Tuesday, April 24, 2018

মধ্যপ্রাচ্যকে কব্জায় রাখতে আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

পশ্চিম এশিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক গোত্র, বর্ণ ও ধর্মের মানুষের বসবাস রয়েছে যা কিনা বিভিন্ন ঐশী ধর্মের প্রাণকেন্দ্র। এ ছাড়া, ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং তেল ও গ্যাসের খনির বিশাল ভাণ্ডারের কারণে এই এলাকাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে সবার কাছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে পাশ্চাত্যের লোলুপ দৃষ্টি রয়েছে এ অঞ্চলের ওপর।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভূ-রাজনৈতিক কারণে প্রথমে ব্রিটেন ও পরে আমেরিকার কাছে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। গ্যাস ও তেল সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য পাশ্চাত্য এ অঞ্চলকে ভেঙে একাধিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে এবং নিজেদের ইচ্ছেমতো সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। একই সঙ্গে তারা এ অঞ্চলের রাজতন্ত্র শাসিত সরকারগুলোর নিরাপত্তা দেয়ারও প্রতিশ্রুতি দেয়। ছোট বড় দেশগুলোর সমন্বয়ে আমরা বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যে ভৌগোলিক চেহারা দেখছি তা ব্রিটেন ও ফ্রান্সের উপনিবেশিক শাসনের ফসল। ১৯১৪ সালে 'সাইকাস-পিকট' পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটেন ও ফ্রান্স নিজেদের ইচ্ছেমতো সীমানা নির্ধারণ করে মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক দেশের জন্ম দিয়েছিল। আরব-ইসরাইল দ্বন্দ্ব, ইরাক-কুয়েত যুদ্ধ, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সীমানা বিরোধ এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান অন্যান্য সংকট এসবই মধ্যপ্রাচ্যে উপনিবেশিক শাসনের ফল। ১৯৪৮ সালে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনকে খণ্ডবিখণ্ড করে এ অঞ্চলে যে স্থায়ী সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে তাও উপনিবেশিক শাসনের অন্যতম ফসল।
শীতল যুদ্ধের সময় দুই মেরুকেন্দ্রীক ব্যবস্থায় আমেরিকার টার্গেট ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে দক্ষিণাঞ্চলীয় মুসলিম এলাকাগুলোকে আলাদা করে দেয়া। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম অঞ্চলগুলোকেও জাতীয়তার ভিত্তিতে খণ্ড বিখণ্ড করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় মার্কিন সরকার। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে কোনো লক্ষ্যই অর্জিত না হওয়ায় আমেরিকা এ অঞ্চলকে অসুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করে ফের এ এলাকার দেশগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করার উদ্যোগ নিয়েছে। শীতল যুদ্ধের পর বিশেষ করে ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর আমেরিকা ও তার পাশ্চাত্যের মিত্ররা তেল সমৃদ্ধ ও ভূ-কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করে। সে অনুযায়ী তারা এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি, গৃহযুদ্ধ বাধানো এবং ধর্ম ও জাতীয়তার ভিত্তিতে দেশগুলোকে খণ্ড বিখণ্ড করার পদক্ষেপ নিয়েছে যাতে এ দেশগুলো সবসময় দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত থাকে এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমেরিকা ২০০৩ সালের শুরু থেকে সাদ্দাম সরকারের গণবিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার কথা বলে ইরাকের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ শুরু করে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা ও সংস্কারের শ্লোগান দিয়ে আমেরিকা যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে দেয়। ১৯১৪ সালে ঘোষিত 'সাইকাস-পিকট' পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফসল হচ্ছে বর্তমানের সীমানা বিরোধ ও জাতিগত বিদ্বেষ যা কিনা এ অঞ্চলে পাশ্চাত্যের হস্তক্ষেপের সুযোগ এনে দিয়েছে। ২০০৩ সালে আমেরিকা কর্তৃক ইরাক দখলের ঘটনা 'সাইকাস-পিকট' পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আরেকটি দৃষ্টান্ত যার লক্ষ্য ইরাকসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোকে খণ্ডবিখণ্ড করা। অবশ্য আমেরিকা 'বৃহৎ মধ্যপ্রাচ্য' গঠনের যে কথা বলছে তা ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নতুন সংস্করণ মাত্র। পাশ্চাত্যের সরকার ও গণমাধ্যমগুলো এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব সংঘাতকে শিয়া-সুন্নি সংঘাত বলে তুলে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়েও আমেরিকা দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এ অঞ্চলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বললেও সৌদি আরবের রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। এটা কারো অজানা নয় যে, সারা বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে তার উৎসভূমি হচ্ছে সৌদি আরব। মার্কিন পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির সদস্য রিচার্ড হ্যাস বলেছেন, "'সাইকাস-পিকট' পরিকল্পনার আদলে যদি আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় তাহলে দেশটি ইরাক ও সিরিয়ার যে চোরাবালিতে আটকা পড়েছে তা থেকে মুক্তি পেতে পারে এবং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা পাল্টে নতুন আকৃতি ধারণ করবে।"
মুসলিম দেশগুলোর অভ্যন্তরে যে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা বা মতভিন্নতা বিরাজ করছে তাকে ব্যবহার করে আমেরিকা স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মুসলিম দেশগুলোর বর্তমান অবস্থা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এসবের মূলে রয়েছে পাশ্চাত্যের ভূমিকা এবং এটাও প্রমাণিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যকে অগ্নিগোলকে পরিণত করার জন্য ইরাকই তাদের প্রথম টার্গেট নয়। অন্যান্য মুসলিম দেশেও তারা ইরাকের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির পায়তারা করছে। এর আগে আমেরিকা বহু বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে ২০১১ সালে আফ্রিকার দেশ সুদানকে বিভক্ত করতে সক্ষম হয়। এরপর দখলদার ইসরাইলই প্রথম দক্ষিণ সুদানকে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ইসরাইল ও আমেরিকার পরবর্তী টার্গেট হচ্ছে লিবিয়া ও ইয়েমেনকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। পাশ্চাত্যের প্রচারমাধ্যমগুলো ইয়েমেন থেকে শুরু করে সিরিয়া, পাকিস্তান, লিবিয়া, ইরাক, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টির কথা বলছে যার পেছনে বার্নার্ড লুইস নামের এক ইহুদিবাদীর পরিকল্পনা কাজ করছে।
বার্নার্ড লুইস আমেরিকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের ওপর প্রায় ২০ হাজার প্রবন্ধ ও বই রচনা করেছেন। প্রথমে তিনি ভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করতেন। কিন্তু ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বর্নার্ড লুইস বিশাল ওসমানি সাম্রাজ্যের অন্তর্গত আরব দেশগুলোর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে গবেষণার দিকে মনোনিবেশ করেন। তিনি ১৯৭৯ সালে অস্ট্রিয়ায় এক সেমিনারে প্রথম তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকে এমনভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করার প্রস্তাব তুলে ধরেন যাতে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করা যায়। তিনি ভাষা, ধর্ম, গোত্র, বর্ণের ভিত্তিতে বড় রাষ্ট্রগুলোকে ভেঙে ছোট ছোট রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেন। ব্রিটেনের এই ইহুদিবাদীর উত্থাপিত ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, লেবাননের দ্রুজ, ইরানের বালুচ-তুর্ক-কুর্দি জাতিগোষ্ঠী, সিরিয়ার আলাভি, ইথিওপিয়ার খ্রিস্টান, সুদানের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, আরব দেশগুলোর বিচ্ছিন্নতাকামী উপজাতি গোষ্ঠী, তুরস্কের কুর্দিসহ অন্যান্য দেশের বিচ্ছিন্নতাকামী কিংবা বিদ্রোহীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেয়া উচিত।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে খণ্ড-বিখণ্ড করার পরিকল্পনায় ইরান হচ্ছে তাদের সবচেয়ে বড় টার্গেট। কারণ যে কোনো উপায়ে ইরানের বর্তমান সীমান্তে পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে অর্থাৎ ইরানকে ভেঙে কয়েক টুকরায় পরিণত করতে পারলে খুব সহজে প্রতিবেশী ইরাক, তুরস্ক ও পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা যাবে। এটা বার্নার্ড লুইসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হয়। এ কারণে আমেরিকা ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বার্নার্ড লুইসের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা উপস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নেরই অংশ। ইরাক দখলের পর ২০০৩ সাল থেকে আমেরিকা ও ব্রিটেন বহুবার এ অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোকে বিভক্ত করার কথা বলেছে। এ থেকে বোঝা যায়, আমেরিকা আসলে যুদ্ধ, সংঘাত ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে এ অঞ্চলের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

কিম জং উন কি পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগ করবেন?

উত্তর কোরিয়াকে ‘মহান সমাজতন্ত্রী পারমাণবিক শক্তিধর’ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে কিম জং উন যুগপৎ পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির ডাক দিয়েছেন। তবে শনিবার সমান্তরাল অগ্রগতি বলে পরিচিত নিজের এই প্রধান নীতি থেকে পিছু হটার ঘোষণা দিলেন তিনি। অবশ্য তিনি এ-ও বলেছেন যে, সময় এসেছে নতুন ‘কৌশলগত পন্থা’ অবলম্বনের। দেশের সম্পদ ব্যবহার জিরে অর্থনীতি পুনঃনির্মাণ করা প্রয়োজন।
পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে তিনি শনিবার ঘোষণা দিয়েছেন যে, মিশন সম্পন্ন হয়েছে। আর আণবিক বোমা বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। তিনি দেশটির একমাত্র জ্ঞাত পারমাণবিক পরীক্ষাস্থল বন্ধেরও ঘোষণা দিয়েছেন। কিম জং উনের মতে, ‘সমান্তরাল অগ্রগতি’র নীতির মাধ্যমে ইতিমধ্যে বিরাট বিজয় অর্জিত হয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি ছেড়ে কিমের নজর এখন অর্থনীতির দিকে। এই অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা তিনি দিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইনের সঙ্গে পূর্ব-নির্ধারিত সাক্ষাতের কয়েকদিন আগে। যুক্তরাষ্ট্রে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হামলা চালানোর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, কিম জং উন একটি বিষয় স্পষ্ট করছেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমনভাবে সমঝোতায় আসতে চান, যেমনটা কয়েক দশক আগে প্রতিষ্ঠিত পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন করেছিল।
তবে প্রধান প্রশ্ন হলো, কিম জং উন আদৌ তার পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগ করবেন কিনা। ঠিক এই প্রশ্নেরই উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
মার্কিন এই পত্রিকাটির এক বিশ্লেষণী সংবাদে বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, সঠিক প্রণোদনার বিনিময়ে পারমাণবিক অস্ত্রাগার পরিত্যাগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন কিম। এই প্রণোদনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে অর্থনৈতিক সাহায্য, শান্তিচুক্তি ও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অন্যান্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক একত্রীকরণ মন্ত্রী লি জং-সিওক বলেন, ‘চীনে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে তেমনটা চান তিনি। তিনি যেই উত্তর কোরিয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তা তার পিতার চেয়ে আলাদা।’ তবে তিনি এ-ও বলেন যে, ‘কিম জং উনের শাসনের পারমাণবিক দিকটিই এখন পর্যন্ত আমরা দেখতে পেয়েছি। অন্য দিকটা আমরা এড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগ করতে রাজি। তিনি যদি নিজের জনগণকে ৩ বেলা খাবার দিয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন, তাহলে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করতেন না।’
দক্ষিণ কোরিয়ার জ্যেষ্ঠ গবেষণা থিঙ্কট্যাঙ্ক সেজং ইন্সটিটিউটের জ্যেষ্ঠ উত্তর কোরিয়া বিশেষজ্ঞ চেওং সেওং চ্যাং বলেন, কিমের এই ঘোষণা তার জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নতির প্রত্যাশা বাড়াবে। তবে উত্তর কোরিয়া অনেকদিন ধরেই বলে আসছে, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো দরকষাকষি করা হবে না। কিম নিজেই এই অস্ত্রকে বলেছেন, ‘ন্যায়বিচারের অমূল্য তলোয়ার।’ তিনি আরও বলেন, এই পারমাণবিক অস্ত্র তার জনগণের অস্তিত্বের অধিকার রক্ষায় একটি শক্তিশালী অস্ত্র।
টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও কূটনীতি অনুষদের কোরিয়া বিশেষজ্ঞ লি সাং-উন বলেন, কিম জং উনের এই সিদ্ধান্ত স্রেফ একটি পুরনো উত্তর কোরিয়ান কৌশলের পুনরাবৃত্তি। নাটকীয় প্রতীকী ছাড়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে ছাড় আদায় করে নেয়ার কৌশল। তিনি বলেন, ‘ইতিহাস প্রহসনের মতো নিজের পুনরাবৃত্তি ঘটায়। কিম জং উনের কৌশল নতুন কিছু নয়।’
আমেরিকান কর্মকর্তারা বলেন, অতীতে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করার আলোচনায় উত্তর কোরিয়া বারবার তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ১৯৯৪ সালে এমন একটি চুক্তি ভেস্তে যায় যখন যুক্তরাষ্ট্র উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অভিযোগ তোলে। কীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মান স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে মতদ্বৈততার জেরে ২০০৫ সালেও আরেকটি চুক্তি ধসে পড়ে। ২০১২ সালে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সাময়িক স্থগিত করতে সম্মত হওয়ার পর উত্তর কোরিয়া দূরপাল্লার রকেট নিক্ষেপ করে!
কিম জং উনের সর্বশেষ ঘোষণার ব্যাপারে ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ফেডারেশন অব আমেরিকান সাইয়েন্টিস্টের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যাডাম মাউন্ট বলেন, ‘একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র অস্ত্রমুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে, এমনটা নয় কিন্তু। একে বরং স্রেফ অস্ত্রনিয়ন্ত্রণ চুক্তির প্রস্তাবের মতো মনে হয়েছে।’ কিম জং উনের বিবৃতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটি বেশ যত্নসহকারে তৈরি করা একটি বিবৃতি। এতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আংশিক স্থগিত করার কথা বলা হয়েছে। পুরোপুরি বাদ দেয়ার কথা বলা হয়নি। বিধিনিষেধের মধ্যেও উত্তর কোরিয়া নিজের সামর্থ্য অনেকখানি বৃদ্ধি করতে পারবে।’
তবে তিনি এ-ও বলেছেন যে, পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণাও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, প্রযুক্তিগত ও সামরিক মানের দিক থেকে, উত্তর কোরিয়া এখনও একটি অত্যাধুনিক পারমাণবিক অস্ত্রাগার নির্মাণ সম্পন্ন করতে পারেনি। ফলে কর্মসূচি পরিত্যাগের আলোচনার পাশাপাশি, তাদের অগ্রগতি থামিয়ে দেয়াটাই হবে বড় অগ্রগতি।
তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক যুক্তি দেখিয়েছেন যে, উত্তর কোরিয়ায় আরও বড় ধরণের মৌলিক এক পরিবর্তন হয়তো দেখা যাচ্ছে।
পারমাণবিক অস্ত্রের দিক থেকে কিম জং উন বিজয় অর্জনের ঘোষণা দিতে থাকেন নববর্ষের দিন দেয়া এক বক্তৃতার মাধ্যমে। তিনি ওই বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনই আর এই দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ উস্কে দেওয়ার সাহস করবে না। বিজয় অর্জনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই কূটনৈতিক পথে এগোতে শুরু করেন তিনি। কয়েকদিন আগে তিনি চীনের নেতা শি জিনপিং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ওই সাক্ষাতের পরই দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে উত্তর কোরিয়া।
শেষ পর্যন্ত কিম কী করবেন, তা অনিশ্চিত। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, দেশকে পঙ্গু করে দেয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে অধীর হয়ে আছেন কিম। তিনি চেষ্টা করবেন পারমাণবিক কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার বিনিময়ে বড় ছাড় আদায় করতে। তবে অন্যরা বলছেন, কিম আত্মবিশ্বাসী যে, পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনে নতুন ট্রাম্প কার্ড রয়েছে তার হাতে।
কিম যদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে গুরুতরভাবে মাথা ঘামান, তাহলে তার বিশ্বের সাহায্য প্রয়োজন হবেই। বিশ্লেষকরা এক্ষেত্রে আশির দশকে চীনের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা দেং শিয়াওপিং-এর উদাহরণ টেনে আনছেন। পশ্চিমের সঙ্গে তখন লেনদেন চালু করার ফলেই এই কয়েক বছরে চীনের অবিশ্বাস্য উত্থান ঘটেছে।
চেওং বলেন, ‘কিম জং উন আদৌ উত্তর কোরিয়ার দেং শিয়াওপিং হতে পারবেন কিনা, তা নির্ভর করে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া সহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দেশটিকে পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগের বিনিময়ে কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ প্রদান করে, তার ওপর।’

চ্যালেঞ্জ নিয়েই সিলেটের রাজপথে সার্জেন্ট হৈমন্তী by ওয়েছ খছরু

বিশ্বকবি রবি ঠাকুরের অনন্য সৃষ্টি ‘হৈমন্তী’ চরিত্রটি। এই চরিত্রের নানা উপমা এখনো সমাজের মানুষের কাছে আলোচিত হচ্ছে। সেই হৈমন্তী হয়তো যুগেরতালে পরিবর্তিত হয়েছে। এখনকার হৈমন্তীরা সমাজ বিনির্মাণের কারিগর  হয়ে উঠেছেন। প্রতিবাদী পেশায়ও নেমেছেন হৈমন্তীরা। তেমনি এক ‘হৈমন্তী’ সিলেটে প্রথমবারের মতো নেমেছেন রাস্তায়। সিলেটের রাস্তায় গুরুত্বপূর্ণ পেশা ট্রাফিক সার্জেন্ট হয়ে প্রথম বারের মতো কাজ শুরু করেছেন হৈমন্তী সরকার। গতকাল সিলেটে হৈমন্তীর সিলেটের প্রথম কার্যদিবস। নগরীর নাইওরপুল পয়েন্ট। সঙ্গে কয়েকজন নারী ট্রাফিক কনস্টেবল। মূল দায়িত্বে হৈমন্তী সরকার। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নাইওরপুল। সবসময় ঝামেলা লেগেই থাকে। পুরুষ ট্রাফিক সার্জেন্টও হাঁপিয়ে উঠে ওই এলাকায়। সেখানে দায়িত্ব পালন শুরু করেন হৈমন্তী। একেক করে গাড়ি যাচ্ছে আর দাঁড়িয়ে দেখছেন হৈমন্তী। হাত নেড়ে ইশারায় গাড়ি থামাচ্ছেন আর ছেড়ে দিচ্ছেন। দৃশ্য তো অবাক করার মতো। সিলেটের রাস্তায় এভাবে কোনো নারী সার্জেন্টকে অতীতে দেখা যায়নি। এই শহর সিলেটে এতদিন যারাই দায়িত্ব পালন করছেন তারা পুরুষ। বেশ স্মার্ট নারী হৈমন্তীকে দেখেই চমকে ওঠেন চালকেরা। এ দৃশ্য তো সিলেটে অতীতে দেখা যায়নি। ট্রাফিক কন্ট্রোলও পরিচালিত হচ্ছে স্মার্টভাবে।
এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করেন সার্জেন্ট হৈমন্তী সরকার। সঙ্গে থাকা নারী কনস্টেবলরা দক্ষভাবে সেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এমন সময় নাইওরপুল এলাকা দিয়ে পাড়ি দিচ্ছিল এক সিএনজি অটোরিকশা। এমন সময় হাত দিয়ে সিএনজি অটোরিকশা থামালেন হৈমন্তী সরকার। কাগজ দেখতে চাইলেন। সিএনজিচালক নানা ভাবে তাকে ম্যানেজের চেষ্টা চালালেন। বললেন- ‘আমরা রাস্তায় চলি। কোনো অসুবিধা হয় না।’ নাছোড়বান্দা হৈমন্তী সরকার। কোনো কথাই শুনছেন না। কাগজ দেখাতে আবারো চালককে নির্দেশ দিলেন। চালক মোবাইল ফোনে কথা বললেন কারো সঙ্গে। এ সময় চালক হৈমন্তীর দিকে মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন- ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। একটু কথা বলুন।’ সম্মান জানালেন হৈমন্তী। কথা বললেন। এরপর মোবাইল ছেড়ে দিলেন। চালকের কাছে আবারো চাইলেন কাগজ। চালক কাগজ দেখালেন।  দেখলেন সার্জেন্ট হৈমন্তী সরকার। কাগজে সমস্যা আছে। একটি মামলা দিয়ে বললেন- ‘কাগজ ঠিক করতে হবে।’  হৈমন্তী থামছেন না। এবার থামালেন প্রাইভেট কার। একটি নয়, একাধিক কার। কাগজ চেক করলেন। খুব ছোটখাটো ভুল হলে সতর্ক করে দিলেন। আর যাদের কাগজে গরমিল বেশি তাদের মামলা দিয়ে দিলেন।
এভাবে গতকাল দুপুরের পর পর্যন্ত নাইওরপুল পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করলেন সার্জেন্ট হৈমন্তী সরকার। চালকদের সামলাতে হয়েছে তার। কেউ কেউ নিজের ক্ষমতা দেখাতে এখানে-ওখানে ফোন করলেন। কিন্তু আইন থেকে একটু নড়লেন না হৈমন্তী সরকার। নিজের দায়িত্ব পালনে তিনি অবিচল থাকলেন। সিলেটের রাজপথে নারী সার্জেন্ট। বিষয়টি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেল পরিবহন সেক্টরের মানুষের কাছে। সাংবাদিকরাও জানলেন বিষয়টি। তারাও ছুটে গেলেন নাইওরপুল পয়েন্টে। সেখানে তারা নারী সার্জেন্ট হৈমন্তীর দায়িত্ব পালনের দৃশ্য নিচ চোখে দেখলেন। কোথাও ভ্রুক্ষেপ নেই হৈমন্তীর। কাজের প্রতি অবিচল থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করে চললেন অবিরাম। দিনশেষে হৈমন্তী ১০টি যানকে মামলা করলেন। জরিমানাও করলেন কাউকে কাউকে। সিলেট মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন ইনচার্জ আবু বকর শাওন হৈমন্তীর দায়িত্ব পালন সম্পর্কে জানালেন- এসএমপি’র কমিশনার মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া ও উপ- কমিশনার (ট্রাফিক) তোফায়েল আহমেদ এসএমপি’র ট্রাফিক বিভাগে নারী সদস্য যুক্ত করার বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। এ চ্যালেঞ্জ সফল হলে ভবিষ্যতে সিলেটের পথে আরো নারী সদস্যদের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে দেখা যাবে। ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি থামানোর কাজটি চ্যালেঞ্জের মনে করলেও নিজের এ দায়িত্ব নিয়ে বেশ রোমাঞ্চিতই মনে হলো হৈমন্তী সরকারকে। সিলেটের রাজপথে প্রথমবারের মতো দায়িত্ব পালন করা নারী সার্জেন্ট হৈমন্তী সরকার জানালেন- ‘পুলিশের পেশাটাই তো চ্যালেঞ্জিং পেশা, তার মাঝে ট্রাফিক সামলানোর দায়িত্বটা আরো চ্যালেঞ্জের। তবে এ চ্যালেঞ্জটাকেই জয় করতে চাই।’  হৈমন্তী সরকার সিলেট মেট্রোপুলিশের ট্রাফিক বিভাগে যোগ দেন এক বছর আগে। মাঝে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন। সে ছুটি শেষে গত ২৪শে ফেব্রুয়ারি কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেন। হৈমন্তী সরকার নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার সাফল্য সরকার ও অনীতা সরকারের মেয়ে। তার স্বামী যীশু দেবনাথ পেশায় একজন ব্যাংকার।
বাংলাদেশ পুলিশের ট্রাফিক বিভাগে ২০১৫ সালে ২৯ জন নারীকে সার্জেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়। রাজপথে প্রথম নারী পুলিশ সার্জেন্ট বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ মনে করে পুলিশ বিভাগ ওই সব নারী সার্জেন্টদের নিয়োগ প্রদান করে। এরপর প্রাথমিকভাবে নিয়োগকৃত ২৯ জনের মধ্যে ২২ জনকে ঢাকা মহানগরের রাজপথে দায়িত্ব পালনে নামায়। তারা বেশ দক্ষতার সঙ্গে ঢাকার রাজপথে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি সময়ে ওই ২২ জনের মধ্যে তিনজনকে চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল পাঠানো হয়। নেত্রকোনায় বাড়ি হৈমন্তীর স্বামী সিলেটের একজন ব্যাংকার। এ কারণে হৈমন্তী তার পছন্দের শহর সিলেটে এসেছেন। এখন থেকে সিলেটের রাজপথে চ্যালেঞ্জিং পেশায় থাকবেন তিনি। গতকাল দায়িত্ব পালনের প্রথম দিনই হৈমন্তী সরকার সবার সহযোগিতা চাইলেন। বললেন- ‘সবাই আইন মেনে চললে একদিন এই দেশ পাল্টে যাবে। আমরা যেন হই পাল্টে যাওয়া সময়ের সহযাত্রী।’

বিচার কত দূর? by শুভ্র দেব

৫ বছর আগে আজকের এই দিনে সকালবেলায় ঘটে যায় মর্মান্তিক ও ভয়াবহ এক দুর্ঘটনা। সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে রানা প্লাজা নামের একটি ৮ তলা ভবন ধসে পড়ে। ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিল পোশাক খাতে কর্মরত ১ হাজার   ১৩৬ জন শ্রমিক। আহত হোন আরো ১ হাজার ১৬৯ জন। কিন্তু যাদের কারণে এত প্রাণ ঝরে গেল, অগণিত মানুষ পঙ্গু হলো তাদের  বিচার এখনো শুরুই হয়নি। খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হত্যা ও ইমারত আইনের মামলায় অভিযোগ গঠন হলেও এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য গ্রহণই শুরু হয়নি। আরো জানা গেছে, মামলার অনেক সাক্ষীই বর্তমান ঠিকানা ছেড়ে চলে গেছেন অন্যত্র। আর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করতে না পারায় ওই ঘটনায় নিহতদের স্বজন ও বেঁচে যাওয়া শ্রমিকরা হতাশ। ভয়াবহ ওই ঘটনার ৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও বিচার শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের প্রশ্ন কবে এই মামলার বিচারকাজ শেষ হবে?
বিশ্ব বিবেককে নাড়া দেয়া ওই ঘটনার পরপরই অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে পুলিশের মামলা, রাজউকের করা ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের মামলা এবং নিহত একজন পোশাক শ্রমিকের দায়ের করা খুনের মামলা, দুর্নীতির মাধ্যমে রানা প্লাজা নির্মাণের মামলাসহ মোট ১৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এদিকে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে দুদকের একটি মামলার রায় হয়েছে গত বছর।  দুদকের নোটিশ অনুযায়ী সম্পত্তির হিসাব বিবরণী জমা না দেয়া সংক্রান্ত একটি মামলায় গত বছরের ২৯শে আগস্ট সোহেল রানাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫৯ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের দুই মামলায় ২০১৫ সালের ১লা জুন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। পরে ২০১৬ সালের ১৮ই জুলাই অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর নির্দেশ দেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান।
হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে সোহেল রানা, তার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে কুলু খালেক, মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, স্থানীয় কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খান, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, ধসে পড়া ওই ভবনের তিনটি গার্মেন্ট কারখানার মালিক, সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. সারোয়ার কামালসহ ৪১ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৫৯৪ জনকে। যে ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে দুজন মারা গেছেন। সাতজন এখনো পলাতক। আর সোহেল রানা ছাড়া আর কেউ জেলে নেই। বাকি সবাই জামিনে আছেন। অভিযুক্ত ৪১ জনের মধ্যে ৩৮ জনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। অন্যদিকে ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় বিধি না মেনে রানা প্লাজা ভবন নির্মাণের অভিযোগে ১৮ আসামির বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের ইমারত নির্মাণ আইনের ১২ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। এই মামলায় ১৩৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
রানা, তার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে কুলু খালেক, মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, রানা প্লাজার নিউওয়েব বাটন লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইথার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. সারোয়ার কামালসহ হত্যা মামলার ১৭ জনকে এই মামলায়ও আসামি করা হয়েছে। মাহবুবুল আলম নামক একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে ইমারত নির্মাণ মামলায় আসামি করা হলেও হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি। ফলে, দুই মামলা মিলিয়ে মোট আসামি ৪২ জন।
রানা প্লাজার ঘটনায় করা হত্যা মামলায় দীর্ঘ দিনেও কেন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়নি- এমন প্রশ্নে এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী খোন্দকার আব্দুল মান্নান বলেন, হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে আমরা সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করতে পারি নাই। আসামি পক্ষের ৮ জনের আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট থেকে ৬ মাস করে দুই বার স্থগিতাদেশ এসেছিল। ইতিমধ্যে স্থগিতাদেশ শেষ হয়েছে। আর  ১ জনের স্থগিতাদেশ আগামী ১২ই মে শেষ হবে। আব্দুল মান্নান বলেন, আমরা  আশা করছি আইনি আর কোনো জটিলতা না থাকলে আগামী ১৬ই মে থেকে হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরু করতে পারবো।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ইমারত নির্মাণের আইনের মামলাটি চলছে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে। এই মামলায় ২০১৬ সালের ১৪ই জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ওই বছরের ২৩শে আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. মোস্তাফিজুর রহমান। কিন্তু অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রানা প্লাজা ভবনের নিউওয়েব বাটন লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস.. সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইথার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামানের করা একটি আবেদন জেলা ও দায়রা আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। যে কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আনোয়ারুল কবির মানবজমিনকে বলেন, ইতিমধ্যে হাইকোর্টে করা ৮ জনের আবেদনের মধ্যে ৭ জনের আবেদন  আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। শুধু আনিসুর রহমান নামে একজনের করা আবেদনের শুনানি আগামী ৭ই মে দেওলিয়া আদালতে হবে। তিনি বলেন, আশা করি আমরা দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করতে পারবো।

আমেরিকা ও সৌদির স্বার্থ রাখতে গিয়ে মরেছে পাকিস্তান: হিনা রব্বানি

২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন হিনা রব্বানি খার
পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানি খার বলেছেন, বিশ্বের কিছু দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে দেশটির অপূরণীয় ক্ষতি করছে।
তিনি রোববার এক সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের আফগানিস্তান নীতির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, বিশ্বের প্রতিটি দেশ নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে; কিন্তু পাকিস্তান অনেক সময় আমেরিকা ও সৌদি আরবের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজের মারাত্মক ক্ষতি করে বসে।
হিনা রব্বানি খার বলেন, প্রতিটি দেশ নিজের ভৌগলিক অবস্থানকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার কাজে ব্যবহার করলেও ইসলামাবাদ সব সময় ওয়াশিংটন ও রিয়াদের স্বার্থ করার কাজে এই অবস্থানকে ব্যবহার করেছে।
পাকিস্তানের এই কূটনীতিক ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
পাকিস্তান সরকার যখন ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৌদি আরবের কথিত সামরিক জোটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তখন হিনা রব্বানি খার এ মন্তব্য করলেন।
পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক এক্সপ্রেস ট্রিবিউন সম্প্রতি খবর দিয়েছে, পাকিস্তান সরকার সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সেনাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। ইয়েমেনের জনগণকে হত্যার লক্ষ্যে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট গঠনের পরিণতি আফগান যুদ্ধের চেয়ে খারাপ হবে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন কথিত সামরিক জোটের ভয়াবহ বিমান হামলা (ফাইল ছবি)

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি: ওদের এখনো দুর্বিষহ জীবন by এমএম মাসুদ ও হাফিজ উদ্দিন

ঢাকার অদূরে সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে ভয়াবহ রানা প্লাজা ভবন ধসের ৫ বছর পূর্তি হলো আজ। ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিলের ওই দুর্ঘটনায় মারা যায় ১১৩৬ জন। তবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া আহত অনেক শ্রমিকই আগের চেয়েও দুঃসহ জীবনযাপন করছেন। চিকিৎসার পেছনে পাওয়া ক্ষতিপূরণের সমস্ত টাকাই খরচ হয়ে গেছে । এছাড়া দুর্ঘটনার পর এখনো অনেকেই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক কারণে তাদের অর্ধেকই বেকার জীবনযাপন করছেন। গতকাল সাভার এলাকার আশেপাশের বেশ কয়েক জন আহত শ্রমিকের সঙ্গে কথা বললে তারা এসব তথ্য জানান।
আহতরা বলেছেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারি কিছু অনুদান পেলেও এর সিংহভাগই চলে গেছে চিকিৎসা ব্যয়ে। এর মধ্যে অনুদান পেয়ে কেউ কেউ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও জীবনের কঠিন বাস্তবতায় তারা হেরে যাওয়ার পথে। আগামীর দিনগুলো কীভাবে কাটবে, কীভাবে সংসার চলবে, চিকিৎসার ব্যয় কোথা থেকে আসবে, এসব চিন্তা আর মানসিক যন্ত্রণায় প্রতিনিয়ত তাড়া করছে তাদের। এছাড়া গত ৫ বছরে এখনো আহতরা পায়নি প্রয়োজনীয় আর্থিক ক্ষতিপূরণ। ফলে অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিতে না পারায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না তারা।
ভবন ধসের পর কনক্রিটের বিমের নিচে আটকা পরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন নিলুফা বেগম। কিন্তু হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হলেও বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি। এখন অবশ্য ওই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেই ভালো হতো বলে মনে করেন তিনি। কিন্তু পাঁচ বছর পেরোনোর পর যখন সংসার টানতে গলদঘর্ম হতে হচ্ছে, তখন নিলুফার মধ্যে প্রায় মনের মধ্যে উঁকি দেয় ভয়াবহতম ওই দুর্ঘটনা থেকে কেনো বেঁচে ফিরলেন এমন প্রশ্ন।
৩৮ বছর বয়সী নিলুফার জানালেন তার করুণ কাহিনী। বললেন, উপার্জন করে আমিই আমার পরিবারে সহযোগিতা করেছি। কিন্তু এখন আমার হাতে নিয়মিত কাজ নেই। রানা প্লাজার ঘটনার পর যা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলাম তার প্রায় বেশিরভাগই আমার চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে। দুর্ঘটনার পর আগের মতো কাজ করতে পারি না। তাই তার আয় নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে মনে হয় কেন বেঁচে গেলাম!
রানা প্লাজা ভবনের আটতলায় প্যান্টন এ্যাপারেলস লি.-এ সুইং অপারেটর হিসেবে সাড়ে পাঁচ বছর কাজ করেছেন তিনি। তার ও স্বামীর আয়ে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু ঘটনার দিন থেকে তার স্বপ্নগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। ভেঙে যায় স্বপ্নের দুনিয়া। ঘটনার আগের দিন জানতে পারেন ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। এ কারণে কাজে যেতে চাননি তিনি। কিন্তু সুপারভাইজারের ফোন আর বেতনের হুমকি সহ্য করতে না পেরে কাজে যেতে বাধ্য হন। সেই যাওয়াই যে তার পুরো জীবন নদীর স্রোতকে উজানে বইবে দেবে-তা কে জানতো? আহত হওয়ার পর থেকে একমাত্র ছেলে এবং স্বামীর সঙ্গে সাভার পৌর এলাকার পশ্চিম রাজাশন মহল্লার আয়াত আলী মার্কেটে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন তিনি।
দুর্ঘটনার সময় তার পায়ের উপরে একটি বিম পড়ে যায়। সেই বিমের আঘাতে ডান পা ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। সাড়ে নয় ঘণ্টা পর নিলুফাকে উদ্ধার করে নেয়া হয়েছিল এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ন্যাশনাল মেডিকেল, বারডেম, মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হয়। এরই মাঝে গত ৫ বছরে তিনি পায়ের চিকিৎসায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ, উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল, হেলটন হাসপাতাল, গণস্বাস্থ্য ও সিআরপিতে ছুটেছেন। কিন্তু সুস্থ হয়ে ওঠেনি সেই পা। হাঁটতে পারেন না। প্রতিদিন ব্যথা ওঠে পায়ের আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাগুলোতে। বর্তমানে সেই পায়ে পচন ধরার উপক্রম। চিকিৎসকরা সেই পা কেটে ফেলার পরামর্শ দিয়েছেন নিলুফারকে। কিন্তু টাকার কারণে সেটিও করতে পারছেন না আহত এই নারী। পা ছাড়া অচল এই মানুষটি এখন প্রতিনিয়ত স্ক্র্যাচে করে হাঁটাচলা করেন। তাও বড় কষ্টের আর যন্ত্রণার। নিলুফার সঙ্গে কথা বলার সময় অঝোরে চোখের পানি ঝরছিল তার।
বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিইবা লাভ এসব কথা কইয়া?’ বলেই থেমে গেলেন। এরপর বললেন, ‘চলতি মাসের ১৫ দিন থাইক্যা কিডনির সমস্যায় ভুগতাছি। পা-টাও ব্যথা করে। গত ৫ বছর ধইরা জেলখানায় আটকাইয়া আছি। এর চাইতে আমার মরণই ভালা আছিল। চোখের পানি ঝরছে আর কথাগুলো আনমনে বলেই যাচ্ছেন নিলুফা।
কত টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, এর জবাবে নিলুফা বলেন, দুর্ঘটনার পর সরকার ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ৩ লাখ ৩০ টাকা পাই। এখান থেকে ৭৬ হাজার টাকা দিয়ে স্বামী শহীদুল ইসলামকে সংসার চালানোর জন্য দোকান ধরিয়ে দেই। বছর চার না ঘুরতেই সেই দোকানের মালামাল এখন শূন্য হয়ে পড়েছে। শুধু চা আর বিস্কুট বিক্রি করে যা  আসে তাতেই নিলুফার সংসারে তার মা, স্বামী ও একমাত্র সন্তানের দু’মুঠো ভাত জোটানো কষ্টের হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন মাধ্যমে পাওনা টাকার সবটাই হারিয়ে এখন নিঃস্ব নিলুফা।
দুই বছর আগে বিজিএমইএতে তার স্বামী শহীদুল ইসলাম ক্ষতিপূরণের টাকার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন। তখন বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল সামনের বছরের এপ্রিলে প্রত্যেক আহত শ্রমিকের জন্য বরাদ্দকৃত সাড়ে আট লাখ টাকা দেয়া হবে। কিন্তু সেই এপ্রিল আর নিলুফার জীবনে ফিরে আসেনি।
তার স্বামী শহীদুল ইসলাম জানালেন, দুর্ঘটনার আগে নিলুফা প্রতি মাসে কাজ করে পেতেন আট থেকে দশ হাজার টাকা। এ নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। এখন তাদের সংসারে দৈনিক ১০০ টাকা আসা মানেই অনেক। গেল পাঁচ বছরে নিলুফার চিকিৎসায় প্রায় চার লাখ টাকার উপরে ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি নিলুফা তার বাবার বাড়ির জমি বন্ধক রেখে ৫৫ হাজার টাকা নিয়ে এসেছিলেন। তাও চিকিৎসার ব্যয়ে খরচ করেছেন। এছাড়া গত দুই বছরে সংসার ও তার চিকিৎসার খরচ চালাতে দুই লাখ টাকার মতো ঋণ করেছেন তার স্বামী। এরপরও সেই আঘাতপ্রাপ্ত পা ভালো হয়নি বলে জানালেন তার স্বামী শহীদুল।
নিলুফার স্বামী শহীদুল বলেন, রানা প্লাজার পর অচল হইয়া গেছি, আমার এখনকার অবস্থা ভিক্ষা করার মতো। নিলুফা তো সাড়ে তিন লাখ টাকা পেয়েছিলেন। নিলুফার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলার সিংড়ায়। একমাত্র ছেলে (১১)কে পড়ালেখা করাইতে পারছি না। সবাই স্কুল ড্রেস বানিয়ে দিয়েছে, আমি এখনো ছেলের স্কুল ড্রেস দিতে পারিনি। মাস্টাররা বকাঝকা করে। মাঝে মধ্যে পোশাকের জন্য ছেলের স্কুলে লজ্জা পেতে হয়। নিলুফা বলেন, ক্ষতিপূরণের জন্য উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সাংসদের কার্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে গেছি। কোথাও কোনো সহযোগিতা পাইনি। হাত-পা থাকতেও আহত অনেকে ১০-২০ লাখ টাকা পাইছে। আমি শুধু বিকাশ এবং প্রধানমন্ত্রীর দেয়া এক লাখ টাকার চেকসহ তিন লাখ ত্রিশ হাজার টাকা পেয়েছি। এরই মধ্যে যা টাকা পেয়েছি তারচেয়ে অনেক বেশি চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়েছে। বাকি টাকা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ করেছি। প্রতিমাসে প্রায় দুই হাজার টাকা দোকান ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু দোকানে কোনো মালামাল না থাকায় বেচাকেনাও নেই।
আপনাদের কাছে আমার একটাই দাবি, আমি যেন একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বাঁচতে পারি। তা না হলে আমি পরিবারসহ বিষ খেয়ে মরে যাবো। মাসের ২০ তারিখ চলে গেছে এখনো ঘর ভাড়া দিতে পারিনি। গত মাসে দশ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি। কিন্তু এখন আমার কাছে এক টাকাও নেই। ওষুধ কিনে টাকা শেষ। আরেক হতভাগা শ্রমিক হালিমা বেগম। রানা প্লাজার আটতলায় থাকা নিউ ওয়েব স্টাইল লিমিটেড কারখানায় অপারেটর পদে কাজ করতেন। ভবন ধসের ঘটনায় নাকের হাড়, ডান পা ও মাথাসহ শরীরের নানা স্থানে আঘাত পান। ভবন ধসের পর তিনি যে পরিমাণ টাকা অনুদান পেয়েছেন তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা চিকিৎসার জন্য ব্যয় করেছেন তিনি। তাই তিনি আর কারো কোনো আশ্বাস শুনতে চান না। তার প্রাপ্য ক্ষতিপূরণটুকু পেলেই তিনি খুশি। পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র সিআরপির সহায়তায় একটি দোকান দিয়ে কোনো রকমে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন এই নারী।
শ্রমিক জুয়েল শেখ রানা প্লাজার ৪র্থ তলার প্যান্টম এ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানায় কাজ করতেন। বিয়ের পর গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর থানার ইদিলপুর গ্রাম ছেড়ে জীবিকার তাগিদে পরিবার নিয়ে কাজের সন্ধানে আসেন সাভারে। অনেক ঘুরে-ফিরে ফিনিশিং আয়রনম্যান হিসেবে কাজ জুটিয়ে নেন রানা প্লাজায়। ভবন ধসের প্রায় ২৮ ঘণ্টা পর উদ্ধার হন তিনি। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা নেন। এছাড়া সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি’র) সহায়তায় একটি মুদি দোকান করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন তিনি। দুই মেয়ে মনিরা (৯), জান্নাত (৫) ও স্ত্রীকে নিয়ে সাভারের চাপাইন এলাকায় একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন। দোকানের নাম দিয়েছেন জান্নাত-মনিরা স্টোর। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় পুঁজি থেকে ঘাটতি যাচ্ছে তার। এছাড়া পায়ে সমস্যার কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারেন না জুয়েল শেখ। স্ক্র্যাচ দিয়ে হাঁটতে গেলেও পায়ের রগে টান লাগে। রাতে ঘুমের মধ্যেও আতঙ্কিত হয়ে জেগে উঠেন তিনি। এছাড়া বড় কোনো শব্দ হলেও ভয় পান। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সহায়তা প্রদানসহ তিনি সরকারের কাছে উপযুক্ত চিকিৎসা সেবাও দাবি করেছেন পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকা জুয়েল শেখ।
ফ্যান্টম এ্যাপারেলস কারখানার আহত শ্রমিক মিনু আক্তার। ভবন ধসের তিন দিন পর তিনি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার হন। ভবন ধসের সময় কানের পর্দা ফেটে যাওয়াসহ মাথা ও শরীরের বিভিন্নস্থানে মারাত্মক আঘাত পান তিনি। সামান্য নাম মাত্র সহায়তা পেলেও উন্নত চিকিৎসা সেবা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পাননি তিনি। ধসের ৫ বছর পরও মিনু অন্য অনেক শ্রমিকের মতো সঠিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানিয়েছেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, দেশে অনেক সময়ই অনেক অপরাধের বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করা হয়। যেমন সিলেটের শিশু রাজন হত্যা মালার বিচারকাজ দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে করা হলো। অথচ রানা প্লাজা ধসে নিহত ও আহতের ঘটনায় জড়িত দায়ীদের বিচারকাজ বিশেষ ট্রাইবুনালে না হওয়াটা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন এই শ্রমিক নেতা। শ্রমিকদের এখন একটাই প্রাণের দাবি আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ সরকার বা বিজেএমইএ’র পক্ষ থেকে যেন তাদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। সেই সঙ্গে ভবন ধসের ঘটনায় প্রধান আসামি সোহেল রানাসহ সকল দোষীকে অবিলম্বে শাস্তির আওতায় আনা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে ধসে পড়ে ৯ তলাবিশিষ্ট বহুতল ভবন রানা প্লাজা। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ভবন দুমড়ে মুচড়ে একত্রিত হয়ে যায়। ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায় পুরো আকাশ। প্রথমে চারদিকে ছুটোছুটি তার কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় লাশের মিছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান তৈরি পোশাক শ্রমিকসহ ১১৩৬ জন লোক। আর আহত হন আরো অন্তত ২ হাজার ৪৩৮ জন হতভাগা শ্রমিক।
এদিকে গত শনিবার রানা প্লাজা ধসের ৫ বছর উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত শ্রমিকদের জন্য গঠিত তহবিলে অর্থ থাকলেও কোনো শ্রমিক তা নিতে আসছে না। ক্ষতিগ্রস্ত কোনো শ্রমিক বলতে পারবে না যে, তারা ক্ষতিপূরণ পায়নি। দুর্ঘটনায় রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছিল। এ ফান্ড থেকে ২৪০ কোটি টাকা ওই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের দেয়া হয়েছে। এখনো টাকা রয়েছে কিন্তু কেউ নিতে আসে না।
এদিকে গত মঙ্গলবার একশনএইড বাংলাদেশ এক প্রতিবেদনে বলেছে, পাঁচ বছর আগে রানা প্লাজা ধসের পর প্রাণে বেঁচে গেলেও এখনো কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারেননি আহত হওয়া অর্ধেক শ্রমিক। তারা বলছে, আহত শ্রমিকদের ৪৮.৭ শতাংশ এখনো কোনো কাজ করতে পারছেন না। ১২ শতাংশের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। ২২ শতাংশ শ্রমিক এখনো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। অন্যদিকে ২১.৬ শতাংশ শ্রমিক আবারো পোশাক কারখানায় কাজে যুক্ত হতে পেরেছেন বলে একশনএইডের গবেষণায় উঠে এসেছে।

হাত হারিয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে সুমি

এভাবে ট্রাকের নিচে চলে যাবে কোলের শিশু ভাবতেও পারেনি মা। রোববার দুপুর দেড়টায় জেলার শেরপুর উপজেলার শেরুয়া বাজার থেকে মহাসড়ক ধরে হেঁটে বাড়িতে যাচ্ছিলেন মরিয়ম বেগম। মায়ের হাতে হাত রেখেই পাশাপাশি হাঁটছিল কন্যা সুমি। কিছু দূর গিয়ে মহাসড়ক ক্রস করে অন্য রাস্তায় যেতে হবে তাদের। মা মরিয়ম কন্যাকে কোলে তুলে নেয়। রাস্তার মাঝখানে গিয়ে পড়ে থাকা একটি পাথরের সঙ্গে হোঁচট লেগে দু’জনেই পড়ে যায়। পিছন থেকে দ্রুতগতিতে আসা একটি ট্রাক রাস্তায় পড়ে যাওয়া সুমির বাম হাতের উপর দিয়ে চলে যায়। ঘটনাস্থলেই বাম হাত ছিঁড়ে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। হতবাক হয়ে যায় মা। কন্যার এই অবস্থায় কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। স্থানীয়রা ঘটনাস্থল থেকে সুমিকে উদ্ধার করে প্রথমে ওই এলাকার দুবলাগাড়ী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে চিকিসৎকরা তার প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। কিন্তু তার অবস্থা বেশি খারাপ হওয়ায় বিকাল ৪টার দিকে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শজিমেক) স্থানাস্তর করা হয়। সেখানে রোববার সন্ধ্যায় সুমির অপারেশন করা হয়।
গতকাল বেলা ১১টায় সরজমিন হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় সুমি এখন হাসপাতালের বিছানায় তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তার হাতের ক্ষতস্থান দিয়ে এখনো রক্ত ঝরছে। যদিও ডাক্তাররা বলেছেন ৭২ ঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত জোড়ালোভাবে কিছু বলা যাবে না। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, এরকম রোগীর ক্ষেত্রে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ইনফেকশন হতে পারে। যদি ওই সময় পর্যন্ত কোনো সমস্যা দেখা না দেয় তাহলে অন্যকোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। 
এদিকে সুমির পরিবার সুমিকে নিয়ে চরম দুঃশ্চিন্তায় আছে। সুমির বাবা দুলাল মিয়া শেরপুরের একটি দোকানের কর্মচারী। মা মরিয়ম বেগম বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। তিন সন্তানের মধ্যে সুমি সবার ছোট। বাড়ি শেরপুরের শাহবন্দেগী ইউনিয়নের ফুলতলা দক্ষিণপাড়া এলাকায়। স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে পড়ে সুমি। সুমির বয়স মাত্র আট বছর। এই বয়সেই তার এতো বড় ক্ষতি হবে ভাবতেই পারছেন না মা মরিয়ম বেগম। মেয়ের এই অবস্থায় অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়েছেন তিনি। তেমন কোনো কথাও বলছেন না। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ঝরাচ্ছেন তিনি।  
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নির্মলেন্দু চৌধুরী জানান, শিশুটির অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। মাথার আঘাত গুরুতর। একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আরেক হাতের আঙ্গুল ভেঙে গেছে। এখানে ভর্তি করার সময় শিশুটির জ্ঞান ছিল না। বর্তমানে তার জ্ঞান ফিরেছে। তিনি আরো জানান, ক্ষত স্থানগুলো ড্রেসিং করে দেয়া হচ্ছে। তবে, ৭২ ঘণ্টা পার না হলে কিছুই বলা যাবে না।
বগুড়ার স্থানীয় সাংবাদিক আ. ওয়াহেদ ফকির রোববার হাসপাতালে আনার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে গিয়েছিলেন। সুমিকে ভর্তি করতে সার্বিক সহযোগিতাও করেছেন তিনি। গতকাল সকালে আবারো তিনি সুমিকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছেন। তিনি বলেন, সুমির পরিবার একান্তই গরিব। চিকিৎসা ফ্রিতে হলেও আনুষঙ্গিক খরচের টাকাও মায়ের কাছে নেই। ফলে একদিকে মেয়ের চিন্তা অপরদিকে অর্থের চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সুমির মা মরিয়ম বেগম।
শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ডা. রেজাউল আলম জুয়েল জানান, সুমির অবস্থা এখন আগের চেয়ে একটু ভালো। ওর জন্য হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত কিচিৎসা সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে।

সেনাবাহিনী ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়

বাংলাদেশে এখন যেকোনো নির্বাচনই সেনাবাহিনী ছাড়া সুষ্ঠুভাবে করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় নির্বাচন কিংবা জাতীয় নির্বাচন যেটাই হোক। আসন্ন খুলনা ও গাজীপুর সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, সেজন্য যা যা করণীয় তাই তাদের করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুজন সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ওপর নাগরিক ভাবনা বিষয়ক ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’ আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, গাজীপুর ও খুলনা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত করার ব্যাপারে আমাদের এখানে বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে আমরা আহ্বান জানাই যে করেই হোক জনগণের মাঝ থেকে ভোটভীতি দূর করতে হবে। একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য যা-ই দরকার হবে তাদের তা-ই করতে হবে। আলোচনায় অংশ নিয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজনের নির্বাহী সদস্য অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, নির্বাচনকালীন প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন। এ সময় তিনি সুজনের পক্ষ থেকে ১২টি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
সেসব প্রস্তাবনায় বলা  হয়, যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে না তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কাছে লিখিতভাবে প্রতিবেদন এবং যারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবে তাদের জন্য প্রশংসাপত্র থাকা উচিত। যা তাদের নিজ নিজ চাকরির ব্যক্তিগত নথিপত্রে সংরক্ষিত থাকবে এবং ভবিষ্যতে পদোন্নতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
সুজনের পক্ষ থেকে আরো উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে নানা কারণে নির্বাচনের প্রতি জনগণের গণ-উদাসীনতা দেখা দিয়েছে, গণ-উদাসীনতার কারণগুলো ব্যাপক এবং বিস্তৃত। যেমন, একতরফা ও জবরদস্তিমূলক ভোট ছিনতাই, সংস্কৃতি, উপযুক্ত প্রার্থীর অভাব, নির্বাচনের পর নির্বাচিতদের গণবিচ্ছিন্নতা, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি ইত্যাদি। গণ-উদাসীনতা সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথে একটি বড় বাধা। জনগণকে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার যতরকম উপায় আছে তা নিতে হবে। ব্যাপকভাবে জনগণ ভোটকেন্দ্রে এসে ভোটের গণজোয়ার সৃষ্টি করলে প্রশাসন বা যারা সূক্ষ্ম বা স্থূল কারচুপি ফাঁদ পাতে তাদের সেই ফাঁদ পাতার কৌশল বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন সমাপ্তির অন্তত এক সপ্তাহ পর্যন্ত  নির্বাচন সংক্রান্ত নানা ধরনের অভিযোগ গ্রহণ এবং তা প্রতিকারের একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি করা উচিত। নির্বাচনী ব্যয় পর্যবেক্ষণের একটি সুষ্ঠু পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। মনোনয়ন ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বাণিজ্যমুক্তকরণ এবং দলের স্থানীয় সংগঠনের মতামতকে গণতান্ত্রিকভাবে বিবেচনার যেই সুযোগ আইন করে দিয়েছে তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা দরকার। ওপর থেকে প্রার্থী চাপানোর প্রবণতা বন্ধ করা হোক।
গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন মানে এখন ভিন্ন অর্থ। কেউ আমার কাছে নির্বাচন করার কথা বলতে চাইলে আমি তাদেরকে বলে দিই রাতের আঁধারে বুথ দখল করা আর অর্থ খরচ করতে পারলেই কেবল নির্বাচন করতে পারেন। ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে সেনাবাহিনীর প্রয়োজনের কথা বলেছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু সাইদ খান। কিন্তু তৎকালীন সরকারও সেনাবাহিনী দেয়নি। সেখানে জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন না করলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে আমি মনে করি না। সাবেক এ নির্বাচন কমিশনার আরো বলেন, স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা করা খুব সহজ যদি নির্বাচন কমিশন করতে চায়। ব্যালট বাক্স নির্বাচনের দিনে দিন যাতে আগের রাতে ব্যালট বাক্স দখল না হয়। এ ছাড়াও এখন দেশের বেশির ভাগ মানুষ মনে করে, আমি ভোট দিলেই কি হবে আর না দিলেই কি হবে। এর থেকে না দেয়াই ভালো। এর কারণ সরকার শুধু একা দায়ী নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও দায়ী।
তাছাড়া প্রতি ঘণ্টায় প্রতিটি কেন্দ্রে কতটি ভোট পরে তা প্রিজাইডিং অফিসার হিসাব রাখলে শেষে গণ্ডগোল হবে না। এজন্য সরকারের কাছে যেতে হবে না, আইনও বদলাতে হবে না। কমিশন নিজেরাই এটা করতে পারবে। প্রার্থীদের হলফনামা কিছুটা সংস্কারের প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন এ কমিশনার।
সুজন সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন,  আমাদের আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য এ দুটি সিটির নির্বাচন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ এ নির্বাচন কেমন হয় তা থেকে জাতীয় নির্বাচন কেমন হবে তা বিবেচনা করবে। নির্বাচন কমিশনের সব ক্ষমতাই রয়েছে, তারা যদি বলে আমাদের হাত-পা বাঁধা, তাহলে সেটা হবে নির্দিষ্ট দলের ছক বাস্তবায়ন করাই মাত্র।
আলোচনায় আরো অংশ নেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রমুখ।

‘মৃত’ নবজাতক নড়ে উঠলো কবরস্থানে

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘মৃত ঘোষণা’ করা এক নবজাতককে ঢাকা শিশু হাসপাতালের কার্ডিয়াক আইসিইউতে রাখা হয়েছে। গতকাল মৃত ঘোষণার পর আজিমপুর কবরস্থানে গোসল করানোর সময় ‘নড়ে ওঠায়’ ওই শিশুকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করেছে তার পরিবার। শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আবু তৈয়ব গণমাধ্যমকে বলেন, শিশুটিকে আইসিইউতে রেখে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার অবস্থা ভালো না। চিকিৎসকরা তাকে সুস্থ করে তুলতে চেষ্টা করবেন। শিশুটির বাবা মিনহাজ উদ্দিন সাভারের নয়াডিঙ্গির একটি পোশাক কারখানায় আয়রনম্যান পদে কাজ করেন। আর মা শারমিন আক্তার এখনো ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি আছেন। জীবিত শিশুকে মৃত ঘোষণার অভিযোগ তদন্ত করে দেখতে ঢামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. বিদ্যুৎ কান্তি পালকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, শনিবার সাভার থেকে এসে গাইনি বিভাগের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হন শারমিন আক্তার। সোমবার সকালে তিনি কন্যাসন্তান প্রসব করলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর শিশুটিকে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় আজিমপুর কবরস্থানে। সেখানে গোসলের সময় শিশুটির দেহে প্রাণ থাকার বিষয়টি টের পান এক মহিলা। দাফনের আগে গোসল দেয়ার সময় শিশুটি নড়ে উঠলে তা অভিভাবকদের জানান ওই মহিলা। পরে তাকে প্রথমে আজিমপুর মেটারনিটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক আবু তৈয়ব সাংবাদিকদের আরো বলেন, শিশুটির মায়ের রক্তশূন্যতা ছিল। সাত মাসে তিনি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ওজন এক কেজি। শিশুটির অবস্থা আশঙ্কামুক্ত নয়। আমরা মনে করছি, সকালে শিশুটির হার্ট কাজ করছিল না। তাকে কবরস্থানে নেয়ার পর হার্ট সামান্য কাজ করা শুরু করে। এরপর তার পরিবারের সদস্যরা তাকে শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
শিশুটির মামা মো. শরিফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে যে, আপনারা গাছ চান, নাকি ফল চান?’ তখন আমরা বলেছি, গাছ বেঁচে থাকলে ফল এমনিতেই পাওয়া যাবে। তিনি জানান, শিশুটির মা ১০৫ নম্বর ওয়ার্ডে এখনো ভর্তি আছে। রোববার রাতে শিশুটির মায়ের রক্ত বমি হয়েছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, খবর শুনে আমরা হাসপাতালের গাইনি বিভাগের প্রধানের সঙ্গে কথা বলেছি। শারমিন নামে একজন এখানে ২৭ সপ্তাহের প্রেগনেন্সি নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। তার স্টিলবর্ন বেবি (মৃত শিশু) হয়েছে। তার শরীর এখনো ভালো না। এখনো সে ঢাকা মেডিকেলে আছে। বাচ্চাটি এই মহিলারই কিনা সেটা তদন্ত করে দেখতে হবে। তিনি বলেন, শিশুটিকে মৃত বলার পর জীবিত হওয়ার ঘটনা সত্যিই ঘটে থাকলে তা তদন্ত করে দেখা হবে। সেজন্য ডিএনএ টেস্টসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা করা হবে। তারপরও অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটনাটি যদি ঘটেও থাকে, সেটার বিষয়ে তদন্ত করে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ঢামেক হাসপাতালে ২১শে এপ্রিল রাতে সন্তানসম্ভবা শারমিন আক্তারকে যখন ভর্তি করা হয় তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেছিলেন, ‘শিশুটি মায়ের গর্ভেই মারা গেছে।’ এরপর  গতকাল ৮টা ১০ মিনিটে শারমিনের স্বাভাবিক প্রসব হলে দেখা যায়, শিশুটি নড়াচড়া করছে না। তখন ঢামেকের কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। শিশুটি সম্পর্কে তার মামা শরিফুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মো. আবু তৈয়ব। শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক বলেন, ১৯শে এপ্রিল সাভারের স্থানীয় একটি ক্লিনিকে শিশুটির মা শারমিন আক্তারকে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাকে দুই ব্যাগ রক্ত দেয়া হয়। ২০শে এপ্রিল সকালে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন স্থানীয় চিকিৎসক। ওইদিনই তাকে সাভারের মালেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু মালেক হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ ওই রোগীকে ভর্তি করেনি। তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় শিশুটির মামা মো. শরিফুল ইসলাম আজিমপুর কবরস্থানে শিশুটিকে কবর দেয়ার জন্য নিয়ে যান। ১০টা ১২ মিনিটের দিকে এক মহিলা শিশুটিকে গোসল করানোর সময় তার মামাকে জানান যে, শিশুটি বেঁচে আছে। গোসল করানোর সময় সে নড়ে উঠেছে। শিশু হাসপাতালের উপ-পরিচালক আরো বলেন, শিশুটি বেঁচে আছে শুনে তাৎক্ষণিক তার মামা শরিফুল ইসলাম শিশুটিকে আজিমপুর মাতৃসদনে নিয়ে যান। ওখানকার চিকিৎসক শরিফুলকে শিশুটির বেঁচে থাকার বিষয়ে নিশ্চিত করেন। ওই সময় শিশুটির হার্টবিট খুব আস্তে আস্তে চলছিল এবং  খুব আস্তে সে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। আজিমপুর থেকে পরে তাকে ঢাকা শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় বেলা সাড়ে ১২টায়। এখানে আনার পরপরই প্রথমে শিশুটিকে চিকিৎসকরা কাপড়ে মুড়িয়ে নেন। তারপর আমরা তাকে কার্ডিয়াক আইসিইউতে ভর্তি করেছি। তিনি বলেন, শিশুটিকে যখন ভর্তি করানো হয়, তখন তার হার্টবিট ছিল ৩০-৩৫। আইসিইউতে নেয়ার পরে তার হার্টবিট ৮০-৯০-তে উঠেছে। শিশুটি এখন লাইফ সাপোর্টে আছে। আমরা তাকে বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি।
আজিমপুর মাতৃসদনের সুপার ডা. ইসরাত জাহান বলেন, আমাদের এখানে শিশু ইউনিটে তার প্রাথমিক চিকিৎসা হয়েছে। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় আমরা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে পরিবারের সঙ্গে শিশু হাসপাতালে পাঠিয়েছি। তিনি বলেন, পরিবার আমাদের জানিয়েছিল, শিশুটিকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করতে নেয়া হয়েছিল। আজিমপুর কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক হাফিজুল ইসলাম বলেন, কবরস্থানের লাশ নিবন্ধনের রেজিস্ট্রারে শিশুটির নাম লেখা হয়েছে মীম। ঠিকানা লেখা হয় ধামরাইয়ের শ্রীরামপুরে। তার বাবার নাম মিনহাজউদ্দিন। মা শারমিন আক্তার। শিশু হাসপাতালের ভর্তি রেজিস্ট্রারেও শিশুটির নাম মীম লেখা হয়েছে।