বাচনিক অভীক্ষা নেওয়া হয়। তাহলে শিক্ষার্থীদের বহু নির্বাচনী প্রশ্নে দক্ষ করে তোলা হবে না কোন যুক্তিতে? এই পদ্ধতির সুবিধা, অসুবিধা দুটিই আছে। কারও কারও মতে, এ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় ত্রুটি এটা অনেকটা স্মৃতিনির্ভর। কিন্তু স্মৃতিতে ধারণ করা শিক্ষাক্ষেত্রে অস্বীকৃত কোনো পন্থাও নয়। এমনকি ব্লুম টেক্সোনমিতে ১৯৫৬ সালে যাকে 'জ্ঞান' বলা হয়েছিল স্বয়ং ব্লুমের নেতৃত্বে ১৯৯৯ সালে তা সংশোধন করে 'স্মরণ করা' বলা হয়েছে এবং ২০০১ সাল থেকে তার চর্চাও হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বহু নৈর্বাচনিক অভীক্ষার আরেকটি বিপদ হলো, পরীক্ষার্থীরা সুযোগ পেলে পরস্পর আলোচনা করে উত্তর দিতে পারে। সেটি প্রতিরোধে একই প্রশ্নের ক্রমপরিবর্তন করে চার সেট আলাদা আলাদা প্রশ্ন তৈরি করা হয়। তাছাড়া এমনভাবে আসন বিন্যাস করে একই সেটের পরীক্ষার্থীদের দূরে দূরে বসানো হয়, যাতে একে অন্যের উত্তর দেখে বা বলাবলি করে উত্তর দিতে না পারে। এ বিষয়ে ওপরে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে সুবিধা হলো, এই পদ্ধতিতে সিলেবাসের সবকিছুই মনোযোগ দিয়ে শিখতে হয়। বহু নৈর্বাচনিক অভীক্ষার কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক সূত্র আছে। সেগুলো অনুসরণ করলে এই অভীক্ষায় শিক্ষার্থীর শিখনফল নৈর্ব্যক্তিকভাবে যাচাই করা যায়। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে অতি অল্প সময়ে সঠিক মূল্যায়ন ও ফলাফল তৈরি করা যায়। তাই সারা পৃথিবীতেই বহু নৈর্বাচনিক অভীক্ষা চালু আছে। কিন্তু আমাদের দেশে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে বহু নৈর্বাচনিক প্রশ্ন তৈরি করা হয় না, যেটি করা জরুরি ছিল। দেখা যাচ্ছে, বহু নির্বাচনী অভীক্ষার দুর্বলতা দূর করার বিজ্ঞানসম্মত উপায় আছে। কাজেই বহু নির্বাচনী অভীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণ নিশ্চয়ই পদ্ধতির ত্রুটি নয়; ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাঘটিত ত্রুটি। তাহলে ব্যবস্থাপনা, মূল্যবোধ বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত ত্রুটির দায় শিক্ষার্থীরা কেন বহন করবে? এর কারণ উপযুক্ত প্রশিক্ষণ অভাবের। সে দায় শাসন ব্যবস্থার, প্রশাসনের, শিক্ষকের, আইন প্রয়োগে শৈথিল্যের। শিক্ষায় যে কোনো পরিবর্তন করার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান হলো জাতীয় পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। কিন্তু এ সম্পর্কে তারা কোনো কথা বলছে না। যেসব জনপ্রিয় শিক্ষাবিদ বহু নির্বাচনী অভীক্ষা তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, তাদের কেউই শিক্ষাবিজ্ঞানী বা কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ নন। আমলারাও কেউ কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ নন। আমাদের দেশে শিক্ষাকে বিজ্ঞান বলেই স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। তেমনি পার্থক্য করা হয় না শিক্ষক ও শিক্ষাবিজ্ঞানীদের মধ্যেও। এখানে জনতুষ্টিবাদের জয়জয়কার। জনতুষ্টিবাদীদের পরামর্শ কোনো সঠিক পথ প্রদর্শনে সফল হয় না। তাছাড়া মনে রাখতে হবে, সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে শিক্ষার্থী ও জনমনে নিদারুণ উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা কাজ করছে। সে কারণে শতভাগ সৃজনশীল প্রশ্ন জনচিত্তে ক্ষোভ সঞ্চার করতে পারে। আমরা মনে করি, বহু নির্বাচনী অভীক্ষা পুরোপুরি তুলে দেওয়া সঠিক নয়। তবে নম্বর কিছু কমিয়ে ১৫ থেকে ২০ করা যায় কিনা সে বিষয়ে শিক্ষাবিজ্ঞানীদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। যা কিছুই করা হোক, তা করতে হবে যথোপযুক্ত ব্যক্তিদের পরামর্শে ও ধীরেসুস্থে; তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত বুমেরাং হতে বাধ্য।
amirulkhan7@gmail.com
যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান

আজীবন ক্ষমতায় থাকার ৫টি উপায়

চীনে শীর্ষ নেতার ক্ষমতায় থাকার নির্দিষ্ট মেয়াদের সময়সীমা প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে এবং এটি কার্যকর হলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং 'আজীবন ক্ষমতায়' থাকতে পারবেন। ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে রোববার দেশটির সাংবিধানিক পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পার্লামেন্টের অনুমোদনের পরই এটি কার্যকর হবে। তবে চীনে কংগ্রেসই নীতি নির্ধারণে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। বিবিসির ডেইলি পলিটিক্স অনুষ্ঠানের রিপোর্টার এলিজাবেথ গ্লিঙ্কা বিশ্ব নেতাদের মধ্যে যারা ক্ষমতা ছাড়তে চান না তাদের জন্যে পাঁচটি টিপস দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আজীবন ক্ষমতায় থাকতে হলে একজন রাজনীতিককে কী কী করতে হবে। তিনি বলছেন, কোনো একটি দেশে কেউ তাকে ক্ষমতায় দেখতে না চাইলেও এই গাইড বা নির্দেশিকা তাকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করবে:
১) সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করুণ : সংবাদ মাধ্যমগুলো যাতে স্বাধীনভাবে খবর পরিবেশন করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সংবাদ মাধ্যমে যদি সমালোচনা-ধর্মী কিছু প্রকাশ করা হয় তাহলে সেটাকে ফেইক নিউজ বা ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দিতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে হলে তাদের পরিবেশিত বার্তার উপর থাকতে হবে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। এজন্যে খুবই বিখ্যাত উত্তর কোরিয়া। এই দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে সরকারের পক্ষে যেসব প্রচারণা চালানো হয় তার জন্যে দেশটি সুপরিচিত। ইন্টারনেটকে নিয়ন্ত্রণ করার কথাও ভুললে চলবে না। এজন্যে বিখ্যাত চীন। ইন্টারনেট ব্রাউজিং এর ক্ষেত্রে নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে হবে ফায়ার ওয়াল বসিয়ে। দেশটিতে 'উইনি দ্য পু' কার্টুনও নিষিদ্ধ। কারণ প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ডাক নাম পু।
২) পদ পরিবর্তন করতে হবে : যদি কোনো দেশের সংবিধান পরিবর্তন করা সম্ভব না হয়, যেমনটা করা হয়েছে, চীনের সংবিধানে, তাহলে পদ পরিবর্তন করতে পারেন। যেমনটা করেছেন রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন। পুতিন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তারপর সেটা ছেড়ে হয়েছেন প্রেসিডেন্ট, আবার প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে দিয়ে হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তারপর আবার প্রেসিডেন্ট। শুধু আপনি যখন দেশের বাইরে থাকবেন তখন যাতে আপনার অনুগত ও বিশ্বস্ত লোকদের হাতে ক্ষমতা থাকে সেটা নিশ্চিত করে যেতে হবে। তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী কারো হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার চিন্তাটা বাদ দিতে হবে।
৩) দারুণ একটা নাম নিতে হবে : নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ বোঝাতে হলে আপনার নামটা কী এবং সেটা শুনতে কেমন শোনায় সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উগান্ডার স্বৈরশাসক ছিলেন ইদি আমিন। কিন্তু তিনি শুনতে চাইতেন তাকে বলা হোক 'মহামান্য, আজীবনের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বে সব শান্তি ও সমুদ্রে সব মাছের রাজা এবং আফ্রিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিজয়ী ইদি আমিন।'
৪) সব নির্বাচনে জয়ী হতে হবে : যদি দেশে নির্বাচন দেয়া হয় তাহলে সব নির্বাচনে জিততে হবে। সাবেক রুশ নেতা স্তালিন বলেছিলেন, যেসব জনগণ ভোট দেন তারা গুরুত্বপূর্ণ নন। গুরুত্বপূর্ণ তারাই যারা ভোট গণনা করেন। ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং আন নির্বাচন দিয়ে তাতে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে। ভোটের ১০০ শতাংশও পেয়েছিলেন তারা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিউবার রাউল ক্যাস্ত্রো এবং সিরিয়ার বাশার আল আসাদ তাদের চেয়ে সামান্য কম ভোট পেয়েছেন। তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিলো ৯৭ থেকে ১১ শতাংশ।
৫) নিজের একটা ইমেজ তৈরি করুন : নিজের একটা ভাবমূর্তি তৈরি করুন। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি দেখতে কেমন, কি ধরনের পোশাক-আশাক পরেন, আপনার কতোগুলো বন্দুক আছে, পুতিনের মতো খালি গায়ে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়ান, যাতে সবাই আপনার দিকে ঘুরে তাকায়।

রোহিঙ্গাদের জমিগুলোতে এখন যা করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, সেনা নির্যাতনে রোহিঙ্গারা পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের ফেলে আসা গ্রাম ও জমিজমায় ঘাঁটি তৈরি করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। নতুন এক গবেষণার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে,
তারা স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবি ও প্রত্যক্ষ দর্শীদের বরাত দিয়ে এমন তথ্য জানতে পেরেছেন। যেসব গ্রাম থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনে রোহিঙ্গারা পালিয়ে গেছেন সেসব গ্রামেই ঐ রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা জমি ও ভিটে-বাড়ির উপর ঘাঁটি তৈরি করছে সেনাবাহিনী। এই জানুয়ারি মাসে রোহিঙ্গাদের গ্রামে বহু বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে বলে অ্যামনেস্টির বলছে। নতুন করে সারি সারি ঘর জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে বলেও জানাচ্ছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এর আগে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও একই ধরনের ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একজন মুখপাত্র এটিকে সেনাবাহিনী দ্বারা ভূমি গ্রাস বলে উল্লেখ করেছেন। মিয়ানমারের সরকার অ্যামনেস্টির অভিযোগ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি। গত বছরের আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ থেকে মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর অভিযানে নির্যাতন শুরুর পর থেকে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা।

যেকারণে যাত্রীবাহী বিমানকে ভূপাতিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন পুতিন

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যাত্রীবাহী একটি বিমানকে গুলি করে মাটিতে নামিয়ে আনার আদেশ দিয়েছিলেন। কারণ তাকে জানানো হয়েছিলো যে বিমানটির ভেতরে বোমা আছে। শুধু তাই নয়, বিমানটিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সোচির শীতকালীন অলিম্পিকসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিকে। লক্ষ্য বিমানটি দিয়ে সেখানো হামলা চালানো। এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে প্রেসিডেন্ট পুতিনের নিজের মুখ থেকে। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে তৈরি করা নতুন একটি সিনেমাতে তিনি এসব কথা বলেছেন। দুই ঘণ্টার এই সিনেমাটি অনলাইনে পোস্ট করার পর থেকে তা নিয়ে প্রচুর কথাবার্তা হচ্ছে। রাশিয়ায় নির্বাচন হবে ১৮ই মার্চ। প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাতজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনে তিনিই জয়ী হবেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনিকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অনুমতি দেয়নি কর্তৃপক্ষ। মি. পুতিন জানান, তাকে বলা হয়েছিলো বিমানটি ইউক্রেন থেকে তুরস্কের দিকে যাচ্ছিলো। অলিম্পিক শুরুর ঠিক আগেভাগে বিমানটিকে ছিনতাই করা হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে দেখা যায়, মি. পুতিনকে দেয়া এসব তথ্য সত্য নয়। তাই বিমানটিকে আর ভূপাতিত করা হয়নি। নতুন সিনেমায় পুতিন বলেন, ‘আমাকে বলা হয় ইউক্রেন থেকে ইস্তাম্বুল যাচ্ছে এরকম একটি বিমান ছিনতাই হয়েছে। ছিনতাইকারীরা দাবি করছে বিমানটিকে সোচিতে অবতরণ করানোর জন্যে।’ তুর্কী পেগাসাস বোয়িং এয়ারলাইন্সের বিমানটি ১১০ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে ইউক্রেনের খারকিভ থেকে। মি. পুতিনকে জানানো হয় একজন যাত্রীর কাছে একটি বোমা আছে। সে পাইলটকে বলেছে বিমানটিকে সোচির দিকে নিয়ে যেতে।
মি. পুতিন বলেন, নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তখন তাকে বলেন যে, এরকম জরুরী পরিস্থিতিতে প্রথম কাজ হলো বিমানটিকে মাটিতে নামানো। ‘আমি তাদেরকে বলি- পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করুন,’ বলেন মি. পুতিন। এই আদেশ দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তিনি আরেকটি টেলিফোন কল পান। তখন তাকে বলা হয় এর আগে বিমানটি সম্পর্কে যেসব তথ্য দেওয়া হয়েছে সেগুলো সঠিক নয়। এসব ছিলো ‘ফলস এলার্ম’। এর কিছুক্ষণ পরই মি. পুতিন অলিম্পিকের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে সোচিতে অলিম্পিকের ভেন্যুতে গিয়ে পৌঁছান। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ক্রেমলিনের একজন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও মি. পুতিনের এসব বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ছবিতে মি. পুতিনের একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী তার কাছে জানতে চান ক্রাইমিয়া অঞ্চলকে আবার ইউক্রেনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কোন সম্ভাবনা আছে কিনা? প্রেসিডেন্ট পুতিন তখন স্পষ্ট বলে দেন, ‘আপনি এসব কি বলছেন? এরকম কোনো পরিস্থিতি বিরাজ করছে না এবং এরকম কখনও হবে না।’ রাশিয়া ২০১৪ সালে ইউক্রেন থেকে এই অঞ্চলটি দখল করে নিয়েছে। সিনেমাতে প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, তিনি ‘কিছু কিছু বিষয়’ ক্ষমা করতে পারেন কিন্তু ‘সবকিছু’ তিনি ক্ষমা করতে পারেন না। তিনি কী ক্ষমা করতে পারেন না জানতে চাইলে মি. পুতিন স্পষ্ট ভাষায় বলেন ‘বেইমানি’। এই সিনেমাতে রুশ প্রেসিডেন্ট আরো জানিয়েছেন যে তার দাদা স্পিরিডন পুতিন সাবেক রুশ নেতা ভ্লাদিমির লেনিন এবং জোসেফ স্তালিনের জন্যে রান্না করতেন।
সূত্র: বিবিসি

পর্বতে উঠতে গিয়ে ৫ কলেজ ছাত্রের মৃত্যু

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিল নাড়ুতে দাবানলে কমপক্ষে পাঁচ কলেজ ছাত্র মারা গেছে। সোমবার দেশটির পুলিশ একথা জানায়। খবর বার্তা সংস্থা সিনহুয়া’র। রোববার ৪০ জনের একটি দল কুরাঙ্গিনি পাহাড়ে উঠার সময় এই ঘটনা ঘটে। পর্বতারোহীদের অধিকাংশই কলেজ ছাত্র। পাহাড়টি রাজ্যের রাজধানী চেন্নাই থেকে প্রায় ৫৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছে, ‘রোববার রাতে ঘটনাস্থলে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে। ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এসময়ে পাঁচ ছাত্রের পুড়ে যাওয়া লাশও উদ্ধার করা হয়।’

অস্ট্রিয়া ও ব্রিটেনে বিপদের মুখে ইরানের ২ রাষ্ট্রদূত

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ইরানি রাষ্ট্রদূতকে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া ব্রিটেনে নিযুক্ত ইরানী রাষ্ট্রদূতকে দেয়া হয়েছে হত্যার হুমকি। ইরানের গণমাধ্যমের খবরে প্রকাশ, অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ইরানি রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের বাইরে পুলিশের গুলিতে এক হামলাকারী নিহত হয়েছে।
অস্ট্রিয়ার পুলিশের মুখপাত্র হেরাল্ড মুজের বলেছেন, মধ্যরাতের একটু আগে চাকু নিয়ে এক ব্যক্তি ইরানি রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে ঢোকার চেষ্টা করে। এতে বাধা দেয়ায় বাসভবনের নিরাপত্তারক্ষীর ওপর হামলা চালায়। পুলিশ মরিচের স্প্রে দিয়ে হামলাকারীকে মোকাবেলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। এরপর তিনি নিরুপায় হয়ে হামলাকারী ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় হামলাকারী। নিহত ব্যক্তির বয়স ২৬ এবং সে অস্ট্রিয়ার নাগরিক। তার হামলায় রাষ্ট্রদূতের বাসভবনের নিরাপত্তারক্ষী আহত হয়েছেন এবং বর্তমানে তাকে একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পুলিশের মুখপাত্র বলেছেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ওই ঘটনার পর ভিয়েনায় অবস্থিত সব দূতাবাসের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। লন্ডনে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতকে হত্যার হুমকি দেয়ার পর ভিয়েনায় এ ঘটনা ঘটলো। ভিয়েনায় ইরানি রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে চাকু নিয়ে প্রবেশের প্রচেষ্টার কারণ এখনো জানা যায়নি।

ইরানে তুর্কি বিমান বিধ্বস্ত : সব আরোহী নিহত

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তুরস্কের একটি একটি প্রাইভেট বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১১ আরোহীর সবাই প্রাণ হারিয়েছেন। সোমবার দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে একথা বলা হয়েছে। তুরস্ক ও ইরানের কর্মকর্তারা বলেন, বিমানটিতে আট যাত্রী ও তিন ক্রু ছিলেন।
শনিবার সন্ধ্যায় শারজাহ্ থেকে ইস্তাম্বুল যাওয়ার পথে জাগরোস পর্বতমালায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। তুরস্কের গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, যাত্রীদের মধ্যে তুরস্কের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীর মেয়ে মিনা বাসারান ছিলেন। অপর সাত যাত্রী তার বান্ধবী। তারা মিনার বিয়ে উপলক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গিয়েছিল। নিহত ক্রুদের মধ্যে দু'জন ছিল পাইলট। ক্রু সবাই নারী। তাৎক্ষণিকভাবে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

ত্রিপুরা নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভ ও উত্থানের তাৎপর্য by গৌতম দাস

সম্প্রতি ভারতের ত্রিপুরায় প্রাদেশিক রাজ্য বা বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। আর তাতে ২০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা কমিউনিস্ট সিপিএম জোট সরকারের পতন ঘটেছে খুবই শোচনীয়ভাবে। এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো মোদির হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার সেখানে একাই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিজেপির যেখানে কোনো দলীয় অস্তিত্বই ছিল না, সেখানে এবার বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তনের কারণ কী? এটা কি হিন্দুত্ববাদী দল বলে নাকি অন্য কিছু? ত্রিপুরা বাংলাদেশের খুব দূরের নয়।
অতীত জন্ম হিসেবে এটি আসলে ব্রিটিশ-ভারতের কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত এক ছোট তবে মূলত করদরাজ্যের রাজার এলাকা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জন্ম নেয়ার পর কুমিল্লা জেলা বাংলাদেশের মানে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে আসে আর এর বাইরের একাংশ আর ত্রিপুরার রাজার রাজ্য এলাকা ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত অমীমাংসিত থেকে যায়, যা পরে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজার রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ভারতে যোগদান করে। তবে ত্রিপুরা রাজ্যসহ বাকি অংশ তখন ভারতেরও কোনো আলাদা রাজ্যের মর্যাদা পায়নি, একটা কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনাধীন এলাকার (ইউনিয়ন টেরিটরি) মর্যাদায় থেকে গিয়েছিল। পরে ১৯৭২ সালে ত্রিপুরা, মেঘালয় আর নাগাল্যান্ড- এ তিনটি নতুন রাজ্যের জন্ম হয়। ত্রিপুরা ভারতের ২৯ রাজ্যের একটি রাজ্য, খুবই ছোট আর ভারতের ছোট রাজ্যগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচের দিক থেকে তৃতীয়- গোয়া আর সিকিমের চেয়ে ওপরে। তুলনা করে বোঝার জন্য যেমন- ত্রিপুরার আয়তন ৪০৫০ বর্গমাইল, যেখানে বাংলাদেশের ৫৬০০০ বর্গমাইল। ত্রিপুরার মোট জনসংখ্যা মাত্র ৩৬ লাখ। এর মধ্যে আবার ১৯০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ৫৩ শতাংশ ছিল পাহাড়ি আদিবাসী, ভারতের ভাষায় ইন্ডেজিনিয়াস, ট্রাইবাল বা আদিবাসী। অনেকে হিন্দিতে জনজাতিও বলে। আমাদের পাহাড়িদের ভারতীয় অপর অংশের মতো ত্রিপুরায় তাদের বসবাস। যদিও স্থানীয় হিন্দু বাঙালিদের সাথে তাদের কালচারাল নৈকট্য বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। বলা হয়ে থাকে, দেশভাগে পাকিস্তান মানে পূর্ব পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্রের অংশ হওয়ায় পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত, যা পরে সাত ছোট রাজ্য হিসেবে ঢেলে সাজানো হয়েছে, এদের মূল সঙ্কট শুরু হয়। প্রথম সঙ্কট হলো উত্তর-পূর্ব ভারতের এরা ভারতের অপর বা মূল অংশ থেকে প্রায় পুরোটাই আলাদা হয়ে যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে আমাদের পশ্চিমে পশ্চিম বাংলাসহ মূল ভারত অবস্থিত, অথচ বাংলাদেশের পূর্বে ও উত্তরেও ভারত আছে, যেটাকে আমরা সাত ভাইয়ের উত্তর-পূর্ব ভারত বলছি। কুমিল্লা-ফেনী জেলারই লাগোয়া অপর পার হলো ত্রিপুরা। অথচ ত্রিপুরা থেকে কলকাতা যেতে হলে তাকে উজানে আরো উত্তরে গিয়ে এরপর উত্তরাঞ্চল আসাম ঘুরে শিলিগুড়ি দিয়ে কলকাতা যেতে হবে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে আগে সরাসরি ত্রিপুরা-কলকাতার সড়ক দূরত্ব ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। সেটা এখন হয়েছে ১৭০০ কিলোমিটার। এমনিতেই পাহাড়ি অঞ্চল বলে উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ অবকাঠামো দুর্বল। এর ওপর ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান মাঝখানে পড়ায় উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ অবকাঠামো আরো দুর্বল হয়ে গেছে সেই ১৯৪৭ সাল থেকেই।
আর তাদের দ্বিতীয় সঙ্কট হিসেবে ভারতীয় বক্তব্য হলো, বাংলাদেশ থেকে ১৯৪৭ সালে এবং ১৯৭১ সালে বিপুল জনগোষ্ঠী ত্রিপুরায় বসবাস শুরু করেছিল। ২০০৭ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে ত্রিপুরাকে নিয়ে যে সার্ভে রিপোর্ট পেশ করা হয়েছিল, সেই দলিল অনুসারে ত্রিপুরায় ১৯০১ সালে ট্রাইবাল জনসংখ্যা আগে ছিল ৫৩ শতাংশ, যেটা এখন হয়েছে ৩১ শতাংশ। কিন্তু আসামের মতো সত্যি-মিথ্যা যুক্তিতে এখানে কিন্তু মুসলমান ‘বাঙালি খেদাও’ ইস্যু হয়নি। কারণ, সবাই দেখছে মাইগ্রেটেডরা হিন্দু বাঙালি, তাই চেপে গেছে। তবু বাঙালি-পাহাড়ি টেনশন হিসেবে তা হাজির হয়ে উঠেছিল। এর মূলকথা ত্রিপুরার সংখ্যাগরিষ্ঠ ট্রাইবালরা, হিন্দু বাঙালির মাইগ্রেশনের কারণে সংখ্যালঘু ৩০ শতাংশ হয়ে যাওয়া। ফলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ব্যাপকতাও দেখা দিয়েছিল; কিন্তু দুটো ঘটনায় তা সামলানো যায়। এক. ১৯৭২ সালে ত্রিপুরাকে রাজ্য করার সময় এর প্রাদেশিক সংসদ ও সরকার ছিল ৬০ আসনের। ওই ৬০ আসন থেকে (এক-তৃতীয়াংশ) মানে ২০টি আসন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত করে দেয়া হয়। ফলে এক ধরনের স্বায়ত্তশাসনের অবস্থা তৈরি হয় এতে। অপর বড় ঘটনা হলো পাহাড়ি বা তাদের ভাষায় আদিবাসী (ট্রাইবাল) আন্দোলনের নেতা ছিলেন দশরথ দেব। বিগত ১৯৪৮-৫০ সাল থেকেই তৎকালীন ত্রিপুরা রাজার বিরুদ্ধে তিনি গণমুক্তি পরিষদ নামে সশস্ত্র আন্দোলনের মূল নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। পরে ১৯৫০ সালে তিনি কমিউনিস্ট সিপিএম দলে যোগ দেন। এতে সেই থেকে তিনি হয়ে যান ত্রিপুরায় কমিউনিস্টদের বিপুল শক্তি-সামর্থ্যরে উৎস। যিনি একই সাথে ট্রাইবাল ও কমিউনিস্ট নেতা। শুধু তাই নয়, তিনি একই সাথে হয়ে যান ট্রাইবাল ও হিন্দু বাঙালির সমঝোতা করে খাড়া করা এক রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতীক। এ কারণে ১৯৯৮ সালে তার স্বাভাবিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী ও মূল নেতা; কিন্তু ধীরে ধীরে অন্যান্য পাহাড়ি রাজনৈতিক দলও গঠিত হতে থাকে মূলত অবকাঠামোগত বিনিয়োগ না হওয়ায় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পরিচয় পায় তারা- এ কারণে। এ ছাড়া ট্রাইবাল নাগরিকেরা অভাবে জমি ধরে রাখতে না পেরে এবার তা বাঙালির কাছে বিক্রি করাতে এটাকে বাঙালিদের অনুপ্রবেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার আদিবাসী ইস্যু তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন ট্রাইবাল রাজনৈতিক দল প্রায় ১১টা।
ফলে ত্রিপুরা ল্যান্ড নামে নতুন রাজ্য গঠন করতে হবে, সেটাও তাদের দাবি। এ পটভূমিতে এবার ত্রিপুরার নির্বাচন হয়েছে। এক কথায় বললে ‘ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী বনাম হিন্দু বাঙালি’ এই টেনশন রেষারেষি ত্রিপুরাতে যে আছে, বিজেপি এই দ্বন্দ্বে ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর ক্ষোভগুলোকে উসকে বা উচ্চকিত অ্যাড্রেস করে ট্রাইবাল রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আঁতাত ও নির্বাচনী জোট করে আগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মজার ব্যাপার হলো, বিজেপির সরকার হিসেবে মাইগ্রেশন ইস্যুতে তাদের অবস্থান ঠিক এর উল্টো। ২০১৬ সালে তারা একটা বিল এনেছিল যেখানে মূল বিষয় হলো, এই বিলে তিনটি দেশ আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে যারা ভারতে মাইগ্রেট করেছে বা করছে- এদের মধ্যে মুসলমান ছাড়া ছয় ধর্মের মানুষকে স্বাগত জানানো হবে। সেই ছয় ধর্ম হলো- হিন্দু, শিখ, বুদ্ধিস্ট, জৈন, পার্সি ও ক্রিশ্চান। এদেরকে আর অবৈধ নাগরিক বলা হবে না। তাদেরকে প্রধান দ্রুত ধারার (ফাস্ট ট্র্যাকে) উপায়ে নাগরিকত্ব দেয়া হবে। এখন এই বিল পাস হওয়া মানে আসাম বা ত্রিপুরার বাঙালি হিন্দুরা নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে, যেটা আসলে স্থানীয় ট্রাইবাল রাজনীতির প্রধান আপত্তির ইস্যু। অন্য দিকের মূল বিষয় হলো, এ আইনটি একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মোদি সরকার ইসলামবিদ্বেষী। কেউ মুসলমান হলে তার প্রতি বৈষম্য করা হবে কেন, এর কোনো ব্যাখ্যা মোদি কোথাও দেননি। কনস্টিটিউশন অনুসারে, সেটি কোনো সরকার করতে পারে না। এই নির্বাচনে মোদির বিজেপি যাদেরকে বলা হচ্ছে; যারা ত্রিপুরার ৬০ আসনের নির্বাচনে জেতার জন্য দলের পক্ষে কাজ করেছেন, এরা কারা? এর প্রথম বড় চাঙ্ক হলো ‘ইন্ডেজেনিয়াস পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা (IPFT)’ স্থানীয় ট্রাইবাল এ দলটি। বিজেপি উত্তর-পূর্ব ভারতের এ রকম ১১টি দলের সাথে মিলে জোটে আবদ্ধ হয়েছে, যে জোটের নাম The North East Regional Parties Forum। ত্রিপুরা নির্বাচনে IPFT দলকে ৯টি আসন ছেড়ে দিয়ে বিজেপি নিজের নামে ৫১ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। আসলে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারের কমিউনিস্ট জোট ছাড়া বাকি ত্রিপুরার সব দলের গুরুত্বপূর্ণ লোকেরা গত পাঁচ বছরের বিভিন্ন সময়ে এসে বিজেপিতে যোগদান করেছেন। মোটা দাগে বললে এমন যোগদানের মূল ট্রাকরুট হলো এ রকম যে, যারা কংগ্রেস করতেন সেখান থেকে; এরাই কমিউনিস্টদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। এরপর সেখান থেকে তারা চলে যায় তৃণমূল কংগ্রেস দলে। আর শেষ তৃণমূল থেকে বিজেপি। এভাবেই বিজেপি ৫৯ আসনের (একজন কমিউনিস্ট প্রার্থী মারা যাওয়ায় ওই আসনে নির্বাচন স্থগিত) মধ্যে ৪৩ আসনে জয়লাভ করে।
আর ওই ৪৩ আসনের মধ্যে IPFT-এর জেতা আট আসন আছে। এ দিকে ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই IPFT বিজেপির সাথে গোপন কথাবার্তা সামনে নিয়ে এসেছে। তারা ‘ত্রিপুরা ল্যান্ড’ নামে নতুন রাজ্য ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি এখন তুলছে, যেটা নির্বাচনের সময় একেবারেই কথাও তোলেনি। বলছে বিজেপি এটা জানে, তারা কেবল ফলাফলের পরে এই দাবি তুলতে বলেছে। এমনিতেই উত্তর-পূর্ব এই ভারতের সাত ছোট রাজ্য সবার প্রধান সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা আর দুর্বল অবকাঠামো বিনিয়োগ; কিন্তু এ থেকে তৈরি হওয়া অসন্তোষগুলোর সারকথা বা প্রধান প্রকাশ হলো বিচ্ছিন্নতাবাদ। যেন বিচ্ছিন্নতা বা স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের অবকাঠামো বা বিনিয়োগের সমস্যা মিটিয়ে দেবে। তবুও এ রাজনীতিই সেখানে চলছে। এ পরিস্থিতিতে বিজেপি সেখানে নিয়ে গিয়েছে এক মাত্রা, একেবারেই সম্পর্কহীন নতুন মাত্রা, এই নতুন মাত্রা হলো ‘হিন্দুত্ব’। মোদি যেন বলতে চাচ্ছে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সবাই জোট বাঁধতে হবে, আর তাতেই সব সমস্যার সমাধান। ফলে এই চরম ইসলামবিদ্বেষ দেখার অপেক্ষায় আমাদের থাকতে হবে। যার প্রথম টাইম ফ্রেম হলো আগামী জুনের শেষে আর অন্যটা ২০১৯ সালের মে মাস। প্রথমটা আসামের, কারা আসামের নাগরিক নয় মানে তাদের ভাষায় বাংলাদেশী মুসলমান, সেই তালিকা তৈরি চলছে আদালতের নির্দেশে, যার প্রকাশের শেষ দিন ৩০ জুন। আর দ্বিতীয়টি হলো ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন, যা ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে শেষ হবে। স্বভাবতই তাতে মোদির একমাত্র বয়ান হবে মুসলিমবিদ্বেষ। কারণ, তার অর্থনীতির বিকাশ ও উন্নয়ন ইতোমধ্যেই ফেল করেছে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

ট্রাম্পের ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট স্ট্র্যাটেজি’ by জি. মুনীর

১৮ ডিসেম্বর ২০১৭। এই দিনটিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্র্যাটেজি’। আগেকার নিরাপত্তা নীতিকৌশলের মতো এই নিরাপত্তা দলিলেও প্রতিশ্রুতি ঘোষিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখার ব্যাপারে। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে ১৯৮৬ সালের ‘গোল্ডওয়াটার-নিকোলাস অ্যাক্ট’ পাস হওয়ার পর থেকে যেক’টি এই নিরাপত্তা কৌশল দলিল প্রণীত হয়েছে, এর প্রতিটির থিমই ছিল, এই বিদ্যমান সুবিধা অব্যাহত রাখা। এই আইনের মাধ্যমে ম্যান্ডেট দেয়া হয় যে, প্রেসিডেন্টকেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার রূপকল্প বা ভিশন প্রণয়ন করতে হবে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রজেক্টের সাথে খাপ খাইয়ে তিনি এই নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করেছেন ‘মেইক অ্যামেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ ধারণাকে সামনে রেখে ৫৫-পৃষ্ঠার এই নিরাপত্তা দলিলে গ্রহণ করে নেয়া হয়েছে ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট স্ট্র্যাটেজি’। এই দলিলের মতো আমেরিকার আর কোনো দলিলে ‘অ্যামেরিকান’ বিশেষণটি এতটা আবিষ্টভাবে ব্যবহার করা হয়নি। এখানে বিধৃত স্ট্র্যাটেজি হচ্ছে : ‘to protect the American people, the American way of life or American interests’ or ‘A strong America is in the vital interest of the American people.’। এটি যেন এমন কথারই অব্যাহত উচ্চারণ যে, আমেরিকানরাই কোনো না কোনো উপায়ে আমেরিকাকে আবারো ‘গ্রেট’ করে তুলবে। এই নিরাপত্তা কৌশলের ধাঁচটি হচ্ছে এমন যে, আমেরিকাকে ক্ষমতাধর করে তোলা যাবে না, যদি দেশটির অর্থনীতি দুর্বল থেকে যায়। অর্থনীতিতে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি হচ্ছে, কম করারোপ ও কম বিধিনিষেধ আরোপ করে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ ত্বরান্বিত করতে হবে। আরো জোরদার অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ করে দেবে আরো বড় মাপের সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার। আর এটাই হবে বিশ্বে সুপার পাওয়ার হিসেবে টিকে থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রর বড় অবলম্বন। বিশ্বে আমেরিকার বিরোধিতা রোধ করতে আমেরিকার চাই একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অর্থ হচ্ছে, যেকোনো পরিকল্পনায় আমেরিকানদের কথা সর্বপ্রথম বিবেচনায় আনা। আর বৈষম্যের এই বিশ্বে আমেরিকাকেই সবার আগে রাখা, অন্যদের পেছনে ঠেলে দেয়া। ‘অ্যামেরিকা ফার্স্ট স্ট্র্যাটেজি’র ক্ষেত্রে আমেরিকার ‘অর্থনৈতিক নিরাপত্তা’ বলতে কী বুঝব? ট্রাম্পের পুরো অর্থনৈতিক অ্যাজেন্ডা একটা বাজি বৈ কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল দলিল স্বীকার করে, যুক্তরাষ্ট্রের করপোরেশনগুলো সে দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। এরা ট্রিলিয়ন-ট্রিলিয়ন ডলার ধরে রাখছে; কিন্তু বিনিয়োগ করছে না উৎপাদনশীল খাতে। এই কৌশলপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে- ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সঙ্কট সময়ের পর থেকে রিস্ক অ্যাভারসন (ঝুঁকি এড়ানো) ও রেগুলেশনের (বিধিনিষেধ আরোপের) স্থান প্রতিস্থাপিত হয়েছে ইনভেস্টমেন্ট ও এন্টারপ্রিনিউয়ারশিপের মাধ্যমে। ট্রাম্পের ইকোনমিক টিম ধরে নিয়েছে, কর ও বিধিনিয়ন্ত্রণ আরোপ কমিয়ে আনার ফলে ব্যবসাায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহী হবে আমেরিকায় বিনিযোগের ব্যাপারে। আর এর ফলে আমেরিকার সাধারণ নাগরিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে। কর্মসংস্থানের আয়তন বাড়বে। এ ধরনের ‘ট্রিকল-ডাউন’ পলিসির প্রমাণ খুবই দুর্বল। বিগত এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগ প্রশ্নে যত প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, এর সবই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। কম সুদহারে করপোরেশনগুলো সরকারি ঋণ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু এই অর্থ এরা উৎপাদনশীল খাতে কিংবা সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির খাতে বিনিয়োগ করেনি। বরং এর পরিবর্তে এরা এই অর্থ এমন খাতে বিনিয়োগ করছে, যেখানে উচ্চ উৎপাদনশীলতা হার ও অটোমেশন কার্যত কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধিকেই নিরুৎসাহিত করেছে। অপর দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কিছু জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে। অবাক হওয়ার বিষয় নয়- জাতিসঙ্ঘের চরম দারিদ্র্য তথা এক্সট্রিম পোভার্টি ও হিউম্যান রাইটসবিষয়ক স্পেশাল রেপোর্টিয়ার ফিলিফ অ্যালস্টন যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্য সম্পর্কে বিব্রতকর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশলপত্র ও এই প্রতিবেদন একই সপ্তাহে প্রকাশিত হয়। অ্যালস্টনের এই প্রতিবেদন যেন এ সময়ের যুক্তরাষ্ট্র সমাজের কিছু কিছু অংশে অবতীর্ণ হলো এক কাব্যিক সূচক হিসেবে। লস অ্যাঞ্জেলেসে এমন অনেক লোক রয়েছে, যারা মানবেতর জীবনযাপন করছে সেখানকানকার স্কিড রো-তে। লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কিড রো হচ্ছে একটি ৫৪-ব্লক এরিয়া, যেখানে বসবাস করছে দেশটির হোমলেস পিপলের সবচেয়ে বড় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। নিউ ইয়র্ক সিটিতেও রয়েছে এমন গৃহহীন মানুষের বসবাস। তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের এসব ক্যাম্পের মানুষ বসবাস করে রাস্তার পাশে তাঁবুর নিচে। সেখানে নেই তেমন কোনো সেনিটেশনের ব্যবস্থা। গত সপ্তাহেও লস অ্যাঞ্জেলেসে এসব হোমলেস পিপলের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে, গুলিতে মারাও গেছে একজন। সম্প্রতি সানফ্রান্সিসকোতে পুলিশ একদল গৃহহীন মনুষকে একটি স্থান থেকে সরে যেতে বলে; কিন্তু তারা কোথায় যাবে, সে প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি পুলিশ। পোয়ের্টেরিকোর দক্ষিণে একটি পাহাড়ের পেছনে কিছু দরিদ্র লোক বসবাস করছে। এদের ওপর অবাধে পড়ছে কয়লার ছাই ও কয়লাবৃষ্টি। সম্পূর্ণ অরক্ষিত এরা। লেকাসগণনা পরিসংখ্যান মতে, চার কোটি আমেরিকান, অর্থাৎ প্রতি আটজনে একজন আমেরিকান দরিদ্র শ্রেণীভুক্ত।
এদের অর্ধেক চিহ্নিত ‘ডিপ পোভার্টি’ শ্রেণীভুক্ত। অ্যালস্টন রিপোর্ট মতো, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে পাস হওয়া ট্যাক্স বিল দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে বৈষম্যমূলক সমাজে পরিণত করবে। প্রটেস্ট্যান্ট মিনিস্টার ও নর্থ ক্যারোলিনার রাজনৈতিক নেতা রেভারেন্ড উইলিয়াম বার্বার এখন নতুন আন্দোলন গড়ে তুলছেন ‘পুওর পিপলস ক্যাম্পেইন’ নামে। এর মাধ্যমে আমেরিকার দারিদ্র্য সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি রাষ্ট্র ও মার্কিন সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরা হচ্ছে। রেভারেন্ড বার্বার মনে করেন, সে দেশে এমন কোনো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হতে পারে না, যেখানে হতদরিদ্রদের একপাশে ঠেলে দেয়া হয়। আমেরিকান নাগরিকদের জন্য সত্যিকারের হুমকি কোনটি? এই হুমকি কি উত্তর কোরিয়া, না দেশটির চরম দারিদ্র্য বা ক্ষুধা? ট্রাম্প আভাস দিয়েছেন, তিনি নাগরিকদের কল্যাণের ব্যাপারে সচেতন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলপত্রের পরামর্শ হচ্ছে- আমেরিকার সাধারণ মানুষকে উত্তর কোরিয়ার হুমকির বিষয়টি আমলে নিতে হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি হচ্ছে : ‘allow families to live without fear, and permit markets to thrive’। আলোচ্য নিরাপত্তা কৌশলপত্রে এটিই হচ্ছে ‘মোস্ট ওনেস্ট লাইন’। আমেরিকাকে সচেতন থাকতে হবে উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে, অপর দিকে, করছাড় থেকে উপকৃত হবে করপোরেশনগুলো। কারা সেই পিশাচ, যাদের দিকে ট্রাম্প প্রশাসন আঙুল তুলছে। ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকে যেভাবে দেখছে, তার পূর্ববর্তী ও স্নায়ুযুদ্ধোত্তর সময়ের প্রশাসনগুলোও পৃথিবীটাকে ঠিক সেভাবেই দেখেছে। প্রকৃতপক্ষে এরা এই হুমকি সংজ্ঞায়িত করতে ব্যবহার করে একই পদবাচ্য- ‘রিভিশনিস্ট পাওয়ার (রাশিয়া ও চীন) চায় আমেরিকান হেজিমনি রোধ করতে; ‘রগ স্টেটস’ (উত্তর কোরিয়া ও ইরানে প্রয়োজন সরকারের পরিবর্তন; ‘জিহাদিস্ট টেরোরিস্ট গ্রুপগুলোর ওপর উপর্যুপরি আঘাত হানতে হবে পূর্ণ মার্কিন সামরিক শক্তি ব্যবহার করে। পূর্ববর্তী মার্কিন সরকারগুলো অন্তত জর্জ বুশ ও বারাক ওবামার সময় থেকে এটাই বুঝতে পেরেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রে শক্তির একটা অবনতি ঘটেছে। এরা চেষ্টা করেছে তাদের শক্তি ফিরিয়ে আনতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে- অন্তহীন ‘ওয়ার অন টেরোর’ চালু রেখে এবং বহুপক্ষীয় ট্রেড এগ্রিমেন্ট ব্যবহার করে। ওবামা চীনের বাণিজ্যিক ভূমিকা খর্ব করার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করেছিলেন ট্র্যান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ এবং ট্র্র্যান্স আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রে একটি ঐকমত্য হচ্ছে- ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি আইনের কড়াকড়ি আরোপ ও অ্যান্টি-পাইরেসি রুলস ব্যবহার করে চীনকে এমনভাবে বাধাগ্রস্ত করা, যাতে দেশটি শ্রমঘন ম্যানুফ্যাকচারিং হাব থেকে হাই-টেকনোলজি-ড্রিভেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাওয়ার হাউজে পরিণত হতে না পারে। বুশ ও ওবামা উভয়ই সচেষ্ট ছিলেন চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন শক্তিকে কাজে লাগাতে; কিন্তু তাদের প্রয়াস একটা জায়গায় এসে থেমে যায়। আর ট্রাম্প বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক সেই জায়গাটিতেই। আসলে, ট্রাম্পের কৌশল হচ্ছে, চীনের মতো দেশকে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে থামিয়ে দিতে। ট্রাম্পের কৌশলের তাগিদ হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রভাব আরো জোরদার করে তুলতে কাজ করতে হবে, আর জোরদার করতে হবে আমেরিকার সামরিক শক্তি, যাতে আমেরিকার ‘সুপিরিওরিটি’ অব্যাহতভাবে জারি থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের আলোচ্য নিরাপত্তা কৌশল প্রকাশিত হওয়ার পরপরই আমরা ট্রাম্প প্রশাসন থেকে পেলাম একটি চরম দুষ্ট সিদ্ধান্ত : জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তরে ট্রাম্পের চরম অনৈতিক ও অগ্রহণযোগ্য আদেশ। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ বিশ্বের প্রায় সব দেশ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থক আরব দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করে মিসর। যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দেয়। এরপর তুরস্ক ও ইয়েমেন সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সহায়তায় বিষয়টি নিয়ে যায় জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে। সেখানে প্রস্তাবটি বিপুলভোটাধিক্যে পাস হয়। আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বেশির ভাগ দেশই আমেরিকার বিরুদ্ধে ভোট দেয়। যদিও আমেরিকা হুমকি দিয়েছিল, যেসব দেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে ভোট দেবে, তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে।
এ ঘটনা প্রমাণ করে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব তো বাড়েইনি, বরং কমছে। আসলে যুক্তরাষ্ট্রের প্যারিস আবহাওয়া চুক্তি থেকে ও ইউনেস্কো থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার বিষয়গুলো আমেরিকান প্রভাবের অধিকতর দুর্বলতারই প্রমাণবহ। এদিকে ডিপ্লোম্যাসি খাতে খরচ কমিয়ে আনার ফলে, বিশ্বের ওপর আমেরিকার প্রভাব আরো কমবে বলেই মনে হয়। এরপর অবশেষ থাকে যুদ্ধ। আলোচ্য নিরাপত্তা কৌশলপত্রে প্রতিফলন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট সম্পর্কিত সিদ্ধান্তের। যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক বাহিনীকে দেখা হয় মার্কিন পরাশক্তির স্যালভেশন টুল হিসেবে। ট্রাম্প আগ্রাসীভাবে বাড়িয়েছেন মার্কিন সামরিক ব্যয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে ওয়েল-ফান্ডেড মিলিটারি ফোর্স। ট্রাম্প তার দেশের সামরিক ব্যয়ের তহবিল যতটুকু বাড়িয়েছেন, সে পরিমাণ অর্থ রাশিয়া সামরিক বাহিনীর পেছনে সারা বছরে খরচ করে না। মার্র্কিন নিরাপত্তা কৌশলপত্রের একটি লাইন এমন : ‘We must convince adversaries that we can and will defeat hem- not just punish them if they attack the United States.’। আমেরিকার সামরিক বাহিনী জোরদার করে তোলার পেছনে মূল মন্ত্রটা এটাই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র চীন বা রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে লড়েও জয়ের মুখ দেখবে বলে যুক্তরাষ্ট্র আশা করে। বিগত দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করে যাচ্ছে সেসব দেশের সাথে মিত্রতা গড়ে তুলতে, যেগুলো রাশিয়া ও চীনের বৈরী। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ভারত তেমনি একটি দেশ। ট্রাম্পের নিরাপত্তা কৌশলপত্রে বলা আছে : ভারতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সম্পর্ক আরো গভীরতর করতে হবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহায়তা করতে হবে। কারণ, এ অঞ্চলে এর প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়িয়ে তুলছে চীন। আমেরিকার উদ্বেগ হচ্ছে চীনের প্রভাব নিয়ে, সে প্রেক্ষাপটেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। একইভাবে রাশিয়াকে দমাবার জন্য আমেরিকা চায় পূর্ব-ইউরোপের দেশগুলোর সাথে মিত্রতা গড়ে তুলতে। পশ্চিম গোলার্ধে ও আফ্রিকায় হুমকি হচ্ছে চীন ও রাশিয়া। এসব দিকে ট্রাম্পের অতিমাত্রিক নজর থাকায় যেমনি আমেরিকার দরিদ্র্যজনগোষ্ঠী বঞ্চনার শিকার হচ্ছে, দেশটিতে বাড়ছে মানুষে-মানুষে বৈষম্য, তেমনি গোটা বিশ্ব এখন রূপ নিচ্ছে সুপরিসর এক যুদ্ধ ক্ষেত্রে। মানবজাতি এসে দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ এক নিরাপত্তা হুমকিতে। যুক্তরাষ্ট্র এ পথ ছেড়ে কখন মানবিকতার সড়কপথে হাঁটবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সর্বত্রই সঙ্কট by সালাহউদ্দিন বাবর

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন চলছে নানা সঙ্কট। এই সঙ্কট কোনো দল বিশেষের নয়, সঙ্কট সরকারের তথা সরকারি দলের, সংসদে সরকারের অনুগত বিরোধী দলের এবং নানা সমস্যায় জর্জরিত প্রধান বিরোধী দল বিএনপির। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন ত্রিমুখী সঙ্কট যদি বিরাজমান থাকে, তবে দেশ চলবে কিভাবে! গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শুধু ক্ষমতাসীন বা সরকারি দলই দেশ পরিচালনা করে না। বিরোধী দল, সংসদেই হোক বা বাইরে, দেশ পরিচালনায় তাদেরও ভূমিকা থাকে। কিন্তু এখন বাংলাদেশে উল্লিখিত তিন শক্তির কেউই ভালো অবস্থায় নেই।
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে স্বাভাবিক পরিবেশ থাকা দরকার, সেটা বিরাজ করছে না। এর ফলে অনেক উপসর্গ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। আর সে কারণে নাগরিক জীবনেও নানা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এ নিয়ে এখন অনুযোগ করেও কোনো ফল হচ্ছে না। সরকারের সমস্যা হচ্ছে, তাদের কাছে শুধু ‘রাজনীতি’ প্রাধান্য পাচ্ছে এবং আগামীতে আবার কিভাবে ক্ষমতায় আসবে, তার হিসাব-নিকাশ কষাই মূল গুরুত্ব পাচ্ছে। বিরোধী দলকে কেমন করে কোণঠাসা করে রাখা যায়, সেটাই বড় ভাবনা। তাদের ওপর মামলার পাহাড় চাপিয়ে রাখা হচ্ছে। বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপিকে গণবিচ্ছিন্ন করার জন্য তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পর্যন্ত বাধা দেয়া হচ্ছে। এসব দিকে মনোযোগ দেয়ার কারণে সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনের শাসনের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে নিচে যে দেশগুলো আছে তার অন্যতম বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে নিচে আছে যে তিনটি দেশ, তার মধ্যেও রয়েছে বাংলাদেশ। এশিয়ায় সবচেয়ে নিচে অবস্থান করছে কম্বোডিয়া। তার এক ধাপ উপরে পাকিস্তান। আর তার ঠিক উপরে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি ভারতের ডাটলিডসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেয়া হয়েছে। লক্ষ করা যায়, আইনের শাসন না থাকার অন্যতম কারণ হচ্ছে সুশাসনের অভাব। বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটা দেখা যায় যে, ক্ষমতাসীনদের ‘নিজস্ব’ লোকজন আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটছে মারাত্মভাবে। জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে দুর্নীতি অনিয়ম ছড়িয়ে পড়েছে। সংসদে সরকারের ‘অনুগত বিরোধী দল’ জাতীয় পার্টি তাদের অবস্থান সরকারে না বিরোধী দলে, তা বুঝে উঠতে পারছে না। নিজেদের অবস্থান কোথায়, তা নির্ণয়ের ক্ষমতাও তাদের নেই।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বক্তব্য দানকালে জাতীয় পার্টি নেত্রী রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির (জাপা) সম্মান বাঁচাতে মন্ত্রিসভায় দলটির সদস্যদের পদত্যাগ করার নির্দেশ দিতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। মন্ত্রিসভায় তারা থাকবেন কি না সে সিদ্ধান্ত নেয়ার অবস্থানেও নেই দলটি। সংসদে রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন : আমরা সরকারি দল, না বিরোধী দল, কোনটি আমরা? তিনি বলেন, দেশে-বিদেশে নিজেদের পরিচয় দিতে পারি না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা লাগে। কারণ সবাই জানতে চায়, জাতীয় পার্টি সরকারি দল, না বিরোধী দল? তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম আমাদের মন্ত্রীগুলোকে উইথড্র করে নেন, আমাদের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে দেন। কিন্তু আমি জানি না, কেন সেটা হয়নি। অর্থাৎ, পরিচিতি সঙ্কটে জাপা এখন ভুগছে। বিএনপি নানা সমস্যায় রয়েছে দীর্ঘকাল ধরে। ২০১৪ সালে তাদের পক্ষে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া সম্ভব হয়নি। তারা তখন চেয়েছিলেন অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা তাদের সেই ন্যায্য দাবি পূরণ করতে সম্মত না হওয়ায় বিএনপির সে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। সেই থেকে বিএনপি নিরপেক্ষ ও প্রশ্নহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি নিয়ে সোচ্চার রয়েছে। আগামী নির্বাচন যাতে প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সে দাবিতে বিএনপি এখন সোচ্চার। বস্তুত এটা দেশের সব শ্রেণীর মানুষ চায়। ভালো নির্বাচন হলে সবাই তাতে অংশ নেবে, স্বাধীনভাবে ভোট দেবে। এর মধ্যে তো কোনো রাজনীতি নেই, কোনো হীন মানসিকতা নেই। নির্বাচনে কত ভালোভাবে জনমত প্রতিফলিত হবে, সেটাই সবার কামনা ও প্রয়াস হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে যত প্রতিবন্ধকতা দূর করার দাবি আসে তাকে স্বাগত জানায় সবাই। তবে লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে প্রশ্নহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রশ্নে যত মতবিরোধ। নিশ্চয়ই এটি অবাক হওয়ার মতো।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, ক্ষমতাই যদি শুধু নিছক রাজনীতির উদ্দেশ্য হয়, তবে জনকল্যাণ কার দ্বারা কিভাবে হবে? রাজনীতিতে ক্ষমতার নিমিত্ত হওয়া উচিত, কত ভালোভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়টি। এ জন্যই ক্ষমতার আকাক্সক্ষা থাকা উচিত। আজ পৃথিবী আর সনাতন পদ্ধতিতে এগিয়ে যাবে না। বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও আধুনিকতার প্রয়োগ পদ্ধতি রপ্ত করতে হবে। এ জন্য দলগুলোর গবেষণা, জপির ও তথ্য হালনাগাদ থাকতে হবে। আমরা যদি দেশের দলগুলোর দিকে দৃষ্টি দেই, তবে হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। অতীতে রাজনীতির স্বরূপ এবং রাজনীতিবিদদের ভূমিকা যা ছিল আজ সেখানে বহু বড় বড় ঘাটতি রয়েছে, রাষ্ট্রীয়ব্যবস্থায় বহু মারাত্মক দুর্বলতা লক্ষ করা যায়। সংসদ নির্বাচন নিয়ে স্বস্তি নেই। দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হলে এর কারণগুলো পরিষ্কার হবে। নির্বাচনের প্রধান দু’পক্ষ বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয় মতপার্থক্যের আরো বিস্তৃতি ঘটেছে। অথচ তাদের কাছাকাছি আসাটা একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের স্বার্থে জরুরি। যেকোনো একপক্ষ যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী না হয়, তবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। গত প্রায় ১০ বছর বাংলাদেশ বস্তুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে না। এটা শুধু অগণতান্ত্রিকই নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুদ্ধতার বরখেলাপ। আগামীতেও যদি এমনটি হয় তবে তা হবে দেশের জন্য আত্মঘাতী। একটি রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে যদি সত্যিকার জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা না থাকে, তা হলে আর জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা কার্যকর থাকে না। এর ফলে নানা ক্ষতিকর উপসর্গ দেখা দেয়, যা ইতোমধ্যে এ দেশে লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশের বাইরেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়ে থাকে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এ বিষয়গুলো নিয়েও তিক্ত আলোচনা হচ্ছে, যা দেশের ভাবমর্যাদাকে খাটো করছে। বিএনপি বিরাজমান রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলছে, বর্তমান সময়ে তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছেন না। তারা নানা দিক থেকে বৈষম্যের শিকার। তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনেরা নানাভাবে ও নানা প্রক্রিয়ায় নির্যাতন চালাচ্ছেন। সমআচরণ থেকে বঞ্চিত বিএনপি হতাশ ও ক্ষুব্ধ। এদিকে বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া এখন কারারুদ্ধ, এটা দলটির জন্য একটি বড় সমস্যা। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেয়া সম্ভব হবে কি? এটা তারা পূর্বাপর বলে আসছেন, দল নেত্রী ছাড়া তাদের নির্বাচনে অংশ নেয়া সম্ভব নয়।
এদিকে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ‘সংবিধান অনুসারে’ নির্বাচন হবে, তাতে কেউ অংশ না নিলে তাদের ‘করার কিছু নেই’। অর্থাৎ নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টির যে দাবি বিএনপিসহ বিরোধী দল করছে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের কোনো আগ্রহ নেই। এ অবস্থায় আসলে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান আশা করা যায় না। বেগম জিয়া যেমন মামলায় ভোগান্তি পোহাচ্ছেন, অনুরূপ মামলায় জড়িত ছিলেন এখনকার সরকারি দলের বহু শীর্ষস্থানীয় নেতা। তারা ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেন। অথচ তাদের বিরোধী দলের নেতাদের মামলাগুলো জারি রাখেন। অথচ এসব মামলা দায়ের করা হয়েছিল ১/১১ সরকারের আমলে; যার উদ্দেশ্য ছিল ষড়যন্ত্রমূলক এবং রাজনীতিবিদদের হেনস্তা করা। এদিকে, অংশগ্রহণমূলক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা খুব স্পষ্ট না হলেও আন্তর্জাতিকভাবে বহু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে পরিষ্কার বক্তব্য দেয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমের দেশগুলো এবং জাতিসঙ্ঘ সুষ্ঠু অবাধ ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জোরালো বক্তব্য দিচ্ছে। অপর দিকে, বর্তমান সরকারের অধীনেই ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ অনুষ্ঠানে সহায়তা দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বিদেশীদের এ ব্যাপারে যতটুকু আগ্রহ রয়েছে, তার চেয়ে এটা বেশি প্রয়োজন বাংলাদেশের জনগণের। কেননা গত প্রায় এক দশক দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সুশাসন আইনের শাসন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে দেশে শাসনব্যবস্থা দুর্বল এবং অকার্যকর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন শিথিল হয়ে পড়লে জনগণের দুঃখ কষ্ট দেখার বিষয়ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। জনগণ কোন দলকে পছন্দ করবে সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা একান্ত নির্ভর করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অভিপ্রায়ের ওপর। তবে দুটো বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। নির্বাচনে জনগণ পছন্দ করবে একটি দলকে। জনগণ যাকেই পছন্দ করুক, সে বিষয়টি নির্ধারণের জন্য সব দলের নাম ব্যালট পেপারে থাকতে হবে। সবার নাম ব্যালটে না থাকলে নির্বাচন প্রশ্নহীন ও গ্রহণীয় হবে না। তা ছাড়া ভোটের সামগ্রিক প্রক্রিয়া ও কার্যক্রম যাতে স্বচ্ছ হয়, দেশের সব ভোটার যাতে বাধা ও চাপমুক্ত হয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই স্বাভাবিক ও কাক্সিক্ষত অবস্থাটা সৃষ্টি করার ব্যাপারে প্রশাসনে এমন মানসিকতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য গণতন্ত্রের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি থাকা উচিত। আসলে একটি ভালো নির্বাচনের জন্য সরকার বা প্রশাসনের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং যারা নির্বাচনে অংশ নেবেন তাদের সেই প্রশাসনের ওপর আস্থা থাকা খুবই জরুরি। একটি ভালো মানের নির্বাচনের ব্যাপারে কারোই দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। এটা গণতন্ত্রের মূল চেতনা। এমন একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে যারা প্রধান পাত্র-মিত্র তথা সব রাজনীতিক, তাদের এ জন্য ফলপ্রসূ কাজ করা প্রয়োজন। কিন্তু যতদূর দেখা যায়, এ ব্যাপারে প্রধান দলগুলোর মধ্যে বিরাট মতপার্থক্য রয়েছে। এটা অবিলম্বে দূর হওয়া উচিত। আর সেজন্য অবশ্যই সংলাপ আয়োজন করতে হবে। পৃথিবীতে বিভিন্ন স্থানে এবং বিভিন্ন সময় সংলাপের মাধ্যমে পরস্পর বৈরী পক্ষের মধ্যে এমন কি বিশ্বযুদ্ধসহ নানা যুদ্ধ বিগ্রহের অবসান ঘটেছে। তারা বৈরী অবস্থা থেকে মিত্র হয়ে উঠেছেন। এখনো কার্যকর আলোচনা করে বন্ধ করা যায় পারস্পরিক শত্রুতা। মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন অত্যন্ত নাজুক। তার পরও জরুরি অবস্থায় দুই পাশের সীমান্ত রক্ষায় দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়। সমঝোতার মাধ্যমে উত্তেজনা হ্রাস পায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সংলাপ করে সমঝোতায় পৌঁছার নজির নেই। অতীতে বারকয়েক সংলাপ হয়েছে বটে। কিন্তু কোনো সফলতা আসেনি। এমনকি বেশ আগে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায়ও সংলাপ হয়েছিল, তাও ফলপ্রসূ হয়নি। এবারে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক সরকারের প্রশ্নেও বিএনপির পক্ষ থেকে কয়েক দফা সংলাপ অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তাব দেয়া হলেও, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে তা সাথে সাথে নাকচ করে দেয়া হয়।
তাই নির্বাচন প্রশ্নে মতপার্থক্য ব্যাপকভাবে বিরাজ করছে। আর এ প্রশ্নটি সুরাহা না হলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা বিরাজ করবেই। নির্বাচনের বেশি সময় হাতে নেই। এখন তাই সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে, সংশ্লিষ্ট সবাইকে তা দূর করার জন্য আশু উদ্যোগী হতে হবে। যদি ধরে নেয়া যায় যে, রাজনীতিকরা সমঝোতায় উপনীত হলেন। তারপরও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আরো একটি অধ্যায় রয়েছে। সেই অধ্যায়টি হলো নির্বাচন কমিশনের পারঙ্গমতা বা যোগ্যতা। যেকোনো নির্বাচনে সব প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিজয়ী হওয়ার দুর্দম মানসিকতা থেকে নির্বাচনে বল প্রয়োগ ও পেশিশক্তির ব্যবহারের হাজার নজির হয়েছে। একই সাথে থাকে ক্ষমতাসীনদের অন্যায় হস্তক্ষেপ যাতে নির্বাচনী পুরো প্রক্রিয়াটা তাদের অনুকূলে আসে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে জনগণের পক্ষে স্বাধীন ও চাপমুক্তভাবে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়া সম্ভব হবে না। জনগণ যদি তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন না ঘটাতে পারে, তবে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়বে। এটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নেহায়েত আশঙ্কা নয়। অতীতে বহুবার এমন গুরুতর অন্যায় অনিয়ম হয়েছে। তাই ভোটের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবিটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সব আয়োজন হওয়ার পর যদি নিরাপত্তার প্রশ্নই উপেক্ষিত হয় তবে সব কিছু ব্যর্থ হয়ে যাবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের আরেকটি শর্ত হচ্ছে, নির্ভুল ভোটার তালিকা। এই তালিকায় দেশের ভোটার হওয়ার যোগ্য সব নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া সবার গণতান্ত্রিক অধিকার।