Monday, July 30, 2018

৩৬ বছর বয়সী নারী হবেন পুরুষ

আসাম সরকারের ৩৬ বছর বয়সী নারী কর্মী রীতা দেবী। তিনি এখন আর নারী থাকতে চান না। অপারেশন করিয়ে পুরুষে রূপান্তরিত হতে চান। তাই যোগাযোগ করেছেন মুম্বইয়ের একটি হাসপাতালে। সেখানে তার প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। প্রক্রিয়া চলছে তার লিঙ্গ পরিবর্তন করে পুরুষে রূপান্তরের। শুধু তিনি একাই নন। একই রকমভাবে লিঙ্গ পরিবর্তন করানোর লাইনে রয়েছেন আরো ১২ জন। ভারতের একটি অনলাইন ট্যাবলয়েড দৈনিক এ খবর দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে ললিত সালভে নামে একজন কনস্টেবল সম্প্রতি এমন প্রক্রিয়ায় লিঙ্গ পরিবর্তন করিয়েছেন। তার কাহিনী শুনে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন আসাম সরকারের বিদ্যুত বিভাগের কর্মী রীতা দেবী। এ জন্য তিনি যোগাযোগ করেছেন মুম্বইয়ের সেইন্ট জর্জ হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার তার প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। এরপর তিনি আসামে ফিরে গেছেন। তবে এই যে লিঙ্গ পরিবর্তনের যে ধাপে তিনি পা দিয়েছেন তাতে তার সামনে বড় একটি বাধা রয়েছে। তা হলো রাজ্য সরকারের অনুমোদন। তারা যদি কোনো অনাপত্তি না করে তাহলেই রীতা দেবী এই অপারেশন করাতে পারবেন। তা ছাড়া তার কমপক্ষে এক মাসের ছুটি প্রয়োজন হবে।
রীতা দেবী বলেছেন, তিনি নারী হলেও নিজের ভিতর কখনো মেয়েত্ব বা নারীত্ব অনুভব করেন নি। তার ভাষায়, যখন আমি ললিতের লিঙ্গ পরিবর্তনের বিষয়ে শুনতে পাই তখনই সামনে এগুনোর সাহস পাই। আমার বাড়ি এমন একটি গ্রামে যেখানকার মানুষ জানেই না যে লিঙ্গ পুনর্গঠন করা যায় বা লিঙ্গ পরিবর্তন করা যায়। আমার এখন বয়স ৩৬ বছর। অনেক মানুষ আমার কাছে বিয়ের বিষয়ে জানতে চান। তবে এ বিষয়ে আমি সিরিয়াসলি কিছু ভাবি নি। কারণ, আমার লিঙ্গগত পরিচয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি। এক্ষেত্রে আমার আত্মীয়রা আমাকে সব সময় সমর্থন দিয়েছেন। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
ওই হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেন্ডেন্ট ড. মাধুকর গাইকওয়াড বলেছেন, রীতা দেবীকে এ প্রক্রিয়ায় আসতে হলে আসাম রাজ্য সরকারের অনুমোদন আনতে হবে। তা ছাড়া প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি। তাই তাকে মেডিকেল ছুটি আনতে হবে। এক্সরেতে দেখা গেছে তার যৌনাঙ্গের গঠন পরিপূর্ণ। এ জন্য আমাদের জন্য কাজটি খুব সহজ হবে। আমরা শুধু সেটাকে তুলে ফেলবো। তারপর সেখানে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে বসিয়ে দেব পুরুষের একটি লিঙ্গ। তবে এখনও বিষয়টি অনেক পরীক্ষার ওপর নির্ভর করছে।
আরো ১২ জন একই লাইনে
লিঙ্গ পরিবর্তনের এই একই ধারায় আছেন মহারাষ্ট্রের আরো ১২ জন। তারা লিঙ্গ পরিবর্তনের অপারেশনের জন্য হাসপাতালের দ্বারস্থ হয়েছেন। এর বেশির ভাগই নারী। এর মধ্যে রয়েছে ৫ বছর বয়সী একটি মেয়ে। ডা. মাধুকর বলেন ললিত, তার চিকিৎসক ড. রজত কাপুর ও আমি নিয়মিত ফোন পাচ্ছি। এখন আমরা আগ্রহীদের ডাটা একত্রিত করছি। এমনকি ৫ বছর বয়সী একটি মেয়ের পরিবার ললিতের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তার কাছে সহায়তা চাইছে কিভাবে আমাদের নাগাল পাওয়া যায়।

ইয়াসির আরাফাতের সমাধিতে তামিমি, প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার

ফিলিস্তিনি জাতিমুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে যে নামটি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে, প্যালেস্টানিয়ান লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) সেই প্রয়াত নেতা ইয়াসির আরাফাতের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বীরকন্যা আহেদ তামিমি। রবিবার ইসরায়েলি কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। মুক্তির পর সাংবাদিকদের সামনে তামিমি অঙ্গীকার করেন, জাতিগত মুক্তি না আসা পর্যন্ত তার প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।
ইয়াসির আরাফাতের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানান আহেদ তামিমি
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ইসরায়েলি দখলদারিত্বের প্রতিবাদ করতে গিয়ে সেনাদের গালে থাপ্পড় মেরে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হন তামিমি। তাকে ইসরায়েলের কারাগারে নেওয়া হয়। মার্চে সামরিক আদালতে তার বিরুদ্ধে ঘোষিত হয় জরিমানাসহ আট মাসের কারাদণ্ড। সে হিসেবে ১৯ ডিসেম্বর থেকে কারাগারে থাকা তামিমির মুক্তি পাওয়ার কথা ১৯ আগস্ট। তবে বিশেষ মূল্যায়নে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষ কারও কারা মেয়াদ কমিয়ে আনতে পারে। সেই বিশেষ মূল্যায়নেই রবিবার তামিমির কারামুক্তি দেওয়া হয়। আহেদ তামিমির চূড়ান্ত মুক্তির সময় তার বাবা বাসেম তামিমি তাকে সাংবাদিকদের ভিড়ের মধ্যে হাত দিয়ে ঘিরে বের করে নিয়ে যান। ওই সময় তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, আমরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই।

মুক্তির পর রানটিস চেকপয়েন্ট থেকে তামিমি রামাল্লায় ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাতের সমাধিতে যান। পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে প্যারিসের উপকণ্ঠে একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি, সম্পন্ন হয়নি মরদেহের ময়নাতদন্তও। পরে তাকে রামাল্লায় সমাধিস্থ করা হয়। সেই সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন তামিমি।
ভাইকে বাঁচাতে ইসরায়েলি সেনার হাতে কামড় দেন আহেদ তামিমি
২০০৪ সালেই আরাফাতের জামাকাপড়ে পোলোনিয়াম-২১০ তেজস্ক্রিয় বিষের হদিস পাওয়া গিয়েছিল এবং আরাফাতের স্ত্রী সুহা আরাফাত বিষয়টির তদন্ত দাবি করেছিলেন। ফ্রান্স, রাশিয়া এবং সুইজারল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা ২০১২ সালে আরাফাতের লাশ থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষাগারে পাঠান। ২০১৩ সালে সুইশ বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল রামাল্লায় ফিলিস্তিনি স্বশাসন কর্তৃপক্ষ এবং সুহা আরাফাতকে প্রদান করেন। আল-জাজিরার তখনকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিজ্ঞানীদের রিপোর্টে পোলোনিয়াম-২১০'-এর বিষক্রিয়ায় আরাফাতের মৃত্যুর স্পষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ রয়েছে। যদিও রিপোর্টের বয়ানে ‘মডারেট' বা মাঝারি গোছের সাক্ষ্যপ্রমাণের কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলি গোয়েন্দা ও শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘রাইজ অ্যান্ড কিল ফাস্ট: দ্য সিক্রেট হিস্টোরি অব ইসরায়েল’স টার্গেটেড অ্যাসাসিনেশন্স’ নামের বইতে ইসরায়েলের অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও লেখক রনিন বার্গম্যানও দাবি করেন, রেডিয়েশনের মাধ্যমে বিষ প্রয়োগে ফিলিস্তিনের নেতা ইয়াসির আরাফাতকে হত্যা করেছিল ইসরায়েল।
ইসরায়েলি সেনা সদস্যের সঙ্গে বাদানুবাদরত আহেদ তামিমি
প্রয়াত আরাফাতের সমাধি থেকে তামিমি যান তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে। এক ফিলিস্তিনি বিক্ষোভে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ওই বাড়ির এক সদস্য নিহত হন। ফিলিস্তিনিদের ঐহিত্যবাহী পাগড়ি কেফিয়েহ পরে আহেদ তামিমি সেই বাড়িতে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই শহীদের বাড়ি থেকে আমি ঘোষণা করছি, দখলদারিত্ব বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিরোধ জারি থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, জেলে বন্দি সব নারী শক্তিশালী। জেলে থাকা অবস্থায় যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদও জানান তামিমি।
বাবা বাসেম তামিমির সঙ্গে আহেদ তামিমি
২০১৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর তামিমির বাড়িতে হানা দেয় দখলদার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। বাড়ির প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে দখলদার সেনাদের চলে যেতে বলেন ১৬ বছরের তামিমি। কথায় কাজ না হওয়ায় পথ আটকে দাঁড়িয়ে থাকা দুই সেনাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাতেও কাজ না হওয়ায় একপর্যায়ে সেনাদের থাপ্পড় মারতে শুরু করেন তামিমি। এই দুঃসাহসিক ভূমিকার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। তামিমি ও তার মাকে গ্রেফতার করে ইসরায়েলি সেনারা। একাধিক দফায় নেওয়া হয় রিমান্ডে। বিপরীতে ফিলিস্তিনের বাইরে যুক্তরাজ্যসহ দুনিয়ার নানা প্রান্ত থেকে তার মুক্তির দাবি ওঠে। সেই সময়ে ১৬ বছরের মেয়ে তামিমি হয়ে উঠেন ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি আন্দোলন ও তৃতীয় ইন্তিফাদার প্রতীকী চরিত্র।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্ট থেকে স্বর্ণ বের হয় যেভাবে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা স্বর্ণের পরিমাণ ও ধরন বদলে যাওয়া নিয়ে আলোচনা দেশজুড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ভল্টে রাখা স্বর্ণের কোনো ধরনের হেরফের হয়নি। যা হয়েছে ইংরেজি-বাংলায় হিসাব লেখার হেরফেরে। ওদিকে শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিবেদন বলছে, জব্দকৃত স্বর্ণের হিসাব ও পরিমাপে গরমিল রয়েছে। এ অবস্থায় সর্বত্র জিজ্ঞাসা ভল্টে কিভাবে রাখা হয় স্বর্ণ? কিভাবেইবা সেখান থেকে বের করা হয়।
সূত্র মতে, সাধারণত জব্দ হওয়া স্বর্ণ বেশ কয়েকটি ধাপে পরীক্ষা করে কঠোর নিরাপত্তায় ভল্টে জমা হয়। ভল্ট থেকে স্বর্ণ বের করার প্রক্রিয়াটিও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মোড়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে কর্মরত কর্মকর্তারা বলছেন, ভল্ট এলাকাকে বাংলাদেশে ব্যাংকের ভাষায় ‘মহা নিরাপত্তা এলাকা’ বলা হয়। স্বর্ণের যে ভল্ট সেখানে ঢুকতে গেলে ছয় স্তরের নিরাপত্তা ও গেট কিপিং পার হতে হয়। শুরুতে পাঞ্চ কার্ড, তার পর কলাপসিবল গেট। এরপর দেহ তল্লাশি। স্বর্ণের ভল্ট পর্যন্ত তিনটি দরজা রয়েছে। আর সেই ভল্টে আলাদা আলমারিগুলোর আলাদা আলাদা চাবি। কিন্তু সেই চাবিও আবার সিন্দুকে রাখা হয়। আর এর দায়িত্বে থাকেন দুজন কর্মকর্তা। আবার জমা রাখা সোনা ভল্ট থেকে বের করতে হলেও একই নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানতে হয়। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশনাসহ আরো বেশ কয়েকটি ধাপ পার করে ভল্ট থেকে সোনা বের করতে হয়। এরপর সেটি বিক্রি করে তার অর্থ সরকারকে দিয়ে দেয়া হয়। আর যদি কোনো সোনা নিয়ে আদালতে নিষ্পত্তি না হয়, সেগুলো অস্থায়ীভাবে ভল্টেই আলাদা জায়গায় জমা থাকে। আর গচ্ছিত স্বর্ণ যদি গয়না হয় তবে কোর্টে নিষ্পত্তির পর সেটি স্বর্ণকাররা কিনতে পারেন। সূত্র মতে, এত নিরাপত্তার পর স্বর্ণে অনিয়ম হয়ে থাকলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের মহাব্যবস্থাপক মো. মাছুম পাটোয়ারী বলেন, আদালতের নির্দেশনা ছাড়া ভল্ট থেকে এক রতি সোনা বের করার সুযোগ নেই। একইভাবে শুল্ক গোয়েন্দা, কাস্টমসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সোনা রাখতে চাইলেও আদালতের নির্দেশনা মেনে বেশ কয়েকটি ধাপ পার করতে হয়। আবার বের করতে চাইলেও একই ধাপ অনুসরণ করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভল্টে শুধু জব্দ হওয়া স্বর্ণের ঢোকার অধিকার রয়েছে। বিভিন্ন সময় কাস্টমস বা অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা চোরাচালান বা চুরি-ডাকাতির স্বর্ণ আটক করে। ওই সংস্থাগুলো স্বর্ণ বার, গয়না বা অন্য কোনো মূল্যবান ধাতু বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করতে আসে। জব্দ স্বর্ণের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। সেটিকে অস্থায়ীভাবে জমা গ্রহণ করা হয়। সেগুলো আদালতের নির্দেশক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে।
পরের ধাপে বাজেয়াপ্ত স্বর্ণের তালিকা আদালতে উপস্থাপন করা হয়। আদালত যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রাখার জন্য বলে, তাহলে পরের ধাপে সংশ্লিষ্ট সংস্থার পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রাখার অনুমতি চেয়ে আদালতের রায়ের কপিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় আবেদন করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট সংস্থার আবেদন আমলে নিয়ে পরের ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল শাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদনের জন্য একটি ফাইল পাঠায়। সেই ফাইল অনুমোদন হয়ে ফিরে আসার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সব স্বর্ণ নিয়ে আসার জন্য একটি তারিখ দেয়া হয়। ওইদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকারকে আসতে বলা হয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্বর্ণসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়ে আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকার নতুন করে স্বর্ণের ওজন করেন।
সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে কষ্টিপাথরে স্বর্ণের মান যাচাই করা হয়। কী পরিমাণ স্বর্ণ আছে তারও পরিমাপ করা হয়। স্বর্ণকার তথ্যগুলো বলতে থাকেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি বিভাগের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওই তথ্যগুলো রেকর্ডবুকে লিখে নেন। এরপর সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে সব স্বর্ণ একটি কৌটার মধ্যে রাখা হয়। ওই কৌটার মুখে ছোট একটি তালা লাগানো হয়। এরপর কৌটাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়ার পর সিলগালা করা হয়। সেই প্যাকেটের ওপর সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি বিভাগের একজন কর্মকর্তা আড়াআড়িভাবে স্বাক্ষর করেন। এরপর কৌটার চারদিক দিয়ে ছোট ছোট পিন গেঁথে দেয়া হয়। সর্বশেষ ধাপে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে ছয় স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পার করে ভল্টের মধ্যে ঢোকানো হয়। পরে ব্যাংক, কাস্টম হাউসের অথবা এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ওই সব সোনা মান নির্ধারণপূর্বক ব্যাংক গ্রহণ করে রসিদ দেয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে এ-সম্পর্কিত প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেয়া হয়।
এরপর যখন আদালতের নির্দেশ আসে যে রাষ্ট্রের অনুকূলে এই স্বর্ণ বাজেয়াপ্ত করা হলো, তখন সেটি বিক্রি করে তার অর্থ সরকারকে দিয়ে দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এখানেই শেষ নয়। রাষ্ট্রের অনুকূলে বিষয়টি অদালতে নিষ্পত্তি হলো। এরপর স্বর্ণ যদি বার আকারে থাকে (সেটি হতে হবে প্রায় ৯৯% খাঁটি) সেটি আসলে ক্রয় করতে পারে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে। তা ক্রয় করে সরকারকে অর্থ দিয়ে দেয়। আদালতে নিষ্পত্তি হয় না যে স্বর্ণের, সেগুলো অস্থায়ীভাবে জমা থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিসের মহাব্যবস্থাপক মো. মাছুম পাটোয়ারী বলেন, আদালতের নির্দেশনা পেলে একই পদ্ধতিতে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে অথবা আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত ব্যক্তির কাছে সোনা তুলে দেয়া হয়।
জানা গেছে, বাংলাদেশে ব্যাংকে ৭০ জন পুলিশের একটি কন্টিনজেন্ট রয়েছে যারা অন্য কোথাও পাহারায় যায় না। তারা টাকশাল থেকে টাকাও আনতে যায় না। তারা শুধু এখানেই সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়। রাতে ভল্ট বন্ধ করে যাওয়ার পর এমনকি গভর্নর এসে ঢুকতে চাইলেও তাকে পুলিশ ঢুকতে দেবে না। ভল্টে ঢোকার অধিকার রয়েছে শুধু কারেন্সি অফিসার, জয়েন্ট ম্যানেজার ক্যাশ এবং ডিজিএম ক্যাশ। কারেন্সি অফিসার যদি প্রয়োজন মনে করেন তার অনুমতি যিনি পাবেন তিনি শুধু ভেতরে প্রবেশ করেন। এখানে গভর্নর বা ডেপুটি গভর্নর এবং সরকারের অন্য কর্মকর্তারা, অননুমোদিত ব্যক্তিদের যাওয়ার কোনো অধিকার নেই বা প্রয়োজনও নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ভল্টে তদন্তাধীন স্বর্ণ গচ্ছিত ছিল ৯৬৩ কেজি, যা প্রায় এক টনের কাছাকাছি। গণমাধ্যমে আসা যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে তা হলো ২০১৫ সালে গচ্ছিত প্রায় ৩৫০ কেজি স্বর্ণ নিয়ে। যে প্রতিবেদনটি নিয়ে এত আলোচনা তাতে বলা হয়েছে, ওই স্বর্ণ ছিল চাকতি ও আংটি। কিন্তু তা পাওয়া গেছে মিশ্র ধাতু আকারে। আর ওই স্বর্ণ ছিল ২২ ক্যারেট। কিন্তু তদন্তে পরীক্ষার পর নাকি পাওয়া গেছে ১৮ ক্যারেট। গচ্ছিত বেশিরভাগ স্বর্ণের ক্ষেত্রেই নাকি অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে।
এদিকে ভল্টে রক্ষিত সোনা গায়েবের ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করতে ছয় সদস্যের ওই তদন্ত কমিটিকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

কৈশোরের লাজুক ছেলেটিই আজকের ইমরান খান by মোহাম্মদ আবুল হোসেন

ইমরান খান। পুরো নাম ইমরান আহমাদ খান নিয়াজি। একজন সফল ক্রিকেটার। একজন সফল রাজনীতিক। যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই তার কাছে ধরা দিয়েছে সফলতা। প্রথমবারের মতো এবং একবারই পাকিস্তান বিশ্বকাপ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তা ওই ইমরান খানের হাত ধরে। আর এবার তিনি রাজনীতির দাবায় বাজিমাত করেছেন। সদ্য সমাপ্ত পার্লামেন্টের একজন সদস্য ছিলেন তিনি। রাজনীতিতে প্রবেশ করার আগে তিনি ছিলেন একজন ক্রিকেটার ও সমাজহিতৈষী। দু’দশক ধরে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। পরে সমাজসেবামুলক প্রতিষ্ঠান শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যান্সার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্স সেন্টার এবং নামাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তার জন্ম ১৯৫২ সালের ৫ই অক্টোবর পাঞ্জাবের লাহোরে এক পস্তুন পরিবারে। তিনি পড়াশোনা শুরু করেছেন ওরসেস্টারের আইছিসকনে। পরে কেবল কলেজ, অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেন। ১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি ক্রিকেট খেলা শুরু করেন। প্রথমদিকে তিনি কলেজের হয়ে খেলতেন। পরে যোগ দেন ওরসেস্টারশায়ার ক্রিকেট ক্লাবে। ১৯৭১ সালে বার্মিংহামে ইংলিশ সিরিজ চলাকালে ১৮ বছরে পাকিস্তানের হয়ে তার ক্রিকেটে অভিষেক হয়। অক্সফোর্ডে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পরে ইমরান খান ১৯৭৬ সালে যোগ দেন পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলে। তারপর একটানা ১৯৯২ সাল পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পুরো সময় তিনি টিমের ক্যাপ্টেন ছিলেন। ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় তিনি নেতৃত্ব দেন। এরপরই তিনি ক্রিকেট থেকে অবসরে যান এবং পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল খেলোয়াড়দের অন্যতম হয়ে থাকেন। টেস্ট ক্রিকেটে তিনি সর্বমোট ৩৮০৭ রান করেছেন। উইকেট নিয়েছেন ৩৬২টি। টেস্ট ক্রিকেটে এ যাবত বিশ্বে মাত্র আটজন ক্রিকেটারের ভাগ্যে জুটেছে ‘অল রাউন্ডারস ত্রিপল’ খেতাব। তার একজন ইমরান খান। তাকে ২০১০ সালে আইসিসি ক্রিকেট হল অব ফেম দেয়া হয়। ১৯৯১ সালে তিনি মায়ের স্মৃতির উদ্দেশে একটি ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য তহবিল সংগ্রহের প্রচারণা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি ২ কোটি ৫০ লাখ ডলারে লাহোরে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ২০১৫ সালে পেশোয়ারে দ্বিতীয় একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এখনও ইমরান খান উদারমনা সমাজ হিতৈষী ও ভাষ্যকার। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ব্রাডফোর্ড ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্মানসূচক ফেলোশিপ পেয়েছেন রয়েল কলেজ অব ফিজিসিয়ানস থেকে ২০১২ সালে।
১৯৯৬ সালের এপ্রিলে মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এ দলটির জাতীয় নেতায় পরিণত হন তিনি। ২০০২ সালের অক্টোবরে জাতীয় পরিষদের একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইমরান খান। তারপর ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিরোধী দলীয় একজন নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি আবার নির্বাচিত হন। এ সময় পপুলার ভোটের হিসাবে তার দল দেশে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে উঠে আসে। তিনি নিজে দলের পার্লামেন্টারি নেতা।
ইমরান খানের পারিবারিক জীবন
ইমরান খান ১৯৫২ সালের ৫ই অক্টোবর জন্মগ্রহণ করলেও কোনো কোনো রিপোর্টে ২৫শে নভেম্বর উল্লেখ করা হয়। পরে জানা যায়, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তারা ভুল করে তার পাসপোর্টে জন্মদিন ২৫শে নভেম্বর উল্লেখ করেছেন। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ইকরামুল্লাহ খান নিয়াজি ও তার স্ত্রী শওকত খানমের একমাত্র ছেলে ইমরান খান। তার পিতৃপুরুষের আদিবাস পাঞ্জাবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মিয়ানওয়ালিতে। তারা পসতুন সম্প্রদায়ের। তারা নিয়াজি গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। তার মা পসতুন উপজাতির বুরকি সম্প্রদায়ের। এ সম্প্রদায় থেকে পাকিস্তানের ইতিহাসে বহু সফল ক্রিকেটারের জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ইমরানের কাজিন জাভেদ বুরকি, মাজিদ খান।
কৈশোরে ইমরান খান ছিলেন চুপচাপ ও লাজুক। তার ছিল চার বোন। পরিবার ছিল উচ্চ মধ্যবিত্তের। তারা শৈশবেই যথেষ্ট শিক্ষা পেয়েছিলেন।
রাজনীতিতে ইমরান
১৯৯৬ সালে তিনি নিজে প্রতিষ্ঠা করেন রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই)। এ দল থেকে ১৯৯৭ সালে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে দুটি আসনে তিনি নির্বাচন করেন। একটি আসন হলো মিয়ানওয়ালি (আসন নং ৫৩) ও লাহোর (আসন নং ৯৪)। কিন্তু দুটি আসনেই তিনি হেরে যান। দুই আসনেই বিজয়ী হন পিএমএলএনের প্রার্থী। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে তখনকার প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। ওই অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছিলেন ইমরান খান। তিনি বিশ্বাস করতেন মোশাররফ পাকিস্তান থেকে দুর্নীতি খতম করতে পারবেন। রাজনীতিকে মাফিয়ামুক্ত করতে পারবেন। ইমরান খান এক পর্যায়ে জানান, ২০০২ সালে তাকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে চেয়েছিলেন পারভেজ মোশাররফ। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেন নি। ২০০২ সালের অক্টোবরে জাতীয় পরিষদের ২৭২ আসনে নির্বাচন হয়। তাতে অংশ নেন ইমরান। নির্বাচনে তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট না পেলে জোট সরকার গঠনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। এ সময় তিনি মিয়ানওয়ালি থেকে নির্বাচিত হন। কিউবায় যুক্তরাষ্ট্রের বন্দিশিবির গুয়ানতানামো বে’তে পবিত্র কোরআন শরীফকে অবমাননা করা হয়েছে বলে মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি- এ কথা বলা হয় নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে। এরপর ২০০৫ সালের ৬ই মে তাকে এ ঘটনার জন্য ‘মোস্ট ডাইরেক্টলি রেসপনসিবল’ বলে আখ্যায়িত করে দ্য নিউ ইয়র্কার। ২০০৭ সালে তিনি পার্লামেন্টের ভিতরে ও বাইরে রাজনৈতিক বিরোধের মুখে পড়েন। ২০০৭ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ সেনা প্রধানের পদ না ছেড়েই প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ৬ই অক্টোবর ওই নির্বাচন ঘোষণা করলে এর প্রতিবাদ করে পার্লামেন্ট থেকে ওই বছর ২রা অক্টোবর পদত্যাগ করেন ৮৫ জন এমপি। তারা গড়ে তুলেছিলেন অল পার্টিজ ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট। এর সঙ্গে যোগ দেন ইমরান খানও। তখনকার প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এরপর ৩রা নভেম্বর গৃহবন্দি করা হয় ইমরান খানকে। পরে সেখান থেকে পালিয়ে আত্মগোপন করেন ইমরান। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের একটি প্রতিবাদ বিক্ষোভে যোগ দিতে ১৪ই নভেম্বর প্রকাশ্যে আসেন তিনি। ওই বিক্ষোভ থেকে তাকে আটক করে জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র বিষয়ক শাখার নেতাকর্মীরা এবং তার সঙ্গে খুব বাজে ব্যবহার করে। বিক্ষোভ যতদিন হয়েছে এ সময় তাকে আটক রাখা হয়েছে। তাকে পাঠানো হয় পাঞ্জাবের দেরা গাজি খান জেলে। সেখানে কয়েকদিন কাটানোর পর তিনি মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসেন। ২০১১ সালের ৩০শে অক্টোবর লাহোরে লক্ষাধিক সমর্থকের উদ্দেশে ভাষণ দেন ইমরান খান। এ সময় তিনি সরকারের নীতিকে চ্যালেঞ্জ করেন। ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের সুনামি আহ্বান করেন। একই বছর ২৫ শে ডিসেম্বর তিনি করাচিতে আরেকটি সফল জনসভা করেন। এতেও কয়েক লাখ মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। তখন থেকেই ক্ষমতাসীন দলগুলোর জন্য প্রকৃত হুমকি হয়ে ওঠেন ইমরান খান। পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেন। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইন্সটিটিউটের জরিপ বলে, জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সবার শীর্ষে রয়েছে ইমরান খানের পিটিআই।
২০১২ সালের ৬ই অক্টোবর তিনি দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের কোটাই গ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রতিবাদে ইসলামাবাদে গাড়িবহরের এক বিক্ষোভে যোগ দেন। ২০১৩ সালের ২৩ শে মার্চ তিনি নির্বাচনী নতুন স্লোগান ধরেন। এর নাম দেন ‘নয়া পাকিস্তান রেভ্যুলুশন’। ২৯ শে এপ্রিল দ্য অবজারভার ইমরান খান ও তার দল পিটিআইকে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের প্রধান বিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে। ২০১৩ সালের ৩০ শে এপ্রিল পাকিস্তান পিপলস পার্টির(পাঞ্জাব) প্রেসিডেন্ট মানজুর ওয়াত্তু সম্ভাব্য জোট সরকারে ইমরান খানকে প্রধানমন্ত্রীত্ব প্রস্তাব করেন। পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজকে সরকার গঠন থেকে বিরত রাখতে ইমরান খানের পিটিআই এবং পিপিপিকে নিয়ে জোট গঠনের কথা ভাবছিলেন মানজুর ওয়াত্তু। কিন্তু তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন ইমরান।  ২০১৪ সালে ইমরান খানকে পাকিস্তানের ভিতরে ও বাইরে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি হিসেবে র‌্যাংকিং করে ইউগভ।
ব্যক্তিগত জীবন
১৯৯৫ সালের ১৬ই মে বৃটিশ এক ধনকুবেরের কন্যা জেমিমা গোল্ডস্মিথকে বিয়ে করেন ইমরান খান। ওই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল প্যারিসে। আর অনুষ্ঠানটির স্থায়িত্ব ছিল মাত্র দুই মিনিট। এর এক মাস পরে ২১ শে জুন তারা আবার ইংল্যান্ডের রিচমন্ড রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। জেমিমা গোল্ডস্মিথ ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হন। তাদের দুটি সন্তান রয়েছে। তারা হলো সুলাইমান ইশা ও কাশিম। এক পর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তাদের দাম্পত্য জীবন সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিবাদে পাকিস্তানের পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন জেমিমা। তাতে তিনি ওই গুজবকে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু সেই গুজবই বাস্তবে পরিণত হয়। ২০১৪ সালের ২২ শে জুন ঘোষণা দেয়া হয় যে, তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেছে। এর ফলে ৯ বছরের বিবাহিত জীবনের ইতি ঘটে। বলা হয়, পাকিস্তানের জীবনধারার সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারছিলেন না জেমিমা।
২০১৫ সালের জানুয়ারি। এবার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বৃটিশ সাঙবাদিক রেহাম খানকে বিয়ে করেন ইমরান খান। ইসলামাবাদে তার নিজের বাসভবনে ওই বিয়ে হয়। ২২ শে অক্টোবর তারা ঘোষণা দেন যে, বিবাহ বিচ্ছেদে যাচ্ছেন তারা।
২০১৬ সালের মাঝামাঝি, ২০১৭ সালের শেষের দিকে এবং ২০১৮ সালের শুরুর দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, নিজের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা বুশরা মানিকাকে বিয়ে করেছেন ইমরান খান। তবে প্রথমে পিটিআইয়ে সহযোগী ও মানিকার পরিবারের সদস্যরা একে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। গুজব ছড়িয়ে দেয়ার জন্য মিডিয়ার সমালোচনা করেন ইমরান। যে নিউজ চ্যানেল এই খবর প্রচার করেছিল তাদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে পিটিআই। ২০১৮ সালের ৭ই জুন পিটিআইয়ের কেন্দ্রীয় অফিস থেকে একটি বিবৃতি দেয়া হয়। তাতে বলা হয়, বুশরা মানিকাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ইমরান খান। তিনি সেই প্রস্তাব তখনও গ্রহণ করেন নি। ২০১৮সালের ১৮ ই ফেব্রুয়ারি মানিকাকে ইমরান খান বিয়ে করেছেন বলে নিশ্চিত করে পিটিআই।

জেব্রা ফিস কেন ইঁদুরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে গবেষণাগারে by অমিতাভ ভট্টশালী

জেব্রা ফিস বা বাংলায় যেটি অঞ্জু মাছ বলে পরিচিত, তা ব্যবহার করতে শুরু করেছেন বৈজ্ঞানিকরা।
নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য ইঁদুর বা বানরের ব্যবহারের চল বহুদিনের। জীববিজ্ঞান নিয়ে যারাই পড়াশোনা করেন, তাদের ইঁদুর নিয়ে কাটাছেঁড়া করতেই হয় গবেষণাগারে।
গিনিপিগ বা কখনও বানরের ওপরেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হয় গবেষণার খাতিরে।
কিন্তু সেই ধারণাটা পাল্টে যেতে চলেছে। বৈজ্ঞানিকরা এখন ইঁদুরের পরিবর্তে এক ধরনের মাছ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য জেব্রা ফিস বা বাংলায় যেটি অঞ্জু মাছ বলে পরিচিত, তা ব্যবহার করতে শুরু করেছেন বৈজ্ঞানিকরা।
এই মাছ গোটা উপমহাদেশেই সহজলভ্য। তবে এছাড়াও রয়েছে তার আরও অনেক গুণাগুণ, যার মধ্যে একটি হল, তাদের অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গই মানুষের মতো। সেজন্য কোন রোগীকে ঠিক কোন ওষুধ দেওয়া যেতে পারে, তা চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা জেব্রা ফিসের ওপরে গবেষণা করে সহজেই জেনে নিতে পারছেন।
পরীক্ষার মাধ্যম হিসাবে কেন ইঁদুর বা বানরের তুলনায় জেব্রা ফিস বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য সুবিধাজনক, জানতে চেয়েছিলাম ভারতের সেন্টার ফর সেলুলার এন্ড মলিকিউলার বায়োলজির পরিচালক রাকেশ মিশ্রর কাছে।
মি. মিশ্র বলছিলেন, "প্রথমত, ইঁদুরের ওপরে পরীক্ষা চালানোর জন্য যে বিরাট আয়োজন, অনেক জায়গা বা বিপুল খরচ করতে হয়, জেব্রা ফিসকে পরীক্ষার জন্য তৈরি করতে তার এক শতাংশও খরচ করতে হয় না।"
"খুব সহজেই প্রচুর সংখ্যায় জেব্রা ফিস রাখা যায় গবেষণাগারে। দ্বিতীয়ত, ইঁদুর ছাড়া বানরজাতীয় প্রাণীর ওপরে পরীক্ষা চালাতে গেলে অনেক নিয়মকানুন মানতে হয়, এথিকসের কারণে। নিতে হয় ছাড়পত্র। জেব্রা ফিসের ক্ষেত্রে সেসব প্রয়োজন হয় না। এজন্যই পরীক্ষাগারে জেব্রা ফিসের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে," বলেন তিনি।
ভারতেই এখন অন্তত ৪০টি গবেষণাগারে জেব্রা ফিস ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে তার মধ্যে ৩-৪টি কেন্দ্রে অত্যাধুনিক পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে।
জেব্রা ফিসকে কাজে লাগিয়ে জীববিজ্ঞান গবেষণা তো চলছেই, তার সঙ্গে মানুষের দেহে কোন রোগে কী ধরনের ওষুধ দেওয়া যেতে পারে, সেটার পরীক্ষাও খুব তাড়াতাড়ি করা সম্ভব হচ্ছে।
এমনিতেই মাছ হল মেরুদণ্ডী প্রাণী। তাই বিবর্তনের সময়কাল অনুযায়ী সেটি মানুষের কিছুটা কাছে।
তাছাড়া মাছের অনেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গই মানুষের শরীরের সঙ্গে মেলে - যেমন এদের দেহে হাড় রয়েছে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটা মানবশরীরের মতো, যকৃৎ, হৃৎপিণ্ড প্রভৃতি রয়েছে। যদিও শ্বাসযন্ত্র নেই।
"তবে এসবের থেকেও জেব্রা ফিসের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল তাদের ভ্রূণটা শরীরের বাইরে বিকশিত হয়। তাই বাইরে থেকেই লক্ষ্য রাখা যায় গোটা প্রক্রিয়াটি," জানাচ্ছিলেন রাকেশ মিশ্র। তিনি বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় জেব্রা ফিস অতি দ্রুত কাজে দেয়।
সিসিএমবির পরিচালক রাকেশ মিশ্রর কথায়, "ধরুন কোনও রোগীর দেহে একটা টিউমার পাওয়া গেল। সেখান থেকে কোষ সংগ্রহ করে একসঙ্গে অনেকগুলি জেব্রা ফিসের শরীরে প্রবেশ করানোর তিন থেকে চারদিনের মধ্যেই ওই মাছের শরীরেও টিউমার তৈরি হয়ে যাবে। তার পরেই টিউমারসহ মাছগুলির শরীরে নানা ধরণের ওষুধ প্রয়োগ করে দেখে নেওয়া যায় যে ঠিক কোন ওষুধটি ওই বিশেষ টিউমার সাড়াতে সবথেকে উপযুক্ত।"
তিনি বলেন, "এছাড়া ক্যান্সারের চিকিৎসাতেও জেব্রা ফিস ব্যবহার করা হচ্ছে। এর কারণ হলো একেকটি ক্যান্সার জিনগতভাবে একেক ধরনের। তাই একই ওষুধ নানা জনের ওপরে প্রয়োগ করা হলে সঠিক ফল নাও দিতে পারে।"
"এক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে ক্যান্সারের ধরনটি চিহ্নিত করে সঠিক মাত্রায় ওষুধ প্রয়োগ করা যাবে। আর গোটা পরীক্ষার ফল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষাও করতে হবে না। দিন সাতেকের মধ্যেই জানা যাবে যে কোন ওষুধ কী পরিমাণে রোগীকে দেওয়া উচিত," বলছিলেন রাকেশ মিশ্র।
হায়দ্রাবাদ শহরের সেন্টার ফর সেলুলার এন্ড মলিকিউলার বায়োলজি বা সিসিএমবি কোষ এবং আণবিক জীববিজ্ঞান গবেষণার প্রধান কেন্দ্র। এই সপ্তাহে সেখানে হাজির হয়েছিলেন এমন অনেক জীববিজ্ঞানী, যারা জেব্রা ফিসের ওপরে নানা গবেষণা চালাচ্ছেন।
এর মধ্যে একটি গবেষণাপত্র অনেকের নজর কেড়েছে, যা হল এই জেব্রা ফিস কী সংখ্যা গণনা করতে পারে?
ওই গবেষণাপত্র যিনি লিখেছেন, সেই কাভেরী রাজারামন ইন্দিরা, বিবিসিকে বলছিলেন, "জেব্রা ফিস যে পরিমানগতভাবে আলাদা বস্তু পৃথকভাবে চিনতে পারে, তা প্রমাণিত। আমি যে গবেষণাটা করছি, তাতে খোঁজার চেষ্টা করছি যে জেব্রা ফিস আসলে কত অবধি গুনতে পারে।"
"এটা দেখেছি যে এক দুই আর তিনের মধ্যে তারা ফারাক করতে পারছে। তবে তা সত্যিই গণনা করার ক্ষমতা না কি অন্য কোনও প্রক্রিয়ায় মাছটি বিভিন্ন পরিমাণ খাদ্যের মধ্যে ফারাক করছে, তা এখনও প্রমাণিত হওয়ার অপেক্ষায়," বলেন তিনি।

আমি আশিতে নবাগত by হাফিজ মুহাম্মদ

সন্ধ্যাটি যেন তারায় তারায় পূর্ণ হয়েছিল কেন্দ্রের মিলনায়তনে। কিন্তু অসংখ্য তারার ভিড়ে ঝলমল করছিলেন একজনই। তিনি আবদুুল্লাহ আবু সায়ীদ। যিনি অশীতিপর এক যুবক। কথাটি কেমন  বৈপরীত্যপূর্ণে ঢাকা। আসলেই তাই। তিনি আশিতে পড়েছেন। আশিতো অতিক্রম করেননি। তবে সকল যুবকের যুবক যিনি। আশিকে যিনি শুধু একটি বছরের মধ্যেই বেঁধে দিয়েছেন। বলেছেন, কর্মময় মানুষের কোনো বয়স থাকে না। চল্লিশ আর আশি দু’টিই মানুষের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
একটিতে মানুষ পয়গম্বর হয় অর্থাৎ পরিণতি। আর অন্যটিতে পরিণতির শেষ অর্থাৎ পুনরাবৃত্তি। কিছুই বাদ যায়নি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথামালায়। তিনি বলেন, আমি আজ যেদিকে তাকাই শুধুই ছাত্রদের দেখি। মানুষ দেখি না। প্রশংসা আর স্তুতির জবাবও দিয়েছেন মধুরতম শব্দ দিয়ে। টেনে এনেছেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র আর গোপাল ভাঁড়কে। সেইসঙ্গে সভাসদদেরও। প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, একবার মাহফুজ আনাম (সম্পাদক, ডেইলি স্টার) জেদ ধরেছেন, ওনাকে তুমি বলতে। কারণ, আমি মাহফুজ আনামের চেয়ে পাঁচবছরের বড়। বললাম, ৫০ বছর আগে দেখা হলে বলতাম, কাঁদে না বাবু, কাঁদে না। কথায় কথায় জীবন-দর্শনের নানা প্রসঙ্গের অবতারণা। ২৫শে জুলাই আশিতম জন্মদিনে পা দেয়া আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বক্তৃতার চুম্বক অংশ মানবজমিন পাঠকের জন্য প্রকাশিত হলো-
যে যেভাবেই প্রসংসা করুক, তা শুনতে সকলেরই ভালো লাগে। অবশ্য আমার ভালো লাগে না, বার্ধক্যের জন্য। একটি গল্প মনে পড়ছে, গোপাল ভাঁড় একদিন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে বললেন, মহারাজ এই যে সভাসদবৃন্দ বসে আছেন তারা একসঙ্গে কি ভাবছেন তা আমি বলে দিতে পারি। মহারাজ ভাবলেন এটা কি করে সম্ভব? তারা সবাই একই কথা ভাবে এটা কি করে সম্ভব। সবার চিন্তা-ভাবনা আলাদা। গোপাল ভাঁড় বললেন মহারাজ আপনি কি দেখতে চান? মহারাজ বললেন দেখাও। তখন গোপাল সবাইকে বললেন এই যে সভাসদবৃন্দ, বলেন আপনারা এই মুহূর্তে ভাবছেন কি-না, ‘মহারাজ দীর্ঘজীবী হোক।’ তারপরে গোপাল বললো আমি আরেকবার বলি, মহারাজ বললেন, বলো। গোপাল বললেন, সভাসদবৃন্দ আপনারা ভাবছেন কি-না, মহারাজের একটি পুত্রসন্তান হোক। মহারাজের সন্তান ছিল না। আর হলে তো পুত্রসন্তানই হবে। ফিরে আসি নিজের কথায়।
আমার জন্মদিন আর আমি সামনে। সভাসদবৃন্দের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আর এতো ছাত্র পড়িয়েছিলাম তা বুঝিনি। আজকে দেখি ছাত্র ছাড়া মানুষ নাই এই দেশে। একবার নিজেকে একটু আলাদা করে ভাবছিলাম। কি অদ্ভুত ব্যাপার, যে একজন মানুষ বুড়ো হচ্ছে, মৃত্যুর দিকে এগুচ্ছে। সেই দেখার আনন্দে এতো মানুষ একসঙ্গে হয়েছে। আমাদের সবাইকে ঘিরেই জীবনে কিন্তু অনেক মানুষ আসে। আমরা যখন জন্মাই তখন অনেক মানুষ আসে। আমরা যখন বিয়ে করি তখন অনেক মানুষ আসে না! দিব্বি দিয়ে আনা হয়। বিয়ের যে দাওয়াত। এটা কিন্তু একটা শাঁখের করাত। যা আসতেও কাটে, যেতেও কাটে। দাওয়াত না দিলে বলে, দাওয়াত দিলি না কেন? আবার দাওয়াত দিলে বলে খসালি তো টাকা। আমাকে একজন অশীতিপর বলছে। আসলে আমি তা নই।
কেননা অশীতিপর হতে হলে আশি পার হতে হয়। আমি তা নই। আমি আশিতে নবাগত। এবং আমি জীবনেও নবাগত। ওই আশি/নব্বই আমাকে ধরতে পারবে না। মৃত্যু তার কাজ করুক। জীবন আমার হাতে পরিপূর্ণভাবেই। আশি বছর এটা কিন্তু একটি বছর। এতদিন যে বাঁচবো তা কোনোদিন কল্পনাও করিনি। কতবার যে মৃত্যুর সম্ভবনা হয়েছে, একবার দু’বার নয়। আমার মনে আছে ছোটবেলায় একবার টাইফয়েড হয়েছিল। আমাদের সময় যাদের টাইফয়েড হতো তাদের হয় একটা ঠ্যাং না হয় একটা চোখ, একটা কান অথবা দুইটা কান দিতে হতো। আমার মনে আছে টানা ৪২ দিন টাইফায়েড থাকলো।
কিন্তু আমি সেরে উঠলাম, কিছুই হয়নি। সাতদিনের মধ্যে দ্বিতীয়বার আবার হলো। তখনও মারা যাইনি। এটা একটি বিস্ময়কর ব্যাপার। কতরকম মানুষের মৃত্যুর কারণ রয়েছে। একদিন আমি আর লেখক কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ যাচ্ছি। এক লোক জিজ্ঞেস করছে আপনার রাশি কি ভাই। আমি বললাম ভাই কি মনে হয়, মেষ মনে হয়। সে বললো না। তাহলে। সিংহ মনে হয়। আমি বললাম ওই। একবার আর্মি ধরে নিয়ে গেলো যুদ্ধের সময়। আমার সামনে আরো সাতজন। এ কয়জনকেই বাদ দিলো।
ছোটবেলায় একবার নানার বাড়িতে গেছি বেড়াতে। যখন আমার বয়স পাঁচবছর। তখন হঠাৎ দেখলাম নানা ভয়ঙ্কর ক্রুদ্ধ। এগুলোরে তাড়া এখান থেকে। তখন আমার খুব লাগলো। আমি একটি কাগজে লিখলাম, ‘আমি কোনোদিন এই বাড়িতে আসিবো না’। লিখলাম তবে অত্যন্ত আতঙ্কের সঙ্গে। আবার যেন নানার হাতে না পড়ে। সেটা একটা কাঠের চলার ডিপের নিচে রাখলাম। যাতে প্রতিবাদও জানানো হলো আবার নানাও দেখলো না। কেন এত সতর্কতা? সতর্কতার কারণ হচ্ছে নানা কলকাতা থাকেন। কলকাতা মানে চিড়িয়াখানা, কলকাতা মানে আইসক্রিম।
কলকাতা মানে গাড়ি, কলকাতা মানে শত শত দালান। আমরা থাকি গ্রামের মধ্যে। সেই কলকাতা থেকে বিতাড়িত হওয়াটা আদম-হাওয়ার মতোই অবস্থা। তবে বড় হয়ে ওই বাড়িতে একবার গেছি। গিয়ে ছাদে উঠে মনে হলো এ কি ব্যাপার। হঠাৎ স্মৃতিতে ভাসলো আমরা তো ছাদের কার্নিশ দিয়ে দৌড়াতাম। নিচে রাস্তা। আহা কেমন আরামে দৌড়াচ্ছি। তখন মরতে পারতাম। কতবার মৃতুর সম্ভাবনা জীবনের উপর দিয়ে যায়। সেটা শুধু আমার একার নয় প্রত্যেকের জীবনেই যায়। অন্তত ৩০/৪০ বার আমরা মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে তারপরে আসল কবরে যাই। এটা কিন্তু খুব আশ্চর্য যে, মানুষ কি করে সারভাইব করে এই পৃথিবীতে? সেখানে আমি ৮০ বছরে পা রাখলাম। হয়তো ৮০ বছর পার করেই এসব কথা বলা উচিত ছিল। তবে সেই সুযোগ যদি না পাই তাই আগেই বলে ফেললাম। কিছুদিন আগে লন্ডনে আমার জন্মদিন পালন করছে। তখন আমি বললাম এই যে তোমরা আমার জন্মদিন পালন করছো আমি যদি ২৫ তারিখ পর্যন্ত না বাঁচি?
৪০ বছর আর ৮০ বছর জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ বয়স। ৪০ বছর হচ্ছে পয়গম্বর হওয়ার বয়স। মানে ৪০ বছর হচ্ছে জীবনের পরিণতির সূচনা। ৮০ বছর হচ্ছে জীবনের পরিণতির শেষ। ৮০ বছর মানে এরপর আর নতুন কিছুই হবে না। এরপর শুধু পুনরাবৃত্তি আর পুনরাবৃত্তি। আগের ঘটনার পনরাবৃত্তি।
রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা আছে, ‘প্রথমদিনের সূর্য প্রশ্ন করেছিল, সত্তার নুতন আবির্ভাবে, কে তুমি, কিন্তু মেলেনি উত্তর। বৎসর বৎসর চলে গেল, দিবসের শেষ সূর্য প্রশ্ন করলো পশ্চিম সাগর তীরে নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় কে তুমি? পেল না উত্তর।’ এখন এই আশি বছর হচ্ছে পেলো না উত্তর। এরপরে মানুষের জীবনে কিছু আছে বলে ধরা হয় না। তবে আমি এটাতে বিশ্বাস করি না। জর্জ বার্নার্ড শ, কী দুর্ধর্ষ মানুষ। ৯২/৯৩ বছর বয়সে বলে ফেললেন আমি মরবো না। কারণ এই বুড়ো লোকটা যখন যা বলেছে তখন তা হয়েছে। তাই পৃথিবীর ভিতরে ওলটপালট লেগে গেছে এই কথায়। সবাই ভাবতে শুরু করছে আসলে ওনি মরবেন না। ওনি মরে গেছে কিন্তু এটাই রয়ে গেছে। কেননা জীবনে যে বাঁচতে জানে না সে কিছুই পায় না। আমার নিউরোলজিস্ট দীন মোহাম্মদ সাহেব বললেন, এখন আর হবে না। এখন স্মৃতির উপরে আর চাপ দেয়া যাবে না। নোট রাখতে হবে। আমেরিকায় তো সব দেখে দেখে পড়ে। আর সেখানে আমরা যে এত সৃজন করলাম মুখে-মুখে। তার কোনো দাম নেই।
আমার আর একটা পাঁচবছরের শিশুর মধ্যে কি পার্থক্য রয়েছে। আমিও বেঁচে আছি, সেও বেঁচে আছে। আমাদের মধ্যে যে প্রবীণ তা নির্ধারিত হবে কে আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে। আমি নিজেকে পাঁচবছরের শিশু ভাবতে এক বিন্দুও কার্পণ্য করি না। তার মানে এই নয় যে, হামাগুড়ি দেয়া শিশু। একবার মাহফুজ আনাম (সম্পাদক, ডেইলি স্টার) আর আমি। মাহফুজ আনামের বয়স ৫৫ আর আমার ৬০। মাহফুজ আনাম জেদ ধরলো তাকে তুমি বলতে হবে। আমি বললাম, যে আমার সঙ্গে যদি আপনার ৫০ বছর আগে দেখা হতো তাহলে সহজেই বলতে পারতাম। তখন কোলে নিয়ে বলতাম কাঁদে না বাবু, কাঁদে না।
তবে শেষ পর্যন্ত সেটাও আমি বলতে পারছি না। আমি একটা কবিতা বলবো। এটি চীনা কবিতা। অনুবাদটা এতই ভালো হয়েছে যে, একবার ভাবলাম ওই সংস্করণ থেকে কবির নাম বাদ দেই। সেই কবিতাটা হচ্ছে, হাওয়া বয় শনশন, তারারা কাঁপে, হৃদয়ে কি জং ধরে পুরনো খাপে (মানে বুড়োদের)। কার চুল এলোমেলে, কী বা তাতে এলোগেলো। কার চোখে কত জল, কি হবে মেপে। (এটি কি মেনে নেয়া যায়, আমি বুড়ো হয়েছি তাতে কি আমার হৃদয়ে জং ধরেছে) জেনে কী-বা প্রয়োজন অনেক দূরের বন, রাঙা হলো বহ্নিতাপে। (জেনে কি লাভ, অনেক দূরের বন রাঙা হয়েছে তা আমাদের জানতে হবে না। মৃত্যুর আগে কি জানা ছেড়ে দিবো। আমাদের জানতে হবে।)
ইকবালের একটা কবিতা দিয়ে শেষ করি। তিনটি লাইন। ‘দুর্বার তরঙ্গ এক বলে গেল তীর তীব্র বেগে।
আমি আছি যতক্ষণ আমি গতিমান। যখনই হারাই গতি, সে মুহূর্তে আমি আর নাই।’ আমার আশি হয়েছে বলে আমার গতি শেষ হয়েছে। নতুন গতি, এইবার সবচেয়ে তীব্রতম যুদ্ধ। আগে প্রকৃতি আমাকে যোদ্ধা বানিয়ে দিয়েছে, এইবার প্রকৃতি নাই, আমিই যোদ্ধা। তবে সেইভাবে যেন আমাদের জীবন বাঁচে এবং শেষ হয়।

পায়েলের চোখে নির্দয় পৃথিবী by শামীমুল হক

আমি পায়েল বলছি। সাঈদুর রহমান পায়েল। অন্য সবার মতো আমারও চোখে স্বপ্ন ছিল। মনে আশা ছিল। মাত্র কিশোর থেকে তারুণ্যে পা দিয়েছিলাম। পুরো জীবনটাই সামনে পড়েছিল। কিন্তু কি হলো? একদল শকুন আমাকে খুবলে খেয়েছে। ওরা উল্লাস করছে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখেছি। জানিনা ওদের কাছে আমি কি অন্যায় করেছিলাম? কি অপরাধ করেছিলাম?  না কোনো উত্তর নেই। শকুনের দল কোনো উত্তর দিতে পারবে না। কিন্তু আমার জীবনের এ অল্প সময়ে কি দেখেছি আজ আপনাদের জানাতে চাই। আমি দেখেছি নির্দয় এক পৃথিবী। এমন পৃথিবীর প্রতি বর্ষন করছি ঘৃণা। যেখানে ভালোবাসা মূল্যহীন। প্রেম যেখানে ছলনা। আদর সোহাগ যেখানে কৃত্রিমতা। আকুতি যেখানে বৃথা।
স্বার্থপররা যেখানে বাসা বেঁধেছে শক্ত খুঁটি গেড়ে। আমি শকুনদের উল্লাস দেখেছি আর আফসোস হয়েছে। যারা আমার স্বপ্নকে গলাটিপে হত্যা করেছে। যারা আমার ইচ্ছাকে পিষে মেরেছে। অথচ আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম আরও কিছুদিন। সুন্দর পৃথিবীতে ভালবাসা বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। আমাকে নিয়ে যাদের স্বপ্ন ছিল তাদের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলাম। কি অভাগা আমি। তা আর হলো না। শকুনের খপ্পরে পড়ে প্রাণসহ সবই বিলিয়ে দিতে হয়েছে। জানেন, এ দেশকে কিছু দেওয়ার ইচ্ছা নিয়েই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার জীবনের সুখ-দুখের বহু কাহিনী আছে। সেসব বলতে চাই না। আমি চাই জীবনের শেষদিনের কথা আপনাদের জানাতে। গত ২১শে জুলাই, দিনটি ছিল শনিবার। দুই বন্ধু ও আমি হানিফ পরিবহনের একটি বাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা আসছিলাম। বাস নাম্বার ঢাকা মেট্রো-ব-৯৬৮৭। ওইদিন রাত সোয়া ১০টায় গাড়িটি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। ভোর চারটায় গজারিয়া ভাটের চর ব্রিজের কাছে প্রচ- জ্যাম দেখতে পাই। এ সুযোগে আমি প্রস্রাব করতে নামি। দেখি গাড়িটি আস্তে আস্তে চলছে। আমি দৌড়ে গাড়িতে উঠতে গিয়ে মাথায় আঘাত পাই। বাসের চালক জামাল হোসেন, সুপারভাইজার জনি ও হেলপার ফয়সাল সহযোগিতার বদলে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই শকুনরা আমার উপর চালায় নির্মম অত্যাচার।
এক পর্যায়ে নদীতে ফেলে দেয়। পৃথিবী থেকে আমার নাম নিশানা মুছে দেয় ওরা। আমার বুকে জমানো স্বপ্নগুলো পানিতে তলিয়ে যায়। মা-বাবা হন সন্তানহারা। যে সন্তানকে নিয়ে তারা আগামীদিনগুলো নতুন করে সাজাচ্ছিলেন। যাক সেসব কথা। গভীর রাত হওয়ায় বাসের যাত্রীরা ছিলেন ঘুমে বিভোর। ২৩শে জুলাই সকালে গজারিয়ার ফুলদি নদীতে ভেসে ওঠে আমার মরদেহ। পুলিশ আসে। আসে লোকজন। সবাই দেখতে পায় আমার নাক-মুখ থেঁতলানো। শরীরে রক্ত। পুলিশ এটিকে অস্বাভাবিক মৃত্যু বলে ধরেও নেয়। ২৪শে জুলাই পুলিশের সহযোগিতায় গজারিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা করেন আমার মামা গোলাম সারোওয়ার্দী বিপ্ল¬ব। এরপরই বেরিয়ে আসে আসল তথ্য। গ্রেপ্তার করা হয় বাসের চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারকে। ইতিমধ্যে সুপারভাইজার জনি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে ঘটনার বিস্তারিত জানিয়েছে। এ নিয়ে মুন্সীগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম পিপিএম সংবাদ সম্মেলন করেন। দেশবাসী জানতে পারে একদল শকুনের কথা। কিন্তু এখানেই কি শেষ? মানবজাতি হিসেবে বিবেক বুদ্ধি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন সৃষ্টিকর্তা। এই কি আমাদের বিবেক। আমি পায়েল শুধু নয়, কত পায়েল নির্দয় এ পৃথিবীতে শকুনদের খপ্পরে পড়ে অকালে জীবন দিতে হচ্ছে। আর শকুনরা করছে উল্লাস। এ থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ বুঝি নেই পৃথিবীতে। পৃথিবীর বিচার ব্যবস্থায় হয়তো এর বিচার হবে। হয়তোবা হবে না। কিন্তু পরপারে? সেখানকার বিচারতো কেউ ঠেকাতে পারবে না।

ময়লা-আবর্জনা সরাতে ব্যালটবাক্স ব্যবহার

বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে। ময়লা-আবর্জনা সরাতে ব্যালটবাক্স ব্যবহার করা হচ্ছে। ছবিটি বরিশাল নির্বাচন কমিশন কার্যালয় থেকে তোলা।

দুই শিক্ষার্থীকে পিষে মারলো বেপরোয়া বাস

নির্মম। মর্মান্তিক। হৃদয় বিদারক। সহপাঠীদের সামনেই বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ গেল দুই কলেজ শিক্ষার্থীর। বেপরোয়া বাসের চাপায় আহত হয়েছে আরো ১০ থেকে ১২ জন। গতকাল নগরীর বিমানবন্দর সড়কের রেডিসন ব্লু হোটেলের উল্টোপাশে ঘটেছে মর্মান্তিক এই ঘটনা। নিহতরা হলেন শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের আবদুল করিম রাজিব ও দিয়া খানম মিম। তারা কলেজের দ্বাদশ ও একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। আহতদের কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কুর্মিটোলা হাসপাতালের সহকারী পরিচালক লে. কর্নেল সগির মিয়া বলেন, দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে একজন ছেলে অপরজন মেয়ে। আহতদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল বেলা সাড়ে ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। মোহাম্মদপুর-আবদুল্লাহপুর সড়কে চলাচলকারী জাবালে নুর পরিবহনের দুটি বাস ফ্লাইওভার দিয়ে নামছিল। এ সময় বাসের চালকরা নিজেদের মধ্যে রেষারেষি শুরু করে। আর রেডিসন ব্লু হোটেলের বাস স্টপেজে আগে থেকে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের ১০-১২ জন শিক্ষার্থী। রেষারেষির একপর্যায়ে ডান দিকের বাসটি ওভারটেক করে চলে গেলেও বাম দিকের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
এ সময় বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা দেয় বাসটি। এতে ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যান। আর বাকিরা মারাত্মকভাবে আহত হন। ঘটনার পরপরই ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর করে। সরজমিন ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কাকলি মোড় থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত এলাকায় মূল সড়কের পাশে শিক্ষার্থীরা শত শত যানবাহন আটকে রেখেছে। কয়েক কিলোমিটার সড়কে যানবাহনের ভাঙা কাচ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করলে ওই এলাকাসহ আশেপাশের এলাকায় যানজট বেড়ে যায়। আনুমানিক ৩টার দিকে শিক্ষার্থীরা চলে গেলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়। ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় অর্ধ শতাধিক পুলিশ। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রত্যক্ষদর্শী একরামুল হক মানবজমিনকে বলেন, আমি ঘটনাস্থল দিয়ে মোটরসাইকেল করে যাচ্ছিলাম। বাসটি যখন শিক্ষার্থীদের আঘাত করে তখন আমি মোটরসাইকেল সাইড করে নেমে পড়ি। বাসের কাছে গিয়ে দেখি দুটি মরদেহ পড়ে আছে। আমরা কয়েকজন মিলে বাসটিকে পেছনের দিকে ঠেলে দিই। তারপর দেখতে পাই বাসের নিচে পড়ে থাকা শিক্ষার্থীরা বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করছে। তখন আমি নিজে বাসের নিচ থেকে ২ জন মেয়ে শিক্ষার্থী ও ৩ জন ছেলে শিক্ষার্থীকে টেনে বের করে হাসপাতালে নিয়ে আসি। একরামুল বলেন, বাসের নিচ থেকে ৫ জন ও বাসের সাইড থেকে আরো ৫-৬ জনকে আমি উদ্ধার করেছি। শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, আমরা কলেজেই ছিলাম। খবর পেয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে আমি ও আমার বন্ধুরা ঘটনাস্থলে আসি। তারপর আর আমাদের মাথা ঠিক ছিল না। চেনা মানুষগুলোর মরদেহ পড়ে আছে। বাকিরা চিৎকার করে কাঁদছে। এ দৃশ্য সহ্য করার মতো ছিল না। আবদুল্লাহ বলেন, আর কত প্রাণ ঝরবে। বেপরোয়া এসব বাসের রেষারেষিতে। আমরা এর বিচার চাই। আমরা আমাদের আর কোনো বন্ধুকে এভাবে অকালে চলে যেতে দেবো না। জাহিদ ইসলাম নামের আরেক শিক্ষার্থী জানান, এদের দায়ভার কে নেবে। আর কত মৃত্যু হলে বাসের চালকরা থামবে। আমরা আমাদের আর কত আপনজন হারাবো।
মেয়েকে হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেছেন দিয়া খানম মিমের বাবা। পরিবারের সঙ্গে মহাখালি এলাকায় মিম থাকতো। ২ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে মীম সবার ছোট। শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ শ্রেণিতে পড়তো। তার বাবা ঢাকা চাঁপাই নবাবগঞ্জ-রাজশাহী রুটের তিতাস বাসের চালক। এছাড়া তিনি এক সময় মহাখালি বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। মিমের বাবা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মানবজমিনকে বলেন, কিছুদিন ধরে আমার মেয়ের স্কুল ৮টা থেকে শুরু হয়। তাই বাসা থেকে ৭টার দিকে রওয়ানা হয়। প্রতিদিনই আমি তাকে বাসে তুলে দেই। আজ (গতকাল) সকালেও সে আমাকে বলেছে তার মা বাসে তুলে দিবে। তাই সকালবেলা আলম এশিয়া নামের একটি বাসে উঠে সে এমইএস নামে। সেখান থেকে কলেজে যায়। ফেরার পথে এই ঘটনা ঘটে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেউ একজন আমাকে ফোন দিয়ে বলে কুর্মিটোলা হাসপাতালে আসার জন্য। এসে দেখি আমার মেয়ের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ পড়ে আছে। জাহাঙ্গীর বলেন, আমি ৩০ বছর ধরে গাড়ি চালাই। কখনই আমার হাতে কেউ মরেনি। এমনকি হাত-পা ভাঙার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিছু লোভী মালিক কম টাকায় অদক্ষ চালক দিয়ে বাস চালানোর কারণে আজ আমার মেয়েকে হারালাম। আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই। নিহত আবদুল করিম রাজিবের বোন কুলসুম বলেন, তারা সবাই গ্রামের বাড়িতে থাকেন। দক্ষিণখানের আশকোনা এলাকায় খালাতো ভাইয়ের বাসায় থেকে রাজিব লেখাপড়া করতো। তাদের বাবা মৃত নুরুল ইসলাম মারা গেছেন অনেক আগে। রাজিবকে নিয়েই পরিবারের সব স্বপ্ন ছিল। সে একদিন চাকরি করবে। সংসারের দায়িত্ব নিবে। কুলসুম বলেন, আমাদের সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। আমার মা রাজিবের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ।
সহপাঠীদের মধ্যে শোকের ছায়া: এদিকে সহপাঠীদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে। খবর পেয়ে ঘটনার পরপরই সবাই ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে। সেখানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ-ভাঙচুর করেন। পরে তারা সবাই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে ভিড় করতে থাকেন শত শত শিক্ষার্থী। এ সময় শিক্ষার্থীদের চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় জল পড়ছিল। চিৎকার করে নিহত বন্ধুর নাম ধরে ডেকে অনেকে কাঁদছিলেন। অতীতের অনেক স্মৃতির কথা মনে করেও অনেক শিক্ষার্থীরা কান্না করছিল। সহপাঠীদের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে আসে। তাদের সান্ত্বনা দিতে আসেন তাদের পরিবারের সদস্যরাও। আবদুল্লাহ আল আমিন নামের এক সহপাঠী বলেন, বেপরোয়া বাসের চালকদের জন্যই আমাদের বন্ধুদের হারিয়েছি। আমি এই চালকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আবদুল আহাদ বলেন, আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ঘটনার পরপরই শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, ভাঙচুর করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তা নিয়ন্ত্রণে এনেছে। জাবালে নুর বাসের চালক ও তার সহকারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়েছে।

সেক্স ডলের পিছনে খরচ দেড় লাখ পাউন্ড

৬০ বছর বয়সী ব্রিক ডোলব্যাঙ্গারের বিবাহ  বিচ্ছেদ ঘটেছে। তিনি আর বিয়ে করছেন না। তাই বলে জীবনকে তো আর একা একা টেনে নেয়া যায় না। তাই তিনি নারী সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন আর্টিফিসিয়াল প্রেমিকা। যাকে আরো সহজ করে বললে বলা যায় সেক্স ডল। হ্যাঁ, এই সেক্স ডল নতুন এক বিপ্লব শুরু করছে মানবজাতির মধ্যে। দিন দিন এর প্রতি ঝোঁক বাড়ছে মানুষের। ফলে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মানুষের জীবনে ভবিষ্যত সামাজিক বন্ধন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। যদি একজন পুরুষ সেক্স ডলেই তার জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে পারেন তাহলে তার নারীর প্রতি আসক্তি কমে যেতে পারে। ফলে দেখা দিতে পারে সামাজিক বিশৃংখলা। ৬০ বছর বয়সী ব্রিক ডোলব্যাঙ্গারের দুটি সন্তান আছে। তার বিবাহ বিচ্ছেদ হওযার পর তিনি আর বিয়ের স্বপ্ন দেখেন নি। উল্টো তিনি আসক্ত হয়ে পড়েছেন সেক্স ডলের প্রতি। এরই মধ্যে তার সংগ্রহে আছে এমন ৫টি ডল। আবার ১৫ হাজার পাউন্ড দিয়ে কিনে নিয়েছেন নতুন একটি ডল। এ ডলটির বিশেষত্ব হলো সে তার মালিকের জন্মদিন এবং তার শরীরের চাহিদা সম্পর্কে স্মরণ রাখতে পারে।  বিশ্বে প্রথম তিনিই এমন সেক্স ডলের মালিক হলেন। এ ডলটি তৈরি করেছে ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রিয়েলবোটিক্স। সিলিকন ত্বক ব্যবহার করে তারা জীবন্ত মানুষের মতো এই ডলটি তৈরি করেছে। আকারেও তা মানুষের সমান। সে মনে রাখতে পারে মালিকের প্রিয় খাবার, ছবি, গান। এসব নিয়ন্ত্রণ করা হয় একটি অ্যাপ দিয়ে। মালিক এসব সেক্স ডলের বিভিন্ন অঙ্গের রং পরিবর্তন করতে পারেন। এমনকি ডলটি তার সঙ্গে লাজুকের মতো নাকি ঈর্ষান্বিত আচরণ করবে তাও নির্ধারণ করতে পারবেন মালিক। এ ছাড়া এ সেক্স ডল কথা বলে বৃটিশ উচ্চারণে। তার কণ্ঠ রোবোটিক। তার কাছে মালিক ব্রিক জানতে চান, সে কি তার সঙ্গে একটি ডেটিংয়ে যেতে রাজি কিনা। জবাবে তার সেক্স ডল জানায়, একটি আর্ট গ্যালারি পরিদর্শনে? সেখানে পরে আমরা একটু কফি পান করতে পারি।
এরই মধ্যে গত এক দশকে এসব সেক্স ডলের পিছনে ব্রিক প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড খরচ করেছেন। তার মতে নিজে একা থাকা ভাল লাগে না। তাই একজন সঙ্গী পাওয়ার জন্য তিনি একটি সেক্স ডল কেনার সিদ্ধান্ত নেন। এটাই তার এর প্রতি আসক্তির কারণ। ব্রিক দাবি করেন, যেসব পুরুষ একা বসবাস করছেন তারাও একই রকম কাজ করছেন হয়তো। এর মধ্যে থাকতে পারেন বিপতিœক, অঙ্গহানি হওয়া মানুষ অথবা ব্রিকের মতো কেউ, যারা অন্য নারীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে সমস্যা মনে করেন।

কঠিন পরীক্ষার মুখে ইউরোপ: হয় ট্রাম্প না হয় ইরানকে বেছে নিতে হবে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতা অকার্যকর করার জন্য যেভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছেন তাতে ইউরোপ বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। ইউরোপের পক্ষ থেকে হয় ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারিতা মেনে নিয়ে আমেরিকাকে বেছে নিত হবে অথবা ইরানের সঙ্গে আর্থ-রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
ইউরোপ পরমাণু সমঝোতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তারা এই দুইয়ের কোন্‌টিকে বেছে নেবে সেটাই এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাওয়াদ জারিফ তেহরানে  বিদেশে কর্মরত ইরানি রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের প্রথম যৌথ সম্মেলনে দেয়া ভাষণে বলেছেন, "অন্যদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা আমেরিকার বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে।" তিনি বলেন, "ইউরোপকে হয় মার্কিন সরকার অথবা ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে অথবা তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।"
পর্যবেক্ষকরা এ ব্যাপারে দুটি বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতায় ইরানের স্বার্থ নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে দরকষাকষির কোনো সুযোগ নেই। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, পরমাণু সমঝোতায় প্রতিপক্ষ অর্থাৎ ইউরোপ, চীন ও রাশিয়ারও স্বার্থ রয়েছে। এ অবস্থায় আমেরিকার স্বেচ্ছাচারিতার কাছে নতি স্বীকার করলে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পরমাণু সমঝোতা টিকিয়ে রাখা ইউরোপের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ ক্ষেত্রে ইউরোপকে আরো বেশি কৌশলী ও বিচক্ষণ হতে হবে। রাজনৈতিক আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে হলে ইউরোপকে অবশ্যই আমেরিকার অযৌক্তিক নীতির অনুসরণ থেকে দূরে থাকতে হবে। ইরানের আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক নাসরুল্লাহ তাজিক বলেছেন, আমেরিকার প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের ঘটনা বিশ্বে ইউরোপের মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কাঠামোকে দুর্বল করে দেবে। এ অবস্থায় ইউরোপের উচিত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ দেয়া এবং ইরান ও ইউরোপের স্বার্থকে এককরে দেখা।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ওপর ইউরোপের নিরাপত্তা নির্ভর করছে। তাই এ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইউরোপও নিরাপদ থাকবে না। মূল বিষয়টি হচ্ছে নিরাপত্তা রক্ষা, রাজনৈতিক আস্থা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইউরোপের যে অগ্রণী ও ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে আমেরিকার প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের ঘটনা তাকে ম্লান করে দিচ্ছে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরমাণু সমঝোতাকে অকার্যকর করে দেয়ার যে পদক্ষেপ নিয়েছেন তাতে সরাসরি ইউরোপের স্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থায় ইউরোপ যদি পরমাণু সমঝোতা টিকিয়ে রাখতে চায় তাহলে তাদেরকে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আর্থ-রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

ভোটারদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শুভ কামনা

তিন সিটির ভোটারদের প্রতি ‘শুভ কামনা’ জানিয়েছে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। প্রায় অভিন্ন বার্তায় বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটে শান্তিপূর্ণ এবং উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রয়োগ দেখতে চেয়েছেন বাংলাদেশে থাকা বন্ধু রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা। তারা এ-ও বলছেন, একটি দেশের গ্রহণযোগ্য গণতন্ত্রের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু এবং সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে মৌলিক শর্ত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ক’মাস বাকি। ওই সময়ে দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিটি নির্বাচনগুলো বিদেশিরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। আজ যে তিন সিটিতে নির্বাচন হচ্ছে তাতে গোটা কূটনৈতিক সম্প্রদায়ের চোখ এখন পুরোপুরি নিবদ্ধ। কিন্তু তারা অতীতের অভিজ্ঞতা এবং নানা কারণে ভিন্ন কায়দায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। আজ সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা অবধি বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট- এই তিন সিটিতে ভোটগ্রহণ চলবে। পশ্চিমা দুনিয়ার প্রতিনিধিরা প্রি-ইলেকশন বা নির্বাচন-পূর্ব পরিস্থিতি সরজমিন দেখেছেন। বৃটেনসহ বিভিন্ন দেশের একাধিক টিম বরিশাল ও সিলেট সফর করেছে। ভোটের দিনে তিন সিটিতে থাকছেন বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সংস্থার ১৮ জন পর্যবেক্ষক।
এরই মধ্যে তারা নির্বাচন কমিশনের ইস্যু করা পর্যবেক্ষক কার্ড নিয়ে শহরগুলোতে পৌঁছে গেছেন। যারা মাঠে যাননি সেই সব দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা প্রযুক্তি, মিডিয়া এবং নিজস্ব প্রতিনিধির মাধ্যমে নিয়মিতভাবে ভোটের মাঠের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। গত মাসে অনুষ্ঠিত গাজীপুর সিটি নির্বাচন এবং তারও আগে খুলনার নির্বাচন পরিস্থিতি সরজমিনে দেখা এবং এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন ঢাকায় থাকা কূটনীতিকরা। বিশেষ করে মার্কিন দূতাবাসের টিমের নখদর্পণে ছিল গাজীপুর সিটি নির্বাচন পরিস্থিতি। ওই নির্বাচনের পর রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট ব্যালটে প্রকাশ্যে সিল মারা, অনিয়ম ও বলপ্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। জাতীয় নির্বাচনে গ্রহণযোগ্য করতে গাজীপুর ও খুলনার নির্বাচনের অনিয়ম তদন্ত করা এবং আসন্ন তিন সিটির নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত করার তাগিদও দিয়েছিলেন তিনি। যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকরা মার্কিন দূত কিংবা ভিন দেশি কূটনীতিকদের বক্তব্যকে পছন্দ করেননি। ফলে এবার ভিন্ন কায়দায় বিদেশি মিশনগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। গতকাল এক টুইট বার্তায় ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পো বলেন, আগামীকাল (আজ) সকাল ৮টায় বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের ভোটগ্রহণ শুরু হবে। বাংলাদেশের ওই তিন সিটির ভোটারদের জন্য আমাদের শুভ কামনা রইলো- তারা যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের পছন্দের নেতা নির্বাচনে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ অর্থাৎ ভোট দিতে পারেন।
মার্কিন দূতাবাসের  অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে সন্তান কোলে নিয়ে ভোটার ভোট দিচ্ছেন এমন একটি ছবি প্রকাশ করে  লেখা হয়- আমাদের শুভ কামনা থাকছে বাংলাদেশের বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটির সেই সব ভোটারের জন্য। যারা শান্তিপূর্ণভাবে এবং উৎসবমুখর দিনে, সবাইকে নিয়ে তাতে (শান্তিপূর্ণ উৎসবে) অংশ নিতে চান। তারা যেন তাদের সিটি করপোরেশনের নেতৃত্ব বা নেতা নির্বাচনে অত্যন্ত স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন- সেটাই যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া। ঢাকাস্থ ডাচ দূতাবাসের তরফেও আর এক ধাপ এগিয়ে বার্তা দেয়া হয়েছে তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে। বার্তাটি ঠিক এরকম- ‘আগামীকাল (আজ) ভোট হবে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ তিন সিটিতে। বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে অনেক দূর এগিয়েছে। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক খাতে অর্জন-অগ্রগতি রয়েছে এমন একটি দেশের (বাংলাদেশ) পরবর্তী উন্নয়ন বা এগিয়ে যাওয়ার জন্য সর্ব ক্ষেত্রে সুদৃঢ়, সবার অংশগ্রহণ এবং প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করা এবং সমর্থন দেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে যে কোনো গ্রহণযোগ্য গণতন্ত্রের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু এবং সবার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হচ্ছে মৌলিক শর্ত।’

তিন সিটি এক পরীক্ষা

রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল সিটিতে আজ ভোট। পৌনে নয় লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন এ তিন সিটিতে। মেয়র পদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী। প্রথমবারের মতো তারা দলীয় প্রতীক নৌকা ও ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন। জাতীয়  নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে অনেকটা উৎসবের আমেজেই চলেছে প্রচার-প্রচারণা। তবে শুরু থেকেই ভোট নিয়ে ছিল ভয় আর শঙ্কা। শেষ মুহূর্তে তা আরো বেড়েছে। কেমন ভোট হবে আগে থেকে হলফ করে বলার মতো পরিবেশ ছিল না তিন সিটিতেই। বিরোধী প্রার্থীদের শত অভিযোগে নির্বাচনী কর্মকর্তারা ভাসলেও প্রতিকারের কোনো দাওয়াই ছিল না তাদের হাতে। নির্বাচন কমিশন আর প্রার্থীদের আলোচনা ছাপিয়ে তিন সিটিতেই সামনে এসেছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা। যেমনটি দেখা গিয়েছিল খুলনা ও গাজীপুরের ভোটে। বাতাসে ভেসে বেড়ানোর গুঞ্জনই সত্য হয়েছিল ভোটের ফলে। সর্বশেষ তিন সিটির ভোটেও সারা দেশের চোখ। বাতাসে নানা গুজব-গুঞ্জন। আগাম ফলের বার্তাও এসেছে ভোটের একদিন আগে। এতে গুজবের ডালপালা মেলেছে বহুদূর। খুলনা-গাজীপুরের মতো দখল-অনিয়মের ভোট হবে নাকি নয়া কোনো তরিকায় তিন সিটি দখলের মহড়া হবে এমন প্রশ্ন মানুষের মুখে মুখে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে তিন সিটির নির্বাচনকে নিজেদের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা হিসেবে দেখাতে চায় আওয়ামী লীগ। আর রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত লড়ে দুই ধরনের পরীক্ষা দিতে চায়। সুষ্ঠু ভোট হলে বড় জয় নিয়ে বার্তা দিতে চায় দলটি। আর দখল-অনিয়মের ভোট হলে এটিও দেশবাসীর সামনে এক ধরনের বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করবে বিএনপি। এমন প্রেক্ষাপটে তিন সিটির নির্বাচন ইসির সামনেও বড় এক পরীক্ষা। তিন সিটি করপোরেশনের ১৫টি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট নেয়া হবে। এর মধ্যে বরিশালে সর্বাধিক ১১টি কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেয়া হবে। এ নগরীতে ইভিএম কেন্দ্রে ভোট দেবেন প্রায় ২৫ হাজার ভোটার। সিলেট এবং রাজশাহীতে দুটি করে কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট গ্রহণ করা হবে। তিন সিটিতেই কর্মী সমর্থকদের গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ করেছে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য দলের প্রার্থীরা। গতকাল রাজশাহীতে বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল জানিয়েছেন, তার ২৪ জন পোলিং এজেন্টের খোঁজ মিলছে না শনিবার রাত থেকে। বরিশালে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য প্রার্থীরা গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বহিরাগতরা ভোটের মাঠে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। নগরীর আশপাশে হাজার হাজার বহিরাগত জড়ো হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের। প্রার্থীরা জালভোট ও কেন্দ্র দখল ঠেকাতে একসঙ্গে মাঠে থাকার কথাও জানিয়েছেন। সিলেটে পরিবেশ দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ হলেও নানা শঙ্কা আর ভয় নিয়েই কেন্দ্রে যাবেন ভোটাররা। ভোটে অনিয়ম ঠেকাতে শক্ত অবস্থানে থাকার কথা জানিয়েছেন বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী। যদিও আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান জানিয়েছেন শান্তিপূর্ণ ভোট হবে সিলেটে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারাও আশা প্রকাশ করেছেন খুলনা-গাজীপুরের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না তিন সিটিতে।
ভোট ঘিরে নির্বাচন কমিশন শেষ করেছে সব ধরনের প্রস্তুতি। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোট গ্রহণ চলবে। এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরা। তিন সিটির নির্বাচনী এলাকায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি সাধারণ ভোটকেন্দ্রে পুলিশ, আনসারসহ ২২জন এবং গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ২৪জন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিটি সাধারণ ওয়ার্ডে পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসারদের সমন্বয়ে মোবাইল টিম, প্রতি তিন ওয়ার্ডে একটি করে স্ট্রাইকিং ফোর্স, প্রতি সাধারণ ওয়ার্ডে র‌্যাবের একটি টিম, প্রতি দুইটি সাধারণ ওয়ার্ডে এক প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন থাকবে। মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স ভোটগ্রহণের দিন এবং তার আগের দুইদিন ও পরের একদিনসহ মোট ৪দিন মোতায়েন থাকবে। ভোটগ্রহণের পরের দুইদিন পর্যন্ত প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিতকরণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া নির্বাচনী অপরাধ বিচারার্থে আমলে নেয়ার জন্য প্রতি তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। রাজশাহী সিটিতে ৩০টি ওয়ার্ডের ১৩৮ ভোটকেন্দ্রে কক্ষের সংখ্যা ১০২৬টি। এসব ভোটকেন্দ্রে ১৩৮জন প্রিজাইডিং অফিসার, ১০২৬ কক্ষে সম-সংখ্যক সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং কক্ষে দুইজন করে ২০৫২ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। এ সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ১৮ হাজার ১৩৮ জন। যার মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৫ জন ও নারী ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৩ জন। এ সিটিতে মেয়র প্রার্থী ৫ জন।
সিলেট সিটির ২৭টি ওয়ার্ডে ১৩৪ ভোটকেন্দ্রে কক্ষের সংখ্যা ৯২৬টি। এসব ভোটকেন্দ্রে ১৩৪ জন পিজাইডিং অফিসার, ৯২৬ কক্ষে সম-সংখ্যক সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং কক্ষে দুইজন করে ১৮৫৪ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। এ সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৪৪ জন ও নারী ১ লাখ ৫০ হাজার ২৮৮ জন। সিলেটে মেয়র পদে লড়ছেন ৭ জন প্রার্থী, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১২৭ এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ৬২ জন প্রার্থী।
বরিশাল সিটিতে ৩০ ওয়ার্ডে ১২৩ ভোটকেন্দ্রে কক্ষের সংখ্যা ৭৫০টি। এসব ভোটকেন্দ্রে ১২৩ জন প্রিজাইডিং অফিসার, ৭৫০ কক্ষে সম-সংখ্যক সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং কক্ষে দুইজন করে ১৫০০ জন পোলিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবেন। এ সিটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪২ হাজার ১৬৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২১ হাজার ৪৩৬ জন ও নারী ১ লাখ ২০ হাজার ৭৩০ জন। এ সিটিতে মেয়র পদে লড়ছেন ৬ জন মেয়র প্রার্থী।