Sunday, January 3, 2016

জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে হোক সামনের পাঁচ নির্বাচন by মিনার রশীদ

এ দেশে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয় গিনেস বুক অব রেকর্ডসে শুধুমাত্র নামটি ওঠানোর জন্য। আমাদের বুকের মাঝে কতখানি দেশপ্রেম রয়েছে তা ঠিকঠাক মতো প্রদর্শনের জন্য কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন পড়ে। আমরা যে কিছিমের দেশপ্রেমের রেকর্ড গড়ি সেই রেকর্ড ভাঙার জন্য আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেনের মতো কোনো প্রজ্ঞাবান জাতি কখনই এগিয়ে আসে না। কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমরা বৃহত্তম মানবপতাকার যে রেকর্ড গড়েছিলাম, তা নাকি আবার পাকিস্তান পুনরুদ্ধার করে নিয়েছে। বাইরে যাই দেখাই না কেন, ভেতরের মিলটি সত্যিই অবাক করার মতো! সেই বিবেচনায় বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে খানিকটা বুদ্ধিমানই মনে হয়। মেরুদণ্ড আছে কি নেই তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও তাদের বুদ্ধি নিয়ে একই সন্দেহ পোষণ করা যাবে না। কারণ কোনোরূপ খরচ ছাড়াই এই কমিশন অনেক বিশ্বরেকর্ড এই জাতিকে উপহার দিয়েছে। একটি ব্যালট পেপারে সিল না দিয়েও সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই পৃথিবীর অন্য কোনো নির্বাচন কমিশন তাদের ঝুলিতে ভরতে পারেনি। মাত্র চার বছর বয়সে তিন তিনটি ভোট দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে এই দেশের একটি শিশুর। পৃথিবীর অন্য কোনো শিশুর কপালে জোটেনি। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন বেঁচে থাকলে এই শিশুটিকে ডেকে নিয়ে অনেক অনেক আদর করতেন। এই শিশুটির নাম দিতেন ‘ভোট শিশু’। পৃথিবীর কোনো দেশের পূর্ণবয়স্ক ভোটাররা ভোট দিতে গিয়ে গণহারে জন্মদাতা পিতাদের নাম ভুলে যায়নি। জাদুকর পিসি সরকার ভেলকি দিয়ে যেমন সারা দেশের ঘড়ির সময় বদলে ফেলেছিল তেমনি সরকারের ভেলকিতে ডিজিটাল ভোটাররা জন্মদাতা পিতার নাম ভুলে গেছে। পিসি সরকারের মতো এই ভেলকি এ সরকারের একটি অনন্য রেকর্ড হয়ে থাকবে। বুদ্ধিমান রকীব সাহেব সাংবাদিকদের নির্বাচন কেন্দ্রে বেশিক্ষণ না থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। জাতি তার সেই পরামর্শের মাহাত্ম্য এখন ঠিকভাবে মালুম করতে পেরেছে। পিচকি পিচকি সাংবাদিকদের কেউ কেউ সেই নির্দেশটি অমান্য করলেও বাঘা বাঘা সাংবাদিকেরা রকীব সাহেবের মনোবাঞ্ছা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। উভয়লিঙ্গের বিরোধীদলীয় নেত্রী ঠিকই ঠাহর করেছেন, দেশে বেকার সমস্যার কারণেই এই বিচ্ছুর বাচ্চাদের (তার দৃষ্টিতে) সংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। তবে বিপন্ন মানবতার উদ্ধারকারী হিসেবে সামনে উপস্থিত হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম শুধু নির্বাচন কমিশনকেই উলঙ্গ করেনি, তার অন্যতম প্রশ্রয়দাতা এসব মিডিয়াকেও ন্যাংটা করে ছেড়েছে ও ছাড়বে। যেই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া কথিত অপরাধ সংঘটনের আগেই বিচারপতি এম এ আজিজের প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই একই মিডিয়া পরপর কয়েকবার (সারা পৃথিবীর বিস্ময় রকীব কর্তৃক) এমন রেকর্ড সৃষ্টি করার পরও মুখে কুলুপ এঁটে বসেছে! অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ দাবিদার একটি প্রথম শ্রেণীর পত্রিকার নির্বাচনসংক্রান্ত রিপোর্টটি দেখলে সত্যি মায়া হয়। রিপোর্টের শিরোনামসহ সব লাইন বিএনপি অমুক অভিযোগ করেছে, তমুক আপত্তি জানিয়েছে এই গোছের বাক্য দিয়ে গঠিত। কিন্তু নিজেদের অনুসন্ধানে কি জিনিসটি বেরিয়ে এসেছে, তা নিয়ে একটা লাইনও তারা যোগ করেনি। নির্বাচন নিয়ে সিইসির সন্তুষ্টির কথাটিও এসব মিডিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্টিসহকারে প্রকাশ করেছে। সদ্যসমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয়ে পড়েছে যে বর্তমান সরকার ও তাদের তল্পিবাহক নির্বাচন কমিশনের অধীনে এ দেশে আর কোনো সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন সম্ভব হবে না। এত দিন যারা এই মোহে আটকা ছিলেন তাদের সেই মোহও ভেঙে গেছে। এই মুহূর্তে বিরোধী দল তথা বিএনপির জন্য বোধহয় নগদ লাভ এটাই হয়েছে। সরকার ও সরকার সমর্থক টিয়াপাখিতুল্য মিডিয়ার প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে বিএনপির একটা অংশও বিশ্বাস করা শুরু করেছিল যে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে বিশদলীয় জোট মারাত্মক ভুল করেছে। আজ স্পষ্ট হয়েছে যে সেই নির্বাচনে অংশ নিলে বিশেষ ভেলকির মাধ্যমে এরশাদের জাতীয় পার্টিকে প্রধান বিরোধী দল বানিয়ে বিএনপি জোটকে সর্বোচ্চ আট থেকে ১০টি আসন ধরিয়ে দেয়া হতো। ২০০৮,-এর নির্বাচন নিয়ে এ ধরনের সুখস্বপ্ন ও সক্ষমতার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখ থেকেই বেরিয়ে এসেছিল, ‘আমরা ইচ্ছা করলেই এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতা বানাতে পারতাম। বিশ্বাস করুন, একটু ইচ্ছা করলেই পারতাম।’ পৌরসভা নির্বাচনের পর দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে পড়েছে যে, শেখ হাসিনার অধীনে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিলে ফলাফলটি কেমন হতো। আজকে সরকারের ওপর অবৈধতার যে মনস্তাত্ত্বিক চাপটি রয়েছে, তখন সেটি আর থাকত না। কাজেই অত্যন্ত দুর্বল ঈমান তথা হালকা রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী বিএনপির এই অংশটির প্রয়োজনীয় বোধটি এই নির্বাচনের মাধ্যমে ফিরে এসেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেয়ার মাধ্যমে বিএনপি নেত্রী এ কথাটি তার পার্টির অনেককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পারবেন। সর্বশক্তি নিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই এই ধারণাটি এখন দেশের সব পক্ষের মধ্যেই নতুন করে সঞ্চারিত হয়েছে। নতুন প্রজন্ম একদলীয় বাকশালের রূপটি আরেকটু খোলাসাভাবে দেখতে পেরেছে। গণতান্ত্রিক বিশ্বও এই সরকারের আসল চেহারাটি চিনতে পেরেছে। এককথায় এই সরকারের নৈতিক ভিত্তি তলায় নেমে এসেছে। এমতাবস্থায় বিশদলীয় জোট নেতৃত্বের একমাত্র দাবি হবে, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে অতি শিগগিরই একটি সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। কোনোরূপ অস্পষ্টতা না রেখে সুস্পষ্ট উচ্চারণে এই দাবিটি তোলা দরকার। বর্তমান সরকার দেশের প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে ধ্বংস করে ফেলেছে যে দেশের ভেতরের কোনো শক্তি বা গোষ্ঠী দিয়ে এই কাজটি আর সম্ভব হবে না। এ দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প হাতে নেই। স্বামী স্ত্রী যখন নিজেদের মধ্যকার দাম্পত্য সমস্যা নিজেরা সমাধান করতে পারে না, তখন বাইরের কোনো সুহৃদের সাহায্য অনিবার্য হয়ে পড়ে। ওই দম্পতির ছেলেমেয়ের জন্য বিষয়টি যেমন জরুরি, এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য বিষয়টি তার চেয়েও বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। একটা বিশেষ মতলব থেকে আগে থেকেই দেশের নিরপেক্ষ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিকলাঙ্গ করে ফেলা হয়েছে। হয় আমার দলে, না হয় তার দলে- এ ধরনের বুশীয় উন্মাদনায় দেশের সব নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিত্বকে সমূলে বিনাশ করা হয়েছে। সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির সংখ্যা এ দেশে মারাত্মকভাবে কমে গেছে। এই ঘরানার যে কয়জন অবশিষ্ট ছিলেন তাদেরও ‘মুই কার খালু’ বানিয়ে রাখা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিকেও অতি চালাকির মাধ্যমে বিতর্কিত করে ফেলা হয়েছে। এই ব্যবস্থাটি আবার ফিরিয়ে এনে কতটুকু কার্যকর করা যাবে তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। দেশের গণমাধ্যমগুলোও মারাত্মকভাবে একপেশে হয়ে পড়েছে। এরা কখনো তিলকে তাল বানায়, আবার কখনো আস্ত তিলকেই ভ্যানিশ করে দেয়। কাজেই সবকিছু বিবেচনায় আগামী পাঁচটি সাধারণ নির্বাচন এই জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হওয়া দরকার। বিএনপি জোটকে শুধু সামনের একটা নির্বাচনের দাবি নয়, পরপর পাঁচটি সাধারণ নির্বাচন জাতিসঙ্ঘের আওতায় অনুষ্ঠানের দাবি নিয়ে জনগণের সম্মুখে উপস্থিত হওয়া দরকার। তখন স্পষ্ট হবে এটা শুধু নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, দেশ ও দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্যই এই দাবিটি তোলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে তাতে সামনের পাঁচটি সাধারণ নির্বাচন জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হলে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাক্সিক্ষত একটা জায়গায় ফিরে আসবে বলে অনুমিত হয়। জনগণের সার্বিক সচেতনতায় তখন জবাবদিহিতার একটা কালচারও সমাজ ও প্রশাসনের সর্বস্তরে গড়ে উঠবে। আমাদের সেনাবাহিনী জাতিসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সুনাম ও দক্ষতার সাথে কাজ করছে। অন্যান্য দেশ থেকে কিছু পর্যবেক্ষক রেখে বাদবাকি জায়গায় আমাদের সেনাবাহিনীর প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্যের ব্যবহারের মাধ্যমে এই কাজটি সহজেই করতে পারে জাতিসঙ্ঘ। এই দেশটি একটি কলিসন কোর্সে রয়েছে। আমরা এখনই যদি একটা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি তবে নির্দিষ্ট সময় পরে একটা মারাত্মক বিস্ফোরণ বা সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হবে। আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিটিও হয়ে পড়বে ইরাক, আফগানিস্তান বা সিরিয়ার মতো কিংবা তার চেয়েও ভয়ঙ্কর কোনো জায়গা। গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথে যদি জনগণের ক্ষোভ, হতাশা, আকাক্সক্ষা, ইচ্ছা, অনুভূতি প্রভৃতিকে প্রবাহিত করা না যায় তবে এ ধরনের বিস্ফোরণ অনিবার্য। গণতন্ত্রহীনতা মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, আমরা তা নিজের চোখে দেখছি। আবার গণতন্ত্রের কল্যাণে পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোতে যে সামাজিক ও আর্থিক উন্নতি হয়েছে তাও আমাদের চোখে পড়ছে। বর্তমানে যে রাজনৈতিক বিশ্বাসই ধারণ করি না কেন, তখন আমরা কেউ এর পরিণাম থেকে আত্মরক্ষা করতে পারব না। একবার ওই পর্যায়ে চলে গেলে সেখান থেকে শত চেষ্টা করেও আর ফিরে আসতে পারব না। কাজেই যা করার এখনই সময়। এ দেশের একজন নগণ্য নাগরিক হিসেবে সবার কাছে নিবেদন, আসুন সময় থাকতে সবাই সজাগ হই। সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের ১০ ফোঁড়ের সমান। একদিন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি নামে কোনো দল হয়তোবা এ দেশে থাকবে না। কিন্তু এই দেশটিকে টিকে থাকতে হবে। আমার আপনার সামান্য ক্ষোভ, হতাশা, লোভ যেন ১৬ কোটি আত্মা এবং তাদের আগত প্রজন্মকে মারাত্মক বিপদে না ফেলে। আজকে যে মহাপরাক্রমশালী পুলিশ বা আর্মি অফিসার আছেন, আগামী দিন হয়তোবা তারই কোনো রক্তের উত্তরসূরি ইরাক-সিরিয়ার অসহায় নারী ও শিশুর মতো বোমা বা গোলার আঘাতে জর্জরিত হবে। আমার আপনার রক্তের উত্তরসূরির কান্নায় বাংলার আকাশ-বাতাস মুখরিত হবে। কোনো সম্মিলিত বাহিনীর স্মার্টবোমা যত স্মার্ট হোক, তখন আওয়ামী লীগ আর বিএনপির উত্তরসূরি বা ঘরবাড়ির মধ্যে পার্থক্য করতে পারবে না। আমাদের মানতে হবে যে, এই দেশটি যেমন আওয়ামী লীগের, তেমনিভাবে এই দেশটি বিএনপির, এই দেশটি জামায়াতের, এই দেশটি অন্য সবার। এদের কাউকেই এই দেশ থেকে বের করে দেয়া সম্ভব হবে না। এমনকি জামায়াতের যে জনসংখ্যা রয়েছে তা শ্রীলঙ্কার মতো দেশের সর্বসাকুল্য জনসংখ্যার সমান। এসব মানুষকে মেরে ফেলা সম্ভব হবে না। সবাইকে নিয়েই এই দেশটিতে থাকতে হবে। সবাইকে নিয়ে থাকার ফর্মুলা বের করতে হবে। কোনো ক্রুদ্ধ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় আদর্শ দিয়ে বিরোধী শক্তিকে নির্মূল করা সম্ভব হবে না। তা করতে গিয়ে শুধু এই সোনার দেশটিকে জাহান্নাম বানিয়ে রাখা সম্ভব হবে। এ ধরনের সর্বনাশা পরিণতি থেকে জাতিকে রক্ষা করতে দেশের বিবেকবান ও সচেতন অংশকে এগিয়ে আসতে হবে। এ জন্য জাতিসঙ্ঘের অধীনে আগামী পাঁচটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তুলতে হবে। এ দেশের শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকারসহ সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে এই দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান সময় ও বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে এর কোনো বিকল্প নেই।
minarrashid@yahoo.com

হ্যাপি নষ্টামি

বছরশেষের সপ্তাহ শুধু আনন্দের নয়, পুলিশের কাছে খুব দুশ্চিন্তার। কারণ এই সময় সব রকমের নষ্টামিই খুব বেড়ে যায়। তারই কিছু কাহিনি।
এমন সুন্দর চোখ আমি কখনও দেখিনি। পাতায় যেন কালো ঝালর। টানা টানা চোখ। তাতে কৃতজ্ঞতা ভরা... বছর সাতাশ-আটাশ বয়স হবে মেয়েটির।’
আমি একটু অবাক চোখে সাব-ইন্সপেক্টরের দিকে তাকাই। তিনি একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বললেন, ‘আর বর্ণনা করতে পারব না, ঘটনায় আসি। ক’বছর আগেই ২৪ ডিসেম্বরের রাতে পার্ক স্ট্রিটে ঘটেছিল। সিভিল ড্রেসে জনতার মধ্যে আছি। মেয়েদের দিকে নানা রকম টুকরোটাকরা মন্তব্য ছুড়তে ছুড়তে অনেকে এগোচ্ছে। কিছু কথা তো কান জ্বালা করা। হঠাৎই একটি মেয়ে ‘সমীর, সমীর’ বলে চিৎকার করে উঠল। পাশে এক জন কেউ বলল, ‘এ বাবা! ব্লেড মেরে দিয়েছে!’ তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে দেখি, মেয়েটির কনুই থেকে পাঞ্জার কাছ অবধি লম্বা সরু দাগ। তাতে চিড়চিড়ে রক্ত। ভিড় থেকে তাকে বার করে নিয়ে, পকেটে থাকা অ্যান্টিসেপটিক ক্রিমের টিউব থেকে ক্রিম বার করে, তার হাতে লাগিয়ে দিলাম। এ দিকে সমীর তো ধাঁ। মেয়েটি বলল, বাড়ি যাব। আমি বললাম, ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। দিলাম। গাড়িতে ওঠার সময় সে আমার দিকে চোখ তুলে তাকাল। ঝালর লাগানো চোখ— যে কথা আগে বলছিলাম।’
পুলিশের ভাগ্যে ওই সময়টায় অবশ্য এমন এমন রোম্যান্টিক মুহূর্ত বিশেষ জোটে না। পার্ক স্ট্রিট ও তার আশেপাশে, রাত হতে না হতে গাদা গাদা লোক আর হইচই, তার মধ্যেই প্রচুর খুচরো ক্রাইম। কিছু আবার তেমন খুচরোও নয়। বাপি সেন-এর ঘটনা সকলের মনে আছে নিশ্চয়ই। তবে পুলিশের অনেকেই বললেন, বেশির ভাগ গন্ডগোলই হয় ২৪ ডিসেম্বর রাতে, ক্রিসমাস ইভ-এ।
‘আমাদের কাজ হচ্ছে, একটু হইচই আর ছোটখাটো হুজ্জোতি করে, লোকেরা মদ-খাবার পেট পুরে খেয়ে সঙ্গিনীকে বগলদাবা করে যাতে ঠিক ঠিক বাড়ি ফিরে যেতে পারে, সেটা দেখা।’ হাসতে হাসতে বললেন প্রাক্তন এক অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার। তার পর বললেন একটি ২৪ ডিসেম্বর রাতেরই কথা।
থানা দুজনকে পার্ক হোটেল থেকে ধরে নিয়ে এসেছিল। কিছু ক্ষণ পরেই ধুন্ধুমার কাণ্ড। আসলে যাদের ধরেছিল, তারা ছিল সাধারণ পোশাকে বিএসএফ-এর জওয়ান। জাগুলিয়ার দিকের কোনও এক ব্যাটেলিয়ন থেকে আসা জনা পাঁচ-ছয় জওয়ান হোটেলে ঢুকে আকণ্ঠ মদ্যপানের পর একটু বেশি ‘হাই’ হলে, তাদের সঙ্গে বাউন্সারদের গোলমাল লাগে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে দুজনকে অ্যারেস্ট করে। জনা চারেক পালিয়ে যায়। যাদের ধরা হয়েছিল, তারা বলে, আমরা জওয়ান। পুলিশ তবু তাদের থানায় নিয়ে যায়। যারা পালিয়েছিল, তারা এলাকায় গিয়ে খবর দেয়। ব্যস, তাদের সঙ্গে শুধু জওয়ান নয়, কয়েক জন কমান্ডার এসে পার্ক স্ট্রিট থানার চেয়ার-টেবিল উলটে ভেঙে, পুলিশের কয়েক জনকে ব্যাপক মারধর করে, নিজেদের লোকদের ছাড়িয়ে নেয়।
তবে, রাস্তার ওপর নিষ্পাপ মজাও আছে। যেমন সান্তা ক্লজের টুপি পরিয়ে দিয়ে কিছু আদায় করা। এমন মজা দেখতে গিয়েই প্যান্টের পাশ-পকেট থেকে হাজার তিনেক টাকা হারিয়েছিলেন আমার পরিচিত জন। হঠাৎই খেয়াল করেন, কেউ তাঁর পকেট হালকা করে দিচ্ছে। এক জনকে জাপটে ধরে ‘পকেটমার! পকেটমার!’ বলে চিৎকার করে ওঠেন। যাকে ধরেছিলেন, সে ‘আমি!’ বলে তার ডান হাতটি চাদরের থেকে বার করে দেয়। হাতটি কনুই থেকে নেই। হতভম্ব হয়ে ছেড়ে দিতেই, সে মুহূর্তে অদৃশ্য! কাছের পুলিশকে অভিযোগ করতে, তিনি বলে ওঠেন, ‘এই রে! এ ব্যাটা এখানেও এসেছে! আরে মশাই, লোকটার ডান হাত নেই, বাঁ হাতে পকেট মারে। সঙ্গে এক মহিলা থাকে, তার ব্লাউজের মধ্যে টাকা চালান হয়।’
এসপ্ল্যানেড এলাকার এক হোটেলে, এক জন বার ড্যান্সার তার পোশাকগুলো নাচের তালে তালে খুলছিল। ওপরের অংশের শেষ ফালিটা সরানোর আগেই দুজন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হোটেলের বাউন্সার ছিল, তারা আটকে দু-এক ঘা দিতেই অন্য দর্শকরা খেপে উঠল। পুলিশ এসে কিন্তু লোক দুটোর বদলে ম্যানেজারকে অ্যারেস্ট করল। কারণ এমন অনুষ্ঠানের অনুমতি ছিল না। পুলিশ অনির্দিষ্ট কালের জন্য হোটেল বন্ধ করে দিল।
এই ন’দিনের দামাল রাতে আর এক উৎপাত হল: বাইক-বাহিনীর উল্লাস-সফর। বছর কয়েক আগে মৌলালির চার্চের কাছ থেকে পার্ক স্ট্রিটের দিকে রওনা হয় অন্তত পঞ্চাশটি মোটর সাইকেল, যার সওয়ারি কয়েক জন মহিলাও। পুলিশ বিশাল ফোর্স নিয়ে এসে, সকলকে লকআপে ভরে। পরের দিন সকালে, আজব ব্যাপার। থানায় হাজির প্রচুর গণ্যমান্য লোক। তাঁদেরই বাড়ির ছেলেমেয়ে মাঝরাতে শহর দখল করতে বেরিয়ে পড়েছে, তাঁরা জানতেন না। পুলিশ ‘পেটি কেস’ দিয়ে সকলকে ছেড়ে দেয়।
এক বার, এই উৎসব সিজনেই, পার্ক স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকায় টহলদারি করতে করতে এক কনস্টেবলের চোখে পড়ল, এক মধ্যবয়স্ক লোক, ধুতির ওপর শার্ট, তার ওপরে পুলওভার পরা, ফালুক-ফুলুক তাকাতে তাকাতে হাঁটছে। তার ভুঁড়িটা এমন বিদঘুটে, মানুষের ভুঁড়ি এ-রকম হতেই পারে না। থানায় এনে তল্লাশি করতেই, ‘পেট’ থেকে একশো টাকা থেকে দশ টাকার বান্ডিলে, নব্বই হাজার টাকা বেরল। লোকটা বলল, সে হরিয়ানা থেকে এসেছে, সুতোর ব্যবসা করে। এটা তার পাওনা টাকা। হোটেলে না রেখে, চুরি যাওয়ার ভয়ে সঙ্গে রেখেছে। এখানে উৎসবের রাতে মেয়ে খুঁজতে এসেছে। পুলিশ এই উদ্ভট গল্পটায় বিশ্বাসই করল না, টাকা ‘সিজ’ করল, আর পরের দিন লোকটাকে কোর্টে চালান করল। পরে প্রমাণ হল, লোকটির সব কথা সত্যি!
পাশের রাজ্য থেকে আসা একটি ছেলে, মসজিদবাড়ি স্ট্রিটের এক বারবনিতাকে নিয়ে, এক ২৬ ডিসেম্বর রাতে এসপ্ল্যানেড পেরিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ গোটা চারেক ছেলে এসে তাকে মারধর করে, মেয়েটাকে টেনে নিয়ে চলে যায়। ছেলেটি কাছের থানায় যায়। পুলিশ তার কথায় ফোর্স নিয়ে বেরিয়ে পড়ে এক জায়গায় এসে দেখে, একটা ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা, পাশে মেয়েটির এক পাটি জুতো। পুলিশ ভাবল নিশ্চয়ই মেয়েটাকে ম্যানহোলে ফেলা হয়েছে। পরে অবশ্য খোঁজ করতে মেয়েটির বাড়িতে, মানে তার নির্দিষ্ট ঘরে, যাওয়া হল। দেখা গেল, মেয়েটি সেখানেই অাছে। জেরা করতে, সে দুটো ছেলের নাম বলল। তাদের ধরার পর, বাকি দুজনও ধরা পড়ল। পর দিন সকালেই থানায় বিভিন্ন দলের নেতা হাজির! গুণধরেরা তাদেরই পুত্র। মেয়েটি ও তার বাড়িওয়ালির সঙ্গে তাদের কী সব ফিসফিস কথা হল, মেয়েটি অক্লেশে জানাল, ছেলেগুলো তার ওপর কোনও অত্যাচার করেনি, বরং যত্ন করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল। ভিনরাজ্যের ছেলেটি হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে। কী হবে তাতে, কেস ডিসমিস।
খিদিরপুর রোড দিয়ে জিপ নিয়ে পার্ক স্ট্রিটের দিকে রাউন্ডে আসছিলেন সঙ্গী সহ এক অফিসার। হঠাৎ দেখেন, দাঁড়িয়ে থাকা মারুতি ৮০০ থেকে প্রায় ছিটকে বেরিয়ে আসা এক ভদ্রমহিলা ‘হেল্প! হেল্প!’ চিৎকার করছেন। জানা গেল, ইনি এক জন আর্মি অফিসারের স্ত্রী। স্বামী সহ তাঁদের ক্লাবে গিয়েছিলেন। স্বামী বেহেড হয়ে গেলে আর এক অফিসার এসে তাঁকে প্রস্তাব দেয়, ‘চলুন এক বার গঙ্গার ধার থেকে হাওয়া খেয়ে আসি, তত ক্ষণে ইনি ঠিক হয়ে যাবেন।’ কিন্তু বেরনোর পর থেকেই অফিসার অন্য রকম সুযোগ চায়। পুলিশ ভদ্রমহিলাকে বলে, এখন কী করবেন? ক্লাবে স্বামীর কাছে পৌঁছে দেব? তিনি বলেন, না, বাড়ি পৌঁছে দিন। ওই অফিসারের নামে কমপ্লেন করবেন করবেন তো? ভদ্রমহিলা ডুকরে ওঠেন, ‘কী যে বলেন! স্বামীর বন্ধু যে!’
অবশ্য, কিছু পুলিশও এই ফুর্তিতে শামিল হয়ে পড়েন কখনও-সখনও। এক ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের রাতে কলকাতা দক্ষিণের এক থানার ওসি, সঙ্গিনী সহ এক নামী হোটেলে ঢুকেছেন। সঙ্গিনী, বলাই বাহুল্য, ওঁর স্ত্রী নন। একটু বেশি পানাহারের পর অফিসারের প্রেম চাগিয়ে উঠল। তিনি সর্বসমক্ষেই মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে এমন কাণ্ড করতে লাগলেন, বাউন্সাররা এসে বাধা দিল। অফিসার স্বমূর্তি ধরলেন, ‘জানিস, আমি কে?’ বাউন্সাররা জানতে চাইল না। তাঁকে পার্ক স্ট্রিট থানায় নিয়ে গেল। অনেক কিছু হতে পারত, কিন্তু ওসি-র সহকর্মীরা তাঁকে বাঁচিয়ে দিল। কিন্তু কী করে যেন, ওপরমহলে খবর গেল। রাতারাতি তাঁকে বদলি করা হল। তার পর থেকে তিনি কোনও থানার দায়িত্ব পাননি।
এ সব ঘটনার চেয়েও বড় কিছু কখনও কখনও নিশ্চয়ই ঘটে। যেমন সোনাগাছি থেকে একটি মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে দুটি ছেলে ডায়মন্ড হারবার গিয়েছিল। সেখানেই সন্ধেরাতে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা শখে তারা পার্ক স্ট্রিট আসছিল, রাস্তায় দুর্ঘটনায় মেয়েটি মারা যায়। তাকে সেখানে ফেলে ছেলে দুটো পালায়। বেশ কিছু দিন পর বাড়িউলি মাসির পুলিশে ডায়েরির কারণে কাঁটাপুকুর মর্গে থাকা মেয়েটি শনাক্ত হয়। ছেলে দুটির শাস্তি? না, থাক।
আর এক বার তিনটি ছেলে আর দুটি মেয়ে পার্ক স্ট্রিট এলাকায় নাচগান শুনতে আসে। তাদের মধ্যে একটি মেয়ে ছিল এদেরই এক জনের প্রেমিকা। খানাপিনা করে বাইরে আসার সময় অন্য একটি ছেলে ওই প্রেমিকাকে জড়িয়ে ধরে। প্রেমিক ছেলেটি ওই ছেলেটির বুকে এমন মারে, সে তক্ষুনি মারা যায়। সকলে মিলে ওই রাতে তাকে বাইপাসের ধারে ফেলে দিয়ে আসে। পরে সকলেই ধরা পড়ে। সাজা পায়। যে গাড়িটি চড়ে তারা সে দিন ফুর্তি করতে বেরিয়েছিল, সেটা এখনও তালতলা থানার কাছে পড়ে আছে।
সুত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

নতুন বছরে নতুন প্রযুক্তির চমক by আহমেদ ইফতেখার

প্রতি বছরের মতো ২০১৬ সালে প্রযুক্তিপণ্যের বাজারে যোগ হবে নতুন প্রযুক্তিপণ্য। নতুন বছরে সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত প্রযুক্তিপণ্যগুলো নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে প্রযুক্তিবিষয়ক সাইট সিনেট। নতুন বছরে যে প্রযুক্তিগুলো নজর কাড়বে, তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বা ভিআর। প্রকৃত অর্থে বাস্তব নয়, কিন্তু বাস্তবের চেতনার উদ্যোগকারী বিজ্ঞাননির্ভর কল্পনাকে ভার্চুয়াল রিয়ালিটি বলে।
ভার্চুয়াল রিয়ালিটি
২০১৬ সাল নিশ্চিতভাবে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির (ভিআর) বছর হতে যাচ্ছে। এই খাতে বর্তমানে উন্নত বিশ্ব প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে। নতুন বছরে বাজারে আসছে একাধিক ভিআর হেডসেট। ডিভাইসগুলোর মধ্যে সবার আগে অকুলাস রিফট আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। অকুলাস রিফট ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হবে একটি আলাদা পিসির। তবে এক্সবক্স কন্ট্রোলারের সাথেও কাজ করবে। গুগলও লাইভলি নামে ভার্চুয়াল চ্যাটিং সার্ভিস চালু করেছে। যেখানে ভার্চুয়াল কক্ষে বা পরিবেশে যে কেউ তার বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে প্রবেশ করতে পারে। সেখানে ইচ্ছেমতো বস্তু দিয়ে সাজানো, বন্ধুদের সাথে মারামারি, নাচানাচি ও আবেগের গ্রাফিক্যাল প্রকাশ ইত্যাদি সম্ভব। গেমিং জায়ান্ট ভাল্বের সাথে জোট বেঁধে স্মার্টফোন নির্মাতা এইচটিসি বানাচ্ছে ভিআর হেডসেট ‘এইচটিসি ভাইভ’। এই ডিভাইসটি গেমারদের সবচেয়ে বেশি কাজে আসবে।
শুরুতে প্রজেক্ট মরফিয়াস নামে পরিচিত ছিল সনির প্লেস্টেশন ভিআর। এর মাধ্যমে ভিআর বাজারে প্রবেশ করে সনি। এটি সনি প্লেস্টেশন ৪-এর সাথে কাজ করবে। এটি নতুন বছরের প্রথমার্ধেই বাজারে আসতে পারে।
মাইক্রোসফট হলোলেন্স
কল্পনার এ জগৎকে বাস্তবে সম্ভব করতে সফটওয়্যার জায়ান্ট মাইক্রোসফট উদ্ভাবন করেছে ‘মাইক্রোসফট হলোলেন্স’ নামে হেডসেট কম্পিউটার, যা ব্যবহারকারীর মাথায় হেডসেটের মতো লাগানো থাকবে। আর এর মাধ্যমেই ব্যবহারকারী তার চারপাশের বাস্তব জগৎকে কম্পিউটারের সাথে যোগ করে তৈরি করবে এক হাইব্রিড জগৎ- হলোগ্রাফিক ওয়ার্ল্ড। মাইক্রোসফট হলোলেন্স হচ্ছে একটি স্ট্যান্ডলোন সিস্টেম, যা ব্যবহারকারীর দৃষ্টির আওতায় কম্পিউটারে তৈরি বস্তু দেখাতে পারবে। হলোলেন্সের ডেভেলপমেন্ট কিট ২০১৬ সালে তিন হাজার ডলার দামে বাজারে ছাড়া হবে।
আইফোন ও স্মার্টওয়াচ
প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপল নতুন বছরের মার্চ মাসে নতুন একটি ফোন এবং স্মার্টওয়াচ আনতে যাচ্ছে। নতুন আইফোন ৬সি এবং নতুন ভার্সনের অ্যাপেলের ‘দ্য অ্যাপেল ওয়াচ ২’ স্মার্টওয়াচে নতুন অনেক ফিচার থাকবে। নতুন স্মার্টওয়াচে ভিডিও চ্যাট করার জন্য ক্যামেরাসহ অন্যান্য ফিচার থাকবে। আইফোন ৬সি-এর ডিসপ্লে হবে ৪ ইঞ্চির। আইফোন ৬সি-এর মেটাল কেসিং থাকবে। প্রচলিত হোম বাটন সরিয়ে টাচ হোম বাটন আনা হবে নতুন আইফোনে। সেই সাথে হেডফোন জ্যাকও সরানো হতে পারে।
গ্যালাক্সি এস৭
গ্যালাক্সি এস৭ সিরিজে একসাথে দু’টি স্মার্টফোন আনবে স্যামসাং। ২০১৬ সালে নতুন ডিজাইনে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৭ আর এস৭ এজ আনবে। নতুন বছরের ফেব্র“য়ারিতেই উন্মুক্ত হতে পারে এসব স্মার্টফোন। গ্যালাক্সি এস৭-এর স্ক্রিন হবে ৫ দশমিক ২ ইঞ্চির এবং এস৭ এজের স্ক্রিন হবে ৫ দশমিক ৫ ইঞ্চির। স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৭-এর ডিজাইন হবে অনেকটা এস৬-এর মতোই। তবে নতুন স্মার্টফোনটিতে থাকবে কোয়ালকোম স্ন্যাপড্রাগন ৮২০ প্রসেসরের সাথে ৪ জিবি র‌্যাম এবং যোগ হবে ইউএসবি টাইপ সি পোর্ট। নতুন এই ফ্ল্যাগশিপের হাত ধরে এস সিরিজে আবার ফিরে আসবে মাইক্রো এসডি কার্ডের স্লট। গ্যালাক্সি এস৭-এ যোগ হতে পারে প্রেসার-সেনসিটিভ স্ক্রিন, অনেকটা আইফোন ৬এসের থ্রিডি টাচের মতোই।
গুগল গ্লাস ২.০
প্রযুক্তি বিশ্বে বেশ কয়েক দিন ধরেই জোর গুজব চলছে, স্মার্টগ্লাসের পরবর্তী সংস্করণ আনতে কাজ করছে গুগল। দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার উপযোগী প্রযুক্তি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে বাজারজাত করতে এফসিসির অনুমোদন নিতে হয়। বিশেষ করে স্মার্টফোন ও পরিধেয় ইলেকট্রনিকস পণ্যের ক্ষেত্রে এটা অবশ্য করণীয়। মূলত এ কারণেই সম্প্রতি এফসিসির অনুমোদন পাওয়ার জন্য নিজেদের পরিধেয় প্রযুক্তিপণ্য গুগল গ্লাসের পরবর্তী সংস্করণ বিষয়ে একটি নথি পাঠিয়েছিল গুগল। ওই নথির সাথে স্মার্টগ্লাসের নতুন সংস্করণের একটি ছবিও জমা দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। আর তাই এবার আর গুজবনির্ভর আলোচনা নয়, বরং গুগলের নথি থেকেই স্মার্টগ্লাসের পরবর্তী সংস্করণ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে। নতুন বছরে দেখা মিলবে গুগল গ্লসের নতুন সংস্করণের। গুগল গ্লাসের নতুন সংস্করণে আরো বড় আকৃতির প্রিজম, বলিষ্ঠ কাঠামো ও আকর্ষণীয় নকশা এবং ডিভাইসটিতে ইন্টেলের এটম প্রসেসর ব্যবহার করা হয়েছে।
গেম কনসোল
নতুন গেম কনসোল আনছে ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিনতেন্দো। নতুন বছরের শুরুতেই নিনতেন্দো এনএক্স কোড নামের ডিভাইসটি বাজারে আনতে পারে। নতুন প্লাটফর্মটির জন্য সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিট এরই মধ্যে সরবরাহ করতে শুরু করেছে। এতে তৃতীয় পক্ষ নতুন কনসোলের জন্য নিনতেন্দোর গেম উন্নয়নের পাশাপাশি নিজেদের গেমও তৈরি করতে পারবেন। বছরের শুরুতে কনসোলটি বাজারে এলে এর উপযোগী গেমের যাতে স্বল্পতা না পড়ে, সে জন্যই সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার সরবরাহ শুরু করেছে তারা।
এর আগে বাজারে আসা উই ইউ অন্য প্রতিযোগীদের সাথে খুব বেশি সুবিধা করতে পারেনি। এ কারণে নতুন ডিভাইসটিতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা যোগ করার চেষ্টা করবে নিনতেন্দো। এতে বাজারে প্রাপ্য সর্বোচ্চ মানের চিপ ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন ডিভাইসটির কনসোল ও হাতে বহনযোগ্য সংস্করণ থাকবে। সনির প্লেস্টেশন ফোর ও মাইক্রোসফটের এক্সবক্স ওয়ানের চেয়ে নতুন ডিভাইসটিকে ভিন্নভাবে উপস্থানের লক্ষ্যেই দু’টি সংস্করণ আনতে পারে।
নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি
২০১৬ সাল থেকেই টেসলার নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি মডেল ৩ এর প্রি-অর্ডার নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন টেসলা প্রধান ইলন মাস্ক। ৩৫ হাজার ডলার থেকে শুরু হবে এর দাম। ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, টেসলার এই নতুন প্রযুক্তি একটি সফটওয়্যার আপডেট, যার মাধ্যমে টেসলার এস সেডান গাড়িতে যুক্ত হবে ‘সেলফ ড্রাইভিং’ ফিচার। আর এর ফলে বিনামূল্যে এবং গাড়ি ড্রাইভার ছাড়া ভ্রমণ করা যাবে। স্মার্টফোন ট্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারী এই গাড়ি গ্যারেজ থেকে বের করতে পারবে। অটোমোবাইলবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেলি ব্লু বুকের বিশেষজ্ঞ কার্ল ব্রওয়ার বলেন, ‘অন্য গাড়িনির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সেলফ ড্রাইভিং ফিচারটি ব্যবহারকারীদের হাতে তুলে না দেয়ার উপযুক্ত কারণ আছে, আছে আইনগত বাধাও। কোনো ব্যবহারকারী যদি ফিচারটি ব্যবহার করতে চান, তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
বন্ধু হবে রোবট
২০১৬ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমান রোবটের প্রসার ঘটবে ব্যাপক আকারে। গৃহকর্ম থেকে শুরু করে কলকারখানায়, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মহাকাশ জয়ে সবখানেই আজ রোবট ব্যবহার আরো বাড়বে। এ জন্যই নতুন ও ভিন্ন ধাঁচের বিচক্ষণ রোবট বানানোয় এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে বিশ্বজুড়েই।

অত্যাধুনিক সাবমেরিন বানাচ্ছে পাকিস্তান, সহযোগিতায় চীন

নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডারকে আরো শক্তিশালী করছে পাকিস্তান। পাকিস্তানকে আরো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন আটটি ডুবোজাহাজ বিক্রি করছে চীন। যার মধ্যে চারটি করাচিতে তৈরি করা হবে। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি চুক্তি হয়েছে বেইজিং ও ইসলামাবাদের মধ্যে।
পাকিস্তান প্রতিরক্ষা দফতরের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চীন এবং পাকিস্তানে একযোগে এই সব সাবমেরিন নির্মাণের কাজ শুরু করবে। একই সঙ্গে চীন ডুবোজাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তর করবে বলেও জানানো হয়েছে ওই বিবৃতিতে। যদিও চীনের কাছ থেকে কী ধরণের ডুবোজাহাজ কেনা হবে সে বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
ধারণা করা হচ্ছে, ইউয়ান শ্রেণির টাইপ-০৪১ ডুবোজাহাজ কেনা হবে যা ডিজেল ও বিদ্যুতের সাহায্যে চলে। এ আট ডুবোজাহাজ কেনার মধ্যদিয়ে পাকিস্তান নৌবাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা আরও বাড়বে। যদিও এর আগে ফ্রান্স এবং জার্মানি থেকে ডুবোজাহাজ কেনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে পাকিস্তানের।

ব্যর্থতা অনুধাবনই সাফল্যের সোপান by মো. মাহমুদুর রহমান

ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০১৫ সালের তারিখগুলো এখন সবার কাছে স্মৃতি। তবে হ্যাঁ, স্মৃতির নুড়িপাথরের কোনো কোনোটি জ্বলজ্বল করবে তারার মতো। আবার কোনো কোনোটির আঘাত মনে থাকবে অনেকদিন। প্রত্যেকেই ব্যক্তিজীবনে অনেক কিছু যেমন পেয়েছে বিগত সালে, তেমনি অনেকে অনেক কিছু হারিয়েছেও। অর্জন-বিসর্জন, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে বিগত বছর অতিবাহিত হয়েছে। তবু প্রত্যাশা, শুধুই আনন্দ আর স্বপ্ন পূরণের বছর হোক ২০১৬ সাল। এ প্রত্যাশা পূরণের জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। পেছনে নির্মোহভাবে ফিরে তাকানো। ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র- সবার ক্ষেত্রেই বিষয়টি সমভাবে প্রযোজ্য। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গত বছর সবচেয়ে আলোচিত নাম ছিল আইএস। সিরিয়া ও ইরাকভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ ছিল না। পশ্চিমা বিশ্ব আইএসকে মুসলিম জঙ্গি সংগঠন হিসেবে চেনে। কারণ তারা নিজেদের মুসলমান দাবি করে। বিশ্বব্যাপী ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা তাদের স্বপ্ন হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু বেশিরভাগ মুসলমান এদের ইসরাইলসৃষ্ট ইহুদি স্বার্থের পক্ষশক্তি হিসেবে মনে করে। এদের কর্মকাণ্ড বিশ্বব্যাপী ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। বেসামরিক মানুষ তাদের হামলার শিকার হয়ে প্রাণ দিচ্ছে। বন্দিদের শিরশ্ছেদ করা হচ্ছে। ‘যৌন জিহাদ’ নামে ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এক অদ্ভুত বিষয় আইএস যুক্ত করছে তাদের কর্মকাণ্ডে। আইএস দমনের নামেও নিরীহ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। এক পক্ষের উগ্রতা অপর পক্ষের উগ্রতাকে উসকে দিচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলমানদের আমেরিকায় নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন। মূলধারার একজন রাজনীতিকের এরকম সাম্প্রদায়িক বক্তব্য ভবিষ্যৎ বিশ্বের শান্তির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইএস উসকে দিচ্ছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’দের, আবার তাদের বক্তব্য শক্তিশালী করছে আইএসকে। ২০১৬ সালের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ দুষ্টচক্র ভেদ করে বিশ্বকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
প্রতিবেশী ভারতেও উগ্রপন্থীদের আস্ফালন শুরু হয়েছে। ২০১৫ সালে ভারতের আরএসএস, শিবসেনাসহ কট্টর হিন্দুদের কাছে দেশটির মুসলমানদের চেয়ে গরুর মর্যাদা ছিল বেশি। গরুর মাংস খাওয়ার জন্য মানুষের জীবনহানি ঘটেছে। অবশ্য ভারতের বিবেকবান মানুষ এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। দেখার বিষয় ২০১৬ সালে গরুর চেয়ে মানুষের জীবন বেশি গুরুত্ব পায় কি-না!
বাংলাদেশ ২০১৫ সালকে বরণ করেছিল প্রচণ্ড এক ‘ঘূর্ণিঝড়ের’ মধ্য দিয়ে। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে ৫ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিনের নজিরবিহীন হরতাল-অবরোধ সত্ত্বেও সরকারের পতন ঘটেনি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারকে টলাতে ব্যর্থ হয়। এই হরতাল-অবরোধ চলাকালে জনজীবনে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসে। একদিকে যানবাহনে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হওয়া মানুষের আর্তনাদ, অন্যদিকে যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের স্বজনদের কান্না। এ সহিংস রাজনীতির বিভীষিকাময় স্মৃতি ভুলতে অনেকদিন লাগবে এ দেশের মানুষের। অন্যদিকে র‌্যাব-পুলিশের বুলেটের সামনে বিরোধী দলের কোনো আন্দোলনই সফল হয়নি। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন সফল হয়েছিল। গণতন্ত্রের নির্বাসন ও সুশাসনের অভাব সচেতন মানুষকে ব্যথিত করার পাশাপাশি জঙ্গি তৎপরতা করেছে বিচলিত। ব্লগার ও বিদেশী নাগরিকদের হত্যার মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের সক্রিয় উপস্থিতি শান্তির জন্য হুমকি হিসেবে সামনে এসেছে। এভাবে বিভিন্ন অপশক্তি ও সমস্যার জঞ্জাল দেশের সম্ভাবনার আকাশকে কালো মেঘে ঢেকে দিচ্ছে।
তবে এতকিছুর পরও অনেক পুরনো সমস্যারও সমাধান হয়েছে। ছিটমহলবাসীর দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান হয় ২০১৫ সালে। মানবিক এ সমস্যাটি সমাধানে সরকারের উদ্যোগ এবং দেরিতে হলেও ভারতের সাড়া প্রশংসার দাবি রাখে। অনেক আলোচনা-সমালোচনার পর অবশেষে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ও তহবিল প্রত্যাহারের পর আদৌ পদ্মা সেতু নির্মাণ হবে কি-না, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। আজ সব সন্দেহের কুয়াশা কাটিয়ে পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সঙ্গী করে নিয়ে যাচ্ছে অশান্তি ও অস্থিরতাকে। যদিও সারা দুনিয়ার মানুষ উন্নয়নের সঙ্গী হিসেবে চায় শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে, কিন্তু বাস্তবে তা পাচ্ছে না চিন্তা ও কর্মের বৈপরীত্যের কারণে। মানুষ নিজের জন্য যা ভালো মনে করে, তা অন্যের জন্য মনে করে না। নিজে যা পেতে চায়, অন্যকে তা দিতে চায় না। মানুষের প্রতারণা, স্বার্থপরতা ও কপটতা বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের সমস্যা।
মুখে গণতন্ত্র, অন্তরে স্বৈরাচারের ভূত। কণ্ঠে ধর্মের শান্তির বাণী, অথচ কর্মে সহিংসতা। মানবাধিকারের পক্ষে মুখে জপ, বাস্তবে অন্যের ওপর আধিপত্য বিস্তারের মতলব। ঐক্যের বদলে জাতি, ধর্ম ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রচণ্ড বিভাজন। ভালোবাসার পরিবর্তে হিংসার চাষবাস। আইলান কুর্দির সাগরতীরে পড়ে থাকা মৃতদেহ যদিও সজোরে বিবেকের দরজায় ধাক্কা দিয়ে মানবতাকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু প্যারিস হামলা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় বন্দুক হামলার পর তা আবার হারিয়ে গেছে।
মজার বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের কিছু মানুষ নেপাল হিন্দুরাষ্ট্র থেকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত হলে খুশি হয়। ভারতে গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে। ইউরোপ-আমেরিকার উদার গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থার সুবিধা ভোগ করে। কিন্তু বাংলাদেশকে বানাতে চায় ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র! অন্যরা মুখে যাই বলুক না কেন, বাস্তবে প্রতিপক্ষকে নির্মূলের ফ্যাসিস্ট রাজনীতি-চর্চা ছাড়া তারা অন্য কিছুতে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হয় না। পুরো ২০১৫ সাল এরকম বৈপরীত্যের মধ্যে অতিবাহিত করেছে বাংলাদেশ।
২০১৫ সালের পহেলা জানুয়ারিতে যুগান্তরের শিরোনাম ছিল : ‘কঠিন সময়ে রাজনীতি’। সারা দেশে ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের ওপর একই পত্রিকা বছরের শেষদিন ৩১ ডিসেম্বর শিরোনাম করেছে : ‘প্রশ্নবিদ্ধ ভোট : ইসির ভরাডুবি’। সময়ের হিসাবে আমরা এক বছর অতিবাহিত করলেও রাজনৈতিক অবস্থার মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাহ্যত দেখা যাচ্ছে, সরকারের শক্তি আরও সংহত হয়েছে। বিরোধী জোটের শক্তি খর্ব হয়েছে। ২০১৫ সালের শুরুতে বিরোধীদের আন্দোলনের যে ক্ষমতা ছিল, ২০১৬-তে তা আর নেই বলেই মনে হয়। তবুও রাজনীতিতে এক অদ্ভুত অস্বস্তি বিরাজমান।
বছর শেষে ২০১৬ সালের প্রথম দিন সব খবরের কাগজে ২০১৫ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বরাতে খবর এসেছে। তারা এও জানিয়েছে, ২০১৫ সালে ক্রসফায়ারে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৪৬।
নতুন বছর শুরু হয়েছে। কল্পনা করুন তো, ২০১৭ সালের পহেলা জানুয়ারিতে সংবাদপত্রের শিরোনাম কেমন হতে পারে? ‘আসক’ কি বলতে পারবে, ২০১৬-তে মানবাধিকারের আশানুরূপ উন্নতি হয়েছে?
হয়তো পারবে। যদি আমরা সবাই চিন্তায় ও কর্মে স্বচ্ছ হই। মুখে ও বুকে কোনো বৈপরীত্য না থাকে। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হই। ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীল হই। আমরা এমন শপথে আবদ্ধ হলে নতুন বছরে সব অশুভ শক্তি বিদায় নেবে। প্রতিটি সকাল দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য হবে শান্তি ও শুভ্রতার আলোয় ভরপুর।
মো. মাহমুদুর রহমান : ব্যাংকার
mahmudpukra@gmail.com

এ নজির ছড়িয়ে পড়ুক by ইকতেদার আহমেদ

আমাদের রাষ্ট্রীয় মানক্রমে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান ২নং ক্রমিকে। রাষ্ট্রপতির অবস্থান ১নং ক্রমিকে হলেও আমাদের সরকার ব্যবস্থা সংসদীয় পদ্ধতির বিধায় রাষ্ট্রপতির কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ে অতীব অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি) হওয়ায় তাদের উভয়ের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক নিরাপত্তা সামরিক বাহিনীর দুটি বিভাগ যথা এসএসএফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) ও পিজিআরের (প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্ট) ওপর ন্যস্ত। উভয়ের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অন্যান্য বাহিনীর সাহায্য নেয়ার প্রয়োজন দেখা দিলে তা সমন্বয়ের দায়িত্বটি এ দুটি বিভাগ পালন করে থাকে। এ দুটি বিভাগসহ আইনশৃংখলা বাহিনীর অন্যান্য বিভাগের সদস্যরা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের সময় তাদের উপস্থিতি রয়েছে এমনসব স্থান, তাদের কার্যালয়, আবাসস্থল ইত্যাদির ক্ষেত্রে নিñিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে থাকে। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সমপর্যায়ের বিদেশী কোনো অতিথি বাংলাদেশ সফরে এলে নিরাপত্তার সার্বিক দায়িত্ব এ দুটি বিভাগ পালন করে থাকে। কিছু কিছু ক্ষমতাধর রাষ্ট্র তাদের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের বিদেশ সফরকালীন বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োজিত করলেও তারা এ দুটি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকে। ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাদের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা সফরের দু-একদিন আগেই সফরকারী দেশে গিয়ে উপস্থিত হয়। আমাদের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাইরের যে কোনো দেশে সফরে গেলে এ দুটি বাহিনীর সদস্যরা তাদের সফরসঙ্গী হন এবং ক্ষেত্রবিশেষে সফরের দু-একদিন আগে সফরকারী দেশে গিয়ে উপস্থিত হন।
গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ পদ্মা সেতুর নদীশাসন ও সেতুটির মূল পাইলিং কাজ উদ্বোধনের জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রথমে হেলিকপ্টারযোগে শরীয়তপুরের জাজিরায় যান এবং সেখানে নদীশাসনের কাজ উদ্বোধনের পর নদীর অপর পাড় মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় এসে সেতুটির মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন। ওই দিন তিনি মাওয়ায় এক জনসভায়ও ভাষণ দেন। সফরসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা ফেরার কথা ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি সড়কপথে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাৎক্ষণিক সড়কপথে ঢাকা ফেরার আয়োজন সম্পন্ন করে ফেলেন। ঢাকা ফেরার পথে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরকে শীতলক্ষ্যা সেতুর টোল প্লাজা এবং মেয়র হানিফ উড়াল সেতুর টোল প্লাজা অতিক্রম করতে হয়। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তার সামরিক সচিব গাড়িবহরের প্রতিটি গাড়ির টোলের টাকা প্রদানের ব্যবস্থা করেন।
টোল প্লাজার তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিলাম ডাকের মাধ্যমে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়। অতীতে দেখা গেছে, আমাদের দেশে অতীব অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি) এবং অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির (ভিআইপি) অনেকে এ ধরনের টোল প্লাজায় কোনো ধরনের টোল প্রদান না করেই টোল সেতু বা টোল উড়াল সেতু অতিক্রম করতেন। এতে নিলামে ডাকার মাধ্যমে টোল আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক ক্ষতি হলেও রাষ্ট্র ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের পদস্থদের কাছ থেকে টোল নেয়া না হলে তা তাদের নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনার জন্য সহায়ক হবে এ বিবেচনায় অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক টোল আদায়ে অনীহ ছিলেন। আবার পদস্থ অনেকের ক্ষেত্রে এমনও শোনা গেছে, এরূপ টোল দেয়া তাদের নিজেদের ও পদের জন্য মর্যাদাহানিকর বিবেচনায় তারা টোল দেয়া হতে বিরত থাকতেন।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এবং অনেক উন্নয়নশীল দেশে টোল সেতু, টোল উড়াল সেতু ও টোল এক্সপ্রেসওয়ে রয়েছে। এসব সেতু, উড়াল সেতু অথবা এক্সপ্রেসওয়েতে টোল আদায় পদ্ধতি কম্পিউটারাইজড হওয়ায় একজন ব্যক্তি নিজ দেশের বিবেচনায় যতই পদস্থ হন না কেন, টোল প্রদান ছাড়া তার গাড়ি সেতু, উড়াল সেতু বা এক্সপ্রেসওয়ে অতিক্রমের কোনো সুযোগ নেই। আবার অনেক দেশে শহরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ব্যস্ত সময়ে অতিক্রম করতে হলে টোল প্রদান করতে হয়। এসব পথে চলাচলকারীরা ইলেকট্রনিক টোলকার্ড কিনে তা গাড়ির নির্ধারিত স্থানে ইলেকট্রনিক কার্ড হোল্ডারের মধ্যে রেখে থাকেন এবং গাড়িটি ব্যস্ত সময় সড়ক অতিক্রমকালীন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে টোলের টাকা ইলেক্ট্রনিক কার্ড থেকে পরিশোধ হয়। এ ক্ষেত্রেও পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, ইলেক্ট্রনিক কার্ডের মাধ্যমে নির্ধারিত অংকের টাকা পরিশোধ ছাড়া পথ ব্যবহারের সুযোগ নেই।
আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার সময় তাদের চলাচলকে দ্রুত ও নির্বিঘ্ন করার জন্য সড়কটি যানবাহনশূন্য করা হয়। এভাবে দেখা যায় সড়কটি ১৫-৩০ মিনিট যানবাহনশূন্য থাকে। এ সময়ের মধ্যে সড়কটির সঙ্গে যেসব সড়কের সংযোগ রয়েছে, প্রতিটির মুখে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ যানজটের রেশ সমগ্র শহরের যানবাহনের ওপর পড়ে এবং তা দীর্ঘসময় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
কোনো উন্নত দেশে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের চলার সময় সাধারণ মানুষের চলার পথ বিঘ্নিত করা হয় না। এমনও দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে যাওয়ার পথে যানজটে পড়লে তিনি দ্রুত কার্যালয়ে পৌঁছানোর জন্য তার গাড়ি ত্যাগ করে ট্রেনে আরোহণ করেছেন এবং ট্রেনে বসার সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে থেকে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। যানজটে পড়ে একজন প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি ত্যাগ এবং ট্রেনে দাঁড়িয়ে থেকে গন্তব্যে পৌঁছানো যুক্তরাজ্যের মানুষের কাছে কোনো ব্যতিক্রম হিসেবে পরিলক্ষিত হয়নি। কারণ তারা মনে করে আইন সবার জন্য সমান। তাই যানজট যত তীব্রই হোক না কেন, অপরের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের পথ সুগম করার কোনো সুযোগ নেই। একজন প্রধানমন্ত্রী তার যাত্রাকালীন ট্রেনে বসার জায়গা পেল কী পেল না এটি সে দেশের মানুষের কোনো ভাবার বিষয় নয়। তারা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী একজন সবল ও সুস্থ ব্যক্তি এবং স্বল্প যাত্রাপথে তিনি ট্রেনের আসনে বসার জায়গা না পেলেও তা তার শরীরিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে না। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী নিজেও মনে করেন না তিনি দাঁড়িয়ে যাওয়ায় তার কোনোরূপ মর্যাদাহানি ঘটেছে। বরং সেদেশের জনগণ মনে করে, এতে প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদাই বৃদ্ধি পেয়েছে।
যানজট আমাদের ঢাকা শহরের নিত্যদিনের সমস্যা। যানজটের জন্য অনেকাংশে যে ট্রাফিক অব্যবস্থাপনা দায়ী এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে যানজট নিরসনের চেয়ে ট্রাফিক পুলিশ ও সার্জেন্ট যে ট্রাক, বাস, অটোরিকশা ইত্যাদিতে চাঁদা আদায়ে অধিক ব্যস্ত থাকেন, তা যে কোনো রাস্তার মোড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেই দেখা যায়। ঢাকা নগরীর যানজটের কারণে আমাদের অর্থনীতির অপরিসীম ক্ষতি হচ্ছে। এ ক্ষতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর চলাচলের জন্য বিকল্প পন্থা উদ্ভাবন করতে হবে এবং ট্রাফিক পুলিশ সার্জেন্টদের চাঁদা আদায়ের পরিবর্তে নিজ দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জনগণের সেবক। একসময় এ দুই শীর্ষ পদে বহাল ছিলেন এমন অনেক ব্যক্তি সাধারণ মানুষের মতো প্রতিদিন ঢাকা নগরীতে কোনোরূপ নিরাপত্তা রক্ষী ছাড়াই চলাচল করছেন। এরূপ চলাচলের ক্ষেত্রে তাদের কারও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে এমনটি শোনা যায়নি। সুতরাং পদে বহাল থাকাকালীন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে চলাচল কীভাবে করলে অপরের চলাচল বিঘ্নিত হবে না, এটি তাদের নিজেদেরই উদ্ভাবন করতে হবে। আমাদের দেশে এ দুটি পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা চাটুকার দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর চলাচল নির্বিঘ্ন করার কারণে সাধারণ মানুষকে যে ভোগান্তি ও বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, এ কথাটি চাটুকাররা তাদের বলেন না।

আমাদের দেশে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অনেকে যানজটে পড়লে অথবা যানজটে না পড়লেও দ্রুত পথ অতিক্রম করার জন্য উল্টো পথ ব্যবহার করে থাকেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে মুমূর্ষু রোগীবাহিত অ্যাম্বুলেন্স এবং অগ্নিনির্বাপণ কাজে নিয়োজিত ফায়ার ব্রিগেড ছাড়া অপর কেউ যতই পদস্থ হোন না কেন, উল্টো পথ ধরে যেতে পারেন না। দুঃখ হয় যখন দেখা যায়, অনেকেই গাড়িতে পুলিশের ইউনিফর্মধারী নিরাপত্তা রক্ষী উপবিষ্ট থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উল্টো পথে সগর্বে যাতায়াত করেন।
আমাদের দেশের মতো পৃথিবীর সব উন্নত দেশের বিমানবন্দরে ভিভিআইপি ও ভিআইপি লাউঞ্জ রয়েছে। উন্নত দেশগুলোয় এসব লাউঞ্জের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার ওপর ন্যস্ত। সাধারণত নিলামে সর্বোচ্চ ডাকধারী প্রতিষ্ঠান এ দায়িত্বটি পেয়ে থাকে। সেসব দেশের পদধারীরা যত উচ্চ মর্যাদাবিশিষ্ট হোন না কেন, নির্ধারিত অংকের অর্থ প্রদান ছাড়া লাউঞ্জ ব্যবহার করতে পারেন না। রাষ্ট্রের পদস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লাউঞ্জ ব্যবহার বাবদ প্রদত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারের হিসাব থেকেই যায়। আমাদের দেশে কোনোরূপ অর্থ প্রদান ছাড়াই এগুলো ব্যবহারের প্রাধিকারপ্রাপ্তদের তালিকাটি বেশ বড় হওয়ায় হরহামেশাই এগুলোর অপব্যবহার হচ্ছে। এ ধরনের লাউঞ্জগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিলামে ডাকের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ডাকধারী বেরসকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা হলে এ খাত থেকে রাষ্ট্রের বিপুল অংকের রাজস্ব আয়ের পথ উন্মোচিত হবে। বিদেশে নির্ধারিত অংকের অর্থ প্রদানের মাধ্যমে যে কোনো ব্যক্তি এসব লাউঞ্জ ব্যবহার করতে পারে।
আমাদের দেশে পদস্থ অনেকের কাছে অনিয়মই নিয়ম। আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেকের ক্ষেত্রে যেটি অনিয়ম সে অনিয়মটিকে নিয়মের মধ্যে এনে তার গাড়িবহরের প্রতিটি গাড়ির জন্য টোল দিয়ে যে নজির স্থাপন করেছেন, দেশবাসীর প্রত্যাশা তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর বিস্তৃতি ঘটুক।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com

পাবলিক পরীক্ষায় ভালো করাই যথেষ্ট নয় by মাছুম বিল্লাহ

২০১৫ সালের শেষদিনে একই সঙ্গে প্রকাশিত হল পিইসি, জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষাগুলোর ফল। আমাদের ছোট্ট সোনামণিরা ক্রমাগত ভালোর দিকেই এগোচ্ছে, আর এটিই স্বাভাবিক। পৃথিবী এগোচ্ছে, আমাদেরও এগোতে হবে। পরীক্ষার ফল শিক্ষার্থী, শিক্ষক, বিদ্যালয়, অভিভাবক সবার জন্য বিরাট এক আনন্দ নিয়ে আসে। আর এ আনন্দ আমাদের এক ধরনের বার্তা দিচ্ছে : শুধু পরীক্ষাতেই ভালো করতে হবে। শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করলে জানা যায়, যে কোনো বয়সের শিক্ষার্থীরা এখন আর বাইরের, আনন্দের, গল্পের, দেশ-বিদেশ সম্পর্কে জানার বইপুস্তক পড়ছে না। পরীক্ষা, পরীক্ষায় ভালো করা, পরীক্ষার প্রস্তুতি ইত্যাদি বিষয় তাদের অন্য বই পড়তে দিচ্ছে না। অভিভাবকরাও চাচ্ছেন না বাইরের বই পড়ে তাদের ছেলেমেয়েরা সময় নষ্ট করুক। আসলে কি তাই? বাইরের বই পড়লে শিশুদের সময় নষ্ট হয়? মোটেই না, বরং তাতে জ্ঞানের পরিধি বাড়ে।
আমাদের শিক্ষানীতিতে পাবলিক পরীক্ষা ছিল দুটো। সেটি না মেনে আমরা চারটি পরীক্ষা চালু করেছি। ফলে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা প্রকৃত জানা, মূল্যায়ন থেকে দূরে সড়ে গিয়ে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার অর্থাৎ ফল প্রদর্শনীর খেলায় মেতেছে। এ পরীক্ষাগুলোতে আরেকটি মাতামাতি ছিল : ‘সেরা বিদ্যালয় নির্বাচন’। দেশের, বিভাগের, জেলার সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ণয় ইত্যাদি গতবার থেকে বাদ দিয়েছে সরকার।
সমাপনীতে সাতটি বিভাগের মধ্যে পাসের হারের দিক থেকে এগিয়ে আছে রাজশাহী বিভাগ। এ বিভাগে পাসের হার ৯৯ শতাংশ। সবচেয়ে কম পাসের হার সিলেট বিভাগে, ৯৬.৭৯ শতাংশ। অপর পাঁচটি বিভাগে ৯৮ শতাংশের কম-বেশি। জেলা হিসেবে সবচেয়ে ভালো করেছে মুন্সীগঞ্জ। এ জেলার সব শিক্ষার্থীই পাস করেছে আর সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বরগুনা। ধরন অনুযায়ী সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, যেগুলোতে প্রাথমিক শাখা আছে, সেগুলোর ফল সবচেয়ে বেশি ভালো হয়েছে। এটি একটি গবেষণার বিষয়, সম্ভবত উচ্চমানের শিক্ষক সেখানে আছেন। এসব বিদ্যালয়ে গড়ে পাসের হার ৯৯.৯৭ শতাংশ। এতদিন প্রাথমিক শিক্ষা ইনস্টিটিউটসংলগ্ন (পিটিআই) পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে পাসের হার বেশি হতো। এবার তারা দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। অন্যান্য বিদ্যালয়ে গড় পাসের হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশের মধ্যে। এ বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মানসম্মত গবেষণা দরকার, যার ফল শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভালোভাবে অবহিত করা দরকার। কেন একেক বছর একেক এলাকার শিক্ষার্থীরা হঠাৎ করে বেশি ভালো করে আবার বেশি খারাপ করে, যা দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে আলাদা হয়?
পাসের হার ও জিপিএ-৫ গতবারের চেয়ে বেড়েছে। তবে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষার ফল গতবারের চেয়ে খারাপ হয়েছে। এ বোর্ডে পাসের হার ৯৮.৫২ শতাংশ ছিল গতবার, এবার তা হচ্ছে ৯৭.৯২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৮০। মোট পরীক্ষার ৯.৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গতবার পেয়েছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ৪১১। গতবার (২০১৪) প্রাথমিকে শতকরা একশ’ ভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৭২ হাজার ৫৭, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৯১ হাজার ২২৭। শূন্যভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা এবারও ১৫৩। এতকিছুর পরও এখনও পাসের হার শূন্য থাকা বিদ্যালয় রয়েছে, যা আমাদের অনেক কিছুর অপারগতার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, এসব বিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টদের সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা কমে যাওয়ায় গতবার জেএসসি পরীক্ষার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছিল। এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই বেড়েছে। পাসের হার ২.৫ শতাংশ আর জিপিএ-৫ গতবারের ৫০ হাজার ৫৫৭ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৭ হজার ৫০২। ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১৯ লাখ ২৯ হাজার ৯৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৭৭০ জন। এবার গণিতে শিক্ষার্থীরা গতবারের চেয়ে ভালো করেছে। জেএসসিতে সেরা রাজশাহী (৯৭.৪৭), সবচেয়ে পিছিয়ে চট্টগ্রাম বোর্ড (৮৫.৪৮ শতাংশ) মাদ্রাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেছেন, এবার প্রথমবারের মতো চালু হওয়া বাংলা, ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, শারীরিক শিক্ষা/কর্মমুখী ও জীবনমুখী শিক্ষা বিষয়ের প্রতিটিতে পূর্ণমান ৫০-এর মধ্যে আলাদা করে ৪০ নম্বর না পেলে জিপিএ-৫ ধরা হয়নি, ফলে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা এবার কমেছে।
২০১৫ সালের প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় কোনো রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশ ছিল না। গতবার শিক্ষার্থীরা অনেক আতংকের মধ্যে পরীক্ষা দিয়েছে। এবার তারা নিরুদ্বেগে ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরীক্ষা দিয়েছে। গণিতে প্রথমবারের মতো সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ায় গতবার পাসের হার কম ছিল। এ বিষয়ে সরকার প্রশিক্ষণের সংখ্যা ও আওতা বাড়িয়েছিল, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও বিষয়টি আয়ত্ত করার সময় পেয়েছে, তাই গণিতে এবার ভালোই করেছে শিক্ষার্থীরা, যা পুরো ফলকে প্রভাবিত করেছে। ব্যাপকভাবে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছিল গতবারের পরীক্ষার সময়, যা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে অনেক ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল। এবারকার পরীক্ষা এ থেকে মুক্ত ছিল বলে শিক্ষার্থীরা অনেকটা মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা দিতে পেরেছিল। রাজনৈতিক গণ্ডগোল না থাকা এবং প্রশ্নফাঁস না হওয়া আমাদের আনন্দের বার্তার কথা বলছে।
ভালো ফলের মানদণ্ড নির্বাচনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দশটি সূচক নির্ধারণ করেছে। এগুলো হচ্ছে- ১. অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, ২. পাস করা শিক্ষার্থী, ৩. ফেল করা শিক্ষার্থী, ৪. পাসের হার, ৫. জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী, ৬. শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান, ৭. শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠান, ৮. বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা, ৯. কেন্দ্র সংখ্যা এবং ১০. প্রতিষ্ঠান সংখ্যা। এগুলোর মধ্যে একটি সূচক ছাড়া বাকিগুলো ইতিবাচক। তবে আরেকটি সূচক এখানে যোগ করা যেত। সেটি হচ্ছে, একটি প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করার পর কতজন শিক্ষার্থী পরবর্তী ভালো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পেরেছে। কেবল বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা গতবারের চেয়ে এবার (২০১৫-এর ফল) সাতজন বেশি। এবার চট্টগ্রাম, বরিশাল ও দিনাজপুর বোর্ডের শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে গতবারের চেয়ে খারাপ করেছে, তা না হলে ফল আরও ভালো হতো বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। এবারের আরেকটি পজিটিভ সূচক হচ্ছে, মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে পাসের দিক থেকে এগিয়ে আছে। আমাদের ক্ষুদে শিক্ষার্থী তথা ভবিষ্যৎ যোদ্ধাদের অভিনন্দন জানাই তাদের এ সাফল্যের জন্য। সেই সঙ্গে শিক্ষকমণ্ডলী ও অভিভাবক যারা শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তাদেরও অভিনন্দন জানাচ্ছি। সিস্টেম যেহেতু পরীক্ষার, পড়াশোনা যেহেতু পরীক্ষানির্ভর- শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের সেটি তো মানতেই হবে।
তারপরও দু-একটি কথা না বললেই নয়। পরীক্ষায় পাস বা ভালো গ্রেড পাওয়াকেই প্রকৃত মূল্যায়ন এবং প্রকৃতি শিক্ষা অর্জন বোঝায় না, যা আমাদের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বুঝতে হবে। হ্যাঁ, পরীক্ষায় অবশ্যই ভালো করতে হবে। ভালো করার জন্য শুধু পরীক্ষানির্ভর পড়া যেন আমরা না পড়ি বা না পড়াই। শিক্ষার কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য সামনে রেখে এগোতে হবে। তার মধ্যে আসবে পরীক্ষা, প্রচলিত পদ্ধতিতে মূল্যায়ন। এক্ষেত্রেও ভালো করতে হবে। আমরা যেন বিস্মৃত না হই যে, পরপর কয়েকটি পাবলিক পরীক্ষায় অনেক ভালো করেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আমাদের শিক্ষার্থীদের কী হয়েছিল। এ অবস্থাটি আমাদের বার্তা দিচ্ছে, শুধু পাবলিক পরীক্ষায় ভালো করাই আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। সৃজনশীল প্রশ্নপত্র চালু করা হয়েছে ঠিকই; কিন্তু কোচিং ও গাইডের ব্যবহার কি কমেছে? বরং বেড়েছে। তাহলে কেন সৃজনশীল প্রশ্ন চালু করা হল? প্রশ্নপত্র প্রণয়নে আমরা তো এখনও ট্রাডিশন থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। বইয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেছে বেছে পড়লেই তো ফল ভালো করা যায়, তাহলে পুরো বই শিক্ষার্থীরা কেন পড়বে আর কমার্শিয়াল শিক্ষকরাইবা তার বাইরে যাবেন কেন? গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন যদি এক বোর্ডে সেট করা হয়, তো দেখা যায় বছরের পর বছর ওই একই প্রশ্ন বিভিন্ন বোর্ডে চলতে থাকে। দেখার যেন কেউ নেই। কিছুদিন আগে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের বেশ ক’জন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হলে তারা এ সম্পর্কে অতটা অবগত নন বলে জানান। কেউ কেউ বলেন, প্রশ্ন তো তারা করেন না, শিক্ষকরাই করেন, অতএব এ দায়-দায়িত্ব তাদের নয়। আমার প্রশ্ন, বিষয়টি কি তারা এড়িয়ে যেতে পারেন? শিক্ষার্থী মূল্যায়নের মূল কাজটি শিক্ষা বোর্ডগুলোই করে থাকে, সেখানে প্রকৃত স্বচ্ছতা ও যথার্থতা থাকতেই হবে।
মাছুম বিল্লাহ : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক
masumbillah65@gmail.com

নরেন্দ্র মোদির পাকিস্তান সফর ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক by বদরুদ্দীন উমর

মাউন্টব্যাটেন ও জওহরলাল নেহরু যৌথভাবে ১৯৪৭ সালে যে কাশ্মীর সমস্যা তৈরি করেছিলেন, তার জের ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৪৭ সাল থেকে আজ পর্যন্ত কোনো স্বাভাবিক প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি। উপরন্তু প্রথম থেকেই ব্রিটিশ-ভারতে হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের প্রেতাত্মার মতো ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ লেগেই আছে। ব্রিটিশ শাসন যেভাবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় পার্থক্য এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ব্যবহার করে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষা ও পুষ্ট করেছিল সেই একইভাবে তারা নিজেদের ঔপনিবেশিক শাসন গুটিয়ে নেয়ার সময় কথিত সমস্যা তৈরি করে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা করেছিল। আর এ চক্রান্তের অংশীদার ছিলেন ভারতের ‘পূজনীয়’ প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। কাশ্মীর সমস্যা যে জওহরলাল নেহরুই তৈরি করেছিলেন এ নিয়ে সম্প্রতি ভারতের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে তর্কবিতর্ক ও আলোচনার সূত্রপাত দেখা যাচ্ছে।
১৯৪৭ সালের পর থেকে কাশ্মীর সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের জনগণের মধ্যে, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা জিইয়ে রাখার যে শর্ত তৈরি হয়েছিল, সেই অনুযায়ী ব্রিটিশ আমলের সাম্প্রদায়িকতার ধারাবাহিকতা এ অঞ্চলে রক্ষিত হয়ে আসছে। কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে যেভাবে দুই দেশের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের পরিস্থিতি চলে আসছে তার থেকে মনে হয়, এ দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে অন্য কোনো সম্পর্কের গুরুত্ব নেই। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, পর্যটন, সংস্কৃতি এবং আঞ্চলিক স্বার্থ বিষয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলার কোনো প্রয়োজন ও মূল্য নেই! ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এ সম্পর্ক প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে জায়মান থাকা ব্রিটিশ সরকারের সাম্রাজ্যবাদী কৌশলের বড় রকম সাফল্য ছাড়া আর কী? শুধু ব্রিটিশ নয়, তাদের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করার সঙ্গে সঙ্গে কাশ্মীর নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের ফায়দা তারাও লুণ্ঠন করেছে। এ পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন এখনও হয়নি।
লক্ষ করার বিষয়, যখনই এ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় তখনই এ সাম্রাজ্যবাদীরা ভারত ও পাকিস্তানে নিজেদের এজেন্টদের মাধ্যমে দুই দেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটায় যাতে সে সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়ে দুই দেশই আবার শত্রুতায় পরস্পরের মুখোমুখি হয়। দুই দেশেই সাম্প্রদায়িকতা চাঙ্গা হয়ে ওঠে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে নিজেদের বিভিন্ন স্বার্থের তাগিদে সম্প্রীতি ও সমঝোতার প্রয়োজনে পরস্পরের কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা বিনষ্ট হয়। দুই দেশের এ পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের দ্বারা তাদের উভয়েরই ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয় না। এ ক্ষতির একটা বড় দিক হচ্ছে, পরস্পরকে মোকাবেলা করার জন্য সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি। ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশে এতদিন পর্যন্ত জনগণ যেভাবে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে আছেন, তার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সামরিক খাতে এদের অবিশ্বাস্য পরিমাণ ব্যয়। এ ব্যয়ের একটা অংশও যদি তারা জনগণের জন্য, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যয় করত তাহলে জনগণের দুর্দশা এত ব্যাপক ও গভীর হতো না।
লক্ষ্য করার বিষয়, মাউন্টব্যাটেন ও জওহরলাল নেহরু কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রদায়িকতার যে নতুন ভিত্তি তৈরি করেছিলেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ভারতের কংগ্রেস সরকার তার ওপর দাঁড়িয়েই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতির চেষ্টা করেনি। পাকিস্তান সরকারও এ সম্পর্ক পরিবর্তনের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে সাম্প্রদায়িক নীতির ওপরই দাঁড়িয়ে থেকেছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর হলেও কংগ্রেসের থেকেও বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের যে চেষ্টা করেছে, সেটা কংগ্রেস আমলে কোনো সরকারের সময়েই দেখা যায়নি। এর কারণ, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের যে প্রয়োজন আছে, বাণিজ্য, পর্যটন, অন্যান্য আঞ্চলিক স্বার্থ বিষয়ে সহযোগিতার যে প্রয়োজন আছে, তার তাগিদে নেহরুর সৃষ্ট ঐতিহ্যের বাইরে দাঁড়িয়ে বিজেপি দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক পরিবর্তনের একটা চেষ্টা, যত দুর্বল প্রচেষ্টাই হোক না কেন, করেছে। বিজেপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী এ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার চেষ্টা সফল হয়নি। একদিকে বিজেপির আদর্শিক প্রভু রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং অন্যদিকে পাকিস্তানের কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত সেখানকার সামরিক শাসকরা তার বিরোধিতা করেছিল। কীভাবে তা ঘটেছিল, সেটা ওয়াকিবহাল মহলে ভালোভাবেই জানা আছে।
বাজপেয়ীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চরম সাম্প্রদায়িক বিজেপি নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন করে আবার ভারত ও পাকিস্তানের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটা চেষ্টা করছেন। তার এ চেষ্টা কোনো অসাম্প্রদায়িক চেতনা সৃষ্ট নয়। সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদের। এ তাগিদ একইভাবে পাকিস্তানের শাসক শ্রেণীর একাংশের মধ্যে আছে একই কারণে। শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে নরেন্দ্র মোদিরও এই শিক্ষা হয়েছে যে, তিনি যতই সাম্প্রদায়িক হোন, সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ স্বার্থ এগিয়ে নেয়া এবং দুনিয়ায় ভারতের ভাবমূর্তির উন্নতি সম্ভব নয়। এ কারণে ক্ষমতায় বসার ঠিক পরই কাঠমান্ডুর সার্ক সম্মেলনে যে নরেন্দ্র মোদি পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একবার করমর্দন ছাড়া কোনো বাক্যবিনিময় পর্যন্ত করেননি, তিনি বিদেশ সফরে গিয়ে কয়েকদিন আগে কাবুল থেকে দেশে ফেরার পথে আকস্মিকভাবে লাহোরে অবতরণ করে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন!
তার এ পাকিস্তান সফর নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক মহলে এখন হৈ চৈ হচ্ছে। কিন্তু কংগ্রেস এর সমালোচনা করলেও ভারতের শাসক শ্রেণীর একটা প্রভাবশালী অংশ এবং সংবাদমাধ্যম এ সফরকে স্বাগত জানিয়েছে। যারা এর সপক্ষে, তাদের ধারণা এ সফরের ফলে দুই দেশের সম্পর্ক একটা ইতিবাচক মোড় নেবে এবং তাতে ভারত লাভবানই হবে। তাছাড়া যে কাশ্মীর সমস্যা দুই দেশের সম্পর্ক পর্যন্ত বিষাক্ত করে রেখেছে, সেই কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের একটা পথও এই পরিবর্তনের মাধ্যমেই বের করা সম্ভব হবে।
কিন্তু নরেন্দ্র মোদির এ চেষ্টা কতদূর অগ্রসর হবে এবং এর পরিণতি বাজপেয়ীর প্রচেষ্টার মতোই দাঁড়াবে কিনা, এ নিয়ে ইতিমধ্যেই সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ নরেন্দ্র মোদিরও আদর্শিক প্রভু আরএসএস এখন অযোধ্যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরি মসজিদের জায়গার ওপর রাম মন্দির নির্মাণের কর্মসূচি কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সেখানে বিশাল আকারে পাথর জমা করতে শুরু করেছে। এ কাজ যে ভারতের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িকতা আরও চাঙ্গা করবে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানেও যে সাম্প্রদায়িকতা নতুনভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরোধিতা জোরদার করবে এ সম্ভাবনা ষোল আনা। এ নিয়ে ভারতের বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের কথা হল- নরেন্দ্র মোদির উচিত কাজ হচ্ছে বিজেপির ওপর খবরদারি করনেওয়ালা আরএসএস নেতৃত্বের সঙ্গে এ নিয়ে কথাবার্তা বলা। কিন্তু আরএসএসই নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে তারা এক নির্ধারক শক্তি। কাজেই নরেন্দ্র মোদি যে অযোধ্যায় তাদের রাম মন্দির নির্মাণের কর্মসূচি স্থগিত বা বন্ধ করতে সক্ষম হবেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।
এ বিষয়কে কেন্দ্র করে নরেন্দ্র মোদি ও আরএসএসের সম্পর্ক যতই টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ুক, শেষ পর্যন্ত আরএসএসে তাদের সংঘ পরিবারভুক্ত অন্যান্য সংগঠন- বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, শিবসেনা এবং হিন্দু করসেবকের দলকে ঠেকিয়ে রাখার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসে থাকা সত্ত্বেও যে নরেন্দ্র মোদির হবে না, এটা ধরে নেয়াই সঙ্গত। কাজেই ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নতির পরিবর্তে এ যাত্রাতেও অবস্থা দাঁড়াবে যথা পূর্বং তথা পরং।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

রাজশাহীর তিন পৌরসভায় অস্বাভাবিক ভোট নিয়ে প্রশ্ন by আনু মোস্তফা

সারা দেশে পৌরসভাগুলোতে গড়ে ৭৩ দশমিক ৯২ ভাগ ভোট পড়লেও রাজশাহী বিভাগের তিন পৌরসভায় ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশের বেশি। এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এত ভোট কিভাবে পড়ল, এ নিয়ে বিএনপির প্রার্থীরাও সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে পারছেন না। ঢালাওভাবে তারা ভোট কারচুপির কথা বলছেন। পৌরসভাগুলো হচ্ছে- রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার কেশরহাট, নাটোরের নলডাঙ্গা ও জয়পুরহাট জেলার কালাই। তিনটিতেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া রাজশাহীর কাকনহাট ও ভবানীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও নাটোরের বড়াইগ্রাম পৌরসভায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়েছে।
রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার ৪৯ পৌরসভার ৭৯৪ কেন্দ্রে ভোট হয়েছে। এর ২৭৯ কেন্দ্রই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। আলোচিত তিন পৌরসভার ২৭ কেন্দ্রের মধ্যে ১৪টি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ভোট বেশি পড়লেও এসব কেন্দ্রে মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়- এই দাবি প্রশাসনের।
কেশরহাট পৌরসভার ৯ কেন্দ্রের মধ্যে ৫টি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ৯২ দশমিক ০১ ভাগ ভোট পড়েছে। আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শহীদুজ্জামান শহীদ নৌকা প্রতীকে ৭ হাজার ৩৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির মেয়র প্রার্থী ও সাবেক মেয়র আলাউদ্দিন আলো পেয়েছেন মাত্র ১০১ ভোট। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উঠে আসেন জামায়াতের হাফিজুর রহমান আকন্দ। তিনি জগ প্রতীকে পেয়েছেন ৪ হাজার ৯৯৬ ভোট। জাতীয় পার্টির জয়নাল আবেদিন লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছেন ৫৫ ভোট।
জেলা নির্বাচন অফিসার আমিরুল ইসলাম বলেন, ভোটের হার যাই হোক কেশরহাটের সব কেন্দ্রেই শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। এখানে কোনো প্রার্থীর কোনো অভিযোগও নেই। কী হয়েছিল কেশরহাটে- এ প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে। ভোটের তিন দিন আগে বিএনপির প্রার্থী আলাউদ্দিন আলো দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে প্রচারণা থেকে সরে যান। জামায়াতের প্রার্থী (স্বতন্ত্র) হাফিজুর রহমান আকন্দই হয়ে যান মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। গুঞ্জন রয়েছে আলোর সমর্থকরা শেষের দিকে নৌকা প্রতীকের পক্ষে মাঠে নেমে পড়েন। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী স্বল্পসংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে মাঠে থাকলেও ভোটের দিন কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি দখলে ছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের। তারা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছেন কোনো বাধা বা আপত্তি ছাড়াই।
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বরত নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সাহায্য নিয়েই ঢালাও ভোট দেয়া হয়েছে। এটি বাইরে থেকে বোঝার ব্যাপারও ছিল না। কারণ আপত্তি করার কোনো লোক ছিল না। তবে নির্বাচিত মেয়র শহীদুজ্জামান শহীদ দাবি করেন, পৌরবাসী তাকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছেন। এখানে কোনো কারচুপি হয়নি। নলডাঙ্গা পৌরসভায় ৯০ দশমিক ৭০ ভাগ ভোট পড়েছে। নৌকা প্রতীকে ৩ হাজার ১৫ ভোট পেয়ে মেয়র হয়েছেন শরীফ উদ্দিন মণ্ডল। বিএনপির প্রার্থী আব্বাস আলী নান্নু ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ হাজার ৬৯৫ ভোট। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নলডাঙ্গা পৌরসভার সোনাপাতিল সরকারি স্কুল কেন্দ্রে শতভাগ ও অন্যদিকে নলডাঙ্গা সরকারি হাইস্কুল কেন্দ্রে ৯৯ দশমিক ৮৮ ভাগ ভোট পড়েছে। নান্নুর অভিযোগ, বেলা ৩টার পর তিন কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ভোটার ব্যালট পেপার না থাকায় ভোট দিতে গিয়ে ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বলেন, কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিতরাই ভোট কেটে বাক্স ভর্তি করেছেন। আগে থেকেই আইনশৃংখলা বাহিনীর হয়রানিমূলক তৎপরতায় বিএনপির নেতাকর্মীরা কেন্দ্রে গিয়ে প্রতিবাদ করবে এমন পরিস্থিতি ছিল না।
কালাইতেও ভোট পড়েছে ৯২ দশমিক ৪২ ভাগের বেশি। ভোটের দিন দুপুরের পরপরই এ পৌরসভার বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাজ্জাদুর রহমান সোহেল তালুকদার, বিদ্রোহী প্রার্থী আনিসুর রহমান তালুকদার ও জাতীয় পার্র্টির আনিসুর রহমান ভোট বর্জন করেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করে ভোট দিয়েছেন। দখল করা এক কেন্দে ৯৪ দশমিক ৬৮ ভাগ ভোট পড়ে। এ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের খন্দকার হালিমুল আলম জন ৬ হাজার ৮৪৪ ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন। বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন ১ হাজার ৫০০ ভোট।
অস্বাভাবিক ভোট পড়ার বিষয়ে জেলা রিটার্নিং অফিসার তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে। অনিয়মের কোনো অভিযোগ নেই। কালাই পৌরসভার ৫ কেন্দ্র ছিল বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সেগুলোতে অবশ্য কোনো অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি।
রাজশাহী বিভাগের কাকনহাটে ৮৯ দশমিক ৭৭ ভাগ, ভবানীগঞ্জে ৭৭ দশমিক ৫২ ভাগ, বড়াইগ্রামে ৮৮ দশমিক ১৮ ভাগ, রায়গঞ্জে ৮৭ দশমিক ৬০ ভাগ ভোট পড়েছে। এসব পৌরসভার মধ্যে ভবানীগঞ্জে ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ছাড়া বাকিগুলোতে ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি স্থানীয় প্রশাসনের। এর মধ্যে কাকনহাটে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর সমর্থকরা ভোটের আগের দিন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর হয়ে কাজ শুরু করায় কয়েকটি কেন্দ্রে একচেটিয়া ভোট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এখানে বিএনপি প্রার্থী কোনো অভিযোগ করেননি।
রাজশাহী জেলায় ৩৯টি কেন্দ্র অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এসব কেন্দ্রেও ভোটের হার বেশি। এ প্রসঙ্গে রাজশাহীর অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, আইনশৃংখলার দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা একটি প্রশাসনিক বিষয়। তবে ঘোষণা করা হলেও রাজশাহী বিভাগে সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃংখলা বাহিনীর লক্ষাধিক সদস্য ভোট গ্রহণে কাজ করেছে।
পাবনার ১০৭ কেন্দ্রের সবগুলো ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু পাবনার কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পাবনা সদর পৌরসভার সবগুলো কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ভোট পড়েছে শতকরা ৬৫ ভাগ। রাজশাহী বিভাগীয় নির্বাচন অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, ভোটাররা শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট দিয়েছে। পাবনা জেলার কোথাও কোথাও শতকরা ৭৫ ভাগের বেশি ভোট পড়েছে। এটাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে বিবেচনার সুযোগ নেই। রাজশাহীর চারঘাটে ৬ কেন্দ্র ছিল অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ভোট শেষে দেখা গেছে এসব কেন্দ্রে ৭৫ ভাগের বেশি ভোট পড়েছে। তাহেরপুরের সবগুলো কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ভোট পড়েছে ৮২ ভাগের বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৪ পৌরসভার ৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে ২৫ কেন্দ্র ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে সর্বাধিক ১৭টি। জেলায় ভোট পড়েছে ৭৩ ভাগ। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ভোট পড়েছে ৭৯ ভাগ। বিভাগের অন্যান্য পৌরসভায়ও ভোটের হার বেশি তবে দৃশ্যমান কোনো অনিয়মের কথা বলছেন না বিএনপি বা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।

সৌদিতে শিয়া নেতাসহ ৪৭ জনের শিরশ্ছেদ, চড়া মূল্য দিতে হবে: ইরান

সৌদি আরবে গতকাল শনিবার শিরশ্ছেদ করে ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দেশটির শিয়া সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতা শেখ নিমর আল নিমরও রয়েছেন। আল নিমরের শিরশ্ছেদ করায় কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ইরান। ইরান বলেছে, সৌদি আরবকে অচিরেই এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ৪৭ জনের মধ্যে একজন চাদ এবং একজন মিসরের নাগরিক। বাকি ৪৫ জনের সবাই সৌদি নাগরিক। খবর বিবিসির।
শেখ নিমর আল নিমর
সৌদি আরব গত বছর ১৫৭ জনের শিরশ্ছেদ করে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবমতে, ২০ বছরের মধ্যে এটাই ছিল এক বছরে সর্বোচ্চসংখ্যক লোকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনা।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা ও রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তে জড়িত থাকার দায়ে তাঁদের শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বিবৃতির মাধ্যমে এ কথা জানায়।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন জাবের আনসারি গতকাল বলেন, ‘সৌদি সরকার বরাবরই সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন এবং উগ্রপন্থীদের মদদ দিয়ে আসছে, আর নিজের দেশের সমালোচকদের নির্যাতন-নিপীড়নের মাধ্যমে দামিয়ে রাখছে।...এই নীতি অনুসরণের জন্য সৌদি আরবকে চড়া মূল্য দিতে হবে।’
শিয়া নেতা শেখ নিমরকে দুই বছর আগে বিক্ষোভ করার সময় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আটক করা হয়েছিল। ২০১১ সালে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করে, তাতে শেখ নিমর প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিলেন। সৌদি আরবে শিয়ারা দীর্ঘদিন থেকে সরকারের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করার অভিযোগ করে আসছে।
গত অক্টোবরে শেখ নিমরের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। ওই সময়ও শিয়া মুসলিমপ্রধান দেশ ইরান শেখ নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে সৌদি আরবকে ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
শেখ নিমরের এক ভাই গতকাল বিবিসিকে বলেন, তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে সৌদি রাজত্বে বিদেশিদের ‘অনুপ্রবেশ’ ঘটাতে চাওয়া; শাসকদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন না করা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
২০১১ সালে ‘আরব বসন্ত’ শুরু হলে সৌদির তেলসমৃদ্ধ পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা বিক্ষোভ শুরু করে।
শেখ নিমরের সমর্থকেরা বলেছেন, নিমর শুধু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমর্থন করেছিলেন এবং সরকারবিরোধী সব ধরনের সহিংস বিক্ষোভের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন।
সৌদি আরব বরাবরই শিয়াদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং এই বিক্ষোভের পেছনে ইরানের হাত আছে বলে অভিযোগ করেছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে আল-কায়েদার হামলায় বহু লোক নিহত হয়। এর জের ধরে দেশটি কয়েক হাজার জঙ্গিকে আটক করেছে, যাদের মধ্যে কয়েক শ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শিয়া বিক্ষোভ চলাকালে দেশটির বেশ কিছু এলাকায় বন্দুক ও বোমা হামলা হয়। এসব হামলায় কয়েকজন পুলিশসহ বহু বেসামরিক লোক নিহত হয়।

শেষ বছরে ওবামার লক্ষ্য

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা
হোয়াইট হাউসে নিজের শেষ বছরে পা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কদিন বাদেই চূড়ান্ত ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণ দেবেন তিনি। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, কিউবায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা ও ফৌজদারি বিচার-সংক্রান্ত আইনে সংস্কারের মতো বিষয়গুলো তাতে অগ্রাধিকার পাবে। ওবামার সামনে এখন লক্ষ্য একটাই; সেটা হলো, বাকি মেয়াদের পুরো সময়ে প্রাসঙ্গিক থাকা। স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ হলো মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের যৌথ অধিবেশনে প্রেসিডেন্টের দেওয়া ভাষণ। এমন ভাষণ বছরে একবার দিয়ে থাকেন প্রেসিডেন্ট। সে হিসাবে ১২ জানুয়ারি সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের যৌথ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণ হবে ওবামার শেষ স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ। এমন এক সময়ে তিনি এই ভাষণ দিতে যাচ্ছেন, যখন হোয়াইট হাউসে তাঁর উত্তরসূরি হওয়ার জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রচারণা নতুন মাত্রা পেয়েছে। হোয়াইট হাউসের সাবেক ও চলতি উপদেষ্টাদের মতে, ওবামা ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে আন্তর্জাতিক চুক্তির মতো বড় কিছু সফলতার মাধ্যমে ‘অভাগা প্রেসিডেন্ট’-এর তকমা এড়িয়েছেন। আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে প্রতিপক্ষ শিবির রিপাবলিকান শিবিরে যে বিশৃঙ্খলাপূর্ণ অবস্থা, তা অব্যাহতভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবেন ওবামা। হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টা ড্যান পিফেইফার বলেন, ‘আমি মনে করি, ২০১৬ সালটা অনেক ক্ষেত্রেই ২০১৫ সালের মতো হবে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ও তাঁর সহযোগীরা আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলো এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে যাবেন। আর রাজনৈতিক সার্কাসের আলোকপাতটা থাকবে প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ট্রাম্প ও অন্যদের ওপর।’ উপদেষ্টারা বলছেন,
ওবামার ১২ জানুয়ারির চূড়ান্ত ভাষণে অতীতের মতো আইনগত পদক্ষেপের লম্বা ফর্দ থাকবে না বলে তাঁদের ধারণা। এর পরিবর্তে ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তন ও কিউবা নীতির মতো অগ্রাধিকারভিত্তিক বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি ওবামা নিজের শেষ দিনগুলোতে যেসব নীতির চূড়ান্ত পরিণতি দেখতে চান, তার ওপর আলোকপাত করবেন। এর বাইরে দেশে একের পর এক সহিংস ঘটনার প্রেক্ষাপটে তিনি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নতুন করে আহ্বান জানাবেন। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ রিপাবলিকানদের দখলে থাকায় ওবামা অতীতে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিতে পারেননি। তবে শিগগিরই নতুন ঘোষণা আসার ইঙ্গিত দিয়ে ওবামা বলেছেন, আগামী সোমবার তিনি এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে বসবেন। দপ্তর ছাড়ার আগেই ওবামা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন—কিউবার গুয়ানতানামো বের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করা। এ বিষয়ে একটি সংশোধিত পরিকল্পনা শিগগিরই কংগ্রেসে তুলতে পারে হোয়াইট হাউস। তবে ওই পরিকল্পনার বিরোধিতা করা থেকে আইনপ্রণেতারা সরে আসবেন বলে মনে করছেন না ওবামার সহযোগীরা। গুয়ানতানামো বে ঘাঁটির বিষয়ে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়টি এখনো হোয়াইট হাউসে প্রকাশ্য আলোচনায় নেই। তবে ওবামার সহযোগীরা বলছেন, এ বছর শেষ হওয়ার আগেই ওবামা সেই লড়াইয়ে নামবেন, তা সন্দেহাতীত। সাবেক উপদেষ্টা এবং ২০০৮ ও ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ওবামার সেনাপতিদের একজন ডেভিড অ্যাক্সেলর্ড বলেন, প্রেসিডেন্টরা সব সময়ই প্রাসঙ্গিক থাকেন। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাঁর সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সব আইনগত কর্তৃত্ব ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে।

দুবাইয়ের হোটেলে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু

বিলাসবহুল হোটেলটি থেকে গতকাল সকালেও
ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। এএফপি
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে একটি বিলাসবহুল হোটেলে নববর্ষ উদ্যাপনের ঠিক আগমুহূর্তে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে কর্তৃপক্ষ। অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন আহত হয়েছেন। ভবনটির কাছেই বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফার অবস্থান। খবর বিবিসি ও এএফপির। ইউএইর কর্মকর্তারা বলেন, গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে নয়টায় ৬৩ তলাবিশিষ্ট পাঁচ তারকা হোটেল অ্যাড্রেস ডাউন টাউনের ২০ তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রচণ্ড বাতাসে ১০ মিনিটের মধ্যেই হোটেলটির বড় অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের চারটি দল কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় বলে কর্মকর্তারা জানান। তবে গতকাল শুক্রবার সকালেও ভবনটির অংশবিশেষ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে বলে গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়। বিবিসির একজন সংবাদদাতা বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সূচনা হওয়া ২০ তলায় গতকালও আগুনের শিখা দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পরপরই ওই হোটেল ও দুবাই মলসহ আশপাশের অন্যান্য ভবন থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
নববর্ষ উপলক্ষে বুর্জ খলিফা ভবন থেকে মধ্যরাতে বিরাট আতশবাজি প্রদর্শনী শুরুর আগে কাছাকাছি ওই হোটেলটিতে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আতশবাজি দেখতে সমবেত হওয়া লোকজনকে অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়। তবে হোটেলটিতে অগ্নিকাণ্ড চলার মধ্যেই নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে বুর্জ খলিফা থেকে আতশবাজির পূর্বনির্ধারিত প্রদর্শনী চালিয়ে যাওয়া হয়। দুবাই পুলিশের প্রধান খামিস মাত্তার আল মাজেইনা খালিজ টাইমসকে বলেন, প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্টে ভোগা ১৪ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। মিশেল ডিউক নামের একজন পর্যটক বিবিসিকে বলেন, ‘হঠাৎ করেই আমরা দেখি খলিফা টাওয়ার ও ওই হোটেলের মাঝখান দিয়ে কালো ধোঁয়ার বিরাট কুণ্ডলী বেরিয়ে আসছে। আগুনের তীব্রতা অনেক বেশি ছিল। বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে ওঠার আগেই হোটেলটি কমলা রঙের আগুনে ঢেকে যায়।’ অ্যাড্রেস ডাউন টাউনে একটি বিলাসবহুল হোটেলের পাশাপাশি বহু অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সও রয়েছে।

বিমানবন্দর থেকে রাহাত ফতেহ আলীকে ফেরত

রাহাত ফতেহ আলী খানক
পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী রাহাত ফতেহ আলী খানকে ভারতের হায়দরাবাদ বিমানবন্দর থেকে আবুধাবি ফেরত পাঠানো হয়েছে। হায়দরাবাদে নববর্ষের এক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে অংশ নিতে আবুধাবি থেকে সরাসরি বিমানবন্দরটিতে এসেছিলেন তিনি। খবর দ্য হিন্দুর। ভারতের কর্মকর্তারা জানান, পাকিস্তানের নাগরিকদের দেশটিতে প্রবেশের জন্য কেবল রাজধানী দিল্লি এবং মুম্বাই বিমানবন্দর দিয়ে ঢোকার অনুমতি রয়েছে।
রাহাত সেই নিয়ম না মেনে সরাসরি হায়দরাবাদে আসেন। তবে রাহাতের দাবি, তিনি কোনো ভুল করেননি। খবরে বলা হয়, হায়দরাবাদ থেকে আবুধাবি ফেরত গিয়ে সেখান থেকে দিল্লি হয়ে আবার হায়দরাবাদে আসেন এই সংগীতশিল্পী। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে হায়দরাবাদের একটি হোটেলে আয়োজন করা নববর্ষের ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি।

স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া প্রকাশ্যে

প্রকাশ্যে চলে এলো স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া। কয়দিন আগেই সংবাদ সম্মেলন করে স্ত্রী বলেছিলেন, কর্মীদের চাঙা রাখার জন্য স্বামী নানা কথা বলেন। আর গতকাল স্ত্রীর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন স্বামী। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং তার স্ত্রী রওশন এরশাদের বিভেদ অবশ্য নতুন কিছু নয়। দুই বছর আগে স্বামী যখন হাসপাতাল নামক আধুনিক কারাগারে বন্দি তখন দলের একাংশ নিয়ে নির্বাচনে চলে যান রওশন। ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের পর মুক্তি মিলে এরশাদের। সংসদের বিরোধী দলের নেতা হন রওশন। তবে এরশাদের প্রাপ্তির খাতাও একেবারে খালি থাকেনি। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ জুটিয়েছেন তিনি। নানা সময় সরকারের সমালোচনায় মুখর থাকলেও এ পদ এখনও ছাড়েননি তিনি।
গতকাল রাজধানীর একটি মিলনায়তনে জাতীয় পার্টির ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এরশাদ-রওশনের রাজনৈতিক দূরত্বের বিষয়টি আবারও সামনে আসে। এরশাদ বলেন, ইমেজ সংকটের কারণেই পৌরসভা নির্বাচনে জাপার ভরাডুবি হয়েছে। মানুষ আওয়ামী লীগের পরে বিএনপির নাম নেয়। কারণ, জাতীয় পার্টিকে কেউ বিরোধী দল হিসেবে মনে করে না। এ সময় এরশাদ রওশনের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনার কাছে আমার আবেদন, জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হয়ে থাকুক। আপনি প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করুন। এরশাদ আরও বলেন, আমরা যদি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করি আর আমি বিশেষ দূতের পদটি ছেড়ে দেই, তবেই জাপা সত্যিকারের বিরোধী দল হবে।
পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলেও মন্তব্য করেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, আমাদের ৭৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩ জনকে জোর করে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক প্রার্থীকে হুমকি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও স্থানীয় পর্যায়ে আমাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের ভেবে দেখতে হবে, কেন আমরা ভালো করতে পারি নাই। আমাদের ইমেজ সংকট দূর করতে হবে। প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হবে। দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা তুলে ধরে জাপা চেয়ারম্যান আরও বলেন, মাত্র ২৭টি জেলায় আমাদের সংগঠন আছে। বাকি জেলাগুলোতে নেই। সব জেলায় সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। পার্টিকে ক্ষমতার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। তিনি বলেন, জাপাকে শক্তিশালী করার জন্য যা প্রয়োজন, আমি সব করবো। এবং আমি নিশ্চিত রওশন আমাকে সহযোগিতা করবেন। এর মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করবো আমাদের মধ্যে কোন বিভক্তি নেই। এ সময় সবাইকে দাঁড়িয়ে হাত তুলার জন্য অনুরোধ করেন এরশাদ। মঞ্চের নেতারাসহ সব কর্মীরা হাত তুলে দাঁড়ালেও রওশন এরশাদ উঠেননি। যদিও পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল মাহমুদ তাকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য কয়েকবার ইশারা দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রওশন বলেন, পার্টি যতদিন শক্তিশালী না হয়, ততদিন আমরা মানুষের কথা বলতো পারবো না। সমালোচনা করতে পারবো না। যতটুকু সমালোচনা করা প্রয়োজন, আমরা তা করতে পারছি না। কারণ আমরা শক্তিশালী নই। তিনি বলেন, ভুল থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। পার্টিকে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত করতে হবে। ঢাকায় বসে পার্টি সংগঠিত করা যাবে না। তৃণমূলে যেতে হবে। রওশন বলেন, জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠায় কাজী জাফর আর মিজানুর রহমান চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। নানা সমস্যার কারণে অভিমান করে কাজী জাফর আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তারা আজ আমাদের মাঝে নেই। যারা পার্টি ছেড়ে চলে গেছেন দলকে সংগঠিত করার জন্য তাদেরকে আবারও পার্টিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, আমরা আপনাদের জন্য আকুল আগ্রহে বসে আছি। আপনারা আসুন। এদিকে পৌর নির্বাচন শেষ হয়ে গেলেও দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনী দিক নির্দেশনা দেন রওশন এরশাদ। তিনি বলেন, অনেক কেন্দ্রে কারচুপির আশঙ্কা থাকে। যেসব কেন্দ্র খুব প্রত্যন্ত অঞ্চলে, মানুষ হেঁটে পৌঁছাতে পারে না, সেসব কেন্দ্র ভোট কারচুপি হয়। আমাদের ভোট পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ভোট রক্ষা করতে হবে।
এর আগে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পানি সম্পদ মন্ত্রী ও জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, যারা পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে বসে আছেন, কিন্তু কাজ করছেন না, তাদরে বাদ দিতে হবে। পার্টিকে শক্তিশালী করার জন্য নতুনদের এগিয়ে আনতে হবে। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- জাপা প্রেসিডিয়াম সদস্য দেলোয়ার হোসেন খান, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, গত ২৯শে ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ। ওই সংবাদ সম্মেলনে দেশে গণতন্ত্র নেই ও নির্বাচন কমিশন মেরুদণ্ডহীন বলে এরশাদ যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন রওশন। তিনি বলেন, এরশাদ দলকে চাঙ্গা রাখার জন্যই এসব কথা বলে থাকেন।

সৌদি আরবকে ‌'উচ্চ মূল্য' দিতে হবে : ইরান

শীর্ষস্থানীয় শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ শেইখ নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় সৌদি আরবকে 'উচ্চ মূল্য' দিতে হবে বলে দেশটিকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন ইরান।
এফএফপি জানায়, শনিবার সৌদি আরব নিমরসহ ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে।
ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন জাবের আনসারি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তীব্র নিন্দা করে বলেন, সৌদি সরকার সন্ত্রাসী আন্দোলনগুলোকে সমর্থন করে।
২০১১ সালে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, তার অন্যতম চালিকাশক্তি ছিলেন নিমর (৫৬)।
এদিকে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক সংসদীয় কমিশনের প্রধান আলাউদ্দিন বোরুজেরদির উদ্ধৃতি দিয়ে রেডিও তেহরান বলেছে, সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় আলেম আয়াতুল্লাহ শেইখ নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্যদিয়ে দেশটির রাজতন্ত্র পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। ইরানের জাতীয় সংসদের নিজস্ব বার্তা সংস্থার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি।
বোরুজেরদি আরও বলেছেন, শেইখ নিমরের শাহাদাতের কারণে সৌদি আরবে গণ অসন্তোষের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে আলেমদের দমন করার পরিণতি হচ্ছে ধ্বংস। তিনি আরও বলেন, শেইখ নিমরসহ আরও অনেকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মধ্যদিয়ে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, সৌদি আরবে স্বাধীনতা এবং আলেম ও জ্ঞানীদের প্রতি সম্মানবোধের কোনো অস্তিত্ব নেই। দেশটিতে পুরোপুরি স্বৈরতন্ত্র কায়েম করা হয়েছে।
বোরুজেরদি বলেন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের দাবিদার আমেরিকা সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে এবং ইয়েমেনে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানিসহ সৌদি আলেম শেইখ নিমরের শাহাদাতের দায় মার্কিন সরকারও এড়াতে পারে না।

ভারতে বিমানঘাঁটিতে জঙ্গি হামলায় নিহত ৮

শনিবার ভোররাতে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের পাঠানকোটে বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে জঙ্গি হামলা হয়েছে। নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে ৫ জঙ্গি ও ৩ বিমানবাহিনী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন জওয়ান। ভারত-পাকিস্তান আলোচনার পথ ফের বন্ধ করতেই এমন মরিয়া হামলা বলে ভারত সরকার মনে করছে। এর পর ভারতের বিভিন্ন শহরে বাড়ানো হয়েছে সতর্কতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ভারত প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক চায়। তাই বলে সন্ত্রাসী হামলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভারতের উপর যদি সন্ত্রাসী হামলা হয় তবে ভারত তার উপযুক্ত জবাব দিতে দ্বিধা করবে না। লাহোরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাতের কয়েকদিন পরেই এ হামলা চালানো হলো। এ দিন রাত সাড়ে তিনটা নাগাদ পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে ঢুকে পড়ে জঙ্গিরা। তবে তাদের সংখ্যা কত ছিল তা নিশ্চিত ভাবে জানা যায় নি। এরা প্রত্যেকেই বিমানবাহিনীর পোশাকে ছিল বলে জানা গেছে। ঘাঁটির পিছন দিকে একটি ক্যানালের সঙ্গে বিমানঘাঁটির সংযোগকারী নিকাশী নালার মধ্য দিয়ে জঙ্গিরা ভিতরে প্রবেশ করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘাঁটির যে অংশে যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার রাখা থাকে সেদিক থেকে হামলা চালাতে শুরু করে জঙ্গিরা। ঘাঁটির বাইসন মিগ বিমান ও এমআই হেলিকপ্টারগুলি ধ্বংস করাই জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল বলে  ধারণা করা হচ্ছে। পাঠানকোটের বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে যত বেশি সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি করাই লক্ষ্য ছিল জঙ্গিদের। এজন্য নির্দেশ এসেছিল পাকিস্তান থেকে। জঙ্গিদের ফোন ট্যাপ করে একথা জানা গেছে বলে সূত্রের খবর। সন্দেহের তীর জঙ্গি সংগঠন জৈশ-ই-মহম্মদের দিকে।   জৈশ-এর প্রধান কমান্ডার আজহার মাসুদের ভাই আবদুল রউফ মাসুদ আজহার ও আল- রেহমান ট্রাস্ট এই হামলার পেছনে রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে দাবি করা হয়েছে। গোয়েন্দাদের মতে, হামলার প্রধান মাথা হিসেবে কাসেম জান, মৌলানা আসফাক, আব্দুর গফুরকে গোয়েন্দারা চিহ্নিত করেছেন। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, গত শুক্রবার গুরুদাসপুর এসপির ছিনতাই হওয়া গাড়িতে করেই জঙ্গিরা বিমানবাহিনীর ঘাঁটিতে পৌঁছেছিল। এই গাড়ি ছিনতাইয়ের পরেই জঙ্গী হামলার আশঙ্কায় রাতেই বিমানবাহিনীর অফিসারদের নিয়ে দিল্লিতে ভারতের জাতীয় উপদেষ্টা অজিত দোভাল জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন। নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছিল। সেনাপ্রধানদেরও হামলার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল। জানা গিয়েছিল, এসপির গাড়ি ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে জঙ্গিরা নাকি পাকিস্তানে কথাও বলেছিল বেশ কয়েকবার। ফোন ট্যাপ করে তা জানা গিয়েছে। বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সময়ও জঙ্গিরা পাকিস্তানে কথা বলছিল বলে জানা গেছে। জঙ্গিদের কাছে বার বার নির্দেশ আসছিল ভারতীয় বিমানঘাঁটির দামি সরঞ্জাম আগে নষ্ট করে দেয়ার জন্য। তবে বিমানবাহিনী সূত্রে দাবি করা হয়েছে, সতর্কতার ফলেই বিমানঘাঁটিতে প্রবেশের পর ঘাঁটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেনাদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল জঙ্গিদের। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টায় জঙ্গিদের খতম করা  সম্ভব হয়েছে। তবে আরও জঙ্গি এলাকায় রয়েছে কিনা তাদের খোঁজে গোটা এলাকায় কম্বিং অপারেশন চলছে। জানা গেছে, জঙ্গিরা পাকিস্তানের ভাগলপুর থেকে এই হামলার উদ্দেশ্য নিয়ে তিন দিন আগেই ভারতে প্রবেশ করেছিল।  পুলিশ সূত্রে খবর, পাঠানকোট-জম্মু হাইওয়েতে সতর্ক প্রহরা শুরু হয়েছে। দিল্লিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পানিক্কর সেনাবাহিনীর তিন প্রধান, গোয়েন্দা প্রধান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ঘটনার বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছেন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য এবং এই ধরনের যে কোনো হামলার চেষ্টা গোড়াতেই প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে সেনাবাহিনীকে। জঙ্গিদের ফোনকল ট্যাপ করে খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে সাউথ ব্লক সূত্রের খবর। তবে আগাম আশঙ্কা সত্ত্বেও জঙ্গি হামলা কিভাবে ঘটেছে সেটা নর্থ ব্লকের কর্তাদের ভাবাচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রের খবর, এমআই-২৫ ও এমআই-৩৫ হেলিকপ্টারগুলিই মূল টার্গেট ছিল জঙ্গিদের। এই হেলিকপ্টার গানশিপ তথা অ্যাটাক হেলিকপ্টার ভারতীয় বায়ুসেনার অন্যতম বড় শক্তি। একেই যুদ্ধক্ষেত্রে ‘উড়ন্ত ট্যাঙ্ক’ বলা হয়। ওই কপ্টারগুলি ধ্বংস করতে পারলে জঙ্গিরা বড় ধাক্কা দিতে পারত বিমানবাহিনীকে। কিন্তু ঘটেছে ঠিক উল্টোটাই। ঘাঁটিতে জওয়ানরা যখন জঙ্গিদের মুখোমুখি লড়েছেন, তখন এমআই-২৫ এবং এমআই-৩৫ কপ্টারগুলিও অভিযান শুরু করে দিয়েছিল। আকাশ থেকে হামলা শুরু হয় জঙ্গিদের উপর। ফলে অচিরেই জঙ্গিদের ছক   ভেস্তে গেছে। পরে কম্বিং তল্লাশিতেও কাজে লাগানো হয় ওই কপ্টারগুলিকেই। গুরুদাসপুরে জঙ্গি হামলার মাত্র ছ’মাসের মধ্যে  ফের এক বার রক্তাক্ত হয়েছে পাঞ্জাব। তবে বিমানঘাঁটিতে হামলার নিন্দা করেছে সব রাজনৈতিক দলই। কংগ্রেস ও পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট বলেছে, পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকে লাইনচ্যুত করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
আইএসআই’র হাত?
ভারতের কিছু সূত্র মোতাবেক, হামলার পেছনে সরাসরি জড়িত পাকিস্তানের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। জি নিউজ এক খবরে জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরে ভারতে হামলার জন্য আইএসআই কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠকে বসে। সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করার জন্যই ওই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
এদিকে কয়েকদিন আগে গ্রেপ্তার হওয়া ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তাকে এ হামলার বিষয়ে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। রঞ্জিত কেকে নামে ওই কর্মকর্তাকে নারীর লোভ দেখিয়ে জালে আটকানো হয়। পরে তাকে ব্ল্যাকমেইল করে ভারতের বিভিন্ন বিমানঘাঁটির তথ্য হাতিয়ে নেয়া হয়। গোয়েন্দাদের ধারণা এ হামলার সঙ্গে রঞ্জিত কেকের দেওয়া তথ্যের সমপর্ক থাকতে পারে।
হামলার আগে মা’কে ফোন?
জি নিউজের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্ত্রাসীরা হামলার আগে পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি কল করে, যেসব তৎক্ষণাৎ একটি গোয়েন্দা সংস্থার হস্তগত হয়। এর মধ্যে এক সন্ত্রাসী তার মাকে ফোন করেছিল। কথোপকথনের একপর্যায়ে নিজের ছেলেকে মৃত্যুর আগে খাবার খেয়ে নিতে বলেন তার মা।