Showing posts with label রংপুর. Show all posts
Showing posts with label রংপুর. Show all posts

Monday, August 24, 2026

রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যা: খুনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ

রংপুর শহরে অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুলশিক্ষক, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার নেপথ্য কারণ হিসেবে পুলিশ প্রথমে ধারণা করেছিল, এটা ডাকাতি। তবে গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় হত্যা করা হয় তাঁদের। পুলিশের এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই শিক্ষকের স্বজনেরা।

গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা লাশ চারটি হলো রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩)।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গতকাল ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের ওই দুই তরুণের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে। এরপর গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়।

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন।

হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশের ভাষ্য

পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতির নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। দেখতে পেয়ে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়। গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে হত্যা করা হয় তাঁদেরও। এরপর ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আয়ুশকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।

গণপতির পরিবারের সঙ্গে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের আগে থেকেই পরিচয় ছিল উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দুজন মিলে একে একে পরিবারটির চার সদস্যকেই হত্যা করেন।

মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান, হত্যার পরও ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা গোসল করেন, ফ্রিজ (রেফ্রিজারেটর) থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং আবার ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তাঁরা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। আর যাওয়ার আগে আলমারি-ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন।
গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে ইয়াবা সেবন করার সরঞ্জাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরও জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি গয়নার দোকানে প্রায় আট বছর কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।

‘পুলিশ যা বলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়’

তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।’

এ ঘটনায় গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। মামলার পর এর আগে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘পুলিশ যা বলছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা, তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে।’

দুই তরুণ যে হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না তাঁদের পরিবারও। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, ‘আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস বলেন, ‘ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।’

জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আজ (গতকাল) ভোরে আটক করা হয়। পরে তাঁরা হত্যায় জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ কারণে মামলায় তাঁদের দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’

একেক জায়গায় পড়ে ছিল লাশ

পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয় তাঁর। এরপর শনিবার ফোন দিলে বোন, জামাতা ও বোনের মেয়ে—সবার নম্বর বন্ধ পান। কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বামীকে নিয়ে রাত পৌনে ৯টার দিকে ওই বাসায় যান। কারও সাড়া না পেয়ে পাশের একটি ভবনে উঠে জানালার কাচ ভেঙে ঘরের জিনিসপত্র অগোছাল দেখতে পান। এরপরই খবর দেন পুলিশকে। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে রাত ১১টার দিকে। দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ লাশ চারটি উদ্ধার করে বাড়িটি থেকে নিয়ে যায়।

রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।

নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকত। প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ চলছে। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। গামছা প্যাঁচানো ছিল তাঁর গলায়।

হত্যার প্রতিবাদ, বিক্ষোভ

পরিবারসহ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে হত্যার ঘটনায় গতকাল দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে। মানববন্ধন থেকে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। পরে শিক্ষার্থীরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।

হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে রংপুর মহানগর জামায়াত। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রেসক্লাবের সামনে এসে হয় সমাবেশ।

সমাবেশে মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি পরিবারের চারজন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার এমন ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনায় নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র দুজন মাদকসেবী কীভাবে একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করলেন, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

‘কোথায় বাস করছি আমরা’

গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণপতি আগে রংপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০১০ সালে কামালকাছনার মাছুয়াপাড়ায় ৬ শতাংশ জমি কেনেন। তিন বছর আগে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন সেখানে।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির পাশে লোকজনের ভিড়। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি তিনতলা ভবনেরও নির্মাণকাজ চলছে। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন হিমাংশু রায় নামের অবসরপ্রাপ্ত এক কলেজশিক্ষক। হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, কিছুই বুঝতে পারেননি।
বোন, জামাতা ও বোনের ছেলে–মেয়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পূজা চক্রবর্তী। বাড়িতেও একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেন নেই—সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের তো শত্রুও নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই!’

রংপুরে হত্যার শিকার একই পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি
রংপুরে হত্যার শিকার একই পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত

Monday, February 16, 2026

জাতীয় পার্টি নিয়ে মানুষের আর ‘ওই আবেগ নাই’ by জহির রায়হান

রংপুর বিভাগের ৩৩ আসনঃ রংপুর নগরের কেরামতিয়া জামে মসজিদ। গত শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর সামনের চা-দোকানে গল্পে মেতেছিলেন মুন্সিপাড়ার সবুজ আলী, মকবুল হোসেন, আহম্মদ মিয়ারা। আলোচনার মূল বিষয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল।

ভোটের ফলাফলে বিস্মিত সবুজ আলী বলেন, ‘ভোটের আগে মনে হচ্ছিল এবার রংপুরে জাতীয় পার্টি হারবে। কিন্তু এ রকম শোচনীয়ভাবে হারবে, এটা চিন্তা ছিল না।’

কথার ফাঁকে সত্তরোর্ধ্ব সবুজ আলী নিজেকে জাতীয় পার্টির একজন কর্মী পরিচয় দেন। বলেন, ‘এরশাদ যখন জেলে, সেই ’৯১ সালে, তখন থেকে লাঙ্গলকে ভোট দেই। এবারও দিছি। কিন্তু জাতীয় পার্টিক নিয়া রংপুরের মানুষের আর ওই আবেগ নাই। মানুষ এবার মুখ ফিরি দিছে।’

সবুজ আলীর এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায় গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে। জাতীয় পার্টির ‘ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত রংপুর বিভাগে কোনো আসন পায়নি জাতীয় পার্টি। এমনকি রংপুর-৩ (সিটি করপোরেশন ও সদর) আসনেও দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের হেরেছেন।

বিভাগের ৮ জেলায় সংসদীয় আসন ৩৩টি। এর মধ্যে ১৮টি আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা। জামায়াতের প্রার্থীরা ১৬টিতে এবং ২টিতে জয় পেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা। বিএনপি পেয়েছে ১৪টি আসন। একটি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র (বিএনপির বিদ্রোহী) প্রার্থী।

জাপার প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরের মানুষ। শহরে তাঁর পুরোনো বাড়ি রয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি জেল থেকে প্রার্থী হয়ে পাঁচটি আসনে দাঁড়িয়ে সব কটিতেই জিতেছিলেন। সেই নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ১৭টি আসন জিতে জাপা। ১৯৯১ সালের পর আরও তিনটি নির্বাচনে রংপুর বিভাগে ভালো ফল করে জাপা। ১৯৯৬ সালে ২১টি, ২০০১ সালে ১৪টি এবং ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৩টি আসন পেয়েছিল জাপা।

রংপুর-৪ আসনের জয় পাওয়া এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রংপুরের ৬টি আসনে শাপলা কলি ও দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন আওয়ামী লীগ নাই হয়ে গেছে, তেমনি জাতীয় পার্টিকেও রংপুরের মানুষ প্রত্যাখান করেছেন।

জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময়

এবার বিভাগে সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতের আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে মাত্র একটিতে করে জয়লাভ করেছিল। ২০০১ সালে বিভাগে জামায়াতের আসন বেড়ে চারটি হলেও ২০০৮ সালে এসে একটি আসনও পায়নি জামায়াত। ১৮ বছর পর এই অঞ্চলে জামায়াতের এমন বিজয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি ফখরুল আনাম প্রথম আলোকে বলেন, জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক নেতৃত্বের বিকাশ নেই। তারা কী করতে চায়, তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার নেই। তারা রংপুর অঞ্চলের মানুষের ইমোশন (আবেগ) নিয়ে রাজনীতি করেছে। কিন্তু মানুষ এবার ‘হামার ছওয়াল ইমোশনে’ সাড়া দেয়নি। জাতীয় পার্টিকে প্রত্যাখান করা ‘সংক্ষুব্ধ’ ভোটারদের জামায়াত কাজে লাগাতে পেরেছে বলেই মনে করেন তিনি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, গাইবান্ধার পলাশবাড়ি, সুন্দরগঞ্জ, রংপুরের মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলায় ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হয়ে আসছিল জামায়াত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব আসনে ঘিরে জোরালো তৎপরতা শুরু করে দলটি। ভোঠের মাঠে তাদের এমন সাংগঠনিক দক্ষতা ও কৌশল এবার ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।

এ বিষয়ে রংপুর মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির এ টি এম আজম খান প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে এই এলাকায় জামায়াত-বিএনপির প্রভাব ছিল না। যার কারণে মানুষ নতুনটাকে বেছে নিয়েছে।

আগামী দিনে ভালো করতে চায় বিএনপি

অতীতের তুলনায় এবার রংপুরে বিএনপির আসনও বেড়েছে। ১৯৯১ সালে বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে মাত্র ১টি ও ১৯৯৬ সালে ৩টি আসন পায় বিএনপি। ২০০১ সালে বিএনপি ৯টি আসন পেলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলটিকে খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফলাফলে দেখা গেছে, বিএনপি দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিহাটের ১৪টি আসন পায়। দিনাজপুর-৫ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীসহ ধরলে এই ৪ জেলার ১৫টি আসনেই তাদের দখলে। কিন্তু বিভাগীয় শহর রংপুরসহ কুড়িগ্রাম, নীলফামারীতে কোনো আসন পায়নি বিএনপি। গাইবান্ধার ৫টি আসনের মধ্যে শুধু গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী শামীম কায়সার জয়লাভ করেন।

বিএনপি রংপুর, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে রংপুর বিভাগে বিএনপির আরও ভালো করার সুযোগ ছিল। কিন্তু নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, তৃণমূল কর্মীদের অবম্যূল্যায়ন না করার কারণে সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়নি।
রংপুরের একজন বিএনপি নেতা প্রথম আলোকে বলেন, রংপুর বিভাগীয় শহর হলেও বিএনপি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে রংপুরকে নেতৃত্ব দেওয়ার লোক নগন্য। আবার যাঁরা আছেন, তাঁরাও রংপুর থেকে ভোট করেননি। স্থানীয় নেতাদের ওপর ভোটারদের আস্থার সংকট ছিল। যে সংকট ঠাকুরগাঁও বা লালমনিরহাটে ছিল না।

তবে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (রংপুর বিভাগ) আবদুল খালেক প্রথম আলো বলেন, ‘প্রতিটি জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। অনেক জায়গায় বিএনপি-জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা ভোট কাটাকাটি করেছেন, মাঝখান দিয়ে জামায়াত প্রার্থী জয়লাভ করেছেন। তবে বিএনপির যাঁরা হেরেছেন, খুব অল্প ভোটে হেরেছেন। এটা কোনো সমস্যা নয়। সাংগঠনিকভাবে কাজ করলে আগামী দিনে এগুলো ভালো হবে।’

ভুলত্রুটি খুঁজছে জাতীয় পার্টি

রংপুর বিভাগে নীলফামারী সদর আসন বাদ দিয়ে ৩২ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জাতীয় পার্টি। কোনোটিতে জাতীয় পার্টি জিতেনি। দলের সাধারণ সম্পাদক গাইবান্ধার দুটি আসনে ভোট করলেও একটিতে তৃতীয় হয়েছেন, আরেকটিতে জামানত হারান।
রংপুরে জাপা নেতা-কর্মীদের ধারণা ছিল, দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের অন্তত তাঁর আসনে জিতবেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর মাহবুবুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন এ আসন ধরে রাখার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় অবস্থানে। এর পর থেকে রংপুরের মানুষের আলোচনায় জি এম কাদের।

জাপা নেতারা অবশ্য দলের চেয়ারম্যানের হারকে মেনে নিতে পারছেন না। তাঁরা এটিকে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ হিসেবে দেখছেন। জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আজমল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গণসংযোগ করেছি। প্রতিটা বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। সবাই স্বতঃস্ফূর্ত জাতীয় পার্টির পক্ষে সাড়া দিছে। এখানে জাতীয় পার্টির এই ধরনের রেজাল্ট হওয়ার কথা না। এটা “সূক্ষ্ম কারচুপি” ছাড়া আর কিছু হয়নি।’

জাপা চেয়ারম্যানের গতকাল ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন ও সাংবাদিকদের বিফ্রিং করার কথা থাকলেও করেননি। সারা দিন তাঁর রংপুরের বাসভবন দ্য স্কাই ভিউতে ছিলেন।
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আজ সকাল থেকে জাতীয় পার্টি রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকার নেতা–কর্মীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। বেলা দুইটার পর তিনি ঢাকার উদ্দেশে চলে যান। জি এম কাদের ভোট নিয়ে কোনো মন্তব্য করেছেন কি না, তা জানতে চাইলে মিলন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের বলেছেন, সবাই মিলে সংগঠন ঠিক করো। ভুলক্রটি কোথায়, কী কারণে এমন হলো। 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-02-13%2Fsit6cfbn%2FRANGPURDH049420260212IMG6061.JPG.JPG?rect=88%2C0%2C3207%2C2138&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোট দিচ্ছেন একজন ভোটার। গত বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর নগরের কেল্লাবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। ছবি: মঈনুল ইসলাম

Wednesday, September 24, 2025

রংপুরের তারাগঞ্জ: আলুর দামে ধস, সরকারি দর ২২, কৃষক পান ৫ টাকা by রহিদুল মিয়া

হিমাগারে প্রতি কেজি আলুর দাম ১২ টাকা হলেও হিমাগারভাড়া বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে আসছে মাত্র ৫ টাকার কিছু বেশি।

আলুর দামে ধস নামায় ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন রংপুরের তারাগঞ্জে কৃষকেরা। হিমাগার পর্যায়ে উৎপাদন খরচ ২৯ থেকে ৩০ টাকা হলেও আলু বিক্রি করে কৃষকেরা হাতে পাচ্ছেন মাত্র ৫ টাকা। অথচ ২৭ আগস্ট হিমাগার পর্যায়ে আলুর কেজি ২২ টাকা বেঁধে দেয় সরকার। কিন্তু এ দামে হিমাগারে কেউ আলু কিনছেন না।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার মৌসুমে তারাগঞ্জে ৪ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। তিনটি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে ১৬ হাজার মেট্রিক টন। এ পর্যন্ত হিমাগার থেকে আলু বের হয়েছে সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন। অথচ গত বছর এ সময় তিন ভাগের দুই ভাগ আলু বের করা হয়েছিল।

ইকরচালীর বড় আলুচাষি ইকবাল হোসেন বলেন, ‘হিমাগারে জায়গা না পেয়ে গোডাউনে, ঘরে আলু সংরক্ষণ করেছি। তা পচে যাওয়ায় ট্রাকে ট্রাকে সড়কের ধারে ফেলেছি। হিমাগারে যে আলু আছে, দাম না থাকলে ছেড়ে আসতে হবে।’

চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে আলু উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২২ টাকা। বস্তা, গাড়িভাড়া, শ্রমিকের খরচ, হিমাগারে সংরক্ষণ খরচসহ এ খরচ দাঁড়াচ্ছে কেজিপ্রতি ২৯ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু বর্তমানে বাজারে আলুর দাম প্রতি কেজি ১২ টাকা। হিমাগারে প্রতি কেজি আলুর দাম ১২ টাকা হলেও হিমাগারভাড়া বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে আসছে মাত্র ৫ টাকার কিছু বেশি। ফলে সরকারি ক্রয় দর ২২ টাকা আর বাস্তবে কৃষকের প্রাপ্তি ৫ টাকার মধ্যে বিশাল বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এতে হিমাগার পর্যায়ে কেজিতে কৃষকের ১৮ টাকা লোকসান থাকছে।

গত শুক্রবার তারাগঞ্জের তিনটি হিমাগার ঘুরে দেখা গেছে, প্রকারভেদে প্রতি কেজি আলু সাড়ে ১০ থেকে ১২ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা না থাকায় তেমন কর্মব্যস্ততা দেখা যায়নি। হিমাগারের শেডগুলো অধিকাংশ ফাঁকা। সিনহা হিমাগারে কথা হয় বামনদীঘি গ্রামের কৃষক সোনা মিয়ার সঙ্গে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তিন একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। জমিতে তাঁর উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ২০ টাকা পড়েছে। মৌসুমের শুরুতে ১৪ টাকা কেজি হওয়ায় লোকসানের ভয়ে আলু হিমাগারে রেখেছেন। সরকার ২২ টাকা দাম বেঁধে দিলেও, সেই দামে কেউ আলু নেন না।

তারাগঞ্জের প্রামাণিকপাড়ার কৃষক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়ছে ২০ টাকা, বস্তা, গাড়িভাড়া, হিমাগারভাড়াসহ ৩০ টাকা। অথচ বাজারে পাচ্ছি ১২ টাকা। হিমাগারের খরচ বাদ দিয়ে হাতে আসে ৫ টাকা। এভাবে লোকসান হলে কৃষকেরা আলু চাষ ছেড়ে তামাক চাষে ঝুঁকবেন।’

সিনহা হিমাগারের ব্যবস্থাপক দুলাল হোসেন বলেন, ‘হিমাগারের আলু সংরক্ষিত আছে১ লাখ ৫১ হাজার বস্তা। এই সময়ে গত বছর তিন ভাগের বেশি আলু বের হয়েছিল। এবার আজ পর্যন্ত মাত্র ২৮ হাজার বস্তা আলু বের হয়েছে। আলুর অবস্থা খুবই ভয়াবহ।’

তারাগঞ্জের এন এম হিমাগারের ব্যবস্থাপক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘১৫ ডিসেম্বরে মধ্যে হিমাগারের সব আলু বের হয়ে যায়। কিন্তু এবার যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হয় না আলু সব বের হবে। ২ লাখ ৬০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা থাকলেও এ পর্যন্ত আলু বের হয়েছে মাত্র ৪৫ হাজার বস্তা।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বলেন, সরকারিভাবে রংপুরে আলু কেনা হলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন। আগামী মৌসুমে আলুর চাষ কমবে। কৃষকেরা যাতে পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করেন, তা নিয়ে মাঠে কাজ করছেন, যাতে কৃষকেরা লোকসানে না পড়েন।

আলুর দাম না থাকায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। ক্রেতা না পাওয়ায় হিমাগারের বারান্দায় এভাবে ফেলে রাখা হয়েছে আলু। গতকাল তারাগঞ্জের এন এন হিমাগারে
আলুর দাম না থাকায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। ক্রেতা না পাওয়ায় হিমাগারের বারান্দায় এভাবে ফেলে রাখা হয়েছে আলু। গত ১৯ সেপ্টেম্বর তারাগঞ্জের এন এন হিমাগারে। ছবি: প্রথম আলো

Friday, February 14, 2025

নিভৃতপল্লির নারীদের হাতে তৈরি জুতা যাচ্ছে বিদেশে by রহিদুল মিয়া

আরজিনা খাতুন, লিপি বেগম, সুলতানা আক্তার, আয়েশা বেগমকে এখন আর না খেয়ে থাকতে হয় না। শুনতে হয় না স্বামীর গালমন্দও। কারণ, এখন সংসারে অর্থ জোগান দিচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের মতো রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের হাজারো নারী ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেডে জুতা তৈরি করে দারিদ্র্যকে জয় করেছে। সংসারে এসেছে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। তাঁদের হাতে তৈরি জুতা ইউরোপ–আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

ইতিবাচক কোনো পরিবর্তনের শুরুটা হয় কারও হাত ধরেই। তারাগঞ্জের সেই শুরুটা করেছিলেন দুই সহোদর মো. হাসানুজ্জামান ও মো. সেলিম। নীলফামারী সদরের বাবুপাড়া গ্রামে তাঁদের বাড়ি। তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে ঘনিরামপুর গ্রামে সাড়ে ৯ একর জমির ওপর ওই জুতা কারখানা গড়ে তোলেন তাঁরা।

হাসানুজ্জামান বলেন, আশির দশকে তাঁরা দুই ভাই বিদেশে পাড়ি জমান। আমেরিকায় শুরু করেন আবাসন ব্যবসা। সেখানে ব্যবসায় সফলতা আসে। এরপর দেশরে মাটিতে বিনিয়োগের চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই ২০০৯ সালে নীলফামারীতে ও ২০১২ সালে মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষকদের জন্য বীজ ও আলু সংরক্ষণরে জন্য হিমাগার স্থাপন করেন।

ব্লিং লেদার নামের জুতা কারখানা তারাগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালে। এখানকার জুতা এখন ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষের। ২০২৩ সালে বড় ভাই মো. সেলিম মারা যান। হাসানুজ্জামান বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়্যারম্যান।

আজ শুক্রবার ওই প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় ইউনিটের উদ্বোধন করা হয়েছে। রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম ফিতা কেটে এই ইউনিটের উদ্বোধন করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক খাজা রেহান বখ্ত।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ৩০০ শ্রমিকের থাকার জন্য আবাসিক ভবন রয়েছে এ কারখানায়। তাইওয়ান থেকে আনা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে কারখানার ভেতরে জুতা তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের ১০ ভাগ পুরুষ ও ৯০ ভাগ নারী। ভবনটির চারদিকে শোভাবর্ধনের জন্য লাগানো হয়েছে ফুলের গাছ।

কারখানার অন্তত ৫০ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পাঁচ থেকে ছয় বছর আগেও তাঁদের নির্দিষ্ট কোনো আয়ের পথ ছিল না। বছরের অর্ধেক সময় কাজের খোঁজে গ্রামের বাইরে থাকতে হতো পুরুষদের। কাজের অভাবে উঠতি বয়সের তরুণ ও নারীরা অলস সময় কাটাত। কারখানা গড়ে ওঠায় গ্রামবাসীর কর্মহীনতা ঘুচেছে। উপার্জন বেড়েছে, বেড়েছে জীবনযাত্রার মান।

ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের মার্জিনা খাতুন (৩১) জানান, ভিটামাটি ছাড়া কিছু ছিল না। এখন টিনের ঘর ও নিজের ৪ শতাংশ জমি আছে। গাছগাছালি ঘেরা বাড়িতে হাস-মুরগি, ছাগল ও গাভি পালন করছেন। জুতা তৈরির কাজ করে মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করছেন। সন্তানেরা স্কুলে যাচ্ছে সংসারে তাঁর (মর্জিনা) মতামতও এখন গুরুত্ব পায়।

কথা হয়, কারখানায় কর্মরত হাজীরহাট গ্রামের নারী শ্রমিক সীতা রানীর সঙ্গে (২৫)। তিনি বলেন, ‘স্বামী ছেড়ে গেছে তিন বছর আগে। খুব সমস্যায় ছিলাম। পরে ব্লিং লেদারে এসে প্রশিক্ষণ নেই। তারপর এখানে চাকরিও করছি। এখন আর কোনো চিন্তা নেই। মাস গেলেই টাকা পাচ্ছি ভালো আছি।’

প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. হাসানুজ্জামান বলেন, ‘দেশে নারীদের র্কমসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বড় ভাই সেলিমের উদ্যোগে নিভৃতপল্লীতে কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। কারখানাটি পরিচালনা করার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পাচ্ছি। গ্রামীণ নারীদের ছোঁয়ায় ৩০০ জোড়া থেকে এখন ১০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদন হচ্ছে। ২০২৬ সালের শেষে দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের ইচ্ছে আছে। সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।’

জুতা তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। আজ শুক্রবার রংপুরের তারাগঞ্জের ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেডে
জুতা তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। আজ শুক্রবার রংপুরের তারাগঞ্জের ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেডে। প্রথম আলো

Wednesday, December 11, 2024

রংপুর ভূমি কর্মকর্তা মোজাহিদের তেলেসমাতি কারবার

মো. মোজাহিদ। বিগত আওয়ামী সরকারের দোসর ও দালাল হিসেবে পরিচিত রংপুর শালবন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা মোজাহিদ একযুগ ধরে প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে তৈরি করেছেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট। দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অপকর্মের স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন। বৈধ দলিলের তোয়াক্কা না করে খাস খতিয়ানে জমি তুলে শত শত মানুষকে করছেন হয়রানি। আবার সরকারি খাসজমি ব্যক্তির নামে রেকর্ড করে হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তার এ দুর্নীতি ও অপকর্মের সহযোগিতা করেছেন রংপুর রাজস্ব বিভাগের সাবেক হিসাব তত্ত্বাবধায়ক আমজাদ হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা তুষার কান্তি মণ্ডলসহ একাধিক নেতা। বিনিময়ে তারাও নিয়েছেন অবৈধ সুবিধা। জনগণের টাকায় বেতন নেয়া এ চাকরিজীবী ছোট-বড় কাউকে তোয়াক্কা না করে নিজেকে ভাবেন মহারাজা, এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। চাকরির সুবাদে ভূমি বাণিজ্যে অর্জন করেছেন কোটি কোটি টাকা। যা তদন্ত হলে বেরিয়ে আসবে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। জানা যায়, ভূমি জালিয়াতি সিন্ডিকেট মোজাহিদের নামে আদালতে মামলা রয়েছে। দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ পেলেও বিগত সরকারের নেতাদের ছত্রছায়ায় ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পার পেয়েছেন। সম্প্রতি বেপরোয়া, দুর্নীতিবাজ মোজাহিদের বিরুদ্ধে রংপুর জেলা প্রশাসক, ভূমি মন্ত্রণালয়, দুদক, বিভাগীয় কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল মানবজমিনকে বলেন, মোজাহিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তদন্তের রিপোর্ট পেয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। ছাড় দেয়া হবে না, আইনের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা হবে। অনুসন্ধানে জানা যায়, রংপুর নগরীর কামাল কাছনার শামসুল হক একসনা মেয়াদে জমি লিজ নিয়ে খাজনা প্রদান করে ৪৭ বছর ধরে ভোগ-দখল করেছেন। সম্প্রতি ভূমি সিন্ডিকেটের ইন্ধনে আব্দুল হাই নামে এক ব্যক্তি ওই জমির মালিকানা দাবি করছেন। তার প্রশ্ন এতদিন কোথায় ছিলেন তিনি। এছাড়াও কামাল কাছনা মৌজার আরএস-৭২৭৩ হাল দাগের সরকারি আট শতক খাসজমি জাল দলিল তৈরি করে দুর্নীতিবাজ মোজাহিদ চক্র রক্ষক ও ভক্ষকের কাজ করছেন। শালবন ভূমি অফিসে খাজনা-খারিজের ভলিউমের পাতা ছেঁড়া, হোল্ডিং নেই, তালিকায় আছে, দীর্ঘদিন খাজনা দেয়া নেই বলে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি করে মোটা অঙ্কের টাকা নিচ্ছে। রাধাবল্লভ মৌজার ২৭৭৯ দাগের সরকারি জমি, আরএস রেকর্ড সেটেলমেন্ট অফিসে নিজে যোগসাজশ করে নিজের নামে রেকর্ড করে। এছাড়া একই মৌজায় ১৮৮৮ দাগের রংপুর সরকারি কলেজের জমি অন্যের নামে রেকর্ড করে দেন এবং কামাল কাছনা মৌজার ৩৪৭৩২৬ দাগের জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে দেন।

 অভিযোগে বলা হয়, এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হলে জালিয়াতি চক্রের মূলহোতা মোজাহিদ, আমজাদ গংয়ের প্রমাণ বেরিয়ে আসবে। জুম্মাপাড়ার হারুন, শালবনের শাহাবুদ্দিনসহ অনেকে অভিযোগ করে বলেন, ক্রয়কৃত একই দাগের জমি দুই অংশীদারের একজন রহস্যজনকভাবে খাজনা পরিশোধ করলেও অপরজনের খাজনা নেয়া হচ্ছে না বিভিন্ন অজুহাতে। এ ব্যাপারে ভূমি কর্মকর্তা মোজাহিদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আমি অপকর্ম করিনি। এটা হয়তো শালবন ভূমি অফিসের সাবেক কর্মকর্তা মেজবাহ ও শাহাজাদা মিয়া করেছে। একই দাগের জমি একজনের খাজনা নিলে, অপরজনের কেন নিচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি কৌশলে এড়িয়ে বলেন, হয়তো এটা ভুলে হয়েছে। মানবাধিকারকর্মী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, খাজনা, নামজারি, খারিজ করতে প্রতিদিন মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। ভূমি অফিসে অসাধু কর্মকর্তা ও দালাল চক্র সিন্ডিকেট বিভিন্ন অজুহাতে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের বদলি করে দিয়ে আরেক জায়গায় দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। এটা সঠিক বিচার নয়। দুর্নীতিবাজদের অপসারণ করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

mzamin

Thursday, November 21, 2024

বিএনপি’র মামলা বাণিজ্যের ঘটনায় উত্তপ্ত রংপুর by জাভেদ ইকবাল

রংপুর মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামুর বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্যের ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দলের পরিস্থিতি। পাল্টাপাল্টি অভিযোগে সংবাদ সম্মেলনে শুরু হয়েছে তোলপাড়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে রংপুরে হতাহতকে ঘিরে বিএনপি’র বিরুদ্ধে নিরীহ, নিরপরাধ মানুষজনকে মামলায় জড়িয়ে হয়রানি ও বাণিজ্যের অভিযোগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে নগরবাসী। ক্ষুব্ধ সচেতন নাগরিক রবিউল ইসলাম বলেন, দেশ থেকে এক চোরকে তাড়িয়ে এখন ডাকাতের হাতে পড়েছি। বিব্রতবোধ করে খোদ ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্রদলের সাবেক কারমাইকেল কলেজের জিএস বিএনপি নেতা শহিদুল ইসলাম মিজুসহ একাধিক নেতাকর্মীরা। তারা মানবজমিনকে বলেন, দু’চারজনের জন্য দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপ কামনা করে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে গতকাল রংপুর মহানগর বিএনপি আহ্বায়কের মামলা বাণিজ্যের প্রতিবাদ করায় রোষানলে ফেলে মিথ্যা অপ-প্রচারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছেন মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক কমিটির সদস্য কাওছার জামান বাবলা। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৩ই নভেম্বর বিএনপিকর্মী মামুনুর রশীদ মামুন রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় বাদী হয়ে ১৮১ জনের নামে মামলা দায়ের করেন।

আওয়ামী লীগ ছাড়া নিরীহ, নিরপরাধ মানুষসহ রংপুর ও পার্শ্ববর্তী জেলার বাসিন্দাদের মামলার বাদী কেন করা হয়েছে জিজ্ঞাসা করলে মামুন জানান- তিনি ২৫ জনের নাম দিলেও মহানগর আহ্বায়ক সামাসুজ্জামান সামু অন্যদের আসামি করে মামলায় সই করাতে বাধ্য করেন। এ কথোপকথনের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। তিনি বলেন, বিএনপি নেতা সামু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গুলি চালানো মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার উৎপল কুমার, উপ-পুলিশ কমিশনার আবু মারুফ হোসেনসহ একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়েছেন। কাওছার জামান বাবলা বলেন, বিএনপি’র রাজনীতি করার কারণে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমি তাজহাট ও ডিবি অফিস পোড়ানোর মামলায় জেল খেটেছি। বিএনপি’র আহ্বায়ক সামু তো জেল খাটে নাই। রংপুর, ঢাকা, খুলনায় আমার বিরুদ্ধে ৭টি রাজনৈতিক মামলা হয়েছে। বিএনপি করার কারণে খুলনায় আমার জুটমিল দখল হয়েছে। অথচ প্রতিপক্ষ বলে দলে আমার কোনো অবদান নাই। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, মাহিগঞ্জের পরেশনাথ মন্দিরের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা রামকৃষ্ণ সোমানী, সহ-সভাপতি বরুণ কান্তি সাহা, বিকাশ চন্দ্র মহন্ত, মহানগর বিএনপি’র সদস্য সেলিম চৌধুরীসহ অন্যান্য নেতাকর্মী। এর আগে মিথ্যা অভিযোগ, হয়রানি ও মামলা বাণিজ্যের হোতাদের গ্রেপ্তারের দাবিতে হুঙ্কার দিয়েছেন রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ২৫নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নুরুন্নবী ফুলু।

এক  সংবাদ সম্মেলনে তিনি লিখিত বক্তব্যে সাংবাদিকদের বলেন, আমি সাবেক রংপুর পৌরসভা ও বর্তমান রংপুর সিটি কর্পোরেশনের পরপর পাঁচবার নির্বাচিত কাউন্সিলর। জনপ্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ওয়ার্ডবাসীকে সেবা দিয়ে আসছি। আমি কখনও কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, বর্তমানেও নেই। অথচ গত ১৯শে জুলাই রংপুর সিটি কর্পোরেশনের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতের ঘটনায় মামুনুর রশীদ মামুন রংপুর মেট্রোপলিটন কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। যেখানে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ রংপুর নগরী, জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী জেলার ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। মামলায় আমাকে ১৪৭ নং আসামি করা হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিপক্ষে আমার অংশগ্রহণ ছিল না, যা ওয়ার্ডবাসী সকলেই অবগত রয়েছেন। ফুলু বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জানতে পেরেছি মামলার বাদী মামুনুর রশীদ মামুন বিএনপি করেন এবং রংপুর মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু এ মামলার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল আমাকে হয়রানিসহ অবৈধ সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে আমাকে জড়িয়েছে। তিনি কঠোর আন্দোলনের হুমকি দিয়ে বলেন, আগামী ২৪ নভেম্বরের মধ্যে আমার নাম প্রত্যাহারসহ আমার মতো নিরপরাধ, নিরীহ মানুষের হয়রানি বন্ধ না হলে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। উল্লেখ্য, রংপুর মহানগর বিএনপি’র আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামুর বিরুদ্ধে মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন নেতাকর্মীরা। এর প্রতিবাদে বিএনপি কার্যালয়ে মহানগরের আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে এক সংবাদ সম্মেলন করেন।

mzamin


Wednesday, October 16, 2024

রংপুরে সারজিস হাসনাতকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা জাপা’র

রংপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় পার্টি মুখোমুখি অবস্থান করছে। জাতীয় পার্টিকে আওয়ামী লীগের দোসর বলায় সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমকে রংপুরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে দলটি। এ নিয়ে রংপুরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। দুই সমন্বয়ককে রংপুরে প্রবেশ ঠেকাতে জেলা-উপজেলা, মহানগর কমিটিকে নির্দেশ দিয়েছে দলটির কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। অপরদিকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা জাতীয় পার্টির বক্তব্য প্রত্যাহারসহ হুঁশিয়ার দিয়েছেন।

সোমবার রাতে রংপুর নগরীর সেন্ট্রাল রোডস্থ জাতীয় পার্টির দলীয় কার্যালয়ে জেলা, মহানগর এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে দলটির যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়। দলের কো- চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। বক্তব্য রাখেন, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এসএম ইয়াসির আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা। সভাপতির বক্তব্যে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ রংপুরে আসতে পারবে না। যদি কোনো ফেসবুকে মেসেজে দেখেন তারা রংপুরে আসছে, তাহলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন। আমরা দেখিয়ে দিতে চাই জাতীয় পার্টির শক্তি কতটুকু। এই আন্দোলন পুলিশ, বিজিবি না র‌্যাব ঠেকাতে তাই দেখা যাবে। তিনি বলেন, আপনারা প্রত্যেক উপজেলার নেতৃবৃন্দ কান খুলে শোনেন, মহানগর থেকে যখনই ঘোষণা আসবে, সারজিস ও হাসনাতের কোনো অংশগ্রহণ রংপুরের মাটিতে হতে দেয়া হবে না। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ডিআইজি, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ও বিভাগীয় কমিশনার আপনারা কান খুলে শুনে রাখেন, রাজনৈতিক সংলাপে জাপাকে আমন্ত্রণ করা না হলে সেই সংলাপ রংপুরে হতে দেবো না। জাপা ধ্বংসাত্মক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। রংপুরে আমাদের অস্তিত্ব। এটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনে আমি মোস্তফা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেবো।

মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার এ বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। তারা সোমবার দিবাগত মধ্য রাতে নগরীর মেডিকেল মোড় এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় তারা ‘স্বৈরাচারের দোসরেরা হুঁশিয়ার সাবধান, ‘দালালের ঠিকানা এই রংপুরে হবে না’, ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ শেষ হয়নি যুদ্ধ’, ‘সারজিস-হাসনাতের অপমান মানবে না রংপুরের জনগণ’, ‘২৪’র বিপ্লবীদের অপমান মানবে না জনগণ’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। এরপর মেডিকেল মোড়ে বক্তব্য রাখেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুরের সমন্বয়ক ইমরান আহমেদ, ইমতিয়াজ ইমতি, মোতাওয়াক্কিল বিল্লাহসহ অন্যরা।  এ সময় বক্তারা বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম দুই সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম। তাদেরকে নিয়ে কথা বলার দুঃসাহস যদি কেউ দেখায়, তাদের সমুচিত জবাব এই রংপুর থেকেই প্রথম শুরু হবে। আমরা জাতীয় পার্টির বক্তব্য প্রত্যাহারের হুঁশিয়ারি দিচ্ছি।

mzamin

Sunday, October 13, 2024

ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে কাজ করা গণমাধ্যমের বিচার হবে

জুলাই-আগস্ট গণহত্যার পক্ষে যেসব গণমাধ্যম ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে, তাদের বিচার করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, এ ঘটনায় ইতিমধ্যে কয়েকটি মামলা হয়েছে এবং কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছেন। আরও যাদের সম্পৃক্ততা আছে, তদন্ত সাপেক্ষে তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে। গতকাল সকাল ৯টায় ঢাকা থেকে রংপুরে যাওয়ার পথে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় তাকে নীলফামারী জেলা ও সৈয়দপুর উপজেলা প্রশাসন এবং সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। সৈয়দপুর জেলা বিএনপি ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও পৃথকভাবে উপদেষ্টাকে শুভেচ্ছা জানান। নাহিদ ইসলাম রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগদানের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে আসেন। এই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন নাগরিক ঐক্য কমিটির সদস্য সচিব আকতার হোসেন।

এ সময় নীলফামারীর জেলা প্রশাসক নায়িরুজ্জামান, সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুর-ই আলম সিদ্দিকী, সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল ইসলাম, সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর হাফেজ মাওলানা আবদুল মুনতাকিম তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
এরপর সড়কপথে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান যোগ দিতে যান। অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তথ্য উপদেষ্টা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদকে গভীরভাবে স্মরণ করে বলেন, ‘আবু সাঈদসহ এই জুলাই বিপ্লবের সব শহীদদের স্মরণ করছি। আবু সাঈদরা যে কারণে শহীদ হয়েছেন, গণঅভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা তারা ধারণ করেছিলেন, সেই একই আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে আমরা বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের সহযোদ্ধা শহীদ আবু সাঈদ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তিনি লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। তার এই রক্তের বিনিমিয়ে আমরা স্বাধীনতা ভোগ করছি। এই সময়ে প্রতিনিধি হিসেবে আমরা সরকারের কাজ করছি। সম্প্রতি ভারত ধর্ম ও জুলাই বিপ্লব নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়া হবে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই সত্যটা তুলে ধরতে হবে। যেটা সত্য, যেটা আসলে দেশে ঘটেছে, সেই জিনিসটাই যেন তুলে ধরতে পারি। দেশের মানুষের কাছে প্রচার করতে পারি, এতটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে। এ বিষয়ে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, ফেসবুকে নানা গুজব রটানো হচ্ছে, ফেক আইডি খুলে নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ফ্যাসিবাদী শক্তি রাজপথ থেকে পরাজিত হয়ে এখন অনলাইনে তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করছে। আমরা যাতে সচেতন হই, কোনো মিথ্যা তথ্য বা গুজব বিশ্বাস না করি। স্থানীয় সাংবাদিকেরা রংপুর অবহেলিত জেলা কেন, জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা  বলেন, আমরা অবশ্যই মনে করি, রংপুর অবহেলিত। বাজেটগুলোতে রংপুরে অল্প পরিমাণ বাজেট দেয়া হয়। তার দ্বিগুণ, তিনগুণ বাজেট দেয়া হয় গোপালগঞ্জে। এই যে বৈষম্য, এই বৈষম্যের বিরুদ্ধেই আমাদের লড়াই ছিল। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আমরা অবশ্যই সে অনুযায়ী কাজ করছি। রংপুরের যে বৈষম্য অবহেলা, তা অবশ্যই আমরা দূর করবো। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করে না। বাংলাদেশের যা ন্যায্য প্রাপ্তি, সেই ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে কাজ করা হচ্ছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যাগুলো প্রসঙ্গে বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদ হয়েছেন, সেখানে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অবহেলিত থাকবেন না, তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. শওকাত আলী, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন মোরশেদ হোসেন, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন মিজানুর রহমান, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন কমলেস চন্দ্র রায়, কলা অনুষদের ডিন শফিকুর রহমান, বিজনেস স্টাডিজের ডিন ফেরদৌস রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

mzamin

Wednesday, October 9, 2024

চোখে বুলেটবিদ্ধ আবেদের পরিবারকে কে দেখবে? by জাভেদ ইকবাল

১৯শে জুলাই বৃহস্পতিবার। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে উত্তাল রংপুর। দফায় দফায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছিল নগরীতে। সুপার মার্কেটে নিয়মিত মাস্ক বিক্রি করে সংসার চালানো আবেদ সেদিনও বেরিয়েছেন, তবে সেদিন শুধু মাস্ক বিক্রির উদ্দেশ্যে নয়, আবেদ বেরিয়েছেন ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতেও। সেদিন ছাত্রদের বিক্ষোভ-স্লোগানের সঙ্গে মিশেছিল তারও প্রতিবাদী চিৎকার। হঠাৎ বিক্ষোভে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। বেশ কয়েকটি রাবার বুলেট লাগে আবেদের শরীরে। তারই একটি আঘাত করে চোখে। তাকে নেয়া হয় হাসপাতালে। সেদিন থেকেই আবেদের চোখে পৃথিবীর একটিই রং, সেটি কালো।

রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার আবেদুল ইসলাম আবেদ লুঙ্গি-গেঞ্জি ও কালো চশমা চোখে বসে আছেন তার জীর্ণ-শীর্ণ বাড়ির উঠানে। পাশে বসে স্ত্রী মৌসুমী বেগম। উঠানে খেলা করছে আবেদের দেড় বছরের শিশু। কিন্তু এর কিছুই দেখতে পারছেন না আবেদ।  বৃদ্ধ বাবা-মাসহ ৫ জনের সংসার আবেদের। আবেদ জানান, ১৯শে জুলাই নগরীর সুপার মার্কেটের সামনে মাস্ক বিক্রি করছিলেন তিনি। বিকালে ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে আসলে সিটি করপোরেশনের সামনে পুলিশ বাধা দেয় এবং ছাত্রদের ওপর গুলি ছোড়ে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা দেখে অন্যদের মতো আবেদও ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান। এতে তার শরীরে ও চোখে রাবার বুলেট লাগে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবেদের শরীরের রাবার বুলেট অপসারণ করা হলেও চোখের আলো ফেরানো সম্ভব হয়নি। গত ২১শে জুলাই চিকিৎসকের পরামর্শে ঋণ করে পরিবারের সদস্যরা জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে আবেদকে ভর্তি করে। দু’দিন চিকিৎসা করে দৃষ্টিশক্তি না ফেরায় ঢাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২৪শে জুলাই পর্যন্ত তার চিকিৎসা চলে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন আবেদ চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে। তবে কর্নিয়া স্থাপন করা গেলে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসতে পারে। এতে প্রয়োজন বিপুল অঙ্কের টাকা। একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি দৃষ্টি হারানোয় আবেদের পরিবার দিশাহারা হয়ে পড়েন। তার ওপর ঋণ করে আবেদের চিকিৎসা করানোয় পাওনাদাররা টাকার জন্য প্রতিদিন চাপ দিচ্ছে।

ভুক্তভোগী আবেদ বলেন, কতোদিন হলো আমার শিশু সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা’র মুখ দেখি না। আর তাদের মুখ দেখতে পারবো কিনা, এটি ভেবে খুবই খারাপ লাগে। স্ত্রী মৌসুমী বেগম বলেন, আমার স্বামীর উপার্জন দিয়ে সংসার চলতো। এখন বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি, আমার সন্তান ও আমাকে কে দেখবে। বাবা নুরুল হক বলেন, ঢাকায় ডাক্তাররা বলছে কর্নিয়া যদি স্থাপন করা যায় তবে আবেদ চোখে দেখতে পারবে। সেজন্য অনেক টাকা লাগবে। আমি সেই টাকা কোথায় পাবো। গায়ে তো শক্তি নাই যে কাজ করে টাকা যোগাড় করবো। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি তারা যেন আমার ছেলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে এই সংসারের ৫ জনকে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে সহযোগিতা করে। মা রবেদুন নেছা বলেন, আমাদের বাড়ির ভিটা ছাড়া আর কোনো সম্পদ নাই। আবেদের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ হয়েছে। সরকার আমাদের দিকে যেন দৃষ্টি দেয়।

mzamin

Sunday, August 18, 2024

আবু সাঈদ হত্যার তদন্ত নিয়ে সংশয় by জাভেদ ইকবাল

আবু সাঈদ। কোটা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগী রংপুরের এই শিক্ষার্থী। যার রক্তের বিনিময়ে এসেছে নতুন স্বাধীনতা। ন্যায্য দাবি আদায়ে বেরোবি’র বিপ্লবী শিক্ষার্থী। বন্দুকের নলের সামনে বুক চিতিয়ে দিয়েছিলেন। প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান। তার নিহতের ঘটনায়  বারুদ জ্বলে উঠেছিল সারা দেশের ছাত্র-জনতার বুকে। অসহযোগ আন্দোলনে পতন হয়েছে শেখ হাসিনার সাম্রাজ্যের। সূচনা হয়েছে নতুন এক ইতিহাসের। সেই মহানায়কের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।

মৃত্যুর এক মাসেও আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ড নিয়ে হয়নি কোনো মামলা। পুলিশের করা তাজহাট থানার আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের অংশে তদন্ত করছে পিবিআই। তবে কোটা আন্দোলনের সময় দায়ের করা পুলিশের মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন আইন উপদেষ্টা। ঘোষণা অনুাযায়ী তাজহাট থানার মামলাটি প্রত্যাহার হলে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অবিলম্বে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা, তদন্তের জন্য কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।

আবু সাঈদ হত্যায় সুনির্দিষ্ট মামলা হয়নি: গত ১৬ই জুলাই আন্দোলনে বেরোবি শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষে নিরস্ত্র আবু সাঈদের মৃত্যু হয়। পরদিন ১৭ই জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় পরস্পর যোগসাজশে বেআইনি জনতাবদ্ধে সাধারণ ও মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সরকারি কাজে বাধার সৃষ্টি করে গুরুতর জখম, চুরি, ভাঙচুর, ক্ষতিসাধন, অগ্নিসংযোগ ও নিরীহ ছাত্রকে হত্যার অপরাধে মেট্রোপলিটন তাজহাট থানায় মামলা করেন। এতে আসামি করা হয় অজ্ঞতানামা উচ্ছৃঙ্খল দুই থেকে তিন হাজার আন্দোলনকারী ছাত্র নামধারী দুর্বৃত্তসহ বিএনপি, জামায়াত-শিবির সমর্থিত নেতাকর্মীকে। মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়‘ বিভিন্ন দিক থেকে আন্দোলনকারীদের ছোড়া গোলাগুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে একজন শিক্ষার্থী রাস্তায় পড়ে যায়। তখন সহপাঠীরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কোনো কমিটিই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। সেইসঙ্গে আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা আবু সাঈদের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলায় মাহিম নামে এক নাবালক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে মেট্রোপলিটন পুলিশ। দু’সপ্তাহ জেল খাটার পর আদালতের মাধ্যমে জামিনে মুক্তি পায় ওই কিশোর। এদিকে গত ৩রা আগস্ট আবু সাঈদ নিহতের ঘটনায় অপেশাদার আচরণের অভিযোগে এএসআই আমীর হোসেন ও তাজহাট থানার কনস্টেবল সুজন চন্দ্রকে সাময়িক বরখাস্ত করে মেট্রোপলিটন পুলিশ। গত ১২ই আগস্ট তাজহাট থানার মামলার আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের অংশটির তদন্তের ভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), রংপুর। পরদিন আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের সময় দায়িত্বে থাকা রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।  

আবু সাঈদ হত্যার বিচার নিয়ে সংশয়: গত ১৪ই আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ঢাকায় সংবাদ সম্মেলনে জানান, কোটা পদ্ধতি সংস্কার ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারা দেশে পুলিশের করা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা আগামী ৩১শে আগস্টের মধ্যে প্রত্যাহার করা হবে। এতে করে পুলিশের করা তাজহাট থানার মামলাটি প্রত্যাহার হলে আবু সাঈদের হত্যার ঘটনায় আর কোনো মামলা থাকবে না। সচেতনদের মতে, আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা না হওয়ায় এটির সঠিক বিচার নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। পুলিশের দায়ের করা মামলা, পুলিশের একটি বিভাগ তদন্ত করায় এটির সঠিক তদন্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। সেই সঙ্গে পরিবার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আবু সাঈদের হত্যার ঘটনায় মামলা না হলে তৃতীয় পক্ষ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করে বিভিন্ন মহলকে মামলায় জড়ানোর হুমকি নিয়ে বাণিজ্যে মেতে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছে।

পিবিআই যা বলছে: আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে পিবিআই রংপুর অফিসের এসআই জিল্লুর রহমান মামলাটি তদন্ত শুরু করেছেন। পিবিআই বলছে, আইন উপদেষ্টার নির্দেশে পুলিশের করা মামলাগুলো খারিজ হলেও আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডের মামলাটি থেকে যাবে। পিবিআই রংপুরের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, আবু সাঈদের পরিবার কিংবা অন্য কোনো পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি। যদি বিজ্ঞ আদালত কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মামলা হয় তবে আমরা অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে তদন্ত করবো। তবে তাজহাট থানায় দায়ের করা মামলার আবু সাঈদের অংশের তদন্ত ভার পেয়ে আমরা তদন্ত শুরু করেছি।

আবু সাঈদ হত্যার বিচারে সোচ্চার শিক্ষার্থীরা: গত ১৪ই আগস্ট থেকে চার দফা দাবিতে ‘প্রতিরোধ সপ্তাহ’ পালন করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। প্রতিদিনের কর্মসূচিতে আবু সাঈদসহ কোটা আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থীদের সঠিক বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। ৪ দফা দাবি আদায়সহ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছেড়ে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। রংপুর সরকারি কলেজের ছাত্র মনিরুজ্জামান বলেন, দেশবাসী দেখেছে আবু সাঈদকে কীভাবে পুলিশ লীগ গুলি করে হত্যা করেছে। শিক্ষার্থী তাসিন বলেন, আবু সাঈদ ভাইয়ের মৃত্যু স্বৈরাচার সরকার হটাও বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছে। আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন রংপুর দাবি জানাচ্ছি যেন আবু সাঈদ ভাইয়ের পরিবার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি মামলা দায়ের করে। এরপরেও কেউ মামলা করতে এগিয়ে না আসলে ছাত্রদের পক্ষ থেকে আবু সাঈদ হত্যা মামলা দায়ের করে খুনিদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে।

Sunday, August 11, 2024

আবু সাঈদের বাড়িতে আপ্লুত প্রধান উপদেষ্টা by জাভেদ ইকবাল

আবু সাঈদ। পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক চিতিয়ে শহীদ হওয়া এই তরুণের সাহস আর প্রতিবাদী ক্ষোভ ধারণ করে বিজয় এসেছে ছাত্র-জনতার। সাঈদের পর আন্দোলনে জীবন দিয়েছেন আরও কয়েকশ’ ছাত্র-জনতা।  তাদের আত্মত্যাগের পথ ধরে গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দায়িত্ব নেয়ার পর আনুষ্ঠানিক অফিস শুরুর আগেই গতকাল প্রথম রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের বাড়িতে ছুটে গিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সাঈদের বাবা-মা’সহ পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়ার সময় আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। সাঈদের কবর জিয়ারত ও মোনাজাতের পর সেখানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন ড. ইউনূস। যে পতাকা হাতে ছাত্র-জনতা আন্দোলন করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন সেই পতাকা তুলে দেন আবু সাঈদের বাবার হাতে।

প্রায় আধাঘণ্টা আলাপচারিতায় আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী, আবু হোসেনসহ পরিবারের সদস্যরা ৮ দফা দাবি সংবলিত একটি আবেদন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেন। এতে আবু সাঈদসহ ছাত্র-জনতার হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা, আবু সাঈদের স্মরণে ১৬ই জুলাইকে শহীদ আবু সাঈদ দিবস ঘোষণা করা, আবু সাঈদের স্মরণে পীরগঞ্জে একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, একটি পাবলিক গ্রন্থাগার, স্মৃতি সংরক্ষণাগার, একটি মসজিদ ও এতিমখানা নির্মাণ, আবু সাঈদের নামে তার নিজস্ব এলাকায় বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শহীদি মর্যাদায় ভূষিত করা এবং অষ্টম বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে ঘোষণা করা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পটভূমি মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা, তরুণদের জন্য একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ, জাফরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আবু সাঈদের সমাধিস্থল সংলগ্ন রাস্তাটি জাফরপাড়া মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রশস্তকরণের দাবি জানানো হয়।

এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সকলকে ঐক্যবদ্ধ করাই বর্তমান সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। নতুন স্বাধীনতা দিতে আবু সাঈদ যে স্বপ্নের জন্য বুক পেতে দিয়েছিল, আমাদের কাজ হলো- সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।

এটা গোটা জাতির কর্তব্য। আমি শুধু এখানে এসে কবর জিয়ারত করলাম, চলে গেলাম তা- না। এটা সারা জাতিকে বলতে চাই। যে লক্ষ্য নিয়ে বুক পেতে দিয়েছিল, যার কারণে কোটি কোটি ছেলে-মেয়ে বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ভয় পায় নাই। আবু সাঈদের জন্য আমরা যে নতুন বাংলাদেশ পেলাম, সেটি গড়ার দায়িত্ব আমাদের। তার কথা স্মরণ হবে- এই কাজ করার মধ্য দিয়ে।

তিনি বলেন, জাতি ঐক্যবদ্ধ হলে অতি দ্রুতই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, একটি মুক্তির জন্য আবু সাঈদ বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ছবি দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। একটা মানুষ বন্দুকের সামনে হাত উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে বলছে- মারেন। গুলি করেছে, একটু হেলে উঠে আবার  দাঁড়িয়েছে। পরে আবার একটা গুলি করেছে। আবু সাঈদ এখন পীরগঞ্জের না, তিনি এখন সারা বিশ্বের। আবু সাঈদ যে কাজ করেছে এটি নিয়ে যুগ-যুগান্তর কবিতা হবে, উপন্যাস হবে, নাটক হবে। মানুষ তাকে সারা জীবন স্মরণ করবে। এই সেই লোক এখানে শুয়ে আছে। তিনি বলেন, যারা ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে বড় হবে, স্কুলে আবু সাঈদের কথা পড়বে। নিজে নিজে প্রস্তুত হবে। আমিও ন্যায়ের জন্য লড়বো, আমিও বুক পেতে দিবো। আবু সাঈদ এখন ঘরে ঘরে। প্রত্যেক ঘরে আবু সাঈদ রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা এ মাটির সন্তান। এটা আবু সাঈদের বাংলাদেশ। এটা এক বাংলাদেশ, দুই  বাংলাদেশ না। দেশ নিয়ে পার্থক্যকারীদের বিরুদ্ধে আমরা আবু সাঈদের মতো রুখে দাঁড়াবো। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। তার মর্মস্পর্শী বক্তব্যের সময়ে সকলের চোখে অশ্রু চলে আসে। এ সময় আবেগতাড়িত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আন্দোলন সমন্বয়কারী ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নাহিদসহ অন্যরা। এরপর তিনি আবু সাঈদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন ও রংপুরের সমন্বয়কারীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোটা আন্দোলনে আহতদের দেখতে যান।
বিকালে রংপুর সার্কিট হাউজে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে ক্রয়ক্ষমতার আওতায় আনাই লক্ষ্য উল্লেখ করে সকলের সহযোগিতা চান।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নিরাপরাধীদের কোনো হয়রানি নয়। তাদেরকে ফুলের টোকাও দেয়া হবে না। আমরা অপরাধীদের বিচার করবো। দেশে সহিংসতা বন্ধ হলে ১৭ কোটি মানুষকে আরও বহু উপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, দেখা যাবে কতোদিনে ভালো হয়। এখন আপনারাই বিচার করেন কতোদিন হলে ভালো হবে। এটা তো কেউ এখনো বলে নাই।  

তিনি আরও বলেন, আমরা সবাই একটি পরিবার, সবাইকে উপরে উঠানোর চেষ্টা করবো। এখানে কেউ আমাদের বিদেশি আক্রমণকারী নেই, আমরা-আমরাই। একটি পরিবারে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া হতে পারে, তাই বলে সম্পর্ক নষ্ট হয় না। আমরা একটি পরিবার হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে চাই।

এর আগে বেলা আড়াইটায় রংপুর সার্কিট হাউজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।   
দুপুর পৌনে ২টায় রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যান প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিশ্ববিদ্যায়ের প্রশাসনিক ভবন মিলনায়তনে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের নানা দাবিসহ আগামীর বাংলাদেশ গড়তে তাদের প্রত্যাশার কথা শোনেন। এ সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, নতুন বাংলাদেশ তরুণদের বাংলাদেশ। তরুণদের এখন কেউ টেনে রাখতে পারবে না। পথ পরিষ্কার করতে হবে। বেগম রোকেয়া নারীদের মুক্ত করেছেন। এখন রংপুর পুরো বাংলাদেশকে মুক্ত করবে।

এর আগে সকাল ১১টায় তিনি হেলিকপ্টারে করে রংপুর পীরগঞ্জের মেরিন একাডেমিতে আসেন। এরপর সড়ক পথে উপজেলার মদনখালী ইউনিয়নের জাফরপুর বাবনপাড়া গ্রামে কোটা আন্দোলনে নিহত আবু সাঈদের বাড়িতে যান। সেখানে তার কবর জিয়ারতসহ পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, রংপুর বিভাগীয় কমিশনার জাকির হোসেন, ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলমসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

Monday, August 5, 2024

রংপুর রণক্ষেত্র, কাউন্সিলরসহ নিহত ৪, আহত শতাধিক

রংপুরে শিক্ষার্থী ও আওয়ামী লীগের ভয়াবহ সংঘর্ষে আওয়ামী-যুবলীগ ও ছাত্রলীগ, সিটি কাউন্সিলরসহ ৪ জনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে আন্দোলনকারীসহ বিক্ষুব্ধ জনতা। উত্তাল রংপুর, মাঠ এখন রণক্ষেত্র। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অসহযোগ কর্মসূচি চলাকালীন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালীন সময় আওয়ামী লীগের যুবলীগ-ছাত্রলীগের ক্যাডাররা দেশীয় অস্ত্র, ছোরা, তলোয়ার, এসএস পাইপসহ পিস্তল নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গুলি চালায়। তাদের গুলিতে এক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হলে নিয়ন্ত্রণহীন শিক্ষার্থীরা বেপরোয়া হয়ে পাল্টা ধাওয়া করে দু’জন যুবলীগ-ছাত্রলীগ কর্মীকে আটক করে পিটিয়ে হত্যা করে। এর পরপরই আওয়ামী লীগ নেতা, রংপুর সিটি করপোরেশনের ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হারাধন রায় ও ভাগ্নেকে ঘেরাও করে বিক্ষুব্ধ জনতা পিটিয়ে হত্যা করে। এ সংঘর্ষে আহত শতাধিক। নিহত দু’জনের লাশ রংপুর মেডিকেল হাসপাতালে পড়ে আছে। অপর দু’জনের লাশ নগরীর পায়রা চত্বরে পড়ে রয়েছে। ব্যাপক সংঘর্ষ হলেও নগরীর কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, সেনবাহিনীসহ প্রশাসনের কাউকে দেখা যায়নি।

সরজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে রংপুর টাউন হলের সামনে আন্দোলনকারীরা আসতে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে রাজপথ মহাসমুদ্রে পরিণত হয়। শান্তিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালীন একঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেখানে জমায়েত হয়ে সরকারের পতনে একদফা দাবিতে নানা স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীরা তাদের ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ডে লেখা “মোদির পোষা হাসিনা, আমরা তোমায় মানি না” সেই সঙ্গে “আর কোনো আপস নাই খুনী স্বৈরাচার হাসিনার পদত্যগ চাই” “একদফা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষজন। আন্দোলন চলাকালীন বেলা ১১টায় আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেম, তুষার কান্তি মণ্ডলের নেতৃত্বে দেশীয় অস্ত্র ও পিস্তল নিয়ে ৭-৮শ’ নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে একটি পক্ষ সামনের দিকে এগুতে থাকে। এ সময় আন্দোলনকারীরা তাদের আসতে দেখে প্রতিহত করার উদ্যোগ নিলে সংঘর্ষে নগরীর সিটি করপোরেশন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পিস্তল দিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি ছুঁড়লে একজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে আন্দোলনকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে আওয়ামী-যুবলীগ-ছাত্রলীগের ওপর। ধাওয়া করে একে একে ৪ জনকে পিটিয়ে হত্যা করে। বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সংঘর্ষ চলছিল। এ সময় দু’পক্ষেরই কমপক্ষে ১০০ জন আহত হয়। শিক্ষার্থী মৌমিতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের এখন আলোচনায় বসতে বলতেছেন। তার বাবা তো আলোচনায় বসেননি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমার ভাইয়ের লাশের উপর দিয়ে আলোচনায় বসতে পারবো না। তাই আর কোনো আলোচনা নয়, বর্তমান সরকারের পদত্যাগ চাই। শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবির উপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করছে। আমি প্রশাসনের ভাইদের বলবো অনেক হয়েছে। দালালি করেছেন এখন বাঁচতে চাইলে আপনারা নিরপেক্ষ থাকেন। কারণ যারা আন্দোলনে রয়েছে তারা আপনার ভাই-বোন। তাদের ওপর গুলি করবেন না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি এলাকা পীরগঞ্জে উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ ছাড়াও পীরগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে ১২টি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে।

Friday, August 2, 2024

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ১৬ দিন পর শিশু মাহিমের জামিন: আদালত চত্বরে মানুষের ঢল by জাভেদ ইকবাল

রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ১৬ দিন জেল খাটার পর অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশু আলফি শাহরিয়ার মাহিম জামিনে মুক্তি পেয়েছে। গতকাল আলোচিত এ মামলার শুনানিতে শিক্ষার্থী, কৌতুহলী মানুষের ঢল নামে আদালত চত্বরে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মাহিমের পরিবারকে আশ্বস্ত করেছেন মাহিমের মুক্তিতে সার্বিক সহায়তা করা হবে। গতকাল দুপুরে রংপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মাহিমের আইনজীবীরা জামিনের জন্য আবেদন করেন। আদালতের বিচারক মো. মোস্তফা কামাল মাহিমের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। এ সময় মাহিমের বাবা শাহজালাল, মা আঞ্জুম আরা ও বোন সানজানা আক্তার স্নেহাসহ তাদের স্বজনরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। মাহিমের আইনজীবী জোবাইদুল ইসলাম বলেন, মাহিমকে জামিন দেয়া হয়েছে। এখনো সে মামলা থেকে অব্যাহতি পায়নি। সে মামলার আসামি হিসেবেই রয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনেক বড় বড় কথা বলেন। তাদের প্রশাসন আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় কোনো মামলা না করায় পুলিশ সুযোগ পেয়ে সেই মামলাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে শিশু মাহিমকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে। আজ মিডিয়া, আইনজীবী, সচেতন মহল ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে মাহিম ছাড়া পেলো। তা না হলে এই মামলা থেকে তার মুক্তি কঠিন হয়ে যেতো। মাহিমের বোন সানজানা আক্তার স্নেহা বলেন, গতকাল পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন, আমার ভাইকে কোনো মামলায় রাখবেন না। আজ তাকে জামিন দেয়া হলো। আমরা এতে খুশি। আমরা চাই মামলা নিয়ে মাহিমসহ আমার পরিবার যেন আর ট্রমাটাইজ হয়ে না পড়ে। মাহিমের মা আঞ্জুমান আরা ময়না বলেন, মাহিমের স্বপ্ন ছিল বুয়েটে পড়া। প্রকৌশলী হওয়া। আমার ছেলে কি অন্যায় করেছে? বাড়ির সামনে থেকে আমার ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমার ছেলেকে বিনা অপরাধে গ্রেপ্তারসহ জেলহাজতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িতদের আমি বিচার চাই।

মাহিমের বাবা মো. শাহজালাল বলেন, আমি মামলা থেকে মাহিমের অব্যাহতি চাচ্ছি। পুলিশ কমিশনার বলেছিলেন, আমাদের আর কোর্টে আসতে হবে না। আমি আপনারদের মাধ্যমে জানাই তার এই কথা যেন বাস্তবায়ন হয়।  এ ব্যাপারে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, তাজহাট থানা আক্রমণের সময় থানার সামনে থেকে পুলিশ মাহিমকে গ্রেপ্তার করে। সেই সময় তার বয়স সম্পর্কে জানা সম্ভব হয়নি। তার বয়স ১৭ হলেও দেখানো হয়েছে ২০ বছর। আমি বিষয়টি জানতে পেরে তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলি এবং মাহিমের মুক্তিতে সার্বিক সহযোগিতা করার কথা জানাই। আশা করছি আদালতের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মাহিম মামলা থেকে মুক্তি পাবে।
উল্লেখ্য, গত বুধবার দুপুর ১টার দিকে মাহিমের বড় বোন সানজানা আক্তার স্নেহা তার ফেসবুকে ছোটভাই পুলিশ লাইন্স স্কুল এন্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আলফি শাহরিয়ার মাহিম (১৬)কে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় পুলিশ গ্রেপ্তারসহ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠিয়েছে উল্লেখ করেন। ভাইয়ের মুক্তির জন্য তিনি সকলের কাছে সহযোগিতা চান। ফেসবুকের এ পোস্টটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা বিভিন্ন মহলের নজরে আসে। এরপর সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা দেখা যায়।

Saturday, July 20, 2019

ক্যাম্পাসে অনৈতিক কর্মকাণ্ড, ডাকা হয় কলগার্লদেরও by ইভান চৌধুরী

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরে বেড়েই চলেছে অনৈতিক কর্মকাণ্ড। বোটানিক্যাল গার্ডেন, নির্মাণাধীন শেখ হাসিনা হলের দক্ষিণ পাশে, বকুলতলা রোড, ক্যাফেটেরিয়ার সামনে, ভিসি রোড, পাওয়ার হাউজের পিছনে এবং আবাসিক হলগুলোর আশপাশসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন নির্জন এলাকাকে বেছে নিয়েছে সুযোগ সন্ধানিরা। কখনো সেচ্ছায় আবার কখনো জোরপূর্বক অনৈতিক কাজে জড়াতে বাধ্য করা হচ্ছে মেয়েদের। এমনকি ডাকা হয় কলগার্লদেরও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে এলাকার স্কুল-কলেজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসে। তাদেরকে জনশূন্য এলাকায় প্রায়ই অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে দেখা যায়। ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মীদের চোখে প্রায়ই দিনই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দেখা মেলে। পরে থাকতে দেখা যায়, অসামাজিক কাজের ব্যবহৃত উপাদান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তা কর্মী জানান, আমরা যখন দায়িত্ব পালন করি তখন প্রায়ই আমরা অশ্লীল কর্মকাণ্ড দেখতে পাই। বিশেষ করে দুপুর ১২ টা থেকে ৪ টার দিকে এসব কাজ বেশি দেখা যায়।
কারণ তখন ক্যাম্পাস অনেক জনশূন্য বলা চলে। বেশির ভাগই বোটানিক্যাল গার্ডেনে এসব হয়ে থাকে। অনেক সময় নিজেরই লজ্জা লাগে।
আবার অন্য দিকে সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসে জমে উঠে মাদকের আড্ডা। আবার কখনো কখনো ডাকা হয় কলগার্লদের। রাতে মাদক সেবিরা নিরাপদে মাদক সেবন এবং নিজেদের কর্মকাণ্ড অনায়াসেই করতে ক্যাম্পাসকেই বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে আবাসিক হলগুলোর ছাদ, স্বাধীনতা স্মারকের পিছনে, লাইব্রেরির দক্ষিণ পাশ, বোটানিক্যাল গার্ডেন, হলের আশে পাশেসহ নির্জন জায়গাগুলোতে বসে মাদকের আসর। জড়িয়ে পড়ছে কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থীরাও।
বহিরাগত সন্ত্রাসীরা মূলত ক্যাম্পাসকে তাদের মাদক গ্রহণের নিরাপদ স্পট হিসেবে ব্যবহার করলেও তাতে মাথা ব্যাথা নেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসলেও এড়িয়ে যাচ্ছে প্রশাসন। এমনটাই অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
ক্যাম্পাসে বহিরাহতদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মত। বহিরাগত সন্ত্রাসী আর অপরাধীচক্রের অভয়াশ্রমে পরিণত হয়ে পড়ছে ক্যাম্পাস। ৭৫ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত এ ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা প্রাচীর রয়েছে। তারপরও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা অনায়াসেই ঘুরাফেরা করে ক্যাম্পাসে। সরেজমিন দেখা যায়, ক্যাম্পাসে প্রবেশের চারটি ফটকের একটিতেও কোন নিরাপত্তা প্রহরী নেই।
গত চার বছরে অন্তত শতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে গোটা ক্যাম্পাস সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা না ঘটলেও চুরির প্রকোপ বেড়েছে। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু হল থেকে এক শিক্ষার্থীর মটরসাইকেল চুরি হয়। চুরির দীর্ঘদিনেও মটর সাইকেল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি প্রশাসন। এদিকে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ডরমেটরি থেকে প্রায়ই সাইকেল চুরির ঘটনা ঘটে। তারপরও কর্তৃপক্ষ নীরবই রয়েছে। ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসে প্রক্টর ও পুলিশের  টহল দেয়ার কথা থাকলেও তা হয় না বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
রাতে দায়িত্বরত এক নিরাপত্তা কর্মী জানান, বিভিন্ন ভবনের পেছনে ও মাঠের মাঝে বসে নিয়মিতভাবেই নেশা গ্রহণ করে। মাঝে মধ্যে মেয়ে (কলগার্ল) নিয়ে আসে ফুর্তি করে বহিরাগতরা। আমরা কিছুই বলতে পারিনা। যাবার সময় আমাদেরকে শাসিয়ে চলে যায়।
এব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আতিউর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মাদক ও সব ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপরে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন জায়গাতে যেন এমন অসামাজিক কাজে কেউ লিপ্ত হতে না পারে সে ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করবে। একটু ব্যস্ততার কারণে আমরা নিয়মিত টহল দিতে পারছিনা। তবে শীঘ্রই সেটাও আমরা করব। বর্তমান প্রশাসন ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ বাস্তবায়নে সর্বদা সচেতন অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান তিনি।

Thursday, July 18, 2019

এরশাদ ছাড়া জাপা: উদ্বিগ্ন রংপুরের নেতাকর্মীরা যা ভাবছেন by পিয়াস সরকার ও জাভেদ ইকবাল

জাতীয় পার্টির ঘাঁটি রংপুর। রংপুরবাসীর বিপুল সমর্থন নিয়ে পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনীতির অঙ্গনে দলটির টিকে থাকার ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রেখেছে রংপুরের মানুষ। সাবেক সেনা শাসক এরশাদের শেষ বিদায়েও সীমাহীন শ্রদ্ধা আর ভালবাসা দেখিয়েছে তার জন্মস্থানের মানুষ। তাদের চাপে দল সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে রংপুরে সমাহিত করা হয়েছে এরশাদকে। এরশাদের মৃত্যুতে দলে যে শুন্যতা তৈরি হয়েছে তা কিভাবে কাটবে। দলের ভবিষ্যৎইবা কী? সারা দেশের মতো এমন প্রশ্ন রংপুরের মানুষের মুখে মুখে। নানা শ্রেণি পেশার মানুষ ও জাতীয় পার্টির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে উদ্বেগের ছাপ লক্ষ্য করা গেছে।
তারা জানিয়েছেন এতো দিন রংপুরে জাতীয় পার্টি যে দাপট দেখিয়ে এসেছে শিগগিরই এর অবসান হতে যাচ্ছে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে জাপার সম্রাজ্য ক্ষয়ের লক্ষণ ফুটে উঠেছিল। এবার তা আরও ম্রিয়মান হতে যাচ্ছে। এছাড়া পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নেতাকর্মীরা শঙ্কিত।

মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাপা অধ্যুষিত রংপুরের সিটি মেয়র। তিনি এখন এই এলাকার অভিভাবক। নেতাকর্মীদের মাঝে বিভক্তির রেখা স্পষ্ট হয়নি। তৃণমূল নেতাদের একাট্টা করে রেখেছেন মেয়র মোস্তফা।

তবে জাতীয় পর্যায়ে বিভক্তিতে তারা চিন্তিত। দুই গ্রুপে বিভক্ত জাতীয় পার্টি এক গ্রুপের নেতা রওশন এরশাদ আরেক গ্রুপের জিএম কাদের। যদিও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দাবি দলে কোন বিভক্তি নেই। তবে রংপুরবাসী আছেন এরশাদের দিক নির্দেশনার মধ্যে। এরশাদ ছোটভাইকে উত্তরসুরি করে গেছেন। রংপুরের নেতাকর্মীরা তাকে সামনে রেখেই রাজনীতি করতে চান। মোস্তফা বলেন, এরশাদের মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। চলে যেতে হয় সবাইকে। কেউ চিরকাল বেঁচে থাকেন না। তবে আমরা তার মূলনীতিতে বিশ্বাসী। তিনি জি এম কাদেরকে নেতা করে গেছেন আমরা তার দেখানো নীতিতেই চলবো।

একই সুরে কথা বলেন নগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী রাজ্জাক। বলেন, আমাদের রংপুরে আমরা এরশাদের নীতিতেই আছি। আর রংপুরের মানুষ এরশাদের কতটুকু আপন তা দেশবাসী প্রমাণ পেয়েছেন।
এরশাদের মৃত্যুতে কে লড়তে যাচ্ছেন রংপুর ৩ (সদর) আসনে? নেতা-কর্মীদের কথা- এখনো সেই ভাবনাটার সময় আসেনি।

মেয়রের একান্ত সচিব ও মহানগর জাপার দপ্তর সম্পাদক কাজী জাহিদ হোসেন বলেন, এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির সমর্থন আরো দ্বিগুণ হয়েছে। যার প্রমাণ আপনারা পেয়েছেন। তরুণ সমাজের ভালোবাসাটা একটু কম ছিলো এরশাদের প্রতি। তারাও এখন জাতীয় পার্টিতে ভিড়ছে। কারণ তারা জানতে পেরেছে এরশাদের শাসন আমলের চিত্র। এরশাদের নেয়া নীতির সুফল। তিনি আরো বলেন, জাতীয় পার্টির বিভক্তির কোন চিহ্ন রংপুরে নেই। ইনশাআল্লাহ হবেও না। সাধারণ জনগণের ভালোবাসা এরশাদ ও জাতীয় পার্টির মাঝে অক্ষুন্ন থাকবে।

নেতারা এসব বললেও সাধারণ জনগণের আলোচনায় জাতীয় পার্টির ভবিষ্যত। নগরীর কেরাণীপাড়ার বাসিন্দা শিক্ষার্থী শাকিল চৌধুরী বলেন, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষের মাঝে এরশাদের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। তারা শুধু লাঙল মার্কাটাকে চেনে। আর চেনে এরশাদকে। তারা লাঙলকে সর্মথন করেই যাবেন।

জাপা মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙা বলেন, আমাদের জাতীয় পার্টির মাঝে কোনো বিভক্তি নেই। আমরা সকলে একত্রে আছি আমরা দলকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। এছাড়া বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন তা আমরা সর্ব সম্মতক্রমে সিদ্ধান্ত নেব।

রংপুরের স্কুল শিক্ষক এনামুল রহমান বলেন, রংপুরে এরশাদের কারণে জিএম কাদেরের জনপ্রিয়তা আছে। রংপুরের মানুষ রওশন বিরোধী এটা মানতেই হবে।

রংপুর সরকারী কলজের ছাত্র সমাজের নেতা জুবাইদুল ইসলাম বলেন, রংপুরে আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান বরাবরই ভালো। তবে সাংগঠনিক ভাবে আরো মজবুত হওয়া দরকার। আমরা আমাদের দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। আমাদের দলে কোনো বিভক্তি চাই না। জেলা ছাত্র সমাজের আহবায়ক আশরাফুল হক জবা বলেন, আমরা একত্রে আছি। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয়ভাবে যে সিদ্ধান্ত হবে আমরা মানতে রাজি। ইয়াসির আহমেদ বলেন, আমরা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মানতে প্রস্তুত। তবে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মেনে নেয়া হবে না।

Wednesday, July 17, 2019

রংপুরেই এরশাদের সমাধি by পিয়াস সরকার

সকাল থেকেই রংপুরের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। গুমোট আবহাওয়ার মতো রংপুরের মানুষের মনও ছিল শোকাচ্ছন্ন। শোকের সঙ্গে ক্ষোভ আর দাবি আদায়ের উচ্চারণ। ভিন্ন এ পরিবেশ ছিল দুপুর পর্যন্ত। দুপুরের পর প্রিয় নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের লাশ যখন কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে আসে তখন লাখো মানুষের জমায়েত সেখানে। এরশাদকে রংপুরে সমাহিত করার দাবি মুখে মুখে। কারও কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার।
জানাজার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল। বক্তৃতা দিচ্ছিলেন নেতারা। কিন্তু এরশাদকে কোথায় দাফন করা হবে এর কোন ঘোষণা আসছিল না। এতে বাড়ে ক্ষোভ। হতাশা। নেতাকর্মীরা থেমে থেমে স্লোগান দিতে থাকেন। ‘এরশাদের সমাধি-রংপুরে, রংপুরে’। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দাফনের ঘোষণা না দিয়েই জানাজা সম্পন্ন হয়। এরপর এরশাদের কফিনবাহী গাড়ি ঘিরে ধরেন হাজারো নেতাকর্মী। এসময় কেন্দ্রীয় নেতারা ঘোষণা দেন এরশাদকে রংপুরেই দাফন করা হবে।

তখন নেতাকর্মীদের বিজয়ধ্বনি। রংপুর নগর পিতা জাপা নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা লাশবাহী গাড়ির সামনের সিটে উঠে বসেন। নির্দেশনা দেন গাড়ি চালিয়ে এরশাদের পল্লী নিবাসের দিকে নিয়ে যেতে। গাড়ি চলতে থাকে। গাড়িবহর ঘিরে হাজার হাজার নেতাকর্মী। তারা প্রায় কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় গাড়ি বহরকে ঘিরে রেখেই। বিকাল পৌনে ছয়টার পর এরশাদের হাতে গড়া পল্লি নিবাসেই চির নিদ্রায় শায়িত করা হয় তাকে। আর এর মধ্য দিয়ে তার দাফন নিয়ে কয়েক দিনের উত্তেজনার সমাপ্তি ঘটে। শনিবার এরশাদের মৃত্যুর পর ঘোষণা দেয়া হয়েছিল রাজধানীর বনানীর সামরিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। গতকাল সকালে ঢাকা থেকে রংপুরে এরশাদের লাশ নিয়ে যাওয়ার আগে পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদেরও একই কথা জানিয়ে এর পক্ষে নানা যুক্তি দেখিয়েছিলেন। বনানী কবরস্থানে কবরও খোড়া হয়েছিল। দাফনের সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল।

ঘড়ির কাটা তখন সকাল ৯ টায়। এরই মধ্যে রংপুর কালেক্টরেট ঈদ গাহ মাঠে বাড়তে থাকে  নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড়। উদ্দেশ্য প্রিয় নেতার জানাজায় অংশগ্রহণ ও শেষ বিদায়। রংপুর সেন্ট্রাল রোডের জাপা কার্যালয় নেতাকর্মীতে পূর্ণ। তখন থেকেই আওয়াজ উঠতে থাকে এরশাদের লাশ রংপুরে দাফনের। এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শহরের সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দুপুর ২ টা পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়। আর আশপাশের জেলা উপজেলা থেকে বাসে ট্রাকে করে আসতে থাকেন  নেতাকর্মীরা। জানাজা নামাজের মাঠেই উপস্থিত ছিলেন রংপুরের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তাফা। এরশাদের মৃত্যুর পর তিনি রংপুর জাপার পক্ষ থেকে ঘোষণা দিয়েছিলেন রংপুরে এরশাদের দাফন না হলে প্রয়োজনে কঠিন কর্মসূচি দেয়া হবে।

কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠ এরশাদের পল্লী নিবাস থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে। এই মাঠেই ঈদের নামাজ আদায় করতেন তিনি। সেই মাঠেই জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যবস্থা করা হয়। মাঠ আগে থেকেই ছিল প্রস্তুত। সামিয়ানা টাঙানো ও মঞ্চও বানানো হয় সোমবার। জানাজা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। সকাল সাড়ে ১০টায় এরশাদকে বহন করা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার তেজগাঁও বিমনবন্দর থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। মরদেহের সঙ্গে যান জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের, এরশাদের বড় ছেলে রাহগির আল মাহি সাদ এরশাদ, জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, সাবেক মহাসচিব এ বিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মেজর (অব.) খালেদ আখতার, আজম খান, এটিইউ তাজ রহমান ও শফিকুল ইসলাম সেন্টু। মরদেহবাহী হেলিকপ্টারটি দুপুর ১২ টায় রংপুর ক্যান্টনমেন্টে অবতরণের পরে সেখান থেকে এরশাদের লাশ সরাসরি কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রথমে পুলিশের পক্ষ থেকে এরশাদকে দেয়া হয় সম্মান সূচক গার্ড অব অনার। কয়েক মিনিট মঞ্চে রাখার পর ফের জনতার চাপে নেয়া হয় গাড়িতে। এরপরে সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও রংপুর মহানগর সভাপতি সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। এরপর একে একে শ্রদ্ধা জানান জাতীয় পার্টি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আগত নেতাকর্মীরা। এসময় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রীতিমতো বেগ পেতে হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি নেতাকর্মীরা স্লোগান দেন ‘লাশ নিয়ে রাজনীতি চলবে না চলবে না।’

বাদ যোহর এ মাঠেই জানাজা নামাজের কথা থাকলেও নেতাকর্মীদের রংপুরে দাফনের দাবির কারণে বিলম্বিত হয়। জোহরের নামাজের পর জানাজার পূর্ব মুহুর্তে ঈদগাহ মাঠে আসেন জি এম কাদের, মসিউর রহমান রাঙ্গাসহ নেতারা। জানাজার নামাজের পূর্বে বক্তব্য রাখেন রাঙ্গা। তিনি বলেন, আমরা অভিভাবক শুন্য হয়েছি। এরশাদের মৃত্যু আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। আমাদের মিইয়ে গেলে চলবে না। পার্টির নতুন অভিভাবক জি এম কাদের। আপনারা তার কথা মানবেন? এরপর সবার হাত উচিয়ে সম্মতি নেন। 

জি এম কাদের তার বক্তব্যের শুরুতে এরশাদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এরশাদের শাসন আমলে আমরা উপজেলা পেয়েছি, জেলা পেয়েছি ৬৪টি। তিনি আমাদের বাংলাদেশের সকল উন্নয়নের নায়ক। তিনি যেসব আইন করেছেন সেসব আইন আমাদের  দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি সাবেক সফল রাষ্ট্রপ্রধান, তিনি সাবেক সেনাপ্রধান, বিরোধী দলীয় নেতা। তার লাশ দাফন করা উচিত সম্মানের সঙ্গে। তাই আমরা চাই তার লাশ ঢাকায় দাফন করতে। এই কথার পরেই চারদিকে শোরগোল উঠে না, না। উত্তেজিত জনতার স্লোগানে আর একটি কথাও বলতে পারেননি জি এম কাদের। নির্ধারিত সময়ের ৪০ মিনিট পর অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। নামাজ শেষেই ফের উত্তপ্ত ময়দান। লাশের গাড়ি ঘিরে রাখেন নেতাকর্মীরা। তারা ফের স্লোগান দিতে থাকেন লাশবাহী গাড়ি ঘিরে। আবারও ৪০ মিনিটি দেরি হয়। উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থতি। এরপর সিটি মেয়র এরশাদকে রংপুরে দাফনের ঘোষণা দিলে গাড়ি ছাড়েন নেতাকর্মীরা। দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে ঈদগাহ মাঠ ছাড়ে লাশবাহী গাড়ি। ঈদ গাহ মাঠ থেকে বেরিয়ে বা পাশের সড়ক দিয়ে পল্লী নিবাস আর ডানের রোডে সেনানিবাস। ডানের রোডে নেতাকর্মীদের ভিড় ও হাতে হাত রেখে নেয়া অবস্থান ছিলো চোখে পড়ার মতো। এই ঈদগাহ মাঠ থেকে গাড়ি তারা হেঁটে নিয়ে যান পল্লী নিবাসে।

প্রায় ৬ কিলোমিটার রাস্তা লাখো মানুষ গাড়ি ঘিরে নিয়ে যান এরশাদের বাড়িতে। এতে সময় লাগে ২ ঘণ্টারও বেশি। আর লাশ বাহী গাড়ির সামনে বসা ছিলেন মেয়র মোস্তফা। বিকাল ৪ টা ৫০ মিনিটে মরদেহ পৌঁছায় পল্লী নিবাসে। সেখানে আগে থেকেই সেনাবাহিনীর একটি দল প্রস্তুত ছিল। গাড়ি থেকে এরশাদের মরদেহ সেনা সদস্যরা ফুল সজ্জিত এক কফিনে নামিয়ে নেন। এরপর ফের গার্ড অব অনার দেয়া হয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিকাল ৫টা ৪৬ মিনিটে দাফন করা হয় এরশাদকে। দাফনের পূর্বে সেনাবহিনীর পক্ষ থেকে এরশাদের কর্মজীবন তুলে ধরা হয়।

বননীতে দাফনের সব প্রস্তুতি ছিল: এরশাদকে দাফনের জন্য ঢাকার বনানীর সামরিক কবরস্থানে সবধরণের প্রস্তুতি নেয়া হয়। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী কবর খুঁড়ে রাখা ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কবরস্থানের প্রবেশ রাস্তা বন্ধ করে দেন। বনানীতে দাফন করা হবে জেনে পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা আশেপাশে অবস্থান নেন। কিন্তু বিকাল ৩ টার দিকে রংপুরে দাফনের খবর এলে তারা চলে যান।
নেতাকর্মীরা এরশাদের মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন পল্লী নিবাসে -ছবি: জীবন আহমেদ

Saturday, July 13, 2019

‘তোমরা হাঁস, মুরগীর মত বেঁধে ছেলেয়েদের বড় করো’

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ২৫ পরিবার মানবিক জীবন-যাপন করছে। পরিবার গুলোর অভিযোগ প্রশাসনের সহযোগীতার অভাবে পরিবার গুলোর এ দুরবস্থা। এমনকি প্রশাসন থেকে জানানো হয়, তোমরা হাঁস, মুরগীর মত বেঁধে ছোট ছেলেয়েদের বড় করো।
পরিবার গুলো জানায়, উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের দ: কোলকোন্দ গ্রামের মটের পাড় বাঁধের ধারে তারা বসবাস করে আসছিল। বাঁধ সংস্কার করায় তাদের বাড়ি-ঘর সড়িয়ে দেয়া হয়। বসবাসের জায়গা না থাকায় ওই এলাকায় বাঁধের ধারের একটু দুরে দীপের মত এক খন্ড জায়গায় পরিবারগুলো চাপাচাপি করে বাড়ি পূর্ণ স্থাপন করে বসবাস শুরু করে। তাদের বসবাসকৃত জায়গা টুকুর পিছঁনে নিচু জলাশয় ও সামনে একটা পুকুরের মত বড় গর্ত এবং দক্ষিণ দিকে জলাশয় আর উত্তর দিকে রাস্তা। উত্তর দিকের ৩/৪ বাড়ির লোকজন বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তা উঠে চলাচল করতে পারলেও বাকী বাড়ির লোকজন বের হওয়ার মত কোন রাস্তা বা জায়গা নাই। ফলে তারা এক বাড়ির ভিতর দিয়ে আরেক বাড়ির লোকজন কোন রকম চলাচল করছে।
সরজমিন দেখা যায় আব্দুল হামিদ, মোজাম্মেল, মতিয়ার রহমান, লাল মিয়া, ঋরনা বেগম, দীপা বেগম, রনজিনা বেগম, মমতাজ, নিলুফা, সুজা মিয়া, দুলাল, রাবেয়া, মনোয়ার, বাবু মিয়া, সোয়াদ, রোকছানা জানান, বাঁধের ধারে বাড়ি করে বসবাস করে আসছিলাম।
বাঁধ সংস্কার করায় আমাদের সেখান থেকে উচ্ছেদ করে। নিরুপায় হয়ে সামান্য একটু জায়গাতে ঠেলাঠেলি করে বাড়ি করে ২৫ পরিবার বসবাস শুরু করে। কিন্তু বসবাসকৃত জায়গাটাও নিচু। সামান্য বৃষ্টি হলে বাড়িতে পানি উঠে। তাছাড়া বাড়ি থেকে বের হওয়ার মত কোন জায়গা না থাকায় কষ্টে আছি। ছোট ছেলেমেয়ে ও গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগী নিয়ে পড়েছি বিপাকে। বাড়ির সবদিকে নিচু জলাশয় থাকায় বাড়ি করার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ৩টি শিশু পানিতে পড়ে ছিলো। এমন মানবিক জীবন থেকে পরিত্রাণ পেতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্তৃপক্ষ ও ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্যর সাথে আলোচনা করে বাড়ির সামনে ও বাঁেধর ধারের গভীর গর্তটি ভরাটের উদ্যোগ নেই। ওই গর্তটি ভরাট হলে আমাদের কষ্ট কেটে যাবে চলাচলে কোন সমস্যা হবেনা। সেজন্য একজন জমির মালিকের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের টাকা খরচ করে সেখান থেকে মেশিন দিয়ে মাটি ভরাটের ব্যবস্থা করি। কিন্তু জনৈক দু’জন সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মেশিন দ্বারা মাটি উত্তোলনের অপরাধে ওসির কথা বলে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে তাদের মাটি উত্তোলন বন্ধ করে দিবে। আমরা তাদের টাকা না দেওয়ায় সামান্য মাটি না কাটতেই পুলিশ এসে মাটি উত্তোলন বন্ধ করে দিয়ে বলে, 'তোমরা হাঁস, মুরগীর মত বেঁধে ছোট ছেলেয়েদের বড় করো।' তারা আরো বলেন, স্তিস্তা নদীসহ বিভিন্ন এলাকায় অবাধে মাটি বালু উত্তোলন করে রাস্তা ঘাটের কাজ করছে, কেউ বিক্রি করছে সেখানে বন্ধ না করে আমরা বসবাসের জন্য মাটি কাটলে অপরাধ যদি হয় তাহলে মানবিকতা কোথায় থাকলো। কে দেখবে আমাদের মাবেতর জীবন যাপনের কষ্ট।
আমরা প্রশাসনের কাছে সরকারিভাবে মাটি ভরাটের ব্যবস্থা করে শান্তিতে বসবাসের দাবি করছি। ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব আলী রাজু বলেন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা এ গুলো নাগরিকের নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র তথা সরকারের। এ কথা বিবেচনা করে মানুষ গুলোর কষ্টের কথা ভেবে মাটি ভরাটের কথা বলে ছিলাম। আইনে মেশিন মাটি উত্তোলন অপরাধ তাই প্রশাসন বন্ধ করে দেয়। মানিক বিবেচনায় তাদের কষ্ট লাঘবে প্রশাসনের সহযোগী প্রয়োজন।

Monday, July 8, 2019

দিনাজপুর নয়, রংপুরেই দেশের প্রথম লোহার খনি by সরকার মাজহারুল মান্নান

৫৩ বছরেও উত্তোলনের উদ্যোগ নেইদেশের প্রথম লোহার খনি দিনাজপুরে নয়, রংপুরের পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারে আবিষ্কৃত হয়েছিল ৫৩ বছর আগে। ১৯৬৫ সালে এই লোহার খনির অস্তিত্ব নিশ্চিত করে পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগ এবং ১৯৯৯ সালে পুনরায় খনন শুরু করেছিল জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ-জিএসবি। সুদীর্ঘ ৫৩ বছর আগে এই লোহার খনিটির প্রথম সন্ধান পাওয়া গেলেও আজ পর্যন্ত উত্তোলনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। আর দিনাজপুরের হাকিমপুরের ইসবপুরে লোহার খনির অস্তিত্বের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে চলতি মাসের ১৪ জুন। কিন্তু সম্প্রতি সন্ধান পাওয়া লোহার খনির অস্তিত্বকে প্রথম বলে প্রচারণা পাওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রথম লোহারখনি পাওয়া রংপুরের মানুষ। তারা অবিলম্বে পীরগঞ্জের ভেলামারি খনিকে প্রথম লোহার খনি স্বীকৃতি দিয়ে সেখান থেকে লোহা উত্তোলনের দাবি জানিয়েছেন।
জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ-জিএসবি এবং পেট্রোবাংলা সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে, রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার শানেরহাট ও মিঠিপুর ইউনিয়নের মাঝামাঝি বিশাল একটি এলাকার নাম ভেলামারি পাথার। এখানেই প্রথম অস্তিত্ব আবিষ্কার হয়েছে বিশ্বমানের লৌহ খনির। ওই সময়ে খনি এলাকা চিহ্নিতকরণে বর্ণিত পাথারের মাঝখানে একটি জমিতে কংক্রিটের ঢালাই করে রাখা হয় অনুসন্ধান করা চারটি কূপের মুখ। ৫৩ বছর ধরে খনিমুখে কংক্রিটের ঢালাই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে সেখানে।
জেসবি ও পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধের পর স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তৎকালীন পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগের একদল বিশেষজ্ঞ বিমান ও গাড়িবহর নিয়ে এই ভেলামারি পাথারে আসে। প্রায় ছয় বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই পাথারে তারা লৌহ খনির অবস্থান নিশ্চিত করতে বিমানের নিচে একটি বিশাল শক্তিশালী চুম্বক ঝুলিয়ে দেন। এরপর বিমানটি নিচু দিয়ে পাথারের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে বিমানের ঝুলন্ত চুম্বকটি ছোট পাহাড়পুর গ্রামের আবুল ফজল ও আব্দুল ছাত্তার নামে দুই ব্যক্তির মালিকানাধিন জমির ওপর এসে আকর্ষিত হয়। এই আকর্ষণ বিমানটিকে বারবার মাটির দিকে টেনে নিচে নামাতে চেষ্টা করে। পরে অন্যান্য পরীক্ষার পর পাকিস্তানের খনিজ বিজ্ঞানীরা এখানে লোহার খনির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হন। পরে উৎস হিসেবে ওই জমির ওপর কংক্রিটের ঢালাই করা চিহ্ন দিয়ে চলে যান। সূত্র জানায়, পরের বছর পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগ চিহ্নিত স্থানে খনন কাজ শুরু করেন। প্রায় আট মাস ধরে তারা ভেলামারী এলাকার পাশের কেশবপুর, ছোট পাহারপুর, প্রথম ডাঙ্গা, পবনপাড়া, সদরা কুতুবপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় অসংখ্য স্থানে পাইপ বসিয়ে লোহার খনির সন্ধান নিশ্চিত করেন। অনুসন্ধানের সময় পাইপের ভেতর দিয়ে মাটির গভীরে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বোমার বিস্ফোরণে ওই এলাকার অনেক মাটির কুয়া ভেঙে যায়। পরে আবারো দ্বিতীয় দফায় পাইপের মাধ্যমে জরিপকাজ সম্পন্ন করা হয়।
১৯৬৭ সালের শেষের দিকে পাকিস্তান খনিজসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারাসহ একদল বিদেশী খনিজ বিশেষজ্ঞ রংপুরে আসেন। তারা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির বিশাল বহর ও পরিবার পরিজনসহ স্থানীয় পানবাজার হাইস্কুল মাঠে অস্থায়ীভাবে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে। প্রাপ্ত লোহার উপাদান উত্তোলন করেন।
মাটির ৯০০ ফুট নিচ থেকে ২২ হাজার ফুট পর্যন্ত পাইপ খনন করে তারা লোহার উন্নতমানের স্তরের সন্ধান পেয়েছেন। এর বিস্তৃতি প্রায় ১০ কিলোমিটার। প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে ব্যাপক খনি অনুসন্ধান কাজ শেষ করে ভেলামারিতে স্থাপনকৃত চারটি মূল পাইপের উৎসমুখে কংক্রিটের ঢালাইয়ের মাধ্যমে বন্ধ করে খনি কর্মকর্তারা তাদের ক্যাম্প গুটিয়ে চলে যান। এ সময় তারা বলে যান লৌহ অপরিপক্ব আছে। আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যেই এটি উত্তোলন সম্ভব। সে হিসাবে আরো ৩৭ বছর আগে লোহা খনিটি পূর্ণতা পেয়েছে।
বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভেলামারি পাথারে লোহার খনির অনুসন্ধান কাজ শুরু করেন। কিন্তু তারা পূর্বে আবিষ্কৃৃত লৌহ খনির উৎসমুখ ভেলামারি হতে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে পাহারপুর গ্রামের পূর্বপ্রান্তে পরীক্ষামূলক খনন করে কোনো রিপোর্ট না দিয়েই চলে যান। ওই রিপোর্ট পরে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশও করা হয়নি।
তবে জিএসবি সূত্র এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছে, সেখানে অনুসন্ধান চালিয়ে উন্নতমানের আয়রন কোর (লোহা আকরিক) পাওয়া গেছে। কিন্তু সেখানে আয়রন কোরের রিজার্ভ কম হওয়ায় লৌহ উত্তোলনের সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি জিএসবি।
কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, রিজার্ভের পরিমাণ ইকোনমিক্যালি ভায়াবোল না হওয়ায় সেখানে লৌহ উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। যে পরিমাণ খরচ হবে তা রিজার্ভ দিয়ে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে জিএসবি। এরপর লৌহখনির অবস্থান ও উত্তোলনে আরো ব্যাপকভাবে কোনো অনুসন্ধান কিংবা উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি জিএসবি। লৌহ খনিটি এখন প্রায় ৫৩ বছর পার করতে চলেছে।
ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য মতে, পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারের এই লোহার খনিটি এখন পরিপক্ব হয়েছে। কিন্তু পেট্রোবাংলা অনুসন্ধান চালিয়ে চলে যাওয়ার পর আর কোনো আওয়াজ উঠছে না।
পীরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান সাবেক এমপি নুর মোহাম্মদ মণ্ডল নয়া দিগন্তকে জানান, আমাদের পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারেই লোহার খনি আবিষ্কার হয়েছে ৫৩ বছর আগে। সেটাই প্রথম লোহার খনি। দিনাজপুরের হাকিমপুরে লোহার খনির সন্ধান পাওয়া গেল এই মাসে। তাহলে প্রথম লোহার খনি কোনটা পীরগঞ্জ নাকি হাকিমপুরে। সেটা জেএসবিকে নিশ্চিত করে মিডিয়ায় বলতে হবে। তা না হলে মিডিয়ায় বিকৃত তথ্য যাচ্ছে। এই জনপ্রতিনিধি আরো জানান, আমাদের এই খনি থেকেই লোহা উত্তোলন প্রথমে শুরু করতে হবে। তারপর দিনাজপুরে। আমাদের খনি থেকে প্রথম লোহা উত্তোলন শুরুর ঘোষণা না দেয়া হলে আমরা পীরগঞ্জের সব শ্রেণিপেশার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবো।
ভূতত্ত্ববিদ পেট্রোবাংলার মহাব্যবস্থাপক এ বি এম কামরুজ্জামান পুলক নয়া দিগন্তকে জানান, জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ-জিএসবি রংপুরের পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারে জরিপ চালিয়ে প্রথম আয়রন কোরের (লৌহ আকরিকের) অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। কিন্তু আয়রন কোরের রিজার্ভ কম হওয়ায় সেখানে লৌহ উত্তোলনের সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি জিএসবি। দিনাজপুরে জিএসবির জরিপ প্রাথমিক পর্যায়ে। তবে ধারণা করা হচ্ছে এখানে আয়রন কোরের পুরুত্বটা অনেক বেশি। এখানে রিজার্ভ অনেক থাকতে পারে।
রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর ও পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী দেশে প্রথম লোহার খনির সন্ধান পাওয়া যায় রংপুরের পীরগঞ্জের ভেলামারির পাথারে। সেখানে পাকিস্তান সরকার এবং বাংলাদেশ সরকার কূপ খনন করে অনুসন্ধান চালিয়ে উৎস মুখ চিহ্নিতও করেছেন। কিন্তু দিনাজপুরে সন্ধান পাওয়া লোহার খনির অস্তিত্বকে প্রথম হিসেবে প্রচারণা পাওয়ায় প্রকৃত ইতিহাস ধামাচাপা পড়ে যাবে। জরিপ অনুযায়ী ভেলামারি পাথারের লোহার খনিটিই প্রথম।
রংপুরের পীরগঞ্জের ভেলামারি পাথারে লোহার খনির উৎসমূল নিশ্চিত হয়ে ৫৩ বছর আগে দেয়া কংক্রিটের ঢালাই - ছবি : নয়া দিগন্ত

Saturday, June 29, 2019

সুস্বাদু হাঁড়িভাঙা আম by মঈনুল ইসলাম

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ এলাকা হাঁড়িভাঙা আমের জন্য বিখ্যাত। এখান থেকেই জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে এ আমের চাষ। এ আম সুস্বাদু। এর মধ্যে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে হাঁড়িভাঙা আমের সুখ্যাতি।
গাছে ঝুলে আছে আমগাছে ঝুলে আছে আম
বাগানজুড়ে আমবাগানজুড়ে আম
মাটিতে ঝুলে পড়েছে আমমাটিতে ঝুলে পড়েছে আম
আম পাড়ছেন আমচাষিআম পাড়ছেন আমচাষি
বাগান থেকেই বিক্রি হয় আমবাগান থেকেই বিক্রি হয় আম
সাইকেলে করে বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছে আমসাইকেলে করে বিক্রির জন্য নেওয়া হচ্ছে আম
হাটে নেওয়া হচ্ছে আমহাটে নেওয়া হচ্ছে আম
আমের পসরা, চলছে বিকিকিনিআমের পসরা, চলছে বিকিকিনি
রিকশা–ভ্যানে হাট থেকে আম যাচ্ছে শহরের কুরিয়ার সার্ভিসেরিকশা–ভ্যানে হাট থেকে আম যাচ্ছে শহরের কুরিয়ার সার্ভিসে

Friday, April 5, 2019

রংপুরের তারাগঞ্জ: রাস্তার পাশে পুকুর খনন করে বালুর ব্যবসা

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার বুড়িরহাট-ঘোনপাড়া রাস্তার পাশে পুকুর খনন করে বালু তুলছেন এক ব্যক্তি। এসব বালু আবার ট্রাক ও ট্রলিতে করে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। এতে ধুলা ওড়ায় এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে ছয়টি গ্রামের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পাশাপাশি বালু তোলায় গভীর খাদ সৃষ্টি হওয়ায় রাস্তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাস্তাটি রক্ষা এবং নিজেদের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য ওই ছয় গ্রামের ৬৩ জন বাসিন্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গত ২৮ মার্চ লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এই বিষয়ে ইউএনও আমিনুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ‘অভিযোগ পেয়েছি। এই বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরে বৈদ্যনাথপুর, রঘুনাথপুর, পূর্ব রহিমাপুর, খানপাড়, বাঙালিপুর, ঘোনপাড়াসহ ছয়টি গ্রাম। গ্রামগুলোর ভেতর দিয়ে চলে গেছে বুড়িরহাট-ঘোনপাড়া কাঁচা রাস্তা। ওই রাস্তা দিয়ে যানবাহন ছাড়াও ছয়টি গ্রামের মানুষ বুড়িরহাট বাজার ও উপজেলা সদরে যাতায়াত করে। কিন্তু ১৫ দিন ধরে রহিমাপুর গ্রামে যাদু মিয়া তাঁর বাড়ির পাশে তিন একর জমিতে ওই রাস্তার গা ঘেঁষে পুকুর খনন করে বালু তুলে ট্রাক ও ট্রলিতে করে ওই রাস্তা দিয়ে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে রাস্তাটি নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া বেপরোয়াভাবে ট্রাক-ট্রলিগুলো চলাচল করায় ধুলায় ছেয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি। ধুলার কারণে রহিমাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ ওই ছয় গ্রামের প্রায় ছয় হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
ঘোনপাড়া গ্রামের হবিবার রহমান অভিযোগ করেন, ‘ওই রাস্তা দিয়ে দিনরাত ৩০-৩৫টি ট্রাক-ট্রলি খোলা অবস্থায় বালু বহন করছে। এতে ওই আট গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। অবস্থা এতটাই খারাপ যে বাইসাইকেল-রিকশা তো দূরের কথা, হেঁটেও ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করা যাচ্ছে না। ধুলোয় পুরো শরীর সাদা হয়ে যায়।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বালু বহন করায় রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ভেঙে ও দেবে গেছে। রাস্তার পাশে খনন করা হচ্ছে পুকুর। মাটি ভর্তি ট্রাক ও ট্রলিগুলো ওই রাস্তা দিয়ে চলছে। ট্রাক ও ট্রলি চলাচল করায় ধুলা উড়ছে। ধুলা থেকে রক্ষা পেতে পথচারীরা চোখ, মুখ ও নাক ঢেকে চলাচল করছে।
কুর্শা কাজীপাড়া মহিলা বিএম কলেজের অধ্যক্ষ আনিছুল হক অভিযোগ করেন, আবাসিক এলাকায় রাস্তার পাশে পুকুর খননের নিয়ম না থাকলেও রহিমাপুর গ্রামের যাদু মিয়া পুকুর খনন করছেন। বাধা দেওয়ার পরেও তিনি শুনছেন না। এতে ওই রাস্তাসহ তাঁর দুই একরের লিচুবাগান ও গ্রামের আরও অনেকের জমি হুমকির মুখে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে রাস্তা ও লিচুবাগান ওই পুকুরে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রহিমাপুর গ্রামের বাসিন্দা মনমোহন রায় বলেন, ‘পুকুরটি আমার বসতঘরের ১০০ গজ সামনে খনন করা হচ্ছে। ট্রাক ও ট্রলির শব্দে রাতে ঘুমানো যাচ্ছে না। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করার পর থেকে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত লোকজন আমাকে নানা রকম হুমকি দিচ্ছেন।’
পূর্ব রহিমাপুর গ্রামের নুরুজ্জামান বলেন, রাস্তার ধারে যাদের বাড়ি, ধুলার কারণে তারা ঘরের জানালা খুলতে পারে না। জানালা খুললে ঘরের কাপড়চোপড় ও আসবাব ধুলায় নষ্ট হয়ে যায়।
স্থানীয় সয়ার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন বলেন, বুড়িরহাট-ঘোনপাড়া কাঁচা রাস্তাটি গুরুত্বপূর্ণ। দিনরাত মাটি-বালু বোঝাই ট্রাক-ট্রলি চলাচল করায় রাস্তা বেহাল হয়ে গেছে। পাঁচ দিন আগে ওই ছয় গ্রামের অর্ধশতাধিক বাসিন্দা তাঁর কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি তিনি ইউএনও ও পুলিশকে জানিয়েছেন।