Showing posts with label সরল গরল. Show all posts
Showing posts with label সরল গরল. Show all posts
Tuesday, September 13, 2011
বিচারপতিদের চিকি ৎ সাভাতা-বিতর্ক by মিজানুর রহমান খান
প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে গত ১২ বছরে ২৮ বিচারপতির চিকি ৎ সাভাতা গ্রহণের খবর সাধারণ মানুষের মনে বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বিস্মিত তাঁরা কি করে ত্রাণ নিতে পারলেন? তবে যাঁরা ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ নিয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা সম্ভবত চার-পাঁচজনের বেশি নয়। এর মধ্যে তিনজনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র আমাদের নিশ্চিত করেছে। প্রধান বিচারপতি হিসেবে এ বি এম খায়রুল হকই শুধু তাঁর স্ত্রীর চিকি ৎ সার জন্য ত্রাণ নিয়েছেন। আর নিয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি এস কে সিনহা। আওয়ামী লীগের বর্তমান আমলে এই দুজনই ত্রাণ নেন। ২০০৪ সালে নিয়েছিলেন বিচারপতি মো. ফজলুল করিম (পরে প্রধান বিচারপতি)। এই তথ্য সত্য হলে বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের দুমুখো নীতিই ধরা পড়বে। তাঁদের ব্যাখ্যা দিতে হবে যে, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কোন বিবেচনায় একজন কর্মরত বিচারপতিকে ত্রাণ দিয়েছিলেন। প্রশ্নটি নীতিগত। সংখ্যা বা টাকার অঙ্কে কোনো পক্ষের অবস্থানই বিচার্য নয়।
এখন আমরা দেখব ত্রাণ ব্যতিরেকে অন্যদের চিকি ৎ সা-ব্যয় মেটাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হওয়ার দরকারটা পড়ল কেন? চলতি অর্থবছরে বিচারপতিদের জন্য এযাব ৎ কালের সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা (সুপ্রিম কোর্টের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য সাড়ে ১১ লাখ টাকা) চিকি ৎ সাভাতা নির্দিষ্ট করা আছে। এর পুরো তহবিল শুধু প্রধান বিচারপতির অনুমোদনেই খরচযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাভের কোনো দরকার নেই। তিনি তা নেবেনও না। তাহলে প্রশ্ন, ওই দুই কোটি টাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সই লাগল কেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, বিচারপতিদের জন্য প্রযোজ্য প্রিভিলেজেস অ্যাক্ট ও ১৯৫০ সালের স্পেশাল মেডিকেল অ্যাটেন্ডান্স রুলস বিচারকদের বিদেশে চিকি ৎ সা গ্রহণের বিষয়ে নীরব। তাই সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মের আদলে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় একটি রেওয়াজ গড়ে তুলেছে। বিচারকদের দেশে চিকি ৎ সার খরচ প্রধান বিচারপতির সইয়ে চুকে যায়। কিন্তু আইনে না থাকার কারণে বিদেশে চিকি ৎ সা খরচ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয়। খরচটা কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বাজেট থেকেই মেটানো হয়। সুতরাং ওই দুই কোটি টাকার সবটাই ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে মিটেছে, সেটা সত্য নয়। সংসদ এমনিতে কোনো বিচারকের আচরণগত আলোচনার জায়গা নয়। হঠা ৎ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উদ্যোগটি ব্যক্তিবিশেষের ভাবমূর্তি রক্ষার সঙ্গে জড়িত বলেই প্রতীয়মান হতে পারে।
সংসদীয় কমিটি, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সরকারি যন্ত্র একমত যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ যাঁরাই ত্রাণ নিয়েছেন, সবটাই বিধিসম্মত। জনমনে এ রকম একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা দুঃখজনক। আইন ও বিচারমন্ত্রী ১০ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বিচারকরা বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থের জন্য আবেদন করতে পারেন। এই বিধান সরকারের অন্যান্য বিভাগের জন্যও প্রযোজ্য। এবং এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা অবগত রয়েছেন।’
আইনমন্ত্রীর ওই উক্তিতে স্পষ্ট যে তিনি বিচারকদের সরকারের অন্যদের সঙ্গে এক কাতারে ফেলেছেন। কিন্তু সারা পৃথিবীতে এটাই স্বীকৃত যে বিচারপতিদের সাধারণতন্ত্রের অন্য কোনো বিভাগের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে কতিপয় সাংবিধানিক পদাধিকারীর পারিশ্রমিক প্রভৃতি বিষয়ে একটি বিশেষ রক্ষাকবচ সৃষ্টি করা হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা তাঁদের কার্যভারকালে ‘তাঁদের পারিশ্রমিক, বিশেষ-অধিকার ও কর্মের অন্যান্য শর্তের এমন তারতম্য করা যাবে না, যা তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনক হতে পারে।’ এঁরা হলেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনার ও সরকারি কর্মকমিশনের সদস্য। ভারতীয় সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদটি শুধু বিচারক-সংশ্লিষ্ট। এতে বলা আছে, ‘কোনো বিচারপতির বিশেষাধিকার বা ভাতা অথবা অনুপস্থিতি-অবকাশ বা পেনশন-সম্পর্কিত অধিকার তাঁর নিয়োগের পর তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনকভাবে পরিবর্তিত হবে না।’ বিচারকদের বেতনকাঠামো ভারতীয় সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিলে নির্দিষ্ট আছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিচারকেরা যে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের কারও সঙ্গে তুলনীয় নন, তার মর্যাদা যে সুমহান ও সুউচ্চ, সেটা নিশ্চিত করা।
মার্কিন সংবিধানও বলেছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা তাঁদের সার্ভিস বা সেবার জন্য কমপেনসেশন বা সম্মানী পাবেন। যা তাঁরা কর্মরত থাকাকালে তাঁদের জন্য অসুবিধাজনকভাবে কমানো যাবে না।’ ব্রিটেনে হাউস অব কমন্স সব পারে, কিন্তু কর্মরত বিচারকের বেতন কমিয়ে আইন করতে পারে না বা করে না। ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সরকার বিচারকদের বেতন কর্তন করেছিল। সে সিদ্ধান্ত টেকেনি। কানাডায় একবার বিচারকদের বেতন কমালে সুপ্রিম কোর্ট তাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন।
বিশ্বের দেশে দেশে কেন এমন রক্ষাকবচ? আমেরিকান সুপ্রিম কোর্ট ১৯২০ সালে ‘ইভান্স বনাম গোর’ মামলায় বলেছেন, বিচারিক কর্মে উত্তম এবং যোগ্য লোককে আকৃষ্ট করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উ ৎ কর্ষ বৃদ্ধি ও বিচারকেরা যেন আইনের রক্ষক হতে পারেন, সে জন্যই এমন বিধান।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জিম্বাবুয়ের প্রধান বিচারপতি অ্যান্থনি গাবের বরাত দিয়ে বলেন, ‘বিচার বিভাগের কাছে অর্থকড়ির ক্ষমতা নেই। বিচার বিভাগ যদি সরকারের মন জুগিয়ে না চলে তাহলে নির্বাহী বিভাগ তার হাত মোচড়াতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের যদি আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’
বিদেশে বিচারকদের চিকি ৎ সা-ব্যয় মেটানো নিয়ে আমাদের সরকার যেন একটি ফাঁদ তৈরি করেছে এবং সুপ্রিম কোর্ট সেটা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় মেনে নিয়েছেন। সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া আজ যে তহবিলের অর্থ গ্রহণকে ‘ঘুষ’ আখ্যা দিয়েছেন তার পক্ষে তিনিও। আইনমন্ত্রী প্রকারন্তরে সেটাই তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সংসদীয় কমিটির বক্তব্যে বিরোধী দলের নেতার তপ্ত উক্তির ভঙ্গুরত্ব প্রমাণ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতার সপক্ষে পদক্ষেপ গ্রহণ সংক্রান্ত কিছু লক্ষ করলাম না।
বিচারপতি মোস্তাফা কামাল মাসদার হোসেন মামলায় লিখেছিলেন, The dependent of the Supreme Court on the executive branch for resources is another factor which impairs its independence. এর অর্থ হচ্ছে, আর্থিক সুবিধার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত করার আরেকটি বিষয়। এই রায় অনুযায়ী আমরা কি বলতে পারি না যে ১২ বছর ধরে দুটি দলীয় সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা আদালতের স্বাধীনতার ক্ষতি করেছেন। চিকি ৎ সাভাতার জন্য নির্বাহী বিভাগনির্ভরতা কি আপিল বিভাগের ওই রায়বিরুদ্ধ নয়?
আমলাতান্ত্রিক এই রাষ্ট্র বিচার বিভাগ পৃথক্করণে চঞ্চলা হরিণীর মতো ভীত ও সন্ত্রস্ত। ওই একই কারণে তারা বিচারপতিদের নিয়োগে উ ৎ কর্ষ এবং সে জন্য বিচারকদের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চলেছে। দুই দলই এখানে ঐক্যবদ্ধ। চিকি ৎ সাভাতা নিয়ে চটকদার মন্তব্য চলছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করতলগত রাখার মতো মৌলিক বিষয়ে এরা এককাট্টা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে বেতনকাঠামো বৃদ্ধির যে প্রস্তাব সম্প্রতি পেশ করেছিলেন, সরকার তা অমর্যাদাকরভাবে পাশ কাটিয়েছে। বিএনপি তার সমালোচনা করেনি।
যত দূর জানি, বিচারপতিদের চিকি ৎ সাভাতার প্রশ্নে বিদ্যমান নিয়মনীতি অস্পষ্ট, অসংগতিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। বিধিতে শুধু বলা আছে, বিচারপতি ও তাঁর পোষ্যরা চিকি ৎ সাভাতা পাবেন। কর্মরত ও অবসরকালীন চিকি ৎ সাভাতা গ্রহণের মধ্যে কোনো তারতম্য নেই। বিচারক আমৃত্যু চিকি ৎ সাভাতা পাবেন। একজন বিচারক ও তাঁর পরিবারের সদস্যের এককালীন চিকি ৎ সাভাতা গ্রহণের সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন কোনো সীমা নেই। বিদেশে চিকি ৎ সায় যেতে হলে মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাতে স্বচ্ছতার অভাব আছে। আমরা ধারণা পেয়েছি যে, কোনো কোনো বিচারক ও তাঁর পরিবারের সদস্য মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ ছাড়াও বিদেশে চিকি ৎ সা নিয়েছেন এবং ফিরে এসে তাঁর বিল জমা দিয়েছেন।
ত্রাণের দিকে নজর দেওয়া যায়—এ রকমের চিন্তাভাবনা সাম্প্রতিক। এই রাষ্ট্রকে সুবিচার পেতে হলে অবশ্যই তার যথামূল্য শোধ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টকে প্রলয়মুক্ত করার পাশাপাশি বিচারপতিদের জন্য অবিলম্বে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের বেতন বাড়াতে সচিবালয়ের কোটারি আমলাদের স্পর্শকাতরতা কিংবা চোখ রাঙানি উপেক্ষা করতে হবে।
সরকারের মন্ত্রী ও তাঁদের মিত্রদের যদি চলতি চিকি ৎ সাভাতা বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ প্রদানের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, তাঁরা বলবেন, সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারকদের জন্য এই টাকা কোনো টাকাই নয়। এই বিচারকেরা যদি ওকালতি করতেন তাহলে তাঁরা মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা আয় করতে পারতেন। হক কথা। কিন্তু এটা তাঁদের স ৎ বিবৃতি নয়, কৌশলগত ও দায়ঠেকা। শাসকগোষ্ঠী বকশিশ দিতেই উদ্গ্রীব, হিসাবের পাওনা দিতে অনিচ্ছুক। সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব কেন অগ্রাহ্য হলো? বিচারকদের বেতন কেন বাড়ানো হলো না? অধস্তন আদালতের পে-কমিশন কেন ধামাচাপা দিয়ে রাখা হলো?—এসব প্রশ্ন তুললেই তারা (আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপিও) বিরক্তি বোধ করবে। আমরা মনে করি, বিচারপতিদের চিকি ৎ সাভাতা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনে বা তাঁর ত্রাণ তহবিল থেকে দেওয়ার অনৈতিক রীতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
রোববার টেলিফোনে কথা হলো বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক (১৯৯৬-২০০৩) বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সঙ্গে। হাইকোর্ট থেকে তিনি অবসর নিয়েছিলেন ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০০৫ সালের দিকে তিনি গিয়েছিলেন আমেরিকায়। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সেখানে চিকি ৎ সা নেন। মাত্র লাখ দেড়েক টাকার বিল হয়। তখনকার আইনসচিব আলাউদ্দিন তাঁকে বলেন, ‘স্যার, টাকাটা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে নিতে হবে।’
বিচারপতি বদরুজ্জামানের কথায়, ‘এটা শুনে আমি ভাবলাম, আমি তো জাকাতের টাকা দিই, আমি জাকাতের অর্থ নেব না।’
জওহরলাল নেহরুর আহ্বানে ১৯৪৮ সালে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর রিলিফ ফান্ড খোলা হয়েছিল। সে দেশে সেই তহবিল থেকে আজও দুস্থের চিকি ৎ সা খরচ মেটে। কিন্তু কখনো কোনো বিচারক নিয়েছেন বলে জানি না।
বিচারকদের চিকি ৎ সাভাতা-সংক্রান্ত বিধিবিধান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অনেক জেলা জজও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে চিকি ৎ সার জন্য অর্থ নিয়েছেন। নিতে পারেন। তবে যাঁরাই নেবেন, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পদের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। বিচারকদের ত্রাণের অর্থ গ্রহণের খবরে জনমনে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। বিচারকদের তালিকা দেখেছি। এখন আমরা মন্ত্রী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য শ্রেণীর গ্রহীতাদের ব্যাপারেও জানতে চাই। তাহলে বোঝা যাবে ধনিক শ্রেণীর রাষ্ট্রব্যবস্থা দুস্থদের জন্য গঠিত ত্রাণ তহবিল থেকে কীভাবে ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা উভয়ে অনৈতিক বিধিবহির্ভূত ও অসাংবিধানিক কাজকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। বিদেশে চিকি ৎ সা গ্রহণসংক্রান্ত অনুমোদন দেওয়ার অধিকার শুধু প্রধান বিচারপতিরই থাকা উচিত। সংসদীয় কমিটিকে এদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
এখন আমরা দেখব ত্রাণ ব্যতিরেকে অন্যদের চিকি ৎ সা-ব্যয় মেটাতে প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হওয়ার দরকারটা পড়ল কেন? চলতি অর্থবছরে বিচারপতিদের জন্য এযাব ৎ কালের সর্বোচ্চ ৮০ লাখ টাকা (সুপ্রিম কোর্টের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য সাড়ে ১১ লাখ টাকা) চিকি ৎ সাভাতা নির্দিষ্ট করা আছে। এর পুরো তহবিল শুধু প্রধান বিচারপতির অনুমোদনেই খরচযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাভের কোনো দরকার নেই। তিনি তা নেবেনও না। তাহলে প্রশ্ন, ওই দুই কোটি টাকার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সই লাগল কেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, বিচারপতিদের জন্য প্রযোজ্য প্রিভিলেজেস অ্যাক্ট ও ১৯৫০ সালের স্পেশাল মেডিকেল অ্যাটেন্ডান্স রুলস বিচারকদের বিদেশে চিকি ৎ সা গ্রহণের বিষয়ে নীরব। তাই সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মের আদলে সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয় একটি রেওয়াজ গড়ে তুলেছে। বিচারকদের দেশে চিকি ৎ সার খরচ প্রধান বিচারপতির সইয়ে চুকে যায়। কিন্তু আইনে না থাকার কারণে বিদেশে চিকি ৎ সা খরচ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হয়। খরচটা কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বাজেট থেকেই মেটানো হয়। সুতরাং ওই দুই কোটি টাকার সবটাই ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে মিটেছে, সেটা সত্য নয়। সংসদ এমনিতে কোনো বিচারকের আচরণগত আলোচনার জায়গা নয়। হঠা ৎ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উদ্যোগটি ব্যক্তিবিশেষের ভাবমূর্তি রক্ষার সঙ্গে জড়িত বলেই প্রতীয়মান হতে পারে।
সংসদীয় কমিটি, আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সরকারি যন্ত্র একমত যে, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ যাঁরাই ত্রাণ নিয়েছেন, সবটাই বিধিসম্মত। জনমনে এ রকম একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা দুঃখজনক। আইন ও বিচারমন্ত্রী ১০ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বিচারকরা বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অর্থের জন্য আবেদন করতে পারেন। এই বিধান সরকারের অন্যান্য বিভাগের জন্যও প্রযোজ্য। এবং এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতা অবগত রয়েছেন।’
আইনমন্ত্রীর ওই উক্তিতে স্পষ্ট যে তিনি বিচারকদের সরকারের অন্যদের সঙ্গে এক কাতারে ফেলেছেন। কিন্তু সারা পৃথিবীতে এটাই স্বীকৃত যে বিচারপতিদের সাধারণতন্ত্রের অন্য কোনো বিভাগের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৭ অনুচ্ছেদে কতিপয় সাংবিধানিক পদাধিকারীর পারিশ্রমিক প্রভৃতি বিষয়ে একটি বিশেষ রক্ষাকবচ সৃষ্টি করা হয়েছে। যাতে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা তাঁদের কার্যভারকালে ‘তাঁদের পারিশ্রমিক, বিশেষ-অধিকার ও কর্মের অন্যান্য শর্তের এমন তারতম্য করা যাবে না, যা তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনক হতে পারে।’ এঁরা হলেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, নির্বাচন কমিশনার ও সরকারি কর্মকমিশনের সদস্য। ভারতীয় সংবিধানের ১২৫ অনুচ্ছেদটি শুধু বিচারক-সংশ্লিষ্ট। এতে বলা আছে, ‘কোনো বিচারপতির বিশেষাধিকার বা ভাতা অথবা অনুপস্থিতি-অবকাশ বা পেনশন-সম্পর্কিত অধিকার তাঁর নিয়োগের পর তাঁর পক্ষে অসুবিধাজনকভাবে পরিবর্তিত হবে না।’ বিচারকদের বেতনকাঠামো ভারতীয় সংবিধানের দ্বিতীয় তফসিলে নির্দিষ্ট আছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিচারকেরা যে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের কারও সঙ্গে তুলনীয় নন, তার মর্যাদা যে সুমহান ও সুউচ্চ, সেটা নিশ্চিত করা।
মার্কিন সংবিধানও বলেছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা তাঁদের সার্ভিস বা সেবার জন্য কমপেনসেশন বা সম্মানী পাবেন। যা তাঁরা কর্মরত থাকাকালে তাঁদের জন্য অসুবিধাজনকভাবে কমানো যাবে না।’ ব্রিটেনে হাউস অব কমন্স সব পারে, কিন্তু কর্মরত বিচারকের বেতন কমিয়ে আইন করতে পারে না বা করে না। ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সরকার বিচারকদের বেতন কর্তন করেছিল। সে সিদ্ধান্ত টেকেনি। কানাডায় একবার বিচারকদের বেতন কমালে সুপ্রিম কোর্ট তাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দেন।
বিশ্বের দেশে দেশে কেন এমন রক্ষাকবচ? আমেরিকান সুপ্রিম কোর্ট ১৯২০ সালে ‘ইভান্স বনাম গোর’ মামলায় বলেছেন, বিচারিক কর্মে উত্তম এবং যোগ্য লোককে আকৃষ্ট করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উ ৎ কর্ষ বৃদ্ধি ও বিচারকেরা যেন আইনের রক্ষক হতে পারেন, সে জন্যই এমন বিধান।
মাসদার হোসেন মামলার রায়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জিম্বাবুয়ের প্রধান বিচারপতি অ্যান্থনি গাবের বরাত দিয়ে বলেন, ‘বিচার বিভাগের কাছে অর্থকড়ির ক্ষমতা নেই। বিচার বিভাগ যদি সরকারের মন জুগিয়ে না চলে তাহলে নির্বাহী বিভাগ তার হাত মোচড়াতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের যদি আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।’
বিদেশে বিচারকদের চিকি ৎ সা-ব্যয় মেটানো নিয়ে আমাদের সরকার যেন একটি ফাঁদ তৈরি করেছে এবং সুপ্রিম কোর্ট সেটা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় মেনে নিয়েছেন। সেই ফাঁদে পা দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া আজ যে তহবিলের অর্থ গ্রহণকে ‘ঘুষ’ আখ্যা দিয়েছেন তার পক্ষে তিনিও। আইনমন্ত্রী প্রকারন্তরে সেটাই তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সংসদীয় কমিটির বক্তব্যে বিরোধী দলের নেতার তপ্ত উক্তির ভঙ্গুরত্ব প্রমাণ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীনতার সপক্ষে পদক্ষেপ গ্রহণ সংক্রান্ত কিছু লক্ষ করলাম না।
বিচারপতি মোস্তাফা কামাল মাসদার হোসেন মামলায় লিখেছিলেন, The dependent of the Supreme Court on the executive branch for resources is another factor which impairs its independence. এর অর্থ হচ্ছে, আর্থিক সুবিধার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত করার আরেকটি বিষয়। এই রায় অনুযায়ী আমরা কি বলতে পারি না যে ১২ বছর ধরে দুটি দলীয় সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা আদালতের স্বাধীনতার ক্ষতি করেছেন। চিকি ৎ সাভাতার জন্য নির্বাহী বিভাগনির্ভরতা কি আপিল বিভাগের ওই রায়বিরুদ্ধ নয়?
আমলাতান্ত্রিক এই রাষ্ট্র বিচার বিভাগ পৃথক্করণে চঞ্চলা হরিণীর মতো ভীত ও সন্ত্রস্ত। ওই একই কারণে তারা বিচারপতিদের নিয়োগে উ ৎ কর্ষ এবং সে জন্য বিচারকদের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চলেছে। দুই দলই এখানে ঐক্যবদ্ধ। চিকি ৎ সাভাতা নিয়ে চটকদার মন্তব্য চলছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করতলগত রাখার মতো মৌলিক বিষয়ে এরা এককাট্টা। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করে বেতনকাঠামো বৃদ্ধির যে প্রস্তাব সম্প্রতি পেশ করেছিলেন, সরকার তা অমর্যাদাকরভাবে পাশ কাটিয়েছে। বিএনপি তার সমালোচনা করেনি।
যত দূর জানি, বিচারপতিদের চিকি ৎ সাভাতার প্রশ্নে বিদ্যমান নিয়মনীতি অস্পষ্ট, অসংগতিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। বিধিতে শুধু বলা আছে, বিচারপতি ও তাঁর পোষ্যরা চিকি ৎ সাভাতা পাবেন। কর্মরত ও অবসরকালীন চিকি ৎ সাভাতা গ্রহণের মধ্যে কোনো তারতম্য নেই। বিচারক আমৃত্যু চিকি ৎ সাভাতা পাবেন। একজন বিচারক ও তাঁর পরিবারের সদস্যের এককালীন চিকি ৎ সাভাতা গ্রহণের সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন কোনো সীমা নেই। বিদেশে চিকি ৎ সায় যেতে হলে মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ লাগে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাতে স্বচ্ছতার অভাব আছে। আমরা ধারণা পেয়েছি যে, কোনো কোনো বিচারক ও তাঁর পরিবারের সদস্য মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশ ছাড়াও বিদেশে চিকি ৎ সা নিয়েছেন এবং ফিরে এসে তাঁর বিল জমা দিয়েছেন।
ত্রাণের দিকে নজর দেওয়া যায়—এ রকমের চিন্তাভাবনা সাম্প্রতিক। এই রাষ্ট্রকে সুবিচার পেতে হলে অবশ্যই তার যথামূল্য শোধ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টকে প্রলয়মুক্ত করার পাশাপাশি বিচারপতিদের জন্য অবিলম্বে সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের বেতন বাড়াতে সচিবালয়ের কোটারি আমলাদের স্পর্শকাতরতা কিংবা চোখ রাঙানি উপেক্ষা করতে হবে।
সরকারের মন্ত্রী ও তাঁদের মিত্রদের যদি চলতি চিকি ৎ সাভাতা বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ প্রদানের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, তাঁরা বলবেন, সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারকদের জন্য এই টাকা কোনো টাকাই নয়। এই বিচারকেরা যদি ওকালতি করতেন তাহলে তাঁরা মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা আয় করতে পারতেন। হক কথা। কিন্তু এটা তাঁদের স ৎ বিবৃতি নয়, কৌশলগত ও দায়ঠেকা। শাসকগোষ্ঠী বকশিশ দিতেই উদ্গ্রীব, হিসাবের পাওনা দিতে অনিচ্ছুক। সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাব কেন অগ্রাহ্য হলো? বিচারকদের বেতন কেন বাড়ানো হলো না? অধস্তন আদালতের পে-কমিশন কেন ধামাচাপা দিয়ে রাখা হলো?—এসব প্রশ্ন তুললেই তারা (আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপিও) বিরক্তি বোধ করবে। আমরা মনে করি, বিচারপতিদের চিকি ৎ সাভাতা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনে বা তাঁর ত্রাণ তহবিল থেকে দেওয়ার অনৈতিক রীতি চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
রোববার টেলিফোনে কথা হলো বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক (১৯৯৬-২০০৩) বিচারপতি মো. বদরুজ্জামানের সঙ্গে। হাইকোর্ট থেকে তিনি অবসর নিয়েছিলেন ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। ২০০৫ সালের দিকে তিনি গিয়েছিলেন আমেরিকায়। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সেখানে চিকি ৎ সা নেন। মাত্র লাখ দেড়েক টাকার বিল হয়। তখনকার আইনসচিব আলাউদ্দিন তাঁকে বলেন, ‘স্যার, টাকাটা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে নিতে হবে।’
বিচারপতি বদরুজ্জামানের কথায়, ‘এটা শুনে আমি ভাবলাম, আমি তো জাকাতের টাকা দিই, আমি জাকাতের অর্থ নেব না।’
জওহরলাল নেহরুর আহ্বানে ১৯৪৮ সালে ভারতে প্রধানমন্ত্রীর রিলিফ ফান্ড খোলা হয়েছিল। সে দেশে সেই তহবিল থেকে আজও দুস্থের চিকি ৎ সা খরচ মেটে। কিন্তু কখনো কোনো বিচারক নিয়েছেন বলে জানি না।
বিচারকদের চিকি ৎ সাভাতা-সংক্রান্ত বিধিবিধান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অনেক জেলা জজও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে চিকি ৎ সার জন্য অর্থ নিয়েছেন। নিতে পারেন। তবে যাঁরাই নেবেন, তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পদের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। বিচারকদের ত্রাণের অর্থ গ্রহণের খবরে জনমনে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও বিস্ময় সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। বিচারকদের তালিকা দেখেছি। এখন আমরা মন্ত্রী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য শ্রেণীর গ্রহীতাদের ব্যাপারেও জানতে চাই। তাহলে বোঝা যাবে ধনিক শ্রেণীর রাষ্ট্রব্যবস্থা দুস্থদের জন্য গঠিত ত্রাণ তহবিল থেকে কীভাবে ধনিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা উভয়ে অনৈতিক বিধিবহির্ভূত ও অসাংবিধানিক কাজকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। বিদেশে চিকি ৎ সা গ্রহণসংক্রান্ত অনুমোদন দেওয়ার অধিকার শুধু প্রধান বিচারপতিরই থাকা উচিত। সংসদীয় কমিটিকে এদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Thursday, June 9, 2011
দুই নেত্রীর আপিল বিভাগ ও সংসদ অবমাননা by মিজানুর রহমান খান
আওয়ামী লীগ আপিল বিভাগের রায়ের অপব্যাখ্যা ব্যাখ্যা করেছে। বিরোধী দলও রায়ের সঠিক ব্যাখ্যা করেনি। তারা কেউ পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় থাকার দরকার মনে করেনি। বিশেষ কমিটিও নয়। উভয় দল পানি ঘোলা করছে। তবে যদি বলা হয়, ঠিক এই পর্বের দায় কার কাঁধে বেশি চাপবে, তাহলে সেটা সরকারি দলের কাঁধেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। দুটোতেই দুটি মুদ্রিত কপি ছিল, এর বাইরে ছিল প্রশ্নোত্তর। এই দুটো কপি দুটি অকাট্য প্রমাণ। মাত্রাভেদে এ দুটিতেই রয়েছে আপিল বিভাগ অবমাননার উপকরণ। দুটোতেই ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
আপিল বিভাগের ছয় বিচারক বিভক্ত রায় দিয়েছেন। আমরা জানি না কতজন মিলে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু হয়েছেন। ছয় বিচারক স্বাক্ষরিত সংক্ষিপ্ত আদেশটি অবিকল এ রকম: ‘(১) সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে বিনা খরচায় আপিলটি মঞ্জুর করা হইল। (২) সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন ১৯৯৬ ভাবিসাপেক্ষে (প্রসপেক্টিভলি) বাতিল ও সংবিধানবহির্ভূত ঘোষণা করা হইল। (৩) দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন সুপ্রাচীন নীতিসমূহ, যা অন্যবিধভাবে বৈধ নয়, প্রয়োজনের কারণে বৈধ, জনগণের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন—এর ভিত্তিতে উল্লিখিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। যা হোক জাতীয় সংসদ অন্তর্বর্তীকালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি কিংবা আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিধান বাদ দিয়ে স্বাধীনভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে পারে। রায়ের বিস্তারিত বিবরণ অনুসরণীয়। সংশ্লিষ্ট সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ৫৯৬/২০০৫ এতদ্দ্বারা নিষ্পত্তি করা হইল।’
১০ মে ওই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ছয়জন বিচারক ছয়টি বাক্যে সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়েছেন। এটা হলো রায়ের চুম্বক অংশ। ওই আদেশের তিনটি দফাকে বিচ্ছিন্নভাবে পড়া বা তেমনভাবে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই; বরং এ ধরনের দাবি করা প্রলাপের নামান্তর।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা যে করতেই হবে, সে বিষয়টিও কিন্তু আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন। কিন্তু নেতা-নেত্রীরা কেউ পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করেননি। অথচ কয়েকটি বিষয় জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছে মর্মে গণমাধ্যমে যেভাবে বড় শিরোনাম করেছিল, সেটা বিভ্রান্তিকর অন্তত সংক্ষিপ্ত আদেশের মতে। এর কারণ, আমাদের অনুমান সত্যি হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ‘ডকট্রিন অব প্রসপেক্টিভ ওভাররুলিং’ প্রয়োগ করে রায় লেখা হয়েছে। এর আগে সংবাদপত্রের রিপোর্টের ভিত্তিতে লিখেছিলাম, এটা দেখা গুরুত্বপূর্ণ যে মূল রায়ে কখন থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল বলে গণ্য করা হবে বলা হয়। ভয়েড, মানে গোড়া থেকে বাতিল। আমাদের দেশে সামরিক শাসনসংশ্লিষ্ট পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী এবং সংসদের করা অষ্টম সংশোধনীকে গোড়া থেকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ত্রয়োদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে প্রসপেক্টিভ অর্থাৎ ভবিষ্যৎ থেকে রহিত করা হয়েছে। এটা যে দেশের বিচার বিভাগে এই প্রথম, সেটুকু ব্যারিস্টার রফিক-উল হক রোববার আমাদের নিশ্চিত করেন। তবে এখনই হলফ করে কিছু বলব না। কারণ, সাম্প্রতিক কালে আমরা দেখেছি, রায় ঘোষণার দিনে যে ধরনের আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে, পরে পূর্ণাঙ্গ রায়ের পরে তা বিস্ময়করভাবে বদলে গেছে।
ভবিষ্যৎকালে সংবিধানের সংশোধনী বাতিলে আদালতের ক্ষমতাও আইনে লেখা নেই। এটা এক কল্পনাপ্রসূত লিগ্যাল ফিকশন। মৌলিক কাঠামোর মতো এই ডকট্রিনও একটা ফিকশন। বিশেষ কমিটির রিপোর্টে মৌলিক কাঠামোর উল্লেখ দেখে আমরা হতবাক। কোনো সংবিধানে এটা দেখিনি। যাক, কোনো আইন ভবিষ্যৎকালে বাতিলে অভিনবত্ব ও চমৎকারিত্ব দুই-ই আছে। এর প্রথম উন্মেষ ঘটে আমেরিকায়। ভারতের প্রধান বিচারপতি সুভা রায় ১৯৬৭তে ‘গোলকনাথ’ মামলায় এর প্রথম প্রয়োগ করেন। সাংবিধানিক পণ্ডিতদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ প্রবল। কারণ, আদালতের এ ধরনের ‘কল্পনাপ্রসূতা’ চূড়ান্ত অর্থে সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে সংকুচিত করতে পারে। ভারতে এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম হয়নি। বিখ্যাত মণ্ডল মামলায় বিচারপতি জীবন রেড্ডি রায় দিয়েছিলেন যে, রায়ের কার্যকারিতা রায় ঘোষণার দিন থেকে আগামী পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বলবৎ হবে।
আমরা তো কল্পনায় ভাসতে পারি না। নবম ও দশম সংসদের মেয়াদ শেষ হলে পরেই তবে বাতিল কথাটি কার্যকর হবে, সেটা পূর্ণাঙ্গ রায়ে থাকবে বা থাকবে না, তা ধরে নেওয়ার বিষয় নয়। অথচ বিশেষ কমিটি আদালতের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা বলি দিল। তাদের দুরভিসন্ধি না থাকলে রায়ের দোহাই দিত না।
অন্যদিকে আপিল বিভাগ যদি নিঃশর্তে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলই করবেন, তাহলে তারা কি দুই ও তিন নম্বর দফা যুক্ত করলেন বেহুদাই? বাতিল জিনিসের আবার প্রয়োজনীয় সংশোধনী কী। সে জন্য সংসদকে ‘লিবার্টি’ দেওয়ার মানে কী। এই লিবার্টি তো স্ট্যাচু অব লিবার্টি নয়।
তবে যা-ই ঘটুক না কেন, আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশ যেটি আমাদের হাতে রয়েছে, তার যে অপব্যাখ্যা করে বিশেষ কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে ও ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ হরতাল হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই বললেই চলে।
আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে আইনবিদ্যায় যাঁদের অ আ ক খ জ্ঞান আছে, লজ্জায় তাঁরা হয়তো মাটিতে মিশে যাচ্ছেন। গত বছর সংসদ নেতার মোশনে বিশেষ কমিটি হয়। তারা দুই নেত্রীকে আমন্ত্রণ জানায়। এটা পকেট কমিটি ছিল না। এর রিপোর্ট যাবে সংসদে, যেকোনো সিদ্ধান্ত সংসদের ফ্লোরে হওয়ার কথা। কিন্তু তা হতে দেওয়া হলো না। এর মাধ্যমে স্পষ্টতই শুধু আদালত নয়, সংসদেরও অবমাননা ঘটেছে। আজ যদি সংসদের নেতা, প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি তিনটি আলাদা মাথা থাকত, তাহলে হয়তো এমনটা ঘটত না।
প্রধানমন্ত্রী সাফ বলেছেন, আদালতে বাতিল হওয়ার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা ডাহা মিথ্যাচার করছেন। হয়তো ‘মে’ শব্দটি থেকে ফায়দা নিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, দুই মেয়াদের নির্বাচন কথাটা নাকি অবিটার ডিকটা। লাতিন এ শব্দের মানে বাতকিবাত, পর্যবেক্ষণ। তবে এর কোনো দাম নেই—এটাও ডাহা মিথ্যা। যদি ধরেও নিই, এটা অবিটার ডিকটা। তাহলেও বলব, আওয়ামী লীগ অসত্য বলছে। ১৯৬০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় আছে, অবিটার ও পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের হলে তা বাধ্যতামূলকই। ভারতের প্রধান বিচারপতি এ এম আহমেদির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ, যেখানে জে.এস. ভারমার (পরে প্রধান বিচারপতি) মতো বরেণ্য বিচারক ছিলেন; ১৯৯৫ সালে তাঁরা বলেন, অবিটার ডিকটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং তা মেনে চলাটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। নেহাত শুনানিকালে মার্কিন প্রধান বিচারপতি ওয়েটারের একটা মামুলি উক্তি পরে একটি নন্দিত ডকট্রিনে পরিণত হয়েছিল।
আমাদের শাসকগোষ্ঠীকে এসব বলে লাভ নেই। আমরা পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। বিরোধী দলের নেতা (অভ্যাসগত সংসদ অবমাননাকারী) বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ৪ জুনের সংবাদ সম্মেলনে ১৭১৯ শব্দের একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রতি তাঁর রাগ বোধগম্য। ওই বিবৃতিতে রায়সংক্রান্ত ৩৪৮ শব্দের একটি প্যারাগ্রাফ আছে। সেখানে আছে, ‘বিতর্কিত এ রায়টি আইন ও সংবিধানসম্মত নয়। পরস্পরবিরোধী, দুর্বল, যুক্তিহীন ও বিতর্কিত। সরকারের অনুগ্রহভাজন এই ধরনের বিচারপতির রায়ের ছুতা ধরেই আজ সংবিধান বদল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা চলছে।’ অবশ্য এ কথাও আছে যে, ‘এই বিতর্কিত রায়ের একটি অংশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আরও দুই মেয়াদ বহাল রাখা যাবে বলে যে মত দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার এখন সেটিও এড়িয়ে যেতে চাইছে।’
পূর্ণাঙ্গ রায় পাঠে তাঁর আগ্রহ নেই। তাঁদের দরকার অস্থিতিশীলতার মসলা। ক্ষমতাসীনেরা চেয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা বাতিল করতে। এই আকাঙ্ক্ষা তাদের গোড়াতেই প্রকাশ পায়। সেটা তারা রায় অপব্যাখ্যা করে, কালবিলম্ব না করে উসুল করেছে। আর বিএনপি-জামায়াত চেয়েছিল ‘জনসমর্থিত’ জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচির ফিতাকাটা। এ উপলক্ষটি পেয়ে তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সেটাও ওই রায়ের ছুতোয়, বিশেষ করে লাভবান হয় জামায়াত। তারা প্রথমবারের মতো ‘গণমুখী’ হরতাল ডাকতে সক্ষম হয়। বিএনপি নেত্রীর মলিন ভাবমূর্তির ছেলেদের জন্য হরতাল দিতে তাঁরা মওকা পায়নি। কদিন পরেই জামায়াতের নতুন পাখনা গজাবে। সাঈদী ও সাকা চৌধুরীর মতো ব্যক্তিদের বিচারের জন্য ৪৭ অনুচ্ছেদ শোধরানোর সুপারিশ এলেও ধর্মভিত্তিক দলগুলো তো বেঁচে গেল। জামায়াত নিষিদ্ধের রাজনীতি আওয়ামী লীগই নিষিদ্ধ করল।
আমরা আপিল বিভাগের কাছে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ রায় আশা করি। দ্ব্যর্থক নয়, পষ্টাপষ্টি। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যারা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ধরে নিয়েছেন এবং নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণসহ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপায় বাতলাচ্ছেন, তাঁদের আশু করণীয় রায়ের সঠিক ব্যাখ্যার বিষয়ে কলম ধরা। ক্ষমতাসীনেরা সংবিধান ও আদালতের রায় কাকে বলে—যা কিছুই ঠিক করে দিচ্ছেন, সেটাই কোনো না কোনোভাবে কল্কে পাচ্ছে। সংবিধান পুনর্মুদ্রণ পর্বে আমরা অসহায় বোধ করেছি, বিশেষ করে আদালত যখন এই নীতি নেন যে তাঁরা রায় অপব্যাখ্যার বিষয়ে নীরব থাকবেন। যে যা বুঝে সারতে পারে। তবে ক্ষমতাসীনের বোঝাটাই সার।
পাদটীকা: ৫ জুন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের মানবজমিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি স্ববিরোধী। আপিল বিভাগের ওই সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গেও তা সংগতিপূর্ণ নয়। ‘বিতর্ক এড়াতেই দুই মেয়াদে নির্বাচন রেখেছি’ বলার পরে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়ে গেছে। এখন আর তা নেই’, এটা কীভাবে যৌক্তিক হতে পারে?’ পঞ্চম সংশোধনীর রায় অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে একটি রিট হয়েছে। গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এক সপ্তাহ সময় নিয়েছে। ১৩ জুন শুনানি হবে। এ লড়াইটা চালাতে হবে। এটা এক নতুন লড়াইয়ের ক্ষেত্র। শুধু রাজনীতিকেরাই এর কুশীলব নন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। দুটোতেই দুটি মুদ্রিত কপি ছিল, এর বাইরে ছিল প্রশ্নোত্তর। এই দুটো কপি দুটি অকাট্য প্রমাণ। মাত্রাভেদে এ দুটিতেই রয়েছে আপিল বিভাগ অবমাননার উপকরণ। দুটোতেই ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত আপিল বিভাগের রায়কে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
আপিল বিভাগের ছয় বিচারক বিভক্ত রায় দিয়েছেন। আমরা জানি না কতজন মিলে তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু হয়েছেন। ছয় বিচারক স্বাক্ষরিত সংক্ষিপ্ত আদেশটি অবিকল এ রকম: ‘(১) সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে বিনা খরচায় আপিলটি মঞ্জুর করা হইল। (২) সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আইন ১৯৯৬ ভাবিসাপেক্ষে (প্রসপেক্টিভলি) বাতিল ও সংবিধানবহির্ভূত ঘোষণা করা হইল। (৩) দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন সুপ্রাচীন নীতিসমূহ, যা অন্যবিধভাবে বৈধ নয়, প্রয়োজনের কারণে বৈধ, জনগণের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ আইন—এর ভিত্তিতে উল্লিখিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। যা হোক জাতীয় সংসদ অন্তর্বর্তীকালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি কিংবা আপিল বিভাগের বিচারপতিদের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার বিধান বাদ দিয়ে স্বাধীনভাবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে পারে। রায়ের বিস্তারিত বিবরণ অনুসরণীয়। সংশ্লিষ্ট সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ৫৯৬/২০০৫ এতদ্দ্বারা নিষ্পত্তি করা হইল।’
১০ মে ওই রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ছয়জন বিচারক ছয়টি বাক্যে সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়েছেন। এটা হলো রায়ের চুম্বক অংশ। ওই আদেশের তিনটি দফাকে বিচ্ছিন্নভাবে পড়া বা তেমনভাবে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ নেই; বরং এ ধরনের দাবি করা প্রলাপের নামান্তর।
পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা যে করতেই হবে, সে বিষয়টিও কিন্তু আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন। কিন্তু নেতা-নেত্রীরা কেউ পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করেননি। অথচ কয়েকটি বিষয় জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেছে মর্মে গণমাধ্যমে যেভাবে বড় শিরোনাম করেছিল, সেটা বিভ্রান্তিকর অন্তত সংক্ষিপ্ত আদেশের মতে। এর কারণ, আমাদের অনুমান সত্যি হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ‘ডকট্রিন অব প্রসপেক্টিভ ওভাররুলিং’ প্রয়োগ করে রায় লেখা হয়েছে। এর আগে সংবাদপত্রের রিপোর্টের ভিত্তিতে লিখেছিলাম, এটা দেখা গুরুত্বপূর্ণ যে মূল রায়ে কখন থেকে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল বলে গণ্য করা হবে বলা হয়। ভয়েড, মানে গোড়া থেকে বাতিল। আমাদের দেশে সামরিক শাসনসংশ্লিষ্ট পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী এবং সংসদের করা অষ্টম সংশোধনীকে গোড়া থেকে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু ত্রয়োদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে প্রসপেক্টিভ অর্থাৎ ভবিষ্যৎ থেকে রহিত করা হয়েছে। এটা যে দেশের বিচার বিভাগে এই প্রথম, সেটুকু ব্যারিস্টার রফিক-উল হক রোববার আমাদের নিশ্চিত করেন। তবে এখনই হলফ করে কিছু বলব না। কারণ, সাম্প্রতিক কালে আমরা দেখেছি, রায় ঘোষণার দিনে যে ধরনের আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে, পরে পূর্ণাঙ্গ রায়ের পরে তা বিস্ময়করভাবে বদলে গেছে।
ভবিষ্যৎকালে সংবিধানের সংশোধনী বাতিলে আদালতের ক্ষমতাও আইনে লেখা নেই। এটা এক কল্পনাপ্রসূত লিগ্যাল ফিকশন। মৌলিক কাঠামোর মতো এই ডকট্রিনও একটা ফিকশন। বিশেষ কমিটির রিপোর্টে মৌলিক কাঠামোর উল্লেখ দেখে আমরা হতবাক। কোনো সংবিধানে এটা দেখিনি। যাক, কোনো আইন ভবিষ্যৎকালে বাতিলে অভিনবত্ব ও চমৎকারিত্ব দুই-ই আছে। এর প্রথম উন্মেষ ঘটে আমেরিকায়। ভারতের প্রধান বিচারপতি সুভা রায় ১৯৬৭তে ‘গোলকনাথ’ মামলায় এর প্রথম প্রয়োগ করেন। সাংবিধানিক পণ্ডিতদের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ প্রবল। কারণ, আদালতের এ ধরনের ‘কল্পনাপ্রসূতা’ চূড়ান্ত অর্থে সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে সংকুচিত করতে পারে। ভারতে এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা কম হয়নি। বিখ্যাত মণ্ডল মামলায় বিচারপতি জীবন রেড্ডি রায় দিয়েছিলেন যে, রায়ের কার্যকারিতা রায় ঘোষণার দিন থেকে আগামী পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বলবৎ হবে।
আমরা তো কল্পনায় ভাসতে পারি না। নবম ও দশম সংসদের মেয়াদ শেষ হলে পরেই তবে বাতিল কথাটি কার্যকর হবে, সেটা পূর্ণাঙ্গ রায়ে থাকবে বা থাকবে না, তা ধরে নেওয়ার বিষয় নয়। অথচ বিশেষ কমিটি আদালতের দোহাই দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা বলি দিল। তাদের দুরভিসন্ধি না থাকলে রায়ের দোহাই দিত না।
অন্যদিকে আপিল বিভাগ যদি নিঃশর্তে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলই করবেন, তাহলে তারা কি দুই ও তিন নম্বর দফা যুক্ত করলেন বেহুদাই? বাতিল জিনিসের আবার প্রয়োজনীয় সংশোধনী কী। সে জন্য সংসদকে ‘লিবার্টি’ দেওয়ার মানে কী। এই লিবার্টি তো স্ট্যাচু অব লিবার্টি নয়।
তবে যা-ই ঘটুক না কেন, আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশ যেটি আমাদের হাতে রয়েছে, তার যে অপব্যাখ্যা করে বিশেষ কমিটি রিপোর্ট দিয়েছে ও ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ হরতাল হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই বললেই চলে।
আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে আইনবিদ্যায় যাঁদের অ আ ক খ জ্ঞান আছে, লজ্জায় তাঁরা হয়তো মাটিতে মিশে যাচ্ছেন। গত বছর সংসদ নেতার মোশনে বিশেষ কমিটি হয়। তারা দুই নেত্রীকে আমন্ত্রণ জানায়। এটা পকেট কমিটি ছিল না। এর রিপোর্ট যাবে সংসদে, যেকোনো সিদ্ধান্ত সংসদের ফ্লোরে হওয়ার কথা। কিন্তু তা হতে দেওয়া হলো না। এর মাধ্যমে স্পষ্টতই শুধু আদালত নয়, সংসদেরও অবমাননা ঘটেছে। আজ যদি সংসদের নেতা, প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি তিনটি আলাদা মাথা থাকত, তাহলে হয়তো এমনটা ঘটত না।
প্রধানমন্ত্রী সাফ বলেছেন, আদালতে বাতিল হওয়ার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের কোনো সুযোগ নেই। ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা ডাহা মিথ্যাচার করছেন। হয়তো ‘মে’ শব্দটি থেকে ফায়দা নিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, দুই মেয়াদের নির্বাচন কথাটা নাকি অবিটার ডিকটা। লাতিন এ শব্দের মানে বাতকিবাত, পর্যবেক্ষণ। তবে এর কোনো দাম নেই—এটাও ডাহা মিথ্যা। যদি ধরেও নিই, এটা অবিটার ডিকটা। তাহলেও বলব, আওয়ামী লীগ অসত্য বলছে। ১৯৬০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় আছে, অবিটার ও পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের হলে তা বাধ্যতামূলকই। ভারতের প্রধান বিচারপতি এ এম আহমেদির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ, যেখানে জে.এস. ভারমার (পরে প্রধান বিচারপতি) মতো বরেণ্য বিচারক ছিলেন; ১৯৯৫ সালে তাঁরা বলেন, অবিটার ডিকটার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং তা মেনে চলাটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। নেহাত শুনানিকালে মার্কিন প্রধান বিচারপতি ওয়েটারের একটা মামুলি উক্তি পরে একটি নন্দিত ডকট্রিনে পরিণত হয়েছিল।
আমাদের শাসকগোষ্ঠীকে এসব বলে লাভ নেই। আমরা পড়েছি মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। বিরোধী দলের নেতা (অভ্যাসগত সংসদ অবমাননাকারী) বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ৪ জুনের সংবাদ সম্মেলনে ১৭১৯ শব্দের একটি লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের প্রতি তাঁর রাগ বোধগম্য। ওই বিবৃতিতে রায়সংক্রান্ত ৩৪৮ শব্দের একটি প্যারাগ্রাফ আছে। সেখানে আছে, ‘বিতর্কিত এ রায়টি আইন ও সংবিধানসম্মত নয়। পরস্পরবিরোধী, দুর্বল, যুক্তিহীন ও বিতর্কিত। সরকারের অনুগ্রহভাজন এই ধরনের বিচারপতির রায়ের ছুতা ধরেই আজ সংবিধান বদল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা চলছে।’ অবশ্য এ কথাও আছে যে, ‘এই বিতর্কিত রায়ের একটি অংশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আরও দুই মেয়াদ বহাল রাখা যাবে বলে যে মত দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার এখন সেটিও এড়িয়ে যেতে চাইছে।’
পূর্ণাঙ্গ রায় পাঠে তাঁর আগ্রহ নেই। তাঁদের দরকার অস্থিতিশীলতার মসলা। ক্ষমতাসীনেরা চেয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক-ব্যবস্থা বাতিল করতে। এই আকাঙ্ক্ষা তাদের গোড়াতেই প্রকাশ পায়। সেটা তারা রায় অপব্যাখ্যা করে, কালবিলম্ব না করে উসুল করেছে। আর বিএনপি-জামায়াত চেয়েছিল ‘জনসমর্থিত’ জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচির ফিতাকাটা। এ উপলক্ষটি পেয়ে তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। সেটাও ওই রায়ের ছুতোয়, বিশেষ করে লাভবান হয় জামায়াত। তারা প্রথমবারের মতো ‘গণমুখী’ হরতাল ডাকতে সক্ষম হয়। বিএনপি নেত্রীর মলিন ভাবমূর্তির ছেলেদের জন্য হরতাল দিতে তাঁরা মওকা পায়নি। কদিন পরেই জামায়াতের নতুন পাখনা গজাবে। সাঈদী ও সাকা চৌধুরীর মতো ব্যক্তিদের বিচারের জন্য ৪৭ অনুচ্ছেদ শোধরানোর সুপারিশ এলেও ধর্মভিত্তিক দলগুলো তো বেঁচে গেল। জামায়াত নিষিদ্ধের রাজনীতি আওয়ামী লীগই নিষিদ্ধ করল।
আমরা আপিল বিভাগের কাছে অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ রায় আশা করি। দ্ব্যর্থক নয়, পষ্টাপষ্টি। বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যারা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ধরে নিয়েছেন এবং নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণসহ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপায় বাতলাচ্ছেন, তাঁদের আশু করণীয় রায়ের সঠিক ব্যাখ্যার বিষয়ে কলম ধরা। ক্ষমতাসীনেরা সংবিধান ও আদালতের রায় কাকে বলে—যা কিছুই ঠিক করে দিচ্ছেন, সেটাই কোনো না কোনোভাবে কল্কে পাচ্ছে। সংবিধান পুনর্মুদ্রণ পর্বে আমরা অসহায় বোধ করেছি, বিশেষ করে আদালত যখন এই নীতি নেন যে তাঁরা রায় অপব্যাখ্যার বিষয়ে নীরব থাকবেন। যে যা বুঝে সারতে পারে। তবে ক্ষমতাসীনের বোঝাটাই সার।
পাদটীকা: ৫ জুন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের মানবজমিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটি স্ববিরোধী। আপিল বিভাগের ওই সংক্ষিপ্ত আদেশের সঙ্গেও তা সংগতিপূর্ণ নয়। ‘বিতর্ক এড়াতেই দুই মেয়াদে নির্বাচন রেখেছি’ বলার পরে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়ে গেছে। এখন আর তা নেই’, এটা কীভাবে যৌক্তিক হতে পারে?’ পঞ্চম সংশোধনীর রায় অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে একটি রিট হয়েছে। গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর এক সপ্তাহ সময় নিয়েছে। ১৩ জুন শুনানি হবে। এ লড়াইটা চালাতে হবে। এটা এক নতুন লড়াইয়ের ক্ষেত্র। শুধু রাজনীতিকেরাই এর কুশীলব নন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Tuesday, March 29, 2011
নিয়ামুলের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন চাই by মিজানুর রহমান খান
শিশু নিয়ামুলকে আপনারা চেনেন। গত ৩০ ডিসেম্বর প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকায় খবর ছাপা হয় যে শিশুদের পঙ্গু করে নামানো হচ্ছে ভিক্ষায়। একেবারে হইচই ফেলে দেওয়া খবর। এ ঘটনা শুনে অনেকেই স্তম্ভিত হন। ভাবেন, আমরা কোথায় যাচ্ছি? আদালত ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন এ ঘটনা পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর। এই শিশুটিকে ঘিরে দুটো পরস্পরবিরোধী গল্প। এর তদন্ত চলছে। কিন্তু এটা এতই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর যে যাকে হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ যথেষ্ট সংগত কারণেই ‘উচ্চ অগ্রাধিকার’ দেন। সন্দেহভাজন বলে যারা প্রচারিত, তাদের অন্যতম নাজমা আক্তার। তাকে বলা হচ্ছে ‘গডমাদার’।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) লালমাটিয়ার ভবনে কথা হলো পরিচালক নূর খানের সঙ্গে। প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছেন। তিনি আমাকে অনুযোগের সুরে বললেন, মিডিয়া মানবাধিকার প্রশ্নে সাধারণত ভালো ভূমিকা রাখে। কিন্তু কখনো কখনো গুরুতর বিভ্রাট ঘটে। তাঁর সঙ্গে আলোচনার নির্যাস হলো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি কখনো বিপত্তি ঘটাতে পারে। আমি এক উপকূলীয় জেলায় র্যাবের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কথা জানি। তারা দেখিয়েছে, একটি ইটের ভাটায় শ্রমিকদের ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়। ওই ইটের ভাটা একজন সংখ্যালঘু কলেজশিক্ষক ও চিকিৎসক পরিবারের। সেই খবর প্রথম আলোয়ও ছাপা হয়েছে। পরে শুনেছি, তাতে প্রতিপক্ষের হাত ছিল। জব্দ করতে ডান্ডাবেড়ির ঘটনা সাজানো হয়।
নিয়ামুলের ঘটনা আরও বিশ্বাসযোগ্য ছিল। র্যাবের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন হয় গত ২৯ ডিসেম্বর। সেখানে কথিতমতে পঙ্গু করে ভিক্ষুক বানানো চক্রের সদস্য শরিফুল ইসলাম ওরফে কুরবান হাজির হন। টিভি অনুষ্ঠান সূত্রে র্যাব অভিযান চালায়। ওই অনুষ্ঠান করেন এলিনা খান ও রোকেয়া প্রাচী। দুজনই স্বনামধন্য। তাঁরাই র্যাবের কাছে তথ্য-প্রমাণ হাজির করেন। তাঁরা সংবাদ সম্মেলনে হাজিরও ছিলেন। সুতরাং, দৃশ্যত মিডিয়া যথাসংগত কারণেই গুরুত্ব দিয়েছে।
আমার লেখার উদ্দেশ্য হলো, আসক এ বিষয়ে একটি প্রাথমিক তদন্ত চালিয়েছে। অভিযুক্ত ও পার্শ্বচরিত্রগুলোর জবানবন্দি রেকর্ড করেছে। আর তা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। আমরা দেশের বরেণ্য মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামালের মন্তব্য গুরুত্ব না দিয়ে পারি না। গতকাল তিনি টেলিফোনে আমাকে বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছি যে অভিযুক্ত নাজমা আক্তার এর সঙ্গে জড়িত নন।’ আসকের অনুসন্ধান সত্য হলে পুরো বিষয়টি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাবে। আইনজীবী এলিনা খান গতকাল আমাকে বলেন, হাইকোর্টে গত ৯ মার্চ সর্বশেষ শুনানি হয়। সেদিন র্যাবের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা এম এ বাতেন আদালতে বক্তব্য দেন। তিনি তথ্য দেন যে অভিযুক্তদের মধ্যে একমাত্র নাজমা আক্তারই পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
প্রথম আলোর ৩০ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনের বর্ণনায় আট-নয় বছরের এক শিশুকে জড়সড় করে আটকে রাখা হয়েছিল অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলের ভেতর। টানা ছয় মাস। খাবার বলতে দিনে একবার। সামান্য ভাত কিংবা রুটি। দিনে দিনে শিশুটি হয়ে পড়ে কঙ্কালসার। এরপর তাকে ভাড়া দেওয়া হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। ১৯ জানুয়ারি ২০১১ দৈনিক জনকণ্ঠ-এর শিরোনাম, সেই শিশুর অঙ্গহানির বিবরণ এলাকাবাসীর মতে সাজানো নাটক। সাজানো হলো ভিক্ষাবৃত্তির কাহিনি।
আসকের দুজন কর্মকর্তাও বিষয়টি অনুসন্ধান করেন। তাঁদের বর্ণনায়, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১০ তিন শিশু নিয়ামুল, রাসেল ও ইমরান মার্বেল খেলছিল। রাসেল ও ইমরান তার পুরুষাঙ্গ কাটে। এরপর তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি ওমর ফারুকের কাছে বিচার দেয়। তিনি কামরাঙ্গীরচর থানাকে জানান। পুলিশ রাসেল ও ইমরানকে ধরে নিয়ে যায়। থানা ও আদালতে মামলা হয়। নিয়ামুল ও রাসেলের পরিবার নাজমার বাসায় ভাড়া থাকে।
পরে এই নাজমা বেগমকে আমরা পাই পত্রপত্রিকার রিপোর্টে। কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ওমর ফারুক ও নাজমা বেগমের নেতৃত্বে একটি চক্র শিশুদের বিকলাঙ্গ করে তাদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির কাজ করাচ্ছে। টিভিতেও এর সম্প্রচার ঘটে।
কয়েকটি বিষয় দেখে মনে হয়েছে, বিষয়টি খুবই জটিল। প্রশ্নজাল তৈরি করে। প্রথমত, গত সেপ্টেম্বরে মার্বেল খেলার ঘটনার জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছিল কি না? এর প্রায় দুই মাস পর ইমরানের বড় ভাই কুরবান আলীকে র্যাব অপহরণ করেছিল কি না? র্যাব-১ তাঁকে আটক করেছিল কি না? তাকে নির্যাতন করে নিয়ামুলের ঘটনার মূল হোতা হিসেবে ওমর ফারুক, নাজমা বেগমসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তৈরি করেছিল কি না? পরে ওমর ফারুককে র্যাব চার দফায় মোট ১২ দিন রিমান্ডে নিয়েছিল কি না? সে সময় তাঁকে ইলেকট্রিক শক বা নিপীড়ন চালানো হয়েছিল কি না? এবং তাঁর কাছ থেকে সাজানো জবানবন্দি আদায় করা হয়েছিল কি না?
আসকের কাছে কারাবন্দী ওমর ফারুক বলেন, ‘আমি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। এ ঘটনায় আমি সালিস করেছিলাম। নিয়ামুলের বাবা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। তখন রাসেল ও ইমরানের বাবা বলেছেন, “আমরাও গরিব, এত টাকা দিতে পারব না।” তখন কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। এরপর হঠাৎ করেই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। আমাকে র্যাব আটক করে। র্যাব ১০ দিন ও পুলিশ দুই দিন রিমান্ডে নিয়েছে। নির্যাতনের কারণে র্যাব যা শিখিয়ে দিয়েছে, তা-ই বলেছি। নাজমা আক্তারকে ফুফু বলে জানি। তাঁর নাম আমাকে বলতে বাধ্য করেছে। ঘটনা হয়েছে বাচ্চাদের সঙ্গে বাচ্চাদের। অথচ টেলিভিশন ও পেপারে সাংবাদিকদের সামনে আমাকে দিয়ে বলতে বাধ্য করেছে, আমরা শিশুদের নুলা করে ভিক্ষা করাই। এসবই মিথ্যা ও বানোয়াট।’
কুরবান এই গল্পের মুখ্য চরিত্র। হাইকোর্টের আদেশেও এসেছে তাঁর নাম। ৯ জানুয়ারি আদালত লিখেছেন, ‘অভিযুক্ত কুরবানের বিবৃতিতে যাদের নাম এসেছে, সেই সব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে আইজিপি ও মহানগর পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হলো। এবং যখন উপযুক্ত মনে হবে, তখন তাঁরা রিমান্ড প্রার্থনা করবেন।’ আদালতের আদেশে আরও বলা হয়, ‘কদমতলীর ওসি যথাসম্ভব শিগগির ইনভেস্টিগেশন সম্পন্ন করবেন। আমরা অভিযুক্ত কুরবানকে গ্রেপ্তার এবং অশুভ চক্রের উদ্ঘাটন র্যাব সদস্যদের চমৎকারিত্বপূর্ণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করছি।’
৬ মার্চ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসকের কাছে তাঁর দাবি: ‘আমার নাম কুরবান আলী। অথচ র্যাব মামলায় আমার নাম দিয়েছে শরিফুল ইসলাম কুরবান। আমার নাম কোনো দিনও শরিফুল ইসলাম কুরবান ছিল না।’ গত ৩০ ডিসেম্বর প্রথম আলোর রিপোর্টেও “শরিফুল ইসলাম” দেখেছি। তিনি আসককে বলেন, ‘আমি একটি চায়ের দোকান চালাই। হঠাৎ একদিন কিছু লোক মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। আমার চোখ বেঁধে ফেলে। চোখ খুলে দেখি একটি কক্ষ। চার-পাঁচজন লোক। একজনকে চিনি। তিনি এলিনা খান।’ এলিনা গতকাল তা অস্বীকার করেন। তবে কুরবান আসককে বলেন, নির্যাতিত হয়ে তাঁকে বলতে হয়, ‘পঙ্গু করে আরও অনেককে ভিক্ষাবৃত্তি করিয়েছি। তারা আমাকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়েছে।’
শিশু নিয়ামুলের ঘটনায় অভিযুক্ত ইমরানের মা আয়েশা বেগম আসককে নিশ্চিত করেন যে ‘মার্বেলের ঘটনার পর পুলিশ ইমরান ও রাসেলকে আটক করেছিল। আদালত তাদের গাজীপুরের শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠিয়েছিল। পক্ষকাল পর ইমরান জামিনে বের হয়ে আসে। এলিনা খান গতকাল আমাকে বলেন, ‘ওই আটক ও মামলা ছিল সাজানো।’ আরটিভির ক্রাইম রিপোর্টে ভিক্ষাবৃত্তির বিষয়টি প্রকাশ পায়। র্যাবের সন্দেহভাজন নাজমা আক্তার ২ মার্চ ২০১১ আসকের অফিসে যান। তিনি মার্বেল খেলা ও সেটা নিয়ে পরবর্তী ঘটনার বিবরণ দেন। বলেন, ‘নিয়ামুল ও রাসেলের পরিবার আমার বাড়িতে ভাড়া থাকে। তারা উভয়েই দরিদ্র পরিবারের শিশু। একটা আপস হয়েছিল। আপসনামায় সাক্ষীদের মধ্যে আমি প্রথম সই করি। ওমর ফারুকও সই করেন। কিন্তু নিয়ামুলের বাবা উমেদ ও অভিযুক্ত রাসেলের বাবা এতে সই দেননি। ওই সালিসের দুই দিন পর এলিনা খান ও রোকেয়া প্রাচী নিয়ামুলের ঘটনার বিষয়ে সাক্ষাৎকার নেন।’
শিশু নিয়ামুলের ঘটনায় অভিযুক্ত ইমরানের বাবা আবদুল জব্বার ৮ মার্চ আসকের অফিসে যান। তিনিও মার্বেল ও মারামারির বিবরণ দেন। ইমরানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, নাজমা বেগমের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না। তাঁর কথা, ‘নিয়ামুলের ঘটনার আগে থেকে আজ পর্যন্ত আমি নাজমা খালাকে দেখিনি এবং তাঁর সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার কোনো কথা হয়নি।’
সবচেয়ে লক্ষণীয় হচ্ছে, কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম সিকদার জানান, মার্বেলের ঘটনায় রাসেল ও ইমরানকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। থানায় মামলা হওয়ার পর একই বিষয়ে নিয়ামুলের বাবা আদালতে আরেকটি মামলা করেন। তিনি বলেন, এ মামলার তদন্তভার পুলিশের কাছে নেই। র্যাব-১ তদন্ত করছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র্যাব-১-এ কর্মরত এএসপি বাতেন আসকের কর্মীকে ফোনে জানান, ‘ভিকটিম শিশুকে আপনারা পাবেন না। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সে আমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।’
বিচারপতি এ এইচ এম সামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ২ জানুয়ারি ২০১১ একটি সুয়োমোটো রুল জারি করেন। সেই রুলের অন্যতম জিজ্ঞাসা ছিল অভিযুক্ত ‘কুরবান’কে রিমান্ডে নিতে তাঁরা কেন আবেদন করেননি। তাঁরা কেন রমজান, সাদ্দাম, ইমরান, রাসেল, ওমর ফারুক, সালাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ থেকে প্রশ্ন ওঠে, ইমরান ও রাসেলের পূর্ববর্তী গ্রেপ্তারের তথ্য আদালতের গোচরে আনা হয়েছিল কি।
৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, এসআই নুরুল আলমের ভূমিকা এই ‘বিয়োগান্ত উপাখ্যানে’ কী ছিল, সেটা উদ্ঘাটন প্রয়োজন। সেটা হয়তো একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত চক্রের অংশ হতে পারে। তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকে তাঁকে অপসারণ করতে নির্দেশ দেওয়া হলো। এবং তাঁকে অবিলম্বে বরখাস্ত করতে হবে। বিভাগীয় মামলা দায়ের করতে হবে।
হাইকোর্ট র্যাবকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এতে অভিযুক্তদের মনে বিচার লাভের অনুভূতি অনেক কম সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে হয়। আদালত বলেছেন, ‘একজন উপযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তা, সেটা র্যাব থেকেই হলে ভালো হয়, পুরো সত্য ঘটনা উদ্ঘাটনে নিয়োগ করতে হবে। আমরা এ বিষয়টিকে উচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানের নির্দেশনা দিচ্ছি। এটা হয়তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গডফাদাররা হয়তো এ ক্ষেত্রে বহুসংখ্যক সংগঠিত চক্র গড়ে তুলেছে।’ এর পরও কোনো সরকারি তদন্তের ফলাফল বের হয়নি। অথচ আদালত বলেছেন, নিয়ামুল র্যাবের হেফাজতে থাকবে। কারণ, নিয়ামুল এই বিষয়ের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তাই র্যাবের মহাপরিচালক নিয়ামুলের সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন।’
আমরা মনে করি না যে র্যাব বা অন্য কোনো সংস্থার তদন্তে এর সুষ্ঠু সুরাহা মিলবে। শুনেছি ড. কামাল হোসেনকে নথিপত্র দিয়েছে আসক। তিনি নাকি একটু চোখ বুলিয়ে বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। জনকণ্ঠ পত্রিকার রিপোর্ট আদালতের গোচরে এসেছে। আদালত বলেছেন, ‘তদন্তের স্বার্থে আরও রিপোর্ট না করাই সমীচীন।’ নাজমা সম্পর্কে সুলতানা কামালের বক্তব্য গতকাল এলিনার নজরে আনি। তিনি সুলতানাকে সরাসরি নাকচ করেননি। তিনি বলেন, নাজমার ভূমিকা শুরু থেকেই বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ। এলিনা নিশ্চিত করেন যে, এ ঘটনার বিষয়ে আদালতের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শক্তিশালী কমিটি করেছে। কদমতলী থানাকে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলেছেন। কেউ দেয়নি। তদন্ত বলতে এলিনার মানবাধিকার ফাউন্ডেশন আদালতকে তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে। এ জন্যই আমি একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন দ্বারা পুরো ঘটনার তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। স্বল্পতম সময়ে জনসমক্ষে তার প্রকাশ আশা করি। এলিনাও এই দাবির সঙ্গে একমত হন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Tuesday, March 22, 2011
উইকিলিকস ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের জবাবদিহি by মিজানুর রহমান খান
উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া মার্কিন দূতাবাসের সর্বশেষ দলিলটি অন্তত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের ভূমিকা ও জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। ড. গওহর রিজভী যদিও দাবি করেছেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির সঙ্গে ওই তারিখে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি। তাহলে ধরে নিতে হবে, মরিয়ার্টি আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে একটি বার্তা ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। ড. রিজভীর দাবি সত্য হলে সেটি হয়তো হবে মার্কিন কূটনৈতিক ইতিহাসের এক অদ্ভুত বিপর্যয়। অবশ্য মরিয়ার্টি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। বিষয়টি ১৯২৩ সালের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আলোকে যাচাইযোগ্য। ওই বার্তাটি বানোয়াট প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করব। তত দিন এ নিয়ে আলাপ করতে পারি। আমরা হয়তো এ পর্যন্ত একটি মুখ রক্ষার বিবৃতি পেয়েছি। ড. রিজভীর ব্যাখ্যায় মনে হয়েছে, তিনি ‘ব্যক্তিগতভাবে’ বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সত্যিই দেখা করেননি!
সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেন। সে দেশে বিশেষ উপদেষ্টা রয়েছে। সহজেই বোঝা যায়, কে মন্ত্রী আর কে উপদেষ্টা। কোন কাজ মন্ত্রী করেন, কোন কাজ উপদেষ্টা করেন। কিন্তু আমাদের দেশে তা ঠাহর করা যায় না। দেশে উপদেষ্টার আকস্মিক প্রাদুর্ভাব ঘটল। ৪৪ জন মন্ত্রীর দেশে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত উপদেষ্টা সাত। কোনো আইন হলো না।
এক-এগারোতে ভাগ্যবিড়ম্বিত আব্দুল জলিল ২০০৯ সালে সংসদে কথাটা তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘উপদেষ্টারা মন্ত্রিসভার বৈঠকে বসতে পারেন না। কারণ সেখানে অনেক গোপনীয় বিষয় আলোচিত হয়। মন্ত্রীরা গোপনীয়তার শপথ নেন। উপদেষ্টাদের নিতে হয় না।’ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা আলাউদ্দিন আহমেদ ক্ষুব্ধ হন। বলেন, ‘তিনি মন্ত্রিসভায় বসতে পারেননি। তাঁর ক্ষোভ তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারেন। সংসদে বলাটা দৃষ্টিকটু।’ ড. আলাউদ্দিন স্পষ্টতই ভ্রান্ত। আমরা ভুলিনি, চরম দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির ধাক্কা সামাল দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গত বছর তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি বিষয়ে একটি নন্দিত তালিকা করেন। সচেতন মহলে তা প্রশংসিত হয়। কিন্তু অবাঞ্ছিত দলীয় ও কোটারি চাপ আসে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটান। তিনি উপদেষ্টা আলাউদ্দিনকে সেই তালিকা সংশোধন করতে বলেন। তবে এ ধরনের কাজে উপদেষ্টাদের সম্পৃক্ত করা প্রমাণ দেয়, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় উপদেষ্টা কী কাজে লাগে, সে ব্যাপারে শাসকদের ধারণা নেই। চাকরি দিতে হবে। কারও ঠাটবাট, ওজন আরও বাড়াতে হবে। তাই পদ সৃষ্টি করা। আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর উপদেষ্টার কথা শুনেছিলাম। ইদানীং জানছি, ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা’ এই নামেও অঘোষিত পদ আছে। কোনো বিষয় নির্দিষ্ট ছাড়া ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা’ পদ অন্য কোথাও আছে কি না, সন্দেহ।
সরকারের কাজ আর সরকারি দলের কাজ সব সময় এক হতে পারে না। ব্রিটেনের চেয়ে এ সমস্যা আমাদের বেশি। ব্রিটেনের আচরণবিধি মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কাজের ফারাক স্পষ্ট করেছে। তাদের বিধি বলেছে, সরকার ও সরকারি দলের কাজে কখনো ‘ওভারল্যাপ’ বা দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। তখন স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তারা তাতে জড়াবে না। তখন মন্ত্রীদের সহায়তা দেবেন বিশেষ উপদেষ্টারা। প্রকৃতপক্ষে প্রশাসনকে নির্দলীয় রাখাও বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগের অন্যতম দায়িত্ব। আর আমরা দেখি উল্টো। নির্দলীয় বিষয়ে দলীয় বিষ ঢালেন উপদেষ্টা।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাত উপদেষ্টা। মন্ত্রীদের কারও নেই। ব্রিটিশ মন্ত্রীরা কিন্তু অনধিক দুজন বিশেষ উপদেষ্টা নিতে পারেন। তবে তাঁদের নিয়োগপত্রে বিষয় ও কী ধরনের কাগজপত্র দেখবেন, তা নির্দিষ্ট থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এই উপদেষ্টারা মন্ত্রিসভা বৈঠকেও অংশ নিতে পারেন।
এ বিষয়ে দু-একটি উদাহরণ দিই। লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচার। প্রধানমন্ত্রিত্বের শুরুতে উপদেষ্টা নিয়োগে নিরাসক্ত ছিলেন। রাজনীতি বিষয়ে মন্ত্রী, নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মন্ত্রণালয়। এ-ই ছিল তাঁর মন্ত্র। পরে মত পাল্টান। অ্যান্থনি স্টিফেন কিং লিখেছেন, ১৯৮০ সালে থ্যাচার ভাবলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় ঠিকভাবে চলছে কি না, তার নজরদারি দরকার। মুদ্রানিয়ন্ত্রণবাদী মার্কিন অর্থনীতিবিদ অ্যালান ওয়াল্টারকে নিয়োগ দেন। তাঁর জ্যেষ্ঠতা ও স্বাধীন মর্যাদা বজায় রাখতে হবে। তাই তাঁর পদমর্যাদা ছিল অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তিরাশির জানুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। তবে খণ্ডকালীন উপদেষ্টা হন। মাসে একটা সপ্তাহ লন্ডনে কাটাতেন।
মার্কিন অধ্যাপক ওয়াল্টারকে দিয়ে থ্যাচার কী কাজ করিয়েছেন, তা দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ জানে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তা অকপটে বলতে পারবেন। কিন্তু স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. রিজভী কী করছেন, তা কি আমরা জানতে পারছি, নাকি পারব? আমাদের পেশাদার কূটনীতিকদের কাছে কি স্পষ্ট যে দেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কী কাজ করেন? ড. রিজভী রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ান। আমাদের ছাত্রদের কি পড়ানো হবে যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের কাজ কী। আমাদের মন্ত্রীদের অনেকেই উপদেষ্টাদের প্রতি বিরক্ত। কারণ অহেতুক তাঁরা তাঁদের মাথার ওপর ছায়া ফেলেছেন। তাঁদের পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা অপরিহার্য কেন? মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজনকে অবৈতনিক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা করেছেন। মন্ত্রীর মর্যাদা দরকার হয়নি। বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরও তখন মন্ত্রীর পদমর্যাদা দরকার পড়েনি। আমাদের উপদেষ্টারা পদমর্যাদায় পূর্ণ মন্ত্রী।
বিধিবিধানের বাঁধন সত্ত্বেও উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ব্রিটেনেও আছে। জেমস কালাহান সরকারের বিশেষ উপদেষ্টা লর্ড ম্যাক নেলি সম্প্রতি বলেন, ‘বিশেষ উপদেষ্টা ও সিভিল সার্ভেন্টদের মধ্যে ভারসাম্য আরও নিকৃষ্ট রূপ নিচ্ছে। কোনো ব্যক্তি এখন সহজেই রাজনৈতিক নিয়োগ থেকে সিভিল সার্ভেন্ট কিংবা সিভিল সার্ভেন্ট থেকে রাজনৈতিক নিয়োগ পেতে পারেন।’
আমরা উদ্বিগ্ন হতে পারি এই ভেবে যে আমাদের আমলাতন্ত্র এবং আগ্রহীরা ক্রমশ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে ‘বিশেষ বিনিয়োগে’ আগ্রহী হতে পারে। আব্দুল জলিলকে খণ্ডাতে গিয়ে ড. আলাউদ্দিনের ঔদ্ধত্য মন্তব্য বড়ই উদ্বেগজনক। তাঁর কথায়, ‘কতজন উপদেষ্টা থাকবেন সেটা প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপার। তিনি চাইলে ১০০ জনও থাকতে পারেন।’ তবে তিনি বলেছিলেন, তাঁদের ‘কার্যপরিধি’ আছে। থাকলে সেটা প্রকাশ করা হোক। আমরা জানতে চাই।
১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড সংকটের পর থ্যাচার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নিয়োগ করেছিলেন স্যার অ্যান্থনি পার্সনসেক। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় তিনি জাতিসংঘে ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিরাশির ডিসেম্বরে তাঁর দরকার ফুরায়। স্যার পার্সি ক্রাডকক আসেন। কারণ কী। তিনি চীনে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিরাশিতে হংকং প্রশ্নে ব্রিটেনের ভূমিকা কী হবে, সেটা নির্ধারণ জরুরি ছিল। তাই তাঁকে বেছে নেওয়া হয়। এসব আমরা অনলাইনেই জানতে পারি। কিন্তু আমাদের উপদেষ্টাদের কাকে কী কারণে বেছে নেওয়া হলো, সেটা আমরা জানি না। অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত ড. রিজভীকে বিশ্ব চেনে। বাংলাদেশ চেনে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক ইস্যুগুলোতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কখন কেমন ছিল, তা আমাদের জানা নেই।
মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘রিজভী রাষ্ট্রদূতকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরসংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে অত্যন্ত গোপন ও ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল। শুধু গত সপ্তাহে এতে সম্পৃক্ত করা হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।’ এই বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যত বাদ দিয়েই ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ‘ছোট তরী’ এতই ছোট যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তাতে ঠাঁই নেই। যার বিয়ে তার খবর নেই। নীতিনির্ধারণী পেশাদার কূটনীতিকদের অন্ধকারে রাখা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা আমাদের ইতিহাসে বিরল নয়। সামরিক শাসনামলে এর যথেচ্ছাচার ঘটেছে। ড. আলাউদ্দিনও বলেছেন, উপদেষ্টা নিয়োগ নতুন নয়। জিয়ার আমল থেকে চলছে। বাহ্। কী চমৎকার যুক্তি! সাধে কি বলি, সামরিক শাসন যায়, সামরিক সংস্কৃতি যায় না।
আমরা বহুকাল জেনেছি, ভারতের আমলাতন্ত্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে অন্যতম বড় বাধা। এই সে দিনও ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্রীনিবাসনদ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে এ বিষয়ে আক্ষেপ করেছেন। মুচকুন্দ দুবের কাছ থেকেও তেমনটাই শুনেছি। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার থাকাকালে বাংলাদেশকে শূন্য শুল্ক-সুবিধা দিতে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। এর বহু পরে ঢাকায় তিনি আমাকে বলেন, ভারতের আমলাতন্ত্রই বাধা। আর এবারে মরিয়ার্টিকে ড. রিজভী ধারণা দিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও ট্রানজিটের মতো সুবিধা ভারতকে প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রই বাধা। মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘চূড়ান্ত ধাপে এসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও মসিউর রহমানকে; আমলাতন্ত্রের মধ্যে আটকে পড়া চুক্তিগুলো বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলাদের সম্পর্কে রিজভী বলেন, ‘তাঁদের সৃজনশীলতা ও দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে।’
তবে ড. রিজভী তাঁর বক্তব্য অস্বীকার করলেও মরিয়ার্টি করেননি। তাঁর কাছ থেকে আমাদের তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম পাঠ নিতে পারে। কারণ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে তল্পিবাহকেরা অনেক সময় সেসব বিষয়ে বড় বড় শিরোনাম ছাপেন, যেগুলো ভারতের জাতীয় স্বার্থের বা অগ্রাধিকারের অনুকূল হয়। মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম নতুন ও তুলনামূলকভাবে গৌণ চুক্তিগুলোর (প্রত্যর্পণ, বন্দিবিনিময়, বিদ্যুৎ বিনিময় ইত্যাদি) ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এবং এই সফরকালে সেগুলো স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ সত্যিই আমরা সম্মিলিতভাবে মুজিব-ইন্দিরার ঐতিহাসিক চুক্তির অনুসমর্থন, পানি ভাগাভাগি ও সমুদ্রসীমা ইত্যাদি প্রশ্নে আওয়াজ তুলতে পারিনি। মরিয়ার্টিকে ধন্যবাদ। তিনি যথার্থই বাংলাদেশের প্রেসের দৈন্য চিহ্নিত করতে পেরেছেন।
মরিয়ার্টি রিজভীর বরাতে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা বিতর্কটি একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক সালিস কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করে তখন ভারতীয়রা হতাশ হয়।’ রিজভী সম্ভবত এখানেও অসতর্ক ছিলেন। তিনি যদি মরিয়ার্টিকে এই ধারণা দিয়ে থাকেন যে সমুদ্রসীমা বিতর্কটি বাংলাদেশ একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক দরবারে নিয়ে গেছে, তাহলে তাতে সত্যের অপলাপ ঘটে। কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সরকারই এ বিষয়ে সংলাপের সূচনা ঘটিয়েছিল। বাংলাদেশ বুঝতে পেরেছিল, ভারতীয় আমলাতন্ত্র কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে আলোচনার টেবিলে এই বিতর্কের মীমাংসা নেই। অথচ সময় পার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পিঠ অনেক আগেই দেয়ালে ঠেকে। তখন উপায়ান্তর না দেখে ভারতের প্রতি বন্ধুপরায়ণ আওয়ামী লীগ কিংবা সমগ্র জাতি ইন্দিরা গান্ধীর দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও আমাদের সরকারকে সালিসিতে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে ভারতের হতাশা নয়, তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। আমরা যখন ভারতকে করিডোর দিই, তখন আমাদের রিজভী সাহেবকে তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়ে ‘সামান্য আশাবাদী’ মনে হয়। তার মানে অবশিষ্ট নদ-নদীর ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে এখনো আশাবাদী হওয়ার প্রশ্ন আসে না।
ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা উইকিলিকসের এই খবরটি পরিবেশন করতে গিয়ে তার কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে শেখ হাসিনার কলকাতা সফর ভণ্ডুল করে দেওয়ার বিষয়টি। তুলনা চলে না, তবে এক অর্থে দিল্লির চেয়ে বরাবর কলকাতা আমাদের বান্ধব। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাসংগ্রামে আমরা পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলাম। জ্যোতি বসু চলে গেছেন। গঙ্গার মতো সহজে তিস্তা হবে কি না, সন্দেহ। প্রণব মুখার্জির যুগের অবসান ঘটলে আমরা দিল্লির সঙ্গে কাদের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলব, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা দিল্লির সঙ্গে বড় গলায় কথা বলেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কোনো সাড়াশব্দ কিংবা কোনো প্রাণের স্পন্দন পাই না। ড. রিজভী প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্টতই অপরিণামদর্শী পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ দিল্লির সঙ্গে দর-কষাকষিতে কিংবা ছাড় পাওয়া না-পাওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালি রাজনীতিকেরাই কার্যকর ভূমিকা রাখেন এবং রাখবেন। পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজ কিংবা বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ মানুষগুলোকে কাছে না টেনে দিল্লি থেকে ঢাকায় উড়ে আসার পরামর্শ সঠিক ছিল না। কারণ, বাংলাদেশের বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপির মতো দলকে ভারত প্রশ্নে অহেতুক ভয় করার কোনো কারণ নেই। কারণ তার রাজনৈতিক বিকাশ যথেষ্ট বৈধতা পেয়েছে ভারত-বিরোধিতার বাতাবরণে। তাকে সামলাতে কলকাতাকে চটানো কোনো যুক্তির কথা নয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের বিরোধী দলের অপপ্রচার কিংবা পাবলিক খেপানো দিল্লির নীতিনির্ধারকদের অবাক করবে না।
সুতরাং ড. গওহর রিজভী বা অন্য কারও পরামর্শে প্রধানমন্ত্রীর কলকাতাকে পাশ কাটানো ভুল হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘রূপান্তরে’ কলকাতাকে লাগবেই। তবে উপদেষ্টাদের জবাবদিহির বিষয়টিই আমরা বড় করে দেখি। তাঁদের কার কী কাজ থাকবে, মন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কী হবে, তা নির্দিষ্ট করে একটি আইন করতে হবে। ব্রিটিশরা উইকস কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বলেছে, ‘সরকার বিশ্বাস করে না যে বিশেষ উপদেষ্টার বিষয় সংখ্যা দিয়ে বিবেচ্য হতে পারে। ইস্যু হচ্ছে জবাবদিহি, ভূমিকা, দায়িত্বশীলতা ও তাদের সংখ্যার বিষয়ে স্বচ্ছতা।’ আমরাও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের কাজের স্বচ্ছতা আশা করি। মন্ত্রীদের সম্পদের বিবরণী চাওয়া হয়েছে। উপদেষ্টারাও দেবেন। তবে বড় দরকার মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের জন্য পৃথক আচরণবিধি।
ড. রিজভীর একটি মনোভঙ্গি উল্লেখ না করলেই নয়। মরিয়ার্টির সঙ্গে তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত ও সামাজিক’ সম্পর্ক আছে বলেই তিনি আমাদের অবহিত করেছেন। সেটা তিনি যথারীতি বজায় রাখবেন। কিন্তু মরিয়ার্টির কথিত বার্তার সত্যতা যাচাই করবেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা। সত্যিই তাঁর এই পরিহাস স্বচ্ছ।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেন। সে দেশে বিশেষ উপদেষ্টা রয়েছে। সহজেই বোঝা যায়, কে মন্ত্রী আর কে উপদেষ্টা। কোন কাজ মন্ত্রী করেন, কোন কাজ উপদেষ্টা করেন। কিন্তু আমাদের দেশে তা ঠাহর করা যায় না। দেশে উপদেষ্টার আকস্মিক প্রাদুর্ভাব ঘটল। ৪৪ জন মন্ত্রীর দেশে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত উপদেষ্টা সাত। কোনো আইন হলো না।
এক-এগারোতে ভাগ্যবিড়ম্বিত আব্দুল জলিল ২০০৯ সালে সংসদে কথাটা তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘উপদেষ্টারা মন্ত্রিসভার বৈঠকে বসতে পারেন না। কারণ সেখানে অনেক গোপনীয় বিষয় আলোচিত হয়। মন্ত্রীরা গোপনীয়তার শপথ নেন। উপদেষ্টাদের নিতে হয় না।’ প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা আলাউদ্দিন আহমেদ ক্ষুব্ধ হন। বলেন, ‘তিনি মন্ত্রিসভায় বসতে পারেননি। তাঁর ক্ষোভ তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারেন। সংসদে বলাটা দৃষ্টিকটু।’ ড. আলাউদ্দিন স্পষ্টতই ভ্রান্ত। আমরা ভুলিনি, চরম দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির ধাক্কা সামাল দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। গত বছর তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি বিষয়ে একটি নন্দিত তালিকা করেন। সচেতন মহলে তা প্রশংসিত হয়। কিন্তু অবাঞ্ছিত দলীয় ও কোটারি চাপ আসে। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রীর সিদ্ধান্তের পরিবর্তন ঘটান। তিনি উপদেষ্টা আলাউদ্দিনকে সেই তালিকা সংশোধন করতে বলেন। তবে এ ধরনের কাজে উপদেষ্টাদের সম্পৃক্ত করা প্রমাণ দেয়, সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় উপদেষ্টা কী কাজে লাগে, সে ব্যাপারে শাসকদের ধারণা নেই। চাকরি দিতে হবে। কারও ঠাটবাট, ওজন আরও বাড়াতে হবে। তাই পদ সৃষ্টি করা। আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর উপদেষ্টার কথা শুনেছিলাম। ইদানীং জানছি, ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা’ এই নামেও অঘোষিত পদ আছে। কোনো বিষয় নির্দিষ্ট ছাড়া ‘প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা’ পদ অন্য কোথাও আছে কি না, সন্দেহ।
সরকারের কাজ আর সরকারি দলের কাজ সব সময় এক হতে পারে না। ব্রিটেনের চেয়ে এ সমস্যা আমাদের বেশি। ব্রিটেনের আচরণবিধি মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের কাজের ফারাক স্পষ্ট করেছে। তাদের বিধি বলেছে, সরকার ও সরকারি দলের কাজে কখনো ‘ওভারল্যাপ’ বা দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। তখন স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তারা তাতে জড়াবে না। তখন মন্ত্রীদের সহায়তা দেবেন বিশেষ উপদেষ্টারা। প্রকৃতপক্ষে প্রশাসনকে নির্দলীয় রাখাও বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগের অন্যতম দায়িত্ব। আর আমরা দেখি উল্টো। নির্দলীয় বিষয়ে দলীয় বিষ ঢালেন উপদেষ্টা।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাত উপদেষ্টা। মন্ত্রীদের কারও নেই। ব্রিটিশ মন্ত্রীরা কিন্তু অনধিক দুজন বিশেষ উপদেষ্টা নিতে পারেন। তবে তাঁদের নিয়োগপত্রে বিষয় ও কী ধরনের কাগজপত্র দেখবেন, তা নির্দিষ্ট থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এই উপদেষ্টারা মন্ত্রিসভা বৈঠকেও অংশ নিতে পারেন।
এ বিষয়ে দু-একটি উদাহরণ দিই। লৌহমানবী মার্গারেট থ্যাচার। প্রধানমন্ত্রিত্বের শুরুতে উপদেষ্টা নিয়োগে নিরাসক্ত ছিলেন। রাজনীতি বিষয়ে মন্ত্রী, নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মন্ত্রণালয়। এ-ই ছিল তাঁর মন্ত্র। পরে মত পাল্টান। অ্যান্থনি স্টিফেন কিং লিখেছেন, ১৯৮০ সালে থ্যাচার ভাবলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় ঠিকভাবে চলছে কি না, তার নজরদারি দরকার। মুদ্রানিয়ন্ত্রণবাদী মার্কিন অর্থনীতিবিদ অ্যালান ওয়াল্টারকে নিয়োগ দেন। তাঁর জ্যেষ্ঠতা ও স্বাধীন মর্যাদা বজায় রাখতে হবে। তাই তাঁর পদমর্যাদা ছিল অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। তিরাশির জানুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। তবে খণ্ডকালীন উপদেষ্টা হন। মাসে একটা সপ্তাহ লন্ডনে কাটাতেন।
মার্কিন অধ্যাপক ওয়াল্টারকে দিয়ে থ্যাচার কী কাজ করিয়েছেন, তা দুনিয়াসুদ্ধ মানুষ জানে। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি তা অকপটে বলতে পারবেন। কিন্তু স্বনামধন্য অধ্যাপক ড. রিজভী কী করছেন, তা কি আমরা জানতে পারছি, নাকি পারব? আমাদের পেশাদার কূটনীতিকদের কাছে কি স্পষ্ট যে দেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কী কাজ করেন? ড. রিজভী রাষ্ট্রবিজ্ঞান পড়ান। আমাদের ছাত্রদের কি পড়ানো হবে যে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের কাজ কী। আমাদের মন্ত্রীদের অনেকেই উপদেষ্টাদের প্রতি বিরক্ত। কারণ অহেতুক তাঁরা তাঁদের মাথার ওপর ছায়া ফেলেছেন। তাঁদের পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদা অপরিহার্য কেন? মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অর্থনীতিবিদ রঘুরাম রাজনকে অবৈতনিক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা করেছেন। মন্ত্রীর মর্যাদা দরকার হয়নি। বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরও তখন মন্ত্রীর পদমর্যাদা দরকার পড়েনি। আমাদের উপদেষ্টারা পদমর্যাদায় পূর্ণ মন্ত্রী।
বিধিবিধানের বাঁধন সত্ত্বেও উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ব্রিটেনেও আছে। জেমস কালাহান সরকারের বিশেষ উপদেষ্টা লর্ড ম্যাক নেলি সম্প্রতি বলেন, ‘বিশেষ উপদেষ্টা ও সিভিল সার্ভেন্টদের মধ্যে ভারসাম্য আরও নিকৃষ্ট রূপ নিচ্ছে। কোনো ব্যক্তি এখন সহজেই রাজনৈতিক নিয়োগ থেকে সিভিল সার্ভেন্ট কিংবা সিভিল সার্ভেন্ট থেকে রাজনৈতিক নিয়োগ পেতে পারেন।’
আমরা উদ্বিগ্ন হতে পারি এই ভেবে যে আমাদের আমলাতন্ত্র এবং আগ্রহীরা ক্রমশ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদে ‘বিশেষ বিনিয়োগে’ আগ্রহী হতে পারে। আব্দুল জলিলকে খণ্ডাতে গিয়ে ড. আলাউদ্দিনের ঔদ্ধত্য মন্তব্য বড়ই উদ্বেগজনক। তাঁর কথায়, ‘কতজন উপদেষ্টা থাকবেন সেটা প্রধানমন্ত্রীর ব্যাপার। তিনি চাইলে ১০০ জনও থাকতে পারেন।’ তবে তিনি বলেছিলেন, তাঁদের ‘কার্যপরিধি’ আছে। থাকলে সেটা প্রকাশ করা হোক। আমরা জানতে চাই।
১৯৮২ সালে ফকল্যান্ড সংকটের পর থ্যাচার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা নিয়োগ করেছিলেন স্যার অ্যান্থনি পার্সনসেক। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় তিনি জাতিসংঘে ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিরাশির ডিসেম্বরে তাঁর দরকার ফুরায়। স্যার পার্সি ক্রাডকক আসেন। কারণ কী। তিনি চীনে ব্রিটেনের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিরাশিতে হংকং প্রশ্নে ব্রিটেনের ভূমিকা কী হবে, সেটা নির্ধারণ জরুরি ছিল। তাই তাঁকে বেছে নেওয়া হয়। এসব আমরা অনলাইনেই জানতে পারি। কিন্তু আমাদের উপদেষ্টাদের কাকে কী কারণে বেছে নেওয়া হলো, সেটা আমরা জানি না। অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত ড. রিজভীকে বিশ্ব চেনে। বাংলাদেশ চেনে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক ইস্যুগুলোতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কখন কেমন ছিল, তা আমাদের জানা নেই।
মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘রিজভী রাষ্ট্রদূতকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরসংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে অত্যন্ত গোপন ও ছোট পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল। শুধু গত সপ্তাহে এতে সম্পৃক্ত করা হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে।’ এই বক্তব্য থেকে আমরা বুঝতে পারি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে কার্যত বাদ দিয়েই ভারতের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনে সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ‘ছোট তরী’ এতই ছোট যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তাতে ঠাঁই নেই। যার বিয়ে তার খবর নেই। নীতিনির্ধারণী পেশাদার কূটনীতিকদের অন্ধকারে রাখা, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা আমাদের ইতিহাসে বিরল নয়। সামরিক শাসনামলে এর যথেচ্ছাচার ঘটেছে। ড. আলাউদ্দিনও বলেছেন, উপদেষ্টা নিয়োগ নতুন নয়। জিয়ার আমল থেকে চলছে। বাহ্। কী চমৎকার যুক্তি! সাধে কি বলি, সামরিক শাসন যায়, সামরিক সংস্কৃতি যায় না।
আমরা বহুকাল জেনেছি, ভারতের আমলাতন্ত্র বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে অন্যতম বড় বাধা। এই সে দিনও ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্রীনিবাসনদ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে এ বিষয়ে আক্ষেপ করেছেন। মুচকুন্দ দুবের কাছ থেকেও তেমনটাই শুনেছি। ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার থাকাকালে বাংলাদেশকে শূন্য শুল্ক-সুবিধা দিতে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। এর বহু পরে ঢাকায় তিনি আমাকে বলেন, ভারতের আমলাতন্ত্রই বাধা। আর এবারে মরিয়ার্টিকে ড. রিজভী ধারণা দিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও ট্রানজিটের মতো সুবিধা ভারতকে প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রই বাধা। মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘চূড়ান্ত ধাপে এসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও মসিউর রহমানকে; আমলাতন্ত্রের মধ্যে আটকে পড়া চুক্তিগুলো বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলাদের সম্পর্কে রিজভী বলেন, ‘তাঁদের সৃজনশীলতা ও দূরদৃষ্টির অভাব রয়েছে।’
তবে ড. রিজভী তাঁর বক্তব্য অস্বীকার করলেও মরিয়ার্টি করেননি। তাঁর কাছ থেকে আমাদের তল্পিবাহক বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যম পাঠ নিতে পারে। কারণ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে তল্পিবাহকেরা অনেক সময় সেসব বিষয়ে বড় বড় শিরোনাম ছাপেন, যেগুলো ভারতের জাতীয় স্বার্থের বা অগ্রাধিকারের অনুকূল হয়। মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম নতুন ও তুলনামূলকভাবে গৌণ চুক্তিগুলোর (প্রত্যর্পণ, বন্দিবিনিময়, বিদ্যুৎ বিনিময় ইত্যাদি) ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এবং এই সফরকালে সেগুলো স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ সত্যিই আমরা সম্মিলিতভাবে মুজিব-ইন্দিরার ঐতিহাসিক চুক্তির অনুসমর্থন, পানি ভাগাভাগি ও সমুদ্রসীমা ইত্যাদি প্রশ্নে আওয়াজ তুলতে পারিনি। মরিয়ার্টিকে ধন্যবাদ। তিনি যথার্থই বাংলাদেশের প্রেসের দৈন্য চিহ্নিত করতে পেরেছেন।
মরিয়ার্টি রিজভীর বরাতে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা বিতর্কটি একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক সালিস কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করে তখন ভারতীয়রা হতাশ হয়।’ রিজভী সম্ভবত এখানেও অসতর্ক ছিলেন। তিনি যদি মরিয়ার্টিকে এই ধারণা দিয়ে থাকেন যে সমুদ্রসীমা বিতর্কটি বাংলাদেশ একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক দরবারে নিয়ে গেছে, তাহলে তাতে সত্যের অপলাপ ঘটে। কারণ, ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সরকারই এ বিষয়ে সংলাপের সূচনা ঘটিয়েছিল। বাংলাদেশ বুঝতে পেরেছিল, ভারতীয় আমলাতন্ত্র কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে আলোচনার টেবিলে এই বিতর্কের মীমাংসা নেই। অথচ সময় পার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পিঠ অনেক আগেই দেয়ালে ঠেকে। তখন উপায়ান্তর না দেখে ভারতের প্রতি বন্ধুপরায়ণ আওয়ামী লীগ কিংবা সমগ্র জাতি ইন্দিরা গান্ধীর দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও আমাদের সরকারকে সালিসিতে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে ভারতের হতাশা নয়, তাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। আমরা যখন ভারতকে করিডোর দিই, তখন আমাদের রিজভী সাহেবকে তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়ে ‘সামান্য আশাবাদী’ মনে হয়। তার মানে অবশিষ্ট নদ-নদীর ন্যায্য হিস্যার বিষয়ে এখনো আশাবাদী হওয়ার প্রশ্ন আসে না।
ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকা উইকিলিকসের এই খবরটি পরিবেশন করতে গিয়ে তার কাছে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে শেখ হাসিনার কলকাতা সফর ভণ্ডুল করে দেওয়ার বিষয়টি। তুলনা চলে না, তবে এক অর্থে দিল্লির চেয়ে বরাবর কলকাতা আমাদের বান্ধব। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাসংগ্রামে আমরা পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলাম। জ্যোতি বসু চলে গেছেন। গঙ্গার মতো সহজে তিস্তা হবে কি না, সন্দেহ। প্রণব মুখার্জির যুগের অবসান ঘটলে আমরা দিল্লির সঙ্গে কাদের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলব, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
পশ্চিমবঙ্গে যাঁরা দিল্লির সঙ্গে বড় গলায় কথা বলেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কোনো সাড়াশব্দ কিংবা কোনো প্রাণের স্পন্দন পাই না। ড. রিজভী প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্টতই অপরিণামদর্শী পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ দিল্লির সঙ্গে দর-কষাকষিতে কিংবা ছাড় পাওয়া না-পাওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালি রাজনীতিকেরাই কার্যকর ভূমিকা রাখেন এবং রাখবেন। পশ্চিমবঙ্গের সুশীল সমাজ কিংবা বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ মানুষগুলোকে কাছে না টেনে দিল্লি থেকে ঢাকায় উড়ে আসার পরামর্শ সঠিক ছিল না। কারণ, বাংলাদেশের বিরোধী দল, বিশেষ করে বিএনপির মতো দলকে ভারত প্রশ্নে অহেতুক ভয় করার কোনো কারণ নেই। কারণ তার রাজনৈতিক বিকাশ যথেষ্ট বৈধতা পেয়েছে ভারত-বিরোধিতার বাতাবরণে। তাকে সামলাতে কলকাতাকে চটানো কোনো যুক্তির কথা নয়। তা ছাড়া বাংলাদেশের বিরোধী দলের অপপ্রচার কিংবা পাবলিক খেপানো দিল্লির নীতিনির্ধারকদের অবাক করবে না।
সুতরাং ড. গওহর রিজভী বা অন্য কারও পরামর্শে প্রধানমন্ত্রীর কলকাতাকে পাশ কাটানো ভুল হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ‘রূপান্তরে’ কলকাতাকে লাগবেই। তবে উপদেষ্টাদের জবাবদিহির বিষয়টিই আমরা বড় করে দেখি। তাঁদের কার কী কাজ থাকবে, মন্ত্রীদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক কী হবে, তা নির্দিষ্ট করে একটি আইন করতে হবে। ব্রিটিশরা উইকস কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বলেছে, ‘সরকার বিশ্বাস করে না যে বিশেষ উপদেষ্টার বিষয় সংখ্যা দিয়ে বিবেচ্য হতে পারে। ইস্যু হচ্ছে জবাবদিহি, ভূমিকা, দায়িত্বশীলতা ও তাদের সংখ্যার বিষয়ে স্বচ্ছতা।’ আমরাও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের কাজের স্বচ্ছতা আশা করি। মন্ত্রীদের সম্পদের বিবরণী চাওয়া হয়েছে। উপদেষ্টারাও দেবেন। তবে বড় দরকার মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের জন্য পৃথক আচরণবিধি।
ড. রিজভীর একটি মনোভঙ্গি উল্লেখ না করলেই নয়। মরিয়ার্টির সঙ্গে তাঁর ‘ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত ও সামাজিক’ সম্পর্ক আছে বলেই তিনি আমাদের অবহিত করেছেন। সেটা তিনি যথারীতি বজায় রাখবেন। কিন্তু মরিয়ার্টির কথিত বার্তার সত্যতা যাচাই করবেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা। সত্যিই তাঁর এই পরিহাস স্বচ্ছ।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Tuesday, March 8, 2011
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ! by মিজানুর রহমান খান
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অসম্মানজনকভাবে বিদায় দেওয়ার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের নিম্ন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই ধারাবাহিকতা। এই কাণ্ড ঘটিয়ে ভিন্নমতকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আনুগত্যহীনদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই নিকৃষ্ট রূপটি নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে তাজউদ্দীন আহমদের কথা। ওই সময়ে তাঁর অবস্থান অন্য সতীর্থদের মতো ছিল না। অনেক বিষয়ে তাঁর ভিন্নমত ছিল। সে জন্য তাঁকে খেসারত দিতে হয়।
ড. ইউনূস নোবেল জিতেছিলেন বলে কি রুষ্ট হন শেখ হাসিনা? ইউনূস দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেসব অন্যতম উপসর্গ। আসল রোগ নয়। গ্রামবাংলায় বিরল, যেখানে একজন মানি লোক আছেন যিনি স্থানীয় দলীয় এজেন্ট বা মাস্তানকে কুর্নিশ করছেন না, সেলাম ঠুকছেন না, ভেট-ভোট দিচ্ছেন না। নিরীহ নাগরিকের সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে না রাষ্ট্র। রাষ্ট্রযন্ত্র শুধু মেধা ও প্রজ্ঞার জন্য কাউকে কুর্নিশ করছে এমনটা কোথাও নেই। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বহু ব্যক্তির বিকাশ ও সহাবস্থান আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বেশি দিন ধারণ করতে পারে না। আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনেকেই সামন্ত আমলের জমিদারের মতো। তাঁরা দেশটাকে নিজের জমিদারি মনে করেন। অজ্ঞতা ও স্বেচ্ছাচারিতা তাঁদের ধর্ম। আমরা তাকে কখনো জাতীয়তাবাদী, কখনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চিহ্নিত করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলি। তাঁরা সংবিধান ও গণতন্ত্রের লেবাস বেশিক্ষণ গায়ে চাপিয়ে রাখতে পারেন না। অভ্যাস নেই। অস্বস্তি লাগে। তাই হঠাৎ হঠাৎ লেবাসটা খসে পড়ে।
ড. ইউনূসের ছায়াটা আরও প্রকাণ্ড হয়ে উঠেছিল। বিশ্ববাঙালি হওয়ার পথে তাঁর ছায়াটা দীর্ঘতর হচ্ছিল। কিন্তু তা ব্যক্তির পূজায় লাগছিল না। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর অসম্মানজনক অন্তর্ধানের কারণও ওই একই সুতোয় গাঁথা। আমিই শক্তি, নৈবেদ্য আমারই প্রাপ্য। প্রশ্নটা নিরঙ্কুশ আনুগত্যের। একইভাবে ড. কামাল হোসেনকে ‘বস্তি থেরাপি’ দেওয়া হয়েছিল। এভাবে আমরা আমাদের ইতিহাসে এটা দেখব যে—কি সামরিক কি বেসামরিক—একজন ব্যক্তিকে আমরা আরাধনার পাত্রে পরিণত করি। আর তাঁকে ঘিরে অন্য সবার অনন্ত আরাধনা আশা করি। অনেক জ্ঞানীগুণী তাই বড় দলে ভাত পান না। হারিস চৌধুরী ও মোসাদ্দেক আলী ফালুর মতো মাপের ব্যক্তি ভাত পান। তাঁরাই রাজনৈতিক উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হন। কিচেন ক্যাবিনেটে মোসাহেবদের রোশনাই বরাবর।
হাইকোর্টে শুনানি শুনছিলাম। রাষ্ট্রের ধাতব কণ্ঠ শুনলাম। রাষ্ট্র বলছে, মোদ্দা কথা, এটা বয়সের ব্যাপার। বয়সগত একটা সর্বজনীন ব্যাপার আছে। সবচেয়ে হাস্যকর ও ঠুনকো যুক্তি। আমরা ব্যক্তির জন্য সংবিধান তাঁর পায়ের মাপে করে নিতে ওস্তাদ জাতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হবেন প্রধানমন্ত্রী, তাই একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতেই নির্বাহী ক্ষমতা সমর্পিত হলো। মুজিব হবেন রাষ্ট্রপতি, তাই সংবিধানে লেখা হলো, ধরে নিতে হবে যেন তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। সামরিক ফরমানের যুগেও যেই লাউ সেই কদু। জিয়া সিএমএলএ থাকবেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনাও পুর্ণ করবেন। সেভাবে ফরমান পয়দা হলো। বিচারপতি সাত্তারের জন্য ষষ্ঠ সংশোধনী ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের জন্য আমরা একাদশ সংশোধনী পাস করেছি। বিচারপতি কে এম হাসানের জন্য এল ১৪তম সংশোধনী। এর আগে বয়সের ফাঁদ পেতে প্রধান বিচারপতি বধ করেন ‘বিশ্ববেহায়া’ এরশাদ। ড. ইউনূসের মতো প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন আকস্মিক ‘নো-বডি’ হন।
আমরা আইনের চোখে (অ)সমতা নিশ্চিত করা জাতি। সে জন্য আমরা ইউনূসকে ‘নিয়মিত কর্মকর্তার’ ঊর্ধ্বে তুলিনি। তবে তাঁকে স্বপদে বহাল রাখতে সংবিধান সংশোধনের দরকার ছিল না। বড়জোর এক লাইনের একটি বাক্য দরকার ছিল। গ্রামীণ ব্যাংকে বিকল্প নেতৃত্ব কিংবা ক্ষুদ্রঋণ পুঁজিবাদকে প্রশ্রয় দেয় কি দেয় না; দারিদ্র্যকে, সাম্রাজ্যবাদকে মহান করল কি না সেসব বিতর্ক এখন অবান্তর। তাঁকে অপমান করার মনোভঙ্গিই প্রকট। পুরো বিষয়টি আপাদমস্তক সামন্ততান্ত্রিক।
ইউনূস একা নন। এই সমাজে আরও অনেক ইউনূস রয়েছেন, যাঁরা ভিন্নমতাবলম্বী। তাঁরা দাসখত দিতে রাজি নন, তাঁদের প্রতি এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আদালতে ড. কামাল হোসেন বলছিলেন, ‘যদি ব্যাংকের স্বার্থ দেখার কথা বলা হয়, তাহলে একজন সিইও (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার) পেতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েও ইউনূসের চেয়ে যোগ্য কাকে মিলবে?’ জবাবে রাষ্ট্র মশকরা করেছে। কিংবা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে ‘কঠিন সত্য’। আমাদের রাষ্ট্র বলল, নেলসন ম্যান্ডেলা দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হননি। সোনিয়া গান্ধী শত অনুরোধেও প্রধানমন্ত্রী হননি। জ্যোতি বসুও প্রধানমন্ত্রী হননি। অথচ এর কোনোটাই ইউনূসের জন্য খাটে না। খাটে বরং তাঁদের জন্য, যাঁরা এই রাষ্ট্রের খেয়ে-পরে এই রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মাথা খাচ্ছে, অমরত্বের দাবি নিয়ে একই পদে গদিনশিন থাকছে—তিন দশকের বেশি সময় ধরে। আমরা হয়ে আছি চিন্তার ক্রীতদাস। দুই নেত্রী দলীয় গদি ছাড়লে তাঁদের দল কয় টুকরা হবে, সে উত্তর পাওয়া কঠিন কিছু নয়।
ম্যান্ডেলা ৭৬ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতি হন। ৮১-তে দ্বিতীয়বার হতে চাননি। ৮৬ বছর বয়সেও মুখ্যমন্ত্রী থাকা জ্যোতি বসু ও সোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সঙ্গে ইউনূস তুলনীয় নন। কলকাতার দৈনিক টেলিগ্রাফ এক সম্পাদকীয়তে ইউনূসকে তালিম দিয়েছে। তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, রতন টাটা (৭৫) আগামী বছর অবসর নেবেন। বাংলাদেশের বাজেটের চেয়ে বড় বাজেটের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বে অনেক আছে। সেসব সংস্থার তুখোড় সিইও হিসেবে বিশ্বে এখন অন্তত এক ডজন ব্যক্তি আছেন যাঁরা বয়সে সত্তরোর্ধ্ব। রুপার্ট মারডক আশিতেও বাসি নন। তাহলে ৭০ পেরোনো ইউনূসের জন্য বয়স বাধা হবে কেন?
আমরা আক্রান্ত ‘আমি’ নামক শব্দদূষণে। ‘আমি’, ‘আমি’, ‘আমি’। ‘আমি’ এটা করেছি। ‘আমার সরকার‘ এটা করেছে। ‘আমি’ দেশের জন্য এটা করব, ওটা করব। ‘আমরা’ আমাদের সংস্কৃতিতে নেই। সে কারণে আমরা বিশেষ দুই ব্যক্তির নেতৃত্ব মানলাম। স্রেফ অধিকতর যোগ্যতার কারণে কাউকে নেতা মানা আমাদের স্বভাবে নেই। অথচ আমরা একই সঙ্গে যোগ্যতা, শিক্ষা ও মেধার কথা বলি। সসম্মানে আমরা কাউকে বিদায় দেওয়া ভুলছি। ধারণা করি, বিদায় সংবর্ধনার কার্ডই সবচেয়ে কম ছাপা হয়। এই সংস্কৃতি ক্রমশ আরও নিম্ন ও পশ্চাদমুখী। ‘যেতে নাহি দেব হায়, তবু যেতে দিতে হয়’—এ পঙিক্ত প্রায় অনুচ্চারিত। আমরা যে যেখানে আছি, বিদায় কেউ সহজে নিতে চাই না। দিতেও চাই না।
গত বছর অর্থমন্ত্রীকে লেখা একটি চিরকুট ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। তাতে দেখি, ইউনূস মসৃণ ক্রান্তিকাল চেয়েছেন। ক্রান্তিকালের আভিধানিক অর্থ হলো, একপর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উত্তরণের মধ্যবর্তী সময়। এই সামন্ত মুলুকের ক্রান্তিকাল তো যায় না।
ইউনূস শেষতক দল করতে উৎসাহ পাননি। অথচ আমরা বিকল্প শক্তির কথা বলি। বিকল্প শক্তির উত্থান না দেখে হা-পিত্যেশ করি। আবার কেউ এগিয়ে এলে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত হলে, এই আমরাই অদ্ভুত আচরণ করি। বাম-ডান যা-ই হোক, সর্বাগ্রে মতলব খুঁজি। ইউনূসকেও আমরা পত্রপাঠ অবিশ্বাস করেছি। সন্দেহ করেছি। সেটা কি অসময়ের কারণেই? সময় কবে আসবে? পাশ্চাত্য ঠেকাতে আমরা নাকি দুই নেত্রীকে বাগে রাখতে পারি। বেশি শিক্ষিত ও বিদেশি লাইন থাকা ইউনূসকে আমরা বাগে রাখতে পারব না। তাই অনেকেই তাঁকে গাছে তুলে মই সরিয়ে নেন। মাত্র চার বছর আগে ড. ইউনূস বলেছিলেন, ‘আমি নিজেকে রাজনৈতিক দল গঠন থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছি। কারণ, গোড়াতে যাঁরা আমাকে এ কাজে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, তাঁদের উৎসাহে ভাটির টান পড়েছে।’ তিনি আরও স্বীকার করেছিলেন, জরুরি অবস্থা জারি না হলে তিনি রাজনীতিতে নামার কথা ভাবতেন না। সামরিক শাসনে আমরা তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্র পেয়েছি। আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম দেখেছি। সম্ভাবনাময় কেউ যদি এখন দল করেন, যাঁরা কল্পনা তৈরি করতে পারেন, তাহলে তাঁরা মার খাবেন। আমরা তাঁদের পিটিয়ে তক্তা বানাব। কারও না কারও এজেন্ট বলব।
সেই কল্পনাটা কী? আগামী সাধারণ নির্বাচন হবে। কিন্তু সেখানে আর দুটি সম্ভাবনা থাকবে না। মানুষ বাজি ধরবে না নির্দিষ্ট দুটো প্রতীকে। নৌকা ও ধানের শীষ ছাড়াও নতুন দল দাঁড়াবে। কিংবা ওই দুই দলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসবে। যোগ্যতাসম্পন্নরা মনোনায়ন পাবেন। ছোট দলের অনেক গুণী লোক আফসোস করেন, বড় পত্রিকা তাঁদের বক্তব্য ছাপে না। কারণটা বাণিজ্যিক। জায়গা দিয়ে লাভ কী? খামোখা কে জায়গা নষ্ট করে! কারও তো মুরোদ নেই দাবার ছক পাল্টানোর। গরিবের পেটে ঋণ সয়, ঘি সয় না। আমরা কোনো ব্যক্তি বা ছোট দলকে সম্ভাবনাময় মনে করি না। সেভাবে কেউ গড়ে উঠুক, তাও চাই না। দুই বড় দল নিয়েই থাকি। কিন্তু সেখানে দুই ব্যক্তির বাইরে সম্ভাবনাময় অন্য কেউ আছেন কি? আমরা সে চিন্তা করতেও ভুলে গেছি।
আমরা কী অবলীলায় সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের পূজারি বানালাম ইউনূসকে। তাই দ্রুতই তাঁর অবস্থা দাঁড়াল, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। আমরা তাঁকে তিরস্কার করলাম। পুরস্কার আমরা তাঁকে দিইনি। আমরা কতটা হীনম্মন্য, তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার কেড়ে নিতে বলেছি। আজ জন কেরি ও মরিয়ার্টির প্রতিবাদের ভাষা আমাদের জাতীয় প্রতিবাদের নিনাদকে যেন ছাপিয়ে যাচ্ছে। আমাদের চেনা শাসকগোষ্ঠী এতটাই পরীক্ষিত যে, তাঁরা নাকি ‘পুঁজিবাদে’র দোসর নন। অথচ আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে বাংলাদেশ ভাড়া নিতে হামিদ কারাজাই লাগেনি। গ্যাস-তেলের চুক্তি আমরা জানতেও পারি না। চটজলদি ইউনূস যখন বিদায় নিলেন, তখন দুই বড় দলই অভিনন্দন জানাল। আপদ বিদায় নিয়েছে বলে তারা উভয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বিএনপির নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ইউনূসের অপসারণকে প্রতিহিংসামূলক বলে প্রত্যাশিত বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের জায়গাটি কি স্পষ্ট করবে বিএনপি?
ব্যাংকার ইউনূসকে আমরা এই সমাজে ৩০ বছর বাঁচতে দিয়েছি। একজন রাজনীতিক ইউনূসকে ২০০৭ সালে আমরা বাঁচতে দিয়েছি মাত্র ৬৮ দিন। সেই দিনগুলোও অবশ্য টেস্টটিউবেই কেটেছে। ময়দান তাঁকে দেখেনি। ইউনূস বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক ছেড়ে রাজনীতিতে নামবেন। ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ত্যাগ করা তাঁর কখনো সেভাবে হবে না। ব্যাংকে তাঁর প্রচণ্ড প্রভাব, যা রাজনীতিতে ব্যবহার করা সম্ভব। গ্রামীণ ব্যাংকের মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, বাংলাদেশে যদি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার থাকত, তাহলে তিনি অনেক আগেই রাজনীতিতে আসতেন। সামনের দিনগুলোতে এসব উক্তি আমরা যাচাই করতে পারব।
অনেকের চোখ আদালতের দিকে। কিন্তু প্রশ্নটা আইনগত নয়, একান্তভাবেই রাজনৈতিক। আদালতের সিদ্ধান্তে আমার আগ্রহ নেই। দি ইকোনমিস্ট ২ মার্চ লিখেছে, ‘১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, প্রফেসর ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের অসাধারণ কাজের জন্য তাঁরা গর্বিত। শান্তিচুক্তির পরে তাঁর ‘পারিষদ-দলের’ মদদে তিনি নোবেল জয়ের স্বপ্ন দেখেন। আর লক্ষ করেন, ইউনূস জনপ্রিয়তায় বিশ্বে তাঁর প্রয়াত পিতাকে ছাড়িয়ে গেছেন। শেখ হাসিনাকে যারা ব্যক্তিগতভাবে জানেন তাঁরা বলেন, এটা তাঁর জন্য তেতো বটিকা গেলা। তাঁর সেই তিক্ততা শত্রুতায় পরিণত হয় যখন নোবেল পাওয়ার পাঁচ মাস পরে তিনি দল গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি সন্দেহ করেন তাঁকে সরানোর জেনারেলদের চেষ্টায় তাঁর সায় ছিল।’ সুতরাং অসুখটা সর্বগ্রাসীরূপে রাজনীতিতে। সেই অসুখের সংক্রমণ থেকে এ দেশের কেউ, কোনো প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্ন নয়। ইকোনমিস্ট আদালত সম্পর্কে যে ভাষ্য দিয়েছে তার প্রবণতা সাম্প্রতিক নয়। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘বাংলাদেশের আদালত উত্তরোত্তর সরকারসংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদাসীন হয়ে পড়ছে। তিনি হবেন এক সাহসী বিচারক, যিনি তাঁর পদোন্নতি বরবাদ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ইউনূসের সমর্থনে কোনো আদেশ দেবেন।’
এক নোবেলজয়ীকে কুপোকাত করতে রাষ্ট্র ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়ে আরেক নোবেলজয়ীর ওপর ভর করেছেন। ইউনূসকে অনির্দিষ্ট মেয়াদে ব্যাংকে রাখতে রেহমান সোবহান ব্যাংকের বোর্ড সভায় যথার্থ যুক্তি দেন। আদালতে রাষ্ট্রের আইনজীবী তাঁকে কটাক্ষ করেন। ‘দুই বিঘা জমি’ থেকে বলেন, ‘বাবু যতো বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।’ আর দীপু মনি সংবাদ সম্মেলনে আবৃত্তি করেন রবীন্দ্রনাথ। বয়সটাই যে আইনি বাধা, সেটাই তিনি বোঝান। তাঁর সুন্দর বচন শুনে মনে হবে, আহা! সরকার চক্ষুষ্মান, কিন্তু আইনের চোখ তো অন্ধ। দীপু মনি বলেন, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা’।
আমার বিশ্বাস, রাষ্ট্রে যোগ্যতম লোকের নেতৃত্বই ভোটাধিকার-অসেচতন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনমান বাড়াবে। ক্ষুদ্রঋণ অন্যতম হাতিয়ার মাত্র। তবে এখন সত্য কী? সরকারি প্রচারযন্ত্র কোটি কোটি টাকা তছরুপের গল্প শোনাচ্ছে। আমরা তা সত্য বলে বিশ্বাস করি না। শ্রদ্ধেয় রবীন্দ্রগবেষক আহমেদ রফিককে সত্য বলে বিশ্বাস করি। শনিবার তিনি আমাকে বললেন, ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ। ইউনূসের ঋণদানের ৭৫ বছর আগের কথা। ১৯০৫ সাল। পতিসরে কৃষি ব্যাংক বসে। রবীন্দ্রনাথ শতকরা আট শতাংশ সুদে ঋণ নিতেন। কৃষকদের দিতেন চার শতাংশ বেশি সুদে। নোবেল পুরস্কারের অর্থের সিংহভাগ (এক লাখ ১২ হাজার টাকা) তিনি ওই ব্যাংকে জামানত রেখেছিলেন। জমিদার রবীন্দ্রনাথকে কেউ ‘রক্তচোষা’ বলেছিল কি না জানি না। তবে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা রচনা করেছিলেন পতিসরেই, হয়তো কোনো উপেনের জমি কেড়ে নেওয়ার ঘটনা তাঁকে বিচলিত করেছিল।
আমি বড় রসসিক্ত হলাম। বৃৃহস্পতিবার সকালে দেখি আদালতে ইউনূসকে জব্দ করতে রবীন্দ্রনাথ, পরদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রবীন্দ্রনাথ। ইউনূসকে ‘গরিবের রক্তচোষা’ বলার ধরন দেখে হাসি পায়। রাজনীতিকদের দুর্নীতিগ্রস্ত বলেছিলেন তিনি। হঠাৎ আইন ‘আপন গতি’ নেয়। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে স্বতঃস্ফূর্ত মামলার হিড়িক পড়েছিল। এসবের একটা সমুচিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে ক্ষুদ্রঋণ-গুরু রবীন্দ্রনাথকেই ধ্যান করি।
আদালতকক্ষে ড. ইউনূসের ঠিক পেছনে বসেছিলাম। রাষ্ট্র যখন বলল, ইউনূস ‘ধানাইপানাই’ করেছেন, সরকারের ৬০ ভাগ মালিকানা কমিয়ে ২৫ ভাগ করেছেন, তখন ইউনূসের এক পরিহাসসূচক অভিব্যক্তি চোখে পড়ে। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, গ্রামীণ ব্যাংক যেন কখনো আদমজীতে পরিণত না হয়। ড. ইউনূস রবীন্দ্রনাথেই সান্ত্বনা পেতে পারেন: ‘বাবু কহে হেসে, বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!’ আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে—তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
ড. ইউনূস নোবেল জিতেছিলেন বলে কি রুষ্ট হন শেখ হাসিনা? ইউনূস দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেসব অন্যতম উপসর্গ। আসল রোগ নয়। গ্রামবাংলায় বিরল, যেখানে একজন মানি লোক আছেন যিনি স্থানীয় দলীয় এজেন্ট বা মাস্তানকে কুর্নিশ করছেন না, সেলাম ঠুকছেন না, ভেট-ভোট দিচ্ছেন না। নিরীহ নাগরিকের সর্বজনশ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে না রাষ্ট্র। রাষ্ট্রযন্ত্র শুধু মেধা ও প্রজ্ঞার জন্য কাউকে কুর্নিশ করছে এমনটা কোথাও নেই। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বহু ব্যক্তির বিকাশ ও সহাবস্থান আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বেশি দিন ধারণ করতে পারে না। আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনেকেই সামন্ত আমলের জমিদারের মতো। তাঁরা দেশটাকে নিজের জমিদারি মনে করেন। অজ্ঞতা ও স্বেচ্ছাচারিতা তাঁদের ধর্ম। আমরা তাকে কখনো জাতীয়তাবাদী, কখনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চিহ্নিত করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলি। তাঁরা সংবিধান ও গণতন্ত্রের লেবাস বেশিক্ষণ গায়ে চাপিয়ে রাখতে পারেন না। অভ্যাস নেই। অস্বস্তি লাগে। তাই হঠাৎ হঠাৎ লেবাসটা খসে পড়ে।
ড. ইউনূসের ছায়াটা আরও প্রকাণ্ড হয়ে উঠেছিল। বিশ্ববাঙালি হওয়ার পথে তাঁর ছায়াটা দীর্ঘতর হচ্ছিল। কিন্তু তা ব্যক্তির পূজায় লাগছিল না। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর অসম্মানজনক অন্তর্ধানের কারণও ওই একই সুতোয় গাঁথা। আমিই শক্তি, নৈবেদ্য আমারই প্রাপ্য। প্রশ্নটা নিরঙ্কুশ আনুগত্যের। একইভাবে ড. কামাল হোসেনকে ‘বস্তি থেরাপি’ দেওয়া হয়েছিল। এভাবে আমরা আমাদের ইতিহাসে এটা দেখব যে—কি সামরিক কি বেসামরিক—একজন ব্যক্তিকে আমরা আরাধনার পাত্রে পরিণত করি। আর তাঁকে ঘিরে অন্য সবার অনন্ত আরাধনা আশা করি। অনেক জ্ঞানীগুণী তাই বড় দলে ভাত পান না। হারিস চৌধুরী ও মোসাদ্দেক আলী ফালুর মতো মাপের ব্যক্তি ভাত পান। তাঁরাই রাজনৈতিক উপদেষ্টা বা উপদেষ্টা হন। কিচেন ক্যাবিনেটে মোসাহেবদের রোশনাই বরাবর।
হাইকোর্টে শুনানি শুনছিলাম। রাষ্ট্রের ধাতব কণ্ঠ শুনলাম। রাষ্ট্র বলছে, মোদ্দা কথা, এটা বয়সের ব্যাপার। বয়সগত একটা সর্বজনীন ব্যাপার আছে। সবচেয়ে হাস্যকর ও ঠুনকো যুক্তি। আমরা ব্যক্তির জন্য সংবিধান তাঁর পায়ের মাপে করে নিতে ওস্তাদ জাতি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হবেন প্রধানমন্ত্রী, তাই একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতেই নির্বাহী ক্ষমতা সমর্পিত হলো। মুজিব হবেন রাষ্ট্রপতি, তাই সংবিধানে লেখা হলো, ধরে নিতে হবে যেন তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। সামরিক ফরমানের যুগেও যেই লাউ সেই কদু। জিয়া সিএমএলএ থাকবেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনাও পুর্ণ করবেন। সেভাবে ফরমান পয়দা হলো। বিচারপতি সাত্তারের জন্য ষষ্ঠ সংশোধনী ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের জন্য আমরা একাদশ সংশোধনী পাস করেছি। বিচারপতি কে এম হাসানের জন্য এল ১৪তম সংশোধনী। এর আগে বয়সের ফাঁদ পেতে প্রধান বিচারপতি বধ করেন ‘বিশ্ববেহায়া’ এরশাদ। ড. ইউনূসের মতো প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন আকস্মিক ‘নো-বডি’ হন।
আমরা আইনের চোখে (অ)সমতা নিশ্চিত করা জাতি। সে জন্য আমরা ইউনূসকে ‘নিয়মিত কর্মকর্তার’ ঊর্ধ্বে তুলিনি। তবে তাঁকে স্বপদে বহাল রাখতে সংবিধান সংশোধনের দরকার ছিল না। বড়জোর এক লাইনের একটি বাক্য দরকার ছিল। গ্রামীণ ব্যাংকে বিকল্প নেতৃত্ব কিংবা ক্ষুদ্রঋণ পুঁজিবাদকে প্রশ্রয় দেয় কি দেয় না; দারিদ্র্যকে, সাম্রাজ্যবাদকে মহান করল কি না সেসব বিতর্ক এখন অবান্তর। তাঁকে অপমান করার মনোভঙ্গিই প্রকট। পুরো বিষয়টি আপাদমস্তক সামন্ততান্ত্রিক।
ইউনূস একা নন। এই সমাজে আরও অনেক ইউনূস রয়েছেন, যাঁরা ভিন্নমতাবলম্বী। তাঁরা দাসখত দিতে রাজি নন, তাঁদের প্রতি এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
আদালতে ড. কামাল হোসেন বলছিলেন, ‘যদি ব্যাংকের স্বার্থ দেখার কথা বলা হয়, তাহলে একজন সিইও (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার) পেতে হবে। এ জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েও ইউনূসের চেয়ে যোগ্য কাকে মিলবে?’ জবাবে রাষ্ট্র মশকরা করেছে। কিংবা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে ‘কঠিন সত্য’। আমাদের রাষ্ট্র বলল, নেলসন ম্যান্ডেলা দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি হননি। সোনিয়া গান্ধী শত অনুরোধেও প্রধানমন্ত্রী হননি। জ্যোতি বসুও প্রধানমন্ত্রী হননি। অথচ এর কোনোটাই ইউনূসের জন্য খাটে না। খাটে বরং তাঁদের জন্য, যাঁরা এই রাষ্ট্রের খেয়ে-পরে এই রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের মাথা খাচ্ছে, অমরত্বের দাবি নিয়ে একই পদে গদিনশিন থাকছে—তিন দশকের বেশি সময় ধরে। আমরা হয়ে আছি চিন্তার ক্রীতদাস। দুই নেত্রী দলীয় গদি ছাড়লে তাঁদের দল কয় টুকরা হবে, সে উত্তর পাওয়া কঠিন কিছু নয়।
ম্যান্ডেলা ৭৬ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতি হন। ৮১-তে দ্বিতীয়বার হতে চাননি। ৮৬ বছর বয়সেও মুখ্যমন্ত্রী থাকা জ্যোতি বসু ও সোনিয়ার প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সঙ্গে ইউনূস তুলনীয় নন। কলকাতার দৈনিক টেলিগ্রাফ এক সম্পাদকীয়তে ইউনূসকে তালিম দিয়েছে। তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, রতন টাটা (৭৫) আগামী বছর অবসর নেবেন। বাংলাদেশের বাজেটের চেয়ে বড় বাজেটের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বে অনেক আছে। সেসব সংস্থার তুখোড় সিইও হিসেবে বিশ্বে এখন অন্তত এক ডজন ব্যক্তি আছেন যাঁরা বয়সে সত্তরোর্ধ্ব। রুপার্ট মারডক আশিতেও বাসি নন। তাহলে ৭০ পেরোনো ইউনূসের জন্য বয়স বাধা হবে কেন?
আমরা আক্রান্ত ‘আমি’ নামক শব্দদূষণে। ‘আমি’, ‘আমি’, ‘আমি’। ‘আমি’ এটা করেছি। ‘আমার সরকার‘ এটা করেছে। ‘আমি’ দেশের জন্য এটা করব, ওটা করব। ‘আমরা’ আমাদের সংস্কৃতিতে নেই। সে কারণে আমরা বিশেষ দুই ব্যক্তির নেতৃত্ব মানলাম। স্রেফ অধিকতর যোগ্যতার কারণে কাউকে নেতা মানা আমাদের স্বভাবে নেই। অথচ আমরা একই সঙ্গে যোগ্যতা, শিক্ষা ও মেধার কথা বলি। সসম্মানে আমরা কাউকে বিদায় দেওয়া ভুলছি। ধারণা করি, বিদায় সংবর্ধনার কার্ডই সবচেয়ে কম ছাপা হয়। এই সংস্কৃতি ক্রমশ আরও নিম্ন ও পশ্চাদমুখী। ‘যেতে নাহি দেব হায়, তবু যেতে দিতে হয়’—এ পঙিক্ত প্রায় অনুচ্চারিত। আমরা যে যেখানে আছি, বিদায় কেউ সহজে নিতে চাই না। দিতেও চাই না।
গত বছর অর্থমন্ত্রীকে লেখা একটি চিরকুট ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। তাতে দেখি, ইউনূস মসৃণ ক্রান্তিকাল চেয়েছেন। ক্রান্তিকালের আভিধানিক অর্থ হলো, একপর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উত্তরণের মধ্যবর্তী সময়। এই সামন্ত মুলুকের ক্রান্তিকাল তো যায় না।
ইউনূস শেষতক দল করতে উৎসাহ পাননি। অথচ আমরা বিকল্প শক্তির কথা বলি। বিকল্প শক্তির উত্থান না দেখে হা-পিত্যেশ করি। আবার কেউ এগিয়ে এলে, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত হলে, এই আমরাই অদ্ভুত আচরণ করি। বাম-ডান যা-ই হোক, সর্বাগ্রে মতলব খুঁজি। ইউনূসকেও আমরা পত্রপাঠ অবিশ্বাস করেছি। সন্দেহ করেছি। সেটা কি অসময়ের কারণেই? সময় কবে আসবে? পাশ্চাত্য ঠেকাতে আমরা নাকি দুই নেত্রীকে বাগে রাখতে পারি। বেশি শিক্ষিত ও বিদেশি লাইন থাকা ইউনূসকে আমরা বাগে রাখতে পারব না। তাই অনেকেই তাঁকে গাছে তুলে মই সরিয়ে নেন। মাত্র চার বছর আগে ড. ইউনূস বলেছিলেন, ‘আমি নিজেকে রাজনৈতিক দল গঠন থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছি। কারণ, গোড়াতে যাঁরা আমাকে এ কাজে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন, তাঁদের উৎসাহে ভাটির টান পড়েছে।’ তিনি আরও স্বীকার করেছিলেন, জরুরি অবস্থা জারি না হলে তিনি রাজনীতিতে নামার কথা ভাবতেন না। সামরিক শাসনে আমরা তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্র পেয়েছি। আওয়ামী লীগের পুনর্জন্ম দেখেছি। সম্ভাবনাময় কেউ যদি এখন দল করেন, যাঁরা কল্পনা তৈরি করতে পারেন, তাহলে তাঁরা মার খাবেন। আমরা তাঁদের পিটিয়ে তক্তা বানাব। কারও না কারও এজেন্ট বলব।
সেই কল্পনাটা কী? আগামী সাধারণ নির্বাচন হবে। কিন্তু সেখানে আর দুটি সম্ভাবনা থাকবে না। মানুষ বাজি ধরবে না নির্দিষ্ট দুটো প্রতীকে। নৌকা ও ধানের শীষ ছাড়াও নতুন দল দাঁড়াবে। কিংবা ওই দুই দলের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসবে। যোগ্যতাসম্পন্নরা মনোনায়ন পাবেন। ছোট দলের অনেক গুণী লোক আফসোস করেন, বড় পত্রিকা তাঁদের বক্তব্য ছাপে না। কারণটা বাণিজ্যিক। জায়গা দিয়ে লাভ কী? খামোখা কে জায়গা নষ্ট করে! কারও তো মুরোদ নেই দাবার ছক পাল্টানোর। গরিবের পেটে ঋণ সয়, ঘি সয় না। আমরা কোনো ব্যক্তি বা ছোট দলকে সম্ভাবনাময় মনে করি না। সেভাবে কেউ গড়ে উঠুক, তাও চাই না। দুই বড় দল নিয়েই থাকি। কিন্তু সেখানে দুই ব্যক্তির বাইরে সম্ভাবনাময় অন্য কেউ আছেন কি? আমরা সে চিন্তা করতেও ভুলে গেছি।
আমরা কী অবলীলায় সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের পূজারি বানালাম ইউনূসকে। তাই দ্রুতই তাঁর অবস্থা দাঁড়াল, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। আমরা তাঁকে তিরস্কার করলাম। পুরস্কার আমরা তাঁকে দিইনি। আমরা কতটা হীনম্মন্য, তাঁর নোবেল শান্তি পুরস্কার কেড়ে নিতে বলেছি। আজ জন কেরি ও মরিয়ার্টির প্রতিবাদের ভাষা আমাদের জাতীয় প্রতিবাদের নিনাদকে যেন ছাপিয়ে যাচ্ছে। আমাদের চেনা শাসকগোষ্ঠী এতটাই পরীক্ষিত যে, তাঁরা নাকি ‘পুঁজিবাদে’র দোসর নন। অথচ আফগানিস্তানে যুদ্ধ করতে বাংলাদেশ ভাড়া নিতে হামিদ কারাজাই লাগেনি। গ্যাস-তেলের চুক্তি আমরা জানতেও পারি না। চটজলদি ইউনূস যখন বিদায় নিলেন, তখন দুই বড় দলই অভিনন্দন জানাল। আপদ বিদায় নিয়েছে বলে তারা উভয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। বিএনপির নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ইউনূসের অপসারণকে প্রতিহিংসামূলক বলে প্রত্যাশিত বিবৃতি দিয়েছেন। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের জায়গাটি কি স্পষ্ট করবে বিএনপি?
ব্যাংকার ইউনূসকে আমরা এই সমাজে ৩০ বছর বাঁচতে দিয়েছি। একজন রাজনীতিক ইউনূসকে ২০০৭ সালে আমরা বাঁচতে দিয়েছি মাত্র ৬৮ দিন। সেই দিনগুলোও অবশ্য টেস্টটিউবেই কেটেছে। ময়দান তাঁকে দেখেনি। ইউনূস বলেছিলেন, প্রয়োজনে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক ছেড়ে রাজনীতিতে নামবেন। ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেছিলেন, গ্রামীণ ব্যাংক ত্যাগ করা তাঁর কখনো সেভাবে হবে না। ব্যাংকে তাঁর প্রচণ্ড প্রভাব, যা রাজনীতিতে ব্যবহার করা সম্ভব। গ্রামীণ ব্যাংকের মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, বাংলাদেশে যদি রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার থাকত, তাহলে তিনি অনেক আগেই রাজনীতিতে আসতেন। সামনের দিনগুলোতে এসব উক্তি আমরা যাচাই করতে পারব।
অনেকের চোখ আদালতের দিকে। কিন্তু প্রশ্নটা আইনগত নয়, একান্তভাবেই রাজনৈতিক। আদালতের সিদ্ধান্তে আমার আগ্রহ নেই। দি ইকোনমিস্ট ২ মার্চ লিখেছে, ‘১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, প্রফেসর ইউনূস ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের অসাধারণ কাজের জন্য তাঁরা গর্বিত। শান্তিচুক্তির পরে তাঁর ‘পারিষদ-দলের’ মদদে তিনি নোবেল জয়ের স্বপ্ন দেখেন। আর লক্ষ করেন, ইউনূস জনপ্রিয়তায় বিশ্বে তাঁর প্রয়াত পিতাকে ছাড়িয়ে গেছেন। শেখ হাসিনাকে যারা ব্যক্তিগতভাবে জানেন তাঁরা বলেন, এটা তাঁর জন্য তেতো বটিকা গেলা। তাঁর সেই তিক্ততা শত্রুতায় পরিণত হয় যখন নোবেল পাওয়ার পাঁচ মাস পরে তিনি দল গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি সন্দেহ করেন তাঁকে সরানোর জেনারেলদের চেষ্টায় তাঁর সায় ছিল।’ সুতরাং অসুখটা সর্বগ্রাসীরূপে রাজনীতিতে। সেই অসুখের সংক্রমণ থেকে এ দেশের কেউ, কোনো প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্ন নয়। ইকোনমিস্ট আদালত সম্পর্কে যে ভাষ্য দিয়েছে তার প্রবণতা সাম্প্রতিক নয়। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘বাংলাদেশের আদালত উত্তরোত্তর সরকারসংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদাসীন হয়ে পড়ছে। তিনি হবেন এক সাহসী বিচারক, যিনি তাঁর পদোন্নতি বরবাদ হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ইউনূসের সমর্থনে কোনো আদেশ দেবেন।’
এক নোবেলজয়ীকে কুপোকাত করতে রাষ্ট্র ও তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়ে আরেক নোবেলজয়ীর ওপর ভর করেছেন। ইউনূসকে অনির্দিষ্ট মেয়াদে ব্যাংকে রাখতে রেহমান সোবহান ব্যাংকের বোর্ড সভায় যথার্থ যুক্তি দেন। আদালতে রাষ্ট্রের আইনজীবী তাঁকে কটাক্ষ করেন। ‘দুই বিঘা জমি’ থেকে বলেন, ‘বাবু যতো বলে পারিষদ-দলে বলে তার শতগুণ।’ আর দীপু মনি সংবাদ সম্মেলনে আবৃত্তি করেন রবীন্দ্রনাথ। বয়সটাই যে আইনি বাধা, সেটাই তিনি বোঝান। তাঁর সুন্দর বচন শুনে মনে হবে, আহা! সরকার চক্ষুষ্মান, কিন্তু আইনের চোখ তো অন্ধ। দীপু মনি বলেন, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনো করে না বঞ্চনা’।
আমার বিশ্বাস, রাষ্ট্রে যোগ্যতম লোকের নেতৃত্বই ভোটাধিকার-অসেচতন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনমান বাড়াবে। ক্ষুদ্রঋণ অন্যতম হাতিয়ার মাত্র। তবে এখন সত্য কী? সরকারি প্রচারযন্ত্র কোটি কোটি টাকা তছরুপের গল্প শোনাচ্ছে। আমরা তা সত্য বলে বিশ্বাস করি না। শ্রদ্ধেয় রবীন্দ্রগবেষক আহমেদ রফিককে সত্য বলে বিশ্বাস করি। শনিবার তিনি আমাকে বললেন, ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ। ইউনূসের ঋণদানের ৭৫ বছর আগের কথা। ১৯০৫ সাল। পতিসরে কৃষি ব্যাংক বসে। রবীন্দ্রনাথ শতকরা আট শতাংশ সুদে ঋণ নিতেন। কৃষকদের দিতেন চার শতাংশ বেশি সুদে। নোবেল পুরস্কারের অর্থের সিংহভাগ (এক লাখ ১২ হাজার টাকা) তিনি ওই ব্যাংকে জামানত রেখেছিলেন। জমিদার রবীন্দ্রনাথকে কেউ ‘রক্তচোষা’ বলেছিল কি না জানি না। তবে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতা রচনা করেছিলেন পতিসরেই, হয়তো কোনো উপেনের জমি কেড়ে নেওয়ার ঘটনা তাঁকে বিচলিত করেছিল।
আমি বড় রসসিক্ত হলাম। বৃৃহস্পতিবার সকালে দেখি আদালতে ইউনূসকে জব্দ করতে রবীন্দ্রনাথ, পরদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রবীন্দ্রনাথ। ইউনূসকে ‘গরিবের রক্তচোষা’ বলার ধরন দেখে হাসি পায়। রাজনীতিকদের দুর্নীতিগ্রস্ত বলেছিলেন তিনি। হঠাৎ আইন ‘আপন গতি’ নেয়। তাঁর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আদালতে স্বতঃস্ফূর্ত মামলার হিড়িক পড়েছিল। এসবের একটা সমুচিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে ক্ষুদ্রঋণ-গুরু রবীন্দ্রনাথকেই ধ্যান করি।
আদালতকক্ষে ড. ইউনূসের ঠিক পেছনে বসেছিলাম। রাষ্ট্র যখন বলল, ইউনূস ‘ধানাইপানাই’ করেছেন, সরকারের ৬০ ভাগ মালিকানা কমিয়ে ২৫ ভাগ করেছেন, তখন ইউনূসের এক পরিহাসসূচক অভিব্যক্তি চোখে পড়ে। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করি, গ্রামীণ ব্যাংক যেন কখনো আদমজীতে পরিণত না হয়। ড. ইউনূস রবীন্দ্রনাথেই সান্ত্বনা পেতে পারেন: ‘বাবু কহে হেসে, বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়!’ আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে—তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Tuesday, December 14, 2010
বিচারপতিদের সামনে যখন ‘ঘুষ’ by মিজানুর রহমান খান
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. গোলাম রাব্বানী আলোচনার সূচনাতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় বিচারকদের রাখার বিধান বহাল রাখা সমর্থন করলেন। তিনি বললেন, অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিরাই সবচেয়ে নিরপেক্ষ। তাই এই পদে বিচারকদের রাখলে ক্ষতি নেই। সবিনয়ে তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেন ড. আকবর আলি খান। তাঁর কথায় আশ্বস্ত হলাম। ড. খানের যুক্তি: বিচারকদের উপদেষ্টা রাখার কারণে বিচার বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি নানাবিধ বিকল্পের কথা বললেন। আমি তাঁকে সমর্থন জানালাম। বললাম, স্যার, নিনিয়ানের ৫+৫+১ ফর্মুলা এখনো উত্তম মনে করি। তবে যা-ই হোক, এ নিয়ে একটা ফয়সালার চেষ্টা এখনই শুরু করা উচিত। লগি-বৈঠার পরিবেশে সংবিধানসম্মত সুরাহা আশা করা চলে না। সুপ্রিম কোর্টকে বাঁচাতে হবে। আদালতকে বাদ দিয়ে অন্য যেকোনো বিকল্প বের করতে হবে।
গত সপ্তাহে এই আলোচনা হচ্ছিল আরটিভির ‘রোড টু ডেমোক্রেসি’ অনুষ্ঠানে। বললাম, এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় আছে। শুধু রায় বললে কম বলা হবে। এটা একটা মাইলফলক রায়। শুধু প্রধান উপদেষ্টা কেন, অবসরের পরবর্তী প্রথম তিন বছরে যাতে তাঁরা কোনো পদই না নেন, তা হোক লাভজনক বা অলাভজনক, সে বিষয়ে বিচারপতি খায়রুল হকের একটি অনন্যসাধারণ রায় আছে। এটা শুধু অবসরপ্রাপ্তদের জন্য নয়, কর্মরতদেরও জন্য প্রযোজ্য। কর্মরতদের জন্য নির্বাচন কমিশনের পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে এই রায়। বাংলায় লেখা এই শ্রমসাধ্য দীর্ঘ রায়টি পড়লে আপনার সামনে ছবির মতো ভেসে উঠবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জনের হাজার বছরের ইতিহাস। অবাক বিস্ময়ে আমরা সেই ইতিহাস পড়েছি। স্পন্দিত হয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, এই রায়টি হয়েছে জরুরি অবস্থায়, ১২ ডিসেম্বর ২০০৭। পূর্ণাঙ্গ রায় এসেছে আরও অনেক পরে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তখন বাতাসে ভাসছে।
প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তাঁর রায়ে স্পষ্ট বলেছেন, অবসরে গিয়ে এ ধরনের পদপদবি গ্রহণের সুযোগ বিচারকদের জন্য রাখা হলে বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ওই আলোচনায় সে কথা উল্লেখ করে বলি, এর সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। তিনি এখন এ ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন। বিচারপতি মো. গোলাম রাব্বানী এ প্রসঙ্গে উচ্চ আদালতের রায় সম্পর্কে আমার ‘আইডিয়া’ না থাকার কথা বলেন। তাঁর যুক্তি: বিচারকেরা রায়ের মাধ্যমে কথা বলেন। এর বাইরে কথা বলেন না। তাঁর মতে, বিচারপতি খায়রুল হকের তরফে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করা বা না-করা প্রশ্নে মন্তব্যের সময় এখনো আসেনি। টিভি উপস্থাপক অতঃপর ড. আকবর আলি খানের মন্তব্য জানতে চান। তিনি বিচারপতি রাব্বানীর সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। তাঁর ভাষায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হতে এখনো অনেক দেরি আছে। সুতরাং এখন বলার সুযোগ নেই।
তাঁদের প্রতিক্রিয়ার দুটি দিক আছে। একটি হলো, এখনই মতামত দিতে সংবিধান বাধা দেয় কি না। দ্বিতীয়ত, এখনই বলার সুযোগ আছে কি না। একটি আইনগত, অন্যটি রাজনৈতিক। আমি শুধু বললাম, বিজ্ঞ দুই আলোচক যে অভিমত রেখেছেন, সেটা আমি ধরে নিচ্ছি যে তাঁরা তাঁদের যুক্তি আইন ও সংবিধানের আলোকে করেছেন। প্রধান বিচারপতির এখন কথা বলা বারণ। টিভিতে শুধু বললাম, আমি বিনয়ের সঙ্গে তাঁদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি।
এম এ আজিজ কর্মরত বিচারক থাকতে সিইসি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস (প্রধান বিচারপতি তাঁকে বিতর্কের মুখে অতিরিক্ত বিচারক পদে সম্প্রতি শপথ দেন)। এ মামলায় সিইসি পদে আজিজের নিয়োগ অবৈধ ঘোষিত হয়। এই রায়ে কোনো ব্যক্তির বিষয় নয়, একটি নীতি মীমাংসিত হয়। টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুল ইসলাম, এম আমীর-উল ইসলাম, এম কে রহমান (বর্তমানে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল) ও ড. শাহ্দীন মালিক ছিলেন অ্যামিকাস কিউরি। বার ও বেঞ্চ এক বিরল মতৈক্যে পৌঁছান। তাঁরা বলেন যে অবসরে গিয়েও কোনো লাভজনক পদ গ্রহণ করা বিচারকের জন্য সমীচীন নয়। সামরিক ও বেসামরিক আমলারা গত কয়েক বছরে অবসর নিয়ে সংসদ নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছিলেন। আইন করে অবসর গ্রহণের তিন বছরের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়। বাকি ছিলেন বিচারকেরা। এই রায় সেখানে শক্ত দেয়াল তুলে দেয়।
বাহাত্তরের মূল সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদটি পঞ্চম সংশোধনী মামলায় ফিরে আসতে পারত। তাহলে আমরা দেখতাম ত্রয়োদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিল হয়ে গেছে। বিচারপতি খায়রুল হক তা সযত্নে এড়িয়ে যান। কিন্তু এটা যে একটা বিরাট স্ববিরোধিতা ছিল, তা হয়তো তাঁকে পীড়িত করছিল। তাই আমরা দেখি, ২০০৫ সালে তাঁর ওই দৃশ্যমান বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়ন দুই বছর বাদে তিনি বীরোচিতভাবেই মোকাবিলা করেন। তফাত শুধু এই যে ৯৯ অনুচ্ছেদকে বাঁচিয়ে তুলতে তিনি পুনর্মুদ্রণের সুযোগ সৃষ্টি করেননি। নির্দিষ্টভাবে সংসদকে শোধরাতে বলেছেন। পাঠক খেয়াল করবেন, নিজেদের পায়ের মাপের সঙ্গে এটা যায় না বলে দুই বড় দল ও তদীয় মিত্রজীবীরা এ বিষয়ে যথারীতি চুপচাপ আছেন।
বাহাত্তরের সংবিধানে কেন বলা হয়েছিল যে অবসরে গিয়ে বিচারকেরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে অযোগ্য হবেন, তার ইতিহাস তুলে ধরেছেন বিচারপতি খায়রুল হক। ক্রুদ্ধ রাজার সামনে ‘ভূমিতে ষষ্ঠাঙ্গে প্রণামরত’ অবস্থায় থাকা প্রধান বিচারপতি কোক থেকে পরের ৪০০ বছরের ইতিহাসের অতল স্পর্শ করেন তিনি। রাজনীতিক ও বিচারবহির্ভূত পদপদবি গ্রহণে আগ্রহী বিচারকদের চোখে তিনি সজোরে অঙ্গুলি চালিয়েছেন। দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘একটি জাতির সামনে এমন কোনো পরিস্থিতিই আসা স্বাভাবিক নয়, যখন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকেরা লাভজনক পদে নিযুক্ত হবেন।’ আমাদের সমাজের কতিপয় লোক, গণতন্ত্র কিংবা বাংলাদেশি বাস্তবতার নিরিখে এখনো বিচারকদের রেহাই দিতে চান না, তাঁদের প্রতিও তিনি এই রোদনভরা বাণী দিয়েছেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
বিচারপতি খায়রুল হক প্রকারান্তরে লিখেছেন, বিচারকদের সামনে এ ধরনের পদের মুলো ঝুলিয়ে রাখা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী। পাঠক যদি বলেন আপনি মুলো কথাটি বললেন, সেটা কি তিনি ব্যবহার করেছেন? আমি বলব, না, ঠিক মুলো নয়, তিনি এটাকে ‘ঘুষ’ বলেছেন। বলেছেন, এটা হলো ‘প্রলুব্ধকরণ’ বা সম্মোহন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ কিন্তু অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়ে ১৯৮৯ সালে ঠিক এ কথাই বলেছিলেন। আবার এক বছর না যেতেই সেই তিনি তিন জোটের ঐতিহাসিক রূপরেখা অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর পদ গ্রহণ করেছিলেন। বিচারপতি খায়রুল হক যথার্থ বলেছেন, ‘নেহাত দুর্ভাগ্য ব্যতিরেকে কোনো জাতির জীবনে এই রূপ অস্বাভাবিক অবস্থা একাধিকবার আসে না। এবং সমস্যা সমাধানের অজুহাতে কখনোই নতুন কোনো স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে না।’ সুতরাং এরশাদের পতনের পর একটি বিশেষ অচলাবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটেছিল। সেটাকে মডেল দেখিয়ে নির্বাহী বিভাগে বিচারকদের পদায়ন ছিল অবৈধ। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।
তথাকথিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিচারিক যাচাই-বাছাই একেবারে কম হয়নি। ১৯৯৬ সাল। বিচারপতি এম এম হক ও বিচারপতি এম এ মতিনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের সামনে সম্ভবত প্রথম প্রশ্ন এসেছিল। বলা হয়েছিল, এই সংশোধনীর জন্য গণভোট দরকার ছিল। ওই বেঞ্চ সরাসরি রিট নাকচ করে বলেছিলেন, গণভোট দরকার নেই। পরে ১৯৯৯ সালে আরেকটি রিটে যথার্থ প্রশ্ন তোলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে কি না? বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টার পদ গ্রহণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি ছিল এই রিটের অন্যতম প্রতিপাদ্য। বিচারপতি শাহ আবু নঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই প্রশ্নে বিভক্ত রায় দিয়েছিলেন। সে কারণে তিন সদস্যের একটি বৃহত্তর হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠিত হয়েছিল। ২০০৪ সালে তাঁরা রায় দেন। এতে সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনী টিকে যায়। কিন্তু বিচারকদের উপদেষ্টা হওয়ার বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়। বিচারকেরা যথেষ্ট রক্ষণশীলতার সঙ্গে সমর্থন দেন। তাঁরা বলেন, কেউ যদি নিজেকে পক্ষপাত বা কোনো দলের বিজয় দেখতে আগ্রহী হন, তাহলে তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ নেবেন না। তাঁরা আরও বলেন, সংসদ চাইলে তার আপন প্রজ্ঞায় বদলে নিতে পারে। তদুপরি আমরা হাইকোর্টের রায়ের সমালোচনা করি। কারণ তাঁরা বিচারকদের ‘প্রধানমন্ত্রীর’ মতো রাজনৈতিক পদ গ্রহণের বিষয়টিকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোবিধ্বংসী হিসেবে ঘোষণা করতে অসমর্থ হয়েছিলেন। হাইকোর্টের রায়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে ‘সংসদের প্রজ্ঞা’র ওপর জোর দেওয়া হয়। সংসদের প্রজ্ঞা যদি এত পূত-পবিত্র হবে, তাহলে জিয়ার ফরমান পঞ্চম ছাড়াও দ্বাদশ সংশোধনীতে দুই দলের প্রজ্ঞায় পাস হলেও তা এখন অপবিত্র হলো কেন।
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা পরীক্ষার ওই মামলায় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবর্তনকে সমর্থন করেন। কিন্তু বিচারকদের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধানকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেন। ওই মামলার অন্যতম অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তা সমর্থন করেন। এভাবে আমরা দেখি, বিচারকেরা যেকোনো অবস্থাতেই উপদেষ্টা হতে পারেন না এবং তেমন বিধান বিচার বিভাগবিধ্বংসী, সে কথায় দুই বড় দলের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা একমত। এবং তার প্রমাণ সুপ্রিম কোর্টের হেফাজতে আছে।
বিচারকেরা উপদেষ্টা, মন্ত্রী কিংবা সিইসি হলে কী ক্ষতি, তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন বিচারপতি খায়রুল হক। কোনো অবস্থাতেই বিচারকদের উপদেষ্টার পদ গ্রহণ সমর্থন করেননি তিনি। পরোক্ষভাবেও বৈধতা দেননি। এমনকি তিনি অবসর নেওয়ার তিন বছর পরও এ ধরনের পদপদবি গ্রহণের বিরুদ্ধে অভিমত ব্যক্ত করেন। যেমন তিনি বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা প্রায় সবাই যে জ্ঞানে-গুণে এবং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। এটা অনস্বীকার্য যে অবসরে গমনের পরও বিচারপতিরা তাঁদের সুদীর্ঘ কর্মজীবনে আহরিত অমূল্য অভিজ্ঞতার ফসল বিভিন্ন বিচার বিভাগীয় পদে বহাল হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু তা কখনোই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল্যে নয়।’
বিচারপতি অ্যান্ড্রু জ্যাকসন ছিলেন আমেরিকার সপ্তম প্রেসিডেন্ট। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সহযোগী বিচারক। বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর রায়ের উপসংহারে বলেছেন, ‘বিচারপতি জ্যাকসনের ভাষায়, ‘বিচারকেরা (জ্যাকসন অবশ্য তাঁর রায়ে বিচারক নয়, মানুষ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন) প্রায়ই অর্থের চেয়ে বেশি মাত্রায় উচ্চাভিলাষ ও আনুগত্যের ঘুষ গ্রহণ করে থাকেন। অতএব বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতাকে দেশ ও জাতীয় স্বার্থে কোনো কারণে বা কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ন করা যাবে না।’
বিচারপতি খায়রুল হক আরও লিখেছেন, ‘বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার পৃথক্করণ নীতি সংবিধানের মূল নীতিগুলো অপরিবর্তনীয়। নির্বাহী আদেশ বা আইন সংশোধন মারফত কোনোভাবেই সংবিধানের কোনো মূল নীতিকে বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না, এমনকি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেও নয়।’ তার মানে, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বিচারকদের জন্য রাখা টোপের প্রতি তিনি কটাক্ষ হেনেছেন। তিনি লেখেন, ‘সংশোধিত সংবিধান যদি উক্ত মূল নীতিকে কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল করে তাহলে সংশোধিত সংবিধানের সেই অংশ অসাংবিধানিক হবে। প্রলুব্ধতার হাত থেকে রক্ষা করবার স্বার্থে অবসর বা অপসারিত হবার পর প্রজাতন্ত্রের অন্য কোন লাভজনক পদে বহাল করা থেকে বিচারকদের সাংবিধানিকভাবে অযোগ্য করা হয়েছে। যাতে ভবিষ্যৎ অনুগ্রহের আশায় দায়িত্ব পালন কর্মকালীন সময়ে তাঁদের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হবার কোন আশঙ্কা না থাকে।’ এরপর তিনি আরও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেন যে ‘সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারক তাঁর পদে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কিংবা অবসর গ্রহণের পর কিংবা অপসারণের পর সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্য বা নীতির পরিপন্থী বা ব্যতিক্রমকরত কোন প্রকার লাভজনক বা অলাভজনক পদ গ্রহণ করতে পারবেন না।’
আমরা এটা ধরে নিতে পারি, প্রধান উপদেষ্টা হওয়াসংক্রান্ত জটিলতা তাঁর কাছে পরিষ্কার ছিল। সে কারণে তিনি যেসব পদপদবি গ্রহণ করা যাবে না, তার একটি তালিকা দেন। এর নামকরণ করেন ‘উদ্ভাসিত সত্য’। সেই সত্যে তিনি অবসরে যাওয়া বিচারকদের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণকে নিষিদ্ধ করেন বলেই প্রতীয়মান হয়।
এমনকি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা টি এইচ খান নির্দিষ্ট অভিমত দেন, বিচারকেরা অবসরে গমনের দুই-তিন বছর পরই শুধু যথাযথ বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় পদে বহাল হতে পারেন। এমনকি বিএনপি-সমর্থিত বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনও এ বিষয়ে পরিত্রাণ পেতে সোচ্চার। আমরা শুধু দেখি, দুই নেত্রী তাঁদের বিচিত্র ও ঝাঁঝালো বাদানুবাদের মধ্যেও কায়দা করে এই বিষয়টিতে তাঁদের অবস্থান নির্দিষ্ট করছেন না। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা পদে বিতর্কিত করতেই বিএনপি তাঁর সমালোচনা করছে। বিএনপি অনেক আগেই বলেছে, তারা তাঁর অধীনে নির্বাচনে যাবে না। রফিক-উল হক বলেন, ‘অ্যাটর্নি জানলেন কী করে যে তিনিই হবেন।’ তবে আমরা মনে রাখব, এ ধরনের বোলচালে কোনো গঠনমূলক অবস্থান নেই। আলোচ্য রায়ের কথা প্রবক্তাদের কাউকে মুখে নিতে দেখি না।
শেক্সপিয়ারের কালজয়ী ‘হ্যামলেট’ নাটক সারা বিশ্বে তুমুল জনপ্রিয়। মনে হচ্ছে তার চেয়েও জনপ্রিয় ছয় শব্দের একটি সংলাপ। ‘টু বি অর নট টু বি’। এর অর্থ হতে পারে আলোতে বেরিয়ে আসব, নাকি অন্ধকারে। প্রধান বিচারপতি এই মুহূর্তে ‘টু বি অর নট টু বি’-তে আছেন ও থাকবেন। তিনি তাঁর ওই রায়ের ৩৭৭ নম্বর প্যারাগ্রাফে লিখেছেন, ‘এমতাবস্থায় একদিকে দেশ ও জাতীয় স্বার্থে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিগণের সেবা গ্রহণ, অন্যদিকে তাঁদেরকে প্রলুব্ধতার হাত থেকে রক্ষা করে দেশ ও জাতিকে রক্ষাকরণ—এই দুইয়ের মধ্যে টু বি অর নট টু বি-এর মতো অবস্থান। এর মধ্যে একটি সমতা আনা প্রয়োজন। এই রূপ সমতা আনয়নের কথা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর অষ্টম সংশোধনী রায়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এমতাবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারপতিকে তাঁর অবসর গ্রহণের অন্তত তিন বছর অতিবাহিত হবার পর কোন পদে বহাল করবার লক্ষ্যে সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে প্রয়োজনীয় সংশোধনী বাংলাদেশ সংসদ আনতে পারে।’
আমরা তাঁর সঙ্গে একমত। রুহুল কুদ্দুস বনাম বিচারপতি আজিজ মামলার রায়টির প্রতি অক্ষরের সঙ্গে আমরা একমত। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, দুই বড় দলীয় কিংবা নির্দলীয় উল্লিখিত শীর্ষ আইনবিদেরা সত্যিই বিশ্বাস করেন, সুপ্রিম কোর্টকে বাঁচাতে হবে। আর সে জন্য মুলো ঝোলানোর ওই বিধান অপসারণ করা দরকার। আমরা আশা করব, যথেষ্ট সময় থাকতেই ৯৯ অনুচ্ছেদে উপযুক্ত সংশোধনী আনা হবে। জনগণকে ভাঁওতাবাজির কবল থেকে মুক্তি দিতে পরম করুণাময় আমাদের সবাইকে শক্তি দিন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
গত সপ্তাহে এই আলোচনা হচ্ছিল আরটিভির ‘রোড টু ডেমোক্রেসি’ অনুষ্ঠানে। বললাম, এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় আছে। শুধু রায় বললে কম বলা হবে। এটা একটা মাইলফলক রায়। শুধু প্রধান উপদেষ্টা কেন, অবসরের পরবর্তী প্রথম তিন বছরে যাতে তাঁরা কোনো পদই না নেন, তা হোক লাভজনক বা অলাভজনক, সে বিষয়ে বিচারপতি খায়রুল হকের একটি অনন্যসাধারণ রায় আছে। এটা শুধু অবসরপ্রাপ্তদের জন্য নয়, কর্মরতদেরও জন্য প্রযোজ্য। কর্মরতদের জন্য নির্বাচন কমিশনের পদ গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে এই রায়। বাংলায় লেখা এই শ্রমসাধ্য দীর্ঘ রায়টি পড়লে আপনার সামনে ছবির মতো ভেসে উঠবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জনের হাজার বছরের ইতিহাস। অবাক বিস্ময়ে আমরা সেই ইতিহাস পড়েছি। স্পন্দিত হয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, এই রায়টি হয়েছে জরুরি অবস্থায়, ১২ ডিসেম্বর ২০০৭। পূর্ণাঙ্গ রায় এসেছে আরও অনেক পরে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা তখন বাতাসে ভাসছে।
প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তাঁর রায়ে স্পষ্ট বলেছেন, অবসরে গিয়ে এ ধরনের পদপদবি গ্রহণের সুযোগ বিচারকদের জন্য রাখা হলে বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। ওই আলোচনায় সে কথা উল্লেখ করে বলি, এর সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। তিনি এখন এ ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন। বিচারপতি মো. গোলাম রাব্বানী এ প্রসঙ্গে উচ্চ আদালতের রায় সম্পর্কে আমার ‘আইডিয়া’ না থাকার কথা বলেন। তাঁর যুক্তি: বিচারকেরা রায়ের মাধ্যমে কথা বলেন। এর বাইরে কথা বলেন না। তাঁর মতে, বিচারপতি খায়রুল হকের তরফে প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করা বা না-করা প্রশ্নে মন্তব্যের সময় এখনো আসেনি। টিভি উপস্থাপক অতঃপর ড. আকবর আলি খানের মন্তব্য জানতে চান। তিনি বিচারপতি রাব্বানীর সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। তাঁর ভাষায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হতে এখনো অনেক দেরি আছে। সুতরাং এখন বলার সুযোগ নেই।
তাঁদের প্রতিক্রিয়ার দুটি দিক আছে। একটি হলো, এখনই মতামত দিতে সংবিধান বাধা দেয় কি না। দ্বিতীয়ত, এখনই বলার সুযোগ আছে কি না। একটি আইনগত, অন্যটি রাজনৈতিক। আমি শুধু বললাম, বিজ্ঞ দুই আলোচক যে অভিমত রেখেছেন, সেটা আমি ধরে নিচ্ছি যে তাঁরা তাঁদের যুক্তি আইন ও সংবিধানের আলোকে করেছেন। প্রধান বিচারপতির এখন কথা বলা বারণ। টিভিতে শুধু বললাম, আমি বিনয়ের সঙ্গে তাঁদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি।
এম এ আজিজ কর্মরত বিচারক থাকতে সিইসি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস (প্রধান বিচারপতি তাঁকে বিতর্কের মুখে অতিরিক্ত বিচারক পদে সম্প্রতি শপথ দেন)। এ মামলায় সিইসি পদে আজিজের নিয়োগ অবৈধ ঘোষিত হয়। এই রায়ে কোনো ব্যক্তির বিষয় নয়, একটি নীতি মীমাংসিত হয়। টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুল ইসলাম, এম আমীর-উল ইসলাম, এম কে রহমান (বর্তমানে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল) ও ড. শাহ্দীন মালিক ছিলেন অ্যামিকাস কিউরি। বার ও বেঞ্চ এক বিরল মতৈক্যে পৌঁছান। তাঁরা বলেন যে অবসরে গিয়েও কোনো লাভজনক পদ গ্রহণ করা বিচারকের জন্য সমীচীন নয়। সামরিক ও বেসামরিক আমলারা গত কয়েক বছরে অবসর নিয়ে সংসদ নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছিলেন। আইন করে অবসর গ্রহণের তিন বছরের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়। বাকি ছিলেন বিচারকেরা। এই রায় সেখানে শক্ত দেয়াল তুলে দেয়।
বাহাত্তরের মূল সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদটি পঞ্চম সংশোধনী মামলায় ফিরে আসতে পারত। তাহলে আমরা দেখতাম ত্রয়োদশ সংশোধনীর আংশিক বাতিল হয়ে গেছে। বিচারপতি খায়রুল হক তা সযত্নে এড়িয়ে যান। কিন্তু এটা যে একটা বিরাট স্ববিরোধিতা ছিল, তা হয়তো তাঁকে পীড়িত করছিল। তাই আমরা দেখি, ২০০৫ সালে তাঁর ওই দৃশ্যমান বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়ন দুই বছর বাদে তিনি বীরোচিতভাবেই মোকাবিলা করেন। তফাত শুধু এই যে ৯৯ অনুচ্ছেদকে বাঁচিয়ে তুলতে তিনি পুনর্মুদ্রণের সুযোগ সৃষ্টি করেননি। নির্দিষ্টভাবে সংসদকে শোধরাতে বলেছেন। পাঠক খেয়াল করবেন, নিজেদের পায়ের মাপের সঙ্গে এটা যায় না বলে দুই বড় দল ও তদীয় মিত্রজীবীরা এ বিষয়ে যথারীতি চুপচাপ আছেন।
বাহাত্তরের সংবিধানে কেন বলা হয়েছিল যে অবসরে গিয়ে বিচারকেরা প্রজাতন্ত্রের কর্মে অযোগ্য হবেন, তার ইতিহাস তুলে ধরেছেন বিচারপতি খায়রুল হক। ক্রুদ্ধ রাজার সামনে ‘ভূমিতে ষষ্ঠাঙ্গে প্রণামরত’ অবস্থায় থাকা প্রধান বিচারপতি কোক থেকে পরের ৪০০ বছরের ইতিহাসের অতল স্পর্শ করেন তিনি। রাজনীতিক ও বিচারবহির্ভূত পদপদবি গ্রহণে আগ্রহী বিচারকদের চোখে তিনি সজোরে অঙ্গুলি চালিয়েছেন। দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ‘একটি জাতির সামনে এমন কোনো পরিস্থিতিই আসা স্বাভাবিক নয়, যখন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকেরা লাভজনক পদে নিযুক্ত হবেন।’ আমাদের সমাজের কতিপয় লোক, গণতন্ত্র কিংবা বাংলাদেশি বাস্তবতার নিরিখে এখনো বিচারকদের রেহাই দিতে চান না, তাঁদের প্রতিও তিনি এই রোদনভরা বাণী দিয়েছেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
বিচারপতি খায়রুল হক প্রকারান্তরে লিখেছেন, বিচারকদের সামনে এ ধরনের পদের মুলো ঝুলিয়ে রাখা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পরিপন্থী। পাঠক যদি বলেন আপনি মুলো কথাটি বললেন, সেটা কি তিনি ব্যবহার করেছেন? আমি বলব, না, ঠিক মুলো নয়, তিনি এটাকে ‘ঘুষ’ বলেছেন। বলেছেন, এটা হলো ‘প্রলুব্ধকরণ’ বা সম্মোহন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ কিন্তু অষ্টম সংশোধনী মামলার রায়ে ১৯৮৯ সালে ঠিক এ কথাই বলেছিলেন। আবার এক বছর না যেতেই সেই তিনি তিন জোটের ঐতিহাসিক রূপরেখা অনুযায়ী রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর পদ গ্রহণ করেছিলেন। বিচারপতি খায়রুল হক যথার্থ বলেছেন, ‘নেহাত দুর্ভাগ্য ব্যতিরেকে কোনো জাতির জীবনে এই রূপ অস্বাভাবিক অবস্থা একাধিকবার আসে না। এবং সমস্যা সমাধানের অজুহাতে কখনোই নতুন কোনো স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে না।’ সুতরাং এরশাদের পতনের পর একটি বিশেষ অচলাবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটেছিল। সেটাকে মডেল দেখিয়ে নির্বাহী বিভাগে বিচারকদের পদায়ন ছিল অবৈধ। সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী।
তথাকথিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিচারিক যাচাই-বাছাই একেবারে কম হয়নি। ১৯৯৬ সাল। বিচারপতি এম এম হক ও বিচারপতি এম এ মতিনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চের সামনে সম্ভবত প্রথম প্রশ্ন এসেছিল। বলা হয়েছিল, এই সংশোধনীর জন্য গণভোট দরকার ছিল। ওই বেঞ্চ সরাসরি রিট নাকচ করে বলেছিলেন, গণভোট দরকার নেই। পরে ১৯৯৯ সালে আরেকটি রিটে যথার্থ প্রশ্ন তোলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছে কি না? বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টার পদ গ্রহণে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি ছিল এই রিটের অন্যতম প্রতিপাদ্য। বিচারপতি শাহ আবু নঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই প্রশ্নে বিভক্ত রায় দিয়েছিলেন। সে কারণে তিন সদস্যের একটি বৃহত্তর হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠিত হয়েছিল। ২০০৪ সালে তাঁরা রায় দেন। এতে সার্বিকভাবে ত্রয়োদশ সংশোধনী টিকে যায়। কিন্তু বিচারকদের উপদেষ্টা হওয়ার বিষয়টি ভিন্ন মাত্রা পায়। বিচারকেরা যথেষ্ট রক্ষণশীলতার সঙ্গে সমর্থন দেন। তাঁরা বলেন, কেউ যদি নিজেকে পক্ষপাত বা কোনো দলের বিজয় দেখতে আগ্রহী হন, তাহলে তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ নেবেন না। তাঁরা আরও বলেন, সংসদ চাইলে তার আপন প্রজ্ঞায় বদলে নিতে পারে। তদুপরি আমরা হাইকোর্টের রায়ের সমালোচনা করি। কারণ তাঁরা বিচারকদের ‘প্রধানমন্ত্রীর’ মতো রাজনৈতিক পদ গ্রহণের বিষয়টিকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোবিধ্বংসী হিসেবে ঘোষণা করতে অসমর্থ হয়েছিলেন। হাইকোর্টের রায়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে ‘সংসদের প্রজ্ঞা’র ওপর জোর দেওয়া হয়। সংসদের প্রজ্ঞা যদি এত পূত-পবিত্র হবে, তাহলে জিয়ার ফরমান পঞ্চম ছাড়াও দ্বাদশ সংশোধনীতে দুই দলের প্রজ্ঞায় পাস হলেও তা এখন অপবিত্র হলো কেন।
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা পরীক্ষার ওই মামলায় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবর্তনকে সমর্থন করেন। কিন্তু বিচারকদের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার বিধানকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করেন। ওই মামলার অন্যতম অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তা সমর্থন করেন। এভাবে আমরা দেখি, বিচারকেরা যেকোনো অবস্থাতেই উপদেষ্টা হতে পারেন না এবং তেমন বিধান বিচার বিভাগবিধ্বংসী, সে কথায় দুই বড় দলের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা একমত। এবং তার প্রমাণ সুপ্রিম কোর্টের হেফাজতে আছে।
বিচারকেরা উপদেষ্টা, মন্ত্রী কিংবা সিইসি হলে কী ক্ষতি, তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন বিচারপতি খায়রুল হক। কোনো অবস্থাতেই বিচারকদের উপদেষ্টার পদ গ্রহণ সমর্থন করেননি তিনি। পরোক্ষভাবেও বৈধতা দেননি। এমনকি তিনি অবসর নেওয়ার তিন বছর পরও এ ধরনের পদপদবি গ্রহণের বিরুদ্ধে অভিমত ব্যক্ত করেন। যেমন তিনি বলেন, ‘অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা প্রায় সবাই যে জ্ঞানে-গুণে এবং অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। এটা অনস্বীকার্য যে অবসরে গমনের পরও বিচারপতিরা তাঁদের সুদীর্ঘ কর্মজীবনে আহরিত অমূল্য অভিজ্ঞতার ফসল বিভিন্ন বিচার বিভাগীয় পদে বহাল হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে ব্যয় করতে পারেন। কিন্তু তা কখনোই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মূল্যে নয়।’
বিচারপতি অ্যান্ড্রু জ্যাকসন ছিলেন আমেরিকার সপ্তম প্রেসিডেন্ট। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সহযোগী বিচারক। বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর রায়ের উপসংহারে বলেছেন, ‘বিচারপতি জ্যাকসনের ভাষায়, ‘বিচারকেরা (জ্যাকসন অবশ্য তাঁর রায়ে বিচারক নয়, মানুষ কথাটি ব্যবহার করেছিলেন) প্রায়ই অর্থের চেয়ে বেশি মাত্রায় উচ্চাভিলাষ ও আনুগত্যের ঘুষ গ্রহণ করে থাকেন। অতএব বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতাকে দেশ ও জাতীয় স্বার্থে কোনো কারণে বা কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ন করা যাবে না।’
বিচারপতি খায়রুল হক আরও লিখেছেন, ‘বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার পৃথক্করণ নীতি সংবিধানের মূল নীতিগুলো অপরিবর্তনীয়। নির্বাহী আদেশ বা আইন সংশোধন মারফত কোনোভাবেই সংবিধানের কোনো মূল নীতিকে বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না, এমনকি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেও নয়।’ তার মানে, ত্রয়োদশ সংশোধনীতে বিচারকদের জন্য রাখা টোপের প্রতি তিনি কটাক্ষ হেনেছেন। তিনি লেখেন, ‘সংশোধিত সংবিধান যদি উক্ত মূল নীতিকে কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা দুর্বল করে তাহলে সংশোধিত সংবিধানের সেই অংশ অসাংবিধানিক হবে। প্রলুব্ধতার হাত থেকে রক্ষা করবার স্বার্থে অবসর বা অপসারিত হবার পর প্রজাতন্ত্রের অন্য কোন লাভজনক পদে বহাল করা থেকে বিচারকদের সাংবিধানিকভাবে অযোগ্য করা হয়েছে। যাতে ভবিষ্যৎ অনুগ্রহের আশায় দায়িত্ব পালন কর্মকালীন সময়ে তাঁদের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হবার কোন আশঙ্কা না থাকে।’ এরপর তিনি আরও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেন যে ‘সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারক তাঁর পদে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কিংবা অবসর গ্রহণের পর কিংবা অপসারণের পর সংবিধানের মূল বৈশিষ্ট্য বা নীতির পরিপন্থী বা ব্যতিক্রমকরত কোন প্রকার লাভজনক বা অলাভজনক পদ গ্রহণ করতে পারবেন না।’
আমরা এটা ধরে নিতে পারি, প্রধান উপদেষ্টা হওয়াসংক্রান্ত জটিলতা তাঁর কাছে পরিষ্কার ছিল। সে কারণে তিনি যেসব পদপদবি গ্রহণ করা যাবে না, তার একটি তালিকা দেন। এর নামকরণ করেন ‘উদ্ভাসিত সত্য’। সেই সত্যে তিনি অবসরে যাওয়া বিচারকদের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণকে নিষিদ্ধ করেন বলেই প্রতীয়মান হয়।
এমনকি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা টি এইচ খান নির্দিষ্ট অভিমত দেন, বিচারকেরা অবসরে গমনের দুই-তিন বছর পরই শুধু যথাযথ বিচার বিভাগীয় বা আধা বিচার বিভাগীয় পদে বহাল হতে পারেন। এমনকি বিএনপি-সমর্থিত বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনও এ বিষয়ে পরিত্রাণ পেতে সোচ্চার। আমরা শুধু দেখি, দুই নেত্রী তাঁদের বিচিত্র ও ঝাঁঝালো বাদানুবাদের মধ্যেও কায়দা করে এই বিষয়টিতে তাঁদের অবস্থান নির্দিষ্ট করছেন না। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা পদে বিতর্কিত করতেই বিএনপি তাঁর সমালোচনা করছে। বিএনপি অনেক আগেই বলেছে, তারা তাঁর অধীনে নির্বাচনে যাবে না। রফিক-উল হক বলেন, ‘অ্যাটর্নি জানলেন কী করে যে তিনিই হবেন।’ তবে আমরা মনে রাখব, এ ধরনের বোলচালে কোনো গঠনমূলক অবস্থান নেই। আলোচ্য রায়ের কথা প্রবক্তাদের কাউকে মুখে নিতে দেখি না।
শেক্সপিয়ারের কালজয়ী ‘হ্যামলেট’ নাটক সারা বিশ্বে তুমুল জনপ্রিয়। মনে হচ্ছে তার চেয়েও জনপ্রিয় ছয় শব্দের একটি সংলাপ। ‘টু বি অর নট টু বি’। এর অর্থ হতে পারে আলোতে বেরিয়ে আসব, নাকি অন্ধকারে। প্রধান বিচারপতি এই মুহূর্তে ‘টু বি অর নট টু বি’-তে আছেন ও থাকবেন। তিনি তাঁর ওই রায়ের ৩৭৭ নম্বর প্যারাগ্রাফে লিখেছেন, ‘এমতাবস্থায় একদিকে দেশ ও জাতীয় স্বার্থে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিগণের সেবা গ্রহণ, অন্যদিকে তাঁদেরকে প্রলুব্ধতার হাত থেকে রক্ষা করে দেশ ও জাতিকে রক্ষাকরণ—এই দুইয়ের মধ্যে টু বি অর নট টু বি-এর মতো অবস্থান। এর মধ্যে একটি সমতা আনা প্রয়োজন। এই রূপ সমতা আনয়নের কথা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁর অষ্টম সংশোধনী রায়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। এমতাবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারপতিকে তাঁর অবসর গ্রহণের অন্তত তিন বছর অতিবাহিত হবার পর কোন পদে বহাল করবার লক্ষ্যে সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে প্রয়োজনীয় সংশোধনী বাংলাদেশ সংসদ আনতে পারে।’
আমরা তাঁর সঙ্গে একমত। রুহুল কুদ্দুস বনাম বিচারপতি আজিজ মামলার রায়টির প্রতি অক্ষরের সঙ্গে আমরা একমত। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, দুই বড় দলীয় কিংবা নির্দলীয় উল্লিখিত শীর্ষ আইনবিদেরা সত্যিই বিশ্বাস করেন, সুপ্রিম কোর্টকে বাঁচাতে হবে। আর সে জন্য মুলো ঝোলানোর ওই বিধান অপসারণ করা দরকার। আমরা আশা করব, যথেষ্ট সময় থাকতেই ৯৯ অনুচ্ছেদে উপযুক্ত সংশোধনী আনা হবে। জনগণকে ভাঁওতাবাজির কবল থেকে মুক্তি দিতে পরম করুণাময় আমাদের সবাইকে শক্তি দিন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Monday, April 19, 2010
ক্যাম্পাস হত্যার বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠান by মিজানুর রহমান খান
লাল বাতি জ্বলে, কিন্তু গাড়ি চলে। সবুজ বাতি জ্বলে, গাড়ির চাকা বন্ধ থাকে। রাজধানীতে এ দৃশ্য চিরচেনা হয়ে উঠেছে। এখন রাজনীতিতেও খটকা চলছে। এ থেকে আমরা আসলে এক সংকেত-অসংবেদনশীল জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এটা এক ধরনের বিকার বটে।
ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাস বন্ধে সরকারি দলের অব্যাহত কঠোর হুঁশিয়ারিও এক ধরনের বৈকল্য। আপাত মনে হয় ভালোই তো। সরকারি দল কত নিরপেক্ষ। কত উদার। আমাদের শাসকদের দিল কত নরম। তারা কত উত্তম সরকার। আসলে তা কোনোটিই নয়। আমাদের বিরোধী দল মানে বিএনপি-জামায়াত এখন ছাত্রলীগের হানাহানি ও রক্তপাত উপভোগ করছে। তারা এক ধরনের অমানবিক মজা পাচ্ছে। তারা একটি বিষয়ে সতর্ক। ক্যাম্পাস হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি তারা করবে না। ক্যাম্পাসের রক্তগঙ্গা, সহিংসতার বিষয়ে কোনো তদন্তও তাদের চিন্তার অতীত।
ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ভাষণ দিচ্ছেন দেশের সরকারপ্রধান। এর ফলে আইনের চেতনা নস্যাত্ হচ্ছে। অথচ অনেকে এমন ভাষণ শুনে তাঁকে বাহবা দিচ্ছে। আমাদের গণমাধ্যমেও তা ইতিবাচকভাবেই ছাপা হচ্ছে। এটাও একটা বিকৃতি। আমরা বিকৃতি-বৃত্তে বন্দী।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে ১৫৩খ নামে একটি ধারা আছে। এখন এটা প্রয়োগের সময়। কেউ এর প্রয়োজনীয়তা বা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তাহলে জবাব হবে, এটা অবৈধ হলে সংসদে বিল আনতে হবে। সংশোধনী আনতে হবে। আইন রেখে আইন ভাঙা যাবে না। রাজনীতির অপরাধকরণ তো ঘটেছেই। এখন ব্যাপকতা বাড়ছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ছাত্রলীগের ছেলেরা খুন হচ্ছে। কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মেয়াদ বাড়ছে। অথচ নিহত ছাত্রলীগ কর্মীদের অভিভাবকেরা অসহায় ও বিপন্ন বোধ করছেন। তাঁরা বড় গলায় বিচার চাওয়ার অধিকার পর্যন্ত পাচ্ছেন না। তাঁদের কেউ ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। যে বাবা-মায়ের বুক খালি, ক্ষতি শুধু তাঁদেরই। ছাত্রশিবির রগ কাটে। এই সন্ত্রাস অতীব দানবীয়। কিন্তু কেউ বলবে না, ছাত্রশিবির কর্মী খুন হলে তার বিচার লাগবে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র খুনের মূল আসামি এখন হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারক। তিনি সাবেক জাসদ-ছাত্রলীগ নেতা। গত সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের টিকিটপ্রার্থী ছিলেন। পাননি। তাঁকে বিচারক করা হবে। তাই আসামি হিসেবে তাঁর নাম প্রত্যাহার করা হলো। অথচ অনেক আগেই সেই মামলার দ্রুত বিচার অনুষ্ঠান সম্ভব ছিল।
ছাত্ররাজনীতি এখন অনেকের কাছে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। আমাদের রাজনীতিটা পেশিশক্তিনির্ভর। আর এই পেশির চৌকস জোগানদাতা ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসের দিকে তাই অনেকের শকুনের চোখ। ১৯৮৮-তে ছাত্রশিবির কর্মী খুনের ওই মামলায় অভিযোগ গঠিত হয়েছিল। সেই মামলা থেকে নির্বাচিত কতিপয় নাম তুলল সরকার। তৈরি করল নতুন দৃষ্টান্ত। সেই সঙ্গে একটি বার্তা পৌঁছাল। সেই বার্তার ভাষা বোধগম্য।
ছাত্রলীগ কর্মীর খুনের বিচার এখন কী কারণে হয় না? যে কারণে ছাত্রশিবির কর্মীর হত্যার বিচার হয় না। অন্যান্য ক্যাম্পাস-নাশকতার বিচার হয় না। জাহাঙ্গীরনগরের সেই অস্ত্রধারী মাস্তান ফুরফুরে মেজাজে থাকে। বুঝতে হবে, এসব কারণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এর কারণ কালোত্তীর্ণ। ছাত্রলীগের হাতে ছাত্রলীগ কিংবা প্রতিপক্ষের হাতে প্রতিপক্ষ হত্যা ও তার বিচার না হওয়া একই সূত্রে গাঁথা।
দণ্ডবিধির ১৫৩খ ধারার শিরোনাম বড় স্পষ্ট। বড় দল। বড় নেতা। বড় ওষুধ। এর শিরোনাম ‘রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণের জন্য ছাত্রগণকে প্ররোচিত করা’। এই ধারায় বলা আছে, ‘যে ব্যক্তি কথিত বা লিখিত শব্দাবলীর সাহায্যে বা সংকেতসমূহের বা দৃশ্যমান কল্পমূর্তিসমূহের সাহায্যে বা প্রকারান্তরে যে কোনো ছাত্র বা ছাত্রী শ্রেণী বা ছাত্রদের ব্যাপারে আগ্রহশীল বা তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে এমন কোন রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণের জন্য প্ররোচিত করে বা প্ররোচিত করার উদ্যোগ করে যা গণশৃংখলা নষ্ট বা খর্ব করে, অথবা যার গণশৃংখলা নষ্ট বা খর্ব করার সম্ভাবনা রয়েছে—সে ব্যক্তি কারাদণ্ডে, যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে বা জরিমানা দণ্ডে বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।’
আমাদের নেতারা ছাত্রদের ব্যবহার করছেন। প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেছেন, ‘কোনো ধরনের টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না। টেন্ডারবাজ ও চাঁদাবাজদের দলে রাখা হবে না।’ কিন্তু ছাত্রদের তাঁরা দলে রাখার কথা বলেন প্রকাশ্যেই। অথচ আইনবলে ছাত্রদের তাঁরা দলে টানতে পারেন না। ছাত্রদের দলীয় কাজে ব্যবহার বেআইনি।
ছাত্র অপরাধীদের বিচার না করাও বেআইনি। যে ছাত্রটি প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় টেন্ডারবাজ, সে কিন্তু শিক্ষক-সহপাঠীর সঙ্গে মেশে। শ্রেণীকক্ষে বসে। সহজে কল্পনা করা চলে, শ্রেণীকক্ষে টেন্ডারবাজের উদ্ধত উপস্থিতি। সবার জন্য অস্বস্তিকর। টেন্ডারবাজের ছাতি ফোলা থাকে। চলাফেরায় থাকে উগ্রতা। টেন্ডারবাজ পড়াশোনার পরিবেশ দূষিত করে। তার স্পর্ধায় শিক্ষক মর্মযাতনায় ভোগেন। আত্মসম্মানের ভয়ে প্রায়ই তা চেপে যান।
প্রধানমন্ত্রী-বর্ণিত টেন্ডারবাজের পুঁজি কী? পেশি। ফোলায় কে? নেতা। কীভাবে? ফুঁ দিয়ে। এর প্রমাণ থাকে না। টেন্ডারবাজি ৫০৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য। টেন্ডারবাজ সামলানো পুলিশের রুটিন কাজ। তারা রুটিন মামলা করতে পারে। পুলিশ সেই কাজ করতে অক্ষম। কেন অক্ষম? বিষয়টি মোটেই লুকোছাপার ব্যাপার নয়। সোজা উত্তর, পুলিশ ওপরের হুকুম পায়। গায়েবি হুকুম। প্রকাশ্য হুকুমও আছে। তাই বলি, পুলিশকে কাজ করতে দিন।
সম্পাদকেরা বাসি খবর ছাপেন না। সম্পাদক মতিউর রহমান তা ছাপেন। একই শিরোনাম দুবার ছাপালেন, ‘ছাত্রলীগকে সামলান’। হলফ করে বলতে পারি, তিনি এমন সুযোগ আরও পাবেন। এ দেশে সব খবর বাসি হয় না। সব সময় তরতাজা থাকে। এটা তেমন এক জাতের খবর।
আমি বলব, ছাত্রলীগকে সামলাতে হবে না। নির্বাহী ক্ষমতার মালিক প্রধানমন্ত্রী। সংবিধানের সেই বলদর্পী প্রধানমন্ত্রীকে সামলান। ছাত্রলীগ সামলে যাবে। আরও অনেক কিছু সামলানো হবে। সেটা তো অসম্ভব, তাই তো? বেশ কথা। তাহলে অন্তত পুলিশের কাজ পুলিশকে করতে দিন।
পুলিশকে ‘কঠোর নির্দেশ’ প্রদান বন্ধ করুন। পুলিশকে ‘কড়া হুঁশিয়ারি’ দেবেন না। এটা একটা ঠাট্টা। সস্তা, কিন্তু নিষ্ঠুর। এমন কাজ ছাত্রলীগ নেতারাও করেন। তাঁরা বলেন, ‘সন্ত্রাসী যে-ই হোক তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ তার মানে বোঝাই যাচ্ছে ছাড়পত্রটা কোথায়? ছাত্র নষ্ট হতে পারে। আপেলে পোকা থাকবেই। তাই নষ্ট পুলিশও মিলবে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে আইন। এবং সেটা পুলিশেরই কাজ। এটা কারও হুকুমের অপেক্ষায় থাকার নয়। নষ্ট ছাত্র তার দুষ্কর্মের জন্য আইনের কোপানলে পড়বে। অন্যরা তা দেখবে। নিজেদের শোধরাবে। সেই স্বাভাবিক নিয়মরীতি একদম অনুপস্থিত। তাই ক্যাম্পাসে সহিংসতার শেকড় গেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটি ঠুঁটো জগন্নাথ। দলের লেজুড়বৃত্তি আর ভিসিগিরি-প্রভোস্টগিরি কখনো সমার্থক। একটি গোষ্ঠী মওকার অপেক্ষায় থাকে। তারা স্বায়ত্তশাসন গেল গেল বলে চিল্লায়। কিন্তু ক্যাম্পাসে লাশ পড়লেও তারা শাসন করে না। শাসন কী জিনিস, বুঝতেই চায় না। তাই প্রশ্ন হলো, কুঁজো তো কুঁজোই। তার আবার চিত হওয়া না-হওয়া নিয়ে চিন্তা কেন। কিন্তু আমরা বাস্তবে তা-ই দেখি। কুঁজোর চিত হওয়ার শখ দেখি। তারা বিচার চায় না। কিন্তু হঠাৎ সহিংসতার বিনাশ চায়। সরকারি দলের শাসন চেয়ে গলা ফাটায়। ক্যাম্পাসে আকসার মরামরি হয়। খুনখারাবি হয়। উদ্যত পিস্তল কিংবা কিরিচ হাতে ছাত্রের ছবি তো কম ছাপা হলো না। কিন্তু পুলিশ তাদের ধরতে পারে না। পুলিশের এসব দেখে নিশ্চয় কান্না পায়। কিন্তু সেই কান্না কেউ শোনে না। ভিসিরা দম দেওয়া পুতুলের মতো আচরণ করেন। কখনো ইস্তফা দেন না। তাঁদের অনুমতি ছাড়া পুলিশ হলে ঢুকতে পারে না। ঢুকলে তাদের অপমান হয়। স্বায়ত্তশাসন বিস্বাদ ঠেকে।
ছাত্রনেতা ছাত্র-অপরাধী হলেই দায়মুক্তি। এটাই ক্যাম্পাস-সংস্কৃতি। ১৫৩খ ধারার বাক্য গঠন পরিষ্কার। নেতাদের লক্ষ্যে পরিচালিত। নেতারাই কোমলমতি ছাত্রদের ‘রাজনৈতিক কার্যকলাপে’ লিপ্ত হতে প্ররোচনা দেন।
তবে তর্কের খাতিরে বলি, দণ্ডবিধিতে আরও অনেক ধারা আছে, যার আওতায় ক্যাম্পাসও পড়ে। এই যুক্তিটা দিই এক বিশেষ কারণে। সমাজে একদল লোক আছে। যারা বিরাজনৈতিকীকরণের তত্ত্ব নিয়ে হাজির হবে। তারা প্রায় অন্ধ। তারা কোনটা রাজনীতি আর কোনটা দুর্বৃত্তায়ন তা আলাদা করতে পারে না। তারা তারস্বরে চিৎকার করবে। তর্ক তুলবে ছাত্ররাজনীতি ভালো না মন্দ। এ আরেক জ্বালা। এ ধরনের অনভিপ্রেত বিতর্ক বন্ধ করা কঠিন। এর জন্য বিকল্প দাওয়াই। মাফ চাই, ভাই। তওবা নাক খপ্তা। ১৫৩খ-এর তলায় আর যদি যাই। তবে এও বলি, যে আইন মানা যাবে না, সেই আইন রাখা কেন? আইন রেখে আইন ভাঙা ভারি মজার বলেই?
তাহলে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী সম্পর্ক যেমন আছে তেমনই থাকুক! অঙ্গসংগঠনও যা, সহযোগী সংগঠনও তা। কূটতর্ক বৃথা। পানিতে পানি থাক। দণ্ডবিধিতে আরও ধারা আছে। এসব বিধান ব্রিটিশদের করা। ক্যাম্পাসে ছাত্র খুন হলে, কেউ মাস্তানি করে বেড়ালে দায়মুক্তির কোনো বিধান আইনে নেই। যে যাকে যে কারণে মারুক-ধরুক, আইনে শাস্তির বিধান আছে। ক্যাম্পাসে গন্ডা চারেক অপরাধ ঘটছে হামেশা। মারামারি, দখল, টেন্ডারবাজি ও খুন। বহিরাগত মাস্তানদের সঙ্গে তাদের অনেকের আঁতাত আছে। অবৈধ অস্ত্রের জোগান আছে।
কেউ ভয় দেখালে দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারা প্রযোজ্য। ক্যাম্পাসে এই ভয় দেখানোটা সবচেয়ে মামুলি ব্যাপার। এটা প্রায় অধিকার বলে গণ্য হচ্ছে। এই শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। ফৌজদারি অপরাধ করলে সতর্ক করার বিধান আইনে নেই। আবার তারা কী মর্যাদাবান! কী ভাগ্য তাদের! পাতিমন্ত্রীরা সতর্ক করেন না। অত মুরোদ তাঁদের নেই। ছোট মুখে বড় কথা তাঁদের সাজে না। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদকের নিচে কেউ তাদের সতর্ক করতে পারে না। ক্যাম্পাসে কুশীলবদের উঁচু মর্যাদা।
যুগান্তর ও সমকাল অভিন্ন শিরোনাম করেছিল সম্প্রতি। ‘ছাত্রলীগের কারণে সব অর্জন বিসর্জন দেওয়া যাবে না’। যুগান্তর-এর বিবরণ থেকে দেখা যায়, শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সব অর্জন ছাত্রলীগের কারণে বিসর্জন দেয়া যাবে না। আদু ভাই দিয়ে ছাত্রলীগ চলবে না। ছাত্ররাই ছাত্রলীগের রাজনীতি করবে। ছাত্রলীগ থেকে আংকেলদের সরে যেতে হবে। ছাত্রলীগ নিয়ে প্রতিদিনের পত্রপত্রিকায় যেসব সংবাদ দেখি, আর এ রকম সংবাদ দেখতে চাই না। দল ভারী করার জন্য দলে সন্ত্রাসী ঢোকানো যাবে না। সুবিধাভোগীদের চিনতে হবে।’
পক্ষকালের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরে সিলেটে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ছাত্রলীগকে সতর্ক করে দেন। এই সতর্কীকরণ মোটামুটি একটা রুটিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু দলে ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়া সন্ত্রাসীদের রোখা যাবে কীভাবে?
ক্যাম্পাসে গত সোয়া বছরে প্রায় ৫০টি সংঘর্ষ হয়েছে। শান্ত আবহাওয়ায় এত বড় দুর্যোগ বিরল। এর কারণ ও প্রতিকার নির্ধারণে একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন করা হোক। এর প্রতিবেদন যথাসময়ে প্রকাশ করতে হবে। একই সময়ে ক্যাম্পাসে একাধিক হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হোক। সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচার মিলবে। এই আইনের মেয়াদ সম্প্রতি দুই বছর বাড়ল। এই বিচারটা করলে মেয়াদ বৃদ্ধির একটা বড় তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যাবে। নিহত ছাত্রলীগ কর্মীর বাবা-মায়েরা সান্ত্বনা পাবেন। সরকারের ভাবমূর্তি খুবই উজ্জ্বল হবে! ছাত্ররা টের পাবে, দিন বদলাচ্ছে! আমরা সাম্প্রতিক খুনখারাবির বিচার পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৭ বছরে ৭৪টি খুনের মামলার বিচারেও হয়তো ঈষত্ আশাবাদী হতে পারব।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাস বন্ধে সরকারি দলের অব্যাহত কঠোর হুঁশিয়ারিও এক ধরনের বৈকল্য। আপাত মনে হয় ভালোই তো। সরকারি দল কত নিরপেক্ষ। কত উদার। আমাদের শাসকদের দিল কত নরম। তারা কত উত্তম সরকার। আসলে তা কোনোটিই নয়। আমাদের বিরোধী দল মানে বিএনপি-জামায়াত এখন ছাত্রলীগের হানাহানি ও রক্তপাত উপভোগ করছে। তারা এক ধরনের অমানবিক মজা পাচ্ছে। তারা একটি বিষয়ে সতর্ক। ক্যাম্পাস হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি তারা করবে না। ক্যাম্পাসের রক্তগঙ্গা, সহিংসতার বিষয়ে কোনো তদন্তও তাদের চিন্তার অতীত।
ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ভাষণ দিচ্ছেন দেশের সরকারপ্রধান। এর ফলে আইনের চেতনা নস্যাত্ হচ্ছে। অথচ অনেকে এমন ভাষণ শুনে তাঁকে বাহবা দিচ্ছে। আমাদের গণমাধ্যমেও তা ইতিবাচকভাবেই ছাপা হচ্ছে। এটাও একটা বিকৃতি। আমরা বিকৃতি-বৃত্তে বন্দী।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে ১৫৩খ নামে একটি ধারা আছে। এখন এটা প্রয়োগের সময়। কেউ এর প্রয়োজনীয়তা বা বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। তাহলে জবাব হবে, এটা অবৈধ হলে সংসদে বিল আনতে হবে। সংশোধনী আনতে হবে। আইন রেখে আইন ভাঙা যাবে না। রাজনীতির অপরাধকরণ তো ঘটেছেই। এখন ব্যাপকতা বাড়ছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ছাত্রলীগের ছেলেরা খুন হচ্ছে। কেউ দায়িত্ব নিচ্ছে না। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মেয়াদ বাড়ছে। অথচ নিহত ছাত্রলীগ কর্মীদের অভিভাবকেরা অসহায় ও বিপন্ন বোধ করছেন। তাঁরা বড় গলায় বিচার চাওয়ার অধিকার পর্যন্ত পাচ্ছেন না। তাঁদের কেউ ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে না। যে বাবা-মায়ের বুক খালি, ক্ষতি শুধু তাঁদেরই। ছাত্রশিবির রগ কাটে। এই সন্ত্রাস অতীব দানবীয়। কিন্তু কেউ বলবে না, ছাত্রশিবির কর্মী খুন হলে তার বিচার লাগবে না।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র খুনের মূল আসামি এখন হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারক। তিনি সাবেক জাসদ-ছাত্রলীগ নেতা। গত সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের টিকিটপ্রার্থী ছিলেন। পাননি। তাঁকে বিচারক করা হবে। তাই আসামি হিসেবে তাঁর নাম প্রত্যাহার করা হলো। অথচ অনেক আগেই সেই মামলার দ্রুত বিচার অনুষ্ঠান সম্ভব ছিল।
ছাত্ররাজনীতি এখন অনেকের কাছে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। আমাদের রাজনীতিটা পেশিশক্তিনির্ভর। আর এই পেশির চৌকস জোগানদাতা ক্যাম্পাস। ক্যাম্পাসের দিকে তাই অনেকের শকুনের চোখ। ১৯৮৮-তে ছাত্রশিবির কর্মী খুনের ওই মামলায় অভিযোগ গঠিত হয়েছিল। সেই মামলা থেকে নির্বাচিত কতিপয় নাম তুলল সরকার। তৈরি করল নতুন দৃষ্টান্ত। সেই সঙ্গে একটি বার্তা পৌঁছাল। সেই বার্তার ভাষা বোধগম্য।
ছাত্রলীগ কর্মীর খুনের বিচার এখন কী কারণে হয় না? যে কারণে ছাত্রশিবির কর্মীর হত্যার বিচার হয় না। অন্যান্য ক্যাম্পাস-নাশকতার বিচার হয় না। জাহাঙ্গীরনগরের সেই অস্ত্রধারী মাস্তান ফুরফুরে মেজাজে থাকে। বুঝতে হবে, এসব কারণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এর কারণ কালোত্তীর্ণ। ছাত্রলীগের হাতে ছাত্রলীগ কিংবা প্রতিপক্ষের হাতে প্রতিপক্ষ হত্যা ও তার বিচার না হওয়া একই সূত্রে গাঁথা।
দণ্ডবিধির ১৫৩খ ধারার শিরোনাম বড় স্পষ্ট। বড় দল। বড় নেতা। বড় ওষুধ। এর শিরোনাম ‘রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণের জন্য ছাত্রগণকে প্ররোচিত করা’। এই ধারায় বলা আছে, ‘যে ব্যক্তি কথিত বা লিখিত শব্দাবলীর সাহায্যে বা সংকেতসমূহের বা দৃশ্যমান কল্পমূর্তিসমূহের সাহায্যে বা প্রকারান্তরে যে কোনো ছাত্র বা ছাত্রী শ্রেণী বা ছাত্রদের ব্যাপারে আগ্রহশীল বা তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে এমন কোন রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণের জন্য প্ররোচিত করে বা প্ররোচিত করার উদ্যোগ করে যা গণশৃংখলা নষ্ট বা খর্ব করে, অথবা যার গণশৃংখলা নষ্ট বা খর্ব করার সম্ভাবনা রয়েছে—সে ব্যক্তি কারাদণ্ডে, যার মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে বা জরিমানা দণ্ডে বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।’
আমাদের নেতারা ছাত্রদের ব্যবহার করছেন। প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেছেন, ‘কোনো ধরনের টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না। টেন্ডারবাজ ও চাঁদাবাজদের দলে রাখা হবে না।’ কিন্তু ছাত্রদের তাঁরা দলে রাখার কথা বলেন প্রকাশ্যেই। অথচ আইনবলে ছাত্রদের তাঁরা দলে টানতে পারেন না। ছাত্রদের দলীয় কাজে ব্যবহার বেআইনি।
ছাত্র অপরাধীদের বিচার না করাও বেআইনি। যে ছাত্রটি প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় টেন্ডারবাজ, সে কিন্তু শিক্ষক-সহপাঠীর সঙ্গে মেশে। শ্রেণীকক্ষে বসে। সহজে কল্পনা করা চলে, শ্রেণীকক্ষে টেন্ডারবাজের উদ্ধত উপস্থিতি। সবার জন্য অস্বস্তিকর। টেন্ডারবাজের ছাতি ফোলা থাকে। চলাফেরায় থাকে উগ্রতা। টেন্ডারবাজ পড়াশোনার পরিবেশ দূষিত করে। তার স্পর্ধায় শিক্ষক মর্মযাতনায় ভোগেন। আত্মসম্মানের ভয়ে প্রায়ই তা চেপে যান।
প্রধানমন্ত্রী-বর্ণিত টেন্ডারবাজের পুঁজি কী? পেশি। ফোলায় কে? নেতা। কীভাবে? ফুঁ দিয়ে। এর প্রমাণ থাকে না। টেন্ডারবাজি ৫০৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য। টেন্ডারবাজ সামলানো পুলিশের রুটিন কাজ। তারা রুটিন মামলা করতে পারে। পুলিশ সেই কাজ করতে অক্ষম। কেন অক্ষম? বিষয়টি মোটেই লুকোছাপার ব্যাপার নয়। সোজা উত্তর, পুলিশ ওপরের হুকুম পায়। গায়েবি হুকুম। প্রকাশ্য হুকুমও আছে। তাই বলি, পুলিশকে কাজ করতে দিন।
সম্পাদকেরা বাসি খবর ছাপেন না। সম্পাদক মতিউর রহমান তা ছাপেন। একই শিরোনাম দুবার ছাপালেন, ‘ছাত্রলীগকে সামলান’। হলফ করে বলতে পারি, তিনি এমন সুযোগ আরও পাবেন। এ দেশে সব খবর বাসি হয় না। সব সময় তরতাজা থাকে। এটা তেমন এক জাতের খবর।
আমি বলব, ছাত্রলীগকে সামলাতে হবে না। নির্বাহী ক্ষমতার মালিক প্রধানমন্ত্রী। সংবিধানের সেই বলদর্পী প্রধানমন্ত্রীকে সামলান। ছাত্রলীগ সামলে যাবে। আরও অনেক কিছু সামলানো হবে। সেটা তো অসম্ভব, তাই তো? বেশ কথা। তাহলে অন্তত পুলিশের কাজ পুলিশকে করতে দিন।
পুলিশকে ‘কঠোর নির্দেশ’ প্রদান বন্ধ করুন। পুলিশকে ‘কড়া হুঁশিয়ারি’ দেবেন না। এটা একটা ঠাট্টা। সস্তা, কিন্তু নিষ্ঠুর। এমন কাজ ছাত্রলীগ নেতারাও করেন। তাঁরা বলেন, ‘সন্ত্রাসী যে-ই হোক তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ তার মানে বোঝাই যাচ্ছে ছাড়পত্রটা কোথায়? ছাত্র নষ্ট হতে পারে। আপেলে পোকা থাকবেই। তাই নষ্ট পুলিশও মিলবে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে আইন। এবং সেটা পুলিশেরই কাজ। এটা কারও হুকুমের অপেক্ষায় থাকার নয়। নষ্ট ছাত্র তার দুষ্কর্মের জন্য আইনের কোপানলে পড়বে। অন্যরা তা দেখবে। নিজেদের শোধরাবে। সেই স্বাভাবিক নিয়মরীতি একদম অনুপস্থিত। তাই ক্যাম্পাসে সহিংসতার শেকড় গেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা কমিটি ঠুঁটো জগন্নাথ। দলের লেজুড়বৃত্তি আর ভিসিগিরি-প্রভোস্টগিরি কখনো সমার্থক। একটি গোষ্ঠী মওকার অপেক্ষায় থাকে। তারা স্বায়ত্তশাসন গেল গেল বলে চিল্লায়। কিন্তু ক্যাম্পাসে লাশ পড়লেও তারা শাসন করে না। শাসন কী জিনিস, বুঝতেই চায় না। তাই প্রশ্ন হলো, কুঁজো তো কুঁজোই। তার আবার চিত হওয়া না-হওয়া নিয়ে চিন্তা কেন। কিন্তু আমরা বাস্তবে তা-ই দেখি। কুঁজোর চিত হওয়ার শখ দেখি। তারা বিচার চায় না। কিন্তু হঠাৎ সহিংসতার বিনাশ চায়। সরকারি দলের শাসন চেয়ে গলা ফাটায়। ক্যাম্পাসে আকসার মরামরি হয়। খুনখারাবি হয়। উদ্যত পিস্তল কিংবা কিরিচ হাতে ছাত্রের ছবি তো কম ছাপা হলো না। কিন্তু পুলিশ তাদের ধরতে পারে না। পুলিশের এসব দেখে নিশ্চয় কান্না পায়। কিন্তু সেই কান্না কেউ শোনে না। ভিসিরা দম দেওয়া পুতুলের মতো আচরণ করেন। কখনো ইস্তফা দেন না। তাঁদের অনুমতি ছাড়া পুলিশ হলে ঢুকতে পারে না। ঢুকলে তাদের অপমান হয়। স্বায়ত্তশাসন বিস্বাদ ঠেকে।
ছাত্রনেতা ছাত্র-অপরাধী হলেই দায়মুক্তি। এটাই ক্যাম্পাস-সংস্কৃতি। ১৫৩খ ধারার বাক্য গঠন পরিষ্কার। নেতাদের লক্ষ্যে পরিচালিত। নেতারাই কোমলমতি ছাত্রদের ‘রাজনৈতিক কার্যকলাপে’ লিপ্ত হতে প্ররোচনা দেন।
তবে তর্কের খাতিরে বলি, দণ্ডবিধিতে আরও অনেক ধারা আছে, যার আওতায় ক্যাম্পাসও পড়ে। এই যুক্তিটা দিই এক বিশেষ কারণে। সমাজে একদল লোক আছে। যারা বিরাজনৈতিকীকরণের তত্ত্ব নিয়ে হাজির হবে। তারা প্রায় অন্ধ। তারা কোনটা রাজনীতি আর কোনটা দুর্বৃত্তায়ন তা আলাদা করতে পারে না। তারা তারস্বরে চিৎকার করবে। তর্ক তুলবে ছাত্ররাজনীতি ভালো না মন্দ। এ আরেক জ্বালা। এ ধরনের অনভিপ্রেত বিতর্ক বন্ধ করা কঠিন। এর জন্য বিকল্প দাওয়াই। মাফ চাই, ভাই। তওবা নাক খপ্তা। ১৫৩খ-এর তলায় আর যদি যাই। তবে এও বলি, যে আইন মানা যাবে না, সেই আইন রাখা কেন? আইন রেখে আইন ভাঙা ভারি মজার বলেই?
তাহলে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী সম্পর্ক যেমন আছে তেমনই থাকুক! অঙ্গসংগঠনও যা, সহযোগী সংগঠনও তা। কূটতর্ক বৃথা। পানিতে পানি থাক। দণ্ডবিধিতে আরও ধারা আছে। এসব বিধান ব্রিটিশদের করা। ক্যাম্পাসে ছাত্র খুন হলে, কেউ মাস্তানি করে বেড়ালে দায়মুক্তির কোনো বিধান আইনে নেই। যে যাকে যে কারণে মারুক-ধরুক, আইনে শাস্তির বিধান আছে। ক্যাম্পাসে গন্ডা চারেক অপরাধ ঘটছে হামেশা। মারামারি, দখল, টেন্ডারবাজি ও খুন। বহিরাগত মাস্তানদের সঙ্গে তাদের অনেকের আঁতাত আছে। অবৈধ অস্ত্রের জোগান আছে।
কেউ ভয় দেখালে দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারা প্রযোজ্য। ক্যাম্পাসে এই ভয় দেখানোটা সবচেয়ে মামুলি ব্যাপার। এটা প্রায় অধিকার বলে গণ্য হচ্ছে। এই শৃঙ্খল ভাঙতে হবে। ফৌজদারি অপরাধ করলে সতর্ক করার বিধান আইনে নেই। আবার তারা কী মর্যাদাবান! কী ভাগ্য তাদের! পাতিমন্ত্রীরা সতর্ক করেন না। অত মুরোদ তাঁদের নেই। ছোট মুখে বড় কথা তাঁদের সাজে না। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদকের নিচে কেউ তাদের সতর্ক করতে পারে না। ক্যাম্পাসে কুশীলবদের উঁচু মর্যাদা।
যুগান্তর ও সমকাল অভিন্ন শিরোনাম করেছিল সম্প্রতি। ‘ছাত্রলীগের কারণে সব অর্জন বিসর্জন দেওয়া যাবে না’। যুগান্তর-এর বিবরণ থেকে দেখা যায়, শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সব অর্জন ছাত্রলীগের কারণে বিসর্জন দেয়া যাবে না। আদু ভাই দিয়ে ছাত্রলীগ চলবে না। ছাত্ররাই ছাত্রলীগের রাজনীতি করবে। ছাত্রলীগ থেকে আংকেলদের সরে যেতে হবে। ছাত্রলীগ নিয়ে প্রতিদিনের পত্রপত্রিকায় যেসব সংবাদ দেখি, আর এ রকম সংবাদ দেখতে চাই না। দল ভারী করার জন্য দলে সন্ত্রাসী ঢোকানো যাবে না। সুবিধাভোগীদের চিনতে হবে।’
পক্ষকালের ব্যবধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরে সিলেটে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ ছাত্রলীগকে সতর্ক করে দেন। এই সতর্কীকরণ মোটামুটি একটা রুটিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু দলে ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়া সন্ত্রাসীদের রোখা যাবে কীভাবে?
ক্যাম্পাসে গত সোয়া বছরে প্রায় ৫০টি সংঘর্ষ হয়েছে। শান্ত আবহাওয়ায় এত বড় দুর্যোগ বিরল। এর কারণ ও প্রতিকার নির্ধারণে একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন করা হোক। এর প্রতিবেদন যথাসময়ে প্রকাশ করতে হবে। একই সময়ে ক্যাম্পাসে একাধিক হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ড ও সন্ত্রাসের বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হোক। সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচার মিলবে। এই আইনের মেয়াদ সম্প্রতি দুই বছর বাড়ল। এই বিচারটা করলে মেয়াদ বৃদ্ধির একটা বড় তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যাবে। নিহত ছাত্রলীগ কর্মীর বাবা-মায়েরা সান্ত্বনা পাবেন। সরকারের ভাবমূর্তি খুবই উজ্জ্বল হবে! ছাত্ররা টের পাবে, দিন বদলাচ্ছে! আমরা সাম্প্রতিক খুনখারাবির বিচার পেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৭ বছরে ৭৪টি খুনের মামলার বিচারেও হয়তো ঈষত্ আশাবাদী হতে পারব।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Thursday, April 1, 2010
আদালতের কৌটায় জামায়াতের প্রাণ by মিজানুর রহমান খান
সুপ্রিম কোর্টের দিকে তাকিয়ে আছে সংসদ ও সরকার। এত দিনে স্পষ্ট যে তারা সংবিধানের গণতন্ত্রায়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার কথা হয়তো তারা মুখেও আনত না। পঞ্চম সংশোধনীর রায় নিয়েও তাদের মুখে খই ফুটত না। এখন ফুটেছে, কারণ, ক্ষমতার রাজনীতির প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উপাদান আছে এতে। তাই তারা আদালতের ওপর ভর করেছে। উদ্দেশ্য জামায়াত শিকার। রাজনৈতিক ফায়দা লোটার এত বড় সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চায় না।
আইন ও বিচারমন্ত্রী শফিক আহমেদের বক্তব্য বেশ ধারালো। এটা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, জামায়াত ইতিমধ্যে কোমায় চলে গেছে। এখন তারা কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। কোমায় যাওয়া রোগীরাও অবশ্য আশার সলতে জ্বালিয়ে রাখেন। কিন্তু জামায়াতের সামনে যেন সেটুকুও নেই। পঞ্চম সংশোধনী আপিল বিভাগেও বাতিল হয়েছে। সেই ভরসায় আইনমন্ত্রী বলছেন, তারা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। শুধু আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষা।
আইনমন্ত্রীকে প্রশ্ন রাখি, কী করে এমন নিশ্চিন্তে এ কথা বলছেন। আপিল বিভাগ তো পরিমার্জন বা মডিফিকেশনের কথা বলেছেন। এখন যদি তাঁরা হাইকোর্টের রায়ের এ অংশটি উল্টে দেন? আইনমন্ত্রী যুক্তি দেন, সেটা কেমন করে হবে? পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের মূলনীতি তো এর ওপর দাঁড়িয়ে। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় প্রধানত দুটি ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। প্রথমত, সামরিক শাসন জারি অবৈধ। তাই সামরিক শাসকদের সৃষ্ট পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বদলাতে পারে না। উভয় যুক্তি আমরা মানি। কিন্তু হাইকোর্ট যোগ-বিয়োগের নীতি নিয়েছেন। কিছু বিষয় মার্জনা করেছেন। যেমন, জিয়াউর রহমানের সামরিক ফরমানের ফসল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এই কাউন্সিল ব্যবস্থাটি তো সামরিক শাসনবান্ধব। তা ছাড়া এটি বিচারপতিদের প্রকারান্তরে সরকারি কর্মচারী বানিয়ে রেখেছে। সচিবদের বিরুদ্ধে তদন্তে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন (স্যাংশন) লাগত ও লাগবে। বিচারকদের ক্ষেত্রেও লাগে।
হাইকোর্টের রায়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে ক্ষমতার পৃথক্করণ (সেপারেশন অব পাওয়ার) ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়নে নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
ধর্মনিরপেক্ষতার মতো অনেক শক্তিশালী ও দরকারি মৌলিক কাঠামো হলো ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে না লিখেও ধর্মনিরপেক্ষ বা মুক্ত সমাজ গঠন করা চলে। ভারত তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখানে একটি পরিহাসও আছে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে বিচারপতি সায়েম ধর্মভিত্তিক দল চালু করতে ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ তুলে দেন। তখনো সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা টিকে ছিল। সেই বছরেই ভারত ৪২তম সংশোধনী আনে। এর মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির সংযোজন ঘটে। সুতরাং, ২৯ বছর তারা ধর্মনিরপেক্ষ ‘না থেকেও’ ধর্মনিরপেক্ষ থেকেছে। বিজেপির জন্ম আরও চার বছর পর ১৯৮০ সালে। তারা প্রমাণ করেছে, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা থাকলেও ধর্মভিত্তিক দল সরকার গঠন করতে পারে।
সাধারণ আইন দিয়ে রাজনৈতিক দলের সংবিধান ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কিন্তু ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তা অবশ্যই সংবিধানে থাকতে হবে। প্রজাতন্ত্রের বিচারিক ক্ষমতা মার্কিন সংবিধানের মতো করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকার কথা লিখে দিতে হবে। অথচ সরকারি দল ও তাদের ভক্তরা সভা-সেমিনারে পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের কীর্তন গাইছেন। বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরার কথা বলে গলা ফাটাচ্ছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে তাঁদের মুখে যথারীতি কুলুপ আঁটা।
বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে সংবিধানের ১০টি মৌলিক কাঠামো চিহ্নিত করেছেন। এতে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার ঠাঁই দিয়েছেন সবশেষে। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে শাসকগোষ্ঠী হয়তো একটুও মাথা ঘামাত না, যদি হাইকোর্টের রায়ে একটি বিশেষ জাদুমন্ত্র না থাকত। এই জাদুমন্ত্রই হলো আকর্ষণ। এটা হলো ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ। এই শর্তাংশ হলো রাক্ষসের প্রাণসংহারী সেই কৌটা।
জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর প্রাণভোমরা লুকানো এই কৌটায়। হাইকোর্ট কৌটার সন্ধান দিয়েছেন। এখন আপিল বিভাগ সেই কৌটা খুলবেন কি না, সেটাই প্রশ্ন। তাঁরা তা খুলে প্রাণভোমরা মারতে পারেন। মারলে জামায়াত বর্তমান রূপে লুপ্ত হবে। অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনও অচল হবে। তারা তখন অন্য রূপে আসবে। জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জটিল পটভূমিতে সেই রূপটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য ভালো হবে কি না, সে প্রশ্ন খুব জোরালো।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মী নিহত হলে মন্ত্রীদের শূন্যগর্ভ চিত্কার ও আস্ফাালন আমরা শুনেছি। এ রকম ঘটনার সময় তাদের শিবির নিষিদ্ধের কথা মনে পড়ে। কিন্তু খুন তো খুন। যে যেভাবে সন্ত্রাস করুক, তার বিচার হতে হবে। কিন্তু তা প্রায় কখনো হয় না। এখন আদালতকে দিয়ে কৌটা খুলিয়ে জামায়াতের সঙ্গে শিবির বধ করার স্বপ্ন দেখছে ক্ষমতাসীন দল। অথচ তারা ঠিকই ছাত্রদের ব্যবহার করে যাবে। ছাত্রলীগকে তারা সামলাবে না। অঙ্গসংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করবে না।
জামায়াতের সঙ্গে রাজপথের ঐক্য গড়ে তোলা, কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করা এবং জিয়া বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক নামকরণেও ধর্মের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ব্যবহারে আমরা ক্ষমতাসীনদের ম্যাকিয়াভেলীয় চরিত্র দেখতে পাই। মূল সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ বলেছে, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোনো সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সংঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোনো প্রকারে তাহার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকিবে না।’ সম্ভবত সে কারণেই আইনমন্ত্রী আমার প্রশ্নের জবাবে মত দেন যে এ বিধানটি জেগে উঠলেই হলো। ধর্মভিত্তিক সংগঠন নিষিদ্ধ করতে সরকারকে নতুন কোনো আইন করতে হবে না। তবে প্রশ্ন হলো, বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্র, যারা রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র অর্জন করেছে, তাদের সংবিধানে এমন বিধান কি রয়েছে? বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ রকম খাপ খোলা তলোয়ার দিয়ে কি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির রাক্ষসপুরীকে স্তব্ধ করা সম্ভব? একটা গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা দিতে যদি শাসক দল সম্ভাবনাময় হয়ে উঠত, বা তাকে বিশ্বাস করা যেত, তখন না হয় একটা সান্ত্বনা মিলত।
সরকারি দলের সংকীর্ণ মনমানসিকতার আরেকটি পরিচয় হলো, তারা সংবিধান সংশোধনে ভালো প্রস্তুতি নিতে অনিচ্ছুক। একটা প্রতারণাপূর্ণ প্রচারণাও দেখেছি। সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরিতে আইন কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইন কমিশনের সদস্যরা হয়তো কিছু দিন আশায় ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, বিরাট বড় একটা দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু কোথায় কী। এ সবই শঠতা। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা ছাড়া তাঁদের মাথায় অন্য চিন্তা নেই। থাকলেও তার প্রমাণ পাই না। কেউ যদি প্রশ্ন করেন, ক্ষমতা পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, না রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা—এর মধ্যে কোনটি আগে চান? আমি বলব, সবটাই একসঙ্গে। যদি বলা হয়, কোথায় অগ্রাধিকার? তাহলে বলব, ক্ষমতা পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতায়। জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বিরাট শূন্যতা চলছে। মাসদার হোসেন মামলার কারণে আমরা বিচার বিভাগ পৃথক্করণ শিখেছি। এখনো ক্ষমতার পৃথক্করণ শিখিনি। বিচারপতি খায়রুল হক বর্ণিত ১০টি মৌলিক কাঠামো কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেওয়ার বিষয়। আদালত যখন রাজনৈতিক প্রশ্নের সুরাহা দেন, তখন তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেন। তবে রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসায় আদালতকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। সুপ্রিম কোর্ট পারতপক্ষে রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে চলেন। ১৮৫৭ সালে বিখ্যাত ড্রেড স্কট মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট দাসপ্রথাকে বৈধতা দিয়েছিলেন। কোর্ট বলেছিলেন, দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করতে কংগ্রেসের আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। সেই টাইটানিক ভুলের অনুশোচনা তারা আজও করছেন।
আমরা পঞ্চম সংশোধনীর রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। কারণ, এতে যথার্থই জিয়া, সায়েম, মোশতাককে জবরদখলকারী বলা হয়েছে। সামরিক শাসনকে অবৈধ বলা হয়েছে। আমরা আশায় ছিলাম, সংবিধানে গণমুখী পরিবর্তন আনা হবে। বাহাত্তরে তো ফিরবই। ঘাটতিও দূর হবে। সোনিয়া গান্ধী সংসদে নারীর জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করছেন। রাজ্যসভায় বিল পাস হলো। বাংলাদেশে টুঁ শব্দ নেই। অথচ নারীর জন্য ১০০ আসন বাড়াতে স্পষ্ট নির্বাচনী ওয়াদা রয়েছে। এখন সন্দেহ হচ্ছে, আদালতের রায় বাস্তবায়ন ছাড়া তারা আদৌ আর কিছু করবে কি না।
সংবিধানে তারা হাত দিতে পারে। কিন্তু দেখার বিষয়, তাতে জনগণের ক্ষমতায়ন ঘটছে কি না। প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাস কিংবা নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগ কোনোভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে কি না। এটা আদালত করে দেবে না। সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ সংসদ যেকোনো সময় ফিরিয়ে আনতে পারে। এ জন্য গণভোটও লাগবে না। সাধারণ একটা আইন দিয়ে যা সম্ভব, তা আদালতকে দিয়ে কেন। আমার তো মনে হয়, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও ৮ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মৌলিক কাঠামো হিসেবে মান্য করা চলে। কিন্তু সেই কারণে ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ মৌলিক কাঠামো বলে গণ্য হতে পারে কি না, তা তলিয়ে দেখার দাবি রাখে।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখার চেয়ে সংবিধানে ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতিফলন ঘটানো অনেক বেশি উপকারী ও আরাধ্য। এটা পেলে রাষ্ট্র গঠনের কাজ অনেকটা এগিয়ে যাবে। রাজনীতিতে কেবল ধর্মের অপব্যবহার কেন, কালো টাকা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধেও তা খুব কাজে আসবে।
এর আগের একটি লেখায় আমি জিয়াকে তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক লিখেছিলাম। ই-মেইলে একজন পাঠক তার কারণ জানতে চান। প্রথমত, বাকশাল বিলোপ সায়েম করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, বহুদলীয় গণতন্ত্র বলতে পাশ্চাত্যের বহুত্ব (প্লুরালিজম) বোঝানো হয়। সেই বহুত্ব একটি সমন্বিত ধারণা। এতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাধীন সংসদ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকতে হবে। এসব না থাকলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পানসে। চতুর্থ সংশোধনীতে আসে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা। জিয়া একে সুরক্ষা দেন। তিনি তাতেই ক্ষান্ত থাকেননি। সংসদের অনুমতি ছাড়া যত খুশি অর্থ খরচে সংবিধানে নতুন বিধান আনেন। বিচারপতি খায়রুল হকের কথায় এভাবে তিনি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের জেমস ও চার্লসদের লজ্জায় ফেলেন। কারণ, সংসদকে পদানত করার এমন ক্ষমতা মধ্যযুগের ওই নৃপতিরাও ভোগ করেননি।
কিন্তু কথা হলো এখন কী চলছে? বহুদলীয় বা সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান। আসলে এটা ছদ্মবেশী রাজতন্ত্র বা ‘কতিপয়তন্ত্রে’র কাজে লাগছে। বর্তমানে বাকশাল নেই ঠিকই। কিন্তু বাকশালের মতো একটি ব্যবস্থায় আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। মাতৃস্নেহে অন্ধ জননী তাঁর কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখতে পারেন। বাংলাদেশের শাসকেরা হলেন সেই স্বৈর-স্নেহান্ধ জননী। পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির পর তাঁরা বলেছেন, এই নাও বহুদলীয় গণতন্ত্র। এরশাদের পতনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মোলাকাত হয়েছিল। তখন তারা বলেছে, এই নাও সংসদীয় গণতন্ত্র। দুটোই মস্তবড় ধাপ্পা ও শঠতাপূর্ণ।
জামায়াতের প্রসঙ্গ টেনে শেষ করি। আদালত যদি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর দোহাই দেন, সরকারি দলের আপাতত কৌশলগত পছন্দনীয় বিষয় জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করেন, কিংবা তা না করলেও তাঁরা যেন সংবিধানের অধিক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক কাঠামোবিনাশী বিষয়গুলোর দিকে সদয় হন। তাঁরা যেন শাসকগোষ্ঠীর ভীষণ পছন্দনীয় ব্যবস্থা, যেমন—অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণ ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিলোপ করে মূল সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলো ফিরিয়ে দেন। ডেনমার্কের রাজপুত্র ছাড়া হ্যামলেট মঞ্চায়ন সম্ভব নয়। চতুর্থ সংশোধনীতে মৌলিক কাঠামোর ধ্বংসযজ্ঞ পাশ কাটিয়ে বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরাও সম্ভব নয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
আইন ও বিচারমন্ত্রী শফিক আহমেদের বক্তব্য বেশ ধারালো। এটা বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায়, জামায়াত ইতিমধ্যে কোমায় চলে গেছে। এখন তারা কৃত্রিমভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। কোমায় যাওয়া রোগীরাও অবশ্য আশার সলতে জ্বালিয়ে রাখেন। কিন্তু জামায়াতের সামনে যেন সেটুকুও নেই। পঞ্চম সংশোধনী আপিল বিভাগেও বাতিল হয়েছে। সেই ভরসায় আইনমন্ত্রী বলছেন, তারা নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। শুধু আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অপেক্ষা।
আইনমন্ত্রীকে প্রশ্ন রাখি, কী করে এমন নিশ্চিন্তে এ কথা বলছেন। আপিল বিভাগ তো পরিমার্জন বা মডিফিকেশনের কথা বলেছেন। এখন যদি তাঁরা হাইকোর্টের রায়ের এ অংশটি উল্টে দেন? আইনমন্ত্রী যুক্তি দেন, সেটা কেমন করে হবে? পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের মূলনীতি তো এর ওপর দাঁড়িয়ে। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায় প্রধানত দুটি ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। প্রথমত, সামরিক শাসন জারি অবৈধ। তাই সামরিক শাসকদের সৃষ্ট পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদও সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বদলাতে পারে না। উভয় যুক্তি আমরা মানি। কিন্তু হাইকোর্ট যোগ-বিয়োগের নীতি নিয়েছেন। কিছু বিষয় মার্জনা করেছেন। যেমন, জিয়াউর রহমানের সামরিক ফরমানের ফসল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে টিকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু এই কাউন্সিল ব্যবস্থাটি তো সামরিক শাসনবান্ধব। তা ছাড়া এটি বিচারপতিদের প্রকারান্তরে সরকারি কর্মচারী বানিয়ে রেখেছে। সচিবদের বিরুদ্ধে তদন্তে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন (স্যাংশন) লাগত ও লাগবে। বিচারকদের ক্ষেত্রেও লাগে।
হাইকোর্টের রায়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে ক্ষমতার পৃথক্করণ (সেপারেশন অব পাওয়ার) ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়নে নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
ধর্মনিরপেক্ষতার মতো অনেক শক্তিশালী ও দরকারি মৌলিক কাঠামো হলো ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে না লিখেও ধর্মনিরপেক্ষ বা মুক্ত সমাজ গঠন করা চলে। ভারত তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখানে একটি পরিহাসও আছে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে বিচারপতি সায়েম ধর্মভিত্তিক দল চালু করতে ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ তুলে দেন। তখনো সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা টিকে ছিল। সেই বছরেই ভারত ৪২তম সংশোধনী আনে। এর মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটির সংযোজন ঘটে। সুতরাং, ২৯ বছর তারা ধর্মনিরপেক্ষ ‘না থেকেও’ ধর্মনিরপেক্ষ থেকেছে। বিজেপির জন্ম আরও চার বছর পর ১৯৮০ সালে। তারা প্রমাণ করেছে, সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা থাকলেও ধর্মভিত্তিক দল সরকার গঠন করতে পারে।
সাধারণ আইন দিয়ে রাজনৈতিক দলের সংবিধান ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণযোগ্য। কিন্তু ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্র গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং তা অবশ্যই সংবিধানে থাকতে হবে। প্রজাতন্ত্রের বিচারিক ক্ষমতা মার্কিন সংবিধানের মতো করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকার কথা লিখে দিতে হবে। অথচ সরকারি দল ও তাদের ভক্তরা সভা-সেমিনারে পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের কীর্তন গাইছেন। বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরার কথা বলে গলা ফাটাচ্ছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে তাঁদের মুখে যথারীতি কুলুপ আঁটা।
বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে সংবিধানের ১০টি মৌলিক কাঠামো চিহ্নিত করেছেন। এতে তিনি ধর্মনিরপেক্ষতার ঠাঁই দিয়েছেন সবশেষে। ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে শাসকগোষ্ঠী হয়তো একটুও মাথা ঘামাত না, যদি হাইকোর্টের রায়ে একটি বিশেষ জাদুমন্ত্র না থাকত। এই জাদুমন্ত্রই হলো আকর্ষণ। এটা হলো ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ। এই শর্তাংশ হলো রাক্ষসের প্রাণসংহারী সেই কৌটা।
জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর প্রাণভোমরা লুকানো এই কৌটায়। হাইকোর্ট কৌটার সন্ধান দিয়েছেন। এখন আপিল বিভাগ সেই কৌটা খুলবেন কি না, সেটাই প্রশ্ন। তাঁরা তা খুলে প্রাণভোমরা মারতে পারেন। মারলে জামায়াত বর্তমান রূপে লুপ্ত হবে। অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনও অচল হবে। তারা তখন অন্য রূপে আসবে। জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জটিল পটভূমিতে সেই রূপটি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য ভালো হবে কি না, সে প্রশ্ন খুব জোরালো।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের কর্মী নিহত হলে মন্ত্রীদের শূন্যগর্ভ চিত্কার ও আস্ফাালন আমরা শুনেছি। এ রকম ঘটনার সময় তাদের শিবির নিষিদ্ধের কথা মনে পড়ে। কিন্তু খুন তো খুন। যে যেভাবে সন্ত্রাস করুক, তার বিচার হতে হবে। কিন্তু তা প্রায় কখনো হয় না। এখন আদালতকে দিয়ে কৌটা খুলিয়ে জামায়াতের সঙ্গে শিবির বধ করার স্বপ্ন দেখছে ক্ষমতাসীন দল। অথচ তারা ঠিকই ছাত্রদের ব্যবহার করে যাবে। ছাত্রলীগকে তারা সামলাবে না। অঙ্গসংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করবে না।
জামায়াতের সঙ্গে রাজপথের ঐক্য গড়ে তোলা, কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গে গোপনে চুক্তি করা এবং জিয়া বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক নামকরণেও ধর্মের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ব্যবহারে আমরা ক্ষমতাসীনদের ম্যাকিয়াভেলীয় চরিত্র দেখতে পাই। মূল সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ বলেছে, ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী কোনো সাম্প্রদায়িক সমিতি বা সংঘ কিংবা অনুরূপ উদ্দেশ্যসম্পন্ন বা লক্ষ্যানুসারী ধর্মীয় নামযুক্ত বা ধর্মভিত্তিক অন্য কোনো সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার বা তাহার সদস্য হইবার বা অন্য কোনো প্রকারে তাহার তৎপরতায় অংশগ্রহণ করিবার অধিকার কোনো ব্যক্তির থাকিবে না।’ সম্ভবত সে কারণেই আইনমন্ত্রী আমার প্রশ্নের জবাবে মত দেন যে এ বিধানটি জেগে উঠলেই হলো। ধর্মভিত্তিক সংগঠন নিষিদ্ধ করতে সরকারকে নতুন কোনো আইন করতে হবে না। তবে প্রশ্ন হলো, বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্র, যারা রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র অর্জন করেছে, তাদের সংবিধানে এমন বিধান কি রয়েছে? বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এ রকম খাপ খোলা তলোয়ার দিয়ে কি ধর্মভিত্তিক রাজনীতির রাক্ষসপুরীকে স্তব্ধ করা সম্ভব? একটা গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা দিতে যদি শাসক দল সম্ভাবনাময় হয়ে উঠত, বা তাকে বিশ্বাস করা যেত, তখন না হয় একটা সান্ত্বনা মিলত।
সরকারি দলের সংকীর্ণ মনমানসিকতার আরেকটি পরিচয় হলো, তারা সংবিধান সংশোধনে ভালো প্রস্তুতি নিতে অনিচ্ছুক। একটা প্রতারণাপূর্ণ প্রচারণাও দেখেছি। সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ তৈরিতে আইন কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইন কমিশনের সদস্যরা হয়তো কিছু দিন আশায় ছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, বিরাট বড় একটা দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু কোথায় কী। এ সবই শঠতা। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা ছাড়া তাঁদের মাথায় অন্য চিন্তা নেই। থাকলেও তার প্রমাণ পাই না। কেউ যদি প্রশ্ন করেন, ক্ষমতা পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, না রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা—এর মধ্যে কোনটি আগে চান? আমি বলব, সবটাই একসঙ্গে। যদি বলা হয়, কোথায় অগ্রাধিকার? তাহলে বলব, ক্ষমতা পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতায়। জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বিরাট শূন্যতা চলছে। মাসদার হোসেন মামলার কারণে আমরা বিচার বিভাগ পৃথক্করণ শিখেছি। এখনো ক্ষমতার পৃথক্করণ শিখিনি। বিচারপতি খায়রুল হক বর্ণিত ১০টি মৌলিক কাঠামো কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেওয়ার বিষয়। আদালত যখন রাজনৈতিক প্রশ্নের সুরাহা দেন, তখন তাঁরা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেন। তবে রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসায় আদালতকে বাড়তি সতর্ক থাকতে হয়। সুপ্রিম কোর্ট পারতপক্ষে রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে চলেন। ১৮৫৭ সালে বিখ্যাত ড্রেড স্কট মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট দাসপ্রথাকে বৈধতা দিয়েছিলেন। কোর্ট বলেছিলেন, দাসপ্রথা নিষিদ্ধ করতে কংগ্রেসের আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। সেই টাইটানিক ভুলের অনুশোচনা তারা আজও করছেন।
আমরা পঞ্চম সংশোধনীর রায়কে স্বাগত জানিয়েছি। কারণ, এতে যথার্থই জিয়া, সায়েম, মোশতাককে জবরদখলকারী বলা হয়েছে। সামরিক শাসনকে অবৈধ বলা হয়েছে। আমরা আশায় ছিলাম, সংবিধানে গণমুখী পরিবর্তন আনা হবে। বাহাত্তরে তো ফিরবই। ঘাটতিও দূর হবে। সোনিয়া গান্ধী সংসদে নারীর জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করছেন। রাজ্যসভায় বিল পাস হলো। বাংলাদেশে টুঁ শব্দ নেই। অথচ নারীর জন্য ১০০ আসন বাড়াতে স্পষ্ট নির্বাচনী ওয়াদা রয়েছে। এখন সন্দেহ হচ্ছে, আদালতের রায় বাস্তবায়ন ছাড়া তারা আদৌ আর কিছু করবে কি না।
সংবিধানে তারা হাত দিতে পারে। কিন্তু দেখার বিষয়, তাতে জনগণের ক্ষমতায়ন ঘটছে কি না। প্রধানমন্ত্রীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাস কিংবা নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগ কোনোভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হচ্ছে কি না। এটা আদালত করে দেবে না। সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ সংসদ যেকোনো সময় ফিরিয়ে আনতে পারে। এ জন্য গণভোটও লাগবে না। সাধারণ একটা আইন দিয়ে যা সম্ভব, তা আদালতকে দিয়ে কেন। আমার তো মনে হয়, সংবিধানের প্রস্তাবনা ও ৮ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতাকে মৌলিক কাঠামো হিসেবে মান্য করা চলে। কিন্তু সেই কারণে ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাংশ মৌলিক কাঠামো বলে গণ্য হতে পারে কি না, তা তলিয়ে দেখার দাবি রাখে।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখার চেয়ে সংবিধানে ক্ষমতার পৃথক্করণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতিফলন ঘটানো অনেক বেশি উপকারী ও আরাধ্য। এটা পেলে রাষ্ট্র গঠনের কাজ অনেকটা এগিয়ে যাবে। রাজনীতিতে কেবল ধর্মের অপব্যবহার কেন, কালো টাকা ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধেও তা খুব কাজে আসবে।
এর আগের একটি লেখায় আমি জিয়াকে তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক লিখেছিলাম। ই-মেইলে একজন পাঠক তার কারণ জানতে চান। প্রথমত, বাকশাল বিলোপ সায়েম করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, বহুদলীয় গণতন্ত্র বলতে পাশ্চাত্যের বহুত্ব (প্লুরালিজম) বোঝানো হয়। সেই বহুত্ব একটি সমন্বিত ধারণা। এতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাধীন সংসদ ও স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকতে হবে। এসব না থাকলে বহুদলীয় গণতন্ত্র পানসে। চতুর্থ সংশোধনীতে আসে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা। জিয়া একে সুরক্ষা দেন। তিনি তাতেই ক্ষান্ত থাকেননি। সংসদের অনুমতি ছাড়া যত খুশি অর্থ খরচে সংবিধানে নতুন বিধান আনেন। বিচারপতি খায়রুল হকের কথায় এভাবে তিনি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের জেমস ও চার্লসদের লজ্জায় ফেলেন। কারণ, সংসদকে পদানত করার এমন ক্ষমতা মধ্যযুগের ওই নৃপতিরাও ভোগ করেননি।
কিন্তু কথা হলো এখন কী চলছে? বহুদলীয় বা সংসদীয় গণতন্ত্র বিদ্যমান। আসলে এটা ছদ্মবেশী রাজতন্ত্র বা ‘কতিপয়তন্ত্রে’র কাজে লাগছে। বর্তমানে বাকশাল নেই ঠিকই। কিন্তু বাকশালের মতো একটি ব্যবস্থায় আমরা ঘুরপাক খাচ্ছি। মাতৃস্নেহে অন্ধ জননী তাঁর কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখতে পারেন। বাংলাদেশের শাসকেরা হলেন সেই স্বৈর-স্নেহান্ধ জননী। পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির পর তাঁরা বলেছেন, এই নাও বহুদলীয় গণতন্ত্র। এরশাদের পতনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মোলাকাত হয়েছিল। তখন তারা বলেছে, এই নাও সংসদীয় গণতন্ত্র। দুটোই মস্তবড় ধাপ্পা ও শঠতাপূর্ণ।
জামায়াতের প্রসঙ্গ টেনে শেষ করি। আদালত যদি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর দোহাই দেন, সরকারি দলের আপাতত কৌশলগত পছন্দনীয় বিষয় জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করেন, কিংবা তা না করলেও তাঁরা যেন সংবিধানের অধিক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক কাঠামোবিনাশী বিষয়গুলোর দিকে সদয় হন। তাঁরা যেন শাসকগোষ্ঠীর ভীষণ পছন্দনীয় ব্যবস্থা, যেমন—অধস্তন আদালত নিয়ন্ত্রণ ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বিলোপ করে মূল সংবিধানের অনুচ্ছেদগুলো ফিরিয়ে দেন। ডেনমার্কের রাজপুত্র ছাড়া হ্যামলেট মঞ্চায়ন সম্ভব নয়। চতুর্থ সংশোধনীতে মৌলিক কাঠামোর ধ্বংসযজ্ঞ পাশ কাটিয়ে বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরাও সম্ভব নয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Wednesday, February 17, 2010
অযোগ্য ‘আওয়ামীদের’ নিয়োগ নয় by মিজানুর রহমান খা
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাহাত্তরের সংবিধান সম্পর্কে কতিপয় ক্ষেত্রে ভিন্নমত দিয়েছিলেন। এই ভিন্নমত-সংবলিত চূড়ান্ত খসড়া ১২ অক্টোবর ১৯৭২ গেজেটে ছাপা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টে নতুন বিচারক নিয়োগের চলতি তোড়জোড় সামনে রেখে আমি আজ তাঁর সেই ভিন্নমত থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত লিখেছিলেন, ‘মি. চেয়ারম্যান স্যার, সংবিধানের ৯৫(২) অনুচ্ছেদের ক দফায় বর্ণিত বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা সম্পর্কে যে বিধান রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে আপত্তি জানাচ্ছি।’ ওই অনুচ্ছেদ বলেছে, বিচারক হতে হলে দুটো শর্তের একটি পূরণ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে, না হয় কোনো বিচার বিভাগীয় পদে অন্যূন ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। শ্রী সেনগুপ্তের যুক্তি ছিল, ‘কেউ ১০ বছর বা তার বেশি সময় ওকালতি করলেই তিনি বিচারক হতে পারেন না। কারণ সে ধরনের নিয়োগে রাজনৈতিক নিয়োগের সম্ভাবনা থাকবে। আর এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মৌলিকত্ব নিশ্চিতভাবেই লুপ্ত হবে।’ আমরা আজ বেদনার সঙ্গে লক্ষ করি যে শ্রী সেনগুপ্তর আশঙ্কা কী নিষ্ঠুরভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে। বড় অবাক হয়ে ভাবি, তিনি কী করে এ রকম একটি বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হলো?
শ্রী সেনগুপ্ত কষ্ট চেপে স্বস্তি অনুভব করতে পারেন এটা লক্ষ করে যে, সেই সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান কামাল হোসেন ইতিমধ্যেই আক্ষেপ করেছেন যে সুপ্রিম কোর্টে একটি সুনামি আসা উচিত। আরেক বরেণ্য আইনবিদ মাহমুদুল ইসলাম ২০০৬ সালে লিখলেন, ‘কেবল অল্পসংখ্যক বিচারকই দক্ষ। এবং তাঁদের মধ্যে অতি কমসংখ্যক বিচারকই তাঁদের দক্ষতার জন্য গর্ব করতে পারেন। বিচারকদের নৈতিকতা ও সততা প্রশ্নবিদ্ধ।’ এই প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগে আমরা জরুরি অবস্থায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন পেলাম। এরপর আমরা সেই কমিশনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিলাম। অতঃপর হাইকোর্টের রায় এল। বিএনপি আমলে আওয়ামী হিসেবে বাদ পড়া ১০ বিচারকের পুনর্বহাল আমরা দেখলাম। হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চকে বিচারক নিয়োগে গ্রহণযোগ্য নীতিমালা দিতে দেখলাম। আপিল বিভাগ তা অনেকটাই বিসর্জন দিলেন। তাঁরা যেন কার্যত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে নিছক পরামর্শের বিধানটা টেকালেন। আপিল বিভাগের পরিমার্জিত নীতিমালার ৯ নম্বর দফাটি নির্দিষ্টভাবে বলেছে, ‘প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ কিংবা সংবিধানে বর্ণিত যোগ্যতার শর্ত পূরণের ঘাটতির প্রশ্ন ছাড়া অন্য কোনো কারণেই বিচারক নিয়োগের বৈধতা বিচার্য নয়।’ এমনকি ‘পক্ষপাত ও অসদুদ্দেশ্যে’ নিয়োগের যুক্তিতেও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। হাইকোর্টের রায়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশটাও বাদ পড়ল। সেটি ছিল, নতুন বিচারক নিয়োগে প্রথম বাছাই তালিকাটা জন্ম নেবে মাতৃজঠরেই অর্থাৎ সুপ্রিমকোর্টেই।
ডেইলি স্টার-এ খবর এসেছে, ১৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে এ সপ্তাহেই। অথচ কীভাবে আগেই তালিকা তৈরি হলো, তার স্পন্দন টের পেলাম না। বিএনপির মাথাব্যথা না থাকাই স্বাভাবিক। কারণ তারা চাইবেই আওয়ামী লীগ যেন তাদের টেক্কা দিতে পারে!
প্রধান বিচারপতি সম্পদের বিবরণী প্রকাশে অভিপ্রেত মত দিয়েছেন। প্রথম আলোতে এ ব্যাপারে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। সম্পাদকীয়তে আশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে ‘আমরা প্রধান বিচারপতির দিকে তাকিয়ে’। আইনবিদ শাহদীন মালিক এর প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোতে লিখলেন, যতক্ষণ খুশি তাকিয়ে থাকুন। খোঁচাটা হজম করতে না হলে আমরা সবাই খুব খুশি হব।
কিছুদিন আগে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এক সভায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিচারপতি চৌধুরীকে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ অপসারণ করেছিলেন। তাতে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। পারভেজীয় সামরিক জমানার অবসানে বিচারপতি চৌধুরীর অবদান বিরাট। তিনি প্রধান বিচারপতি পদে পুনর্বহাল হন। বিশ্বের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে গত রোববার পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি-রাষ্ট্রপতির মধ্যকার টানোপোড়েনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাসিত জীবনে বেনজির ও নওয়াজ শরিফ গণতন্ত্রের সনদ তৈরি করেছিলেন। তাতে তাঁরা বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গণশুনানি করে বিচারক নিয়োগের বিধানের কথা বলেছিলেন। এখন তা পিপিপি ও মুসলিম লীগ ভুলে গেছে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ না করেই দুটি নিয়োগ দেন আসিফ জারদারি। লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি খাজা মোহাম্মদ শরিফকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক এবং বিচারপতি সাকিব নেসারকে লাহোর হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি করা হয়। গত শনিবার তাঁদের নিয়োগ হয়। তাঁরা শপথ নিতে যাচ্ছিলেন। প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন। তাঁরা ‘অসাংবিধানিক’ বলে দুটি নিয়োগ স্থগিত রেখেছেন। জারদারি যে কাণ্ড করলেন, তা রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯৪ সালে করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ‘মি. নোবডি’ বলাতে ঝড় উঠেছিল। নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার উদারতায় অল্পের ওপর দিয়ে ধকল যায়। এবার পাকিস্তানের ঘটনা দেখার মতো। বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরী শুধু ‘নো বডি’ বলার লোক নন। তিনি বিচারপতিদের নিয়োগ স্থগিত করে দুনিয়ার সব সাহসী প্রধান বিচারপতির জন্য অনুকরণীয় নজির তৈরি করলেন। পাকিস্তানের অন্তত ৬৬টি বার অ্যাসোসিয়েশন সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতির ওই নিয়োগকে অবৈধ বলে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাস করেছে।
আমরা আমাদের আপিল বিভাগের কাছ থেকে বিচারক নিয়োগে একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিচারক নিয়োগ নীতিমালা পেয়েছি। এই নীতিমালায় সরকারের সঙ্গে ভীষণ রকম আপস করা হয়েছে। সুতরাং নতুন করে এখন ১৫ জন হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের কথা জেনে আমরা উত্কণ্ঠিত। এরপর আরও নেওয়া হবে। শোনা যাচ্ছে, সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট বার একাট্টা হয়েছে, তারা আর ভুলেও বিএনপি আমলের বিতর্কিত বিচারকদের নিয়োগের বিরোধিতা করে নেওয়া রেজুলেশনের কথা মুখে আনবে না। তার চেয়ে বরং চাপে রেখে সংখ্যা দিয়ে তথাকথিত বিএনপিপন্থী বিচারপতিদের সংখ্যালঘু করবে।
আওয়ামী লীগের সমর্থক আইনজীবীরা আমাদের ইতিমধ্যে শিখিয়েছেন যে বিচারক নিয়োগ নিয়ে কী করে সংকীর্ণ রাজনীতি করতে হয়। জোট সরকারের আমলে উনিশজন বিচারক (যোগ্যতাসম্পন্নরাও এখানে আছেন) নিয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার নিদারুণ লম্ফঝম্ফ করেছিল। আইনের শাসনের জন্য মায়াকান্না করেছিল। তাঁরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার স্লোগান তুলেছিল। এখনো তারা জোট সরকারের নানা কাণ্ডকীর্তির সমালোচনায় মুখর, কিন্তু ওই একটি বিষয় বাদে। অতি যত্নের সঙ্গে তারা সেই রেজুলেশন প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে উনিশজন বিচারকের নিয়োগ নিয়ে তবু প্রতিবাদের একটা আওয়াজ উঠেছিল। এবার সে ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটলে প্রতিবাদ করারও কেউ থাকবে না। কারণ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির বর্তমান নেতারা একান্তভাবে আওয়ামী লীগের অনুগত। তাঁদের কাছ থেকে অতীতের মতো রেজুলেশন পাস করা তো দূরের কথা, বরং তাঁরা অন্ধের মতো সাধুবাদ জানানোর জন্য প্রস্তুত থাকবেন। সুতরাং একটি সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রেহাই পেতে চাইলে নাগরিক সমাজকে কালবিলম্ব না করে প্রস্তুতি নিতে হবে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বক্তব্য আমরা স্মরণ করি। পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনাটা সহায়ক হবে। বাহাত্তরে তিনি ভিন্নমতে লেখেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে যাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে, যাঁরা সব সময় ব্যক্তিস্বার্থচিন্তাতাড়িত এবং যাঁরা তোষামোদি কলা রপ্ত করেছেন, তাঁরাই বিচারক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। সে কারণে আমি মনে করি, অতীতের অভিজ্ঞতা হওয়া উচিত আমাদের সংবিধান প্রণয়নের পাথেয়। বিচার বিভাগের মর্যাদাকে খাটো করে, তাঁর স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে এমনভাবে বিচারক নিয়োগের সুযোগ থাকা উচিত নয়।’
হলফ করে বলতে পারি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শতভাগ অভ্রান্ত। কিন্তু আমরা কেবল আফসোস করব না। এখন সময় এসেছে বিচারক নিয়োগে সংসদে একটি উপযুক্ত আইন তৈরি করা। এই রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে আইনজীবীদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগের ওই দফাটি বিলোপ করতে সেনগুপ্ত সুপারিশ করেছিলেন। বলেছিলেন অধস্তন আদালতে কর্মরত বিচারকদের মধ্য থেকে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ দিতে। কী আশ্চর্য, এম হাফিজ উদ্দীন খান ঠিক এমন একটি সুপারিশ করেছেন সমপ্রতি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে তাঁর ভিন্নমতের জন্য অভিবাদন জানাই। তবে জেলা জজ থেকে শতভাগ বিচারক হয়তো বাস্তব নয়, কিন্তু জেলা জজদের অচ্ছুত্ ভেবে বর্তমানে যেভাবে নিয়োগ চলছে, তা অবশ্যই বদলানো উচিত। দশজন নিলে দুজন জেলা জজ নিয়োগের চলতি রীতি অসাংবিধানিক।
আমরা গোপন বিচারের মতো গোপন বিচারক নিয়োগ চাই না। তবে আপাতত প্রার্থনা এই—আওয়ামী মনোভাবাপন্ন অনেক ভালো আইনজীবী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে দিন। অযোগ্য ‘আওয়ামীদের’ নিয়োগ দেবেন না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সেই মোসাহেবরা আজও সমান সক্রিয়।
পুনশ্চ: গত ২৫ জানুয়ারি ‘প্রধান বিচারপতি নিয়োগে সমীকরণ’ শীর্ষক লেখায় অনবধানতাবশত উল্লেখ করেছিলাম, বিচারপতি মো. ফজলুল করিম প্রধান বিচারপতি হলে বিচারপতি মো. আবদুল মতিনের প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হবে। এটি সঠিক নয়। প্রধান বিচারপতি অবসরে যাবেন আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর। এরপর বিচারপতি আবদুল মতিনই হবেন জ্যেষ্ঠতম। তিনি প্রধান বিচারপতি হলে সে পদে থাকবেন ২৫ ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমি দুঃখিত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত লিখেছিলেন, ‘মি. চেয়ারম্যান স্যার, সংবিধানের ৯৫(২) অনুচ্ছেদের ক দফায় বর্ণিত বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা সম্পর্কে যে বিধান রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে আপত্তি জানাচ্ছি।’ ওই অনুচ্ছেদ বলেছে, বিচারক হতে হলে দুটো শর্তের একটি পূরণ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে, না হয় কোনো বিচার বিভাগীয় পদে অন্যূন ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। শ্রী সেনগুপ্তের যুক্তি ছিল, ‘কেউ ১০ বছর বা তার বেশি সময় ওকালতি করলেই তিনি বিচারক হতে পারেন না। কারণ সে ধরনের নিয়োগে রাজনৈতিক নিয়োগের সম্ভাবনা থাকবে। আর এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মৌলিকত্ব নিশ্চিতভাবেই লুপ্ত হবে।’ আমরা আজ বেদনার সঙ্গে লক্ষ করি যে শ্রী সেনগুপ্তর আশঙ্কা কী নিষ্ঠুরভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে। বড় অবাক হয়ে ভাবি, তিনি কী করে এ রকম একটি বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হলো?
শ্রী সেনগুপ্ত কষ্ট চেপে স্বস্তি অনুভব করতে পারেন এটা লক্ষ করে যে, সেই সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান কামাল হোসেন ইতিমধ্যেই আক্ষেপ করেছেন যে সুপ্রিম কোর্টে একটি সুনামি আসা উচিত। আরেক বরেণ্য আইনবিদ মাহমুদুল ইসলাম ২০০৬ সালে লিখলেন, ‘কেবল অল্পসংখ্যক বিচারকই দক্ষ। এবং তাঁদের মধ্যে অতি কমসংখ্যক বিচারকই তাঁদের দক্ষতার জন্য গর্ব করতে পারেন। বিচারকদের নৈতিকতা ও সততা প্রশ্নবিদ্ধ।’ এই প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগে আমরা জরুরি অবস্থায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন পেলাম। এরপর আমরা সেই কমিশনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিলাম। অতঃপর হাইকোর্টের রায় এল। বিএনপি আমলে আওয়ামী হিসেবে বাদ পড়া ১০ বিচারকের পুনর্বহাল আমরা দেখলাম। হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চকে বিচারক নিয়োগে গ্রহণযোগ্য নীতিমালা দিতে দেখলাম। আপিল বিভাগ তা অনেকটাই বিসর্জন দিলেন। তাঁরা যেন কার্যত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে নিছক পরামর্শের বিধানটা টেকালেন। আপিল বিভাগের পরিমার্জিত নীতিমালার ৯ নম্বর দফাটি নির্দিষ্টভাবে বলেছে, ‘প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ কিংবা সংবিধানে বর্ণিত যোগ্যতার শর্ত পূরণের ঘাটতির প্রশ্ন ছাড়া অন্য কোনো কারণেই বিচারক নিয়োগের বৈধতা বিচার্য নয়।’ এমনকি ‘পক্ষপাত ও অসদুদ্দেশ্যে’ নিয়োগের যুক্তিতেও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। হাইকোর্টের রায়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশটাও বাদ পড়ল। সেটি ছিল, নতুন বিচারক নিয়োগে প্রথম বাছাই তালিকাটা জন্ম নেবে মাতৃজঠরেই অর্থাৎ সুপ্রিমকোর্টেই।
ডেইলি স্টার-এ খবর এসেছে, ১৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে এ সপ্তাহেই। অথচ কীভাবে আগেই তালিকা তৈরি হলো, তার স্পন্দন টের পেলাম না। বিএনপির মাথাব্যথা না থাকাই স্বাভাবিক। কারণ তারা চাইবেই আওয়ামী লীগ যেন তাদের টেক্কা দিতে পারে!
প্রধান বিচারপতি সম্পদের বিবরণী প্রকাশে অভিপ্রেত মত দিয়েছেন। প্রথম আলোতে এ ব্যাপারে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। সম্পাদকীয়তে আশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে ‘আমরা প্রধান বিচারপতির দিকে তাকিয়ে’। আইনবিদ শাহদীন মালিক এর প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোতে লিখলেন, যতক্ষণ খুশি তাকিয়ে থাকুন। খোঁচাটা হজম করতে না হলে আমরা সবাই খুব খুশি হব।
কিছুদিন আগে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এক সভায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিচারপতি চৌধুরীকে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ অপসারণ করেছিলেন। তাতে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। পারভেজীয় সামরিক জমানার অবসানে বিচারপতি চৌধুরীর অবদান বিরাট। তিনি প্রধান বিচারপতি পদে পুনর্বহাল হন। বিশ্বের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে গত রোববার পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি-রাষ্ট্রপতির মধ্যকার টানোপোড়েনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাসিত জীবনে বেনজির ও নওয়াজ শরিফ গণতন্ত্রের সনদ তৈরি করেছিলেন। তাতে তাঁরা বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গণশুনানি করে বিচারক নিয়োগের বিধানের কথা বলেছিলেন। এখন তা পিপিপি ও মুসলিম লীগ ভুলে গেছে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ না করেই দুটি নিয়োগ দেন আসিফ জারদারি। লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি খাজা মোহাম্মদ শরিফকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক এবং বিচারপতি সাকিব নেসারকে লাহোর হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি করা হয়। গত শনিবার তাঁদের নিয়োগ হয়। তাঁরা শপথ নিতে যাচ্ছিলেন। প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন। তাঁরা ‘অসাংবিধানিক’ বলে দুটি নিয়োগ স্থগিত রেখেছেন। জারদারি যে কাণ্ড করলেন, তা রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯৪ সালে করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ‘মি. নোবডি’ বলাতে ঝড় উঠেছিল। নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার উদারতায় অল্পের ওপর দিয়ে ধকল যায়। এবার পাকিস্তানের ঘটনা দেখার মতো। বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরী শুধু ‘নো বডি’ বলার লোক নন। তিনি বিচারপতিদের নিয়োগ স্থগিত করে দুনিয়ার সব সাহসী প্রধান বিচারপতির জন্য অনুকরণীয় নজির তৈরি করলেন। পাকিস্তানের অন্তত ৬৬টি বার অ্যাসোসিয়েশন সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতির ওই নিয়োগকে অবৈধ বলে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাস করেছে।
আমরা আমাদের আপিল বিভাগের কাছ থেকে বিচারক নিয়োগে একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিচারক নিয়োগ নীতিমালা পেয়েছি। এই নীতিমালায় সরকারের সঙ্গে ভীষণ রকম আপস করা হয়েছে। সুতরাং নতুন করে এখন ১৫ জন হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের কথা জেনে আমরা উত্কণ্ঠিত। এরপর আরও নেওয়া হবে। শোনা যাচ্ছে, সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট বার একাট্টা হয়েছে, তারা আর ভুলেও বিএনপি আমলের বিতর্কিত বিচারকদের নিয়োগের বিরোধিতা করে নেওয়া রেজুলেশনের কথা মুখে আনবে না। তার চেয়ে বরং চাপে রেখে সংখ্যা দিয়ে তথাকথিত বিএনপিপন্থী বিচারপতিদের সংখ্যালঘু করবে।
আওয়ামী লীগের সমর্থক আইনজীবীরা আমাদের ইতিমধ্যে শিখিয়েছেন যে বিচারক নিয়োগ নিয়ে কী করে সংকীর্ণ রাজনীতি করতে হয়। জোট সরকারের আমলে উনিশজন বিচারক (যোগ্যতাসম্পন্নরাও এখানে আছেন) নিয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার নিদারুণ লম্ফঝম্ফ করেছিল। আইনের শাসনের জন্য মায়াকান্না করেছিল। তাঁরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার স্লোগান তুলেছিল। এখনো তারা জোট সরকারের নানা কাণ্ডকীর্তির সমালোচনায় মুখর, কিন্তু ওই একটি বিষয় বাদে। অতি যত্নের সঙ্গে তারা সেই রেজুলেশন প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে উনিশজন বিচারকের নিয়োগ নিয়ে তবু প্রতিবাদের একটা আওয়াজ উঠেছিল। এবার সে ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটলে প্রতিবাদ করারও কেউ থাকবে না। কারণ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির বর্তমান নেতারা একান্তভাবে আওয়ামী লীগের অনুগত। তাঁদের কাছ থেকে অতীতের মতো রেজুলেশন পাস করা তো দূরের কথা, বরং তাঁরা অন্ধের মতো সাধুবাদ জানানোর জন্য প্রস্তুত থাকবেন। সুতরাং একটি সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রেহাই পেতে চাইলে নাগরিক সমাজকে কালবিলম্ব না করে প্রস্তুতি নিতে হবে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বক্তব্য আমরা স্মরণ করি। পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনাটা সহায়ক হবে। বাহাত্তরে তিনি ভিন্নমতে লেখেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে যাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে, যাঁরা সব সময় ব্যক্তিস্বার্থচিন্তাতাড়িত এবং যাঁরা তোষামোদি কলা রপ্ত করেছেন, তাঁরাই বিচারক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। সে কারণে আমি মনে করি, অতীতের অভিজ্ঞতা হওয়া উচিত আমাদের সংবিধান প্রণয়নের পাথেয়। বিচার বিভাগের মর্যাদাকে খাটো করে, তাঁর স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে এমনভাবে বিচারক নিয়োগের সুযোগ থাকা উচিত নয়।’
হলফ করে বলতে পারি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শতভাগ অভ্রান্ত। কিন্তু আমরা কেবল আফসোস করব না। এখন সময় এসেছে বিচারক নিয়োগে সংসদে একটি উপযুক্ত আইন তৈরি করা। এই রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে আইনজীবীদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগের ওই দফাটি বিলোপ করতে সেনগুপ্ত সুপারিশ করেছিলেন। বলেছিলেন অধস্তন আদালতে কর্মরত বিচারকদের মধ্য থেকে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ দিতে। কী আশ্চর্য, এম হাফিজ উদ্দীন খান ঠিক এমন একটি সুপারিশ করেছেন সমপ্রতি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে তাঁর ভিন্নমতের জন্য অভিবাদন জানাই। তবে জেলা জজ থেকে শতভাগ বিচারক হয়তো বাস্তব নয়, কিন্তু জেলা জজদের অচ্ছুত্ ভেবে বর্তমানে যেভাবে নিয়োগ চলছে, তা অবশ্যই বদলানো উচিত। দশজন নিলে দুজন জেলা জজ নিয়োগের চলতি রীতি অসাংবিধানিক।
আমরা গোপন বিচারের মতো গোপন বিচারক নিয়োগ চাই না। তবে আপাতত প্রার্থনা এই—আওয়ামী মনোভাবাপন্ন অনেক ভালো আইনজীবী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে দিন। অযোগ্য ‘আওয়ামীদের’ নিয়োগ দেবেন না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সেই মোসাহেবরা আজও সমান সক্রিয়।
পুনশ্চ: গত ২৫ জানুয়ারি ‘প্রধান বিচারপতি নিয়োগে সমীকরণ’ শীর্ষক লেখায় অনবধানতাবশত উল্লেখ করেছিলাম, বিচারপতি মো. ফজলুল করিম প্রধান বিচারপতি হলে বিচারপতি মো. আবদুল মতিনের প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হবে। এটি সঠিক নয়। প্রধান বিচারপতি অবসরে যাবেন আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর। এরপর বিচারপতি আবদুল মতিনই হবেন জ্যেষ্ঠতম। তিনি প্রধান বিচারপতি হলে সে পদে থাকবেন ২৫ ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমি দুঃখিত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
Wednesday, February 3, 2010
বন্দুকের নল সরিয়ে নিন -সরল গরল by মিজানুর রহমান খান
একটি কবির লড়াই হলে কেমন হয়। সেখানে একদিকে থাকবেন পঞ্চম সংশোধনী সমর্থক আইনবিদেরা, অন্যদিকে এর বিরোধীরা। টস নয়, সমর্থক পণ্ডিতেরা আগে বলার সুযোগ পাবেন। জানা কথা, তাঁরা তারস্বরে বলবেন, পঞ্চম সংশোধনী খুবই জরুরি বিষয়। সুপ্রিম কোর্টের সাধ্যি নেই এর গায়ে আঁচড় কাটে।
হয়তো তাঁরা বলবেন, পঞ্চম সংশোধনী আরও জাতে ওঠে ১৯৯১ সালে। তখন আমরা রাষ্ট্রপতি-পদ্ধতি বাতিল করেছি, এনেছি সংসদীয় গণতন্ত্র। আমরা গণভোট করেছি। সুতরাং পঞ্চম সংশোধনীর গায়ে সামরিক শাসনের কালিঝুলি যদি লেগেও থাকে, তা তো এখন ফকফকা। এর গায়ে আর কোনো দুর্গন্ধ নেই। বারুদের গন্ধ নেই।
এ ধরনের যুক্তিতে কাল্পনিক ওই ‘কবির লড়াই’ বেশ জমে উঠবে। জনতা মুখ চাওয়াচাওয়ি করবে। হয়তো বিরোধী শিবিরেও কিছুটা নীরবতা নামবে। সত্যিই তো, ১৯৯১ সালে গণভোট হয়েছে। জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান দিয়ে গণভোটের বিধান সংবিধানে ঢোকান। তাঁরা দূরদর্শী ছিলেন। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০০৫ সালে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে যে রায় দেন, তেমন দুর্যোগ তাঁরা ১৯৭৯ সালে কল্পনা করেছিলেন। তাই সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদে তাঁরা সামরিক ফরমানগুলোর জন্য একটি বাড়ি বানান।
সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদটা একটা ব্যতিক্রম। নামেই এর পরিচয়। শিরোনাম: অস্থায়ী ও ক্রান্তিকালীন বিধানাবলি। এখানে লেখা: চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত বিধানাবলি সংবিধানের অন্যান্য বিধানাবলি সত্ত্বেও কার্যকর হবে। পঞ্চম সংশোধনী দিয়ে এখানে ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফ যুক্ত করা হয়। এই প্যারাগ্রাফটিতে সব ধরনের সামরিক ফরমানকে নির্বিচারে বৈধতা দেওয়া হয়।
সবারই জানা যে সংসদ যখন কোনো আইন পাস করে, তখন তার বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। কেউ এমন কোনো আইন দেখাতে পারবেন না যে যেখানে লেখা আছে, এই আইনটা কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। কিন্তু জেনারেল জিয়া তেমন আইন তৈরি করলেন। আদালতের এখতিয়ার খর্বকারী আইন বিষয়ে বিএনপিপন্থী আইনবিদেরা কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান, তা আমরা সম্প্রতি লক্ষ করেছি। জরুরি অবস্থায় প্রণীত আইনে লেখা ছিল, দ্রুত বিচারের স্বার্থে বিচার চলাকালে অভিযুক্তরা জামিন পাবেন না। এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপিপন্থীসহ আইনজীবীরা হাইকোর্টে হাত-পা ছুড়ে চিত্কার জুড়ে দিয়েছিলেন। কী সর্বনাশ, কী সর্বনাশ। উচ্চ আদালতের হাত-পা বাঁধা। কেউ কেউ এতে মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের তাণ্ডব দেখলেন। বললেন, এই হলো জংলি আইন।
বিএনপিপন্থী এই আইনজীবীরাই এখন আবার আদালতের ক্ষমতা খর্বকারী ওই ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের সমর্থক। এখানে বন্দুকের নল থেকে বেরোনো আইনকে বিরাট মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বলা হলো, সংসদে পাস হওয়া আইনই কেবল আইন নয়, বন্দুকের নল থেকে বেরোলেও তা ‘আইন’। নির্দিষ্ট করে লেখা হলো, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল সেনাশাসন তুলে নেওয়া পর্যন্ত সময়ে, যেখানে যত প্রকার ফরমান ও প্রবিধান তো বটেই, এমনকি যত প্রকার ‘আদেশ ও বিজ্ঞপ্তিসমূহ’ জারি করা হয়েছে, তাও আইন হিসেবে টিকে থাকবে। এমনকি ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের মাধ্যমে যুক্ত ৩ক অনুচ্ছেদের ১০ দফায় স্পষ্ট বলা হলো, সামরিক আদেশ ও বিজ্ঞপ্তিসমূহ এমনভাবে বিবেচিত হবে যেন এগুলো সবই সংসদের আইন ছিল!
জেনারেল জিয়ার আইন-বিষয়ক সহযোগীরা তখন বন্দুকের নলের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই সংসদ নিজেদের মনের মাধুরী দিয়ে সাজিয়েও তাঁরা স্বস্তি পাননি। মনে ডর ছিল। পঞ্চম সংশোধনী বিল পাস করা হলো সামরিক আইন বহাল রেখে। অতঃপর শেষ ফরমান হিসেবে মহা আজব সামরিক ফরমানটি জন্ম নিলো। সংবিধান ও গণতন্ত্রের ওপর এটা ছিল একটা মরণছোবল। মওদুদ আহমদ আদালতে বলেছেন, চতুর্থ সংশোধনীর কারণেই পঞ্চম সংশোধনী অনিবার্য হয়ে পড়ে। মুজিব যদি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আগের তুলনায় ঢের বেশি মাত্রায় সাংবিধানিক স্বৈরশাসক হন, তাহলে বলব তাঁর হত্যা-পরবর্তী শাসকেরা শুধু স্বৈরশাসক নন, ভয়ংকর দানব হয়ে উঠেছিলেন। শেষ ফরমানের মাধ্যমে জেনারেল জিয়া সংবিধান এফোঁড়-ওফোঁড় করেন। শেষবারের মতো ট্রিগারে চাপ দেন। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে চিরকালের জন্য বন্দুকের নলের কাছে নতমুখ করে রাখার ব্যবস্থা পাকা করেন। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এই ব্যবস্থাটা হাস্যকরভাবে হলেও আক্ষরিক অর্থে এখনো টিকে আছে।
জিয়া সামরিক আইন তুলে নেন ৬ এপ্রিল ১৯৭৯ রাত আটটায়। ঠিক এ দিন লে. জে. জিয়া প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে একটি ফরমান জারি করেন। সম্ভবত এটিই ছিল তাঁর শেষ ফরমান। বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর রায়ে এই ফরমানটি সম্পর্কে ‘সম্ভবত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি গেজেটে ছাপা হয় ৭ এপ্রিল ১৯৭৯। এ দিনই সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে। এবারে আমরা ৭ এপ্রিলের ওই প্রজ্ঞাপনের কথাটি মনে রেখে ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফটি লক্ষ করব। এতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান....বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তত্সম্পর্কে কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোন কারণেই কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিলের সর্বশেষ ফরমানটির রাজনৈতিক ও আইনগত তাত্পর্য অপরিসীম ও সংবেদনশীল।
জিয়া মুজিব হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, এটি একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। কিন্তু এই সামরিক ফরমানটি সাক্ষ্য দিচ্ছে যে তিনি ১৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানকে ‘দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বার্থে’ প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করেছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেলের সই করা এই দলিলটি নতুন প্রজন্মকে মুজিব হত্যাকাণ্ডে জিয়ার ভূমিকা মূল্যায়নে পথ নির্দেশ করতে পারে।
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পরবর্তী পাঁচ দিন দেশে সংবিধান বা সামরিক আইন কোনোটিই ছিল না। ২০ আগস্ট সামরিক আইন জারি করেন মোশতাক। জিয়া ছিলেন মোশতাক ও সায়েমের পর তৃতীয় সিএমএলএ। ১৫ আগস্টের পরিবর্তন ‘জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য’ আনা হয়েছিল—এই ঘোষণা মোশতাক-ফারুক-রশিদ চক্রের দ্বারা ৩ নভেম্বরের আগেই এসেছিল। চার বছর পর তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক জিয়ার সামনে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার কোনো দরকার ছিল না। উপরন্তু, তখন তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। ওই ফরমানেই তিনি বলেন, ‘আমি ৩ জুন ১৯৭৮ অনুষ্ঠিত ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়েছি।’ সুতরাং কোনো বিচারেই প্রায় চার বছর পর ১৯৭৯ সালের ৬ জুলাই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সম্পর্কে ওই মন্তব্য করে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না। উপরন্তু, তখনো দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি আওয়ামী লীগই ছিল। ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের’ সময় কোনো রাষ্ট্রনায়কের পক্ষে এ রকম একটা কৌশলগত ঝুঁকি কবুল করা কি স্বাভাবিক মনে হয়? তবে কি তিনি বিশেষ দায় থেকেই ১৫ আগস্টকে সমর্থন করেছিলেন? এই দলিলটি তিনি সংবিধানের অংশে পরিণত করতে সচেষ্ট হন। ১৫ আগস্টের প্রতি জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়নের এটি একটি দালিলিক প্রমাণ। শুধু দালিলিক নয়, সাংবিধানিক প্রমাণ!
তবে এর তাত্পর্যের কাহিনি এখানেই শেষ নয়, এই সেই সামরিক ফরমান, যেখানে বাংলাদেশের সংবিধান পঞ্চম সংশোধনীর পর কাগজে-কলমে কার্যকর হওয়ার পরও সেখানে ছদ্মবেশী প্রধান সামরিক আইন প্রশাসককে টিকিয়ে রাখা হয়। পঞ্চম সংশোধনী পাসের পরেও জেনারেল জিয়া যাতে সব সময় সংবিধানের ওপরে থাকেন, সে জন্য একটি বিশেষ রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়। কী পরিহাস, মুজিব কত বড় স্বৈরশাসক ছিল, সেই গল্প বিএনপির মুখে শুনতে হয়। ১৯৭৯ সালে জিয়া তাঁর সর্বশেষ ফরমানে লিখেন, ‘সংবিধান বা অন্য আইনে যা আছে তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি যেকোনো অসুবিধা দূর করার স্বার্থে সময়ে সময়ে আদেশ দিয়ে বিধান জারি করতে পারবেন।’ পাঠক লক্ষ করবেন, জিয়া এক হাতে সামরিক আইন তুললেন, সংবিধানের প্রাণ দিলেন আর চুপিসারে যা তিনি লিখে নিলেন, তার সরল মানে দাঁড়াল: পঞ্চম সংশোধনী পাস হলেও কুছ পরোয়ানা নেই। চেনা সাফারিতে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির লেবাস নিলে কি হবে, উর্দিটাই আসল। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের চাবিটা নেয় কে? আগের মতোই তিনি জাতির ‘অসুবিধা’ দূর করবেন। সময়ে সময়ে সংবিধানের শ্রাদ্ধ ঘটিয়ে হলেও নতুন বিধান দেবেন।
বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর রায়ে মন্তব্য করেন যে ‘সংবিধান অগ্রাহ্য করে যখন খুশি তেমন আদেশ জারি করার ক্ষমতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কখনো ছিল না। বাহাত্তরেও নয়, এখনো নয়। কিন্তু বাংলাদেশের তখনকার রাষ্ট্রপতির (জিয়া) হাতে ওই ক্ষমতা ছিল।’ কিন্তু তিনি যা বলেননি, সেটাই কাল্পনিক কবির লড়াইয়ে পঞ্চম সংশোধনী বিরোধী আইনজ্ঞরা তাঁদের প্রতিপক্ষের বন্ধুদের শুনিয়ে দিতে পারেন। সমর্থকেরা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঈষত্ রঙ্গ করে বলতে পারেন, ‘‘আচ্ছা, তর্কে আপনাদেরই জিত হলো। মানলাম, আপনারাই বড় পণ্ডিত। কিন্তু এটা তো ঠিক যে, ওই ফরমানটা আপনাদের যুক্তিমতেই সংবিধানের অংশ। সত্য বটে শাসনপদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু সেই আজব ফরমান তো রাষ্ট্রপতিকে সংজ্ঞায়িত করেনি। এখন বর্তমান রাষ্ট্রপতি যদি বলেন, আমি সেই ‘পবিত্র ফরমান’ অনুযায়ী ‘রাষ্ট্রপতি’ হব। জাতির ‘অসুবিধা’ দূর করব। সংবিধান বেঁটে উপযুক্ত বিধান দেব। তাহলে প্রতিপক্ষের বন্ধুরা কী বলবেন?’’ সেই কাল্পনিক লড়াইয়ের পর্বে পঞ্চম সংশোধনী সমর্থকদের একই সঙ্গে আরেকটি মোক্ষম দাওয়াই দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির জারি করা উক্তরূপ ‘নতুন বিধানের’ বৈধতার প্রশ্নে আপনারা কী কহেন? আপনাদের এবং সংবিধানের কথামতোই এ বিষয়ে ‘কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।’
এ রকম একটা কবির লড়াই এই তীব্র শীতে বেশ জমবে এবং দারুণ উপভোগ্য হবে বলেই কল্পনা করা চলে!
কখনো মনে হয়, পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টে ফারুক-রশিদরা যে ট্যাংক বের করেছিলেন, সে ট্যাংক ফিরে গেছে, তাঁরাও পরপারে গেলেন, কিন্তু তাঁদের বন্দুকের নল আজও তাক করা। পঞ্চম সংশোধনীর রায় আপিলে টিকলে ওই ১৮ প্যারাগ্রাফ হয়তো বিলোপ হতে পারে। বিশিষ্ট সংবিধান-বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম গতকাল আপিল বিভাগে আলোচ্য প্যারাগ্রাফটির সংযোজনকে ‘সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রবর্তন থেকে সংবিধানের সঙ্গে এ যাবত্ যত প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, তা এক রায়ে কিংবা আদালতে নিঃশেষ হওয়ার নয়। রায়ে যদি ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের বিলোপ ঘটে, তাহলেও বন্দুকের নল তাক করা থাকবে। সেটা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ঘাতক ফারুক রহমানের সাবেক রানিংমেট জেনারেল এরশাদের বন্দুকের নল। ১৯ নম্বর প্যারাগ্রাফে বিএনপির নির্বাচিত সরকার উত্খাত-পরবর্তী আমলের (১৯৮২-১৯৮৬) সামরিক ফরমান ও আদেশগুলোকে অভিন্ন ভাষায় রক্ষাকবচ দেওয়া আছে। এই বন্দুকের নলও সরাতে হবে। এক এগারোতে পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের আত্মমর্যাদার স্বার্থে বর্তমান সংসদেরই সেটা করা উচিত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
হয়তো তাঁরা বলবেন, পঞ্চম সংশোধনী আরও জাতে ওঠে ১৯৯১ সালে। তখন আমরা রাষ্ট্রপতি-পদ্ধতি বাতিল করেছি, এনেছি সংসদীয় গণতন্ত্র। আমরা গণভোট করেছি। সুতরাং পঞ্চম সংশোধনীর গায়ে সামরিক শাসনের কালিঝুলি যদি লেগেও থাকে, তা তো এখন ফকফকা। এর গায়ে আর কোনো দুর্গন্ধ নেই। বারুদের গন্ধ নেই।
এ ধরনের যুক্তিতে কাল্পনিক ওই ‘কবির লড়াই’ বেশ জমে উঠবে। জনতা মুখ চাওয়াচাওয়ি করবে। হয়তো বিরোধী শিবিরেও কিছুটা নীরবতা নামবে। সত্যিই তো, ১৯৯১ সালে গণভোট হয়েছে। জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমান দিয়ে গণভোটের বিধান সংবিধানে ঢোকান। তাঁরা দূরদর্শী ছিলেন। বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০০৫ সালে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে যে রায় দেন, তেমন দুর্যোগ তাঁরা ১৯৭৯ সালে কল্পনা করেছিলেন। তাই সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদে তাঁরা সামরিক ফরমানগুলোর জন্য একটি বাড়ি বানান।
সংবিধানের ১৫০ অনুচ্ছেদটা একটা ব্যতিক্রম। নামেই এর পরিচয়। শিরোনাম: অস্থায়ী ও ক্রান্তিকালীন বিধানাবলি। এখানে লেখা: চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত বিধানাবলি সংবিধানের অন্যান্য বিধানাবলি সত্ত্বেও কার্যকর হবে। পঞ্চম সংশোধনী দিয়ে এখানে ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফ যুক্ত করা হয়। এই প্যারাগ্রাফটিতে সব ধরনের সামরিক ফরমানকে নির্বিচারে বৈধতা দেওয়া হয়।
সবারই জানা যে সংসদ যখন কোনো আইন পাস করে, তখন তার বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য। কেউ এমন কোনো আইন দেখাতে পারবেন না যে যেখানে লেখা আছে, এই আইনটা কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। কিন্তু জেনারেল জিয়া তেমন আইন তৈরি করলেন। আদালতের এখতিয়ার খর্বকারী আইন বিষয়ে বিএনপিপন্থী আইনবিদেরা কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখান, তা আমরা সম্প্রতি লক্ষ করেছি। জরুরি অবস্থায় প্রণীত আইনে লেখা ছিল, দ্রুত বিচারের স্বার্থে বিচার চলাকালে অভিযুক্তরা জামিন পাবেন না। এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপিপন্থীসহ আইনজীবীরা হাইকোর্টে হাত-পা ছুড়ে চিত্কার জুড়ে দিয়েছিলেন। কী সর্বনাশ, কী সর্বনাশ। উচ্চ আদালতের হাত-পা বাঁধা। কেউ কেউ এতে মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের তাণ্ডব দেখলেন। বললেন, এই হলো জংলি আইন।
বিএনপিপন্থী এই আইনজীবীরাই এখন আবার আদালতের ক্ষমতা খর্বকারী ওই ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের সমর্থক। এখানে বন্দুকের নল থেকে বেরোনো আইনকে বিরাট মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বলা হলো, সংসদে পাস হওয়া আইনই কেবল আইন নয়, বন্দুকের নল থেকে বেরোলেও তা ‘আইন’। নির্দিষ্ট করে লেখা হলো, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল সেনাশাসন তুলে নেওয়া পর্যন্ত সময়ে, যেখানে যত প্রকার ফরমান ও প্রবিধান তো বটেই, এমনকি যত প্রকার ‘আদেশ ও বিজ্ঞপ্তিসমূহ’ জারি করা হয়েছে, তাও আইন হিসেবে টিকে থাকবে। এমনকি ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের মাধ্যমে যুক্ত ৩ক অনুচ্ছেদের ১০ দফায় স্পষ্ট বলা হলো, সামরিক আদেশ ও বিজ্ঞপ্তিসমূহ এমনভাবে বিবেচিত হবে যেন এগুলো সবই সংসদের আইন ছিল!
জেনারেল জিয়ার আইন-বিষয়ক সহযোগীরা তখন বন্দুকের নলের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন। তাই সংসদ নিজেদের মনের মাধুরী দিয়ে সাজিয়েও তাঁরা স্বস্তি পাননি। মনে ডর ছিল। পঞ্চম সংশোধনী বিল পাস করা হলো সামরিক আইন বহাল রেখে। অতঃপর শেষ ফরমান হিসেবে মহা আজব সামরিক ফরমানটি জন্ম নিলো। সংবিধান ও গণতন্ত্রের ওপর এটা ছিল একটা মরণছোবল। মওদুদ আহমদ আদালতে বলেছেন, চতুর্থ সংশোধনীর কারণেই পঞ্চম সংশোধনী অনিবার্য হয়ে পড়ে। মুজিব যদি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে আগের তুলনায় ঢের বেশি মাত্রায় সাংবিধানিক স্বৈরশাসক হন, তাহলে বলব তাঁর হত্যা-পরবর্তী শাসকেরা শুধু স্বৈরশাসক নন, ভয়ংকর দানব হয়ে উঠেছিলেন। শেষ ফরমানের মাধ্যমে জেনারেল জিয়া সংবিধান এফোঁড়-ওফোঁড় করেন। শেষবারের মতো ট্রিগারে চাপ দেন। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংবিধানকে চিরকালের জন্য বন্দুকের নলের কাছে নতমুখ করে রাখার ব্যবস্থা পাকা করেন। আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এই ব্যবস্থাটা হাস্যকরভাবে হলেও আক্ষরিক অর্থে এখনো টিকে আছে।
জিয়া সামরিক আইন তুলে নেন ৬ এপ্রিল ১৯৭৯ রাত আটটায়। ঠিক এ দিন লে. জে. জিয়া প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে একটি ফরমান জারি করেন। সম্ভবত এটিই ছিল তাঁর শেষ ফরমান। বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর রায়ে এই ফরমানটি সম্পর্কে ‘সম্ভবত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি গেজেটে ছাপা হয় ৭ এপ্রিল ১৯৭৯। এ দিনই সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটে। এবারে আমরা ৭ এপ্রিলের ওই প্রজ্ঞাপনের কথাটি মনে রেখে ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফটি লক্ষ করব। এতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান....বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তত্সম্পর্কে কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোন কারণেই কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিলের সর্বশেষ ফরমানটির রাজনৈতিক ও আইনগত তাত্পর্য অপরিসীম ও সংবেদনশীল।
জিয়া মুজিব হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না, এটি একটি বিতর্কিত প্রশ্ন। কিন্তু এই সামরিক ফরমানটি সাক্ষ্য দিচ্ছে যে তিনি ১৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানকে ‘দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের স্বার্থে’ প্রয়োজনীয় বলে ঘোষণা করেছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেলের সই করা এই দলিলটি নতুন প্রজন্মকে মুজিব হত্যাকাণ্ডে জিয়ার ভূমিকা মূল্যায়নে পথ নির্দেশ করতে পারে।
১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পরবর্তী পাঁচ দিন দেশে সংবিধান বা সামরিক আইন কোনোটিই ছিল না। ২০ আগস্ট সামরিক আইন জারি করেন মোশতাক। জিয়া ছিলেন মোশতাক ও সায়েমের পর তৃতীয় সিএমএলএ। ১৫ আগস্টের পরিবর্তন ‘জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য’ আনা হয়েছিল—এই ঘোষণা মোশতাক-ফারুক-রশিদ চক্রের দ্বারা ৩ নভেম্বরের আগেই এসেছিল। চার বছর পর তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক জিয়ার সামনে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার কোনো দরকার ছিল না। উপরন্তু, তখন তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। ওই ফরমানেই তিনি বলেন, ‘আমি ৩ জুন ১৯৭৮ অনুষ্ঠিত ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়েছি।’ সুতরাং কোনো বিচারেই প্রায় চার বছর পর ১৯৭৯ সালের ৬ জুলাই পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সম্পর্কে ওই মন্তব্য করে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না। উপরন্তু, তখনো দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি আওয়ামী লীগই ছিল। ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের’ সময় কোনো রাষ্ট্রনায়কের পক্ষে এ রকম একটা কৌশলগত ঝুঁকি কবুল করা কি স্বাভাবিক মনে হয়? তবে কি তিনি বিশেষ দায় থেকেই ১৫ আগস্টকে সমর্থন করেছিলেন? এই দলিলটি তিনি সংবিধানের অংশে পরিণত করতে সচেষ্ট হন। ১৫ আগস্টের প্রতি জিয়াউর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়নের এটি একটি দালিলিক প্রমাণ। শুধু দালিলিক নয়, সাংবিধানিক প্রমাণ!
তবে এর তাত্পর্যের কাহিনি এখানেই শেষ নয়, এই সেই সামরিক ফরমান, যেখানে বাংলাদেশের সংবিধান পঞ্চম সংশোধনীর পর কাগজে-কলমে কার্যকর হওয়ার পরও সেখানে ছদ্মবেশী প্রধান সামরিক আইন প্রশাসককে টিকিয়ে রাখা হয়। পঞ্চম সংশোধনী পাসের পরেও জেনারেল জিয়া যাতে সব সময় সংবিধানের ওপরে থাকেন, সে জন্য একটি বিশেষ রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়। কী পরিহাস, মুজিব কত বড় স্বৈরশাসক ছিল, সেই গল্প বিএনপির মুখে শুনতে হয়। ১৯৭৯ সালে জিয়া তাঁর সর্বশেষ ফরমানে লিখেন, ‘সংবিধান বা অন্য আইনে যা আছে তা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি যেকোনো অসুবিধা দূর করার স্বার্থে সময়ে সময়ে আদেশ দিয়ে বিধান জারি করতে পারবেন।’ পাঠক লক্ষ করবেন, জিয়া এক হাতে সামরিক আইন তুললেন, সংবিধানের প্রাণ দিলেন আর চুপিসারে যা তিনি লিখে নিলেন, তার সরল মানে দাঁড়াল: পঞ্চম সংশোধনী পাস হলেও কুছ পরোয়ানা নেই। চেনা সাফারিতে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির লেবাস নিলে কি হবে, উর্দিটাই আসল। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের চাবিটা নেয় কে? আগের মতোই তিনি জাতির ‘অসুবিধা’ দূর করবেন। সময়ে সময়ে সংবিধানের শ্রাদ্ধ ঘটিয়ে হলেও নতুন বিধান দেবেন।
বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর রায়ে মন্তব্য করেন যে ‘সংবিধান অগ্রাহ্য করে যখন খুশি তেমন আদেশ জারি করার ক্ষমতা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কখনো ছিল না। বাহাত্তরেও নয়, এখনো নয়। কিন্তু বাংলাদেশের তখনকার রাষ্ট্রপতির (জিয়া) হাতে ওই ক্ষমতা ছিল।’ কিন্তু তিনি যা বলেননি, সেটাই কাল্পনিক কবির লড়াইয়ে পঞ্চম সংশোধনী বিরোধী আইনজ্ঞরা তাঁদের প্রতিপক্ষের বন্ধুদের শুনিয়ে দিতে পারেন। সমর্থকেরা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঈষত্ রঙ্গ করে বলতে পারেন, ‘‘আচ্ছা, তর্কে আপনাদেরই জিত হলো। মানলাম, আপনারাই বড় পণ্ডিত। কিন্তু এটা তো ঠিক যে, ওই ফরমানটা আপনাদের যুক্তিমতেই সংবিধানের অংশ। সত্য বটে শাসনপদ্ধতি বদলেছে। কিন্তু সেই আজব ফরমান তো রাষ্ট্রপতিকে সংজ্ঞায়িত করেনি। এখন বর্তমান রাষ্ট্রপতি যদি বলেন, আমি সেই ‘পবিত্র ফরমান’ অনুযায়ী ‘রাষ্ট্রপতি’ হব। জাতির ‘অসুবিধা’ দূর করব। সংবিধান বেঁটে উপযুক্ত বিধান দেব। তাহলে প্রতিপক্ষের বন্ধুরা কী বলবেন?’’ সেই কাল্পনিক লড়াইয়ের পর্বে পঞ্চম সংশোধনী সমর্থকদের একই সঙ্গে আরেকটি মোক্ষম দাওয়াই দিতে হবে। রাষ্ট্রপতির জারি করা উক্তরূপ ‘নতুন বিধানের’ বৈধতার প্রশ্নে আপনারা কী কহেন? আপনাদের এবং সংবিধানের কথামতোই এ বিষয়ে ‘কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।’
এ রকম একটা কবির লড়াই এই তীব্র শীতে বেশ জমবে এবং দারুণ উপভোগ্য হবে বলেই কল্পনা করা চলে!
কখনো মনে হয়, পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টে ফারুক-রশিদরা যে ট্যাংক বের করেছিলেন, সে ট্যাংক ফিরে গেছে, তাঁরাও পরপারে গেলেন, কিন্তু তাঁদের বন্দুকের নল আজও তাক করা। পঞ্চম সংশোধনীর রায় আপিলে টিকলে ওই ১৮ প্যারাগ্রাফ হয়তো বিলোপ হতে পারে। বিশিষ্ট সংবিধান-বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম গতকাল আপিল বিভাগে আলোচ্য প্যারাগ্রাফটির সংযোজনকে ‘সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রবর্তন থেকে সংবিধানের সঙ্গে এ যাবত্ যত প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, তা এক রায়ে কিংবা আদালতে নিঃশেষ হওয়ার নয়। রায়ে যদি ১৮ নম্বর প্যারাগ্রাফের বিলোপ ঘটে, তাহলেও বন্দুকের নল তাক করা থাকবে। সেটা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ঘাতক ফারুক রহমানের সাবেক রানিংমেট জেনারেল এরশাদের বন্দুকের নল। ১৯ নম্বর প্যারাগ্রাফে বিএনপির নির্বাচিত সরকার উত্খাত-পরবর্তী আমলের (১৯৮২-১৯৮৬) সামরিক ফরমান ও আদেশগুলোকে অভিন্ন ভাষায় রক্ষাকবচ দেওয়া আছে। এই বন্দুকের নলও সরাতে হবে। এক এগারোতে পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের আত্মমর্যাদার স্বার্থে বর্তমান সংসদেরই সেটা করা উচিত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com
Subscribe to:
Posts (Atom)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2005)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
বিনোদন
শেষের পাতা
ক্রিকেট খেলা
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
দেশে দেশে
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
আমার দেশ
ইসরায়েল
ফুটবল খেলা
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
ফিলিস্তিন
Lead
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
ইরান
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
কালবেলা
চট্টগ্রাম
বিশাল বাংলা
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
মুসলিম
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
জাতিসংঘ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সাক্ষাৎকার
রাশিয়া
মুক্তিযুদ্ধ
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
ইউরোপ
খেলা ধুলা
সৌদি আরব
ছাত্রলীগ
ইতিহাস
প্রতিবেদন
জামায়াতে ইসলামী
সোহরাব হাসান
অমানবিক
পশ্চিমবঙ্গ
আলোকিত চট্টগ্রাম
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
জাতীয় সংসদ
নারী ধর্ষণ
আনন্দ
খেলাধুলা
বিজ্ঞান ও গবেষণা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
আফ্রিকা
মাদক
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
সংখ্যালঘু
প্রবাস
ছুটির দিনে
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
সৈয়দ আবুল মকসুদ
তুরস্ক
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
আফগানিস্তান
গোল্লাছুট
বইপত্র
অন্য আলো
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
ইউক্রেন
দুর্ঘটনা
অপহরণ
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
স্বাস্থ্য
ফূটবল খেলা
হিন্দু
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
নেপাল
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
জ্যোতির্বিজ্ঞান
সড়ক দুর্ঘটনা
আলী রীয়াজ
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
শিল্প ও সাহিত্য
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
কক্সবাজার
এ এম এম শওকত আলী
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
Exclusive
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
গবেষণা
বাংলাদেশ
মিসর
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
শোক
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
সংস্কৃতি
ইয়েমেন
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শুভ্র দেব
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
ফ্রান্স
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
জীবনযাপন
কিশোরগঞ্জ
লেবানন
আবদুল মান্নান
জাপান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
কুমিল্লা
শিল্প
মুক্তমত
মাহমুদুর রহমান
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
পার্বত্য চট্টগ্রাম
ময়মনসিংহ
সংবাদ২৪.নেট
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
যশোর
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
চিকিৎসা
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা
মেহেদী হাসান
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
তথ্য প্রযুক্তি
বরগুনা
আনু মুহাম্মদ
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
ব্রাজিল
অস্ট্রেলিয়া
মারুফ কিবরিয়া
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
মসজিদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
রোকনুজ্জামান পিয়াস
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
উত্তর কোরিয়া
একরামুল হক
জলবায়ু ও পরিবেশ
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
তুহিন ওয়াদুদ
কালি ও কলম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
কুষ্টিয়া
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
জনস্বাস্থ্য
জাতীয় নাগরিক পার্টি
ঝিলিমিলি
নিবন্ধ
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
উচ্চশিক্ষা
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
প্রযুক্তি
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কাতার
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
ঝড় ও দুর্যোগ
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
শিশির মোড়ল
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
হুমায়ূন আহমেদ
আবুল হাসনাত
আল আমিন
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
হারুন হাবীব
অমিত বসু
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জার্মানি
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
লাতিন আমেরিকা
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
আরব আমিরাত বা দুবাই
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
ব্যবসা
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
দক্ষিণ কোরিয়া
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
লিবিয়া
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
ইসলাম
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
আসজাদুল কিবরিয়া
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
Hot Topic
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
Fantastic
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
মহাকাশচারী
জোহরান মামদানি
নিয়ন আলোয়
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
ইতালি
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
নরসিংদী
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জলবায়ু পরিবর্তন
ঝালকাঠি
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
যৌন অপরাধ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
কিশোর আলো
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
WikiInterview
আকবর হোসেন
ইসলামী ছাত্রশিবির
ইহুদি
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
চুয়াডাঙ্গা
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
ধর্মঘট
স্পেন
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গণমাধ্যম
গদ্যকার্টুন
পিরোজপুর
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
প্রবাসী শ্রমিক
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
সোমালিয়া
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কলম্বিয়া
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
চিঠিপত্র
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
বেলজিয়াম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
হংকং
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কুয়েত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চুক্তি
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সমাজ
সামাজ
সুজন সুপান্থ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
ওমান
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
জঙ্গি
জর্দান
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শেরপুর
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সিঙ্গাপুর
সুইডেন
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
রাজবাড়ী
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অমানবিকতা
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
পোল্যান্ড
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আলজেরিয়া
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রিস
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নীহারুল ইসলাম
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রকিব হাসান
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট