Thursday, September 5, 2013

একতরফা নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না by ড. আবদুল হাই তালুকদার

রাজনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করায় দেশের মানুষের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বিগ্ন। রাজনীতিকদের কথাবার্তায় সংকট সমাধানের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না। রাজনৈতিক সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রাথমিক দায়িত্ব সরকারের। সরকার সে পথে না গিয়ে বিরোধী দলকে হুমকি-ধামকি দিয়ে নির্বাচনে আনার কৌশল অবলম্বন করছে। মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ হওয়া, মধ্যযুগে ফেরত নেয়া ইত্যাদি কথা বলে সরকার বিএনপির বিরুদ্ধে নানারকম প্রচারণা চালাচ্ছে।
দেশের দুর্বল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক বিধানটি খুব কার্যকর ও প্রায়োগিক ছিল। সরকার এরূপ জনবান্ধব একটি পদ্ধতি উঠিয়ে দিয়ে ওয়েস্ট মিন্স্টার ধরনের গণতন্ত্র অনুসরণ করতে চায়। মনে রাখতে হবে, পশ্চিমা গণতন্ত্রের বয়স অনেক। ১৬৮৮ সালে ব্রিটেনে ও ১৭৭৬ সালে আমেরিকায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ফরাসি বিপ্লবে লাখ লাখ লোকের আÍদানে যে জনতার শাসন ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়, তার হাওয়া সমস্ত ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে ওয়েস্ট মিন্স্টার স্টাইল আশা করা যায় না। সরকারি দলের নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে মনে হয়, বাংলাদেশের মানুষ প্রজা এবং তারা সামন্ত প্রভু ও রাজা। তাদের ইচ্ছায় সবকিছু চলবে। তারা দয়া করে যেভাবে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন, জনগণ তা-ই মেনে নেবেন ও রাজনৈতিক দলগুলো সুড় সুড় করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলে তারা একাই নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ক্ষমতায় ফিরে আসবে। বিরোধী দল না এলে কী হবে, বাম দলগুলোকে একত্রিত করে বিরোধী দল বানানো যাবে। তাদের দয়া করে ১০-২০টি আসন দিলেই চলবে। ওসব দলের জনভিত্তি নেই। ১০-২০টি সিট পেলেই তারা সন্তুষ্ট থাকবে। আমার বিবেচনায় ওরকম বিরোধী দলও পাওয়া মুশকিল হবে। সাজানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কোনো দল রাজনৈতিক আত্মহত্যার ঝুঁকি নেবে বলে মনে হয় না। দেশের সিংহভাগ মানুষের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার বিপরীতে যেতে চাইবে না কোনো রাজনৈতিক দল। সরকারের কথা শুনে অনেক সময় মনে হয়, বিএনপি নির্বাচনে আসতে বাধ্য। জেনেশুনে বিএনপি বা অন্য দলগুলো এমন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কেন?
আওয়ামী লীগ ইচ্ছাকৃতভাবে সংবিধান সংশোধন করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে। এ সংকটের সমাধান তাদেরই করতে হবে। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া এরূপ পরিবর্তন কেউ মানবে না। দেশের জ্ঞানী, গুণী ও প্রখ্যাত আইনজীবীরা সৃষ্ট সংকটের সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছেন। দেশের মানুষও শান্তি চায়। রাজনৈতিক সংকটের কারণে মানুষের জীবন-জীবিকা ও সম্পদের হানি কেউ চায় না।
বিএনপিসহ ১৮-দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তে অটল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জাতীয় পার্টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বিকল্প ধারা ইত্যাদি। বিএনপি নেতা-নেত্রীরা গত সাড়ে চার বছরে অসংখ্য মামলা, হামলা, গুম, খুন-নিপীড়ন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কিন্তু মনোবল হারাননি। মানুষের জানমালের কথা বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি নেত্রী শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়ে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করে তার দাবির ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন। ৫ সিটি কর্পোরেশনে তার দাবির ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যৌক্তিক দাবি সব মহল সমর্থন করে। সুশীল সমাজ, সংবাদকর্মী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বিদেশী দাতা সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুধাবন করে বিরোধী দলের দাবি সমর্থন করেছে। দেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতা, বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া তড়িঘড়ি করে সংবিধান সংশোধনকে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা ও বেঈমানি বলে ঘোষণা করেছেন।
দেশের প্রায় সব বিরোধী দল ও ৯০ ভাগ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রত্যাশা করে। তারপরও সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। আমাদের কথা হল, সংবিধান মানুষের জন্য, মানুষ সংবিধানের জন্য নয়। তাছাড়া সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয় যে তাতে পরিবর্তন আনা যাবে না। জনগণের প্রয়োজনে ৪২ বছরে অনেকবার সংবিধান কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। বর্তমানে জনগণের আকাক্সক্ষা ও প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে সংবিধানে সংশোধন আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
রাজনৈতিক সংকট ও জনগণের অশান্তি অনুমান করে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসও চুপ থাকতে পারেননি। তিনিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশে তৃতীয় শক্তি বলে কিছু নেই। নির্বাচনই একমাত্র সমাধান। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হতে হবে।’ তার বক্তব্যের মধ্যে বর্তমান সংকটের সত্যিকার সমাধান নিহিত। সরকারি দল থেকে তার বক্তব্যকে ‘অযাচিত ও আগ বাড়িয়ে উপদেশ’ বলা হয়েছে। সরকারি দলের বক্তব্য ড. ইউনূসকে না বোঝার ফল হিসেবে বিবেচনা করা যায়। ড. ইউনূস নিজের জন্য কিছু বলেননি। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনে তার কোনো লাভ নেই। তিনি নিশ্চয়ই মন্ত্রী-এমপি হবেন না। তার ধ্যানজ্ঞান গরিবের ভাগ্যোন্নয়ন। রাজকীয় পদের প্রতি তার কানাকড়ি লোভ আছে বলে মনে হয় না। আমরা মনে করি, ড. ইউনূস বিবেকের আদেশ পালন করে জাতীয় দায়িত্ব সম্পাদন করেছেন। জাতীয় সংকটকালে চুপ থাকা বিবেকের বিরুদ্ধাচরণ করা এবং শান্তিতে নোবেল বিজয়ের তাৎপর্য পরিপন্থী। দেশে অশান্তির কালোমেঘ দেখে চুপ থাকলে মানুষ তার প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলবে। আমি কয়েকটি লেখায় ড. ইউনূসকে মানবকেন্দ্রিক চিন্তা-চেতনার অধিকারী বলেছি। মানুষের দুঃখকষ্ট, অশান্তি ও গরিব দেশের সম্পদহানি অনুমান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সবারই উচিত সরকারকে চাপ দেয়া। ড. ইউনূস জাতীয় কর্তব্য পালন করে সবার সম্মান ও শ্রদ্ধা নতুন করে অর্জন করেছেন। বক্তব্যের জন্য তার প্রশংসা না করে সরকারি তরফ থেকে যেভাবে কটাক্ষ, বিদ্রুপ ও অপমানজনক বক্তব্য দেয়া হচ্ছে তা দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। ড. ইউনূস এ দেশের নাগরিক। এ দেশের সুখ-দুঃখে তিনি মতামত দিতেই পারেন। এতে দোষের কিছু নেই।
আগেই বলেছি, দেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল উদ্বিগ্ন। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাবান সংস্থা জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে ফোন করে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছার তাগিদ দিয়েছেন। পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতরা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সঙ্গে সমঝোতার তাগিদ দেন। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চীন। চীনের রাষ্ট্রদূত দুই নেত্রীকে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টিকে সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা জাতিসংঘের পদক্ষেপকে যথোপযুক্ত মনে করে বলেছেন, বাংলাদেশের জনগণ নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। আগের পদক্ষেপ সফল না হলেও জাতিসংঘ তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলে জানা যায়। সে কারণে বিএনপি অহিংস ও নরম কর্মসূচি দিয়ে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আশা করব, শিগগিরই সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। নির্দলীয় সরকার প্রশ্নে আলোচনার উদ্যোগ নিয়ে তারা সংকট সমাধানের পথ প্রশস্ত করবেন। পারস্পরিক আস্থার সংকট কেটে গেলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে।
আওয়ামী লীগ বলতে গেলে এখন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশের চাপেও নির্দলীয় বিধান মানতে চাচ্ছে না। এককভাবে সব বিরোধী দল ছাড়া নির্বাচন করতে চাওয়া জনআকাক্সক্ষা ও জনস্বার্থবিরোধী চিন্তা। সব বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করে চুপ করে বসে থাকবে না। তারা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে এগিয়ে যাবে। এতে রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হবে। শান্তি বিনষ্ট হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের মানুষ ও সম্পদ। এককভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে অগ্রসর হওয়া দুঃখজনক। এটা রক্তক্ষয়ী সাংঘর্ষিক অবস্থার জন্ম দেবে। বিরোধী দলের আন্দোলন করার ক্ষমতা নেই বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করে সংকটের সমাধান হবে না। কারণ প্রধান বিরোধী দল ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। তাই উদ্ভূত রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সরকারকে এখনই সংলাপ আয়োজনের আহ্বান জানাচ্ছি। এতেই রাজনীতিকদের পাশাপাশি দেশের মঙ্গল নিহিত।
ড. আবদুল হাই তালুকদার : প্রফেসর, দর্শন বিভাগ ও ডিন, কলা অনুষদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পোশাক শিল্পে ন্যূনতম মজুরি by মামুন রশীদ

বাংলাদেশে কার্যরত একটি গ্লোবাল অ্যাপারেল সোর্সিং কোম্পানির কান্ট্রি ম্যানেজার দেশে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিু মজুরি ৮০০০ টাকা করার ব্যাপারে আমার কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন। আমি জানতাম, তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের বেতন কাঠামো ঠিক করতে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ বছরের ১২ মে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। বোর্ড গঠনের পর ১ মে থেকে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করা হবে বলে জানানো হয়। কিন্তু সেই ন্যূনতম মজুরি কত নির্ধারণ করা হয়েছে, আমি সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারিনি। বরং আমিই তার কাছে ন্যূনতম মজুরি ৮০০০ টাকা করার ব্যাপারে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাই। তিনি জানান, তৈরি পোশাক শিল্পের সামগ্রিক অবস্থা, বিদ্যুৎ ও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ, ভবনের নিরাপত্তা, সর্বোপরি শ্রমিকদের নিরাপত্তা এবং মালিকের সামর্থ্যরে বিষয়টি মাথায় রেখেই ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা উচিত। তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে না চাইলেও তার অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে, তিনি একলাফে ন্যূনতম মজুরি ৮০০০ টাকা করার ব্যাপারে কিছুটা স্পর্শকাতর এবং এটা তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান অবস্থায় ভালো ফল বয়ে আনবে না বলে মনে করছেন।
বাংলাদেশ মজুরি বোর্ড কর্তৃক ১৯৯৪ সালে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য সর্বনিু মজুরি ধার্য করা হয়েছিল ৯৩০ টাকা। এর ১২ বছর পর ২০০৬ সালে এটি ১৬৬২ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। এরও অনেক পরে ২০১০ সালে এসে এটি ৩০০০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি হতাশাজনক। কেননা বর্তমান জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে এটি খাপ খায় না। যার ফলে প্রায়ই তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা বিক্ষোভ আন্দোলনে নেমে পড়েন।
কিছুদিন আগে ন্যূনতম মজুরি ৮১১৪ টাকা নির্ধারণকল্পে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা-নেত্রীরা দাবি তোলেন। পক্ষান্তরে গার্মেন্ট মালিকরা বর্তমান ন্যূনতম মজুরির ৫০ ভাগ বৃদ্ধি করে তথা ৩০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৫০০ টাকা করা বিষয়টি বিবেচনায় আনেন।
পণ্যের অনুকূল মূল্য নির্ধারণ বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য সর্বদাই চ্যালেঞ্জস্বরূপ। পণ্যের নিুমূল্য নির্ধারণ পণ্যের উৎপাদন ও গ্রাহকের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিকে প্রভাবিত করে। আবার উচ্চমূল্য পণ্যের গ্রহীতা বা বিক্রয় কমিয়ে দেয়। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে আমাদের এগোতে হবে। আমাদের দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বর্তমান অবস্থার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ থেকে এটা বেশ স্পষ্ট যে, পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে সেটা হতে হবে মালিক, শ্রমিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থাÑ প্রত্যেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য। কোনো পক্ষকেই এতে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। এক্ষেত্রে এটি এখনই চীনের মতো ২০০ ডলার বা এমনকি ভারতের মতো ১০০ ডলার করার পর্যায়ে হয়তো আসেনি। আসেনি এজন্যই যে, বাংলাদেশে ৫৫০০ তৈরি পোশাক কারখানার মধ্যে মাত্র ৩০০০টি সরাসরি রফতানি অর্ডার পেয়ে তৈরি পোশাক রফতানি করে। বাকিরা সবাই স্বল্প লাভে সাব-কন্ট্রাক্ট করে থাকে।
আমরা জানি, তাজরিন ফ্যাশন ও রানা প্লাজার ঘটনা পুরো বিশ্বকে নেতিবাচকভাবে নাড়া দিয়েছে। এতে আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এতে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে নেতিবাচক অবস্থার শিকার হন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা। তবে এটাও মানতে হবে, রানা প্লাজা ও তাজরিন ফ্যাশনের ঘটনা শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না। ছিল কারখানার নিরাপত্তা, শ্রমিক নিরাপত্তা তথা সামাজিকভাবে শ্রম অধিকারের সঙ্গে জড়িত। অপরদিকে এটাও সত্য যে, তাজরিন ফ্যাশন ও সাভার ট্রাজেডির মতো বিভিন্ন দুর্ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে চাপের মুখে ফেলে বিদেশী ক্রেতারা আদায় করে নিচ্ছেন বাড়তি সুবিধা।
তাজরিন ফ্যাশন ও রানা প্লাজার ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি না পাওয়ার বিষয়টি, সেই সঙ্গে দালানের নিরাপত্তা কমপ্লায়েন্স না থাকা, শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মস্থল না থাকা সর্বোপরি শ্রমিকদের সামান্যতম জীবন-মানের তত্ত্বাবধান না থাকার বিষয়টি নিয়ে আমাদের অবশ্যই ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি পোশাক শিল্পের নির্মাণ অবকাঠামো সুদৃঢ় করতে হবে। নিুমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করে ভবন তৈরি করে নিরীহ শ্রমিকদের মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা অবশ্যই জোরদার করতে হবে। আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটাই অচল। সেই সঙ্গে আগুন লাগলে পাবলিক অ্যানাউন্সমেন্ট (পিএ) সিস্টেম না থাকায় এবং ফ্লোর ম্যানেজারের অসতর্কতায় আগুনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশেই বেড়ে যায়।
সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রায় ২০০০ ফ্যাক্টরিতে নিরাপত্তা নিরীক্ষার কোনো ব্যবস্থাই নেই। অবশ্যই এ বিষয়গুলো আমাদের বিবেচনায় আনতে হবে। একজন ফ্যাক্টরি ইন্সপেক্টরকে নিশ্চিত হতে হবে, ফ্যাক্টরিতে বা ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্টে ন্যূনতম মান অনুসরণ করা হচ্ছে। আমাদের ফায়ার ব্রিগেডকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হবে।
চীনের পোশাক শিল্পে মাসিক মজুরি ২০০ ডলারেরও বেশি। তবে চীনা শ্রমিকরা ২০০ ডলারের বেশি মজুরি নিয়ে যা উৎপাদন করছে, আমাদের শ্রমিকদের একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করতে লাগছে প্রায় ২০০ ডলার। সেক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি কম নয়। যেখানে বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি ৪০ ডলারের নিচে, সেখানে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে ন্যূনতম মজুরি ১১৩ ডলার, পাকিস্তানে ন্যূনতম মজুরি ১১৮ ডলার এবং ভিয়েতনামে ন্যূনতম মজুরি ১২০ ডলার। দেশের পোশাক খাতের মজুরি নিয়ে প্রশ্ন সেখানেই। আবার এটাও সত্য যে, সদ্য যোগদানকারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেই শুধু ন্যূনতম মজুরির বিষয়টি প্রাসঙ্গিক কিংবা বড়জোর ৬ মাস একজন শ্রমিককে এই বেতনে রাখা যায়। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের মাসিক আয় প্রায় ৭০০০ টাকা বলে পত্রিকান্তরে জানা গেছে।
নিরাপদ ভবন, শ্রমিকদের নিরাপত্তা, জ্বালানি সমস্যার সমাধান, উপযুক্ত অবকাঠামো, কমপ্লায়েন্স ডেভেলপমেন্ট এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। এ ব্যাপারে আমেরিকা, ইউরোপ ও জাপান থেকেও আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত। কেননা সেখানে শুধু শ্রমিকদের মজুরিই নয়, তাদের নিরাপত্তা, জীবনমান উন্নয়ন, উন্নত কর্মপরিবেশ ইত্যাদি সবকিছু নিয়েই চিন্তাভাবনা রয়েছে তাদের। শ্রমিকরাও কেবল বেতনের দিকে মুখিয়ে থাকেন না। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু অদ্যাবধি এর প্রতি গুরুত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এই শিল্পে যেসব অভাব-অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর সমাধানকল্পে আমাদের প্রয়োজন পূর্ব পরিকল্পনা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কেননা পথ কণ্টকাকীর্ণ হলেও সম্ভাবনা প্রচুর।
মামুন রশীদ : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো ও শিক্ষার মান by সুলতান মাহমুদ রানা

সরকারের শেষ সময়ে এসে বেশকিছু নতুন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এসব উদ্যোগকে এক কথায় নির্বাচনবান্ধব বলে আখ্যায়িত করা যায়। এর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত স্থায়ী পে-কমিশন গঠনের উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। প্রায় ১৩ লাখ সরকারি চাকরিজীবী নতুন কাঠামো অনুযায়ী বাড়তি বেতন-ভাতা পাবেন। নির্বাচনের ঠিক পূর্বাবস্থায় এবং নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ নির্বাচিত হওয়ার পরপরই পে-কমিশন ঘোষণার একটি রীতি চালু আছে। এ ধারাবাহিকতায়ই হয়তো এই উদ্যোগ। তবুও যা হোক, এটি একটি সান্ত্বনাও বটে। উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৯ সালের ১১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল। ওই বেতন কাঠামো অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি পায় সর্বোচ্চ ৭৪ শতাংশ ও সর্বনিু ৫৬ শতাংশ। সরকারের শেষ সময়ে এসে প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এখন একটু শিক্ষকদের বেতন কাঠামোসংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গ উপস্থাপন করতে চাই। নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার দিন বদলের সনদে বলা হয়েছিল, মানব উন্নয়নে শিক্ষা ও বিজ্ঞান ক্ষেত্রে ‘শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষাঙ্গনকে দলীয়করণমুক্ত, শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর বেতন কাঠামো ও স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন ও স্বতন্ত্র কর্মকমিশন গঠন করা হবে।’ এ সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন সম্পর্কযুক্ত। এ কারণে যে কোনো কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়। একটি সুশিক্ষিত জাতি স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে যায়। বিশ্বের দরবারে নিজের উচ্চ স্থান নিশ্চিত করতে পারে। এজন্যই প্রয়োজন শিক্ষার মানোন্নয়ন। বাংলাদেশে শিক্ষার হার বাড়ছে। তবে শিক্ষার মান নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর জন্য প্রথমে যে বিষয়টিতে লক্ষ্য রাখা দরকার তা হল শিক্ষকদের গুণগত মান কিংবা মানসম্পন্ন শিক্ষকতা। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরেই শিক্ষার গুণগত মান সুনিশ্চিত করা অপরিহার্য। সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদাই যে কোনো পেশাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। যে পেশায় সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা নেই, স্বাভাবিকভাবেই সেই পেশার প্রতি মেধাবীদের অনাগ্রহ ও অনিচ্ছা তৈরি হয়।
প্রথমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের বাস্তব অবস্থা নিয়ে দু-একটি কথা বলতে চাই। দেশের সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যে বেতন কাঠামো, তা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৪র্থ ও ৩য় শ্রেণীর কর্মচারীর বেতনের কাছাকাছি। সমাজে সম্মান ও মর্যাদার দিক থেকে শিক্ষকরা নিশ্চয়ই এক ধাপ এগিয়ে। আর এই এক ধাপ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবনযাত্রাও এক ধাপ এগিয়ে থাকার কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একজন শিক্ষক তার বেতন কাঠামো বিচারে কোনোভাবেই সমাজে এগিয়ে থাকতে পারে না। এমনকি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষককে তার পেশার সঙ্গে অসামঞ্জস্য দায়িত্বও পালন করতে হয়। তিনি প্রতিদিন সকালে পাঠদানের জন্য বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রথমেই বিদ্যালয় পরিষ্কারের জন্য ঝাড়– দেয়া থেকে শুরু করে এ ধরনের নানা দায়িত্ব পালন করে থাকেন, যে কাজগুলো একজন শিক্ষক হিসেবে তার জন্য কোনোক্রমেই মানানসই নয়। একদিকে তার নিুমানের বেতন কাঠামো অন্যদিকে পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কাজÑ এ দুয়ের ফলাফল যেমন জাতির জন্য লজ্জাজনক, তেমনি মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে পরিচিত গোটা শিক্ষক সমাজের জন্যও তা লজ্জাজনক। আমরা সবাই জানি, একটি শক্তিশালী ইমারত নির্মাণের পূর্বশর্ত হল শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন। ভিত্তিপ্রস্তর যদি দুর্বল হয়, তাহলে কোনোক্রমেই শক্তিশালী ইমারত নির্মাণ সম্ভব নয়। এমন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে আমাদের দেশের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা কাঠামোতে। প্রমোশন, আপগ্রেডেশন কোনো পদ্ধতিই এসব শিক্ষকের জন্য প্রযোজ্য নেই। ফলে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন সময়ে কাফনের কাপড় জড়িয়ে অনশন করতে দেখা যায়। এতেই বোঝা যায় এদেশে শিক্ষকরা কেমন আছে।
এ অবস্থায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা কাঠামো অনেকটাই কোচিংনির্ভর হয়ে পড়েছে। সরকার অনেকবার কোচিং বন্ধের উদ্যোগ নিলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠদানের অনিচ্ছা মূলত অর্থনৈতিক অভাব থেকেই সৃষ্ট। অভাব মেটানোর তাগিদেই গড়ে উঠেছে কোচিং বাণিজ্যের ব্যাপকতা। বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং ও প্রাইভেট কোচিংয়ের সঙ্গে দেশের সরকারি কলেজের শিক্ষকরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এমনকি কোনো কোনোটির পরিচালকও বটে। শিক্ষকদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মনোযোগী করে তোলার জন্য দরকার যুগোপযোগী বেতন কাঠামো। বেতন কাঠামোর মাধ্যমেই মেধাবীদের এই পেশায় আগ্রহ সৃষ্টি করা সম্ভব।
এবার আশা যাক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা কোনোভাবেই যুগোপযোগী নয়। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়, সে তুলনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত কম। এ কারণেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষকতায় ঝুঁকে পড়েছেন। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শুধু বেতনের ওপর নির্ভর করতে হয়। জীবনযাপনের খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় বেতনের এই অর্থ দিয়ে শিক্ষকদের সামাজিক অবস্থানটুকু ধরে রাখা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে কর্মক্ষেত্রে তাদের হতাশায় ভুগতে হয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকেরই ব্যক্তিগত বসার কোনো জায়গা নেই। অন্যান্য তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধাও নেই। নিরাপত্তা নিয়েও সমস্যা রয়েছে। গবেষণায় নিমগ্ন হয়ে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে শিক্ষকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
মহাজোট সরকারের দিন বদলের সনদে শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বলা হলেও সরকারের শেষ সময়ে তা উপযুক্ত পর্যায়ে পৌঁছেনি। শিক্ষাঙ্গনকে দলীয়করণমুক্ত করা যায়নি। বরং তা ক্রমেই বাড়ছে। শিক্ষকদের উচ্চতর বেতন কাঠামো, স্থায়ী বেতন কমিশন ও স্বতন্ত্র কর্মকমিশন গঠন আজও স্বপ্নই থেকে গেছে। সরকারি দল প্রদত্ত অন্যতম এই অঙ্গীকার পালন না করেই আবার নির্বাচনী ইশতেহারে এমন বক্তব্য পুনঃস্থাপন করা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সামনে নৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে, তা বাস্তবায়ন করতে মানসম্পন্ন শিক্ষক, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা এবং শিক্ষকের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর বিকল্প নেই।
সুলতান মাহমুদ রানা : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সরকারের সদিচ্ছাটাই বেশি জরুরি by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

চার হাজার ছয় শতাধিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, পৌরসভা নির্বাচন, উপনির্বাচন, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং সর্বশেষে সরকারের শেষ বছরে চারটি বিভাগীয় শহরে এবং রাজধানীর সন্নিকটে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন থেকে প্রাপ্ত মেসেজে সরকার তার জনপ্রিয়তার অবস্থা বুঝতে পেরেছে। চারটি বিভাগীয় শহরের সিটি কর্পোরেশনে উন্নয়ন কাজ করেও সরকারদলীয় প্রার্থীরা পরাজিত হওয়ার পর গাজীপুরে ক্লিন ইমেজের আকর্ষণীয় প্রার্থী দাঁড় করিয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও এক লাখ ছয় সহস্রাধিক ভোটের ব্যবধানে পরাজয়ের পর সরকারের বুঝতে বাকি থাকেনি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলে ওই নির্বাচনে সরকারি দলের পারফরম্যান্স কেমন হবে। এসব নির্বাচনের ফলাফল ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি জরিপের ফলাফল থেকেও সরকার তার জনপ্রিয়তা হ্রাসের তথ্য পেয়েছে। অনেকে মনে করেন, এ কারণে পরাজয় এড়াতেই সরকার গত সাড়ে চার বছরে ডিসিসি নির্বাচন দেয়নি। তবে সরকার যদি তার মেয়াদকালে ডিসিসি নির্বাচন না করতে পারে, তাহলে বিরোধী পক্ষ সরকারের এ ব্যর্থতাকে সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাকালে সরকারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।
উল্লেখ্য, ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যে সরকার তার জনপ্রিয়তার নিুগতি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে তখন থেকেই কিভাবে আবারও ক্ষমতায় আসা যায় সে সম্পর্কে পরিকল্পনা শুরু করে। এ লক্ষ্যে নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের প্রতিশ্র“তি না থাকা সত্ত্বেও আদালতের দোহাই দিয়ে একটি মামলার বিভক্ত রায়ের সংক্ষিপ্ত আদেশের নিজ স্বার্থ উদ্ধারকারী অংশ ব্যবহার করে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার আগেই অ্যামিকাস কিউরিদের মতামত ও জনমত উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। যেসব কারণে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, ওই কারণগুলো দূর না করেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ ব্যবস্থা বাতিল করা হয় বলে প্রতীয়মান হয়। নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের জন্য আন্তরিক হলে সরকার বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পরিবর্তে এর ত্র“টি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধনের লক্ষ্যে এ ব্যবস্থার সংস্কার এবং নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিত। কিন্তু তা না করে সরকার অসুখ নিরাময়ের আগেই ওষুধ বন্ধ করে দেয়ার মতো পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে একদিকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়, অন্যদিকে এ সংশোধনীতে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা থেকেও বিরত থাকে।
এভাবে দলীয় সরকারের অধীনে সাজানো প্রশাসনে নিজেদের নিয়োগকৃত নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে সরকার সহজে সংসদ নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার ব্যবস্থা করে। তবে জনগণের মতামত না নিয়ে এ ব্যবস্থা করায় এ সরকারি পরিকল্পনা কার্যকর করা সম্ভব হবে কি-না, তা দেখার জন্য জাতিকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়ার বিষয়টি দেশের সর্বস্তরের মানুষ মোটেও পছন্দ করেননি। অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এসিড টেস্ট হিসেবে আখ্যায়িত পাঁচটি হাইভোল্টেজ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মতামত প্রদানের মাধ্যমেও শহরাঞ্চলের সচেতন ভোটাররা সরকারি পরিকল্পনার বিপক্ষে তাদের সে মতামত জানিয়ে দিয়েছেন।
স্মর্তব্য, ড. হুদা কমিশনকে কাজে লাগিয়ে ইভিএমের মাধ্যমে সংসদ নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে সংসদ নির্বাচন জেতার একটা সরকারি এক্সপেরিমেন্টও ব্যর্থ হয়। সে পরীক্ষায় কোটি কোটি টাকা খরচ করেও ওই পরিকল্পনা বিরোধী দল এবং জনগণকে গ্রহণ করাতে ব্যর্থ হয়ে এখন সে চেষ্টা থেকে সরকার ও নির্বাচন কমিশন সরে এসেছে। ইভিএমে নির্বাচন করতে পারলে যে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল কারচুপি করা সম্ভব, সে বিষয়টি বিরোধী দল ও ভোটাররা অনুধাবন করে এ ব্যবস্থায় সংসদ নির্বাচন করতে কিছুতেই রাজি হয়নি। প্রধান বিরোধী দল কেবল ইভিএম প্রত্যাখ্যানই করেনি, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকালীন বাংলাদেশী ইভিএম যে হ্যাকপ্র“ফ নয় সে ব্যাপারে তারা নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কিভাবে এ মেশিন হ্যাক করা সম্ভব তা দেখানোর জন্য ইসির কাছে একটি ইভিএম মেশিন কয়েকদিনের জন্য চেয়েছিল। কিন্তু সে ব্যাপারে কমিশন বিরোধী দলকে সহযোগিতা করেনি। তাছাড়া বাংলাদেশী ইভিএমের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান বুয়েট ছাড়া অন্য কোনো দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সরকার বা ইসি এ ইভিএমের কার্যকারিতা পরীক্ষা করায়নি। ফলে বিরোধী দল ও জনগণ কারও কাছে ইভিএম গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশন অনেক দেরি করে বহু অর্থ গচ্চা দেয়ার পর হলেও ইভিএমে সংসদ নির্বাচন করার পথ থেকে সরে এসেছে।
এসব পরিকল্পনা কার্যকর না করতে পেরে সরকার এখন আরও কিছু পরিকল্পনা করে নিজ তত্ত্বাবধানে স্বনিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন করে আবারও ক্ষমতায় আসতে চাইছে। এসব পরিকল্পনার মধ্যে একটি হল উভয় দল থেকে সমসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করে তার অধীনে নির্বাচন করা। এ পরিকল্পনা কার্যকর করতে না পারলে রাষ্ট্রপতি বা স্পিকারকে প্রধান করে তাদের অধীনে উভয় বড় দল থেকে সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে তার অধীনে নির্বাচন করা। কিন্তু এসব পরিকল্পনা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এ পরিকল্পনাগুলোতে বিরোধীদলীয় আন্দোলনের মূল স্পিরিট- নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থাধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি সুনিশ্চিত হয় না। কেননা প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার এবং রাষ্ট্রপতি- এদের কেউই নির্দলীয় ব্যক্তিত্ব নন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো একাধারে দলীয় ও সরকারপ্রধান, কাজেই তার অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে মনে করা যায় না। আর বাকি দু’জনও পদে আসার আগে রাজনীতি করেছেন এবং মাত্র কিছুদিন আগেও তারা দলীয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। কাজেই বিরোধী দল তাদের নির্দলীয় সরকারপ্রধান হিসেবে মেনে নিতে চাইবে না। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে একই চরিত্রের আন্দোলনে বিচারপতি কেএম হাসানের দীর্ঘ বিচারপতি জীবনে কোনো রকম দলীয় পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও বহু বছর আগে তিনি বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয় সম্পাদক থাকার কারণে তাকে আওয়ামী লীগ নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে মেনে নেননি। একইভাবে এখন একই চরিত্রের আন্দোলনে বিএনপি যদি রাষ্ট্রপতি বা স্পিকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করতে রাজি না হয় তাহলে সরকার তাদের কিভাবে দোষ দেবে?
চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকারকে বিরোধী দল ও জনগণকে এ মর্মে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তারা যেভাবে নির্বাচন করতে চাইছেন তাতে নির্বাচনটি সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতি ও কারচুপিমুক্ত হবে। বিরোধী দলকে বোকা মনে করে গোঁজামিল দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে স্বনিয়োজিত নতজানু নির্বাচন কমিশনের অধীনে সংসদ নির্বাচনে রাজি করানোর চেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এ রকম রাজনৈতিক আন্দোলন আগেও হওয়ায় এ ব্যাপারে বিরোধীদলীয় নেতাদের পরিষ্কার ধারণা আছে এবং বিরোধী দলেও যেহেতু অনেক কৌশলী, অভিজ্ঞ ও পোড় খাওয়া নেতা রয়েছেন; কাজেই অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে যেনতেন প্রকারে বা গোঁজামিল দিয়ে তাদের দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে রাজি করানো যাবে না। কিভাবে বা কোন শর্তে বিরোধী দল নির্বাচনে রাজি হবে সে সম্পর্কে তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে সরকারের অনাগ্রহের কারণ বোধগম্য নয়। কতিপয় আশাবাদী সরকারদলীয় নেতাকে বলতে শোনা যাচ্ছে- এখনও সময় আছে, সময়মতো একটা গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা বের হয়ে আসবে। কিন্তু সে ফর্মুলাটা একটু আগেভাগে জাতিকে জানিয়ে সাধারণ মানুষকে টেনশনমুক্ত করতে অসুবিধা কোথায়? দেরি করে সমস্যার সমাধান করলে এ কারণে সৃষ্ট আন্দোলন, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দায় কে নেবে? তাছাড়া আগে থেকেই নির্বাচনী ব্যবস্থার ফয়সালা হলে যুগপৎ নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রস্তুতি ও প্রচারণার কাজ গঠনমূলকভাবে করতে পারার সুবিধার বিষয়টি মাথায় না রাখার কারণ কী?
উভয় বড় দলের কতিপয় নেতা নির্বাচনী ব্যবস্থার ফয়সালা করার ক্ষেত্রে দু’দলের মধ্যে এ বিষয়ে সংলাপের ওপর গুরুত্ব আরোপ করছেন। তাদের বক্তব্যে মনে হয়, সংলাপে বসলেই যেন উদ্ভূত সংকটের ফয়সালা হয়ে যাবে। বিষয়টি কিন্তু মোটেও সে রকম নয়। কারণ, এর আগে জাতি আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপের পরিণতি দেখেছে। এক্ষেত্রে সংলাপের চেয়ে সদিচ্ছা বেশি প্রয়োজন। সদিচ্ছাবিহীন সংলাপ সময় বিনষ্টকারী আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আর যদি সদিচ্ছা থাকে, তাহলে সংলাপেরও দরকার হয় না। সরকারি দলের যদি সদিচ্ছা থাকে যে সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ ও কারচুপিমুক্তভাবে করতে হবে, তাহলে সংলাপ ছাড়াই তা করা সম্ভব। ১৯৯৬ সালে এহেন সমস্যা জটিল আকার ধারণ করার পরও তৎকালীন সরকারি দল কোনো সংলাপ না করে একটি যেনতেন প্রকারের নির্বাচন করে সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে আওয়ামী লীগ-জাপা-জামায়াতের দাবি মেনে নিয়ে ওই সমস্যার সমাধান করেছিল। সংলাপবিহীন ওই সমাধান আন্দোলনকারী দলগুলো মেনে নিয়ে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। বর্তমানে তো পরিস্থিতি অতটা নাজুক হয়নি। এখনও বিরোধী দলগুলো সংসদ থেকে সম্মিলিতভাবে পদত্যাগ করেনি। বর্তমানে বিরোধী দলগুলোর সংসদ থেকে পদত্যাগের কোনো পরিকল্পনা আছে বলেও শোনা যায় না। কাজেই সরকারি দল চাইলে সংসদের আসন্ন শেষ অধিবেশনে একাকী অথবা বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে সংবিধানে সংশোধনী এনে সহজে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করতে পারে।
বিরোধী দল যদি সরকারের আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলেও সরকারের কিছু এসে যায় না। কারণ, তাদের যে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে তাতে তারা সংসদে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিল এনে সে বিল পাসের মধ্য দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে সক্ষম। সরকারি দল যদি এককভাবেও এমন কাজ করে বাহবা নিতে চায়, তাহলে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যেমন বিএনপির এককভাবে পাস করা ত্রয়োদশ সংশোধনী মেনে নিয়েছিল, সেভাবে বিরোধী দলের পক্ষে তা মেনে নেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। তবে এক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো দেখা যাচ্ছে। কারণ প্রধান বিরোধী দল থেকে বারবার বলা হচ্ছে, নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে যে কোনো সরকারি উদ্যোগে তারা অংশগ্রহণ করবে এবং এ ব্যাপারে সরকারকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে। কাজেই এমন পরিস্থিতিতে সংলাপ করে সময়ক্ষেপণ করার পরিবর্তে সংসদের আসন্ন শেষ অধিবেশনে সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়ে আলোচ্য সমস্যার সমাধান করে জাতির কাছ থেকে সরকারের বাহবা পাওয়ার সুযোগ আছে।
ইদানীং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারদলীয় নেতাদের অনেকে ওয়েস্টমিন্স্টার স্টাইলে সংসদ নির্বাচন করার যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ, পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে গণতন্ত্র বিকশিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্ব যেভাবে গড়ে উঠেছে, বাংলাদেশের সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার তুলনা করতে যাওয়া বোকামি হবে। যে দেশের জাতীয় নেতারা বড় বড় জাতীয় সংকটে এক টেবিলে বসে আলোচনা করতে পারেন না, দুই প্রধান নেতা একজন আরেকজনের মুখদর্শন করতে চান না, তাদের মুখে ওয়েস্টমিন্স্টার স্টাইলে নির্বাচন করার প্রতিশ্র“তি জনগণের কাছে কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে? পাশ্চাত্যের দেশগুলোর অংশগ্রহণমূলক, স্থিতিশীল, সুশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিহিংসাপরায়ণ ও সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির কি কোনোভাবেই তুলনা করা যায়? কাজেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতিগত উন্নয়ন না ঘটিয়ে রাতারাতি ওয়েস্টমিন্স্টার স্টাইলে নির্বাচন করতে চাওয়াকে বড় ধরনের আহাম্মকি অথবা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা বলা বেমানান নয়।
সরকার যদি আসন্ন সংসদ অধিবেশনে নির্দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচনের ব্যবস্থা না করে দলীয় সরকারের ও স্বনিয়োজিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন করে বিজয় সুনিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তার পরিণতি সম্পর্কেও সরকার অবগত আছে। কারণ সরকার জানে, গোঁজামিল দিয়ে দলীয় ব্যবস্থাধীনে বিরোধী দলকে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো যাবে না। বরং ওই রকম কোনো উপায় অবলম্বন করলে দীর্ঘমেয়াদি সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এসব জেনেও প্রধানমন্ত্রী সচিব সভায় সংসদ ও মন্ত্রী-এমপি বহাল রেখে জনমতকে শ্রদ্ধা না করে আইন ও নিজেদের সংশোধিত সংবিধানের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করে যেভাবে নির্বাচন করার ছক উপস্থাপন করেছেন, তাতে নির্বাচন ও দেশ যথাক্রমে অনিশ্চয়তা ও সংঘাতমুখী হবে। এ ব্যাপারে অনড় অবস্থানে না থেকে প্রধানমন্ত্রী যদি তার সচিব সভার বক্তব্যকে বিরোধীদলীয় নেতাদের ওপর স্নায়ুচাপ বাড়িয়ে তাদের দরকষাকষিতে কিছুটা নমনীয় করতে ব্যবহার করে অচিরেই আসন্ন সংসদে এ অবস্থান থেকে সরে আসতে চান, তাহলে সে সুযোগ এখনও হাতছাড়া হয়ে যায়নি।
কাজেই আগামী সংসদ নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে হবে কি-না এবং ওই নির্বাচন অবাধ ও দুর্নীতি-কারচুপিমুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হবে কি-না, তা মোটেও বিরোধীদলীয় আন্দোলন-সংগ্রাম বা সরকার ও বিরোধীদলীয় নেতাদের সংলাপের ওপর নির্ভর করছে না; বরং বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে সরকারের সদিচ্ছার ওপর। এখন দেখার বিষয়, আসন্ন সংসদ অধিবেশনে সরকার নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে প্রশংসিত হয়, নাকি নিজস্ব নির্বাচনী বিজয় সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি না করে দলীয় ব্যবস্থাধীনে সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে নির্বাচনকে অনিশ্চয়তা এবং দেশকে অস্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়