Sunday, November 29, 2009

ইসরায়েল হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের খুনি চর: শাভেজ

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ গত বুধবার ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের খুনি চর অভিহিত করেছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের কারাকাস সফরকালে তিনি এ কথা বলেন।
আহমাদিনেজাদ দক্ষিণ আমেরিকার তিনটি দেশ সফরের শেষ পর্যায়ে ভেনেজুয়েলায় যান।
ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেস এ মাসে দক্ষিণ আমেরিকা সফরকালে ‘তাঁর ও আহমাদিনেজাদের দিন শেষ হয়ে আসছে’ বলে যে মন্তব্য করেন, সে প্রসঙ্গে শাভেজ বলেন, ‘আমরা জানি, ইসরায়েল আসলে যুক্তরাষ্ট্রের খুনি অস্ত্র।

হজ পালন করলেন ওবামার দাদি

এ বছর পবিত্র হজ পালন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সত্দাদি সারাহ ওবামা। গত বুধবার সৌদি আরবভিত্তিক পত্রিকা ওকাজ জানিয়েছে, সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর আমন্ত্রণে কেনিয়ার একটি গ্রাম থেকে সারাহ ওবামা (৮৭), তাঁর এক নাতি ও ১০ জন গ্রামবাসী হজ পালন করতে আসেন।
প্রতিবছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের হজ পালন করার জন্য আমন্ত্রণ জানান সৌদি বাদশাহ। তিনি ওই হাজিদের সব ব্যয় বহন করে থাকেন। সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে এ বছর প্রায় তিন হাজার অতিথি হজ পালন করেছেন।
বারাক ওবামার দাদা হুসেন ওনয়াঙ্গোর তৃতীয় স্ত্রী সারাহ ওবামা। বারাক কিছুকাল কেনিয়ায় ছিলেন। ওই সময় আপন দাদি আকুমা ওবামার সঙ্গে সারাহও বারাকের দেখভাল করেছিলেন।

সৌদি আরবে বন্যায় ৪৮ জনের মৃত্যু

সৌদি আরবের জেদ্দায় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সৃষ্ট বন্যায় ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে মক্কায় মারা গেছে চারজন। তবে হজ পালন করতে আসা কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমানের প্রাণহানি ঘটেনি। দেশটির একটি উদ্ধারকারী সংস্থা গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছে।
উদ্ধারকারী সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জানান, ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যায় কেউ পানিতে ডুবে, কেউ সেতু ভেঙে, আবার কেউ গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বন্যার কারণে জেদ্দায় অনেক লোক পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। সেখানে ইতিমধ্যে বন্যাকবলিত ৯০০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পবিত্র হজ পালনের জন্য এবার প্রায় ২৫ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান মক্কায় সমবেত হয়েছেন। বন্যার কারণে মক্কায় যাওয়ার পথে একটি সড়কপথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের হজ পালনে ভোগান্তি হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা জাসেম আল-ইয়াকোত বলেন, মক্কায় যাওয়ার পথে দুটি সেতু ভেঙে গেছে। বৃষ্টিতে জেদ্দার অনেক স্থানে বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

জামিন মিললেও মুক্তি পাচ্ছেন না পোলানস্কি

অস্কারজয়ী চলচ্চিত্র পরিচালক রোমান পোলানস্কি গত বুধবার সুইস আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। এখন তিনি কারাগার থেকে মুক্তির প্রহর গুনছেন। তবে শিগগিরই তিনি মুক্তি পাচ্ছেন না বলে সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্র বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছে। বিচার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে এখন দেশটিতে গৃহবন্দী থাকতে হবে। এএফপি।
৭৬ বছর বয়সী এই তারকা চলচ্চিত্র পরিচালক ১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পালিয়ে আসেন। ওই দেশে অবস্থানকালে তাঁর বিরুদ্ধে ১৩ বছরের এক মেয়ের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। এর পরই তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়েন। তখন মার্কিন কর্তৃপক্ষ পোলানস্কির বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করে।
একপর্যায়ে মার্কিন পরোয়ানার সূত্র ধরে জুরিখ বিমানবন্দর থেকে সুইস পুলিশ গত ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। সেখানে একটি চলচ্চিত্র উত্সবে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদানের কথা ছিল।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ফৌজদারি আদালত বুধবার এক বিবৃতিতে জানান, রোজম্যারিস বেবি ও চায়না টাউন-এর পরিচালক পোলানস্কির পালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। তবে ৪৫ লাখ ডলারের বিনিময়ে জামিন লাভের যে প্রার্থনা তিনি করেছেন তা শর্তসাপেক্ষে মঞ্জুর করা হয়েছে। তাঁকে এখন কারাগার থেকে মুক্তির পর গৃহবন্দী থাকতে হবে। যে বাড়িতে তিনি থাকবেন সেখানে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় কঠোর নজরদারি থাকবে। এতে তাঁর পালানোর ঝুঁকি এড়ানো যাবে।
পোলানস্কির আইনজীবীরা জানান, গাস্তাদে পোলানস্কির একটি বাড়ি রয়েছে। কারামুক্তির পর সেখানেই হয়তো তাঁকে রাখা হবে।

সন্ত্রাসবাদ বন্ধে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, সন্ত্রাসবাদ বন্ধে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে সম্ভাব্য সবকিছু করছে ওয়াশিংটন। পাকিস্তানের ভূখণ্ড থেকে লস্কর-ই-তাইয়েবার মতো সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর মূলোত্পাটনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে তারা ইসলামাবাদের ওপর সব ধরনের চাপ অব্যাহত রেখেছে।
মুম্বাই হামলার প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জেমস জোনস এ কথা বলেছেন। বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, সব ধরনের সন্ত্রাসী সংগঠনের তত্পরতা বন্ধে পাকিস্তানকে নিয়মিত উত্সাহিত করছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন বলেছে, পাকিস্তান যদি এ লক্ষ্য পূরণে সফল হয়, তবে তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বিশেষ করে আরও বেশি আর্থিক সহযোগিতা পাবে।
জোনস বলেন, ‘আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে সন্ত্রাসবাদ বন্ধের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্টভাবে পাকিস্তানের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এ ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সবকিছু করছি। সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে নিরস্ত্র করার ব্যাপারে আমরা পাকিস্তানকে উত্সাহিত করছি। আমরা ইসলামাবাদকে সাফ জানিয়ে দিয়েছি, নিজেদের স্বার্থেই সন্ত্রাসবাদ দমন করা উচিত তাদের।’ তিনি বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে পাকিস্তানে সন্ত্রাসীদের তথাকথিত নিরাপদ ঘাঁটি বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা।’
মার্কিন নিরাপত্তা উপদেষ্টা আরও বলেন, মুম্বাই হামলার ঘটনা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে খুব নাড়া দিয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত উভয় দেশের জন্যই সন্ত্রাসবাদ একটা বড় ধরনের অভিন্ন ইস্যু। ওবামা বলেছেন, কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদই গ্রহণযোগ্য নয়। সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।
জোনস অতি সম্প্রতি পাকিস্তান সফর করেছেন। তিনি ওবামা প্রশাসনের একটি বার্তা সেখানে পৌঁছে দিয়েছেন। ওই বার্তায় আল-কায়েদা ও তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তত্পরতা বাড়াতে পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

এম লুতফর রহমান নিটল ইন্স্যুরেন্সের নতুন এমডি

এম লুতফর রহমান মিঞা সম্প্রতি নিটল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন।
এম লুতফর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করার পর ১৯৬৭ সালে তত্কালীন পাকিস্তান ইন্স্যুরেন্স করপোরেশনে কর্মজীবন শুরু করেন।
স্বাধীনতার পর তিনি সাধারণ বীমা করপোরেশনে আত্তীকৃত হন। ১৯৯৬ সালের সাধারণ বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োজিত হন।

নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটীতে আইএফআইসি ব্যাংকের শাখা উদ্বোধন

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পঞ্চবটীর গফুর সুপার কমপ্লেক্সে আইএফআইসি ব্যাংকের ৭৯তম শাখা উদ্বোধন করা হয়েছে।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ লুত্ফর রহমান সম্প্রতি শাখাটির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, ঊর্ধ্বতন নির্বাহী ও কর্মকর্তা এবং এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

টেকনাফের চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার পুঁজির সংকটে আছেন

কক্সবাজারের টেকনাফের চামড়া ব্যবসায়ীরা চরম মূলধনসংকটে পড়েছেন। চট্টগ্রামের আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের কাছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের প্রায় এক কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকায় তাঁরা এবারের ঈদে কোরবানির পশুর চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিতে পারছেন না বলে জানান।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, চট্টগ্রামের আড়তদার ও ট্যানারি মালিকেরা শিগগির বকেয়া না মেটালে সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারিদের সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ উপজেলায় ২৯ জন চামড়া ব্যবসায়ী থাকলেও বর্তমানে সক্রিয় রয়েছেন মাত্র ১১ জন। অবশিষ্ট ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। চট্টগ্রামের আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের কাছে পুঁজি আটকে যাওয়ায় তাঁদের এ হাল হয়েছে।
বিপাকে পড়া স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, অন্য বছরগুলোতে ঈদের প্রায় এক মাস আগে বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা হলেও এবার তা করছেন না চট্টগ্রামের আড়তদার ও ট্যানারি মালিকেরা।
টেকনাফে বড় চামড়া ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত আবদুল্লাহ মনির ও শেখ হায়দার প্রথম আলোকে জানান, তাঁদের কাছে এবার পুঁজি নেই। বকেয়া পাওনা পাওয়া গেলে চামড়া কিনবেন। অন্যথায় ঋণ নিয়ে চামড়া কিনবেন না।
চামড়ার চোরাচালানের আশঙ্কা প্রসঙ্গে টেকনাফ ৪২ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের উপ-অধিনায়ক মেজর শাহিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে সীমান্ত পয়েন্টগুলোয় বিডিআরের টহল জোরদার করা হয়েছে।

নিউজিল্যান্ড যাচ্ছেন মিসবাহ

অনুমিতভাবেই পাকিস্তান দলে ফিরতে যাচ্ছেন মিসবাহ-উল-হক। পাকিস্তানের নির্বাচক কমিটির এক সদস্য ক্রিকেট ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোকে জানিয়েছেন, দ্বিতীয় টেস্টের আগেই নিউজিল্যান্ডে দলের সঙ্গে যোগ দেবেন মিসবাহ। ইউনুস খান নিউজিল্যান্ড সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর পর থেকেই মিসবাহর ফেরার কথা শোনা যাচ্ছিল।
ওয়েলিংটনে দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ৩ ডিসেম্বর থেকে। ওই টেস্টের আগেই মিসবাহ নিউজিল্যান্ড যাবেন, এটা নিশ্চিত করেছেন ওই নির্বাচক। তবে ঠিক কবে এই মিডল-অর্ডার দেশ ছাড়বেন এটা নিশ্চিত করতে পারেননি, ‘আমরা এখনো জানি না কবে সে যাবে। তবে আমরা ওকে নিউজিল্যান্ড পাঠাতে চাই।’
পড়তি ফর্মের জন্য এই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগে তিন ধরনের ক্রিকেটের দল থেকেই বাদ পড়েছিলেন মিসবাহ। ৩৫ বয়সী ব্যাটসম্যানের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও শেষ বলেই ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। তবে মিসবাহ তখনই ফিরে আসার প্রত্যয় জানিয়েছিলেন। ঘরোয়া ক্রিকেটেও ব্যাট হাতে দুর্দান্ত করতে থাকেন। কায়েদে আজম ট্রফিতে খেলেন ক্যারিয়ার-সেরা ২৮৪ রানের ইনিংস। ইউনুসের কাছ থেকে অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়ে মোহাম্মদ ইউসুফ বলেছিলেন, মিসবাহকে দলে চান তিনি। মিসবাহ তখন বাংলাদেশে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে খেলছেন গাজী ট্যাংকের হয়ে।

সেকেলে সামরিক বিচার -প্রতিক্রিয়া by মোহাম্মদ ফজেল করিম খান

গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে ছাপা মিজানুর রহমান খানের ‘রাষ্ট্রপতির রেফারেন্স ও সেকেলে সামরিক বিচার’ লেখাটির জন্য ধন্যবাদ। তিনি সেনা আইনের সংস্কারের বিষয়ে যথার্থই বলেছেন। অথচ মহামান্য আপিল বিভাগের রেফারেন্সে কিংবা অ্যামিকাস কিউরিদের বক্তব্যেই এ বিষয়টি আসা উচিত ছিল। লেখক শুরুতেই দেখিয়েছেন ১৯৫২-এর আর্মি অ্যাক্টের ৮ ধারার ১২ উপধারাটি। সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে ‘Her Majesty’ শব্দটা এখনো এ আইনে আছে—এটা তো আশ্চর্যের বিষয়। দুর্ভাগ্য, এ বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞজনেরা কিংবা সরকার দৈন্যের প্রমাণ দিয়েছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের রেফারেন্স আপিল বিভাগে প্রেরণের বিষয়টি আমার কাছে আদালতের সময় নষ্ট এবং ১১ অ্যামিকাস কিউরিদের আইন ব্যবসায় ব্যাঘাত ঘটানো ছাড়া আর কিছু বলে মনে হয়নি। এ রেফারেন্স উত্থাপনই ছিল অবান্তর। আমি মনে করি, সরকার এ বিষয়ে সামরিক বাহিনীর আইনগুলো খতিয়েই দেখেনি। যদি দেখত, তাহলে রেফারেন্সের প্রয়োজনীয়তা নেই বলেই মনে করত। নৌবাহিনীর জন্য প্রযোজ্য ম্যানুয়াল অব বাংলাদেশ নেভাল ল-এর পার্ট-১-এর প্রথম পৃষ্ঠার ২ নম্বর প্যারায় বলা হয়েছে—
‘Legal position of officers and sailors by the law of Bangladesh a man who joins the Navy, whether as an officer or as a sailor, does not cease to be a citizen, with a few exceptions his position under the ordinary law of the land remains unaffected.’
অর্থাত্ নৌবাহিনীর সদস্যদের নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না। এখানে আরও বলা হয়েছে, তাদের দেশের প্রচলিত আইন এবং কোর্ট মার্শাল আইন উভয়ের আওতায় আসতে বাধা নেই। এ বিধান সেনা ও বিমান বাহিনীর আইনের ক্ষেত্রে এক। এ ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে দুই আইনের আওতায়ই সামরিক কর্মকর্তাদের বিচারে সোপর্দ করা যাবে। অথচ এই নীতিমালা কেউ পরখ করেই দেখেনি। ১৯৬৮ সালের ভারতের বিএফএফ আইনে বিদ্রোহের বিচার ‘মৃত্যুদণ্ড’-এর বিধান রেখে সংশোধনী আনা হয়। অথচ আমাদের ’৭২-এর বিডিআর আইনে সংশোধনীর কথাটি কারও মাথায় আসেনি। লেখকের প্রশ্ন যথার্থই।
বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীর আইনে সংস্কারের বিষয়টি কেন এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে তা নিয়ে কর্তৃপক্ষের জবাব চাওয়াটা প্রাসঙ্গিক। সামরিক বাহিনীর আইনে দেখা যায়, আর্মি অ্যাক্ট ১৯৫২-এর ১৩৩ ধারা, নেভি অর্ডিন্যান্স ১৯৬১-এর ১৪০ ধারা এবং এয়ার ফোর্স অ্যাক্ট ১৯৫৩-এর ১৬২ ধারায় কোর্ট মার্শালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, কোর্ট মার্শালের রায়ের বিরুদ্ধে কোনো আপিল চলবে না। বলা হয়েছে, কোনো আদালত এর বৈধতা, পদ্ধতি ও গঠনের যথার্থতার প্রশ্নে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না।
এ স্বাভাবিক ন্যায়বিচার বা ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’বিরোধী বিধানের সংস্কারে কারও তোড়জোড়ই নেই। সামরিক বাহিনীর আইনগুলোয় সংশোধনী নয়, মহা সংশোধনীর প্রয়োজন রয়েছে। এখানে প্রাসঙ্গিক আর একটি বিষয়ে বলে রাখি। সেনা আইনের আরেকটি বিরাট বাধা হচ্ছে ‘ডকট্রিন অব প্লেজার অব দ্য প্রেসিডেন্ট’-এর বিধান। এখানে বলা আছে, ‘Every officer and sailor shall hold office during the pleasure of the president’। এই ডকট্রিন অব প্লেজারের আওতায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিম এবং সাবেক নৌপ্রধান আমীর আহমেদ মোস্তফাকে কোনো কারণ দর্শানো এবং কোনো সময় না দিয়েই বরখাস্ত করা হয়েছিল। তাঁরা অনেক দিন উচ্চ আদালতের বারান্দায় ঘুরে ঘুরেও এবং আদালতের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে চেয়েও কোনো প্রতিকার পাননি। আদালত এ ডকট্রিন অব প্লেজারের দোহাই দিয়ে তাঁদের বরখাস্তের আদেশ বহাল রাখেন।
আমি নৌবাহিনীর জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল পদে নিযুক্ত থাকাকালে সামরিক বাহিনীর সংস্কারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু সুপারিশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। ৬ অক্টোর ১৯৯৭-এ আইন কমিশন বরাবর সামরিক বাহিনীর আইনের বিভিন্ন ত্রুটি এবং সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। আমার আশা ছিল, আইন কমিশন এ প্রস্তাব বিবেচনায় এনে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে।
নৌবাহিনীর আইনের পাশাপাশি আমার সহকর্মী অন্য দুই বাহিনীর জজ অ্যাডভোকেটদেরও অনুরূপ প্রস্তাব পাঠাতে অনুরোধ করি। আইন কমিশনের তত্কালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ টি এম আফজালের সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাত্ করে এ বিষয়ে অবগত করি। এ ছাড়া তদানীন্তন আইন কমিশনের সচিব (সাবেক সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার) ইকতেদার আহমেদ এবং বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের সচিব (বর্তমান আইনসচিব) কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গেও দেখা করে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনার জন্য বলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, কারও কাছ থেকে কোনো সদুত্তর আসেনি। এখন হয়তো এ নথি আইন কমিশনের পুরোনো স্তূপে জমা আছে, যদি উইপোকা না খেয়ে থাকে। আমি অবসরগ্রহণের পর আমার উত্তরসূরি এ পদে আসীন জজ অ্যাডভোকেট জেনারেলকে বলি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ অক্টোবর ২০০৫ সালে তিনিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিকট একই বিষয়ে লিখিত আবেদন করেন। তিন বাহিনীর গলায় ফাঁস লাগানোর অনেক বিধানই বাহিনীর নিজস্ব আইনগুলোয় রয়েছে। আগেই বলেছি, সামরিক বাহিনীর আইনে সূচনা অংশেই সামরিক কর্মকর্তাদের সাধারণ ও নিজস্ব আইনের আওতায় আনা যায় বলা হলেও প্রতিটি পরতে এ বিধানের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে একই আইনে মূলনীতির সঙ্গে আইনের ধারার দ্বৈততা তৈরি হয়েছে।
সাংবাদিক লেখক মিজানুর রহমান খান চোখে আঙুল তুলে দেখিয়েছেন, সেনা আইনের সংস্কারের বিষয়টি। এ মত অবিলম্বে আমলে নেওয়া উচিত। লেখক ভারত, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনা আইনের সংস্কারের বিষয়টি স্পষ্ট বিশ্লেষণ করেছেন। এতে আমাদের বিশ্লেষণক্ষমতাহীন ও চিন্তাক্ষমতাহীন কর্তৃপক্ষের মস্তিষ্কে নতুন করে তাগাদা আসা উচিত। অ্যামিকাস কিউরি এবং বিচারপতিদের সিদ্ধান্তের অংশেও সেনা আইনের সংস্কারের প্রসঙ্গটি আসতে পারত। ২০০৯ সালে ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনীর জন্য স্বাধীন আপিল ট্রাইব্যুনাল স্থাপিত হয়েছে। ভারতের তত্কালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিলের ভাষণের কিছু অংশ লেখক উল্লেখ করেছেন। আমাদের শাসক এবং বিজ্ঞজনদের উচিত এ থেকে উদ্বুদ্ধ হওয়া। ভারতের আইন কমিশনের রিপোর্টও আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। এ নৃশংস ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে যে প্রশ্ন উপলব্ধি করা গেছে, তা থেকে সামরিক বাহিনীর আইনের সংস্কারের যে গুরুত্ব, তা ফেলে দেওয়া যাবে না।
মোহাম্মদ ফজেল করিম খান: ইনস্ট্রাক্টর ক্যাপ্টেন, বিএন (অব.); সাবেক জজ অ্যাডভোকেট জেনারেল, বাংলাদেশ নৌবাহিনী; বর্তমান প্রক্টর, গ্রিন ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।
fazlekarim2002@yahoo.com

ধীরে চালাও তরণী -চিরকুট by শাহাদুজ্জামান

ওয়াশিংটনের একটি মেট্রো স্টেশনে সকালবেলা বেহালা বাজাতে শুরু করেন একজন। স্টেশনে শত শত মানুষের ঢল। মহা ব্যস্ততায় কাজে যাচ্ছেন সবাই। বেহালাবাদকের দিকে লক্ষ করার ফুরসত নেই কারও। বেহালাবাদক মহান সুরকার সিবাস্তিয়ান বাখের সুর বাজাতে থাকেন।
একজন মাঝবয়সী লোক বেহালাবাদকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর গতি একটু শ্লথ করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মেট্রো আসতেই দ্রুত চলে যান তিনি। কিছুক্ষণ পর সেই বাদক তাঁর দিনের প্রথম কয়েনটি পান। আরও কিছু সময় পেরিয়ে গেলে একজন মহিলা চলতে চলতেই ফ্লোরে উল্টে রাখা বেহালাবাদকের টুপিতে ছুড়ে দেন আরেকটি কয়েন। মানুষের স্রোত চলেছে বেহালাবাদকের চারপাশ দিয়ে। একজন লোক সামনের দেয়ালে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ বেহালা শোনেন কিন্তু একটু পরই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে সরে পড়েন। বেহালাবাদকের দিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেয় একটি তিন বছরের শিশু। শিশুটি বেহালাবাদকের সামনে দাঁড়িয়ে একাগ্র হয়ে বেহালা শোনার চেষ্টা করে। কিন্তু তার মা তাকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকলে শিশুটি হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ঘুরিয়ে যতক্ষণ সম্ভব বেহালাবাদককে দেখতে থাকে। বেহালাবাদক ঘণ্টাখানেক পর তাঁর বাজনা থামান। বলা বাহুল্য, কোনো তালি বাজে না। মেট্রো স্টেশনে হঠাত্ নেমে আসে সংগীতহীন নীরবতা। বেহালাবাদক তাঁর টুপির কয়েনগুলো গুনে দেখেন, রোজগার হয়েছে সাকল্যে ৩২ ডলার।
কেউ টের পায় না, মেট্রোতে এতক্ষণ যিনি বেহালা বাজালেন তিনি আসলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাদকদের একজন, জোসুয়া বেল, যাঁর সংগীত বিক্রি হয় মিলিয়ন ডলারে। মাত্র দুই দিন আগে বোস্টনে যাঁর কনসার্ট হয়ে গেছে, যে কনসার্টের প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল ১০০ ডলার; কিন্তু একটি সাধারণ স্থানে, অনুপযোগী একটি সময়ে, অপ্রত্যাশিত একটি পরিস্থিতিতে কেউই চিনে উঠতে পারেনি জোসুয়া বেলকে। বেল মেট্রোতে ভিখারি সেজে বেহালা বাজিয়েছিলেন বস্তুত একটি গবেষণার অংশ হিসেবে। গবেষকেরা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, মানুষ যখন তাড়ায় থাকে তখন তার পক্ষে সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব হয় না। তার সামনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী শ্রেষ্ঠতম সুর বাজালেও তা তার নজর এড়িয়ে যায়।
তাড়াহুড়ায় হয়তো অবিরাম আমরা জীবনের এমনি ছোট-বড় অগণিত মাধুরী উপেক্ষা করে যাচ্ছি। আমরা সবাই বস্তুত একেকটি তাড়া খাওয়া প্রাণীতে পরিণত হয়েছি। সিংহের হুঙ্কারে ভীত তাড়া খাওয়া জেব্রা যেমন ছুটে চলে প্রান্তরে। জীবিকার প্রতিযোগিতায় সিংহ হুঙ্কার দিচ্ছে পেছনে আর আমরা ছুটে চলেছি সবাই। প্রান্তরেই ছুটছি। জানি না, কোথায় ঠিক নিরাপদ আশ্রয়। ছুটে চলা মানুষের সময় কোথায় কাচপোকার ওড়াওড়ি দেখার। কান পেতে শোনার, কে গাইছে ‘পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’। সৌন্দর্য উপভোগ করানোর জন্য চাই অবসর। ছুটে চলা মানুষ একে অন্যকেও বা জানবে কী করে? জীবনের লেনদেন এতটাই ব্যস্ত করে ফেলেছে আমাদের যে আমরা একে অন্যের কাছ থেকে কেবলই দূরে সরে যাচ্ছি, যেমন মহাশূন্যে তারারা নিরন্তর একে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। সব পাখি ঘরে ফিরলে, জীবনের সব লেনদেন ফুরালে যে অন্ধকার নামে সেখানে স্থির হয়ে মুখোমুখি বসলেই কেবল বনলতা সেনকে চেনা যায়।
জীবনের লেনদেন পশ্চিমা দুনিয়ায় এসে ঠেকেছে ভোগে আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে নিছক টিকে থাকায়। দুটোর জন্যই ছুটতে হচ্ছে দুই পক্ষকে। সব মিলিয়ে আমাদের তুমুল ব্যতিব্যস্ত রাখছে জীবন। পশ্চিমা দুনিয়ার দ্রুততা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন এখানকার চিন্তাবিদেরাও। লেখক মিলান কুন্ডেরা সম্প্রতি উপন্যাস লিখেছেন স্লোনেস নামে। দ্রুততাকে তিনি তুলনা করেছেন বিস্মৃতির সঙ্গে, গতির মানসিক নেতিবাচকতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছেন তিনি। বাংলা উপন্যাসের পাঠকের কাছে অবধারিত মনে পড়ে যাবে যাযাবরের সেই পুরোনো সংলাপ, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। শুধু আবেগ নয়, পশ্চিমা দুনিয়ায় এখন জীবনই কেড়ে নিচ্ছে বেগ। ডায়রিয়া, যক্ষ্মা নয় পশ্চিমা বহু দেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ এখন মোটরগাড়ি অ্যাকসিডেন্ট। নিজেদের তৈরি বাহারি গাড়িতে দ্রুততম সময় ছুটতে গিয়ে অবিরাম মরছে তারা। বহুকাল আগে জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘মোটরগাড়ি আমার কাছে একটা বড় খটকার ব্যাপার মনে হয়। আমি যেখানে যেতে চাই সেখানে পায়ে হেঁটে যাবার অবসর আমার আছে।’ ব্যাপারটিকে নেহাত কবিসুলভ রোমান্টিকতা মনে হলেও কৌতূহলোদ্দীপকভাবে দেখতে পাচ্ছি, মোটরগাড়ি একটা খটকার ব্যাপার বলেই আজকাল জোরে আওয়াজ তুলছে পশ্চিমা দেশের বহু মানুষ। পরিবেশবিদেরা গাড়ির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
ইউরোপের প্রায় ৪০টি দেশ বছরে এক দিন গাড়িবিহীন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করে উচ্চ পার্কিং মূল্য ধার্য করে গাড়িকে নিরুত্সাহিত করার চেষ্টা চলছে। খটকার মোটরগাড়িগুলো আমাদের মতো চাপা শহরগুলোতে গাদাগাদি করে পাঠিয়ে ইউরোপের শহরগুলোতে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে বাইসাইকেল। বিপদ টের পেয়ে গতি শ্লথ করার একটা হাওয়া ওঠালেও ব্যাপারটি অত সহজ হচ্ছে না, কারণ পেছন থেকে শিং দিয়ে ঠেলছে গাড়ি ব্যবসায়ীর দল। আর শিং তো মনের ভেতরেই গজিয়েছে সবার, যে শিং বিলাসের, প্রতিযোগিতার। সেই শিংয়ের গুঁতোয় ছুটে চলা আর থামছে না। ছুটতে গিয়ে ওরা মরছে আর আমরা জট পাকিয়ে বসে আছি। কে জানে হয়তো রক্ষা হতো পুরোপুরি ডোবার আগে কেউ যদি সবার কানে কানে বলে যেত, ‘নাইয়া, ধীরে চালাও তরণী।’
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।

‘ওবামাকে কি হত্যা করা উচিত?’ -খোলা চোখে by হাসান ফেরদৌস

ইন্টারনেট-ভিত্তিক জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ সাইট ‘ফেসবুক’-এ এই রকম একটি প্রশ্ন রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য, জনমত জরিপ করে দেখা কত লোক এই প্রশ্নের পক্ষে বা বিপক্ষে। অন্য যেকোনো সময় হলে চমকে উঠতাম, কিন্তু এখন বিন্দুমাত্র অবাক হইনি এমন খবরে। ঘটনাটা ফাঁস হওয়ামাত্রই ইন্টারনেট থেকে অবশ্য সে প্রশ্ন সরিয়ে ফেলা হয়। এই প্রশ্ন কে রেখেছে বা কেন তাও এখনো জানা যায়নি। তবে আমেরিকার অতি দক্ষিণপন্থী কোনো কোনো মহলে যে এমন সম্ভাবনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে, সে তো রাখঢাকের কোনো ব্যাপার নয়। এবার তার খোলামেলা প্রমাণ মিলল।
প্রমাণ অবশ্য অনেক আগে থেকেই পাচ্ছি আমরা। গত বছর নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই ‘কিল ওবামা’ চিত্কার শুনেছিলাম। তিনি আরব ও মুসলমান, এমন কথা তো রিপাবলিকান প্রার্থী ম্যাককেইনের মুখের ওপর করা হয়, টিভির পর্দায় তা আমরা সবাই-ই দেখেছি। ম্যাককেইনের ‘রানিং মেট’ সারাহ পেলিন সরাসরি অভিযোগ করেছিলেন, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ওবামার ওঠাবসা আছে। এখনো সুযোগ পেলেই সে কথা তিনি বলে যাচ্ছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত হওয়ার পরও ওবামার ওপর সাদা মানুষদের রাগ কমেনি, বরং বেড়েছে। এ দেশের সাদা মানুষদের একাংশ যে রাগে ফুঁসছে, আগস্ট মাসে তার ঢের প্রমাণ মেলে। ওবামা প্রশাসন স্বাস্থ্যবীমা প্রশ্নে যে প্রস্তাব রেখেছে, তার প্রতিবাদে সে সময় দেশের বিভিন্ন অংশে রিপাবলিকান দল বেশ কয়েকটি টাউনহল মিটিংয়ের আয়োজন করে। কিন্তু রাগটা শুধু স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে নয়, ওবামাকে নিয়ে। তিনি যা যা করছেন, তার সব কিছুর বিরুদ্ধে। সেসব মিটিংয়ে ওবামাকে হিটলার বলা হয়েছে, স্তালিন ও কাস্ত্রোর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে; এমনকি বাঁদরের মতো ছবি এঁকে আফ্রিকায় ফিরে যেতে বলা হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে ওয়াশিংটনে যে ওবামাবিরোধী জমায়েত হয়, তাতেও সেসব কথাই চেঁচিয়ে বলা হয়। লাখখানেক মানুষ সে জমায়েতে অংশ নেয়, ফক্স নিউজ চ্যানেল থেকে তা সরাসরি দেখানো হয়। সেখানে উপস্থিত অনেকে তথ্যমাধ্যমের কাছে সাক্ষাত্কারে আমেরিকার ফেডারেল ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার হুমকি দেন। কেউ কেউ এমন কথাও বলেন, ওবামার হাত থেকে বাঁচার জন্য সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করতে হবে।
শুধু কথার কথা নয়, এসব রাগী মানুষের কেউ কেউ এখন লুকিয়ে বন্দুক সঙ্গে রাখছেন। ওবামা ভাষণ দেবেন বলে কথা আছে, এমন একাধিক সভায় তাঁরা বন্দুক বয়ে এনেছেন, এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলসি সপ্তাহখানেক আগে এই বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে চড়া গলায় ও কুিসত ভাষায় ওবামাকে আক্রমণ করা হচ্ছে, তার ফলে একটা রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তেমন ঘটনা ঘটাতে খুব বেশি লোকের দরকার নেই। কেনেডির ওপর কজন মানুষ গুলি চালিয়েছিল? মার্টিন লুথার কিং-কে গুলি করেছিল কে? সানফ্রান্সিসকোর প্রথম সমকামী নির্বাচিত প্রতিনিধি হার্ভে মিল্ককে হত্যার জন্য কটা বন্দুক লেগেছিল?
অথচ ওবামা যে কী এমন মহা অপরাধ করেছেন, যার জন্য তাঁকে হত্যার কথা বলা হতে পারে, তা বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত তিনি এমন একটি কাজও করেননি, যা থেকে মনে হয় আমেরিকার শ্বেত সভ্যতা ধসে পড়ার উপক্রম। এমনকি স্বাস্থ্যবীমা প্রশ্নেও তিনি যা চান, ব্যক্তিগত বীমা কোম্পানির পাশাপাশি একটি সরকার পরিচালিত স্বাস্থ্য পরিচর্যাব্যবস্থা চালু করা, তাও যে কীভাবে শ্বেত সভ্যতার জন্য হুমকি হতে পারে, তা বোঝা সুস্থ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। ওবামা নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। গত সপ্তাহে পিটসবার্গে যে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন হয়ে গেল, তাতে এক রাষ্ট্রপ্রধান ওবামাকে একান্তে ডেকে নিয়ে প্রশ্ন করেন, ‘ব্যাপারটা কী, একটু বুঝিয়ে বলুন তো? আপনি চাইছেন সবার যেন স্বাস্থ্যবীমা থাকে, আর সে জন্য ওরা আপনার ছবির ওপর হিটলারের মতো গোঁফ লাগাচ্ছে?’ উত্তরে ওবামা নিরীহের মতো বলেন, ‘ভাই, ব্যাপারটা তো আমার কাছেও পরিষ্কার নয়।’
আসলে ব্যাপারটা খুবই পরিষ্কার। সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার সে কথাই খোলাসা করে বলেছেন। এখন ওবামাবিরোধী যে হট্টগোল হচ্ছে, তার একটি বর্ণবাদী চেহারা রয়েছে। শ্বেত সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী একদল লোক একজন কালো মানুষ হোয়াইট হাউসে আসন গেড়ে বসুক, তা মানতে এখনো প্রস্তুত নয়। আর সে কারণেই ওবামার জন্ম কোথায় তা নিয়ে সন্দেহ ছড়ানো হচ্ছে, তাঁকে মুসলমান ও আরব বলে প্রচার করা হচ্ছে। তাঁকে যে কমিউনিস্ট ও টেররিস্ট বলা হচ্ছে, তার কারণও ওই একটা। যেভাবেই হোক প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওবামার ‘লেজিটিমেসি’ বা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, মানুষের মনে এমন সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া যে ওবামা সাদা আমেরিকানদের মতো মানুষ নন। তিনি ভিনদেশি, একজন ‘আউটসাইডার’, মিথ্যা বলে ক্ষমতা দখল করে বসেছেন।
কার্টারের কথা শুনে একদল সাদা মানুষ অবশ্য হা হা করে খেঁকিয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে দু-চারজন বুদ্ধিমান বলে পরিচিত মানুষজনও আছে। যেমন, নিউইয়র্ক টাইমসের কলামলেখক ডেভিড ব্রুকস। নিজেকে মধ্যপন্থী বলে পরিচিত করাতে ভালোবাসেন এই রক্ষণশীল সাংবাদিক-ভাষ্যকার। তাঁর বক্তব্য, আসলে এতে বর্ণবাদের কিছু নেই। আমেরিকান নাগরিকেরা সরকারের ক্রমবর্ধমান ভূমিকায় আতঙ্কিত। সরকারের ভূমিকা বাড়া মানে সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা খর্ব হওয়া। হতে পারে কিছুটা কর্কশ গলায় প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু তার কারণ মানুষজন সত্যি সত্যি ক্ষিপ্ত। রাজনৈতিক মতভেদের জন্য জর্জ বুশকে গাল দেওয়া হয়েছে, ক্লিনটনও কম আক্রমণের সম্মুখীন হননি। নিজের দেশের প্রেসিডেন্টকে সমালোচনা করা আমেরিকার গণতন্ত্রের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা ‘হলমার্ক’। ওবামাও সে নিয়মের ব্যতিক্রম নন।
ডেভিড ব্রুকসের কথাটা এক কথায় উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। সম্মানিত কলামলেখক তিনি, দু-চারটে বইও তিনি লিখেছেন রাজনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। কিন্তু ডেভিড যে কথা জেনেও না জানার ভান করছেন তা হলো, এর আগে অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট—কার্টার বা ক্লিনটন—তাঁর গাত্রবর্ণের জন্য আলাদাভাবে চিহ্নিত হননি বা বর্ণগত কারণে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হননি। ওপরে ওয়াশিংটন ডিসির যে ওবামাবিরোধী সভার কথা উল্লেখ করেছি, তাতে একটি পোস্টারের ভাষা ছিল এই রকম—‘চিড়িয়াখানায় আফ্রিকার সিংহ আছে আর হোয়াইট হাউসে আছে একজন মিথ্যুক আফ্রিকান।’ কিছুদিন আগে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার এক চিড়িয়াখানা থেকে একটি গরিলা পালিয়ে গেলে সেখানকার এক রিপাবলিকান নেতা মন্তব্য করেন, মিশেল ওবামার এক আত্মীয় পালিয়েছে। এই দুটি উদাহরণ উল্লেখ করে নিউইয়র্ক টাইমসের আরেক কলামলেখক বব হার্বার্ট মন্তব্য করেছেন, এসব কথাবার্তার পেছনে যে বর্ণবাদী মনোভাব আছে, তা বোঝার জন্য কি আমাদের কার্টারের বকবকানি শোনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে? এই সাধারণ সত্যিটা কি খোলাচোখেই ধরা পড়ে না? ‘হতে পারে বর্ণগত ভারসাম্য অর্জনে এ দেশ অনেকটা এগিয়েছে, কিন্তু যারা এ দেশে বর্ণবাদ নেই বলে দাবি করে, তারা আসলে চোখ বন্ধ করে পথ হাঁটে।’ হার্বার্টের এই মন্তব্য সম্ভবত তাঁর সতীর্থ ডেভিডের প্রতিই নিক্ষিপ্ত।
শুধু যদি অতি ডান বা অতি বাম গ্রুপগুলো ওবামার বিরুদ্ধে এই বর্ণভিত্তিক সমালোচনা করত, তাহলে উদ্বেগের কিছু থাকত না। সব দেশে সব সময়ই দু-চারটি ‘নাট কেস’ থাকে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এসব সমালোচনা ও ক্রুদ্ধ চিত্কার আসছে দেশের কোনো কোনো দায়িত্বসম্পন্ন রিপাবলিকান নেতাদের কাছ থেকে। যেসব রেডিও বা টিভিতে যে টক শোগুলো রিপাবলিকান সমর্থিত বলে পরিচিত, তারাই উগ্রপন্থী দলগুলোকে পেছনে থেকে সমর্থন জোগাচ্ছে। তাদের সবাই মূলধারার বলেই পরিচিত। যেমন, ওয়াশিংটনের ওবামাবিরোধী সমাবেশটি আয়োজন করে এ দেশের একটি প্রধান টিভি নেটওয়ার্ক ফক্সের এ সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় উপস্থাপক গ্লেন বেক। হতে পারে বেক অতি দক্ষিণপন্থীদের মধ্যে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে নরম-গরম কথা বলছেন, কিন্তু তাঁর পেছনে ছাতা ধরে বসে আছেন খোদ রিপাবলিকান দলের প্রথম সারির নেতারা। অস্বীকার করি কী করে যে তাঁরাই এই বর্ণবাদী আগ্রাসনকে বৈধতা পেতে সাহায্য করছেন। ভয়টা সে কারণেই।
রিপাবলিকানরা কেন এমন বর্ণবাদী পথ বেছে নেবে, তার কারণ বোঝা খুব কঠিন নয়। দল হিসেবে রিপাবলিকান পার্টি এখন ছ্যাড়াব্যাড়া অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। দলের কোনো স্বীকৃত নেতা নেই। একমাত্র দক্ষিণের কৃষিপ্রধান ও অতি রক্ষণশীল রাজ্যসমূহ ছাড়া সারা দেশে কোথাও এই দলের শক্ত খুঁটিও নেই। টিকে থাকার জন্য দলের অবশিষ্ট নেতৃত্ব আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে নিজেদের ভিত বা ‘বেইস’-কে চাঙা করতে। রিপাবলিকানদের ‘বেইস’ মানে মূলত সাদা ও পুরুষ মানুষ, যাদের অধিকাংশের বয়স ৪০-এর ওপরে। ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান এসব লোকজন গর্ভপাত, সমকাম ও বহিরাগত কালো মানুষকে সমানভাবে ঘৃণা করে। রিপাবলিকানদের চোখে তাঁরা হলেন ‘ভ্যালুজ ভোটারস’। অর্থাত্ অন্য সবকিছুর ওপর তাঁরা নৈতিক মূল্যবোধের প্রশ্নগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। ওবামা ও তাঁর প্রশাসনকে যদি গর্ভপাত ও সমকামের সমর্থক এবং বহিরাগতদের রক্ষক বলে প্রচার করা যায়, এসব মানুষ বিনা প্রশ্নেই সে কথায় বিশ্বাস করবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে খেপে উঠবে। হয়েছেও তা-ই। স্বাস্থ্যবীমা প্রশ্নে ওবামা যে প্রস্তাব রেখেছেন তা বাস্তবায়িত হলে এখন বীমা নেই এমন প্রায় চার কোটি মানুষ উপকৃত হবে। এই চার কোটি মানুষের সিংহভাগই যে হয় কালো বা বহিরাগত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুখে না বললেও যে যুক্তিটা রিপাবলিকানরা ফিসফিসে গলায় বলে বেড়াচ্ছে তা হলো, আমাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে ওবামা এখন তাঁর এসব বন্ধু ও সমর্থকদের স্বাস্থ্য বীমার সুযোগ করে দিতে চাইছেন। আর তাতেই এই সাদা ভাইয়েরা রেগে টং।
মিথ্যা ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে রিপাবলিকানরা হয়তো স্বল্পমেয়াদি ফায়দা কিছু পাবে, কিন্তু আখেরে এতে তাদের লাভ কিছুই হবে না। শুধু সাদাদের ভোটে এ দেশে ক্ষমতা ধরে রাখা অসম্ভব। কারণ আমেরিকার জনসংখ্যার চিত্র বা ‘ডেমোগ্রাফি’ বদলে গেছে। কৃষ্ণকায় ও বহিরাগতদের, বিশেষত হিস্পানিকদের সমর্থন ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার কার্যত অসম্ভব। এই সহজ সত্যটা যে রিপাবলিকানরা নিজেরাও বোঝে না তা নয়। কিন্তু মুখ ফুটে সে কথা বলার মতো লোক এখন দলে আর নেই। যাঁরাও বা আছেন, ওবামাবিরোধী মারমুখো কর্মীদের সামনে তাঁরা ফুটো বেলুনের মতো চুপসে আছেন।
আমেরিকার গণতন্ত্রের তাজা অবস্থা দেখে এক সময় পৃথিবীর মানুষ বিস্মিত হতো। ওবামার বিজয়ের মধ্যে সেই তাজা গণতন্ত্রের এক বিজয়-উল্লম্ফন তারা দেখেছিল। এখন সেই গণতন্ত্রের যে হাল, তা দেখে এ দেশের চিন্তাশীল মানুষ উদ্বিগ্ন, ভীত। সন্দেহ নেই, খুব অল্পসংখ্যক মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতা কথায় ও কাজে চূড়ান্তবাদী পথ অনুসরণে উত্সাহ জোগাচ্ছেন। তাঁদের যদি এখনই না ঠেকানো হয়, খুব বড় ধরনের এক সর্বনাশ হয়ে যাবে। আর সেটাই হবে আমেরিকার জন্য আসল ট্র্যাজেডি।
[পুনশ্চ: রক্ষণশীল ওয়েব পত্রিকা নিউজ ম্যাক্স—এ সুপরিচিত ভাষ্যকার জন এল পেরি ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রস্তাব করেছেন, আমেরিকার ‘ওবামা সমস্যা’ সমাধানের একটা পথ হতে পারে সামরিক অভ্যুত্থান। পেরি প্রস্তাব করেছেন, ‘রক্তপাতহীন ও সভ্য’ এই সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকবেন একজন দেশপ্রেমিক জেনারেল। ওবামার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমেই তিনি নির্বাহী ক্ষমতা নিজের হাতে নেবেন। অবশ্য বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ ওঠায় নিউজ ম্যাক্স পরে ওই লেখাটি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নিয়েছে।]
২৮ সেপ্টেম্বর ২০০৯, নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সড়ক কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে -সিলেটের ‘ভিআইপি’ সড়কের করুণ অবস্থা

সড়ক ও জনপথের সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের অবস্থা খুবই করুণ। ‘ভিআইপি’ প্রকল্পভুক্ত পাঁচ কিলোমিটার সড়ক খানাখন্দে ভরে গেছে। কার্পেটিং উঠে মাটিও দেবে গেছে বেশ কিছু জায়গায়। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে লোকজন। অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।
বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোর এক সচিত্র প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘ভিআইপি’ প্রকল্পের আওতাধীন সড়কটির উন্নয়নে ২২ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও এটি ২২ মাসও টেকেনি। কাজ সম্পন্ন করার পর ছয় মাস যেতে না যেতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আবার সংস্কার করা হয়। কিন্তু সংস্কার করা অংশেও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাত্ সংস্কারের সময় যথাযথভাবে কাজটি করা হয়নি, মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। কেন তা হয়নি, তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। সংস্কারের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ যথাযথভাবে খরচ না করে পকেটে পুরে ফেলা হলেই এমন হওয়ার কথা।
সড়ক উন্নয়ন খাতে দুর্নীতির সংবাদ প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও লাগামহীন দুর্নীতি পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলেছে। তাই সিলেটের সড়কটি সংস্কার হওয়া সত্ত্বেও এত দ্রুত কেন এ অবস্থা হলো, তা তদন্ত হওয়া দরকার। উন্নয়নকাজের দায়িত্ব যারা পেয়েছিল, তারা কী প্রক্রিয়ায় পেয়েছিল আর কীভাবে তা বাস্তবায়িত হলো, তা খতিয়ে দেখা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ তদারকির দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা কী করেছে সেটাও দেখতে হবে। কোনো ভাগবাটোয়ারার ব্যাপার না থাকলে তো এই নিম্নমানের কাজ অনুমোদন হওয়ার কথা নয়।
ভালো যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার ওপর। সন্দেহ নেই, সড়কের করুণ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে কর্তৃপক্ষের অযত্ন ও অবহেলা অনেকাংশে দায়ী। জবাবদিহির অভাবে তারা পার পেয়ে যায়। সংস্কারের পরও সড়কের করুণ অবস্থা কেন হলো, এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষকে দিতে বাধ্য করা হলে এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা গেলে এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটবে বলে আশা করা যায়।

একজন শহীদ জননীর কথা -স্মর্রণ by সেলিনা আখতার

দিন, কাল, মাস ঘুরে আসে। আবার পার হয়ে যায়। এমনি করে দেখতে দেখতে মিলনের অন্তর্ধানের দীর্ঘ ১৯টি বছর কেটে গেল। প্রতিবছর ২৭ নভেম্বর দিনটি যেন অমাবস্যার কালো আঁধারে ঢেকে রাখে আমার হূদয় আকাশ। নভেম্বরের পুরো মাসটি আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় মিলনশূন্য এ পৃথিবীকে। এ ব্যথা প্রকাশ করার নয়, কেবল অনুধাবনের আর অনুভবের। শ্রদ্ধাভাজন প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান তাঁর ‘একজন শহীদের মা বলছেন’ কবিতাটির প্রতিটি পঙিক্ত যেন আমার হূদয়ের ভাষার প্রতিধ্বনি। কবি লিখেছেন, ‘মৃত্যু তার বলে ওরা, করেছে আমাকে মহীয়সী,/ আরো কত কথা বলা হয়,/ যা শুনে আমার মাথা গর্বে দূরের আকাশ ছুঁতে পারে লহমায়।/ নির্দয় দুঃখের চেয়ে, গৌরব অনেক বড়,/ এই অলংকৃত ভান নিয়ে দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়া কি দুঃসহ,/ আমি ছাড়া বুঝবে কে আর পৃথিবীতে?/ আমার এ শূন্য বুক পোড়োবাড়ি,/ যাতে লক্ষ্মীপ্যাঁচা ডেকে ওঠে ঘোর মধ্যরাতে।/ ক্লান্ত লাগে, দেয় না ঘুমোতে কিছুতেই ফণিমনসার খোঁচা।’
কবি আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর এই অনবদ্য সৃষ্টি প্রত্যেক শহীদ জননীর হূদয়ে ধ্বনিত হবে প্রতিনিয়ত। অবাক হই এই ভেবে যে কবি কেমন করে এক সন্তানহারা মাতৃহূদয়ের ভাষা এমন নিখুঁতরূপে রচনা করতে সক্ষম হলেন।
১৯৫৭ সালের ২১ আগস্ট মিলনের জন্ম, ঢাকার রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে, যা হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল নামে আগে পরিচিত ছিল। মিলনের ছোটবেলার লেখাপড়ায় আমি ওকে সাহায্য করতাম। অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার পর আমার বাবা ওর লেখাপড়ায় সাহায্য করতেন। সে সময় আজকের মতো প্রাইভেট টিউটর রাখার প্রবণতা ছিল না। খুব কমসংখ্যক অভিভাবকই তা চিন্তা করতেন। ছেলেবেলা থেকেই মিলন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিল। খেলাধুলায় ও স্কুল চ্যাম্পিয়ন ছিল। ক্লাসে মেধা তালিকায় ওর প্রথম বা দ্বিতীয় বরাদ্দ থাকত। বর্তমান সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় শিল্পকলা বিভাগ থেকে মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করে নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। মেডিকেল কলেজে ভর্তির এক বছর পর, মিলন ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রলীগ মেডিকেল শাখার মিলন ছিল সাহিত্য সম্পাদক, ক্রীড়া সম্পাদক এবং পরবর্তী ছাত্রলীগ মেডিকেল কলেজ শাখার সভাপতি নির্বাচিত হয়। ছাত্রজীবন থেকেই মিলন বক্তৃতা, স্লোগানসর্বস্ব রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিল না। মিলন বিশ্বাস করত, রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহণ ব্যতীত রাজনীতি বোঝা সম্ভব নয়। দেশকে ভালো না বাসলে, দেশের অর্থনীতি না বুঝে এবং দেশে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে না পারলে সমাজ বদলের বিপ্লবসাধন কোনো দিনই সম্ভব হয় না।
মিলন বিশ্বাস করত, চিকিত্সকদের কেবল রোগীর সেবা দেওয়ার মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। চিকিত্সক, রোগীর সুসম্পর্ক ও সেবাদানের একটি পূর্বশর্ত। দেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বও চিকিত্সকদের। তাই সাধারণ মানুষের উপযোগী একটি গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের লক্ষ্যেই তত্কালীন স্বৈরাচার এরশাদ সরকার প্রণীত, গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতির বিরুদ্ধে জঙ্গি আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এই আন্দোলন দীর্ঘদিন চলে। এরশাদ সরকার চিকিত্সকদের জনগণের চোখে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশে এবং আন্দোলনে ভাঙন ধরানোর অসত্ উপায় অবলম্বন করে নানা অপপ্রচার চালানো আরম্ভ করে। আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ায় মাঝে মাঝে মিলনকে বিষণ্ন মনে হতো। সরকারের এই অপপ্রচারে জনসমর্থন হারিয়ে ফেলার একটা আশঙ্কায় ও হয়তো কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়ত। তবে ওই ভেতরের মানুষটি ছিল অত্যন্ত আশাবাদী, দৃঢ়প্রত্যায়ী, আপন আদর্শের প্রতি আস্থাশীল এবং অসম্ভব সাহসী মনের অধিকারী, যে মানুষটি কখনো হার মানতে জানত না।
নভেম্বর মাসে এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন জোরদার হলো, পেশাজীবী সংগঠনগুলো যখন আন্দোলনে অবতীর্ণ হলো এবং চিকিত্সকদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করল, তখন ও আশাবাদী হয়ে উঠল এবং একদিন আমাকে বলল, ‘দেখবেন, আমাদের এই আন্দোলনই স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের আন্দোলনের রূপ নেবে।’ সেদিন বুঝিনি, মিলনের মুখ থেকে নিঃসারিত এই অমোঘ উক্তটি ওর বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ও বাস্তবে পরিণত করবে।
আজ দুঃখভারাক্রান্ত মন নিয়ে দেখি ‘রাজা আসে, রাজা যায়’, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। মিলনের অন্তর্ধানের পর দেশ স্বৈরশাসনমুক্ত হয়, দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। গত ১৯ বছরে দেশে চারটি নির্বাচিত সরকার দেশ শাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়।
দেশের রাজনীতিবিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই বলছি, তাঁরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলে থাকেন, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ ডা. মিলন। তার আত্মাহুতির মধ্য দিয়েই দীর্ঘ নয় বছরের সৈরশাসনের পতন ঘটে। কিন্তু ব্যথিত হই, যখন দেখি বিগত ১৯ বছরের চারটি গণতান্ত্রিক সরকার তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি তার হত্যার বিচার করার জন্যও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আশা করছি, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এ সরকার মিলন হত্যার পুনর্বিচারে আন্তরিক প্রচেষ্টা নেবে এবং মিলনের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি সড়কের নামকরণ করবে।
বর্তমান সরকার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন করেছে সন্দেহ নেই। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—সব ক্ষেত্রেই। ইতিমধ্যে সরকার একটি স্বাস্থ্যনীতির রূপরেখাও করেছে বলে জানতে পেরেছি। সরকারের আন্তরিকতা থাকলে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং বিশেষ করে নবনির্বাচিত বিএমের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এবার একটি গণমুখী স্বাস্থ্যনীতি প্রবর্তিত হবে বলেই আশা করছি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের নবনির্বাচিত সদস্যরা প্রায় সবাই এরশাদ সরকারের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি আন্দোলনে মিলনের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাই মিলনের স্বপ্নকে সার্থক করার ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতার অভাব হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। দুস্থ, অসহায় সাধারণ মানুষের কাছে চিকিত্সাসেবা সহজলভ্য করতে হলে একটি ওষুধনীতিরও প্রয়োজন আছে। আমার প্রত্যাশা, এদিকেও তারা সজাগ দৃষ্টি রাখবে। তারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মিলনের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালাবে, গ্রামের দুস্থ মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করে তুলবে—এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি। তাহলেই মিলনের আত্মদান সার্থক হবে। মিলনের স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করবে।
সেলিনা আখতার: শহীদ মিলনের মা।

আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে আত্মোত্সর্গ -ঈদুল আজহা by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

‘ঈদুল আজহা’ শব্দদ্বয় আরবি। ‘ঈদ’ অর্থ খুশি আর ‘আজহা’ অর্থ কোরবানি বা আত্মোত্সর্গ। তাই ‘ঈদুল আজহা’ অর্থ হলো আত্মোত্সর্গের খুশি। মূলত মুসলমানদের ঈদের খুশি সাধারণ অর্থে নয়; বরং উত্সর্গ ও ত্যাগের মাধ্যমে ধর্মীয় কর্তব্য পালনের আনন্দ। ঈদুল আজহার সঙ্গে কোরবানি সম্পৃক্ত বিধায় একে কোরবানির ঈদ বলা হয়। ‘কোরবানি’ শব্দটি আরবি ‘কুরব’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, এর অর্থ হলো নৈকট্য; আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে আত্মোত্সর্গ করাই কোরবানি। শরিয়তের পরিভাষায় আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের আশায় তাঁর নামে কোনো কিছু উত্সর্গ করাকে কোরবানি বলে। প্রচলিত অর্থে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য নির্দিষ্ট কিছু হালাল পশু জবাই করাকে কোরবানি বলা হয়। এ মর্মে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির একটি নিয়ম নির্দিষ্ট করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩৪)
কোরবানি করার বিষয়টি মানব ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। নবী করিম (সা.)-এর শরিয়তের আগেও এর প্রচলন ছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারীরা কোরবানি করেছেন। তবে একেক উম্মতের কোরবানির পদ্ধতি ছিল বিভিন্ন রকম। ইতিহাসে হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল-কাবিলের মাধ্যমে সর্বপ্রথম কোরবানির সূত্রপাত হয়। আল্লাহ তাআলা তাদের কোরবানির কথা উল্লেখ করেছেন, ‘(হে নবী!) আর তুমি তাদের আদমের পুত্রদ্বয়ের (হাবিল-কাবিলের) ঘটনা সঠিকভাবে শুনিয়ে দাও। যখন উভয়েই এক একটি কোরবানি উপস্থিত করল এবং তন্মধ্য থেকে একজনের (হাবিলের) কোরবানি কবুল হলো আর অপরজনের কবুল হলো না; সেই অপরজন বলতে আরম্ভ করল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। উত্তরে সে বলল, ‘আল্লাহ ধর্মভীরুদের কোরবানি কবুল করে থাকেন।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত: ২৭)
এরপর আল্লাহর নবী হজরত নূহ (আ.), হজরত ইয়াকুব (আ.) ও হজরত মূসা (আ.)-এর সময়ও কোরবানির প্রচলন ছিল। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) আল্লাহ-প্রেমে স্বীয় পুত্রকে কোরবানি করার মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেন। আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইবরাহিম (আ.) স্বপ্নযোগে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ত্যাগের জন্য আদিষ্ট হন। তিনি পরপর তিন দিন দৈনিক ১০০ করে মোট ৩০০ উট কোরবানি করেন। কিন্তু কোরবানি কবুল হলো না, বারবার আদেশ করা হলো, ‘তোমার প্রিয় বস্তু কোরবানি কর’। শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারলেন, প্রাণাধিক প্রিয়পুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.) কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উত্সর্গ করতে হবে।
শিশুপুত্র হজরত ইসমাঈল (আ.) নিজের জানকে আল্লাহর রাহে উত্সর্গ করতে নির্দ্বিধায় সম্মত হয়ে আত্মত্যাগের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বস্তুত হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতি এটা ছিল আল্লাহ তাআলার কঠিন পরীক্ষা মাত্র। তাই ধারালো ছুরি হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর একটি পশমও কাটতে পারেনি। এর পরিবর্তে আল্লাহর হুকুমে বেহেশত থেকে দুম্বা এসে হাজির হয়। পৃথিবীর বুকে এটাই ছিল স্রষ্টাপ্রেমে সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কোরবানি। আত্মত্যাগের সুমহান ও অনুপম দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য কোরবানি করাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাঁদের স্মরণে এ বিধান অনাদিকাল তথা রোজ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর সমীপে না তার গোশত পৌঁছে, আর না তার রক্ত; বরং আল্লাহর কাছে তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে থাকে।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩৭)
কাল পরিক্রমায় প্রতিবছর হজের পরে ঈদুল আজহা ফিরে আসে। ঈদুল আজহার প্রধান আকর্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো কোরবানি। ঈদের দিন কোরবানিকে কেন্দ্র করে ধুমধামের সঙ্গে চলে ঈদের মহোত্সব। রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কোনো আমল আল্লাহর কাছে নেই। কোরবানিকারী কিয়ামতের দিন জবেহকৃত পশুর লোম, শিং, খুর, পশম ইত্যাদি নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা কোরবানির সঙ্গে নিঃসংকোচ ও প্রফুল্লমন হও।’ (ইবনে মাজা, তিরমিজি)
কোরবানির মর্মবাণী সম্পূর্ণ ভিন্নতর। কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনদের ও এক ভাগ গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া মুস্তাহাব। কোরবানির চামড়া বা তার নগদ অর্থ গরিব-দুঃখীদের দান করে দিতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত, দীন-দুঃখী ও শীতার্তরাও যাতে ঈদের আনন্দ করতে পারে সে লক্ষ্যে কেবল ভোগ নয়, ত্যাগ-তিতিক্ষার মনোভাব নিয়ে তাদের মধ্যে কোরবানির গোশত অকাতরে বিলিয়ে দিতে হবে এবং তাদের দান-খয়রাত করতে হবে। মুমিন মুসলমানদের মনে রাখা প্রয়োজন হালাল উপার্জন, ইখলাস এবং একনিষ্ঠতাই হলো কোরবানি কবুল হওয়ার অপরিহার্য শর্ত। কোরবানি হতে হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে খুশি করার জন্য। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘বলো! আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মৃত্যু, সবকিছু আল্লাহর জন্য, যিনি সারা জাহানের মালিক ও প্রভু।’ (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬২)
ঈদুল আজহা আমাদের শিক্ষা দেয় আল্লাহপ্রেমে পূর্ণ তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ও মনের একাগ্রতা নিয়ে কোরবানি করতে হবে, লোক দেখানোর জন্য নয়। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র এ কোরবানির উত্সব বা ঈদুল আজহা শুধু প্রতীকী অনুষ্ঠান মাত্র নয়। এর প্রকৃত রূপ হলো মনের গভীরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাকওয়া নিয়ে প্রিয় বস্তু তাঁর নামে উত্সর্গ করা। তাই কোরবানির মধ্যে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভয় কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আর (কোরবানির) উটগুলোকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের বহুবিধ কল্যাণ নিহিত আছে।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত: ৩৬)
যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ সুদৃঢ় প্রত্যয় ও ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের অনুসারীরাও তাঁদের অনুসৃত পথে চলেছেন। তাই মুসলমানদের শুধু কোরবানির প্রতীক হিসেবে পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মতো স্রষ্টাপ্রেমে জাগরিত হয়ে জানমাল নিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ব মানবতার কল্যাণের জন্য সবাইকে উত্সর্গিত ও নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে। পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অন্তর থেকে পাশবিক শক্তিকেও কোরবানি করে দিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে কোরবানি জীব-জানোয়ার বা পশু হনন করতে আসে না, বরং গৃহপালিত পশু কোরবানির মাধ্যমে পাশবিক প্রবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার যে এটি একটি উত্তম ব্যবস্থা সে অতিসূক্ষ্ম কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে ঈদুল আজহা প্রতিবছর ফিরে আসে।
আসুন, আমরা সবাই মিলেমিশে ইসলামের ইতিহাসে কোরবানির সঠিক দীক্ষা নিয়ে সুন্দর সচেতন সুশীল সমাজ, পাপমুক্ত পরিবেশ, হিংসামুক্ত রাজনীতি, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সন্ত্রাসমুক্ত দেশ, প্রেম ও ভালোবাসা বিজড়িত বিশ্ব গড়ে তুলি। ত্যাগ-উত্সর্গের মাধ্যমে অসহায় নিরন্ন-আশ্রয়হীন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত মানুষের মুখে হাসি ফোটাই। তাহলেই ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে নেমে আসবে অনাবিল সুখ-শান্তির ফল্গুধারা, আর আদায় হবে পবিত্র ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির পরম সার্থকতা।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo

ঈদ মানে সবার জন্য আনন্দ -উৎসব by মোজাফ্ফর আহমদ

ঈদ অর্থ আনন্দ—এ তো আমাদের সবারই জানা, কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি—ঈদ অর্থ সবার জন্য আনন্দ? আজকাল সবার জন্য স্বাস্থ্য, সবার জন্য শিক্ষা, সবার সমান অধিকার এমন নানা কথা নানা সময়ে নানা উচ্চারণে আমরা শুনে থাকি। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা যে অনেক কঠিন এবং এ জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের নিত্যসময়ের সার্বিক অঙ্গীকার ও কার্যক্রম প্রয়োজন হয় সে বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সম্মেলন ও কার্যক্রম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। সবার জন্য শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা ব্যক্তিক ও জাতীয় সক্ষমতা সৃষ্টি করতে চাই, যার মাধ্যমে সমাজ এবং ব্যক্তি সৃজনশীল ও সচল হয়ে ওঠে। কিন্তু এও আমাদের অভিজ্ঞতা, সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা একটি কঠিন সংগ্রাম। এখানে কেবল অর্থ অথবা পরিকাঠামো থাকলেই হয় না। এ জন্য প্রয়োজন হয় নিবেদিত শিক্ষা-অন্তপ্রাণ একদল কর্মীর, যাঁরা শিক্ষার্থীদের কাছে টানেন, তাদের মনের পাললিক স্তরে মূল্যবোধের বীজ উপ্ত করেন, যা থেকে সার্বিকভাবে দায়বদ্ধ একটি মন ও মননের মহিরুহ সৃষ্টি হয়। এই মহিরুহ যখন ফুল, পাতা ও ফলে সুশোভিত হয় এবং তার সুবাসে ও সুফলে নানাজন নানাভাবে আকর্ষিত হয়ে জীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া পায়, তখনই সবার জন্য শিক্ষা সুন্দর ও সুস্থ সমাজের বাস্তবতাকে অর্জন করে।
সবার জন্য স্বাস্থ্য এমনি আরেকটি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রক্রিয়া। সুস্বাস্থ্য কেবল সুন্দর জীবনের ভিত রচনা করে না, এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নীরব, মঙ্গলদায়ী ও কর্মক্ষম সমাজের অবস্থা নির্ণয় করে। এ কাজও অনেক কঠিন। আমরা জানি যে অনেক উন্নত দেশে আজও সবার জন্য স্বাস্থ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। বিষম সমাজ অনেককে সক্ষমতার গণ্ডিতে প্রবেশই করতে দেয় না। দুস্থ ও বঞ্চিত মানুষ সমাজের নানা স্তরে নানাভাবে ছড়িয়ে থাকে। শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিকভাবে নানা কারণে নানা সময়ে বিভিন্ন জন অসুস্থ থেকে সমাজের অস্থিরতার সৃষ্টি করে। এর ফলে আত্মহনন থেকে অন্যের অধিকার হরণের বিচিত্র মানসিকতা আমরা বিভিন্ন সময়ে ইতিহাসের নানা বাঁকে, সমাজের নানা স্তরে বিচিত্ররূপে দেখতে পেয়েছি।
এই পরিপ্রেক্ষিতে সবার জন্য আনন্দ—আমাদের আদর্শই স্মরণ করিয়ে দেয়—এটি নিশ্চিত করতে হলে সমাজকে প্রস্তুত হতে হয়। অন্যভাবে বললে, সমাজকে প্রস্তুত করতে হয়। যে সমাজ মানুষের একত্ম এবং বহুবিধ বিভিন্নতাকে গ্রহণ করে এর মনুষ্যত্ববিনাশী মননকে ত্যাগ করতে পারে, সে সমাজেই বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও একে অন্যের জন্য সংবেদী মন সৃষ্টি হয়। যখন আমরা অন্যকে কাছে টানতে ব্যর্থ হই, বিভেদ যেখানে বড় হয়ে ওঠে, সেখানে সুন্দরকে আমরা গ্রহণ করতে পারি না, সেখানে এই আনন্দের সমদর্শিতা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই আনন্দের একটি ভিত হলো অন্যের জন্য অনুভব করা এবং অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়া। আজকালকার ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজে প্রতিযোগিতার নামে আমরা মানুষকে কাছে না টেনে অনেক সময়ই দূরে ঠেলে দিই। আমরা এগিয়ে যেতে চাই, তাই অন্যকে পেছনে ফেলে দিই। সবাই মিলে এগিয়ে যাওয়ার যে আনন্দ সেটা আমাদের হূদয়ে অনুভবও করি না। মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তার নামে এক সারিতে দাঁড়ায়, সেটা কেবল তথাকথিত সাম্য ও ঐক্যের প্রতীক নয়। সেখানে সুষম সমাজের একটি আন্তরিক কামনা ও বাসনা বিমূর্ত হয়ে ওঠে।
আজকালকার বস্তুবাদী সমাজে ভাববাদী আনন্দের বিষয়টি অনেক সময়ই উপেক্ষার বিষয় হয়। তবে স্মরণ রাখতে হবে, ভাববাদী আনন্দেরও একটি বস্তুগত ভিত্তি থাকতে হয়। সেই বস্তুগত ভিত্তি তৈরি হতে হয় সামাজিক প্রক্রিয়ায়, যেখানে বিত্ত এক মানুষের পরিচয় নয়, তার চিত্তের সম্পদ তাকে বিশিষ্টভাবে চিহ্নিত করে দেয়। আজকের পৃথিবীতে আমরা উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিভাজিত নানা স্তরে দেশগুলোকে দেখি। আমরা এও দেখি যে, নানা দেশের মধ্যে যে আন্তসম্পর্ক সেখানে নৈতিকতা ও নীতিমান্যতা নানাভাবে বিঘ্নিত হয়। যার প্রাযুক্তিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা যত বেশি, পৃথিবীর নানা সম্পর্কীয় রঙ্গমঞ্চে সে তত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। নিজের ভোগবাদিতার মাধ্যমে ও ক্ষমতা সংরক্ষণের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংঘাতের মধ্য দিয়ে আজ পৃথিবীর পরিবেশ এক সংকটময় অবস্থানে এসে উপনীত। এই অতিভোগবাদিতা ও ক্ষমতালিপ্সা আমাদের সভ্যতাকেই বিপন্ন করে তুলেছে। সেখানেও আমরা দেখতে পাই শক্তিধরের ভোগবাদী জীবনের আকাঙ্ক্ষা। পৃথিবীর শতকোটি বঞ্চিত মানুষের মৌলিক অধিকারকে অস্বীকার করার এক মানসিকতা যেটা শিক্ষিত মনন ও সুস্থ মানসিকতার পরিচয় বহন করে না। আমাদের সমাজেও এই দুষ্ট ক্ষতের নানা পরিচয় নানাভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করি। এখানে যার অনেক আছে সে আরও অনেক চায়। যার ক্ষমতা আছে সে মঙ্গলের জন্য নিজেকে নিবিষ্ট না করে অন্যের অমঙ্গলের মাধ্যমে নিজের স্ফীত ভোগবাদী মানসিকতার পরিচয় রাখে। সে কারণে যখন আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্য, বঞ্চনা ও তীব্র দুঃখ-কষ্টের যাতনায় পিষ্ট হয়, তখন নানা রকম বাণিজ্যিক বিপণন ও ভোগবাদী নানা পণ্যের বিভিন্ন রকম প্রসার এই কষ্ট ও দুঃখকে আরও তীব্র করে তোলে।
সবার জন্য আনন্দ নিশ্চিত করতে কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে দান ও খয়রাত যথেষ্ট নয়। এই আনন্দ সর্বজনীন হয়ে উঠতে সমাজব্যবস্থাকেই পরিবর্তনের প্রয়োজন। সে সঙ্গে রাষ্ট্রযন্ত্রেরও পরিবর্তন আবশ্যক। রাষ্ট্রকে হতে হবে সর্ব মানুষের কল্যাণে নিরত একটি সেবাধর্মী ও মাঙ্গলিক ব্যবস্থা, যেখানে সবার অধিকার সমান হতে হবে, সবার কণ্ঠের উচ্চারণ শ্রুত হতে হবে, সবার মন ও মানসিকতা এমন হতে হবে যেখানে অন্যের বঞ্চনা নিজের বঞ্চনা বলে মনে হবে এবং সে কারণে বঞ্চনা বিদূরণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব লাভকারী প্রতিনিধিরা প্রথমে অন্যের মঙ্গলে নিজেকে সঁপে দেবেন। যেমনটি—আমাদের কাছে এখন রূপকথার মতো শোনায়—সেই প্রজাহিতৈষী মানবতাবাদী খলিফা ও শাসকদের মধ্যে দেখেছি এবং যেটা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে। ক্ষমতা যে দায়িত্বের অন্যরূপ এবং ক্ষমতার ব্যবহার যে দায়বদ্ধরূপে করতে হয় এবং ক্ষমতা ব্যবহার যে জবাবদিহির জন্ম দেয়, এ চেতনা আজ সমুন্নত নয় বলেই রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার হয় এমনভাবে যেখানে ক্ষুদ্রস্বার্থ বৃহত্ স্বার্থকে দলিত করে, গোষ্ঠীস্বার্থ বা দলগত স্বার্থ মানবতাকে নিপিষ্ট করে। এই রাষ্ট্রযন্ত্র পরিবর্তনে প্রয়োজন হয় সমাজের স্তরীকরণকে ভেঙে মানুষকে এবং সে সঙ্গে নানা জীব ও সৃষ্টির অন্য সম্পদকে এমনভাবে বিবেচনায় আনা, যেখানে অন্যের প্রয়োজন অনেক বেশি গুরুত্ব পায়, নিজের প্রয়োজন, স্বার্থ ও নিরাপত্তার চেয়ে।
এই সমাজ বিনির্মাণে আমাদের সকল কর্মে মানবিক নীতিমান্যতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আজকালকার পৃথিবীতে নানাভাবে মানবতা লাঞ্ছিত হয়, অন্যের অধিকার অস্বীকৃত থেকে যায় এবং বৈষম্যকে আমরা অগ্রগমনের মাপকাঠি বলে ধরে নিই। এ কারণে নানাভাবে আমাদের সমাজে ঢুকে পড়ে তথাকথিত উন্নয়ন সংস্থা, যারা আত্মশক্তি সৃষ্টি না করে একটি পরনির্ভরশীল অবস্থা ও মানসিকতার জন্ম দেয়। এই পৃথিবীতে নানাভাবে আমরা একে অন্যের সাহায্য গ্রহণ করি, একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকি। কিন্তু সে সম্পর্কের ভিত্তি হলো সমদর্শিতা এবং সমসক্ষমতা। যেখানেই এর ব্যত্যয় ঘটে, সেখানেই আসে এর বিভাজন, বিভাজন থেকে বৈষম্য, বৈষম্য থেকে নিরানন্দ অবস্থান।
আমরা যখন যান্ত্রিকভাবে ঈদের উত্সব পালন করি, তখন সবার জন্য আনন্দ এই ভাবনা আমাদের ভেতরে থাকে না। আমরা আমাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকি। নিকটজনের আনন্দকেই প্রাধান্য দিই এবং এই বাণিজ্যিকায়নকৃত প্রতিযোগী সমাজে কারণে-অকারণে বঞ্চিত হওয়ার বেদনা অনুভব করি। যদি আমরা এই বিষম পৃথিবীর বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক ও সমাজিকভাবে স্তরীকৃত মানুষের মধ্যে আমাদের চেয়ে নিচে যাদের অবস্থান, তাদের কথা ভাবতে পারতাম, তাদের কাছে যেতে পারতাম এবং তাদের আনন্দিত করে আনন্দ উপভোগের চেতনা সৃষ্টি করতে পারতাম, তাহলে ঈদের আনন্দ এক ভিন্ন মাত্রা পেতে পারত।
সবার জন্য আনন্দ বাস্তবায়িত করতে হলে অন্যের আনন্দকে অগ্রাধিকার দিতে হয় এবং সে স্বীকৃতি কেবল একটি উচ্চারণ হলে হবে না। এর স্বীকৃতির জন্য যে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজন, সেটি অনেক সময়ই প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পাওয়া যায় না। সে কারণে আমরা অনেক শিক্ষিত ব্যক্তিকেন্দ্রিক সফল ব্যক্তিত্বকে বিচরণ করতে দেখি আমাদের ব্যবসায়-বাণিজ্যে, নানাবিধ কর্মে, রাজনীতিতে ও নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মন ও মননে প্রাপ্তির যে হিসাব আছে, সে হিসাবে অন্যের কাছে নিজের দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বের কোনো স্থিতিপত্র থাকে না। একজনকে বস্তুগতভাবে সফল হতে যেমন কর্মদক্ষতার প্রয়োজন হয়, তেমনি আমাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এমন এক অবস্থার উপস্থিতি থাকে, যেখানে অন্যের প্রতি দায়িত্ব একটা সীমিত দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হয়। দান ও অনুদানে এই দায়বদ্ধতার নিরসন হয় বলে একটি মানসিক পরিমণ্ডল সৃষ্টি হয়।
এ সমাজব্যবস্থায় কীর্তিমান মানুষ অনেক সময়ই ভুলে যান যে, অন্যের নানা অবদানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাঁর জীবন সমৃদ্ধ হয়েছে। কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম তাঁকে খাদ্য জুগিয়েছে অথচ সেই প্রান্তিক কৃষক অনেক সময় কাটিয়েছেন অনাহারে বা অর্ধাহারে। যেহেতু এই বাস্তবতা প্রত্যক্ষ নয়, সে কারণে জীবনে সফল অনেকেই এই কৃষকের কাছে ঋণকে হূদয়ে অনুভব করেন না। যে শ্রমিক বা তন্তুবায়ী তাঁর শখের বস্ত্র জুগিয়েছেন, তাঁর কথাও কি তাঁর মনে থাকে? হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যারা যোগাযোগের রাস্তা তৈরি করেছে, সেই রাস্তায় যান্ত্রিক যানে পরিভ্রমণের সময় আমাদের কারও তার কাছে ঋণ স্বীকার করার মানসিকতা থাকে না। আমাদের জীবন এমন বস্তুতান্ত্রিক ও যান্ত্রিক হয়ে উঠেছে যে, উত্পাদন সম্পর্কের নানা স্তরে নানা মানুষের এই শ্রমঘন অবস্থান আমরা নিজেদের আনন্দ-অনুভবে কখনোই স্মৃতিতে আনি না। এর ফলে সবার জন্য আনন্দ বাস্তব হয়ে ওঠে না। বরং এমন এক ধারণার মধ্যে আমরা বাস করি যে, নানাভাবে বঞ্চনার হাতিয়ার যে বাজারব্যবস্থা সে ব্যবস্থাই ওই বঞ্চিতদের যথার্থ মূল্য দিয়েছে, এমনি একটা ভাবনা আমাদের তুষ্ট রাখে।
এই বিষম অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমাদের যেসব মানুষ আজ নিচে পড়ে আছে, যারা সুযোগের অভাবে এই ত্রুটিযুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমসুযোগের অধিকার হারিয়েছে, তাদের কাছে যেতে হবে। তাদের বেদনা অনুভব করতে হবে। তাদের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে হবে এবং আর্থসামাজিকভাবে তার ভেতরে যে সম্ভাবনা আছে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়নের পথ সৃষ্টি করে দিতে হবে। ঈদের জামাতে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যখন মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন অবস্থানের প্রতীকী চিত্র আমরা আঁকি তখন যেন আমরা আমাদের এই সামাজিক দায়িত্ব স্মরণ রাখি। ক্ষণিকের এক সারিতে দাঁড়ানো কিন্তু সমাজের সবার জন্য সুষম অবস্থানের বাস্তব চিত্রের পরিচিতি নয়। সবার জন্য আনন্দ বাস্তব হতে হলে সমাজ ও রাষ্ট্রক্ষমতায় এই সমতা ও ঐক্যের সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে ক্ষণিকের দয়া-দাক্ষিণ্য সবার মধ্যে মানবিক মূল্যবোধের ঐকতান সৃষ্টি করবে না। সেই ঐকতানের মূর্ছনা সৃষ্টিই হোক আজকের দিনের প্রত্যয়, আমাদের অঙ্গীকার।
মোজাফ্ফর আহমদ: অর্থনীতিবিদ।

বিদেশে কর্মরত নারীদের নিরাপত্তা -বাংলাদেশ দূতাবাসের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি নারীদের বেশির ভাগ গৃহকর্মী এবং তাঁদের অনেকেই শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার। তাঁদের মাত্র পাঁচ ভাগ হয়তো নিরাপদ, কিন্তু বাকিদের সবাই নিয়োগকর্তাদের হাতে নির্যাতনের শিকার। ২০ শতাংশ নারীকর্মী যৌন নির্যাতনের শিকার। এই ভয়াবহ চিত্র উদ্ঘাটিত হয়েছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এক সমীক্ষায়। এ ধরনের খবর গণমাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হলেও সরকার বা কর্তৃপক্ষ খুব বেশি তত্পর হয়নি। কিন্তু এবার বিদেশে কর্মরত ২৫০ জন নারীকর্মীর সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে উপস্থাপিত প্রতিবেদনটি কোনোভাবেই আর উপেক্ষা করা যাবে না।
প্রবাসী বাঙালিরা দেশের অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান হারে অবদান রাখছেন। বাংলাদেশের মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) প্রায় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ (২০০৭ সালের হিসাবে) আসে প্রবাসীদের আয় থেকে। সুতরাং এই খাতের সুষ্ঠু বিকাশ জাতীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নারীকর্মীরা যদি এভাবে নির্যাতিত ও নিগৃহীত হতে থাকেন, তাহলে তাঁদের প্রবাসে কাজ করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। একশ্রেণীর অর্থলোভী লোক প্রবাসে কর্মী প্রেরণের নামে প্রতারণা করে। ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধার কথা বলে বিদেশে পাঠানোর পর বিশেষত নারীকর্মীরা অসহায় অবস্থায় পড়েন। তাঁদের অমানবিক কাজে নিয়োগ করা হয়। জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের গৃহকর্মীরা বাহরাইন ও দুবাইয়ে মাসে মাত্র ১০০ ডলারের মতো বেতনে কাজ করতে বাধ্য হন, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় সাত হাজার টাকারও কম। সেখানে ন্যূনতম বেতন বলতে কিছু নেই। না আছে শ্রম আইন, না আছে অন্যায়ের প্রতিবাদের উপায়। যেসব আদম-ব্যবসায়ী জেনেশুনে সরলমনা বাঙালি নারীদের প্রতারিত করে, যারা এ ধরনের পাপকাজে লিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের শিথিলতা চলতে দেওয়া যায় না।
আমাদের দেশে কর্মীদের বিদেশে কাজ নিয়ে যাওয়ার আগে ও ফিরে আসার পর ভালো প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থা কার্যকর করা হলে সমস্যা কিছুটা কমিয়ে আনা যাবে। তবে প্রবাসে যাওয়ার পর যেন সেখানে নারীরা প্রয়োজনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা দরকার। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসগুলোতে বিশেষ সেল বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকা দরকার, যাঁরা বিশেষভাবে নারীকর্মীদের নির্যাতনের যেকোনো ঘটনায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন। প্রবাসী নারীকর্মীদের কাছে মোবাইল ফোন ও দূতাবাসে জরুরি যোগাযোগের নম্বর থাকলে বিপদ-আপদে সহিংসতার শিকার নারীরা খুব উপকৃত হবেন। এ ধরনের একটি পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে জানা গেছে। আমরা আশা করব, ব্যবস্থাটি যেন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হয়।

পবিত্র ঈদুল আজহা -আনন্দ ও ত্যাগে শুদ্ধ হোক জীবন

ঈদ এসেছে, সঙ্গে এনেছে শান্তি আর আনন্দের সওগাত। সব ভেদ ও পরিচয় ভুলে এই দিন মানুষ কেবল মানুষকেই বুকে জড়াবে। এই মিলনের আকুতি, ঈদের সেই রঙিন বারতাই কি সবার মনে অধীর বাঁশরির মতো বাজছে না? বহুবর্ষ আগে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই মর্মের কথাই তাঁর গানে চাউর করে দিয়েছিলেন, ‘আজ ভুলে যা সব হানাহানি, হাত মেলা হাতে...’। এই আয়োজন তো জীবনেরই উদ্যাপন। ঈদুল আজহার কোরবানির ত্যাগের মহিমা তো এটাই।
পবিত্র ঈদুল আজহায় আল্লাহর নৈকট্য, করুণা ও আনুগত্য লাভের জন্য মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি দেবে। পেছনে ফিরলে দেখা যাবে, আল্লাহ তাআলা হজরত ইব্রাহিম (আ.)কে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দিতে। আল্লাহ তাঁর নবীকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। স্নেহের পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সবচেয়ে প্রিয়। পিতা হয়ে পুত্রকে কোরবানি দেওয়া অসম্ভব কাজ। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) বিনা দ্বিধায় নিজ পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্যত হয়েই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মহান আল্লাহর নির্দেশে তাঁর ছুরির নিচে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে কোরবানি হয়ে যায় একটি দুম্বা। স্রষ্টার প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য ও ত্যাগ স্বীকারের বাণীই এ ঘটনার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।
ঈদুল আজহার উদ্দেশ্য স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে উত্সর্গ করতে প্রস্তুত থাকা। এরই প্রতীক হিসেবে পশু কোরবানি করা হয়। এই কোরবানির মাধ্যমে মূলত মানুষের মধ্যে বিরাজমান পশুশক্তি, কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুকেই কোরবানি দিতে হয়। হালাল অর্থে কেনা পশু কোরবানির মাধ্যমেই তা সম্পন্ন হয়। কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ঐকান্তিক প্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যা দিয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভ করা যায়।
কিন্তু কোরবানির এই মর্মবাণী সহজেই ভুলে যাওয়া হয়। দেখা যায়, ত্যাগের সাধনার চেয়ে ভোগবিলাস ও অপচয়ই বড় হয়ে ওঠে। পবিত্র কর্তব্য পরিণত হয় পশুনিধন ও মাংস ভক্ষণের উত্সবে। দরিদ্র মানুষের কথাও ভাবা হয় না। আমাদের দেশে অসংখ্য দরিদ্র মানুষ আছে, যাদের দুই বেলা দুই মুঠো ভাত জোটে না। তীব্র শীতে তাদের শরীরে থাকে না কোনো শীতবস্ত্র, তারা সংস্থান করতে পারে না খাবারের। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মুখে হাসি ফোটানোর মাধ্যমে ঈদের আনন্দ সার্থক হয়ে উঠতে পারে।
ঈদের সময় যেখানে-সেখানে পশু জবাই করার প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে। কোরবানির পর ঠিকমতো হাড়, রক্ত ইত্যাদি পরিষ্কার করা নিশ্চিত করতে হবে। সিটি করপোরেশনগুলো এ ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হবে, সে কামনা করি আমরা।
বিশ্ব মুসলিমের এই উত্সবে ধরণি সজীব হবে, যেখানেই তাঁরা থাকবেন, সেখানেই ঈদ উত্সবের পবিত্র সৌন্দর্যে অপরের মনের প্রীতি আদায় করে নেবেন—এটাই কাম্য।

Saturday, November 28, 2009

ওল্ড ট্রাফোর্ডে বেসিকতাসের ম্যানইউ-বধ

মাথার ওপর এখনো ঝুলছে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ। অপরাধ—রেফারির সমালোচনা। কিন্তু তাতেও নিবৃত্ত নন অ্যালেক্স ফার্গুসন। পরশু চ্যাম্পিয়নস লিগের ম্যাচ শেষে আরেক দফা রেফারিকে তুলাধুনো করলেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ। এবার তাঁর শূলে ফরাসি রেফারি স্টেফানি লেনয়। ফার্গুসনের দাবি, নিশ্চিত একটা পেনাল্টি থেকে তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন।
ওই পেনাল্টি পেলেও অবশ্য জয় আসত না। কারণ নিজেদের মাঠে পরশু ম্যানইউ ১-০ গোলে হেরেছে তুরস্কের ক্লাব বেসিকতাসের কাছে। চ্যাম্পিয়ন লিগে নিজেদের মাঠে টানা ২৩ ম্যাচ এবং সাড়ে চার বছর পর তাদের এই পরাজয়। তাতে অবশ্য ক্ষতিবৃদ্ধি হচ্ছে না। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে গেছে ম্যানইউ। তবে ‘বি’ গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকে তাদের ‘নকআউট’ পর্বে যাওয়াটা নির্ভর করছে ৮ ডিসেম্বর ভলফসবুর্গের মাঠে ম্যাচটির ফলাফলের ওপর।
ওদিকে ‘এ’ গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করেছে বোর্দো, পরশু জুভেন্টাসকে নিজেদের মাঠে ২-০ গোলে হারিয়েছে তারা। ঝুলে আছে বায়ার্ন মিউনিখ আর ‘জুভ’দের ভাগ্য। প্রথম চার ম্যাচে মাত্র ৪ পয়েন্ট পাওয়া বায়ার্ন পরশু ম্যাকাবি হাইফাকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে জুভেন্টাস-বায়ার্ন। নিজেদের মাঠে ড্র করলেই দ্বিতীয় রাউন্ডে চলে যাবে জুভরা, জিততেই হবে বায়ার্নকে।
একমাত্র ‘ডি’ গ্রুপ থেকেই দুটো দলের নকআউট পর্ব নিশ্চিত। পরশু আনেলকার একমাত্র গোল নিজেদের মাঠে হারলেও চেলসির সঙ্গী হয়েই নকআউট পর্বে নাম লিখিয়েছে পোর্তো। ‘ডি’ গ্রুপের যেমন দুই দল নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি ‘সি’ গ্রুপ থেকে এখনো কারোরই নিশ্চিত হয়নি দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা। তবে এক পা দিয়ে রেখেছে রিয়াল মাদ্রিদ। পরশু বার্নাব্যুতে গঞ্জালো হিগুয়েইনের একমাত্র গোলে তারা হারিয়েছে এফসি জুরিখকে। এক পা দিয়ে রাখতে পারত এসি মিলানও। কিন্তু পরশু নিজেদের মাঠে অলিম্পিক মার্শেইয়ের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করায় দুটো পয়েন্ট হাতছাড়া হয়ে গেছে সাতবারের চ্যাম্পিয়নদের।
‘সি’ গ্রুপে ১০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রিয়াল। মিলানের পয়েন্ট ৮। ৭ পয়েন্ট নিয়ে তিনে মার্শেই। দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে হলে ৮ ডিসেম্বর ফ্রান্সে মার্শেইয়ের বিপক্ষে রিয়ালের জয়টাই কাম্য হবে মিলানের জন্য। মার্শেই জিতলে একই দিন জুরিখের বিপক্ষে ড্র করলেও বাদ পড়ে যাবে মিলান।
এক নজরে ফলাফল দেখে বুঝতেই পারছেন, পরশু ইউরোপীয় ফুটবল গোল করার ক্ষেত্রে কার্পণ্যই দেখিয়েছে। ২ গোলের ব্যবধানে জিতেছে কেবল বোর্দো। সেটিও হতো না, যদি ৯৪ মিনিটে, একেবারে শেষ বাঁশি বাজার আগমুহূর্তে গোল না পেতেন মারুয়ানে শামাখ। দুটো গোল করেছে সিএসকেএ মস্কোও। যদিও প্রথমার্ধে এডিন জেকোর গোলে এগিয়ে ছিল (১-০) ভলফসবুর্গ।
প্রথমার্ধে পিছিয়ে গিয়েছিল ম্যানইউও। এদিন অবশ্য ফার্গুসন তরুণ একটা দল নামিয়েছিলেন। আক্রমণভাগে ফেদেরিকো মাচেদার সঙ্গী ছিলেন ড্যানি ওয়েলব্যাক। ফন ডার সারের বদলে গোলপোস্টের নিচে ছিলেন বেন ফস্টার। ওয়েইন রুনি দলেই ছিলেন না। মাইকেল ওয়েন, মাইকেল ক্যারিক, পল স্কোলস, ড্যারেন ফ্লেচার, নানিদের বসে থাকতে হয়েছে বেঞ্চে। কিন্তু প্রত্যাশার প্রতিদান দিতে পারেনি তরুণেরা।
ফার্গুসন অবশ্য তরুণদের দোষারোপ না করে সব ক্ষোভ উগরে দিলেন রেফারির ওপর, ‘ইউরোপে টানা দুটো ম্যাচে আমরা নিশ্চিত পেনাল্টি থেকে বঞ্চিত হলাম। এটা খেলাটির চেতনা-বিরুদ্ধ, কিন্তু আমি আর কী করতে পারি? এ ধরনের পেনাল্টিগুলো না দিলে খেলাটাই সমস্যাতে পড়ে যাবে।’
এমন মন্তব্যের পর ফার্গুসন আবারও সমস্যায় পড়ে যান কি না কে জানে। ওদিকে বার্নাব্যুতে কিন্তু রিয়ালকে খুব একটা সমস্যায় ফেলতে পারেনি মিলানকে তাদের মাঠে হারিয়ে আসা জুরিখ। তবে মাত্র একটা গোল নিয়ে নিশ্চয়ই অস্বস্তিতে ছিল সমর্থকেরা। সেই অস্বস্তি তো ঘুচেছেই, সবচেয়ে বেশি স্বস্তির ছিল আট সপ্তাহ পর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মাঠে ফেরা। ৬৯ মিনিটে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলারটি। তেমন কোনো কারিশমা দেখাননি। তবে বুঝিয়ে দিয়েছেন ২৯ ডিসেম্বরের ‘এল ক্লাসিকো’র জন্য তিনি প্রস্তুত।

চীন কার্বন নিঃসরণ ৫০ শতাংশ কমাবে -যুক্তরাষ্ট্র ১৭ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দেবে

চীন ২০০৫ সালের তুলনায় ২০২০ সালনাগাদ মাথাপিছু জিডিপির জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশকমিয়েআনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে আসন্ন জলবায়ুবিষয়ক সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রস্তাব দেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ওবামা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ২০২০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ২০০৫ সালের তুলনায় ১৭ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দেবে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা ও পরিবেশবাদীরা এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন।
গত বুধবার বেইজিংয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাওয়ের সভাপতিত্বে মন্ত্রিপরিষদের এক অধিবেশনে জলবায়ু পরির্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয়কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়। অধিবেশনে ২০২০ সালনাগাদ কার্বন নিঃসরণ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়েআনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটিকে একটি বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে চীনের জাতীয়অর্থনীতি ও সামাজিক বিকাশে মাঝারি এবংদীর্ঘকালীন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এদিকে জলবায়ু-নীতিবিষয়ক ওবামার শীর্ষ সহকারী ক্যারল ব্রাউনার সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী মাসে কোপেনহেগেনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি আনতে এ ব্যাপারে প্রস্তাব রাখবেন ওবামা। সম্ভাব্য প্রস্তাবটি হচ্ছে, নিঃসরণ ১৭ শতাংশ কমিয়ে আনা। তবে বিষয়টি মার্কিন সিনেটের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ওবামা আগামী ৯ ডিসেম্বর কোপেনহেগেন সম্মেলনে বক্তব্য দেবেন। পরের দিনই নরওয়ের অসলোতে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করবেন তিনি।
মার্কিন উপজাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ফ্রোম্যান বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে চীন, ভারত ও অন্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি আনার লক্ষ্যে এ ধরনের ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ওবামা। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানান, ওবামা একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরতে পারেন। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫, ২০৩০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ২০০৫ সালের তুলনায় যথাক্রমে ৩০, ৪২ ও ৮৩ শতাংশ কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে।
ওবামা প্রশাসনের এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিরোফুমি হিরানো বলেন, এ বিষয়ে অগ্রগতি কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করবে জাপান। ফ্রান্সের পরিবেশ-বিষয়কমন্ত্রী জ্যঁ-লুই বোর্লু ওবামার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘এটা একটি খুবই উত্সাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ।’ ওবামা প্রশাসনের এ ধরনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে বিরোধী রিপাবলিকান-দলীয় সিনেটর জেমস ইনহফ জানিয়েছেন, তাঁরা এ ধরনের পরিকল্পনার বিপক্ষে অবস্থান নেবেন। ২০২০ সাল নাগাদ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ এবং জাপান ২৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

ওয়েবসাইটে ‘৯/১১ বার্তা’

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা মনে এলেই গা শিউরে ওঠে। চোখের সামনে মার্কিনিদের অহঙ্কার টুইন টাওয়ার ধ্বংস হলো সেদিন। প্রাণ দিল তিন হাজার লোক। আহত হয়েছে আরও হাজার কয়েক মানুষ। নিউইয়র্কে সেই ভয়াবহ হামলার সময় অনেকে বার্তা দিয়ে তাঁদের আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুদের এ হামলার কথা জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ নিজেদের আশু বিপদের কথা জানিয়েছেন অন্যকে। কেউবা খোঁজ নিয়েছেন টুইন টাওয়ারে আটকে পড়া স্বজনের। সম্প্রতি কয়েকটি ওয়েবসাইটে এ রকম বহু বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে।
নিউইয়র্কবাসী সেদিন পরস্পরের মধ্যে লাখ লাখ বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ লাখ ৭৩ হাজার বার্তা প্রকাশ করেছে বিতর্কিত উইকিলিকস ওয়েবসাইট। কিছু বার্তা প্রকাশ করেছে সামাজিক যোগাযোগ ওয়েবসাইট টুইটারও। এসব বার্তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সংস্থার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অসংখ্য সাধারণ মানুষের বার্তাও রয়েছে। ওই দিন গ্রিনিচ মান সময় আটটা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত এসব বার্তা পাঠানো হয়।
নিউইয়র্কবাসীর পাঠানো বার্তার সবগুলো সন্ত্রাসী হামলার ব্যাপারে ছিল না। এগুলোর মধ্যে কিছু ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, রসিকতাপূর্ণ ও নিত্যনৈমিত্তিক কাজের ব্যাপারে। যেমন কেউ কেউ বার্তা পাঠিয়ে আত্মীয়স্বজন মধ্যাহ্নভোজে কী খেয়েছে তা জানতে চেয়েছিলেন।
টুইন টাওয়ারে সন্ত্রাসীদের হামলার পর বেশির ভাগ লোক পেজারের (সংক্ষিপ্ত বার্তা বা ই-মেইল পাঠানোর যন্ত্র) মাধ্যমে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের অবস্থা জানতে চেয়েছেন। যেমন একটি বার্তায় বলা হয়েছে, ‘আমি মিরনা বলছি, তুমি বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত আমার স্বস্তি নেই। টুইন টাওয়ারের দ্বিতীয়টি ধসে পড়েছে। দয়া করে তুমি বাড়িতে ফিরে যাও।’ আরেকটি বার্তায় বলা হয়েছে, ‘বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে বোমা হামলা হয়েছে। কোনো প্রয়োজন হলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করো।’
ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বার্তাগুলো সঠিক। এখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই। তবে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি।

মালয়েশীয় এয়ারের নতুন সময়সূচি

মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস যাত্রীদের সুবিধার্থে ১ ডিসেম্বর থেকে শীতকালীন ফ্লাইটের সময় পরিবর্তন করবে।
ঘন কুয়াশার কারণে ফ্লাইটে বিলম্ব হয়ে যাতে যাত্রীদের দুর্ভোগ না হয় সে জন্য ওইদিন থেকে নতুন সময় অনুযায়ী ফ্লাইট পরিচালনা করবে এ বিমান সংস্থা।
মালয়েশিয়া এয়ারলাইনস প্রতিদিন রাত ১০টা ১০ মিনিটে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে রওনা হবে এবং কুয়ালালামপুর সময় রাত তিনটায় সেখানে পৌঁছাবে। কুয়ালালামপুর থেকে সন্ধ্যা ছয়টা ১০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবে এবং রাত নয়টায় ঢাকায় অবতরণ করবে। নতুন সময়সূচি ৩১ জানুয়ারি ২০১০ পর্যন্ত বলবত্ থাকবে।

চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ৭.৫% নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে

চামড়াজাত পণ্য (ফিনিশড লেদার) রপ্তানির ক্ষেত্রে সাড়ে সাত শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করেছে।
এতে বলা হয়েছে, সম্পূর্ণ স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাঁচা চামড়া থেকে নিজস্ব কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে উত্পাদিত পণ্যকে ‘ফিনিশড লেদার’ বলে গণ্য করা হবে।
এসব পণ্য রপ্তানির পর বৈদেশিক মুদ্রার যথাযথ প্রত্যাবাসনের পর প্রকৃত ‘এফওবি’ মূল্যের ওপর এই ভর্তুকি বা নগদ সহায়তা দেওয়া হবে।
২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে জাহাজীকৃত চামড়াজাত পণ্য এ নগদ সহায়তা সুবিধা পাবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পণ্য উত্পাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে শুল্ক প্রত্যর্পণ সুবিধা গ্রহণ করা হলে এই নগদ সহায়তা প্রযোজ্য হবে না।

এল ক্লাসিকোতে মেসিকে চান হিগুয়েইন

লিওনেল মেসি ইনজুরিতে, পরশু চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতে পারেননি জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচও। বার্সেলোনার অন্যতম দুই খেলোয়াড়ের ইনজুরি রিয়াল মাদ্রিদের জন্য নিশ্চয়ই সুসংবাদ। পরের রোববারই তো এই মৌসুমের প্রথম ‘এল ক্লাসিকো’, ধ্রুপদী যে ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা আর রিয়াল।
তবে গঞ্জালো হিগুয়েইন কিন্তু চান মেসি সেরে উঠুন দ্রুত। রিয়াল স্ট্রাইকারের এই চাওয়ার পেছনে আর্জেন্টাইন যোগসূত্র খুঁজে লাভ নেই। কারণ স্বদেশির প্রতি টান থেকে নয়, মেসির সুস্থতা কামনা করছেন সুন্দর ফুটবলের স্বার্থে, ‘এই ম্যাচটা সবচেয়ে সুন্দর ম্যাচগুলোর একটি, যদি সেরা খেলোয়াড়েরা মাঠে থাকে। সেও যদি থাকে, তা হলে সেটি দারুণ হবে।’ বলেছেন, ‘আমি যেমন চাই আমাদের দলের সব সেরা খেলোয়াড় এই ম্যাচে খেলুক, তেমনি বার্সেলোনা দলেও থাকুক সেরা খেলোয়াড়েরাই।’
জাতীয় দলে আক্রমণভাগের সঙ্গী মেসির সুস্থতা কামনা করলেও কিন্তু বার্সার প্রতি কোনো শুভকামনা নেই এই ২১ বছর বয়সীর, ‘ন্যু ক্যাম্পে পুরো প্রাণশক্তি নিয়ে যাওয়াটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানে জিততে পারলে পয়েন্ট টেবিলে একটা বড় ধরনের ধাক্কাই লাগবে। এটা গুরুত্বপূর্ণ হবে এই কারণেও, জিতলে লিগে আমরা ওদের থেকে ৪ পয়েন্টে এগিয়ে যেতে পারব।

শীর্ষে থেকেই বছর শেষ ফেদেরারের

বছরটা এক নম্বরে থেকেই শেষ করছেন রজার ফেদেরার। বছরের শেষ টুর্নামেন্ট ‘এটিপি ট্যুর ফাইনালে’ রাফায়েল নাদাল তাঁর প্রথম ম্যাচেই হেরেছেন, আর ফেদেরার পরশু অ্যান্ডি মারেকে হারিয়েছেন। ১ ঘণ্টা ৫৭ মিনিটের ম্যাচটিতে মারেকে ৩-৬, ৬-৩ ও ৬-১ গেমে হারানোর পরই নিশ্চিত হয়ে গেছে বিষয়টি।
২০০৯ বছরটা ফেদেরারের জন্য অন্য রকম। বহুদিনের বান্ধবী মিরকা ভাবরিনেচকে বিয়ে করেছেন, যমজ মেয়ের বাবা হয়েছেন; ফিরে পেয়েছেন র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর জায়গা। বছর শেষে সেই এক নম্বর জায়গাটা তাঁরই থাকছে। মৌসুমের শুরুতে যেমন চেয়েছিলেন, শেষটা সেই চাওয়ার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় আনন্দে উদ্বেল সুইস টেনিস তারকা, ‘এক নম্বরে থেকে বছর শেষ করা আমার অন্যতম লক্ষ্য ছিল এবং আমার কাছে মনে হয়, এটা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম ভালো পারফরম্যান্স।’
শুধু শীর্ষ থাকার তৃপ্তি নিয়েই নয়, মৌসুমের শেষ টুর্নামেন্টটা জিতেই বছরটা শেষ করতে চান ফেদেরার। সে জন্য অবশ্য আজ আর্জেন্টাইন হুয়ান মার্টিন দেল পোত্রোকে হারিয়ে উঠতে হবে সেমিফাইনালে। ফেদেরার কি পারবেন? গত ইউএস ফাইনালে ফেদেরারকে হারানো তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, আজকের ম্যাচে আরেকটা বিশেষ অনুপ্রেরণা আছে পোত্রোর।
পোত্রোর এই ম্যাচটি দেখতে লন্ডনের ওটু অ্যারেনায় যাবেন ম্যানচেস্টার সিটির আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার কার্লোস তেভেজ। তাঁকে খুশি করতে ফেদেরারকে হারাতে চান পোত্রো, ‘(কার্লোস) তেভেজের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সে আমাকে এই ম্যাচটি জিততে বলেছে।

জলবায়ু আন্দোলনে ফুটবল-শক্তি

ম্যাচটার নাম অনায়াসে দেওয়া যেতে পারে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্দোলনের স্মারক ম্যাচ!’
জলবায়ুর পরিবর্তনটা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ হয়তো তেমনভাবে অনুভব এখনো করে না। তবে অসময়ে বৃষ্টিপাত, এক একটি ‘সিডর’ বা ‘আইলা’ ছোবল দিয়ে সতর্কসংকেত দিয়ে যায়। আর বিধ্বস্ত জনপদে মানুষের হাহাকার আগামী দিনের একটি ভয়াল ছবি আঁকে।
উন্নত বিশ্বের মানুষ অবশ্য অনেক আগে থেকেই বিশ্বব্যাপী এই জলবায়ু বিপর্যয় সম্পর্কে অবহিত। এই বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ওপরের দিকেই থাকবে বাংলাদেশ। সুতরাং এই জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্দোলনে বা জনসচেতনতায় বাংলাদেশের আগ্রহটা একটু বেশিই হওয়ার কথা। আগামী ৭ ডিসেম্বর কোপেনহেগেন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের উদ্যোগে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাতে জোরালো ভূমিকা রাখবেন বলে খবর।
সেই সম্মেলনের আগে আজ থেকে ঢাকায় শুরু হচ্ছে এরই একটি বিশেষ প্রচারণা। মানুষকে খুব কাছাকাছি নেওয়ার বিরাট ক্ষমতা ফুটবলের, তাই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে প্রীতি ফুটবল দিয়েই শুরু হচ্ছে প্রচারণার। বেলা সাড়ে তিনটায় বাফুফে ও কোপেনহেগেন একাদশের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ থেকে জনগণের কাছে আহ্বান জানানো হবে, ‘আসুন, জলবায়ু পরিবর্তন আন্দোলনে শামিল হোন। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ওয়েবসাইটে নিজের মন্তব্য লিখুন।’ ওয়েবসাইট ঠিকানা: www. sealthedeal2009.org, www. volunteeringforourplanet.org)।
কোপেনহেগেন একাদশ নামটা শুনে ভাবতে পারেন ডেনমার্কের রাজধানী থেকে কোনো দল আসছে কি না। আসলে ব্যাপারটা তা নয়। কোপেনহেগেনে জলবায়ু সম্মেলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এমন নামকরণ। যাতে কোপেনহেগেন সম্মেলনের গুরুত্বটা মানুষের কাছে তুলে ধরা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজটা করছে ঢাকার জাতিসংঘের সহযোগী সংগঠন ইউনাইটেড নেশনস ভলান্টিয়ার (ইউএনভি)। আজকের ম্যাচ তো বটেই, আজ থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় নানা কর্মসূচি পালন করবে ইউএনভি। যেটাকে বলা হচ্ছে ‘সিল দি ডিল ক্যাম্পেইন, ২০০৯’। এই প্রচারণায় যারা ওয়েবসাইট ব্যবহারের সুযোগ পাবেন না, তাঁদের জন্য স্বাক্ষর অভিযান থাকবে ৪ ডিসেম্বর সাফ ফুটবলের উদ্বোধনী দিনে।
এই কর্মসূচিগুলোর বিস্তারিত কাল জানালো হলো বাফুফে ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে। ইউএনভির প্রোগ্রাম অফিসার নগোজি ব্লেসিং ওট্টি ঘুরেফিরে এই গুরুত্বই বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ, তাই এ দেশে জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। আমরা আশা করি, মানুষ এতে সাড়া দেবে।’ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে (বাফুফে) ধন্যবাদ জানালেন নাইজেরীয় ভদ্রমহিলা, ‘এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ফুটবলেরই দেশের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।’
২৫ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবক সপ্তাহ পালন করছে ইউএনভি। এই প্রচারণার অন্য একটা নামও দেওয়া হয়েছে, ‘ভয়েস অব ভিকটিম’। অর্থাত্ আক্রান্তদের কণ্ঠ। যার অন্যতম হলো, ‘গো গ্রিন’। পরিবেশদূষণ কমাতে হাঁটাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিশেষ দিন রাখা হয়েছে ২৯ নভেম্বর। ১ ডিসেম্বর পালন করা হবে বিশ্ব এইডস দিবস।
ফুটবলকে এই প্রচারণায় নিয়ে আসায় খুশি ফুটবলাররা। কাল সংবাদ সম্মেলনে বাফুফের একাদশের খেলোয়াড় জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আরিফ খান জয় বললেন, ‘এটা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করতে দারুণ এক সুযোগ।’ জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক আলফাজের কথা, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এখন সময় এসেছে এর বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে এগিয়ে যাওয়ার।’ বিদেশি ফুটবলারদের সমন্বয়কারী পুমা বললেন, ‘এই উদ্যোগের সঙ্গে থাকতে পেরে আমরা খুবই খুশি।’ এ ম্যাচটা দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি সবার প্রতি। প্রীতি ম্যাচ হলেও ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়কে দেওয়া হবে পুরস্কার। পদক পাবেন সব খেলোয়াড়ই।
বাফুফে সহসভাপতি শওকত আলী খান জাহাঙ্গীর, সদস্য ফজলুর রহমান বাবুল প্রমুখ কর্মকর্তাও এর গুরুত্ব নিয়ে কথা বললেন সংবাদ সম্মেলনে।

মুম্বাইয়ে ২৬/১১ হামলার প্রথম বার্ষিকী আজ

আজ সেই ২৬/১১। গত বছরের এই দিনে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে ঘটেছিল ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা। এ দিন পাকিস্তান থেকে আসা জঙ্গিরা মহারাষ্ট্রের রাজধানীর আটটি স্থানে হামলা চালিয়েছিল। এতে প্রাণহানি ঘটে ১৭৩ জনের। আহত হন ৩০৮ জন। এক বছর পর আবার ফিরে এসেছে দিনটি। আজই সেদিনের সেই সন্ত্রাসী হামলার বিচারাধীন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হচ্ছে। ফের হামলার আশঙ্কায় মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানভিত্তিক লস্কর-ই-তাইয়েবার জঙ্গিরা করাচি থেকে সমুদ্রপথে আরব সাগর হয়ে ভারতের ভূখণ্ডে ঢোকে। এরপর ভারতীয় একটি মাছধরার ট্রলার বন্দুকের মুখে ছিনতাই করে এর ক্রুকে হত্যা করে মুম্বাইয়ের দিকে আসে। মুম্বাই বন্দরের কাছাকাছি এসে তারা ট্রলারে থাকা একটি রাবার বোটে করে মুম্বাই উপকূলে অবতরণ করে। তারপর জঙ্গিরা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে মুম্বাইয়ের আটটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা চালায়। স্থান আটটি হচ্ছে, ছত্রপতি শিবাজি টার্মিনাল বা সিএসটি, ওবেরয় ট্রিডেন্ট হোটেল, হোটেল তাজমহল প্যালেস ও টাওয়ার, লিওপোল্ড কাফে, ক্যামা হসপিটাল, নরিম্যান হাউস এবং মেট্রো সিনেমা। এ ছাড়া তারা বিস্ফোরণ ঘটায় মুম্বাইয়ের বন্দর এলাকার মাঝাগাঁও এবং ভিলে পার্লে ট্যাক্সিতে। ২৬ নভেম্বর এই হামলা শুরু হলেও শেষ হয় ২৯ নভেম্বর। ওই দিন ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের (এনএসজি) সদস্যরা সর্বশেষ হোটেল তাজমহলকে সন্ত্রাসীমুক্ত করেন। তাঁরাই ওবেরয় থেকে ২৫০, তাজমহল থেকে ৩০০ ও নরিম্যান হাউস থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করেন।
জঙ্গিরা সবচেয়ে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায় মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি স্টেশনে। রাত সাড়ে নয়টার দিকে এখানে জঙ্গিরা নিরীহ মানুষের ওপর একটানা গুলি চালিয়ে হত্যা করে ৫২ জনকে। আর জখম করে ১০৯ জনকে। এখানেই জীবিত ধরা পড়ে পাকিস্তানি জঙ্গি মোহাম্মদ আজমল আমির কাসাব। এখন সেই কাসাবের বিচার চলছে। এ ছাড়া সংঘর্ষে মারা যায় নয় পাকিস্তানি জঙ্গি। ওই নয় জঙ্গির মৃতদেহ এখনো পড়ে আছে মুম্বাইয়ের জে জে হাসপাতালের মর্গে।
মুম্বাই হামলা মামলার বিচার চলছে মুম্বাইয়ের একটি বিশেষ আদালতে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এই মামলার বিচার করছেন বিশেষ বিচারক এম এল তাহিলিয়ানি। গত বছরের ৮ মে শুরু হয়েছিল বিচারপর্ব। আজ বৃহস্পতিবার শেষ হচ্ছে সাক্ষ্যগ্রহণ। শুনানি শেষে রায় দেওয়া হবে।
এ মামলার সরকারি কৌঁসুলি উজ্জ্বল নিকম গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, এরই মধ্যে ২৬৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৩০০ সাক্ষী হলফনামার মাধ্যমে সাক্ষ্য দিয়েছে। পাকিস্তানি জঙ্গি আজমল কাসাব ছাড়াও এই মামলায় দুই ভারতীয় জঙ্গিকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন, ফাহিম আনসারি ও সাবা উদ্দিন আহমেদ। তাঁরা সবাই এখন মুম্বাইয়ের আর্থা রোড কারাগারে বন্দী।
পাকিস্তানের আদালতে সাতজনকে অভিযুক্ত
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, পাকিস্তানের একটি আদালত মুম্বাই হামলার ঘটনায় সাতজন সন্দেহভাজনকে অভিযুক্ত করেছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আদালতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।
এঁদের মধ্যে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী জাকিউর রেহমান লাকভি ও লস্কর-ই-তাইয়েবার সদস্য জারার শাহ রয়েছেন।
আইনজীবী শাহবাজ রাজপুত বলেন, সন্দেহভাজন সাতজনকেই মুম্বাই হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগের পক্ষে যথাযথ সাক্ষ্যপ্রমাণ না থাকায় অভিযুক্তরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং পাকিস্তান দণ্ডবিধির অধীনে তাঁদের অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আফগানিস্তান যুদ্ধের অবসানের অঙ্গীকার করলেন বারাক ওবামা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আফগানিস্তান যুদ্ধের ইতি টানার অঙ্গীকার করে বলেছেন, আল-কায়েদা ও তালেবানের বিরুদ্ধে লড়তে আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর বিষয়ে তিনি শিগগিরই ঘোষণা দেবেন। ওবামা বলেন, বৃহস্পতিবার (আজ) থ্যাংকসগিভিং ডের পর যেকোনো সময় তিনি এ ঘোষণা দেবেন।
যুক্তরাষ্ট্র সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে গত মঙ্গলবার বৈঠকের পর বারাক ওবামা এ কথা বলেন। ওবামা বলেন, ‘আফগানিস্তান যুদ্ধে সফলতার জন্য বিগত আট বছরে আমরা প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত শক্তি সেখানে মোতায়েন করতে পারিনি। এমনকি আমরা সঠিক কৌশলও নিতে পারিনি। আমি এই যুদ্ধের অবসান চাই।’ তিনি বলেন, ‘আফগানিস্তানে আল-কায়েদা ও তালেবান বাহিনীকে পরাস্ত করতে যাচ্ছি আমরা। সেখানে তাদের সব ধরনের যোগাযোগ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা বিশ্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আফগানিস্তানে আমরা কী করছি এবং সেখানে কীভাবে সফলতা আসবে, এ বিষয়ে মার্কিনিরা একটা স্পষ্ট বার্তা পেলে তা অবশ্যই আমাদের জন্য সহায়ক হবে।’ তিনি আরও বলেন, আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি গোটা বিশ্বসম্প্রদায়েরই দায়িত্ব রয়েছে। অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণার সময় আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর দায়দায়িত্বের বাধ্যবাধকতার বিষয়টিও তুলে ধরা হবে।
এদিকে বিভিন্ন খবরে দাবি করা হয়েছে, আগামী মঙ্গলবার ওবাবা দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এ ঘোষণা দেবেন। সেখানে আফগানিস্তানে অতিরিক্ত ৩৪ হাজার সেনা পাঠানোর ঘোষণা আসতে পারে। তবে এসব খবরের বিষয়ে ওবামার ঘনিষ্ঠ কারও পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর বিষয়ে মার্কিন শীর্ষ কমান্ডার ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগীদের সঙ্গে গত সোমবারও বৈঠক করেন ওবামা। এই নিয়ে এ ইস্যুতে তিনি মোট নয় দফা বৈঠক করলেন।

জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের জন্য কোপেনহেগেনে বাড়তি নিরাপত্তা by সরাফ আহমেদ

ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন সামনে রেখে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে দেশটির সরকার। সম্মেলন চলাকালে যেকোনো ধরনের সহিংস ঘটনা এড়াতে সরকার নতুন আইনও প্রণয়ন করেছে। ১২ দিনব্যাপী ওই শীর্ষ সম্মেলন শুরু হবে আগামী ৭ ডিসেম্বর।
বিশ্বের প্রায় ১৯০টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান, পরিবেশবিজ্ঞানী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, এনজিও প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে বিশ্বের উষ্ণায়ন বৃদ্ধি কীভাবে ঠেকানো যায়, সে ক্ষেত্রে একমত হওয়ার চেষ্টা চালাবেন।
সম্মেলনে প্রতিনিধিদের পাশাপাশি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে হাজার হাজার পরিবেশবাদী বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য কোপেনহেগেনে পৌঁছাবেন।
ডেনমার্কের রক্ষণশীল সরকারের প্রতিনিধি কিম অ্যান্ডারসন জানিয়েছেন, সম্মেলন চলাকালে বিক্ষোভ করে রাস্তাঘাট বন্ধ বা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ রুখতে নতুন আইন অনুযায়ী বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার করে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত আটক রাখা যাবে বা বিচারে সাজা হলে ৪০ দিন পর্যন্ত জেল দেওয়াসহ ৪০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হবে।
ওই আইনের বিরুদ্ধে সারা ইউরোপের পরিবেশবাদীরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গ্লোবাল নেটওয়ার্ক ফর জাস্টিস অ্যাকশন বলেছে, পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভকে অপরাধীদের দৃষ্টিতে দেখা একটি বড় অপরাধ। ডেনমার্ক সরকার ওই আইন করে নিজেরাও অপরাধ করেছে।

যুদ্ধবিমানে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল

প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যুদ্ধবিমানে চড়ে ইতিহাস গড়লেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল। গতকাল বুধবার দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রে ভারতীয়বিমানবাহিনীর ‘সুখোই-৩০’ নামের একটি যুদ্ধবিমানে চড়ে তিনি এই ইতিহাস গড়েন।
যুদ্ধবিমানে চড়ার জন্য প্রতিভা পাতিল এক মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাঁর চিরচেনা শাড়ি ছেড়ে বৈমানিকের বিশেষ পোশাক পরে যুদ্ধবিমানে চড়েন তিনি। ভারতের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে ‘একাত্মতা প্রকাশের’ লক্ষ্যে তিনি এ পদক্ষেপ নেন।
দুঃসাহসিক এ অভিযানের আগে প্রতিভা পাতিলকে গতকাল উচ্ছল দেখাচ্ছিল। রাশিয়ার তৈরি সুপারসনিক যুদ্ধবিমানটিতে চড়ার আগে উপস্থিত সবার উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান তিনি। এরপর বৈমানিকের পাশের সিটে বসে ৩০ মিনিট আকাশে ভেসে বেড়ান প্রতিভা।
আধঘণ্টা আকাশে বেড়ানোর পর দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট যুদ্ধবিমানটি মহারাষ্ট্রের বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। এ সময় প্রতিভা পাতিল সবাইকে বিজয় চিহ্ন দেখান।
যুদ্ধবিমানে চড়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রতিভা পাতিল (৭৪) বলেন, এটা ‘অসাধারণ’, ‘চমত্কার’। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিমানে নারী বৈমানিকদেরও নিয়োগ দেওয়া উচিত। ভারতের তিন বাহিনীতেই নারীরা রয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিভা পাতিল বলেন, ‘নারীদের ক্ষমতার ব্যাপারে আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমার বিশ্বাস, নারীরাও যুদ্ধবিমানের বৈমানিক হিসেবে স্বচ্ছন্দে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।’
ভারতে সম্প্রতি বিমানবাহিনীর একটি ঘোষণায় নারীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ওই ঘোষণায় বলা হয়, যুদ্ধবিমানে নারী বৈমানিক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। তবে এ জন্য নারীদের সন্তান না নেওয়ার অঙ্গীকার করতে হবে।
ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক প্রতিভা পাতিলকে যুদ্ধবিমানে চড়ার প্রস্তুতি হিসেবে স্বাস্থ্য পরীক্ষাও দিতে হয়েছে।
প্রতিভা পাতিলের আগে ২০০৬ সালে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম একই মডেলের একটি যুদ্ধবিমানে চড়েন। ওই সময় তাঁরও বয়স ছিল ৭৪ বছর।

স্বপ্ন কোনো চোরাবালি নয় -চারদিক by সুজন সুপান্থ

ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সব গোল হয়ে দুপুরের খাবার খেতে বসেছে। ঠিক একইভাবে তাদের পাশে বসে ভাত আর মাছের ঝোল নিয়ে বসেছে জাপান থেকে আসা সুনচকে। কারও বা খাওয়া শেষ হয়েছে। খাওয়া শেষে সবাই যে যার মতো ভাতের প্লেট পরিষ্কার করে কাজে লেগে যাচ্ছে। কাজ তাদের তেমন কিছু নয়, এই খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলা আর ঘুম। এতেই তাদের আনন্দের যেন সীমা থাকে না।
‘আমি তো এখন সাকিব খানের মতোন হিরো হয়া গেছি। যে শহর চোরাবালি সিনেমায় আমার অভিনয় তো জোস্ হইছে, সবাই সেই কথাই কয়। শুনছি, আমারে নাকি জাপান আর জার্মান দ্যাশের সব সিনেমা হলে দেখাইতাছে। আমি বড় হইয়া হিরোই হমু।’—কথাগুলো ১২ বছর বয়সের শামীম ইয়াসার রাজুর। মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে খেতে এভাবেই নিজের হিরো বনে যাওয়ার কথাগুলো বলছিল রাজু। তিন বছর আগেও ছেলেটি টোকাই ছিল। দিনমান রাস্তায় রাস্তায় কাগজ আর পাতা কুড়িয়ে বেড়াত সে। সেই পাতাকুড়ুনির দল থেকে ধরে এনে সুস্থ-সুন্দর জীবন গড়ার জন্য একমাত্রা তাকে আশ্রয় দিয়েছে পল্লবীর এই শিশু আশ্রয়ণকেন্দ্রে। শুধু রাজু নয়, রাজুর মতো আরও অনেক শিশুই এখন থাকে এ আশ্রয়ণকেন্দ্রে।
সর্বমোট ২০ জন ছেলেমেয়ে আর একমাত্রার পরিচালনা পর্ষদ নিয়েই তাদের বর্তমান পরিবার। ২০০৩ সাল থেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘একমাত্রা’ বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আর এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পল্লবীর ইস্টার্ন হাউজিংয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করে শিশু আশ্রয়ণকেন্দ্র।
এই আশ্রয়ণকেন্দ্রের শিশু-কিশোররা প্রতিদিনই আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকে। কিন্তু গত ২৪ নভেম্বর যেন তাদের মনে একটু বাড়তি আনন্দ এসে জেঁকে বসেছে। আজ তো ওই খুদে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে মাঠে খেলতে খোদ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোচ জেমি সিডন্স, অধিনায়ক মাশরাফি-বিন-মূর্তজা ও ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল আসবেন। এটা কী তাদের জন্য কম গর্বের কথা!
২৪ নভেম্বরের সেই প্রতীক্ষিত সময়টার অপেক্ষার পালা যেন ফুরোতেই চাচ্ছে না তাদের। তাদের বরণ করে নিতে সারা দিন চলে নানা আয়োজন। কেউ ফুলের মালা বানিয়েছে, কেউ নিজ হাতে এঁকেছে নানা ছবি আর কেউ বা কবিতা আর গান গেয়ে দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর বরণ করে নেয় জেমি সিডন্স, মাশরাফি আর আশরাফুলকে।
একটু পরেই শুরু হয় আশরাফুল আর মাশরাফির সঙ্গে ছোট ছোট শিশু-কিশোরের ক্রিকেট খেলার আয়োজন। ছোট্ট শিশুদের বলে আশরাফুল যেমন পিটিয়েছে, ঠিক তেমনি শিশুরাও কম নয়। আশরাফুল আর মাশরাফির বলে শিশুরাও পিটিয়ে যাচ্ছে দেদার। আজ যেন কেউ কারও চেয়ে কম নয়, সমানে সমান।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কোচ জেমি সিডন্স বলেন, ‘শিশুদের সঙ্গে আজকের এই খেলা আমার খুবই ভালো লাগছে। একসময়ের টোকাই আর হকার শিশুদের ভেতরও যে অসম্ভব রকম প্রতিভা থাকে তা এদের না দেখলে বোঝা যেত না। এই শিশুদের মধ্যে আমি আসতে পেরে খুবই আনন্দিত।’
শিশুদের এই আনন্দকে আরও একটু বাড়িয়ে দিতে পাশ থেকে ছুটে আসে অগণিত দর্শক। সবাই আগ্রহভরে দেখছিল তাদের খেলা।
‘একমাত্রা’র নির্বাহী পরিচালক শুভাশীষ রায় বলেন, ‘২০০৩ সাল থেকেই এসব অপরাধে জড়িয়ে পড়া আর সুবিধাবঞ্চিত শিশু-কিশোরদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। আমরা দেখেছি, যদি পরিপূর্ণ পরিচর্যা করা যায় তাহলে এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। আমরা এসব শিশুকে নিয়ে যে শহর চোরাবালি নামে একটি সিনেমা করে দেখেছি, তাদের মধ্যে অপার সম্ভাবনা। আমরা তাদের সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেই বর্তমানে ময়মনসিংহে একটি শিশু একাডেমী প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা প্রায় শেষ করেছি। ইতিমধ্যেই দেশের সুধীসমাজ ও সহূদয় ব্যক্তিরাও এ কাজে আমাদের সঙ্গে এগিয়ে এসেছেন। এর মাধ্যমে আমরা চাই এসব শিশুর জন্য একটি উপযুক্ত জায়গা তৈরি করতে। আমাদের বিশ্বাস, সমাজের সহূদয়-সচেতন মানুষেরা নিজ নিজ সাধ্যমতো এ যাত্রার সঙ্গী হলে একমাত্রার এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাটা অসম্ভব হবে না। আর যেকোনো সত্য কাজ করতে আমরা কখনোই পিছপা হব না।’
‘স্বপ্ন যে চোরাবালি নয়, স্বপ্ন সৃষ্টির পূর্বশর্ত’ এ বিশ্বাসকেই ধারণ করে হাঁটিহাঁটি পা পা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ‘একমাত্রা’। তাদের এই স্বপ্ন নিঃসীম মহাসাগরের বুকে ক্ষুদ্র একবিন্দু জলকণার মতো হলেও এই বিন্দু কণা ছাড়া যে মহাসাগরের পূর্ণতা হয় না তা খুব ভালো করেই উপলব্ধি করেছে ‘একমাত্রা’। আজকে যে শিশুদের বোঝা মনে হচ্ছে ‘একমাত্রা’ তাদেরই একদিন সঠিক পরিচর্যা করে জনসম্পদে পরিণত করে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করবে এই দেশ, এই জনপদ।

বলিভারীয় বিপ্লব ও শান্তি -ভেনেজুয়েলা by ফিদেল কাস্ত্রো

শেভেজকে আমি ভালো করে চিনি, ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার জনগণকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়ার মতো কোনো শক্তিপরীক্ষা হতে দিতে শেভেজ সবচেয়ে অনাগ্রহী। কিউবা দ্বীপের পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিমাংশের অধিবাসীরা যে ভ্রাতৃসুলভ বন্ধনে আবদ্ধ, তেমনি সম্পর্ক দুই দেশের জনগণের।
কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের পরিকল্পনা করছেন শেভেজ—মার্কিনীদের এ ধরনের অবমাননাকর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রভাবশালী এক মার্কিন পত্রিকা সম্প্রতি ‘ওয়ার ড্রামস’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘সাত দশকের ভেতর কলম্বিয়ার জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সবচেয়ে গুরুতর এই হুমকিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত। কারণ এ হুমকি আসছে এমন এক দেশ থেকে যার প্রেসিডেন্টের সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে...’ এ ধরনের বক্তব্য ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের জন্য অমর্যাদাকর।
সেই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়েছে, ‘আঞ্চলিক ও স্থানীয় সরকারে শেভেজের বিরোধীদের তিনি তীব্র আক্রমণ করেন, তাদের সরানোর চেষ্টা করেন। ইতিমধ্যে কারাকাসের মেয়র এমন আচরণের শিকার হয়েছেন...এখন কলম্বিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের যে গভর্নররা তাঁর শাসন মানতে নারাজ তাঁদের বিহিত করতে চান তিনি...কলম্বিয়ার সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষ বা আধাসামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার ভূমিতে ঢুকে অভিযান চালাতে পারে এমন অভিযোগকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে শেভেজ সরকার সাংবিধানিক অধিকার স্থগিত করে দিতে পারে।’
এসব কথা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী পরিকল্পনা এবং ভেনেজুয়েলার অভিজাত শ্রেণী ও প্রতিবিপ্লবীদের সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতার ন্যায্যতাই শুধু প্রতিপাদন করে।
কাকতালীয়ভাবে, এই সম্পাদকীয় প্রকাশের সময় শেভেজ একটি কলামে বিশ্লেষণ করেন কলম্বিয়া কর্তৃক সাতটি সামরিক ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি।
সেই কলামে বলিভারীয় প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত স্পষ্ট ও সাহসিকতার সঙ্গে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে কলম্বিয়া কাউকে নিরাপত্তা ও সম্মান দিতে পারে না; এমনকি নিজ দেশের নারী-পুরুষদেরও না। যে দেশ নিজের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে নতুন ঔপনিবেশিক শক্তির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে তার পক্ষে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়।’
শেভেজ সত্যিকারের বিপ্লবী, সাহসী কর্মী। তিনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেননি। যে নয়া-উদারনৈতিক সরকারগুলো ভেনেজুয়েলার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করেছিল এবং জনগণের ওপর নিপীড়ন ও গণহত্যা চাপিয়ে দিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে তিনি বিদ্রোহ করেছিলেন। তাঁকে কারাভোগ করতে হয়েছে, ধীরে ধীরে তাঁর চিন্তার বিকাশ ঘটেছে, পরিপক্বতা এসেছে। সামরিক বাহিনীতে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর আছে, কিন্তু তিনি অস্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেননি।
তথাকথিত প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র এবং মতপ্রকাশের পরম স্বাধীনতার মধ্য থেকে তিনি সামাজিক বিপ্লবের কঠিন পথে এগিয়েছেন। এই সময় সবচেয়ে শক্তিশালী মিডিয়া অভিজাত ও সাম্রাজ্যের স্বার্থরক্ষায় নিয়োজিত ছিল। শেভেজের লড়াইয়ের মহত্ব এখানেই।
অভ্যুত্থান ও দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অপপ্রচার সত্ত্বেও মাত্র ১১ বছরে ভেনেজুয়েলা শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রগতিতে যে অর্জন করেছে তার নজির দুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যাবে না।
নানা জটিল কায়দা ব্যবহার করে সফল না হয়ে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার মতো ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেনি; কারণ বৈদেশিক জ্বালানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু তারা বলিভারীয় প্রক্রিয়া এবং ক্যারিবীয় ও মধ্য আমেরিকান দেশগুলোকে ভেনেজুয়েলা উদারভাবে যে জ্বালানি সহায়তা দিচ্ছে এবং দক্ষিণ আমেরিকা, চীন, রাশিয়া এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে যে বিপুল বাণিজ্য তার বিরুদ্ধে তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। প্রতিটি মহাদেশের বিপুল পরিমাণ মানুষ বলিভারীয় বিপ্লবের প্রতি সহানুভূতিশীল। আর সে দেশের সরকারের সঙ্গে কিউবার সম্পর্ক সাম্রাজ্যের জন্য বিচলিত হওয়ার মতো। বলিভারের ভেনেজুয়েলা এবং মার্তির কিউবা যুক্তি ও ন্যায্যতাভিত্তিক নতুন ধরনের সম্পর্কের সূচনা করেছে।
প্রচণ্ড জ্বালানি সংকটের সময়ে ক্যারিবীয় দেশগুলোকে ভেনেজুয়েলা উদারভাবে সহায়তা দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা এখন যে সমস্যা মোকাবিলা করছে তা কিউবাতে বিপ্লবের সময়ে আমাদের সমস্যার থেকে একেবারে আলাদা। মাদক পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সামাজিক সহিংসতা এবং আধাসামরিক বাহিনীর কথা আমাদের সময়ে বলতে গেলে শোনাই যেত না। পুুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও ভোগবাদী সমাজ তখনো যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল মাদকের বাজারে পরিণত করেনি। কিউবার বিপ্লবের জন্য তখন মাদক পাচার মোকাবিলা কঠিন ছিল না।
এখন মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ আমেরিকায় এগুলো মস্তবড় আসন গেড়ে বসেছে। বাণিজ্যের অসম শর্ত, সংরক্ষণবাদ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লাতিন আমেরিকার সমাজে অনুন্নয়ন, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানহীনতা এবং মাদকের বিশাল বাজার তৈরির ফলে মাদক পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ। মাদক পাচার ও অপব্যবহার রোধে ধনী ও সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর অসামর্থ্য লাতিন আমেরিকাতে মাদক উত্পাদনের কাঁচামাল হিসেবে কিছু উদ্ভিদের চাষের রাস্তা করে দিয়েছে।
সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা থাকার কারণেই শেভেজ জানেন যে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক চুক্তির বৈধতা দানের অছিলা হিসেবে ব্যবহার করছে, যে চুক্তি স্নায়ুযুদ্ধোত্তর দুনিয়াব্যাপী প্রাধান্য বিস্তারের মার্কিন যুদ্ধকৌশলের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বিমান ঘাঁটি স্থাপন, কার্যক্রম চালানোর অধিকার এবং মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের কলম্বিয়ার ভূমিতে দায়মুক্তি দেওয়ার সঙ্গে মাদক চাষ, উত্পাদন ও পাচারের কোনো সম্পর্ক নেই। বৈশ্বিক এ সমস্যা শুধু দক্ষিণ আমেরিকায়ই ছড়াচ্ছে না, বিস্তার ঘটছে আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলেও। ব্যাপক মার্কিন সেনা উপস্থিতি সত্ত্বেও আফগানিস্তানে এ অবস্থা দেখা যায়।
সামরিক ঘাঁটি তৈরি, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় হামলা, যুদ্ধ ও লুণ্ঠন চালানোর জন্য মাদককে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। যাঁরা ভাবছেন ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার জনগণের মধ্যে বিভক্তি তাঁদের প্রতিবিপ্লবী পরিকল্পনার সাফল্য বয়ে আনবে তাঁরা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে ভালো শ্রমিকদের অনেকে কলম্বিয়ার নাগরিক; বিপ্লব তাদের, তাদের পরিবারকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নাগরিক অধিকার ও অন্যান্য সুবিধাদি দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার অধিবাসী এক সাথেতাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করবে, একই সঙ্গে তারা শান্তি ও মুক্তির লক্ষ্যে লড়াই করবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত।
ফিদেল কাস্ত্রো: কিউবার বিপ্লবের নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট।

লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক -হজ by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

পবিত্র হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোকন। আরবি ‘হজ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ কোনো স্থান দর্শনের সংকল্প করা, কোনো পবিত্র স্থানে গমন করার ইচ্ছা করা, জিয়ারতের উদ্দেশ্যে প্রতিজ্ঞা করা প্রভৃতি। ইসলামের পরিভাষায় নির্দিষ্ট দিনসমূহে কাবাগৃহ এবং এর সংলগ্ন কয়েকটি সম্মানিত স্থানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুসারে অবস্থান করা, জিয়ারত করা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার নামই হজ। নবী করিম (সা.) উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘হে মানবগণ! আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন, অতএব তোমরা হজ পালন করো।’ (মুসলিম)
ইসলামে হজ একটি দৈহিক ও আর্থিক সংগতিপূর্ণ সার্বিক ইবাদত, যা একজন মুসলমান জিলহজ মাসের ৯-১৩ তারিখ পর্যন্ত বায়তুল্লাহ শরিফে পৌঁছে যথাযথভাবে পালন করে থাকেন এবং যা বিশ্বমানবতা ও তাওহিদী পয়গাম থেকে উত্সারিত স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের এক বাস্তব দৃষ্টান্ত। হজের মর্মকথা হলো যে ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দেবেন এবং মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.) যে সদিচ্ছা ও বিশ্বাসের দৃঢ়তার সঙ্গে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করেছিলেন আবশ্যিকভাবে জীবনে একবার তা পালন করবেন। এ মর্মে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মানবজাতির জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা মক্কায়, এটা বরকতময় ও বিশ্বজগতের দিশারি। এতে রয়েছে মাকামে ইবরাহিমের প্রকৃষ্ট নিদর্শন। যে এর ভেতরে প্রবেশ করে সে নিরাপদ। আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ওই ঘরে হজ করা তার অবশ্যকর্তব্য।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯৬-৯৭)
আল্লাহর কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণের মুহুর্মুহু ধ্বনিতে ৯ জিলহজ মক্কা মোয়াজ্জমায় সুবিশাল আরাফাতের ময়দান মুখরিত ও প্রকম্পিত করে বিশ্বের লাখ লাখ মুমিন বান্দা মহাসম্মিলনী পবিত্র হজব্রত পালন করেন। ভাষা, বর্ণ ও লিঙ্গের ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বের প্রায় ১৭২টি দেশের প্রায় ৩৫ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজ পালনের লক্ষ্যে মিনা থেকে আরাফাত ময়দানে গমন করেন। তাঁরা পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে আত্মশুদ্ধির শপথ ও আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করার পরম সৌভাগ্য অর্জন করে সৃষ্টিকর্তার দরবারে ঐকান্তিক আবেদন জানান। মক্কা শরিফ থেকে হজের ইহরাম পরিহিত লাখ লাখ নর-নারী ধর্মীয় আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নিয়ামাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাকা’ অর্থাত্ আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, আপনার মহান দরবারে হাজির, নিশ্চয়ই সব প্রশংসা, নিয়ামত এবং সব রাজত্ব আপনারই, আপনার কোনো শরিক নেই—এ হাজিরী তালবিয়া পাঠ করতে করতে মিনাতে এসে জোহর, আসর, মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করেন।
বাদ জোহর মিনা থেকে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করতে করতে আরাফাতের সুবিশাল প্রান্তরে লাখ লাখ মুসলমান উপস্থিত হন। জোহরের নামাজের জামাতের আগে আরাফাত ময়দানের মসজিদে নিমরার মিম্বারে দাঁড়িয়ে হাজিদের উদ্দেশে হজের খুতবা দেওয়া হয়, যাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি, বিশ্ব শান্তি ও কল্যাণের কথা ব্যক্ত করা হয়। খুতবা শেষে জোহর ও আসরের ওয়াক্তের মধ্যবর্তী সময়ে জোহর ও আসরের কসর নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা হয়। সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সব হজযাত্রী আরাফাত ময়দানেই অবস্থান করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর জিকির-আজকারে মশগুল থাকেন। হজের দিনে সারাক্ষণ আরাফাতে অবস্থান করা ফরজ। হজ পালন তথা এদিনে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের প্রতিদান হলো আল্লাহ সেসব হজযাত্রী মুমিন বান্দাদের নিষ্পাপ ঘোষণা করেন। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করে, আর কোনো প্রকার কুকর্ম না করে, সে ব্যক্তি যে দিবসে তার মাতা তাকে প্রসব করেছিল সে দিবসের ন্যায় বে-গুনাহ অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
সূর্যাস্তের পরপরই হাজিগণ মুযদালিফায় এসে এশার ওয়াক্তে মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করে উন্মুক্ত আকাশের নিচে খোলা মাঠে অবস্থান করে আল্লাহর ইবাদত করেন। পরের দিন ১০ জিলহজ ফজরের নামাজ আদায় করে হাজিগণ কিছুক্ষণ অবস্থান করেন এবং সূর্যাস্তের আগেই মিনার উদ্দেশে রওনা হন। মিনাতে পৌঁছে বড় শয়তানকে একে একে ৭টি কঙ্কর মারার পর কোরবানি দিয়ে মাথার চুল কেটে গোসল করে ইহরামমুক্ত হন। মিনাতে হাজিগণ আরও দুই দিন থাকেন। পর্যায়ক্রমে ছোট, মধ্যম ও বড় শয়তানকে চিহ্নিত স্থানসমূহ লক্ষ্য করে প্রতিটিতে ৭টি করে কঙ্কর মারেন। ইতিমধ্যে মক্কায় গিয়ে কাবাগৃহ তাওয়াফ করে আবার মিনায় ফিরে আসেন। এটাকে বলা হয় কাবা শরিফের ফরজ তাওয়াফ।
১২ জিলহজ শেষবারের মতো শয়তানকে নিয়ম অনুযায়ী কঙ্কর মেরে সূর্যাস্তের আগে মক্কায় ফিরে আসেন, আর যদি সূর্যাস্তের আগে ফিরে আসতে ব্যর্থ হন তবে মিনা থেকে ১৩ জিলহজ কঙ্কর মেরে মক্কায় ফেরেন। মক্কায় ফিরে এসে বিদায়ী তাওয়াফ করে হাজিগণ মদিনায় যান। যাঁরা আগে যাননি তাঁরা মদিনার পথে, আর যাঁরা হজের আগে মদিনা সফর করেছেন তাঁরা নিজ নিজ দেশের উদ্দেশে রওনা হন। হজের সফরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নবী করিম (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করা। মূল হজ শুরুর আগে মদিনাতে যাওয়া যেতে পারে বা হজের কার্যাবলি শেষ করেও যাওয়া যায়। হজ আল্লাহপ্রেমকে জাগ্রত করে আর নবীজির রওজা মোবারক জিয়ারতের মাধ্যমে সেই প্রেমের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়।
ইসলামে হজের ধর্মীয় গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য অপরিসীম। পবিত্র হজ উপলক্ষে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান নফল রোজা ও ইবাদত বন্দেগি করেন। ৯ জিলহজ হাজিদের আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পরের দিন ফজরের নামাজ থেকে ১৩ জিলহজ আসরের নামাজ পর্যন্ত প্রত্যেক নামাজের পর উচ্চস্বরে এ তাকবিরে তাশরিফ বলতে হয়, ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ।’
হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত আছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত হজ পালনকারীদের নিকটবর্তী। অতঃপর হজ পালনকারী বান্দাদের সম্পর্কে ফেরেশতাদের কাছে গৌরব করে বলতে থাকেন, এরা কিসের সংকল্প করেছে?’ উত্তরে ফেরেশতারা বলেন, ‘হে আল্লাহ! এরা হজের সংকল্প করেছে।’ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি এদের হজ কবুল করলাম, আর হজের বিনিময়ে একমাত্র জান্নাত দান করব।’ নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘মকবুল হজের বিনিময় একমাত্র জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)
সারা বিশ্বে মুসলিম ভ্রাতৃত্ব, সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধন রচনায় হজের তাত্পর্য অতুলনীয়। প্রতিবছরই হজের সময় মুসলমানদের মহামিলনের সমারোহ ঘটে। হজের দিনে পবিত্র মক্কা ও আরাফাতের ময়দানে বিশ্বের প্রায় ৩০ লাখ হাজি নিবিড়ভাবে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ অনুভব করেন। তাওহিদী পতাকাতলে সমবেত হওয়ার এমন নজির অন্য কোনো ধর্মে সাধারণত পরিলক্ষিত হয় না। একই ঐকতান ও একই মহান উদ্দেশ্য লাভের আশায় আল্লাহর প্রতি একাগ্রতার একনিষ্ঠ প্রয়াস সমগ্র বিশ্বকে ধর্মীয় আবেগ-অনুভূতিতে আলোড়িত করে তোলে। নানা দেশের, নানা বর্ণের এবং নানা ভাষার মানুষের মুখে যখন উচ্চারিত হয়, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ আরাফাতের ময়দানে এহেন ভ্রাতৃপ্রেম খুলে দেয় এক নতুন দিগন্ত। বিভিন্ন বর্ণ ও ভাষার মানুষগুলো মহান সৃষ্টিকর্তা এক আল্লাহর তাঁবেদার হয়ে যায়। গোটা বিশ্বের মুসলমানরা তখন একই মিল্লাতের মানুষ। পবিত্র হজে সব মানুষ এক আদমের সন্তান তথা উম্মতে মুহাম্মদী, এটাই আমাদের শিক্ষা দেয় এবং ইবাদতের পাশাপাশি মহামিলনের মধ্যে ইহকালীন জগতে শান্তিকামী মুসলমানদের বৃহত্তর ঐক্য স্থাপনের অনন্য অতুলনীয় নজির স্থাপন করে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

আলোকচিত্রে তিনি চিনিয়েছেন বিচিত্র রং -রদ্ধাঞ্জলি by নাসির আলী মামুন

ভুলেও পাবে না তাঁকে। ২৪ নভেম্বর একমাত্র অনিবার্য গন্তব্যে চলে গিয়েছেন তিনি। গতকাল সমাহিত করা হয়েছে মানিকগঞ্জের পারিল নওয়াধা গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। দুঃখিত নওয়াজেশ আহমদ, দীর্ঘ ৬১ বছর আপনার ক্যামেরা সৃষ্টিশীল থাকলেও রাষ্ট্র আপনাকে কোনো স্বীকৃতি বা সম্মান জানাতে পারেনি। আপনার ভাগ্যে মেলেনি কোনো জাতীয় পুরস্কার! কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আপনার সত্যিকার মূল্যায়ন করতে আসেনি এগিয়ে। বাংলাদেশের আলোকচিত্রণের প্রতিষ্ঠানগুলো নীরবে উপেক্ষা করেছে আপনাকে। আপনি সবই জানতেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মনে পড়ে না। আমরা যারা আপনার বর্ণিল আলোকচিত্রগুলো পাঠ করি, সেখান থেকে উদ্ধার করি একজন নিঃসঙ্গ কবিকে, তখন তো আপনাকে পাই এই বাংলার সবখানে। প্রকৃতি কীভাবে স্থির ফটোগ্রাফে পাঠ করতে হয়, শিখিয়েছেন আপনি। আমরা আপনাকে স্মরণ করব বহুকাল।
নওয়াজেশ আহমদ আমাদের আলোকচিত্রের সাম্রাজ্যকে বহুবর্ণিল করে গেছেন। ১৯৪৮ সালে প্রকৃতি তাঁর আরাধনার বিষয় হয়। মায়াবী এক ক্যামেরা চলে আসে তাঁর নিয়ন্ত্রণে। আমানুল হক ও নাইব উদ্দিন আহমেদ—পূর্বসূরি এই দুজন এবং নওয়াজেশ এ দেশে সূচনা করেন সৃষ্টিশীল আলোক-চিত্রণের ভূখণ্ড। অগ্রজ নাইব উদ্দিনের আলোকচিত্রের বিষয় নদী, নৌকা এবং এর অববাহিকার জনপদ। আমানুল হকের ছবি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত থেকেও বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠের জনপদ গ্রামকে বিচ্ছিন্ন রাখেনি। লোকায়ত বাংলার এক বিশাল শিল্পময় সত্তা আমানুল হকের আলোকচিত্রে দীপ্যমান। নওয়াজেশ, আমানুল ও নাইব উদ্দিনের ক্যামেরার ফোকাস গ্রামবাংলায় নিবদ্ধ থাকলেও প্রত্যেকেই নিজস্ব ভঙ্গি ও চেহারায় সম্পূর্ণ আলাদা। বিস্তর তফাতের দৃষ্টিকোণ থেকে নওয়াজেশের আলোকচিত্র নিস্তব্ধ, নীরব ও নিঃসঙ্গ। বাংলাদেশের প্রকৃতির মধ্য দিয়ে আজীবন প্রবাহিত হয়েছেন এই শিল্পী।
কেন নওয়াজেশ আহমদের ক্যামেরা এত বর্ণিল বিষয়কে আলিঙ্গন করেও শেষ পর্যন্ত থেকেছে নিশ্চুপ, নিঃসঙ্গ? তিরিশ ও চল্লিশের দশকের দুঃখিত কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার রসায়ন তাঁর আলোকচিত্রে ব্যাপকভাবে প্রবাহিত হয়েছিল। তিনি যখন আমাদের উপহার দিচ্ছেন শীতের শিশিরভেজা কান্নাময় সকাল, ধুধু প্রান্তর, কোথাও কোনো মানব নেই। ছবির ফোরগ্রাউন্ডে গাছের শুকনো ডালে চুপটি বসে থাকা পাখিটি যেন কোনো দিন উড়তে পারে না—এমন দৃশ্য দেখে শুধু মন খারাপ হয় না, আমাদের কাঁদায়ও। তাঁর ব্যক্তিজীবন ও আলোকচিত্রী-সত্তা আলাদা কিছু নয়। অকৃতদার এই মানুষটি বিষণ্ন নাবিকের মতো বিচরণ করেছেন এই বাংলায়। একদিন ধানসিড়ি নদীটির পাশে আলোকচিত্র-গ্রন্থটি তাঁর একাকিত্বের মহিমা জানান দেয়। তিনি হয়ে ওঠেন আরেক জীবনানন্দ দাশ। অক্ষরে নয়, ছবিতায়। রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্র’ অবলম্বনে তাঁর আলোকচিত্রের সম্ভার দুরূহ এক ব্যতিক্রমী কাজ। রবীন্দ্রসম্পদকে স্থির ক্যামেরার ভাষায় যেভাবে তিনি উপস্থাপন করলেন, একজন আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রশিল্পীর জন্য এটি একটি শ্লাঘার বিষয়।
আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলোকচিত্রী যখন গ্রামবাংলার সৌন্দর্য ও জনপদকে পুঁজি করে চিত্রসাধনায় ব্যস্ত, নওয়াজেশ একই বিষয় অবলম্বন করে তাঁর সৃষ্টিশীল ক্যামেরায় ধারণ করেছেন ভিন্ন এক বাংলা, অন্যদের চেয়ে আলাদা এক পৃথিবী। প্রকৃতি তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে বনলতা সেনের মতো স্বপ্নময় ও প্রেমময় এক অলৌকিক সম্পদে। তাঁর বিজ্ঞানপাঠকে প্রকৃতির রসায়নে ঢেলে সাজিয়েছেন ছবিতে—নর-নারীর অপার্থিব মুখ; যা দেখলে তাঁর সৃজনশীল শক্তির প্রতি বাহবা দিতে হয় আমাদের।
ছবির ভেতর দিয়ে অন্য এক মোহনীয় জগতে নিয়ে চলেন তিনি। আমরা প্রশ্ন করি আর উপভোগ করি নওয়াজেশের বিপন্ন প্রকৃতিকে। বোধ করি, আর কারও নয়, তাঁর ছবিতেই চিত্রকরদের তেলরঙের মতো রঙের বুনট বা টেকচার সমৃদ্ধ করে তাঁর শিল্পকর্মকে। একের ওপর আরেকটা রং বুনে বুনে যেন মোহনীয় রঙের জাল তৈরি করে।
পঞ্চাশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সময় সাদা-কালো পোর্ট্রেট করেছিলেন তিনি বেশ কিছু। পরিচিতজন, সহপাঠিনীদের বিষণ্ন মুখ। এই পোর্ট্রেটগুলো দেখা হয়নি আমাদের। নওয়াজেশের অন্তরঙ্গ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা বলেছেন, প্রকৃতি ও ভিনদেশি মানুষের মুখ তিনি আলাদা কিছু ভাবেননি। মানুষের মুখের যে অবয়ব তিনি নির্মাণ করেছেন তাঁর পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফিতে, তা কেবল রহস্যময় নয়, বনলতা সেনদের মতো স্বপ্নময়।
লিখেছেন বিস্তর। আমাদের জানিয়েছেন বিচিত্র বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতার আর্কাইভ থেকে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাতটি। একসময় নওয়াজেশ গল্প লিখতেন, ছোটগল্প। গল্পগুলো বাংলার প্রকৃতির মতো নির্ভেজাল, ছায়াময়, কিন্তু একা। রং ফেলে তিনি বর্ণময় করেছেন নিজের লেখাকেও। তাঁর গল্পগুলো আর আলোকচিত্রকে আলাদা রাখা যায় না। ক্যামেরা ও কলমে সমান সচল সদ্যপ্রয়াত আন্তর্জাতিক মানের এই শিল্পী, এঁকেছেন-লিখেছেন কত ছবি, কত মুখ। তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ক রচনা বা প্রবন্ধ অনেক। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ জার্নালে সেগুলো প্রকাশিত হয়েছে, এ খবর আমরা রাখিনি। ব্যক্তিজীবনে নিজের লেখালেখি সম্পর্কে খুব বেশি আলোচনা করতেন না তিনি। সম্ভবত সে কারণেও তাঁর লেখালেখির মেজাজটা আমাদের অজানা। দুরূহ বিষয়ের ওপর তোলা তাঁর আলোকচিত্রণের কাজের ভবিষ্যত্ নিয়ে ওয়াকিবহাল থাকতে চাইতেন ঘনিষ্ঠজনদের কাছে। মেনে নিতেন তাঁদের পরামর্শ। তরুণ আলোকচিত্রীদের কাজ সম্পর্কে তাঁর আগ্রহের সীমানা ছিল বিস্তৃত।
সম্পূর্ণ এক নতুন ঘরানা নির্মাণ করেছিলেন আমাদের নওয়াজেশ আহমদ। সবার মধ্যে থেকে ছিলেন একেবারেই আলাদা। মাত্র এক মাস আগে ক্যানন জি-১০ ক্যামেরা কিনে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন ডিজিটাল ফটোগ্রাফিতে। বলেছিলেন, অনেক কাজ তাঁর করা হয়নি। এই ক্যামেরাটি দিয়ে নতুন ধরনের আরও অনেক আলোকচিত্র ধারণ করবেন। নিরহংকার নওয়াজেশ আহমদ আমাদের যা উপহার দিয়েছেন, আমরা পেয়েছি অনেক। আলোকচিত্রে তিনি আমাদের বিচিত্র সব রং চিনিয়েছেন। তাঁকে ভুলে থাকা অসম্ভব।
 নাসির আলী মামুন: আলোকচিত্রী।

গাড়ির দুর্ঘটনা ও হার্ট অ্যাটাক -ঘড়ির কাঁটা by ফরিদা আখতার

এ বছরের জুন মাসে যখন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা এগিয়ে নেওয়া হলো, তখন এ ব্যবস্থা বিশ্বের কত দেশে চালু আছে তা নিয়ে বেশ যুক্তি দেখানো হয়েছিল। কথাটা মিথ্যাও নয়। শুধু পার্থক্য এই যে যেসব দেশ ঘড়ির কাঁটা আগে-পিছে করেছে, সেখানে শীত ও গরমকালে সময়ের ব্যবধান অনেক বেশি। গরমকালে কোথাও সূর্য ডোবে রাত ১০টায় আর শীতকালে সূর্য ওঠে সকাল ১০টায়। অনেকটা এ রকমই। উত্তর মেরুর দেশে তো কথাই নেই। জুন মাসে সূর্য ডোবে আর ওঠে, অর্থাত্ রাত বলতেই নেই, আর ডিসেম্বর মাসে সূর্য উঠেই ডুবে যায়, অর্থাত্ দিন বলতে কিছু নেই। আমাদের দেশে গরম আর শীতকালের সময়ের ব্যবধান সে রকম নয়। ভূগোলে বড় ভালো অবস্থানে আছি আমরা। কিন্তু সেটাও আমাদের সইছে না। আমাদেরও উত্তর ও পশ্চিমের দেশের মতোই আচরণ করতে হবে। এটাই কি ডিজিটাল?
যা হোক, ধরে নিলাম, সরকার যা করেছে, বিদ্যুত্ সাশ্রয়ের জন্য আন্তরিকভাবেই চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করা তো দোষের কিছু নয়। কিন্তু সেই চেষ্টায় যদি কোনো ফল না হয় এবং যদি এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষের, তখন তো একটু নড়েচড়ে বসা লাগে। জনগণ এখন তিক্ত-বিরক্ত হয়ে প্রতিদিন পত্রিকায় তাদের মতামত দিচ্ছে। একটি পত্রিকায় নয়, বেশ কয়েকটি পত্রিকায়। কিন্তু সরকার বলে দিয়েছে, ঘড়ির কাঁটা আবার ফিরিয়ে নেওয়ার নাকি কোনো পরিকল্পনাই নেই। কী জ্বালা! এখন তো দেখছি চেষ্টা নয়, এখন সরকার জেদ করছে। ব্যাপারটা মনে হচ্ছে সরকার ভাবছে, ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিলে যদি বিফলতা স্বীকার করা হয়ে যায়! তাই সেটা আর পেছানো যাবে না। এদিকে সূর্য তো আর সরকারের কথায় ওঠেও না, বসেও না। সে তার সময়মতো উঠছে আর সেটা সরকারের নির্ধারিত ঘড়ির সময়ে হয়ে যাচ্ছে সকাল সাতটা পাঁচ মিনিট। অর্থাত্ সূর্য উঠতে না উঠতেই সবার ছুটতে হয় কাজের উদ্দেশ্যে।
এত ভূমিকা দিচ্ছি ঘড়ির কাঁটা পেছানোর জন্য আরও একটু তদবির করার জন্য শুধু নয়। সেটা তো এখন সবাই বলছে, এখন সরকারের দয়া হলে সবার দাবির প্রতি নজর দেবে। সে কামনাই করি। কিন্তু আজ আমি লিখতে বসেছি ঘড়ির কাঁটা আগে-পিছে করার সঙ্গে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক আছে, এমন গবেষণার খবর পেয়ে তা পাঠকের কাছে তুলে ধরার জন্য। কিছুদিন আগে পেশাগত কাজে কানাডার টরন্টোতে গিয়েছিলাম। সেখানে গরমকালে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নিলেও শীতের সময় আসতেই তা পিছিয়ে নেওয়া হয়। টরন্টোতে নভেম্বরের ১ তারিখ থেকে শীতকালীন সময় অনুযায়ী ঘড়ির কাঁটা আবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। টেলিভিশনের খবরে দেখলাম আবহাওয়ার খবর বলার সময় ঘড়ির কাঁটা আগানো ও পেছানো সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে সুইডেনের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়। মন্তব্য করা হয় যে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নেওয়ার সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। ইন্টারনেট থেকে সেই গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করে দেখলাম, এই গবেষণার ফলাফল ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশ করা হয়েছিল, কিন্তু সম্প্রতি The New England Journal of Medicine এই গবেষণাটি প্রকাশ করেছে। সুইডেনের Karolinska Institute-এর Dr. Imre Janszky এবং সুইডেনের National Board of Health and Welfare-এর Dr. Riokard ১৯৮৭ সাল থেকে সংগৃহীত রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, বসন্তকালে অর্থাত্ মার্চ মাসে ডে লাইট সেভিং টাইমের জন্য ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দিলে সপ্তাহের প্রথম তিন দিন (সোমবার বা প্রথম কর্মদিবস থেকে তিন দিন) হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি পাঁচ শতাংশ বেড়ে যায়। আবার হেমন্তকালে (নভেম্বর মাসে) সোমবারে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা একটু কমে আসে। গবেষকদ্বয় বলেছেন, ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দিলে এক ঘণ্টা কম ঘুম হওয়ার কারণে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে, আবার ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে নিলে এক ঘণ্টা বেশি চোখ বন্ধ রাখার সুযোগ তাঁদের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। New England Journal of Medicine-এর কাছে চিঠি লিখে এই দুই গবেষক বলেছেন, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ানোর জন্য আসল ‘কালপ্রিট’ হচ্ছে এক ঘণ্টা ঘুম কম হওয়া। তাঁদের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এ ঝুঁকির মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি পড়ছেন। বয়সের দিক থেকে দেখা গেছে, ৬৫ বছর বয়সের নিচে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরাই এই ঝুঁকির শিকার হচ্ছেন। অর্থাত্ যাঁরা কর্মক্ষম এবং কাজের জন্য যাঁদের নির্দিষ্ট সময় বাইরে যেতে হয়, তাঁদের ঘুম কম হওয়ার সঙ্গে হার্ট অ্যাটাকের ব্যাপার জড়িত আছে। অবসর নিয়েছেন এমন মানুষ এই বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ছেন না। বর্তমানে যেসব দেশে এই ডে লাইট সেভিং টাইম মেনে চলা হচ্ছে, সেখানে মানুষের সংখ্যা হচ্ছে ১৫০ কোটি। তার মানে, কোটি কোটি মানুষ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারেন।
ঘুমের ব্যাঘাত মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে, এমন শিরোনামে U. S. National Commission on Sleep Disorders-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৮৮ সালে ২৪ হাজার ৩১৮টি গাড়ির দুর্ঘটনা ঘটেছে ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে গাড়ি চালানোর কারণে। নিদ্রাহীনতার কারণে কর্মক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ দুর্ঘটনার ফলে ১৩ মিলিয়ন কর্মদিবসের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া পরোক্ষ কারণে এই সংখ্যা আরও অনেক বড়। নিদ্রাহীনতা অনেক কারণে ঘটছে; তার মধ্যে যুক্ত হয়েছে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নেওয়া। কানাডার ট্রাফিক অ্যাকসিডেন্ট রেকর্ড থেকে দেখা গেছে, বসন্তকালে যখন ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নেওয়া হয় সোমবার ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্টের হার সাত শতাংশ বেড়ে যায়। আবার হেমন্তকালে ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে নিলে এই হার কমে আসে। আমেরিকার আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডেট্রয়েটে মাসে গড়ে ৮৪০টি গাড়ির দুর্ঘটনা ঘটে, কিন্তু ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দেওয়ার পর প্রথম সপ্তাহের প্রথম দিন (সোমবার) দুর্ঘটনার সংখ্যা এক হাজার ৩৯৭, অর্থাত্ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আর বিদ্যুত্ খরচের বিষয়টিও গবেষণায় দেখা গেছে, ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে নেওয়ার ফলে বাসায় বিদ্যুতের ব্যবহার এক শতাংশ বেড়ে গেছে। কাজেই বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে এই যুক্তিও খাটে না।
দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে এই গবেষণাগুলো করা হয়নি, করলে হয়তো বা একই রকম ফলাফল আসবে। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা শুনলেই তো মনে হয়, এ সমস্যাগুলো এখানেও প্রকটভাবে দেখা দিচ্ছে। এবার কি তাহলে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করতে পারি যে আর কোনো যুক্তিতে না হোক, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও গাড়ি দুর্ঘটনার কথা বিবেচনা করে ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দেওয়া হোক। আমাদের মন্ত্রীদের গাড়িও তো এই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
 ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী।