Tuesday, April 14, 2015

‘ইংল্যান্ডেইতো ধরতে পারে, নোটিস কেন’

লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বেশ আগে থেকেই চেষ্টা করছে সরকার। এ বছরের শুরুতেও এক দফা উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ওই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি দেন। এতে তারেকের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, লন্ডনে অবস্থান করেও বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে ও নির্দেশনা দিয়ে তিনি বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলছেন।  এই চিঠি পাঠানোর প্রায় তিন মাস পর তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারে রেড নোটিশ জারি করল ইন্টারপোল। সংস্থাটির বাংলাদেশ শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোর (এনসিবি) প্রধান পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা তিন-চার মাস আগেই ইন্টারপোলে রিকোয়েস্ট (অনুরোধ) পাঠিয়েছিলাম।
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হওয়ার বিষয়ে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, খবরটা আমি বিভিন্ন টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখেছি। বিষয়টা আমার কাছে অ্যাবসার্ড (অযৌক্তিক) মনে হচ্ছে। সে তো ইংল্যান্ডেই আছে। ধরতে চাইলে সেখান থেকেই তাকে ধরতে পারে। তাকে ধরতে ইন্টারপোলকে কেন নোটিশ দিতে হবে? আমার কাছে পুরো বিষয়টাই ফলস বলে মনে হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তাই এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে পারব না।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন বা ইন্টারপোল একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যার প্রধান কাজ আন্তর্জাতিক পুলিশকে সহায়তা করা। সংস্থাটিতে ১৮৮টি দেশের পুলিশ নিজেদের মধ্যে গুরুতর অপরাধ-সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করে। এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নোটিশ ইন্টারপোলের সাধারণ সচিবালয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সংস্থাটি আট রকমের নোটিশ জারি করে, রেড (লাল), ইয়োলো (হলুদ), ব্লু (নীল), ব্ল্যাক (কালো), গ্রিন (সবুজ), অরেঞ্জ (কমলা), ইন্টারপোল-জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বিশেষ নোটিশ ও পারপল (হালকা বেগুনি)।
ইন্টারপোলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রেড নোটিশের মাধ্যমে ওয়ান্টেড ব্যক্তিদের অবস্থান জানা এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়। আর এর লক্ষ্য থাকে ওই ব্যক্তিরা যে দেশে দোষী সাব্যস্ত, সেই দেশে প্রত্যর্পণ বা এ ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
তবে সংস্থাটির গঠনতন্ত্রের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোনো রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় অথবা জাতিগত ব্যক্তিত্বের (ক্যারেকটার) ক্ষেত্রে এ সংস্থার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা কার্যক্রম চালানো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।’
সে ক্ষেত্রে তারেক রহমানের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে তারেক রহমানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, ‘অনেক সময় সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য এ রকম করে থাকে। তবে পুরো বিষয় নিয়ে জেনেশুনে আগামীকাল বিস্তারিত মতামত জানাতে পারব।’
ইন্টারপোলের গঠনতন্ত্রের তিন নম্বর অনুচ্ছেদের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিবির প্রধান মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘ইন্টারপোল যাচাই-বাছাই করে, সবকিছু ক্লিয়ার (স্পষ্ট) পেয়ে, তারপরই নোটিশ জারি করে। এটা তাদের এখতিয়ার। তাদের নিজস্ব লিগ্যাল অ্যাডভাইজার বডি (আইনি পরামর্শ শাখা) আছে, তারা যাচাই বাছাই করেই কারো বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করে। এটা শুধু তারেক রহমানের ক্ষেত্রে নয়, সবার ক্ষেত্রেই এটা করা হয়।’
সূত্র: এনটিভি অনলাইন

মুসা বিন শমসেরের ব্যাপারে দুদকের হাতে নতুন তথ্য! by মোর্শেদ নোমান

মুসা বিন শমসের। ফাইল ছবি
বিতর্কিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের সম্পদ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে মুসা ও ব্যবসায়ী টিপু আলমের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণীর জন্য নোটিশ জারি করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সুইস ব্যাংকে তাঁর ১২ বিলিয়ন ডলার বিষয়ে তথ্য জানতে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কাছেও চিঠি পাঠাচ্ছে সংস্থাটি। দুদকের কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
টিপু আলম মুসার ছোট ছেলে জুবি হাজ্জাজের শ্বশুর কে এম শহিদুল্লাহর ভাগ্নে ও ব্যবসায়িক অংশীদার। জুবির স্ত্রী নাসরিন সুলতানা সুমি টিপু আলমের খালাতো বোন। দুদকের অনুসন্ধানে মুসার সঙ্গে টিপু আলমের ‘পরোক্ষ’ সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। এর আগে তাঁকেও দুদক জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, অনুসন্ধানে নামার সময় সুইস ব্যাংকে মুসার যে পরিমাণ অর্থ রয়েছে বলে দুদক জানত, প্রকৃতপক্ষে এ পরিমাণ আরও বেশি। দুদকের দ্বিতীয় দফা জিজ্ঞাসাবাদে মুসা নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন। সম্প্রতি দুদকের অনুসন্ধান দল মুসার মালিকানাধীন বনানীর জনশক্তি প্রতিষ্ঠান ড্যাটকো এবং তার গুলশানের বাসায় পরিদর্শনে যান। সেখানে মুসা বিন শমসেরকে দলটি জিজ্ঞাসাবাদও করেন বলে জানা গেছে।
সূত্রটি আরও জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে মুসা জানিয়েছেন, সুইস ব্যাংকে তাঁর একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। তবে এ অ্যাকাউন্টে সাত বিলিয়ন নয়, বর্তমানে জমা আছে মোট ১২ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৭৮ টাকা হিসেবে)। এ অর্থ জব্দ অবস্থায় রয়েছে বলেও জানান তিনি। অথচ সুইস ব্যাংকে মুসার জব্দকৃত অর্থের পরিমাণ সাত বিলিয়ন ডলার রয়েছে তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুদক। দুদকের প্রথম দফা জিজ্ঞাসাবাদেও এ তথ্য জানিয়েছিলেন মুসা। মুসার দেওয়া নতুন এ তথ্যের পর আইনি প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অর্থের পরিমাণ ও উৎস জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের সহায়তা চাইছে দুদক।
দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে মুসা দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে তার কোনো অর্থই সুইস ব্যাংকে জমা হয়নি। ৪২ বছর বিদেশে বৈধভাবে ব্যবসার মাধ্যমেই তিনি ১২ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করেছেন, যা সুইস ব্যাংকে তার নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, মিসর, সিরিয়া ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের সরকারি প্রতিরক্ষা ক্রয়সংক্রান্ত পাওনা অর্থই সুইস ব্যাংকের মুসার অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে।
সুইস ব্যাংকে অতিরিক্ত পাঁচ বিলিয়ন ডলার সম্পদের তথ্যের পাশাপাশি দুদককে মুসা আরও জানিয়েছেন, সাভারে তাঁর এক হাজার ২০০ বিঘা জমি রয়েছে। সত্তরের দশকে নিজ নামে ঢাকা জেলার সাভার অঞ্চলে বিভিন্ন দাগে বিভিন্ন সময় দলিল ও সাফ-কবলার মাধ্যমে এ সব জমি কিনেছেন। জমির অধিকাংশই বর্তমানে গাজীপুর জেলার বিভিন্ন মৌজায় তফসিলভুক্ত। তিনি জানান, দেশে না থাকায় এ সব জমির খাজনা পরিশোধ করে নামজারি করা সম্ভব হয়নি। তবে গত কয়েক বছরে দেশের অবস্থানের কারণে জমিগুলো পুনরুদ্ধারে চেষ্টা করছেন।
২০১৪ সালের জুন মাসে বিজনেস এশিয়া নামের একটি সাময়িকীর ঈদসংখ্যায় মুসাকে নিয়ে প্রকাশিত প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের সূত্র ধরে গত বছরের ৩ নভেম্বর কমিশনের নিয়মিত বৈঠকে মুসার সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। ওই সাময়িকীতে এই ব্যবসায়ীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তাঁর জীবনযাত্রা, আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর প্রায় ৪০ জন ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর বহর নিয়ে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হন তিনি। দুদকের উপপরিচালক মীর জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে একটি দল অভিযোগটির অনুসন্ধান করছেন।

জীর্ণ-পুরাতন কবে ভেসে যাবে? by মাহমুদুজ্জামান বাবু

নতুন বছর, তাকে বরণ করে নিতে কত প্রস্তুতিই না থাকে তরুণদের
মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০/১১ মার্চ বাংলা সন প্রবর্তন করেন এবং তা কার্যকর হয় তাঁর সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬)। হিজরি চান্দ্র সন ও বাংলা সৌর সনকে ভিত্তি করে বাংলা সন প্রবর্তিত হয়। এটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত থাকলেও পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা হয় আকবরের আমল থেকেই। সে সময় বাংলার কৃষকেরা চৈত্র মাসের শেষ দিনের সময় পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার এবং অন্যান্য ভূ-স্বামীর বকেয়া খাজনা পরিশোধ করত। পরদিন ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন, মেলা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন হতো। ক্রমান্বয়ে পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে সর্বজনীন এক মহোৎসব। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলনেও পয়লা বৈশাখ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। তৎকালীন আইয়ুব সরকার ‘রবীন্দ্রচর্চা’র ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে, তার প্রতিবাদে বৈশাখের প্রথম দিনে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ঢাকার রমনা বটমূলে নববর্ষ পালনের আয়োজন করে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই অনুষ্ঠান ক্রমান্বয়ে বিপুল জনসমর্থন পেতে থাকে এবং স্বাধিকার আন্দোলনের চেতনায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রামের অংশ হয়ে ওঠে।
তারপর ক্রমে সাংস্কৃতিক উৎসবের সংখ্যা কমেছে, প্রতিক্রিয়াশীলতার চর্চা বেড়েছে। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জীবন থেকে উৎসারিত পয়লা বৈশাখ এখন নাগরিক উৎসবের ঝলমলে আয়োজন। কৃষকের জীবনের ‘হালখাতা’ খোলা হোক বা না হোক, শহুরে ব্যবসায়ীদের মুনাফার ঢোল বাজতে থাকে। নানা চটকদার বিজ্ঞাপনে বাজার ছেয়ে যায়। কোনো কোনো ফ্যাশন হাউস বলে, ‘এই শাড়ি/পাঞ্জাবি/অলংকার শুধু একটাই করা হয়েছে। এ কেবল আপনারই জন্য। দ্রুত অর্ডার করুন।’ আবার কেউ কেউ বিজ্ঞাপনে লিখেছেন, ‘প্রাপ্ত অর্থের একটা অংশ আমরা কারিগরদের দেব।’ কত অংশ দেবেন তা সুস্পষ্ট নয় যদিও, তবু ভাবখানা এমন যে এতে তাঁদের বদান্যতার সীমা নেই।
মাত্র কিছুদিন আগে, যখন পেট্রলবোমায় পুড়ে সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছিলেন, বার্ন ইউনিটে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, সেই সব অগ্নিদগ্ধ আলোকচিত্র দিয়ে ঢাকার একটি বিখ্যাত ফ্যাশন হাউস নারী-পুরুষের পোশাক তৈরি করে বিক্রি করেছেন। মুনাফার লোভ কতটা লকলকে হয়ে উঠলে এ ধরনের কাজ করা যায়!
তবু চাই, উৎসব হোক। এত আত্মবলিদানের এই দেশে চারদিক যখন অন্ধকারে ঢেকে যায়, তখন খুব ইচ্ছে করে নব আনন্দে জাগতে। প্রতিক্রিয়ার শক্তির অভয়ারণ্য যখন চারপাশ, তখন একটি দীর্ঘ মঙ্গল শোভাযাত্রা অশুভের বিনাশের দিকে ধাবিত হোক। রাজনীতিতে হিংস্র কপটতা, সংস্কৃতিতে আপস, পরিবার ও ব্যক্তিমানসে চূড়ান্ত নৈরাজ্য—সবকিছু প্রবল বাতাসে উড়িয়ে, দিগ্বিদিক কাঁপিয়ে বজ্র-বিদ্যুৎ নিয়ে বৈশাখী ঝড় আসুক, বছরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক, জীর্ণ-পুরাতন যাক ভেসে যাক। নববর্ষের নব আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক সব প্রাণে।
কিন্তু, সব সময় জয় হয় না চাইলেই। একদা যা ছিল মূল্যবোধের প্রতীক, এখন তা উপহাসের ফিসফাস। এখানে রাষ্ট্রের সম্পদ চুরি করে যারা, তারা বুক চিতিয়ে হাঁটে, কখনো কখনো জনপ্রতিনিধিও হয়। চুরি সমাজে আছে, প্রতিকারহীনতাও আছে, সুতরাং চুরির অভ্যাসও আছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের এক তরুণ কূটনীতিক নেদারল্যান্ডসের একটি ইলেকট্রনিক দোকান থেকে চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। তিনি স্বীকার করে বলেছেন, তাঁর কয়েকজন সহকর্মী এর আগে এ ধরনের কাজ করেছেন এবং তাঁরা কেউই ধরা পড়েননি। তাতেই তিনি উৎসাহিত হয়েছেন। ওই কূটনীতিক ও তাঁর নয়জন সহকর্মী ডাচ সরকারের খরচে ও তাদের আমন্ত্রণে একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে নেদারল্যান্ডসে যান। ৩৫০ ইউরো জরিমানা দিয়ে ওই কূটনীতিক রেহাই পেলেও ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত ডাচ সরকার বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেছে।
মানুষের মানুষ হিসেবে বেঁচেবর্তে থাকার লড়াইটা এখন বৈশ্বিক। দুই মাসের কাছাকাছি সময় হলো কানাডার মন্ট্রিয়লে এসেছি। অভিবাসী বাঙালিদের আয়োজিত কয়েকটি অনুষ্ঠানে গান গাইতে এসেছি এখানে। আমার স্ত্রী, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রোকেয়া চৌধুরীর সঙ্গে এখানে যে বাসায় থাকছি, ৩১ মার্চ রাতে আকাশে ওড়া হেলিকপ্টারের শব্দে সেই ঘরে টেকা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, ঘরের ছাদেই হেলিকপ্টার নেমেছে। পরদিন অনলাইনে সংবাদ দেখে কারণটা বোঝা গেল। শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানোর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছিল সেই রাতে। তাদের দিকে সন্ধানী আলো ফেলে আকাশে ঘুরপাক খাচ্ছিল পুলিশের হেলিকপ্টার। ২ এপ্রিল সেই বিক্ষোভ পুরো মন্ট্রিয়ল শহরকে অচল করে দিল। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিলে নামল মাঝারি আয়ের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরদিন মন্ট্রিয়ল গেজেট-এ লেখা হলো, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল ১ লাখ ২ হাজারেরও বেশি মানুষ। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সেই বিক্ষোভ মিছিল দেখেছি। কুইবেক প্রদেশের মেয়রের বিশাল বিশাল সব ব্যঙ্গাত্মক মুখোশ, রংবেরঙের প্ল্যাকার্ড আর হরেক রকমের প্যারেড সংগীত। এক দলের বাজানো সুরে উৎকর্ণ হয়ে উঠলাম। খুব পরিচিত সুর। কোন গান এটা? হঠাৎ শিহরিত হলাম: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, সোভিয়েত রেড আর্মি যখন ফ্যাসিস্ট হিটলার বাহিনীকে হটাচ্ছে পেছনের দিকে, তখনকার একটি গান, বাংলা অনুবাদ করে গেয়েছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস: ‘ভেদি অনশন মৃত্যু তুষার ও তুফান/ প্রতি নগর হতে গ্রামাঞ্চল/ কমরেড লেনিনের আহ্বান/ চলে মুক্তি সেনাদল...।’
চারুকলা অনুষদ থেকে এবার যে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে পয়লা বৈশাখের সকালে, কৃষকের জমি ও অধিকার কেড়ে নেওয়া জোতদার এবং জোতদারি রাষ্ট্রের একটা মুখোশ কি সেখানে থাকবে? ঐতিহ্যের নামে এসব জীর্ণ-পুরাতন আর কত? অনেক তো হলো!
মাহমুদুজ্জামান বাবু: গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী।
mzamanbabu71@gmail.com

জনগণ নীরব বিপ্লব ঘটাবে : খালেদা জিয়া

দেশের মানুষ নীরব বিপ্লব ঘটাবে বলে মন্তব্য করেছেন করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, এই সরকার অবৈধ। তারা পদে পদে আইন অমান্য করছে। নির্বাচনী প্রচারণায় আমাদের প্রতিনিয়ত বাধা দিচ্ছে। আমাদের প্রার্থীদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করে জনগণ নীরব বিপ্লব ঘটাবে। কারণ তারা গুম-খুনের এই সরকারকে আর দেখতে চায় না। তারা পরিবর্তন চায়। সিটি নির্বাচনে মানুষ সেই পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দেবে।
রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিএনপির সাংস্কৃতিক অঙ্গ-সংগঠন জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত নববর্ষের অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ৫ মিনিটে খালেদা জিয়া দলীয় কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত হন। প্রায় এক ঘণ্টা সেখানে অবস্থান শেষে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি গুলশানের উদ্দেশে রওনা হন।
অনুষ্ঠান মঞ্চে খালেদা জিয়ার পাশে বিএনপি সমর্থিত ঢাকা সিটি দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস এবং উত্তরের বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন।
খালেদা জিয়া এ সময় মির্জা আব্বাসের প্রতীক ‘মগ’, তাবিথ আউয়ালের প্রতীক ‘বাস’ এবং চট্টগ্রাম সিটির বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনজুর আলমের ‘কমলালেবু’ প্রতীকের সাথে উপস্থিত সবাইকে পরিচয় করিয়ে দেন। খালেদা জিয়া তাদের জন্য ভোট ও দোয়া প্রার্থনা করেন।
এ সময় মঞ্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রভিসি আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, ডিইউজের সভাপতি আব্দুল হাই সিকদারসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
২০১৪ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত অনুষ্ঠানে সর্বশেষ নয়াপল্টন কার্যালয়ে আসেন খালেদা জিয়া।
এর আগে, ২০১৩ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসেছিলেন।
গত ৫ জানুয়ারি থেকে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ‘অবরুদ্ধ’ ছিলেন খালেদা জিয়া। তিন মাস পর ৫ এপ্রিল নিজ বাসভবন ‘ফিরোজা’য় ফিরে যান খালেদা জিয়া।
এদিকে নয়া পল্টনে খালেদা জিয়ার আগমনকে কেন্দ্র করে আজ দুপুর থেকেই বিএনপির কার্যালয় ঘিরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম মোর্শেদ বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে জানিয়েছেন, ১৪টি শর্তে জাসাস এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারবে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে অনুষ্ঠান অবশ্যই কার্যালয়ের ভেতরে আয়োজন করতে হবে, কোনো মাইক ব্যবহার করা যাবে না, কোনো নেতাকর্মী কার্যালয়ের বাইরে ফুটপাতে দাঁড়াবেন না।
গতকাল সোমবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন জানান, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে জাসাস আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আজ বিকেল ৪টায় নয়াপল্টন কার্যালয়ে যাবেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
আব্বাস-তাবিথের জন্য ভোট চাইলেন খালেদা জিয়া
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিপ্লব ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
খালেদা জিয়া বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের জন্য ভোট চান। ঢাকাবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা মগ ও বাস মার্কায় ভোট দিয়ে নীরব বিপ্লব ঘটাবেন।
বিএনপি চেয়ারপাসন বলেন, মির্জা আব্বাসকে আপনারা আগেও ভোট দিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আব্বাসকে ভোট দিয়ে আবারো সেবা করার সুযোগ দিন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের জন্য ভোট চেয়ে খালেদা জিয়া বলেন, তাবিথ অনেক শিক্ষিত, বাইরে থেকে পড়াশোনা করা। তার নিজের ব্যবসা আছে। তার তো প্রয়োজন ছিল না এখানে আসার। তবুও এসেছে। তার কাছে নগর নিয়ে নতুন ভাবনা আছে।
এ সময় মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস ও তাবিথ আউয়াল উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ।

ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলো রাশিয়া

ইরানে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহ করার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিনের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। জাতিসংঘ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ২০১০ সালে এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহ বাতিল করা হয়েছিল। সম্প্রতি বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ইরান অন্তর্বতীকালীন পরমাণু সমঝোতায় উপনীত হবার পর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ওই নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেন। ইরানকে ওই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা দেয়ার সিদ্ধান্তকে তীব্র সমালোচনা করেছিল ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের আশঙ্কা ছিল অত্যাধুনিক এ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ইরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনা রক্ষার্থে ব্যবহার করতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহ বাতিল হয়ে যাওয়ার পর ইরান কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা দায়ের করেছিল। মস্কো সেসময় বলেছিল, জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর তা বাতিল করা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না তাদের। বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাঙ রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্বৃতি দিয়ে বলেছে, তারা এস-৩০০ সরঞ্জাম দ্রুত সরবরাহ করতে তারা প্রস্তুত। উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচী নিয়ে প্রাথমিক সমঝোতায় যে ছয়টি দেশ উপনীত হয়েছে তার মধ্যে রাশিয়া একটি। পূর্ণাঙ্গ একটি চুক্তিতে পৌঁছুতে দেশগুলোর ৩০শে জুন ডেডলাইন রয়েছে।

মন্ত্রীদের গরম স্যুট, নরম রাজনীতি by মিজানুর রহমান খান

জাতীয় ফুল আছে, ফল আছে, পাখি আছে। আরও অনেক কিছু আছে। কিন্তু পিন্দনের কাপড় কী হবে তা ঠিক নেই। কথা খাঁটি। কিন্তু কাজটা কি এতই সহজ? স্বাধীনতার পর মুজিবকোট অনেকের জাতীয় পোশাক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কখনো তা ড্রেস কোডে আসেনি। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার জানালেন, খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকেই পোশাকবিধি তাঁর মন্ত্রীদের ললাটে লটকে দিয়েছিলেন। শেরোয়ানি আর মোশতাকি টুপি হয়ে উঠেছিল ‘জাতীয় আনুষ্ঠানিক পোশাক’।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাবের দিনটিতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক পরেছিলেন শেরওয়ানি–পাজামা ও জিন্না টুপি। এটা এখনো পাকিস্তানের জাতীয় পোশাক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পোশাক নিয়ে গত সপ্তাহে আবার অসন্তোষ ব্যক্ত করেছেন। আশা করব, মন্ত্রীরা তাঁর অসন্তোষকে কেবলই গরমের মধ্যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারের বিলাসিতার প্রতি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখবেন না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, মন্ত্রীদের চালচলনে মিতব্যয়িতার ঘাটতি খুব বেশি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ার কারণেই প্রধানমন্ত্রী হয়তো এ বিষয়ে অসন্তোষ ব্যক্ত করার কথা স্মরণে এনেছেন। অনেকের কাছে মন্ত্রীদের পরনে গরমে লাউঞ্জ স্যুট বিলাসিতা, অপচয়। এমনকি গ্রামের বিদ্যুৎবঞ্চিত গরিব জনগণের প্রতি তাদের অবিমৃশ্যকারিতার ইঙ্গিতবহ। কিন্তু এটাও সত্য যে অনেক কিছুতেই পরনির্ভর দেশের মন্ত্রিবর্গ যাঁদের হরহামেশা বিদেশিদের সঙ্গে ওঠাবসা করতে হয়, তাঁদের হয়তো কোনো ‘জাতীয় পোশাক’ ধারণ করা সহজ নয়।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দিল্লির অভিজাতপাড়ায় টি-শার্ট ও জিনস পরেন, কিন্তু আমেথির গ্রামে তিনি কখনো সুতি শাড়ি না পরে যান না। তিনি কেন ইন্দিরা কিংবা হালের মমতা, মায়াবতী ও জয়ললিতার মতো সর্বত্র শাড়ি পরেন না, সে নিয়ে তাঁকে গঞ্জনা শুনতেই হচ্ছে। গোয়া সরকারের শিল্পকলা ও সংস্কৃত বিভাগ কদিন আগেই অফিসে আস্তিনবিহীন কুর্তা, জিনস, টি-শার্ট, বহু পকেটওয়ালা প্যান্ট নিষিদ্ধ করল। গত বছরের আদেশ নতুন করে ঝড় তুলল, যখন তা গত ২৪ মার্চ বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে সরকার কড়াকড়ি আরোপে আবার তুলল। স্থানীয়ভাবেই নয়, এই তর্কের ঝড়ে দিল্লিও দুলল। দ্রুত আদেশ বদলে ২৮ মার্চ বলা হলো, না, অফিসে সবাই ‘আধা আনুষ্ঠানিক, আনুষ্ঠানিক কিংবা চৌকস ক্যাজুয়াল পোশাক’ পরবেন। এর সংজ্ঞায় লাউঞ্জ স্যুটসহ দুনিয়ার সব পোশাককেই হয়তো ফেলা যাবে। দিল্লিতে মোদি সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী গোয়ার নতুন পোশাক কোডকে ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে সমালোচনা করেছিলেন। গোপা সাবরওয়াল তাঁর ইন্ডিয়া সিন্স নাইনটিন ফোরটি সেভেন: দি ইনডিপেনডেন্ট ইয়ার্স বইয়ে ১৯৭৩ সালের অবস্থা সম্পর্কে লিখেছেন, মন্ত্রীদের ফ্যাশনে বড় পরিবর্তন চোখে পড়ে। এখন কেবল তিন মন্ত্রী (জগজীবন রাম, ওয়াই বি চ্যাবন ও উমা শংকর দীক্ষিত) গান্ধী টুপি পরেন। কিন্তু একটা দিন ছিল, যখন কংগ্রেসদলীয় আলগারাই শাস্ত্রী দাবি করেছিলেন যে যাঁরা গান্ধী টুপি পরতে ব্যর্থ হবেন, কংগ্রেস থেকে তাঁদের সদস্যপদ খোয়া যাবে। আর এটা বলার পরে যিনি ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন, তিনি স্বয়ং পণ্ডিত নেহরু: ‘আমি টুপিতে নয়, টুপির নিচে কী আছে সেই বিষয়ে কৌতূহলী।’ গান্ধী টুপির সঙ্গে মিল কিসে? ভিক্টোরিয়া যুগের আগে ভারতে ব্রিটিশরা উলেন হ্যাট পরত।
আমাদের পোশাক সম্পর্কে মন্ত্রীদের কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। তাঁরা কেউ হয়তো বলবেন না, লাউঞ্জ স্যুটে নয়, স্যুটের ভেতরের মানুষটা কতটা ‘সামাজিক সুবিচার’–এর (স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত) নীতিতে বিশ্বাসী সেটাই বড় কথা। বিশ্বের প্রথম ইন্দোনেশিয়ার জাভা নারী মন্ত্রী মারিয়া উলফা সান্তোসো। ১৯৪৭ সালে সমাজকল্যাণমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি বেছে নেন পাশ্চাত্যের ব্লাউজ ও স্কার্ট। কোনো কিছুই রাজনীতিমুক্ত নয়। পোশাকে রাজনীতি আছে, সেটা নরম রাজনীতি। তার প্রমাণ হলো মিনা রোসেসের লেখা বই দ্য পলিটিকস অব ড্রেস ইন এশিয়া অ্যান্ড দি আমেরিকাস। এতে তিনি বলেন, মারিয়া হয়তো মনে রেখেছেন যে পাশ্চাত্যের মন্ত্রীরা যে পোশাক পরেন, তাতে সমতার ঘোষণার প্রতিফলন আছে। ইন্দোনেশীয় জাতীয়তাবাদী নেতা সুকর্ণ দেশটির অভিজাত শ্রেণির জন্য পশ্চিমা স্যুট পরতে উৎসাহিত করেছিলেন। দেশের জাতীয় পোশাক ছিল লুঙ্গির মতো সারং। আমাদের জাতীয় পোশাক কি পাজামা-পাঞ্জাবি, নাকি লুঙ্গি-পাঞ্জাবি, নাকি প্যান্ট-শার্ট তা বলা দুরূহ। কোনো একটা নির্দিষ্ট করে দিলে বিতর্ক আর থাকবে না। তবে জাতীয় পোশাক আর রাষ্ট্রীয় বা সরকারি অনুষ্ঠানের পোশাকবিধি দুটো আলাদা হতে পারে।
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গামছা ধরেছেন। অনেকে লুঙ্গিকে জাতীয় পোশাকের অপরিহার্য অনুষঙ্গ মনে করেন। ইদানীং একটি লুঙ্গির বিজ্ঞাপন প্রচুর হাস্যরসের সঞ্চার করেছে। জনপ্রিয় লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ সেলাই ছাড়া সাদা পোশাক পরছেন। কবি ফরহাদ মযহারের লুঙ্গি ফ্যাশন ঢাকা ক্লাবে পরাস্ত হয়েছে। বঙ্গভবনের আমন্ত্রণপত্রে লাউঞ্জ স্যুট লেখা থাকে। কিন্তু সবাই কি তা মানেন বা মানতে পারেন বা মানাটা খুব দরকারি? এর উত্তর বিবিধ ও বিচিত্রই হবে।
পাঞ্জাবি বা লুঙ্গি কি সেকেলে ফ্যাশন, যা পরিত্যক্ত হওয়া উচিত? সুকর্ণ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আমি এমনকি সুপারিশ করলাম যে ঘরোয়াভাবেও যেন সারং পরা না হয়। কারণ, এই স্বদেশি পোশাকটির একটি মর্যাদাহীন বৈশিষ্ট্য রয়েছে।’ প্রায়ই আমরা শুনি, ঔপনিবেশিক প্রভুদের পোশাক আমরা আজও আঁকড়ে ধরে আছি। এসব ছাড়ো। স্বদেশি হও। এই যুক্তি খণ্ডন করেছেন সুকর্ণ। তাঁর কথায়, প্রভুদের চাপিয়ে দেওয়া ‘দাসসুলভ শৃঙ্খলগুলো’ আমরা অবশ্যই ভাঙব। কিন্তু আসুন আমরা প্রমাণ করি, সাবেক প্রভুদের মতোই আমরা প্রগতিশীল। আমরা সমানতালে চলার যোগ্য। আমাদের আধুনিক পোশাক পরতে হবে।’ সুকর্ণ ইন্দোনেশীয় সংস্কৃতি পেছনে ফেলতে পারেননি।
স্যুট-সমর্থক সুকর্ণ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রেমে কি করে পড়েছিলেন, তাঁর বিবরণ দেন: ‘আমি ওকে পরিশীলিত হলদে বোরকার আড়ালে দেখেছিলাম। সেকেলে ধরনটাই আমার পছন্দ। খাটো স্কার্ট, আঁটসাঁট ব্লাউজ ও অতি উজ্জ্বল লিপস্টিকে শোভিত আধুনিক নারী আমার পছন্দ নয়।’ সুকর্ণের মতো এরশাদ-জিয়াও স্যুট চালু করেন। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাদত হুসেইন স্মরণ করতে পারেন যে এরশাদ আমলে ‘গাঢ় রঙের গলাবদ্ধ প্রিন্স কোট পরতে মন্ত্রীদের প্রতি নির্দেশ জারি হয়েছিল।’
অধ্যাপক মিনা রোসেসের বই পোশাকের রাজনীতিটা কত গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পরে তারই একটি প্রামাণ্য দলিল। ইউরোপীয়রা জুতা না খুলে বৌদ্ধ মন্দিরে যেত, ১৯১৯ সালে মিয়ানমারের মান্ডালাতে এর প্রতিবাদে দাঙ্গা ঘটে, এমনকি তা বর্মি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে উসকে দিয়েছিল। সুকর্ণর ভাবনাটা বর্মি জাতীয়তাবাদীদের আচ্ছন্ন করেছিল। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় বর্মিরা পাশ্চাত্যের পোশাক পরতে শুরু করলে প্রভুরা প্রমাদ গোনেন। তাঁরা দেখেন, আরে এটা তো তাদের শর্তে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নয়, বরং স্পর্ধা। ইউরোপীয়দের অনেকে বর্মি লুঙ্গি পরতে শুরু করেছিলেন বটে, তবে তা নিতান্ত ‘খামখেয়ালি’ বা ‘ধর্তব্য নয়’। ১৮৮৭ সালে লন্ডনে একমাত্র শুভ্র ধুতি পরিহিত গান্ধী সাহেবদের চমকে দিয়েছিলেন। এর ৩৩ বছর পর গান্ধীতে দীক্ষিত বর্মি ভিক্ষু উত্তমা বিদেশি বস্ত্র বর্জনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এই সময়টায় বর্মি তরুণদের কাছে তাদের পরিহিত নিজস্ব বস্ত্র হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা। গবেষক এমা টারলোর মতে, গান্ধী খাদি পরেছিলেন। কারণ, তিনি বার্তা পাঠান যে ‘ভারতের দারিদ্র্য মোচনে তাঁতশিল্প ও ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা দুটোই লাগবে।’ অং সান সু চির দল কিন্তু বার্মা সফরে গান্ধী পরিহিত কৃষক হ্যাটকেই দলীয় প্রতীক করেছে। বর্মি সামরিক সরকারগুলো মনে রাখে, পোশাকে ঢাকা শরীর হলো ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর। পোশাকের সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতির যোগসূত্র আছে।
খন্দকার মোশতাককে প্রায় কেউ অনুসরণ করেননি। তাঁর টুপি কম লোকই পরেছেন। সাদত হুসেইনকে বললাম, এই টুপি কি জিন্নাহর নকল? তিনি আমাকে অবাক করলেন। না, এটা বরং সুভাস বোসের টুপির কাছাকাছি। তিনি রাষ্ট্রাচার ক্লাসে প্রবাদপ্রতিম একটি বাক্য আওড়ান: স্যুট ইজ অলসো ইনফরমেশন ট্রান্সমিটার, অর্থাৎ পোশাক তথ্য আদান–প্রদানেরও মাধ্যম। তিনি স্মৃতিচারণা করেন যে স্বাধীনতার পরে লুঙ্গি পরে বঙ্গভবনে ঢুকতে চেয়েছিলাম, দ্রুত বুঝলাম এটা হওয়ার নয়। স্যুট-টাইয়ের কদর আলাদা। তাঁর উপলব্ধি স্মরণ করিয়ে দেয় ‘আগে নজরদারি, তার পরে গুণবিচারি’ কথাটা। ইরানি কবি শেখ সাদির অভিজ্ঞতাও তাই। বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে সাধারণ পোশাকে কদর না পেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরে খাতির পেয়েছিলেন। সে কারণে তিনি খাবারগুলো না খেয়ে পকেটে পুরেছিলেন।
আমাদের চিন্তাচেতনায় পোশাক দিয়ে গান্ধীর মতো বার্তা বহনের ইঙ্গিত নেই। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় যদি আদৌ কিঞ্চিৎ বিদ্যুৎ সাশ্রয় ঘটে, সেটুকুই হবে বিরাট প্রাপ্তি। এরশাদ আমলে ‘রবিবাসরীয় মেজাজের’ ড্রেস পরা যাবে না মর্মে হুকুম জারি ছিল। আমার তো মনে হয়, নাশকতাপূর্ণ রাজনীতির গরমে স্যুট পরা মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ অনেকেই রবিবাসরীয়, অর্থাৎ ফুরফুরে মেজাজেই রয়েছেন।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ির জমি বেদখল

শৈলকুপায় কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ি বাঁশ দিয়ে
ঘিরে রেখেছে দখলদারেরা। সম্প্রতি তোলা ছবি
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ির জমির বেশ কিছু অংশ বেদখল হয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার বাঁশ দিয়ে জমিটুকু দখল করে নেন কয়েকজন লোক। দখলি জায়গায় কবির কাচারিঘর ও কবির হাতে রোপণ করা বেশ কয়েকটি গাছ আছে। আরও আছে কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র, চিত্রশালা ও পাঠাগার।
সরেজমিনে মনোহরপুর গ্রামে গেলে একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বৃহস্পতিবার একদল দখলদার এসে বাঁশ দিয়ে বেড়া দিয়ে দেন।
কবি গোলাম মোস্তফা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজ খান-নুন জানান, কবির মূল বাড়িটি ছিল বর্তমান বাড়ি থেকে কিছুটা দক্ষিণে। ভারতের বালিগঞ্জ হাইস্কুল ও বাকুড়া জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকা অবস্থায় কবি গোলাম মোস্তফা ১৯৫০ সালে অবসর নেন। এরপর তিনি পুরোনো বাড়িতে থাকতে না পেরে শ্বশুরবাড়ি মাগুরার কমলাপুরে চলে যেতে চেয়েছিলেন। তখন গ্রামের মানুষ তাঁকে রাস্তার ধারে পাঁচ বিঘা জমি দেন। কবি জমিটি দান হিসেবে গ্রহণ করেননি। তিনি ওই জমির পরিবর্তে আশপাশে তাঁর নিজস্ব জমি থেকে সবাইকে জমি দেন। যার কিছু ছিল লিখিতভাবে দেওয়া আর কিছু ছিল মৌখিকভাবে। তাঁদের একজনের সন্তান মনোহরপুর গ্রামের সদর উদ্দিন ও আলাউদ্দিন এখন দাবি করছেন কবির বাড়ির ভেতরে তাঁদের ২৪ শতক জমি পাওনা রয়েছে।
কবির ছোট মেয়ে রাশিদা হক হেনা মুঠোফোনে জানান, তাঁদের দুই চাচাতো ভাই বাড়িটি দেখাশোনা করেন। তাঁরা চেয়েছিলেন, বাড়িটি স্মৃতি হিসেবে থাক। কিন্তু হঠাৎ করে বাড়ির জায়গা দখল শুরু হয়েছে।
এ ব্যাপারে দখলদার সদর উদ্দিনের ছেলে জিহাদ মিয়া জানান, জমি তাঁরা পাবেন তাই দখল করেছেন। তাঁদের জমির পরিবর্তে কবি কোনো জমি বা টাকা দিয়েছিলেন এমন কথা তাঁদের জানা নেই।
জমির পরিবর্তে জমি দিয়েছেন এমন একজন মনোহরপুর গ্রামের আমিন উদ্দিন মিয়ার ছেলে নুরুল আমিন বলেন, তাঁদের ৩৩ শতক জমির পরিবর্তে মাঠে ১৮ শতক জমি পেয়েছেন। যার কোনো লিখিত প্রমাণ ছিল না।
শৈলকুপা উপজেলা ইউএনও সন্দীপ কুমার সরকার জানান, তিনি বাঁশের বেড়া উঠিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে যাঁরা দখল করছেন, দখলের পক্ষে তাঁদের কোনো কাগজপত্র থাকলে সেগুলো ১৫ এপ্রিল তাঁর কার্যালয়ে আনতে বলা হয়েছে।
২০১৪ সালের মে মাসে দখলদারেরা প্রথম দফায় কবির বাড়ির জমি দখলের চেষ্টা করেন। সে সময় পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হলে প্রশাসন তৎপর হয়। এতে দখলপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়।

পুরনোর পাওয়া ও নতুনের কাছে চাওয়া by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

গ্রামবাংলায় নববর্ষ উদ্যাপনে খুব আড়ম্বরতা কখনও ছিল না। অনেকটা বলে বয়ে আসা আত্মীয়ের মতো ছিল দিনটি, দীর্ঘদিন। তাকে বরণ করে নেয়া হতো, কিন্তু আচার, কিছু কৃত্য পালন করা হতো, কিন্তু উচ্ছ্বাসের প্রাবল্য ছিল না। বরং তাতে আন্তরিকতা, আনন্দ আর নমিত কিছু আবেগের প্রকাশ দেখা যেত। ছোটবেলায় যে দু-একবার নববর্ষের দিনে গ্রামে গিয়েছি, চোখে পড়ত দিনটিকে আলাদা করে রাখার আয়োজনগুলো। কিন্তু তাতে উচ্ছ্বাসের আতিশয্য থাকত না, থাকত ব্যতিক্রমী উদ্যাপনের আনন্দ।
ব্যতিক্রম তো বটেই। সারা বছর যেত মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামে, শোকে-দুঃখে, প্রত্যাশায়-প্রাপ্তিতে। দুই ঈদে অথবা পূজা-পার্বণে দু-এক দিনের ছেদ পড়ত সেই নিত্যদীনতায়। কিন্তু ধর্মীয় উৎসবে সবাই তো শামিল হতে পারত না। যারা ঈদ করছে, তারা পূজা-পার্বণে হয়তো জীবন-সংগ্রামে মাঠে, গঞ্জে অথবা অন্যত্র। নববর্ষ ছিল সবার জন্য একটা অভিন্ন উদ্যাপন। এদিনে সবাই যে কাজ থেকে হাত গুটিয়ে রাখতেন তা নয়। কিন্তু সব সম্প্রদায় মিলে ওই একটা দিনেই একটা জায়গায় এসে দাঁড়াতে পারতেন। ওই একটা দিনে হিন্দু-মুসলমান একই সঙ্গে উৎসবের রং গায়ে মাখতেন। বাংলার কৃষক বরাবরই ছিলেন শোষণের শিকার, বাংলার মেহনতি মানুষও পুঁজির কাছে, ক্ষমতার কাছে ছিলেন পরাভূত। নববর্ষে ওই সব মানুষ কষ্ট ভুলে, গ্লানি ভুলে একটা অভিন্ন উদ্যাপনের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন। আয়োজন ছিল খুব সামান্যই- একটুখানি ভালো খাওয়া, সন্তানদের জন্য, সম্ভব হলে নতুন জামা (যা অসম্ভবের পর্যায়ে থেকে যেত অনেকের জন্য), মেলা-উৎসবে সবাইকে নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাওয়া, একটুখানি কেনাকাটা করা- তাও যদি গাঁটে কিছু পয়সা থাকত। নববর্ষের মেলা ছিল এদের জন্য একটা সান্ত্বনার মতো। নববর্ষের মেলায় বিকিকিনিটা বড় ছিল না, ছিল অংশগ্রহণটা। যত মানুষ যেসব মেলায় যেত, তার একটা বড় অংশেরই হয়তো কিছু কেনার পয়সা থাকত না। তারপরও মেলা হতো সপ্রাণ। মেলায় থাকত আনন্দ, কোলাহল। নিত্যদিনের সংগ্রাম ভুলে থাকার কিছু উপলক্ষ।
নববর্ষের কাছে মানুষের চাওয়া ছিল কয়েকটি- প্রথমত. জীবনের কঠিন সংগ্রাম ভুলে কিছুটা আনন্দ, কিছুটা রং আর উদ্যাপনের বৈচিত্র্য তারা আশা করত। দ্বিতীয়ত. সব সম্প্রদায়ের সমান অংশগ্রহণ যেহেতু ছিল দিনটিতে, একটা বড় চাওয়া ছিল সম্প্রীতি, সৌভ্রাতৃত্ব। আর তৃতীয় একটি চাওয়া ছিল নিজেদের গণ্ডি ভেঙে সবার এক হয়ে যাওয়া, যেখানে সন্তানরা, প্রতিবেশীরা সবাই শামিল হবে। নববর্ষের মেলা ছিল উচ্চ-নীচের, নিকট-দূরের, ধনী-দরিদ্রের দেয়াল ভাঙার একটা প্রতীক। মেলা কখনও পুঁজির শাসনে পড়েনি। মেলা ছিল একটা-দুটো মুদ্রার বিনিময়ে বিমলানন্দ খুঁজে পাওয়া। মেলা ছিল নববর্ষের একটা বড় চাওয়া, যেহেতু মেলাতে টুকটাক কেনাকাটার আনন্দটা কখনও টাকার হিসাবে দেখা হতো না, হতো প্রাপ্তির তৃপ্তির হিসেবে।
নববর্ষে গঞ্জের বাজারে হালখাতা লেখা হতো। হালখাতায়- এক বছরের হিসাব নেয়া হতো। লাভ হলে লাভ, ক্ষতি হলে ক্ষতি- কিন্তু গঞ্জের ব্যবসায়ী এ লাভ-ক্ষতির আলোয় সব দেখতেন না। তার দোকানে বাতাসা-মিষ্টি থাকত, আগন্তুক সবাই তাতে ভাগ বসাত। হালখাতা ছিল সামাজিক একটি অনুষ্ঠান। ছোট-বড় ব্যবসায়ীকে তা নিজের কর্মফলের সামনাসামনি করত। হালখাতার হিসাবটা ছিল একই সঙ্গে ব্যবসা-দর্শন এবং আত্মদর্শন। কালু শাহের একটা গাছ আছে এই রকম, বছরে একবার দেখরে ভিতরে চাইয়া, মনটা আছে কিনা বিষয়ে ছাইয়া। বিষয় যদি মন ছেয়ে রাখে, তাহলে লোভ বাড়ে। আর লোভ বাড়লে কোনো নৈতিকতা কাজে আসে না।
হালখাতা লাল কাপড়ে মোড়া থাকত। তা জীবনকে, জীবনের চলমানতাকে ঘোষণা করত; জীবনহীন, শুকনো অঙ্কের হিসাবকে নয়। এ জন্য হালখাতা উৎসব হতো, মিষ্টি বিতরণ হতো, মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি হয়ে দাঁড়াত।
২...
নববর্ষের রূপ পাল্টেছে। এখন শহরের নববর্ষ গ্রামের নববর্ষকে প্রভাবিত করছে। এখন নববর্ষ পোশাকপ্রধান, আচারপ্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এ কথাটাও তো ঠিক যে, এখন নববর্ষ প্রবল উচ্ছ্বাস, হাসি-আনন্দ ও কোলাহলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে নববর্ষের মূল চাওয়াটা মোটেও চাপা পড়েনি।
একটিই সমস্যা এই নতুন নববর্ষে- এটিকে একটা প্রচারের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। মিডিয়া বলতে ছাপা এবং (প্রধানত) ইলেকট্রনিক মাধ্যমের যে সমন্বয়কে আমরা জানি, তা-ই এখন দায়িত্ব নিয়েছে প্রচারের এবং মিডিয়ার পিঠে হাত রেখেছে বড় পুঁজি অর্থাৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলো। তাতে আয়োজনটা ব্যাপক হয়, চাকচিক্য প্রবল হয়। কিন্তু প্রাণটাও থাকে। এ এক অদ্ভুত যোগ। এত চমক, কিন্তু প্রাণটা স্পন্দিত। তার কারণ ওই চাওয়া- নববর্ষের কাছে মানুষ নিত্যদীনতার জাঁতাকল থেকে মুক্তি চায়, উদ্যাপন চায়, সবার সঙ্গে প্রাণ মেলাতে চায়।
অর্থাৎ আয়োজনের উদ্যাপনের ব্যাপ্তি বেড়েছে, কিন্তু চাওয়াটা একই রয়ে গেছে।
আরেকটা চাওয়া হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ। এখন সারা দেশে- শহরে-বন্দরে-গ্রামে-গঞ্জে যে নববর্ষ পালন হয়, তাতে এ চেতনার বলিষ্ঠ এবং প্রত্যয়দীপ্ত একটি স্ফুরণ দেখা যায়। এখনও হালখাতা হয় এবং এখনও, আশ্চর্য, লাভ-ক্ষতির থেকেও সামাজিক দায়বদ্ধতাটা মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এখানেই বাঙালিয়ানার শক্তি। একটি দিন, একটি উপলক্ষ- কিন্তু ইতিহাসের বিবর্তনে এর মহিমায় কোনো ছায়া পড়ে না। কর্পোরেট অংশগ্রহণেও না। বরং মহিমাটা আরও বাড়ে।
৩...
বাংলাদেশ এখন বিভাজিত একটা দেশ। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও বিত্তগত বিভাজন এখন তীব্র। উগ্রবাদের বিস্তার হচ্ছে, বহুমতের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে সংকীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তা। পুঁজির শাসন বেড়েছে।
এরকম দেশে নববর্ষ একটা বাণী নিয়ে আসে। বাণীটা এই কায়মনে বাঙালি হও, বিভেদ ভোল, বাংলার উদার আকাশের নিচে এক কাতারে দাঁড়াও- উদারতা শেখো ওই আকাশ থেকে। নিঃসর্গ থেকে।
এবারের চাওয়াও আমাদের যুগযুগের সেই চাওয়া- একতা চাই। আমরা বিভাজন চাই না। ভিন্নমত থাকবেই। কিন্তু তা যেন উগ্র না হয়। প্রাণঘাতী না হয়।
নববর্ষ হচ্ছে প্রাণের মেলার এক সমাবেশ। এ সমাবেশ আরও ব্যাপক হোক। আমরা চাই, নববর্ষের রং যেন সবাই মনের ভেতরে মেখে নেয়। তাহলে সারা বছর শুধু প্রাপ্তিতেই যাবে।
নববর্ষে কঠোরে-কোমলে কী সুন্দর এক উদ্যাপনকে দেখি আমরা। প্রকৃতি কঠোর আবার কোমল তার সৌন্দর্য। বাঙালি কঠোর হোক অশুভের বিরুদ্ধে, কিন্তু কোমল হোক সবার প্রতি।
নববর্ষ যেন আমাদের সবাইকে সারা বছরের জন্য রাঙিয়ে দিয়ে যায়।

ডেমোগ্রাফি ডেমোক্রেসি ডিমান্ড বিশ্বকে ভারতমুখী করেছে

ভারত সারা বিশ্বের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ আকর্ষণের পেছনে তিনটি ডি রয়েছে বলে জানান তিনি। মোদি বলেন, ডেমোগ্রাফি (ভৌগোলিক অবস্থান), ডেমোক্রেসি (সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র), ডিমান্ড (চাহিদা)- এ তিন কারণেই পৃথিবী আজ ভারতমুখী। ইউরোপের ত্রিদেশীয় সফরে সোমবার জার্মানির এক সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি। জার্মানির হ্যানোভারে ‘জার্মান-ভারত বাণিজ্য সম্মেলন’-এর উদ্বোধনী সেশনে বক্তব্য দেন মোদি। মোদি বলেন, ইন্ডিয়া মিনস বিজনেস। তিনি বলেন, শুধু জার্মানি নয়, গোটা বিশ্বই আজ ভারতের প্রতি আকৃষ্ট। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলো মার্কেল।
হ্যানোভার মেসে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্য মেলায় ভারতের প্যাভিলিয়ন উদ্বোধন করেন মোদি। এ মেলায় ভারতকে অংশীদার করার জন্য জার্মানিকে ধন্যবাদ জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। মেলায় ৪০০টি ভারতীয় কোম্পানি অংশগ্রহণ করছে। এ বছর ভারতের ১৪টি রাজ্যও এ মেলায় অংশ নিয়েছে। নিজেদের রাজ্যে বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করছে প্রতিটি রাজ্য। সেখানে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র লোগো হিসেবে হাজির হয় অ্যানিমেশনে তৈরি এক সিংহ। পরে মোদি বলেন, ‘ওই সিংহ এক নতুন ভারতের প্রতীক। মৈত্রী ও অংশীদারিত্বের বার্তা দেয় সে।’
মোদি দাবি করেন, বড় শিল্প স্থাপনে ভারত দ্রুত অনুমোদনের পথে হাঁটছে। জার্মান কোম্পানিগুলোকে আশ্বাস দিয়ে তিনি জানিয়েছেন ‘ভারত এখন এক অন্য দেশ। বর্তমান সরকার অনেক বেশি স্বচ্ছ, স্থায়ী ও দায়িত্বশীল।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ সরকার ইতিমধ্যে পশ্চাৎমুখী কর ব্যবস্থা উঠিয়ে দিয়েছে।’ তার মতে, দু’দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যতটা ভালো হওয়ার কথা ছিল, এখনও ততটা হয়ে ওঠেনি। তবে তিনি জানিয়েছেন, ভারত ও জার্মানির মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনের পথ এখন অনেক সুগম।
মোদি আরও বলেন, গোটা বিশ্বের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হয়ে উঠতে পারে ভারত। তার মতে, ভারতে জনসংখ্যার অধিকাংশই তরুণ প্রজন্মের। সঙ্গে রয়েছে উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো দক্ষ শ্রমিক বাহিনী। এ দুটি বিষয়ই বিনিয়োগের পক্ষে অনুকূল। একই সঙ্গে তার দাবি, ভারতে স্থায়ী চরিত্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও বিনিয়োগের পক্ষে সুবিধাজনক।
ইউরোপের সব থেকে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানিতে নিজের স্বপ্নের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের হয়ে সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতে আরও বেশি বিদেশী বিনিয়োগের জন্য তিনি আহ্বান জানান। মোদির কথায়, ‘ভারতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা অসীম। আমরা স্বচ্ছ, স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করছি। এখন ঘন ঘন নিয়মকানুন বদলের সম্ভাবনা নেই।’ এ প্রসঙ্গে মনমোহন সিংহ সরকারকে কটাক্ষও করেছেন মোদি। তার মতে, ‘আপনাদের কাছে কেউ কলম কিংবা রুমাল চাইলে যেভাবে সেগুলো দিয়ে দেন, ইউপিএ সরকার সেভাবেই কয়লাখনি দিয়ে দিয়েছিল।’
প্রধানমন্ত্রীর ব্যাখ্যা, ‘এ নিয়ে পরে ঝড় ওঠে। সুপ্রিমকোর্ট কয়লাখনির বণ্টন বাতিল করে দেয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নামও উঠে এসেছে। তা নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না।’

বাংলা নববর্ষে প্রীতির রাখিবন্ধন by সনজিদা খাতুন

সনজিদা খাতুন
খ্রিস্টাব্দ নয়, হিজরি সন নয়, বাংলা অব্দের পহেলা বৈশাখ যখন বাঙালির আবিষ্কারের অঙ্গ হিসেবে উৎসব হয়ে উঠতে চাইছে তখন পাকিস্তানের বড় রমরমা সময়। ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের উদ্বোধন হয়েছিল ইংরেজি ১৯৬৩ সালে। বাংলা ১৩৭০- এর পহেলা বৈশাখে। ঘরে তৈরি দেশী খাবারের সঙ্গে নল দিয়ে ডাবের পানিতে চুমুক দেয়ার ব্যবস্থা ছিল সেদিন। এর আগেও নগরে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করা হয়েছে ঘরোয়া আসর করে। নাসির ভাইয়ের বাড়িতে, মাক্কীর বাড়িতে অপরূপ পুষ্পসজ্জার পরিবেশে গান গেয়ে আনন্দে প্রাণ ভরেছে। আব্বাসউদ্দীন সাহেবের বাড়িতেও পহেলা বৈশাখে গান-বাজনা হতো, মনে আছে। এরকমের আসরেই কি একবার ধীর আলী ভাইয়ের (বংশীবাদক) ছোট ভাই নবীন বেহালাবাদক মনসুর আলীকে সঙ্গীতরসিক সমাজের সামনে তুলে ধরেছিলেন আব্বাসউদ্দীন সাহেব?
যাই হোক, পহেলা বৈশাখে নতুন জীবনের আকাক্সক্ষা অনেক বাঙালিকেই এই আবাহনী অনুষ্ঠানে উদ্বুদ্ধ করেছে। কোথাও কোথাও আলোচনার ধারা পহেলা বৈশাখের বিষয়ে মুসলিম ঐতিহ্যের স্মরণের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। ইরানের এবং আকবরের নওরোজের সঙ্গে যোগ সন্ধান করে পাকিস্তানের পহেলা বৈশাখকে ‘হালাল’ বলে তুলে ধরার প্রবণতা দেখা গেছে। তখন বড় অসহায় অবস্থা কিনা! বাঙালি-উৎসব হিসেবে দেখে শাসকরা যদি নাখোশ হন!
তবু শেষ পর্যন্ত বাঙালির বর্ষবরণের আনন্দোৎসব হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পেল পহেলা বৈশাখ। বাঙালির স্বাধীকার-বোধের নিুকণ্ঠ উচ্চারণ হিসেবে শুরু হলেও, সাধারণভাবে সমগ্র বাঙালি এতে সাড়া দিয়ে বিপুল আবেগ তরঙ্গে পহেলা বৈশাখকে দিল আন্দোলনের রূপ। পাকিস্তান আমলে বাঙালির নিরুদ্ধ আবেগ এমনি করে উৎসবমুখ খুঁজে পেয়েছিল। নগরের বাঙালি শহুরে মঞ্চে নাগরিক কাব্যগীতিকারদের গানে গানে মানুষকে নতুন দিনের কথা বললেও, চিরকালের বাঙালির বৈশাখী মেলা জমিয়ে তোলার চেষ্টাও করেছিল। নগরে-গ্রামে আদান-প্রদানের ভেতর দিয়ে শাশ্বত বাঙালি সত্তা পরস্পরের মধ্যে রাখিবন্ধনে বাঁধা পড়বে, এ ছিল উদ্দেশ্য। বটমূলের অনুষ্ঠানের সঙ্গে বৈশাখী মেলা জমিয়ে তোলার জন্য ছায়ানট শিল্পী ইমদাদ হোসেনের সহায়তা নিয়েছিল। কয়েকবার চেষ্টার পর একবার মানিকগঞ্জ থেকে পাটের সিঁকা, বৈঠকখানার মেঝেতে পেতে সাজাবার মতন পাট দিয়ে বোনা মাঝারি আকারের গোল আর লম্বাটে-গোল সুদৃশ্য অচ্ছাদন, খাবার টেবিলের ম্যাট ইত্যাদি নিয়ে এসে পসরা সাজিয়েছিল দু-একজন। কিন্তু বিক্রি যা হয়েছিল তাতে অত জিনিস নিয়ে যাওয়া-আসার খরচ পোষায়নি। আর তার চেয়ে বড় সমস্যা ছিল গ্রামের বৈশাখী মেলা, হালখাতা ইত্যাদি ফেলে শহরে আসার আকর্ষণ তখনকার গ্রামের মানুষের ছিল না। এখনকার মতন এমন কেনাকাটার অভ্যাসও ছিল না তখনকার শহরের মানুষের। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর অবস্থা বদলাল। গ্রামের মানুষ বাহিরমুখী হল যুদ্ধ অভিজ্ঞতার অভিঘাতে।
স্বাধীনতার পর এই বাঙালি-উৎসবটি ক্রমে বটমূল ছাড়িয়ে সারা ঢাকা শহরে বিস্তৃত হল। বাংলা একাডেমিতে মেলা জমল। প্রথম প্রথম শিল্পকলার আর্ট গ্যালারিতে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বইমেলা শুরু হয়েছিল। বাঙালির সরকার শিল্পকলা একাডেমিতেও অনুষ্ঠান করতে আরম্ভ করল। ধানমণ্ডি লেকের ধারে বুলবুল একাডেমি পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করতে লাগল। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের ইমদাদ হোসেন দেশের নানা জায়গায় বৈশাখী মেলার সমারোহ লাগিয়ে দিলেন। ঢাকাকেন্দ্রিক রইল না আর পহেলা বৈশাখ। মেলা শহরে এলো, মফস্বল শহরে এলো, জেলা শহরগুলোতে শহুরে মানুষের অনুষ্ঠানের পাশে পাশে মহা ধুমধাম করে বৈশাখী মেলা বসতে লাগল! নাগরিক গান আর গ্রামীণ মেলা এবার মিলল পরস্পর।
তবে কিছু শহুরে বুদ্ধিজীবী খবরের কাগজে আর এক ধারায় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চেষ্টা করতে লাগলেন- নাগরিক পহেলা বৈশাখ এক অর্থহীন অনুষ্ঠান। নাকি বছরের প্রথম দিনে নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে শখের পান্তাভাত খাবার অনুষ্ঠান। সুন্দর জিনিসের বিকৃতি ঘটাতে সময় লাগে না। ব্যবসাবুদ্ধি নিয়ে নিতান্ত অর্থলালসায় দোকান সাজিয়ে বসে কৃত্রিম বাঙালি ভড়ং দেখিয়ে পরিবেশ কলুষিত করে যারা, তারা নিন্দনীয় নিঃসন্দেহে কিন্তু শুধু ওই বিকৃতি দিয়ে বাঙালির এ উৎসবকে অর্থহীন বলে ছাপ দিয়ে দেয়া যায় না। পাশাপশি ব্যান্ড-শো আর পপ গান নিয়ে উচ্ছ্বাসে তো ভাটা পড়তে দেখা যায় না! বুদ্ধিজীবীরাও বেশ মেতে ওঠেন ওই বিজাতীয় সংস্কৃতির মত্ততায়!
চারু ও কারুকলা ইন্সটিটিউটে মুখোশ আর হাতি-ঘোড়া-বাঘ ইত্যাদি তৈরি করে যে বর্ণময় মিছিলটি পহেলা বৈশাখের দিনে শুরু করেছে, এর তুলনা নেই। চারুকলার ছাত্ররা আধুনিক শিল্পচর্চার সঙ্গে লোকশিল্প জড়িয়ে-মিশিয়ে নগরের বুকে যে সমারোহটি সম্ভব করে তুলেছে, এতেও আমি নগর আর পল্লীর মেলবন্ধন দেখতে পাই। এ উৎসবের বুদ্ধিজীবী সমালোচকরা কি এ সৌন্দর্য চোখ মেলে দেখেছেন? চারু-কারুকলার উৎসবে ছাত্রদের দিকনির্দেশনা দিতেন ছায়ানটের সেই পুরনো বন্ধু ইমদাদ হোসেন। গ্রাম আর শহরের শিল্পকে কাছাকাছি নিয়ে এসে উভয়ের যোগ ঘটানোর এ প্রয়াসের জন্য তাকে শ্রদ্ধা জানাই।
ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা শহরে নববর্ষের আনন্দানুষ্ঠান কয়েকদিন ধরে চলে। খোলা আকাশের নিচে মেলা-মেশার, বই কিনে প্রীতিভাজনকে উপহার দেয়ার এ সুযোগ বাঙালির জীবনকে অধিকতর বাঙালি হয়ে উঠবার জন্য নিরন্তর হাতছানি দিচ্ছে। ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নদীর ধারে হয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরপর সেখানে নৃত্যগীতের মধ্য দিয়ে বর্ষবরণ করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হুমকি সত্ত্বেও নববর্ষের আবাহন চলছে। ঘরোয়াভাবে এক অধ্যাপকের সুপ্রসর বাগানসংলগ্ন ঘরে নতুন বছরকে বরণ করা নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও এ বরণানুষ্ঠানের রেওয়াজ হয়েছে। সব জায়গার নাম করার দরকারই বা কি, শুধু আনন্দিত চিত্তে স্মরণ করি ১৯৬৭ সালে রমনার অশ্বত্থগাছের নিচে সর্বসাধারণের জন্য শুরু হওয়া ছায়ানটের সেই অনুষ্ঠানটি আজ স্বাধীন বাঙালির কত আদরের কত উচ্ছ্বাস প্রকাশের অবলম্বন হয়ে উঠেছে। আগেও বলেছি, আবার বলি, বাঙালির অন্তরের গভীরে লালিত সংস্কৃতি বোধ এ উৎসারণের জন্য অপেক্ষা করে ছিল। তাই পাকিস্তানি বাধা অপসৃত হতেই উচ্ছল আনন্দে এ উৎসবকেও সবাই বরণ করে নিয়েছে আপন উৎসব বলে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মেলবার এ আয়োজন শান্তিপ্রিয় সহাবস্থানে অভ্যস্ত বাঙালির অতীত ঐতিহ্যকে জাগ্রত করেছে আবার।
বাঙালি এখন একুশে ফেব্রুয়ারিতে শোকের ক্ষেত্রে মিলতে শিখেছে, মিলছে বিজয় উৎসবে, স্বাধীনতা দিবসে। অনেক আত্মাহুতি আর ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এ সম্মিলনের ধারা বাঙালি জীবনে অব্যাহত থাকুক। বাঙালি নববর্ষে তো মিলবেই, আরও মিলুক নানান ঋতু-উৎসবে। বসন্তে, শরতে, শীতে উৎসবের তরঙ্গ আমাদের একপ্রাণ করুক। প্রীতিবন্ধনেই বাঙালির জাতিসত্তার বিকাশ ঘটবে, এ উপলব্ধি আমাদের জীবনে শুভ সূচনা ঘটাবে। আসুন, আমরা শহরে-গ্রামে, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আর যত আদিবাসীতে মিলে সবার হৃদয়ে রাখিবন্ধনের উদ্যোগ নেই।

সংলাপের ভূমিকা পালন করছে সিটি নির্বাচন -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : এমাজউদ্দীন আহমদ by এ কে এম জাকারিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ নাগরিক সংগঠন শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। ঢাকা সিটি নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচন পরিচালনার জন্য সম্প্রতি গঠিত আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের আহ্বায়ক হিসেবেও তিনি এখন দায়িত্ব পালন করছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া

প্রথম আলো : বিএনপির আন্দোলন কার্যত ব্যর্থ হলো। আপনি কি তা মনে করেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : ব্যর্থ হলো কোথায়? এক ঢাকা ছাড়া তো দেশের কোথাও পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। সেখানে শাসন-প্রশাসন বলে কিছু কাজ করেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করে চলতে হয়েছে। দেশজুড়ে সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছে। আন্দোলন কাজে না দিলে তো এসবের প্রয়োজন পড়ত না। আন্দোলন দমনে সরকারকে গুম, খুন ও দমন-নিপীড়নের আশ্রয় নিতে হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এই সরকারের ধরন ও আচরণ সবার সামনে স্পষ্ট হয়েছে।

প্রথম আলো : এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপি কী অর্জন করল?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এখন যে তিনটি সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এটা গত তিন মাসের আন্দোলনের ফল। এই নির্বাচনকে যদি এখন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা যায়, তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে। ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতি দূষিত হয়ে পড়েছে। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাভাবিক কাজ করতে পারছে না। যে র‍্যাব জনগণের নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো, তাদের কেউ কেউ আজ ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করছে। এ ধরনের একটি বিষাক্ত পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের পথ হচ্ছে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ। এই নির্বাচন সেই সংলাপের ভূমিকা পালন করছে

প্রথম আলো : তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে আপনি সংলাপ মনে করছেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এই নির্বাচনগুলো একধরনের সংলাপের ভূমিকা পালন করছে। নির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। প্রার্থীদের মাধ্যমে যে যোগাযোগ হচ্ছে, সেটাও একধরনের সংলাপ। এই নির্বাচনের পরও এর প্রভাব থাকবে। ভোটার ও ভোটপ্রার্থীদের মধ্যে এই সংলাপ ও আদান-প্রদানকে আমি খুবই ইতিবাচক মনে করছি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এখন পরিচালিত হচ্ছে দুজন প্রশাসকের মাধ্যমে, সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসবেন।

প্রথম আলো : এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার ব্যাপারে আপনি কতটুকু আশাবাদী?
এমাজউদ্দীন আহমদ : আমি মনে করি না যে পুরোপুরি অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। নির্বাচন কমিশন অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি উপেক্ষা করছে। তবে আমি আশাবাদী যে তারা দেখে শিখবে। ভারতের নির্বাচন কমিশন যেভাবে নির্বাচন করে, তারাও সে ধরনের কাজ করার চেষ্টা করবে। আমরা চাই ইউরোপের উন্নত গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন যেভাবে কাজ করে, তা থেকে তারা শিখুক। নিরপেক্ষভাবে দেখার দৃষ্টিকোণ অর্জন করুক। এই নির্বাচন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো হবে বলে আমি মনে করি না। আর বিষয়টি শুধু নির্বাচন কমিশনেরও নয়, জনগণের দায়িত্ব রয়েছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে। নির্বাচন কমিশন ঠিক-বেঠিক যা-ই করুক না কেন, জনগণ কিন্তু সবই দেখবে ও বিবেচনায় নেবে। বলা যায় জনগণের পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকবে নির্বাচন কমিশন।

প্রথম আলো : আপনি এই তিন সিটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলেন, কী ধারণা হলো?
এমাজউদ্দীন আহমদ : নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছি। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, ভোটার যেন তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, তা নিশ্চিত করা। আর ভোটপ্রার্থীও যেন ভোট চাওয়ার জন্য ভোটারদের কাছে যেতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে একজন প্রার্থীর পক্ষে যেহেতু সব ভোটারের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই প্রয়োজন সভা-সমাবেশ ও মিছিলের। সব প্রার্থীর জন্য সমতল ক্ষেত্র তৈরি করা হলো নির্বাচন কমিশনের কাজ। আমরা এসবই বলে এসেছি। তারা সচেতনভাবে তা চাইলে করতে পারবে। নির্বাচন কমিশন যদি প্রজ্ঞা ও নিরপেক্ষতার মনোভাব নিয়ে কাজ করে, তবে তাদের ভুল হওয়ার সুযোগ কম।

প্রথম আলো : এই নির্বাচনের প্রভাব কি জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এই নির্বাচন জাতীয় পর্যায়ে একধরনের মর্যাদাবোধ ও চিন্তাভাবনার উন্মেষ ঘটাবে বলে আমি মনে করি। জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যখন এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং জনগণের ভোট পেয়ে যখন কেউ নির্বাচিত হবেন, তখন তাঁর মধ্যে একটি মর্যাদাবোধের পরিস্থিতি তৈরি হবে। যাঁরা একটি ভোট না পেয়েও সংসদে গেলেন, তাঁরা এটা বুঝতে পারবেন যে আইনগতভাবে সিদ্ধ হলেও এ ধরনের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সম্মানজনক নয়। এই নির্বাচন তাই আমাদের পরবর্তী রাজনীতির রূপরেখার মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারে, বর্তমান চিন্তাভাবনাকে পাল্টে দিতে পারে।

প্রথম আলো : এটা আশার কথা, কিন্তু বর্তমান রাজনীতির যে ধারা, তাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : সমস্যা হচ্ছে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ধ্বংস বা নিঃশেষ করতে চায়। এটা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের ক্ষেত্রেই সত্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা থাকতে হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এটা মানতে হবে যে দুই পক্ষের কোনো পক্ষই অপর পক্ষকে ধ্বংস করতে পারবে না। সংসদীয় রাজনীতির মূল বিষয় হচ্ছে, দুই পক্ষকেই একসঙ্গে থাকতে হবে। পাশের দেশ ভারতের কথাই বলি, সেখানে প্রধানমন্ত্রী যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ করেন, বিষয়টি অবহিত করেন। এসব থেকে আমরা অনেক দূরে আছি। এসব সমস্যা দূর হতে আরও সময় লাগবে।

প্রথম আলো : বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছে, এর এক বছরের মাথায় নতুন নির্বাচনের জন্য বিএনপি এক নজিরবিহীন আন্দোলন করল। আগাম বা নির্ধারিত সময়ে যখনই পরবর্তী নির্বাচন হোক, তা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, বিএনপির অংশগ্রহণ কি নিশ্চিত করা যাবে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : যখনই নির্বাচন হোক, নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু ও অবাধভাবে অনুষ্ঠানের জন্য কতগুলো শর্ত সংসদীয় ব্যবস্থায় আছে। প্রথমেই সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচন যখন হবে, তখন নির্বাচন কমিশনই সব ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করবে। তখন যেমন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীও থাকেন না, বিরোধী দলের নেতাও থাকেন না। ভারতের উদাহরণকে আমরা বিবেচনায় নিতে পারি, দেশ চালায় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সেখানে তখন মূল ভূমিকায় থাকে নির্বাচন কমিশন। ফলে ভারতে নির্বাচনের সময় কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, সেটা কোনো বিবেচনার বিষয় নয়।

প্রথম আলো : আপনি আগে এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও বিএনপি নির্বাচনে যেতে পারে।
এমাজউদ্দীন আহমদ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ও তা কার্যকর হয়েছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে। তখনো ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, এটা কয়েক মেয়াদ পর্যন্ত চলবে। সর্বশেষ উচ্চ আদালতের যে রায়, সেখানেও বলা হয়েছিল যে পরের দুই মেয়াদের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। সব সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, সেটা চাওয়া হতে পারে না। আসলে নিজেদের স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলোকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। এমনভাবে নির্বাচন হতে হবে যে কে প্রধানমন্ত্রী বা কে বিরোধীদলীয় নেত্রী, সেটা নির্বাচনের সময় বিবেচ্য থাকবে না। কিন্তু এ জন্য পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, নির্বাচন কমিশনকে সেভাবে কাজ করতে দিতে হবে।

প্রথম আলো : আগামী নির্বাচনের সময় তবে কী ধরনের সরকার আশা করছেন, বা এর আগে করণীয় কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এখন দেশে যে রাজনীতি চলছে, তাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তো আমরা ফেরেশতা নিয়ে আসতে পারব না। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেক বিচক্ষণ ব্যক্তি রয়েছেন। তাঁরা যদি তাঁদের প্রজ্ঞার উচ্চতম ব্যবহার করতে পারেন, তবে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা ও একটি পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

প্রথম আলো : কিন্তু বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেখান থেকে শুরুটা হবে কীভাবে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : প্রথমেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা থাকতে পারে। সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠন করতে হবে। এখন যেভাবে হয়েছে সেভাবে নয়। ফলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি প্রক্রিয়ার সূচনা হতে পারে।

প্রথম আলো : নির্বাচনকালীন সরকার?
এমাজউদ্দীন আহমদ : ভারতে যে ধরনের নির্বাচনকালীন সরকার হয়, এখানেও সে ধরনের কিছু হতে পারে। এই সরকার অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে কাজ করবে। নির্বাচনের সময় বিশেষ কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করবে না, উন্নয়নমূলক কাজ বা এ ধরনের কোনো উদ্যোগ বা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনই তখন নির্বাচনকালীন প্রধান শক্তি হিসেবে সব কাজ করবে।

প্রথম আলো : সিটি নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে অরাজনৈতিক, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এর যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তা আপনি শুরুতে বলেছেন। এই নির্বাচনকে ঘিরে আপনি সক্রিয় হয়েছেন। আপনার এই যুক্ততার পেছনে কী কাজ করছে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : তিন মাস ধরে যে আন্দোলন চলেছে, তাতে মানুষ মরেছে, সাধারণ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থা চরম বিপর্যস্ত হয়েছে। তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি পথ হিসেবে দেখছি। তাই এই বয়সেও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আমি মনে করি, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া যাবে। নগর পরিচালনা ও এর ব্যবস্থাপনার দোহাই দিয়ে ঢাকাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি যে এর মধ্য দিয়ে বরং আমলাতন্ত্র বেড়েছে। এই নির্বাচন ঢাকার জন্য ইতিবাচক হবে বলে আমি মনে করি। একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে সামনের দিনগুলোতে।

প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
এমাজউদ্দীন আহমদ : ধন্যবাদ।

বঙ্গাব্দের উত্সবিচার by শিশির ভট্টাচার্য্য

বঙ্গাব্দের প্রবর্তক কে? শশাঙ্ক, আকবর, নাকি মুর্শিদকুলী খান? শশাঙ্কের মৃত্যুর পরের বছর ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ভারতবর্ষ পরিভ্রমণে আসা হিউ এন সাঙ বাংলা অঞ্চলে ‘ভাস্করাব্দ’ নামে একটি সন প্রচলিত থাকার কথা লিখেছেন, বঙ্গাব্দের উল্লেখ করেননি। বঙ্গাব্দ প্রচলন করার গৌরব ভারতবর্ষের কোনো শাসককে দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম সমস্যা হচ্ছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক অঞ্চল, যেমন—ব্রহ্মদেশ, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, চীনের ইউনান প্রদেশের দাই বা থাই জাতি-অধ্যুষিত এলাকা, দক্ষিণ ভারতসহ ভারতের নানা এলাকা ও শ্রীলঙ্কায় এপ্রিল মাসের ১৩ / ১৪ / ১৫ তারিখে নতুন বছর শুরু হয়।
কোনো অব্দের প্রথম দিনটি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে অতীতে দুটি বিষয় বিবেচিত হতো: ১. জ্যোতিষশাস্ত্র আর ২. খাজনা আদায়ের সুবিধা। বিভিন্ন নক্ষত্রের মধ্যে কল্পিত রেখা টেনে সিংহ, বৃষ, কর্কট ইত্যাদি ১২টি রাশি কল্পনা করা হয় জ্যোতিষশাস্ত্রে। প্রতি মাসে সূর্য নতুন রাশিতে প্রবেশ করার সময়টিকে বলা হয় ‘সংক্রান্তি’। হেমন্ত আর গ্রীষ্ম ঋতুর সূচনার মধ্যবর্তী সংক্রান্তিগুলো (উত্তরায়ণ বা মকর, মহোদরী বা বিষ্ণুপদী, ষড়শীতি এবং মহাবিষুব) এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নববর্ষের প্রথম দিন নির্বাচিত হয়েছে অর্থনৈতিক কারণে, ফসল তোলার পর খাজনা আদায় সুবিধাজনক বলে। প্রাচীন ভারতে একটি ধর্মবিশ্বাস ছিল এই যে ডিসেম্বর-জানুয়ারির উত্তরায়ণ থেকে পরবর্তী ছয় মাস স্বর্গলোকের দিবাভাগ। (দিনে ভ্রমণ নিরাপদ বলে!) এই পবিত্র সময়কাল স্বর্গে যাওয়ার জন্যে প্রশান্ত। মহাভারতে পিতামহ ভীষ্ম দেহত্যাগের জন্যে শরশয্যায় শুয়ে উত্তরায়ণের অপেক্ষা করেছিলেন।
প্রাচীন ভারতবর্ষে অগ্রহায়ণ মাসে বছর শুরু হতো, কারণ ‘অগ্রহায়ণ’ শব্দে অন্তর্ভুক্ত সংস্কৃত ‘হায়ণ’ শব্দের অর্থ ‘বত্সর’। প্রাচীন ইউরোপে দশ মাসের বছর শেষ হতো উত্তরায়ণ সংক্রান্তির কাছাকাছি সময়ে দশম মাস ডিসেম্বরে। উত্তরায়ণ ও মহোদরী সংক্রান্তির মাঝে পড়ে চীনা নববর্ষ (২১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে)। ষড়শীতি (১ চৈত্র) সংক্রান্তিতে কাশ্মীরের নাভ্রে, কর্ণাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশের উগাডি, মহারাষ্ট্রের গুড়ি পাড়োয়া, সিন্ধু ছেতি চাঁদ, পশ্চিম ভারতের শকাব্দ (২২ মার্চ) এবং মধ্য এশিয়ার নওরোজ (২০ মার্চ)। মহাবিষুব সংক্রান্তিতে (১৩ / ১৪ / ১৫ এপ্রিল) নববর্ষ হয় শ্রীলঙ্কা, ভারতের মণিপুর, তামিলনাড়ু, কেরালা, ওডিশা, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, (ভারত ও পাকিস্তানের) পাঞ্জাব, বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস, চীনের দাইজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলে।
অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্মৃত অঞ্চলে এক সময় প্রটো-অস্ট্রোলয়েড গোষ্ঠীর মানুষেরা বসবাস করত বলে ধারণা করা হয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মধ্য এপ্রিলে বর্ষ শুরু করার প্রথাটা হয়তো এরাই চালু করেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার অনার্য সংস্কৃতির সঙ্গে হিন্দু-বৌদ্ধ তথা আর্য সংস্কৃতির মিশ্রণের ফলশ্রুতি এই সনটি। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রায় সমজাতীয় আবহাওয়াও মধ্য এপ্রিলে বর্ষ শুরুর কারণ হতে পারে। থাই জাতির উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। দক্ষিণ চীন থেকে থাইল্যান্ডে অভিবাসন করা দাই বা থাই জাতি প্রথমে চীনা সৌর-চান্দ্র সন অনুসরণ করত (থাইল্যালের কোথাও কোথাও এখনো চীনা নববর্ষ পালন করা হয়)। কিন্তু পরবর্তী কালে দেখা গেল, মধ্য এপ্রিলে শুরু হলে বর্ষটি থাইল্যান্ডের আবহাওয়ার সঙ্গে অধিকতর সংগতিপূর্ণ হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে জাতীয় উৎসব ‘সঙ্করণ’ (‘সংক্রান্তি’’র অপভ্রংশ) উপলক্ষে অফিস-আদালত-স্কুল-কলেজ ছুটি থাকে। (হোলিতে রং বা আবির ছিটানোর মতো) একে অপরের গায়ে জল ছিটিয়ে দেওয়া এই উৎসবের অন্যতম অঙ্গ। এই রং বা জল ছিটানো আর নববর্ষ পালনের প্রথাটি ভারতবর্ষ থেকে বর্হি ভারতে গিয়েছে, নাকি বহিষ্কার থেকে ভারতবর্ষে এসেছে—তা স্থির করা গবেষণাসাপেক্ষ।
বাংলা-আসাম অঞ্চলে একাধিক থাই-বর্মি-চীনা বংশোদ্ভূত নৃগোষ্ঠী মধ্য এপ্রিলে বিহু (বিষুব?) উৎসব পালন করে থাকে। শশাঙ্ক-আকবরের জন্মেরও বহু আগে আদিবাসী-হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান-আস্তিক-নাস্তিক, এমনকি বাঙালি হতে শুরু করারও বহু আগে থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক জাতি-উপজাতি-নৃগোষ্ঠীর মতো আমাদের আদিবাসী-উপজাতি পূর্বপুরুষেরাও মধ্য এপ্রিলে শুরু হওয়া এই সনটিই সম্ভবত ব্যবহার করত তাদের দৈনন্দিন জীবনে, ব্যবসায়ে, কৃষিকাজে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মধ্য এপ্রিলে শুরু হওয়া সব অব্দের বর্ষসংখ্যা এক নয়। এ বছর ১৪২২ বঙ্গাব্দ হওয়ার কারণ সম্রাট আকবরের একটি সিদ্ধান্ত। তুর্কি, সুলতানি ও মুঘল আমলের প্রথম দিকে হিন্দুস্থান সরকারি কাজকর্মে ব্যবহৃত হতো হিজরি সন। চান্দ্র বর্ষ হওয়ার কারণে হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমের পয়লা তারিখটা সব বছর ফসল তোলার সময়ে পড়ত না। চর্মচক্ষে চাঁদ দেখা না গেলে হিজরি মাস শুরু হয় না বলে ৩৫৪ দিনের হিজরি সন ৩৬৫ দিনের সৌর সনের চেয়ে ছোট হয়। আবুল ফজলের মতে, কোনো দেশে যদি চান্দ্র বর্ষ অনুসরণ করে খাজনা আদায় করা হয়, তবে ৩০ সৌরবর্ষ = ৩১ চান্দ্র বর্ষ হওয়ার কারণে প্রতি ৩০ বছরে কৃষককে এক বছরের খাজনা বেশি দিতে হয়।
হিজরি সনের অর্থনৈতিক ও প্রায়োগিক সমস্যা সমাধানকল্পে আকবরের নির্দেশে ৯৯২ হিজরিতে (১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দ) ‘তারিখ-ই-এলাহি’ নামে নতুন একটি ফসলি সন প্রবর্তিত হয়। তবে এলাহি সন গণনা শুরু হয় ৯৬৩ হিজরি বা ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে, কারণ সেই বিশেষ বছরটিতে দুটি ঘটনা ঘটেছিল: ১. পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আকবর ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ২. বৈশাখ মাস আর মহররম মাস একসঙ্গে পড়েছিল। এলাহি আর হিজরি সনের বর্ষসংখ্যা এক রাখা হয়েছিল সম্ভবত সাম্রাজ্যের মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মানুভূতিতে আঘাত না দেওয়ার জন্য এবং দীর্ঘদিন যাবৎ প্রচলিত হিজরি বর্ষ ব্যবহারের অভ্যাস অক্ষুণ্ন রাখার জন্য। ৯৬৩ এলাহি/ হিজরির ৪৫৯ বছর পরে আজ (৯৬৩ + ৪৫৯) ১৪২২ বঙ্গাব্দ, কিন্তু ১৪৩৬ হিজরি হওয়ার কারণ হচ্ছে, সাড়ে চার শতকের মাথায় হিজরি সন (সৌরবর্ষের ৩৬৫ দিন (হিজরি সনের ৩৫৪ দিন = ১১ দিন (৪৫৯ বছর = ৫০৪৯ দিন (হিজরি সনের ৩৫৪ দিন) ১৪ বছর ৯৩ দিন এগিয়ে গেছে। এযাবত্কাল পর্যন্ত হিজরি সন চালু থাকলে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের জনগণকে ১৪ বছর তিন মাসের খাজনা ও আয়কর বেশি দিতে হতো।
এলাহি সনের মাসের নামগুলো ফার্সি (কানওয়াদিন, আর্দি, ভিহিশু, তীর, আমাদাদ, শাহরিয়ার, আমান, আযুর, দাই, বাহাম, ইস্কান্দর ও মিয) রাখা হয়েছিল সম্ভবত মুঘল সাম্রাজ্যের দাপ্তরিক ভাষা ফার্সি ছিল বলে। আকবর কেন মধ্য এশিয়ার নওরোজের পরিবর্তে ১ বৈশাখকে বর্ষ শুরুর দিন নির্বাচন করেছিলেন? ভারতবর্ষের বহু এলাকায় তখনো সম্ভবত ১ বৈশাখেই বর্ষ শুরু হতো (বৈশাখ মাসের সঙ্গে মহররম মাসকে মেলানোর চেষ্টা এর প্রমাণ)। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধযাত্রা থেকে শুরু করে শিবির-স্থাপন, নগর-নির্মাণ ইত্যাদি সব কাজেই মুঘল সম্রাটেরা হিন্দু জ্যোতিষীদের মত নিতেন। রাশিচক্রের প্রথম রাশি মেষ বিধায় এই রাশিতে সূর্য প্রবেশের কালে এবং উত্তরায়ণের মধ্যভাগে মহাবিষুব সংক্রান্তিতে বর্ষ শুরু হওয়া ভারতীয় জ্যোতিষ মতে অতি শুভ।
আরব-পারসিক-ভারতীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ তারিখ-ই-এলাহি কোনো অজ্ঞাত কারণে ‘বঙ্গাব্দ’ নামে বাংলা অঞ্চলে এখনো চালু আছে। বাঙালি হিন্দু ও বৌদ্ধদের ধর্মীয় কাজকর্মে এখনো বঙ্গাব্দ অনুসৃত হয়। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে বঙ্গাব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে ব্যবসায় ও কৃষিকাজে। বঙ্গাব্দ বৃহৎ ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত এই অর্থে যে বাংলা মাসের নামগুলোর মূলে আছে বিভিন্ন নক্ষত্রের সংস্কৃত নাম ‘বিশাখা’ (বৈশাখ), ‘মঘা’ (মাঘ), পূষা (পৌষ), ‘উত্তর-আষাঢ়া’ (আষাঢ়), ‘শ্রবণা’ (শ্রাবণ), ‘কৃত্তিকা’ (কার্তিক), ‘ফাল্গুনী’ (ফাল্গুন)। এই নামগুলো ভারতবর্ষের আরও কয়েকটি সনে ব্যবহৃত হয়। গত কয়েক দশকে ছায়ানট-পান্তা-ইলিশ-মেলা-শোভাযাত্রার এলাহি আয়োজন নিয়ে বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে পয়লা বৈশাখ। সুতরাং দুই অর্থে বঙ্গাব্দ এখনো ‘এলাহি’: প্রথমত, এত সব প্রাগৈতিহাসিক, ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও করপোরেট প্রেক্ষাপটের সমন্বয় করা মরণশীল মানুষের সাধ্যের অতীত; দ্বিতীয়ত, বঙ্গাব্দ স্বয়ম্ভূ, এর সুনির্দিষ্ট কোনো প্রবর্তক নেই।
এশিয়ার বহু এলাকায় প্রচলিত এই সনটির নাম ‘বঙ্গাব্দ’ কেন? লক্ষ করা যেতে পারে যে বাঙালির দখলে যা কিছু আসে সব ‘বাংলা’ হয়ে যায়। ‘আমাদের’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন ‘ওদের’ বিহু উৎসবে যে দো-চোয়ানি সুরা পান করে থাকেন, সেটাকে আমরা ‘বাংলা’ বলি। ‘ভাত গেঁজিয়ে ধেনো মদ বহু দেশে তৈরি হয়; মোদের চোলাই ‘বাংলা’ শুধু, আর কারওটা নয়! ’ সুতরাং ১৪২২ একটি প্রাগৈতিহাসিক/ঐতিহাসিক দো/তিন চোয়ানি, সুতরাং এটি অবশ্যই ‘বাংলা’। আর পয়লা বৈশাখের পরদিনই যে আমরা ‘বাংলা’ তারিখ ভুলে যাই তার একটি কারণ হচ্ছে, কোনো হুজুগ বা নেশাই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
শিশির ভট্টাচার্য্য: অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বৈশাখী মেলার গল্প; অকুস্থল রবীন্দ্র সরোবর

প্লাস্টিকের বাঁশি মুখে নিয়ে ছোট বড় সবার প্যাঁ পোঁ
হাতের ছাপ দিচ্ছে এক শিশু। ছবি: মানসুরা হোসাইন
সবার মনোযোগের চেষ্টা করছেন এক বিক্রেতা
শামীমের ব্যবসা আজ ভালোই ছিল। ছবি: মানসুরা হোসাইন
আবদুল বারেক আর হেলেনা। বিয়ে করেছেন চার বছর হলো। বারেক রিকশা চালান। হেলেনা গৃহিণী। ঘরসংসার গুছিয়ে রাখেন। আজ হেলেনা লাল টুকটুকে একটি সুতি শাড়ি পরেছেন। কানে দুল, ঠোঁটে লিপস্টিক।
দুজনে পাশাপাশি বসা। অনেক লোকের ভিড়েও আলতোভাবে স্বামীর ঊরুর ওপর একটি হাত দিয়ে বসে আছেন হেলেনা। ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে আজ মঙ্গলবার দুপুরে কথা হয় এই দম্পতির সঙ্গে।
আবদুল বারেক হাসি হাসি মুখ করে বললেন, ‘আজকে পহেলা বৈশাখ। এই দিনে কী হয় জানি না। আমরা বেড়াইতে আসছি।’
হেলেনা বললেন, ‘সকালে শিশু পার্কে গেলাম। দোল খাইলাম।’ সারা দিনে আরও কী কী খেলেন, কী কী করলেন তার ফিরিস্তিও দিলেন হাসিমুখে।
রবীন্দ্র সরোবরে গতকাল সোমবার রাত থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন বাংলা, কোকাকোলাসহ অনেক প্রতিষ্ঠান কনসার্টের আয়োজন করে। চুড়িমালা, মুড়িমুড়কি, ডুগডুগি, কাঁচা আম, পান সুপারি, হাওয়াই মিঠাইসহ হরেক পণ্য নিয়ে চলে বৈশাখী মেলার আয়োজন। এবার বেশির ভাগ তরুণের মাথায় ছিল গামছা। ভাবখানা এমন ছিল যে, ফ্যাশনও হলো আবার রোদ থেকেও বাঁচা গেল। আর তরুণীদের মাথায় ছিল ফুলের মালা।
বারেক ও হেলেনার মতো অনেকেই আজ নববর্ষ উদ্‌যাপনের জন্য সারা দিন নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়িয়েছেন, খেয়েছেন, বাঁশি-বেলুন কিনেছেন। চটপটি, ফুচকাও বাদ যায়নি। দুপুরের প্রচণ্ড গরমে একটু শান্তির পরশ পাওয়ার জন্য অনেকে ছুটে গেছেন তালপাখা, কাপড়ের হাতপাখা কিনতে।
নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ, যে নামেই ডাকা হোক বা যে উৎসবই হোক, দিনটিতে ব্যবসা হবে, এটুকুই জানেন অনেকে। বেতের তৈরি কুলা-ডালার ব্যবসাটিকে ‘সিজনাল’ ব্যবসা হিসেবে আখ্যা দিলেন মো. ইলিয়াস হোসেন। শুধু আজকের দিনের জন্যই এ ব্যবসা। অন্য সময় চলে অন্য ব্যবসা। নরসিংদী, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে এসব জিনিস সংগ্রহ করেছেন তিনি। তবে এবার তিনি হতাশ।
ইলিয়াস হোসেন জানালেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ২০ হাজার টাকারও জিনিস বিক্রি হয়নি। গত বছর এ সময় ৮০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি করেন। ইলিয়াস বলেন, ‘এইবার লোকজন কম। লোকই নাই, কিনব কে? অন্যবার এইসময় এই জায়গায় খাড়াইতেই পারতেন না।’
চুড়িমালা বিক্রেতা নাছিমার কণ্ঠেও আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘বিক্রি নাই। সকাল থেইক্যা দুই হাজার টাকার মাল বেচছি।’
রবীন্দ্র সরোবরে শামীমের একচ্ছত্র আধিপত্য। সে এ এলাকাতেই প্রতিদিন থাকে। ধানমন্ডি এলাকায় বেশির ভাগ স্কুলের অভিভাবকদের কাছে সে পরিচিত। শামীমের হাত ও পা বাঁকা হয়ে ছোট হয়ে গেছে। তিন চাকার কাঠের তৈরি একটি জিনিস ঠেলে ঠেলে সে সামনে যায়, পেছনে যায়। শামীম জানে আজ পয়লা বৈশাখ। সকাল থেকে আয়রোজগারও খারাপ হয়নি। সকাল থেকে কত টাকা পেয়েছে জানতে চাইলে বলে, ‘গুইন্যা দেহি নাই।’
তবে বেশি ভিড় হলে শামীমের লাভের চেয়ে খানিকটা ক্ষতিই হয়। লোকজনের পায়ের সঙ্গে তার শরীর লেগে যায় বলে তাকে চুপচাপ একটি জায়গায় বসে থাকতে হয়।
সাভার থেকে বেদেনীদের একটি নারী দল রবীন্দ্র সরোবরে তাঁদের উপস্থিতির জানান দেন। সাজগোজ করা নারীর সামনে একজন বেদেনী বললেন, ‘ও বড়লোকের বেটি, কিছু দিয়া যাও।’ তবে সেই নারী সেদিকে তেমন একটা পাত্তা দিলেন না। একজন দিলেন না তো কী হয়েছে, তাই আবার আরেকজনের কাছে ছুট।
পরিবারের কয়েক মাস বয়সী সদস্যটিও রবীন্দ্র সরোবরে এসেছে লাল বা সাদা জামা পরে। মা-বাবা মুঠোফোনে সেলফি ও ছবি তুলতে ব্যস্ত। স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে এসেছেন একজন। ছবি তুলতে মেয়েটি রাজি হলেও ছেলেকে কিছুতেই রাজি করানো যাচ্ছিল না। ফলে সেই ভদ্রলোক রাগে লাল হয়ে গেলেন। বললেন, ‘আজ বাসায় চলো, তারপর তোমার খবর আছে।’
বৈশাখী উত্তাপের পাশাপাশি রবীন্দ্র সরোবরের চারপাশে ধুলা উড়ছে। তার মধ্যে প্লাস্টিকের বাঁশির প্যাঁ পোঁ শব্দ। বউ, বাচ্চার মন রক্ষার জন্য যাঁরা এখানে আসতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের গজগজ করতে দেখা গেল। অনেকে আবার শুধু পরিবারের সদস্যদের কথা চিন্তা করে সব মেনেও নিচ্ছিলেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনেক শিশু আইসক্রিমসহ অন্যান্য জিনিসের বায়না ধরে। বাবা কিনে দিতে রাজি হওয়ায় তাদের খুশি দেখে কে।
রবীন্দ্র সরোবরের আশপাশের রাস্তার মুখ বন্ধ। রবীন্দ্র সরোবর ছাড়িয়ে উৎসবের অনেক আয়োজন রাস্তায় চলছে। লাইফবয়ের পক্ষ থেকে ফুটপাতে বেসিন বসানো হয়েছে। সেখানে লাইফবয় হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
বার্জার পেইন্ট সাদা কাপড় টানিয়ে দিয়েছে। তার সামনে বড় বড় ড্রামে রং গুলিয়ে রাখা। শিশুসহ একেকজন গিয়ে রঙে হাত চুবিয়ে সাদা কাপড়ে হাতের ছাপ দিচ্ছে। তার পাশেই একটি পোস্টারে লেখা আছে-হাতের ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে নির্দিষ্ট জায়গায় ট্যাগ করতে হবে। তারপর সর্বোচ্চ লাইক এবং শেয়ার অর্জনকারী ব্যক্তি পাবেন বিশেষ পুরস্কার। বিনা মূল্যে হাতে মেহেদি লাগানোসহ অন্যান্য আয়োজনও ছিল অনেক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে।
বাঙালির বৈশাখ উদ্‌যাপনে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে তার জন্য র‍্যাব ও পুলিশের উপস্থিতিও ছিল রবীন্দ্র সরোবরে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই সদস্যদের পোশাক ছাড়া সবার পোশাকেই ছিল বৈশাখী লাল-সাদার ছোঁয়া।
পুলিশের একজন কনস্টেবল সেলিনা বসে ছিলেন। ‘সবাই এত সাজগোজ করে মজা করছে, আর আপনারা তা করতে পারছেন না’ এইটুকু বলতেই মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সেলিনা বলেন, ‘আমার দায়িত্ব পালন করতে খারাপ লাগছে না। আমার কাজই তো এইটা।’

সিটি করপোরেশনকে ঢেলে সাজাতে হবে by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

প্রায় আট বছর স্থগিত থাকার পর ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ঢাসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একটি ঠুনকো অজুহাতে আদালতে আটকা পড়েছিল ঢাসিক নির্বাচন। অনেকের ধারণা, আওয়ামী লীগ সরকার ঢাকা শহরে তাদের অবস্থা অনুকূল না দেখায় এত দিন তারা ঢাসিক নির্বাচনে আগ্রহী ছিল না। ওই সময় ঢাকার বাইরে প্রায় সব সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় হয়েছে। তাই ঢাকাকে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় রাজনীতির (ঢাকা) অঙ্গনে যখন বিএনপি বিপর্যস্ত, দলের বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা হয় বন্দী বা পলাতক, তখন আদালতের গিঁটটা অতি দ্রুত খুলে যায়। এটা কারও ইচ্ছায় ঘটেছে, এমন বলা আমাদের অভিপ্রায় নয়। এটা কাকতালীয়ভাবেই হয়তো ঘটেছে। ঢাকাবাসীদের সৌভাগ্য, নির্বাচনের বাধাটি আদালত অবশেষে অপসারণ করেছেন। তাই আমরা আজ ঢাসিক নির্বাচন করতে পারছি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো বাধা ছিল না। নিয়ম অনুযায়ীই চসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে একটা নতুন আইন করার জন্য প্রস্তাব করছি। নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো রিট করা হলে তা তিন মাসের মধ্যে নিষ্পন্ন করতে হবে। আদালতের ব্যস্ততার জন্য তা করা সম্ভব না হলে পরবর্তী নির্বাচনে তা প্রযোজ্য হবে না। এর পরের নির্বাচনে তা প্রযোজ্য হবে। ভাবুন তো, সংসদ নির্বাচন নিয়ে এ রকম একটা রিট করার ফলে আট বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত রয়েছে! আশা করি, বাংলাদেশে কলেজ নির্বাচন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবখানে রিটের কারণে তিন মাসের বেশি নির্বাচন স্থগিত রাখার সুযোগ থাকবে না। এ জন্য প্রয়োজন হলে নতুন আইন করা যেতে পারে।
এবার প্রথমবারের মতো ঢাকা সিটি করপোরেশনে (ঢাসিক) দুই ভাগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ঢাসিককে দুই ভাগ করা কোনো সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের ধারণা, ভবিষ্যতে অন্য কোনো সরকার এটা পরিবর্তন করে ঢাসিককে আবার আগের জায়গায় (একক সত্তা) নিয়ে যেতে পারে। ঢাসিকের অনেক সমস্যা। ঢাসিকের আয়তন, জনসংখ্যা, কাজের পরিধি, সেবার মান, সমন্বয় ইত্যাদি নিয়ে নানা সমস্যা রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ঢাকার ৫৬টি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর মেয়রের (দুজন মেয়র হলেও) কোনো একক কর্তৃত্ব নেই। ফলে শুধু দুজন কেন, দশজন মেয়র নির্বাচিত হলেও এ সমস্যার সমাধান হবে না। বর্তমান আইন ও ব্যবস্থায় ঢাসিকের মেয়র মূলত একজন নিধিরাম সরদার। সরকার মূল সমস্যার সমাধানে মনোযোগ না করে অহেতুক ঢাসিককে দুই ভাগ করেছে।
ঢাসিকের আরেকটা সমস্যা হলো মেয়র ‘রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির’ মতো এককভাবে নির্বাচিত হন। কাউন্সিলরদের সঙ্গে তাঁর কোনো নির্বাচনী জোট বা বোঝাপড়া নেই। কেউ কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। মেয়র স্বাধীনভাবে একক কর্তৃত্বে সিটি করপোরেশন চালান। কাউন্সিলরদের উপেক্ষা করেও তিনি মেয়র অফিস চালাতে পারবেন। আইন বাধা হবে না। এটা একটা প্রহসন। উচিত ছিল ‘সংসদীয় পদ্ধতির’ মাধ্যমে নির্বাচন করা। সবাই কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন। তাঁরা হবেন শহরের ‘এমপি’। এই ‘এমপিরা’ ভোট দিয়ে সিটি করপোরেশনের মেয়র, ডেপুটি মেয়র ও স্পিকার নির্বাচন করবেন। তাহলে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য রকম হতো। একই অবস্থা চসিকের জন্যও প্রযোজ্য।
আমাদের প্রস্তাব এবারের নির্বাচনের পর সরকার ‘সিটি করপোরেশন’-এর নির্বাচন ও কার্যাবলি পর্যালোচনার জন্য একটি কমিশন গঠন করবে। যে কমিশন অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের জন্য নানা সুপারিশ দেবে। ঢাকা দুই ভাগ হবে, না চার ভাগ হবে, তা গবেষণা, জনমত জরিপ ও বিভিন্ন দেশের মডেল দেখে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হবে। কী ধরনের ব্যবস্থা নিলে ঢাকা বা চট্টগ্রামের সব সেবাদানকারী সংস্থা মেয়রের অধীনে আসবে, তা-ও এ কমিশন সুপারিশ করবে। মোট কথা, বড় সিটি করপোরেশনগুলো ঢেলে সাজাতে হবে।
এবার প্রথমবারের মতো ঢাকায় দুজন মেয়র নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। তাঁরা কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবেন, তা আমরা পরে জানতে পারব। বা দুজন মেয়র হওয়ায় কী কী সুবিধা হলো, তা-ও পরে জানা যাবে।
আশা করা যায়, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে এ নির্বাচন পরিচালনা করবে। যাতে তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ উত্থাপিত না হয়। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার যেভাবে একক কর্তৃত্বে কমিশন পরিচালনা করছেন (সূত্র: প্রথম আলো) তাতে সন্দেহ হয়, তিনি এককভাবে কোনো এজেন্ডা বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছেন।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন যে বড় দুই দলের সাংগঠনিক অবস্থা এক রকম নয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব সংস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অপর দিকে বিএনপির বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতা নানা অভিযোগে হয় বন্দী, নতুবা মামলার ভয়ে ফেরারি। গত তিন মাস তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পুলিশ বন্ধ করে রেখেছিল। ঢাকা দক্ষিণে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী গ্রেপ্তারের ভয়ে আত্মগোপনে। বিএনপি-সমর্থিত অনেক কাউন্সিলর প্রার্থীও আত্মগোপনে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল আওয়ামী লীগ তাদের সমর্থিত মেয়র বা কাউন্সিলর প্রার্থীরা স্বাধীনভাবে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। এবারের ঢাসিক নির্বাচন তাই সংগত কারণেই একটি অসম প্রতিযোগিতা হতে যাচ্ছে।
আমাদের মহামান্য আদালত ঢাসিক সীমানা নিয়ে মামলার নিষ্পত্তি করার জন্য এ সময়টা যে বেছে নিয়েছেন, এ জন্য দূরদর্শিতার প্রশংসা তাঁদের প্রাপ্য। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী যেসব প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তাঁদের ও দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের জামিন দেওয়া যায় কি না, আদালত তা বিবেচনা করতে পারেন।
দলের এ রকম একটা দুঃসময়ে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এ অসম প্রতিযোগিতায় নামতে বিএনপি যে সম্মত হয়েছে, এ জন্য তারা প্রশংসার যোগ্য। ‘জিততেই হবে’ এ রকম মানসিকতা নিয়ে গণতন্ত্রচর্চা হয় না। গণতন্ত্রে ও খেলায় হার-জিতের জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হয়। গত তিন মাস জনসম্পৃক্ততাহীন কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি যে প্রায় নিষ্ফল আন্দোলন পরিচালনা করেছে, সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তার রাজনীতিকে সঠিক ট্র্যাকে আবার ফিরিয়ে আনার একটা সুযোগ পেয়েছে। সিটি নির্বাচনের পর তারা আন্দোলনের নতুন ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে পারবে। সরকার যদি আগামী সংসদ নির্বাচনের জন্য সব দলের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়, তাহলে বিএনপিকে আর আন্দোলনের কর্মসূচিও দিতে হবে না। আশা করি, সরকার নতুন নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা উপলব্ধি করতে পারবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বাংলাদেশে দ্রুত আরেকটি অর্থপূর্ণ ও সব দলের অংশগ্রহণে সংসদ নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে না।
চট্টগ্রামের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো। দুই বড় দলের সমর্থন নিয়ে দুই মেয়র প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। চট্টগ্রামে অন্য ধরনের সমস্যা রয়েছে। বিরোধী দল থেকে মেয়র নির্বাচিত হলে কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাশিত সহযোগিতা করে না। দোষ হয় মেয়রের। সরকারি দলের এমপি, মন্ত্রীরা তাতে আনন্দ পান। চট্টগ্রামে চসিকের সঙ্গে সিডিএর (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) একটা দ্বন্দ্ব সরকার তৈরি করে রেখেছে। উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন কে?
এ সমস্যার একটা সমাধান দরকার। চট্টগ্রাম বা জেলা শহরে উন্নয়নে নেতৃত্ব দেবেন কে? নির্বাচিত মেয়র? না সরকারি কর্মকর্তা? ঢাকার একটি সমস্যা চট্টগ্রামেও রয়েছে। সেবাদানকারী সরকারি সংস্থাগুলোর ওপর মেয়রের একক কর্তৃত্ব নেই।
সে জন্যই একটি ‘কমিশন’ গঠনের কথা বলেছিলাম। ঢাকা, চট্টগ্রাম বা অন্য সিটি করপোরেশনগুলো কীভাবে চলবে, কীভাবে নির্বাচন হবে, মেয়রের একক কর্তৃত্ব কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার পথ বের করতে হবে। অন্যথায় নির্বাচিত মেয়ররা তেমন কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবেন কি না সন্দেহ। আছে আইনের সীমাবদ্ধতা। সেই সীমাবদ্ধতা দূর করতে হবে পরের নির্বাচনের আগেই।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

এসো হে বৈশাখ by আনিসুজ্জামান

গ্রীষ্মকাল—বৈশাখের খরতাপে হৃদয় তৃষায় হানে। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং কবুল করেছেন, সময়টা আরামের নয়। তারই মধ্যে লোকে গলা ফাটিয়ে বলছে, এসো হে বৈশাখ। বাঙালি না হলে এমন আর কে করে! করে তার নববর্ষকে আবাহন করার জন্য।
সারা বছরে নববর্ষের সূচনা করার মতো অনুকূল সময় আরও ছিল। এক সময়ে তা-ই হতো। অগ্রহায়ণ মাসের নাম থেকেই বোঝা যায়, কোনো এক কালে তাকেই গণ্য করা হতো বছরের (হায়ন) শুরু (অগ্র) বলে। তখন হেমন্তকাল—চারদিকে নরম রোদ, একটু হিম-হিম ভাব। বেশ আরামের কাল। কিন্তু সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। অগ্রহায়ণ বদলে বাঙালি তার নববর্ষ আরম্ভ করল বৈশাখ থেকে। অগ্নিস্নানই সই, কালবৈশাখিতেও ভয় নেই। ধোপদুরস্ত বাঙালি গগন বিদীর্ণ করে চিৎকার করছে, এসো হে বৈশাখ।
অন্য জায়গার বাঙালির চেয়ে বাংলাদেশের বাঙালিই একটু বেশি করে অমন করে। নববর্ষকে সে দেখে তার সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের অংশ বলে। একদা পাকিস্তানি শাসকেরা বাঙালির নববর্ষ-উদ্যাপনকে নিরুৎসাহ করতে চেয়েছিল, বাধাও দিয়েছিল প্রকারান্তরে। তবেই হুঁশ হলো বঙ্গসন্তানের। সারা বছর বাংলা তারিখের খোঁজ নেই তার, কিন্তু সে মরিয়া হয়ে গেল পয়লা বৈশাখে। কোমর বেঁধে লেগে গেল দিনটা পালন করতে। নববর্ষ-উদ্যাপন এখন বাংলাদেশের প্রধানতম উৎসব। এর মধ্যে আমরা খুঁজে পাই আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, আমাদের স্বকীয়তা, আমাদের অস্তিত্বের শিকড়।
পঞ্জিকাই একটা জাতির পরিচয়ের মূলসূত্র নয়। কিন্তু নিজেদের যে একটা পঞ্জিকা আছে—স্বতন্ত্র, একান্ত, বিশেষ—তা একটা বলবার বিষয়, সবাইকে জানানোর মতো কথা—আনন্দের, গৌরবের, অহংকারের ব্যাপার। সনমাত্রেরই উদ্ভব হিসেব-নিকেশের জন্য। রাজস্ব সংগ্রহের প্রয়োজনেই তো বাংলা সনের সূচনা। তাই আশ্চর্য নয় যে, ব্যবসায়ীদের হালখাতা খোলাই ছিল এককালে নববর্ষের মূল উৎসব। তার মধ্যে অবশ্য আনন্দের উপকরণও ছিল। হালখাতা উপলক্ষে খাওয়া-দাওয়ার, বিশেষ করে মিষ্টান্ন বিতরণের, রেওয়াজ ছিল। বৈশাখি মেলায় হরেক রকমের সামগ্রীর প্রদর্শনী ও কেনাবেচা ছিল বিনোদনের একটা উৎস। কোনো না কোনোভাবে সবাই দিনটাকে উৎসবের আনন্দ দিয়ে ভরে রাখার চেষ্টা করত।
ইংরেজদের নিউ ইয়ার্স ডে পালনের দেখাদেখি শিক্ষিত নাগরিক সমাজে নববর্ষ-পালন শুরু হয় উনিশ শতকের শেষভাগে। নৃত্যগীতবাদ্য দিয়ে দিনটিকে সুশোভিত ও আমোদিত করার কাজে অগ্রণী হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপর তা ছড়িয়ে গিয়েছিল সবখানে।
বাংলাদেশ-অঞ্চলে নববর্ষ-উৎসব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ছায়ানটের উদ্যোগে। পাকিস্তান সরকার নববর্ষ পালনে আপত্তি করে জেনে আমাদের উৎসাহ আরও বেড়ে গিয়েছিল। এখন তো ছায়ানটের পাশাপাশি চারুকলা ইনস্টিটিউট বা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা, বাংলা একাডেমির বক্তৃতা ও কবিতা পাঠের আসর, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর সংগীতানুষ্ঠান আয়োজিত হচ্ছে। রবীন্দ্র-সরোবরে বসছে গানের আসর। গত কয়েক বছর ধরে সুরের ধারা চৈত্রসংক্রান্তিতে বর্ষশেষের অনুষ্ঠান করছে, যা শেষ হচ্ছে মধ্যরাত্রির পরে নববর্ষ আবাহন করে। বিসিকের বৈশাখি মেলা নববর্ষের দিনটিকে সৌষ্ঠবমণ্ডিত করে আসছে। শুধু ঢাকায় নয়, দেশের সর্বত্র নববর্ষ উদ্যাপিত হচ্ছে সাড়ম্বরে।
তারপরেও, কিংবা তা সত্ত্বেও, এ-কথা সত্য যে, রমনার বটমূলে ছায়ানটের নববর্ষ-উৎসব আক্রান্ত হয়েছে, হতাহত হয়েছে মানুষ, কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আনন্দযজ্ঞে ছড়িয়ে পড়েছে ভীতি আর কান্না। আমাদের সমাজে কিছু মানুষ সবক্ষেত্রে ধর্মকে টেনে আনেন এবং শিরক ও বেদাতের সন্ধান করেন। নরহত্যাকে তাঁরা গুরুতর পাপ বলে মনে করেন না। মেয়েদের কপালে টিপ পরা থেকে শুরু করে পিচ-ঢালা পথে আলপনা আঁকাকে তাঁরা বিধর্মীয় আচার বলে সাব্যস্ত করেন এবং তা দমন করতে তৎপর হন। এসব প্রয়াসে তাঁরা যে একেবারে ব্যর্থ হয়েছেন, তা নয়। মেয়েদের সাম্প্রতিক পোশাক-আশাক দেখলে তা বোঝা যাবে। কেউ তার পছন্দমতো খাওয়াপরা চলাফেরা করতেই পারে। গোলমাল লাগে যখন কেউ অপরের পছন্দ-অপছন্দে হস্তক্ষেপ করে, তখন।
ছায়ানটের অনুষ্ঠানে সেই বোমা-হামলার পরে কয়েকজন কিশোর-কিশোরীকে সামনে পেয়ে টেলিভিশনের সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, এরকম দুর্বিপাকের পরে তারা কি আর আসবে এখানে? ছেলেমেয়েরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দ্বিধাহীনচিত্তে তাৎক্ষণিক উত্তর দিয়েছিল, ‘সামনের পয়লা বৈশাখে আবার আমরা আসব।’
এইখানেই পয়লা বৈশাখের শক্তি। শুধু পয়লা বৈশাখের নয়, বাঙালির সকল উৎসবের। আমাদের ইতিহাসের ধারা, ঐতিহ্যের পারম্পর্য বহন করে নিয়ে চলেছে দেশের সরল মানুষ। তারা অদম্য, তারা অপরাজেয়। তারা একুশে ফেব্রুয়ারিতে তা দেখিয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানে তা দেখিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধে তা দেখিয়েছে। শাশ্বত বাঙালিত্বের সন্ধানে তাদের যাত্রা থামবার নয়, স্বকীয় সংস্কৃতির লালনে তাদের প্রয়াস শেষ হওয়ার নয়। জয় হোক তাদের। আমাদের ভবিষ্যৎ তাদেরই হাতে।
নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে।

প্রবাসী–আয় যেভাবে বাড়ানো সম্ভব by আলী আকবর মল্লিক

এমন এক সময় ছিল যখন ভাগ্যে বিদেশ যাওয়া আছে কি না, হাতের রেখা দেখে পরখ করা হতো। এখন বিদেশ যাওয়া ডালভাত হয়ে যাওয়ায় এমনটা কেউ আর করে না। মোটা দাগে বলা যায়, আমাদের ১৬ কোটি জনসংখ্যার প্রায় এক কোটি বিদেশে থাকেন, অর্থাৎ ১৬ ভাগের এক ভাগ আজ প্রবাসী। এই প্রবাসীদের অধিকাংশ অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও অদক্ষ শ্রমিক হওয়ায় কম পারিশ্রমিকের কাজ করেন। তবে তাঁরা একাই শ্রম দিতে বিদেশে থাকেন এবং মাস শেষে উপার্জিত অর্থ প্রিয়জনদের জন্য নিয়মিতভাবে দেশে পাঠিয়ে দেন। প্রবাসীদের মধ্যে অপর একটি অংশ সুশিক্ষিত ও দক্ষ হওয়ায় তুলনামূলকভাবে ভালো আয় করেন। কিন্তু এই অংশটির বেশির ভাগ পরিবার-পরিজন নিয়ে বিদেশে থাকেন (যাঁদের অনেকে দেশান্তরী হয়েছেন) এবং তাঁদের অনেককে দেশে অর্থ পাঠাতে হয় না বা পাঠালেও কদাচিৎ। তাই মূল রেমিট্যান্সের ধারাটি অব্যাহত আছে নিম্ন আয়ের প্রবাসীদের দ্বারা।
গত বছর প্রবাসীরা ১ হাজার ৪২২ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। উল্লিখিত নিম্ন আয়ের প্রবাসীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে এই পরিমাণ অর্থ দেশে এসেছে। তাই নিম্ন আয়ের এই প্রবাসীদের আয় যদি দেড় থেকে দ্বিগুণ করা যেত, তবে বছরে আমাদের আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স আসত। এটা সম্ভব কি না, যাচাই করার জন্য এশিয়ারই অন্য একটি দেশের দ্বারস্থ হব।
১০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ফিলিপাইনের প্রায় এক কোটি লোক বিদেশে থাকেন, অর্থাৎ দশ ভাগের এক ভাগ প্রবাসী। তাই বলা চলে, বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের প্রবাসী সংখ্যায় বড় ব্যবধান নেই। অথচ গত বছর বাংলাদেশি প্রবাসীরা যখন দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, তখন একই সময়ে ফিলিপিনোরা পাঠিয়েছেন ২ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। প্রায় সমসংখ্যক লোক বিদেশে থাকলেও ফিলিপিনোদের রেমিট্যান্স প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার কারণ হচ্ছে:
(১) ফিলিপিনোরা যে যাঁর কাজে অত্যন্ত দক্ষ। পেশাগত এই দক্ষতা অর্জন তাঁরা বিদেশে পাড়ি জমানোর আগে দেশের মাটিতেই করে থাকেন। তবে কাজ করে করে আরও দক্ষতা অর্জন করা যেকোনো মানুষের সহজাত বিষয়।
(২) ফিলিপিনোরা কমপক্ষে সেকেন্ডারি স্কুল পাস করা এবং ইংরাজিতে দক্ষ। এই দক্ষতার নিয়ামকগুলো হচ্ছে: (ক) ফিলিপাইনের স্কুলগুলোতে ইংরেজি পড়া, লেখা, শোনা ও বলা—এই চার দিকই গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। যেমন, ইংরেজি ক্লাসের সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার জন্য মাতৃভাষায় কথা বলা নিষেধ। (খ) ম্যানিলাসহ দেশের সব শহর-বন্দর-গ্রামের বিজ্ঞাপন, নির্দেশনা সবটাই ইংরেজিতে। যেমন, গ্রামগঞ্জের যত্রতত্র ধানের জমিতে ট্রেসপাসিং ইজ স্ট্রিকলি প্রহিবিটেড (অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ) লেখাটি প্রায়ই চোখে পড়ে। লক্ষণীয় যে নিরেট গ্রামে হলেও বিজ্ঞাপনটি মাতৃভাষা তাগালোগে নয়, বিদেশি ভাষা ইংরেজিতে। মহাসড়কের ট্রাফিক-সংক্রান্ত নির্দেশনাগুলো সবই ইংরাজিতে লেখা। যেমন নো লোডিং অর আনলোডিং, অর্থাৎ লোক, মালামাল ওঠানো–নামানো নিষেধ। পাবলিক মোটরগাড়ির পেছনে দেখা যায়, হাউ ইজ মাই ড্রাইভিং (আমার গাড়ি চালানোয় আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি) এবং সঙ্গে অভিযোগ করার মতো একটি যোগাযোগের নম্বর। অফিসের দরজায় চোখে পড়ে ‘নো ভ্যালিড আইডি, নো এন্ট্রি’ (বৈধ পরিচয়পত্র ছাড়া ঢোকা নিষেধ)। এসব লেখা বারবার চোখে পড়ায় তা ‘ন্যাচারাল’ বইয়ের মতো কাজ করে, যা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন জনতা মাত্রেরই ইংরেজি চর্চা সমুন্নত রাখে। (গ) পরিবারে ভাইবোন ইংরেজিতে বা তাগালোগ ও ইংরেজির সংমিশ্রণে কথা বলেন, যেন তাঁরা বিদেশে গিয়ে ইংরেজি ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেন।
(৩) ফিলিপিনোরা অত্যন্ত ঠান্ডা মেজাজের। উগ্র মেজাজ দেখানো বা দেশের বদনাম হতে পারে, এমন কোনো কাজ তাঁরা সহজে করেন না। কর্মস্থলে ওপরের বা সমপর্যায়ের যে কাউকে খুব সহজে স্যার, ম্যাডাম সম্বোধন করে আনুগত্য প্রকাশ করেন। অন্যের সঙ্গে একত্রে কাজ করতে গিয়ে সহনশীলতার পরিচয় দেন। খুব সহজে অন্যের বন্ধু হয়ে যান।
এভাবেই ফিলিপিনোরা পেশাগত দক্ষতা ও ভালো ইংরেজি জানার কারণে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন এবং একই কর্মক্ষেত্রে একজন বাংলাদেশির চেয়ে অনেক বেশি পারিশ্রমিক পান। জেদ্দা, দুবাই বা কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের প্রায় সবাই যখন বিদেশি, তখন একজন ফিলিপিনোও সেখানে দেখা যায় না। কারণ বেশি মূল্যে তাঁদের অন্যত্র চাহিদা আছে। এমনকি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালের লোকজনও খুব কম দেখা যায়। কম পারিশ্রমিকে বাংলাদেশিরা কষ্টের কাজ করতে বাধ্য হন পেশাগত ও ভাষার দক্ষতা না থাকার কারণে। তবে কষ্টের কাজগুলোও কারও না কারও করতে হবে। সে জন্য অত্যন্ত উচ্চ হারে পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের পারিশ্রমিক ওই দেশের সরকারপ্রধানের চেয়ে বেশি, এমন দেশ এশিয়াতেই আছে।
ফিলিপিনোদের মতো পেশাগত দক্ষতা অর্জন করা বাংলাদেশিদের পক্ষেও সম্ভব। যেমন একজন ধান, সবজি, ফলচাষি যদি দেশে তিন থেকে পাঁচ বছর কাজ করেন, তবে তাঁর এ বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করার কথা। তেমনি রাজমিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, প্লাম্বিং মিস্ত্রি, মোটর ড্রাইভিং, মেকানিকসসহ এমন হাতের কাজ করার ক্ষেত্রেও। বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা পেলে মধ্যপ্রাচ্যে ভালো পারিশ্রমিকের কাজ যেমন সেবিকা, এয়ার ক্রু, হোটেল, বিমানবন্দর, এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনার কাজে বর্তমানে কদাচিৎ দেখা পাওয়া বাংলাদেশিরা সংখ্যাধিক্যে পরিণত হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে এসব ক্ষেত্রে দিনে দিনে প্রসার বাড়ছে।
বাংলাদেশে শিক্ষা কার্যক্রমে ইংরেজি ভাষাটি মাতৃভাষা বাংলার সঙ্গে সমানতালে শেখানোর অন্যতম কারণ পৃথিবীব্যাপী ইংরেজি ভাষার গ্রহণযোগ্যতা। মার্কিন ডলার, ইংরেজি ভাষা ও পাসপোর্টে একটি বৈধ ভিসা থাকলে বিদেশে বসে আত্মবিশ্বাসের পারদ ঊর্ধ্বমুখী থাকে। তবে ইংরেজি শিক্ষায় পড়া, লেখা, শোনা ও বলা—এই চার দিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তাহলে এমনকি যারা পঞ্চম-ষষ্ঠ শ্রেণিতে ঝরে পড়ছে, তারাও কর্মজীবনে ইংরেজির দক্ষতা বাড়াতে পারবে। শুধু বিদেশের জন্য নয়, দেশেও বিদেশিদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় ইংরেজিতে যোগাযোগ করতে সক্ষম গাড়ি ভাড়া দেওয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন গাড়িচালক ও তৈরি পোশাকের বায়ার হাউজগুলোতে এমন দক্ষÿ কর্মীর কদর বাড়ছে।
ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা ছাড়াও সবুজ পাসপোর্টধারী বাংলাদেশিদের পাসপোর্টের মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজন আত্মসম্মানবোধের। অবৈধ উপায়ে সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে চাওয়া আর থাইল্যান্ডের বনজঙ্গলে আশ্রয় নেওয়া লোকজনকে কে কত মূল্য দিতে চাইবে! কোটি টাকা কুড়িয়ে পেয়ে প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিয়ে অনেক দেশে বাংলাদেশিরা যেমন সুনাম অর্জন করেছেন, আবার সবুজ পাসপোর্টের দিকে বাঁকা চোখে তাকানোর দেশ এশিয়াতেই অনেক আছে। উগ্র বা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আমাদের পুরো জাতির ওপর কলঙ্ক বয়ে আনে। কারণ একেকজন বাংলাদেশি বিদেশের মাটিতে আলাদা একক ব্যক্তি নন, বরং একেকজন রাষ্ট্রদূত।
আলী আকবর মল্লিক: কাঠামো প্রকৌশলী, ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সাবেক মহাসচিব। কম্বোডিয়ার নমপেনে কর্মরত।

এসো হে বৈশাখ এসো এসো by হক ফারুক আহমেদ

আজ পহেলা বৈশাখ। বঙ্গাব্দ ১৪২২-এর প্রথম দিন। ঐতিহ্য, উৎসব, আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে বাঙালির হারিয়ে যাওয়ার দিন। নতুন সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো বছরের গ্লানি আর জরা মুছে দিয়ে নতুনের আবাহনে মেতে উঠার দিন। ১৪২১-এর আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার হিসাব চুকিয়ে জীবন অংকের সরল সমীকরণে নতুন বছরের পরিকল্পনায় শুভ-সূচনার দিন।
‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’র হৃদয়হরণি সুরে আজ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসবে নববর্ষ উদযাপনে মেতে উঠবে বাঙালি। পান্তা-ইলিশ আর মণ্ডা-মিঠাইয়ের সঙ্গে নাচে-গানে, ঢাকে-ঢোলে, শোভাযাত্রায় পুরো জাতি বরণ করবে ১৪২২-কে। গ্রাম থেকে শহর, নগর থেকে বন্দর, আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ থেকে প্রকৃতির প্রতিটি নৈসর্গিক দৃশ্যেই ঝলমল করবে বৈশাখী উন্মাদনা। খোলা হবে হালখাতা।
সোমবার বসন্তের শেষদিনে নানা আয়োজনে চৈত্র সংক্রান্তির মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতি বিদায় জানিয়েছে ১৪২১-কে।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো এ উপলক্ষে প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে ক্রোড়পত্র ও বিশেষ নিবন্ধ। নির্বিঘ্নে উৎসব পালনে দেশব্যাপী কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
দেশবাসীকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরিন শারমীন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদসহ রাজনৈতিক দলের প্রধানরা।
রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান ও চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা বৈশাখকে আজ মহিমান্বিত করে তুলবে জাতির কাছে। রমনার বটমূল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চারুকলা, টিএসসি, ছবির হাট, ধানমণ্ডির রবীন্দ্রসরোবরসহ রাজধানীর সর্বত্রই কাকডাকা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বৈশাখী উন্মাদনায় হারিয়ে যাবে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাসহ সব শ্রেণী-পেশার ও সব ধর্মের মানুষ। এই একটি মাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব জাতির জীবনে শুধু আনন্দই বয়ে আনে না, বয়ে আনে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধ তৈরির অনন্য সুযোগ। সারা দেশেই সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মিলবে সেই স্বপ্ন-মধুর উপলক্ষ।
মঙ্গল শোভাযাত্রা ও রমনার বটমূলের প্রভাতী অনুষ্ঠানের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। চারুকলা ও ছায়ানট সোমবার নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন ও চৈত্রসংক্রান্তির মধ্য দিয়ে পুরনো বছর ১৪২১-কে বিদায় জানিয়েছে। শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনে আজ নতুন বছরেকে বরণ করবে।
বাংলা নববর্ষ-১৪২২ জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। বাংলা নববর্ষের তাৎপর্য তুলে ধরে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় কাল বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সুধী, নেতৃস্থানীয় লেখক, কবি, সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের সংবর্ধনা প্রদান করবেন। বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও সব উপজেলায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, আলোচনা সভা ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদফতর, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটগুলো, বিসিক ও ছায়ানট নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে।
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে আজ সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার দেয়া করা হবে। শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।
হোটেল সোনারগাঁও, র‌্যাডিসন, ওয়েস্টিন, ঢাকা রিজেন্সিসহ হোটেল-রেস্টুরেন্টেগুলোর উদ্যোগেও উদযাপিত হবে নতুন বছরের উৎসব। ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, উত্তরা ক্লাবের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হবে। মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলোও নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে। দুপুর থেকে রাত অবধি কনসার্টের আয়োজন করেছে ফ্যান্টাসি কিংডম ও নন্দন পার্ক।
সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হচ্ছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলো এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।