Sunday, July 6, 2025

‘তারা কেবল হাড্ডিসার’

গাজার চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, শিশুখাদ্যের তীব্র সংকটের কারণে শত শত শিশু মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। ইসরাইল যেহেতু অবরুদ্ধ উপত্যকায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, তাই এই সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. আহমাদ আল-ফাররা জানান, তাদের ওয়ার্ডে এক সপ্তাহের মতো শিশুদের দুধ মজুত আছে। নবজাতকদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ ফর্মুলা ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। ফলে তিনি সাধারণ ফর্মুলা রেশনিং করে শিশুদের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। ডা. আহমাদ আল-ফাররা বলেন, পরিস্থিতি বর্ণনা করার মতো ভাষা নেই। এখন যা মজুত আছে, তা এক সপ্তাহ চলবে। অথচ হাসপাতালের বাইরেও অনেক শিশু আছে যাদের জন্য কোনো দুধ নেই। এটি একেবারে ধ্বংসাত্মক। ইসরাইল গাজায় খুব সীমিত সহায়তা প্রবেশ করতে দিচ্ছে। বিতর্কিত মার্কিন-ইসরাইল সমর্থিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের (জিএইচএফ) মাধ্যমে যে খাদ্য সহায়তা আসে, তাতে শিশুখাদ্য থাকে না বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। ২৭ বছর বয়সী পাঁচ সন্তানের মা হানাআ আল-তাওয়িল বলেন, তিনি নিজেই খাবার খেতে না পেয়ে বুকের দুধ শুকিয়ে গেছে। ১৩ মাস বয়সী সন্তানের জন্য শিশুখাদ্য জোগাড় করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, শিশু জন্মের পর থেকেই দুধ জোগাড়ের সমস্যা চলছে। অপুষ্টির কারণে এবং নিজের দুর্বলতার জন্য আমি বুকের দুধ দিতে পারিনি। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হানাআর শিশুটি অপুষ্টিজনিত কারণে শারীরিক ও মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। তার আগের সন্তানরা এই বয়সে হাঁটতে ও কথা বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু এই শিশু তেমন কিছু করতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, ঘুমানোর সময় পাশে একটু রুটি রাখি। কারণ সে প্রায়ই ক্ষুধায় কেঁদে ওঠে। আমি দুঃখ আর ভয়ে থাকি- আমার সন্তানরা না জানি কখন না খেয়ে, না খেতে পেয়ে বা রোগে মারা যায়। গাজায় চলমান যুদ্ধে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে কমপক্ষে ৬৬ জন ফিলিস্তিনি শিশু অনাহারে মারা গেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করার অভিযোগ এনেছে, যা তারা ‘ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যার কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইসরাইলের মানবিক সহায়তা সমন্বয় বিষয়ক সংস্থা দাবি করেছে, তারা শিশুখাদ্য প্রবেশে বাধা দিচ্ছে না। কয়েক সপ্তাহে ১৪০০ টনের বেশি শিশুখাদ্য গাজায় পাঠানো হয়েছে। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তারা নিজেরা শিশুখাদ্য নিজেদের লাগেজে করে গাজায় নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। একবার, এক মার্কিন চিকিৎসকের লাগেজ থেকে ১০টি শিশুখাদ্যের কৌটা ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ জব্দ করে নেন। ডা. ডায়ানা নাজ্জাল একজন ফিলিস্তিনি-জার্মান চক্ষু চিকিৎসক। তিনি ওই চিকিৎসকের ব্যাগ গুছিয়ে দিতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি বলেন, ওই দুধগুলো ছিল অপরিণত শিশুদের জন্য। একজন অপরিণত শিশুর দুধের কৌটা ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য কী ধরনের হুমকি হতে পারে? তিনি আরও জানান, গাজায় ঢোকা অনেক চিকিৎসক তাদের লাগেজে চিকিৎসা সরঞ্জামের পরিবর্তে উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবার যেমন প্রোটিন বার ও বাদাম নিয়ে আসছেন। গাজায় অর্ধ মিলিয়ন মানুষ চরম দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। বাকি জনসংখ্যা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মা যদি অপুষ্টিতে ভোগে বা বেঁচে না থাকেন, তবে শিশুরা বুকের দুধ পায় না, যার ফলে ফর্মুলা দুধের চাহিদা আরও বেড়ে যায়।

mzamin

সরকারের ভেতরে সরকার

সরকারের ভেতরে সরকার। এই শিরোনামে লিখতে হবে ভাবিনি। বিশেষ করে প্রফেসর ইউনূসের সরকারকে নিয়ে। কারণ প্রফেসর ইউনূসের ছিল আকাশসম জনপ্রিয়তা, দেশে-বিদেশে। কিন্তু সব ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। এগারো মাস আগে এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনূসের সরকার। প্রেক্ষাপট সবার জানা। অভ্যুত্থানকালে তিনি দেশে ছিলেন না। বিদেশে বসেই তিনি শুনতে পান হাসিনা আউট। অন্তহীন খুশিতে তিনি তখন টগবগ করছিলেন।

দেশে ফিরলেই যেখানে তাকে জেলে যেতে হতো তার বদলে হয়তো অন্য কিছু অপেক্ষা করছে। যাই হোক প্রথমে বিশ্বাস করেন নি। পরে তার কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয় দেশি-বিদেশি টেলিফোন পাওয়ার পর। যদিও সমালোচকরা বলছেন, ঢাকায় কী ঘটছে তা তিনি জানতেন আগেভাগেই। একটি নীলনকশার মাধ্যমে এই পরিবর্তন আসে। এখন দিন দিন পরিষ্কার হচ্ছে কী ছিল সেই নীলনকশায়। কারা ছিলেন এর সঙ্গে যুক্ত। যাই হোক, ছাত্রদের বিরামহীন প্রচেষ্টার পর প্রফেসর ইউনূস রাজি হন। অনিশ্চয়তা কেটে যায়। ৮ই আগস্ট ২০২৪। প্যারিস থেকে উড়ে এসে দায়িত্ব নেন সরকারের। তখন সবার প্রত্যাশা ছিল চমকপ্রদ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তা কি আর হয়! শুরুতেই হোঁচট। ‘গ্রামীণ বক্স’-এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেন সরকারকে। পুরনো সহকর্মী পুনর্বাসন কেন্দ্রে পরিণত হয় সরকার।

এক দুর্বল উপদেষ্টা পরিষদ দেখে দেশবাসী তখন হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। ছাত্ররা যেখানে মানসিকভাবে সরকারে যেতে প্রস্তুত ছিল না সেখানে তাদের জায়গা দেন এক অবিশ্বাস্য চালে। আর এখানেই করলেন ভুল। এখন তিনি হিসাব মেলাচ্ছেন আর বলছেন, তাড়াহুড়ো করে সরকার গঠন না করে আরও সময় নেয়া যেত। ভুল পরামর্শ যারা দিয়েছিলেন তারা এখন আখের গুছিয়ে ইউনূসের সমালোচনা করছেন  আড়ালে-আবডালে,  কখনো চায়ের টেবিলে। 

বিপ্লবের পর তিউনিশিয়া পেয়েছিল এক দুর্বল গণতন্ত্র। বাংলাদেশ পেলো এক দুর্বল সরকার। একের পর এক চ্যালেঞ্জ আসতে থাকলো। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে কাবু ছিল রাজনীতি, প্রশাসন। ব্যক্তির কথায় চলতো গোটা প্রশাসন। গুম-খুন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ছিল না গণতন্ত্র। মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল। টাকা লুট ছিল নেশা, বিদেশ পাচার করায় ছিল তীব্র প্রতিযোগিতা। দেশটা হয়ে গিয়েছিল ফোকলা। এর মধ্যেই প্রফেসর ইউনূস দায়িত্ব নেন। যেখানে হাত দেন সেখানেই শুধু নেই আর নেই। ভেঙে পড়লো প্রশাসন। বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল তার প্রথম চ্যালেঞ্জ। এখনো তিনি লড়াই করছেন সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়।

১৭৭ জন মানুষ ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হলো। সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত বাতিলে মব সন্ত্রাস হয়ে গেল এক ধরনের হাতিয়ার। ইউনূস দেখেও না দেখার ভান করলেন। কারণ এরাই তার নিয়োগকর্তা এবং কাছের লোক। পুলিশের মনোবল চাঙ্গা করতে নেয়া হলো অনেকগুলো কৌশল। ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বারবার থেমে গেল সব প্রচেষ্টা। কারণ পুলিশে ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। হাসিনা চলে গেলেও তার প্রশাসন ছিল সচল। ঢালাও খুনের মামলা পরিণত হলো টাকা বানানোর কৌশলে। মানুষ বিরক্ত হলো। ভিন্নরূপে আইনি শাসন ধাক্কা খেলো। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক যখন আইনের দায়িত্ব নেন তখন সবার ধারণা ছিল এবার আইন চলবে নির্মোহভাবে। অল্পদিনের মধ্যেই সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। হেঁটে হেঁটে তিনি আইন পরিবর্তন করতে থাকলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এসবের উপর নজর রাখছে। তারা বলছে, ময়লার মধ্যে আটকে যাচ্ছেন এই শিক্ষক। প্রফেসর ইউনূসের বিশ্বাসে চিড় ধরলো। এখন অনেক দূরত্ব। আইন যেখানে অসহায় তখন মানুষ কী করবে। মানুষ কার উপর ভরসা রাখবে। মন্ত্রণালয় সামলাতে প্রফেসর ইউনূস বেছে নিলেন এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে। সেনা কাম নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এই কর্মকর্তা দায়িত্ব পেয়ে শুরুতেই ভুল করে বসলেন। তাকে অল্প কয়েকদিনের মধ্যে সরিয়ে দেয়া হলো। এটাও যে ভুল ছিল আখেরে তাই প্রমাণিত হয়েছে। এরপর যাকে বেছে নেয়া হলো তিনিও একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা। কথাবার্তা, চালচলনে খুবই সাদাসিধে। সহজ সরল এই মানুষটির পক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় চালানো যে কঠিন তা তিনি পদে পদে প্রমাণ করছেন। আশার কথা- তার গায়ে কোনো ময়লা লাগেনি। তার কাছে কৃষি মন্ত্রণালয় জুড়ে দেয়াটাও ছিল আরেক ভুল সিদ্ধান্ত।

উপদেষ্টা পরিষদ গোড়া থেকেই নির্বাচন প্রশ্নে বিভক্ত। একদল নির্বাচনের পক্ষে। অন্যদল মনে করে এখনই নির্বাচন কেন? নির্বাচনবিরোধী স্রোতটাই প্রবল। এই  স্রোতটি কৌশলে ছাত্রদের সঙ্গে হাত মেলায়। তারা বলছে, জাতীয় নাগরিক পার্টি ঘুরে না দাঁড়ানো পর্যন্ত নির্বাচন দেয়া কি ঠিক হবে! তারাই কিন্তু ঐকমত্য কমিশন গঠনের প্রস্তাব রেখেছিল। তাদের যুক্তি ছিল- বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারবে না। তখন নির্বাচনের দাবি অযৌক্তিক প্রমাণিত হবে। তাদের এসব অনৈক্যের বয়ান জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আমরা তখন বলতে পারবো আপনারাই তো একমত নন। এই অবস্থায় নির্বাচন হয় কীভাবে! এসব লক্ষ্য নিয়েই টেলিভিশনে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা সরাসরি সমপ্রচার করার সিদ্ধান্ত হয়।  উপদেষ্টারা নতুন নতুন তত্ত্ব হাজির করছেন পর্দার আড়ালে থেকে বিশ্বস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর মাধ্যমে।  আইনজীবী আর আমলানির্ভর এই স্রোত নির্বাচনকে বারবার অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জুলাই সনদ নিয়েও নানা খেলা রয়েছে।

লন্ডন বৈঠকের পরও ষড়যন্ত্র থেমে নেই। আর এই ষড়যন্ত্র হচ্ছে ইউনূসের সরকারের ভেতর থেকেই। এই সুযোগ নিচ্ছে উগ্রবাদীরা। তারা ক্ষমতা দখলের চেষ্টায় বিভোর। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এরা সবাই ইউনূসের পছন্দের লোক। ব্যক্তিপূজার কৌশলে তারা নিজস্ব চিন্তা-চেতনা বাস্তবায়ন করতে সক্রিয়। মাঝে মধ্যে প্রফেসর ইউনূস যে পুলকিত হন না- তা কিন্তু নয়। সর্বশেষ প্রফেসর ইউনূস কিছুটা বুঝতে পেরেছেন। তাই ডানা কেটে দিচ্ছেন। বলছেন ব্যক্তিপূজা নয়, তোমাদের মতলব সম্পর্কে আমি বুঝতে পেরেছি। অনেক হয়েছে, এখন আমার এত প্রচারের দরকার নেই। এসব করতে থাকলে দেশ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবে যাবে। আমাকেই জনগণ কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। আমার পুঁজি-পাট্টা সবই যাবে। কে জানে আমার সামনে কী অপেক্ষা করছে! কয়েকজন উপদেষ্টাকে সতর্ক করেছেন তিনি। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, প্রফেসর ইউনূস গোয়েন্দা তথ্যের উপর আগাগোড়াই আস্থাশীল নন। তিনি চলেন তার মতো। গোয়েন্দাদের ব্যাপারে তার ধারণা মোটেই সুখকর নয়। প্রায়ই বলেন, ওরা শোনা কথা আর প্রচার মাধ্যমের খবরের উপর নির্ভরশীল। বঙ্গবন্ধু অতিমাত্রায় বিশ্বাস রাখতেন আমলাদের ওপর। হাসিনারও এই বাতিক ছিল।

ইউনূস কি এসব থেকে মুক্ত? জানা গেল তিনিও আমলানির্ভর হয়ে পড়ছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, হাসিনার বিশ্বস্তদের হাতেই ইউনূস সরকারের চাবিকাঠি। এটা শুধু বেসামরিক প্রশাসন নয়। এর ফলে ইউনূসের জনপ্রিয়তা দিন দিন কমছে। একের পর এক ভুল করে যাচ্ছেন তিনি। নির্বাচন নিয়ে স্থির থাকতে পারছেন না। বিদেশিরা একসময় বলতেন, ইউনূস ছাড়া বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কোনো বিকল্প নেই।  এখন তারা বলছেন, কোথায় যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ নিয়ে বিদেশি শক্তি এখন সমালোচনামুখর। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে ইউরোপ থেকেও অন্য বার্তা পাচ্ছেন প্রফেসর ইউনূস। পশ্চিমা গণমাধ্যমের সুরও পাল্টে যাচ্ছে। সরকারের ভেতরে আরেকটি সরকার থাকলে পরিণতি কী হয় অতীতে  আমরা দেখেছি বাংলাদেশে। সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। প্রফেসর ইউনূসকে এটা বুঝতে হবে- এই উপদেষ্টা পরিষদ দিয়ে সামনের চ্যালেঞ্জিং নির্বাচনকে সামাল দেয়া সম্ভব নয়। যারা কিনা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষেই বন্দি। ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা মোটেই ওয়াকিবহাল নন। এই অবস্থায় নীতিকৌশল তারা কীভাবে ঠিক করবেন। এখানে বলে রাখা ভালো,  ঘুষ-দুর্নীতি আরও বেড়েছে। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে বাজার পরিস্থিতি সহনীয়। কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলেও সাধারণ ভোক্তারা ঠিকই এর সুবিধা পাচ্ছেন। সরকার অনেক ভালো কাজও করেছে। বিশেষ করে সংস্কার পর্বে বেশ কিছু অগ্রগতি হয়েছে। উপদেষ্টারা সরকারি এসব সাফল্য জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারছেন না।  নীতিনির্ধারকদের কারও কারও ব্যাপারেও নানা অভিযোগ উঠছে।  কমিশন বাণিজ্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। ব্যবসায়ীরা হতাশ। নেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ। জনগণ বড়ই চিন্তিত। দেশটা কি গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে? নাকি এক অজানা গন্তব্যই হবে নিয়তি!

(জনতার চোখ থেকে)

mzamin

ইরানে বোমা মেরে সরকার ফেলে দেওয়ার যুগ আর নেই by ইয়ান বুরুমা

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যে বিমান হামলা চালিয়েছে, তাতে আসলে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত জুনে ন্যাটো সম্মেলনে দাঁড়িয়ে গর্ব করে বলেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস, এটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান হয়তো কয়েক মাসের মধ্যেই আবার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কাজ শুরু করতে পারবে। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি।

একটি বিষয় মোটামুটি নিশ্চিত; তা হলো, এই বিশাল মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ইরানের জনগণকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উসকে দিতে পারেনি। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেই ফলাফলটিই আশা করেছিলেন। এমনকি ট্রাম্প নিজেও বলেছিলেন, ‘এই সরকার যদি ইরানকে আবার মহান করতে না পারে, তাহলে সরকার পরিবর্তনই সঠিক সমাধান’। তবে তিনি বলেননি, সেই পরিবর্তনটা দেশীয়ভাবে হবে, নাকি বাইরের থেকে চাপ দিয়ে ঘটানো হবে।

সাধারণ জনগণের ওপর বোমা ফেললে তারা ভয় পেয়ে সরকারবিরোধী হয়ে উঠবে এবং নিজেরা বাঁচতে তারা সরকারকে টেনে নামাবে—এটি বহু পুরোনো একটি চিন্তা। সময়ের পরীক্ষায় এই ধারণা বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে।

১৯৩৭ সালে স্পেনে গৃহযুদ্ধের সময় জার্মানি ও ইতালির বাহিনী যখন গোয়ের্নিকা শহর বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, তখনো জনগণের মনোবল ভাঙেনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলার ব্রিটেনে যে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন, কিংবা মিত্রশক্তি নাৎসি জার্মানির শহর ধ্বংস করে দিয়েছিল—তাতেও সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি।

একইভাবে, ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে উত্তর ভিয়েতনামে ‘অপারেশন রোলিং থান্ডার’ নামের ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও এই তত্ত্ব ব্যর্থ হয়েছিল। এখন গাজায় ইসরায়েল যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তাতেও একই ফলাফল দেখা যাচ্ছে।

এই ধরনের যুদ্ধনীতিকে বলা হয় স্ট্র্যাটেজিক বোম্বিং বা স্যাচুরেশন বোম্বিং বা টেরর বোম্বিং। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ইতালির জেনারেল জুলিও দৌহে এই কৌশলটি প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই নির্মম বোমা হামলাগুলোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে পড়েন দুইজন। একজন হলেন, ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বোম্বার কমান্ড প্রধান আর্থার ‘বম্বার’ হ্যারিস এবং অন্যজন হলেন, মার্কিন বিমানবাহিনীর জেনারেল কার্টিস এমারসন লে’মে।

জেনারেল লে’মে ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে জাপানের বহু শহর একেবারে ধ্বংস করে দেন এবং লক্ষাধিক বেসামরিক মানুষকে হত্যা করেন। পরে তিনি নিজেই বলেন, ‘যদি আমেরিকা এই যুদ্ধে হারত, তাহলে আমাকেই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার করা হতো।’

এই ইতিহাসগুলো দেখায়, সাধারণ মানুষের ওপর হামলা করে তাদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার এবং তাদের সরকারবিরোধী বানানোর পরিকল্পনা যতবারই নেওয়া হয়েছে, ততবারই তা ব্যর্থই হয়েছে। বরং এই ধরনের কৌশল বর্বরতা ও যুদ্ধাপরাধের নামেই বেশি পরিচিতি পেয়েছে।

কৌশলগত বোমাবর্ষণ বা পরিকল্পিতভাবে শহরের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু শহরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ব্রিটিশ কমান্ডার আর্থার হ্যারিস অনেক ‘বোচ’ (জার্মানদের জন্য অবজ্ঞাসূচক একটি শব্দ) হত্যা করতে চেয়েছিলেন এবং তা তিনি অনেকাংশে করতে পেরেওছিলেন। কিন্তু এই কৌশল যতই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হোক না কেন, তা কোনো সময়েই জনতার বিদ্রোহ ঘটাতে পারেনি। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলার পর জাপানে আমরা কোনো সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলন দেখিনি।

অনেক সময় এই ধরনের বোমাবর্ষণ উল্টো ফল দেয়। এতে মানুষ আরও রেগে যায় এবং এমনকি খুবই অজনপ্রিয় সরকারের পক্ষেও জনসমর্থন জোগাতে শুরু করে। ১৯৪১ সালে জার্মান বাহিনী লন্ডনের ওপর যখন বিমান হামলা চালায়, তখন লন্ডনবাসী আরও জেদি হয়ে উঠেছিল। তারা আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল যে, তাদের শহর এই আক্রমণ সহ্য করে টিকে থাকবে। উইনস্টন চার্চিল তখন জনপ্রিয় ছিলেন; কিন্তু এই প্রতিক্রিয়া শুধু তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে হয়নি। একই ধরনের দৃঢ়তা দেখা গিয়েছিল বার্লিনেও। জার্মানিতে হামলার পর মিত্রবাহিনীর ওপর এমন জার্মান লোকও খেপে গিয়েছিলেন যিনি হিটলারকে ঘৃণা করতেন।

আসলে বেশির ভাগ মানুষই চায় না, বিদেশি শক্তি এসে তাদের দেশকে বোমা মেরে ধ্বংস করুক। এমনকি যদি তারা নিজেদের সরকারকে অপছন্দও করে, তা হলেও তারা তা চায় না।

এটি বিশেষভাবে ইরানের মতো একটি গর্বিত দেশের ক্ষেত্রে খাটে। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সহায়তায় ইরানে একটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিল। সেই অভ্যুত্থান একটি নবীন গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এরপর থেকে ইরানিদের মনে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি সন্দেহ থেকেই গেছে।

এই পরিস্থিতিতে কল্পনা করা খুব কঠিন যে, ইরানিরা হঠাৎ করে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’র অনুকরণে ‘মেক ইরান গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মিগা’ স্লোগানকে গ্রহণ করবে। আর নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক ত্রাণকর্তা বা উদ্ধারকর্তা হিসেবে দেখা? সেটা তো আরও অবাস্তব চিন্তা।

নিশ্চিতভাবেই, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করা একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। লেবানন ও সিরিয়ায় ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইসরায়েল যে হামলা চালিয়েছে, সেটিও হয়তো ভালো একটি পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, বোমাবর্ষণের মাধ্যমে কখনোই গণতান্ত্রিক পরিবর্তন আনা যায় না।

অনেকে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ও জাপান হেরে যাওয়ার পর তারা যেভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়েছিল, সেটি একটা ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তবে সেই রূপান্তরের পেছনে শুধু বোমাবর্ষণ কাজ করেছিল—এমনটা নয়। আসলে যুদ্ধের পর এই দেশগুলোর ভেতরের প্রভাবশালী মানুষেরা মিত্রবাহিনীর ছায়ায় গণতন্ত্র গড়েছিলেন।

আজ কেউই বলছেন না, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল দখল করে রাখুক। আর যদি দখল করেও, তাতে জার্মানি বা জাপানের মতো ফল হবে—এটা ভাবাও অবাস্তব।

ইরানে এখন যে কড়াকড়িভাবে ধর্মভিত্তিক সরকার চলছে, সেটি অনেকেরই পছন্দ নয়। ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ গণতান্ত্রিক সরকার চায়। তাই যদি ইরানের সরকার কখনো বদলায়, সেটা শুধু ইরানিদের হাতেই বদলাবে। বাইরের চাপিয়ে দেওয়া শক্তি দিয়ে সেটি হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের কিছু সামরিক দুর্বলতা ধরা পড়লেও এই হামলা ইরানের সাধারণ মানুষের আন্দোলনকে দুর্বল করে দিতে পারে। কারণ, বাইরের হামলা অনেক সময় দেশের ভেতরে সরকারবিরোধী শক্তিগুলোর প্রতি সন্দেহ তৈরি করে, আর সরকার তখন সেই সুযোগে আরও দমন-পীড়ন চালায়।

ইরানের বিখ্যাত অভিনেতা রেজা কিয়ানিয়ানের প্রতিক্রিয়া থেকে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা যায়। তিনি ২০২২ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনের একজন দৃঢ় সমর্থক ছিলেন এবং সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তাই ধরে নেওয়া যায়, তিনি অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক ইরান দেখতে চান। কিন্তু যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমা ফেলা শুরু করল, তখন তাঁর কাছে দেশপ্রেম বড় হয়ে উঠল। তিনি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বললেন, ‘কেউ যদি ইরানের বাইরে বসে আমাদের বলে ওঠো, বিদ্রোহ করো—তা আমি মানব না। ইরান আমার দেশ। কী করব বা কী করব না, সে সিদ্ধান্ত আমি নেব। তুমি আমাকে শেখাবে না, আমার দেশে আমি কী করব।’

তাঁর এই কথার মধ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপ নিয়ে একটি ন্যায্য ক্ষোভ আছে। কিন্তু যদি ইরানের জনগণ আরও শক্তভাবে ঠিক করে নেয় যে, তারা ভেতর থেকে পরিবর্তন চায় তাহলে এই মনোভাব হয়তো খুব তাড়াতাড়িই বদলে যেতে পারে। কোনো শাসক চাপের মুখে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তা আগে থেকে বলা যায় না। তবে এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, ইরানের সরকার বরং আরও বেশি কঠোর হয়েছে। তারা ‘দেশদ্রোহী’ বা বিরোধীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন বাড়িয়েছে।

এদিকে, ইরানের সামরিক দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ার ফলে সরকারের ভেতর থেকে আরও জোর দিয়ে পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা বাড়তে পারে। এটা নিঃসন্দেহে এমন কিছু নয়, যা নেতানিয়াহু বা ট্রাম্প চেয়েছিলেন। এমনকি ইরানের সাধারণ মানুষও এটা চায় না। কিন্তু বাইরের চাপ আর ভেতরের নিরাপত্তাহীনতা মিলিয়ে সরকার হয়তো এখন আরও বেশি আগ্রাসী পথে এগোবে।

- প্রজেক্ট সিন্ডিকেট: ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত
* ইয়ান বুরুমা, ডাচ-ব্রিটিশ লেখক।

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদে তেহরানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ
ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদে তেহরানে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ। ছবি : রয়টার্স

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এরদোয়ানের কপাল খুলে দিতে পারে by ইলকার সেজার

ইসরায়েল শুধু ইরানের ওপর আক্রমণই করেনি, এটি ছিল ইহুদি রাষ্ট্রটির বড় সামরিক শক্তির প্রদর্শনও। কিন্তু ইরানের ওপর হামলার ইসরায়েলের সেই সামরিক শক্তি প্রদর্শন তুরস্কের নাগরিকদের হকচকিত করে।

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ও দরিদ্র হলেও ইরান তুর্কিদের কাছে একটি স্থিতিশীল দেশ। তা ছাড়া ইরানিরা একটি মহৎ জাতি, যার রয়েছে প্রাচীন সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সাহিত্য সম্ভার। তুর্কিরা ইরানিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা আধিপত্যের প্রতিরোধ এবং নিজেদের ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর আস্থার প্রতি সম্মান করে।

ইরাক বা লেবাননের ওপর হামলার তুলনায় ইরানের ওপর হামলার ঘটনা তুরস্কে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া হয়। ইরানে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে তাদের আসলে অন্য আরও উদ্দেশ্য রয়েছে, যেমন বৃহত্তর ইসরায়েল গঠন এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার; ফলে তুরস্কের নাগরিকেরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে সেখানে তুরস্ক হতে পারে ইসরায়েলের পরবর্তী টার্গেট।

ইরানে হামলার পর তুর্কিদের রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সবার প্রথম ও প্রধান উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা নিয়ে। ‘তুরস্কের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কী অবস্থা?’, ‘আমাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কি এফ-৩৫ শনাক্ত করতে পারবে?’—এই প্রশ্নগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে এসেছে। এসব প্রশ্ন ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ চলাকালে দৈনন্দিন আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তৃতীয় মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে আশা প্রকাশ করা যাচ্ছে। ধারণা করা যায় তিনি তুর্কি জনগণের এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ভালোভাবে দিতেই প্রস্তুত আছেন। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের বিষয়ে তিনি ইতিমধ্যে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন।

ইস্তাম্বুলের সাবেক মেয়র একরেম ইমামোগ্লুর দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার (যাকে বিরোধীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করে) এবং অর্থনৈতিক সংকটের বাইরে এরদোয়ান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যেখানে নিজের সাফল্য দেখাতে পারেন, তা হলো নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ।

প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে পুনরায় নির্বাচনী প্রচারাভিযানে নামার ক্ষেত্রে এরদোয়ান ইসরায়েল ও তুরস্কের তুলনামূলক প্রতিরক্ষাবিষয়ক অর্জনগুলোর ওপর জোর দিতে পারেন। ২০২৩ সালে নির্বাচনের আগে তিনি তুর্কি নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ টিসিজি আনাদলু সামনে এনেছিলেন। জাহাজটিতে সাধারণ তুর্কি নাগরিকদের ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, মানুষ সেটির বিশালতা নিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। নির্বাচনের মাত্র ৩৪ দিন আগে জাহাজটি সামরিক শক্তিতে যোগ করা হয়।

ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের কারণে তুরস্কের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতার প্রতি তুর্কি নাগরিকদের মনোযোগ আরও বেশি থাকবে। এরদোয়ানও নির্বাচনী প্রচারণার সময় এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে ভালোভাবে প্রস্তুত হচ্ছেন। তুর্কিদের সংখ্যাগরিষ্ঠদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ বিরোধীদের তুলনায় এরদোয়ানকে স্থিতিশীল তুরস্কের শক্তি হিসেবে দেখে। ক্রমবর্ধমান অস্থির হয়ে উঠা এ অঞ্চলে দেশ পরিচালনার জন্য বিরোধীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও সংকল্পের অভাব রয়েছে বলে তারা মনে করে।

টিসিজি আনাদলু জাহাজ সংযোজন তুর্কি সামরিক বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হয়ে থাকে। এটি এক ব্যাটালিয়নের একটি বাহিনী পরিবহন এবং আটটি নৌযান বহন করতে সক্ষম ও বিমান পরিচালনাও করা সম্ভব এ জাহাজ থেকে। সহায়ক সামরিক সম্পদে অত্যাধুনিক ড্রোনের চেয়েও বড় কিছু দাবি করা হয়ে থাকে এ জাহাজকে।

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে এরদোয়ানের প্রতিক্রিয়া ছিল লক্ষণীয়ভাবে সংযত ও গঠনমূলক। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে একটি আলাদা যোগাযোগের চ্যানেল খোলার চেষ্টা করেছিলেন, যার মধ্য দিয়ে ইস্তাম্বুলে একটি মার্কিন-ইরান বৈঠক করা যায়। যুদ্ধকালীন এরদোয়ানের মন্তব্যগুলো আগের মতো আক্রমণাত্মকও ছিল না।

সামনের নির্বাচনে তাঁর চ্যালেঞ্জ হবে তুরস্কের সামরিক শক্তি এবং এর নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা সম্পর্কে জনসাধারণকে বোঝানো। প্রতিরক্ষা শিল্পের পরিসর আরও বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত কর আরোপ করে তিনি তুর্কি জনগণের কাছে আর্থিক ত্যাগের জন্য অনুরোধ জানাতে পারেন। এ ধরনের একটি নির্বাচনী প্রচারণার কৌশল তুরস্কের তরুণ প্রজন্মের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

অনেক বিশ্লেষক যা মনে করেন, তাঁর বিপরীতে তুর্কি তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন ও এর পেছনে ব্যয়ের বিষয়টি নিবিড়ভাবে অনুসরণ করে। তারা তুরস্কের নির্মিত যুদ্ধবিমানগুলো সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর রাখে এবং এগুলো তৈরির তাৎপর্য বোঝে। ফলে তুরস্কের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার শিল্পকে নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান কৌশল হিসেবে নিলে এরদোয়ানের জন্য ভালো ফল দেবে।

* ইলকার সেজার, তুর্কি টুডে-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
- তুর্কি টুডে থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান। ছবি: এএফপি

নিরস্ত্র থেকে সশস্ত্র আসিফ মাহমুদের রূপান্তর by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

যে-বিপ্লবী একদিন রাষ্ট্রের কামান ও গুলির সামনে দাঁড়িয়েও ভীত হননি, মৃত্যুকে সংবর্ধিত করার অনুপ্রেরণা লালন করতেন, নিজের প্রাণ উৎসর্গের জন্য প্রস্তুত থাকতেন-হঠাৎ করে তিনি নিজের নিরাপত্তার প্রশ্নে পিস্তল কিনলেন এবং অস্ত্রের লাইসেন্স গ্রহণ করলেন-এই পরিবর্তন কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং বৃহত্তর সামাজিক-নৈতিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ।

এটি একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের পেছনে লুকিয়ে থাকা সমাজের গভীর মনস্তত্ত্ব এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংস্কৃতির প্রতিফলন। এর পর্যালোচনা জরুরি। কারণ, একজন সাহসী প্রতিবাদীর এমন রূপান্তরের ভেতর দিয়েই সমাজের গতি-প্রকৃতি এবং ক্ষমতার অন্তর্নিহিত ভাষা প্রকাশিত হয়।

’২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার অসম সাহসিকতা আমাদের জানা। তার অবস্থান ছিল কেবল কেন্দ্রে নয়; ইতিহাসের নির্মাণস্থলে।
স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কোটা আন্দোলন যখন দানা বাঁধছিল, তখন সেটিকে সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে রূপান্তরিত করার নেপথ্য কারিগরদের একজন তিনি। শুধু রাজপথে নয়, ছিলেন আন্দোলনের কৌশল নির্মাণেও। সেই অনিশ্চিত, দুঃসাহসিক সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘জুলাই: মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’ শিরোনামে একটি বইও লিখেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী যখন জনতার বুকে বন্দুকের নিশানা করেছিল, তখন আসিফ মাহমুদ সেই নিপীড়নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলেন বুক চিতিয়ে-নিরস্ত্র, কিন্তু নির্ভীক। তিনি মাথা নোয়াননি, বরং মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রাজপথে তৈরি করেছিলেন এক অপরাজেয় নৈতিকশক্তি। মিছিলের পর মিছিলের শব্দে প্রকম্পিত হয়েছিল শহরের প্রতিটি চত্বর, তার ভূমিকা ও পদচারণায় আস্থা পেয়েছিল অস্থির সময়।

গণ-অভ্যুত্থানে আসিফ মাহমুদ যে, নিরস্ত্র থেকে সশস্ত্র রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তা নিছক শারীরিক সাহস নয়; এটি ছিল নৈতিকদৃঢ়তা, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক গভীর শক্তি। তার সেই সময়কার অস্ত্র ছিল-জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা, নৈতিক ন্যায্যতার চেতনা, মৃত্যু ভয়কে অতিক্রম করার বিপ্লবী মানসিকতা।
পিস্তলের লাইসেন্স: নিরাপত্তার বোধ নাকি ক্ষমতার প্রতিচ্ছবি?
পিস্তলের লাইসেন্স করা মানে নিছক নিরাপত্তা নয়; বরং এটি একপ্রকার Surveillance mentality- নিজেকে ‘Target’ হিসেবে কল্পনা করা এবং নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষার নামে নিজেকে সশস্ত্র করা। আসিফ মাহমুদের অস্ত্র ধারণক্ষমতার অহংকার শুধু নয় বরং ক্ষমতার চূড়ায় উঠে আবার ভীতু হয়ে পড়ার মনস্তাত্ত্বিক নিঃসঙ্গতাও প্রকাশ পেয়েছে। তিনি এখন আর জনগণের রক্ষাকবচ নন, বরং নিজের জন্য প্রহরী খোঁজা একজন ভীতসত্তা। ‘Surveillance mentality’। অর্থাৎ নজরদারি-মনস্কতা, একধরনের মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ সবসময় বিশ্বাস করে যে, সে কারও নজরে আছে, কেউ তার গতিবিধি লক্ষ্য করছে এবং সে এক ‘টার্গেট’। যখন কেউ ক্ষমতা বা অর্থের উচ্চতায় উঠে যায়, তখন তার মনে জন্মায় একধরনের অনুভূতি-‘আমি এখন বিপদে পড়তে পারি।’ সে ভাবে-যারা একসময় আমার পাশে ছিল, এখন তারাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে। এই মানসিকতা তাকে বাস্তব বা কাল্পনিক ‘শত্রু’র সন্ধানে রাখে। ফলে, সে নিজের সুরক্ষার জন্য অস্ত্রে ভরসা রাখে।

নিজেকে টার্গেট কল্পনা করা, ‘আমি গুরুত্বপূর্ণ, আমি নজরদারির কেন্দ্রে-সুতরাং আমি ঝুঁকিতে’।
এখানে অস্ত্র হয়ে ওঠে-আত্মরক্ষার প্রতীক নয় বরং ‘আমাকে কেউ ঘাঁটাবেন না’-এই ভয়ের উত্তরে একরকম ক্ষমতা প্রদর্শন।
ক্ষমতা-সম্পদের অহংবোধ: গণ-অভ্যুত্থানে অসম সাহসিকতা তাকে এনে দিয়েছিল সম্মান; কিন্তু সেই সম্মানের মূলে ছিল জনগণের ভালোবাসা। তিনি যখন অস্ত্রকেই নিরাপত্তা মনে করেন, তখন তিনি আর জনগণের কাতারে নেই। তিনি এখন একা-ক্ষমতার নিঃসঙ্গ ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রতিচ্ছবি। আর এই নিঃসঙ্গতা তাকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা থেকে ছিন্ন করেছে। অহংকারের একটি মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য হলো-‘আমি যা অর্জন করেছি, তা হারানোর ভয়।’ ক্ষমতা ও অর্থ মানুষকে একধরনের কৃত্রিম নিরাপত্তা দেয়, যা আবার সহজেই ভঙ্গুর। এই ভঙ্গুরতা থেকেই জন্ম নেয় অস্ত্রের প্রতি নির্ভরতা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর যারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন রাতের আঁধারে, তাদের অনেকের সীমাহীন টাকা এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র ছিল- কিন্তু কেউ নিরাপত্তা বোধ করেননি। অস্ত্র কাউকে সুরক্ষাও দেয়নি। এ থেকে আমরা কেউ শিক্ষা নেই না।

নৈতিকতার অবক্ষয়: নিরস্ত্র অবস্থান একধরনের নৈতিক দৃঢ়তা দাবি করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন তার নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয় বা স্বার্থের সঙ্গে আপস করে, তখন মানুষ নিজেকে অস্ত্র দিয়ে নিরাপদ রাখতে চায়। পিস্তলের আবরণে বিবেকের শূন্যতা ঢাকতে চায়। নৈতিক দৃঢ়তা হারালে অস্ত্রই হয় শেষ ভরসা। পিস্তল তখন আত্মবিশ্বাসের ছদ্মবেশে লুকিয়ে থাকা এক আত্মগ্লানি।
গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা: ছাত্র-সমাজ, শ্রমিক-শ্রেণি, সর্বস্তরের জনগণ, শিল্পী-সমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল আর এর মাধ্যমেই পরাক্রমশালী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। কিন্তু পরবর্তীতে কারও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের প্রয়োজন পড়েনি, শুধু প্রয়োজন পড়েছে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোদ্ধা, আন্দোলনের সতীর্থ নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, বাকের মজুমদার, হাসনাত আব্দুল্লাহ, উমামা ফাতেমা-সহ অসংখ্য বিপ্লবীর ব্যক্তিগত অস্ত্র সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়লো না, অথচ আসিফ মাহমুদের জন্য অস্ত্র অনিবার্য হয়ে পড়লো। এই অস্ত্র একদিন আসিফ মাহমুদকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে, ইতিমধ্যে করেছেও।
রূপান্তরের ট্র্যাজেডি: তিনি এক সময় ছিলেন জনগণের স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি-ভরসার মুখ, সাহসের প্রতীক। কিন্তু অস্ত্রে বিশ্বাস স্থাপন মানে, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলার সূচনা। যে মানুষটি একদিন ভালোবাসায় নিরস্ত্র হয়ে চলতে পারতেন, আজ তার চলার সঙ্গী  গুলিবর্তী পিস্তল। এই অস্ত্র কেবল ব্যক্তিগত আতঙ্কের নয়, বরং জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। এই অস্ত্রই আসিফ মাহমুদকে বড়ো অনিরাপদ করে ফেলবে। এ ভয় একজন ব্যক্তির নয়-তা পুঞ্জীভূত ট্র্যাজেডি, যেখানে সমাজ, রাজনীতি এবং নৈতিকতা-সবই একসঙ্গে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের উপর বিশ্বাস হারানো মানেই বিপ্লব থেকে বিচ্যুতি আর অস্ত্র হাতে নেয়া মানেই সেই বিচ্যুতিকে স্থায়ী করে ফেলা। গণ-অভ্যুত্থানের একজন উজ্জ্বল মুখ, যিনি এক সময় জনগণের বিশ্বাসে বেঁচে ছিলেন, তিনি যদি অস্ত্রে বিশ্বাস করেন-তবে এটা তার একাকিত্বের প্রতিচ্ছবি, জনগণের উপর বিশ্বাস স্থাপনের ঘাটতি; সর্বোপরি ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নতুন স্বপ্ন বিনির্মাণে আসিফ মাহমুদের ভূমিকা রাখার সুযোগ ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে গেল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বিপুল সম্ভাবনা আসিফ মাহমুদ নিজ হাতেই নিজেকে হত্যা করেছেন।

জনগণের কাতারে দাঁড়াবার নৈতিক শক্তিকে, ক্ষমতার দম্ভের কাছে জলাঞ্জলি দিয়েছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে এটা খুবই ভয়ঙ্কর। আসিফ মাহমুদের পতন কেবল ব্যক্তিগত নয়-এ এক আদর্শগত পরাজয়।
তিনি ভুলে গিয়েছেন-গণ-অভ্যুত্থানের পর সত্যিকারের নেতৃত্ব আত্মরক্ষা নয়, বরং আত্ম-উৎসর্গের মধ্যেই বিকশিত হয়।
বাকি সহযোদ্ধারা যখন ভবিষ্যৎ নির্মাণে আত্মনিয়োগ করেছেন, তখন তিনি অস্ত্রে নির্ভর করে আত্মরক্ষা করছেন কিন্তু অস্ত্র তাকে রক্ষা করেনি, বরং নৈতিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। ইতিহাস যারা বদলে দিতে চায়, তাদের আত্মাকে হতে হয় স্বচ্ছ, হৃদয়কে হতে হয় উন্মুক্ত আর হাতে থাকতে হয় জনতার হাত। আসিফ মাহমুদ সেই নৈতিক পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। অস্ত্র তার জন্য প্রতিরক্ষার উপায় নয়, আত্মবিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই বিচ্ছিন্নতা কেবল সহযোদ্ধাদের থেকে নয়, তাকে ছিনিয়ে নিয়েছে ভবিষ্যতের কাছ থেকেও।
তিনি যদি বুঝতে পারতেন-নিজের হাতে নিজের কী সর্বনাশ করেছেন, তাহলে তার একমাত্র নৈতিক কর্তব্য-‘উপদেষ্টা’ এবং ‘অস্ত্র’-দু’টোই পরিত্যাগ করা। কিন্তু তিনি কোনোটাই পরিত্যাগ করতে পারবেন না। কারণ, পরিত্যাগ করতে হলে একটা নৈতিক সাহস লাগে আর সেই সাহস তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। আসিফ মাহমুদ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন-যে হাত একদিন পতাকা ধরেছিল, সে হাতেই যদি অস্ত্র ওঠে, ইতিহাস তখন সেই হাতে আর আস্থা রাখে না। এই গল্প আমাদের শেখায়- যে নেতা জনতার কণ্ঠস্বর থেকে সরে দাঁড়ায়, সে একদিন জনতার স্মৃতি থেকেও মুছে যায়।
একদিন যে-মানুষটি ভবিষ্যতের মুখ হয়ে উঠতে পারতেন, আজ তিনি ইতিহাসের এক সতর্কবাণী। আসিফ মাহমুদের রূপান্তর কেবল ব্যক্তিগত নয়-এটি একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনার উত্থান ও বিপর্যয়ের উপাখ্যান এবং একইসঙ্গে বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraizees@gmail.com
(সূত্র- জনতার চোখ)

mzamin