Tuesday, July 23, 2013

ইসলামাবাদ সফরের জন্য শর্ত জুড়ে দিলেন কারজাই

পাকিস্তানের ইসলামাবাদ সফরের আমন্ত্রণের জবাব দিয়েছেন আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই। দুই দেশের ক্রমবর্ধমান হিমশীতল সম্পর্কের উন্নয়নে যেকোনো ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের বিষয়ে তিনি গতকাল সোমবার কিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ গত রোববার কাবুল সফরে যান। ১২ বছর ধরে আফগানিস্তানে চলমান সংঘাতের অবসানে তালেবান জঙ্গিদের সঙ্গে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছার বিষয়ে কাবুলকে ইসলামাবাদের সহায়তার বার্তা পৌঁছে দেন তিনি। পাকিস্তানের শীর্ষ এই কূটনীতিক আফগান প্রেসিডেন্টের কাছে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ পৌঁছে দেন। হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি তিনি আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জালমাই রসুলের সঙ্গেও বৈঠক করেন। আফগান প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে গতকাল জানানো হয়, কারজাই ইসলামাবাদ সফরের ওই আমন্ত্রণ ‘নীতিগতভাবে’ গ্রহণ করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল তখনই পাকিস্তান সফরে যাবে, যখন আলোচ্যসূচি সুনির্দিষ্ট করা হবে; প্রাথমিক প্রস্তুতিগুলো সারা হবে; এবং ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তরিক ও কার্যকর লড়াই এবং শান্তি প্রক্রিয়ার বিষয়টি আলোচ্যসূচির শীর্ষে রাখা হবে।’ আফগানিস্তানে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানের সহায়তাকে অপরিহার্য মনে করে পশ্চিমারা। তবে তালেবান এবং অন্যান্য ইসলামি জঙ্গিদের কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেশি দেশ দুটির পারস্পরিক আস্থা না থাকায় সম্পর্কে অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যদিও জঙ্গি সমস্যা নিয়ে উভয় দেশই অতিষ্ঠ। কাবুল ও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মধ্যে আজিজই পাকিস্তানের নতুন সরকারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য, যিনি আফগানিস্তান সফর করলেন। আফগানিস্তানের অনেকেই মনে করেন, তালেবানকে নিয়ন্ত্রণ করে পাকিস্তান। গেল সপ্তাহে কারজাইয়ের চিফ অব স্টাফ করিম খুররম দাবি করেছিলেন, পাকিস্তান বা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় তালেবান আফগানিস্তানকে ভাঙার চক্রান্ত করছে। শান্তি আলোচনার জন্য কাতারে তালেবানের লিয়াজোঁ অফিস খোলা ছিল ওই চক্রান্তেরই অংশ। তবে পাকিস্তান তালেবানকে নিয়ন্ত্রণ করে এ ধরনের ধারণাকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে কূটনীতিক আজিজ বলেন, মিলিশিয়াদের সঙ্গে তাঁদের কেবল কিছুটা যোগাযোগ রয়েছে মাত্র। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিদেশি বাহিনী আগামী বছর আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেবে। এ ছাড়া আগামী বছরের এপ্রিলে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হবে। এ অবস্থায় সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এএফপি।

মোদিকে প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে চাই না: অমর্ত্য

অমর্ত্য সেন
নোবেলজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, ‘গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনবিষয়ক প্রধান নরেন্দ্র মোদিকে আমি দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে চাই না।’ একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেছেন তিনি। সিএনএন-আইবিএন চ্যানেলকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন বলেন, ‘একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে আমি মোদিকে আমার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাই না। তিনি দেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপদ ভাবার মতো যথেষ্ট কিছু করেননি।’ মোদিকে কেন প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে চান না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে অমর্ত্য সেন বলেন, সবার আগে তাঁকে আরও বেশি ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যাতে নিজেদের আরও নিরাপদ ভাবতে পারে, তাঁকে সে রকম কিছু করতে হবে। নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি বুঝতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ার দরকার নেই মন্তব্য করে অমর্ত্য সেন আরও বলেন, ‘আমরা ভারতীয়রা এমন কোনো পরিস্থিতি চাই না, যেখানে সংখ্যালঘুরা নিজেদের অনিরাপদ ভাববে। আমরা চাই না, ২০০২ সালে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো পরিস্থিতি আবার ফিরে আসুক।’ মোদিকে সম্প্রতি বিজেপির নির্বাচনবিষয়ক প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ এ পদে আসীন হওয়ায় বিজেপি ভারতের আগামী সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হলে তিনিই দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও মোদিকে ওই পদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে। গুজরাটে মোদির সরকারের শাসনের ধরন নিয়েও সমালোচনা করেছেন অমর্ত্য সেন। পিটিআই।

ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন ম্যান্ডেলা

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। গত রোববার হাসপাতালে ম্যান্ডেলাকে দেখার পর এক বিবৃতিতে তাঁর নাতি মান্ডলা ম্যান্ডেলা এ কথা জানান। ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে গত ৮ জুন ম্যান্ডেলাকে প্রিটোরিয়ার মেডি ক্লিনিক হার্ট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পর থেকে তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন। বিবৃতিতে মান্ডলা বলেন, ‘হাসপাতালে দাদাকে দেখার পর খুব ভালো লাগছে। তিনি প্রতিদিন একটু একটু করে সবল হয়ে উঠছেন।’ মান্ডলা বলেন, দাদার সুস্থ হয়ে ওঠাটা তাঁদের মুখে চপেটাঘাত হয়ে এসেছে, যাঁরা মিথ্যা কথা প্রচার করছিলেন যে, ম্যান্ডেলা স্থায়ীভাবে অচেতন হয়ে গেছেন। আর তাঁরা লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার অপেক্ষা করছিলেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিরোধের কারণে ১৮ জুলাই ম্যান্ডেলার ৯৫তম জন্মদিনে হাসপাতালে যাননি মান্ডলা। ম্যান্ডেলার নাতিদের মধ্যে মান্ডলাই বড় এবং একমাত্র পুরুষ উত্তরাধিকারী। ম্যান্ডেলা তাঁকে নিজের জন্মস্থান ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের এমভেজো অঞ্চলের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। ম্যান্ডেলার পূর্বপুরুষের ভিটা ইস্টার্ন কেপের কুনু এলাকায়। সেখানেই পারিবারিক সমাধিক্ষেত্রে মান্ডলার বাবা মাকগাথো এবং ম্যান্ডেলার প্রথম স্ত্রীর অন্য দুই সন্তান থেমবি ও মাকাজিকে সমাহিত করা হয়েছিল। মান্ডলা দুই বছর আগে ওই তিনজনের দেহাবশেষ তুলে এনে এমভেজায় সমাধিস্থ করেন। মান্ডলার ভাষ্য, তাঁর দাদা ম্যান্ডেলার জন্মস্থান এমভেজায় বলে সেখানে বিশেষ ঐতিহ্য (হেরিটেজ) গড়ে তুলতে চান তিনি। এ জন্যই তিনি তাঁর বাবাসহ তিনজনের দেহাবশেষ কুনু থেকে তুলে এমভেজায় সমাধিস্থ করেন। কিন্তু মান্ডলার এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ম্যান্ডেলা পরিবারের ১৬ জন সদস্য। এএফপি।

অন্ধ চোখে আলো আসবে

অন্ধ চোখে আলো ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জনের দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। তাঁরা একটি প্রাণীর ক্ষতিগ্রস্ত চোখ সারিয়ে তুলতে স্টেম সেল ব্যবহার করে ইতিবাচক সম্ভাবনার ইঙ্গিত পেয়েছেন। নেচার বায়োটেকনোলজি সাময়িকীতে গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন ও মুরফিল্ডস আই হসপিটালের গবেষকেরা বলছেন, এবার অন্ধ মানুষের দৃষ্টি ফেরানোর প্রচেষ্টায় স্টেম সেল ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রেটিনার কোষে যেসব ফটোরিসেপটর রয়েছে, সেগুলো আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করতে পারে। আর সেই সংকেত মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এই কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে অন্ধত্ব দেখা দিতে পারে। মানুষের চোখের ক্ষতিগ্রস্ত ফটোরিসেপটরকে সক্রিয় রাখার চেষ্টায় পরীক্ষামূলকভাবে স্টেম সেল ব্যবহারের চিন্তাভাবনা করছেন গবেষকেরা। লন্ডনভিত্তিক গবেষকেরা বলছেন, আলোক-সংবেদী কোষ প্রতিস্থাপনে স্টেম সেল ব্যবহারে সাফল্য পাওয়া যেতে পারে। আর তা হলে অন্ধত্ব দূরীকরণের চেষ্টাও সফল হবে। অন্ধ ইঁদুরের ওপর পরীক্ষাগারে ইতিমধ্যে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্সেলো রিভোল্টা বলেন, অন্ধত্বের চিকিৎসায় এই গবেষণা একটি ‘বড় পদক্ষেপ’। বিবিসি।

ব্রিটিশ রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীর প্রতীক্ষায়

যুক্তরাজ্যের প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী সন্তানসম্ভবা কেট মিডলটনকে (৩১) গতকাল সোমবার ভোরে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রসববেদনা শুরু হলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। কেটের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া শিশুটিই হবে ব্রিটিশ সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারী। কোন দিন সন্তানের জন্ম দেবেন কেট—এ নিয়ে গণমাধ্যমের সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে গতকাল গ্রিনিচমান সময় ভোর পাঁচটার দিকে পশ্চিম লন্ডনের প্যাডিংটনের সেন্ট মেরি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়। ডাচেস অব কেমব্রিজ কেটকে কেনসিংটন প্রাসাদ থেকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় ডিউক অব কেমব্রিজ উইলিয়াম সঙ্গে ছিলেন। হাসপাতালে ভর্তির পর কেটের শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল। তিনি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ই সন্তানের জন্ম দেওয়ার পক্ষে। কেটকে হাসপাতালে নেওয়ার পরপরই তাঁর বোন পিপা ও মা ক্যারল মিডলটনও হাসপাতালে যান। কেট-উইলিয়াম দম্পতির অনাগত শিশুটি ছেলে না মেয়ে তা আগেভাবে জানা যায়নি। সন্তান গর্ভে আসার পর প্রথম দিকে কিছু সমস্যার কারণে গত ১৫ জুন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন কেট। এরপর আর তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। কেটের সন্তান জন্মদানের সংবাদ সংগ্রহের আশায় গণমাধ্যম কর্মীরা গত ১ জুলাই থেকে হাসপাতালের সামনে অবস্থান করছেন। কিন্তু তাঁদের কৌশলে এড়িয়ে গতকাল হাসপাতালের পেছনের দরজা দিয়ে কেটকে ভেতরে নেওয়া হয়। ব্যয়বহুল এই হাসপাতালেই ৩১ বছর আগে প্রিন্সেস ডায়ানার গর্ভে জন্ম নেন প্রিন্স উইলিয়াম। রাজপ্রাসাদ থেকে কেটের সন্তান জন্মদানের তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্ববাসী যে শিশুটির আগমনের জন্য প্রতীক্ষা করছে, সে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর হালনাগাদ তথ্য জানানো হবে। রাজপ্রাসাদের একটি সূত্র জানায়, কেটের প্রসববেদনা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রসববেদনা শুরুর পরপরই উইলিয়াম স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যান। এ সময় তাঁরা কোনো পুলিশি নিরাপত্তা নেননি। তবে পরে হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এর বাইরে টহল দিচ্ছে পুলিশ। উইলিয়াম-কেটের শিশুটির জন্মের বিষয়টি তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হলেও ব্রিটিশ রাজপরিবারের তৃতীয় উত্তরাধিকারী বলে কথা। গণমাধ্যমের হইচইয়ের অন্ত নেই। সারা বিশ্বই নবাগতের আগমন উদ্যাপন করবে। যখনপ্রিন্স উইলিয়ামের জন্ম হয়, তখন তাঁর বাবা প্রিন্স চার্লসেরও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। এখন প্রিন্স উইলিয়াম বাবা হতে যাচ্ছেন। রয়টার্স।

ইইউর প্রস্তাবে রাজি হলে মুরসি প্রেসিডেন্ট থাকতেন

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যস্থতায় একটি রাজনৈতিক সমঝোতার প্রস্তাবে রাজি হলে এখনো মিসরের প্রেসিডেন্ট থাকতে পারতেন মোহাম্মদ মুরসি। মিসরের রাজনীতিকেরা এবং ইউরোপের কূটনীতিকেরা এমনটাই মনে করছেন। মিসরে ২০১১ সালে গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন ঘটে। এরপর দেশের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন প্রভাবশালী ইসলামপন্থী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মুরসি। নির্বাচনে জয় দেশ শাসন করার জন্য যথেষ্ট ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, এমন মনোভাব তৈরি হয়ে যায় মুরসি ও ব্রাদারহুডের মধ্যে। মুরসির পক্ষে-বিপক্ষে দেশজুড়ে বিক্ষোভের জের ধরে সবচেয়ে জনবহুল এই আরব দেশটিতে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বিভাজন দেখা দিলে উভয় পক্ষে সমঝোতা গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয় ইইউ। তবে সেই প্রস্তাবকে অবজ্ঞা করেছিলেন মুরসি ও ব্রাদারহুডের নেতারা। ওই ঘটনার তিন মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভের জের ধরে ৩ জুলাই মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী। ইইউর কূটনীতিক বার্নারদিনো লিওন কয়েক মাসের চেষ্টায় ওই সমঝোতা প্রস্তাবের ব্যাপারে মিসরের ছয়টি বিরোধী দলের জোট ন্যাশনাল সালভেশন ফ্রন্টকে রাজি করিয়েছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল, ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর এই ফ্রন্ট প্রেসিডেন্ট হিসেবে মুরসির বৈধতার স্বীকৃতি দেবে এবং পরবর্তী পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবে। বিনিময়ে মুরসি তাঁর প্রধানমন্ত্রী হিশাম কান্দিল এবং অন্য পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে সরিয়ে দেবেন, যাতে করে অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে একটি জাতীয় মতৈক্যের সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত হয়। এ ছাড়া মুরসিকে তাঁর নিয়োগ দেওয়া বিতর্কিত প্রসিকিউটর জেনারেলকে বরখাস্ত করতে হবে। এ ছাড়া মিসরের সাংবিধানিক আদালতকে সন্তুষ্ট করতে প্রচলিত নির্বাচনী আইনে সংশোধনী আনতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা মিসরে ইইউর প্রভাব বিস্তার যে অতটা সহজ নয়—এই উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার মাধ্যমে তার কিছুটা নমুনা দেখা যায়। তবে মিসরীয় রাজনীতির উভয় মেরুতে ওয়াশিংটনের ওপর ক্ষোভ থাকায় ইইউই সেখানে ‘বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী’ হতে পারবে—এমন আশা থেকে এখনো হাল ছাড়তে নারাজ ইইউ। নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে ইইউর পরররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন অ্যাস্টন এখন কায়রোতে। অবশ্য উভয় পক্ষের মন গলাতে তাঁর নানা প্রচেষ্টা কাজে দেবে বলে মনে হচ্ছে না। গত মঙ্গলবারই তার নিদর্শন পাওয়া গেছে। এদিন দেশটির অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে। আর মুসলিম ব্রাদারহুড ওই মন্ত্রিসভাকে ‘অবৈধ’ আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।ইইউর ওই মধ্যস্থতার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির (এফজেপি) নেতা সাদ আল-কাতাতনি ওই চুক্তির পক্ষে ছিলেন। তবে তিনি মুরসি ও ব্রাদারহুডের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের রাজি করাতে ব্যর্থ হন। মিসরের বামপন্থী দল পপুলার কারেন্টের নেতা হামদিন সাবাহি বলেন, ‘সমঝোতায় পৌঁছাতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলাম। আমরা সমঝোতার কাছাকাছি চলেও গিয়েছিলাম। তবে শেষে মুরসির অবস্থান বদলাল না। তিনি শর্তহীন সংলাপের দাবি জানিয়ে বসলেন। মুরসি যদি ওই আস্থা গঠনের পদক্ষেপকে গ্রহণ করতেন, তবে বিরোধীরা তাঁর বৈধতা মেনে নিত এবং পার্লামেন্ট নির্বাচনে যেত।’ ইইউর মধ্যস্থতায় বিরোধী জোটের সঙ্গে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আলোচনায় বসার কথা স্বীকার করেছেন মুরসির প্রেসিডেন্ট দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা ওয়ায়েল হাদ্দারা এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের জ্যেষ্ঠ নেতা ফরিদ ইসমাঈল। মুরসি নিজেও কখনো ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেননি। তবে তিনি হয় একগুঁয়ে ছিলেন। আবার হতে পারে, তিনি ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতৃত্বকে প্রস্তাবের ব্যাপারে রাজি করাতে পারেননি।

যৌনতা তো পুরুষের বাপের সম্পত্তি

জীবনের অনেকগুলো বছর পেরিয়ে যখন দেখি পেছনের দিনগুলো ধুসর ধুসর, আর সেই ধুসরতার শরীর থেকে হঠাত্‍ হঠাত্‍ কোনও ভুলে যাওয়া স্বপ্ন এসে আচমকা সামনে দাঁড়ায় বা কোনও স্মৃতি টুপ করে ঢুকে পড়ে আমার একাকী নির্জন ঘরে,

সাহসী নারী তসলিমা নাসরিন

নারী কখনও একটির বেশি স্বামী গ্রহন করতে পারে না। কেবল স্বামীকে রুপে ও গুনে সন্তুষ্ট করা ও পুত্র সন্তানের জননী হওয়াতেই নারীর সার্থকতা।

তসলিমা দিদি চারটে ছেলে এসেছে তোমাকে প্রণাম করতে

চারটে ছেলে এসেছে তোমার সঙ্গে দেখা করতে। একবার তোমাকে প্রণাম করতে এসেছে। করেই চলে যাবে। আমি প্রণামের লোভে নয়, কেন এসেছেন…।

নারীকে একা পেলে সব পূরুষই পণ্য মনে করে

রাজার রাজত্বের কী বর্ণনা দেযা যায়? টপকাপি প্যালেসে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই আমার এ কথা মনে হয়েছে। টপকাপি প্যালেস দর্শনীয় স্থানের মাঝে অন্যতম প্রধান।

বিশেষ কোনো অঙ্গ স্পর্শ ও যৌনতা সম্বন্ধে বাধা-নিষেধ?

যদিও অনেক প্রাণীর মধ্যে সমকামিতার যৌনখেলা বর্তমান। তাদের যৌনতার পরিচালনা হয় বেশিরভাগই উর্বরতাবৃত্তের সময়ে।

মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে!

ঢাকায় লিভ টুগেদার বাড়ছে। মধ্যবিত্ত ঘরের যুবক-যুবতীরা লিভ টুগেদারে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এ কারণে বাড়ছে খুনের মতো অপরাধও।

হ্যাণ্ডসাম ছেলে দেখলে মেয়েদের লালা আসাটা স্বাভাবিক: তসলিমা নাসরিন

আল্লামা আহমেদ শফির সাম্প্রতিক সময়ে প্রচারিত ভিডিও টেপ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।

নগ্ন বিতর্কের জননী পুনমের পোস্টার নিয়ে মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ

ফের আরও একবার বলিউড সিনেমায় যৌন প্রদর্শন নিয়ে শুরু হল বিক্ষোভ। এ বারও বিক্ষোভের সূচনা হল শিবসেনার হাত ধরে।

ঢাবি ক্যাম্পাসে অসহনীয় ভিক্ষুক বিড়ম্বনা by সাখাওয়াত আমিন

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই গ্রাম, মফস্বল বা জেলা শহর থেকে আসা। তাদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান।

ভেজাল থেকে রেহাই নেই? by ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

আমাদের দেশে মানুষ যে ধরনের খাবার খায়, তার মধ্যে সম্ভবত এমন একটিরও নাম বলা যাবে না যেটি ভেজাল বা বিষমুক্ত। অর্থাৎ জনগণ প্রতিনিয়তই ভেজাল খাবার খাচ্ছে। এ থেকে যেন কোনোভাবেই মুক্তি মিলছে না। এ অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে পরিস্থিতি আজ এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। খাদ্য মানুষের প্রথম ও প্রধান মৌলিক চাহিদা। ভেজালমুক্ত বা নির্ভেজাল খাদ্য যেমন দেহের ক্ষয় পূরণ, বৃদ্ধি সাধন এবং রোগ প্রতিরোধ করে, তেমনি ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে স্বাস্থ্যহানি হওয়াসহ বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে জীবন পর্যন্ত বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু দেশে শাক-সবজি, ফল-মূল, মাছ-মাংস, দুধ, গুড়, মশলা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাদ্যেই ভেজাল মেশানো চলছে অবাধে। এমনকি শিশুখাদ্য ও জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে।
বর্তমানে চলছে আম-কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের মৌসুম। আর কাঁচা ফল পাকানো হচ্ছে রাসায়নিক পদ্ধতিতে। এসব ‘টসটসে পাকা’ ফল খেয়ে মানুষ দুরারোগ্য নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। ফল পাকানোর ক্ষেত্রে ব্যবহƒত বিষাক্ত রাসায়নিকের কিছু অংশ ফলের খোসার সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে ফলের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। আর এ ধরনের ফল খাওয়ার ফলে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের অংশবিশেষ শরীরে ঢুকে পড়ে যে লিভার, কিডনিসহ মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি করছে, তা সহজেই অনুমেয়। বিকল্প উপায় না থাকায় জনগণকে এক ধরনের বাধ্য হয়েই এসব ভেজাল খাদ্য খেতে হচ্ছে। ফলে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি ভেজালযুক্ত ওষুধ খেয়েও অনেক শিশুর অসুস্থ হয়ে পড়াসহ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। নিরাপদ খাদ্যের ব্যাপারটি জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত এমনই এক বিষয় যে, এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম ছাড় দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ, বাস্তবে এ ক্ষেত্রে কী ঘটছে তা চোখ বন্ধ করে ভালোভাবে চিন্তা করলে সহজেই অনুধাবন করা যাবে।
খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল বা মারাÍক ক্ষতিকর উপাদান (যেমন- ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম পাউডার, ইথেফেন ইত্যাদি) মেশানোর বিষয়টি এ দেশে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত হওয়াসহ সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বেশ তীব্রভাবেই নিন্দিত হয়ে আসছে। পত্রিকায় প্রকাশিত এক তথ্য থেকে জানা যায়, দেশে শিল্প খাতে ফরমালিনের প্রয়োজন ৪০-৫০ টন। কিন্তু গত অর্থবছরে ফরমালিন আমদানি করা হয়েছে ২০৫ টন। তার মানে বাড়তি ১৫০ টনের বেশি ফরমালিন বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে দেশবাসীর পেটে গেছে। অনেক সময় দেখা যায়, ঢাকঢোল পিটিয়ে বিভিন্ন বাজারকে ফরমালিনমুক্ত ঘোষণা করতে। অথচ ভালোভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ওই বাজারে নিয়মিত কোনো পরীক্ষাই করা হয় না। ভেজালযুক্ত তথা বিষাক্ত খাবার গ্রহণের ফলে মানুষ দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। এমনকি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরাও (যাদের বলা হচ্ছে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ)। এ পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে সবার জন্য উদ্বেগজনক। আমাদের পুরো খাদ্যচক্রের মধ্যে প্রতিনিয়ত যেভাবে বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাতে মনে হয় জাতি হিসেবে আমরা বেশ দ্রুতগতিতেই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। অথচ এসব প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ কোনো সরকারের পক্ষ থেকেই তেমন কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বা বর্তমানেও হচ্ছে না। এমনকি আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়নি ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ প্রশাসন’ ধরনের কোনো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। শুধু তা-ই নয়, উচ্চ আদালতের নির্দেশের চার বছরেও খাদ্যে ভেজাল রোধে সারাদেশে খাদ্য আদালত গঠন করা হয়নি। রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে সবাই সোচ্চার হলেও জনস্বাস্থ্য তথা জনস্বার্থের কথা কেউ চিন্তা করেন না। খাদ্যে ভেজাল রোধে কয়েকটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মধ্যেই যেন সরকারের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ। অথচ এর মাধ্যমে তেমন কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
কনজুমার রাইটস সোসাইটি ও কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) একসঙ্গে আন্দোলন করার পর সরকার কর্তৃক ২০১০ সালে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর গঠন করা হয়। কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানটি বিশেষজ্ঞনির্ভর না হয়ে আমলানির্ভর হওয়ায় তা এক ধরনের নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা নেই। সরকার ও প্রশাসনের অব্যাহত গাফিলতি এবং দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বহীনতার কারণে এখন যেন কোনোভাবেই খাদ্যে ভেজাল রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আর এভাবেই চলছে মানুষের মূল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিবছর ভেজাল খাদ্য খেয়ে তিন লাখের বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। আর প্রায় দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিস এবং প্রায় দুই লাখ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলেও ওই পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে গর্ভবতী মায়ের বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দেয় এবং গর্ভজাত অনেক শিশু বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে। ভেজাল খাদ্যের কারণে শিশু বিকলাঙ্গ হওয়া এবং শিশু খাদ্যে ভেজাল মেশানো যে আগামী প্রজšে§র জন্য এক বিরাট অশনি সংকেত, তা সহজেই অনুমেয়। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আবেদন জানিয়ে এর আগে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে ছয়জন আইনজীবী জনস্বার্থে উচ্চ আদালতে রিট করেন। এরপর ২০০৯ সালের ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট ‘কেন খাদ্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হবে না’ তা জানতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করেন। একই সঙ্গে একটি সম্পূরক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত পিওর ফুড অধ্যাদেশের ৪(৪১) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রতিটি জেলায় খাদ্য বিশ্লেষক ও খাদ্য আদালত গঠনের নির্দেশ দেন। রায় কার্যকর করতে আদালত সরকারকে দু’বছর সময় বেঁধে দিয়েছিল। অথচ চার বছরেও সরকার এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়নি। চলতি বছর ভোক্তা অধিকার দিবসে খাদ্যমন্ত্রী ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘দেশের ৬৪ জেলায় খাদ্য আদালত স্থাপন করা হবে।’ কিন্তু বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে হওয়ায় সব জেলায় খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠা করা এ সরকারের আমলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
খাদ্যে ভেজাল রোধ এবং খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন নিয়ন্ত্রণে এ দেশে একটি আইন রয়েছে, যার নাম ‘বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ-১৯৫৯’। কিন্তু এ আইনটি প্রচলিত হওয়ার পর এর বেশির ভাগ বিধানই কার্যকর না হওয়ায় তা মূলত কাগজে-কলমের মধ্যেই রয়ে গেছে। তাছাড়া পশ্চিমা দেশগুলোয় যারা মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা, তারা মুক্তবাজার অর্থনীতির মাধ্যমে খাদ্যে ভেজালের রাস্তাটা খুলে দিয়েছে। শাক-সবজি, ফল-মূল, গুড়, মুড়ি, মাছ-মাংস, দুধ, মশলা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের খাদ্য সামগ্রীতে বিভিন্ন বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা না করেই অধিক মুনাফার লোভে খাদ্যদ্রব্যে এসব বিষাক্ত কেমিক্যাল মেশাচ্ছে। অনেক সময় তাদের কেউ হাতেনাতে ধরা পড়লেও তারা টাকা ও পেশিশক্তির জোরে এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যায়। মূলত এসব কারণসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা, মানুষের অসচেতনতাসহ এ ব্যাপারে জনগণ তীব্রভাবে সোচ্চার না হওয়ার কারণে খাদ্যে ভেজাল নিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থার যদি অবসান না ঘটানো হয় অর্থাৎ এ অবস্থা যদি চলতে থাকে, তাহলে এর ভয়াবহ কুফল সময়মতো সবাই হাড়ে হাড়ে টের পাবেন। তখন হয়তো করার মতো তেমন কিছুই থাকবে না।
একটি আশার কথা হল, সরকার সম্প্রতি ফরমালিন আমদানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’-এর খসড়া সম্প্রতি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ আইনে খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া খাদ্য নিয়ে মিথ্যা বিজ্ঞাপন, নিবন্ধন ছাড়া খাদ্য বিপণন, ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দিয়ে খাদ্য বিক্রি করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদন লাভ করায় এখন তা দ্রুত চূড়ান্ত করা হবে, এমনটাই সবার প্রত্যাশা। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো আইন প্রণয়ন করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন। সরকার জনস্বাস্থ্য তথা জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে দেশের সব জেলায় খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠায়ও যথেষ্ট আন্তরিক হবে বলে সবার প্রত্যাশা। দুর্নীতি ও শৈথিল্যের কারণে সরকারের নানা উদ্যোগের মতো এ উদ্যোগগুলোও যেন শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত না হয়, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। সর্বোপরি, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, গণমাধ্যমসহ সবার সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আশা প্রয়োজন। প্রয়োজন এ ব্যাপারে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। তবে খাদ্যে ভেজাল রোধে সর্বাগ্রে প্রয়োজন নিজের নৈতিকতাবোধ ও বিবেককে জাগ্রত করা।
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ইউআইটিএস; অ্যামনেস্টি  ইন্টারন্যাশনালের সদস্য

জনগণ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাই চায় by ড. কাজী আবদুস সামাদ

এ বিষয়ে এর আগে দেশে-বিদেশে, প্রিন্ট মিডিয়ায়, টিভি টকশো’তে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই চালু ছিল। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ৯০ দিনের পরিবর্তে ২ বছর ক্ষমতাসীন হওয়ার খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি হওয়ায় বর্তমান ১৪ দলীয় মহাজোট সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে। মহাজোট সরকারের মূল যুক্তি হল, আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে ২ বছর কিংবা তার চেয়েও দীর্ঘ সময় ক্ষমতাসীন হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিরোধীদলীয় নেত্রী আবার যে দীর্ঘ সময়ের জন্য জেলে যাবেন না, তার নিশ্চয়তা কোথায়?
বিষয়টি এর আগে হাইকোর্টে তোলে বর্তমান মহাজোট সরকার। হাইকোর্ট থেকে বলা হয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অবৈধ, তবে চলমান রাজনৈতিক পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অনাস্থার কারণে আরও দুটি জাতীয় নির্বাচন তত্ত্বাবধায়কের নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত হতে পারে। হাইকোর্ট সম্ভবত এটা ভেবেছে যে, আগামী দুই বছরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা, বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা তৈরি হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে আর তত্ত্বাবধায়কের প্রয়োজন না পড়ে। মহাজোট সরকার আদালতের পর্যবেক্ষণের প্রথম অংশকে গ্রহণ করে দ্বিতীয় অংশকে গুরুত্ব না দিয়ে সংসদে ভোটাভুটির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। এখন আমরা একটু পেছন ফিরে তাকাই। ১৯৯১ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এর পর ১৯৯৩ সাল থেকেই তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নিরপেক্ষ-নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আন্দোলন করতে থাকে। এই একটি মাত্র ইস্যুকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল দিয়ে দেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। বিএনপি ক্রমাগতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব না করলেও আন্দোলনে ভাটা পড়েনি আওয়ামী লীগের। তখন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যু তার নৎধরহ পযরষফ. চাপের মুখে বিএনপি অতঃপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নেয় এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে ক্ষমতাসীন হয়।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে অগোছালো, অপ্রস্তুত বিএনপি পরাজয় বরণ করে এবং পার্লামেন্টে বিরোধী দলের আসনে বসে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী মহাজোটের শরিকদের নিয়ে গঠন করে মন্ত্রিসভা। মহাজোট তাতে আরও শক্তিশালী হয়। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যে দুইবার করে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে। অর্থাৎ গত ২০ বছর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাতেই এবং কোনো দলই এ ব্যবস্থাতে নির্বাচন করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে মনে করেন দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ।
বিএনপি বিগত ৪ বছর ধরেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন ইস্যুতে আন্দোলন করে আসছে। এই দলটি ১৭৩ দিন হরতাল না দিলেও নানাভাবে, বিভিন্ন কৌশলে, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি বাঁচিয়ে রেখেছে। বিএনপির বিভিন্ন জাতীয় পর্যায়ের নেতা একে কেন্দ্র করে বারবার কারানির্যাতিত হয়েছেন। বিএনপি যত কার্যকরভাবেই আন্দোলন চালিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার তত কঠোরভাবে বিএনপির আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দেয়ার চেষ্টা করেছে। আশা-নিরাশার দোলায় আন্দোলিত হয়েছে রাজপথ। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে সংসদ ভবন এলাকা ও রাজধানীর অন্যান্য জায়গা। বিষয়টি এখনও ফয়সালা হয়নি। যার যার অবস্থানে আছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপি। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল প্রথমে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট এবং এর কয়েকদিন পর গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। প্রথমে চারটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হওয়ার পর ক্ষমতাসীনদের নজর পড়ে গাজীপুর নির্বাচনে। এখানে সরকার তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেও আরও বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হন সরকার সমর্থিত প্রার্থী। বিরোধী দল এখন বলছে, পাঁচ-পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রায়ের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে রায় পুনর্ব্যক্ত হয়েছে। তাই তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া কোনোক্রমেই বিরোধী দল নির্বাচনে যাবে না এবং নির্বাচন হতেও দেবে না। সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি এ অবস্থানে আটকে আছে আগামী নির্বাচনের ব্যবস্থাপনা। কয়েকটি প্রশ্ন এখানে প্রণিধানযোগ্য যথা- যে আওয়ামী লীগ বছরের পর বছর হরতাল ধর্মঘট করে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে বিরোধী দলকে বাধ্য করল, সেই আওয়ামী লীগ এখন ৯০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে এর বিপরীত অবস্থান নিচ্ছে কেন? যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তার নৎধরহ পযরষফ, তিনি এখন সেখান থেকে সরে আসছেন কেন? যে আওয়ামী লীগ বলেছিল, তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া অন্য কোনো সরকার ব্যবস্থার অধীনে তারা নির্বাচনে যাবে না এবং নির্বাচন হতেও দেবে না, সেই আওয়ামী লীগ এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থেকে সরে আসছে কেন? তত্ত্বাবধায়কে তাদের এত ভয় কিসের? নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার অধীনে জাতীয় নির্বাচন হলে কোনো পক্ষেরই তো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই- যেটার জন্য তারা এত আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ যেহেতু বিএনপিকে আস্থায় ও বিশ্বাসে আনতে পারেনি, বিএনপিও একইভাবে আওয়ামী লীগকে আস্থায় নিতে পারছে না। আওয়ামী লীগ তখন যে অজুহাত দেখিয়েছিল, বিএনপি এখন সেই একই অজুহাত দেখাচ্ছে। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করায় বিএনপি আরও আশাবাদী হয়ে উঠেছে এবং তাদের তত্ত্বাবধায়কের দাবি আরও সুসংগঠিত, বেগবান ও জোরদার হয়েছে।
আওয়ামী লীগ যদি একটি নির্বাচনমুখী ও রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ দল হয়, তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় তো তাদের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। আওয়ামী লীগ দু’-দু’বার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তত্ত্বাবধায়কের অধীনে নির্বাচন করেই। তাই এ পদ্ধতিতে তাদের আপত্তির কারণ জনগণ বুঝতে পারছে না। আওয়ামী লীগই তো এ ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য বিএনপি সরকারকে তখন বাধ্য করেছিল। শেখ হাসিনা তার নৎধরহ পযরষফ-কে মেরে ফেলতে চাইছেন কেন? নব্বইয়ের পর এযাবৎকালে দু’বার করে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে দুই দলই। এবার ভোটের আভাস দেখেও মনে হয় বিএনপির একটি সুযোগ আসতে পারে। তাই কি আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দেয়ার চিন্তা করছে, যাতে তারা কলকাঠি নাড়িয়ে তৃতীয়বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হতে পারে? এর ফলাফল দু’রকম হতে পারে- ১. বিএনপি আস্থাহীনতার কারণে নির্বাচন বয়কট করতে পারে। ফলে নির্বাচন হবে একতরফা। ২. তত্ত্বাবধায়ক দাবি মেনে নিলে শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর পরিবেশে জাতীয় নির্বাচন সুসম্পন্ন হতে পারে। এ বাস্তবতায় জাতির কল্যাণে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রয়োজনে তত্ত্বাবধায়ক ইস্যু মেনে নিয়ে সরকার যত তাড়াতাড়ি জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাবে, ততই দেশ ও জাতি বিশাল এক সংকট কাটিয়ে উঠবে। বিভিন্ন জরিপেও দেখা যায়, দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আওতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন চায়। এই বাস্তবতা আওয়ামী লীগ যত তাড়াতাড়ি হƒদয়ঙ্গম করতে পারবে, ততই সবার মঙ্গল। এর বাইরে গিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো লাভ হবে না। কারণ গণরায় তখন তাদের পক্ষে যাবে না।
তাই আওয়ামী লীগ জনতার মতামত, গণতন্ত্র, দেশ, জাতি ও আগামী প্রজর প্রতি লক্ষ্য রেখে যত তাড়াতাড়ি কার্যকর ব্যবস্থা (সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল) নেবে, ততই মঙ্গল। নিরপেক্ষ, নির্দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন ব্যবস্থাই এখন সময়ের দাবি।
ড. কাজী আবদুস সামাদ : অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নীতির রাজনীতি বনাম ভোটের রাজনীতি by মেজর সুধীর সাহা (অব.)

রাজনীতি ও গণতন্ত্রের অন্যতম অধ্যায় নির্বাচন। নির্বাচন কিংবা ভোটের রাজনীতির সঙ্গে নীতিগত রাজনীতির কোনো বিভেদ থাকার কথা নয়। কিন্তু রাজনীতি যখন হয়ে উঠে শুধু ভোটের জন্য নিবেদিত এবং নিয়ন্ত্রিত, তখন সেই রাজনীতিতে নীতির জায়গাটি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ কঠিন রোগটি অনেক আগেই ঢুকে পড়েছে। ঠিক কখন ঢুকে পড়েছে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন হলেও বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে ভোটকেন্দ্রিক রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। সেই দলটির নীতিগত অবস্থান হল তারা স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা বা অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণতন্ত্রের চেতনাবাহক একটি রাজনৈতিক দল। স্বাধীনতার নেতৃত্ব প্রদান থেকে শুরু করে সব প্রগতিশীল আন্দোলনের ইতিহাস এ দলটির রয়েছে। এ দলটি যতদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ছিল ততদিন এর নীতিগত অবস্থানের বিষয় নিয়ে কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না। বঙ্গবন্ধুর পরের দিনগুলো অর্থাৎ বর্তমান সভানেত্রী শেখ হাসিনার পূর্ববর্তী সময়েও এ দলটির নীতিগত রাজনীতিতে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। এ দলে নীতিগত রাজনীতিতে ভোটের রাজনীতি ঢুকে পড়ে দলটির বর্তমান নেতৃত্বের হাত ধরে। ভোটের বিবেচনাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তারা বারবার নীতির রাজনীতিতে সমঝোতা করে। স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী এ দলটি এক সময় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতে ইসলামের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করতেও দ্বিধা করে না। গোলাম আযমের মতো যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে তারা এক কাতারে বসে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করে শুধু এরশাদের পতনের লক্ষ্যে। আবার সেই এরশাদের দলের সঙ্গে জোট বেঁধে আওয়ামী লীগ বর্তমান সময়ে সরকার পরিচালনা করছে। আওয়ামী লীগ একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে, অন্যদিকে সমর্থনের আশায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে গোপন আঁতাত করার চেষ্টা করে। ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে ফতোয়া প্রদানের বিষয়ে একটি গোপন চুক্তিও স্বাক্ষর করেছিল। মৌলবাদী সংগঠনের এবং ধর্মীয় অনুভূতির ভোটারের সমর্থন লাভের আশায় আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বহাল রাখে। সরকার একসময় গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে একাÍতা প্রকাশ করে; আবার যখন দেখে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে মৌলবাদী কিছু সংগঠন, তখন সরকার ভোটের হিসাবকে বেশি মূল্য দিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। মৌলবাদীদের খুশি করতে সরকার প্রমাণ সংগ্রহের আগেই গ্রেফতার করে তিন ব্লগারকে।
বিএনপি ধর্মীয় রাজনীতির একটি প্লাটফর্ম। ধর্মীয় রাজনীতির অপর দল জামায়াতে ইসলামী তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সঙ্গী। বিএনপি কখনও কখনও নিজেদের মু্িক্তযোদ্ধাদের দল বলে ঘোষণা করে। তাদের দলে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা নেতাকর্মী আছে। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ধর্মের কোনো সংঘাত নেই। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীর মধ্যে একটি পার্থক্য আছে নিশ্চিতভাবেই। সে ক্ষেত্রে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা থাকা দল বিএনপি শুধু ভোটের হিসাব করেই জামায়াতের মতো কট্টর মৌলবাদী মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট বেঁধে রাজনীতি করছে। জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব এবং সহিংস কার্যকলাপ রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের সৃষ্টি করলেও শুধু ভোটের হিসাব করতে গিয়ে বিএনপি জামায়াতকে তার জোটে ধরে রাখছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আর সেই জিয়াউর রহমানের দলের অন্যতম প্রধান শরিক দল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতে ইসলামী।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টি এবং বিএনপির সঙ্গে জামায়াত; বিবেচনা শুধু ভোটের গুরুত্ব। ভোটের ওপর জোর দিতে গিয়েই বিএনপি জোটের সমর্থক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী জামায়াতের মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে রাজনীতি করছেন। নীতির রাজনীতি আজ দেশে ভোটের রাজনীতির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছে। হয়তো একদিন এর পরিবর্তন আসবে। তবে সেই দিনটি না আসা পর্যন্ত আমাদের যে কতদিন অপেক্ষা করতে হবে তা কে বলতে পারে। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি আজ রাজনীতি করে শুধুই যেন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনীতি করার মানসিকতা আজ তারা অনেক পেছনে ফেলে রেখে এসেছে। কীভাবে, কী পদ্ধতিতে, কী চাতুর্যে বেশি ভোট পাওয়া যাবে, কার সঙ্গে থাকলে সরকার গঠন করার মতো ভোট পাওয়া যাবে আজ যেন তা-ই রাজনীতির মূলমন্ত্র হয়ে গেছে। নীতি এবং দলের আদর্শ সেখানে গৌণ অবস্থানে রয়েছে। ক্ষমতা চাই-ই-চাই। আর সেই ক্ষমতা পেতে যদি বিপরীত মেরুর কোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আঁতাত করতে হয়, যদি নীতি বিসর্জন দিয়ে বিপরীত মেরুর কারও সঙ্গে হাত মেলাতে হয়, তবে তা ঠিক আছে।
জনগণের সেবা করার যে রাজনীতি তাতে সরকার গঠন করার বিষয়টি মুখ্য নয়। বিরোধী দলে থেকেও জনগণের স্বার্থে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই প্রধান দল শুধু ক্ষমতাই চায়Ñ বিরোধী আসনে বসতে চায় না। ভোটের হিসাব করতে গিয়ে এ দেশের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দল ক্রমশ নীতির রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। মিথ্যাই হোক, কৃত্রিমভাবেই হোক অথবা ছলনা করেই হোক, রাজনৈতিক দলের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতা গ্রহণ অর্থাৎ ভোটের প্রাপ্তি। তাই ভোটের স্বার্থে সবকিছুই করা যেতে পারে। সেখানে নীতিকে টেনে এনে তারা ঝামেলা পোহাতে চায় না। নীতি ধরে রেখে বিরোধী আসনে বসার চেয়ে তারা বরং ভোটের গতি দেখে নীতিতে ছাড় দিয়ে ক্ষমতায় বসতে চায়। ক্ষমতার রাজনীতি নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে তারা শুধু দলীয় স্বার্থের কথাই চিন্তা করে, জনগণের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে না।
ঠিক এ মুহূর্তে যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতা গোলাম আযমের বিচারের রায় নিয়েও আমরা স্পষ্টত দেখতে পাই ভোটের রাজনীতির খেলা। রায় নিয়ে বিএনপি কোনো মন্তব্য প্রকাশ করছে না। তারা এতে সব মহলকে খুশি করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ৯০ বছরের শাস্তি হওয়ায় সরকারও রায়ে খুশি বলে জানিয়েছে। জাতির যে প্রত্যাশা ছিল সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের, সেখানে ভোটের সুবিধার কথা চিন্তা করে মৃত্যুদণ্ড আশা না করে ৯০ বছরের সশ্রম কারাভোগের রায়কেই সরকার বাহবা জানাচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পর অন্য সরকার এসে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচারের রায় থেকে কোনো যুদ্ধাপরাধীকে মুক্ত করে দিতে পারে এমন একটি সংশয় বজায় থাকলেও বর্তমান সরকার সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও সেই ৫৯ ধারায় কোনো পরিবর্তন আনছে না। কেননা তারা ভোটের রাজনীতির কারণে এখানেও নীতির সঙ্গে সমঝোতা করছে। জামায়াত একটি সন্ত্রাসী দল বলে সরকার মনে করলেও শুধু ভোটের হিসাব কষে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না মুক্তিযুদ্ধের দল আওয়ামী লীগ।
নীতির রাজনীতি জয়ী না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেশের রাজনীতির চেহারা বদলাবে না। শুধু নীতি বিসর্জিত ভোটের রাজনীতির কারণে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে ক্রমশ প্রকৃত রাজনীতিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং অর্থ-সম্পদশালী ব্যবসায়ী শ্রেণীর হাতে রাজনীতি বন্দি থাকছে।
মেজর সুধীর সাহা (অব.) : কলাম লেখক

কী হবে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক এজেন্ডা by মামুন রশীদ

দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান আমার সঙ্গে সেলফোনে পাঠানো একটি শর্ট মেসেজের কথা শেয়ার করেছিলেন। মেসেজটি এসেছিল সরকারের শীর্ষ ব্যক্তির কাছ থেকে। মেসেজটি ছিল এরকম : ‘গরীব মানুষের কথা ভুলবেন না’। এই ছোট্ট মেসেজটি গভর্নর আতিউর রহমানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নির্দেশনা হিসেবে সম্ভবত এখনও কাজ করে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে এক সামাজিক অনুষ্ঠানে বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার দেখা হয়। ২ মিনিটেরও কম সময়ের এই সাক্ষাতে তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মতো একটি দেশে প্রাইভেট সেক্টরকে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করতে হবে। প্রাইভেট সেক্টর সহযোগিতা পেলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ফলে দেশে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে।’ নিন্দুকদের বলতে শুনেছি, বেগম খালেদা জিয়া মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরুতে পারেননি। কিন্তু তার এই দূরদৃষ্টি দেশের বরেণ্য শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে কোনো অংশে কম বলে মনে হয়নি আমার। একটি জাতি যদি অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে না পারে, তাহলে সে জাতি কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। কোনো দেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে থাকে, তখন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সুনজর পড়ে তার ওপর। তখন স্বাভাবিকভাবেই সেদেশে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বেড়ে যায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে থাকে। যার ফলে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস পেতে থাকে। আর এভাবেই একটি দেশ ধীরে ধীরে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। আমাদের দেশেও এরকম প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু তারপরও দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, দুর্নীতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অদূরদর্শিতা ইত্যাদি কারণে আমরা পিছিয়ে আছি। অবশ্যই আমাদের এই গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আগামী জাতীয় নির্বাচনের আর বেশি দেরি নেই। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ছয় মাস পরই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে অবশ্যই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দল জয়লাভ করে সরকার গঠন করবে। যেহেতু দেশের অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয় রাষ্ট্র পরিচালনায় ফ্রন্টলাইনে চলে এসেছে, সেহেতু নতুন সরকারের অর্থনৈতিক এজেন্ডা কী হতে পারে, সে বিষয়ে কিছুটা আলোচনা করার চেষ্টা করছি।
প্রথমেই যে বিষয়টি এসে যায় সেটি হচ্ছে বিদ্যুৎ। বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়েও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি। তারপরও জাতীয় গ্রিডে আশাব্যঞ্জক পরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ খরচও যথেষ্ট বেড়েছে বলে প্রতীয়মান। বিদ্যুতের খরচ বাড়লেও এর চাহিদা কোনো অংশেই কমছে না, বরং বাড়ছে। দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। বিদ্যুতের চেয়েও আরও একটি বড় সমস্যা হচ্ছে গ্যাস সংকট। কেননা গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না, কল-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন কল-কারখানা বাস্তবায়নের মুখ দেখছে না। সুতরাং গ্যাস সংকট উত্তরণেও আমাদের বিশেষ নজর দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। গ্যাস সংকট সমাধানে সরকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই চেষ্টা তেমন একটা ফলদায়ক হয়নি। গ্যাস উত্তোলনে সরকার সঠিক সময়ে টেন্ডার দিতে পারেনি। যেসব প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাদের অভিযোগ, তাদের ঠিক সময়ে জায়গা বুঝিয়ে দেয়া হয়নি, কন্ট্রাক্ট কনফারমেশন করা হয়নি। যার ফলে এনার্জি সেক্টরে সমস্যার সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘকালীন সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। এলএনজি বা লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস প্রকল্প স্থাপনের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এলেও তারও অগ্রগতি হয়নি। বিদেশী দু’-একটি এনার্জি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে বলেছিল, তারা বঙ্গোপসাগরে একটি প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের মাধ্যমে এলএনজি জাতীয় গ্রিডে দেবে, এর বিনিময়ে পেট্রোবাংলা ওই প্রতিষ্ঠানকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টোল দিয়ে যাবে। পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে টেন্ডার ডাকা হয়েছিল এবং সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজটি বুঝিয়ে দেয়ার কথাও হয়। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের অনমনীয় শর্তের কারণে কাজটি বেশিদূর এগোতে পারেনি। ফলে এনার্জি সংকটের বিষয়টি সংকটের আবর্তেই রয়ে গেছে।
এনার্জি সেক্টরের আরেকটি বিষয় হচ্ছে কয়লা। আমাদের দেশের কয়লার মান যথেষ্ট ভালো। কিন্তু সরকারের কয়লানীতি অনুমোদনের জটিলতার কারণে সেটিও মুখথুবড়ে পড়ে রয়েছে। কোল কর্পোরেশন গঠন করার যে পদক্ষেপ নেয়ার কথা ছিল, সেটিও বাস্তবতার মুখ দেখেনি। সুতরাং যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, এ বিষয়গুলো সরকারের প্রধান পরিকল্পনার মধ্যে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে দেশের বন্দর ও পোতাশ্রয়ের বিষয়টি প্রণিধানযোগ্য। আমাদের যে প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর রয়েছে সেখানে যথেষ্ট পরিমাণ খাঁড়ি বা গভীরতা নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভারি জাহাজ সেখানে নোঙর করতে পারে না। যার কারণে পণ্য বোঝাই বা পণ্য খালাস করতে যথেষ্ট ঝামেলা পোহাতে হয় এবং এতে অনেকটা সময়ও ব্যয় হয়। এটা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি প্রধান অন্তরায়। আমরা শুনেছিলাম, আমাদের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশী এক্সপার্টদের সহায়তায় দ্রুত শেষ করা হবে। এ ব্যাপারে সরকার কিছুটা এগিয়েছে। কিন্তু এভাবে ধীর পদক্ষেপে এগোতে থাকলে ২০১৮ সালের পর পণ্য লোড-আনলোড ক্যাপাসিটি একটি সংকটের আবর্তে পড়বে বলে অনেকে মনে করছেন। সুতরাং যেভাবেই হোক, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে এবং সমুদ্রবন্দরগুলোকে যুগোপযোগী করতে হবে। সেই সঙ্গে বন্দরে দুর্নীতি কমাতে হবে। এর সঙ্গে প্রধান যে সমস্যা পোতাশ্রয়ের গভীরতা, সেটি দূর করতে হবে। পর্যাপ্ত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পোতাশ্রয়ের গভীরতা বাড়ানো সম্ভব। সেটি সরকার ইচ্ছে করলেই করতে পারে। দেশের নৌ-বন্দরগুলোরও গভীরতা কম থাকার কারণে অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্য অগ্রসর হতে পারছে না। নৌ-পথে ট্রান্সপোর্ট ব্যয় কম থাকার কারণে পণ্য পরিবহনের বিষয়ে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে যদি বন্দর ও নদীগুলোর গভীরতা বাড়াতে পারি, তাহলে পণ্য পরিবহনের দ্বার খুলে যাবে। যার ফলে নদীর উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বিভিন্ন প্লান্ট, কল-কারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। এতে করে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বিনিয়োগ বাড়বে, দারিদ্র্য হ্রাস পাবে, সর্বোপরি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটবে। সুতরাং নতুন সরকারকে ড্রেজিংয়ের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যৌথ দেশী-বিদেশী বিনিয়োগে একটি প্রাইভেট পোর্ট প্রতিষ্ঠার কথাও ভাবা যেতে পারে। এমনকি কুয়াকাটার সন্নিকটে রামনাবাদ চ্যানেলে গড়ে উঠতে পারে দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর। পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পোর্টগুলো হয়ে উঠবে আরও সহায়ক ও দক্ষ।
দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন করা উচিত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের যে প্রক্রিয়া চলছে, সেটি খুবই শম্বুকগতিতে চলছে। এ প্রক্রিয়াকে কিভাবে দ্রুত এগিয়ে নেয়া যায় সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন সরকারের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আলোচনা-সমালোচনা থাকবে। এটা গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিন্তু দ্বান্দ্বিকতাকে কেন্দ্র করে বসে থাকা চলবে না। এগিয়ে যেতে হবে। সেটি আলোচনার মাধ্যমেই হোক বা সমঝোতার মাধ্যমেই হোক। এ ব্যাপারে দুর্নীতিকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। আমাদের দেশে বিভিন্ন সরকারি বা সামরিক প্রতিষ্ঠানে অনেক মেধাবী প্রকৌশলী, প্রকল্পবিদ ও ব্যবস্থাপক রয়েছে। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে তাদের কাজে লাগানো উচিত বলে আমি মনে করি।
কৃষিতে আমাদের অগ্রসরতা এখনও কাক্সিক্ষত জায়গায় পৌঁছেনি। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, তারা তাদের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে কৃষিতে যথেষ্ট অগ্রগতি লাভ করছে। এর ফলে তারা কৃষিপণ্য বিশ্ববাজারে রফতানি করে অর্থনীতি সচল রাখতে পারছে। যেটি আমাদের দেশে সম্ভব হয়ে উঠছে না। জিডিপিতে দেশের কৃষির অবদান ১৮ শতাংশের মতো। কিন্তু কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমশক্তি প্রায় ৪৫ শতাংশ। অবশ্যই এর পরিমাণ আমাদের বাড়াতে হবে। ধান গবেষণায় আমাদের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। ইরি ও বোরো সে গবেষণারই ফল। কিন্তু ইরি ও বোরো চাষাবাদে আমাদের যথেষ্ট পরিমাণ পানি খরচ হয়। সুতরাং অল্প পানির সাহায্যে কিভাবে উন্নত ধান চাষ করা যায়, সেটি আমাদের গবেষণায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে কৃষক যাতে দামে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সরকারের বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন।
কৃষককে প্রণোদনার মাধ্যমে হোক, সহযোগিতার মাধ্যমে হোক, কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে উৎপাদিত পণ্য বিশেষ করে চাল বিদেশে রফতানি করার প্রক্রিয়াটি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। সুতরাং কৃষি ও খাদ্য গবেষণায় আমাদের আরও জোর দিতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যদি এ ব্যাপারে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে গাটছড়া বাঁধতে হবে।
আমাদের অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ব্যবসা-বাণিজ্যে যথেষ্ট উন্নতি করেছেন। এখন তাদের উচিত বিদেশে কিভাবে অর্থলগ্নি করা যায় সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা। আমাদের একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সেটি হচ্ছে শিল্পের কারণে এবং আবাসনের কারণে আমাদের কৃষি জমি দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বিশ্বের যেসব দেশ উর্বর জমি থাকা সত্ত্বেও জনবলের অভাবে কৃষি কাজ করতে পারছে না, সেসব দেশের পতিত জমিগুলো আমাদের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে অধিগ্রহণ করে সেখানে কিভাবে কৃষি উৎপাদন করা যায়, সেসব বিষয় নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হতে পারে, সেখানে উৎপাদিত পণ্যের ৫০ শতাংশ আমাদের দেশের জন্য দিতে হবে। এ বিষয়টি যদি আমাদের মাথায় থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে কৃষি জমি কমে গেলেও দেশে খাদ্য ঘাটতির বিষয়টি থাকবে না।
দেশের প্রাইভেট সেক্টর নিয়ে আমাদের ভাবা উচিত। বিগত ২২ বছরে প্রাইভেট সেক্টর দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। সুতরাং প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশকে আমাদের ত্বরান্বিত করতে হবে। প্রাইভেট সেক্টর নিয়ে যে আইন রয়েছে, সেগুলোকে যুগোপযোগী করতে হবে। ১৯৪৭ সালের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন আইনটি প্রাইভেট সেক্টর বিকাশের ক্ষেত্রে গলার কাঁটা হিসেবে বিঁধে রয়েছে। আমাদের এ স্বাধীন দেশে এখনও কেন ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া আইন অনুসরণ করতে হবে? যেহেতু দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি প্রাইভেট সেক্টর, সেহেতু এর অগ্রসরতার জন্য আইনকে যুগোপযোগী করা উচিত। আইন মন্ত্রণালয় শুধু বিরোধী দলকে ঠেঙ্গানোর জন্য আইন প্রণয়ন করবে না। দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য কিভাবে অগ্রসরমান হয়, সেদিকেই নজর দেবে। কোন কোন আইন উদ্যোক্তা তৈরিতে বাধা এবং কোন কোন মান্ধাতার আমলের আইন দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়, সেসব আইন যুগোপযোগী করা একান্ত প্রয়োজন। ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন আইনটি দিয়েই শুরু করা যেতে পারে।
নতুন সরকারের কাছে জাতির অনেক প্রত্যাশা থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। জাতির এ প্রত্যাশাগুলো সরকার আমলে নিয়ে নব উদ্যমে দেশকে এগিয়ে নেবে, বিশেষ করে এ প্রবন্ধে আলোচ্য বিষয়গুলোকে নতুন সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
মামুন রশীদ : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক