Showing posts with label জনস্বাস্থ্য. Show all posts
Showing posts with label জনস্বাস্থ্য. Show all posts

Tuesday, August 25, 2026

পুরুষ বন্ধ্যত্ব কেন হয়, সমাধান কী by ডা. অবন্তি ঘোষ

পুরুষের বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতি কমে গেলে, কিংবা কখনো বীর্যে কোনো শুক্রাণুই শনাক্ত না হলে এবং স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে নিয়মিত সহবাস করার পরও এক বছরের মধ্যে গর্ভধারণ না হলে ওই অবস্থাকে পুরুষ বন্ধ্যত্ব বা মেল ইনফার্টিলিটি বলা হয়। সব বন্ধ্যত্ব-দম্পতির ক্ষেত্রে ৩০-৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষজনিত কারণই দায়ী।

কারণ

● অতিরিক্ত ধূমপান করা।

● অ্যালকোহল, নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করা।

● কম সক্রিয় জীবনযাপন।

● ওজনাধিক্য।

● অতিরিক্ত স্ট্রেস।

● হরমোনজনিত সমস্যা (টেস্টোস্টেরন, থাইরয়েড, প্রোলাকটিন)।

● জিনগত কারণ।

● সংক্রমণ যেমন ক্ল্যামাইডিয়া, গনোরিয়া ইত্যাদি।

● শুক্রনালির ব্লকেজ।

● অণ্ডকোষের টিউমার, ভেরিকোসিলি, মামস অরকাইটিস।

● দীর্ঘ সময় গরম আবহাওয়ায় কাজ করা।

কীভাবে শনাক্ত করা হয়

বীর্য পরীক্ষার মাধ্যমে পুরুষ বন্ধ্যত্ব শনাক্ত করা সম্ভব। এর নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। তিন দিন সহবাস বন্ধ রেখে বীর্য পরীক্ষা করতে হবে। একটি বীর্য পরীক্ষার রিপোর্ট যদি খারাপ আসে তাহলে এক মাস পরে আরেকটি বীর্য পরীক্ষা করতে হবে। সেটিও যদি খারাপ আসে তাহলে অণ্ডকোষের আলট্রাসনোগ্রাফি ও হরমোন পরীক্ষা করতে হবে।

যা করতে হবে

* ওজন কমানো, প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটাচলা করা, সবুজ শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া, তৈলাক্ত ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা।

* স্ট্রেস কমানো এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা।

* ধূমপান, মদ্যপান পরিহার করা।

* শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতির উন্নতির জন্য কিছু মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট দেওয়া হয়। যেমন লেবোকারনিটিন, ভিটামিন সি, ই, ডি, বি কমপ্লেক্স, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।

* তিন মাস পর্যবেক্ষণের পর যদি শুক্রাণুর সংখ্যার উন্নতি না হয়, তাহলে ইন্ট্রাইউটেরাইন ইনসেমিনেশন বা আইভিএফ/ইকসি করা যেতে পারে।

* ভেরিকোসিলি (অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়া) বা শুক্রনালি বন্ধ। এ-জাতীয় সমস্যা থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সার্জারি লাগতে পারে।

* হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে এর চিকিৎসা করতে হবে।

* যদি শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতির মাঝারি ধরনের সমস্যা থাকে, তবে সাধারণত আইইউআই এবং যদি শুক্রাণুর সংখ্যা বা গতির অনেক বেশি সমস্যা থাকে তবে ইকসি করা হয়।

* কিছু ক্ষেত্রে বীর্যে কোনো শুক্রাণুই পাওয়া যায় না, যাকে অ্যাজোস্পারমিয়া বলা হয়, সে ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ থেকে শুক্রাণু নিয়ে ইকসি করা হয়।

* ডা. অবন্তি ঘোষ, গাইনি, প্রসূতি ও বন্ধ্যত্ব রোগবিশেষজ্ঞ, আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2024-09-02%2Fg4mui9cd%2FThumb.jpg?rect=132%2C0%2C1350%2C900&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সব বন্ধ্যত্ব-দম্পতির ক্ষেত্রে ৩০-৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষজনিত কারণই দায়ী। ছবি: আনস্প্ল্যাশ

Friday, August 21, 2026

ঘাড়, কোমর, হাঁটু বা কাঁধের ব্যথা বারবার ফিরে আসে কেন, সমাধান কী by ডা. সাকিব-আল-নাহিয়ান

জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ঘাড়, কোমর, হাঁটু বা কাঁধের ব্যথায় ভোগেননি এমন মানুষ কম। অনেকের কাছে ব্যথা যেন জীবনেরই একটি অংশ।

ব্যথা হলে আমরা একটি ব্যথানাশক ওষুধ খাই, কিছুদিন বিশ্রাম নিই, ব্যথা কমে গেলে আবার আগের জীবনে ফিরে যাই।

কিন্তু কিছুদিন পর দেখা যায় একই ব্যথা আবার ফিরে এসেছে, কখনো আরও বেশি তীব্র হয়ে ফিরে আসে। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়?

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা ব্যথার কারণ নয়, শুধু উপসর্গের চিকিৎসা করি। ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন (পুনর্বাসন) চিকিৎসার এমন একটি ধরন, যা শুধু ব্যথা কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যথার কারণ খুঁজে বের করে রোগীকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে।

ব্যথা সব সময় রোগ নয়, একটি সংকেত। ব্যথা অনেকটা অ্যালার্মের মতো। এটি শরীরের কোনো সমস্যার সতর্কবার্তা। কোমরের ব্যথা হতে পারে দুর্বল কোর মাংসপেশির কারণে।

ঘাড়ের ব্যথা হতে পারে দীর্ঘ সময় মুঠোফোন বা কম্পিউটার ব্যবহারের ফলে। হাঁটুর ব্যথা হতে পারে ওজন বৃদ্ধি বা ভুলভাবে হাঁটার কারণে। শুধু ব্যথার ওষুধ খেয়ে সাময়িক স্বস্তি মিললেও মূল সমস্যা থেকে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মাংসপেশি ও হাড়-জোড়ের রোগ বর্তমানে কর্মক্ষমতা হ্রাসের অন্যতম কারণ।

পুনর্বাসন চিকিৎসা আসলে কী

অনেকেই মনে করেন রিহ্যাবিলিটেশন মানেই ফিজিওথেরাপি; বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। একজন ফিজিয়াট্রিস্ট বা ফিজিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞ রোগীর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করেন।

ব্যথার উৎস, মাংসপেশির শক্তি, অস্থিসন্ধির (জয়েন্ট) কার্যক্ষমতা, কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি, দৈনন্দিন অভ্যাস ও মানসিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন।

চিকিৎসার মধ্যে থাকতে পারে—জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নির্দিষ্ট ব্যায়াম, ভঙ্গি সংশোধন করা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ওষুধ, ইন্টারভেনশনাল পেইন ম্যানেজমেন্ট, ফিজিওথেরাপি অকুপেশনাল থেরাপি, পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ।

শুধু ব্যথা-বেদনা নয়, স্ট্রোক, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, ব্রেন ইনজুরি, সেরিব্রাল পালসি, পারকিনসনস ডিজিজ, অঙ্গচ্ছেদ, খেলাধুলাজনিত আঘাত, দীর্ঘমেয়াদি বাতরোগ, ক্যানসার–পরবর্তী দুর্বলতা, এমনকি হার্ট ও ফুসফুসের রোগের ক্ষেত্রেও রিহ্যাবিলিটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চলাফেরা হলো সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ। সঠিকভাবে পরিচালিত শারীরিক কার্যক্রম ও ব্যায়াম নিজেই একটি শক্তিশালী চিকিৎসা। নিয়মিত ব্যায়াম শুধু ব্যথা কমায় না; এটি পেশি শক্তিশালী করে, জয়েন্ট সচল রাখে, হাড় মজবুত করে, হৃদ্​যন্ত্র ভালো রাখে ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করে।

তবে সব ব্যায়াম সবার জন্য নয়। বয়স, রোগ এবং শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যায়াম নির্বাচন করা জরুরি।

* ডা. সাকিব-আল-নাহিয়ান, সহকারী অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগ, গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা

ঘাড় ও মেরুদণ্ডের জয়েন্টের একটি রোগ সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিস। নানা কারণে এ সমস্যা দিন দিন বাড়ছে
ঘাড় ও মেরুদণ্ডের জয়েন্টের একটি রোগ সার্ভিক্যাল স্পন্ডাইলোসিস। নানা কারণে এ সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। ছবি: প্রথম আলো

Tuesday, August 18, 2026

হার্ভার্ডের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড পেলেন বাংলাদেশি কুদসিয়া হুদা, বিস্তারিত জানুন তাঁর সম্পর্কে

জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের অ্যালামনাই অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের পাঁচ সাবেক শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশের কুদসিয়া হুদা। তিনি পাবলিক হেলথ প্র্যাকটিসে পেয়েছেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড। প্রতি বছর অ্যালামনাই উইকেন্ডে হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের সাবেক শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ বছর অ্যালামনাই উইকেন্ড অনুষ্ঠিত হবে ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর। পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে কুদসিয়া হুদা বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সদর দপ্তর জেনেভায় দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, স্থিতিস্থাপকতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। ২০২৩ সালের ১২ আগস্ট কুদসিয়া হুদাকে নিয়ে ‘অনেকেই বলেছিল ক্যারিয়ার হবে না, সেই কুদসিয়াই এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা বিভাগের প্রধান’ শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়েছিল প্রথম আলোয়।

অনেকেই বলেছিল ক্যারিয়ার হবে না, সেই কুদসিয়াই এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা বিভাগের প্রধান

কঙ্গো থেকে ইন্দোনেশিয়া, ইরান থেকে ইয়েমেন, ভারত থেকে জর্ডান—যেখানে মানবিক বিপর্যয়, সেখানেই ছুটে যান কুদসিয়া হুদা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের তিনি প্রধান। তাঁর ছুটে চলা জীবনের গল্প শুনেছেন তানজিনা হোসেন

২০০৪ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ইরানের কেরমান প্রদেশের অনেক ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। মারা যান ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ। আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেন গৃহহারা হাজারো মানুষ। দুর্গত এলাকায় ছুটে যান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কুদসিয়া হুদা। একদিন এক আশ্রয়শিবিরে ছোট্ট এক মেয়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ। চার বছরের ফুটফুটে মেয়েটির সঙ্গে ওর বাবা ও ভাইও আছেন। আলাপের একপর্যায়ে কুদসিয়ার কাছে মেয়েটার আবদার, ‘তুমি কি আমার মাকে এনে দিতে পারবে?’

‘কোথায় তোমার মা?’ জানতে চান কুদসিয়া।

জবাবে মেয়েটি আর তার বাবা যা বললেন, শুনে স্তম্ভিত হয়ে যান কুদসিয়া। শেষ রাতে যখন ভূমিকম্পে সবকিছু কেঁপে ওঠে, মেয়েকে কোলে করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন মা। আর তার বাবা হাত ধরে টেনে এনেছিলেন ছেলেকে। খানিকটা পথ আসার পর ছোট মেয়েটা কাঁদতে শুরু করে। কারণ, তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী খেলনা পুতুলটা ঘরে ফেলে এসেছে। মুহূর্ত না ভেবেই মেয়েকে বাবার কোলে দিয়ে মা বলেছিলেন, ‘তোমরা যাও, আমি এক্ষুনি পুতুলটা নিয়ে আসছি। যাব আর আসব।’

সেই যে গেলেন, আর ফিরে এলেন না মা!

কুদসিয়ার হৃদয়-আয়নায় নিজের মেয়ের ছবিটা ভেসে ওঠে। দূর দেশে এই মেয়ের বয়সী সন্তানকে রেখে এসেছেন তিনি। বুকটা হু হু করে ওঠে। এক মায়ের সন্তানবৎসল হৃদয়কে উপলব্ধি করে চোখে পানি আসে। চোখের পানি মুছে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে কুদসিয়া বললেন, ‘নিশ্চয়ই একদিন মায়ের সঙ্গে তোমার দেখা হবে। সেদিন তুমি মাকে জানিও যে তুমি তাকে কত মিস করেছ। আর এ জন্য নিজেকে দায়ী কোরো না।’

ভূমিকম্পের ওই বছরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন কুদসিয়া। এরপর মা-হারা সেই মেয়েটার মতো দেশে দেশে আরও অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়েছে। সেই যে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে সুনামিতে সবাইকে হারানো নারী, কুদসিয়ার মাথায় হাত দিয়ে যিনি আশীর্বাদ করেছিলেন।

আফগানিস্তানে যুদ্ধক্ষেত্রে কাজ করা এক চিকিৎসকের অসহায় মুখ, দায়িত্ব পালনের সময় জানতে পারেন বোমার আঘাতে উড়ে গেছে তাঁর পুরো পরিবার। আর সুনামিতে আক্রান্ত এলাকায় সব হারানো সেই তরুণ, আশ্রয়শিবিরে গান গেয়ে যিনি শিশুদের আনন্দ দিতেন।

বর্তমানে জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দপ্তরে ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স (দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন) বিভাগের প্রধান কুদসিয়ার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা আছে এমন অনেক মানুষের মুখ, হৃদয়স্পর্শী সত্য গল্প।

কোনো কোনো গল্প তাঁকে যেমন ঘুমাতে দেয় না, তেমনি কোনো গল্প এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণাও দেয়। সেদিন আলাপের সময় তেমনি কিছু আশ্চর্য গল্পের ঝাঁপিই খুলেছিলেন কুদসিয়া হুদা।

নিজেও পড়েছেন বিপদে

মিসরে কর্মরত অবস্থায় ২০১১ সালে একবার স্বামী-সন্তানকে কায়রোতে রেখে অফিসের কাজে ওমান গেছেন কুদসিয়া। মাসকাটে বসেই শোনেন আরব বসন্ত শুরু হয়ে গেছে। উত্তাল কায়রো আর ততোধিক উত্তাল তাঁর অতি পরিচিত তাহরির স্কয়ার।

একসময় স্বামী-সন্তানের সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এদিকে মাসকাট থেকেও কিছুতেই আর কায়রোতে ফিরতে পারছিলেন না। তারপর কী কষ্ট আর কত ঝামেলা করেই না অগ্নিগর্ভ কায়রোতে পৌঁছালেন।

কারফিউয়ের মধ্যে পথে পথে কূটনৈতিক পরিচয়পত্র দেখিয়ে স্বামী-সন্তানের কাছে গেলেন। তারপর পুরো পরিবার গৃহবন্দী। সে এক অদ্ভুত সময়। চারদিকে সামরিক ট্যাংক বহর ঘুরছে, থরথর করে কাঁপছে পুরো বাড়ি।

বন্দী অবস্থায় আরও কিছুদিন থাকার পর বিশেষ বিমানে জাতিসংঘের অন্য কর্মীদের সঙ্গে মিসর ছাড়তে সক্ষম হন।

দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহুবার এমন ঝুঁকির মুখে পড়েছেন কুদসিয়া। আফগানিস্তানে কাজ করার সময় প্রাচীরঘেরা সুরক্ষিত হোটেলে থাকার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু ভূমিকম্পে সব ভেঙে যেতে থাকল।

সুরক্ষিত জায়গাটাই তাঁদের জন্য হয়ে উঠল মরণফাঁদ। ঠিক একইভাবে ইরাকে কাজ করতে গিয়ে পার্শ্ববর্তী ভবনে আকস্মিক বোমা হামলা থেকে স্রেফ কপালগুণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

আরাম দেয় লেখালেখি

দুর্গত মানুষেরা যেমন মানসিক কষ্টে ভোগেন, তেমনই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিতরাও নানা রকম ট্রমার শিকার হন। বিপর্যস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করতে গিয়ে অনেকে অস্বাভাবিক হয়ে পড়েন।

কুদসিয়া হুদা বলেন, ‘আমাদের এ জন্য নানা রকম প্রশিক্ষণ নিতে হয়। তারপরও মাঝেমধ্যে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা মুশকিল হয়ে পড়ে।’

এ জন্য এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কুদসিয়া হুদা শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করেন, নিয়ম করে ধ্যানও করেন। মন ভালো না হলে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু আমার বরের সঙ্গে সবকিছু শেয়ার করেও আমি অনেক স্বস্তিবোধ করি। তবে সবচেয়ে যে জিনিসটা আমাকে প্রশান্তি এনে দেয় তা হলো, লেখালেখি। আমার স্ট্রেস দূর হয় এতে।’

কুদসিয়া হুদার লেখক নাম দীপা ফিরোজ। তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন। ছোটবেলায় শেখা গানের চর্চাও ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গান।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিপজ্জনক আর চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করতে গিয়েও প্রিয় পোশাক শাড়ির প্রতি ভালোবাসা হারাননি। জেনেভায় নিজের অফিসে প্রতিদিন শাড়ি পরেন। যেকোনো দেশে বিপর্যয়ের খবর পেয়ে উড়াল দেওয়ার সময় স্যুটকেসে অন্তত একটা শাড়ি নিতে ভোলেন না কখনো।

ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরাম কিংবা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সম্মেলন, জলবায়ু সম্মেলনে পুরোপুরি বাঙালি বেশভূষায় হাজির হন কুদসিয়া।

পৃথিবীর নানা ভাষা আর সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করতে সমস্যা হয় না। তিনি বলেন, ‘যে দেশ বা যে কমিউনিটিতে কাজ করি, তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার জন্য দরকার তাদের জীবনযাত্রার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ।

যেমন ইরানে কাজ করার সময় লম্বা পোশাক পরতে হতো, আমার দীর্ঘ চুল তখন পিন দিয়ে আটকে স্কার্ফে মাথা ঢাকতে হতো। এত সব কাজের মধ্যেও আমাকে মাথার স্কার্ফ সামলে চলতে হতো। ইয়েমেন, সিরিয়া, সোমালিয়া, ইরাকে কাজের সময় পরতে হতো বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট আর হেলমেট।

আফ্রিকায় ইবোলা সংক্রমণে কাজ করার সময় পরতে হতো জীবাণুরোধী পোশাক। কাজ চালানোর মতো ফরাসি, আরবি ও ফারসি ভাষা শিখেছি। একজীবনে বিচিত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মের মানুষের আপনজন হয়ে ওঠা—এ এক পরম পাওয়া।’

অনেকেই বলেছিলেন, কুদসিয়ার ক্যারিয়ার হবে না

কুদসিয়া হুদার বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ঢাকায়। ছোটবেলায় গান শিখেছেন, নেচেছেন, ছবি এঁকেছেন, স্কুলে পড়ার সময় ফুটবলও খেলেছেন। ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে এসএসসি আর হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি।

এরপর ভর্তি হয়েছিলেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে। মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। প্রথম সন্তানের জন্ম চতুর্থ বর্ষে পড়ার সময়। বিয়ের পর অনেকে বলেছিলেন, কুদসিয়াকে দিয়ে পড়াশোনা হবে না। সন্তান হওয়ার পর তাঁরাই বলতে থাকলেন, তাঁকে দিয়ে আর ক্যারিয়ার হবে না।

সবার কথাই ভুল প্রমাণ করেছেন কুদসিয়া। ১৯৯১ সালে এমবিবিএস পাস করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে যোগ দেন। কাজ করতে করতেই স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিসিএস দিয়ে পঞ্চগড়ে যোগ দেন।

সেখানে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে কাজ করেছেন। জনস্বাস্থ্য বিষয়টি তখন প্রিয় বিষয় হয়ে ওঠে। তাই পরে এসে যোগ দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিতে। পরবর্তীকালে এই বিষয়েই উচ্চতর ডিগ্রি নিতে যান যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

হার্ভার্ডে পড়তে পড়তেই একটি মাস্টার্স কোর্সে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পান। সেটি ছিল হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথ, টাফট বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একটি সমন্বিত কোর্স।

আমন্ত্রণ পেয়েও দ্বিধায় ছিলেন কুদসিয়া। ছোট ছোট দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে হার্ভার্ডে পড়তে গিয়েছিলেন তিনি। যাদের একজন তখনো দুগ্ধপোষ্য শিশু। দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে একা বোস্টনে থাকা, স্কুলে ও ডে কেয়ারে রাখা, আনা-নেওয়া, রান্নাবান্নাসহ সব কাজ করে পড়তে বসতেন গভীর রাতে।

কুদসিয়া ভাবলেন আবেদন করে কী হবে, এত কিছু তিনি সামাল দিতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর পরামর্শক রিচার্ড ক্যাশ পরামর্শ দিয়ে বললেন, ‘কেন তুমি আবেদন করবে না? মাত্র ২০ জনকে এই সুযোগ দেওয়া হবে। আরেকটা কথা মনে রেখো, তোমার এই সন্তানেরাই তোমার শক্তি। আমার বিশ্বাস, তুমি দুটো মাস্টার্স প্রোগ্রাম করতে পারবে।’

রিচার্ড ক্যাশের কথাটাই এখনো বিশ্বাস করেন কুদসিয়া। আসলে যা যা মানুষ প্রতিবন্ধকতা, বাধা বা দুর্বলতা মনে করে, প্রতিটিই জীবনে শক্তিদায়ী রূপে দেখা দিতে পারে। জনস্বাস্থ্যে পড়াশোনা শেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেন ২০০৪ সালে। এরপর সংস্থাটির নানা পদে কাজ করেছেন।

কুদসিয়া বললেন, মা-বাবার পর সব সময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন তাঁর স্থপতি স্বামী আর সন্তানেরা। একজন বিবাহিত নারীর এমন যাত্রায় বরের ভূমিকা অনেক। বোঝাপড়া না হলে সবকিছু সামলানো কঠিন!

কুদসিয়ার দুই মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন থেকে দক্ষিণ ভারতের কোদাইকানাল, মিসরের কায়রো থেকে বিলেত—নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ে বড় হয়েছেন। দুজনই এখন প্রতিষ্ঠিত। বড় মেয়ে বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরে এনার্জি সেক্টরে কাজ করেন, আর ছোট মেয়েটি বাবার মতো স্থাপত্য পেশা বেছে নিয়েছেন।

কুদসিয়া হুদার কাছে জানতে চাই, ‘আপনি একজন এশীয়, তার ওপর বাংলাদেশি নারী। এই পরিচয়গুলো বৈশ্বিক সমাজে কি আপনার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কখনো?’ কুদসিয়া হুদা হেসে বলেন, ‘যেসব বিষয় নিয়ে আমি কাজ করি, যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয়, তা একজন বাংলাদেশির চেয়ে ভালো আর কে বুঝতে পারে? বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, লঞ্চডুবি—এসব দেখেশুনে আর মোকাবিলা করেই বড় হই আমরা।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের  প্রধান কুদসিয়া হুদা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিজাস্টার রিস্ক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স বিভাগের প্রধান কুদসিয়া হুদা। ছবি: সংগৃহীত

Sunday, August 16, 2026

ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে কোন কোন খাবারে by মো. ইকবাল হোসেন

বিশেষ কিছু খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়—এমনটাই বলছে গবেষণা। কারসিনোজেন বৈশিষ্ট্য থাকা খাবারগুলোই মূলত ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী। যেসব উপাদান, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ও অণুজীব মানবদেহ বা কোষের ডিএনএর জিনগত পরিবর্তন ঘটায়, সেগুলোকেই কারসিনোজেন বলে।

কারসিনোজেন কিসে থাকে

১. প্রক্রিয়াজাত মাছ-মাংসে ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম উপাদান থাকে। হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন হলো এমন সব রাসায়নিক যৌগ, যা মাছ–মাংস উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার সময় তৈরি হয়। বিশেষ করে মাংস গ্রিল করা, আগুনে ঝলসিয়ে কাবাব বানানো ও ভাজার সময় এগুলো বেশি তৈরি হয়। এই যৌগগুলো কারসিনোজেন হিসেবে বিবেচিত এবং কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

২. কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) সমৃদ্ধ অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করা খাবারে অনেক বেশি কারসিনোজেন যৌগ থাকে। শর্করাকে উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজা বা সেঁকা হলে অ্যাক্রিলামাইড নামক কারসিনোজেন যৌগ তৈরি হয়। এমন খাবারগুলো হলো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ক্র্যাকার, চিপস, তেলেভাজা বিস্কুট, চানাচুর। এমন খাবারগুলো নিয়মিত খেলে পরিপাকতন্ত্রের ক্যানসার ও কোলন ক্যানসারে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

৩. ট্রান্সফ্যাট (ক্ষতিকর চর্বি) সমৃদ্ধ খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। চিপস, চানাচুর, শিঙাড়া, পেঁয়াজু, পিৎজা, বার্গার ইত্যাদি ফাস্ট ফুড ট্রান্সফ্যাট সমৃদ্ধ। ট্রান্সফ্যাট শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি করে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণা অনুযায়ী, উচ্চমাত্রায় ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ কলোরেক্টাল, ওভারিয়ান ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

৪. প্রিজারভেটিভ সমৃদ্ধ খাবার ক্যানসারের জন্য দায়ী—বিশেষ করে নাইট্রেট ও নাইট্রাইটস সমৃদ্ধ প্রিজারভেটিভ। এগুলো সসেজ, হ্যাম, বেকন, হটডগসহ বিভিন্ন ফাস্ট ফুড এবং প্রক্রিয়াজাত মাংসে ব্যবহার করা হয়। এটি উচ্চ তাপের সংস্পর্শে কারসিনোজেন গঠন করে, যা পাকস্থলীর ক্যানসারে ভূমিকা রাখে।

৫. তামাক বা তামাক জাতীয় পণ্য থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। তামাকের ধোঁয়ায় নাইট্রোসামিন নামক কারসিনোজেন উৎপন্ন হয়। এটি মুখের ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে।

৬. বর্তমানে ভেজাল খাবারের পাশাপাশি শাকসবজিতে কীটনাশকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। কীটনাশকে হেভি মেটাল (ভারী ধাতু) ও অর্গানোফসফেটসহ অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হয়। অর্গানোফসফেট কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করলে তা শাকসবজি ও ফলমূলে কিছুটা অবশিষ্ট থাকতে পারে। এই শাকসবজি নিয়মিত খেলে পাকস্থলী ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৭. অ্যালকোহল পানের ফলে শরীরে অ্যাসিটালডিহাইড তৈরি হয়। এটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনকে সক্রিয় করে। তাই নিয়মিত অ্যালকোহল পান করলে পরিপাকতন্ত্রের ও লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে।

* মো. ইকবাল হোসেন, জ্যেষ্ঠ পুষ্টি কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল

বিশেষ কিছু খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়
বিশেষ কিছু খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। ছবি: পেক্সেলস

৫ কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো যে উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম by শিশির মোড়ল

ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএসকে আমরা খাওয়ার স্যালাইন বা ওরস্যালাইন বলেই জানি। কলেরা বা কলেরার মতো ডায়রিয়াজনিত রোগে পানিশূন্যতা দূর করার জন্যই ওষুধটি উদ্ভাবিত হয়েছিল। যে উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। লিখেছেন শিশির মোড়ল

তরল খাইয়ে রোগীর কলেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, তা নিয়ে ১৯৫২ সালের দিকে কলকাতায় একটি গবেষণা হয়েছিল। ওই গবেষণার ফলাফল নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট–এর ১৯৫৩ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ লেখেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের কলেরা ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হেমেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি।

প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে কলেরায় আক্রান্ত কিছু রোগীর বমি বন্ধ ও পানিশূন্যতা দূর করার জন্য অ্যাভোমিন ট্যাবলেটের সঙ্গে পাথরকুচির পাতার রস খাওয়ানো হয়েছিল। তাতে ফলও পাওয়া গেছে।

গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে বা তারও কিছু আগে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কলেরা নিয়ন্ত্রণে কিছু গবেষণা হয়েছিল। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল। আমাদের এখানে এই গবেষণা করেছিল পাক–সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (আজ যা আইসিডিডিআরবি)।

মাঠপর্যায়ে ওআরএসের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা হয় আইসিডিডিআরবির চাঁদপুরের মতলব ও ঢাকা হাসপাতালে। এ পর্যায়ের গবেষণায় মূল গবেষক ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড ক্যাস। তাঁদের সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম ও মজিদ মোল্লা। অনেকে এই বিজ্ঞানীদের ওআরএসের উদ্ভাবক বলে মনে করেন।

১৯৬৮ সালের আগস্টে ল্যানসেট তাদের গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে। গবেষণা প্রবন্ধের মোদ্দাকথা ছিল, কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানোর পর ভালো ফল পাওয়া যায়।

ওই প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, খাওয়ার দ্রবণের এই উপাদানগুলো সস্তা ও সহজে পাওয়া যায়। এসব উপাদান সংরক্ষণ বা মজুত করা সম্ভব। আর পানি দিয়েই এই দ্রবণ তৈরি করা যায়।

ঢাকা ও কলকাতায় কতটা সমান্তরালভাবে ওআরএস নিয়ে গবেষণা চলেছিল, দুই শহরের বিজ্ঞানীদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল, তার একটি বর্ণনা ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টভিউ প্রেস থেকে প্রকাশিত কলেরা: দ্য আমেরিকান সায়েন্টিফিক এক্সপেরিয়েন্স ১৯৪৭–১৯৮০ বইয়ে পাওয়া যায়। ওই গ্রন্থে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে বিশদ বর্ণনা আছে।

ওই বছরের জুন নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীশিবিরে কলেরা দেখা দেয়। তখন বনগাঁও এলাকার শরণার্থীদের প্রথম ওআরএস খাওয়ানো হয়। এটাই ছিল ওআরএসের প্রথম ব্যাপক ব্যবহার। ভারতে এই কাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিলীপ মহলানবিশ।

তাই একক কোনো প্রতিষ্ঠান, একক কোনো বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী দল খাওয়ার স্যালাইন উদ্ভাবন করেনি। ওআরএসের গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি হওয়ার আগে অনেকে অনেক ধরনের কাজ করেছেন। ম্যানিলায় কিছু কাজ হয়েছে, কিছু হয়েছে ঢাকায়, কিছু কলকাতায়। ওআরএসের চূড়ান্ত রূপটি এসেছে ১৯৬৭ বা ১৯৬৮ সালের দিকে।

পানি–লবণ–গুড়ের ঘুঁটা

স্বাধীনতার পর দেশে ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রকোপ ছিল প্রবল। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও ছিল ডায়রিয়া। তখন মানুষের বাড়ি বাড়ি ওআরএসের প্যাকেট পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। ওই পটভূমিতে ওআরএস বা মুখে খাওয়ার স্যালাইনকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, বিশ্বের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনে তা বিরল।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির পদ্ধতি বা কৌশল শিখিয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা। ১৯৮০ সালে ডায়রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ও বাড়িতে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির প্রকল্প শুরু করে ব্র্যাক। ‘এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি’—এই ফর্মুলা নিয়ে মাঠে নামে ব্র্যাক।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্র্যাকের কর্মীরা শিখিয়েছিলেন: প্রথমে ফুটিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে, একটি পাত্রে আধা সের (আধা লিটারের কিছু বেশি) পানিতে এক চিমটি লবণ ও এক মুঠ গুড় নিয়ে ভালো করে গুলতে বা ঘুঁটতে হবে। সেই দ্রবণ ডায়রিয়ার রোগীকে খাওয়াতে হবে। ব্র্যাকের লক্ষ্য ছিল দেশের প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনকে এই দ্রবণ তৈরি শেখাতে হবে। ব্র্যাকের পাশে ছিল সরকার।

বেঁচেছে পাঁচ কোটির বেশি প্রাণ

ল্যানসেট–এর ১৯৭৮ সালের ৫ আগস্ট সংখ্যার সম্পাদকীয়র বিষয় ছিল ওআরএস। তাতে বলা হয়েছিল, ওআরএসের উদ্ভাবন চিকিৎসাক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার ২৮ বছর পর ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি—এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে টাইম ম্যাগাজিন

এগুলো বিশ্বের মানুষের কাছে ওআরএসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বেড়ে যাওয়ার উদাহরণ। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ওআরএসের ব্যবহার বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনা ও ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে। তার নেতৃত্বে ছিলেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষকেরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে শরীর থেকে দ্রুত পানি বের হয়ে যায়। ওআরএসের মাধ্যমে সেই পানি প্রতিস্থাপন করা হয়। ওআরএস ব্যবহার করে এ পর্যন্ত পাঁচ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছে।

বছরে বিক্রি ১৫০ কোটি প্যাকেট

এখন রক্তচাপ কমে গেলেও খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) খেয়ে নিচ্ছে মানুষ। প্রখর রোদে ক্লান্ত–ঘর্মাক্ত রিকশাচালক রাস্তার পাশের দোকান থেকে আধা লিটার পানির বোতল কিনে তাতে এক প্যাকেট খাওয়ার স্যালাইন গুলে খেয়ে নিচ্ছেন। বহু মানুষের বাড়িতেই ওরস্যালাইন এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

কেউ কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে, বাক্স–পেটরা গোছানোর সময় দেখে নেন, খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট নেওয়া হয়েছে কি না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকান থেকে শুরু করে রাজধানীর অভিজাত হাসপাতালেও পাওয়া যায় ওরস্যালাইন।

দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী, নিরক্ষর, শিক্ষিত—সব শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে এটি। ওআরএস এ দেশের মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের যেসব দেশে ওআরএসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার অন্যতম। ওষুধটি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীদের বড় ভূমিকা ছিল।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে ওআরএস পৌঁছানো এবং বাড়িতে ওআরএস তৈরি করার পদ্ধতি–কৌশলও উদ্ভাবন করেছে এ দেশের মানুষ। সারা দেশে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) ওআরএসের একক আধিপত্য।

এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, ‘সারা বছর এসএমসির প্রায় ১৫০ কোটি প্যাকেট ওরস্যালাইন বিক্রি হয়। বাজারের ৯৫ শতাংশ ওরস্যালাইন এসএমসির।’

এসএমসি ছাড়া আরও কয়েকটি কোম্পানির ওআরএসের প্যাকেট বাজারে বিক্রি হয়। এরা বছরে প্রায় আট কোটি প্যাকেট ওআরএস বিক্রি করে। এ ছাড়া মানুষ নিজেই ঘরে বা বাড়িতে পানির সঙ্গে লবণ ও চিনি বা গুড় গুলিয়ে খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করে। বাড়িতে বানানো এই মিশ্রণও ওআরএস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো উদ্ভাবন মানুষের জীবনের সঙ্গে এমন মিশে যাওয়ার উদাহরণ বিরল।

(বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫–এ প্রকাশিত)

লবণ ও গুড় মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করছেন মতলবের একজন নারী, ১৯৭৯–৮০ সাল
লবণ ও গুড় মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করছেন মতলবের একজন নারী, ১৯৭৯–৮০ সাল। ছবি: আইসিডিডিআরবি

Tuesday, July 28, 2026

মলত্যাগের পর মল ভেসে থাকা কি কোনো রোগের লক্ষণ

মলত্যাগের পর কমোড বা প্যানের পানির স্তরের নিচে মল ডুবে যাওয়াই স্বাভাবিক। তবে কখনো কখনো মলত্যাগের পর মল ভেসে থাকতে পারে। কেন এমন হয়? এটা কি পেটের কোনো রোগের লক্ষণ? রাফিয়া আলমকে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের কনসালট্যান্ট সার্জন ডা. রেজা আহমদ

কখনো কখনো কেন মল পানিতে ভাসে

সাধারণত মল পানির চেয়ে ভারী হয়। স্বাভাবিকভাবেই তাই মল পানিতে ডুবে যায়। তবে মলের ভেতর যদি বাতাসের পরিমাণ বেশি থাকে, তাহলে মল পানির চেয়ে হালকা হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে মল পানিতে ভেসে থাকে। আবার মলে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকলেও ঘটে একই ঘটনা।

কেন এমন হয়

ইউরোপিয়ান জার্নাল অব গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বিষয়টি উঠে এসেছে। ১ হাজার ২৫২ জন রোগীর ওপর করা সেই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীদের ২৬ শতাংশই জানিয়েছেন, মলত্যাগের পর তাঁদের মল পানিতে ভাসে। এখানে ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডার সম্পর্কে একটু বলে রাখা প্রয়োজন।

গঠনগত বা অন্য কোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও যখন একজন ব্যক্তির অন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করে না, তখন ধরে নেওয়া হয় তিনি ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডারে ভুগছেন।

অন্ত্র ছাড়া পরিপাকতন্ত্রের অন্যান্য অংশেও এমন ‘ফাংশনাল’ সমস্যা হতে পারে। অর্থাৎ সে ক্ষেত্রেও বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নেই, তবু পরিপাকতন্ত্রের কাজে দেখা দেয় গন্ডগোল।

ওই গবেষণায়ই জানা গেছে, ফাংশনাল বাওয়েল ডিজঅর্ডার ছাড়াও পরিপাকতন্ত্রের অন্যান্য ফাংশনাল সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩ শতাংশ ব্যক্তি মলত্যাগের পর মল ভেসে থাকতে দেখেছেন। বিভিন্ন ফাংশনাল সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অতিরিক্ত গ্যাস হয়ে থাকে।

আঁশসমৃদ্ধ খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে অন্ত্রে গ্যাসের মাত্রা বাড়তে পারে। কারণ, অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে বাস করা ব্যাকটেরিয়াগুলো এসব আঁশের ওপর কিছু ফারমেন্টেশন, অর্থাৎ গাঁজন ঘটায়। তাতে তৈরি হয় গ্যাস।

শাক, শিমজাতীয় সবজি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, মসুর ডাল প্রভৃতিতে প্রচুর আঁশ থাকে। ফল ও সবজির খোসায়ও প্রচুর আঁশ থাকে।

এ ধরনের খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে মল পানিতে ভাসতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে দুধের ল্যাকটোজ এবং ফলের ফ্রুকটোজের কারণেও অন্ত্রে গ্যাসের মাত্রা বাড়ে। সে ক্ষেত্রেও মল ভাসতে পারে পানিতে।

একইভাবে মলে চর্বির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে, যদি কেউ অতিরিক্ত তেল-চর্বিজাতীয় খাবার খান। তবে কারও যদি খাবারের চর্বি স্বাভাবিকভাবে শোষণে কোনো বাধা সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রেও তাঁর মলে চর্বির মাত্রা বেড়ে যাবে। অন্ত্র, অগ্ন্যাশয় বা পিত্তথলির নির্দিষ্ট ধরনের রোগে এমনটা হতে পারে।

করণীয়

মল পানিতে ভাসলেই তা কোনো রোগের লক্ষণ না-ও হতে পারে। তবে প্রায়ই এমন হলে আপনি কী খাচ্ছেন বা কীভাবে খাচ্ছেন, সে বিষয়ে একটু যত্নশীল হতে পারেন। অর্থাৎ আপনি খেয়াল করতে পারেন, অতিরিক্ত বায়ু উৎপন্নকারী খাবার বা খাবারে অতিরিক্ত চর্বি থাকার কারণে এমন সমস্যা হচ্ছে কি না।

তবে কারণটা আপনি খুঁজে না পেলেও সাধারণত কোনো ক্ষতি হয় না। অবশ্য কিছু লক্ষণের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন, যেসব দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে

* একটানা বেশ কয়েক দিন যদি মলত্যাগের পর পানিতে মল ভাসে।

* যদি মলের স্বাভাবিক গন্ধের চেয়ে আলাদা ধরনের দুর্গন্ধ হয়।

* যদি মল বেশ আঠালো হয়।

* যদি মলের পরিমাণ খুব বেশি হয়।

* যদি মলের সঙ্গে রক্ত আসে বা টয়লেট পেপারে রক্ত দেখা দেয়।

* কোনো চেষ্টা না করার পরও ওজন কমতে থাকে।

* পেটব্যথা হয়।

* অতিরিক্ত গ্যাস বের হয়।

এমন কোনো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসক সমস্যার কারণ খুঁজে বের করবেন এবং প্রয়োজনমাফিক চিকিৎসার নির্দেশনা দেবেন।

মলত্যাগের পর কমোড বা প্যানের পানির স্তরের নিচে মল ডুবে যাওয়াই স্বাভাবিক, তবে কখনো কখনো মলত্যাগের পর মল ভেসে থাকতে পারে
মলত্যাগের পর কমোড বা প্যানের পানির স্তরের নিচে মল ডুবে যাওয়াই স্বাভাবিক, তবে কখনো কখনো মলত্যাগের পর মল ভেসে থাকতে পারে। ছবি: পেক্সেলস

Saturday, July 25, 2026

যে কারণে কথায় কথায় অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না by ডা. কাকলী হালদার

১৮-২৪ নভেম্বর বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) সচেতনতা সপ্তাহ। ‘অ্যাক্ট নাউ: প্রোটেক্ট আওয়ার প্রেজেন্ট, সিকিউর আওয়ার ফিউচার’ বা ‘এখনই পদক্ষেপ নিন: বর্তমানকে রক্ষা করুন, সুরক্ষিত করুন ভবিষ্যৎ’—এই প্রতিপাদ্য আজকের বিশ্ব স্বাস্থ্য প্রেক্ষাপটে এক গভীর তাৎপর্য বহন করে।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স কী

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালস রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর এক নীরব মহামারি, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে হার মানাচ্ছে। এতে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসাশাস্ত্র উভয়ই হুমকির মুখে পড়ছে মারাত্মকভাবে।

অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্সের মানে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবীগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসকারী ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠা। ফলে একসময় যেসব সংক্রমণ সহজেই সারানো যেত, সেসবই আবার প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

মূল কারণ কী

এ সমস্যার মূলে বিশেষ করে আছে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গালের যথেচ্ছ ব্যবহার, যা অণুজীবদের বিবর্তনে সাহায্য করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডিরেক্টর জেনারেল ড. টেড্রোস আধানম ঘেব্রেইসাসও বলেছেন, ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী পরিবারগুলোর স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।’

একটি সাধারণ সংক্রমণ যখন চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে ওঠে, তখন অস্ত্রোপচার, ক্যানসার থেরাপি বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মতো জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাগুলোও খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

করণীয়

এ মুহূর্তে ‘অ্যাক্ট নাউ’ বা এখনই পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে কেবল বিজ্ঞানী বা চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করা নয়, বরং এ লড়াইয়ে আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা রয়েছে।

১. সচেতন ব্যবহার: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রেই কার্যকর। ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়াটিক অকার্যকর।

২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: সংক্রমণ রোধের জন্য নিয়মিত হাত ধোয়া, নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ও টিকা নেওয়া অপরিহার্য। এটি অণুজীবের বিস্তার রোধ করে এবং অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা কমায়।

৩. নতুন উদ্ভাবনে বিনিয়োগ: সরকার ও সংস্থাগুলোর উচিত নতুন অ্যান্টিবায়োটিক ও রোগনির্ণয়ের উন্নত প্রযুক্তির গবেষণায় আরও বেশি বিনিয়োগ করা।

শেষ কথা

‘প্রোটেক্ট আওয়ার প্রেজেন্ট’ মানে হলো আমাদের বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থা, যার ওপর আমরা নির্ভর করি, তাকে সচল ও সুরক্ষিত রাখা। আর ‘সিকিউর আওয়ার ফিউচার’ মানে হলো এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা, যেখানে আমাদের শিশুরা যেন সাধারণ সংক্রমণে মারা না যায়।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা, যার জন্য প্রয়োজন একীভূত ও বহুক্ষেত্রীয় পদক্ষেপ। এখনই সম্মিলিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে আমরা এই নীরব হুমকি মোকাবিলা করতে পারি এবং মানবতার জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারি।

* ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাউক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-24%2F8ye2l7oh%2Fpexels-photo-3683088.jpg?rect=202%2C0%2C2178%2C1452&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বা কোর্স অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না। ছবি: পেক্সেলস

Tuesday, July 21, 2026

মানুষের দাঁত নতুন করে প্রাকৃতিকভাবে গজাবে

দাঁত গজাতে পুনরুৎপাদনশীল চিকিৎসার শক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন গবেষকেরা।

দাঁত পড়ে যাওয়ার পর বর্তমানে যেসব চিকিৎসা রয়েছে, সেগুলো সাময়িক এবং শতভাগ কার্যকর নয়। কিন্তু কেমন হতো, যদি কৃত্রিম ব্যবস্থার বদলে আমাদের দাঁত প্রাকৃতিকভাবেই আবার গজাত? বিভিন্ন জরিপ বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৭০ শতাংশেরই দন্তচিকিৎসকের কাছে যেতে একধরনের ভয় কাজ করে। দাঁতে ফিলিং করা বা ড্রিল করার প্রতি তাঁদের আতঙ্ক ও অনীহার কারণে অনেকেই নিয়মিত দাঁত পরিষ্কার বা যত্ন নেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান।

বায়োকেমিস্ট হ্যানেল রুওহোলা-বেকারের কাছে প্রায় প্রতিদিনই এমন সব মানুষের ই–মেইল আসে, যাঁরা দাঁতের সাধারণ চিকিৎসা বা ব্যথার চেয়েও জটিল কোনো ডেন্টাল এক্সপেরিমেন্টের মধ্য দিয়ে যেতেও রাজি। তাঁদের একটাই আকুতি—রুওহোলা-বেকার যেন তাঁদের দাঁত আবার গজাতে সাহায্য করেন।

রুওহোলা-বেকার বিশ্বজুড়ে এমন একদল বিজ্ঞানীর অন্তর্ভুক্ত, যাঁরা প্রথাগত ডেন্টাল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে রিজেনারেটিভ মেডিসিন বা পুনরুৎপাদনশীল চিকিৎসার শক্তিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। দাঁত হারানো এবং দাঁতের ব্যথায় ভোগা লাখ লাখ মানুষের জন্য এটি এক নতুন আশার আলো।

বিজ্ঞানীদের এই স্বপ্ন যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে কোনো একদিন দন্তচিকিৎসকের কাছে যাওয়ার অর্থ হবে—সিনথেটিক উপাদান দিয়ে দাঁত মেরামত করা কিংবা তা টেনে উপড়ে ফেলার পরিবর্তে ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু বা আস্ত একটি দাঁত প্রাকৃতিকভাবেই আবার গজিয়ে তোলা।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর স্টেম সেল অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিনের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর রুওহোলা-বেকার বলেন, ‘আমরা যখন কাজ শুরু করি, তখন একটি বিষয় আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—মানুষ দাঁতের চিকিৎসায় নতুন কিছুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত।’

দাঁত পড়ে যাওয়ার সঙ্গে মানুষের বেশি অসুস্থ হওয়া এবং দ্রুত মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে। এটি মানুষের খাওয়া, চিবানো এবং হাসির ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, যা সামাজিক ও মানসিক সুস্থতার ক্ষতি করতে পারে—আর এই ক্ষতিকর চক্র শৈশব থেকেই শুরু হতে পারে।

রুওহোলা-বেকার এবং তাঁর দল কাজ করছেন একধরনের ‘লিভিং ফিলিং’ বা জীবন্ত ফিলিং নিয়ে। আক্কেল দাঁত নিয়ে গবেষণা করে এই বিজ্ঞানী দেখতে পান, এনামেল তৈরিকারক বিশেষ কোষ মানুষের দাঁত পুরোপুরি ওঠার পর মারা যায়। ফলে দাঁত একবার মাড়ি ভেদ করে বাইরে চলে এলে এই কোষগুলোকে আর উদ্দীপিত করা যায় না।

এর পরিবর্তে, গবেষক দলটি কিছু স্টেম সেলকে রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে অ্যামেলোব্লাস্টে রূপান্তরিত করেন। ল্যাবরেটরির পাত্রে এই উপাদানগুলো একত্রিত করার পর একটি ‘টুথ অর্গানয়েড’ তৈরি হয়, যা নিজে থেকেই এনামেল প্রোটিন নিঃসৃত করতে সক্ষম।

রুওহোলা-বেকার এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন, যেখানে এই এনামেল প্রোটিনগুলো ফিলিং তৈরিতে বা ফেটে যাওয়া দাঁতের ওপর প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। তবে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ল্যাবরেটরিতে আস্ত একটি দাঁত তৈরি করা।

দন্ত চিকিৎসকের কাছে যেতে অনেকেই ভয় পান
দন্ত চিকিৎসকের কাছে যেতে অনেকেই ভয় পান। ছবি: রয়টার্স

Monday, July 13, 2026

শিশুকে ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে কী হয় by ডা. মানিক মজুমদার

জ্বর হলে দোকানি বা প্রতিবেশীর পরামর্শে শিশুকে কয়েক ডোজ অ্যান্টিবায়োটিক দিলেই তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যায়—এই প্রবণতা বাংলাদেশে খুবই পরিচিত। কখনো জ্বর তিন–চার দিনের বেশি হলে মা–বাবারাই চিকিৎসককে অ্যান্টিবায়োটিক লিখতে চাপ দেন। তবে এই প্রবণতা কি ভালো?

রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় প্রভাব

শিশুকে অপ্রয়োজনে বারবার অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো তার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। এতে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শিশুর হজমশক্তি স্বাভাবিক রাখা এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে জরুরি। বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে শিশু ঘন ঘন অসুস্থ হয়। সাধারণ সর্দি-কাশির সঙ্গেও শিশুর ইমিউন সিস্টেম লড়াই করতে পারে না।

ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি হলো ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স। অপ্রয়োজনে বা অসম্পূর্ণ কোর্সে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ালে শিশুর শরীরের ব্যাকটেরিয়া ধীরে ধীরে সেই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরে যখন শিশু সত্যিকারের মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে আক্রান্ত হয়, তখন অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। বাংলাদেশে এখন এমন শিশু নিয়মিতই পাওয়া যায়, যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না। এ পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর তা কল্পনারও অযোগ্য।

মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব

অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর ডায়রিয়া, বমি, অ্যালার্জি বা ত্বকে র‍্যাশ দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। গবেষণায় উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য—শিশুর জীবনের প্রথম দিকে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা দিতে পারে। মনোযোগের ঘাটতি, অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও নানা আচরণগত সমস্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

করণীয়

প্রথমত, কখনো নিজ থেকে বা দোকানির পরামর্শে শিশুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াবেন না। কেবল নিবন্ধিত চিকিৎসক বা শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শে খাওয়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, মনে রাখবেন—ভাইরাসজনিত সাধারণ সর্দি, কাশি বা জ্বরে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ভূমিকা নেই। সঠিক যত্নে এসব কিছুটা সময় নিয়ে এমনিতেই সেরে যায়। শিশুর পুষ্টি ও বিশ্রামের দিকে নজর দিন। তৃতীয়ত, চিকিৎসক যদি অ্যান্টিবায়োটিক দেন, পুরো কোর্স শেষ করুন। মাঝপথে বন্ধ করলে ড্রাগ রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি বাড়ে। চতুর্থত, স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে শিশুকে সঠিক সুষম পুষ্টিকর খাবার দিন। সংক্রমণ এড়াতে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি ও হাঁচি–কাশির শিষ্টাচারের দিকে লক্ষ রাখুন।

* ডা. মানিক মজুমদার, কনসালট্যান্ট (শিশুরোগ) পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি. ময়মনসিংহ

বাংলাদেশে এখন এমন শিশু নিয়মিতই পাওয়া যায়, যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না
বাংলাদেশে এখন এমন শিশু নিয়মিতই পাওয়া যায়, যাদের শরীরে ছয়-সাত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আর কোনো প্রভাব ফেলছে না। ছবি: পেক্সেলস

Thursday, July 9, 2026

বড়দেরও কি নিয়মিত কৃমির ওষুধ প্রয়োজন by ডা. তাসনোভা মাহিন

আমাদের দেশে শিশু–কিশোরদের প্রতিবছর কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। কৃমি সংক্রমণের কোনো উপসর্গ না থাকলেও কেবল প্রতিরোধের ব্যবস্থা হিসেবেই তাদের দেওয়া হয় এই ওষুধ। প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যেও তো কেউ কেউ ভোগেন কৃমির সমস্যায়। তাহলে কি সব বয়সেই কৃমি প্রতিরোধে ওষুধ খাওয়া জরুরি? স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের মেডিসিন বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. তাসনোভা মাহিন-এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম

কৃমি এবং অন্যান্য বহু জীবাণু প্রতিরোধের উপায় হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন এবং খাওয়ার আগে ভালোভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাসের বিকল্প নেই। বাসনকোসন ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়া এবং কাঁচা খাওয়া যায়—এমন খাবার ভালোভাবে ধুয়ে নেওয়াও জরুরি।

শৌচকর্মের পর ভালোভাবে হাত ধোয়ার গুরুত্বও সবারই জানা। খালি পায়ে মাটিতে হাঁটলে কৃমি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই এ ব্যাপারও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

শিশু–কিশোরদের জন্য কেন বাড়তি সতর্কতা

সব বয়সেই কৃমি প্রতিরোধের জন্য এসব বিষয় মেনে চলা উচিত। তবে বাস্তবতা হলো, শৈশব-কৈশোরে স্বাস্থ্যরক্ষার অনেক দিক সব সময় মেনে চলা সম্ভব না-ও হতে পারে। ঘাসের ওপর দৌড়ে যাওয়ার অবিশ্বাস্য সুন্দর অনুভূতি থেকে আপনিও নিশ্চয়ই আপনার সন্তানকে বঞ্চিত করতে চাইবেন না।

কিন্তু বাড়ন্ত বয়সের আনন্দের মধ্যে পুষ্টিহীনতার কারণ হয়ে উঠতে পারে কৃমি। পুষ্টির ঘাটতিতে বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে প্রতিবছর নিয়মমাফিক তাদের কৃমির ওষুধ খাওয়ানোই ভালো। বড়দের জন্য আলাদাভাবে এমন নিয়ম নেই।

বড়দের মধ্যে কারা নেবেন কৃমির ওষুধ

প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের কৃমি সংক্রমণ ও সংক্রমণজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেশি, সংক্রমণের উপসর্গ না থাকলেও তাঁদের প্রতিবছর কৃমির ওষুধ খেতে বলা হয়।

বাকিদের মধ্যে কৃমি সংক্রমণের উপসর্গ না থাকলে কৃমির ওষুধ তেমন প্রয়োজনীয় নয়। জেনে নিন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বড়দের মধ্যে কারা আছেন ঝুঁকিতে।

* যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম (যেমন ৬৫ বছর পেরোনো ব্যক্তি, কেমোথেরাপি বা দীর্ঘ মেয়াদে স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ সেবনকারী ব্যক্তি)

* খালি পায়ে মাটিতে হাঁটেন বা কাজ করেন, এমন ব্যক্তি (যেমন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি)

* গর্ভধারণ করতে সক্ষম, এমন নারী (গর্ভাবস্থায় নয়)

* যে এলাকায় কৃমির প্রাদুর্ভাব বেশি, সেই এলাকায় বসবাসরত যেকোনো বয়সী নারী-পুরুষ (কখনো কখনো সরকারি উদ্যোগেও কোনো এলাকার সবাইকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর কর্মসূচি হতে পারে)

একটি ওষুধ খেলেই চলবে?

সাধারণত কৃমি প্রতিরোধে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বছরে একবার ৪০০ মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। তবে আমাদের দেশে যেসব কৃমির প্রাদুর্ভাব আছে, সেসব প্রতিরোধ করতে এরই সঙ্গে আরেকটি ওষুধ সেবন করা প্রয়োজন। ওষুধটির নাম আইভারমেকটিন।

একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওজনের ওপর নির্ভর করে আইভারমেকটিনের ডোজ নির্ধারণ করতে হয়। প্রতি কেজি ওজনের জন্য ২০০ মাইক্রোগ্রাম। তাই সঠিক ডোজ জেনে নিতে একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

কখন খাওয়া ভালো

দিনে নাকি রাতে, খাওয়ার আগে নাকি পরে—কখন কৃমির ওষুধ খাওয়া ভালো, এ নিয়ে দ্বিধায় পড়বেন না। আপনি নিজের সুবিধামতো সময়েই কৃমির ওষুধ খেতে পারেন। তবে যেকোনো দুই বেলার খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে কৃমির ওষুধ খাওয়া ভালো।

এক বেলার খাবার খাওয়ার দু-তিন ঘণ্টা পর খেতে পারেন, যার দু–এক ঘণ্টা পর আরেক বেলার খাবারের সময় হয়ে যায়। অনেকে আবার রাতে কৃমির ওষুধ খান। মৃদু কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে সেই সময় বিশ্রাম নিলে তা উপশম হতে পারে। রাতে কৃমির ওষুধ খাওয়ার কোনো আলাদা উপকারিতা নেই।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জানা থাক

কৃমির ওষুধ খাওয়ার পর সাধারণ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে ভয়ের কিছু নেই। এ ধরনের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

* বমি ভাব

* বমি

* পেটে হালকা ব্যথা

* পাতলা পায়খানা

* মাথা ঘোরানো

* মাথাব্যথা

* একটু ঘুম ভাব

* মৃদু বা মাঝারি জ্বর

* পেশিতে হালকা ব্যথা

তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে বিপজ্জনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এ ধরনের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

* তীব্র পেটব্যথা

* চোখ বা প্রস্রাব হলুদ হয়ে যাওয়া

* ত্বকে গোটা সৃষ্টি হওয়া

ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই খেয়াল রাখুন

* গর্ভাবস্থায় কৃমির ওষুধ খেতে নেই। কৃমির ওষুধ খাওয়ার আগে ও পরে (এক মাস পর্যন্ত সময়) গর্ভনিরোধক পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত। এমনকি গর্ভধারণ হয়েছে কি না, এ নিয়ে সন্দেহ থাকলেও কৃমির ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।

* কোনো কৃমির ওষুধে অ্যালার্জি থাকলে তা খাওয়া যাবে না।

* অন্য কোনো ওষুধ চলমান থাকলে বা কোনো রোগের উপসর্গ থেকে থাকলে কৃমির ওষুধ খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ওষুধ খাওয়ার আগেই কৃমি সংক্রমণ হয়ে থাকলেও ভিন্ন ডোজ বা ভিন্ন ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।

* যে মা সন্তানকে দুধ খাওয়ান, তাঁর ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রয়োজন।

সাধারণত কৃমি প্রতিরোধে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বছরে একবার ৪০০ মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন
সাধারণত কৃমি প্রতিরোধে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বছরে একবার ৪০০ মিলিগ্রামের একটি অ্যালবেনডাজল ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। ছবি: পেক্সেলস

Saturday, June 27, 2026

৬ মাস পার হলেই কি শিশুকে মাংস খাওয়ানো যাবে? by রাফিয়া আলম

ছয় মাস পেরোনোর পর মায়ের দুধের পাশাপাশি শিশুকে দিতে হয় সম্পূরক খাবার। পুষ্টিকর খাবার হিসেবে অনেক অভিভাবকই এই বয়স থেকেই খিচুড়ির সঙ্গে শিশুকে মাংস দিয়ে থাকেন।

মাংস থেকে আমিষ, আয়রন, ভিটামিন বি১২, জিংক ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশে এসব উপাদান কাজে লাগে। ছোট্ট শিশুকে মাংস খাওয়ানো প্রসঙ্গে পরামর্শ দিলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশুবিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. তাসনুভা খান।

অভ্যস্ততা

ছয় মাস বয়স পার হলেই মুরগির মাংস দেওয়া যায়। তবে হাঁস, গরু বা খাসির মাংস এক বছর পার হলে খাওয়ানো ভালো। এসব মাংস হজম হতে একটু বেশি সময় লাগে। সব ধরনের মাংস সব শিশুর সহ্য না-ও হতে পারে।
যেকোনো নতুন খাবারে শিশু ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। মাংসের বেলাতেও তা–ই। শিশুকে যেকোনো নতুন খাবারই খুব অল্প পরিমাণে শুরু করতে হয়। অনেক বাড়িতেই ছোট্ট শিশুকে সুজি ও নরম খিচুড়ির মতো খাবার দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে শিশু পরিবারের সাধারণ খাবারের স্বাদের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
শিশুকে শুরুতেই নরম খিচুড়ি বা নরম ভাতের সঙ্গে অল্প পরিমাণে মাংস মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এভাবে ধীরে ধীরে মাংসের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।

খেয়াল রাখুন

* শিশুকে মাংস দিলে অবশ্যই খুব ভালোভাবে সেদ্ধ করতে হবে। আধসেদ্ধ মাংস দেওয়া যাবে না।

* শিশুকে মাংস দেওয়ার পর সে তা খেতে পারছে কি না, তা–ও দেখতে হবে।

* যে শিশু মাত্র খেতে শিখেছে, তাকে মিহি করে মাংস দিতে হবে। শুরুর দিকে ব্লেন্ড করে দেওয়া যেতে পারে।

* সেদ্ধ করার পর হাত দিয়ে চটকে নরম করে দিলেও ছোট শিশু তা খেতে পারবে।

* মুরগি আর সবজি দিয়ে পুষ্টিকর স্যুপও করে দিতে পারেন।

* মাংসের শক্ত টুকরা বা হাড়ের টুকরা দেওয়া যাবে না। এসব অংশ শিশুর গলায় আটকে যেতে পারে।

* যেকোনো মাংসের চর্বি বা শক্ত চামড়ার অংশ ফেলে দিন। ফার্মের মুরগিতেও চর্বি থাকে।

* যেকোনো নতুন খাবার শুরু করার তিন দিনের মধ্যে অন্য আরেকটি খাবার শুরু না করাই ভালো। শিশুর কোনো খাবারে অ্যালার্জি থাকলে এভাবে তা বোঝা সহজ হয়।

* শিশু একটু বড় হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করা ভালো। এতে সে নানান রকম খাবারের প্রতি আগ্রহী হবে। এভাবে সে অল্প অল্প করে মাংসের নানান পদে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে।

* যে বয়সে শিশু নিজ হাতে খাবার ধরতে পারে, সেই বয়সে হাতে মুরগির লম্বা হাড় তার হাতে দেওয়া যেতে পারে। এভাবে সে একটু একটু করে চুষে খেতে শিখবে। উৎসাহও পাবে।

শিশুকে যেকোনো নতুন খাবারই খুব অল্প পরিমাণে শুরু করতে হয়
শিশুকে যেকোনো নতুন খাবারই খুব অল্প পরিমাণে শুরু করতে হয়। ছবি: পেক্সেলস

শরীরে পটাশিয়াম কেন বেড়ে যায়, নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী by অধ্যাপক ডা. এ কে এম মূসা

পটাশিয়াম শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইট বা খনিজ। পেশি ও স্নায়ুর কার্যকারিতা এবং হার্টের ছন্দ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অত্যাবশ্যক। সাধারণত রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা লিটারে ৩ দশমিক ৫ থেকে ৫ মিলিমোল। যখন এটি ৫ দশমিক ৫-এর ওপরে চলে যায়, তখন একে হাইপারক্যালেমিয়া বলা হয়। এটি একটি জরুরি অবস্থা, দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

রক্তের সেরাম ক্রিয়েটিনিন ও ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষা করে এটি বোঝা যায়। ইসিজি-হাইপারক্যালিমিয়ার কারণে কিছু ইসিজির নির্দিষ্ট পরিবর্তন পাওয়া যায়, যা চিকিৎসায় সাহায্য করে। এ ছাড়া প্রস্রাবের পটাশিয়াম, সোডিয়াম ও অসমোলারিটি রোগ নির্ণয়ে দেখা হয়।

পটাশিয়াম বাড়ার কারণ

* কিডনির অকার্যকারিতায় পটাশিয়াম প্রস্রাবের সঙ্গে নির্গত না হয়ে শরীরে জমতে থাকে। দীর্ঘস্থায়ী কিডনির রোগ, বিশেষ করে স্টেজ ৪ ও ৫, হঠাৎ করে সৃষ্ট কিডনি ফেইলিওর, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট-পরবর্তী জটিলতায় বা ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি হলে এমন হয়।

* গুরুতর আঘাতে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ও রক্তকোষ ভেঙে গেলে। হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, যেমন অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির রোগ হলে।

* কিছু ওষুধ যেমন উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এসিই ইনহিবিটরস, এআরবি, পটাশিয়াম-স্পেয়ারিং ডাইইউরেটিকস এবং ব্যথানাশক ওষুধ রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বাড়াতে পারে। অতিরিক্ত পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ।

লক্ষণ কী

* পটাশিয়াম বেড়ে গেলে অনেক সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে বুক ধড়ফড়, বুকে ব্যথা বা হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হতে পারে। পেশিতে দুর্বলতা, অবশ ভাব বা খিঁচুনি, বমি ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি হতে পারে।

* হাইপারক্যালিমিয়ার জটিলতা-কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট অর্থাৎ হৃদ্‌যন্ত্র হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া। পক্ষাঘাত।

খাবার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি

* যেসব খাবার খাওয়া যাবে না—ডাবের পানি, কলা, আলু, টমেটো, আরও কিছু ফল ও শাকসবজি।

* যেসব সবজি খাওয়া যাবে—ঝিঙে, চিচিঙ্গা, চালকুমড়া, পটোল, ডাঁটা, লাউ, মুলা, শসা, শিম।

* যেসব ফল খাওয়া যাবে—পেয়ারা, পেঁপে, আপেল, নাশপাতি, আনারস, বেল, জামরুল।

* যেসব শাক খাওয়া যাবে—ডাঁটাশাক, লাউশাক, কলমিশাক, লালশাক।

তবে একজন ডায়েটেশিয়ানের পরামর্শে খাদ্য গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। কোনো ওষুধের কারণে হাইপারক্যালিমিয়া হলে, তা পরিবর্তন করতে হবে।

* অধ্যাপক ডা. এ কে এম মূসা, মেডিসিন বিভাগ চেম্বার: আলোক হেলথকেয়ার, মিরপুর-১০, ঢাকা

পটাশিয়াম বেড়ে গেলে বুকে ব্যথা বা হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হতে পারে
পটাশিয়াম বেড়ে গেলে বুকে ব্যথা বা হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হতে পারে। ছবি: পেক্সেলস

Wednesday, June 24, 2026

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে যেসব পানীয়

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বললেই অনেকে সবার আগে গ্রিন টি-র কথা ভাবেন। স্বাস্থ্যের জন্য এই চায়ের নানা গুণের কথা সবারই জানা।

তবে পুষ্টিবিদদের মতে, গ্রিন টি ছাড়াও এমন কিছু ঘরোয়া পানীয় রয়েছে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে দারুণ কাজ করে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের পাশাপাশি এই পানীয়গুলো খেলে হৃদ্‌যন্ত্র বা হার্ট ভালো থাকে। চলুন, জেনে নিই পানীয়গুলো কী কী।

তবে মনে রাখা জরুরি, কোনো পানীয়ই উচ্চ রক্তচাপের মূল ওষুধের বিকল্প নয়।
উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, কারণ দীর্ঘ সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি শরীরের বড় ক্ষতি করে দেয়। তাই ওষুধের পাশাপাশি এগুলোকে স্বাস্থ্যকর জীবনের অংশ করে নেওয়া যেতে পারে।

জবা ফুলের চা (হিবিস্কাস টি)
যাদের ক্যাফেইনে সমস্যা আছে, তারা গ্রিন টি-র বদলে জবা ফুলের চা বেছে নিতে পারেন। এই চা ঠাণ্ডা বা গরম— দুইভাবেই খাওয়া যায়।
জবা ফুলে থাকা ‘পলিফেনল’ রক্তনালিগুলোকে শিথিল করে দেয়, ফলে রক্ত চলাচল সহজ হয়। অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট এবং ভিটামিন সি-তে ভরপুর এই চা রক্তচাপের পাশাপাশি কোলেস্টেরল কমায়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, হজম ভালো করে এবং ওজন কমাতেও সাহায্য করে।

বেদানার রস
বেদানা কেবল সুস্বাদু ফলই নয়, এটি হার্টের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট থাকে, যা শরীরের প্রদাহ (ইনফ্লেমেশন) কমাতে সাহায্য করে। বেদানার রস রক্তনালি সচল রেখে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
তবে বাজার থেকে কেনা চিনিযুক্ত জুস না খেয়ে, বাড়িতে তৈরি করা খাঁটি বেদানার রস খাওয়া বেশি কার্যকরী।

বিটের রস
বিট হলো ‘ডায়েটারি নাইট্রেট’-এর একটি দুর্দান্ত উৎস। এই রস শরীরে যাওয়ার পর নাইট্রেট উপাদানটি ‘নাইট্রিক অক্সাইড’-এ পরিণত হয়। এটি রক্তনালিকে প্রসারিত ও শিথিল করে দেয়, যার ফলে রক্তচাপ দ্রুত স্বাভাবিক হতে শুরু করে। উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য এই রস যেমন উপকারি, তেমনই এটি শারীরিক কর্মক্ষমতা ও শক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল পানীয়ের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত প্রেশার মাপা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সুষম জীবনযাপন করা জরুরি।

সূত্র : আনন্দবাজার

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে যেসব পানীয়

চুলের যত্নে নারকেল তেলের সঙ্গে মেশাতে পারেন যে ৫ উপাদান

চুলের যত্নে নারকেল তেলের ব্যবহার বহু যুগ ধরে প্রচলিত। প্রাকৃতিক এই তেল শুধু চুলকে নরম ও উজ্জ্বল রাখে না, বরং চুলের গোড়া মজবুত করতে এবং চুল ভাঙা কমাতেও সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারকেল তেলে থাকা লরিক অ্যাসিড চুলের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, যা চুলের প্রোটিন ক্ষয় কমাতে সাহায্য করে। ফলে চুল থাকে আরো স্বাস্থ্যকর, মজবুত এবং প্রাণবন্ত। তবে নারকেল তেলের সঙ্গে কিছু উপকারী উপাদান মিশিয়ে ব্যবহার করলে এর উপকারিতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। জেনে নিন এমন ৫টি কার্যকর সংমিশ্রণের কথা।

নারকেল তেল ও মেথি
মেথি বীজে রয়েছে প্রোটিন, আয়রন, ফ্ল্যাভোনয়েড ও নিকোটিনিক অ্যাসিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান, যা চুলের বৃদ্ধিতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। এছাড়া মেথিতে থাকা লেসিথিন মাথার ত্বককে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে এবং শুষ্কতা কমায়।

ব্যবহার পদ্ধতি
২ টেবিল চামচ মেথি সারা রাত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে পেস্ট তৈরি করে নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে মাথার ত্বক ও চুলে লাগান।

নারকেল তেল ও ভৃঙ্গরাজ
আয়ুর্বেদে ভৃঙ্গরাজকে ‘ভেষজের রাজা’ বলা হয়। এটি চুলের বৃদ্ধি বাড়াতে এবং অকালেই চুল পেকে যাওয়া প্রতিরোধে সহায়ক বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে।

ব্যবহার পদ্ধতি
আধা কাপ নারকেল তেলের সঙ্গে ২ টেবিল চামচ শুকনো ভৃঙ্গরাজ গুঁড়ো মিশিয়ে ১৫ মিনিট হালকা আঁচে গরম করুন। ঠান্ডা হলে ছেঁকে কাচের বোতলে সংরক্ষণ করুন এবং নিয়মিত ব্যবহার করুন।

নারকেল তেল ও কালোজিরা
কালোজিরায় থাকা থাইমোকুইনোন শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও প্রদাহনাশক উপাদান হিসেবে পরিচিত।
এটি মাথার ত্বকের প্রদাহ ও জ্বালাভাব কমাতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি চুলের গোড়াকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও সুরক্ষা দেয় বলে মনে করা হয়।

ব্যবহার পদ্ধতি
গুঁড়ো করা কালোজিরা নারকেল তেলের সঙ্গে মিশিয়ে কয়েক ঘণ্টা রেখে ব্যবহার করতে পারেন।

নারকেল তেল ও লবঙ্গ
চুলের যত্নে লবঙ্গের ব্যবহার খুব বেশি পরিচিত না হলেও এটি বেশ উপকারী হতে পারে। লবঙ্গে থাকা ইউজেনল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল গুণে সমৃদ্ধ, যা মাথার ত্বকের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি রক্তসঞ্চালন বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্যবহার পদ্ধতি
৪ থেকে ৫টি লবঙ্গ নারকেল তেলে হালকা গরম করুন। ঠান্ডা হলে সেই তেল মাথার ত্বকে মালিশ করুন।

নারকেল তেল ও রোজমেরি অয়েল
বর্তমানে চুলের বৃদ্ধির জন্য রোজমেরি অয়েল বেশ জনপ্রিয় একটি প্রাকৃতিক উপাদান। এটি মাথার ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়াতে এবং প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।

ব্যবহার পদ্ধতি
২ টেবিল চামচ নারকেল তেলের সঙ্গে ৫ ফোঁটা রোজমেরি এসেনশিয়াল অয়েল মিশিয়ে ১০-১৫ মিনিট মাথার ত্বকে ম্যাসাজ করুন। সারা রাত রেখে পরদিন শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

যদিও এসব প্রাকৃতিক উপাদান চুলের যত্নে সহায়ক হতে পারে, তবে সবার ত্বক ও চুলের ধরন এক নয়। তাই নতুন কোনো উপাদান ব্যবহার করার আগে অল্প পরিমাণে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। কোনো ধরনের অ্যালার্জি বা সমস্যা দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। প্রাকৃতিক উপায়ে চুলের যত্ন নিতে চাইলে নারকেল তেলের সঙ্গে এই উপাদানগুলোর সংমিশ্রণ হতে পারে একটি সহজ ও কার্যকর সমাধান।

সূত্র : এই সময়

চুলের যত্নে নারকেল তেলের সঙ্গে মেশাতে পারেন যে ৫ উপাদান

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে উপকারী হতে পারে যে ফল

স্বাস্থ্যসচেতনদের খাদ্যতালিকায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অ্যাভোকাডো। সালাদ, টোস্ট কিংবা বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর খাবারে এই বিদেশি ফলের ব্যবহার এখন বেশ পরিচিত।

পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় একে অনেকেই ‘সুপারফুড’ বলে থাকেন। সম্প্রতি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে অ্যাভোকাডোর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা বেড়েছে।

পুষ্টিবিদদের মতে, অ্যাভোকাডোতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ভিটামিন বি৬, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট এবং হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট (গুড ফ্যাট) । অন্যান্য অনেক ফলের তুলনায় এতে কার্বোহাইড্রেট কম এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বেশি থাকে, যা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য অ্যাভোকাডো উপকারী হতে পারে কারণ এর উচ্চ ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রক্তে শর্করার দ্রুত ওঠানামা কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাভোকাডো সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস খাদ্যের গ্লাইসেমিক লোড কমাতে সহায়তা করতে পারে।

সকালের নাস্তায় ব্রাউন ব্রেডের সঙ্গে অ্যাভোকাডোর শাঁস মেখে খাওয়া যেতে পারে।
সিদ্ধ ডিমের সঙ্গে খেলে তা আরো পুষ্টিকর হতে পারে। ফাইবারের উপস্থিতির কারণে এটি দীর্ঘ সময় তৃপ্তি দেয় এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমায়। তবে চিকিৎসকদের মতে, অ্যাভোকাডো কোনোভাবেই ডায়াবেটিসের ওষুধ নয়। এটি কেবল স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হতে পারে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যাভোকাডো উপকারী হলেও আপেল, পেয়ারা বা অন্যান্য পুষ্টিকর ফলের বিকল্প হিসেবে নয়; বরং সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবেই এটি খাওয়া উচিত।

সূত্র : আনন্দবাজার

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে উপকারী হতে পারে যে ফল

Sunday, June 21, 2026

শিশুর জ্বরে কখন ও কীভাবে প্যারাসিটামল খেতে দেবেন by ডা. মানিক মজুমদার

শিশুর শরীর সামান্য গরম মনে হলেই অনেক মা-বাবা উদ্বিগ্ন হন। তাড়াহুড়ো করে প্যারাসিটামল খাওয়ানো শুরু করেন। অনেক সময় তাপমাত্রা না মেপেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় এবং শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। প্রথমেই জানা জরুরি শিশুকে কখন প্যারাসিটামল দেওয়া উচিত।

কখন শুরু করবেন প্যারাসিটামল

শরীরের তাপমাত্রা ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হলেই প্যারাসিটামল প্রয়োজন হয়। এর মাত্রা নির্ধারিত হয় শিশুর ওজনের ভিত্তিতে, বয়সের ভিত্তিতে নয়। সাধারণ হিসাব প্রতি কেজি ওজনের জন্য প্রায় ১৫ মিলিগ্রাম।

উদাহরণ দেওয়া যাক তাহলে। প্রায় ৮ কেজি ওজনের একটি শিশুর জন্য সিরাপের পরিমাণ এক চা-চামচ অথবা পাঁচ মিলিলিটার আর ১৬ কেজি ওজনের শিশুর জন্য তা দ্বিগুণ অর্থাৎ দুই চা-চামচ। এই সিরাপ প্রতি ছয় ঘণ্টা অন্তর দেওয়া যায়। দিনে সর্বোচ্চ চারবার। যদি জ্বর ১০২ ডিগ্রি বা তার বেশি হয় ও শিশু সিরাপ খাওয়ার অবস্থায় না থাকে, তখন ওজন অনুযায়ী পায়ুপথে সাপোজিটরি দিতে পারেন আট ঘণ্টা অন্তর এক দিনে সর্বোচ্চ তিনবার।

প্যারাসিটামল কতটা নিরাপদ

নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধান না মেনে বা অতিরিক্ত মাত্রায় প্যারাসিটামল দিলে শিশুর লিভার ও কিডনির ক্ষতি হতে পারে। শিশুর শরীরে র‍্যাশ, ফুসকুড়ি, মুখ অথবা ঠোঁট ফুলে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘুম, খিঁচুনি বা জন্ডিসও হতে পারে। তাই এই ওষুধকে নিরাপদ মনে করে নিজের ইচ্ছামতো বারবার প্রয়োগ করাটা মোটেও উচিত নয়।

অ্যান্টিবায়োটিক কি জরুরি

আরেকটি বিষয়ে অভিভাবকদের মধ্যে বিভ্রান্তি থাকে, তা হলো জ্বরের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের সম্পর্ক। শিশুর জ্বর হলেই অনেক মা-বাবা মনে করেন, দ্রুত অ্যান্টিবায়োটিক দিলেই সমস্যা মিটবে। বাস্তবতা হলো, শিশুদের অধিকাংশ জ্বরের কারণ ভাইরাসজনিত, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা নেই। জ্বর এলে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা প্রক্রিয়া, জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি অংশ। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করলে তা শুধু শিশুর শরীরের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট করে না, ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স অথবা প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। এতে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনের সময় চিকিৎসা কঠিন করে তোলে।

শিশুর জ্বর হলে কী করবেন

শিশুর জ্বর হলে প্রথমেই তাপমাত্রা মেপে দেখুন। প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় প্যারাসিটামল দিন। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না। জ্বর তিন দিনের বেশি থাকলে অথবা শিশুর অস্বাভাবিক দুর্বলতা, খিঁচুনি বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

* ডা. মানিক মজুমদার, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড, ময়মনসিংহ

জ্বর হলেই তাড়াহুড়ো করে প্যারাসিটামল খাওয়ানো ঠিক নয়
জ্বর হলেই তাড়াহুড়ো করে প্যারাসিটামল খাওয়ানো ঠিক নয়। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

Thursday, June 18, 2026

হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুবিধা ও ঝুঁকিগুলো জেনে রাখুন by অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেন

হাঁটুতে দীর্ঘদিনের ব্যথা, ফোলা ও চলাফেরায় কষ্টের কারণ সাধারণত অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাড়ের বিকৃতি বা কোনো দুর্ঘটনাজনিত আঘাত। প্রাথমিকভাবে ওষুধ, ব্যায়াম ও ফিজিওথেরাপিতে উপকার না হলে হাঁটু প্রতিস্থাপনে অস্ত্রোপচার (সার্জারি) প্রয়োজন হতে পারে।

হাঁটু প্রতিস্থাপন সার্জারিতে ক্ষতিগ্রস্ত হাঁটুর অংশ অপসারণ করে সেখানে কৃত্রিম সংযোগ বা ইমপ্ল্যান্ট বসানো হয়। বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সফল ও বহুল প্রচলিত একটি অস্ত্রোপচার।

কখন অস্ত্রোপচার দরকার হতে পারে

● হাঁটুতে তীব্র ব্যথা ও ফুলে গেলে। হাঁটা, বসা বা সিঁড়ি ওঠা–নামায় সমস্যা হলে।

● ওষুধ বা ফিজিওথেরাপিতে উপকার না পেলে। অথবা হাঁটু বেঁকে বা শক্ত হয়ে গেলে।

হাঁটু প্রতিস্থাপনে সুবিধা

ব্যথা অনেক কমে যায়। স্বাভাবিক চলাফেরা সহজ হয়। দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা বাড়ে। অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক ও সক্রিয় জীবনে ফিরে যেতে পারেন।

কত দিন ভালো থাকা যায়

আধুনিক হাঁটু প্রতিস্থাপনের ইমপ্ল্যান্ট সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছরের বেশি সময় কার্যকর থাকে। হাঁটু প্রতিস্থাপন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম সফল অস্ত্রোপচার হিসেবে বিবেচিত। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯৫-৯৮ শতাংশ রোগী অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘদিন ব্যথামুক্ত ও স্বাভাবিক চলাফেরায় সক্ষম হন। হাঁটু প্রতিস্থাপনের এক দিন পরেই রোগী সম্পূর্ণ ভর দিয়ে হাঁটাচলা শুরু করেন। বাংলাদেশে এখন সফলতার সঙ্গে হাঁটু প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।

সম্ভাব্য কিছু ঝুঁকি

যেকোনো অস্ত্রোপচার–পদ্ধতির মতো হাঁটু প্রতিস্থাপনেও কিছু ঝুঁকি আছে। যেমন—

● অ্যানেসথেসিয়ার সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকি: গভীর শিরা–রক্তনালিতে বা পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধা। কখনো কখনো এই জমাট রক্তগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে ফুসফুসে যেতে পারে। এর ফলে একটি মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়, যার নাম ‘পালমোনারি এম্বোলিজম’।

● অস্ত্রোপচারের জায়গায় বা জয়েন্টের মধ্যে সংক্রমণ: ইমপ্লান্টের চারপাশের হাড়ে ফ্র্যাকচার (ফাটল) হতে পারে। হাঁটুর ক্যাপের স্থানচ্যুতি ঘটতে পারে অথবা কাছাকাছি থাকা লিগামেন্ট (অস্থিবন্ধনী), স্নায়ু ইত্যাদির কিছু ক্ষতি হতে পারে।

* অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেন, চিফ কনসালট্যান্ট ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থোপেডিক, আর্থ্রোপ্লাস্টি, আর্থোস্কোপিক এবং ট্রমা সার্জারি বিভাগ, ল্যাবএইড হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা

হাঁটুতে দীর্ঘদিনের ব্যথা, ফোলা ও চলাফেরায় কষ্টের কারণ সাধারণত অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাড়ের বিকৃতি বা কোনো দুর্ঘটনাজনিত আঘাত
হাঁটুতে দীর্ঘদিনের ব্যথা, ফোলা ও চলাফেরায় কষ্টের কারণ সাধারণত অস্টিওআর্থ্রাইটিস, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হাড়ের বিকৃতি বা কোনো দুর্ঘটনাজনিত আঘাত। ছবি: পেক্সেলস

কিডনি সুস্থ রাখতে কী খাবেন by ফারজানা ওয়াহাব

কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের ওপর রেনাল লোড বা কিডনির ওপর চাপ নির্ভর করে। তাই কিডনি সুস্থ রাখতে পুষ্টির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত।

রেনাল লোড কী

আমরা যে খাবার খাই, তা থেকে শরীরে বিভিন্ন বর্জ্য তৈরি হয়—যেমন ইউরিয়া, সোডিয়াম, পটাশিয়াম। এগুলো ছাঁকতে (ফিল্টার) কিডনিকে প্রতিনিয়ত কাজ করতে হয়। এই কাজের চাপকেই বলা হয় রেনাল লোড। প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রোটিন, লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এই রেনাল লোড বাড়ায়, যে কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিডনি সুস্থ রাখার ১০টি টিপস

পর্যাপ্ত পানি পান: প্রতিদিন ৬-৮ গ্লাস (শরীর ও আবহাওয়া অনুযায়ী পানির পরিমাণ বাড়তে পারে)। প্রস্রাব হালকা স্বচ্ছ রঙের থাকলে বুঝবেন পানির পরিমাণ ঠিক আছে।

লবণ কম খাওয়া: দিনে ১ চা–চামচ বা তার কম, শুধু রান্নায় লবণ ব্যবহার করুন। কাঁচা বা ভাজা লবণ পরিহার করুন। অতিরিক্ত লবণ কিডনি ও উচ্চ রক্তচাপের জন্য ক্ষতিকর।

প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়ান: চিপস, ফাস্ট ফুড, ক্যানজাত খাবার বাদ দিন। এগুলোয় লবণ ও রাসায়নিক উপাদান বেশি থাকে।

সুষম খাবার: শাকসবজি, ফল, দেহের ওজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত প্রোটিন (বিশেষ করে লাল মাংস) যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।

নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।

ডায়াবেটিস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: এগুলো কিডনির রোগের প্রধান কারণ। নিয়মিত চেকআপ করুন।

ব্যথার ওষুধ: অকারণে বা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না।

ধূমপান অ্যালকোহল: এসব এড়িয়ে চলুন। এগুলো কিডনির রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়।

ওজন নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ওজন কিডনির ওপর চাপ ফেলে।

নিয়মিত পরীক্ষা: নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে সমস্যা শুরুতেই ধরা পড়ে।

কীভাবে বুঝবেন কিডনি আক্রান্ত

অনেক সময় প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণ থাকে না। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

● শরীর ফুলে যাওয়া (পা/মুখ)।

● প্রস্রাবে সমস্যা, প্রস্রাবে ফেনা বা রক্তপাত।

● দুর্বলতা

● ক্ষুধামান্দ্য

মনে রাখতে হবে, কিডনির রোগ হঠাৎ করে হয় না—এটি ধীরে ধীরে বাড়ে। তাই সচেতন হলে বড় জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
কিডনি রোগের ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক থাকুন
কিডনি রোগের ঝুঁকি এড়াতে সতর্ক থাকুন। প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো

শিশুদের বার্নআউট বুঝবেন কীভাবে by মৃণাল সাহা

শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো পরিশ্রমের সময়, এখানে অবসাদ স্থায়ী হওয়ার কোনো সুযোগই নেই; বরং তাকে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেন অনেকে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতার চাপই ডেকে আনতে পারে অবসাদ, প্রভাব ফেলতে পারে শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর।

বার্নআউট’ শব্দটা সম্ভবত সবচেয়ে খাপ খায় করপোরেট চাকরিজীবীদের সঙ্গে। কাজের চাপে পিষ্ট হয়ে অবিরাম ডেডলাইনের চাপে মানসিক চাপ ছাড়িয়ে যায় সহ্যের সীমা। তখনই ভেঙে পড়ে শরীর ও মন। সাধারণ কাজকর্ম করতেও তখন বিরক্ত লাগে, মানসিক অবসাদ মিলিয়ে শরীর আর চলতে চায় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই বার্নআউট।

অনেকেরই ধারণা, এ ধরনের বার্নআউট শুধু মাঝবয়সী চাকরিজীবীদেরই হতে পারে। কিন্তু তা নয়, বার্নআউট হানা দিতে পারে যেকোনো বয়সে। মূলত মানুষের মস্তিষ্ক যখন প্রতিদিনের কাজের চাপ একত্রে আর নিতে পারে না, তখনই চেপে বসে মানসিক অবসাদ। আর সেই অবসাদ থেকে শরীর ও মন দুটিই হাল ছেড়ে দেয়। এই অবসাদ যে শুধু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জমা হয়, তা নয়; বরং শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ।

শিশুদের বার্নআউট কেন হয়?

শিশুরা বার্নআউট হতে পারে বিভিন্ন কারণে। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষা, পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে শুরু করে পরিবারের মানুষের চাপ। অনেক সময় একটা পরীক্ষার ফল ভালো না হওয়ার প্রভাবও পড়তে পারে অনেক বড় আকারে। তাই মানসিক চাপ ভালোভাবে মনে গেঁথে বসার আগেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

ঠিক এই জায়গায়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মা–বাবার ভূমিকা। কারণ, একটি শিশুকে খুব কাছ থেকে দেখেন তার মা-বাবা। সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন আর লক্ষণ দেখে সহজেই ধারণা করতে পারবেন, আপনার সন্তান বার্নআউট হয়ে যাচ্ছে কি না এবং তখন থেকেই দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে এই অবসাদ মনে আজীবনের মতো চেপে না বসে।

বার্নআউট বুঝবেন কীভাবে?

হঠাৎ করেই গড়িমসি করা

আগে হয়তো আপনার সন্তান স্কুল থেকে ফিরেই নিজে থেকে পড়তে বসে যেত, কিন্তু এখন তাকে পড়তে বসার কথা বারবার মনে করাতে হচ্ছে। বাসার পড়া তো পড়ছেই না, বইপত্রের মুখোমুখিই হতে চাচ্ছে না। নানা অজুহাতে পড়তে বসা পিছিয়ে দিচ্ছে। পড়াশোনার প্রতি অবসাদ, বার্নআউট থেকে এমনটা হতে পারে।

উদাসীন ভাব

হঠাৎ করেই সন্তানের মধ্যে সবকিছুর প্রতি একধরনের অনীহা বা উদাসীনতা দেখা দিতে পারে। আগে স্কুল থেকে ফিরেই প্রতিটি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আলোচনা করত, কথা বলত; কিন্তু হঠাৎ করেই এমন কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে সে। জিজ্ঞেস করলেও দুই এক শব্দের মধ্যেই কথা শেষ করতে চায়। হুট করে আগ্রহ কমে যেতে পারে বার্নআউট থেকে।

প্রিয় কাজে অনীহা

পড়াশোনার পাশাপাশি আগে যেসব কাজ করার জন্য উৎসুক ছিল, যেমন কোনো শখের কাজ বা খেলাধুলায় যেতে ভীষণ অনীহা দেখানো, নতুন নতুন বাহানা তৈরি করা হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ।

মনোযোগ হারিয়ে ফেলা

শিশুরা সাধারণত দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। কিন্তু হুট করেই যদি দেখেন তার মনোযোগ কমে গেছে, আগে টানা ২০-৩০ মিনিট মনোযোগ দিতে পারত, সে এখন ১০ মিনিটও স্থির থাকতে পারছে না; তাহলে সেটিও হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ। অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং শারীরিক ক্লান্তি থেকে মনোযোগ অনেক সময় কমে যায়।

খিটখিটে মেজাজ

বার্নআউটের অন্যতম লক্ষণ খিটখিটে মেজাজ। হুট করেন শিশুর হাসিখুশি চেহারা উবে যায়, আর মনমেজাজ হয় তিরিক্ষি। ছোটখাটো বিষয়ে রিঅ্যাক্ট করা হতে পারে বার্নআউটের লক্ষণ।

সাহায্য করবেন কীভাবে?

সন্তানকে জানুন

প্রতিটি শিশুর আচরণ, স্বভাব, মানসিক চাপ নেওয়ার ক্ষমতা আলাদা। সময়ের সঙ্গে, পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে এসব গড়ে ওঠে। কোন বিষয়গুলো আপনার সন্তানকে আনন্দ দিচ্ছে, কোন বিষয়গুলো তার মনে বিরক্তির উদ্রেক করছে—এসব বোঝার চেষ্টা করুন। সময় দিয়ে তাকে বিভিন্ন কাজে আগ্রহী করে তুলুন।

সন্তানকে পথ দেখান

সন্তান সুন্দর একটা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাক, তা কে না চান! কিন্তু সেই চাওয়া-পাওয়া সন্তানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। এমন চাপ থেকেও মানসিক অবসাদ আসে। সন্তানের ওপর আপনার চাওয়া-পাওয়া যে বাড়তি চাপ নয়, সেটি তার ছোট্ট মনে গেঁথে দিন।

সন্তানের কথা শুনুন

বেশির ভাগ সময়েই মা-বাবা সন্তানের কথার তেমন মূল্য দেন না; বরং নিজের কথাকেই বড় মনে করেন। তবে এই সময়ে শিশুদের মানসিক স্বস্তির জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সে–ও যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানো।

বিশ্রাম দিন

বেশির ভাগ বার্নআউটের পেছনে কারণ থাকে টানা কাজ করে যাওয়া। ক্লান্ত মন ও শরীরকে নতুন করে সতেজ করতে সবারই পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন। পড়াশোনা দূরে রেখে তাকে একটু নিজের মতো সময় কাটাতে দিন। তার শরীর ও মনকে একটু আরাম করতে দিন।

স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ করুন

ডিভাইস বা ফোনের স্ক্রিনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা শিশুদের মস্তিষ্ককে শান্ত করে না, উল্টো বার্নআউটের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই ডিভাইসের সামনে না বসিয়ে অফলাইন বা মাঠে খেলতে নিয়ে যান। এতে তারা যেমন শারীরিকভাবে অ্যাকটিভ হবে, তেমনই মানসিক চাপও অনেকটা ঝেড়ে ফেলতে পারবে।

চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখান

মানসিক চাপ বা কঠিন পরিস্থিতি কীভাবে বুদ্ধি দিয়ে সামলাতে হয়, তা সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই একটু একটু শেখান। পরীক্ষার সময়ের চাপ, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আবেগকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেটা কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে কথা বলুন। মন খারাপ হলে বা চাপ অনুভব করলে তা নিয়ে কথা বলা, ডায়েরি লেখা বা খেলাধুলার অভ্যাস দারুণ উপকারে আসে।

সূত্র: চাইল্ড ফোকাস
শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ
শিশুদের মধ্যেও দেখা যায় বার্নআউটের বেশ কিছু লক্ষণ। ছবি: প্রথম আলো
 

Wednesday, June 17, 2026

বড়রাও কেন হামে আক্রান্ত হন? কীভাবে বুঝবেন, চিকিৎসা কী? by ডা. শাহনুর শারমিন

দেশে চলছে হামের প্রাদুর্ভাব। হাম যদিও মূলত শিশুদের রোগ, কিন্তু এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে শিশুকালে একবার হাম হয়ে গেলে কিংবা হামের টিকা নেওয়া থাকলে হামের সংক্রমণের আশঙ্কা কম থাকে। এ কারণে সহজে বড়রা হামে আক্রান্ত হন না। তবে এবার হাম পরিস্থিতি আলাদা। শিশুদের ক্ষেত্রেও যেমন বয়সের বাছবিচার মানছে না, তেমনি বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

কেন আক্রান্ত হন বড়রা

যাঁরা আগে টিকা নেননি বা অসমাপ্ত টিকার ডোজ নিয়েছেন, যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগে ভুগছেন, কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগী বা স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ খাচ্ছেন, রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি নিচ্ছেন, তাঁরাই হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিককালে শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি ছিল বলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’র কার্যকারিতা নষ্ট হয়েছে। তাই বর্তমানে যেকোনো বয়সী মানুষ হামে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে হাম শিশুদের ক্ষেত্রে যতটা মারাত্মক রূপ ধারণ করে বা জটিলতার সৃষ্টি করে, বড়দের বেলায় অতটা না-ও করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড়রা তেমন কোনো জটিলতা ছাড়াই সেরে উঠতে পারেন।

কীভাবে বুঝবেন

হামের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রেই প্রায় এক। তীব্র জ্বর, গায়ে ব্যথা, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীর বা গলা ব্যথার সঙ্গে থাকছে চামড়ায় ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ। কখনো কখনো বড়দের ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ শিশুদের চেয়েও মারাত্মক হতে পারে। হাম খুবই সংক্রামক বলেই শিশুদের কাছ থেকে বড়রা আক্রান্ত হতে পারেন। অসচেতনতার কারণে সময়মতো সাবধান না হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ আরও কিছু জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

চিকিৎসা কী

বেশির ভাগ ভাইরাসজনিত রোগের মতোই হামেরও কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তাহলে কী করবেন? চাই পূর্ণ বিশ্রাম এবং পানিশূন্যতা রোধের জন্য পর্যাপ্ত তরল খাবার। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ খেতে হবে।

ঠান্ডা-কাশির জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন বা অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। কখনো কখনো প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হতে পারে। ফুসফুসের প্রদাহের কারণে শ্বাসকষ্ট বা প্রচণ্ড কাশি বা বুকে ব্যথার মতো সমস্যা হলে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে।

যেভাবে প্রতিরোধ

হামের মতো অতিসংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে রোগীকে আলাদা রাখা বা আইসোলেশন করা। চামড়ায় ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ আসার আগে থেকেই রোগীর কাছ থেকে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারেন। তাই এই নাজুক সময়ে জ্বর, গায়ে ব্যথা, ঠান্ডা কাশি হলে হামের কথা মাথায় রাখতে হবে। হাম প্রতিরোধে টিকার বিকল্প নেই। আগে টিকা দেওয়া না থাকলে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে যেহেতু এটি ছড়ায়, তাই আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সাবধানে থাকতে হবে। মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ইত্যাদি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।

* ডা. শাহনুর শারমিন, অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

দেশে চলছে হামের প্রাদুর্ভাব
দেশে চলছে হামের প্রাদুর্ভাব। ছবি: ফ্রিপিক