Saturday, January 2, 2016

পণ্য বহুমুখীকরণে বাণিজ্য মেলার অবদান by খায়রুল আলম

গতকাল শুক্রবার শুরু হয়েছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর উদ্যোগে মাসব্যাপী ২১তম ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা-২০১৬’ (ডিআইটিএফ) উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ মেলার মাধ্যমে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রসার লাভ করে। প্রতিটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এ মেলায়। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠান কী পারে আর কী পারে না বা গত এক বছরে তাদের কী অর্জন, তা এ মেলার মাধ্যমে দেশী-বিদেশী ক্রেতার সামনে তুলে ধরা হয়। তাই অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় এ মেলার গুরুত্ব অনেক।
ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাধ্যমে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাণিজ্য মেলা-২০১৬ উপলক্ষে দেয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মেলাটি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সর্বাধুনিক জ্ঞান, প্রযুক্তি ও অগ্রগতির সঙ্গে সংযুক্ত রাখার একটি সময়োচিত পদক্ষেপ। এ মেলায় একদিকে যেমন দেশী-বিদেশী ভোক্তারা আমাদের দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হতে পারবেন, অপরদিকে দেশী উদ্যোক্তারা বিদেশী পণ্য, সর্বশেষ ডিজাইন, স্টাইল ও বিদেশী ক্রেতাদের রুচি, মান-চাহিদা ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা লাভ করতে পারবেন।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, এ মেলার মধ্য দিয়ে রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সেই সঙ্গে দেশীয় উদ্যোক্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের পণ্যের গুণগত মানোন্নয়নে তৎপর হবেন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশী পণ্যকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নেয়ার প্রয়াস পাবেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত উদার বাণিজ্যনীতির ফলে দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ ও রফতানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিদেশী শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও আমদানিকারকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাণিজ্য মেলা-২০১৬ দেশীয় পণ্যের উৎপাদনকারী এবং বিদেশী ক্রেতাদের মধ্যে অধিকতর আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে।
বর্তমান বিশ্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। রফতানিযোগ্য পণ্যের যথাযথ বিপণনের সুযোগ সৃষ্টিসহ রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখা এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর জন্য নতুন পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ প্রদানই এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মূল লক্ষ্য।
দেশী ও বিদেশী পণ্যসামগ্রী প্রদর্শন, রফতানি বাজার অনুসন্ধান এবং দেশী-বিদেশী ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এ মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিল্পপণ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারীরা একদিকে তাদের উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান, ডিজাইন, প্যাকেজিং ইত্যাদি প্রদর্শন ও বিপণন করতে পারবেন, অন্যদিকে শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা পারস্পরিক সংযোগ স্থাপনসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ পাবেন।
পণ্য পরিচিতি ও বহুমুখীকরণের জন্য প্রতিবছর জানুয়ারিতে মাসব্যাপী ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। বিশ্বের উন্নত দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এ মেলায় অংশগ্রহণ করে এবং তাদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রফতানি আদেশ পাওয়া যায়। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এবার পাঁচটি মহাদেশ থেকে বাংলাদেশসহ মোট ২২টি দেশ মেলায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে সাতটি দেশ এবার প্রথমবারের মতো অংশ নিচ্ছে। বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণকারী বিদেশী রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে : ভারত, পাকিস্তান, চীন, মালয়েশিয়া, ইরান, থাইল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, মরিশাস, ঘানা, নেপাল, হংকং, জাপান, মরক্কো, ভুটান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তো আছেই।
বিশ্বের উন্নত দেশে বাংলাদেশের রফতানি বাজারকে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, হংকং, ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বাংলাদেশ নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে। এ ছাড়া কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশী পণ্যের একক প্রদর্শনীর আয়োজনও করা হয়। এমনকি উন্নত দেশে নতুন নতুন বাজার অন্বেষণের লক্ষ্যে সরকারি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধির সমন্বয়ে বাণিজ্যিক মিশনও পাঠানো হয়ে থাকে।
বাণিজ্য মেলায় প্রতিবছরই বিদেশী ক্রেতারা এসে থাকেন। তারা তাদের পছন্দের পণ্যটি এখানে এসে দেখে সরাসরি যাচাই-বাছাই করার সুযোগ পান। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশী পণ্যের সুনামও ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবছরই এ বাণিজ্য মেলায় রফতানি আদেশের পরিমাণ বাড়ছে।
গত বছর (২০১৫) বাণিজ্য মেলা চলছিল এক অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে। সে সময় বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধ-হরতাল চলাকালে পেট্রলবোমা আর সন্ত্রাসের কিছুটা ধাক্কা লাগে মেলায়। যদিও পরে এ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়; এত বড় ধাক্কার পরও সর্বোচ্চ ৯৫ কোটি ডলারের রফতানি আদেশ পাওয়া গিয়েছিল। এর আগের বছর (২০১৪) পাওয়া গিয়েছিল ৮০ কোটি ডলারের রফতানি আদেশ।
দেশবিরোধী একটি চক্র বাংলাদেশে যাতে বিদেশীরা আসতে না পারেন সেজন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অপপ্রচারও চালিয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই অপপ্রচার ধোপে টেকেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বাণিজ্য মেলায় আগতদের ব্যাপক উপস্থিতিকে বড় অর্জন বলে দাবি করছিলেন আয়োজকরা। শেষ বিচারে প্রমাণ হয়েছে, হরতাল-অবরোধ ও পেট্রলবোমাসহ কোনো বাধাই এ আয়োজনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আগামীতে আরও এগিয়ে যাবে। এর মধ্য দিয়ে ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে।
খায়রুল আলম : উন্নয়নকর্মী

প্রয়োজন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আধুনিকায়ন by এ কে এম শাহনাওয়াজ

নতুন বছর এলে আমাদের মধ্যে অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়। পাশাপাশি অনেক হতাশা এসে দুর্বল করে দেয় প্রত্যাশা পূরণের জায়গাটিকে। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক অঙ্গনের ভালো থাকা মন্দ থাকার ওপরই নির্ভর করে এ দেশের সব সম্ভাবনা ও প্রত্যাশিত অগ্রগতি। কিন্তু আমাদের বড় দুর্ভাগ্য, এ দেশের রাজনীতিকদের রাজনৈতিক আচরণ আটকে আছে গৎবাঁধা বলয়ের ভেতর। ক্ষমতাপ্রত্যাশী বড় দলগুলো গণতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে কখনও পথ চলে না। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নয়- বাহুবলে ও নানা কৌশলে ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার অভিলাষ সব পক্ষের। এ বাস্তবতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলছে। সবল পক্ষ আরও সবল হতে প্রতিপক্ষকে ছলে-বলে-কৌশলে হীনবল করে দিচ্ছে। এতে যে গণতান্ত্রিক কাঠামো বিপন্ন হচ্ছে তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। অতি আত্মম্ভরিতা স্বয়ংক্রিয় নিয়মেই যে তাদের কক্ষপথ থেকে ছিটকে ফেলে দিচ্ছে, ধপাসধরণীতল না হওয়া পর্যন্ত সে বাস্তবতা তারা অনুধাবন করতে পারছেন না। সময়ের সুবিধায় অপেক্ষাকৃত দুর্বল পক্ষ নিজেদের ক্ষেত্রেও অভিন্ন ফর্মুলা আরোপ করে একা অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাধর হতে চায়। এভাবে আরেকবার বিপন্ন করে গণতন্ত্রকে। কেউ একটু বেশি ভুল করে, কেউ খানিকটা কম। এ ধারাতেই বিগত বছরগুলোতে চলেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থেকে যেভাবে সরকারপক্ষকে সমালোচনা করত, বিএনপিও বিরোধী দলে এসে একই অভিযোগ করে। শব্দমালা প্রায় একই থাকে, শুধু পাত্রপাত্রী আলাদা হয়। সবসময়ই বিরোধী দলের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, তাদের মতো গণতন্ত্রের প্রতি নিষ্ঠাবান আর কেউ নয়। সব নষ্টের গোড়া সরকারপক্ষ। সব সরকারই একইভাবে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করে, আবার বিরোধী দলে এসে সব ভুলে যায়। বিরোধীদলীয় রীতিতে সমালোচনার ঝড় তোলে। কিন্তু দু’পক্ষ কখনও গণতন্ত্রের পক্ষে হাঁটার প্রত্যয়ে এক চিন্তায় আসে না- নিজেদের সংশোধন করে না। দেশবাসী প্রত্যাশা করেও বারবার প্রতারিত হয়, তবু অনন্যোপায় হয়ে করুণা প্রার্থী হয় রাজনীতিকদের কাছেই।
আমাদের আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তা নিয়ে একটি দুর্ভাবনা রয়েছে। একুশ শতকে পৃথিবী অনেক আধুনিক হয়েছে। টেকনোলজির দিক থেকে অনেক বেশি উন্নতি করেছে, স্মার্ট হয়েছে। বাংলাদেশে ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটছে। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরি হচ্ছে। দেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে পা বাড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীসহ অনেক মেধাবী বাঙালি আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত হচ্ছেন। কিন্তু এর সঙ্গে মিল রেখে তারা রাজনীতির ক্ষেত্রে আধুনিক ও স্মার্ট হতে পেরেছেন কি? ডিজিটাল বাংলাদেশে এখানটিতেই রয়ে গেছে পুরোপুরি এনালগ ধারা। সদ্যসমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচন থেকেই আমরা উদাহরণ নিতে পারি।
প্রথমবারের মতো এবার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার হল। এ সিদ্ধান্তটি হওয়ার পর বিরোধী দল ও পেশাজীবী সমালোচকরা প্রচণ্ডভাবে এর সমালোচনা করেছেন। এটি ছিল এনালগ পদ্ধতির সমালোচনা। পাঠক নিশ্চয় খেয়াল করবেন, বিগত দিনগুলোতে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে এদেরই অনেকে সমালোচনা করে বলতেন, নির্বাচন তো আসলে দলীয় সমর্থনে এবং দলীয় নিয়ন্ত্রণেই হয়, তাহলে প্রতীকে নয় কেন! আবার যখন দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হল, তখন সুর পাল্টে গেল। অর্থাৎ সমালোচনাটি করতেই হবে। আবার নির্বাচন ঘনিয়ে এলে এই বিতর্কে ভাটা পড়তে লাগল। সরকারপক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করতে লাগল আর বিরোধীপক্ষ সম্ভাব্য কারচুপি নিয়ে অগ্রিম আশংকা প্রকাশ করতে থাকল। এসবে দেশবাসীর মনে নিশ্চয় কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। কারণ এমন ছকবাঁধা সমালোচনা শুনে তারা অভ্যস্ত। কোন সময় কী সমালোচনা হবে বা আশংকা প্রকাশ করা হবে বা সরকারপক্ষ কীভাবে জবানবন্দি দেবে, তা অগ্রিম বলার জন্য এখন আর জ্যোতিষীর প্রয়োজন হয় না। আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফ কীভাবে সাফাই গাইবেন বা বিএনপির নেতাদের সমালোচনা আর আশংকা প্রকাশের শব্দমালা কেমন হবে, তা আগেভাগেই কৌতুকপ্রিয় মানুষ বলতে পারে। শুধু এটুকু দেখার বাকি থাকে- আওয়ামী লীগ নেতাদের এক-একজন বলার জন্য কী কী বা কেমন ‘শব্দ’ বেছে নেন, বিএনপির নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম কতটা পরিমার্জিত ভঙ্গিতে কথা বলেন আর প্রতিদিনের সংবাদ সম্মেলনে রিজভী কতটা সাহিত্যমানসম্পন্ন শব্দ দিয়ে মালা গাঁথেন। বেলা শেষে সবকিছুর নির্যাস একেবারেই সাত পুরনো।
নির্বাচন ঘিরে অনেক প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। ভ্রান্ত পথে হাঁটতে গিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগকে অনেক যত্নে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। সময়ের সুবিধায় এবং কুশলী রাজনৈতিক মেধা প্রয়োগ করে এ সময়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান অনেক সুসংহত। পৌর নির্বাচনে হারলে যেহেতু সরকার পতন হয় না, তাই এ সময়ে আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল নির্বাচন নিয়ে বিগত সময়ের দুর্নাম ঘোচানোর চেষ্টা করা। এ কারণে বদনাম হয় তেমন আচরণ যাতে নির্বাচনী প্রচারণায়, নির্বাচন কেন্দ্রে না ঘটে, তার জন্য কেন্দ্রের সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত ছিল। মানছি স্থানীয় নির্বাচনে তেমনভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখা যায় না। তবুও দলীয় এমপি থেকে শুরু করে স্থানীয় নেতৃত্বের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারাটা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের কিছুটা রাজনৈতিক ব্যর্থতা বলা বোধহয় অন্যায় হবে না।
আওয়ামী লীগ সরকার দৃশ্যমান অনেক উন্নয়ন কাজে সফল হয়েছে। অর্থনৈতিক কারণে মানুষ এখন অতটা বিপন্ন নয়। এখানে তুলনা করতে গেলে সাধারণ মানুষের বিচারে বিএনপি তেমন পয়েন্ট পাবে বলে মনে হয় না। এমন বাস্তবতায় নির্বাচনকে অনেক বেশি বিতর্কহীন করার চেষ্টা করা উচিত ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের। কিন্তু এ কাজে তারা খুব সফল হয়েছেন বলা যাবে না।
বিএনপির নেতারা তো রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেনই। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তারা ৮০ ভাগ ভোট পাবেন- অন্যদের কথা বাদ দিই, বিএনপি নেতারাও কি তা বিশ্বাস করেন? সরকারি নিপীড়নের ভয়েই হোক বা যে কারণেই হোক, নিজ রাজনৈতিক ভুলের খেসারতে দেশজুড়ে চরম অগোছালো অবস্থায় আছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলের জন্য জীবনপাত করার মতো কর্মীর সংখ্যা কমে গেছে বলেই নেতাদের ডাকে মাঠে নামার মতো কর্মী পাওয়া যায় না। নিকট অতীতে বিএনপি আর সহযোগী জামায়াত এমন কোনো সুকীর্তি করেনি যে সাধারণ মানুষ ঘুরে দাঁড়াবে। অন্তত ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নেতা-নেত্রীদের যে মাঠে সক্রিয় থাকতে হয় তেমন চেষ্টাও আমরা দেখিনি। এমন অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক তুলে এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে অমার্জিত কথা বলে বিএনপি অনেক ভোটারকেই বিরক্ত করে ফেলেছে।
অথচ তারা আবার সাত পুরনো দোষারোপের রাজনীতিই করে যাচ্ছেন অহর্নিশী। এবার বিএনপি আগেই বলেছে, তারা পৌর নির্বাচনে যাচ্ছে নিজেদের দলীয় অবস্থান বোঝা এবং নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার জন্য। তাই ৮০ ভাগ ভোট পাওয়ার সঙ্গে এ বাস্তবতার মিল করানো যাবে না। আত্মবিশ্বাসী নয় বলে নির্বাচনে না যাওয়া বা মাঝপথে নির্বাচন থেকে সরে আসার বদনামতিলক এরই মধ্যে বিএনপি কপালে ধারণ করেছে। এবার সমালোচনার মুখে বিএনপির নেতারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফল ঘোষণার আগে ভোট কেন্দ্র ত্যাগ না করার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এ নির্দেশ কি পালিত হয়েছে? কেন্দ্রীয় নির্দেশ অমান্য করে কয়েকজন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মাঝপথে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন, পত্রপত্রিকার সূত্রে জানতে পেরেছি। সরকারদলীয়দের পীড়ন ছাড়াও অনেক জায়গায় ভোট কেন্দ্রে বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। পোলিং এজেন্টরা ভোট কেন্দ্রে যাননি। এজেন্ট কার্ড সংগ্রহ করেননি। এসব বাস্তবতা দেখে নির্বাচনের দিনেই অনেকে মন্তব্য করছিলেন, বিএনপি সম্ভবত অভ্যাসমতো মাঝপথে নির্বাচন বর্জন করবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অবশ্য আশ্বস্ত করছিলেন, তারা নির্বাচনে থেকেই মোকাবেলা করবেন। বিএনপির এ আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের আশাবাদী করেছিল।
তারপরও রাতে যখন জানা গেল খালেদা জিয়া দলীয় নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসেছেন, তখন আবার আশংকা দোলা দিল। হয়তো পরাজয়ের আশংকা মাথায় নিয়ে আবার তারা সেই গৎবাঁধা এনালগ রাজনীতির পথেই পা বাড়াবেন। শেষ পর্যন্ত হলও তাই। সকালে অনলাইন পত্রিকায় জানলাম, বিএনপি পৌর নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে। আমার মনে হয় না এ সিদ্ধান্তে দেশবাসী খুব অবাক হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তে দলের জন্য আরেকটি ক্ষতি হল বলেই আমাদের ধারণা।
বিএনপির মতে, দেড় শতাধিক পৌরসভায় সরকারি দল কেন্দ্র দখল করেছে। কোনো কোনো পত্রিকা বলেছে শতাধিক। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্যে এ সংখ্যা আরও কম। বিএনপি আর নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে যদি সন্দেহ থাকে, তবে শত বা শতাধিকে আমরা আপাতত স্থির থাকতে পারি। দেশে মোট পৌরসভা ২৩৪টি। তাহলে বাকিগুলোর অবস্থা কী? আমরা মনে করি, ফল প্রত্যাখ্যানের রাজনীতিতে না গিয়ে বিএনপির সেসব পৌরসভায় নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য এবং ভোটারের পরিসংখ্যানে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে কাজ করা উচিত ছিল। স্থানীয় নির্বাচনে সবসময়ই স্থানীয় প্রভাব বলয়ের ভূমিকা কাজ করে। এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই নির্বাচনের মাঠে কাজ করতে হয়। পত্রিকার পরিসংখ্যানে দেখা যাবে, সরকারি দলের আধিপত্য বিস্তারের তেমন অভিযোগ যেসব পৌরসভায় নেই, সেখানেও বিএনপির ভোট কাঙ্ক্ষিত সংখ্যক নয়। ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি) ৫৫৫টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৯৮টি পর্যবেক্ষণ করে বলেছে ‘অনেক কেন্দ্রে অনিয়ম হলেও তা পুরো পৌরসভা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনি।’ পর্যবেক্ষক দল ১২ ভাগ কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টের উপস্থিতি দেখেনি।
আমরা অনেক পৌরসভায় দেখেছি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে ধানের শীষ আর নৌকার মধ্যে। অনেক জায়গায় লড়াই করে বিএনপির প্রার্থী জিতে গেছেন। সেসব জায়গায় সরকারি শক্তি প্রয়োগ হলে এমনটি হতো না। আমরা মনে করি, নির্বাচন বর্জন না করে এসব নিয়ে পর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা উচিত ছিল বিএনপি নেতৃত্বের। দলের বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থায় এ ফল প্রত্যাখ্যানে বিএনপির ১৯ নির্বাচিত মেয়র আর কাউন্সিলরদের ভাগ্যে কী ঘটবে! যে হতাশার দিকে স্থানীয় নেতাদের ঠেলে দেয়া হল, তাতে কি দলের জন্য মঙ্গল হবে?
এসব বাস্তবতা সামনে রেখে আমরা তাই আমাদের ভাগ্যবিধাতা রাজনীতিকদের কাছে নতুন বছরে প্রার্থনা রাখব, ক্ষমতা কেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছার জন্য গৎবাঁধা রাজনৈতিক পথহাঁটা পরিহার করে একটু আধুনিক-স্মার্ট রাজনীতির দিকে এগিয়ে যান। যেখানে সত্যিকার অর্থে পরিচর্যা করা হবে গণতন্ত্রের।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

নতুন রাজনৈতিক দিশা চিহ্নিত করার বছর by ফরহাদ মজহার

সবাইকে ঈসায়ী নববর্ষের শুভেচ্ছা। নতুন বছরের শুরুতে অল্প কিছু কথা বলব। বরং সবাইকে বলব, ভাবুন, আমরা কোনদিকে যাচ্ছি। চরম দুর্নীতি, লুটপাট, নাগরিক ও মানবিক অধিকার লংঘন এবং ভোটের তামাশা সত্ত্বেও আমি মনে করি না বাংলাদেশের জনগণ ভুল পথে যাচ্ছে। গত বছরের (২০১৫) শেষে পৌরসভার নির্বাচন গিয়েছে। নির্বাচনে কারচুপি ঘটেছে, একে কোনো অর্থেই নির্বাচন বলা যায় না। ইসির ভূমিকা নিন্দনীয়। বিএনপি যথারীতি তা প্রত্যাখ্যান করেছে। পৌর নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্রে বদল ঘটল কিনা অনেকে সেই প্রশ্ন তুলছেন। আদৌ কোনো বদল হয়েছে কিনা বুঝতে পারব কি? আমার ধারণা, বুঝব। কিন্তু সবার আগে বুঝতে হবে, শেখ হাসিনার অধীনে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এরপর রাজনীতিতে নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠতে হলে কী ধরনের নীতি ও কৌশল দরকার, খালেদা জিয়া সেক্ষেত্রে তার দলের ভেতর থেকে কারও সহযোগিতা পাননি। বরং একটি ধারা গড়ে উঠেছে, যারা নির্বাচন বর্জনের ছুতা ধরে দলের অভ্যন্তরে বিরোধ তৈরি এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্ভবত এদের চাপেই খালেদা জিয়া পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। অন্য যুক্তি হচ্ছে, তৃণমূলে কর্মীদের রাজনীতিতে সক্রিয় রাখারও দরকার ছিল। কিন্তু এখন স্পষ্ট হয়ে যাওয়া উচিত, স্রেফ নির্বাচন দিয়ে অবৈধ ক্ষমতাকে মোকাবেলা করা হাস্যকর। সেটাই পৌর নির্বাচনে প্রমাণিত হল। ক্ষমতাসীনরা সুষ্ঠু নির্বাচনী পন্থায় ক্ষমতা ছাড়বে না। এটা নিশ্চিত। কিন্তু এরপরও জাতীয় নির্বাচন বর্জনের জন্য বিএনপিকে দোষারোপ করে যারা বিএনপিকে কোণঠাসা করতে চাইছে, পৌর নির্বাচনে নগ্ন কারচুপি ও তামাশা তাদের জন্য খালেদা জিয়ার উত্তর হিসেবে আমরা পাঠ করতে পারি। এরপরও ফ্যাসিস্ট শক্তির পক্ষে দালাল সাফাই গানেওয়ালাদের অভাব হবে না। তাতে আমাদের চিন্তিত হওয়ার কিছু নাই।
পৌর নির্বাচনে কী ঘটেছে তার পুরো ছবি আমাদের কাছে নাই। এ অভাব বাংলাদেশের জনগণের এখনকার রাজনৈতিক মানসিকতা বোঝার ক্ষেত্রে বড় ধরনের কোনো বাধা নয়। সন্দেহ নাই, পৌর নির্বাচনে এক ধরনের নির্বাচনী তামাশা হয়েছে। কিন্তু সত্য হল, এটাই যে ঘটবে এ ব্যাপারে আগাম কোনো সন্দেহ ছিল না। বিএনপি এই নির্বাচনে নগ্ন কারচুপি হবে সে ‘আশংকা’ ব্যক্ত করেই অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু এ নির্বাচন থেকে তারা কী অর্জন করতে চেয়েছে এবং তারা তা পেরেছে কি-না সেটা একমাত্র ভবিষ্যতই বলতে পারবে।
বিএনপির মধ্যে কিছু মধুর স্মৃতি কাজ করে থাকতে পারে। মনে আছে কি-না যে, ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ আসন পেয়েছিল। তবে ২০০৮ সালে তারা মাত্র ২৯ আসন পেয়েছিল। কিন্তু ভোটের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে তা কোনো বিপর্যয় ছিল না। আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ৪৯ ভাগ; বিপরীতে বিএনপি ভোট পেয়েছিল ৩৩.২ ভাগ। ক্ষমতায় আসার ৫ বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগ তার ক্ষমতার ভিত্তি পোক্ত করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি, মানবাধিকার লংঘন, একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট শাসনকে সাংবিধানিক চরিত্র দেয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভও ছিল। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আওয়ামী সেক্যুলার রাজনীতির রাজনীতি নিয়ে কূটচাল। আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে বিবর্তিত হয়ে আসা আওয়ামী লীগের ধ্র“পদী চরিত্রের সঙ্গে যা ছিল একদমই বেমানান। সেকুলারিজম ও মুক্তিযুদ্ধের নামে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চড়ে একটি হীনশক্তি বাংলাদেশকে বিভক্ত ও বিভাজিত করে চলেছে। এ শক্তির ওপর ভর করে আওয়ামী লীগ কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে যেভাবে যুদ্ধে নেমে পড়েছিল, তাতে দলটি ইসলামবিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেকে জাহির করেছে। সেই কলংক থেকে আওয়ামী লীগের মুক্তি পাওয়া কঠিন।
কিন্তু এর কিছুই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নিজের পক্ষে ব্যবহার করতে পারেনি। বিএনপি-জোটের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থী দলগুলো থাকা সত্ত্বেও ইসলাম প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান ছিল দোদুল্যমান। ধর্ম নিয়ে কৌশলী আওয়ামী মার্কা রাজনীতির বিপরীতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শক্তি হিসেবে বিএনপি তার ভাবমূর্তি রক্ষা করতে পারেনি। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তার সম্পর্কটাকেই আওয়ামী প্রচারণা প্রধান করে তুলতে পেরেছে। কিন্তু কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দেওবন্দি ধারার ইসলামপন্থী দলগুলোও বিরোধী জোটে ছিল। ঔপনিবেশিক ইংরেজবিরোধী এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এ ধারার সমর্থন পেয়েও বিএনপি তাকে নিজের ভাবমূর্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেনি। এখানে মনে রাখা দরকার যে, হাফেজ্জী হুজুর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বলছিলেন জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই। ইসলামের জায়গা থেকে জাতীয়তাবাদী বিকারে পদস্খলিত না হয়ে মজলুমের পক্ষে বাংলাদেশের বহু আলেম-ওলামা দাঁড়িয়েছিলেন। তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু বিএনপি একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকার ভার বহন করতে গিয়ে আওয়ামী প্রচারণার মুখে নিজেকে খামাখা বিপর্যস্ত হতে দিয়েছে।
আসলে ধর্মবিদ্বেষী কিংবা তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ না হয়েও কী ধরনের রাজনৈতিক চর্চা বিএনপিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য দল হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারে, সে সম্পর্কে বিএনপির মধ্যে চিন্তাভাবনার অনুপস্থিতি অবিশ্বাস্যই বলতে হবে। বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে চলে, ইসলামপন্থীদের তার সঙ্গে রাখে। এর নীতিগত ভিত্তি সম্পর্কে বিএনপির সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নাই। উপমহাদেশে ইসলামের ভূমিকা ব্যাখ্যার মধ্য দিয়েই উপনিবেশবিরোধী মুক্তি সংগ্রামের ঐতিহাসিক ধারার সঙ্গে বিএনপি নিজেকে যুক্ত রাখতে পারত। কিন্তু বিএনপির বুদ্ধিজীবী বা প্রচারকদের মধ্যে সেই বুদ্ধিবৃত্তিক হিম্মত আমরা দেখিনি। ফলে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাত করা একটি দল হিসেবে নিজের পরিচয়কে বাড়তে দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পাল্টা প্রচার আজও গড়ে তুলতে পারেনি।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট মূলত নির্বাচনী জোট, পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে তা নাজায়েজ কিছু নয়। কিন্তু এ জোট নিয়েই বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন নয়, আন্দোলন করেছে; হরতাল ডেকেছে, রাস্তায় লড়েছে। দুই পক্ষের হানাহানিতে মানুষ মরেছে, মানুষ পুড়েছে। বিএনপি পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছে, ইসলামপন্থীদের সঙ্গে বিএনপির জোট নির্বাচনী জোট নয়, এটা আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনৈতিক জোট। কিন্তু এ জোটের নৈতিক ভিত্তি বিএনপি স্পষ্ট করতে পারেনি। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে জোট কেন? দ্বিতীয়ত, ইসলামপন্থীদের সঙ্গেই বা তার জোটের আদর্শিক ভিত্তি কি? বিএনপি ইসলামকে কী চোখে দেখে? এসব প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বিএনপি রাজনীতি করতে চেয়েছে। তার ফল ভালো হয়নি।
ধর্মকে কেন্দ্র করে রাজনীতি হতে পারে না কেন? অবশ্যই হতে পারে এবং হচ্ছেও বটে। সারা দুনিয়াতে হচ্ছে, বাংলাদেশেও ধর্ম রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সেটা ইসলামপন্থী হতে পারে, নাও হতে পারে। এমনকি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর বয়ান অনুযায়ী ‘ইসলামী সমাজতন্ত্র’ও হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ঔপনিবেশিক আমলে এ দেশের জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম ঐতিহাসিক কারণে ধর্মকে কেন্দ্র করেই হয়েছিল। সেটা সফলও হয়েছিল। দেশের মানুষ জমিদার-মহাজনদের হাত থেকে মুক্তি চেয়েছিল। পাকিস্তান আমলে তারা তা পেয়েছেও বটে। তদুপরি পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পারত না। দিল্লির অধীন একটি রাজ্য হিসেবে থাকতে হতো, যেখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যালঘু। বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তার ধর্ম চেতনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সাধারণ মানুষ মনে করে, একাত্তরে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র জন্য মানুষ যুদ্ধ করেনি, সেটা স্বাধীনতার ঘোষণাতেও নাই। এটা দিল্লির চাপিয়ে দেয়া নীতি। যার উদ্দেশ্য এ দেশের জনগণের বিশ্বাস ও চর্চা- অর্থাৎ তাদের সংস্কৃতি, ঈমান ও আকিদার সরাসরি বিরোধিতা। তারা একে ইউরোপীয় এনলাইটমেন্টের প্রস্তাব হিসেবে গ্রহণ করেনি। ইসলামবিরোধী রাজনীতির আদর্শ হিসেবে বুঝেছে।
এটা স্পষ্ট বোঝা দরকার, ইসলাম এ দেশের জনগণের রাজনীতির প্রধান আকর্ষণের বিষয়। একে উপেক্ষা করার সুযোগ নাই। ভাসানী ন্যাপ পুরোটা নিয়েই জিয়াউর রহমান বিএনপি গড়ে তুলেছিলেন। ধর্মবাদীদেরও বাইরে রাখেননি। ভাসানী ধর্মকে রাজনীতি থেকে পৃথক না করেও কমিউনিস্টদের সঙ্গে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুম জনগণের লড়াই-সংগ্রাম করে গিয়েছেন। কমিউনিস্টদের সঙ্গে যে কারণে তিনি কাজ করেছেন। যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন বলে জিয়াউর রহমানের রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য গণমানুষের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী শক্তির ঐক্য গড়ে তোলা এবং বাকশালী অর্থনীতির বিপরীতে গতিশীল অর্থনৈতিক বিকাশ ও উন্নয়ন। দ্বিতীয়ত, ছোট দেশ হলেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়ায় বহুপাক্ষিক সম্পর্ক বিকশিত করে ভারতের সঙ্গে শক্তির অসমতা সামাল দেয়ার শর্ত বিকশিত করা। ভুলে যাওয়ার কথা নয়, এ লক্ষ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক জোট ‘সার্ক’ জিয়াউর রহমানই গড়ে তুলেছিলেন।
আফসোস, বর্তমান বিএনপির মধ্যে জিয়াউর রহমানের দূরদৃষ্টির ছিটেফোঁটা আছে কিনা সন্দেহ। মুখে বিএনপি নিজেকে জামায়াতের রাজনীতি থেকে আলাদা বলে বারবার দাবি করেছে। কিন্তু রাস্তার আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির মূল সাংগঠনিক শক্তি ছিল জামায়াত ও শিবির। হেফাজতে ইসলামের ছায়ায় সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের বিশাল বিক্ষোভ ও আন্দোলনকেও বিএনপি কাজে লাগাতে পারেনি। কারণ ইসলাম কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো বিষয়েই বিএনপি সুস্পষ্ট নয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠলেও বিএনপি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জায়গা থেকে কোনো সমালোচনা-পর্যালোচনা করেনি। দুই এক কলি নাম কা ওয়াস্তে কথা বললেও তা বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো পর্যালোচনা ছিল না। চুপ থেকে বিএনপি ভেবেছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির সঙ্গে ‘আন্দোলনের আঁতাত’-এর দাহ নিজের গা থেকে সহজে ঝেড়ে ফেলতে পারবে। আফসোস, সেটা ঘটেনি। এর পূর্ণ সুযোগ আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিয়েছে। দল হিসেবে বিএনপির বিপর্যয় এতে ত্বরান্বিত হয়েছে। ইসলামপন্থীদের সঙ্গে জোট বাঁধার জন্য এ বিপর্যয় ঘটেনি। ইসলাম প্রশ্নে অস্পষ্টতার জন্যই এ বিপর্যয় ঘটেছে।
বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের দল। সত্য হচ্ছে এই যে, জিয়াউর রহমান একাত্তরের নয় মাস সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান নন। তবে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জিয়ার আবির্ভাবের কারণ হচ্ছে জিয়াউর রহমান সৈনিক ও জনতার মৈত্রীর চিহ্ন হিসেবে হাজির হয়েছিলেন। দিল্লির আধিপত্যবাদ, আগ্রাসন ও বাকশালী রাজনীতির বিপরীতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে এ মৈত্রী বাংলাদেশের একমাত্র সম্বল, সাধারণ মানুষ তা বুঝেছিল।
বিএনপির বর্তমান গভীর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট তিনটি কারণ রয়েছে : এক. জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝতে অক্ষম হওয়া এবং তার রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি হারিয়ে ফেলা; দুই. ইসলাম প্রশ্নে অস্পষ্টতা, যা একইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কেও চরম অজ্ঞতা এবং তিন. রাজনৈতিক নীতিহীনতা ও হিপক্রেসি। যার কারণে জনগণের বিশ্বাস বিএনপি ধরে রাখতে পারছে না। বাংলাদেশের জনগণ বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তি চায়, কিন্তু খোলামনে এ সংকটের মোকাবেলা না করলে বিএনপির ওপর বাংলাদেশের জনগণ ভরসা করবে না।
গত এক দশকে নব্য আওয়ামী রাজনীতির ইসলাম বিদ্বেষ প্রকট আকার ধারণ করে। ইসলামের প্রতি আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গি আওয়ামী লীগের জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এর কিছুই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট নতুন গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক আকাক্সক্ষা তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারেনি। অর্থাৎ বিএনপি পাল্টা এমন কোনো নীতিগত দাবি নিয়ে আসেনি যার কারণে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বাংলাদেশকে বিকল্প পথের সন্ধান দিতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি ছাড়া আর কোনো রেকর্ড বিএনপির কাছ থেকে আমরা শুনিনি।
শেখ হাসিনার প্রকট ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে থেকেও আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১১ সালে বিএনপি পৌর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার জাতীয় চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছিল। ২৩৬টি পৌরসভার মধ্যে বিএনপির সমর্থকরা ৯২টি আর আওয়ামী লীগ সমর্থকরা ৮৮টি পৌরসভায় জয়ী হয়েছিলেন। আর এখন তা উল্টে দাঁড়াল ১৭৮ বনাম ২২। তখন অধিকাংশ পৌরসভায় নির্বাচন হয়েছিল তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ। ২০১১ সালের সফলতার পেছনে ছিল বিএনপির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনেও বিএনপি এভাবে বিপর্যস্ত হয়নি। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে বিএনপি কতটা ভালো করেছে, সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিলেন। পৌরসভার নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে সন্দেহ নাই। আওয়ামী লীগ ধরে নিয়েছে বিএনপিকে রাজনীতি করার সুযোগ না দিয়ে এভাবেই তারা ‘নির্বাচন’ নামক প্রহসন চালিয়ে যাবে।
বিএনপির ওপর জনগণের হতাশা স্থায়ী কিছু বলে আমি মনে করি না। দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট ক্ষমতার বিপরীতে জাতীয় রাজনীতিতে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জোটের গুরুত্বকে কোনোভাবেই হালকা করে ভাবা উচিত নয়। বিরোধী জোটের কঠোর সমালোচনা দরকার। কিন্তু মনে করি না বিএনপি দুর্বল বা বিপর্যস্ত হয়ে পড়লে তাতে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের কোনো উপকার হবে। এতে হাততালি দেয়ার যেমন কিছু নাই, হতাশ হওয়ারও কোনো কারণ দেখি না। এর কারণ খুবই সোজা। আগামী দিনে যে রাজনীতি প্রবল শক্তি নিয়ে সামনে আসবে, তা তিনটি প্রশ্নের মোকাবেলা করার জন্যই আসবে।
এক. সার্বভৌমত্ব বোধের সঙ্গে সৈনিকতা এবং নাগরিকতার মৈত্রী- আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য যা জরুরি। জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উত্থান ও তাৎপর্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে বিএনপি তা এখনও বোঝাতে সক্ষম।
দুই. ইসলাম প্রশ্নে স্পষ্টতা অর্জন, যা একইভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার পর্যালোচনা। ইসলামকে ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব হিসেবে না বুঝে উপমহাদেশে ইসলামের ইতিহাস মনোযোগের সঙ্গে পাঠ করা। ধর্ম প্রসঙ্গে সেই অবস্থানই জরুরি আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে যা খামাখা অন্য রাষ্ট্র বা অন্য রাষ্ট্রের জনগণের মনে কোনো সন্দেহ বা আশংকার সৃষ্টি না করে। নীতিগত দিক অস্পষ্ট রেখে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সমর্থনের জন্য দালালি করলে কোনো ফল নাই, এটাও বোঝা দরকার; এবং তিন. রাজনৈতিক নীতিহীনতা ও হিপক্রেসি পরিহার।
এ তিনটি দিকে বিএনপি মনোযোগী হবে কি-না আমরা জানি না। কিন্তু ফ্যাসিস্ট রাজনীতি ও রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে জনগণের একটি লড়াই চলছে, যা বিএনপি বা তার জোটভুক্ত দলের অধীন নয়। এ রাজনীতি দুর্বল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। বিএনপি ‘জাতীয়তাবাদ’ বলতে যদি এ ধারাটিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারে এবং জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের ওপর দাঁড়ায়, জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে বিএনপির ফিরে আসা কয়েক মাসের ব্যাপার মাত্র।
আমি নিশ্চিত ২০১৬ সাল হবে নতুন রাজনৈতিক দিশা চিহ্নিত করার বছর।
১৮ পৌষ, ১৪২২, ১ জানুয়ারি, ২০১৬/ শ্যামলী

বছরের শুরুতেই সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে চীন

নতুন বছরের শুরুতেই সামরিক শক্তিতে পাকাপোক্ত অবস্থান নিতে মরিয়া হয়ে পড়েছে চীন। গেল বছরে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দেয়া ঘোষণা বাস্তবায়নে সৈন্য-সামন্তে নতুনত্ব আনছে দেশটি। এছাড়া দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগর নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের দ্বন্দ্ব অনেকদিনের। এর পাশাপাশি নিজেদের জল সীমানার কাছাকাছি মাঝে মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি তাদের আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এ প্রেক্ষাপটে সামরিক শক্তি বাড়ানোয় মনোযোগী হয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন। এরই অংশ হিসেবে নতুন তিনটি সামরিক ইউনিট তৈরি ও অস্ত্র সামগ্রীর আধুনিকায়ন করছে দেশটি। শুক্রবার এ খবর দিয়েছে চীনের সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া। বৃহস্পতিবার সামরিক সৈন্যদের নিয়ে এক সভায় দেশটির সেনাবাহিনী পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) জন্য একটি স্থল ইউনিট, একটি ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী ও একটি প্রযুক্তি কৌশলগত ইউনিট তৈরির উদ্বোধন ঘোষণা করেন জিনপিং।
সামরিক বাহিনীর স্থল ইউনিট কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন লি জুচ্যাং। সেনাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় নতুন ইউনিট প্রধানকে বড় লাল পতাকা প্রদান করেন জিনপিং। এর আগে চেংদু সামরিক এলাকার সেনা কমান্ডার ছিলেন লি।
দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রাগারে কর্মরত সৈন্যদের নিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গঠন করা হয়েছে। যার প্রধান হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রাগারে কর্তব্যরত ওয়েই ফেং দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া অস্ত্রের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রযুক্তি কৌশলগত ইউনিটের কাজ হবে পারমাণবিক শক্তি প্রক্রিয়া বৃদ্ধি, মুখোমুখি আঘাত প্রতিহত ও দীর্ঘ পরিসরে আঘাত পরিচালনার যোগ্যতাসহ রকেট ফোর্সেরও তদারকি করা।
২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে সামরিক শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে জিনপিং ঘোষণা দেন, সেনাবাহিনীকে ঢেলে সাজাতে নতুন প্রযুক্তিগত অস্ত্র সামগ্রী সরবরাহ বৃদ্ধি ও বিমান, রণতরী ও স্থল- তিন দিকেই সৈন্য বাড়াবে চীন।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে জাপান ও ফিলিপিন্সের সঙ্গে উত্তেজনা ক্রমেই বেড়ে চলেছে চীনের। দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরোটাতেই আধিপত্য দাবি করছে তারা। ওই সাগরে চীনের কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফলে সংঘর্ষের আশঙ্কাও করছে কেউ কেউ। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ও বিমান মাঝে মধ্যে চীনের জলসীমায় টহল দিয়ে এ অঞ্চলে উসকানি দিয়ে চলেছে।
দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী বানাচ্ছে চীন: সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী তৈরির কাজে মনোযোগী হয়েছে চীন। বৃহস্পতিবার দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিমানবাহী রণতরী নির্মাণের ব্যাপারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইয়াং ইউজুন বলেন, ‘সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে এই রণতরী নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে। তিনি আরও বলেন, এ রণতরী জি-১৫ জেট বিমান ও অন্যান্য বিমানের জন্য মোট ৫০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন হবে। প্রথম বিমানবাহী রণতরী লিওনিংয়ের কাছ থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণ ও গবেষণার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় রণতরীর পরিকল্পনা ও তৈরির কাজ চলছে।’ কয়েক মাস ধরেই সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কথায় রণতরী নির্মাণের বিষয়টি উঠে আসছিল। তবে বৃহস্পতিবারই এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয়া হয়। এএফপি
তৃতীয় বিমানবাহী রণতরী বানানো পূর্বাভাস : দ্বিতীয় বিমানবাহী রণতরী তৈরির পর তৃতীয় রণতরী বানানোর পূর্বাভাস দিয়েছে চীন। দ্বিতীয়টির কাজ শেষ হলে সমুদ্রের নীল পানি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় রণতরী বানাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইয়াং ইউজুন।

‘ভোটবিহীন নির্বাচনের সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য বড় আঘাত’

ধারাবাহিক ভাবে ভোটারবিহীন নির্বাচন দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট জনেরা। এবারও নির্বাচন সুষ্ঠু করতে উত্তীর্ণ হয়নি নির্বাচন কমিশন। পৌরসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন তাদের হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে। এরপরও সরকার এবং নির্বাচন কমিশন দাবি করছে  পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, ফলাফল মেনে নিতে। সুতরাং ফলাফল মেনে নিতেই হবে এর সঙ্গে দ্বিমত করার ক্ষমতা বাংলাদেশের  কারো নেই বলে মনে করেন তারা। পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন বলেন, পৌরসভা নির্বাচনে যে কারচুপি হয়েছে তা সবাই দেখেছে। একই প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় ৫ই জানুয়ারি, উপজেলা, ঢাকা সিটি করপোরেশনের মতো পৌরসভা নির্বাচনেও কারচুপি হয়েছে। অথচ নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছিল নির্বাচন কমিশন বিএনপির হয়ে কাজ করছে। এই কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে মনে হয় না। শেষ বারের মতো পৌরসভা নির্বাচনেও নির্বাচন কমিশন তাদের হারানো ইমেজ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করেন হাফিজউদ্দিন। সমাজ বিজ্ঞানী মীজানুর রহমান শেলী বলেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন ও পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে যে ভোটবিহীন নির্বাচনের সং¯কৃতি শুরু হয়েছে তা গণতন্ত্রের জন্য বড় আঘাত। নির্বাচনে আসলে কি হয়েছে তা সবাই জানে। নির্বাচন কমিশন ও সরকার একই পথে না চললে এ ধরনের একপেশে  নির্বাচন সম্ভব হতো না। এ নির্বাচনে কি হয়েছে সবকিছু আয়নার মতো পরিষ্কার কিন্তু ধরার উপায় নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন এ পর্যন্ত যত নির্বাচন হয়েছে পৌরসভা নির্বাচনকে সর্বশ্রেষ্ঠ নির্বাচন বলে দাবি করছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন। তাদের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার ক্ষমতা বাংলাদেশের কোনো মানুষের নেই। নির্বাচন সুষ্ঠু হোক বা না হোক সরকারি দল বলেছে ফলাফল মেনে নিতে। সুতরাং ফলাফল মেনে নিতেই হবে।

পাকিস্তানের এজেন্ট : বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগ by এবনে গোলাম সামাদ

বেগম জিয়া সম্প্রতি তার এক বক্তৃতায় বলেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে কতগুলো মানুষ মারা গিয়েছে তার হিসাব এখনো জানা যায়নি। তিনি কী পটভূমিতে কথাটি বলেছেন, তা আমার জানা নেই। তবে ১৯৭১ সালে ঠিক কতগুলো লোক মারা গিয়েছেন তার সঠিক তথ্য যে আছে অজানা, সেটা কোনো বিতর্কের বিষয় হয়ে নেই। বিশেষ করে শর্মিলা বসুর ‘ডেট রেকনিং’ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর। ১৯৭১-এ অনেক ব্যক্তিই মারা গিয়েছেন। তারা যে সবাই ছিলেন বাংলাভাষী, তা নয়। একমাত্র শান্তাহারেই নাকি মারা গিয়েছেন ১৫ হাজার বিহারি বা উর্দুভাষী। ১৯৭১ সালের মৃত্যুর হিসাব নিতে হলে অবাঙালিদেরও মৃত্যুর হিসাব নিতে হবে। কেননা এ সময় সবাই ছিলেন পাকিস্তানের নাগরিক, বাংলাদেশের নাগরিক নন। বেগম জিয়া ইতঃপূর্বে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি তার প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে এ বিষয়ে একটি জরিপ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। হঠাৎ করেই কেন তিনি প্রসঙ্গটি টেনে আনা প্রাসঙ্গিক মনে করলেন, তা আমি জানি না। যা হয়ে গিয়েছে তা হলো অতীতের ঘটনা। অতীত নিয়ে জাবর কেটে আমাদের কোনো লাভ হবে না। আমাদের এখন যা ভাবা দরকার তা হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যা করণীয় সে সম্বন্ধে। কেননা আমাদের বেঁচে থাকতে হবে বর্তমানে; অতীতে নয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক Leopold Von Ranke (1795-1886) বলেছেন যে, একজন ইতিহাসবিদকে ইতিহাস লিখতে হবে ঘটনা নির্ভরভাবে; মতবাদ নির্ভরভাবে নয়। কারণ মানুষ যদি প্রকৃত তথ্য না জানে, তবে ইতিহাস পাঠ করে সে কিছু শিখতে পারবে না। আসবে বিভ্রান্তিকর উপসংহারের মধ্যে। তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক জাতি বা রাষ্ট্রের স্বাধীন অস্তিত্ব নির্ভর করে তার অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির ওপর। ভুল পররাষ্ট্রনীতি তাকে জড়িয়ে ফেলতে পারে ক্ষতিকর যুদ্ধে। একটা জাতির জীবনে তার নিজের ইতিহাস পর্যালোচনার গুরুত্ব আছে নানা দিক থেকেই। এর মধ্যে একটি হলো তার নিজের উপযোগী পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ। ভুল ইতিহাস একটা জাতিকে তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে করে তুলতে পারে বিভ্রান্ত। কিন্তু আমাদের ইতিহাসবিদেরা যেভাবে ইতিহাস রচনা করছেন, তাতে কেবলই থাকছে ১৯৭১-এর আবেগ; ১৯৭১-এর ঘটনাবলির প্রকৃত বিবরণ নয়। ১৯৭১-এর যুদ্ধ ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর দ্বারা পরিচালিত যুদ্ধ। ১৯৭১-এ বাঙালি-বিহারি সঙ্ঘাতে ইন্ধন জুগিয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দাচক্র। এসব কথা আমাদের ইতিহাসবিদেরা তাদের লেখায় বিবৃত করতে চাচ্ছেন না। ফলে আমরা জানছি কার্যত ভুল ইতিহাস। আর তা থেকে পেতে পারছি নীতি নির্ধারণে ভুল নির্দেশ।
বর্তমান পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে আছে ১৭০০ কিলোমিটার দূরে। বাংলাদেশে নেই কোনো খান সেনা। ভারত ডিঙিয়ে এসে পাঞ্জাবি খান সেনারা এখন আর কোনোভাবেই বাংলাদেশকে দখল করতে সক্ষম হবে না, এটা ধরে নেয়া যায় স্বতঃসিদ্ধভাবেই। ভারতঘেরা বাংলাদেশ দখল করার চেষ্টা করতে পারে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, পাকিস্তান নয়। কিন্তু আমরা যেন ভারতকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সেভাবে গুরুত্ব না দিয়ে দিতে চাচ্ছি বর্তমান পাকিস্তানকে। যেটা অবশ্যই বলতে হবে বিভ্রান্তিকর বিশ্লেষণ। সম্প্রতি সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, খালেদা জিয়া হলেন পাকিস্তানের এজেন্ট। তার উচিত পাকিস্তানে চলে যাওয়া (আলোকিত বাংলাদেশ, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫)। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলছেন, ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ চায় না। সে পাকিস্তানের সাথে গড়ে তুলতে চায় মসৃণ সম্পর্ক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানে নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে জড়িয়ে ধরেছিলেন বুকে। ভারত কেন এটা করছে আমরা তা জানি না। তবে মনে হচ্ছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে আসছে পরিবর্তন। কেননা বিশ্বে শুরু হতে পারে একটা বড় রকমের যুদ্ধ। ভারত চাচ্ছে না সে যুদ্ধে জড়িত হতে। সে চাচ্ছে না দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। আর যুদ্ধ এসে যাক ভারতের দুয়ারে। ভারত চাচ্ছে, তার প্রতিবেশী সার্কভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে পক্ষে নিয়ে একটি বিশেষ ব্লক তৈরি করতে; যা তাকে শক্তি জোগাবে বিশ্ব রাজনীতির ধারা নিয়ন্ত্রণে।
১৯৭১-এর বিশ্ব পরিস্থিতি আর আজকের বিশ্ব এক নয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি তাই হয়ে উঠতে চাচ্ছে অনেক ভিন্ন। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে যেন আঁকড়ে থাকতে চাচ্ছে সাবেক ধ্যান ধারণাকে নিয়ে। হতে চাচ্ছে না এ ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ। রাজনীতি করতে চাচ্ছে কেবলই পাকিস্তানকে সমালোচনা করে। অথচ পাকিস্তান এখন ভৌগোলিক কারণেই আমাদের শত্রু বলে বিবেচিত হতে পারে না। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষতাকে নির্ভর করেই শেষ পর্যন্ত গঠিত হওয়া উচিত একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি। ভারতে মোদির সমালোচনা উঠেছে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য। একই রকম সমালোচনা উঠছে বিএনপি পাকিস্তানের সাথে অতীত বিবাদ বজায় রাখতে চাচ্ছে না বলে। ভারতে কংগ্রেস যেভাবে মোদির সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে, এ দেশে আওয়ামী লীগ যেন খালেদা জিয়ার সমালোচনায় অনুসরণ করতে চাচ্ছে একই বাগধারা। মনে হচ্ছে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে চাচ্ছে ভারতের কংগ্রেসের অনুসরণে। কিন্তু ভারতে কংগ্রেস এখন আর ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতায় আসার আশু সম্ভাবনা অনুমান করা যাচ্ছে না। ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ কংগ্রেসের নীতি অনুসরণ করে শক্তি সঞ্চয় করতে পারত, কিন্তু এখন কংগ্রেসের সাথে একসূত্রে রাজনীতি করতে গেলে সে পেতে পারবে না বর্তমান ভারত সরকারের সাহায্য ও সভানুভূতি। তাই বলতে হয় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভুল পথে হাঁটছে। আর এর ফলে এ দেশের রাজনীতিতে হয়ে পড়তে পারে একদিকে যেমন জনবিচ্ছিন্ন, তেমনি অন্য দিকে হয়ে পড়তে পারে তার শক্তির আদি উৎস ভারত থেকেও যথেষ্ট বিচ্ছিন্ন।
প্রতিটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হয় সে দেশের পার্লামেন্ট অথবা যথাযথভাবে আলোচনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের বর্তমান সরকার সেটা করতে চাচ্ছে না। যদিও পার্লামেন্ট আছে, আর হচ্ছে তার অধিবেশন। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে যেন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়। রাষ্ট্র ও প্রধানমন্ত্রী হয়ে পড়েছেন সমার্থক। যা আমাদের রাজনৈতিক সঙ্কটকে করে তুলছে ঘনীভূত। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মধ্যে পররাষ্ট্রনীতিতে দেখা যাচ্ছে দু’টি ভাগ। এক ভাগ হয়ে উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচক। তারা বলছেন, ইসলামি স্টেটপন্থীরা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের শত্রুরাষ্ট্র নয়। কিন্তু মন্ত্রীপর্যায়ে হতে পারছে তার সমালোচনা। যেটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে আমাদের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে। এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষতি করে বাংলাদেশ কিভাবে লাভবান হবে সেটা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। বাংলাদেশ সিরিয়ার সন্নিকটের দেশ নয়। সিরিয়া সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট জ্ঞাতও নই। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আমরা সিরিয়ার ব্যাপারে থাকব সৌদি আরবের সাথে। পাকিস্তানও বলছে যে, সে সৌদি আরবের সাথে থাকবে। কিন্তু এমন কিছু করবে না, যা পাকিস্তানের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের মিত্রতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সে কোথায় সৈন্য পাঠাবে না পাঠাবে, সেটা ঠিক করবে নিজের জাতি ও স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ রকম কিছু চাচ্ছে না বলতে।
আসলে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে বর্তমান সরকার ভুগছে স্ববিরোধিতায়। আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা বামচক্র সমর্থন করতে চাচ্ছে রাশিয়াকে। অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন অংশ করতে চাচ্ছে এর বিরোধিতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ দ্বন্দ্ব চলেছে আওয়ামী লীগের মধ্যে। পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে এভাবে বিভক্ত একটি দল দেশের স্বার্থে যে একটি সুষ্ঠু পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে চলতে পারবে, তা মনে হচ্ছে না। একটি অংশ বলছে, তারা আইএসবিরোধী। আইএস হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা সৃষ্ট। আর মার্কিন স্বার্থে পারিচালিত। অন্য অংশ বলছে, বাংলাদেশে কোনো আইএস নেই। আইএস বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নয়। ‘প্রথম আলো’র খবরে প্রকাশ (৩০ নভেম্বর ২০১৫) : কামরাঙ্গীচরে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিমদের সাথে এক আলোচনা সভায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র বানিয়ে কোনোভাবে এ দেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।’ ওই একই সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন- ‘বাংলাদেশে আইএস-এর কোনো কার্যকলাপ বা অস্তিত্ব নেই।’ অর্থাৎ দুই মন্ত্রীর বক্তব্য এ সভাতেই হতে পারছে দুই রকম। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা বলতে পারেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অথবা প্রধানমন্ত্রী, অন্য মন্ত্রীরা নন। কিন্তু এখন অনেক মন্ত্রী কথা বলছেন পররাষ্ট্র বিষয়ে। মনে হচ্ছে, পররাষ্ট্র বিষয়ে এই কলরব হচ্ছে না আমাদের সংবিধানসম্মত। আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রনীতি দেশকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে এক গভীর বিপদের মধ্যে। খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানের এজেন্ট বলে সমালোচনা করে সে বিপদকে কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে করতে চাচ্ছেন পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন। অন্য দিকে আমরা রাজনীতি করতে চাচ্ছি যেন কেবলই পাকিস্তানের সমালোচনা করে। কিন্তু পাকিস্তান এখন আর আমাদের কোনো সমস্যা নয় ভৌগোলিক দূরত্বের কারণেই। বিএনপি এখন ক্ষমতায় নেই, নেই বিরোধী দলেও। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র বিএনপিকে দিচ্ছে যথেষ্ট গুরুত্ব। খালেদা জিয়াকে কাবু করতে হলে তার পেছন থেকে এই আন্তর্জাতিক সমর্থন সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু যেভাবে বিএনপির সমালোচনা করা হচ্ছে, তাতে তার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে না কমে বৃদ্ধি পাওয়াই হবে সম্ভব।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

ভারতের বিমানঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ৬

ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে বিমানবাহিনীর পাঠানকোট ঘাঁটিতে আবার গুলির শব্দ শোনা গেছে। এনডিটিভির খবরে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চিরুনি অভিযান শুরু হওয়ার পর এই শব্দ শোনা যায়। সেখানে আরও সন্ত্রাসী লুকিয়ে আছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। আজ শনিবার ভোরে ওই ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে হামলাকারী সন্ত্রাসীদের কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা গোলাগুলিতে চারজন সন্ত্রাসী ও দুজন বিমান সেনা নিহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জয়েশ-ই-মোহাম্মদ এই হামলা চালিয়েছে বলে ভারত সন্দেহ করছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ হামলার পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, পাঞ্জাবের সন্ত্রাসী হামলা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাকিস্তান সফরকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলল। তিনি বলেন, ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) বুঝতে হবে যে সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না। এ ধরনের হামলা ভারত-পাকিস্তানের আলোচনা বা সমঝোতাকে ক্ষুণ্ন করল।
এনডিটিভি ও টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের খবরে জানানো হয়, ভোর চারটার দিকে সেনাবাহিনীর পোশাকে সন্ত্রাসীরা বিমানঘাঁটির কাছে একটি ভবন থেকে এই হামলা চালায়। চাক্কি নদীর কাছে অবস্থিত সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নিরাপত্তাবাহিনীর কয়েক ঘণ্টা ধরে গোলাগুলি চলে। সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত বিমানঘাঁটি থেকে ভারী গুলির শব্দ পাওয়া যায়।
বার্তা সংস্থা পিটিআইকে পাঞ্জাবের একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, সন্ত্রাসীরা সামরিক পোশাক পরে পুলিশের একটি গাড়িতে করে বিমানঘাঁটিতে ঢোকে। বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, গাড়িটি গুরুদাসপুরের পুলিশ সুপারের। গতকাল শুক্রবার পাঠানকোট থেকে সেনাবাহিনীর পোশাক পরা কয়েকজন সন্ত্রাসী পুলিশ সুপারকে আঘাত করে তাঁর গাড়ি ও ফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ওই ফোন দিয়ে পাকিস্তানে সন্ত্রাসীরা যোগাযোগ করেছে বলে গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে। গতকাল এ ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্কাবস্থায় ছিল। এর মধ্যেই এ হামলার ঘটনা ঘটল।
সেনাবাহিনীর বিশেষ দুটি দল, জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও বিমানবাহিনী এই অভিযানে অংশ নেন। পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে। ওই এলাকায় চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পাঠানকোট-জম্মু মহাসড়কে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিমানবাহিনীর স্টেশন এলাকায় যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা সূত্র বলছে, সেনাবাহিনীকে মহাসড়কে অবস্থান নিতে বলা হয়েছে, যাতে কোনো জঙ্গি জম্মু ও কাশ্মীরে ঢুকতে না পারে।
পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরে ছয় মাস আগে আরও একটি সন্ত্রাসী হামলা হয়। এতে তিনজন নাগরিক নিহত হয়। ১২ ঘণ্টা ধরে নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির পর তিন হামলাকারী সন্ত্রাসী নিহত হয়।

একাল সেকালের ধর্মকর্ম এবং রাজনীতি by গোলাম মাওলা রনি

ধর্মকর্ম যে রাজনীতির অনেক আগে চালু হয়েছিল, সে ব্যাপারে কারো কোনো সন্দেহ নেই। সব ধর্ম, সব মতাদর্শ এবং সব বিজ্ঞানই স্বীকার করে যে, হজরত আদম আ:-ই প্রথম মানব এবং আমাদের আদিপিতা। তার আগমনের সাথে সাথেই পৃথিবীতে ধর্মকর্মের রেওয়াজ চালু হয়ে যায়। আমরা জানি না, পৃথিবীতে হজরত আদম আ:-এর আগমনের ঠিক কয়দিন পর রাজনীতি চালু হয়েছিল। তবে আন্দাজ করতে পারি, রাজনীতির আগে অবশ্যই রাজার সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথম দিকে রাজা ছিলেন গোত্রভিত্তিক। পরে তা গোত্রের সীমানা পেরিয়ে চলে দূর-দূরান্তে। সৃষ্টি হয় রাজ্য ও সাম্রাজ্য। রাজাগণের অনেকে হয়ে যান মহারাজা কিংবা সম্রাট।
রাজনীতির শুরু থেকে আজ অবধি সর্বকালে সব সমাজে ও রাষ্ট্রে ধর্মই রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক হয়ে আছে। কখনো ধর্ম রাজনীতিকে গ্রাস করার চেষ্টা করেছে, আবার কখনো বা রাজনীতি চেষ্টা করেছে ধর্মকে নির্বাসনে পাঠাতে। ধর্ম ও রাজনীতির পারস্পরিক দ্বন্দ্বে বহু রাজা প্রাণ হারিয়েছেন, বহু রাজা সিংহাসনচ্যুত হয়েছেন এবং বহু রাজ্য ভেঙে খান খান হয়ে গেছে। অন্য দিকে প্রভাবশালী রাজাদের কেউ কেউ স্বল্পসময়ের জন্য ধর্মকর্মের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন- কেউ কেউ আবার নিজেকে ধর্মীয় প্রধান বানিয়ে ধর্ম ও রাজনীতি নিয়ে খেলা করেছেন। দু-চারজন প্রতাপশালী ও পরাক্রান্ত রাজা তো নিজেদের খোদা পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছিলেন। আমরা সবাই কম-বেশি সেসব স্বঘোষিত খোদার পরিণতি জানি এবং এ কথাও জানি যে, ধর্ম ও রাজনীতির বিরোধিতায় এযাবৎকালে পৃথিবীর পথে প্রান্তরে মারা যাওয়া শত কোটি মানুষের হিসাব পৃথিবীর কোনো রাজদরবারে সংরক্ষিত নেই।
ধর্ম ও রাজনীতির অস্থির এবং সঙ্ঘাতপূর্ণ ইতিহাস যেমন রয়েছে তেমনি সহযোগিতামূলক সম্প্রীতির ইতিহাসও কম নয়। যেসব ক্ষেত্রে ধর্মের নামে ভণ্ডামি হয়নি এবং রাজনীতির নামে জুলুম-অত্যাচার হয়নি, সেসব ক্ষেত্রে রাজনীতির অঙ্গন তৈরি করতে পেরেছিল খলিফা আল মনসুর, খলিফা হারুন-আল-রশিদ, সুলতান সুলায়মান, দি ম্যাগনিফিসেন্ট প্রমুখের মতো ব্যক্তিত্ব। অন্য দিকে রাজনীতিবিদদের সম্মান ও মর্যাদা নিয়েই বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী র:, ইমাম গাজ্জালী, ইবনে কাসির, খাজা মঈনউদ্দিন চিশতী র: এবং খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার মতো মহান অলি আল্লাহগণ এই জমিনে তাদের কীর্তিকে অমর করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ধর্ম ও রাজনীতির সুদীর্ঘ ইতিহাসের কোথাও একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাকে কোনো ভণ্ড ধর্ম ব্যবসায়ী যেমন বিব্রত করতে পারেনি, তেমনি কোনো জুলুমবাজ শাসক শত চেষ্টা করেও কোনো ওলি আল্লাহর মর্যাদাহানি করতে পারেনি। এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলার আগে বলে নিই কেন আমার হঠাৎ করেই এই শিরোনাম প্রসঙ্গে নিবন্ধ লেখার সাধ জাগল-
গত শুক্রবার জুমার নামাজে মসজিদে গিয়ে ইমাম সাহেবের বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি অন্যান্য দিনের মতো দ্বীন-দুনিয়ার কথা না বলে বাংলাদেশের পুলিশপ্রধানের প্রশংসা করছিলেন। তার বক্তব্যের ধরন ও প্রকৃতি দেখে উপস্থিত মুসল্লিরা উসখুস করছিলেন, আবার কেউ বা মুখটিপে হাসছিলেন। ইমাম সাহেব পুলিশপ্রধানের শিখিয়ে দেয়া জঙ্গিবাদবিরোধী বক্তব্য হয়তো ভালোমতো রপ্ত করতে পারেননি অথবা সেই বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ইসলামের নীতি ও আদর্শ বর্ণনা করে একটি বক্তব্য পরিবেশন করতে পারেননি। ফলে একটি জগাখিচুড়ি মার্কা খুতবা শুনে উপস্থিত সবাই মহাবিরক্ত হয়ে ওঠেন এবং নামাজের পর ইমাম ও তার মদদদাতাদের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে যাচ্ছেতাই বলতে বলতে মসজিদ ত্যাগ করেন। এই ঘটনার কয়েক দিন আগে আমি পত্রিকায় দেখেছিলাম, বাংলাদেশের পুলিশপ্রধান বেশ কিছুসংখ্যক আলেম-ওলামা, ইমাম ও খতিবকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ডেকে নিয়ে লম্বা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি দেশের সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে আলেম-ওলামাদের সহযোগিতা চেয়েছেন এবং অনুরোধ করেছেন জুমার নামাজের খুতবায় জঙ্গি হামলার বিরুদ্ধে মুসলমানদের করণীয় বিষয়াদি সম্পর্কে বক্তব্য রাখার জন্য।
স্বাভাবিক ও সরল দৃষ্টিতে যদি উপর্যুক্ত ঘটনা মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে আপাতদৃষ্টিতে কোনো ত্রুটি বা অসামঞ্জস্য ধরা পড়বে না। কিন্তু জঙ্গি হামলা যেহেতু একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয়, সেহেতু বিষয়টি নিয়ে সাধারণ সরলীকরণ করলে মারাত্মক ভুল হবে। পশ্চিমা বিশ্বের মতো দেশের বর্তমান প্রশাসন ভাবছে না কেন জঙ্গিবাদের উত্থান হচ্ছে অথবা শক্তি প্রয়োগ ব্যতিরেকে কী করে জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করা যায়! তারা পশ্চিমাদের মতোই জঙ্গি কর্মকাণ্ডের জন্য ইসলাম ধর্ম এবং সেই ধর্মের অনুসারীদের দায়ী করে যাচ্ছেন। মুসলমানদের দুর্ভাগ্য যে, দেশে-বিদেশে তাদের এমন কোনো নেতা বা পীর নেই, যিনি জ্ঞানগরিমা, চেহারা-চরিত্রে এবং মন-মানসে সর্বজনশ্রদ্ধেয় এবং সর্বজন মান্য হতে পারেন। অশিক্ষা-কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা, চরিত্রহীন লাম্পট্য, দুর্নীতি, সন্ত্রাস এবং ভোগবিলাস কিছু নেতাকে এমনভাবে গ্রাস করেছে, যার বিনিময়ে আইজি সাহেবের মতো প্রশাসনিক ব্যক্তিরা আলেম-ওলামাগণকে নিজ দফতরে ডেকে নিয়ে নানা পরামর্শ, আদেশ-উপদেশ দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।
আইজি সাহেবের দফতরে কারা গিয়েছিলেন তা আমার জানা নেই। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, তারা বিভিন্ন কারণে প্রশাসনের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছেন এবং আইজির দফতরের চা-বিস্কুট আপ্যায়ন লাভ করে নিজেদের ধন্য মনে করেছেন। অন্য দিকে, আইজি সাহেবও তাদের ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পেরেছিলেন, এদেরকে অনেক কিছু বলা সম্ভব। অথচ নিয়ম মোতাবেক ঘটনা হওয়ার কথা উল্টো। আইজির যদি কোনো বক্তব্য থাকে তাহলে তার উচিত ছিল বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদের খতিবের সাথে দেখা করা। পুলিশপ্রধান যদি তার সহযোগী কর্মকর্তাদের নিয়ে বায়তুল মোকাররমে নামাজ পড়তেন এবং নামাজ শেষে হুজুরের খাস কামরায় সাক্ষাৎ করে নিজেদের কথা বলতেন, তবে প্রেক্ষিতটি সর্বাঙ্গীণ সুন্দর দেখাত। পুলিশপ্রধানের কথা শোনার পর খতিব মহোদয় যদি দেশের শীর্ষ আলেম-ওলামাগণকে জাতীয় মসজিদে দাওয়াত দিতেন, তবে সরকার দেশের মসজিদ-মাদরাসাগুলো থেকে অধিকতর সাহায্য-সহযোগিতা পেত।
গত এক বছরে সরকার জঙ্গি দমনের জন্য যা করছে তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে তারাই ভালো বলতে পারবেন। জনগণ তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে কী ভাবছে, এমন কোনো প্রশ্ন যদি তারা করত কিংবা জনগণের মনোভাবের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করত তাহলে তারা বুঝত, জনগণ তাদেরকে একটুও বিশ্বাস করে না। জনগণ মনে করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারকে খুশি করার জন্য প্রায়ই নাটকীয় সব ঘটনা ঘটায়। নিজেদের কর্মকে নিয়োগকর্তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা, নিয়োগকর্তার শত্রুদের নির্বিচারে এবং অমানবিকভাবে নির্মূল করা এবং তাদের বন্ধুদের ধনে-জনে-মনে বেড়ে উঠতে সাহায্য করাকে নিজেদের ধ্যানজ্ঞান বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছে বলেই দেশবাসী বিশ্বাস করে। কর্মচারীদের বিশ্বাস এবং আস্থা এতটাই সুদৃঢ় ও বদ্ধমূল যে, তারা মনে করে- তারা যা বলবে, যা করবে, যা করতে বলবে তার সবগুলোই জনগণ মানবে, বিশ্বাস করবে এবং মুখ বন্ধ করে কোনো প্রশ্ন তো করবেই না- এমনকি মনে মনে অথবা স্বপ্নেও বিপরীত কিছু স্থান দেবে না।
গত দুই বছরে আমরা দেখলাম- দেশের সব নাশকতা, অনাসৃষ্টি, জঙ্গি তৎপরতা করছে বিএনপি-জামায়াতের লোক। এরপর দেখলাম, সব কিছু করছে হরকাতুল জেহাদ। পরবর্তীকালে বেশ কিছুদিন শুনলাম আনসার উল্লাহ বাংলা টিমের নাম। তাদেরকে হটিয়ে দিয়ে মাঠ দখল করল আইএস। সরকার জোরগলায় বলল, দেশে আইএস মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে আইএসের প্রধান পৃষ্ঠপোষক আখ্যা দিয়ে সরকারদলীয় কুশীলবেরা বক্তৃতা, বিবৃতি, টকশো এবং টিভি সাক্ষাৎকারে কথার ফুলঝুরি ছোটালেন। এরপর আবার গতি পরিবর্তিত হলো। বলা হলো, দেশের প্রধান বিরোধী দলের প্রবাসী নেতৃবৃন্দ এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা বিদেশী হত্যাসহ সব অপকর্ম করছে সরকারের পতন ঘটানোর জন্য। এভাবে কিছু দিন চলার পর রাষ্ট্রীয় কর্তারা পুনরায় জনগণের রুচিতে পরিবর্তন এবং ভিন্ন স্বাদ সংযোজনের চেষ্টা করল। প্রথমত, দেশবাসীকে হুকুম করা হলো এ কথা বিশ্বাস করার জন্য যে, এ দেশে কোনো আইএস নেই। দ্বিতীয়ত, বর্তমানের সব জঙ্গি তৎপরতা যে জেএমবি নামে একটি কুখ্যাত সংগঠন চালাচ্ছে, সে ব্যাপারে শতভাগ আস্থা রাখার পরিবেশ দৃশ্যপটে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হলো।
সাম্প্রতিক সময়ে বাঙালির মন ও মানসিকতা আনুগত্য, ধৈর্য, নীরব থাকা, সব কিছু মেনে নেয়া এবং সব কিছু ভুলে যাওয়ার যে মাত্রা প্রদর্শন করছে, তা এ দেশ তো বটেই সারা দুনিয়ার পথে-প্রান্তরে কোনো কালে দেখা যায়নি। আমাদের সমাজের মধ্যে যে নবতর গৃহপালিত উচ্ছিষ্টভোগী শ্রেণীটির সৃষ্টি হয়েছে, তাদের ভাবসাব এবং কথাবার্তা শুনে বোবা ইতর প্রাণীরা পর্যন্ত লজ্জায় মরে যেতে চাচ্ছে। সমাজের সব পেশা, সব শ্রেণী, সব বর্ণ এবং সব ধর্ম একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে গৃহপালিত হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। ফলে সরকারি লোকজন এদেরকে কতটুকু মূল্যায়ন করবে তা বোঝার জন্য খুব বেশি জ্ঞানী হওয়ার দরকার পড়বে না। অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। কারণ, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে হাজারো উদাহরণ দেখা যাবে যেখানে রাজনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতা ও সিংহাসন আলেম-ওলামাগণের কদমবুচি করেছে।
আব্বাসীয় খিলাফতের ক্রান্তিকালে বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহ: বাগদাদে বসবাস করতেন। ওই সময়ের খলিফারা বিভিন্ন কারণে মারাত্মক নীতিভ্রষ্টতায় ভুগছিলেন। তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার দম্ভ, ভোগবিলাস, ধনসম্পদের আধিক্য এবং অত্যাচার করার ক্ষমতার সাথে বর্তমানকালের কোনো কিছুই তুলনীয় নয়। তারপরও শাসকেরা কোনো ওলি আল্লাহর দরবারে হাজির হয়ে উচ্চবাচ্য তো দূরের কথা, আড়ালে-আবডালেও বিরূপ মন্তব্য করতে সাহস পেতেন না। বাগদাদের খলিফা স্বয়ং বড়পীরের সাথে দেখা করতে এসে তার অনুমতি না পেয়ে ফিরে গিয়েছিলেন। খলিফা অনেক চেষ্টা করে রাজকোষ থেকে একটি পয়সাও বড়পীরের মক্তবের জন্য বরাদ্দ দিতে পারেননি।
পাক ভারতে হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া জীবিত ছিলেন তখন দিল্লির সিংহাসনে অনেক নামজাদা সুলতান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। গিয়াস উদ্দিন বলবান, কুতুব উদ্দিন মুবারক শাহ, আলাউদ্দিন খলজি, মালিক কাফুর ও গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের হুঙ্কারে প্রকাশ্য রাজদরবারে অনেক উজির-নাজির পায়খানা-প্রস্রাব করে দিতেন।
এসব ভয়ঙ্কর শাসকগণকে খাজা সাহেব কোনো দিন স্বীকৃতি দেননি, উল্টো নানা কটুবাক্যে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতেন। অন্য দিকে শাসকগণও কোনো দিন খাজা সাহেবকে দরবারে ডেকে পাঠানো তো দূরের কথা, নিজেরা যে খাজার খানকা শরিফ মেহরুলিতে উপস্থিত হবেনÑ এমন বুকের পাটা তাদের ছিল না। ব্রিটিশ ভারতে দেওবন্দ মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা রশিদ আহম্মদ গাঙ্গুহী কিংবা মাওলানা আশরাফ আলী খান থানভীবে শাসককুল কতটা ভয় ও সমীহ করে চলতেন, তা সমসাময়িককালের ইতিহাস থেকে জানা যায়। অন্য দিকে, মাওলানা শিবলী নোমানীর কথা বলতে গিয়ে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে যে, তার মুরিদগণের মধ্যে দুইজন ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের সর্বকালের কিংবদন্তি দুই সভাপতি। প্রথমজন হলেন মহাত্মা গান্ধী এবং দ্বিতীয়জনের নাম মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। অন্য দিকে খাজা মইনউদ্দিন চিশতী রহ:-এর কথা না হয় বাদই দিলাম। কারণ, গত প্রায় সাড়ে ৮০০ বছরের ইতিহাসে পৃথিবীর কোনো সিংহাসনের মালিক খাজা সাহেবের দরবারে জুতা পায়ে দিয়ে ঢুকতে সাহস পাননি।
বাংলাদেশে যদি এমন আলেম থাকতেন, যার দরবারে পুলিশপ্রধানকে ঢুকতে হলে অনেক মেহনতের প্রয়োজন পড়ত এবং তিনি সেসব মেহনত করে যখন কাঁচুমাচু হয়ে আলেমের দরবারে দাঁড়িয়ে থাকতেন, তখন মুসলমানদের নেতা স্মিতহাস্যে আইজিকে জিজ্ঞেস করতেন- ‘বাবা, ঠিকমতো নামাজ পড়েন কি না? ছেলে-সন্তানদের নামাজ পড়তে বাধ্য করেন কি না এবং আপনার অধীনস্থদের মসজিদে যেতে বাধ্য করেন কি না? আগে আপনার লোকজনকে নামাজ পড়তে মসজিদে পাঠান এবং নিজে যান- দেখবেন মসজিদকে ঘিরে জঙ্গি হামলার যে আশঙ্কা করছেন তা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। খুতবায় জঙ্গিবিরোধী কথা বলা লাগবে না- দ্বীনের কথা বললেই হবে। কারণ, দ্বীন পালনকারীরা জঙ্গি হয় না।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন মার্কিন অবরোধ আসছে?

ইরানের একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত জুলাইয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তির পরমাণু চুক্তির পর এটি হবে দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অবরোধ। পরমাণু কর্মসূচিতে সমঝোতার ফলে ইরানের ওপর থেকে শর্তসাপেক্ষে পাশ্চাত্যের কিছু অবরোধ তুলে নেওয়ারই কথা ছিল। খবর গার্ডিয়ানের। যুক্তরাষ্ট্র আরব সাগরের হরমুজ প্রণালিতে তার যুদ্ধজাহাজের খুব কাছে ইরানের পরীক্ষামূলক রকেট ছোড়ার অভিযোগ করার এক দিন পর এই নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনার কথা জানা গেল। তবে ইরান গতকাল বৃহস্পতিবার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে গার্ডিয়ান পত্রিকা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ দপ্তর ইরান সরকার এবং দেশটির ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সহায়তাকারী দুটি ‘নেটওয়ার্কের’ বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশের নাগরিকেরা ওই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে কোনো ব্যবসা করতে পারবে না। মার্কিন ব্যাংকগুলোও প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অর্থসম্পদ জব্দ করবে। ইরানের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংয়ের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অবরোধ আরোপ করা হতে পারে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত পাঁচজন ইরানি কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আসবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক মাবরুকা ট্রেডিং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য কার্বন ফাইবার কিনতে ইরানকে সাহায্য করেছে। ওবামা সরকারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমরা কিছুদিন থেকেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পর্যবেক্ষণ করছি। এর মধ্যে রয়েছে গত ১০ অক্টোবর চালানো ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা। আমরা জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কূটনৈতিক পদক্ষেপ বিবেচনা করছি। এর পাশাপাশি কংগ্রেসকে নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনার কথাও অবহিত করছি।’ যুক্তরাষ্ট্রের এ অবরোধের পরিকল্পনা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আগে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এ ধরনের অবরোধকে পরমাণু চুক্তির লঙ্ঘন বলে বিবেচনা করবেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গত জুলাইয়ে পরমাণু কর্মসূচি বিষয়ে বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তির পর ইরান এ পর্যন্ত দুটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে।

কী বার্তা বয়ে আনল পৌর নির্বাচন? by মিজানুর রহমান খান

পৌর নির্বাচন সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষকদের কাজ বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ে যদি সত্যিকারের জনমতের প্রতিফলন ঘটে, বিএনপির অভিযোগ যদি ভিত্তিহীন হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়াবে এই ফলাফলকে বাংলাদেশের সমাজ রূপান্তরের একটি বড় সূচক হিসেবে গণ্য করা যাবে কি না? কারণ, আমরা ১৯৯১ সাল থেকে যে ধারণা পোষণ করে আসছি, সেটা আর বজায় থাকবে না। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা এতকাল বিশ্বাস করে আসছেন যে বাংলাদেশের রাজনীতি বিভক্ত। এটা কেবলই মতাদর্শগত নয়। ভোটের রাজনীতিতেও এর প্রতিফলন ঘটে আসছে। মনে করা হয়ে থাকে, দুই প্রধান দলের মধ্যে ভোটের অঙ্কটা মোটামুটি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ওঠা–নামা করে থাকে। এই অঙ্কটা অবশ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ধরে অনুমান করা হয়।
আমাদের বোঝা দরকার আওয়ামী লীগের বিজয় ও বিএনপির ভরাডুবি ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু তার স্বরূপটা কী। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ আসন পেয়েছিল। ২০০৮ সালে তারা মাত্র ২৯ আসন পেলেও ভোটের ব্যবধানে তারা কিন্তু অতটা পিছিয়ে ছিল না। যদি আমরা ধরে নিই যে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে সাত বছর পরে প্রথম লড়াই হয়েছে; আর জনগণ সেই ঐতিহ্য মেনে ভোট দিয়েছেন, তাহলে কি একটা বিরাট সামাজিক পরিবর্তন ঘটে গেছে না অন্য কিছু হয়েছে! কারণ, বিএনপির ভরাডুবি কেবল মেয়র পদের সংখ্যা হারানোর মধ্যেই সীমিত নয়, তারা অধিকাংশ স্থানে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও ভোটের ব্যবধানও অনেক বেশি।
এক-এগারোর সুনামিতে বিধ্বস্ত ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০১১ সালেও বিএনপি পৌর নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, যদিও সেই নির্বাচন কাগজে–কলমে অদলীয় ছিল। ২৩৬টি পৌরসভার মধ্যে বিএনপির সমর্থকেরা ৯২টি আর আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা ৮৮টি পৌরসভায় জয়ী হয়েছিলেন। আর এখন তা উল্টে দাঁড়াল ১৭৮ বনাম ২২। তখন অধিকাংশ পৌরসভায় নির্বাচন হয়েছিল তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ।
তখন বলা হয়েছিল যে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূলের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সাংগঠনিক দুর্বলতার খেসারত দিয়েছিল। আর বিএনপি ২০০৮ সালের শোচনীয় পরাজয়ের দুই বছরের পরে তৃণমূলে নিজকে শক্তিশালী করে তুলতে সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। প্রশ্ন হলো এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অঙ্কটা মাত্র চার বছরের ব্যবধানে উল্টে যেতে পারল? এটা কি বাস্তবসম্মত?
আমরা ফলাফল মূল্যায়নের সূচক হিসেবে যেগুলো বিবেচনায় নিতে পারি, তার সবটাই জাতীয় পর্যায়ের, কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনের ফ্যাক্টরগুলো কীভাবে কতটা কাজ করেছে সেটাও বিবেচ্য। চার বছর আগেও বিএনপির বিরুদ্ধে জঙ্গি ও জামায়াতপ্রীতি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে শিথিল মনোভাব দেখিয়ে চলার অভিযোগ ছিল। এই সময়ে নতুন যুক্ত হয়েছে হিংসাত্মক অবরোধ। বিএনপি একটি হৃদয়হীন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল। কিন্তু এরপরও সমাজে যারা বহুকাল ধরে বিএনপির সঙ্গে লেপ্টে থেকেছে, তাদের পাইকারি হারে বিএনপি ত্যাগ করতে দেখিনি। সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুই দলের মেরুকরণ ও বিভাজন যেখানে যেভাবে ছিল, সেভাবে অটুট রয়েছে বলে ধারণা করি। বিএনপি বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে অভিযোগ করে আসছে যে তাদের নেতা-কর্মীরা ব্যাপকভাবে হয়রানির সম্মুখীন। বহু স্থানে বিএনপির প্রার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এবং তাঁরা যে একটি ভঙ্গুর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, দুর্বলতর সাংগঠনিক শক্তি এবং প্রতিকূলতার মধ্যে নির্বাচন করেছেন, সে বিষয়েও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের জিজ্ঞাসা হলো স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে বিএনপির এই ভূমিধস পরাজয় বাংলাদেশ রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা বয়ে আনবে? যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যে সফল হওয়া ও ব্যাপক উন্নয়ন সাধনই কি সরকারি দলের এই ভূমিধস বিজয় নিশ্চিত করেছে? ক্ষমতাসীন দল কি তবে এই নির্বাচনকে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনের
সম্ভাব্য ফলাফল হিসেবে দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হতে পারে?
আমরা কি সত্যিই ধরে নেব, ভোটারদের মনোভাবে বিরাট পরিবর্তন এসেছে? আমরা কি সত্যিই ইসির প্রতি আস্থা রাখতে পারি? এই নির্বাচন আগের স্থানীয় সরকারের নির্বাচন, বিশেষ করে ২০১১-এর পৌর নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি বিরোধপূর্ণ ও মলিন হওয়া সত্ত্বেও এর ফলাফলের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল থাকব? এতকাল আমরা জানতাম যে দুই বড় দলের যারা ভোটব্যাংক হিসেবে কাজ করে, তারা সংখ্যায় একেবারে কম নয়। তারা রোদে-বৃষ্টিতে দলের সঙ্গেই থাকে। নেতা-কর্মীরা হরেক রকম কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত হন, কিন্তু দলের টিকিট তাঁদের উতরে দেয়। তাই বিএনপি-জামায়াত জোটের বিগত অপশাসন ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপর্যস্ত হওয়ার দুই বছরের মাথায় তারা বৃহত্তম পৌরশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছিল। তখনো বিএনপির তেমন সাংগঠনিক শক্তি ছিল না। আমরা স্মরণ করতে পারি যে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনেও বিএনপি এভাবে বিপর্যস্ত হয়নি। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোতে বিএনপি কতটা ভালো করেছে, সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরেছিলেন।
২০১১ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। তবে তখন এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন নির্বাচনটা করেছিল। ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি বজায় রাখার স্বার্থে ২৩৬টি পৌরসভা নির্বাচনকে চার পর্বে ভাগ করে ভোট গ্রহণ করেছিলাম। আমরাও নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন নজরদারিতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছিলাম। তাঁরা রিপোর্ট পাঠাতেন, ডিসিরাও রিপোর্ট দিতেন। দুইয়ের মধ্যে অমিল হলে আমাদের কর্মীদের ভাষ্য মেনে নিতাম।’ কিন্তু এবার ইসিকে আপাদমস্তক শিথিল আচরণ করতে দেখা গেছে। একটি আধা বিচারিক সংস্থা হিসেবে প্রিন্সিপাল অব ন্যাচারাল জাস্টিস অনুসরণ থেকে তারা অনেক দূরে ছিল।
তবে সন্দেহের অবকাশ কম যে ২০১১ ও ২০১৫ সালের দুটি নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে দলীয় শৃঙ্খলায় বিরাট ধস নেমেছে। বিদ্রোহী প্রার্থীরা এবারও তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়েছেন। যদিও ‘বিদ্রোহ দমনেই’ আওয়ামী লীগ প্রধানত দলীয় প্রতীকে নির্বাচন প্রথা চালু করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি। কারণ ক্ষমতাসীন দলের ১৭ জন বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। এঁদের ঠেকাতে ও ‘দলীয় শৃঙ্খলা’ রক্ষায় এরপর কি আমরা ৭০ অনুচ্ছেদের মতো বিধান পাব? নাকি এক-এগারোতে হুদা কমিশনের পরামর্শে অধ্যাদেশ দিয়ে চালু করা এবং পরে সংসদ দ্বারা পরিত্যক্ত সেই বিধানটি ফিরিয়ে আনতে হবে, যেখানে দলের তৃণমূলের ভোটে প্রার্থী মনোনয়ন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল?
নির্বাচন সম্পর্কে বিএনপির অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে বা না নিয়েও আমরা লক্ষ করি যে নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে কোথাও জোরালো কণ্ঠ শুনিনি। এর অন্যতম কারণ হতে পারে আমজনতা কার স্বার্থে লড়বে? কিসের জন্য ঝুঁকি নেবে? মোটা দাগে প্রার্থীদের একটি বড় অংশ অজনপ্রিয় বা কম জনপ্রিয়। সুতরাং তাদের দুঃখে জনগণের মন কাঁদে না। বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের একটি বিপুল অংশ মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয়ে আগে থেকেই কোণঠাসা, যা ২০১১ সালে ছিল না। তদুপরি বিএনপির কারচুপির অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হলেও তার দলীয় স্বার্থ রক্ষায় মানুষ রাস্তায় নামবে না।
অবশ্য মানুষের ভোটাধিকার যেখানেই খর্ব হয়েছে, সেখানকার মানুষ অসুখী হয়ে থাকবে। তারা এটা ভুলবে না।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

শেষ বছরে ওবামার লক্ষ্য -রয়টার্সের বিশ্লেষণ

হোয়াইট হাউসে নিজের শেষ বছরে পা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কদিন বাদেই চূড়ান্ত ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দেবেন তিনি। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, কিউবায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা ও ফৌজদারি বিচার-সংক্রান্ত আইনে সংস্কারের মতো বিষয়গুলো তাতে অগ্রাধিকার পাবে। ওবামার সামনে এখন লক্ষ্য একটাই; সেটা হলো, বাকি মেয়াদের পুরো সময়ে প্রাসঙ্গিক থাকা।
স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ হলো মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের যৌথ অধিবেশনে প্রেসিডেন্টের দেওয়া ভাষণ। এমন ভাষণ বছরে একবার দিয়ে থাকেন প্রেসিডেন্ট। সে হিসাবে ১২ জানুয়ারি সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের যৌথ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণ হবে ওবামার শেষ স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ। এমন এক সময়ে তিনি এই ভাষণ দিতে যাচ্ছেন, যখন হোয়াইট হাউসে তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
হোয়াইট হাউসের সাবেক ও চলতি উপদেষ্টাদের মতে, ওবামা ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আন্তর্জাতিক চুক্তির মতো বড় কিছু সফলতার মাধ্যমে ‘অভাগা প্রেসিডেন্ট’-এর তকমা এড়িয়েছেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে প্রতিপক্ষ শিবির রিপাবলিকান শিবিরে যে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থা, তা অব্যাহতভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবেন ওবামা।
হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টা ড্যান পিফেইফার বলেন, ‘আমি মনে করি, ২০১৬ সালটা অনেক ক্ষেত্রেই ২০১৫ সালের মতো হবে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও তাঁর সহযোগীরা আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলো এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাবেন। আর রাজনৈতিক সার্কাসের আলোকপাতটা থাকবে প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ট্রাম্প ও অন্যদের ওপর।’
উপদেষ্টারা বলছেন, ওবামার ১২ জানুয়ারির চূড়ান্ত ভাষণে অতীতের মতো আইনগত পদক্ষেপের লম্বা ফর্দ থাকবে না বলে তাঁদের ধারণা। এর পরিবর্তে ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তন ও কিউবা নীতির মতো অগ্রাধিকারভিত্তিক বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি ওবামা নিজের শেষ দিনগুলোতে যেসব নীতির চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে চান, তার ওপর আলোকপাত করবেন। এর বাইরে দেশে একের পর এক সহিংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নতুন করে আহ্বান জানাবেন।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষ রিপাবলিকানদের দখলে থাকায় ওবামা অতীতে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিতে পারেননি। তবে শিগগিরই নতুন ঘোষণা আসার ইঙ্গিত দিয়ে ওবামা বলেছেন, আগামী সোমবার তিনি এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে বসবেন।
দপ্তর ছাড়ার আগেই ওবামা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন—কিউবার গুয়ানতানামো বের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা। এ বিষয়ে একটি সংশোধিত পরিকল্পনা শিগগিরই কংগ্রেসে তুলতে পারে হোয়াইট হাউস। তবে ওই পরিকল্পনার বিরোধিতা করা থেকে আইনপ্রণেতারা সরে আসবেন বলে মনে করছেন না ওবামার সহযোগীরা।
গুয়ানতানামো বে ঘাঁটির বিষয়ে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টি এখনো হোয়াইট হাউসে প্রকাশ্য আলোচনায় নেই। তবে ওবামার সহযোগীরা বলছেন, এ বছর শেষ হওয়ার আগেই ওবামা সেই লড়াইয়ে নামবেন, তা সন্দেহাতীত।
সাবেক উপদেষ্টা এবং ২০০৮ ও ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওবামার সেনাপতিদের একজন ডেভিড অ্যাক্সেলর্ড বলেন, প্রেসিডেন্টরা সব সময়ই প্রাসঙ্গিক থাকেন। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাঁর সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সব আইনগত কর্তৃত্ব ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।

আশা জাগানিয়া সেই সুরাইয়া by ইফতেখার মাহমুদ

মা নাজমা খাতুনের কোলে পাঁচ মাস বয়সী সুরাইয়া। মাগুরা শহরের
দোয়ারপাড়ার বাড়িতে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় l এহসান-উদ-দৌলা
চোখে-মুখে তার রাজ্যের বিস্ময়। মা নাজমা খাতুনের কোলে বসে পাঁচ মাস এক সপ্তাহ বয়সী সুরাইয়া এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। খানিক বাদে তার মুখে হাসির আভা। সেই আভা যেন মাগুরা শহরের দোয়ারপাড়ার সন্ধ্যা বেলার মৃদু অন্ধকারকেও ছাপিয়ে গেল। কে বলবে, সুরাইয়া নামের এই শিশুটি মায়ের পেটে থাকতেই গুলিবিদ্ধ হয়েছিল!
সুরাইয়া নামের এই ফুটফুটে মেয়েটি যেন নতুন বছরে নতুন আশার প্রতীক। সমাজের অমানবিক সংঘাত-সংঘর্ষের বিপরীতে সুরাইয়া এক উজ্জ্বল নাম। সুরাইয়ার অমলিন হাসি মানুষের অন্তহীন প্রীতি আর ভালোবাসার জয় ঘোষণা করছে।
গত ২৩ জুলাই ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে মায়ের গর্ভে শিশু সুরাইয়া গুলিবিদ্ধ হয়। গুলি মায়ের তলপেট ভেদ করে গর্ভের শিশুর হাত, গলা ও চোখে আঘাত করে। এতে তার চোখ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাগুরা সদর হাসপাতালে জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম হয় তার। আশঙ্কাজনক অবস্থায় দুদিন পর ওকে নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। চিকিৎসকদের চেষ্টায় আশঙ্কাজনক অবস্থা থেকে সুরাইয়া সুস্থ হয়ে ওঠে। এখন দেখলে সে দিনের কথা অনেকটাই অবিশ্বাস্য মনে হয়। ওর ওজনও এখন সাড়ে ছয় কেজি ছাড়িয়েছে।
গত ২৯ ডিসেম্বর মাগুরায় ওদের বাড়ি গিয়ে জানা গেল, সুরাইয়াদের বাসায় বিস্তর ভিড় ছিল বিকেলে। নির্বাচনে পৌর মেয়র ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীরা এসে দেখে গেছেন ওকে। অনেক প্রার্থী আবার মুখ ফুটে বলেই গেছেন, এই বাড়িতে এলে ভোট বাড়বে।
সুরাইয়ার চাচি শিলা খাতুন বলছিলেন, ‘এই বাড়িতে আগে কেউ ঢুঁ দিত না। এখন সব প্রার্থীই পালা করে আসছে। মাঝে মাঝে বসার জায়গাও দিতে পারিনে, লাইন ধরে যায়।’ ওর আরেক চাচি হাজেরা বেগম বলছিলেন তাঁদের যত পরিচিতি সবই সুরাইয়ার কারণে। সুরাইয়ার স্বজনেরা বলছিলেন সুরাইয়াকে দেখতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন থেকে শুরু করে বিদেশ থেকেও অনেকে এসেছেন। কানাডা-প্রবাসী হিল্লাল নামে একজন এসে ২০ সেট বিদেশি কাপড় ও আকিকার জন্য একটি ছাগল দিয়ে গেছেন।
ওই বাড়িতেই শোনা গেল, ‘সুয্যিমামা জাগার আগে’ প্রতিদিন জেগে ওঠে সুরাইয়া। বাবা বাচ্চু ভূঁইয়ার কোলে উঠে কিছুক্ষণ এঘর-ওঘর করে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া ভোরে কিছুটা সময় মেয়ের সঙ্গে কাটালেও কাজ সেরে দুপুরে ভাত খেতে আসার ফাঁকে মেয়েকে চোখের আড়াল করেন না। সে কারণেই কি না কে জানে স্বজনেরা বলছিলেন, সুরাইয়া কিছুক্ষণ পরপরই আব্বু বলার চেষ্টায় বু-বু-বু শব্দ করে। সুরাইয়া যে বেঁচে আছে এটাই বাবা বাচ্চু ভুঁইয়াকে অনাবিল আনন্দ দেয়। আর, মা নাজমার চিন্তা সে শতভাগ সুস্থ হয়ে উঠবে কি না তা নিয়ে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুরাইয়া শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কানিজ হাসিনার তত্ত্বাবধানে ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার কানিজ হাসিনা প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই মাস পর পর সুরাইয়া চেকআপে ঢাকায় আসে। আগামী ৫ জানুয়ারি ওর আসার কথা আছে। ডান চোখটা ছাড়া আর কোথাও কোনো সমস্যা নেই। গুলি লাগা চোখটির কী অবস্থা, এই চোখ দিয়ে সুরাইয়া কতটা দেখতে পাবে সেটা হয়তো এবার বোঝা যাবে।’
শিশু সুরাইয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠায় চিকিৎসকদের কাছে তাঁদের ঋণের শেষ নেই। সুরাইয়ার মা নাজমা বলছিলেন, ‘মেয়েকে মমতাময়ী ডাক্তার বানাতে চাই। যে মমতা নামের জিনিসটা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল তার জোরেই আমার মেয়ে আজ বাঁইচে আছে।’

"হিন্দু রাষ্ট্র করার চেষ্টা হলে ভারত টুকরো টুকরো হবে"

ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করার ক্ষমতা কারও নেই। এটা করতে গেলে এই দেশ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। দেশের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়বে। দ্বিতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধ হবে। ‘আমরা জমিয়তের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সুদীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করছি, কোনোদিন আমাদের দেশকে হিন্দু রাষ্ট্র হতে দেব না।’
বৃহস্পতিবার বিকেলে উত্তর ২৪ পরগণার টালিখোলায় এক সমাবেশে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ পশ্চিমবঙ্গ শাখার সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘দেশপ্রেম কোনো নাগরিকের কাছ থেকে শিখতে হবে না। প্রশাসনের কাছ থেকেও নয়। এই দেশ আমরাই স্বাধীন করেছি-এটা মাথায় রাখতে হবে। আমরা স্বাধীন না করলে ১৯৪৭ সালের পরিবর্তে আরও ১০০ বছর পর এই দেশ স্বাধীনতা পেত। আমাদের বাদ দিয়ে দেশ স্বাধীন হতো না। এজন্য আমরা দেশের অংশীদার, আমরা ভাড়াটিয়া নই। এটা আমাদের অংশ।’
ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে সিদ্দিকুল্লাহ বলেন, ‘এখানে হিন্দু, দলিত, খ্রিস্টান ও মুসলিম সবাই থাকবে। কেউ যদি মনে করেন, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এদেশকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ বানিয়ে নেব তাহলে তাকে ১০ হাজার বার জন্ম নিতে হবে। পরিষ্কার শুনে রাখুন, ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র করার ক্ষমতা কারও নেই।’
তিনি আরও বলেন, আগে দেশ তারপর জনগণ, এরপর সমাজ এবং ব্যক্তি-জীবন। দেশ না বাঁচলে কেউ বাঁচতে পারবে না। ভারত পৃথিবীর অন্যতম একটি ভাল দেশ। এই দেশ, এ দেশের মাটি আমাদের কাছে পবিত্র। ভারতের মতো পবিত্র মাটি পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও দুবাইয়ের মাটি আমাদের কাছে তৃতীয় পর্যায়ের আর ভারতের মাটি প্রথম পর্যায়ের।
সিদ্দিকুল্লাহ বলেন, ভারতের সংবিধান সবার ওপরে আর নিচে হলো ভারতের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী-মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান। ভারতের সাংবিধানিক পরিকাঠামো খুব মজবুত। অনেক ঝড় ৬৯ বছরে বয়ে গেছে; কিন্তু ভারতবর্ষ নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কম করে হলেও ৬৭ হাজার বার দাঙ্গা হয়েছে ভারতে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ’৬৪ ও ’৪৭ সালের ভাঙা ক্যাসেট আর শুনতে চায় না। বাংলার মানুষ সুন্দর বাংলা দেখতে চায়, উন্নয়নের বাংলা দেখতে চায়। এজন্য এ দেশকে সমৃদ্ধ করতে হবে।
সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, হাসনাবাদের নদীর ওপার ও কুচবিহার পর্যন্ত ৮ থেকে ৯টি জেলায় বাংলাদেশের সীমান্ত। আপনারা সীমান্ত এলাকার মানুষ। তাই বর্ধমান, বীরভূম ও মেদিনীপুর জেলা থেকে আপনাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। আমরা খবরের কাগজ এবং অন্যান্য মাধ্যমে দেখি সমাজবিরোধী ও দেশ বিরোধী শক্তি সীমান্ত এলাকায় মানুষকে প্রভাবিত করে দেশের ক্ষতি করতে চায়। এখানকার নাগরিক হিসেবে আমাকে, আপনাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দেশবিরোধী বা দেশের ক্ষতি হতে পারে- এরকম কোনো বিষয়ই সহ্য করা হবে না।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী বলেন, তিন ভাগের এক ভাগ মুসলমানদের। তাদের বাদ দিয়ে বাংলার ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত হতে পারে না। তিনি বলেন, বুধবার (৩০ ডিসেম্বর) সন্ধ্যার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে টেলিফোন করে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। জমিয়তের কর্মী-বন্ধুদেরও তিনি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। আমিও তার সুস্থতা কামনা করে শুভেচ্ছা জানিয়েছি। এভাবে সম্পর্ক গড়ে উঠছে। আমরা তৃণমূলের কাছে হাত পাতিনি। আমাদের মূল্যায়ন, দেশপ্রেম, ঈমানদারী, জনভিত্তি, স্বচ্ছতা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ভাবছেন। আমরাও ভাবছি। কি হবে না হবে সেটা ভবিষ্যৎ বলবে।

জনতার রায়ে বেকসুর খালাস by চৌধুরী মুমতাজ আহমদ

কারার অন্ধকারই কি আলো হয়ে দেখা দিলো তার সামনে। সারা দেশের মধ্যে একমাত্র তিনিই মেয়র পদে লড়েছেন জেল থেকে। বিজয়ও ছিনিয়ে এনেছেন। তাও সে বিজয় এসেছে পরাজয়ের স্রোতে ‘ফুল’ হয়ে। পৌরসভা নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যখন শুধু বিএনপি প্রার্থীদের একের পর এক পরাজয়ের বার্তা আসছিল, তখন হবিগঞ্জে উল্লাসে গর্জে উঠেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। জিতে গেছেন গোলাম কিবরিয়া গউছ।  আদালতে তার মামলা বিচারাধীন। দোষী না নির্দোষ-আদালতই দেবে সে রায়। তবে তার আগে জনতার রায়ে তিনি যেন ‘বেকসুর খালাস’। হবিগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দারা জানিয়ে দিলেন তারা আবারও জিকে (গোলাম কিবরিয়া) গউছকেই তাদের অভিভাবক হিসেবে চান।
১৩৪ বছর বয়সী হবিগঞ্জ পৌরসভার শীর্ষ পদে বৃটিশ প্রতিনিধি থেকে শুরু করে কতজনই তো বসেছেন। জিকে গউছও ছিলেন সে চেয়ারে। তবে এবার যেমন করে তিনি এ চেয়ারটিতে বসার অধিকার পেলেন তেমন করে কেউ কি আর এসেছিলেন এ চেয়ারের কাছে? ব্যালট পেপারে সিল নয় যেন হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসার ১০ হাজার ৭শ’ ৯৭টি নীলপদ্ম দিয়ে মালা সাজিয়ে পৌরবাসী তা পরিয়ে দিয়েছেন জিকে গউছের গলায়। নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল  জিকে গউছই হয়তো আবার নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন হবিগঞ্জের মেয়র হিসেবে।
মাথায় ঝুলছে তার একটি আলোচিত হত্যা মামলা। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলায় অভিযুক্ত তিনি। প্রথম দিকে চার্জশিটে তার অন্তর্ভুক্তি না থাকলেও ২০১৪ সালের ১৩ই নভেম্বর দাখিল করা তৃতীয় সম্পূরক চার্জশিটে তিনিও যুক্ত হন অভিযুক্তের তালিকায়। পরে ঐ বছরের ২৮শে ডিসেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাকে জেলে পাঠান। এরপর সাময়িকভাবে হারাতে হয় মেয়র পদও। এরই মাঝে শেষ হয় পৌরসভার মেয়াদ। আবার নির্বাচন আসে। জনতার ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস রেখে জেল থেকেই সে নির্বাচনে প্রার্থী হন জিকে গউস।
৯.০৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হবিগঞ্জ পৌর এলাকাজুড়ে নির্বাচনী উত্তাপ। প্রার্থী-সমর্থকদের মাঠজুড়ে ছুটোছুটি। কিন্তু নির্বাচনী মাঠের সে দৌড়ঝাঁপে কোথাও তিনি ছিলেন না। কারও কাছে ভোট চাইতে পারেননি, কারও সঙ্গে বুক মেলাতে পারেননি, হাত ধরে ঝাঁকুনিও দিতে পারেননি। কিন্তু যেন ছিলেন সবখানেই। চায়ের দোকানে-আড্ডায়-ঘরোয়া বৈঠকে তিনি ছিলেন মুখে মুখে। কারাগারে বন্দি থাকায় তার প্রতি মানুষের বাড়তি সহানুভূতি ছিল। নির্বাচনী মাঠে তার না থাকাটাই যেন সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠে জিকে গউসের জন্য। সে শক্তিতেই পার হয়ে গেলেন নির্বাচনী বৈতরণী।
নির্বাচনী বৈতরণী পার হলেও জি কে গউছ কি নিতে পারবেন হবিগঞ্জ পৌরবাসীর অভিভাবকত্বের ভার- সে আশঙ্কা অনেকেরই মনে। কারণ তার ওপর থাকা মামলাটির মীমাংসা হয়নি এখনও। যে মামলার কারণে তিনি মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই বরখাস্ত হয়েছিলেন। আবারও কি বরখাস্ত হবেন? সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ই ইউ শহীদুল ইসলাম শাহীনও ধারণা করছেন, হয়তো আবার সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হবে জিকে গউসকে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, যদি তাকে বরখাস্তই করা হবে তবে তাকে কেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়। আইনের এ ধারাগুলোকে তিনি স্ববিরোধী বলেই মনে করেন। তিনি বলেন, কেউ যদি জনপ্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য না হন, তবে তার ভোটে দাঁড়ানোর যোগ্যতা থাকাও উচিত নয়। আর যদি ভোটে দাঁড়ানোর যোগ্য হন তবে তার ক্ষমতা কেড়ে নেয়াও যৌক্তিক নয়। আমলাকর্তৃক একজন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করার বিষয়টিকেও একজন জনপ্রতিনিধির জন্য অমর্যাদাকর বলে অভিমত ব্যক্ত করেন অ্যাডভোকেট ই ইউ শহীদুল ইসলাম শাহীন।
২০০৪ সাল থেকেই প্রায় ১ লাখ মানুষের আবাস হবিগঞ্জ পৌর এলাকা দেখভালের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন জি কে গউছ। খুব ছোট থাকতে তার দাদা মনসাদ মিয়াকে দেখেছিলেন গোপায়া ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব সামলাতে। এ ছাড়া তার ঘরেও আছে জনপ্রতিনিধির রক্তের উত্তরাধিকার। জি কে গউছের স্ত্রী ফারহানা গউছ হ্যাপীর বাবা অ্যাডভোকেট আতিকুল্লাহ ছিলেন হবিগঞ্জের সংসদ সদস্য।
সিলেট জেলা কারাগারে ডিভিশনে থাকা জি কে গউছের শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। মেরুদণ্ডে ব্যথার কারণে সপ্তাহে তাকে তিন দিন হাসপাতালে যেতে হয়, থেরাপি নিতে হয়। মেরুদণ্ডের এ ব্যথাটি তার সঙ্গী হয়েছে জেল জীবনেই। হবিগঞ্জ কারাগারে থাকার সময় গত বছরের ১৮ই জুলাই এক কয়েদির ছুরির আঘাতে মারাত্মক আহত হন তিনি। কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভের সংবাদে সব ব্যথা ভুলে আবারও তিনি আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বলে জানিয়েছেন তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া শুভানুধ্যায়ীরা। তাদের কাছেই পরদিন তিনি জেনেছিলেন নিজের বিজয় বার্তা। এখানেও ব্যতিক্রম জি কে গউছ। যেখানে দেশের সব পৌরসভা নির্বাচনে বিজয়ীরা নির্বাচনের দিনই তাদের ফলাফল জেনে গিয়েছিলেন, জি কে গউছকে তা জানতে হয় আরও এক রাত নির্ঘুম কাটানোর পর।

দেশে গণতন্ত্র নয় রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে, ভোট ডাকাতি করে আনন্দের কিছু নেই : খালেদা জিয়া

দেশে গণতন্ত্র নেই মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বর্তমানে দেশে গণতন্ত্র তো নাই, স্বৈরশাসনও না, এখন হয়েছে রাজতন্ত্র কায়েম। এক ব্যক্তি যিনি তার ইচ্ছা প্রকাশ করবেন তার ইচ্ছায় সব। তাকে সালামী দিয়ে এবং সালাম দিয়ে সেই ইচ্ছা পূরণ করতে হচ্ছে।  শুক্রবার সন্ধ্যায় ছাত্রদলের এক সমাবেশে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার নয়, ডাইনি বাহিনী। রক্তের প্রতি তাদের নেশা হয়ে গেছে। এদের হাতে শুধু রক্ত আর রক্ত। রক্ত ছাড়া থাকতে পারে না। তারা রক্ত পিপাসু এবং নরপিশাচ হয়ে জন্মেছে। পৌর নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসিনা-রকিব মার্কা নির্বাচন আমরা প্রত্যাখান করেছি। তাদের অধীনে কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। খুব শিগগিরই দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ছাত্রসমাবেশের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বেগম জিয়া বলেন, আজকে দেশে গণতন্ত্র নেই। দেশের গণতন্ত্র নির্বাসনে। কোথাও কোনো উন্নয়ন নেই। শুধু ঢাকায় কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করে দেখাচ্ছে। কারণ এসব প্রকল্পে কমিশন পাওয়া যায়।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের নামে বিদ্যুৎ খাতকে ধ্বংস করেছে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুতে ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে। আর সেই বোঝা জনগণের ওপর চাপাচ্ছে।
সরকারের উদ্দেশে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, পৌর নির্বাচনে ভোট ডাকাতি করে কতটি আসন পেলেন তা নিয়ে আনন্দ পাওয়ার কিছু নেই। কারণ এ কাজ কারা করেছে তা তারা (সরকার) ভালোভাবেই জানে। এই নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করে নষ্ট করা হয়েছে।
সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার আগে অনুষ্ঠানস্থলে এসে খালেদা জিয়া জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং পায়রা উড়িয়ে ছাত্র সমাবেশের উদ্বোধন করেন।
এর আগে সকালে শেরেবাংলা নগরে শহীদ জিয়ার মাজারে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় ছাত্রদল। সেখানে ফাতেহা পাঠ ও মুনাজাত হয়।
সদ্য অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। এ নির্বাচন ইতোমধ্যে আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি। জনগণও নির্বাচন মানে না। হাসিনা-রকিব মার্কা নির্বাচন যে অচল তা আরেকবার প্রমাণিত হলো। প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদেরকে দলীয় কর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।
খুব শিগগিরই সরকারের পরিবর্তন হবে মন্তব্য করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো সরকারেরই স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নেই। সরকার আসবে এবং যাবে। এ সরকারও ক্ষমতায় চিরদিন থাকতে পারবে না। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকদেরকে থাকতে হবে। সরকারের কর্মকর্তারা থাকবেন। খুব শিগগিরই দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে এ সরকারের বিদায় হবে। তাই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কারণ, সরকারের পরিবর্তন হলেও আপনাদের থাকতে হবে।
দেশে কেউ খুন ও গুম হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বেশি করে ভাত খান মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, আওয়ামী লীগ শুধু স্বৈরাচার নয়, তারা ডাইনি বাহিনি। রক্তের প্রতি তাদের নেশা হয়ে গেছে। এ নিয়ে অতীতে হাসিনারই সহকর্মী ‘আমার ফাঁসি চাই’ গ্রন্থে লিখেছেন। এদের থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য আমাদের অনেক সন্তানকে জীবন দিতে হয়েছে।
দেশে রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে মন্তব্য করে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে গণতন্ত্র নাই, স্বৈরতন্ত্রও নাই, দেশে রাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে। এক ব্যক্তির কথাই সব। তাকে সালাম দিয়ে সব করতে হয়।
ছাত্রলীগ সব দখল করে নিয়েছে দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাতে দেয় অস্ত্র। সব জায়গায় চাঁদাবাজি করে। তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে আজ দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ নেই।
বিদেশীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে ভয় পায় জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ। বিদেশী হত্যা হচ্ছে। বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় বিদেশীরা বিনিয়োগ করছে না।
পৌর নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশের মানুষ দেখেছে পৌর নির্বাচন কেমন হয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো হাসিনা এবং রকিবের অধীনে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না।
তিনি বলেন, এর মানে এই নয় যে, দেশে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না? অবশ্যই নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আমরা চাই। জনগণ সেই নির্বাচনে ভোট দিতে পারলে বিএনপি অবশ্যই ক্ষমতায় যাবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনে সরকারী দল প্রিজাইডিং অফিসারদের দলীয় কর্মীর মত ব্যবহার করেছে। প্রিজাডিং অফিসাররা অনেক অসহায়, তাদের কোনো দোষ নেই। বর্তমান ইসি অথর্ব ও মেরুদণ্ডহীন। তাদেরকে বার বার আমরা সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছি। কিন্তু তিনি বলেছেন, সেই পরিস্থিতি না কি সৃষ্টি হয়নি।
খালেদা জিয়া বলেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে আমরা এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য ছিল, বিএনপি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে, এ কথা সবার কাছে বলবে!
দেশের অর্থনীতির অবস্থা অনেক খারাপ দাবি করে খালেদা জিয়া বলেন, ব্যাংকগুলোতে আজ টাকা নেই, লুট হয়েছে। দেশে চাকরি নেই, চাকরির আশায় মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে। তারা কষ্ট করে ঢাকায় কিছু একটা করে জীবনধারণ করছে।
প্রশাসনের উদ্দেশে তিনি বলেন, খুব দ্রুত সরকারের পরিবর্তন হবে। আপনারা নিরপেক্ষ থাকুন। আওয়ামী লীগ সরকার বলে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আপনাদের চাকরি যাবে। কিন্তু আমি বলবো আপনাদের চাকরি যাবে না। আপনারা আপনাদের মেধা ও যোগ্যতা বলেই চাকরি করবেন।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করেছিলেন মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, তিনি দেশকে এগিয়ে নিতে কাজ শুরু করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশকে গুছিয়ে নিয়েছিলেন। পাহাড়ে-সমতলে কোথাও বৈষম্য সৃষ্টি করেননি। বর্তমানে অনেকে কর্মকর্তা আছে যারা সেদিন জিয়াউর রহমানের সাথে খাল কেটেছিলেন। আজ কেনো হঠাৎ করে তাদের মস্তিষ্ক বিকৃত হলো?
ছাত্রদলের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিগত দিনের আন্দোলনে তোমাদের প্রত্যেকেরই অনেক অবদান রয়েছে। তবে তোমাদেরকে আরো শৃঙ্খলিত হতে হবে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে। তা না হলে লক্ষ্য অর্জন হবে না। কেবল কোনো নেতার নামে আর এলাকার নামে শ্লোগান দিলে হবে না। পড়ালেখা করে অনেক কিছু শিখতে হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে লিফলেট বানিয়ে তা সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। মানুষের সুখে-দুখে পাশে থাকতে হবে। জনপ্রিয়তা অর্জন করতে হবে। নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু, এম ইলিয়াস আলীর মতো অনেক ছাত্রনেতা এমপি হয়েছিলেন। আজ তাদেরকে গুম ও হত্যা করা হয়েছে। এসবের বিচার একদিন হবে।
বেগম জিয়া বলেন, সবকিছু বিবেচনা করে ত্যাগীদের সমন্বয়ে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কমিটি করা হবে। কেউ পদ না পেলে মন খারাপ করা যাবে না। অন্য সংগঠনে পদ দেয়া হবে। মন খারাপ না করে এক হয়ে কাজ করতে হবে। সবাইকে নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। ছাত্রদলের জট কমানো হবে।
ছাত্রদলের সভাপতি রাজীব আহসানসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবি করেন তিনি।
ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুনের সভাপতিত্বে আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শাসসুজ্জামান দুদু, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, কেন্দ্রীয় নেতা ড. আসাদুজ্জামান রিপন, খায়রুল কবির খোকন, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, এবিএম মোশাররফ হোসেন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু প্রমুখ।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান।
দর্শক সারিতে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যাস্টিার মওদুদ আহমদ, ড. আব্দুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. জেড এম জাহিদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন ছাড়াও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সবশেষে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।

পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এমন ফলই চেয়েছিল by আনোয়ার হোসেন

বিএনপিসহ অন্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে অর্জিত ফলকে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় মনে করছে আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি অধ্যুষিত বলে পরিচিত কিছু এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধানকে কিছুটা বিব্রতকর মনে করছেন কোনো কোনো নেতা। এখন আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য, নির্বাচন নিয়ে যাতে বিতর্ক তৈরি না হয় তা দেখা।
নির্বাচন তদারক-সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে এই মনোভাব জানা গেছে। নিজস্ব জরিপ পর্যালোচনা করে ভোটের আগেই আওয়ামী লীগ বলেছিল যে দুই শতাধিক পৌরসভায় তাদের প্রার্থীরা এগিয়ে।
নির্বাচনের আগে পুলিশের এক গোপন জরিপে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ১২৮ এবং বিএনপির প্রার্থীরা ৪৯টি পৌরসভায় এগিয়ে আছেন। বিএনপি যে ২২টি পৌরসভায় জিতেছে তার অধিকাংশই এই জরিপে এসেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বিএনপিকে পৌর নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ফল প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দিয়ে বিএনপি প্রকারান্তরে জনগণের রায়কে অপমান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা অনুরোধ করব, এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন, ফল মেনে নেন।’ তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচনে জনগণ এমন বার্তা দিয়েছে যে তারা বাংলাদেশে পাকিস্তানি প্রেতাত্মার কোনো রাজনৈতিক দলকে দেখতে চায় না। বিএনপিকে জনগণের এই মনোভাব ভালোভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভোট গণনা পর্যন্ত বিএনপিকে নির্বাচনে রাখতে চেয়েছিল সরকার। নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনও ছিল অগ্রাধিকার। এর দুটিই অর্জিত হওয়ায় ফুরফুরে আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে বিদেশিদের কাছে বিএনপির একমাত্র বক্তব্য ছিল, তারা মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয়। এ জন্যই পৌরসভা নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করে বিএনপির এ বক্তব্যের ফয়সালা চেয়েছিল সরকার।
পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অর্জন কী? ভোট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মাহবুব উল আলম হানিফকে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছে যে বর্তমান সরকার বৈধ। এই রাজনৈতিক দলটি (বিএনপি) সরকারকে মানে না। নির্বাচন কমিশনকে মানে না। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে পৌরসভা নির্বাচন করতে বাধ্য হয়েছে তারা। এই নির্বাচনে এটাই আওয়ামী লীগের বড় অর্জন।’
ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে হানিফ বলেন, ‘বিএনপি যদি নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিত, তাহলে তাদের সব পর্যায়ের নেতারা প্রচারে অংশ নিত। তাদের এই সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা সেটা কাজে লাগায়নি। খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদের সংখ্যা নিয়ে যে কটাক্ষ করেছেন, তাতে দেশের জনগণ তাদের ওপর চড়াও হতে পারে, এই ভয়ে কেউ এজেন্ট না হলে এর দায়ভার তো আওয়ামী লীগের না।’
বিএনপির ভবিষ্যৎ আন্দোলন পরিকল্পনা সম্পর্কে হানিফ বলেন, গত ৫ জানুয়ারির আন্দোলনের সহিংসতা ও জনগণের শিক্ষা তাদের মনে থাকলে তারা সন্ত্রাস করার জন্য মাঠে নামবে না। আর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করার সাংগঠনিক শক্তিও দলটির নেই। বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি একটি মাজাভাঙা রাজনৈতিক দল, মেরুদণ্ড ভাঙা দল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার মতো সাংগঠনিক শক্তিও নেই।’
বিপুল বিজয়ে ফুরফুরে ভাব থাকলেও কিছু কিছু পৌরসভায় জয়-পরাজয়ের ব্যবধান অনেক বড় হওয়ায় কিছুটা বিব্রত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। নির্বাচন তদারকের দায়িত্বে নিয়োজিত একাধিক নেতা বলেন, ঢাকা বিভাগ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, রংপুর বিভাগ, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের বেশির ভাগ পৌরসভায় ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া ভালো ছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের বেশির ভাগ ও অন্য কিছু পৌরসভায় অতি উৎসাহী হয়ে ব্যাপক জোর-জবরদস্তি করেছে। ফলে বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকাগুলোতেও দলটির মেয়র প্রার্থীরা ১০ শতাংশের কম ভোট পেয়েছেন, যা অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দেবে।
বিদ্রোহীদের ভালো ফল: নানা চাপ প্রয়োগের পরও ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের ১৭ জন বিদ্রোহী মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন। দলটির নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় মন্ত্রী-সাংসদের মদদের কারণেই অধিকাংশ বিদ্রোহী জয়ী হয়েছেন। তবে এবার বিদ্রোহীদের ফুলের মালা দিয়ে দলে ভিড়িয়ে নেওয়া হবে না। কারণ এবার ছাড় দেওয়া হলে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রচুর বিদ্রোহী দাঁড়িয়ে যাবেন। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
বিদ্রোহীদের বিষয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মাহবুব উল আলম হানিফের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের জনগণ রায় দিয়েছে, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তাঁরা দলে ফিরে আসার রায় পাননি। তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা বহাল থাকবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সময়ের স্বল্পতার কারণে ১০ শতাংশ পৌরসভায় প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হয়ে থাকতে পারে।