Showing posts with label আলী যাকের. Show all posts
Showing posts with label আলী যাকের. Show all posts

Monday, March 2, 2015

মমতার সঙ্গে কিছুক্ষণ এবং ... by আলী যাকের

সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঢাকায় এসেছিলেন। সঙ্গে তাঁর সরকারের লোকজন যারা ছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষজন। আর অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের কিছু ব্যবসায়ী। ঢাকায় তার অবস্থানকালে তারই ইচ্ছায় নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল বাংলাদেশের কিছু সংস্কৃতি সম্পৃক্ত ব্যক্তি এবং বুদ্ধিজীবীদের। মধ্যাহ্নভোজের আগে তাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আমাদের সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বসেছিলেন শীর্ষ টেবিলে। আর অন্য অভ্যাগতরা বসেছিলেন তাদের মুখোমুখি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গোলটেবিলের চারপাশে। এই সম্মিলনে সত্যিকার অর্থে একটি আড্ডার আমেজ ছিল এবং বাঙালির আড্ডায় যেমন হয়ে থাকে, নানাবিধ বিষয়ের সমাহার। একটি অতি সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাবেশ ছিল এটি। আমি হেন এক নগণ্য ব্যক্তিও আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম ওইখানে। কথায় কথায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়াদি উঠে আসছিল মাঝে মধ্যেই এবং সেটাই হওয়ার কথা। বাংলাদেশের সবার মনেই সবার ওপরে ছিল তিস্তার পানি বণ্টন সংক্রান্ত উৎকণ্ঠা। অতএব, বিভিন্ন সংস্কৃতজন তাদের নিজস্ব পরিশীলিত ভাষায় এই বিষয়টি সম্বন্ধে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যা এত সহজ নয় যে, একটি কিংবা দুটি আলোচনায় এর সুরাহা হয়ে যাবে। এ কারণেই সেদিনের মধ্যাহ্নভোজে তাৎক্ষণিকভাবে এর কোনো সমাধান পাওয়া যেতে পারে এমন ধারণা কারও মনেই ছিল না। তিনি সংস্কৃতিসেবীদের নিজস্ব ভাষায় তাদের মনের কথা জানতে চেয়েছিলেন এবং বাংলাদেশি অতিথিরা নিজেদের আন্তরিক ভাষায় সেটি জানান দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে। একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে এসেছিল এই কথোপকথন থেকে, তারা কেউ আবেগবর্জিত নিছক রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেননি। এটাই ছিল আমার জন্য বিশাল এক প্রাপ্তি।
পরবর্তীকালে আমি কতগুলো টেলিভিশন টকশোতে দেখলাম :বলা হয়েছে যে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ব্যবসা-বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গকে এই সম্মিলন থেকে দূরে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুদ্ধিজীবীদের বেছে নিয়েছেন এই কারণে যে, তিনি দ্বিপক্ষীয় সমস্যা জর্জরিত বিষয়গুলোর ব্যাপারে আলোচনা করতে আদৌ আগ্রহী ছিলেন না। এহেন কথাবার্তা শুনে আমি বেশ আমোদিত বোধ করেছি। ভেবেছি টকশো এবং বিদগ্ধজনকে ডেকে ডেকে বলি, আপনারা এই সম্মিলনে যাদের চেয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে তো অনেকবার, অনেকভাবে দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে ভারতীয়দের আলাপ-আলোচনা হয়েছে; কিন্তু অবশেষে কিছুই তো হয়নি। একবার না হয় বাকচাতুর্যের পরিবর্তে, আন্তরিকতা দিয়ে যুদ্ধজয় করা যায় কি-না সেটি পরীক্ষা করে দেখলেনই-বা! কী এমন ক্ষতি হয় তাতে? যারা এখনও সংস্কৃতিকে পরিহারযোগ্য বিবেচনা করে এসব তথাকথিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিষয়ক আলাপ-আলোচনাকে কেবল বাগাড়ম্বরসর্বস্ব মানুষের জন্য নির্ধারিত রাখতে চান তাদের স্মরণ করিয়ে দেই যে, সংস্কৃতি দেশ, কাল এবং ব্যক্তিস্বার্থের অনেক ঊধর্ে্ব। অতএব, যে কোনো মানুষ সংস্কৃতজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় হৃদয়ের ছোঁয়াটি সহজেই বুঝতে পারেন। বুঝতে পারেন মানুষের অন্তর কী চায় এবং এই আন্তরিকতাকে উপেক্ষা করলে এর ফল খুব একটা ইতিবাচক হয় না।
লক্ষ্য করা সম্ভব হবে যে, বাংলাদেশের স্বাধিকার এবং স্বাধীনতার যে চেতনা তার উন্মেষ মাতৃভাষার দাবি দিয়ে। ভাষা, সংস্কৃতির অন্তর্গত একটি বিষয়। কেবল ভাষা কেন? দৃষ্টির গোচরে এবং অগোচরে যেসব বিষয় আমাদের জাতিসত্তাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে তার সবই তো সংস্কৃতি উৎসারিত। যেমন_ খাদ্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, সামাজিক আচার, ধর্ম, প্রায়োগিক শিল্পকলা, নানাবিধ শিল্পকর্ম এবং এমনকি মানুষে মানুষে পারস্পরিক সম্পর্ক। অতএব, দুই জাতি কিংবা রাষ্ট্রের মানুষদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভাষা হতে পারে একমাত্র সংস্কৃতি। এটিকে বাহন করলেই ভেতরের সত্যটিকে জানা যায় এবং সত্য জানতে পারলেই আলোচনায় ঐকান্তিকতা আসে এবং সমস্যার সমাধানের দিকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যাওয়া যায়। স্মর্তব্য, ১৯৭১-এ আমরা যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলাম, সেখানে বাঙালি সংস্কৃতির দ্বারা প্রাণিত বাংলাদেশের মানুষ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যার যা আছে তাই তুলে নিয়েছিল হাতে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। এখানে 'স্বতঃপ্রবৃত্ত' শব্দটি প্রণিধানযোগ্য। ইংরেজিতে দুটি কথা আছে। একটি By Choice এবং অন্যটি  By Compulsion. আমাদের যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে বাঙালি সামরিক ব্যক্তিবর্গ অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন By Compulsion.. তারা বীরের মতো যুদ্ধ করেছেন, শহীদ হয়েছেন এবং বিজয়ীও হয়েছেন। কিন্তু এই যুদ্ধ না করা ছাড়া তাদের কোনো গত্যন্তর ছিল না। যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্তর্গত থাকলে তাদের সবাইকে মেরে ফেলা হতো। ঠিক এর বিপরীতে বাঙালি শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে গিয়েছিল By Choice. তারা নিরাপদ দূরত্বে থাকতে চাইলে থাকতে পারতেন। তারা বাধ্য ছিলেন না যুদ্ধ করতে। এখানে আমার নিজের জন্য বিব্রতকর হলেও দু'একটি কথা বলতে চাই এই কারণে যে, কথাগুলো বলা দরকার। বাঙালি ও বাঙালির রাজনীতির সঙ্গে আমরা সম্পৃ্ক্ত ছিলাম সেই তরুণ বয়স থেকেই, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। পাকিস্তানিরা যখন বাঙালিদের আক্রমণ করল, তখন আমি একটি পাকিস্তানি কোম্পানিতে চাকরিরত ছিলাম। আমার বাসযোগ্য একটি ফ্ল্যাট ছিল এবং ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল। আমি এ সবকিছুই ছেড়ে দিয়ে যুদ্ধে চলে গিয়েছিলাম। কলকাতা আমার নানাবাড়ি। আমার কোম্পানির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পাকিস্তানি ছিলেন এবং করাচিতে বসবাস করতেন। তিনি আমার কাছে একটি পত্র পাঠান, যেটি লন্ডন হয়ে কলকাতায় আমার নানাবাড়িতে পেঁৗছে '৭১-এর জুলাইয়ে। এই চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, আমি যদি চাই তবে করাচিতে ফিরে যেতে পারি। কলকাতা থেকে লন্ডন হয়ে করাচি যাওয়ার টিকিট তিনি পাঠিয়ে দেবেন। এই চিঠিটি আমার হাতে আসে প্রায় সপ্তাহতিনেক পরে যখন যুদ্ধ প্রতিবেদনের কাজ শেষ করে কলকাতায় আসি। আমি প্রত্যুত্তরে তাকে লিখেছিলাম, 'আমি যা করছি, তা ভেবেচিন্তে করছি। বাংলাদেশ আমার মা। এটি আমার মায়ের প্রতি আমার ঋণ শোধের একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র' এবং আমি নিশ্চিত, এই আবেগ আমার একক ছিল না, যারাই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যুদ্ধ করেছেন তাদের সবারই হৃদয়ের কথা ছিল এটি।
আমি আবারও বলি, আমার নিতান্ত ব্যক্তিগত এই ঘটনাটি এই প্রথম আমার পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম, যে কারণে আমি বিব্রত। তবে জীবনের একটা এমন ক্রান্তিকালে এসে পেঁৗছেছি যে, যা কিছু সত্য কথা তা বলা প্রয়োজন বলে মনে করি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আমার সেই চেতনা যা এখনও সব কাজে আমাকে অনুপ্রাণিত করে, তা সম্ভব হয়েছে ভাষা, শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি আমার আনুগত্যের কারণে। অতএব, সংস্কৃতি এবং জীবনবোধকে বাইরে রেখে কোনো কর্মকাণ্ডে আন্তরিকতার খোঁজ করাটা এক ধরনের মূর্খতা। সেদিন সেই মধ্যাহ্নভোজে মমতার সঙ্গে কিছু কথার বিনিময়ে আমি নিশ্চিত, তিনি বাংলাদেশিদের হৃদয়ের কথা সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং যেহেতু তিনি নিজেও সংস্কৃতির প্রতি অনুগত, সেই উপলব্ধি নিয়েই বুঝতে পেরেছেন আমাদের সুখ-দুঃখ, আমাদের কান্না-হাসি এবং আমাদের অন্তরের কথা।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Monday, February 23, 2015

শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চা শুরু হোক by আলী যাকের

আমাদের আপন আঙিনায় নভেম্বর মাস। তখনও শীত তেমন জাঁকিয়ে পড়েনি। রাত যখন মধ্যযামে, আমি একটা চাদর জড়িয়ে আমার পড়ার ঘরের জানালার ধারে বসে ছিলাম। একটি বহুতল আবাসিক ভবনের দশ তলায় আমি থাকি। আমার সামনে উত্তরের জানালাটি খোলা ছিল। মৃদুমন্দ বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসছিল ধ্রুপদী সঙ্গীতের সুর মূর্ছনা। এই সঙ্গীত শুনছিলাম বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কল্যাণে। তাদের বার্ষিক শুদ্ধ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান থেকে। আমরা সবাই জানি, আজকাল প্রতি বছর এ আসরটি ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় সেনাবাহিনীর স্টেডিয়ামে। সেই শুরু থেকেই এই সম্মিলনে প্রচুর মানুষ ভিড় করে আসে। তবে এ বছর প্রায় ষাট হাজার সঙ্গীতপ্রেমীর সমাগম হয়েছিল এই অনুষ্ঠানে। আমি গত দুই বছর ধরে স্বশরীরে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারি না স্বাস্থ্যগত কারণে। অতএব, আমার পড়ার ঘরের টেবিলের ধারে বসে সঙ্গীতের সুধা পান করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। ওইখানে বসেই আমি এই উপমহাদেশের তাবৎ প্রধান সঙ্গীতজ্ঞের নিবেদন উপভোগ করেছি। শুনেছি অজয় চক্রবর্তী, কৌশিকী চক্রবর্তী, ভীমসেন জোশী, আমজাদ খান, শিবকুমার শর্মা, ডাগর ভ্রাতৃদ্বয়, কিশোরী আমোলকার প্রমুখের অনবদ্য সঙ্গীত। শুনতে শুনতে কখন যে অন্ধকার রাত ফর্সা হয়ে এসেছে তা লক্ষ্যও করিনি। ডুবে রয়েছি সুরের মূর্ছনায়। মনে মনে সাধুবাদ জানিয়েছি বেঙ্গলকে, আমাদের এই শহরে এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ নিবেদন জনসমক্ষে আনার জন্য।
ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রতি আমার অনুরাগ যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সেই তখন থেকে। সেই বাল্যকাল থেকে আকৃষ্ট ছিলাম বাংলা আধুনিক সঙ্গীতে এবং মা আর দিদির কল্যাণে রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং নজরুলগীতির প্রতি। মনে পড়ে, আমরা প্রায়ই কলকাতার আকাশবাণীতে চিঠি লিখে অনুরোধ করতাম বিভিন্ন গান শোনানোর জন্য। আকাশবাণীর অনুরোধের আসর থেকে আমাদের নাম যখন উচ্চারিত হতো, তখন কী আনন্দ যে হতো মনে তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ওই সঙ্গীতবোধ নিয়ে আস্তে আস্তে বয়োবৃদ্ধি হচ্ছিল আমাদের। তখন আমাদের অজান্তে কখন যে সংস্কৃতি আর রাজনীতি এই বাংলাদেশে এক দেহে লীন হয়ে গিয়েছিল তা বুঝতেও পারিনি। হঠাৎ একদিন ছায়ানটের কল্যাণে ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে গেল। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
এসব কথা ভাবছিলাম ওই রাতে হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়ার বাঁশি শুনতে শুনতে। ভাবছিলাম আজকের এই বাংলাদেশে শুদ্ধ সঙ্গীতের প্রতি যে কোনো অনুরাগ অথবা শুদ্ধ সঙ্গীতের প্রসারে যে কোনো প্রচেষ্টাকেই আমাদের মাথায় তুলে নেওয়া দরকার। ঠিক এই কাজটিই করছে বেঙ্গল। বেঙ্গলের ওই আসর ঘিরে জমে উঠছে রসাস্বাদনে উদগ্রীব সঙ্গীতপ্রেমীদের সম্মিলন। তারা সন্ধ্যা হতে না হতেই জড়ো হচ্ছেন সুর সাগরে অবগাহন করতে। সম্মিলিত সব মানুষের মধ্যে সুর বেঁধে দিচ্ছে এক বন্ধনহীন গ্রন্থি। কাকডাকা প্রত্যুষে তারা যখন যার যার গৃহে ফিরে যাচ্ছেন, তখন যেন তারা একদল সঙ্গীত অধিকৃত মানুষ। ফরাসি লেখক আলবেয়ার ক্যামুর ভাষায় 'চড়ংংবংংবফ'.
অথচ বেশিদিনের কথা নয়, বিষয়টা ছিল ভিন্ন রকম। সেই চলি্লশের দশকের শেষে দেশটি যখন পাকিস্তান হলো তখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আপাত সেক্যুলার শিক্ষা এবং সংস্কৃতি সত্ত্বেও শিল্পকলা এ দেশে হয়ে গেল ব্রাত্য এবং শিল্পকলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব মানুষও হয়ে পড়ল অচ্ছুত। এই ঢাকা শহরেই তো আমরা দেখেছি, ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান জনসমক্ষে অপমানিত হয়েছেন! সবে তানপুরার তার সুরে বেঁধে তিনি পাহাড়ি রাগে একটি ঠুমরির আলাপ শুরু করতেই এক উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি আমলা প্রথম সারি থেকে বলে উঠলেন, 'অনেক হয়েছে! এবারে একটা গজল শোনান ওস্তাদজি!' কথিত আছে, ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খান কিছুক্ষণ স্তম্ভিত থেকে নীরবে ওই আসর থেকে উঠে আসেন এবং অচিরেই চলে যান ভারতে। আবাস গড়েন কলকাতাতেই। সেখানে তিনি সুরের সাগর মন্থন করে দুর্লভ সব রত্ন তুলে এনে পরিবেশন করেন বিশ্বের সব সঙ্গীতপ্রেমী মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে। পরবর্তীকালে আমাদের অতি পরিচিত শিল্পী মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, অজয় চক্রবর্তী প্রমুখ বড়ে গোলাম আলীর ধ্বজা বয়ে চলেছেন এবং চলছেন।
আমরা প্রথম থেকেই প্রত্যক্ষ করেছি সামগ্রিকভাবে শুদ্ধ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এবং বিশেষভাবে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির বিপরীতে পাকিস্তানিদের আগ্রাসন। রবীন্দ্রনাথকে আমাদের জন্য নিষিদ্ধ করতেও দ্বিধাবোধ করেনি পাকিস্তানিরা। রবীন্দ্রনাথের প্রতিপক্ষ হিসেবে দ্বিখণ্ডিতভাবে দাঁড় করিয়েছে আমাদের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। এখন কয়জন খোঁজ রাখেন যে, পাকিস্তানি আমলে নজরুলের কিছু তথাকথিত ইসলামী গজল ছাড়া তার সঙ্গীতের যে ঋদ্ধ ভাণ্ডার ছিল, সেটি অনাস্বাদিত রয়ে গিয়েছিল অধিকাংশ বাঙালির কাছে? তার শ্যামাসঙ্গীত আমরা শুনতে পাইনি। তার ভক্তিসঙ্গীত আমাদের জন্য ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা হয়েছিল।
সেই প্রতিকূল অবস্থায় বাংলাদেশের কিছু সাহসী তরুণ স্বেচ্ছায় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়েছিল বাঙালিকে নিজ বাসভূমে পুনর্বাসিত করার চেষ্টায়। সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশক হয়ে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তারা লড়ে গেছেন আমাদেরই সংস্কৃতির স্বার্থে। রবীন্দ্রনাথ ফিরে পেয়েছেন তার স্থান। উদযাপিত হয়েছে তার জন্মশতবার্ষিকী। নজরুলের অধিকাংশ গান শেখানো হয়েছে শিশু, কিশোর, যুবাদের। নতুন কবিতা লেখা হয়েছে আধুনিক বাঙালি কবিদের দ্বারা। লেখা হয়েছে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী, গণতন্ত্রকামী যত কাব্য। এভাবে আমরা এগিয়ে গেছি সংস্কৃতি-ভাস্বর স্বাধীনচেতা এক জাতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। এসবই মনে আসছিল সেই রাতে, রাতের শেষে। চৌরাসিয়ার বাঁশিতে স্বপ্নমগ্ন হয়ে। তবে সে সঙ্গে আরও কিছু কথা মনে এসেছিল। আমরা যারা বছরের পর বছর ভিড় করে যাচ্ছি সঙ্গীতের ওই মিলনমেলায়, তারা যেন কেবল আপাতরম্যে গা ভাসিয়ে না দিয়ে কিছু সঙ্গীত বক্ষে ধারণ করে নিয়ে যাই যার যার আবাসে। প্রতিনিয়ত ওইসব অমৃত সুধা পান করি। যেন সঙ্গীত মিলনমেলা থেকে উঠে আসে আমাদের ঘরে ঘরে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Monday, February 16, 2015

ইলোরা-অজন্তা by আলী যাকের

বোম্বে থেকে ট্রেনে আওরঙ্গবাদে এসে যখন পেঁৗছলাম, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। কাছেপিঠেই ছিল ভারতীয় পর্যটন সংস্থার তারকা খচিত হোটেল 'আওরঙ্গবাদ'। সেখানে গিয়ে উঠলাম। সকাল সকাল উঠে প্রথমেই গেলাম আওরঙ্গবাদে অবস্থিত 'বিবিকি মাকবারা' নামে তাজমহলসদৃশ একটি ইমারত দেখতে। এটি নির্মাণ করেছিলেন বাদশা আওরঙ্গজেব সপ্তদশ শতাব্দীতে তার স্ত্রী দিলরাস বানু বেগমের কবরের ওপর। তাজমহলের সঙ্গে এর স্থাপত্যে মিল থাকার কারণে এটি দক্ষিণী তাজ হিসেবেও পরিচিত। কিন্তু আওরঙ্গজেব এই ইমারতের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিলেন তা অত্যন্ত সীমিত। অতএব এটি তাজমহলের কাছাকাছিও যেতে পারেনি। বিবিকি মাকবারা দেখার পর আমরা ইলোরার পথে রওনা হলাম। পথিমধ্যে পড়ল প্রাচীন শহর দৌলতাবাদ। এ শহরটি নির্মাণ করেছিলেন ভারত সম্রাট মোহাম্মদ বিন তুঘলক। চতুর্দশ শতাব্দীতে নির্মিত মহারাষ্ট্রের এ শহরটি তুঘলক সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। এই সেই বিখ্যাত নগর যেখানে দিলি্ল থেকে ভারতের রাজধানী প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে অজস্র মানুষের প্রাণ যায়। আমরা ইলোরার গুহার সামনে যখন এসে পেঁৗছলাম ট্যুরিস্ট বাসে করে তখন দুপুর।
ইলোরা আওরঙ্গবাদ থেকে ২৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে রয়েছে ৩৪টি গুহা এবং পাথর কেটে তৈরি এসব গুহার স্থাপত্য বিশ্বের সব পরিব্রাজকের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ইলোরা ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত। সবগুলো গুহাই পাথরের পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে। এই পাহাড়ের আঞ্চলিক নাম 'চরনন্দ্রী' এবং এখানে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলো হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উপাসনালয় হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ বিশ্বের তিনটি প্রধান ধর্মের সনি্নবেশ ঘটেছে এই ইলোরায়। পঞ্চম থেকে দশম খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত এ গুহাগুলোর ১২টি বৌদ্ধ, ১৭টি হিন্দু এবং পাঁচটিতে জৈন ধর্মের নিদর্শন রয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, সেই পৌরাণিক কাল থেকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের উপমহাদেশে বিদ্যমান ছিল।
ইলোরা কখনও লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে যায়নি, যেটা অজন্তায় ঘটেছিল। সেই সৃষ্টির সময় থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত অসংখ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষ নিত্যই এখানে এসেছে। এই নিদর্শনগুলোকে কেন্দ্রে রেখে চারপাশে দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে নানা ধরনের সেবামূলক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ইলোরা দেখা শেষ হলো আমাদের আড়াইটার দিকে। একটি ছোট রেস্তোরাঁয় ফুলকো রুটি আর নিরামিষ তরকারি খেয়ে রওনা দিলাম অজন্তার পথে। অজন্তায় পেঁৗছেই বাসটা গুহার কাছে না গিয়ে বেশ একটি উঁচু পাহাড়ের খাদের কাছে আমাদের নামিয়ে দিল। এখান থেকেই গুহাগুলো দেখা যায়। অর্ধবৃত্তাকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অজন্তার গুহাগুলো ওই সুদূরে। চমৎকৃত হলাম। এই ভিউ পয়েন্ট জায়গাটি আবিষ্কৃত হয় ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৮ এপ্রিল। তৎকালীন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ২৮ ক্যাভেলরির এক অফিসার জন স্মিথ বাঘ শিকারে বেরিয়েছিলেন। তিনি একটি বাঘের পিছে পিছে ছুটতে ছুটতে পাহাড়ের এই খাদের সামনে এসে পড়েন। আর এগোনো সম্ভব ছিল না। এখান থেকে তিনি নিচে তাকিয়ে দেখলেন, নিচে সমতল ভূমিতে ঘোড়ার ক্ষুরের মতো অর্ধবৃত্তাকারে ছড়িয়ে রয়েছে কিছু গুহা, যার মুখগুলো বনের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। ক্লান্ত ক্যাপ্টেন স্মিথ অতীব কৌতূহলী হয়ে পড়লেন এবং শারীরিক ক্লান্তি ভুলে ঘোড়ায় চড়ে সমতল ভূমিতে নেমে এসে নানা গ্রাম ঘুরে ওই গুহাগুলোর কাছে চলে এলেন। ওগুলোর ভেতরে বন্যপ্রাণী কিংবা সাপখোপ থাকতে পারে, এই কারণে তিনি একা সেখানে প্রবেশ করার চেষ্টা না করে পরের দিন প্রত্নতত্ত্বে আগ্রহী এই রকম আরও কিছু ইংরেজ সেনাবাহিনীর অফিসার নিয়ে এ গুহাগুলোর জঙ্গল সরিয়ে এগুলোকে পুনরাবিষ্কার করেন।
আমরা এই ইতিহাস শুনতে শুনতে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। তারপর বাসে করে যখন গুহাগুলোর কাছে এসে পেঁৗছলাম, তখন এক ধরনের শিহরণ জাগল আমাদের মাঝে। এখানে আছে ৩০টি পাথর খোদাই করে তৈরি করা গুহা এবং এর নির্মাণ ঘটেছে খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে প্রায় ছয়শ' পঞ্চাশ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। গুহাগুলোর মধ্যে ফ্রেসকো করা নানা বর্ণের ছবি আঁকা রয়েছে। এগুলোর সামনে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম আর আমাদের গাইড যখন মোমবাতির আলোয় এগুলো দেখাতে শুরু করল, আমরা যেন এক স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করলাম। এত শতাব্দী পরেও এই চিত্রগুলো রয়েছে একেবারে অমলিন।
আমি যেন সেই অতীতে ফিরে গিয়েছিলাম, যখন বৌদ্ধ তীর্থিরা এ গুহাগুলোয় অভিনিবেশ সহকারে একের পর এক এমন সৃজনশীল সৃষ্টি করে চলেছেন। এই গুহাগুলোর বেশিরভাগই ছিল বৌদ্ধ দর্শনের শিক্ষার্থীদের শ্রেণীকক্ষ। কিছু গুহায় তারা বসবাসও করতেন। আবার কয়েকটি গুহা উপাসনার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। চিত্রগুলো অবশ্য জাতকের গল্পের চিত্রকল্প হিসেবে আঁকা হয়েছিল। কী কারণে অজন্তাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়, সেটা এখনও জানা যায়নি। অজন্তার গুহাগুলোর মধ্যে দেয়ালের গায়ে নানা ধরনের ভাস্কর্য দেখা যায়। এগুলো ভারতের প্রাচীন ভাস্কর্যের উজ্জ্বলতম নিদর্শন হিসেবে বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। সপ্তম খ্রিস্টাব্দে চীনা পরিব্রাজক পণ্ডিত জুয়ান জ্যাং লিখে গেছেন, ৫ম খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত বৌদ্ধ দার্শনিক দিগংগ, যিনি যুক্তিবিদ্যায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন, এই গুহায় বসবাস করতেন। আমরা এ গুহাগুলো দেখতে দেখতে এতটাই মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম যে, লক্ষ্যই করিনি ইরেশ এই পরিশ্রম আর নিতে পারছিল না। ও গুহার বাইরে একটি পাথরের খণ্ডে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ছিল। অজন্তা দেখতে দেখতে সন্ধ্যা নেমে এলো। এখান থেকে ৭টায় বাস ছাড়বে। অজন্তা থেকে বাসে জলগাঁওয়ের দূরত্ব প্রায় ৫৭ কিলোমিটার, যখন পেঁৗছলাম তখন রাত ৯টা। এটি একটি জংশন স্টেশন। অবস্থান মহারাষ্ট্রের জলগাঁও জেলায়। এখান থেকেই আমরা রাত ৩টায় কলকাতাগামী বোম্বে মেইল ট্রেন ধরব।
শেষ রাতে হুইসেল দিয়ে ট্রেন যাত্রা শুরু করল কলকাতার পথে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে নানা বিচিত্র চিন্তা আমায় আচ্ছন্ন করে ফেলল। এই অল্প কয়দিনে এত বিচিত্র জায়গা ভ্রমণ করেছি, এত বিচিত্র মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি সব যেন পেঁজা তুলোর মতো সরে সরে যায় মনের ভেতরে। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারা বলে উঠল, 'এটা ছিল একটা টেলিগ্র্যাফিক ট্যুর'। মনে হলো সত্যিই তো!
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Monday, February 9, 2015

অতঃপর বোম্বেতে... by আলী যাকের

বোম্বে এত বিশাল শহর যে, কয়েকদিনের মধ্যে এই শহরটির সব দেখে শেষ করা যায় না। এমনকি বিশেষ দ্রষ্টব্য স্থানগুলোও নয়। এখন তো বোম্বে আরও বড় হয়ে গেছে। কিন্তু ১৯৮০তে যখন আমি দ্বিতীয়বারের মতো বোম্বে গিয়েছিলাম, তখনও এ শহরটি প্রায় সীমাহীন আয়তনের ছিল। উত্তরে সান্তাক্রস বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দক্ষিণে কোলাবা পর্যন্ত শহরটি প্রদক্ষিণে তখনও অনেক সময় লেগে যেত। বোম্বের গল্পে আসার আগে গোয়া সফরের একটি বিষয় বলে নিতে চাই। এটি অনুলি্লখিত রয়ে গিয়েছিল। আমরা যেদিন কালাংগুট সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে গিয়েছিলাম সেদিন ছিল পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ আরও এই কারণে যে, এর আগে কখনও উন্মুক্ত প্রান্তরে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখার সৌভাগ্য আমাদের কারও হয়নি। সৈকতে বসে থাকতে থাকতে কখন যে সূর্যের আলো মৃদু থেকে মৃদুতর হচ্ছিল আমরা লক্ষ্য করিনি। হঠাৎ সচকিত হয়ে আবিষ্কার করলাম, চারপাশ সব অন্ধকার হয়ে গেছে। সে এক গা ছম্ ছম্ করা রোমাঞ্চকর অনুভূতি। মনে হচ্ছিল যেন চারদিকে সবকিছু হঠাৎ করে থেমে গেছে। এমনকি সমুদ্রের ঢেউও একেবারে নিস্তব্ধ। হঠাৎ করেই রোমান্টিক যুগের কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের লেখা 'দ্য রাইম অব দ্য এনসিয়েন্ট মেরিনার' কবিতাটির কথা মনে পড়ে গেল। সেই যখন দৈব নির্দেশে সাগরের ঢেউ এবং স্রোত থেমে গিয়েছিল। সমুদ্রের জলকে মনে হচ্ছিল ইস্পাতের মতো স্থবির। পাখির কলকাকলি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জাহাজ নিস্পন্দ হয়ে গিয়েছিল। সূর্য ছিল মধ্য গগনে স্থির। তখন কেবল সূর্য ছিল না কোথাও। সূর্যের চারপাশে সোনালি একটি আংটির মতো গোল রেখা জ্বলজ্বল করছিল। এমন অদ্ভুদ দৃশ্য এর আগে আমরা কখনও অবলোকন করিনি। আমাদেরও যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। আমরা জানতাম আজ সূর্যগ্রহণ হবে। তবে ভুলেই গিয়েছিলাম বিষয়টির কথা।
আমরা বোম্বেতে উঠেছিলাম অভিজাত কাফ প্যারেড এলাকায় একটি বহুতল ভবনে আমার কলকাতার বন্ধু রাম চন্দ্র রায়ের আনুকূল্যে হিন্দুস্তান টমসন কোম্পানির ট্র্যানজিট ফ্ল্যাটে। এই গোটা সফরে এতদিন বাদে আমরা একটি অত্যন্ত বিলাসবহুল জায়গায় থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। ইরেশ মহাখুশি। বাথরুমটিও খুব পছন্দ হয়েছিল ওর। এই বাথরুমের টাবে বসে ও ঘণ্টা খানেক ধরে স্নান করত। ভারতের পূর্বে অবস্থিত কলকাতা থেকে দক্ষিণের পাড় ধরে সর্ব দক্ষিণে, তারপর আবার পশ্চিমে আরব সাগরের তীর ঘেঁষে উঠে এলাম বোম্বে শহরে। দু'সপ্তাহের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় আমরা বড়ই ক্লান্ত ছিলাম। কোথাও আমাদের কাপড়-চোপড় ধোয়ার সুযোগ মেলেনি। আমরা নিজেরাও সমুদ্রের ধারে কিংবা কড়া রোদের প্রহারে কিম্ভূতকিমাকার হয়ে উঠেছিলাম। আমাদের অর্ধেক দিন কেটে গেল নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে। প্রথমেই নোংরা কাপড়গুলো লন্ড্রিতে দিয়ে দিলাম। তারপর বাইরে গিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করে এসে একটি দীর্ঘ ঘুম।
ঘুম ভাঙল পেটে প্রচণ্ড খিদে নিয়ে রাত ন'টায়। যে ফ্ল্যাটটিতে উঠেছিলাম সেখানে খাবারের কোনো বন্দোবস্ত ছিল না। অতএব বাইরে গিয়ে খেতে হবে। এই প্রথমবার ভেবেচিন্তে রেস্তোরাঁ বের করার একটি সুযোগ পাওয়া গেল। কেননা বোম্বে শহরটিতে আর যাই হোক না কেন খাবারের জায়গার কোনো অভাব নেই। কোনো কালেই ছিল না।
এই শহরে থাকব আরও তিনদিন। তারপর ফেরার পালা। ফেরার পথেই আমাদের মূল আকর্ষণ ইলোরা এবং অজন্তা দেখে কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা হবে শুরু। অতএব তিনদিনে বোম্বের যতখানি দেখা যায় সেই চেষ্টা। একটা গল্প শুনেছিলাম, সাহেবরা ভারত ভ্রমণের পর দেশে ফিরলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় জিজ্ঞেস করা হয়ে থাকে 'হ্যাভ ইউ ডান বোম্বে'? জবাবটা যদি না বোধক হয় তাহলে প্রশ্ন কর্তা বলেন, 'দ্যান ইউ হ্যাভ নট ডান ইন্ডিয়া'। অর্থাৎ বোম্বে দর্শন না হলে ভারত দর্শন হলো না। অথচ কিই-বা আছে এই শহরে? এটি ইতিহাস খ্যাত নগর নয়, দিলি্লর মতো। দিলি্ল শুরু হয়েছিল ইন্দ্রপ্রস্থ দিয়ে। তারপর ছয়টি ভিন্ন, ভিন্ন কালে ছয়বার দিলি্লকে রাজধানী হতে হয়েছে। যে জন্য 'দ্য সিক্স ক্যাপিটালস অফ ডেলহি' একটি বিখ্যাত উক্তি। বোম্বে কেবলই একটি বাণিজ্যিক নগরী। তবে সেই কারণেই এ শহরটিতে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে নানা ধরনের মানুষের আনাগোনা। এক কথায় বলা যায় ভারতের সবচেয়ে কসমোপলিটান নগর এ বোম্বে এবং বোধকরি এ কারণেই শহরটির এমন অসাম্প্রদায়িক চরিত্র।
আমরা তিনদিনে বোম্বের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সর্বত্র ঘুরে বেড়ালাম। তখনও বিশ্ববিখ্যাত শচীন টেন্ডুলকার আবির্ভূত হননি ক্রিকেটের মাঠে। তবে তখনকার সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির অধিকারী সুনীল গাভাস্কারও বোম্বের খেলোয়াড় ছিলেন।
আমাদের তিনজনেরই ছিল থিয়েটারের প্রতি ভালোবাসা। সেই তাগিদেই গিয়েছি বিখ্যাত অভিনেতা পৃথ্বীরাজ কাপুরের পৃথ্বী থিয়েটার দেখতে। বোম্বের দক্ষিণ-পশ্চিম আরব সাগর তীরে অবস্থিত 'গেট ওয়ে অফ ইন্ডিয়া' দেখে চমৎকৃত হয়েছি সবাই। গেট ওয়ে অফ ইন্ডিয়ার পাশে বিখ্যাত তাজ হোটেল। এখানে সব প্রখ্যাত মানুষ থেকেছেন বিভিন্ন সময়ে। সেই ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের কাল থেকে। এখানকার সব খাবার অত্যন্ত চড়া মূল্যের। তবুও সেখানে বসে কফি খেয়েছি আমরা। ইরেশ খেয়েছে কোকাকোলা। এ শহরের ফ্লোরা ফাউন্টেইন এলাকায় রয়েছে একটি বিখ্যাত বইয়ের দোকান। নাম দ্য স্ট্র্যান্ড। তখন বই কেনার পয়সা ছিল না। তবুও ওই দোকানে গিয়ে বই দেখেছি। বিভিন্ন তাকে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নানা রকম গ্রন্থ। এভাবে কেটে গেছে তিনটি দিন। অতঃপর এক সকালে বোম্বের গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল রেলস্টেশন থেকে স্বল্প দূরত্বের একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেনে উঠে বসেছি ইলোরা-অজন্তার উদ্দেশে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Monday, February 2, 2015

গোয়া এবং তারপর ... by আলী যাকের

দক্ষিণ গোয়ার ভাস্কো দা গামা স্টেশনে ট্রেনটি এসে পৌঁছল সন্ধ্যা ৬টায়। খোঁজ নিয়ে জানলাম, এখানেই রাতটা কাটাতে হবে; কেননা ভাস্কো থেকে গোয়ার রাজধানী পানাজিতে যাওয়ার কোনো পরিবহন সেই সময় পাওয়া যাবে না। স্টেশনে খবর নিয়ে জানলাম যে, কাছে-ধারেই একটা মাঝারি গোছের হোটেল আছে। নাম 'সুপ্রিম'। অতএব, আমরা সাড়ে তিনজন মালপত্র নিয়ে দুটি রিকশা করে হাজির হলাম হোটেলে। প্রসঙ্গত বলে রাখি যে, সম্প্রতি ইন্টারনেট সূত্রে জানতে পারলাম যে ভাস্কোতে এখনও এই হোটেলটি আছে এবং অতি সস্তা মূল্যে এখানে থাকা যায়। যেমন, ভারতীয় দেড় হাজার রুপিতে একটি ডাবল রুম পাওয়া যায় এখন। ১৯৮০-তে কত রেট ছিল এখন মনে পড়ছে না। হোটেলে চেকইন করে রাত ৯টার দিকে খাবারের সন্ধানে বের হলাম। রিসিপশন থেকে বলা হলো, এই হোটেল থেকে অল্প দূরেই একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁ রয়েছে। আমাদের সবার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সাড়ে তিন বছরের ইরেশ পর্যন্ত খুশির চোটে ফ্যাক করে হেসে দিয়ে লাফিয়ে উঠল। আমরা দ্রুতগতিতে হেঁটে পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেস্তোরাঁয় পেঁৗছে গেলাম। খুবই ছোট রেস্তোরাঁ। খাবার ঢাকার মতোই চিরায়ত ভারতীয় চাইনিজ। মনে আছে আমরা সাড়ে তিনজন ছয় রকমের ছয়টি ডিশ সাবাড় করে দিলাম। তারপর আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর যখন তুলছি হঠাৎ উচ্চকণ্ঠে ইরেশ বলে উঠল, 'বাবা, এতদিনে পেট ভরল'। এই পর্যন্ত দক্ষিণ ভারত সফরে আসার পর সবচেয়ে ভালো ঘুম হলো সেই রাতে।
পরদিন সকালে একটি ট্যাক্সিতে করে আমরা পানাজির উদ্দেশে রওনা দিলাম। ভাস্কো থেকে পানাজি ৩৩ কিলোমিটার পথ। কিন্তু পাহাড়ি পথে স্বভাবতই দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো সম্ভব নয় বলে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। পথটি সবুজ পাহাড়ের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে। ভারি মনোরম। গোয়ার রাজধানী পানাজি ছোট্ট সুন্দর একটি শহর। একাধিক দর্শনীয় স্থান আছে এখানে। শহরের মধ্যখানে প্রায় পুরোটাজুড়েই একটি বাজার, অনেকটা আমাদের দেশের বাণিজ্য মেলার মতো বিন্যস্ত। এখানকার লোকজন, বিশেষ করে নারীরা সর্বদাই হাসিমুখে শপিং করে বেড়াচ্ছে। আমরা যেদিন সকালে পানাজিতে এলাম সেদিন খ্রিস্টানদের 'লেন্ট' উৎসব চলছিল। পানাজিতে হাজার হাজার পুরুষ-রমণী তাদের আকর্ষণীয় পোশাক-পরিচ্ছদে আবৃত হয়ে রাস্তায় নেমে এসেছে। এখানকার সব রাস্তার মোড়ে লাউড স্পিকার লাগিয়ে নানা রকম ইংরেজি গান বাজানো হচ্ছে। সবাই সেই সুর এবং ছন্দে নেচে নেচে পথ চলছে। আমরা এ বাজারেরই একটা ছোট্ট হোটেলে আমাদের মালপত্র রেখে বেরিয়ে এলাম পানাজির মানুষের সঙ্গে নেচে-গেয়ে দিনটা পার করে দেব বলে।
এখানে দু'দিন থাকব। আজকের রাত থেকে কাল সারাদিন কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে যাব ভাস্কোতে। ওই রাতেই সেখান থেকে আমাদের ট্রেন। অতএব, আজকের এই 'লেন্ট' উৎসবের দিনে শহর এবং আশপাশ দেখেই কাটাব সারাদিন। কালকের জন্য রাখা থাকল গোয়ার অতি আকর্ষণীয় সমুদ্রসৈকতগুলো। সৈকতে আমাদের গন্তব্য হবে অর্জুন এবং কালাংগুট বিচ। পানাজির অদূরেই পুরনো গোয়া নামে একটি উপশহর আছে। যেটি পর্তুগিজদের প্রথম উপনিবেশ ছিল এবং যেখানে প্রতিদিন প্রচুর পর্যটকের সমাগম ঘটে। পুরনো গোয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিজাপুরের সুলতানদের দ্বারা ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এইটিই ছিল গোয়ার রাজধানী। এ সময়ে পুরনো গোয়া আক্রান্ত হয় প্লেগ মহামারীর দ্বারা এবং এখানকার অধিবাসীরা শহরটি থেকে পালিয়ে গিয়ে গোয়ার বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট উপশহর নির্মাণ করে। পুরনো গোয়ায় বেসিলিকা গির্জায় একটি কাচের কফিনের ভেতরে রক্ষিত আছে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়েরের মমিকৃত দেহ। মেঝে থেকে একটু ওপরে স্থাপিত এই কাচের কফিনটির মধ্যে সেন্ট ফ্রান্সিসের মুখটি স্পষ্ট দৃশ্যমান। আমরা সবাই প্রথম দর্শনেই শিহরিত এবং মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
পরের দিন সমুদ্রসৈকতের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম সকাল ৭টায়। এরই মধ্যে নাশতা করা হয়েছিল। প্রথমে কালাংগুট। ইরেশ তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছিল। তাই প্রাতঃকৃত্য শেষ করা হয়নি তার। এখানে একটি বাবলা গাছের তলায় সেটি সারা হলো। এটি নিয়ে ও নিজেই একটি গান বেঁধেছিল এবং সেটি প্রায়ই গাইত। 'এই তো বেশ এই, কালাংগুটের বাবলা গাছের নিচে...!' অর্জুন সৈকতে নারী-পুরুষের নগ্ন দেহের ভিড় দেখে আমরা সত্যিই ঘাবড়ে গেলাম।
ওইদিনই রাতে ভাস্কো থেকে আমরা ট্রেনে চেপে বসলাম। গন্তব্য বোম্বে, বর্তমানের মুম্বাই। ভাস্কো থেকে মেইল ট্রেনটি ছাড়ে বোম্বের উদ্দেশে রাত ১০টায়। আমরা গুছিয়ে-গাছিয়ে বসতেই ট্রেন ছেড়ে দিল। সকাল ৮টায় এই গাড়ি বোম্বে পেঁৗছবে। ঘুম যখন ভাঙল তখন ট্রেনটি আস্তে আস্তে বোম্বের গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের দিকে এগোচ্ছে। নূর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল ট্রেনের দু'দিকে। সেখানে রেললাইনের দু'ধারে বসে সারিবদ্ধ মানুষ তাদের ভোরের প্রথম কাজটি সারছে। সকাল সোয়া ৮টায় ট্রেন বোম্বের গ্র্যান্ড সেন্ট্রালে এসে থামল। আমরা মালপত্র নিয়ে নেমে এলাম। গ্র্যান্ড সেন্ট্রালের বাইরে এসে দেখি এই বিশাল শহরের প্রাত্যহিক কাজকর্ম ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। প্রতি মিনিটে একটি করে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীবাহী ট্রেন এসে প্লাটফর্মে দাঁড়াচ্ছে। ভেতরের মানুষ বেরিয়ে এসে ছুটছে রুদ্ধশ্বাসে যার যার গন্তব্যে। রাস্তায় হাজার হাজার গাড়ি। ইতিহাসের সাক্ষী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের নিদর্শন এই গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল। নিজস্ব গরিমায় স্নাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন বলছে, এই দেখ আমাকে। প্রাণচঞ্চল বোম্বের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে আমি তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি। অস্ফুটে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো, 'গুড মর্নিং বোম্বে'।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

Friday, July 26, 2013

হৃদয়নন্দন বনে-একটু পেছন ফিরে দেখি by আলী যাকের

সেদিন এক বন্ধু ফেসবুকে একটি ছবি দিয়েছিল। ছবিটি হাতে আঁকা। ফাঁসির মঞ্চে, ফাঁসির দড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষুদিরাম। আমি নিশ্চিত যে, ক্ষুদিরাম সম্বন্ধে পাঠকের সম্যক ধারণা আছে।

Saturday, July 20, 2013

হৃদয়নন্দন বনে-কত চাই আর? by আলী যাকের

আজ এই বর্ষণমুখর সকালে যখন সমকালের জন্য এই কলামটি লিখতে শুরু করেছি তখন মনটা ভারি উৎফুল্ল ছিল। বৃষ্টি, বৃষ্টি! বর্ষা আমায় মাতিয়ে তোলে। বর্ষার শব্দে আমার সমস্ত মন এক অনাবিল আনন্দে ভরে যায়।

Friday, June 21, 2013

হৃদয়নন্দন বনে-জয়নগরের মোয়া বৃত্তান্ত by আলী যাকের

আজকে সকালে লেখার টেবিলে বসে যখন ভাবছি কী বিষয়ে লিখব, তখন হঠাৎই জয়নগরের মোয়ার কথা মনে পড়ে গেল। এই মিষ্টিটি বিশেষ ঋতুতে কলকাতার বাগবাজার এলাকায় প্রায় সব ময়রার দোকানে পাওয়া যায়।

Friday, February 8, 2013

হৃদয়নন্দন বনে-ওই পোহাইল তিমির রাতি by আলী যাকের

একাত্তরের ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান থেকে যখন উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম', তখন সেই উত্তাল জনসমুদ্র থেকে সন্ধ্যাবেলায় আমরা কতিপয় বন্ধু ফিরে চলেছি আমাদের ডেরায় আর বসন্তের মৃদুমন্দ দখিনা বাতাস ছিল আমাদের সহযাত্রী।

Friday, January 11, 2013

হৃদয়নন্দন বনে-আসুক বাধা দুর্মর_ চলবো বাধা তুচ্ছ করে! by আলী যাকের

'যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,/সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া/যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অন্তরে/যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া/মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে/দিক্্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা-/তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর/এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।'

Wednesday, January 9, 2013

ধর নির্ভয় গান- রাজনীতির ওপরে যে জননীতি by আলী যাকের

কোনো কিছুই চিরায়ত বলে ধরে নেবেন না দয়া করে। আজকের বিপুল জনসমর্থন সহজেই কাল শূন্যতায় পর্যবসিত হতে পারে। আমার মনে হয়, প্রত্যেক জনপ্রতিনিধির উচিত প্রতিটি ইস্যুতে গণমানুষের ধ্যান-ধারণাকে পর্যবেক্ষণ করা।

Friday, January 4, 2013

হৃদয়নন্দন বনে-আমার গেলাস সদাই থাক আধেক পূর্ণ by আলী যাকের

মধ্য ষাট বয়সে এসে আমার এই পরম আশাবাদী মনটাকে আর বদলাতে চাই না। থাকুক না সে যেমন আছে? জীবনের সেই কোনো বিহানবেলা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমার জীবনে রোদ, বৃষ্টি এবং দাবদাহের প্রচণ্ডতা অথবা কালো মেঘের ভয়াবহ কটাক্ষ আমাকে জীবনবিমুখ করতে পারেনি।

Monday, December 31, 2012

ধর নির্ভয় গান-ক্রিকেট, ক্রিকেট by আলী যাকের

এবার ক্রিকেটের বিশ্বকাপ আমাদের ঘরেই শোভা পাচ্ছে। আমরা এটিকে প্রায় ছুঁতেই পারি_ এ-ইবা কম কিসের? বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিজয় তো এখানেই।

Friday, December 28, 2012

হৃদয়নন্দন বনে-কুয়াশার চাদর ভেদ করে যখন আশার আলো দেখা দেয় by আলী যাকের

আজকাল খুব সকালে আমার ঘুম ভেঙে যায়। মাঝে মধ্যে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করি, ঘুম আসে না। তখন বিছানা ছাড়তেই হয়। গিয়ে বসি আমার পড়ার টেবিলে। আমার সামনেই বিশাল খোলা জানালা।

Saturday, December 22, 2012

হৃদয়নন্দন বনে-মুক্তবুদ্ধির পরাজয়! by আলী যাকের

বিজয় দিবস পেরিয়ে এলাম বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল। কিন্তু এবারের বিজয় দিবসের স্মৃতি আমার মনে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। বস্তুতপক্ষে আমার জন্মের পরে কয়েক বছর পার হওয়ার পর এমন রমরমা বিজয় দিবস খুবই কম দৃষ্টিগোচর হয়েছে আমার।

Friday, November 30, 2012

হৃদয়নন্দন বনে-হাতে হাত ধরে সোনালি আলোর দিকে by আলী যাকের

বছরের এই সময়টিকে, বাল্যকাল থেকে শুনে আসছি আমরা, সুদিন বলা হয়ে থাকে। এর কারণ একাধিক। প্রথমত, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, খানাখন্দ ভরা জলপ্রধান এই দেশে বছরের বাকি সময়গুলোতে চলাফেরা করা দুষ্কর।

Saturday, November 17, 2012

হৃদয়নন্দন বনে-আগামী প্রজন্মকে সৎ চিন্তায় দীক্ষিত করার এখনই সময় by আলী যাকের

বয়স যখন বাড়ে, মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে, তখন স্বভাবতই মানুষ পেছনের দিকে তাকায়। অনেকে মানুষের এই অতি স্বাভাবিক আচরণকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অথচ এটাই মানুষের ধর্ম।

Saturday, November 10, 2012

বাংলাদেশের জয় হোক by আলী যাকের

আজ, এই পড়ন্তবেলায় গোধূলি লগ্নে অস্তগামী সূর্যের ছটা এটাই মনে করিয়ে দেয় যে, একটি দিনের শেষ হতে চলল, আরও একটি নতুন দিনের শুভারম্ভের ইঙ্গিত দিয়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমি একজন আশাবাদী মানুষ। আমি আশাবাদী ছিলাম আমার যৌবনের উন্মেষ থেকে। আশাবাদী আছি এখনও। বলা যায় এই আশাই আমায় দ্বিগুণ আগ্রহ নিয়ে নতুন একটি দিন পরিক্রমায় উৎসাহ প্রদান করে।

আলোকের এই ঝরনাধারায় (পর্ব-১৪)-ধূপখোলা মাঠ দেখে আনন্দে উদ্বেলিত by আলী যাকের

গেণ্ডারিয়ায় আমাদের গুছিয়ে-গাছিয়ে বসতে বেশ কিছু দিন লেগেছিল। সেখানে আমাদের শুরুর দিনগুলো স্মৃতির পাতায় কেমন যেন ধূসর হয়ে গেছে। তবুও মনে পড়ে, বাড়ির খুব কাছে বিশাল ধূপখোলা মাঠ দেখে আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিলাম। একদিকে আমবাগান, আরেক দিকে পাড়ার বসতবাটি, বিশাল এক প্রান্তর ছিল ওই ধূপখোলা মাঠ।

Friday, November 9, 2012

হৃদয়নন্দন বনে-বারাক ওবামা :গণমানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে...! by আলী যাকের

অবশেষে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে বারাক ওবামা দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলেন। এই নির্বাচন নিয়ে বাঙালি কি বাংলাদেশি, আমরা সবাই অল্প-বিস্তর উদ্বিগ্ন ছিলাম। কেন উদ্বিগ্ন ছিলাম? প্রথমত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জন্য একটি ভয়াবহ বাস্তব! এতটাই বাস্তব যে, সে দেশে যদি হাঁচি দেয়, আমাদের দেশের সর্দি লেগে যায়।