Tuesday, March 29, 2011

যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দাবি

জিএসপি-সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশি পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে যেভাবে প্রবেশ করতে পারছে, জিএসপি-সুবিধা না থাকায় যুক্তরাজ্যের বাজারে সেভাবে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এই তথ্য উল্লেখ করে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্যকে যুক্তরাজ্যের বাজারে বিনা শুল্কে প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।
গতকাল রোববার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ’—শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ প্রস্তাব করেন।
এ সময় আসিফ ইব্রাহীম আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে ইইউ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কোরিয়া প্রভৃতি দেশে শুল্কমুক্ত ও শুল্কছাড় সুবিধা পাচ্ছে।
ঢাকা চেম্বার সভাপতি ব্রিটিশ উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক শিল্প, গ্যাসভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুৎ, সার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তৈরি পোশাক শিল্পের পশ্চাৎসংযোগ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সিরামিকস, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, ইস্পাত, অবকাঠামো উন্নয়ন, হাসপাতাল, শিক্ষা, পর্যটন, হোটেল প্রভৃতি খাতে যৌথ বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্টিফেন ইভান্স বলেছেন, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিগত বছরগুলোয় দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ২০১০ সালে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে একই সময় যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ১১ শতাংশ বেড়েছে।
হাইকমিশনার আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু কোম্পানি ও অনাবাসী বাংলাদেশি এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের চিন্তা করছেন। বাংলাদেশের জ্বালানি, বন্দর, অবকাঠামো, সফটওয়্যার, বস্ত্র, সিরামিকস, ওষুধ ও পরিবেশ খাতে বিনিয়োগে ব্রিটিশ উদ্যোক্তারা আগ্রহী বলে তিনি জানান।
বৈঠকে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর আলোচনা করেন ঢাকায় ব্রিটিশ দূতাবাসের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান কেভিন রিংহাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি টি আই এম নূরুল কবীর।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০১০ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়কালে বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাজ্য ১১ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডের পণ্য রপ্তানির বিপরীতে ১১৩ কোটি পাউন্ডের পণ্য আমদানি করেছে। এ ছাড়া আলোচ্য সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে ৮২ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড প্রবাসী আয় এসেছে। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করেছে।

ক্ষুদ্রঋণ-ব্যবস্থা পরিবর্তনের তাগিদ

দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থাকে ঘিরে সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ জোগানদাতাদের ব্যক্তিগতভাবে লাভালাভের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও ব্যপকভাবে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবস্থাটিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ গতকাল রোববার এসব কথা বলেন।
খলীকুজ্জমান আরও বলেন, ‘১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে এ দেশে ক্ষুদ্রঋণের যাত্রা শুরু। আশির দশকে এসে এটি বিস্তার লাভ করে। নব্বইয়ের দশকে এসে ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। যখন কোনো কিছু বড় হয়ে যায়, তখন অনেক নতুন জিনিস প্রবেশ করে। সেই অবস্থা থেকে বিষয়টিকে এগিয়ে নিতে হলে পরিবর্তনের প্রয়োজন। আর এটা করতে গেলে এখন আমরা কী করছি সেটা ভালোমতো জানতে হবে।’
খলীকুজ্জমান বলেন, ‘ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থায় পরিবর্তনের জন্য বিদেশে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা চলছে। কিন্তু এ ব্যবস্থাটির পথিকৃৎ হিসেবে পরিবর্তনের পথিকৃৎও আমাদের হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন ক্ষুদ্রঋণ যাঁরা নিচ্ছেন, তাঁদের যেমন উপকার হয়, তেমনি যাঁরা ঋণ জোগান দিচ্ছেন তাঁরাও যাতে টেকসই হতে পারেন। কারণ, ঋণ জোগানদাতারা টেকসই না হলে অর্থের সরবরাহ কমে যাবে। এটা মাথায় রেখেই নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে।’
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসফের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মেসবাহউদ্দিন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য দেন পিকেএসএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভীন মাহমুদ।
খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার নিয়ে একটা সমালোচনা ছিল। সম্প্রতি ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (এমআরএ) ক্ষুদ্রঋণের জন্য ২৭ শতাংশ সর্বোচ্চ সুদ হার বেঁধে দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, আগে ছিল ১৫ শতাংশ, এখন কমানোর কথা বলে উল্টো বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টি তা নয়।
খলীকুজ্জমান ব্যাখ্যা করে বলেন, আগে ১৫ শতাংশের কথা বলা হলেও প্রকৃত হার অনেক বেড়ে যেত। কিন্তু এখন সুদহার ব্যাংকের মতো। ২৭ মানে ২৭। এ ছাড়া এখন থেকে ঋণ ছাড় করার এক সপ্তাহের মধ্যে কিস্তি নেওয়া যাবে না। কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দিতে হবে। সঞ্চয়ের নামে শুরুতেই বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচ শতাংশ টাকা কেটে রাখা বন্ধ করতে হবে।
সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রধান নির্বাহীদের উদ্দেশে খলীকুজ্জমান বলেন, আগামী জুনের মধ্যে সবাইকে এ নিয়ম বাস্তবায়ন করতে হবে।
খলীকুজ্জমান বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থের প্রবাহ যেতে হবে। এ জন্য ক্ষুদ্রঋণের সম্প্রসারণ দরকার। এ জন্য তাড়াহুড়া করা যাবে না। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, কেবল টাকা দিয়েই দারিদ্র্য দূর করা যাবে না। এ জন্য সমন্বিত প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে।
ক্ষুদ্রঋণ যাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে, সেদিকে গুরুত্ব দিয়ে খলীকুজ্জমান বলেন, উৎপাদনশীলতা না বাড়লে সঞ্চয় বাড়বে না। তাই যেসব পরিবার ঋণ নেবে তাদেরও ভেবে দেখতে হবে আদৌ তাদের ঋণ প্রয়োজন রয়েছে কি না।
খলীকুজ্জমান বলেন, ক্ষুদ্রঋণকে ধীরে ধীরে স্বকর্মসংস্থান থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে যেতে হবে।
কাজী মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্ষুদ্রঋণের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে একটা ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধিই দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে পারে না। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটা যোগাযোগ স্থাপিত না হলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হবে না।
ভারতের এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে মেসবাহউদ্দিন বলেন, দেশটিতে আগে যে পরিমাণ শ্রমশক্তি দিয়ে উৎপাদন হতো, এখন তার অর্ধেক শ্রমশক্তি দিয়ে দ্বিগুণ উৎপাদন হয়। প্রযুক্তির কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বৈষম্য বেড়েছে।
মতবিনিময় সভায় পিকেএসএফের সারা দেশ থেকে ১৯৮টি সহযোগী সংস্থার প্রধান নির্বাহীরা অংশ নেন। তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা-সংকটের কথা তুলে ধরেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বর্তমানে এ কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রবণতা বাড়ছে।

তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের আগ পর্যন্ত বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বন্ধ

পুঁজিবাজারে কারসাজি তদন্তে গঠিত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বন্ধ রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন স্টেক হোল্ডাররা। আজ সোমবার সকালে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তাঁরা এ অভিমত দেন।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সভাপতি ফখরউদ্দিন আলী আহমেদ বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পর কমিটির সুপারিশ থাকলে সে অনুযায়ী বুক বিল্ডিং পদ্ধতি সংশোধন করা হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহসানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বন্ধ রয়েছে। এটা বন্ধ থাকুক। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে যথাযথ সুপারিশ অনুযায়ী এটা সংশোধন করা হবে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার, বাংলাদেশ পাবলিকলি লিস্টেট কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সালমান এফ রহমান, মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

পুঁজিবাজার চাঙা, বেড়েছে বেশির ভাগ শেয়ারের দাম

চার দিন নিম্নমুখী থাকার পর আজ সোমবার দেশের পুঁজিবাজার ছিল চাঙা, বেড়েছে বেশির ভাগ শেয়ারের দামও। আজ ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব খাতেই শেয়ারের দাম বাড়ে।
ডিএসই সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকিং খাতের ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আজ ২৫টির দাম বাড়ে। এ ছাড়া সিমেন্ট খাতে পাঁচটির মধ্যে সবকটির, সিরামিক খাতে পাঁচটির মধ্যে চারটির, প্রকৌশল খাতে ২৩টির মধ্যে ২০টির, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ২১টির মধ্যে সবকটির, খাদ্য খাতের ১৫টির মধ্যে ১৪টির, জ্বালানি খাতে ১১টির মধ্যে ১০টির, বিমা খাতের ৪৪টির মধ্যে ৪২টির, আইটি খাতের পাঁচটির মধ্যে সবকটির, বিবিধ খাতে নয়টির মধ্যে সবকটির, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ৩৩টির মধ্যে ২৯টির, ওষুধ খাতের ২০টির মধ্যে ১৮টির, বস্ত্র খাতের ২৫টির মধ্যে ২৩টির ও টেলিযোগাযোগ খাতে একমাত্র প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনেরও দাম বাড়ে।
ডিএসইতে আজ চাঙাভাবের মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু হয়, যা সারা দিনই অব্যাহত থাকে। দিন শেষে ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ১৪৮.৮৯ পয়েন্ট বেড়ে ৬২৪৩.৫৩ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৬১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ২৩৯টির কমেছে ২০টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানের। আজ স্টক এক্সচেঞ্জটিতে ৭৯০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা গতকালের চেয়ে ১৭৫ কোটি টাকা বেশি।
ডিএসইতে আজ লেনদেনে শীর্ষে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো বেক্সিমকো, আরএন স্পিনিং, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, গোল্ডেন সন, তিতাস গ্যাস, কেয়া কসমেটিকস, বেক্সটেক্স, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, ম্যাকসন স্পিনিং ও এনবিএল।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ৩৯০.৪৯ পয়েন্ট বেড়ে ১৭৫৩৭.১১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে ২০০টি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে বেড়েছে ১৮১টির, কমেছে ১৫টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইতে আজ মোট ৯০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা গতকালের চেয়ে ১৫ কোটি টাকা বেশি।

বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও আমাদের অগ্রগতি-অধোগতি by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ যৌক্তিকভাবেই ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ। বর্তমান সরকার জাতিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য, সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিগত দশকগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিজ্ঞানের ছাত্রসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। শুধু তাই-ই নয়, ছাত্রজীবন শেষে শ্রেয়তর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকারী কর্মজীবনের জন্য বিজ্ঞানের ছাত্ররা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিদ্যা ও গণিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ভিন্ন বিষয়ে লেখাপড়া করে তাদের বিজ্ঞানের সুপ্ত প্রতিভাকে অকালে শেষ করে দিচ্ছে। এই মেধাকে যথাযথভাবে বিকশিত করে দেশ গড়ার কাজে ব্যবহার করার দায়িত্ব সরকারের। দেশের বাণিজ্যনীতি, বিনিয়োগনীতি দেশীয় শিল্প বিকাশের অনুকূল হওয়া উচিত। বিশ্বের এক-সহস্রাংশ ভূখণ্ডে পৃথিবীর ২৩ সহস্রাংশ মানুষের বাস—মালয়েশিয়ান পরোটা, বিস্কুট আর ভুটানের ফলের রস খেয়ে এত বড় দেশ উন্নতির পথে এগোতে পারে না, নিজেদের উৎপাদন করতে পারতে হবে, নিজেদের পণ্য ব্যবহার করে ধন্য বোধ করতে হবে।
দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার এমন নিরস অবস্থায় বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী বিজ্ঞান শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে, ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে দেশব্যাপী ২০১০ সাল থেকে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজন করছে। এ বছর সারা দেশের ১২টি কেন্দ্রে এই বিভাগীয় অলিম্পিয়াড মার্চ মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়। এই কেন্দ্রগুলো ছিল হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রযুক্তি ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রযুক্তি ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল ও কলেজ, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ও নটর ডেম কলেজের ১২টি কেন্দ্রের প্রায় ৩০০ বিজয়ী বিগত ২৫ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। সকাল আটটায় দূরদূরান্ত থেকে লাল টি-শার্ট পরে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয়। জাতীয় অলিম্পিয়াডের উদ্বোধন ঘোষণা করেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর সম্মানিত সভাপতি বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী অধ্যাপক শমসের আলী এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শাহ এ আলম। এরপর ছাত্ররা নয়টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়, যেখানে তাদের দুই ঘণ্টা সময়ে প্রতি বিষয়ে ১৫টি করে জীববিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জিং প্রশ্নের উত্তর করতে হয়। এই অলিম্পিয়াড এসএসসি ও এইচএসসি এই দুই বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৮০টি স্কুল-কলেজ এই প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করেছে। অলিম্পিয়াড পরীক্ষার পর ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে সমবেত হয়। উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে ছাত্ররা অনেক সৃজনশীল প্রশ্ন করে তাদের অনুসন্ধিৎসু মনের প্রকাশ ঘটায়। ছাত্রদের বিজ্ঞান নিয়ে নানা কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দেন একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক শমসের আলী, একাডেমীর ফেলো অধ্যাপক কাজী আবদুল ফাত্তাহ, অধ্যাপক মেসবাহউদ্দিন আহমাদ, অধ্যাপক আলী আসগর, অধ্যাপক নাইয়ুম চৌধুরী।
দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের সান্নিধ্য নিশ্চয়ই আমাদের স্কুল-কলেজের ছাত্রদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াডে সূচিত রুবিক কিউর প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকেরা যে কষ্ট স্বীকার করে তাঁদের ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন, তা থেকে অত্যন্ত এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান শিক্ষায় গুরুত্ব অনুভব করে। এবার সরকারকে বিজ্ঞান শিক্ষায় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যদি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, জীববিজ্ঞান পড়ে চাকরি না পায়, তাহলে তারা যে বিষয়ে পড়লে চাকরিপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে, তা-ই পড়াবে এবং আমাদের ছেলেমেয়েরা তা-ই করছে। এ কারণে বিজ্ঞান শিক্ষার হার হ্রাস পাচ্ছে।
আসছে অক্টোবরে সাংহাই শহরে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় কনফারেন্স শুরু হতে যাচ্ছে। এর আগের কনফারেন্সগুলোতে জ্ঞানতাপসেরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া উন্নয়নশীল দেশসমূহ একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। এ কারণে এই জনবহুল দেশটির অগ্রগতি নিশ্চিত করতে শুধু বিজ্ঞান শিক্ষা নয়, বিশ্বমানের বিজ্ঞান শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ঔপনিবেশিক বৈরী পরিবেশে জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহা যে বৈজ্ঞানিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে তার ধারাবাহিকতা রাখতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি, বিশ্ব জ্ঞানভান্ডারে আমাদের সঞ্চয় সময়ের সঙ্গে হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের নানা সরকার শিক্ষার সর্বোচ্চ বরাদ্দের ঢাক বাজালেও আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় শিক্ষায় আমাদের বরাদ্দ অপ্রতুল। এই দুর্বল অর্থনীতির দেশে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা মোটেই সহজ কাজ নয়। তবে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শিক্ষা খাতে ডিজিটাল টেকনোলজির জুতসই ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার মান অবশ্যই বাড়ানো সম্ভব। অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষায় পৌঁছাতে শিক্ষকদের দিয়ে তৈরি পঠন বিষয় শিক্ষার জন্য নিয়োজিত টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে সময়সূচি অনুযায়ী পরিবেশন করা সারা দেশে লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর জন্যই নয়, এমনকি শিক্ষকদেরও সহায়তা করা যেতে পারে। আবার এই পঠন বিষয়গুলো ডিভিডির মাধ্যমেও সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
তবে শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের জন্য জনপ্রিয় ও সুস্থ প্রতিযোগিতার সূচনার বিকল্প নেই। এমনকি সর্বোচ্চ মাপের জ্ঞানতাপসেরাও নোবেল পুরস্কার জয়ের প্রতিযোগিতায় আন্তরিকভাবেই নিজেদের সঁপে দেন। সুতরাং সাধারণ মনুষ্য সন্তানদের প্রতিযোগিতার লোভনীয় পুরস্কার দেখিয়ে শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জন করাতে পারলে ক্ষতির কিছু নেই।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী কর্তৃক অতি সম্প্রতি সূচিত বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এমনই একটি উদ্যোগ। বাংলাদেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠ এবং অভিজ্ঞ বৈজ্ঞানিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করতে শুধু বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডই নয়, গবেষকদের নানা ক্ষেত্রে গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বর্ণপদক দিয়ে থাকে। এ ছাড়া তরুণ গবেষক ও নারী গবেষকদের জন্য কনফারেন্স, তরুণ ছাত্রদের উৎসাহিত ও উজ্জীবিত করতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের কনফারেন্সে অংশগ্রহণ, ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াড এবং এসিএম প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে। অতি সম্প্রতি কৃষি গবেষণাকে জোরদার করার জন্যও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের সহায়তায় নানা প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যবস্থা করছে। তা ছাড়া জাতীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানেও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী যথেষ্ট তৎপর। সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী দেশের সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে অংশ নিয়ে থাকে।
আমাদের সমস্যাজর্জরিত দেশে সমস্যার অন্ত নেই। কেবল রাজধানীর যানজট সমস্যাই নাকি কম করে হলেও দৈনিক ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি নিশ্চিত করছে, সুপেয় পানির অভাব, পর্যাপ্ত বিদ্যুতের অভাব, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাব, জ্ঞান ও দক্ষতার অভাবে নিজেদের গ্যাস, কয়লা উত্তোলনের অক্ষমতা—এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী শ্রেয়তর পরিবেশে সরকারের থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করতে পারে, আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। রাশিয়া, হাঙ্গেরি কিংবা পোল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশের বিজ্ঞান একাডেমী দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া যে দেশের উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না, সেই দেশের বিজ্ঞান একাডেমী অধিকতর কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের বিজ্ঞান শিক্ষাকে জোরদার করতে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী আরও জোরালো ভূমিকা পালন করুক, এটাই সবার প্রত্যাশা।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বুয়েট ও ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী।

কানাডার পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে

কানাডার গভর্নর জেনারেল ডেভিড জনস্টোন গত শনিবার দেশটির পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে ২ মে নির্বাচন ঘোষণা করেছেন। গত শুক্রবার হাউস অব কমনসে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার সরকারের পতন হলে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার এ সিদ্ধান্ত হয়। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হারপার বলেন, ‘অনাস্থা ভোটে সরকার পতনের পর আমি গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে সম্মতি জানিয়েছেন।

মার্কিন রাজনীতিক ফেরারো আর নেই

যুক্তরাষ্ট্রের নারী রাজনীতিবিদ জেরালডিন ফেরারো মারা গেছেন। গত শনিবার বোস্টন নগরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১২ বছর ধরে তিনি ক্যানসারে ভুগছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
ফেরারো যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী, যিনি কোনো প্রধান রাজনৈতিক দলের হয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ওয়াল্টার ম্যানডেইলের সঙ্গে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। ওই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয় হয়েছিল।
ফেরারোর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রিপাবলিকান নেত্রী সারাহ পেলিন শোক প্রকাশ করেছেন।
ফেরারো ১৯৭৮ সালে নিউইয়র্ক থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন।

জনগণ ক্ষমতার উৎস তাদের হাতেই দায়িত্ব হস্তান্তর করব: সালেহ

ইয়েমেনের মারিব শহরে গতকাল রোববার সন্দেহভাজন আল-কায়েদা সদস্যদের হামলায় ছয়জন সেনা নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। এদিকে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী প্রবল আন্দোলন সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ আবারও পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, জনগণ ক্ষমতার উৎস, তাদের হাতেই দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। একমাত্র আলাপ-আলোচনাই হচ্ছে দেশ রক্ষার একমাত্র উপায়।
একজন সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গতকাল রাজধানী সানার পূর্বে অবস্থিত মারিব শহরে সন্দেভাজন আল-কায়েদার সদস্যরা একটি সেনাবহরে হামলা চালায়। এতে ছয়জন সেনা নিহত ও আরও চারজন আহত হন। স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, মারিব শহরের আল-কায়েদার সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা আয়েদ আল-সাবওয়ানির নেতৃত্বে ওই হামলা চালানো হয়। ইয়েমেনের সেনারা আইয়ান শহরে আল-কায়েদার সহযোগী একটি সংগঠনের ছয়জন যোদ্ধাকে হত্যার একদিন পর ওই হামলা চালানো হলো।
সালেহ বিরোধীদের আলাপ-আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে এর বিকল্প নেই।

সিরিয়ায় বিক্ষোভ চলছে, আরও ছয়জন নিহত

সিরিয়ায় বিক্ষোভ সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গতকাল রোববার দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লাতাকিয়ায় সেনারা প্রবেশ করেছে। শহরটিতে শনিবার গুপ্তঘাতকদের হামলা এবং সেনাদের গুলিতে ছয়জন নিহত হন। এঁদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর দুজন সদস্যও রয়েছেন।
এদিকে সিরিয়া সরকার ২৬০ জন রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার পর দেশজুড়ে কানাঘুষা শুরু হয়েছে যে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ শিগগিরই দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা দেবেন।
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ৩৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত লাতাকিয়া শহরে শনিবার গুপ্তঘাতকদের গুলিবর্ষণে নিরাপত্তা বাহিনীর দুজন সদস্য ও দুজন পথচারী নিহত হন।
একই দিন লাতাকিয়ার একটি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে দুজন নিহত হন। এ ঘটনা সম্পর্কে কায়রোয় সিরিয়ার মানবাধিকার-কর্মী আমর কুরাবি সাংবাদিকদের জানান, ক্ষুব্ধ জনতা ক্ষমতাসীন বাথ পার্টির একটি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করতে গেলে সেনারা গুলিবর্ষণ করে। এতে দুজন প্রাণ হারান। তবে কানাডায় অবস্থানরত সিরিয়ার ভিন্নমতাবলম্বী নেতা মামুন আল-হোমসি ওই ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন।
গুপ্তঘাতকদের হামলায় চারজন নিহত হওয়ার পর গতকাল সেনারা লাতাকিয়া শহরে প্রবেশ করে।

দুর্গত এলাকায় খাদ্য পানি ও ওষুধের তীব্র সংকট

ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মিয়ানমারের শান প্রদেশের দুর্গত এলাকায় খাদ্য, পানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের অনেক জায়গায়ই গতকাল রোববার পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীরা পৌঁছাতে পারেননি। বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পে কমপক্ষে ১৫০ জন নিহত ও ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মিয়ানমারের কর্মকর্তারা গতকাল জানান, ভূমিকম্পে কত লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটা তাঁরা এখনো জানেন না। তবে জানার চেষ্টা করছেন। গত বৃহস্পতিবার দেশটিতে ভূমিকম্প আঘাত হানে।
কর্মকর্তারা জানান, ভেঙে পড়া যোগাযোগ-ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এখন তাঁদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় কিংবা বড় ফাটলের সৃষ্টি হওয়ায় অনেক স্থানেই তাঁরা এখনো পৌঁছাতে পারেননি। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কতজন লোক বেঁচে আছে, তা-ও তাঁরা জানেন না।
শান প্রদেশের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা তাকলিকে কর্মরত রেড ক্রসের একজন কর্মী একটি বিদেশি বেতারকে জানিয়েছেন, একমাত্র সেখানেই ভূমিকম্পে দেড় শ লোক প্রাণ হারিয়েছে।

চুল্লিতে কোটি গুণ তেজস্ক্রিয়তা, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কর্মীদের

জাপানে ক্ষতিগ্রস্ত ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২ নম্বর চুল্লির ভেতরের পানিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় এক কোটি গুণ বেড়ে গেছে। গতকাল রোববার ওই চুল্লিতে কর্মরত সব কর্মীকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই কেন্দ্রের পাশের সাগরের পানিতেও অস্বাভাবিক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা হয়েছে।
কেন্দ্রের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো) জানায়, ২ নম্বর চুল্লির টারবাইন হাউসের পানিতে স্বাভাবিকের তুলনায় এক কোটি গুণ বেশি তেজস্ক্রিয়তা ধরা পড়ার পরপরই দ্রুত কর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কর্মীরা ওই টারবাইন হাউসের পানি পাম্পের সাহায্যে নিষ্কাশনের কাজ করছিলেন।
টেপকোর এক মুখপাত্র বলেন, তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এত বেড়ে যাওয়ার কারণ অনুন্ধান করে দেখা হচ্ছে। তবে তেজস্ক্রিয়তার কারণে এখন সেখানে কোনো কর্মী কাজ করতে পারছেন না।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ৩ নম্বর চুল্লির পানিতে ১০ হাজার গুণ বেশি তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা হয়। তখন ওই পানির মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়ায় তিন কর্মীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
ফুকুশিমা উপকূলের সাগরের পানিতেও তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। গতকাল পানিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় এক হাজার ৮৫০ গুণ বেশি। আগের দিন শনিবার তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ছিল এক হাজার ২৫০ গুণ।জাপানের পরমাণু ও শিল্প নিরাপত্তা সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিদেহিকো নিশিয়ামা বলেন, সামুদ্রিক স্রোতে তেজস্ক্রীয় পদার্থ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং তখন তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাও কমে যাবে। কাজেই এতে সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি হবে না এবং সামুদ্রিক খবারও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে না বলে জানান তিনি।
এদিকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক ইয়োকিয়া আমানো সতর্ক করে দিয়েছেন, জাপানের পারমাণবিক সংকট আরও কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাস প্রলম্বিত হতে পারে। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, সব দিক বিবেচনায় এটি একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা এবং শিগগির এর সুরাহা হচ্ছে না।
জাপানের সাবেক এই কূটনীতিক জানান, ওই চুল্লির পরমাণু কোর ও জ্বালানি রড ঠান্ডা রাখার জন্য পুরোপুরি পানিতে ঢেকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে কি না, কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত নয়। এ ছাড়া কেন্দ্রে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়ার কাজেও কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন না।

সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ

লিবিয়ার এক নারী একদল সরকারি সেনার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন। গতকাল রোববার রাজধানী ত্রিপোলির একটি হোটেলে উপস্থিত হয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে তিনি ধর্ষণ ও নির্যাতনের কাহিনি বর্ণনা করেন। তবে নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে ওই নারীর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ত্রিপোলির রিক্সোস হোটেলে বিদেশি সাংবাদিকেরা যখন নাশতা করছিলেন, সে সময় তিনি ওই হোটেলে প্রবেশ করেন। ৩০ বছর বয়সী ওই নারী নিজেকে ঈমান আল-ওবায়দি নামে পরিচয় দিয়ে পরনের কিছু বসন খুলে নির্যাতনের চিহ্ন দেখান সাংবাদিকদের।
ওবায়দি জানান, বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত বেনগাজি থেকে ত্রিপোলি ফেরার পথে গত বুধবার সরকারি সেনারা তাঁকে আটক করেন। এরপর টানা দুদিন তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। ১৫ সেনা তাঁকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নির্যাতনের চিহ্ন সাংবাদিকদের দেখিয়ে ওবায়দি বলেন, ‘আপনারা ছবি তুলুন এবং বিশ্বের কাছে আমার অবস্থা তুলে ধরুন।’ ওবায়দি তাঁর কথা শেষ করার আগেই হোটেলের কর্মীরা তাঁকে টেনেহিঁচড়ে সেখান থেকে বের করে দেন। পরে সরকারি লোকজন তাঁকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

গাদ্দাফি মিথ্যা বলে লড়াইয়ে নামিয়েছেন

লিবিয়ায় বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়া সেনারা দাবি করেছেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি মিথ্যা কথা বলে তাঁর অনুগত সেনাদের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, গাদ্দাফি তাঁদের বুঝিয়েছিলেন, আল-কায়েদা, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদসহ বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা ভাড়াটে লোক দিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, বিদেশিরা নয় বরং লিবিয়াবাসী স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত বেনগাজি শহরের কয়েকটি হাসপাতালে বেশ কয়েকজন বন্দী সেনা চিকিৎসাধীন রয়েছে। জোট বাহিনী অথবা বিদ্রোহীদের হামলায় আহত হয়ে এখন তাঁরা বন্দী অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আজুমি আলী মোহাম্মাদ আলী (২৫) এমনই একজন সেনা। প্রায় ৪০০ সেনার সঙ্গে তিনি আজদাবিয়া শহরের দিকে এগোচ্ছিলেন। মাঝপথে জোট বাহিনীর বোমা হামলায় তাঁরা ছত্র ভঙ্গ হন। তাঁর অনেক সঙ্গী মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বন্দী করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আলী বলেন, তাঁদের বলা হয়েছিল, মোসাদ ও সিআইএ এবং আল-কায়েদার সন্ত্রাসীরা লিবিয়ার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে বিদ্রোহ ছড়িয়েছে।

জোট বাহিনীর ওপর হত্যার দায় চাপাতে চাইছে গাদ্দাফি বাহিনী

লিবিয়ার নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনী তাদের হাতে নিহত লোকজনের দেহ যেসব এলাকায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে সেখানে নিয়ে ফেলছে। জোট বাহিনীর ওপর বেসামরিক লোকজনকে হত্যার দায় চাপাতে গাদ্দাফি বাহিনী এই কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস গতকাল রোববার এ অভিযোগ করেন।
সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘গাদ্দাফি বাহিনী নো ফ্লাই জোন এলাকায় বিমান হামলা চালিয়ে নিরপরাধ বেসামরিক লোকজনকে হত্যা করছে। আর এসব মৃতদেহ তারা যেসব এলাকায় গাদ্দাফি বাহিনীকে লক্ষ্য করে আমরা হামলা চালাচ্ছি সেখানে নিয়ে ফেলছে। আমাদের কাছে এ রকম গোয়েন্দা তথ্য আছে।’
সাক্ষাৎকারে গেটস লিবিয়ায় সেনা অভিযান চালানোর সময় বেসামরিক লোকজন যাতে হতাহত না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকায় জোট বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। ১৯ মার্চ লিবিয়ায় নো ফ্লাই জোন ঘোষণা করে জাতিসংঘ।
গত শনিবার গাদ্দাফি-সমর্থিত সেনাবাহিনীর একটি সূত্র অভিযোগ করে, ফ্রান্স ও যৌথ বাহিনীর অন্য সহযোগীরা লিবিয়ায় গণহত্যা চালাচ্ছে। এ বাহিনী কোনো বাছবিচার ছাড়াই সেনা কিংবা বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে। লিবিয়ার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আল-জাজিরা জানিয়েছে, জোট বাহিনীর বিমান হামলায় দেশটিতে এ পর্যন্ত শতাধিক বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তবে আহতের সংখ্যা জানাতে পারেনি তারা।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ ভারতের

আলোচনা শুরুর জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি এবং আইএসআইয়ের প্রধান সুজা পাশার সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইসলামাবাদে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে নির্দেশ দিয়েছে ভারত।
নয়াদিল্লি সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা সবুজসংকেত দিয়েছি।’ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক পুরো উপমহাদেশে গভীর প্রভাব ফেলে। ভারত এর আগেও কয়েকবার পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই উদ্যোগের আন্তরিকতা নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিল। কেননা, পাকিস্তানে এখন বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও ক্ষমতার মূল ভরকেন্দ্র তাদের সেনানিবাস বা সেনাবাহিনী। আর ভারত কখনো আলোচনায় সেনাবাহিনীকে দেখতে চায়নি। কিন্তু এবার ভারত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিল।
আগামী বুধবার ভারতের মোহালিতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের খেলায় মুখোমুখি হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান। ওই খেলা দেখার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। গিলানি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে খেলা দেখতে ভারতে যেতে রাজি হয়েছেন। এটা একটা ভালো অগ্রগতি। যদিও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ঘটনা খুব বেশি প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে না। তবে এতে সম্পর্কের গুমোট ভাব কিছুটা পরিষ্কার হতে পারে।
ভারতের দিক থেকে এই উদ্যোগের পুরোটাই মনমোহন সিংয়ের। মনমোহন মনেপ্রাণে চাইছেন প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে। কিন্তু এর আগে তাঁর কয়েকবারের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। এবারও পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া ভারত এখনো পায়নি।
পাকিস্তানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়-পর্যায়ের আলোচনায় ভারত যে সেনাবাহিনীকে জড়াতে চায় না, তার কারণ দুই দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশেষ করে ভারতের সেনাবাহিনী পুরোপুরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুগত। রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্তে তারা নাক গলাবে না। কিন্তু পাকিস্তানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সেখানে সেনাবাহিনীই সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। কাজেই ভারতের হয়তো এই উপলব্ধি হয়েছে যে পাকিস্তানের সঙ্গে তারা যদি সত্যিই সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে চায়, তাহলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পাশে সরিয়ে রেখে সেটা সম্ভব হবে না।

ব্রাজিলের জয়, ড্র আর্জেন্টিনার

ইউরোপজুড়ে চলছে ইউরোর বাছাইপর্বের আগুনে লড়াই। পরশু রাতে সেই লড়াইয়ে নেমেছিল জার্মানি, ইংল্যান্ডের মতো দল। কিন্তু ইউরো বাছাইপর্বের ম্যাচ নয়, পরশু বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের চোখ আটকে ছিল লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির দুটি প্রীতি ম্যাচে! প্রীতি ম্যাচ দুটি যে ছিল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার।
লন্ডনে আর্সেনালের এমিরেটস স্টেডিয়ামে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল স্কটল্যান্ড। নিউজার্সিতে আর্জেন্টিনা খেলেছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। একযোগে মাঠে নামলেও চিরশত্রুদের দিনটা একরকম যায়নি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিল জিতেছে ২-০ গোলে। নিজেদের মাঠে যুক্তরাষ্ট্র আর্জেন্টিনাকে রুখে দিয়েছে ১-১ গোলে।
ব্রাজিলের দুটি গোলই করেছেন নেইমার। ৪২ মিনিটে প্রথমটি পেনাল্টি থেকে, দ্বিতীয়টি ৭৭ মিনিটে। আর্জেন্টিনার গোলটি এস্তেবান কাম্বিয়াসোর। ৪২ মিনিটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন তিনি। কিন্তু মেসি-কাম্বিয়াসোদের জয়বঞ্চিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ স্ট্রাইকার অ্যাগুডেলো। ৫৯ মিনিটে গোল শোধ করেন অ্যাগুডেলো। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জার্সি গায়ে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেছেন ১৮ বছর বয়সী এ স্ট্রাইকার। তিন ম্যাচে তাঁর ২ গোল হয়ে গেল।
যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল ততটাই জনপ্রিয়, বাংলাদেশে যতটা বাস্কেটবল। তার পরও নিউজার্সির ইস্ট রাদারফোর্ড স্টেডিয়াম পরশু ভরে গেল ৭৯ হাজার ৮০০ দর্শকে। কারণ আর্জেন্টিনার খেলা, মেসি-জাদুর আকর্ষণ। আর্জেন্টিনা না পারলেও দর্শকদের হতাশ করেননি লিওনেল মেসি।
তীব্র শীতের রাতেও যেন আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলছিলেন দুবারের বর্ষসেরা মেসি। যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক কার্লোস বোকানেগ্রা তো বার্সেলোনা তারকার খেলা দেখে হতবাক, ‘এটা সত্যি অবিশ্বাস্য। সে কীভাবে এমন খেলে? এবং এখানে আমরা দেখলাম। ওকে এভাবে খেলতে দেখে আসলেই বিস্ময় লাগে, কারণ পেশাদার ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে আমরাও তো খেলছি।’
ব্রাজিলের জয়, আর্জেন্টিনার ড্রয়ের রাতে আনন্দে কেটেছে জার্মানি ও ইংল্যান্ডের। ইউরো বাছাইয়ে মিরোস্লাভ ক্লোসা ও টমাস মুলারের জোড়া গোলে জার্মানি বিধ্বস্ত করেছে কাজাখস্তানকে (৪-০)। ওয়েলসকে ২-০ গোলে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের গোলদাতা ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড ও ড্যারেন বেন্ট। এই জয়ে পাঁচ ম্যাচে সব কটি জিতে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে ‘এ’ গ্রুপের শীর্ষে জার্মানি। তবে ‘জি’ গ্রুপে তিন ম্যাচে এটি ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় জয়। ৭ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দুইয়ে ফ্যাবিও ক্যাপেলোর দল। চার ম্যাচে ১০ পয়েন্ট পাওয়া মন্টেনেগ্রো সবার ওপরে। এদিকে ড্র করেছে রাশিয়া ও ডেনমার্ক।

মিসবাহর কণ্ঠে দলীয় সংহতির জয়গান

বড় কোনো টুর্নামেন্টে ভারতকে সামনে পেলে মিসবাহ-উল-হকেরও হয়তো মনে পড়ে ওই সর্বনাশা স্কুপ। মনে না পড়লেই কী, কেউ না-কেউ ঠিকই মনে করিয়ে দেন। প্রশ্নটা যে হবেই, মিসবাহও বোধহয় তা জানেন। উত্তরটাও হয়তো অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করে রেখেছেন।
২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা ভেবে এই ম্যাচটা কি আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? মিসবাহর কণ্ঠে যেন রেকর্ড বাজল, ‘অতীত তো অতীতই। সব ম্যাচেই এমন কিছু না-কিছু থাকে। বাকি সব ম্যাচের মতোই এখানেও ভালো কিছু করতে চাই।’
বাকি সব ম্যাচের মতো? ভারত-পাকিস্তান বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল আর বাকি সব ম্যাচ এক নাকি! মিসবাহও নিশ্চয়ই তা মনে করেন না। বলার জন্য বলা। তিনি ভালোমতোই জানেন, এই একটা ক্রিকেট ম্যাচ যা খেলা ছাড়িয়ে সব সময়ই ভিন্ন মাত্রা পেয়ে যায়। এখানে জয়-পরাজয় শুধুই একটা ম্যাচ জেতা-হারা নয়। ডারবানের ওই দুঃস্মৃতি মুছে দেওয়ার প্রতিজ্ঞাটা মনে মনে রাখলেও পাক-ভারত লড়াইয়ের আলাদা তাৎপর্যটা ঠিকই বললেন, ‘এই ম্যাচ ঘিরে দর্শক-সমর্থকদের আগ্রহটাই এটিকে আলাদা করে দেয়। শুধু এই দুই দেশ কেন, অন্য দেশের মানুষও এই একটা ম্যাচের রেজাল্ট জানতে চায়।’
এই মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান সেই বিরল প্রজাতির পাকিস্তানি ক্রিকেটার, খেলার সঙ্গে লেখাপড়াটাকেও যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন। সেটির ছাপ কথাবার্তাতেও পড়ে। সবচেয়ে বেশি পড়ল, যখন এক সাংবাদিক বললেন—পাকিস্তানের বোলিং খুবই ভালো। কিন্তু ব্যাটিং তো খুব খারাপ। এই বিশ্বকাপে পাকিস্তানের পক্ষে একটিও সেঞ্চুরি নেই। সেরা বিশে নেই পাকিস্তানের কোনো ব্যাটসম্যান। মিসবাহ উত্তর দিলেন, ‘সেঞ্চুরি দিয়ে কী হবে? আসল ব্যাপার হলো জেতা। একটা সেঞ্চুরি না করেও যদি আমরা বিশ্বকাপ জিততে পারি তাতেই খুশি। অনেক সেঞ্চুরি-টেঞ্চুরি করেও যদি বাইরে চলে যাই, সেই সেঞ্চুরির কী দাম! সময়মতো ২০-৩০ রানও অনেক সময় সেঞ্চুরির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
তবে মিসবাহর কাছে আসল প্রশ্ন এর কোনোটাই নয়। টেস্ট দলের অধিনায়ক তিনি। এই বিশ্বকাপের কিছুদিন আগ পর্যন্তও কে অধিনায়ক—শহীদ আফ্রিদি, না মিসবাহ-উল-হক দোলাচল। দলে আছেন আরেক সাবেক অধিনায়ক ইউনুস খান। বাইরে বসে আছেন শোয়েব আখতার। অথচ পাকিস্তান দল শুধু মাঠের খেলার কারণেই খবর হচ্ছে—না, এই বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে একদমই পাকিস্তানের মতো লাগছে না! ঘটনা কী ভাই?
রমিজ রাজা পাকিস্তান দলে নতুন যে সংস্কৃতির আগমনী গান শুনছেন, মিসবাহও সেটিই শুনিয়ে গেলেন কাল সংবাদ সম্মেলনে। মতান্তর মানেই যে মনান্তর নয়—সেটি জানিয়ে বললেন, ‘মতের পার্থক্য তো হয়ই। তবে আমাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুব ভালো। অধিনায়ক কোচের সঙ্গে যেমন কথা বলেন, তেমনি সিনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গেও।’
অতীতের দলগুলোর সঙ্গে এই দলের বড় একটা পার্থক্যও তাই ধরা পড়ছে মিসবাহর চোখে, ‘আমরা এবার সত্যিকার একটা টিম হয়ে খেলছি। ব্যক্তিগতভাবে কেউই এমন বিরাট কিছু করে ফেলেনি, তার পরও দেখুন আমরা সেমিফাইনালে। কারণ একটাই, আমরা টিম হিসেবে খেলছি, যাতে প্রত্যেকে প্রত্যেকের ভূমিকা সম্পর্কে জানে।’
পাকিস্তান দলে এই সৌহার্দ্যের বাজনা এমনই উচ্চ স্বরে বেজে যাচ্ছে যে অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মিসবাহর কণ্ঠে আবেগ ছুঁয়ে যায়, ‘আক্রমণাত্মক মেজাজটাই ওর সবচেয়ে বড় শক্তি। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। এই বিশ্বকাপেই দেখুন না, একেবারে ঠিক সময়ে উইকেট নিয়ে নিচ্ছে। অধিনায়ক এমন পারফর্ম করলে দলের বাকিরাও পারফর্ম করতে চায়।’
ম্যাচটাকে পাকিস্তানের বোলিং বনাম ভারতের ব্যাটিং বলছেন অনেকে। পাকিস্তানের বোলিংয়ে যদি শোয়েব আখতারও যোগ হয়ে যান? মিসবাহ ‘এটা ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার’ বলে প্রথমে নিরাপদ পথে হেঁটেও গুরুত্বপূর্ণ দুটি লাইন যোগ করে দিলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাস বোলার। সেই ’৯৯ বিশ্বকাপে পর্যন্ত খেলেছে। ওকে নামিয়ে দিলে মনস্তাত্ত্বিক একটা সুবিধা হলেও হতে পারে।’

এবার নিজেদের ছাড়াতে চান টেলর

প্রচলিত ধারণা এমন, দল যেমনই হোক, বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনালে খেলবেই। এবার সেটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। বাংলাদেশের কাছে হোয়াইটওয়াশ, ভারতে গিয়ে ৫-০-তে হার, এর পর দেশের মাটিতে পাকিস্তানের কাছে সিরিজ হার, বিশ্বকাপের আগে মনে হচ্ছিল, তলানিতে ঠেকেছে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট। সেই দলটাও যখন শেষ চারে উঠল, ‘নিউজিল্যান্ড মানেই সেমিফাইনাল’ ধারণা প্রতিষ্ঠিত না হয়ে উপায় আছে?
‘এত ছোট দেশ, এত কম মানুষের দেশ হয়েও আমরা এতবার সেমিফাইনাল খেলেছি, আমি সত্যিই গর্বিত। মাত্র ৪০ লাখ লোকের এক দেশের জন্য এটা বড় একটা অর্জন’—ড্যানিয়েল ভেট্টোরি যা বললেন, খুবই সত্য কথা। কিউই অধিনায়ক গর্ব করতেই পারেন। তবে গর্বের এই রেকর্ডটার পাশে আছে একটা অস্বস্তিও। ১০ বিশ্বকাপের ছয়টিতেই সেমিফাইনাল, কিন্তু ফাইনাল যে খেলা হয়নি একবারও!
গর্বিত হচ্ছেন ভেট্টোরির ডেপুটি রস টেলরও। তবে এবার নিজেদের ছাড়িয়ে নতুন ইতিহাস গড়তে চান বিশ্বকাপের পর সম্ভাব্য নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক, ‘বারবার সেমিফাইনাল খেলার ইতিহাস নিয়ে আমি গর্বিত। তবে এই দল ইতিহাস নতুন করে লেখাতে চায়। আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি, আমাদের ফাইনাল খেলা সম্ভব, মঙ্গলবারই আমরা সেটা প্রমাণ করে দেব!’
টেলরের কণ্ঠের জোর থেকেই পরিষ্কার, কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়টা কতটা আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে কিউইদের। সেই আত্মবিশ্বাসের আগুনে এবার পোড়াতে চান শ্রীলঙ্কাকেও, ‘দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর আত্মবিশ্বাস আমরা শ্রীলঙ্কা ম্যাচে কাজে লাগাব। গ্রুপ পর্বে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলাটা আমাদের অবশ্যই বাড়তি সুবিধা দেবে। ওই ম্যাচে কিছু জিনিস আমার ঠিকঠাক হয়নি, সেসব এবার শোধরানোর চেষ্টা করব। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার ম্যাচটা খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখব। দেশের মাটিতে ওদের হারানো কঠিন হবে। কিন্তু আমরা ওদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে সেখানে আঘাত করার চেষ্টা করব।’
গ্রুপ পর্বে হারিয়েছে এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল পাকিস্তানকে, কোয়ার্টারে অন্যতম ফেবারিট দক্ষিণ আফ্রিকাকে। অথচ অনেকেই সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে মনে করছে ‘আগন্তুক।’ হয়তো গত কিছুদিনের পারফরম্যান্সের জন্যই। বাংলাদেশের কাছে হোয়াইটওয়াশ হওয়া দলকে তো কেউ পাত্তাই দেয়নি। টেলরের দাবি, এতে আখেরে লাভ হয়েছে তাঁদেরই, ‘বিশ্বকাপের বেশির ভাগ ম্যাচেই নিউজিল্যান্ড ছিল আন্ডারডগ, ব্যাপারটা আমরা উপভোগই করেছি। প্রতিপক্ষের ওপর প্রত্যাশার চাপ বেশি ছিল, এতে লাভ হয়েছে আমাদেরই। গত কিছুদিনের বাজে পারফরম্যান্সের পরও দলের সবার বিশ্বাস ছিল, আমরা পারব এবং আমরা সেটা করে দেখিয়েছি।’
গ্রুপ পর্বে দুই দলের লড়াইয়ে উড়ে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। কিন্তু অন্য দলগুলোর মতো শ্রীলঙ্কাও যদি পাত্তা দিতে না চায়, এবারও কিন্তু আখেরে লাভ হয়ে যেতে পারে কিউইদের!

আত্মবিশ্বাসী কামরান আকমল

স্পট ফিক্সিং কেলেঙ্কারি, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ইত্যাদি জটিলতা, বিতর্কের ঘেরাটোপ থেকে যেন গা ঝাড়া দিয়ে বেরিয়ে এসেছে পাকিস্তান। দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখিয়ে উঠে এসেছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের চোখে এখন ’৯২-এর স্মৃতি ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন জ্বলজ্বল করছে। আর তার চেয়েও বড় কথা, শেষ চারের লড়াইয়ে তারা মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের। দীর্ঘদিন পর ভারতের বিপক্ষে এ মহারণের জন্য এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। নিজ দেশের মাটিতে খেলা বলে ভারতকে অন্তত মানসিকভাবে হলেও কিছুটা এগিয়ে রাখছে অনেকেই। তবে ভারতকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা।
খুব খারাপ একটা সময় পার করে বিশ্বকাপে ভালো পারফরমেন্সের পর পাকিস্তানি শিবিরের আত্মবিশ্বাসও অনেক বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন উইকেটরক্ষক কামরান আকমল। তিনি বলেছেন, ‘আমি সব সময় ইতিবাচক ক্রিকেট খেলার চেষ্টা করি। আর ভারতের মাটিতে তাদের বিপক্ষে খেলার অনেক অভিজ্ঞতা আমার আছে। কাজেই আমি এ লড়াইটার জন্য মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত।’ শুধু তিনি নিজেই না, পুরো দলই মোহালির দিবা-রাত্রির ম্যাচটায় মাঠে নামার জন্য মুখিয়ে আছে বলে জানিয়েছেন আকমল। বলেছেন, ‘অনেক দিক দিয়েই এই ম্যাচটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা শুধু বিশ্বকাপে ফাইনালে যাওয়ার লড়াই-ই না। ম্যাচটা জিততে পারলে দীর্ঘদিন পর ভারতে প্রত্যাবর্তনটাও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দলের সবাই এটা বেশ ভালো মতোই বুঝতে পারছে।’
বাজে কিপিংয়ের কারণে কিছুদিন আগে চরম সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন কামরান আকমল। আবারও তাঁকে সেই প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি এসব সমালোচনার কথা এককথায় উড়িয়ে দিয়েছেন। পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে এখনো তাঁর অনেক কিছু দেওয়ার আছে মন্তব্য করে কামরান বলেছেন, ‘আমার কাছে এখন সেমিফাইনালটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই। আমি সংবাদপত্রও পড়ি না, টেলিভিশনও দেখি না। আমাকে নিয়ে মিডিয়া যা খুশি লিখতে পারে, আমার কিছুই যায় আসে না। কারণ, পাকিস্তান ক্রিকেট দলকে আমার এখনো অনেক কিছু দেওয়ার আছে।’

হতাশায় মুহ্যমান প্রোটিয়া ক্রিকেট

দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এসেছিল ‘চোকার্স’ অপবাদটা ঘোচাতে। দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখিয়ে, গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান দখল করে উঠে এসেছিল কোয়ার্টার ফাইনালেও। অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন বিশ্বকাপটা এবার প্রোটিয়াদের ঘরেই যাবে। কিন্তু হলো না। কোয়ার্টার ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৪৯ রানের হারে আবারো চূড়ান্ত হতাশা দিয়েই শেষ হলো দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ স্বপ্ন। যে নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরুর কয়েকদিন আগে এই উপমহাদেশ থেকে ফিরে গিয়েছিল টানা ১১টি ম্যাচে হারের লজ্জা নিয়ে, তাদের কাছেই পরাজয় অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথকে একেবারে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। রীতিমতো বাকহীন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এই ব্যর্থতার ধাক্কা সামলে উঠতেও অনেকদিন লেগে যাবে বলেই মনে করেন স্মিথ।
কোয়ার্টার ফাইনালে জয়ের লক্ষ্যটা খুব বেশি ছিল না। মাত্র ২২২ রান। চার উইকেটের বিনিময়ে স্কোর বোর্ডে ১২১ রান জমাও করে ফেলেছিলেন স্মিথ, ক্যালিস, ডি ভিলিয়ার্সরা। কিন্তু এরপর যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং অর্ডার। মাত্র ৫১ রান সংগ্রহ করতেই ধরাশায়ী হলেন বাকি ৬ ব্যাটসম্যান। গ্রুপ পর্বে তাদের দুর্দান্ত পারফরমেন্সও প্রায় ম্লান হয়ে গেল এই ব্যাটিং বিপর্যয়ে। বিশ্বকাপ থেকে এই হতাশাজনক বিদায়ের পর গ্রায়েম স্মিথ বলেছেন, ‘আমরা কয়েকটি ম্যাচে খুব ভালো খেলেছিলাম। এখান থেকে আমাদের অনেক প্রাপ্তিও আছে। কিন্তু এখন দলের জন্য এই বিশ্বকাপের স্মৃতিটা খুব বেদনাদায়ক হয়েই থাকবে। আমাদের নিকট ভবিষ্যত্টাও খুব হতাশায় কাটবে। আমি জানি সবাই আবার একটা সময় খুব ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু আমরা কেউই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারব না। এবারের বিশ্বকাপটা জেতার খুবই সুবর্ণ সুযোগ ছিল আমাদের সামনে। কিন্তু এভাবে ছিটকে যাওয়ার জন্য এখন শুধু নিজেদেরকে দোষারোপ করা ছাড়া, আর কিছুই করার নেই আমাদের।’
তবে ভবিষ্যত্টাকে হতাশাচ্ছন্ন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও একেবারেই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন না স্মিথ। ইমরান তাহির, স্টেইন, মরকেল, বোথা, পিটারসেনরা আবার দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে যেতে পারবে বলেই আশা করছেন তিনি। বলেছেন, ‘বিশ্বকাপের পুরোটাই যে ব্যর্থতা, এমন না। দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেট একটা নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে একসঙ্গে অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার আছে।’

একাদশ নিয়ে নির্ভার ভারত

বিশ্বকাপ সাধারণত সেই দলই জেতে যে দলের খেলোয়াড় নির্বাচনে স্থিতিশীলতা থাকে। অতিমাত্রায় পরিবর্তন, একে নেওয়া, আরেকজনকে বাদ দেওয়ার ব্যাপার যে দলে থাকে, তারা বিশ্বকাপ জিততে পারে না। এটা ধ্রুব সত্য।
এবারের বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের প্রথমদিকে এ পরিবর্তনের ব্যাপারটি পুরোমাত্রাতেই ছিল। গ্রুপ পর্যায়ের বেশির ভাগ ম্যাচে ভারত যে একাদশ খেলিয়েছে, তাতে সাফল্যের অনুষঙ্গ ছিল না। খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে ছিল না আস্থার ছাপ। যাঁরা একাদশে খেলছিলেন, তাঁদের অনেকের পারফরম্যান্সে ছিল যথেষ্ট উত্থান-পতন। আর সে কারণেই একাদশ নির্বাচনে নির্বাচকেরা বাধ্য হয়েছেন হস্তক্ষেপ করতে।
পীযূষ চাওলার অন্তর্ভুক্তি প্রথম থেকেই প্রশ্নের উদ্রেক করেছিল। রবিচন্দ্রন অশ্বিনকে বসিয়ে রাখা, সুরেশ রায়নার বিনিময়ে ইউসুফ পাঠানকে বারবার খেলিয়ে যাওয়ায় সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। পেসার আশিস নেহরা ও শ্রীশান্তও নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি একেবারেই।
তবে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের জয়টিই এক ধাক্কায় সবকিছু বদলে দিয়েছে। এ জয় কেবল ভারতের সেমিফাইনালই নিশ্চিত করেনি, ভারতকে একটি সেরা একাদশ বেছে নিতেও দারুণ সহায়তা করেছে। এটা নিশ্চিত, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যে একাদশটি খেলিয়ে ভারত জয় পেয়েছে সেমিফাইনালে এটিই হবে ভারতের জন্য একাদশ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সেরা পছন্দ। আর, সেমিফাইনালে জিতে ভারত যদি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার সুযোগ পায়, তাহলে এ ১১ জনই ভারতের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ে রাখবেন প্রধান ভূমিকা।
পীযূষ চাওলার পরিবর্তে রবিচন্দ্রন অশ্বিনের অন্তর্ভুক্তি একাদশ নিয়ে বিতর্কের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে। সুরেশ রায়নাও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ এক ইনিংস খেলে ভারতের ব্যাটিংয়ের সাত নম্বর স্থানটিতে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন আত্মবিশ্বাস।
আহমেদাবাদ ম্যাচের পর ভারতের একাদশ মোটামুটি স্থিতিশীল চেহারায় থাকলেও মুনাফ প্যাটেল এই একাদশে নিজের অবস্থান নিয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারছেন না। মুনাফ ভারতের কন্ডিশনে এখন পর্যন্ত নিজেকে কার্যকরী প্রমাণ করতে পারেননি। সেমিফাইনালে মোহালিতে তাঁর স্থান শেষ মুহূর্তে অন্য কেউ নিয়ে নিলেও নিতে পারেন। তবে এ পর্যন্ত নেহরা কিংবা শ্রীশান্তও পারফরম্যান্সে মুনাফকে ছাড়িয়ে যেতে না পারায় মুনাফ কিছুটা নিরাপদ বোধ করলেও করতে পারেন।
ভারতের মূল একাদশে জহির খানকে নিয়ে কোনো সংশয় নেই। তিনি তাঁর পারফরম্যান্স দিয়েই প্রমাণ করেছেন তিনিই ভারতের সেরা গতি অস্ত্র। মোহালির উইকেটে সন্ধ্যায় পেসাররা ঐতিহাসিকভাবেই সুবিধা আদায় করে নেন। এ ক্ষেত্রে গত জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে মুনাফের পারফরম্যান্সের বিচারে তিনিই হতে পারেন ভারতের তুরুপের তাস। তবে নির্বাচকেরা জহির খানের সঙ্গী নির্বাচনে যে ব্যাপারটি ভাবছেন, তা হলো, কোন পেসার এই কন্ডিশনে ব্যাটসম্যানকে ক্রিজে বেঁধে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সেদিক দিয়ে নেহরা ও শ্রীশান্তের চেয়ে কয়েক ক্রোশ এগিয়ে রয়েছেন মুনাফ প্যাটেল।
এ মুহূর্তে ভারতীয় দল অনেকটাই নির্ভার হয়ে বুধবারের ম্যাচের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। একাদশ মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার কারণে টিম ম্যানেজমেন্টও পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের প্রস্তুতি-পরিকল্পনা চালিয়ে যেতে পারছেন দারুণ নিশ্চিন্তে। চাপের এই ম্যাচের প্রাক্কালে একাদশের দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাওয়ায় ভারতীয় দল অনেকটাই হালকা বোধ করতে পারে।
অন্যদিকে, নিজেদের নিয়ে নির্ভার পাকিস্তান দলও। চাপটাপ দূরে ঠেলে উপভোগ তত্ত্বেই আস্থা রাখছে শহীদ আফ্রিদির দল।
সব মিলিয়ে ক্রিকেটানুরাগীরা এবার নিয়ে নিতে পারেন জম্পেশ এক খেলা উপভোগের প্রস্তুতি। মোহালি আপনাদের নিরাশ করবে না

নিয়ামুলের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন চাই by মিজানুর রহমান খান



শিশু নিয়ামুলকে আপনারা চেনেন। গত ৩০ ডিসেম্বর প্রথম আলোসহ কয়েকটি পত্রিকায় খবর ছাপা হয় যে শিশুদের পঙ্গু করে নামানো হচ্ছে ভিক্ষায়। একেবারে হইচই ফেলে দেওয়া খবর। এ ঘটনা শুনে অনেকেই স্তম্ভিত হন। ভাবেন, আমরা কোথায় যাচ্ছি? আদালত ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন এ ঘটনা পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর। এই শিশুটিকে ঘিরে দুটো পরস্পরবিরোধী গল্প। এর তদন্ত চলছে। কিন্তু এটা এতই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর যে যাকে হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ যথেষ্ট সংগত কারণেই ‘উচ্চ অগ্রাধিকার’ দেন। সন্দেহভাজন বলে যারা প্রচারিত, তাদের অন্যতম নাজমা আক্তার। তাকে বলা হচ্ছে ‘গডমাদার’।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) লালমাটিয়ার ভবনে কথা হলো পরিচালক নূর খানের সঙ্গে। প্রায় দেড় দশক ধরে তিনি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করছেন। তিনি আমাকে অনুযোগের সুরে বললেন, মিডিয়া মানবাধিকার প্রশ্নে সাধারণত ভালো ভূমিকা রাখে। কিন্তু কখনো কখনো গুরুতর বিভ্রাট ঘটে। তাঁর সঙ্গে আলোচনার নির্যাস হলো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি কখনো বিপত্তি ঘটাতে পারে। আমি এক উপকূলীয় জেলায় র্যাবের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির কথা জানি। তারা দেখিয়েছে, একটি ইটের ভাটায় শ্রমিকদের ডান্ডাবেড়ি পরানো হয়। ওই ইটের ভাটা একজন সংখ্যালঘু কলেজশিক্ষক ও চিকিৎসক পরিবারের। সেই খবর প্রথম আলোয়ও ছাপা হয়েছে। পরে শুনেছি, তাতে প্রতিপক্ষের হাত ছিল। জব্দ করতে ডান্ডাবেড়ির ঘটনা সাজানো হয়।
নিয়ামুলের ঘটনা আরও বিশ্বাসযোগ্য ছিল। র্যাবের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন হয় গত ২৯ ডিসেম্বর। সেখানে কথিতমতে পঙ্গু করে ভিক্ষুক বানানো চক্রের সদস্য শরিফুল ইসলাম ওরফে কুরবান হাজির হন। টিভি অনুষ্ঠান সূত্রে র্যাব অভিযান চালায়। ওই অনুষ্ঠান করেন এলিনা খান ও রোকেয়া প্রাচী। দুজনই স্বনামধন্য। তাঁরাই র্যাবের কাছে তথ্য-প্রমাণ হাজির করেন। তাঁরা সংবাদ সম্মেলনে হাজিরও ছিলেন। সুতরাং, দৃশ্যত মিডিয়া যথাসংগত কারণেই গুরুত্ব দিয়েছে।
আমার লেখার উদ্দেশ্য হলো, আসক এ বিষয়ে একটি প্রাথমিক তদন্ত চালিয়েছে। অভিযুক্ত ও পার্শ্বচরিত্রগুলোর জবানবন্দি রেকর্ড করেছে। আর তা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং বিশেষ বিবেচনার দাবি রাখে। আমরা দেশের বরেণ্য মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামালের মন্তব্য গুরুত্ব না দিয়ে পারি না। গতকাল তিনি টেলিফোনে আমাকে বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছি যে অভিযুক্ত নাজমা আক্তার এর সঙ্গে জড়িত নন।’ আসকের অনুসন্ধান সত্য হলে পুরো বিষয়টি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যাবে। আইনজীবী এলিনা খান গতকাল আমাকে বলেন, হাইকোর্টে গত ৯ মার্চ সর্বশেষ শুনানি হয়। সেদিন র্যাবের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা এম এ বাতেন আদালতে বক্তব্য দেন। তিনি তথ্য দেন যে অভিযুক্তদের মধ্যে একমাত্র নাজমা আক্তারই পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
প্রথম আলোর ৩০ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনের বর্ণনায় আট-নয় বছরের এক শিশুকে জড়সড় করে আটকে রাখা হয়েছিল অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলের ভেতর। টানা ছয় মাস। খাবার বলতে দিনে একবার। সামান্য ভাত কিংবা রুটি। দিনে দিনে শিশুটি হয়ে পড়ে কঙ্কালসার। এরপর তাকে ভাড়া দেওয়া হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। ১৯ জানুয়ারি ২০১১ দৈনিক জনকণ্ঠ-এর শিরোনাম, সেই শিশুর অঙ্গহানির বিবরণ এলাকাবাসীর মতে সাজানো নাটক। সাজানো হলো ভিক্ষাবৃত্তির কাহিনি।
আসকের দুজন কর্মকর্তাও বিষয়টি অনুসন্ধান করেন। তাঁদের বর্ণনায়, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১০ তিন শিশু নিয়ামুল, রাসেল ও ইমরান মার্বেল খেলছিল। রাসেল ও ইমরান তার পুরুষাঙ্গ কাটে। এরপর তারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি ওমর ফারুকের কাছে বিচার দেয়। তিনি কামরাঙ্গীরচর থানাকে জানান। পুলিশ রাসেল ও ইমরানকে ধরে নিয়ে যায়। থানা ও আদালতে মামলা হয়। নিয়ামুল ও রাসেলের পরিবার নাজমার বাসায় ভাড়া থাকে।
পরে এই নাজমা বেগমকে আমরা পাই পত্রপত্রিকার রিপোর্টে। কামরাঙ্গীরচর এলাকায় ওমর ফারুক ও নাজমা বেগমের নেতৃত্বে একটি চক্র শিশুদের বিকলাঙ্গ করে তাদের দিয়ে ভিক্ষাবৃত্তির কাজ করাচ্ছে। টিভিতেও এর সম্প্রচার ঘটে।
কয়েকটি বিষয় দেখে মনে হয়েছে, বিষয়টি খুবই জটিল। প্রশ্নজাল তৈরি করে। প্রথমত, গত সেপ্টেম্বরে মার্বেল খেলার ঘটনার জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছিল কি না? এর প্রায় দুই মাস পর ইমরানের বড় ভাই কুরবান আলীকে র্যাব অপহরণ করেছিল কি না? র্যাব-১ তাঁকে আটক করেছিল কি না? তাকে নির্যাতন করে নিয়ামুলের ঘটনার মূল হোতা হিসেবে ওমর ফারুক, নাজমা বেগমসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তৈরি করেছিল কি না? পরে ওমর ফারুককে র্যাব চার দফায় মোট ১২ দিন রিমান্ডে নিয়েছিল কি না? সে সময় তাঁকে ইলেকট্রিক শক বা নিপীড়ন চালানো হয়েছিল কি না? এবং তাঁর কাছ থেকে সাজানো জবানবন্দি আদায় করা হয়েছিল কি না?
আসকের কাছে কারাবন্দী ওমর ফারুক বলেন, ‘আমি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। এ ঘটনায় আমি সালিস করেছিলাম। নিয়ামুলের বাবা ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। তখন রাসেল ও ইমরানের বাবা বলেছেন, “আমরাও গরিব, এত টাকা দিতে পারব না।” তখন কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। এরপর হঠাৎ করেই ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। আমাকে র্যাব আটক করে। র্যাব ১০ দিন ও পুলিশ দুই দিন রিমান্ডে নিয়েছে। নির্যাতনের কারণে র্যাব যা শিখিয়ে দিয়েছে, তা-ই বলেছি। নাজমা আক্তারকে ফুফু বলে জানি। তাঁর নাম আমাকে বলতে বাধ্য করেছে। ঘটনা হয়েছে বাচ্চাদের সঙ্গে বাচ্চাদের। অথচ টেলিভিশন ও পেপারে সাংবাদিকদের সামনে আমাকে দিয়ে বলতে বাধ্য করেছে, আমরা শিশুদের নুলা করে ভিক্ষা করাই। এসবই মিথ্যা ও বানোয়াট।’
কুরবান এই গল্পের মুখ্য চরিত্র। হাইকোর্টের আদেশেও এসেছে তাঁর নাম। ৯ জানুয়ারি আদালত লিখেছেন, ‘অভিযুক্ত কুরবানের বিবৃতিতে যাদের নাম এসেছে, সেই সব অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে আইজিপি ও মহানগর পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হলো। এবং যখন উপযুক্ত মনে হবে, তখন তাঁরা রিমান্ড প্রার্থনা করবেন।’ আদালতের আদেশে আরও বলা হয়, ‘কদমতলীর ওসি যথাসম্ভব শিগগির ইনভেস্টিগেশন সম্পন্ন করবেন। আমরা অভিযুক্ত কুরবানকে গ্রেপ্তার এবং অশুভ চক্রের উদ্ঘাটন র্যাব সদস্যদের চমৎকারিত্বপূর্ণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করছি।’
৬ মার্চ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আসকের কাছে তাঁর দাবি: ‘আমার নাম কুরবান আলী। অথচ র্যাব মামলায় আমার নাম দিয়েছে শরিফুল ইসলাম কুরবান। আমার নাম কোনো দিনও শরিফুল ইসলাম কুরবান ছিল না।’ গত ৩০ ডিসেম্বর প্রথম আলোর রিপোর্টেও “শরিফুল ইসলাম” দেখেছি। তিনি আসককে বলেন, ‘আমি একটি চায়ের দোকান চালাই। হঠাৎ একদিন কিছু লোক মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। আমার চোখ বেঁধে ফেলে। চোখ খুলে দেখি একটি কক্ষ। চার-পাঁচজন লোক। একজনকে চিনি। তিনি এলিনা খান।’ এলিনা গতকাল তা অস্বীকার করেন। তবে কুরবান আসককে বলেন, নির্যাতিত হয়ে তাঁকে বলতে হয়, ‘পঙ্গু করে আরও অনেককে ভিক্ষাবৃত্তি করিয়েছি। তারা আমাকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়েছে।’
শিশু নিয়ামুলের ঘটনায় অভিযুক্ত ইমরানের মা আয়েশা বেগম আসককে নিশ্চিত করেন যে ‘মার্বেলের ঘটনার পর পুলিশ ইমরান ও রাসেলকে আটক করেছিল। আদালত তাদের গাজীপুরের শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠিয়েছিল। পক্ষকাল পর ইমরান জামিনে বের হয়ে আসে। এলিনা খান গতকাল আমাকে বলেন, ‘ওই আটক ও মামলা ছিল সাজানো।’ আরটিভির ক্রাইম রিপোর্টে ভিক্ষাবৃত্তির বিষয়টি প্রকাশ পায়। র্যাবের সন্দেহভাজন নাজমা আক্তার ২ মার্চ ২০১১ আসকের অফিসে যান। তিনি মার্বেল খেলা ও সেটা নিয়ে পরবর্তী ঘটনার বিবরণ দেন। বলেন, ‘নিয়ামুল ও রাসেলের পরিবার আমার বাড়িতে ভাড়া থাকে। তারা উভয়েই দরিদ্র পরিবারের শিশু। একটা আপস হয়েছিল। আপসনামায় সাক্ষীদের মধ্যে আমি প্রথম সই করি। ওমর ফারুকও সই করেন। কিন্তু নিয়ামুলের বাবা উমেদ ও অভিযুক্ত রাসেলের বাবা এতে সই দেননি। ওই সালিসের দুই দিন পর এলিনা খান ও রোকেয়া প্রাচী নিয়ামুলের ঘটনার বিষয়ে সাক্ষাৎকার নেন।’
শিশু নিয়ামুলের ঘটনায় অভিযুক্ত ইমরানের বাবা আবদুল জব্বার ৮ মার্চ আসকের অফিসে যান। তিনিও মার্বেল ও মারামারির বিবরণ দেন। ইমরানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, নাজমা বেগমের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না। তাঁর কথা, ‘নিয়ামুলের ঘটনার আগে থেকে আজ পর্যন্ত আমি নাজমা খালাকে দেখিনি এবং তাঁর সঙ্গে এ ব্যাপারে আমার কোনো কথা হয়নি।’
সবচেয়ে লক্ষণীয় হচ্ছে, কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম সিকদার জানান, মার্বেলের ঘটনায় রাসেল ও ইমরানকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। থানায় মামলা হওয়ার পর একই বিষয়ে নিয়ামুলের বাবা আদালতে আরেকটি মামলা করেন। তিনি বলেন, এ মামলার তদন্তভার পুলিশের কাছে নেই। র্যাব-১ তদন্ত করছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা র্যাব-১-এ কর্মরত এএসপি বাতেন আসকের কর্মীকে ফোনে জানান, ‘ভিকটিম শিশুকে আপনারা পাবেন না। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সে আমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।’
বিচারপতি এ এইচ এম সামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ২ জানুয়ারি ২০১১ একটি সুয়োমোটো রুল জারি করেন। সেই রুলের অন্যতম জিজ্ঞাসা ছিল অভিযুক্ত ‘কুরবান’কে রিমান্ডে নিতে তাঁরা কেন আবেদন করেননি। তাঁরা কেন রমজান, সাদ্দাম, ইমরান, রাসেল, ওমর ফারুক, সালাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ থেকে প্রশ্ন ওঠে, ইমরান ও রাসেলের পূর্ববর্তী গ্রেপ্তারের তথ্য আদালতের গোচরে আনা হয়েছিল কি।
৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগের আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, এসআই নুরুল আলমের ভূমিকা এই ‘বিয়োগান্ত উপাখ্যানে’ কী ছিল, সেটা উদ্ঘাটন প্রয়োজন। সেটা হয়তো একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত চক্রের অংশ হতে পারে। তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব থেকে তাঁকে অপসারণ করতে নির্দেশ দেওয়া হলো। এবং তাঁকে অবিলম্বে বরখাস্ত করতে হবে। বিভাগীয় মামলা দায়ের করতে হবে।
হাইকোর্ট র্যাবকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এতে অভিযুক্তদের মনে বিচার লাভের অনুভূতি অনেক কম সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে হয়। আদালত বলেছেন, ‘একজন উপযুক্ত তদন্ত কর্মকর্তা, সেটা র্যাব থেকেই হলে ভালো হয়, পুরো সত্য ঘটনা উদ্ঘাটনে নিয়োগ করতে হবে। আমরা এ বিষয়টিকে উচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানের নির্দেশনা দিচ্ছি। এটা হয়তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গডফাদাররা হয়তো এ ক্ষেত্রে বহুসংখ্যক সংগঠিত চক্র গড়ে তুলেছে।’ এর পরও কোনো সরকারি তদন্তের ফলাফল বের হয়নি। অথচ আদালত বলেছেন, নিয়ামুল র্যাবের হেফাজতে থাকবে। কারণ, নিয়ামুল এই বিষয়ের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। তাই র্যাবের মহাপরিচালক নিয়ামুলের সুরক্ষা নিশ্চিত করবেন।’
আমরা মনে করি না যে র্যাব বা অন্য কোনো সংস্থার তদন্তে এর সুষ্ঠু সুরাহা মিলবে। শুনেছি ড. কামাল হোসেনকে নথিপত্র দিয়েছে আসক। তিনি নাকি একটু চোখ বুলিয়ে বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। জনকণ্ঠ পত্রিকার রিপোর্ট আদালতের গোচরে এসেছে। আদালত বলেছেন, ‘তদন্তের স্বার্থে আরও রিপোর্ট না করাই সমীচীন।’ নাজমা সম্পর্কে সুলতানা কামালের বক্তব্য গতকাল এলিনার নজরে আনি। তিনি সুলতানাকে সরাসরি নাকচ করেননি। তিনি বলেন, নাজমার ভূমিকা শুরু থেকেই বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ। এলিনা নিশ্চিত করেন যে, এ ঘটনার বিষয়ে আদালতের নির্দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শক্তিশালী কমিটি করেছে। কদমতলী থানাকে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলেছেন। কেউ দেয়নি। তদন্ত বলতে এলিনার মানবাধিকার ফাউন্ডেশন আদালতকে তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে। এ জন্যই আমি একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন দ্বারা পুরো ঘটনার তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। স্বল্পতম সময়ে জনসমক্ষে তার প্রকাশ আশা করি। এলিনাও এই দাবির সঙ্গে একমত হন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ও আমাদের অগ্রগতি-অধোগতি by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ যৌক্তিকভাবেই ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সংকল্পবদ্ধ। বর্তমান সরকার জাতিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য, সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিগত দশকগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিজ্ঞানের ছাত্রসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। শুধু তাই-ই নয়, ছাত্রজীবন শেষে শ্রেয়তর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকারী কর্মজীবনের জন্য বিজ্ঞানের ছাত্ররা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিদ্যা ও গণিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ভিন্ন বিষয়ে লেখাপড়া করে তাদের বিজ্ঞানের সুপ্ত প্রতিভাকে অকালে শেষ করে দিচ্ছে। এই মেধাকে যথাযথভাবে বিকশিত করে দেশ গড়ার কাজে ব্যবহার করার দায়িত্ব সরকারের। দেশের বাণিজ্যনীতি, বিনিয়োগনীতি দেশীয় শিল্প বিকাশের অনুকূল হওয়া উচিত। বিশ্বের এক-সহস্রাংশ ভূখণ্ডে পৃথিবীর ২৩ সহস্রাংশ মানুষের বাস—মালয়েশিয়ান পরোটা, বিস্কুট আর ভুটানের ফলের রস খেয়ে এত বড় দেশ উন্নতির পথে এগোতে পারে না, নিজেদের উৎপাদন করতে পারতে হবে, নিজেদের পণ্য ব্যবহার করে ধন্য বোধ করতে হবে।
দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার এমন নিরস অবস্থায় বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী বিজ্ঞান শিক্ষাকে উৎসাহিত করতে, ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে দেশব্যাপী ২০১০ সাল থেকে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজন করছে। এ বছর সারা দেশের ১২টি কেন্দ্রে এই বিভাগীয় অলিম্পিয়াড মার্চ মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়। এই কেন্দ্রগুলো ছিল হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রযুক্তি ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রযুক্তি ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম কারিগরি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল ও কলেজ, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ও নটর ডেম কলেজের ১২টি কেন্দ্রের প্রায় ৩০০ বিজয়ী বিগত ২৫ মার্চ রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়। সকাল আটটায় দূরদূরান্ত থেকে লাল টি-শার্ট পরে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হয়। জাতীয় অলিম্পিয়াডের উদ্বোধন ঘোষণা করেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমীর সম্মানিত সভাপতি বিশিষ্ট পরমাণুবিজ্ঞানী অধ্যাপক শমসের আলী এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শাহ এ আলম। এরপর ছাত্ররা নয়টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়, যেখানে তাদের দুই ঘণ্টা সময়ে প্রতি বিষয়ে ১৫টি করে জীববিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের চ্যালেঞ্জিং প্রশ্নের উত্তর করতে হয়। এই অলিম্পিয়াড এসএসসি ও এইচএসসি এই দুই বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৮০টি স্কুল-কলেজ এই প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করেছে। অলিম্পিয়াড পরীক্ষার পর ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে সমবেত হয়। উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে ছাত্ররা অনেক সৃজনশীল প্রশ্ন করে তাদের অনুসন্ধিৎসু মনের প্রকাশ ঘটায়। ছাত্রদের বিজ্ঞান নিয়ে নানা কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দেন একাডেমীর সভাপতি অধ্যাপক শমসের আলী, একাডেমীর ফেলো অধ্যাপক কাজী আবদুল ফাত্তাহ, অধ্যাপক মেসবাহউদ্দিন আহমাদ, অধ্যাপক আলী আসগর, অধ্যাপক নাইয়ুম চৌধুরী।
দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের সান্নিধ্য নিশ্চয়ই আমাদের স্কুল-কলেজের ছাত্রদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াডে সূচিত রুবিক কিউর প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকেরা যে কষ্ট স্বীকার করে তাঁদের ছেলেমেয়েদের বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন, তা থেকে অত্যন্ত এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বিজ্ঞান শিক্ষায় গুরুত্ব অনুভব করে। এবার সরকারকে বিজ্ঞান শিক্ষায় অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা যদি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নশাস্ত্র, জীববিজ্ঞান পড়ে চাকরি না পায়, তাহলে তারা যে বিষয়ে পড়লে চাকরিপ্রাপ্তি নিশ্চিত হবে, তা-ই পড়াবে এবং আমাদের ছেলেমেয়েরা তা-ই করছে। এ কারণে বিজ্ঞান শিক্ষার হার হ্রাস পাচ্ছে।
আসছে অক্টোবরে সাংহাই শহরে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় কনফারেন্স শুরু হতে যাচ্ছে। এর আগের কনফারেন্সগুলোতে জ্ঞানতাপসেরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া উন্নয়নশীল দেশসমূহ একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। এ কারণে এই জনবহুল দেশটির অগ্রগতি নিশ্চিত করতে শুধু বিজ্ঞান শিক্ষা নয়, বিশ্বমানের বিজ্ঞান শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ঔপনিবেশিক বৈরী পরিবেশে জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন বোস, মেঘনাদ সাহা যে বৈজ্ঞানিক প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে তার ধারাবাহিকতা রাখতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি, বিশ্ব জ্ঞানভান্ডারে আমাদের সঞ্চয় সময়ের সঙ্গে হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি।
আমাদের নানা সরকার শিক্ষার সর্বোচ্চ বরাদ্দের ঢাক বাজালেও আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় শিক্ষায় আমাদের বরাদ্দ অপ্রতুল। এই দুর্বল অর্থনীতির দেশে বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য উন্নত মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা মোটেই সহজ কাজ নয়। তবে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শিক্ষা খাতে ডিজিটাল টেকনোলজির জুতসই ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার মান অবশ্যই বাড়ানো সম্ভব। অভিজ্ঞ ও উচ্চশিক্ষায় পৌঁছাতে শিক্ষকদের দিয়ে তৈরি পঠন বিষয় শিক্ষার জন্য নিয়োজিত টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে সময়সূচি অনুযায়ী পরিবেশন করা সারা দেশে লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর জন্যই নয়, এমনকি শিক্ষকদেরও সহায়তা করা যেতে পারে। আবার এই পঠন বিষয়গুলো ডিভিডির মাধ্যমেও সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
তবে শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জনের জন্য জনপ্রিয় ও সুস্থ প্রতিযোগিতার সূচনার বিকল্প নেই। এমনকি সর্বোচ্চ মাপের জ্ঞানতাপসেরাও নোবেল পুরস্কার জয়ের প্রতিযোগিতায় আন্তরিকভাবেই নিজেদের সঁপে দেন। সুতরাং সাধারণ মনুষ্য সন্তানদের প্রতিযোগিতার লোভনীয় পুরস্কার দেখিয়ে শিক্ষায় উৎকর্ষ অর্জন করাতে পারলে ক্ষতির কিছু নেই।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী কর্তৃক অতি সম্প্রতি সূচিত বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এমনই একটি উদ্যোগ। বাংলাদেশের লব্ধপ্রতিষ্ঠ এবং অভিজ্ঞ বৈজ্ঞানিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশে বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণাকে উৎসাহিত করতে শুধু বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডই নয়, গবেষকদের নানা ক্ষেত্রে গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বর্ণপদক দিয়ে থাকে। এ ছাড়া তরুণ গবেষক ও নারী গবেষকদের জন্য কনফারেন্স, তরুণ ছাত্রদের উৎসাহিত ও উজ্জীবিত করতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের কনফারেন্সে অংশগ্রহণ, ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াড এবং এসিএম প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়াচ্ছে। অতি সম্প্রতি কৃষি গবেষণাকে জোরদার করার জন্যও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচারের সহায়তায় নানা প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যবস্থা করছে। তা ছাড়া জাতীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানেও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী যথেষ্ট তৎপর। সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী দেশের সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে অংশ নিয়ে থাকে।
আমাদের সমস্যাজর্জরিত দেশে সমস্যার অন্ত নেই। কেবল রাজধানীর যানজট সমস্যাই নাকি কম করে হলেও দৈনিক ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি নিশ্চিত করছে, সুপেয় পানির অভাব, পর্যাপ্ত বিদ্যুতের অভাব, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাব, জ্ঞান ও দক্ষতার অভাবে নিজেদের গ্যাস, কয়লা উত্তোলনের অক্ষমতা—এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী শ্রেয়তর পরিবেশে সরকারের থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করতে পারে, আমাদের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। রাশিয়া, হাঙ্গেরি কিংবা পোল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশের বিজ্ঞান একাডেমী দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কার্যকরভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া যে দেশের উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না, সেই দেশের বিজ্ঞান একাডেমী অধিকতর কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। দেশের বিজ্ঞান শিক্ষাকে জোরদার করতে বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী আরও জোরালো ভূমিকা পালন করুক, এটাই সবার প্রত্যাশা।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বুয়েট ও ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী।

রাজশাহী বড়কুঠির দুর্দশা by মুহাম্মদ লুৎফুল হক

১৬৫৩ সালে ডাচরা কাশিমবাজারে ব্যবসা শুরু করে এবং কালক্রমে সারা বাংলায় বিস্তার লাভ করে। ১৬৬০ সালে ব্যবসার প্রসারের জন্য ডাচ গভর্নর ম্যাথু ভ্যান ডেন ব্রুক বাংলা ও তৎসংলগ্ন এলাকার মানচিত্র তৈরি করেন। এটি এখনো এই এলাকার অন্যতম প্রাচীন মানচিত্র হিসেবে গণ্য হচ্ছে। মানচিত্রে তিনি তাঁদের ব্যবসাকেন্দ্র, বাংলার গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর ও জনবসতিগুলো চিহ্নিত করেন। এই মানচিত্রে রাজশাহীর উল্লেখ আছে।
ডাচরা রাজশাহীতে কবে ব্যবসা শুরু করে, তা জানা যায় না, তবে ও’ মেলির গেজেট থেকে পাওয়া যায় যে অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি রাজশাহীতে ডাচদের ব্যবসা-বাণিজ্য বেশ প্রসার লাভ করেছিল। ব্যবসাসামগ্রীর মধ্যে অন্যতম ছিল রেশম। ডাচদের এই ব্যবসা ‘বড়কুঠি’ নামের একটি দ্বিতল ইমারত থেকে নিয়ন্ত্রিত হতো। ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে পদ্মার তীরে বড়কুঠি নির্মাণ করা হয়। বড়কুঠির নির্মাণকাল নির্ধারণ করা না গেলেও এটি যে অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তৈরি, তা ও’ মেলির গেজেট এবং অন্যান্য সূত্র থেকে ধারণা করা যায়।
গত প্রায় পৌনে ৩০০ বছরে বড়কুঠির মালিকানা একাধিকবার হাতবদল হয়। মূল কাঠামোর সঙ্গে নতুন কিছু স্থাপনাও সংযুক্ত হয়। নতুন স্থাপনাগুলো কালের বিবর্তনে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু ডাচদের তৈরি মূল বড়কুঠি প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। বড়কুঠির ধারাবাহিক ইতিহাস পাওয়া যায় ও’ মেলির গেজেটে। এর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং এতে ব্যবহূত কামানের বিশদ বর্ণনা ও’ মেলির গেজেট ও মেসের আলীর বইয়ে উল্লেখ আছে। বড়কুঠির স্থাপত্যের বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় ড. নাজিমুদ্দিন আহমদের বইয়ে। কিছুদিন আগে ডাচ প্রতিনিধিরা বড়কুঠি দেখে নিশ্চিত করেছেন, এটি তাঁদের তৈরি স্থাপত্য এবং এই স্থাপনার অনেক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তাঁদের সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দীর স্থাপনার মিল আছে।
এই ভবন ঘিরে জমে আছে অনেক স্মৃতি। ডাচদের রেশম ব্যবসা, ইংরেজদের নীল ব্যবসা, বিভিন্ন কোম্পানির অন্যান্য ব্যবসা, ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহকালে ইংরেজ বাহিনীর সদর দপ্তর, দেশভাগের পর খাদ্য বিভাগের কার্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊষালগ্নে উপাচার্যের কার্যালয়—এই সবই বড়কুঠির অতীত ইতিহাস, প্রকারান্তরে রাজশাহীর ইতিহাস। বড়কুঠির ভেতরের কয়েদখানা মনে করিয়ে দেয় নীলচাষিদের ওপর নির্যাতনের কথা। ভবনটি বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ক্লাব হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।
আয়ুর বিচারে বড়কুঠি রাজশাহী শহরের প্রাচীনতম স্থাপনা। সারা বাংলাদেশে সুলতানি ও মোগল আমলের কয়েকটি স্থাপনা ছাড়া বড়কুঠির চেয়ে প্রাচীন স্থাপনা হাতে গোনা যাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বড়কুঠি তার প্রাচীন এবং কার্যকর রূপ নিয়ে এখনো অক্ষত আছে।
বড়কুঠি যেকোনো মানদণ্ডে একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন, এটির সংরক্ষণ সেভাবেই হওয়া উচিত। তবে বর্তমানে ভবনটি যে অবস্থায় আছে বা যেভাবে ব্যবহূত হচ্ছে, তা ভবনটির ধস ত্বরান্বিত করছে। কুঠির ভেতর-বাইরে অপরিষ্কার, উঠান জঙ্গলাকীর্ণ, কাঠের সিঁড়ি ব্যবহারের অনুপযোগী এবং ধ্বংসপ্রায়, বুরুজ হয়ে ছাদে যাওয়ার পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ভবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে নতুন ধাঁচের সিঁড়ি তৈরি—এসবই ভবনটির প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রকাশ।
অনেকেই উল্লেখ করেছেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়ে বাঙালি বেশ উদাসীন। অন্যরা ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়, বাঙালি তা থেকে বিরত থাকে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি পর্যন্ত সবার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য। বেশ কিছুদিন আগে ডাচ দূতাবাস বড়কুঠি সংরক্ষণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, কিন্তু সাড়া না পাওয়ায় পিছিয়ে যায়।
রাজশাহীর সুশীল সমাজ বড়কুঠি রক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ সবার কাছে আবেদন করেছে, স্থানীয় সাংবাদিকেরা বড়কুঠির ঐতিহ্যের পক্ষে কলম ধরেছেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মহাপরিচালক বড়কুঠিকে প্রত্নসম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং একে সংরক্ষণের আগ্রহ দেখিয়েছেন। সর্বোপরি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়রও বড়কুঠিকে ঘিরে রাজশাহীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যনির্ভর পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছেন; শুধু বাকি থাকছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমর্থন। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়জন শিক্ষক একত্রে প্রথম আলোয় একটি লেখার মাধ্যমে মহাস্থানগড় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো রক্ষার সপক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন। আমরা কি আশা করতে পারি না যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও তাঁদের নৈতিক ও মননের অবস্থান থেকে বড়কুঠি রক্ষার জন্য এ ধরনের কিছু একটা করবেন!
মুহাম্মদ লুৎফুল হক: গবেষক ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।
lutful55@gmail.com

মার্কিন রাজনীতিক ফেরারো আর নেই

যুক্তরাষ্ট্রের নারী রাজনীতিবিদ জেরালডিন ফেরারো মারা গেছেন। গত শনিবার বোস্টন নগরের একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১২ বছর ধরে তিনি ক্যানসারে ভুগছিলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।
ফেরারো যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী, যিনি কোনো প্রধান রাজনৈতিক দলের হয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ওয়াল্টার ম্যানডেইলের সঙ্গে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন। ওই নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয় হয়েছিল।
ফেরারোর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রিপাবলিকান নেত্রী সারাহ পেলিন শোক প্রকাশ করেছেন।
ফেরারো ১৯৭৮ সালে নিউইয়র্ক থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন।

কানাডার পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে

কানাডার গভর্নর জেনারেল ডেভিড জনস্টোন গত শনিবার দেশটির পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে ২ মে নির্বাচন ঘোষণা করেছেন। গত শুক্রবার হাউস অব কমনসে অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার সরকারের পতন হলে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার এ সিদ্ধান্ত হয়।
কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হারপার বলেন, ‘অনাস্থা ভোটে সরকার পতনের পর আমি গভর্নর জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে সম্মতি জানিয়েছেন।

দুর্গত এলাকায় খাদ্য পানি ও ওষুধের তীব্র সংকট

ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মিয়ানমারের শান প্রদেশের দুর্গত এলাকায় খাদ্য, পানি ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের অনেক জায়গায়ই গতকাল রোববার পর্যন্ত উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীরা পৌঁছাতে পারেননি। বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পে কমপক্ষে ১৫০ জন নিহত ও ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মিয়ানমারের কর্মকর্তারা গতকাল জানান, ভূমিকম্পে কত লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটা তাঁরা এখনো জানেন না। তবে জানার চেষ্টা করছেন। গত বৃহস্পতিবার দেশটিতে ভূমিকম্প আঘাত হানে।
কর্মকর্তারা জানান, ভেঙে পড়া যোগাযোগ-ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এখন তাঁদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় কিংবা বড় ফাটলের সৃষ্টি হওয়ায় অনেক স্থানেই তাঁরা এখনো পৌঁছাতে পারেননি। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কতজন লোক বেঁচে আছে, তা-ও তাঁরা জানেন না।
শান প্রদেশের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা তাকলিকে কর্মরত রেড ক্রসের একজন কর্মী একটি বিদেশি বেতারকে জানিয়েছেন, একমাত্র সেখানেই ভূমিকম্পে দেড় শ লোক প্রাণ হারিয়েছে।

জনগণ ক্ষমতার উৎস তাদের হাতেই দায়িত্ব হস্তান্তর করব: সালেহ

ইয়েমেনের মারিব শহরে গতকাল রোববার সন্দেহভাজন আল-কায়েদা সদস্যদের হামলায় ছয়জন সেনা নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। এদিকে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী প্রবল আন্দোলন সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ আবারও পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, জনগণ ক্ষমতার উৎস, তাদের হাতেই দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। একমাত্র আলাপ-আলোচনাই হচ্ছে দেশ রক্ষার একমাত্র উপায়।
একজন সেনা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গতকাল রাজধানী সানার পূর্বে অবস্থিত মারিব শহরে সন্দেভাজন আল-কায়েদার সদস্যরা একটি সেনাবহরে হামলা চালায়। এতে ছয়জন সেনা নিহত ও আরও চারজন আহত হন। স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, মারিব শহরের আল-কায়েদার সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা আয়েদ আল-সাবওয়ানির নেতৃত্বে ওই হামলা চালানো হয়। ইয়েমেনের সেনারা আইয়ান শহরে আল-কায়েদার সহযোগী একটি সংগঠনের ছয়জন যোদ্ধাকে হত্যার একদিন পর ওই হামলা চালানো হলো।
সালেহ বিরোধীদের আলাপ-আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে এর বিকল্প নেই।

সিরিয়ায় বিক্ষোভ চলছে, আরও ছয়জন নিহত

সিরিয়ায় বিক্ষোভ সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গতকাল রোববার দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর লাতাকিয়ায় সেনারা প্রবেশ করেছে। শহরটিতে শনিবার গুপ্তঘাতকদের হামলা এবং সেনাদের গুলিতে ছয়জন নিহত হন। এঁদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর দুজন সদস্যও রয়েছেন।
এদিকে সিরিয়া সরকার ২৬০ জন রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার পর দেশজুড়ে কানাঘুষা শুরু হয়েছে যে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ শিগগিরই দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা দেবেন।
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ৩৫০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত লাতাকিয়া শহরে শনিবার গুপ্তঘাতকদের গুলিবর্ষণে নিরাপত্তা বাহিনীর দুজন সদস্য ও দুজন পথচারী নিহত হন।
একই দিন লাতাকিয়ার একটি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে দুজন নিহত হন। এ ঘটনা সম্পর্কে কায়রোয় সিরিয়ার মানবাধিকার-কর্মী আমর কুরাবি সাংবাদিকদের জানান, ক্ষুব্ধ জনতা ক্ষমতাসীন বাথ পার্টির একটি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করতে গেলে সেনারা গুলিবর্ষণ করে। এতে দুজন প্রাণ হারান। তবে কানাডায় অবস্থানরত সিরিয়ার ভিন্নমতাবলম্বী নেতা মামুন আল-হোমসি ওই ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন।
গুপ্তঘাতকদের হামলায় চারজন নিহত হওয়ার পর গতকাল সেনারা লাতাকিয়া শহরে প্রবেশ করে।

সরকারি সেনাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ

লিবিয়ার এক নারী একদল সরকারি সেনার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন। গতকাল রোববার রাজধানী ত্রিপোলির একটি হোটেলে উপস্থিত হয়ে বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে তিনি ধর্ষণ ও নির্যাতনের কাহিনি বর্ণনা করেন। তবে নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে ওই নারীর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ত্রিপোলির রিক্সোস হোটেলে বিদেশি সাংবাদিকেরা যখন নাশতা করছিলেন, সে সময় তিনি ওই হোটেলে প্রবেশ করেন। ৩০ বছর বয়সী ওই নারী নিজেকে ঈমান আল-ওবায়দি নামে পরিচয় দিয়ে পরনের কিছু বসন খুলে নির্যাতনের চিহ্ন দেখান সাংবাদিকদের।
ওবায়দি জানান, বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত বেনগাজি থেকে ত্রিপোলি ফেরার পথে গত বুধবার সরকারি সেনারা তাঁকে আটক করেন। এরপর টানা দুদিন তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। ১৫ সেনা তাঁকে পালাক্রমে ধর্ষণ করেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নির্যাতনের চিহ্ন সাংবাদিকদের দেখিয়ে ওবায়দি বলেন, ‘আপনারা ছবি তুলুন এবং বিশ্বের কাছে আমার অবস্থা তুলে ধরুন।’ ওবায়দি তাঁর কথা শেষ করার আগেই হোটেলের কর্মীরা তাঁকে টেনেহিঁচড়ে সেখান থেকে বের করে দেন। পরে সরকারি লোকজন তাঁকে গাড়িতে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

চুল্লিতে কোটি গুণ তেজস্ক্রিয়তা, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কর্মীদের

জাপানে ক্ষতিগ্রস্ত ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২ নম্বর চুল্লির ভেতরের পানিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় এক কোটি গুণ বেড়ে গেছে। গতকাল রোববার ওই চুল্লিতে কর্মরত সব কর্মীকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওই কেন্দ্রের পাশের সাগরের পানিতেও অস্বাভাবিক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা হয়েছে।
কেন্দ্রের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো) জানায়, ২ নম্বর চুল্লির টারবাইন হাউসের পানিতে স্বাভাবিকের তুলনায় এক কোটি গুণ বেশি তেজস্ক্রিয়তা ধরা পড়ার পরপরই দ্রুত কর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কর্মীরা ওই টারবাইন হাউসের পানি পাম্পের সাহায্যে নিষ্কাশনের কাজ করছিলেন।
টেপকোর এক মুখপাত্র বলেন, তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এত বেড়ে যাওয়ার কারণ অনুন্ধান করে দেখা হচ্ছে। তবে তেজস্ক্রিয়তার কারণে এখন সেখানে কোনো কর্মী কাজ করতে পারছেন না।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার ৩ নম্বর চুল্লির পানিতে ১০ হাজার গুণ বেশি তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা হয়। তখন ওই পানির মাধ্যমে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হওয়ায় তিন কর্মীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
ফুকুশিমা উপকূলের সাগরের পানিতেও তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। গতকাল পানিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ছিল স্বাভাবিকের তুলনায় এক হাজার ৮৫০ গুণ বেশি। আগের দিন শনিবার তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ছিল এক হাজার ২৫০ গুণ।
জাপানের পরমাণু ও শিল্প নিরাপত্তা সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিদেহিকো নিশিয়ামা বলেন, সামুদ্রিক স্রোতে তেজস্ক্রীয় পদার্থ বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়বে এবং তখন তেজস্ক্রিয়তার মাত্রাও কমে যাবে। কাজেই এতে সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের ক্ষতি হবে না এবং সামুদ্রিক খবারও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে না বলে জানান তিনি।
এদিকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক ইয়োকিয়া আমানো সতর্ক করে দিয়েছেন, জাপানের পারমাণবিক সংকট আরও কয়েক সপ্তাহ এমনকি কয়েক মাস প্রলম্বিত হতে পারে। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, সব দিক বিবেচনায় এটি একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা এবং শিগগির এর সুরাহা হচ্ছে না।
জাপানের সাবেক এই কূটনীতিক জানান, ওই চুল্লির পরমাণু কোর ও জ্বালানি রড ঠান্ডা রাখার জন্য পুরোপুরি পানিতে ঢেকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে কি না, কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে এখনো নিশ্চিত নয়। এ ছাড়া কেন্দ্রে বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়ার কাজেও কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন না।

কোমায় চলে গেছে সিপিএম: মমতা

তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সিপিএম কোমায় চলে গেছে। অক্সিজেন ও রক্ত দিয়ে আর বাঁচানো যাবে না। ১৩ মে ওদের শেষকৃত্য।’
গত শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল টেন-এ ‘মুখোমুখি মমতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠান থেকে তিনি দর্শক-শ্রোতাদের প্রশ্নেরও উত্তর দেন।
মমতা বলেন, ওদেরকে এমনভাবে পরাজিত করতে হবে, যেন ওরা আর কোনো দিন ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখতে না পারে। সে জন্য বিধানসভার ২৯৪টি আসনের সব কটিতেই তৃণমূল কংগ্রেস জোটকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করতে হবে। সিপিএম এবার শূন্যে নামবে। তিনি বলেন, তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি ১৮টি আসনে বিজেপি প্রার্থী দিয়েছে সিপিএমকে সুবিধা করে দিতে। তিনি বলেন, নির্দলীয় প্রার্থীদের একটি ভোটও নয়।
প্রায় দুই ঘণ্টার ওই অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, ‘হয় বামফ্রন্ট, নয়তো আমাদের জোট। এবার আর গায়ের জোরে সিপিএম জিততে পারবে না। পরিবর্তনের হাওয়ায় মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে।’
অন্যদিকে শনিবার একই সময়ে ২৪ ঘণ্টা টিভি চ্যানেলে সরাসরি এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেন, তৃণমূলের প্রতিশ্রুতি ভিত্তিহীন। মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। পরবর্তী রাজ্য সরকার গড়বে বামফ্রন্টই। তিনি বলেন, ‘ভোটের বাজারে পাটিগণিতের অঙ্ক সব সময় খাটে না। দুইয়ে দুইয়ে যেমন চার হয়, তেমনি কখনো শূন্য হয়। মানুষের মনে সব সময় পাটিগণিতের সরলরেখা পৌঁছায় না। তিনি বলেন, আমরা মানুষকে মিথ্যা কোনো প্রতিশ্রুতি দেই না।’

গাদ্দাফি মিথ্যা বলে লড়াইয়ে নামিয়েছেন

লিবিয়ায় বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়া সেনারা দাবি করেছেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফি মিথ্যা কথা বলে তাঁর অনুগত সেনাদের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, গাদ্দাফি তাঁদের বুঝিয়েছিলেন, আল-কায়েদা, ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদসহ বিভিন্ন বিদেশি সংস্থা ভাড়াটে লোক দিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তবে এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন, বিদেশিরা নয় বরং লিবিয়াবাসী স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত বেনগাজি শহরের কয়েকটি হাসপাতালে বেশ কয়েকজন বন্দী সেনা চিকিৎসাধীন রয়েছে। জোট বাহিনী অথবা বিদ্রোহীদের হামলায় আহত হয়ে এখন তাঁরা বন্দী অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।
আজুমি আলী মোহাম্মাদ আলী (২৫) এমনই একজন সেনা। প্রায় ৪০০ সেনার সঙ্গে তিনি আজদাবিয়া শহরের দিকে এগোচ্ছিলেন। মাঝপথে জোট বাহিনীর বোমা হামলায় তাঁরা ছত্র ভঙ্গ হন। তাঁর অনেক সঙ্গী মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বন্দী করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আলী বলেন, তাঁদের বলা হয়েছিল, মোসাদ ও সিআইএ এবং আল-কায়েদার সন্ত্রাসীরা লিবিয়ার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে বিদ্রোহ ছড়িয়েছে।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ ভারতের

আলোচনা শুরুর জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানি এবং আইএসআইয়ের প্রধান সুজা পাশার সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইসলামাবাদে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে নির্দেশ দিয়েছে ভারত।
নয়াদিল্লি সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা সবুজসংকেত দিয়েছি।’ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক পুরো উপমহাদেশে গভীর প্রভাব ফেলে। ভারত এর আগেও কয়েকবার পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছিল, কিন্তু তাদের সেই উদ্যোগের আন্তরিকতা নিয়ে কিছুটা সংশয় ছিল। কেননা, পাকিস্তানে এখন বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও ক্ষমতার মূল ভরকেন্দ্র তাদের সেনানিবাস বা সেনাবাহিনী। আর ভারত কখনো আলোচনায় সেনাবাহিনীকে দেখতে চায়নি। কিন্তু এবার ভারত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিল।
আগামী বুধবার ভারতের মোহালিতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ ক্রিকেটের খেলায় মুখোমুখি হচ্ছে ভারত-পাকিস্তান। ওই খেলা দেখার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে আমন্ত্রণ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। গিলানি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে খেলা দেখতে ভারতে যেতে রাজি হয়েছেন। এটা একটা ভালো অগ্রগতি। যদিও দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ ঘটনা খুব বেশি প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে না। তবে এতে সম্পর্কের গুমোট ভাব কিছুটা পরিষ্কার হতে পারে।
ভারতের দিক থেকে এই উদ্যোগের পুরোটাই মনমোহন সিংয়ের। মনমোহন মনেপ্রাণে চাইছেন প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে। কিন্তু এর আগে তাঁর কয়েকবারের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। এবারও পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের কাছ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া ভারত এখনো পায়নি।
পাকিস্তানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়-পর্যায়ের আলোচনায় ভারত যে সেনাবাহিনীকে জড়াতে চায় না, তার কারণ দুই দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশেষ করে ভারতের সেনাবাহিনী পুরোপুরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুগত। রাজনৈতিক কোনো সিদ্ধান্তে তারা নাক গলাবে না। কিন্তু পাকিস্তানের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সেখানে সেনাবাহিনীই সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেনাবাহিনীকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। কাজেই ভারতের হয়তো এই উপলব্ধি হয়েছে যে পাকিস্তানের সঙ্গে তারা যদি সত্যিই সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে চায়, তাহলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পাশে সরিয়ে রেখে সেটা সম্ভব হবে না।

যুক্তরাজ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দাবি

জিএসপি-সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশি পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে যেভাবে প্রবেশ করতে পারছে, জিএসপি-সুবিধা না থাকায় যুক্তরাজ্যের বাজারে সেভাবে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এই তথ্য উল্লেখ করে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি আসিফ ইব্রাহীম স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্যকে যুক্তরাজ্যের বাজারে বিনা শুল্কে প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।
গতকাল রোববার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ’—শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ প্রস্তাব করেন।
এ সময় আসিফ ইব্রাহীম আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে ইইউ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কোরিয়া প্রভৃতি দেশে শুল্কমুক্ত ও শুল্কছাড় সুবিধা পাচ্ছে।
ঢাকা চেম্বার সভাপতি ব্রিটিশ উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক শিল্প, গ্যাসভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুৎ, সার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তৈরি পোশাক শিল্পের পশ্চাৎসংযোগ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সিরামিকস, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, ইস্পাত, অবকাঠামো উন্নয়ন, হাসপাতাল, শিক্ষা, পর্যটন, হোটেল প্রভৃতি খাতে যৌথ বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্টিফেন ইভান্স বলেছেন, যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিগত বছরগুলোয় দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। ২০১০ সালে আগের বছরের তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাজ্যের রপ্তানি ৬৮ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে একই সময় যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ১১ শতাংশ বেড়েছে।
হাইকমিশনার আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু কোম্পানি ও অনাবাসী বাংলাদেশি এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের চিন্তা করছেন। বাংলাদেশের জ্বালানি, বন্দর, অবকাঠামো, সফটওয়্যার, বস্ত্র, সিরামিকস, ওষুধ ও পরিবেশ খাতে বিনিয়োগে ব্রিটিশ উদ্যোক্তারা আগ্রহী বলে তিনি জানান।
বৈঠকে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ওপর আলোচনা করেন ঢাকায় ব্রিটিশ দূতাবাসের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান কেভিন রিংহাম। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি টি আই এম নূরুল কবীর।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০১০ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়কালে বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাজ্য ১১ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডের পণ্য রপ্তানির বিপরীতে ১১৩ কোটি পাউন্ডের পণ্য আমদানি করেছে। এ ছাড়া আলোচ্য সময়ে যুক্তরাজ্য থেকে ৮২ কোটি ৯০ লাখ পাউন্ড প্রবাসী আয় এসেছে। যুক্তরাজ্য বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করেছে।

পিপলস ইনস্যুরেন্সের লভ্যাংশ ঘোষণা

পিপলস ইনস্যুরেন্স ২০১০ সালের জন্য পাঁচ শতাংশ নগদ ও পাঁচ শতাংশ শেয়ার লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আজ সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) আগামী ১ জুন সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেন রোডে ঢাকা লেডিস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হবে। এজিএমের রেকর্ড ডেট ১১ এপ্রিল। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, ওই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ২.১১ টাকা, শেয়ারপ্রতি মোট সম্পদমূল্য ১৯.৮৯ টাকা এবং নেট ওপেনিং ক্যাশ ফ্লো ১.৯১ টাকা।

ক্ষুদ্রঋণ-ব্যবস্থা পরিবর্তনের তাগিদ

দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থাকে ঘিরে সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণ জোগানদাতাদের ব্যক্তিগতভাবে লাভালাভের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও ব্যপকভাবে এগিয়ে নিতে হলে ব্যবস্থাটিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ গতকাল রোববার এসব কথা বলেন।
খলীকুজ্জমান আরও বলেন, ‘১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে এ দেশে ক্ষুদ্রঋণের যাত্রা শুরু। আশির দশকে এসে এটি বিস্তার লাভ করে। নব্বইয়ের দশকে এসে ক্ষুদ্রঋণের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। যখন কোনো কিছু বড় হয়ে যায়, তখন অনেক নতুন জিনিস প্রবেশ করে। সেই অবস্থা থেকে বিষয়টিকে এগিয়ে নিতে হলে পরিবর্তনের প্রয়োজন। আর এটা করতে গেলে এখন আমরা কী করছি সেটা ভালোমতো জানতে হবে।’
খলীকুজ্জমান বলেন, ‘ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থায় পরিবর্তনের জন্য বিদেশে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা চলছে। কিন্তু এ ব্যবস্থাটির পথিকৃৎ হিসেবে পরিবর্তনের পথিকৃৎও আমাদের হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন ক্ষুদ্রঋণ যাঁরা নিচ্ছেন, তাঁদের যেমন উপকার হয়, তেমনি যাঁরা ঋণ জোগান দিচ্ছেন তাঁরাও যাতে টেকসই হতে পারেন। কারণ, ঋণ জোগানদাতারা টেকসই না হলে অর্থের সরবরাহ কমে যাবে। এটা মাথায় রেখেই নীতিমালায় পরিবর্তন আনতে হবে।’
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পিকেএসফের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মেসবাহউদ্দিন আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য দেন পিকেএসএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভীন মাহমুদ।
খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার নিয়ে একটা সমালোচনা ছিল। সম্প্রতি ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (এমআরএ) ক্ষুদ্রঋণের জন্য ২৭ শতাংশ সর্বোচ্চ সুদ হার বেঁধে দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, আগে ছিল ১৫ শতাংশ, এখন কমানোর কথা বলে উল্টো বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টি তা নয়।
খলীকুজ্জমান ব্যাখ্যা করে বলেন, আগে ১৫ শতাংশের কথা বলা হলেও প্রকৃত হার অনেক বেড়ে যেত। কিন্তু এখন সুদহার ব্যাংকের মতো। ২৭ মানে ২৭। এ ছাড়া এখন থেকে ঋণ ছাড় করার এক সপ্তাহের মধ্যে কিস্তি নেওয়া যাবে না। কমপক্ষে ১৫ দিন সময় দিতে হবে। সঞ্চয়ের নামে শুরুতেই বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচ শতাংশ টাকা কেটে রাখা বন্ধ করতে হবে।
সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রধান নির্বাহীদের উদ্দেশে খলীকুজ্জমান বলেন, আগামী জুনের মধ্যে সবাইকে এ নিয়ম বাস্তবায়ন করতে হবে।
খলীকুজ্জমান বলেন, দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থের প্রবাহ যেতে হবে। এ জন্য ক্ষুদ্রঋণের সম্প্রসারণ দরকার। এ জন্য তাড়াহুড়া করা যাবে না। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, কেবল টাকা দিয়েই দারিদ্র্য দূর করা যাবে না। এ জন্য সমন্বিত প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে।
ক্ষুদ্রঋণ যাতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে, সেদিকে গুরুত্ব দিয়ে খলীকুজ্জমান বলেন, উৎপাদনশীলতা না বাড়লে সঞ্চয় বাড়বে না। তাই যেসব পরিবার ঋণ নেবে তাদেরও ভেবে দেখতে হবে আদৌ তাদের ঋণ প্রয়োজন রয়েছে কি না।
খলীকুজ্জমান বলেন, ক্ষুদ্রঋণকে ধীরে ধীরে স্বকর্মসংস্থান থেকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির দিকে যেতে হবে।
কাজী মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্ষুদ্রঋণের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে একটা ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধিই দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখতে পারে না। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটা যোগাযোগ স্থাপিত না হলে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হবে না।
ভারতের এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে মেসবাহউদ্দিন বলেন, দেশটিতে আগে যে পরিমাণ শ্রমশক্তি দিয়ে উৎপাদন হতো, এখন তার অর্ধেক শ্রমশক্তি দিয়ে দ্বিগুণ উৎপাদন হয়। প্রযুক্তির কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। এতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও বৈষম্য বেড়েছে।
মতবিনিময় সভায় পিকেএসএফের সারা দেশ থেকে ১৯৮টি সহযোগী সংস্থার প্রধান নির্বাহীরা অংশ নেন। তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা-সংকটের কথা তুলে ধরেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, বর্তমানে এ কার্যক্রমে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রবণতা বাড়ছে।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংককে পূর্ণাঙ্গ মার্চেন্ট ব্যাংকের অনুমোদন

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডকে পূর্ণাঙ্গ মার্চেন্ট ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সিএসই)। আজ সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
সিএসই গতকাল রোববার একটি চিঠির মাধ্যমে ব্যাংকটিকে এ অনুমোদন দিয়েছে। ব্যাংকটির মার্চেন্ট ব্যাংকের নাম হবে ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।

পুঁজিবাজার চাঙা, বেড়েছে বেশির ভাগ শেয়ারের দাম

চার দিন নিম্নমুখী থাকার পর আজ সোমবার দেশের পুঁজিবাজার ছিল চাঙা, বেড়েছে বেশির ভাগ শেয়ারের দামও। আজ ব্যাংক, বিমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সব খাতেই শেয়ারের দাম বাড়ে।
ডিএসই সূত্রে জানা যায়, ব্যাংকিং খাতের ৩০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আজ ২৫টির দাম বাড়ে। এ ছাড়া সিমেন্ট খাতে পাঁচটির মধ্যে সবকটির, সিরামিক খাতে পাঁচটির মধ্যে চারটির, প্রকৌশল খাতে ২৩টির মধ্যে ২০টির, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ২১টির মধ্যে সবকটির, খাদ্য খাতের ১৫টির মধ্যে ১৪টির, জ্বালানি খাতে ১১টির মধ্যে ১০টির, বিমা খাতের ৪৪টির মধ্যে ৪২টির, আইটি খাতের পাঁচটির মধ্যে সবকটির, বিবিধ খাতে নয়টির মধ্যে সবকটির, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ৩৩টির মধ্যে ২৯টির, ওষুধ খাতের ২০টির মধ্যে ১৮টির, বস্ত্র খাতের ২৫টির মধ্যে ২৩টির ও টেলিযোগাযোগ খাতে একমাত্র প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনেরও দাম বাড়ে।
ডিএসইতে আজ চাঙাভাবের মধ্য দিয়ে লেনদেন শুরু হয়, যা সারা দিনই অব্যাহত থাকে। দিন শেষে ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ১৪৮.৮৯ পয়েন্ট বেড়ে ৬২৪৩.৫৩ পয়েন্টে দাঁড়ায়। ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৬১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দাম বেড়েছে ২৩৯টির কমেছে ২০টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠানের। আজ স্টক এক্সচেঞ্জটিতে ৭৯০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা গতকালের চেয়ে ১৭৫ কোটি টাকা বেশি।
ডিএসইতে আজ লেনদেনে শীর্ষে থাকা ১০টি প্রতিষ্ঠান হলো বেক্সিমকো, আরএন স্পিনিং, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, গোল্ডেন সন, তিতাস গ্যাস, কেয়া কসমেটিকস, বেক্সটেক্স, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, ম্যাকসন স্পিনিং ও এনবিএল।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ৩৯০.৪৯ পয়েন্ট বেড়ে ১৭৫৩৭.১১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। সিএসইতে ২০০টি প্রতিষ্ঠানের লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে বেড়েছে ১৮১টির, কমেছে ১৫টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইতে আজ মোট ৯০ কোটি টাকার লেনদেন হয়, যা গতকালের চেয়ে ১৫ কোটি টাকা বেশি।

তদন্তের রিপোর্ট প্রকাশের আগ পর্যন্ত বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বন্ধ

পুঁজিবাজারে কারসাজি তদন্তে গঠিত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বন্ধ রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন স্টেক হোল্ডাররা। আজ সোমবার সকালে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকে তাঁরা এ অভিমত দেন।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সভাপতি ফখরউদ্দিন আলী আহমেদ বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশের পর কমিটির সুপারিশ থাকলে সে অনুযায়ী বুক বিল্ডিং পদ্ধতি সংশোধন করা হবে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহসানুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বন্ধ রয়েছে। এটা বন্ধ থাকুক। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে যথাযথ সুপারিশ অনুযায়ী এটা সংশোধন করা হবে।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার, বাংলাদেশ পাবলিকলি লিস্টেট কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সালমান এফ রহমান, মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ঢাকা ইনস্যুরেন্সকে এসইসির শোকজ

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) আইন ভঙ্গ করায় ঢাকা ইনস্যুরেন্স লিমিটেড, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানির সচিবকে শোকজ কাম শুনানির নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ডিএসইর ওয়েবসাইট সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া প্রতিষ্ঠানটির তৃতীয় প্রান্তিকের ত্রৈমাসিক আর্থিক বিবরণীতে আইন ভঙ্গ করায় এসইসির পক্ষ থেকে এই শুনানির নোটিশ দেওয়া হয়।
গত বছরের ৩১ আগস্ট ডিএসইর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আর্থিক বিবরণীতে বলা হয়, জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক অনিরীক্ষিত হিসাব অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির কর-পরবর্তী লাভ আট কোটি ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ৫৩ দশমিক ৭৮ টাকা, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল যথাক্রমে ৫৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা ও ৯ দশমিক ৭৩ টাকা।

আশরাফুলদের অর্থ পুরস্কার

কমনওয়েলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসের পদকজয়ী খেলোয়াড়দের প্রতিশ্রুত অর্থ পুরস্কার দিল বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)।
গত অক্টোবরে দিল্লি কমনওয়েলথ গেমসের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে দলগত ব্রোঞ্জজয়ী দুই শ্যুটার আসিফ হোসেন ও আবদুল্লাহ হেল বাকি পেলেন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে। তবে ওই ইভেন্টে বাংলাদেশের রুপা জিততে না পারা ছিল চরম ব্যর্থতা এবং আসিফ নিজের সেরা স্কোরের চেয়ে কম করেছেন। প্রত্যাশার ধারেকাছেও যেতে পারেননি। আসিফ এককের ফাইনালেও উঠতে পারেনি। পদক জয়ের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরস্কৃত হয়েছেন দুজন। কিন্তু এটাও ঠিক, অগ্রগামিতা নয়, পেছনের দিকে হাঁটারই সাক্ষ্য ওই সফরে রেখে এসেছেন আসিফরা।
ওদিকে গত নভেম্বরে চীনের গুয়াংজুতে এশিয়ান গেমসে সোনাজয়ী পুরুষ ক্রিকেট দলের প্রত্যেক খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা পেয়েছেন ১ লাখ টাকা করে। রুপাজয়ী মহিলা ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের দেওয়া হলো ৫০ হাজার টাকা করে। আর্থিক পুরস্কার পেয়েছেন ব্রোঞ্জজয়ী মহিলা কাবাডি দলের খেলোয়াড়-কর্মকর্তারাও। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় ৩০ হাজার টাকা।
খেলোয়াড়দের হাতে চেক তুলে দেন বিওএর মহাসচিব কুতুবউদ্দিন আহমেদ।

ব্রাজিলের জয়, ড্র আর্জেন্টিনার

ইউরোপজুড়ে চলছে ইউরোর বাছাইপর্বের আগুনে লড়াই। পরশু রাতে সেই লড়াইয়ে নেমেছিল জার্মানি, ইংল্যান্ডের মতো দল। কিন্তু ইউরো বাছাইপর্বের ম্যাচ নয়, পরশু বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের চোখ আটকে ছিল লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির দুটি প্রীতি ম্যাচে! প্রীতি ম্যাচ দুটি যে ছিল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার।
লন্ডনে আর্সেনালের এমিরেটস স্টেডিয়ামে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ছিল স্কটল্যান্ড। নিউজার্সিতে আর্জেন্টিনা খেলেছে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে। একযোগে মাঠে নামলেও চিরশত্রুদের দিনটা একরকম যায়নি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিল জিতেছে ২-০ গোলে। নিজেদের মাঠে যুক্তরাষ্ট্র আর্জেন্টিনাকে রুখে দিয়েছে ১-১ গোলে।
ব্রাজিলের দুটি গোলই করেছেন নেইমার। ৪২ মিনিটে প্রথমটি পেনাল্টি থেকে, দ্বিতীয়টি ৭৭ মিনিটে। আর্জেন্টিনার গোলটি এস্তেবান কাম্বিয়াসোর। ৪২ মিনিটে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন তিনি। কিন্তু মেসি-কাম্বিয়াসোদের জয়বঞ্চিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ স্ট্রাইকার অ্যাগুডেলো। ৫৯ মিনিটে গোল শোধ করেন অ্যাগুডেলো। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জার্সি গায়ে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেছেন ১৮ বছর বয়সী এ স্ট্রাইকার। তিন ম্যাচে তাঁর ২ গোল হয়ে গেল।
যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবল ততটাই জনপ্রিয়, বাংলাদেশে যতটা বাস্কেটবল। তার পরও নিউজার্সির ইস্ট রাদারফোর্ড স্টেডিয়াম পরশু ভরে গেল ৭৯ হাজার ৮০০ দর্শকে। কারণ আর্জেন্টিনার খেলা, মেসি-জাদুর আকর্ষণ। আর্জেন্টিনা না পারলেও দর্শকদের হতাশ করেননি লিওনেল মেসি।
তীব্র শীতের রাতেও যেন আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলছিলেন দুবারের বর্ষসেরা মেসি। যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক কার্লোস বোকানেগ্রা তো বার্সেলোনা তারকার খেলা দেখে হতবাক, ‘এটা সত্যি অবিশ্বাস্য। সে কীভাবে এমন খেলে? এবং এখানে আমরা দেখলাম। ওকে এভাবে খেলতে দেখে আসলেই বিস্ময় লাগে, কারণ পেশাদার ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে আমরাও তো খেলছি।’
ব্রাজিলের জয়, আর্জেন্টিনার ড্রয়ের রাতে আনন্দে কেটেছে জার্মানি ও ইংল্যান্ডের। ইউরো বাছাইয়ে মিরোস্লাভ ক্লোসা ও টমাস মুলারের জোড়া গোলে জার্মানি বিধ্বস্ত করেছে কাজাখস্তানকে (৪-০)। ওয়েলসকে ২-০ গোলে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের গোলদাতা ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ড ও ড্যারেন বেন্ট। এই জয়ে পাঁচ ম্যাচে সব কটি জিতে ১৫ পয়েন্ট নিয়ে ‘এ’ গ্রুপের শীর্ষে জার্মানি। তবে ‘জি’ গ্রুপে তিন ম্যাচে এটি ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় জয়। ৭ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের দুইয়ে ফ্যাবিও ক্যাপেলোর দল। চার ম্যাচে ১০ পয়েন্ট পাওয়া মন্টেনেগ্রো সবার ওপরে। এদিকে ড্র করেছে রাশিয়া ও ডেনমার্ক।

ইংলিশ মিডিয়ার চোখে তাঁরা গর্দভ!

স্বপ্নটা খুব বেশি উজ্জ্বল হয়তো ছিল না। কিন্তু তা ভেঙে গেল বড় নির্মমভাবে, ১০ উইকেটের পরাজয়ে। ইংলিশ মিডিয়ায় অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের দলের মুণ্ডপাত যে চলবে, জানাই ছিল। তবে সমালোচনার ধরনটায় এবার যেন একটু বদলের রং। কোয়ার্টার ফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে অপমানজনক হারে বিশ্বকাপের স্বপ্নভঙ্গের দায়টা ইংলিশ মিডিয়া চাপাচ্ছে অধিনায়ক স্ট্রাউস ও ইংল্যান্ডের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সূচির কাঁধে।
ইংলিশ মিডিয়ার প্রথম কোপটাই অধিনায়ক স্ট্রাউসের ঘাড়ে। স্বপ্নের ফানুস উড়ে যাওয়ার পর দেশে ফেরার আগেই স্ট্রাউস শুনতে পাচ্ছেন ওয়ানডে অধিনায়ক থেকে সরে যাওয়ার ডাক! ইংলিশ ক্রিকেটের অলিখিত রীতিটাই যে এমন! ১৯৯৯ বিশ্বকাপ ব্যর্থতার দায়ে অধিনায়কত্ব হারান অ্যালেক স্টুয়ার্ট। ২০০৩ বিশ্বকাপের পর নাসের হুসেইন এবং সর্বশেষ ২০০৭ বিশ্বকাপের পর মাইকেল ভন। এবার তো স্ট্রাউসের পালাই আসার কথা!
সানডে টেলিগ্রাফ-এর কলাম লেখক স্টিভ জেমস সরাসরিই বলে দিয়েছেন, স্ট্রাউসের সরে দাঁড়ানো উচিত এবং ওয়ানডে অধিনায়কত্ব দেওয়া উচিত অ্যালিস্টার কুককে। অবজারভার অবশ্য অধিনায়কত্ব নিয়ে পড়ে গেছে সংশয়ে। লিখেছে, ‘এই পরাজয় অধিনায়ক স্ট্রাউসের বিদায় দাবি করে। কিন্তু তাঁর নিশ্চিত কোনো বিকল্পও নেই।’ পত্রিকাটি আরও দাবি করেছে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন এবং অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাশেজ জয়—‘বিস্ময়কর একটি বছর’ কাটানোর পরও অক্টোবর থেকে টানা সূচির কারণে বিশ্বকাপে ক্রিকেটারদের ‘দুর্ভাবনাপীড়িত’ দেখাচ্ছিল।
ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচির জন্য ইংলিশ ক্রিকেট কর্তাদের অবজারভার-এর চেয়েও কড়া সমালোচনা করেছেন সানডে টেলিগ্রাফ-এর কলাম লেখক জেমস। অ্যাশেজের পর বিশ্বকাপের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি ও সাতটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলার সমালোচনা করে জেমস বলেছেন, ‘শুধুই টাকার জন্য, শুধুই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পেট ভরানোর জন্য, এবং এর বিনিময়ে নিজেদেরও পকেট ভরানোর জন্য।’
বিশ্বকাপ ব্যর্থতার সমালোচনা আসলে কতটা কড়া হতে পারে, সেটা ছোট্ট একটা শিরোনামে বুঝিয়ে দিয়েছে সানডে টাইমস—‘গর্দভদের ক্লান্ত পা বাড়ির পথ ধরেছে।’
এদিকে এক অ্যান্ড্রুর চরম সময়ে পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন আরেক অ্যান্ড্রু। মিডিয়া স্ট্রাউসের পতন অবশ্যম্ভাবী মনে করলেও ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ বলছেন, স্ট্রাউস তাঁর জায়গায় ঠিকই আছেন, আসল সমস্যা ইংল্যান্ডের ক্রিকেট পদ্ধতিতে, ‘অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসই পদটির জন্য সঠিক লোক। সব সাবেক খেলোয়াড়ই হয়তো মিছিল করে এই দলটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু আসল কথা হলো, ১৯৯২ সালের পর থেকেই আমরা ওয়ানডেতে দুর্বল দল।’
ব্যস্ত সূচি নিয়ে সমালোচনা অধিনায়ক স্ট্রাউসও করেছেন। তাতে সুর মেলালেন এই বিশ্বকাপে শেষের ম্যাচগুলোয় সাইডলাইনে বসে কাটানো অলরাউন্ডার পল কলিংউডও। তাঁর কথা, এই সূচির কারণেই ইংলিশ ক্রিকেটাররা ফর্ম ও ফিটনেস হারিয়ে ফেলেছেন।

ক্রিকেটময় এক রেস্তোরাঁ

নামটাই যথেষ্ট রোমাঞ্চ-জাগানিয়া, ‘ক্রিকেট ক্লাব ক্যাফে।’ ক্রিকেট, ক্লাব, ক্যাফে—সব মিলিয়ে সময় কাটানোর জন্য নিশ্চয়ই ভালো একটা জায়গাই হবে!
মূল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই বড়সড় একটা চমক। কম্পাসের মতো একটা নির্দেশিকা। বিশ্বের প্রধান ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলো ওই জায়গা থেকে যেদিকে, সেদিকে নির্দেশ করা। লেখা আছে দূরত্বও, প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম ৭ কিমি, কেপটাউনের নিউল্যান্ডস স্টেডিয়াম ৭৮৭৯ কিমি, ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভ ১০৯৭০ কিমি...আছে মেলবোর্ন, লর্ডস, হারারে স্পোর্টস ক্লাব...।
এ তো কেবল শুরু, রেস্টুরেন্টের ভেতরে চমকের পর চমক। ডন ব্র্যাডম্যান, রে লিন্ডওয়াল, স্ট্যান ম্যাককেব, গ্যারি সোবার্স, ইয়ান বোথাম, ইমরান খান, ওয়াসিম আকরাম, শচীন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়—কে নেই ভেতরে! শ্রীলঙ্কার সাবেক-বর্তমান প্রায় সবাই আছেন। ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা সব তারকার দারুণ সব ছবি, মাঠে-মাঠের বাইরের স্মরণীয় সব মুহূর্তের ছবি দিয়ে সাজানো পুরো রেস্টুরেন্ট। শুধু কী ছবি, আছে তাঁদের ব্যবহূত জার্সি, পুলওভার, ব্যাট, গ্লাভস, স্টাম্প, বলসহ অনেক অনেক স্মারক। আছে টেস্ট খেলুড়ে প্রতিটি দেশের বিশাল পতাকা। রেস্টুরেন্ট তো নয়, যেন সমৃদ্ধ এক ক্রিকেট সংগ্রহশালা কিংবা জাদুঘর। ক্রিকেটের প্রতি সামান্য অনুরাগ আছে, এমন যে কেউ সম্মোহিত হয়ে যাবেন ভেতরে ঢুকলেই। ইচ্ছে হবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টুকরো টুকরো ইতিহাসগুলোর পাশে থাকতে, হাত দিয়ে ছুঁতে। থাকতে পারেন, ছুঁতেও পারেন। কেউ বাধা দেবে না। এই হলো ক্রিকেট ক্লাব ক্যাফে, সংক্ষেপে ‘সিসিসি’, কলম্বোর সবচেয়ে জনপ্রিয় থিম রেস্টুরেন্ট।
রেস্টুরেন্টের মালিক জেমস হোয়াইট ও গ্যাব্রিয়েল নামের অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি। নব্বই দশকের শুরুতে শ্রীলঙ্কায় এসেছিলেন সার্ফিং করতে, দেশটার এমন প্রেমে পড়ে যান যে পাকাপাকিভাবে থেকে যান এখানেই। শ্রীলঙ্কা ১৯৯৬ বিশ্বকাপ জয়ের পর হঠাৎ করেই এমন একটি রেস্টুরেন্টের পরিকল্পনা মাথায় আসে তাঁদের। কাজও শুরু করে দেন। সাবেক ফাস্ট বোলার লিন্ডওয়ালের সঙ্গে পরিচয় ছিল, তাঁর পুলওভার দিয়েই শুরু হলো যাত্রা। আরও অনেক সাবেক ক্রিকেটারের কাছ থেকে স্মারক সংগ্রহ করা হলো, কিছু কেনা হলো নিলামেও। কলম্বোর কুইন্স রোডে দাঁড়িয়ে গেল ক্রিকেট ক্লাব ক্যাফে।
কিন্তু সবকিছুর আগে তো এটা রেস্টুরেন্ট! সবচেয়ে বড় চমক তাই খাবারের মেন্যুতেই। মেন্যুকার্ডের প্রচ্ছদ করা হয়েছে বর্তমান-সাবেক অনেক ক্রিকেটাদের অটোগ্রাফ দিয়ে। ক্রিকেট থিম রেস্টুরেন্ট, চাইলেই তাই আপনি ধরে ধরে খেতে পারবেন ক্রিকেটারদের! বিশ্বাস হচ্ছে না? অর্ডার দিয়েই দেখুন না ‘শচীনস সসেজ অ্যান্ড ম্যাশ’ কিংবা ‘পান্টারস পেপার চিকেন’, ইচ্ছেমতো খেতে পারবেন শচীন টেন্ডুলকার কিংবা রিকি পন্টিংকে। খাবারের নামটাই যে এমন! রেস্টুরেন্টের সব খাবার পানীয়র নাম ক্রিকেট আর ক্রিকেটারদের নামে! মুরালিস মাল্লাগাতানি, ইমরানস পাকিস্তানি পাম্পকিন, পন্সফোর্ডস প্রন, দ্য ডেভিড শেফার্ড, সোবার্স স্টার ফ্রাই, অফ স্পিনার পিনাচ, কভার প্রাইভ কর্ডন ব্লু, জয়াসুরিয়াস ট্রিপল সেঞ্চুরি, ‘হোয়াট এ ক্যাচ’ ক্র্যাব, গাঙ্গুলিস গ্রিল...আরও অসংখ্য। ব্যাট হাতে পেশিশক্তির প্রদর্শনীর প্রতীক ভিভ রিচার্ডসকে সবজি খাবারের তালিকায় রাখা হলো কেন কে জানে!
সবচেয়ে বেশি লোকের আনাগোনা রেস্টুরেন্টের পানশালায়। এই অংশটা পুরোপুরি উৎসর্গ করা হয়েছে সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানকে, নাম ‘ব্র্যাডম্যান বার।’ স্যার ডনের ক্যারিয়ারের স্মরণীয় সব মুহূর্তের ছবি, স্মারক, তৈলচিত্র দিয়ে সাজানো পুরো পানশালা। আছে ১৯৪৮ সালের সেই ‘ইনভিন্সিবল’ দলের খেলার কিছু পেপার কাটিংও। রেস্টুরেন্টের সেরা সংগ্রহ নিঃসন্দেহে গ্যারি সোবার্সের ছয় ছক্কা মারার সেই ব্যাট।
শ্রীলঙ্কার সাবেক-বর্তমান ক্রিকেটাররা নিয়মিতই আসেন এখানে, সবচেয়ে বেশি আসেন অরবিন্দ ডি সিলভা। শ্রীলঙ্কায় আসা সব দলের ক্রিকেটাররাই কখনো না কখনো ঢুঁ মেরেছেন এখানে। রিকি পন্টিং এসে খেয়েছেন নিজেকেই, মানে পান্টার চিকেন পেপার! নিজের নামের খাবার খেয়েছেন আরও অনেকেই। সুপারভাইজার চান্না জানালেন, বাংলাদেশের দীর্ঘদেহী ওই ধারাভাষ্যকারও নাকি এখানে অনেকবার এসেছেন। আতহার আলী খান!
দিনে-রাতে ভিড় মোটামুটি লেগেই আছে। এটা যে শুধুই একটি রেস্টুরেন্ট নয়, ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে একরকম তীর্থস্থান!

মিসবাহর কণ্ঠে দলীয় সংহতির জয়গান

বড় কোনো টুর্নামেন্টে ভারতকে সামনে পেলে মিসবাহ-উল-হকেরও হয়তো মনে পড়ে ওই সর্বনাশা স্কুপ। মনে না পড়লেই কী, কেউ না-কেউ ঠিকই মনে করিয়ে দেন। প্রশ্নটা যে হবেই, মিসবাহও বোধহয় তা জানেন। উত্তরটাও হয়তো অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করে রেখেছেন।
২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের কথা ভেবে এই ম্যাচটা কি আপনার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ? মিসবাহর কণ্ঠে যেন রেকর্ড বাজল, ‘অতীত তো অতীতই। সব ম্যাচেই এমন কিছু না-কিছু থাকে। বাকি সব ম্যাচের মতোই এখানেও ভালো কিছু করতে চাই।’
বাকি সব ম্যাচের মতো? ভারত-পাকিস্তান বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল আর বাকি সব ম্যাচ এক নাকি! মিসবাহও নিশ্চয়ই তা মনে করেন না। বলার জন্য বলা। তিনি ভালোমতোই জানেন, এই একটা ক্রিকেট ম্যাচ যা খেলা ছাড়িয়ে সব সময়ই ভিন্ন মাত্রা পেয়ে যায়। এখানে জয়-পরাজয় শুধুই একটা ম্যাচ জেতা-হারা নয়। ডারবানের ওই দুঃস্মৃতি মুছে দেওয়ার প্রতিজ্ঞাটা মনে মনে রাখলেও পাক-ভারত লড়াইয়ের আলাদা তাৎপর্যটা ঠিকই বললেন, ‘এই ম্যাচ ঘিরে দর্শক-সমর্থকদের আগ্রহটাই এটিকে আলাদা করে দেয়। শুধু এই দুই দেশ কেন, অন্য দেশের মানুষও এই একটা ম্যাচের রেজাল্ট জানতে চায়।’
এই মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান সেই বিরল প্রজাতির পাকিস্তানি ক্রিকেটার, খেলার সঙ্গে লেখাপড়াটাকেও যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন। সেটির ছাপ কথাবার্তাতেও পড়ে। সবচেয়ে বেশি পড়ল, যখন এক সাংবাদিক বললেন—পাকিস্তানের বোলিং খুবই ভালো। কিন্তু ব্যাটিং তো খুব খারাপ। এই বিশ্বকাপে পাকিস্তানের পক্ষে একটিও সেঞ্চুরি নেই। সেরা বিশে নেই পাকিস্তানের কোনো ব্যাটসম্যান। মিসবাহ উত্তর দিলেন, ‘সেঞ্চুরি দিয়ে কী হবে? আসল ব্যাপার হলো জেতা। একটা সেঞ্চুরি না করেও যদি আমরা বিশ্বকাপ জিততে পারি তাতেই খুশি। অনেক সেঞ্চুরি-টেঞ্চুরি করেও যদি বাইরে চলে যাই, সেই সেঞ্চুরির কী দাম! সময়মতো ২০-৩০ রানও অনেক সময় সেঞ্চুরির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।’
তবে মিসবাহর কাছে আসল প্রশ্ন এর কোনোটাই নয়। টেস্ট দলের অধিনায়ক তিনি। এই বিশ্বকাপের কিছুদিন আগ পর্যন্তও কে অধিনায়ক—শহীদ আফ্রিদি, না মিসবাহ-উল-হক দোলাচল। দলে আছেন আরেক সাবেক অধিনায়ক ইউনুস খান। বাইরে বসে আছেন শোয়েব আখতার। অথচ পাকিস্তান দল শুধু মাঠের খেলার কারণেই খবর হচ্ছে—না, এই বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে একদমই পাকিস্তানের মতো লাগছে না! ঘটনা কী ভাই?
রমিজ রাজা পাকিস্তান দলে নতুন যে সংস্কৃতির আগমনী গান শুনছেন, মিসবাহও সেটিই শুনিয়ে গেলেন কাল সংবাদ সম্মেলনে। মতান্তর মানেই যে মনান্তর নয়—সেটি জানিয়ে বললেন, ‘মতের পার্থক্য তো হয়ই। তবে আমাদের মধ্যে বোঝাপড়াটা খুব ভালো। অধিনায়ক কোচের সঙ্গে যেমন কথা বলেন, তেমনি সিনিয়র খেলোয়াড়দের সঙ্গেও।’
অতীতের দলগুলোর সঙ্গে এই দলের বড় একটা পার্থক্যও তাই ধরা পড়ছে মিসবাহর চোখে, ‘আমরা এবার সত্যিকার একটা টিম হয়ে খেলছি। ব্যক্তিগতভাবে কেউই এমন বিরাট কিছু করে ফেলেনি, তার পরও দেখুন আমরা সেমিফাইনালে। কারণ একটাই, আমরা টিম হিসেবে খেলছি, যাতে প্রত্যেকে প্রত্যেকের ভূমিকা সম্পর্কে জানে।’
পাকিস্তান দলে এই সৌহার্দ্যের বাজনা এমনই উচ্চ স্বরে বেজে যাচ্ছে যে অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি সম্পর্কে বলতে গিয়ে মিসবাহর কণ্ঠে আবেগ ছুঁয়ে যায়, ‘আক্রমণাত্মক মেজাজটাই ওর সবচেয়ে বড় শক্তি। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। এই বিশ্বকাপেই দেখুন না, একেবারে ঠিক সময়ে উইকেট নিয়ে নিচ্ছে। অধিনায়ক এমন পারফর্ম করলে দলের বাকিরাও পারফর্ম করতে চায়।’
ম্যাচটাকে পাকিস্তানের বোলিং বনাম ভারতের ব্যাটিং বলছেন অনেকে। পাকিস্তানের বোলিংয়ে যদি শোয়েব আখতারও যোগ হয়ে যান? মিসবাহ ‘এটা ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার’ বলে প্রথমে নিরাপদ পথে হেঁটেও গুরুত্বপূর্ণ দুটি লাইন যোগ করে দিলেন, ‘ওয়ার্ল্ড ক্লাস বোলার। সেই ’৯৯ বিশ্বকাপে পর্যন্ত খেলেছে। ওকে নামিয়ে দিলে মনস্তাত্ত্বিক একটা সুবিধা হলেও হতে পারে।’

এবার নিজেদের ছাড়াতে চান টেলর

প্রচলিত ধারণা এমন, দল যেমনই হোক, বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনালে খেলবেই। এবার সেটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। বাংলাদেশের কাছে হোয়াইটওয়াশ, ভারতে গিয়ে ৫-০-তে হার, এর পর দেশের মাটিতে পাকিস্তানের কাছে সিরিজ হার, বিশ্বকাপের আগে মনে হচ্ছিল, তলানিতে ঠেকেছে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট। সেই দলটাও যখন শেষ চারে উঠল, ‘নিউজিল্যান্ড মানেই সেমিফাইনাল’ ধারণা প্রতিষ্ঠিত না হয়ে উপায় আছে?
‘এত ছোট দেশ, এত কম মানুষের দেশ হয়েও আমরা এতবার সেমিফাইনাল খেলেছি, আমি সত্যিই গর্বিত। মাত্র ৪০ লাখ লোকের এক দেশের জন্য এটা বড় একটা অর্জন’—ড্যানিয়েল ভেট্টোরি যা বললেন, খুবই সত্য কথা। কিউই অধিনায়ক গর্ব করতেই পারেন। তবে গর্বের এই রেকর্ডটার পাশে আছে একটা অস্বস্তিও। ১০ বিশ্বকাপের ছয়টিতেই সেমিফাইনাল, কিন্তু ফাইনাল যে খেলা হয়নি একবারও!
গর্বিত হচ্ছেন ভেট্টোরির ডেপুটি রস টেলরও। তবে এবার নিজেদের ছাড়িয়ে নতুন ইতিহাস গড়তে চান বিশ্বকাপের পর সম্ভাব্য নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক, ‘বারবার সেমিফাইনাল খেলার ইতিহাস নিয়ে আমি গর্বিত। তবে এই দল ইতিহাস নতুন করে লেখাতে চায়। আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি, আমাদের ফাইনাল খেলা সম্ভব, মঙ্গলবারই আমরা সেটা প্রমাণ করে দেব!’
টেলরের কণ্ঠের জোর থেকেই পরিষ্কার, কোয়ার্টার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে জয়টা কতটা আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে কিউইদের। সেই আত্মবিশ্বাসের আগুনে এবার পোড়াতে চান শ্রীলঙ্কাকেও, ‘দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানোর আত্মবিশ্বাস আমরা শ্রীলঙ্কা ম্যাচে কাজে লাগাব। গ্রুপ পর্বে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলাটা আমাদের অবশ্যই বাড়তি সুবিধা দেবে। ওই ম্যাচে কিছু জিনিস আমার ঠিকঠাক হয়নি, সেসব এবার শোধরানোর চেষ্টা করব। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার ম্যাচটা খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখব। দেশের মাটিতে ওদের হারানো কঠিন হবে। কিন্তু আমরা ওদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে সেখানে আঘাত করার চেষ্টা করব।’
গ্রুপ পর্বে হারিয়েছে এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা দল পাকিস্তানকে, কোয়ার্টারে অন্যতম ফেবারিট দক্ষিণ আফ্রিকাকে। অথচ অনেকেই সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে মনে করছে ‘আগন্তুক।’ হয়তো গত কিছুদিনের পারফরম্যান্সের জন্যই। বাংলাদেশের কাছে হোয়াইটওয়াশ হওয়া দলকে তো কেউ পাত্তাই দেয়নি। টেলরের দাবি, এতে আখেরে লাভ হয়েছে তাঁদেরই, ‘বিশ্বকাপের বেশির ভাগ ম্যাচেই নিউজিল্যান্ড ছিল আন্ডারডগ, ব্যাপারটা আমরা উপভোগই করেছি। প্রতিপক্ষের ওপর প্রত্যাশার চাপ বেশি ছিল, এতে লাভ হয়েছে আমাদেরই। গত কিছুদিনের বাজে পারফরম্যান্সের পরও দলের সবার বিশ্বাস ছিল, আমরা পারব এবং আমরা সেটা করে দেখিয়েছি।’
গ্রুপ পর্বে দুই দলের লড়াইয়ে উড়ে গিয়েছিল নিউজিল্যান্ড। কিন্তু অন্য দলগুলোর মতো শ্রীলঙ্কাও যদি পাত্তা দিতে না চায়, এবারও কিন্তু আখেরে লাভ হয়ে যেতে পারে কিউইদের!

হতাশায় মুহ্যমান প্রোটিয়া ক্রিকেট

দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে এসেছিল ‘চোকার্স’ অপবাদটা ঘোচাতে। দুর্দান্ত পারফরমেন্স দেখিয়ে, গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান দখল করে উঠে এসেছিল কোয়ার্টার ফাইনালেও। অনেকেই বলতে শুরু করেছিলেন বিশ্বকাপটা এবার প্রোটিয়াদের ঘরেই যাবে। কিন্তু হলো না। কোয়ার্টার ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের কাছে ৪৯ রানের হারে আবারো চূড়ান্ত হতাশা দিয়েই শেষ হলো দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ স্বপ্ন। যে নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ শুরুর কয়েকদিন আগে এই উপমহাদেশ থেকে ফিরে গিয়েছিল টানা ১১টি ম্যাচে হারের লজ্জা নিয়ে, তাদের কাছেই পরাজয় অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথকে একেবারে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। রীতিমতো বাকহীন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এই ব্যর্থতার ধাক্কা সামলে উঠতেও অনেকদিন লেগে যাবে বলেই মনে করেন স্মিথ।
কোয়ার্টার ফাইনালে জয়ের লক্ষ্যটা খুব বেশি ছিল না। মাত্র ২২২ রান। চার উইকেটের বিনিময়ে স্কোর বোর্ডে ১২১ রান জমাও করে ফেলেছিলেন স্মিথ, ক্যালিস, ডি ভিলিয়ার্সরা। কিন্তু এরপর যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং অর্ডার। মাত্র ৫১ রান সংগ্রহ করতেই ধরাশায়ী হলেন বাকি ৬ ব্যাটসম্যান। গ্রুপ পর্বে তাদের দুর্দান্ত পারফরমেন্সও প্রায় ম্লান হয়ে গেল এই ব্যাটিং বিপর্যয়ে। বিশ্বকাপ থেকে এই হতাশাজনক বিদায়ের পর গ্রায়েম স্মিথ বলেছেন, ‘আমরা কয়েকটি ম্যাচে খুব ভালো খেলেছিলাম। এখান থেকে আমাদের অনেক প্রাপ্তিও আছে। কিন্তু এখন দলের জন্য এই বিশ্বকাপের স্মৃতিটা খুব বেদনাদায়ক হয়েই থাকবে। আমাদের নিকট ভবিষ্যত্টাও খুব হতাশায় কাটবে। আমি জানি সবাই আবার একটা সময় খুব ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। কিন্তু আমরা কেউই বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারব না। এবারের বিশ্বকাপটা জেতার খুবই সুবর্ণ সুযোগ ছিল আমাদের সামনে। কিন্তু এভাবে ছিটকে যাওয়ার জন্য এখন শুধু নিজেদেরকে দোষারোপ করা ছাড়া, আর কিছুই করার নেই আমাদের।’
তবে ভবিষ্যত্টাকে হতাশাচ্ছন্ন হিসেবে আখ্যায়িত করলেও একেবারেই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন না স্মিথ। ইমরান তাহির, স্টেইন, মরকেল, বোথা, পিটারসেনরা আবার দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে যেতে পারবে বলেই আশা করছেন তিনি। বলেছেন, ‘বিশ্বকাপের পুরোটাই যে ব্যর্থতা, এমন না। দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেট একটা নতুন যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে একসঙ্গে অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার আছে।’