Friday, February 15, 2019

নতুন কোনও সংগঠনে যুক্ত হচ্ছি না: বাংলা ট্রিবিউনকে ব্যারিস্টার রাজ্জাক by সালমান তারেক শাকিল

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারির পদ থেকে শুক্রবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) পদত্যাগ করেছেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। পদত্যাগপত্রে বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দলকে ক্ষমা চাওয়া উচিত এবং কয়েক দফা উদ্যোগ নিলেও দলের হাইকমান্ড এতে কর্ণপাত না করায় তিনি পদত্যাগ বেছে নিয়েছেন।
শুক্রবার দুপুরে লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াত থেকে পদত্যাগ করে নতুন কোনও সংগঠনে যুক্ত হওয়ার কোনও ইচ্ছা আমার নেই।’ তার পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করলে তিনি এই প্রতিবেদকের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন। ব্যস্ততার কারণে তিনি স্বল্প সময় কথা বলেন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্রে ইস্তফার কারণসহ এও জানিয়েছেন যে, তিনি তার নিজের পেশায় আত্মনিয়োগ করবেন।
বাংলা ট্রিবিউনের প্রশ্ন ছিল—আপনি এমন সময়ে ইস্তফা দিয়েছেন, যে সময় জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্যরা দলের নাম পরিবর্তন ও নতুন নামে ভিন্ন আঙ্গিকে নতুন সংগঠন তৈরির সম্মতি জানিয়েছেন। সেক্ষেত্রে আপনার পদত্যাগ কী সেই নতুন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার পূর্বলক্ষণ? জবাবে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘জামায়াত কী করবে কী করবে না, সেটা আমি বলতে পারবো না। পদত্যাগপত্রে বলেছি আমি আমার পেশায় যুক্ত থাকবো। নতুন কোনও সংগঠনে যুক্ত হচ্ছি না।’
আপনার পদত্যাগের পর জামায়াতের প্রতিক্রিয়া জেনেছেন কি? উত্তরে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমি জামায়াতে ইসলামীতে ছিলাম। আজকে পদত্যাগপত্র দলের আমির মকবুল আহমাদের কাছে পাঠিয়েছি। আমি নিজে ফোনে কথা বলেছি তার সঙ্গে, দলের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান সাহেবকে জানিয়েছি। আমরা বন্ধু ছিলাম। আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকবে আশা করি।’
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন। সেখানে তিনি আব্দুর রাজ্জাকের অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ‘তার পদত্যাগে আমরা ব্যথিত ও মর্মাহত। পদত্যাগ করা যেকোনও সদস্যের স্বীকৃত অধিকার। আমরা দোয়া করি তিনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আমরা আশা করি তার সঙ্গে আমাদের মহব্বতের সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে।’
ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের কাছে শেষ প্রশ্ন ছিল—আপনি কী সহসা দেশে ফিরছেন? তিনি বললেন, ‘লন্ডনে আমি ভালো আছি। লন্ডনেই আপাতত প্র্যাক্টিস করছি।’
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ভূমিকা পালনের জন্য জামায়াতে ইসলামী থেকে কোনও নেতার সরাসরি পদত্যাগের ঘটনা এই প্রথম। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্রে জানিয়েছেন— তিনি কয়েক দফায় জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন। ২০০১ সাল থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি তার পরামর্শ অব্যাহত রাখেন। এরমধ্যে ২০০৭-০৮ সালে, ২০১১ সালে সর্বশেষ শুরার বৈঠকে, ২০১৬ সালের মার্চে, নভেম্বরে তিনি আমিরের কাছে লিখিতভাবে প্রস্তাব করেন।
জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের পরিবারের সদস্যদের অনেকে বলছেন, জামায়াতে সংস্কারের প্রস্তাব তুলে কোনও নেতাই দলে থাকতে পারেননি। তবে এবার ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ বড় ঘটনা। দলের অনেকেই এটাকে পরবর্তী নতুন সংগঠনের কৌশল হিসেবে দেখছেন। যদিও বিগত দিনে যারাই জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা প্রসঙ্গে বা সংস্কার চেয়ে কথা বলেছেন, তাদের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
১৯৮২ সালে জামায়াতের অনুজ সংগঠন ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের। বর্তমানে ২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব তিনি। তার ভাষ্যে, ‘জামায়াতের ৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে রিভিউ করেছিলাম। রিভিউ বলতে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা। প্রায় ২০/২৫টি প্রশ্ন ছিল আমাদের। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামায়াতের অবস্থানের সিদ্ধান্ত জামায়াতের ফোরামে হয়নি। আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, এ সিদ্ধান্ত কোথায় হয়েছে? কার সভাপতিত্বে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২৬ মার্চ পর্যন্ত জামায়াত শেখ মুজিবকে ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তাহলে এটা চাওয়া কীভাবে ঘুরে গেলো? আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম, আপনারা ৭১ সালের এপ্রিলে যে বিবৃতি দিলেন, কোন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দিলেন? আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম, আপনারা আলবদর বাহিনী গঠন করলেন, এটা কোথায় করলেন, কে এই সিদ্ধান্ত নিলেন? এসব জামায়াত পছন্দ করেনি। জামায়াত ভুল করেছে। জামায়াত নাম-ই থাকা উচিত ছিল না।’
ওই সময়ে সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন ফরীদ আহমদ রেজা। বর্তমানে তিনি লন্ডনে প্রবাস জীবনযাপন করছেন। ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এবং আলেম সমাজের বিরোধিতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে বলে মনে করার কোনও কারণ দৃশ্যমান নয়।’
২০১৬ সালে জামায়াতে সংস্কারের প্রস্তাব এনেছিলেন প্রয়াত নেতা, রাজশাহী মহানগর আমির আতাউর রহমান। তিনি জামায়াতের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদের শ্বশুর। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি আতাউর রহমানকে কেন্দ্রীয় নায়েবে আমিরের পদ থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত প্রকাশ হয় দলে। ওই সময় দলের গঠনতন্ত্র সংশোধিত হয়। জামায়াতের নেতাকর্মীরা বলছেন, আতাউর রহমানও মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামান ২০১০ সালে কারাগার থেকে নতুন কৌশল প্রণয়নের জন্য চিঠি দিলেও তা আমলে নেয়নি জামায়াতের নেতৃত্ব।
গত কয়েক বছর আগে দল থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর মোজ্জাম্মেল হক। তিনি জামায়াতের ভেতরে সংস্কারের পক্ষে কাজ করলেও তা গৃহীত হয়নি। বর্তমানে তিনি নিজেই একটি নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে কাজ করছেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রয়াত এক নেতার সন্তানের ভাষ্য, ‘জামায়াতে থেকে সংস্কার করা যাবে না। যারাই সংস্কার চেয়েছে, তাদেরকেই বেরিয়ে যেতে হয়েছে।’ তবে তার কাছে প্রশ্ন ছিল, ‘ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বেরিয়ে যাওয়া কী নতুন কৌশল কিনা? জবাবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একজন সদস্য বলছেন, ‘তার পদত্যাগ হঠাৎ করেই নয়।
প্রয়াত ওই নেতার ছেলের ভাষ্য, ‘হতে পারে। নতুন সংগঠনে যদি জামায়াতের নেতারাই যান, তাহলে তো ইস্যু একই থাকবে। সেক্ষেত্রে নতুন অবয়বে সংগঠন করতেই হয়তো এ সিদ্ধান্ত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেবের পদত্যাগের বিষয়টি শুনেছি। আগে পুরো বিষয়টি আমি জেনে কথা বলতে পারবো।’

ইয়াবা ব্যবসা: কাল আত্মসমর্পণ, বদিসহ অনেকের নাম নেই by শেখ সাবিহা আলম ও গিয়াসউদ্দিন

  • • কাল আত্মসমর্পণ করছেন ১২০ জন ইয়াবা কারবারি।
  • • উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
  • • রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের নাম নেই তালিকায়।
  • • ইতিমধ্যে এসব নেতাদের অনেকে গা ঢাকা দিয়েছেন।
কক্সবাজারে বহুল আলোচিত ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান আগামীকাল শনিবার। টেকনাফ পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সকাল ১০টায় ১২০ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ছাড়াও মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুষ্ঠানে থাকার কথা রয়েছে।
তবে মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে পরিচিত, এমন রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের নাম নেই এই তালিকায়। ইতিমধ্যে তাঁদের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। এ ছাড়া মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্তের পর কেবল বদলি ছাড়া অন্য কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আইন অনুযায়ী যখন ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার হবে, তখন নেওয়া হবে।
কক্সবাজারের আলোচিত সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির নামও আত্মসমর্পণের তালিকায় নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৭৩ শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। যদিও ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণে তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে প্রচার আছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণও পাননি তিনি।
গত বছরের ৪ মে থেকে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন বাহিনী ও সংস্থা স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পরিকল্পনা নেয়। পাশাপাশি দেশজুড়ে চলা ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে প্রায় ৩০০ ইয়াবা কারবারি নিহত হন। এর মধ্যে কক্সবাজার জেলায় মারা গেছেন ৪৪ জন। গত ডিসেম্বর থেকে মাদক নির্মূলে ইয়াবা কারবারিদের ‘স্বাভাবিক জীবনে’ ফিরে আসা ও পুনর্বাসনে সরকার উদ্যোগ নেবে এমন ইঙ্গিত আসে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে আত্মসমর্পণের জন্য ইয়াবা কারবারিরা কক্সবাজার পুলিশ লাইনসে আশ্রয় নিতে শুরু করেন।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৭৩ শীর্ষ মাদক কারবারির মধ্যে যাঁরা আত্মসমর্পণ করেননি, তাঁদের মধ্যে আরও রয়েছেন আবদুর রহমান বদির ভাই টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ টেকনাফ উপজেলার সভাপতি মুজিবুর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সাংসদ মো. আলীর বড় ছেলে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ ও রাশেদ মোহাম্মদ আলী, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জাফর আহমদ ও তাঁর ছেলে টেকনাফ সদর ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান রফিক উদ্দিন ও তাঁর ছোট ভাই বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আজিজ উদ্দিন, সাবেক জেলা যুবলীগের সহসভাপতি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবুল কালাম, হ্নীলা ইউপির চেয়ারম্যান ও হ্নীলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এইচ কে আনোয়ার ও সাবরাং ইউপি সদস্য ও শাহপরীর দ্বীপ সাংগঠনিক শাখা যুবলীগের সভাপতি রেজাউল করিম।
সর্বশেষ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের করা ১১৫১ জনের তালিকায় পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাবেদ ইকবালসহ দলটির সহযোগী সংগঠনের ২৩ জন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর আলমসহ দলটির ১৭ জন এবং জামায়াত নেতা ও টেকনাফ পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র মো. ইসমাঈল আত্মসমর্পণ করেননি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
আত্মসমর্পণকারীদের তালিকায় আবদুর রহমানের ৪ ভাইসহ অন্তত ১২ জন নিকটাত্মীয় রয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযুক্ত সদস্যদের কী হবে?
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ১ জানুয়ারি ২০১৮ থেকে মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে ৩৮৮ পুলিশের বিরুদ্ধে। তাদের মধ্যে কনস্টেবল ২১৬ জন, নায়েক ১১ জন, সহকারী পুলিশ পরিদর্শক ৮১ জন, ট্রাফিকের সহকারী পুলিশ পরিদর্শক ৩ জন, সার্জেন্ট ১ জন, উপপরিদর্শক ৭৫ জন ও পরিদর্শক ১ জন। এই পুলিশ সদস্যদের কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার, সাময়িক বরখাস্ত ও বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার খবর পুলিশ সদর দপ্তরের কাছে নেই। যদিও গত বছর একাধিক ঘটনায় ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ জানায়, কাল সকালে কক্সবাজারে পুলিশের হেফাজতে থাকা প্রায় ১২০ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীকে সড়কপথে টেকনাফের অনুষ্ঠানস্থলে আনা হবে। এরপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে ইয়াবা তুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন কারবারিরা। এ সময় তাঁরা ইয়াবা ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অঙ্গীকার করবেন। অনুষ্ঠান শেষে আত্মসমর্পণকারীদের পুনরায় কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানো হবে।

অন্ধ হয়ে গেলেন সিলেটের জাহেদ by ওয়েছ খছরু

নির্জন এলাকা। বিদঘুটে অন্ধকার। সুরমার তীর। হাত-পা বাঁধা জাহেদ বার বার চিৎকার করে বলছিলেন ভাই- ‘আমার হাত-পা ভেঙ্গে দিন। চোখ দুটো নিবেন না। আমি আর দেখতো পারবো না।’ তার এই চিৎকারে মন গলেনি পাষণ্ড ছানু মিয়ার। নিজ হাতে জাহেদের চোখে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে চুন ঢুকিয়ে দেয়। তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয় জাহেদের।
কিন্তু কারো কানে পৌঁছেনি তার আর্তনাদ। দু’চোখের যন্ত্রণায় এক সময় সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। হঠাৎ ঠাহর করেন- কেউ তার পায়ে আগুন দিয়েছে। আবার চিৎকার করে উঠেন। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করা জাহেদ এ সময় একটু পানি চান। কিন্তু তার মুখে তুলে দেয়া হয় চুন মেশানো পানি।
এমন ঘটনা ঘটেছে সিলেটের গোলাপগঞ্জের নদী তীরবর্তী রুস্তুমপুর গ্রামে। এই ঘটনায় গুরুতর আহত জাহেদকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করার পর তার চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু চোখে দৃষ্টি ফেরাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন ডাক্তাররা। বলেছেন- হয়তো জীবনের মতো অন্ধ হয়ে গেছে জাহেদ। গতকাল জাহেদের ভাই আল আমিন শেষবারের মতো ডাক্তারের  সঙ্গে কথা বলেছেন। ডাক্তাররা চার দিনের চিকিৎসা শেষে তাকে ঢাকার চক্ষু হাসপাতালে রেফার্ড করেছেন। সিলেটের গোলাপগঞ্জের বাঘা এলাকার জাহেদের ওপর চলা নির্মম এ অত্যাচারের ঘটনায় গোটা উপজেলাজুড়ে চলছে ক্ষোভ।
পৌর মেয়র রাবেলসহ গুণীজনেরা সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার ধিক্কার জানিয়েছেন। জাহেদের বাড়ি গোলাপগঞ্জের বাঘা ইউনিয়নের দৌলতপুর গ্রামে। আর পাশের গ্রাম হচ্ছে জাহেদের ওপর নির্যাতনকারী ছানু মিয়ার। এ কারণে নগরীর আম্বরখানার সোনালী ব্যাংকের নিচতলায় ছানু মিয়ার মালিকানাধীন মাহি এক্সচেঞ্জে চাকরি করতো জাহেদ। প্রায় সময় টাকার বড় বড় চালান দিয়ে ছানু মিয়া জাহেদকে পাঠাতো এখানে-ওখানে। জাহেদও কোনো প্রশ্ন না করে চাকরির খাতিরে টাকা গন্তব্যে পৌঁছে দিতো। ৪ মাস আগে সিলেট নগরীর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন জাহেদ। সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা জাহেদের কাছ থেকে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। এরপর থেকে ছানুর সঙ্গে জাহেদের বিরোধ বাধে। জাহেদ জানতে পারেন- ছানু তাকে দিয়ে হুন্ডি ব্যবসা করাতো। আর যে টাকাগুলো ছিনতাইকারীরা নিয়ে গেছে সেই টাকা ছিল হুন্ডির। এরপর থেকে জাহেদ চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে আসেন।
ছানু মিয়া গত ৯ই ফেব্রুয়ারি রাতে তার এক আত্মীয় জুবেরকে জাহেদের বাড়ি পাঠায়। জাহেদকে ছানুর বাড়িতে জরুরি প্রয়োজনে আসতে বলেন। কথা মতো রাত ৯টার দিকে জুবেরের সঙ্গে ছানু মিয়ার রুস্তুমপুরের বাড়িতে যান জাহেদ। বাড়ি আসার পর ছানু মিয়াসহ কয়েকজন অজ্ঞাত যুবক জাহেদ ও জুবেরের হাত-পা বেঁধে ফেলে। এরপর তারা জাহেদকে নিয়ে যায় সুরমা নদীর তীরে নির্জন স্থানে। ওখানে নিয়ে যাওয়ার পর ছানু তার আগের কর্মচারী জাহেদকে জুবেরের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়ার জন্য বলে। জানায়- সে সাক্ষ্য দেবে জুবেরই তার টাকা ছিনতাই করেছে। এতে রাজি হয়নি জাহেদ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ছানু মিয়া। সে প্রথমে মারধর করে জাহেদকে। পাশাপাশি জাহেদের গায়ে থাকা সুয়েটার দিয়ে মুখ বেঁধে ফেলে। একপর্যায়ে অজ্ঞাত দুই ব্যক্তি জাহেদের বুকের ওপর উঠে মাথা শক্ত করে ধরে রাখে। আর ছানু মিয়া হাত দিয়ে চুন মাখিয়ে দেয় চোখের ভেতর। চুন মেশানো পানিও খাওয়ানো হয় জাহেদকে। ঘটনার পর ছানুসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তাকে ধরাধরি করে ছানুর বাড়ির পুকুর পাড়ে নিয়ে যায়। ওখানে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলে।
পরে ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার দিয়ে লোকজনকে জড়ো করে। গ্রামের লোকজন ছানু ও জাহেদকে স্থানীয় বাঘা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যান। চেয়ারম্যান পুলিশ ডেকে জাহেদ ও ছানুকে তুলে দেন। পুলিশ জাহেদকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের চতুর্থ তলার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করে। জাহেদের পিতা বাছন মিয়ার দায়ের করা মামলায় ছানু মিয়াকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করে। এদিকে- ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে টানা চার দিন চিকিৎসা হয় জাহেদের। যন্ত্রণা কমলেও চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেছে জাহেদ। এই দৃষ্টি আর ফিরবে কী না- এ নিয়ে সন্দিহান ওসমানীর ডাক্তাররা। তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহেদকে ঢাকায় রেফার্ড করেছেন। আজ-কালের মধ্যে জাহেদকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তার ভাই মো. আল আমিন আহমদ। তিনি জানান- সিলেটের ডাক্তার জাহেদের চোখে দৃষ্টি ফেরাতে পারেননি। ঢাকায় নেয়ার পর আবার চিকিৎসা শুরু করা হবে। তবে- জাহেদের চোখে দৃষ্টি ফিরে আসার সম্ভাবনা কম বলে ডাক্তাররা মত দিয়েছেন।
জাহেদকে তুলে নিয়ে নির্যাতন ও চোখে চুন ঢেলে অন্ধ করে দেয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার ছানু মিয়ার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল ছানু মিয়াকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাকন দের আদালতে হাজির করে পুলিশ ৭ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গোলাপগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়- ছানু মিয়াকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যাবে। এদিকে- গোলাপগঞ্জে নিরীহ যুবক জাহেদ আহমদের ওপর নির্যাতন ও চোখ নষ্ট করার প্রতিবাদে সর্বস্তরের জনতার উদ্যোগে দক্ষিণ বাঘা বটর তল বাজারে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাঘা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেনের সভাপতিত্বে ও তরুণ সমাজসেবী হাবিবুর রহমান হাবিবের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন গোলাপগঞ্জ প্রেস ক্লাব সভাপতি আবদুল আহাদ, কাপ্তাই সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মহির উদ্দিন, বাঘা ইউনিয়নের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুল কাদির সেলিম, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সেক্রেটারি সেলিম আহমদ প্রমুখ। দরিদ্র পরিবারের সন্তান জাহেদ আহমদকে অমানুষিক নির্যাতন ও চোখে চুন দিয়ে দৃষ্টি শক্তি কেড়ে নেয়ার বিষয়টি মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। এর আগে গত বুধবার গোলাপগঞ্জের পৌর মেয়র রাবেল আহমদসহ সুধীজনেরা সংবাদ সম্মেলন করে বর্বরোচিত এ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।
জাহেদের পাশে মানবাধিকার কমিশন: সন্ত্রাসী হামলায় আহত জাহেদ আহমদকে দেখতে যান বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সিলেট জেলা ও মহানগর শাখার নেতৃবৃন্দ। বিকালে নেতৃবৃন্দ সিলেট এমএজি  ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জাহেদকে দেখতে যান ও চিকিৎসার খোঁজ খবর নেন। এ সময় নেতৃবৃন্দ বলেন, অমানবিক এই নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে জাহেদ আহমদের পাশে থাকবেন বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সদর দপ্তরের বিশেষ প্রতিনিধি ফারুক আহমদ শিমুল, সিলেট বিভাগীয় আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ও মহানগর সভাপতি আবদুল মান্নান, সিলেট জেলার সম্পাদক ইসলাম উদ্দিন, মহানগরের সহ-সভাপতি সাহাব উদ্দিন, জেলা শাখার অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক রুবেল আহমদ মাসুম, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. এনামুল হক এনাম প্রমুখ।

একাদশ সংসদ নির্বাচন কৌলিন্য হারিয়েছে -নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সার্বিকভাবে অংশগ্রহণমূলক হয়নি উল্লেখ করে এ নির্বাচন কৌলিন্য হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে কর্মকর্তাদের ব্রিফিং শেষে তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কমিশনে কোনো আত্মবিশ্লেষণমূলক আলোচনা হয়নি। মাহবুব তালুকদার বলেন, গণতন্ত্র কখনো একদলীয় হয় না। বহুদলীয় না হলে গণতন্ত্র রূপ লাভ করে না। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়ার বিষয়টিতে সর্বদা গুরুত্বারোপ করা হয়। তবে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হওয়া নিতান্তই প্রাথমিক প্রাপ্তি। তিনি আরো বলেন, নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হতে হয়।
এ দুটি শব্দের পরিমাপক জনগণ, যারা নির্বাচন করেন তারা নয়। এমন প্রেক্ষাপট মনে রেখে আগামী উপজেলা নির্বাচনে যাতে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার প্রতি জনগণকে অধিকতর আস্থাশীল করা যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
শুদ্ধ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়ে কমিশনার বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু ও শুদ্ধ। বিতর্কিত বা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কখনো কাম্য নয়। তিনি বলেন, আমরা সবাই বলি নির্বাচন আইনানুগ হতে হবে। কথাটার কিছু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। নির্বাচন আইনানুগ হওয়ার অর্থ সবার সমঅধিকার ও সবার প্রতি সমআচরণ নিশ্চিত করা। এ জন্য আপনাদের কঠোর নিরপেক্ষতা অবলম্বন করতে হবে।
কোনো প্রকার ভয়-ভীতি চাপ, লোভ বা প্রলোভনের কাছে নতি স্বীকার করবেন না। নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে সাহসিকতার সঙ্গে আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন। অনেক অপ্রত্যাশিত সমস্যা আপনাদের সামনে উপস্থিত হতে পারে। আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকেই আপনাদের তা মোকাবিলা করতে হবে। আইন কখনো সমস্যা সৃষ্টি করে না, সমাধান দেয়। আইনের ব্যত্যয়ই সকল সমস্যার মূল কারণ। যারা নির্বাচনের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন, তারা প্রতি পদক্ষেপে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, এটাই প্রত্যাশা। মাহবুব তালুকদার আরো বলেন, বর্তমান কমিশনের মেয়াদে অনেকগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়াও সাতটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব নির্বাচনে কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেছেন।
এসব নির্বাচনের সাফল্য ও ব্যর্থতা সম্পর্কে আপনারা সম্যক অবহিত। নির্বাচন কমিশনে এখন পর্যন্ত নির্বাচনগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে আত্মবিশ্লেষণমূলক আলোচনা হয়নি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আপনারা সাফল্য ও ব্যর্থতার যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তা থেকে পরবর্তী পর্যায়ের নির্বাচনগুলোর ভুলগুলো শুধরে নেয়ার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন।’ রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা উপজেলা নির্বাচনের মূল শক্তি। আপনাদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা আছেন। সবার সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়ার মূল দায়িত্ব কর্মকর্তাদের।

পিটিআই-এর রিপোর্ট: আসামের ১৭ আসনে জয়ী হবেন (কথিত) বাংলাদেশী মুসলিমরা -হিমান্ত বিশ্বশর্মা

নাগরিকত্ব (সংশোধিত) বিল ভারতের রাজ্যসভায় পাস না হওয়ায় ভীষণ বিরক্ত আসামের অর্থমন্ত্রী ও সিনিয়র বিজেপি নেতা হিমান্ত বিশ্বশর্মা। তিনি এ ঘটনায় ক্ষোভ সামলে রাখতে পারেন নি। বলে দিয়েছেন, এই বিল পাস না হওয়ায় আসামে যে ১৭টি আসন আছে তাতে বিজয়ী হবেন (কথিত) বাংলাদেশী মুসলিমরা।  বুধবার তার কণ্ঠে এমন ক্ষোভ ঝরে পড়ে। এর মধ্য দিয়ে তিনি আসামে বসবাসকারী মুসলিমদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাদের দাবি, এরা কথিত বাংলাদেশী মুসলিম। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা পিটিআই।
তিনি বুধবার বলেছেন, রাজ্যসভায় নাগরিকত্ব বিল পাস না হওয়া আসামের জন্য পরাজয়। তিনি আরো দাবি করেন, এই বিলটি ছাড়া আসামের ১৭টি আসনেই বিজয়ী হবেন (কথিত) বাংলাদেশী মুসলিমরা।
উল্লেখ্য, নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের আহ্বায়কও এই বিশ্বশর্মা। তিনি বলেছেন, তার দল এই বিলের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ ইস্যুকে সামনে রেখে তারা লোকসভা নির্বাচনে লড়াই করবেন।
৮ই জানুয়ারি নাগরিকত্ব বিষয়ক ওই বিলটি লোকসভা পাস করে। এরপর মঙ্গলবার বিলটি তোলার কথা ছিল উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায়। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনের আগে এটিই ছিল রাজ্যসভার শেষ অধিবেশন। এদিন বিরোধীদের তীব্র বিরোধিতায় বিলটি উত্থাপন করা যায় নি। ফলে বিলটি মৃত অবস্থায় রয়েছে। এ প্রসঙ্গে হিমান্ত বিশ্বশর্মা বলেছেন, আমি মনে করি রাজ্যসভায় বিলটি পাস না করার অর্থ হলো আসামের পরাজয়। এখন আসামের নাগরিকদের কে রক্ষা করবেন? এখন রাজ্যসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই এনডিএ সরকারের। তাই তারা বিলটি আবার উত্থাপন করতে পারছে না। কিন্তু বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট যদি আবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় তাহলে বিলটি আবার তোলা হবে। তিনি আরো বলেন, আমার দল এ বিলটিকে সমর্থন করে। বিজেপি অঙ্গীকারাবদ্ধ। এর প্রতি চিরদিন অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবে। এই প্রতিশ্রুতিতে নির্বাচনে লড়াই করবে বিজেপি।
নিম্নকক্ষ লোকসভায় গত মাসেই পাস হয়েছিল নাগরিকত্ব বিল। কিন্তু নির্বাচনের আগে বুধবার পার্লামেন্টের শেষ অধিবেশনে বিলটি অনুমোদন পায়নি। এ বিলের বিরুদ্ধে যারা অবস্থান নিয়েছিলেন এতে তাদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। অন্যদিকে আসাম রাজ্য সংগঠনের সদস্যরা বিলটি আটকে দেওয়ার জন্য রক্তবন্যা বইয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। বিলটিকে ঘিরে উত্তরপূর্ব ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সম্প্রতি বিক্ষোভও হয়েছে। মঙ্গলবার সরকারপক্ষ থেকে বিলটি রাজ্যসভায় পেশ করার কথা ছিল।  কিন্তু বিরোধীদের হট্টগোলে এদিন রাজ্যসভার অধিবেশন সারা দিনের জন্য মুলতবি করা হয়। এর আগে গত ৮ জানুয়ারিতে লোকসভায় পাস হয়েছিল বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়া অ-মুসলিম শরণার্থীদের নাগরিকত্বের প্রস্তাব সম্বলিত এই সংশোধনী বিল। সঙ্গে সঙ্গেই তা উত্তেজনা ছড়িয়েছিল উত্তর-পূর্ব ভারতে। অমুসলিম শরণার্থীদের তালিকায় আছেন হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, শিখ এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষরাও। বিলের আওতায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে ধর্মীয় সহিংসতার শিকার হয়ে কেউ ভারতে থাকার আবেদন করলে নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ সুগম রাখা হয়েছে।

একটি বেগুন এবং...

টেপ মোড়ানো একটি বস্তু। পড়ে ছিলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অফিসের সামনে। এটাকে বোমা ভেবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসে। ডাকা হয় পুলিশ। আড়াই শতাধিক পুলিশ হাজির হয় ক্যাম্পাসে। বিপুল পরিমাণ পুলিশের উপস্থিতি আতঙ্ক বাড়িয়ে দেয় আরও কয়েকগুণ। আতঙ্কের পারদ তুঙ্গে ওঠে যখন ক্যাম্পাসে এসে হাজির হয় বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত-কর্মচারিদের।
ঘটনাস্থল ঘিরে সারারাত চলে কঠোর নজরদারি। পরে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা টেপ সরানোর পর দেখা যায়, এটি শুধুমাত্র একটি বেগুন বৈ কিছুই নয়। তবে, বেগুনটি সাদা না কালো তা জানা যায়নি। পরে বিষয়টি হাস্যরসের সৃষ্টি করে।
আজ শুক্রবার বেলা ১১ টার দিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের পাঁচ সদস্যের একটি টিম এতে অংশ নেন। আর এর আগে এই বেগুন নিয়ে ঘটে যায় লঙ্কাকান্ড। হাটহাজারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি বেলাল উদ্দিন জাহাঙ্গীর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বেগুন দিয়ে কেউ বোমা তৈরি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে এ কাজ করেছে। তবে কারা করেছে তাদের খুঁজে বের করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ।
ওসি জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১০ টার দিকে আইন অনুষদের ডিনের কার্যালয়ের সামনে বোমা সদৃশ্য বস্তু পড়ে থাকতে দেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীরা পুলিশকে খবর দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় ফাঁড়ির পুলিশ ঘটনাস্থল ঘিরে রেখে হাটহাজারী থানা পুলিশকে জানায়। হাটহাজারী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। ফলে শুক্রবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আড়াই শতাধিক পুলিশের উপস্থিতি ঘটে। এতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত সকল কর্মচারী-কর্মকতাদের সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এসে বোমাটির টেপ কেটে নিষ্ক্রিয় করার পর বলা হয় এটি শুধুমাত্র একটি বেগুন। যা নিয়ে হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় স্থানীয় জনমনে।
ওসি বলেন, বেগুনের মধ্যে তার ঢুকিয়ে বোমার মতো করে তৈরী করা ছিল। যার কারণে পুলিশ কর্মকর্তারা এটিকে তাজা বোমা মনে করে। এ ঘটনায় পুলিশ প্রশাসন ক্ষুব্দ। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বেরতে নির্দেশ দেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা।

যেভাবে খুন হন মাহফুজা by শুভ্র দেব

দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ইডেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ  মাহফুজা চৌধুরী। তিনটার দিকে মাসিক বেতন আনতে বাসায় যান তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক সুজন। বেতন বুঝিয়ে দেয়ার পর সুজন বাসা থেকে চলে যান। ৩টা ২১ মিনিটে সুজনের সঙ্গে মোবাইলফোনে কথা হয় তার। জানিয়ে দেন পরের দিন সকালে বের হবেন সময়মতো যেন চলে আসে। কথা শেষ করে আবার নিজের শোবার কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণ পর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বাসার গৃহকর্মী স্বপ্না ও রেশমা কিলিং মিশনের প্রস্তুতি নেয়। বিকাল আনুমানিক সাড়ে তিনটার পর তারা দুজন কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেয়।
পরে রেশমা মাহফুজা চৌধুরীর শরীরের ওপর উঠে শক্ত করে হাত-পা ধরে রাখে।
আর স্বপ্না গলায় ওড়না পেঁচিয়ে টান দিতে থাকে। এসময় তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় মাহফুজা চৌধুরীর। এক পর্যায়ে হাতের আঙ্গুল ভেঙে যায় তার। বাঁচার জন্য চিৎকার করতে চাইলে স্বপ্না বালিশ চেপে ধরে তার মুখের উপর। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যান ইডেনের সাবেক এই অধ্যক্ষ। পুলিশের হাতে আটকের পর এমনটাই জানিয়েছে গৃহকর্মী ৩০ বছর বয়সী রেশমা। মাহফুজা চৌধুরীর হত্যা মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পুলিশের বিশ্বস্ত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে রেশমাকে আটকের বিষয়টি গতরাত পর্যন্ত স্বীকার করেনি পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, মাহফুজা চৌধুরী হত্যার পর তার স্বামী ইসমত কাদির গামা বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় স্বপ্না, রেশমা ছাড়াও গৃহকর্মী সরবরাহকারী রুনুকে আসামি করা হয়। এরপর থেকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা এই খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটনে মাঠে নামেন। মামলার একদিন পরেই গ্রেপ্তার করা হয় রুনুকে। তার দেয়া তথ্যমতে পুলিশ আটক করে রেশমার ভাই শরীফকে। পরে পুলিশ শরীফের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে নেত্রকোনার স্বামীর বাড়ি থেকে আটক করে রেশমাকে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, অভাবের সংসারে অর্থের যোগান দিতে গৃহকর্মীর কাজ নেন নেত্রকোনার ৩০ বছর বয়সী রেশমা।
দিনমজুর স্বামী ছাড়াও সংসারে তিন সন্তান রয়েছে তার। তাই সংসারে নিত্যদিন অভাব অনটন লেগে থাকতো। উপায়ান্তর না পেয়ে রেশমা ঢাকায় থাকা তার ভাইয়ের কাছে সব খুলে বলে। বোনের এমন অবস্থা দেখে ভাই তার জন্য কাজ খুঁজতে থাকে। পরিচয় হয় বাংলাদেশ মেডিকেলের আয়া রুনুর সঙ্গে। যিনি বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজের লোক সরবরাহ করতো। এই রুনুই পরবর্তীতে রেশমাকে দীর্ঘদিনের পরিচিত এলিফ্যান্ট রোডের সুকন্যা টাওয়ারের ১৬/সি ও ১৫/সি ডুপ্লেক্স বাসায় মাসে ৬ হাজার টাকা বেতনে কাজ জুটিয়ে দেয়। সেই মোতাবেক ২রা ফেব্রুয়ারি রেশমা ওই বাসাতে কাজে যোগদান করে। একই বাসায় আড়াই মাস ধরে গৃহকর্মীর কাজ করছিলো স্বপ্না (৩০) ও পঞ্চাশোর্ধ রুশিদা বেগম।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রেশমা দাবি করেছে, কাজে যোগদানের পর থেকে গৃহকর্ত্রীর ব্যবহারে অখুশি ছিল সে ও স্বপ্না। যদিও স্বপ্না আরো অনেক আগে থেকেই কাজ করছিলো। স্বপ্না আরো আগে থেকেই গৃহকর্মীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। কিন্তু কিছুতেই সে সেই ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারছিল না। রেশমা কাজে যোগদানের পর সঙ্গী হিসেবে সে তাকেই বেছে নেয়। দুজনের ক্ষোভ থেকেই তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে রেশমা পুলিশের কাছে দাবি করেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে রেশমা জানিয়েছে, বাসার বাইরে যেতে না পারা, স্বজনদের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলতে না পারার জন্য তারা অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। তাই ৯ই ফেব্রুয়ারি মাহফুজা চৌধুরীকে হত্যা করে পালিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় তারা। রেশমা জানায়, কিলিং মিশনে তারা দুজনই অংশ নেয়। কারণ গৃহকর্তা ইসমত কাদির গামা প্রতিদিন সকালে বের হয়ে যেতেন আর আসতেন সন্ধ্যায়। ঘটনার দিন গৃহকর্ত্রী ও গৃহকর্তার মোবাইলফোনে কথা শুনে তারা নিশ্চিত হয়েছেন গৃহকর্তার ফিরতে দেরি হবে। তাই তারা পরিকল্পনা অনুযায়ী বয়স্ক গৃহকর্মী রুশিদাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখে। গাড়িচালক সুজন চলে যাওয়ার পর তারা মূল কিলিং মিশন শুরু করে। রেশমা আরো জানায়, মাহফুজা চৌধুরী নিস্তেজ হয়ে গেলে সে চলে যায় ডুপ্লেক্স বাসার ১৫/সি নিচ তলায়। আর এই সুযোগে স্বপ্না ১৬/সি উপরের তলায় এসে নিহতের কাছে থাকা চাবি নিয়ে আলমিরাসহ আরো কিছু জায়গা থেকে টাকা পয়সা ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর রেশমা নিচ তলা থেকে উপরের তলায় গিয়ে দেখে ঘরের সবকিছু এলোমেলো হয়ে আছে। সে বুঝতে পারে স্বপ্না সবকিছু নিয়ে পালিয়ে গেছে। তখন মাহফুজা চৌধুরীর মৃত্যু হয়েছে কিনা সে আরেকবার নিশ্চিত হয়। পরে ছোট একটি হ্যান্ড পার্টস ব্যাগ থেকে ৬ হাজার টাকা ও একটি স্বর্ণের চেইন ও কিছু কাপড় নিয়ে সেও পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়ার সময় বাসার নিরাপত্তাকর্মীরা হাতে ব্যাগ দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল সে কোথায় যাচ্ছে। তখন সে বলেছে, ১৬/সি-তে গৃহকর্মীর কাজ করে আর দর্জির দোকানে কাপড় সেলাই করতে যাচ্ছে। তারপর সেখান থেকে সরাসরি সে নেত্রকোনার স্বামীর বাড়িতে চলে যায়। বাড়িতে চলে গেলেও স্বামীর কাছে খুনের বিষয় চাপা রাখে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে বাড়ি ফিরেছে বলে জানায়।
এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই হত্যা মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটনে এখন পর্যন্ত ডজনখানেক ব্যক্তিকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। রুনু, রেশমা ছাড়াও এখনো পুলিশের কাছে আটক আছে রেশমার স্বামী। এর আগেও একাধিক লোককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে কিলিং মিশনে অংশগ্রহণ করা আরেক আসামি স্বপ্না এখনো পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তাকে আটক করার জন্য পুলিশের একটি টিম গত কয়েকদিন ধরে কাজ করছে। রুনুর স্বামী মো. মোজাম্মেল বলেন, ১২ বছর আগে রুনুর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। সে বাংলাদেশ মেডিকেলে আয়ার কাজ করে আর আমি মোহাম্মদপুরে একটি আড়তে চাকরি করি। ওই আড়তের পাশেই আমাদের বাসা। বাসার পাশেই রেশমার ভাই চাকরি করতো। তাই রুনুকে সে চিনতো। তখন ওই ভাই রুনুকে রেশমার জন্য চাকরি খুঁজে দেয়ার কথা বলেন। মোজাম্মেল বলেন, ইসমত কাদির গামার সঙ্গে আমি ও আমার স্ত্রীর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। তিনি রুনুকে গৃহকর্মী দেয়ার কথা বলেছিলেন।
তাই রেশমাকে ওই বাসায় কাজে দিয়েছিল রুনু। বিনিময়ে নগদ ২০০ টাকা ও একটি শাড়ি পেয়েছিল। কিন্তু রেশমা এমন কাজ করবে তা সে কখনই জানতো না। ঘটনার পরের দিন গৃহকর্তা রুনুকে ফোন করে গৃহকর্ত্রী হত্যার কথা জানায়। ভয় পেয়ে সে মোবাইল বন্ধ করে তার খালাতো ভাইয়ের বাসায় চলে যায়। তার মোবাইল বন্ধ পেয়ে গৃহকর্তা আমার মোবাইলে ফোন দিয়ে হত্যার বিষয়টি বলেন। তখন আমিই তাকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিয়েছি। কারণ সে কোনো দোষ করে নি। দোষ না করে যদি সে পালিয়ে থাকে তবে শাস্তি বেশি হবে।
নিউ মার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি ওই দুই নারী গৃহকর্মীই মাহফুজা চৌধুরীকে হত্যা করেছে। আমরা খুব তাড়াতাড়ি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবো।
গত ১০ই ফেব্রুয়ারি এলিফ্যান্ট রোডের সুকন্যা টাওয়ারের ১৬ তলা থেকে ইডেন কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মাহফুজা চৌধুরীর মরদেহ উদ্ধার করেছে নিউ মার্কেট থানা পুলিশ।

ইরানের নাম উল্লেখ ছাড়াই ওয়ারশ’ সম্মেলনের সমাপ্তি

আমেরিকার উদ্যোগে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ’তে অনুষ্ঠিত দু’দিনব্যাপী ইরান-বিরোধী সম্মেলন তেহরানের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো ঘোষণা প্রকাশ ছাড়াই শেষ হয়েছে।
সম্মেলন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে আমেরিকা ও পোল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিকবার ইরানকে ‘নিরাপত্তাজনিত হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করলেও সম্মেলনের সমাপনি ঘোষণায় ইরানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠাকে সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ওয়ারশ’ সম্মেলন আয়োজনের শুরু থেকেই মার্কিন সরকার এটি আয়োজনের মূল লক্ষ্য হিসেবে ইরানের নাম উল্লেখ করে আসছিল। পরবর্তীতে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ ওয়াশিংটনের সে পরিকল্পনা সমর্থন না করায় এটিকে ‘মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক’ সম্মেলন হিসেবে অভিহিত করা হয়।
আমেরিকা এ সম্মেলনে অংশ নেয়ার জন্য বিশ্বের ৭০ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বেশিরভাগ দেশ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাঠায়নি যা আমেরিকার সঙ্গে এই ইউনিয়নের মতপার্থক্য অব্যাহত থাকারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত ওয়ারশ’ সম্মেলনে শুধুমাত্র আমেরিকা ও কয়েকটি আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নেন এবং পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ইহুদিবাদী ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এই সম্মেলনে যোগ দেন।
সম্মেলনের সমাপনি ঘোষণায় ইরানের নাম উল্লেখ করতে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এই সম্মেলনকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি এজন্য সন্তোষ প্রকাশ করেন যে, সম্মেলনে ইসরাইল ও আমেরিকার পদলেহী আরব দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে ইরানের ব্যাপারে কোনো মতপার্থক্য ছিল না। ইহুদিবাদী প্রধানমন্ত্রীও সম্মেলনে ইরানের বিরুদ্ধে খোলা গলায় বক্তব্য রাখতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তবে সম্মেলন শেষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আমেরিকা ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরোধিতা উপেক্ষা করে স্বাগতিক পোল্যান্ডের  পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াকিচ চাপোতোভিতজ বলেন, ইরানের পরমাণু সমঝোতার ব্যাপারে তার দেশ পরিপূর্ণভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি-অবস্থানকে সমর্থন করছে।
আমেরিকা গত বছরের মে মাসে ইরানের পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গেলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই সমঝোতা মেনে চলবে বলে ঘোষণা করেছে।

শিবিরের সাবেক সভাপতির চোখে জামায়াতের যত ভুল

জামায়াতের নানা ভুল নিয়ে খোলামেলা মতামত দিয়েছেন ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু। এ নিয়ে ফেসবুকে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন তিনি। সেই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
আমার খুব ঘনিষ্ঠ প্রিয় একজন মানুষ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফোন করলেন। কুশলাদি জানার পর সরাসরি প্রশ্ন করলেন- শুনলাম আপনি নাকি জামায়াত থেকে বের হয়ে নতুন দল খুলতে যাচ্ছেন? আমি তাঁর কাছ থেকে এ রকম আচমকা প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ হাসলাম। কী উত্তর পেলে ভদ্রলোক খুশী হবেন তা নিয়ে সামান্য ভাবলাম। - হ্যাঁ আপনি ঠিকই শুনেছেন। ঠিক! সত্যি সত্যি আপনি.... (তিনি চমকে উঠলে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললাম) আপনি যা শুনেছেন সেটা আমিও শুনেছি। মানে?- মানে হলো, এ রকম কথা বেশ কিছুদিন যাবত ফেসবুকের কিছু আইডি থেকে প্রচার হয়ে আসছে।
সেই সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় এ রকম আলোচনা হচ্ছে। কোনো অফিস, আদালত সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলে অনেকে মজা করে আমাকে বলে ভাই নতুন দলের খবর কী? আমার জন্য একটা পোস্ট রাইখেন। এগুলো শুনতে শুনতে আমি ধাতস্থ হয়ে গেছি। নতুন দলের উদ্যোক্তা! হিসেবে এ রকম কদর দেখে মাঝে মাঝে একটু-আধটু ভাবও নিই।
- ও আচ্ছা! তাহলে কী কথাটা সত্য নয়, শুধুই অপপ্রচার! আসলে আমার যদি যোগ্যতা থাকত, আমি যদি শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্যবান হতাম তাহলে বহু আগেই এ রকম একটা উদ্যোগ নিতাম। আমি চাই এ রকম একটা উদ্যোগ বড়রা কেউ নিক। আমি তাদের নিবিড় সহযোগী হবো। আপনি তো ভয়ানক কথা বলছেন। জামায়াতের মতো একটা সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক দলে ভাঙন ধরানোর কথা বলছেন। না না আমি জামায়াতের কথা বলছি না। আমি বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের কথা বলছি। আমি মনে করি বাংলাদেশে এই মুহূর্তে একটি রাজনৈতিক দলও নেই যারা বাংলাদেশে সুশাসন উপহার দিতে পারে। যারা সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার-এর ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারে। জামায়াত তো এ উদ্দেশ্যেই কাজ করছে এবং সৎ ও যোগ্য লোক  তৈরির মাধ্যমে তারা ধীরে ধীরে একটি সুন্দর দেশ উপহার দেয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। অবশ্যই জামায়াত চেষ্টা করছে। শুধু জামায়াত নয়, আরও অনেকেই চেষ্টা করছে। বাংলাদেশে এখনও যতটুকু আশা বেঁচে আছে তা সেসব প্রচেষ্টারই ফল। কিন্তু শুধু চেষ্টা করলেই তো হবে না। চেষ্টার সঙ্গে কর্মকৌশল, কর্মনীতি, যথা সময়ে প্রয়োজনীয় চিন্তা ও সিদ্ধান্তের সমন্বয় না ঘটলে সে চেষ্টা একসময় পথ হারিয়ে ফেলে। কখনও কখনও অনিশ্চয়তায় নিপতিত হয়। বহু নবী বিজয় অর্জন করতে পারেননি। চেষ্টা করতে করতে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির পথে তাঁরা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।
কিন্তু সর্বশেষ নবী এবং রাসূল (সা.) বিজয় অর্জন করেছিলেন। আল্লাহ্‌র বিধান প্রতিষ্ঠিত করে প্রমাণ করেছিলেন ইসলাম কীভাবে সমতা, শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে। জামায়াতের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য রাসূল (সা.) এর অনুরূপ। জামায়াত যে চেষ্টা করছে তাতে উদ্দেশ্য পূরণ হবে হয়তো কিন্তু লক্ষ্য যদি অর্জিত না হয় তাহলে সমাজ ও ইতিহাস আমাদের ব্যর্থই ভাববে। তাহলে আপনি মনে করেন বাংলাদেশে আপনারা জামায়াতের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হতে চলেছেন? হ্যাঁ মনে করি। তবে এই ব্যর্থতার একটা বড় দায়ভার জামায়াতের বিরোধীদের। জামায়াতকে সর্বক্ষেত্রে, সর্বদিক দিয়ে নির্মূল করার যে চেষ্টা সে চেষ্টায় তারা ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। আমরা সে ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার মোকাবিলা করতে পারিনি বরং দু’টি মেজর মিসটেক নিয়ে আমরা দীর্ঘ সংগ্রামী পথ পাড়ি দিয়েছি। একটি আদর্শগত তাত্ত্বিক ভুল অন্যটি রাজনৈতিক ভুল।
আদর্শগত ভুলটা কী? আমার দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এবং বাস্তবায়নে আমরা যে তত্ত্বগত, দার্শনিক ও বাস্তবায়নগত কর্মপন্থা নিয়েছি তা আদর্শগত ভুল। ফলে জামায়াতে ইসলামী কী একটি ইসলামী আন্দোলন? না রাজনৈতিক দল? তা নিয়ে দোটানায় থাকতে হয়। ইসলামী আন্দোলন হিসেবে আমাদেরকে মানতে পারেন না বৃহৎ অংশের আলেম ওলামারা। আবার সুশীল-মধ্যবিত্ত আর পাশ্চাত্যপন্থিদের সমলোচনা হল জামায়াত গোঁড়া- মৌলবাদী। প্রচলিত ভোট এবং জোটের রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত জায়েজ-নাজায়েজ, হালাল-হারাম ইত্যাদি বিতর্কে নাকাল হতে হয়। একটি রাজনৈতিক দল নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা হবে, সমলোচনা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জামায়াতে এটার সুযোগ কম। যেমন এই যে, আমি এখন আপনার সাথে জামায়াত নিয়ে আলোচনা করছি এটা যদি কেউ টেপ করে দায়িত্বশীলদের শোনায় তাহলে আমার সদস্যপদ থাকবে না। তাই নাকি! কেন? আমাদের গঠনতন্ত্রে সদস্যদের প্রকাশ্য মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বেরিয়ার আছে। ফোরাম ছাড়া অন্য কোথাও ভিন্নমত নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ নেই। যদি এ রকম তৎপরতা পরিলক্ষিত হয় তাহলে সেটা শৃংখলা ভঙ্গ, গ্রুপিং হিসেবে চিহ্নিত হয়। যেমন এখন আপনি আমাকে বললেন আমি দলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করছি। নতুন দল গড়তে যাচ্ছি- সেরকম। ভিন্নমত, ভিন্ন আলোচনা মানেই আপনি বিদ্রোহী। এটা রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য নয়। রাজনৈতিক দলে যৌক্তিক আলোচনা-সমলোচনা হবে। একটা অর্গানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কর্মীরা গড়ে উঠবে। একটু সমলোচনা হলেই সব গেল গেল, কর্মীরা বুঝি নিরুৎসাহিত হয়ে যাচ্ছে! ভীতি সঞ্চারিত হবে না। কোথাও দু’চারটা মিটিং হলেই হায়! হায়! দল বুঝি ভেঙে গেল! বলে রব উঠবে না।
বরং পাবলিক তর্ক- বিতর্ক দলকে সুসংহত করে মজবুত আস্থায় স্থাপিত করে। পবিত্র কুরআনে মুসলিম বাহিনীর শুধু সৌকর্যের কথা বলা নেই। পাশাপাশি ওহুদ যুদ্ধে তাদের বিপর্যয় ও আনুগত্য লঙ্ঘনের কথাও বলা আছে। হযরত আয়েশার (রা:) ইফকের মতো সেনসিটিভ ঘটনাও কুরআনে আল্লাহ্‌তায়ালা তুলে ধরেছেন। হাদিসে তো এমন কোনো জটিল বিষয় নেই যা বাদ গেছে। এ সকল কিছুই সবার জন্য উন্মুক্ত। যারা এসব দ্বান্দ্বিক জ্ঞানের বেড়াজাল পেরিয়ে ইসলাম গ্রহণ করবে তাঁরাই হবে মজবুত মুসলিম। অর্থাৎ ইসলামের যে পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক ও রাজনৈতিক রূপ সেই অর্থে জামায়াতে অপূর্ণতা রয়েছে। কিন্তু এটাতো মানবেন যে আপনারা মানে জামায়াত-খুব সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত দল। হ্যাঁ। সেটা বলতে পারেন। তবে সেটা এপারেন্টলি। কার্যত: জামায়াত পরিবার, জামায়াত অধ্যুষিত অফিসগুলো এবং জামায়াত সার্কেলের বন্ধু-বান্ধবেরা সারাক্ষণই জামায়াত নিয়ে ব্যাপক কাটা-ছেঁড়া করেন। এমন কোনো সমলোচনা নেই যা এ সকল আড্ডায় হয় না।
দায়িত্বশীলদের ঘর-বাড়ি, অফিসে এসবের মাত্রা আরও বেশি। কিন্তু ফোরামের পরিবেশ খুব বিশুদ্ধ, উখুয়াতে পরিপূর্ণ। আবেগ আর কান্নার রোলে সেখানে শুধুই পবিত্র বন্ধনের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি।
হুম্‌ (দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে) বুঝতে পারলাম। কিন্তু এবার বলেন, আপনাদের রাজনৈতিক মেজর মিসটেক বা ভুলটা কী? রাজনৈতিক বড় ভুল হলো- বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে আমাদের অস্বচ্ছ- বিভ্রান্তিকর অবস্থান। সেটা কী রকম? ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াত অংশ নেয়নি বরং বিরোধিতা করেছে। এই বিরোধিতা করে জামায়াত কী সঠিক করেছে? না ভুল করেছে? দলীয়ভাবে এ বিষয়টি তারা এখনো সুরাহা করতে পারেননি। ভুল শুদ্ধের সুরাহা না করেই জামায়াত বিভিন্ন সময়ে বক্তৃতায় বিভিন্ন কথা বলেছে। মরহুম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান’ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে। অথচ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তাদের বিবেচনায় শেখ মুজিব ছিলেন ‘ষড়যন্ত্রকারী’ ‘দেশদ্রোহী’ এবং মুক্তিযাদ্ধারা ছিলেন ‘ভারতের দালাল’। একই নেতৃবৃন্দের কাছে আমরা কখনো শুনি “মুক্তিযুদ্ধকালীন আমাদের ভূমিকা ছিল আবেগ নির্ভর ও বাস্তবতা বিবর্জিত” আবার কখনো তাঁরা বলেন- “৭১-এ আমরা যে ভূমিকা নিয়েছিলাম তা যে সঠিক ছিল তা এখন জাতি বুঝতে পারছে”!
মহান মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে আমাদের মুরব্বীদের মুখ থেকে দুই ধরনের পাঠ পাওয়াটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এতে বোঝা যায় তাঁরা পরিস্থিতি বুঝে একবার একরকম বলছেন। দলের সুস্পষ্ট কোনো স্ট্যান্ড নেই। ফলে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে এ প্রশ্ন জাগাটা খুবই স্বাভাবিক যে, মুক্তিযুদ্ধ কে সমর্থন না করাটা যদি সঠিক হয়, তাহলে বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস পালন কীভাবে সঠিক হয়? হ্যাঁ জামায়াত যদি ৭১ সালের ভূমিকার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতো, ক্ষমা চাইতো এবং সবার আগে আমাদেরকে অর্থাৎ দলীয় কর্মীদের কে সে বিষয়ে দীক্ষা দিত তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। আমাদের কে জানানো হয়েছে শেখ মুজিব স্বাধীনতা চাননি। তিনি স্বেচ্ছায় পাকিস্তানিদের হাতে ধরা দিয়েছিলেন। কিন্তু আবার জনসম্মুখে চাপে পড়ে বলা হচ্ছে শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা! ফলে আমাদের সকল রাজনৈতিক অর্জন এই এক ক্ষেত্রে এসে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রসঙ্গ এলে রাজাকার, আলবদর, যুদ্ধাপরাধী এমন কোনো গালি নেই যা আমাদের দেয়া হয় না। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে এবং নেতৃত্বের দোদুল্যমানতায় অযথা আমরা সমাজের ২য় শ্রেণির নাগরিক হয়ে আছি। আপনি কী মনে করেন মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে ক্ষমা চাইলে জামায়াতের রাজনীতি সবাই গ্রহণ করে ফেলবে? না আমি ক্ষমা চাওয়া আর ক্ষমা চাওয়ার সঙ্গে সবার রাজনীতি গ্রহণ করার কথা বলছি না। জামায়াত ভুল করেছে না শুদ্ধ করেছে সেটা আগে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করার কথা বলছি। আপনি যদি ভুল করে থাকেন আর সেটা স্বীকার না করে নানা ধানাই-পানাই করে যুক্তি দেন তাহলে সেটা কখনোই আপনি প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন না। এটা ইসলামিক পদ্ধতিও নয়। বরং এতে আপনার বিরুদ্ধ প্রচারণাটাই প্রতিষ্ঠা পাবে। আর যদি আপনার ভূমিকা হায় সঠিক, ন্যায়ানুগ এবং যুক্তিপূর্ণ কিন্তু আপনি পরিস্থিতির কারণে সুবিধা পাওয়ার জন্য বলেন না আমি ঠিক করিনি, আবেগ নির্ভর ছিল বা ভুল ছিল-সেটা আরো মারাত্মক। এই অস্পষ্টতা,  দ্বৈতাচরণ আপনাকে আদর্শিকভাবে শূন্য বানিয়ে ফেলবে। -তাহলে জামায়াত এখন কী করবে? আপনাদের যাদের ভিন্নমত তাঁরাই বা কী করবেন? দেখুন আমি রাজনীতি থেকে এখন অনেক দূরে। আমি আমার দলের একটি ক্ষুদ্র ইউনিটেরও দায়িত্বশীল নই। এই দলের ভাঙন তো দূরের কথা আমার কথায় দলের সামান্য সুতাও নড়বে না।
আমি আমার ওজন ও সামর্থ্য বুঝি। বিভিন্ন পেশা ও মতের মানুষদের নিয়ে কিছু ইনটেলেকচুয়াল গ্রুপ আছে যেখানে সমাজ রাজনীতি নিয়ে ডিস্কাশন হয়। আমি সে রকম কয়েকটির সদস্য। একটির মডারেটর আমি নিজে। সেখানে রাজনীতির রূপান্তর, কার কী ভবিষ্যৎ, জাতীয় মুক্তি আন্দোলন কীভাবে সম্ভব এসব নিয়ে আলোচনা হয়। আমার কাজ আলাপ-আলোচনা, ফেসবুকিং, আড্ডা এগুলোতেই সীমাবদ্ধ। যারা আমার সাথে কথা বলতে চায় তাদের সাথে কথা বলি। পেশাগত কাজে এদিক সেদিক যাই। কোন দাওয়াতে গেলে ছোট খাট মিটিং হয়ে যায়। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করার অধিকার আল্লাহ্‌তায়ালার প্রদত্ত অধিকার। আত্মসমলোচনা,  বৈরী পরিবেশেও হক কথা বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা এসব অনুপ্রেরণা আমি সংগঠন থেকে শিখেছি। আমি বিশ্বাস করি সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এর পথ বড্ড প্রতিকূল। পথভ্রষ্ট, দালাল, মুনাফেক, সংস্কারবাদী, সুবিধাবাদী, ভীরু, দলে ভাঙন সৃষ্টিকারী, ষড়যন্ত্রকারী, গ্রুপিং সৃষ্টিকারী, শৃঙ্খলা বিরোধী ও বিনষ্টকারী...... এ রকম বহুমাত্রিক গালি-অপবাদ তাদের পাথেয়। দলে তাদের ঠাঁই হয় না। শৃঙ্খলা রক্ষা, দলের ঐক্য অটুট রাখার স্বার্থে তাদের দল থেকে বের করে দেয়া হয়। তাদের দল ছাড়তে বাধ্য করা হয়। কিন্তু এরপরও কী দল অটুট থাকে? সংস্কারের দাবি তিরোহিত হয়? হয়না। দমননীতি আর অপবাদ দিয়ে সংস্কার আর পরিবর্তনের পথ রোধ করা যায় না।
সংস্কার কে যুক্তি এবং একোমোডেশন দিয়ে আত্মস্থ করতে হয়। তাহলে দল টিকে এবং সফল হয়। আপনি কী মনে করেন জামায়াত টিকবে? উফ্‌... আপনি তো দেখি আমাকে কঠিন ইন্টারেগেশনে ফেললেন। আমি আর কথা বলতে আগ্রহ বোধ করছি না। না না এটা বলেন। এটা বলেই শেষ করেন। শোনেন জামায়াত অবশ্যই টিকবে। যুগ যুগ শতাব্দীকাল ধরে টিকবো আমরা। কিন্তু সফল হবো কি না সেটাই প্রশ্ন? আর এই শতাব্দীকালের পরিক্রমায় আমাদের লক্ষ্য হয়তো সরে যাবে। উদ্দেশ্য সাধনে যুক্ত হবে শিরক, বেদায়াত, মানুষের ভয়। গঠনতন্ত্রের চাবুক আমাদের নমনীয়, অনুগত এবং তাক্‌ওয়াবান বানিয়ে রাখবে। এটাই বা কম সফলতা কিসের। আপনার জবাব কী পেয়েছেন?  হুম্‌ম্‌.. পেয়েছি। তবে দেশে আসলে আপনার সথেঙ্গ সাক্ষাতে আরও অনেক আলাপ করবো  ওকে। ভালো থাকবেন, দোয়া করবেন। আল্লাহ্‌ হাফেজ।

জামায়াত থেকে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক। দুটি কারণ উল্লেখ করে পদত্যাগপত্রে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন,  জামায়াত ৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধিনাতার বিরোধিতা করার জন্য জগনের কাছে ক্ষমা চায়নি এবং একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার আলোকে ও অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি। যুক্তরাজ্য থেকে বৃহস্পতিবার সকালে পাঠানো একটি চিঠিতে দলের আমীর মকবুল  আহমদের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র পেশ করেন। পদত্যাগপত্রটি ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের ব্যক্তিগত সহকারী কাউসার হামিদ পত্রিকায় পাঠান। এ ব্যাপারে কাউসার হামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, বিষয়টি সত্য। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেছেন। কেন পদত্যাগ করেছেন তার বিস্তারিত সেই পদত্যাগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যারিস্টার  রাজ্জাক  তার  পদত্যাগপত্রে  উল্লেখ  করেন  বাংলাদেশের  সমাজ  গঠনে  জামায়াতের  অনেক মুল্যবান অবদান থাকা সত্ত্বেও একবিংশ শতাব্দীতে  ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় অপারগ  হয়ে  পড়েছে।  এর  প্রধান  কারণ  হচ্ছে  জামায়াত  ১৯৭১  সালে  বাংলাদেশের  স্বাধীনতার  বিরোধিতা করেছিল।
তিনি বলেন, আমি বিগত প্রায় দুই দশক নিরবিচ্ছিন্নভাবে জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, ৭১-এ দলের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত এবং ওই সময়ে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তান সমর্থনের  কারণ  উল্লেখ  করে  জাতীর  কাছে  আন্তরিকভাবে  ক্ষমা  চাওয়া  উচিত।  কিন্তু  তার  সকল  প্রচেষ্টা  ব্যর্থ হয়েছে। ফলস্বরূপ ক্ষমা না চাওয়ার দায়ভার আজ তাদেরও নিতে হচ্ছে। যারা তখন এই সিদ্ধান্তের সাথে জড়িত ছিলনা,  এমনকি  যারা  ৭১-এ  জন্ম  গ্রহণও  করেনি।  অধিকন্তু,  অনাগত  প্রজন্ম  যারা  ভবিষ্যতে  জামায়াতের  সাথে জড়িত হতে পারে তেমন সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদেরকেও এই দায়ভার বহন করতে হবে। ব্যারিস্টার রাজ্জাক আরও বলেন, জামায়াতে যোগদান করার পর তিনি দলের ভেতরে থেকেই সংস্কার  করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কাঠামোগত সংস্কার, নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য মৌলিক পরিবর্তনের পক্ষে তার মতামত  তুলে  ধরেন।  ২০১৬  সালে  জামায়াতের  আমীরের   কাছে  লিখিত  চিঠিতে  তিনি  অন্যান্য  মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সংস্কারের উদাহরণ টেনে আভ্যন্তরিন সংস্কারের উপর সর্বোচ্চ  গুরুত্ব দেন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্রে বাংলাদেশ যুবসমাজের বিপুল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেন, 'তারা দেশপ্রেমিক এবং দেশের পরিবর্তনের জন্য প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে আগ্রহী ও সক্ষম। তিনি আরও বলেন, সময় এসেছে আমাদের পূর্বপুরুষের তৈরি ইসলামি রাষ্ট্রের ধারনায় কোনো পরিবর্তন আনা যায় কিনা তা নিয়ে নতুন প্রজন্মের গভীর ভাবে চিন্তা করার। রিশেষে তিনি কঠিন ও বৈরী সময়ে ব্যাপক কষ্ট এবং অসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে জামায়াত নেতৃবৃন্দ দলে ঐক্য বজায় রাখার প্রশংসা করেন। পদত্যাগ পত্রের শুরুতেই, ব্যারিস্টার রাজ্জাক দলীয় প্রধানকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, পরম শ্রদ্ধেয় মকবুল ভাই, আসসালাম আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, আজ এই মুহূর্তে আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করছি। এটি আমার জন্য এক কঠিন সিদ্ধান্ত। ১৯৮৬ সালে যোগদানের পর থেকে আজ অবধি আমি সততা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে জামায়াতে ইসলামীর আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করেছি। বিগত তিন দশক ধরে আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব সাধ্যমত পালন করতে সচেষ্ট থেকেছি। প্রধান কৌশলী হিসাবে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের  মামলা  আস্থা,  সততা  ও  একাগ্রতার  সাথে  পরিচালনা  করেছি।  আমার  বিশ্বাস,  জামায়াতের  দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে শুধ ইসলাম নির্দেশিত কর্তব্যই নয়, দেশের প্রতিও  দায়িত্ব পালন সম্পন্ন হয়।
জামায়াতে  ইসলামী  দুর্নীতি  মুক্ত  রাজনীতি,  অভ্যন্তরীণ  গণতন্ত্র  ও  দলকে  প্রাতিষ্ঠানিক  রূপ  দেয়ার  মাধ্যমে দেশের জন্য অসংখ্য সৎ, দক্ষ ও কর্মনিষ্ঠ নাগরিক তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। এতদসত্ত্বেও জামায়াত একবিংশ শতাব্দীতে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অপারগ হয়ে পড়েছে। একথা অনস্বীকার্য  যে,  জামায়াত  স্বতস্ফুর্তভাবে  বাংলাদেশের  স্বাধীনতা  ও  স্বার্বভৌমত্ব  মেনে  নিয়েছে।  এই  দেশের স্বার্থবিরোধী  কোন  কর্মকান্ডের  সাথে  জামায়াত  প্রত্যক্ষ  বা  পরোক্ষভাবে  জড়িত  নয়।  অধিকন্তু,  জামায়াত  গত শতাব্দীর  ৬০-এর দশকে  গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার  সকল সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে; যেমন, কমবাইন্ড অপজিশন  পার্টি (কপ), পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক  মুভমেন্ট (পি ডি এম) এবং ডেমোক্রেটিক একশন কমিটি (ডাক)। একইভাবে গত  শতাব্দীর  ৮০  এর  দশকে  ৮-দল,  ৭-দল  ও  ৫-দলের  সাথে  জামায়াত  যুগপৎভাবে  রাজপথে  সামরিক স্বৈরাচারের বিরদ্ধে সংগ্রাম করেছে। দলটির এসকল অসামান্য অবদান ৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে স্বীকৃতি পায়নি। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা পরবর্তীকালে জামায়াতের সকল সাফল্য ও অর্জন ম্লান করে দিয়েছে। এসব কারণে আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি এবং এখনও করি যে, ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে নেতিবাচক ভূমিকার জন্য  ক্ষমা চাওয়া শুধ নৈতিক দায়িত্বই নয় বরং তৎপরবর্তী প্রজন্মকে দায়মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত জরুরী কর্তব্য।
আমি বিশ্বাস করি, ইসলাম ও স্বাধীনতা সংগ্রাম বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভিত্তি । এ দুটি কোন অবস্থাতেই আপোষযোগ্য নয়, জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ এই দুইটি উপাদানকে বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করার সুযোগ নাই।  সংখ্যাগরিষ্ঠ  মানুষের  উপলব্ধি  ও  মুক্তির  আকাক্সক্ষার  বিপরীতে  দাঁড়িয়ে  তৎকালীন  জামায়াতে  ইসলামী বাংলাদেশের  স্বাধীনতার  বিরোধীতা  করেছিল।  পাকিস্তানি  শাসকগোষ্ঠীর  জুলুম,  বঞ্চনা  ও  বৈষম্যের  বিরদ্ধে ন্যায়সঙ্গত  আন্দোলনকে  যখন  পাকিস্তানী  সামরিক  জান্তা  গণহত্যা  ও  ধ্বংসযজ্ঞের  মাধ্যমে  নিস্তব্ধ  করে  দিতে চেয়েছে  তার  বিরদ্ধে  প্রকাশ্যে  প্রতিবাদ  করেনি।    স্বাধীনতার  ৪৭  বছর  পর  আজও  দলের  নেতৃবৃন্দ  ৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে পারেনি। এমনকি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ প্রসঙ্গে দলের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেনি। তাই অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতের ক্ষতিকর ভূমিকা সম্পর্কে ভুল স্বীকার  করে,  জাতির  কাছে  নিজেদের  সেই  সময়কার  নেতাদের  পক্ষ  থেকে  ক্ষমা  চেয়ে  পরিষ্কার  অবস্থান  নেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে। যে কোন রাজনৈতিক দল, ইতিহাসের কোন এক পর্বে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্রটি-বিচ্যুতির শিকার হতে পারে। কিন্তু তাকে ক্রমাগত অস্বীকার করে, সেই সিদ্ধান্ত ও তার ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনড় অবস্থান বজায় রাখা শুধ অগ্রহণযোগ্যই নয় বরং আত্মঘাতী রাজনীতি। তা কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
আমি বিগত প্রায় দুই দশক নিরবিচ্ছিন্নভাবে জামায়াতকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, ৭১-এ দলের ভূমিকা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত এবং ওই সময়ে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত। সুনির্দিষ্ট কারণসমূহ উল্লেখ করে যে যে সময় আমি বিষয়টি দলের শীর্ষ সংস্থা ও নেতৃত্বের কাছে উত্থাপন করেছি  তার কয়েকটির বিবরণ দিতে চাইÑ ক) ২০০১ এর অক্টোবর মাসে জামায়াতের তৎকালীন আমীর ও সেক্রেটারী জেনারেল মন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ  করেন।  বিজয়  দিবস  উদযাপনের  আগেই  ৭১-এর  ভূমিকা  নিয়ে  বক্তব্য  দেয়ার  জন্য  আমি জোরালো  পরামর্শ  দিয়েছিলাম।  একটি  কমিটি  গঠন  করা  হয়েছিল।  বক্তব্যের  খসড়াও  প্রস্তুত  করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। খ) ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বৈঠকে আবারো ৭১ নিয়ে বক্তব্য প্রদানের পক্ষে আমি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করি । আমার সেদিনের বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। গ) ২০০৭-২০০৮ সালে জরুরী অবস্থার সময় জামায়াতের বিরদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ভিন্ন মাত্রা পায়। তখনও ৭১ প্রসঙ্গে বক্তব্য প্রদানের জন্য জামায়াতকে বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি।
ঘ) আমি ২০১১ সালে মজলিসে শুরার সর্বশেষ প্রকাশ্য অধিবেশনে বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করি।
দলের নেতৃত্ব প্রদানে  এগিয়ে আসার জন্য নতুন  প্রজন্মের  প্রতি আমি বিশেষ  আহবান  জানাই । আমার  সেইপ্রস্তাব শীর্ষ নেতৃবৃন্দের একাশেংর অবহেলার নিকট পরাজিত হয়। ঙ) ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ আপনাকে পাঠানো ১৯ পৃষ্ঠার চিঠিতে ৭১ প্রসঙ্গে বক্তব্য প্রদানের জন্যে আমি পরামর্শ  দিয়েছিলাম।  তাতে  পরিবর্তিত  বিশ্ব  পরিস্থিতির  আলোকে  নতুন  আঙ্গিকে  রাজনীতি  শুর  করার আহবানও জানিয়েছিলাম।
চ)  ২০১৬  সালের  নভেম্বর  মাসে  আপনি  আমীর  নির্বাচিত  হওয়ার  অব্যবহিত  পর  এ  বিষয়ে  আমার মতামত চাওয়া হয়েছিল। আমি জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া সংক্রান্ত একটি খসড়া বক্তব্য পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন করা হয়নি।
ছ) সবশেষে,   ডিসেম্বরের   নির্বাচনের পর জানুয়ারী মাসে জামায়াতের করণীয় সম্পর্কে আমার মতামত চাওয়া হয়। আমি যুদ্ধকালীন জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেই। অন্য কোন বিকল্প না পেয়ে বলেছিলাম, জামায়াত বিলুপ্তি করে দিন। ৬।  কিন্ত অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় আমার তিন দশকের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
৭১ প্রসঙ্গে গ্রহণযোগ্য বক্তব্য প্রদানের ব্যর্থতা এবং ক্ষমা না চাওয়ার দায়ভার আজ তাদেরও নিতে হচ্ছে  যারা তখন এই সিদ্ধান্তের সাথে জিড়িত ছিলনা, এমনকি  যারা ৭১-এ  জন্ম  গ্রহণও করেনি। অধিকন্তু, অনাগত প্রজন্ম যারা ভবিষ্যতে জামায়াতের সাথে জড়িত হতে পারে তেমন সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদেরকেও এই দায়ভার বহন করতে হবে। এই ক্রমাগত ব্যর্থতা জামায়াতকে স্বাধীনতা বিরোধী দল হিসাবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে জামায়াত জনগণ, গণরাজনীতি এবং দেশ বিমুখ দলে পরিণত হয়েছে।
ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, জামায়াতে যোগদান করার পর আমি সিদ্ধান্ত  নিয়েছিলাম ভিতর থেকেই সংস্কারের চেষ্টা করব। বিগত ৩০ বছর আমি সেই চেষ্টাই করেছি। আমি কাঠামোগত সংস্কার ও নারীর কার্যকর অংশগ্রহণের পক্ষে ছিলাম। আমার সংস্কার বিষয়ক ভাবনাগুলো মৌখিক ও লিখিতভাবে দলের সামনে একাধিকবার উপস্থাপন করেছি। এ ব্যাপারে কমবেশি সকলেই অবহিত আছেন। ২০১৬ সালে আপনার কাছে লিখা চিঠিতে আমি আভ্যন্তরিন সংস্কারের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। অন্যান্য মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সংস্কারের উদাহরণ দিয়েছি। সবশেষে বিশ্ব পরিস্থিতি ও মুসলিম  দেশগুলোর  উত্থান  পতনের  আলোকে  জামায়াতের  উদ্দেশ্য,  পরিকল্পনা  ও  কর্মসূচীতে  আমূল  পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছি। প্রতিবারের ন্যায় কোন ইতিবাচক সাড়া পাইনি।
বাংলাদেশের যুবসমাজ সচেতন, শিক্ষিত এবং আলোকিত।তারা চলমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞাত এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে ওয়াকিবহাল। সর্বোপরি তারা দেশপ্রেমিক এবং দেশের পরিবর্তনের জন্য প্রত্যক্ষ ভূমিকা  রাখতে  আগ্রহী  ও  সক্ষম।এই  সচেতন  যুবসমাজের  একটি  অংশ  জামায়াতের  সাথে  থাকলেও  বৃহত্তর যুবসমাজকে নেতৃত্ব দিতে জামায়াত সফলতা অর্জন করতে পারেনি। বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক দল গড়ে তোলাএখন সময়ের দাবি। সময়ের সে দাবি অনুযায়ি জামায়াত নিজেকে এখন পর্যন্ত সংস্কার করতে পারেনি।
তিনি পদত্যাগপত্রে আরও বলেন, অতীতে আমি অনেকবার পদত্যাগের কথা চিন্তা করেছি। কিন্তু এই ভেবে নিজেকে বিরত রেখেছি যে, যদি আমি আভ্যন্তরিন সংস্কার করতে পারি এবং ৭১-এর ভূমিকার জন্য জামায়াত জাতির কাছে ক্ষমা চায় তাহলে তা হবে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। কিন্তু জানুয়ারি মাসে জামায়াতের সর্বশেষ পদক্ষেপ আমাকে হতাশ করেছে। তাই পদত্যাগ  করতে  বাধ্য  হলাম।  এখন  থেকে  আমি  নিজস্ব  পেশায়  আত্মনিয়োগ  করতে  চাই।  সেই  সাথে  ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধশালী ও দূর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব। পরিশেষে  জামায়াত  থেকে  পদত্যাগের  পূর্বমুহূর্তে  একটি  বিষয়  বলা  আমার  দায়িত্ব  মনে  করছি।  গত  দশ বছরে জামায়াত নেতৃবৃন্দ অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেছেন। তা এখনও অব্যাহত। এটি প্রশংসনীয় যে, এই কঠিন ও বৈরী সময়েও ব্যাপক কষ্ট এবং অসীম ত্যাগ ও তিতিক্ষার মাধ্যমে জামায়াত নেতৃবৃন্দ দলের ঐক্য বজায়
রেখেছেন। দলের প্রতি তাদের নিষ্ঠা এবং একাগ্রতা অনস্বীকার্য। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আপনার বিশ্বস্ত ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, বারকিং, এসেক্স, যুক্তরাজ্য।

আইনি লড়াইয়ে ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থীদের যত যুক্তি

একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭৪ জন প্রার্থী। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী তারা। বৃহস্পতিবার একদিনেই হাইকোর্টের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে জমা পড়েছে ৫৬টি আবেদন। জমার শেষ দিনে হাইকোর্টের নির্বাচনী আবেদন শাখায় ছিল ভিড়। হিমশিম খেতে হয়েছে শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। এসব আবেদনের শুনানি হবে নির্বাচনী আবেদনের এখতিয়ার পাওয়া হাইকোর্টের ৬টি একক বেঞ্চে।
আবেদনকারীরা বিজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বীর ফল বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের পুরো নির্বাচন বাতিল চেয়েছেন। আবেদনে নির্বাচনের আগের রাতে বেশির ভাগ কেন্দ্রে ব্যালটবাক্স ভরে রাখা, বিএনপির পোলিং এজেন্ট ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনে বাধা, ভোটারদের ভয় দেখানো, প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে নৌকায় সিল মারতে বাধ্য করাসহ নানা অভিযোগ এনেছেন প্রার্থীরা।
নির্বাচনী আবেদন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় করতে হয়।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) এর ৫১ (২) ধারায় বলা হয়েছে আবেদনকারী নির্বাচিত প্রার্থীর জয় বাতিল, আবেদনকারী বা অপর কোনো প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা এবং পুরো নির্বাচন বাতিল চাইতে হবে। ওই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আবেদন করা হয়।
আরপিও’র বিধান অনুযায়ী নির্বাচনের পর প্রকাশিত ফলাফলের প্রজ্ঞাপন জারির ৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আপত্তি বা ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে হবে। সে হিসেবে আজ শুক্রবার আবেদন দাখিলের শেষ দিন। কিন্তু সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ার কারণে বৃহস্পতিবারই ছিল আবেদনের শেষ সময়সীমা। তবে আইনজীবীরা জানিয়েছেন তামাদির কারণ দেখিয়ে পরেও আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
একেকজন আবেদনকারীকে ১০টি করে পৃথক আবেদন জমা দিতে হয়েছে। বিবাদী করা হয়েছে নির্বাচন কমিশন, নিজ নিজ আসনের প্রার্থীদের। এসব প্রার্থীদের বিবাদী করে তাদের প্রতি নোটিশ প্রদান এবং সাক্ষীদের তলবের আরজি রয়েছে আবেদনে।
সূত্র জানিয়েছে, গত ২৯শে জানুয়ারি প্রথম ঢাকা-৬ আসনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ধানের শীষের প্রার্থী ও গণফোরামের অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন। দ্বিতীয় আবেদনটি গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি গণফোরামের অপর প্রার্থী মানিকগঞ্জ-৩ আসনের মফিজুল হক খান কামাল দায়ের করেন। তৃতীয় আবেদনটি ৬ই ফেব্রুয়ারিতে কুড়িগ্রাম-২ আসনের মেজর জেনারেল (অব.) আ আ ম স আমিনের। ৭ই ফেব্রুয়ারি করেন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। এরপর গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাইফুল ইসলাম ফিরোজ আবেদন করলে দুই দিনে ১৪টি আবেদন জমা পড়ে। বৃহস্পতিবার শেষ দিনে ৫৬ জন আবেদন করেন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায়।
মাগুরা-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নিতাই রায় চৌধুরী সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদনে স্বাক্ষর করতে আসেন। স্বাক্ষর করতে করতে তিনি মানবজমিনকে বলেন, ৩০শে ডিসেম্বর দেশে কোনো নির্বাচন হয়নি। এ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আমরা এখন স্যাটেলাইট রাষ্ট্রের নাগরিক। আমরা জালিয়াতির এ নির্বাচন বাতিলের দাবি করছি।
ঢাকার প্রার্থীদের মামলার দায়িত্ব পাওয়া আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেছেন, ‘প্রতিটি নির্বাচনী আসনে ক্ষমতাসীন দলের প্রাার্থীরা যে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছে, সে সম্পর্কে কতগুলো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যেগুলো আমরা আমাদের প্রার্থীদের কাছে থেকে পেয়েছি, সেগুলো আমরা আবেদনে উল্লেখ করেছি।’ উদাহরণ হিসেবে একটি মামলার অভিযোগের বিবরণ দিয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘ঝিনাইদহ ৪ আসনে বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ করেছেন যে একটি কেন্দ্রে মোট ভোটার ২২৬২ জন। সেখানে ভোট পড়েছে ২২৫১টি। সেখানে ভোটার তালিকা থাকা ২৫ জন এরই মধ্যে মারা গেলেও রিটার্নিং অফিসারের হিসেবে দেখা গেছে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হননি ভোটার তালিকায় থাকা মাত্র ১১ ব্যক্তি। তাহলে ১৪ জন মৃত ব্যক্তি কি ভোট দিয়েছেন? কে কবে মারা গেছে সেটা আমরা আবেদনে উপস্থাপন করেছি।’
৭৪ জন আবেদনকারী হলেন-অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, ঢাকা-৬, মফিজুল ইসলাম খান কামাল (মানিকগঞ্জ-৩), মেজর জেনারেল (অব.) আ আ ম স আমিন (কুড়িগ্রাম-২), আব্দুল মোমেন চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৫), সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (ঝিনাইদহ-৪), আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী (টাঙ্গাইল-৭), অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন (বরিশাল-৩), রুমানা মাহমুদ (সিরাজগঞ্জ-২), জহির উদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১), শাহ রিয়াজুল হান্নান (গাজীপুর-৪), নাসের রহমান (মৌলভীবাজার-৩), আব্দুল হাই (মন্সিগঞ্জ-৩), হাফিজ ইব্রাহিম (ভোলা-২), রুহুল আমিন দুলাল (পিরোজপুর-৩), ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন (ঢাকা-১৯), হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (ভোলা-৩), তাসভীর উল আলম (কুড়িগ্রাম-৩), মো. সাইফুল ইসলাম (রংপুর-৬), মো. সাদেক রিয়াজ (দিনাজপুর-২), মোস্তফা মহসীন মন্টু (ঢাকা-৭), নজরুল ইসলাম আজাদ (নারায়ণগঞ্জ-২), মইনুল ইসলাম খান শান্ত (মানিকগঞ্জ-২), ইরফান ইবনে আমান অমি (ঢাকা-২), নবিউল্লাহ নবী (ঢাকা-৫), আশরাফ উদ্দিন (নরসিংদী-৫), মো. আমিরুল ইসলাম খান (সিরাগঞ্জ-৫), শহিদুল ইসলাম (টাঙ্গাইল-১), ফরহাদ হোসেন আজাদ (পঞ্চগড়-২), মো. হাসান রাজিব প্রধান (লালমনিরহাট-১), মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী (চট্টগ্রাম-১৬), মো. আকতারুজ্জামান মিয়া (দিনাজপুর-৪), মো. শাহজাহান মিয়া (চাাঁপাইনবাবগঞ্চ-১), মিজানুর রহমান (সুনামগঞ্জ-৫), জি কে গউছ (হবিগঞ্জ-৩), মজিবুর রহমান চৌধুরী (মৌলভীবাজার-৪), ফারুক আলম সরকার (গাইবান্ধা-৫), শফি আহমেদ চৌধুরী (সিলেট-৩), মো. আনোয়রুল হক (নেত্রকোনা-২), শাহ মো. ওয়ারেস আলী (জামালপুর-৫), নিতাই রায় চৌধুরী (মাগুরা-২), অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর-৩), মো. আবু সুফিয়ান (চট্টগ্রাম-৮), মাসুদ অরুণ (মেহেরপুর-১), আমিন উর রশিদ (কুমিল্লা-৬), ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন (নোয়াখালী-১), শহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া (খাগড়াছড়ি), সাব্বির আহমেদ (রংপুর-৩), মুন্সী রফিকুল আলম (ফেনী-১), জয়নাল আবদীন ফারুক (নোয়াখালী-২), সাচিং প্রু (বান্দরবান) শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক (চাঁদপুর-৩), আবুল খায়ের ভূঁইয়া (লক্ষ্মীপুর-২), জাকির হোসেন সরকার (কুষ্টিয়া-৩), রকিবুল ইসলাম (খুলনা-৩), শ্যামা ওবায়েদ ইসলাম (ফরিদপুর-২), আনিসুর রহমান (মাদারীপুর-৩), আজিজুল বারি হেলাল (খুলনা-৪), শাহ মো. আবু জাফর (ফরিদপুর-১), মো. শরিফুজ্জামান (চুয়াডাঙ্গা-১), হাবিবুল ইসলাম হাবিব (সাতক্ষীরা-১), আলী নেওয়াজ মো. খৈয়ুম (রাজবাড়ী-১)।
মেহেরপুর-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মাসুদ অরুণের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ কে এম এহসানুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, ওই আসনে ১০৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫৩টি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ থেকে শুরু করে ফল গণনা পর্যন্ত পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রিজাইডং কর্মকর্তার। মেহেরপুর-১ আসনের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। তার ব্যর্থতায় ৫৩টি কেন্দ্রে ধানের শীষের প্রার্থীর কোনো পোলিং এজেন্ট যেতে পারেননি। অথচ এসব কেন্দ্রে এজেন্ট দিয়েছিলেন প্রার্থী। এতে নির্বাচনের ফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
গত ১লা জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের  পর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন হাইকোর্টের ৬টি একক বেঞ্চকে নির্বাচনী আবেদন নিষ্পত্তির এখতিয়ার দেন। নির্বাচনী আবেদন নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি সৌমেন্দ্র সরকার, বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান, বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক, বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান, বিচারপতি মাহমুদুল হক ও বিচারপতি কাশেফা হোসেনের একক বেঞ্চকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। একক বেঞ্চের এখতিয়ার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট একক বেঞ্চের কার্য-তালিকায় এখতিয়ার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে ‘২০০১ ইং সনের গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধন) অধ্যাদেশ দ্বারা সংশোধিত ১৯৭২ইং সনের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ মোতাবেক “নির্বাচনী” আবেদনপত্র; যেসব বিষয় এই বেঞ্চে স্থানান্তরিত হইবে তার আবেদনপত্র গ্রহন করিবেন।’

‘১৪-১৫ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছিলো’ -ডা. মুশতাক হোসেন

১৪ ফেব্রুয়ারি সারাদেশের তরুণ-তরুণীরা যখন বিশ্ব ভালোবাসা দিবস পালন করছেন তখন তাদের অনেকেই হয়তো জানেন না এ দেশের ইতিহাসে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কী ঘটেছিলো। যা ছিলো একই সঙ্গে বেদনাদায়ক ও গৌরবময় ঘটনা এবং আজকের দিনটি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’।
১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন স্বৈরশাসক লে. জে. হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের বিতর্কিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে উঠেছিলো আন্দোলন।
সামরিক আইনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ১৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার জন্যে মিছিল নিয়ে আসে মন্ত্রণালয়ের কাছে। স্বৈরাচার এরশাদের পুলিশ নির্মমভাবে গুলি চালায় শিক্ষার্থীদের মিছিলে। নিহত হন অনেক ছাত্র।
সেই থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। ছাত্রসমাজের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। তারপরের ইতিহাস সবাই জানেন। পর্যায়ক্রমে আওয়ামী লীগ-বিএনপি স্বৈরাচারের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলেছে, ক্ষমতার অংশীদার করেছে। এখন আর বড় দুটি রাজনৈতিক দল সেভাবে দিবসটি পালন করে না। কেউ কেউ অজুহাত তৈরি করে নিয়েছে এই বলে যে- এটি তো ছাত্রদের আন্দোলন, তারাই পালন করবে। ১৯৫২ সালেও ছাত্ররাই প্রতিবাদ করেছিলেন, জীবন দিয়েছিলেন। তাই বলে ২১ ফেব্রুয়ারি শুধু ছাত্র সংগঠনগুলোই পালন করে না।
দিনটির স্মরণে আজ (১৪ ফেব্রুয়ারি) দ্য ডেইলি স্টার অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেন সেদিন মিছিলে অংশ নেওয়া জাসদ ছাত্রলীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ও ডাকসুর সাবেক জিএস ডা. মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, “আমরা বলি- ১৪ এবং ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম মিলিয়ে কমপক্ষে ৫০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিলো। মরদেহ হাতে কমই পেয়েছি। আমরা মোট তিনজনের লাশ হাতে পেয়েছিলাম। ঢাকায় মোজাম্মেল আইয়ুব ও জয়নাল এবং চট্টগ্রামে মোজাম্মেল কাঞ্চনের লাশ পাওয়া গিয়েছিলো। দীপালি ও জাফরের লাশ পাওয়া যায়নি।”
“মোজাম্মেল আইয়ুবের লাশ নিয়ে আসার সময় মর্গে গুলিবিদ্ধ আরও অনেকের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিলো। তাদের দেওয়া তথ্য থেকেই বলা হয় যে সেসময় পুলিশের গুলিতে কমপক্ষে ৫০জন মারা গিয়েছিলেন,” যোগ করে এই সাবেক ছাত্রনেতা।
তার মতে, ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ও চট্টগ্রামে একটি করে- মোট তিনটি লাশ হাতে পাওয়া গিয়েছে।। “তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন যে পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছেন আরও অনেক মানুষ। যেমন- একজন মেয়ের লাশ পুলিশকে নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিলো। পরে আমরা জেনেছি দীপালি নামের এক মেয়ে নিখোঁজ রয়েছেন।”
দিনটির স্মৃতিচারণ করে তিনি আরও বলেন, “আমি তখন বৈজ্ঞানিক জাসদ ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে মিছিল শুরু হয়। আমি মিছিলে ছিলাম। এরপর মিছিলটি কার্জন হলের সামনের রাস্তায় এলে পুলিশ বাধা দেয়। তখন আমি কার্জন হল এবং শিশু একাডেমির সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিলাম। আমি মিছিলের অগ্রভাগ থেকে সামান্য পেছনে ছিলাম। এরপর পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়া হয়। পুলিশ গুলি চালায়।”
“মৃত্যুর ঘটনা সরকার যদি রেকর্ড না করে তাহলে তা সঠিকভাবে জানা হয় না” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা যদি জয়নালের লাশ ছিনিয়ে না নিতাম তাহলে তার মারা যাওয়ার কথা জানতে পারতাম না। এমনিভাবে আমরা অনেকের লাশ উদ্ধার করতে পারিনি।”
অন্য একটি ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, “যেমন ধরুন- ১৯৮৩ সালের নভেম্বরে সচিবালয় ঘেরাওয়ের সময় কাঁধে ব্যাগ নিয়ে একজন স্কুলের ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলো। তার লাশ আমরা বুয়েটে এনে কবর দিয়েছিলাম। রাতে পুলিশ এসে সেই লাশ তুলে নিয়ে যায়। সেই শিক্ষার্থীর অভিভাবকের খবর আমরা পাইনি। তখনতো পত্রিকায় তার ছবিসহ খবর ছাপানোর সুযোগ ছিলো না। তাই আমাদের দলের বুলেটিনে সেই খবরটি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু, সেই লাশের খোঁজ নিতে কেউ আসেনি।”
এভাবেই সেই মৃতরা পরিবারের কাছে নিখোঁজ হিসেবে বিবেচিত হয় বলে তার মন্তব্য। “শুধু স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বেলায় নয়, বিভিন্ন সরকারের আমলেও আমরা দেখেছি লাশ সরিয়ে ফেলতে। মৃতের আত্মীয় প্রভাবশালী না হলে লাশ আর ফেরত পাওয়া যায় না।”
এখন বড় রাজনৈতিক দলগুলো বা সরকার দিবসটি পালন করছে না। সেদিনের সেই স্বৈরাচার পুনর্বাসিত হয়েছে- এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?- জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “সব ছাত্র সংগঠনই দিবসটি পালন করছে। তবে কোনো রাজনৈতিক দল তা পালন করছে না। তারা বলে- এটি ছাত্রদের দিবস তারাই পালন করুক। আজকেও ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন রাজধানীর ‘শিক্ষা অধিকার চত্বরে’ এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছে। প্রতিবারের মতো সংগঠনগুলোর সাবেক ও বর্তমান নেতারা শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন।”
“রাজনৈতিক দলগুলো দিবসটি পালন না করলেও এরশাদের সঙ্গে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির যে রাজনৈতিক সখ্যতা দেখা যাচ্ছে আমরা সেটির কঠোর সমালোচনা করি। বিএনপি চার দলীয় জোটে এরশাদকে রেখেছিলো এবং আওয়ামী লীগের মহাজোটে এরশাদকে রেখেছে। এই দল দুটি তাদের রাজনৈতিক জোটে এরশাদ ও জাতীয় পার্টির বিভিন্ন অংশকে ব্যবহার করছে।”
“এ জন্যে আমরা খুবই ক্ষুব্ধ। আমরা মনে করি এটি শহিদদের জন্যে অপমানকর। সেদিনের সেই আন্দোলনের প্রতি উপহাস করে এসব করা হচ্ছে। তারা যদি শহিদ হয়ে আন্দোলনের পথকে বেগবান না করতেন তাহলে এই দলগুলো কখনই ক্ষমতায় আসতে পারতো না। আর এখন এমন কী ঘটনা ঘটলো যে স্বৈরাচারের ধারক-বাহকদের সঙ্গে জোট না বাঁধলে ক্ষমতা যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে?”
তার মতে, সেদিন সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিহত হয়েছিলেন বলে হয়তো তাদেরকে নিয়ে কোনো দল উচ্চবাচ্য করে না। কিন্তু, ১৪ ফেব্রুয়ারিকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা উচিত। এই দিনকে স্মরণ করাকে ঋণ শোধের অংশ বলে মনে করেন ডা. মুশতাক।

পোল্যান্ডে ইরানবিরোধী সম্মেলন: এলিট ফোর্সে আত্মঘাতী হামলা, নিহত ২৭

পোল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সম্মেলন। ইসরাইল ও আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে এ সম্মেলনের প্রতিপাদ্যই যেন ইরানবিরোধী সুর। সম্মেলনের বাইরে শ’ শ’ মানুষকে ইরানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে। অংশগ্রহণকারী অনেক প্রভাবশালী আলোচকের পাশাপাশি বিক্ষোভকারীরাও ইরানের ক্ষমতা-ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। ঠিক একই দিনে কাকতালীয়ভাবে ইরানের সীমান্ত অঞ্চলে এলিট ফোর্স আইআরজিসির ওপর এক ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়েছে। ওই হামলায় ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর ২৭ সদস্য নিহত হয়েছেন। ওই গাড়ি বোমা হামলায় আরো ১০ সেনা আহত হন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, এই হামলা হয়েছে সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে। এই প্রদেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আফিম পাচারের রুট। এখানে ইরানি বাহিনীর সঙ্গে প্রায়ই বেলুচ বিচ্ছিন্নতাকামী ও মাদক চোরাকারবারিদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, জৈশ আল-আদল নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেছে। এই হামলা এমন দিনে ঘটলো যখন পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ’তে চলছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সম্মেলন। এতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের ‘ধ্বংসাত্মক কর্মকা-’ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। ইরানে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে ব্যাপক শক্তিশালী। এটি কেবল দেশের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আল  খোমেনির কাছে জবাবদিহি করে থাকে। ২০০৯ সালে এই সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশেই এক আত্মঘাতী হামলায় এই বাহিনীর ৬ কমান্ডার সহ ৪০ জন নিহত হন। সেবার জান্দাল্লাহ নামে একটি সুন্নিপন্থি গোষ্ঠী দায় স্বীকার করে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরেও ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তেল-সমৃদ্ধ প্রদেশে সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে হামলা হলে ২০ জন নিহত ও ৬০ জন আহত হন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ এই হামলা ও পোল্যান্ডের সম্মেলনের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি টুইটারে বলেন, এটি কি কাকতালীয় ঘটনা যে, ওয়ারশতে এই রঙ্গ শুরু হওয়ার দিনেই সন্ত্রাসী হামলার শিকার হলো ইরান? এদিকে ওই সম্মেলনে অংশ নিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আরব ও অন্যান্য নেতারা ইসরাইলের সঙ্গে একসঙ্গে বসেছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অভিন্ন স্বার্থ এগিয়ে নিতে। সম্মেলনে অংশ নেয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী রুডি জুলিয়ানি বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানের ধর্মভিত্তিক নেতৃত্বব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।’ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত না হলেও, তিনি ইরানের ভিন্নমতাবলম্বীদের একটি গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে বক্তৃতা রাখেন। জুলিয়ানি বলেন, পারমাণবিক চুক্তি মেনে চলার ব্যাপারে ইরানের ওপর বিশ্বাস রাখা যায় না। বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে বক্তৃতায় ইরানের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে’র ডাক দেন তিনি। ওই ভিন্নমতাবলম্বী গ্রুপের আরেক প্রতিনিধি সাবেক মার্কিন সিনেটর রবার্ট টেরিসেলিও ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পরিবর্তে দেশটির নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি জানান। আল জাজিরার খবরে বলা হয়, এই সম্মেলনের কথা গত মাসে প্রথম ঘোষণা দেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। কায়রোতে গতমাসে কড়া ভাষায় ইরানবিরোধী বক্তব্যে তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন। অনেকেই মনে করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে বিশ্বশক্তিকে এক করতে ওয়াশিংটন এই প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছে। তবে এই সম্মেলনের সময় অনেক কারণে সংবেদনশীল। এটি এমন সময় হচ্ছে, যখন ইরানের সঙ্গে আমেরিকার পরিত্যাগকৃত পারমাণবিক চুক্তি কার্যকর রাখতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলো।
সম্মেলনের আয়োজক পোল্যান্ড চেষ্টা করছে এই সম্মেলনকে ইরানবিরোধী রূপ না দিতে। দেশটি বার বার বলছে, ইরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তির প্রতি পোল্যান্ডের অঙ্গীকার এখনো অক্ষুণœ রয়েছে। তবে দৃশ্যত, সম্মেলনের নিয়ন্ত্রণ এখন পোল্যান্ডের হাতে নেই। এই সম্মেলনে তেহরানের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ইরান বিষয়ক ট্রাম্পের বিশেষ দূত ব্রায়ান হুক এই সম্মেলনের আয়োজক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর উপস্থিতিতে এতে বক্তব্য রাখবেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ ছাড়া এতে বিরল ভাষণ দেবেন ট্রাম্পের বিশেষ উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার। বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট উপস্থিত থাকলেও তিনি এই সম্মেলনে শুধু ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য দেবেন। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো নি¤œপদস্থ কর্মকর্তা পাঠাচ্ছে। কিছু আরব দেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন মন্ত্রীরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান কূটনীতিক ফেডেরিকা মোঘেরিনি বলেছেন, তিনি এতে অংশ নেবেন না। ইরানের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র রাশিয়াও আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারাও থাকবেন না। তাদের বক্তব্য, এই সম্মেলন হলো ফিলিস্তিনি দাবি- দাওয়া মুছে ফেলতে মার্কিন-ইসরাইলি চক্রান্ত।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল লাইনের দুই ধারের চিত্র

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল লাইনের দুই ধার ঘেঁষে বিপজ্জনকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট। ছবিটি গত সপ্তাহে ঢাকার জুরাইন এলাকা থেকে তোলা। ছবি: পলাশ খান @দ্য ডেইলি স্টার বাংলা

আইএসে যোগ দেয়া সেই শামিমা ফিরতে চান বৃটেনে

খেলাফত কায়েম করার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে দুই বান্ধবী খাদিজা সুলতানা ও আমিরা আবাসের সঙ্গে লন্ডনের বেথনাল গ্রিন এলাকা থেকে পালিয়ে সিরিয়া গিয়েছিলেন শামিমা বেগম (১৯)। সেখানে গিয়ে যোগ দেন জঙ্গি গোষ্ঠী আইএসের সঙ্গে। কিন্তু যেমনটা তিনি ভেবেছিলেন জীবন তেমন নয়। তার চোখের সামনে মারা গেছে নিজের গর্ভজাত দুটি সন্তান। মারা গেছেন তার দুই বান্ধবীর একজন। অন্যজন কোথায় সে তথ্য দিতে পারেন নি তিনি। এখন অন্তঃসত্ত্বা শামিমা বেগম। তিনি আবার বৃটেনে ফিরতে চান স্বাভাবিক জীবন যাপনের জন্য, যেন তার সন্তান সেখানে জন্ম নিতে পারে।
তবে আইএসে যোগ দেয়া নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই।
লন্ডনের দ্য টাইমস পত্রিকাকে তিনি সাক্ষাতকার দিয়েছেন। তাতে বলেছেন অনেক কথা। শামিমা বলেছেন, শিরñেদের অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন তিনি। কিন্তু তাতে তিনি ভয় পান নি কোনো। সিরিয়ার আল হাওল শরণার্থী শিবিরে এখন অবস্থান করছেন তিনি। ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ওই সন্তানের জন্যই তিনি ফিরতে চান বৃটেনে।
২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বৃটেন ছেড়ে পালিয়ে সিরিয়া চলে যান শামিমা বেগম। তার সঙ্গী আমিরা আবাসের বয়স তখন ১৫ বছর। আর খাদিজা সুলতানার বয়স ১৬ বছর। পড়াশোনা করতেন তারা বেথনাল গ্রিন একাডেমিতে। সেখান থেকে প্রথমে তারা গেটওয়ে বিমানবন্দর থেকে পৌঁছেন তুরস্কে। পরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যান সিরিয়ায়।  সেখানকার রাক্কায় কিছুদিন অবস্থানের পরে ২৭ বছর বয়সী এক ডাচ নাগরিকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ওই ব্যক্তি অন্য ধর্ম থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
দ্য টাইমসকে দেয়া তার সাক্ষাতকারের পর এ খবরটি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে বৃটিশ মিডিয়া। বলা হয়েছে, শামিমা বেগমের বয়স এখন ১৯ বছর। সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, তিনি আইএসের খেলাফত আন্দোলন থেকে পালিয়েছেন ভয়ে। তার ভয়- গর্ভজাত সন্তানকে নিয়ে। কারণ, ওই সন্তানটি জন্ম নেয়ার পর তাকে তারা হত্যা করতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে যে কষ্ট তা তিনি আর সহ্য করতে পারেন না। তার সাক্ষাতকারটি নেন দ্য টাইমসের সাংবাদিক অ্যান্থনি লয়েড। এতে শামিমা বেগম বলেন, এখন আমি যা চাই তা হলো বৃটেনে ফিরতে চাই।
এর আগে ২০১৪ সালে শামীমার আরো একজন বান্ধবী পূর্ব লন্ডন ছেড়েছিলেন। তিনিও গিয়েছিলেন সিরিয়ায়। সেখানে গিয়ে তার সঙ্গে যুুক্ত হতে তারা তিন বান্ধবী ২০১৫ সালে লন্ডন ছাড়েন। ২০১৬ সালের মে মাসে রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যে, খাদিজা সুলতানা সিরিয়ার রাকায় বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন বলে বিশ্বাস করা হয়। ওই রাকা হলো আইএসের শক্ত ঘাঁটি। খাদিজার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন শামিমা। তা সত্ত্বেও অন্যরা সিরিয়ার বাঘুজ এলাকার যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, তারা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজেদের ইচ্ছায়, সিঙ্গেল নারী হিসেবে। কারণ, তখন তাদের স্বামীরা নিহত হয়েছেন।
দ্য টাইমসের মতে, শেষে যাওয়া ওই তিন শিক্ষার্থীর প্রত্যেকেই বিয়ে করেছিলেন আইএসের বিদেশী একজন যোদ্ধাকে। শামিমা বলেছেন, তিনি সম্প্রতি শুনতে পেয়েছেন, আমিরা আবাস ও অন্য যেসব মেয়ে ২০১৪ সালে বৃটেন ছেড়েছিলেন তারা জীবিত থাকতে পারেন। তিনি বলেন, আমি সিরিয়ায় পৌঁছার পরই আমাকে একটি ঘরে রাখা হয়। সেখানে জিহাদি পাত্ররা বিয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
২০১৫ সালে রাকায় পৌঁছানোর ১০ দিন পর শামিমা বিয়ে করেন একজন ডাচ নাগরিককে। তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। শামিমা বলেন, তার ওই স্বামীকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়। গোয়েন্দাগিরি ও নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। এরপর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে তিনি তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে রাকা ত্যাগ করেন। তার সন্তান বলতে এক বছর ৯ মাস বয়সী একটি মেয়ে ও তিন মাস বয়সী একটি ছেলে। সম্প্রতি এ দুটি শিশুই মারা গেছে। তার ছেলেটির অজ্ঞাত রোগ হয় পুষ্টিহীনতায়।
শামিমা বলেছেন, রাকায় তিনি যথেষ্ট স্বাভাবিক জীবন যাপন করছিলেন। এক পর্যায়ে তার স্বামী আত্মসমর্পণ করেন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের সঙ্গে সখ্য আছে সিরিয়ার এমন একটি যোদ্ধা গ্রুপের সঙ্গে। তারপর থেকে তার আর দেখা পান নি শামিমা।
ওদিকে শামিমা ও অন্যরা পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের পরিবারের আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তাসনিম আখুঞ্জে। শামিমা বেঁচে আছেন এবং নিরাপদে আছেন এ কথা জানতে পেরে তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। ওই শিক্ষার্থীরা যখন নিখোঁজ হয়েছিলেন তখন মেট্রোপলিটান পুলিশ কমিশনার বারনার্ড হোগান হাউয়ি’র অবস্থান সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। বার্নার্ড বলেছিলেন, এসব মেয়েকে ভিক্টিম হিসেবে দেখা উচিত। এ বিষয়ে তিনি ওই যুবতীদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

মালদ্বীপে চীন-ভারতের লড়াই যে কারণে by মিসবাহুল হক

গত বছরের সেপ্টেম্বরে মালদ্বীপের নির্বাচনে বিরোধী জোটের প্রার্থী ইব্রাহীম ইবু মোহাম্মদ সলিহ অবাক করা জয় পেয়েছেন। এই নির্বাচনের ফল খুবই সাধারণ একটি ভূ-রাজনৈতিক বাক্যের মাধ্যমে বর্ণনা করা সম্ভব। তা হলো- নির্বাচনে ভারত জিতেছে, পরাজিত হয়েছে চীন। পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনের অধীনে মালদ্বীপ গণতন্ত্র ও আইনের   শাসনকে পরিহার করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি শুধু নয়াদিল্লি থেকে দূরে সরেছে এমন না। একই সঙ্গে চীনের থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ঋণও নিয়েছে।
নির্বাচনের পরবর্তী মাসগুলোতে, বিশেষ করে গত নভেম্বরে সলিহ’র নেতৃত্বে নতুন সরকার যাত্রা শুরুর পর থেকে দেশটি শুধু এটা যাচাই করার চেষ্টা করছে যে, ইয়ামিনের অধীনে ঠিক কি পরিমাণ চীনা ঋণ নেয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। পুলিশ তার বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থ লুট ও চুরির অভিযোগ এনেছে।
নতুন প্রেসিডেন্ট সলিহ অভিষেক বক্তৃতায় চীনের দেয়া ‘সার্বভৌম ঋণ’ নিয়ে উদ্বেগের কথা বলেছিলেন। সার্বভৌম ঋণের অর্থ হলো- ঋণ প্রদানকারী দেশ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সকল ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের সুযোগ ভোগ করতে পারবে। অর্থাৎ চীনা অর্থায়নে মালদ্বীপে যেসব প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, সেগুলোতে মালদ্বীপ সরকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।  ঋণের শর্ত হিসেবে চীন এতে একক কর্তৃত্ব ভোগ করবে।
নতুন সরকারের অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার সামনেই সলিহ পূর্ববর্তী সরকারের নির্বিচারে চীনা ঋণ গ্রহণের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। পুরোপুরি রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির জন্য গৃহীত এসব মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকেই তিনি মালদ্বীপের শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য দায়ী করেন। সলিহ বলেন, ব্যাপক অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিলিয়ন বিলিয়ন রুপি কমে গেছে। এই অর্থ মালদ্বীপের জনগণের। যা জনগণের ভালোর জন্য খরচ করার কথা ছিল।
যাই হোক, ইয়ামিনের শাসনামলে মালদ্বীপ চীনা ঋণের জালে ঠিক কতোটা জড়িয়েছে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব প্রকাশিত হয়নি। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের নতুন একটি রিপোর্টে এ বিষয়ে কিছুটা জবাব পাওয়া যায়। মালদ্বীপের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য উল্লেখ করে রিপোর্টে হিসাব দেখানো হয়েছে, চীনের কাছে মালদ্বীপের ঋণ ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হবে। শুধু তাই না, বেশির ভাগ ঋণের ক্ষেত্রেই মালদ্বীপ চীনকে সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি দিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ পৃথক একটি হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি দেখিয়েছেন। যদিও তার এই তথ্য প্রমাণিত না।
এমন পরিস্থিতিতে সলিহ’র নেতৃত্বাধীন সরকারকে ঋণের বিষয়ে চীনের কাছ থেকে আরো অনুকূল শর্ত খুঁজতে হবে। তার অর্থ হলো, দ্রুতই প্রেসিডেন্ট সলিহ চীনের আর্থিক সহায়তায় চলমান প্রকল্পগুলো থেকে সরাসরি তার দেশকে সরিয়ে নেয়ার মতো অবস্থায় নেই। তাই  সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে ভারত জিতেছে বলা হলেও ভবিষ্যৎ সময়ে মালদ্বীপ চীনা বলয় থেকে নিজেকে কতটা মুক্ত করতে পারে- সেটাই দেখার বিষয়।

জনগণের ভোটের মাধ্যমেই তো ক্ষমতায় আসা, সেটা একদলীয় হয় কী করে? - ডয়চে ভেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী

ডয়চে ভেলের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি ভবিষ্যতে তরুণদের সুযোগ করে দিতে চান। তাই তিনি চান বর্তমান ও টানা তৃতীয় মেয়াদটিই যেন হয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার শেষ মেয়াদ।
এক মাস আগেই চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার দল আওয়ামী লীগ ও এর জোটের দলগুলো মিলে এবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৯৬ শতাংশ আসন জিতেছে। টানা তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেবার পর প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক সমপ্রচার মাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এটা নিশ্চিত করেছেন যে, পরবর্তী মেয়াদে আর প্রধানমন্ত্রীর পদের জন্য চেষ্টা করতে চান না।
ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘এটা আমার তৃতীয় মেয়াদ। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী হয়েছি (১৯৯৬-২০০১)। সব মিলিয়ে চতুর্থবার। আমি আর চাই না। একটা সময়ে এসে সবারই বিরতি নেয়া উচিত বলে আমি মনে করি, যেন তরুণ প্রজন্মের জন্য জায়গা করে দেয়া যেতে পেরে।’
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে এবং নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।
বছরে গড়ে ৬ থেকে ৭ ভাগ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বাণিজ্য বেড়েছে। বিদেশি বিনিয়োগও এসেছে।
এই উন্নয়নের পরও বিশ্বব্যাংকের হিসাব বলছে, এখনো বাংলাদেশের প্রতি চারজনে একজন দরিদ্র। শেখ হাসিনা তার সম্ভাব্য শেষ মেয়াদে এই দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইকেই অগ্রাধিকার দিতে চান।
‘খাদ্য নিরাপত্তা, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান- এসব মৌলিক চাহিদা,’ ডিডাব্লিউকে বলেন তিনি। ‘প্রত্যেক মানুষই তার অবস্থার উন্নতি ঘটাতে চায়। আমাদের সেটাই নিশ্চিত করতে হবে।’
উন্নয়ন বনাম বাকস্বাধীনতা
তবে এই উন্নয়ন দিয়ে সেসব সমালোচকের মুখ বন্ধ করতে পারেননি শেখ হাসিনা, যাদের অভিযোগ, তিনি বা তার সরকার বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন এবং মুক্ত চিন্তা ও মুক্তচিন্তকদের ওপর আঘাত থামাতে খুব বেশি কিছু করতে পারেননি। কিন্তু হাসিনা তা অস্বীকার করে বলেন, মুক্ত চিন্তাকে শতভাগ সমর্থন করেন তিনি। সমালোচনাও তাই স্বাভাবিক।
‘যত কাজ করবেন, তত সমালোচনা শুনবেন,’ তার যুক্তি। ‘আপনি আমার দেশের মানুষকে প্রশ্ন করুন, তারা সন্তুষ্ট কিনা; তাদের যা যা প্রয়োজন, সব পাচ্ছে কিনা, কিংবা আমি  সব দিতে পারছি  কিনা।’
হাসিনা তার আওয়ামী লীগবিরোধীদের জন্য রাজনীতির মাঠ সংকুচিত করে রেখেছেন এবং এক দলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে চাইছেন- এমন অভিযোগও আছে জোরালোভাবে। কিন্তু তা মানতে রাজি নন বাংলাদেশের সরকার প্রধান।
‘জনগণের ভোটের মাধ্যমেই তো ক্ষমতায় আসা, সেটা একদলীয় হয় কী করে? আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে, ২০০৮-এ যে নির্বাচন হয়েছিল, সে নির্বাচনেও ৮৪ ভাগ (আসলে ৮৬.৩৪%) ভোট পড়েছিল। এবার তো ৮০ ভাগ ভোট পড়েছে। তখন বিএনপি-জামায়াত জোট পেয়েছিল মাত্র ২৮টি সিট। এবার ইলেকশনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পেয়েছে ২৬০টি সিট (৩০০টির মধ্যে)। বাকি সব অন্য দলগুলো পেয়েছে। সেখানে দল তো আছেই,’ বলেন তিনি।
বিরোধী দলকে দুর্বল মনে করেন তিনি। বলেন, ‘এখন কোনো দল যদি তাদের কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে না যেতে পারে, জনগণের বিশ্বাস, আস্থা অর্জন করতে না পারে, আর যদি ভোট না পায়, সে দায়-দায়িত্ব কার? সে তো ওই দলগুলোর দুর্বলতা।’
মৌলবাদীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নিবিড় সম্পর্ক আছে বলেও সমালোচনা আছে। বাংলাদেশের ‘উদারপন্থিরা’ হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের  সুসম্পর্কের সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, এই গোষ্ঠী মৌলবাদী ও তারা নারীর বিকাশের বিরুদ্ধে। সমপ্রতি এই গোষ্ঠীর নেতা মাওলানা শাহ আহমেদ শফী মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পাঠানোর জন্য সমর্থকদের ওয়াদা করিয়েছেন।
তার এই বক্তব্যের দায়দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘আমি বলেছি যে, এখানে বাক স্বাধীনতা আছে। তাই যে কেউ যে কোনো কিছুই বলতে পারেন।’ নারীর বিকাশে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি দাবি করে হাসিনা বলেন, ‘আমি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারী শিক্ষা পুরোপুরি অবৈতনিক করে দিয়েছি। তাদের বৃত্তিও দিচ্ছি।’
মুজিব-কন্যা বলেন, তার নীতি নারী শিক্ষার ব্যাপারে সাধারণ মানুষের চিন্তাও বদলে দিয়েছে। ‘আগে বাবা মায়েরা চিন্তা করতেন যে, মেয়েকে পড়িয়ে লাভ কী, সে তো অন্যের ঘরে চলে যাবে। এখন সেভাবে চিন্তা করেন না তারা। এখন ভাবেন যে, মেয়েকে শিক্ষিত করা উচিত যেন সে নিজে উপার্জন করতে পারে। এরপর সে বিয়ে করবে। খুব ধীরে ধীরে আমরা পরিবর্তন আনছি। বাল্যবিবাহ এখন অনেক কমে গেছে।’
যে লক্ষ্য অর্জনে শেখ হাসিনা কাজ করে যাচ্ছেন, তাতে কি মৌলবাদীরা বাধা হবে? ‘অবশ্যই না। আমি যা করেছি, তা করেছি এবং এটা চলবে,’ বলেন তিনি।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ
জীবনমান উন্নয়ন এবং উদারপন্থি ও মৌলবাদীদের মাঝখানে একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা ছাড়াও শেখ হাসিনার সরকারকে নতুন করে সাত লাখ রোহিঙ্গার দায়িত্ব নিতে হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে ‘জঙ্গিবাদের’ বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বলি হয়ে এরা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের কাছে কক্সবাজারের দুটি ক্যাম্পে বেশিরভাগই খুব মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই মানুষের স্রোত এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলেছে। এদের অনেকেই স্থানীয়দের কাজ, থাকার জায়গা ও ব্যবসায় ভাগ বসিয়েছে।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকার হাজার হাজার শিশু-কিশোর-তরুণ যারা বেড়ে উঠছে, তাদের জন্য মধ্যবর্তী বিকল্প উপায় ভাবার চেষ্টা করছে। ‘আমরা একটা দ্বীপ বেছে নিয়েছি। সেখানে আমরা বাঁধ দিয়েছি। সাইক্লোন শেল্টার ও ঘরবাড়ি তৈরি করেছি। আমরা তাদের সেখানে নিয়ে যেতে চাই এবং কাজ দিতে চাই। তাহলে তরুণ ও নারীরা অর্থ উপার্জন করতে পারবে।’
তবে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়াকে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বলে মনে করেন হাসিনা। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই এই দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে যেতে চায় বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে ভারত ও চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ভূমিকা রাখতে পারে।
‘আমরা কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। আমাদের সঙ্গে একটা চুক্তিও হয়েছে যে, তারা ফেরত নিয়ে যাবে। চীন ও ভারতের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছি এবং মিয়ানমারের সঙ্গে যে পাঁচটি দেশের বর্ডার আছে, চীন, বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও লাওস, আমরা সকলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছি যে, কীভাবে এই সমস্যা সমাধানে তাদের কাজ করা উচিত।’
তিনি যোগ করেন, ‘এটাই চাই যে, তারা মিয়ানমারকে এ কথাটি বুঝাক যে, এরা যখন মিয়ানমারে চলে যাবে, তখন তাদের যা যা সাহায্য দরকার, থাকার বাড়িঘর, তাদের খাওয়ার ব্যবস্থা, এখানে যা যা দিচ্ছে, তা ওখানেই দেবে এবং তাদের একটা নিরাপত্তার ব্যবস্থাও তারা করবে। জাতিসংঘ এ ব্যাপারে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে।’
[সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ডয়চে ভেলের প্রধান সম্পাদক ইনেস পোল ও এশিয়া বিভাগের প্রধান দেবারতি গুহ।]

১০৮ কোটি টাকার জমি নিয়ে জালিয়াতি by দীন ইসলাম

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ৩০৮ কাঠা জমি। বাজার মূল্য ১০৮ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের ফিরোজ শাহ হাউজিং এস্টেটের উচ্চ মূল্যের এ জমি জালিয়াতির মাধ্যমে ২৮ ব্যক্তির নামে রেকর্ড করে দেয়া হয়েছে। এর পেছনে কলকাঠি নেড়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। জেলা প্রশাসন থেকে জমি বন্দোবস্ত এবং রেকর্ড সব কিছুই হয়েছে টর্নেডো গতিতে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি এর দালিলিক প্রমাণ পেয়েছে। এ কমিটি তাদের রিপোর্টে শত কোটি টাকার জমি নিয়ে ভয়ঙ্কর জালিয়াতির তথ্য বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে। রিপোর্টে তারা জমি বেহাতের জন্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ওম প্রকাশ নন্দীকে (বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী গণপূর্ত অধিদপ্তর) দায়ী করেছেন।
এজন্য তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি মর্মে মত দিয়েছেন তারা।
পাশাপাশি তদন্ত কমিটি চট্টগ্রাম ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদের বিরুদ্ধে মূল নথি গোপন, কমিটির চাহিদামতো কাগজপত্র সরবরাহ না করা এবং তদন্ত কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের সাবেক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর সুপারিশ করে বলা হয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের রেকর্ডীয় ৪ নং খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি অবৈধভাবে ২৮ জন ব্যক্তির নামে বন্দোবস্ত দেয়ায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রিপোর্টে চট্টগ্রামের চান্দগাঁও সার্কেলের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মশিউর রহমান ও এ কে এম রেজাউর রহমানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ওম প্রকাশ নন্দী’র কাছে মুঠোফোনে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রশ্ন শোনার পরই চুপ মেরে যান। তিন মিনিট ধরে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোনে কথা বলেননি। চট্টগ্রাম ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার মোর্শেদকে বার বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিষয়টি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৯৫তম বোর্ড সভায় আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য উঠানো হয়। ওই সভায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম ডিভিশনের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) ওম প্রকাশ নন্দীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দায়ী অন্যদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এজন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে চিঠি পাঠানো হবে। এদিকে নিজের জালিয়াতির এসব তথ্য প্রকাশ হয়ে পড়ায় এখন নিজের স্বাক্ষরকেও অস্বীকার করছেন ওম প্রকাশ নন্দী। আবোল তাবোল বকছেন তিনি। তদন্ত কমিটির কাছে সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ওম প্রকাশ নন্দী ছাড়পত্র প্রদান প্রসঙ্গে বলেন, ছাড়পত্রে আমি স্বাক্ষর করিনি। এ বিষয়ে অফিস সহকারী সুব্রত বড়ুয়া ও বাবুল হোসেন বিশ্বাস তদন্ত কমিটির কাছে তাদের বক্তব্যে জানান, ছাড়পত্রের চিঠিতে ওম প্রকাশ নন্দী স্বাক্ষর করেছেন। তারা জানান, জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য সার্ভেয়ার নিজেই একটি খসড়া পত্র তৈরি করে নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে উপস্থাপন করেন। ওই পত্রের খসড়া টাইপ করেন সাবেক কম্পিউটার অপারেটর সোহেল রেজা চৌধুরী। পরিচ্ছন্ন কপি নথিতে নোট আকারে উপস্থাপন করা হয়। ৫ দশমিক ১৩ একর জমি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের নয় মর্মে এনওসি দেয়া হয়েছিল। যেহেতু নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে পরিচ্ছন্ন কপি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হবে তাই তিনি হেড ক্লার্কের দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকায় পত্রের নিচে স্বাক্ষর করেন। অর্থাৎ পত্রটি সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ওম প্রকাশ নন্দীই স্বাক্ষর করেছেন মর্মে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের ফিরোজশাহ হাউজিং এস্টেটের জন্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১২৬ দশমিক ১৩ একর অধিগ্রহণকৃত জমি রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নামে ১০৬ দশমিক ৯৪ একর জমি রেকর্ডভুক্ত হয়। মন্ত্রণালয়ের রেকর্ডকৃত জমি থেকেই ২৮ জনের নামে ৫ দশমিক ১৩ একর বা ৩০৮ কাঠা জমি বরাদ্দ দেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। তবে জমিটি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত থাকায় ২০০৯ সাল পর্যন্ত জমিটি নামজারি করতে পারেনি জেলা প্রশাসন কর্তৃক বরাদ্দকৃতরা। এ জন্য ওই বছর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে ৫ দশমিক ১৩ একর জমি রেকর্ডের বিষয়ে মতামত জানতে চায়। ২০০৯ সালের ২৭শে জুলাই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ওম প্রকাশ নন্দী এক চিঠিতে জানান, নতুন মনসুরাবাদ জমি অধিগ্রহণজনিত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা ও ১৫৯/৪৯-৫০ নং এল, এ কেসের জমি দখল হস্তান্তরকারীদের আরএস,পিএস ও বিএস দাগগুলোর আলোকে ৪ নং খতিয়ান গণপূর্ত মন্ত্রণালয় হাউজিং নাম থেকে অবমুক্ত করা যেতে পারে। সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলীর মতামতের ভিত্তিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) নতুন খতিয়ান সৃষ্টি এবং কর আদায়ের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি)-কে নির্দেশনা দেন। ওই অনুযায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) ২৮ জন বরাদ্দ গ্রহীতার নামে নামজারি করে দেন। এরপরই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১০৮ কোটি টাকার সম্পত্তি বেহাত হয়ে যায়।    
তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সূত্রে জানা গেছে, ৫ দশমিক ১৩ একর বা ৩০৮ কাঠা জমি কোন খাস খতিয়ানভুক্ত জমি নয়। এরপরও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নামে রেকর্ড করা জমি জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ বরাদ্দ দেয়ার এখতিয়ার জেলা প্রশাসনের নেই। জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ পাওয়া ২৮ জন তদন্ত কমিটিকে জানায়, আগ্রাবাদ সিএসডি গোডাউন করার জন্য তাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য তারা ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে ৫ দশমিক ১৩ একর জমি বরাদ্দ পেয়েছেন। তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্টে বলেছে, সিএসডি গোডাউন নির্মাণের সঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পর্ক নেই। জেলা প্রশাসক কোনো ক্ষতিগ্রস্তকে পুনর্বাসন হিসেবে জমি দিতে চাইলে তা তার আওতাধীন ১ নং খতিয়ানভুক্ত জমি থেকে দিতে পারেন। কিন্তু জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পত্তি জেলা প্রশাসক বরাদ্দ দিতে পারেন না। এজন্য জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বোর্ড সভায় জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ওম প্রকাশ নন্দী কর্তৃক জারি করা অনাপত্তি পত্র বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সহাবস্থানের সঙ্গে অন্য দাবি আদায়ে অনড় ছাত্র সংগঠনগুলো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের পরিবেশ দৃশ্যমান হয়েছে। গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো মধুর ক্যান্টিনে সময় কাটিয়েছে বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ২০১০ সাল থেকে ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে মধুর ক্যান্টিনে প্রবেশ ও ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় অনেকটা কোণঠাসা ছিল ছাত্রদল। আসন্ন ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে ছাত্রদলসহ  বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের দাবি তুলে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে আস্তে আস্তে ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করছে ছাত্রদলসহ প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। তবে তারা সহাবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবনে স্থাপনসহ অন্যান্য দাবি আদায়ে এখনো অনড় রয়েছে। দাবি আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চারদিনের আলটিমেটাম দিয়েছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। এদিকে টিএসসিকেন্দ্রিক ২১টি সংগঠনের সঙ্গে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ’র ব্যানারে জোটবদ্ধ হয়ে ডাকসু নির্বাচনের প্যানেল দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রলীগ। গতকাল দুপুরে মধুর? ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘোষণা দেয় সংগঠনটি।
মধুতে ছাত্রদলের দ্বিতীয় দিন: ডাকসুর জন্য গঠিত কমিটির পুনঃগঠন দাবি: এদিকে দ্বিতীয় দিনের মতো মধুর ক্যান্টিনে গিয়েছে ছাত্রদল। গতকাল বেলা ১১টার দিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার সিদ্দিকীসহ ২০-২৫ জন নেতাকর্মী মধুর ক্যান্টিনে প্রবেশ করেন। এর আধঘণ্টা পর আরো কিছু নেতাকর্মী নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে যায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাজীব আহসান। এ সময় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ বলেন, শুধুমাত্র ডাকসু নির্বাচনের জন্য নয়, সহাবস্থানের জন্য তারা ক্যাম্পাসে এসেছেন। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অন্যসব ক্যাম্পাসেও সহাবস্থান নিশ্চিতের দাবি করেন।
এ সময় সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বলেন, আমাদের সাত দফা দাবির মধ্যে অন্যতম দাবি সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। আমরা ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে করাসহ অন্য ছয় দফা দাবি আদায়েও সচেষ্ট থাকবো। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। এ সময় রাজীব আহসান সাংবাদিকদের বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কিছু দাবি জানিয়েছিলাম। আশা করছি প্রশাসন আমাদের দাবিগুলোর ব্যাপারে আন্তরিকতা প্রকাশ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে সহাবস্থান নেই। আমাদের নেতাকর্মীরা হলে থাকতে পারে না। সহাবস্থানের স্থায়ী সমাধান হোক এটাই চাই। ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে আসা শুরু করেছে। তবে আমরা শুধু ডাকসুকেন্দ্রিক ক্যাম্পাসে সহাবস্থান চাই না। আমরা চাই সবসময় ক্যাম্পাসে সহাবস্থান ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকুক। তিনি বলেন, আমরা যৌক্তিক বিষয়গুলোকে সমর্থন করবো। কিন্তু প্রশাসন যেভাবে নির্বাচন করার জন্য চাচ্ছে সেটিকে ছাত্রদল গণতান্ত্রিক মনে করছে না।
আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের যাত্রা শুরু হয়েছে। আমরা এ যাত্রা অব্যাহত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আশ্বাস রাখতে চাই। আমরা ডাকসু নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকতে চাই। ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের জন্য গঠিত কমিটিগুলোতে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ শিক্ষক নেই অভিযোগ করে এসব কমিটির পুনর্গঠন চেয়ে সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বলেন, ডাকসু নির্বাচনের জন্য গঠিত কমিটিগুলোতে গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ শিক্ষক নেই। যাদেরকে এসব কমিটিতে রাখা হয়েছে, তারা সবাই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক। তাই এসব কমিটিতে গ্রহণযোগ্য শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। ‘ছাত্রদলের মধ্যে শিবির ঢুকেছে’ ছাত্রলীগের এ অভিযোগের বিষয়ে আকরাম বলেন, আমরা প্রত্যেকটি নেতাকর্মীকে যাচাই-বাছাই করে পদ দিয়েছি। তাই ছাত্রদলের কমিটির মধ্যে কোনো শিবির নেই। তবে কারো  বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে শিবিরের অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা শেষে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কিছুক্ষণ মধুতে অবস্থান করে চলে যান।
একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র স্থাপনে প্রগতিশীলদের আল্টিমেটাম: এদিকে ভোটকেন্দ্র আবাসিক হলের বাইরে একাডেমিক ভবনে করা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চার দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট। গতকাল ভিসি কার্যালয়ের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে এ হুঁশিয়ারি দেয় ছাত্রজোট। এর আগে মধুর ক্যান্টিন থেকে এক বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে ভিসি কার্যালয়ের সামনে সমাবেশে মিলিত হয়। সেখানে বলা হয় আগামী ১৮ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে দাবি না মানলে ঐদিন ভিসি কার্যালয় ঘেরাও করা হবে। জোট নেতারা বলেন, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য ও দখলদারি জারি রয়েছে। এ অবস্থায় হলে ভোটকেন্দ্র করা হলে নির্বাচনকেও তারা প্রভাবিত করবে। নির্বাচনের আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকেই আমরা ও বেশির ভাগ সংগঠন হলের বাইরে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র করার দাবি জানিয়ে আসছি।
টিএসসির সংগঠনগুলোকে নিয়ে জোটবদ্ধ প্যানেল দেবে ছাত্রলীগ: নির্বাচনে টিএসসিকেন্দ্রিক ২১টি সংগঠনের সঙ্গে ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ’র ব্যানারে জোটবদ্ধ হয়ে প্যানেল দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ছাত্রলীগ। বৃহস্পতিবার দুপুরে মধুর? ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘোষণা দেয়া হয়। টিএসসিকেন্দ্রিক ২১টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনকে নিয়ে আয়োজিত ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী, ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। এ সময় টিএসসিভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে শোনান সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদের মুখপাত্র ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি এসএম রাকিব সিরাজী। সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেন, এই (সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ) সংগঠনের ব্যানারে ডাকসু নির্বাচনের প্যানেল ঘোষণা করা হবে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদও এর সঙ্গে থাকবে বলে জানান তিনি। এ সময় ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সবাই সহযোগিতা করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ছাত্রলীগের এই নেতা।
সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী চায় সুন্দর একটি ডাকসু নির্বাচন। তবে, ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী যেন রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে না পারে সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এস এম রাকিব সিরাজী বলেন, টিএসসিকেন্দ্রিক সংগঠনগুলো ডাকসু নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির সঙ্গে থাকবে। ডাকসু নির্বাচনের উদ্দেশ্য হলো একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরকে সহশিক্ষা কার্যক্রমে উৎসাহিত করা। সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও ঢাবিকে একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসনকে সহযোগিতা করাও এর উদ্দেশ্য। তবে গত ২৮ বছরে ডাকসু না থাকায় টিএসসিকেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন ডাকসুর বিকল্প হিসেবে কাজ করে আসছে।
এজন্য সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ নামে আদর্শিক প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ একটি জোট একসঙ্গে কাজ করছে। ডাকসু নির্বাচনের ভোট কেন্দ্র হলে রাখার বিষয়টিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বাগত জানিয়েছে দাবি করে এতে আরো বলা হয়, ডাকসু নির্বাচনের ভোট কেন্দ্র ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় হলে হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেটি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো আপত্তি নেই। বরং সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সকল প্যানেল সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়া, দাবি-দাওয়া ও তাদের আবেগ অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ইশতেহার দেবে বলে প্রত্যাশা। এ সময় নির্বাচনের আচরণবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কর্মসূচি বা কর্মকাণ্ড না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।