Monday, June 29, 2015

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্রের

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বলা হয়েছে, সরকারি হয়রানি ও প্রতিশোধের ভয়ে অনেক সাংবাদিক নিজেরাই সরকারের সমালোচনামূলক লেখা সেন্সর করেন। সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ বলে দাবি করেছে তারা। তা ছাড়া ব্যাপক আকারে দুর্নীতির সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার ও আটক রাখার সমালোচনা করা হয়েছে। গত বছর ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনকে বিতর্কিত বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ওই নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে পারে নি। বিশেষ করে সমালোচনা করা হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, অনেকাংশে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ দিয়েছে সরকার। সিলেটে অনিতা ভট্টাচার্যের ওপর নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের নির্যাতনের ঘটনারও সমালোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১২টারও পরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৪ সালের ঘটনাবলি নিয়ে বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশ করে। বিশ্বের ১৯৯টি দেশের ওপর ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বাংলাদেশ অধ্যায়ে গত বছর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, কয়েক মাসের রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার পর গত বছর ৫ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন। বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও তার মিত্র জোট ওই নির্বাচন বর্জন করে। তারা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। ওই নির্বাচনে জাতীয় সংসদের অর্ধেকেরও বেশি আসনে নির্বাচিত হন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা। বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ওই নির্বাচনকে বিতর্কিত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা বলেন, বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের ফলে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। রিপোর্ট প্রকাশের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তার পরই প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম মালিনোস্কি। তার কাছে বাংলাদেশের সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল জানতে চান- এ রিপোর্টের জন্য সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে ধন্যবাদ। আমি মুশফিকুল ফজল। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমার প্রশ্ন। আপনি কি মনে করেন যে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সন্তোষজনক? বাংলাদেশ যেহেতু গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং জনগণের অধিকার নিয়ে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তার প্রশ্নের জবাবে সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম মালিনোস্কি বলেন, বিস্তারিত তথ্যের জন্য আপনি নিশ্চয়ই রিপোর্টটা পড়বেন। আমি এখন যেটা বলতে পারি তা হলো- ২০১৪ সালের ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তি থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতারা, নাগরিক সমাজের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছি আমরা। রাজনৈতিক অচলাবস্থার শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং সহিংসতা বন্ধে আমরা তাদের আহ্বান জানিয়েছি। এ সহিংসতায় দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়েছে। নিরপরাধ মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে সহিংসতা ব্যবহার নিয়ে আমরা অত্যন্ত শক্ত ভাষায় নিন্দা জানিয়েছি। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আয়োজনের সুযোগ দেয়ার বিষয়ে সরকারের দায়িত্বের কথাও বলেছি। আইনশৃঙ্খলার প্রতি হুমকিগুলোর প্রতি যথাযথ মাত্রার শক্তি ব্যবহারের কথাও আমরা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি।
মানবাধিকার বিষয়ে ওই রিপোর্টে বাংলাদেশে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতন, খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার, আটক রাখার বিষয় তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে একজন সুপরিচিত স্থানীয় এক রাজনীতিকসহ সাতজনকে প্রকাশ্যে অপহরণ ও হত্যার বিষয় তুলে ধরা হয়। বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলার প্রতি দুর্বল শ্রদ্ধা থাকায় বাংলাদেশে ব্যক্তিবিশেষ, সরকারি কর্মকর্তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের দেয়া হয় দায়মুক্তি। ওই রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে রাজনৈতিক সহিংসতা থামে নি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে গত বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর সময়কালে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১২৪ জন নিহত ও ৬০৮৭ জন আহত হয়েছেন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আন্তঃকোন্দলে সৃষ্ট সহিংসতা ঘটেছে ৭৭টি। এতে নিহত হয়েছেন ২২ জন ও আহত হয়েছেন ৯৯৬ জন। বিরোধী দল বিএনপিতে এ রকম ঘটনা ঘটেছে ১৩টি। এতে তিনজন নিহত ও ৮৩ জন আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক কারণ বাদে এর বেশির ভাগই ঘটেছে অপরাধবিষয়ক ঘটনায়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ঘটেছে অনেক সহিংসতা। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে নীলফামারীতে বিএনপি ও জামায়াতের একদল সমর্থক আওয়ামী লীগের নেতা আসাদুজ্জামান নূরের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ আছে। আসাদুজ্জামান নূর বর্তমানে সংস্কৃতিবিষয়কমন্ত্রী। ওই হামলায় নূর রক্ষা পেলেও অন্য ৫ জন নিহত হন। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্থানীয় অধিবাসীরা রাস্তার পাশে, ভবনের পাশে তিনজনের মৃতদেহ দেখতে পান। এরা নূরের ওপর হামলার মূল সন্দেহভাজন। এর মধ্যে দুটি মৃতদেহের শরীরে ছিল বহু আঘাতের চিহ্ন। তৃতীয়জনের শরীরে একটিমাত্র গুলির চিহ্ন ছিল। সংবিধান ও আইনে নির্যাতন, নিষ্ঠুরতা, অমানবিক ও মর্যাদাহানিকর আচরণ ও শাস্তি নিষিদ্ধ থাকলেও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো ও স্থানীয় মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, র‌্যাব, পুলিশসহ নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতন, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার ব্যবহার করেছে। এ ক্ষেত্রে তারা ব্যবহার করেছে হুমকি, প্রহার ও বৈদ্যুতিক শক। এমনকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা কোন কোন সময়ে ধর্ষণ করেছে ও যৌন নির্যাতন করেছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের মতে, নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী গত বছরের প্রথম ৯ মাসে নির্যাতন করায় মারা গেছেন ১০ জন। এর জন্য যারা দায়ী তাদের বিরুদ্ধে সরকার অভিযোগ গঠন করেছে বা অভিযুক্ত করেছে বা শাস্তি দিয়েছে- এমন ঘটনা বিরল। ওই প্রতিবেদনে দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট তুলে ধরা হয়। বলা হয়, সিলেটে একটি শিশু অপহরণের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে গত বছর ৭ই নভেম্বর পুলিশ গ্রেপ্তার করে অনিতা ভট্টাচার্য নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়। পুলিশের কাছে তার স্বামী অভিযোগ করেছেন, রিমান্ডের সময় কোতোয়ালি থানা পুলিশ ইনচার্জ মনিরুল ইসলাম ও সাব-ইন্সপেক্টর হাসিনা আখতার আঁখি মদপান করতে বাধ্য করে অনিতাকে। এ ক্ষেত্রে তারা পাইপ ব্যবহার করে তাকে মদপান করায়। তখন অনিতার গলায় বুুট দিয়ে চেপে ধরে মনিরুল ইসলাম। অন্যদিকে হাসিনা আকতার আঁখি তার যৌনাঙ্গে লাঠি দিয়ে নির্যাতন করে। তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় ওই থানা থেকে ওসি মনিরুল ইসলাম ও হাসিনা আকতার আঁখিকে প্রত্যাহার করে। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, মার্চ মাসে পিরোজপুরের নাজিরপুরে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর এক টিনেজ ছেলে ও একটি মেয়েকে নগ্ন হতে বাধ্য করে। বাধ্য করে অশালীন পোজ দিতে। এরপর সেই দৃশ্য ধারণ করে মোবাইল ফোনে। এরপর পুলিশের ওই কর্মকর্তা ওই টিনেজ মেয়েকে ধর্ষণ করে। ওই সাব-ইন্সপেক্টর ও অন্যরা এরপর ওই দুই টিনেজকে বিয়ে করতে বাধ্য করে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জেলের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জেলখানায় বন্দিতে উপচে পড়ছে। সেখানকার পরিস্থিতি ভয়াবহ। অতিরিক্ত বন্দি রাখায় জেলখানার পরিবেশ হয়ে উঠেছে জীবনের জন্য হুমকি। নেই যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা। অধিকারের মতে, এসব অবস্থার কারণে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। অধিকারের মতে, সেপ্টেম্বরে নিরাপত্তা হেফাজতে মারা গেছেন ৩৯ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ৩০শে জুন পর্যন্ত এমন মৃত্যু হয়েছে ২৮ জনের। মিডিয়া ও মানবাধিকারবিষয়ক পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টে বলা হয়েছে, অক্টোবরে জেলখানায় বন্দি ছিল ৬৫ হাজার ৬৬২। দেশের ৬৮টি জেলখানার ধারণক্ষমতা এ ক্ষেত্রে ৩৪ হাজার ১৬৭। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর প্রিজন স্টাডিজের হিসাবে, বন্দিদের মধ্যে শতকরা ৬৯ ভাগকেই আটক রাখা হয়েছে বিচারের আগে অথবা তাদের বিচার চলছে। জেলখানায় অতিরিক্ত বন্দি রাখায় সেখানে বন্দিরা শিফট করে ঘুমায়। নেই পর্যাপ্ত টয়লেট সুবিধা। সব বন্দির রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা পানি পাওয়ার অধিকার। মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থাগুলো ও মিডিয়া বলছে, অনেক বন্দিই এ সুবিধা পায় না। জেলখানার ভেতর অথবা একই ভবনে যে জেলখানাগুলো রয়েছে সেখানকার পরিস্থিতিতে ভিন্নতা দেখা যায়। কোথাও তাপমাত্রা অনেক বেশি। নাজুক ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। আর রয়েছে বন্দিতে ঠাসা। অনেক ক্ষেত্রে কিশোর অপরাধীকে রাখা হয় বয়স্কদের সঙ্গে। নিয়মিতভাবে কর্তৃপক্ষ পুরুষ ও নারী বন্দিকে আলাদা রাখে। আইন অনুয়ায়ী নারীদের (যারা ধর্ষিতা, পাচারের শিকার, সংসারে নির্যাতিত) অপরাধী নারীদের থেকে আলাদা রাখার কথা। কিন্তু কর্মকর্তারা সব সময় তাদের আলাদা রাখে না। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস বা অন্য স্বতন্ত্র কোন মানবাধিকারবিষয়ক পর্যবেক্ষককে জেলখানা পরিদর্শনের অনুমতি দেয় না সরকার। তবে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিকে শুধু বিদেশী বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়। মাসে জেলখানা পরিদর্শনের জন্য সরকার একটি কমিটি করে দেয়। কিন্তু ওই কমিটি কি দেখতে পেয়েছে তা প্রকাশ করা হয় না। কোন কোন সময় জেলা জজরাও জেলখানা পরিদর্শন করে থাকেন। বাংলাদেশে পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে। অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তাদের। প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করা। কিন্তু প্রয়োজনে সিভিল অথরিটির সহায়তায় তারা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করে। কোন ব্যক্তিকে ৩০ দিন আটক রাখার ক্ষমতা আছে সরকার বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের। এতে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোন কোন সময় কর্তৃপক্ষ বন্দিকে দীর্ঘ সময় আটক রাখে। একজন ব্যক্তিকে কেন আটক করা হয়েছে তা ১৫ দিনের মধ্যে জানাতে বাধ্য একজন ম্যাজিস্ট্রেট। নিয়ম অনুযায়ী একজন বন্দির মামলা যাচাই করার জন্য চার মাস পরে একটি উপদেষ্টা পরিষদ থাকতে হবে। খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক প্রতিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগেও গ্রেপ্তার করা হয়। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াাই সরকার আটক করে। কখনও কখনও এর উদ্দেশ্য তার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা। গত বছর একটি জনসভায় জাতীয় নির্বাচনকে প্রহসন বলার সামান্য পরেই ৭ই জানুয়ারি পুলিশ গ্রেপ্তার করে বিএনপির অন্যতম উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেনকে। তিনি একজন সুপরিচিত অ্যাটর্নি। ২০১৩ সালের এক প্রতিবাদ সমাবেশের সময়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। ৩রা ফেব্রুয়ারি তাকে জামিন দেয়া হয়। পরে খন্দকার মাহবুব হোসেনের ঘটনার সঙ্গে কোন সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পেয়ে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পুলিশ প্রত্যাহার করে আগস্টে। জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা সিটি ইউনিটের সহকারী সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয় ১০ই আগস্ট। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১৩ সালে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের অভিযোগে আটক অন্য ১৫৪ জনের সঙ্গে রাখা হয় তাকে। তাকে ২০১৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে চারবার গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সুপরিচিত একজন মানবাধিকারবিষয়ক আইনজীবী বলেছেন, আটক রাখা অবস্থায় মাসুদকে কোথায় রাখা হয়েছে তা ছিল অজানা। তার সঙ্গে আইনজীবীদের সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয় নি। তার আইনজীবীদের তার সঙ্গে কথা বলতে দেয়া হয় নি। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জেল কর্তৃপক্ষ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়কার অপরাধে ফাঁসি কার্যকর করে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বান উপেক্ষা করা হয়। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশী আদালত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তাকে অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইন সংশোধন করে বিবাদীদের আপিল করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এরপর তাদের আপিলে সুপ্রিম কোর্টের আপিলেট ডিভিশন কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তিকে বাড়িয়ে তার ফাঁসির রায় দেন। যদিও কাদের মোল্লার রিভিউ পিটিশনের অধিকারের বিষয়টি আদালত গ্রহণ করেন। সেপ্টেম্বর মাসে ২০১৩ সালে মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। এ সময় তাদের আরও সতর্ক হতে বলা হয। স্বাধীনতাযুদ্ধে অপরাধীদের বিচার চলতেই থাকে। নভেম্বর পর্যন্ত কোন রায় দেয়া হয় নি। এ সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আলাদা আলাদা মামলায় জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। একই সময়ে জামায়াতের আরেক নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিলেট ডিভিশন। এসব ঘটনায় জামায়াত দেশজুড়ে হরতাল আহ্বান করে। বিরোধীদলীয় নেতাদের গ্রেপ্তার ও বিচারের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই রাজনৈতিক কারণকে ব্যবহার করা হয়েছে। সরকার কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগের বিচার শুরু করে নি। সিভিল জুডিশিয়াল ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও বাইরে থেকে প্রভাব বিস্তার বড় সমস্যা। ১৯৭৪ সালের অপদখলীয় সম্পত্তি আইনে অধীনে যারা জমি হারিয়েছেন, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে কোন পদক্ষেপ নেয় নি সরকার। ওই রিপোর্টে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, সংবিধান মতপ্রকাশ ও মিডিয়ার স্বাধীনতা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে সরকার এসব অধিকারের প্রতি সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। মুক্ত মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। সরকারের হয়রানি ও প্রতিশোধের ভয়ে অনেক সাংবাদিক সরকারের সমালোচনায় সেলফ সেন্সরশিপ মেনে চলেছেন। ওই প্রতিবেদনে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বলা হয়, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে যারা তাতে সরকার যুক্ত থাকায় ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে প্রধান বিরোধী দল। এতে সংসদের অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থী নির্বাচিত হন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। এ ছাড়া অনেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নামমাত্র। প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় অনেক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন নি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। বিরোধী দল তাদের দাবি মেনে নিতে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে ওঠে উত্তেজনাপূর্ণ। নিরপেক্ষ নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা প্রত্যক্ষ করেছেন নির্বাচনী কেন্দ্রে কমপক্ষে ১০০ সহিংসতা। কোন কোন ক্ষেত্রে ভোটারদের বাধা দেয়া হয়েছে। আবার ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৫ আসন নিয়ে ক্ষমতা ফিরে পান। নির্বাচন বর্জন করায় পার্লামেন্টে বিএনপির কোন আসন নেই। এতে আনুষ্ঠানিকভাবে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। তাদের রয়েছে ৩৬টি আসন। তারা ক্ষমতাসীন জোটের শরিক। সরকারকে সমর্থন করে এমন দলগুলো অর্জন করে বাকি আসনগুলো। শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভায় স্থান দেন অন্য দলের প্রতিনিধিদের। অনেক সূত্র জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ৫ দফায় অনুষ্ঠিত হয় স্থানীয় নির্বাচন। এতে দেখা দেয় সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন ও অনিয়ম। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা ব্যালটবাক্স পূর্ণ করছে, এমন ছবি অনেক পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। দলনিরপেক্ষ সংগঠন বাংলাদেশ ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ এ নির্বাচনের মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা এতে ব্যাপক জালিয়াতি, সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কথা বলেছে। এতে বলা হয়, বিএনপির বর্জনের কারণে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। যেসব আসনে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে নির্বাচন কমিশন শতকরা ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে দেখিয়েছে। অথচ ২০০৯-এর নির্বাচনে ভোট পড়েছিল শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি। কোন ভোটারই ১৫৩ আসনের নির্বাচনে কোন ভোট দেন নি। কারণ, সেখানে মাত্র একজন প্রার্থীই ছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই সরকার বিরোধী দলকে জনসভা করতে দেয়ার ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেছে। বিরোধী দলের কোন সভা-সমাবেশের খবর সম্প্রচারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত দেয়। তার বিরুদ্ধে আপিল করেছে জামায়াত। তা এখনও অব্যাহত আছে। রিপোর্টে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে বলা হয়, আইন অনুযায়ী স্বতন্ত্র বিচারব্যবস্থা থাকার কথা। তবে, সংবিধানের একটি ধারায় নিম্ন আদালতের বিচারিক নিয়োগের ওপর নির্বাহী শাখার কর্মকর্তাদের এখতিয়ার দিয়েছে। এতে বিচারবিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। পাল্টা জবাব হিসেবে অন্যত্র বদলি হওয়ার রিপোর্ট করেছেন কয়েকজন বিচারক। সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী সংসদদকে হাইকোর্ট বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতা দিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে এটা পাস হয়। নভেম্বর পর্যন্তও বাস্তাবায়নের আইন লেখা হয়নি। আর অন্তত একটি আইনি চ্যালেঞ্জ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দুর্নীতি আর জমে থাকা অনেক মামলার কারণে আদালতের বিচার প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হচ্ছে। আর বর্ধিত দীর্ঘসূত্রতা কার্যত বিচারপ্রার্থী অনেকের ন্যায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সাক্ষীদের ওপর প্রভাব বিস্তার, অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং তথ্যপ্রমাণ গায়েব হয়ে যাওয়া। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন ম্যাজিস্ট্রেট, আইনজীবী আর আদালত কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করে থাকে। সমাবেশ করার স্বাধীনতা নিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, সরকার সাধারণত সভা সমাবেশের অনুমতি দিয়ে থঅকে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে সভা সমাবেশ আয়োজনে বাধা দিয়েছে। আইন সরকারকে চার জনের বেশি ব্যক্তির জমায়েত হওয়া নিষিদ্ধ করার সুযোগ দেয়। প্রতিবাদ ও সমাবেশ আয়োজন করার আগ দিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মানবাধিকার এনজিওদের মতে কর্তৃপক্ষ এ ধারাটি ক্রমাগতভাবে বেশি ব্যবহার করেছে। প্রায়ই পুলিশ বা ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা বলপ্রয়োগ করে সমাবেশ ভেস্তে দিয়েছে। ৩রা মে, সংসদ ভবনের সামনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের প্রতিবাদে আয়োজিত মানববন্ধন বন্ধ করে দেয়া পুলিশ। প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজকরা বলেছেন, তারা এর অনুমতি নিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে লিখেছিল। এর আগের প্রতিবাদ কর্মসূচিগুলোর জন্য অবশ্য তাদের সেটা করতে হয়নি। পুলিশ তাদের ব্যানার জব্দ করে নেয়। ওই ব্যানারগুলোতে ন্যায়বিচারের আহ্বান জানানো হয়েছিল কোন সরকারবিরোধী বিষয়বস্তু ছিল না। ২২শে মে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিএনপির একটি সভা করতে পুলিশ বাধা দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একটি অডিটোরিয়াম বন্ধ করে দেয় পুলিশ। অংশগ্রহণকারীদের প্রবেশ করতে না দেয়ায় সভা বাতিল করা হয়। গণমাধ্যম রিপোর্টে বলা হয়, পুলিশের দাবি ওই সভা করার অনুমতি বিএনপির ছিল না। তবে বিএনপির মুখপাত্র বলেছেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ অডিটোরিয়ান আটকে রাখার কোন কারণ দেখায়নি। বিএনপির এক সদস্য বলেছেন, অক্টোবর মাসের শুরু থেকে কর্তৃপক্ষ তাদের দলের সমাবেমশের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করেছে  কমপক্ষে ২০ বার। অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যখন অনুমতি দিয়েছে তখন সমাবেশ আয়োজন করার মতো সময় ছিল না। সরকারে দুর্নীতি এবং স্বচ্ছতার ঘাটতি প্রসঙ্গে বলা হয়, আইনে সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির জন্য সাজার বিধান রয়েছে। কিন্তু সরকার এ আইন কার্যকরীভাবে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো, গণমাধ্যম, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং অন্যান্য সংগঠন সরকারের দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট করেছে। কর্মকর্তরা প্রায়ই দুর্নীতিমূলক চর্চায় লিপ্ত হয়েছে এবং এসব অপরাধ থেকে দায়মুক্তি পেয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা দুদক। ২০১০ সালের বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকার দুদকের কাজ খর্ব করেছে আর  দুর্নীতি মোকাবিলায় সংস্থাটির কাজ ব্যাহত করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ জাতিসংঘের একটি রিপোর্টের উদ্ধৃত করে বলেছে ২০১১ সালে সরকার দুদককে ১০,৫৩৬ টি মামলা প্রত্যাহার করতে বলেছে। ১৬তম সংবিধান সংশোধনী সংসদীয় অভিশংসন ক্ষমতা বর্ধিত করে নিয়ে গেছে দুদক, নির্বাচন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশ (এনএইচআরসি) এবং অন্যান্য সাংবিধানিক কমিশন পর্যন্ত। নাগরিক সমাজের অনেকে বলেছেন যে সরকার দুর্নীতি মোকাবিলায়  আন্তরিক নয়। আর তারা দুদককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় ব্যবহার করছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বলেছে, দুদকের কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সংস্থাটিকে ‘দন্তহীন বাঘ’-এ (টুথলেস টাইগার) পরিণত করেছে। ২০১৩ সালে দুদক আইন সংশধোনীতে আগাম সরকারি অনুমোদন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার কর্তৃত্ব দুদকের কাছ থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে পদ্মা সেতু দুর্নীতি কেলেঙ্কারি নিয়ে সকল অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয় দুদক। কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলেছিল, তাদের তদন্তকারীরা দুর্নীতি তদন্তে অভিযুক্তদের জড়িত থাকার কোন তথ্যপ্রমাণ পায়নি। সরকার অনেক সময় বিচার ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক চাপ দিয়েছে। আর বিরোধী নেতাদের সম্পৃক্ততা আছে এমন কিছু কিছু মামলার কার্যক্রম এগিয়েছে অনিময়িত রীতিতে। বিচারব্যাবস্থায় দুর্নীতি অব্যাহতভাবে গুরুতর একটি সমস্যা। আর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সম্পদের হিসাব প্রকাশ প্রসঙ্গে বলা হয়, সংসদের প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব দিয়ে থাকে। কিছু রাজনীতিক অজানা সূত্রে অর্জিত পুঞ্জিভূত অর্থ নিয়ে বলেছে সম্পদের হিসাবের এফিডেভিটে তারা ভুল করেছে। এরপর ওই রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রত্যাহার করে নেয় দুদক। বছরের প্রথম আট মাসে দুদক প্রায় ১৬০০ ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত প্রত্যাহার করেছে বা তাদের ছাড়পত্র দিয়েছে। এদের বেশির ভাগই রাজনীতিক বা সরকারের কর্মকর্তা।
মানবাধিকার লঙ্ঘন অভিযোগের আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি তদন্ত নিয়ে সরকারী দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়, বিস্তৃত পরিসরের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সাধারণত স্বতন্ত্রভাবে কাজ করেছে, তদন্ত পরিচালনা করেছে এবং মানবাধিকার ঘটনাগুলো নিয়ে তাদের প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশ করেছে। মানবাধিকার গ্রুপগুলো কখনও কখনও সরকারের কড়া সমালোচনা করলেও তারা একই সঙ্গে কিছু সেলফ সেন্সরশিপ চর্চা করেছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণত সহযোগিতামূলক ছিলেন না বা সাড়া দেননি। ২০১৩ সালে অধিকারের একটি রিপোর্ট প্রকাশ হওয়ার পর থেকে এখনও সরকার অব্যাহতভাবে তাদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। ওই রিপোর্টে হেফাজতে ইসলামের এক সমাবেশে মৃতের যে সংখ্যা বলা ছিল তা আনুষ্ঠানিক সংখ্যা ও অন্য ধারণা থেকে বেশি ছিল। ওই সমাবেশে সরকারি বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়টি বিশ্বাস করেন অনেক স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষক। অধিকার সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান এবং প্রেসিডেন্ট নাসিরুদ্দিন এলান জামিনে মুক্তি পেলেও তাদের সংস্থার রিপোর্ট থেকে উদ্ভব হওয়া অভিযোগগুলো এখনও তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে। হয়রানি, আর্থিক হিসাবে তদন্ত এবং সংস্থার বিদেশী অনুদানে নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলো জানিয়েছে অধিকার। এছাড়াও হয়রানির শিকার হয়েছেন অধিকার কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। তারা দাবি করেছেন তাদের টেলিফোন, ই-মেইল আর গতিবিধির ওপর সার্বক্ষণিত নজরদারি রাখছেন নিরাপত্তা কর্মীরা। বৈষম্য, সামাজিক নির্যাতন প্রসঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়, আইনে নারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু বৈষম্যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়াও আইনে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে নির্যাতনকারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলা আছে। রয়েছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান। অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার বাধ্যবাধকতা। আর এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা করলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হলে তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। তবে এসব আইনের প্রয়োগ ছিল বেশ দুর্বল। নারী, শিশু, সংখ্যালঘু, শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, আদিবাসী ও সেক্সুয়াল মাইনরিটি প্রায়ই সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। এছাড়াও রিপোর্টে শ্রমিক অধিকার প্রসঙ্গে বিদ্যমান নানা প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে, ২৭শে আগস্ট গ্লোবাল ট্রাউজার্স ফ্যাক্টরিতে লোহার রড দিয়ে এক নারী ইউনিয়ন অর্গানাইজারকে প্রহার করে মুখোশধারী ব্যক্তিরা। তার স্বামীকেও কারখানার বাইরে মারধর করা হয়। এতে করে ওই নারী কর্মী মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ইউনিয়ন আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ প্রাথমিকভাবে ওই দম্পতির অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এছাড়া রিপোর্টে শিশুশ্রম বন্ধের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

স্ত্রীর কারণে নিউজিল্যান্ডে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার

নিউজিল্যান্ডে ভারতীয় হাইকমিশনার সেদেশ ছাড়ছেন। তার স্ত্রী শর্মিলা একজন কর্মচারীকে মারধর করেছেন এ অভিযোগের পর তারা নিউজিল্যান্ড ছাড়ছেন। হাইকমিশনার রবি থাপারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডেকে পাঠানো হয়েছে। শনিবার সকালে তার ওয়েলিংটনের বাসভবনের সামনে মালামাল নেয়ার গাড়ি দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যম এ কথা জানায়।
পুলিশ বলছে, যে স্টাফকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে তিনি মে মাসের প্রথম দিকে ভারত ফিরে গেছেন। পুলিশ জানায়, ওই স্টাফ আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ জানাতে চায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ওই স্টাফ ছিলেন শেফ। এক রাতে ওয়েলিংটনের কূটনৈতিক পাড়া থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে তাকে বিপর্যস্ত অবস্থায় হাঁটতে দেখে একজন পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায়। পরে ওই স্টাফকে ওয়েলিংটনের আশ্রয় কেন্দ্রে কয়েক রাত রাখা হয়। তখন সে অভিযোগ করে তার সঙ্গে চাকর-বাকরের মতো আচরণ করা হয় এবং শর্মিলা তাকে মারধর করেন।

তিউনিসিয়ায় আইএস হামলা কেন?

আরব বিশ্বের অন্যতম প্রবীণ সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত তিউনিসিয়া দ্বিতীয়বারের মতো সন্ত্রাসী হামলার শিকার হল। গত মার্চে দেশটির বারদো জাদুঘরে হামলা করে ২২ জন বিদেশী পর্যটককে হত্যার ঘটনা ছিল তিউনিসিয়ার ইতিহাসে সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী ঘটনা। এবার ৩৯ জন নিহতের পর দেশটি আরও গভীর সংকটে পড়ল। স্বাভাবিকভাবেই এ ঘটনায় সন্দেহ করা হচ্ছে ইসলামপন্থী জঙ্গি সংগঠন কিংবা ইসলামিক স্টেটকে (আইএস)। তিউনিসিয়া সরকারের গোয়েন্দা তথ্য সরবারহকারী সুফান গ্র“প বলছে, দেশটির প্রায় ৩ হাজার সিরিয়ান যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। যা অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে কিছু সেখানে নিহত হয়েছে, আর কিছু দেশে ফিরে এসেছে। এছাড়া একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা পার্শ্ববর্তী লিবিয়ার মিলিশিয়া ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তিউনিসিয়ার রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সচিবের তথ্য অনুযায়ী, বারদো জাদুঘরে হামলাকারী দুই বন্দুকধারী লিবিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল।
সাম্প্রতিক এসব রক্তক্ষয়ী হামলা তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের সেক্যুলার নির্যাতনের প্রতিশোধ। ২০১১ সালে আরব বসন্তের মধ্য দিয়ে সেই প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে তিউনিসিয়ার ২৪ বছরে স্বৈরশাসক জিনে আল আবেদিন বেন আলীর পতন ঘটেছিল। পরিবার নিয়ে সৌদি আরবে পালিয়ে বেঁচেছিলেন বেন আলী। বেন আলীর সেক্যুলার সরকার জনগণকে অতিমাত্রায় আবদমন করে রেখেছিল। জনগণের এক-পঞ্চমাংশই ছিল সেনাবাহিনী। সেবাবাহিনী দিয়ে ইসলামপন্থীদের চরম নির্যাতন করা হতো। নারীদের বোরকার পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ২০১১ সালের অক্টোবরে মডারেট ইসলামী পার্টি ক্ষমতায় এসে ধর্মীয় স্বাধীনতার অনুমোদন দেয়। সম্প্রতি আবার সেক্যুলার পার্টি ক্ষমতায় এসেছে। জঙ্গি তৎপরতায় তিউনিসিয়দের জড়িত হওয়ার কারণ বিশালসংখ্যক তরুণ সমাজের বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সমস্যা, দেশটির ৪০ শতাংশ জনগণের বয়স ২৪ এর নিচে। ব্রিটিশদের শান্ত থাকার আহ্বান ক্যামেরনের : ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, তিউনিসিয়ার একটি অবকাশযাপন কেন্দ্রে শুক্রবারের সন্ত্রাসী হামলায় তার দেশের বহু নাগরিক নিহত হয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্যামেরন তার ডাউনিং স্ট্রিটের বাসভবন থেকে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে বলেন, তিউনিসিয়ায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে বহু ব্রিটিশ নাগরিক রয়েছেন এবং এ ব্যাপারে জনগণকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

বিএনপির ‘বিলুপ্তি’ (!) ও তার সম্ভাব্য পরিণতি by বদিউল আলম মজুমদার

সামন্তবাদী যুগে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ছিল রাজা-মহারাজাদের হাতে। এ ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁরা প্রজাদের প্রায় সব ধরনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করতেন। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে অধিকারহীন মানুষ প্রায় দাসের সমতুল্য। তাই সামন্তবাদের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের পেছনে মূল আকর্ষণ ছিল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, যে অধিকারের অনেকগুলো তার জন্মগত।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও ক্ষমতা কুক্ষিগত এবং জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়ে থাকে। এ ছাড়া ক্ষমতা কুক্ষিগত হলে দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার ঘটে। তাই খ্রিষ্টপূর্ব গ্রিসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রচলনের পর থেকেই পণ্ডিতেরা ক্ষমতার বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পন্থা উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করেন। ফরাসি চিন্তাবিদ মন্টেস্কোর উদ্ভাবিত ‘প্রিন্সিপলস অব সেপারেশন অব পাওয়ারস’ বা ক্ষমতা বিভাজনের নীতি যার অন্যতম। এই নীতির আলোকে সরকারি ক্ষমতাকে বিভাজিত করে এর ভিন্ন ভিন্ন অংশ নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এ ধরনের ‘চেকস অ্যান্ড সায়েন্সেস’ স্কিমের উদ্দেশ্য হলো কোনো বিভাগ যাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নাগরিকের অধিকার হরণ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। আর তা করা সম্ভব যদি এক বিভাগ অন্য বিভাগের ওপর নজরদারি রাখে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নজরদারির কাঠামো আরও জোরদার হয় আইনসভায় বিরোধী দলের উপস্থিতির মাধ্যমে। আইনসভায় একটি সক্রিয় ও শক্তিশালী বিরোধী দল নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। নির্বাহী বিভাগের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার অন্যতম মাধ্যম অবশ্য আইনসভার বিভিন্ন ধরনের স্থায়ী কমিটি।
আধুনিক রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নজরদারির ব্যবস্থা থাকে। রাজনৈতিক দল মূলত এ ভূমিকা পালন করে থাকে। আইনসভার বাইরে বিরোধী দল তাদের আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে। মার্কিন জাতির পিতারা রাজনৈতিক দলকে ‘ইভিল’ বা অশুভ বলে আখ্যায়িত করলেও কালের পরিক্রমায় রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কার্যকর করার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বস্তুত, রাজনৈতিক দল ছাড়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কল্পনাই করা যায় না।
সংসদীয় গণতন্ত্রে ক্ষমতার বিভাজনের পদ্ধতি এমনিতেই দুর্বল। আর বাংলাদেশে এ পদ্ধতি প্রায় ভেঙে পড়েছে। আমাদের বর্তমান অবস্থায় ‘অল পাওয়ারফুল’ বা সর্বশক্তিমান নির্বাহী বিভাগ অন্য দুই বিভাগের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে আসছে। বস্তুত, সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও আমাদের আইনসভা সে ভূমিকা পালন করতে অপারগ। বিচার বিভাগও নানা কারণে প্রশাসনের প্রভাব বলয়ের বাইরে থাকতে পারছে না।
এ ছাড়া আমাদের সংসদে বিরোধী দলের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। দশম জাতীয় সংসদে স্বীকৃত বিরোধী দল জাতীয় পার্টি একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে রয়েছে। তাদের দলের তিনজন সদস্য মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত। তাই তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনে অক্ষম। এ ছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য নয়।
প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির কাঠামোর এ দুর্বলতার কারণে নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের স্বার্থে রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্তিশালী ও কার্যকর বিরোধী দল থাকা জরুরি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল। ১৯৯০ সালের পর থেকে এ দুটি দলই পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল এবং রয়েছে। উভয় দলই আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশের মতো ভোটারের প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু নির্বাচন বর্জনের কারণে দশম জাতীয় সংসদে বিএনপির কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। সংসদের বাইরেও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে দলটি তেমন কোনো অর্থবহ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে না। দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও তাদের নেতা-কর্মীদের ওপর সরকারের দমন-পীড়ন এর অন্যতম কারণ বলে অনেকেই মনে করেন।
এ বছরের প্রথম তিন মাসে সরকারবিরোধী সহিংস আন্দোলনে লিপ্ত হয়ে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো একেবারে ভেঙে পড়েছে বলে অনেকে মনে করেন, যার প্রতিফলন ঘটেছে সরকার হটানোর আন্দোলনে দলের অনেক নেতা-কর্মীর নিষ্ক্রিয়তায়। তবে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো আগে থেকেই দুর্বল। প্রকট পরিবারতন্ত্রই এর মূল কারণ। বস্তুত, পরিবারতন্ত্রের কারণে দলটিতে মালিকানার সংকট রয়েছে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকের ধারণা যে দলীয় কাঠামোতে তাঁদের ভবিষ্যৎ মূলত নির্ভর করে বেগম জিয়া ও তারেক জিয়ার আজ্ঞার ওপর। সাংগঠনিক কাঠামোর দুর্বলতার আরেকটি কারণ হলো দলের সিদ্ধান্ত¦ গ্রহণের একাধিক উৎপত্তিস্থল। এ ছাড়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে—যে সংশোধনীর মাধ্যমে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—অদূর ভবিষ্যতে দলটির ক্ষমতায় যাওয়ার এবং ক্ষমতার ফায়দা ভোগ করার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। তাই বিএনপির সরকার হটানোর আন্দোলনে জড়িত হয়ে জেল-জুলুম ও অন্যান্য হয়রানির ঝুঁকি নিতে দলের অনেক জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম সারির নেতা সংগত কারণেই অনাগ্রহী।
বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো সরকারের দমন-পীড়ন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মারমুখী আচরণ। সরকার খালেদা জিয়াসহ দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকেই মামলার জালে আটকে ফেলেছে, যার বেশির ভাগই হয়রানিমূলক। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে ইতিমধ্যে কারাগারে অন্তরীণ করা হয়েছে। যেমন, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে অন্তত ৭৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তিনি বহু মাস থেকেই কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। এ ছাড়া লাখ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বছরের প্রথম তিন মাসের সহিংস আন্দোলনের সময় বিএনপির প্রায় ১০ হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিএনপিকে সুস্পষ্ট কর্মসূচিভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক, সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ ও শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আজ বেগম জিয়াকেই নিতে হবে। তাঁকেই পরিবারতন্ত্র পরিহার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দলের জন্য সৎ ও নিষ্ঠাবান নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায়িত করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় দলের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব একজন এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্টের ওপর অর্পণ করার কথাও তিনি বিবেচনা করতে পারেন।
অনেকের আশঙ্কা, বিএনপিকে বিলুপ্ত করাই সরকারের দমন-পীড়নের অন্যতম লক্ষ্য। অনেককে বলতে শোনা যায় যে এ ধরনের দমন-পীড়ন অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দলটির কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়বে এবং বিএনপি যাবে বিলুপ্তির পথে। তবে অনেকেরই এ ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে। তাঁরা মনে করেন যে নেতৃত্বের সংকট থাকলেও বিএনপির সমর্থকের অভাব নেই। কারণ, নানা অপকর্মের ফলে সরকারি দল যে জনসমর্থন হারিয়েছে, বিএনপির ঘরেই তার সুফল উঠছে, অনেকটা নাগরদোলার মতো। নাগরদোলার এক প্রান্ত নিচের দিকে গেলে যেমন আরেক প্রান্ত ওপরের দিকে উঠে যায়, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগ জনসমর্থন হারালে বিএনপি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যদিও এটি বিএনপির কোনো কৃতিত্বের কারণে নয়।
অতীতের বহু অপকর্মের জন্য বিএনপির প্রতি অনেক চিন্তাশীল নাগরিকেরই সহানুভূতি নেই। তবু অনেকেই মনে করেন যে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপির বিলুপ্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। বরং একটি চরম কর্তৃত্ববাদী সরকারের উত্থান রোধ করার লক্ষ্যে বিএনপিকে একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও শক্তিশালী দল হিসেবে বিকশিত হওয়া আজ জরুরি। এ ছাড়া বিএনপি বিলুপ্ত হলে তার অগণিত কর্মী-সমর্থকের অনেকেই সাম্প্রদায়িক দলগুলোতে ভিড়ে যেতে পারেন, এমনকি উগ্রবাদের দিকেও হাঁটতে পারেন, যা কারও জন্যই কাম্য হতে পারে না। বস্তুত, এমন আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
প্রসঙ্গত, বিএনপির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হলেও অনেকের মতে, ক্ষমতাসীন দলের অবস্থাও দীর্ঘমেয়াদিভাবে তেমন ভালো নয়। প্রায় সাড়ে ছয় বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে প্রায় ‘বিলুপ্ত’ হয়ে গেছে। বস্তুত, সরকার অনেকটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাঁধে সওয়ার হয়ে পড়েছে। আর ফায়দাতন্ত্রের চেইনে আবদ্ধ ও পরিপুষ্ট অগণিত নেতা-কর্মী দলের প্রতি সমর্থন জোগাচ্ছেন। তাই ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে আওয়ামী লীগও যে খুব একটা শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে, তা অনেকেই মনে করেন না।
পরিশেষে, বিএনপিকে সুস্পষ্ট কর্মসূচিভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক, সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষ ও শক্তিশালী দল হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আজ বেগম জিয়াকেই নিতে হবে। তাঁকেই পরিবারতন্ত্র পরিহার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দলের জন্য সৎ ও নিষ্ঠাবান নতুন নেতৃত্ব ক্ষমতায়িত করতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় দলের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব একজন এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্টের ওপর অর্পণ করার কথাও তিনি বিবেচনা করতে পারেন। আর তিনি যদি প্রজ্ঞা ও সাহসিকতা প্রদর্শন করে প্রয়োজনীয় অপ্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপারগতা প্রদর্শন করেন, তাহলে তিনি নিজে এবং তাঁর দলকেই শুধু নয়, পুরো জাতিকেই এর মাশুল গুনতে হবে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)৷

কোকেন পাচার নিয়ে বিশ্বব্যাপী তোলপাড় জাতিসংঘ আসছে by মিজানুর রহমান ও মহিউদ্দীন জুয়েল

চট্টগ্রামে তেলের সঙ্গে তরল কোকেনের চালান ধরা পড়ায় দুনিয়ার দৃষ্টি এখন বাংলাদেশে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এরই মধ্যে ঘটনাটির বিষয়ে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) নড়েচড়ে বসেছে। সরকারের তরফে জাতিসংঘকে এ ঘটনার তদন্তে সহযোগিতার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হতে পারে। সরকারের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক হোসাইন আহম্মদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে এ নিয়ে জাতিসংঘকে চিঠি দেয়া হবে। সেখানে আন্তর্জাতিকভাবে ঘটনাটি তদন্তের কথা জানানো হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশজুড়ে তোলপাড় হওয়া এই ঘটনার পর গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এনবিআর। এরপর বিকালে এক বৈঠকে চলতি সপ্তাহের সোম ও মঙ্গলবারের মধ্যে চিঠিটি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আন্তর্জাতিক তদন্তের বিষয়ে আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র। বলা হয়েছে, এ ধরনের অপরাধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এমনিতে আকৃষ্ট হয়। বিশেষ করে জাতিসংঘের। তারা স্থানীয় প্রতিনিধির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক খবর পেয়ে থাকে। সরকার চাইলে তারা তদন্তেও সহযোগিতা করে।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজীবুর রহমান মানবজমিনকে জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করছে। তারা সতর্ক ছিল বলে এত বড় চালান আটক করা সম্ভব হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকারত। সরকার তার নিজস্ব ক্ষমতা দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করছে। প্রয়োজনে তদন্তে বৈদেশিক সহায়তা নেয়া হবে। তবে সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে আগে সিদ্ধান্ত হবে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি)’র সঙ্গে যোগাযোগ সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন অপরাধের বিষয়ে খোঁজখবর রাখে। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহায়তা করে থাকে। এ ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক কোন যোগাযোগ হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এনবিআরের কারও সঙ্গে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
এদিকে ধরা পড়া কোকেনের চালান বাংলাদেশে ব্যবহারের জন্য এসেছে এমনটি মনে করেন না মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। কারণ হিসাবে তারা বলেন, যেহেতু বাংলাদেশে কোকেনের বাজার এখনও ততোটা সয়লাভ হয়নি। তারা মনে করেন এখানে রুট হিসেবে বাংলাদেশকে মাফিয়ারা ব্যবহার করতে পারে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করেন তারা। পুরো বিষয়টি এনবিআর মনিটরিং করছে জানিয়ে এক কর্মকর্তা বলেন, এ জন্য আন্তর্জাতিকভাবে তদন্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, আগামী সপ্তাহে এই বিষয়ে তদন্ত করতে দুটি বিদেশী টিম চট্টগ্রাম বন্দরে আসার বিষয়টি এক প্রকার নিশ্চিত হয়েছে। দুই দলেই মোট ৫ সদস্য করে ১০ জন পৃথকভাবে বন্দর পরিদর্শন করবেন বলে ফোনে জানিয়েছেন তাদেরকে। তবে এই বিষয়ে জানতে চাইলে কমিশনার আবদুল জলিল মণ্ডল মানবজমিনকে বলেন, আন্তর্জাতিক তদন্ত হওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত হচ্ছে। বিদেশী কয়েকজন গোয়েন্দা সদস্য আসার কথা শুনেছি। তদন্তের স্বার্থে এখনি কিছু বলা যাচ্ছে না। এদিকে এই ঘটনায় আমদানিকারক খান জাহান আলী লিমিটেডের বিরুদ্ধে গতকাল বিকালে বন্দর থানায় মামলা করেছে পুলিশ। এতে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদকে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। যদিও তিনি এই ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন। ইতিমধ্যে এই ঘটনায় সোহেল নামের তার প্রতিষ্ঠানের অপর এক কর্মকর্তা এই ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে বলে মানবজমিনকে জানান বন্দর থানার ওসি মহিউদ্দিন সেলিম।
লন্ডনে বসে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ!
চট্টগ্রাম বন্দরে সূর্যমুখী তেলের ড্রামে কোকেন আমদানির ঘটনায় লন্ডনপ্রবাসী ফজলু নামের এক ব্যক্তির জড়িত থাকার নাম বেরিয়ে আসছে ঘুরেফিরে। এই ঘটনায় গত ২১ দিন আগে গ্রেপ্তার হওয়া খান জাহান আলী লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান প্রাইম হ্যাচারির কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা সোহেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ওই সময় তিনি লন্ডনে থাকা এক ব্যক্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ভোজ্য তেল আমদানির কথা জানান। গত শনিবার পরীক্ষাগারে কোকেন পাওয়ার ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর পুলিশ জনৈক ব্যক্তিটির নাম ফজলু বলে জানতে পারেন।
সম্পর্কে তিনি গ্রেপ্তার হওয়া সোহেলের খালাতো বোনের জামাই। তার মাধ্যমেই বলিভিয়া থেকে সে এই চালানটি চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নিয়ে এসেছিল বলে পুলিশকে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিল। গতকাল এই বিষয়ে জানতে চাইলে নগর গোয়েন্দা পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ফজলুকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে মত দেন।
তারা জানান, তাকে ধরা গেলে এই ঘটনার গোপন রহস্য বেরিয়ে আসবে। যদিও গ্রেপ্তার হওয়া সোহেলও অনেক কিছু জানেন। তার কথায় ইতিমধ্যে কোকেন পাচার হওয়ার চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ধারণা করা হচ্ছে, সোহেলের খালাতো বোনের জামাই ফজলু একজন আন্তর্জাতিক মাদক ব্যবসায়ী। কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরকে রুট হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে সে। এই কাজে তার সঙ্গে চীন ও সিঙ্গাপুরের  একটি চক্র জড়িত রয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, একটি বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত ৬ই জুন ভোজ্য তেলের বড় এই চালানটির ঘটনা ফাঁস হয়। এর আগে চালানটি ছাড়িয়ে নিতে আমদানিকারক খান জাহান আলী লিমিটেডকে জানানো হলে প্রতিষ্ঠানটির মালিক নূর মোহাম্মদ এর কোন দায়ভার নিতে রাজি হননি। তখন তিনি বলেছিলেন তার প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে কেউ এই কাজটি করেছে।
এতে সন্দেহ আরও বাড়ে। শেষমেশ চালানটির রপ্তানিকারক বলিভিয়ার সান্তা ক্রুজ কোম্পানি থেকে খাতুনগঞ্জের নবী মার্কেটের খান জাহান আলীর প্যাড ব্যবহার করে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সোহেল সান ফ্লাওয়ার তেলের চালানটি আমদানি করেন বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।
এরপর কৌশলে গত ৬ই জুন রাতে অভিযান চালিয়ে সোহেলকে আটক করে। পরে তার দেয়া স্বীকারোক্তিতে বন্দরের সিসিটি গিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের সহযোগিতায় কনটেইনারটি জব্দ করা হয়। গত ৮ই জুন কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও পুলিশের উপস্থিতিতে কনটেইনারটি খোলা হয়।
যদিও তখন সেখানে থাকা ১০৭টি ড্রাম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েও কোকেন পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছিলেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান। পরে সেগুলো ঢাকায় পাঠানোর পর গত শনিবার ৯৬ নম্বর ড্রামে তা ধরা পড়ে।
বর্তমান বাজার দর অনুসারে প্রতি কেজি কোকেনের দাম ৫০ কোটি টাকা। সেই হিসেবে ড্রামে থাকা এক তৃতীয়াংশ কোকেনের পরিমাণ প্রায় ৬১ কেজি।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনার প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপপরিচালক জাকির হোসেনের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক ড. মঈনুল খান বলেন, বাংলাদেশে কোকেনের বাজার তেমন নেই। তবে বিদেশী কোন চক্র এই দেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। এইজন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে কৌশলে কাজে লাগাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তদন্ত করলে সব বেরিয়ে আসবে। এই ঘটনায় দেশের বাইরের অনেকে জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা। তাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার তানভীর আরাফাত মানবজমিনকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া সোহেল লন্ডন প্রবাসী এক ব্যক্তির নাম বলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, সে-ই মূল হোতা। সম্পর্কে সোহেলের আত্মীয়। অপরাধীরা ভেবেছে তরল কোকেন পরীক্ষা করা যায় না বাংলাদেশে। আর সেই কারণে পাউডারের পরিবর্তে তরল করে তা পাচারের পন্থা বেছে নিয়েছে।

আশার কথা শোনাতে পারছেন না দুই মেয়র

জলাবদ্ধতায় ত্যক্ত-বিরক্ত নগরবাসীর শিগগিরই মুক্তির কোনো আশা নেই। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই মেয়র এ ব্যাপারে আশার কথা শোনাতে পারছেন না।
এদিকে নগরবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দফায় জলাবদ্ধতার দায় দুই মেয়র এড়াতে পারলেও আগামী বছর বর্ষার আগেই তাঁদের ‘দৃশ্যমান’ কিছু করে দেখাতে হবে। শহরে বিভিন্ন পরিষেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এ ছাড়া জলাবদ্ধতার জন্য সিটি করপোরেশনের দায়ও নেহাত কম নয়।
প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, ‘জলাবদ্ধতা কবে যাবে, এর উত্তর আমার জানা নেই। এটা কমবেই, তা জানি।’ তিনি জলাবদ্ধতার জন্য কিছু আবাসন প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করেছেন। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, ১৫ মের পরে রাস্তা না কাটার নির্দেশনা ওয়াসা মানছে না। টাকা ছাড়ের হেরফেরের কারণে এমনটি হচ্ছে। তিনি কিছু উদ্যোগের কথাও বলেছেন। খালের মুখ বন্ধ করে দেওয়ায় একটি নামকরা আবাসন প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ করেছেন এবং মিরপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৬২টি বাড়ি ভাঙার কাজ চলছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন জলাবদ্ধতার জন্য অপরিকল্পিত নগরায়ণকে দায়ী করেছেন। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নগরের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় পয়োব্যবস্থা রাখা হয়নি। তার ওপর বক্স কালভার্ট করে খাল ভরাট করা হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের বন্যাপ্রবাহ এলাকা, যেখান থেকে পানি নেমে যাবে, সেখানে বালু ফেলে ভরাট করে আবাসন প্রকল্প ও বাড়ি উঠেছে।
জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে কাজ শুরুর পরামর্শ দিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন মেয়রদের এখনো দায়-দায়িত্ব কাঁধে নেওয়ার সময় হয়নি। ২০১৫-২০৩৫ সাল মেয়াদে রাজউকের স্ট্রাকচার প্ল্যান আছে। সেখানে পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা প্রসঙ্গে কিছু সুপারিশ আছে। মেয়ররা এগুলো পড়ে দেখে সব প্রতিষ্ঠান ও নগর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
নজরুল ইসলাম বলেন, ওয়াসার বেশ কিছু পদক্ষেপের কারণে মিরপুর সড়কে এখন আর সেভাবে পানি জমে থাকছে না। ওয়াসা যেন তার কাজটা ঠিকমতো করতে পারে, সে জন্য সিটি করপোরেশনের সহযোগিতা দরকার। বর্ষা মৌসুম শেষ হলেই একটা একটা করে কাজ শেষ করতে হবে। খালগুলো পুনরুদ্ধার করা দরকার, জলাধার থাকা বাঞ্ছনীয়। তিনি বলেন, নিচু জমিতে মাটি ফেলে ভরাট করেছে বেশ কিছু আবাসন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু জলাধার রাখেনি। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন নিকুঞ্জ থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ৩০০ ফুট চওড়া রাস্তার দুই পাশে ১০০ ফুট করে ২০০ ফুট খাল রাখার। এ নিয়ে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো খুব একটা আগ্রহী নয় বলে তিনি জানান।
এদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ইকবাল হাবীব বলেছেন, নগরে ভূ-উপরিস্থিত পয়োপ্রণালি পুরোটা ও ভূ-গর্ভস্থ প্রণালির ৩০ ভাগ সিটি করপোরেশনের। তাই সিটি করপোরেশন দায় এড়াতে পারে না। তাঁর মতে, সিটি করপোরেশনের কঠিন বর্জ্য খাল, বিল, ঝিলগুলোকে ভাগাড়ে পরিণত করেছে। সিটি করপোরেশনের উচিত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভালোভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা। একই সঙ্গে কর্তৃত্ব নিয়ে পরিষেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে।

দক্ষিণের মতো আমি দেউলিয়া নই -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : আনিসুলহক by মিজানুর রহমান খান

ঢাকার নতুন দুই মেয়র পদে দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পূর্ণ হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে জনবান্ধব, পরিচ্ছন্ন ও গতিশীল নগর গড়ে তোলার অঙ্গীকারের পথে তাঁরা কতটা এগোলেন, নগরবাসী কী পেল, তা জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তাঁদের মুখোমুখি হন মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো : মেয়র হয়ে কোনো স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছে কি না?
আনিসুল হক : না। গত ৪২ দিনে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে কখনো রাত ১১টা পর্যন্ত অফিস করেছি। এই সময়ে যত বেশি ফাইলে সই করেছি, তত সই সারা জীবনে করিনি। আমি বিশ্বাস করি, একজন প্রধান নির্বাহীর হাতে এ ধরনের কাজ থাকা উচিত নয়। যদিও বলা হয়ে থাকে ৫৬ রকম সংস্থা আছে, কিন্তু এখন আমি মনে করি মেয়রের পক্ষে কিছু কাজ করা সম্ভব। দেখার মতো করে পরিবর্তনটা আসতে তিন-চার বছর লাগবে। 
প্রথম আলো : অগ্রাধিকারগুলো কী?
আনিসুল হক : পরিচ্ছন্ন নগর সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে অনেক কিছু পড়ে। বেশির ভাগ পার্ক ও হ্রদ আমাদের নয়। গুলশানের সব লেক রাজউক দেখে। অথচ গঠনতান্ত্রিকভাবে তার কাজ এটা বানিয়ে হস্তান্তর করা। সুতরাং বাস্তবতা ও জনধারণার সঙ্গে বৈপরীত্য আছে। খাল, বিল, নর্দমা, পানি, বিলবোর্ড—সব ডিসিসির, আসলে তা নয়। এক-তৃতীয়াংশ বিলবোর্ড করপোরেশনের নয়, আর্মি, নেভি, রাওয়া ক্লাব, সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ও বিলবোর্ড বসায়।
প্রথম আলো : তাহলে কীভাবে অবৈধ বিলবোর্ড সরবে?
আনিসুল হক : আমি মনে করি, এটা সম্ভব। ইতিমধ্যে আড়াই শ বিলবোর্ডের ওপরের ছাল তোলা হয়েছে। ক্রেন দিয়েও দিনে তিনটির বেশি তোলা যায় না। দু-এক জায়গায় বাধা এসেছে, কিন্তু বিস্ময়করভাবে ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতা-কর্মীর বাধা পাইনি, খুব নিচের পর্যায়ে এক-আধটু আপত্তি তুলেছে। বিলবোর্ড সমিতি, যার ৫০০ সদস্য, তাদের বলেছি, আপনাদের সব অবৈধ বিলবোর্ড তুলে নিতে হবে। ১ জুলাই তাদের সম্মেলন হবে। বিজ্ঞাপনদাতাদের চিঠি দিয়েছি।
প্রথম আলো : প্রথম ১০০ দিনে কী করে দেখাবেন বলে আশা করেন? জবাবদিহির স্বার্থে নির্দিষ্ট করে বলুন।
আনিসুল হক : ১. তেজগাঁও, গাবতলী ও মহাখালীর যন্ত্রণাদায়ক ট্রাক পার্কিং অপসারণ করব। ২. ডিএনসিসির আওতাধীন যেকোনো স্থান থেকে বাসযাত্রী ওঠানামায় শৃঙ্খলা আনব। ৩. বাসমালিকদের সঙ্গে আলাপ করে নতুন বাস নামাব। ৪. কারওয়ান বাজারের পাইক​ারি বাজারকে মহাখালী নিতে শক্তিশালী উদ্যোগ নেব।
প্রথম আলো : এটাই কি যথেষ্ট?
আনিসুল হক : আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ১. কারওয়ান বাজার অপসারণ চূড়ান্ত করব। ২. রাস্তাঘাটের বিশাল আবর্জনার স্তূপ (তিন-চার বছরের মধ্যে বর্জ্য হবে বড় সম্পদ) ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করব। ৩. নগর হবে বেশ পরিচ্ছন্ন। ৪. মহাখালীর বাসস্ট্যা‌ন্ডের জট অনেকটা কমাব। ৫. আগামী শীতের মধ্যে নগর সবুজ হয়ে ওঠা আপনার চোখে পড়বে (৬০ শতাংশ শেষ হবে ২০১৮ সালে), বিশেষজ্ঞরা উদয়স্ত পরিশ্রম করছেন। ৬. নগর হবে অবৈধ বিলবোর্ডমুক্ত। ৭. হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের জন্য ১৫টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করব। ৮. ডিএনসিসির জন্য সুষ্ঠু প্রশাসন গড়ব।
প্রথম আলো : কিন্তু মানুষের বড় ভোগান্তি ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, যানজট ও জলাবদ্ধতায়। সে বিষয়ে আপনি কবে কী করবেন, সেটা বলুন?
আনিসুল হক : ওয়াসাসহ অনেক সংস্থা রাস্তা কাটে। বর্ষায় বেশি রাস্তা কাটার অভিযোগ অনেকটা কল্পকাহিনি। কারণ, প্রকল্প বাস্তবায়নের অর্থ জোগাতে সরকার ও দাতা সংস্থাসহ বহু ধরনের সংস্থা একসঙ্গে জড়িত থাকে। তাই টাকা ছাড়ে হেরফের ঘটার প্রভাব সড়ক নির্মাণ বা মেরামতে পড়ে। তদুপরি ১৫ মের পরে রাস্তা না কাটার যে  নির্দেশনা আছে, ওয়াসা তা মানে না। তারাও ২০ শতাংশের বেশি রাস্তা খোঁড়ে না, কিন্তু সেটাই বেশি চোখে পড়ে। এ মুহূর্তে তারা নাখালপাড়াসহ দু-চারটি স্থানে কাটছে। চাপের মুখে তারা নাখালপাড়ায় এক মাসের কাজ ১০ দিনে শেষ করছে।
প্রথম আলো : অলিগলির খানাখন্দ দূর হবে, নাকি এটা ঢাকাবাসীর নিয়তি?
আনিসুল হক : কিছু বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। দু-চার বছরের মধ্যে সুফল মিলবে।
প্রথম আলো : আপনি জলাবদ্ধতা পরিদর্শনে যাচ্ছেন। এটা কি লোক দেখানো?
আনিসুল হক : না, এটা শৌখিন পরিদর্শন নয়, মূলত আমি যেখানেই যাচ্ছি সেখানে একটি স্থানীয়ভাবে সমাধান দিয়ে আসছি। আমার সঙ্গে রাজউক ও ওয়াসার কর্মকর্তারা থাকছেন। কিন্তু জলাবদ্ধতা কবে যাবে, তার উত্তর আমার জানা নেই, এটা কমবেই, তা জানি। একটি নামকরা হাউসিং কোম্পানি একটি খালের মাথা আটকে দিয়েছে, তাদের খাল কেটে দিতে বলেছি, অন্যথায় চাপ দেব। মিরপুর ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ৬২টি ছোট বাড়ি ভাঙা হচ্ছে, এর মধ্যে ২১টি ভাঙার কাজ শেষ। হ্যাঁ, এটা দুরূহ কাজ। আমি শুধু কমিশনারকে বলেছি, ভাই, কখনো যেন না শুনি যে আপনার গায়ে লেগেছে বলে আপনি কারও স্থাপনা ভেঙে দিয়েছেন। 
প্রথম আলো : টাকা পাবেন কোথায়? তহবিল নাকি শূন্য—
আনিসুল হক : অল্প কিছু ছিল।
প্রথম আলো : টাকার অঙ্কটা প্রকাশ করুন।
আনিসুল হক : না, সেটা গোপনীয়। ভাগ হওয়ার সময় উত্তরের কোনো টাকা ছিল না। গত তিন বছরে কিছু জমেছে, দক্ষিণের কাছে আমরা এখনো প্রায় ২০০ কোটি টাকা পাই।
প্রথম আলো : টাকার অঙ্কে কে শক্তিশালী?
আনিসুল হক : দুজনেই গরিব তবে দক্ষিণের চেয়ে উত্তর খেয়ে-পরে ভালো আছে। দক্ষিণের প্রশাসকেরা খুব অপরিকল্পিত কাজ করেছেন, তাঁরা ৫০০ কোটি টাকার কার্যাদেশ দিয়েছেন, ইচ্ছেমতো দোকান, ভবন তৈরি করেছেন। উত্তরেরও দেনা আছে, তবে তা হয়তো সোয়া শ কোটি টাকার। আরেকটি দুঃখ হলো, ডিসিসি সম্পর্কে সুনাম শুনিনি। মানুষ বলে দুর্নীতির আখড়া, আমি বলি দুর্নীতির সংক্রমণ ঘটেছে। কানে এসেছে, নেই প্রকল্প পাস হয়েছে, বিলও শোধ হয়েছে।
প্রথম আলো : দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি চান কি না?
আনিসুল হক : অবশ্যই চাই। দক্ষিণের মতো আমরা দেউলিয়া নই। তবে আমরাও সরকারের অর্থের ওপর বিরাটভাবে নির্ভরশীল।
প্রথম আলো : বাজেট কেমন হবে, কর বাড়াবেন?
আনিসুল হক : না। দুই হাজার কোটি টাকার বাজেটে নিজস্ব জোগান আট শ কোটির মতো থাকবে।
প্রথম আলো : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভোটের পরে কী কথা হলো?
আনিসুল হক : আমি প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন, আমার প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন আছে। আমার পক্ষে সম্ভব সবকিছুই করব, নিজেকে যাতে তাঁর বিশ্বাসের যোগ্য রাখতে পারি। আমার সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে ঢাকার রূপান্তরকরণের চেষ্টা চালাব। দুবার তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে। অন্যদের সঙ্গে অল্প সময়ের, দ্বিতীয়বার একান্তে এক ঘণ্টারও বেশি, সেখানে তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আর তহবিলের বিষয়ে দক্ষিণের মতো নাজুক অবস্থায় কিন্তু আমরা নেই। 
প্রথম আলো : সিটি করপোরেশনে অনেক অনেক বদনাম। কীভাবে ঘোচাবেন?
আনিসুল হক : ইতিমধ্যে দুজন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী প্রকৌশলী বরখাস্ত ও আরও দুজন প্রভাবশালী কর্মীর পদাবনতি ঘটেছে। ডিএনসিসি একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা হিসেবে জনমনে ছাপ আছে। সুতরাং ডিএনসিসির পুনর্গঠন আমার অগ্রাধিকার। যথাসময়ে অফিসে আসতে ও মানুষকে উত্তম সেবা দিতে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
প্রথম আলো : পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়াই গুলশান, বনানী গড়ে উঠল। কী করবেন? 
আনিসুল হক : রাজউক এটা পরিকল্পনা করেনি। ওয়াসা এখন একটি মহাপরিকল্পনা করেছে। এখন আমরা ২৪০ কোটি টাকার একটি বড় তহবিল পেয়েছি। এটা কুয়েত ফান্ড হিসেবে পরিচিত।
প্রথম আলো : শহরের যত্রতত্র অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এ সময়ের মধ্যে  কী ব্যবস্থা নিয়েছেন?
আনিসুল হক : সম্প্রতি আমি মার্কিন দূতাবাসের সামনের অবৈধ কাঠামো, দপ্তর ভেঙে দিয়েছে। ঢাকা শহর তো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাস। তাঁদের চাপ আসা এখনো শুরু হয়নি, সেটা এলে বুঝব, কত দূর কী পারব। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য এখনো আমার ভালো প্রস্তুতি নেওয়া বাকি। তবে এটা না বললেই নয় যে নগর গড়তে নাগরিকের অংশগ্রহণ লাগবেই, এর ঘাটতি থাকলে যত কিছুই করি, তা টেকসই হবে না।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
আনিসুল হক : ধন্যবাদ।

তহবিল প্রশ্নে দুদকের তদন্ত চাই -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : সাঈদ খোকন by মিজানুর রহমান খান

ঢাকার নতুন দুই মেয়র পদে দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাস পূর্ণ হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে জনবান্ধব, পরিচ্ছন্ন ও গতিশীল নগর গড়ে তোলার অঙ্গীকারের পথে তাঁরা কতটা এগোলেন, নগরবাসী কী পেল, তা জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তাঁদের মুখোমুখি হন মিজানুর রহমান খান
প্রথম আলো :  গত বৃহস্পতিবার আপনি নিজেই নগর ভবন থেকে কয়েক ঘণ্টায়ও বনানীর বাসায় যেতে পারেননি, পথে ইফতার সেরেছেন। এই যন্ত্রণা থেকে নগরবাসী কবে মুক্তি পাবে?
সাঈদ খোকন : যানজট ডিসিসির দায়িত্বে আসে না, আবার আসেও। ওয়াসার উচিত ডিএমপিকে সহায়তা দেওয়া। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প হিসেবে সিগন্যালিংয়ের নতুন বাতি প্রায় সর্বত্র বসে গেছে। কিন্তু জটের কারণে লাল-সবুজ-হলুদ জ্বলা-নেভার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা যাচ্ছে না। একদিন পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছিল, তাতে শহরের জট আরও বেড়ে যায়। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস, মৌচাক ফ্লাইওভার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
প্রথম আলো : আপনি তো হতাশ করলেন, আশু নিস্তার নেই তাহলে? মেট্রোরেল কবে?
সাঈদ খোকন : ২০১৯-এর আগে মেট্রোরেল শুরুই করা যাবে না। তবে মহাখালী-মগবাজার ফ্লাইওভার হলে কিছুটা লাঘব হবে। শহরের দু-তিনটি পয়েন্ট খুবই ঝামেলাপূর্ণ। কাকলী থেকে শাহবাগ, ধানমন্ডি ও মিরপুর রোড। ডিএমপির সভায় আমি বলেছি, আসুন, আগে কাকলী-শাহবাগ চ্যানেলটা ঠিক করি। ইরানি রাষ্ট্রদূত বললেন, তাঁরাও নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সপ্তাহের সব দিনগুলোতে গাড়ি চলাচল করতে দেন না। গোড়াতে কাকলী-শাহবাগ সড়কে এমন একটা নিয়ন্ত্রণ চালুর কথা ভাবছি, এ জন্য একটি কমিটি করেছি।
প্রথম আলো : প্রথম ১০০ দিনে আপনার অগ্রাধিকার কী?
সাঈদ খোকন : হকার উচ্ছেদের পদক্ষেপ নিয়েছি, এ জন্য তারা বিক্ষোভও দেখিয়েছেন। চার-পাঁচ ঘণ্টার অভিযান চালানোর পরে দেখা গেল রাস্তাঘাট মোটামুটি পরিষ্কার, আমরা চলে যাওয়ার এক–দুই ঘণ্টার মধ্যেই আবার সাবেক অবস্থা বহাল হয়।
প্রথম আলো : তাহলে নগরবাসী মুক্ত ফুটপাত ও সড়ক পাবে না?
সাঈদ খোকন : আমরা যদি একটি সিটি পুলিশ ও সিটি কোর্ট গঠন করে দ্রুত কিছু ব্যবস্থা নিতে পারি এবং স্থায়ীভাবে তদারকি করতে পারি, তাহলে এ চিত্রটা বদলানো যেতে পারে।
প্রথম আলো : সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ আপনাকে ‘জনশৃঙ্খলা রক্ষার’ দায়িত্বও দিয়েছে।
সাঈদ খোকন : সিটি পুলিশ যে এখনই দরকার তা নয়, একটা রিজার্ভ ফোর্স দরকার। ডিএমপি কমিশনার বলছেন, ৫০ জনের একটি ফোর্স রেখে দেব, বললেই তারা এগিয়ে যাবে। কিন্তু শিল্প পুলিশের মতো একটা সিটি ফোর্স দরকার। কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে ফুটপাত দখলদারদের সম্পর্ক থাকে, সেটা আমরা চিহ্নিত করতে পারি না। এখানে বিশাল অঙ্কের টাকা ওঠে এবং তা বিভিন্ন বিভাগে, এমনকি রাজনৈতিক নেতাদের পকেটেও যায়।
প্রথম আলো : জলাবদ্ধতা দূর করতে কী করছেন, বহু এলাকায় মানুষ তো ডুবে আছে।
সাঈদ খোকন : ওয়াসার কাজ শহরের বৃষ্টির পানি সরানো। এও ঠিক নগরের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় পয়ঃপ্রণালি ব্যবস্থাই রাখা হয়নি। এর ওপরে বক্স কালভার্ট করে খাল ভরাট করা হয়েছে। নিম্নাঞ্চলের ফ্রি ফ্লাড জোন, যেখান থেকে পানি নেমে যাবে, সেখানে বালু ফেলে ভরাট করে আবাসিক প্রকল্প ও বাড়ি উঠেছে। এখানে আমরা খুবই অসহায়।
প্রথম আলো : ফুটপাত ও জলাবদ্ধতায় আপনি অসহায়, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাটের ব্যাপারে কী বলবেন?
সাঈদ খোকন : বৃষ্টির পরে কাজ ধরে শেষ করে দেব ইনশা আল্লাহ। অর্থাভাবে অনেক দিন কাজ বন্ধ ছিল। শুধু দক্ষিণের রাস্তাঘাটের জন্য প্রায় ৩১০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। ৬ জুলাই এর প্রি-একনেক হওয়ার কথা, এরপর এটা একনেকে যাবে। অক্টোবরে কাজ শুরু করে আগামী জুন পর্যন্ত রাস্তা ও নর্দমার সংস্কারকাজ চলবে।
প্রথম আলো : আপনার তহবিল শূন্য হলো কী করে? আপনার কথায় মনে হয়, বড় ধরনের কেলেঙ্কারি ঘটেছে।
সাঈদ খোকন : হ্যাঁ। মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে কয়েকটি বড় প্রকল্প, যেখানে বড় অনিয়ম ঘটেছে বলে ধারণা করা হয়, তার বিস্তারিত কাগজপত্র সংসদীয় স্থায়ী কমিটি চেয়েছে।
প্রথম আলো : দায়িত্ব নিয়ে কত টাকা তহবিলে দেখতে পেলেন? এই ঘাপলার জন্য দায়ী কে বা কারা?
সাঈদ খোকন : কোনো টাকা পাইনি, সাড়ে তিন শ কোটি টাকার দেনা পেয়েছি। আমার বেতন দেওয়ার পয়সা ছিল না। এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট তদন্ত হয়নি, তাই না জেনে বলা যাবে না।
প্রথম আলো : আপনি নিজে কেন একটা প্রাথমিক অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিচ্ছেন না?
সাঈদ খোকন : মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে একটি গাইডলাইন পেয়েছি, তাদের আমরা সেমতে তথ্য সরবরাহ করব। তহবিল কী করে খালি হলো, দুদকের অবশ্যই উচিত তদন্ত করে দেখা। আর সংসদের স্থায়ী কমিটি একটি তদন্ত করবে বলে আশা করি। সেখান থেকে কী বেরোয়, সেটা আগে দেখি।
প্রথম আলো : প্রথম ১০০ দিনের কাজ নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব?
সাঈদ খোকন : পুরো দক্ষিণে সড়কের বাতি ৬০ শতাংশের বেশি জ্বলত না। এখন সেগুলো পুনঃস্থাপনের কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ সম্পন্ন করেছি। প্রতিটি ঘরে বিনা মূল্যে আবর্জনা ফেলার ব্যাগ পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেছি। নগরবাসী আবর্জনা ব্যাগে ভরে রাখবেন, আমরা সংগ্রহ করব। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। জন্মসনদ অনলাইনে দেওয়া শুরু করেছি। চটপটির দোকানগুলো অস্বাস্থ্যকর।
এফএও ও আইসিডিডিআরবির সহায়তায় আমরা ৩০০ ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান (ফুড কার্ট) দেব। এর মধ্যে ১০০ বিতরণ শেষ হয়েছে। দক্ষিণে ৫৩টি পেট্রলপাম্প রয়েছে। এর প্রতিটিতে পাবলিক টয়লেট বসবে, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তরাও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারবেন। আইপিডিসি নামের একটি সংস্থা সৌজন্য হিসেবে একটি করে দেবে। তারা বার্তা দিতে চায় যে, সবাই মিলে যাতে এটা করি। সিএসআর হিসেবে ৫৩ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কাজটা ভাগ করে নিতে পারে। ডিসেম্বরের মধ্যে অর্ধেক শেষ করার আশা রাখি। খুব শক্তভাবে বাজার তদারকি শুরু করেছি। দক্ষিণে ২১টি বাজার আছে। দাম ওঠানামা করবে। কিন্তু পাইকারি হারের সঙ্গে খুচরা বাজারের সংগতি থাকতে হবে। এ জন্য আমরা চার্ট টানানোর নিয়ম করেছি।
প্রথম আলো : দীর্ঘ মেয়াদে কী করবেন?
সাঈদ খোকন : বুড়িগঙ্গার ব্যাপারে অনেক বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। এর ড্রেজিং ও পরিচ্ছন্ন করার দায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের। আমি তীরে কিছু করার কথা ভাবছি। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক দ্রুত সই হবে। দক্ষিণের এলাকা বাড়িয়ে বুড়িগঙ্গার ওপারেও বিস্তৃত করা হবে।
প্রথম আলো : নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বসেছেন?
সাঈদ খোকন : এখনো নয়। তাঁর একটা গাইডলাইন ছিল, কাজ কিছুটা বুঝে নিয়ে বসা, যাতে আলোচনাটা ফলপ্রসূ হয়।
প্রথম আলো : উত্তরের মেয়রের মতে সেখানে কমিশনারদের মধ্যে প্রায় ১৫ বিদ্রোহী আওয়ামী লীগার, বিএনপির ৩ ও জামায়াতের ২ মহিলা কাউন্সিলর আছেন। এটা দক্ষিণের অবস্থা কী?
সাঈদ খোকন : আমার ৫৭ কমিশনারের মধ্যে বিদ্রোহী সংখ্যা ১৫-এর বেশি, বিএনপিরও প্রায় ৮ জন আছেন। সবার সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক। আর শিগগিরই আমি ঢাকা সংলাপের উদ্যোগ নিচ্ছি।
প্রথম আলো : আপনার আড়ম্বরপূর্ণ যাতায়াতে যানজট আরও বাড়ে, ভেঁপু বাজে। আনিস সাহেব বললেন, তিনি গাড়ি থেকে সাইরেন খুলে ফেলেছেন। আপনি হানিফ ফ্লাইওভারে টোল দেন না। টোল চাওয়ার ঘটনায় এক কর্মকর্তার নাকি বদলি ঘটেছে। এসব সত্যি?
সাঈদ খোকন : (হাসি) না। চলতে গেলে বিধিমাফিক তিনটি গাড়ি থাকে। আর টোল পরিশোধ করতে গিয়ে আমার সেদিন দ্রুত পৌঁছানোয় বিলম্ব ঘটছিল। আমাদের কনভয়ের পাঁচ-সাতটি গাড়ির টোল একসঙ্গে দেওয়া নিয়ে কর্মীদের সঙ্গে একটু বচসা হয়েছিল, এরপর প্রকল্পের পিডি আমার অজ্ঞাতসারে আমার টোলমুক্ত চলাচলে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। আমি জানামাত্র তা প্রত্যাহার করিয়েছি। আমি টোল দিয়েই চলছি।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
সাঈদ খোকন : ধন্যবাদ।

বিদেশে স্বদেশের উপলব্ধি by এম সাখাওয়াত হোসেন

বেশ কিছুদিন দেশের বাইরে ছিলাম। গিয়েছিলাম ফ্রান্স হয়ে সুইজারল্যান্ড ও উত্তর ইতালির ভেনিস নগর পর্যন্ত। এবার পিসার হেলানো টাওয়ার (Leaning Tower of Pisa) দেখার সুযোগ হলো। পিসা দেখার পর হোটেলে এসে খবর পেলাম, আমাদের দেশের রাজধানী ঢাকায় পিসার টাওয়ারের চেয়ে দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে পান্থপথের মোড়ের একটি হোটেল। ভবিষ্যতে আমরাও হতে পারব অষ্টম আশ্চর্যের দেশ লিনিং হোটেল অব ঢাকা। পাঠকেরা হয়তো অবগত আছেন যে আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে যখন পিসার গির্জার বেল টাওয়ার হিসেবে তৈরি করা হয়, তখন থেকে কাজ হতে শুরু করে এবং এভাবেই প্রায় ২০০ বছরে ক্রমান্বয়ে এই সাততলা টাওয়ার তৈরি হয়। পরে বিংশ শতাব্দীতে টাওয়ারটি আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে হেলে পড়া ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। টাওয়ারটি এখন দর্শনীয় স্থান এবং টাওয়ারের সবচেয়ে উঁচু স্থানে প্রতিদিন শত শত পর্যটক উঠছেন। একইভাবে হয়তো আমাদের রাজধানীর ওই হোটেল এবং হেলে পড়া জায়গা দেখতে আসবেন ভবিষ্যৎ পর্যটকেরা। ‘রাজউক’ হয়তো এমনই মনে করে।
ঢাকায় হয়তো অচিরেই আরও সুউচ্চ দালান পিসার টাওয়ারের মতো হেলে থাকবে। হয়তো কয়েকটি রানা প্লাজার মতো ধসেও পড়বে। কারণ, আমাদের দেশে ঘুষ-বাণিজ্য এবং সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলের প্রভাব থাকলে সবই সম্ভব। যে দেশে উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নপর্যায় পর্যন্ত যখন কোনো জবাবদিহি নেই, সেখানে বিল্ডিং কোডই কী, আর ভবন ধসে পড়লেই কী। পান্থপথের যে জায়গায় কথিত টুইন টাওয়ার তৈরি করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে জায়গা একসময় ছিল গভীর জলাশয়। ঢাকা শহরের এরূপ বহু জলাশয় ভরাট করে সেখানে বহুতল দালান তোলা হয়েছে। খবরে প্রকাশ, এ ঘটনার কারণে রাজউকের কয়েকজন মধ্যম ও নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তবে আমরা ঊর্ধ্বতন কাউকে পদত্যাগ করা তো দূরের কথা, কেন এমন ঘটল তার জবাবদিহি করতেও শুনিনি। উন্নত সংস্কৃতির গণতান্ত্রিক দেশ হলে হয়তো মন্ত্রি পর্যায়ের কাউকে পদত্যাগ করতে দেখা যেত।
ইতালির উত্তরের আদ্রিয়াতিক সাগরকোলের শহর ভেনিস। এই শহরটি বহু নামে পরিচিত। খালের শহর, পানির শহর এবং আদ্রিয়াতিকের রানি বলে সমধিক পরিচিত। আদি ভেনিস জলাভূমির ওপরে নির্মিত হয়েছিল বিধায় শহরের প্রধান যোগাযোগব্যবস্থা খাল অথবা অত্যন্ত সরু গলিপথের মাধ্যমে। আদি ভেনিস তিন দ্বীপ নগর, যদিও বর্তমানে ভেনিস শহরের কিছু অংশ আধুনিক শহরের মতো। ভেনিস শহর কতগুলো খালের সমন্বয়ে নির্মিত, তার হিসাব সহজে পাওয়া যায় না। তবে পুরো শহরটি ১১৮টি ছোট ছোট দ্বীপের ওপর তৈরি এবং প্রায় ৪০০ পায়ে চলা সেতু দিয়ে সংযুক্ত। খালগুলোতে যান্ত্রিক জলযান ব্যবহার করা হলেও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ গন্ডোলা বা আমাদের দেশের ছিপ নৌকার মতো নৌকা। শহরটিতে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার পর্যটক আসা-যাওয়া করেন। প্রতিটি খাল পূর্ণ থাকে পর্যটকে। এক অসাধারণ শহর।
ছোটবেলা থেকে এই শহরের নাম শুনছিলাম, যখন শুনতাম বরিশালকে প্রাচ্যের ভেনিস বলা হতো। খাল, বিল আর নদীর জেলা বরিশাল। শহরের মধ্যে একাধিক খাল ছিল, যার মাধ্যমে যোগাযোগ ও পণ্য বহন করা হতো শহরের মধ্যে, বাজার-ঘাটে। অনেক সময় ব্যবহৃত হতো যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেও। জিলা স্কুলের সামনে, সার্কিট হাউসের সামনে এবং বর্তমান সদর রোডের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছিল প্রশস্ত খাল। দুই ধারে ছিল দোকানপাট আর রেস্তোরাঁ। আজ বরিশাল শহরে খাল বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবই ভরাট হয়েছে কিছু অদূরদর্শী ভূমিখেকো রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে। চকবাজারের খালটি রয়েছে, তবে না থাকার মতো প্রায় ভরাট হয়ে গিয়েছে ওই খালটিও। বাল্যকালে দেখেছি, ওই খাল দিয়ে বড় বড় নৌকা চকবাজারে পণ্য বয়ে আনত। এখন বরিশাল শহরেও অতিবৃষ্টিতে হাঁটুপানি জমে, যা অতীতে ছিল কল্পনাতীত। আমরা কি পারতাম না বরিশালকে প্রাচ্যের ভেনিসে রূপ দিতে?
২...
আমার এই দুই সপ্তাহের সফরে প্রায় প্রতি দেশেই বহু বাংলাদেশি অভিবাসীর সঙ্গে রাস্তাঘাট, দোকান ইত্যাদিতে দেখা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি দেখেছি ইতালির পর্যটন শহর ভেনিসে। দেখা হয়েছে অনেক তরুণের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে। বেশ কিছু বাংলাদেশি রয়েছেন জুরিখ শহরে। তাঁদের সিংহভাগ এখন পর্যন্ত ওই সব দেশের নাগরিকত্ব পাননি। ভেনিসে এবং অন্যান্য জায়গায় ছোট ছোট শৌখিন দ্রব্যের দোকানপাট করে তাঁদের ভাষায় ‘মোটামুটি ভালোই রয়েছে’, এমনকি পিসাতেও বহু তরুণ এ ধরনের দোকানের স্বত্বাধিকারী হয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে ভেনিসে। প্রায় প্রতি রেস্তোরাঁয় তাঁরা কর্মরত। রয়েছে ছোট ছোট ব্যবসা। তবে অনেকেই ফুটপাতে ফেরি করে জীবিকা আহরণ করতে ব্যস্ত। তাঁদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন ভালো অবস্থাতেই রয়েছেন। আলাপ-আলোচনার সূত্রে জানা গেল যে প্রায় সবাই কোনো না কোনো পর্যায়ে অবৈধ পথে ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রেক্ষাপটে আমাকে একজন বাংলাদেশি জানালেন যে শুধু রোম শহরেই তাঁর মতে ৪০ হাজার তরুণ ছোটখাটো ব্যবসা করছেন, অথচ আমাদের দূতাবাস থেকেও তাঁরা কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পান না এসব দেশে থাকার ও কাজ করার অনুমতি পেয়েছেন। তবে নাগরিকত্ব পেতে আমাদের সরকারের যে ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন, তা পাচ্ছেন না। হাজার হাজার ‘ভেরিফিকেশন’ পড়ে রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক জবাবের ওপরই এঁদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
এসব দেশের সরকারের উদারতা ও মানবাধিকার আইনের আশ্রয়েই বহু বছর ধরে রয়েছেন এসব বাংলাদেশি, যাঁরা কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে ভোলেন না। কত কষ্ট করে এঁরা অর্থ উপার্জন করছেন, তা না দেখলে বোঝা যায় না। আমাকে অনেকেই জানালেন যে তাঁদের উপার্জিত বহু অর্থ ওই সব দেশের আইনজীবীদের পেছনে খরচ করতে হয়, অথচ আমাদের সরকার সহযোগিতা করলে হয়তো তাঁদের এ কষ্ট লাঘব হতো। অনেকেই জানালেন, দেশে এলে তাঁদের পুলিশের হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেকে অহেতুক মামলা মাথায় নিয়ে বিদেশে রয়েছেন। অথচ এঁরা ওই সব দেশের বৈধ নাগরিক হতে পারলে তা দেশেরই উপকার হতো। সবাই হয়তো মারাত্মক ফৌজদারি মামলার আসামি নন।
এঁদের প্রায় সবাই দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রায় শতভাগ এই শ্রেণির বাংলাদেশিরা দেশের প্রতিদিনকার খবর রাখেন। অনেকেই আক্ষেপ করে বলেছেন যে দেশে গিয়ে তাঁদের চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়েছে। বিদেশে থাকেন বলে এবং বিভিন্ন অজুহাতে দেশে থাকলে প্রতিনিয়ত এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। এসব কারণে দেশে ফিরতে বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসতেও ভীতসন্ত্রস্ত বলে প্রায় সবারই মতামত। এঁরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তবু দেশে ফিরলেই হয়রানির শিকার হতে হয়। আমার মতো কাউকে পেলে তাঁদের এ বেদনার কথা প্রকাশ করেন, হয়তোবা যদি কিছু হয়?
উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের সরকার এ ধরনের অভিবাসীদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে থাকে, শুধু আমাদের দেশ ছাড়া। আমাকে একজন বাংলাদেশি জানালেন যে শুধু রোম শহরেই তাঁর মতে ৪০ হাজার তরুণ ছোটখাটো ব্যবসা করছেন, অথচ আমাদের দূতাবাস থেকেও তাঁরা কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পান না। তাঁদের অনুযোগ, উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের সরকার ও দূতাবাস যে ধরনের সহযোগিতা করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পেতে সুবিধা হয়। ওই সব দেশের বহু অভিবাসী স্থানীয়, প্রাদেশিক ও জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে অবস্থানের কারণে মাতৃভূমির পক্ষে স্বাগতিক দেশের সরকারের সঙ্গে কাজ করে থাকেন। একধরনের ‘লবি’র কাজ করেন। এ ক্ষেত্রে উপমহাদেশে ভারত সবচেয়ে এগিয়ে। এরপরই পাকিস্তান। কিন্তু আমরা আমাদের দেশের সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নাগরিকদের সঙ্গে সরকারের দূরত্বের করণে অতি মৌলিক কর্তব্যও পালন করতে পারছি না। অবশ্য বিদেশে এসব বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা না হলে হয়তো এতখানি উপলব্ধি করা যেত না।
আশা করব, আমাদের সরকার যারাই ক্ষমতায় থাকুক, এ বিষয়ে যত্নবান হবে। সরকারের মন্ত্রী মহোদয়রা বিদেশে স্বীয় দলের চাটুকারদের বাদ দিয়ে ভাগ্যাহত এসব বাংলাদেশির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের সামান্যতম সাহায্য করবেন বলে আশা রাখি। এমনকি আমাদের সাংসদেরাও বিদেশে নিজেদের সমর্থকদের বাইরে যেতে আগ্রহী নন। আশা করব, আমাদের সরকার ও নেতৃত্বে থাকা ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা এই ‘ডায়াসপোরা’ বা অভিবাসীদের বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হবেন। বিদেশে তাঁদের কষ্ট লাঘবে আরও যত্নবান হবেন।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

বুলেট কেড়ে নিলো সোনিয়ার সংসার

মাত্র ৭ মাস আগে বিয়ে হয়েছিল ওবায়দুল ও সোনিয়ার। এখনও বিয়ে উৎসবের আমেজ কাটেনি বাড়িতে। পরিবারের ছোট হওয়ায় নতুন বউয়ের যত্নআত্তি নিয়ে কমতি ছিল না কারও। একসঙ্গে থাকবেন বলে সম্প্রতি স্ত্রী সোনিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এনেছিলেন। বাসা নিয়েছিলেন কলাবাগান থানাধীন ভূতেরগলির ৫৭ নম্বর নর্থ সার্কুলার রোডে। কিন্তু একসঙ্গে থাকা হলো না তাদের। পাতা হলো না সুখের সংসার। দুর্বৃত্তদের একটি বুলেট কেড়ে নিয়েছে ওবায়দুলের প্রাণ। গত শুক্রবার রাতে বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের গুলিতে নিহত হন ওবায়দুল হাসান। তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম বিএসসির ভাগনে ও সানোয়ারা গ্রুপের ড্রিংকস অ্যান্ড বেভারেজ (কোয়ালিটি আইসক্রিম) ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওবায়দুলের মৃত্যুর পর নববধূ সোনিয়ার জীবনের সবকিছুই যেন ওলটপালট হয়ে গেছে। এত অল্প সময়ে স্বামীকে হারিয়ে নির্বাক তাসনিম খাদিজা সোনিয়া। ঢাকায় একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটি থেকে এলএলবি শেষ করেছেন মাত্র। স্বামীর ইচ্ছে ছিল এই বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়ার। পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে বসুন্ধরা সিটি থেকে রিকশাযোগে বাসায় ফিরছিলেন ওবায়দুল হাসান। রিকশাটি ১০৩ নম্বর সার্কুলার রোডের সেলিম মিয়ার বাসার সামনে আসলে পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেলে তিন দুর্বৃত্ত এসে তার গতিরোধ করে। এরপর তারা ওবায়দুলের সঙ্গে থাকা ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। সব কিছু লুটে নেয়ার পরও তারা ওয়ায়দুল হকের মাথা বরাবর গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে রিকশাচালক তাকে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত আড়াইটার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। রিকশা চালকের বরাত দিয়ে কলাবাগান থানার ওসি ইকবাল হোসেন জানান, ছিনতাইকারীদের বিনা বাধায় নিহত ওবায়দুল সব মালামাল দিয়ে দেন। কিন্তু কোন বাধা না দেয়ার পরও তারা যাওয়ার সময় নিহতের মাথা বরাবর গুলি করে। ঘটনাটি শুধু ছিনতাই নাকি অন্য কোন কারণ আছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় নিহতের চাচাতো ভাই ইয়াসির শেখ আদনান বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
নিহতের বড় ভাই শেখ আহমেদ জানান, নয় ভাইবোনের মধ্যে ওবায়দুল ছিল সবার ছোট। গত বছর নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের মেয়ে সোনিয়াকে বিয়ে করেন ওবায়দুল। বিয়ের পর থেকেই স্ত্রী ও মাকে নিয়ে কলাবাগান থানাধীন ৫৭ নম্বর নর্থ সার্কুলার রোডের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি কোন রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন না। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বাকুলিয়ায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শুক্রবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটে সর্বশেষ কথা হয়েছিল সোনিয়া-ওবায়দুলের। স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় বাসায় বসে ছিলেন সোনিয়া। রাতে হঠাৎ করেই ফোন বন্ধ পাওয়ায় এই নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে পরিবারের সদস্যদের। খোঁজ নিতে ওবায়দুলের ছোট বোনের স্বামী প্রথমে কলাবাগান থানায় যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন বসুন্ধরা মার্কেটের এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখতে পান সেখানে ফ্লোরে পড়ে আছে ওবায়দুল এর লাশ। এরপর পরিবারের সদস্যরা ছুটে আসলে সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বামীর লাশের পাশে কাঁদতে দেখা যায় সোনিয়াকেও। বিশ্বাসই করতে পারছেন না ভালবাসার মানুষটি বেঁচে নেই। তার সঙ্গে কখনও নিজের ভাল লাগাটা শেয়ার করা হবে না। তবে যে মানুষটিকে হারিয়ে একেবারেই খুব বেশি একাকী হয়ে গেছেন সেই প্রিয়তমা স্ত্রী তাসনিম খাদিজা সোনিয়ার কাছে এখন বিয়ের ছবিগুলোই কেবলই শেষ সম্বল। স্বামীর মৃত্যুতে একটু পরপরই মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। অঝোরে কাঁদছিলেন বাড়ির বারান্দায়। কথা বলতে গিয়ে ভেসে উঠছিল জমে থাকা স্মৃতিগুলো। ‘আমি আর সে দারুণ মানিয়ে গিয়েছিলাম। দুজনের একটা পরিকল্পনা ছিল। কখনও মনে হয়নি সে আমার স্বামী। সবসময় বন্ধু হয়েই থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ওবায়দুল। বলেছিল সারা জীবন পাশে থাকবে। কিন্তু কেন সে চলে গেল জানিনা।’ বলছিলেন সোনিয়া। তার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন বাড়িভর্তি মানুষ তাকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টায়। সোনিয়ার একটা কথাই তখন কানে আসছিল সবার। ‘তুমি ফিরে এসো। আমার স্বামীকে কেন চলে যেতে হলো। কি নিয়ে বাঁচবো আমি। কাকে ধরে বাঁচবো।’
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, আসামিদের চিহ্নিত করা কঠিন হবে না পুলিশের। কারণ তাদের সিসি ক্যামেরাতে দেখা গেছে। পরিবারের কারও সঙ্গে কোন শত্রুতা নেই দাবি করে ভাই শেখ আহমেদ বলেন, সে কোন রাজনীতি করতো না। ঢাকার বসুন্ধরা মার্কেটে সানোয়ারা করপোরেশনের আইসক্রিম শপের ম্যানেজার ছিল। রোজ রাতে বাড়ি ফিরতো। ছিনতাইকারীরা টাকা ছিনিয়ে নিতে তাকে টার্গেট করেছিল বলে আমরা প্রাথমিকভাবে মনে করছি।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, ওবায়দুলের কপালের মাঝ বরাবর গুলি বিদ্ধ হয়েছিল। গুলিটি কপাল দিয়ে ঢুকে কানের পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার দুপুরে নিহতের সহকর্মী অরূপ রতন রায় ঢামেক থেকে লাশ গ্রহণ করেন।

খালেদা জিয়া সবক্ষেত্রে ব্যর্থ :সংসদে মন্ত্রী-এমপিরা

প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন সরকারদলীয় মন্ত্রী ও এমপিরা। তারা বলেন, ২০১৯ সালের আগে নির্বাচনের সম্ভাবনা নেই। ওই নির্বাচনে খালেদা জিয়াকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ফাঁকা মাঠে গোল নয়, ওই নির্বাচনে আপনার সঙ্গে লড়াই হবে। নির্বাচনের মাঠে আপনাকে ওয়াইটওয়াশ করা হবে। গতকাল সংসদে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে একথা বলেন। প্রথমে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় ১১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে ‘মাধ্যমিক শিক্ষায় কোন কাজ হয়নি, অগ্রগতি নেই।’ যা আমাদের বিরোধীরাও বলে না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, শিক্ষা নিয়ে আমরা কি তুলনা করবো আমেরিকার সঙ্গে, নাকি শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগে কী ছিল তার সঙ্গে? আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষা খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আন্দোলন, নির্বাচন ও রাজনীতি সর্বক্ষেত্রে খালেদা জিয়া পরাজিত হয়েছেন। সবকিছু হারিয়ে তিনি এখন ইফতার মাহফিলে মোনাজাত করতে গিয়ে বলেছেন, এ সরকারের ওপর গজব নাজিল হোক! কি নীচ তিনি, ভাবতেও অবাক লাগে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘরে ফিরে যাবেন না। কিন্তু দেশের মানুষসহ পুরো বিশ্ব অবাক তাকিয়ে দেখলো- তিনি পরাজিত হয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে শূন্য হাতে ঘরে ফিরে গেলেন। খালেদা জিয়াকে প্রশ্ন করি, এখন কোথায় আমার মায়েরা, বোন, ট্রাক ড্রাইভাররা। কেন তাদের পুড়িয়ে হত্যা করলেন? এর জবাব তিনি কী দেবেন? খালেদা জিয়া আন্দোলনের নামে যেভাবে মানুষকে হত্যা করেছেন, একদিন তাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ২০১৯ সালের আগে কোন নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া প্রতি পদে পদে ভুল করছেন আর আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা চাই আপনি রাজনীতির মাঠে থাকুন, ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে আপনার সঙ্গে ফাইনাল খেলা হবে। আমরা ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চাই না, আপনার সঙ্গে মাঠে খেলেই জিততে চাই। ওই নির্বাচনে আপনাকে হোয়াইটওয়াশ করা হবে। তাই আমরা চাই আপনি সুস্থ থাকুন। আর সমঝোতা হবে, তবে কোন খুনি, ঘাতকের সঙ্গে নয়। খুনি-ঘাতকের জন্য গণতন্ত্র হবে না, তাদের সঙ্গে কোন আপসও হবে না। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া যেভাবে কথা বলছেন, তা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। তিনি বর্তমান সরকারকে জালেম বলেন, কিন্তু খালেদা জিয়ার মতো বড় জালেম এ দেশে আর কেউ নেই। আপনার স্বামী জেনারেল জিয়া, এরশাদ সরকার ও আপনি খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন, কেউ বিচার করেননি। ২১ বছর আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে আমাদের সেই রক্তক্ষরণ বন্ধ করেছেন, খুনিদের বিচার করেছেন, রায়ও কার্যকর করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্ব নেতারাও স্বীকার করছেন, সন্ত্রাস-জঙ্গি কীভাবে দমন করতে হয়, তা শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিখতে হবে। তিনি স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দের দাবি জানান। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের অপ্রতুলতার কথা তুলে ধরে বলেন, শিক্ষা খাতে উন্নয়নের জন্য দরকার ১৬ হাজার কোটি টাকা অথচ দেয়া হয়েছে মাত্র ৪ হাজার কোটি। এ দিয়ে বেতন দেবো নাকি অবকাঠামো উন্নয়ন করবো? এ সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমাদের জাতীয় উন্নয়নের ৬ ভাগ শিক্ষা খাতে ব্যয় করার দরকার। অথচ এবার বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৩ ভাগ, যা সর্বোচ্চ বরাদ্দকৃত মন্ত্রণালয়ের মধ্যে অষ্টম। যেখানে ঘাণা, কেনিয়ার মতো গরিব দেশে দেশে শিক্ষা খাতে ব্যয় করা হয় ৩১ ভাগ, সেখানে আমাদের ব্যয়মাত্র মাত্র ৪ দশমিক ৩ ভাগ। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে বিগত সময়ের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ। বর্তমানে আমাদের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫ কোটি ৫২ লাখ। আইপিইউ সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী তামাকের ওপর কর বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে শুধু তামাকের কারণে প্রতি মিনিটে দুজন, প্রতি ঘণ্টায় ২৮ জন, প্রতিদিন ৬৮০ জন অর্থাৎ এক বছরে আড়াই লাখ মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে। আমরা পাহাড় ধস, রানা প্লাজা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার কথা বলি, কিন্তু তামাকের কারণে এত বিশালসংখ্যক মানুষের মৃত্যু নিয়ে কিছু বলি না। পুরো বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশে তামাকজাত পণ্যের দাম সস্তা। তাই তামাকের ওপর অধিক করারোপের মাধ্যমে ব্যবহার কমাতে পারলে অকালমৃত্যু হ্রাস, তামাকজনিত অসুস্থতা-রোগমুক্ত, চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস এবং সরকারের আয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, সারাবিশ্বে যেখানেই সন্ত্রাস-জঙ্গি দমন এবং নারীর ক্ষমতায়নের কথা ওঠে, সেখানেই বাংলাদেশ ও শেখ হাসিনার নাম আসে। পুরো বিশ্বে সন্ত্রাস দমন, নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ নেতৃত্বের অবস্থানে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার মিথ্যাচার ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরাও তার সঙ্গে নেই। আমরা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার সব মিথ্যাচারের জবাব দেবো।
আজ শেষ হচ্ছে বাজেট আলোচনা: আজ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে প্রায় এক মাস ধরে চলা প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শেষ হবে। এর আগে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের বক্তব্য রাখবেন। আগামীকাল জাতীয় সংসদে পাস হবে প্রস্তাবিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট।

দর্জিপাড়ায় ঈদের ব্যস্ততা

ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত দর্জিপাড়া। দিন-রাত একাকার। অভিজাত মার্কেট থেকে শুরু করে নগরীর অলিগলিতে চলছে এমন ব্যস্ততা। দর্জি দোকানিরা জানিয়েছেন, রমজানের আগ থেকে শুরু হওয়া তাদের এ ব্যস্ততা চলবে চাঁদরাত পর্যন্ত। কিন্তু এবার কাজে একটু ধীরগতি। নগরীর গুলিস্তান দর্জির দোকানগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, ছোট-বড় প্রায় সব দর্জির দোকানে সমানতালে কাজ করছেন দর্জিরা। নানা বয়সীর কাপড় সেলাই করতে করতে কখনও রাত গড়িয়ে ভোর হয়ে যাচ্ছে, তবুও শেষ হচ্ছে না কাজ। এখানকার কয়েকজন দর্জি জানান, নগরীর অভিজাত অনেক টেইলারিং শপের পোশাকও তারা সেলাই করেন। যারা রেডিমেড পোশাক না কিনে নিজের ইচ্ছামতো বানিয়ে নিতে চান, তারাও ছোটখাটো দোকানের মাধ্যমে সেলাইয়ের অর্ডার বা ফরমায়েশ দেন। কাপড় দোকান মালিকদের হাত ঘুরে এখানেই আসে। তাই বছরের অন্য সময়ের তুলনায় শুধু রমজান মাস এলেই তোড়জোড়টা বেড়ে যায় একটু বেশি।
বঙ্গবন্ধু এভিনিউ মার্কেটের দুই শতাধিক সেলাইয়ের দোকানেও সমানতালে চলছে ব্যস্ততা। দম ফেলার ফুরসত নেই এখন দর্জি দোকানের কারও। প্রতিটি দোকানে কাজ করছেন ৩ থেকে ৪ জন দর্জি। দর্জিরা জানান, দোকানে ৪ জন দর্জি নিয়মিত সুট, কোট, শার্ট, প্যান্ট, সাফারি সেলাইয়ের কাজ করছে। দেখা গেছে, মার্কেটের ছোট্ট দোকানগুলোর ভেতরে গাদাগাদি করে কাজ করছেন দর্জিরা। দোকানিরা জানান, এবার ঈদে সুতি কাপড় বেশি চলছে। যারা গজ কাপড়ের ঝামেলায় যেতে চান না, তারা সেলাই ছাড়া থ্রি-পিস কিনছেন। দোকানের কর্মকর্তারা জানান, একই সঙ্গে শার্ট-প্যান্ট ও সুট-সাফারির কাপড় কেনা এবং মানসম্মত সেলাইয়ের জন্য অভিজাত শ্রেণীর ক্রেতারা এখানে বেশি আসেন। বেশ কয়েকটি দোকানের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ পাঞ্জাবি সেলাইয়ের খরচ পড়ছে ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এমব্রয়ডারি করা পাঞ্জাবি সেলাইয়ে ৬৫০ থেকে এক হাজার ৫’শ টাকা আর পায়জামা সেলাইয়ের জন্য নেয়া হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। নগরের অলিগলির দর্জির দোকানেও ব্যস্ততার কমতি নেই, তেমনি বিভিন্ন বিপণীকেন্দ্রের টেইলার্স দোকানগুলোতেও এখন কারও সঙ্গে কথা বলার সময় নেই কর্তৃপক্ষের। কাটিং মাস্টাররা জানান, সামগ্রিকভাবে সেলাইয়ের অর্ডার গত বছরের চেয়ে এবছর একটু কম।
বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সালিমাবাদ ভবনের নিচে আদর্শ পাঞ্জাবি টেইলার্সের কর্ণধার মো. খলিলুর রহমান জানান, গত বছরের তুলনায় এবছর ফরমায়েশ ( অর্ডার) কম হচ্ছে। কারণ হিসেবে তিনি বললেন, মাসের শেষ  হওয়ায় হয়তো এরকম  পরিস্থিতি। তবে, আশা করছি দুই তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতি ভাল হবে। তার দোকানে একটি  পাঞ্জাবি বানাতে খরচ পড়বে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। একই ভবনের বাবু টেইলার্সের মালিক বলেন, কাজ একটু কম। তিনি জানান, রমনা এবং সালিমাবাদ ভবনে প্রায় ২০০টি টেইলার্সের দোকান রয়েছে। সেঞ্চুরি টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান জানান, তার  দোকানে প্যান্ট ৫০০ টাকা, স্যুট ৪২০০ টাকা এবং শার্ট সেলাইয়ে ৪০০ টাকা নেয়া হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু এভিনিউর ব্রাদার্স টেইলার্সের মালিক বেলাল হোসেন বলেন, এখনও আশানুরূপ ক্রেতা ফরমায়েশ দেয়নি। বেশি ক্রেতারের অপেক্ষায় আছি। তার  দোকানে প্রতি শার্টের মজুরি ২৫০ থেকে ৫৫০ টাকা।  পীর ইয়ামেনী মার্কেটের পিছনে রয়েছে ১০০টির মতো দর্জির দোকান। প্রতিটি  দোকানে ৪ থেকে ৫ কর্মচারী রয়েছে। এই মার্কেটের ওয়ার্সি টেইলার্সের মালিক  আবদুস সোবহান ওয়ার্সি জানান, তার দোকানে পাঞ্জাবির মজুরি ৫০ টাকা বেড়ে ৫০০ টাকা করা হয়েছে। এখানে কথা হয় দোকানী বজলু সিকদার, আলী নেওয়াজ, রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তারা প্রায় সবাই বলেছেন, এবছর কাজের গতি একটু কম।
আজিমপুর সিটি করপোরেশনের মার্কেটে সালোয়ার-কামিজ বানাতে আসা কলেজছাত্রী লিজা জানান, লিনেন কাপড়ের ঝুল কামিজের সঙ্গে প্যান্ট সালোয়ারের অর্ডার দিয়েছেন তিনি। বললেন, বুটিক হাউস বা যে কোন মার্কেট থেকে পোশাক কিনলে সেটি অন্যের সঙ্গে মিলে যাওয়ার ভয় থেকে যায়। একটু পরিশ্রম করে নিজের পছন্দমতো পোশাক বানিয়ে নিলে সেটি যেমন অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়, তেমনি পোশাকের ক্যানভাসে রুচি ও সৃজনশীলতার প্রকাশটাও থাকে পুরোপুরি নিজস্ব।

চিকিৎসকদের জেল-জরিমানার বিধান বাতিল মন্ত্রিসভায় উঠছে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন

চিকিৎসকদের জেল-জরিমানার বিধান বাতিল করে নতুনভাবে মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৯৯৯ সালের এ সংক্রান্ত পুরনো আইনে অপরাধী চিকিৎসকদের আইন ভঙ্গের শাস্তি ছিল সর্বোচ্চ সাত বছর ও সর্বনিম্ন তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। সঙ্গে তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধানও ছিল। চিকিৎসকরা আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে এই শাস্তির সঙ্গে চিকিৎসক হিসেবে তাদের রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্স বাতিল করার বিধানও ছিল। নতুন আইনে শুধুমাত্র রেজিস্ট্রেশন বা লাইসেন্স বাতিল করার বিধান রাখা হয়েছে। এভাবেই অপরাধী চিকিৎসকদের শাস্তি কমিয়ে নতুনভাবে মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ২০১৫ এর খসড়া চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। আজ সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে আইনটি নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উঠবে। একই সঙ্গে মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯ বাতিলের প্রস্তাবও থাকছে। খসড়া আইন অনুযায়ী, সরাসরি রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় ছাড়া অন্য কারও কাছ থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গ্রহণ নিষিদ্ধ। অনাত্মীয়কে আত্মীয় পরিচয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ ও প্রতিস্থাপন বন্ধে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। মানুষের মস্তিষ্কের মৃত্যুর (ব্রেইন ডেথ) পর তার বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অসুস্থ ব্যক্তির দেহে সংযোজন করার সুযোগ থাকছে এ আইনে। মূলত ওই ব্যক্তির বা তার উত্তরাধিকারের সম্মতিতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অন্যকে দান করা যাবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে খসড়া আইনটি সংশোধন করার উদ্যোগ নেয়া হয়। খসড়া আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হলে নীতিগত অনুমোদন দিয়ে আরও যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়। কিন্তু ভেটিং- এর জন্য সংশোধন প্রস্তাবটি গেলে নতুন আইন তৈরির কথা বলা হয়। এজন্য নতুনভাবে আইনটি তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন খসড়া আইনে শাস্তি ছাড়াও অঙ্গপ্রতঙ্গ সংযোজনের জন্য সরকারের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করার পদ্ধতি,  মেডিক্যাল বোর্ডের দায়িত্ব, মৃত ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ, মৃত ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজনে জাতীয় কমিটি, সংযোজন কমিটি ও তাদের কার্যক্রম, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন সম্পর্কিত ডাটাবেইস সংরক্ষণ ও মিথ্যা তথ্য প্রদানকারীর শাস্তির বিধান রয়েছে। খসড়া আইন অনুযায়ী মিথ্যা তথ্য দিলে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, খসড়া আইন কার্যকর হলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আদান- প্রদান জটিল হবে। কারণ, আইনে এ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে জড়িত করা হয়েছে। এতে করে কেউ সহজে এ জটিল প্রক্রিয়ায় যেতে চাইবে না। এ ছাড়া এত প্রক্রিয়া থাকায় অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের আইনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি নিষিদ্ধ ছিল। এবারের আইনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি নিষিদ্ধ বহাল রাখার পাশাপাশি বিষয়টিকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। খসড়া আইনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজনের জন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউট বা ক্লিনিককে অনুমতি নিতে হবে। তবে কোন  ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম ২০ শয্যার দুটি ইউনিট না থাকলে সরকার এ-সংক্রান্ত অনুমতি দেবে না। এ ছাড়া এ ধরনের ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যসেবী প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম দুটি অপারেশন থিয়েটার, আট শয্যার ট্রান্সপ্লান্ট আইসিইউ, কিডনি সংযোজনের জন্য ন্যূনতম ছয় শয্যার ডায়ালিসিস ইউনিট, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একজন অধ্যাপক, দুইজন সহযোগী বা সহকারী অধ্যাপক বা সমমানের চিকিৎসক থাকতে হবে। খসড়া আইনে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করার পদ্ধতিতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি তার নিকটাত্মীয়কে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিতে চাইলে সরকারের কাছে আবেদন করবে। আবেদন পাওয়ার পর আত্মীয়তা যাচাই-বাছাই করা হবে। দাতা-গ্রহীতার জন্ম নিবন্ধনপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দিতে হবে। উভয়ে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে স্ট্যাম্পে হলফনামা দেবে। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র,  থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদন, প্রয়োজনে বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এসব তথ্য যাচাই করে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে অথেনটিফিকেশন বোর্ডে পাঠানো হবে। এই বোর্ড গঠন করা হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালক ও দুইজন উপ-পরিচালকের সমন্বয়ে। দাতা-গ্রহীতার আত্মীয়তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর বোর্ড অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এসব খুব দীর্ঘ ও রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়া বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। প্রস্তাবিত খসড়া আইনে বলা হয়েছে, ক্যাডাভেরিক (মৃত) ব্যক্তির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজনে জাতীয় কমিটি থাকবে। এ কমিটির কার্যক্রম পরিচালনা করবে ১৯ সদস্যের জাতীয় কমিটি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এ কমিটির প্রধান হবেন। কমিটিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিনিধি, বিএমডিসির সভাপতি, বিএমএ সভাপতি বা তার প্রতিনিধি, সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতির প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা থাকবেন। এ কমিটির সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের পরিচালক। এ কমিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয়কারীর কার্যক্রম তদারকি করবে এবং ক্যাডাভেরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন সহজ করার পরামর্শ দেবে। এই কমিটি মেডিক্যাল বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে মৃত ব্যক্তি থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ ও সংযোজনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। এ কমিটি বিভিন্ন ধরনের উপকমিটি গঠন করে কার্যক্রম পরিচালনা করবে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজনের জন্য ট্রান্সপ্লান্ট কমিটি থাকবে। তবে প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কেউ এ কমিটিতে থাকতে পারবে না। খসড়া আইন অনুযায়ী যেসব আইসিইউতে কোন রোগীর ব্রেন ডেথ হয়েছে বলে ঘোষণা করা হবে, তাদের সঙ্গে সমন্বয়কারীর মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হবে। বিযুক্ত অঙ্গপ্রতঙ্গ সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। মৃত ব্যক্তি মৃত্যুর আগে তার কোন আত্মীয়কে তার অঙ্গ দান করে গেলে সেটা অগ্রাধিকার দেয়া হবে। তুলনামূলকভাবে কম বয়সীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বৃষ্টিতে প্লাবিত যশোর

যশোরে রোববার ভোর থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত একটানা বৃষ্টি হয়েছে। প্রবল বৃষ্টিতে ডুবে গেছে শহরের বেশির ভাগ এলাকা। শহরের শংকরপুর, বেজপাড়া, খড়কি-কারবালা এলাকার বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। ছবিগুলো তুলেছেন এহসান-উদ-দৌলা।
ছবি:এহসান-উদ-দৌলা।
বৃষ্টিতে একান্ত প্রয়োজনে অনেককে ছাতা নিয়ে বের হতে দেখা গেছে। ছবিটি রোববার দুপুরে যশোর শহরের নাজির শংকরপুর এলাকা থেকে তোলা। ছবি: এহসান-উদ-দৌলা।
ছবি: এহসান-উদ-দৌলা, যশোর
রোববার ভোর থেকে প্রবল বর্ষণে ডুবে গেছে যশোর ফায়ার সার্ভিস স্টেশন।  ছবি: এহসান-উদ-দৌলা।
ছবি: এহসান-উদ-দৌলা, যশোর
বৃষ্টির পানি ও নর্দমার পানি একাকার হয়ে গেছে। পানি বেশি হওয়াতে সড়কে মাছ শিকারে ব্যস্ত শহরের নাজির শংকরপুর এলাকার সাদেক দারোগার মোড়ের সাধারণ মানুষ। ছবি: এহসান-উদ-দৌলা।
ছবি: এহসান-উদ-দৌলা, যশোর
ডুবে যাওয়া সড়কে নছিমন নিয়ে নিজের তৈরি রেইনকোট পরে যাচ্ছেন এক চালক। ছবি: এহসান-উদ-দৌলা।
ছবি: এহসান-উদ-দৌলা, যশোর
শহরের রেলরোড এলাকার খাদ্যগুদাম এলাকায় হাঁটুপানি জমেছে। ছবি: এহসান-উদ-দৌলা।
ছবি: এহসান-উদ-দৌলা, যশোর
শহরবাসীকে কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি ভেঙে চলতে হয়েছে। ছবি: এহসান-উদ-দৌলা।
ছবি: এহসান-উদ-দৌলা, যশোর
যশোর শহরের বেজপাড়া কবরস্থানের সামনেও জমেছে পানি। ছবি: এহসান-উদ-দৌলা।
ছবি: এহসান-উদ-দৌলা, যশোর
ঘরে ঢুকে পড়া পানি সেঁচায় ব্যস্ত এক বাসিন্দা। ছবিটি নগরের নাজির শংকরপুরের জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে তোলা। ছবি: এহসান-উদ-দৌলা।