Saturday, July 19, 2025

সিরিয়ায় ইসরায়েলি হামলা: ইসলামপন্থী শারার সরকারের জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ

সিরিয়ায় আবারও প্রাণঘাতী গোষ্ঠীগত সহিংসতার ঢেউ শুরু হয়েছে, যা দেশটির ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এমন একসময়ে এসব সংঘাত ঘটছে, যখন নতুন সরকার বিভক্ত দেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।

গত রোববার (১৩ জুলাই) দ্রুজ সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের খবর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দক্ষিণ সিরিয়ায় দ্রুজ মিলিশিয়া ও সুন্নি বেদুইন যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এটি এখনো চলছে।

এরই মধ্যে গত মঙ্গলবার ইসরায়েল সিরিয়ায় হামলা চালায়। যদিও আগে থেকেই তারা দেশটিতে মাঝেমধ্যে হামলা চালিয়ে আসছিল। ইসরায়েল দাবি করেছে, তারা দ্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে ও সিরিয়ার সরকারপন্থী বাহিনীকে দমন করতে এ হামলা চালিয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, সিরিয়ার সরকারপন্থী বাহিনীগুলো দক্ষিণাঞ্চলের সুয়েইদা প্রদেশে দ্রুজদের ওপর হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস (এসওএইচআর) বলেছে, গত রোববার থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষে শুধু সুয়েইদাতেই গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত ৩৫০ জন নিহত হয়েছেন।

সুয়েইদা প্রদেশে গত এপ্রিল ও মে মাসে প্রথমবারের মতো রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়। তখন দ্রুজ যোদ্ধাদের সঙ্গে সিরিয়ার নতুন নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাতে ৩০ থেকে ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর দ্রুজ সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশটিতে এটাই দ্বিতীয় বড় সংঘাত।

গত মার্চে সিরিয়ার উপকূলীয় প্রদেশগুলোতেও ভয়াবহ সংঘাত হয়। সেই সংঘাতে শত শত আলাউতি সম্প্রদায়ের মানুষ নিহত হন। দেশটির ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এ সম্প্রদায়ের একজন সদস্য।

ভয়াবহ সহিংসতা ও ইসরায়েলের তীব্র হামলার কারণে সিরিয়ায় নতুন সরকারের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ার নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এক দশকের বেশি সময়ের গৃহযুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতে ও ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের ক্ষমতা দখলের মধ্যেই এ আশঙ্কা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। দেশটির অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট ও সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) নেতা আহমেদ আল-শারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

দ্রুজ কারা

দ্রুজরা আরবিভাষী একটি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। সিরিয়া, লেবানন, ইসরায়েল ও অধিকৃত গোলান মালভূমিতে এ সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। দ্রুজরা শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি শাখা। তবে তাদের পরিচয় ও ধর্মবিশ্বাসে ভিন্নতা রয়েছে।

দ্রুজ জনগোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। তাদের প্রায় অর্ধেকই বসবাস করে সিরিয়ায়। সেই হিসেবে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ দ্রুজ।

ইসরায়েলে দ্রুজদের রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত হিসেবে ধরা হয়। ফলে তারা দেশটির সেনাবাহিনীতেও যোগ দিতে পারে। ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল ও অধিকৃত গোলান মালভূমিতে প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার দ্রুজ বাস করে।

ঐতিহাসিকভাবে সিরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দ্রুজদের সব সময় একটি অনিশ্চিত অবস্থানে থাকতে হয়েছে। প্রায় ১৪ বছরব্যাপী চলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে দক্ষিণ সিরিয়ায় দ্রুজরা নিজেদের মিলিশিয়া বাহিনী পরিচালনা করেছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে বাশারের ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে দেশটির নতুন সরকার দক্ষিণ সিরিয়ায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু দ্রুজরা সেটার বিরোধিতা করছে। নতুন সরকারের প্রতি দ্রুজ নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি বিভক্ত। নেতাদের একটি অংশ নতুন সরকারের বিষয়ে সতর্ক। অন্যরা নতুন সরকারের কর্তৃত্বের সরাসরি বিরোধী।

তবে উভয় পক্ষের একটি বড় অংশই সুয়েইদা প্রদেশে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরিবর্তে স্থানীয় মিলিশিয়ার ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে।

আল-শারার নেতৃত্বাধীন সরকার দ্রুজ সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানিয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ সিরিয়ায় আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সরকারি বাহিনীও জনগোষ্ঠীটির ওপর হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এসওএইচআরের প্রতিবেদনে সরকারি বাহিনী দ্রুজদের ‘নির্বিচারে হত্যা’ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ধরনের প্রতিবেদনের কারণে দ্রুজদের অনেকের মধ্যে দামেস্কের কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস বেড়েছে।

এদিকে বাশারের পতনের পর থেকে ইসরায়েল নিজেদের উত্তর সীমান্তের কাছে বসবাসকারী দ্রুজ সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এটি সিরিয়ার সংখ্যালঘুদের সঙ্গে দেশটির মিত্রতা গড়ার দীর্ঘদিনের চেষ্টারই অংশ। ইসরায়েল নিজেকে সিরিয়ার কুর্দি, দ্রুজ ও আলাউতি সংখ্যালঘুদের ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করে থাকে। তাদের সহায়তার অজুহাতে দেশটির সামরিক ঘাঁটিসহ সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে তেল আবিব।

মে মাসের গোষ্ঠীগত সংঘর্ষের সময় ইসরায়েল দামেস্কের প্রেসিডেন্টের প্রাসাদের কাছাকাছি বিমান হামলা চালিয়েছিল। তখন বলেছিল, এটি দ্রুজদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে একটি সতর্কবার্তা। কিন্তু সিরিয়া ও লেবাননের কিছু দ্রুজ নেতা ইসরায়েলের এ হামলার বিরোধিতা করেন। তাঁদের অভিযোগ, এ অঞ্চলে নিজের সম্প্রসারণবাদী আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই গোষ্ঠীগত বিভাজন বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইসরায়েল।

ইসরায়েল কেন হামলা চালাচ্ছে

মূলত একটি সতর্কবার্তা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে সিরিয়ায় সাম্প্রতিক বিমান হামলাগুলো চালিয়েছে ইসরায়েল—এমনটাই বলছে তেল আবিব। উদ্দেশ্য, সিরিয়ার সেনাবাহিনী যাতে দক্ষিণাঞ্চলে মোতায়েন করা না হয়। এ এলাকায় ইসরায়েল একটি বেসামরিক অঞ্চল গড়ে তুলতে চায়।

ইসরায়েলের উদ্বেগ, সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে দেশটির বর্তমান সরকারের অনুগত যোদ্ধারা অবস্থান নিতে পারেন। এখান থেকে ইসরায়েল অধিকৃত গোলান মালভূমির দূরত্ব বেশি দূরে নয়। তাই নিজেদের উত্তর সীমান্তের এ অঞ্চলে শারা সরকারের অনুগত যোদ্ধাদের উপস্থিতি নিয়েই তাদের যত মাথাব্যথা।

ইসরায়েলের গত ১৫ জুলাইয়ের বিমান হামলা সুয়েইদা প্রদেশে সিরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী ও সামরিক যানবাহনে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৬ জুলাই হামলার পরিসর বাড়ানো হয়। এদিন রাজধানী দামেস্কে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সেনা সদর দপ্তর ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের আশপাশে হামলা চালায় ইসরায়েল। সিরিয়া ও দেশটির কিছু মিত্রদেশ এসব হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

১৬ জুলাইয়ের হামলাগুলো ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে দেশটিতে চালানো হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। গত ডিসেম্বরে বাশার উচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে দেশটির বিভিন্ন স্থানে ছয় শতাধিক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইতিমধ্যে গোলান মালভূমির জাতিসংঘ-নিয়ন্ত্রিত একটি বাফার জোনে (নিরপেক্ষ অঞ্চল) সেনা পাঠায় সিরিয়া।

১৬ জুলাই দামেস্কে বিমান হামলা শুরুর পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ লেখেন, ‘দামেস্কের প্রতি সতর্কবার্তা শেষ হয়েছে। এখন যন্ত্রণাদায়ক আঘাত শুরু হবে।’

সিরিয়ার সামরিক সদর দপ্তরে হামলার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করেছে দেশটির শীর্ষস্থানীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেল। চ্যানেলটির স্টুডিও ওই ভবনের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত। সম্প্রচারের দেখা যায়, হামলার কারণে উপস্থাপক স্টুডিও ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।

১৬ জুলাই হামলার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সহিংসতা নিয়ে ‘অত্যন্ত উদ্বিগ্ন’। ওই দিনই তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমরা এমন কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপের বিষয়ে সম্মত হয়েছি, যা আজ রাতেই এ ভয়াবহ ও দুঃখজনক পরিস্থিতির অবসান ঘটাবে।’

লেবানন, ইরাক, কাতার, জর্ডান, মিসর, কুয়েতসহ একাধিক আরব রাষ্ট্র ১৬ জুলাই সিরিয়ার সরকারি ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ হামলাকে ‘ইসরায়েলের সুস্পষ্ট আগ্রাসন’ উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে। ইরানও এ হামলার নিন্দা জানিয়ে মন্তব্য করেছে।

বাশারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তুরস্কও ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধের পর সিরিয়ার পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা ইসরায়েল নস্যাৎ করতে চাইছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সিরিয়ার জনগণের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস ও আন্তর্জাতিক সমাজে একীভূত হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। সব পক্ষের উচিত সিরিয়ার সরকারের শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে সহায়তা করা।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও সুয়েইদা ও দামেস্কে ইসরায়েলের উসকানিমূলক হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

সামনে কী অপেক্ষা করছে


সিরিয়ার চলমান গোষ্ঠীগত সহিংসতা দেশটির গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থার নাজুক পরিস্থিতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। সাম্প্রতিক এসব সংঘাতের কারণে দেশটিতে আবার গোষ্ঠীগত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট শারা পুরো সিরিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। তাঁর সরকারে ইসলামের বিভিন্ন আইনকানুন বিষয়ে কঠোর মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিদের আধিপত্য রয়েছে। তাই প্রশ্ন হলো, এ সরকার কি প্রায় ১৪ বছরের গৃহযুদ্ধে গভীরভাবে বিভক্ত দেশটির গোষ্ঠীগত বিভক্তি মেটাতে পারবে? কারণ, গোষ্ঠীগত সংঘাতের পাশাপাশি ইসরায়েলের উপর্যুপরি হামলা শারার রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও যুদ্ধ-পরবর্তী সম্প্রীতি স্থাপনের প্রয়াসকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।

ইসরায়েল আপাতত দামেস্কের বর্তমান শাসক ও দক্ষিণ সিরিয়ায় তাঁর সহযোগী যোদ্ধাদের সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবেই দেখবে বলে মনে হচ্ছে। তাই তারা দেশটির এমন গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করবে, যারা নতুন সরকার থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন বলে মনে করে।

ইসরায়েলি হামলায় আহত এক ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সিরিয়ার সুয়েইদা শহরে, ১৮ জুলাই ২০২৫
ইসরায়েলি হামলায় আহত এক ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সিরিয়ার সুয়েইদা শহরে, ১৮ জুলাই ২০২৫ ছবি: এএফপি

‘ট্রাম্প ডকট্রিন’ নয় ইরানের ৩টি কৌশলই সফল তাহলে by মেলানি ডব্লিউ সিসন

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যে হামলা চালিয়েছেন, তা ছিল তাঁর ‘ট্রাম্প ডকট্রিন’-এর একটি সফল উদাহরণ।

ভ্যান্সের মতে, এই নীতির মূলকথা হলো—যে সমস্যাটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি, তা আগে কূটনৈতিকভাবে সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে। যদি কূটনীতি কাজ না করে, তাহলে ‘তীব্র সামরিক শক্তি’ ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং তারপর দ্রুত এলাকা ত্যাগ করতে হবে, যাতে তা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে পরিণত না হয়।

কিন্তু বিষয়টা আসলে এত সোজা নয়। ভ্যান্স যেটাকে ‘ডকট্রিন’ বা ‘নীতি’ বলছেন, তা আসলে নতুন কিছু নয়। এটি বরং এমন একধরনের কল্পনাপ্রসূত চিন্তা, যা অতীতে বহু ব্যর্থ, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘস্থায়ী মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের জন্ম দিয়েছে। ভ্যান্স নিজেও সেসব হস্তক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন।

যদি ভ্যান্স মনে করেন, এই হামলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সমস্যাকে ‘সমাধান’ করেছে, তাহলে তার মানে দাঁড়াবে, তিনি বিশ্বাস করেন—এই হামলায় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, ভ্যান্স বিশ্বাস করছেন, ইরানের সেন্ট্রিফিউজ, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং অস্ত্র তৈরির জন্য ব্যবহৃত অন্যান্য উপকরণ সব ধ্বংস হয়ে গেছে। অথবা তিনি হয়তো ভাবছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই শক্তি প্রদর্শন ইরানকে এতটাই ভীত করেছে যে তারা ভবিষ্যতে আর পারমাণবিক কর্মসূচি চালাবে না।

এটা ঠিক যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের ফর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনাগুলো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবে এই হামলা এবং ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা ইরানের পুরো কর্মসূচিকে একেবারে বন্ধ করে দিতে পেরেছে কি না, তা এখনো পর্যন্ত পরিষ্কার নয়। বরং মনে হচ্ছে ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা কিছুটা সময়ের জন্য থমকে গেছে। এই থমকে থাকার সময়সীমা মাস কয়েক থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে—যতক্ষণ পর্যন্ত এ কথা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না বা এর সপক্ষে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত ভ্যান্সের বক্তব্য শুধু একটাই বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে; আর সেটি হলো, ‘আমেরিকা এখন আবার আগের মতো ভয় দেখাতে পারছে।’

ট্রাম্প প্রশাসনই প্রথম নয়, যারা মনে করেছিল, অল্প সময়ের জন্য শক্তি প্রদর্শন করে অন্য দেশগুলোকে ভয় দেখানো বা যুক্তরাষ্ট্রের কথা মানাতে বাধ্য করা যায়। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন থেকে তারা বহুবার এ ধরনের চেষ্টা করেছে। তবে তার অনেকগুলোই ব্যর্থ হয়েছে।

বেশ কয়েকটি দেশের নেতারা যুক্তরাষ্ট্র যতটা আশা করেছিল, তার চেয়েও বেশি কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত ছিলেন। যেমন ১৯৯০-এর দশকে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বহুবার জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার অস্ত্র পরিদর্শন কার্যক্রমে বাধা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বিমান হামলার মুখে পড়েন। এই হামলাগুলো সত্ত্বেও তিনি দমেননি। শেষমেশ ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘শক অ্যান্ড অও’ নামের এক বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই অভিযান আট বছরের দীর্ঘ এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সূচনা করে। এতে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা ও প্রায় পাঁচ লাখ ইরাকির মৃত্যু হয়।

একইভাবে ১৯৯০-এর দশকে ন্যাটোও বিভিন্ন হুমকি, অবরোধ ও শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচকে ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া ও কসোভোয় যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই দমে যাননি। বিশেষ করে কসোভোয় শুরুতে শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ বিমান হামলা মিলোসেভিচকে থামাতে পারেনি।

এই হামলা কয়েক দিনে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা মাসের পর মাস চলেছে এবং তা চলেছে কোনো সফলতা ছাড়াই। শেষমেশ যখন ন্যাটো সার্বিয়ার রাজধানী বেলগ্রেড ও আশপাশের অবকাঠামোয় হামলা শুরু করে (যেটা সরাসরি সার্ব রাজনৈতিক অভিজাতদের স্বার্থে আঘাত হানে), তখন মিলোসেভিচ কসোভো থেকে সরে আসতে রাজি হন।

আরও কিছু দেশ আছে, যারা প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতিস্বীকারের ভান করে, কিন্তু কিছুদিন পর আবার আগের আচরণে ফিরে যায়। উত্তর কোরিয়া এমন এক দেশ। তারা বহুবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মুখে পিছু হটলেও পরে আবার পারমাণবিক হুমকি দেয়, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়, কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে এবং নানা উসকানিমূলক কাজ করে।

চীনের আচরণও প্রায় একই রকম। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক বড় সামরিক মহড়ার কারণে চীন ফিলিপাইনের আশপাশে দ্বীপ নির্মাণ ও দাবি কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখে। কিন্তু কয়েক মাস আগেই চীনের কোস্টগার্ড এমন এক দ্বীপে নেমেছে, যেটিকে ফিলিপাইন নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।

এসব উদাহরণ থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র যতই শক্তি দেখাক, অনেক সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় কিছু লাভ হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা সব সময় কার্যকর হয় না। আর কিছু দেশ মার্কিনদের ক্ষতিও করে বসে। যেমন সোমালিয়ার মোহাম্মদ ফারাহ আইদিদ কিছু মার্কিন সেনাকে হত্যা করে দেখিয়েছেন যে শক্তিশালী মার্কিন সেনাও বেকায়দায় পড়লে পিছিয়ে যায়।

ইরান এই তিনটি কৌশলই ব্যবহার করছে। তারা অর্থনৈতিক ও সামরিক আঘাত সামলাতে পারে। কখনো তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, কখনো নিজের মতো। ইরান বিশেষজ্ঞ ভালি নাসরের মতে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি একবার বলেছিলেন, ‘আমেরিকা একটা কুকুরের মতো, তুমি যদি পিছিয়ে যাও, ও আক্রমণ করবে; আর তুমি যদি সামনে এগিয়ে যাও, তাহলে ও পিছিয়ে যাবে।’

ভ্যান্স যদি বিশ্বাস করেন, শুধু শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই কঠিন রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন সম্ভব (যেমন ইরানকে চিরতরে পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল), তাহলে তা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কারণ, যদি শুধু ভয় দেখিয়ে এমন লক্ষ্যে পৌঁছানো যেত, তাহলে সেটা সব প্রেসিডেন্টেরই নীতির অংশ হতো।

* মেলানি ডব্লিউ সিসন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি প্রোগ্রামের সিনিয়র ফেলো
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্স
হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জেডি ভ্যান্স। ছবি: রয়টার্স

যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইসরায়েল, দীর্ঘসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত জানাল হামাস

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের সামরিক শাখার মুখপাত্র আবু উবাইদা বলেছেন, সব জিম্মির মুক্তির বিনিময়ে দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবটি ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করেছে। উবাইদা আরও বলেছেন, কোনো চুক্তি না হলে হামাস দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে।

প্রায় ২০ মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় কাসাম ব্রিগেডের দীর্ঘদিনের মুখপাত্র উবাইদা এ কথা বলেছেন। আগে থেকে রেকর্ড করা ভিডিওটি গতকাল প্রকাশ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় হামাস একটি ‘পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব’ দিয়েছে। সেখানে তারা সব জিম্মিকে একসঙ্গে মুক্তি দেওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রীরা তা নাকচ করে দেন।

উবাইদা বলেন, ‘এটা এখন আমাদের কাছে পরিষ্কার, অপরাধী নেতানিয়াহুর সরকার বন্দীদের ব্যাপারে মোটেই আন্তরিক নয়। কারণ, তারা সবাই সেনাসদস্য।’ তিনি আরও বলেন, হামাস এমন একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির পক্ষে যার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটবে, ইসরায়েলি বাহিনীকে গাজা থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে এবং অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রবেশের নিশ্চয়তা থাকবে।

কাতারে চলমান পরোক্ষ আলোচনা থেকে ইসরায়েল যদি আবারও সরে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো আংশিক চুক্তির সম্ভাবনা থাকবে না বলেও হুঁশিয়ার করেছেন উবাইদা। এর মধ্যে ৬০ দিনের একটি প্রস্তাবিত চুক্তিও আছে, যার আওতায় ১০ জন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া কথা।

গাজা উপত্যকায় হামাসের কাছে এখনো ৫০ জন জিম্মি আছেন। এর মধ্যে প্রায় ২০ জন এখন জীবিত আছেন বলে ধারণা করা হয়।

এদিকে শুক্রবার হোয়াইট হাউসে আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে নৈশভোজের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, গাজা থেকে আরও ১০ জন বন্দী খুব শিগগির মুক্তি পাচ্ছেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা বেশির ভাগ বন্দীকে ফিরিয়ে এনেছি। খুব তাড়াতাড়ি আরও ১০ জন ফিরবেন। আর আমরা আশা করছি, পুরো বিষয়টা দ্রুতই শেষ হবে।’ তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি।

কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প বলে আসছেন, যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিদের মুক্তিসংক্রান্ত একটি চুক্তি অনিবার্য। যদিও এখনো পর্যন্ত তা বাস্তব হয়নি।

মার্চের শুরু থেকে এই প্রথম ভিডিও বার্তা দিয়েছেন উবাইদা। ভিডিওতে তিনি বলেন, হামাস যোদ্ধারা দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত আছেন। তাঁরা গাজাজুড়ে ইসরায়েলি সেনাদের হত্যা বা আটক করার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়ে যাবেন।

আরব ও ইসলামি দেশগুলোর নেতাদেরও কঠোর সমালোচনা করেছেন আবু উবাইদা। ইসরায়েলের ‘গণহত্যা’ নিয়ে আরব দেশগুলোর নীরব ভূমিকাকে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

হামাসের সামরিক শাখার মুখপাত্র আবু উবাইদা
হামাসের সামরিক শাখার মুখপাত্র আবু উবাইদা। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে

ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসরাইলের পাবলিক ব্রডকাস্টার ক্যান, জাচি আদেগাতি বলেছেন, দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ১০ ইসরাইলি সেনা আত্মহত্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, অনেক হয়েছে! সড়কে অনেক প্রবীণ সেনাকে দেখা যায়। তবে চারপাশের আমলাতন্ত্রের কারণে তাদের কাছে পর্যাপ্ত সাহায্য পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

আরও বলেছেন, কখনো কখনো ওই সব প্রবীণ যোদ্ধাদের কাছে ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করার মতো সময় থাকে না। অনেকে সরকারের কাছ থেকে চিকিৎসাসেবার অপেক্ষায় থাকার পর তা না পেয়ে আত্মহত্যা করেন। এ সপ্তাহের শুরুতে টাইমস অব ইসরাইলের তরফে বলা হয়েছে, ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে প্রশিক্ষণে থাকা অবস্থায় আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে এক সেনা। এতে সে গুরুতরভাবে আহত হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে ইসরাইলি সামরিক জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ২৮ সেনা আত্মহত্যা করেছে।

এদিকে ২৪ ঘণ্টায় আরও কমপক্ষে ৫৬ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। এছাড়া গাজার একটি ক্যাথলিক চার্চে ইসরাইলি হামলায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত ১০। চার্চে হামলার ফলে বিশ্বজুড়ে চলছে নিন্দার ঝড়। এদিকে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দ্রুজ ও বেদুইন যোদ্ধাদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সুয়াইদা প্রদেশে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। সূত্র: আল জাজিরা 

mzamin

গাজায় হাজার হাজার বেসামরিক ভবন নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ইসরাইল

এ ধ্বংসযজ্ঞের বড় অংশই পরিকল্পিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছে। শুধু ক্ষতিগ্রস্ত ভবন নয়, অক্ষত ভবনও এর মধ্যে রয়েছে। যাচাই করা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ইসরাইলি বাহিনী টাওয়ার ব্লক, স্কুল এবং অন্যান্য অবকাঠামোয় নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ চালাচ্ছে, যার ফলে ধুলা ও ধ্বংসাবশেষে চারদিক ঢেকে যাচ্ছে। বিবিসি ভেরিফাইকে একাধিক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, ইসরাইল এই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে বিবেচিত হতে পারে, যা অধিকৃত কোনো অঞ্চলের অবকাঠামো ধ্বংসকে নিষিদ্ধ করে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, তারা আন্তর্জাতিক আইনের সীমার মধ্যে থেকেই কাজ করছে এবং হামাস বেসামরিক এলাকায় ‘সামরিক অবকাঠামো’ লুকিয়ে রেখেছে। আইডিএফ বলেছে, কোনো সম্পত্তি ধ্বংস তখনই করা হয়, যখন তা সামরিক প্রয়োজনে অপরিহার্য।

রাফায় ধ্বংসের চিত্র
মিশর সীমান্তঘেঁষা রাফা শহরে ধ্বংসযজ্ঞ সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে ইসরাইলি বাহিনী ও তাদের ঠিকাদাররা শহরের বড় অংশ ধ্বংস করে ফেলেছে। শিক্ষাবিদ কোরি শার ও জামন ভ্যান ডেন হুকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এপ্রিলের পর থেকে গাজায় সবচেয়ে বেশি ধ্বংস হয়েছে রাফা অঞ্চলেই। বিস্ফোরক, এক্সকাভেটর ও বুলডোজার দিয়ে এলাকা সমান করে ফেলা হয়েছে। জুলাই মাসে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরাইল কাটজ ঘোষণা দেন, রাফার ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি ‘মানবিক শহর’ গড়ে তোলা হবে, যেখানে প্রাথমিকভাবে ৬ লাখ ফিলিস্তিনিকে আটকে রাখা হবে। এই পরিকল্পনা ব্যাপক নিন্দা কুড়িয়েছে। ইসরাইলি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট বিবিসিকে বলেন, এই প্রস্তাব ‘একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মতো’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

স্কুল, হাসপাতাল, মসজিদ ধ্বংস
বিবিসি ভেরিফাই মার্চের পর থেকে গাজায় ৪০টির বেশি জায়গায় অবকাঠামো ধ্বংসের ভিডিও শনাক্ত করেছে। তেল আল-সুলতান এলাকার একটি স্কুলসহ অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন এবং পৌরসভা ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। রাফার এই প্রাণবন্ত পাড়া একমাত্র বিশেষায়িত মাতৃসদন হাসপাতাল এবং এতিম শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য পরিচিত ছিল। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, এই এলাকা আগেই বোমাবর্ষণ ও গোলাবর্ষণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবু অনেক ভবন টিকে ছিল। কিন্তু ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে ধ্বংসের মাত্রা বাড়ে, এমনকি খোলস রূপে থাকা ভবনগুলোকেও ধ্বংস করে ফেলা হয়। সৌদি পাড়া, যেখানে রাফার সবচেয়ে বড় মসজিদ ও অনেক স্কুল ছিল, সেখানেও ধ্বংসযজ্ঞ চলছে।

সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গভীর অভ্যন্তরে ধ্বংস

ইসরাইলি বাহিনী কেবল সীমান্তবর্তী এলাকাই নয়, গাজার গভীরেও ভবন ধ্বংস করছে। খুজা’আ নামের একটি কৃষিপ্রধান শহর, যা ইসরাইল সীমান্ত থেকে ১.৫ কিমি দূরে, সেটিও প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। যুদ্ধের আগে সেখানে প্রায় ১১,০০০ মানুষের বসবাস ছিল। আইডিএফ দাবি করেছে, তারা সেখানে ১২০০ ভবন ধ্বংস করেছে, যেগুলো হামাসের অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল। পাশের শহর আবাসান আল-কবিরাতেও (যেখানে প্রায় ২৭,০০০ মানুষ বাস করত) ব্যাপক ধ্বংস হয়েছে। ৩১ মে এবং ৮ জুলাইয়ের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, মাত্র ৩৮ দিনে বিশাল এলাকা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে।

মানবিক শহর না দখল?
গাজার পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চলকে পৃথক করতে তৈরি করা হয়েছে নিরাপত্তা করিডোর, যার দু’পাশে ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ইসরাইল হয়তো ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চায় এই ধ্বংসের মাধ্যমেÑ নিরাপত্তা অঞ্চল গড়ে তুলে। কেউ কেউ মনে করছেন, রাফায় যে কথিত মানবিক শহর গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য এইভাবে এলাকা পরিষ্কার করা হচ্ছে। আবার কেউ কেউ বলেন, ইসরাইল এই ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের গাজা ছেড়ে চলে যেতে প্রলুব্ধ করতে চাইছে। জেরুজালেম ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির প্রেসিডেন্ট এফরাইম ইনবার বলেন, এই ধ্বংস মানুষের মনে দেশ ছেড়ে যাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা তৈরি করতে পারে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এর আগে এমপিদের এক বৈঠকে বলেছেন, আমরা আরও ঘরবাড়ি ধ্বংস করছি Ñ যাতে ফিলিস্তিনিদের আর ফিরে যাওয়ার কিছু না থাকে।

গাজাবাসীর হৃদয়বিদারক বাস্তবতা
তেল আল-সুলতানের বাসিন্দা মোয়াতাজ ইউসুফ আহমেদ আল-আবসি বলেন, আমি যুদ্ধ শুরুর এক বছর আগে নতুন বাড়িতে উঠেছিলাম। খুব খুশি ছিলাম, ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছিল। এখন সব ধ্বংস হয়ে গেছে। সবকিছু হারিয়ে আমি আর কোনো ঘর বা আশ্রয় পাই না। এই ধ্বংসযজ্ঞ এখনো চলছে। ইসরাইলি মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র থেকে কয়েক ডজন ডি৯ বুলডোজার পেয়েছে আইডিএফ। বাইডেন প্রশাসন এগুলোর রপ্তানি আগে স্থগিত রেখেছিল। এ ছাড়া মে মাস থেকে অনেক ইসরাইলি ফেসবুক গ্রুপে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞে ঠিকাদার চেয়ে বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে। বিজ্ঞাপনগুলোতে ‘ফিলাডেলফি করিডোর’ এবং ‘মোরাগ অ্যাক্সিস’-এর মতো আইডিএফ নিয়ন্ত্রিত এলাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। বিবিসি ভেরিফাই এসব ধ্বংসের জন্য সামরিক ব্যাখ্যা জানতে চাইলে আইডিএফ বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। ডায়াকোনিয়া ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান ল’ সেন্টারের আইন বিশেষজ্ঞ ইইতান ডায়মন্ড বলেন, সামরিক প্রয়োজনের অজুহাতে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ব্যবহারের ভিত্তিতে বেসামরিক সম্পত্তি ধ্বংস করা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এথিকস, ল’ অ্যান্ড আর্মড কনফ্লিক্ট-এর সহপরিচালক অধ্যাপক জানিনা ডিল বলেন, কোনো দখলদার শক্তির উচিত সেই অঞ্চলের জনগণের কল্যাণে শাসন করাÑ কেবল পুরো এলাকা বসবাসের অযোগ্য করে দেওয়ার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই।

mzamin

সিরিয়ার সুয়েইদা ঘিরে জড়ো হচ্ছেন বেদুইন যোদ্ধারা, তীব্র লড়াই

যুদ্ধবিরতি ঘোষণা সত্ত্বেও সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ সুয়েইদায় দ্রুজ সম্প্রদায়ের সঙ্গে বেদুইন গোষ্ঠীর তীব্র লড়াই ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সিরিয়া সরকারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সীমিত সংখ্যায় ৪৮ ঘণ্টার জন্য সুয়েইদায় প্রবেশ করতে দিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল। দেশটির একজন কর্মকর্তা আজ শুক্রবার এ কথা জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইসরায়েলি ওই কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ায় চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সুয়েইদা জেলায় পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার জন্য সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীকে সীমিত আকারে প্রবেশ করতে দিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল।

তবে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সানা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, নতুন করে সুয়েইদা প্রদেশে মোতায়েনের জন্য সরকারি বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে না।

দ্রুজ একটি ক্ষুদ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী। ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে শিয়া মুসলিমদের একটি শাখা। লেবানন ও ইসরায়েলেও প্রভাবশালী এই গোষ্ঠীর অনুসারী রয়েছে। সম্প্রতি দ্রুজদের সঙ্গে বেদুইন গোষ্ঠীর সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষ থামাতে গত সোমবার সুয়েইদা প্রদেশে হস্তক্ষেপ করে সিরিয়ার সরকারি বাহিনী। কিছুদিন ধরে দ্রুজ ও বেদুইনদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও অপহরণ ঘিরে এই সংঘাতের সূচনা হয়েছিল।

সিরিয়ার সরকারি বাহিনী সুয়েইদায় প্রবেশ করলে তাদের ওপর হামলা চালান সশস্ত্র দ্রুজ সদস্যরা। দ্রুজদের সমর্থনে সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর ওপর বিমান ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইসরায়েল। একপর্যায়ে বুধবার সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে অবস্থিত দেশটির সামরিক সদর দপ্তর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছি স্থানে ইসরায়েল বিমান হামলা চালায়।

দামেস্কের বর্তমান সরকারকে ‘জিহাদি’ আখ্যা দিয়ে সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি মেনে না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েলি সরকার। নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এই অঞ্চলকে ‘বাফার জোন’ হিসেবে রাখতে চায় ইসরায়েল। যদিও সিরীয় বাহিনীর ওপর হামলার কারণ হিসেবে সংখ্যালঘু দ্রুজদের ‘সুরক্ষার’ কথা বলছেন ইসরায়েলি কর্মকর্তারা।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও আরব দেশগুলোর মধ্যস্থতায় দ্রুজদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়ে সুয়েইদা থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয় সিরিয়া সরকার। সরকারি বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর বেদুইনদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে দ্রুজ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে। এরপর আরব বেদুইন উপজাতি নেতারা দ্রুজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ঘোষণা দিলে গতকাল বৃহস্পতিবার দিনের শেষ দিকে ব্যাপক সংঘর্ষ শুরু হয়।

আরব বেদুইন উপজাতি নেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আজ শুক্রবার সকালের দিকে অন্যান্য বেদুইন গোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা সুয়েইদার আশপাশে জড়ো হন। তাঁরা শহরের দিকে অগ্রসর হতে চাইলে তীব্র লড়াই ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সংঘর্ষ বন্ধে স্থানীয় নেতারা সিরিয়ার সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সোমবার থেকে চলা সংঘর্ষের প্রথম চার দিনে অন্তত ৩৫০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী, নারী ও শিশু রয়েছে।

এখন পর্যন্ত সুয়েইদায় নতুন করে সরকারি বাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্বীকার করলেও সংঘাত থামানো নিয়ে পর্দার আড়ালে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে মনে করা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত মতৈক্য হলে সরকারি বাহিনী মোতায়েন হতে পারে।

সিরিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক লাবিব আল-নাহহাস আল-জাজিরাকে বলেন, দ্রুজদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর আরও বেদুইন গোষ্ঠী এ লড়াইয়ে যোগ দিতে শুরু করে। ফলে নতুন করে সহিংসতা ঠেকাতে ৪৮ ঘণ্টার জন্য সরকারি বাহিনীকে সুয়েইদায় প্রবেশ করতে দিতে সম্মত হয় ইসরায়েল।

লাবিব আল-নাহহাস বলেন, দামেস্ক এবং দক্ষিণ সিরিয়ার অন্যান্য এলাকায় ইসরায়েলের বিমান ও ড্রোন হামলার পর সুয়েইদার নিয়ন্ত্রণ নেয় দ্রুজদের প্রধান আধ্যাত্মিক নেতা শেখ হিকমাত আল-হাজারির মিলিশিয়া বাহিনী। কিন্তু বেদুইন গোষ্ঠী ও তাদের পরিবারের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে বড় ভুল করেছে তারা।

এদিকে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। ইসরায়েল সিরিয়াকে বিভক্ত করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু দ্রুজ জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সিরীয় প্রেসিডেন্ট।

সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুয়েইদা শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আরব বেদুইন যোদ্ধারা। আজ শুক্রবার আল–মাজরা গ্রামের কাছে
সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় সুয়েইদা শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আরব বেদুইন যোদ্ধারা। আজ শুক্রবার আল–মাজরা গ্রামের কাছে। ছবি: এএফপি

রাশিয়াকে মোকাবিলায় মার্কিন নির্ভরশীলতা, কোন পথে ইউরোপের রাজনীতি

ইউরোপের মার্কিন নির্ভরশীলতার কথা স্বীকার করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস। বিবিসি’র টুডে প্রোগ্রামে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইউরোপ অতীতে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এখন সময় এসেছে নিজেদের দায়িত্ব নেয়ার।

ওই সাক্ষাৎকারে মের্ৎস আরও বলেন, আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের আরও কিছু করতে হবে। আমরা অতীতে ফ্রি-রাইড করেছি, এটা সত্যি। এখন আমেরিকা চাইছে আমরা আরও দায়িত্ব নিই- আর আমরা সেটা নিচ্ছিও।

ঐতিহাসিক এক মৈত্রী চুক্তি করতে বৃটেন সফর করেছেন জার্মানির চ্যান্সেলর। এর মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলা ও যুব উন্নয়ন কর্মসূচি আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

মের্ৎস জানান, জার্মানি-বৃটেনের নতুন মৈত্রী চুক্তি পরস্পরের প্রতিরক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। যা আগে ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অংশ হিসেবে ছিল এবং এখন ন্যাটোর অংশ হিসেবেও বহাল।

দুই দেশের কোম্পানি ইতিমধ্যে টাইফুন যুদ্ধবিমান ও বক্সার সাঁজোয়া যান উৎপাদনে যৌথভাবে কাজ করছে। এখন তারা ২০০০ কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণেও একত্রে কাজ করছে। শিগগিরই  ইউক্রেনকে দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা জানিয়েছেন মের্ৎস। বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক এখন ভালো। নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন ফোনে কথা হয়। একসঙ্গে কাজ করছি। ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য ও শুল্কের মতো বিষয়গুলো সমন্বয় করা হচ্ছে। তিনি জানান, চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার চার দিনের মাথায় তিনি কিয়েভ সফর করেন, সেখানে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোনের সঙ্গে দেখা করেন।

ইউরোপের জন্য এখন রাশিয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ মনে করছেন মের্ৎস। বলেছেন, আমরা এক বিশাল হুমকি দেখছি। এই হুমকির নাম রাশিয়া। এটা শুধু ইউক্রেনের বিরুদ্ধে না, এটা ইউরোপের শান্তি, স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর হামলা।

জার্মান নির্বাচনের আগে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইউরোপের মিত্রদের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় কথা বলেন। এতে ইউরোপ জেগে উঠেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। কোনরাড অ্যাডেনাওয়ার ফাউন্ডেশনের লন্ডন অফিসের কানান আতিলগান বলেন, মিউনিখে মের্ৎসের উপলব্ধি ছিল- আমরা আমেরিকাকে হারিয়েছি, এখন নিজেদেরকেই নিজেদের রক্ষা করতে হবে। তার ওই মন্তব্যের পরেই জেলেনস্কির হোয়াইট হাউস সফরের চিত্র বদলে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেয়ার আগেই মের্ৎস জার্মান সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন। যাতে প্রতিরক্ষা বাজেট ব্যাপকভাবে বাড়ানো যায়। তিনি বিবিসিকে বলেন, আমাদের সেনাবাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাই আমাদের বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।

বর্তমানে একত্রে কাজ করছে বৃটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স। ‘ই থ্রি’ নামের একটি ত্রিদেশীয় জোট গড়ে তুলতে চায় তারা। এর মাধ্যমে নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেয়া হবে। মের্ৎস বলেন, আমি এখন কিয়ের স্টারমারের খুব কাছের মানুষ, ম্যাক্রোনের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন আগামী সপ্তাহে বার্লিন সফরে যাচ্ছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।

বিজয়ের রাতেই মেৎর্স মন্তব্য করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপের প্রতি প্রায় উদাসীন। এখনো সেই মন্তব্যে অটল তিনি। মের্ৎস বলেন, ট্রাম্প আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মতো স্পষ্ট বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপ থেকে মুখ ঘুরিয়ে এশিয়ার দিকে ঝুঁকছে। এ কারণেই ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আত্মনির্ভরতা বাড়ানো জরুরি।

আগামী ১লা আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সমঝোতার লক্ষ্যে ওয়াশিংটন গিয়েছেন ইইউ’র বাণিজ্য আলোচক মারোস শেফচোভিচ। মের্ৎস বলেন, উচ্চ শুল্ক জার্মান রপ্তানি শিল্প ধ্বংস করে দেবে। তবে আমার মনে হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট নিজেও বিষয়টি বুঝছেন এবং সমাধান চাচ্ছেন।

নতুন চুক্তিতে রয়েছে মানব পাচার রোধে জার্মান আইন পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি। জার্মানিতে ছোট নৌকা জমিয়ে রাখা পাচারকারীদের অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। তাছাড়া লন্ডন-বার্লিন সরাসরি রেল সংযোগ, এবং শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। মের্ৎস আশা করেন, সবার আগে এই মৈত্রী চুক্তির বাস্তব ফল পাবে শিক্ষার্থীরাই। কেননা উভয় দেশের ভবিষ্যত সম্পর্ক তারাই নেতৃত্ব দেবে।

mzamin

ইরানের পর এবার টার্গেট পাকিস্তান, কেন? by ফয়সাল হানিফ

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ গত মাসে সতর্ক করে বলেছিলেন, মুসলিম দেশগুলোকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নাহলে ‘সবার পালা আসবে’। তাঁর এই বক্তব্য যতটা না কূটনৈতিক আক্ষেপ, তার চেয়ে বেশি সতর্কতা সংকেত।

গত মাসে ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। পশ্চিমা নেতারা ও গণমাধ্যম বাস্তবতাকে উল্টে দিয়ে ইরানকেই হুমকি হিসেবে ঘোষণা করে। এ ঘটনায় যে গা হিম করা প্রশ্ন উঠে এল, তা হলো, এবার কার পালা?

‘বৈশ্বিক নিরাপত্তা’র নামে দশকের পর দশক ধরে একের পর এক দেশকে যেভাবে শয়তান ও অবৈধ তকমা দিয়ে নিশ্চিহ্ন করার ঘটনা ঘটে চলছে, তাতে বিষয়টিকে উপেক্ষা করা যায় না।

পশ্চিমের এখন আর জাতিসংঘের প্রস্তাবের প্রয়োজন পড়ে না। তাদের সামনে নতুন কৌশল চলে এসেছে। বর্তমানে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করে দেওয়া হয় সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম, অর্থনৈতিক অবরোধ ও বয়ান নির্মাণের যুদ্ধের মাধ্যমে। সেটা যদি ব্যর্থ হয়, তাতে সমস্যা নেই। ইসরায়েল যেভাবে আগাম ধারণার বশবর্তী হয়ে ইরানের ওপর হামলা করেছে, সেভাবে হামলার ন্যায্যতা তৈরি করা যাবে।

এবারে অন্তত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে একটা কৃতিত্ব দেওয়া যেতেই পারে। তিনি মুখ ফসকে সত্যটা বলে দিয়েছেন। দশকের পর দশক ধরে তিনি সতর্ক করে আসছিলেন যে বেয়ারা মুসলিম দেশগুলোর শাসকেরা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারেন। এর আগে ইরাককে বোমা মেরে ধ্বংস করা হয়েছে। লিবিয়াকে নিরস্ত্র করা হয়েছে। এখন ইরানকে গলা চেপে হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আর পাকিস্তান? এটাই শেষ সীমান্ত, তা এই কারণে নয় যে পাকিস্তান সবাইকে আক্রমণ করেছে, বরং এই কারণে যে পশ্চিমা ও জায়নবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে পাকিস্তান কৌশলগত, মতাদর্শগত ও প্রযুক্তিগত প্রতিরোধের প্রতীক।

এই যুক্তি এখন ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সম্প্রতি ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদন ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তান এমন আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যেটা যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। কোনো নিশ্চিত প্রমাণের দরকার নেই; শুধু ইঙ্গিতই সন্দেহ ছড়ানোর জন্য যথেষ্ট।

এটা ২০০১ সাল নয়। এখন আর কেউ স্যাটেলাইট থেকে তোলা ঝাপসা ছবি দিয়ে ‘ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের গল্প’ বানিয়ে বিক্রি করে না। কিন্তু উদ্দেশ্যটা সেই একই রয়ে গেছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে যেন এটা একটা বৈশ্বিক বোঝা।

ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ও নিরাপত্তাবিষয়ক থিঙ্কট্যাংকগুলো এখন নিয়মিতই পাকিস্তানকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করছে, যে রাষ্ট্র উগ্রবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করার জন্য মুখিয়ে আছে।

ডেইলি মেইলের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে সেই ক্লিশে বয়ান আবার দেখা গেল। পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব নাকি যুক্তিসঙ্গত কারণে নয়, ধর্মীয় উন্মাদনার বশবর্তী হয়ে ভারতের সঙ্গে সংঘর্ষের কিনারে পৌঁছে গেছে। একজন ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকের বরাতে সেখানে বলা হয়েছে, পাকিস্তান উগ্রপন্থী ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।

এ ধরনের অভিযোগ যে কতটা ফাঁপা, সেটা এই অঞ্চল সম্পর্কে যাঁর ন্যূনতম জ্ঞান আছে, তাঁর পক্ষে বোঝাটা যথেষ্ট। নানা সংকট থাকা সত্ত্বেও গত সাত দশকের বেশি সময়ে পাকিস্তান কখনোই কোনো ধর্মভিত্তিক দলকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনেনি। ভোটাররা সব সময় ব্যালটের মাধ্যমে ধর্মতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করে এসেছেন।

অন্যদিকে ভারত এমন একজনকে উৎসাহের সঙ্গে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে, যিনি ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যার সময় সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। অভিযোগ আছে যে তিনি সে সময় চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন। সেই ব্যক্তি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, এখন এমন একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যে দল প্রকাশ্যেই একটি হিন্দু জাতীয়তাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের কথা বলে, যেখানে মুসলমান ও অন্য সংখ্যালঘুদের প্রান্তিক করে তোলা হবে।

এরপরও ব্রিটিশ ও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের একটা বড় অংশ ভারতকে এখনো যুক্তিবাদনির্ভর রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের বাতিঘর হিসেবে দেখে। এই দ্বিচারিতাকে হাস্যকর বলা যেত যদি সেটা বিপদজ্জনক না হতো।

গত এপ্রিলে পেহেলগামে হিন্দু তীর্থযাত্রীদের ওপর ট্র্যাজিক হামলার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে বিবেচনায় নেওয়া যাক। সেই ঘটনায় পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ না দিয়েই সীমান্ত পার হয়ে সামরিক অভিযান শুরু করে ভারত।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম অনেকটাই দিল্লির বয়ানকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করে। এর বিপরীতে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বৈরিতাপূর্ণ সাক্ষাৎকারের মুখোমুখি হতে হয়। সন্ত্রাসবাদ ইস্যুতে তাঁদের আবারও কাঠগড়ায় তোলা হয়। এই চিত্রায়ন হতাশাজনকভাবে নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।

এখানে একটা অঘোষিত ও অব্যর্থ যুক্তি আছে। সেটা হলো, হিন্দু জাতীয়তবাদী রাজনীতি, সেটা যতই সহিংস হোক না কেন, সেটাকে কারও রাজনৈতিক পছন্দ হিসেবে চিত্রায়িত করা হবে। অর্থাৎ, পরিতাপ করার মতো বিষয় হলেও, সেটা বৈধ। ইসলামপন্থী রাজনীতি, সেটা ক্ষমতার ধারেকাছে না থাকলেও, সেটাকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখা হবে।

পাকিস্তান বিষয়ে পশ্চিমা সমস্যাটা আসলে দেশটি যা করছে তার জন্য নয়। বরং পাকিস্তান যেসব বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করে, তার জন্য। পাকিস্তান একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র, একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং চীনের মিত্র। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় এই তিনের সম্মিলন হলো চূড়ান্ত বিপৎসীমা।

* ফয়সাল হানিফ, সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং-এর একজন বিশ্লেষক
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

পাকিস্তানের ক্ষেপনাস্ত্র মহড়া
পাকিস্তানের ক্ষেপনাস্ত্র মহড়া। ফাইল ছবি: এএফপি

আল মাহমুদের কাব্যচিন্তা ও গ্রামে প্রত্যাবর্তনের অর্থবহতা by সুহৃদ সাদিক

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কবিতায় গ্রামে প্রত্যাবর্তনের আকুতি নিছক ‘আত্মজৈবনিক অনুভব’ কিংবা ‘স্মৃতিনির্ভর নস্টালজিয়া’ নয়; বরং তা এক সুগভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। তার কবিতায় গ্রাম একটি প্রতীকী পরিসর, যা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা ও নগরভিত্তিক পুঁজিতান্ত্রিক জীবনের কৃত্রিমতা, বিকার এবং সংস্কারমূলক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক বিকল্প জীবনচেতনা ও কৌম-সচেতনতার জোরালো অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে। ‘সোনালি কাবিন’ সহ বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে আল মাহমুদ যে গ্রামীণ জগৎ নির্মাণ করেছেন, তা কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য বা আবেগঘন স্মৃতির পুনরাবৃত্তি নয়-বরং তা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ-নির্মাণ। পাশ্চাত্যনির্ভর নাগরিক জীবনযাপনের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা ও আত্মশূন্যতার বিপরীতে তিনি বপন করতে চেয়েছেন এক প্রাণময়, শেকড়-সংলগ্ন লোকায়ত জীবনের স্বপ্ন। এভাবে তার কবিতা হয়ে ওঠে এক বিকল্প কাব্যতাত্ত্বিক প্রকল্প-যেখানে ঔপনিবেশিকতার চেতনা, ঐতিহ্যনিষ্ঠ জীবনবোধ এবং আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম একসূত্রে গাঁথা। আল মাহমুদের কাব্যচিন্তা নিছক সাহিত্যিক প্রবণতা নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা, যা আধুনিকতাবাদের চাপিয়ে দেয়া একমাত্রিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আত্মনির্ভর, স্বদেশভিত্তিক কাব্যভুবনের দাবি তুলে ধরে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তার কবিতাকে ঔপনিবেশায়ন ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদবিরোধী সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে।

আল মাহমুদের সময়কাল ছিল এক গভীর সংকটের সময়-স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে একদিকে রাজনৈতিক দিশাহীনতা। অন্যদিকে ছিল সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ তথা ইউরোপকেন্দ্রিক কিংবা কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিকতার প্রাবল্য। তিরিশের কবিদের নাগরিকতা ও ইউরোপীয় নিঃসঙ্গতাবাদকে অনুসরণ করে বাংলা কাব্যে যে ভঙ্গুর, আত্মবিচ্ছিন্ন এবং নির্জীব নগরজীবনের অনুরণন তৈরি হয়েছিল, আল মাহমুদ তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন জোরের সঙ্গেই। শহুরে নাগরিকতার বিপরীতে তিনি ‘গ্রামে ফেরা’-এই কাব্যিক অভিপ্রায়কে রচনা করেছেন এক সাংস্কৃতিক আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রকল্প হিসেবে। তার ভাষায়: “আমি আমার কবিতায় প্রথম থেকেই গ্রামকে উত্থাপন করতে চেয়েছি... গ্রামকেই প্রাধান্য দিয়েছি; কারণ যাকে বলে ধনতান্ত্রিক নাগরিক জীবন... আমি তেমন পরিবেশে বেড়ে উঠিনি।” এই বক্তব্য কেবল জীবনবোধের ভিন্নতা নয়, এটি মূলত ঔপনিবেশিক আধুনিকতার একচেটিয়া সাংস্কৃতিক প্রতিমূর্তি বা মেট্রোপলিটন মডেলের প্রতিবাদী প্রকল্পও বটে। আল মাহমুদের কবিতায় গ্রাম কেবল একটি ‘স্থান’ নয়, এটি একটি ‘ঐতিহাসিক চেতনার ক্ষেত্র’ যেখানে লুকিয়ে আছে জাতির আত্মপরিচয়, লোকজ স্মৃতি, নৈতিক চর্চা, প্রেম, দ্বন্দ্ব এবং শৌর্যের উপাখ্যান। তিনি আধুনিকতার বয়ানে বিস্মৃত ‘সাবঅল্টার্ন’ গ্রামীণ জীবন ও লোকায়ত ঐতিহ্যকে দৃশ্যমান করে তোলেন। ঔপনিবেশিক শিক্ষায় শিক্ষিত নাগরিক শ্রেণির দৃষ্টিতে যা ‘আধুনিকতার অন্তরায়’, আল মাহমুদের কাছে তা ‘ঐতিহ্যগত শক্তি’। তার কবিতায় দেখা যায়: “কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী... কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিংবা নাড়ার দহন।” এই কবিতার চিত্রকল্পগুলো সাংস্কৃতিক আত্মোন্মোচনের গূঢ় কৌশল। এখানে কবি একটি বিকল্প জগৎ রচনা করছেন যা আধুনিক, পুঁজিবাদী ও শহুরে সংস্কৃতির বিরুদ্ধ ধারায় প্রবাহিত। ঔপনিবেশিক শক্তি কেবল রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নয়, তা সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকেও সচেষ্ট থাকে। তারা স্থানিক সংস্কৃতিকে ‘লোকাচার’ বা ‘প্রাক-আধুনিক’ আখ্যা দিয়ে পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষানীতি ও সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে ঔপনিবেশিক জীবনবোধ চাপিয়ে দেয়। আল মাহমুদের কবিতায় এই প্রক্রিয়ার বিপরীতে প্রবল আপত্তি পাওয়া যায়। ‘খড়ের গম্বুজ’ কিংবা ‘পলাতক’ কবিতায় তিনি দেখান নগরজীবনের অন্তঃসারশূন্যতা এবং তার কদর্যতা-যা গ্রামীণ আত্মপরিচয়ের বিপরীত।

নগরের ‘নিভাঁজ পোশাক’, ‘সেলাই’, ‘কঠিন প্যান্ট’ ইত্যাদি কবিতার চিত্রকল্পের পরতে পরতে আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিক জীবনচর্চার কৃত্রিমতা এবং দাসত্বপ্রবণতা স্পষ্ট। আল মাহমুদের ‘প্রত্যাবর্তন’ নিছক বাস্তব ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়; এটি আধুনিকতা ও ঔপনিবেশিক বিশ্বদৃষ্টির একটি কাব্যিক পাল্টা আঘাত। ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’ কবিতায় দেখা যায় গ্রামে ফেরার জন্য কবি মোটেই লজ্জিত নন; বরং নাগরিক কৃত্রিমতা ত্যাগ করে নিজ শেকড়ে ফিরে যাওয়ার জন্য তিনি আনন্দিত। তিনি লেখেন: “আমার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাকে ঘষে ঘষে তুলে ফেলবো।”এই পঙ্ক্তিটি সাংস্কৃতিক দাসত্বের বিরুদ্ধে আত্মমুক্তির প্রতীক। এই ‘ফেরার ইচ্ছা’ উপনিবেশবাদবিরোধী লেখকদের এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য, যেখানে তারা পশ্চিমা আধিপত্যবাদী সংস্কৃতির পরিবর্তে নিজেদের ভাষা, মাটি ও ঐতিহ্যে আত্মপরিচয় নির্মাণ করতে সচেষ্ট হন।

আল মাহমুদের কবিতায় ‘গ্রাম’ একটি সক্রিয়, প্রতিরোধী, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কাঠামো। তিনি বলেন: “গ্রাম বলতে আমি যূথবদ্ধ আদিম মানবজীবনকে বুঝি না... ধনতান্ত্রিক নগরসভ্যতার বিরুদ্ধে গেরিলা বাহিনী গড়ে তুলেছেন... তারা আসলে গ্রামেরই লোক।” এখানে গ্রাম প্রতিরোধের প্রতীক, এক বিপ্লবী চেতনার ঘাঁটি। এটি গভীরভাবে উপনিবেশায়নবাদী অবস্থান। ইউরোপকেন্দ্রিক বয়ানে ‘গ্রাম’ যে পশ্চাৎপদতা বা অনুন্নয়নের প্রতীক, আল মাহমুদ তা প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার অবস্থান পুনর্গঠন করেন। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সাংস্কৃতিক অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ স্থাপন করে থাকে-যেখানে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ‘নগর’-কে প্রাধান্য দেয়, আর ‘গ্রাম’-কে প্রান্তিক করে তোলে। আল মাহমুদ তার কবিতায় এই সাংস্কৃতিক উপনিবেশের বিরুদ্ধে জাতিগত আত্মপরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে ‘গ্রাম’, ‘লোকজ সংস্কৃতি’, ‘ভাষা’ এবং ‘ঐতিহ্য’-কে পুনঃস্থাপন করেন। তার কবিতা ‘স্বপ্নের সানুদেশে’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক স্বপ্নরাজ্য নির্মাণ করে যেখানে নগরের স্থানে গ্রাম উঠে আসে: “স্বপ্নের সানুদেশে আমরা শস্যের বীজ ছড়িয়ে দেবো...”এটি রূপক মাত্র নয়, এটি কবির সংস্কৃতিচেতনার রাজনৈতিক রূপায়ণ।

আল মাহমুদের কবিতায় গ্রামে প্রত্যাবর্তনের আকুতি নস্টালজিক রোমান্টিসিজমের প্রকাশ না হয়ে একটি সুগভীর ঔপনিবেশিক কাব্যচেতনার বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে। তিনি ঔপনিবেশিক আধুনিকতার ছাঁচে কবিতা লেখেননি, বরং গ্রামীণ লোকজীবনের ভাষা, ছন্দ, অনুভব ও বাস্তবতার ভেতর থেকে নির্মাণ করেছেন নিজের কাব্যভাষা-যা নগরভিত্তিক আধুনিকতার কৃত্রিমতা থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তার কবিতায় ‘গ্রাম’ শুধুমাত্র ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী অনুঘটক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ক্ষেত্র। এই লোকজ-গ্রামীণ সংস্কৃতিই তার কবিতায় হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক। ফলে আল মাহমুদের কবিকণ্ঠ হয়ে উঠেছে উপনিবেশোত্তর বাংলার সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদবিরোধী সাহিত্যধারার এক বলিষ্ঠ ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। জীবনানন্দের প্রতীকী নিঃসঙ্গতা বা জসীমউদ্‌দীন লোকগাথার নান্দনিক অভিব্যক্তিকে ছাড়িয়ে আল মাহমুদ গ্রামকে দেখেছেন প্রতিরোধ, সংগ্রাম ও পুনর্নির্মাণের সম্ভাবনায়। এই ভাবনাই তাকে আধুনিক বাংলা কবিতায় ‘লোকায়ত রাজনৈতিক কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে তার কবিতা হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক মুক্তির জ্বলন্ত ও ভারবাহী ভাষ্য।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

mzamin