Thursday, October 29, 2009

ইসলামাবাদে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার ওপর হামলা

পাকিস্তানে আবারও একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে এবারের হামলায় প্রাণে বেঁচে গেছেন ওই সেনা কর্মকর্তা। গতকাল মঙ্গলবার মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্দুকধারী সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ারের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহের মধ্যে ইসলামাবাদে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে দ্বিতীয়বারের মতো হামলা চালানো হলো।
পুলিশ কর্মকর্তা খুরশিদ খান বলেন, সকালের দিকে চালানো এ হামলায় কেউ আহত হননি। শহরের ব্যস্ত আই-৯ আবাসিক এলাকায় ওই হামলা চালানো হয়। হামলা চালিয়ে বন্দুকধারীরা পালিয়ে যায়।
তিনি জানান, মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্দুকধারী ব্রিগেডিয়ার ওয়াকার আহমেদের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। তিনি ও তাঁর মা তখন গাড়িতে ছিলেন। তবে ব্রিগেডিয়ার ওয়াকার, তাঁর মা কিংবা গাড়ির চালক কেউ আহত হননি।
গত বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে এক ব্রিগেডিয়ার ও তাঁর গাড়িচালককে হত্যা করে বন্দুকধারীরা। রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা সদর দপ্তরসহ সেনাবাহিনীর ওপর জঙ্গিদের ধারাবাহিক হামলায় বিব্রত সেনাবাহিনী।

সিদ্ধান্ত ছাড়াই জারদারি-নওয়াজ বৈঠক শেষ

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) শীর্ষনেতা প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) চেয়ারম্যান নওয়াজ শরিফের মধ্যকার আলোচিত বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়েছে।
পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে এ দুই শীর্ষনেতা গত সোমবার রাজধানী ইসলামাবাদের প্রেসিডেন্ট ভবনে আলোচনায় বসেন। প্রায় ৯০ মিনিট স্থায়ী এ বৈঠকে তাঁরা কোনো বিষয়েই ফলপ্রসূ সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি।
সম্প্রতি পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের জারি করা জাতীয় পুনরেকত্রীকরণ অর্ডিন্যান্স (এনআরও) বাতিল করা না-করা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। নওয়াজ শরিফ পার্লামেন্টে মোশাররফের জারি করা এ অধ্যাদেশ বাতিল করার লক্ষ্যে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী আনার ব্যাপারে কট্টর অবস্থানে রয়েছেন। এনআরওতে পাকিস্তানে কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না বলে আইন জারি করা হয়। অধ্যাদেশের ওই ধারাটি নওয়াজ শরিফকে উদ্দেশ করেই জারি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
তবে গত সোমবার অনুষ্ঠিত নওয়াজ-জারদারি বৈঠকে এনআরওর বিষয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি বলে জানায় নওয়াজ শরিফের ঘনিষ্ঠ সূত্র।
সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর কয়েকটি ব্যাপারে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে আলোচনা হলেও এখনো তাঁরা বাস্তবসম্মত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। এনআরও বাতিল করে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী জারি করার ব্যাপারে জারদারির ক্ষমতাসীন পিপিপি একক কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে তাদের শরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট জারদারি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের এনআরও সংশোধন-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির প্রধান রাজা রাব্বানীকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ১০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এনআরও ছাড়া আরও কয়েকটি জাতীয় ইস্যুতে মতৈক্যে আসতে পারছেন না দুই নেতা। প্রেসিডেন্ট জারদারি পিএমএল-এন নেতা নওয়াজ শরিফকে পাকিস্তান আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টির উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের নাম পরিবর্তন করে ‘পাখতুনখোয়া’ রাখার প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। নওয়াজ নাম পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেলুচিস্তানের স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত প্রস্তাব মেনে নিতে প্রেসিডেন্ট জারদারির প্রতি আহ্বান জানান।
তবে এ বৈঠকে একবারও এনআরও-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা না হওয়াটাকে একেবারেই অস্বাভাবিক বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বৈঠক শেষে পাকিস্তান মুসলিম লীগের একজন মুখপাত্র বলেন, নওয়াজ শরিফ সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বিচার দাবি করেছেন। তিনি আরও বলেন, প্রেসিডেন্ট জারদারির সঙ্গে বৈঠকে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ, বিচার বিভাগের সংস্কার, জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান, নির্বাচনের আগে পিপিপি ও পিএমএল-এনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘গণতন্ত্র সনদ’ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

পাকিস্তান মুক্তি দিল ১১ ইরানি গার্ডকে

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের ১১ সদস্যকে গতকাল মঙ্গলবার মুক্তি দিয়েছে পাকিস্তান। বিনা অনুমতিতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশের অভিযোগে গত সোমবার তাঁদের আটক করা হয়েছিল।
ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে আত্মঘাতী হামলায় রেভল্যুশনারি গার্ডের ছয় কমান্ডারসহ ৪২ জন নিহত হওয়ার আট দিন পর সীমান্তবর্তী মাশখেল এলাকা থেকে ওই ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সুন্নি মুসলিম গোষ্ঠী জুনদোল্লাহ (আল্লাহর সৈনিক) ওই হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে। তেহরানের অভিযোগ, গোষ্ঠীটি পাকিস্তানের ভেতরে থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
কর্মকর্তারা জানান, অসাবধানতাবশত পাকিস্তানি ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ায় ১১ জন ইরানি গার্ডকে গত সোমবার গ্রেপ্তার করা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, সন্দেহভাজন জ্বালানি চোরাকারবারিদের ধাওয়া করার সময় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, গার্ড সদস্যদের ইরানি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কারণ, তাঁরা ভুল করে পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন।
পাকিস্তান ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক সাধারণত ভালো থাকলেও ইরানে গত সপ্তাহের আত্মঘাতী হামলার পর দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা দেয়।
ইরানের অভিযোগ, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে জুনদোল্লাহ গোষ্ঠীর ঘাঁটি রয়েছে। জুনদোল্লাহর নেতা আবদুল মালিক রিগিকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যায় ভাটা by ইব্রাহীম চৌধুরী,

যুক্তরাষ্ট্রে গত ছয় মাসে সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যায় ব্যাপক ভাটা পড়েছে। মন্দা অর্থনীতি ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির দাপটে প্রচারসংখ্যা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে এ দেশের সংবাদপত্র শিল্প। প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো আত্মরক্ষার জন্য তাদের পত্রিকার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বিজ্ঞাপন ও বিপণনব্যবস্থায় পরিবর্তিত কৌশল নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নিরীক্ষা ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, দেশের ৩৭৯টি সংবাদপত্রে গত ছয় মাসে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ প্রচারসংখ্যা কমেছে। অনলাইন প্রযুক্তির কারণে এক দশক ধরেই সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা নিম্নগামী ছিল। কিন্তু গত ছয় মাসে এ দশকের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে পত্রিকার প্রচারসংখ্যা।
বনেদি পত্রিকা হিসেবে পরিচিত দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বহুল বিক্রীত সংবাদপত্র। সর্বশেষ নিরীক্ষা তথ্য অনুযায়ী, দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রচারসংখ্যা ২২ লাখ। ইতিপূর্বে সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা হিসেবে পরিচিত ইউএসএ টুডে গত ২৭ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রচার ঘাটতিতে পড়েছে। গত ছয় মাসে তাদের প্রচারসংখ্যা কমেছে ১৭ শতাংশ। ইউএসএ টুডের প্রচারসংখ্যা এখন ১৯ লাখ। বিমানবন্দর ও হোটেলগুলোতে বেশি বিক্রি হয় পত্রিকাটি। মন্দা অর্থনীতিতে বিমানযাত্রী হ্রাস ও হোটেলগুলোতে পর্যটক ঘাটতিকেই পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা কমার কারণ মনে করা হচ্ছে।
২০০৮ সালে প্রচারসংখ্যায় নিউইয়র্ক টাইমস-এর অবস্থান ছিল তৃতীয়। পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমলেও তৃতীয় সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকার অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে গড়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রচারসংখ্যা প্রায় সাড়ে নয় লাখ। ছুটির দিন রোববার পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা গড়ে ১৪ লাখ বলে নিরীক্ষার তথ্যে জানা গেছে।
টিকে থাকার জন্য বেশির ভাগ সংবাদপত্রই কর্মী ছাঁটাই করছে। এ ছাড়া পত্রিকার দামও বাড়িয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস ইতিমধ্যে গত গ্রীষ্মে দাম বাড়িয়েছে এক দফা। প্রভাবশালী পত্রিকাগুলো পত্রিকার অংশবিশেষ অনলাইনে বিনামূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো অংশের জন্য ফি আরোপের চিন্তা করছে। অঙ্গরাজ্যভিত্তিক পত্রিকাগুলো বিপণনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। সোম থেকে শুক্রবার পর্যন্ত গ্রাহকদের পত্রিকা পৌঁছে দেওয়া হবে। সপ্তাহান্তের শনি ও রোববার গ্রাহকেরা অনলাইনে পত্রিকা পড়বে অথবা নিউজ স্ট্যান্ডে গিয়ে সংগ্রহ করতে হবে।
মিশিগান ও টেক্সাসে একাধিক সংবাদপত্র এ বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। অনলাইনে নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে অনলাইন পাঠকের সংখ্যা কমবে। অনলাইন বিজ্ঞাপন প্রাপ্তিও ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদপত্র শিল্প এখন একদিকে প্রচারসংখ্যা ধরে রাখা, অন্যদিকে বিজ্ঞাপন প্রাপ্তি ও টিকে থাকার জন্য আয় নিশ্চিত করার সংঘাতে ভুগছে। সংকটের এ সময়ে প্রচারসংখ্যা বৃদ্ধির বদলে টিকে থাকার জন্য অর্থ সংগ্রহ ও অর্থ সাশ্রয়কেই গুরুত্ব দিচ্ছে এখানকার সংবাদপত্রগুলো।

মালয়েশিয়ায় সেতু ভেঙে শিশু-শিক্ষার্থীর মৃত্যু

মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পিরাক রাজ্যের একটি ঝুলন্ত সেতু ভেঙে এক শিশু-শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নদী থেকে ২২ শিশুকে উদ্ধার করা গেলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছে আরও দুই শিশু। তাদের বয়স ১৩ বছরের নিচে।
গত সোমবার বিকেলে নদীর ওপর ওই ঝুলন্ত সেতুটি হেঁটে পার হওয়ার সময় হঠাত্ সেতুটি ভেঙে গেলে ওই শিশুরা নদীতে পড়ে যায়। তবে সেতুর বিভিন্ন অংশ আঁকড়ে ধরে নদীতে পড়া থেকে বেঁচে যায় ২০ জন শিশু।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বারনামা জানায়, গত দুই সপ্তাহ আগে ৫০ মিটার দীর্ঘ এই ঝুলন্ত সেতুটি ভেঙে যাওয়া আরেকটি সেতুর জায়গায় প্রতিস্থাপন করা হয়।
দেশটির উত্তর পিরাক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জাম্বরি আবদুল কাদির জানান, সোমবার সন্ধ্যায় সেতুটির বিম ভেঙে গেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
১২ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী কে মাথিভানান জানায়, কামপারের কোয়ালা দিপাংয়ের সেতুটি হঠাত্ ভেঙে গেলে কয়েকজন শিশু পানিতে পড়ে যায়। কিন্তু সে সেতুর একটি দড়ি ধরে ঝুলে থেকে প্রাণে বেঁচে যায়।
দুর্ঘটনাকবলিত ওই শিশুরা পিরাক রাজ্যের একটি গ্রামে ক্যাম্পিংয়ে এসেছিল।

ল্যাপটপ জ্যোতিষী

নেপালি গৃহবধূ দীপশ্রী জোশি। নিজের ভূত-ভবিষ্যত্ জানতে একসময় ধরনা দিতেন জ্যোতিষীর চেম্বারে। ভবিষ্যত্ জানার জন্য তাঁকে সেখানে অপেক্ষা করতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কিন্তু দীপশ্রীকে এখন কোনো জ্যেতিষীর চেম্বারে যেতে হয় না, অপেক্ষা করতে হয় না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ললাটের লিখন জানার জন্য এখন শুধু একটি ফোনের কলই যথেষ্ট। দীপশ্রী এখন শুধু একটি ফোন করেই জেনে নিচ্ছেন নিজের ভাগ্যের লিখন।
বাসুদেব কৃষ্ণ শাস্ত্রী। তিনি সবার কাছে পরিচিত ‘ল্যাপটপ জ্যোতিষী’ হিসেবে। ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাসে টেলিভিশনে ফোন-ইন শো নামের একটি অনুষ্ঠান চালু করেন তিনি। তাঁর ওই অনুষ্ঠানে ফোন করে দর্শকেরা জেনে নিচ্ছেন নিজের ভাগ্যের লিখন। ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানটি। জাতীয় সেলিব্রিটিতে পরিণত হন শাস্ত্রী। গড়ে ওঠে তাঁর বিশাল ভক্ত শ্রেণী।
এখন জ্যোতিষীর চেম্বারে না গিয়ে ওই অনুষ্ঠানে ফোন করে নিজের ভাগ্য জেনে নিচ্ছেন দীপশ্রী জোশির (৩৯) মতো হাজারো মানুষ। দীপশ্রী বলেন, এটা এতটাই সুবিধাজনক ও চমকপ্রদ যে টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে শুধু একটি ফোন করেই নিজের ভাগ্য জেনে নেওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি তাঁদের বিশ্বাস করি। কারণ তাঁদের দেওয়া ভবিষ্যদ্বাণী প্রায়ই সঠিক প্রমাণিত হয়। আমার অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে অনুষ্ঠানটি আমাকে সহায়তা করছে।’
ফোনদাতা ব্যক্তিদের ভবিষ্যত্ জানতে বিশেষভাবে তৈরি একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে থাকেন শাস্ত্রী (৩৪)। অনুষ্ঠানে তাঁকে সহযোগিতা করেন একজন নারী উপস্থাপক। ফোনদাতা ব্যক্তির বিভিন্ন তথ্য কম্পিউটারে লিপিবদ্ধ করেন তিনি।
প্রথম দিকে অনুষ্ঠানটি সপ্তাহে এক দিন প্রচার করা হতো। কিন্তু অনুষ্ঠানটি এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে টেলিভিশন চ্যানেল কান্তিপুর টেলিভিশন এ অনুষ্ঠানটি প্রতিদিন প্রচারের সিদ্ধান্ত নেয়। সপ্তাহে প্রায় ৫০০ মানুষ অনুষ্ঠানে ফোন করে থাকে।
শাস্ত্রী বলেন, ‘গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের পরিবর্তন বিশ্বের সবাইকে প্রভাবিত করে থাকে। আজকের এই দিনে আপনি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছেন। জ্ঞান পুরোনো, কিন্তু আপনি নতুন নতুন চিন্তাধারা একীভূত করতে পারেন। এটা একটা ফিউশন।’ অনলাইনে গ্রাহকসেবা দেওয়ার জন্য এখন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করছেন বাসুদেব কৃষ্ণ শাস্ত্রী।
শাস্ত্রীর অনুষ্ঠানে ফোন করছে স্কুলের শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ লোকজন। নানাজন নানা বিষয়ে জানতে চায়। জানতে চায় পরীক্ষার ফলাফল থেকে শুরু করে বিয়ের খবর পর্যন্ত। স্কুলের শিশুরা ফোন করছে পরীক্ষার ফল জানতে। নাতি-নাতনিরা কাকে বিয়ে করতে যাচ্ছে, সেটা জানতে ফোন করছেন বয়োজ্যেষ্ঠ দাদুরা।
তবে মানুষ সবচেয়ে বেশি জানতে চায় তিনটি বিষয়। এগুলো হচ্ছে তাঁরা কাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তাঁরা কী পরিমাণ আয় করবেন এবং কপালে বিদেশ ভ্রমণ আছে কি না? শাস্ত্রী জানান, তরুণেরা বিশেষ করে জানতে চান, তাঁরা মনের মানুষকে পাবেন কি না?
হিন্দু অধ্যুষিত নেপালে জ্যোতিষবিদ্যার শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। যেখানে বিয়ে, এমনকি নির্বাচনের তারিখও নির্ধারণ করা হয় গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। আর এ কারণেই অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
শাস্ত্রী বলেন, মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই কৌতূহলী। মানুষ নিজের ও নিজের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে জানতে চায়। তিনি জানান, ভবিষ্যত্ জানতে তাঁর কাছে যাঁরা আসেন, তাঁদের মধ্যে অনেক বড় রাজনীতিকও রয়েছেন।
শাস্ত্রী বলেন, রাজনীতিকদের জিজ্ঞাস্য হচ্ছে, তাঁরা ক্ষমতায় যেতে পারবেন কি না, ভবিষ্যতে সরকারে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না? তিনি বলেন, অনেক কমিউনিস্ট নেতা তাঁর কাছে এসে নিজেদের ভবিষ্যত্ সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। তাঁর গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছেন অনেক জ্যেষ্ঠ মাওবাদী নেতাও।
এএফপি অবলম্বনে দাউদ ইসলাম।

হিংস্র সামুদ্রিক প্রাণী প্লিওসরের জীবাশ্মকৃত খুলি উদ্ধার

১৫ কোটি বছর আগের একটি হিংস্র সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্মকৃত মাথার খুলি পাওয়া গেছে। ব্রিটেনের জুরাসিক উপকূলে সম্প্রতি প্লিওসর নামের ওই বিশালাকার প্রাণীটির খুলি উদ্ধার হয়েছে। ২ দশমিক ৪ মিটার লম্বা এই খুলিটি দেখে গবেষকেরা বলেছেন, এটি এযাবত্কালের মধ্যে উদ্ধারকৃত বড় প্লিওসরের জীবাশ্মগুলোর একটি। উদ্ধার করা খুলিতে চোয়ালের নিচের ভাগ এবং মাথার ওপরের অংশ রয়েছে।
খুলিটি জুরাসিক উপকূলের স্থানীয় এক সংগ্রাহক উদ্ধার করেছেন। ডরসেট কাউন্টি কাউন্সিল খুলিটি কিনে নিয়েছে। হেরিটেজ লটারি ফান্ডের অর্থের জোগান দিয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার পর খুলিটি ডরসিট কাউন্টি জাদুঘরে এটি প্রদর্শন করা হবে।
জীবাশ্মবিদ রিচার্ড ফরেস্ট বলেছেন, ‘আমি প্রথমে শুনেছিলাম একটা বিশাল কিছু উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু পরে দেখি এটি খুলির চোয়ালের নিচের অংশ। তবে নিঃসন্দেহে এটি বড় কোনো প্লিওসরের খুলি।’
প্লিওসর হলো হিংস্র জলজ সরীসৃপ প্লেসিওসর গোষ্ঠীর বিকশিত রূপ। কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে যখন ডাইনোসরের বিচরণ ছিল, সে সময় প্লিওসরেরও বিচরণ ছিল। এরা সমুদ্রে দাপিয়ে বেড়াত। তাদের নখ ছিল ছোট ছোট। তবে এদের শক্তিশালী চোয়াল এবং খুবই ধারালো দাঁত ছিল। বিশাল দেহ নিয়ে সাঁতার কাটার জন্য চারটি বড় ডানা ছিল প্লিওসরের।
ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের জীবাশ্মবিদ ডেভিড মার্টিল বলেন, প্লিওসরের ঘাড়ে বিশাল পেশি ছিল। এরা প্রথমে শিকারি প্রাণীকে কামড় দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখত। পরে ওই প্রাণীটিকে ঘাড়ের সেই বিশাল পেশিতে নিয়ে আছড়িয়ে টুকরো টুকরো করত।
মার্টিল বলেন, খুলিটি আসলেই বিশাল। আমি এটি দেখে বিস্মিত হয়েছি। কারণ, প্লিওসরটি কত বড় ছিল তা এ বিশাল খুলি দেখে অনুমান করা যায়।
গবেষকেরা বলেন, খুলির আকার অনুযায়ী প্লিওসরটি ১০ থেকে ১৬ মিটার (৩৩ থেকে ৫২ ফুট) লম্বা ছিল। আর এর ওজন ছিল ৭ থেকে ১২ টন।

‘শিকাগো সান টাইমস’-এর মালিকানা বদল

যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো সান-টাইমস পত্রিকা এবং এর সহযোগী কয়েকটি প্রকাশনা কিনে নিয়েছে স্থানীয় একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ। গত সোমবার এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষ এ তথ্য দিয়েছে।
জেমস টাইরির নেতৃত্বাধীন শিকাগো অর্থ বিনিয়োগকারী গ্রুপ নগদ ৫০ লাখ ডলারের বিনিময়ে সান-টাইমস ছাড়াও শহরতলি থেকে প্রকাশিত সাতটি দৈনিক ও ৫১টি সাপ্তাহিকের মালিকানা কিনে নিয়েছে। এ ছাড়া দুই কোটি ১৫ লাখ ডলার ঋণ পরিশোধের চুক্তি সই করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৫তম শীর্ষ এই দৈনিকটিকে গত মার্চ মাসে দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা শতকরা ১১ দশমিক ৯৮ ভাগ কমে যায়। শেষমেশ পত্রিকাটি বিক্রির সংখ্যা মাত্র দুই লাখ ৭৫ হাজার ৬৪১টিতে নেমে আসে।
জেমস টাইরির নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে, বিপুল উদ্যমে নতুন করে বেরুবে সান-টাইমস।

ভারতীয় নাগরিকদের পাকিস্তানে ভ্রমণ না করার পরামর্শ

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সে দেশের নাগরিকদের পাকিস্তানে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর জঙ্গি হামলার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা।
গতকাল মঙ্গলবার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে নিয়মিত জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটছে। তাই ভারতীয় সরকার মনে করে, পাকিস্তানের পাঞ্জাবে গুরুদুয়ারা পরিদর্শনের জন্য তীর্থযাত্রীদের এই মুহূর্তে সেখানে ভ্রমণ করাটা ঠিক হবে না। এ ছাড়া পাকিস্তানের নিরাপত্তা-পরিস্থিতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত ভারতীয় নাগরিকদের সে দেশে এ ধরনের কোনো ভ্রমণে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’ ৫ অক্টোবর ইসলামাবাদে জাতিসংঘ খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) কার্যালয়ে আত্মঘাতী বোমা হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত সেখানে দুই শরও বেশি মানুষ জঙ্গি সহিংসতায় মারা গেছে।

রাশিয়া-ভারত-চীন বৈঠকে ঐক্য বাড়ানোর প্রতি গুরুত্বারোপ

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর বেঙ্গালুরুতে গতকাল মঙ্গলবার রাশিয়া-চীন-ভারত পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে যৌথ ঘোষণাপত্রে পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তিন দেশের মধ্যে ঐক্যের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা টিকিয়ে রাখতে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে ওই ঘোষণাপত্রে।
ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব থাকার পরও এই তিন দেশের উন্নয়নের গতি ভালো। বৈঠকে অংশ নেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণা, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং জাইচি ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ।
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো বিশ্বের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি। তাই আন্তর্জাতিক সংকটের বিষয়গুলো নিয়ে সমভাবেই উদ্বিগ্ন আমরা।’ যৌথ ঘোষণাপত্রে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ জানিয়েছে এই তিন দেশ। এ ব্যাপারে আগামী ডিসেম্বরে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠেয় জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘ সম্মেলনে কার্যকর ভূমিকা রাখার ব্যাপারে কাজ করার আশাবাদ জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ এই তিন দেশে বাস করে এবং মোট ভূ-ভাগের ২০ শতাংশ নিয়ে তিন দেশের সীমানা।
এদিকে চীন-ভারত সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন ভারতের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী শশী থারুর। স্থানীয় টেলিভিশন এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, সীমান্তের সমস্যা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। অল্প কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। সম্প্রতি, নির্বাসিত তিব্বতি আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামার ভারত সফর নিয়ে আপত্তি জানায় চীন।
এর আগে ২১ অক্টোবর মস্কোতে বৈঠক করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ ও ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী কৃষ্ণা। অন্যদিকে গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সম্মেলনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের মধ্যে বৈঠক হয়।

ফিলিস্তিনিদের পানি পাওয়া থেকে বঞ্চিত করছে ইসরায়েল

ইসরায়েল নিরাপদ পানি পাওয়া থেকে ফিলিস্তিনিদের বঞ্চিত করছে বলে অভিযোগ করেছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের কারণে ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের বাসিন্দারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। ইসরায়েলি সেনাসদস্যরা গাজা ভূখণ্ড অবরোধ করে রাখায় এই পানিসংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ইসরায়েল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এই প্রতিবেদন ত্রুটিপূর্ণ অভিহিত করে বলেছে, ১৯৯০ সালের শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ফিলিস্তিনিরা বেশিই পানি পাচ্ছে।
১১২ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিন গড়ে যেখানে ৭০ লিটার পানি পায়, সেখানে ইসরায়েল পায় ৩০০ লিটার। অ্যামনেস্টি বলেছে, জরুরি অবস্থায় প্রয়োজনীয় ২০ লিটার পানিও পায় না ফিলিস্তিনিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের পানি উত্তোলন করতে দেয় না। এমনকি ইসরায়েল এখানকার জলাধার ধ্বংস করে দিয়েছে এবং পানির ট্যাংক দখল করে নিয়েছে। অথচ ইসরায়েলি নাগরিকেরা সুইমিংপুলে সাঁতার কেটে আনন্দ করছে।
অন্যদিকে গাজায় বিধ্বস্ত বাড়িঘরে আবার যাতে পানি উত্তোলনের ব্যবস্থা না করতে পারে, সে জন্য ইসরায়েলি সেনাসদস্যরা সেখানে ফিলিস্তিনিদের পানি উত্তোলনের জন্য দরকারি জিনিসপত্র আনতে দেয় না।
অ্যামনেস্টি বলেছে, ইসরায়েল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় পানির প্রধান উত্স থেকে পাওয়া মোট পানির ৮০ শতাংশই ইসরায়েল ব্যবহার করে। সংস্থাটির কর্মকর্তা দোনাটেল্লা রোভেরা বলেন, মানুষের মৌলিক চাহিদা ও অধিকার হচ্ছে পানি। কিন্তু অনেক ফিলিস্তিনি নাগরিক নিম্নমানের পানি ও নামমাত্র পানি ছাড়া কিছুই পায় না। তিনি বলেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই এই বৈষ্যম্যমূলক নীতি পরিহার করতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব ফিলিস্তিনিদের ওপর আরোপিত বিধি-নিষেধ তুলে নেওয়া দরকার তাদের। তিনি ইসরায়েলের প্রতি পানির সমবণ্টন-ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সৃষ্ট মানবিক সমস্যা নিরসনের আহ্বান জানান।
ইসরায়েল সরকারের মুখপাত্র মার্ক রেগেভ বলেন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনটি সঠিক নয়। পানির সংকটের জন্য ফিলিস্তিনিদের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন তিনি। ফিলিস্তিনিদের কূপ খননে ইসরায়েল বাধা দিচ্ছে—এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ইসরায়েল পানি ব্যবস্থাপনার জন্য ৮২টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এর মধ্যে মাত্র ২৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

আফগানিস্তানে নতুন করে সেনা মোতায়েনে কোনো তাড়া নেই: বারাক ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, আফগানিস্তানে নতুন করে আরও সেনা পাঠানোর প্রশ্নে তাঁর কোনো তাড়া নেই। গত সোমবার ফ্লোরিডায় একটি নৌ-ঘাঁটি পরিদর্শনকালে সেখানে কর্মরত নৌসেনাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতার সময় ওবামা এ কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, ‘খুব প্রয়োজন না হলে আমি আমার দেশের সেনাদের মৃত্যুর মুখে ফেলে দিতে পারি না।’
সম্প্রতি আফগানিস্তানে আরও বেশিসংখ্যক সেনা পাঠানোর আবেদন জানান আফগানিস্তানে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সেনা কমান্ডার। তারপর থেকেই আফগানিস্তানে সেনাসংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে ওবামা প্রশাসন চাপের মুখে রয়েছে।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি আফগানিস্তানে আরও বেশিসংখ্যক সেনা মোতায়েনের ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতার জন্য প্রেসিডেন্ট ওবামার কড়া সমালোচনা করার কয়েক দিনের মধ্যে ওবামা এসব কথা বললেন।
ফ্লোরিডায় জ্যাকসন ভিলা সামরিক ঘাঁটিতে সেনাসদস্যদের উদ্দেশ্যে ওবামা বলেন, ‘কোনো ক্ষতিকর কাজের জন্য আপনাদের পাঠানোর আগে আমাকে এর বিভিন্ন দিক ভালোভাবে দেখে নিতে হবে। অযথা আমি আপনাদের জীবন বিপন্ন করতে চাই না।’ তিনি সেনাদের আশ্বস্ত করে বলেন, যদি আফগানিস্তানে শেষ পর্যন্ত সেনা পাঠাতেই হয়, তাহলে প্রশাসন সেনাদের সর্বোচ্চ সহায়তা দেবে।
বারাক ওবামা কোনো জায়গায় সেনা পাঠানোর আগে সেনাদের রণকৌশল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা, নিশ্চিত লক্ষ্য, পর্যাপ্ত যুদ্ধ-সরঞ্জামের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এর আগে বারাক ওবামা তাঁর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাদের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে প্রতিরক্ষা নীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

জুলাই মাসে বাজেট ঘাটতি ৩৫৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে অর্থাত্ জুলাই মাসে দেশে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
গত বছর জুলাই মাসে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ২৮৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এর মানে এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি অর্থায়ন ছয় ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
এই সময়কালে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সরকারকে তেমন কোনো অর্থ ব্যয়ই করতে হয়নি। এডিপি বাবদ জুলাই মাসে ৪৮২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ একই সময়ে ছাড় করা হয়েছে এক হাজার ২০৫ কোটি টাকা।
জুলাই মাসে এডিপির ব্যয় মোট বরাদ্দের মাত্র দুই শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান থেকে আরও জানা যায়, জুলাই মাসে সরকার ব্যাংক থেকে কার্যত কোনো ঋণ গ্রহণ করেনি। বরং বকেয়া বাবদ ৬৮১ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করেছে।
তবে ব্যাংকবহির্ভূত উত্স থেকে সরকার এক হাজার তিন কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে, এর প্রায় পুরোটাই সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাবদ।
অথচ গত বছর জুলাই মাসে চিত্রটা ছিল প্রায় বিপরীত। সে সময় ব্যাংক থেকে সরকার এক হাজার ৬২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ গ্রহণ করেছিল। আর ব্যাংকবহির্ভূত উত্স থেকে ঋণ নিয়েছিল ৫০২ কোটি টাকা।

১৭ মাস পর বিদেশে বিনিয়োগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করল চীন

চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো আবার বিদেশি সিকিউরিটিজ কিনতে পারবে। আর্থিক সংকট দেখা দেওয়ার পরপরই ২০০৮ সালের মে মাসে চীন থেকে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল চীন সরকার।
১৭ মাস পর এই বাধা তুলে নেওয়ার মধ্য দিয়ে চীন সরকার মন্দার সবচেয়ে খারাপ অবস্থা কেটে গেছে বলে মনে করছে—এমনটাই মন্তব্য বিশ্লেষকদের।
ইতিমধ্যে ই ফান্ড ম্যানেজমেন্ট ও চায়না মার্চেন্টস ফান্ড ম্যানেজমেন্টকে যথাক্রমে ১০০ কোটি ও ৫০ কোটি ডলার বিদেশি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকেরাও এও বলছেন যে বিদেশি বিনিয়োগ করার অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে চীন আসলে দেশ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ বাইরে পাঠানোর ব্যাপারেই আভাস দিয়েছে। এর মাধ্যমে চীনা মুদ্রা ইউয়ানের ওপর ক্রমাগত শক্তিশালী হওয়ার চাপও কমে আসবে।
বাণিজ্যিক ভারসাম্যে বিরাট অঙ্কের উদ্বৃত্তাবস্থা এবং বিদেশি বিনিয়োগের বিপুল পরিমাণ অন্তর্মুখী প্রবাহ চীনের মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি করেছে। এর ফলে চীনা মুদ্রা ডলারের বিপরীতে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে।
অবশ্য চীনের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদাররা মনে করছে, ইউয়ান এখন অবমূল্যায়িত। কাজেই এর উর্ধ্বমুখী মূল্যায়ন হওয়া উচিত। অর্থাত্ ডলার বা ইউরোর বিপরীতে ইউয়ানের দর আরও কম হওয়া উচিত। বর্তমানে গড়ে এক ডলার সমান প্রায় সাত ইউয়ান।
চীন অবশ্য ইউয়ানকে আরও শক্তিশালী করে তার রপ্তানিকারকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে আগ্রহী নয়। সে কারণেই ইউয়ানের ওপর চাপ কমানোর বিভিন্ন কৌশল নিচ্ছে দেশটি।
চীনে ইউবিএস সিকিউরিটিজের প্রধান অর্থনীতিবিদ ওয়াং তাও বলেন, ‘বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে এখন দেশের বাইরে পুঁজি যেতে দিতে হবে। তবে সরকার নিয়ন্ত্রিতভাবে পুঁজির এই প্রবাহ বাইরে যেতে দিতে আগ্রহী।’
চীন সরকার এখন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিক হারে বিদেশে সরাসরি বিনিয়োগ করায় উত্সাহিত করছে। একই সঙ্গে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ড ও শেয়ার বিক্রি করে পুঁজি বাড়ানোর অনুমতি দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে।
এই দুটি পদক্ষেপ ইউয়ানের ওপর চাপ কমিয়ে দেবে বলে ধারণা করা হয়।
উল্লেখ্য, এ বছর জানুয়ারির শেষে চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল এক লাখ ৯১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, যা সেপ্টেম্বরের শেষে এসে দাঁড়ায় দুই লাখ ২৭ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

জার্মানির উদ্যোক্তাদের বিদ্যুত্ খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব এমসিসিআইয়ের

বাংলাদেশ সফররত জার্মানির শিল্পোদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিদ্যুত্ খাতে; বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক, বায়ুচালিত, সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের প্রভাবশালী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।
একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠনটি দেশের অন্যান্য অবকাঠামোর মধ্যে বন্দর, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
অন্যদিকে জার্মান ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও বলেছে, কয়লাভিত্তিক ও সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্প নির্মাণে তাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে লভ্যাংশের পুরো অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকলে বিদ্যুত্সহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে তারা বিনিয়োগ আগ্রহী।
গতকাল মঙ্গলবার জার্মান এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যাসোসিয়েশনের (ওএভি) একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল এমসিসিআইয়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল হাফিজ চৌধুরী। আরও বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের সহসভাপতি নাসিম মঞ্জুর, পরিচালক নিহাদ কবীর, উপদেষ্টা সি কে হায়দার প্রমুখ। জার্মান বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পিটার ক্লাসেন।
স্বাগত বক্তব্যে আবদুল হাফিজ চৌধুরী বলেন, জার্মানি হলো বাংলাদেশের অন্যতম ব্যবসায়িক অংশীদার। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ছিল ১৪৯ কোটি সাড়ে ৮৬ লাখ ডলার। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৫৮ কোটি ডলার।
আর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জার্মানিতে ২২৬ কোটি সাড়ে ৯৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ ওভেন পোশাক ও ২৪ শতাংশ নিট পোশাক।
এ ছাড়া জার্মানিতে চিংড়ি, হোম টেক্সটাইল, কাঁচা পাট, কৃষিজাত পণ্য, জাহাজ ও চামড়া রপ্তানি হয়ে থাকে।
এমসিসিআইয়ের সভাপতি আরও বলেন, জার্মানি থেকে পণ্য আমদানিও ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। দেশটি থেকে মূলত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রায় ২৮ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছিল।
আবদুল হাফিজ চৌধুরী বলেন, বিশ্বমন্দার প্রভাবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এবার শিল্পোত্পাদনও কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা মন্থর গতি দেখা দিলেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ২২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এমসিসিআইয়ের সভাপতি কয়লাভিত্তিক, বায়ুচালিত, সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্পসহ অন্যান্য অবকাঠামোর মধ্যে বন্দর, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব করেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নানা ধরনের সরকারি সুবিধার কথা তুলে ধরে আবদুল হাফিজ চৌধুরী জার্মানির উদ্যোক্তাদের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) প্রকল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
জার্মান বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের নেতা পিটার ক্লাসেন বলেন, বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে চমত্কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশীদারি ৮০ শতাংশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও আমলাতন্ত্রিকতা ও উপযুক্ত অবকাঠামো না থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না।
পিটার ক্লাসেন আরও বলেন, কয়লাভিত্তিক ও সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্প নির্মাণে তাঁদের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প স্থাপন করে তার লভ্যাংশের অর্থ দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকলে বিদ্যুত্সহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে জার্মানির উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী বলে তিনি জানান।

জার্মানির উদ্যোক্তাদের বিদ্যুত্ খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব এমসিসিআইয়ের

বাংলাদেশ সফররত জার্মানির শিল্পোদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিদ্যুত্ খাতে; বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক, বায়ুচালিত, সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের প্রভাবশালী সংগঠন মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)।
একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠনটি দেশের অন্যান্য অবকাঠামোর মধ্যে বন্দর, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
অন্যদিকে জার্মান ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও বলেছে, কয়লাভিত্তিক ও সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্প নির্মাণে তাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে লভ্যাংশের পুরো অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকলে বিদ্যুত্সহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে তারা বিনিয়োগ আগ্রহী।
গতকাল মঙ্গলবার জার্মান এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যাসোসিয়েশনের (ওএভি) একটি বাণিজ্য প্রতিনিধিদল এমসিসিআইয়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল হাফিজ চৌধুরী। আরও বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের সহসভাপতি নাসিম মঞ্জুর, পরিচালক নিহাদ কবীর, উপদেষ্টা সি কে হায়দার প্রমুখ। জার্মান বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পিটার ক্লাসেন।
স্বাগত বক্তব্যে আবদুল হাফিজ চৌধুরী বলেন, জার্মানি হলো বাংলাদেশের অন্যতম ব্যবসায়িক অংশীদার। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ছিল ১৪৯ কোটি সাড়ে ৮৬ লাখ ডলার। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ২৫৮ কোটি ডলার।
আর ২০০৮-০৯ অর্থবছরে জার্মানিতে ২২৬ কোটি সাড়ে ৯৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ১৭ শতাংশ ওভেন পোশাক ও ২৪ শতাংশ নিট পোশাক।
এ ছাড়া জার্মানিতে চিংড়ি, হোম টেক্সটাইল, কাঁচা পাট, কৃষিজাত পণ্য, জাহাজ ও চামড়া রপ্তানি হয়ে থাকে।
এমসিসিআইয়ের সভাপতি আরও বলেন, জার্মানি থেকে পণ্য আমদানিও ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। দেশটি থেকে মূলত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রায় ২৮ কোটি ২৯ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছে। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করা হয়েছিল।
আবদুল হাফিজ চৌধুরী বলেন, বিশ্বমন্দার প্রভাবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এবার শিল্পোত্পাদনও কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা মন্থর গতি দেখা দিলেও প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ ২২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এমসিসিআইয়ের সভাপতি কয়লাভিত্তিক, বায়ুচালিত, সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্পসহ অন্যান্য অবকাঠামোর মধ্যে বন্দর, পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব করেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নানা ধরনের সরকারি সুবিধার কথা তুলে ধরে আবদুল হাফিজ চৌধুরী জার্মানির উদ্যোক্তাদের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) প্রকল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
জার্মান বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের নেতা পিটার ক্লাসেন বলেন, বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে চমত্কার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশীদারি ৮০ শতাংশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও আমলাতন্ত্রিকতা ও উপযুক্ত অবকাঠামো না থাকায় বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না।
পিটার ক্লাসেন আরও বলেন, কয়লাভিত্তিক ও সৌরবিদ্যুত্ প্রকল্প নির্মাণে তাঁদের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশে অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে শিল্প স্থাপন করে তার লভ্যাংশের অর্থ দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ থাকলে বিদ্যুত্সহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে জার্মানির উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী বলে তিনি জানান।

সিমেন্ট খাত আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে BY হানিফ মাহমুদ

দেশের সিমেন্ট খাত নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। মাঝখানের মন্দাবস্থা কাটিয়ে উত্পাদনে গতিশীলতা এসেছে। প্রসারিত হয়েছে রপ্তানি বাজার। আবার সরকার বড় বড় কিছু অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ায় দেশীয় সিমেন্টের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। আর এসব কিছুকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুসারে, বিগত দুই দশকে দেশে ছোট-বড় প্রায় ৭০টি সিমেন্ট কারখানা গড়ে ওঠে। মোট উত্পাদনক্ষমতা দাঁড়ায় দুই কোটি টন। কিন্তু বাজার না পেয়ে বিগত কয়েক বছরে এই উত্পাদনক্ষমতার অর্ধেক অব্যবহূত হয়ে পড়েছিল। বন্ধ হয়ে গেছে ৩৫টি কারখানা।
তবে ২০০৯ সালটি আবার নতুন করে আশার আলো দেখাতে শুরু করেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট নির্মাতা বড় বড় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফলও ভালো। এটাও সিমেন্ট খাতের গতিময়তার আভাস দিচ্ছে।
গোড়ার কথা: নব্বইয়ের দশকের আগে বাংলাদেশে সিমেন্টের চাহিদার সিংহভাগই পূরণ হতো বিদেশ থেকে আমদানি করে। স্থানীয় উত্পাদন বলতে মূলত সরকারি খাতে সুনামগঞ্জের ছাতক সিমেন্ট কারখানা। ১৯৪১ সাল থেকে এখানে সিমেন্ট উত্পাদিত হচ্ছে।
এই পুরোনো সিমেন্ট কারখানার বাইরে স্বাধীনতার পর প্রথম বেসরকারি খাতে সিমেন্ট কারখানা গড়ে ওঠে ১৯৯২ সালে। মাত্র পাঁচ বছরে আরও আটটি কারখানা গড়ে ওঠে বার্ষিক প্রায় ৩২ লাখ টন উত্পাদনক্ষমতা নিয়ে।
তবে নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে নির্মাণ খাতের বড় প্রবৃদ্ধি দেখে একসময়ের সিমেন্ট আমদানিকারকেরা সবাই বিদেশ থেকে ক্লিংকার এনে দেশে সিমেন্ট তৈরির কারখানা নির্মাণের হুজুগে মেতে ওঠে। এর ফলে একপর্যায়ে বাজার চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি উত্পাদনক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়।
তীব্র প্রতিযোগিতা ও বড় বড় অবকাঠামো খাতে সরকারি বিনিয়োগের নিম্ন গতিতে বাজার না পেয়ে অনেক কোম্পানিই মুখ থুবড়ে পড়ে।
হালচিত্র: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তালিকাভুক্ত তিনটি বড় সিমেন্ট উত্পাদন কোম্পানি হাইডেলবার্গ, লাফার্জ সুরমা ও মেঘনা সিমেন্ট—সবারই অর্ধবার্ষিক (জানুয়ারি-জুন ২০০৯) ফলাফল ইতিবাচক। তাদের মধ্যে লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট উত্পাদনের পাশাপাশি ক্লিংকার উত্পাদন করে থাকে।
হাইডেলবার্গ সিমেন্টের বার্ষিক উত্পাদনক্ষমতা বছরে ১৫ লাখ টন। তারা রুবি ও স্ক্যান নামের দুটি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট বাজারজাত করে। কোম্পানির দাবি অনুযায়ী মোট বাজারের প্রায় ১৩ শতাংশ তাদের দখলে।
ডিএসই বলছে, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট ২০০৯ সালের প্রথম ছয় মাসে তাদের দুটি ব্র্যান্ডের সিমেন্ট বিক্রি থেকে আয় করেছে প্রায় ৪১০ কোটি টাকা। গত বছর একই সময় প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৩৪৫ কোটি টাকা।
বিশ্বের অন্যতম সিমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানি লাফার্জের বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান লাফার্জ সুরমারও এ বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের ব্র্যান্ড সুপারক্রিট ও ক্লিংকার বিক্রি থেকে আয় বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে তাদের মোট আয় হয়েছে ৩৮০ কোটি টাকা। গত বছর একই সময় প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ২৯৭ কোটি টাকা। অর্থাত্ প্রবৃদ্ধি প্রায় ২৭ শতাংশ।
প্রায় ১০ লাখ টন উত্পাদনক্ষমতার মেঘনা সিমেন্ট কিং ব্র্যান্ডের সিমেন্ট বাজারজাত করে থাকে। ডিএসই তথ্য অনুসারে ২০০৯ সালের প্রথম ছয় মাসে তাদের সিমেন্ট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ২৩৯ কোটি টাকা। গত বছর একই সময় তাদের আয় ছিল ১৭৬ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশে সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিগত দুই বছরের তুলনায় এ বছর পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। তবে এখনো উত্পাদনক্ষমতার অর্ধেক ব্যবহূত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধও হয়ে গেছে।’
মোস্তফা কামাল এ খাতের দুটি আশার খবর জানালেন। উত্পাদকেরা নিজেরাই ভারতসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানির বাজার তৈরি করে ফেলেছে। ভারতেই এখন প্রতিমাসে অন্তত ১২ হাজার টন সিমেন্ট রপ্তানি হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারের হাতে বেশ কিছু বড় প্রকল্প আছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রাস্তা চার লাইন করা, পদ্মা সেতু নির্মাণ, ঢাকা শহরে একাধিক ফ্লাইওভার নির্মাণের মতো বড় বড় অবকাঠামোর কাজ যদি আগামী বছর শুরু হয়, তাহলে সিমেন্ট খাতে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যাবে।
রপ্তানি চিত্র: রপ্তানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার টন সিমেন্ট ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোয় রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি করছে হোলসিম বাংলাদেশ, শাহ সিমেন্ট, মেঘনা সিমেন্ট, মদিনা সিমেন্ট, আরামিট সিমেন্ট, এমআই সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্টসহ প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠান।
তাদের মধ্যে হোলসিম বাংলাদেশ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে শক্ত জায়গা করে নিয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানি হোলসিমের বার্ষিক উত্পাদনক্ষমতা ১৩ লাখ টন।
কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ২০০০ সাল থেকে কোম্পানিটি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। জাতীয়ভাবে মোট বাজারের আট শতাংশ তাদের দখলে। তবে ঢাকার বাজারের ১৭ শতাংশ হোলসিম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৮ সালে ৩২ হাজার টন সিমেন্ট ভারতে রপ্তানি করেছে। আর বর্তমানে প্রতি মাসে এ প্রতিষ্ঠান আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টন সিমেন্ট ভারতে রপ্তানি করছে।
দেশের অন্যতম রড়-সিমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানি আবুল খায়ের গ্রুপের শাহ সিমেন্টও রপ্তানি বাড়াচ্ছে। কভার্ডভ্যানে ঘরে ঘরে সিমেন্ট পৌঁছে দিয়ে বাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল শাহ সিমেন্ট। বার্ষিক ছয় লাখ টন উত্পাদনক্ষমতার দুটি ইউনিট স্থাপন করে এক দশক আগে কোম্পানিটির যাত্রা শুরু।
জানা গেছে, ক্রাউন ব্র্যান্ডের বাজারজাতকারী এম আই সিমেন্টের হাতে বর্তমানে বড় বড় রপ্তানি আদেশ আছে। ত্রিপুরা থেকে এ বছর তারা ১২ হাজার টন রপ্তানির আদেশ পেয়েছে।
রেকর্ড উত্পাদন: সিমেন্ট প্রস্তুতকারকদের সূত্রে জানা গেছে, অনেক বছর পর আবার ২০০৯ সালে একটি রেকর্ড হতে পারে। বাংলাদেশে সিমেন্ট খাতের ইতিহাসে মাত্র একবার ২০০৬ সালে এক কোটি টনের ওপরে সিমেন্ট উত্পাদন হয়ে ছিল। উত্পাদকদের আশা, রপ্তানির বাজার যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে যদি সরকারের বড় বড় নির্মাণকাজ শুরু হয়, তাহলে এ বছর উত্পাদন এক কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। আর অল্প সময়ের মধ্যেই উত্পাদনক্ষমতার পুরোটাই ব্যবহার শুরু হবে দেশে।

আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হলো কার -স্মরণ by শারমিনী আব্বাসী

দক্ষিণের আকাশে মেঘ ডাকলে নদীর কোল ভরে ওঠে। আকাশের দ্রিম দ্রিম শব্দে ছোট মাছের বুক কাঁপে। খোলা পাটক্ষেতে পট পট শব্দে পাট ভাঙার শব্দ ভাসে। ভোররাত থেকে ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছে কৃষাণীরা। তার ছন্দময় লয় শোনা যায়। নতুন বউ বাপের বাড়ি যাচ্ছে। তার নতুন শাড়ির পাড়েরও তো একটা খসসর-মসসর শব্দ আছে, ছন্দ আছে। আর কালজানির বিস্তীর্ণ জলরাশিজুড়ে সুরের সাম্পান। সবই আমোঘ অলৌকিক অতিন্দ্রীয় হয়ে ধরা পড়ে কিশোর আব্বাসের শ্রবণেন্দ্রিয়ের সঞ্চয়ে। তাই সে স্কুল ফিরতি পথে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে কণ্ঠে তুলে নেয় সুর। সেই আব্বাসই কালের কপোলতলে সুরসম্রাট আব্বাসউদ্দিন আহমদ, সংগীতের জাদুস্পর্শে যিনি একদা পশ্চাত্পদ তত্কালীন মুসলমান সমাজে কুসংস্কার ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে ঘটিয়েছিলেন রক্তহীন বিপ্লব, সুর ও বাণীর মায়া দিয়ে। আজকের বাংলাদেশ তাই তাঁর কাছে চিরঋণী; আজকের সংগীত বিস্তৃত নীলাকাশ, খোলা পরিসর পেয়েছে যে একজন কিংবদন্তির সংগীত প্রতিভার বিরল সংগ্রামে, বেগবান হয়েছে সংগীতের খরস্রোতা নদী যাঁর কল্যাণে।
তাই আজ তাঁর জন্মের ১০৮ বছর পরও পদ্মা নদীর ওপর ছইতোলা নৌকার লাউড স্পিকারে যখন বাজে:
‘তোরষা নদীর উথাল পাথাল
কার চলে বা নাও
সোনা বন্ধুর বাদে রে মোর
কেমন করে গাও’
অমনি চকিতে বাংলার মানুষ চিনে নেয়, ওই তো আব্বাসের গান। তেমনি সময়ের সুকণ্ঠ অর্ণবের টাটকা সিডিতে যখন বাজে ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে’...ভক্তহূদয় চিনে নেয়, এ যে ‘উড়ালি বিড়ালী’ আব্বাসেরই গান।
আমার দাদু আব্বাসউদ্দিনকে আমি পাইনি, পেয়েছি তাঁর হাসিভরা ছবি। পেয়েছি তাঁর অমর লেখা জীবনীগ্রন্থ আমার শিল্পী জীবন-এর কথা, যেখানে পাওয়া যায় কলকাতা থেকে বঙ্গভঙ্গের পর বাংলাদেশে এলে পুরানা পল্টনের বাড়িতে তাঁর পরিবার নিয়ে পুনর্বার সংসার পাতার রোজনামচা।
বাড়ির সামনে ছিল অপূর্ব কেয়ারি করা ইউরোপীয় ধাঁচের লন। তাতে নানা ফুলের সমাহার। এই সবুজের মালাকার আর কেউ নন, আব্বাস। পেয়েছি তাঁর রেখে যাওয়া প্রায় ৭০০ গানের বাণী ও রেকর্ড। আমাদের পুরোনা গ্রামোফোনটি, যেটি দাদু পেয়েছিলেন গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে তাঁর ফেলে আসা গানের পুরস্কার হিসেবে, আজ তা ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সজ্জিত।
পুরানা পল্টনের বাড়িতে প্রতিটি ঘরে শোভা পেত তাঁর শিল্পীজীবনের অনুরণন, যেন সে বাড়ির কড়ি-বরগা-অলিন্দ থেকে উত্সারিত হতো সুরের ধারা। এই সুর হূদয়ের গহিন থেকে, কল্পলোকের বিস্তার থেকে, সাধনার বেদিমূলে অঙ্কুরিত। চেনা জীবনের অচেনা স্টেশনে গ্রথিত যে সংগীত, সেই সংগীতের কথা বলছি। ঘরে ঘরে কৃতী সংগীতজ্ঞদের ছবি শোভা পেত। আঙ্গুরবালা দেবী, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কাজী নজরুলের ঝাঁকড়া চুল আন্দোলিত হতো।
আজ অবশ্য সংগীত শব্দটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে মিউজিক দিয়ে। আব্বাসউদ্দিন বলে গিয়েছিলেন, সংগীতের ইতিহাস আছে, ভূগোল নেই। তাই সংগীত না মিউজিক, সে বিতর্কের অবকাশ নেই। আছে শুধু সমর্পণের স্তব্ধতা নিয়ে আজকের শিল্পী হওয়া মানে ‘যাকে খুঁজে ফেরে বাংলাদেশ’। সঙ্গে শিল্পীর করুণ আবেদন, আমাকে প্লিজ ‘এসএমএস’ করুন। সাজসজ্জা আর যন্ত্রের অনুষঙ্গকে তীব্র করে যে পাঁচ মিনিটের মাদকতা, তাতে চোখ তৃপ্ত হয়, হূদয় নয়।
এসবের একটি গান একটি বছর পরিক্রমণেও কেউ মনে রাখে না। কিন্তু আব্বাসউদ্দিনের গান শত বছর পরও গাইছে বাংলার মানুষ, গাইছে শচীনদেব বর্মণের গান, ফেলে যাওয়া লালন ফকিরের সুর।
‘আমার নেভা ছিল মনের আগুন
জ্বালাইয়া গেলি
আমায় এত রাতে কেনে ডাক দিলি।’
হ্যাঁ দাদু, আজ রাতের শেষে আশ্বিনের বৃষ্টি ধোয়া সকালে তোমার জন্মদিনে তোমায় মনে করছি। প্রার্থনা করছি, আমাদের রুক্ষ জনপদে, বিভ্রান্ত উদাস সময়ের পেরিয়ে যাওয়া দাম্ভিক দিনলিপিতে আবার যেন সংগীতের মধুর উদ্ভাসিত দিনগুলো ফিরে আসে, ফিরে আসে সুরের স্বপ্ন সবার প্রাণে।

আমরাই পারি -জলবায়ু পরিবর্তন by বান কি মুন

ধীরে ধীরে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোপেনহেগেন সম্মেলনের কাছাকাছি চলে এসেছি। জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার অস্তিত্বের জন্য হুমকি—এ কথা সবাই মানে। তারপরও কী করতে হবে, তা নিয়ে এখনো আমরা একমত হতে পারছি না।
এমন হচ্ছে কেন? জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়াবলি বেশ জটিল। জাতীয় অর্থনীতি থেকে ব্যক্তির জীবনযাপন সবই আক্রান্ত হচ্ছে। রাজনৈতিক লেনদেন ও সম্পদের অঙ্গীকারের প্রশ্ন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কোনো দেশের পক্ষে এগুলোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ব্যাংককে সম্প্রতি জলবায়ু আলোচনায় আমরা এমনটাই দেখেছি। প্রত্যাশা ছিল আমরা অগ্রগতির দেখা পাব, অথচ দেখলাম অচলাবস্থা।
তথাপি সমঝোতার আশাজাগানিয়া কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। সঠিক অবস্থান নেওয়ার জন্য দরকার শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা। জাতীয় স্বার্থের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার মানসে খোলাখুলি ও গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নেওয়া দরকার।
এ বিষয়ে আমরা আশাবাদী হতে পারি। সম্প্রতি লন্ডনে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধিশালী ১৭টি দেশের (এ দেশগুলো বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ কার্বন নির্গমনের জন্য দায়ী) এক সভায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন জানিয়েছেন, দেশগুলো এতে সম্পৃক্ত হয়ে পরিবর্তনের কোনো সমন্বিত এজেন্ডা তুলে ধরলে কোপেনহেগেন সম্মেলনের সফলতা দুরবর্তী কোন বিষয় হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ। জন কেরি ও লিন্ডসে গ্রাহাম সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দল সমর্থিত পদক্ষেপ ঘোষণার মাধ্যমে এ বিষয়ে আপসের মানসিকতা দেখিয়েছেন, তা আমাকে উত্সাহিত করেছে। একজন ডেমোক্রেট অন্যজন রিপাবলিকান সিনেটর; তাঁরা দলীয় পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যিকারের লেনদেনের মানসিকতা নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে মতৈক্যে পৌঁছেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল দর্শক হয়ে থাকার মতো সময় দেওয়ার ঝুঁকি আমরা আর নিতে পারব না। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কোপেনহেগেনে সমঝোতায় পৌঁছাতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দ্বিধাগ্রস্ত বা ঠিকমতো সম্পৃক্ত না হলে সুনির্দিষ্ট কৌশল ও নীতি গ্রহণে অযথা দেরি হবে। আশু বিপদ মোকাবিলায় এই দেরির ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ আমাদের নেই।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সারা বিশ্বের নেতাদের যুক্ততা ও নেতৃত্ব দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শতাধিক দেশের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে যোগ দেন। তাঁর এ অংশগ্রহণ সংহতি ও দায়বদ্ধতার স্পষ্ট বার্তাবাহী। একইভাবে চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নেতারা দূষণমুক্ত জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নতি ঘটানো ও কোপেনহেগেন সম্মেলন সফল হওয়া নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ২০২০ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের কার্বন নির্গমন মাত্রার ২৫ শতাংশ কমাবেন, যার মাধ্যমে তিনি অন্য সব শিল্পোন্নত দেশের জন্য অনুসরণীয় মাত্রা দেখিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বৈশ্বিক মতৈক্যের অংশ হিসেবে ৩০ শতাংশ নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নরওয়ে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নির্গমন কমাতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। বন ধ্বংসের ফলে যে নির্গমন তা প্রচুর পরিমাণে কমানোর পরিকল্পনা হাজির করেছে ব্রাজিল। নির্গমন কমাতে ভারত ও চীন নানা কার্যক্রম নিচ্ছে।
কোপেনহেগেন সম্মেলনের সফলতার চারটি মাপকাঠি হলো:
প্রতিটি দেশকে বন ধ্বংস এবং নৌ ও বিমান চলাচলসহ কার্বনের প্রধান প্রধান উত্স থেকে নির্গমন কমানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। উন্নত দেশগুলোর অগ্রগতির মধ্যমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা আরও শক্তিশালী করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তর্দেশীয় প্যানেলের মতে বর্তমানে এ লক্ষ্যমাত্রা প্রয়োজনীয় মাত্রার ধারে কাছে নেই। উন্নয়নশীল দেশগুলোর কার্বন নির্গমনের ঊর্ধ্বগতি হ্রাস করতে হবে এবং তাদের দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলের অংশ হিসেবে পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে হবে।
সফল সমঝোতা এমন হতে হবে যেন তা পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সঙ্গে দুনিয়ার খাপ খাওয়ানোর সামর্থ্য বাড়াতে পারে। বিশেষত, এটিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যাদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে তাদের জন্য সমন্বিত সহায়তা প্রদান করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনে সহায়তা কেবল নৈতিক কর্তব্যের বিষয় নয়, আরও স্থিতিশীল, আরও নিরাপদ পৃথিবীর জন্য এক চমত্কার বিনিয়োগও বটে।
সমঝোতার বাস্তবায়নের জন্য অর্থ ও উপায়ের সরবরাহ থাকতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক বিকাশের দিকে অগ্রসর হতে দরকার তহবিল ও প্রযুক্তিগত সহায়তা। প্রচুর পরিমাণে বাড়তি অর্থায়ন না করা গেলে আলোচিত সমাধানগুলো অর্জন করা যাবে না।
সমঝোতার মধ্যে অবশ্যই থাকতে হবে একটি ন্যায়সংগত বৈশ্বিক সুশাসনকাঠামো। সম্পদের বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায় সব দেশের কথা বলার জায়গা থাকতে হবে। এমনভাবেই পারস্পরিক আস্থা তৈরি হবে।
কোপেনহেগেনে এমন কোনো সমন্বয়ী, ন্যায়সংগত ও উচ্চাভিলাষী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারি কি আমরা, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমিয়ে এবং বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি রুখে বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ স্তরে নিয়ে আসতে পারবে? আমরা কি দূষণমুক্ত জ্বালানী বিকাশে অনুঘটকের ভূমিকা নিতে পারি? জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে আক্রান্ত দেশগুলো রক্ষায় আমরা সহায়তা করতে পারি? যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ভূমিকার প্রত্যাশা কি আমরা করতে পারি?
এসব প্রশ্নের সর্বোত্কৃষ্ট উত্তর মিলবে সিনেটর কেরি ও গ্রাহামের সাম্প্রতিক কথায়, ‘হ্যাঁ, আমরা পারি।’
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: আহসান হাবীব
বান কি-মুন: জাতিসংঘের মহাসচিব।

প্রান্তিকতা ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের অসুস্থতা -সমাজ ও নারী by বদিউল আলম মজুমদার

বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশেই স্বাস্থ্যক্ষেত্রে দুটি ‘প্যারাডক্স’ বা স্ববিরোধী বাস্তবতা লক্ষণীয়। একটি হলো যে এসব দেশে হূদরোগ ও বহুমূত্র রোগের হার ব্যাপক। এমনকি ক্যানসারের ব্যাপকতাও এসব দেশে তুলনামূলকভাবে বেশি। এসব দুরারোগ্য রোগবালাই সাধারণত প্রাচুর্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাই এগুলোকে ‘সমৃদ্ধির ব্যাধি’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি একটি পর্যায়ে পৌঁছালে, জীবনযাত্রা প্রণালি বদলে যায় এবং সচরাচর এসব ব্যাধি বিস্তার লাভ করতে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে এগুলো ক্রমাগতভাবে বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। যেমন, এসব দেশে হূদরোগে মৃত্যুর হার পশ্চিমা দেশগুলোর থেকেও বেশি।
অনুন্নত দেশগুলোয় সাধারণত পানিবাহিত ও সংক্রামক ব্যাধি ব্যাপক। যেমন, বাংলাদেশে প্রতি বছর কয়েক লাখ শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মানুষ ‘অনুন্নয়নের ব্যাধি’র সঙ্গে সঙ্গে ‘সমৃদ্ধির ব্যাধি’তেও অধিক হারে আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাত্ এসব দেশে দুই ধরনের রোগই ‘ওভারল্যাপ’ বা যুগপত্ভাবে বিরাজ করছে। এ যেন এক বিরাট গোলক ধাঁধা!
দ্বিতীয় রহস্যটি হলো দক্ষিণ এশিয়ায়। বিশেষত বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে স্বল্প ওজনের শিশুর জন্মের হার ও শিশুদের মধ্যে পুষ্টিহীনতা ব্যাপক। এমনকি সাব-সাহারান আফ্রিকার তুলনায়ও। অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের সঙ্গে পুষ্টিহীনতার একটি সম্পর্ক রয়েছে বলে সাধারণত ধরে নেওয়া হয়। অর্থাত্ অধিক উন্নত দেশে পুষ্টিহীনতার হার অপেক্ষাকৃত কম। সাব-সাহারান আফ্রিকার তুলনায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান অপেক্ষাকৃত উন্নত। তবুও পুষ্টির দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার এসব দেশ অনেক পেছনে, যা নিঃসন্দেহে রহস্যজনক।
বিজ্ঞানীদের মতে, এ দুটি রহস্যের—স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম ও পুষ্টিহীনতার হার এবং পরিণত বয়সে হূদরোগ, বহুমূত্র রোগ ও ক্যানসারের ব্যাপকতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। এগুলোর আরও যোগসূত্র রয়েছে সমাজে নারীর বিদ্যমান অবস্থার সঙ্গে। চিকিত্সা বিজ্ঞানীরা দাবি করেন, যেসব দেশে নারীদের অবস্থা যত বেশি প্রান্তিক, সেসব দেশে স্বল্প ওজনের শিশুর জন্মের ও শিশুর অপুষ্টির হার তত বেশি। আবার সেসব দেশের মানুষদের মধ্যেই হূদরোগ, বহুমূত্র রোগ ও ক্যানসারের ব্যাপকতাও বেশি। অন্যভাবে বলতে গেলে মায়ের সুস্বাস্থ্য আর সন্তানের ভবিষ্যত্ সুস্বাস্থ্য একই সুতায় গাঁথা। কিন্তু কেন? কীভাবে এ যোগসূত্রতার সৃষ্টি হয়?
মনে রাখা প্রয়োজন যে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে পুরুষতন্ত্রের মানসিকতা অত্যন্ত প্রকট। ফলে এসব দেশে নারীরা অপেক্ষাকৃত অধিক অধঃস্তন। তারা অধিকতর বঞ্চিত, নিপীড়িত ও অবহেলিত। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (রিপোর্ট) সর্বশেষ ‘বংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০০৭’ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শতকরা ৬০ ভাগ নারী বিবাহিত জীবনে স্বামীর দ্বারা নির্যাতিত হন। তারা অধিক হারে বৈষম্যেরও শিকার। অর্থাত্ এসব দেশে নারীদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক —এক কথায় প্রান্তিক।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নারী-পুরুষের বৈষম্য শুরু হয় বাল্যকাল থেকেই। উদাহরণস্বরূপ এসব দেশে পাঁচ বছরের নিচের কন্যাশিশুদের অপুষ্টির হার ছেলে শিশুদের তুলনায় অধিক। এসব অপুষ্ট শিশুদের অনেকেই, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে, বাল্যকালেই মৃত্যুবরণ করে। কন্যাশিশুদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকে তাদের অনেকে কিশোরী বয়সে শিক্ষা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত হয়। বঞ্চিত হয় চলাফেরার স্বাধীনতা ও বিনোদন থেকে। বিশেষত গ্রামীণ সমাজে অনেকে চার দেয়ালের মধ্যে আটকা পড়ে যায় এবং পারিবারিক ও গৃহস্থালির কার্যক্রমে জড়িত হতে বাধ্য হয়।
বয়ঃসন্ধিক্ষণেই কিশোরীদের অনেকের বিয়ে হয়ে যায়। যেমন, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার ৬৬ শতাংশ। আর এদের অধিকাংশই দ্রুত, পরিণত বয়সের আগেই গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এসব গর্ভবতী মায়েরা নিজেরাও অপুষ্টিতে ভোগে এবং নিজেরা শারীরিক এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই মা হয়ে যায়। আর এসব অপুষ্ট ও অধিকারবঞ্চিত মায়েরাই পরবর্তী সময়ে স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম দেয়। এভাবে আমাদের সমাজে একটি ‘অপুষ্টির দুষ্টচক্র’ সৃষ্টি হয় এবং আজন্ম বঞ্চনার কারণে দুর্ভাগ্যবশত নারীরাই হয়ে পড়ে এ দুষ্টচক্রের অনাগ্রহী উত্স। অর্থাত্ পুষ্টিবঞ্চিত নারীরাই স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম দেয় এবং এসব স্বল্প ওজনের শিশুর অনেকেই, বিশেষত কন্যাশিশুরা অপুষ্টি নিয়েই বড় হয়।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে অপুষ্ট নারীরা শুধু অপুষ্ট কন্যাশিশুই নয়, অপুষ্ট পুত্রশিশুরও জন্ম দেয়। অর্থাত্ নারীদের বঞ্চিত রাখার ফলে তাদের গর্ভে জন্ম নেয়া শুধু কন্যাশিশুরাই নয়, পুত্রশিশুরাও ঝুঁকি মাথায় নিয়ে পৃথিবীতে আসে। এভাবে কন্যাশিশু তথা নারীদের বঞ্চিত রাখার মাশুল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে পুরো জাতিকেই গুণতে হয়।
স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুরা—অর্থাত্ আড়াই কেজি ওজনের কমের নবজাতকেরা কেন পরবর্তী জীবনে দুরারোগ্য ব্যাধিতে অধিক হারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে? এর মূল কারণ হলো, ভ্রূণ অবস্থায় বঞ্চনা। মায়ের প্রতি বঞ্চনার কারণে যেসব ভ্রূণ মাতৃগর্ভে অপুষ্ট পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তারা একটি বিশেষ জৈবিক প্রক্রিয়ায় কম পুষ্টি গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সীমিত পুষ্টি তারা সেসব কাজেই ব্যবহার করে যা তাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। এর ফলে অনেকগুলো প্রক্রিয়া (যেমন: ডায়রিয়া প্রতিরোধ প্রক্রিয়া) অবশ্য উপেক্ষিত থেকে যায়। স্বল্প পুষ্টি গ্রহণে এ অভ্যস্ততার কারণে জন্মের পর অধিক পুষ্টি পেলেও তা তারা কাজে লাগাতে সক্ষম হয় না। বরং এমন অধিক পুষ্টি তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো তাদের জন্য উচ্চ রক্তচাপ ও বহুমূত্র রোগের সূত্রপাত ঘটায়।
স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা ব্যক্তিদের বেলায় এসব দুরারোগ্য ব্যাধি সৃষ্টির জন্য অস্বাভাবিক পরিমাণের পুষ্টি গ্রহণ প্রয়োজন হয় না। একজন উঠতি বয়সের তরুণ কিংবা বয়স্ক ব্যক্তির জন্য যে স্বাভাবিক পরিমাণের পুষ্টি প্রয়োজন তাও তাদের জন্য ঝুঁকির সৃষ্টি করে। অর্থাত্ স্বাভাবিক পরিমাণের পুষ্টিই তাদের জন্য অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। এর কারণ হলো তাদের ভ্রূণ অবস্থায় কম পুষ্টি গ্রহণে অভ্যস্ততা। এ অভ্যস্ততার ফলে স্বাভাবিক পরিমাণের পুষ্টিও তাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে পড়ে।
উল্লেখ্য যে স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরেকভাবেও সৃষ্টি হয়। স্বল্প ওজনের শিশুরা সাধারণত শৈশবেও পুষ্টিহীনতায় ভোগে, যার ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যথাযথভাবে গড়ে ওঠে না। শৈশবের অপুষ্টির এ ক্ষতিকর দিক তাদের সারা জীবন বহন করতে হয়, যা তাদের জন্য বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।
ভ্রূণের স্বাস্থ্যের সঙ্গে জন্মের পরবর্তী সময়ের, বিশেষত পরিণত বয়সের অসুস্থতার এ যোগসূত্রকে বিজ্ঞানীরা ‘ফিটাল প্রোগ্রামিং’ (fetal programming) বলে আখ্যায়িত করেন। অর্থাত্ ভ্রূণ থেকেই একজন ব্যক্তির ভবিষ্যত্ নিয়তি, বিশেষত ভবিষ্যত্ অসুস্থতা একটি জৈব প্রক্রিয়ায় ‘প্রোগ্রামড’ বা নির্ধারিত হয়ে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিচালিত অনেকগুলো গবেষণার মাধ্যমে এ ধারণা আজ চিকিত্সা বিজ্ঞানে পরীক্ষিত সত্য বলে প্রমাণিত।
প্রসঙ্গত, একজন অপুষ্ট মায়ের গর্ভে থাকা ভ্রূণের জন্য কম পুষ্টি গ্রহণে অভ্যস্ততার সমস্যা গর্ভকালীন সময়ে মায়ের জন্য শুধু অধিক পুষ্টির যোগান দিয়ে পুরোপুরিভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। এ জন্য আরও প্রয়োজন মায়ের দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতার (chronic persistent hunger) সমস্যার অবসান। অর্থাত্ ভ্রূণের অপুষ্টি এবং এ অপুষ্টির কারণে সৃষ্ট ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য সমস্যার বা অসুস্থতার সমাধান একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ সমস্যা সমাধানের জন্য অন্তত দুই পুরুষকাল সময় প্রয়োজন। অর্থাত্ বিজ্ঞানীদের মতে, একজন পরিণত বয়সের ব্যক্তির সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে তার নানির গর্ভে তার মায়ের ভ্রূণাবস্থায় এবং জন্ম-পরবর্তীকালের সুস্বাস্থ্যের ওপর। তার মা স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ না করলে এবং জন্ম পরবর্তীকালে পরিমিত পুষ্টি পেয়ে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হলেই তার পরিণত বয়সে হূদরোগ, বহুমূত্র রোগ ও ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
পরিশেষে এটি সুস্পষ্ট যে মায়ের প্রান্তিকতা ও সন্তানের ভবিষ্যত্ অসুস্থতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র বিরাজমান। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় মায়েরা অধিক হারে অপুষ্টিতে ভোগে, তারা অধিক হারে স্বল্প ওজনের শিশুর জন্ম দেয় এবং একটি জৈবিক প্রক্রিয়ায়—বিজ্ঞানীরা যাকে ‘ফিটাল প্রোগ্রামিং’ বলে আখ্যায়িত করেন—পরবর্তী জীবনে তারা অধিক হারে হূদরোগ, বহুমূত্র ও ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। তাই আশ্চার্যান্বিত হওয়ার কারণ নেই যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এসব সমৃদ্ধির ব্যাধির ব্যাপকতা উন্নত দেশগুলোর তুলনায়ও বেশি। অর্থাত্ এসব দেশের সমৃদ্ধির ব্যাধির অপেক্ষাকৃত অধিক হারের ব্যাখ্যা মেলে বিরাজমান নারীর প্রান্তিক অবস্থা থেকে। তাই এটি এখন আর একটি ‘প্যারাডক্স’ বা রহস্যজনক বিষয় নয়। এটি আরও রহস্যের বিষয় নয় যে দক্ষিণ এশিয়া তুলনামূলকভাবে সাব-সাহারান আফ্রিকা থেকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হলেও স্বল্প ওজনের শিশুর জন্মের এবং শিশুদের অপুষ্টির হার এসব দেশে অপেক্ষাকৃত বেশি। এর কারণ দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের অপেক্ষাকৃত নাজুক অবস্থা। তাই আমাদের ভবিষ্যত্ বংশধরদের সুস্বাস্থ্য তথা জাতির সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার স্বার্থে নারীদের প্রতি বৈষম্য-বঞ্চনার অবসানের দিকে আজ আমাদের জরুরিভিত্তিতে মনোনিবেশ করতে হবে। বিশেষত নজর দিতে হবে কন্যাশিশুদের প্রতি।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও কান্ট্রি ডিরেক্টর, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশ