Sunday, May 11, 2025
চিরিরবন্দরে ৪০ মণের ‘সম্রাট’
তার আরেক ছেলে রমেল হক জানান, এমনিতেই ষাঁড়টির স্বভাব শান্তপ্রকৃতির হলেও মাঝেমধ্যে চড়াও হয়ে ওঠে। তাই সম্রাটকে বাড়ি থেকেই বিক্রি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া ষাঁড়টির উচ্চতা সাড়ে ৭ ফুট ও দৈর্ঘ্য ৯ ফুট হওয়ায় দরজা দিয়ে বের করা যাবে না। তাই ষাঁড়টি বিক্রি হলে দরজা কেটে বের করে ক্রেতার হাতে তুলে দেয়া হবে।
ষাঁড়টিকে দেখতে আসা সাবেরউদ্দিন ও রাজীব উদ্দিন বলেন, ফেসবুকে ছবি দেখে দেখতে আসলাম। ছবি দেখে আসলে বুঝতে পারিনি ষাঁড়টি কতো বড়! ছবির চেয়ে বাস্তবে ষাঁড়টি দেখতে অনেক বড় ও সুন্দর। উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. আবু রায়হান বলেন, সম্ভবত সম্রাটই দিনাজপুরের মধ্যে সবচেয়ে বড় গরু। ফ্রিজিয়ান জাতের গরুটি লালন-পালনে খামারিকে সর্বদা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। এ বছর গরুটি বিক্রি করতে না পারলে খামারির অনেক লোকসান হয়ে যাবে। এতবড় গরু লালন-পালন করা যেমন খুব কষ্টকর তেমনি ব্যয়বহুলও।

Tuesday, September 24, 2024
দিনাজপুর গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে নজিরবিহীন ঘটনা
জানা গেছে, তাদের রাহুগ্রাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি বাঁচাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ এলাকাবাসী আন্দোলন শুরু করলে তাতে বাধা দিয়ে আন্দোলন দমনের পাঁয়তারা করে ফারুক গং। তাদের হাত থেকে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটকে উদ্ধার করাই এখন প্রতিষ্ঠানটির সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দিনাজপুরবাসীর প্রাণের দাবি। ইতিমধ্যে ড. গোলাম ফারুক পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগের দাবিতে কৃষি উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন দপ্তরে স্মারকলিপি প্রদান করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। সূত্র মতে সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগের দিন রাজধানীর খামারবাড়ীতে ‘শান্তি সমাবেশে’ কর্মকর্তাদের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মাঠে নামান কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব ও শেখ হাসিনার উপদেষ্টা মসিউর রহমানের ভাগ্নি ওয়াহেদা আক্তার। এ কারণে কৃষি মন্ত্রণালয়ে তার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন অধিদপ্তরে নিজের পছন্দের লোককে বসিয়েছেন। ওয়াহিদা দু’জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে নিজের ক্লাসমেট গোলাম ফারুককে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে বসান। তিনি ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যখন মাঠে নামান, তখন তারই অনুগত ও আস্থাভাজন কর্মকর্তা দিনাজপুরের গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তৎকালীন মহাপরিচালক ড. গোলাম ফারুক খামারবাড়ীর ওই শান্তি সমাবেশে পোস্টার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে অংশ নেন।
২০২১ সালের ২৬শে নভেম্বর ড. গোলাম ফারুককে মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেয়া হয়। ইনস্টিটিউটের তৎকালীন পরিচালক (অর্থ ও প্রশাসন) সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. মো. আবু জামান সরকার ও পরিচালক (পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর) ড. সালাহ্উদ্দিন আহমেদকে ডিঙিয়ে তাকে এ পদে বসানো হয়। আর গোলাম ফারুক ডিজি হওয়ার পর তিনিও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে কর্মকর্তাদের পদায়ন করেছেন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দলীয় সমর্থক হিসেবে পরিচিত জুনিয়র কর্মকর্তাদের নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। বর্তমানে সব জায়গা থেকে বিগত সরকারের আশীর্বাদপুষ্টরা বিদায় নিচ্ছেন। অথচ ড. গোলাম ফারুককে শুধু পদাবনতি করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে পরিচালক হিসেবে পদায়ন করে তার দুর্নীতির রাজত্ব চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ফলে তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন। একাধিক বিজ্ঞানী জানান, ড. গোলাম ফারুক বিভিন্ন প্রকল্পের পরিচালকদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ নিতেন। প্রতি মাসে দু’-তিনবার ঢাকায় যাওয়ার সময় সচিবের নাম করে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ১০-১২ লাখ টাকা নিতেন।
ড. গোলাম ফারুকের পদাবনতি নয়, পুরোপুরি অপসারণ চান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ এলাকাবাসী। বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, আমরা ইনস্টিটিউটের সামনে দিনাজপুর-দশমাইল মহাসড়কে মানববন্ধন কর্মসূচির প্রস্তুতি নিতে গেলে এসএ রুবেল ও ডিজি’র গাড়িচালক মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে ইনস্টিটিউটের একজন কর্মকর্তা, শ্রমিক-কর্মচারী হামলা চালায়। এতে ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী মো. আসাদুজ্জামান চৌধুরী ও মো. নূরে আলম আহত হন। কিন্তু এসব হামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, গোলাম ফারুক বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসর ছিলেন। তিনি ও তার সহযোগী প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদের নেতা ও সাবেক হাবিপ্রবি ছাত্রলীগের নেতা ড. মো. আব্দুল হাকিম ঢাকায় ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে মাঠে নেমে আন্দোলন করেছেন। তারা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করেছেন। দুর্নীতিবাজ এই হাকিমের বিরুদ্ধে দুদকের একটি মামলায় তদন্ত চলমান রয়েছে। আমরা তাদের শুধু পদাবনতি নয়, পুরোপুরি অপসারণ বা বদলি চাই। এই সম্ভাবনাময় ইনস্টিটিউটটি তাদের জন্য ধ্বংস হোক- তা আমরা কেউই চাই না। এ ব্যাপারে গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বর্তমান পরিচালক ড. গোলাম ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
Thursday, July 16, 2020
নয়নাভিরাম কান্তজীর মন্দিরের কথা by নাকিবুল আহসান নিশাদ
![]() |
| কান্তজীর মন্দির |
হিন্দু ধর্মের কান্ত বা কৃষ্ণের মন্দির এটি, যা লৌকিক রাধা-কৃষ্ণের ধর্মীয় প্রথা হিসেবে বাংলায় প্রচলিত। ধারণা করা হয়, মহারাজা সুমিত ধর শান্ত এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নির্মাণশৈলীর জন্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের মধ্যে এই প্রাচীন মন্দিরের জনপ্রিয়তা ব্যাপক।
কান্তজীর মন্দির শ্রীকৃষ্ণের জন্য নিবেদিত। কালিয়াকান্ত জীউ অর্থাৎ শ্রী-কৃষ্ণের বিগ্রহ স্থাপনের জন্যই মন্দিরের নামকরণ হয়েছে কান্তজীউ, কান্তজী বা কান্তজীর। মন্দিরটির সুবাদে এলাকাটি কান্তনগর নামে পরিচিতি পায়। সেজন্য পরবর্তী সময়ে এর আরেক নাম হয়ে যায় কান্তনগরের মন্দির।
জনশ্রুতি রয়েছে, মন্দিরের নির্মাণ সামগ্রী সুদূর আসামের পর্বত ও হিমালয় থেকে আনা হয়েছিল। এর নির্মাণকাজের জন্য বেশিরভাগ কর্মী পারস্য থেকে এসেছিলেন। ইতিহাস ও গঠনশৈলীর জন্য এটি দেশের বিখ্যাত মন্দির।
দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে ও কাহারোল উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে সুন্দরপুর ইউনিয়নে। সেখানে দিনাজপুর-তেঁতুলিয়া মহাসড়কের পশ্চিমে ঢেঁপা নদীর তীরে অবস্থিত কান্তজীর মন্দির। এর উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি অনুযায়ী, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় নিজের শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। এরপর প্রাণনাথের পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে নির্মাণকাজ শেষ করেন।
মন্দিরের বাইরের দেয়াল জুড়ে পোড়ামাটির ফলকে লেখা রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত ও বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি, উদ্ভিদ, প্রাণীর জ্যামিতিক চিত্র ইত্যাদি। পুরো মন্দিরে প্রায় ১৫ হাজারের মতো টেরাকোটা টালি আছে। ওপরের দিকে তিন ধাপে উঠে গেছে মন্দিরটি। চারদিকের সব খিলান দিয়ে ভেতরের দেবমূর্তি দেখা যায়।
![]() |
| কান্তজীর মন্দির |
শুরুতে চূড়ার উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে কান্তজীর মন্দিরটি ভূমিকম্পের কবলে পড়লে চূড়াগুলো ভেঙে যায়। মহারাজা গিরিজানাথ এতে ব্যাপক সংস্কার করেছিলেন। তবে চূড়াগুলো আর সংস্কার করা হয়নি। স্থাপত্য রীতি, গঠনবিন্যাস, শৈল্পিক মন্দিরটির সামগ্রিক দৃশ্যকে এতই মাধুর্যমণ্ডিত করে তুলেছে। এর চেয়ে নয়নাভিরাম মন্দির দেশে দ্বিতীয়টি নেই।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাস ও ট্রেনে দিনাজপুর যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে দিনাজপুরগামী বাসগুলো সাধারণত গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে ছাড়ে। এই রুটে নাবিল পরিবহনের এসি বাসের ভাড়া ৯০০ টাকা। এছাড়া হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এসআর ট্রাভেলস, কেয়া পরিবহন, শ্যামলী পরিবহনের নন-এসি বাস আছে। ভাড়া ৫০০-৫৫০ টাকা।
ঢাকার আসাদগেট, কলেজগেট, শ্যামলী, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল মোড় অথবা গাবতলী থেকে নাবিল বা বাবলু এন্টারপ্রাইজের চেয়ার কোচে চড়ে সরাসরি দিনাজপুর যেতে হবে। প্রায় সারাদিন আধঘণ্টা ও এক ঘণ্টা পরপর গাড়িগুলো ছেড়ে যায়। তাছাড়া উত্তরা থেকে কিছু পরিবহন দিনাজপুরে যাত্রীসেবা দিয়ে থাকে।
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন দ্রুতযান এক্সপ্রেস ছাড়ে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে। আর আন্তঃনগর একতা এক্সপ্রেস ছাড়ে সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে। ঢাকা থেকে একতা ও দ্রুতযান এক্সপ্রেস বন্ধ থাকে যথাক্রমে মঙ্গল ও বুধবার। ভাড়া শোভন শ্রেণি ১৮৫ টাকা, শোভন চেয়ার ২৫০ টাকা, প্রথম শ্রেণি চেয়ার ৩৫০ টাকা, প্রথম শ্রেণি বার্থ ৫৩৫ টাকা, এসি চেয়ার ৬১৮ টাকা, এসি বার্থ ৮৯৭ টাকা। দিনাজপুর শহর থেকে অটোরিকশায় চড়ে কান্তজীর মন্দিরে যাওয়া যায়।
ছবি: লেখক
![]() |
| কান্তজীর মন্দিরের সামনে লেখক |
Saturday, October 26, 2019
অভিমানী এক মুক্তিযোদ্ধার অন্যরকম প্রতিবাদ

আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাই না। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করিও। জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি বরারর এ চিঠি লেখার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুবরণ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন। তার এই চিঠিতে লিখে যাওয়া অছিয়ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
অবশ্য ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের চৌকসদল গার্ড অব অনার জানাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসেন। দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেন পিতৃস্নেহে চিঠিতে যা লিখে গেছেন তার মূলকথা হচ্ছে- জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সুপারিশে ছেলে নুর ইসলামের ‘নো-ওয়ার্ক, নো-পে’ ভিত্তিতে গাড়িচালক হিসেবে চাকরি হয়। সেই সুবাদে নুর ইসলাম সদর অ্যাসিল্যান্ডের গাড়ি চালাতেন। কর্মস্থলে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
এ সময় তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে সেখানে উপস্থিত এডিসি রাজস্বকে বিষয়টি দেখতে বলেন। হুইপকে বিষয়টি অবগত করায় প্রশাসন থেকে প্রথমে নুর ইসলামকে তার বসবাসরত খাস পরিত্যক্ত বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেয়া হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অ্যাসিল্যান্ড-এর স্ত্রী নুর ইসলামকে বাথরুম পরিষ্কার ও মাংস রান্না করতে বলেন। মাংস রান্না ঠিক না হওয়াসহ বিভিন্ন অজুহাতে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়। পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকারিয়াকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করতে গেলে জেলা প্রশাসকও ক্ষিপ্ত হন। এ ছাড়াও নুর ইসলাম তার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাফ চাওয়ার জন্য অ্যাসিল্যান্ডের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও দেখা করতে পারেনি। চাকরি চলে যাওয়ায় উপায় না পেয়ে হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু প্রশাসন সেটি চরম নেগেটিভ ভাবে নেয়। বর্তমানে তার ছেলেটি চাকরিচ্যুত ও বাস্তুচ্যুত হয়ে স্ত্রী-পুত্র পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
তিনি লিখেছেন, ‘জীবন বাজি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়ে করা স্বাধীন দেশে আমার ছেলের রুজি রোজগারটুকুও অন্যায়ভাবে কেড়ে নেয়া হলো। গত ২১.১০.২০১৯ইং তারিখ থেকে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দিনাজপুরের কার্ডিওলজি বিভাগে, ওয়ার্ড নং-২, বেড নং-৪৪ এ ভর্তি অবস্থায় আছি, এই পত্রটি তোমার কাছে লিখছি। তোমার কাছে আমার আকুল আবেদন- তুমি ন্যায় বিচার কর। ঠুনকো অজুহাতে আমার ছেলেটিকে চাকরিচ্যুত করায় তাকে চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কর। আমার বয়স প্রায় ৮০ বছরের কাছাকাছি। ছেলেটি হঠাৎ করে চাকরিচ্যুত হওয়ায় একেই তো আমি শারীরিকভাবে অসুস্থ তারপর মানসিকভাবেও ভেঙ্গে পড়েছি। জীবণ মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, আমাকে যেন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন না করা হয়। কারণ অ্যাসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি, ডিসি যারা আমার ছেলেকে চাকরিচ্যুত, বাস্তুচ্যুত করে পেটে লাথি মেরেছে, তাদের সালাম-স্যালুট আমার শেষ যাত্রার কফিনে আমি চাইনা।’ পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২২শে অক্টোবর চিঠিতে তিনি স্বাক্ষর করে ডাকযোগে ঢাকায় জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির বরাবরে প্রেরণ করেন। পরের দিন ২৩শে অক্টোবর সকাল ১১টার সময় হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন আবস্থায় মারা যান।
বৃহস্পতিবার ২৪শে অক্টোবর সকাল ১১টায় সদর উপজেলার ৬নং আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ী গ্রামে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের জানাজার পূর্ব মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট মহসীন উদ্দিনের নেতৃত্বে পুলিশ প্রশাসনের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করার জন্য যান। এ সময় স্ত্রী ছেলে-মেয়েরা তাদের পিতার লিখে যাওয়া চিঠি অনুয়ায়ী তারা রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন বা গার্ড অব অনার প্রদান করতে দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। তাদের ভাষায় এটাই হবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মরহুম ইসমাইল হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। জানাজার আগে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের পরিবার পরিজন দায়িত্ব দিলে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোফাজ্জল হোসেন দুলাল জানাজা নামাজে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, অন্যায়ভাবে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এই চিঠি লিখে গেছেন। আমরা তার লিখে যাওয়া চিঠির অছিয়ত অনুয়ায়ী দাফন করতে চাই। চিকিৎসার জন্য তিনি অনেকের কাছে ফোন করে সাহায্য চেয়েছিলেন। গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেটকে ছেলেরা বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জেলা প্রশাসক বেতন পান। তিনি জেলার পিতা। তার সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধা দেখা করতে গিয়ে দেখা পান না। এর চেয়ে লজ্জার কি হতে পারে। এই কারণেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রশাসন থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে যাওয়ার পর বিষয়টি অবগত হই। তিনি বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করতে না দেয়ায় তা প্রদান করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের মুক্তিবার্তা নং-০৩০৮০১১০০২, ভাতা বই নং-৮১৯।
Sunday, October 13, 2019
জনপ্রিয় ‘কসাই’ জমিলা by রাজিউল ইসলাম
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার শেষ সীমান্তে ঝাড়বাড়ি গ্রামের জমিলা প্রায় ২০ বছর ধরে কসাইয়ের তকমা গায়ে লাগিয়ে মাংস বিক্রি করছেন। হাটে গিয়ে গরু কেনা, গরু জবাই করা, মাংস কাটা, ওজন দেওয়াসহ প্রায় সব কাজই করেন তিনি। সপ্তাহের সোমবার বাদে অন্য দিনগুলোতে মাংস বিক্রি করেন। তবে শুক্রবারে মাংস বিক্রি ২০ থেকে ২৫ মণে গিয়ে ঠেকে। প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫টি গরু জবাই করেন। ক্রেতারা দূরদূরান্ত এমনকি ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী থেকেও আসেন জমিলার দোকানে। জমিলা বললেন, ‘আমি বাজারে না গেলে ক্রেতারা অপেক্ষা করতেই থাকেন।’
খানসামা উপজেলা থেকে মাংস কিনতে আসা আফজাল হোসেন বললেন, প্রায় ১০ বছর ধরে সঠিক ওজন এবং ভালো মাংস পাওয়া যায় বলে জমিলার দোকান থেকে মাংস কেনেন।
জমিলা যেখানে মাংস বিক্রি করেন, সেই বাজারের মাংস বিক্রেতা আয়নাল হক বললেন, ‘জমিলা ভাবির কারণে এই বাজারটিকে অনেকেই চিনছে। আমাদের ব্যবসাও ভালো হয়। ’
জমিলার কাজে ছেলে জহুরুল ইসলাম (২৮) সহায়তা করেন। ৫ জন কর্মচারীও আছেন।
জমিলা বললেন, হয়তো গরু কিনতে হাঁটে গেছেন, গরু পছন্দও হয়েছে, কিন্তু হাতে টাকা নেই। ব্যবসায়ীরা বাকিতে তিন থেকে চার লাখ টাকার গরু দিয়ে দেন অনেক সময়।
বীরগঞ্জ উপজেলার গড়েয়া বাজারের গরু ব্যবসায়ী হযরত আলী বললেন, ‘ জানি টাকা মাইর যাবে না।’
স্কুলের পড়াশোনা নেই জমিলার। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবা জাকির হোসেন মেয়েকে বিয়ে দেন বগুড়ার রফিকুল ইসলাম ভান্ডারীর সঙ্গে। তিনিও পেশায় একজন কসাই। প্রথম সন্তানের জন্ম পর্যন্ত ভালোই ছিলেন। কিন্তু পরে স্বামী মাদকাসক্ত হয়ে ব্যবসাটা লাটে তোলেন। ২০০০ সালের শেষ দিকে স্বামী-সন্তানসহ বীরগঞ্জে বাবার বাড়িতে ফেরত আসেন জমিলা। বাবার সামান্য জমি বিক্রি করে বাজারে একটি দোকানে মাংসের দোকান দেন। ছেলে জহুরুল তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। জমিলা আবার যখন অন্তঃসত্ত্বা, তখন স্বামী প্রায় আড়াই লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। তালাক হয়ে যায় জমিলার। পাশে দাঁড়ান জমিলার বাবা এবং ছেলে।
বর্তমানে এক ছেলে, ছেলের বউ আর মেয়ে সোহাগীকে (১৪) নিয়ে সুখেই আছেন জমিলা। ১০ শতক জমিসহ আবাদি জমি কিনেছেন। ৩ রুমের পাকা বাড়ি করেছেন।
জমিলা বললেন, ‘স্বামী চলে গেছে। প্রথম যখন দোকানে বসি, তখন অনেকেই বিরোধিতা করছিল। এলাকার কিছু লোক থানায়, ইউনিয়ন পরিষদে আমার নামে অভিযোগও দিছিল। কয়েকজন আবার পাশেও দাঁড়ায়। এখন মানুষ উৎসাহই বেশি দেয়। ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে মাংস বিক্রি করছি, সেই মাংস এখন বিক্রি করি ৫০০ টাকা কেজি দরে।
বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়ামিন হোসেন বললেন, ‘জমিলাকে সরকারের পক্ষ থেকে জয়িতা পুরস্কারে ভূষিত করা যায় কি না, তা বিবেচনা করব।’
![]() |
| নিজের দোকানে বসে মাংস কাটছেন জমিলা বেগম। |
Sunday, September 22, 2019
২০১৯বাংলাদেশে ভিক্ষা বন্ধে এক ইউএনও'র অভিনব প্রয়াস by ফারহানা পারভীন
![]() |
| ঢাকার রাস্তায় ভিক্ষা করছেন একজন বয়স্ক নারী |
![]() |
| বাংলাদেশে বৃদ্ধ বয়সে বহু মানুষের ভিক্ষা ছাড়া কোনো উপায় থাকেনা। (ফাইল চিত্র) |
Wednesday, August 28, 2019
উত্তরাঞ্চলে ‘ভাদ্র কাটানি’ উৎসব by শাহ্ আলম শাহী

দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে এ ঐতিহ্যবাহী উৎসবের লক্ষ্যে বাবার বাড়িতে যান নববিবাহিতা বধূরা। শহরে এর প্রভাব কম থাকলেও গ্রামে এ উৎসব চোখে পড়ে বেশি।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ভাদ্র কাটানি’ উৎসবের কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও এ অঞ্চলের আদি প্রথা অনুযায়ী, পহেলা ভাদ্র থেকে শুরু হয়ে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে এ উৎসব।
নববিবাহিতা বধূ বাবার বাড়িতে নাইয়োর যাবে। এ বাক্যটি এখন নববিবাহিত পরিবারের সবার মুখে মুখে।
দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে এবং ভারতের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিনাজপুর মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের কোনো কোনো অংশে এ প্রথা চালু আছে।
এছাড়াও জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি জেলার কোনো কোনো অংশে এ প্রথা বাঙালি সমাজে চালু রয়েছে বলে জানা যায়।
আধুনিককালে ভাদর কাটানির পক্ষে নিরপেক্ষ তর্ক-যুক্তি নেই। তবুও ভাদর কাটানি উৎসব থেমে নেই। যারা মনে প্রাণে বাঙালি, যারা বাঙালির রীতি-নীতি ও প্রথা মেনে চলে, মানার চেষ্টা করেন তাদের নিয়মের ভেতরেই রয়েছে ভাদর কাটানি প্রথা।
স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস- বিবাহিত জীবনের প্রথম ভাদ্র মাসের ১-১০ তারিখ পর্যন্ত স্বামীর মুখ দেখলে অমঙ্গল হবে। তাছাড়া সাধারণত: এ মাসে বিয়ের কোনো আয়োজনও চোখে পড়ে না। প্রচলিত এ প্রথাটি যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে হিন্দুু-মুসলিমদের মধ্যে চলে আসছে।

নিয়ম অনুযায়ী, কনে পক্ষ শ্রাবণ মাসের দু’একদিন বাকি থাকতেই বরের বাড়িতে সাধ্যমতো বিভিন্ন রকমের ফল, মিষ্টি, পায়েসসহ নানা রকম পিঠা-পুলি নিয়ে যান। বরপক্ষও সাধ্যমতো তাদের আপ্যায়ন করে। বাড়িতে কনে পক্ষের লোকজন আসায় চারদিকে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়।
দিনাজপুরের প্রবীণ ব্যক্তি মফিজুল্লাহ শাহ্ জানিয়েছেন, বউ গেছে তার বাপের বাড়িতে। বৌকে বিদায় দিতে হবে কিংবা কনের বাড়ির লোকজন দলবেঁধে মেয়েকে নিতে আসবে। বাড়িতে অতিথি আসলে বাড়ির লোকজনরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রথমে হাত মুখ ধোয়ার ব্যবস্থা, গামছা তোয়ালের ব্যবস্থা, তারপর খড়ম বা স্যান্ডেল ধুতি-লুঙ্গির ব্যবস্থা যেন পরিপূর্ণ করা হয়। তারপর খাওয়ার জন্য ছাগলের গোস্ত, মুরগির গোস্ত, ডিম, দুধ, কলা, দই, চিড়া, মুড়ি, পায়েশ, পুলি, পিঠা, আয়োজনের মধ্যে সবই থাকে বাঙালি সমাজে।
দিনাজপুরের নাট্য ব্যক্তিত্ব তারেকুজ্জামান জানান, ভাদর কাটানি মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো ধর্মীয় বিষয় না হলেও এ অঞ্চলে প্রথাটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এক সময় সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায় এ উৎসবকে জাকজঁমকভাবে পালন করতো। তাদের এ রেওয়াজ ক্রমান্বয়ে এ অঞ্চলের মানুুষকে প্রভাবিত করে। একপর্যায়ে উৎসবটি এ অঞ্চলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়। আবহমান গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ফুটে উঠে এ মাসে। পথে-ঘাটে, নদী-নালা, ক্ষেত-খামারে চোখে পড়ে অপরূপ দৃশ্য।

Wednesday, June 19, 2019
লোহার খনি আবিষ্কার, ৪০০ ফুট পুরুত্বের আকরিকের সন্ধান : বিপুল মজুদের অস্তিত্ব

খনন কাজে নিয়োজিত জিএসবির উপপরিচালক মোহাম্মদ মাসুম গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বলেন, বিশ্বের যে কয়েকটি দেশে লোহার খনি আবিষ্কার করা হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের আকরিকে লোহার শতাংশ ৬৫-এর ওপরে। কানাডা, চীন, ব্রাজিল, সুইডেন ও অষ্ট্রেলিয়ার খনির লোহার মান ৫০ শতাংশের নিচে। আবিস্কৃত খনি থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জয়পুরহাটে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) পরীক্ষাগারে পরীক্ষার পর এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, খনিটির ব্যাপ্তি ৬-১০ বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে স্বর্ণের অস্তিত্বের পাশাপাশি কপার, নিকেল ও ক্রোমিয়ামেরও উপস্থিতি রয়েছে। ১ হাজার ১৫০ ফুট গভীরতায় চুনাপাথরের সন্ধানও মিলেছে।
তিনি জানান, জিএসবি ২০১৩ সালে ইসবপুর গ্রামের ৩ কিলোমিটার পূর্বে মুশিদপুর এলাকায় কূপ খনন করে খনিজ পদার্থের সন্ধান পেয়েছিল। সেই গবেষণার সূত্র ধরে চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল থেকে ইসবপুরে কূপ খনন শুরু করা হয়। এরপর ১ হাজার ৩৮০ থেকে দেড় হাজার ফুট গভীরতা পর্যন্ত খননকালে আশার আলো দেখা যায়। এ খবর পেয়ে ২৬ মে জিএসবির মহাপরিচালক জিল্লুর রহমান চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখানে পরিদর্শনে আসেন।
তখন জিল্লুর রহমান সাংবাদিকদের সুখবর না দিলেও লোহার খনি আবিষ্কার হতে চলেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এ অঞ্চলটি ৬০ কোটি বছর আগে সমুদ্র ছিল। সেই কারণে এখানে জমাট বাঁধা আদি শিলার ভেতরে লোহার আকরিকের এ সন্ধান পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাকিমপুর উপজেলা সদর থেকে ১১ কিলোমিটার পূর্বের গ্রাম ইসবপুরের কৃষক ইছাহাক আলীর কাছ থেকে ৫০ শতক জমি ৪ মাসের জন্য ৪৫ হাজার টাকায় লিজ নিয়ে খনিজ পদার্থের অনুসন্ধানে কূপ খনন শুরু করেছিল ভূ-তাত্তি¡ক জরিপ অধিদফতর। ২০১৩ সালে এ গ্রামের ৩ কিলোমিটার পূর্বে মুশিদপুর এলাকায় কূপ খনন করে খনিজ পদার্থের সন্ধান পেয়েছিল। সেই গবেষণার সূত্রধরে দীর্ঘ ৬ বছর পর চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল থেকে ইসবপুর গ্রামে কূপ খনন শুরু করা হয়। এরপর ১৩৮০-১৫০০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত খননকালে সেখানে আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়। এ খবর পেয়ে গত ২৬ মে জিএসবি’র মহাপরিচালক জিল্লুর রহমান চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পরিদর্শনে যান। এসময় মহাপরিচালক সাংবাদিকদের সুখবর না দিলেও লোহার খনি আবিষ্কার হতে চলেছে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ চেষ্টার ফলে ১৭৫০ ফুট গভীরতা খনন করে লোহার খনির আবিষ্কার করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৪০০ ফুট পুরুত্বের লোহার আকরিকের এ স্তরটি পাওয়া গেছে।
জিএসবি’র উপ-পরিচালক (ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ার) মাসুদ রানা জানান, গত ১৯ এপ্রিল থেকে ইসবপুর গ্রামে কূপ খনন শুরু করা হয়। ৩০ সদস্যের বিশেষজ্ঞ একটি দল ৩ শিফটে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
ইসবপুর গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, আমরা জানতে পারলাম এখানে লোহার খনি পাওয়া গেছে। এখান থেকে লোহা উত্তোলন করা হলে এখানকার মানুষের জীবনমান পাল্টে যাবে। কর্মসংস্থান হবে এখানকার মানুষদের। দেশের জন্যও লাভজনক হবে। এমনই আশায় বুক বাঁধছেন এখানকার সর্বস্তরের মানুষ। তাই গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারের কাছে খনি বাস্তবায়নে জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
Thursday, June 6, 2019
দিনাজপুরে অদ্ভুত ‘বৃষ্টিগাছ’! by বিপুল সরকার সানি

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা ধুলাপাথার। উপজেলার কালিয়াগঞ্জ বাজার থেকে কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে গোবরার বিলের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তার একটি গেছে বনের ভেতরে। এই এলাকার বনের প্রায় এক কিলোমিটার গভীরে বিশেষ বৃষ্টি গাছের সন্ধান মিলেছে। এমন চারটি গাছ রয়েছে সেখানে। গাছগুলো থেকে সবসময় ঝিরঝির করে পানি ঝরছে। অবাক করে দেওয়ার মতো এমন ঘটনা দেখতে অনেকেই সেখানে ভিড় জমাচ্ছেন।
স্থানীয় আদিবাসী গোদাবাড়ী এলাকার রমজান পাহান (৩৬) বলেন, 'জঙ্গলে গাছটি দেখেছি। ধর্মপুর শালবনের ধুলাপাথারের গাছটির নিচে গেলেই পানি পড়ে। বৃষ্টির ফোঁটার মতো পানি গাছের নিচে পুরো স্থান জুড়ে পড়ে।'
আরেক আদিবাসী ধর্মজল এলাকার সুখি টুডু (৫০) বলেন, গাছটিকে আমরা ‘শেখরেদারে’ বলে ডাকি। গাছটি থেকে পানি পড়ে তা দেখেছি। এটা অবাক করার মতো।
বিশেষ ধরনের এই বৃষ্টিগাছ প্রস্থে প্রায় ৪ ফুট এবং লম্বায় ১২ ফুটের মতো। অনেকটা ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এর পাতা গোলাকার।
এরই মধ্যে অদ্ভুত গাছটির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের একটি দল। তারা গাছ পরিদর্শন করে তথ্য-উপাত্ত, ডাল, পাতাসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করেছেন। পানি পড়ার বিষয়টিকে গাছের প্রস্বেদন প্রক্রিয়া বলে ধারণা করছেন গবেষকরা। তবে এত দ্রুতগতিতে পানি বের হওয়াকে অস্বাভাবিক বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
দলের সদস্য দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের এমএসসির শিক্ষার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, 'গাছটির কচি কাণ্ড এবং পুরাতন কাণ্ডের সংযোগে বাকল ফেটে নতুন কুঁড়ি বের হওয়ার স্থান থেকে পানি বেরিয়ে ঝির ঝির করে ঝরছে। বিষয়টি আশ্চর্যের! উদ্ভিদ থেকে পানি এভাবে ঝরার বিষয়টি নতুন বলেই মনে হয়েছে।'
মোসাদ্দেক হোসেন আরও জানান, ওই বনে আরও বেশকিছু এই একই প্রজাতির গাছ রয়েছে এবং প্রতিটি থেকেই পানি ঝরার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছেন তারা। গাছটির গবেষণা করে পরিচিতি এবং যাবতীয় বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের জানানোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
সরেজমিন গাছটি পর্যবেক্ষণ করেছেন উদ্ভিদ বিষয়ক গবেষক, লেখক ও দিনাজপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, 'বনের ভেতরে থাকা চারটি গাছের সন্ধান মিলেছে। এগুলোর তথ্য-উপাত্ত, গাছের ডাল, পাতা, বাকল ও নমুনা সংগ্রহ করেছি। এরপর কলেজের ল্যাবে এনে তা পরীক্ষার পাশাপাশি গবেষণার প্রতিবেদনগুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।'
তবে এই ধরনের গাছ নিয়ে আগে কোনও গবেষণা হয়নি বলে জানান তিনি। একইসঙ্গে গাছ থেকে বেগ কিংবা চাপে নির্দিষ্ট সময় পর পর এভাবে পানি বের হওয়াকেও অস্বাভাবিক বলে ধারণা তার।
অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন জানান, বর্ষাকালে অনেক গাছই অতিরিক্ত পানি শোষণ করে। এই গাছটিও বেশি পরিমাণে পানি শোষণ করেছে। পুরাতন কাণ্ড ভেদ করে নতুন কাণ্ড বা নতুন কুঁড়ি বের হওয়ার জায়গায় গাছটির ভাস্কুলার বান্ডেল তথা পরিবহন কলাগুলো বেরিয়ে পড়েছে। ফলে উদ্ভিদের মূল থেকে আরোহিত পানি কাণ্ডের ওই অংশ থেকে বিন্দু বিন্দু আকারে ঝরে পড়ছে। অতিরিক্ত পানির চাপ থাকায় ভাস্কুলার বান্ডেল তথা পরিবহন কলা কাণ্ডের ছিদ্র দিয়ে পানি বাইরে সজোরে ছড়িয়ে দিচ্ছে। ভ্যাপার বা বাষ্পায়ন না ঘটার ফলে গাছের নিচে কেউ গেলে বৃষ্টির মতো ঝরা পানি অনুভব করছে এমনটি হতে পারে। তবে এই গাছ থেকে বেগ বা চাপ দিয়ে স্প্রে করার মতো যে পানি বের হচ্ছে তা অস্বাভাবিক।
তিনি বলেন, 'এখন পর্যন্ত এ ধরনের গাছ নিয়ে গবেষণা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। গাছটির পরিচিতি জানতে এবং অধিকতর গবেষণার জন্য এর নমুনা উন্নত গবেষণাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।'

Tuesday, May 7, 2019
পাথরের মজুত বাড়ছে, বিক্রি কমছে by সামছুর রহমান

• পাথর কম লোড হওয়ার কারণে পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ।
• ভারত থেকে আমদানি করা পাথরের দাম কম পড়ে।
• উত্তোলনের তুলনায় পাথর বিক্রি অর্ধেকের কাছাকাছি।
দিনাজপুরের মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পে উত্তোলিত পাথরের মজুত বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মেট্রিক টন। প্রকল্পে পাথর উত্তোলন বাড়লেও বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে প্রতি মাসেই মজুতের পরিমাণ বাড়ছে। তাই আর্থিকভাবে লোকসানে থাকা সরকারের প্রতিষ্ঠানটি পাথরের দাম কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
খনি কর্তৃপক্ষ, পাথর উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, পাথরের ডিলার এবং শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাথর বিক্রি বাড়াতে খনি কর্তৃপক্ষ পরিকল্পিতভাবে বিপণনের কোনো ব্যবস্থা করেনি। পাথর পরিবেশকদের (ডিলার) কমিশন কমিয়ে দেওয়ায় তারা পাথর নিতে আগ্রহী হচ্ছে না। এর মধ্যে গত বছর সড়ক বিভাগ পাথর পরিবহনে মোটরযানের ওজন নির্ধারণ (এক্সেল লোড) করে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করায় পাথর বিক্রি আরও কমে গেছে।
মধ্যপাড়া খনি থেকে পাথর উত্তোলন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)। আর খনির উত্তোলিত পাথর বিক্রির দায়িত্বে আছে পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল)। এই খনির পাথর সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয় না। নির্ধারিত ডিলারের মাধ্যমে পাথর বিক্রি করা হয়। বর্তমানে ৪৫ জন ডিলার রয়েছেন।
খনি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে পাথরখনিতে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন পাথর অবিক্রীত রয়েছে। গত বছর খনি থেকে প্রায় ১১ লাখ ৬৬ পাথর মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৭ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। বাকি পাথরগুলো অবিক্রীত থেকে যায়।
চলতি বছরের শুরুর মাস থেকে পাথর উত্তোলনের পরিমাণ আরও বেড়েছে। বছরের প্রথম তিন মাসে খনি থেকে উত্তোলন করা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এপ্রিল মাসের শুরু থেকে খনিতে উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। এপ্রিল মাসের ২৭ দিনে বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন। বাকি পাথরগুলো মজুত হয়েছে।
খনির একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে খনির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রতিমাসে ১ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদিত হচ্ছে ১ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। কিন্তু বিক্রির পরিমাণ এর অর্ধেকের কাছাকাছি। বিক্রি না বাড়লে মজুত করা পাথর বিক্রিতেই এক বছরের বেশি সময় লাগবে।
খনির কর্মকর্তা ও ডিলাররা বলছেন, আগে ১০ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৪২ থেকে ৪৬ মেট্রিক টন ও ৬ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৩০ থেকে ৩২ মেট্রিক টন পাথর পরিবহন করত। কিন্তু ২০১৮ সালের মোটরযান এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ বিধি অনুযায়ী ১০ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ৩২ মেট্রিক টন ও ৬ চাকার ট্রাক (ট্রাকের ওজনসহ) ২২ মেট্রিক টনের বেশি পাথর বহন করতে পারছে না। ফলে পাথর বিক্রি অনেকটা কমেছে।
খনির পুরোনো ডিলারদের একজন মো. মমিনুল হক বলেন, পাথর কম লোড হওয়ার কারণে পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আগে ৫ শতাংশ কমিশন দেওয়া হলেও এখন ৩ শতাংশ দেওয়া হচ্ছে। এই ৩ শতাংশের ওপর আবার ভ্যাট কাটছে ১৫ শতাংশ। ফলে সামগ্রিকভাবে লাভ কমে যাওয়ায় ডিলাররা পাথর বিক্রিতে আগ্রহ হারাচ্ছে।
গত রোববার খনি এলাকা ঘুরে দেখা যায় খনির ফাঁকা জায়গাগুলোতে অবিক্রীত পাথর স্তূপ করে রাখা। আকৃতি অনুযায়ী পাথরগুলো আলাদা করা হয়েছে। কয়েকটি ট্রাকে পাথর ওঠানোর কাজ চলছে। খনির মূল ফটকের বাইরে ৮–১০টি ট্রাক পাথর তোলার অপেক্ষায় আছে। মূল ফটকের সামনেই ট্রাকের ওজন মাপা হচ্ছে।
ট্রাকে পাথর উত্তোলনকারী শ্রমিকদের সংগঠন লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাদেকুল ইসলামের ভাষ্য, ভারত থেকে পাথর আমদানির কারণে মধ্যপাড়ায় উত্তোলিত পাথর অবিক্রীত থাকছে। আগে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক পাথর দেশের বিভিন্ন স্থানে যেত। বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক পাথর বিক্রি হচ্ছে।
এমজিএমসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) মো. আবু তালেব ফারাজী প্রথম আলোকে বলেন, বিক্রি বাড়াতে পাথরের দাম কমানোর একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সরকারি কাজে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহার করতে বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। এটি নিশ্চিত করা গেলে বিক্রি বাড়বে, মজুতের পরিমাণও কমে আসবে।
মধ্যপাড়ায় বর্তমানে ৫ থেকে ২০ মিলিমিটার (মিমি) পাথর প্রতি টন ২ হাজার ৯৩৮ টাকা, ২০ থেকে ৪০ মিমি ২ হাজার ৭৭০ টাকা এবং ৪০ থেকে ৬০ মিমি ২ হাজার ৬৮৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রতি টন পাথর ট্রাকে তোলার খরচ ৬০ টাকা। চট্টগ্রাম বন্দরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে শুল্কসহ এক টন পাথরের আমদানি খরচ পড়ছে গড়ে ২ হাজার ৫৬৮ টাকা।

Sunday, April 29, 2018
লিচুর বাগানে মৌচাষ by শাহ্ আলম শাহী

ধানের জেলা দিনাজপুরে প্রকৃতির রসগোল্লা খ্যাত লিচুগাছে মৌ চাষে ধুম পড়েছে। ম-ম গন্ধে গাছে গাছে বাতাসে দোল খাচ্ছে লিচুর মুকুল। বেদন, বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না থ্রি, কাঠালীসহ দেশীয় লিচু গাছগুলোতে এবার প্রচুর মুকুল ধরেছে। তাই, লিচু চাষিরা এখন ব্যস্ত লিচু গাছ পরিচর্যায়। চাষিরা এখন কামনা করছে বৃষ্টির। আবহাওয়ার অনুকূলে থাকলে এবার কৃষিবিদরা লিচুর বাম্পার ফলনের আশা করছে।
গাছে থোকা থোকা লিচু মুকুল আগমনই বলে দিচ্ছে এবার লিচুর ভালো ফলন হবে এ জেলায়। তাই দিনাজপুরের লিচু চাষিরা এখন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন লিচু গাছের পরিচর্চায়। অনেকে ছত্রাক নাশক ও কীটনাশক সেপ্র করছে গাছে। লাভজনক ফল হওয়ায় অনেকে ধান ও অন্যান্য ফসলের জমিতে লিচু গাছ লাগিয়েছে। দিনাজপুরের ১৩টি উপজেলায় ৩৩০০ হেক্টর জমিতে রয়েছে লিচুর বাগান। এছাড়াও বসতবাড়িতে ৫৪০ হেক্টর জমিতে লিচু বাগান রয়েছে। ছোট-বড় মিলে সাড়ে ৪ হাজার বাগানে রয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৪ হাজারের বেশি লিচুর গাছ। প্রতি বছর লিচু বিক্রি থেকে অর্জিত হয় অনুমানিক ৯০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার প্রায় ৮ লাখ ৫০২ টন লিচু উৎপাদন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. তৌহিদুল ইকবাল জানান, প্রকৃতি এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার দিনাজপুরে লিচুর ফলন হবে বাম্পার। বেদনা, বোম্বাই, মাদ্রাজি, চায়না থ্রি, কাঠালীসহ দেশীয় লিচু গাছগুলোতে এবার রেকর্ড পরিমাণ ফলন আশা করা হচ্ছে। সদর, বিরল, কাহারোল চিরিরবন্দর, বীরগঞ্জ পার্বতীপুর এলাকার লিচু বাগানগুলোতে প্রচুর মুকুল ধরেছে। লিচুর মুকুল রক্ষা ও রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখতে নিয়মিত লিচু চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। লিচু বাগান পরিচর্যা আর পাহারা দিয়ে ভালো ফলন পাবেন এই প্রত্যাশা বাগান মালিক এবং আগাম অর্থ দিয়ে কেনা লিচু বাগান ক্রেতাদের। এরমধ্যে সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌচাষি এসে বাগানে ছোট বড় বিভিন্ন আকৃতির মৌমাছির বাক্স বসিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৌ চাষ করে মধু সংগ্রহ করছেন। বাগানে তারা শতাধিক ব্রুড ও নিউক্লিয়াস নামের ছোট বড় কাঠের বাক্স স্থাপন করেছেন। প্রতিটি বাক্সে একটি রানী মৌমাছি, একটি পুরুষ মৌমাছি ও অসংখ্য এপিচ মেইলিফ্রা জাতের কর্মী মৌমাছি রয়েছে। কর্মী মৌমাছিরা ম-ম গন্ধে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে যায় লিচুর মুকুলে। পরে মুকুল হতে মধু সংগ্রহ করে মৌমাছির দল নিজ নিজ কলোনিতে মৌচাকে এনে জমা করছে।
১০-১৫ দিন অন্তর প্রতিটি বাক্স হতে চাষিরা ৬-৭ মণ মধু সংগ্রহ করছেন। যে লিচু গাছে মৌমাছির আগমন বেশি হয় সে গাছের মুকুলে পরাগায়ন ভালো হয়। ফলে ওই গাছে বা বাগানে লিচুর যেমন বাম্পার ফলনের সম্ভবনা থাকে, তেমনি মৌ চাষিরা বেশি মধু সংগ্রহ করে বাণিজ্যিকভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারে। জেলার বিভিন্ন বাগান থেকে শতাধিক মৌ চাষি প্রতিদন ১৫ থেকে ২০ মণ মধু সংগ্রহ করে বাজারজাত করছে। কাঠের তৈরি শত শত বিশেষ বাক্সের মাধ্যমে মৌ চাষ মধু সংগ্রহ করা দৃশ্য দেখে এলাকাবাসীও উদগ্রীব হয়ে ছুটে আসছেন মধু কেনার জন্য লিচু বাগানে। ক্রেতা আবুল হোসেন জানান, বাজারে খাঁটি মধু পাওয়া যায় না। তাই নিজ চোখে নির্ভেজাল মধু সংগ্রহ করতে পেরে তারা নিজেকে ধন্য মনে করছেন। কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক গোলাম মোস্তফা জানান, চলতি বছর প্রতিটি লিচু বাগানে ভালো মুকুল এসেছে। আর এ কারণে প্রচুর মৌ মাছির আগমন দেখা দিয়েছে। লিচু গাছ থেকে মৌমাছি মধু আহরণের ফলে গাছে গাছে বেশি করে পরাগায়ন হয় এবং শতকরা ৩০-৪০ ভাগ লিচুর বেশি ফলন হয়। লিচু বাগানে মৌমাছিদের গুণগুণ শব্দে মুখরিত পুরো এলাকা। তবে কোনো বন্য মৌমাছি নয়, বাক্সে চাষ করা শিকারি মৌমাছিই এমন গুঞ্জনে মুখরিত। চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলে লিচুর মুকুলের ওপর নির্ভর করে মৌয়ালরা এসেছে বিভিন্ন জেলা থেকে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে বিরল প্রজাতির রাণী মৌমাছি। মৌয়ালরা নিজেদের সুবিধামতো আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন এলাকার লিচু বাগানে। সেখানে দিনরাত পরিশ্রম করে মধু সংগ্রহ করছে। সরেজমিনে বিরল উপজেলার চেতরা বাজার গেলে চোখে পড়ে মধু সংগ্রহের বাস্তব চিত্র। সেখানে ১০-১৫ জন মৌয়াল বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউবা মুখোশ পরে পুরনো বাক্স থেকে মৌচাক বের করে মধু সংগ্রহের জন্য প্রস্তত করছে। আবার কেউ পুরনো বাক্স বদলিয়ে নতুন বাক্সে মাছিদের জন্য নিরাপদ আবাস্থল তৈরি করছে। মৌয়ালদের মত কর্মী মাছিরাও বসে নেই। মৌমাছিরা দলবেধে ঝাঁকে উড়ে গিয়ে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে বাক্সের চাকে জমিয়ে রাখতে ব্যস্ত রয়েছে। সেখানে মৌমাছি ও মৌয়ালদের কর্ম ব্যস্ততায় উৎসব মুখর হয়ে উঠেছে মধু মৌসুম। এ বিষয়ে কথা হয় সিরাজঞ্জ থেকে আসা মৌয়াল চান মিয়ার সঙ্গে। তিনি জানান, এই লিচু বাগানে মৌমাছির বাক্স রয়েছে ২৫০। এখানে ৭-১০ দিনের মধ্যে বাক্সগুলো থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। এই মধু সংগ্রহ অভিযান চলবে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত। প্রতি সপ্তাতে প্রায় ১২০০ মনেরও বেশি মধু সংগ্রহ করা সম্ভব। তবে ফুলের উপর নির্ভর করে মধুর পরিমাণ। তিনি আরো জানান, চলতি মৌসুমে এই বাগান থেকে ৫৫ মণ মধু সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে তাদের। প্রতি মণ মধুর বিক্রি করা হয় সাড়ে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই মধু দেশের বিভিন্ন কোম্পানির চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ভারতীয় কোস্পানি সস্তা দামে মধু ক্রয় করে বিদেশে রপ্তানি করছে। অথচ মধু কিনে নিচ্ছে আমাদের নিকট থেকে। এছাড়াও এই পেশার সঙ্গে যুব সমাজের একটি বড় অবদান রয়েছে। সরকারিভাবে কোনো পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় সম্ভাবনাময় এই মধু চাষ শিল্পের কোনো অগ্রসর লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। মধু চাষে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে এই শিল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি সম্ভব। তেমনি দূরীকরণ হতো বেকারত্ব সমস্যা।
লিচু এবং মধু দু’টি প্রাকৃতিক সম্পদ- এ দু’টি সম্পদ সংগ্রহ সঠিক প্রশিক্ষণ ও বাজারজাতকরণে বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হলে চাষিরা যেমন লাভবান হবে তেমনি দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে মনে করছেন দিনাজপুরবাসী।
Sunday, February 25, 2018
প্রতিবন্ধী পাঁচ ছেলেকে নিয়ে বিপাকে মোজাম্মেল by শাহ্ আলম শাহী

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার ৪নং আটগাঁও ইউনিয়নের লোহাগাঁও গ্রাম। গ্রামের মৃত এমারউদ্দীনের ছেলে মোজাম্মেল হক ওরফে বুধু। আর বুধুর পরিবারে ৫ প্রতিবন্ধী ছেলে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মোজাম্মেল হক ওরফে বুধু ১৯৯৬ সালে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার বলরামপুর গ্রামে আবেদ আলীর মেয়ে বিউটি আরা খাতুনকে বিয়ে করে।
বিয়ের কিছুদিন পর তাদের ঘরে এক এক করে ৬টি ছেলে সন্তানের জন্ম হয়। একমাত্র তৃতীয় ছেলে রিয়াদ (১৪) ছাড়া বাকি ৫টি ছেলে সন্তানই শারীরিক প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধীরা হলেন, সবচেয়ে বড় ছেলে বিপ্লব (১৮), মিরাজ ওরফে রাসেল (১৫), রাজু (৯), রিশাত (৭) ও জীবন (৪)। একই পরিবারের ৫টি সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেয়ায় গ্রামের কিছু কুসংস্কার মনের মানুষ ভালো চোখে দেখে না তাদের। সমাজে তারা ভালোভাবে খেলাধুলা, মেলামেশা এবং চলতে পারে না অনেকের সঙ্গে। অধিকাংশ সময় বাড়িতেই থেকে সময় কাটাতে হয় তাদের। প্রতিবন্ধী হওয়ায় পিতামাতাকেই দেখাশোনা করতে হয় তাদের। এদিকে সংসারের ৮ জন মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে অসহায় পিতা মোজাম্মেল হক বুধুকে কাজ করতে হয় চায়ের দোকানে। প্রতিদিন হাজিরা ২০০ টাকা দিয়ে তার সংসার চালাতে হয়। মাত্র ২০০ টাকা দিয়ে ৮ জন মানুষকে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত দেয়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে মোজাম্মেলের। চাষাবাদের জন্য বিঘা খানিক জমি বর্গা চুক্তি দিয়ে চাষও করেন তিনি। জীর্ণশীর্ণ একমাত্র কুঁড়েঘরে একত্রে স্বামী-স্ত্রী ও ৬ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন তারা। একই পরিবারের ৫ জন প্রতিবন্ধী মানুষ থাকার পরও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিমুখ আচরণে দীর্ঘদিন ধরে সরকার থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধা পায়নি তারা। অবশেষে বোচাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ফরহাদ হাসান চৌধুরী ইগলুর প্রচেষ্টায় ২০১৫ সালের জুলাই মাস থেকে মিরজা ওরফে রাসেল মাসিক ৫০০ টাকা ও ২০১৭ সালের জুলাই মাস থকে বিব মাসিক ৬০০ টাকা করে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছে উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে। যা থেকে কিছুটা হলেও অভাব লাঘব হয়েছে তাদের।
প্রতিবন্ধীদের মা বিউটি খাতুন জানান, একটি স্বাভাবিক সন্তান মানুষ করতেও খুব কষ্ট করতে হয় কিন্তু পরপর ৫টি প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে যে কি অমানুষিক কষ্ট-দুর্ভোগ পোহাতে হয় তা কেউ অনুভব করেনা! আমার প্রতিবন্ধী ৫ সন্তান যে কি শারীরিক যন্ত্রণায় ভুগেছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাদের সঙ্গে কেউ মিশতে চায় না। খেলাধুলা করে না। বাড়ির বাইরে গেলে অন্যরা তাদের দেখে বিরূপ মন্তব্য করে। কিন্তু প্রতিবন্ধী হলেও তাদের বোঝা হিসেবে না নিয়ে অন্যান্য স্বাভাবিক সন্তানের মতোই মানুষ করতে হচ্ছে তাদের। সমাজের কিছু মানুষ নানা রকম কটূক্তি করে। সহ্য করেই শত দুঃখ-কষ্টের মাঝে দিন পার করতে হচ্ছে আমাদের। প্রতিবন্ধী হিসেবে জন্ম নিলেও প্রতিটি সন্তানকেই মায়ের মমতা দিয়ে ভালোবাসি আমি। তাদের লেখাপড়া জন্য ভর্তি করে দিয়েছি হাট মাধবপুর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলে। সপ্তাহে ৫ দিন স্কুলের অটোতে করেই নিজেই ৫ সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাই ও নিয়ে আসি। তারা এখন স্কুলে যেতে পেরে খুব খুশি। স্কুলে খেলার সাথী ও শিক্ষকদের সঙ্গে মিশতে পেরে তারা এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। প্রতিদিন বাড়িতেও পড়াতে বসাই তাদের।
বাবা-মায়ের ইচ্ছা যতটুকু সম্ভব লেখাপড়া করে তারা যেন সমাজের বোঝা না হয়ে নিজেরাই স্বাবলম্বী হতে পারে। বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীদের সমাজে বোঝা নয় সম্পদ হিসেবে দেখার কারণে এই পরিবারটির মনে আশা জেগেছে তাদের বাকি তিনটি সন্তানই প্রতিবন্ধী ভাতা পাবেন।
লোহাগাঁও গ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবক মিজানুর রশিদ জানান, বর্তমান সরকার যেভাবে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে এগিয়ে এসেছে, তাতে আমরা আশাবাদী এই পরিবারটির দীর্ঘদিনের অভাব অনটন দূর হবে। শুধু সরকার নয়, সমাজের বিত্তবান মানুষকে এদের পাশে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। ৪নং আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কফিল উদ্দীন জানান, আমরা এই অসহায় পরিবারটির পাশে আছি এবং থাকবো। এদের জন্য যা করার দরকার আমাদের পরিষদ তা করবে। বোচাগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আহসান হাবিব জানান, একই পরিবারের ৫ জন প্রতিবন্ধী একটি ব্যতিক্রম বিষয়। ইতিমধ্যে সমাজসেবা অধিদপ্তর বোচাগঞ্জ অফিস থেকে দুজনের ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে বাকি তিন জনকেও ভাতার আওতায় আনা হবে।
‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনে জন্য’ এই উক্তিটি যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি মন থেকে মনে করেন তাহলে সমাজের অবহেলিত এই অসহায় প্রতিবন্ধীদের পাশে এসে দাঁড়াবেন এটাই কাম্য প্রতিবন্ধী পরিবার ও সচেতন মহলের।
Monday, May 22, 2017
প্রধানমন্ত্রীর ছবি বিকৃতি, জামায়াত নেতার মেয়ে গ্রেফতার
Monday, March 6, 2017
দিনাজপুরের ঐতিহাসিক নিদর্শন সীতারকোট বৌদ্ধবিহার by শাহ্ আলম শাহী

জানা যায়, সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে তার রাজ্যের মধ্যে ৮৪ হাজার স্তূপ স্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ঐ সময় থেকে শুরু করে ৬ষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে বহু বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কার্যক্রম শুরু হয়। যার একটি ছিল আলোচিত এই সীতারকোট বৌদ্ধবিহার। নবাবগঞ্জ উপজেলার সদর থেকে পশ্চিম দিকে বিরামপুরগামী রাস্তার উত্তর পার্শ্বে গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের ফতেপুর মাড়াষ মৌজার প্রায় ১ একর ভূমির উপর এই বিহার অবস্থিত। প্রাপ্ত তথ্য জানা যায়, এই বিহার পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা ২১৪ ফুট, উত্তর-দক্ষিণ প্রস্থ ২১২ ফুট। শৌচাগার ছাড়া ছোট-বড় কক্ষের সংখ্যা ৪১টি। বেষ্টনী প্রাচীর সাড়ে ৮ ফুট, সামনে প্রাচীর ৫ ফুট, বারান্দা ৮ ফুট, বারান্দার সামনের প্রাচীর ৫ ফুট প্রশস্ত। কক্ষে প্রবেশের পথ ৩ থেকে ৫ ফুট প্রশস্থ। মূল প্রবেশ পথ উত্তর দিকে। প্রবেশের পথের মুখের দু’পার্শ্বে পাশাপাশি ২টি করে ৪টি কক্ষ আছে। পাটিশন প্রাচীরের প্রশস্থ ৪ ধরনের। ১৩ ফুট ৫ ফুট ও ৪ ফুট। বিহারের ভিতরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটি কূপ ছিল। বর্তমানে কূপটি ভরাট হয়ে গেছে। বিহারের বাইরে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে পাশাপাশি অবস্থিত ৫টি কুটির দেখা যায়। সম্ভবত এগুলো টয়লেট হিসেবে ব্যবহার হতো। মূল মন্দির ছিল দক্ষিণ দিকের মাঝখানে। প্রত্যেক কক্ষের সামনের দেয়াল ব্যতীত বাকি ৩ দেয়ালে তাক কুলঙ্গী ছিল। প্রত্যেক কক্ষে প্রবেশের একটিমাত্র পথ আছে। বিহারের ৪ কোনায় ৪টি কক্ষে বেশ লম্বা পশ্চিম দিকে মাঝের অংশে রয়েছে একটি বড় কক্ষ। তার দক্ষিণে পার্শ্বের কক্ষটি খুব ছোট। এর কোন প্রবেশ পথ নেই। সম্ভবত এই টি গুপ্ত কক্ষ ছিল। সমগ্র ইমারতের গাঁথুনী লম্বা মধ্যম ও ছোট ইট এবং চুন সুরকি দিয়ে নির্মাণশৈলী দেখে গবেষকগণ অনুমান করেন এ বিহার পশ্চিম শতাব্দী কিংবা তার কিছু আগে নির্মিত হয়েছিল। বিহার খননের পরে বা আগে যেসব দ্রব্য পাওয়া গেছে তা হলো নানা ধরনের হিরার বাইশ, মাটির পাত্রের ভাঙ্গা অংশ, মাটির দোয়াত, লোহার পেরেক, নকশা করা মাটির তৈরি মাছ, মাটির পুতুল, নকশা ইট, লোকেশ্বর পাদ্যুপানী ও মজুশ্রী রোজ নির্মিত দু’টি মূর্তিসহ লোহার রিং ও রড। বিহারের পূর্ব দিকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে একটি বিশাল দীঘি রয়েছে, যা শালদীঘি নামে পরিচিত। সেখানে বর্তমানে একটি আশ্রয় কেন্দ্র করা হয়েছে এবং দীঘিটি একজন সরকারী কর্মচারীর আওতায় লিজ রয়েছে। পশ্চিম দিকে একটু বেশি দুরত্বে একটি পুকুর ছিল। এখন তা নেই। উত্তর দিকে জঙ্গলের ওপারে একটি ছোট নিচু জমি দেখা যায়। সম্ভবত সেখানে পুকুর বা জলাশয় ছিল। এই বিহার খননের পূর্ব কথা যা জানা যায় বিহারের উত্তর দিকে মাড়াষ গ্রামে মহিরউদ্দিনের পুত্র তালেব আলীর বাস। তালেব আলী বিহারের পার্শ্বে জমি চাষ করতে গিয়ে একটি জরাজীর্ণ ধারালো অস্ত্র (বাইশ) পান। বাড়িতে নিয়ে ধার দিয়ে তা গৃহস্থালীর কাজে লাগান তালেব আলী। এ ধারালো অস্ত্র দ্বারা ২-১ কোপে বনের বড় বড় শাল গাছ কাটা যেত। বন বিভাগের লোকেরা তা মোটেও টের পেত না। এমতাবস্থায় একদিন ধরা পড়ার পর তালেব আলীকে জিজ্ঞাবাদের একপর্যায়ে বন বিভাগের লোককে ঐ ধারালো অস্ত্র দেখায় বন বিভাগের লোক দেখে অস্ত্র পছন্দ করছিল না পরে তার নিকট থেকে নিয়ে নেই এবং তা পরীক্ষার জন্য কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠান। পরে জানা যায় অস্ত্রটি ছিল হিরার তৈরি বিষয়টি জানাজানি হলে আরো মূল্যবান প্রত্ন মিলতে পারে বলে দিনাজপুর জেলা পরিষদ নিজস্ব অর্থে বিহার এলাকা খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চাকরি দেয়া হয় তালেব আলীকে ঐ বিহার পাহারা দেয়ার। তালেব আলী কয়েক বছর আগে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে। বর্তমান বিহারের পশ্চিম পার্শ্বে বিহার সংলগ্ন গড়ে তোলা হয়েছে একটি মাদরাসা। এলাকার লোকজন জানালেন বিহারের দু-পার্শ্বে দুইটি সাইন বোর্ড ছিল যা চুরি হয়েছে এখনও বিহারের ইট চুরি হয়। বর্তমানে প্রত্ন-তত্ত্ব বিভাগ নতুন একটি সাইন বোর্ড তৈরি করেন। বিহারের জায়গা অনেকে জবর দখল করে খায়। বিহারের ইমারতের জায়গা ছাড়া কিছু জায়গা চাষাবাদের জন্য পত্তনি দেয়া হয়। কিন্তু কেউ কেউ সেগুলোতে বসতবাড়ি করেছে। তবে যারা বাড়ি করছে তা তাদের নিজস্ব জমি বলে দাবি করছে। এলাকাবাসী বলছে, বিহারটি সংস্কার করে দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। হতে পারে পিকনিক কর্ণার। যা থেকে সরকারের রাজস্ব আয় আসবে।
Saturday, October 31, 2015
৪৪ বছর পর কবর খুঁজে পেলেন স্বজনরা
১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে দিনাজপুর-রংপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের দশমাইল মোড়ে সম্মুখ সমরে শহীদ হন তাঁরা।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার ছয় মাস পর তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তর থেকে এই দুজনের পরিবার মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়ার সনদ, দুই হাজার টাকা এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর করা একটি চিঠি পায়। কিন্তু পরিবারের কেউ জানতে পারেনি এই দুজনকে কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে বা আদৌ কবর দেওয়া হয়েছে কিনা। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর অবশেষে স্বজনেরা সন্ধান পেলেন এই দুই শহীদের কবর।
আজ শনিবার দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও-রংপুর মহাসড়কের দশমাইল মোড় নামক স্থানে পরিবারের সদস্যরা এ দুজনের কবরের পাশে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর দুই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিহতদের কবরের সন্ধান দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিনিয়োগ বোর্ডের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মাহবুব কবির মিলন।
মাহবুব কবির মিলন বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সন্ধান করেন। তেমনই একটি ইতিহাসের পেছনে ছুটতে গিয়ে তিনি এই দুই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবরের সন্ধান পান। জানতে পারেন দুই মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সন্ধান পায়নি কেউ। তিনি খোঁজখবর করে দেখেন দিনাজপুরের প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এবং দিনাজপুরের বিজিবি দপ্তরে এই দুই শহীদের ঠিকানার বিষয়ে কোনো রেকর্ড নেই। সম্প্রতি বিজিবির সদর দপ্তর পিলখানার রেকর্ড অফিস থেকে তাঁদের পারিবারিক ঠিকানা বের করা হয়। ল্যান্স নায়েক মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড় মানিকা ইউনিয়নের উত্তর বাটমারা গ্রামে। বাবার নাম সফিউর রহমান। বাবা-মা অনেক আগেই মারা গেছেন। এক ভাই ও এক বোন বেঁচে আছেন। হাবিলদার মিয়া হোসেনের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার খলিশাউর ইউনিয়নের গৌরকান্দা গ্রামে। মিয়া হোসেনের স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে বেঁচে আছেন। পরে তিনি এই ঠিকানায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
মিলন বলেন, ‘পরিবারের কাছে কবরের খবর দিতেই তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রায় এক ঘণ্টা কাঁদেন তাঁরা। ওই মুহূর্তের কথা বলে বোঝাতে পারব না।’
আজ শনিবার সন্ধ্যায় দিনাজপুর দশমাইল মোড়ে দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে দিনাজপুর বিজিবি সেক্টর সদর দপ্তর এর ২ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আখতার ইকবাল, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আবু রায়হান মিয়া, অন্যতম আয়োজক জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মো. সাখাওয়াত হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ দিনাজপুর জেলা কমান্ডার সিদ্দিক গজনবী ও সাবেক কমান্ডার এম এ জলিলসহ বিশিষ্টজনরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা দুই শহীদের কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধা ল্যান্স নায়েক মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ছোট ভাই অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসা শিক্ষক মো. নাছির হোসেন বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৬ মাস পর বিডিআর সদর দপ্তর থেকে বড় ভাই শহীদ হওয়ার সনদ, দুই হাজার টাকা এবং বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বাড়ির ঠিকানায় আসে। এরপর ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত বাবা এবং বাবার মৃত্যুর পর ২০০২ সাল পর্যন্ত মা ছেলের পেনশনের টাকা পান। কিন্তু আজ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো ভাতা পাননি। তিনি বলেন, সেই সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে ছিল বিডিআরের দপ্তর। যুদ্ধের পরে তিনি ভাইয়ের খোঁজ নিয়েছেন। তাঁর ভাই শহীদ হয়েছেন শুধু সেটাই জানানো হয়েছে। কিন্তু কোথায় নিহত হয়েছেন, কীভাবে নিহত হয়েছেন, সেটা কেউ জানাতে পারেননি।
শহীদ হাবিলদার মো. মিয়া হোসেনের স্ত্রী মোসাম্মৎ শামসুন নাহার (৬৫), ছেলে মো. শাহজাহান মিয়া (৪৬), মেয়ে সুফিয়া খাতুন (৪৬), পূর্বধলা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. নিজামুদ্দিনসহ পরিবারের সদস্যরা নেত্রকোনা জেলা থেকে দিনাজপুরে আসেন স্বজনের কবরের কাছে। মিয়া হোসেনের স্ত্রী বলেন, সে সময় মাত্র দু বছর ছিল চাকরির মেয়াদ। এর মধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যুদ্ধের এক মাস আগে তিনি শেষবার যখন বাড়ি থেকে দিনাজপুর যান তখন তাঁর ব্যাংকের ও চাকরি কাগজপত্র সব সঙ্গে নিয়ে যান। বলেছিলেন, ‘যাচ্ছি, দু বছর পর চাকরি শেষ হবে, তখন পেনশনের টাকা ও ব্যাংকের টাকা সব একসঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরব’। এরপর যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ শেষে স্বামীর কোনো কিছুই আর তিনি জানতেন না। তৎকালীন জেলা প্রশাসক, থানা এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদে অনেক খোঁজ করেছেন। কেউ তাঁদের কোনো হদিস দিতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘তাঁর কবরে আমরা আসতে পারছি, ফাতেহা পাঠ করতে পারছি এটাই শান্তি’।
১৯৭১ সালের সেদিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দিনাজপুর জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নিহতদের সঙ্গে ওই দিন একসঙ্গে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনিও। তিনি বলেন, পাক হানাদার বাহিনীর নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর সেনাক্যাম্প থেকে দশমাইল মোড় হয়ে পাকিস্তানি পাক হানাদার বাহিনীর দিনাজপুরে প্রবেশের চেষ্টা করে। হানাদার বাহিনীর প্রবেশ রুখতে ইপিআর, মুজাহিদ, পুলিশ ও মুক্তিযোদ্ধা-জনতা দিনাজপুর-রংপুর-ঠাকুরগাঁও মহাসড়কের দশমাইল মোড়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। প্রচণ্ড লড়াই হয়। সেই সম্মুখ সমরে পাক হানাদার বাহিনীর একটি কামানের গোলায় নিহত হন দিনাজপুর কর্মরত তৎকালীন ইপিআর এর ল্যান্স নায়েক মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং হাবিলদার মো. মিয়া হোসেন। স্থানীয়রা দশমাইল মোড়ে মহাসড়কের পাশে তাঁদের কবর দেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে দিনাজপুর বিডিআরের উদ্যোগে কবর দুটি পাকা করা হয়। বাঁধানো কবরে তাঁদের নামফলকে ঠিকানা লেখা আছে-‘শহীদ হাবিলদার মিয়া হোসেন। বাড়ি ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ’। আর ‘ল্যান্স নায়েক মো. মোস্তাফিজুর রহমান। বাড়ি ঝালকাঠি-বরিশাল’। ‘শহীদ হন ১২-০৪-১৯৭১।’
Friday, August 7, 2015
এক ভয়ার্ত সাঁওতালপল্লি থেকে বলছি... by ফারুক ওয়াসিফ
![]() |
| অনিশ্চয়তার মুখে এ রকমই থতমত সমতলের আদিবাসীরা |
সবার চোখের জলই সমান নোনা, সবার রক্তই সমান লাল। কিন্তু তা হয়তো নয়। উত্তরবঙ্গের পার্বতীপুরের গহিন মেঠোপথের মাথায় যে গ্রামটির নাম চিড়াকুটা, সেখানকার মানুষের সবই কম। তাদের জমি কম, রক্ত কম লাল, চোখের পানি কম নোনা, অত্যাচার-নির্যাতনও যেন তাদের গা-সওয়া। কমই যদি না হবে, তাহলে এত সহ্য করে কীভাবে? বাঙালির পক্ষে বাঙালি, মুসলমানের ডাক আরেক মুসলমানে শোনে, হিন্দু ও খ্রিষ্টানদেরও সহায়-শক্তি আছে এ দেশে—কিন্তু আদিবাসী সাঁওতালদের কিছুই নেই। চিড়াকুটার সাঁওতাল উচ্ছেদ হলে শিমুলজুড়ির সাঁওতালেরা তাদের আশ্রয় দিতে ভয় পায়। এত ‘নেই’-এর মধ্যেও খুব করে ‘আছে’ তাদের গায়ের রং, চেহারার ধাঁচ আর সাঁওতালি ভাষার বুলি। এই থাকাতেই মস্ত বিপদ। হোটেল-রেস্তোরাঁয় তাদের পাতে কেউ খায় না। তাদের কোনো যুবকের স্বজাতির বাইরের কাউকে ভালোবাসা মানে মৃত্যু ডেকে আনা। তাদের মর্যাদা ও সম্পত্তি দুটোই যেন লুটপাটের বিষয়।
এ বছরের ২৪ জানুয়ারির ঘটনা। সকালবেলা চিড়াকুটার কৃষকেরা তাঁদের জমিতে গিয়ে দেখেন, পাশের গ্রামের জনৈক জিয়ারুল-জহুরুল ভ্রাতৃদ্বয় লোকজন নিয়ে হাল চষা শুরু করেছেন। বাধা দিলে তাঁদের একজন পিস্তল বের করেন। সাঁওতালি রক্তে সুপ্ত হুলের স্মৃতি জেগে ওঠে। সাঁওতালি তিরে এক বাঙালির প্রাণ যায়। যথারীতি পুলিশ এসে ২৩ সাঁওতালকে আটক করে। পুলিশ যাওয়ামাত্রই চারপাশের হাজার হাজার বাঙালি মুসলমান নামধারী হামলাকারী ‘পিঁপড়ার মতো আসি’ ঘরদোর লুট করে, বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, ছিনিয়ে নেয় গবাদিপশুসহ অস্থাবর সব সম্পদ। তারপরও অটুট তাদের অপার্থিব সরলতা, সাঁওতালি ঐক্য আর আধুনিক হাহাকার।
এর প্রায় পাঁচ মাস পর ১ জুলাই চিড়াকুটায় গিয়ে পেলাম মধ্যবয়সী চ্যালচিউস হেমব্রমকে। কথা বলতে বলতে উত্তেজনায় তড়পাচ্ছিলেন। বলছিলেন ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের বীর নেতা সিধো-কানো-চাঁদ-ভৈরব ভাই ও তাঁদের ফুলমণি বোনের কথা। কিন্তু যেই বললাম, ‘আপনারা তো সংখ্যায় কম, পারবেন কী করে?’ বাতাস–হারা পতাকা যেমন মিইয়ে পড়ে, লোকটার গলার স্বরও তেমনি নেমে যায়: ‘ওদিকে ভারত এদিকে বাংলাদেশ, কী করব, কোথায় যাব? সংখ্যায় তো আমরা কম! আমারও মারবা ইচ্ছা করে, কিন্তু পারি না!’
পার্বতীপুর থেকে রওনা দিলে মোটরসাইকেলে দুই ঘণ্টার পথ চিড়াকুটা। পথের মধ্যে অবিরত সবুজের সমারোহ, বৃষ্টিভেজা খেতগুলো ধান রোপার জন্য প্রস্তুত। মাটির বা পাকা রাস্তার ওপর ধানের খড় আর ভুট্টা শুকাতে দেওয়া। বৃষ্টিজমা খেতে বা খালে বাচ্চা-বুড়ো মাছ ধরছে। কোথাও কোনো বিপর্যয়ের চিহ্ন নেই। শুধু চিড়াকুটা গ্রামের জমিগুলো ফাঁকা, চাষবাস বন্ধ। পুরো গ্রামে সরকারি স্কুলঘরে পুলিশ ক্যাম্প। আরও এগোলে সাঁওতালপল্লির মাটির ঘরবাড়ি। পাঁচ মাস আগের আগুনের দাগ এখনো এদিকে-ওদিকে। কয়েকটি অঙ্গার হওয়া গাছ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাঙাচোরা টিনের বেড়া, চালহীন কিছু ঘর সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাঁচ মাসেও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। সেদিনের পর এলিজাবেথ টুডুর রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না। দুঃস্বপ্নের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে সেদিনের হামলার স্মৃতি।
মধ্যবয়সী বিমলা মুর্মুর চোখে এখনো ভাসে সেই সব দৃশ্য: ‘হিসাব ছাড়া লোক আসছে সেদিন আমার ঘরে। আমার দুই ড্রাম চাল, টিভি, সাইকেল, সেলাই মেশিন, হাঁড়িকুড়ি, জামা-কাপড়—সব নিয়ে গেছে।’ গ্রামের মধ্যে এটিই সবচেয়ে অবস্থাপন্ন বাড়ি। গ্রামের একমাত্র টেলিভিশনটাও তাদেরই ছিল। বিমলার দুঃখ, ‘সেলাই মেশিন আমার জান, সেটাও নিয়ে গেল! তারা আমার পায়ে বাড়ি দিল, গলায় টিপে ধরে কোমরে হাত দিয়ে মোবাইল নিতে গেল। আমি দৌড় দিলাম—এত পুরুষ আমার পেছনে। কেউ বলতেছে ম্যারা ফেল। তখন লালমাটি গ্রামের মোস্তফা চৌকিদার আমারে বাঁচাইল! কিন্তু মোবাইল আর পাইলাম না।’
৬৫ বছরের বৃদ্ধ লক্ষণ টুডুর হাহাকার লুট হওয়া পোয়াতি গরুটার জন্য। ‘এত দিনে গরুটা মনে হয় বিয়াইছে’ বলে হাতের লাঠি দিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি করতে থাকেন। মেসেস টুডুর বিমারি স্বামী জেলখানায়, বাড়িটা মাটির সঙ্গে মেশানো, ওর মধ্যেই ছিল তাঁর খাসি বিক্রির ১০ হাজার টাকা—তা–ও পুড়েছে। ওদের ধারণা, এখন যারা গ্রাম পাহারা দিচ্ছে তারা তাদের পুলিশ, আর যারা গ্রামবাসীদের ধরে নিয়ে গেছে তারা ‘ওদের পুলিশ’। ওদের ধারণা, ‘বঙ্গবন্ধু দেশের ব্যাপার আর সিধো-কানো সংস্কৃতির ব্যাপার।’ ওদের ধারণা, ‘যা বলব সত্যই বলব, মিথ্যা বলব কেন?’ ওদের ধারণা, বউ পেটানো ছাড়া আর কোনো অপরাধ তারা করে না। ওরা মনে করে, সাঁওতালদের মধ্যে কানা-খোঁড়া, চোর-ডাকাত-ভিখারি কিছু নাই। ওদের ধারণা, মারামারি-লুটপাট করলে ‘নিজের জাতের ওপরই ঘিন্না লাগবে!’ ওদের বিশ্বাস, ‘আমরা জয় পাব, কারণ সরেজমিনে লড়াই করছি, আর ওরা তো ভূমিদস্যু।’
অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঁওতালেরা পাকিস্তানি মিলিটারি হটিয়ে রংপুরকে অল্প সময়ের জন্য স্বাধীন করেছিল। কিছুদিন আগেও গ্রামে ফুটবল খেলা হলে সাঁওতাল-বাঙালি মিলেমিশে ‘লাফাত’। জাত নিয়ে ছি ছি করত না! কিন্তু মাঝখানে চলে এসেছে ভূমি। সেই ইংরেজ আমল থেকে জমির অধিকার, অরণ্যের অধিকার, মর্যাদার অধিকার বাঁচাতে সাঁওতালেরা লড়ে যাচ্ছে।
দুই...
আগের দিন ছিল ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৬০তম বছরপূর্তি। এ উপলক্ষে দিনাজপুর শহরে জমায়েত হয়েছিল কয়েক হাজার সাঁওতাল নারী-পুরুষ-শিশু। দূর-দূরান্তের গ্রাম থেকে বাসে করে, ভটভটিতে চড়ে তারা এসেছে রোদে পুড়তে পুড়তে। এর আয়োজন করে আদিবাসী পরিষদ ও দিনাজপুরের নাগরিক সমাজ। তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, গ্রাম বিকাশ কেন্দ্রসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। সবার দাবি, সমতলের আদিবাসীদের জন্য স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন হোক। সেখানে যতজনের সঙ্গে কথা বলেছি, অধিকাংশেরই জমি নিয়ে হয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, নয়তো এলাকার প্রভাবশালী বাঙালিদের সঙ্গে বিরোধ চলছে। কোথাও সরকারের বন বিভাগ তাদের জমিকে বনাঞ্চল ঘোষণা করে দখলে নিচ্ছে। দিনাজপুরের হাজী দানেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পাটকলসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই সাঁওতালদের জমির ওপর নির্মিত।
এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী তাঁদের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে দাবি করলেন, ৮০ শতাংশ সাঁওতালি জমি নিয়েই গন্ডগোল চলছে। চিড়াকুটার যে ৪৩ একর ৩৩ শতক জমি নিয়ে বিবাদ, তার ১৯ একর ১৭ শতক জমিতে অনাদিকাল থেকে সাঁওতালেরাই চাষবাস করছিল। কিন্তু বিষয়বুদ্ধি নেই বলে, আর শিক্ষা-দীক্ষার অভাবে এসব জমির দলিল-রেকর্ড তারা করে উঠতে পারেনি। আর পারলেই-বা কী, ভূমি দপ্তর, সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে নকল দলিলের ভিত্তিতে সেই সব জমি কেড়ে নেওয়া খুবই সহজ। আমেরিকায় একসময় স্বর্ণ শিকারিরা গোল্ড রাশের জন্ম দিয়েছিল, বাংলাদেশে এখন চলছে ভূমিদস্যুদের ল্যান্ড রাশ তথা ভূমিগ্রাসের ছিনিমিনি খেলা। এই খেলায় সাঁওতাল-আদিবাসীসহ প্রান্তিক হিন্দু-মুসলমান বাঙালির জেতার সম্ভাবনা খুবই কম।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা নিরসনে একটা ভূমি কমিশন সরকার গঠন করেছে। অনুরূপ কমিশন সাঁওতালদেরও দাবি। এর জন্য আইন লাগবে, লাগবে ভূমি প্রশাসনের দুর্নীতি বন্ধ করা। কিন্তু কে করবে?
তিন...
দিনাজপুর থেকে পার্বতীপুরে যাওয়ার পথে এক স্কুলের মাঠে দুজন মানুষকে ঘুরে ঘুরে ঢোল আর মাদল বাজাতে দেখে থামি। মাঠের প্রান্তে সাদা কাপড়ের প্যান্ডেলে প্রমাণ আকারের দুই যোদ্ধামূর্তি। হাতে তির-ধনুক আর পুরু গোঁফ দেখে চিনতে পারি, সাঁওতাল বিদ্রোহের নায়ক, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের পথপ্রদর্শক সিধো ও কানোর মূর্তি। পাশেই আদিবাসী কমিউনিটি সেন্টার। সেখানকার মণ্ডপে প্রতি সন্ধ্যায় বাতি দেওয়া হয়, ঢোল-মাদলের নাচে আর পুষ্পে সাঁওতালদের জাতীয় বীরদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। মাঠের দুই পাশে বালক ও বালিকাদের জন্য আলাদা দুটি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় ও কমিউনিটি সেন্টারের এত জমি কোথা থেকে এল? জটলার ভেতর থেকে জবাব দিলেন হাড্ডিসার প্রৌঢ় একজন। হাসতে হাসতে বুকে হাত দিয়ে বললেন, ‘আমি দিসি।’
অবাক চোখে লুঙ্গি-শার্ট পরা ছোটখাটো মানুষটার ফোকলা মুখটায় তাকিয়ে থাকি।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, ঢোল-মাদল নিয়ে ওরা উঠে দাঁড়াল। কোথায় যায়? বলে, নসিপুরে এক বাড়িতে বিয়া। সেখানে বাজনা বাজাব, নাচব। আর কী করব?
হারিয়ে ফেলার আগেই এই আদিবাসী দাতা হাতেম তাইয়ের নাম জানতে চাইলাম। আকাশি রঙের শার্টের বুক পকেটের কাছটায় আবারও হাত দিয়ে মানুষটা উত্তর করে, ‘আমার দাদা ডুলু মুর্মু, বাবা মঙ্গল মুর্মু আর আমি নরেশ মুর্মু। এই সব জমি আমাদের দান।’
এখন কত জমি আছে আপনার?
চলে যাওয়ার আগে অবলীলায় হা হা হা হেসে লোকটা বলে, ‘কিসসু নাই।’
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com
Saturday, July 18, 2015
ঈদে বিজিবি-বিএসএফের মিষ্টিবিনিময়
Monday, July 13, 2015
লাচ্ছা সেমাই তৈরি হচ্ছে যেভাবে by শাহ্ আলম শাহী
এ ব্যাপারে বেকারি মালিক সমিতির সভাপতি সাইফুল্লাহ জানিয়েছেন, আমরা সনাতন পদ্ধতিতে পা দিয়ে মাড়িয়ে লাচ্ছা তৈরি বর্জন করেছি। তাই অনেকে এখন মেশিন দিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত লাচ্ছা সেমাই তৈরি করছে। যারা বিএসটিআই’র অনুমোদন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে লাচ্ছা তৈরি করছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কঠোর হস্তক্ষেপ গ্রহণ করুক, এটা আমরা চাই। এ ব্যাপারে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।
অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ফাঁকি দিতে অধিকাংশ লাচ্ছা তৈরির কারখানায় রাতের আঁধারে ময়দা খামিরের কাজ করছে শ্রমিকরা। আর সারাদিন চলছে লাচ্ছা তৈরি ও ভাজার কাজ। তবে দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মীর খায়রুল আলম এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা বাঁচতে চাই। তাই চাই, বিষমুক্ত খাবার। এজন্য আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। প্রতিরোধ গড়তে হবে বিষযুক্ত খাবারের বিরুদ্ধে। তাই, স্থানীয় প্রশাসন প্রতিনিয়ত লাচ্ছা সেমাই তৈরীর কারখানাগুলোতে অভিযান অব্যাহত রেখেছে। মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান মেশানো বা অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে লাচ্ছা তৈরি করা হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে
Sunday, July 12, 2015
বিক্রির শীর্ষে কিরণমালা by এস এম জাকির হোসেন
এবার ফুলবাড়ী বাজারে শাড়ি, থ্রি-পিস, সালোয়ার, কামিজ, জিন্স প্যান্ট, টি-শার্ট প্রভৃতি কাপড়ের আইটেমসহ রকমারি জুতা-স্যান্ডেলের সমাহার হয়েছে। বাচ্চাদের কাপড়ের মধ্যে গতবছরের আকর্ষণীয় ডিজাইন ও বাহারি কাপড়ের সমাহার যেমন রয়েছে তেমনি নিত্য নতুন নামেও এবার রয়েছে বাচ্চাদের অনেক আইটেমের কাপড়। তবে সব কিছুকে ছাড়িয়ে এবার কিরণমালা জয়-জয়কার সব বয়সের বাচ্চাদের কাছে। পুরো মার্কেট যেন কিরণমালা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। তবে দাম বেশি হওয়ায় এই সব পোশাক সব ধরনের ক্রেতারা কিনতে পারছেন না বলে আফসোস করে ফিরে যাচ্ছেন। ১ বছরের শিশু থেকে ১২/১৪ বছরের বাচ্চাদের ১ সেট পোশাক বিক্রি হচ্ছে ৬’শ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন দোকানদার জানান, শুধু কিরণমালার বিক্রি বেশি বিধায় সব ধরনের পোশাকে কিরণমালার স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। পাঞ্জাবির দোকানগুলোতে পাঞ্জাবির পাশাপাশি ট্রাউজার ও জুড়িধার পায়জামা বিক্রি হচ্ছে বেশি। এবার পাঞ্জাবির বাজারে সুতি পাঞ্জাবির চাহিদাই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাঞ্জাবির মধ্যে মোদি পাঞ্জাবি, পুষ্পকলি, জিপসী, অক্টোপাস, মাসাককালী প্রভৃতির চাহিদা রয়েছে। জেন্টস ফ্যাশনের মালিক জাহিদ হোসেন জানান, এখন পুরোদমে বেচাকেনা শুরু হয়েছে। ক্রমান্বয়ে বাজারে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। তবে দাম বেশি হওয়ায় ফ্যাশন পাঞ্জাবি ও রেডিমেট ফ্যাশন পোশাকের বিক্রি কম হচ্ছে। শুধু কিরণমালা আইটেমের পোশাক দিতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানান। এবার মোদি পাঞ্জাবি ১৫শ’ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঞ্জাবি নিম্নে ৭’শ থেকে উপরে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
পৌরবাজারে অভিজাত জুতার দোকান সৌখিন সু-হাউজের মালিক ফুলবাড়ী থানা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র মো. মানিক সরকার বলেন, দেরিতে হলেও ফুলবাড়ীতে ঈদের বাজার ক্রমেই জমে উঠেছে। ক্রেতারা নেড়ে চেড়ে দেখছেন এবং তুলনামূলক কম দামের স্যান্ডেল- জুতা বেশি কিনছেন। তবে ক্রেতাদের মধ্যে বেলাল জানান, দাম বেশি হওয়ার জন্য পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও মনের মতো স্যান্ডেল কেনা যাচ্ছে না। সাধ্যের মধ্যে একটু কম দামে স্যান্ডেল কিনেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। ফুলবাড়ীর ২টি অভিজাত টেইলার্স ভিআইপি ও বেনিসন, জিএম লেডিস টেইলার্স তাদের অর্ডার নেয়া এখন বন্ধ করে দিয়েছে। শাড়ি কাপড়ের দোকানের মধ্যে রমণী শাড়িঘর, মনে রেখো শাড়িঘর, সুলভ বস্ত্রালয়, লাকী বস্ত্রালয়, বধূ সাজঘর এই দোকানগুলোতে বেশি ক্রেতার ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কারণ ক্রেতাদেরকে এই সব দোকানেও আক্ষেপ করে বলতে শোনা গেছে সব কাপড়ের দাম বেশি, কেনার সাধ্য নেই। বিক্রেতারা বলছেন- পাইকারি মোকামেই বেশি দামে এবার ঈদ মার্কেটের কেনাকাটা করতে হয়েছে। তাই আমাদের কিছু করার নেই। ন্যূনতম লাভেই আমরা বেচাবিক্রি করার চেষ্টা করছি। এবার ফুলবাড়ী বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে তরুণ-তরুণীদের ভিড়ই বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে স্কুল- কলেজ বন্ধ থাকায় তরুণীরা দল বেঁধে দোকানগুলোতে কেনাকাটা করছে। কম-বেশি সকল কেনাকাটা শেষ করে মেয়েরা এখন ছুটছে তাদের রূপচর্চার দিকে। ফুলবাড়ীতে বিবিয়ানা, শাহানাজ, ফেমিনা বিউটি পার্লারগুলোতে ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদিকে ফুলবাড়ী বাজারে ছেলেদের রূপচর্চার জন্য জেন্টস পার্লার রয়েছে। সেখানেও ভিড় করছে ছেলেরা।
Friday, June 26, 2015
দিনাজপুরে তিন সপ্তাহে ১১ শিশুর মৃত্যু, তোলপাড়- বিষমিশ্রিত লিচু না অন্য কিছু by শাহ্ আলম শাহী
অবশ্য আইইডিসিআর গবেষক দল বলছে, মৃত শিশুদের পরিবারগুলো দরিদ্র। এ কারণে তারা পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম রাখে। লিচু বাগানের অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশকের প্রভাব এবং ঝরে পড়া ফাটা লিচু শিশুরা কুড়িয়ে খেয়ে অসুস্থ হয়ে থাকতে পারে। এ কারণে তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঘটনার পর আইইডিসিআর গবেষক দল দুদফায় আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবক ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এলাকার শিশুদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ, লিচু বাগান পরিদর্শন এবং লিচু সংগ্রহ করেছেন। পরে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
ঘটনার পর সরজমিন পরিদর্শন করা হয় বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের পূর্ব সাদুল্ল্যাপাড়া গ্রাম। সেই গ্রামের মৃত শিশু স্বপন আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের বাড়িটি লিচু বাগানবেষ্টিত। বাড়ির চারপাশে প্রায় ২০০ গাছের দুটি লিচু বাগান রয়েছে।
মৃতের পিতা রবি চান জানিয়েছেন, ঘটনার দিন তার ছেলে খেলাধুলা করলেও অসুস্থ ছিল না। রাত ১০টার দিকে হঠাৎ করে প্রচণ্ড খিঁচুনি ও কাঁপুনি উঠলে চিৎকার করতে তাকে। এরপর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থায় তাকে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে রাতেই সে মারা যায়। মৃত স্বপন আলীর সহপাঠী মাসুদ জানায়, তারা সারা দিন লিচু বাগানে খেলা করে এবং সেখানে পড়ে থাকা লিচু খেয়েছিল। একই এলাকার ধুলট দাসপাড়া গ্রামের গজেন চন্দ্র দাস জানান, তার একমাত্র সন্তান ফুল কুমারের প্রচণ্ড খিঁচুনি ও কাঁপুনি উঠলে চিৎকার করতে শুরু করে। এরপর তার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থায় প্রথমে তাকে দিনাজপুর সদরের অরবিন্দু শিশু হাসাপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে একদিন থাকার পর দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুদিন পর সে মারা যায়।
গজেন চন্দ্র দাস জানান, তিনি লিচু বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কাজ শেষে বাড়িতে ফেরার পথে সন্তানের জন্য কিছু লিচু নিয়ে আসেন। লিচু বাগানে কাজ করার সময় মালিক বিষ প্রয়োগ করেন। ব্যবহারের পর বাগান মালিক বিষের প্যাকেট ও বোতলগুলো লুকিয়ে রাখেন।
এ ব্যাপারে বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, এ ধরনের অভিযোগ তারা পেয়েছেন। সম্ভবত ভারত থেকে চোরাই পথে এসব বিষ এনে ব্যবহার করা হয়। বিষয়টি জানার পর বাগান মালিক ও লিচু ব্যবসায়ীদের নিয়ে তারা মতবিনিময় করেছেন। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিচুবাগান এলাকায় সভা-সমাবেশ করেছেন।
দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সিদ্দিকুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি মাসে অজ্ঞাত রোগ নিয়ে ১২ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এদের মধ্যে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার পর সরকারের রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) গবেষক দল দুদফায় আক্রান্ত শিশুদের বাড়ি পরিদর্শন করেছে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়ে আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে কোন তথ্য তাদের দেয়া হয়নি। তিনি জানান, গত ২৯শে মে থেকে ১৮ই জুন পর্যন্ত দিনাজপুরের বিরল, বীরগঞ্জ, খানসামা, কাহারোল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অজ্ঞাত রোগে আক্রান্ত ১২ শিশু ভর্তি হয়। এদের মধ্যে বীরগঞ্জ উপজেলার পাল্টাপুর ইউনিয়নের ধুলট দাসপাড়া গ্রামের গজেন চন্দ্র দাসের ছেলে ফুল কুমার (২), একই এলাকার সেন গ্রামের আবদুল হকের মেয়ে শামিমা (৫), সনকা গ্রামের আবু তালেবের ছেলে মামুন (৫), সাদুল্ল্যাপাড়া গ্রামের রবি চানের ছেলে স্বপন আলী (৫), কাহারোল উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের জিয়ারুল ইসলামের মেয়ে ইয়াসমিন (৪), চিরিরবন্দর উপজেলার ডগনবাড়ী গ্রামের আমানুল হকের ছেলে আবু সায়েম (৪), বিরল উপজেলার নুরপুর গ্রামের আলমের মেয়ে মিনারা (২), সদর উপজেলার মাধবমাটি গ্রামের আজিবর রহমানের ছেলে সামিউল (২) ও একই এলাকার রুবেল হাসানের ছেলে সাকিব (৩) এবং পার্বতীপুর উপজেলার জুরাই গ্রামের জোবাইদুর রহমানের মেয়ে জেরিন (৫) মারা যায়।
তবে অসুস্থ ১২ শিশুর মধ্যে ১১ জন মারা গেলেও কাহারোল উপজেলার পূর্ব সাদিপুর গ্রামের খায়রুল ইসলামের মেয়ে নিধি (৩) বেঁচে আছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, না জানিয়ে তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আইইডিসিআরের গবেষকরা জানিয়েছেন, যারা লিচু বাগানে ছিটানো কীটনাশক ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হয়েছিল তারাই এ ঘটনার শিকার। আইইডিসিআরের গবেষকদের মতে, বর্তমানে লিচু বাগানে ২৩ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এর বাইরেও কিছু অপরিচিত কীটনাশক ব্যবহার করছেন চাষিরা। এছাড়া এন্টি ফাঙ্গাল, গ্রোথ হরমোন নাম দিয়ে আরও কিছু রাসায়নিক ব্যবহার হচ্ছে যেগুলো স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যারা মারা গেছে, তারা দেড় থেকে ৬ বছর বয়সী শিশু। গত ২৯শে মে থেকে ১৮ই জুনের মধ্যে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় তারা।
এ ব্যাপারে আইইডিসিআরের গবেষক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মাহমুদুর রহমান জানান, নিহত শিশুরা কীটনাশক ছিটানো লিচু বাগানের আশপাশে গিয়ে বিষে আক্রান্ত হয়েছিল। মৃত শিশুদের রক্ত ও লিচু পরীক্ষায় বিষাক্ত কীটনাশকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, ওই শিশুদের বাড়ি ও লিচু বাগান পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে তাদের মৃত্যুর কারণ কীটনাশক মিশ্রিত লিচুর সংস্পর্শ বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। মাহমুদুর রহমান জানান, সরজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে যে ওই শিশুদের প্রত্যেকের বাড়ি লিচু বাগানসংলগ্ন। তারা লিচু বাগানে বিচরণ করেছে, লিচু খেয়েছেও। ওসব লিচু বাগানে ব্যাপক মাত্রায় কীটনাশক ছিটানো হয়েছিল।
এর আগে ২০১২ সালেও লিচু বাগানে ছিটানো কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় ২২ দিনে ১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল বলে আইইডিসিআর জানিয়েছে।
BNM Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1536)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...









